Sunday, December 10, 2023

হলুদ গাঁদার ফুল

 

স্বাধীনতার এত বছর পরেও দেশে এমন একটা জায়গা আছেসত্যিই না দেখলে বিশ্বাস করতে পারতাম না। বাস স্টেশনে হেডমাস্টার আর তাঁর সঙ্গীদের দেখেই থমকে গেছিলাম। এ দৃশ্য না দেখলে ভাবতাম ওদের ওয়েবসাইটের মাস্টারমশাইদের ছবি আমার ছোটোবেলায় পড়া সেই ইংরিজি বইয়ের বোর্ডিং স্কুল থেকে নেওয়া। এই সবে মাথা থেকে মর্টার বোর্ড আর কাঁধ থেকে স্কলার্স গাউন নামিয়েছেন। এরকম স্কুল এখন ইংল্যান্ডেও কি আর আছেআমার জিনস আর সারা রাত বাসজার্নি করা শার্টের দুর্দশার দিকে না তাকিয়ে এগিয়ে গেলাম।

করমর্দনের জন্য হাত বাড়িয়ে দিলেন চারজনের মধ্যে যিনি আধ পা এগিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। অভ্যর্থনা জানালেন। না বললেও বুঝতে অসুবিধে হত নাতবে নিজের পরিচয় দিলেন — চিত্রেশ আলোকহেডমাস্টার। জানতে চাইলেন যাত্রা আরামদায়ক ছিল কি না। পথে কোনও অসুবিধে হয়নি তোসঙ্গীদের পরিচয় দিলেন। কার্লটন সোমস্‌প্রিতপাল সিংমাকেনা কিমাঙ্গী — যথাক্রমে ইংরেজিকমার্স আর সায়েন্সের হেড। সকলেই হ্যান্ডশেকসকলেরই ইংরেজি চোস্ত। চিঠির বয়ানে ভালো ইংরেজি একরকমকিন্তু এ আলাদা। ইংল্যান্ড ছাড়ার পরে এমন সাহেবি ইংরেজি আর আদবকায়দার একত্রিত সমাহার আর দেখিনি। এবার বুঝলামসৌমিকদা কেন বলেছিলওরে বাবাওখানে... আর তারপরে বলেছিলঅবশ্য কেউ যদি মানিয়ে নিতে পারেতুই-ই পারবি। ওদেশে জন্ম কি না!

আমার জন্ম কোন দেশে আমি জানি। কিন্তু তার সঙ্গে নতুন চাকরির কী সম্পর্ক হবে তখন বুঝিনি। ক্রমে বুঝতে পারলাম। প্রথমে করমর্দনের ঘটা দেখে ভাবছিলামএঁরা কি করোনার নাম শোনেননিকিন্তু দেখলাম সবার সঙ্গে আমার হ্যান্ডশেক শেষ হওয়ামাত্র সায়েন্সের হেড কিমাঙ্গী পকেট থেকে স্যানিটাইজারের বোতল বের করে বাড়িয়ে ধরলেন। বললেন, “এই এক জ্বালা হয়েছে। কিন্তু উপায় তো নেইনিন...” আর ইংরেজির হেড বললেন, “তবু ভালো এতদিন পরে মাস্ক পরার জ্বালাতনের হাত থেকে মুক্তি পেয়েছি। আপনাদের ওখানেও শুনলাম মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক নয় আর?”

আমি বাসে মাস্ক পরেই ছিলামতবে নামার আগে খুলে নিয়েছিসে ওঁরা জানেন না। বললাম, “হ্যাঁতবে বলা হচ্ছে পাবলিক প্লেসে মাস্ক পরে থাকাই বাঞ্ছনীয়।”

ওঁরা চারিদিকে তাকালেনযেন করোনা গুঁড়ি মেরে আসছে কি না দেখছেন। তারপরে হেডমাস্টার বললেন, “চলুনযাওয়া যাক?”


ওঁরা বলেছিলেনইন্টার্ভিউয়ের আগে কিছু সময় কাটানোর জন্য হাতে দিন দুয়েক নিয়ে এলে ভালো হয়। বলেছিলেনস্কুল সানন্দে আমার থাকা-খাওয়ার দায়িত্ব নেবেএবং যথোপযুক্ত কম্পেনসেশনও দেবে। আমি বলেছিলাম দু’ দিন ঠিক আছেকিন্তু তার মধ্যেই ইন্টারভিউ হলে ভালো হয়। তাহলে আমি আগের দিন সকালে পৌঁছেপরদিন ইন্টার্ভিউ দিয়ে আবার সন্ধের বাসে বেরিয়ে যাব। উত্তরে যখন ওঁরা জানালেন ইন্টার্ভিউ রবিবার হলে কি আমার আপত্তি হবেতাহলে শনিবার পৌঁছেরবিবার ইন্টার্ভিউ দিয়ে সেদিনই ফিরতে পারব। সানন্দে রাজি হয়েছিলাম। তা হলে আমার ছুটি খরচ হবে না।

চারজনে দুটো গাড়িতে এসেছেন। হেডমাস্টারের গাড়িতে আমিবাকি তিনজন অন্য গাড়িটায় উঠলেন।

চলতে চলতে বললেনযদিও স্কুলের নামটা এই শহরেরই নামেআদতে কিন্তু স্কুলটা এখানে নয়। এখান থেকে প্রায় বাইশ কিলোমিটার দূরে। সেটা অন্য গ্রাম। রাস্তা ভালো — আধঘণ্টা থেকে পঁয়তাল্লিশ মিনিটে পৌঁছে যাব।

ছোট্ট গ্রাম। বরং বসতি বলাই ভালো। পাহাড়ি রাস্তা এঁকেবেঁকে উঠেছে স্কুলের গেট অবধিতার আগে গোটা দশ-বারো বাড়ি। অবাক হয়ে দেখলামএ আমার পরিচিত ভারতীয় পাহাড়ি গ্রাম নয়। এ যেন ছবিতে আঁকা একটা ইউরোপীয় গ্রাম তুলে আনা হয়েছেযেমন বাড়িঘরের গঠনসৌষ্ঠবতেমনই সুন্দর বাগানের পরিচর্যা। আমার অব্যক্ত প্রশ্নের উত্তর দিলেন হেডমাস্টার। বললেন, “এখানে আসলে আমাদের স্কুলের সঙ্গে যুক্ত আছেনবা ছিলেনএমন মানুষই থাকেন। যেমন রিটায়ার্ড টিচারবা সিনিয়র নন-টিচিং স্টাফ। তাই বাড়িগুলো ব্যতিক্রমী। চলুনস্কুলের ভিতরটা দেখে বুঝবেন।”

স্কুল দেখে আমি সত্যিই চমৎকৃত হয়ে গেলাম। বিশাল মাঠআর গাছের সারিসত্যিই একেবারে ইংল্যান্ডের মেডো যেন। তার মধ্যে পুকুরদিঘীবাগান। ছাত্রদের হস্টেলটিচারদের কোয়ার্টারসবই যেন গল্পের বইয়ের ছবি। দেশ বিদেশের নানা বোর্ডিং স্কুল দেখার সৌভাগ্য আমার হয়েছেকিন্তু সত্যি বলতে কীএখানকার আবহে যেন আরও কিছু আছেযা সঙ্গে সঙ্গে আকর্ষণ করে।

