~এক~
শহরের একদা অভিজাত উচ্চ-মধ্যবিত্ত পাড়ার বাড়িটা আজ খালিই পড়ে থাকে প্রায়। একসময়ে সে বাড়ির মালিক ছিলেন ভুবনব্রত মুখার্জি — ব্যবসায়ী বলেই তাঁকে জানে পাড়ার লোকে, কিন্তু কী ব্যবসা, তা কেউ ঠিক বলতে পারেনি। থাকতেন স্ত্রী, ছেলে, আর একজন আশ্রিতা এবং আশ্রিতার ছেলে নিয়ে। খুব যে গমগমে বাড়ি ছিল, তা নয়, কিন্তু লোকজনের যাতায়াত ছিল, পালপার্বণে মুখার্জিগিন্নী পাড়ায় আসতেন — দুর্গাপুজোয় ঠাকুরবরণ তো করতেনই। পাড়ার বয়োঃজ্যেষ্ঠরা, প্রধানত কমলকুমারবাবু, এ সব খবর দিয়েছেন। আশ্রিতা মহিলা কে, সে নিয়ে ধন্ধ রয়েছে পাড়ার লোকের মনে। কেউ বলেছে ভুবনব্রতবাবুর বোন, কেউ বলেছে শালী। সধবার পোশাকেই থাকতেন, কিন্তু তাঁর স্বামীকে কেউ কোনও দিন চোখে দেখেনি, কানাঘুষোয় শোনা — হারিয়ে গেছিলেন, তারপরে কোনও খবর পাওয়া যায়নি।
বড়ো ছেলে দীপব্রত যখন শিশু, তখন একটা পুরোনো বাড়ি কিনে, সেটা আপাদমস্তক রেনোভেট করে থাকতে এসেছিলেন ভুবনব্রতবাবু। ছেলে যখন বছর তিন, বা চার, তখন আগমন সেই আশ্রিতা আর ছেলের। দুটি বাচ্চা প্রায় সমবয়সীই। এই ছেলেটিই ভুবনব্রতবাবুর ছোটো ‘ছেলে’ পরাগব্রত। বোধহয় দত্তক নিয়েছিলেন মুখার্জি দম্পতি। কেউ পরিষ্কার জানে না। আসলে খুব বেশি যাওয়া-আসা-মাখামাখি কারওরই ছিল না। ওরা নিজেদের মতোই থাকত। নামের মিল থেকে দত্তক নেওয়ার ব্যাপারটা আন্দাজ করা যায়।
একে একে মারা যান প্রথমে মুখার্জি গৃহিণী, তারপর সেই আশ্রিতা। সবশেষে ভুবনব্রতবাবু। শেষ কয়েক মাস প্রায় কোনও জ্ঞানই ছিল না। হুঁশ তো ছিল না-ই — এ কথা জানা গেছে স্বয়ং ভুবনব্রতর ডাক্তারবাবুর কাছে।
তিনজন মা-বাবা-মাসি, অথচ ছেলে দুটোর বিয়ে-থা হয়নি। আসলে মুখার্জিগিন্নী যখন চলে গেলেন, তখনও ওদের বিয়ের বয়েস হয়নি, আর ভুবনব্রতবাবুও সাংসারিক বিষয়ে মাথা ঘামাননি কোনও দিন। ব্যবসা নিয়েই পড়ে থাকতেন। দূরসম্পর্কের সেই শালী, বা বোন... একে অসুস্থ, তায় অতীব গ্রামীণ। বহু বছর শহরে থেকেও মোটে সাব্যস্ত হননি। বাড়ি থেকেও বেরোতেন না একেবারে। প্রথম বছর দুর্গাপুজোয় মুখার্জিগিন্নীর সঙ্গে সিঁদুর খেলতে এসেছিলেন। তখনই সকলের চোখে পড়েছিল ওঁর গ্রাম্য আচার-আচরণ। এতই হাসাহাসি হয়েছিল পাড়ায়, যে কানাঘুষোয় সে খবর পেয়ে মুখার্জিগিন্নী বোনকে... না কি ননদকে?... আর বেরোতেই দিতেন না। এ সব কারণেই গার্জেনদের মৃত্যু অবধি ছেলেদের বিয়ে হয়নি। আর তাঁদের অবর্তমানে ছেলেদুটো তো একেবারেই বখে গিয়েছিল। চলাফেরা হাবভাব কোনওটাই বলার মতো ছিল না, কাজকর্ম কখনও করেছে কি না কে জানে। বাড়িতেই যখন মেয়ে নিয়ে আসা শুরু হল তখন কারও কারও মত ছিল — কিছু একটা প্রতিবাদ অন্তত হওয়া উচিত। মাতব্বররা ধরেছিল কমলকুমারবাবুকেই, কিন্তু উনি ঘাড়ে বন্দুক নিতে রাজি হননি। পাড়ার কাউন্সিলরও ওদের বন্ধু, থানার ওসি-ও। এক গেলাসের ইয়ার। বাড়িতে যাদের আনাগোনা, তাদেরও দেখলে পাড়ার লোকে থমকে রাস্তা পেরিয়ে যেত। ওরা ফেরত ঝামেলা করলে পাড়ায় বাস করাই সমস্যা হতে পারত। ফলে দুই ছেলের উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাপনে কোনও বাধা পড়েনি।
তবে পর পর, কয়েক মাসের মধ্যে, এক এক করে দুই ছেলেই উধাও হয়ে যায়। বড়োজন হারিয়ে যায় সেই ভয়াবহ আম্ফান ঝড়ের রাতে, ডেডবডি পাওয়া যায় কয়েকদিন পরে শহরতলির কোথায় যেন। সে মৃত্যু-রহস্যের সমাধান হয়নি। ছোটো ছেলেটা যায় কয়েক মাস পরে। প্রায় বছর ঘুরতে গেল, তার কোনও হদিশই নেই এখনও। দু-ভাই-ই নাকি মাঝরাতে গাড়ি নিয়ে বেরিয়েছিল, ফেরেনি। বড়োভাইয়ের বেলা ছোটোটা পুলিশে গেছিল, খোঁজ পাবার পরে গাড়িটা নিয়ে ফিরেছিল... ছোটোভাইয়ের বেলা পুলিশে ডায়রিই হয়নি। করবেই বা কে? বাড়িতে এখন তো কেবল ওই মেয়েটাই থাকে — ভাইয়েরা যাবার আগে শেষ কয়েক মাস যে ওদের সঙ্গে থাকত। মেয়েটা কে, জানা যায়নি। পাড়ার লোকেরা কেউ ভাবে ও বড়োছেলের শয্যাসঙ্গিনী হয়ে এসে বড়োটির মৃত্যুর পর ছোটোজনের...
অবশ্য দু-ভাই চলে যাবার পরে তাকে-ও বাইরে দেখা যায় না বড়ো একটা। না, বাজার-টাজার করে না কেউই, সুইগি আর জোম্যাটো-ই খাবার নিয়ে আসে দুবেলা। পয়সাকড়ি কোথায় পায় কে জানে...
তবে পুলিশ স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে ছোটোভাইয়েরও কিছু খোঁজ করেছে, কারণ বড়োভাইয়ের অস্বাভাবিক মৃত্যু। ঝড়ের রাতে মফস্বলে নিজের বাড়ির চৌহদ্দিতেই গাছ ভেঙে পড়ে মারা যায়। কিন্তু সে কেন আম্ফানের মতো অমন ভয়ানক ঝড়ের রাতে, যার প্রকোপে পুলিশ, অ্যাম্বুলেন্স, দমকল জাতীয় সরকারি সব পরিষেবাও তুলে নেওয়া হয়েছিল, গাড়ি নিয়ে বেরিয়েছিল তা জানা যায়নি। ফলত, ছোটো ভাই-ও যখন তার পরেই একদিন রাতে গাড়ি নিয়েই উধাও হয়ে গেল, তখন পুলিশের ভুরু আপনিই কুঁচকেছিল। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় এই, যে এই আধার-কার্ড, প্যান কার্ড, আর আধার-লিঙ্কড ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের যুগেও, লোকটা যে কেবল উবে গেছে তা নয়, গাড়িটাও হাওয়া। কমলকুমারবাবুর নেতৃত্বে পাড়ার লোকজন সদলবলে থানায় গেছিলেন, মেয়েটার বিষয়ে কিছু করা যায় কি না জানতে। তখনও পুলিশের স্বরূপ দেখে চুপচাপ ফিরে এসেছেন তাঁরা। কোন বাড়িতে একলা কে অল্পবয়সী মহিলা থাকেন, সে দিকে পাড়ার বয়োঃজ্যেষ্ঠদের অহেতুক কৌতুহল নিয়ে তারা তামাশা করে ওঁদের চুপ করিয়ে দিয়েছে। বাড়িতে ‘নানাবিধ’ পুরুষ-সমাগম হয় জানতে পেরে জিজ্ঞেস করেছে, ক-জন? দুটি করে সব মিলিয়ে চার, বা ছ-জন এবং তারা কেউ দেখতে ভদ্রলোকের মতো নয় শুনে বলেছে, তাদের আচার-আচরণে কোনও অভদ্রতা আছে কি? নেই। বলতে বাধ্য হয়েছেন সকলে। তবু পুলিশ ঘুরে গেছিল। মহিলা তাদের বলেন যে তিনি বড়ো ভাই দীপব্রতর বাগদত্তা ছিলেন, কিন্তু দাদা মারা যাবার পর ভাই তাঁকে থাকতে দিয়েছে। ভাই এখন নেই বটে, কিন্তু ফিরতেও পারে। তাই অপেক্ষা করছেন। দু-টি করে দারোয়ান বাড়ির নিচে ডিউটি করে, সবসুদ্ধ ছ-জন। পুলিশও তাদের দেখেছে। তারা কখনও বাইরে থাকে, কখনও নিচের তলায় বসার জায়গায় শুয়ে ঘুমোয়। ব্যাস। কোনও বেআইনি কিছু হচ্ছে বলে মনে হয়নি। আশ্চর্য, অদ্ভুত — কিন্তু বেআইনি নয়।
~দুই~
রিপোর্ট যে পড়ছিল, সে ফাইল বন্ধ করে মুখ তুলে তাকাল। টেবিলের চারপাশে অন্য মুখগুলো একেবারেই ভাবলেশহীন, নিথর। দেখতে দেখতে নব্যযুবকটির মুখ থেকে আত্মপ্রসাদের হাসিটা শুকিয়ে গেল। কয়েক দিন ধরে অনেক খেটে, বহু লোককে জিজ্ঞাসাবাদ করে তৈরি করা রিপোর্টটা ওর মনে হয়েছিল সম্পূর্ণ। কিন্তু যাদের রিপোর্ট দেওয়া, তারা তো মনে হচ্ছে খুশি নয়।
টেবিলের একপ্রান্তে যে গোঁফওয়ালা অবাঙালী প্রৌঢ়টি বসেছিলেন, দৃশ্যত তিনিই অবিসম্বাদী দলনেতা। এতক্ষণ চোখ বুজে শুনছিলেন, এখন অর্ধনিমীলিত চোখে বললেন, “আগে বোলো।”
থতমত খেয়ে যুবকটি পাশে বসা সিড়িঙ্গে রোগা প্রৌঢ়টির দিকে চাইল। তিনি ছোটো করে হস্তসংকেত করে বললেন, “সিংজী, রিপোর্ট তো বাস ইতনা হি...”
দাঁতের ফাঁকে ‘ছিক্’ করে একটা শব্দ করে সিংজী অস্ফুটে একটা বিশ্রী গালাগালি দিয়ে প্রৌঢ়টিকে উদ্দেশ্য করে হিন্দি-সুরে বাংলায় বললেন, “ই সব ফালতু খোবোর জুগাড় করে এনেছে তুমহার গোয়েন্দা? এই মুরোদ! ও কি ভাবছে এই বেকার ইনফোরমেশনের জন্য ওকে আমরা ফি দেব? ঘর ভেজো উসকো।”
এবার যুবকটির মুখমণ্ডল আরক্ত হল। সামনে ঝুঁকে পড়ে কিছু বলতে যাবে, পাশে বসা প্রৌঢ়র হাত পড়ল হাঁটুর ওপর। চোখের ইশারায় ওকে উঠতে বলে, নিজেও সঙ্গে সঙ্গে উঠে এলেন ঘরের বাইরে। লিফটের সামনে যুবকটি অসহিষ্ণুভাবে বলল, “এটা কীরকম হল, ছোটোমামা! তুমি বললে ফ্যামিলিটা সম্বন্ধে পুরোনো খবর জোগাড় করতে। আমি তো তা-ই করলাম।”
প্রৌঢ় সান্ত্বনা দেবার মতো বললেন, “আহা, বুঝলি না, ছেলেটা অনেক টাকার মাল নিয়ে পালিয়েছে। তাই সিংজীরা আশা করেছিলেন তোর রিপোর্টে পরাগব্রত এখন কোথায় আছে তা-ও জানা যাবে। সেটা হয়নি বলেই আপসেট হয়ে গেছেন আর কী। তুই বাড়ি যা, আমি দেখছি।”
তীব্র অভিযোগের সুরে যুবক বলল, “আবার ফি-টাও দেবে না বলল।”
মামা নিজের পকেটে আঙুল ছুঁইয়ে বললেন, “তোর বিল তো আমার কাছে। ভাবিস না। আমি ব্যবস্থা করে দেব।”
কথা বলতে বলতেই মামা লিফটের বোতাম টিপেছিলেন। বাড়ির অভ্যন্তরে লিফট। সামনে অপেক্ষা করার জায়গা যত অল্প, লিফটের ভেতরটাও ততই অপরিসর। ভাগ্নেকে সঙ্গে মামাও লিফটে ঢুকতে যাচ্ছিলেন, পেছনে ঘরের দরজা খুলে বেরিয়ে এল এক দশাসই চেহারার ব্যক্তি। লম্বায় তাকে ছ-ফুটের বেশি না বলে সাতফুটের কম বললে বুঝতে সুবিধে হবে। মুশকো জোয়ান। ডাম্বেল-বারবেল ভাঁজা চেহারা। প্রৌঢ় লোকটিকে সে বলল, “ওকিলসাব, আপ ওয়াপস অন্দর যাইয়ে। সিংজী বুলা রহা হ্যায়। ম্যায় ইনকো নিচে লে যাতা হুঁ।”
উকিলসাব — অর্থাৎ প্রৌঢ় মামা — বিনাবাক্যে রাস্তা ছেড়ে দাঁড়ালেন। বিশালদেহী লিফটে ঢুকল। বিরাট দশাসই চেহারার চাপে গোয়েন্দা একেবারে কোনঠাসা। দরজা বন্ধ হবার আগে ভাগনের ভয়ার্ত দৃষ্টি মামার চোখ এড়াল না।
ঘরের ভেতরে সব আগের মতোই। সিংজী বললেন, “বৈঠো। বেকার তিন হফতা বরবাদ হুয়া।” সিংজীর উষ্মা উথলে উঠল পরাগব্রতর হদিস পাওয়া যায়নি বলে।
উকিলবাবু বললেন, “একটা রাস্তা এখনও আছে — তা হল গাড়িটার সন্ধান করা। আজকাল ফাস্ট-ট্যাগ ইত্যাদি হয়েছে, চট করে...”
“চুপ হো জাও, উকিলবাবু।” সিংজীর ঘড়ঘড়ে গলায় ধমকের সুর স্পষ্ট। “তুমহে জো কাম দিয়া গয়া হ্যায়, ও-হি করো।”
সুযোগ পেয়ে উকিল বললেন, “কিন্তু এই গোয়েন্দাকে তো পরাগব্রতর হদিস বের করার কাজ দেওয়া হয়নি। ওর কাজ ছিল অতীতটা ঘেঁটে দেখা। যদি তা থেকে কিছু পাওয়া যায়?”
“তো? কেয়া পাতা চলা তুমহে?”
“ওই যে বলল, পরাগব্রত হয়ত দত্তক নেওয়া?”
“তো?”
উকিলবাবু বললেন, “দত্তক নেওয়া হলে নিশ্চয়ই তার কোনও কাগজপত্র আছে? হয়ত তা থেকে কিছু পাওয়া যাবে...”
টেবিলের মাঝামাঝি বসা আর একজন মাঝবয়সী অবাঙালি বললেন, “অগর সাচমুচ এডোপটেড হ্যায়, তো।”
উলটো দিক থেকে একজন বলে উঠলেন, “সেটা কিন্তু হ্যায়।”
সকলে প্রায় চমকেই তাকালেন বক্তার দিকে। বেঁটেখাটো, নাদুসনুদুস, টাকমাথা বাঙালিটিকে দেখে মনে হয়, ইনি শার্ট-প্যান্ট-জামা-জুতো পরে টেবিলে না বসে যদি গেঞ্জি আর লুঙ্গি পরনে মিষ্টির দোকানে ছানা-ক্ষীর ঠাসতেন, মানাত ভালো। সিংজী বললেন, “কোনটা কিন্তু হ্যায়, রবিবাবু?”
রবিবাবু বললেন, “দত্তক। সত্যি হ্যায়।”
টেবিলের চারপাশের সবার মুখে চাপা হাসি। সিংজী বললেন, “আপকো ক্যায়সে মালুম?”
রবিবাবু একটু আত্মপ্রসাদের হাসি হেসে বললেন, “ও এক জামানা থা যখন আমি ভুবনব্রতকা পিছুমে খুব কাঠি দেতা থা। ওই সময়কা বাত হ্যায়, একবার ভুবনব্রতকা ঝি... মানে নোকরানি... উসকা ঘর ছোড়ে ভাগা। নোকরানি, ঔর ওই কী বোলতা, রাঁধুনি...” রবিবাবু হাত নেড়ে খুন্তি চালানোর ভঙ্গি করে বললেন, “ওই যে রান্না করতা হ্যায়।”
ঘরে বসা অন্যদের হাসি আর নিঃশব্দ নেই। বোঝা-ই যায়, যে তারা রবিবাবুর হিন্দি বলা খুবই উপভোগ করে। কিন্তু আজ সিংজীর মেজাজ তেতো। বললেন, “হাঁ, তো কেয়া হুয়া? আপ হিন্দি ছোড়কে বাংলা বোলো, রবিবাবু। হাম সমঝতে হ্যায়।”
রবিবাবুর ধারণা উনি ভালোই হিন্দি বলেন। বললেন, “তখনই তো হাম জানতে পারা থা। ও জো দুসরা লেড়কা, ওকে তো ভুবনব্রত দত্তক লিয়া থা। ও থা ওই অন্য মেয়েটার বাচ্চা। ওরা ওদের আত্মীয় টাত্মীয় নেহি থা। রাস্তাসে কুড়াকে লায়া থা। গরিবের মেয়ে বলে বাড়িতে নিয়ে এসেছিল, মেয়েছেলেটা ভুবনব্রতবাবুর ইয়ে ছিল, মানে বউ তো আর ভুবনব্রতকে স্যাটিসফাই করতে পারত না... ছেলেটাকে দত্তক নিয়েছিল, যাতে মেয়েটা কিছু ট্যাঁ-ফোঁ না করে।”
সিংজী জানতে চাইলেন, “ইয়ে সব তুমহার জানা ছিল কি?”
রবিবাবু বললেন, “হাঁ তো।”
“কভি বোলা নেহি?”
“কেউ তো কভি জিজ্ঞেস নেহি কিয়া...”
আবার সুযোগ বুঝে উকিলবাবু বললেন, “আমরা পরাগব্রতর পাস্ট্ নিয়ে আগে কখনও মাথা ঘামাইনি। এখন এই ইনভেস্টিগেটর বলল তাই...”
সিংজী বললেন, “হুঁ। তো উকিলবাবু, তুমি উখানে সব কাগজ, ফাইল, সব ছানবিণ করিয়েছিলে কি?”
ঘাড় নাড়লেন উকিলবাবু। পরাগব্রত নিরুদ্দেশ হবার পর এক বাণ্ডিল হীরের খোঁজে বাড়িটা তন্নতন্ন করে খোঁজা হয়েছে। এর চেয়ে ভালো করে খুঁজতে হলে ইঁট খুলে খুলে খুঁজতে হত। কিছু না-পাওয়া যেতে উকিলবাবুকে পাঠানো হয় কাগজপত্র খুঁজে দেখতে।
“উসমে দত্তক কা কাগজাদ নেহি থা?”
উকিলবাবু বললেন দত্তকের কাগজের কথা তো আলাদা করে বলা হয়নি, বলা হয়েছিল জমিজমা, প্রপার্টির কাগজ খুঁজতে — যদি অন্য কোথাও গিয়ে পরাগব্রত লুকিয়ে থাকে তার হদিস পাবার আশায়। যদিও সে-ও পাওয়া যায়নি কিছুই।
“ঠিক হ্যায়,” বললেন সিংজী। “ওয়াপস যাও। আচ্ছে সে ঢুণ্ডো। কুছ শায়দ হ্যায় নেহি, লেকিন ফিরসে ঢুণ্ডো। রবিবাবু?”
রবিবাবু বললেন, “হাঁ?”
“ওই মেয়েলোকটা আপনার কাছে এখনও কাম করে? ও বলতে পারবে না, পরাগব্রৎকা পাস্ট?”
“ও তো কভকে চলি গয়ী — উসকো খুঁজে পাওয়া সম্ভব নেহি হ্যায়।”
সিংজী ছাড়লেন না। বললেন, “খোঁজ করো, রবিবাবু। সোর্স লাগাও। ঘর কাহাঁ থা, মালুম?”
রবিবাবু একটু ভেবে বললেন, “এক্ষুনি মনে পড়ছে না। নামটা-ই মনে নেই হ্যায় ছাতা। কী যেন, মানসী... না মনীষা...”
সিংজী একটু হাসলেন। কোন বিষয় কার কতটা মনে থাকে সে সম্বন্ধে তাঁর জ্ঞান অনেক। বললেন, “ঠিক সে ইয়াদ করো, ইয়াদ আ জায়েগা।”
দরজা খুলে ঘরে ফিরল সেই বিশালদেহী। তার স্থান সিংজীর চেয়ারের পেছনে। সিংজী মিটিং শেষ করলেন। সকলে একে একে চেয়ার ছেড়ে ওঠা আরম্ভ করামাত্র বললেন, “উকিলবাবু বৈঠো।” ঘরের বাইরের ছোট্ট জায়গাটায় একসঙ্গে চারজনের বেশি দাঁড়াতে পারে না, লিফটের ভেতরে চারজনের দাঁড়ানোর জায়গা লেখা থাকলেও খুব রোগা না হলে তিনজনের বেশি উঠতে পারে না, তাই দরজাটা অনেকক্ষণ খোলা রইল। ক্রমে তিন-চার বার লিফট ওঠানামা করে বাইরের কথাবার্তার শব্দ মিলিয়ে এল। সিংজী বললেন, “আজ-হি যাও। কাগজাদ দেখো। ঠিক সে দেখনা। কাফি দিন হো গিয়া। সির্ফ দত্তক কা কাগজ নেহি। সব কাগজ দেখনা। কাহিঁ কুছ ভি অগর মিল যায়ে।”
উকিলবাবু উঠছিলেন, সিংজী বললেন, “নিচে রুকনা। লচমণ ভি যায়গা।”
বিনা বাক্যে উকিলবাবু বেরিয়ে গেলে পরে সিং বললেন, “লচমণ।”
বিশালদেহী চেয়ারের পেছন থেকে সামনে এসে দাঁড়াল।
“লাগতা তো নেহি হ্যায় কি ও লড়কা উস্ মকান মে ওয়াপস্ আয়েগা।”
এটা প্রায় স্বগতোক্তি। লক্ষ্মণ উত্তর দিল না। সিংজী বললেন, “ও লড়কি...”
“হাঁ, সরকার।”
“ওহাঁ বিঠাকে নেহি রাখনা ঔর। অয়সে তো কোই কাম কি নেহি নিকলি। ওহ্ রহতে হুয়ে ভি দোনো ভাই ভাগ গিয়া। সির্ফ্ বৈঠে বৈঠে দারু পিতি থি ঔর দোনো কা সাথ সোতি থি। বেকার খরচা বঢ়াকে ফায়দা কেয়া? মকান খালি করোয়া দো।”
“জি, সরকার। কহাঁ লে যায়ুঁ?”
সিংজী একটু চুপ করে রইলেন। লক্ষ্মণ বহু বছরের বিশ্বস্ত কর্মচারী। এই নৈঃশব্দের অর্থ জানে। তবু কিছু বলল না। অপেক্ষা করে রইল।
“কাহিঁ নেহি। মিটা দেনা। কিসিকো পতা না চলে।”
এই শেষ বাক্যটা বলার দরকার ছিল না। লক্ষ্মণ আজ পর্যন্ত কতজনকে পৃথিবী থেকে মুছে ফেলেছে তার ইয়ত্তা নেই। কোনও ক্ষেত্রেই কেউ কিছু জানতে পারেনি।
“কিতনা আদমি হ্যায় পাহারা মে?”
“সব মিলাকে ছ আদমি। একসাথ দো রহতা হ্যায়।”
“সবকো ওয়াপস ভেজো। মকান বন্ধ করকে নিকলনা। ঔর ও টিকটিকি বোলা কি পুলিশ আভি ভি গাড়ি কা তালাশ মে হ্যায়। গাড়ি কা কোই নিশানা বাকি নেহি হ্যায় না?”
“নেহি, সরকার। সব খতম।”
“ঠিক হ্যায়।” হাত নেড়ে সিংজী লক্ষ্মণকে বিদায় দিয়ে নিজেও উঠে বাড়ির ভেতর গেলেন। পুলিশ পরাগব্রতর গাড়ি খুঁজে পায়নি, কারণ তারা তল্লাশি শুরু করার অনেক আগেই সিংজীর লোকজন পরাগব্রতর পাড়ার থানার পাশের গলিতেই গাড়িটা পায়। পার্ক করা ধুলি-ধুসরিত গাড়ি, বেশ কিছুদিন হল পড়ে ছিল ওখানে। দু-চারদিন সারাক্ষণের নজরদারির পরে একদিন প্রকাশ্য দিবালোকেই গাড়ি সারানোর ট্রাক পাঠিয়ে টেনে আনা হয়েছিল সিংজীর গ্যারেজে। প্রতিটা অংশ খুলে খোঁজা হয়েছিল কিছু লুকোনো আছে কি না। পাওয়া যায়নি কিছু, এবং সে গাড়ির কোনও অংশই আর অবশিষ্ট নেই। হয় অন্য গাড়িতে লাগানো হয়ে গেছে, নয়ত গলিয়ে ফেলা হয়েছে। পুলিশ সে গাড়ির হদিস আর পাবেই না।
~তিন~
সন্ধে হয়ে এসেছে। একা বাড়িতে এই সময়টা মিনির খুব মন খারাপ করে। কী হয়ে গেছে জীবনটা। শহরের সুপ্রতিষ্ঠিত সম্ভ্রান্ত পরিবারের মেয়ে, দেখতেও অতিশয় সুশ্রী, অভিনয় বা মডেলিং কেরিয়ারে উন্নতি অবধারিত — শুনে শুনে বড়ো হওয়া মিনির সেই রূপ, বা অঙ্গসৌষ্ঠব, কিছুই আর আগের মতো নেই। একটা দোতলা বাড়ির ওপর তলার একটা ঘরে কার্যত বন্দী। পড়াশোনা ছেড়ে ফুল-টাইম মডেলিং করতে চাওয়া নিয়ে বাড়িতে অশান্তি যখন তুঙ্গে, বার বার বাড়ি থেকে পালিয়ে কোথাও ঠাঁই না পেয়ে বাধ্য হয়ে ফিরে এসে মায়ের বকুনি আর বাবার মার খেয়ে খেয়ে যখন একেবারেই বীতশ্রদ্ধ, যখন প্রায় পাগলের মতো পথ খুঁজছে গ্ল্যামার জগতে স্থায়ীভাবে ঢোকার, তখনই সিংজীর সঙ্গে পরিচয়। সিংজীই বুদ্ধি দিয়েছিলেন, বাড়ি থেকে পালিয়ে ওঁর হোটেলে গিয়ে থাকতে। বলেছিলেন একবস্ত্রে বেরোতে, সবই সিংজী দেবেন।
দিয়েওছিলেন। কেবল আশ্রয় নয়, অন্ন, বস্ত্র, সুখ, সঙ্গ — কোনওটারই অভাবই রাখেননি। শুধু দেননি কাজ। বা, বলা ভালো, যে কাজ মিনি চেয়েছিল, তা দেননি। প্রথমে কেবল সিংজীর ব্যক্তিগত ভোগের জন্যই বরাদ্দ ছিল মিনি। তারপর দু-চারজন অন্য লোক — সিংজীই পাঠাতেন। মিনিকে বলতেন, তারা মডেলিং কেরিয়ার তৈরি করে দেবে। এসব লাইনে কাজ পাবার আগে ওপরওয়ালাদের সন্তুষ্ট করতে হয়, জানত মিনি। কিন্তু কাজ পায়নি। সিংজীকে জিজ্ঞেস করলে বলতেন, হবে।
সব শেষে দীপব্রত। ওই একই টোপ দিয়েছিলেন সিংজী। মডেলিং কেরিয়ার। কিন্তু সেই সঙ্গে দীপের ওপর নজরদারি করে সিংজীকে মাঝে-মধ্যে খবর দিতে হবে। সবই হয়েছিল। দীপব্রত মুখার্জি খুবই সন্তুষ্ট ছিল, এবং দীপের কাজকর্ম, চলাফেরা সবই ওর মারফত জানতে পারতেন সিংজী। কিন্তু মিনির কোনও লাভ হয়নি। আজ অবধি কোনও ক্যামেরার সামনে দাঁড়ায়নি মিনি, কোনও ফটোশুট হয়নি ওকে নিয়ে। মুখের কথাই সার — হচ্ছে, হবে। অনেকদিন আগেই মিনির চৈতন্যোদয় হয়েছে। এ জন্মে আর বিখ্যাত মডেল, বা হিরোইন কোনওটাই হওয়া হবে না। বয়েস হয়ত এখনও আছে, চেহারাটা আর নেই। ধস নামা শুরু হয়েছিল অনেক আগেই, যখন কার্যত বন্দীদশা শুরু হয়েছিল সিংজীর হোটেলের বিশাল স্যুইটে। চারবেলা পাঁচতারা হোটেলের ভূরিভোজ, রোজ সিংজীর দেওয়া বিলিতি চকলেট... তবু সেখানে একটা জিম ছিল, ট্রেনার ছিল। তারপর যখন ঠাঁই হল এই মুখার্জি-বাড়িতে, তখন থেকে তো তা-ও নেই। দীপব্রত মুখার্জি বলেছিল, একেবারে কাঠির মতো রোগা মেয়ে চাই না। জিরো ফিগারের যুগ শেষ। যদিও মিনি কোনও দিনই জিরো ফিগার ছিল না, তবু দীপব্রতকে খুশি করতে কিছু মেদ শরীরে জমতে দিয়েছিল। কিন্তু আজ...?
জোর করে বিছানা ছেড়ে উঠে মিনি মাটিতে বসে কয়েকটা যোগাসন করল। বড়ো, দোতলা বাড়িটায় মিনি একা। তা সত্ত্বেও চলাফেরা একেবারেই সীমিত। বেশিরভাগ সময় এ-ঘরেই থাকে। সিংজীর লোক দুজন করে সর্বক্ষণ নিচে থাকে পাহারায়। ওরা জানে মিনি সিংজীর। ওদের সাহস নেই মিনিকে কিছু করার, কিন্তু চোখ দিয়ে গিলতে থাকে সারাক্ষণ। মিনি ওর ভাগ্যকেই দোষ দেয়। বাড়ি ছেড়ে বেরোনোর আগের প্রায় চার-পাঁচ বছরের অশান্তির জন্য দায়ী করে মা-বাবাকে। আর পাহারাদারদের চোখের আড়ালে থাকে। ওরা ওকে যেন সহজলভ্য মনে না করে।
~চার~
উকিলবাবু একতলায় অপেক্ষা করছিলেন কেউ সিংজীর নির্দেশ নিয়ে আসবে বলে। সাধারণত কাজের লোকেদের কারও মুখে নির্দেশ আসে, কখনও কপাল ভালো থাকলে গাড়ি পান একটা।
আজ কপাল ভালোর দিন, ‘লচমণ্ ভি জায়েগা’ — বলেছেন সিংজি। তবু বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসে মারুতি ইকো ভ্যানটার দরজা খুলে লক্ষ্মণ যখন নিজেই ডাকল, “আইয়ে ওকিলসাব।” তখন অবাকই হলেন উকিল তারাশঙ্কর।
এই ভ্যানটা লক্ষ্মণ একাই চালায়। লক্ষ্মণের বিশাল বপু ধরানোর জন্য এর ড্রাইভারের সিট-টা নতুন করে লাগাতে হয়েছে প্রায় আট ইঞ্চি পিছিয়ে। এই গাড়িতে তারাশঙ্কর চড়েননি আগে। অন্য দিন যদি গাড়ি পান, তা চালায় ড্রাইভার, উনি পেছনে বসেন। আজ দোনোমোনো করে সামনে গিয়েই বসলেন। বললেন, “তুমি নিজেই যাচ্ছ।”
বক্তব্যের ঢঙে প্রশ্ন। লক্ষ্মণের কাছ থেকে এভাবেই খবর পেতে হয়। কিন্তু আজ লক্ষ্মণ নাক দিয়ে ঘোঁত করে একটা শব্দ করল কেবল। উকিলবাবু একটু চুপ করে থেকে বললেন, “ওই পরাগব্রতটা গেল কোথায় কে জানে! আজকের দিনে একটা লোক কী করে পুরো ভ্যানিশ করে যায়!”
লক্ষ্মণ গাড়ি চালাতে চালাতেই তাচ্ছিল্যের সুরে বলল, “কোথা আর গায়েব হোবে? ইখানেই আছে কোথাও ঘাপটি মেরে। হামার তো মনে হয় দুই ভাই-ই বেঁচে আছে। ওই বড়োভাইয়ের মরে যাওয়ার ব্যাপারটাও ঝুট হ্যায়।”
উকিলবাবু আঁতকে উঠলেন। “বলো কী! ওর তো ডেডবডি পাওয়া গেছে। পোস্ট মর্টেম হয়েছে... পুলিশ কেস ক্লোজ করে দিয়েছে...”
লক্ষ্মণের উত্তর শুনে তারাশঙ্করবাবু থতমত খেয়ে গেলেন। “হাঁ, হাঁ। সব শুনা হ্যায় ম্যায়নে। লেকিন ডেডবডি দেখা কৌন? সির্ফ পুলিস, না? ভাই ভি নেহি দেখা। কৌন জানতা হ্যায় বডি কিসকা থা? কৌন জানতা হ্যায় সচমুচ মর গিয়া কেয়া?”
