১
অনেক দিন আগে, কোনও এক দূর দেশের জঙ্গলে অনেক প্রাণী থাকত। তাদের মধ্যে ছিল এক দল কৃষ্ণসার মৃগ। মৃগ মানে কিন্তু হরিণ না। ওরা হরিণের মত দেখতে, কিন্তু অন্য প্রাণী। হরিণের মত দলবেঁধে জঙ্গলে থাকত।
সেই দলে ছিল এক মা আর তার দুষ্টু বাচ্চা ছেলে। বাচ্চাটা খুবই ছোটো। কিচ্ছু জানে না। খালি মায়ের সঙ্গে দৌড়য়, আর মাকে ছেড়ে এদিক ওদিক ছুটে বেড়ায়। এটা সেটা দেখে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। বড়োরা শেখানোর চেষ্টা করে। বলে দেয় কোন ঘাস খেতে নরম আর মিষ্টি। বলে দেয় কোন কোন ঝোপ থেকে দূরে থাকতে হয় — কারণ তার পাতা তেতো। ওকে শিখিয়ে দেয় কোন গাছে কোন সময় ফল পাকে। শেখায় কোথায় কোথায় বিপদ থাকতে পারে। কোথায় শেয়াল লুকিয়ে থাকে, নেকড়ে কী ভাবে শিকার করে, সাবধান করে অন্য বিপদ থেকে, বলে দেয়, কখনও হায়নাও আসতে পারে। নদীর ধারে দেখিয়ে দেয় কী ভাবে কুমীররা জলে ভেসে থাকে যেন গাছের গুঁড়ি। যাতে ওদের দল জল খেতে এলেই পায়ে কামড় দিয়ে টেনে নিয়ে যেতে পারে জলের নিচে।
ওকে ওরা শেখাতো একরকম দু’পেয়ে প্রাণীর কথাও। তারা পোশাক পরে। তারা রাতের আঁধারে আসে। তাদের হাতে থাকে সূর্যের চেয়েও জোরালো আলো। তাদের গাড়ি দৌড়োয় সবেচেয়ে জোরে —তাদের নাম মানুষ। ওরা বাচ্চা কৃষ্ণসারকে শেখাত, সবসময় মায়ের কাছে কাছে থাকবে। আগে শিখে নাও, কোনটা ভালো, কোনটা খারাপ। তার পরে এদিক ওদিক দৌড়বে।
বাচ্চাটা কথা শুনত না। দুষ্টু তো। ভাবত আমি খুব চালাক। ছুটে চলে যেত মায়ের কাছ থেকে। দেখতে যেত ওই গাছের পিছনে কী আছে? এই ঝোপটার ভেতরে? মাকে সব ফেলে দৌড়তে হত পিছনে। পাছে কোনও বিপদ আসে!
অন্য বড়ো কৃষ্ণসারেরা ওকে বোঝানোর চেষ্টা করত।বলত, “খোকা, যেটা দেখতে ভাল, সেটাই দেখতে কাছে যেও না। বড়ো গাছের কাছে যাবার আগে দেখে নিও ডালের ওপর চিতাবাঘ লুকিয়ে আছে কি না। ছুটে গেছিলে নদীতে জল খেতে— যদি ওখানে একটা কুমীর থাকত? গাড়ির শব্দ শুনলেই লুকিয়ে পড়বে। মানুষের হাতে অনেক সময় বন্দুক থাকে। দূর থেকে গুলি করে মেরে ফেলতে পারে আমাদের।”
বাচ্চাটা শুনতই না।
এক দিন একটা খরগোশ জিজ্ঞেস করল, “এই, মায়ের থেকে এত দূরে কী করছিস রে?”
বাচ্চা কৃষ্ণসার উলটে জানতে চাইল, “সারাক্ষণ মায়ের সঙ্গে থাকতে হবে কেন?”
খরগোশ বলল, “ছোটো না তুই? কোনটা ভালো আর কোনটা বিপদজনক তুই জানিস?”
বাচ্চাটা বুক ফুলিয়ে বলল, “জানি। আমি স-অ-অ-ব জানি।”
খরগোশটা বলল, “তবেই হয়েছে। এক দিন এমন বিপদে পড়বি...”
“কাঁচকলা,” বলে বাচ্চাটা ফিরে গেল মায়ের কাছে। মা তখন ওকে হন্যে হয়ে চারিদিকে খুঁজছে।
“কোথায় গিয়েছিলি?”