গাড়ি থামল টিচারদের কোয়ার্টারের কমপ্লেক্সের ভিতরে হেডমাস্টারের বাড়ির সামনে। অন্য গাড়িটাও পিছনে এসেছে। সিটে রাখা আমার ছোটো সুটকেসটা নিতে যাচ্ছিহেডমাস্টার বাধা দিলেন। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই বেরিয়ে এল ভেতর থেকে উর্দিপরা বেয়ারাসকলকে সেলাম করে হেডমাস্টারের অল্প মস্তকান্দোলনের নির্দেশেই বোধহয় বাক্সটা নিয়ে ভেতরে গেল।

ইট ইজ মাই প্লেজার টু হোস্ট ইউ ফর ইওর স্টে।” হেডমাস্টার বাড়ির দিকে হাত দেখালেনদেখলাম ভেতর থেকে বেরিয়ে এলেন একজন মহিলাআমার দিকে হাত বাড়িয়ে বললেন, “হেলো।”

সুমেধামাই ওয়াইফ,” পরিচয় করিয়ে দিলেন হেডমাস্টার। আবার করমর্দনআবার স্যানিটাইজার। হেডমাস্টার বললেন, “আপনার থাকার ব্যবস্থা আমার বাড়িতেকিন্তু খাওয়ার ব্যবস্থা টিচার্স ডাইনিং রুমে। ছুটির দিন না হলে টিচাররা ওখানেই খাইতাহলে নিজেদের মধ্যে আলোচনাকথাবার্তার সময় পাওয়া যায় বেশি। আজ ছুটির দিন হওয়া সত্ত্বেও আমরা ওখানেই খাবার ব্যবস্থা করেছিযাতে আপনি সবটার একটা আন্দাজ পান।” তারপরে স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বললেন, “হ্যাভিং সেড দ্যাটমাই ওয়াইফ হ্যাজ ইনসিস্টেড দ্যাট ইফ ইউ আর স্টেইং ইন আওয়ার হোমইউ মাস্ট হ্যাভ সাম অফ দ্য মিলস উইথ আস। তাইআপনাকে দুটো ব্রেকফাস্ট আমাদের সঙ্গে এ বাড়িতেই খেতে হবে।”

আমি এর সদুত্তর দেবার আগেই ইংরেজির হেড সোমস মাথা নিচু করে সুমেধাকে অভিবাদন জানিয়ে বললেন, “এবং সেই সুবাদে আজ আমাদেরও সৌভাগ্য হয়েছে ম্যামের অসাধারণ ব্রেকফাস্ট খেতে পাবার।” বলে আমাকে বললেন, “তবে ভাববেন না উনি আপনি এসেছেন বলেই আমাদের ডেকেছেন। আমরা প্রায়ই নিমন্ত্রিত হই।”

আমি নিজেকে ভাগ্যবান এবং ধন্য মনে করছি,’ জাতীয় কথা বলতে বলতে থমকে গেলাম। এটা হেডমাস্টারের কোয়ার্টারএ তো পশ্চিমী সিনেমার বিলিওনেয়ারের বাড়িবাপরেকথা বলতে বলতে আমরা একটা বসার ঘরের মধ্যে ঢুকেছি। বাড়িটা আদ্যিকালের হলেও আজকালকার ওপেন প্ল্যান। বসার ঘরের ওদিকে একটা সাইডবোর্ডের ওপর দিয়েকিছু ইনডোর গাছগাছালির ওপারে খাবার ঘরের কিছুটা দেখা যাচ্ছে। বসার ঘরের জানলায় পর্দা টানাকিন্তু খাবার ঘরের জানলা খোলাদেখে মনে হয় ফ্রেঞ্চ উইন্ডো। তার ভিতরে কীদেখা যাচ্ছে না।

হেডমাস্টার বললেন, “জার্নির পরে ব্রেকফাস্টের আগে নিশ্চয়ই ফ্রেশ হয়ে নিতে চাইবেনআমরা অপেক্ষা করব। সুমেধা আপনাকে দেখিয়ে দেবে... সুমেধা?”

আসুনপ্লিজ...” বললেন সুমেধা। আমি বাকিদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ওঁর পেছনে রওয়ানা দিলাম। বসার ঘরের পরে আর একটা বসার ঘর — এটা আর একটু প্রাইভেট। সেটা পার করে প্রথম দেওয়াল আর দরজা। তারপরে বাড়ির ভেতর দিকটা। তাক লেগে যাবার মতো। বললাম, “হোয়াট আ বিউটিফুল হাউস।”

সুমেধা বললেন, “সত্যিই। আপনি আসলে দেখবেনঅ্যাসিস্ট্যান্ট হেডমাস্টারের কোয়ার্টারও প্রায় এতটাই বড়োএবং সুন্দর। আর থাকলে তো আপনিই তিন বছর পরে হেডমাস্টার হবেন। তখন এই বাড়িই আপনার হবে। এবং অনেক দিনের জন্য — এখানে রিটায়ারমেন্ট পঁয়ষট্টিতে। যার অর্থ আপনি — কতবছর বাইশ...? — এই বাড়িতে থাকবেন” লম্বা করিডোর দিয়ে হেঁটে এসে একটা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে উনি প্রশ্নটা করে আমার দিকে তাকালেন।

মহিলা আমার বয়স জানার চেষ্টা করছেন। আমি কি এক কথায় বলে দেবনা। কথার খেলায় আমিও দড়। মাথাটা ঝুঁকিয়ে বললাম, “ম্যামএই অসাধারণ স্কুলের হেডশিপ আমার কপালে থাকলে আমি পাঁচ বছরের জন্যেও এই বাড়িতে থাকতে পেলে নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করব।”

সুমেধা কথা না বাড়িয়ে কোনটা বাথরুমের দরজাকোন সুইচ বাজালে গৃহকর্মীরা আসবে এরকম প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে বিদায় হলেন। আমিও সময় নষ্ট না করে তাড়াতাড়ি তৈরি হতে শুরু করলাম। দাঁত মাজাদাড়ি কামানোস্নান করা — সবই বাকি।

সমস্যা হলো পোশাক পরতে গিয়ে। সৌমিকদা বলে দিয়েছিলতিনটে সুট নিয়ে যাস। আমিই অবাক হয়ে বলেছিলামদু-দিনের জন্য কেউ তিনটে সুট নেয়আমি কি রাজা-গজা নাকিভেবেছিলামইন্টার্ভিউয়ের জন্য একটা আর যদি আগের দিন কোনও ফর্মাল ডিনার থাকে তাহলে আর একটা — সবসুদ্ধ দুটোই যথেষ্ট। এখন দেখছি এরা সকাল থেকে সবাই সুট পরে রয়েছে। তাহলে তো আমারও সুট-টাই পরেই ব্রেকফাস্টে যাওয়া উচিত। তাহলে একটাই সুট পরে আজ পুরোটা আর কাল অর্ধেক দিন — আমার ইন্টার্ভিউ তো দুপুরে — কাটাতে হবে?

সুট পরব না। আমি বাইরে থেকে এসেছি। আমার পক্ষে একরাশ সুট নিয়ে একরাতের সফরে আসা সম্ভব না হওয়াই স্বাভাবিক। সবচেয়ে বড়ো কথা — বিদ্যাসাগরের মতো আমার পরিচয় যদি আমার পোশাকে হয়তবে সত্যিই আমি এই চাকরি চাই না।

সাত-পাঁচ ভেবে সুটকেস খুলে দুটো সুট-ই বের করে আলমারিতে ঝুলিয়ে কেবল শার্ট-প্যান্ট পরেই ব্রেকফাস্টে গেলাম। গিয়ে দেখি অন্যরাও সুটের ভারমুক্ত হয়ে বসেছেন। আমাকে দেখে সকলে উঠে দাঁড়ালেন। প্রীতপাল সিং প্রায় নিশ্চিন্দির সুরে বললেন, “যাকআপনি দেরি করেন না। আমরা ভাবছিলাম — আপনাকে যাবার আগেই তাড়া দেওয়া উচিত ছিল কি না।”

আমি বললাম, “আপনারা ভুলে গেছেনযে আমি সারা রাত বাস জার্নি করে এসেছি। সকালে খাইনি কিছু। আর তাছাড়া এসেই শুনলাম আপনারা সকলে ম্যামের ব্রেকফাস্টের সুখ্যাতি করছেন। সুতরাং দেরি করি কী করে?”

