Wednesday, August 10, 2016

ভালোবাসা

অনিরুদ্ধ দেব

ঘুম ভেঙে বিজয়বাবু খাটের ধারে পা ঝুলিয়ে বসে হাত বাড়িয়ে টেবিল থেকে চশমা নিয়ে চোখে দিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে ঘুমন্ত কস্তুরীর দিকে তাকালেন। তিপ্পান্ন বছরের অভ্যাস। বিয়ের পরদিন ভোরে ঘুম ভেঙে পাশে শুয়ে থাকা ক্লান্ত বাইশ বছরের মেয়েটাকে দেখে ভেবেছিলেন, ‘মানুষ এতো সুন্দর হয়?’ সেই প্রথম। শেষ কবে চিন্তাটা এসেছে তা অবশ্য মনে নেই, -ও মনে নেই কবে থেকে তাঁর কস্তুরীর দিকে তাকানোটা হয়ে গেছিল চুরি করে… সকালে উঠে দেখে নেওয়া কস্তুরীর ঘুম ভেঙেছে কি না। দেরি করে ঘুম থেকে উঠলেই যেন ভালো। কিন্তু যে ভাবেই হোক, তিপ্পান্ন বছরের বিবাহিত জীবনে কোনও দিন তিনি ঘুম থেকে উঠেই কস্তুরীর ঘুমন্ত মুখ দেখেননি, এমনটা মনে করতে পারে না। বাড়িতে থাকার সময়েই অবশ্য, যখন কাজের তাগিদে বিদেশ বিভুঁইয়ে গেছেন, তখন তো আর নয়। আজ কস্তুরীর বয়স পঁচাত্তর ছুঁই-ছুঁই, আজ এটা শুধুই অভ্যাস।
বিছানা থেকে উঠলেন। চায়ের জল চড়ালেন – আর একটা অভ্যাস। বারান্দায় গিয়ে দেখলেন কাগজ আসেনি এখনও। আগে বোধহয় আরও বেশি ঘুমোতেন, কাগজ আসার শব্দে ঘুম ভাঙত। আজকাল ঘুম কমে গেছে। সেবার তো ছোটো ছেলের বাড়িতে গিয়ে ঘুমই হতো না। প্রায়ই মাঝরাতে উঠে টিভি খুলে বসতেন। বসে বসে ঢুলতে শুরু করতেন, আবার গিয়ে বিছানায় শুতেই, ব্যাস, চোখ খোলা। “বয়েস হয়েছে,” বলেছিল কস্তুরী। “এখন নিজের বিছানা, নিজের বালিশ ছাড়া আর ঘুম হবে না।” এক মাসের জন্য গিয়েছিলেন, সাত দিন যেতে না যেতে হাঁসফাঁস অবস্থা। শেষে বউমাকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে, ছেলেকে দিয়ে টিকিট কাটিয়ে কোনও রকমে ঘরের ছেলে ঘরে ফেরা।
চায়ের জল হয়ে গেছে। পটে চা দিয়ে জল ঢেলে ঢাকা দিয়ে শোবার ঘরে ঢুকলেন। “ওঠো,” ডাকলেন কস্তুরীকে। “চা ভিজিয়েছি।”
কস্তুরী পাশ ফিরল। “হুঁ।”
সময়ে কতো কিছু বদলে যায়। প্রথম প্রথম কস্তুরীকে ডাকাটাই ছিল আলাদা রকম। কস্তুরীও ঘুম থেকে উঠে ভীষণ অপ্রস্তুত হয়ে পড়ত। জিজ্ঞেস করত, “আমাকে না ডেকেই চা বানিয়ে ফেললে?” স্বামীকে সকালে প্রথম চা-টা করে না খাওয়ানোটা অক্ষমতার মধ্যে পড়ত। কখন সেটা নিয়ম বলে মেনে নিয়েছে কস্তুরী। প্রথম দিকে বার কয়েক জানতে চেয়েছিল, “সারাদিনে আর পাঁচ কাপ চা যদি আমাকেই বানাতে হবে, তাহলে সকালের চা-টাও কেন আমি করতে পারি না?” উত্তর দেননি বিজয়বাবু। কস্তুরী খুনসুটি করে নালিশ করতে গিয়েছিল বিজয়বাবুর মাকে। “জানেন, মা, একদিনও আমাকে ডাকবে না। রোজ চা ভিজিয়ে তবে আমাকে ঘুম থেকে ওঠাবে।” শাশুড়িও হাসিমুখে উত্তর দিয়েছিলেন, “ভালোই তো। সারাদিন তো আর কোনও কাজে সাহায্য করে না। তা সকালের চা-টা যদি করেই দেয়, খারাপ কী? ওর বাবা তো সারা জীবন সেটাও করেননি, বরং চা পেতে এক মিনিট দেরি হলে চেঁচিয়ে পাড়া মাথায় করেছেন।”
কথাটা শেষ হয়ে গেছে ওখানেই, কস্তুরীর আর জানা হয়নি বিজয়বাবুর সকালের চা বানানোর আসল কারণটা।
কস্তুরীকে ডেকে, দাঁত মেজে, চা ছেঁকে, দুটো কাপ হাতে করে যতক্ষণে বিজয়বাবু রান্নাঘর থেকে বেরিয়েছেন, কস্তুরী ততক্ষণে বারান্দা থেকে খবরের কাগজ কুড়িয়ে নিয়ে বিজয়বাবুর বসার জায়গার সামনে ইংরিজি কাগজটা রেখে নিজে বসেছে বাংলা কাগজ নিয়ে। আগে বিজয়বাবুর যখন দেরি করে ঘুম ভাঙত, তখন উনি কাগজ কুড়িয়ে নিয়ে ঘরে রেখে তবে চা বানাতে যেতেন। এখন হয় ঘুম আগে ভাঙে, নয় কাগজ দেরিতে আসে। যা-ই হোক, কবে জানি কাজটা কস্তুরীর হয়ে গেছে।
টেবিলে ফুলদানির ফুলগুলো কতোদিনের পুরোনো? শুকনো লাগছে যেন?
ফুলগুলো শুকিয়ে যাচ্ছে।” চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বললেন বিজয়বাবু।
আজকালকার সব কিছুর মতোই ফুলের জীবনও বেশিদিন নয়। চট করে ঝরে যায়,” কাগজ থেকে মুখ না তুলেই বলল কস্তুরী।
বিজয়বাবু ভাবলেন এর উত্তরে কিছু বলা উচিত। কিন্তু খানিকটা ভেবে কী বলবেন খুঁজে না পেয়ে আবার মন দিলেন হাতের কাগজে।
খানিকটা সময় নিঃশব্দে কাটল। বিজয়বাবু কাগজ পড়তে পড়তে ভাবলেন কী কথা বলা যায়। শেষ কবে তাঁরা সকালে চা খেতে খেতে কোনও বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন? বিয়ের পর – শীতকাল ছিল – বাংলোর সামনে লনে চা খেতেন দুজনে। উর্দিপরা বেয়ারা দিয়ে যেত। তখন কস্তুরীর হাতে অনন্ত সময়। বিজয়বাবু কাজে যেতেন দশটার কাছাকাছি। তখন কতো কথা হত। বিভিন্ন বিষয়ে কস্তুরীর জ্ঞান আর চিন্তার গভীরতা দেখে বিজয়বাবু অনেক সময় অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকতেন। কস্তুরী জিজ্ঞেস করত, “কী হলো?” কিন্তু বিজয়বাবু বোঝাতে পারতেন না। কস্তুরীর অনুভূতির মাত্রা যে নিজের চেয়ে বেশি, সেটা কবুল করতে কোথায় যেন বাধত। কবে শেষ হয়ে গেল সেই গল্প-গাছা? কলকাতায় ফিরে, না কি তখনই? মনে পড়ে না ভালো। ছেলেমেয়ে হবার পরে তো সকালে কস্তুরীর কোনও দিকে তাকানোর সময়ই থাকত না। বিজয়বাবু কাগজে চোখ বুলিয়ে দৌড়তেন অফিসে, আর কস্তুরী রান্নাঘর সামলাত। কথা আজকালও বলেন না। কাল বলেননি। পরশু? না। তার আগের দিন? বোধহয় না। গত এক মাসে? সম্ভবত আজ বাজার থেকে কী আনতে হবে জাতীয় কথা ছাড়া কিছুই না। কিংবা, ওমুকের চিঠি এসেছে ইমেইলে, কম্পিউটারে খুলে রেখেছি, পড়ে নিও। দুজনে একসঙ্গে বসে চা খেতে খেতে কাগজ পড়ার এই বন্দোবস্তই বা কতো দিন হয়েছে? রিটায়ার্মেন্টের পর। কিন্তু কতো পর? সঙ্গে সঙ্গে না বোধহয়। তখন তো ছোটো ছেলে আর মেয়ে দুজনেই এখানে থাকত। ছেলে যেত অফিসে, আর মেয়ে কলেজে। দুজন বেরোনো পর্যন্ত কস্তুরী বসতে পেত কই? তারপর বিজয়বাবু যেতেন বাজারে। তখনও বাজার করাটা সখের কাজ ছিল। ঘুরে ঘুরে দর-দাম করে কেনাকাটিতে মজা পেতেন।
কে আগে ঘর ছাড়ল? ছেলে চাকরি নিয়ে বম্বে গেল, না কি অদিতির বিয়ে হল? বেশিদিন আগের কথা নয়, কিন্তু কয়েকটা জায়গায় বিজয়বাবুর স্মৃতির ধারগুলো যেন ঝাপসা হয়ে এসেছে। মনে পড়েছে – ছেলে আগে বম্বে গেল। বোনের বিয়েতে ওখান থেকে কেনাকাটাও করেছিল কিছু।
কস্তুরী উঠে এসে কাপটা নিতে গিয়ে থমকে গেল। “এ কী? চা যে শেষ করোনি। ঠাণ্ডা হয়ে গেল। খেয়ে নাও।”
থতমত খেয়ে বিজয়বাবু চায়ে চুমুক দিলেন। এঃ! সত্যিই একেবারে ঠাণ্ডা। এক চুমুকে চা-টা শেষ করে নিয়ে কাগজ হাতে বাথরুম গেলেন। একেবারে দাড়িটা কামিয়ে বেরোনোই ভাল। তারপর বাজারটা ঘুরে আসা যাবে। তৈরি হয়ে বসার ঘরে গিয়ে দেখলেন কস্তুরী ব্রেকফাস্ট শো দেখছে। এখন কিছু জিজ্ঞেস করলে ঠিকঠাক উত্তর পাওয়া যাবে না। সুতরাং চেয়ারে বসে কাগজটা টেনে নিলেন আবার। বিজ্ঞাপন বিরতির সময় জিজ্ঞেস করলেন, “কী আনতে হবে, বাজার থেকে?”