“ও-ও-ও-ই, খরগোশটার সঙ্গে কথা বলছিলাম,” বলল বাচ্চা কৃষ্ণসার।
“এক দিন টের পাবে,” বলল আর এক কৃষ্ণসার মা।
ওর মা বলত, “খোকা, চোখ কান খুলে চলবি। সবসময় দেখবি অন্যরা কী করছে। অন্য জন্তুরাও বিপদ এলে বলে দেয়। বাঁদররা বাঘ দেখলে দূর থেকে চেঁচামেচি লাগিয়ে দেয়। পাখিরাও বলে দেয় কোন দিকে বাঘ যাচ্ছে। ওদের দিকে লক্ষ রাখলে দূর থেকে বিপদ বুঝে পালাতে পারবি।”
বাচ্চাটা পাত্তাই দিত না। কারওর কোনও কথাই শুনত না। বড়োরা বিপদের কথা বলত বলে হাসত। সবাই ওকে নিয়ে দুশ্চিন্তা করত।
বলত, “এক দিন যখন বিপদ এসে পড়বে, পালাবার পথ পাবে না বাছাধন।”
২
এক দিন সক্কালবেলা ওরা ঘুম থেকে উঠে দেখল আকাশে ঘন মেঘ। সূর্যের দেখা নেই। গ্রীষ্মকাল শেষ হয়েছে। সবাই আশা করছে এই বার বর্ষা আসবে, বৃষ্টির জল পেয়ে আবার সবুজ ঘাস হবে, গাছে নতুন কচি পাতা হবে। কৃষ্ণসারেরা সবাই আকাশে মুখ তুলে বৃষ্টির গন্ধের আশায় নাক টানছে,এমন সময় এক দল হনুমান ছুটে এল গাছ বেয়ে।
বলল, “সাবধান, এক গাড়ি মানুষ এসেছে জঙ্গলে। ওদের হাতে বন্দুক। ওরা শিকারে এসেছে। সবাই সাবধানে থাকবে।”
সবাই সতর্ক হয়ে গেল। কিন্তু বাচ্চা কৃষ্ণসার কারওর কথা শোনে না। খালি মায়ের সঙ্গে লুকোচুরি খেলছে সারা দিন।
সবাই ডেকে বলছে, “মায়ের কাছে থাক।”
ও ফুঃ ফুঃ করে বলছে, “কোনও চিন্তা নেই। বাঁদররা ঠিক বলে দেবে।”
সারা দিন কেটে গেল। কোনও বিপদ হল না। রাতে কৃষ্ণসারের দল ঠিক করল, রাস্তা থেকে দূরে গিয়ে ঘুমোবে। যাতে গাড়ি করে মানুষ এলেও ওদের দেখতে না পায়।
“আমার পাশে থাকিস,” মা ডেকে বলল বাচ্চা কৃষ্ণসারকে।
বাচ্চা বলল, “হ্যাঁ, মা।”
সূর্য ডুবে গেল। অন্ধকারহয়ে গেল জঙ্গল। মেঘে ঢাকা আকাশ, চাঁদও দেখা যায় না, তারাও না। একে একে সব্বাই ঘুমিয়ে পড়ল। কেবল বাচ্চা কৃষ্ণসার জেগে। ওর মনে কোনও ভয় নেই। ও ভাবছে, হনুমানরা নিশ্চয়ই বাজে কথা বলেছে। কেউ তো আসেনি শিকার করতে! মা ঘুমিয়ে পড়ার পর ও চুপিসাড়ে উঠে দেখতে গেল, দূরের ওই ঝোপে টিপ-টিপ করে কিসের আলো জ্বলছে নিভছে?
জোনাকিরা গেল রেগে।
“দেখ, ওই বোকার হদ্দ কৃষ্ণসারটা মায়ের থেকে কতো দূরে চলে এসেছে — চল আমরা আরও দূরে চলে যাই। তাহলে ও মায়ের কাছে ফিরে যাবে।”
ওরা উড়ে গেল দূরে। কিন্তু বাচ্চাটা মায়ের কাছে ফিরে গেল না। ও-ও চলল পিছনে পিছনে। ভাবছে, “ওরা আলোটা জ্বালায় কী করে?” এমনি করে চলে গেল বেশ খানিকটা দূরে।
হঠাৎ, রাত কাঁপিয়ে ডেকে উঠল কোটরে প্যাঁচা। “ওঠো, ওঠো সবাই। দূর থেকে গাড়ি আসছে, আমি শুনতে পাচ্ছি। গাছের ফাঁকে আলো দেখছি। ওঠো, ওঠো, পালাও সবাই, পালাও! মানুষ আসছে, শিকার করতে!”
ঘুমন্ত সব প্রাণী জেগে উঠে আস্তে আস্তে, নিঃশব্দে জঙ্গলের আরও ভিতরে চলে যেতে শুরু করল। কৃষ্ণসার মৃগরাও উঠে পায়ে পায়ে মিলিয়ে যেতে শুরু করল জঙ্গলের সঙ্গে। কিন্তু মা কৃষ্ণসার নড়ল না।
অন্যরা ডাকল, “এস, চলো...”
“কী করে যাব? আমার ছেলে কোথায় গেল?”
কোটরে প্যাঁচা বলল, “তোমার ছেলে ওই রাস্তার পাশেই দাঁড়িয়ে আছে। তাড়াতাড়ি ডাকো — ওই রাস্তাতেই গাড়ি আসছে।”
মা চেঁচিয়ে ডাকল, “খোকা-আ-আ-আ...”
এতক্ষণ বাচ্চাটা ওখানেই দাঁড়িয়ে ছিল। ভয়ে নিশ্চল, কোনদিকে যাবে বুঝতে পারছিল না। মার ডাক শুনে দৌড়তে যাবে, ঠিক তখনই গাড়িটা রাস্তার বাঁক ঘুরল। গাড়ির আলোয় স্পষ্ট দেখা গেল ওদের।
“কৃষ্ণসার একটা,” কে যেন হেঁকে বলল।
আর একটা গলা এল, “দাঁড়াও, ওটা বাচ্চা। ওই দেখ, পিছনেই ওর মা।”
মা ততোক্ষণে বাচ্চার দিকে দৌড়তে শুরু করেছে। গাড়ি থেকে একটা দড়াম শব্দ হল আর মা মাটিতে পড়ে গেল। বাচ্চা দৌড়ে গেল মায়ের কাছে।
“মা, মা, ওঠো, চলো, পালাই!”