প্রাতরাশ সেরে — সত্যিই মিসেস সুমেধা চিত্রেশের খাবারের স্বাদ অতুলনীয় — বেরোলাম স্কুল পরিদর্শনে। হেডমাস্টারের কথায় প্রাথমিক পরিদর্শন। এখন ওপর ওপর দেখেশুনে নিতে হবে। যদি চাকরি পাইতাহলে আরও ভালো করে দেখাবেন।

সঙ্গে চললেন সকলেই। এঁরাই স্কুলের সিনিয়র শিক্ষকশিক্ষিকা। এবং অ্যাসিস্ট্যান্ট হেড ছাড়া সকলেই উপস্থিত। উনি চিকিৎসা করাতে গেছেন স্বদেশে। স্বাস্থ্য ভালো নয় বলেই কাজ ছেড়ে চলে যাবেন। ওই পদের জন্যই আমার কাল ইন্টার্ভিউ।

প্রাথমিক দেখাতেই লাগল লাঞ্চ অবধি। বিরাট ক্যাম্পাসতার এ-কোনে ও-কোনে ছড়ানো ছাত্রদের নানা কর্মক্ষেত্র। এইখানে জিমনেশিয়ামতো ও---ওইখানে হর্স রাইডিংআবার বহু চলে যেতে হবে কোন কর্মশালায় — যেখানে ছাত্রদের হাতের কাজ শেখানো হয়। এ ছাড়া ছাড়া একাধিক ফুটবলক্রিকেটহকিআর ট্র্যাক অ্যান্ড ফিল্ড-এর মাঠ। গাড়ি বিনাশুধু পায়ে হেঁটে এ রাজত্ব পরিদর্শন সম্ভব নয়। হেডমাস্টার আমাকে দেখালেনএই জন্যই উনি ব্যাটারিচালিত গাড়ির ব্যবস্থা করেছেন। ছুটির দিন বলে আজ সেগুলি মেইন্টেনেন্স হচ্ছেতাই উনি নিজের গাড়ি বের করেছেন।

শিক্ষকদের ডাইনিং রুমে দ্বিপ্রাহরিক ভোজনশেষে গেলাম অভ্যন্তর পরিদর্শনে। লাইব্রেরিতে আরও কয়েকজন সিনিয়র শিক্ষক শিক্ষিকা উপস্থিতসেখান থেকে বিভিন্ন বিভাগীয় লাইব্রেরি এবং ল্যাবরেটরিইত্যাদি শেষ করতে করতে বিকেল। ততক্ষণে আমি বেশ ক্লান্ত। ভাগ্যিস সুট-টা পরিনি!

হেডমাস্টারের বাড়িতে ফিরলাম কেবল আমরা দুজনই। বাকিরা অনুমতি এবং বিদায় নিয়ে গেলেন যে যার বাড়ি। বলে গেলেনডিনারে দেখা হবে।

চা খেতে খেতে আলোক আর সুমেধার কাছে স্কুল সম্বন্ধে আরও কিছু জানলামতারপরে দম্পতি আমাকে অনুমতি দিলেনঘরে গিয়ে বিশ্রাম করার। ডিনার রাত আটটায়সেখানে সুমেধাও যাবেনএবং আমি যেহেতু গেস্ট অফ অনারতাই আমার ওখানে আটটা বাজার দু’মিনিট আগে পৌঁছলেই হবে। বাড়ি থেকে আমরা বেরোব আটটা বাজতে দশে।

সুমেধা বললেন, “সন্ধে ছটায় উনি অল্প ড্রিঙ্ক করেন। আপনি চাইলে...”

মদিরারসে আমার কোনও উৎসাহ নেই বলে বিদায় নিলাম।


আর একবার স্নান করতে হলো সারা দিনের ক্লান্তি দূর করতে। পাজামা পরে খাটে লম্বা হয়ে ভাবছি অভিজ্ঞতার কথাএমন সময় মনে হলো অনেকক্ষণ ধরে একটা গান যেন গুনগুন করছিগানটার কথাগুলো মাথায় আসতেই মনে হলোআসলে কেবল এক্ষুনি নাদুপুর থেকেই গানটা মাথায় ঘুরছে। গাঁদাফুল সম্বন্ধে। কথাগুলো মনে করে গানটা গাইবার চেষ্টা করলাম। বাংলা আধুনিক গানে আমার কখনোই খুব ইন্টারেস্ট ছিল নাতাই ‘হলুদ গাঁদার ফুল দে এনে দে...’ আর তারপরে একটা কী ঝুমকোলতা আর কে যেন চুল বাঁধবে না — এইটুকু বাদ দিয়ে আর কিছুই মনে পড়ল না। কেন এই গান মাথায় ঘুরছে সারা দিনএটা তো আমার প্রিয় গানও নয় — বস্তুত গানের কথাগুলোও জানি না ঠিক করে।

কিন্তু যতই চেষ্টা করিনা পারি গানটা বের করতেনা পারি বুঝতে কেন গানের ওইটুকু মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে।

সন্ধে ছ-টার কয়েক মিনিট পরে হেডমাস্টারকে সুরাপাত্র হাতে ভেতরের ড্রইং রুমে পেলাম। অনুমতি নিয়ে ওঁর সঙ্গে বসলাম। আমার জন্য কফি এলসুরাপাত্র খালি হতে শুরু করলএবং একটুক্ষণের মধ্যেই হেডমাস্টারের জিভ ঢিলে হয়ে গেলআগামীকালের ইন্টার্ভিউয়ে আমাকে কী কী জিজ্ঞেস করা হবে এবং তার কোন উত্তরটা আমার দেওয়া উচিত বলতে শুরু করলেন।

আমি থামিয়ে বললামস্যারএটা কি আপনার উচিত হচ্ছেআপনি কাল নিশ্চয়ই ইন্টার্ভিউ বোর্ডে থাকবেন। সেই বোর্ডের ক্যান্ডিডেটকে এ ভাবে সাহায্য করছেন?

হেডমাস্টার মিষ্টি হেসে বললেনআহদেয়ার ইউ আর মিস্টেকেন। আই উইল নট বি ইন দ্য বোর্ড টুমরো।

এটাও আশ্চর্য। তাই মেনে নিয়ে ভাবলাম সবচেয়ে বড়ো জিনিসটা জেনে নেওয়া ভালো। বললামএকটা কথা জানতে চাইযদি আপনি অনুমতি করেন।

উনি ঘাড় নেড়ে অনুমতি দিলে বললামএরকম একটা প্রতিষ্ঠানে হেড চলে গেলে সাধারণত অ্যাসিস্ট্যান্ট হেড-ই দায়িত্ব নেন। আপনাদের অ্যাসিস্ট্যান্ট হেড আপনার আগেই চলে যাবেনকিন্তু সিনিয়রদের মধ্যে এমন কেউ কি নেইযিনি দায়িত্ব নিতে পারেনবাইরের লোক কেন চাইছেন আপনারা?