উকিলবাবু ভাবতে বাধ্য হলেন। লক্ষ্মণ ঠিক বলেছে। দীপব্রত মুখার্জিকে বাড়ি থেকে বেরোতে কেউ দেখেনি। আম্ফানের পরদিন সকালে তার শয্যাসঙ্গিনী মিনি আর ভাই পরাগব্রত নাকি দেখেছিল দীপব্রত বাড়িতে নেই। পুলিশকে তা-ই বলে দু-জনে। প্রায় দু-সপ্তাহ পরে পুলিশ দুই-য়ে দুই-য়ে চার করে, যে শহরতলীর একটা বড়ি ভেঙে যাবার ফলে যে অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছিল — পরদিন সকালে ভাঙা বাড়ির ইঁটকাঠের নিচ থেকে পাড়ার লোকজন যার মৃতদেহ উদ্ধার করে — সে-ই দীপব্রত। এই সিদ্ধান্তের প্রধান তিনটে কারণ — ওই বাড়ির মালিক ছিল দীপব্রত, বাড়ির বাইরে দীপব্রতর গাড়ি দাঁড়িয়ে ছিল, আর মৃতের পরনে ছিল দীপব্রতর পোশাক। কিন্তু এ সব দু-সপ্তাহ পরের কথা। দীপব্রতকে কেউ দেখেনি, কারণ বেওয়ারিশ মৃতদেহ ততদিনে দাহ হয়ে গেছে। ভাই পরাগব্রতও লাশ দেখতে পায়নি। দু-সপ্তাহ পরে পুলিশের কাছে খবর পেয়ে থানায় গিয়ে মৃতব্যক্তির পোশাক দেখে বলে যে সেগুলো তার দাদারই বটে। ঝড়ের তাণ্ডবে তছনছ হয়ে যাওয়া শহর তখন কেবল খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে স্বাভাবিক হচ্ছে, তা নয়, ভুললে চলবে না, কোভিড মহামারীও চলছিল। কারওরই কাজ কম ছিল না। একটা মৃতদেহ বেশিদিন ফেলে রাখার কোনও উপায়ই ছিল না। পোস্ট মর্টেম রিপোর্টে ছিল, মাথায়, মুখে এবং শরীরের অন্যত্র আঘাতজনিত কারণেই মৃত্যু, কিন্তু খুব মন দিয়ে কিছু খোঁজা হয়েছিল কি না কে জানে? ফাউল প্লে সন্দেহ করেছিল কেউ? না বোধহয়। করলেও, কোভিড জমানায়, সে প্রলয়ঙ্কর ঝড়ের পরে কতটা মন দিয়ে ফরেনসিক ডাক্তাররা কাজ করতে পেরেছিলেন? ভেঙে পড়া বাড়ির ইঁট-কাঠের আঘাতে মৃত্যু ধরে নিয়েই রিপোর্ট লেখা হয়নি তো? আর ওদিকে দুই ভাই হয়ত কয়েক কোটি টাকার হীরে হাতিয়ে নিয়ে পালিয়ে এখন ঘাপটি মেরে বসে আছে!
অশিক্ষিত গুণ্ডা লক্ষ্মণ ছোকরার ওপর শ্রদ্ধা অনুভব করলেন তারাশঙ্কর। ছোটো ভাইয়ের ওপর সবার সন্দেহ হয়েছিল কারণ লোকটা কেবল রাতারাতি বেমালুম গায়েব হয়ে যায়নি, সিংজীর বিরাট সাম্রাজ্যের নানা চর খবর এনেছিল, ওর সব ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট বন্ধ করা হয়েছে অনেক দিন আগেই। দীপব্রত বেঁচে থাকতেই। দীপব্রতর তথাকথিত মৃত্যুর পরে — এখন তথাকথিতই ভাবছেন উকিল তারাশঙ্কর — জোরকদমে দীপব্রতরও অ্যাকাউন্টগুলোও খালি হয়ে যায়। পরাগব্রতর ওপর সন্দেহ গাঢ় হয় সেইজন্যই। এতদিন অবধি সবার ধারণা ছিল পরাগব্রতই কোনও ভাবে দাদাকে খুন করে মিনির চোখ এড়িয়ে, বা মিনির সাহায্যেই, মৃতদেহ ওখানে ফেলে এসেছিল। কিন্তু... উকিলবাবু ভাবলেন আবার... দীপব্রতর বেঁচে থাকতে আপত্তি কিসের? ওই দুই ভাইয়ের যা ক্যালি, একটা রাস্তার লোককে ঝড়বাদলের নামে আশ্রয় দিয়ে তাকে অনায়াসেই মেরে ফেলে ডেডবডি নিয়ে গিয়ে ভাঙা বাড়িতে ফেলে দিয়ে আসতে পারে। আবার লক্ষ্মণের প্রতি শ্রদ্ধা হল। এটা তো ওঁদেরই ভাবা উচিত ছিল। আর কারও না হোক, উকিলবাবুর নিজেরই ভাবা উচিত ছিল। জানতে চাইলেন, “এ কথা শুনে সিংজী কী বললেন?”
মুখার্জিবাড়ির খোলা গেটের ভেতরে গাড়িটা ঢুকিয়ে ইঞ্জিন বন্ধ করে দরজা খোলার আগে তারাশঙ্করের দিকে তাকাল লক্ষ্মণ। বলল, “ম্যায় কুছ নেহি বোলা। আপনি অওকাদ সে বড়কে ম্যায় কভি কুছ বোলতা ভি নেহি, করতা ভি নেহি।”
নিশ্চিন্ত। তাহলে কোনও সময়ে বক্তব্যটা সিংজীর কাছে উকিলবাবুই পেশ করতে পারবেন। তবে তার আগে কিছু হোমওয়ার্ক করতে হবে।
বাড়ির ভেতরে, একতলার বসার ঘরে সোফায় পা তুলে বসে টিভি দেখছিল সিংজীর দুই কর্মচারী। দেখতেও চোয়াড়ে গুণ্ডার মতো, এবং করেও গুণ্ডামিই। এখন এদের কাজ মিনিকে পাহারা দেওয়া, এবং পরাগব্রত ফিরলে তাকে ধরে রেখে সিংজীকে খবর দেওয়া। দ্বিতীয় দায়িত্ব পালন করতে হয়নি এখনও। তারাশঙ্কর একবার আড়চোখে ওপরতলার দিকে দেখলেন। মিনি নিশ্চয়ই ঘরে। আজকাল নামে না। আগে আসত, দুটো কথা বলত। দীপব্রত বা পরাগব্রতর খবর পাওয়া গেছে কি না জানতে চাইত। মেয়েটাকে দেখতে বেশ। চাইলে যে কোনও পুরুষই ওর অধরা থাকত না। কিসের আশায় সিংজীর দলে নাম লিখিয়েছে কে জানে। তারাশঙ্করের হঠাৎ রাগ হল সিংজীর ওপর। মেয়েটাকে হাত করে বেশ্যার কাজ করাচ্ছে শালা। তারপরে ভাবলেন, রাগটা কি একজন পিতৃস্থানীয় ব্যক্তির? না কি অসফল এক কামুক প্রৌঢ়ের? অত ভেবে কাজ নেই... এখন ভুবনব্রতর কাগজপত্র নিয়ে পড়তে হবে।
বসার ঘর থেকে অফিসে ঢুকতে ঢুকতে শুনতে পেলেন, লক্ষ্মণ দারোয়ান দুজনকে বলছে সিংজীর বাড়ি ফিরে যেতে। এখনই। এখানের পাট চুকল।
কেন? মিনি কি তাহলে সিংজীর বাড়িতেই ফিরে যাবে আবার? পরাগব্রতর জন্য অপেক্ষা শেষ? কেন?
তারাশঙ্করের সে নিয়ে কী দরকার? কাজ করতে হবে অঢেল। অনেক কাগজপত্র ঘাঁটতে হবে। ভুবনব্রতবাবুর টেবিলে বসে স্থির করতে লাগলেন কোথা থেকে শুরু করবেন।
~পাঁচ~
শহর থেকে বহুদূরে ছোটো গঞ্জ আমোদপুর। বড়ো রাস্তা, মানে স্টেট হাইওয়ে গিয়েছে গ্রামটার গা দিয়ে। রাস্তার দু-ধারে উৎসাহীরা দোকান দিয়েছে এই আশায়, যে বাস, গাড়ি থামলে চার-পয়সার বিজনেস হবে। সব মিলিয়ে গোটা বিশ-বাইশ দোকান। আমোদপুরে সব মিলিয়ে শ-দুয়েক ফ্যামিলি। তার মধ্যে প্রায় দেড়শো ঘর মুসলমান। বাকি হিন্দু, কিন্তু তাদের মধ্যে উচ্চবর্ণ প্রায় নেই। সেখানে কিছুদিন হল বাসা বেঁধেছে একটা নতুন মানুষ। সে হিন্দু। শুধু হিন্দু না, বামুন। চক্কোত্তি। মোড়ল শেখ নসিবুল্লার ছেলে শামীমের দোকানটা ভাড়া নিয়েছিল ‘নকডাউনের’ ঠিক আগে। বলেছিল, জেরক্সের দোকান দেবে। গ্রামের লোক, হিন্দু-মুসলমান একযোগে নসিবুল্লার কাছে নালিশ জানিয়েছিল। কাজটা ভালো হচ্ছে? দিনকাল ভালো নয়। এর মধ্যে একটা উটকো লোক, দেখতে শুনতে পুরোদস্তুর শহুরে, সে কেন এখানে এসে ঠাঁই গাড়বে? নসিবুল্লা ছেলেকে ডেকে বলেছিলেন গাঁয়ের লোকের আপত্তির কথা। শামীম গা করেনি। আব্বাকে বলেছে, লোকটা শামীমেরই বয়সী, চিন্তার কিছু নেই। গ্রামে ইশকুল আছে, মাদ্রাসা আছে, আশপাশের চার পাঁচটা গ্রাম থেকে ফি বছর শ-খানেক বাচ্চা পরীক্ষা দেয় শুনে বলেছে জেরক্সের দোকান দেবে। গাঁয়ের লোকের মুরোদ নেই, অন্য কেউ ভালো কিছু করতে চাইলে ব্যাগড়া দেবে।
নসিবুল্লা তা-ও মানেননি। ওই মুরোদটা তো শামীমই দেখাতে পারত। বাপের খেয়ে ঘুরে বেড়ানোটাই ধান্দা। সহজে রোজগারের পথ হাসিল হয়েছে, এখন শামীম আর কোনও দিকে তাকাবে না। বাধ্য হয়ে নসিবুল্লা গাঁয়ের লোককেই বলে রেখেছিলেন, গোলমালের আভাসটুকু দেখলেই ভালো রকম ধোলাই দিয়ে গাঁ-ছাড়া করতে। আরও বেশি করে বলেছিলেন, যখন শামীম নিজেই লোকটা আসার পরে তাকে চিনতে পারেনি। দেখা গেছিল শামীম যাকে শহুরে পোশাকে, এক মাথা চুলদাড়ি সমেত কেবল দেখেছে, সে ধুতি ফতুয়া পরে, ন্যাড়ামাথা, চাঁছা-দাড়িগোঁফ হয়ে এসেছে। মুখে বলেছিল ‘করোলা’য় সব আত্মীয়-স্বজন খুইয়ে বিবাগী-মতন হয়ে গিয়েছে, কিন্তু সহজে তাতে গাঁয়ের লোকের ভবি ভোলেনি।
তবে বছরখানেক প্রায় পেরিয়ে গেল, কোনও গোলমাল কারও নজরে পড়েনি এখনও। চালচলন, হাবভাবে গোলমাল নেই, এমনকী পয়সাকড়ির ব্যাপারেও একদম পাকা কথার লোক নাড়ুগোপাল চক্কোত্তি। এসে থেকে প্রতিবেশীদের সঙ্গে সদ্ভাব, হিন্দু, মুসলমান দুই সমাজের সঙ্গেই বন্ধুত্ব, পালপার্বনে প্রতিবেশীর সঙ্গে যোগাযোগ — সবই বজায় রেখেছে। নিজের মতো থাকে। কাউকে জ্বালায় না, কারও পাকা ধানে মই দেয় না।
দোকানের বাইরে নাড়ুগোপাল দরজায় পিঠ ঠেকিয়ে পিঁড়িতে বসে ছিল। রাস্তার ওপারে মদিনা ক্লথ স্টোর্সের মালিক তারিক, আর পাশের চায়ের দোকানদার, তার ভায়রা হাবিব, দু-জনে তারিকের দোকানে বসে গ্যাঁজাচ্ছে। একবার ভাবল, গিয়ে যোগ দেয়, তারপর ভাবল, নাঃ। যত কম লোক ওর সম্বন্ধে জানতে পারে, ততই ভালো। তাছাড়া কিছুদিন পর থেকেই আকন্দপুরে নিজের জমি-ভিটের দখলদারির কাজ শুরু করতে হবে। তখন হয়ত স্থানীয় লোক কারও কারও সঙ্গে বিরোধ লাগবে। সুতরাং বেশি দহরম মহরম করে কাজ নেই।
মদিনা ক্লথ স্টোর্স-এর ভেতরে হাবিব বলছিল, “মনে তো হয় ইদিকেই চেয়ে আছে। দোকানের মদ্ধি আমাদের দ্যাখতে পায়?”
তারিক বলল, “আরে দ্যাখলেই বা কী? নিজের দোকানে বসে কথা কইছি... তাছাড়া ওর দিষ্টি ইদিকপানে লয়। রাস্তা দ্যাখে। কে আসে কে যায়, দ্যাখে।”
“তুই জানিস?”
“জানি নে? দেকি নে? গাঁয়ের মানুষ গেলে গেরাজ্ঝি নাই। বায়রের গাড়ি আসতি দ্যাখলে শরীল টান হই যায়। বিশেষ, সে এইদিক থেকি আসলে আরও। ঘাড় ঘুরায়ে দ্যাখে, যতক্ষণ না ও-ও-ওই দূরের বাঁক পার করতেছে। তারপরও বার বার ঘাড় ফি রায়ে দ্যাখে।”
“কী দ্যাখে? যাওয়া গাড়ি ফিরে কি না?”
“আল্লায় জানে... দ্যাখে, এইটুকু দেখি। ক্যাবল এ-ই না। বাস আসলিও দ্যাখে, কিন্তুক তখন ভিতরে যায়। আন্ধার থেকি দ্যাখে, কে আসে, কে যায়... কে লামে বাস থিকি।”
হাবিবের ভুরু কোঁচকায়। “ক্যানে? লুকায়ে ক্যানে? অমনে দ্যাখলে কী হয়? আমরাও তো দেখি। রোজই তো কেউ না কেউ যায়, আবার ফিরে...”
তারিক মাথা নেড়ে বলে, “তা আমি জানিনে। তবে গাঁয়ের লোকেরে দ্যাখে না। দ্যাখে বাইরে থিকা কেউ আসছে কি না।”
হাবিব বলল, “তা তুই জানলি ক্যামনে?”
তারিক বলল, “গাঁয়ের চিনা লোক লাইমলে লগে লগে বাইর হয়। একদিন দীনু ময়রা আসছিল, তারে তো চিনে না। সে লামার পরে আর বেরয় না। দীনু আসল, আমারে আদাব কইল, তোর দোকানে চা খাইল... মনে নাই?”
হাবিব বলল, “হাঁ, এই তো সেদিন।”
“তারপর গাঁয়ের লোকে আসল, কথা কইল, তারপর সে বাইর হইলো।”
“আশ্চজ্জি! কিন্তু কেন?”
“কেন কে জানে।”
ওদের আলোচনা চলাকালীন রাস্তার ওপারের দোকানে নাড়ুগোপাল ভেতরে ঢুকে দরজা বন্ধ করল। অন্ধকার হয়ে আসছে, এবার রান্নার বন্দোবস্ত করতে হবে। চিরকাল রাঁধুনির রান্না খাওয়া লোকটা, এখানে আসার কিছুদিন আগেও জোম্যাটো আর সুইগি করে খাবার আনাত যে, সে আজ হাত পুড়িয়ে রাঁধতে বসেছে। হাসি পায়।
~ছয়~
রাত হয়েছে। এখনও বাস পাওয়া যাবে, আর লক্ষ্মণ যদি গাড়ি করে পৌঁছে দেয়, তাহলে আরও ঘণ্টাখানেক পরে যাওয়া যাবে। বাইরের ঘরে লক্ষ্মণ বসে টিভি দেখছে। ওকে জিজ্ঞেস করবেন, না...
দরজায় লক্ষ্মণ এসে দাঁড়াল। “হো গিয়া, ওকিলসাব?”
মাথা নাড়লেন তারাশঙ্কর। “অনেক কাগজ হে, একদিনে হবে না। সারাদিন কাজ করলেও অন্তত তিন চার দিন।”
আগের বারও জমিজমার দলিল খোঁজার সময় মনে হয়েছিল, এখন আরও মনে হচ্ছে — কাগজপত্রগুলো ইচ্ছে করেই গোলমাল করে মিলিয়ে মিশিয়ে রাখা হয়েছে। এ কেবল অগোছালো করে রাখা নয়। আগের বার হাতে সময় ছিল না। মনে হয়েছিল যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ছেলেটাকে পেতে হবে। কিন্তু এখন ভালো করে দেখতে হবে। তাই তারাশঙ্কর কাগজ পরীক্ষা করার সঙ্গে সঙ্গে গোছাচ্ছিলেনও। যদি ভবিষ্যতেও কাজে লাগে?
মুখ তুলে বললেন, “তুমি এখন যাবে, লক্ষ্মণ?”
লক্ষ্মণ উত্তর দিল না। চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর আস্তে আস্তে বলল, “বেহেতর আপ ঘর যাও উকিলসাব। কাল ফির আনা।”
এক লহমায় সমস্তটা পরিষ্কার হয়ে গেল। আর এক মুহূর্ত লাগল তারাশঙ্করের নিজেকে সামলে নিয়ে কলম বন্ধ করে নিজের কাগজগুলো গুছিয়ে ব্যাগে ভরতে। তারপর বললেন, “এই ঘরে কেউ না আসে। বন্ধ করে দিও। তালা দিলে ভালো হয়।”
লক্ষ্মণ বলল, “কোই নেহি আয়েগা। তালাকা জরুরত হ্যায় নেহি।”
দরজা ছেড়ে সরে দাঁড়াল লক্ষ্মণ। উকিলবাবু বেরোলেন। নিচের ঘরে আর কেউ নেই। বাইরেও কেউ নেই। অর্থাৎ ঠিকই বুঝেছেন। পাহারা আর থাকবে না। মেয়েটাকে সরিয়ে দেওয়া হবে। সেটা কোথায়, তা-ও এতদিনের অভিজ্ঞতায় তারাশঙ্কর জানেন। অল্প শিউরে উঠলেন। আর না ভেবে পা চালালেন বাস স্টপের দিকে।
বাইরের দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ করে লক্ষ্মণ আস্তে আস্তে সিঁড়ি চড়তে আরম্ভ করল, মিনির ঘরের দিকে।
সামান্য কিছু ব্যায়াম সেরে মিনি আবার শুয়েছিল বিছানায়। আজকাল করার কিছু থাকে না। এ ঘরে টিভিও নেই, বইপত্রও কিছু নেই। অবশ্য মিনির বই পড়ার অভ্যেস নেই মোটেই। ঘরের আদত মালিক, দীপব্রত বা তার ভাই পরাগব্রতরও ছিল না। কাগজও পড়ত না, কেবল টিভি দেখত। টিভি নিচের তলায়। সেখানে এখন শুধু ওর পাহারাদারেরা বসে থাকে। এ ছাড়া আর কোথাও যেতে পারে না মিনি। বাগানে যাওয়া বারণ, ছাদে উঠে পায়চারি বারণ। ওর সামনেই সিংজীর পেয়ারের গুণ্ডা লক্ষ্মণ তালা লাগিয়ে গেছে। লক্ষ্মণকে মিনি সহ্য করতে পারে না। যদিও কোনও দিন কিছু বলেওনি, কিছু করেওনি — মিনির ধারণা ওর নজর থাকে মিনির দিকে। কখনও আগে মনে হয়েছে যেন আড়চোখে ওকে মাপছে। তখনও হয়েছিল, এখনও মনে পড়তেই যেন অন্তরাত্মা শুকিয়ে গেল মিনির।
মিনি জানত লক্ষ্মণ এখন নিচে রয়েছে। গাড়ি এসেছে। ইঞ্জিনের শব্দ পেয়ে জানলা দিয়ে তাকিয়েছিল। এই গাড়িটা কেবল লক্ষ্মণই চালায়।
রাত বেড়েছে। গাড়িটা এখনও রয়েছে। মানে লক্ষ্মণ আর ওর সাঙ্গপাঙ্গরা নিচের তলায় রয়েছে। কী করছে এখনও? সাধারণত আটটা নাগাদ রাতের পাহারাদাররা আসে। সাড়ে আটটা, পৌনে নটা নাগাদ একজন ওপরে উঠে এসে জানতে চায় দিদি, বা মেডাম, কী খাবেন? মিনি বলে দিলে ওরা জোম্যাটো বা সুইগি করে আনিয়ে নেয়।
সাড়ে দশটা বেজে গেছে। এখনও কেউ আসেনি কেন? মিনির খিদে পাচ্ছিল। একবার দরজাটা একটু ফাঁক করে উঁকি দিয়ে নিচের তলায় দেখেছিল। লক্ষ্মণ নিচে একলা বসে টিভি-র সামনে। বাকি দুজন কোথায়? খাবার আনতে গেছে? মিনিকে কিছু জিজ্ঞেস করেনি — কেন?
আরও আধঘণ্টা পর মিনি বাধ্য হয়ে ঘরে রাখা কিছু পুরোনো বিস্কুট খেয়েছিল। তারপর জল। কিন্তু সে-ও তলিয়ে গেছে।
নিচতলায় টিভি বন্ধ হল? কথাবার্তা? খাবার নিয়ে ফিরল লোকগুলো? কিন্তু না, ওরকম কথাবার্তা নয়। মিনি আস্তে আস্তে দরজা ফাঁক করল। নিচের তলায় লক্ষ্মণ অফিস ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে কথা বলছে। ভেতরে কে? দেখতে দেখতে ভেতর থেকে বেরিয়ে এল — তারাশঙ্কর উকিল! সে-ও এসেছে? আবার এসেছে কেন? উকিলবাবু বেরিয়ে গেল। এবার মিনি বুঝতে পারছে নিচে লক্ষ্মণ একাই। পাহারাদার দুজন হয় নেই, নয়ত বাইরে। লক্ষ্মণ বাইরের দরজা বন্ধ করল। ছিটকিনি, আগল দুই-ই লাগাল। মিনির ভয় করছে। লক্ষ্মণ দরজা থেকে ঘুরে সোজা তাকাল মিনির ঘরের দিকে। চট করে দরজা থেকে সরে গেল মিনি। বুকটা ধড়াস ধড়াস করছে। দেখতে পেল? মিনি বিছানায় গিয়ে বসল। দরজা রইল ওমনিই। মিনির একা থাকা শুরু হবার পরে একদিন লক্ষ্মণই এসে ভেতর থেকে বন্ধ করার সব ছিটকিনি খুলে দিয়েছিল। এমনকি বাথরুমেও ছিটকিনি খুলে দিয়ে একটা পাতলা এক ইঞ্চির হুক লাগিয়ে গেছিল। এর কারণ মিনি জানে না। এতটুকু জানে, যে তার পর থেকে ও আর নিশ্চিন্তে এক মুহূর্ত কাটায়নি।
লক্ষ্মণের পায়ের শব্দ সিঁড়ি দিয়ে উঠে দোতলার ঘরগুলোর সামনের ঝুলবারান্দা দিয়ে এগিয়ে এসে থামল মিনির দরজার সামনে। কাঠ হয়ে বসে মিনি। লক্ষ্মণের হাতের ছোঁয়ায় দরজা খুলল। আড়চোখে সেদিকে চেয়ে দেখে মিনির বুকটা আবার শুকিয়ে গেল। মাত্র বাইশ বছর বয়সে বহু পুরুষের সঙ্গে সহবাসের অভিজ্ঞতা হয়েছে ওর। পুরুষের চোখের দৃষ্টি ও চেনে। লক্ষ্মণের চোখেও আজ সেই চাহিদা ফুটে উঠছে।
পায়ে পায়ে লক্ষ্মণ এসে সামনে দাঁড়াল। ঘড়ঘড়ে গলায় বলল, “তৈয়ার হো যাও। যানা হ্যায়। কপড়া বদল লেনা। ইস কাপড়া মে বাহার নেহি যানা।”
অবাক হয়ে লক্ষ্মণের দিকে তাকাল মিনি। এ কথার অর্থ? কোনটা বেশি জরুরি ঠিক ধরতে পারল না — তুমি বলা, তৈরি হয়ে বেরোনোর কথাটা, না পোশাক বদলের নির্দেশ! পরনের স্কার্ট ব্লাউজের সেট-টা সিংজী স্বয়ং দিয়েছিলেন জন্মদিনে। সেটা নিয়ে সিংজীর অধস্তন কেউ, সে যে-ই হোক, মন্তব্য করছে, ভাবা-ই যায় না। এবং এক্ষেত্রে, লক্ষ্মণ, যে আর যা-ই হোক, সামান্য ভৃত্যই তো — ওর কাজ যা-ই হোক, দারোয়ান বা বডিগার্ডের চেয়ে বেশি কিছুই নয় — সে মিনিকে ‘তুমি’ বলে সম্বোধন করে পোশাক পরা নিয়ে হুকুম দেয় কোন সাহসে?
আগুপিছু না ভেবেই মিনি উঠে দাঁড়িয়ে আঙুল তুলে দরজার দিকে দেখিয়ে বলল, “গেট আউট।”
কথাটা বললে কী হতে পারে মিনি ভাবেনি। তবে মনে হয়েছিল, কম করেও লক্ষ্মণ ঘর থেকে বেরিয়ে যাবে। যেটা হল, তা মিনি স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারেনি। ঠাস করে চড়টা এসে পড়ল বাঁ গালে। কান মাথা ঝঁ ঝাঁ করে উঠল। চোখে অন্ধকার দেখল। হেলে পড়ে যাচ্ছিল, কিন্তু হাত বাড়িয়ে জামাটা ধরে ফেলল লক্ষ্মণ। হ্যাঁচকা টান মেরে দাঁড় করিয়ে দিল। টানের ফলে ফড়ফড় করে ব্লাউজটা ছেঁড়ার শব্দ পেল মিনি। মুখের কাছে মুখ এনে লক্ষ্মণ হিসহিস করে উঠল, “শালী কুত্তী...”
লক্ষ্মণের নিঃশ্বাসে পান-মশলার চড়া গন্ধে মিনির মাথায় চড় খাওয়ার ঝিম-টা কেটে গেল। আবার চড় আসবে, আরও গালাগালি শুনবে, এই আশঙ্কায় চোখ বন্ধ করে মাথাটা ঘুরিয়ে ফেলেছিল, কিন্তু দুটোর কোনওটাই হল না, তাই আড়চোখে লক্ষ্মণের দিকে তাকিয়ে ওর দৃষ্টি অনুসরণ করে নিচের তাকিয়ে নিজের চেহারা দেখে আঁতকে উঠল। লক্ষ্মণের টানে ওর ব্লাউজের বোতামগুলো ছিঁড়ে, সামনেটা পুরো ঝুলে গিয়েছে। বাঁদিকের স্তনটা পুরোটা উন্মুক্ত। বাঁ হাতে জামার ঝুলে পড়া অংশটা তুলে লজ্জা নিবারণ করার আগেই আবার, হঠাৎ-ই লক্ষ্মণের মধ্যে আবার একটা পরিবর্তন হল। পুরুষের মধ্যে এই পরিবর্তনগুলো মিনি চেনে। মনে হল, এটা হতে পারে না। ওর প্রতি লক্ষ্মণের আকর্ষণ ও আগে অনুভব করেছে, কিন্তু কখনও ভাবেনি মালিকের শয্যাসঙ্গিনীর প্রতি ওর কামনা এভাবে উথলে উঠবে।
লক্ষ্মণের ধাক্কায় মিনি বিছানায় গিয়ে পড়ল। এক টানে হলদে র্যাপ-অ্যারাউন্ড স্কার্টটা ছিঁড়ে চলে গেল লক্ষণের হাতে। এক হাতে ওকে বিছানায় চেপে রেখে, আর এক হাতে ওর প্যান্টি খুলে নিল মিনি যেন একটা পুতুল। তারপর, অনায়াসে দু-হাতের টানে মিনির দুই উরু ফাঁক করে ফেলল লক্ষ্মণ...
মিনির কপাল একদিক থেকে ভালো, লক্ষ্মণের দম রইল না বেশিক্ষণ। যতক্ষণ ও মিনির ওপর ছিল, প্রতি মুহূর্তেই মিনির মনে হচ্ছিল, এই বুঝি গলা দিয়ে প্রাণ বেরিয়ে গেল। তাই, একটু পরেই যখন লক্ষ্মণ ওর ওপর নেতিয়ে পড়ল, আধখোলা মুখের পান-মশলা মিশ্রিত গাঢ় শ্বাসে ওর নাড়িভুঁড়ি গুলিয়ে যেতে লাগল, মিনি অতি কষ্টে শরীরটা ওর নিচ থেকে টেনে বের করে এনে টলতে টলতে বাথরুমে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিল। প্রথমে বমি করতে চেষ্টা করল, কিন্তু পেট খালি, কিছু বেরোল না। হাঁপাতে হাঁপাতে, ওক্ তুলতে তুলতে মিনি শাওয়ার খুলে তার নিচে দাঁড়িয়ে থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে অঝোরে কাঁদতে শুরু করল।
বেশিক্ষণ এই একাকীত্বও সইল না। হঠাৎ বন্ধ দরজায় দুম দুম করে ধাক্কার শব্দে চমকে জল বন্ধ করল। বাইরে থেকে তর্জন শুনতে পেল, “দরোয়াজা খোল্... নেহি তো তোড় দুঙ্গা।” সামান্য হুক ভাঙতে লক্ষ্মণের এক সেকেন্ডও লাগবে না। তোয়ালে দিয়ে শরীরটা আড়াল করে দরজা ফাঁক করল।
লক্ষ্মণের চোখ ওর অর্ধাবৃত শরীরে। বলল, “পাঁচ মিনিট মে তৈয়ার হোনা। নিকলনা হ্যায়। এক সাড়ি পহননা, তিন-চার সাড়ি সাথ লেনা। বাস।”
মিনিকে বাথরুমে রেখে লক্ষ্মণ আবার নেমে গেল নিচে। টিভিটা চলছে এখনও। একটা পুরোনো, আগে দেখা হিন্দি ছবি। লক্ষ্মণের মন সে দিকে নেই। মিনির শরীরটা ওকে যতটা শান্তি দেবে মনে হয়েছিল, ততটা দেয়নি। বরং আরও বেড়েছে চাহিদা। এই চাহিদা লক্ষ্মণের আজকের নয়। মিনিকে যেদিন প্রথম দেখেছিল, সেদিনই ওর শরীরে-মনে আগুন লেগেছিল। ভাবত, একবার... শুধু একবার কি মিনিকে ভোগ করতে পারবে না? আজও সারা সন্ধে বসে ভেবেছিল ভগবান জুটিয়ে দিয়েছেন। ভোগ করে নিয়ে সাবাড় করে দিলেই হবে।
হবে না। সাবাড় এত তাড়াতাড়ি করা যাবে না।
বাথরুম থেকে বেরিয়ে মিনি ত্রস্ত হাতে শাড়ি পরল। মাথার মধ্যে অনেকগুলো চিন্তা একত্রে ঘুরপাক খাচ্ছে। লক্ষ্মণের সঙ্গে মিনির সম্পর্ক আর আগের মতো নেই। এর অর্থ কি এই, যে এখন থেকে সিংজীর আশ্রয়ে থেকেই লক্ষ্মণের সখও মেটাতে হবে? এটা কি নতুন মাত্রা যোগ হল, না সিংজীর ছত্রছায়া থেকে ওর নির্বাসন? এখন সিংজী কি শরীরের সুখ পেতে অন্য কারও বিছানায় যাবে? হোটেলের ওই স্যুইটটা আর কেউ পেয়ে গেছে এর মধ্যেই?
কোন শাড়িগুলো নেওয়া যায়? শাড়ি মিনির খুব পছন্দের পরিচ্ছদ নয়। পশ্চিমী পোশাক ওর প্রিয়। আগে সিংজীর কিছু খদ্দের বা বিজনেস পার্টনারকে খুশি করতে শাড়ি পরত, আর শেষ কিছুদিন পরত দীপব্রতর ইচ্ছায়। এই আলমারির বেশির ভাগ শাড়িই দীপব্রতর দেওয়া। হঠাৎ শরীরটা ঠাণ্ডা হয়ে এল। মাথাটা ঝিমঝিম করে উঠল। মিনি বিছানায় বসে পড়ল দু-হাতে মাথাটা ধরে। কী হতে চলেছে ওর জীবনে?
ঠিক তখনই দরজা খুলে ঘরে ঢুকে এল লক্ষ্মণ। “হো গিয়া?” কাছে এল। “হো গিয়া?” বাক্সের ভেতর হাত দিয়ে দেখল। শাড়িগুলোর গায়ে হাত বোলাল। ওই মোটা মোটা আঙুলগুলো একটু আগেই ওর শরীরের খাঁজে খাঁজে ঘুরছিল। শরীরটা আবার গুলিয়ে উঠল মিনির।
লক্ষ্মণ ওর বাক্সের পাশে খাটের ওপরেই বসে পড়ল। তারপর আস্তে আস্তে, এক এক করে সমস্ত কথাই বলে ফেলল। সিংজী বলেছেন মিনিকে সরিয়ে ফেলতে। কাকপক্ষীও যেন টের না পায়, মিনির মৃতদেহও খুঁজে পাওয়া যায় না যেন। কিন্তু লক্ষ্মণ ঠিক করেছে তা করবে না। মিনিকে নিয়ে যাবে নিজের কাছে। নিজের মতো রাখবে কাছে। মিনি রাজি হলে ভালো, নইলে ওকে নিকেশ করে লাশ গায়েব করতে এক মিনিটও লাগবে না।
শুনতে শুনতে মিনির মাথাটা গুলিয়ে উঠেছিল আবার। আচ্ছন্নের মতো লাগছিল। মাথাটা টলে গেছিল। পড়ে যেত, কিন্তু লক্ষ্মণ ছিল পাশেই। লক্ষ্মণের ঝাঁকুনিতে সম্বিৎ ফিরল।
“আবে, উঠ্, ছিনাল কাঁহিকি, নৌটঙ্কি বন্ধ্ আজসে। একদম বন্ধ্! বরনা এক এক থাপ্পড় লাগেগা।”
মিনির পড়ে যাওয়ার ভুল অর্থ করেছে লক্ষ্মণ।
উঠে দাঁড়িয়ে লক্ষ্মণ ওর হাত ধরে হ্যাঁচকা টান মেরে তুলল। যন্ত্রণায় ককিয়ে উঠল মিনি। লক্ষ্মণ এক হাতে বাক্সটা বন্ধ করে হাতে ঝুলিয়ে নিল। অন্য হাতে মিনির কনুইয়ের ওপরটা টানল। মিনি চুপচাপ সঙ্গে চলল। বাইরে এসে লক্ষ্মণ দরজা বন্ধ করল। বাইরের বারান্দায় ইলেকট্রিক মিটার বক্স। তার পাশেই দুটো মেইন সুইচ। কোনটা কিসের, জানে না লক্ষ্মণ। দুটোই নিভিয়ে দিল। অবশ্য নেভানো বা জ্বালানোতে আর তফাত হবে কি? এতদিন মিনি রয়েছে বলেই সিংজী ইলেকট্রিক বিল দিতেন। এখনও কি আর দেবেন?