বাজার?” অবাক চোখে তাকাল কস্তুরী। “এই তো পরশু বাজার করে আনলে। আজ আবার বাজার কেন?”
ও। হ্যাঁ,” থতমত খেয়ে চুপ করে গেলেন বিজয়বাবু। কিন্তু কস্তুরী এখনও তাঁর দিকেই তাকিয়ে আছে। একেবারে হাঁ করে।
কী হলো?” বললেন বিজয়বাবু।
তুমি কি আর কোথাও যাচ্ছ?” জানতে চাইলেন কস্তুরী।
আর কোথায় যাব?” ফেরত প্রশ্ন করলেন বিজয়বাবু। “পরশু বাজার গেছিলাম, ভুলে গেছি। বয়স হচ্ছে, সব কথা সব সময় মনে থাকে না।”
ততোক্ষণে বিজ্ঞাপন বিরতি শেষ হয়ে গেছে। কস্তুরীর মাথাটা ঘুরে গেছে টিভির দিকে আবার। “সার্টটা পরেছ, তাই বললাম।”
সার্ট? এ আবার কী কথা? সার্ট তো সারাজীবনই… নিজের বুকের দিকে তাকিয়ে বিজয়বাবুর চিন্তাটা হোঁচট খেয়ে থেমে গেল। মুখ তুলে দেখলেন কস্তুরী আবার তাঁর দিকে তাকিয়ে আছে। মুখে একটা ছোট্ট হাসি। বিরক্ত হয়ে বললেন, “হাসির কী হলো?”
হেসে গড়িয়ে পড়ল প্রায় কস্তুরী। “বা রে! হাসব না? বাজার যাবার নাম করে তুমি তোমার সবচেয়ে দামি সাদা জামাটা পরে আসবে, আর আমি হাসব না?”
গজগজ করতে করতে বিজয়বাবু উঠে গেলেন। জামা খুলে আলমারিতে রাখতে গিয়ে মনে পড়ল, একটা সময় ছিল, যখন কস্তুরীকে ওই রকম হাসতে দেখলে জিজ্ঞেস করতেন, “কী, দুষ্টু হাসি কেন?” এবং তার উত্তরে কস্তুরী ঠিক এইভাবেই হেসে গড়িয়ে পড়ত। তখন কিন্তু বিজয়বাবুর রাগ হত না। অন্য কিছু হত।
ওই বাড়িটা বেশ বড়ো ছিল। কস্তুরীর পছন্দ ছিল না। “বড্ডো অন্ধকার। এতো আলো জ্বলে সারা সন্ধে যে ইলেকট্রিক বিল দেখলে গা করকর করে। অথচ দেখ, কোনও লাভ নেই। বসার ঘরে ঢুকলে মনে হয় কিছুই দেখা যাচ্ছে না।”
অজস্র আয়না কিনে কস্তুরী ঘরে ভর্তি করেছিল। যাতে আলো রিফ্লেক্ট করে। সেই বাড়িতে একদিন কস্তুরী ঠিক এই রকম ডিভানে বসে কী যেন কথায় হেসে গড়িয়ে পড়েছিল আর বিজয়বাবু ছুটে গিয়ে জড়িয়ে ধরেছিলেন। আর ঠিক যখন দুজনের ঠোঁটে ঠোঁটে মিলন, তখন বাইরের দরজা দিয়ে ঢুকেছিলেন ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট। এতোই জরুরি দরকার যে ফোন না করে, বেয়ারাকে কার্ড না দিয়ে সটান ঢুকে পড়েছিলেন। বিজয়বাবু সেই যে ডি.এম-এর সঙ্গে বেরিয়েছিলেন, ফিরেছিলেন তিন দিন পরে। মনেও ছিল না, যে ডি.এম. চুমু খাওয়া দেখে ফেলেছিলেন। কিন্তু কস্তুরীর মনে ছিল। সেদিন বিজয়বাবুকে প্রতিজ্ঞা করতে হয়েছিল যে তিনি আর কখনও এমন জায়গায় কস্তুরীকে আদর করবেন না যেখানে বাইরের লোক দেখে ফেলতে পারে, আর সেই সঙ্গে সেই অসম্পূর্ণ চুমু শেষ করতে হয়েছিল। প্রায় সারা রাত ধরে।
কবে শেষ হয়ে গেল সেই দিনগুলো? শেষ কবে কস্তুরীকে চুমু খেয়েছেন? মনে পড়ে না।
রান্নাঘরে ঢুকে উলটে রাখা বাটিগুলো সোজা করে মিট-সেফ থেকে কর্নফ্লেক্স-এর প্যাকেট বের করতে করতে দরজায় ঘণ্টি বাজল। কস্তুরী উঠে দরজা খুলে দিয়েছে। অদিতি। সঙ্গে সোমক।
কী, দাদুভাই,” হাঁক পাড়লেন বিজয়বাবু। “আজ পড়াশোনা নেই?”
নেই,” চেঁচিয়ে উত্তর দিয়ে নাতি একছুটে চলে গেল ভেতরে। সেখানে দাদুর কম্পিউটার, তাতে নাতির পছন্দসই খেলা লোড করা আছে।”
চা খাবি?” মেয়েকে জিজ্ঞেস করল কস্তুরী।
নাঃ,” সোফায় বসে বলল অদিতি। “খেয়ে এসেছি। আমার কোনও দিন তোমাদের মতো চায়ের নেশা ছিল না।”
সে তো তোর বরের জন্য,” অভিযোগের সুরে বলল কস্তুরী। “পড়তি তোর বাপের মতো লোকের পাল্লায়, তখন দেখতাম। তাও তো আজকাল একটু কমেছে। রাইটার্সে অফিস করতেন যখন...”
হিরু আসেনি?” মায়ের কথা কেটে জানতে চাইল অদিতি। রান্নাঘরে একটু হাসলেন বিজয়বাবু। ছ-সাত বছর বয়স থেকেই অদিতির এই দোষ। কথা শোনাতে হলে বারবার বলতে হত, চুপ করে আমার কথাটা শোন, নিজের কথা পরে বলবি। তাও সবসময় পারা যেতো না।”
ও কি এতো সকাল সকাল ঘুম থেকে ওঠে?”
তাহলে আমাকে এতো সকালে ঘর থেকে টেনে এখানে আনা কেন বাপু?” বিরক্ত স্বরে বলল অদিতি।
অদিতিকে নিয়ে খাবার টেবিলে এসো,” দুজনের কর্নফ্লেক্স-এর বাটি নিয়ে টেবিলে রেখে হাঁক দিলেন বিজয়বাবু। কস্তুরী উঠে এল। অদিতিও পেছনে। কস্তুরী গিয়ে ফ্রিজ থেকে দুধের ডেকচি বের করে দুজনের বাটিতে দুধ ঢালল।
তোরা দু ভাইবোন হঠাৎ একসঙ্গে ভোরবেলা এখানে হাজির হবার প্ল্যান করেছিস যে?” জিজ্ঞেস করলেন বিজয়বাবু। “ধান্দাটা কী?”
মা, শুনলে?” চোখ মটকে অদিতি জিজ্ঞেস করল মা-কে। “বাবা-মায়ের সঙ্গে ছেলেমেয়ের দেখা করতে আসার মধ্যেও বাবা ধান্দা দেখতে পায়।”
বিজয় হেসে বললেন, “তা কী আর করা, বল, তোর বাবা হয়েছি আজ থেকে আটত্রিশ বছর আগে। আর হিরুকে চিনি চুয়াল্লিশ বছর ধরে। অর্থাৎ তোদের সারা জীবন। তোরা দুজনে একসঙ্গে ছুটির দিনে এতো সকালে কবে বুড়ো বাবা-মাকে শুধু সঙ্গ দেবার জন্য এসেছিস শুনি?”
বাজে কথা বোলো না। তোমাদের এমন কিছু বয়েস হয়নি যে বুড়ো মনে করতে হবে,” ধমকের সুরে কথাটা বলে ঘাড় ঘুরিয়ে অদিতি ছেলেকে উদ্দেশ্য করে বলল, “সোমু, একবার বড়োমামার মোবাইলে ফোন করে দেখ তো, কতো দূর, অ্যাট অল বাড়ি থেকে বেরিয়েছে কি না...”
ইয়েস মাম্মি,” ছেলের গলা ভেসে এল পাশের ঘর থেকে।
সাময়িক নৈঃশব্দের মধ্যে বিজয়বাবু একবার ভাবলেন জানতে চান মেয়ে কেন ভেঙে বলছে না কেন দু ভাইবোন একসঙ্গে সকালে আসা প্ল্যান করেছে। পাশের ঘর থেকে পিক-পিক শব্দ আসছে – সোমক ফোন করছে। একটু পরে মাকে ডেকে বলল, “মাম্মি, বিজি বলছে।” বলতে না বলতেই ফোনটা বেজে উঠল। সোমক কর্ডলেসটা নিয়ে ছুটে এল। “মাম্মি, মামা।”
একতরফা কথাগুলো বিজয়বাবুর অদ্ভুত লাগল।
হ্যালো,… , তুই!”
না--, এখনও আসেইনি তো...”
জানিসই তো, ওই রকম।”
হ্যাঁ, হ্যাঁ, আচ্ছা। আমি ফোন করব। ও---কে।”
ফোন কাটার পর কস্তুরী জিজ্ঞেস করল, “কোথায় হিরু? বাড়ি থেকে বেরিয়েছে?”
