~এক~
মোবাইল বাজছে। গভীর তন্দ্রাচ্ছন্ন মস্তিষ্ক ছেয়ে ফেলছে তীব্র বাদ্যধ্বনি। পরতে পরতে হানা দিচ্ছে, ছিঁড়ে ফালা ফালা হয়ে যাচ্ছে সুপ্তির প্রগাঢ় আস্তরণ। মাথা থেকে সরে যাচ্ছে পুনরুজ্জীবক প্রস্বাপনের সুখানুভূতি।
একরাশ বিরক্তি নিয়ে উঠে বসলেন ঋতবাক। বিছানার পাশের টেবিলে এখনও তারস্বরে চেঁচিয়ে যাচ্ছে মোবাইল। ‘আহা কী আনন্দ আকাশে বাতাসে’-র সুর রিংটোন করেছিলেন সখ করে, সে-ও এখন বিরক্তির পরাকাষ্ঠা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ফোনটা হাতে নেবার আগে চশমা পরতে হবে, নইলে দেখতে পাবেন না কে ফোন করেছে। একটুক্ষণ হাতড়াতে না হাতড়াতেই ছুটে এল চঞ্চরী। “আঃ, ফোনটা তখন থেকে বাজছে...”
আরও বিরক্তি ছাইল শরীরে। অতই যখন কানে লাগে, তাহলে এসে ধরলেই তো হয়। জানে তো ঋতবাক ঘুমোচ্ছে। ওর দিকে না তাকিয়ে চশমাটা পরলেন। চঞ্চরী ফোনটা বাড়িয়ে দিয়ে ফিশফিশিয়ে বলল, “অনুজবাবু...”
এবারে ঋতবাকের নিদ্রালস শরীরেও গতি সঞ্চারিত হলো। হাত বাড়িয়ে ফোনটা নিলেন, কিন্তু নেওয়ামাত্র কেটে গেল। একটু বিরক্তিভরে চঞ্চরী বলল, “কেটে গেল তো? এত গরিমসি করলে চলে?”
ততোধিক বিরক্তির সঙ্গে মিসড্ কলের তালিকা খুলতে খুলতে ঋতবাক বললেন, “দেখলেই যখন অনুজবাবু, তখন আমার দিকে ফোনটা বাড়িয়ে না দিয়ে উত্তর করতেই তো পারতে?”
ঘর থেকে বেরোতে বেরোতে চঞ্চরী বলল, “কী করে জানব, উত্তর দেবে কি না?”
এই কথাগুলোর এতই অর্থহীন, যে ঋতবাকের বিরক্তি আরও উপচে উঠল। এ বাড়িতে শেষ কবে কেউ ইচ্ছা করে অনুজবাবুর ফোন ধরেনি? ততক্ষণে মোবাইলের স্ক্রিন দেখাচ্ছে — কলিং... অনুজবাবু। এখনই হয়ত ধরবেন, গলায় বা বাচনভঙ্গি থেকে বিরক্তি সরিয়ে নেওয়ার প্রথম পদক্ষেপ, বিছানার পাশের ড্রেসিং টেবিলের আয়নায় নিজের দিকে হাসি হাসি মুখে তাকালেন ঋতবাক।
“দ্য নাম্বার ইউ আর কলিং ইজ কারেন্টলি বিজি... যে নম্বরে আপনি ফোন করেছেন সেটি এখন ব্যস্ত...” বার তিনেক কথাটা ইংরিজি, বাংলা আর হিন্দিতে শুনে কেটে দিলেন ঋতবাক। ব্যস্ত মানুষ, এইটুকু সময়ের মধ্যেই আর কাউকে ফোন করেছেন, বা ফোন এসে গেছে। মোবাইলটা টেবিলে রেখে ঋতবাক বিছানা ছেড়ে উঠলেন। দু-চার পা এগিয়ে আবার ফিরে এসে ওটা হাতে নিয়েই গেলেন। কে জানে, যদি আবার ফোন করেন...
~দুই~
সকালে খেতে বসে মা জানতে চাইলেন, “অনুজবাবু ফোন করেছিলেন?”
শাশুড়ি-বউয়ের ষড়যন্ত্র। ‘অনুজবাবু ফোন করেছিলেন?’ শুনেছ যখন তাহলে তো এটাও জানো যে তারপরে কী হয়েছিল! অত কথায় গেলেন না। বললেন, “হুঁ। ধরতে ধরতে কেটে গেছে।”
“তো ফিরে ফোন তো করতে পারতি?”
“করেছিলাম। দু’বার। প্রথমবার বিজি, পরের বার বেজে গেল, ধরলেন না।”
“আবার কর। ফোন করে না পেলে যদি বিরক্ত হন?”
মুখে ‘হুঁ’ বলে চুপ করে গেলেন। যে মানুষটা ফোন করে না পেলে বিরক্ত হন, ফিরে ফোন না করলে বিরক্ত হন, তিনি যে একগাদা মিসড কল পেয়ে বিরক্ত হবেন না, তার তো নিশ্চয়তা নেই। একটা ভদ্রস্থ সময় যেতে দিয়ে আবার ফোন করতে হবে। বেশি দেরি করলে যেমন বিপদ, ঘনঘন করলেও নিশ্চয়ই তথৈবচ?
খেয়ে উঠে ঋতবাক বসার ঘরে বসেই ফাইলগুলো খুললেন। অনেক কাজ এখনও বাকি। অথচ ইউনিভার্সিটির চাপও কম নয়। আজ কয়েকটা খাতা অন্তত দেখে এগিয়ে রাখতে হবে। এরকম সময়েও বিভাগীয় প্রধান আর ডিন ফোন করছেন — খাতা দেখা আর কত বাকি? আর ভি-সি তো আর এক কাঠি। কনডোলেনস বাণীর পরেই বললেন, “তোমার কাছে কি অনেকগুলো খাতা আছে?” ওখানেও একই রকম বেশি-তাড়াতাড়ি-নয়, আবার বেশি-দেরি-নয় প্রিনসিপ্লে চলেন ঋতবাক। বেশি দেরি করলে যেমন রেপ্রিমান্ড পেতে হয়, বেশি তাড়াতাড়ি খাতা দেখে নম্বর জমা দিলে সঙ্গে সঙ্গে পরের কাজটা হাজির হয়।
একটানা কাজ করা যাচ্ছে না। বার বার ফোন আসছে। ব্যাঘাত ঘটছে। চেনা, অচেনা, অল্প-চেনা সবাই বিধ্বস্ত। যারা একটু আঁতেল, তারা শুধুই ধ্বস্ত। কেউ আবার ইংরেজিতে ডিভাস্টেটেড। ইন্দ্রপতন, মহীরূহপতন, সংকট... কত কিছু। অনেকেই স্মৃতিসভার আয়োজক। ঋতবাক কি পারবেন, সে সভায় যোগ দিতে?
আগামী শুক্রবার শ্রাদ্ধ — কথাটা আর কাউকে বলছেন না। “উনি তো ঘোর কমিউনিস্ট ছিলেন...” ফলে ওঁর কেন শ্রাদ্ধ হবে — এ কৈফিয়ত আর দিতে চান না। কারণ কৈফিয়ত একটাই — উনি ঘোর কমিউনিস্ট বলে আমিও কি কমিউনিস্ট নাকি? বা, আরও ভালো, তাতে তোর কী রে শালা? আমি আমার বাবার শ্রাদ্ধ করি, পিণ্ড দিই, বা চটকাই — সে সব আমার ব্যাপার। তোর বাপ মলে তুই কী করবি বা করেছিস, আমি দেখতে গেছি?
বাবা বলতেন, পাব্লিক ফিগার হলে বিছানায় কী করছি, তা-ও জনগনের গোচরে থাকতে হবে। ঋতবাক অত দয়াপরবশ নন।
তৃতীয়বারে ফোন ধরলেন অনুজবাবু। বিনম্রভাবে ঋতবাক জানতে চাইলেন, “কাজের দিন আসবেন তো?”
অবশ্য আসবেন, অতি অবশ্যই আসবেন... এসব কথার পরে ঋতবাক সুযোগ বুঝে জানতে চাইলেন, “আসলে বাবা বলে গেছিলেন, আপনার কাছে কিছু টাকা হয়ত পান... সেগুলোর...”
কাউকে এত অবাক হয়ে যেতে কখনওই শোনেননি ঋতবাক। একেবারে আকাশ থেকে পড়লেন অনুজবাবু। বাকি টাকা? আজ অবধি কখনও একটা পয়সা কারও কাছে ধারেননি অনুজ কাঞ্জিলাল। বিশেষত ঋচিকের ক্ষেত্রে তো নয়ই।
হতভম্ব ঋতবাক কী বলবেন বুঝতে পারলেন না। একটু আমতা আমতা করে বললেন, “আমার ভুল হয়েছে বোধহয়। আসলে বাবা তো যাবার আগে বলেছিলেন...”
এবারে গলায় একটু বিরক্তি। “কী বলেছিল ঋচিক? আমার কাছে টাকা পায়? এক পয়সা বাকি নেই ওর কাছে। শুধু তাই না — হাসপাতালে যাবার কথা হয়েছিল যখন আমি বেশ কিছু টাকা ওর হাতে নিজে দিয়ে এসেছি। সে কত তোমার জেনে কাজ নেই। কারণ ওটা আমি ফেরত পাবার জন্য দিইনি। শুধু এ মাসের টাকা বাকি আছে — সে মাস গেলেই আমার লোক গিয়ে চেক দিয়ে আসবে।”
কৃতজ্ঞকণ্ঠে ঋতবাক ধন্যবাদ দিলেন। বললেন, “আসলে বাবা যাবার পরে খুবই অসুবিধে হয়েছে। মানে... এখন তো কাজটাও করতে হবে... আর আমার কলেজে আবার...”