মিনিকে টেনে নিয়ে গাড়িতে তুলল। মিনি কি একবারও ভেবেছিল বাধা দেবে? দিলে কী হত? ঘড়িতে রাত প্রায় একটা। গোটা পাড়াই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। ছড়ানো ছেটানো দু-একটা জানলায় আলো জ্বলছে। আজকাল অনেকেই নানা কারণে সারা রাতই জেগে থাকে।
তারা কেউই শুনলও না একটা গাড়ি প্রায় নিঃশব্দে মুখার্জিবাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল।
~সাত~
দিন বারো পরে উকিল তারাশঙ্করবাবু ভাগনে সত্যজিৎ প্রথম দামী কাগজটা পেল। ভুবনব্রত মুখার্জির অফিসঘরের অজস্র কাগজ যে কেউ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে উথালপাতাল করে মিশিয়েছে, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই আর। ছাপাখানার কাগজের সঙ্গে ইনশিওরেন্সের আদ্যিকালের রসিদ, ইনকাম ট্যাক্সের ফাইলে পাম্পের মিস্তিরির ঠিকানা, প্রায় পাতায় পাতায় এহেন নানাবিধ অজস্র গোলমাল কোনও একজন মানুষের পক্ষে ঠিক করা সম্ভব না। তাই চার দিন হল সত্যজিৎকেও আনছেন সঙ্গে।
দুপুরেই দু-জনে আলোচনা করেছিলেন। নিজের পরিচয় পাওয়া যেতে পারে এমন কোনও দলিল রেখে যায়নি পরাগব্রত। শুধু তা-ই নয়, ভুবনব্রতর সম্পত্তিরও কোনও দলিল নেই। এমনকি এ-বাড়ির দলিলটাও নেই।
মাথা নেড়েছিল সত্যজিৎ। ওর মতে সব কাগজ হয়ত সরাতে পারেনি। সরালে কেন আবার সব মিলিয়ে মিশিয়ে রাখবে? ও জানত না সব সরিয়েছে কি না। তাই কাগজপত্র হিজিবিজি করেছে।
“মামা? ভুবনব্রত মুখার্জির ওয়াইফের নাম প্রতিভা মুখার্জি ছিল?”
কাগজপত্র ঘাঁটতে ঘাঁটতে তারাশঙ্কর বললেন, “উঁ? কী ছিল?” তারপরেই খেয়াল হল, বললেন, “হ্যাঁ। প্রতিভা মুখার্জি। কেন?”
“আর ওদের তো একটাই ছেলে?”
আবার হ্যাঁ বললেন তারাশঙ্কর। পরাগব্রত তো দত্তক নেওয়া।
হাতে ধরা কাগজটা মামার দিকে বাড়িয়ে সত্যজিৎ বলল, “এটা জন্মের সময়ের কাগজ।”
“কার?” কাগজটা হাতে নিলেন তারাশঙ্কর। প্রতিভা মুখার্জি চার দিন ভর্তি ছিলেন শহরের উত্তর দিকের একটা নামী নার্সিং হোমে। সুস্থ পুত্রসন্তানের জন্ম হয়েছে। ওজন তিন কেজি সাতশো।
“এটা দীপব্রত,” বললেন তারাশঙ্কর। “পরাগব্রত নয়।”
“হ্যাঁ। কিন্তু দুজন তো একই বয়সী ছিল। স্কুলের রেজিস্টারে তো তাই লেখা ছিল।” মুখার্জিদের অতীত খুঁজতে সত্যজিৎ সেখানেও গেছিল। “যদি একই ডাক্তার দু-জনের জন্ম দিয়ে থাকে?”
দু-ভাইয়ের কারওর বার্থ সাটিফিকেট পাওয়া যায়নি। শুধু ডেট অফ বার্থ লেখা ছিল স্কুলের রেজিস্টারে।
“গাইনেকোলজিস্টের নাম রয়েছে। নার্সিং হোমে খোঁজ করলে পাওয়া যেতে পারে।”
তারাশঙ্করের কপালে ভ্রূকুটি। “বলছিস? সে কবেকার কথা… কে জানে বেঁচে আছে কি না?”
ডিটেকটিভ মানসিকতা সত্যজিতের। বলল, “সার্টিফিকেটে ডাক্তারের রেজিস্ট্রেশন নম্বর আছে। অনলাইন এক্ষুনি পেয়ে যাব।”
এসব বোঝেন না তারাশঙ্কর উকিল। সত্যজিৎ দেখিয়ে দিল কী ভাবে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য মেডিক্যাল কাউনসিলের ওয়েবসাইটে গিয়ে একলহমায় রেজিষ্ট্রেশন নম্বর লিখে ডাক্তারের নাম-ধাম বের করে আনা যায়।
“নার্সিং হোম, বাড়ির ঠিকানা দুইই শ্যামবাজার অঞ্চলে,” বলল সত্যজিৎ। “কাল গিয়ে খোঁজ নেব।”
তারাশঙ্কর বললেন, “মনে থাকলেও ডাক্তার কি তার রোগীর কথা বলবে?”
সত্যজিৎ বলল, “কায়দা করে বের করতে হবে। দেখি, কাল গিয়ে। তবে নার্সিং হোম-টা বোধহয় নেই।”
“কী করে বুঝলি?”
“এখানে ফোন নম্বরটা আদ্যিকালের। সাত ডিজিটের ল্যান্ডলাইন। সামনে দুই বসিয়ে ডায়াল করলাম, বলল, এই নম্বরের কোনও অস্তিত্ব নেই। ইন্টারনেটেও এই নার্সিং হোমের হদিস পাচ্ছি না।”
তারাশঙ্কর বললেন, “এক সময়ে বেশ নামকরা নার্সিং হোম ছিল।”
সত্যজিৎ বলল, “তাই? তাহলে নির্ঘাত উঠে গেছে, নইলে আমিও তো নাম শুনতাম।”
তারাশঙ্করের মনে হচ্ছিল না নার্সিং হোম বা ডাক্তারকে দিয়ে কিছু হবে, তাই কথা না বাড়িয়ে কাগজ গোছানোর দিকে মন দিলেন।
~আট~
প্রায় দু-সপ্তাহ হল মিনির নতুন জীবন শুরু হয়েছে। অতীতের তুলনায় অতীব কষ্টদায়ক এই দিনচর্যা। মাঝরাতে লক্ষ্মণ গাড়ি করে কোথায় নিয়ে গেছিল, ও চেনে না, তবে আন্দাজ করেছিল, শহরের মাঝখানে কোনও বস্তি। এখানে গরিব মানুষের বাস। চারপাশে দোকান-বাজার। বড়ো রাস্তায় আলো-ঝলমল, ঝকঝকে দোকান, রেস্টুরেন্ট, অফিস। এখন অবশ্য মাঝরাত, অন্ধকার, সব দরজা বন্ধ। চেনা রাস্তাটা অচেনা। কিছু দূরে দূরে, দুটো বাড়ির ফাঁকে ফাঁকে এক একটা গলি। বড়ো রাস্তার ফুটপাথ ঘেঁষে গাড়ি পার্ক করে, তালা দিয়ে সেরকমই একটা গলিপথে ওকে সঙ্গে নিয়ে ঢুকেছিল লক্ষ্মণ। দু-চার পা যেতে না যেতেই ডাইনে বাঁয়ে ঘুরে মিনি দিকভ্রান্ত হয়ে গেছিল। তবে পেছনেই ছিল লক্ষ্মণ। চাপা-স্বরে পেছন থেকে ‘আগে ডাইনে,’ ‘আব বাঁয়ে,’ বলে বলে নির্দেশ দিচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত, প্রায় পাক্কা মিনিট পাঁচেক হেঁটে শেষে লক্ষ্মণ একটা দরজার সামনে দাঁড়িয়েছিল। ভাগ্যিস! গত প্রায় তিন বছর বাড়ির বাইরে পা-রাখেনি মিনি, তার মধ্যে প্রায় দু-বছর দীপব্রতর ঘরটাতেই বন্দিদশা কেটেছে। অনভ্যস্ত, মেদবহুল শরীর নিয়ে হাঁপিয়ে গেছে এতক্ষণ হাঁটতে হাঁটতে। তবু ভালো স্যুটকেসটা লক্ষ্মণই নিয়েছে। যত অল্পই ওজন হোক, ওটা নিয়ে চলতে মিনি পারতই না। দরজার পাশের দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে বড়ো বড়ো শ্বাস নিতে নিতে চারপাশটা দেখার চেষ্টা করল মিনি। সরু গলি। সাইকেলের চেয়ে চওড়া কোনও বাহন চলবে কি না সন্দেহ। দু-পাশের বাড়িগুলো দোতলা।
হুড়কো খোলার খটখট শব্দ। ঝনাৎ শব্দে একটা শিকল পড়েছিল। তারপর খুলে গেছিল দরজা।
ভেতরে একটা… বাচ্চা? না, অন্ধকারে ভুল হয়েছিল মিনির… এক অশীতিপর বৃদ্ধা, শরীরটা সামনের দিকে ঝুঁকে ভাঁজ হয়ে গেছে, দরজা খুলে সরে দাঁড়িয়েছিল। মাথা নুইয়ে ভেতরে ঢুকেছিল লক্ষ্মণ। পেছনে মিনি।
একচিলতে বাঁধানো উঠোন। ডাইনে বাঁয়ে কী আছে অন্ধকারে দেখা যাচ্ছিল না। সামনে একটা ঘর। ঘরের দরজা খোলা, ভেতরে ম্লান আলো। মিনির কনুইয়ের ওপরটা ধরে বাড়ির পাশের দিকে ঠেলে নিয়ে গেছিল লক্ষ্মণ। কিছুটা এগিয়ে, ততক্ষণে অন্ধকারে চোখ সয়ে গেছে বলেও, আবার কাছে আসার জন্যেও, একটা দরজা দেখতে পেয়েছিল। লক্ষ্মণ পাল্লাটা টান মেরে খুলে, কনুই ধরা অবস্থাতেই ওকে ঠেলে ভেতরে ঢুকিয়ে দিয়ে হাতে স্যুটকেসটা দিয়ে বলেছিল, “যা, উপর কমরা মে যাকে কপড়া উতার লেনা। ম্যায় আভি আয়া।”
ভেতরে কী আছে দেখতে পাবার আগেই লক্ষ্মণ বাইরে থেকে দরজাটা বন্ধ করে দিয়েছিল। এমনিতেই ভেতরে আলো পৌঁছচ্ছিল না, তার ওপর দরজা বন্ধ করায় অন্ধকার একেবারে আলকাতরার মতো। মিনি কোন দিকে যাবে বুঝতে পারছিল না। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে বুঝেছিল, এত অন্ধকারে চোখ আর সইবে না। সেই সঙ্গে ভয়ও পাচ্ছিল, যদি লক্ষ্মণ ফিরে এসে দেখে ও ওখানেই দাঁড়িয়ে আছে, আবার হয়ত মারবে।
শেষে হাত বাড়িয়ে, পা ঘষে ঘষে এগিয়ে সিঁড়িটা পেয়েছিল। খাড়া সিঁড়ি উঠেছে বাড়ির পাশ দিয়ে দোতলা অবধি। বেশ উঁচু উঁচু ধাপ, আগেকার দিনের বাড়ি বলেই বোধহয়।
এগারোটা ধাপের পর সিঁড়ি শেষ। আবার আন্দাজে দরজাটা হাতে পেয়েছিল। বন্ধ। লক্ষ্মণ ঘরে যেতে বলেছিল, তাহলে দরজায় নিশ্চয়ই তালা নেই? হাত বুলিয়ে হুড়কোটা খুলে ভেতরে ঢুকে চারদিকে তাকিয়ে আবার মুশকিলে পড়েছিল মিনি। সুইচবোর্ড? এখানে অবশ্য অন্ধকার অত ঘন ছিল না। নিচের দরজা-খোলা ঘরটার ওপরেই, বাইরের দিকে দুটো বড়ো, মাটি থেকে ছাদ ছোঁয়া পাল্লা খোলা জানলা, তার পর্দা-বিহীন গ্রিলের ফাঁক দিয়ে নিচের আলোটার মৃদু আভা ঘরের ভেতরে ছড়িয়ে পড়ছিল। মনে হয়েছিল এই আলোতে পোশাক বদলানোর মতো সহজ কাজটা করতে পারবে, কিন্তু তার পরমুহূর্তেই দুটো কথা মনে পড়ে আবার হাত পা ঠাণ্ডা হয়ে গেছিল মিনির।
লক্ষ্মণ ওকে পোশাক ছাড়তে বলেছিল। বদলাতে নয়! আর দ্বিতীয়টা আপাতদৃষ্টিতে অত ভয়ঙ্কর না হলেও অতীব অস্বস্তিকর তো বটেই — মিনির বাক্স গোছানো শেষ হবার আগেই লক্ষ্মণ এসে পড়েছিল। ফলে শাড়ি-ব্লাউজ-অন্তর্বাস নিলেও মিনির বাক্সে রাত-পোশাক নেই।
শাড়ি পরে কোনও দিন ঘুমোয়নি মিনি। আশ্চর্য, এত বিপদেও এর আগে যে মিনির কান্না পায়নি, তার তখন চোখ ফেটে যেন জল বেরিয়ে আসছিল। খিদেয় পেট জ্বলছিল। তেষ্টাও পেয়েছিল খুব। লক্ষ্মণ কি খাবারদাবার কিছু আনবে? বলা উচিত ছিল? কিন্তু সারা সন্ধে লক্ষ্মণের মেজাজ, কথাবার্তা, মার আর জামা ছিঁড়ে নিয়ে ওর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার অভিজ্ঞতায় মিনি বিহ্বল হয়ে গেছিল।
চিন্তার সুতো ছিঁড়েছিল সিঁড়িতে লক্ষ্মণের ভারি পায়ের শব্দে। কিছু করার আগেই দরজা ঠেলে ঢুকে লক্ষ্মণ খেঁকিয়ে উঠে জানতে চেয়েছিল অন্ধকারে কেন দাঁড়িয়ে আছে মিনি।
শুকনো টাকরায় শুকনো জিভ আটকে গেছিল, ঠোঁটে ঠোঁট সেঁটে গেছিল। কোনও রকমে, “লাইট সুইচ...,” বলেছিল মিনি।
নাক-মুখ থেকে ঘোঁত শব্দ করে লক্ষ্মণ দেওয়ালের এক কোনায় সুইচ টিপে আলো জ্বালিয়েছিল। অল্প আলোয় দেখা গেছিল একটা কাঠের খাটিয়া, তাতে পাতলা তোশকের ওপর একটা বালিশ, আর একটা কাঠের চেয়ার। এইটুকু সময়েই লক্ষ্মণের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙেছিল। বলেছিল, “কেয়া হুয়া? উতারো কাপড়া।”
মিনি বলেছিল, “নাইটি আনিনি। শাড়িই পরতে হবে।”
“কেয়া বোলা?” লক্ষ্মণ সবে বসতে যাচ্ছিল বিছানায়, ছিলে ছেঁড়া ধনুকের মতো উঠে দাঁড়িয়েছিল। “কেয়া বোলা তু?” এক ঝটকায় সুটকেসটা খুলে ভেতরের সবকিছু ছড়িয়ে ফেলেছিল মেঝেতে। তারপর, হতভম্ব মিনির বিস্ফারিত চোখের সামনে এক এক করে সমস্ত দামী দামী লেসের অন্তর্বাসগুলো টেনে টেনে ছিঁড়েছিল। সেই সঙ্গে গর্জন, “ইয়ে সব নেহি চলেগা। সাড়ি পহননা, ঔর ইয়ে সব বেকার কি কুছ নেহি। উতার কাপড়া, লেট যা বিস্তর পে…”
কী ঘটতে চলেছে আন্দাজ করতে পেরেছিল মিনি। তবু সাহস সঞ্চয় করে বলেছিল, “খিদে পেয়েছে খুব…”
কিছু আশা করে বলেনি, কিন্তু কাজ হয়েছিল। লক্ষ্মণ এবারে গলা থেকে হুঁ… জাতীয় একটা শব্দ করে সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেছিল। কাঠের মতো দাঁড়িয়ে ছিল মিনি।
দু-সপ্তাহ পরেও সেই মুহূর্তটার কথা মনে পড়লে শিরদাঁড়া দিয়ে ঠাণ্ডা স্রোত বয়ে যায় শরীরে।
~নয়~
এখনও কি গ্রামের জমিজমার খবর নেওয়ার সময় হয়েছে? ভেবে ঠিক করতে পারছে না পরাগব্রত, ওরফে নাড়ুগোপাল। এ বিষয়ে সন্দেহ নেই যে খোঁজ শুরু করামাত্র সদরের জমি-দালালরা ওয়াকিবহাল হয়ে যাবে, আর তা হলে আমোদপুরের দালালরাও জেনে যাবে, যে ওদের নবাগত প্রতিবেশী নাড়ুগোপাল চক্রবর্তী আকন্দপুরে জমির খোঁজ নিচ্ছে — আর যাদের জমির খোঁজ নিচ্ছে, তারাও সবাই চক্কোত্তি। না-হয় নাড়ুগোপালের ভালো করে মনে নেই ছেলেবেলার গ্রাম্যজীবনের কথা, কিন্তু আকন্দপুরে নিশ্চয়ই এই তিরিশ বছর পরেও কারও ওর মা-বাবার নাম মনে আছে? মনে আছে ওর নামও? গ্রামে আসার আগে কথাগুলো ভাবেনি নাড়ু। এসে দেখছে গ্রামবাসীদের মধ্যে ঐতিহাসিক কম নেই। কে কার বাবা, কার মা, তাদের কোন আত্মীয় স্বজন কোথায় থাকে, কী করে — এসব কথা আড্ডায় গল্পে বেশ জোরে জোরেই আলোচনা হয়। গলা নামিয়ে আলোচনা হয় অবৈধ সম্পর্কের কথা। সে হিসেবও গাঁয়ের লোকে খুব ভালোই রাখে। কোন বোঁচা-নাক ব্যক্তির স্ত্রীর কাছে কোন তীক্ষ্ণনাসা পরপুরুষ আনাগোনা করে, এবং বিবাহিত দম্পতির দুটি বোঁচা-নাক সন্তানের পরে এক লম্বা নাকওয়ালা ছেলে জন্মায়, আলতাফের মতো লোক অনায়াসে বলে দিতে পারে। আর আলতাফ কেবল গ্রামবাসী নয়, জমির দালালও বটে। কোন জমি কত টাকার বিনিময়ে কবে কার থেকে কে কিনেছিল, আলতাফ তিন চার পুরুষের ইতিহাস গড়গড়িয়ে বলতে পারে। গ্রামের এত কাছে ঘাঁটি গেড়ে জমির দখল নেবার চেষ্টা করা ঠিক হবে না। অনেক বার ভেবেছে, আলতাফকে জিজ্ঞেস করবে, আকন্দপুরের চক্কোত্তি পরিবারের কোনও মা-বাবা-ছেলে বছর পঁচিশেক আগে দেশ ছেড়ে চলে গিয়েছিল কি না। কিন্তু সেটা করা মানেই নিজের পরিচয় দেওয়া। তাই চুপ করে থেকেছে।
লকডাউনের মধ্যেই স্কুল-কলেজে অনলাইন ক্লাস চালু হওয়ার পরে নাড়ুগোপালের ব্যবসার কাজ অল্প বেড়েছিল। গ্রাম হলেও বেশিরভাগ ছাত্র-ছাত্রীই সরকারি অনুদানপ্রাপ্ত বেসরকারি স্কুল-কলেজে পড়ে। তাদের অনেক ক্লাস এখনও অনলাইন হয়। টিচাররা নোট, হোমওয়ার্ক, সবই মোবাইল ফোনে পাঠিয়ে দেন। এদিকে অনেক ছাত্র-ছাত্রীর স্মার্টফোন কেনার সামর্থ্য নেই। নাড়ুগোপাল তাদের জন্য একটা সার্ভিস চালু করেছে। একটা নতুন ফোনের কানেকশন নিয়ে গ্রামের লোকের কাছে নম্বর দিয়েছে। যাদের স্মার্টফোন নেই, তারা স্কুলে কলেজে নাড়ুগোপালের নম্বর দিয়ে রেখেছে। তাদের টিচাররা দিনের পড়াশোনা, বাড়ির কাজ — সব সেই নম্বরে পাঠায়। নাড়ুগোপাল সে-সব ওর কম্পিউটারে ডাউনলোড করে প্রিন্ট করে দেয় ছাত্র ছাত্রীদের। ওরা বাড়ির কাজ করে আবার নিয়ে আসে, নাড়ুগোপাল-ই ফোনের ক্যামেরা দিয়ে ছবি তুলে টিচারের নম্বরে পাঠায়। মন্দ রোজগার হচ্ছে না। অবশ্য যখন রোজের স্কুল আবার শুরু হবে, তখন এত হবে না জানে নাড়ু। তবে সে নিয়ে ওর মাথাব্যথা নেই, বলা-ই বাহুল্য। ওর নরকবাসী পালক পিতা ভুবনব্রতর কল্যাণে ওর অভাব নেই। এই গ্রামের মতো কোথাও থাকতে হলে সারা জীবনে যা খরচ হবে তাতে ওর ব্যাঙ্ক ব্যালেনসে আঁচড়টাও পড়বে না। রোজ ওর দোকানে কালো-কালো, রোগা-ভোগা, গরিব-গরিব ছেলেমেয়ে আর তাদের ধুতি-ফতুয়া পরা, বা খালি-গা বাবাদের দেখে নাড়ুগোপাল ভাবে, সেই কবে ছোটোবেলায়, ওর মা বাবা যদি ওকে নিয়ে শহরযাত্রা না করত, আর পথে ট্রেন থেকে বাবা হারিয়ে না যেত, তাহলে একদিন, অন্য এক জীবনে হয়ত ও-ও এরকম খালি গায়ে হাফ-প্যান্ট পরে গাঁয়ের স্কুলে পড়তে যেত। শহরের স্টেশনে সদ্য বাবা-হারা, স্বামী-হারা নাড়ুগোপাল আর ওর মায়ের সঙ্গে যদি ভুবনব্রতবাবুর সপরিবারে দেখা না-হত, তাহলেও ওরা কোথায় এতদিনে ভেসে গেছে, কে জানে। আজকের বাচ্চাদের দেখে নাড়ুর পঁচিশ বছর আগের নিজেকে নিয়ে কোনও আবেগ উত্থিত হয় না, কিন্তু তাদের বাবারা, যারা আজ ওর কাছাকাছি বয়সী, তারা নাড়ুর মনে একটা আশ্চর্য সতৃষ্ণতার উদ্রেক করে। আকন্দপুরেই যদি থাকত, আকন্দপুরেই বড়ো হত, তাহলে আজ ও-ও এদেরই মতো চাষ-আবাদ করত, দিন-শেষে বাড়ি আসত, হুঁকো হাতে দাওয়ায় বসে বিশ্রাম করত… অবশ্য এখন গ্রামে আর কাউকে বিশেষ হুঁকো খেতে দেখা যায় না। লোকে প্রধানত সিগারেট খায়, কেউ কেউ বিড়ি। তবে, নাড়ুগোপাল নিশ্চয়ই খেত। হুঁকোর তামাক কি পাওয়া যায় আজকাল? কোথায়? জগদ্ধাত্রীপুরের বড়ো বাজারে? একবার গিয়ে খোঁজ নিলে হয়!
কিন্তু হুঁকো কেনার সুযোগ হল না পরাগব্রতর।
সেদিন শনিবার ছিল, স্কুলের ছাত্র ছাত্রী কম। কয়েকজন কলেজ-ছাত্রী সকালেই এসে ঘুরে গেছে। অভ্যাসমতো নাড়ুগোপাল দরজায় পিঁড়ি পেতে বসে ছিল। নজর ছিল রোজকার মতোই রাস্তার দিকে। দরজায় এসে একটা লজ্ঝড়ে মোটরবাইক দাঁড়াল। বাইকে একটা বছর আট-নয়ের বাচ্চা মেয়েকে নিয়ে তার… বাবা, না কাকা? এতদিন গ্রামে কাটিয়েও গ্রামের লোকের বয়স বোঝে না নাড়ুগোপাল। মেয়েকে দেখে আন্দাজ করল, এ-ই যদি মেয়ের বাবা হয়, তবে ওরই সমবয়সী হবে, বা বড়োজোর একটু বড়ো।
মেয়েটার কাগজগুলো নিতে নিতে অভ্যাসমতো নাড়ুগোপাল কথা বলতে শুরু করল। গ্রামের লোককে ব্যক্তিগত প্রশ্ন করলে তারা বিরক্ত হয় না, বরং খুশি হয়েই গল্প করে। সেই সঙ্গে অবশ্য নানা কথা জানতেও চায়… এতদিনে নাড়ুগোপালেরও সে গল্প বলতে আর অসুবিধে হয় না। বহুদিন ধরে বলতে বলতে টুকরো টুকরো করে একটা সম্পূর্ণ অতীত তৈরি করে ফেলেছে নাড়ু।
“কী নাম তোমার?”
মেয়েটা প্রশ্নের উত্তরে এক ঝলক সঙ্গের লোকটার দিকে তাকিয়ে বলল, “কুমারী লক্ষ্মীরানি চক্রবর্তী।”
নাড়ুগোপাল প্রথম কাগজটা জেরক্স মেশিনে ঢোকাতে ঢোকাতে বলল, “কোন ইশকুলে পড়ো তুমি? আগে তো দেখিনি …”
মেয়েটা বলল, “আমি তো এখানে থাকি না। আমি আকন্দপুর বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে পড়ি।”
“ও বাবা! তুমি উচ্চবিদ্যালয়ে পড়ো! তুমি তো এইটুকুনি!”
এই ঠাট্টাটা নাড়ুগোপাল প্রায়ই করে এখানে বাচ্চাদের সঙ্গে। বাচ্চারাও খুব উপভোগ করে জেরক্সকাকুর এরকম বোকামো।
লক্ষ্মীমণিও হি-হি করে হেসে গড়িয়ে পড়ল। কিন্তু তারপর কী বলল, সেটা খেয়াল করল না নাড়ুগোপাল। ওর হঠাৎ মনে হচ্ছে, এই মেয়েটার পদবি চক্রবর্তী। বাড়ি সম্ভবত আকন্দপুরেই। নাড়ুগোপালের আত্মীয়? ওর বাবা দাঁড়িয়ে আছে পেছনে। গ্রাম্য লোকটা কি বাইরে সাইনবোর্ডটা খেয়াল করে দেখেছে? দেখেছে, যে দোকানের নামের সঙ্গে নাড়ুগোপালের নামও লেখা আছে? নাম জিজ্ঞেস করবে? যদি মিল থাকে? হরিগোপাল, বা চূনিগোপাল যদি হয়? যদি ওর আত্মীয় বা যদি জ্ঞাতি হয়? নামটা জিজ্ঞেস করবে? না, থাক। যদি লোকটা খেয়াল না করে থাকে, কিন্তু যদি বললে পরে খেয়াল হয়? — আপনি… তুমি… নাড়ুগোপাল … মানে আমাদের ন্যাড়া? আমি তোমার …তুতো দাদা…
নাম জিজ্ঞেস করা বিপজ্জনক।
“আপনারা আকন্দপুরে থাকেন?”
“আজ্ঞে হ্যাঁ।”
“আমি আগে ভেবেছিলাম আকন্দপুরেই দোকান করব কি না, তবে এটা তো বড়ো গঞ্জ। দোকান এখানে চলবে ভালো…”
লোকটা বলল, “আমোদপুরই আগে ছোটো গাঁ ছিল। আকন্দপুর ছিল বর্ধিষ্ণু। ওখানেই থাকত সব বড়ো ব্যবসায়ী, জমিদার… বামুনপাড়া, কায়েতপাড়া ওখানেই। আমোদপুর ছোটো জাতের বাসা ছিল। আর মুসলমান। পরে এখানেই ব্যবসাপাতি বাড়ে। মুসলমানদের ব্যবসাবুদ্ধি বেশি। আমরা কেবল চাষবাসই জানতাম… এসব জমি…” চারপাশে হাত দিয়ে বলল লোকটা, “সব আমাদেরই ছিল। কিন্তু সরকার বর্গা করল, সব চলে গেল আমাদের। এখন না আছে জমিজমা, না আছে ব্যবসাপাতি…”
এ সব নাড়ুগোপাল জানে। এ-ও জানে, যে আকন্দপুরে নাড়ুগোপাল চক্রবর্তীর-ও জমি আছে। ছিল। জমি জিরেতের যেখানে অভাব, সেখানে কি ও জমি পড়ে আছে? যে সেখানে চাষ করছে, সে কি এক কথায় নাড়ুগোপালের দাবি মেনে নেবে?
~দশ~
লক্ষ্মণ আগে বাড়ি যেত না বেশি। সিংজীর বাড়িতেই পড়ে থাকত দিনরাত। হয়ত দু-তিন সপ্তাহে একবার বা, মাস পেরোলে মায়ের কাছে যেত। ওর পাতানো মায়ের বাড়ি কোথায় কাউকে ও বলেনি, কেউ জানতেও চায়নি। সিংজীর বাড়িতেই ওর থাকা-খাওয়া, আর কখনও সখনও, কালেভদ্রে সাঙ্গপাঙ্গদের সঙ্গে নিয়ে মোচ্ছব। বিশেষত সিংজী লক্ষ্মণকে খুশি হয়ে বকশিস দিলে। সিংজীর জন্য লক্ষ্মণ যতরকম কাজ করে তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি বকশিস যে ধরনের কাজে পাওয়া যায়, ওর দলের সবাই জানে তেমন একটা কাজ কিছুদিন আগেই লক্ষ্মণ নিশ্চয়ই করেছে। নইলে মুখার্জিবাড়িতে পাহারার কাজটা ওদের আর করতে হয় না কেন? অন্যরা এ কথা নিয়ে ভাবে? নাথু জানে না। কিন্তু নাথু ভাবে।
আজ অবধি এরকম কাজ করে যখনই লক্ষ্মণ টাকাকড়ি পেয়েছে, প্রতিবারই ওদের খাইয়েছে। এবারে কী হল? নাথুর উদ্যোগে দু-চারবার নিজেদের মধ্যেই আলোচনা করেছে ওরা। লক্ষ্মণকে জিজ্ঞেস করার সাহস কারওরই নেই।
ওদিকে বস্তির গলির বাড়ির দোতলায় বন্দী মিনি ক্রমশ নতুন জীবনে অভ্যস্ত হয়ে উঠছে। ঘর, সিঁড়ি, আর নিচের ঘরের সামনের ছোট্ট উঠোনের শেষে ঘুপচি স্নানঘর। এ-ই ওর চলাফেরার পরিধি। লক্ষ্মণ ওকে বলে রেখেছে, এইটুকুর মধ্যে সীমিত থাকলে ওর বিপদ নেই, কিন্তু এর বাইরে বেরোনো সমীচীন নয়। লক্ষ্মণের বন্ধুবান্ধব বিশেষ নেই, কিন্তু যারা আছে তারা হঠাৎ এসে পড়ে মিনিকে দেখে ফেললে সমূহ বিপদ। সিংজীর কাছে খবর পৌঁছলে লক্ষ্মণ বা মিনি, দু-জনের কারওরই আর রক্ষা থাকবে না।
ফলে মিনিকে ভোরের আগে বা গভীর রাতের অন্ধকারেই ঘরের বাইরের সব কাজ শেষ করতে হয়। এবং তার জন্যেও অপেক্ষা করতে হয় কতক্ষণে নিচ থেকে লক্ষ্মণের মা বুড়ি তুলসী এসে দরজার হুড়কো খুলে দেবে। লক্ষ্মণ থাকলে সমস্যা নেই, দরজা বন্ধ থাকে ভেতর থেকেই, কিন্তু লক্ষ্মণ বেরোলে দরজা বাইরে থেকে বন্ধ করে যায়।
সারাদিন করার কিছু থাকে না মিনির। লক্ষ্মণের ঘরে টিভি নেই, বই বা খবরের কাগজের বালাই নেই, এক টুকরো লেখার কাগজ বা কলম নেই। মিনির অবশ্য বই বা কাগজ পড়ার অভ্যেস নেই। লেখারও নেই কিছু। ও মানুষের সান্নিধ্য ভালোবাসে। যে ক-দিন মুখার্জিবাড়িতে একা কাটাতে হয়েছে, সে ক-দিন ওর সঙ্গী ছিল মোবাইল। কপর্দকহীন অবস্থায় গৃহত্যাগ করেছিল মিনি। বেশ কিছু টাকা ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে ছিল। ওর নিজের রোজগার। ছোটোবেলা থেকে যত মডেলিং, ছোটোখাটো রোলে যত শিশু-অভিনেতার অ্যাপিয়ারেন্স মানি — সব বাবা-মা জমা করে রাখত। সমস্যা ছিল, অ্যাকাউন্টটা ছিল মা-র নামে, ও মাইনর ছিল বলে। যতদিনে ওর আঠেরো বছর বয়েস হয়েছে ততদিনে মা-বাবার সঙ্গে বিবাদ এমনই চরমে উঠেছে, যে ওই অ্যাকাউন্টে মিনির নাম যোগ করা যায়নি। তবে মিনি আঠেরো হতেই ব্যাঙ্কে গিয়ে নিজের অ্যাকাউন্ট খুলেছিল। সিংজীর আশ্রয়ে আসার আগের কয়েক মাসের সমস্ত রোজগারটা জমা ছিল সেখানে। ব্যাস। সিংজীর পাঁচতারা হোটেলের ব্যক্তিগত স্যুইট, আর তারপর দীপব্রত মুখার্জির বাড়িতে ওর কোনও রোজগারই হয়নি। ওই ক-বছর মিনির খরচার সব ভার সিংজীর আর দীপব্রত মুখার্জির হওয়া সত্ত্বেও মাঝে মাঝে মিনি নিজস্ব খরচা কিছু নিজের অ্যাকাউন্ট থেকে করত। ব্যক্তিগত কিছু মেয়েলি খরচার জন্য সিংজী ওর হাতে টাকা দিতেন, দীপব্রত ওর জি.পে-তে টাকা ভরে দিত। লক্ষ্মণের কাছে ও চায়ওনি, আর স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে লক্ষ্মণ কিছু দেয়-ও না। প্রথম মাসে বিগ বাস্কেট থেকে স্যানিটারি ন্যাপকিন অর্ডার করেছিল। তারপর দোতলার জানলা থেকে দেখেছিল তুলসীবুড়ি একটা হতভম্ব ডেলিভারি বয়কে দূর দূর করে তাড়িয়ে দিচ্ছে। গনগন করতে করতে উঠে এসেছিল মিনির ঘরে। রণং দেহি মূর্তি। বারণ করা সত্ত্বেও কেন মিনি বাইরের লোকের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে? জানে না, লক্ষ্মণ জানতে পারলে কী কাণ্ড করবে? মিনি কাঁচুমাচু মুখে স্যানিটারি ন্যাপকিনের কথাটা বলাতে তুলসী আর কিছু বলেনি, চুপচাপ নিচে চলে গেছিল। কিছুক্ষণ পরে আবার ওপরে উঠে এসেছিল হাতে একমুঠো ন্যাকড়া নিয়ে। বিছানার ওপর ছুঁড়ে দিয়ে বলেছিল, “ও রহা। ইসিসে কাম চালানা।” ঘর থেকে বেরোবার আগে ঘুরে দাঁড়িয়ে বলেছিল, “ধো-কে, সুখাকে ফির উসিকো ইস্তেমাল করনা।”
হতভম্ব মিনির মুখ দিয়ে একটা কথাও বেরোয়নি। ন্যাকড়া! বাড়িতে ওর মা কাজের লোককেও কোনও দিন ন্যাকড়া ব্যবহার করতে দেননি। বকাবকি করেছেন, “ভয়ানক অসুখ হবে। খবরদার কক্ষনও এসব করবে না… আমার কাছে চাইবে…” এই সব।
তবে এসব কথা মিনি প্রাণ গেলেও লক্ষ্মণকে তো বলতে পারবে না। পারবে না বোঝাতে তুলসীকেও। ফলে সেদিন থেকে মনে একটা আবছা ভাবনা ক্রমশ দানা বাঁধতে আরম্ভ করল। এখান থেকে বেরোতে হবে।
কেন এতদিনে কথাটা মনে হল মিনির? নিজেই অবাক হয়ে ভাবে। ক্রমে বুঝতে পারে, যে স্বাধীনতা নিয়ে বাড়িতে যতই বড়ো বড়ো কথা বলে থাকুক, আসলে ও কোনওদিন কারও ছত্রছায়া ছাড়া থাকেনি। প্রথমে বাবা, তারপরে সিংজী, তারপরে দীপব্রত, এবং সবশেষে দীপব্রতর বাড়িতে সিংজীর তত্ত্বাবধানে — সবসময়ই কোনও না কোনও পুরুষ ওর দায়িত্ব নিয়েছে। আজ নিচ্ছে লক্ষ্মণ। সুখ-শান্তি আর ভবিষ্যতের আশায় প্রথম দিকে অন্যের হাতে নিজেকে সঁপেছিল মিনি। লক্ষ্মণের কাছে এসে এতদিন একটা হতাশা ছিল মনে। ভাবছিল এই ফাঁদ থেকে ওর মুক্তি নেই। কিন্তু তুলসীর কাছ থেকে সেদিন হঠাৎ একগাদা ন্যাকড়া পেয়ে হঠাৎ করে অনুভব করল যে এতদিন ও কী ভুল করেছে। এখানে জীবন কাটানো যাবে না। এটা তো ভাবার বিষয় নয়, এটা স্বাভাবিক চিন্তা হওয়া উচিত ছিল! এতদিন লাগল কেন ভাবতে! মিনি কি গাধা?
