হলুদ পাখি
অনিরুদ্ধ দেব
ছোট হলুদ পাখিটা বাসা বানাচ্ছিল।
দুপুরের রোদ্দুরটা সেদিন ভীষণ গরম। অসহ্য লাগছে, খিদেও পেয়েছে। পাখিদের তো খুব ঘনঘন খিদে পায়! খায়ও অনেক। বাসাটানলবনের গভীরে। আস্তে আস্তে, সাবধানে,নলখাগড়ারফাঁক দিয়ে দিয়ে বাইরের দিকে এল হলুদ
পাখিটা। যেখানে নলবন শেষ, তার পরেই খোলা জল, সেখানে এসে লম্বা লম্বা সবুজ নলের
ফাঁক দিয়ে সাবধানী চোখ মেলে তাকাল। কেউ কোথাও নেই। ছোট পাখিদের শত্রু অনেক। জলে আর
নলবনে সাপ আর মেছো বিড়াল। আকাশে রয়েছে শিকারী পাখি। তাদের অনেকে দেখে রাখে কোথা
থেকে কোন পাখি বেরোচ্ছে – বোঝে, এখানেই তাদের বাসা। তাই ওরাও কখনও বাসা থেকে উড়ে সোজা
বাইরে আসে না। পায়ে পায়ে চলে, থেমে থেমে দেখে। ডান দিকে যায়, আবার বাঁ দিকে। আবার
চলে।
নাঃ, কোত্থাও
কেউ নেই। কিচ্ছু নেই। নলবনের ভিতর মেছো বিড়ালের
চুপিসাড়ে চলার হালকা সরসর শব্দ নেই, জলের নিচে শরীর লুকিয়ে সাঁতরে আসা সাপের জল
কাটার তিরতিরে ঢেউ নেই, আকাশ থেকে ছোঁ মারা বাজপাখির ছায়া নেই জলের ওপর। চারিদিক
নিস্তব্ধ। জলের পোকাগুলো সাঁতরে চলেছে বলে জলে সামান্য ঢেউ কাটছে, কিন্তু তা বাদে
সব শান্ত। হাওয়াও নেই এক ফোঁটা। একটা নলের ডাঁটি, একটা গাছের পাতাও নড়ছে না।
শত্রু নেই দেখে নিশ্চিন্ত হয়ে হলুদ পাখিটা শিকার ধরার দিকে নজর দিল।
চারিদিকে গঙ্গাফড়িং উড়ছে। অন্য দিনের চেয়ে অনেক,অনেক বেশি। নলের বনে ঘাপটি মেরে
পাখিটা অপেক্ষা করতে থাকল। যেই একটা গঙ্গাফড়িং কাছে আসে, ছোঁ মেরে ধরেই গিলে নেয়।
তিনটে ফড়িং আর একটা ব্যাং খেয়ে খিদে মিটল। আজ সারা দিন বড্ড ধকল গিয়েছে গরমে। ভোর থেকে ওরা দুজনে
মিলে বাসা বানানো শুরু করেছিল।
রোদ বাড়ার পরে থেমে বিশ্রাম নিয়েছে নলবনের ছায়ায়। এতক্ষণে রোদের
তেজ কমে আসা উচিত ছিল, কিন্তু কোথায় কী! গুমোট হয়ে আছে।
ফুড়ুৎ করে উড়ে এল ডোরাকাটা বাবুই। ও-ও বাসা বানাচ্ছে হলুদ পাখির বাসার
কাছেই। ওদের বাসা দেখতে অন্যরকম। সরু সরু করে নল ঘাসের পাতা আর অন্য ঘাস ছিঁড়ে
বুনে বুনে বাসা বানায় ওরা। মেয়েরা বানায় না। ছেলেরাই কেবল বানায়।
বাবুইটা নলের ওপরের দিকে একটা পাতা দু’পা দিয়ে আঁকড়ে ধরে বসে বলল, “বড্ড
গরম আজ!”