উনি বুঝেছিগোছের মাথা নাড়লেন। বললেনজানেনসত্যিই নেই। অ্যাসিস্ট্যান্ট হেডের পরেই যিনি সিনিয়র টিচারতিনি আর্ট টিচার। অভিষেক। লম্বা মতনঢিলে চশমা — লাল জামা আর নীল জিনস পরে এসেছিলেন লাঞ্চে।

মনে আছে। লাঞ্চে কেউই সুট পরে আসেননিকিন্তু ওঁকে দেখেই একটু নিশ্চিন্ত বোধ করেছিলাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই অবশ্য বুঝেছিলামযে অভিষেকের মধ্যে বিদ্রোহী মনোভাব নেইআছে কেবল খ্যাপাটে-পনা। টিচাররা তো ধর্তব্যের মধ্যেই আনেন না, ছাত্ররাও বোধহয় খুব মানে না

হেডমাস্টার বলে চলেছেনএ বাদে আর কারওর অ্যাসিস্ট্যান্ট হেডমাস্টার হবার মতো অভিজ্ঞতা নেইএবং যে দু জন এক-দেড় বছরের মধ্যে অ্যাসিস্টান্ট হবার সিনিয়রিটি পাবেনতাঁরা আবার কেউই আগামী তিন বছরের মধ্যে হেড হবার মতো বাড়তি অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারবেন না। ফলে আমাদের বাইরে থেকে কাউকে আনতেই হত। তাই...

বুঝলাম। কিন্তু ওঁর কথা এখনও শেষ হয়নি।

বলছেনআমরা অনেক আলোচনা করে ঠিক করিযে গত সাতজন হেডমাস্টার স্কুলেরই টিচার ছিলেনএবারে বাইরের লোক আনা হোক নাআপনার নাম আমিই দিই। এডুকেশনএক্সপিরিয়েন্সমানসিকতা — সব দিক থেকেই আইডিয়াল হবেন-ই আমার বিশ্বাস।

বললামএবং সেইজন্যই কি আপনি ইন্টার্ভিউ বোর্ডে থাকছেন না?

উনি হেসে মাথা নাড়লেন। না। আমার নিকটাত্মীয় আপনার কম্পিটিটর। তাই।

এবার আমি সত্যিই অবাক হলাম। নিকটাত্মীয়র চেয়ে বেশি আমাকে চাইছেন অ্যাসিস্ট্যান্ট হেডের পোস্টেআশ্চর্যউনি আমার মুখের ভাব দেখলেন না। বলতে থাকলেননিকটাত্মীয় আমার বড়ো মেয়ে। ও-ও এই স্কুলের না। ছাত্রীও নাশিক্ষকও না। এখান থেকে কিছু দূরে আর একটা স্কুলের সিনিয়র টিচার।

বাবা মেয়ের মধ্যে কোনও সমস্যাথাকএত কথায় আমার কী কাজ?


অনুপস্থিত অ্যাসিস্ট্যান্ট হেডমাস্টার বাদে ডিনারে সব টিচারই এসেছিলেন। শুরুতে বেশ ফর্মাল ডিনারের রূপ নিয়ে শুরু হলেওকিছুক্ষণের মধ্যেই বেশ হইচই আমুদে পার্টির আকার নিলকোথা থেকে গিটার বের করে আনলেন আর্ট টিচারগানে গলা মেলালেন অনেকেই। খাবার টেবিলে বসেও এমনই হালকা মেজাজে আলোচনা হচ্ছিলএমন সময় ইংরিজির একজন টিচার — ভদ্রমহিলার নাম মনে নেই — হঠাৎ আমাকে জিজ্ঞেস করে বসলেনআপনি তো স্যার কিছুই বলছেন না। আপনার কি কিছুই জানার নেই আমাদের সম্বন্ধে?

আমি তেমন কিছু না ভেবেই বলেছিলামএকটা কথা দুপুর থেকে মাথায় ঘুরছেজিজ্ঞেসই করলেন যখনবলেই ফেলি। আজ সকালে এখানে আসার পথেই মনে হয়েছিলএকটা ফুল-প্রেমী কমিউনিটিতে ঢুকছি। স্কুলে এসেও দেখলামস্কুলে সকলেই প্রায় বাগান করেন — এবং সবাই প্রায় ফুলের বাগান ভালোবাসেন।

বুঝলাম সবাই মন দিয়ে শুনছেন। বললামকিন্তু একটা কথা বার বার মনে হয়েছে দুপুর থেকে — আমাদের দেশে শীতের একটা প্রধান ফুল হলো গাঁদা। এখানে অনেকই গাঁদা দেখলাম। অজস্র গাঁদাকিন্তু আশ্চর্যগাঁদার সবচেয়ে উজ্জ্বল এবং সবচেয়ে কমন ভ্যারাইটির হলুদ রংটা কোত্থাও দেখলাম না। সকালে পাহাড় বেয়ে ওঠার সময়েও নাআর এত বড়ো স্কুলের এত বাগানেও না...

টেবিলের চারিপাশে সকলেই আমি কথা বলা শুরু করা মাত্র চুপ করে গেছিলেন। সেটাই স্বাভাবিক। আমি অতিথিতার ওপরে আর কিছুদিন পরেই আমি হয়ত অ্যাসিস্ট্যান্ট হেড হবএবং ক্রমে ক্রমে হেডমাস্টারসুতরাং আমি কথা বললে না-শুনবে এমন ক-জনই বা থাকবে?

কিন্তু নৈঃশব্দ্যটা খুব চট করে ভদ্রতা থেকে পিন-ড্রপ হয়ে অস্বস্তিকর হয়ে গেল। ফলে আমার প্রশ্নটাই শেষ হলো না। কেমন থতমত খেয়ে চুপ করে গেলাম।

সকলেই আমার দিকে তাকিয়ে। আমি প্রবল অস্বস্তিতে। এরকম সামান্য একটা প্রশ্নে সবাই কেন এমন চুপ করে যাবে আমার বোধগম্য হচ্ছিল না। নিস্তব্ধতাটা এতক্ষণ ধরে চলছেযে আমার মনে হতে শুরু হয়েছিল আমারই কিছু বলা উচিতকিন্তু কী বলবআমি দুঃখিতআপনাদের অস্বস্তিতে ফেলার উদ্দেশ্য আমার ছিল নানা কি আর কিছু বলা উচিতনা কি কেবলই বিষয়টা বদলে অন্য কিছু বলবএমন সময় আমাকে বাঁচালেন হেডমাস্টার নিজে। বললেনস্যারআই মাস্ট কনগ্র্যাচুলেট ইউ অন ইওর ওয়ান্ডার্ফুল পাওয়ার্স অফ অব্জারভেশন। সত্যিই আমরা কেউ এখানে হলুদ গাঁদা লাগাই না। তবে এ বিষয়টা এখানে আলোচ্য নয়আমি কথা দিচ্ছিএর উত্তর আমি আপনাকে আপনি যাবার আগে দেব।

মুহূর্তে ডিনার টেবিলের থমথমে ভাবটা কেটে গেলসবাই প্রায় একসঙ্গেই নানা বিষয় কথা বলতে শুরু করলএবং আমিও হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম।


যেমন সুমেধা বলেছিলেনআমার অনুরোধ অনুযায়ী সকাল সাড়ে ছটাতেই দরজায় টোকা দিয়ে বেয়ারা বেড টি নিয়ে এল। চা খেয়ে জগিং-এ বেরিয়ে পড়লাম। কালকেই দেখে রেখেছিলাম কোথায় যাব। আধ কিলোমিটার মতো গিয়ে মস্তো লেকটার চারপাশে ঘুরলে কিলোমিটার দুয়েক হয়আন্দাজ করেছিলামএক পাক মেরে হেঁটে ফিরলাম বাড়ি। পকেটে রাখা মোবাইল জানান দিলআমি সবসুদ্ধ তিন কিলোমিটার সাতশো মিটার গিয়েছি। আজকের পক্ষে এ-ই যথেষ্ট।

ভিতরের বসার ঘরের মধ্যে দিয়েই প্রায় যেতে হবেকারণ বাড়িটার এই অংশে কোনও দেওয়াল নেই। হেডমাস্টার আর সুমেধা চা খাচ্ছেন। সাহেবি কায়দায় অভিবাদন জানালাম। ওঁরাও উত্তর দিলেন। হেডমাস্টার বললেনআপনাকে নিয়ে একটু বেরোব। ব্রেকফাস্টের পরেই। আপনার আপত্তি নেই তো?