কিন্তু মা কৃষ্ণসার আর নড়ল না। বাচ্চাটা নাক দিয়ে মাকে ঠেললো। নাকে এলো রক্তের গন্ধ। ভয়ে সিঁটিয়ে গেল।
গাছ থেকে প্যাঁচাটা ডেকে বলল, “তোর মা মরে গেছে। এবার তোর পালা। প্রাণে বাঁচতে চাস তো ভাগ!”
বাচ্চাটা জিজ্ঞেস করল, “মরে গেছে? মরে গেছে কি?”
প্যাঁচাটা বকুনি দিয়ে বলল, “বোকা ছেলে, আগে পালা, প্রশ্ন করার সময় পরে পাবি।”
কিন্তু পালানো হল না। উজ্জ্বল আলোটায় চোখ ধাঁধিয়ে গেল। কিছুই দেখতে পেল না, শুধু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে থর থর করে ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে শুনল খচ্ খচ্ খচ্ খচ্ করে পায়ের শব্দ এগিয়ে আসছে ওর দিকে।
তার পরে একটা গলা শুনল আবার। মানুষের কথা।
“এটা নিশ্চয়ই ওই মা’টার বাচ্চা। তুমি মরা মাকে নিয়ে যাও। ছাল ছাড়িয়ে বসার ঘরে সাজাবে। আমি এটা নিচ্ছি। পুষব।”
- Left
- Centre
- Right
Remove
লোকটা বাচ্চাটাকে দু’হাতে তুলে নিজের কোটের ভেতর ঢুকিয়ে নিল। অন্যরা ওর মাকে ধরাধরি করে নিয়ে গিয়ে তুলল গাড়িতে। তার পরে চলে গেল জঙ্গলের অন্য দিকে। আরও প্রাণী শিকার করতে।
লুকোনো সব জন্তুরা বেরিয়ে এল একে একে।
বলল, “সেই আমাদের কথা না শুনে নিজেও বিপদে পড়ল, মাকেও বিপদে ফেলল।” নিজেদের বাচ্চাদের দিকে তাকিয়ে বলল, “বুঝলে এখন, মা-বাবার কথা না শুনলে কী হয়?”
৩
লোকটা বাচ্চাটাকে নিয়ে গেল শহরে ওর বাড়িতে। ওর বাড়ির ছাদে সারি সারি অনেক খাঁচা। তাতে নানা পশু পাখি। লোকটা জঙ্গলে গিয়ে কোনও প্রাণী বা পাখি জীবন্ত পেলে ধরে নিয়ে আসত, খাঁচায় রাখত, কিন্তু দেখাশোনা করত না।
কৃষ্ণসারেরও ওই দশা হল। লোকটা ওকে একটা খাঁচায় ঢুকিয়ে দিয়ে চলে গেল। চাকরদের বলল খেতে দিতে। চাকররা জানত বাবু আর ওকে দেখতেও আসবে না। ফলে ওরাও ভালো করে দেখাশোনা করতো না।
দিন কাটে, বাচ্চাটা খেতে পায় সামান্য, বাড়ে না ভাল করে। কিন্তু তাও দেখতে দেখতে খাঁচাটার চেয়ে বড়ো হয়ে গেল। আর হাঁটতে চলতে পারে না ওটার মধ্যে। আর কিছু দিন পরে দাঁড়াতেও পারে না। বসে বসেই খায়, বসে বসেই হিসি করতে হয়। কেউ পরিষ্কার করতে আসে না। লোমে, চামড়ায় নোংরা মাখামাখি হতে থাকে। চামড়ায় অসুখ হয়। লোম খসে পড়ে, চামড়া থেকে রক্ত ঝরে। কেউ মাথাই ঘামায় না। চাকররাও না, আর লোকটাও নয়। বাচ্চাটা বসে বসে ভাবে, এবার ও-ও বুঝি ওর মায়ের মত একদিন মরেই যাবে।
কিন্তু মরল না। এক দিন ভোরবেলা, তখনও বাড়িতে কেউ ঘুম থেকে ওঠেনি, অনেক লোক এসে দরজায় ধাক্কা দিল। ওরা কেউ বনদপ্তরের অফিসার। কেউ বা পুলিশ। পাশের বাড়ির একটা ছেলে দেখেছিল এ বাড়ির ছাদে অনেকগুলো খাঁচা, তাতে সারি সারি বন্যপ্রাণী। ছেলেটা জানত যে সেটা বে-আইনি। তাই ফোন করে বনদপ্তরকে জানিয়েছিল ওদের কথা।
কাজের লোক দরজা খুলল।
পুলিশ বলল, “তোমার বাবু কোথায়?”
চাকর ভয়ে পেয়ে বলল, “বাবু ঘুমোচ্ছে।”
পুলিশ বলল, “ডাকো তাকে।”
লোকটা এল, চোখে ঘুম, চুল উস্কোখুস্কো। পুলিশ জিজ্ঞেস করল, “আপনার বাড়িতে বন্যপ্রাণী আছে?”
লোকটা মিথ্যে করে বলল, “কী? না, না! কই, না তো!”
বনদপ্তরের অফিসার বলল, “আমরা খুঁজে দেখব।”
লোকটা এবার আরও ভয় পেল। বলল, “না না, তার দরকার নেই। আমি বলছি তো, কোনও বন্যপ্রাণী-টানি কিচ্ছু নেই।”
পুলিশ বলল, “তবু আমরা খুঁজে দেখব। আপনিও আসুন আমাদের সঙ্গে। নইলে যদি পালিয়ে যান!”