“হ্যাঁ, ভালো কথা — তোমার সঙ্গে আমার আরও কাজ আছে। ঋচিকের সঙ্গে আমার একটা কনট্র্যাক্ট ছিল। এখন তো মানে, ওটা শেষ হয়ে গেল... এবারে তোমার আর তোমার মা’র সঙ্গে নতুন করে কনট্র্যাক্ট করতে হবে... কাজ-টাজ সব মিটে যাক — আমি তোমাদের বাড়ি গিয়ে সই-সাবুদ করিয়ে আনব।”
ফোন নামিয়ে রেখে ঋতবাক গেলেন মায়ের ঘরে — এই সেদিনই এটা বাবা-মা’র ঘর ছিল। আজ কেবলই মায়ের ঘর। ঋতবাকের কথা শুনে মা কিছুক্ষণ হাঁ করে চেয়ে রইলেন।
“টাকা পাওনা নেই? পাওনা নেই? পনেরো বছরে কটা বই ছেপেছে — সব মিলিয়ে বই কটা?” দেওয়াল আলমারির দিকে হাত তুলে বললেন, “বত্রিশ না পঁয়ত্রিশটা। তিনটে প্রাইজ পাওয়া। প্রত্যেক বইমেলায় হাজারে হাজারে বিক্রি। সই করতে যেত প্রতি বছর। অথচ, টাকার কথা উঠলেই, একটু অসুবিধে আছে — সব তোকে পরে সুদে আসলে দিয়ে দেব। তোর বাবার শেষ হিসেবমতো অনেক টাকা-ই বাকি। আর, কই, হাসপাতালে যাবার আগে এল কই? বাবা ফোন করে বলেছিল, অন্তত কিছু টাকা যদি দেয় — বলেছিল, আজ-কালের মধ্যেই নিয়ে আসছি। সেই বলল, এল সোজা শ্মশানে — হাতে সাদা ফুলের তোড়া।”
কিছু না বলে ঋতবাক আস্তে আস্তে মা’র ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। তখনও মা বলছেন, “অথচ, তোর বাবার হাত ধরেই ওর পাবলিশারবৃত্তি শুরু। তোর বাবার বইয়ের জন্যই ওর প্রথম নাম-ডাক। আজ না হয় বড়ো বড়ো লেখকরা ওর কাছে দৌড়য়, কিন্তু কই, এখনও তো তোর বাবার চেয়ে বেশি কাটতি কারওর না...”
এ অভিযোগের শেষ নেই। এখনও খাতা দেখা বাকি অনেক। তার ওপর আজ স্মরণসভাও আছে কোথায় যেন। গাড়ি পাঠাবে সন্ধে ছ’টায়।
~তিন~
লেক ক্লাবের লনে অভিজিৎ নিজের জন্য একটা ডবল হুইস্কি সোডা আর ঋতবাকের জন্য একটা প্রিমিয়াম বিয়ার অর্ডার দিয়ে বললেন, “তাহলে কী দাঁড়াল? তোর বাবার বন্ধু, প্রায় সারা জীবনের পাবলিশার — এতদিন তোর বাবাকে ঠকাচ্ছিল, এখন তোকে ঠকাচ্ছে?”
ঋতবাক সামনে রাখা চানাচুরের প্লেট থেকে একটা বাদামভাজা তুলে নিয়ে সেটা দু’আধখানা করে একটা আধা মুখে ফেলে বললেন, “আমাকে আর মাকে। তুই ভাব, প্রত্যেকটা বইয়ের একটা লিখিত চুক্তি আছে বাবার সঙ্গে। প্রত্যেক বইয়ের জন্য একটা থোক টাকা, আর একটা পার্সেন্টেজ দেওয়া হবে। দিত না, তা নয়, কিন্তু যা দেবার তার তুলনায় সামান্যই দিত।”
অভিজিৎ চুপচাপ হুইস্কি খাচ্ছিল। বলল, “তা-ও তোর বাবা কেন ওই অনুজবাবুকে দিয়েই বই ছাপাত?”
বিয়ারের গ্লাসটা নিয়ে গলা ভেজালেন ঋতবাক। বললেন, “তুই পাবলিশিং সমাজটা কতটা জানিস, জানি না। আগে অন্য পাবলিশার ছিল। তারাও টাকা দিত না। শেষে এই অনুজবাবুই যখন আসলেন, তখন বাবা প্রথম কিছু টাকা পেয়েছিল বই লিখে। ফলে অনুজবাবুকেই ধরে রেখেছিল — শেষ দিন অবধি বিশ্বাস করত, অনুজ ঠকাবে না। এখন হয়ত টাকাকড়ির অসুবিধে — পরে ঠিক দিয়ে দেবে সব। বাইপাসের জন্য ভর্তি হবার আগের দিনও ফোন করেছিল — অন্তত কিছু বাকি-টাকা যদি দিয়ে দেয়...”
“কত টাকা পেতেন?”
“মা বলছে অনেক। বাবা নাকি মাঝে মাঝে হিসেব করত, আর কাগজগুলো ছিঁড়ে ফেলত। বলত, অত চাপ দেওয়া উচিত হবে না। বলত, আমার তো তবু পেনশন আছে — ছেলেটারও চাকরি হয়ে গেছে। অনুজের তো ব্যবসাটাই সব। তার ওপর মেয়েটারও বিয়েটা টিঁকল না, নাতি নিয়ে বাবার কাছেই এল... এই সব...”
“তুই কী করতে চাস?”
“আমি জানি না। সেইজন্যই তো তোর কাছে আসা। মামলা করা যায়?”
“দেখ, আমাদের দেশে সব কিছুতেই মামলা করা যায়। তুইও করতে পারিস। কিন্তু মামলায় যত না টাকা আসে, যায় তার ঢের বেশি। আর তোর চেয়ে অনুজবাবুর ট্যাঁকের জোর অনেক বেশি। তোর ফোন পেয়ে একটু রিসার্চ করেছি। যত ‘ছোটো’ পাবলিশার তুই ভাবছিস, তত ছোটো কিন্তু নন ভদ্রলোক। হ্যাঁ, বিরা-আ-আ-আট পাবলিশিং হাউস নয়, কিন্তু ব্যবসার সাইজ ভালো, এবং বইয়ের জগতে নাম-ডাক আছে। তোকে ঘোল খাইয়ে দিতে পারেন। এবং তারপরে অন্য সমস্যাও সৃষ্টি করতে পারেন।”
ঋতবাক থমকালেন। “অন্য কী সমস্যা?”
“জানি না। ব্যবসায়ীরা সাধারণত কানেকটেড লোক হন। আর পাবলিশাররা অনেক সময়েই শিক্ষাবিদদের সঙ্গে একসঙ্গে কাজ করেন। তুই ঠিক জানিস, তোর ইউনিভার্সিটির কর্তাব্যক্তিরা ওনাকে চেনেন না?”
ঋতবাক চুপ করে গেলেন। একটু পরে বললেন, “তাহলে কি কিছুই করা সম্ভব না?”
মাথা নাড়লেন অভিজিৎ। বলল, “অনেক কিছুই সম্ভব। কিন্তু তোর পক্ষে না। তুই যদি কলেজের অধ্যাপক না হয়ে প্রোমোটার হতি, তাহলে চারটে লোক পাঠিয়ে বেদম প্যাঁদানি দিয়ে হাত পা ভেঙে রেখে আসতি। টাকা পেতি না, কিন্তু অন্তত যত টাকা ঝেড়েছে, তার তিনগুণ খরচা করিয়ে দিয়ে শান্তি পেতি।”
চুপ করে কিছুক্ষণ দুজনে গেলাসের পানীয়ের দিকে নজর দিলেন। এবং বাড়ি যাবার আগে এই সিদ্ধান্তে এলেন, যে অনুজবাবু যখন ব্যবসার কথা বলতে আসবেন, তখন সেটা হবে অভিজিতের অফিসে।
~চার~
অনুজবাবু ছাড়াও আরও দু’জন প্রকাশক ঋতবাকের পেছনে লেগে আছেন। বাবার অপ্রকাশিত লেখা তাঁরা চান। ঋতবাক সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না। জানেন বাবা অনেক লিখেছেন, যেগুলো খাতাতেই রয়েছে, প্রকাশ করতে চাননি। বলতেন, ওগুলো কখনও দিনের আলো দেখবে না। কিন্তু কাহিনিভাস্কর ঋচিক মহেশ্বরের লেখা অপ্রকাশিত থেকে যাবে — এ যেন মানতে মন চায় না।
কিন্তু গত কয়েক সপ্তাহ হলো বাবার নানা কাগজপত্রের হিসেব করতে করতে অপ্রকাশিত আর অসম্পূর্ণ লেখাগুলো নাড়াচাড়া করে ঋতবাক একটা অস্বস্তির মধ্যে পড়েছেন। বুঝতে পারছেন, বাবার প্রকাশিত লেখার তুলনায় অপ্রকাশিত লেখাগুলোর মান ভালো নয়। এগুলো প্রকাশ করলে কিছুদিন হয়ত নামে কাটবে, কিন্তু কাহিনির প্লট দুর্বল, শুরু ভালো হলেও শেষ ভালো নয়, এবং অনেক ক্ষেত্রেই গল্পের মাথামুণ্ডু কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। লেখক যেন খানিকটা লিখে পথ হারিয়ে ফেলেছেন, বা লেখার ইচ্ছা চলে গেছে।
সত্যিই কি বাবার অপ্রকাশিত লেখা ছাপার যোগ্য নয়? এতটা বিশদে না গিয়েও কথাটা টেলিফোনে অনুজবাবুর সঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে ধমক খেলেন ঋতবাক। শুনলেন, অতবড়ো একজন সাহিত্যিকের লেখা বিচার করার ক্ষমতা ঋতবাকের আছে, সেটা সে মনে করে কী করে? ক্ষুব্ধ হলেন ঋতবাক। উনি নিজেও যে বাংলা সাহিত্যের শিক্ষক, সে কথাটা কি অনুজবাবু ভুলেই গেছেন? বাবার পুরোনো বন্ধু বলে মাঝে মাঝে একটা ক্ষমাশীল ভাবের উদয় হচ্ছিল, সেটা গেল উবে। ফলে যেদিন অভিজিতের অফিসে অনুজবাবু ঋতব্রতর আর ওর মায়ের সঙ্গে নতুন কন্ট্র্যাক্ট সই করলেন, সেদিন অপ্রকাশিত লেখা বই হিসেবে ছাপার কথা উত্থাপন করা মাত্র অভিজিৎ স্বয়ং, এক জুনিয়রকে পাশে নিয়ে স্পষ্ট বললেন, যে ঋচিক মহেশ্বরের বাকি টাকা সুদে আসলে না দেওয়া অবধি অনুজবাবু যেন আর লেখা চাইতে না আসেন। শুধু তা-ই নয়, আগামী দিনে বই বিক্রির হিসেব এবং রয়্যালটির টাকাকড়ির কী বন্দোবস্ত হয়, তা-ও খতিয়ে দেখা হবে। অভিজিৎ এ-ও বললেন, যে ঋতবাক নেহাত ভদ্রলোক, তাই অনুজবাবুর বিরুদ্ধে কনট্র্যাক্ট ফেল করার অপরাধে মামলা করছেন না। রাগে গনগন করতে করতে সেদিন অনুজবাবু বেরিয়ে গেলেন, পরের কয়েকদিন ঋতবাককে ফোন করে উত্তর পেলেন না, ধমক দিয়ে দু’টো মেসেজ লিখতে না লিখতে না লিখতে ঋতবাকের উকিল ফোন করে জানালেন, অনুজবাবুর সব মেসেজ জমানো থাকছে, সুতরাং কী লিখছেন, যেন একটু ভেবে লেখেন।
অনুজবাবুকে অভিজিতের ভাষায় ‘নিউট্রালাইজ’ করে দেবার পরে ঋতবাক অন্যদিকে মন দিতে পারলেন। মনে মনে স্থির করেছিলেন, ঋচিকের অপ্রকাশিত লেখা ছাপান’র কথা এখন না ভাবলেও চলবে। কিন্তু আর একটা লোভনীয় অফার এসেছে বাংলার অন্যতম বড়ো এক সাপ্তাহিকীর সম্পাদকের কাছ থেকে। ঋচিকের কিছু অসম্পূর্ণ কাহিনি নিশ্চয়ই আছে? সেগুলি কি ঋতবাক সম্পূর্ণ করবেন? দুজনের নামেই প্রকাশ করতে চান উনি। এবং পরে হয়ত বই হয়েও বেরোতে পারে? নয় কেন? কত বিখ্যাত সাহিত্যিকের সন্তান তো লেখক মারা যাবার পরে অসম্পূর্ণ লেখা সম্পূর্ণ করেছেন। অনেকে একই সিরিজের লেখা লিখেছেন আরও। কেউই নিজের বাবার মতো অত বিখ্যাত হতে পারেননি — কিন্তু সে ট্র্যাডিশন যদি ঋতবাক ভেঙে ফেলেন? কে জানে! বাবার স্টাডিতে বাবার ডেস্কে বসে লিখছেন — এ স্বপ্ন তো অনেক বছরের... হয়ত পূর্ণ হবে!