আমি বললামনানা। অবশ্যই। আমি আটটাতেই আসছি ব্রেকফাস্টের জন্য।

যথাসময়ে হাজির হলাম খাবার ঘরেচান করেদাড়ি কামিয়ে। ব্রেকফাস্ট নিয়ে তৈরি সুমেধা। বললেনআজ আপনার ইন্টার্ভিউকিন্তু সকালেই উনি আপনাকে নিয়ে বেরোবেন।

আমি হেসে বললামতাতে অসুবিধে নেই।

এমন সময়ে হেডমাস্টার এসে পড়ায় সুমেধা আর কিছু বললেন না।

খেয়ে দেয়ে হেডমাস্টার আর সুমেধা আমাকে নিয়ে বেরোলেন। হেডমাস্টার সুমেধার জন্য পেছনের দরজা খুলে ধরেছেন। নিজেই চালাবেনতাই আমি বসলাম ওঁর পাশে। স্কুলের বাইরে যেতে হলো। একটু গিয়েই পাহাড়ের গা বেয়ে একটা রাস্তা চলে গেছে ডানদিকে। পাহাড় বেয়ে নামার রাস্তা দিয়ে না গিয়ে সেই রাস্তায় মোড় নিলেন হেডমাস্টার। বললেনএখানে যদি আসেনতাহলে পাহাড়ে গাড়ি চালানোর লাইসেন্স নিতে হবে।

হেসে বললামআমার মাতৃভাষায় একটা প্রবাদ আছেকবে রাধা নাচবেসাত মণ তেল পুড়বে।

উনিও হাসলেন। বললেনআপনার সম্ভাবনাই বেশি।

কিছুক্ষণ স্কুলের দেওয়াল সঙ্গে চললতারপরে সে রাস্তার সংসর্গ ত্যাগ করে অন্য দিকে ঘুরলরাস্তার দু দিকে আবার বসতবাড়ি। হেডস্যার বললেনখানকার বাসিন্দারাও স্কুলের কর্মচারীবা শিক্ষক ছিলেনরিটায়ার করে এখানেই থেকে গেছেন।

বেশিদূর যেতে হলো না। রাস্তাটা একটা পাহাড়ি বাঁক নিলআর আমার সামনেগাড়ির উইন্ডস্ক্রিন প্রায় পুরোটা জুড়ে দেখলাম একটা বাড়ি। যেমন এই পাহাড়ের সব বাড়ি — তেমনইবাংলোর মতো। তার বাগান বেশি বড়ো নয়কিন্তু প্রায় পুরোটা জুড়ে কেবল হলুদ গাঁদা। বাগানে হলুদ গাঁদাবাংলোর বারান্দায় হলুদ গাঁদাবারান্দার আলসে থেকে ঝুলছে ছোটো ছোটো টবে হলুদ গাঁদা... এত হলুদ গাঁদা আমি একসঙ্গে কখনও দেখিনি। হাজার হাজার ফুল বাড়িটার চতুর্দিকে।

গাড়িটাকে পাহাড়ি রাস্তার মাঝখানেই দাঁড় করিয়ে ইঞ্জিন বন্ধ করে দিলেন হেডমাস্টার। আমি একবার পেছনে ঘুরে বললামরাস্তাটা আটকে দাঁড়ালেন?

উনি বললেনএই রাস্তা এই বাড়িতেই শেষ। এখানে গাড়ি আসবে না।

তারপরে বললেনবলছিলেন নাএখানে কেন হলুদ গাঁদা নেইএই দেখুন তার কারণ।

বলার ভঙ্গীতে কোনও অনুভূতি নেই। কেমন যেন মরা গলায় বললেন কথাগুলো।

এত হাজার হাজার হলুদ গাঁদা একসঙ্গে দেখা সত্যিই এক আশ্চর্য অভিজ্ঞতাকিন্তু আমার মনে হলো আরও কিছু আছে। তা না হলে এ ভাবে আমাকে গাড়ি করে স্বামী-স্ত্রী দুজনে মিলে এই ফুলের বাড়ি দেখাতে আনতেন না।

কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকার পর আমি বুঝলামআমার কিছু জিজ্ঞেস করা উচিত। বললামকিন্তু সারা পাহাড়ের কোনও বাড়িতেএমনকি আপনার স্কুলের বাগানেও যে ফুল নেইএই একটা বাড়িতে সেই ফুল কেন?

ভদ্রলোক বললেনএর পেছনের ঘটনাটা অদ্ভুত। যেন গল্পের বইয়ের কাহিনি। এই বাড়িটা — আপনাকে বলেছিপাহাড়ের সব বাড়ির মতোইএই স্কুলের একজন কর্মচারীর। তিনি শিক্ষক নন। মেইন্টেনেন্স এর স্টাফ। এঞ্জিনিয়ার।

একটু চুপ করে থেকে বললেনএঞ্জিনিয়ারদের এ জমি পাওয়ার কথা নয়কিন্তু ইনি পেলেন কারণ উনি বিয়ে করেছিলেন আমাদের স্কুলেরই এক সিনিয়র শিক্ষকের মেয়েকে। বিয়েতে শিক্ষক রাজি ছিলেন নাকিন্তু তার উত্তরে মেয়ে বলে তাদের আটকানো যাবে না — বিয়ে তারা করবেই। মেয়েটির অনেক গুণ ছিলকিন্তু পড়াশোনায় ছিল দুর্বল। ফলে নিজের ক্ষমতায় কিছু করতে পারবে বলে মা-বাবার আশা ছিল না। ভাবতেনভালো বিয়ে দেবেনমেয়ের সংসারী হবার অনেক গুণই রয়েছে। এবং সেজন্যই তিনি শেষ অবধি নিজের জন্য কিনে রাখা এই জমিটি মেয়ে-জামাইকে দেনযাতে মেয়ে চোখের সামনে থাকতে পারে। এবং বিয়েটা হয়ে যায়।

এবারে পেছন থেকে সুমেধা বললেনএখানে যে যা-ই বলুকএ বিষয়ে সন্দেহ নেই যে স্বামী তাঁর স্ত্রীকে খুবই ভালোবাসতেন। অনেক স্বামী দেখেছি যারা মুখের কথা খসতে না খসতে বউয়ের ইচ্ছাপূরণ করেনকিন্তু ইনি তার এককাঠি ওপরে। বউয়ের মনের কথা পড়ে নিতেন প্রায়।

বি দ্যাট অ্যাজ ইট মেএকটু জোর দিয়েই বললেন হেডমাস্টার। দে ওয়্যার হ্যাপি। সেটাও ফ্যাক্ট। ওই যে বললামমেয়েটার সংসার করার সব গুণই ছিল। আর এঞ্জিনিয়ারও যে স্বামী হবার সব যোগ্যতাই রাখেনসে-ও সন্দেহাতীত।

মেয়েটির খুব বাগান করার সখ ছিল। আবার পেছন থেকে বললেন সুমেধা। আর প্রিয় রং — সে কী ছিল তা নিশ্চয়ই বলে দিতে হবে না আপনাকে। সারা বাগানের সব ফুলের রং ছিল হলুদ। বাড়ির রংও হলুদ। সে এক দেখবার মতো দৃশ্য।

আমি বললামবাড়ির রং তো এখন হলুদ নয়?