বাধ্য হয়ে লোকটা গেল পুলিশের সঙ্গে। বলল, “আমি দাঁত মেজে আসি?”
পুলিশ মাথা নাড়ল। দাঁতও মাজতে দিল না।
সব ঘর ঘোরা হয়ে গেলে লোকটা বলল, “দেখলেন? কিছুই নেই।”
পুলিশ বলল, “ওই সিঁড়ির ওপরে কী?”
লোকটা বলল, “কিছুই না। শুধু চিলেকোঠা, আর ছাদ। ওখানে গিয়ে লাভ নেই।”
বনদপ্তরের অফিসার বলল, “লাভ আছে বইকি! সারা বাড়িই খুঁজতে হবে না?”
এই শুনে লোকটা বুঝল আর লাভ নেই। পুলিশ ছাদের দরজা খুললেই সব ধরা পড়ে যাবে। এক লাফে সিঁড়ি দিয়ে নেমে পালালো। কিন্তু সিঁড়ির নিচে আরও অনেক পুলিশ দাঁড়িয়ে ছিল। খপ্ করে ধরে ফেলল ওকে।
পুলিশ বলল, “তার মানেই ছাদে কিছু আছে। চল, দেখা যাক।”
ছাদের দরজা খুলেই দেখা গেল এক ভয়ানক দৃশ্য।
সারি সারি খাঁচা। তাতে অসুস্থ, প্রায় মরে যাওয়া সব প্রাণী। কৃষ্ণসারের বাচ্চাটাও তাদের মধ্যে রয়েছে। এতই দুর্বল, এতই অসুস্থ, যে বেঁচে আছে না মরে গেছে বোঝাই যাচ্ছে না। অনেকক্ষণ ধরে দেখে তবে বনদপ্তরের অফিসাররা বুঝল, না —বেঁচে আছে, নিঃশ্বাস পড়ছে।
খাঁচা খুলে খুলে সবকটা পশু পাখিকে বের করল অফিসাররা। সব্বাই অসুস্থ, দুর্বল। বাড়ির সবাইকে ধরে নিয়ে গেল পুলিশ। লোকটাকে নিয়ে গেল বন্যপ্রাণীদের খাঁচায় বন্দী করে রাখার জন্য। ওর চাকরবাকরদের নিয়ে গেল প্রাণীদের দেখাশোনা না করার জন্য। বাড়ির অন্য সবাইকে নিয়ে গেল ওদের সাহায্য করার জন্য। আর ওই পাশের বাড়ির সাহসী ছেলেটা, যে বনদপ্তরকে খবর দিয়েছিল, তাকে পুরষ্কার দিল ওরা।
সব অসুস্থ জীবগুলোকে ওরা নিয়ে গেল পশু হাসপাতালে। সেখানে পশুপাখিদের জন্য ডাক্তার রয়েছে — তাদের বলে ভেটেরিনারি ডাক্তার। তারা দেখেই বুঝতে পারে পশুপাখিদের কোথায় কষ্ট হচ্ছে। ওরা তো মানুষের মতো বলতে পারে না, কোথায় ব্যথা করছে!
কৃষ্ণসারের অবস্থা শোচনীয়। তার মানে খুবই খারাপ। বহু দিন দাঁড়াতে না পেরে ওর পা একেবারে দুর্বল হয়ে গেছে। উঠতে গেলেই থরথর করে কাঁপে, আবার বসে পড়তে হয়। সারা গায়ে ঘা, তা থেকে রক্ত পড়ছে। গোছা গোছা লোম খসে খসে পড়ছে। ভেটেরিনারি ডাক্তার দেখে ভীষণ রেগে গেল। বলল, “এমন নিষ্ঠুর মানুষের ভীষণ সাজা হওয়া উচিত।”
লোকটাকে পুলিশ আদালতে নিয়ে গেল। কোর্টে বসে বিচারপতি সব শুনলেন। বললেন, “আমি দেখতে যাব ওই প্রাণীগুলো।” উনি নিজে এলেন পশু হাসপাতাল। দেখে শুনে এমন রেগে গেলেন, যে লোকটাকে অনেক দিনের জন্য জেলে পাঠালেন। বললেন, “ওকে কঠিন কাজ দিতে হবে, যাতে ওর শিক্ষা হয়।”
৪
যত্ন পেয়ে কৃষ্ণসারের শরীর সারতে আরম্ভ করল। যখন ও আবার হাঁটতে চলতে পারছে, বনদপ্তরের অফিসাররা ওকে নিয়ে গেল একটা খোলা জায়গায় — সেখানে অনেক গাছ। মানুষের তৈরি পার্ক। সেখানে অনেক হরিণ। তাকে বলে ডিয়ার পার্ক — মৃগদাব। ওকে অফিসাররা পার্কের বাইরে একটা বড়ো খাঁচায় রাখল। ভালো ভালো খেতে দিল, ওষুধ দিল। ডাক্তার রোজ এসে দেখে যেত।
এক দিন বনদপ্তরের অফিসার জিজ্ঞেস করল, “কেমন দেখছেন ওকে?”
