Friday, September 30, 2016

আর্টিস্ট


১ হাতের তুলিটা নামিয়ে রেখে সুকৃত দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। সামনে তৈরি ক্যানভাসটা এখনও পরিষ্কার। প্যালেটে এখানে ওখানে রঙের জগঝম্প। মাথায় কিচ্ছু আসছে না। সুপ্রতীক বলে, “হাবিজাবি। নিও-ইম্‌প্রেশনিস্ট না ঘোড়ার ডিম। ধ্যাবর ধ্যাবর করে চালান’ তুলি! সবুজটা গাছ, হলুদটা বালি আর নীলটা আকাশ ভাবে সবাই। তার জন্যেও এত কী ইন্‌স্‌পিরেশন লাগে?” আজও নিশ্চয়ই তাই বলত। কাজটা ওরই সোর্সে পাওয়া। ওর অফিসের এম.ডি তরুণ সামন্তর একটা ল্যান্ডস্কেপ চাই। সুপ্রতীককে দিয়ে বলিয়েছেন। সুকৃত মেজাজি মানুষ সবাই জানে। ফট করে ‘না’ বলতে আটকায় না। অত বড় একটা সংস্থার এম.ডি-কে ‘না’ বলার দম সুকৃতর থাকুক চাই না থাকুক, সুপ্রতীক বললে তো ‘না’ বলার প্রশ্ন ওঠে না, তাই ‘হ্যাঁ’-ই বলেছিলেন। চার দিন গেল। এম.ডি-র ফরমাশের শরতের নীল আকাশ আর সোনালী হলুদ মিশিয়ে কোন আইডিয়াই আসছে না। সরে এলেন সুকৃত। সাদা ক্যানভাসের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলে আইডিয়া আসে না। বিরক্তি বাড়ে। উত্তরমুখী জানালার বাইরে দেখার নেই কিছুই — সামনের উঁচু বাড়ির নোংরা কালচে দেওয়াল। ওপরে ছাইরঙা আকাশ। কাজটা না নিলেই হত। কমিশন নিয়ে সুকৃত আঁকেন না তা নয়, ছোটদের ম্যাগাজিনে ইলাস্ট্রেশনের কিছু কাজ সুপ্রতীক দেয় মাঝে মাঝে। ওর এখন এত চাপ যে সময়ে কুলিয়ে উঠতে পারে না। সেই সম্পাদকরা সস্তায় কাজ করাতে চাইলে সুকৃতকে ফোন করে। সে দায়িত্ব আর এই দায়িত্বে অনেক ফারাক। স্টুডিও থেকে বেরিয়ে খানিকক্ষণ ড্রয়িং রুমের দেওয়ালের ছবিগুলো দেখলেন ঘুরে ঘুরে। সবই নিজের ছবি। শুধু ডাইনিং রুমে দুটো নিজের না। একটা সুপ্রতীকের বিরাট শিবঠাকুর, আর একটা সুঋতির আঁকা। এটা অরিজিন্যাল না। ইনটারনেট থেকে নিয়ে অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে রেজোলিউশান বজায় রেখে বড় একটা প্রিন্ট নেওয়া। ল্যান্ড — না, সী-স্কেপ। এই ছবিটার সামনে দাঁড়ালে অনেক পুরনো কথা ভীড় করে আসে। ব্যাচের তিনজন বেস্ট স্টুডেন্টই জীবনে বিশেষ কিছু করে উঠতে পারেনি। সুকৃতর মতে সবচেয়ে ট্যালেন্টেড ছিল সুঋতি। কিন্তু বিয়ে করে নিউফাউন্ডল্যান্ড না কোথায় চলে গেল — সুপ্রতীক বলে ফাউন্ড না, নিউলস্ট-ল্যান্ড — আর যোগাযোগও নেই। সুপ্রতীক আজ ওদের মধ্যে সবচেয়ে নামী শিল্পী। সেটা ওর চাকরির জন্যও বটে, তবে ট্যালেন্টেড তো বটেই। বটব্যালদা বলতেন, “তোরা আমার থ্রী shoes।” তিনজনেরই নাম সু- দিয়ে বলে থ্রী shoesডাকতেন। বলতেন, “মনে থাকে যেন, জগতে ছাপ রেখে যাবি।” ছাপ, নাম, কারওরই থাকবে না। বটব্যালদা দুঃখ করতেন সুপ্রতীক ওর ট্যালেন্ট নষ্ট করল বিজনেস হাউসের পোষা কুকুর হয়ে গিয়ে, দুঃখ করতেন সুকৃত ভাল করে নিজের খ্যাতিবৃদ্ধির দিকে নজর-ই দিল না, মনমৌজি এঁকে গেল বলে। সবচেয়ে বেশি দুঃখ করতেন সুঋতিকে নিয়ে। ছবি ভুলে ঘর করছে কোথায়, হোয়াট আ ওয়েস্ট অব ট্যালেন্ট। চা চাই। রান্নাঘরে ঢুকে সস্‌প্যানে জল ভরে গ্যাসে বসালেন। এক কাপ জল, দেরি হবে না। ওখানেই দাঁড়িয়ে রইলেন। সস্‌প্যানের নিচের আগুনের শিখার নীলটাই চাই। তার সঙ্গে শরতের রোদের হলদে। গ্যাসের আগুনে একটা লালচে আভা? অনেক সময় বার্নারে কিছু আটকে থাকলে এমন হয়। পেঁয়াজের খোসা বা আলুর? রান্নার মাসি ঠিক করে পরিষ্কার করেনি? কোমর ভাঁজ করে নিচু হয়ে দেখতে যেতেই একটা অদ্ভুত জিনিস হল। শিখাটা দপ্‌ করে অনেকটা বেড়ে প্রায় সুকৃতর মুখ ছুঁয়ে, চোখ ধাঁধিয়ে দিয়ে নিভে গেল। চট্‌ করে চোখ বন্ধ করে হাত বাড়িয়ে নব্‌ ঘুরিয়ে গ্যাস বন্ধ করে দিলেন। কিন্তু বন্ধ গ্যাসের নব্‌ হাতে ধরে চোখ বন্ধ করেই দাঁড়িয়ে রইলেন প্রায় মিনিট খানেক। তার পরে আস্তে আস্তে চোখ খুলে তাকালেন। মুখে স্মিত হাসি। সুপ্রতীক ইন্সপিরেশন নিয়ে প্যাঁক দিতে পারে, কিন্তু ব্যাটা ম্যাগাজিনের ইলাস্ট্রেটর এই চোখ বন্ধ করে ছবি দেখতে পাওয়াটা কোনদিন বুঝতে পারবে না। দ্রুত পায়ে স্টুডিওতে ফিরে গিয়ে হাতে তুলি নিয়ে যে রংটা লাগাতে শুরু করলেন, সেটা নীলও নয়, হলুদও না। গাঢ় বাদামী — প্রায় কালো। ২ মাস পাঁচেক পরে একদিন সকাল সাড়ে দশটায় যখন ফোন বাজল, তখন সুকৃত বসার ঘরে ইজি চেয়ারে বসে চোখ বুজে নতুন ছবি দেখছেন। গতকাল সুপ্রতীক আবার ফোন করেছিল। ওদের অনেক ম্যাগাজিনের একটার পূজাবার্ষিকীর প্রচ্ছদ এঁকে দিতে হবে। তরুণ সামন্ত নাকি বলেছেন, সুপ্রতীক যেন যে করে হোক সুকৃতকে রাজি করায়। সুকৃত রাজি হয়েছেন। গ্যাসের ঘটনার তিন দিনের মাথায় ছবি আঁকা শেষ করে, চার দিনের দিন সুপ্রতীকের ভূয়সী প্রশংসায় অল্প হেসে, আরও দিন কয়েক পরে ট্যাক্সি করে দু’বন্ধু তরুণ সামন্তর বাড়িতে ছবি নিয়ে পৌঁছেছিলেন। সামন্ত ছবি দেখে বাক্যহারা, বিদায় দেবার সময় হাতে যে চেকটা ধরিয়ে দিয়েছিলেন, সেটায় লেখা সংখ্যাটা পূর্বনির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশ খানিকটা বেশি। সেটাও কাজ করেছে প্রচ্ছদ আঁকতে রাজি হওয়ার পেছনে। এই ভাবেই শিল্পী বিক্রি হয়ে যায়? তবে গত পাঁচ মাসে ছবির চাহিদাও বেড়েছে হঠাৎ। সুতরাং তরুণবাবুর সামন্ততন্ত্রকে বেশি না ডরালেও চলবে। ইজি চেয়ারে বসে বন্ধ চোখের পর্দায় পূজাবার্ষিকীর মলাট দেখছিলেন, এমন সময় মোবাইল বাজল। নিগ্‌ঘাত নতুন কলার টিউনের বিজ্ঞাপন। উঠে গিয়ে ফোনটা হাতে নিয়ে নম্বরটা দেখে একটু অবাক হলেন। বিদেশি নম্বর। বোতাম টিপে বললেন, “হ্যালো?” “এটা কী আর্টিস্ট সুকৃত চৌধুরীর নম্বর?” ইংরেজিতে নারীকণ্ঠ! গত পনের বছরে সুকৃতকে কোনও মহিলা ফোন করেছে বলে তো মনে পড়ে না। শুধু সেই এক জন গ্যালারী মালিক করতেন কখনও সখনও। কিন্তু তিনি নেই অনেক দিন। আবার বিদেশ থেকে! বাপরে! বিদেশ থেকে সেই কবে শেষ কেউ ফোন করেছিল... জবাব দিতে দেরি হওয়ায় আবার শোনা গেল, “হ্যালো?” সুকৃত বললেন, “হ্যাঁ, সুকৃত চৌধুরী বলছি, বলুন। কে বলছেন?” ওপারের কণ্ঠস্বর এবারে উচ্ছ্বসিত শোনাল। “কৃত, চিনতে পারলি? কে বলত?” সুকৃত ধপ করে বসে পড়লেন। সুকৃত, সুপ্রতীক আর সুঋতির ‘সু-’ বাদ দিয়ে কৃত, প্রতীক আর ঋতি বলে ডাকা যে শুরু করেছিল, দেশ ছেড়ে সে চলে যাবার পরে বাকি দু’জন সে খেলা আর বজায় রাখেননি। “সু-... সুঋতি?” নামটা উচ্চারণ করতে গিয়ে থতিয়ে গেলেন সুকৃত। খিলখিল হাসিটা বদলায়নি। হাসি শেষে সুঋতি বলল, “চমকালি তো? কেমন আছিস?” “ভাল... কিন্তু কী আশ্চর্য! এত দিন বাদে... তুই... কোত্থেকে? কী ব্যাপার...” আবার সেই হাসি। তারপর, “অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে তোর নম্বর জোগাড় হয়েছে। খবর বল। কোথায় আছিস? কী করছিস? বিয়ে করেছিস? ছেলে-পুলে ক’জন? বউ কী করে?” সুকৃত অকৃতদার। অনেকে বলত সুঋতি চলে যাবার পরে সুকৃত সব রকমের ইচ্ছাই জলাঞ্জলি দিয়েছেন। সুকৃত সেটা ঠিক বা ভুল প্রমান করার কোন চেষ্টাই করেননি কোনও দিন। সুকৃতর খবরে তাই সে সব অ্যাঙ্গেল নেই। খবর শুধু ছবি আঁকার — বা না আঁকার। তবে সুঋতির খবর আছে। বিয়ে ভেঙেছে বেশ কয়েক বছর হয়ে গেল। এত দিন ছেলেমেয়ের পড়াশোনার জন্য কাজ করত। এখন ছেলে ভাল চাকরি পেয়েছে। বলেছে, তুমি ছবি আঁক, আমি স্পনসর করব। তবে এর মধ্যেই সুঋতির ছবির যা কদর হয়েছে, তাতে মনে হচ্ছে না ছেলের স্পনসরশিপ দরকার হবে। “এজেন্ট বলেছে, যথেষ্ট বায়ার্স আছে...” সুকৃত বললেন, “বটব্যালদা থাকলে খুব খুশি হতেন।” সুঋতি একটু থেমে বলল, “বটব্যালদা... নেই?” “না, মাস ছয়েক হল। ক্যানসার... লাং।” “স্মোক করতেন তো খুব...” “খুব। আমরা হাসপাতালেও দেখতে গেলেই ঝুলোঝুলি করতেন, ‘এনে দে না রে, একটা দে, মরেই তো যাব — সর্বাঙ্গে ছড়িয়েছে, জানিস তো — এই শেষ ইচ্ছেটা অন্ততঃ রাখ...’ এই সব বলতেন।” সুঋতি জিজ্ঞেস করল, “তুই এখনও খাস?” সুকৃত হাসলেন। “আমি? কোনও দিনই খেতাম না।” সুঋতি বলল, “ওঃ, স্যরি, তুই না, প্রতীক খেত, তাই না? ওর কী খবর রে?” সুকৃতর কি সামান্য দুঃখ হল, সুঋতি সিগারেটের ব্যাপারটা মনে রাখেনি বলে? মনটাকে ঝাড়া দিয়ে বললেন, “ও এখন বিখ্যাত ইলাস্ট্রেটর। বড় বড় ম্যাগাজিনে ওর ছবি দেখা যায়। ওর নম্বর আছে? দেব?” সুঋতি বলল, “না, এখন না। আমি ফোন করেছি অন্য একটা কারণে। প্রায় বিজনেস্‌ রিজ্‌ন... কৃত, রিসেন্টলি তোর একটা ছবি বিক্রি হয়েছে নিউ ইয়র্কে, জানিস?” না। নিউ ইয়র্কে? কে বিক্রি করেছে? কে কিনেছে? “বড় ছবি — অ্যাবাউট চার ফুট হাইট। গোল্ডেন সানশাইন নামে বিক্রি হয়েছে।” গোল্ডেন সানশাইন? সুকৃত কোনও দিন ইংরিজিতে ছবির নাম দেননি। তবে কখনও কোনও অবাঙালি খদ্দের ইংরিজি নাম দিয়েছে। নিউ ইয়র্কে সুকৃতর ছবি কোনওদিন বিক্রি হয়েছে বলে জানেন না। তবে অত বড় ছবি জীবনে কটা এঁকেছেন, জানেন সুকৃত। একটা। নাম দিয়েছিলেন ‘শরততপনে’। গোল্ডেন সানশাইন কি তারই ইংরিজি? “ছবিটা তুই দেখেছিস?” জানা গেল, দেখেনি, বিশেষ কিছু জানেও না। তবে? “কৃত, ছবিটা কত দামে বিক্রি হয়েছে জানিস?” বিক্রি হয়েছে তাই জানতেন না, তায় দাম। কিছু না বলে চুপ করে রইলেন। ওদিক থেকে সুঋতি বলে চলল ছবিটা কিনেছেন এক অজ্ঞাত ক্রেতা। প্রাইভেট সেল। কিন্তু তিনি খুব শিগগিরই সেটাকে নিউ ইয়র্কে একটা পাবলিক অকশনে প্রকাশ করবেন। এবং সেই অকশনের পূর্বাভাস হিসেবে সেই বিক্রেতার এজেন্ট বলেছেন ছবির আর্টিস্ট এক অজ্ঞাত, অখ্যাত ভারতীয়। এবং বলেছেন যে এই ছবি নাকি একপ্রকার অমূল্য! অমূল্য? সুকৃতর ছবি! তাই বলেছেন এজেন্ট। আপাতত একটা দাম ধার্য হয়েছে, তবে এজেন্ট আশা করছেন ছবি তার চেয়ে অনেক বেশি দামে বিক্রি হবে। দামটা শুনে হাত পা ঠাণ্ডা হয়ে গেল। এত দামে সুকৃতর ছবি বিক্রি হবে? হতে পারে কখনও? তরুণ সামন্ত যা দিয়েছিলেন, তা আশাতীত বেশি ছিল — কিন্তু এ তো তার চেয়েও আরও, আরও অনেক বেশি! ঠিক ক’ গুণ, সুকৃত চট করে হিসেব করে উঠতে পারছেন না, কারণ নিজে পারিশ্রমিক পেয়েছেন টাকায়, আর এ হিসেবটা ডলারে... সুঋতি বলে চলেছে, “আমার এজেন্ট আমাকে জানাল...” এবার কথা কেটে সুকৃত বললেন, “তুই শিওর, আর্টিস্ট আমিই?” “আমার এজেন্ট তোর নাম নিয়ে এসেছে। আমিও ইন্ডিয়ান, তাই... সুকৃত চৌধুরী নামে আর কোনও আর্টিস্ট তুই চিনিস, যে নিও-ইম্‌প্রেশনিস্ট আঁকে?” না। কিন্তু... “আমার ছবি এত দামে বিকোবে আমি ভাবতেই পারছি না।” “ছবিটা নিশ্চয়ই খুব ভাল। কিন্তু আমি কেন ফোন করেছি... আমার এজেন্টের কাছে খবর, তোর ছবি কেনার চেষ্টা করছে ওই এজেন্ট এবং ওর ক্লায়েন্ট, দুজনেই। ওর ধারণা তোর সব ছবিরই দাম অনেক বাড়বে। যারা তোর ছবি কিনেছে, সকলেই অনেক লাভে বেচতে পারবে। সুতরাং এই ব্যাপারটা সল্‌ভ্‌ হওয়া অবধি তুই তোর কোনও ছবি বিক্রি করবি না, বুঝলি? নানা ওয়েবসাইটে তোর ছবির যা প্রাইসিং দেখলাম, সবই রিডিকুলস্‌লি কম...” পিঁক, পিঁক করে শব্দ এল সুঋতার কথা ছাপিয়ে। কান থেকে মোবাইল নামিয়ে এক লহমা দেখলেন সুকৃত। কল ওয়েটিং — তরুণ সামন্ত। আবার ফোন কানে দিলেন। “...বিক্রি করার কোন মানেই হয় না। সব ছবি তুই সরিয়ে দে — ডোন্ট সেল এনিথিং। তোর ছবির দাম যদি সাংঘাতিক বেড়ে যায়, ইউ শুড বী দ্য ফার্স্ট টু বেনিফিট, তাই না? হ্যালো, কৃত, শুনছিস?” শুনছেন, এবং দ্বিমত পোষণ করছেন না, এই ফোন শেষ করেই সমস্ত ছবি বাজার থেকে তুলে নেবেন এমন কথা দিয়ে শেষ করলেন, যদিও সেটা করা উচিৎ হবে কি না, সেটা বুঝতে পারছেন না। প্রায় তক্ষুনি আবার ফোন বাজল। “ভাল আছেন? ব্যস্ত কি? না হলে পরে ফোন করব?” বাবা! এমন কণ্ঠস্বর তো আগে শোনেননি! বশংবদ না হলেও, প্রায় সেই গোছেরই। কিছু করছেন না, ছবি আঁকছেন না, ইত্যাদি শুনে নিশ্চিন্ত হয়ে ভদ্রলোক বললেন, “আপনার ছবিটা না, লোকে সাংঘাতিক প্রেজ করছে। অনেকেই আপনার ছবি কিনতে চায়। আর কী কী আছে, ফর সেল?” “অত বড় ছবি তো...” “না, না,” তাড়াতাড়ি বললেন সামন্ত। “বড় ছোট নিয়ে কথা নয়, যা আছে, তাতেই চলবে। আছে নিশ্চয়ই?” “ইয়ে...” আবার কথা শেষ হল না সুকৃতর। “আমি আসতে পারি? কখন সুবিধা হবে আপনার? ধরুন দুপুরের দিকে?” খটকা লাগল। বললেন, “আমি তো এখুনি বেরিয়ে যাব...” “ফিরবেন কখন? সন্ধেবেলা? ধরুন ছ’টা-সাতটা?” এত তাড়া? একটা দুষ্টুবুদ্ধি এল। বললেন, “ছবিটা কোথায় ডিস্প্লে করেছেন? একবার দেখতে পারি?” একটু নৈঃশব্দের পর, “ডিস্প্লে...” এবার সামন্তর কথা কেটে সুকৃত বললেন, “আজ আমি সন্ধের দিকে আপনার বাড়ির কাছাকাছি থাকব। আপনি বললে, সাতটা, সাড়ে-সাতটায় আমিই আপনার বাড়ি যেতে পারি।” “না,” প্রায় আর্তনাদের মত শোনাল কি? “আমি আজ কলকাতায় নেই... মানে... ইয়ে, বেরিয়ে যাব... ক’দিন পর ফিরব...” এবার বেশ উৎফুল্ল গলায় সুকৃত বললেন, “বেশ তো, তাহলে আপনি ফিরে আসুন, তার পরেই নাহয় যাব।” তার পরে সৌজন্যমূলক কিছু কথা বলে শেষ করলেন। আর দেরি করা চলবে না। খাতা খুলে সুকৃত ডিলারদের, গ্যালারিগুলোর আর ওয়েবসাইটের ম্যানেজার না কী বলে তাদের নম্বর বের করে করে একে একে ফোন করলেন। হিসেব মত বাইশটা ছবি থাকার কথা ছিল, জানলেন তার মধ্যে ন’টা বিক্রি হয়েছে গতকাল রাত থেকে আজ সকালের মধ্যে। একজন ডিলার একাই তিনটে বিক্রি করেছেন। ওনার কাছে আর কোনও ছবি নেই। বললেন, “ঔর কুছ ভেজ দিজিয়ে, এক কাস্টমার মাং রহে থে...” “কী নাম কাস্টমারের?” “আরে বড়া আদমী হ্যয়।” বলে যে নামটা বললেন, সেটাই শুনবেন, জানতেন সুকৃত। যে কটা ছবি বাকি আছে সেগুলো বিক্রি হবে না, এমনকি ডিস্প্লে থেকে তুলে নেওয়া হবে সুকৃত আবার জানান’ অবধি, এমনটা গ্যালারি, ওয়েবসাইট, ডিলারদের বুঝিয়ে শেষ করতে প্রায় ঘণ্টা দেড়েক লাগল। এর মধ্যে ছ’টা মিস্‌ড্‌কল সুপ্রতীকের। অন্য দিন হলে ফিরে ফোন করতেন। কিন্তু আর কথা বলতে ইচ্ছে করছে না। তাছাড়া, সুপ্রতীক কী বলবে সেটা তো আন্দাজ করতে পারছেন। দাড়ি তেমন গজায় না। সপ্তাহে বার দুয়েক কামালেই চলে, কিন্তু গতকাল কামান’র সত্ত্বেও আজও কামাতে ইচ্ছে করছে। কেন ঠিক বুঝছেন না, মনটা বেশ ফুরফুরে লাগছে। ছবি বেশি দামে বিক্রি হবে বলে? উঁহু। খ্যাতি বাড়বে বলে? নাঃ, তাও না। তবে? জানেন না সুকৃত। দাড়ি কামান’র মধ্যে আরও একবার, চান করে বেরিয়ে দেখলেন দু’বার ফোন করেছে সুপ্রতীক। এবার ফিরে ফোন করলেন। “কোথায় থাকিস?” রাগ রাগ গলা। “দু’ঘণ্টা ফোন বিজি, তার পরে বাবু হাওয়া! ফোন ধরার নাম নেই।” ঠাণ্ডা গলায় বললেন, “কেন? তোর বস্‌ কি জানতে চেয়েছে আমি কোথায়?” একটু থতমত খেয়ে সুপ্রতীক বলল, “কেন, তা কেন? না, তা বলেনি — কিন্তু বসের জন্যই ফোন করলাম। তোর কপাল খুব ভাল।” সুকৃত চুপ। সুপ্রতীক বলল, “তোর সব ছবি এখন থেকে তরুণ সামন্ত কিনতে চাইছে।” সুকৃত বললেন, “সব? তার মানে?” এবার সুকৃত বিরক্ত। “সব মানে? জানি না তুই কী জিজ্ঞেস করছিস। সব মানে সব। ইংরিজিতে বলে ‘অল’।” সুকৃত বললেন, “কেন?” সুপ্রতীক বলল, “কেন মানে? তুই ইয়ার্কি করছিস? সামন্ত তোকে এত বড় একটা অ্যাসাইন্‌মেন্ট দিল, এত হ্যান্ডসামলি পে করল, তার ওপর এখন তোর সব ছবি কিনতে চাইছে, আর তুই কারণ খুঁজছিস?” উত্তর না দিয়ে সুকৃত বললেন, “নতুন বাড়ি কিনছেন, না মিউজিয়াম বানাচ্ছেন তোর বস্‌?” “তুই একটু ঝেড়ে কাশবি?” “বেশ তবে শোন। আমি মাসে অন্তত একটা, কখনও দু’টো ছবি আঁকি। কোনও বছর যদি মেজাজ ভাল থাকে, বা বিক্রি কম হয়, প্রায় পঁচিশটা অবধি এঁকেছি। এটা কমিশন বাদ দিয়ে আঁকার কথা। তোর বস যদি এগুলো সব কিনতে চায়, তাহলে পাঁচ বছরে শ’খানেক ছবি হবে। কোথায় রাখবেন?” সুপ্রতীক কিছু বলার চেষ্টা করছিল, সুকৃত বললেন, “শোন, ‘শরততপনে’ ছবিটা নাকি ওনার বন্ধুরা খুব অ্যাপ্রিশিয়েট করেছে। আমি দেখতে চেয়েছিলাম ডিস্প্লেটা, উনি বলেছেন, উনি কলকাতার বাইরে, ফিরে হবে। আমার কী ছবি উনি কিনবেন, সেটাও নাহয় তখনই হবে।” সুপ্রতীক অবাক। “কে কলকাতার বাইরে? তরুণ সামন্ত? কে বলল তোকে?” “উনি নিজেই। বাইরে না? আমিও আন্দাজ করেছিলাম। যাই হোক, ওই ছবিটা কোথায় আছে, কীভাবে আছে না জেনে আমি সামন্তকে আর ছবি বেচছি না। সেটা তুই ওকে বলবি কি না আমি জানি না, কিন্তু এটাই ফ্যাক্ট।” ফোন কেটে দিলেন। হঠাৎ রাগ হতে লেগেছে। বসের সঙ্গে মিলে এ কী রকম অত্যাচার বন্ধুর ওপর! দু’তিন দিন কারওর সঙ্গে যোগাযোগ না করে কাটালেন। তেমন কেউ ফোনও করল না, দেখাও করতে এল না। কিন্তু এ ক’দিনে সুকৃত তিন তিনটে ছবি এঁকে ফেললেন। তার মধ্যে দুটো বড় — সামন্ত যেমন কিনেছেন, তেমন বড়। তার পরে সুঋতির ফোনটা এল। এজেন্ট খবর পেয়েছে, আগামি পঁচিশে ছবির অকশন। কিন্তু তার আগে একটা অনুষ্ঠানে কার্ট ভ্যান ডাম্‌ আর আৎসুসি টাকেউচি কিছু একটা ডেমনস্ট্রেট করবেন। এরা কারা? নামও শোনেননি জীবনে। জানা গেল এনারা বিখ্যাত আর্ট ক্রিটিক। দু’জনেই জাপানি আর্ট স্পেশালিস্ট। এর তাৎপর্য কী, তা সুকৃত বা সুঋতির জানা নেই। সুঋতি বলল, “আমার ভীষণ ইন্ট্রিগিং লাগছে, জানিস? আমি যেতাম, কিন্তু আমার মেয়ের কনভোকেশন সেদিনই। যেতে হবে অ্যালবার্টা। তবে আমার এজেন্ট থাকবে। ওরও জাপানি আর্টে ইন্টারেস্ট... তুই একবার সুপ্রতীককে জিজ্ঞেস করবি? ও তো থিয়োরিতে খুব স্ট্রং...” গত ক’দিনে সুপ্রতীকের সঙ্গে কোনও কথাই হয়নি। কিন্তু সে কথা সুঋতিকে জানাবার নয়, হুঁ-হাঁ করে ফোন রেখে দিলেন। পঁচিশে। তিন দিন আরও। অর্থাৎ আরও চারদিনের আগে কিছু জানা যাবে না। দিন কাটে, সুকৃতর ছটফটে ভাবটা বাড়ে। কারওর সঙ্গে কথা বলতে পারলে হত।অনেকবার সুঋতিকে ফোন করতে গিয়েও করেননি। অনেক বার ভেবেছেন সুপ্রতীকের সঙ্গে কথা বলেন, কিন্তু… তৃতীয় রাতে প্রায় ঘুমোতেই পারলেন না সুকৃত।ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই রাস্তায় হেঁটে এলেন এক চক্কর।লেকের ধারে ফুটপাথের দোকানে চা খেতে খেতে চোখের সামনে একটা ছবি ফুটে উঠল বলে চা’টা শেষ না করেই বাড়ি ফিরে ক্যানভাসে জেসো লাগিয়ে শুকোতে দিয়ে জল বসাতে গেলেন।তখনই দরজায় বেল বেজে উঠল। এত সকালে কে? ভিজে হাতটা তোয়ালেতে মুছতে মুছতে দরজা অবধি যেতে যেতে আবার বাজল।কারও কোনও সমস্যা হয়েছে? সুকৃত পা চালিয়ে বসার ঘর পেরিয়ে দরজার পীপ্ হোলে চোখ রেখে অবাক হলেন। সুপ্রতীক। এত সকালে? দরজা খুললেন। সুপ্রতীকের চুল উস্কোখুস্কো। চোখের নিচে কালি। সুকৃত বললেন, “কী হয়েছে?” জবাব না দিয়ে ঢুকল সুপ্রতীক। বলল, “হিদাও নাকামুরার নাম শুনেছিস?” সুকৃতর এক কাপ জল ফুটে গেছে। আর এক কাপ জল তাতেই ঢেলে দিয়ে সুপ্রতীকের দিকে ফিরে বললেন, “জাপানি?” “জাপানি তো বটেই। নাম শুনেছিস কি?” না, শোনেননি। কী হয়েছে নাকামুরার? “হিদাও নাকামুরা উনিশশতকের জাপানি আর্টিস্ট। খুব বিখ্যাত না। তার কারণ বেশি দিন বাঁচেননি বলে বেশি ছবি আঁকেননি। গোটা কুড়ি ছবির কথা জানা আছে, সাতটা আছে মেট্রোপলিট্যান মিউজিয়ম অফ আর্ট, নিউ ইয়র্কে, আর বাকি সবই জাপানে, বিভিন্ন মিউজিয়াম, ইত্যাদিতে...” চা ভিজিয়ে আবার রান্নাঘরের দরজায় ফিরে এলেন সুকৃত। সুপ্রতীক টেবিলে রাখা কাগজটা খুলেছে। গতকালের কাগজ। আজকের কাগজ এখনও আসেনি। মুখ তুলে সুকৃতর দিকে তাকিয়ে দেখল, বলল, “গতকাল নিউ ইয়র্কে অ্যাকারম্যান ফাইন আর্ট গ্যালারিতে তোর একটা ছবি বিক্রি হয়েছে...” সুকৃত বললেন, “কোন ছবি?” সুপ্রতীক একটু থতমত খেয়ে চুপ করে মাথা নামিয়ে চেয়ে রইল টেবিলের দিকে। সুকৃত বললেন, “তোর বস্‌ যেটা নিয়েছিল, সেটাই?” চট করে একবার চোখে চোখ রেখে আবার অন্যদিকে তাকিয়ে ঘনঘন হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ল সুপ্রতীক। “আর কার্ট ভ্যান ডাম্‌ আর আৎসুসি টাকেউচি কী বললেন?” প্রশ্নটা করে সুকৃত চা ছাঁকার জন্য রান্নাঘরে ঢুকে গিয়েছিলেন, কিন্তু চায়ের পট হাতে নিয়ে ঢালার আগেই সুপ্রতীক রান্নাঘরের মধ্যে। “তুই সব জানিস, শালা... বল, সব জানিস...” এবার হেসে ফেললেন সুকৃত। বললেন, “চা-টা ঢালি, তারপরে বলছি আমি কী জানি।” আর রাখঢাক নয়, সুকৃত টেবিলে বসে চা খেতে খেতে সুঋতির ফোন থেকে শুরু করে, আজ অবধি যা জানেন সবই বললেন। সুঋতির ফোনের খবরটা জানাননি বলে যে যে মধুর সম্ভাষণ প্রাপ্য ছিল সেগুলো হজম করে বললেন,“নাকামুরার ব্যাপার কিছুই জানি না।” সুপ্রতীক বলল, “তোর ছবি কাল কত দামে বিক্রি হয়েছে জানিস?” জানেন না, তাই চেয়ে রইলেন। কেউ যদি সামন্তর কাছে অত দামে ছবি কিনে অকশন করে, তাহলে কত দামে বিক্রি হতে পারে? দামটা শুনে এক লহমার জন্য সুকৃতর মনে হল দম বন্ধ হয়ে যাবে। চারপাশটা অন্ধকার হয়ে আসছে কি? এর বেশি দামে ভারতীয় কোনও আর্টিস্টের ছবি বিক্রি হয়েছে কোনও দিন? সুপ্রতীক হাসল। “হয়েছে। তোর ছবি কোনও রেকর্ড করেনি, তবে আর্ট ওয়র্ল্ড চমকেছে বইকি!” “তুই এত জানলি কী করে?” “কাল রাত তিনটের পর তরুণ সামন্ত ফোন করেছিল। পিস্‌ড্‌ ড্রাঙ্ক। ভীষণ আপসেট। তোর ছবি বেচে ঠকে গিয়েছে। আমি তখন থেকে পড়াশোনা করছি। আজ একটা ই-মেল করে এসেছি। বেশ হয়েছে, তোর ছবি কিনে বেশি দামে ভায়রাকে বেচে দেবার বেলায় মনে ছিল না?” সুকৃত বললেন, “এবার তুই ঝেড়ে কাশ দেখি, ভায়রা আবার কে?” সুপ্রতীক বলল, “তরুণ সামন্তর ভায়রা নাকি আর্ট বোঝে। নিউ ইয়র্কে থাকে। সেই নাকি কবে তোর কোন ছবি দেখে সামন্তকে বলেছিল, ‘বাঃ, বেশ তো,’ আর তখনই তরুণ সামন্ত ঠিক করে তোকে দিয়ে বড় ছবি আঁকাবে।” সেই ছবিই ‘শরততপনে’। তার ফটো তুলে সামন্ত ভায়রাকে পাঠায়, আর সেটা দেখে ভায়রার এজেন্ট একটা হাই-রেজোলিউশন ছবি চান। এবং তার পরেই এজেন্টের কথায় ভায়রা ছবিটা কিনে নেয়, তরুণকে বলে সব ছবি কিনে নিতে। সুকৃত বিক্রি বন্ধ করার আগে অবধি তরুণ গত কয়েক দিনে কলকাতা, বম্বে, দিল্লীর ডিলারদের কাছ থেকে সুকৃতর সব ছবি কিনেছে, আর ওয়েবসাইট থেকে কিনেছে সামন্ত, ভায়রা আর এজেন্ট — তিনজনেই। এক, কেন? দুই, এর মধ্যে ওই নাকামুরার কী অবদান? এবং তিন, ওই দুই আর্ট বিশেষজ্ঞ কাল কী বলেছেন? “বলেছেন তোর আঁকা আর হিদাও নাকামুরার আঁকার স্টাইল নাকি একই রকম।” “নাকামুরা উনিশ শতকে জাপানে বসে পোস্ট-ইম্প্রেশনিস্ট ল্যান্ডস্কেপ আঁকত?” “জানি না,” বলল সুপ্রতীক। “আমি কাল বাকি রাত অনেক পড়েছি, অনেক খুঁজেছি। তোর মনে আছে, আমাদের সেকেন্ড ইয়ারে একজন ইয়ং টিচার পড়াতে এসেছিলেন, যিনি কয়েক মাস পরে সুইসাইড করেন?” মনে আছে। নাম মনে নেই। “আমারও নেই। উনি আমাদের মাঝে মাঝে জাপানি আর্টিস্টদের কথা বলতেন না? একজনের কথা বলেছিলেন —কুরোদা সেইকি, মনে আছে?” মনে নেই আবার! বিখ্যাত জাপানি ইম্প্রেশনিস্ট, এবং তার চেয়ে বড়ো কথা, নতুন করে জাপানি আর্টে ন্যুড ছবির প্রচলন করেছিলেন। কিন্তু তার সঙ্গে... “এই হিদাও নাকামুরা হল সেইকির সমসাময়িক। তবে বলা বাহুল্য, সেইকির মতো প্যারিস গিয়ে আঁকা শেখেনি, মারাও গিয়েছে সেইকির অনেক আগে। এবং আমি যতটুকু বুঝলাম, আঁকার স্টাইলেও আকাশ পাতাল তফাৎ।” তাহলে কেন... “সেইকির কথাটা বললাম তোকে বোঝানোর জন্য। একটা পরিচিত নাম পেয়ে তো মজা লাগে, তাই। তবে কেন তোর আঁকার সঙ্গে নাকামুরার আঁকার সিমিলারিটি? পেলাম না কোথাও।” ঘড়ির দিকে তাকালেন সুকৃত। নিউফাউন্ডল্যান্ড ন’ঘণ্টা পিছিয়ে। অর্থাৎ ওখানে রাত নটা। “আশাকরি সুঋতি এখনও শুয়ে পড়েনি। আজ ওর মেয়ের কনভোকেশন ছিল। টায়ার্ড থাকতে পারে।” ফোন বাজার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ধরল সুঋতি। “আমি তোকে এখুনি ফোন করছি, কৃত — আই অ্যাম টকিং টু মাই এজেন্ট অ্যাবাউট ইউ।” এখুনি বলে প্রায় দশ মিনিট দেরি করল। এর মধ্যে সুকৃত আর সুপ্রতীক আরও এক কাপ চা খেলেন। সুপ্রতীক প্রায় একশো বার পকেট চাপড়াল, আর বলল, “সিগারেট... কিনতে হবে...” সুঋতির ফোনটা যখন এল তখন সুকৃত উঠে পায়চারি করছেন আর সুপ্রতীক টেবিলে বসে। ফলে হাত বাড়িয়ে মোবাইলটা কানে দিল সুপ্রতীকই। প্রথমেই বলল, “কী রে! কেমন আছিস? সুকৃত ফেমাস হচ্ছে বলে খালি ওকেই ফোন করিস, কেমন?” দু’জনের প্রাথমিক আলাপচারিতা শেষ হলে সুপ্রতীক বলল, “আছে, আছে, এখানেই আছে, একবার এই পা, আর একবার ওই পায়ে নাচছে... দাঁড়া, আমি ফোনটা লাউডস্পীকার করি। তাহলে ব্যাপারটা আমিও জানতে পারব। কেন ওই জাপানি নাকামুরা আর আমাদের আঁকামুরা সমান সমান...” সুঋতি যা বলল সেটা এতই অদ্ভুত যে ওরা অবাক হয়ে গেল। নাকামুরা মোটেই অজানা অখ্যাত শিল্পী নন। বরং যারা জাপানি আর্ট নিয়ে লেখাপড়া করে, আর্টের বিশ্লেষণ করে, তাদের কাছে নাকামুরা একটা ভীষণ ইন্টারেস্টিং ফেনমেনন। তার কারণ ওনার ব্রাশ স্ট্রোক। সুঋতি বলল, “নাকামুরার ব্রাশ স্ট্রোক নাকি অনন্য। সে নাকি স্কলারদের রিসার্চের বিষয় ছিল বহু দশক। এমনকি উনিশশো তেষট্টিতেও নাকি কেউ নাকামুরা স্ট্রোক্‌স্‌ নিয়ে পিএইচডি করেছে। তার পরে গত কয়েক দশকে অত হইচই না হলেও বিদগ্ধজনেরা নাকামুরা স্ট্রোক্‌স্‌ নিয়ে আলোচনা করে।” সুপ্রতীক জিজ্ঞেস করল, “এর বিশেষত্ব কী?” সুঋতি জানে না। সেটাই নাকি কাল ভ্যান ডাম্‌ আর টাকেউচি বুঝিয়েছেন সমবেত জনসাধারণকে। স্পেশাল অকশনের আগে। আর সেই সঙ্গে বলেছেন যে আজ অবধি কেউ কোনদিন নাকামুরা স্ট্রোক্‌স্‌ নকল করতে পারেনি, এমনই কঠিন সে তুলির টান। বিস্ময় বিমূঢ় সুকৃত ধরা গলায় বললেন, “আর আমি...” সুপ্রতীক থেমে যাওয়া প্রশ্ন শেষ করল, “আর তুই বলছিস আমাদের এই সুকৃত হতভাগা নাকামুরা স্ট্রোক করতে পারে?” সুঋতি বলল, “শুধু করতে পারে এমনটা না, ওরা সুকৃতর প্রায় গোটা পনের’ ছবি অ্যানালাইজ করেছে কাল। ওরা বলছে সুকৃত ইজ আ ন্যাচারাল নাকামুরা। ওর সমস্ত ছবিতে ওই একই তুলির টান।” সুঋতি ফোন ছাড়ার পর দু’জনে খানিকক্ষণ চুপ করে বসে রইলেন। সুপ্রতীক চট করে বাইরে গিয়ে এক প্যাকেট সিগারেট কিনে আনল। সুকৃত হুইস্কির বোতল বের করলেন। সুপ্রতীক ঘড়ি দেখে বলেছিল, “এখন হুইস্কি খাবি? তোর মাথাটা গেছে।” কিন্তু সুকৃত যখন বললেন, “এখন যদি আমরা নিউ ইয়র্কে থাকতাম, খেতি, কি না?” তখন আর না বলল না। খানিকক্ষণের মধ্যেই গোটা ঘরটাকে ভরিয়ে ফেলল ধোঁয়ায়। একবার বলল, “বটব্যালদার কথাটা তাহলে তুইই রাখলি।” তারও অনেক পরে, অনেকটাই জড়ান’ স্বরে বলল, “তোর ব্রাশস্ট্রোক স্টাইল আলাদা, চাইনিজ... আমি অনেক বার বলেছি।” ঠিক কথা। বলেছে। “তোর মনে আছে,” বলে চলল সুপ্রতীক, “বটব্যালদা বলত, ব্রাশস্ট্রোক কক্ষণও নিজে নিজে আসে না, কোনও শেখা থেকে আসে?” মনে আছে। “তাহলে? তোরটা কোত্থেকে এল?” এ প্রশ্ন সুকৃত অনেক করতেন নিজেকে, কলেজে যখন সুপ্রতীক ওর আঁকা নিয়ে মন্তব্য করত। উত্তর পেতেন না, বরং একটা গভীর অস্বস্তি হত বলে ভাবতেন না। আজ সুপ্রতীকের প্রশ্নে সেই অস্বস্তিটা আবার ফিরে এল। কিছু বললেন না। ৩ এর পরের কয়েক সপ্তাহ কোথা দিয়ে গেল সুকৃত জানতেও পারলেন না। হাজার ফোনের শুরু হয়েছিল সুঋতির এজেন্টকে দিয়ে। তার পরে দেশি-বিদেশি নানা এজেন্ট — সকলেই সুকৃতর একমাত্র রিপ্রেজেন্টেটিভ হতে চান। সেই সঙ্গে খদ্দেরদের ফোন। সমস্যা হয়েছিল খানিকটা তরুণ সামন্তকে নিয়ে। তবে তাঁকেও সুকৃত সসম্ভ্রমে জানিয়েছেন যে তাঁর জন্যই আজ সুকৃতর নাম ছড়িয়েছে — সুতরাং তাঁকে ছবি নিশ্চয়ই দেবেন সুকৃত, এমনকি বাজারদরের চেয়ে খানিকটা কম দামেই। সামন্ত আর ফোন করেননি, লোকজনকে বলে বেরিয়েছেন, সুকৃত অকৃতজ্ঞ। সেই সঙ্গে এসেছে মিডিয়া। প্রথমে বিদেশি, তার পরেদেশি। কাগজ, ম্যাগাজিন, টিভি। হঠাৎ হয়ে উঠেছেন বিশ্বের, ভারতের, বাংলার সবচেয়ে চর্চিত শিল্পী। নিজে অ্যামেরিকা, ইংল্যান্ড আর জাপান গিয়েছেন বিভিন্ন শিল্প সংস্থার ডাকে। দেখা করেছেন ভ্যান ডাম্‌ আর টাকেউচির সঙ্গে। তাঁরা সি.এন.এন-এর ক্যামেরার সামনে শুকনো তুলি ধরে দেখিয়েছেন, ঠিক কী ভাবে ধরলে, কী ভাবে টানলে নাকামুরা স্ট্রোক আঁকা সম্ভব। হাঁ করে দেখেছেন সুকৃত। ক্যামেরা নিয়ে মিডিয়ার দল গভর্নমেন্ট আর্ট কলেজের আনাচে কানাচে ঘুরে বেড়িয়েছে। ক্যানাডা থেকে উড়িয়ে আনা হয়েছে সুঋতাকে। সুকৃতর বেড়ে ওঠার গল্প তৈরি হয়েছে শহরের নানা গলি ঘুরে। ইন্টারভিউ দিয়েছে দুই বেস্ট ফ্রেন্ড। কখনও আলাদা, কখনও তিনজন এক সঙ্গে। “তোর কল্যাণে আমরাও বিখ্যাত হয়ে গেলাম,” বলেছিল সুপ্রতীক। সুঋতি এক চাঁটি মেরে বলেছিল, “তুই আর বকিস না, তুই এমনিই যথেষ্ট বিখ্যাত। আমারই লাভ হল। আমি বলব — থ্যাঙ্ক ইউ, কৃত।” মুখ্যমন্ত্রী এসে দেখা করে গিয়েছেন সুকৃতর বাড়িতে। জানতে চেয়েছেন, কী এই তুলির টান, বাংলা মিডিয়া যেটাকে বলছে ‘নাকামুরা-চৌধুরী-তুলি-টান’? এর মধ্যে ভ্যান ডাম্‌ আর টাকেউচির টিউটোরিয়াল ইউ-টিউব থেকে পেন ড্রাইভ বন্দী করে দিয়ে গিয়েছে সুপ্রতীক। সেটাই চালিয়ে দেখিয়েছেন সকলকে। লাইভ ডেমনস্ট্রেশনের কথায় হাতজোড় করে বলেছেন, কাজ করেন একাই। কেউ থাকলে হাতে তুলি নিতে পারেন না। আর ‘কোথা থেকে শিখেছেন?’ প্রশ্নটার মুখোমুখি হলেই ভেতর থেকে উথলে ওঠা অস্বস্তিটা জোর করে দাবিয়ে দিয়ে হতাশ হেসে বলেছেন, “জানি না।” গত ক’দিন বি.বি.সি-র টিম কলকাতায় রয়েছে। সব কাজই তাদের শেষ, কিন্তু সুকৃতর তুলির টান ক্যামেরাবন্দী না করে ফিরবে না — এই তাদের ধনুকভাঙা পণ। রোজ ফোন করে জ্বালাচ্ছে। গতকাল ওদের ফোন তোলেননি সুকৃত। আজও যখন ফোনটা বাজল, সুকৃত প্রথমে হাত বাড়াননি। তার পরে মনে হল, যদি অন্য কেউ হয় — তুলে দেখলেন, সুপ্রতীক। বাড়ি আছেন জেনে বলল, “আসছি, বেরোস না কোথাও।” হাজির হল ঝড়ের মত। ওদের মিডিয়া হাউসের টিভি চ্যানেল এখন বি.বি.সি-র সঙ্গে একযোগে কাজ করছে। সুতরাং ওর ওপর দায়িত্ব পড়েছে, সুকৃতর ছবি আঁকার সম্পূর্ণ দৃশ্য যেন বি.বি.সি ক্যামেরায় ধরতে পারে। আঁতকে উঠে সুকৃত বললেন, “ছবি আঁকতে অন্তত দু’তিন দিন লাগে — সারাক্ষণ ক্যামেরা লাগিয়ে বসে থাকবে নাকি ওরা?” সুপ্রতীক হেসে বলল, “আরে না না, একটা ক্যানভাসে কাজ করছিস, সেটার দশ-পনের মিনিট শট নেবে। এত টেনশন করছিস কেন? নিজের মত আঁকবি, ওরা ছবি নিয়ে চলে যাবে। ব্যস, এই তো।” সুকৃত উত্তর দিলেন না। সুপ্রতীক গেলে পরে ওর দেওয়া পেনড্রাইভটা টিভিতে ফিট করে ভিডিওটা আবার চালালেন — নাকামুরা স্ট্রোক্‌স্‌... ৪ দিন কাটে। গড়ায় মাসে, মাস গড়ায় বছরে... দেখতে দেখতে প্রায় তিন বছর হয়ে গেল। সকালে উঠে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সুকৃতর নিজেকে বৃদ্ধ লাগে। চারপাশে তাকিয়ে দেখেন বাড়িটাও বড্ড ন্যাড়া। দেওয়ালগুলো ফাঁকা। কেবল সুপ্রতীকের শিব আর সুঋতির সী-স্কেপ। বাকি ছবিগুলো বিক্রি করে দিয়েছেন। দেওয়ালে ফ্রেম-এর আউটলাইন ধরে কালচে ছোপ। ক’দিন আগেও মাঝে মাঝে ভাবতেন আবার ছবি এঁকে ভরিয়ে দেবেন, কখনও বা ভাবতেন বাড়ি রং করিয়ে শুধু সুপ্রতীক আর সুঋতির ছবিদুটো বসার ঘরে রেখে দেবেন — আর কোন ছবিই থাকবে না। আজ আর সে সব দরকার নেই। সুকৃতর কাজ শেষ। নিজের সব ছবি বিক্রি করে দিয়েছেন। অপেক্ষারও শেষ হয়েছে। সুকৃতর ছবি নিয়ে মাতামাতি কমে এসেছে। দৈনিক একাধিক ফোন থেকে আজ সুকৃতর ফোন প্রায় বাজে না বললেই চলে।টিভি চ্যানেলরা আর ইন্টারভিউ চায় না। ম্যাগাজিনের সম্পাদকরাও ফোন করেন না। তাঁরা জানেন গত তিন বছরে সুকৃত কাউকে হ্যাঁ বলেননি। দুটো মানুষের ফোন আসে। ওরা জানতে চায়, কী আঁকছিস? সুকৃত হেসে বলেন, “জানাব।” স্টুডিওর ঘরে এখন আর কোনও ছবি নেই। ক্যানভাসগুলো গোছান। এদিক ওদিক ছড়ান ছবি নেই। অসম্পূর্ণ ছবিও না। একমাত্র ব্যবহৃত ক্যানভাস সেটাই, যেটার ছবি বি.বি.সি নিয়ে গেছে। যতটুকু বি.বি.সিকে দেখান’র জন্য তুলি চালিয়েছিলেন ততটুকুই রং সেই ক্যানভাসে। এটা না রাখলেও চলত, কিন্তু রাখতে হবে ব্যাপারটা বোঝান’র জন্য। দরজায় ঘণ্টি বাজল। বাইরে চটের ব্যাগ নিয়ে লুঙ্গি পরিহিত সুকৃতর মিস্ত্রী। “ছবি প্যাক হবে খবর দিয়েছিলেন?” দরজা খুলে ছেলেটাকে ঢুকিয়ে সুকৃত সুপ্রতীক আর সুঋতির ছবিদুটো দেখিয়ে বললেন, “ওই দুটো। অনেক দূর যাবে। ভাল করে করবি। দেখ ভেতরের ঘরে বাব্‌ল্‌ র‍্যাপ কাগজগুলো আছে।” ছেলেটা কাজ করে যেতে না যেতে আবার দরজায় কে এল। আবার দরজা খুললেন। বাইরে ছেলেটি সেলাম করে বলল, “গাড়ি এসে গেছে, বাবু।” এবার সুকৃত একটা ঢাউস আর একটা ছোট স্যুটকেস, আর সুন্দর করে প্যাক করা ছবি দুটো দেখিয়ে বললেন, “এগুলো গাড়িতে রাখ। বড়টা রাখবে ডিকিতে, ছোটটা পেছনের সিটে, ছবিগুলোও সিটে রাখবে।” সুকৃত ফিরে গেলেন ডাইনিং টেবিলে। পকেট থেকে চিঠিটা বের করে পড়তে হবে আর এক বার। সেটাই হবে একেবারে শেষ কাজ। ৫ “তোদের দু’জনকে একসঙ্গে লিখছি। হাতে লেখা চিঠি, একটাই কপি। একজন পাবি অরিজিন্যাল, অন্যজন জেরক্স। কে কোনটা পাবি আমি জানি না। কিন্তু বক্তব্য একটাই। আমি চলে যাচ্ছি, সেটা তোরা হয়ত এই চিঠি পাবার আগে জানতে পেরে যাবি। হয়ত জানবি না। এর মধ্যে ফোন করলে জেনে গেছিস যে নম্বরটা আমি ছেড়ে দিয়েছি। অজ্ঞাতবাসে যাচ্ছি। নাকামুরার কল্যাণে যা নাকানি-চোবানি খেয়েছি, তার আর পর নেই। সুপ্রতীক, তোর মত জোক করার চেষ্টা করলাম, মাপ করিস। একটা এক্সপ্ল্যানেশন দেবার চেষ্টা করি। তোরা, বিশেষ করে সুপ্রতীক বার বার জিজ্ঞেস করেছিস, মিডিয়া পাগল করে দিয়েছে — কোথা থেকে পেলাম এই নাকামুরা ব্রাশস্ট্রোক? বাঙালি শহুরে ছেলে, মধ্যবিত্ত পরিবারে মানুষ, যার ঊর্ধ্বতন চোদ্দপুরুষে কেউ কোনও দিন ছবি এঁকেছে বলে জানা যায়নি, সে কী করে এমন এক ব্রাশস্ট্রোক আবিষ্কার করল? সুপ্রতীক, আমাদের মধ্যে তুইই বেশি ভাবিত — এখনও বলিস, গাইডেন্স নিশ্চয়ই ছিল। আমি কখনও মনে করতে পারিনি, কিন্তু প্রশ্নটা করলেই আমার একটা অস্বস্তি হত, যেটা চাপা দিতে আমি কলেজ জীবন থেকে তোর প্রশ্নটা অগ্রাহ্য করতে শিখেছিলাম। কিন্তু এবার আর অগ্রাহ্য করা গেল না। এত বার, এত ভাবে, এত লোকের কাছে এই প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হল, যে আমি দিশেহারার মত হয়ে যেতে লাগলাম। খালি মনে হতে লাগল, আমার জীবনে জাপানি কেউ ছিল, সে কিছু একটা করেছিল, কিন্তু কী, তা ভেবে পাই না। ক্রমে এমন হল যে গত কয়েক বছরে আমি রাতের পর রাত জেগে কাটিয়েছি, স্বপ্নে জাপানি আর্টিস্ট দেখে ঘুম থেকে উঠে গিয়েছি, রাত্তির তিনটের সময় বাথরুমে গিয়ে মাথায় জল ঢেলেছি — আর ভেবেছি, এটা কি সত্যি? নাকি বার বার শুনে শুনে আমার মনই জাপানি গাইডেন্স সৃষ্টি করছে? হঠাৎ, কী করে বলছি একটু পরে, সবটা মনে পড়েছে। আমার তখন বোধহয় পাঁচ কী সাত বছর বয়স, কী এক দূরারোগ্য অসুখ করেছিল। মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি ছিলাম বেশ কয়েক মাস, তার পরে ডাক্তারবাবু বাবাকে বলেন পড়াশোনার চাপ কমিয়ে দিতে। এক মাসি থাকতেন শান্তিনিকেতনে। মেসো নিয়ে গেলেন। এক বছর, বা তার বেশি সময় ছিলাম ওখানে। সেখানে একজন জাপানি আর্টিস্ট ছিলেন, মাসির বাড়িতে থাকতেন। নাম জানি না। ইন ফ্যাক্ট, কিছুই মনে ছিল না। এইটুকু মনে আছে, আমি শান্তিনিকেতনে দুপুরে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াতাম, কিংবা ছবি আঁকতাম। কোনও কথাই হয়নি বোধহয় আমাদের মধ্যে। মনে তো পড়ে না এখনও। আমি হিন্দী ইংরিজি কিছুই জানতাম না। উনি বাংলা এক অক্ষরও বলতে পারতেন না। ছবি আঁকতেন, আমি দেখতাম। আমাকে কাগজ দিয়েছিলেন, আর একটা তুলি, তার সঙ্গে ক্যালিগ্রাফি পেন। আমি ছবি এঁকে দেখাতাম, উনি দেখিয়ে দিতেন, কখনও হাত ধরে তুলির টান দিতেন। যাবার আগে কয়েকটা তুলি আমাকে দিয়ে যান। তখন বুঝিনি, এখন বুঝি, মেসোমশাই কেন বাবাকে বলেছিলেন আমাকে ছবি আঁকা শেখাতে। নিশ্চয়ই ওই আর্টিস্টের কথাতেই। আরও একটা কথা মনে পড়ছে। সুঋতি, তোর বাবা অফিসের কাজে জাপান গিয়েছিলেন — তোকে একসেট বাঁশের জাপানি তুলি এনে দিয়েছিলেন, মনে আছে? তুই সেগুলো কোনও দিন ছুঁয়েও দেখিসনি, কিন্তু আমি সেগুলো তোর কাছ থেকে নিয়ে এসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা, দিনের পর দিন জাপানি ঢঙে অয়েল করতাম? বাঁশের ছবি, বাঁশপাতার ছবি, তোরা হাসতি, নানা বানানো জাপানি নামে ডাকতি আমাকে। সুপ্রতীক, তুই তো এসব রিসার্চ করতে পারিস। আমার পাঁচ সাত বছর বয়সে কোন কোন জাপানি আর্টিস্ট বিশ্বভারতীতে এসেছিলেন, বের করতে পারবি? তিনিও কি কোনও অজ্ঞাত নাকামুরা? দেখ হয়ত তাঁকে তুই-ই আবিষ্কার করবি। এখন আমার মাসি মেসো কেউই আর নেই, সন্তানহীন ছিলেন, তাই জিজ্ঞেস করার কেউ বাকি নেই। এখন আমি নিশ্চিত — ওনার সেই স্টাইলই আমি বয়ে বেড়াচ্ছিলাম। ভাবিওনি, জানতামও না। আমার পার্থিব পোজেশন সব গোছাতে গিয়ে ওই তিনটে জাপানি তুলি আর একটা ক্যালিগ্রাফি পেন খুঁজে পেলাম বাবার ব্যাঙ্কের লকারে। কেন বাবা সেগুলো লকারে রেখেছিল কে জানে! কিন্তু সেই মুহূর্তে কেমন আলাদীনের গুহার দরজা খুলে গেল, বন্যার জলের মত, জলপ্রপাতের মত স্মৃতির বাঁধ ভেঙে গেল। এই মনে পড়া যে কী আশ্চর্য অভিজ্ঞতা, যে এর ভেতর দিয়ে না গিয়েছে, সে বুঝবে না। কিন্তু আজ আমি আর তুলি ধরতে পারছি না। ছবির পর ছবি আমার মনের চোখে ভেসে উঠছে— কিন্তু তুলি ধরলে আর কিছুই হচ্ছে না — কেবল টাকেউচির আঙুল আর কবজি ভেসে উঠছে। কোন অ্যাঙ্গেলে তুলি ধরে, কোন অ্যাঙ্গেলে ক্যানভাসে লাগিয়ে, কী ভাবে টানলে নাকামুরা স্ট্রোক হয়, সেটাই মাথায় ঘুরছে। বার বার দেখছি ভিডিওটা, আবার না দেখে নিজের মত আঁকার চেষ্টাও করছি, কিছুই আর হচ্ছে না। এবার বুঝছি কেন বলেছে জেনেবুঝে নাকামুরা স্ট্রোক্‌স্‌ আঁকা যায় না। গত আড়াই-তিন বছরে একটাও ছবি আঁকিনি। শুধু ক্যানভাসের পর ক্যানভাস নষ্ট করেছি। সব ফেলে দিলাম, শুধু ইজেলে রেখে দিলাম একটা। ওই যেটার ছবি নিয়ে গিয়েছে বি.বি.সি। দেখে বুঝবি কী রকম স্ট্রোক এঁকেছি। আমার খ্যাতির কারণটা জানাই আমার সর্বনাশ করল। আমার ছবি নিয়ে মাতামাতি শেষ হয়ে গিয়েছে, বেশ বুঝছি। অর্থাৎ আমার পনের মিনিটের খ্যাতি শেষ। আর আমি শুধু আলেয়ার পিছনে ঘুরে বেড়াচ্ছি, নাকামুরা স্ট্রোক্‌স্‌ ধাওয়া করে। আর ভাল লাগছে না। এমনিতেই এ শহরের ধুলো ধোঁয়া আমার দম বন্ধ করে দিত, কিন্তু যেতে পারতাম না, যাব কোথায় — এ কথা ভেবে। নাকামুরা আমায় মুক্তি দিয়েছেন। তাঁর কল্যাণে আমি আজ বড়লোক। এবং এ কথা অস্বীকার করলে চলবে না, যে তরুণ সামন্ত আর তাঁর নাম না জানা ভায়রাভাইকে এর জন্য ধন্যবাদ দেওয়া উচিৎ। মানানসই এবং নাটুকে দুইই হত যদি দুটো দারুণ ছবি ওঁদের উপহার দিতে পারতাম। কিন্তু ছবিগুলো সব বিক্রি করার আগে ওঁদের ওপর রেগে ছিলাম, ভেবেছিলাম ওঁরা আমায় ঠকিয়েছেন, তাই মাথায় আসেনি, যে ওনারা যা করেছেন, সেটা ওনাদের হক, আমাকে ঠকান’র জন্য করেননি। এখন চাইলেও ওঁদের ছবি এঁকে দেবার উপায় নেই। কোথায় যাচ্ছি বলে গেলাম না। ভেবেছিলাম ছবি আর আঁকব না, তাই সরঞ্জামও কিছু নিইনি। কিন্তু ওই জাপানি তুলি তিনটে আর ক্যালিগ্রাফি পেনটা নেবার লোভ সামলাতে পারলাম না। নিয়ে যাচ্ছি। যদি নিজেকে আবার খুঁজে পাই, যদি ছবি আবার বেরোয়, তোদেরই আগে জানাব। বাড়ির চাবিটা কেয়ারটেকারের কাছে। বলা আছে, সুপ্রতীক, তোকে দেবে। তুই অনেকদিন বলেছিলি, একটা যুতসই জায়গা পেলে মনের মত একটা ছবি আঁকার স্কুল খুলবি, যেখানে বাঁধাধরা ছবি-রং-করা শেখান হবে না, ট্যালেন্ট খোঁজা হবে, নার্চার করা হবে — আলমারির চাবি রয়েছে বসার গরে চেস্ট অব ড্রয়ারের ওপরের ডানদিকের টানায়। আলমারিতে তোর নামে বাড়ির দানপত্র লেখা আছে। বাড়িটায় অ্যাকাডেমি করিস। আর তা যদি না করতে চাস, যা খুশি করিস, আমি দেখতে আসব না। সুঋতি, তোর নাম এই চিঠিতে কম আছে, তার কারণ গত পনের বছরে তোর সঙ্গে আমার কথা হয়ইনি। কেবল গত ক’দিনে একটু টেলিফোন যোগাযোগ হয়েছে। তবু, অনেক কথা সুপ্রতীকের নাম লিখে বলা সত্ত্বেও সবগুলো তোকেও বলা, সেটা আশাকরি তোর বুঝতে অসুবিধা হবে না। চললাম, ইতি।
---------------------------------------------------------------------
আন্তর্জাতিক পাঠশালা
জানুয়ারি - জুন ২০১৬
বার্ষিক সংখ্যা, ২০১৬
পৃঃ ৩৫০ - ৩৬৭

Sunday, September 25, 2016

টুস্কির রান্নাবাটি

টুস্কির আজ দারুণ আনন্দ। সন্ধেবেলা বাবা বাড়ি ফিরে বলেছে, দাদাভাই আসছে। আর আসছে মানে, শুধু আসছে না, একেবারে থাকতে আসছে। জগদ্ধাত্রীপুরে দাদাভাই চাকরি পেয়েছে লোহা কারখানায় — লোহা বানাবে! আর ওদের বাড়ি বর্ধিষ্ণুনগর থেকে জগদ্ধাত্রীপুর বেশি দূর না হলেও, দাদাভাই জগদ্ধাত্রীপুরেই থাকবে। ওদেরই বাড়িতে! এর চেয়ে বড়ো আনন্দের কথা আর কিছু হতে পারে?
টুস্কি আর হাঁটছে না। নাচছে। একবার তো টেবিলের পাশ দিয়ে যেতে গিয়ে চেয়ারে পা লেগে হাউমাউ কান্না। শেষে মা’র কাছে প্রবল বকুনি খেয়ে থামল। মা বেশি বকে টকে না, কিন্তু আহ্লাদ করলে একেবারে ছেড়ে কথা বলে না। না বকলে কী হবে, রেগে গেলে গুমগুমিয়ে কিলিয়ে ছাড়ে। হুঁ!
দাদাভাই খুব ভালো। সবসময়ে হাসিখুশি, মুখে গুনগুন গান। সবাই অবশ্য বলে ওতে সুরটুর নেই। শুনলে টুস্কির আর গান শেখা হবে না। টুস্কি তাই দাদাভাইয়ের গান শোনে, সুর বাদ দিয়ে। দাদাভাই অনেক গান জানে। আর সেতার বাজাতে পারে। আচ্ছা, দাদাভাই সেতার নিয়ে আসবে? তাহলে বাবা বেহালা বাজাবে, আর দাদাভাই সেতার? বাবা বলল, না। সেতার রাখারই জায়গা নেই। দাদাভাই শোবে কোথায়? বসার ঘরেই না? তক্তপোশে। সেখানে সেতার রাখার জায়গা কোথায়? টুস্কি চট করে একবার ঘুরে দেখে এল। নাঃ, বাবা ঠিকই বলেছে। সোফা, তক্তপোশ, শোকেস, বইয়ের র‍্যাক, মা’র তানপুরা — সব মিলে সেতার রাখার জায়গা নেই। এ হে।
টুস্কির নাচা দেখে দাদাও ধমকালো। হচ্ছেটা কী? পড়তে দিবি না নাকি? দাদার সবতাতেই বেশি বেশি। পড়ে তো ক্লাস ওয়ানে। হাব ভাব যেন বাবার কলেজে পড়ায়। ওই দেবদত্ত জ্যেঠুর মতো। হুঁঃ।
দিন কাটে। বাবা টুস্কির রোজের প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে ক্লান্ত হয়ে ক্যালেন্ডারে একটা দিনে গোল দাগ দিয়ে দিয়েছে, আর টুস্কিকে বলেছে, একটা করে দিন গেলে পেনসিল দিয়ে কেটে দিতে। তা হলে ও নিজেই গুনে নিতে পারবে দাদাভাই ক’দিন বাদে আসবে। টুস্কি অবশ্য এখনও দশের বেশি গুনতে পারে না। তাই দশ দশ করে গুনে দেখেছে, তিনটে দশ আর চার – এখনও বাকি। অন্নে-এ-এ-এক দিন।
দাদাভাই এল, যেমন আসার কথা। সঙ্গে সেই সুটকেসটা, যেটায় জামা নিয়ে আসে। টুস্কির স্কুলের বাক্সের চেয়ে বড়ো। দাদারটার চেয়েও বড়ো। শক্ত কার্ডবোর্ড দিয়ে তৈরি। ঢাকনার দিকে একটা পকেট। ইলাস্টিক দেওয়া, কিন্তু ইলাস্টিকটা ঢিলে হয়ে লটপট করে। তাই ওর মধ্যে কিছু রাখলে বেরিয়ে যায়। ওতে করেই দাদাভাই প্রতিবার টুস্কি আর দাদার জন্য লজেন্স আনে, আর প্রতিবারই সারা সুটকেস হাতড়ে বের করতে হয় — কোথায় গেল!
এবারও তাই হল। টুস্কি একটা লজেন্স নিয়ে দাদাকে দিয়ে এল। দাদাকে মা পড়াচ্ছে। ক্লাস ওয়ান। অনেক পড়া। উসখুস করছে, কিন্তু মা’র কিলের ভয়ে নড়ছে না। ফিরে এসে চুপিচুপি দাদাভাইকে বলল, আমাকে একটা রান্নাবাটি দেবে?
দাদাভাই বলল, রান্নাবাটি আবার কী?
দাদাভাইয়ের বোকামির পরিচয়ে টুস্কিও অবাক! না হয় বোন নেই, তা বলে রান্নাবাটি জানো না! ল্যাবা ল্যাবা ল্যাবা — ল্যাবা খায় থুথু! বলে আড়চোখে দরজাটা দেখে নিল। মা এখনও দাদাকে পড়াচ্ছে। শুনতে পেলে আর দেখতে হবে না।
ফিসফিস করে বলল, ওই যে, রান্নার জিনিসপত্রের খেলনা। কড়াই, ডেকচি, হাতা, খুন্তি, উনুন, বঁটি…
দাদাভাই মাথা নেড়ে বলল, বুঝেছি। কোথায় পাওয়া যায়?
কোথায় পাওয়া যায়? টুস্কি তো জানে না। বলল, দোকানে পাওয়া যায়।
দাদাভাই বলল, তোদের পাড়ার দোকানে? উফ্‌, এরম করলে চলে!
ঝাঁকিয়ে মাথা নেড়ে টুস্কি বলল, আঃ, ওটা তো মুদির দোকান। বাজারে পাবে। বেনাপোকা বাজারে।
দাদাভাই মাথা নাড়ল, কিন্তু ঠিক বুঝেছে বলে মনে হল না টুস্কির।
পরদিন থেকে টুস্কির কাজ হয়ে দাঁড়াল দাদাভাই বেরোনোর আগে মনে করিয়ে দেওয়া। দাদাভাই, মনে আছে তো?
আছে রে আছে।
টুস্কির বিশ্বাস হয় না। শোনো না, রান্নাবাটি। মানে রান্নাঘরের জিনিস। হাঁড়ি, কড়াই, হাতা, খুন্তি, বঁটি, থালা, বাটি… উনুন… আর, হ্যাঁ, ঝাড়ু। ঝাড়ুও আনবে।
আনব রে আনব। বলে দাদাভাই রোজ বেরোয়, আর ফিরে বলে, কই রে, কোনও দোকানেই নেই।
টুস্কি জানে দাদাভাই বেনাপোকার বাজারে যায়নি। বেনাপোকার বাজারের দোকানে আছে, ও দেখেছে। কিন্তু বেনাপোকা কোথায় ও জানে না। অনেক দূরে। জিগেস করারও উপায় নেই। মা-বাবা জানতে পারলে হবে ওর। বাবা তো বার বার বারণ করেছে, রোজ রোজ দাদাভাইয়ের কাছে লজেন্স চাইবে না। ও এখনও মাইনে পায়নি।
মা বলেছে, মাইনে পেলেই বা চাইবে কেন? দেখেছি যদি চাইতে, একেবারে…
তাই সাবধানে বলতে হয়। বাবা মা শুনতে পেলে… ওরে বাবা!
চলছিল ভালোই, কিন্তু সেদিন উনুনটার কথা বলতে ভুলে গিয়েছিল। তাই দাদাভাই বেরিয়ে বাগানের গেটের কাছে পৌঁছেছে — টুস্কি ছুট্টে বাইরের দরজায় দাঁড়িয়ে মনে করিয়ে দিতে গিয়েছিল। দাদাভাই, উনুন। একটা উনুন। দাদাভাই গেট বন্ধ করতে করতে চেঁচিয়ে বলেছিল, হ্যাঁ রে, মনে আছে। আর দুটো ঝাঁটা, তাই না?
আর মা-ও তক্ষুনি রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে ফ্রিজ খুলে কী বের করছিল, শুনতে পেয়েছে, এগিয়ে এসে বলেছে, কী রে? কী বলছিস? কিসের ঝাঁটা?
দাদাভাই গেট থেকেই হেসে বলেছে, আরে কিছু না কাকিমা, রান্নাবাটি।
ব্যাস। যেই না দাদাভাই রাস্তার মোড় ঘুরেছে, ওমনি, রান্নাবাটি? রান্নাবাটি চাওয়া হয়েছে মেয়ের… বলে দরজা বন্ধ করে… সে অনেক গুম্‌গুম্‌, অনেক ভ্যাঁ-ভ্যাঁ… ভাগ্যিস বাবা তক্ষুনি চান করে বাথরুম থেকে বেরিয়েছে, তাই, আ-হা-হা-হা, করো কী, করো কী… বলে বাঁচিয়ে দিল, কিন্তু মা ওকে, আবার যদি খবরদার কিছু চেয়েছ… বলে রান্নাঘরে ঢুকে গেল।
সে দিন থেকে টুস্কির চাওয়া বন্ধ।
দাদাভাইও কিছু বলে না।
রোজ দাদাভাই কাজ থেকে আসে, টুস্কি আড়চোখে হাতের দিকে চেয়ে দেখে। কোনও দিনই কিছু থাকে না। রোজ রাস্তার মোড়ের বটগাছের ঝুরি ধরে দোল খেতে খেতে টুস্কি দাদাভাইয়ের পথ চেয়ে থাকে। আজ বুঝি আসে, আজ বুঝি…
আসে না।
মাস গেল। মাইনে পেয়ে দাদাভাই মা’কে শাড়ি দিল, বাবাকে ধুতি। বর্ধিষ্ণুনগরে জেঠিমার জন্যও শাড়ি নিয়ে গেল। দাদামণির জন্য শার্ট। কিন্তু টুস্কির জন্য আর দাদার জন্য সেই লজেন্স। ধুর!
বর্ষা এল। এল রথ। রথের মেলা শুরু হয়েছে, কিন্তু স্কুলের কাজ, বাড়ির কাজ শেষ করে মা সময়ই পাচ্ছে না, বাবাও আজকাল বড্ডো দেরি করে আসে। শেষে দাদাভাইকে বলেই ফেলল, রথের মেলা নিয়ে যাবে?
দাদাভাই পরদিন অফিস থেকে এসে মাকে বলল, দু’জনকে নিয়ে একটু মেলা ঘুরে আসি, কাকিমা? মা চোখ ছোটো করে বলল, ওরা বলেছে?
তাড়াতাড়ি মাথা নেড়ে দাদাভাই বলল, না, না। আমি ভাবছিলাম আমি তো খালিই বসে আছি…
দুজনে জামা পরে দাদাভাইয়ের হাত ধরে বেরোলো। দাদাভাই মেলা ঘুরিয়ে দেখাল, পাঁপরভাজা কিনে দিল, নাগরদোলায় চড়ালো, দাদাকে বলল, বন্দুক দিয়ে বেলুন ফাটাবি? দাদা পারল না, তখন নিজেই বন্দুক নিয়ে ফট্‌-ফট্‌ করে দশটা বেলুন ফাটিয়ে বলল, বড়ো হ’, তখন শিখিয়ে দেব।
হঠাৎ পাশের দোকানের দিকে তাকিয়ে টুস্কি দেখে, আরে! বাক্সে বাক্সে রান্নাবাটি সাজানো। দুটো, পাঁচটা, সাতটা, দশটা… না, আরও বেশি। কত্তোওওওওওগুলো! দোকান ভর্তি রান্নাবাটি, একটাও ওর না। এমন অন্যায়!
দাদাভাই অন্য দিকে তাকিয়ে আছে। দেখছেই না। আস্তে আস্তে হাতে ধরা দাদাভাইয়ের হাতটা নাড়িয়ে বোঝানোর চেষ্টা করল টুস্কি। দাদাভাই ওর দিকে তাকিয়ে বলল, কী রে?
টুস্কির মনে পড়ল মা কী বলেছিল। কিছু বলল না। আস্তে আস্তে মাথা নাড়ল। তার পরে বাড়ি ফিরে এল। চোখ ফেটে জল আসছিল। সারা সন্ধে কথাই বলতে পারল না। মা এসে জানতে চাইল, তোকে এটা দাও, ওটা দাও বলে বিরক্ত করেনি তো?
দাদাভাই বলল, কী যে বলো কাকিমা, ওরা কত্তো ভালো। বিরক্ত করেই না।
হুঁঃ।
পরদিন অফিস থেকে ফিরে চা খেতে খেতে দাদাভাই বলল, টুস্কি, দাদাকে ডাকতো।
দাদা খেলতে গেছিল পাশের বাড়ি। টুস্কিও ঘুম থেকে উঠে দুধ খেয়ে যাবে। কিন্তু দাদাভাই ডেকেছে বলে দাদাকে আগে ডেকে আনল। তার পরে দুধ খেতে বসল। দুধটা একটু ঠাণ্ডা করে খায় টুস্কি। তাতে গরম দুধের ওপরে সর পড়ে — মাকড়সার জালের মতো লাইনটানা একটা পাতলা চাদর। খেতে বেড়ে লাগে। সবে দু আঙুলের চিমটি দিয়ে সরটা টেনে তুলে মুখে দিতে যাবে, দাদাভাই দাদার হাতে একটা বাক্স দিয়ে বলল, দেখ তো, চলে কী না!
চমকে তাকাল টুস্কি। দাদার হাতের বাক্সের ওপর ছবি আছে, বলে দিতে হয় না, ওটা কী। উজ্জ্বল মুখে দাদা বের করে আনল পিস্তলটা। ট্রিগার ধরে টানতেই কড়কড়, কড়কড় করে গুলি ছোটার শব্দ বেরোল। ঠিক কলকাতায় বুগ্লুদারটার মতো। কিন্তু বুগ্লুদারটার চেয়েও ভালো। বুগ্লুদারটা কালো। এটা লাল।
কিন্তু, কিন্তু… দাদাভাইয়ের কাছে তো আর কোনও বাক্স নেই! টুস্কি একটু উঁকি দিতে গেল, কিন্তু হাত থেকে সরটা ত্যাপ করে টেবিলে পড়ে গেল বলে তাড়াতাড়ি মুছে ফেলে মা আসার আগে বেসিন থেকে হাত ধুয়ে আসতে হল…
দাদাভাইয়ের হাতে আর কিছুই নেই।
চোখ ফেটে জল আসছে টুস্কির। তাড়াতাড়ি দুধ খেয়ে উঠে চলে গেল ঘরে। একটু আগেই ঘুম থেকে উঠে এসেছে দুধ খেয়ে খেলতে যাবে বলে। কিন্তু এখন আর খেলতে যেতে ইচ্ছে করছে না। আবার শুয়ে পড়বে।
যেই না বালিশে মাথা দিয়ে দরজার দিকে পেছন ফিরেছে, ওমনি…
ইইইইইইইইইইইইইইইইইইইইইই…
চিৎকার শুনে রান্নাঘর থেকে মা, খাবার টেবিল থেকে দাদাভাই, বাইরের দরজা থেকে বাবা… সবে এসে ঢুকেছিল, সব্বাই হুড়মুড়িয়ে ছুটে এসেছে, কী হলো, কী হলো…?
টুস্কির কারওর দিকে নজরই নেই। বালিশের ওপাশে রাখা বাক্স খুলে বের করছে — হাঁড়ি, কড়াই, ডেকচি, হাতা, খুন্তি, বঁটি, উনুন… আর ঝাঁটা! একটা না, দুটো! দুটো ঝাঁটা!
উল্লাসে লাফিয়ে উঠে টুস্কি দাদাভাইয়ের কোলে উঠে পড়ল। আবার লাফ মেরে নামল, ঘরময় নাচল, আবার খাটে উঠে রান্নাঘর বানাল, আবার ইইইইইই বলে চেচিয়ে বেরিয়ে গেল বাইরে, রিক্তা, মিষ্টু, দীপা-কে ডেকে দেখানোর জন্য।
নতুন রান্নাবাটি, টুস্কির!
রিক্তা, মিষ্টু আর দীপার সঙ্গে রান্না করতে করতে শুনল, দাদাভাই টেবিলে বসে চা খেতে খেতে বলছে, আরে আমি তো জানিই না জিনিসটা কী! দুদিন বেনাপোকার বাজারেও গেছি। দোকানে দোকানে জিগেস করেছি, এ বলে ওখানে যান, ও বলে জানি না। শেষে রথের মেলায় দেখি টুস্কি চেয়ে আছে, কিচ্ছুটি বলেনি। কাল কিনিনি। কাকিমা ভাববে চেয়েছে, মিছিমিছি বকুনি খাবে মেয়েটা।
সেদিন রাতে সব্বাই খেতে বসে টুস্কির রান্না করা রুটি, আলু-পোস্ত, ধোঁকার ডালনা, আর পাবদা মাছের ঝাল খেল। মা বলল, পোস্তটা সবচেয়ে ভালো হয়েছে, কিন্তু এর পরে যেন আর খাবার টেবিলে বালি আর মাটি নিয়ে না আসে…

টুস্কি আজ বড়ো হয়ে গেছে। অতো কথা মনে নেই। থাকলেও ভান করে যেন ভুলে গেছে। বলে, আহা, আমি যেন চেয়েছিলাম... বেশি বেশি।
তবে কোনও বাচ্চা মেয়ের বাড়িতে প্রথম নেমন্তন্ন থাকলে টুস্কি আজও একটাই উপহার নিয়ে যায়। রান্নাবাটি।

Tuesday, September 20, 2016

সুবচনী

বাড়ির সবার মধ্যে নিমাইয়ের সবচেয়ে পছন্দ ওর ছোটোকাকাকে। সেটার অনেক কারণ আছে, কিন্তু সবচেয়ে বড়ো কারণ এই যে ছোটোবেলায় ছোটোকাকা ওকে বিস্কুট এনে দিত। আর লজেন্স। ছোটোবেলায় নিমাইয়ের ধারণা ছিল ওকে কেউ ভালোবাসে না। মা সকাল থেকে রান্নাঘরে কুটনো কুটতো, বাটনা বাটতো, রান্না করতো, ওকে মুড়ি দিত না। দাদু বাজার থেকে এটা সেটা কিনে এনে মাকে দিত রান্না করতে, ওকে বিস্কুট দিত না। নিমাই রোজ সকালে দাওয়ায় বসে ইনিয়ে বিনিয়ে কাঁদত, এঁ-এঁ-এঁ-এঁ, মা মুড়ি দেয় না, এঁ-এঁ-এঁ-এঁ, দাদু বিত্তু আনে না, এঁ-এঁ-এঁ-এঁ…
এমন সময়ে কখনও যদি ছোটোকাকা আসত, দুই ভাইয়ের জন্য পকেট থেকে বেরোতো ঠোঙা ভরা বিস্কুট, কখনও বা ক্যাডবেরির চকলেট। সেই তখন থেকেই ছোটোকাকা নিমাইয়ের প্রিয় মানুষ। এখন অবশ্য নিমাই আর কাঁদে না। এখন স্কুল টুল পাশ টাস করে কলেজে পড়ে… তবু।
এ হেন কাকা যখন খবর দিল যে বর্ধিষ্ণুনগরে চাকরি পেয়ে আসছে, সঙ্গে কাকিমা আর চার বছরের ছেলে, তখন সবচেয়ে বেশি আনন্দ পেয়েছিল নিমাই। দাদু আর মা-ও খুশি। দাদুর ছোটো ছেলে আর মায়ের ছোটো দেওর আসছে। তবু নিমাই-ই সবচেয়ে আনন্দ পেয়েছিল। কাকার সঙ্গে গল্প করে মজা আছে। আর চার বছরের শান্ত — কাকার ছেলে — সে তো নাকি সাংঘাতিক মজার হয়েছে।
প্রথম দিনই কাকা যখন ক্লান্ত ছেলেকে ঘুম পাড়িয়ে খেতে বসল, নিমাই জিজ্ঞেস করল, কাকা, সুবচনী কোন ঠাকুর?
কাকা খাওয়া থামিয়ে বলল, এতো দিন পরে জানতে চাইছিস?
নিমাই অবাক। এত দিন পরে মানে?
কাকা বুঝিয়ে দিল। বুড়ো আঙলায় পড়েছিস তো?
বুড়ো আঙলা! সে তো সে কবেকার কথা? বাচ্চাবেলায় পড়েছিল নিমাই। কী সব ছিল, গণেশের গল্প না কী যেন, ভালো করে মনেও নেই। সে কথা কেন?
কাকা জিজ্ঞেস করল, হৃদয় যে হাঁসটার সঙ্গে গিয়েছিল, তার নাম কী ছিল?
কী ছিল? মনে নেই নিমাইয়ের। কাকাও এবার একটু থতমত খেল। বলল, তাহলে জানতে চাইলি কেন?
নিমাই বলল, আজকাল একটা লোক আসে, বুড়ো মতো। পুজোর জন্য টাকা চাইতে। কালো, লম্বা, সিড়িঙ্গে, হাতে একটা রথের মতো ঠাকুরের আসন। দোতলা। সিঁদুর-মিদুর মাখিয়ে একেবারে জবরজং। মালা আর ফুলে ভেতরে দেখা যায় না। উঁকি মেরে দেখেছি, ভেতরে পাথর টাথর আছে। কোনও মূর্তি নেই।
কাকা বলল, সুবচনী কে বা কোন ঠাকুর সে নিয়ে নানা লোকে নানা কথা বলে। কেউ বলে সে শুভ চণ্ডী ঠাকুর। সুবচনীর ব্রত সম্ভবত উড়িষ্যা থেকে এসেছে। সে এক রাজার গল্প, সুবচনী ঠাকুর মরা ছেলে ফিরিয়ে দেয়।
সবাই বলল, সুবচনীর গল্প কী?
কাকা বলল, শোনো তবে। উড়িষ্যায় এক রাজা ছিল, তার অনেক হাঁস ছিল। একটা হাঁস ছিল খোঁড়া। খোঁড়া বলে রাজা তাকে খুব ভালোবাসতেন। রোজ সকালে সন্ধেয় তাকে না দেখলে রাজার চলত না।
আর গ্রামে থাকত একটা গরিব ছেলে। বাবা ছিল না, মা অনেক কষ্টে ছেলেকে বড়ো করছিল। ছেলেটা খেতে পেত না, আর মাকে বলত, আমার বন্ধুরা সবাই ভালো ভালো খায়, মাছ খায়, মাংস খায়, আমাকে দাও না?
মা বলত, আমি গরিব, কোথায় পাব? তুই একটা চাকরি কর, তার পরে কিনে আন, আমি বানিয়ে দেব।
ছেলেটা আর কিছু বলল না, কিন্তু চোখে পড়ল রাজার অনেক হাঁস আছে। তার মধ্যে একটা হাঁস আবার খোঁড়া। রাজার ঘেসেড়া রোজ হাঁসগুলো খোঁয়াড় থেকে বের করে পুকুরে নিয়ে গিয়ে ছেড়ে দেয়, আবার রোজ সন্ধেবেলা পুকুর থেকে ওরা যখন বেরিয়ে ফেরে, তখন সবাইকে গুনে গুনে খোঁয়াড়ে বন্দী করে।
ছেলেটা রোজ দেখে। হাঁসগুলো ছাড়া পেয়ে প্যাঁকপেঁকিয়ে দৌড় লাগায় জলের দিকে, আর জল থেকে উঠে এসে রোজ নিজেরাই ঢুকে যায় খোঁয়াড়ে। ঘেসেড়ার কাজ শুধু এবেলা ওবেলা গোনা। কিন্তু খোঁড়া হাঁসটা রোজই পিছিয়ে পড়ে। ঘেসেড়া গুনে পায় না, ফিরে গিয়ে আবার নিয়ে আসতে হয়।
একদিন সন্ধেবেলা খোঁড়া হাঁস পিছিয়ে পড়েছে, ছেলেটা দেখে আশেপাশে কেউ কোত্থাও নেই, হাঁসটা আসছে আস্তে আস্তে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। ছেলেটার মাথায় বদ-বুদ্ধি চেপেছে। টক করে হাঁসটাকে ধরে এক আছাড় মেরেছে পাশের একটা পাথরে। হাঁস গেছে মরে। ছেলেটা জামার মধ্যে হাঁসটাকে লুকিয়ে দৌড়ে ফিরেছে মা’র কাছে, বলেছে, মা, এবারে মাংস রেঁধে দে।
রাজার বাড়ির হাঁস! মা’র মাথায় হাত, কাঁদবে, না গ্রাম ছেড়ে পালাবে ভেবে পায় না। কিন্তু করা আর কী, হাঁস তো মরেই গেছে। রান্নাঘরে গিয়ে ছাল ছাড়িয়ে মাংস রাঁধল আর পালক চামড়া হাড়গোড় সব লুকিয়ে ফেলল বাড়ির পেছনের ছাইগাদায়।
এদিকে ঘেসেড়া খোঁড়া হাঁস আর খুঁজে পায় না। রাজাও সন্ধেবেলা খোঁয়াড়ে গিয়ে দেখে প্রিয় হাঁস নেই! রেগে আগুন — পেয়াদা ডাকে, বলে, গিয়ে দেখো কে আমার হাঁস নিয়েছে। নিয়ে এসে কারাগারে বন্ধ করো — বুকে পাথর চাপা দিয়ে।
দিকে দিকে পেয়াদা বেরিয়ে গেল।
এখানে খোঁজে, ওখানে খোঁজে, এর বাড়ি ঢোকে, ওর বাড়ি ঢোকে। লোকে বিরক্ত হয়, ভয় পায়। শেষে একজন বলল, ও পাশের বাড়ি, ওই যারা গরিবের গরিব, ওর বাড়ি থেকে সন্ধেবেলা মাংস রাঁধার গন্ধ পেয়েছি।
হই হই করে পেয়াদারা দরজা ভেঙে ঢুকল। বলল, এই, মাংস কোথায় পেয়েছিস? বল, নইলে এমন মারব!
এ দিকে দুজন পেয়াদা মা ছেলেকে মারছে, ও দিকে অন্যরা এখানে ওখানে খুঁজছে — খুঁজতে খুঁজতে দেখে, ছাইগাদায় হাঁসের পালক। ব্যাস! ছেলেটাকে ধরে ঢুকিয়ে দিয়েছে কারাগারে — বুকে পাথর চাপা দিয়ে ফেলে রেখেছে।
মা কেঁদে ভাসায় — পাড়ার লোকে এসে বলে, কেঁদো না। কেঁদো না। ছেলে তো চোর। শাস্তি হয়েছে। কিন্তু রাজা তো ওকে ছাড়বে না। মেরে ফেলবে। তুমি সুবচনীর পুজো করো। সুবচনীর পুজো করলে হারিয়ে যাওয়া ছেলে আবার পাওয়া যায়, মরা ছেলে বেঁচে ওঠে। যে মেয়ের বিয়ে হয়নি, তার বিয়ে হয়। গরিব বড়োলোক হয়।
সেই শুনে মা উঠে সুবচনীর পুজো করে সেই পুজোর জল ছিটিয়ে দিল হাঁসের হাড়গোড়ের ওপর। হাঁস আবার বেঁচে উঠে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে ফিরে গেল রাজার বাড়ি। রাজা তো অবাক!
সে দিন রাতে রাজা স্বপ্ন দেখল, দেবী বলছে, তোর কারাগারে যে ছেলেটাকে হাঁস চুরির দায়ে বন্দী করে রেখেছিস, তাকে কাল সকালেই ছেড়ে দিবি। তোর মেয়ের সঙ্গে তার বিয়ে দিয়ে, অর্ধেক রাজত্ব দিবি…
রাজা সকালে উঠেই ভয়ে ভয়ে ছেলেটাকে ছেড়ে দিল, সন্ধেবেলা রাজকন্যার সঙ্গে ওর বিয়ে হল, আর অর্ধেক রাজত্ব পেয়ে ছেলে বাড়ি ফিরল মায়ের কাছে, সঙ্গে সানাই, বাঁশি, ঢাক, ঢোল।
মা তো ছেলেকে পেয়ে আনন্দে আটখানা। তার পরে, নতুন রাজার অর্ধেক রাজত্বে নতুন রাজপ্রাসাদ বানিয়ে মা, ছেলে আর রাজকন্যা মনের সুখে বাস করতে লাগল।
নিমাই মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, বা, রে! এও তো মজা! রাজার হাঁসও খাব, রাজার মেয়েকেও বিয়ে করব, রাজার রাজত্বও নেব! সবই হবে?
ছোটোকাকা হা হা করে হেসে বলল, ওরে, এই জন্যই তো বোকারা ঠাকুর পুজো করে।
ছোটোকাকা খুব কট্টর কমিউনিস্ট। নিমাইও। তাই নিমাইও হাসল। তার পরে ছোটোকাকা বলল, বুড়ো আঙলাটা বাইরের ঘরের ওপরের তাকে আছে। বের করে পড়ে নে। দেখবি ওখানেও সুবচনীর হাঁসের কথা আছে। যারা সুবচনীর ব্রত করে, তাদের একটা খোঁড়া হাঁস পুষতে হয়।
নিমাইয়ের খাওয়া হয়ে গিয়েছিল। তাড়াতাড়ি উঠে পড়ল। ওকে এখন ডিফারেনশিয়াল ক্যালকুলাসের অঙ্ক করতে হবে। এখন কি বুড়ো আঙলা পড়ার সময়?
*
দু দিন যেতেই বোঝা গেল ছোটোকাকার ভারি মিষ্টি ছেলে শান্তর নাম যে রেখেছিল, সে হয় ভবিষ্যৎ দেখতে জানত না, নয়ত খুবই রসিক। এক সপ্তাহের মধ্যে শান্তর আরও কয়েকটা নাম দেওয়া হল। ডাকাত, দস্যি, ওরেব্বাবা, এই সব। এক মুহূর্ত থেমে থাকে না। সারাক্ষণ গেল-গেল, আর ধর-ধর। দাদু, যে কী না পৃথিবীর সবচেয়ে ধৈর্যশীল মানুষ, সেও শান্তকে গুণ্ডা বলে ডাকে!
শান্তর নজর সারাক্ষণ থাকে দু-দিকে। সে দুটোই ওর নাগালের বাইরে থাকার কথা। একটা উঠোনের শেষে কুয়োটা — ওর জানা দরকার কোথা থেকে বালতি করে বড়োরা জল তুলে আনে। ওর মা যখন ওকে চান করাতে নিয়ে যায়, দড়িতে বাঁধা বালতিটা ফেলে দেয় কুয়োর মধ্যে, দূর থেকে ছপ্‌ করে একটা শব্দ ভেসে আসে, আর তার পরেই টেনে টেনে তুলে আনে এক বালতি জল! কোত্থেকে আসে? শান্তকে দেখতে দেয় না কেউ। কুয়োর উঁচু বাঁধানো ধারটা শান্তর মাথার চেয়েও উঁচু। শান্ত মা-কে কতো বলে বেয়ে উঠলেই ও দেখতে পাবে, কিন্তু মা শোনে না। বলে বাবা আসলে বলে দেবে। দেবে বাবা দু চারটে… বাবার দেওয়া নিয়ে শান্ত খুব চিন্তা করে না। বাবা কখনওই ওকে মারে-টারেনি। কিন্তু কেউ ওকে কুয়োর পাড়ে যেতেই দেয় না। করে কী বেচারা। তক্কে তক্কে থাকে।
উঠোনে আর একটা জিনিসের প্রতি শান্তর নজর — খিড়কীর দরজা। এই দরজাটা দিয়ে বেরিয়ে গেলেই বাইরের জগৎ — সেটা ও জানে। সেখানে কী আছে জানার অপরিসীম আগ্রহ শান্তর। সারাক্ষণ চেষ্টা করে কী করে চট করে বেরিয়ে যাওয়া যায়। বাইরে একটা সরু গলি, সেটা গিয়ে পড়েছে আরেকটা গলিতে। তার পরে বড়ো রাস্তা। ছোট্টো ছোট্টো পায়ে দৌড়োলেও শান্ত চোখের নিমেষে রাস্তায় পৌঁছে যাবে। বড়োরা কেউ ওকে যেতেই দেয় না।
শান্ত সারা দিন চোখ রাখে খিড়কির দরজা আর কুয়োতলার দিকে। কখন কেউ দেখছে না? যে বাড়িতে সারা দিন দরজা খোলা থাকত, সেখানে আজকাল দরজা লাগিয়ে দিতে হয়। বাইরের কেউ ঢুকলে ঘরের লোক চেঁচাতে থাকে — দরজা দাও, দরজা দাও, শান্ত বেরিয়ে যাবে…! কুয়োটা দাদু লোক ডেকে কাঠের তক্তা দিয়ে ঢেকে দিল। নইলে কখন কী কাণ্ড ঘটবে কে জানে! বালতি দিয়ে আর জল তোলা যাবে না। একটা হ্যান্ডপাম্প বা টিউবকল বসানো হয়েছে। শান্তর খুব দুঃখ। আর ভেতরটা ও দেখতে পাবে না।
দাদুর ঘরের দরজাটা অবশ্য ওই বাইরের গলিতেই খোলে। আর খোলাও থাকে সারা দিন। ওই দরজা দিয়ে গেলেও শান্ত ঠিক বেরিয়ে পড়বে বাইরের রাস্তায়। ও জানে। কিন্তু দাদুর ঘরে উঁকি দিলেই দাদু হেঁকে বলে, কী দাদুভাই? কী খবর?
দাদু খুব ভালো, শান্তকে কোলে নিয়ে আদর-টাদর করে, বেড়াতেও নিয়ে যায়। কিন্তু তবু শান্ত জানে দাদুই এ বাড়ির কর্তা। সবাই দাদুকে ভয় পায়। এমনকি মা-ও। বাবা তো মাটির দিকে তাকিয়ে কথা বলে। ফলে ও দাদুর ধার ঘেঁষে না। দাদুর ঘর থেকে বাইরে বেরোনোর প্রশ্ন তো নেই-ই।
দাদু ছাড়া আর একজনকে শান্ত ভয় পায়। একটা লম্বা, রোগা কালোমতো লোক আসে প্রায়ই। তার গায়ে রক্তের মতো লাল জামা আর লুঙ্গি। মাথায় ওই লাল কাপড়েরই ফেট্টি। হাতে একটা কী, তাতে নাকি ঠাকুর আছে। কোলে নিয়ে বাড়িতে ঢোকে যখন তখন। হেঁকে বলে, সুবচনীর সেবা হবে নাকি গো! জ্যেঠিমা, বা মা তখন কোনও দিন একটু চাল, বা কোনও দিন একটা তরকারি দিয়ে দেয়। কখনও বা কিছু পয়সা। শান্ত অবশ্য তখন সামনে থাকে না কখনও। ভেতরের ঘর থেকে উঁকি দিয়ে দেখে। এমন ভাবে, যাতে ওকে দেখতে না পায় লোকটা। তবু একদিন দেখে ফেলেছিল। ওর দিকে তাকিয়ে হেঁড়ে গলায় বলেছিল, বাঃ, কী মিষ্টি ছেলে! সে দিন থেকে শান্ত আর দরজাতেও দাঁড়ায় না। খাটের ওপারে ট্রাঙ্ক রাখা থাকে, তার পেছনে লুকিয়ে থাকে। সেবা নিয়ে লোকটা বেরিয়ে পাশের বাড়িতে যায়, সেখান থেকে ওর গলা পেলে তবেই বেরোয় বাইরে।
দিন কাটে। শান্ত অপেক্ষা করে থাকে, কুয়োর পাড়ে না গেলে অন্তত দরজা দিয়ে বাইরে যাওয়া যায় কি? ওর মা’র সঙ্গে যায়, জ্যেঠিমা পাশের বাড়ি নিয়ে যায়, দাদু বলে চল, বাজার যাই! নিমাইদা তো দিনে রাতে রাস্তার মোড়ে, পাশের দোকানে, ওপারের রেললাইনে রেলগাড়ি দেখতে নিয়ে যায় — কিন্তু শান্তর তো তাতে শান্তি নেই, ওকে একাই যেতে হবে দেখতে হবে বাইরেটা ও একা গেলে অন্যরকম দেখায় কি না।
সেদিন ছিল ছুটি। শান্তর বাবা — নিমাইয়ের ছোটোকাকা — আসবে। থাকবে দিন দুয়েক। বাড়িতে সাজ সাজ রব। সকালেই দাদু বাজার করে এনেছে। দুই জা, নিমাইয়ের মা আর শান্তর মায়ের এক মুহূর্ত সময় নেই। নিমাইয়ের পড়াশোনা ডকে — ছুটছে বার বার দোকানে আর এবাড়ি ওবাড়ি।
সবে ফিরেছে পোস্ত নিয়ে, বাইরের দরজার শব্দ পেয়েই রান্নাঘর থেকে কাকিমা ডেকেছে, নিমাই নাকি?
নিমাই বলেছে, হ্যাঁ, আমি। বলতেই মা ডেকে বলেছে, এই, শিগগির আবার যা, রাঁধুনি নিয়ে আয়। রাঁধুনিটা ছাতা পড়েছে, ফেলে দিলাম।
আচ্ছা, বলে একছুটে রান্নাঘরে পোস্ত দিয়ে আবার ফিরবে বলে নিমাই দরজা বন্ধ করেনি। এ দিকে দৌড়েছে নিমাই, আর ও দিকে দৌড়েছে শান্ত। নিমাই রান্নাঘরের দরজা থেকে মায়ের হাতে পোস্ত দিয়ে আবার বাইরের দিকে ফিরতেই দেখে, আরে! শান্ত বেরিয়ে গেল।
চিৎকার করে এক লাফে রান্নাঘরের দাওয়া থেকে উঠোনে পড়েই নিমাই ছুটেছে খিড়কি দরজার দিকে, কাকিমাও শান্ত শান্ত বলে ডাকতে ডাকতে রান্নাঘর থেকে বেরোতে পারছে না, পথে বঁটি পেতে নিমাইয়ের মা কুটনো কুটছে, ওদিকে দাদুও নিজের ঘর থেকে শান্ত শান্ত বলে ডাকতে ডাকতে বেরোনোর চেষ্টা করছে কিন্তু ইজিচেয়ার থেকে উঠতে পারছে না…
এদিকে নিমাইও পৌঁছেছে দরজায়, আর ওদিকে বাইরে শান্তর হাউমাউ কান্না, উ-হা-হা-হা-হা-হাহাহাহা! নিমাই বেরিয়েছে আর শান্ত প্রাণপনে ওর ছোট্টোছোট্টো পায়ে ছুটে গিয়ে ঘরে ঢুকে গেছে, আর পেছন পেছন সুবচনীর মন্দির কোলে লম্বা কালো লোকটা ঢুকে বলছে, খোকা ভয়ে পেয়ে গেল যেন…
মা আর কাকিমা চাল আনতে গেল, আর নিমাই শোবার ঘরে গিয়ে দেখল শান্ত খাটে উঠে উপুড় হয়ে মাথাটা বালিশের নিচে ঢুকিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলছে, আমি আর যাব না, ও সুবচনী, আমি যাব না, আমি আর বাইরে যাব না। আমাকে ধরে নিয়ে যেও না…
সেই নিয়ে কতো হাসাহাসি। রাত্তিরে ছোটোকাকা হাসতে হাসতে খুন। খালি বলে ও সুবচনী, আমি বাইরে যাব না। আমায় ধরে নিয়ে যেও না… আর হেসে গড়িয়ে পড়ে।
শান্ত আজ অ্যামেরিকায় প্রফেসর। এই গল্প শুনলে হাসে আর বলে, যদি দেখতে ওই দৃশ্য, বুঝতে কেমন লেগেছিল আমার।

Tuesday, September 13, 2016

ডাইনি পুকুর


লাল পাহাড়ের গায়ে, যেখানে পাহাড় প্রায় মাঠে এসে মিশেছে, সেখানে চাঁদনীর বাড়ি। গ্রাম থেকে খানিক দূরে, সেখানে আর বাড়ি ঘর নেই, সেখানে চাঁদনির বাবা খানিকটা জমি নিয়ে চাষ করে।
চাঁদনীদেরটা ছাড়া পাহাড়ের গায়ে আরও একটা বাড়ি আছে। সেখানে থাকে বুধ। আর ওর মা বাবা। বুধের বাবাও চাঁদনীর বাবার মতই এক ফালি জমিতে চাষ করে।
বুধ আর চাঁদনী একই সঙ্গে খেলা করে, পড়াশোনা করে। পাহাড় বেয়ে আধ মাইলটাক নেমে এসে বুধ রোজ ডাকে, চাঁদনী বেরিয়ে আসে। দুজনে গল্প করতে করতে ইস্কুল যায়। দিনের শেষে চাঁদনীকে পৌঁছে দিয়ে, পড়া শেষ করে বাড়ি ফেরে বুধ।
সে দিন ইস্কুল যাবার পথে বুধ হঠাৎ একটা অদ্ভুত প্রশ্ন করল। বলল, “লাল পাহাড়ে ওঠা মানা কেন?”
চাঁদনী অবাক হল একটু। লাল পাহাড়ে ওঠা বারণ, সেটা ওরা ছোটোবেলা থেকেই জানে। পাখিপড়ার মত গ্রামের বাবা মায়েরা তাদের ছেলেমেয়েদের শিখিয়েছে, “লাল পাহাড়ে যাবে না। কক্ষণও না। কোনও দিন না। বুঝেছ? কক্ষণও না...” তা সত্ত্বেও কেউ পাহাড়ে চড়ার চেষ্টা কখনও করেনি তা নয়, কিন্তু ধরা পড়ে এমন মার খেয়েছে, যে সখ মিটে গেছে।
বুধ বলল, “কিন্তু কেন? কারণ তো কিছু একটা থাকবে?”
চাঁদনী ঠোঁট ওল্টাল। বলল, “কী জানি! জানতে চাস, তো জিজ্ঞেস করলেই হয়?”
বুধ রাগ-রাগ গলায় বলল, “করেছি। বাবা কিছু বললই না।”
এটা আশ্চর্য কিছু না। বুধের বাবা কথা খুব কমই বলে। তাই চাঁদনী বলল, “আর মা?”
বুধ বলল, “মা বলল, ‘অত জানতে হবে না। যাও পড়া শেষ করে নাও।’“
চাঁদনী বলল, “আচ্ছা, আমি বাবাকে জিজ্ঞেস করব।”
চাঁদনীর বাবা সব সময় চাঁদনী বা ওর দাদার সব প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে। বুধ তাই একটু নিশ্চিন্ত হল।
চাঁদনী জানে বুধের বয়েসটা এখন ঠিক সেইখানে, যখন ছেলেমেয়েরা মা বাবার নিষেধ আর বারণ নিয়ে ভাবতে শুরু করে সিদ্ধান্ত নেয়, যে ওগুলো সব ফালতু, ওর কোনও মানে নেই। চাঁদনীর নিজের বয়সও অতটাই, কিন্তু এই প্রশ্নের উত্তর নিয়ে ওর অত মাথাব্যথা নেই। তবে বুধকে সামলাবার জন্য একটা ব্যবস্থা করতে হবে, নইলে ও যা ডানপিটে ছেলে, নিগ্‌ঘাৎ রওয়ানা দেবে পাহাড় চড়তে। মিছিমিছি মার খাবে।
বলল বটে বাবাকে জিগেস করবে, কিন্তু পরদিন এসে বুধকে কিছুই বলতে পারল না। ওর বাবা নাকি অনেক কথা বলেছে। বলেছে ছোটোদের সব সময় উচিত বড়োদের কথা শুনে চলা, বলেছে অনেক সময়েই ছোটোরা বড়োদের কথা না শুনে বিষম বিপদে পড়ে। বলেছে লাল পাহাড়ে ওঠা কেবল মাত্র বাচ্চাদের বারণ নয়। বড়োদেরও মানা।
আর থাকতে পারল না বুধ। বলল, “কিন্তু কেন?”
“জানি না, বাবা বলেনি।” অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে বলল চাঁদনী।
“জিজ্ঞেস করবি তো?”
“আরে জিজ্ঞেসই তো করলাম, তাতেই তো এত কথা শুনতে হল।”
রাগে পা ঠুকে বুধ বলল, “তা’লে জানা যাবে কী করে?”
একটু হেসে চাঁদনী বলল, “কেন? দাদুকে জিজ্ঞেস করব?”
চাঁদনীর এই আইডিয়াটা এতই দারুণ, যে বুধ থমকে দাঁড়িয়ে ওর দিকে চেয়ে রইল, চেয়েই রইল। শেষে বলল, “তোর মত বুদ্ধিমান মেয়ে আমি আর একজনও চিনি না।”
আড়চোখে বুধকে দেখে নিয়ে চাঁদনী বলল, “বোকা কোথাকার! আমি ছাড়া আর ক’জন মেয়ে চিনিস তুই?”
*
দাদু আসলে চাঁদনীর দাদু না। ওদের কারওরই কোনও আত্মীয় না। সত্যি বলতে কী, ঠাকুর্দার আত্মীয় বলতে কেউ কোনও দিন লছিল কি না তাও কেউ জানে না। বুড়ো একাই থাকে। আজকাল কাজ করতে পারে না, তাই গ্রামের লোকেরাই ওর দেখাশোনা করে। চাঁদনী আর বুধ ইস্কুল শেষ করে গেল দাদুর বাড়ি। দাদু বাড়ির দাওয়ায় একটা কোকো কোলার খালি ক্রেটের ওপর আসন পেতে বসে ছিল শূন্যদৃষ্টিতে সামনের দিকে চেয়ে। ওদের আসতে দেখে বলল, “বুধ আর চাঁদনী। ঠিক বলেছি?”
বুড়ো হলে কী হবে, দাদুর স্মরণশক্তি প্রখর। ছানিপড়া চোখ, তবু কেমন করে জানি সব ঠিকঠিক দেখতেও পায়! হাত দিয়ে কাছে ডেকে বলল, “বস।” ওরা দুজনে ব্যাগ থেকে ওদের টিফিন বের করল। দাদুকে দেবে বলে আজ ওরা সবটা খায়নি। খাবার পেয়ে দাদুর খুব আনন্দ। খেয়ে দেয়ে, দাওয়ায় রাখা বালতি থেকে জল নিয়ে হাত ধুয়ে বলল, “বেশ কথা। কিসের গল্প শুনবি আজ?”
সব দাদুর মত ওদের দাদুও গল্পের ঝুড়ি। কাউকে পেলেই ধরে গল্প আরম্ভ করে।
আজ ওরা গল্প শুনতেই এসেছে। চাঁদনী বলল, “আমাদের লাল পাহাড়ের গল্প বলো।”
প্রশ্নটা শুনে দাদু এতোক্ষণ চুপ করে রইল, যে বুধের মনে হতে লাগল দাদুও গল্পটা বলবেই না। শেষে দাদু আস্তে আস্তে বলতে শুরু করল, “সে সব এতো পুরোনো দিনের ঘটনা, যে আমার ভালো করে পুরোটা মনেও নেই। এক সময় ছিল, যখন লাল পাহাড়ে ওঠা আমাদের মানা ছিল না। তখন অবশ্য লাল পাহাড়ের নামও লাল ছিল না, কোনও একটা স্বাভাবিক সাধারণ নামই ছিল।”
বুধ বলল, “লাল পাহাড়ই বা কী এমন অদ্ভুত নাম?”
দাদু বুধের দিকে খানিকক্ষণ চেয়ে রইল। তারপর বলল, “তাই বুঝি? কতবার দেখেছিস পাহাড়টা?”
বুধ অবাক। ওই পাহাড়ের পায়েই তো ওদের বাড়ি। দাদু তো জানে সে কথা।
দাদু কিন্তু ওদের উত্তরের জন্য অপেক্ষা না করেই পরের প্রশ্নটা করল।
“পাহাড়ের গায়ে লাল রঙের কী কী দেখেছিস আজ অবধি?”
এর উত্তরটাও দিতে হল না। সবাই জানে, লাল পাহাড়ে লাল রঙের কিছুই নেই।
চাঁদনী জিজ্ঞেস করল, “তবে?”
দাদু বলল, “পাহাড়ের মাথায় একটা বড় পুকুর আছে। সে নাকি ভারি সুন্দর। অপরূপ। সেই পুকুর ডাইনিদের পুকুর। প্রত্যেক পূর্ণিমায় ডাইনিরা আসে সে পুকুরের পাড়ে তাদের মন্ত্রতন্ত্র নিয়ে ডাকিনীবিদ্যা, মারণ উচাটন করতে। তাদের দিকে তাকানো মানুষের মানা। তাই সে সময়ে কেউ সেখানে হাজির হলে তার আর রক্ষে থাকত না।”
চাঁদনীর মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেল। জানতে চাইল, “কী হত?”
দাদু ঠোঁট উল্টে বলল, “কে জানে! হয়ত ব্যাং বানিয়ে দিত। কিংবা টিকটিকি। তাদের পাওয়াই যেত না কোনও দিন।”
বুধ ভুরু কুঁচকে বলল, “ডাইনিরা যদি কেবলমাত্র পূর্ণিমায় আসে, তো অন্য দিন পাহাড়ে ওঠা বারণ কেন?”
দাদু বলল, “আরে, অতো কি আমি জানি নাকি? সে অনেক অনেক বছর আগের কথা। আমারও জন্মের অনেক আগে। ডাইনিরা চেয়েছিল আমরা এ পাহাড় ছেড়ে চলেই যাই। গাঁয়ের মানুষ ডাইনিদের সঙ্গে একটা বোঝাপড়া করেছিল, যে আমরা আর পাহাড়ে চড়বো না। কাজে, অকাজে কখনওই আমরা কালো পাথরের ওপরে যাই না। ডাইনিরাও আমাদের কিছু বলে না।”
বুধ বলল, “কিন্তু...”
দাদু ওর দিকে একটা আঙুল তুলে বলল, “কোনও কিন্তু নেই। মাঝে মাঝেই এমন হয়েছে, বহুদিন পরে পরে, কেউ একটা ধরেই নিয়েছে যে ডাইনি-টাইনি সব বাজে কথা। তারা কেউ কেউ পাহাড়ে চড়তে শুরু করেছে। প্রথম দিকে কিছু হয়নি। পরে হঠাৎ করে একে একে তার সব কিছুই নষ্ট হয়ে গেছে। কাজ, চাকরি, ব্যবসা... সবকিছুই। সেই জন্য, মনে রেখো, কালো পাথরের ওপরে যাওয়া বারণ।”
বুধ খানিক ভেবে বলল, “এমন কেউকে তুমি চেন, দাদু, যার অমনি হয়েছিল?”
দাদু মাথা নাড়ল। “না। সে অন্নে-এ-এ-এ-ক দিন আগের কথা। আমার জন্মই হয়নি।”
বুধ বলল, “কিন্তু লাল পাহাড় নাম হল কেন বললে না তো?”
দাদু আবার আঙুল নেড়ে বলল, “বিপদ। ভীষণ বিপদ, তাই।”
পাহাড়ের নিচে, যেখানে পাহাড়ের চড়াই শুরু হয়েছে, সেই ঢালেই, কালো পাথরের অনেক নিচে ওদের বাড়ি। চড়াইয়ের পথে উঠতে উঠতে বুধ হঠাৎ বলল, “সব বাজে কথা!”
চাঁদনী অবাক। “কী বাজে কথা? দাদুর কথাগুলো? কেন?”
বুধ বলল, “ভেবে দেখ, কেউ কোনওদিন যদি ডাইনিদের না দেখেই থাকে, তাহলে কী করে জানল ওরা মানুষদের ব্যাং বানিয়ে দিচ্ছে? দেখতেই যদি না পেল, কে গিয়ে ওদের সঙ্গে বোঝাপড়া করল? সব বাজে কথা।”
চাঁদনী ঝাঁঝিয়ে বলল, “বাজে কথা বলিস না। এসব কথা নিশ্চয়ই ওই বোকাগুলো বলে, যারা মনে করে ডাইনির গল্প সব মিথ্যে।”
বুধ আর কিছু বলল না। চাঁদনীও নিশ্চিন্ত হয়ে হাঁটা দিল বাড়ির দিকে। বুঝল না, চাঁদনী বোকা বলায় বুধ রাগ করেছে।
*
দিন কয়েক পরে সকালে বুধ চাঁদনীকে ডাকতে এল না। ওর জন্য অপেক্ষা করে করে চাঁদনীর দেরি হয়ে গেল, শেষে এক ছুট্টে স্কুল যখন পৌঁছল, তখন অ্যাসেম্বলির ড্রাম বাজাতে শুরু করেছে মনিটররা — অল্পের জন্য বকুনির হাত থেকে বেঁচে গেল।
সারা দিন ক্লাস করতে করতে বার বার জানালা দিয়ে বাইরে দেখছিল চাঁদনী — আসছে কি?
নাঃ।
দিনের শেষে অবশ্য গ্রামের বাইরে, যেখানে কাঠের ব্রিজ দিয়ে ঝোরা পেরিয়ে বাড়ি যেতে হয়, সেখানে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিল বুধ।
চাঁদনী অবাক হয়ে জানতে চাইল, “কোথায় ছিলি সারাদিন?”
বুধ কিছু না বলে ওর পাশে পাশে হাঁটা দিল। আড়চোখে চেয়ে চাঁদনী বুঝল বুধ কিছু একটা বলতে চায়, কিন্তু সাহসে কুলোচ্ছে না।
পাহাড়ে যেখানে মোড় ঘুরলেই চাঁদনীর বাড়ি, তার ঠিক আগে বুধ হঠাৎ বলল, “আমি আজ গিয়েছিলাম।”
থমকে দাঁড়াল চাঁদনী। কী শুনবে জানে, তাও নিঃশ্বাস বন্ধ করে বুকের ধুকপুকুনি কমতে দিল। তারপরে বলল, “কোথায়?”
চাঁদনীর চোখে চোখ না রেখেই বুধ বলল, “আমি লাল পাহাড়ে গিয়েছিলাম। এক্কেবারে ওপরে।”
বেখেয়ালে চাঁদনীর ভুরু কুঁচকে গেছিল। অবশ্য বুধ দেখেনি। ওর দৃষ্টি মাটির দিকেই। মুখটা স্বাভাবিক করে জিজ্ঞেস করল, “কী দেখলি?”
চাঁদনীর গলায় রাগের আভাস না পেয়ে বুধ সাহস পেয়ে মুখ তুলে হড়বড়িয়ে বলে উঠল, “কী অসম্ভব সুন্দর জায়গা, তুই না দেখলে বিশ্বাস করবি না। আকাশটা কী নীল, হাওয়ায় কী সুন্দর গন্ধ! ওই পুকুরটা, স্বপ্নের মতো, জানিস? একদিন তুই আর আমি যাব। কে বলে ওটা ডাইনির পুকুর? ওটা পরীদের দেশ, জানিস? ওটার নাম হওয়া উচিত পরী পুকুর। ওপর থেকে চারপাশটা দেখতে লাগে, যেন, যেন...” কথা খুঁজে না পেয়ে বুধ বলল, “আমি তোকে নিয়ে যাব একদিন। দেখবি কেমন...”
“না!” চাবুকের মতো জবাবটা এলো বুধকে থামিয়ে দিয়ে। চাঁদনীর চোখ দিয়ে আগুন বেরোচ্ছে। “আমি যাবো না। আর ভালো যদি চাস, তাহলে তুইও যাবি না। আর কোনও দিন না।”
ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বুধ বলতে গেল, “কিন্তু...”
বুধকে থামিয়ে দিয়ে কড়া গলায় চাঁদনী বলল, “কোনও কিন্তু নেই, বুধ। এর মধ্যে কোনও কিন্তু নেই। তোমার যদি ভবিষ্যতে কোনও দিন আমাকে বিয়ে করে আমার সঙ্গে সংসার করার ইচ্ছে থাকে, তাহলে — আর কোনও দিন — কোনও দিন — কালো পাথরের ওধারে যাবে না। মনে থাকে যেন।”
হতভম্ব বুধকে ওখানেই ফেলে রেখে চাঁদনী পাহাড়ী পথ ধরে নিজের বাড়ির দিকে চলে গেল। ঠিক করল কি? কে জানে? কিন্তু তক্ষুণি বুধকে বাঁচানোর জন্য আর কিছু মাথায় আসছিলো না, কী করে চাঁদনী?
রাতের অন্ধকার নামার পর চাঁদনী ওদের বাড়ির দরজার বাইরে মাটিতে তিনটে লাল কাঠি পুঁতে দিল। এখানেই দাঁড়িয়ে রোজ বুধ ওকে ডাকে। এই কাঠিই ওকে রক্ষা করবে। কতদিন? কে জানে?
*
কয়েক বছর কেটে গেছে। চাঁদনী আর বুধ ইস্কুলের পাট চুকিয়ে এখন বিয়ে থা করেছে। ওরা এখন বুধের বাড়িতেই থাকে। চাঁদনী বুধের বাড়িঘর, ওদের ছেলেমেয়ের দেখাশোনা করে, আর সেই সঙ্গে বুধের বাবার জমির দায়িত্বও ওর-ই। বুধ গ্রামে একটা খাবার দোকান চালায়। গ্রামের রাস্তা দিয়ে দূরের পাহাড়ে লোকে বেড়াতে যায়। তারা যেতে আসতে গ্রামে থেমে বুধের দোকানে চা, জলখাবার, ডাল-ভাত, মুরগির ঝোল খেয়ে রওয়ানা দেয় আবার।
বুধ ওদের কথা শোনে। শোনে আরও এক বেলা চলে লোকে একটা পাহাড়ে পৌঁছয়। সে নাকি খুব সুন্দর। অবাক হয়ে ভাবে, মানুষ কত দূর-দূরান্ত থেকে আসে শুধু পাহাড় দেখতে।
যাবার পথে ওদের কত উৎসাহ, নতুন কিছু দেখতে যাচ্ছে, ফেরার পথে কত আনন্দ, সুন্দর পাহাড় দেখে ফিরছে ওরা। ওদের মুখে বর্ণনা শোনে, আর নিজের চেয়ারে বসে পাশের জানালা দিয়ে তাকিয়ে বুধ দেখে ওর লাল পাহাড়। ভাবে, এর সৌন্দর্যের কাছে ওই দূরের পাহাড় কতোটুকু? কিন্তু কেউ যদি ওকে জিজ্ঞেস করে, “এখানে দেখবার কী আছে?” ও ঘাড় নাড়ে গাঁয়ের বাকি লোকেদের মতই বলে, “দেখার কিস্যু নেই।”
এ কথা গ্রামের অন্য লোকেদের মতো বিশ্বাস থেকে বলে না বুধ, যদিও সেই সে দিনের পর আর ও ফিরে যায়নি পাহাড়ে। চাঁদনীকে কথা দিয়েছিল। কাউকে বলেওনি। প্রথম দিকে ভাবত দাদুকে বলবে, কিন্তু বলি বলি করে দাদু সত্যিই একদিন মরে গেল, আর বলা হল না। কিন্তু সেদিনের পরে এমন একটাও দিন যায়নি যে দিন বুধ লাল পাহাড়ের মাথায় দিনটার কথা ভাবেনি, মনের চোখে পাহাড়টাকে দেখেনি। দিনে দিনে ওর মনের মধ্যেই আকাশের রঙ হয়ে উঠেছে ঘন নীল। ওর পরী পুকুরের গভীর জল হয়ে উঠেছে কাকের চোখের মতো কালো। চাঁদনী ভেবেছিল বুধকে পাহাড় থেকে দূরে গ্রামে কাজের মধ্যে রাখলে ওর আর পাহাড়ের যাবার কথা মনে থাকবে না। সেটা অবশ্য চাঁদনী বলেনি বুধকে, যেমন বুধও বলেনি চাঁদনীকে যে ও কোনও দিনই পাহাড়ের ওপরের সেই দারুণ দিনের কথা ভুলবে না। বলেনি ও এখনও রোজই পরী পুকুরের কথা ভাবে। বলেনি রোজ রাতেই ও স্বপ্নে পরী পুকুর দেখে। সে স্বপ্নে পরী পুকুরের পাড়ে পূর্ণিমা রাতে ডাইনিরা জড়ো হয়েছে। ওর স্বপ্নের ডাইনিরা কী সুন্দর! তারা হালকা ডানায় উড়ে আসে। তাদের পরনে মসলিন। বুধের মনে হয়, এ তো ওর নিজের জায়গা। লাল পাহাড়ের চুড়ো, পাহাড়ের জঙ্গল, পরী পুকুর, সবই বুধের। আর কারও নয়। সকালে বুধের ঘুম ভাঙে বুকভরা দুঃখ নিয়ে। আর একবার পাহাড়ে উঠে পরী পুকুর দেখার অদম্য ইচ্ছা নিয়ে। তারপরেই চোখ পড়ে চাঁদনীর দিকে। ঠাণ্ডামাথা, বুদ্ধিমান চাঁদনী, সারা দিন মুখ বুজে চারিদিকে নজর রেখে কাজ করে চলা চাঁদনী। মনে পড়ে সেদিনের কথা, বহু বছর আগে চাঁদনীকে দেওয়া কথা — দীর্ঘশ্বাস ফেলে দোকানে যায়, সেখানে, জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে লাল পাহাড় দেখতে পায়, আবার দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
বাড়িতে চাঁদনী বুধের মনের কথা না বুঝলেও মুখের ভাবটা বোঝে, মনে মনে তৈরি হয়, একদিন আসবে, যে দিন বুধকে আর ধরে রাখা যাবে না। রোজই রাতে চাঁদনী বুধের জুতোর নিচে মাটিতে তিনটে কাঠি পুঁতে রাখে। এখন অবশ্য তিনতেই লাল না। দুটো লাল, একটা হলদে। তিনটে লালে আর হবে না।
*
সে দিনটা এল একটা ছোকরা ছেলের হাত ধরে। বেলা শেষ হয়ে এসেছে, সন্ধের পরে গ্রামটা ঘুমিয়ে পড়ে, বুধও সূর্য ডোবার আগেই দোকান বন্ধ করে ফিরে যায় বাড়ি। কিন্তু সেদিন পিঠে একটা মস্ত ব্যাগ, রোগাটে গড়ন, ফর্সা ছেলেটা দোকানে ঢুকে বুধকে বলল, “রাত্রিটা আমাকে এখানে শুতে দেবেন?”
বুধ অবাক হয়ে চারিদিকে চেয়ে বলল, “এখানে? এখানে শোবার জায়গা কোথায়? এই চেয়ার টেবিল বেঞ্চির মধ্যে শোবেন কী করে?”
ছেলেটা বলল, “শোবার জায়গা আমি বানিয়ে নেব।”
বলে ব্যাগ থেকে আর একটা লম্বা, সরুমতো ব্যাগ বের করে বলল, “এটা আমার স্লিপিং ব্যাগ। আমি আপনার খাবার ঘরের দেওয়ালের পাশে ওই জায়গাটায় শুয়ে যাব। শুধু আপনি অনুমতি দিলেই হবে। কাল ভোরে সূর্য ওঠার আগেই চলে যাব।”
বুধ বলল, “কিন্তু এই গ্রামে আপনি থাকবেন কেন? আর অত ভোরবেলা যাবেনই বা কোথায়?”
ছেলেটা বলল, “যাব ওই পাহাড়ের মাথায়।” আঙুল দিয়ে দেখাল লাল পাহাড়ের দিকে।
অভ্যেসমত মাথা নাড়ল বুধ। বলল, “ওখানে দেখার কিছুই নেই।”
ছেলেটা হেসে বলল, “আমি যা দেখতে চাই তা অবশ্যই আছে। আমি পাখি দেখব।”
এবার বুধ এতোই অবাক হল, যে কিছুই বলতে পারল না। পাখি একটা দেখার জিনিস হল? ওর মুখের ভাব দেখে ছেলেটা ব্যাগ থেকে এবারে বের করল একটা বই। পাতা উল্টে দেখাল সারি সারি পাখির ছবি। বলল, “প্রায় আশি রকম পাখি পাওয়া যায় আশেপাশের তিন চারটে পাহাড়ে। লাল পাহাড়েও নিশ্চয়ই পাওয়া যাবে, তাই না?”
আবার মাথা নাড়ল বুধ। বলল, “খুব বিপদজনক।”
“কী বিপদ?” জানতে চাইল ছেলেটা।
বুধ কী বলবে? ডাইনি আর অভিশাপের কথা বললে ছেলেটা নির্ঘাত হেসে উড়িয়ে দেবে। তাই অল্প কথায় সেরে ফেলার মত করে বলল, “লোকে মরে যায়।”
তাও ছেলেটা হেসেই উড়িয়ে দিল। বলল, “সব গল্প। একজনেরও নাম বলতে পারবেন, যে পাহাড়ে গিয়ে মরে গিয়েছে?”
না। এমনকি দাদুও তেমন কাউকে চিনত না।
ওকে চুপ দেখে ছেলেটা বলল, “দেখলেন তো? আচ্ছা, শুনুন, কথায় কথায় সূর্য ডুবে গেল। এখন তো আমার আর কোথাও যাবার উপায়ও নেই। আমার জন্য সামান্য কিছু খাওয়ার ব্যবস্থা করে দিন। আমি দাম দেব।”
ছেলেটা ওর সামনে টাকাকড়ি যা রাখল তাতে বুধ দেখল ওর অনেক রোজগার হবে। ও আর আপত্তি করল না। ছেলেটার খাওয়া-শোয়ার বন্দোবস্ত করে বাড়ি ফিরল। খেয়াল করল না, চাঁদনী মন দিয়ে ওকে নজর করছে।
সারা রাত বুধের ঘুম প্রায় হলই না। খালি মনে হতে লাগল, ছেলেটাকে যেতে দেওয়া যাবে না। ছেলেটার বিপদ হতে পারে সেটা না, কিন্তু ওর লাল পাহাড়ের চুড়ো আর ওর পরী পুকুর! চাঁদনীকে কথা দিয়েছে বলে সেখানে ও নিজে যেতে পারবে না, কিন্তু এই অচেনা ছেলেটা যাবে, সেটা ও কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না।
পাশের ঘরে চাঁদনীও জেগে। আজ আর একটা ধাপ। আজ বুধের বিছানার নিচের মাটিতে দুটো হলদে কাঠি পুঁতে রেখেছে চাঁদনী। এতেও শানাবে না, চাঁদনী জানে। বুধকে বাঁচাবার ব্যবস্থা করতে হবে যে কোনও দিন।
পরদিন বুধ ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়ল সূর্য ওঠার আগেই। ছেলেটাকে পাহাড়ে ওঠার আগেই আটকাতে হবে।
কিন্তু হল না। গ্রামের রাস্তায় খানিকটা যেতে না যেতেই বুধ দেখল, ছেলেটা উঠে আসছে, পিঠে ওর বিশাল ব্যাগ, গলায় দূরবীন, ক্যামেরা। ওকে দেখে উল্লসিত হয়ে বলল, “আপনিও আসবেন আমার সঙ্গে?”
ছেলেটার সঙ্গে পাহাড়ের মাথায় যাবার কোনও চিন্তাই বুধের মাথায় আসেনি। কিন্তু প্রশ্নটা শুনে মনে হল, কেনই বা যাবে না? পাহাড় চুড়োটা তো ওরই, তাই না? ছেলেটার সঙ্গে পাহাড়ে উঠতে উঠতে বুধ ওকে ডাইনি পুকুরের গল্পটা বলেই ফেলল। প্রথমে দাদুর গল্পগুলোই বাড়িয়ে বাড়িয়ে বলছিল, কিন্তু ছেলেটার ভয় পাবার কোনও লক্ষণ নেই। একে একে সব কথাই ওকে বলে ফেলল বুধ। ছোটোবেলায় পাহাড়ের ওপরে ওঠার কথা,চাঁদনীকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি, এমনকি ওর খাবার দোকানে বসে জানালা দিয়ে বাইরে পাহাড় দেখতে দেখতে আস্তে আস্তে পাহাড়চুড়োটাকে নিজের মনে করা, সব।
ছেলেটা কিছু বলছে না দেখে ওর একটু রাগ হল। পাহাড়টা ওর নিজের বলেছে বলে ছেলেটার আপত্তি হল?
চারিদিকে তাকিয়ে আবার বুধের চোখ জুড়িয়ে গেল। এত সুন্দর জায়গা হয়? সেই সঙ্গে দুঃখও হল। এই সৌন্দর্য চাঁদনী দেখবে না কোনও দিন, ওদেরই গ্রামের লোকের বোকামির জন্য। রাগ রাগ গলায় বলল, “নয় কেন? আমার গ্রামের কোনও লোক কোনও দিনই এই দৃশ্য দেখতে আসবে না। এ আমি একাই ভোগ করব। এই পাহাড়, এই পুকুর, আমিই এসবের আসল মালিক। আসল, আসল...”
চোখে দূরবীন লাগিয়ে পাখি খুঁজতে খুঁজতে ছেলেটা বলল, “হ্যাঁ, তা তো বটেই।”
মাঠে কাজ করতে করতে চাঁদনী ওপরে মুখ তুলে, হাত দিয়ে চোখ আড়াল করে বোঝার চেষ্টা করছিল বুধ কতোদূর গেছে। যে দিন ইস্কুল থেকে ফেরার পথে বুধ ওকে প্রথম বলেছিল পাহাড়ে যাবার কথা, সেদিন থেকেই চাঁদনী অপেক্ষায় ছিল, একদিন আসবে এই দিন। এর পর, চাঁদনী জানে, কবে সব শেষ করে দিতে হবে, কেউ বলতে পারবে না। মাঠের কাজ ফেলে চাঁদনী ঘরে ফিরে গেল — বুধের বিছানার নিচে তিনটে কাঠিই এখন হলুদ। কিন্তু প্রয়োজনীয় সব জিনিসগুলোও গুছিয়ে রাখতে হবে। বেশি কিছু লাগবে না, তাও...
বুধ ছেলেটাকে পাহাড়ের ওপরে রেখে দোকান খুলতে নেমে এল। ছেলেটা বলেছিল সকাল শেষ হয়ে দুপুর হবার আগেই ফিরে আসবে, কিন্তু এল প্রায় বিকেলের কাছাকাছি। বলল, অনেক পাখি দেখেছে। খেয়ে দেয়ে দাম মেটানোর সময় বাড়তি কিছু টাকাকড়ি দিল বুধকে। বলল, “আমার সঙ্গে পাহাড় অবধি যাবার জন্য, আমাকে রাস্তা দেখানর জন্য, আর সব গল্পগুলো বলার জন্য এটা আপনার পারিশ্রমিক।”
সেদিন সন্ধেবেলা চাঁদনী বুধকে জিজ্ঞেস করল, “আজ কি তুই পাহাড়ের একেবারে ওপর অবধি গেছিলি?”
বুধ জানতো কেউ ওকে দেখলে চাঁদনীকে বলে দেবে। কিন্তু কেউ দেখেছে বলে ভাবেনি। চাঁদনী জানতে চেয়েছিল কেবল। বুধকে বারণ করার উদ্দেশ্য ছিল না, জানাটাই দরকার ছিল। কিন্তু বুধ হঠাৎ ভীষণ রেগে গেল। পকেট থেকে ছেলেটার দেওয়া টাকা ছুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলল চাঁদনীর সামনে। বলল, “তাকিয়ে দেখ, শুধু সঙ্গে যাবার জন্য কত টাকা পেলাম। এই টাকাটা ছেড়ে দেওয়াটা বোকামি হত না?”
চাঁদনী মুখ ফিরিয়ে নিল বলে বুধ মনে করল চাঁদনী ব্যাপারটা বুঝেছে। যেটা দেখতে পেল না সেটা হল চাঁদনীর চোখের গভীর দুঃখ। এই বাড়ি ছেড়ে ওদের চলে যেতে হবে সেই ভাবনার চোখের জল না ঝরানো কান্না।
সেদিন রাতে, বুধ যখন গভীর ঘুমে, চাঁদনী বেরিয়ে বাড়ির চৌহদ্দির চারিদিকে অনেকগুলো সরু সরু কাঠি পুঁতে এল। এগুলো সব সাদা। অনেক কষ্টে এগুলো জোগাড় করেছে চাঁদনী। কিন্তু এ-ও বেশিদিন চলবে না। চাঁদনী জানে। তবে আজ ও সেদিনের কথা ভাবতে চায় না। সেদিনের কথা তখনই ভাববে। *
ছেলেটা ফিরে এল মাস কয়েক পরে। বুধ ওর দোকানে বসে লাল পাহাড়ের দিকে চেয়ে বসেছিল। ছেলেটা ওর সামনে একটা পত্রিকা রেখে বলল, “এই দেখুন।”
বুধ বলল, “এ তো ইংরেজিতে লেখা। আমি ইংরেজি পড়তে পারি না।”
ছেলেটা হেসে বলল, “পাতা উল্টে দেখুন না, কাউকে বা কিছু চিনতে পারেন কি না?”
আস্তে আস্তে পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে বুধ হঠাৎ থমকে গেল। সামনের ছবি থেকে চোখ তুলে তাকাল জানালা দিয়ে বাইরে। দরকার ছিল না। জানালার বাইরের দৃশ্য ওর চোখে আঁকা। সেই দৃশ্যই ওর সামনে, দু পাতা জোড়া।
“আপনার দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে তুলেছি,” ছেলেটা বলল। “আপনি লাল পাহাড়কে সত্যিই ভালোবাসেন। গ্রামের কেউ তেমনি ভালোবাসে না। ভয় পায়।”
পাতার নিচে কী সব লেখা। ইংরেজি হরফের দিকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বুধ বলল, “কী লেখা আছে?”
ছেলেটা বলল, “‘লাল পাহাড়ের পাখি।’ এটা আমার লেখার নাম।”
চার পাতা জোড়া লেখা। পরের পাতা উল্টেও থমকে গেল বুধ। ওটা ওর এই দোকানটা না? আর তার পরে, ওটা? ওর দোকানে খেয়ে খুশি হয়ে ওর সঙ্গে ছবি তুলেছে এমন লোক আছে, কিন্তু ওর নিজের মুখের ছবি এর আগে দেখেনি বুধ।
ছেলেটা এবার ওর ব্যাগ থেকে আরও কয়েকটা কাগজ বের করল। ওই পাতাগুলোই, কেমন প্লাস্টিকে মোড়া। বলল, “এগুলো ল্যামিনেট করে এনেছি। দেওয়ালে লাগিয়ে দেব। পিন নিয়ে এসেছি। এই পত্রিকাটা শহরে বিখ্যাত। হাজার হাজার লোক পড়বে। তারা এখানে আসলে জানতে পারবে আপনিই সেই বুধ। পাহাড়চুড়োর আর পরী পুকুরের ছবি দিইনি, কিন্তু লিখেছি। ডাইনির কথা লিখিনি। হাতুড়ি দেবেন একটা?”
দেওয়ালে পত্রিকার পাতাগুলো আটকে ছেলেটা ওকে এবার আরও কয়েকটা ছবি দিল। বুধের ছবিটা, ওর দোকানের ছবি, গ্রামের ছবি আর — কী আশ্চর্য — পরী পুকুর আর পাহাড়চুড়োর ছবি!
বলল, “এগুলো আপনার। আপনার বউ ছেলেমেয়েদের দেখাবেন।”
ছেলেটা চলে গেল। বলল আরেকটা পাহাড় দেখতে যাচ্ছে। বুধ থুম হয়ে বসে রইল ছবিগুলো আর পত্রিকাটা সামনে নিয়ে। ওর কর্মচারীরা এসে ল্যামিনেট করা কাগজগুলো দেখে অবাক হল। বুধ একবার ভাবল, লাল পাহাড়চুড়োর ছবিগুলোও দেখায়, কিন্তু তার পরে কী ভেবে সরিয়ে রাখল। দিনটা কেমন স্বপ্নের মতো কেটে গেল। খদ্দেররা অনেকেই দেওয়ালে লাগানো ছবিগুলো দেখে ওকে বলল, আমাদের লাল পাহাড়ে নিয়ে চল। বুধ মাথা নেড়ে সবাইকে বলল, “ওখানে দেখার কিছু নেই।”
দিনের শেষে বুধ ছবিগুলো কাগজের মুড়ে বাড়ি নিয়ে যেতে গিয়েও দোকানেই ওর টেবিলের দেরাজে তালা বন্ধ করে রেখে দিল। লাল পাহাড়ে উঠেছে বলে চাঁদনী ওর ওপর সেদিন রাগ করেছিল। সেই কথা যেচে মনে না করালেও চলবে। খালি হাতেই বাড়ি ফিরল বুধ।
বুধ বাড়ি ফেরার পর চাঁদনী দীর্ঘশ্বাস ফেলে বাইরে গিয়ে বসল। আর কিছু করার নেই ওর। ওর বিদ্যা বুদ্ধিতে যা করার ছিল সবই শেষ। এখন শুধু অপেক্ষা।
*
যত দিন যায়, লাল পাহাড়ে বাইরের লোকের আনাগোনা বাড়ে। বুধের দোকান উপচে পড়ে। কেউ আসে পাখি দেখতে, কেউ আসে পিকনিক করতে, কেউ বা গাছের খোঁজে। কেউ চায় ডাইনিদের ইতিহাস জানতে। কেউ শুধু ঘুরে বেড়ায়।
তবে সবাই বুধকে চায়। রাস্তা দেখিয়ে ওপরে নিয়ে যাবার জন্য, গল্প বলার জন্য, ওপর থেকে নিচের দৃশ্য দেখাবার জন্য — আর সেই সঙ্গে ওরা বুধকে পয়সা দিয়ে যায়। বুধ আজকাল চাঁদনীকে নিয়ে আর মাথা ঘামায় না। ওর এখন অনেক পয়সা। দোকানের রোজগার, গাইডের কাজের রোজগার মিলিয়ে ও এখন গ্রামের বড়োলোক। বাইরের লোকেরা ওকে সম্মান করে কথা বলে। গ্রামের লোকেরা ভয় পায়।
শুধু বাড়িতেই ওর কদর বাড়েনি। চাঁদনী ওর উন্নতি দেখে কোনও আনন্দ দেখায় না। ওর জন্য, বাচ্চাদের জন্য কিছু নিয়ে গেলে শান্তভাবে নিয়ে নেয়, কিন্তু তারপরে সেটা বুধ আর কোনও দিন দেখতেও পায় না।
রোজ বুধ যখন বাইরের লোকেদের নিয়ে লাল পাহাড়ের ওপরে যায়, তখন গ্রামের উল্টো দিকের পথ দিয়ে ওঠে। এখন বুধ লাল পাহাড় চেনে খুব ভালো করে। তার কোন ঢালের কোন গাছে ভুতুম প্যাঁচার বাসা, কোন ঝোপের ফল কখন পাকলে কোন পাখি তা খেতে আসে, পাহাড়ের কোন বনে ছায়ায় পিকনিক জমে সবচেয়ে ভাল, কোন পাথরের ওপরে দাঁড়ালে নিচের দৃশ্য সবচেয়ে সুন্দর দেখা যায়, সব জানে বুধ।
বুধ ভাবে পাহাড়ের ওধার দিয়ে উঠলে চাঁদনী দেখতে পাবে না, গ্রামের লোকে ওকে খবর দেবে না। কিন্তু তা হয় না। গ্রামের লোক না বললেও চাঁদনী ঠিকই বোঝে। আরও একটা-দুটো জিনিস গুছিয়ে রাখে, চলে যাবার প্রস্তুতি।
গ্রামের লোকের কথাও কানে আসে। শুনতে পায়, আজকাল শহরের লোকেরাও বুধের নাম জানে। ওরা এসে বুধের দোকানের খোঁজ করে। বলে, “বুধের পাহাড়ে আমাদের নিয়ে যাবে?” বুধের ছবি বেরিয়েছে শহুরে ইংরিজি পত্রিকায়। বুধ এসব কিছুই বলেনি চাঁদনীকে। বলেনি লোকে লাল পাহাড়কে বুধের পাহাড় বলতে লেগেছে। চাঁদনী দুঃখ পায় না। রাগ করে না। ও জানে এটাই হবার ছিল। বোঝে, সময় হয়েছে।
গোছানো জিনিসগুলো গাঁঠরি বেঁধে নিল চাঁদনী। সাদা লাল হলদে কাঠিগুলো, ঠাকুরের আসনে সব ঠাকুরের আড়ালে লুকোনো একটা কালো গোল পাথর, ওদের সবার জামার তিনটে করে সুতো, উনুনের ছাই সাত চিমটি... এ সব, আর আরও কিছু, গোছানোই ছিল। চাঁদনী সেই বাণ্ডিলে নিল বাগানের সবকটা গাছের তিনটে করে পাতা। তার পরে বাচ্চাদের হাত ধরে বেরিয়ে গেল বাড়ি থেকে। দরজা বন্ধ করল না। তাহলে আর ফিরে আসা যায় না। পেছন ফিরে তাকাল না। তাহলে ছেড়ে যাওয়া যায় না।
রাত্তিরে দোকান থেকে ফিরে বুধ দেখল বাড়ি খালি, অন্ধকার। কেউ কোথাও নেই। বুধ খানিকক্ষণ চাঁদনী আর বাচ্চাদের নাম ডেকে ডেকে ঘুরে বেড়াল। তার পর পাহাড়ী রাস্তা ধরে নেমে গেল চাঁদনীর বাপের বাড়ি, যেখানে এখন থাকে চাঁদনীর দাদা।
চাঁদনীর দাদা রাগ-রাগ গলায় বলল, “আমি কী করে জানব চাঁদনী কোথায়? ওর দায়িত্ব এখন তোমার। তুমি যদি দিনরাত ওই পাহাড়ে ঘুরে না বেড়িয়ে ওদের দেখাশোনা করতে, যদি ওদেরকে নিজের মনে করতে ওই পাহাড়টাকে আপন না মনে করে, তাহলে আজ তুমিই জানতে ওরা এখন কোথায়।”
“আমি মোটেই...” বলতে গিয়েও বুধ থেমে গেল। ওই ছেলেটাকে বলেছিল ও পাহাড়চুড়ো আর পুকুরটাকে নিজের বলেই ভাবে। কে জানে, সে হয়ত সে কথা ওই ইংরেজী পত্রিকায় লিখে দিয়েছে। হয়ত গ্রামের আর পাঁচজনও সে কথা জানে। বুধের মুখ লাল হয়ে উঠল, কান গরম হয়ে গেল, ওর মনের গোপন কথা গ্রামের সবাই জেনে গেছে ভেবে।
চুপচাপ ফিরে গেল বাড়ি। ঘুম এল না রাতে।
*
পরদিন সকালে বুধ কাজে গেল, কিন্তু আর বাড়ি ফিরল না। দোকানেই রয়ে যেতে লাগল রাতে। অবশ্য ওটাকে আর ও দোকান বলে না। বলে রেস্টুরেন্ট। শহরের লোকে তাই শিখিয়েছে ওকে। কিছুদিন আগে বুধ লোক লাগিয়ে ওর দোকানটা আরও সুন্দর করে তুলেছে। যত দিন যাচ্ছে, বুধের ব্যবসা, প্রতিপত্তি দুই-ই বাড়ছে। গ্রামের বয়স্ক আর সমবয়সীরা অবশ্য ওর সঙ্গে আর কথা বলে না। ও-ও আর তাদের সঙ্গে কোনও সম্পর্ক রাখে না। কিন্তু ছোটোরা ওকে হিরো মনে করে, ভাবে বড়ো হয়ে ওরাও লাল পাহাড়ে যাবে রোজ। ওদের মা বাবারা বুঝিয়ে ধমকে ওদের নিরস্ত করে রেখেছে।
চাঁদনী আর বাচ্চাদের কোনও খোঁজ পায়নি বুধ। ওর ধারণা গাঁয়ের কেউ কেউ জানে, কিন্তু বুধকে বলছে না। সারা দিন সবার সামনে বুধ একটা কিছু-হয়নি ভাব করে বেড়ায়, কিন্তু ভেতরে ভেতরে একটা দুশ্চিন্তা কুরে কুরে খায়।
চাঁদনী সেটাও বোঝে। কিন্তু ও জানে, এখনও সময় হয়নি।
একদিন সকালে রেস্টুরেন্টে ঢুকতে গিয়ে বুধ শুনল ওর লোকেরা নিজেদের মধ্যে কথা বলছে ওরই সম্বন্ধে। “এই হল অভিশাপের ফল। বাড়ির লোক তো সবাই চলেই গেছিল, এখন কিছুদিনের মধ্যে বাড়িটাও পড়ে যাবে। আমি তো ঠিক করেছি গ্রাম ছেড়েই চলে যাব। কে জানে কবে বাচ্চাটা পাহাড় চড়তে শুরু করবে...”
বুধ অবাক হল। বাড়ি ভেঙে পড়ছে? ওর বাড়ি? এরই মধ্যে? ক’দিন হল বাড়ি ছেড়েছে? এই তো কয়েক সপ্তাহ... না কি কয়েক মাস?
সেদিন পিকনিকের জন্য একদল লোক নিয়ে বুধ পাহাড়ে চড়ল ওর বাড়ির রাস্তা ধরে। পাহাড়ের পথ এঁকে বেঁকে পাহাড়ী বাঁক পেরিয়ে ওর বাড়ির কাছে এসে পৌঁছন মাত্র বুধ থমকে দাঁড়াল। এ কী দুর্দশা বাড়িটার! খুব সুন্দর, বড় বাড়ি ছিল না কোনও দিনই, অনেক দিন ও চাঁদনীকে বলেওছিল এটা ছেড়ে গ্রামে গিয়ে থাকতে, চাঁদনী রাজী হয়নি — কিন্তু বাড়িটার সর্বাঙ্গে একটা যত্নের ছাপ ছিল, বোঝা যেত কেউ ভালবেসে বাড়িটার দেখাশোনা করে। প্রথমে বুধের মা, তার পরে চাঁদনী।
বুধের সঙ্গে যারা ছিল, তারাও নাক কুঁচকোল। একজন তো বলেই বসল, “এখানে কে থাকে?”
এটা ওরই বাড়ি, সে কথা বলতে লজ্জা করল। বলল, “এখানে যারা থাকত, তারা চলে গেছে।”
সে বলল, “তাহলে এই বাড়িটা এখানে এমন রয়ে গেছে কেন? কী বিশ্রী!”
বুধ আর কিছু বলল না। ওদের পিকনিকের জায়গায় পৌঁছে দিয়ে পাহাড় থেকে নেমে চলে গেল মিস্তিরি ডাকতে। বাড়িটাকে সারিয়ে নিতে সময় নিল মাস দুয়েক। তারপরে ফিরে গেল সেই বাড়িতে। দেখুক গ্রামের লোক, বুধের বউ বোকার মত পালিয়ে গিয়ে থাকতে পারে, কিন্তু বুধ ডরায় না।
কিন্তু বাড়ি এসে তো শান্তি নেই। রোজই কাজ থেকে ফিরে ক্লান্ত শরীরে শুতে যায় বুধ, রোজই জেগে এ পাশ, ও পাশ করে। ঘুম আসে না।
যত দিন যায়, দোকান থেকে আরও দেরি করে ফেরে। ভাবে, ক্লান্ত হয়ে ফিরলে বোধহয় ঘুম আসবে
আসে না।
রাত সেদিন অনেকটাই হয়েছিল। বাড়ি ফিরতে ফিরতে হঠাৎ আকাশের দিকে চোখ পড়ল বুধের। পূর্ণিমারাত, আকাশ জোছনায় ভেসে যাচ্ছে। মনে হল, আজই তো পরীরা আসবে। ওর পাহাড়ে। ওর পুকুরে। কী ভেবে বাড়ির দিকে না গিয়ে হাঁটা দিল পাহাড়চুড়োর দিকে।
থই থই জ্যোৎস্নায় বুধ যখন পাহাড়ে পৌঁছল, তখন পরিশ্রমে, উত্তেজনায় আর প্রত্যাশায় ওর সর্বাঙ্গ ঘামে ভেজা, বুক ধুকপুক করছে, হাপরের মত নিঃশ্বাস পড়ছে। পরী পুকুরের চারপাশের জঙ্গল নিস্তব্ধ নিথর, যেন নিঃশব্দে চাঁদের আলো শুষে নিচ্ছে।
হুড়মুড়িয়ে জঙ্গল থেকে বেরিয়ে এল বুধ। কই, কেউ তো কোথাও নেই! স্বপ্নের মতো সুন্দর পাহাড়চুড়ো। কিন্তু কেউ নেই। পুকুরের জলে তিরতিরে কাঁপুনিটুকু নেই, একটা গাছের পাতাও নড়ে না।
কিন্তু ছিল। বুধ জানে ছিল। এই একখুনি ছিল। বুধ গাছের আড়াল থেকে ছুটে বেরোনর আগের মুহূর্ত অবধি ছিল। ওদের থাকার রেশটা রয়ে গেছে হাওয়ায়, জলে, চাঁদের আলোয় — ওরা নেই।
পাগলের মত বুধ ছুটে ছুটে খুঁজল। শেষে মাটিতে আছড়ে পড়ে হাউ হাউ করে কাঁদল। বলল, “চাঁদনী, তুই এলি না কোনও দিন আমার সাথে, দেখলি না কী সুন্দর পরী পুকুর। কিন্তু পরীরা আমাকে দেখা দিল না।”
চাঁদনী আস্তে আস্তে বলল, “চুপ চুপ। এখনও সময় হয়নি, কিন্তু আর দেরি নেই।”
শুনতে পেল না বুধ। কাঁদতে কাঁদতে ওখানেই ঘুমিয়ে পড়ল। সকালে উঠে মনে হল, এত ভাল ঘুম অনেকদিনের মধ্যে ওর নিজের বিছানাতে হয়নি। সে দিন থেকে বুধ কাজ সেরে রোজ রাতে চলে যেত পরী পুকুরের পাড়ে। অনেকক্ষণ বসে থাকত। রাত বাড়লে নেমে আসত বাড়িতে। ফিসফিস করে চাঁদনীকে বলত, কী কী হয়েছে সারা দিন। জানতেও পারত না, চাঁদনী শুনছে, ওর চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ছে। তার পরে বুধ ঘুমিয়ে পড়ত নিশ্চিন্তে, চাঁদনীও ফিরে যেত নিঃশব্দে।
দিন কাটে, হপ্তা যায়। এগিয়ে আসে পরের পূর্ণিমা। উত্তেজনায় ফুটতে থাকে বুধ।
পূর্ণিমা রাতের একদিন বাকি থাকতে বুধ ওর রেস্টুরেন্টের ছেলেদের জানিয়ে দেয়, কাল দোকান বন্ধ। ছুটি। সারা দিন কাজের শেষে ফিরে সেদিন বুধ আর পাহাড়ে গেল না। পরদিন যাবে, সকালেই। অপেক্ষা করবে পরীদের জন্য।
বুধ ঘুমিয়ে পড়ল।
ঘুম ভাঙল, রাত তখন অনেক। জানালার বাইরে প্রায় দিনের মত আলো। আকাশের চাঁদ পূর্ণিমার পুরো থালাটা নয়, কিন্তু তার চেয়ে কমই বা কী?
বুধ বিছানা থেকে নেমে বাইরে এসে দাঁড়াল। ওর ভুরু কোঁচকানো। কে যেন ডাকল ওকে? না কি ভুল হল?
বাইরে, জোছনাধোয়া আঙিনায় লাল ফুলের গাছটার নিচে কে দাঁড়িয়ে? এত সুন্দর মানুষ হয়? তার লম্বা কালো চুল হাওয়ায় উড়ছে, তার পোষাকও যেন চাঁদের আলোয় তৈরি। তার গায়ে চাঁদের আলো পিছলে যাচ্ছে।
কিন্তু, কিন্তু... এ কে? অবাক বুধ পায়ে পায়ে এগিয়ে এসে থমকে গেল।
পরীটা কিচমিচ করে পাখির ভাষায় কী যেন বলল।
“চাঁদনী? তুই? তুই পরী?”
খিলখিল করে হাসল চাঁদনী। আবার কিচিমিচি করল, পাখিদের মত। কিন্তু এবার বুধ ঠিক বুঝল ওরই ভাষায়। চাঁদনী বলল, “পরী, না ডাইনি? কী বলে ডাকবি?”
বুধ মাথা নেড়ে বলল, “ডাইনি না, পরী। আমি জানি, পরী। আমি দেখতে পাচ্ছি — পরী।”
আবার হাসল চাঁদনী। বলল, “কিচ্ছু জানিস না, বোকা কোথাকার।”
তার পরে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল, “আয়, সময় হয়েছে। যেতে হবে।”
*
লাল পাহাড়ে ওঠার সব রাস্তাই এখন বন্ধ। গ্রামের লোক কাঁটাতার দিয়ে ঘিরে দিয়েছে। বাইরের লোককে আর যেতে দেওয়া হয় না। ওদের বলা হয়, “ও পাহাড়ে দেও আছে। যাওয়া মানা।”
যারা বুধকে চিনত তাদের কেউ জানতে চাইলে বলে, “বুধ? তাকে আর দেখা যায় না। ওই ওর দোকান, তালাবন্ধ। পাহাড়ের গায়ে ওর বাড়িটা আছে এখনও। মজবুত, তাই চট করে ভেঙে পড়েনি। কিন্তু ওরা কেউ নেই। কোথায় গেছে, কেউ জানে না।”
গ্রামের লোকেরা ছেলেমেয়েকে বুধের গল্প বলে। ভয় দেখায়। বলে, বুধ ডাইনির কথা বিশ্বাস করেনি। ও বিশ্বাস করত ডাইনি নেই। পরীদের কথা বলত। বলত ওটা পরী পুকুর। কিন্তু অভিশাপের কথাই ফলে গেল। বুধকে ডাইনিরা সাপ না ব্যাং কী বানিয়ে দিল কে জানে।
শুধু বুধ হাসে। গ্রামের মানুষ জানেও না, পরী আর ডাইনিতে কোনও তফাতই নেই।