হেডমাস্টার বললেনউই আর গেটিং অ্যাহেড অফ আওয়ারসেল্ভ্‌স। বিয়ের প্রথম শীতকালের আগে বউ বলেছিলআই উইশ সারা বাড়ি আর বাগানে শুধু হলুদ ম্যারিগোল্ড থাকবে। ওপর থেকে নিচবারান্দায়বাগানে... কেবল হলুদ ম্যারিগোল্ড। আর প্রেমে পাগল এঞ্জিনিয়ার শহরে গিয়ে ফুলের দোকানির সঙ্গে বোঝাপড়া করে এসেছেযে সে বছর দোকানের সব হলুদ গাঁদার বীজআর কাউকে সে বিক্রি করবে নাসব ও-ই নিয়ে যাবে।

সুমেধা বললেনবেশ ভুল বোঝাবুঝি হয়েছিল। কেউ আর নতুন করে হলুদ গাঁদা কিনতে পারেনি। তবে স্বামী-স্ত্রী সেটা সবাইকে বুঝিয়ে বলেছিল — আর কেউ হলুদ গাঁদা পাবে নাতা ওরা চাইনি। শুধু চেয়েছিলামকটেজটা হলুদ গাঁদায় ভরিয়ে দিতে। সব উদ্বৃত্ত বীজ দিয়ে দিয়েছিল সবাইকে।

হেডমাস্টার বললেনযা-ই হোকসুখেই ছিল দুজনেকিন্তু সে সইল না।

সুমেধা বললেনমেয়েটা মারা গেল।

আমি বললামসে কীকবেকার কথা এ সবকী হয়েছিল?

হেডমাস্টার বললেনবিয়ের বছর তিনেকও হয়নি। একটা ফুটফুটে বাচ্চাও হয়েছে সবে। শীতকাল ছিল। গাঁদাফুল হয়েছে থরে থরে।

সুমেধা বললেনএকটা ফ্রিক অ্যাক্সিডেন্টে। বিশ্রীযন্ত্রণাদায়ক মৃত্যু। এক বছর একা ছিল ছেলেটা। বাবা... প্রতিবেশীরা দেখাশোনা করত। তারপরে আবার বিয়ে করেছে। এখন প্রায় পাঁচ বছর হলো দ্বিতীয় বিয়ের।

কিন্তু এখানে তখন থেকে আর কেউ হলুদ গাঁদাফুল লাগায় না। হলুদ গাঁদা হয় কেবল এই বাড়িতে। আর ওর স্বামী আর দ্বিতীয় স্ত্রী দুজনেই প্রতি শীতে বাড়িটা ওই মেয়েটার স্মৃতিতে হলুদ গাঁদাফুলে ভরিয়ে দেয়আর এই একই কারণে এই পাহাড়ে আর কোথাও আপনি হলুদ গাঁদাফুল দেখতে পাবেন না।

শেষ কথাটা বলে হেডমাস্টার গাড়ি চালু করলেন আবার। বললেনচলুনআলাপ করিয়ে দিই। এখন অবশ্য এঞ্জিনিয়ার নেইস্কুলে মেন্টেনেন্সের কাজে আছেন। তবে গৃহিণী আছেন।

গেট দিয়ে ঢুকে গাড়ি দাঁড়ালআমরা সকলেই নামলাম। ভেতর থেকে বেরিয়ে এল একজন পরিচারিকাবললগুড মর্নিংস্যারম্যাম... মিস আসছেনআপনারা ভিতরে এসে বসুন।

হেডমাস্টার বললেনআমরা বসব না। মিসকে বলোআমার গেস্টকে বাগান দেখাতে এনেছি।

দেখতে দেখতে বেরিয়ে এলেন একজন অতীব সুন্দরী মহিলা। এঁর ছবি আমি দেখেছি হেডমাস্টারের বাড়িতে। আমার সমবয়সী না হলেও বয়স আমার চেয়ে সামান্যই কম। বললেনহ্যালো ড্যাডিহ্যালো মাম্মি... তারপরে আমার দিকে তাকিয়ে বললেনইনিই কী...? বাক্যটা শেষ না করলেও শেষে প্রশ্নবোধক চিহ্নটা বুঝতে অসুবিধে হয় না।

হেডমাস্টার ঘাড় হেলালেন। আমাকে বললেনআপনারা দুজনেই দুজনের কথা জানেন। আপনি যে ইন্টার্ভিউয়ে আজ বসবেনসেই পোস্টের জন্য ইনিই আপনার কম্পিটিটর — আমার বড়ো মেয়েপুষ্পা। পুষ্পাকে আমার নাম বললেন। পুষ্পা এখানকার সাহেবি দস্তুর মতো হ্যান্ডশেক করলেননমস্কার নয়।

পুষ্পা বললেনআপনারা ভেতরে আসবেনবলে একটু ভেতরের দিকে তাকিয়ে বললেনহি হ্যাজ গন টু ওয়ার্ক।

হেডমাস্টার ঘাড় নেড়ে বললেনআজ নাবলে আমার দিকে দেখিয়ে বললেনআজ ওঁর ইন্টার্ভিউ। তাই আমি চাই না উনি ক্লান্ত হয়ে পড়ুন। ছেলে কই?

যেন এই প্রশ্নটার জন্যই অপেক্ষা করছিল এমনভাবে প্রায় ভেতর থেকে ছুটে বেরিয়ে এল একটি বছর ছয় সাতেকের ছেলে। গ্র্যান্ডপাগ্র্যানি... দুজনকে একে একে জড়িয়ে ধরে ছেলেটি বললওন্ট ইউ কাম ইন?

পুষ্পা ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে বললেনগ্র্যান্ডপা আর গ্র্যানির সঙ্গে গেস্ট আছেসান্‌। বলে আমার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন। আমরাও করমর্দন করলাম। তারপরে আমি পুষ্পাকে শুভেচ্ছা জানালামজানতে চাইলাম আজই ওঁরও ইন্টার্ভিউ কি নাউনি বললেন নাআগামী রবিবার। তারপরে উনি আমাকে আজকের জন্য শুভেচ্ছে জানালেনএবং আমরা আবার গাড়িতে উঠে ফিরে এলাম হেডমাস্টারের বাড়িতে।

এ বিষয়ে সারাদিন আলোক বা সুমেধা কিছু বলেনওনিবা আমিও কোনও প্রশ্ন করিনি। শুধু ভেবেছিমেয়ের সঙ্গে হেডমাস্টারের কোনও মনোমালিন্য দেখা গেল না। তবে তিনি কেন চান না মেয়ে অ্যাসিস্ট্যান্ট হেড পদে আসুন?


সারাদিনের শেষে হেডমাস্টার আমাকে বাস-স্টেশনে নিয়ে যেতে পারলেন না বলে অনেক দুঃখ প্রকাশ করলেন। বললেনযে দুর্ঘটনার ফলে একজন ছাত্রের পা ভেঙেছেএবং আরও দুজন সলিল সমাধি হাত থেকে অল্পের জন্য বেঁচেছেতারই তদন্তে আসবেন স্থানীয় থানার ও-সি।

বুঝতেই পারছেনসম্পন্ন এবং ক্ষমতাবান বাবা মায়ের ছেলে সব।

মাথা নাড়লাম। আমি যেখানে কাজ করি সেখানেও ছবিটা অনেকটা একতবে এতটা নয়। তফাৎ কেবল ডিগ্রির। হেডমাস্টার বললেনআমি চেয়েছিলামআমিই আপনাকে আবার বাস স্টেশনে নামিয়ে আসব। কিন্তু তা হবে নাএবং বাকি সব সিনিয়র টিচারদেরও পুলিশের জন্য অপেক্ষায় থাকতে হবে। তবে আপনি ভাববেন নাআপনাকে নিয়ে যাবার জন্য আমাদের আর একজন সিনিয়র টিচার প্রস্তুত। আর্ট টিচার অভিষেক — আপনার সঙ্গে দেখা হয়েছেওই যিনি গিটার বাজালেন... আপনাকে ড্রাইভারের সঙ্গে পাঠাব না।

আমি হাসলাম। ড্রাইভার হয়ত বেশি নিরাপদ হততা বললাম না।

অবশ্য চিন্তার কারণ ছিল না। হেডমাস্টারের মতো অভিষেকেরও হাত গাড়ি চালানোয় পাকাযদিও গাড়িটা একটু পুরোনোআর পেছনের সিটে নানা অপ্রয়োজনীয় জিনিসের সম্ভার। আমাকে তাকাতে দেখে বললেনআমার গাড়িতে পেছনের সিটের দিকে তাকানো বারণ।

আমি হেসে আশ্বস্ত করলামবললামনিজে গাড়ি চালালে পেছনের সিটটা ক্রমে গুদামঘরে পরিণত হয়।

উনিও হাসলেন। বললেনসে হয়ত আপনার গাড়ি। আমারটাকে গার্বেজ ডাম্প... আস্তাকুঁড় বলুন।

পথে চলতে চলতে কী ভাবে আলোচনাটা শুরু হয়েছিল মনে নেইতবে এখন মনে হচ্ছেউনিই বলেছিলেনহলুদ গাঁদার ফুল দেখলেন?

বলেছিলামদেখেছি। সত্যিই দুটো ব্যাপারই মনে রাখার মতো। এক তো অত হলুদ গাঁদা একসঙ্গে আর দুইএকটা গোটা কমিউনিটি কী ভাবে একজনকে মনে রেখেছেতার স্মৃতিকে শ্রদ্ধা জানাচ্ছে হলুদ গাঁদার বাগান না করে।

ঘাড় নাড়লেন আর্ট টিচার। বললেনআসলে কী জানেনপুরো কমিউনিটিটাই হেডমাস্টারকে খুব শ্রদ্ধা করে। শুধু তাই নয়সুমেধাও আমাদের সকলের অতি প্রিয়। মেয়েদুটোকে আমরা জন্মাতে না দেখলেও বড়ো হতে দেখেছি।

সন্ধে হয়ে এসেছেএবং সম্পূর্ণ মনোযোগ রাস্তায়তাই আমার মুখের ভাবের সামান্য পরিবর্তনটুকু ধরতে পারলেন নাবলে চললেনপ্রীতি পড়াশোনায় ভালো ছিল না হয়তকিন্তু বাকি সব কিছু — গানের গলাবাদ্যযন্ত্র বাজানোছবি আঁকারান্নাবাগান করা — এককথায় যা কিছুতে মানুষের সৌন্দর্যবোধ লাগেসবেতেই ও ছিল এক নম্বর।

অন্ধকার হয়ে এসেছেকিন্তু এখনও হেডলাইট জ্বালানোর মতো অন্ধকার নয়গাড়ির সামনের আলো মৃদু হয়ে জ্বলে রয়েছেস্বাভাবিকভাবেই গতি মন্থরতর হয়েছে।

অভিষেক বললেনদুই বোনের একজনও কিন্তু বয়সকালে বিয়ে করতে চায়নি। তাই যখন ছোটো বোন এই ছেলেটির প্রেমে পড়লতখন আমরা সবাই খুব অবাক হয়েছিলাম। অনেকেই প্রীতিকে বারণ করেছিল। বলতে দ্বিধা নেইআমিও করেছিলাম।

আমি এবারে আর থামতে না পেরে জিজ্ঞেস করেই ফেললামকিন্তু আপত্তির কারণ কী ছিলএঞ্জিনিয়ার ছেলেচাকরিও করে এই স্কুলেই...

এক লহমা আমাকে দেখলেন অভিষেক। তারপরে বললেনও। হেডমাস্টার সবটা বলেননি তাহলে। ওঃ...

কিছুক্ষণ চুপচাপ গাড়ি চললতারপরে বললেনএতটা বলেছিবাকিটাও বলি তাহলে। ছেলেটা এঞ্জিনিয়ার নয়। মিস্তিরি। এঞ্জিনিয়ার হবার কোনও যোগ্যতাই ওর নেই। আমাদের সবার ধারণা ছিলছেলেটা মেয়েটাকে ফাঁসিয়েছে ওর বাবার ধনসম্পত্তির লোভে।

আমি বললামএকজন স্কুলটিচারের কী আর ধনসম্পত্তি থাকতে পারে?

হেসে অভিষেক বললেনতাহলেই বুঝুন তার আর্থিক অবস্থা।

তারপরে একটু স্পিড বাড়িয়ে সামনের ট্রাকটাকে ওভারটেক করে বললেনতবে পায়নি কম। হেডমাস্টারের জমি পেয়েছেনিজের সঞ্চয় দিয়ে হেডমাস্টার বাড়ি করে দিয়েছেন... খারাপ কিবলুনসামান্য মাইনের পাম্পের মিস্তিরির পক্ষে?

আমি কিছু বললাম না।

উনি বলে চললেনতবে কী জানেনএত কিছু দিয়েছিলেন হেডমাস্টারকিন্তু মেনে নেননি জামাইকে। শেষে নাতির জন্মের পরে একটু নরম হয়েছিলেন। তাও বোঝেনই তো অবস্থা। একটা কমন পারিবারিক অনুষ্ঠানে দুজনকে ডাকা যেত না। এ কী করে হতে পারেযে এই স্কুলেরই একজন মিস্তিরি এই স্কুলের সব সিনিয়র টিচারদের সঙ্গে একসঙ্গে ড্রিঙ্ক করছেবা কোমর জড়িয়ে নাচছে?