হিরু না, তীর্থ,” বলল অদিতি।
তীর্থ? বম্বে থেকে ছোটো ছেলে? তাঁর বাড়িতে ফোন করে মেয়ের সঙ্গে কথা বলেই লাইন কেটে দিল? আর সে কথা নিশ্চয়ই বড়ো ছেলে হিরণ্ময়ের সাক্ষাতেই হবার কথা ছিল? সে আসেনি বলেই অদিতি বলল, পরে ফোন করবে। তিন ছেলেমেয়ে তাঁর বাড়িতে বসে কনফারেন্স করবে, আর তিনি জানেনই না? এ নিশ্চয়ই আগামিকালের ঘটনার জন্য না – কারণ সে বিষয়ে সব ডিসিশন তো নেওয়াই হয়ে আছে।
বিজয়বাবু চোয়াল শক্ত করে টেবিল থেকে উঠে গেলেন। খানিকটা সময় তিনি নাতির সঙ্গে কাটাবেন। একবার ভাবলেন সোমুকেই জিজ্ঞেস করবেন ব্যাপারটা কী, কিন্তু পরে মনে করলেন, উচিত হবে না। এর মধ্যে যদি পারিবারিক পলিটিক্স কিছু থাকে, তাহলে সোমু সেটা এই বয়সেও জানতেই পারে, কিন্তু উনি বুড়োমানুষ। এই ফাঁদে পা দেবেন না।
গলায় জোর করে একটু উচ্ছ্বাস এনে বললেন, “দাদুভাই, কী খেলছ?”
রোড র‍্যাশ,” কম্পিউটার থেকে চোখ না তুলেই বলল সোমক। বিজয়বাবু বুঝলেন এখানে আড্ডা মারার সুবিধে হবে না। সম্পূর্ণ কনসেন্ট্রেশন এখন কম্পিউটারে।
ঘরের অন্য প্রান্তে গিয়ে এ সপ্তাহের পত্রিকাটা হাতে নিয়ে বুঝলেন মন বসবে না। ছেলেমেয়ে কী উদ্দেশ্যে সাত সকালে বাড়ি বয়ে হাজির হয়েছে সেটা না জানা অবধি নিশ্চিন্ত বোধ করবে না।
রিডিং টেবিলে বসে বাইরে তাকিয়ে দেখলেন সামনের রাস্তা দিয়ে বড়ো ছেলের গাড়ি আসছে। একবার ভাবলেন, উঠবেন না। সে তো আর তাঁর সঙ্গে দেখা করতে আসছে না। আসছে বোনের সঙ্গে কথা বলতে। তারপর ভাবলেন, এটা উচিত হবে না। ছেলেমানুষির বয়স পেরিয়ে গেছে।
ঘর থেকে বেরিয়ে দরজা খুলতে যাচ্ছেন, মেয়ে চেঁচিয়ে উঠল, “বাবা, তুমি কিন্তু এখন বেরোবে না। হিরু আসবে এক্ষুনি।”
বিরক্ত গলায় বিজয়বাবু বললেন, “জানি। ওরই জন্য দরজা খুলতে যাচ্ছি।”
দরজা খুলতে না খুলতেই হিরু হাজির।
কী? বেরোচ্ছ?”
নাঃ,” বললেন বিজয়বাবু। “তোর গাড়ি দেখলাম।” আর কথা না বাড়িয়ে ঢুকে গেলেন ভেতরে।
হিরু ঢুকল বিজয়ের পেছন পেছন। বসার ঘরে উঁকি দিয়ে কেউ নেই দেখে ঢুকল খাবার ঘরে।
, তোমরা সব এই ঘরে?” বলে চেয়ার টেনে বসল।
চা খাবি?” জিজ্ঞেস করলেন বিজয়বাবু।
খাব। অ্যাই, অদিতি, বানা না তুই।”
কেন? আমি কেন?” ঝাঁঝিয়ে উঠল অদিতি। “নিজে বানিয়ে নে।”
ব্যাজার মুখে হিরু বলল, “আঃ, এই তোদের নিয়ে মুশকিল। আজকালকার মেয়েরা কোনও কাজই করতে চায় না। সবই আমাদের দিয়ে করাতে চায়।”
ভীষণ রেগে অদিতি বলল, “আর আজকালকার মেয়েরা যে তোদের সংসারের আয় বাড়ানোর জন্য তোদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করছে, তার বেলা তো গায়ে লাগে না।”
সে যে করছে তার বলা সাজে। তুই তো হেঁসেল ঠেলিস। তোর গায়ে লাগে কেন?”
ঝগড়া বাড়ার আগে চেয়ার ছেড়ে উঠে কস্তুরী বলল, “থাক, থাক, আমিই চা করছি। অদিতি, তুইও খাবি তো? সোমুকে একটু পেস্ট্রি দিই।”
অদিতি গজগজ করতে করতে বলল, “তোমাদের আদর পেয়ে পেয়েই ছেলেদুটো গোল্লায় গেছে। এক গেলাস জল পর্যন্ত গড়িয়ে খেতে জানে না। পড়তো আমার পাল্লায়...”
বিজয়বাবু ছেলেমেয়ের দিকে তাকিয়ে ভাবছিলেন, ওরা সারাজীবন ঠিক এইভাবে ঝগড়া করে কাটালো। প্রথমে আমার খেলনা নিয়ে নিয়েছে, তারপর পেনসিল, রবার, খাতাপত্র, তারপর এর বয়ফ্রেন্ড ওর পছন্দ নয়, তো ওর গার্লফ্রেন্ডকে এ দেখতে পারে না। আজও সেই একই ঝগড়া চলছে।
কেন এরা দুজন এখানে হাজির তা এখনও জানা যায়নি। কৌতুহলে পেট ফেটে যাবার জোগাড় হলেও বিজয়বাবু সারা জীবন বহু মানুষ চরিয়ে বুঝেছেন জোর করে কারও পেট থেকে কথা বের করার চেষ্টা করলে সম্পূর্ণ কথা বেরোয় না। সতুরাং অপেক্ষা করাই শ্রেয়।
কস্তুরী চা নিয়ে আসা অবধি দু ভাইবোন খিটিরমিটির ঝগড়া করল। চায়ের কাপ হাতে নিয়ে কস্তুরী বসার পর বিজয়বাবু লক্ষ করলেন অদিতি হিরুকে চোখের ইশারা করল।
চায়ে চুমুক দিয়ে হিরু বলল, “কাল আমি মাকে আটটার সময় তুলব। তোমরা রেডি থেকো।”
কস্তুরী বলল, সে তো জানি।”
বিজয়বাবু কিছু বললেন না। এটা ভণিতা।
আর আমি ওখানে সোজা চলে যাব,” বলল অদিতি। “বিপ্লবও আসবে। কিন্তু ওর একটু দেরি হবে। ওর অফিসে একটা মিটিং পড়েছে। যদিও ছুটি নেওয়া আছে, কিন্তু ওই মিটিংটা অ্যাটেন্ড করতেই হবে। তবে অপারেশন শেষ হতে হতে এসে যাবে বলেছে।”
কস্তুরী চায়ের কাপটা নামিয়ে রেখে বলল, “আমার কিন্তু এখনও মনে হচ্ছে অপারেশনটা না করলেও হত। এতদিনের অসুখ, আর কদিনই বা আয়ু, এর মধ্যে আবার এত খরচা করে...”
অদিতি রেগে বলল, “এতদিন পুষে রেখেছ বলেই তো অপারেশনটা এখন করাতেই হবে। আর তোমার এখনও আরও অনেক বছর আয়ু। অসুস্থ হয়ে বেঁচে থাকার তো কোনও মানেই হয় না।”
আশ্বস্ত করার সুরে হিরু বলল, “মা, তোমাকে কতোবার বলব, পাইলসের অপারেশন কোনও বড়ো ব্যাপার না। এসব আজকাল জলভাত।”
অদিতি বিজয়বাবুর দিকে ঘুরে বলল, “তুমি কি অপারেশন শেষ হওয়া পর্যন্ত ওখানে থাকবে? না কি আমার সঙ্গে ফিরে, আবার পরে আসবে? আমার তো সোমুকে স্কুলে পাঠানোর জন্য ফিরতেই হবে। তুমি আমার সঙ্গে বাড়ি এসে, দুপুরের খাবার খেয়ে, একটু বিশ্রাম করে তারপর বিকেলে আবার ভিজিটিং আওয়ার্সে আসবে।”
নাঃ,” মাথা নেড়ে বললেন বিজয়বাবু, “আমি ওখানেই থাকব। দুপুরের খাবারও ওখানেই খাব ঠিক করেছি।”
সে কী?” আশ্চর্য হয়ে বলল কস্তুরী, “তুমি খাবে হসপিটাল ক্যানটিনের খাবার? তবেই হয়েছে।”
কেন? হবার কী আছে? পাঁচটা লোক খাচ্ছে না? আমিও পারব।”
সে পাঁচটা লোক অনেক কিছুই করছে যা করার অভ্যাস বা বয়েস কোনওটাই তোমার বাকি নেই,” ঝাঁঝিয়ে বলল অদিতি। “না, না। ওসব হবে না। তোমাকে আমার বাড়ি এসে খতে হবে, ব্যাস।”
চিরকালের ব্যাস। এরপর অদিতির সঙ্গে আর কথাই বলা যায় না। কিন্তু বিজয়বাবু আবার আপত্তি করতে যাবেন, এমন সময় মুখ খুলল হিরু।
বাবা, একটু ভেবে দেখ। অপারেশন শুরু নটায়। মাকে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যাবে সাড়ে নটায়, বা তারও আগে। বেরোতে বেরোতে অন্ততঃ দুঘণ্টা। তখন আমাদের সঙ্গে দেখা করতে দেবে না। তারপর জ্ঞান আসবে, মার ঘুম ভাঙবে, এসব হতে হতে আরও কয়েক ঘণ্টা। ততক্ষণ তুমি ওখানে বসে কী করবে? আমি আর বিপ্লব তো থাকব। না হোক, কোনও দৌড়োদৌড়ি করার থাকলে আমরা করব। সে তুমি তো এমনিও পারবে না, ওমনিও না...”
