Sunday, March 07, 2021

অটরবটরপট




পৃথিবীতে অনেক টাইপের লোক আছে


 

মেডিক্যাল কলেজে পড়ার সময়ে একবার এক সিনিয়র দাদার থিসিস নিয়ে সমস্যা হয়েছিল। তিনি যত দিনে থিসিস লেখা শুরু করেছিলেন এবং তারপরে যত দিনে তাঁর গাইড সেটা শুধরে দিয়েছিলেন, তখন কোনও থিসিস টাইপিস্ট আর টাইপিং শুরু করতে রাজি হননি। তাঁদের বক্তব্য ছিল, এখন নতুন করে কাজ নিয়ে ডিউ ডেটের মধ্যে কাজ শেষ করে দিতে পারবেন এমন গ্যারান্টি নেইস্বর্ণেন্দুদা হন্যে হয়ে ঘুরছে, সবাই চিন্তিত, তখন আমি একদিন বলেছিলাম, “এমনি করে তো এক সপ্তাহ কেটেই গেল। কেউ যদি টাইপিং শুরু করে দিত, তাহলে হয়ত সময়মত শেষও হয়ে যেত।

হিন্দোল দাঁত খিঁচিয়ে বলেছিল, “বড়ো বড়ো কথা না বলে টাইপ করেই দাও না?”

আমি বলেছিলাম, “আমার টাইপ মেশিন থাকলে দিতাম বৈকি।”

এর ফল হয়েছিল এই, যে সেদিনই কলেজ থেকে ফেরার পথে হিন্দোলের বাড়ি থেকে টাইপ মেশিন তুলে নিয়ে এলাম। সারা সন্ধে টাইপ করলাম, স্বর্ণেন্দুদা আর হিন্দোল চোখ কপালে তুলে আমার ঝড়ের গতিতে টাইপ করা দেখল (ফিরবার পথে হিন্দোলকে বলেছিল, “ছোকরার স্পিড দেখে মনে হচ্ছে দু-সপ্তাহ পরে আজ রাত্তিরে ঘুমোতে পারব)। তার পরদিন থেকে ক্লাস শেষ করে এক ছুটে বাড়ি এসে আমি টাইপ করতে বসতাম।

দেখতে দেখতে মেডিক্যাল কলেজে রটে গেল, অনিরুদ্ধ স্বর্ণেন্দুদার থিসিস টাইপ করে দিচ্ছে। সবাই এসে নানা কথা বলতে শুরু করল: যদিও বেশিরভাগই সাধুবাদ বটে, কিছু অযাচিত পরামর্শ এবং ভয় দেখানোও চলত -অ্যামেচার টাইপিস্ট, খেয়াল রেখো তোমার টাইপং-এর ফলে স্বর্ণেন্দুদা এম.ডি.-টা. যেন ফেল না করেন।” তারা সবাই বিশ্বাস করত যে পরীক্ষকরা পরীক্ষার্থীর থিসিস পড়ে দেখেন। বলা বাহুল্য – আমিও তখন বিশ্বাস করতাম

একদিন ক্যান্টিন গেছি, দেখা হল দেবু-দার সঙ্গে। “কী রে দাড়ি, কেমন লাগছে থিসিস টাইপ করতে?”

বললাম, “দেবুদা, একটা ঘটনা ঘটছে, সেটা শুনে আর কেউ না হোক, তুমি মজা পাবে। এতদিন কলকাতার পথে পথে ঘুরে বেড়িয়েছি, কোনও দিন কোথাও আলাদা করে থিসিস টাইপিস্ট দেখিনি। স্বর্ণেন্দুদার থিসিস টাইপ করা শুরু করেই দেখছি সর্বত্র থিসিস টাইপিস্ট থিকথিক করছে। এই ধরো কলেজ স্ট্রীট থেকে আমহার্স্ট স্ট্রীট ভিতরের গলি দিয়ে হেঁটে যাও, দুটো দরজা পরে পরেই থিসিস টাইপ করনেওয়ালার সাইনবোর্ড। আগে কখনও চোখেপড়েনি। এমন কী, ভাবতে পারো, সেদিন গ্রীক অরথোডকস চার্চের পিছনের গলিতে একটা দরজায় দেখি একটা বোর্ডে লেখা, এখানে থিসিস টাইপ করা হয়।”

শুনে দেবুদার মুখটা হাসি হাসি হয়ে গেল। বলল, “এর থেকে কী প্রমাণ হয় বলত?”

বুঝলাম দেবুদার মাথায় কিছু একটা এসেছে, বললাম, “কী?”

দেবুদা বলল, “এর থেকে প্রমাণ হয়, পৃথিবীতে অনেক টাইপের লোক আছে।”


*

১৯৭৯ সাল। সবে স্কুল শেষ করেছি। একদিন পরিচিত একজন বললেন, “শোন, দূরদর্শনে একটা প্রোগ্রাম করবি?”

১৯৭৫ সালে কলকাতায় প্রথম টিভি দেখেছিলাম আমরা – টাইগার পতৌদীর নেতৃত্বে ক্লাইব লয়েডের ওয়েস্ট ইণ্ডিজ দলকে ভারতীয় দল হারিয়েছিল ইডেন গার্ডেনে – ভগবত চন্দ্রশেখর যা বোলিং করেছিল ভাবা যায় না – আর গুণ্ডাপা বিশ্বনাথের সেই অনবদ্য ১৩৯ – ওই স্কোয়ার কাটটা যা মেরেছিল, বলটা এখনও যাচ্ছে – থামেনি!

তখন দূরদর্শনে শুধু স্থানীয় অনুষ্ঠান হয়, সারা দেশে একই অনুষ্ঠান দেখা শুরু হয়নি।

একটা কুইজ কনটেস্ট হবে বিশ্ব বন্যপ্রাণী সপ্তাহ উপলক্ষে। আমি কুইজ মাস্টার – তুই তোর তিনজন বন্ধু নিয়ে আসবি। একজন ছেলে, দু’জন মেয়ে। একটা ছেলে আর একটা মেয়ে – এমন দুটো টিম হবে। এমন কিছু প্রোগ্রাম নয়। শুধু লোকজনের অ্যাওয়ারনেস বাড়ানো আর কি।”

বেশ, হবে। কিন্তু খুব কঠিন প্রশ্ন কোরো না।”

আরে না, না, আম-পাবলিক দেখবে – খুব কঠিন করলে বাজে হবে।”

নির্দিষ্ট দিনে আম-পাবলিক অ্যাওয়ারনেস বাড়ানোর জন্য চান করে, চুল আঁচড়িয়ে পৌঁছেছি দূরদর্শন কেন্দ্রে – টালিগঞ্জে বাঙ্গুর হাসপাতালের পাশে। গেটে দারোয়ান বলল, “লাইভ প্রোগ্রাম? ওই দিকে যান, বলবেন – মেক-আপ রুম।”

পৌঁছলাম একটা বসার ঘরে দুটো সোফা সেট রাখা রয়েছে - একজন ভদ্রলোক বসে আছেন, ভারিক্কে চেহারা... না, একেবারে রাশভারি। মোটা চুরুট খাচ্ছেন, আর এমন ভাব করছেন যেন তিনি ছাড়া ওই ঘরে কেউ নেই।

আমরা গল্প করছি, এমন সময়ে দরজা ঠেলে ঢুকলেন একজন ভদ্রলোক। বললেন, “মিঃ লাহিড়ী, মেক-আপ করতে মেক-আপ ম্যান এখানেই আসছে – আপনাকে যেতে হবে না।”

বজ্রগম্ভীর গলায় ভদ্রলোক বললেন, “হুঁ!”

বলতে না বলতেই ঢুকলেন আরেকজন। হাতে একটা টিফিন বাক্স টাইপের বাক্স বললেন, “কার মেক-আপ?”

অন্যজন যিনি আগে ঢুকেছিলেন, বললেন, “এই যে! ইনিই মিঃ লাহিড়ী।”

মেক-আপ ম্যান মিঃ লাহিড়ীর সামনে দাঁড়ালেন। দুজনের মাঝখানে সোফা সেট-এর সঙ্গী নিচু সেন্টার টবিল। হাতের ছোটো বাক্সটা নামিয়ে রাখলেন, তারপর ঘটাস করে জুতো পরা ডান পা তুলে দিলেন টেবিলে, ডান হাতের কনুই নিজের হাঁটুর ওপর রেখে ঝুঁকে পড়ে নিষ্পলক চেয়ে রইলেন মিঃ লাহিড়ীর মুখের দিকে, যেন কোনও আশ্চর্য সুন্দর চিত্রকলা দেখছেন।

চেয়েই আছেন, চেয়েই আছেন, মিঃ লাহিড়ী খানিকক্ষণ পরে অস্বস্তিবোধ করতে শুরু করেছেন, মুখটা ঘুরিয়ে নিলেন। ওমনি মেক-আপ ম্যান হাত বাড়িয়ে থুতনি ধরে আবার মুখটা ঘুরিয়ে দিলেন নিজের দিকে। আর খানিকক্ষণ পরে বললেন, “হুম!” বাক্স খুলে একটা টিস্যু বার করে ঘষে ঘষে মিঃ লাহিড়ীর মুখটা আর মাথাটা মুছে দিলেন। তারপর একটা পাউডার পাফ বের করে শুকনো কিছু পাউডার লাগালেন ঘষে ঘষে। এই সময়ে মিঃ লাহিড়ী একটু আপত্তিসূচক শব্দ করাতে মেক-আপ ম্যান খ্যাঁক করে উঠলেন, “আঃ চুপ করে বসুন, পাউডার না দিলে স্টুডিয়োতে আলো পড়লে টাক এমন চকচক করবে যে মনে হবে যেন মাথায় সার্চলাইট লাগিয়ে বসে আছেন।”

লাহিড়ী চুপ করে বসে রইলেন; মুখে কাপড়, কাগজ, শিরিস কাগজ ঘষা হলো – নানারকম রঙ লাগানো হলো, ঠোঁটে লিপস্টিক লাগানো হলো (মেয়েরা আমাদের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল – ভাবখানা এই যে: তোমাদেরও হবে, দেখো) তারপর নিয়ে যাওয়া হলো ওই ঘর থেকে।

খানিক পরে আরেকজন এসে বললেন, “তোমরা লাইভ কুইজ? এসো।”

আমরা গেলাম মেক-আপ রুমে। এক সারি আয়নার সামনে আমাদের বসিয়ে চুল আঁচড়ানো, মুখ মোছা, লিপস্টিক লাগানো এসব করা হলো। আমরা একটুও আপত্তি করিনি তা নয়, কিন্তু বলা হলো, এইটুকু না করলে টিভিতে ঠোঁটগুলো কালো কালো লাগবে – তাই কিছু বললাম না। ও হ্যাঁ, একটা কথা বলা হয়নি: তখন টিভিতে রঙ দেখা যেত না, সাদা কালো ছিল।

যথাসময়ে পৌঁছলাম স্টুডিওর ভিতরে। এর আগে টিভি স্টুডিওতে কখনও ঢুকিনি। দেখে চক্ষু চড়কগাছ! এ আবার কী? একটা কোনায় আমাদের বসার জায়গা; আর একটা দেওয়ালের সামনে বসে আছেন তখনকার বিখ্যাত একজন সংবাদ-পাঠিকা – কিন্তু স্টুডিওর বাকিটা অন্ধকারে ঢাকা – দেখে মনে হচ্ছে গোডাউন – রাজ্যের কাঠের টুকরো, প্যাকিং বাক্স, বিভিন্ন রঙের ছোটো বড়ো প্যানেল চারিদিকে ছড়ানো।

সামনে মাইক রেখে ভয়েস টেস্ট করতে করতে খবরের সময় হয়ে গেল, সকলে আমাদের দিকে তাকিয়ে ঠোঁটে আঙুল দিয়ে চুপ করতে বলে চলে গেল। আমাদের দিকের আলো কমে এল, উজ্জ্বল আলো রইল শুধু সংবাদ পাঠিকার উপরে।

সংবাদের পরেই আমাদের কুইজ শুরু হবার কথা। কিন্তু খবর শেষ হবার পরে স্টুডিওর ভিতরের মনিটর টিভির ওপরে দেখলাম লেখা ভেসে উঠল: ‘পরবর্তী অনুষ্ঠান কিছুক্ষণের মধ্যেই শুরু হবে’। একটা কাচের দেওয়ালের ওপার থেকে একজন হাত নেড়ে কিছু একটা ইশারা করলেন, আর ঘরের মধ্যে একজন ক্যামেরাম্যান একটা ক্যামেরা আমাদের দিক থেকে ঘুরিয়ে নিয়ে বললেন, “ফিলার ছবিগুলো নিয়ে আয়।”

দুটো অনুষ্ঠানের মধ্যে কোনও বাড়তি সময় থেকে গেলে তখন বিজ্ঞাপন বাদে যে ছবি দেখানো হয় তাকে ফিলার বলে, সুতরাং এর মানে এই হল যে আমাদের অনুষ্ঠান শুরু হতে আরও কিছু দেরি আছে।

অন্ধকার একটা কোণা থেকে কেউ একজন বেরিয়ে এসে বলল, “ফিলার কোথায়?”

