বাড়ির সবার মধ্যে নিমাইয়ের সবচেয়ে পছন্দ ওর ছোটোকাকাকে। সেটার অনেক কারণ আছে, কিন্তু সবচেয়ে বড়ো কারণ এই যে ছোটোবেলায় ছোটোকাকা ওকে বিস্কুট এনে দিত। আর লজেন্স। ছোটোবেলায় নিমাইয়ের ধারণা ছিল ওকে কেউ ভালোবাসে না। মা সকাল থেকে রান্নাঘরে কুটনো কুটতো, বাটনা বাটতো, রান্না করতো, ওকে মুড়ি দিত না। দাদু বাজার থেকে এটা সেটা কিনে এনে মাকে দিত রান্না করতে, ওকে বিস্কুট দিত না। নিমাই রোজ সকালে দাওয়ায় বসে ইনিয়ে বিনিয়ে কাঁদত, এঁ-এঁ-এঁ-এঁ, মা মুড়ি দেয় না, এঁ-এঁ-এঁ-এঁ, দাদু বিত্তু আনে না, এঁ-এঁ-এঁ-এঁ…
এমন সময়ে কখনও যদি ছোটোকাকা আসত, দুই ভাইয়ের জন্য পকেট থেকে বেরোতো ঠোঙা ভরা বিস্কুট, কখনও বা ক্যাডবেরির চকলেট। সেই তখন থেকেই ছোটোকাকা নিমাইয়ের প্রিয় মানুষ। এখন অবশ্য নিমাই আর কাঁদে না। এখন স্কুল টুল পাশ টাস করে কলেজে পড়ে… তবু।
এ হেন কাকা যখন খবর দিল যে বর্ধিষ্ণুনগরে চাকরি পেয়ে আসছে, সঙ্গে কাকিমা আর চার বছরের ছেলে, তখন সবচেয়ে বেশি আনন্দ পেয়েছিল নিমাই। দাদু আর মা-ও খুশি। দাদুর ছোটো ছেলে আর মায়ের ছোটো দেওর আসছে। তবু নিমাই-ই সবচেয়ে আনন্দ পেয়েছিল। কাকার সঙ্গে গল্প করে মজা আছে। আর চার বছরের শান্ত — কাকার ছেলে — সে তো নাকি সাংঘাতিক মজার হয়েছে।
প্রথম দিনই কাকা যখন ক্লান্ত ছেলেকে ঘুম পাড়িয়ে খেতে বসল, নিমাই জিজ্ঞেস করল, কাকা, সুবচনী কোন ঠাকুর?
কাকা খাওয়া থামিয়ে বলল, এতো দিন পরে জানতে চাইছিস?
নিমাই অবাক। এত দিন পরে মানে?
কাকা বুঝিয়ে দিল। বুড়ো আঙলায় পড়েছিস তো?
বুড়ো আঙলা! সে তো সে কবেকার কথা? বাচ্চাবেলায় পড়েছিল নিমাই। কী সব ছিল, গণেশের গল্প না কী যেন, ভালো করে মনেও নেই। সে কথা কেন?
কাকা জিজ্ঞেস করল, হৃদয় যে হাঁসটার সঙ্গে গিয়েছিল, তার নাম কী ছিল?
কী ছিল? মনে নেই নিমাইয়ের। কাকাও এবার একটু থতমত খেল। বলল, তাহলে জানতে চাইলি কেন?
নিমাই বলল, আজকাল একটা লোক আসে, বুড়ো মতো। পুজোর জন্য টাকা চাইতে। কালো, লম্বা, সিড়িঙ্গে, হাতে একটা রথের মতো ঠাকুরের আসন। দোতলা। সিঁদুর-মিদুর মাখিয়ে একেবারে জবরজং। মালা আর ফুলে ভেতরে দেখা যায় না। উঁকি মেরে দেখেছি, ভেতরে পাথর টাথর আছে। কোনও মূর্তি নেই।
কাকা বলল, সুবচনী কে বা কোন ঠাকুর সে নিয়ে নানা লোকে নানা কথা বলে। কেউ বলে সে শুভ চণ্ডী ঠাকুর। সুবচনীর ব্রত সম্ভবত উড়িষ্যা থেকে এসেছে। সে এক রাজার গল্প, সুবচনী ঠাকুর মরা ছেলে ফিরিয়ে দেয়।
সবাই বলল, সুবচনীর গল্প কী?
কাকা বলল, শোনো তবে। উড়িষ্যায় এক রাজা ছিল, তার অনেক হাঁস ছিল। একটা হাঁস ছিল খোঁড়া। খোঁড়া বলে রাজা তাকে খুব ভালোবাসতেন। রোজ সকালে সন্ধেয় তাকে না দেখলে রাজার চলত না।
আর গ্রামে থাকত একটা গরিব ছেলে। বাবা ছিল না, মা অনেক কষ্টে ছেলেকে বড়ো করছিল। ছেলেটা খেতে পেত না, আর মাকে বলত, আমার বন্ধুরা সবাই ভালো ভালো খায়, মাছ খায়, মাংস খায়, আমাকে দাও না?
মা বলত, আমি গরিব, কোথায় পাব? তুই একটা চাকরি কর, তার পরে কিনে আন, আমি বানিয়ে দেব।
ছেলেটা আর কিছু বলল না, কিন্তু চোখে পড়ল রাজার অনেক হাঁস আছে। তার মধ্যে একটা হাঁস আবার খোঁড়া। রাজার ঘেসেড়া রোজ হাঁসগুলো খোঁয়াড় থেকে বের করে পুকুরে নিয়ে গিয়ে ছেড়ে দেয়, আবার রোজ সন্ধেবেলা পুকুর থেকে ওরা যখন বেরিয়ে ফেরে, তখন সবাইকে গুনে গুনে খোঁয়াড়ে বন্দী করে।
ছেলেটা রোজ দেখে। হাঁসগুলো ছাড়া পেয়ে প্যাঁকপেঁকিয়ে দৌড় লাগায় জলের দিকে, আর জল থেকে উঠে এসে রোজ নিজেরাই ঢুকে যায় খোঁয়াড়ে। ঘেসেড়ার কাজ শুধু এবেলা ওবেলা গোনা। কিন্তু খোঁড়া হাঁসটা রোজই পিছিয়ে পড়ে। ঘেসেড়া গুনে পায় না, ফিরে গিয়ে আবার নিয়ে আসতে হয়।
একদিন সন্ধেবেলা খোঁড়া হাঁস পিছিয়ে পড়েছে, ছেলেটা দেখে আশেপাশে কেউ কোত্থাও নেই, হাঁসটা আসছে আস্তে আস্তে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। ছেলেটার মাথায় বদ-বুদ্ধি চেপেছে। টক করে হাঁসটাকে ধরে এক আছাড় মেরেছে পাশের একটা পাথরে। হাঁস গেছে মরে। ছেলেটা জামার মধ্যে হাঁসটাকে লুকিয়ে দৌড়ে ফিরেছে মা’র কাছে, বলেছে, মা, এবারে মাংস রেঁধে দে।
রাজার বাড়ির হাঁস! মা’র মাথায় হাত, কাঁদবে, না গ্রাম ছেড়ে পালাবে ভেবে পায় না। কিন্তু করা আর কী, হাঁস তো মরেই গেছে। রান্নাঘরে গিয়ে ছাল ছাড়িয়ে মাংস রাঁধল আর পালক চামড়া হাড়গোড় সব লুকিয়ে ফেলল বাড়ির পেছনের ছাইগাদায়।
এদিকে ঘেসেড়া খোঁড়া হাঁস আর খুঁজে পায় না। রাজাও সন্ধেবেলা খোঁয়াড়ে গিয়ে দেখে প্রিয় হাঁস নেই! রেগে আগুন — পেয়াদা ডাকে, বলে, গিয়ে দেখো কে আমার হাঁস নিয়েছে। নিয়ে এসে কারাগারে বন্ধ করো — বুকে পাথর চাপা দিয়ে।
দিকে দিকে পেয়াদা বেরিয়ে গেল।
এখানে খোঁজে, ওখানে খোঁজে, এর বাড়ি ঢোকে, ওর বাড়ি ঢোকে। লোকে বিরক্ত হয়, ভয় পায়। শেষে একজন বলল, ও পাশের বাড়ি, ওই যারা গরিবের গরিব, ওর বাড়ি থেকে সন্ধেবেলা মাংস রাঁধার গন্ধ পেয়েছি।
হই হই করে পেয়াদারা দরজা ভেঙে ঢুকল। বলল, এই, মাংস কোথায় পেয়েছিস? বল, নইলে এমন মারব!
এ দিকে দুজন পেয়াদা মা ছেলেকে মারছে, ও দিকে অন্যরা এখানে ওখানে খুঁজছে — খুঁজতে খুঁজতে দেখে, ছাইগাদায় হাঁসের পালক। ব্যাস! ছেলেটাকে ধরে ঢুকিয়ে দিয়েছে কারাগারে — বুকে পাথর চাপা দিয়ে ফেলে রেখেছে।
মা কেঁদে ভাসায় — পাড়ার লোকে এসে বলে, কেঁদো না। কেঁদো না। ছেলে তো চোর। শাস্তি হয়েছে। কিন্তু রাজা তো ওকে ছাড়বে না। মেরে ফেলবে। তুমি সুবচনীর পুজো করো। সুবচনীর পুজো করলে হারিয়ে যাওয়া ছেলে আবার পাওয়া যায়, মরা ছেলে বেঁচে ওঠে। যে মেয়ের বিয়ে হয়নি, তার বিয়ে হয়। গরিব বড়োলোক হয়।
সেই শুনে মা উঠে সুবচনীর পুজো করে সেই পুজোর জল ছিটিয়ে দিল হাঁসের হাড়গোড়ের ওপর। হাঁস আবার বেঁচে উঠে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে ফিরে গেল রাজার বাড়ি। রাজা তো অবাক!
সে দিন রাতে রাজা স্বপ্ন দেখল, দেবী বলছে, তোর কারাগারে যে ছেলেটাকে হাঁস চুরির দায়ে বন্দী করে রেখেছিস, তাকে কাল সকালেই ছেড়ে দিবি। তোর মেয়ের সঙ্গে তার বিয়ে দিয়ে, অর্ধেক রাজত্ব দিবি…
রাজা সকালে উঠেই ভয়ে ভয়ে ছেলেটাকে ছেড়ে দিল, সন্ধেবেলা রাজকন্যার সঙ্গে ওর বিয়ে হল, আর অর্ধেক রাজত্ব পেয়ে ছেলে বাড়ি ফিরল মায়ের কাছে, সঙ্গে সানাই, বাঁশি, ঢাক, ঢোল।
মা তো ছেলেকে পেয়ে আনন্দে আটখানা। তার পরে, নতুন রাজার অর্ধেক রাজত্বে নতুন রাজপ্রাসাদ বানিয়ে মা, ছেলে আর রাজকন্যা মনের সুখে বাস করতে লাগল।
নিমাই মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, বা, রে! এও তো মজা! রাজার হাঁসও খাব, রাজার মেয়েকেও বিয়ে করব, রাজার রাজত্বও নেব! সবই হবে?
ছোটোকাকা হা হা করে হেসে বলল, ওরে, এই জন্যই তো বোকারা ঠাকুর পুজো করে।
ছোটোকাকা খুব কট্টর কমিউনিস্ট। নিমাইও। তাই নিমাইও হাসল। তার পরে ছোটোকাকা বলল, বুড়ো আঙলাটা বাইরের ঘরের ওপরের তাকে আছে। বের করে পড়ে নে। দেখবি ওখানেও সুবচনীর হাঁসের কথা আছে। যারা সুবচনীর ব্রত করে, তাদের একটা খোঁড়া হাঁস পুষতে হয়।
নিমাইয়ের খাওয়া হয়ে গিয়েছিল। তাড়াতাড়ি উঠে পড়ল। ওকে এখন ডিফারেনশিয়াল ক্যালকুলাসের অঙ্ক করতে হবে। এখন কি বুড়ো আঙলা পড়ার সময়?
*
দু দিন যেতেই বোঝা গেল ছোটোকাকার ভারি মিষ্টি ছেলে শান্তর নাম যে রেখেছিল, সে হয় ভবিষ্যৎ দেখতে জানত না, নয়ত খুবই রসিক। এক সপ্তাহের মধ্যে শান্তর আরও কয়েকটা নাম দেওয়া হল। ডাকাত, দস্যি, ওরেব্বাবা, এই সব। এক মুহূর্ত থেমে থাকে না। সারাক্ষণ গেল-গেল, আর ধর-ধর। দাদু, যে কী না পৃথিবীর সবচেয়ে ধৈর্যশীল মানুষ, সেও শান্তকে গুণ্ডা বলে ডাকে!