কস্তুরী হঠাৎ বলল, “আমার কিন্তু মনে হয় জেনারেল অ্যানাস্থেশিয়া না দিয়ে লোক্যাল দিয়ে করলেই হতো।”
তুমি যে কী বলো না, মা,” ছেলে-ভোলানো সুরে বলল হিরু। “ডাক্তারের কথার ওপর কথা বলতে আছে? ওনারা ভেবেচিন্তে যা ঠিক করেছেন, আমাদের সেই ডিসিশনের ওপর কথা বলা উচিত না।”
আমার কিন্তু হাসপাতাল ছেড়ে নড়বার ইচ্ছে নেই,” বললেন বিজয়বাবু, যদিও তিনি বুঝছিলেন যে ছেলের যুক্তির সামনে নিজের যুক্তি দাঁড় করাতে পারবেন না।
তারপর যদি হাসপাতালের খাবার খেয়ে পেট-টেট খারাপ করে?” চায়ের কাপ শেষ করে নামিয়ে রাখল হিরু। “তাহলে মারাত্মক অবস্থা হবে। এদিকে মা ভর্তি, ওদিকে তোমার শরীর খারাপ… তারপর মা যখন ফিরবে, তখন কে কাকে দেখাশোনা করবে? তুমি মাকে, না মা তোমাকে?”
বিজয়বাবুকে চুপ দেখে অদিতি বুঝল বাবা বাগে এসেছে। বলল, “বেশ তাহলে ওই কথাই রইল।” বলে চট করে ব্যাগ খুলে কী দেখতে দেখতে বলল, “আর তাছাড়া এই কদিন তুমি আমাদের বাড়িতে থাকবে।”
কীঃ?” ভীষণ জোর গলায় বললেন বিজয়বাবু।
না, না, তুমি রাগ কোরো না,” গলা নরম করে বলল অদিতি। “শোনো। আমাদের ওখান থেকে নার্সিং হোম কাছে। তাছাড়া তোমার এ কদিন খাওয়া-দাওয়া...” বলতে বলতে দম দেওয়া গ্রামোফোনের মতো মিইয়ে গেল অদিতি।
বিজয়বাবু আড়চোখে বড়ো ছেলের দিকে তাকালেন। হিরু টেবিলের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে। বাবার মুড ও বোঝে সবচেয়ে বেশি। ও বুঝেছে এই ব্যাপারটায় বাবার সঙ্গে সুবিধা করতে পারবে না।
রান্নাবান্না নিয়ে তোকে ভাবতে হবে না। সরলা করতে পারে। এ ক’দিন করে দেবেও বলেছে।”
সরলার রান্না তোমার মুখে রুচবে?” অদিতি ছাড়ার পাত্রী নয়।
কেন রুচবে না? ও কি আগে আমাদের বাড়িতে রান্না করেনি? তখন তো খেয়েছি ওর রান্না।”
ওকে তো তুমিই ছাড়িয়ে দিয়েছিলে – রান্না মুখে দেওয়া যায় না বলে।”
সে তিন মাস খেয়ে। এখানে বিষয়টা মাত্র তিন দিনের… খুব বেশি হলে তিন দিনের।”
মা-ও বলছিলেন, বাবাকে বোলো, এই কটা দিন আর কষ্ট করে হাত না পুড়িয়ে...”
মা? অবাক চোখে কস্তুরীর দিকে তাকালেন বিজয়। এই জন্যই কি কস্তুরী কোনও কথা বলছে না? কিন্তু ওর সঙ্গে আলোচনা করেই তো এই সব ব্যবস্থা। সরলাকে তো কস্তুরীই বলেছিল, ‘আমি না থাকতে মেসোমশাইয়ের জন্য রান্না করে দিতে পারবি?’
আঃ, মা মানে আমার শাশুড়ি মা।”
শুনেই বিজয়বাবুর মেরুদণ্ডটা সোজা হয়ে গেল। কোনও বেয়াইবাড়িতে গিয়েই তিনি জীবনে রাত কাটাননি। তার ওপর এই ভদ্রমহিলার জিভের ধার তিনি কোনও দিনই পছন্দ করেন না। সুতরাং সে বাড়িতে গিয়ে থাকার প্রশ্নই উঠছে না। এমনকি কাল গিয়ে দুপুরের ভাতও খাবেন না।
উঁহু,” মাথা নাড়লেন বিজয়বাবু। “এই দুতিন দিন আমার একা থাকতে মোটেই অসুবিধা হবে না। বরং এখানে না থাকলেই অনেক অসুবিধে।”
কী অসুবিধে?” প্রায় চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ল অদিতি।
প্রথমতঃ কাজের লোককে বলা হয়ে গেছে...”
ওটা কোনও প্রব্লেম না। কাল সকালে যখন আসবে, বলে দিও।”
দুধ আসবে, কাগজ আসবে, এসব কি দুম করে বন্ধ করা যায়?”
খুব যায়, বাবা, আজকাল তোমার বাড়িতে মাদার ডেয়ারির দুধ আসে। এক্ষুনি বলে দিলে এক্ষুনি বন্ধ। তুমি একবার এতো কম নোটিসে আমাদের নিয়ে মালদা গেছিলে যে সরকারি দুধ বন্ধই করা হয়নি – তোমার নিশ্চয়ই মনে আছে।”
আছে। কিন্তু এই সব আজেবাজে কথা বলার উদ্দেশ্য হলো মেয়ের তর্ক করার দমটা একটু কমানো। এই পলিসিতে উনি তিরিশ বছর বাংলা তথা ভারতের সব পার্টির পলিটিশিয়ান চরিয়ে এসেছেন, আজ মেয়ের সঙ্গে অন্যথা করবেন কেন?
আর সবচেয়ে বড়ো কথা, তিন দিন ঘর বন্ধ থাকলে তোর মা যখন ফিরবে তখন সারা বাড়ি ধুলোময় হয়ে থাকবে। সেই ধুলো অস্বাস্থ্যকর তো বটেই, তার ওপর সেই দৃশ্য দেখলে তোদের মা আর থাকতে পারবে না। লাফ মেরে উঠে ঘরবাড়ি পরিষ্কার করতে লেগে যাবে।”
কস্তুরী মুচকি হাসল। বেয়ান সম্বন্ধে বিজয়বাবুর গোপন মতামত তার অজানা নয়। তাই সবার সামনে আর বলল না, যে অসুস্থ শরীরে বাড়ির ধুলো পরিষ্কার করার মতো শুচিবায়ু তার কখনোই ছিল না।
হিরু এতোক্ষণ চশমা খুলে চোখ মুছছিল। এবার আবার চশমা চোখে লাগিয়ে বলল, “রাতবিরেতে তোমার শরীর-টরির খারাপ হলে কী করবে?”
এই শরীর-টরির খারাপের কথা শুনলে বিজয়বাবুর মাথা গরম হয়ে যায়। কথা নেই বার্তা নেই শরীর খারাপ হবে কেন রে বাপু? নিজে তো বউ ছেড়ে দু বছর দিব্যি একা আছিস। তোর রাতবিরেতে শরীর খারাপ লাগলে কী করিস?
এ কথা অবশ্য ছেলেকে বলা যায় না, তাই শুধু বললেন, “শরীর খারাপ হলে আমার মোবাইলে পাড়ার ক্লাবের অ্যাম্বুলেন্সের নম্বর আছে। ফোন করব।”
আর যদি এতোই শরীর খারাপ হয়, যে ফোন-ই করতে পারছ না, তখন?”
বিরক্ত স্বরে বিজয়বাবু বললেন, “বাজে কথা বলিস না। অত শরীর খারাপ হলে কিছু করেই লাভ এই। তাহলে এখনই আই.সি.ইউ-তে গিয়ে বাসা বাঁধতে হয়। আমার গত পাঁচ-ছ বছরের মধ্যে কোনও বিশেষ অসুবিধে হয়নি, ব্লাড প্রেশার টেশার সব নর্মাল। হঠাৎ শরীর খারাপ হতে পারে বলে আমাকে নিয়ে টানাটানি করার কোনও মানে হয় না। আমি এখানেই থাকব – ব্যাস।”
অদিতির স্টাইলে ব্যাস বলে আলোচনা থামিয়ে দেবার উদ্দেশ্যে উঠতে যাবেন, বাইরের দরজার কাছ থেকে জামাইয়ের বাজখাঁই গলে ভেসে এল –
এ কী? দরজা হাট করে খোলা কেন?”
বিজয়বাবুর খেয়াল হল হিরুকে দরজা খুলে দিয়ে ভেতরে ঢুকে এসেছেন, দরজা বন্ধ করেননি। যদিও তিনি জানেন দরজা বন্ধ করা হিরুর ধাতে নেই। ছোটোবেলা থেকেই হিরু দরজা খোলা রেখে ইস্কুল যেত, খেলতে যেত, বা ফিরে বাড়ি ঢুকলেও হয় মনে করাতে হত, নয়তো অন্য কাউকে গিয়ে দরজা বন্ধ করতে হত। হিরুর খুলে রাখা দরজা দিয়ে একবার বাড়িতে একটা গরু ঢুকেছিল, তখন বিজয়বাবু কোথায় যেন পোস্টেড…
তুমি দরজা খুলে রেখে এসেছিলে” কস্তুরীর ঠোঁটের কোনে সকালের সেই দুষ্টু হাসি।
না, হিরু পেছন পেছন ঢুকল...” বলতে গিয়ে বিজয়বাবু বুঝলেন এই অজুহাত দিয়ে সুবিধে করতে পারবেন না।
জামাইকে দেখে মেয়ে হাতে চাঁদ পাবার মতো করে বলল, “অ্যাই, দেখ না, বাবা কিছুতেই আমাদের বাড়ি গিয়ে থাকতে রাজি হচ্ছে না। তুমি বল, তুমি বললে না করতে পারবে না। পেয়ারের জামাই তো।”
কেন থাকবেন না, বাবা? আপনার কোনও অসুবিধে হবে না। সোমুর ঘরটায় আপনি থাকবেন। ঘরটা নিরিবিলি, আমরা আমদের টিভিটা ওখানে দিয়ে দেব। আপনার বিবিসি দেখায় কোনো অসুবিধে হবে না...”