আগে কী হত, জানে না মিনি, কিন্তু এসে থেকে দেখেছে সদর দরজাটা সবসময় ভেতর থেকে তালা দেওয়া। বলা বাহুল্য, চাবি থাকে তুলসীর কাছে। তুলসী বেরিয়ে গেলে বাইরে থেকে তালা দিয়ে যায়। অবশ্য তা না হলেও ফারাক পড়ত না। মিনির ঘরের দরজা সারাক্ষণই বাইরে থেকে হুড়কো আঁটা। একমাত্র যদি না লক্ষ্মণ ঘরে থাকে। তখনও ভোরবেলা সিঁড়ি দিয়ে নেমে বাথরুমেই যেতে পারে মিনি, বাইরের দরজা খোলার ক্ষমতা ওর নেই। তার চাবি তুলসির কোমরে গোঁজা। যা-ই হোক, পালানোর প্ল্যান পরে। আগে দরকার গোছানো। সবার আগে টাকাকড়ি। ওর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের টাকা দিয়ে লক্ষ্মণের এই সরলস্য সরল জীবনও কয়েক মাসের বেশি চলবে না। আর বাড়ি যদি ভাড়া করতে হয়… যদি কেন, করতে তো হবেই, তাহলে তো কথা-ই নেই।
টাকা জোগাড়ের রাস্তা ভেবে পায় না। রাগ হয় নিজের ওপর। বুদ্ধিহীনের মতো স্বপ্নের পিছনে ধাওয়া করতে গিয়ে নিজেকে দেহপসারিণী করে ফেলেছে। রাগ হয় তাদের ওপর — সিংজী, সিংজীর বন্ধুবান্ধব, ব্যবসার সাথী, দীপব্রত — যারা ওর শরীরটা নিয়ে ছিঁড়ে খেয়েছে, কিন্তু বেশ্যাবাড়িতে গেলে যে খরচটা করতে হয়, তার তিলার্ধও করেনি। সবচেয়ে বেশি রাগ হয় লক্ষ্মণের ওপর। পারত মিনির স্ট্যান্ডার্ডের একজন রূপোপজীবিনীকে ওর দারোয়ানের রোজগারে কিনতে?
রাগটা ফিরে আসে নিজের ওপরেই। না, মিনি রূপোপজীবিনীও নয়। নিজের রূপ, যৌবন, দেহ ও বিলিয়েছে, বিক্রি করেনি। দোষ ওরই।
ব্যাঙ্কের সামান্য সঞ্চয়টুকু বাঁচিয়ে রাখতে হবে। এই ক-দিনে অল্পই খরচ হয়েছে — মোবাইল ফোন রিচার্জ করতে। মুখার্জিদের বাড়িতে ওর শাড়ি-জামা নিয়ে যে কাণ্ডটা লক্ষ্মণ করেছিল, তারপর মোবাইলটা ওর সামনে আর বের-ই করেনি মিনি। লক্ষ্মণ আসলে সুইচ অফ করে লুকিয়ে রাখে। আর যখন থাকে না, তখন ইউটিউব, ইনস্টাগ্রাম ইত্যাদি থেকে যত রাজ্যের এক্সার্সাইজ ভিডিও ডাউনলোড করে। এর পরে আর বেশি রিচার্জও করবে না মিনি। যতক্ষণ না যথেষ্ট টাকা পায়। শুধু নম্বরটাকে জিইয়ে রাখতে যতটা দরকার ততটাই খরচ করবে।
আগে মিনি অতিমাত্রায় স্বাস্থ্য সচেতন ছিল। খাদ্যাখাদ্য-বিচার, নিয়মিত ব্যায়াম — দুই-ই ছিল অপরিহার্য। তাতে অবশ্য মায়ের অবদানও কম ছিল না। সিংজীর হোটেলের সবচেয়ে ওপরের ফ্লোরের স্যুইটে থাকার সময় প্রথম টসকালো ডায়েট। তবে হোটেলের জিমে নিয়মিত যেত মিনি। রোজ। সম্পূর্ণ নিয়মভঙ্গ শুরু হল দীপব্রত মুখার্জির বাড়ি গিয়ে। খাওয়া দাওয়ার ওপর কনট্রোল তো রইলই না, ব্যায়াম করাও মাথায় উঠল। দীপব্রত, পরাগব্রত দুই ভাই ব্যায়াম বা সুষম আহার কাকে বলে বুঝতই না। মিনির দাবিতে দীপব্রত জিমে ভর্তি করে দিয়েছিল বটে, কিন্তু নিয়ে যেত না নিয়মিত। প্রথম দিকে যখন মিনির প্রেমে হাবুডুবু খেত, তখন তবু সপ্তাহে তিন চার দিন যেতে পারত অনেক সাধ্যসাধনার পর, কিন্তু পরের দিকে বলত, “রাস্তা তো চেনো, চলে যাও…”
যেতে হয়ত পারত মিনি, কিন্তু সিংজীর বারণ ছিল, একা যেন রাস্তায় না বেরোয়। সে আদেশ অমান্য করতে সাহস হয়নি, তাই জিম-ও যাওয়া হয়নি।
তারপর তো লকডাউন আর পরপর দুই ভাইয়ের উধাও হয়ে যাওয়ার পরে রেগেমেগে সিংজী ওর চলাফেরার ওপর রাশ টেনে দিয়েছিলেন। ঘরে বসে বসে মুটিয়ে গেছিল মিনি।
একমাসেরও কম সময়ে তুলসীবুড়ির রান্না ভাত, ডাল আর একটা তরকারি খেয়ে মিনি উপলব্ধি করল শরীরটা যেন আগের চেয়ে বেশি ঝরঝরে। তাই, সারা দিন একা ঘরে মিনি আবার ব্যায়াম শুরু করল। প্রথমে সহজ ব্যায়াম, অনভ্যস্ত শরীরটা আবার সচল করতে। তারপর আর একটু কঠিন। এমন করে ক্রমে ক্রমে দিনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা একা ঘরে ব্যায়াম করে, নয় বিশ্রাম করে কাটায়। ওজন নেওয়ার উপায় নেই, ঘরে আয়নাও একটাই, এবং সেটা দিয়ে লক্ষ্মণের দাড়ি কামানো, চুল আঁচড়ানোর বেশি কিছু করা যায় না, তবু মিনি বোঝে, শরীরটা আস্তে আস্তে আবার মজবুত হচ্ছে। সেই সঙ্গে চেষ্টা আরম্ভ করল লক্ষ্মণের বিশ্বাস অর্জন করতে — যাতে দরজাটা বন্ধ করে না চলে যায়। এখনও পর্যন্ত কাজ হয়নি। তবে লক্ষ্মণ কি আজকাল ওর সঙ্গে কথা বলছে বেশি? অন্তত যখনই আসে পরাগব্রত সম্বন্ধে কিছু বলে যায়। কী হয়েছে, তদন্তে কতদূর কী জানা গেল... এসব কি লক্ষ্মণ ওকে গল্প করে বলে, না কি ও-ও চেষ্টা করছে মিনি কতদূর কী জানে তার হদিস পাবার? বোঝে না মিনি।
~এগারো~
সিংজীর দুশ্চিন্তা বেড়ে এখন রাগে পরিণত হয়েছে। কিছু ঘটলেই ভিসুভিয়াসের মতো ফেটে পড়েন যেন সব দোষ সামনে বসা বা দাঁড়ানো লোকটার। যেন তারাই সিংজীর সঙ্গে দীপব্রতর পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল। যেন তারাই দীপব্রতকে হীরে পাচারের ব্যবসায়ে ঢুকিয়েছিল! বস্তুত ব্যাপারটা ছিল ঠিক তার উলটো। সিংজীর পরিচয় হয়েছিল দীপব্রতর সঙ্গে। কোন ক্লাবে, না কোথায়। সিংজীই নিয়ে এসেছিলেন ওকে। বলেছিলেন ওকেও হিস্সেদার করবেন। সকলেই আপত্তি করেছিল। চেনা নেই, শোনা নেই… না জান, না পহেচান! সবচেয়ে বেশি আপত্তি করেছিলেন রবিবাবু। বলেছিলেন, “উসকা বাপ-কা সাথ মেরা অদ্রক ঔর ওই-কী-বলে কাঁচকলাকা সম্পর্ক থা।” কে যেন বলেছিল, “যথেষ্ট চেনেন? পুলিশের চর নয়ত?” তখন সিংজী বলেছিলেন, “পুলিশ নেহি, খানদান ভি ঠিক হ্যায়। সুনা নেহি, রবিবাবু কেয়া বোলা? ইসকে বাপকে সাথ দুষমনি থা। মতলব কেয়া? মতলব এক হি বেরাদরি কা হ্যায় হম…”
সকলে কেবল মুখচাওয়াচাওয়ি করেছিল। কারও দুঃসাহস নেই সিংজীর মুখের ওপর আপত্তি করে, কিন্তু রবিবাবু ঘাবড়ানোর পাত্র নন। ভুবনব্রতর ছেলের সঙ্গে উনি কাজ করতে পারবেন না সাফ বলে দিয়েছিলেন।
সিংজী বরাভয়ের ভঙ্গিতে বলেছিলেন, “ফিকর মত্ করো।” বলেছিলেন দুজনের মুখোমুখি দেখা না হয় যাতে সেটা উনি দেখবেন।
আজ সেই রবিবাবুকেই সারাক্ষণ ঝাঁঝিয়ে ওঠেন। এখন তাঁর দোষ, সেই কবেকার কাজের মেয়ে মানদাকে খুঁজে না-পাওয়া। রোজই জিজ্ঞেস করেন, রোজই রবিবাবু মাথা নাড়েন, আর রোজই সবাইকে শুনতে হয়, “কোই কাম কে নেহি হো তুমলোগ, বংগালি হোতে হি অ্যায়সে… নিকম্মে...” ইত্যাদি। অন্যরা নিজেদের মধ্যে বলাবলি আরম্ভ করেছে — এভাবে কাজ করা যায় না। তার চেয়ে ছেড়ে চলে যাওয়া ভালো। ছেড়ে চলে যাবার সাহস বা উপায় যদিও কারও নেই, কিন্তু আগুন একটা লাগতে চলেছে, তা বুঝতে পারছেন উকিলবাবু। ওঁর নিজের দিক থেকেও কোনও সুরাহা পাচ্ছেন না। ভুবনব্রতর বাড়িতে সব কাগজ গোছানো শেষ। আবার নতুন করে দেখা গেছে বিষয়-সম্পত্তি, বা টাকাকড়ি সংক্রান্ত কোনও কাগজই নেই পড়ে নেই ওখানে। সত্যজিৎ গিয়েছিল দীপব্রতকে জন্ম দেওয়া গাইনিকলজিস্ট ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলতে। লাভ হয়নি। তিনি এখন অতিবৃদ্ধ। স্মৃতিশক্তি প্রায় লোপ পেয়েছে।
অনেক ভেবে তারাশঙ্কর একটা পথ খুঁজে পেলেন। বা, বলা ভালো, পথটা তাঁর জানা-ই ছিল, এতদিনে, আর কোনও রাস্তা নেই বুঝে সে পথে হাঁটলেন। একদিন কাজ সেরে সন্ধেবেলা কোর্ট থেকে বাড়ি না ফিরে গেলেন বহুবাজার থেকে অনতিদূরে একটা শুঁড়িখানায়। দরজার ওপরে টিমটিমে আলোর নিচে প্রাচীন সাইনবোর্ডটায় বহুকাল আগে কেউ যত্ন করে ‘গোল্ডেন বার্ড বার কাম ফ্যামিলি রেস্টুরেন্ট’ লিখেছিল। বাঁকা হাসলেন তারাশঙ্কর। এখানকার খদ্দেরদের ফ্যামিলি থাকলেও তাদের তারা এখানে নিয়ে আসবে না। আর যে মা-বাবা তাদের ছেলেমেয়ে নিয়ে রেস্তোরাঁয় যায়, তারা জীবন থাকতে গোল্ডেন বার্ডে কেন, এই গলিতেই ঢুকবে না। সন্ধেবেলা এখানে রোজই রবিবাবু মদ খেতে আসেন। বয়সকালে তারাশঙ্করও এসেছেন, তবে সে বহু বছর আগের কথা। তখনকার কর্মচারীরা কেউ থাকলেও তাদের নিশ্চয়ই আর তারাশঙ্কর চিনতে পারবেন না।
গেটের বাইরের ময়লা পাগড়ীওয়ালা দারোয়ান থেকে শুরু করে টেবিলে সার্ভ করা বয় পর্যন্ত সকলেই যখন একগাল হেসে, “আসুন স্যার, অনেক দিন পরে…” বলে আপ্যায়ন জানাল, তারাশঙ্কর খুশি হবেন, না দুঃখ পাবেন বুঝতে পারলেন না।
ধোঁয়ায় ছাওয়া ঘরটার দূরের কোনের টেবিলে পানে মত্ত রবিবাবু। তারাশঙ্করকে আসতে দেখে হাসি মুছে গেল মুখ থেকে। ভুরু কুঁচকে সন্দিহান দৃষ্টিতে চেয়ে রইলেন। সঙ্গীরাও তারাশঙ্করের অপরিচিত নন। তাদের তাকানোর ভঙ্গীও ভালো নয়। তারপর, তারাশঙ্কর তখনও কয়েক পা দূরে, রবিবাবু টেবিল ছেড়ে উঠে এসে পথরোধ করে দাঁড়িয়ে ভুরু তুললেন। ‘কী চাই?’ ধরনের ভুরু তোলা।
“কথা আছে,” মৃদুস্বরে বললেন তারাশঙ্কর।
“সিংজী পাঠিয়েছে?”
সিংজী পাঠাননি এবং বন্ধুত্বপূর্ণ মনোভাব নিয়েই এসেছেন এ কথা প্রমাণ করতে তারাশঙ্করকে অনেকটা সময় ব্যয় এবং দু-পাত্তর পান করতে হল। সেই সঙ্গে বেহেড করে দিতে হল রবিবাবুকে। রাত প্রায় সাড়ে এগারোটার সময় তারাশঙ্কর শুঁড়িখানা থেকে বেরোলেন। বউয়ের মুখ-ঝামটা সইতে হবে, কিন্তু যা জানা গেল, তার তুলনা হয় না।
পরদিন সকালেই ফোন করলেন সত্যজিৎকে। জরুরি তলব। বাইরের ঘরে, মামার চেম্বারে বন্ধ দরজার আড়ালে শলাপরামর্শ হল মামা-ভাগনেয়।
“তার মানে রবিবাবু মানদার খোঁজই করেনি? গ্রাম-বাসা জানা সত্ত্বেও?”
“করবে কী করে?” জানতে চাইলেন তারাশঙ্কর। “রবিবাবুর বাড়িতে মদনমোহনের বিগ্রহ ছিল। একদিন কী কারণে রবিবাবুর গিন্নি মানদাকে ধমকধামক দিয়েছেন, বলেছেন, কাল সকালেই বাড়ি ছেড়ে চলে যাবে, আর মুখ দেখতে চাই না। পরদিন সকালে ঠাকুরঘরে ঢুকে দেখেন মদনমোহন নেই। মানদাও নিরুদ্দেশ।”
পুলিশ গিয়ে দেখেছিল মানদা গ্রামে ওর বাড়িতেই রয়েছে! মজার কথা হল মদনমোহন চুরির কথা শুনে ভয় পাওয়া দূরে থাক, খেপে বোম। পুলিশকে বয়ান দিয়েছিল, রবিবাবু মদের নেশায় চুর হয়ে রাতে মানদার কাছে এসেছিল। মানদার চেঁচামেচিতে সবার ঘুম ভেঙে যায়, গিন্নিমা এসে মানদাকেই বকাবকি করেন। বলেন মানদা নষ্ট মেয়েছেলে। ও-ই নিশ্চয়ই বাবুকে ফুসলেছে... বলে-টলে ওকেই তাড়িয়ে দেন। সে পর্যন্ত ঠিক ছিল। ওরা ছোটোলোক, গরিব, বাবুরা কথায় কথায় ওদেরই দোষ ধরে এ আর নতুন কী? কিন্তু একে তো বাবু তার সতীত্ব নিতে এসেছিল, তার ওপর চুরির দায়? এবার মানদা মুখ খুলবে। কারও কথা শুনবে না। রবিবাবু ওকে রেপ করতে এসেছিল। না-পেরে বউ আর বাড়ির ঠাকুর-চাকরের কাছে মান রাখতে কেবল চাকরি ছাঁটাই করেনি, চুরির দায়ে জেল পাঠানোর ধান্দা করছে!
পুলিশ মানদার বাড়িতে মদনমোহনের বিগ্রহ পেল না, তার ওপর থানায় তখন নতুন ওসি — সবে নারী-নির্যাতনের ট্রেনিং নিয়ে এসেছেন — তিনি এবার রবিবাবুর দিকে নজর ফেরালেন। বিগ্রহ উদ্ধারের আশা জলাঞ্জলি দিয়ে কোনওমতে বহু খেসারতের বিনিময়ে সে যাত্রা রক্ষা পেয়েছিলেন।
“খেয়াল রাখিস, বুড়ি রবিবাবুর আঁচ পেলেই আর মুখ খুলবে না। কিছু একটা বলতে হবে যাতে সন্দেহ না করে…”
মানদার গ্রাম সুন্দরবনের কোথাও। একেবারে ভোরবেলা না বেরোলে দিনের-দিন ফেরা কঠিন। রবিবাবুর কথায় একবার লঞ্চে, তারপর ভটভটিতে, এবং তারপর পাথরপ্রতিমায় রাত কাটিয়ে আবার লঞ্চ যাত্রা।
গুগ্ল্ ম্যাপ খুলে দেখা গেল আজকাল হয়ত পুরো রাস্তাটাই গাড়ি করে যাওয়া যাবে। তবু একটা দিন দেরি করে পরদিন সকালেই বেরোল সত্যজিৎ। সারাদিন দুশ্চিন্তায় কাটল তারাশঙ্করের। তবে সন্ধের মধ্যেই ফিরে এল সত্যজিৎ। বেঁচে আছে মানদা, বয়সও খুব নয়, তবে রোগব্যাধিতে জর্জরিত। জবর গপ্পো ফেঁদেছিল বটে তারাশঙ্করের ভাগনে। একবারের জন্যও রবিবাবুর নাম করতে হয়নি। বলেছিল মুখার্জিদের কথা। মানদার মুখ খুলতে দেরি হয়নি। ভুবনবাবু কতটাই ভালো মানুষ ছিল, মানদাকে কত ভালোই না বাসত, মানদার জন্য কত কী করে দিয়েছিল… এই ঘর, বাড়ি, সবই তো তারই দেওয়া…
সত্যজিৎ জানতে চেয়েছিল, “তাহলে ছাড়লে কেন তাদের কাজ?”
যেমনই মুখ থেকে কথাটা বেরোনো, তেমনই মানদার ফুঁসে ওঠা — “ওই হারামজাদি খানকি মাগী…” কিছুক্ষণ তোড়ে গালাগালি করে মানদার রাগ খানিকটা কমার পর সত্যজিৎ জিজ্ঞেস করেছিল, “কে সেই… ইয়ে... মেয়েলোকটা?” শুনল কবে নাকি ছেলে-বউ নিয়ে ভুবনব্রতবাবু শ্বশুরবাড়ি গেছিলেন কার বিয়েতে। সেই জীবনে প্রথম, আর সেই যাত্রা-ই হয়ে দাঁড়াল অভিশাপ। ফিরেছিলেন আরও একজন মহিলা আর তার বাচ্চা ছেলেকে নিয়ে। তাদের বাবা নাকি ট্রেন থেকে পড়ে হারিয়ে গেছিল। সব মিথ্যা। ওই মাগীর ঠাঁই হওয়া উচিত ছিল নিচতলায়, বাড়ির পেছনে, অন্য ঝি-চাকরদের সঙ্গে, কিন্তু সে তো হলই না, বরং সে হয়ে দাঁড়াল বাড়ির দ্বিতীয় কর্ত্রী। দেখতে না দেখতে বাবুর বিছানাও ঠাকরুনের শয্যা হয়ে দাঁড়াল।
বুঝল সত্যজিৎ। তখন থেকেই মানদার ভালোবাসায় — এবং রোজগারেও টান পড়তে আরম্ভ করে। কিন্তু মানদার কথা শেষ হয়নি…
“আর ওই অপোগণ্ড ছেলেটাকে দত্তক পর্যন্ত নিল। নিজের ছেলের নামের সঙ্গে মিলিয়ে নাম রাখল, পরাগব্রত। মরে যাই, নামের কী ছিরি!”
অবাক হবার ভান করল সত্যজিৎ। “তার মানে ওরা আপন ভাই না? সবাই তো জানে…”
জানুক সবাই। আসল কথা জানে মানদা। মহা ধান্দাবাজ ওই মাগী আর ব্যাটা। সব সুলুক-সন্ধান নিয়ে তবেই এসেছিল। ভালোমানুষ মুখুজ্জেদের সর্বনাশ করতে।
এতটা বলার পরে স্বভাবত সেয়ানা মানদার টনক নড়ল। সত্যজিতের দিকে চেয়ে বলল, “কিন্তু তুমি কে বাবা? তোমায় তো চিনলাম না?”
সত্যজিৎ বলল, “আমি একজন উকিল। তোমার জন্য ভালো খবর এনেছি। কিন্তু আগে বলো, তুমি কি ওদের এখনকার কথা কিছু জানো? ওই মুখার্জিদের?”
জানে না মানদা। বহু বছর শহরমুখো হয়নি সে। সত্যজিৎ ওকে মুখার্জিবাড়ির দুই গিন্নি, আর ভুবনব্রতবাবুর মৃত্যু সংবাদ দিল। তারপর বলল, “দীপব্রতও আর নেই।”
“নেই মানে?” চমকে জিজ্ঞেস করল মানদা। “মরে গেছে? ছোটোবাবু মরে গেছে? কী হয়েছিল?”
সত্যজিৎ সংক্ষেপে আম্ফানের রাতের দুর্ঘটনাটা বর্ণনা করল। মানদার চোখ ছলছল করে এল। কেবল ভুবনব্রত মুখার্জি নয়, ছোটোবাবুকেও পছন্দ করত মানদা। কিন্তু সে কেবল এক লহমাই। পরক্ষণেই রেগে উঠে বলল, “তাহলে? দেখলে? কী বলেছিলাম? আসল মালিককে সরিয়ে দিয়ে এখন উড়ে এসে জুড়ে বসা বজ্জাতটা সব ভোগ করছে।”
“সেও আর নেই।”
“নেই? সে-ও মরেছে নাকি?”
“না। ওকে পাওয়া যাচ্ছে না।”
খ্যাকখ্যাক করে হাসল মানদা। “পাওয়া যাবে না। নিগ্ঘাত পালিয়েছে। দেখো গে, তার গাঁয়ে গিয়ে রাজার হালে বসে আছে।”
“গ্রাম? কোথায় গ্রাম তার?”
মানদা এতক্ষণে খেয়াল করেছে যে সত্যজিতের আসার কারণটা এখনও জানা হয়নি। বলল, “সে আমি কী জানি? তুমি বললে ভালো খবর আছে?”
সত্যজিৎ বলল, “আছে। দীপব্রত অনেক টাকাকড়ি রেখে গেছে তোমার নামে।”
আবার চোখে জল এল মানদার। বলল, “ছোটোবাবুর মনটা ভালো।” তারপর বলল, “এনেছ?”
সত্যজিৎ মাথা নেড়ে বলল, “অত টাকা আনা যাবে না।”
“কত টাকা?” চোখ ছোটো হয়ে এল মানদার।
“সে অনেক হাজার। যেতে হবে শহরে, কাগজে সই করে টাকা পেতে হবে।”
মানদা পড়তে, বা সই করতে জানে না জেনে আপাতত পাঁচ হাজার দিয়ে সত্যজিৎ সাদা কাগজে মানদার টিপসই আর দুটো নাম নিয়ে ফিরেছে।
পরাগব্রতর আসল... না… অতীতজীবনের নাম নাড়ু, বা নাড়ুগোপাল। গ্রামের নাম আকন্দপুর।
ভাগনের কান এঁটো করা হাসির অর্থ মাথায় ঢুকল না তারাশঙ্করের। আকন্দপুর কোথায়? এরকম নামের কটা গ্রাম থাকতে পারে পশ্চিমবঙ্গে?
সত্যজিৎ স্মিত হেসে বলল, “না, মামা, ভুবনব্রত মুখার্জি শ্বশুরবাড়ি থেকে ফিরছিল। শ্বশুরবাড়ি কোথায় তো জানি। সেই ট্রেনেই উঠেছিল নাড়ুগোপাল আর ওর মা। বাবা ছিল কি না জানি না, তবে সেটা সমস্যা নয়। ব্যাপার হল এই, যে এই লাইনের কাছাকাছি কোথাও আকন্দপুর বলে কোনও গ্রাম আছে কি না। আছে। গুগ্ল্ বলছে… এই যে…”
ভাগ্নের ফোনে আকন্দপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের কথা লেখা দেখে তারাশঙ্কর বিহ্বল হয়ে গেলেন। কিছু বলতে পারলেন না। ভাবলেন, কেমন চট করে সত্যজিৎ গ্রামের সমস্যাটা সমাধান করে দিল! কার ভাগনে দেখতে হবে তো! অবশ্য সেটা হলে এ-ও সত্যি যে মানদা পড়তে জানে না বলে সত্যজিৎ নির্ঘাৎ ওকে পাঁচ হাজার টাকা দেয়নি। হাজারখানেক, হাজার দুয়েক দিয়ে কাগজে টিপসই মেরে নিয়েছে। তবে তাতেই বা তারাশঙ্করের কী? টাকা তো গৌরী সেন সিংজী দেবেন।
~বারো~
গ্রামের লোকের সঙ্গে দেখা হওয়ার পর থেকে পরাগব্রত ওরফে নাড়ুগোপাল উৎকণ্ঠিত থাকে। যত দিন যায় তত উৎকণ্ঠা বাড়ে বই কমে না। শেষে আর থাকতে না পেরে একদিন চলে গেল সোজা মহামায়াতলার গঞ্জে। ওখানকার হিরো-হন্ডা শোরুম থেকে একটা ১২৫ সিসি মোটরসাইকেল কিনে এনে একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। বাড়ির পেছন থেকে গ্রামের আঁকাবাঁকা রাস্তা চলে গেছে। খানিকটা গিয়েই রাস্তা এতই সরু যে সাইকেল বা মোটর সাইকেল কিছুই চলবে না। তাছাড়া ওই পথে গেলে সাতটা বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে পৌঁছনো যায়।
রাস্তার ওপারে কাপড়ের দোকানে তারিক হাবিবকে বলল, “দ্যাখলি? কয়েছিলাম কী?”
হাবিব বলল, “জেরক্ করে ভালোই কামাচ্ছে!”
তারিক বলল, “দূর গবেট, তোর চায়ের দোকানীর বুদ্ধি আর বাড়বে না। বলি জেরক্ শুরু করেছে এই ক-মাস হল। এর মধ্যেই একেবারে বাইক কেনার টাকা? তাছাড়া ভুলিস না, এখেনে আসার আগেও কতদিন বাড়িভাড়া দেছে শামিমকে। এসব দেখে কী বোঝলি?”
হাবিব কিছুই বোঝেনি। বলল, “কী বোঝলাম?”
“দূর, তোর সঙ্গে কথা বলা এক ঝকমারি। ব্যাটার অনেক টাকা — বুঝলি না?”
“তাই? তুই কী করে বুঝলি?”
“সে তোর জেনে কাজ নেই। আচ্ছা, এটা বল, যে লোকটা দিনরাত কেবল দোকানে বসে রাস্তা দিয়ে কে এল-গেল নজর করে, কোত্থাও যায় না, সে মোটরসাইকেল কিনল কেন? গড়বড় আছে রে, গড়বড় আছে।”
হাবিব ঠিক বুঝল না। একটা লোক যদি বা বাড়িতে বসেও থাকে, কালেভদ্রে কোথাও যায়, তবু সে বাড়িতে একটা সাইকেল বা মোটরসাইকেল রাখতেই পারে, কিন্তু তারিক পাছে আবার ওকে বোকা-বুদ্ধু বলে, তাই চুপ করে গেল।
তবে তারিকের সন্দেহটাই খেটে গেল। দু-তিন দিন পরে একটা গাড়ি এসে দাঁড়াল হাবিবের চায়ের দোকানের সামনে। সামনে ড্রাইভার, পেছনের সিটে একটাই বাবু। বাবুটা কাচ নামিয়ে মাথা বার করে বললেন, “ও ভাই, আকন্দপুর কি এ-পথেই যাব?”
“আগে বাঁয়ে যেতি হবে…” কথাটা বলতে গিয়ে হাবিবের খেয়াল হল, দোকানের ভেতর থেকে মোড়টা দেখা যাচ্ছে না। সস্প্যান মাজায় বিরতি দিয়ে বেরিয়ে এল। “ও-ও-ই যে, এস্টেট ব্যাঙ্কের এ.টি.এম সাইনবোট — তার পাশেই এ.টি.এম। তার গা দে’ রাস্তা গ্যাছে… না, দূর না, সামনেই… না, রাস্তা ভালো, তবে সরু…”
গাড়িটা চলে গেল। খানিক পরে বন্ধ দরজা খুলে বেরোল নাড়ু। ধুতিটা তুলে নিয়ে মালকোঁচা মেরে রাস্তা পেরিয়ে এসে বসল হাবিবের দোকানের বেঞ্চিতে।
“চা আছে?”
সস্প্যানটা মাজা শেষ করেছে হাবিব। বলল, “এই বসাই।”
নাড়ুগোপাল বলল, “সকালের চা নেই, ফেলাক্সে?”
গ্রামে আসার পর পরাগব্রত অনেক শব্দই ক্রমশ গ্রাম্য উচ্চারণ করতে লেগেছে।
দু-হাতে ছাই, মগে সবে জল নিয়েছে হাবিব, বলল, “ওই তো, সবে বাইনেছি।”
“নিয়ে নিই?” বলে একটা কাগজের কাপে ফ্লাস্ক থেকে নিজেই চা ঢেলে নিল নাড়ুগোপাল। বলল, “কী জানতে চাচ্ছিল গাড়ি থেকে?”
একটু থমকাল হাবিব। বলল, “আকন্দপুরের রাস্তা জানতে চাচ্ছিল।”
“কে?”
আবার থমকাল হাবিব। উঠে দাঁড়িয়ে সস্প্যানটা জায়গামতো রাখতে রাখতে বলল, “চিনিনে। একটা বাবু ছেল। বয়স বেশি না। কইল আকন্দপুর কোন পথে, আমি দেইখ্যে দ্যালাম, চলে গেল। কেন?”
নাড়ুও উঠে দাঁড়িয়ে খাওয়া কাগজের কাপটা ময়লার টিনে ফেলতে ফেলতে গা-ছাড়া ভাবে বলল, “এমনি। গাড়ি করে আকন্দপুরে তো লোক আসে না।”
চায়ের দাম হাবিবের সামনে রেখে নাড়ুগোপাল রাস্তা পেরিয়ে নিজের দোকানে চলে গেল। তারিক নিজের দোকান থেকে বেরিয়ে এসে হাবিবকে জিজ্ঞেস করল, “কেন রে আসছিল?”
হাবিব ঠোঁট ওলটাল। “চা খেল।”
“কিছু বলল জানি?”
“জিজ্ঞেস করল গাড়িতে কে আসছিল, কী জানতে চাইল।”
তারিক বলল, “ক্যানো? কে আসছিল, ক্যানো আসছিল, এসবে তার কী কাজ?”
হাবিব নাড়ুর কাছে শোনা উত্তরটাই বলল। “আকন্দপুরে তো গাড়ি করে বায়রের লোক আসে না।”
তারিক চোখ কপালে তুলে বলল, “আরে ও জানল কী করে গাড়ি কই যাবে?”
হাবিব বলল, “আমি কইলাম।”
হাবিবের বুদ্ধিহীনতায় তারিক চোখ কপালে তুলল, হাবিব-ও কপাল চাপড়ে ভাবল, এতে এত ভাবনার কী আছে?