দুপুর বেলা বাবার রাইটিং ডেস্কে বসে অসম্পূর্ণ লেখাগুলো নাড়াচাড়া করছিলেন ঋতবাক। এত অসম্পূর্ণ লেখা! অন্তত চারটি উপন্যাস, বাকি, অন্তত তেইশটি এতই কম লেখা, যে ছোটোগল্প, বড়োগল্প বা উপন্যাস — যে কোনও দিকে যেতে পারে। বাবার সব লেখার মতোই শুরুটা চিত্তাকর্ষক, কিন্তু এসব কি বাবার প্রকাশিত গল্পের মতো টেনে নিয়ে যেতে পারবেন ঋতবাক?
রাইটিং ডেস্কটা অতি প্রাচীন। বাবা কিনেছিলেন অকশন থেকে। ওতে এতগুলো ড্রয়ার আর এত খুপরি, এবং প্রত্যেকটাতে এত কিছু, সবকটা ঋতবাক এখনও দেখে উঠতে পারেননি। একটা খুপরিতে খাতায় লেখা সাময়িকীতে প্রকাশিত কাহিনির তালিকা — সেটা আবার বের করেছিলেন, কোনও দরকার নেই, ভেতরে রাখতে গিয়ে মনে হলো খুপরিতে আরও কিছু আছে, খাতাটা ঠিকমতো ঢুকছে না। বাবার টেবিল ল্যাম্পের আলো ওখানে পৌঁছয় না, ঘরের আলোও অন্যদিকে, তাই মোবাইলের টর্চ জ্বেলে ঝুঁকে দেখলেন — একটা খাম। হাত ঢুকিয়ে বের করে আনলেন। ব্যাঙ্কের খাম। ভেতরে একটা চাবি। বুঝতে না পারার কোঁচকানো ভুরু নিয়ে ঋতবাক সঙ্গের চিঠিটা খুললেন। প্রায় সতেরো বছর আগেকার। ব্যাঙ্কের তরফে বাবাকে জানানো হয়েছে, যে বাবার দরখাস্ত মঞ্জুর করে ব্যাঙ্কের লকার দেওয়া হলো, উনি যেন অবিলম্বে...
বাবার লকার? বাবা লকারে কী রাখতেন?
মা’র কাছে গেলেন ঋতবাক। মা বাবার কোনও কিছুতেই থাকতেন না, তবু, পঞ্চাশ বছরের ওপর একই বাড়িতে, একই ঘরে বাস — কিছুই কি জানেন না?
জানেন না। রামকৃষ্ণ কথামৃত-টা মুড়ে রেখে উঠে বসে চশমা খুলে অবাক চোখে তাকালেন। “লকার? সে তো গয়নাগাটি রাখতে লাগে। আমাদের আবার গয়না কোথায়?”
কথা না বাড়িয়ে ঋতবাক বেরিয়ে গেলেন। মা-ও আবার কথামৃত খুলে শুলেন আগের মতো।
~পাঁচ~
বিদেশি থ্রিলারে যেমন থাকে, ঋতবাকের অভিজ্ঞতা মোটেই সেরকম হলো না। প্রথমে কাগজপত্র নতুন করে জমা করতে হলো, তারপরে ব্যাঙ্কের একজন কর্মী এসে নিজের চাবি ঘুরিয়ে চলে গেলেন, ঋতবাককে বললেন, “দশ মিনিট সময় নেবেন। কারণ অনেকেই আসেন লকারে...”
কেন এসেছেন, কী দেখবেন, ঋতবাক কিছুই জানেন না। তাই নিঃশব্দে ঘাড় নাড়লেন। গতকাল থেকে ক্রমে উত্তেজনা বেড়েছে। না জানি কী আছে। টাকাকড়ি? গয়নাগাটি? না কি সম্পত্তির হিসেব? তাহলে কি বাবাকে সত্যিই যতটা গরিব ভাবতেন ততটা নয়? অনুজবাবুর কাছ থেকে আসলে অনেক টাকা-ই পেয়েছেন? সেগুলি দিয়ে কী করেছেন? সোনা কিনেছেন?
লকারের মধ্যে বাক্সে সারিবদ্ধ ব্রাউন-পেপারের খাম দেখে ঋতবাক প্রথমে কিছুই বুঝতে পারলেন না। প্রায় একই রকম রঙের, একই সাইজের খাম, শুধু কোনওটা বেশি মোটা, কোনওটা অত মোটা নয়, আবার কয়েকটা একেবারেই পাতলা। সবকটাতেই একই হাতের লেখায় বাবার নাম, আর ওঁদের বাড়ির ঠিকানা। সবকটাই রেজিস্টার্ড স্পিড পোস্টে — কয়েকটা শুধু রেজিস্টার্ড পোস্ট, স্পিড নয়। অজস্র খাম। কটা? প্রথম খামটাই তুলে নিলেন, খুলে ভেতরে দেখলেন। অবাক! বাবার লেখা গল্প। কিন্তু না! লেখাটা বাবার নয়। হাতের লেখা অপরিচিত।
চার পাতার গল্প। এই তো সেদিন পড়েছেন। পড়তেই হয়। কারণ বাবার লেখা প্রকাশ হওয়া মাত্র ডিপার্টমেন্টের সব শিক্ষকই পড়ে এসে তুলকালাম আলোচনা করেন। সেখানে যোগ দিতেই হয় ঋতবাককে। এটাই বাবার শেষ প্রকাশিত গল্প। কিন্তু এটা ব্যাঙ্কের লকারে একটা অপরিচিত হাতের লেখায় স্পিড পোস্টে আসা ডাকে...