দেখ, ওইখানে কোথাও।”

লোকটা এদিক ওদিক তাকিয়ে বলল, “কই?”

ততক্ষণে কাচের ওপার থেকে হাত-পা নাড়ার গতিবেগ বেড়ে গেছে!

লোকটা এদিক ওদিক তাকিয়ে “একটা জিনিস যদি কেউ ঠিক জায়গায় রাখে” বলে খুঁজতে থাকল, আর ক্যামেরাম্যানও, “ওখানটা দেখ ... ওই ব্যাগটা সরিয়ে দেখ...” বলে বলে নির্দেশ দিতে থাকলেন। শেষে একজন সিনিয়র মতন ভদ্রলোক ভিতরে ঢুকে ধমকের সুরে, “কী হচ্ছেটা কী? ফিলার কী হল?” বলামাত্র লোকটা দরজার পাশের একটা টুল থেকে কয়েকটা কার্ডবোর্ডের টুকরো তুলে নিয়ে বলল, “এই তো! একটা জিনিস যদি কেউ ঠিক জায়গায় রাখে ...”

ক্যামেরার সামনে একটা কাঠের স্ট্যাণ্ড – মাথায় একটা কাঠের পাটা, ছ’ ইঞ্চি বাই চার ইঞ্চি মতসাইজ। তার সঙ্গে একই সাইজের একটা কাঠের পাটা ইংরিজি ‘এল’-এর মতো করে লাগানো। লোকটা কার্ডবোর্ড-এর টুকরোগুলো এনে খাড়া করে ওই পিছনের কাঠের সঙ্গে হেলান দিয়ে সোজা করে দাঁড় করাল। আমরা বুঝলাম, যে ক্যামেরাটা চালু হলে ওই কার্ডবোর্ডের সঙ্গে সাঁটা ছবিটা ধরা পড়বে। খানিকক্ষণ পরে পরে সামনের কার্ডবোর্ডটা আঙ্গুল দিয়ে ঠেলে মুখ থুবড়ে ফেলে দিলেই পরের কার্ডবোর্ডের ছবিটা বেরিয়ে পড়বে।

প্রথম কার্ডবোর্ডটা কালো – ছবি নেই। ক্যামেরাম্যান ফোকাস ঠিক করে নিয়ে বললেন, “হ্যাঁ শুরু করো”, আর লোকটা প্রথম কার্ডবোর্ডটা আঙুল দিয়ে ফেলে দিল।

তখন অক্টোবর মাস, পুজো শেষ, কালীপুজো আসছে। তাই ফিলারের ছবিগুলো সব কালীপুজো নিয়ে। দূরদর্শনে এগুলো গত কয়েকদিন হলো রোজই দেখছি।

প্রথম ছবিটা অন্ধকার আকাশে আতসবাজি ফাটার। কালো ব্যাকগ্রাউণ্ডে সাদা সাদা আলোর ফুটকি। ক্যামেরাম্যান এক লহমা দেখেই বললেন, “উলটো।”

যে লোকটা ছবিগুলো রেখেছিল, সে বলল, “উলটো?”

সাউণ্ড এঞ্জিনিয়ার, যিনি আমাদের ভয়েস টেস্ট করছিলেন, বললেন, “উলটো?”

অন্য ক্যামেরাম্যান বললেন, “উলটো?”

তিনটে উলটো শুনে ক্যামেরাম্যান রেগে গিয়ে বললেন, “বলছি উলটো, তো সবাই মিলে উলটো উলটো করার কী হয়েছে?”

সাবাই নিজের জায়গা ছেড়ে এসে ছবির সামনে দাঁড়ালেন (সামনে মানে একেবারে সামনে নয়, পাশ থেকে)। আমরাও স্টুডিওর ভিতরে নিঃশব্দ টিভিতে ছবি দেখছি। কালো ব্যাকগ্রাউণ্ডে সাদা ফুটকি – উলটো আবার কী?

ক্যামেরাম্যান আবার বললেন, “ছবিটা উলটো – ওপরটা নিচে, নিচেটা ওপরে।”

কী করে বুঝলি?” কে জানতে চাইল।

রোজ দেখাচ্ছি ছবিটা, দেখে বুঝব না?”

কী জানি বাপু।”

চেঞ্জ কর, চেঞ্জ কর।”

লোকটা ছুটে গিয়ে ছবিটা ফেলে দিতেই পিছনের ছবিটা বেরিয়ে এল। একটা চরকি।

এটাও উলটো”, বললেন, ক্যামেরাম্যান। “গোছাটাই উলটে রেখেছিস।”

কিন্তু অসুবিধা কী?” বললেন কে একজন “এই ছবির তো সোজা উলটো নেই।”

নেই বুঝি?” একটু হেসে বললেন ক্যামেরাম্যান, “বেশ তাই নয় হলো।”

ছবি দেখানো চলল। পটকা, ফুলঝুরি, আতসবাজির ছবি শেষ করে দেখা গেল একটা তুবড়ি।

উলটো। এবার আর বলতে হল না সব্বাই দেখতে পেল উলটো

তারপরের ছবিটা কয়েকটা বাচ্চা ফুলঝুরি নিয়ে খেলছে। ফুলঝুরিগুলো উজ্জ্বল, কিন্তু তাদের পিছনে ছায়া ছায়া মানুষের চেহারাগুলো উলটো। তারপরের ছবিতে কেউ ফুলঝুরি দিয়ে ‘শুভ দীপাবলী’ লিখেছে - উলটো। তার পরেরটা একটা প্যাণ্ডেলে আলোর রোশনাই – সেও উলটো। বাইরের সেই ভদ্রলোক আবার ঢুকে পড়েছেন, যে ছবিগুলো দেখামাত্র বোঝা যাচ্ছে উলটো, সেগুলো সামনে আসতেই “চেঞ্জ - চেঞ্জ” করে চেঁচাতে লাগছেন। প্যাণ্ডেলের ছবি আসতেও “চেঞ্জ – চেঞ্জ” শুরু করলেন, আর লোকটাও পট্‌ করে ছবিটা ফেলল, আর শেষ কার্ডবোর্ডটা বেরিয়ে এল।

*

অনেক বছর পরে – তিরিশ বছরেরও পরে – সেদিন দূরদর্শনে আবার ডাক পড়ল। নামী স্কুলের একটি ছেলে আত্মঘাতী হবার কিছুদিন পরে ছেলেটির বাবা পুলিশের কাছে নালিশ করেছেন, যে প্রধান শিক্ষকের বেত্রাঘাতের কারণেই এই আত্মহনন। বাঙালী, তথা ভারতীয়, স্বভাব অনুযায়ী সবাই হাহাকার করা শুরু করেছেন, গেল-গেল রবে চারিদিক সচকিত – কিন্তু এ-ও বোঝা যাচ্ছে, যে আসলে কারোই মাথাব্যথা নেই – এ হেন সময়ে দূরদর্শন থেকে টেলিফোন।

আমি ওমুক স্যার, আমি দূরদর্শনে ‘প্রোডুসার’। আমাদের একটা অনুষ্ঠানে আর কী, আপনি যদি একটু আসেন, আমরা ইস্কুলে কর্পোরাল পানিশমেন্ট নিয়ে করব। আর থাকবেন ডায়মণ্ড হারবারের ওদিকে এক ইস্কুলের হেড স্যার আর কলকাতার এক ইস্কুলের অঙ্ক দিদিমণি। আমাদের লাইভ ফোন-ইন প্রোগ্রাম, দর্শকরা ফোন করবেন, আর এ-ছাড়া দুটো রেকর্ডিং – আমরা ইস্কুলের বাচ্চাদের জিজ্ঞেস করেছিলাম, তারা বলেছে যে শাস্তি পেতে তাদের ভালোই লাগে – তাদের হোমওয়ার্ক করতে সুবিধা হয়।”

আমি অবাক! একবার ভাবলাম, যাব না। তারপরে মনে হল, দূরদর্শন যদি দুজন স্কুল শিক্ষককে দিয়ে ‘শাস্তি ভালো’ বলানোর চেষ্টা করে তাহলে নিশ্চয়ই আমার ওখানে গিয়ে অন্য কথা বলা উচিত।

বললাম, “নিশ্চ যাব।”

শনিবার দুপুরের অনুষ্ঠান – বৃহস্পতিবার সকাল ১০টায় ফোন। সেই ‘প্রোডুসার’। বললেন, “স্যার, আপনাকে আজ একবার আসতে হবে।”

আবদার! বললাম, “আজ কেন? অনুষ্ঠান তো শনিবার।”

একটা কনট্রাক্ট সই করার আছে যে।”

বললাম, “কী কনট্রাক্ট? সেটা কি দিনেরটা দিনে করা যায় না?”

না স্যার,” ওপার থেকে আর্তনাদ ভেসে এল। “কাল দুপুর বারোটার মধ্যে কনট্র্যাক্ট জমা না দিলে আপনার চেকটা শনিবারের মধ্যে তৈরি করা যাবে না – আবার আপনাকে আরেকদিন আসতে হবে। নইলে ডাকে পাঠালে হারিয়ে যাবে।”

সে বলে আর কথা, এক সরকারি সংস্থা অন্য এক সরকারি সংস্থাকে কতই বিশ্বাস করে!

আর তাছাড়া,” বলে চললেন তিনি, “অনুষ্ঠানের আগে আপনার উচিত সঞ্চালকের সঙ্গে কথা বলা, সেজন্যও তো আপনার আসা উচিত।“

বললাম, “দেখুন আমি এখন শহরের অন্য প্রান্তে। দূরদর্শন কেন্দ্র থেকে অন্তত তিরিশ কিলোমিটার দূরে। আর আপনি যদি মনে করেন যে আমার কোনও কাজ নেই, আপনি ‘আয়’ বললেই আমি পৌঁছে যাব, তাহলে কিন্তু ভুল করছেন।”

সঙ্গে সঙ্গে সুর পালটে গেল।

না, না, তা নয়, আসলে উনিই আপনার সঙ্গে কথা বলতে চাইছিলেন। আপনি সই করবার জন্য কাল আসতে পারবেন?”

কাল হলে সকাল সাড়ে আটটা থেকে ন’টা, নয়ত সাড়ে দশটা থেকে এগারোটার মধ্যে। কখন হলে আপনার সুবিধে হবে?”

সাড়ে দশটা?” চিন্তান্বিত গলা শুনলাম।

বললাম, “আমি সাড়ে দশটা নাগাদ গলফ গ্রীনের কাছে একটা হাসপাতালে থাকব। কিন্তু এগারোটায় আমাকে ক্লিনিকে পৌঁছতেই হবে।“

সাড়ে এগারোটাতে আসতে পারবেন?”