আমি মাথা নাড়লাম। নিজের আত্মীয় স্বজনের মধ্যে এরকম আশ্চর্য অবস্থা আমি দেখেছি বলে জানি।

বললামতাও তো মিঃ আলোক বা প্রীতির স্বামীর আত্মীয়স্বজন এখানে থাকেন না। থাকলে আরও সমস্যা হত।

নিঃসন্দেহেবললেন অভিষেক। তারপরে বললেনতবে হেডমাস্টার পরের দিকে অনেকটাই নরম হয়েছিলেন। বুঝেছিলেনছেলেটা ওঁর মেয়েকে সত্যিই খুব ভালোবাসে। ওকে সব দিক থেকে সুখী করতে চায়। মাঝের থেকে সব ওলটপালট করে দিল অ্যাক্সিডেন্টটা।

বললামআমি অবশ্য সবটাই বুঝতে পেরেছিলামওঁরা আমাকে না বললেও। হেডমাস্টারের ভেতরের বসার ঘরের ম্যান্টেলপিসে দুই মেয়েরই ছবি রয়েছে সদ্যোজাত নাতির ছবি রয়েছে প্রথমে ছোটো মেয়ের কোলেআর পরে বড়ো মেয়ের সঙ্গে। তখন ছেলেটার বয়স বেড়েছে। কিন্তু সবাই বলছেন মেয়েটার মৃত্যু হয়েছিল অ্যাক্সিডেন্টে। আমি ওঁদের জিজ্ঞেস করতে পারিনি কী অ্যাক্সিডেন্ট।

অভিষেক বললেনকোথা থেকে একটা ষাঁড় এসে খোলা গেট দিয়ে ঢুকে মনের আনন্দে গাঁদাফুল খেতে শুরু করেছিল। হাজবেন্ড সবে বেরিয়েছে কাজে — মানে স্কুলেই। মেয়েটা ওকে টা টা বলে ভেতরে গিয়েছিলকাজের মেয়ে চেঁচিয়ে বলেছে গরুতে ফুল খাচ্ছে।

গরু ছিল নাছিল ষাঁড়। সাধের ফুল খেয়ে নিচ্ছে বলে মেয়েটা বেরিয়ে এসে তাড়াতে গেছেষাঁড়টা পাত্তাও দিচ্ছে না। মেয়েটা সাত পাঁচ না ভেবে পিঠে কিল মেরেছেতারপরে গেছে শিং ধরে সরিয়ে দিতে। ষাঁড়টাও সঙ্গে সঙ্গে মেরেছে গুঁতো। শিংটা সোজা পেটে ঢুকে গেছে।

ইন ফ্যাক্ট শিঙের সঙ্গে আটকে গেছিলষাঁড়টা ঝাঁকানি দিয়ে ফেলে দিয়ে চলে গেছিল।

কাজের মেয়েটা গিয়ে দেখে চতুর্দিক রক্তে ভেসে যাচ্ছে। কোনও রকমে তুলে বাড়িতে এনেস্কুলে ফোন করে খবর দিয়েছিল। ওর স্বামী পড়িমরি করে ফিরলকিন্তু ততক্ষণে দেরি হয়ে গিয়েছে। এখান থেকে হাসপাতালও প্রায় ঘণ্টাখানেক দূরে। শিং লিভারে ঢুকে গিয়েছিল।

আমি বললামকিন্তু তারপরে বড়ো মেয়েও কেন ওকেই বিয়ে করতে গেল-ও কি ছেলেটার প্রেমে পড়েছিল নাকিএমনটা তো জানা-ই আছেদুই বোনই একই ছেলেকে ভালোবাসে।

মাথা নাড়লেন অভিষেক। বললেনএই ব্যাপারটা আমরা কেউ-ই ঠিকমতো জানি না। এতটুকু জানিযে প্রীতি মারা যাবার পরে হেডমাস্টার চেয়েছিলেন বাচ্চাটাকে মানুষ করবেন। অনেকবার জামাইকে বলেছিলেনদত্তক নেবেন। জামাই রাজি হয়নি। পাড়ার লোকের বাড়িতে রেখে কাজে আসত। সে এক সময় গেছে। শেষে হঠাৎ একদিন পুষ্পা বললওকেই বিয়ে করতে চায়। সেই নিয়ে আর এক তাইরে-নাইরে। আমরা অনেকেই ভেবেছিলামপুষ্পা কেবলমাত্র বাচ্চাটার জন্যই বিয়েটা করতে চেয়েছে। কিন্তু এখন আমরা কেউ অত শিওর নই। কারণ পুষ্পাও লুকস ভেরি হ্যাপি। দে আর আ হ্যাপি থ্রি-সাম!

বললামপুষ্পারও বোনের মতো হলুদ ফুলেবিশেষ করে গাঁদায় ইন্টারেস্ট — সেটাও আশ্চর্য।

এবারে না সূচক মাথা নাড়লেন অভিষেক। বললেননা... মানেওরা দুই বোনেরই এস্থেটিক সেন্স খুব বেশিতবে হলুদ গাঁদা কেবল প্রীতিই চাইত। পুষ্পা নয়। হলুদ গাঁদা কেবল প্রীতির প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য।


উপসংহার

প্রায় মাসখানেক পরে স্কুলের বোর্ডের তরফে ইমেইল এল। খুব বিনম্র ভাষায় লেখাযে সবরকম যোগ্যতা সত্ত্বেও আমাকে সহকারী প্রধান শিক্ষকের পদে বহাল করা গেল নাএ জন্য তাঁরা দুঃখিত। তবেভবিষ্যতে আমার যোগ্য কোনও পদ খালি হলে তাঁরা আমাকে জানাবেনএবং তখন যদি আমি আবার ইন্টার্ভিউ দিতে চাইতাঁরা যারপরনাই ধন্য হবেনইত্যাদি।

হেডমাস্টার চিত্রেশ অলোক আর একটু খোলসা করে লিখলেন কয়েক দিন পরে। তিনি জোরের সঙ্গেই বার বার বোর্ডের কাছে আমার নাম সুপারিশ করেছিলেন। বোর্ড প্রথম থেকেই ঘরের মেয়ের দিকে হেলে ছিলকিন্তু হেডমাস্টারের জোরাজুরিতেই আমাকে ইন্টার্ভিউয়ের জন্য ডাকা হয়। ডেকে এনে আমাকে চাকরি না দেওয়ার জন্য আমার যে হয়রানি হলো তার জন্য নিজেকেই দায়ী করে আলোক ক্ষমা চেয়েছেন।

বহুদিন পরে দেখা হয়েছিল পুষ্পা চিত্রেশের সঙ্গে। দুবাই শহরেশিক্ষকদের কনভেনশনে। দেখে আমিও চিনতে পারিনিউনিও না। নিমন্ত্রিতদের তালিকায় নাম দেখে এগিয়ে গিয়ে আলাপ করেছিলাম। পুষ্পার মনে পড়েছিল। বলেছিলেনবাবা মা ভালো আছেন। রিটায়ারমেন্টের পরে দেশে ফিরে গেছেন। ওখানে যৌথ পরিবারে আছেন। রাতে ডিনারে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন স্বামী আর চোদ্দ বছরের ছেলের সঙ্গে।

বলেছিলেনস্বামী এঞ্জিনিয়ার। ওঁদের স্কুলেই কাজ করেন। ছেলের কাছে জানতে চেয়েছিলামতুমি কোন স্কুলে পড়োমায়ের স্কুলে?

ছেলে মাথা নেড়েছিল। বলেছিলনা। মা আগে যে স্কুলে পড়াতসেই স্কুলে।

পুষ্পা বলেছিলেনওর স্কুল বদলাইনি। আমার স্কুল তো আপনি দেখেছেন। বড্ড নাক-উঁচু ভাব ছাত্রদের। যেখানে আছেসেখানে থাকলে অনেক মাটির কাছাকাছি থাকতে পারবে। আমি নিজেও ওই নাক-উঁচু স্কুলেরই ছাত্রী কি নাতাই জানি।

জানতে চাইলামহলুদ গাঁদাফুল এখনও হয়শীতকালে?

বললেনআসুন একবার ফেব্রুয়ারিতে। দেখে যান নিজের চোখে। উই উইল বি হ্যাপি ইফ ইউ কাম।