ডাক্তার বলল, “এখন তো ভাল আছে। সেরেই গেছে সব।”
অফিসার জানতে চাইল, “এখন ওকে খাঁচার বাইরে আনা যাবে? ডিয়ার পার্কে ওকে রাখতে চাই।”
ডাক্তার বলল, “আছে তো ভাল। কিন্তু হরিণেরা কী ওকে সহ্য করবে?”
অফিসার জানতে চাইলেন, “না করলে কী হবে?”
ডাক্তার বললেন, “কৃষ্ণসারটা এখনও দুর্বল। হরিণদের গায়ের জোর বেশি, সংখ্যায়ও ওরা অনেক। শিং দিয়ে ঢুঁ দিলে মরেও যেতে পারে।”
তখন বনদপ্তরের অফিসাররা ডিয়ার পার্কের মধ্যেই একটা আলাদা ঘেরা জায়গা তৈরি করল। লম্বা লম্বা কাঠের খোঁটা পুঁতে একটা আলাদা জায়গা তৈরি হল। সেখানে তারের জাল লাগানো হল, যাতে এদিক থেকে কৃষ্ণসার ওদিকে না যেতে পারে, আর ওদিকের হরিণ এদিকে এসে কৃষ্ণসারকে মারতে না পারে। একা কৃষ্ণসারের পক্ষে মস্তো জায়গা। একটা কোনায় ওর জন্য একটা চালা তৈরি হল, যাতে বৃষ্টিতে, রোদে, সেখানে গিয়ে সে বিশ্রাম করতে পারে। একটা মস্তো পাত্রে জল আর একটা থালা দেওয়া হল — তাতে ওর খাবার দেওয়া হবে।
মৃগদাবের হরিণরা অবাক।
এ ওকে জিজ্ঞেস করে, “কী হচ্ছে ওখানে?”
একজন বুড়ো হরিণ বলল, “অন্য কোনও জন্তু আসবে। তার জন্য মানুষরা জায়গা বানাচ্ছে।”
অন্যরা বলল, “আরেকটা জন্তু আসবে তো তার জন্য আরেকটা জায়গা লাগবে কেন? সে তো আমাদের সঙ্গেই থাকতে পারে।”
“নিশ্চয়ই কোনও বিপদজনক প্রাণী,” বলল বুড়ো হরিণ।
একটা বাচ্চা হরিণ জানতে চাইল, “‘বিপদজনক’ কী?”
বুড়ো হরিণ বুঝিয়ে বলল, “বিপদজনক মানে সেই জন্তুটা আমাদের ক্ষতি করতে পারে। কে জানে, হয়ত বাঘ নিয়ে আসছে।”
বুড়ো হরিণ ছাড়া বাকি সবাই ডিয়ার পার্কেই জন্মেছে। ওরা জানেও না বাঘ কী রকম জন্তু। ওরা কেউ কোনও দিন জঙ্গল দেখেইনি। তাও সবাই খুব ভয় পেল।
নতুন ঘেরা জায়গাটা তৈরি হবার পরে খাঁচা শুদ্ধু কৃষ্ণসারকে নিয়ে গিয়ে ছেড়ে দিল বনদপ্তরের কর্মচারীরা। খাঁচার দরজা খুলে রাখা হল। কৃষ্ণসারটা বেরিয়ে আসার পরে আবার খাঁচাটা নিয়ে গেল ওরা। কৃষ্ণসার এখন খাঁচার বাইরে। একটা বাচ্চা হরিণ দেখতে পেল। এক ছুটে গেল তার মায়ের কাছে।
বলল, “মা, মা, বাঘটা এসে গেছে।”
হরিণরা কেউ কেউ গিয়ে দেখে এল নতুন প্রাণীটাকে। তারা তো কেউ বাঘও দেখেনি কোনও দিন, কৃষ্ণসারও না। তাই তারা গিয়ে বুড়ো হরিণকে খবর দিল।
“বাঘটা এনেছে মানুষরা।”
বুড়ো হরিণ জিজ্ঞেস করল, “বড়ো বাঘ?”
ওরা মাথা নাড়ল। “না। আমাদের চেয়ে একটু ছোটো।”
বুড়ো হরিণ ছোটোবেলায় জঙ্গলে দূর থেকে বাঘ দেখেছে। বলল, “তাহলে বাঘের ছানা।”
আর একটা হরিণ বলল, “মাথার শিংগুলো অদ্ভুত।”
অবাক হয়ে বুড়ো হরিণ বলল, “কী বিদঘুটে কথা! বাঘের মাথায় শিং থাকে না।”
বাচ্চা হরিণটা, যে সবার আগে কৃষ্ণসারকে দেখেছিল, বলল, “এই বাঘটার মাথায় আছে।”
বুড়ো হরিণ বলল, “নাঃ, এবারে আমাকেই গিয়ে দেখতে হবে দেখছি।”
তখন সব্বাই মিলে গিয়ে ভীড় করল কৃষ্ণসারকে দেখতে। বুড়ো হরিণ হাসতে হাসতে প্রায় পড়ে যায় আরকি!
“ওটা আবার বাঘ নাকি! ওটা তো মৃগ!”