দাঁত কিড়মিড় করে বললাম, “বললাম তো, আমি এগারোটা থেকে আমার কাজের জায়গায় থাকব, এরপর আমি চারটে নাগাদ আসতে পারব।”

না, না, আপনি সাড়ে দশটাতেই আসুন।”

সাড়ে দশটায় পৌঁছে ‘প্রোডুসার’-কে ফোন করলাম, উনি বললেন, “আপনি সোজা ভিতরে চলে আসুন, আমি নামছি নিচে।”

গেলাম ভিতরে। বিশাল জমি, তার ওপারে বিশাল বাড়ি। আন্দাজে ভর করে এগোলাম, একটুখানি এগোতেই দেখি একটা দরজা দিয়ে হস্তদন্ত একজন বেরোলেন; আমাকে দেখে এগিয়ে এসে বললেন, “আসুন। আমি ওমুক – ‘প্রোডুসার’।”

গেলেন আমাকে নিয়ে তিনতলায়। টেবিল জোড়া একটা রেজিস্টার বের করলেন। পাতা উলটে উলটে আমার নাম খুঁজলেন: “অনিরুদ্ধ দেব, অনিরুদ্ধ দেব... হ্যাঁ, এই তো। এই যে, এইখানে আপনি সই করুন।” খাতাটা আমার সামনে ধরে বললেন, “দেখুন আপনার আগে কতজন সই করেছেন – এক, দুই, তিন, চার, পাঁচ, ছয়, সাত, আট... এরপর আপনি সই করবেন, তারপরে আরও অন্তত চারজনের সই হলে তবেই চেক তৈরি হবে। ভাবতে পারেন আমাদের খাটনিটা? এই যে আপনি যে সাড়ে এগারটাতে না এসে এখন এলেন, আমাকে কিন্তু একটা মিটিং ছেড়ে উঠে আসতে হল।”

চিড়বিড়িয়ে উঠতে যাচ্ছি, উনি বলতে থাকলেন, “আর জামা – এই জামা কিন্তু এক্কেবারে চলবে না, কোনও স্ট্রাইপ না, চেক না, সাদা তো নয়ই – ডার্ক রং পরলে সব চেয়ে ভালো হয়।”

কালো?” জানতে চাইলাম।

হ্যাঁ, কালো চলবে – ডার্ক ব্লু কিংবা ডার্ক গ্রীন পরতে পারেন।”

পরদিন, তিনটের অনুষ্ঠানের জন্য নির্দেশমতো দু’টোর সময়ে পৌঁছলাম দূরদর্শন কেন্দ্রে। একটা গেটের গায়ে লেখা: বিনা অনুমতিতে বহিরাগতদের প্রবেশ নিষেধ। গার্ড ঘরের দিকে তাকিয়ে দেখি সি.আই.এস.এফ.-এর বন্দুকধারী জওয়ান আমার দিকে তাকাচ্ছেই না। মনে হল, আমি আমন্ত্রিত না অবাঞ্ছিত সেটা তিনি জানলেন কী করে?

ফোন করলাম ‘প্রোডুসার’-কে। তিনি বললেন, “এসে গেছেন? স্টুডিওতে চলে যান, মেক-আপ রুমে। ওখানে আপনার সঞ্চালক আর অন্য প্যানেলিস্ট অপেক্ষা করছেন। আমিও আসছি।”

চতুর্দিক শুনশান। কাউকে দেখা যায় না। ঢুকে দেখি ডাইনে-বাঁয়ে লম্বা লম্বা করিডোর – সব ফাঁকা। খানিকটা এদিক ওদিক ঘুরলাম, বিশাল বাড়িতে জনমানুষ নেই। রূপকথার গল্পে দানুবের পুরী। আমি যদি সন্ত্রাসবাদী হতাম, মনের আনন্দে সর্বত্র আর.ডি.এক্স রেখে চলে যেতে পারতাম, কেউ বুঝতও না।

বেরোলাম, দূরে পার্ক করা গাড়ির সামনে দুজন। গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “স্টুডিও কোথায়?”

যে দরজা দিয়ে ঢুকেছিলাম, তার পাশের একটা দরজা দেখিয়ে দিলেন। আবার ঢুকলাম, আবার একই অবস্থা: কেউ কোত্থাও নেই। খানিকটা এধার ওধার হেঁটে দেখি একটা ডেস্কের সামনে একজন বসে ঢুলছেন, আমি কাছে যেতে এক চোখ মেলে বললেন, “মেক-আপ রুম যান।”

এমন অন্তর্যামীর পাল্লায় পড়ব ভাবিনি, বললাম, “কোনদিকে?”

হাত তুলে বললেন, “ডানদিকে, তারপর সোজা গিয়েই বাঁদিকে সোজা।”

বলে আবার ঘুমিয়ে পড়লেন।

আমি অনির্দিষ্ট পথে চলতে চলতে দরজার পর দরজা পার করছি যেন সারিয়ালিস্ট ছবির স্বপ্ন। শেষে, পেলাম একটা দরজা – গায়ে কাগজ সেঁটে লেখা আছে, মেক-আপ রুম। দরজার ওপারে আর একটা করিডোরের শেষে আরেকটা দরজায় হলদে-হয়ে-যাওয়া আধখোলা কাগজে আবার লেখা : ‘মেক-আপ রুম’। এবার নিঃসন্দেহে মেক-আপ রুম: সেই পরিচিত দেওয়ালে লাগানো লম্বা টেবিল, দেওয়ালে সাঁটা আয়নার তিন দিকে বড়ো বড়ো আলোর ডুম। চেয়ারগুলো চারিদিকে ছড়ানো, কোনওটার ওপর আধখোলা ব্যাগ – চারিদিকে খালি সিগারেটের প্যাকেট। মানুষ নেই।

ঘরটার শেষে বন্ধ দরজার গায়ে কাগজ সেঁটে লেখা: ‘দরজা সব সময় বন্ধ রাখুন’।

বন্ধ দরজা ঠেললাম। আরও একটা মেক-আপ রুম। এটাতে প্রাণের সাড়া মিলল। বিশাল ঘরের দূরের দেওয়ালে ছ-টা আয়না। প্রত্যেকটার পাশে আর ওপরে মিলিয়ে পাঁচটা করে ২০০ ওয়াটের ডুম। তিরিশটা বাল্ব জ্বলে রয়েছে। ঘোঁ–ঘোঁ শব্দে তিনটে এ. সি. মেশিন চলা সত্ত্বেও ঘরটা ঠিক ঠান্ডা নয়। চলনসই।

মাত্র একটা আয়নার সামনেই একজন বসে নিজের প্রতিবিম্ব নিরীক্ষন করছেন, আরেকজন মেক-আপ ম্যান তাঁকে সাজাচ্ছেন। ঘরের অন্য দিকের দেওয়াল ধরে প্রচুর সোফা, তার মধ্যে একটিতে একজন বসে আছেন, আমাকে ঢুকতে দেখে একগাল হেসে বললেন, “বসুন বসুন”, বলে হাতের চেটো দিয়ে নিজের পাশের জায়গাটা চাপড়ালেন।

বসে জিজ্ঞেস করতে যাব, “আমি অনিরুদ্ধ দেব। আপনিই কি সঞ্চালক ওমুক চন্দ্র ওমুক?” কিন্তু আমি বসা মাত্র উনি আমার থেকে নজর সরিয়ে নিয়ে মেক-আপ ম্যানকে বললেন, “টিকিটা খাড়া করে দাও।”

মেক-আপ ম্যান সামনে-বসা অভিনেতার পরচুলার ঝুঁটি ধরে একটা রবার ব্যাণ্ড পাকিয়ে জড়িয়ে দিলেন। কিন্তু সেটা ছাড়া মাত্র লটকে পড়ল।

স্প্রে দাও,” বললেন আমার পাশে বসা ভদ্রলোক।

স্প্রে দেওয়া হল, টিপে টিপে শক্ত করা হল টিকিটাকে। এবার ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শক্ত চুলের ঝুঁটিটা সবটাই শুয়ে পড়ল। মেক-আপ ম্যান একটা ঝাঁটার কাঠি ভেঙে সেটাকে গুঁজে গুঁজে ঢোকালেন চুলের গুচ্ছের মধ্যে। এইবার আধখানা টিকি খাড়া হয়ে রইল। সবাই খুব খুশি – অভিনেতা চলে গেলেন, মেক-আপ ম্যান ঘরের দূর প্রান্তে গিয়ে একটা তিনতলা টিফিন ক্যারিয়ার খুলে সাজিয়ে বসে, ভাত, ডাল, মাছের ঝোল খেতে লাগলেন, আর অন্য ভদ্রলোক পা ছড়িয়ে চোখ বন্ধ করলেন।

আমি কী করব ভাবছি, এমন সময়ে দরজা খুলল। ঢুকলেন কটকটে হলদে আর লাল বাটিকের নক্সা কাটা শার্ট পরা এক ভদ্রলোক, সঙ্গে একজন বয়স্ক মহিলা। ভদ্রলোক একবার আমার দিকে তাকালেন তারপর আমার পাশে বসা ভদ্রলোকের দিকে তাকালেন, তারপর গটগট করে ঘরের একেবারে ভিতরে গিয়ে ভোজনরত মেক-আপ ম্যানকে জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি ডাঃ অনিরুদ্ধ দেব?”

বেচারা মেক-আপ ম্যান তখন সবে মাছের ঝোল মাখা ভাত এক গরস মুখে দিয়েছেন। এরকম প্রশ্নে তিনি একেবারে ঘাবড়ে গিয়ে মুখ থেকে হাত নামাবার আগেই মাথা নেড়ে এবং ম্‌-ম্‌-ম্‌ শব্দ করে জানালেন, যে তিনি না। এবার হলুদ শার্ট অসহায়ভাবে ফিরে আমাদের দিকে তাকালেন। ঘরে তিনজন উপস্থিত, তার মধ্যে তিনি যাঁকে মনে করেছেন ডাঃ দেব তিনি ফলস হয়ে গেলেন, এবার বাকি দু’জনের মধ্যে কাকে জিজ্ঞেস করবেন, সেটা স্বাভাবিকভাবেই মনস্থ করা আরও কঠিন হয়ে গেল, এমন সময়ে ঘুমন্ত ভদ্রলোক উঠে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে মেক-আপের সরঞ্জাম গোছাতে শুরু করে ব্যাপারটা আরো কঠিন করে দিলেন।

ততক্ষণে আমিও উঠে দাঁড়িয়েছি, হলুদ শার্ট আমার দিকে তাকালেন, আমি বললাম, “আমি অনিরুদ্ধ দেব।”

ভদ্রলোক অমায়িক হেসে এগিয়ে এসে বললেন, “আমি ওমুক চন্দ্র ওমুক, ওমুক স্কুলের হেডমাস্টার, অনুষ্ঠানের অ্যাঙ্কর, আর ইনি হলেন তমুকদি, তমুক স্কুলের অঙ্কশিক্ষিকা।”

নমস্কার বিনিময়ের পরে আবার সোফায় বসলাম, একদিকে আমি, একদিকে অঙ্ক শিক্ষিকা, আর মাঝখানে সঞ্চালক। সঞ্চালক একটা প্যাড খুলে আমাকে বললেন, “আমরা কী ভাবে এগোব বলি – অনুষ্ঠান শুরু হবার পর আমি প্রথম প্রশ্ন করব দিদিকে, শিক্ষিকা হিসেবে – এইটা। আর তারপরে আপনাকে, মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ হিসেবে এইটা, তারপরে একটা প্রশ্ন দিদিকে, একটা আপনাকে, এমনভাবে এগোব, মাঝে-মাঝে একটা-দুটো ফোন নিয়ে নেব।”

আমি বললাম, “কিন্তু আমি যে শুনলাম কিছু রেকর্ডিং আছে, যেখানে স্কুলের বাচ্চারা বলছে যে তাদের শাস্তি পেতে ভালো লাগে: সেগুলো দেখানো হবার পর সেগুলো নিয়ে আলোচনা করা উচিত নয় কি?”

সঞ্চালক উত্তেজিত হয়ে বললেন, “নিশ্চয়ই। যেমনি সেগুলো দেখাবে আমি আপনাকে জিজ্ঞেস করব আপনি কিন্তু ওই কথাটা বলতে ভুলবেন না, যেটা আমাকে টেলিফোনে বলেছিলেন: ডিসিপ্লিন করতে গেলেই শাস্তির প্রয়োজন, এটা ভুল কথা।”

আমি সঞ্চালকের সঙ্গে কথা বলছি, আর অঙ্ক শিক্ষিকা তাঁর ওদিকে বসে কী একটা খাতা নিয়ে মন দিয়ে পড়ে চলেছেন: অঙ্কের হোমওয়ার্কের মতো দেখাচ্ছে না, কিন্তু আমি বুঝতেই পারছি না কী ওটা। হঠাৎ কথার মাঝখানে বললেন, “আমাকে যে ২ নং প্রশ্নটা করবেন, সেটা কী?”

সঞ্চালক বললেন, “আপনাকে ২নং মানে আমার ৩নং প্রশ্ন... এই যে, এইটা।”

ভদ্রমহিলা প্রশ্নটা পড়ে নিয়ে নিজের খাতাটা সঞ্চালককে দিয়ে বললেন, “আমি যদি তার উত্তরে এটা বলি, তাহলে ঠিক আছে?”