রাস্তার ওপারে ততক্ষণে নাড়ুগোপাল বাইক নিয়ে রাস্তায় এসে পড়েছে। একজন অপরিচিত কেউ এসে আকন্দপুরের খোঁজ নিচ্ছে, সেটা মোটেই স্বস্তিপ্রদ নয়। কিলোমিটার দুয়েক দূরে রাস্তাটা একটা জায়গায় আড়াআড়ি খোঁড়া হচ্ছে কোনও কারণে। সব গাড়িই সেখানে শম্বুক গতিতে যায়। ওখানে অপেক্ষা করলে ফেরার পথে সহজে দেখতে পাবে গাড়ির আরোহীকে। গামছা এনেছে নাড়ুগোপাল। হেলমেটের নিচে যতটা মুখ দেখা যায়, ততটা গামছায় ঢাকা যাবে সহজেই।
কোভিডের পরে এখনও রাস্তায় গাড়ি চলাচল কম। দূর থেকেই ভাড়া করা সাদা গাড়িটা দেখতে পেল নাড়ু। রাস্তায় ভাঙা জায়গাটা পেরোতে প্রায় থেমেই গেছিল। তাই ভেতরে আরোহীকেও দেখা গেল স্পষ্টই। কমবয়সী ছেলেটা উত্তেজিতভাবে কথা বলছে মোবাইলে। ওর দিকে তাকায়ওনি। চেনে না তাকে নাড়ুগোপাল। কিন্তু তা বলে কি নিশ্চিন্ত থাকা যায়? যায় না। বেশ দুশ্চিন্তা নিয়েই ফিরল। রাস্তার ওপারে হাবিবের দোকানে কেউ নেই। পাশের মদিনা ক্লথ স্টোরে হাবিব আর তারিক বসে। ওর ফেরাটা নজর করছে। ওরা ওকে সারাক্ষণই চোখে চোখে রাখে। ওদের সঙ্গেই নাড়ুগোপালের সবচেয়ে বেশি কথাবার্তা হয়, অথচ নাড়ুগোপাল জানে, এ গ্রামে ওকে যারা পছন্দ করে না, তাদের তালিকার শীর্ষে তারিকের নামই লিখতে হবে। হাবিবকে পরে জিজ্ঞেস করবার কথাও মাথায় এল না, তাই জানতে পারল না, যে আকন্দপুর থেকে বিফলমনোরথ হয়ে ফেরার পথে ওর চকচকে, প্রায়-নতুন সাইনবোর্ডে প্রোপ্রাইটরের নাম দেখে চমকে থেমেছিল সত্যজিৎ। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। হতাশা বদলে গেছিল উল্লাসে। গাড়ি থেকেই সাইনবোর্ডের ছবি তুলে দোকানে গেছিল কাগজ জেরক্স করাবার অছিলায়। দোকান বন্ধ দেখে রাস্তা পেরিয়ে আবার গেছিল হাবিবের দোকানে। চা চেয়েছিল। জানতে চেয়েছিল জেরক্সের দোকানদার কোথায়। হাবিব জানে না। একটু আগেই মোটরসাইকেল নিয়ে বেরিয়ে গেছে — মানে কাছে-ধারে কোথাও নয়। সেই ফাঁকে, কথায় কথায় সত্যজিৎ ওদের কাছে আরও অনেক খবরই পেয়েছে অযাচিতভাবেই। নাড়ুগোপাল চক্কোত্তি কবে ওখানে এসেছে, কবে দোকান দিয়েছে, শামীমের কাছে দোকান ভাড়া করার সময়ে তার এক মাথা ঝাঁকড়া চুল আর গালভরা কোঁকড়া দাড়ি, আর নকডাউন উঠে যাবার পর ওদের অবাক করে দাড়ি কামানো, চাঁছা-মাথা প্রায় নতুন লোকের আবির্ভাব… সব শুনেই উত্তেজিত সত্যজিৎ ওর মামার সঙ্গে কথা বলতে বলতেই ফিরছিল, এ.সি গাড়িতে কাচ-তোলা না থাকলে নাড়ুগোপাল শুনতেও পেত ওর কথা।
মামা তারাশঙ্করও সব শুনে উত্তেজিত। বললেন, “তুই এখনই চলে আয়। ওখানে জিজ্ঞাসাবাদ করেছিস... শয়তানটা যদি সন্দেহ করে, আবার গা-ঢাকা দেবে।”
শহরে ফিরতে বেশ রাত হয়েছে সত্যজিতের। তারাশঙ্কর জেগে বসে রয়েছেন। দুজনে আলোচনা করে স্থির করলেন যে এখনই সিংজীর কাছে খবর নিয়ে যাবে না ওরা। আর একটু শিওর হওয়া দরকার। নাড়ুগোপাল চক্রবর্তীর ছবিও যদি একটা থাকত…
মামা বললেন, “এই, খবরদার! ছবিটবি তুলতে যাসনি আবার!”
মাথা নাড়ল ভাগ্নে। উকিল মামা কি কোনওভাবে নাড়ুর জেরক্সের দোকানের ট্রেড লাইসেন্স কোত্থেকে বেরিয়েছে খবর যোগাড় করতে পারবে না?
পারবে। পরদিন সকাল থেকে নানা ফোন করে তারাশঙ্কর শেষ পর্যন্ত একজনকে পেলেন যে একদিনের মধ্যেই খবর নিয়ে আমোদপুর গ্রামের জেরক্স দোকানের মালিক নাড়ুগোপাল চক্রবর্তীর সব রকম অ্যাপ্লিকেশন, লাইসেন্স, ইত্যাদি কাগজপত্রের হদিস পাবেন। সত্যজিৎ বলল, “বেশি কিছু দরকার নেই। অ্যাপ্লিকেশনে নিশ্চয়ই আধার কার্ড রয়েছে। ওটার কপি পেলেই চলবে।”
~তেরো~
শহরের বিশাল বারোতলা মার্কেট বিল্ডিংয়ের পেছনে, পার্কিংয়ের ওপাশে সিংজীর বাড়ির সার্ভেন্ট কোয়ার্টার। একসারি একতলা ঘর, তার একধারে বাথরুম ইত্যাদি। বাড়ি না-গেলে লক্ষ্মণ ওখানেই থাকে। একই সঙ্গে থাকে সিংজীর অন্যান্য কাজের লোকজন, যাদের একদল কাজ করে লক্ষ্মণেরই তত্ত্বাবধানে। আজ বেশ ক-দিন হল মুখুজ্জেবাড়ি থেকে লক্ষ্মণ ওদের ফেরত পাঠানোর পর থেকে আর কোনও কাজ নেই। ওরা শুয়ে, বসে, ঘুমিয়ে, আড্ডা মেরে আর গাঁজা খেয়েই দিন কাটাচ্ছে। সত্যজিৎ আর তারাশঙ্কর উকিল যেদিন শেষ পর্যন্ত নাড়ুগোপালের আধার কার্ডের কপি জোগাড় করে তার শশ্রূগুম্ফহীন, ন্যাড়ামাথা ছবিতে কম্পিউটার গ্রাফিকসের সাহায্যে একমাথা ঝাঁকড়া চুল আর এক মুখ চাপদাড়ি লাগাচ্ছে, সেই সন্ধেয় নাথুলাল বিছানাতেই শুয়ে ছিল। নানা চিন্তায় মাথা ভরপুর। নাথুর মাথা চলে খুব। সেজন্যই ও সিংজীর বিরাগভাজন হয়েছিল। সারাক্ষণ ‘এটা-না-করে-ওটা-করলে-ভালো-হত’ বলা কর্মচারী মালিকরা পছন্দ করেন না। সেটা অবশ্য নাথু মানে না। ওর ধারণা লক্ষ্মণই কোনওভাবে সিংজীকে প্রভাবিত করে ওর জায়গাটা দখল করেছে। তাই সাত বছর তিনমাস আগের সেই সময়টা ওর মাথায় সবসময়ই ঘোরে, যখন লক্ষ্মণ ওকে প্রথম হুকুম দিয়ে সিংজীর নির্দেশিত কাজে পাঠিয়েছিল। আর বসে বসে ভাবে কী করে লক্ষ্মণের আধিপত্য শেষ করা যায়।
মিনিকে লক্ষ্মণ নিকেশ করে দিয়েছে। সন্দেহ নেই নাথুর। সেদিন যেভাবে ওদের পাহারার দায়িত্ব শেষ হয়েছিল হঠাৎ, এবং তার পরে আর যেতে হয়নি — তার অর্থ মিনি আর ও বাড়িতে নেই। কিন্তু সেদিন রাতে লক্ষ্মণ বাড়ি ফেরেনি। পরদিন সকালে যখন ভ্যান গাড়িটা নিয়ে গেট দিয়ে ঢুকেছিল, তখন নাথু গেটের কাছেই। লক্ষ্মণ একাই ছিল।
শুধু, নাথু যদি জানত এমনটা হতে চলেছে তাহলে অন্তত একবার মিনিকে ভোগ করত। নিচের ঘরে বসে বসে সে কথাই ভাবত এতদিন নাথু। কল্পনা করত ওর লোমশ বুকের নিচে মিনির ছোট্ট দেহটা পিষছে। আর…
হঠাৎ ধড়ফড় করে উঠে বসল নাথু। তাই তো! লক্ষ্মণের হাবভাবও তো সেই সেদিন থেকেই একেবারে বদলে গেছে! আর ওদের সঙ্গে সময় কাটায় না, সপ্তাহে দু-তিন দিন ‘মায়ের কাছে যাচ্ছি’ বলে চলে যায়। লক্ষ্মণের পাতানো মায়ের প্রতি এই দুর্বার আকর্ষণ নাথুর হঠাৎ বিকট-রকম অদ্ভুত বলে মনে হতে লাগল।
বিশাল বারোতলা বাড়ির একেবারে ওপরের দু-তলা জুড়ে সিংজীর নিজের বাস। বউ, ছেলে-বউমা, এক ভাই ও তার পরিবার এবং এক স্বামী-পরিত্যক্তা বোন আর এক বিধবা দিদিকে নিয়ে থাকেন তিনি, তার নিচের তলায় রান্নাঘর, খাবার ঘর আর তারও নিচে, ন-তলায় অফিস। দিনের কাজ শেষ হওয়া অবধি লক্ষ্মণকে ওখানেই থাকতে হয়। আজও বসে আছে। সিংজী সাধারণত রাতের খাবার খেতে নামার কিছুক্ষণ আগে ফোন করে বাইরের কর্মচারীদের বিদায় দেন। লক্ষ্মণই সে ফোন ধরে। সিংজীর নির্দেশে লক্ষ্মণের নেতৃত্বে বাকি সবাই চলে যায়, থাকে কেবল রান্নাঘর আর খাবার ঘরের কাজের লোক। ওদের ছুটির সময় নেই। রাতের খাওয়া-বাসন ধুয়ে মুছে সাজিয়ে পরদিন সকালের কাজ অন্ততঃ খানিকটা গুছিয়ে নিয়ে বেরোতে বেরোতে মাঝরাত পেরিয়ে যায়। আবার ফিরে আসতে হয় সূর্য ওঠার আগেই। সারাদিনে পরিবারের আঠেরো জনের এবং জনা পঁচিশেক কাজের লোকের চারবেলার খাবারদাবার ছাড়াও অজস্র বহিরাগতের অজস্র কাপ চা-কফি-শরবত আর নানান তাৎক্ষণিক খাদ্যের যোগান দিতে হয়। যে কোনও মাঝারি মাপের রেস্তোরাঁর গতি এবং দক্ষতাতেই তাদের কাজ করে চলতে হয়।
লক্ষ্মণের অবশ্য এসবের কথা ভাবার সময়ও নেই, মানসিকতাও নয়। আজ খুব ইচ্ছে বাড়ি ফিরে যাবে মিনির কাছে। আজ সিংজীর বিকেলের পরে কোনও কাজই ছিল না। অনায়াসেই পারতেন সন্ধের আগেই লক্ষ্মণদের ছুটি দিতে। কিন্তু কোনও অজ্ঞাত কারণে তা হয়নি।
ন-তলার জানলা দিয়ে আশপাশের বাড়ির ছাদ টপকে লক্ষ্মণের চোখের সামনে দূরের শহুরে গগনরেখার ওপারে সূর্যটা হলদে থেকে কমলা হয়ে শেষে লাল হয়ে নিভে গেল। এমন সময় বন্ধ দরজার বাইরে গোঁ-গোঁ করে লিফট চালু হবার শব্দ কেন? সিংজী লিফট ডেকেছেন? নামবেন? কর্মচারীদের ছুটি না দিয়েই সিংজী নামছেন কেন? নিচ থেকে ওপরে উঠে আসা লিফট ন-তলায় থামে কেন? আপনা থেকেই ভুরু কুঁচকে গেল লক্ষ্মণের। দরজা খুলে ঘরে ঢুকল ওকিলসাব আর ওই টিকটিকি — সত্যজিৎ। লক্ষ্মণ ওর বসার জায়গা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছে। ওদের “বৈঠিয়ে,” বলে লক্ষ্মণ বাইরে গিয়ে দাঁড়াল। লিফটের সামনে। ওকিলসাব এসেছেন সিংজীকে সে খবর দেবার দরকার নেই। সে কাজ সিঁড়ির নিচে দারোয়ান করে দিয়েছে। এখন সিংজী নামলে লক্ষ্মণ ওঁকে সঙ্গে নিয়েই ঘরে ঢুকবে। একটু পরেই আবার গোঁ শব্দে লিফট উঠে গেল আরও ওপরে। লক্ষ্মণ সোজা হয়ে দাঁড়াল। সিংজী এলেন বলে।
ঘরের ভেতরে উত্তেজিত সত্যজিৎ আধার কার্ড থেকে নেওয়া ছবির ব্লো-আপ, আর তাতে ফোটোশপ করে চুলদাড়িগোঁফ লাগানো অবয়ব দুটো পাশাপাশি রেখে বারবার দেখছে। লিফটের শব্দ পেয়ে তারাশঙ্কর চট করে ফাইলের নিচে ছবিগুলো ঢুকিয়ে দিয়ে বললেন, “আগেই ছবি দেখাবি না। আগে মুখে বলবি।”
দেখতে দেখতে দরজা খুলে ঢুকলেন সিংজী, পিছনে লক্ষ্মণ। নির্দিষ্ট চেয়ারে বসে প্রায় গর্জন করে সিংজী বললেন, “কেয়া হুয়া? কেয়া বাত হ্যায়?” সত্যজিৎকে দেখে খুশি হননি উনি। এই সেদিনই এই হতভাগা টিকটিকি কী এক আগড়ম বাগড়ম রিপোর্ট বানিয়ে এনেছিল। সিংজীর ওকে এক পয়সাও দেওয়ার ইচ্ছে ছিল না, কিন্তু কী করা, তারাশঙ্কর ভুজুংভাজুং দিয়ে বাধ্য করেছিল…
তারাশঙ্করের চোখের ইশারায় সত্যজিৎ এক লাইনে সামারি বলল, “পরাগব্রত এখন আমোদপুর বলে একটা ছোটো শহরে একটা জেরক্সের দোকান চালায় ওর আসল নামে — নাড়ুগোপাল চক্রবর্তী।”
সিংজীর চোখদুটো ছোটো হয়ে এল। “কী বললে? তুম সহি জানতে হো?”
সত্যজিৎ একে একে দুটো কাগজ এগিয়ে দিল সিংজীর দিকে। “এটা ওর আধার কার্ডের কপি। আর এটা আধার কার্ডের ছবি — বড়ো করা।”
ছবিটা দেখে সিংজী আপত্তি করে কিছু বলতে গিয়েও চুপসে গেলেন। সত্যজিৎ ওঁর দিকে তৃতীয় ছবি বাড়িয়ে দিয়েছে। আধার কার্ডের ছবির ওপর ফোটোশপ করে কোঁকড়া চুল আর একমুখ দাড়ি। পরাগব্রতকে কখনও কাছ থেকে দেখেননি সিংজী, কিন্তু ক্লোজ আপ ছবি অনেক দেখেছেন। কিছুক্ষণ চুপ করে ছবিটার দিকে চেয়ে রইলেন। এবার সত্যজিৎ শেষ ছবিটা এগিয়ে দিল। পারফেক্ট জেরক্স সেন্টার, প্রপ্রাইটর — নাড়ুগোপাল চক্রবর্তী, আমোদপুর বাসস্টপ। এবার হা-হা করে হেসে উঠলেন সিংজী। “বহুত খুব। বহুত বঢ়িয়া। কেয়াবাত, উমদা,” ইত্যাদি বলে অভিনন্দ জানালেন সত্যজিৎকে। তারপর বললেন, “কাহাঁ হ্যায় ইয়ে জাগাহ? ক্যায়সে জানা হ্যায়?”
ম্যাপ খুলে বুঝিয়ে দিল সত্যজিৎ। মাথা নাড়লেন সিংজী। বললেন, “কাল সোকালেই মিটিং। দশ বাজে। তারপরেই বেরোনো।” লক্ষ্মণের দিকে ফিরে বললেন, “দশ বাজে তক সব রেডি হোনা চাহিয়ে। সব লোগ জানা। কুল মিলাকে দশ আদমি, হ্যায় না? ড্রাইভার লেনা পাণ্ডে ঔর অটল কো। ওহি দো গাড়ি যায়গা। ঔর তুম দশ আদমি — ঔর ইয়ে সত্যজিৎ ভি। দো গাড়ি কাফি। মিটিংকে বাদ বারা বাজে ভি রওয়ানা হো যাওগে, তো আঠ ঘণ্টা মে পহুঁচ যাওগে। ক্যায়সে ভি ভাগনে মত দেনা। ঔর জিন্দা লে আনা।”
ঘাড় কাত করল লক্ষ্মণ। সিংজীর প্ল্যান ওর পছন্দ হয়নি। ওর মন বলছে এখনই রওয়ানা দেওয়া উচিত। এখনই। সারা রাত অপেক্ষা করে পরদিন দুপুর অবধি মিটিং করে চব্বিশ ঘণ্টা পরে অকুস্থলে পৌঁছনোর কোনও মানেই হয় না। কিন্তু এসব কথা লক্ষ্মণ জীবনেও সিংজীকে বলবে না। বরং এখন কত তাড়াতাড়ি উকিল আর ভাগনেকে বিদায় করে বাড়ি যাওয়া যায়, সে দিকে নজর দেওয়া দরকার। আজ যদি মিনির কাছে না পৌঁছতে পারে, তাহলে কাল তো বটেই, হয়ত তার পরের কয়েক দিনও পারবে না। লক্ষ্মণের তলপেট শিরশির করে উঠল।
সিংজী চেয়ার ছেড়ে উঠলেন। ভেতরের ঘরের সিন্দুক থেকে টাকা বের করে এনে একটা বাণ্ডিল সত্যজিতের সামনে ছুঁড়ে দিয়ে বললেন, “আচ্ছা কাম কিয়া। কাল সুবহে দশ বাজে তক আ যানা। তুমহে ভি যানা হ্যায়। লচমন, ইনকো নিচে তক পহুঁচাকে উপর আনা...”
লক্ষ্মণ আর মামা-ভাগ্নে বেরিয়ে গেলে সিংজী ভালো করে নাড়ুগোপালের আধার কার্ডটা কাছে নিয়ে আবার দেখলেন। তারপরে ফোন তুলে কাকে বললেন, “এক অ্যাড্রেস লিখো জ.রা...” আধার কার্ডে নাড়ুগোপালের ঠিকানা রয়েছে শহরতলীর একটা পাড়ায়। বললেন, ওখানে নাড়ুগোপাল চক্রবর্তী সম্বন্ধে ভালো করে খোঁজ নিতে।
তারাশঙ্কর আর সত্যজিৎকে বিদায় দিয়ে লক্ষ্মণ ফিরে এসে দেখল সিংজী সামনে দুটো নোটের বাণ্ডিল নিয়ে বসে। রাহাখরচের জন্য দুটো বাণ্ডিলই লক্ষ্মণের জিম্মায় দিয়ে সিংজী লক্ষ্মণকে বিদায় দিলেন। লক্ষ্মণ আর দেরি করল না। বাণ্ডিল দুটো পকেটে ভরে সিংজীর বাড়ি থেকে বেরিয়ে সোজা রওয়ানা দিল নিজের বাড়ির দিকে — যেখানে ওর ধারণা ওর জন্য অপেক্ষা করে রয়েছে মিনি।
এখন অবশ্য শুধু মিনি নয়, আর একটা উদ্দেশ্যও আছে। পকেটের অতগুলো টাকা কোনও ভাবেই কাল লাগবে না। অন্তত একটা বাণ্ডিল না নিয়ে গেলেও চলবে। তা থেকেও উদ্বৃত্ত থাকবে। সে-ও লক্ষ্মণেরই ভোগে লাগবে। এত বছরের চাকরিতে কম উপরি হয়নি। খানিকটা জমলেই জমি-বাড়ি কিনে তার সদ্ব্যবহার করে। বাড়িতে ওর লুকোনো টাকার বাণ্ডিল আবার অনেকটাই বেড়েছে। সময় আগতপ্রায়। কিছুদিনের মধ্যেই আরও কিছু জমিজমার মালিক হবে লক্ষ্মণ।
মিনির চিন্তায় বিভোর, তা ছাড়া সাবধানে পথ হাঁটার অভ্যেস নেই, তাই জানতে পারল না, কিছু দূর থেকে নাথুলাল-ও ওর ওপর নজর রাখতে রাখতে পেছনে আসছে।
সিংজীর বাড়ি থেকে হাঁটাপথে বাড়িটা খুব দূরে না হলেও লক্ষ্মণ কোনও দিন ওদের নিয়ে যায়নি বলে নাথুলাল এতদিন চিনত না। আজ চিনল। লক্ষ্মণ বাড়িতে ঢুকে ঘরের জানলা খুলে দেবার পরে ভেতরের মহিলাকেও চিনতে পারল।
নাথুলাল সৌখিন লোক। চুলদাড়ি কাটতেও সমগোত্রীয়দের মতো ফুটপাথের নাপিতের কাছে যায় না। যে সেলুনে যায়, সেখানে ও এককালে সিংজীর ছেলেকে হাত ধরে নিয়ে যেত। ওর হাতের মোবাইলও দামী এবং সৌখিন। সে মোবাইলে মিনি আর লক্ষ্মণের অজান্তে যে ছবি উঠল, তাকে চিত্রকলা না বলা গেলেও, দু-জনকেই চেনা যাচ্ছে। সিংজী সে ছবি থেকে কুশীলবকে চিনতে পারবেন, সেই বিশ্বাস নিয়েই ফিরল নাথুলাল।
~চোদ্দো~
আমোদপুরে রাতের খাওয়া শেষ করে নাড়ুগোপাল ওরফে পরাগব্রত বেশ দুশ্চিন্তা নিয়েই শুতে গেল, কিন্তু ঘুম আসে না। ভুল করল? এখনও আমোদপুর ছেড়ে না গিয়ে আরও ভুল করছে? মনস্থির করতে পারছে না, তাই আরও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ছে।
শহরেও রাত গভীর। ঘুম নেই মিনির চোখেও। পাশে লক্ষ্মণ গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। মিনির মনে উত্তেজনা। এতদিনে পরাগব্রতর হদিস পাওয়া গিয়েছে। সিংজীর লোকজন লক্ষ্মণের নেতৃত্বে তাকে নিয়ে আসতে যাবে। তার পরে কী হবে জানা-ই আছে। যে ভবিষ্যৎ লক্ষ্মণের বদান্যতায় মিনি এড়াতে পেরেছে, সেটা এড়ানোর সৌভাগ্য পরাগব্রতর হবে না। পরাগব্রতকে বাঁচানোর জন্য মিনিকেই এগিয়ে যেতে হবে। মিনি যদি পরাগব্রতর প্রাণ বাঁচায়, ও কি মিনিকে সাহায্য করবে না? আবার ফেলে চলে যাবে? নানা চিন্তা করতে করতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছে মিনি জানে না।
অভ্যাসমতো ঘুম ভাঙল অনেক ভোরে। লক্ষ্মণ উঠে খুটখাট করছে। সকালে সিংজীর বাড়ি পৌঁছে অনেক কাজ। দেরি করলে চলবে না। লক্ষ্মণ তৈরি হয়ে বেরোনো অবধি চোখ বন্ধ করে ঘুমের ভান করে অপেক্ষা করে রইল। মিনির কপাল ভালো, লক্ষ্মণের মধ্যে কোনও রোম্যান্টিকতা নেই। জৈবিক তাগিদ মিটে গেলেই শেষ। তারপর ভালোবাসা উথলে ওঠে না।
অন্ধকার থাকতেই বেরিয়ে গেল লক্ষ্মণ, নিয়মমাফিক বাইরে থেকে দরজার হুড়কো টেনে দিয়ে। মিনিট পনেরো অপেক্ষা করে মিনি উঠল। প্রথমেই দু-পায়ের ফাঁকে একটা অস্বস্তি বোধ… তারপর বুঝতে পারা, মাসিকের রক্তপ্রবাহ শুরু হয়েছে। আজই হতে হল? এক লহমা ভয় পেলেও মিনি থমকালো না। দেরি করলে চলবে না। কোনটার পরে কোনটা করবে সেটা আগে থেকেই ঠিক করে রেখেছিল। লক্ষ্মণের দেওয়াল আলমারি থেকে সুটকেসটা বের করে এনে একটা শাড়ি আর ব্লাউজ তাতে ভরে আবার ঢুকিয়ে রাখল আলমারিতে। তারপর রোজ যেমন জানলার পাশের দড়ি ধরে টানে, তেমনই টানল। নিচে তুলসী-বুড়ির ঘরে দড়ির অন্যপ্রান্তে ঘণ্টা বাঁধা, মিনির দরকারে ওভাবেই যোগাযোগ করতে হয়।
গজগজ করতে করতে সিঁড়ি দিয়ে উঠে এল তুলসী। লক্ষ্মণ থাকতেই কেন মিনি সকালের সব কাজ সেরে রাখেনি, কেন বুড়োমানুষকে অনর্থক সিঁড়ি ওঠানামা করাচ্ছে — ইত্যাদি নালিশ করতে করতে কারাগারের দরজা খুলেই থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। অন্য দিনের মতো মিনি নিচে যাবার জন্য তৈরি হয়ে নেই। বিছানায় শুয়ে শুয়ে কাতরাচ্ছে, আর ওয়াক তুলছে।
মিনি জানে তুলসী ওকে পছন্দ করে না। আর সারাক্ষণই ওকে চোখে চোখে রাখে — যাতে কোনও ভাবে ওর নজর এড়িয়ে মিনি সন্তানসম্ভবা না হয়। বুড়ি নাকি আগে দাই ছিল। ফলে এসব অনেক জানে। লক্ষ্মণ বাড়ি থেকে কাজে ফিরে গেলেই বুড়ি ওকে চা বানিয়ে খাওয়ায়। ওকে বলেছে, এই চা রক্ষা করবে। সত্যি মিথ্যে জানে না মিনি, ভাবে, মন্দ কী? ও তো চায় না লক্ষ্মণের সন্তানের মা হতে।
“কেয়া হুয়া?”
কথা বলতে পারছে না, হাত নেড়ে মিনি বোঝাল, বমি হচ্ছে, বা পাচ্ছে। চেষ্টা করেছিল বমি করতেও, কিন্তু সকালে পেট খালি বলে কিছু বেরোয়নি। অনেকটা জল খেয়ে তা-ই বমি করে রেখেছে খাটের পাশে। সেদিকে একবার তাকিয়ে নাক কুঁচকে এগিয়ে আসছে তুলসী, মিনি বলল, “রক্তও বেরোচ্ছে…”
আবার থমকাল তুলসী। ওর সন্দিহান মন বমি শুনে যে সন্দেহ করেছিল, এখন সেটা টলমল করছে। মিনি হাত বাড়িয়ে একটা রক্তমাখা ভিজে কাপড়ের টুকরো বের করে বিছানার পাশে ফেলল। তুলসী এবার ঘুরে খাটের পায়ের দিকে ফেরা মাত্র মিনি চিত হয়ে শুয়ে হাত দিয়ে শাড়ি গোটাতে শুরু করল, যেন ও চাইছে তুলসী ওকে পরীক্ষা করে।
বহুদিনের অভ্যাসের দাস তুলসী মিনির বাঁ হাঁটুতে হাত রেখে মুখটা সবে নামিয়েছে, মিনির ডান পায়ের লাথি এসে সজোরে পড়ল ওর গালে। লাথির চোটে বুড়ির মাথাটা সপাটে ঘুরে গেল, তুলসী ছিটকে পড়ল, মাথাটা ঠুকে গেল দেওয়ালে, আর তারপর একটা চাদরের মতো গুটিয়ে পড়ে গেল মেঝের ওপর।
মরে গেল? মনে মনে হিসেব করেছিল মিনি — কত জোরে মারবে? দুর্বল একজন বৃদ্ধাকে বেশি জোরে মারা উচিত নয়, আবার, তুলসী বুড়ি হলেও খুব শক্তপোক্ত। বহু পরিস্থিতিতে মিনি নজর করেছে, বেশ ভারি জিনিস তোলা, বা হাতুড়ি দিয়ে কয়লা ভাঙা জাতীয় কাজ সহজেই করে ওর বেঁকে ভাঁজ হয়ে যাওয়া শরীর নিয়েই।
কিন্তু মেরে ফেলতে চায়নি মিনি। তাড়াতাড়ি উঠে বুড়ির নাকের নিচে হাত রাখল। বুঝতে পারছে না। দু হাতে পাঁজাকোলা করে তুলে এনে বিছানায় শোয়াল। তখনই তুলসী মুখ খুলে একটা আঁ-আঁ শব্দ করল।
যাক, মরেনি। তবে আর সময় নেই। মিনির হাত কাঁপছে। এতক্ষণ, কিছু করার আগে অবধি, উত্তেজনায় বুঝতে পারেনি, কিন্তু এখন ঘটনার সিরিয়াসনেসটা পুরো উপলব্ধি করছে। সবচেয়ে বেশি ভয় হল হঠাৎ যদি লক্ষ্মণ ফিরে আসে... আজ অবধি কখনও আসেনি, এবং আজ ওর অনেক কাজ, কিন্তু বলা যায় না…
যা হবার হয়েছে, এখন দ্রুত পালানো ছাড়া আর উপায় নেই।
দ্বিতীয় বিপদ তুলসীর জ্ঞান ফেরা। তার আগেই… নার্ভ শক্ত করে একটা বিছানার চাদর ছিঁড়ে ফালি ফালি করে তুলসীর হাত-পা বেঁধে ফেলল। তারপর একইভাবে, সিনেমায় দেখা স্টাইলে মুখে ছেঁড়া কাপড় গুঁজে আর একটা কাপড়ের ফালি দিয়ে বেঁধে ফেলল যাতে জ্ঞান ফিরলেও চেঁচামেচি করতে না পারে। তারপর দেওয়াল-আলমারি খুলে দু-নম্বর তাকের পেছনের দেওয়ালের সঙ্গে লেগে থাকা ক্যালেন্ডারটা সরিয়ে সাবধানে আঙুল বুলিয়ে একটা ইঁট টেনে বের করল। তার পেছনের ফাঁকটাতেই লক্ষ্মণের গোপন অর্থভাণ্ডার। মাঝে মাঝেই রাত্তিরে, মিনি ঘুমিয়ে পড়ার অপেক্ষা করে চোরের মতো উঠে গিয়ে ওখান থেকে ইঁট সরিয়ে টাকা রাখে লক্ষ্মণ। মিনি এ ক-মাসে বেশ কয়েকবার দেখেছে। এর আগে ইঁট সরিয়ে সেখানে কী আছে দেখেও নিয়েছে। মুঠো মুঠো নোট। সবই বেশি টাকার। সুটকেস প্রায় ভরে গেল। এত টাকা! কতটা নেবে? চিন্তাটা মাথায় আসামাত্র তাকে বিদায় দিতে দেরি করল না মিনি। এরা কেউ ওর শুভাকাঙ্ক্ষী নয়। ওকে এতদিনে মেরে না-ফেলার একমাত্র কারণ ওর শরীর। এদের জন্য কষ্ট পাওয়ার, বা দয়াপরবশ হওয়ার কোনও দরকারই নেই।
কিছু নোট শাড়ির আঁচলে বেঁধে নিল। তাৎক্ষণিক খরচাপাতির জন্য বার বার সুটকেস খোলা যাবে না। পাঁচটা সাতান্ন মিনিটে মিনি লক্ষ্মণের বাড়ি থেকে বেরিয়ে একটা অন্য রাস্তা ধরে বড়ো রাস্তার দিকে রওয়ানা দিল। ওর সঙ্গে তুলসীবুড়ির ফোনটাও রয়েছে। লক্ষ্মণের বিছানায় হাত-পা বাঁধা তুলসী তখনও অজ্ঞান। সবার আগে দূরে কোথাও যেতে হবে। কাছে একটা মল রয়েছে। মিনি পা চালাল সেইদিকেই। পালাবার তাগিদ থাকা সত্ত্বেও বারবার ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে দেখতে ভোলেনি, কিন্তু নাথুলাল সাবধান ছিল। ওকে দেখতে পায়নি মিনি।
রাতে লক্ষ্মণ আর ফেরেনি। তবে ভোরে পাণ্ডে গাড়ি বের করতে উঠেছিল বলে নাথুর ঘুম ভেঙে গেছিল। একটু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেছিল এত সকালে কী ব্যাপার? পাণ্ডে অত জানে না। বলেছিল, লক্ষ্মণ তৈরি থাকতে বলেছে। দশটার মধ্যে গাড়ি বেরোবে। কোথায় যাবে লক্ষ্মণ? রাতে তো ফেরেইনি। কৌতূহলে আর ঘুম ধরেনি নাথুর। ঘর ছেড়ে বেরিয়ে দাঁতন করতে লেগেছিল। সূর্য ওঠার আগেই ফিরে এল লক্ষ্মণ। এত সকালে নাথুকে বাইরে দেখে একটু অবাক হয়েই ভুরু তুলল, কিন্তু কিছু না বলে ঢুকে গেল ভেতরে। একটু পরে আবার দরজা দিয়ে উঁকি মেরে বলল, “ইধার আ।” ঘরে ঢুকে নাথু দেখল লক্ষ্মণ বিছানায় বসে। বলল, সকাল দশটায় বাবুদের মিটিং। তারপরই বেরোনো। সবাই যেন হাজির থাকে। এর পরই লক্ষ্মণ আবার শুল। নাথু সকলের নজর এড়িয়ে বেরিয়ে পড়ল। দিনের আলোয় যদি ভালো ছবি পাওয়া যায় মিনির…
এত সকালে কোনও দোকানপাট খোলেনি। তবে মিনি যেখানে যাচ্ছে সেখানে মল বাদ দিয়েও অনেক দোকান আছে, অনেকেই বেশ সকাল সকাল খোলে।
রাস্তার ধারে ট্যাক্সি রয়েছে। ট্যাক্সিওয়ালাদের ডাক অগ্রাহ্য করে মিনি সুটকেস হাতে হনহনিয়ে চলছে। পরনের শাড়িটা উগ্র গোলাপি রঙের। ওর সঙ্গে থাকতে আরম্ভ করার কয়েকদিনের মধ্যেই লক্ষ্মণ ওকে নিজের পছন্দমতো শাড়ি এনে দিয়েছিল। যে শাড়িগুলো মিনি সঙ্গে এনেছিল সেগুলো ছিঁড়ে ছিঁড়ে ন্যাকড়া বানিয়েছিল তুলসী। মিনির পায়ে হাওয়াই চটি। এগুলো ছেড়ে মিনি নিজের পছন্দমতো পোশাক পরতে উদগ্রীব হয়ে রয়েছে, কিন্তু কাপড়ের বা জুতোর দোকান খুলতে এখনও অনেক দেরি। অতক্ষণ অপেক্ষা করা যাবে না। তাহলে লক্ষ্মণদের আগে পরাগের কাছে পৌঁছনো যাবে না।
খেতে হবে। নিজের ফোনে টাকা ভরতে হবে। তা নাহলে ওলা আউটস্টেশন বা উবার ইন্টারসিটি বুক করা যাবে না। তুলসীর সিম কার্ডের ডেটা প্ল্যান কী জানে না মিনি, কিন্তু ইন্টারনেটভিত্তিক কিছুই করতে পারছে না মিনি। ফেসবুক বা ইমেইল তো দেখতে পাচ্ছেই না, ম্যাপটাও কাজ করছে না। সুইচ অফ করে দিল ফোনটা।
মলের উলটোদিকের কফিশপ-টা সকাল সকাল খোলে। আজও একটা কালো টি-শার্ট পরা ছেলে সামনের শাটারটা টেনে তুলছে। তারপর চাবি ঘুরিয়ে কাচের দরজার নিচের আর ওপরের তালা খুলতে না খুলতে মিনি দরজা ঠেলে ঢুকল। ছেলেটা এমন একজন খদ্দের আশা করেনি নিশ্চয়ই। এরকম পোশাক পরা মেয়েরা এ দোকানের সামনে দিয়ে যায়, ঢুকতে সাহস করে না। হাত তুলে কিছু একটা বলতে গেছিল, কিন্তু তার আগেই মিনি ওকে একটা ক্যাফে ল্যাটে আর গতকালকের সবচেয়ে কম বাসী স্যান্ডুইচ দিতে বলে ভেতরের একটা টেবিলে বসল।
চোস্ত ইংরেজিতে কফি, আর পরিষ্কার বাংলায় স্যান্ডউইচের অর্ডার পেয়ে ছেলেটা প্রথমে অবাক হলেও পরে কফি নিয়ে হাসিমুখে এসে বলল, “ওয়েলকাম ম্যাম। অনেক দিন পরে এলেন। আজ শুট আছে?”