হলুদ পাখিটা ঠোঁট ফাঁক করে গলাটাকে থর থর করে কাঁপিয়ে শরীর ঠাণ্ডা করছিল।
বাবুইয়ের কথা শুনে থেমে বলল, “ভীষণ গরম। হাওয়াও নেই। গাছের পাতাটা পর্যন্ত নড়ছে
না।”
বাবুই খানিকক্ষণ জলের পানকৌড়িগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল। ওরা সাঁতার কেটে
বেড়ায়, শরীরটা জলের নিচে, গলা আর মাথাটা বাইরে। মাঝে মাঝেই ডিগবাজি খেয়ে ডুবে যায়
জলের তলায়। উঠে আসে, মুখে একটা মাছ নিয়ে। বাবুই বলল, “ওদের কী মজা! জলের মধ্যে গা
ডুবিয়ে থাকে, গরম টের পায় না। আমি ওরকম করতে গেলে ডুবেই মরে যাব।”
হলুদ পাখি একটু একটু সাঁতার কাটতে পারে। পানকৌড়িদের মত
নয়, তবে জলে পড়লে ডুবে যাবে না। বলল, “মা বলত, এ রকম গরম হলে ঝড় আসে।”
ঘাড় নেড়ে বাবুইটা চারিদিকে গঙ্গাফড়িং উড়তে দেখে বলল, “আর কত গঙ্গাফড়িং,
দেখেছ? এত গঙ্গাফড়িং একসঙ্গে উড়লে বৃষ্টি আসে।”
সামনের খোলা জলের ওপারের নল খাগড়াগুলো নড়ে উঠল সামান্য। কথা থামিয়ে বাবুই
আর হলুদ পাখি তাকিয়ে রইল সেই দিকে। ধীরে ধীরে, পাতাগুলো ফাঁক করে বেরিয়ে এল একটা
হলুদ ঠোঁট, তার পরে একটা হলুদ মাথা আর গলা। বিপদ নয়।
“তোমার সাথী এসেছে,” বলল বাবুই। চট করে উড়ে সামনের জলটুকু পার করে হলুদ
পাখির সাথী এসে ওদের সঙ্গে বসল। বলল, “আমি গিয়েছিলাম ঢেঁকচিলদের সঙ্গে কথা বলতে। ওরা
আর মাছ ধরছে না, দেখেছ? দলে দলে চলে যাচ্ছে কোথায়।”
“কেন?” জানতে চাইল হলুদ পাখি।
“সমুদ্র থেকে ওদের বন্ধু ঢেঁকচিলরা উড়ে এসেছে। বলেছে ওদিককার খবর ভাল নয়।
ভয়ানক ঝড় আসছে। মেঘে মেঘে আকাশ কালো হয়ে যাবে। দু’বছর আগের মত ঝড় আসছে আবার।”
বাবুই ভয় পেয়ে বলল, “কী সর্বনাশ! সেই ঝড়ে আমার বাসা ভেঙে গিয়েছিল। সব ডিম
নষ্ট।”
হলুদ পাখি কিছু বলল না। ওদেরও বাসা ভেঙেছিল। তিনটে ছানা–সবাই মরে গিয়েছিল।
বাবুই বলল, “ঢেঁকচিলরা চলে যাচ্ছে, তোমরাও কি যাবে? দূরে চলে গেলে ঝড় কি কম
হয়?”
হলুদ পাখির সাথী বলল, “ঢেঁকচিলরা যাচ্ছে কোথায় জানি না। তবে ওরা যাচ্ছে
বলেই আমরা যাব সে আবার কি কথা। আমরা তো আর ঢেঁকচিলনা!”
ঠিক কথা। ঢেঁকচিলরাও মাছ ধরে খায়, কিন্তু ওরা সরু, রোগা পাখি। সরু সরু
ডানায় সারা দিন উড়ে বেড়ায় খোলা জলে, যে জলে পানকৌড়ি ডুব দিয়ে মাছ ধরে। ঢেঁকচিলরা
ডুব দেয় না, জলের ওপরে মাছ সাঁতরে আসলে আকাশ থেকে ছোঁ মেরে ধরে নেয়। হলুদ পাখিরা কাঠ
বক। ওরা আরেকটু গোলগাল পাখি। ছোট মুরগির মত বড়। ওদের পা লম্বা,
আর ঠোঁটও ঢেঁকচিলএর চেয়ে লম্বা আর ভারী। ওরা লুকিয়ে চলাফেরা করে, লুকিয়ে শিকার
করে। পোকামাকড়, মাছ, ব্যাং – সবই খায়। ঢেঁকচিলএর মত উড়ে উড়ে বেড়ান ওদের স্বভাব নয়।
ওরা উড়তে পারে – উড়ে যায় এক নলবন থেকে পাশের নলবন, কিন্তু নলবন ছেড়ে দূরে যায় না।
নলবনের ভিতর থেকে বেরোলেও ধারে ধারেই থাকে। বিপদ দেখলেই লুকিয়ে পড়ে নলবনে।
হলুদ পাখি বলল, “তাহলে আর বাসা বানান’ শেষ করে কাজ নেই। ঝড়ে ভেঙে দেবে। তার
চেয়ে ঝড়ের পরে নতুন করে শুরু করব বরং।”
ওর সাথী বলল, “ঝড় যদি দু তিন দিন চলে?”
হলুদ পাখি বলল, “দু তিন দিন অপেক্ষা করা যাবে, কিন্তু তার পরে আর সময় থাকবে
না।”
বাবুইও তার সাথীকে ডেকে ঝড়ের খবর দিল। দুজনে শলা পরামর্শ করে উড়ে গেল
কোথায়।
সূর্য ক্রমে ঢলে পড়ল পশ্চিমের দিকে। আগুনের মত তেজ কমল একটু। সমুদ্রের দিক
থেকে একটা হালকা ঠাণ্ডা হাওয়া বয়ে এল। তাতে গরম কমল একটু, কিন্তু শান্তি এল না
কারওর মনে। পাখিরা কেউ উড়ে যেতে শুরু করল দূরে। বাকিরা ঢুকতে শুরু করল নলবনের
গভীরে। যাদের বাসায় ডিম বা ছানা রয়েছে, তারা ইচ্ছে থাকলেও যেতে পারল না। ওই জলে যে
মানুষরা নৌকো করে মাছ ধরে, তারা নৌকো ফিরিয়ে নিয়ে এল জলের ধারে। ঠাকুরের নাম জপতে
জপতে ফিরে গেল যে যার গ্রামে।
হলুদ পাখির সাথী বলল, “আমি অন্যদের জিজ্ঞেস করে আসি, কোথায় যাচ্ছে সবাই।
তাহলে আমরাও চলে যাব– ঝড় শেষ হলে ফিরব আবার।”
সুর্য তখন প্রায় ডোবে ডোবে – হলুদ পাখি দেখল দূর আকাশের গায়ে কালো মেঘের
ছায়া। দেখতে দেখতে আধখানা আকাশ ঢেকে ফেলল কুচকুচে কালো মেঘ।
“আজ রাতেই ঝড় আসবে,” মনে মনে ভাবল হলুদ পাখি।
যতবার আকাশের দিকে মুখ তুলে তাকায়, দেখে কালো মেঘ ছুটে আসছে আকাশ ছেয়ে।
দেখতে দেখতে আর কোথাও নীলের ছোঁয়া রইল না। সূর্যও পাটে নামল, আর আকাশ চিরে কড়কড়
করে বাজ পড়ল একটা।
সেই সঙ্গে শুরু হল ঝড়ের দমকা হাওয়া।
সে হাওয়ার এতই তেজ, যে হলুদ পাখির মনে হল যেন তাকে একটা বিশাল হাত টেনে
ছিঁড়ে নিয়ে চলে যাবে নলবন থেকে। প্রাণপণে নলের পাতা আঁকড়ে রইল হলুদ পাখি, ভাবল,
সাথী কোথায় কী জানি, নিরাপদে আছে, নাকি ঝড়ের পাল্লায় পড়েছে!