শান্তর নজর সারাক্ষণ থাকে দু-দিকে। সে দুটোই ওর নাগালের বাইরে থাকার কথা। একটা উঠোনের শেষে কুয়োটা — ওর জানা দরকার কোথা থেকে বালতি করে বড়োরা জল তুলে আনে। ওর মা যখন ওকে চান করাতে নিয়ে যায়, দড়িতে বাঁধা বালতিটা ফেলে দেয় কুয়োর মধ্যে, দূর থেকে ছপ্ করে একটা শব্দ ভেসে আসে, আর তার পরেই টেনে টেনে তুলে আনে এক বালতি জল! কোত্থেকে আসে? শান্তকে দেখতে দেয় না কেউ। কুয়োর উঁচু বাঁধানো ধারটা শান্তর মাথার চেয়েও উঁচু। শান্ত মা-কে কতো বলে বেয়ে উঠলেই ও দেখতে পাবে, কিন্তু মা শোনে না। বলে বাবা আসলে বলে দেবে। দেবে বাবা দু চারটে… বাবার দেওয়া নিয়ে শান্ত খুব চিন্তা করে না। বাবা কখনওই ওকে মারে-টারেনি। কিন্তু কেউ ওকে কুয়োর পাড়ে যেতেই দেয় না। করে কী বেচারা। তক্কে তক্কে থাকে।
উঠোনে আর একটা জিনিসের প্রতি শান্তর নজর — খিড়কীর দরজা। এই দরজাটা দিয়ে বেরিয়ে গেলেই বাইরের জগৎ — সেটা ও জানে। সেখানে কী আছে জানার অপরিসীম আগ্রহ শান্তর। সারাক্ষণ চেষ্টা করে কী করে চট করে বেরিয়ে যাওয়া যায়। বাইরে একটা সরু গলি, সেটা গিয়ে পড়েছে আরেকটা গলিতে। তার পরে বড়ো রাস্তা। ছোট্টো ছোট্টো পায়ে দৌড়োলেও শান্ত চোখের নিমেষে রাস্তায় পৌঁছে যাবে। বড়োরা কেউ ওকে যেতেই দেয় না।
শান্ত সারা দিন চোখ রাখে খিড়কির দরজা আর কুয়োতলার দিকে। কখন কেউ দেখছে না? যে বাড়িতে সারা দিন দরজা খোলা থাকত, সেখানে আজকাল দরজা লাগিয়ে দিতে হয়। বাইরের কেউ ঢুকলে ঘরের লোক চেঁচাতে থাকে — দরজা দাও, দরজা দাও, শান্ত বেরিয়ে যাবে…! কুয়োটা দাদু লোক ডেকে কাঠের তক্তা দিয়ে ঢেকে দিল। নইলে কখন কী কাণ্ড ঘটবে কে জানে! বালতি দিয়ে আর জল তোলা যাবে না। একটা হ্যান্ডপাম্প বা টিউবকল বসানো হয়েছে। শান্তর খুব দুঃখ। আর ভেতরটা ও দেখতে পাবে না।
দাদুর ঘরের দরজাটা অবশ্য ওই বাইরের গলিতেই খোলে। আর খোলাও থাকে সারা দিন। ওই দরজা দিয়ে গেলেও শান্ত ঠিক বেরিয়ে পড়বে বাইরের রাস্তায়। ও জানে। কিন্তু দাদুর ঘরে উঁকি দিলেই দাদু হেঁকে বলে, কী দাদুভাই? কী খবর?
দাদু খুব ভালো, শান্তকে কোলে নিয়ে আদর-টাদর করে, বেড়াতেও নিয়ে যায়। কিন্তু তবু শান্ত জানে দাদুই এ বাড়ির কর্তা। সবাই দাদুকে ভয় পায়। এমনকি মা-ও। বাবা তো মাটির দিকে তাকিয়ে কথা বলে। ফলে ও দাদুর ধার ঘেঁষে না। দাদুর ঘর থেকে বাইরে বেরোনোর প্রশ্ন তো নেই-ই।
দাদু ছাড়া আর একজনকে শান্ত ভয় পায়। একটা লম্বা, রোগা কালোমতো লোক আসে প্রায়ই। তার গায়ে রক্তের মতো লাল জামা আর লুঙ্গি। মাথায় ওই লাল কাপড়েরই ফেট্টি। হাতে একটা কী, তাতে নাকি ঠাকুর আছে। কোলে নিয়ে বাড়িতে ঢোকে যখন তখন। হেঁকে বলে, সুবচনীর সেবা হবে নাকি গো! জ্যেঠিমা, বা মা তখন কোনও দিন একটু চাল, বা কোনও দিন একটা তরকারি দিয়ে দেয়। কখনও বা কিছু পয়সা। শান্ত অবশ্য তখন সামনে থাকে না কখনও। ভেতরের ঘর থেকে উঁকি দিয়ে দেখে। এমন ভাবে, যাতে ওকে দেখতে না পায় লোকটা। তবু একদিন দেখে ফেলেছিল। ওর দিকে তাকিয়ে হেঁড়ে গলায় বলেছিল, বাঃ, কী মিষ্টি ছেলে! সে দিন থেকে শান্ত আর দরজাতেও দাঁড়ায় না। খাটের ওপারে ট্রাঙ্ক রাখা থাকে, তার পেছনে লুকিয়ে থাকে। সেবা নিয়ে লোকটা বেরিয়ে পাশের বাড়িতে যায়, সেখান থেকে ওর গলা পেলে তবেই বেরোয় বাইরে।