এবাড়িতে থাকলেও আমার বিবিসি দেখার কোনও অসুবিধে হবে না,” ঠাণ্ডা গলায় বললেন বিজয়বাবু। “তোমরা কি এই জন্যই সদলবলে আজ এখানে হাজির? যাতে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে বা জোর করে আমাকে তোমাদের ওখানে নিয়ে গিয়ে রাখতে পার? তুমি জানতে এই সব?” শেষ প্রশ্নটা কস্তুরীকে উদ্দেশ্য করে।
পুরোটা জানতাম বলা উচিত নয়, কিন্তু তোমাকে নিয়ে একটা আলোচনা আজ হবে সেটা আমার জানা ছিল। আমার মনে হয়েছিল আলোচনাটা ওরা তোমার সঙ্গেই করুক।”
আমাকে জানালে আমি আগেই বারণ করতাম।”
ঠিক বলেছ। আর সেটা আমাকে দিয়েই বলাতে। সেই জন্যই আমি জানাইনি। ওদের বলেছি, তোমরা যা ভাবছ সেটা তোমরা নিজেরাই বাবার সঙ্গে আলোচনা করে নাও।”
বেশ। আলোচনা শেষ। আমি এখানেই থাকছি। ইন ফ্যাক্ট, কালও অপারেশন থিয়েটারে তুমি ঢুকে যাবার পর আমি বাড়ি ফিরে আসব, খেয়ে দেয়ে ঘুমিয়ে বিকেলে ভিজিটিং আওয়ার্সে যাব।”
ফল হল আশানুরূপ, তিন ছেলে-মেয়ে-জামাই এক লাফে উঠে বলল, “না না, তা কী করে হবে, গাড়ি, ড্রাইভার, সময়, এত দূর…” ইত্যাদি।
খানিকটা তাদের চেঁচামেচি শুনে বিজয়বাবু বললেন, “বেশ তাহলে কাল না হয় আমি তোদের বাড়ি গিয়ে খাব, কিন্তু ওখানে থাকা টাকা হবে না। আপাততঃ বিপ্লবকে চা-টা দেবে তো? না কি আমরা চা খাব আর ও বসে বসে দেখবে?” নেগোশিয়েশন, কম্প্রোমাইজ এবং ডাইভার্শনারি ট্যাকটিক্স – পরপর।
কস্তুরী একবার বিজয়বাবুর চায়ের কাপের দিকে তাকিয়ে বলল, “চা আমরা আর খাচ্ছি না। শেষ হয়ে গেছে। তুমিও চা খাচ্ছ না, কিন্তু শেষ হয়নি। আবার প্রায় গোটা কাপ চা নষ্ট করলে।” বিজয়বাবু চমকে উঠে চায়ের পেয়ালায় চুমুক দিতে যাচ্ছিলেন, কস্তুরী বলল, “থাক, থাক। দুবার করে বরফ-জল-চা গিলতে হবে না।” বলে কাপ নিয়ে রান্নাঘরে চলে গেল।
বিজয়বাবুও উঠে রান্নাঘরে গেলেন। কস্তুরী না থাকতে টেবিলে ছেলেমেয়ের সামনে বসে থাকাটা সমীচীন মনে করলেন না।
ওরা কি দুপুরে খাবে নাকি?” ফিসফিস করে জানতে চাইলেন কস্তুরীর কাছে।
ফিসফিস করেই উত্তর দিলেন কস্তুরী, “না। বলল চলে যাবে।”
খাবার ঘর থেকে নিচু গলায় আলোচনা ভেসে আসছে। অদিতি বোধহয় ফোনে কথা বলছে।
রান্নাঘরে কস্তুরী চা করছে, সেখানে বিজয়বাবুর কোনও কাজ নেই। সুতরাং হাঁ করে দাঁড়িয়ে থাকা যায় না। খাবার ঘরে সদলবলে ছেলেমেয়েরা তাঁকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিয়ে উদ্বাস্তু করার ধান্দা করছে, একা একা সেখানে যাওয়ার সাহসও পাচ্ছেন না, তাই ভাবলেন একটু বাথরুমে গিয়ে বসে থাকা যায়? কস্তুরির চা বানানো শেষ হওয়া অবধি।
খাবার ঘরের পাশ দিয়ে যাচ্ছেন, অদিতি টেলিফোনে বলল, “এই যে, বাবা এসে গেছে। তুই-ই কথা বল। এই নাও, বাবা।”
কে?” ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলেন বিজয়বাবু।
তীর্থ। বম্বে থেকে।”
আমার সঙ্গে কী কথা ওর? একা না-থাকার কথা? তাহলে তুই-ই বলে দে। আমার সঙ্গে কথা বলার দরকার নেই।”
আঃ, নাও তো, এস.টি.ডি-তে ফোন করছে, আর তুমি বাজে বকছ,” বলে অদিতি বিজয়বাবুর হাতে টেলিফোন গুঁজে দিল।
সেই একই কথা। একা রান্না, একা কাপড় কাচা, একা রাতে যদি শরীর খারাপ করে, তার সঙ্গে জুড়ে গেল – “আমি আর পম্পা এতোদূরে বসে তোমাদের জন্য সারাক্ষণ দুশ্চিন্তা করি। এই সময়ে যদি কিছু হয়ে যায়, তাহলে আমরা নিজেদের ক্ষমা করতে পারব না।”
বিজয়বাবুর মাথায় দপ্‌ করে আগুন জ্বলে গেল। তবু গলাটা যতোটা পারেন ঠাণ্ডা রেখে বললেন, “বৌমা কি আজকাল কোনও কাজ করছে? না কি এখনও বাড়িতে?”
থতমত খেয়ে তীর্থ বলল, “না, এখনও তেমন কিছু… কিন্তু এই কথা এখন হঠাৎ?”
বিজয়বাবু ঠিক তেমনি গলায় বললেন, “অ্যাদ্দিন বাড়িতে বসে বসে যদি গ্র্যাজুয়েশনের সাইকোলজি ভুলে গিয়ে না থাকে, তাহলে ওকে বলিস আমি বলেছি তোরা আমার সঙ্গে যেটা করতে চেষ্টা করছিস, তাকে ‘ইমোশনাল ব্ল্যাকমেল’ বলে। ও যেন তার ডিটেল তোকে বুঝিয়ে দেয়। আর যদি আমার জন্য দুশ্চিন্তায় তোদের রাতের ঘুম না-ই হয়, তাহলে তো জানাই রইল, রাত-বিরেতে কোনও অসুবিধে হলে তোদেরই আগে ফোন করব।”
বলে তীর্থ উত্তর দেবার আগেই লাইন কেটে দিলেন। যত্তোসব।
মেয়ের হাতে টেলিফোন দিয়ে বিজয়বাবু নিজের ঘরে ঢুকলেন মাথা ঠাণ্ডা করার জন্য। ছেলেমেয়েরা বড়ো হয়ে গেলে বাবা-মায়ের ওপর খবরদারি করে। এই জন্যই বৃদ্ধাশ্রমে গিয়ে থাকতে চেয়েছিলেন।
ঢুকে দেখলেন সোমু তাকিয়ে আছে।
তুমি আমাদের বাড়ি আসবে না, দাদু?”
বিজয়বাবু বুঝলেন না কী বলবেন। শেষে বললেন, “আমি তোমাদের বাড়ি গেলে তোমার আনন্দ হবে, না দুঃখ?”
বা রে, দাদু এলে কারও দুঃখ হয় নাকি?”
কিন্তু শুনলে তো, বাবা কী বললেন, সোমুর ঘরটা দাদুর ঘর হবে। তাহলে?”
ওটাই একটা প্রব্লেম,” চিন্তিত মুখে বলল সোমু।
তাইতো আমিও বলছি, নিজের বিছানা ছাড়া তোমার অসুবিধে হবে।”
না--, আমি তো এখনও মার সঙ্গে শুতেই ভালোবাসি। কিন্তু মা নেয় না। বলে বড়ো হয়ে গেছি। কিন্তু বাবা বলেছে কম্পিউটারটা আমার ঘরেই থাকবে, অতো টানাটানি করতে হবে না। আচ্ছা দাদু, আমি যদি তোমাকে ডিস্টার্ব না করে কম্পিউটার চালাই, তাহলে তুমি আপত্তি করবে?”
না রে, আমি যাব না। তুমি নিশ্চিন্তে কম্পিউটার চালাতে পার।”
যাবে না? আমি কম্পিউটার না হয় চালাব না, তিন দিন। তাহলে?”
হেসে ফেললেন বিজয়বাবু। “না সে জন্য নয়। আমি এখন বুড়ো হয়েছি, দাদু। আমি এখন নিজের বাড়ি ছাড়া অন্য কোথাও গিয়ে রাতে ঘুমোতেই পারি না।”
সে কী? তাহলে তুমি আর কোত্থাও বেড়াতে যেতে পারবে না? হোটেলের বিছানায় তুমি ঘুমোতে পারবে না?”
না বোধহয়। আমি তো কতো বছর হয়ে গেল কোথাও বেড়াতে যাইনি, তাই ঠিক জানি না।”
সোমু ভেবেচিন্তে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, এমন সময় কস্তুরী ডাকল, “চা এনেছি, এসো।”
ছেলে-মেয়ে-জামাইয়ের মুখে চিন্তার রেখা। বিজয়বাবু ভাবলেন এটাসেটা কথা বলে আবহাওয়াটা হালকা করবেন, কিন্তু কী বলবেন, ভেবে পেলেন না।
অস্বস্তিকর নৈঃশব্দটা কাটিয়ে কস্তুরী বলল, “তোরা আজ এখানে খেয়েই যা। এখনও বেলা হয়নি, রান্না কিছু একটা চাপিয়ে দিতে আমার দেরি হবে না।”
না, না,” হাত নেড়ে বলল হিরু। “আমার বন্ধুর বাড়িতে লাঞ্চের নেমন্তন্ন আছে।”
আমরাও সোমুকে বলেছি মেনল্যান্ড চায়না-য় খাওয়াতে নিয়ে যাব। দিদার হাতের রান্না যতোই ভালো হোক, চাইনিজ ফেলে খাবে না।”
কিন্তু আপনি আমাদের বাড়ি গিয়ে থাকলে ভালো হত,” কথা বেশি ঘুরে যাবার আগে বিপ্লব আবার বিষয়ে ফিরে এল।
প্রয়োজন থাকলে কিছু বলার ছিল না। কিন্তু আমি জরুরি বুঝছি না।”
মা,” অদিতি মাকে সালিশি মানল। “বাবা বিয়ের পর কখনও তোমাকে ছেড়ে থেকেছে?”