সঞ্চালক খাতাটা হাতে নেবার পর আমি দেখলাম তাতে ১, ২ করে সব প্রশ্নের উত্তর লেখা আছে। ২নং উত্তর পড়ে সঞ্চালক খাতা ফেরত দিয়ে বললেন, “হ্যাঁ, হ্যাঁ, ঠিক আছে,” আর ভদ্রমহিলাও আবার দুলে-দুলে খাতা মুখস্ত করতে লাগলেন।

আমি বিড়বিড় করে বললাম, “হায় হতোস্মি!” কেউ শুনতে পেল না।

এমন সময়ে ঝড়ের মতো ঘরে ঢুকলেন ‘প্রোডুসার’, আমাদের দেখে বললেন, “আপনাদের কথা শেষ হয়েছে?” আমরা বললাম, “হ্যাঁ”। একে একে সঞ্চালক, অঙ্ক শিক্ষিকা আর আমাকে গিয়ে বসতে হল আয়নার সামনে, সেখানে চুল আঁচড়ানো হল, মুখে পাউডার লাগানো হল, একটা ছোট্ট, প্রায় এক পোয়া ইঞ্চি চিরুনি দিয়ে ভুরু আঁচড়ানো হল, এবার লিপস্টিক লাগানো হল না বোধহয় রঙিন টিভি বলেই। মেক-আপ শেষ করে আবার সবাই দরজায় দাঁড়িয়ে এটা-সেটা গল্প করছেন, আমি ‘প্রোডুসার’কে বললাম, “তিনটের সময় প্রোগ্রাম না?”

প্রোডুসার’ বললেন, “হ্যাঁ, তিনটে।” বলে আবার গল্পে মন দিলেন। আমি আবার বাধা দিয়ে বললাম, “এখন তো দুটো পঞ্চান্ন – স্টুডিওতে ঢুকব কখন?”

বলা মাত্র সবাই ঘড়ি দেখলেন – ‘প্রোডুসার’ বললেন, এই দেখুন, কী কাণ্ড! চলুন! চলুন! চলুন!” বলে এদিক ওদিক দৌড়োদৌড়ি শুরু করলেন, সঞ্চালকের দিকে তাকিয়ে বললেন, “ও হ্যাঁ, টেপটা পাওয়া গেছে।”

সঞ্চালক বললেন, “কোথায় ছিল?”

প্রোডুসার’ বললেন, আরে উলটো করে ঢোকানো ছিল কেস-এ। তাই কী লেখা আছে দেখা যাচ্ছিল না। আর কভারে তো অন্য কিছু লেখা, তাই...” বলে ছুটে চলে গেলেন স্টুডিওর দিকে।

আমি সঞ্চালকের পাশে হাঁটছিলাম, বললাম, “কিসের টেপ পাওয়া যাচ্ছিল না?”

সঞ্চালক নির্বিকারভাবে বললেন, ‘ওই যে, স্কুলের বাচ্চাদের ইন্টার্ভিউ করে টেপ হয়েছিল না? সেই টেপগুলো কোথায় রেখেছিলেন খুঁজে পাচ্ছিলেন না।”

আমরা স্টুডিওতে ঢুকলাম। ‘প্রোডুসার’ আমাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন – আমি ওঁর ঠিক পেছনে। ঘুরে তাকিয়ে আমাকে বললেন, “ডা. দেব, আপনি ওই কোনার চেয়ারটায় বসুন।” বলে আবার আমাকে একবার আপাদমস্তক দেখে নিয়ে বললেন, “কিন্তু আপনি তো ডার্ক রঙের জামা পরে আছেন!”

আমি অবাক হয়ে বললাম, “আপনিই তো আমাকে বললেন ডার্ক রঙের জামা পরতে।”

কিন্তু আপনি তো এখন দেখতে পাচ্ছেন ব্যাকগ্রাউন্ডটা কালো!” ওঁর গলা চড়ে গিয়ে কেঁপে উঠল। চোখে বোধহয় জল।

মন অবস্থায় কী করা উচিত বুঝতে না পেরে আমি ফ্লোরের মাঝখানটাতেই দাঁড়িয়ে সবে দাঁত খিঁচিয়ে বলতে গেছি, “তাহলে জামাটা খুলে গেঞ্জি পরেই বসি?” এমন সময় আমার ডানদিক থেকে গম্ভীর গলায় কে বলে উঠলেন, “আজ সকাল ন’টায় প্রধানমন্ত্রী শ্রী মনমোহন সিং দিল্লি বিমানবন্দরের তৃতীয় আন্তর্জাতিক টার্মিনালটির উদ্বোধন করলেন...”

আঁতকে উঠে তাকিয়ে দেখি একটা ক্যামেরার ওপারে একজন টাই-পরিহিত ব্যক্তি খবর পড়ছেন। আমার ডার্ক রঙের শার্টের খবর সারা পশ্চিমবঙ্গে সবাই জেনে ফেললেন ভেবে আতঙ্কিত হয়ে স্থাণুর মতো দাঁড়িয়ে রইলাম, কিন্তু দেখলাম সংবাদ পাঠক কেন, ফ্লোরের কেউই তা নিয়ে চিন্তিত নয়। এমনকি একজন কে সশব্দে হেঁকে বললেন, “না, না। চিন্তা নেই। আপনি বসুন, আমি ব্যাকগ্রাউন্ডটা বদলে দিচ্ছি।” বলে দুমদাম শব্দে একটা গোলাপি কার্ডবোর্ড এনে আমার পিছনের কালোটা ঢেকে দিলেন। আমি চেয়ারে বসে শুনলাম সংবাদ পাঠক আবার পড়তে শুরু করেছেন, “আজ সকাল ন’টায় প্রধানমন্ত্রী শ্রী মনমোহন সিং দিল্লি বিমানবন্দরের তৃতীয় আন্তর্জাতিক টার্মিনালটির উদ্বোধন করলেন...” স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়লাম। রিহার্সাল চলছে।

চেয়ারে বসামাত্র ‘প্রোডুসার’ এসে একটা করে কলার মাইক হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন, “লাগিয়ে নিন, দেখতেই তো পাচ্ছেন, সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ারদের টিকির দেখা নেই। দেখুন, তারটা আবার যেন জামার সামনে না ঝোলে... জামার ভিতর দিয়ে টেনে আনুন। দিদি (অঙ্কের শিক্ষিকাকে) আপনি আঁচলের আড়াল দিয়ে নিয়ে যান... দাঁড়ান, আমি করে দিচ্ছি...”

এ সব চলছে, আর আমি ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখছি কাঁটা প্রায় তিনটে ছুঁইছুঁই। তাতে অবশ্য দূরদর্শনের কারও কোনও হেলদোল নেই। এমন সময়ে দড়াম করে স্টুডিওর দরজা খুলে ঢুকলেন একজন – মুখে একরাশ বিরক্তি। বললেন, “আব্‌ লাইব্‌ হ্যায় ক্যা?”

আমাদের ‘প্রোডুসার’ বললেন, “আরে, আপলোগকা কোনও পাত্তাই নেহি হ্যায়! সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার নেহি রহনে সে কি হাম কলার মাইক লাগায়গা?”

প্রোডুসার’-র দিকে তাকালেনও না সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার। আবার জিজ্ঞেস করলেন, “আব্‌ লাইব্‌ হ্যায় ক্যা?”

একটা চেয়ারে একজন বসেছিলেন কানে ইয়াব্বড়ো হেডফোন লাগিয়ে - আস্তে আস্তে মাথা নেড়ে বললেন, “হ্যাঁ, এখন লাইভ প্রোগ্রাম।”

হিন্দিভাষী আরও উত্তেজিত হয়ে বললেন, “কোন বোলা? কোন বোলা? কোই বোলা কি ইসকা বাদ লাইব্‌ প্রোগ্রাম হ্যায়?”

নির্বিকারভাবে সামনে রাখা একটা ফাইল দেখালেন হেডফোন। ‘নিজেই দেখে নাও’ গোছের হাবভাব।

হিন্দিভাষী একটু থতমত খেলেন। বললেন, “আরে, ও ম্যায়নে দেখা। ম্যায় পুছ রহা হুঁ কি ইনকে বাদ কোই লাইব্‌ হ্যায় ক্যা?” বলে আমাদের দেখালেন।

মাথা নেড়ে ‘না’ বললেন হেডফোন।

হাঁ, ও হি ম্যায় পুছ রহা হুঁ না? ইয়ে লাইব্‌ হ্যায়, সো তো ম্যায় জানতা হি হুঁ,” বলে তিনি এসে আমাদের কলার মাইকগুলো খুলে খুলে আবার লাগিয়ে দিলেন।

মাইক লাগানো শেষ হতে না হতেই হেডফোন বিশাল হেঁকে বললেন, “স্ট্যান্ড বা-----...” এবং স্টুডিওর সব আলো নিভে গিয়ে শুধু সংবাদ পাঠকের ওপর আলো রইল। আমরা নিঃশব্দ মনিটরে দেখলাম সংবাদ-শিরোনামের ছবি ফুটে উঠল, এবং তারপরে দেখলাম সংবাদ পাঠককে, তিনি বলতে শুরু করলেন, “আজ সকাল ন’টায় প্রধানমন্ত্রী শ্রী মনমোহন সিং দিল্লি বিমানবন্দরের তৃতীয় আন্তর্জাতিক টার্মিনালটির উদ্বোধন করলেন...”

শুধুই হেডলাইন, তাই দু’মিনিটেই খবর শেষ। তারপর আমাদের অনুষ্ঠান শুরু হল। আধঘণ্টার অনুষ্ঠান, তাতে আবার দর্শকদের ফোন উত্তর করা হবে, ফলে একলাইন বলতে না বলতেই বাধা নানা স্কুল শিক্ষক-শিক্ষিকারা ফোন করে জানতে চাইছেন, যদি শাস্তিই না দিলাম তাহলে ডিসিপ্লিন কোত্থেকে হবে? এই তালেগোলে মিনিট দশেক পরেই সঞ্চালক বললেন, “এই বিষয়ে স্কুল ছাত্র-ছাত্রীরা কী বলেন? আসুন দেখি...” বলতেই মনিটরে ভেসে উঠল মাইক হাতে এক দূরদর্শন-মার্কা দিদি একগোছা স্কুল-পড়ুয়াকে কী জিজ্ঞেস করছেন, আর মাইক বাড়িয়ে দিচ্ছেন তাদের মুখের সামনে।

আমরা কিছুই শুনতে পাচ্ছি না। নির্বাক চলচ্চিত্র দেখছি।

সঞ্চালকের দিকে তাকিয়ে বললাম, “এ কী? আমরা তো কিছুই শুনতে পাচ্ছি না?” সঞ্চালক আমার দিকে ফিরে ঠোঁটে আঙুল দিলেন। ফিশ্‌-ফিশ্‌ করে বললেন, “সাউন্ড হয়ত কেউই শুনতে পাচ্ছে না হয়ত আমাদের কথাই শোনা যাচ্ছে।”

হেডফোন খুব নিচু গলায় একটা মাইকে বললেন, “এখানে সাউন্ড দাও... আরে এখানে শোনা যাচ্ছে না... আরে, ওনারা বলছেন শুনতে চান কী বলা হচ্ছে... না, শোনা যাচ্ছে না... না, এখনও সাউন্ড নেই... না... না...”

এই ‘না, না’-র ফাঁকে ক্লিপিংটা শেষ হয়ে গেল। সঞ্চালক বললেন, “স্ট্যান্ড-বাই,” এবং তারপরেই তাঁর মুখের ছবি ভেসে উঠল টিভিতে, এবং আগের ব্যাপারটার কোনোও উল্লেখ না করেই তিনি দিব্যি, “আচ্ছা, দিদি, আপনি শিক্ষিকা হিসেবে বলুন, যদি আপনার ক্লাসে কোনও ছাত্রী অমনোযোগী হয়, তাহলে আপনি কী ভাবে ব্যাপারটা সামলাবেন?”

আমি অবাক! একটু আগেই বাচ্চারা হয়ত বলে গেল, শাস্তি পেতে তাদের ভালোই লাগে হোমওয়ার্ক করতে নাকি সুবিধে হয় – আর সঞ্চালক ব্যাপারটা একেবারে এড়িয়ে গেলেন? লোকে ভাবল আমরাও ব্যাপারটা মেনে নিচ্ছি?

কিন্তু অঙ্ক দিদিমণি প্রশ্নের উত্তর দিতে শুরু করেছেন। আমার কিছু করার নেই। অনুষ্ঠান চলল, ফোন আসতে থাকল, আবার মিনিট দশেক পরে আর একটা ভিডিও দেখান হল – সেই স্কুলেরই প্রধান শিক্ষক – তিনিও নিঃশব্দে ঠোঁট নাড়িয়ে চলে গেলেন।

প্রহসনের এই পর্যায়ের পরে আমার পালা। সঞ্চালকের কোনও ভাববিকার নেই, “ডাক্তারবাবু, আমাদের অনুষ্ঠানের সময় প্রায় শেষ – আপনার কাছে আমার শেষ প্রশ্ন...” বলে পরের প্রশ্নে চলে গেলেন।

আমি বললাম, “আপনার প্রশ্নের উত্তর দেবার আগে বলি, একটু আগে আমরা দুটো ভিডিও দেখলাম, যার একটাতে স্কুল পড়ুয়া ছাত্রছাত্রীরা আর অন্যটাতে কোনও স্কুলের অধ্যক্ষ বোধহয় শাস্তি পাওয়া এবং শাস্তি দেওয়ার বিষয়ে কিছু বলেছেন। দর্শকরা হয়ত ভাবছেন আমরা কেন সে বিষয়ে কিছু বলছি না। আমার মনে হয় দর্শকের জানার অধিকার আছে, যে ওঁরা কী দেখেছেন বা শুনেছেন, আমি জানি না। কিন্তু এখানে বসে আমরা চার্লি চ্যাপলিনের নির্বাক সিনেমার মত কিছু একটা দেখেছি, কোনও কথাই শুনতে পাইনি। সুতরাং ওই দুটি ক্লিপিং সম্বন্ধে আমরা কিছু আলোচনাই করতে পারলাম না।”

এই বলে আমি সঞ্চালকের প্রশ্নের উত্তর দিতে যাব, সঞ্চালক আমার কথা কেটে বললেন, “হ্যাঁ, হ্যাঁ, আমরা কিছুই শুনতে পাইনি - আচ্ছা, আমরা এখন একটা টেলিফোন নিয়ে নিই,” বলে তিনি টেলিফোন নিলেন এবং তারপরই অনুষ্ঠান শেষ হয়ে গেল।

যেমনি শেষ হওয়া, ওমনি পাগলা ষাঁড়ে তাড়া করেছে এমনভাবে দরজা খুলে ঢুকলেন ‘প্রোডুসার’। প্রথমে বললেন, “খুব ভালো প্রোগ্‌গাম হয়েছে।” তারপরেই অঙ্ক-শিক্ষিকাকে, “আপনি শেষ প্রশ্নের উত্তরটা দেননি। কী চমৎকার প্রশ্ন ছিল – ডাক্তারবাবু বাঁচিয়ে দিলেন...” বলে আমার দিকে ঘুরে বললেন, “আপনার কোনও কাণ্ডজ্ঞান নেই? অন-এয়ার বলে দিলেন অডিওটা শুনতে পাননি? সবাই শুনে ফেলল?”

মার খুব রাগ হয়ে গেল। জোর দিয়ে বললাম, “বেশ করেছি বলেছি। আপনার লজ্জা করে না? একটা আধঘণ্টার প্রোগ্রামে দুটো তিরিশ সেকেন্ডের ক্লিপিং দেখাতে পারেন না ঠিক করে, আবার এসে চেঁচাচ্ছেন? এই আপনি প্রোডুসার? আমি ১৯৭৯ থেকে দূরদর্শনে প্রোগ্রাম করছি। তখন টালিগঞ্জে স্টুডিও ছিল। তখনও আপনাদের যতটা ক্যালাস, কেয়ারলেস, ল্যাকাডিজিকাল এবং আনপ্রফেশনাল দেখেছি, আজও ঠিক ততটাই ক্যালাস, কেয়ারলেস, ল্যাকাডিজিকাল এবং আনপ্রফেশনাল রয়েছেন, শুধু বড়ো বাড়ি পেয়ে গলার জোরটা বেড়েছে।”

মার পর সঞ্চালক আর অঙ্ক শিক্ষিকা একই কথা বলতে লাগলেন। এমনকি হেডফোন, যিনি আমাদের সঙ্গেই বেরোচ্ছিলেন, তিনিও বললেন, “আমি তো কতবার বললাম, সাউন্ডটা দাও, ভেতরে সাউন্ডটা দাও – কিন্তু কে কার কথা শোনে বলছে, ওনাদের শোনার কোনও দরকার নেই।”

আমি আবার বললাম, “আপনার এই আধঘণ্টার প্রোগ্রামের জন্য আমাকে আপনি দু-দু’বার উত্তর কলকাতা থেকে দূরদর্শন অবধি দৌড় করিয়েছেন। রেজিস্টার খুলে আটজনের সই দেখিয়ে আমাকে বুঝিয়েছেন আপনাকে কত কাজ করতে হয়। আপনার কি আপনার দিকটা সুষ্ঠুভাবে চালানোর দায়িত্ব ছিল না? সেটা না করে আপনি গেস্টের বিরদ্ধে নালিশ করছেন?”

প্রোডুসার’ খানিকক্ষণ চুপ করে রইলেন, তারপর বললেন, “কোনও কথাই শোনে না আমার। আমি তো বলছি, সাউন্ডটা দাও, সাউন্ডটা দাও...”


দূররদর্শন কেন্দ্র থেকে বেরোবার সময় দেবুদার কথাটা আবার মনে পড়ল। ভাবলাম, অনেক টাইপের লোকের মধ্যে এই বিশেষ টাইপের সব লোক বোধহয় শুধু দূরদর্শনেই কাজ করে।





গোগোলের পেটব্যথা


মেডিক্যাল কলেজে গোগোল আমার চেয়ে এক বছরের জুনিয়র ছিল। ভালো নাম অভিজিৎ। কে যেন একবার বলেছিল, “ওরে গোগোল, ডাক্তারি পড়ছিস, নামটা বদলা। এরকম নাম নিয়ে ডাক্তার হলে আর খেয়ে পরে বেঁচে থাকতে হবে না।” গোগোল অবাক হয়ে বলল, “কেন? অভিজিৎ নাম নিয়ে ডাক্তার হওয়া যায় না?”

যাবে না কেন? কিন্তু তোর যা নাম, তাতে তো পেশেন্টের কাছ থেকে ভিজিট নিতে পারবি না।”

গোগোল বলেছিল, “তা নয়। আমি অ-ভিজিট। তাই আমি ডাক্তারকে ভিজিট দিই না। তোরা কেউ আমার কাছ থেকে ভিজিট নিতে পারবি না।”

গোগোল মুখে যাই বলুক, ভিজিট-নেওয়া ডাক্তারিতে ওর আপত্তি নিশ্চয়ই ছিল। তাই ডাক্তারি পাশ করে চলে গিয়েছিল গ্রামে। এন-জি-ও করতে। সেখানে খুব গরিব, দুস্থ, অসহায় জনসাধারণের সেবা করছিল — যতদিন ধান্দাবাজ রাজনীতিবিদরা করতে দিয়েছিল — ততদিন।

আমরা যখন ডাক্তারি পড়ি তখন কলকাতার ডাক্তারি দুনিয়ার অন্যান্য জায়গা থেকে অনেক পেছিয়ে আছে (এখনও আছে, তবে অত বেশি না)। মানুষ কাজ করে না বলে যেমনি পেছিয়ে থাকা, তেমনই পেছিয়ে থাকা অভাবের ফলে। আমরা যখন ছাত্র ছিলাম, তখন আমাদের শিক্ষকরা তেড়েফুঁড়ে শেখাতেন, যন্ত্রের ওপরে নির্ভর করে ডাক্তারি করবে না। ডাক্তারি মানে যন্ত্রনির্ভরতা নয়। নিজের হাত, চোখ, কান দিয়ে রোগীর রোগনির্নয় করো। কথাগুলো শুনতে যেমন ভালো লাগত, একই সঙ্গে তেমন বিশ্বাস করতাম যে অ্যামেরিকান বা ব্রিটিশ সাহেবরা খুব বোকা। যন্ত্রনির্ভর হয়ে ওরা ডাক্তারি ভুলেই গেছে।

কিন্তু যখন একটা বিশেষ গল্প আমাদের চল্লিশ বছর বয়স্ক লেকচারার থেকে আরম্ভ করে আটান্ন বছরের প্রফেসর, হেড অফ ডিপার্টমেন্ট সক্কলেই নিজের জীবনের ঘটনা বলে বলতে শুরু করলেন, তখন সন্দেহ হতে শুরু করল।

গল্পটা এরকম —

ইংল্যান্ডে কোনও এক হাসপাতালে একটা ক্লিনিক্যাল মিটিং হচ্ছে। এই ধরনের মিটিং-এ হাসপাতালের সব ডাক্তাররা মিলে একজন কঠিন রোগের রোগী নিয়ে বসেন। তার রোগলক্ষণ, নাড়ি-নক্ষত্র বিচার করে সবাই মিলে একটা মতৈক্যে আসার চেষ্টা করেন — রোগীর কী হয়েছে, এবং কী ভাবে তার চিকিৎসা হবে।

যাই হোক, ইংল্যান্ডের এই বিখ্যাত হাসপাতালে এক রোগীকে নিয়ে বিপদে পড়েছেন চিকিৎসক। পেটের টিউমরটা হয়েছে সেটা কোথা থেকে গজিয়েছে, তা বোঝা যাচ্ছে না। এমনকি এ-ও নাকি বোঝা যাচ্ছে না, যে সেটা পেটের ভেতরের নাড়িভুঁড়ি বা প্লীহা-যকৃত থেকে উঠেছে, নাকি পেটের মাংশপেশী থেকে। আলট্রাসাউন্ড হয়েছে — তাতে বোঝা যাচ্ছে না, সিটিস্ক্যান প্লেট হাতে বড়ো বড়ো ডাক্তাররা হাঁ করে তাকিয়ে আছেন, কিন্তু কেউ কিছু বলতে পারছেন না।

পেটের ভেতরে টিউমার হলে ডায়াগনসিস না করে অপারেশন করা যায়। পেট কেটে দেখা যায়, বা দেখার চেষ্টা করা হয় কোথায় কী সমস্যা। তবে তা হয় একেবারে শেষ অবস্থায়, যখন টিউমার কেটে বাদ না দিলে রোগীর জীবনসংশয় হতে পারে। পেট কাটলেই সবসময় বোঝা যায় না টিউমার গজিয়েছে কোথা থেকে। ডাক্তাররা এমন অপারেশন করতে পছন্দ করেন না। জানলামই না পেটের মধ্যে কোথায় কী খুঁজতে হবে, পেট কেটে হাতড়াতে শুরু করলাম, এটা ভালো ডাক্তারি নয়।

এই রোগীর বিপদ আরও বেশি। অপারেশন করে ডায়াগনসিস করতে গেলে পেটের মাস্‌ল্‌ কেটে ঢুকতে হবে, কিন্তু টিউমার যদি মাস্‌ল্‌ থেকেই হয়ে থাকে, তাহলে তাতে ছুরি লাগালে মারাত্মক ফল হতে পারে — সুতরাং না জেনে অপারেশন করা যাবে না। সেই জন্যই এত স্ক্যান — সিটি, আলট্রাসাউন্ড — এ সব।

এখানে বলে রাখি যে আমরা তখনও সিটিস্ক্যান-এর প্লেট বা মেশিন চোখে দেখিনি। বইয়ে ছবি দেখেছি মাত্র। আমরা মেডিক্যাল কলেজে থাকাকালীন কলকাতা শহরে প্রথম দুটো আলট্রা-সাউন্ড মেশিন এসেছিল। প্রথমটা আমাদের কলেজের গায়নকোলজি বিভাগে। সেটা কোথাও রাখার জায়গা ছিল না। সাহেবদের আমলে গায়নকলজির সবচেয়ে কৃতি ছাত্র/ছাত্রীকে ডিপার্টমেন্টে একটা ঘর দেওয়া হত। গুডঈভ স্কলারের ঘরের নাম গুডঈভ রুম। সেই ঘর গুডঈভ স্কলারকে দেওয়া বন্ধ হয়েছে সে কবেকার কথা কারও মনেও নেই। ঘরটা খালি পড়ে রয়েছে বলে সেখানে স্থান হয়েছিল আলট্রা-সাউন্ড যন্ত্রের। নূরজাহানদি — গায়নকলজির মেডিক্যাল অফিসার ডা. নূরজাহানকে পাঠানো হয়েছিল ইংল্যান্ডে, সরকারের পয়সায় শিখে আসতে কী করে আলট্রাসাউন্ড মেশিন ব্যবহার করে গর্ভস্থ শিশুর স্বাস্থ্য বোঝা যায়। নূরজাহানদি শিখেছিলেন, কিন্তু ফিরে আসার আগেই ওঁর ট্রানসফার অর্ডার তৈরি ছিল, দেশে ফিরে তিনি দেখলেন তাঁর জায়গায় মেডিক্যাল কলেজে অন্য কেউ এসেছেন। তাঁকে যেতে হবে মালদা।

সরকারি চাকরির এই গল্প যাঁরা জানেন না, তাঁরা ‘ইয়েস প্রাইম মিনিস্টার’ দেখতে পারেন।

আমরা যখন ইডেন হাসপাতালের তিনতলার করিডোর দিয়ে হাঁটতাম, তখন আমাদের শিক্ষকরা শেখাতেন, “এইটা হল গুডঈভের ঘর। এতেই আছে আমাদের আলট্রাসাউন্ড মেশিন। পরীক্ষায় এগজামিনার জিজ্ঞেস করবেন, ‘মেডিক্যাল কলেজের ছাত্র? তোমাদের আল্ট্রাসাউন্ড মেশিন কোথায়?’ বলতে না পারলে গায়নিকলজিতে ফেল।” ডাক্তারিতে পাশ-ফেল অনেক সময়ে নানারকম অদ্ভুত জিনিসের সঙ্গে জড়িয়ে থাকত। তার সঙ্গে ডাক্তারির কোনও সম্পর্ক না-ও থাকতে পারে।

দ্বিতীয় মেশিনটা এসেছিল একটা প্রাইভেট এক্স-রে ক্লিনিকে। নামটা... থাক। তার উদ্বোধন হয়েছিল বিরাট করে (হবেই বা না কেন? প্রথম চালু-মেশিন বলে কথা)। সব বড়ো বড়ো ডাক্তারদের ডাকা হয়েছিল। পরে আমাদের বিভাগীয় প্রধান বললেন, “গেলাম, দেখলামও। একটা লোককে শুইয়ে তার পেটে একটা কী লাগিয়ে লাগিয়ে টিভির মতন এক যন্ত্রে দেখালেন এই তার পেটের ভেতরে লিভার, এই পিলে, এই কিডনি... খানিক বাদে আর থাকতে না পেরে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আচ্ছা আপনি আমাদের বলছেন লিভার, কিডনি — আমরা দেখছি। কিন্তু আপনাকে কে বলে দিল যে এটা লিভার আর ওটা কিডনি?’ ব্যাস! এমনি রেগে গেলেন, যে তক্ষুনি ডেমনস্ট্রেশন বন্ধ করে দিলেন। খাবারের প্যাকেট দিয়েছিলেন, সে-ও প্রায় কেড়ে নেন আরকি!”

তখন আমরা হেসেছিলাম, কিন্তু কাণ্ডটা তার কিছুদিন পরেই ঘটল। পেটব্যথা নিয়ে একজন পেশেন্ট এল সার্জারি বিভাগে। ভারপ্রাপ্ত সার্জন-শিক্ষক বললেন, “এ ঠিক গল ব্লাডারের মতো মনে হচ্ছে না, কিন্তু আর কী হতে পারে তা-ও তো বুঝছি না। আচ্ছা, এক কাজ করা যাক, নতুন মেশিন এসেছে শহরে, ওখানে পাঠানো যাক। আলট্রাসাউন্ড করে দেখা যাক কী হতে পারে।”

রোগী গেল, ফিরে এল রিপোর্ট নিয়ে — গলস্টোন। স্যার সেই রিপোর্ট আর রোগীর পেটের ছবির প্লেট দেখিয়ে ছাত্র আর জুনিয়ার ডাক্তারদের পড়ালেন, “দেখো, এই রোগী যা যা সিমটম নিয়ে এসেছিল, বা ওর পেটে হাত দিয়ে যা পেয়েছিলাম, তাতে কখনও নিশ্চিতভাবে বলা যেত না — যে এটা গলস্টোন। তাহলে বুঝলে তো, যা আমরা দেখতে পাই না, তা আধুনিক যন্ত্রে দেখা যায়। কাল অপারেশন হবে। তোমরা সবাই এসো।”

পরদিন পেট কেটে দেখা গেল রোগীর গল ব্লাডারই নেই। কপালদোষে শরীরে গল ব্লাডার ভ্রূণাবস্থা থেকেই তৈরি হয়নি। কনজেনিটাল অ্যাজেনেসিস অফ গল ব্লাডার। পেটব্যথারও কোনও কারণ পাওয়া গেল না — অপারেশন সম্পূর্ন বিফল।

সার্জন’স রুমে স্যার ভুরু কুঁচকে বসে আছেন, কয়েকজন সাহসী ছাত্র গিয়ে বলল, “কিন্তু স্যার, কাল যে আপনি আমাদের পড়ালেন — গলস্টোন... আলট্রাসাউন্ডের প্লেট দেখালেন...”

স্যার মাথা নেড়ে বললেন, “আরে আমি কি ছাই জানি নাকি? তোমরা যত আলট্রাসাউন্ড দেখেছ, আমিও ততই দেখেছি। আমি দেখলাম রিপোর্টে লেখা আছে গলস্টোন। তোমাদেরও তাই দেখালাম।”

এমতাবস্থায় ইংল্যান্ডের ডাক্তাররা সিটিস্ক্যান প্লেট নিয়ে মাথা চুলকোচ্ছেন সে গল্প তো আমাদের ভালো লাগবেই।

ইংল্যান্ডের হাসপাতালে বহু আলোচনার পরও যখন টিউমারটা পেটের ভেতরে, না কোথায়, তা-ই স্থির করা যাচ্ছিল না, তখন হঠাৎ হাত তুললেন এক জুনিয়র ডাক্তার — ভারতবর্ষ থেকে সদ্য গিয়েছেন। বললেন, “আমি একবার রোগীকে পরীক্ষা করে দেখি?” সাহেব ডাক্তাররা বললেন, “অবশ্যই...” মনে ভাবলেন, হাতি ঘোড়া গেল তল...

ভারতবর্ষ থেকে সদ্য ডাক্তারি পাস করা ছেলেটি (বলা বাহুল্য, তবু জানিয়ে রাখি — সে বাঙালিও বটে) রোগীকে বললেন, “আপনি হাত দুটো আকাশে তুলে শুধু পেটের মাংশপেশীর ওপরে জোর দিয়ে বসার চেষ্টা করুন দেখি...”

রোগী ওঠার চেষ্টা করামাত্র ছেলেটি তাকে আবার শুইয়ে দিয়ে বললেন, “ঠিক আছে।” তারপর ঘরভর্তি ডাক্তারের দিকে ফিরে বললেন, “জেনটেলমেন, এই রোগীর টিউমার মাংসপেশীতে নয়, পেটের ভেতরের কোনও প্রত্যঙ্গ থেকেই উদ্ভূত। আপনারা অনায়াসে পেট খুলে দেখতে পারেন টিউমারের উৎপত্তি কোত্থেকে।”

সবাই অবাক! এ কোথাকার হনু রে? এ কী রকম খেল? ছেলেটি খুব কাঁচুমাচু মুখ করে বলল, “কিন্তু এ তো রাইজিং (উত্থান) টেস্ট — আমাদের বইয়ে লেখা আছে। এইভাবে রোগীকে উঠিয়ে বসালে টিউমার পেটের ভেতরে থাকলে মাংসপেশী শক্ত হয়ে চাপা পড়ে যাবে, ছোটো দেখাবে। আর মাস্‌ল্‌-এ হলে ফুলে আরও বড়ো হয়ে উঠবে।”

মহারথীরা মুখ চাওয়া-চাওয়ি করছেন, রাইজিং টেস্টের নামই কেউ শোনেননি — এমন সময় একেবারে পেছনের সারি থেকে এক অশীতিপর বৃদ্ধ সার্জন হাত তুলে কাঁপা গলায় বললেন, “ইয়েস, ইয়েস, মেনি ইয়ার্স এগো আই রেড অ্যাবাউট দ্য রাইজিং টেস্ট ইন সাম বুক (হ্যাঁ, হ্যাঁ, বহু যুগ আগে আমি কোনও বইয়ে এই রাইজিং টেস্টের কথা পড়েছি বটে)!”

এর পর নিশ্চয়ই সেই রোগীর অপারেশন করে দেখা যায় যে টিউমর পেটের মধ্যেই বটে — কিন্তু সেটা গল্পের মরাল নয়। মরাল হল — বড়ো বড়ো যন্ত্রের চাপে ডাক্তারিটা ভুলে যেও না বাপু।

গোগোলের কাছে কিন্তু মর‍্যালটা ছিল অন্যরকম।

নিজেরা পারে না সিটিস্ক্যান বুঝতে, তাই আমাদেরও শিখতে দিতে চায় না! কেন রে বাবা? তুই ভালো গরুর গাড়ি চালাতে পারিস বলে কি আমরা প্লেন চড়তে শিখব না?”

ডাক্তারির শেষে গোগোল আর আমি পড়াশোনা আর কর্মসূত্রে পরস্পরের থেকে বহু দূরে চলে যাওয়া সত্ত্বেও যোগাযোগ একেবারে বিচ্ছিন্ন হয়নি। রাঁচিতে এবং কলকাতায় আমার বাড়ি এসেছিল গোগোল — আমার কখনও গোগোলের বাড়ি যাওয়া হয়নি। বেনারসে, আলমোড়ায়, লক্ষ্ণৌতে — কোথাও না। গোগোল প্রায়ই বলত, “দাড়ি, তোকে একবার আমার কাজের সঙ্গে জুড়ে নিয়ে যাব আলমোড়ায়। সারা জীবন তো ক্লিনিকে বসে কাজ করলি, মাঠে নেমে কাজ করা কাকে বলে দেখে আসবি।” কিন্তু হয়ে আর ওঠেনি।

শেষ পর্যন্ত সুযোগ এল ২০০৯-এ। ততদিনে গোগোল আলমোড়া ত্যাগ করেছে চিরদিনের মতো। গেলাম দিল্লিতে ওর সংস্থার মিটিং-এ।

দিল্লি পৌঁছলাম মিটিং-এর আগের দিন সন্ধেবেলা। রাত্তিরে বসলাম গোগোলের সঙ্গে আড্ডা দিতে। দুই ডাক্তারের আলোচনায় চিরকালীন টপিক হিসেবে এল আমাদের দেশের ডাক্তারির দুরবস্থার কথা। খানিক এ-গপ্পো ও-গপ্পোর পরে গোগোল বলল, “যা-ই বলিস, বিদেশে ডাক্তারির অবস্থা খুব ভালো মনে করারও কোনও কারণ নেই। এই আমার কথাই ধর না — আমি তখন ওয়াশিংটনে। ক্লাস নিতে গেছি। হঠাৎ পেট ব্যথা। যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে ভর্তি হলাম ওদের ইউনিভার্সিটি কলেজ অব মেডিসিন-এর হাসপাতালে। বেশ ভালো লেভেলের হাসপাতাল। রোজ হাজার গণ্ডা টেস্ট হচ্ছে, সিটিস্ক্যান, আলট্রাসাউন্ড, হ্যাঁকা-ত্যাকা, ঢেঁকি-কুলো — কোনও ডায়াগনসিস-এর নামগন্ধ নেই। একজন সন্দেহ করে টিবি, তো আর একজন বলে এইড্‌স্‌, আর যিনি সব বোঝেন, তিনি বলেন, ‘না, ক্রিমি হয়েছে। তুমি থাক ইন্ডিয়াতে, এই সবে গিয়েছিলে ব্রেজিল — সব ব্যাকওয়ার্ড দেশ...” আর এদিকে সব টেস্টেরই নর্মাল রেজাল্ট! আর আমি বিছানায় শুয়ে শুয়ে ভাবছি, আচ্ছা, আমি না হয় ডাক্তারি করি না, কিন্তু এই যে সব সিমটম, এগুলো তো আমি ডাক্তারি পাশ করার সময় বইয়ে পড়েছি। এই সিমটমগুলো একসঙ্গে হলে ডায়াগনসিস করতে তো এক মিনিট লাগা উচিত। এদিকে তাবড় তাবড় সব ডাক্তার, মুখ ফুটে কিছু বলতেও পারি না! শেষে আমি হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে শুয়েই ফোন করলাম সুকান্তকে। সুকান্তকে মনে নেই? আমাদের ব্যাচ। দেখলেই চিনতে পারবি। ও এখন ইংল্যান্ডে সার্জন। ও শুনে টেলিফোনেই আমাকে বলল, অন্য কিছু হতেই পারে না। তখন আমি পরদিন ওদের কনসালট্যান্টকে বললাম, ‘কিছু যদি মনে না করো, এটা কি গল ব্লাডারের ব্যথা হতে পারে?