“কিন্তু ওর শিংদুটো অদ্ভুত,” বলল প্রথম বাচ্চা হরিণ।
বুড়ো হরিণ বলল, “তার কারণ, ও হরিণ না। ও মৃগ। আমরা হরিণ। আমাদের শিঙে ফ্যাকড়া থাকে। ওদের শিঙে ডালপালা নেই। আর আমাদের শিং বছরে বছরে খুলে পড়ে যায়। আবার গজায়। ওদের শিং জীবনে একবারই গজায়। গরু মোষের মত।”
বাচ্চা হরিণ বলল, “ওকে ডাক, এখানে আসতে বল।”
বুড়ো হরিণ বলল, “এখন না। দেখছ না, ও ভয় পেয়ে আছে। নতুন জায়গায় অভ্যেস হতে দাও, তার পরে বন্ধুত্ব করা যাবে’খন।”
হরিণরা চলে গেল, কৃষ্ণসারকে একা রেখে। বুড়ো হরিণ ঠিক বলেছিল। প্রথমে কৃষ্ণসার ভয়ে নড়ছিলই না। কোণায় ওর চালার নিচে লুকিয়ে বসে থাকত। কেবল খিদে পেলে বা তেষ্টা পেলে বেরিয়ে আসতো খেতে। কয়েক দিন কাটার পর, আস্তে আস্তে সাহস করে নিজের ঘেরা জায়গায় হাঁটাহাঁটি করতে শুরু করল।
এক দিন, হাঁটতে হাঁটতে জালের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে, হঠাৎ মুখ তুলে তাকিয়ে দেখে আর একটা মুখ ওর দিকে তাকিয়ে আছে। প্রথমে ও চমকে উঠেছিল। তার পরে দেখল ওটা একটা বাচ্চা হরিণ। ওর মনে পড়ল ও ছোটোবেলায় হরিণ দেখেছে। ওরা ভয়ংকর কিছু নয়।
বাচ্চা হরিণ জানতে চাইল, “এখনও ভয় পাচ্ছ?”
কৃষ্ণসার বলল, “আমি ভয় পাই না। আর তোমাকে ভয় পাবো কেন? তুমি তো এইটুকু।”
বাচ্চা হরিণ বলল, “কিন্তু তুমি তো আমাদের ভয়ে অস্থির ছিলে!”
কৃষ্ণসারের মনে পড়ল ও কেমন সব কিছুতেই ভয় পাচ্ছিল। লজ্জা পেয়ে বলল, “মোটেই না।”
বাচ্চা হরিণ বলল, “আমরা যে দিন প্রথম তোমাকে দেখতে এসেছিলাম, তুমি ও-ও-ইখানে লুকিয়ে ছিলে।”
“লুকিয়ে ছিলাম না। আমার শরীর খারাপ ছিল।”
অবাক হয়ে বাচ্চা হরিণ বলল, “শরীর খারাপ? কী হয়েছিল তোমার?”
এর মধ্যে একজন দু’জন করে অন্য হরিণরাও ওখানে পৌঁছে গেছে। তখন কৃষ্ণসার ওদের সব খুলে বলল। ওর গল্প শেষ হবার পরে বাচ্চা হরিণ বলল, “বন্দুক নিয়ে মানুষ জঙ্গলে গিয়ে শিকার করে? কই এখানে তো কেউ বন্দুক নিয়ে আসে না?”
বুড়ো হরিণ বলল, “সে তো এটা হরিণদের জন্য থাকার জন্য তৈরি হয়েছে বলে। এখানে কতো পাহারা দেখ না?”
এক জন হরিণ ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করল, “কিন্তু পাহারাদাররাও কি আমাদের মারতে পারে না?”
বুড়ো হরিণ মাথা নেড়ে বলল, “পারে, কিন্তু মারবে না। ওরা ভালো লোক। ওরা আমাদের পছন্দ করে। ওরা আমাদের দেখাশোনা করে।” এবার কৃষ্ণসারের দিকে ফিরে বলল, “তুমি আলাদা আছ কেন?”
কৃষ্ণসার বলল, “ডাক্তার বলেছে, তোমরা আমাকে মারতে পার।”
বাচ্চা হরিণ লাফিয়ে উঠে বলল, “কী বোকা রে বাবা! আমরা তোমাকে মারবো কেন? তুমি কি আমাদের শত্তুর?”
বুড়ো হরিণ বলল, “মোটেই বোকা নয়। আমরা নিজেদের মধ্যে মারামারি করি বইকি!”
বাচ্চা হরিণ বলল, “কিন্তু আমরা তো ওকে কিছু বলব না।”
ওর মা বলল, “তা বলব না, তবে আমার মনে হয় না মানুষরা ওকে আমাদের সঙ্গে থাকতে দেবে।”
কৃষ্ণসারওখানেই রয়ে গেল। আস্তে আস্তে সব হরিণের সঙ্গেই ওর বন্ধুত্ব হয়ে গেল। ওরা এসে বলত, “তোমার আগের জীবনের গল্প বল।” ওরা কোনও দিন জঙ্গল দেখেনি। গভীর জঙ্গল তো দেখেইনি, কৃষ্ণসার যেমন মেঠো জঙ্গলে থাকত, তাও দেখেনি। রোজ মানুষরা থলে ভর্তি করে খাবার না এনে দিলে কী করে খাবার খুঁজে খেতে হয়, তাও জানে না তারা! গল্প শুনে ওরা ভয় পেত। ওরে বাবা! খাবার খুঁজে খেতে হয়! কোথায় ঘাস, কোথায় পাতা, কোথায় কোন ফলের গাছ — সব মনে রাখতে হয়! শেয়াল, নেকড়ে, চিতাবাঘ এসে ধরে নিয়ে যেতে পারে! কী ভয়ংকর! তার ওপর মানুষও আসে, শিকার করতে! বলত, “বাবা! আমরাই সুখে আছি। এ সব কোনও দুশ্চিন্তাই আমাদের নেই।”
হরিণরা যতই সুখে থাকুক, কৃষ্ণসার মোটেই সুখে ছিল না। যতই হরিণদের ছোটোবেলার গল্প বলে, ততোই সে দিনগুলোর কথা মনে পড়ে যায়। দুঃখ পায় নিজের দুষ্টুমি আর ভুলের জন্য। মনে ভাবে, কোনও দিন আর ওই জীবন ফিরে পাব না। একা থাকলেই মুখ গুঁজে কাঁদে।
সবাই বুঝতে পারল কৃষ্ণসারের কিছু একটা হয়েছে। হরিণদের সঙ্গে আর কথা বলে না, খাবার দিলে খায় না ভালো করে। ডাক্তার দুশ্চিন্তা করে গেল অফিসারের সঙ্গে দেখা করতে।
বলল, “কৃষ্ণসারের কী হয়েছে খেয়াল করেছেন?”