বা রে, সারাক্ষনই তো ডিস্ট্রিক্টে ঘুরে বেড়াত। রাইটার্সে পোস্টিং তো চাকরির অন্তত পনেরো বছর পরে।”
পঁচিশ বছরের ওপর একটানা রাইটার্সে পোস্টিং – সেই সময়টা তোমার সঙ্গে থাকা। আর তারপর রিটায়ারমেন্টের পর এতোগুলো বছর। অভ্যেস আর নেই। তোমার মনে হয়, বাবা তোমাকে ছাড়া ম্যানেজ করতে পারবে?”
মেয়ের প্রশ্ন শুনে একটু হেসে কস্তুরী বলল, “কাল অবধি তো মনে হয়েছিল পারবে। আজ অবশ্য অতোটা শিওর হতে পারছি না।”
ভীষণ ভুরু কুঁচকে বিজয়বাবু বললেন, “কেন? আজ কী করেছি আমি?”
সকাল থেকে দু-কাপ চা জুড়িয়ে জল করলে। প্রয়োজন ছাড়াই বাজার দৌড়চ্ছিলে সিল্কের সাদা জামা গায়ে চড়িয়ে। হিরু ঢোকার পর দরজা বন্ধ না করেই চলে এলে। এগুলো তো ঠিক আমার পরিচিত লোকটার কাজ নয়।”
এইঃ তো,” বলে অদিতি শুরু করার আগেই তাড়াতাড়ি চায়ে চুমুক দিয়ে বিজয়বাবু বললেন, “এর কোনওটাতেই প্রমান হয় না যে আমি তিনটে রাত্তির একা থাকতে পারব না।”
সত্যি সত্যি তোমার এতো ভুলভাল হচ্ছে?” ভুরু তুলে বলল হিরু।
আরে, ছাড় তো, তোর মায়ের কথা।”
ঘড়ি দেখে হিরু বলল, “আমি আগেই বলেছিলাম তুমি কোথাও গিয়ে থাকতে চাইবে না। অদিতি তো শোনার পাত্রী নয়, তাই আমাকে, তীর্থকে, বিপ্লবকে মায় নিজের ছেলেকে পর্যন্ত লাইন করে ধরে এনেছিল। যাই হোক, আমার মনে হয় না এই তিন দিনে খুব মারাত্মক একটা কিছু হবে। আমার আর বসার উপায় নেই, আমি উঠি।”
হিরু চলে গেলে বিজয়বাবু গিয়ে দরজাটা বন্ধ করে এলেন। বিরক্ত গলায় অদিতি বলল, “হিরুটাকে দিয়ে যদি একটা কাজের কাজ হয়। কোথায় বাবার সঙ্গে কথা বলে একটু বোঝাবে, না এগারোটা বাজতে না বাজতে বাবুকে উঠতে হবে। একটা রোববার বিয়ার না খেলে কী হয়?”
সে আলোচনা হবার ছিল না, হলোও না। একটু পরে অদিতি, বিপ্লব আর সোমুও রওয়ানা দিল চাইনিজ খেতে। যাবার সময় মেয়ে তাঁকে আলাদা করে ঘরের ভেতরে ডেকে নিয়ে গিয়ে বলে গেল, “একটু ভেবে দেখ, আমার মনে হয় তুমি ভুল করছ। গত তিরিশ বছরে তুমি আর মা কখনও আলাদা থাকনি। এখন একা থাকতে গিয়ে নানা রকম অসুবিধে হবে।”
বিজয়বাবু কী বলবেন ভেবে পেলেন না।

***
ভুল করছ, ভুল করছ, এই কথাটা মনের মধ্যে বাজতে থাকল। এই নিয়েই বিজয়বাবু সেদিন রাতে ঘুমোলেন, পরদিন সকালে উঠলেনও ওই একই কথা মাথায় নিয়ে। ভুল করছেন? কী ভুল করছেন? বউয়ের অপারেশনের সময়ে একা থাকা কি ভুল? তাই যদি হয়, তবে সেটা কী ধরণের ভুল? কাল অদিতি বলে গেল এতদিন কস্তুরীর সঙ্গে থাকার জন্য আজ কস্তুরী না থাকায় অসুবিধা হবে। কিন্তু কস্তুরীর সঙ্গে থাকা কি তাঁকে এতোই অকর্মণ্য করে দিয়েছে? যে মানুষটার সঙ্গে শুধু ওঠাবসা, শুধু এক টেবিলে বসে খাওয়া ছাড়া আর কোনও মানসিক যোগাযোগই নেই কতো বছর – তা তাঁর মনেও নেই, সে চলে গেলে কি খুব অসুবিধা হবে? বোধহয় না।
ভাবতে ভাবতে চায়ের জল চাপাতে গেলেন বিজয়বাবু। তিনি জানেন না হঠাৎ তাঁর ছেলেমেয়ে তাঁকে অসহায় মনে করছে কেন। তারা যানে ঘরকন্নার কাজে বাবা যথেষ্ট পারদর্শী। এমন কী বন্ধু এবং পরিবারমহলে সবাই জানে যে বিজয়ের রান্না কস্তুরীর চেয়েও ভালো। কেন তারা মনে করছে বাবার অসুবিধা হবে? ওরা কি ভাবছে ভালোবাসার লোক অপারেশন করতে গেছে বলেই অসুবিধা? বিজয়বাবুর সে ভয়ও নেই। ভালোবাসার লোক কাকে বলে? যার সঙ্গে কেবলমাত্র একই বাড়িতে একই ছাদের নিচে বাস? যার সঙ্গে গত কত বছর হলো কোনও মনের কথা আদানপ্রদান হয়নি তাকে কি ভালোবাসার লোক বলা যায়?
বিজয়বাবু একটু থেমে ভাবলেন। কস্তুরীকে কখনও ভালোবেসেছেন কি? বিয়ের ঠিক পরপরই মনে হয়েছিল, হ্যাঁ। একেই বলে ভালোবাসা। কিন্তু কয়েক বছর পরেই বুঝেছেন যে সেটা ছিল মোহ। একজন যুবক এবং একজন যুবতী পরস্পরের প্রতি মোহগ্রস্ত হয়েছিল। দুজনেই এমন পরিবার থেকে এসেছিল যেখানে বিয়ের আগে নারী-পুরুষ মেলামেশার সুযোগ ছিল না। সুতরাং যে মুহূর্তে পরস্পরকে পেয়েছিল, বিয়ের পরে, মনে হয়েছিল এই অনুভূতিকেই ভালোবাসা বলে। আসলে সেটা ভালোবাসা নয়।
ইলেক্ট্রিক কেটলিতে জল ঢেলে প্লাগ লাগাতে গিয়ে থমকে গেলেন। বেশি জল দিয়েছেন। আজ কস্তুরীর চা খাওয়া বারণ। সকাল থেকে উপোস। ডাক্তারবাবু বলেও দিয়েছিলেন, “দেখবেন, সকালে আধকাপ চা যেন খেয়ে ফেলবেন না। ওতেও প্রব্লেম হতে পারে।”
জল কমিয়ে, কেটলি চালু করে, দাঁত মাজার জন্য বেরিয়ে এসে ভাবলেন, আজ যদি কস্তুরীকে চা না-ই দেন, তাহলে রোজের মত চা ভিজিয়েই ডাকার কি কোনও দরকার আছে? আজ না হয় খানিকটা আরও সময় ঘুমোক কস্তুরী। এ সব ভাবতে ভাবতেই কস্তুরী ঘর থেকে বেরিয়ে এল। দাঁত মাজা শেষ করে বিজয়বাবু হাত মুছে রান্নাঘরে গিয়ে দেখলেন কস্তুরী চা ভিজিয়ে দিয়েছে। একটু হেসে বলল, “যাকগে, জীবনে অন্ততঃ একবার তোমাকে সকালের চা করে খাওয়াতে পারলাম।”
বিজয়বাবুর মুখটা বিস্বাদ হয়ে গেল। ভাবলেন কস্তুরীকে এর জন্য একটু বকা উচিত, কিন্তু আবার ভাবলেন, না থাক, একটা দিনের জন্য – বিশেষ করে আজকের দিনে ওকে কিছু না বলাই ভালো। রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এসে শুনতে পেলেন কাগজওয়ালা বারান্দায় কাগজ ফেলছে। কাগজ কুড়িয়ে এনে বসলেন। খানিক পরে কস্তুরী এসে সামনে চায়ের কাপ রাখল। বিজয়বাবু চায়ে চুমুক দিয়ে কাগজে চোখ রাখলেন। কিন্তু মন বসল না। একটু পরে কাগজের ওপর দিয়ে তাকিয়ে দেখলেন কস্তুরী মন দিয়ে কাগজ পড়ছে। আশেপাশে কিছু নজর করছে না।
চিরকাল লক্ষ করেছেন, কস্তুরীর ওয়ান-ট্র্যাক মাইন্ড। যেদিকে মন দিয়েছে, সেদিক থেকে অন্য কোনও দিকে তাকায়নি। রান্না করতে করতে ফোনও ধরত না। জীবনের যে সময় ছেলেমেয়েদের স্কুলের পড়া দেখাশোনা করার কথা, তখন অন্য কোনও দিকে তাকানোর সুযোগ দেয়নি নিজেকে। সেই সময়েই বিজয়বাবু বোঝেন যে তিনি কস্তুরীকে কোনওদিন ভালোবাসেননি। অবশ্য তাঁর জীবনে সেই সময়ে অন্য মহিলা না এলে সে বোধ হয়তো জন্মাতো না। কে জানে, কস্তুরী কি কখনও অন্য কারও প্রেমে পড়েছে? যে সময়ে বিজয়বাবু দিনের পর দিন ছেলেমেয়ে বউ ছেড়ে ডিস্ট্রিক্টে কাটিয়েছেন, সেই সময়ে কস্তুরীর জীবনে কোনও পুরুষ কি এসেছিল? নিজের জীবন নিয়ে তখন তিনি এতোই ব্যস্ত, যে বিজয়বাবু কখনও ভাবেনইনি যে ছেলেমেয়ে, ঘরসংসার সামলে কস্তুরী কখনও অন্য পুরুষের প্রতি আকৃষ্ট হতে পারবে, বা কাউকে সময় দিতে পারবে।