পরদিন আমার গলস্টোন ধরা পড়ল।”

গোগোলের গল্প শুনে আমি খাটের ওপর লাফাতে শুরু করেছি। “গোগোল, এটা তোরই হতে হল? তুই কি না বলতি ডাক্তারিতে সব আধুনিক যন্ত্রপাতি হল এরোপ্লেন, আর পেট-টেপা ডাক্তাররা গরুর গাড়ি চালায়।”

আমি বলেছিলাম? আমি?” গোগোল আকাশ থেকে পড়ল। “কবে?”

পুরো গল্পটা বললাম। গোগোল শুনে বলল, “তাই? আমার অত মনে নেই। তবে আমি কিন্তু বলিনি যে বই না পড়ে, পেশেন্ট না দেখে — শুধু সিটিস্ক্যান করিয়েই ডাক্তার হওয়া যায়।”





পুরাতন ভৃত্য

কী একটা কাজে দেবদত্তর বাড়ি গেছি দুপুরবেলা। দেবদত্তর থাকার কথা নয় – ছিলও না, কিন্তু আমি যাব শুনে বলল, “অনেকদিন দেখা হয়নি। আমি অফিস থেকে বেরিয়ে আসছি – কিন্তু ব্যাঙ্ক হয়ে যেতে হবে। তুই বসিস মিনিট দশেক।”

দেবদত্ত কনসালট্যানসি করে। অফিস থেকে মাঝদুপুরে বেরোন মানে সরকারি কাজের ক্ষতি নয়। আমি গিয়ে দেবদত্তর বাড়িতে দরজায় ঘণ্টা দিলাম, দরজা খুলল অহল্যা। কাজের লোক। আমাকে দেখে খুব খুশি – “এসো দাদা, কতদিন পরে এলে...” ইত্যাদি বলে বসার ঘরে বসিয়ে পাখা চালিয়ে, চা খাব কি না জেনে রান্নাঘরে গিয়ে জল বসিয়ে দিয়ে এসে বলল, “কিন্তু দাদা-রা তো কেউ বাড়ি নেই। ফিরতে রাত্তির হবে।”

আমি বললাম, “দাদা আসছে। এই এল বলে।”

তাহলে ভালোই হল। তোমার সঙ্গে একটু আলোচনা করে নিই,” বলে মাটিতে আসনপিঁড়ি হয়ে বসে গ্রামের কথা, জমির কথা বলতে শুরু করল।

এখানে বলে রাখি, অহল্যা দেবদত্তর কাজের লোক নয়। দেবদত্তর শ্বশুরের বাড়িতে কাজ করে। দেবদত্তর কাজের লোক পাশের বাড়ির ড্রাইভারের সঙ্গে (দু-বাড়ির বেশ কিছু টাকাকড়ি হাতিয়ে) পালিয়ে যাবার পরে পুলিশের হাজতে, এই সময়ে অহল্যা কার্যোদ্ধারের জন্য দেবদত্তর বাড়িতে এসে রয়েছে, কারণ দেবদত্তর শ্বশুর বিদেশ গিয়েছেন ছোটো মেয়ের কাছে।

অহল্যা শুধু কাজের লোক নয়। দেবদত্তদের কাছে, বিশেষ করে ওর বউয়ের কাছে, তার চেয়ে অনেক বড়ো। বহু বছর আগে দেবদত্তর শাশুড়ি দুটো ছোট্ট মেয়েকে রেখে চোখ বোজার পরে দেবদত্তর বউ আর শালীকে বড়ো করেছিল অহল্যা। সে শুধু কোলে-পিঠে করে মানুষ করা নয় – একেবারে লেখাপড়া না-জানা, কোনও দিন ইস্কুলের চৌহদ্দি না-পার-করা অহল্যার তত্ত্বাবধানেই ওরা লেখাপড়া শিখেছিল, সমাজে, জীবনে চলতে শিখেছিল। ওদের বাবা অহল্যাকে অনেক টাকাকড়ি আর গ্রামে বেশ কিছু জমিজমা কিনে রিটায়ার করিয়ে দিয়েছিলেন মেয়েরা বড়ো হবার পরে, কিন্তু অহল্যাই থাকতে পারনি। ফিরে এসে বলেছিল, মরলে এখানেই মরব।

এই সব জমিজমার গল্প শুনছি চা খেতে খেতে, আর দেবদত্তর আসার অপেক্ষা করছি, হঠাৎ রান্নাঘরের খোলা দরজা দিয়ে দেখলাম মাটিতে থালা-বাটি-গ্লাস ঢাকা দেওয়া রয়েছে। জিজ্ঞেস করলাম, “তুমি খাওনি?”

না দাদা। পরে খাব।”

ভাবলাম আমি বসে আছি বলে ও খেতে যেতে পারছে না। বললাম, “তুমি যাও। খেয়ে নাও। আমি বসছি।”

বলল, “না দাদা, বড়দি অফিসে নেই। কাজে বেরিয়েছে। মিটিং আছে। কখন খাবার সময় পাবে তার ঠিক নেই। মিটিং করে খেতে যাবার আগে আমায় ফোন করবে – তখন আমি খেয়ে নেব।”

বড়দি হল দেবদত্তর বউ। সে কখন খাবে তার জন্য হাঁ করে তার কাজের লোক বসে থাকবে? আমিই হাঁ করে চেয়ে রইলাম। সেই দেখে অহল্যা বলল, “মেয়েটা না-খেয়ে থাকলে কী করে খাই বল তো দাদা?”

বললাম, “এখন দেড়টা ছাড়িয়ে ঘড়ির কাঁটা প্রায় একটা চল্লিশের কাছাকাছি। ও যদি দুটো-তিনটে অবধি না-খেয়ে থাকে, তুমি অতক্ষণ না খেয়ে থাক?”

কী করি বলো? গলা দিয়ে ভাত নামে না যে! ফোনটা পাই, নিশ্চিন্ত হয়ে খেতে বসি। এইজন্যই তো দেশে গিয়ে থাকতে পারলুম না। ফিরে আসতে হল।”

আমার চোখ চড়কগাছ। চল্লিশোর্ধ, বিবাহিতা এক মহিলা, সংসার করেন, চাকরি করেন – তিনি খেলেন কি খেলেন না, সেই দুশ্চিন্তায় বৃদ্ধা কাজের লোকের খাওয়া হয় না। নিজের মেয়ে হলে কী হত!

অহল্যা বলে চলেছে, “আর ছোড়দি তো কবেই চলে গিয়েছে অ্যামেরিকা। ওখানের সময় আর এখানের সময় আবার আলাদা। মাঝে মাঝে রাত্তিরে ঘুম ভেঙে যায়। মনে হয় – ওখানে তো এখন দিন। দিদি বলে গেছে, বারো ঘণ্টার তফাৎ। মানে দুপুর দুটো, বা তিনটে। কী জানি, খেয়েছে কি না।”

খাওয়াও হয় না, ঘুমও না। বাঃ! কী বলতাম জানি না, কিন্তু দেবদত্ত এসে পড়ল বলে আমাদের আড্ডা ভঙ্গ হল। অহল্যা চলে গেল রান্নাঘরে, দেবদত্তর জন্য চা বানাতে। আমি বললাম, “বড়দি খায়নি বলে ও-ও না খেয়ে বসে আছে।”

দেবদত্ত বলল, “আরে এই এক জ্বালা। দিদি না খেলে কিছুতেই খাবে না। দিনে হোক, রাতে হোক, যেখানেই থাকুক, ফোন করে জানাতে হবে – খেয়েছি। সবসময় সম্ভব? আজ সকাল থেকে মিটিং – শেষ হতে দেরি আছে। আমি যদি বলি আমাকে জানিয়ে দিয়েছে, বা এস-এম-এস করেছে, মানে না। মুখে কিছু বলে না, ‘আচ্ছা,’ বলে চলে যায় – কিন্তু পরে দেখি খায়নি। বয়েস হয়েছে, গ্যাস্ট্রাইটিস আছে... দাঁড়া, একটা এস-এম-এস করি...”

দেবদত্ত লিখল, “ফোন কর, এখনও খায়নি।” খানিক পরে বাড়ির ফোন বাজল। অহল্যা কথা বলে, নিশ্চিন্ত হয়ে খেতে বসল।


আজ অহল্যা নেই। কিন্তু ওই একদিনের ঘটনার জন্যই ভুলতে পারিনি কাজের লোক অহল্যাকে। কিসের টান ছিল বাবুদের বাড়ির দুই মেয়ের ওপর? মায়েরা হয়ত বলতে পারবেন, কিংবা হয়ত পারবেন না। ভৃত্যের সঙ্গে মালিকের সম্পর্কের ইতিবৃত্ত অন্য কেউ বুঝতে পারে না। ব্যাচেলর পুরুষের পুরুষ গৃহভৃত্য বা চাকর অনেক সময়ে মালিকের সমস্ত বাড়িটা কন্ট্রোল করে – সেটা মালিকের প্রেমিকা বা নতুন বউ সহ্য করেন না – আমরা পি জি উডহাউস পড়ে সে মজাও পেয়েছি।


উডুপি থেকে কলকাতায় আসা পাই-কাকু প্রায় সাহেব ছিল। যেটুকু সাহেব ছিল না, সেটুকু ছিল বাঙালি। প্রায়ই মাকে বলত, “বৌদি, আমার জন্য একটা বাঙালি মেয়ে দেখুন। মাছের ঝোল-ভাত না খেতে পেলে চলবে না।”

কী কারণে শেষ অবধি পাই-কাকু মাছভাতের চাহিদা জলাঞ্জলি দিয়েছিল জানি না, কিন্তু ঘটনাটা সে নিয়ে নয়, প্রদীপকে নিয়ে।

প্রদীপ ছিল পাই-কাকুর কাজের লোক। চাকর। আমার জন্মের আগে থেকেই প্রদীপ পাই-কাকুর কাজ করত। মা বিয়ে হয়ে থেকে প্রদীপকে দেখেছিল।

প্রদীপ সম্ভবত বিহার থেকে এসেছিল। সেটা আমার ধারণা, কারণ সবাই – মায় পাই-কাকু আর (পরে) কাকিমা অবধি প্রদীপের সঙ্গে হিন্দিতে কথা বলত। প্রদীপ কাজের লোক হিসেবে খুব খারাপ ছিল। বিয়ের আগে কাকুর ঘরদোর নোংরা থাকত, আমার মনে পড়ে মা যখনই যেত, প্রদীপকে দিয়ে হয় বসার ঘরের আসবাবপত্রের ধুলো ঝাড়াত, নয়ত বাসন মাজাত, নয়ত কিছু একটা করাত ওরকম। পাই-কাকু চেঁচাত, “বৌদি, আপনি এসে বসুন তো, আপনি তো আবার দু’সপ্তাহ পরে আসবেন। ততদিন তো ও আর কিছুই করবে না।”

আমার ধারণা প্রদীপ চিরকালই বুড়ো ছিল। তার কারণ ওর হাতে একটা অদ্ভুত কাঁপুনি ছিল, যার ফলে কিছু ধরলেই ঠক্‌-ঠক্‌ করে হাত কাঁপতে থাকত। এর ফলে যখন ট্রে-তে করে চা নিয়ে আসত, তখন প্রায় আধ-কাপ চা-ই চলকে পড়ত বাইরে। আগেকার দিনের বাড়ি ছিল – বাড়িতে ঢুকে প্রথমে বসার ঘর, তারপরে খাবার ঘর, সব শেষে রান্না আর শোবার ঘর। আজকালকার বাড়ির মতো ঢুকলেই রান্নাঘর আর খাবার ঘর পেরিয়ে বসার ঘর, আর বসার ঘরে বসে থাকলে খোলা দরজা দিয়ে শোবার ঘর দেখা যেত না। প্রদীপ রান্নাঘর থেকে চা নিয়ে আসতে গিয়ে খাবার টেবিলে ট্রে নামিয়ে একবার প্লেটের চা কাপে ঢালত, আর আবার বসার ঘরে পৌঁছে চা ঢালতে হত কাপে। জল কখনও গ্লাসে ঢেলে আনত না। ট্রে-তে জলের বোতল আর গ্লাস বসিয়ে আনত। তা সত্ত্বেও কতবার গ্লাস বোতল পড়ে ভেঙেছে, তার ইয়ত্তা নেই।