অফিসার বলল, “খাচ্ছে কম। চুপ করে এক জায়গায় বসে থাকছে। অসুখ টসুখ করেছে?”
ডাক্তার মাথা নাড়ল, “না।”
“আমরা ঠিক মতো খেতে দিচ্ছি তো?”
ডাক্তার বলল, “হ্যাঁ।”
“তবে?”
ডাক্তার বলল, “আমার মনে হচ্ছে ওর মন খারাপ হচ্ছে। একা তো।”
অফিসার অবাক হয়ে বলল, “তার কী করা যায়? এখানে তো আর একটা কৃষ্ণসার নেই। চলুন, বড়ো সাহেবকে জিজ্ঞেস করি।”
বড়ো অফিসার সব শুনে বলল, “ওকে ফেরত নিয়ে যাও, ও যে জঙ্গল থেকে এসেছিল, সেখানে ছেড়ে দাও। ওখানে তো অন্য কৃষ্ণসার আছে।”
অবাক হয়ে ছোটো অফিসার বলল, “কিন্তু কোন জঙ্গল থেকে ও এসেছিল, জানব কী করে?”
বড়ো অফিসার বলল, “জেলে গিয়ে লোকটাকে জিজ্ঞেস করে আসব।”
বড়ো অফিসার নিজেই গেল জেলে। লোকটা তো প্রথমে বলতেই চায় না। বড়ো অফিসার ভয় দেখাল, “না বললে তোমার কী হতে পারে বুঝতে পারছ?”
তখন বলে দিল।
৫
একটা মস্তো ভ্যান আনা হল। অনেক লোককে যেতে হবে কৃষ্ণসারের সঙ্গে। তার ওপর একটা ছোটো খাঁচা তৈরি হল। ছোটো খাঁচা না হলে কৃষ্ণসার যদি ভয় পেয়ে ছটফট করে, তাহলে ধাক্কাধাক্কিতে ব্যথা পাবে। দেয়ালে ঘষা খেয়ে চামড়া যাতে ছড়ে না যায়, তাই মোটা করে স্পঞ্জ লাগানো হল।
কৃষ্ণসারকে খাঁচা অবধি তুলে নিয়ে আসতে হল। ও ততোদিনে এতোটাই আবার দুর্বল হয়ে গিয়েছে, যে বনকর্মীরা এসে ওকে তুলে নিল, ও উঠে দাঁড়াতেও পারল না। খাঁচায় ছটফটও করল না। সবাই ভ্যানে উঠে রওয়ানা দিল। অনেক দূরের পথ। সারা দিন চলে রাত্তিরে ওরা থামল। কৃষ্ণসারকে দানাপানি দিয়ে ঘুমোতে গেল। পরদিন আবার চলা শুরু করে, বিকেল বেলায় এসে পৌঁছল সেই জঙ্গলে, যেখান থেকে ওকে অনেক বছর আগে খারাপ লোকেরা ধরে নিয়ে গিয়েছিল।
রাস্তার ক্লান্তিতে কৃষ্ণসার ঘুমোচ্ছিল। গাড়ি থামার পরে হঠাৎ ঘুম ভেঙে প্রথমে বুঝতে পারল না কোথায় এসেছে। এত দিন আগেকার কথা, ওর আর জঙ্গলের দৃশ্যগুলো ভালো করে মনেও নেই।
কিন্তু তখনই হাওয়ায় ভেসে এল জঙ্গলের গন্ধ। ঘুম ছুটে গেল। মনে পড়ল সবুজ ঘাস আর শুকনো লাল মাটির গন্ধ। তৃণভোজীদের বন্ধু বন্ধু গন্ধ, মাংশাসী শিকারী প্রাণীদের ভয়ের গন্ধ, পুকুরের আর নদীর জলের গন্ধ — সবই মনে পড়ে গেল ওর।
মানুষরা ওর খাঁচাটা ভ্যান গাড়ি থেকে ধরাধরি করে নামিয়ে নিল। কৃষ্ণসার তখন উৎসুক হয়ে খাঁচার ফাঁক দিয়ে নাক বের করে গন্ধ নিচ্ছে।
ডাক্তার বলল, “দেখেছ? অর্ধেক সেরে গেছে মনে হচ্ছে।”
অফিসার বলল, “ঠিক বলেছ। ও বুঝেছে, বাড়ি ফিরেছে। চল, ওকে ওর খাঁচায় রাখি গিয়ে।”
কৃষ্ণসার শুনে আবার দুঃখ পেয়েছিল, কিন্তু তার পরেই, ওদের কথা শুনে বুঝল যে বনদপ্তরের অফিসাররা ওর ভালর জন্যই ওর জন্য খাঁচার ব্যবস্থা করেছে।
জঙ্গলের অফিসার শহরের অফিসারকে বলল, “আপনি যেমনি বলেছেন, দুর্বল হয়ে আছে, আমি তখনই ঠিক করেছি, ওকে সঙ্গে সঙ্গে জঙ্গলে ছাড়ব না। আগে খাইয়ে দাইয়ে একটু সুস্থ করে নেব, তার পরে।”
খাঁচা দেখে সবাই মুগ্ধ। শহরের খাঁচার চেয়ে অনেক বড়ো।
কর্মচারীরা খাঁচাটা নিয়ে গিয়ে ভেতরে রাখল। তার পরে আবার খাঁচার চারি দিক ঘুরে দেখল, কোথাও এমন নয় তো, যে বাঘ বা চিতাবাঘ ভেঙে বা গাছে চড়ে ভেতরে ঢুকতে পারবে? তার পরে চারি দিকে আলো জ্বালিয়ে রাখল রাতে, যাতে নেকড়ে বা চিতাবাঘ এসে কৃষ্ণসারকে ভয় দেখাতে না পারে। সবাই ঘুমোতে গেল তার পরে।
কৃষ্ণসার তো ঘুমোতে পারে না। ওর ঘুম আসে না। হেঁটে হেঁটে খালি বেড়ার কাছে ঘুরে বেড়ায় আর বাইরে তাকায়। জঙ্গলের পরিচিত গন্ধ নেয় বাতাসে নাক টেনে। শেষে ক্লান্ত হয়েই ঘুমিয়ে পড়ল।
অফিসাররা ভোর বেলায় ঘুম থেকে উঠে বাইরে এল — তখনও সূর্য ওঠেনি। আকাশ পরিষ্কার। পূব আকাশ লাল হতে লেগেছে। মাটির কাছে আবছা কুয়াশা। কৃষ্ণসার ওর খাঁচার বেড়ার কাছে মাটিতে শুয়ে ঘুমোচ্ছে। আর বেড়ার বাইরে এক দল জংলী কৃষ্ণসার বসে।
অফিসাররা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বলল, “ওকে নিয়ে যেতে এসেছে ওরা।”
কৃষ্ণসারেরও স্বস্তি হচ্ছিল। দেখতে পাচ্ছিল খাঁচার বাইরে অন্য কৃষ্ণসারেরা ওকে নিতে এসেছে। তাদের কাউকে ও চিনতেও পারছিল। ওরাও অবাক, ওরা ভেবেছিল ও এতদিনে মরেই গেছে। ওদের ও শহরের কথা বলেছিল। বলেছিল কেমন করে ওকে মানুষরাই ধরে নিয়ে গিয়েছিল, আবার কেমন করে মানুষরাই ওকে ফিরিয়ে এনেছে।
“আমার মনে আছে, আমি তোমাদের কত জ্বালাতন করেছি। কারওর কথা শুনতাম না। কিন্তু আমার শিক্ষা হয়ে গিয়েছে। আর আমি কোনও দিন তোমাদের জ্বালাবো না।”
ওদের দলের বুড়ো বলল, “সে না হয় হল, কিন্তু তুমি বেরোবে কী করে?”
কৃষ্ণসার বলল, “আরে ওরা আমাকে বেশিদিন রাখবে না। ওরা বলেছে, আমি শুনেছি। আমি একটু ভাল করে খেতে শুরু করলেই আমাকে ছেড়ে দেবে।”
ওরা জানতে চাইল, “কী করে জানলে?”
কৃষ্ণসার লজ্জা পেয়ে বলল, “অনেক দিন ওদের সঙ্গে আছি, ওদের কথা বুঝতে শিখেছি।”
জংলী কৃষ্ণসারেরা হঠাৎ বলল, “মানুষ আসছে এ দিকে, চল আমরা চলে যাই।”
কৃষ্ণসার দেখল বনদপ্তরের অফিসাররা আসছে। বলল, “আরে ওরা আমাদের বন্ধু, ভয় পেও না।”
কঠিন গলায় বুড়ো কৃষ্ণসার বলল, “শোনো হে, আমাদের সঙ্গে যদি আবার যেতে চাও, মনে রেখো, কোনও মানুষকেই বেশি বিশ্বাস করলে চলবে না।”
“মনে রাখব,” চেঁচিয়ে বলল কৃষ্ণসার। এদিকে ওর খাঁচার দরজা খুলে ওর খাবার নিয়ে ঢুকলো বনকর্মীরা।
৬
কিছু দিন পরে মানুষরা আবার কৃষ্ণসারকে জঙ্গলে ছেড়ে দিল। ও ছুটে গিয়ে ওদের দলের সঙ্গে চলে গেল দূরের জঙ্গলে। অফিসার আর ডাক্তার সবাই আবার শহরে ফিরে এল।
এখনও ওখানেই আছে ও। এখন ও বুড়ো হয়েছে। আজ ও সব দুষ্টু বাচ্চাকে শেখায় ভালো হতে। সবাইকে বলে, কেমন দুষ্টুমি করে কী বিপদেই না পড়েছিল ও।
ছবি - দেবাশিস দেব