একটা অব্যক্ত আশঙ্কা ঋতবাকের ভেতরটা ঠাণ্ডা করে দিল। কপালে বিনবিনিয়ে ঘাম বেরোল। বুঝতে পারলেন, ব্যাঙ্কের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত আবহাওয়া সত্ত্বেও ঘামে পিঠের গেঞ্জি ভিজে পাঞ্জাবিটাও সেঁটে যাচ্ছে। পরের খামটাও... একইরকমভাবে, বাবার আর একটা লেখা। সেই হাতের লেখাতেই। এই লেখাটাও নতুন। কিছুদিন আগেই বেরিয়েছিল দিল্লির একটা ম্যাগাজিনে। ঋতবাকই পড়তে দিয়েছিলেন সহকর্মীদের।
থামলেন ঋতবাক। তিন চারটে খাম বাদ দিয়ে একটা বেশ মোটা খাম তুলে নিলেন। উপন্যাস। এটা গত বছর পুজোর। পুজোর সময় বাবা নিয়ম করে চারটে উপন্যাস লিখতেন — গত বেশ কয়েক বছর এটাই দস্তুর ছিল। একবার তাকিয়ে দেখলেন, পর পর চারটে খামই বেশ মোটা।
মাথা ঝিমঝিম করছে। ঘরটায় বসার জায়গা নেই। জল খেতে পেলে হত। পকেট থেকে রুমাল বের করে কপালের ঘাম মুছতে গিয়ে লক্ষ করলেন ঘরের ছাদের কাছে একটা সিসিটিভি ক্যামেরা নির্নিমেষ লক্ষ্য করছে ঋতবাককে। এখানে আচরণ স্বাভাবিক রাখতে হবে। মাথা ঠাণ্ডা করে ভাবতে হবে। কতক্ষণ সময় হয়েছে? ঢোকার সময় খেয়াল করেননি। ব্যাঙ্ক কর্মচারি ‘দশ মিনিট’ বলার সময়ে ঘড়ি দেখেছিলেন? মনে নেই। মাথা গুলিয়ে গেছে। যা-ই হোক, বেশি সময় যায়নি। মিনিট কয়েক বড়োজোর।
খামগুলো মন দিয়ে দেখলেন। স্বভাবসিদ্ধ গোছানে বাবা সবকটাতেই ‘রিসিভড’ লিখে তারিখ দিয়েছেন। আর সাজানোও সেই তারিখ অনুযায়ী। কটা খাম? চট করে গোটা পঞ্চাশেক গুনে নিয়ে সেই হিসেবে আন্দাজ করলেন, চারশোর ওপর। প্রথম তারিখটা কবের? প্রায় পঁচিশ বছর আগেকার। একবার মনে হলো, এখানেই ফেলে রেখে তালাবন্ধ করে চলে যাবেন। তারপরে বুঝলেন সেটা ঠিক হবে না। যা-ই হোক না কেন, এগুলোর ব্যবস্থা করতে হবে।
এতগুলো খাম নিয়ে যাবার মতো কিছু নেই সঙ্গে। কাঁধের ঝোলা ব্যাগে একতাড়া খাম ভরলেন। আন্দাজে গোটা পঞ্চাশই হবে। বাকিগুলো আবার ভরে রাখলেন লকারে। তালা বন্ধ করে বেরিয়ে এলেন। ব্যাঙ্ক কর্মচারি একগাল হেসে ভেতরে গেলেন নিজের চাবি লাগাতে।
বাড়ি ফিরে খামগুলো বাবার রাইটিং ডেস্কের ড্রয়ারে রেখে তালাবন্ধ করলেন। দুপুরে খাওয়া শেষ করে চঞ্চরী শুতে গেল, ঋতবাক গেলেন বাবার স্টাডিতে।
ঝকঝকে বাংলা লেখা। প্রাপকের আর প্রেরকের নাম সুন্দর করে খামের সামনে, যথাক্রমে মধ্যিখানে, আর নিচে, বাঁদিকে লেখা। প্রেরক, শ্রী অমিত মুখোপাধায়, গ্রাম — মাতোড়... বিশদ করে পোস্ট অফিস, জেলা, এমনকি থানার নামও দেওয়া আছে।
খামের ভেতরে একটা ছোটোগল্প। ‘ঘেরাটোপ’। গল্পটা সমাদৃত হয়েছিল। প্রথমে বি-এ ক্লাসে, তারপরে হায়ার সেকেন্ডারির সিলেবাসে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। ঋতবাক নিজেও পড়েছেন, পরীক্ষা দিয়েছেন। প্রশ্নগুলোও মনে আছে। আট পাতার গল্পের সঙ্গে একটা চিঠি। চিঠিটা পড়তে পড়তে ঋতবাকের মাথা থেকে হিমশীতল স্রোত নামতে শুরু করল।
“পরমশ্রদ্ধেয় সাহিত্যিক, শ্রী ঋচিক মহেশ্বর সমীপেষু,
“সুধী,
“অধীনের ধৃষ্টতা মার্জনা করবেন, বিনা পরিচয়ে আপনাকে সরাসরি চিঠি লিখলাম...” ঔধ্যত্বের জন্য বহু মার্জনা, বহু ক্ষমা চেয়ে লেখক অনুরোধ করেছেন, বহু প্রচেষ্টায় তিনি তাঁর কোনও লেখাই কোনও পত্রিকার সম্পাদককে দিয়ে প্রকাশ করাতে পারেননি। ঋচিক খ্যাতনামা সাহিত্যিক, তিনি কি দয়া করে এই ছোটোগল্পটি কোনও যথাযোগ্য পত্রিকার সম্পাদকের নজরে এনে লেখকের লেখা দিনের আলোয় এনে দিতে পারেন... ইত্যাদি।
এ পর্যন্ত বোঝা গেল। অনেক খ্যাতনামা লেখকই এমন চিঠি পেয়ে থাকেন। বাবা-ও অন্যথা নন। ঋতবাকের ধারণা ছিল ঋচিক এরকম চিঠি পেলে না খুলেই তালাবন্ধ করে রেখে দিতেন, যাতে কেউ পরে বলতে না পারে, যে ঋচিক তাঁর লেখা থেকে চুরি করে নিজের গল্প লিখেছেন। কিন্তু এই লেখাটা খোলা অবস্থায় খামসুদ্ধ জমানো রয়েছে, সেই সঙ্গে আরও কয়েকশো লেখা।
ব্যাপারটা কী?
পরের কয়েকটা লেখাও একই রকম চিঠির সঙ্গে। চিঠির বয়ান থেকে সহজেই বোঝা যায়, ঋচিকের সঙ্গে লেখকের চিঠির আদানপ্রদান চলেছে। কয়েকমাস পরে পরেই একটা খাম এসেছে — সঙ্গে একটা নতুন ছোটোগল্প।
যেগুলির প্রায় সবকটাই ঋতবাক চেনেন। সবই উপন্যাসভাস্করের রচনাসম্ভারে একদিন না একদিন ছেপে বেরোবে।
আবার ঘেমে গেলেন ঋতবাক। লেখার ধরণ আলাদা। বাক্যবিন্যাস ভিন্ন। রচনাভঙ্গি কখনওই বাবার নয়। কিন্তু লেখা কার, তা বোঝার অপেক্ষা রাখে না। এই লেখাগুলোই বাবা নিজের মতো করে লিখে নিজের নামে ছাপিয়েছেন।
প্রথম দশ বারোটা খামের পরে শুধু লেখা-ই রয়েছে। তার সঙ্গে কোনও চিঠি আর নেই। কিন্তু আবার কিছুদিন পরে একটা উপন্যাসের সঙ্গে চিঠিটা রহস্যোদ্ধারে সাহায্য করল। বোঝা-ই গেল, অমিত মুখোপাধায়ের সঙ্গে ঋচিক মহেশ্বরের একটা ন্যক্কারজনক বোঝাপড়া হয়েছে...
“আপনার নির্দেশমত উপন্যাসের অর্ধেক পাঠালাম। আপনি যে উপকার আমার করছেন, আপনার বদান্যতায় আমার অকিঞ্চিতকর রচনা দিনের আলোয় প্রকাশ হচ্ছে, জনসাধারণের কাছে যাচ্ছে, এ জন্য আমি আপনার কাছে চিরকৃতজ্ঞ থাকব। আপনার লেখনিতে আমার লেখার যে উৎকর্ষপ্রাপ্তি হয়েছে...”
গা ঘিনঘিন করে উঠল ঋতবাকের।
যে কটা খাম এনেছেন, সবকটাতেই গল্প রয়েছে। সবকটাই ছেপে বেরিয়েছে কোনও সময়। সবাই জানে সেগুলো কাহিনিভাস্কর শ্রী ঋচিক মহেশ্বরের লেখা। এতদিন ঋতবাকও তা-ই জানতেন। আজ নিজের বাবার সম্বন্ধে যে কথাগুলো নতুন করে বুঝতে পারছেন, তা মাথা হেঁট করে দিচ্ছে ঋতবাকের।
~ছয়~
সেদিন স্টাফরুমে উৎপল বলল, “ঋতদা, আপনার বাবার সম্বন্ধে একটা লেখা... একটু দেখবেন, প্লিজ?”
ঋতবাক হাত বাড়িয়ে কাগজগুলো নিয়ে সামনে রাখলেন। আজকাল কলেজে বেশি কথা বলতে পারেন না। চুপচাপ ক্লাস নিয়ে ফিরে আসেন। স্টাফরুমে কারওর সঙ্গে কথা বলতে চান না। নজর পড়ল উৎপলের লেখার দিকে। ‘চিরপরিচিত সাহিত্যিক শ্রী ঋচিক মহেশ্বর যেদিন ‘ঘেরাটোপ’ লিখলেন, সেদিন বাংলা সাহিত্যে এক উল্লেখযোগ্য দিন হয়ে থাকবে, কারণ সেইদিনই ছিল ওঁর সাহিত্যিক থেকে কাহিনিভাস্কর হবার প্রথম পদক্ষেপ...’
“উৎপল?”
ঋতবাকের গলায় একটা উৎকণ্ঠা ছিল, যা পুরো স্টাফরুমকেই সচকিত করল। উৎপল বোধহয় ক্লাস নিতে যাচ্ছিল, থমকে ফিরে বলল, “হ্যাঁ, ঋত-দা?”
“‘ঘেরাটোপ’ কবে প্রথম প্রকাশ তোমার মনে আছে?”
“আছে বৈকি, এখনই তো পড়াব। ওই ওতেও রয়েছে, দেখুন, গ্রন্থপঞ্জী রয়েছে পেছনে...”
উৎপল বেরিয়ে গেল। শেষ পাতায় দেখলেন, ‘দিগন্তমালা’ পত্রিকায় ‘ঘেরাটোপ’-এর প্রথম প্রকাশ যখন, তখন ঋতবাকের বয়স চোদ্দো পেরিয়ে পনেরোয় পৌঁছেছে প্রায়। আবার উৎপলের প্রবন্ধের শুরুটা পড়লেন। ‘ঘেরাটোপ’ বাংলা সাহিত্যে উল্লেখযোগ্য দিন, কারণ সেদিন ঋচিক মহেশ্বরের লেখনশৈলী এক নতুন মাত্রা পেয়েছিল। তারিখটা দেখলেন আবার। একটা কাগজে লিখেও নিলেন। তারপরে উৎপল ফিরে এলে লেখাটা ফেরত দিয়ে বললেন, “ভালো লিখেছ। ছেপে বেরোলে একটা কপি দিও। তোমার কাছে বাবার লেখার কোনও পঞ্জী রয়েছে? আমি যদি লেখার তালিকা দিই, প্রথম প্রকাশের তারিখ জানাতে পারবে?”