তার পরে এল বৃষ্টি। সে কী বৃষ্টি! সে শুধু বড় বড় ফোঁটা নয়, সে এতই বড়
ফোঁটা, আর সে ফোঁটাও এতই বেশি যে চারিদিক সাদা হয়ে গেল – কিছুই আর প্রায় দেখা যায়
না। হলুদ পাখির চোখের সামনে বাবুইয়ের বাসাটা ছিঁড়ে খুঁড়ে টুকরো টুকরো হয়ে হাওয়ায়
উড়ে গেল, বাকিটা বৃষ্টিতে ধুয়ে নিয়ে গেল। ওর নিজের বাসাটা কোথায় গেল দেখতেই পেল
না।
সূর্য ডুবে গেল। চারিদিক অন্ধকার হয়ে গেল। সেই অন্ধকারে, প্রবল বৃষ্টিতে,
প্রচণ্ড ঝড়ে, প্রাণপনে নলখাগড়া আঁকড়ে রইল হলুদ পাখি, ভয় হতে লাগল, বৃষ্টির তোড়েই
না ও বাবুইয়ের মত ডুবে মরে যায়!
সারা রাতের পরে ওই রকম ঝড় বৃষ্টির মধ্যেই ভোর হল। দূরের সমুদ্র এতই উত্তাল
যে তার বিরাট বিরাট ঢেউ এসে আছড়ে পড়ছে নল বনের ভেতরে। সেই ঢেউয়ের ধাক্কার থেকে
অনেক দূরে থাকার ফলে আর কিছু হল না, কিন্তু হলুদ পাখি বুঝল নোনা জল ঢুকে জল বাড়িয়ে
দিচ্ছে। আস্তে আস্তে, এক পা এক পা করে, হলুদ পাখি নলের পাতা ধরে ধরে ওপর দিকে উঠতে
থাকল। তার পরে, যখন নলের পাতাগুলো হাওয়ায়, বৃষ্টিতে আর ওর ওজনে নুয়ে পড়ল, তখন
বৃষ্টির তোড় থেকে বাঁচানোর কিছু রইল না মাথার ওপর।শরীরটাকে গুটিয়ে
আরও ছোট করে চোখ বুজে রইল ভয়ে ভয়ে।
কাছেই একটা সাপ ওরই মতন একটা নলের পাতা জড়িয়ে ওপরে উঠছে বাঁচার তাগিদে।
পাশে একটা ব্যাং ভয়ে ভয়ে জলের নিচে শরীর লুকিয়ে নলের পাতা ধরে নিজেকে বাঁচাচ্ছে।
হলুদ পাখির খিদে পেয়েছে খুব। কিন্তু ব্যাং ধরার দরকার নেই। চারিদিকে জলে হাজার
হাজার মাছ মরে ভেসে উঠছে। হলুদ পাখি তার একটা দুটো খেল পেট ভরাবার তাগিদে। কাছেই
কোথাও মেছো বিড়ালটাও লুকিয়ে আছে। মাঝে মাঝে তার শরীরের গন্ধ পাচ্ছে হলুদ পাখি।
কিন্তু বৃষ্টির হাত থেকে তারও বাঁচার উপায় নেই। সেও প্রাণপনে চেষ্টা করে চলেছে
নলবনের আড়ালে নিজেকে বাঁচানর। শিকার ধরার দিকে নজর নেই তার।
তিন দিন ধরে ঝড় চলতেই থাকল। তিন দিন সূর্যের দেখা পাওয়া গেল না। হাওয়া মাঝে
মাঝে কমল বটে, কিন্তু সে আর কতক্ষণ! বৃষ্টির ধারা একটু নরম হল বটে, কিন্তু
পরক্ষণেই আবার শুরু হল প্রবল বর্ষণ।
শেষে, তিন দিনের দিন, রাত্তির বেলা, হাওয়ার তোড় যেন কমে
এল। বৃষ্টিও কমে আস্তে আস্তে ঝম-ঝম থেকে ঝির-ঝির থেকে টিপ-টিপ হয়ে থেমে গেল সূর্য
ওঠার আগেই। চার দিনের দিন নরম সূর্য উঠল মেঘের আড়ালে। ততোক্ষণে ঝড় বয়ে গিয়েছে।
চারিদিক চুপচাপ।
তবে এই চুপচাপ শান্তির নয় – দুঃখের। চারিদিকে নলবন দুমড়োন, মুচড়োন, নুয়ে
পড়া। দলামোচা। হলুদ পাখির চার পাশে কেবল মরা মাছ, পাখি আর পাখির ছানা।
পায়ে পায়ে, সাবধানে, হলুদ পাখি আবার বেরিয়ে এল নলবনের ভিতর থেকে। একটা মরা
মাছ খেল। সাপটা নলখাগড়ার আশ্রয় ছেড়ে সাঁতার কেটে চলে গেল কোন দিকে। ব্যাংটার কোন
চিহ্ন নেই। মেছো বিড়ালটার গন্ধও কমে গিয়েছে। সেও চলে গিয়েছে কোথায় – অনেক মাছ
রয়েছে তার খাবার জন্য।
লুকিয়ে থাকা পাখিরা বেরোতে শুরু করল। গ্রাম থেকে উড়ে এল কাক আর দাঁড়কাকের
দল। মরা মাছ, পাখি আর পাখির ছানা নিয়ে লাগিয়ে দিল মারামারি। মানুষেরা ফিরে এল দল
বেঁধে। ওদের অনেক নৌকো ভেঙে গিয়েছে একটার সঙ্গে আরেকটার ধাক্কা লেগে। ওরা দল বেঁধে
নৌকোগুলো দেখল। দেখল কত মাছ, কত পাখির ছানা মরে গিয়েছে।
দুপুরের মধ্যে মেঘ কেটে রোদ উঠল। ঝড় চলে গিয়েছে একেবারেই। নলবনের পাতাগুলো
আস্তে আস্তে সোজা হতে লেগেছে। অনেকগুলো মুচড়ে গিয়েছে, কিন্তু নলপাতা নরম, হাওয়ার
বেগে বেঁকে যায়, ভাঙে না। গঙ্গাফড়িংরা ফিরে এল কোথা থেকে, জলের পোকাও বেরিয়ে এল।
ফিরে এল পোকা খাওয়া পাখিরাও। ঢেঁকচিলরা ফিরল একজন দু-জন করে।
বাবুইরা এল দুপুরের আগেই। ওদের বাসার চিহ্নও নেই। বলল, “গেছে বাসাটা।
তাড়াতাড়ি তৈরি করি। ডিম পাড়ার আর দেরী নেই। তুমি কি এখানেই ছিলে? আমরা মানুষের
গাঁয়ে গিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম ওখানেই ভাল হবে। কিন্তু কোথায় কী! চারিদিকে গাছ ভেঙে
পড়ল, মানুষের বাসা গেল গুঁড়িয়ে, চাল উড়িয়ে নিয়ে গেল হাওয়া। এখানে আর ওখানে কোন
তফাৎই নেই।”
ওর সাথী বলল, “এর পর থেকে আর কোথাও যাব না, ঝড়ের সময় এখানেই থাকব। যা হয়
হোক।”
দুপুরের পরে হলুদ পাখি বুঝল আর দেরী করা যাবে না। ডিম পাড়ার সময় প্রায় এসে
গিয়েছে। বাসা বানাতেই হবে এখন। সে ওর সাথী ফিরে আসুক চাই না আসুক। ক্লান্তি আসছে –
বিশ্রাম করতে পারলে হত, কিন্তু আর সময় নেই। দুটো মরা মাছ খেয়ে নলের ভাঙা পাতা দিয়ে
একটা গোলমত বাসা তৈরি করতে লেগে গেল।
সূর্য ডুবতে তখন আর বেশি বাকি নেই – কিন্তু বাসা তৈরি শেষ হতে তখনও বাকি,
এমন সময় তির বেগে উড়ে এল হলুদ পাখির সাথী। ছপাৎ করে নামল– শরীরের আধখানা জলে,
আধখানা নলবনের মধ্যে। বেয়ে উঠল জল থেকে, গা ঝাড়া দিয়ে পালক থেকে জল ফেলে দিল।
“তুমি এসেছ?” জিজ্ঞেস করল হলুদ পাখি।
“হ্যাঁ। আমি বাসা বানানো শেষ করছি। তুমি কিছু খেয়ে বিশ্রাম কর।”
“কোথায় গিয়েছিলে? বাবুইদের মত ওই গ্রামে?”