জীবনের কোনও এক মোড়ে বিজয়বাবু বুঝেছেন তিনি কস্তুরীকে ভালোবাসেন না। বুঝেছেন, কস্তুরীর প্রতি তাঁর যতোটা অনুভূতি, তাঁর জীবনে অন্য যে তিনটি মহিলা এসেছিল, তাদের প্রতিও তাঁর ততোটুকুই অনুভূতি ছিল। এবং তারা তাঁর জীবন থেকে বেরিয়ে যাবার পরে তাঁর যেমন কোনও কষ্ট হয়নি, আজ যদি কস্তুরী তাঁর জীবন থেকে বেরিয়ে যায়, বিজয়বাবু জানেন, তাঁর ঠিক তেমনই কোনও কষ্ট হবে না। কোনও দিনই হত না।
কোনও দিনই কোনও মহিলার প্রতি ভালোবাসা অনুভব করেননি তিনি।
বিজয়বাবু একটু হাসলেন, কী আশ্চর্য! অথচ তাঁর হাত ধরেই একদিন কেউ বলেছিল, “এই সম্পর্কটায় আমার সবচেয়ে বড়ো পাওয়াটা কী জান? তোমার মতো ভালোবাসতে পারে এমন একটা মানুষ দেখতে পাওয়া।” কী দেখে বলেছিল কথাটা? কে জানে! বিজয়বাবু আজ তিপ্পান্ন বছর সংসার করলেন, কিন্তু ভালোবাসতে পারলেন না। কে জানে, হয়ত ভালোবাসার ক্ষমতাই তাঁর ছিল না কোনও দিন।
সবটাই হয়ত ভুল।
দেখতে দেখতে হিরু এসে পড়ল। তারপর নার্সিং হোম যাওয়া, কস্তুরীকে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যাওয়া, যাবার সময় কস্তুরীর চোখ ছলছল করে আসা, বলা – তীর্থ আর সোমুকে দেখতে পেলাম না; অদিতির ঝাঁঝিয়ে ওঠা, বিজয়বাবুর পুরো জিনিসটা কী রকম বোকা বোকা মনে হওয়া, ভ্যাবলার মতো খানিকক্ষণ ও.টি-র বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা, মেয়ের গাড়িতে ওদের বাড়িতে যাওয়া, প্রথমে বেয়ানের সঙ্গে অর্থহীন বাক্যালাপ, পরে সোমককে টা টা বলে স্কুলে রওয়ানা করে দেওয়া, তার মধ্যে বিপ্লবের ফোন – অপারেশন নির্বিঘ্নে হয়েছে, জ্ঞান ফিরেছে, ঘরে দিয়েছে, ইত্যাদি; খাওয়াদাওয়া, বিশ্রাম, বিকেলে আবার কস্তুরীকে দেখতে যাওয়া – এই সমস্ত সময়টা বিজয়বাবুর মাথার পেছনে একটা চিন্তা ঘুরপাক খেতে থাকল। কেন? কেন এই খাটাখাটনি? কিসের জন্য তিনি তিপ্পান্ন বছর এই মহিলার পেছনে খরচা করলেন? কী পেলেন তার পরিবর্তে? হঠাৎ খেয়াল করলেন, কয়েক বার ছেলেমেয়ে দুজনেই বাবার দিকে তাকিয়ে একটু চোখ চাওয়াচাওয়ি করল। পাছে তারা সিদ্ধান্ত নেয় যে বাবার পক্ষে একা রাত কাটানো সম্ভব নয়, তাই তাড়াতাড়ি নিজেকে সামলে নিলেন। ফলে আরও খানিকটা সময় বোকাবোকা কথা বলে, এবং ভিজিটিং আওয়ার্স শেষ হবার পরে বউয়ের দিকে তাকিয়ে সাহেবী কায়দায়, “টেক কেয়ার” বলে পালিয়ে নিশ্চিন্ত হলেন বিজয়বাবু।

***
রাতে ভালো ঘুম হলো না। সকালে ঘুম ভেঙে দেখলেন বিছানার চাদরটা কুঁচকে সরে গেছে, আর শুয়ে আছেন তোষকের ওপর। অভ্যাসমতো ঘাড় ফিরিয়ে বাঁদিকে তাকিয়ে চমকে উঠলেন। বালিশ খালি। ধাতস্ত হতে অবশ্য এক লহমাও লাগল না। তারপর হাত বারিয়ে বেডসাইড টেবিল থেকে চশমাটা তুলতে গিয়ে দ্বিতীয় চমক। চশমাটা নেই। রোজ এখানে থাকে, আজ নেই কেন? বিরক্ত মুখে বিছানা ছেড়ে উঠে গিয়ে দেখলেন খাবার টেবিলে পড়ে থাকে। আসলে রোজই তাই হয়। রাতের খাওয়া সেরে বিজয়বাবু চশমাটা হয় টেবিলে, নয় ফ্রিজের ওপর, নয়ত ওয়াশিং মেশিনের ওপর রেখে মুখ ধোন, তারপরে চোখ মুখ মুছে বারান্দায় তোয়ালে মেলে শুয়ে পড়েন। বিজয়বাবুর চশমা, চাবি, মানিব্যাগ, ঘড়ি – ইত্যাদি গুছিয়ে তোলার দায়িত্ব সবসময়েই কস্তুরীর ছিল। এখন বাকিগুলোর ব্যবহার কমেছে, শুধু চশমা নিয়েই যত গণ্ডগোল। মনে মনে ঠিক করে রাখলেন, আগামী তিন দিন, বা হয়ত তারও বেশি, চশমা কোথায় রাখছেন খেয়াল রাখতে হবে।
চায়ের জল চড়িয়ে, দাঁত মেজে, চা ভিজিয়ে শোবার ঘরে ঢুকে থমকে দাঁড়ালেন। কাকে ঘুম থেকে তুলতে এসেছেন? এবং সেই সঙ্গে আরেকটা কথা মনে পড়ে হাসি পেল। রান্নাঘরে দু-কাপ চা-ই ভিজিয়েছেন। তাড়াতাড়ি ফিরে গিয়ে ভাবলেন, ভেজানো তো হয়েই গেছে। এখন তো আর সে চা তুলে টিনে রাখা যাবে না, সুতরাং ভিজুক, দুকাপই খাওয়া যাবে।
বাথরুমে ঢুকে দাঁত মাজার ব্রাশটা হাতে নিয়ে ভুরু কোঁচকালেন। ভিজে কেন? তারপর মনে হল, নাঃ তাই তো, একটু আগেই তো দাঁত মেজে গেলেন। একটু হেসে বললেন, জোরেই বললেন, নিজেকে শুনিয়ে, “নাঃ, সব ওলট পালট হয়ে যাচ্ছে দেখছি।”
চা ছেঁকে, কাপে ঢেলে, দু কাপ চা টেবিলে এনে মনে মনে আরও হাসলেন খানিকটা। ভাগ্যিস, ছেলেমেয়ে কেউ দেখছে না! মা না থাকার সময়ে দু-কাপ চা বাবা নিয়ে আসতে দেখলে তাদের আর ঠেকিয়ে রাখা যেত না।
চায়ে চুমুক দিয়ে আশেপাশে তাকিয়ে মনে হলো কিসের যেন একটা অভাব? কিসের অভাব সেটা বুঝতে না পেরে টেবিল থেকে কাগজটা তুলতে গিয়ে খেয়াল হলো আজ বারান্দা থেকে কাগজটা আনাই হয়নি।
নিয়ে এলেন কাগজটা। কাগজগুলো। মনে হলো, কতদিন বাংলা কাগজ পড়েননি। সেটাই খুললেন। প্রথমেই পাতাজোড়া খেলার খবর। প্রথম খবর খেলার, প্রথম ছবি খেলার, বাঁ-দিকে ছোটো ছোটো করে খেলার খবর, ডানদিকে লম্বা কলামে খেলার খবর, পাতার নিচের দিকে আবার আরও একটা খেলার খবর। দ্রুত চোখ বুলিয়ে বুঝলেন, ভারত ক্রিকেট খেলায় সাংঘাতিক খারাপ করেছে। সেই নিয়ে এত কিসের মাতামাতি? চিরকাল এই কারণে বাংলা কাগজ পড়েননি। ভেবে পেতেন না, রোজ এই জিনিস মন দিয়ে কী ভাবে পড়ে কস্তুরী? যত্তোসব। আজও সেই কথা। ভারতের ক্যাপ্টেনের বউ আগের দিন বাজারে ক’লাখ টাকার হিরের গয়না কিনেছে সেই খবর দিয়ে ম্যাচ রিপোর্ট শুরু। কিন্তু পড়তে বেশ লাগল। খবরের ‘খ’ না থাকলেও মজার।
কাগজে চোখ বুলিয়ে নিয়ে খানিকক্ষণ চুপ করে বসে রইলেন বিজয়বাবু। উঠে চান করতে যাওয়া উচিত। কাজের মেয়েটা তো এখনও এল না। চানে গেলে ওকে দরজা খুলে দেবে কে? দাড়ি কামাতে গেলেন। কালই কামিয়েছেন, আজকাল আর রোজ রোজ দাড়ি কামাতে হয় না, তবু, কিছু তো করতে হবে একটা।
দাড়ি কামাতে গিয়ে দু-তিন জায়গায় কেটেও গেল। ব্লেডটা ভোঁতা হয়েছে। ব্লেড কস্তুরী রাখে। চাইলে বের করে দেয়। কোথায় আছে, কে জানে। আজ জেনে নিতে হবে। নইলে কাল পরশুও অসুবিধা হবে।
গালে স্যাভলন আর আফটার শেভ মাখতে মাখতে এসে পড়ল সরলা। মাসিমার অপারেশন ভালো হয়েছে ইত্যাদি বলে তাকে কাজে পাঠিয়ে বিজয়বাবু গেলেন ব্রেকফাস্ট বানাতে।
খাবার টেবিলে কর্নফ্লেকসের বাটিটা নামিয়ে রেখে ভাবলেন, অন্ততঃ এইবার দুটো বাটি নিয়ে আসার ভুলটা হয়নি। কাজের মেয়ে রয়েছে, তার সামনে ভুল করলে চলবে না। টেবিলে বসে খেয়াল হলো, অন্য একটা ভুল হয়েছে। রোজ দুধ আনে কস্তুরী। আজ উনি দুধ ছাড়াই বসে পড়েছেন ব্রেকফাস্ট খেতে।