দিন কাটে। শান্ত অপেক্ষা করে থাকে, কুয়োর পাড়ে না গেলে অন্তত দরজা দিয়ে বাইরে যাওয়া যায় কি? ওর মা’র সঙ্গে যায়, জ্যেঠিমা পাশের বাড়ি নিয়ে যায়, দাদু বলে চল, বাজার যাই! নিমাইদা তো দিনে রাতে রাস্তার মোড়ে, পাশের দোকানে, ওপারের রেললাইনে রেলগাড়ি দেখতে নিয়ে যায় — কিন্তু শান্তর তো তাতে শান্তি নেই, ওকে একাই যেতে হবে দেখতে হবে বাইরেটা ও একা গেলে অন্যরকম দেখায় কি না।
সেদিন ছিল ছুটি। শান্তর বাবা — নিমাইয়ের ছোটোকাকা — আসবে। থাকবে দিন দুয়েক। বাড়িতে সাজ সাজ রব। সকালেই দাদু বাজার করে এনেছে। দুই জা, নিমাইয়ের মা আর শান্তর মায়ের এক মুহূর্ত সময় নেই। নিমাইয়ের পড়াশোনা ডকে — ছুটছে বার বার দোকানে আর এবাড়ি ওবাড়ি।
সবে ফিরেছে পোস্ত নিয়ে, বাইরের দরজার শব্দ পেয়েই রান্নাঘর থেকে কাকিমা ডেকেছে, নিমাই নাকি?
নিমাই বলেছে, হ্যাঁ, আমি। বলতেই মা ডেকে বলেছে, এই, শিগগির আবার যা, রাঁধুনি নিয়ে আয়। রাঁধুনিটা ছাতা পড়েছে, ফেলে দিলাম।
আচ্ছা, বলে একছুটে রান্নাঘরে পোস্ত দিয়ে আবার ফিরবে বলে নিমাই দরজা বন্ধ করেনি। এ দিকে দৌড়েছে নিমাই, আর ও দিকে দৌড়েছে শান্ত। নিমাই রান্নাঘরের দরজা থেকে মায়ের হাতে পোস্ত দিয়ে আবার বাইরের দিকে ফিরতেই দেখে, আরে! শান্ত বেরিয়ে গেল।
চিৎকার করে এক লাফে রান্নাঘরের দাওয়া থেকে উঠোনে পড়েই নিমাই ছুটেছে খিড়কি দরজার দিকে, কাকিমাও শান্ত শান্ত বলে ডাকতে ডাকতে রান্নাঘর থেকে বেরোতে পারছে না, পথে বঁটি পেতে নিমাইয়ের মা কুটনো কুটছে, ওদিকে দাদুও নিজের ঘর থেকে শান্ত শান্ত বলে ডাকতে ডাকতে বেরোনোর চেষ্টা করছে কিন্তু ইজিচেয়ার থেকে উঠতে পারছে না…
এদিকে নিমাইও পৌঁছেছে দরজায়, আর ওদিকে বাইরে শান্তর হাউমাউ কান্না, উ-হা-হা-হা-হা-হাহাহাহা! নিমাই বেরিয়েছে আর শান্ত প্রাণপনে ওর ছোট্টোছোট্টো পায়ে ছুটে গিয়ে ঘরে ঢুকে গেছে, আর পেছন পেছন সুবচনীর মন্দির কোলে লম্বা কালো লোকটা ঢুকে বলছে, খোকা ভয়ে পেয়ে গেল যেন…
মা আর কাকিমা চাল আনতে গেল, আর নিমাই শোবার ঘরে গিয়ে দেখল শান্ত খাটে উঠে উপুড় হয়ে মাথাটা বালিশের নিচে ঢুকিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলছে, আমি আর যাব না, ও সুবচনী, আমি যাব না, আমি আর বাইরে যাব না। আমাকে ধরে নিয়ে যেও না…
সেই নিয়ে কতো হাসাহাসি। রাত্তিরে ছোটোকাকা হাসতে হাসতে খুন। খালি বলে ও সুবচনী, আমি বাইরে যাব না। আমায় ধরে নিয়ে যেও না… আর হেসে গড়িয়ে পড়ে।
শান্ত আজ অ্যামেরিকায় প্রফেসর। এই গল্প শুনলে হাসে আর বলে, যদি দেখতে ওই দৃশ্য, বুঝতে কেমন লেগেছিল আমার।
No comments:
Post a Comment