সাথী মাথা নাড়ল। “না। আমি ঢেঁকচিলদের জিজ্ঞেস করাতে ওরা বলল, এরকমই একটা
জলা নাকি আছে অনেকটা দূরে, সমুদ্রর ঢেউ সেখানে আসে না। ওরা বলল, ওখানে নিরাপদ। আমি
তোমাকে ডাকতে আসছিলাম, কিন্তু তখনই ঝড়টা এল। হাওয়ার তোড়ে আর ফিরতে পারলাম না। নিয়ে
গেল আমাকে গ্রামের অনেক উপর দিয়ে। শেষে, অনেক কষ্টে যখন নিচে নামলাম, দেখি সেই
জলাটাতেই এসে পৌঁছেছি। আমার কপাল ভাল।”
সত্যিই কপাল ভাল। ঝড়ের কবলে পড়া পাখিরা অনেক সময়েই এমন জায়গায় গিয়ে পড়ে,
যেখান থেকে বেঁচে ফেরা অসম্ভব। অনেক সময় ঝড়ের মধ্যেই মরে যায় হাওয়ার ঝাপটায়।
“তিন দিন ওখানে নলবনে লুকিয়ে ছিলাম। ওখানেও আমাদের মত হলুদ পাখি রয়েছে। আর
রয়েছে কালো কাঠ বকপাখি।কিন্তু নিরাপদ নয়। এখানকার মতই। আজ সকালে বেরিয়ে দেখি
চারিদিকে মরা মাছ, আর পাখির ছানা। তখনই বেরিয়ে পথ খুঁজে খুঁজে এলাম এতক্ষণে।”
বাসা বানাতে বানাতে বাবুইরা শুনছিল ওর কথা। বলল, “তাহলে তুমিও আর যাবে না
কোথাও? ঝড় হোক জল হোক এখানেই থাকবে আমাদের মত?”
“সত্যিই অনেক অনেক দূরে না যেতে পারলে কোন লাভ নেই,” বলল হলুদ পাখি। তার পরে, সাথীর
হাতে বাসা বানানো ছেড়ে আস্তে আস্তে বেরিয়ে গেল খাবার খুঁজতে।
সেদিন রাতে, আকাশ ভরা তারার আলোয় হলুদ পাখি ওর বাসায় চারটে ডিম পাড়ল। তার
পরে ঠোঁট দিয়ে ডিমগুলো একসঙ্গে করে তার ওপর বসল তা দিতে। পাশে ওর সাথী জেগে রইল
পাহারায়। ওদিকে বাবুইয়ের বাসায়ও মা বাবুই ডিম পেড়েছে। রাত্রি শান্ত। চারিদিকে এখন
শান্তির স্তব্ধতা।
No comments:
Post a Comment