সিংজীর কাছে পালিয়ে যাবার আগে এই ক্যাফেতে কয়েকটা শুট করেছে বটে মিনি। ওয়েটার ওকে চিনেছে, কিন্তু মিনি চিনতে পারেনি। তবু, সুযোগটা নিয়ে বলল, “আপনাদের ওয়াইফাই পাসওয়ার্ড বদলে গেছে?”
ছেলেটা কাঁচুমাচু মুখে বলল, “ম্যাম পাসওয়ার্ড তো দেওয়া হয় না…”
মিনি বলল, “ও, কী করি বলুন তো… আমাকে রিচার্জ করতে হবে, একেবারেই ভুলে গেছিলাম… জাস্ট ওইটুকু সময়ের জন্য…”
ছেলেটা দয়াপরবশ হয়ে মিনিকে পাসওয়ার্ডটা বলে দিল। মিনি-ও ফোন রিচার্জ করে প্রথমেই খুঁজে দেখল, আমোদপুর কোথায়। ছ-ঘণ্টার রাস্তা।
একই সঙ্গে ওলা আর উবারের অ্যাপে সার্চ দিল। আছে আউটস্টেশন ক্যাব। আমোদপুর যাবার ভাড়া দশহাজার টাকার বেশি! তা বটে। অতটাই দূর যে। তবে চিন্তা নেই, টাকা আছে। ঘড়ি দেখল মিনি। আটটা কুড়ি। গাড়ি আসতে আধ ঘণ্টা। চট করে বুক করে দিয়ে মিনি গলা তুলে ছেলেটাকে বলল, “স্যান্ডুইচটা খুব ভালো। আর কটা আছে?” আরও অনেক আছে শুনে বলল, “আপনি চারটে করে আমাকে দুটো প্যাক করে দিন।”
ছেলেটা প্যাক করে এনে দিল, মিনি তখন দেওয়ালে রাখা নানা ফেমিনিন অ্যাকসেসরি দেখছে। একটা হ্যান্ডব্যাগ রয়েছে। বেত বা সেরকম কিছু দিয়ে বোনা একটা বাটির ওপর কাপড়ের আস্তরণ, তার মুখে পাজামার মতো বাঁধার দড়ি। মা-র ছিল এমন। বলত বটুয়া।
“এটা কত?”
বটুয়া আর তার মধ্যে রাখার একটা শান্তিনিকেতনী স্টাইলের মানি-পার্স কিনল মিনি। ছেলেটাকে বলল বিলটা তৈরি রাখতে। তারপর, সুটকেস থেকে ট্যাক্সিভাড়া আর কিছু রাহাখরচের টাকা বের করে পার্সে ভরে বটুয়াতে ঢুকিয়ে রাখতে রাখতেই ফোন বাজতে শুরু করল। ক্যাব ড্রাইভার। কোথায় আসতে হবে বলে দিয়ে মিনি বিল মিটিয়ে যা যা কিনেছে সে সব নিয়ে বেরোতে যাবে, ওয়েটার ছেলেটা বলল, “চলে যাচ্ছেন, ম্যাম? শুটিং হবে না?”
শুটিং! এই রে! ভুলেই গেছিল কী কথা হয়েছিল। চট করে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, “হ্যাঁ, কিন্তু এখানে না তো। এখন লোকেশনে যাব।”
একহাতে টাকা ভর্তি সুটকেস, আর এক হাতে পার্স-সহ বটুয়া আর স্যান্ডউইচের ব্যাগ নিয়ে বেরোল মিনি। অদূরে অপেক্ষমান নাথু চট করে একটা ফুটপাথের গাছের আড়ালে লুকিয়ে মোবাইলের ক্যামেরা তাক করল।
এই সকালেই রোদের তেজ খুব। এরকম রোদ্দুরে মিনি কখনও মাথাঢাকা স্কার্ফ আর রোদচশমা ছাড়া বেরোত না। শাড়ির আঁচলটা মাথায় দিল। রাস্তার ওপারে একটা চশমার দোকান আছে, কিন্তু খুলতে অনেক দেরি। একটা ওলা-ক্যাব এসে দাঁড়াল ফুটপাথের ধারে। ড্রাইভার ঝুঁকে পড়ে কাউকে খুঁজছে। এটাই। মিনি এগিয়ে গিয়ে দরজা খুলে জিজ্ঞেস করল, “ববি পাত্র?”
কমবয়সী ছেলেটা একটু অবাক চোখে তাকাল। মিনি বলল, “আমি মৃণালিনী।” কত বছর পরে নামটা বলল? বুকের ভেতরটা মুচড়ে উঠল একটু?
“লাগেজ আছে, ম্…” অভ্যাসমতো ম্যাম বলতে গিয়ে থমকে ড্রাইভার বলল, “দিদি?”
হাতের সুটকেসটা পায়ের কাছে রাখতে রাখতে মিনি বলল, “এই, ব্যাস।” তারপর সিটে বসে দরজা বন্ধ করে বলল, “চলো।”
ফোন ক্যামেরায় ছবি তোলা বন্ধ করে নাথু একবার ভাবল সামনে দাঁড়ানো হলদে ট্যাক্সিটা নিয়ে ধাওয়া করবে কি না। তারপর ঠিক করল, না। এখন ফেরা ভালো।
ক্যাব-টা ইউ-টার্ন নিয়ে বাইপাসের দিকে বেরিয়ে গেল।
~পনেরো~
দশটার মিটিং শুরু হতে হতে প্রায় দশটা চল্লিশ। সবাই এসে না বসা অবধি সিংজী ওপর থেকে নামেন না। আজ দশটা বারো মিনিট থেকে শুরু করে একে একে শেষ পর্যন্ত রবিবাবু পৌঁছনো অবধি সময় নিল প্রায় দশটা আঠাশ, আর তারপর আরও মিনিট দশেক পরে নামলেন সিংজী নিজে।
লক্ষ্মণ সিংজীর পেছনে। গত ঘণ্টা দুয়েকে ওর উত্তেজনা বেড়েছে। অনেক কষ্টে সামলে রাখছে নিজেকে। মালিকদের এই বাবুয়ানি চাল ওর কাছে অসহ্য। কিন্তু কিছু করার নেই।
সৌভাগ্যক্রমে মিটিং শেষ হতে বেশি সময় লাগল না। টিকটিকি সত্যজিৎ তার প্রমাণগুলো সামনে রাখামাত্র সকলেই বলল, আর এক মুহূর্তও দেরি করে কাজ নেই, এখনই রওয়ানা হতে হবে। ফলে বারোটা নয়, এগারোটার কিছু আগেই ওদের দুটো গাড়ি বেরিয়ে পড়ল আমোদপুরের দিকে।
মিনি ততক্ষণে এগিয়ে গেছে অনেকটাই। ড্রাইভার ববি জিজ্ঞেস করেছিল, “দিদি, আপনি সকালে খেয়েছেন, না খাবেন? সামনে দাঁড়াব? কচুরি, ল্যাংচা…”
মিনি খাবে না। বলেছিল, “সঙ্গে স্যান্ডউইচ আছে। তোমার খেতে হলে চট করে সেরে নাও।” তখনও ঘড়িতে দশটা বাজেনি। লক্ষ্মণ বলেছিল বেরোতে বেরোতে ওদের বারোটা হবে। মিনি জানে না, ঘণ্টাখানেক পরেই ওরাও বেরোবে। ওদের ব্রেকফাস্ট খাবার জন্য দাঁড়াতে হবে না।
ববি বলেছিল, “তাহলে এখানে না। সামনে বিরিঞ্চি থানার পাশে একটা ছোটো হোটেলে থামব। ওদের রুটি তরকারিটা ভালো।”
বিরিঞ্চি থানার পাশে কেবল একটা খাবার দোকান নয়, ছোটোখাটো বাজার। মিনি একটা জামাকাপড়ের দোকানে ঢুকল। যা আছে তার সবই গ্রাম্য। মিনি এসব কিছু পরে না।
তা-ও, এই উগ্র গোলাপি শাড়িটা বদলাতে হবে। মিনি একটু কম উগ্র রঙের একটা চুড়িদার কিনে দোকানের ভেতরেই এদিক ওদিক তাকিয়ে বলল, “দাদা, এখানে শাড়িটা বদলানোর কোনও জায়গা আছে?”
দোকানদার একটু অবাক হয়ে বলল, “এখানে তো…” তারপর উঠে এল দোকানের পেছন দিকে। তোরঙ্গ আর কাপড়ের গাঁঠরির পেছনে একটা ছেলে বসে ঢুলছিল, তাকে, “এই আবদুল, বেরো এখান থেকে, দিদি কাপড় বদলাবে…” বলে বের করে দিয়ে বলল, “এখানে যেতে পারেন, কেউ আসবে না।”
চট করে শাড়ি বদলে নীলচে-সাদা সালোয়ার কামিজ পরে বাইরে বেরোল মিনি। ববিও সবে জলখাবার শেষ করে বেরিয়ে এদিক ওদিক দেখছিল। মিনিকে দেখে একগাল হেসে এগিয়ে এসে বলল, “এ-ই মানিয়েছে ভালো, চলুন,…”
আবার গাড়িতে উঠে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে মিনির হঠাৎই টেনশন হল। বলল, “আর কতটা বাকি?”
ড্যাশবোর্ডে ফোন স্ট্যান্ডে রাখা ফোনের দিকে তাকিয়ে ববি বলল, “বিকেল চারটে দশে পৌঁছব বলছে। তবে মাঝে তো খাবার জন্য থামতে হবে?”
মিনি বলল, “আমার একটু তাড়া আছে ববি। আমার সঙ্গে খাবার রয়েছে। স্যান্ডুইচ... চলবে না? “
ববি একটু কিন্তু কিন্তু করছিল, মিনি বলল, “প্লিজ, ভাই… আমি কম্পেনসেট করে দেব…” তখন বলল, “না, ঠিক আছে, স্যান্ডুইচ তো ভালো…”
গাড়ি ছুটে চলল।
~ষোলো~
আকন্দপুরে পরাগব্রত পরবর্তী কার্যপদ্ধতি ঠিক করে ফেলেছে। মিছিমিছি ভয় পাওয়ার মানে হয় না। একজন অচেনা মানুষ এল কি এল না, তাতে আঁতকে উঠে সব কাজ ফেলে পালিয়ে গেলে কোথাও-ই নিশ্চিন্তে থাকতে পারবে না। তার চেয়ে আগে যেমন ছিল — তেমনই তৈরি থাকা… এখন তো মোটরসাইকেলটাও আছে।
সারাদিন ধরে কাজ করার সঙ্গে সঙ্গে রাস্তার দিকেও নজর রাখছিল নাড়ুগোপাল। দোকান খোলা থাকলে সামনের দরজা সারাক্ষণই খোলা থাকে। সেই সঙ্গে আজ থেকে ভেতরের ঘরের পেছনের দরজাও হাট করে খোলা থাকবে। সে দরজার ঠিক বাইরে মোটরসাইকেল, পকেটে মোটরসাইকেলের চাবি — এখন থেকে এটাই দস্তুর হয়ে যাবে।
কাজ শেষ হল বেশ দেরি করে। একরাশ খুচরো টাকাকড়ি জমা হয়েছে। গুনে গেঁথে থলেবন্দী করে নিয়ে মদিনা ক্লথ স্টোর্সে ঢুকল। তারিকের সঙ্গে একটা চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত, খুচরো নোটে বদলে নেওয়া — যদি ওর বিক্রি বাটা হয়ে থাকে।
আজ তারিকের বিক্রি কিছু হয়নি বললেই চলে। দেবার মতো নোট জমেনি। বলল, “বসো, চা খাও। হাবিবরে কই…”
তারিকের গদিতেই না বসেই নাড়ুগোপাল হাবিবকে ডেকে বলল তিন কাপ চা বানিয়ে নিয়ে এসে আড্ডায় যোগ দিতে। তারপর তারিককে বলল, “চলো, বাইরে গিয়ে বসি। সারা দিন তো ঘরে বসে কাজ করলাম…”
তারিক আর হাবিব মুখ চাওয়া চাওয়ি করল, নাড়ুগোপাল পাত্তা দিল না। বন্ধ দোকানের ভেতর থেকে বাইরের রাস্তা দেখা যায় না।
চা খেতে খেতে তারিক আর হাবিব অনর্গল কথা বলে চলেছে। দুজনেই বড়ো বেশি কথা বলে। বিশেষত তারিক। ওদের সঙ্গে বসলে খানিক পরে ওদের বকবকানিতে নিজে থেকেই নাড়ুগোপালের মনটা যেন সুইচ টিপে কেউ বন্ধ করে দেয়। আজও তাই হয়েছিল, তাই হাবিবের প্রথম কথাগুলো শুনতে পায়নি। সম্বিত ফিরতে চমকে জিজ্ঞেস করল, “কী বললে? কে এসেছিল দোকানে?”
“আরে, ওই বাবুটা গো! সেদিন আকন্দপুরের খোঁজ নিলে যে? সে তো ফেরার পথে এসে থামলে — কইলে কাগজের জেরক করবে! তা আমি কইলাম নাড়ু তো খানিক আগে বাইক নিয়ে বেরিয়ে গেল যে গো। বাইক নে গেছে মানে ফিরতে সময় লাগবে তো… কী হল তোমার?”
পথচলতি একজন গাড়িচড়া বাবু কি নাড়ুগোপালের দোকানে থেমে জেরক্স করাতে চাইতে পারে না? অবশ্যই পারে। তবু, আজ অবধি তো কেউ থামেনি? গাড়িচড়া একটা বাবু কি আকন্দপুর যেতে পারে না? তা-ও নিশ্চয়ই পারে, কিন্তু কই, সে-ও তো এই প্রথম? এবং সেটা একই লোক — যে আকন্দপুরে গেল আর তারপর ফেরার পথে নাড়ুগোপালের দোকানেই থামল — হবার সম্ভাবনা কতটা? তীব্র অস্বস্তিটা আবার ভেতরটা আচ্ছন্ন করে ফেলছে। এবং সেই জন্যই সাদা সুইফ্ট্ ডিজায়ার গাড়িটা ধীরে ধীরে এসে ওদের ঠিক সামনে দাঁড়ানো অবধি ওটা দেখতেই পায়নি। গাড়ির পেছনের সিটের জানলা খুলে মেয়েটা যখন, “ভাই, শুনছেন...” বলল, তাকে দেখে নাড়ুগোপালের মাথা থেকে পা অবধি ঠাণ্ডা হয়ে গেল। এক লহমার জন্য মনে হল উঠে দৌড় লাগায়, পরমুহূর্তে বুঝল সেটা ভুল হবে। মিনি ওদের তিনজনের দিকেই তাকিয়েছে। ওকে চিনতে পারলে এতক্ষণ গাড়ির ভেতরে বসে থাকত কি? ওর চোখে চিনতে পারার কোনও আভাসই নেই। হাবিব উঠে গিয়ে দাঁড়িয়েছে গাড়ির জানলার কাছে। কী বলবে মিনি? ও তো নাড়ুগোপালের ইতিবৃত্ত কিছুই জানে না। পরাগব্রত মুখার্জি বললে গাঁয়ের লোক কিছুই বুঝবে না। ফলে…
মিনি নাড়ুগোপাল চক্রবর্তীর জেরক্সের দোকানের কথাই বলছে। হাবিব ঘুরতে শুরু করেছে ওর দিকে। আর বসে থাকা ঠিক নয়। নাড়ুগোপাল উঠে দাঁড়াল। মিনির নজর ওর দিকে ঘুরেছে। চোখে চোখ... মিনির ঠোঁটের নড়া দেখে নাড়ুগোপাল ওর, “ও, মাই গড...” বলাটা বুঝল। তারপর দরজা খুলছে, মিনি নামছে, মিনি ছু্টে এসে পরাগের বুকে আছড়ে পড়ছে — কী বলছে মিনি?
“পরাগ, আমাদের খুব বিপদ, তোমাকে এক্ষুনি যেতে হবে।”
পরাগ! ওর হতভম্ব অবস্থাটা কি তারিক দেখেছে? তারিকের চোখে সংশয়? পরাগব্রতর মনে পড়ল গ্রামে গল্প বলেছে নাড়ুগোপাল একমাত্র সন্তান। তবে এই বুকের ওপর আছড়ে পড়া ওর চেয়ে কম-বয়সী মেয়েটা ওর কে? পরাগ বলে ডাকে কেন ওকে? কী বলবে? এক লহমায় মাথায় যা এল বলে ফেলল নাড়ুগোপাল, “আমার মামাতো বোন…” মিনি-ও বোধহয় বুঝল কিছু একটা। অস্ফুটে বলল, “মৃণালিনী… মৃণালিনী।”
মিনি গাড়ি থেকে একটা সুটকেস আর একটা বটুয়া বের করল। ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করল, “আমরা যদি এখনই ফিরি, আপনি নিয়ে যাবেন?” ড্রাইভার উত্তর দেবার আগেই নাড়ুগোপাল, ওরফে পরাগব্রত বলল, “ট্যাক্সি? ছেড়ে দাও। ধরে রেখো না।” তারপর চট করে তারিক আর হাবিবের দিকে ফিরে বলল, “পরে আসছি।” মিনি দ্বিরুক্তি না করে ভাড়া মিটিয়ে দিয়েছে। ট্যাক্সিটাও ঘুরছে — ফিরে যাবে শহরের দিকে। পরাগ মিনির কনুই ধরে রাস্তা পেরিয়ে নিজের ঘরের দিকে হাঁটতে শুরু করল। মিনি মৃদুস্বরে বলল, “পালাতে হবে। এক্ষুনি বেরোতে হবে। এক্ষুনি। কী করে যাবে?”
পরাগব্রতও নিচুস্বরে বলল, “বাইক আছে, পেছনের রাস্তা ধরে বেরোব। কিন্তু কেন বলবে তো?”
পরাগব্রতর ঘরে ঢুকে মিনি এক নিঃশ্বাসে বলল, “সিংজীর গুণ্ডারা আসছে। লক্ষ্মণ আর ওর দলবল। সঙ্গে ডিটেকটিভ। আমার পেছনেই। হয়ত এখনই এসে পড়বে। সময় নেই।”
পালানোর জন্য সবকিছু তৈরিই থাকে পরাগব্রতর। একটা ফোলিও ব্যাগ। তাতে যাবতীয় কাগজপত্র — নানা পরিচয়পত্র, ব্যাঙ্কের কাগজ। আর, ভেতরের একটা পকেটে একটা প্লাস্টিক জিপ্লক ব্যাগে অ্যালুমিনিয়াম ফয়েলের মধ্যে, কাগজে মোড়া এক চিমটে সাদা ক্রিস্টাল, যার থেকে দু-চারটে গুঁড়ো একজন মানুষের পক্ষে যথেষ্ট। ওর পালকপিতা ভুবনব্রতবাবুর ইহলোকের লীলাখেলা এই চিমটের কয়েকটা গুঁড়োতেই শেষ হয়েছিল। এখন কি মিনির পালা? তবে এখানে না। এখানে কিছু করা বিপজ্জনক কেবল নয়, সময়-ও হয়ত নেই।
বলল, “চলো। একবার চট করে মোড়লের বাড়িটা ঘুরে যাব। ওদের কী বলব, শুনে নাও…”
মোড়ল নাসিবুল্লার বাড়িতে না ঢুকেই দুঃসংবাদটা দিল নাড়ুগোপাল। মৃণালিনী ওর মামাতো বোন। মামা গ্রামে থাকেন। খুবই অসুস্থ। মৃণালিনী শহর থেকে গ্রামে যাবার পথে নাড়ুগোপালকে নিয়ে যেতে এসেছে। ওরা চলল, হয়ত কয়েক দিন ফিরবে না।
নাড়ুগোপাল জানে, কয়েক দিন নয়, কোনও দিনই আর ফেরা হবে না। তবু, যারা খোঁজ করতে আসবে তারা যদি একটা ভুল খবর পায়…
নাড়ুগোপাল যখন আবার বাইকে স্টার্ট দিচ্ছে, তখন মোড়ল জানতে চাইলেন, “মামাবাড়ি কোথায়?”
এক লহমা না থেমেই নাড়ুগোপাল বলল, “চৌড়া। বাঁকুড়া হয়ে যেতে হবে।”
মোড়ল যতক্ষনে, “আরে বাঁকুড়া তো অনেক দূর। মাঝরাত পারোয়ে যাবে! রাতটা থেকে কাল সকালে বারোলে হত না?…” বলে ডেকেছেন, ততক্ষণে নাড়ুগোপাল আর মৃণালিনী অনেকটাই দূরে চলে গেছে।
লক্ষ্মণ আর তার দলবল অবশ্য মাঝরাতের পরেই এসে পৌঁছল। পাঁচটার কাছাকাছি আসার কথা ছিল, কিন্তু পথে একটা জায়গায় প্রথম গাড়িটা বেরিয়ে যাওয়ার পরেই পাণ্ডের গাড়ি আটকাতে পুলিশ হাত তুলেছিল। পাণ্ডে ভেবেছিল স্পিড বাড়িয়ে বেরিয়ে যাবে, কিন্তু তা তো হয়ইনি, বরং পুলিশটা এগিয়ে এসে রাস্তা আটকাতে গিয়ে ধাক্কা খেয়েছিল। তাতে প্রায় ঘণ্টা চার-পাঁচ দেরি হয়েছে ওদের। এবং পাণ্ডে এতটাই ঘাবড়ে গিয়েছিল যে গাড়ির গতি আর বাড়াতেই পারেনি।
রাতের অন্ধকারে আমোদপুর বাসস্টপের আসপাশের দোকানগুলো সব ছায়া-ছায়া। নিঃশব্দে দরজা খুলে নেমে কয়েকজন ছুটে গেল বাড়ির পেছনের দিকে, কয়েকজন দুটো সিঁড়ি বেয়ে উঠল সামনের দাওয়ায়। সকলের দায়িত্ব আগে থেকেই ঠিক করা আছে। কী কী করতে হবে ওদের মুখস্থ। এত রাতে বাড়ির সব দরজাই বন্ধ থাকবে ভেতর থেকে। পেছনের দরজা বাইরে থেকে খুলে ফেলা সাধারণত সহজ হয়। ভেতরের লোক যাতে বুঝতে পেরে সামনের দরজা খুলে না পালায়, সে জন্যই বাইরের দরজায় পাহারা থাকে।
আজ অবশ্য হিসেব গুলিয়ে গেল। বাইরের দরজায় তালা দেখে একজন গাড়িতে ফিরে এসে লক্ষ্মণকে যতক্ষণে রিপোর্ট করছে, “দরোয়াজা বাহার সে তালা লাগা হুয়া হ্যায়…” ততক্ষণে পেছনের দরজার ছিটকিনি উপড়ে চারজন ঢুকে গেছে বাড়ির ভেতর। তাদেরও মিনিট খানেকের বেশি সময় লাগল না বাড়ি খুঁজে দেখতে। বাইরের দরজা ভেতর থেকে খোলা গেল না। ওরা আবার পেছনের দরজা দিয়েই বেরিয়ে এল। গাড়ি থেকে নামেনি লক্ষ্মণ আর সত্যজিৎ। চট করে পালাতে হলে একজনের বিশাল চেহারা, আর অন্যজনের অনভিজ্ঞ চলাফেরা অন্তরায় হতে পারে। বাড়ির ভেতর কেউ নেই শুনে সত্যজিৎ বলল, “ওর মোটরসাইকেল?”
দুজন ছুটল আবার ভেতরে। ফিরতে সময় লাগল না। মোটরসাইকেলও নেই।
এর অর্থ কী? পরাগব্রত কি কোথাও গেছে, না একেবারেই পালিয়েছে? লক্ষ্মণ বলল, “দরোয়াজা বন্ধ্ করো, জলদি নিক্লো। ইঁহা রুকনা নেহি।”
দু-জন ফিরে গেল পেছনের দরজার উপড়ে ফেলা ছিটকিনি লাগিয়ে দরজা ভেজিয়ে আসতে। বাইরে থেকে ভেতরের ছিটকিনি আটকানো যাবে না, কিন্তু কেউ যে ভেঙে ঢুকেছিল তা বোঝা না গেলেই হল। পরাগব্রত পরে ভাববে ও হয়ত ঠিক করে বন্ধ করেনি — ছিটকিনি আলগা ছিল।
গাড়ি দুটো যেমন এসেছিল, তেমনই বেরিয়ে গেল। গ্রামের বাইরে হাইওয়ের ধারে আবার ঝটতি আলোচনা হলো। ফোন গেল সিংজীর কাছে। অনিদ্র সিংজী খুশি হলেন না, কিন্তু মেনে নিলেন যে দুই গাড়ি ভর্তি লোকের পক্ষে আমোদপুরের আসেপাশে হাঁ করে বসে থাকা সম্ভব নয়। সত্যজিৎ দিনের আলোয় ফিরে যাবে। গ্রামের লোকের কাছে জেনে আসবে নাড়ুগোপালরূপী পরাগব্রতর খবর।
~সতেরো~
মিনি ঘুমিয়ে পড়েছে। পরাগব্রতর চোখে ঘুম নেই। মিনির কাছে সব শোনার পর থেকে একটা তীব্র অনিশ্চয়তাবোধ গ্রাস করেছে ওকে। এত সহজে সমস্ত প্রচেষ্টা একেবারে মাটিতে মিশে গেল? ওর অতীত-বর্তমান এত সহজে বের করে ফেলল হীরে স্মাগলাররা? মিনি অবশ্য বলতে পারেনি কী করে পরাগব্রত যে নাড়ুগোপাল ছিল এবং আবার সেই নামই নিয়েছে তা জানা গেছে। ডিটেকটিভ লাগিয়েছিল — এইটুকু জানে মাত্র। আর বলতে পেরেছে দুটো নাম। সিংজী — দলনেতা। আর তার প্রধান গুণ্ডা লক্ষ্মণ। প্রথম জনকে চেনে না, কিন্তু সে কে, জানে পরাগব্রত। লক্ষ্মণকে চেনে না। মিনির কথা সব জানা হয়ে গেছে। নিজের কথা কিছুই বলেনি। ক্লান্ত মিনি ঘুমিয়ে পড়ার আগে একটাই কথা জানতে চেয়েছিল — তুমি ওদের হীরে চুরি করেছ? কত হীরে?
হীরে! অবাক হওয়ার ভান করেছিল পরাগব্রত। হীরের কথা তো ও কিছুই জানে না!
মিনি চোখ ছোটো করে তাকিয়ে ছিল। “হীরে নিয়ে পালাওনি, তো পালিয়েছিলে কেন?” পরাগব্রত বলেছিল, “তোমাকে বোঝাতে পারব না।” এখন বসে বসে ভেবে দেখছে, ও নিজের দিক থেকে দেখেছে বলে এতদিন বুঝতে পারেনি ওর উধাও হয়ে যাওয়াটা হীরে স্মাগলাররা কীভাবে নিয়েছে।
ও তো অনেক আগে থেকেই ঠিক করেছিল ভুবনব্রত আর দীপব্রত মুখার্জিকে মেরে, সমস্ত বিষয় সম্পত্তির দখল নিয়ে বাড়ি ছেড়ে আকন্দপুরে গিয়েই থাকবে। বৃদ্ধ ভুবনব্রতকে মেরে ফেলতে অসুবিধে হয় নি। বুড়ো অসুস্থ এবং মৃত্যুপথযাত্রী — দুই-ই ছিল। কিন্তু দীপব্রতকে মারা অত সহজ হত না। হঠাৎ পাওয়া সুযোগের সদ্ব্যবহার করেছিল পরাগব্রত। প্রবল ঝড়ের রাতে দীপব্রত হীরে, আর হীরে ব্যবসায়ের টাকা সরাচ্ছিল ওর লুকোনো আস্তানা থেকে। একটা গাছ ভেঙে পড়েছিল বাড়িটার ঝুলবারান্দায়। বারান্দার ভাঙা ইঁটপাটকেলের আঘাতে অজ্ঞান দীপব্রতকে সেই ইঁট আর ভেঙে-পড়া গাছের ডাল দিয়েই পিটিয়ে মেরেছিল পরাগব্রত। টাকা আর হীরেও নিয়ে পালাতে হয়েছিল, কারণ সেগুলো পুলিশের হাতে পড়লে পরাগব্রতরও সমস্যা হত। এক ভাই বেআইনী হিরে ব্যবসা করে, আর অন্যজন সে বিষয়ে কিছু জানে না — এ কথা সহজে মেনে নিত না কেউ। কিন্তু সেই জন্যই আজ হীরে স্মাগলাররা ওর পেছনে লেগে আছে। এই মৃত্যুদূতের হাত থেকে উদ্ধার পাওয়া কঠিন হবে।
কী কী উপায় আছে? সন্দেহ নেই যে মিনি সঙ্গে থাকলে বেশি কিছু করা সম্ভব নয়। এই হোটেলটা পেতে যত সময় লাগল, তাতেই বুঝেছে। পর পর সব হোটেলেই বলে কাপ্ল্দের জন্য ঘর নেই। একজন তো বলল, ম্যারেজ সার্টিফিকেট আছে? পরাগব্রত মেকি রাগ দেখিয়ে বলেছিল, মামাতো বোনের সঙ্গে বিয়ের সার্টিফিকেট কার থাকে?
শেষ পর্যন্ত এই হোটেলটায় ঢুকেই ওরা বলেছিল দুটো ঘর চাই। তখন দেখা গেছিল মিনির সঙ্গে আধার কার্ড বা অন্য কোনও পরিচয়পত্র নেই। পরাগব্রত আর মিনির সম্মিলিত প্রচেষ্টায় অতি কষ্টে ঘর দুটো পেয়েছে। কাল সকালের মধ্যে আধার কার্ড জমা করে দেবে কথা দিতে হয়েছে। মিনি জানত না কী করে ফোন নম্বর দিয়ে আধার কার্ড ডাউনলোড করতে হয়। সেটা করতে গিয়ে চট করে একটা স্ক্রিন-শট নিজের ফোনে পাঠিয়ে দিয়েছে পরাগব্রত। মিনির বাবার নাম ঠিকানা নিয়ে কী করবে ও জানে না। তবু, থাক…
বাইরে রাত ঝিম ঝিম। পরাগব্রত ঘর ছেড়ে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল। কী উপায় আছে? কী উপায় থাকতে পারে? মিনি সঙ্গে থাকলে একরকম, না থাকলে অন্য রকম। মিনি-কে এখানেই রেখে সরে পড়বে? ওর কিসের মাথাব্যথা? কৃতজ্ঞতা? মিনি বিপদ মাথায় করে এসেছে ওকে রক্ষা করতে, না নিজের তাগিদেই এসেছে? লক্ষ্মণ বলে কোন গুণ্ডার বন্দিনী শয্যাসঙ্গিনীর দশা থেকে মুক্তি পেয়ে পরাগব্রত ছাড়া আর কোনও রক্ষাকর্তার কথা মাথায় আসেনি। মিনির মতো একটা মেয়ে আর কোনও অনুভূতি বোধ করে বলেও মনে হয় না পরাগব্রতর। সুতরাং ওকে নিয়ে বেশি মাথা না ঘামালেও চলবে। আধার কার্ডে ওর বাবার নাম আর বাড়ির ঠিকানা দেখে পরাগব্রত গুগ্ল্ খুলে সার্চ করেছে। সদর শহরে যেখানে ওর বাড়ি, সেখানে মোটামুটি সচ্ছল লোকেরাই থাকে। সুতরাং মিনির ফিরে যাবার জায়গা একটা আছে...
রাত একটা। বারান্দার দরজা বন্ধ করে পরাগব্রত শুতে গেল।
~আঠেরো~
সিংজীর নির্দেশে সত্যজিৎ সকালে একা-ই ফিরল আমোদপুরে। পরাগব্রতকে জানতে না দিয়ে খবর নেবে ও ফিরে এসেছে কি না। না ফিরে থাকলে জানতে চেষ্টা করবে কোথায় গেছে। লক্ষ্মণরা সদলবলে রাস্তার ধারের একটা ধাবায় খাওয়া দাওয়া করতে বসল, আর ওদিকে বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাবিবের চায়ের দোকানের সামনে গাড়ি থেকে নামল সত্যজিৎ। চা-বিস্কুট খেয়ে জানতে চাইল, “জেরক্সের দোকানটা খোলেনি এখনও?”
হাবিবও তাকাল নাড়ুগোপালের দোকানের দিকে। বলল, “খুলেছেল তো, কিন্তু কাল বৈকেলে ওর বোন এল, মামা না কার শরীলটা খুব খারাপ। এখন তখন।” সেই শুনে নাড়ুগোপাল নাকি বোনের সঙ্গেই চলে গেছে মামাবাড়ি। আর কিছু বলতে পারল না হাবিব। সত্যজিৎ জানতে চাইল কোথাও সকালের খাবার পাওয়া যাবে কি না। হাবিব রাস্তার ওপারে একটা দোকান দেখিয়ে বলল, “দ্যাখেন, ওখানের লুচি তরকারি আপনার পোষায় কি না!”
দোকানটা আগের দিনই দেখেছিল সত্যজিৎ। মিষ্টির দোকান। এখন, সকালে, বেশ কিছু লোকের ভিড়। ওর গাড়ির ড্রাইভার মিশির এর মধ্যেই প্লেট নিয়ে বসে পড়েছে। এ দোকানটা বেশ সরগরম। দোকানীর নির্দেশে ভেতরের দিকে একটা টেবিলে বসে বুঝল এখানেই আগে আসা উচিত ছিল। খদ্দেররা উত্তেজিতভাবে নাড়ুগোপালের বিষয়েই আলোচনা করছিল। সত্যজিতের আগমনে আলোচনায় সামান্য ভাঁটা পড়লেও গ্রামেরই কেউ একজন ব্যাপারটা কিছুই তখনও জানতে পারেনি বলে সবাই মিলে পুরোটাই তাকে বর্ণনা করল।
আধঘণ্টা পরে, খাবারের দাম মিটিয়ে সত্যজিৎ দোকান থেকে বেরিয়ে একটু দূরে হেঁটে গিয়ে ফোন করল সিংজীকে। সিংজীও ওর সঙ্গে একমত। পরাগব্রতর আবার মামা কোথায়? ভুবনব্রতবাবুর শালা পরাগব্রতর কেউ নয়। ওর নিজের মামাবাড়ির সঙ্গে ওর কোনও যোগাযোগ নেই। আমোদপুরে এতদিন থাকা সত্ত্বেও ও আকন্দপুরেই কারও কাছে যদি ওর খবর না থাকে, তাহলে ওর মায়ের বাড়ির আত্মীয়দের সঙ্গেও ওর কোনও যোগাযোগ হয়নি নিশ্চয়ই? তাহলে এই বছর তেইশ চব্বিশের মেয়েটা কে?
সিংজীর এ প্রশ্নের উত্তরে সত্যজিৎ বলল, ও পরাগব্রতর ব্যাপারে যতটা খোঁজ নিয়েছে তা থেকে বলতে পারে যে ওই বয়সী একটাই মেয়ে ওর জীবনে এখন থাকতে পারে — মিনি।
সিংজী সঙ্গে সঙ্গে বললেন, “নেহি। ঔর কোই হোগা।” বাচনভঙ্গীর দৃঢ়তার ফলে ব্যাপারটা নিয়ে আলোচনা করতে পারল না সত্যজিৎ। সিংজী বললেন, “ওয়াপস্ আ যাও। ওহাঁ রুখকে ঔর ফায়দা নেহি হ্যায়। কিসিকো কুছ মত্ বাতানা। কাল সুবহ্ হি ইধার আ যানা। দশ বাজে।”
~উনিশ~
সকালে উঠে পরাগব্রত পাশের ঘরের দরজায় ধাক্কা দেওয়ামাত্র মিনি দরজা খুলে দাঁড়াল। কিছুক্ষণ মিনিকে বোঝাতে চেষ্টা করল এত বেপরোয়া না হতে, নইলে কোনও দিন কোথাও দরজা খুলে দেখবে বাইরে লক্ষ্মণ দাঁড়িয়ে। মিনি বলল, “এইমাত্র ফোন করে বললে আসছ, এখন আর কে আসবে?” উফ্! পরাগব্রত ফোন করলেই বা কী? কিন্তু এখন আগের কাজ আগে।
পরাগব্রত বলল, “শোনো, আপাতত একটাই উপায় আছে। চলতে থাকা। এক জায়গায় বেশিদিন থাকলে চলবে না। আর লোকের সন্দেহ এড়াতে আমরা ভাই বোন পরিচয়েই থাকব। তুমি আমার মামাতো বোন হয়েই থেকো। বিধবা সেজে। থান কিনে আনব। বিধবা হবার সুবিধে এই, যে ঘোমটা দিয়ে থাকতে পারবে, মুখ দেখা যাবে না।”
বিধবা! কিন্তু ভাবার সময় নেই। তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে চেয়ে রয়েছে পরাগব্রত।
“কোথায় যাবে?” ভয়ে ভয়ে, অনিশ্চিতভাবে জিজ্ঞেস করল মিনি।
“তীর্থে।”।
“আমি বিধবা বলে তীর্থে যাব? আর তুমি?”
“আমি তোমার মামাতো দাদা, তোমার বডিগার্ড। তোমার বাবা আমাকে দায়িত্ব দিয়েছেন।”
“আমি তো তোমার মামাতো বোন?” অবাক বিস্ময়ে প্রশ্ন করল মিনি। “তুমিও কী করে আমার মামাতো দাদা হবে? তুমি তাহলে পিসতুতো দাদা।”
তাই? তবে তাই। পরাগব্রতর কোনও দাদা বা ভাই ছিল না দীপব্রত ছাড়া। ভুবনব্রত মুখার্জি পারতপক্ষে কোনও আত্মীয় স্বজনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন না। নাড়ুগোপালের ছিল? মনে নেই ওর। সম্পর্ক কাকে বলে ও জানে না।
দু ভাই-বোন মিলে মামা-মামী, পিসি-পিসেমশাইয়ের নাম-ধাম, পরিচয় ঠিক করে হোটেল থেকে বেরোল। প্রথমে বাস-স্ট্যান্ড। বাইরে বাইক রাখার জায়গায় হাজারো মোটরসাইকেল, স্কুটার, মোপেডের মেলা। পরাগব্রত বাইকটা পার্ক করে বেরিয়ে এল। কার্যত ফেলেই দেওয়া হল, জেরক্স মেশিনের মতো। সামনের খাবার দোকানে দুজনে খাওয়া সেরে রিকশা নিয়ে গেল রেল স্টেশন। তিনটে ট্রেন বদলে খড়গপুর। পরাগব্রত খোঁজ নিয়ে এল। বিকেলে পুরীর শতাব্দী আছে। রাতে সুপার ফাস্ট। বিকেলের ট্রেন রাত দশটায় পৌঁছবে। রাতেরটা সকাল সাতটায়। “সেটাই ধরব। স্টেশন মাস্টারের সঙ্গে কথা বলেছি। কিছু এক্সট্রা দিতে হবে, উনি এসি ফার্স্ট ক্লাসে ব্যবস্থা করে দেবেন। এসি ফার্স্টে দুজনের কুপে আছে। সেখানে তোমার পোশাক বদলাতে সুবিধা হবে।”
“পুরীতে থাকব কোথায়?” ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করেছিল মিনি।
“ভাড়া বাড়ি,” জবাব তৈরি পরাগব্রতর। “তুমি রোজ যাবে জগন্নাথ মন্দিরে। তিন চার মাস পরে আবার অন্য কোথাও…”
সারা জীবন সাদা থান পরে তীর্থে তীর্থে ঘুরতে হবে?
কথাটা মনেই রইল, মুখে আনল না মিনি। হঠাৎ উপলব্ধি করল, পরাগব্রতর সঙ্গে বাকি জীবন কাটানোর সম্ভাবনাটা মনে করতে বেশ ভালোই লাগছে। ভাইবোন সেজে থাকতে হবে তো কেবল জনসমক্ষেই, আড়ালে কী না হতে পারে?
~কুড়ি~
মিনি আর পরাগব্রত যখন খড়গপুর স্টেশন থেকে রওয়ানা হয়েছে, মোটামুটি তখনই লক্ষ্মণ পৌঁছেছে ওর মায়ের বাড়িতে। সারাদিনে বার কয়েক, যতবারই দলবল, সঙ্গী সাথীদের থেকে একটুও আলাদা হতে পেরেছে, তুলসীর ফোনে ফোন করেছিল। প্রতিবারই একই রেকর্ডেড্ মেসেজ বেজেছে — সুইচ্ড্ অফ্। তুলসীর ফোন কখনওই বন্ধ থাকে না। তবে কি চার্জ শেষ হয়ে গেছে? চার্জার খারাপ? মিনির ফোন থাকলে ওকে ফোন করা যেত, কিন্তু মিনির কি ফোন আছে? ভাবার চেষ্টা করেছিল লক্ষ্মণ। মুখার্জিদের বাড়িতে তো ছিল। ওর বাড়িতে আসার পর থেকে তো একবারও মিনির হাতে ফোন দেখেছে বলে মনে হয় না। অবশ্য মিনির ফোন নম্বর জানেও না লক্ষ্মণ।
তুলসী অসুস্থ হয়ে পড়েনি তো? হয়ত সাহায্যও চাইতে পারছে না? মিনির ঘরের দরজা তো বাইরে থেকে বন্ধ। ওর পক্ষে কিছু করা সম্ভব নয়। আচ্ছা, মা যদি মরে গিয়ে থাকে? মিনি ওকে খবরও দিতে পারবে না। আর… নাঃ, জোর করে থামিয়ে রেখেছিল নিজেকে। শহরে পৌঁছে সিংজীকে বিস্তারিত রিপোর্ট দিতে হয়েছে। অদ্ভুত ব্যাপার, সিংজী টিকটিকি সত্যজিতের কাছে রিপোর্ট নিয়েছে আলাদা, আর ওর কাছে আলাদা। কেন?
সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে লক্ষ্মণ বাড়ির দরজায় পৌঁছল। গলি থেকেই মিনির ঘরের জানলা দেখা যায়। অন্ধকার। যতদূর বোঝা যায় নিচের ঘরেও আলো জ্বলছে না। মিনি আর তুলসী দুজনেই ঘুমোচ্ছে। কড়া নাড়তে গিয়ে দরজাটা খুলে গেল গেল। ভেতর থেকে বন্ধ নয় কেন? কেন কেবল ভেজানো! একটা অজানা আশঙ্কায় লক্ষ্মণের বুকের ভেতরটা খালি হয়ে গেল। হাত দিয়ে ঠেলে দরজা খুলে ঢুকল বাড়িতে। উঠোনের ওদিকে তুলসীর ঘরের দরজা হাট করে খোলা। দোতলায় যাবার দরজাটা সবসময় শিকল তুলে বাইরে থেকে বন্ধ করা থাকে, কিন্তু এখন খোলা। লক্ষ্মণ তুলসীর ঘরে ঢুকে বাতি জ্বালাল। ঘর খালি। লক্ষ্মণের বিশাল বপু নিয়ে দ্রুত চলাফেরা সহজ নয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও যে গতিতে তুলসীর ঘর থেকে বেরিয়ে সিঁড়ি দিয়ে উঠে ওপরতলায় নিজের ঘরের দরজা খুলে ঢুকে আলো জ্বালাল, কেউ দেখলে তার তাক লেগে যেত। অস্ফুটে, “মা জী,” বলে প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়ে কোমরে গোঁজা চাকু দিয়ে তুলসীর হাত, পা, মুখের বাঁধন কেটে পরম মমতায় অচৈতন্য দেহটা কোলে করে নিচে নিয়ে এল। নিচের ঘরে বিছানায় শুইয়ে কাপড় ভিজিয়ে প্রথমে জল, তারপর তুলসীর চোখের পাতা অল্প কেঁপে ওঠার পরে ঘরে রাখা দুধ গরম করে ফোঁটা ফোঁটা করে মুখে ঢেলে দিল।
পুরীগামী সুপার ফাস্ট এক্সপ্রেসে মিনি ওর ক্লান্ত দেহটা পরাগব্রতর ওপর থেকে সরিয়ে নিয়ে পাশে শুয়ে জড়িয়ে ধরে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল, “একটা কথা বলবে? সেদিন রাতে, বাড়ি ছেড়ে যাবার আগে আমাকে আদর করে গেছিলে? সত্যি বলবে?”
মাঝরাতে ঘুম ভেঙে খানিকক্ষণ চুপ করে বসে রইলেন সিংজী। তারপর আস্তে আস্তে ফোনটা টেনে নিলেন কাছে। স্ক্রিনে আঙুল বুলিয়ে নামটা বের করলেন। মিনি। বহুদিন এ নম্বরে ফোন করেননি। আরও কিছুক্ষণ কিছুই করলেন না। চুপ করে চেয়ে রইলেন নামটার দিকে। তারপর প্রায় ছোঁ মেরেই তুলে নিয়ে ডায়াল করলেন নম্বরটা।
সাধারণত কাউকে খুন করলে তার মোবাইল ফোন থেকে সিম কার্ড খুলে নিয়ে ভেঙে ফেলে দেওয়াই দস্তুর। লক্ষ্মণ এ-কাজে ভুল করবে বলে মনে হয় না। এবং মিনির ফোন যেহেতু প্রিপেইড, হয়ত মোবাইল কম্পানি এর মধ্যে নতুন কোনও গ্রাহককে নম্বরটা দিয়েও দিয়েছে। না দিলে ফোন বাজবে না, দিলেও কোনও অপরিচিত কণ্ঠস্বর উত্তর দেবে — এমন কেউ, যে মিনির নামও শোনেনি।
চলন্ত পুরী এক্সপ্রেসের ফার্স্ট ক্লাস কামরায় রিনরিনে রিংটোন বেজে উঠে দুজনেরই ঘুমের চটকা ভেঙে দিল। মিনি হাত বাড়িয়ে ফোন তুলে নিয়েই চমকে বলল, “শিট্!”
“কী হল?” ওপরের বার্থ থেকে পরাগব্রত উঁকি দিয়ে দেখতে পেল স্ক্রিনে ফুটে ওঠা নামটা। বুকের ভেতরটা শুকিয়ে গেল। এই ভুলটা ও কী করে করল? মিনির ফোন নম্বর বদলে নেওয়া উচিত ছিল অনেক আগেই। বলল, “উত্তর দিও না। বেজে যেতে দাও।”
উত্তর দেওয়ার প্রশ্নই নেই। ফোনের স্ক্রিনে ‘ভবানীচরণ সিং’ নামটা দেখামাত্র ওর অন্তরাত্মা কাঁপতে আরম্ভ করেছে। ফোনটা বেজে বেজে কেটে গেল। পরাগব্রত বলল, “সুইচ অফ করো, সুইচ অফ করো!”
ওর গলার স্বরে তাগিদটা মিনিকে আরওই কেমন স্থবির করে দিল। পরাগব্রত লাফ দিয়ে উঠে তড়িঘড়ি কামরার আলো জ্বালাল। ফোনের পেছনের ঢাকনা খুলে সিম কার্ডটা বের করে সাবধানে নিজের মানিব্যাগে রাখতে রাখতে বলল, “তোমার আধার কার্ড এই নম্বরের সঙ্গে লিঙ্কড, তাই ফেলে দেওয়া যাবে না। আধার কার্ডের ফোন নম্বর কী করে বদলায় জানো?”
জানে না মিনি, মাথা নাড়ল। পরাগব্রত বলল, “ঠিক আছে, পরে খোঁজ নেওয়া যাবে। কিন্তু ভয় এখনও রয়েছে।”
মুখ শুকিয়েই ছিল মিনির। আরও শুকিয়ে গেল। বলল, “কী?”
পরাগব্রত চিন্তিত মুখে বলল, “ওরা এটার লোকেশন ট্রেস করেছে? বুঝতে পারবে কি, আমরা পুরী যাচ্ছি?”
দুজনেরই আর ঘুম এল না প্রায় সারা রাত।
সিংজী পাঁচ মিনিট অপেক্ষা করে আবার ফোন করলেন। এবারে শুনতে পেলেন, ‘সুইচ্ড্ অফ্’। ভুরু কুঁচকে ফোন নামিয়ে রাখলেন। বালিশে মাথা দিলেন বটে, কিন্তু কোঁচকানো ভুরু সোজা হল না। চোখ বুজলেনও না আর।
~একুশ~
প্রায় আধবাটি গরম দুধ খেয়ে তুলসী দুর্বল বাঁ-হাত তুলে ইশারায় থামতে বলল লক্ষ্মণকে। কথা বলার চেষ্টা করল, কিন্তু গোঙানির শব্দ ছাড়া কিছু শোনা গেল না। মুখটাও কি একটু বাঁকা লাগছে?
তুলসী আস্তে আস্তে ঘুমিয়ে পড়ছিল। বাইরে ভোরের আলো ফুটছে। দুধের বাটিটা রান্নাঘরে নামিয়ে রেখে লক্ষ্মণ তুলসীর বিছানার পাশে বসল। মাথার ভেতরটা একই সঙ্গে রাগে এবং ভয়ে আক্রান্ত। মেয়েটাকে হাতে পেলে টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে ফেলত। সেই সঙ্গে ভয়। সিংজীর নির্দেশ অমান্য করলে কী হয় ও জানে। তবে এতদিন সিংজীর সে কাজ সব ও একাই করে এসেছে। ওকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিতে পারার মতো লোক কি সিংজীর হাতে আর একজনও আছে?
সকাল সাতটা নাগাদ লক্ষ্মণের মাথাটা আস্তে আস্তে বুকের ওপর ঝুলে পড়ল। বসা অবস্থাতেই যখন ওর নাকটা অল্প অল্প ডাকছে, তখন পুরীতে ট্রেন থেকে নেমে নাড়ুগোপাল চক্রবর্তী ঘিরে ধরা পাণ্ডাদের বলছে, “ঘর ভাড়া চাই। ছ-মাসের জন্য। আমি আর বোন… সদ্য বিধবা…”
~বাইশ~
নাথুর প্রায় সারা রাতই ঘুম হয়নি। সিংজীর কাছ থেকে ফিরেই লক্ষ্মণ বেরিয়ে গেছিল বলে ও কর্মচারীদের কানাঘুষো শুনতে পায়নি — নাথুরা শুনেছে। রান্নাঘরের ছেলেটা ছিল কাছেই… যদি হঠাৎ চা-সরবত দিতে হয়! দিতে হয়নি। তাই প্রায় সব কথাই কানে গেছে ওর। একটা মেয়ে — পরাগব্রতর কোনও মামাতো বোন — এসে ওকে নিয়ে গেছে আগের দিন বিকেলে। সিংজী মানতে রাজি নন যে পরাগব্রতর কোনও মামাতো বোন আছে, তবে মেয়েটা কে হতে পারে সেটা উনি বলতে পারেনি। কেউ কিছুই বলতে পারে নি, কিন্তু নাথু জানে। সিংজী লক্ষ্মণকে কী বলেছিলেন জানে না, কিন্তু মিনিকে নিজের কাছে পুষে রাখতে বলেননি নিশ্চয়ই। লক্ষ্মণ রেখেছিল নিজের ভোগের জন্য। পরশু সকালে মিনি লক্ষ্মণের বাড়ি থেকে বেরিয়ে কোথায় গেছিল? নিশ্চয়ই পালিয়ে গিয়ে পরাগব্রতকে খবর দিয়েছে। সিংজী জানেন না সে কথা, কিন্তু নাথুর কাছে প্রমাণ রয়েছে — পরশু সকাল অবধি মিনি লক্ষ্মণের বাড়িতেই ছিল। এবং পরশুই বেরিয়ে গিয়ে রাস্তা থেকে একটা ওলা ট্যাক্সি ধরে চলে গেছে — সঙ্গে একটা সুটকেস। লক্ষ্মণই হয়ত পাঠিয়েছিল, পরাগব্রতকে সাবধান করতে। যে কারণেই হোক, লক্ষ্মণ সিংজীর বিশ্বস্ত কর্মচারী আর নয়, হয়ত কখনওই ছিল না।
লক্ষ্মণ এখন নেই। এরই মধ্যে সিংজীকে খবর দিতে হবে। সিংজীর মুখোমুখি হয়ে লক্ষ্মণের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করতে হবে ভাবতেই নাথুর হাত-পা পেটের ভিতর সেঁধিয়ে যাচ্ছে। এ ক-বছরে লক্ষ্মণ এতটাই প্রভাবিত করেছে সিংজীকে, যে সিংজী ওর কোনও দোষই দেখতে পান না। কিন্তু এই ছবি দেখলেও কি সিংজীর ভুল ভাঙবে না? এক যদি না…
এক যদি না সিংজীই মিনিকে লক্ষ্মণের হাতে তুলে দিয়ে থাকেন?
আবার ভাবতে হল নাথুকে, কিন্তু ভেবে স্থির করল, না… তার সম্ভাবনা নেই।
সকাল আটটা। সিংজীর পুজো শেষ হয়েছে, কিন্তু এখনও নিচতলার কর্মচারীদের ওপরে যাবার অনুমতি নেই। তবু দুরুদুরু বুকে নাথু গিয়ে দাঁড়াল গেটে। দারোয়ানের চোখে মুখে বিস্ময়।
“আভি?”
“বহোত জরুরি হ্যায়। একবার ফোন লাগাইয়ে।”
দারোয়ান কী ভেবে ইন্টারকম তুলে কথা বলল। তারপর বলল, “উপর যাও, ন-তাল্লা মে রুকো।”
আর পেছোনোর উপায় নেই। ন-তলায় উঠে নাথু নিয়মমাফিক অফিস ঘরের বন্ধ দরজার পাশে দাঁড়াল। দেখতে দেখতে লিফটটা আবার ন-তলা থেকে বারো-তলায় উঠল, পরক্ষণেই আবার নামতে আরম্ভ করল। নাথু সোজা হয়ে দাঁড়াল। লিফট থেকে বেরিয়ে দরজা খুলে অফিস-ঘরে ঢুকতে ঢুকতে আড়চোখে ওর দিকে তাকিয়ে নাক দিয়ে একটা ঘোঁত করে শব্দ করলেন। অর্থাৎ ঘরে ঢোকার অনুমতি দিলেন নাথুকে।
নাথু সিংজীর পেছন পেছন অফিসে ঢুকল। টেবিলের পেছনে দাঁড়িয়ে আছেন, চেয়ারে বসেননি সিংজী। নাথু টেবিলের পাশে গিয়ে দাঁড়াল। “কেয়া হ্যায়?” কালকের ঘটনার পরে সিংজীর মেজাজ এখমও শান্ত হয়নি। ভয়ে ভয়ে সিংজীর দিকে ফোনটা এগিয়ে দিল নাথু। ফোনের স্ক্রিনে মিনির ছবি। পাশ থেকে নেওয়া। জুম-ইন করার ফলে স্ক্রিন জোড়া মিনির মুখ। চিনতে অসুবিধে হওয়ার কথা নয়। নাথু হাত বাড়িয়ে ছবিটা ছোটো করে দিল। মিনি গোলাপি শাড়ি পরে একটা দরজা বন্ধ করছে। পর পর আরও তিনটে ছবি দেখাল নাথু। মিনি রাস্তা দিয়ে সুটকেস হাতে হেঁটে যাচ্ছে, শপিং মলের সামনে মিনি ক্যাফেতে ঢুকছে, এবং সব শেষে, মিনি একটা ওলা ক্যাবে উঠছে।
ফোনটা ফেরত দিলেন সিংজী।
“কভ লিয়া ইয়ে সব তসবির?” ওঁর গলা বিপজ্জনক রকম শান্ত। ভেতরটা কেঁপে উঠল নাথুর। কোনও রকমে বলল, “পরসোঁ সুবহ্, সরকার।”
“ও গাড়ি-ওয়ালা তসবির ফিরসে দিখাও...”
নাথু বিনা বাক্যব্যয়ে বের করে দিল ছবিটা।
ওলা ক্যাবের ছবিটা দু-আঙুলে চিমটি দিয়ে বড়ো করে নম্বর-প্লেটটা দেখে বললেন, “জিগনেশ কো বোলো গাড়ি কা পাতা করে। ফির ড্রাইভার কো পুছো কাহাঁ গিয়া থা...”
“জি, সরকার।”
এবার নিজেই ডাইনে বাঁইয়ে আঙুল চালিয়ে প্রথম দেখা ছবিটা বের করলেন সিংজী। নাথুর হাতে ফোন ফেরত দিয়ে বললেন, “ইয়ে কহাঁ?”
নাথু বলল, “ইয়ে হ্যায় লচমন কা আপনা ঘর। উসকা মা ভি ইধর হি রহ্তি হ্যায়…”
আর একটা ছবি বের করে ফোনটা বাড়িয়ে দিল নাথু। এটা আগের দিন রাতের। এটা আগে দেখায়নি। অন্ধকারের মধ্যে একটা জানলা। ভেতরে আলো জ্বলছে। মুখ দেখা না গেলেও, দেহাবয়ব দেখে লক্ষ্মণকে চিনতে অসুবিধে হওয়ার কথা নয়, আর সে ঘরেই মিনিকেও চেনা যায় মোটামুটি সহজেই।
“ইয়ে এক রোজ পহলে রাত কা হ্যায় সরকার…”
চড়াৎ করে প্রবল বিরাশি সিক্কার চড়টা এসে পড়ল যখন, তার আঘাতে নাথু দুটো চেয়ার নিয়ে ছিটকে গিয়ে পড়ল ঘরের উলটো দিকে।
“সালা হারামি, চুতিয়া, ভোঁসড়িকে…”
“সরকার, গলতি হো গিয়া সরকার। মাফি মাঙ্গে… সরকার…” নাথু বুঝতে পারছে না, অন্যায়টা কোথায় হয়েছে, কিন্তু আগে শান্ত করতে হবে মালিককে। “হুজুর মাফ কর দো…”
“পহেলে কিউঁ নেহি বাতায়া, মাদারচোদ্? আভি বাতাকে কেয়া ফায়দা?”
“মালুম নেহি থা সরকার, মাফি মাঙ্গে সরকার…” সত্যিই নাথু জানত না মিনির ব্যাপারে কী আদেশ দিয়েছিলেন সিংজী, এবং একটা মেয়ে গিয়ে যে পরাগব্রতকে সাবধান করে দিয়েছে, সে-ও তো কেবলমাত্র গতকাল রাতেই সবাই জানতে পেরেছে।
এতদূর ভেবেই নাথুর খেয়াল হল, গতকাল রাতে বন্ধ দরজার আড়ালে কী আলোচনা হয়েছে তা তো নাথু বা ওদের কারও জানার কথা নয়…
কিন্তু সিংজীর মাথায় সে চিন্তা নেই। ছবিটার দিকে আঙুল দেখিয়ে বললেন, “ঔর, ও কাহাঁ হ্যায়? ও মাদারচোদ্?”
মনে মনে স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেও নাথু বেশ ভয়ে ভয়েই বলল, “সরকার, ও তো কাল রাত কো নিচে সোয়া নেহি। নিকলকে চলা গিয়া, শায়দ ওহি গিয়া হ্যায়…” একই সঙ্গে হাত বাড়িয়ে ফোনটা টেনে নিল নাথু — পাছে সিংজীর রাগ গিয়ে ওটার ওপরেই পড়ে…
“ফোন লাগাও হারামখোর কো, বুলাও ওয়াপস আভ্ভি। ইসি ওয়ক্ত।”
কাঁপা হাতে ফোনটা তুলে নিয়ে নাথু ডায়াল করল।
~তেইশ~
অভিষেক পাণ্ডার তত্ত্বাবধানে পরাগব্রত আর মিনি এসে হাজির হল আঠেরোনালায়, যেখানে সমুদ্রতট থেকে এবং মন্দির থেকেও কয়েক মিনিটেরই দূরত্বে বিশ্বম্ভর পাণিগ্রাহীর বাড়ি। পাণিগ্রাহীর বেশ কয়েকটা বাড়ি আছে, তাতে অনেকগুলো করেই দু-কামরা, তিন কামরা এমনকি এক কামরারও ঘর রয়েছে। মিনিকে বাড়ির মেয়েরা যত্ন করে ভেতরে নিয়ে গেল, বাইরের ঘরে বসে পরাগব্রত মৃণালিনীর জীবনের দুঃখের কাহিনি শোনাল বিশ্বম্ভর আর অভিষেককে। বিয়ে হয়েছিল দু-বছরও হয়নি। স্বামী কাজ করত কাতারে। ওখানেই মারা গেছে। মৃণালিনীর বাবা প্রাচীনপন্থী মানুষ, নির্দেশ দিয়েছেন, মেয়েকে তীর্থ করতে যেতে হবে। নিজের ভাইবোন নেই বলে নাড়ুগোপালের ওপরেই ভার পড়েছে সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার। নাড়ুগোপালও বেকার, তাই ওর পক্ষেই কাজটা সবচেয়ে সহজ।
গল্পে কাজ হল, ছ-মাসের জন্য বাড়ি ভাড়া পেতে দেরি হল না।
নাড়ুগোপাল আর মৃণালিনীকে বাড়ির দরজা খুলে দিয়ে বিশ্বম্ভর ফিরে গেলেন, মিনি দরজার পেছনে রাখা একটা পুরোনো ঝাড়ু নিয়ে ঘর পরিষ্কার শুরু করল, নাড়ুগোপাল গেল বাজারে।
বিশ্বম্ভর ফিরে গিয়ে দেখলেন স্ত্রী কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে। জানতে চাইলেন ভাই-বোন সম্বন্ধে কী মনে করলেন। বিশ্বম্ভর অবাক হলেন। এর মানে কী? ভালো না লাগলে কি বাড়ি ভাড়া দিতেন নাকি?
স্ত্রীর দুর্জ্ঞেয় হাসির অর্থ বুঝতে দেরি হল না বিশ্বম্ভরের।
~চব্বিশ~
পকেটে ফোনটা বেশ খানিকক্ষণ বাজার পরে লক্ষ্মণের ঘুম ভাঙল। ধড়ফড় করে উঠে বসে ফোনটা হাতে নিয়ে বোতাম টিপে উত্তর দিল। নাথু।
“কাহাঁ হো? সিংজী বুলা রহেঁ হ্যায়।”
কটা বাজে? সাড়ে আটটাও বাজেনি! এত সকালে সিংজী উঠে ওর খোঁজ করছেন? কী আশ্চর্য!
“জলদি আ যাও…” বলছে নাথু। “বহুত গুস্সে মে হ্যায়।”
“আভি আয়া…” বলে লাইন কেটে লক্ষ্মণ চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। তুলসী এখনও গভীর ঘুমে। বার দুয়েক “মা, মা… মা-ঈ...” বলে ডেকে সাড়া পেল না। ভাবল যত তাড়াতাড়ি পারে ফিরে এসে আবার কিছু খাওয়াবে। দ্রুতপায়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে হাঁটা দিল সিংজীর বাড়ির দিকে।
ওদিকে সকালে বাজার সেরে ভাই-বোন ঘর গুছিয়ে বেরিয়ে পড়ল জগন্নাথ মন্দিরের দিকে। দুটো ঘরেই মেঝেতে বিছানা করে শোয়ার ব্যবস্থা। ভেতরে বোনের ঘরে তোষকটা চওড়া — ডবল-বেডের সাইজ, বাইরের ঘরে ভাইয়ের বিছানা অনেক ছোটো। ঘরে আর কোনও আসবাবপত্র নেই। বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়-স্বজনের আনাগোনার বালাই থাকবে না, মৃণালিনী রোজই মন্দিরে পুজো দিতে যাবে — এ-ই ওদের পুরীতে আসার প্রধান কারণ, জেনে অতি নিশ্চিন্তে বিশ্বম্ভর ঘর দিয়েছেন। নিজের ঘরের বিছানার দিকে দেখিয়ে মিনি ভুরু তুলে জিজ্ঞেস করল, “আগে মন্দির, না আগে…?” পরাগব্রত বলল, “মন্দির। চালচলনে সামান্য ত্রুটি হলেও চলবে না। প্রথম দিকে ভুল হতে পারে, কিন্তু যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সব শিখে নিতে হবে। অভিষেক পাণ্ডা অপেক্ষা করছে, দেরি করলে চলবে না।”
ওরা যখন মন্দিরে যাবার জন্য বেরোচ্ছে, তখনই লিফটে ঢুকে ন-তলার বোতাম টিপেছে লক্ষ্মণ।
সিংজী মিটিঙের বড়ো ঘরেই অপেক্ষা করছিলেন। লক্ষ্মণ ঘরে ঢুকে অভ্যাসমতো সেলাম করে দাঁড়াল।
“কাহাঁ থে?” সিংজীর গলা অদ্ভুতরকম মোলায়েম। নাথু নেই কোথাও, কিন্তু টেলিফোনে যে বলেছিল ভীষণ রেগে আছেন, তার কোনও চিহ্ন নেই চোখেমুখে, কণ্ঠস্বরে। লক্ষ্মণ প্রমাদ গণল। এত বছরের চাকরিতে ও সিংজীকে এত ভয়ংকর রাগতে ক-বার দেখেছে, মনে পড়ে না।
সিংজী তাকিয়ে আছেন। লক্ষ্মণ অল্প কথায় বলল মায়ের খুব অসুখ। অজ্ঞান। তাই…
সিংজীর গলায় উদ্বেগ। সে কী! কী হয়েছে? ডাক্তার দেখিয়েছে লক্ষ্মণ?
ডাক্তার? ডাক্তার দেখানোর কথা ওর মাথায়ও আসেনি। ও যেখানে থাকে সেখানে মেয়েদের জন্য ডাক্তার-টাক্তার ডাকা হয় না। ওর মা-ও মারা গেছে বিনা চিকিৎসায়, ওর ঠাকুমাও তাই। বিদেশ-বিভূঁইয়ে এক পাতানো মা-কে ডাক্তার দেখানোর কথা স্বপ্নেও মনে আসার কথা নয়, আসেওনি। সিংজী চুকচুক করে শব্দ করে বললেন, না, না। তা হয় না। আজই ডাক্তার বাবুকে পাঠানো হবে। গলা তুলে ডাকলেন, “নাথু?”
যেন দরজার আড়ালে তৈরিই ছিল — নাথু সঙ্গে আরও চারজন ঢুকে সিংজীর পেছনে দাঁড়াল। লক্ষ্মণের আত্মরক্ষার বোধ এখন তুঙ্গে।
সিংজী নাথুকে লক্ষ্মণের মায়ের অসুস্থতার কথা বলছেন! বলছেন, নাথু যেন আজই ডাক্তার বাবুকে সঙ্গে নিয়ে যায়… লক্ষ্মণের চিন্তাভাবনা তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে। নাথু যাবে ডাক্তার নিয়ে? নাথু তো জানেই না লক্ষ্মণের মা কোথায় থাকে! লক্ষ্মণ কিছু বলার আগেই সিংজী নাথুর সামনে হাত পাতলেন, নাথু আড়চোখে একবার লক্ষ্মণের দিকে তাকিয়ে সিংজীকে ওর মোবাইলটা দিল।
সিংজী লক্ষ্মণের দিকে ফিরলেন, “সামনে আও।”
লক্ষ্মণ সাবধানে এক-পা এগোল। সিংজী আঙুলের আলতো টোকায় ফোনটা এগিয়ে দিলেন। কী দেখাচ্ছেন সিংজী? ফোনটার দিকে হাত বাড়াতে ভয় পাচ্ছে; সিংজীর থেকে দৃষ্টি না সরিয়েই আড়চোখে দেখার চেষ্টা করল, ঠিক বুঝতে পারল না। শুনতে পেল, সিংজী বলছেন, “আরে সামনে আও, শরমাও মৎ, ঠিক-সে দেখো…”
লক্ষ্মণ ঠিক করে তাকাল। ফোনটা এখনও একটু দূরে, তাই একটু ঝুঁকে পড়তে হল; পরক্ষণেই মাথাটা ঘুলিয়ে উঠল। নাথুর ফোনে মিনির ছবি! মিনি ঝুঁকে পড়ে লক্ষ্মণের বাড়ির গলিতে বাইরের দরজার কড়া ধরে — টানছে না ঠেলছে? চকিতে লক্ষ্মণের তালগোল পাকানো মাথায় অনেকগুলো ভাবনা খেলে গেল। তাহলে মিনি আসলে নাথুর সঙ্গে… নাথু মিনিকে… তাহলে মিনিই পরাগব্রতকে… নাথু আর পরাগব্রত…? প্রশ্নগুলো প্রশ্নই রয়ে গেল, মুখ তুলে তাকিয়ে দেখল সিংজীর হাতে একটা পিস্তল। সিংজীর হাতে পিস্তল! লক্ষ্মণ জানে সিংজীর কাছে সবসময় একটা পিস্তল থাকে, কিন্তু কোনও দিন চোখে দেখেনি। কিন্তু লক্ষ্মণের দিকে কেন? ওটা কি নাথুর দিকে তাক করা উচিত না? নাথুই তো পরাগব্রতর সঙ্গে…
প্রথম গুলিটাতেই একেবারে হৃদপিণ্ড এফোঁড় ওফোঁড় করে দেবেন ভেবেছিলেন ভবানীচরণ সিং। ভাবেননি লক্ষ্মণের মোটা, শক্ত হাড়ের কথা। গুলিটা লক্ষ্মণের বাঁ দিকের তৃতীয় পাঁজরের ওপরে লেগে হৃদপিণ্ডের দিকে না গিয়ে একটু ওপরে উঠে হার্টের খুব কাছেই একটা ধমনী ছিঁড়ে শিরদাঁড়ায় গেঁথে গেল।
হার্টে রক্ত আসা প্রায় পুরোপুরি বন্ধ, এ অবস্থাতেও লক্ষ্মণ কোমরের ছুরিটা খুলে ঝাঁপিয়ে পড়ল সিংজীর ওপর। বাগিয়ে ধরা ফলাটা সিংজীর বক্ষস্থলেই গেঁথে যাবার কথা ছিল, কিন্তু চারজন রক্ষীও একই সঙ্গে লক্ষ্মণকে আটকাতে এগিয়ে এসেছিল, তাই ওরও লক্ষভ্রষ্ট হল; ছুরিটা গেঁথে গেল সিংজীর গলায়। গলার বাঁ-দিকের জাগুলার ভেইন এবং ক্যারটিড আর্টারি দুই-ই কেটে বেরিয়ে গেল; চেয়ার পেছনে উলটে পড়ল, তার ওপর সিংজী, এবং তার ওপর লক্ষ্মণ। সিংজীর পিস্তল থেকে আরও তিনবার গুলি চলল; তার কোনটাতে লক্ষ্মণের প্রাণ গেল পোস্ট মর্টেমেও তা জানা যায়নি।
লক্ষ্মণের বিশাল শরীরটা টেনে সরাতে বেশ খানিকক্ষণ সময় লেগেছিল, ততক্ষণে চেঁচামেচি হইচই শুনে কাজের লোক আর বাড়ির লোক অনেকেই ছুটে এসেছে। রক্তে ভেসে যাচ্ছে সিংজীর শরীর আর ঘরের মেঝে। সিংজীর নিঃশ্বাস নিতে অসুবিধে হচ্ছে। গলায় ঘড়ঘড় শব্দ হচ্ছে। বাড়ির লোক ডাক্তারকে ফোন করে ডাকা, এবং পনেরো কুড়ি মিনিট পরে ডাক্তারবাবুর এসে পৌছনোর মধ্যে সিংজীর শরীরও নিথর হয়ে গেল।
~পঁচিশ~
প্রথম দিনের পুজো শেষ করে মিনি আর পরাগব্রত অনেকক্ষণ ঘুরে বেড়াল জগন্নাথ মন্দিরে। ওখানে বসেই ভবিষ্যৎ নিয়ে অনেক আলোচনা করল। তারপর মহাপ্রসাদ নিয়ে পর্দার দোকান হয়ে বাড়ি ফিরল। বেলা তখনও দুপুর গড়িয়ে বিকেলের দিকে ঢলেছে। দুটো ঘরের দুটো জানলায় পরাগব্রত যতক্ষণ পর্দা লাগাল মিনি ততক্ষণ অতি কষ্টে নিজেকে সামলে রেখেছিল। জানলায় পর্দার আব্রু লাগামাত্র ঝাঁপিয়ে পড়ল পরাগব্রতর ওপর। ঘণ্টাখানেক পরে দুজনে হাঁপিয়ে, ঘেমে বিছানা ছেড়ে উঠে চান করল। তারপর আবার শুল বিছানায়।
“তুমি আবার আমাকে ছেড়ে যাবে না তো?”
মিনির মুখে চোখে চুমু খেতে খেতে পরাগব্রত ভাবছিল একই কথা। মিনির সঙ্গে থাকার মধ্যে শরীর ছাড়া আর কোনও আকর্ষণ আছে কি? বোধহয় না। এভাবে ক-দিন চলতে পারবে? যদিও বেশিদিন এখানে থাকার ইচ্ছে নেই, তবু সে ক-দিনও সর্বসমক্ষে ভাইবোন, আর লোকচক্ষুর আড়ালে প্রেমিক প্রেমিকার সম্পর্ক কতদিন লোকের সন্দেহ উদ্রেক করবে না? তার চেয়ে অন্য কোথাও গিয়ে স্বামী-স্ত্রীর ভেক ধরাই কি বেশি নিরাপদ নয়? না কি মিনিকে কোথাও রেখে চুপচাপ একা একা চলে যাওয়াটাই ভালো হবে?
“কী গো, চুপ করে কী ভাবছ?” নিজের বিবস্ত্র শরীরটা পরাগব্রতর শরীরের নিচ থেকে টেনে বের করে মিনি পরাগব্রতর দিকে ফিরল।
পরাগব্রত মুখটা নামিয়ে আনল মিনির বুকে। ঠোঁট, জিভ আর দাঁতের স্পর্শে বিহ্বল মিনি আলতো শিৎকার করে উঠল। তারই মধ্যে শুনল পরাগব্রত বলছে, “না। যাব না।”
পরদিন ভোর থাকতেই মিনির মন্দিরে যাবার কথা। আজ আবার কিসের ব্রতও আছে — বিধবাদের পালন করা জরুরি। অভিষেক পাণ্ডা অপেক্ষা করবে। রাতে দুজনের শুতে দেরি হয়েছে। ক্লান্ত মিনি বিছানা ছাড়তে চাইছিল না। পরাগব্রতর তাগাদাতেই উঠেছে। পরাগব্রত বুঝিয়েছে, এই ভেক বজায় রাখতে গেলে ভোরে উঠে রোজ মন্দিরে যাওয়া জরুরি। না হয় রাতে আরও আগে শুতে যাবে ওরা।
মিনি যখন মন্দিরে পাণ্ডার সঙ্গে পুজো দিচ্ছে, পরাগব্রত তখন মন্দিরের বাইরের দোকানপাট ঘুরে দেখছে। একটা চায়ের দোকানে দু-জন বাঙালি বেশ জোরে জোরেই কী যেন আলোচনা করছে... খুন, রক্তারক্তি, কাল নাকি টিভিতে দেখিয়েছে... পরাগব্রত ভেতরে গিয়ে এক কাপ চা নিয়ে পাশের টেবিলে বসল। একজনের তাগিদে দোকানি টিভির চ্যানেল বদলে বাংলা একটা নিউজ চ্যানেল দিলেন। পরাগব্রত চায়ে চুমুক দিতে দিতে অলস চোখে তাকাল টিভি স্ক্রিনের দিকে। উত্তেজিত সংবাদ-পাঠিকা এখনও জোড়া-খুনের খবর বলছেন। নিচে স্ক্রোল করছে খবরের হেডলাইন এবং অন্যান্য জরুরি তথ্য। কর্মচারীর হাতে ব্যবসায়ীর মৃত্যু! আত্মরক্ষা করতে গিয়ে ব্যবসায়ীর গুলিতে মৃত্যু কর্মচারীর! জোড়া খুনের তদন্তে সি-আই-ডি! এখনও রহস্যের কুয়াশায় আবৃত পরিস্থিতি!
স্ক্রিনে ডানদিক থেকে বাঁদিকে দ্রুত সরতে থাকা ব্যবসায়ীর আর কর্মচারীর নাম দুটো চোখে পড়তেই চমকে উঠল পরাগব্রত। ভবানীচরণ সিং! তাঁর কর্মচারী লক্ষ্মণ! এর কী অর্থ হতে পারে? ফোনটা তুলে একটা বাংলা কাগজের ই-পেপার খুলল পরাগব্রত। দু-আঙুলে চিমটি দিয়ে স্ক্রিন বড়ো করে সবটা পড়ে ফেলল যত তাড়াতাড়ি পারে। তারপর এক চুমুকে চা শেষ করে মন্দিরের দরজায় গিয়ে দাঁড়াল আবার। মিনির পুজো দেওয়া শেষ হলে এই দরজা দিয়ে বেরিয়েই ওর নতুন ফোন থেকে পরাগব্রতকে ডাকবে — এই ছিল কথা। কিন্তু পরাগব্রতর তর সইছে না।
আজ পরবের জন্য মিনির পুজো দিয়ে বেরোতে সময় লাগল। ঘণ্টা দুয়েক বাদে যখন সরু কালোপাড় সাদা শাড়ি পরিহিত, লম্বা ঘোমটার আড়ালে মুখ লুকোনো চেহারাটা দেখা গেল, সে ফোন করার আগেই পরাগব্রত লম্বা পা ফেলে সামনে গিয়ে দাঁড়াল। এক লহমা ওর মুখের দিকে তাকিয়েই মিনি চমকে বলল, “কী হয়েছে?”
পরাগব্রত ডান-হাতে মিনির বাঁ কবজিটা শক্ত করে ধরে বলল, “তেমন কিছু না। চলো, বলছি।”
দুজনে হেঁটে স্বর্গদ্বার পার করে গিয়ে বসল সমুদ্রের ধারে। সূর্য উঠে গেছে, তাই সূর্যোদয় দেখার ভীড় কমেছে; সমুদ্রের জল এখনও ঠাণ্ডা খুব, তাই স্নানার্থীদের ভীড় এখনও নেই। মিনি বলল, “এবার তো বলবে? কী হয়েছে?”
মুখে কিছু না বলে ফোনটা মিনির হাতে দিল পরাগব্রত। ওই ই-পেপারের পাতাটাই খোলা। হেডলাইনের নিচেই ছবি। কী ভাবে যেন পুলিশকে ফাঁকি দিয়ে তোলা অকুস্থলে জোড়া মৃতদেহ এবং রক্তগঙ্গার ছবি রয়েছে। সেই সঙ্গে রয়েছে প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ অনুযায়ী খুনের বর্ণনার সঙ্গে শিল্পীর স্কেচ, এবং তা ছাড়াও, ভবানীচরণ সিং এবং লক্ষ্মণের জীবিত অবস্থার ফটোগ্রাফ।
মিনি পুরো খবরটা পড়ে বিস্তারিত চোখে পরাগব্রতর দিকে তাকাল।
“এর মানে?”
পরাগব্রত কাঁধ ঝাঁকাল। “পুরোটা বুঝতে পারছি না, কিন্তু বেশ কিছু দিন নিশ্চিন্ত থাকা যাবে বোধহয়। এই সিংজীই তো লিডার, না কি?”
মিনি তা জানে না। পরাগব্রত আবার জিজ্ঞেস করল, “আর এ-ই লক্ষ্মণই তো তোমাকে…?”
বাক্যটা শেষ করতে পারল না পরাগব্রত। মিনিও মুখে উত্তর দিল না। দূরের সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে রইল।
পরাগব্রত বলল, “ছ-মাস না হলেও, মাস দু-তিন এখানে গা-ঢাকা দিয়ে থাকা যায়। তার পর ভেবে দেখা যাবে।”
দু-মাস! আঁতকে উঠল মিনি। এইভাবে ভাইবোন সেজে… রোজ পুজো দিয়ে কাটাতে হবে?
পরাগব্রত হেসে ফেলল। একটু আগেও, যখন সিংজী আর লক্ষ্মণের মৃত্যুসংবাদ ওরা পায়নি, তখন তো ছ-মাসের কথায় এত আপত্তি হয়নি?
মিনি মাথা নাড়ল। “মোটেই তা নয়! আপত্তি সবসময়ই ছিল। তখন মনে হয়েছিল উপায় নেই, এখন তো জেনে গেছি যে ওরা আর নেই…”
“আপনারা এখানে! ওদিকে পুরুতমশাই এসে অপেক্ষা করছেন!”
বিশ্বম্ভর পানিগ্রাহীর গলায় সম্বিত ফিরল দুজনের। তাড়াতাড়ি কাগজ ভাঁজ করতে করতে উঠল মিনি। বলল, “এ বাবা, একেবারে খেয়াল ছিল না… আসলে…”
আসল-নকলের হিসেব নেবার সময় বা মানসিকতা নেই বিশ্বম্ভরের। বললেন, “চলুন, চলুন, তিথি থাকতে থাকতে পুজো আরম্ভ করতে হবে…”
বিশ্বম্ভরের পেছনে যেতে যেতে নিচুগলায় পরাগব্রত জিজ্ঞেস করল, “কী পুজো আবার?”
ততোধিক নিচুস্বরে মিনি বলল, “কী একটা পুজো করতে হবে আমাকে। মন্দিরে বলল অভিষেক।”
“বাড়িতে? মন্দিরে পুজো দিয়ে রক্ষা নেই…?”
“তোমার আর কী? তোমাকে তো নিরম্বু উপবাসে থাকতে হবে না?”
“নিরম্বু কী?” এত বাংলা জানে না পরাগব্রত।
“জল খাওয়াও বারণ!” কথাটা মিনি তামাশার সুরেই বলেছিল, কিন্তু বাড়িতে পুজো-আচ্চার ব্যাপারটাই পরাগব্রতর পছন্দ হয়নি। ঝাঁঝিয়ে কী বলতে যাচ্ছিল, সামনে থেকে ঘাড় ঘুরিয়ে বিশ্বম্ভর বললেন, “তাড়াতাড়ি আসুন। তবু ভালো সত্যবতী ছিল, ও সব জোগাড় করে দিচ্ছে…”
যদিও বাড়ি খুব দূরে নয়, তবুও পা চালাল দুজনেই। এখন বিশ্বম্ভরের খুব কাছাকাছিই ওরা, চুপিচুপি জিজ্ঞেস করার উপায় নেই, তবু ফিসফিস করে জানতে চাইল, “সত্যবতী কে? ওর বউ?”
মিনির মনে হল বিশ্বম্ভর শুনতে পেয়েছেন। মুখে কিছু না বলে মাথা নেড়ে ‘না’ বলল।
দোতলার ফ্ল্যাটের দরজা খোলা। ভেতরে অভিষেক পুরুতমশাই পুজোর তোড়জোড় করছেন এখান থেকেই দেখা যাচ্ছে। দরজা ওরা তো বন্ধ করে গেছিল! তবে? বিশ্বম্ভরকে জিজ্ঞেসই করে বসল পরাগব্রত, “দরজা কি আপনি খুলে দিলেন?”
বিশ্বম্ভর ওদের দরজার গডরেজ লক-এর একটাই চাবি দিয়েছেন। বলেছিলেন অন্যটা এমার্জেন্সি ছাড়া ব্যবহার হবে না। এখন বিশ্বম্ভরের কথা শুনে বোঝা গেল এটাও এমার্জেন্সি।
“কী করি বলুন? ঠাকুরমশাই পুজোর সব সরঞ্জাম নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন, তাই তাড়াতাড়ি দরজা খুলে দিয়ে আমি আপনাদের খুঁজতে গেলাম।”
ওরা বাড়িতে ঢুকতে না ঢুকতেই রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এল একটা মেয়ে — বয়সে পরাগব্রত আর মিনির মাঝামাঝি। কিছু না বলে পরাগব্রতকে হাতজোড় করে নমস্কার করল। বিশ্বম্ভর পরিচয় দিলেন, “সত্যবতী। আমার বোন।” পরাগব্রতর ঘরে আসবাব নেই। দু-ঘরে ভাইবোনের শোবার বন্দোবস্ত রয়েছে কেবল। শীতলপাটির ওপর ওর বিছানাটা দেওয়ালের পাশে গোটানো। বন্ধ দরজার ওপরে এমনই আর একটা বিছানা রয়েছে। সেটা গোছানো নেই। বাইরের লোকে দেখলে সন্দেহ করতে পারে। পরাগব্রত তাড়াতাড়ি নিজের বিছানাটা টেনে দরজা খুলে মিনির ঘরে ঢুকিয়ে দিয়ে নিচের মাদুরটা কেবল বের করে আনল। পুজো আরম্ভ হয়ে গেছে, বিছানো মাদুরের ওপর বসতে বসতে বিশ্বম্ভর নিচু গলায় বললেন, “কিছু ফার্নিচার তো কিনতেই হবে, নাড়ুগোপালবাবু… দু-চারটে চেয়ার, একটা টেবিল… নইলে কেউ এলে-টেলে… বসাবেন, খাওয়াবেনই বা কোথায়?”
পুরীতে এসে তীর্থ করার ভেক ওদের। লোকজন ডেকে এনে সামাজিকতার অভ্যেস বজায় রাখার নয়। এমনিতেও পরাগব্রত কোনও দিনই খুব সামাজিক ছিল না। ওর পালকপিতা ভুবনব্রত মুখার্জির পরিবারের কেউই ছিল না। পালপার্বণে, পুজোয়, এমনকি শহর দেখতে এসেও তাদের কোনও আত্মীয়-বন্ধু কখনও এসে থেকেছে বলে ওর মনে পড়ে না। কালেভদ্রে কোনও বিয়ে, অন্নপ্রাশন, পৈতে বা শ্রাদ্ধের কার্ড হাতে কেউ আসলেও তারা থাকেনি বেশিক্ষণ। শুকনো চা-বিস্কুটে আপ্যায়িত হয়ে ফিরে গেছে। সে সব সময়ে ওর মা কখনও দোতলা থেকে একতলায় নামেনি। ছোটোবেলায় পরাগব্রত যেত, কিন্তু বুঝতে পারত ওকে নিয়ে ওর পালক-মা বিব্রত হচ্ছেন। কেউ না থাকলে বড়ো-মা যতটাই আদরে ভালোবাসায় ওকে জড়িয়ে রাখতেন, বাইরের লোক, বিশেষত আত্মীয়-স্বজন থাকলে ততোধিক অস্বস্তিতে পড়তেন। কখনও কোনও নেমন্তন্ন বাড়িতে মুখরক্ষা করতে গেলেও ওকে, বা ওর মা-কে নিয়ে যেতেন না। সেটা বোঝার পর থেকে কেউ আসলে পরাগব্রতও দোতলা থেকে নামত না। ভুবনব্রতবাবু আর দীপব্রত তো অসামাজিকের পরাকাষ্ঠা! বয়স একটু বাড়তে না বাড়তেই বাবার মতো দীপব্রতও যাব-না, বলে ঘরে ঢুকে পড়ত। বড়ো-মা কিছুক্ষণ ঘ্যানঘ্যান করে হয় একাই যেতেন, নয়ত বিয়েবাড়িতে উপহার বা শ্রাদ্ধে ফুল পাঠিয়ে ক্ষান্ত দিতেন।
মাদুরে বসতে না বসতেই সত্যবতী এসে বিশ্বম্ভর আর ওর হাতে দু-কাপ চা দিল। দুটোই কাপ কিনেছিল কাল পরাগব্রত। কিন্তু চা এল কোত্থেকে? ও তো কফি এনেছিল, মিনির ইচ্ছায়! তার ওপর এ চা খুব তরিবৎ করে আদা, লবঙ্গ, এলাচ দিয়ে বানানো।
পাশ থেকে বিশ্বম্ভর বলছেন, “রান্নাঘরে তো কিছুই নেই! তাই ছেলেকে পাঠিয়ে চট করে কিছু আনিয়ে রাখলাম।” পকেট থেকে একটা দাম-লেখা ফর্দ বের করে বাড়িয়ে দিতে দিতে বললেন, “তাড়া নেই। সুবিধেমতো দেবেন।” পরাগব্রতও কাগজটা নিজের পকেটে চালান করে দিল কী লেখা আছে না দেখেই। বিরক্তি বাড়ছে। গায়ে-পড়া, না অধিকারবোধ, না কি অত্যাচার? কাপে শেষ চুমুক দিয়ে নামিয়ে রাখতে না রাখতেই সত্যবতী এসে তুলে নিয়ে গেল। সামনে অভিষেক হুম্-হুম্ শব্দে মন্ত্র পড়ছে। মিনি কি দেখতে পাচ্ছে কী হচ্ছে এ পাশে? অ্যাত্তোবড়ো ঘোমটা টেনে বসে আছে। পরাগব্রত হুটহাট প্ল্যান করা পছন্দ করে না। একটু না ভাবলে চারদিক সামলানো যায় না। হঠাৎ মিনি আমোদপুরে এসে পড়ায় থতমত খেয়ে ওকে মামাতো বোন বলে পরিচয় দিয়েছিল বটে, কিন্তু তারপর ওটাকেই টেনে টেনে বিধবার গল্প না বানালেই চলত না? মামার জন্য পুজো দিতেও তো আসতে পারত ভাইবোনে? সব হিজিবিজি হয়ে গেছে।
আবার রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এসেছে সত্যবতী। দাদার কানে কানে কিছু একটা বলতেই বিশ্বম্ভর উঠে ভেতরে চলে গেলেন। শালারা বাড়িটা নিজেদের বাড়ি বানিয়ে নিয়েছে! বিশ্বম্ভর আবার বেরিয়ে এসেছেন; হাত নেড়ে ডাকছেন পরাগব্রতকে। বিরক্তি লুকোতে লুকোতে পরাগব্রত রান্নাঘরে ঢোকামাত্র ওর হাতে একটা পাতার প্লেট ধরিয়ে দিল সত্যবতী। তাতে দুটো লুচি আর কালোজিরে দেওয়া সাদা আলুর তরকারি। বিশ্বম্ভর বলছেন, “একটু খেয়ে নিন। কখন পুজো শেষ হবে, তার তো ঠিক নেই।” সকালে কিছু খাওয়ার সময় পায়নি। বেরোবার সময় পরাগব্রত বলেওছিল ফেরার পথে কিছু খেয়ে আসবে। বাড়িতে এই পুজোর ফলে সেটা হয়নি। পরাগব্রত বুঝতে পারল কী ভয়ানক খিদে পেয়েছে। দ্বিরুক্তি না করে একটু গরম লুচি ছিঁড়ে নিয়ে আলুর তরকারির সঙ্গে মুখে দিয়েই চমকে উঠল।
কতদিন এত ভালো রান্না খায়নি পরাগব্রত? সেই এক সময় ছিল যখন দীপব্রত আর পরাগব্রতর খাবার টেবিলে এমন মেনু থাকত, যা অনায়াসে যে কোনও রাজা মহারাজাকে খাওয়ানো যেত। তারপর কোভিড লকডাউনে সেই যে রান্নার লোক সুব্রতকে বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছিল ওরা, সেই থেকে ভালো রান্না কাকে বলে ভুলেই গেছে পরাগব্রত। প্রথমে মিনি রান্না করত। সে এমনই অখাদ্য, যে মিনি নিজেও অনেক সময় খেতে পারত না। তারপর, ধীরে ধীরে লকডাউন আলগা হওয়ায় ওরা খাবার আনাত সুইগি বা জোম্যাটোকে দিয়ে। দীপব্রতর মৃত্যুর কয়েক মাসের মধ্যে পরাগব্রত বাড়ি ছেড়ে যেখানে থাকতে গেছিল, সেখানে বাইরের খাবারের সঙ্গে নিজেও রান্না করা শুরু করেছিল। আমোদপুরে খাবার আনিয়ে খাওয়া যাবে না জানত পরাগব্রত। লকডাউনের শেষে, যখন জেরক্সের দোকান খুলে আমোদপুরে গিয়ে থাকতে শুরু করেছিল, ততদিনে ও খুব ভালো না হলেও খাবার মতো রান্না করে। তবে এ রকম অসাধারণ রান্না তা নয়।
হঠাৎ খেয়াল হল সত্যবতী আর বিশ্বম্ভর দুজনেই যেন খুব অধীর আগ্রহে ওর দিকে তাকিয়ে রয়েছে। বিশ্বম্ভর বললেন, “ঠিক আছে?”
পরাগব্রত কিছু চিন্তা না করেই বলতে শুরু করেছিল, “খুব ভালো রান্না… এ রকম…” ওর কথা শেষ হবার আগেই সত্যবতী একরকম লজ্জায় লাল হয়ে প্রায় ঠেলেঠুলেই বেরিয়ে গেল রান্নাঘর থেকে। বিশ্বম্ভর বললেন, “ওর বানানো। বোনটা আমার খুবই ভালো। ঘরকন্নার কাজে জুড়ি নেই। এবার ভালো একটা ছেলে পেয়ে পাত্রস্থ করতে পারলেই আমার স্বর্গবাসী মা-বাবা শান্তি পাবেন।”
পরাগব্রত খাওয়া শেষ করে থালা নামিয়ে বাইরের ঘরে ফিরে গেল। সত্যবতী তখন মাদুরের ওপর বসে দুই হাঁটুর ওপর থুতনি রেখে একমনে পুজো দেখছে।
পুজো শেষ করে চা-লুচি খেয়ে অভিষেক বেরিয়ে গেলেন, তখন ঘড়িতে সাড়ে দশটা। মিনিও লুচি তরকারি খেল, বিশ্বম্ভর-ও। বাড়তি দুটো লুচি পরাগব্রতকে, “আরে খেয়ে নিন, না হয় দুপুরে একটু কম খাবেন…” বলে বিশ্বম্ভর খাইয়ে দিলেন; বিশ্বম্ভরের, “কিন্তু দুপুরে আপনারা খাবেন কী? বাড়িতে তো কোনও ব্যবস্থাই নেই”-এর উত্তরে পরাগব্রত ওদের, “আমাদের কিছু কাজ আছে… বাড়ি থেকে বাবা কিছু মালপত্র পাঠাচ্ছেন, সেগুলোর জন্য একবার ট্রান্সপোর্ট কম্পানির ওখানে…” বলে ওদের বিদায় দিয়ে দরজা বন্ধ করে মিনির দিকে তাকিয়ে চাপা তর্জনে ফেটে পড়ল।
“এর মানে কী? আমরা বাড়ি নেই, সেই সময়ে ঘরে তালা খুলে ঢুকে…”
মিনিও চটেছিল। কিন্তু সেইসঙ্গে ওর চোখে খেলছিল কৌতুক। বলল, “আসল ব্যাপারটা বুঝতে পারোনি তো? আমিও প্রথমে বুঝিনি। তারপর খেয়াল হল। তুমি হলে সত্যবতীর সম্ভাব্য পাত্র। প্রসপেক্টিভ গ্রুম। বুঝলে?”
“আরে ধ্যাত্!” আপত্তি জানাল পরাগব্রত। “চেনা নেই, জানা নেই — এভাবে কেউ বিয়ের কথা ভাবে? মেয়েটা তো কানা-খোঁড়া-অসুন্দর নয়…”
“অসুন্দর নয়? অসুন্দর নয়? তাকাওনি নাকি ওর দিকে, না কি ন্যাকামি করছ?”
“ন্যাকামি করব কেন? বেশ ভালো দেখতে…”
“আজ্ঞে তা-ও নয়। রীতিমতো সুন্দরী।”
“হ্যাঁ। তা-ই বলছি। সুন্দরী; দাদা বলে গেল ঘরকন্নার কাজে ওস্তাদ… পড়াশোনাও নিশ্চয়ই জানে?”
এবারে মাথা নাড়ল মিনি। “না। পড়াশোনা হয়নি। স্কুলের গণ্ডি পেরোয়নি।”
সে কী! অবাক হল পরাগব্রত। “আজকালকার দিনে? অত ব্যাকওয়ার্ড তো মনে হল না?”
“না,” বলল মিনি। “সমস্যাটা সেখানেই। কথা বলতে শোনোনি নিশ্চয়ই?”
মাথা নাড়ল পরাগব্রত। কেবল ফিসফিস-ই করেছিল দাদার কানে কানে।
“ওটাই সমস্যা। সাংঘাতিক তোতলা। কথাই বলতে পারে না। একটা সেন্টেন্স্ বলতেই কয়েক মিনিট লাগে। অনেক চিকিৎসা হয়েছে, শেষে কেবলমাত্র একটাই পদ্ধতি কাজে লেগেছে। ফিসফিস করে কথা বললে নাকি তেমন তোতলায় না। সে যা-ই হোক, ছোটোবেলা থেকে তোতলা বলে এতই কথা শুনতে হয়েছে, আর বাচ্চা-বুড়ো সবাই এমন পেছনে লেগেছে, যে স্কুলে যাওয়াই বন্ধ হয়ে গেছিল। অতি কষ্টে হোম-স্কুলিং করিয়েছে মা-বাবা। কিন্তু বেশিদূর এগোতে পারেনি।”
“তাই বলে গতকাল সকালেই যার সঙ্গে পরিচয় হল…”
“ওদের এখন দেওয়ালে পিঠ। বয়েস তো বসে নেই। এখন অবিবাহিত পুরুষ দেখলেই বিয়ের কথা ভাবে। কাল তুমি যতক্ষণ বাইরের ঘরে কথা বলছ, ততক্ষণ আমার জেরা চলছিল ভেতরে। আমি প্রথমে ভেবেছি, বাড়িওয়ালা ভাড়াটের পরীক্ষা নিচ্ছে। তারপর দেখি, না। তোমার কথাই বেশি। কী করো, পড়াশোনা কতদূর... কেন বিয়ে করনি... তারপর এল সত্যবতী, তারপর ওর কথা বলা এবং পাত্র পাওয়া নিয়ে দুশ্চিন্তার কথা।”
পরাগব্রত নিজের ভেতর কোথাও যেন অনুভব করতে পারল মেয়েটার অসহায় অবস্থাটা। বলল, “বেচারা।”
“সত্যি বেচারা। ভেবে দেখো। পাত্রী হিসেবে খারাপ না। তুমি তো এখন আর পরাগব্রত নও। লুঙ্গি মার্কা ধুতি ফতুয়া পরা নাড়ুগোপাল। একেবারে রাজযোটক!”
দিন দুয়েক হল পরাগব্রতর মনে সংসারী হওয়ার একটা চিন্তা কোথা থেকে যেন ঘুরপাক খেতে আরম্ভ করেছে। মন্দ কী? বাকি জীবনটা — তা যতদিনই বাকি থাকুক — মিনির সঙ্গে কাটানো? ভোরবেলা চোখ খুলে মিনির ঘুমন্ত মুখটা পাশে দেখে ভবিষ্যৎ কল্পনা করতে খারাপ লাগেনি। তারপর কোনও একদিন রিটায়ার্ড শ্বশুরের ড্রয়িং রুমে বসে আরাম করে শ্বশুরের বিলিতি হুইস্কি? একটা বা দুটো ছেলে-মেয়ে? না, অতদূর যাওয়া সম্ভব নয়। হীরে স্মাগলাররা কবে হাজির হবে… তাড়াতাড়ি তাই চোখ পাকিয়ে বলল, “চুপ।”
মিনি একটুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “মন্দ হত না — ভেবে দেখো — একদম শান্ত, মুখচোরা বউ হবে, চেঁচামেচি করে ঝগড়া করতে পারবে না।”
পরাগব্রত মিনির দিকে তাকিয়ে বলল, “চেঁচামেচি ঝগড়াঝাঁটি করলে তোমারও মুখ বেঁধে রেখে দেব, ব্যাস!”
মিনি ভেতরের ঘরে ঢুকতে যাচ্ছিল। পরাগব্রতর কথাটা বুঝতে একটু সময় নিল। তারপর থমকে ঘুরে দাঁড়াল। পরাগব্রত তখনও মিনির দিকে তাকিয়ে। মিনি বলল, “সত্যি?” দ্রুতপায়ে এগিয়ে এসে পরাগব্রতর জামার বুকের কাছটা খামচে ধরে বলল প্রায় চেঁচিয়ে বলল, “সত্যি?”
পরাগব্রত আস্তে আস্তে মিনিকে টেনে নিল কাছে। দু-দিন আগে থেকে ওর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টগুলো এক এক করে খালি করেছে। ওর যে ব্যাগটা নিয়ে আমোদপুর ছেড়ে এসেছিল, তাতে পরাগব্রত আর নাড়ুগোপাল চক্রবর্তী ছাড়াও আর একজনের আধার আর প্যান কার্ড আছে। তার নাম তীর্থঙ্করপ্রসাদ দাশ। তার সঙ্গে পরাগব্রত বা নাড়ুগোপালের কোনও সম্পর্ক নেই। নাড়ুগোপালের আধার কার্ড বানানোর সময় নামটা পরাগব্রত একেবারে আকাশ থেকেই প্রায় পেড়ে এনেছিল। বাড়ির ঠিকানাটা পেয়েছিল ইন্টারনেট থেকে। জলপাইগুড়ি শহরের একটা ইলেকট্রনিক্স জিনিসপত্রের দোকান। আজ নাড়ুগোপালের কোনও অ্যাকাউন্টে কোনও টাকা নেই। বস্তুত, নাড়ুগোপাল চক্রবর্তীর কোনও অ্যাকাউন্টই আর নেই কোথাও। সবই জিরো ব্যালেনস করে অনলাইনেই অ্যাকাউন্টগুলো বন্ধ করে দিয়েছে পরাগব্রত।
নতুন নামটা মিনিকে না জানালেও চলবে। নাড়ুগোপাল আর পরাগব্রত — এই দুটো নাম দিয়েই মিনি চালাক যতদিন সম্ভব। কিন্তু পরাগব্রতকে আরও কিছু আধার কার্ড তৈরি করতে হবে। যে রকম উল্কার গতিতে স্মাগলাররা ওর নাড়ুগোপালের সব খবর বের করে ফেলেছে, তাতে আরও কয়েকটা আধার কার্ড হাতে থাকা ভালো। তার জন্য যেতে হবে…
মিনি বলছে, “আমরা তো বিবাহিত দম্পতি হয়ে এখানে থাকতে পারব না — পুরী ছেড়ে যেতে হবে।”
পরাগব্রত বলল, “ইন্দোর।”
অবাক হয়ে মিনি বলল, “ইন্দোর? ইন্দোর কেন?”
“নয় কেন?” জানতে চাইল পরাগব্রত। “কাল ভোরবেলা বেরোলে সাতটার মধ্যে ভুবনেশ্বর, ন-টা চল্লিশের ফ্লাইটে দিল্লি। ঘণ্টা দুয়েক লাগবে নতুন করে বাজার করার জন্য? তারপর বিকেলে চারটে কুড়ির ফ্লাইট ধরে ইন্দোর। সেখানে মিঃ অ্যান্ড মিসেস পরিচয়েই না হয় শুরু করা যাবে?”
রাতে শুতে যাবার পরে মিনির টাকাভর্তি সুটকেস, আর নিজের ফোলিও ব্যাগটা মাথার কাছেই রাখল পরাগব্রত। কাল আর কিছু নিয়ে বেরোবে না। সকালে যদি অত্যুৎসাহী বাড়িওয়ালা বা তার বোন তালা খুলে ঢোকে-ও, ভাববে ভাই-বোন মন্দিরেই গেছে। শোবার আগে ফোলিও ব্যাগের ভেতরে হাত বুলিয়ে একটা জিপ লাগানো পকেটে প্লাস্টিক জিপ্লক ব্যাগে অ্যালুমিনিয়াম ফয়েলের মধ্যে, কাগজের মোড়কটা হাত দিয়ে অনুভব করল পরাগব্রত। ক্রিস্টালগুলো আপাতত কাজে লাগছে না। পরে দেখা যাবে। হয়ত ইন্দোরে... হয়ত বা তারও পরে, অন্য কোথাও... কে জানে...
~উপসংহার~
নিজের বাড়িতে বড়ো টেবিলের চারদিকে বসা সকলের দিকে তাকিয়ে রবিবাবু ডানহাতে টেবিল চাপড়ে সবার মনোযোগ আকর্ষণ করলেন।
“হামারা সব কাজ-কাম জো বাকি হ্যায় উসমে সবচে’ জরুরি হ্যায় ওই শুয়োরের বাচ্চা ভুবনব্রত কা হারামি কা ঔলাদ পরাগব্রত কো ঢুন্ডকে নিকালনা। আগের বার জলদিবাজি কিয়া বোলকে শালা ভাগ জানেকা সুযোগ পায়া, কিন্তু এবার সাবধানি সে করনা পড়েগা। সত্যজিৎ উসকা নাড়ুগোপাল নামকা আধার কার্ড কা নম্বর পা গিয়া। প্রভাতজী, আপনার ওই ব্যাঙ্কের আদমিটা ইসসে উসকা নয়া ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টকা খোঁজ পায়েগা না? ভেরি গুড, তব চালু হো যাও।”
শেষ