বাড়ি ফিরে চিঠির তাড়া নিয়ে বসলেন। আজকাল অনেকটা সময় যায় বাবার ডেস্কে। চঞ্চরী অফিস থেকে ফেরার আগেই শেষ করতে হবে। এই চিঠিগুলো ওর দেখা চলবে না। তিন দিন অপেক্ষা করে, নিজের ডে-অফ-এর দিন, চঞ্চরী অফিসে বেরোন’র পরে ব্যাঙ্ক থেকে নিয়ে এসেছেন। বড়ো বাক্স নিয়ে যেতে হয়েছিল। এখন বাবার ডেস্কের আনাচে কানাচে, তারিখ অনু্যায়ী সাজান’।
পরদিন, প্রথম কুড়িটা চিঠিতে যে লেখাগুলো এসেছিল, তার একটা তালিকা দিলেন উৎপলকে। বললেন, “এই লেখাগুলোর প্রথম প্রকাশের তারিখ তোমার কাছে পাব?”
পনেরো মিনিটের মধ্যেই এনে দিল উৎপল। ঠিক যে ক্রমে চিঠিগুলো এসেছিল, সেই ক্রমে না হলেও, কাছাকাছি। এবং এ বিষয়ে সন্দেহ নেই, যে ‘ঘেরাটোপ’-ই প্রথম। প্রথম উপন্যাসও ‘ইচ্ছামৃত্যু’। যেটা ডাকে আসা প্রথম উপন্যাস।
ঋতবাকের জন্মদাতা পিতা সাহিত্যিক ন’ন। কুম্ভীলক।
ঋচিক মহেশ্বরের পুরোনো লেখা আজকাল আর পাওয়া যায় না। বাবার ঘরে বইয়ের আলমারির একেবারে ওপরের তাকে কয়েকটা বই রয়েছে, সেগুলোর রিপ্রিন্ট নেই। দু’চারজন উৎসাহী প্রকাশককে বলায় তারা পিছিয়ে গেছে। না। ওই সময়ের লেখা বোধহয় মার্কেট পাবে না।
ঋতবাক জানেন ওরা কী বলছে। ওই লেখাগুলো ভালো নয়।
অমিত মুখোপাধ্যায়ের লেখা ভালো।
শুধু ভালো নয়। প্রথমদিকের লেখাগুলো বাবা বদলেছেন। নিজের লেখার ঢঙে সাজিয়েছেন। যত দিন গেছে, তত ডাকে পাওয়া লেখা আর প্রকাশিত লেখার মধ্যে তফাত কমেছে। বার বার করে দেখে বুঝেছেন, অমিত মুখোপাধ্যায়ের লেখার শৈলী আরও পরিশীলিত হয়েছে। ক্রমে উপন্যাসভাস্করের লেখা আর অমিত মুখোপাধ্যায়ের লেখায় প্রায় কোনও তফাতই পাওয়া যায় না।
কী পেতেন অমিত? শুধু আনন্দ? না কি...
হঠাৎ কী খেয়াল হলো, বাবার গত কয়েক বছরের ব্যাঙ্কের পাসবই নিয়ে বসলেন। ডেবিটের কলামে... ডেবিটের কলামে... এই তো। কিছুদিন, মানে কয়েক মাস পরে পরেই একটা করে পেমেন্ট। কখনও হাজার, কখনও সাতশো, কখনও বা পাঁচশো। পাসবইয়ের এন্ট্রি থেকে বোঝা যাচ্ছে, বাবার অ্যাকাউন্ট থেকে ইন্টারনেট ব্যাঙ্কিং-এর মাধ্যমে টাকা যেত। বাবা ইন্টারনেট ব্যাঙ্কিং করত? কই, মনে পড়ে না তো!
একটু নাড়াঘাঁটা করেই বুঝলেন, এই একটা অ্যাকাউন্টেই নেটব্যাঙ্কিং-এর মাধ্যমে টাকা পাঠাতেন বাবা। সম্ভবত যাতে কেউ বুঝতে না পারে। বাবার বন্ধ করে রাখা মোবাইলটা খুলে ব্যাঙ্কের আইকনটা টিপে চালু করলেন। বাবার মৃত্যুর পরে ব্যাঙ্কের সাহায্যে সবকটারই পাসওয়ার্ড এখন বদলানো হয়েছে।
পে ক্যাশ... ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট... অ্যাডেড বেনিফিশিয়ারিজ... এই তো... বেনিফিশিয়ারির তালিকায় একটাই নাম — বা, বলা ভালো, নাম নয়, নামের আদ্যক্ষর — এ.এম.। অ্যাকাউন্ট নাম্বারের জায়গায় এক সারি এক্স-এর পরে শেষ চারটে সংখ্যা পাসবইয়ের অ্যাকাউন্ট নম্বরের শেষ চারটির সঙ্গে মিলে যাচ্ছে।
আর সন্দেহ নেই। এবার শুধু গিয়ে জিজ্ঞেস করার অপেক্ষা।
হ্যাঁ। মাতোড় গ্রামে ঋতবাককে এবারে যেতেই হবে।
~সাত~
সকাল সকাল বেরিয়েও তিনটে বাস বদলে মাতোড় পৌঁছতে দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে এল। আসতে আসতে মনে হচ্ছিল ফিরতে অসুবিধে হবে, দু’একবার ভেবেছিলেন ফিরে যাবেন, কিন্তু কী একটা অদম্য ইচ্ছার টানে চলতেই থেকেছেন। ফেরেননি।
দুপুরের ঝলসানো রোদ পড়ে এসেছে, বাস স্টপের চায়ের দোকানে অমিত মুখোপাধ্যায়ের নাম বলে পকেট থেকে কাগজটা বের করতে হলো না, তিন-চারজন একসঙ্গে বললেন, “মাস্টারমশায়ের বাড়ি যাবেন? ওই তো, সোজা রাস্তায় যান, বড়োপুকুর পার করে ডাইনে গিয়ে বাম দিকে গেলেই শীতলা মন্দির, তার দুটো বাড়ি পরেই। সবাই চেনে, দেখিয়ে দেবে। অ্যাই হারান, হারান রে, যা না, স্যারকে মাস্টারমশায়ের বাড়ি নিয়ে যা... লক্ষ্মী ছেলে।”
সাইকেল ঠেলতে ঠেলতে ঋতবাকের সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে হারান জানতে চাইল, “আপনি কোত্থেকে এসেছেন? কী করেন? মাস্টারমশাইয়ের সঙ্গে কাজ আছে?” তারপরে বড়োপুকুরের ধার থেকেই আঙুল তুলে দেখাল, “ওই, শেতলা মন্দিরের পরেই বাড়ি — জবা গাছ দেখা যাচ্ছে।” তারপরে বলল, “আমার স্কুলের মাঠে ফুটবল ম্যাচ...”
ঋতবাক বললেন, “রওয়ানা দাও, নইলে দেরি হয়ে যাবে।” ছেলেটাকে দু’বার বলতে হলো না। তড়াক করে সাইকেলে উঠে উধাও হয়ে গেল যে দিক থেকে এসেছিল সেদিকেই।
উঠোন থেকে কমবয়সী একজন মহিলা বিকেলের রোদ থেকে কুলোয় করে রাখা বড়ি তুলে নিয়ে যাচ্ছিলেন, ঋতবাককে দেখে ঘোমটা টানলেন। প্রশ্নের উত্তরে ঘাড় কাত করলেন — এটাই অমিত মুখোপাধ্যায়ের বাড়ি বটে। তারপরে অতি অস্ফূটে বললেন, “আসুন...” প্রায় শোনা-ই গেল না। বাখারির গেট খুলে ঢুকলেন ঋতবাক। ছোট্ট বাগান, তাতে ফুলগাছেরই ভীড় বেশি। মহিলা বাড়ির ভেতরে ঢুকে গেছেন। ঋতবাক কী করবেন বুঝতে না পেরে বাইরেই দাঁড়িয়েছিলেন। আবার বেরিয়ে এসে বললেন, “আসুন।”
বাড়ির ভেতরটা অন্ধকার। ঋতবাক ঢুকতে ঢুকতে কেউ আলো জ্বালিয়ে দিল। ছোটো ঘর। একটা টেবিল, একটা খাট — টেবিলে একজন বসে রয়েছেন, বাইরের দরজার দিকে তাকিয়ে। টেবিলের পাশে দুটো কাঠের ক্রাচ-ও নজরে পড়ল।
“কে?” ভদ্রলোকের গলায় অস্বস্তি। দেখে মনে হয় বয়স ঋতবাকের চেয়ে অন্তত বছর দশেক বা পনেরো বেশি। ঋতবাক নিজের নাম বললেন। “আপনার সঙ্গে দেখা করতে এসেছি।”
বুঝলেন, আর কিছু বলতে হবে না। উনি বুঝেছেন। ভেতরের দরজায় একজন বয়স্ক ভদ্রমহিলা, বাইরের দরজায় যিনি ঋতবাককে ডেকেছেন। অমিত, উনিই অমিত, বললেন, “আমার স্ত্রী, সবিতা। আর ও — ” বলে বাইরের দরজায় যুবতীকে দেখালেন, “আমার ছেলের বউ।” তারপর বললেন, “তোমরা ভেতরে যাও। আমাদের কিছু কাজের কথা আছে। আপনাকে অনেকটা রাস্তা আসতে হয়েছে। খেয়েছেন?” শেষটা আবার ঋতবাককে উদ্দেশ্য করে।
ঋতবাক নিশ্চিন্ত করলেন। “খেয়েছি। আপনারা ব্যস্ত হবেন না।”
“চা চলবে? তবে আপনাদের মতো চা তো এখানে... গ্রামদেশের চা খান...” এবারে আর কিছু বলতে হলো না, দুজনই বেরিয়ে গেলেন, বাড়ির ভেতর দিকে।
কিছুক্ষণ দুজনেই চুপচাপ। অমিত মুখোপাধ্যায়ই প্রথম কথা বললেন।
“আপনার বাবা কিন্তু আমার বাড়িতে চা খেতেন না। বলতেন, এই চা আমার চলবে না।”
বাবা নাক-উঁচু ছিলেন। ঋতবাক যেখানে খুশি চা খেতেন বলে বাড়িতে পেছনে লাগতেন। “আমার ছেলে হয়ে ফুটপাথের চায়ের দোকানে চা খাস? এ-সব কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার ফল।”
ঋতবাকও ছাড়তেন না। বলতেন, “তুমি যাদবপুর বলে নাক উঁচু হয়েছ। আমি সব এনজয় করতে পারি...”
তখন এ কথাগুলোর মধ্যে মজা ছিল। এখন কেমন ঘেন্না হলো। এই লোকটার লেখা চুরি করে বাবা কাহিনিভাস্কর হয়েছে। এর বাড়ির চা-ও খেত না?
“অবশ্য ডাল-ভাত তৃপ্তি করে খেতেন... মানে খেয়েছিলেন...”
ও।
“বাবা প্রায়ই আসতেন?”
এতক্ষণে ঘরের আলো-আঁধারিতে চোখ সয়ে গেছে ঋতবাকের। অমিত মুখোপাধ্যায়কে পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছেন। না কামানো দাড়ি, অবিন্যস্ত একমাথা কাঁচাপাকা চুল, আর চেয়ারের ওপরে হাঁটুর ওপরেই শেষ হওয়া একটা পা। মাথা নাড়লেন অমিত। “সবসুদ্ধ পাঁচ-ছ’বার এসেছিলেন। সে অনেক বছর আগের কথা... তারপরে তো দরকার হত না...”
“কী করে যোগাযোগ হয়েছিল?” ঔৎসুক্য আর চাপতে পারলেন না ঋতবাক। “কী ভাবে আপনার লেখা বাবার নামে...” ঋতবাক বাক্যটা শেষ করতে পারলেন না।
বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন অমিত মুখোপাধ্যায়। তারপর আস্তে আস্তে বললেন, “আপনি এখানে এসেছেন, মানেই লেখাগুলোর বিষয়ে এ তো স্বাভাবিক। কিন্তু আমি ভাবিনি আপনি সে সম্বন্ধে কিছু জানেন। আমার সঙ্গে ঋচিকবাবুর যা কথা হয়েছিল...”
আবার থামলেন অমিত। ঋতবাক একদৃষ্টে তাকিয়ে। অমিত মুখোপাধ্যায় কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে আবার শুরু করলেন, “আমি ওঁর লেখার অন্ধ ভক্ত ছিলাম। প্রথমদিকে তো বড়ো ম্যাগাজিনে লেখা দিতেন না... নানা লিটিল ম্যাগাজিনে বেরোত। আমি তখন থেকেই যে ভাবে হোক ওঁর লেখা জোগাড় করে পড়তাম। পরের দিকে ঋচিকবাবু আস্তে আস্তে পরিচিত ম্যাগাজিনেও লেখা দিতে শুরু করলেন, জোগাড় করা সহজ হয়ে এল। লেখার অভ্যেস আমারও ছোটো থেকেই। তার একটা দুটো ছোটো ম্যাগাজিনে বেরিয়েছিল। কিন্তু কারও চোখে পড়েনি কখনও। একদিন কী মনে হলো, একটা লেখা দিলাম পাঠিয়ে। অনুরোধ করেছিলাম, যে যদি উনি সম্যক মনে করেন, যেন কোনও যোগ্য পত্রিকায় লেখাটা পাঠিয়ে দেন।”
“বাবা কোনও লেখা পড়তেন না...” বলতে চেয়েছিলেন, প্রায় কৈফিয়ত চাওয়ার মতো করে — যে মানুষটা কারও লেখা পড়তেন না, তিনি কেন হঠাৎ অমিত মুখোপাধ্যায়ের লেখা-ই পড়তে গেলেন? কিন্তু, শেষ মুহূর্তে কথাটা মুখ দিয়ে বেরোল না। থতিয়ে গেলেন।
অমিত মুখোপাধ্যায় মাথা নাড়লেন। বললেন, “সে পরেকার কথা। আমি যখন পাঠিয়েছিলাম, তখন পড়তেন। আমার লেখাও পড়েছিলেন। উত্তর দিয়েছিলেন। খুব যত্ন করে লেখা চিঠি। রাখা ছিল আমার কাছে বহু বছর... তারপরে সেই যে বন্যা হলো... সবই ভেসে গেছিল তখন।”
শরীরটাকে ঘুরিয়ে দেওয়ালের ওপরের দিকে প্রায় ছাদের কাছে একটা তাক দেখালেন। বললেন, “দামি কাগজপত্র সব ওইখানে রাখি, তবে বন্যা হলে কি আর ওতে বাঁচে, বাঁচে না।”
বাইরের আলো কমে এসেছে আরও। ঘরের আলোর উজ্জ্বলতা বেড়েছে বোধহয়। আজকালকার এল-ই-ডি বাতিতে এটা হয়, কিছুক্ষণ জ্বলার পরে আলোর রোশনাই বাড়ে। ঋতবাক জানতে চাইলেন, “কী লিখেছিলেন?”
অমিত মুখোপাধ্যায় বললেন, “খুব ভালো চিঠি লিখেছিলেন। বলেছিলেন, আমার লেখার প্রশংসার ভাষা নেই ওঁর কাছে। প্লট, কাহিনির বিন্যাস — সবই সুন্দর, তবে আজকালকার পত্রিকায় ঠাঁই পেতে গেলে বদলাতে হবে ভাষা। বলে দিয়েছিলেন, কী কী করতে হবে। তারপরে আমার পাণ্ডুলিপিতেই কিছু কিছু জায়গায় লিখে দিয়েছিলেন। আমি ওঁর নির্দেশমত আবার লিখেছিলাম। উনি সেটাও সম্পূর্ণ পছন্দ করেননি। তবু পাঠিয়েছিলেন কয়েকজনকে। পরে জানিয়েছিলেন, সম্পাদকেরা কেউই সেটা চাননি। তখন উনি প্রথম এসেছিলেন এখানে। প্রায় হাতে ধরে আমাকে দিয়ে লিখিয়েছিলেন। আমি বলেছিলাম, আমার লেখা ছাপা হবে না। উনি বলেছিলেন, হবে। আমি বলেছিলাম, এ লেখা যদি উনি লিখতেন, তাহলে শুধু লেখনশৈলীর জোরেই ছাপা হত। তখন একটা অদ্ভুত কথা বলেছিলেন। বলেছিলেন, উনি আজকাল লিখতে পারছেন না। গল্পের প্লট পাচ্ছেন না মাথায়। যা আসে সবই দুর্বল, তাই সেগুলি সম্পাদকদের দেন না। বহু মাস হয়ে গেছে, উনি লেখেননি কিছুই। এতবড়ো একজন লেখকের মুখে এরকম হাহাকারের সুর শুনে আমি বলেছিলাম, ‘ও গল্পটা আপনিই লিখে দেন না, সম্পাদককে? আমার লেখার মান এত ভালো নয়, যে ছাপার যোগ্য। আপনি অবশ্যই ওটা লিখলে ছাপবেন তাঁরা।’
“প্রথমে হেসেছিলেন। তারপরে আমি খুব জোর দিয়ে বলাতে কী ভেবে বলেছিলেন, ‘বেশ। লিখব। কিন্তু আপনার চেয়ে ভালো হবে বলে মনে হয় না।’”
এত সহজে? এত সহজে ব্যাপারটা হয়েছিল? কোথাকার এক অপরিচিত অ-লেখকের কেবল মুখের কথায় ঋচিক মহেশ্বরের মতো একজন লেখক চুরি করতে রাজি হয়ে গেলেন?
অমিত বলে চলেছেন, “হাতে পায়ে ধরতে বাকি রেখেছিলাম... বলেছিলাম, ‘আপনি কোনও দিন আমার কাছ থেকে কোনও অভিযোগ শুনবেন না। তবু আপনার হাত দিয়ে যদি আমার চিন্তা অমরত্ব পায়, তা-ই আমি পরম প্রাপ্তি মনে করব...”
“তারপর?”
“বলেছিলেন, বেশ, যদি এ লেখা ছেপে বেরোয়, তাহলে এর পারিশ্রমিক আপনাকে নিতে হবে।”
বাঃ, সুন্দর ব্যবস্থা। ঋতবাক জানতে চাইলেন, “দিয়েছিলেন?”
ঘাড় নাড়লেন অমিত। “দিয়েছিলেন। দুশো টাকা। লিখে পাঠিয়েছিলেন, পারিশ্রমিকের অর্ধেক মূল্য। পরবর্তীতেও তা-ই করেছেন। যখন যা লেখা বেরিয়েছিল, তা থেকে যা পেয়েছিলেন, তার অর্ধেক আমাকে দিতেন — বই থেকেও।”
যে কেউ বলবে, অমিত মুখোপাধ্যায়ের প্রাপ্যের অর্ধেক ঋচিক মহেশ্বর চুরি করেছিলেন। ঋতবাকও। জানতে চাইলেন, “কিন্তু সে লেখা, বা সে বই যদি আপনার নামে বেরোত, তাহলে তো তার সব উপার্জনই আপনারই হত?”
মাথা নাড়লেন অমিত। কী বলতে যাবেন, ভেতরের দরজা ঠেলে ঘরে এলেন অমিতর স্ত্রী এবং বৌমা। সবিতা বললেন, “একটু চা খেয়ে নিন।”
চায়ের কাপ হাতে নিলেন ঋতবাক। পাশে কাঠের টুল রেখে তাতে একবাটি মুড়ি রেখে সবিতা বললেন, “মুড়ি নারকোল। অল্পই দিলাম। রাতের খাবার খেতে পারবেন না নইলে...”
আঁতকে উঠলেন ঋতবাক। “রাতের খাবার? না না...”
অমিত বললেন, “কেন নয়? এখান থেকে আজ রাতে আপনি তো শহরে ফিরতে পারবেন না...”
প্রশ্নটা ঋতবাক করতেনই — সুযোগ পেয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “কিন্তু চন্দ্রকোণা টাউনে তো রাতেও যেতে পারব। আমি আজ ওখানেই থাকব রাতে। ওখানে হোটেল আছে, খোঁজ নিয়ে এসেছি।”
মুখোপাধ্যায় দম্পতির সনির্বন্ধ অনুরোধ ঠেলে আজ কোনওভাবেই রাতে থাকবেন না, স্থির করতে পাক্কা পনেরো মিনিট লাগল। ছেলের বউকে অমিত বললেন, “মা আমার, ওই তাক থেকে আমার বইয়ের একটা কপি পেড়ে দিবি রে?” উত্তরে তিনি কিছু না বলে খাটে উঠে হাত বাড়িয়ে একটা বই বের করে অমিতর হাতে দিলেন। টেবিল থেকে কলম তুলে তাতে খসখস করে কিছু লিখে ঋতবাকের হাতে দিলেন বইটা। বললেন, “আপনাকে দিলাম। আপনার বাবাকেও দিয়েছিলাম, কিন্তু সে আর এতদিন পরে হয়ত নেই।”
বইয়ের নাম ‘পাণ্ডুলিপি ও অন্যান্য গল্প’। লেখক অমিত মুখোপাধ্যায়। ভেতরের ছিয়ানব্বই পাতায় সবসুদ্ধ ছ’টি গল্প। সস্তা কাগজ, বিশ্রী ছাপা। অমিত বলে চললেন, “এই বইটা আমার একমাত্র ছাপা বই। পড়ে দেখবেন। আমাদের ইস্কুলের একবার কিছু অর্থাগম হয় — এক প্রবাসী বাসিন্দা গ্রামের স্কুলে বেশ কিছু অনুদান দেন, লাইব্রেরির জন্য। হেডস্যারের অনুরোধে গ্রামবাসী হিসেবে লাইব্রেরি কমিটির সদস্য হয়েছিলাম। লাইব্রেরির প্রয়োজনেই এই পাবলিশারের কাছ থেকে সবচেয়ে বেশি বই কেনা হয়। আমার সিলেক্ট করা বইয়ের তালিকা দেখে মালিক আমাকে বইয়ের দামের ৩০% দিতে চেয়েছিলেন। আমি বলেছিলাম, সমমূল্যের বই যেন তিনি লাইব্রেরিকে দেন। উনি বলেন, আমার জন্য কিছু করে দিতে চান। তখন লজ্জার মাথা খেয়ে জানতে চেয়েছিলাম, আমি খরচাপাতি দিতে পারব না, আমার ছোটোগল্পের একটা বই কি উনি প্রকাশ করবেন? এ-ই সেই বই। তিনশো কপি ছাপা হয়েছিল। পাবলিশারের কাছ থেকে কিছুই পাইনি। পঁচিশটা বই দেবার কথা ছিল, তা-ও দেননি। বা, বলা ভালো, দেননি আপনার বাবা আমার হয়ে পাবলিশারের অফিসে হানা দেওয়া অবধি। এরও এক বছর পরে ঋচিকবাবুই খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন প্রায় দুশো কপি বই প্রকাশকের দপ্তরে পোকার খাদ্য হচ্ছে, এবং উনিই সবকটা কিনে আমাকে দেন। ঋতবাকবাবু, আপামর বাঙালি লেখকের এ-ই ভবিতব্য। ক’জনের লেখনিতে এমন জোর আছে, যে তিনি ঋচিক মহেশ্বর হতে পারেন?”
নামেই ভদ্রলোক এমন অভিভূত, যে আর কিছুই ভাবতে পারছেন না। ঋতবাক বললেন, “আপনার প্রথম দিকের লেখা পড়লে সে কথা মনে হতে পারে, অমিতবাবু। তখন বাবা আপনার লেখা অনেকটাই নিজের মতো করে সাজাতেন, প্লটে পরিবর্তন করতেন — মূল ধারাটা একই রেখে বদল করতেন অনেকটাই, বিশেষত ভাষা। কিন্তু গত বেশ কয়েক বছরে আপনার লেখা পাণ্ডুলিপি আর বাবার নামে প্রকাশিত লেখার মধ্যে ফারাক প্রায় নেই বললেই চলে...”
এবারেও বাক্যটা শেষ করতে পারলেন না ঋতবাক।
অমিত মুখোপাধ্যায় কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইলেন। তারপরে বললেন, “আপনি সিনেমা দেখেন, ঋতবাকবাবু?”
কেন? দেখেন তো বটেই, কিন্তু হঠাৎ এ কথা কেন?
“উত্তমকুমারের ছবিতে হেমন্ত মুখার্জির গান শুনেছেন? দুজনের গলা কেমন এক? মনেই হয় না অন্যের গাওয়া গানে উত্তমকুমার লিপ দিয়েছেন, তাই না? আবার অনেক জায়গায় এমনও হয়েছে, যে গানের মাঝে উত্তমকুমারের সংলাপ থাকার কথা — হেমন্ত সে-ও বলে দিয়েছেন। কোনও এক ইন্টারভিউয়ে হেমন্ত বলেওছিলেন। যত দিন গেছে তত দুজনের কণ্ঠস্বর যেন আরও একরকম হয়ে উঠেছে...”
কীসের উত্তরে কী কথা! ভদ্রলোকের কি মাথা খারাপ? গান গাইতে গাইতে সংলাপ বলা, আর নিজের লেখা অন্যের নামে ছাপানো, বা অন্যকে চুরি করতে দেওয়া এক হলো?
তা-ও ছাড়লেন না ঋতবাক। বললেন, “পরের দিকে যখন আপনার লেখা আমার বাবাকে পরিবর্তনও করতে হত না নিজের বলে চালাতে — তখনও কি আপনার লেখা নিজের জোরে ছেপে বেরোত না, অমিতবাবু?”
অমিত মুখোপাধ্যায় চুপ করে মাটির দিকে চেয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। তারপরে বললেন, “বেরোত না, ঋতবাকবাবু। আপনার বাবা নিজেই সে চেষ্টা করেছেন বিভিন্ন সময়ে। শেষবার হয়ত এই বছর চার-পাঁচেক আগে। বহু সম্পাদক লেখা ফেরত দিয়েছেন। একজন তো বলেইছিলেন, ‘এ লেখা আপনার হলে আমি এখনই ছাপতাম, কিন্তু নতুন লেখকের লেখা ছাপব না।’ সে লেখা-ই নিজের নামে পাঠিয়ে অন্য ম্যাগাজিনে ছেপেছেন উনি। পরে সেই সম্পাদক ফোন করে বলেছিলেন, ‘আপনি অন্যের নামে লেখা পাঠিয়ে আমার পরীক্ষা নিচ্ছিলেন?’ শান্ত করতে ওঁকে ঋচিকবাবু আবার অন্য লেখা দেন।”
“টাকা পাঠাতেন নিয়মিত...” ঋতবাকের কোনও বাক্যই কি আজ সম্পূর্ণ হবে না?
উৎসাহভরে অমিতবাবু বললেন, “অবশ্যই। বলতেন সবসময় ৫০-৫০। অতি সজ্জন ব্যক্তি ছিলেন। পরের দিকে বলতেন, প্রকাশক যত দেবার কথা তত দিচ্ছে না বলে উনিও আমার সঠিক পারিশ্রমিক দিতে পারছেন না। ম্যাগাজিনে ছাপালে আর কতটুকু? বই হয়ে বেরোলেই তার রয়্যালটি কিছু নিয়মিত রোজগারের বন্দোবস্ত করে দেয়। সেটা হত না।”
দারিদ্রে মোড়া ঘরটার চারিদিকে চেয়ে দেখলেন ঋতবাক। সংসার কত বড়ো? উপরি রোজগারের ওপর কতটা নির্ভরশীল ছিলেন? বললেন, “কিছু মনে করবেন না, বাবার মৃত্যুতে আপনার কি খুব আর্থিক অনটন হবে?”
এতক্ষণ চুপ করে রইলেন অমিত মুখোপাধ্যায়, যে ঋতবাক ভাবতে শুরু করেছিলেন যে এবারে উনি ভদ্রলোককে রাগিয়েই দিয়েছেন। কিন্তু যখন উত্তর দিলেন, তখন একই রকম ভঙ্গিতে বললেন, “কী আর বলি — খুবই হবে। সত্যি বলতে কী, ওই রোজগারটাই আমার প্রধান রোজগার...”
অবাক হয়ে ঋতবাক বললেন, “আপনাকে সবাই মাস্টারমশাই বলে — আপনি কি এখানে স্কুলশিক্ষক নন? সরকারি স্কুলশিক্ষক কত মাইনে পান আমি জানি না। মাপ করবেন...”
আবার মাথা নাড়লেন অমিত মুখোপাধ্যায়। বললেন, “আমি স্কুলশিক্ষকতা করি না বহু বছর। এ গ্রামের স্কুলে তো নয়ই। এখান থেকে পনেরো কিলোমিটার দূরে একটা স্কুলে আমার অ্যাড-হক পোস্টিং হয় জীবনের শুরুতে। কয়েক বছর পড়িয়েছিলাম, পার্মানেন্ট হইনি। তার আগেই একদিন সাইকেলে স্কুলে যাবার পথে অ্যাক্সিডেন্ট হয়।” নিজের পায়ের দিকে দেখালেন অমিত। “বাস। তারপর থেকে তো অতদূরে সাইকেল করে যাবার উপায় ছিল না। আর সে ছাড়া যাতায়াতের আর কোনও উপায়ও ছিল না। অনেক তদ্বির করেও এখানকার স্কুলে স্থান হয়নি। গৃহশিক্ষকতা করেছি কিছুদিন। এসব ব্যাকওয়ার্ড গ্রামে পড়াশোনার প্রচলন বেশি ছিল না। তবু কিছু ছাত্র হত, কিন্তু পরের দিকে এবং এদান্তি স্কুলশিক্ষকরাই গৃহশিক্ষকতা করেন। ফলে সে-ও বন্ধ হয়ে গেছিল। ছেলেটারও পড়াশোনা হয়নি অর্থাভাবে। গ্রামে একটা মুদি দোকান চালায়। সেই দিয়েই চলতে হবে এখন।”
বাইরে সূর্যের আলো অনেকটাই ম্লান। এবার উঠতে হবে। অপরিচিত গ্রামদেশে রাতের অন্ধকারে পথ চলতে চান না। বিদায় নিতে হবে। কিন্তু বিদায়ের কথা কি এখনই বলবেন, না কি আরও কিছু বলার আছে ঋতবাকের?
হঠাৎ অমিত মুখোপাধ্যায় বললেন, “আপনাকে একটা প্রশ্ন করি আমি?”
ঋতবাক চমকে বললেন, “অবশ্যই। আমিই প্রশ্ন করেছি। আপনি কিছুই জানতে চাননি।”
অমিত বললেন, “আপনি কী জানতে এসেছিলেন? কোনও কাজ ছিল কি?”
ঋতবাকের হঠাৎ খেয়াল হলো, কেন এসেছেন, তা-ই তিনি জানেন না। কাজ? কাজ তো ছিল না, শুধু একটা রহস্যের শেষ দেখতে এসেছিলেন। কিন্তু শেষ হয়েছে কি? তা-ও জানেন না। তাই শেষ করতেও পারছেন না। নিজের অভিজ্ঞতার কথা বললেন। কী ভাবে, বাবার কাগজপত্রের মধ্যে ব্যাঙ্কের লকারের চাবি পেয়েছেন, আর তার ভেতরে অমিতবাবুর লেখা। এবারে আঁতকে ওঠার পালা অমিতবাবুর। “বলেন কী! উনি আমাকে বলতেন লেখা সম্পাদককে পাঠিয়ে দিয়েই আমার লেখা উনি নষ্ট করে ফেলতেন। যাতে কারও হাতে কখনও না পড়ে।”
হাসলেন ঋতবাক। বাবা পারতে জীবনে কোনও কাগজ নষ্ট করেননি, বা ফেলেননি। পঞ্চাশ বছরের পুরোনো ব্যাঙ্কের কাগজ, ইনকাম ট্যাক্সের রিটার্ন — সবই বাবার কাগজপত্রের মধ্যে সযত্নে সঞ্চিত পাওয়া গেছে।
“না না!” অমিতর কণ্ঠে অনুনয়। “এ কিছুতেই হতে দেওয়া যায় না। ঋতবাকবাবু, আপনি আমাকে কথা দিন — ও লেখাগুলো আপনি একটাও রাখবেন না। সব নষ্ট করে দেবেন। পুড়িয়ে ফেলবেন।”
“বা, আপনাকে দিয়ে দেব?”
“আমি!” এবারেও অমিত মুখোপাধ্যায়ের অবাক হওয়া দেখার মতো। “আমি ও নিয়ে কী করব? আমি নিজেই তো সেগুলো নষ্ট করেছি। আমার কাছে কোনও লেখার কপি নেই। কে জানে, কোথায় কে দেখে ফেলবে, আর তারপরে পাঁচকান করবে! ভাবুন তো অত বড়ো একটা ব্যক্তিত্বের কী অপমানই না হবে তাহলে! না, আমি নেব না। আপনিই নষ্ট করবেন। কথা দিন।”
ঋতবাক বললেন, “তাহলে বলছেন, আপনার বাড়ির কেউ এ ঘটনা জানে না?”
মাথা নাড়লেন অমিত। “এমন কী সবিতাও না। দোহাই আপনার, কথা দিন।”
“বেশ,” রাজি হলেন ঋতবাক। “ফিরে গিয়ে আমি সবই নষ্ট করে ফেলব। কথা দিলাম। আজ আমি উঠি। আপনার অনেক সময় নষ্ট করে দিলাম।”
বিগলিত হাসলেন অমিত। বললেন, “কী যে বলেন, আপনি এসেছেন কষ্ট করে আমার বাড়িতে, এখন আবার এই ভর সন্ধেবেলা বেরিয়ে যাবেন... সত্যিই যেতে হবে? অবশ্য থাকতেই বা বলি কী করে, গরিবের বাড়িতে সত্যিই আপনার থাকার খুব অসুবিধে হবে।”
ঋতবাক বরাভয় দেবার সুরে বললেন, “না না, সে জন্য না। আসলে চন্দ্রকোণায় আমাকে যেতেই হত, তাই...”
চেয়ার ছেড়ে উঠলেন ঋতবাক। বিদায়ের শেষ কথাগুলো বলতে যাবেন, অমিত মুখোপাধ্যায় বললেন, “এলেন যখন, এত কথা হলো... সাহস করে একটা কথা বলি?”
ঋতবাক থমকে দাঁড়ালেন। আসার আগে বহুবার মনে হয়েছে, এই যাত্রাটা উচিত হচ্ছে না, এ থেকে ভালো কিছু হতে পারে না। নিঃসন্দেহে, যিনি নিজের লেখা অন্যকে দিয়ে দেন, এবং বছরের পর বছর শুধু কিছু টাকা পেয়েই সন্তুষ্ট থাকেন, তিনি আজ সুযোগ পেয়ে আরও কিছু দাবি করবেন...
অমিত মুখোপাধ্যায় ততক্ষণে টেবিল থেকে কী একটা তুলে নিয়েছেন। বিস্মিত ঋতবাক দেখলেন, একটা ব্রাউন পেপারের খাম। অতি পরিচিত খামের সিরিজের একটি। কী দিচ্ছেন অমিত ঋতবাককে?
কিন্তু কিন্তু করে অমিত বললেন, “আপনি এসেছেন বলেই কথাটা বলছি। আমি তো ভেবেছিলাম, আর সুযোগই হবে না। কিন্তু এখন যেহেতু বুঝলাম আপনি সবটাই জানেন, তাই সাহস করে বলছি। এটা আমার লেটেস্ট গল্প। ছোটোগল্প। সাত পাতার। ঋচিকবাবু চেয়েছিলেন। বলেছিলেন, ‘নির্ণায়ন’-এর সম্পাদকের সঙ্গে কথা হয়ে আছে। হুতাশন দেবনাথ... চেনেন আপনি?”
চেনেন ঋতবাক। বস্তুত এই হুতাশনই ঋতবাকের পেছনে লেগে আছেন, অসম্পূর্ণ লেখা পিতা-পুত্রের দ্বৈত প্রচেষ্টায় প্রকাশ করার জন্য।
এক পা দিয়ে চাকা লাগানো চেয়ারটা ঠেলে অমিত ঋতবাকের কাছে এসে গেছেন। হাতে ঠেলে দিচ্ছেন লেফাফাটা। বলছেন, “লেখাটা যেদিন ডাকে দেব, সেদিনই সকালে আমাকে ফোন করেছিলেন। বললেন, হাসপাতাল থেকে ফিরে এসে আমাকে জানাবেন। তিন সপ্তাহ পরে টিভিতে দেখলাম উনি আর নেই...” নির্বাক কান্নায় গলা ধরে এল অমিতবাবুর। কোনও রকমে নিজেকে সামলে বললেন, “এ গল্প আমার কোথাও দেবার নেই। আপনি যদি ‘নির্ণায়ন’-কে দেন, আপনার বাবার শেষ লেখা খুঁজে পেয়েছেন বলে, ওরা অবশ্যই ছেপে দেবে। আপনার চিন্তা নেই — এ জন্য আমাকে কোনও পয়সাকড়ি দিতে হবে না।”
~আট~
কেন যে মুখবন্ধ খামটা নিয়ে বেরিয়ে এসেছিলেন ঋতবাক জানেন না। রাত আটটা বেজে গেছিল চন্দ্রকোণা পৌঁছতে। বাস স্ট্যান্ডে জিজ্ঞেস করে রিকশওয়ালার সঙ্গে তিনটে হোটেল ঘুরে চার নম্বরে ঘর পেতে পেতে নটা পেরিয়ে গেছিল ঘড়ির কাঁটা। রাতে খেয়ে এসে হোটেলের খাটে শুয়ে ঋতবাক খামটা খুলেছিলেন।
গল্পটা পড়া শেষ হয়েছে অনেকক্ষণ। মনের কোনে একটা দুঃখ আর একটা নিশ্চিন্তবোধ একই সঙ্গে খেলা করছে। এমন একটা গল্প যদি বাবার নামে ‘শেষ কাহিনি’ বলে প্রকাশিত হয়, তাহলে সাহিত্যজগতে আলোড়ন উঠবে সন্দেহ নেই। সেটা-ই দুঃখ। এ গল্পটা বাবা নিজের নামে বের করে যেতে পারলেন না। আর সেইসঙ্গে নিশ্চিন্ত এইজন্য, যে চুরির তালিকায় অন্তত এই গল্পটাও নেই।
এখন রাত এগারোটা বাইশ। শহরের প্রকাশনা দপ্তর এখনও খোলা। হুতাশন দেবনাথ তো বলেন এগারোটা সবে সন্ধের শুরু।
অনেক ভেবেছেন ঋতবাক। উচিত আর অনুচিত, সততা আর শাঠ্য — টানাপোড়েনের অন্ত নেই জীবনে। কিন্তু এ নিয়ে যত ভাবা, তত অনন্ত চিন্তা স্ফূরিত হতেই থাকবে। তাই, আর দেরি করা উচিত নয়।
মোবাইলের স্ক্রিনে আঙুল ছুঁইয়ে ঋতবাক ‘নির্ণায়ন’-এর সম্পাদকের উত্তরের জন্য অপেক্ষা করলেন। হুতাশনের প্রায়-মেয়েলি গলার, “বলুন...” শুনে বললেন, “বাবার শেষ লেখাটা চেয়েছিলেন, কিন্তু তারও চেয়ে ভালো...”