খানিকক্ষণ চুপ করে বসেই রইলেন টেবিলে। হঠাৎ ভীষণ ক্লান্ত লাগতে শুরু করেছে। ব্রেকফাস্টের বাটি ঠেলে সরিয়ে দিয়ে শোবার ঘরে ঢুকলেন মশারি টাঙানো এখনও। বিছানা তোলে সরলা, কিন্তু ঘুম থেকে উঠেই মশারি খোলে কস্তুরী।
বিজয়বাবু মশারি খুলে বারান্দায় গেলেন আবার। চোখে পড়ল দূরের কোনায় চারটে ফুলগাছের টব। এগুলো কস্তুরীর। কস্তুরী নেই, জল দেবার দায়িত্ব আজ নিশ্চয়ই ওঁরই।
বাথরুম থেকে মগে করে জল নিয়ে এসে থমকে গেলেন। টবগুলো খালি কেন? কবে থেকে গাছ নেই এগুলোতে? কস্তুরী কি গাছ লাগানো ছেড়ে দিয়েছে? কিছু বলে তো নি। তাহলে কী করা? সাবধানে একটু একটু জল দিলেন টবগুলোর ফাঁকা মাটিতে। ফাঁকা থাকলে ক্ষতি হবে না। আর যদি কস্তুরী বীজ-টিজ কিছু লাগিয়েও থাকে, তাহলে কাজে লাগবে।
মগ রেখে খাবার ঘর পেরিয়ে নিজের ঘরে ঢুকলেন। চমকে দেখলেন কাল রাতে কম্পিউটারটা বন্ধ করেননি। এরকম হয় না, কিন্তু কস্তুরী শোবার আগে সব ঘরগুলো ঘুরে দেখে নেয়। কাল ও থাকলে এটা হতো না।
কম্পিউটার বন্ধ করে ঘুরতে গিয়ে দেখলেন আরাম চেয়ারের নিচে একটা পত্রিকা পড়ে আছে। কাল পড়া শেষ করে চেয়ারের হাতলে রেখে বিজয়বাবু খেতে গিয়েছিলেন। তখন পড়ে গেছিল। অন্য দিন হলে সকালে বিজয়বাবুকে কোমর বাঁকা করে তুলতে হত না। কাল রাতেই কস্তুরীর কৃপায় ওটা যথাস্থানে পৌঁছে যেত।
এত ছটফটে লাগছে কেন? বসার ঘরে আজ টিভির শব্দ নেই। অন্য দিন হলে কস্তুরী এতক্ষণে ব্রেকফাস্ট শো দেখছে। আজ পাশের বাড়ি থেকে তার টাইটেল মিউজিক ভেসে আসছে। বিজয়বাবু বসার ঘরের দিকে যেতে যেতে লক্ষ করলেন টেবিলে কর্নফ্লেকসের বাটিটা পড়ে আছে। চট করে সেটা ফ্রিজে চালান করে রান্নাঘরে সরলাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “রান্না শুরু করেছিস? আমাকে এক কাপ চা করে দিবি রে? চা-টা খেয়ে চানে যাই।”
বসার ঘরে গিয়ে টিভিটা চালু করতেই গমগম করে উঠল বিবিসি। দিনের এই সময়ে এবাড়িতে বিবিসি চলে না। বাংলা চ্যানেলে ব্রেকফাস্ট শো চলে। বিজয়বাবু কাগজ পড়েন, কস্তুরী টিভি দেখে। সেটা কোন চ্যানেল? বিজয় জানেন না। শূন্য থেকে বোতাম টিপতে টিপতে বিজয়বাবু খুঁজতে শুরু করলেন। বেশি খুঁজতে হলো না। পেয়ে ভাবলেন, কোনও দিনই তো দেখিনি এই প্রোগ্রামগুলো। একটু দেখিই না? দেখলেন খানিকক্ষণ। বাঃ, বেশ তো, কোথাকার কোন অর্থহীন খেলা, ইউরোপে কোথায় কে জানে বরফ জমা পুকুরের ওপরে কে কটা ডিগবাজি খেতে পারে। বিদেশী ফুটেজ নিয়ে তাতে ভয়েস-ওভার করে চালিয়ে দেওয়া। তাও বেশ।
পেছন থেকে চায়ের কাপ বাড়িয়ে দিয়ে সরলা একগাল হেসে বলল, “মাসিমার পোগগাম দেখছ?”
বিজয়বাবু চায়ের কাপটা হাতে নিতে নিতে বললেন, “হ্যাঁ।”
চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে চোখ কপালে তুললেন বিজয়বাবু। বুঝলেন এ কদিন চা যতটুকু খাবেন, নিজেকেই বানিয়ে নিতে হবে। নিজের বাড়িতে নিজের পছন্দমত চা না পেলে চলবে না।
কোনও রকমে চা শেষ করে টিভিটা চালিয়ে রেখেই বিজয়বাবু উঠে গেলেন চানে। যাবার সময় সরলাকে তাড়া দিয়ে গেলেন, “রান্নাটা শেষ কর চটপট। আমি এক্ষুনি বেরোবো।”
চানে যাবার পথেও বাধা। তোয়ালে কই? মুখে প্রায় হাঁকটা এসেই গেছিল, “কস্তুরী আমার তোয়ালে ধুতে দিয়েছ?” কিন্তু সামলে নিলেন। তোয়ালে তো রোজ বারান্দায় এই তারেই ঝোলে। তাহলে? শোবার ঘরে ফিরে এদিক ওদিক তাকালেন। আলনায় তোয়ালেটা দলা হয়ে রয়েছে। বিজয়বাবুর ছোটোবেলা থেকে তোয়ালে মেলার অভ্যাস ছিল না। আজও নেই। কস্তুরীই তুলে রাখে। কাল সন্ধেবেলা গা-ধোবার পর আর কস্তুরী সে কাজ করার সুযোগ পায়নি।
খাবার টেবিলে সরলা রান্না করা খাবারগুলো রাখছে। বলল, “ঢাকা দিয়ে রাকলুম, বেরোনোর আগে ফিরিজে ঢুক্যে দিও।” বিজয়বাবু দেখলেন পরশুর শুকিয়ে আসা ফুলগুলো ঝরে ঝরে পড়ছে টেবিলে। মনে হলো, পঞ্চান্ন বছরের বিবাহিত জীবনে তিনি তাঁর বাড়িতে এই দৃশ্য কখনও দেখেননি। কস্তুরী সর্বদা ঠিক সময়ে শুকিয়ে আসা ফুল সরিয়ে নতুন ফুল সাজিয়ে রাখত।
শুকনো ফুলগুলো গুছিয়ে নিয়ে রান্নাঘরে ময়লার ঝুড়িতে ফেলতে গেলেন। বুঝলেন, সকালের অস্বস্তি-ভাবটা চলে গেছে। অনেকদিন আগে দেখা একটা ইংরিজি সিনেমার একটা গানের কথা মনে পড়ল। লাইনগুলো মনে নেই, সুরটাও না, কিন্তু বক্তব্যটা মনে আছে… স্বামী স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করেছিল, তুমি কি আমায় ভালোবাস? তার উত্তরে স্ত্রী বলেছিল, পঁচিশ বছর ধরে আমি তোমার খাবার রান্না করে দিয়েছি, মোজা রিপু করেছি, সন্তানের মা হয়েছি, পঁচিশ বছর ধরে তোমার বিছানাই আমার বিছানা, এ যদি ভালোবাসা না হয়, তাহলে ভালোবাসা কাকে বলে?
হলিউডের ফিলজফির ভালোবাসাই ভালোবাসা। পঞ্চান্ন বছর ধরে দুটো মানুষের একই বাড়ি, একই নাম, একই বিছানা, একই সন্তান, একসঙ্গে চা খেতে খেতে কাগজ পড়া, একজন বাটিতে কর্নফ্লেকস নিয়ে এলে অন্যজনের তাতে দুধ ঢালা, -ই ভালোবাসা।
শোবার ঘরে ঢুকে এদিক ওদিক তাকিয়ে খুঁজে দেখলেন। অনেকদিন আগে একটা ছবি ছিল দুজনের। বিয়ের ঠিক পরে পরে তোলা। দেওয়ালে টাঙানো থাকত। সেটা আর নেই। কবে থেকে নেই? কস্তুরী? আর কে? বিজয়বাবুকে বলে সরিয়েছিল? বোধহয় না। কেন সরাল? নষ্ট হয়ে গিয়েছিল কি?
বিজয়বাবু আলমারি খুললেন। একটা ছোটো অ্যালবামে কয়েকটা ছবি থাকে তাঁর আলমারিতে। একটা বের করলেন। বছর পনের-ষোল আগের কস্তুরী। আলমারি বন্ধ করে তার দরজায় চুম্বক দিয়ে লাগালেন। খানিকটা তাকিয়ে থেকে আবার দরজা খুলে ভেতর দিকে লাগালেন ছবিটা। লোক দেখিয়ে কাজ নেই।
চানে গেলেন গুণগুণ করে একটা কী গান গাইতে গাইতে।
***
গাড়িতে নার্সিং হোম যাবার পথে অদিতি বাবাকে চোখ মটকে জিজ্ঞেস করল, “কী ব্যাপার, খুব খুশি খুশি দেখাচ্ছে যে? মা-কে ছাড়া বেশ ছিলে মনে হচ্ছে? এই তুমি মাকে ভালোবাস?”
বিজয়বাবু হেসে বললেন, “পঞ্চাশ বছর বিয়ের পর ভালোবাসা থাকে?”
অদিতি বলল, “সে আমি কী করে জানব? আমার কি পঞ্চাশ বছর বিয়ে হয়েছে? সে তো তুমি জানবে।”

জানলা দিয়ে রাস্তার দৃশ্য দেখতে দেখতে বিজয়বাবু বললেন, “এগজ্যাক্টলি।”

No comments: