Monday, September 11, 2017

বোনামপল্লীর ছেলেটা

কলেজে পড়তে অভীক পাখি দেখত জঙ্গলে জঙ্গলে ঘুরে। চাকরি পেয়ে সে সব মাথায় উঠেছিল, তবু ইচ্ছে ছিল ষোল আনা, তাই কুশল যখন ফোন করে বলল সামনের মাসে একটা সার্ভে শুরু হচ্ছে, এক বিরল প্রজাতির প্যাঁচার খোঁজে, তার খানিকটা দেশের বাইরে, এক কথায় রাজি হয়ে গেল। সে দেশে কাজ করেছে ও, ভাষাটা ভালোই বলতে পারে বলেই কুশল ওর কথা ভেবেছে।
অভীক একলা। পিছুটান নেই। বেরোতে অসুবিধা নেই। কেবল অফিসের বসকে একটা ধমক দিতে হয়েছিল - যে অফিস দু’সপ্তাহ আমাকে ছাড়া চলতে পারবে না, সে অফিসে আমার কাজ করা উচিত কি না, ভাবতে হবে… এই রকম আর কি!
পাহাড়ী ঢালে তাঁবু খাটিয়ে গ্রামে গ্রামে ঘুরে ঘুরে প্যাঁচা খোঁজে, কিন্তু পায় আর না। বয়স্ক লোকেরা ছবি দেখে, রেকর্ড করা ডাক শুনে বলতে পারে, এই বীভৎস ডাকে তারা ছোটোবেলায় ঘুম থেকে উঠে বসে কান্নাকাটি করত! ঠিক। এমনই সবাই লিখেছে বটে। জিম করবেট তো “মাই ইন্ডিয়া” বইতে লিখেছেন চুড়েল (পেত্নী)-এর চিৎকার।
শেষে কুশল বলল, “মনে হচ্ছে এ দিকে আর নেই। এক্সটিঙ্কট হয়ে গেছে। আরও ভেতরে যদি থাকে। ধর...” বলে ম্যাপ খুলে দেখাল, “এই যে কণ্টাকাঁই, তার পরে পিকুলদাঁড়ি আর শেষে দীঘলাগড়। পুরোটা ডেন্স ফরেস্ট। দিঘলাগড়েই আমাদের সার্ভে এরিয়া শেষ।”
“তাহলে চল, পা চালিয়ে আমরা তাড়াতাড়ি কণ্টাকাঁই যাই...”
কণ্টাকাঁইতে রেঞ্জ অফিসারকেই পাওয়া গেল। সবুজসুন্দর গাথানি। মজার মানুষ। হা হা করে হাসেন, খুব আড্ডা দিতে পারেন। বললেন, “টেন্ট-ফেন্টের প্রশ্নই নেই। আপনারা আমার গেস্ট। সব ব্যবস্থা করে দেব। আরে আমি মশাই এখানকার খানদানি ফরেস্টার। আমার বাবাও এই জঙ্গলের রেঞ্জার ছিলেন। জঙ্গল ভালোবাসতেন বলে দাদু আমার নাম রেখেছেন সবুজসুন্দর। দাদু ফরেস্ট গার্ড ছিলেন।”
এক বেলার মধ্যে সবুজ-দা হয়ে গেলেন ভদ্রলোক।
কণ্টাকাঁইয়ের আশেপাশের জঙ্গলে কাঙ্খিত প্যাঁচার খোঁজ পাওয়া গেল না। দু-দিন কাটিয়ে পরদিন ওদের যাবার কথা পিকুলদাঁড়ি। কুশলের মনে আশা - ওখানেই পাওয়া যাবে। পুরোনো বইপত্রে এ প্যাঁচার কথা রয়েছে।
সন্ধেবেলা জিনিসপত্র গোছাচ্ছে, সবুজদা এসে বললেন, “পিকুলদাঁড়ি গিয়ে কোনও লাভ নেই। বইয়ে যা লেখা আছে, তা পাবেন না। পঞ্চাশ-ষাট বছর আগে ছোটো শহর ছিল, বেড়ে বেড়ে বিশ্রী বিজনেস সেন্টার হয়ে গিয়েছিল। গত বছর দশেকে ওখানকার বিজনেস আবার বন্ধ – এখন তো আর পাহাড়ে গাছ কাটা বারণ। কেবল মাতাল আর গেঁজেলদের আড্ডা। সপ্তাহে এক-দুটো মার্ডার লেগেই আছে। অনেকে তো ছেড়ে চলেও গেছে।”
“কোথায় যাব তাহলে?” জানতে চাইল কুশল।
“যাবেন বোনামপল্লী,” বললেন সবুজদা। “আমার এরিয়াতে ওখানেই মোস্ট ডেন্স ফরেস্ট। ওখানেই চান্স সবচেয়ে বেশি।”
ম্যাপে খুঁজতে খুঁজতে কুশল বলল, “কই, বোনামপল্লী বলে তো কোনও...”
আঙুল দিয়ে দেখিয়ে সবুজদা বললেন, “পিকুলদাঁড়ি যাবার পথে এইরকম কোথাও একটা রাস্তাটা সাউথে গেছে, সেই রাস্তা ধরে নামতে হবে। ম্যাপে নাম পাবেন না। অনেক বছর আগে ওখানে বোনামপল্লী ছিল। এখন কিছুই নেই।”
অভীক জিজ্ঞেস করল, “কেন?”
হা হা করে হেসে সবুজদা বললেন, “কাল বলব, চলুন তো আগে।”
পিকুলদাঁড়ি গিয়েই বোঝা গেল কোনও কাজ হবে না। নোংরা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, মানুষজন সব কেমন যেন, সব মিলিয়ে পনেরো মিনিটেই হাঁপ ধরে গেল। ওদের মুখের চেহারা দেখে সবুজদা রওয়ানা দিলেন বোনামপল্লীর দিকে।
পাহাড় বেয়ে কাঁচা রাস্তা নেমেছে গিরিখাতের কুটরি নদীতীর অবধি। আড়াইশো তিনশো বছর আগে বোনামপল্লী ছিল এখানকার রাজধানীর পল্লী। রাজধানীর নাম ছিল কৃপানগড়। পরে রাজা রাজধানী সরিয়ে নিয়ে যান দিঘলাগড়ে। খালি কৃপানগড় পড়ে থাকে পাহাড়ের মাথায়।
নদীতীরের ওপারে থাকে থাকে পাহাড় উঠেছে - প্রথম সারির পাহাড় নিচু, তার পরে আরও উঁচু, তার পেছনে আরও, এমনি করে সবার পেছনে, আকাশের গায়ে আঁকা বরফে ঢাকা এক সারি পাহাড়। একেবারে নিচের পাহাড়ের চুড়োয় একটা ধ্বংসাবশেষ দেখিয়ে সবুজদা বললেন, “ওই দেখুন। কৃপানগড় দুর্গ। এখন ওইটুকুই বাকি রয়েছে।”
কুশল বলল, “দুর্গ তো বিরাট হয়। আপনাদের দেশের দুর্গ আবার বেশ শক্ত পোক্ত। সবই যত্ন করে রাখা। এটার এরকম দুরবস্থা কেন?”
সবুজদা বললেন, “এটা অনেক আগেই নষ্ট হয়ে গেছে। দিঘলাগড়ের দুর্গও নয়-নয় করে প্রায় চার-সাড়ে চারশো বছরের পুরোনো। তখন থেকেই এটা পড়ে আছে। আশি-নব্বই বছর আগে কৃপানগড়ে আগুন লাগে। সমস্ত দুর্গটাই জ্বলে ছাই হয়ে যায়। ওইটুকুই আছে। তার পরেই বোনামপল্লীর লোকে ভয় পেয়ে এখান থেকে চলে গেছে। লোকাল লোকে মানে এই জায়গাটা খারাপ। তাই এখানে কেউ থাকে না। আশেপাশে কোনও ভিলেজ নেই, কোনও বসতি নেই।”
অভীক হেসে বলল, “আচ্ছা লোক আপনি! এমন আনলাকি জায়গায় আমাদের থাকতে বলছেন?”
সবুজদা এত জোরে হাসলেন, যে গাছ থেকে একটা ঘুঘু উড়ে গেল ফটফটিয়ে। বললেন, “আপনারা এসব সুপার্স্টিশনে বিশ্বাস করেন না। নইলে আনতাম না। তবে আপনারা যে প্যাঁচার ডাকের রেকর্ডিং এনেছেন – তা আমি নিজের শুনেছি এই জঙ্গলে। মেন রোড দিয়ে যেতে যেতে, রাতের বেলা। তবে ওখানে তো টেন্ট লাগাবার জায়গা নেই, তাই এলাম নদীর ধারে। যে দু’ দিন পিকুলদাঁড়িতে থাকবেন ভেবেছিলেন, এখানে থাকুন। ভালো লাগবে। ফুড নিয়ে ভাববেন না, আমি পাঠিয়ে দেব। দু’ দিন পরে আমার গাড়িতেই চলে যাবেন দিঘলাগড়।”
টেন্ট খাটিয়ে, লোকজন দিয়ে শুকনো কাঠকুটো জোগাড় করে দিয়ে, ওদের সঙ্গে দ্বিপ্রাহরিক ভোজন সেরে সদলবলে চলে গেলেন সবুজদা। যাবার সময় টিফিন-ক্যারিয়ার ভর্তি খাবার দিলেন রাতের জন্য। বললেন, “জঙ্গলে আগুন জ্বালেন না, তবু ফায়ারউড থাক। কখন কী হয়। খাবারটাও থাক, প্যাক্‌ড্‌ ফুড খেয়ে খেয়ে চলে নাকি মশাই! বলেছি, আপনারা আমার গেস্ট! সকালে আমার লোক আসবে ব্রেকফাস্ট নিয়ে। গুডলাক!”
সবুজদা চলে যাবার পরে জঙ্গলটা ঝিমিয়ে পড়ল। সূর্য আকাশের মাঝখানে। পাহাড়ে শীত শেষ হয়নি, রোদ্দুরে থাকলেও জ্যাকেট পরতে হয়। বিকেল হবার আগেই সব সরঞ্জাম গুছিয়ে নিল ওরা। অন্ধকারে দেখার বাইনোকুলার, ক্যামেরা, স্ট্যান্ড – এবং, প্যাঁচার ডাক রেকর্ড করার জন্য সাউন্ড রেকর্ডিং-এর যন্ত্রপাতি, লম্বা মাইক্রোফোন, সব সাজিয়ে নিল হাতের কাছে।
থমথমে জঙ্গলে দুজনে বসে। নদীর ওপারে পাহাড়ের মাথায় জঙ্গল থেকে মাথা উঁচিয়ে আছে দুর্গের ভাঙা মিনার। কুশল নদীর দিকে পেছন করে বসল। বলল, “অস্বস্তি হচ্ছে। একটা দুর্গ পুরোটা জ্বলে শেষ হয়ে গেল, ওইটুকু রয়ে গেল, তা হয় নাকি?”
নদীর দিকে পেছন করে বসলেও মজা কম। তাই দুজনেই নদীকে পাশে রেখে ফোল্ডিং চেয়ার ঘুরিয়ে মুখোমুখি বসল।
পাহাড়ে সন্ধে নামে হঠাৎ। এই জ্বলজ্বল করছে সূর্য, এই সূর্য পাহাড়ের ওপারে চলে গেল। ওমনি নিচের উপত্যকায় ছায়া এসে পড়ল। দেখতে দেখতে ঘনিয়ে এল অন্ধকার। এই জঙ্গলে হিংস্র জন্তু নেই বললেই চলে। একমাত্র পাহাড়ি চিতাবাঘ বরফের রাজ্যে থাকে। ক্রমে সূর্যের অভাব চোখে সয়ে গেল। আকাশ ছেয়ে গেছে তারায়। ফোল্ডিং চেয়ার আরও এলিয়ে দিয়ে দুজনে দৃষ্টি মেলে দিল আকাশের দিকে।
চারিদিক ঝিমঝিম করছে অন্ধকারে, রাতের জঙ্গল থেকে তারস্বরে চেঁচাচ্ছে ঝিঁঝিঁপোকা, দুই বন্ধু মৃদুস্বরে কথা বলছে, দূর থেকে কখনও ভেসে আসছে রাতচরা পাখির ডাক। কিন্তু সেই প্যাঁচা কোথায়, যার সন্ধানে আসা?
প্যাঁচার খোঁজে আসা, তাই বেশি রাত অবধি অপেক্ষা করা উচিত। দুই বন্ধু জেগেই রইল। অন্ধকারে।
মাঝরাতের কাছাকাছি তীব্র কর্কশ ডাকে চমকে উঠল দুজনে। ছোঁ মেরে মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে তৈরি হয়ে রইল অভীক। আরও তিন বার ডাক এল, ওদের যন্ত্রবন্দী হয়ে রইল দুর্লভ প্যাঁচার কণ্ঠস্বর, যে ডাক শুনে রাতের বেলা ভীত গ্রামবাসীরা ভাবত পেত্নী এসেছে।
ক্যামেরা হাতে এদিক ওদিক ঘুরে এল দুজনে। কিন্তু দেখা দিল না পাখি। মাঝরাতের পরে উঁচু পাহাড়ের মাথার ওপরে আকাশটা উজ্জ্বল হয়ে উঠল। পুব আকাশে চাঁদ উঠেছে। পাহাড় পেরিয়ে মাঝ-আকাশে আসতে এখনও কিছু দেরি।
“আর অপেক্ষা করবি?” জিজ্ঞেস করল অভীক। কুশল মাথা নেড়ে বলল, “নাঃ,। শুয়ে পড়ি। কাল সকালে একবার ওই দুর্গে যাব। কিছু একটা টানছে। মনে হচ্ছে ইন্টারেস্টিং কিছু পাব।”
অভিক হেসে বলল, “গুপ্তধন?”
মাথা নেড়ে কুশল বলল, “না। চামচিকে বা বাদুড় জাতীয় কিছু ভাবছি।”
ব্যাটারি চালিত রিচার্জেব্ল লণ্ঠন বের করে দুজনে খেতে বসল। সামান্য আলোও জঙ্গলে অনেক। কিন্তু চার পাশে আলোর বৃত্তের বাইরেটা অদৃশ্য হয়ে গেল অন্ধকারে। নদীর কলকল শোনা গেলেও তার অস্পষ্ট সাদা ফেনাতোলা স্রোত আর দেখা যায় না, আর মাথার ওপরে ঝুঁকে পড়া গাছের পাতা কটার বাইরে আর সবই গাঢ় আঁধার।
অভীক লক্ষ করল কুশল খানিক পরে পরে যেন অন্যমনস্ক হয়ে যাচ্ছে। বলল, “কী হয়েছে?”
কুশল বলল, “কিছু শুনতে পাচ্ছিস?”
শুনতে? কী শুনবে? রাতের জঙ্গলের আওয়াজ মানে তো ঝিঁঝিঁপোকা আর…
হঠাৎ অভীকের খেয়াল হলো, জঙ্গলটা একেবারে নিস্তব্ধ। কোনও শব্দ নেই। কান-ফাটানো ঝিঁঝিঁপোকার ডাক কখন থেমে গেছে।
জিজ্ঞেস করল, “রাত বাড়লে ঝিঁঝিঁপোকা চুপ করে যায়?”
কুশল মাথা নাড়ল। চাপা গলায় বলল, “আস্তে করে বাঁ হাতে তোর টর্চটা নে তো।”
দুজনেরই হাতের কাছে টর্চ আছে। আস্তে আস্তে টর্চটা তুলে নিয়ে অভীক বলল, “কোনদিকে কী দেখব?”
কুশল তেমনই চাপা গলায় বলল, “আমার পেছন দিকে সরাসরি জ্বালা তো? মনে হচ্ছে কী যেন দাঁড়িয়ে আছে।”
অবাক হল অভীক, কিন্তু কুশল চিরকালই ঠাণ্ডা মাথা ছেলে। চট করে কিছুতে ভয় পায় না। তাই দ্বিরুক্তি না করে টর্চটা জ্বালাল।
কিছু নেই।
কুশলও পেছনে ঘুরেছিল। বলল, “খালি মনে হচ্ছে পেছনে কি আছে।”
দুজনে আবার খাওয়ায় মন দিল। কিন্তু কুশলের অস্বস্তি কাটে না। খালি ঘুরে দেখে। একবার নিজের টর্চ জ্বালাল অভীকের পেছনের জঙ্গলের দিকে। কিছুই নেই।
অভীক খাওয়া শেষ করে থালা ধুয়ে নিল নদীর জলে। বলল, “চ’, শুয়ে পড়ি। রাত অনেক হয়েছে।”
কুশল মাথা নাড়ল। না। কিছু বলল না।
অভীক বলল, “কুশল, এখন রাত একটা বেজে গেছে। এখন ঘুমিয়ে না পড়লে আর সকালে উঠে দুর্গ দেখা যাবে না।”
কুশল বলল, “দুর্গ দেখতে হবে না। কাল সকালে এখান থেকে পালাব। অনেক হয়েছে।”
অভীক অবাক, অনেক দিন কুশলের সঙ্গে জঙ্গলে ঘুরেছে। এই রূপ দেখেনি কখনও। বলল, “আচ্ছা বেশ, কিন্তু টেন্টে ঢুকে বস। ফোল্ডিং চেয়ারটা ঢুকিয়ে নে।” মনে মনে ভাবল, “আমি স্লিপিং ব্যাগে ঢুকলে আর বসে থাকতে ইচ্ছে করবে না।”
কুশল চেয়ারটা টেন্টের মধ্যে নিয়ে এল, কিন্তু অভীকের ঘুম আসা অবধি চেয়ার ছেড়ে নড়ল না। অমনিই বসে রইল বাইরের দিকে চেয়ে।
রাত তখন কটা খেয়াল নেই, কুশলের আলতো টোকায় ঘুম ভাংল অভীকের। নিঃশব্দে উঠে বসল অভীক।
বাইরে অস্পষ্ট পায়ের শব্দ।
আলো নিভিয়ে শুতে গেছিল। তাঁবুর ভেতরে অন্ধকার। বাইরে আলো বেড়েছে। আধখানা চাঁদ পুবের পাহাড় টপকে দেখা দিয়েছে নিশ্চয়ই। রাত প্রায় চারটে। ভোর হতে দেরি নেই। রাতের সঙ্গে শিতও বেড়েছে। বাইরে নদীর জল থেকে অল্প বাষ্প উঠে কুয়াশার মতো ছেয়ে গেছে। তাঁবুর ফ্ল্যাপ নামায়নি কুশল। বাইরেটা যতটুকু দেখা যাচ্ছে কেউ নেই।
যথাসম্ভব নিঃশব্দে অভীক সোয়েটার পরে নিল, মাথায় দিল উলের টুপি। টর্চ নিয়ে হামা দিয়ে দুজনে তাঁবুর দরজার কাছে গেল। বাইরে, ঝকঝকে চাঁদের আলোয়, ওদের ফায়ারউডের স্তুপের কাছে ঘুরছে একটা বাচ্চা ছেলে!
অব্যক্ত একটা চুক্তির মতো দুজনে একসঙ্গে টর্চ জ্বালাল। হঠাৎ গায়ে আলো পড়তে ছেলেটা চমকাল না মোটেই। বরং আস্তে আস্তে ঘুরে দাঁড়িয়ে একটু হাসল।
অভীক এ দেশের ভাষা ভালোই বলে। তাই ও-ই বলল, “কে তুমি? এত রাতে এখানে কী করছ?”
ছেলেটা উত্তর দিল না। উলটে প্রশ্ন করল, “তোমরা কে? এখানে এসেছ কেন?”
কুশল আস্তে আস্তে বলল, “সবুজদা বলল যে, এখানে কোনও গ্রাম নেই, তাহলে এই ছেলেটা এখানে এল কী করে?”
অভীক টর্চ নিভিয়ে বাইরে বেরিয়ে উঠে দাঁড়াল। আবার টর্চ জ্বালিয়ে ছেলেটার পায়ের কাছে ফেলল যাতে চোখে আলো না পড়ে। এবার আর একটা জিনিস বোঝা গেল। ছেলেটা বৌদ্ধ ভিক্ষু। অভীক বলল, “তুমি বৌদ্ধ ভিক্ষু? শ্রামনেরা? এখানে কোথায় তোমার গুম্ফা?”
ছেলেটাও দু’পা ওদের দিকে এগিয়ে এল। বলল, “গুম্ফা এখানে না।”
ছেলেটার পা খালি। পাহাড়ে ঠাণ্ডার জন্য গরিবরাও জুতো পরে। কুশল বলল, “তোমার জুতো নেই?”
ছেলেটা বলল, “খুলে পড়ে গেছে। তোমরা এখানে কী করছ?”
অভীক বলল, “আমরা পাখি খুঁজতে এসেছি। প্যাঁচা। এখানে কোনও ভয়ানক প্যাঁচার ডাক শুনেছ? শুনতে লাগে যেন পেত্নি চেঁচাচ্ছে? আমরা কাল সন্ধেবেলা শুনেছি। দেখিনি।”
কুশল অভীককে থামিয়ে দিয়ে আবার জিগেস করল, “তুমি কি এর আগেও এখানে এসেছিলে? আমরা যখন খাচ্ছিলাম?”
ছেলেটা কুশলের দিকে তাকিয়ে বলল, “আমি তো এখানেই থাকি - সবসময়।”
“এখানে? এই জঙ্গলে?”
নদীর ওপারের পাহাড়ের দিকে আঙুল তুলে বলল, “না, ওই ওখানে।”
অভীক বলল, “ওই দুর্গের ধ্বংসের মধ্যে? ওখানে কী করে থাক? আর কে থাকে?”
মাথা নাড়ল ছেলেটা। “কেউ না। আমি একা।”
ইয়ার্কি মারছে। ওরা আবার তাকাল নদীর ওপারে। ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে পুবের আকাশে, কিন্তু নদীর গিরিখাত এখনও অন্ধকারে ঢাকা। কৃপানগড়ের ধ্বংসাবশেষ প্রায় দেখাই যায় না।
অভীকের হঠাৎ কী মনে হল, বলল, “চলো, তোমার সঙ্গে তোমার থাকার জায়গা দেখে আসি।”
কুশল আঁৎকে উঠল। একবার বলতে গেল, “না,” কিন্তু অভীকের মাথায় কিছু ঢুকলে আর সেটা বেরোয় না। ছেলেটাকে বলল, “এক মিনিট। দাঁড়াও,” বলে তাঁবুতে ঢুকে গেল। বাধ্য হয়ে কুশলও গেল পিছু পিছু। বলল, “তুই এই অন্ধকারে ওই ছেলেটার পেছনে পেছনে কোথায় যাবি?”
“অন্ধকারে যাব না,” বলল অভীক। “তৈরি হয়ে বেরোতে বেরোতে আলো ফুটবে আরও।”
“তাই বলে, কথা নেই, বার্তা নেই, একটা ছেলের সঙ্গে বেরিয়ে...”
এবার অভীকের একটু রাগই দেখা গেল। “তোর ব্যাপারটা কী বলতো? কাল রাত থেকে কী হয়েছে তোর? এই একটা বাচ্চা ছেলে, তায় বৌদ্ধ ভিক্ষু - ট্রেইনি। নিপাট ভালোমানুষের দেশে নিপাট ভালো ধর্মের শিক্ষানবিশী - তাকেও ভয় পাচ্ছিস?”
কথাটা ঠিক। দেশটাই ভালো। চুরি ডাকাতি ছিনতাই হয় না। তার ওপর…
কুশল বলল, “তবু... সবুজদা কিন্তু বলেছিল এখানে কোনও গ্রাম টাম নেই।”
“গ্রাম নেই, মনাস্টেরি আছে নিশ্চয়ই কাছেপিঠে। আচ্ছা, ঠিক আছে। তোর যদি অস্বস্তি হয়, তাহলে তুই এখানে থাক। আমি ঘুরে আসি।”
এ কথার পরে আর থাকা যায় না। কুশলও তৈরি হয়ে নিল। ক্যামেরা, সাউন্ড রেকর্ডার, ইত্যাদি নিয়ে তৈরি হতে সময় লাগে, তার পরে টেন্ট গোছাতে হল। স্লিপিং ব্যাগ ছড়িয়ে রেখে বেরোনো ক্যাম্পিঙের নিয়মে বারণ। বাইরে বেরিয়ে অভীক বলল, “কই গেল ছেলেটা?”
বাইরে আলো বেড়েছে। ভোরও বলা যাবে না, ঊষা। কিন্তু ছেলেটা কই? নামটাও জিজ্ঞেস করা হয়নি। অভীক একটু গলা তুলে বলল, “এই ছেলে... লামা, আছো?”
ছেলেটা নেই।
কুশল বলল, “ভেগেছে। চ’ আমরাই ঘুরে আসি। যাব তো ঠিকই করেছিস।”
দুজনে নদীর পাড়ে গিয়ে দেখতে থাকল কোথায় পার হওয়া যায়। নদীতে জল বেশি নেই, কিন্তু খরস্রোতা। নিচে পাথর। ঠিক মতো পা না পড়লে, বা পিছলে গেলে সমস্যা হতে পারে। তাই যদি জলের ওপরেই শুকনো পাথরে পা রেখে রেখে পার হওয়া যায়, তাহলে ভালো।
কুশল নদীর উজানে এগোল, অভীক গেল স্রোত বরাবর।
কুশলের সঙ্গেই দেখা হল। একটা বড়ো পাথরের আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে বলল, “এখানে নদী পেরোতে পারবে। এসো। তোমার বন্ধুকে ডাকো।”
দুজনে সাবধানে নদী পেরোল। গোল পাথরে পা হড়কানোর সম্ভাবনা আছে, তার ওপরে হাতে ভারি ভারি যন্ত্রপাতি। ওপারে দাঁড়িয়ে আছে ছেলেটা। কুশল বলল, “আরে, ও কখন পেরোল?”
অভীক বলল, “অন্য পাথরে পা রেখে পেরিয়েছে। আমরা হয়ত তখন দেখছিলাম না।” তার পরে ছেলেটাকে বলল, “চলো, কোন দিক দিয়ে যাব?”
ছেলেটা এগিয়ে গেল, দুজনে চলল ওর পেছনে।
নদীর ওপারে জঙ্গল ঘন। চলার পথ নেই বললেই চলে। ছেলেটা ছুটে ছুটে আগে আগে যাচ্ছে, পেছনে ওরা দুজন। পাহাড়টা খুব উঁচু না, কিন্তু খাড়া। ভারি ক্যামেরার ব্যাগ আর রেকর্ডিং-এর যন্ত্রপাতি নিয়ে চলা কঠিন।
দুর্গের ভাঙা অংশটায় পৌঁছে পেছনে তাকিয়ে মন ভরে গেল। অল্প আলোয় নিচে নদী ছুটে চলেছে, সামনের পাহাড় এবারে স্বচ্ছ হচ্ছে ধীরে ধীরে। দুর্গের প্রাচীরের যে টুকরোটা নদীর ওপার থেকেও দেখা যায়, তার দেওয়াল ভাঙা, কিন্তু ঘুরে অন্য দিক দিয়ে ঢুকতে হবে। কিন্তু তার চার দিকে আর কিছুই বাকি নেই। এমনকি দুর্গের প্রাচীর এই অংশর কোন দিক থেকে এসে কোন দিকে গিয়েছিল, ডাইনে না বাঁয়ে, সামনে না পেছনে, তা-ও বোঝার যো নেই।
কুশল আবার বলল, “বাকি আর কিছুই রইল না, কোনও চিহ্নটুকুও না, অথচ এই অংশটা রয়ে গেল, অদ্ভুত না?”
কিছু ভাবার সময় পাওয়া গেল না, ছেলেটা বেরিয়ে এল আবার, ঠোঁটে আঙুল দিয়ে চুপ করতে বলে ওদের হাতছানি দিয়ে ডাকল। সাবধানে ওর পেছনে পেছনে গিয়ে দুজনে ভাঙা দেওয়াল পার করে ঢুকল মিনারের মধ্যে। এই অংশটা দুর্গের উঁচু প্রহরা কেন্দ্র। বড়ো ঘরের মতো এর আকার আকৃতি। এক সময়ে এর ভেতর থেকে প্রহরীরা নজর রাখত বাইরের দিকে। ওপর দিকে যে ছোটো ছোটো জানলা ছিল, সেগুলো আর প্রায় নেই। দেওয়াল থেকে যে পাথরের টুকরোগুলো বেরিয়ে থাকত – প্রহরীদের ওপরে ওঠার সিঁড়ি - সেগুলোও আর বেশি বাকি নেই। ছেলেটা আঙুল তুলে অনেক ওপরে ওই রকম একটা পাথরের টুকরো দেখাল। বলল, “তোমরা যে প্যাঁচা খুজছ, সে ওই পাথরটার ওপরে বাসা করে আছে।”
উত্তেজিত কুশল আর অভীক অনেক চেষ্টা করেও ভালো করে দেখতে পেল না। বাসা একটা আছে। তাতে কোনও পাখির নড়াচড়াও দেখা গেল। ওদের চলাফেরাতেই বিরক্ত হয়ে পাখিটা বেরিয়ে এসে উড়ে গিয়ে বসল মিনারের দেওয়ালের ওপরে। নিঃসন্দেহে ওদের কাঙ্খিত প্যাঁচা। দু’চারটে ছবি উঠল। তার পরে উড়ে চলে গেল।
কুশল ব্যস্ত হয়ে ছেলেটাকে বলল, “এখান থেকে বেরিয়ে চলো। ও আমাদের আসায় বিরক্ত হয়েছে। বাসা ছেড়ে চলে যেতে পারে।”
ছেলেটা একটু ম্লান হেসে বলল, “তোমরা যাও। ও আমাকে দেখে বিরক্ত হয় না। তা ছাড়া আমি আর যাব কোথায়? আমি তো এখানেই থাকি।”
চারিদিকে চেয়ে অভীক বলল, “এখানে থাক? কী করে? এখানে তো কিচ্ছু নেই। শোও কোথায়? খাও কী?”
কুশল বলল, “তোমার সঙ্গের অন্য লোকজন কোথায়? তোমার গুম্ফা কোথায়?”
ছেলেটা বলল, “আমি একাই থাকি। আমার সঙ্গে কেউ নেই। আমার গুম্ফা ছিল উদ্রানগরে। সে অনেক দিন আগের কথা।”
কুশল চমকে বলল, “উদ্রানগর! সে তো অনেক দূর! সেখানকার গুম্ফা তো বিখ্যাত! সেখান থেকে তুমি এখানে এলে কেন? একাই এলে?”
ছেলেটা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “সে অনেক দিন আগের কথা। আমার বাবা-মার অনেকগুলো বাচ্চা, তাদের সবাইকে খেতে দিতে পারে না বলে আমাকে পাঠিয়েছিল উদ্রানগরের গুম্ফায়। লামা হতে। সে খুব কঠিন। বড়ো লামারা খেতে দিত না, মারত খুব। অনেকে পালিয়ে যেত। তারা কেউ ফিরে যেত নিজেদের গ্রামে, কেউ রাস্তায় মরে যেত। আমাকে একবার শাস্তি দিয়েছিল। আমি রাত্তিরে পালিয়ে গেছিলাম। পরদিন সকালে আমার সঙ্গে দেখা হল একজন লোকের সঙ্গে। লোকটা আমাকে বলল আমার সঙ্গে এসো, আমি তোমাকে বাড়ি নিয়ে যাব।
“ওর সঙ্গে এলাম এখানে। তখন এখানে দুর্গ ছিল না। কেবল ন্যাড়া পাহাড়। পাহাড়ের মাথায় রাজা দুর্গ বানাচ্ছে। লোকটা আমাকে মেরে মাটির গর্তে ফেলে দিল। ওইখানে।” বলে ছেলেটা মিনারের কোনার দিকে আঙুল দেখাল। বলল, “তার পরে এখানে দুর্গ তৈরি হল। রাজা নাম দিলেন কৃপানগড়। আর দুর্গ যে বানিয়েছিল, বোনামকৃষ্ণ গাথানি, তার নামে পল্লী বানালেন। বোনামপল্লী। তবে টিঁকল না। এখানে রাজা এক দিনও শান্তি পাননি। লোকে বলত ভূত আছে। অনেকেই দেখেছিল আমি রাতের বেলায় পথে পথে, এমনকি লোকের বাড়িতেও ঘুরে বেড়াই। শেষে রাজা যখন কানাঘুষোয় জানতে পারলেন যে এই দুর্গ বানাতে একটা বাচ্চা ছেলেকে মারা হয়েছিল, তখন বোনামকৃষ্ণকে ডেকে সব কথা জানলেন। বললেন অন্য দুর্গ বানাতে হবে। এই দুর্গ অভিশপ্ত। রাজার আদেশে বোনামকৃষ্ণ আর এদেশে বাড়ি বানাবার অনুমতি পায়নি। তবে এই দুর্গ ছিল অনেক দিন, অনেক বছর। শেষে একদিন রাজা অন্য কোথায় চলে গেলেন। আমি একা হয়ে গেলাম। রাতে আমি বোনামপল্লীতে ঘুরে বেড়াতাম। লোকে ভয় পেত। কেন জানি না। আমি তো কারো কিছু করিনি কখনও। শেষে যখন একদিন বাজ পড়ে দুর্গে আগুন লাগল, দেখতে দেখতে তিন দিন তিন রাতে দুর্গ পুড়ে ছাই হয়ে গেল, তখন কেবল এই মিনারটা রয়ে গেল। আর নদীর এপারে ওপারে বোনামপল্লীর সব লোক পালিয়ে গেল। আমি একা হয়ে গেলাম। রাতে জঙ্গলে ঘুরে বেড়াই, আর দিনে ঘুমিয়ে থাকি - ওখানে।” ছেলেটা আবার আঙুল দিয়ে দেখাল মিনারের মাটি।
তার পরে বলল, “এখন সূর্য উঠছে। আমাকে যেতে হবে। তোমরা থাকবে এখন এখানে? তোমাদের কাপড়ের বাড়িতে? তাহলে তোমাদের সঙ্গে রাতে কথা বলব। কেউ তো নেই, তাই কারোর সঙ্গে কথা বলতে পারি না...”
এতক্ষণ ওদের কথা বেরোচ্ছিল না। ছেলেটা থামার পর হা হা করে হেসে উঠল অভীক। কাঁধ থেকে ভারি ব্যাগ নামিয়ে মাটিতে রাখতে রাখতে বলল, “ভাল গল্প বলেছিস, ছেলে! দারুণ! এবার চল, তোর বাড়িটা কোথায় দেখে আসি।”
বলে মুখ তুলে দেখল কুশল হাঁ করে ছেলেটার দিকে দেখছে। অভীক কুশলের দৃষ্টি অনুসরন করে দেখল ছেলেটা কেমন আস্তে আস্তে মাটির নিচে ঢুকে গেল। বুক অবধি গিয়ে হাত তুলে বলল, “রাতে আসব।” তার পরে সবটাই চলে গেল মাটির নিচে।
জ্ঞান হারিয়ে অভীক পড়ে গেল মাটিতে। ভাগ্যিস মাইক্রোফোনটা ব্যাগের ওপরেই পড়েছিল, নইলে ভেঙেই যেত।
সে এক সমস্যা। দুটো ভারি ব্যাগ, আর একটা অজ্ঞান মানুষ। কুশল একে একে খানিকটা নামে একবার দুটো ব্যাগ নিয়ে, তারপরে অভীককে ধরে ধরে, হিঁচড়ে, এমনকি পাঁজাকোলা করেও। আধঘণ্টায় যে পাহাড় চড়েছিল, নামতে লাগল প্রায় দু’ঘণ্টা। সকাল হয়ে গেছে। নদীর পাড়ে এসে কুশল ঠাণ্ডা জলের ঝাপটা দিয়ে অভীকের জ্ঞান ফেরাল। চোখ খুলেই অভীক বলল, “ক্যামেরাটা?” তার পরে উঠে বসে বলল, “ইশ, প্যান্টটার কী দশা করেছিস! আমাকে টেনে টেনে এনেছিস নাকি?”
কুশল রেগে বলল, “ইয়ার্কি! একটা বাচ্চা ছেলে দেখে অজ্ঞান হয়ে গেলি, তার আগে অবধি আমাকে বলছিলি - তোর কী হয়েছে বল দেখি?”
অভীকের খেয়াল হল। আবার তাকাল পাহাড়ের মাথায় দুর্গের দিকে। বলল, “ছেলেটা তাহলে সত্যিই ভূত!”
“ভূত তো বটেই। কিন্তু একটা বাচ্চা ছেলে ভূত,” বলল কুশল।
“তুই ভূত বিশ্বাস করিস?” অবাক হয়ে বলল অভীক।
কুশল হেসে বলল, “তুই করিস না?”
সজোরে ডাইনে বাঁয়ে মাথা নাড়তে গিয়ে থেমে গেল অভীক। নির্বাক চেয়ে রইল কুশলের দিকে। আর তখনই নদীর ওপারে, যেদিকে ওদের তাঁবু, সে দিক থেকে শব্দ পাওয়া গেল জিপের। জঙ্গলের মধ্যে থেকে আসছে।
“চ’, সবুজদা না আসলেও লোক পাঠিয়েছে, যেমন বলেছিল। নিজে নিজে নদী পেরোতে পারবি, না কি কোলে করে নিয়ে যেতে হবে।”
অভীক উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “পারব। চল। ওপারে গিয়ে আগে প্যান্টটা চেঞ্জ তো করি।”
নদী পেরোতে পেরোতে কুশল বলল, “আমি কিন্তু আজ রাতে এখানে আর থাকব না। দীঘলাগড় রওয়ানা দেব। এই ভূতের রাজ্যে আমি আর থাকতে রাজি নই।”
অভীক বলল, “দরকারও নেই। আমাদের যা খোঁজার ছিল তা যে এখানে আছে তাও জেনে গেছি, বাসা করে তাও জানলাম। সুতরাং এখানে আর থাকার দরকার নেই।”
রেঞ্জ অফিসারের অ্যাসিস্ট্যান্ট দাওয়াং সেরিং যখন এসে পৌঁছলেন, তখন কুশল গোছগাছ করছে, আর অভীক টেন্টের ভেতরে। কুশল বলল, “আমাদের কাজ মিটে গেছে সেরিং-জী, পাখি এখানে পেয়েছি। কল রেকর্ড করেছি, ছবি পেয়েছি। নেস্ট করে তাও জানি। এখন আমরা যাব। আজই রওয়ানা দেব দীঘলাগড়।”
সেরিং গাড়ি থেকে ওদের জন্য টিফিন ক্যারিয়ার নামাচ্ছিলেন। থতমত খেয়ে বললেন, “আজই যাবেন? স্যার যে আমাকে বললেন কাল আপনাদের সঙ্গে মোলাকাত করতে আসবেন...”
তাঁবুর দরজা খুলে বেরিয়ে অভীক দু হাতের দুটো ব্যাগ নামিয়ে বলল, “টেন্ট খালি করে দিয়েছি, খেয়ে নিয়ে টেন্ট তুলে নেব, কেমন?”
সেরিং বললেন, “সে আমার লোক করবে, কিন্তু আপনারা চলে যাবেন? গাথানি স্যার খুব দুখ্‌ পাবেন। আমাকে বললেন বলতে...”
অভীক এগিয়ে এসে ক্যামেরা চালিয়ে বলল, “এই যে, সবুজদাকে বলবেন, পাখি পেয়েছি। ফিরে গিয়ে ই-মেইল করে পাঠাব।”
উৎসাহিত হয়ে সেরিং বললেন, “গাথানি স্যার খুব খুশ হবেন। কাল থেকে অনেক বার বলেছেন, হামার রেঞ্জে প্যাঁচা মিলবেই।” তারপরে চমকে গিয়ে বললেন, “এ কোথাকার ছবি?” হাত তুলে দুর্গ দেখিয়ে বললেন, “ওখানে?”
অভীক বলল, “হ্যাঁ। ভোরে গিয়েছিলাম।”
সেরিং কী বলতে গিয়ে থেমে গেলেন। কুশল সেরিং-এর হাত থেকে টিফিন ক্যারিয়ার নিয়ে বলল, “এটা ব্রেক-ফাস্ট? খিদে পেয়েছে।”
প্লেটে করে আলু পরোটা আর চাটনি নিয়ে দুজনে বসল, জোর করে সেরিং-এর হাতেও ধরিয়ে দেওয়া হল এক প্লেট।
কুশল জানতে চাইল, “আচ্ছা, গাথানি কোথাকার নাম? এ নাম তো আপনাদের দেশের না?”
মুখে পরোটা ভরে মাথা নাড়লেন সেরিং। বললেন, “ও আমাদের দেশের নাম না, ওরা এক সময়ে আমাদের দেশের লোক ছিল না। সে অনেক দিন আগের কথা, এই যে দেখছেন, কৃপানগড়, এই গড় বানানোর সময় রাজা দক্ষিণের দেশ থেকে কারিগর আনিয়েছিলেন। ওরা পাথরে গাঁথনির কাজ জানত। এই গাঁথনি থেকেই গাথানি নাম হয়েছে। যে লোক প্রথম এসেছিল, তার নাম ছিল বোনামকৃষ্ণ। ওর নামেই বোনামপল্লী নাম হয়েছিল। কিন্তু বোনামকৃষ্ণ ওদের দেশের এক ভয়াবহ কাণ্ড এখানে করেছিল। দুর্গ তৈরির আগে দুর্গের ভিতে একটা বাচ্চা ছেলেকে ধরে এনে বলি দিয়েছিল রাতের অন্ধকারে। সে ছেলে কে কেউ জানে না। কত শো বছর আগের কথা - কিন্তু লোকে বলে ওই জন্যই এই দুর্গ অভিশপ্ত। অনেকে বলত সে ছেলেকে নাকি দুর্গের আশেপাশে দেখা যেত। রাজা জানতে পেরে বোনামকৃষ্ণকে নির্বাসন দেন। ততোদিনে সে বড়োলোক হয়ে গেছে। তাই রাজার রাজত্ব ছেড়ে কিছুদিনের জন্য চলে গেলেও বেশি দূর যায়নি। ক্রমে লোকে সে কথা ভুলেও গেছে। তবে গাথানি নাম সত্ত্বেও ওরা কেউ আর বাড়ি বানায় না। সে ব্যবসা ওদের বোনামকৃষ্ণর সঙ্গেই শেষ হয়ে গেছে। বোনামপল্লী যে ওর পূর্বপুরুষের নামে তৈরি সে কথা গাথানি স্যার কাউকে বলে না। আপনারা বলবেন না, আমি বলেছি।”
ওরা সেদিনই গাথানির রেঞ্জ ছেড়ে চলে গিয়েছিল। এর পরে দিঘলাগড়ের আশেপাশে অনেক প্যাঁচা পাওয়া গেছিল বলে পরে ওরা আর বোনামপল্লী ফেরেনি। সবুজসুন্দর গাথানির সঙ্গেও আর দেখা হয়নি কোনও দিন।

Wednesday, June 21, 2017

দুষ্টু কৃষ্ণসার



অনেক দিন আগে, কোনও এক দূর দেশের জঙ্গলে অনেক প্রাণী থাকত। তাদের মধ্যে ছিল এক দল কৃষ্ণসার মৃগ। মৃগ মানে কিন্তু হরিণ না। ওরা হরিণের মত দেখতে, কিন্তু অন্য প্রাণী। হরিণের মত দলবেঁধে জঙ্গলে থাকত।
সেই দলে ছিল এক মা আর তার দুষ্টু বাচ্চা ছেলে। বাচ্চাটা খুবই ছোটো। কিচ্ছু জানে না। খালি মায়ের সঙ্গে দৌড়য়, আর মাকে ছেড়ে এদিক ওদিক ছুটে বেড়ায়। এটা সেটা দেখে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। বড়োরা শেখানোর চেষ্টা করে। বলে দেয় কোন ঘাস খেতে নরম আর মিষ্টি। বলে দেয় কোন কোন ঝোপ থেকে দূরে থাকতে হয় — কারণ তার পাতা তেতো। ওকে শিখিয়ে দেয় কোন গাছে কোন সময় ফল পাকে। শেখায় কোথায় কোথায় বিপদ থাকতে পারে। কোথায় শেয়াল লুকিয়ে থাকে, নেকড়ে কী ভাবে শিকার করে, সাবধান করে অন্য বিপদ থেকে, বলে দেয়, কখনও হায়নাও আসতে পারে। নদীর ধারে দেখিয়ে দেয় কী ভাবে কুমীররা জলে ভেসে থাকে যেন গাছের গুঁড়ি। যাতে ওদের দল জল খেতে এলেই পায়ে কামড় দিয়ে টেনে নিয়ে যেতে পারে জলের নিচে।
ওকে ওরা শেখাতো একরকম দু’পেয়ে প্রাণীর কথাও। তারা পোশাক পরে। তারা রাতের আঁধারে আসে। তাদের হাতে থাকে সূর্যের চেয়েও জোরালো আলো। তাদের গাড়ি দৌড়োয় সবেচেয়ে জোরে —তাদের নাম মানুষ। ওরা বাচ্চা কৃষ্ণসারকে শেখাত, সবসময় মায়ের কাছে কাছে থাকবে। আগে শিখে নাও, কোনটা ভালো, কোনটা খারাপ। তার পরে এদিক ওদিক দৌড়বে।
বাচ্চাটা কথা শুনত না। দুষ্টু তো। ভাবত আমি খুব চালাক। ছুটে চলে যেত মায়ের কাছ থেকে। দেখতে যেত ওই গাছের পিছনে কী আছে? এই ঝোপটার ভেতরে? মাকে সব ফেলে দৌড়তে হত পিছনে। পাছে কোনও বিপদ আসে!
অন্য বড়ো কৃষ্ণসারেরা ওকে বোঝানোর চেষ্টা করত।বলত, “খোকা, যেটা দেখতে ভাল, সেটাই দেখতে কাছে যেও না। বড়ো গাছের কাছে যাবার আগে দেখে নিও ডালের ওপর চিতাবাঘ লুকিয়ে আছে কি না। ছুটে গেছিলে নদীতে জল খেতে— যদি ওখানে একটা কুমীর থাকত? গাড়ির শব্দ শুনলেই লুকিয়ে পড়বে। মানুষের হাতে অনেক সময় বন্দুক থাকে। দূর থেকে গুলি করে মেরে ফেলতে পারে আমাদের।”
বাচ্চাটা শুনতই না।
এক দিন একটা খরগোশ জিজ্ঞেস করল, “এই, মায়ের থেকে এত দূরে কী করছিস রে?”
বাচ্চা কৃষ্ণসার উলটে জানতে চাইল, “সারাক্ষণ মায়ের সঙ্গে থাকতে হবে কেন?”
খরগোশ বলল, “ছোটো না তুই? কোনটা ভালো আর কোনটা বিপদজনক তুই জানিস?”
বাচ্চাটা বুক ফুলিয়ে বলল, “জানি। আমি স-অ-অ-ব জানি।”
খরগোশটা বলল, “তবেই হয়েছে। এক দিন এমন বিপদে পড়বি...”
“কাঁচকলা,” বলে বাচ্চাটা ফিরে গেল মায়ের কাছে। মা তখন ওকে হন্যে হয়ে চারিদিকে খুঁজছে।
“কোথায় গিয়েছিলি?”
“ও-ও-ও-ই, খরগোশটার সঙ্গে কথা বলছিলাম,” বলল বাচ্চা কৃষ্ণসার।
“এক দিন টের পাবে,” বলল আর এক কৃষ্ণসার মা।
ওর মা বলত, “খোকা, চোখ কান খুলে চলবি। সবসময় দেখবি অন্যরা কী করছে। অন্য জন্তুরাও বিপদ এলে বলে দেয়। বাঁদররা বাঘ দেখলে দূর থেকে চেঁচামেচি লাগিয়ে দেয়। পাখিরাও বলে দেয় কোন দিকে বাঘ যাচ্ছে। ওদের দিকে লক্ষ রাখলে দূর থেকে বিপদ বুঝে পালাতে পারবি।”
বাচ্চাটা পাত্তাই দিত না। কারওর কোনও কথাই শুনত না। বড়োরা বিপদের কথা বলত বলে হাসত। সবাই ওকে নিয়ে দুশ্চিন্তা করত।
বলত, “এক দিন যখন বিপদ এসে পড়বে, পালাবার পথ পাবে না বাছাধন।”
এক দিন সক্কালবেলা ওরা ঘুম থেকে উঠে দেখল আকাশে ঘন মেঘ। সূর্যের দেখা নেই। গ্রীষ্মকাল শেষ হয়েছে। সবাই আশা করছে এই বার বর্ষা আসবে, বৃষ্টির জল পেয়ে আবার সবুজ ঘাস হবে, গাছে নতুন কচি পাতা হবে। কৃষ্ণসারেরা সবাই আকাশে মুখ তুলে বৃষ্টির গন্ধের আশায় নাক টানছে,এমন সময় এক দল হনুমান ছুটে এল গাছ বেয়ে।
বলল, “সাবধান, এক গাড়ি মানুষ এসেছে জঙ্গলে। ওদের হাতে বন্দুক। ওরা শিকারে এসেছে। সবাই সাবধানে থাকবে।”
সবাই সতর্ক হয়ে গেল। কিন্তু বাচ্চা কৃষ্ণসার কারওর কথা শোনে না। খালি মায়ের সঙ্গে লুকোচুরি খেলছে সারা দিন।
সবাই ডেকে বলছে, “মায়ের কাছে থাক।”
ও ফুঃ ফুঃ করে বলছে, “কোনও চিন্তা নেই। বাঁদররা ঠিক বলে দেবে।”
সারা দিন কেটে গেল। কোনও বিপদ হল না। রাতে কৃষ্ণসারের দল ঠিক করল, রাস্তা থেকে দূরে গিয়ে ঘুমোবে। যাতে গাড়ি করে মানুষ এলেও ওদের দেখতে না পায়।
“আমার পাশে থাকিস,” মা ডেকে বলল বাচ্চা কৃষ্ণসারকে।
বাচ্চা বলল, “হ্যাঁ, মা।”
সূর্য ডুবে গেল। অন্ধকারহয়ে গেল জঙ্গল। মেঘে ঢাকা আকাশ, চাঁদও দেখা যায় না, তারাও না। একে একে সব্বাই ঘুমিয়ে পড়ল। কেবল বাচ্চা কৃষ্ণসার জেগে। ওর মনে কোনও ভয় নেই। ও ভাবছে, হনুমানরা নিশ্চয়ই বাজে কথা বলেছে। কেউ তো আসেনি শিকার করতে! মা ঘুমিয়ে পড়ার পর ও চুপিসাড়ে উঠে দেখতে গেল, দূরের ওই ঝোপে টিপ-টিপ করে কিসের আলো জ্বলছে নিভছে?
জোনাকিরা গেল রেগে।
“দেখ, ওই বোকার হদ্দ কৃষ্ণসারটা মায়ের থেকে কতো দূরে চলে এসেছে — চল আমরা আরও দূরে চলে যাই। তাহলে ও মায়ের কাছে ফিরে যাবে।”
ওরা উড়ে গেল দূরে। কিন্তু বাচ্চাটা মায়ের কাছে ফিরে গেল না। ও-ও চলল পিছনে পিছনে। ভাবছে, “ওরা আলোটা জ্বালায় কী করে?” এমনি করে চলে গেল বেশ খানিকটা দূরে।
হঠাৎ, রাত কাঁপিয়ে ডেকে উঠল কোটরে প্যাঁচা। “ওঠো, ওঠো সবাই। দূর থেকে গাড়ি আসছে, আমি শুনতে পাচ্ছি। গাছের ফাঁকে আলো দেখছি। ওঠো, ওঠো, পালাও সবাই, পালাও! মানুষ আসছে, শিকার করতে!”
ঘুমন্ত সব প্রাণী জেগে উঠে আস্তে আস্তে, নিঃশব্দে জঙ্গলের আরও ভিতরে চলে যেতে শুরু করল। কৃষ্ণসার মৃগরাও উঠে পায়ে পায়ে মিলিয়ে যেতে শুরু করল জঙ্গলের সঙ্গে। কিন্তু মা কৃষ্ণসার নড়ল না।
অন্যরা ডাকল, “এস, চলো...”
“কী করে যাব? আমার ছেলে কোথায় গেল?”
কোটরে প্যাঁচা বলল, “তোমার ছেলে ওই রাস্তার পাশেই দাঁড়িয়ে আছে। তাড়াতাড়ি ডাকো — ওই রাস্তাতেই গাড়ি আসছে।”
মা চেঁচিয়ে ডাকল, “খোকা-আ-আ-আ...”
এতক্ষণ বাচ্চাটা ওখানেই দাঁড়িয়ে ছিল। ভয়ে নিশ্চল, কোনদিকে যাবে বুঝতে পারছিল না। মার ডাক শুনে দৌড়তে যাবে, ঠিক তখনই গাড়িটা রাস্তার বাঁক ঘুরল। গাড়ির আলোয় স্পষ্ট দেখা গেল ওদের।
“কৃষ্ণসার একটা,” কে যেন হেঁকে বলল।
আর একটা গলা এল, “দাঁড়াও, ওটা বাচ্চা। ওই দেখ, পিছনেই ওর মা।”
মা ততোক্ষণে বাচ্চার দিকে দৌড়তে শুরু করেছে। গাড়ি থেকে একটা দড়াম শব্দ হল আর মা মাটিতে পড়ে গেল। বাচ্চা দৌড়ে গেল মায়ের কাছে।
“মা, মা, ওঠো, চলো, পালাই!”
কিন্তু মা কৃষ্ণসার আর নড়ল না। বাচ্চাটা নাক দিয়ে মাকে ঠেললো। নাকে এলো রক্তের গন্ধ। ভয়ে সিঁটিয়ে গেল।
গাছ থেকে প্যাঁচাটা ডেকে বলল, “তোর মা মরে গেছে। এবার তোর পালা। প্রাণে বাঁচতে চাস তো ভাগ!”
বাচ্চাটা জিজ্ঞেস করল, “মরে গেছে? মরে গেছে কি?”
প্যাঁচাটা বকুনি দিয়ে বলল, “বোকা ছেলে, আগে পালা, প্রশ্ন করার সময় পরে পাবি।”
কিন্তু পালানো হল না। উজ্জ্বল আলোটায় চোখ ধাঁধিয়ে গেল। কিছুই দেখতে পেল না, শুধু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে থর থর করে ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে শুনল খচ্‌ খচ্‌ খচ্‌ খচ্‌ করে পায়ের শব্দ এগিয়ে আসছে ওর দিকে।
তার পরে একটা গলা শুনল আবার। মানুষের কথা।
“এটা নিশ্চয়ই ওই মা’টার বাচ্চা। তুমি মরা মাকে নিয়ে যাও। ছাল ছাড়িয়ে বসার ঘরে সাজাবে। আমি এটা নিচ্ছি। পুষব।”


  • Left
  • Centre
  • Right
Remove
click to add a caption
লোকটা বাচ্চাটাকে দু’হাতে তুলে নিজের কোটের ভেতর ঢুকিয়ে নিল। অন্যরা ওর মাকে ধরাধরি করে নিয়ে গিয়ে তুলল গাড়িতে। তার পরে চলে গেল জঙ্গলের অন্য দিকে। আরও প্রাণী শিকার করতে।
লুকোনো সব জন্তুরা বেরিয়ে এল একে একে।
বলল, “সেই আমাদের কথা না শুনে নিজেও বিপদে পড়ল, মাকেও বিপদে ফেলল।” নিজেদের বাচ্চাদের দিকে তাকিয়ে বলল, “বুঝলে এখন, মা-বাবার কথা না শুনলে কী হয়?”
লোকটা বাচ্চাটাকে নিয়ে গেল শহরে ওর বাড়িতে। ওর বাড়ির ছাদে সারি সারি অনেক খাঁচা। তাতে নানা পশু পাখি। লোকটা জঙ্গলে গিয়ে কোনও প্রাণী বা পাখি জীবন্ত পেলে ধরে নিয়ে আসত, খাঁচায় রাখত, কিন্তু দেখাশোনা করত না।
কৃষ্ণসারেরও ওই দশা হল। লোকটা ওকে একটা খাঁচায় ঢুকিয়ে দিয়ে চলে গেল। চাকরদের বলল খেতে দিতে। চাকররা জানত বাবু আর ওকে দেখতেও আসবে না। ফলে ওরাও ভালো করে দেখাশোনা করতো না।
দিন কাটে, বাচ্চাটা খেতে পায় সামান্য, বাড়ে না ভাল করে। কিন্তু তাও দেখতে দেখতে খাঁচাটার চেয়ে বড়ো হয়ে গেল। আর হাঁটতে চলতে পারে না ওটার মধ্যে। আর কিছু দিন পরে দাঁড়াতেও পারে না। বসে বসেই খায়, বসে বসেই হিসি করতে হয়। কেউ পরিষ্কার করতে আসে না। লোমে, চামড়ায় নোংরা মাখামাখি হতে থাকে। চামড়ায় অসুখ হয়। লোম খসে পড়ে, চামড়া থেকে রক্ত ঝরে। কেউ মাথাই ঘামায় না। চাকররাও না, আর লোকটাও নয়। বাচ্চাটা বসে বসে ভাবে, এবার ও-ও বুঝি ওর মায়ের মত একদিন মরেই যাবে।
কিন্তু মরল না। এক দিন ভোরবেলা, তখনও বাড়িতে কেউ ঘুম থেকে ওঠেনি, অনেক লোক এসে দরজায় ধাক্কা দিল। ওরা কেউ বনদপ্তরের অফিসার। কেউ বা পুলিশ। পাশের বাড়ির একটা ছেলে দেখেছিল এ বাড়ির ছাদে অনেকগুলো খাঁচা, তাতে সারি সারি বন্যপ্রাণী। ছেলেটা জানত যে সেটা বে-আইনি। তাই ফোন করে বনদপ্তরকে জানিয়েছিল ওদের কথা।
কাজের লোক দরজা খুলল।
পুলিশ বলল, “তোমার বাবু কোথায়?”
চাকর ভয়ে পেয়ে বলল, “বাবু ঘুমোচ্ছে।”
পুলিশ বলল, “ডাকো তাকে।”
লোকটা এল, চোখে ঘুম, চুল উস্কোখুস্কো। পুলিশ জিজ্ঞেস করল, “আপনার বাড়িতে বন্যপ্রাণী আছে?”
লোকটা মিথ্যে করে বলল, “কী? না, না! কই, না তো!”
বনদপ্তরের অফিসার বলল, “আমরা খুঁজে দেখব।”
লোকটা এবার আরও ভয় পেল। বলল, “না না, তার দরকার নেই। আমি বলছি তো, কোনও বন্যপ্রাণী-টানি কিচ্ছু নেই।”
পুলিশ বলল, “তবু আমরা খুঁজে দেখব। আপনিও আসুন আমাদের সঙ্গে। নইলে যদি পালিয়ে যান!”
বাধ্য হয়ে লোকটা গেল পুলিশের সঙ্গে। বলল, “আমি দাঁত মেজে আসি?”
পুলিশ মাথা নাড়ল। দাঁতও মাজতে দিল না।
সব ঘর ঘোরা হয়ে গেলে লোকটা বলল, “দেখলেন? কিছুই নেই।”
পুলিশ বলল, “ওই সিঁড়ির ওপরে কী?”
লোকটা বলল, “কিছুই না। শুধু চিলেকোঠা, আর ছাদ। ওখানে গিয়ে লাভ নেই।”
বনদপ্তরের অফিসার বলল, “লাভ আছে বইকি! সারা বাড়িই খুঁজতে হবে না?”
এই শুনে লোকটা বুঝল আর লাভ নেই। পুলিশ ছাদের দরজা খুললেই সব ধরা পড়ে যাবে। এক লাফে সিঁড়ি দিয়ে নেমে পালালো। কিন্তু সিঁড়ির নিচে আরও অনেক পুলিশ দাঁড়িয়ে ছিল। খপ্‌ করে ধরে ফেলল ওকে।
পুলিশ বলল, “তার মানেই ছাদে কিছু আছে। চল, দেখা যাক।”
ছাদের দরজা খুলেই দেখা গেল এক ভয়ানক দৃশ্য।
সারি সারি খাঁচা। তাতে অসুস্থ, প্রায় মরে যাওয়া সব প্রাণী। কৃষ্ণসারের বাচ্চাটাও তাদের মধ্যে রয়েছে। এতই দুর্বল, এতই অসুস্থ, যে বেঁচে আছে না মরে গেছে বোঝাই যাচ্ছে না। অনেকক্ষণ ধরে দেখে তবে বনদপ্তরের অফিসাররা বুঝল, না —বেঁচে আছে, নিঃশ্বাস পড়ছে।
খাঁচা খুলে খুলে সবকটা পশু পাখিকে বের করল অফিসাররা। সব্বাই অসুস্থ, দুর্বল। বাড়ির সবাইকে ধরে নিয়ে গেল পুলিশ। লোকটাকে নিয়ে গেল বন্যপ্রাণীদের খাঁচায় বন্দী করে রাখার জন্য। ওর চাকরবাকরদের নিয়ে গেল প্রাণীদের দেখাশোনা না করার জন্য। বাড়ির অন্য সবাইকে নিয়ে গেল ওদের সাহায্য করার জন্য। আর ওই পাশের বাড়ির সাহসী ছেলেটা, যে বনদপ্তরকে খবর দিয়েছিল, তাকে পুরষ্কার দিল ওরা।
সব অসুস্থ জীবগুলোকে ওরা নিয়ে গেল পশু হাসপাতালে। সেখানে পশুপাখিদের জন্য ডাক্তার রয়েছে — তাদের বলে ভেটেরিনারি ডাক্তার। তারা দেখেই বুঝতে পারে পশুপাখিদের কোথায় কষ্ট হচ্ছে। ওরা তো মানুষের মতো বলতে পারে না, কোথায় ব্যথা করছে!
কৃষ্ণসারের অবস্থা শোচনীয়। তার মানে খুবই খারাপ। বহু দিন দাঁড়াতে না পেরে ওর পা একেবারে দুর্বল হয়ে গেছে। উঠতে গেলেই থরথর করে কাঁপে, আবার বসে পড়তে হয়। সারা গায়ে ঘা, তা থেকে রক্ত পড়ছে। গোছা গোছা লোম খসে খসে পড়ছে। ভেটেরিনারি ডাক্তার দেখে ভীষণ রেগে গেল। বলল, “এমন নিষ্ঠুর মানুষের ভীষণ সাজা হওয়া উচিত।”
লোকটাকে পুলিশ আদালতে নিয়ে গেল। কোর্টে বসে বিচারপতি সব শুনলেন। বললেন, “আমি দেখতে যাব ওই প্রাণীগুলো।” উনি নিজে এলেন পশু হাসপাতাল। দেখে শুনে এমন রেগে গেলেন, যে লোকটাকে অনেক দিনের জন্য জেলে পাঠালেন। বললেন, “ওকে কঠিন কাজ দিতে হবে, যাতে ওর শিক্ষা হয়।”
যত্ন পেয়ে কৃষ্ণসারের শরীর সারতে আরম্ভ করল। যখন ও আবার হাঁটতে চলতে পারছে, বনদপ্তরের অফিসাররা ওকে নিয়ে গেল একটা খোলা জায়গায় — সেখানে অনেক গাছ। মানুষের তৈরি পার্ক। সেখানে অনেক হরিণ। তাকে বলে ডিয়ার পার্ক — মৃগদাব। ওকে অফিসাররা পার্কের বাইরে একটা বড়ো খাঁচায় রাখল। ভালো ভালো খেতে দিল, ওষুধ দিল। ডাক্তার রোজ এসে দেখে যেত।
এক দিন বনদপ্তরের অফিসার জিজ্ঞেস করল, “কেমন দেখছেন ওকে?”
ডাক্তার বলল, “এখন তো ভাল আছে। সেরেই গেছে সব।”
অফিসার জানতে চাইল, “এখন ওকে খাঁচার বাইরে আনা যাবে? ডিয়ার পার্কে ওকে রাখতে চাই।”
ডাক্তার বলল, “আছে তো ভাল। কিন্তু হরিণেরা কী ওকে সহ্য করবে?”
অফিসার জানতে চাইলেন, “না করলে কী হবে?”
ডাক্তার বললেন, “কৃষ্ণসারটা এখনও দুর্বল। হরিণদের গায়ের জোর বেশি, সংখ্যায়ও ওরা অনেক। শিং দিয়ে ঢুঁ দিলে মরেও যেতে পারে।”
তখন বনদপ্তরের অফিসাররা ডিয়ার পার্কের মধ্যেই একটা আলাদা ঘেরা জায়গা তৈরি করল। লম্বা লম্বা কাঠের খোঁটা পুঁতে একটা আলাদা জায়গা তৈরি হল। সেখানে তারের জাল লাগানো হল, যাতে এদিক থেকে কৃষ্ণসার ওদিকে না যেতে পারে, আর ওদিকের হরিণ এদিকে এসে কৃষ্ণসারকে মারতে না পারে। একা কৃষ্ণসারের পক্ষে মস্তো জায়গা। একটা কোনায় ওর জন্য একটা চালা তৈরি হল, যাতে বৃষ্টিতে, রোদে, সেখানে গিয়ে সে বিশ্রাম করতে পারে। একটা মস্তো পাত্রে জল আর একটা থালা দেওয়া হল — তাতে ওর খাবার দেওয়া হবে।
মৃগদাবের হরিণরা অবাক।
এ ওকে জিজ্ঞেস করে, “কী হচ্ছে ওখানে?”
একজন বুড়ো হরিণ বলল, “অন্য কোনও জন্তু আসবে। তার জন্য মানুষরা জায়গা বানাচ্ছে।”
অন্যরা বলল, “আরেকটা জন্তু আসবে তো তার জন্য আরেকটা জায়গা লাগবে কেন? সে তো আমাদের সঙ্গেই থাকতে পারে।”
“নিশ্চয়ই কোনও বিপদজনক প্রাণী,” বলল বুড়ো হরিণ।
একটা বাচ্চা হরিণ জানতে চাইল, “‘বিপদজনক’ কী?”
বুড়ো হরিণ বুঝিয়ে বলল, “বিপদজনক মানে সেই জন্তুটা আমাদের ক্ষতি করতে পারে। কে জানে, হয়ত বাঘ নিয়ে আসছে।”
বুড়ো হরিণ ছাড়া বাকি সবাই ডিয়ার পার্কেই জন্মেছে। ওরা জানেও না বাঘ কী রকম জন্তু। ওরা কেউ কোনও দিন জঙ্গল দেখেইনি। তাও সবাই খুব ভয় পেল।
নতুন ঘেরা জায়গাটা তৈরি হবার পরে খাঁচা শুদ্ধু কৃষ্ণসারকে নিয়ে গিয়ে ছেড়ে দিল বনদপ্তরের কর্মচারীরা। খাঁচার দরজা খুলে রাখা হল। কৃষ্ণসারটা বেরিয়ে আসার পরে আবার খাঁচাটা নিয়ে গেল ওরা। কৃষ্ণসার এখন খাঁচার বাইরে। একটা বাচ্চা হরিণ দেখতে পেল। এক ছুটে গেল তার মায়ের কাছে।
বলল, “মা, মা, বাঘটা এসে গেছে।”
হরিণরা কেউ কেউ গিয়ে দেখে এল নতুন প্রাণীটাকে। তারা তো কেউ বাঘও দেখেনি কোনও দিন, কৃষ্ণসারও না। তাই তারা গিয়ে বুড়ো হরিণকে খবর দিল।
“বাঘটা এনেছে মানুষরা।”
বুড়ো হরিণ জিজ্ঞেস করল, “বড়ো বাঘ?”
ওরা মাথা নাড়ল। “না। আমাদের চেয়ে একটু ছোটো।”
বুড়ো হরিণ ছোটোবেলায় জঙ্গলে দূর থেকে বাঘ দেখেছে। বলল, “তাহলে বাঘের ছানা।”
আর একটা হরিণ বলল, “মাথার শিংগুলো অদ্ভুত।”
অবাক হয়ে বুড়ো হরিণ বলল, “কী বিদঘুটে কথা! বাঘের মাথায় শিং থাকে না।”
বাচ্চা হরিণটা, যে সবার আগে কৃষ্ণসারকে দেখেছিল, বলল, “এই বাঘটার মাথায় আছে।”
বুড়ো হরিণ বলল, “নাঃ, এবারে আমাকেই গিয়ে দেখতে হবে দেখছি।”
তখন সব্বাই মিলে গিয়ে ভীড় করল কৃষ্ণসারকে দেখতে। বুড়ো হরিণ হাসতে হাসতে প্রায় পড়ে যায় আরকি!
“ওটা আবার বাঘ নাকি! ওটা তো মৃগ!”
“কিন্তু ওর শিংদুটো অদ্ভুত,” বলল প্রথম বাচ্চা হরিণ।
বুড়ো হরিণ বলল, “তার কারণ, ও হরিণ না। ও মৃগ। আমরা হরিণ। আমাদের শিঙে ফ্যাকড়া থাকে। ওদের শিঙে ডালপালা নেই। আর আমাদের শিং বছরে বছরে খুলে পড়ে যায়। আবার গজায়। ওদের শিং জীবনে একবারই গজায়। গরু মোষের মত।”
বাচ্চা হরিণ বলল, “ওকে ডাক, এখানে আসতে বল।”
বুড়ো হরিণ বলল, “এখন না। দেখছ না, ও ভয় পেয়ে আছে। নতুন জায়গায় অভ্যেস হতে দাও, তার পরে বন্ধুত্ব করা যাবে’খন।”
হরিণরা চলে গেল, কৃষ্ণসারকে একা রেখে। বুড়ো হরিণ ঠিক বলেছিল। প্রথমে কৃষ্ণসার ভয়ে নড়ছিলই না। কোণায় ওর চালার নিচে লুকিয়ে বসে থাকত। কেবল খিদে পেলে বা তেষ্টা পেলে বেরিয়ে আসতো খেতে। কয়েক দিন কাটার পর, আস্তে আস্তে সাহস করে নিজের ঘেরা জায়গায় হাঁটাহাঁটি করতে শুরু করল।
এক দিন, হাঁটতে হাঁটতে জালের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে, হঠাৎ মুখ তুলে তাকিয়ে দেখে আর একটা মুখ ওর দিকে তাকিয়ে আছে। প্রথমে ও চমকে উঠেছিল। তার পরে দেখল ওটা একটা বাচ্চা হরিণ। ওর মনে পড়ল ও ছোটোবেলায় হরিণ দেখেছে। ওরা ভয়ংকর কিছু নয়।
বাচ্চা হরিণ জানতে চাইল, “এখনও ভয় পাচ্ছ?”
কৃষ্ণসার বলল, “আমি ভয় পাই না। আর তোমাকে ভয় পাবো কেন? তুমি তো এইটুকু।”
বাচ্চা হরিণ বলল, “কিন্তু তুমি তো আমাদের ভয়ে অস্থির ছিলে!”
কৃষ্ণসারের মনে পড়ল ও কেমন সব কিছুতেই ভয় পাচ্ছিল। লজ্জা পেয়ে বলল, “মোটেই না।”
বাচ্চা হরিণ বলল, “আমরা যে দিন প্রথম তোমাকে দেখতে এসেছিলাম, তুমি ও-ও-ইখানে লুকিয়ে ছিলে।”
“লুকিয়ে ছিলাম না। আমার শরীর খারাপ ছিল।”
অবাক হয়ে বাচ্চা হরিণ বলল, “শরীর খারাপ? কী হয়েছিল তোমার?”
এর মধ্যে একজন দু’জন করে অন্য হরিণরাও ওখানে পৌঁছে গেছে। তখন কৃষ্ণসার ওদের সব খুলে বলল। ওর গল্প শেষ হবার পরে বাচ্চা হরিণ বলল, “বন্দুক নিয়ে মানুষ জঙ্গলে গিয়ে শিকার করে? কই এখানে তো কেউ বন্দুক নিয়ে আসে না?”
বুড়ো হরিণ বলল, “সে তো এটা হরিণদের জন্য থাকার জন্য তৈরি হয়েছে বলে। এখানে কতো পাহারা দেখ না?”
এক জন হরিণ ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করল, “কিন্তু পাহারাদাররাও কি আমাদের মারতে পারে না?”
বুড়ো হরিণ মাথা নেড়ে বলল, “পারে, কিন্তু মারবে না। ওরা ভালো লোক। ওরা আমাদের পছন্দ করে। ওরা আমাদের দেখাশোনা করে।” এবার কৃষ্ণসারের দিকে ফিরে বলল, “তুমি আলাদা আছ কেন?”
কৃষ্ণসার বলল, “ডাক্তার বলেছে, তোমরা আমাকে মারতে পার।”
বাচ্চা হরিণ লাফিয়ে উঠে বলল, “কী বোকা রে বাবা! আমরা তোমাকে মারবো কেন? তুমি কি আমাদের শত্তুর?”
বুড়ো হরিণ বলল, “মোটেই বোকা নয়। আমরা নিজেদের মধ্যে মারামারি করি বইকি!”
বাচ্চা হরিণ বলল, “কিন্তু আমরা তো ওকে কিছু বলব না।”
ওর মা বলল, “তা বলব না, তবে আমার মনে হয় না মানুষরা ওকে আমাদের সঙ্গে থাকতে দেবে।”
কৃষ্ণসারওখানেই রয়ে গেল। আস্তে আস্তে সব হরিণের সঙ্গেই ওর বন্ধুত্ব হয়ে গেল। ওরা এসে বলত, “তোমার আগের জীবনের গল্প বল।” ওরা কোনও দিন জঙ্গল দেখেনি। গভীর জঙ্গল তো দেখেইনি, কৃষ্ণসার যেমন মেঠো জঙ্গলে থাকত, তাও দেখেনি। রোজ মানুষরা থলে ভর্তি করে খাবার না এনে দিলে কী করে খাবার খুঁজে খেতে হয়, তাও জানে না তারা! গল্প শুনে ওরা ভয় পেত। ওরে বাবা! খাবার খুঁজে খেতে হয়! কোথায় ঘাস, কোথায় পাতা, কোথায় কোন ফলের গাছ — সব মনে রাখতে হয়! শেয়াল, নেকড়ে, চিতাবাঘ এসে ধরে নিয়ে যেতে পারে! কী ভয়ংকর! তার ওপর মানুষও আসে, শিকার করতে! বলত, “বাবা! আমরাই সুখে আছি। এ সব কোনও দুশ্চিন্তাই আমাদের নেই।”
হরিণরা যতই সুখে থাকুক, কৃষ্ণসার মোটেই সুখে ছিল না। যতই হরিণদের ছোটোবেলার গল্প বলে, ততোই সে দিনগুলোর কথা মনে পড়ে যায়। দুঃখ পায় নিজের দুষ্টুমি আর ভুলের জন্য। মনে ভাবে, কোনও দিন আর ওই জীবন ফিরে পাব না। একা থাকলেই মুখ গুঁজে কাঁদে।
সবাই বুঝতে পারল কৃষ্ণসারের কিছু একটা হয়েছে। হরিণদের সঙ্গে আর কথা বলে না, খাবার দিলে খায় না ভালো করে। ডাক্তার দুশ্চিন্তা করে গেল অফিসারের সঙ্গে দেখা করতে।
বলল, “কৃষ্ণসারের কী হয়েছে খেয়াল করেছেন?”
অফিসার বলল, “খাচ্ছে কম। চুপ করে এক জায়গায় বসে থাকছে। অসুখ টসুখ করেছে?”
ডাক্তার মাথা নাড়ল, “না।”
“আমরা ঠিক মতো খেতে দিচ্ছি তো?”
ডাক্তার বলল, “হ্যাঁ।”
“তবে?”
ডাক্তার বলল, “আমার মনে হচ্ছে ওর মন খারাপ হচ্ছে। একা তো।”
অফিসার অবাক হয়ে বলল, “তার কী করা যায়? এখানে তো আর একটা কৃষ্ণসার নেই। চলুন, বড়ো সাহেবকে জিজ্ঞেস করি।”
বড়ো অফিসার সব শুনে বলল, “ওকে ফেরত নিয়ে যাও, ও যে জঙ্গল থেকে এসেছিল, সেখানে ছেড়ে দাও। ওখানে তো অন্য কৃষ্ণসার আছে।”
অবাক হয়ে ছোটো অফিসার বলল, “কিন্তু কোন জঙ্গল থেকে ও এসেছিল, জানব কী করে?”
বড়ো অফিসার বলল, “জেলে গিয়ে লোকটাকে জিজ্ঞেস করে আসব।”
বড়ো অফিসার নিজেই গেল জেলে। লোকটা তো প্রথমে বলতেই চায় না। বড়ো অফিসার ভয় দেখাল, “না বললে তোমার কী হতে পারে বুঝতে পারছ?”
তখন বলে দিল।
একটা মস্তো ভ্যান আনা হল। অনেক লোককে যেতে হবে কৃষ্ণসারের সঙ্গে। তার ওপর একটা ছোটো খাঁচা তৈরি হল। ছোটো খাঁচা না হলে কৃষ্ণসার যদি ভয় পেয়ে ছটফট করে, তাহলে ধাক্কাধাক্কিতে ব্যথা পাবে। দেয়ালে ঘষা খেয়ে চামড়া যাতে ছড়ে না যায়, তাই মোটা করে স্পঞ্জ লাগানো হল।
কৃষ্ণসারকে খাঁচা অবধি তুলে নিয়ে আসতে হল। ও ততোদিনে এতোটাই আবার দুর্বল হয়ে গিয়েছে, যে বনকর্মীরা এসে ওকে তুলে নিল, ও উঠে দাঁড়াতেও পারল না। খাঁচায় ছটফটও করল না। সবাই ভ্যানে উঠে রওয়ানা দিল। অনেক দূরের পথ। সারা দিন চলে রাত্তিরে ওরা থামল। কৃষ্ণসারকে দানাপানি দিয়ে ঘুমোতে গেল। পরদিন আবার চলা শুরু করে, বিকেল বেলায় এসে পৌঁছল সেই জঙ্গলে, যেখান থেকে ওকে অনেক বছর আগে খারাপ লোকেরা ধরে নিয়ে গিয়েছিল।
রাস্তার ক্লান্তিতে কৃষ্ণসার ঘুমোচ্ছিল। গাড়ি থামার পরে হঠাৎ ঘুম ভেঙে প্রথমে বুঝতে পারল না কোথায় এসেছে। এত দিন আগেকার কথা, ওর আর জঙ্গলের দৃশ্যগুলো ভালো করে মনেও নেই।
কিন্তু তখনই হাওয়ায় ভেসে এল জঙ্গলের গন্ধ। ঘুম ছুটে গেল। মনে পড়ল সবুজ ঘাস আর শুকনো লাল মাটির গন্ধ। তৃণভোজীদের বন্ধু বন্ধু গন্ধ, মাংশাসী শিকারী প্রাণীদের ভয়ের গন্ধ, পুকুরের আর নদীর জলের গন্ধ — সবই মনে পড়ে গেল ওর।
মানুষরা ওর খাঁচাটা ভ্যান গাড়ি থেকে ধরাধরি করে নামিয়ে নিল। কৃষ্ণসার তখন উৎসুক হয়ে খাঁচার ফাঁক দিয়ে নাক বের করে গন্ধ নিচ্ছে।
ডাক্তার বলল, “দেখেছ? অর্ধেক সেরে গেছে মনে হচ্ছে।”
অফিসার বলল, “ঠিক বলেছ। ও বুঝেছে, বাড়ি ফিরেছে। চল, ওকে ওর খাঁচায় রাখি গিয়ে।”
কৃষ্ণসার শুনে আবার দুঃখ পেয়েছিল, কিন্তু তার পরেই, ওদের কথা শুনে বুঝল যে বনদপ্তরের অফিসাররা ওর ভালর জন্যই ওর জন্য খাঁচার ব্যবস্থা করেছে।
জঙ্গলের অফিসার শহরের অফিসারকে বলল, “আপনি যেমনি বলেছেন, দুর্বল হয়ে আছে, আমি তখনই ঠিক করেছি, ওকে সঙ্গে সঙ্গে জঙ্গলে ছাড়ব না। আগে খাইয়ে দাইয়ে একটু সুস্থ করে নেব, তার পরে।”
খাঁচা দেখে সবাই মুগ্ধ। শহরের খাঁচার চেয়ে অনেক বড়ো।
কর্মচারীরা খাঁচাটা নিয়ে গিয়ে ভেতরে রাখল। তার পরে আবার খাঁচার চারি দিক ঘুরে দেখল, কোথাও এমন নয় তো, যে বাঘ বা চিতাবাঘ ভেঙে বা গাছে চড়ে ভেতরে ঢুকতে পারবে? তার পরে চারি দিকে আলো জ্বালিয়ে রাখল রাতে, যাতে নেকড়ে বা চিতাবাঘ এসে কৃষ্ণসারকে ভয় দেখাতে না পারে। সবাই ঘুমোতে গেল তার পরে।
কৃষ্ণসার তো ঘুমোতে পারে না। ওর ঘুম আসে না। হেঁটে হেঁটে খালি বেড়ার কাছে ঘুরে বেড়ায় আর বাইরে তাকায়। জঙ্গলের পরিচিত গন্ধ নেয় বাতাসে নাক টেনে। শেষে ক্লান্ত হয়েই ঘুমিয়ে পড়ল।
অফিসাররা ভোর বেলায় ঘুম থেকে উঠে বাইরে এল — তখনও সূর্য ওঠেনি। আকাশ পরিষ্কার। পূব আকাশ লাল হতে লেগেছে। মাটির কাছে আবছা কুয়াশা। কৃষ্ণসার ওর খাঁচার বেড়ার কাছে মাটিতে শুয়ে ঘুমোচ্ছে। আর বেড়ার বাইরে এক দল জংলী কৃষ্ণসার বসে।
অফিসাররা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বলল, “ওকে নিয়ে যেতে এসেছে ওরা।”
কৃষ্ণসারেরও স্বস্তি হচ্ছিল। দেখতে পাচ্ছিল খাঁচার বাইরে অন্য কৃষ্ণসারেরা ওকে নিতে এসেছে। তাদের কাউকে ও চিনতেও পারছিল। ওরাও অবাক, ওরা ভেবেছিল ও এতদিনে মরেই গেছে। ওদের ও শহরের কথা বলেছিল। বলেছিল কেমন করে ওকে মানুষরাই ধরে নিয়ে গিয়েছিল, আবার কেমন করে মানুষরাই ওকে ফিরিয়ে এনেছে।
“আমার মনে আছে, আমি তোমাদের কত জ্বালাতন করেছি। কারওর কথা শুনতাম না। কিন্তু আমার শিক্ষা হয়ে গিয়েছে। আর আমি কোনও দিন তোমাদের জ্বালাবো না।”
ওদের দলের বুড়ো বলল, “সে না হয় হল, কিন্তু তুমি বেরোবে কী করে?”
কৃষ্ণসার বলল, “আরে ওরা আমাকে বেশিদিন রাখবে না। ওরা বলেছে, আমি শুনেছি। আমি একটু ভাল করে খেতে শুরু করলেই আমাকে ছেড়ে দেবে।”
ওরা জানতে চাইল, “কী করে জানলে?”
কৃষ্ণসার লজ্জা পেয়ে বলল, “অনেক দিন ওদের সঙ্গে আছি, ওদের কথা বুঝতে শিখেছি।”
জংলী কৃষ্ণসারেরা হঠাৎ বলল, “মানুষ আসছে এ দিকে, চল আমরা চলে যাই।”
কৃষ্ণসার দেখল বনদপ্তরের অফিসাররা আসছে। বলল, “আরে ওরা আমাদের বন্ধু, ভয় পেও না।”
কঠিন গলায় বুড়ো কৃষ্ণসার বলল, “শোনো হে, আমাদের সঙ্গে যদি আবার যেতে চাও, মনে রেখো, কোনও মানুষকেই বেশি বিশ্বাস করলে চলবে না।”
“মনে রাখব,” চেঁচিয়ে বলল কৃষ্ণসার। এদিকে ওর খাঁচার দরজা খুলে ওর খাবার নিয়ে ঢুকলো বনকর্মীরা।
কিছু দিন পরে মানুষরা আবার কৃষ্ণসারকে জঙ্গলে ছেড়ে দিল। ও ছুটে গিয়ে ওদের দলের সঙ্গে চলে গেল দূরের জঙ্গলে। অফিসার আর ডাক্তার সবাই আবার শহরে ফিরে এল।
এখনও ওখানেই আছে ও। এখন ও বুড়ো হয়েছে। আজ ও সব দুষ্টু বাচ্চাকে শেখায় ভালো হতে। সবাইকে বলে, কেমন দুষ্টুমি করে কী বিপদেই না পড়েছিল ও।
ছবি - দেবাশিস দেব