মা প্রদীপকে মোটে পছন্দ করত না। মা’র ধারণা ছিল প্রদীপ কোনও কাজ করে না, প্রদীপের রান্না মুখে দেওয়া যায় না এবং প্রদীপ বাজার করার সময় পয়সা চুরি করে। তখন আমরা ছোটো। ব্যাপারটা ভালো বুঝতাম না। ভাবতাম, এমন অপদার্থ একজনকে পাই-কাকু কেন যে বাড়িতে পুষে রেখেছে, আর বাবা-ই বা কেন কিছু বলে না? কিন্তু প্রদীপের মধ্যে এমন একটা অসহায় বৃদ্ধ লোকের ছায়া ছিল, যে খুব মায়াও হত।

এ সব মিলিয়ে জুলিয়ে, যখন পাই-কাকুর বিয়ে ঠিক হল, তখন মা বলল, “ব্যাস, প্রদীপের দিন শেষ হল।”

হলও। সংসারের দায়িত্ব নিয়েই কাকিমা বুঝল প্রদীপের গণ্ডগোল কোথায় কোথায়। একদিন দুপুরে মা’র সঙ্গে লম্বা আলোচনা করে গেল এবং তারপরে প্রদীপের ক্ষমতা কমতে শুরু করল। লাগল খিটমিট, সেটা গিয়ে দাঁড়াল ঝগড়ার পর্যায়ে – এবং, বিয়ের প্রায় বছরখানেক বাদে কাকিমা একদিন দুপুরবেলায় প্রদীপকে বিদায় করে দিল।

প্রদীপ সারাদিন বাড়ির সামনে ফুটপাথে বসে রইল, আর পাই-কাকু অফিস থেকে ফেরার সঙ্গে সঙ্গে আবার ফিরে এল।

এ ঘটনার পুনরাবৃত্তি হতে থাকল প্রায়ই। কাকিমা প্রদীপকে বিদায় দেয়, প্রদীপ বিনা বাক্যব্যয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়, অপেক্ষা করে থাকে কখন কাকু অফিস থেকে ফিরবে। আর কাকুও অফিস থেকে ফেরার পথে প্রদীপকে নিয়ে বাড়ি ঢোকে। এমনও হয়েছে যে কাকু কখনও কলকাতার বাইরে থাকলে প্রদীপ একাধিক দিন তাঁর সতরঞ্চি, মোড়া, বোঁচকা নিয়ে বাড়ির বাইরে ফুটপাথে বসে থেকেছে।

প্রদীপকে নিয়ে কাকু-কাকিমার দাম্পত্য জীবনে কী কী সমস্যা হয়েছে তা জানতে পারার মতো বয়স আমার তখনও হয়নি, কিন্তু এ জানি যে কয়েক বছর পরে, কাকিমা আর ছোট্ট ছেলেকে নিয়ে কাকু যখন চাকরি বদলে বম্বে চলে গেল, তখন প্রদীপও গেল সঙ্গে।

আমরা সে সময়ে কাকু-কাকিমার বাড়িতে গিয়ে ছিলাম দিন দশেক। তখন দেখেছিলাম, প্রদীপের সঙ্গে কাকিমার সমস্যা আগের মতই চলছে।

কাকিমা ডেকে বলল, “প্রদীপ, শাকটা কেটে রান্না করে নাও। ভাজা-ভাজা করবে।”

প্রদীপ বলল, “আজ সাগ নেহি লাগেগা। বহোত খানা হ্যায়। ডাল হ্যায়, সবজি হ্যায় দো কিসিমকা...”

কাকিমা বলল, “বাজে না বকে শাকটা তোলো টেবিল থেকে। নিয়ে গিয়ে কেটে নাও। বেগুন দিয়ে ভাজবে।”

প্রদীপ কিছু না বলে চলে গেল।

খেতে বসে শাকটা পাতে নিয়ে নেড়েচেড়ে মা বলল, “প্রদীপ, এটা দেখি কী একটা পোকা শাকের সঙ্গে ভাজা হয়েছে। ভালো করে ধুয়ে বেছে নিয়েছিলে তো?”

প্রদীপ অম্লানবদনে বলল, “নেহি মাঈজি, আমরা শাক ধুই না। শাক খুব পরিষ্কার জিনিস। আর ওতে পোকা থাকতেই পারে না। আমি কাটার আগে বলে নিয়েছি, ‘রাম খায়েগা, সীতা খায়েগি, সব কীরা নিকাল জাও।’ এই কথার পরে কোনও পোকা থাকতেই পারে না। রাম-সীতা খাবে – কোন পোকার হিম্মৎ আছে এই কথা শুনে শাকের মধ্যে বসে থাকবে?”

ভাজা শাকটা ঘেঁটে দেখা গেল তাতে আরও কয়েকটা পোকা জাতীয় জিনিস ভাজা অবস্থায় রয়েছে। বলা বাহুল্য, প্রদীপের আশ্বাস সত্ত্বেও শাকটা ফেলা গেল।

দোসা ভাজতে হবে। কাকিমা বলেছে কত সমস্যা করে কোনওক্রমে প্রদীপকে দোসা ভাজতে শিখিয়েছে। প্রদীপকে বলামাত্র বলল, “মাঈজি, আপ ভাজিয়ে। মেহমান লোগ হ্যায়...”

কাকিমা চোখ পাকিয়ে বলল, “যা---,” প্রদীপ কাঁপতে কাঁপতে চলে গেল, আর তারপরে শুরু হল এক হাস্যকর সিন। খানিক বাদে বাদে প্রদীপ রান্নাঘর থেকে কম্পমান খুন্তির মাথায় একটা কম্পমান দোসা নিয়ে আসে – প্রথমটার মাঝখানে ছেঁড়া, দ্বিতীয়টা পুড়ে কালো, তৃতীয়টা কী রকম যেন গ্রহণ-লাগা চাঁদের আধ-খাওয়া... কাকিমা সবকটা একটা প্লেটে রেখে বলল, “প্রথম দু-তিনটে দোসা তাওয়া থেকে ঠিক করে ওঠে না। তাই এগুলো এখানে থাক। কিন্তু এতক্ষণে তাওয়া গরম হয়ে গেছে। সুতরাং আর যেন খারাপ না ওঠে।”

সত্যিই এর পরের কয়েকটা বেশ ভালো হল। মা বলল, “প্রদীপ, তুমি বেশ ভালো দোসা ভাজতে শিখেছ।” প্রদীপ কিছু না বলে চলে গেল, কাকিমা বলল, “হল এবার।”

পরের দোসাটাই পাতলা এবং পোড়া। কাকিমা এক নজর দেখেই বলল, “এটা এখানে দিতে হবে না। তুমি নিয়ে যাও। এটা তুমি খেও।” প্রদীপ বিনাবাক্যে ঘুরতেই কাকিমা আবার বলল, “তোমার যদি ভালো দোসা খাবার ইচ্ছে থাকে, তাহলে ভালো করে ভেজো। নইলে সবকটা খারাপ দোসাই তোমাকে খেতে হবে।”

আর কোনও দোসা খারাপ হয়নি।

কয়েক বছর পরে খবর পেলাম পাই-কাকু আবার চাকরি বদলে কলকাতায় আসছে। আমাদের খুব আনন্দ, পাই-কাকু দারুণ মজার লোক। দেখতে দেখতে ওরা এসেও গেল, আমাদের বাড়ির খুব কাছেই বাড়ি নিল – আবার যাতায়াত শুরু হল... আর প্রদীপ সংক্রান্ত সমস্যাও চলতে থাকল।

শেষে, এল সেই দিনটা...

আমরা সপরিবারে বাবার এক বন্ধুর বাড়ি থেকে ফিরছিলাম। মহানির্বাণ মঠের সামনে দেখা প্রদীপের সঙ্গে। প্রদীপ আগেই আমাদের দেখেছিল, কোত্থেকে ছুটে এসে মা’র পা ধরে বসে পড়ল, সঙ্গে হাউ হাউ কান্না। কী হল? কী হল? না – “মাঈজি হামকো ছুট্টি কর দিয়া।”

আমাদের হিন্দি-জ্ঞান তখন গগনচুম্বী। ছুট্টি কর দিয়া? সে আবার কী? ছুট্টি তো স্কুল কলেজে হয়। মা-ও তাই জিজ্ঞেস করল প্রদীপকে। বাবা তাড়াতাড়ি মাকে থামিয়ে বলল, “আর সা’ব? সা’ব কী বলল?” প্রদীপ কাঁদতে কাঁদতে কী সব বলে গেল, শুনে বাবা, “তাহলে আর কী করা, আচ্ছা, আমরা চলি,” গোছের কী একটা বলে আমাদের প্রায় জার্মান শেপার্ড ডগের মতো আগলে নিয়ে হনহন করে হাঁটা দিল।

মা রেগে বলল, “কী আশ্চর্য, লোকটা কাঁদছে কেন না জেনেই ওরকমভাবে চলে এলে?”

বাবা ততোধিক রেগে বলল, “কথার অর্থ বোঝো না – তোমাকে তো একশোবার বললেও বুঝতে না। মাঈজি ছুট্টি কর দিয়া – বলল তো পাঁচবার। মানে বুঝেছ?

না। বলা বাহুল্য।

ছুট্টি করে দেওয়া মানে চাকরি ছাড়িয়ে দেওয়া।”

চাকরি গেছে তো অত কান্নাকাটি করার কী আছে?” এবার মা রাগ না করে অবাক হল। “পাই তো রাত্তিরেই আবার বাবা-বাছা বলে ঘরে তুলবে।”

তুলবে না। সেটাই বলল কাঁদতে কাঁদতে। এবার চাকরি গেছে পাইয়ের সামনে। আর পাই নিজেই ওকে বের করে দিয়েছে তিন সপ্তাহ হল। বাড়ির সামনে বসে থেকে, অফিসের সামনে দাঁড়িয়ে, হাতে পায়ে ধরে কোনওভাবেই কাজ হয়নি। বলল আমরা যেন মধ্যস্থতা করি। শুনলে না?”

শুনেছি আমরা সবাই – তখনকার হিন্দিজ্ঞানের বহরে বুঝিনি কিছুই।

প্রদীপকে আর কোনও দিন দেখিনি আমরা। বাবা হয়ত ফোন করে, বা পাই-কাকুর সঙ্গে দেখা করে শেষ পর্যন্ত প্রদীপের চাকরি যাওয়ার ব্যাপারটা জানতে পেরেছিল – আমি জানিনি। লাভও হত না জেনে। প্রদীপ অকর্মণ্য, অপদার্থ ছিল, প্রদীপ কাজ জানত না, প্রদীপ কখনও কাজ শিখতে চায়নি, প্রদীপ চোর ছিল – বাজার করতে গেলে অনেক পয়সা চুরি করত...

কিন্তু বৃদ্ধ প্রদীপ কোথায় গেল আমরা তা জানি না।





সর্ষেবাটা

পাই কাকু মাছ খেতে খুব ভালোবাসত – এবং সেই সঙ্গে অন্যান্য আমিষ খাবারও। কিন্তু উডুপীবাসিনী কাকিমা মোটেই আমিষ খেত না, এমনকি বাড়িতে ঢুকতেও দিত না, পাছে তিরুপতি রাগ করেন ঠাকুরের আসন থেকে। কাকু আমাদের বাড়ি এসে মাছের ঝোল খেত।

বাঙালি খাওয়া পছন্দ করে বলে কাকিমা কাকুর জন্য বেঙ্গলী নিরামিষ রেসিপি নিয়ে যেত – ঝিঙে পোস্ত, আলুর-দম ইত্যাদি। তাতে কাকু কতটা খুশি হত জানি না, কারণ আমাদের বাড়িতে খেতে হলে মাছের মুড়ো না থাকলে কখনও ডালও ছুঁতে দেখিনি। কাকিমা কিন্তু নিয়মিত বাঙালি রান্নার তথ্য নিয়ে যেত এবং রান্না করে আমাদের না খাওয়ালেও কাকুর ওপর দিয়ে এক্সপেরিমেন্ট হত বলেই আমাদের বিশ্বাস। একদিন কাকিমা সকালে এসেছে, মা তখনও রান্না করছে। দুজনে গল্প করছে, মা এক থালা পাবদা মাছ নিয়ে এসেছে রান্নাঘর থেকে খাবার টেবিলে। সর্ষেবাটা দিয়ে মাখা মাখা করে রান্না করা। দেখে কাকিমার চোখ জ্বলজ্বল করে উঠেছে। জিজ্ঞেস করেছে, এটা কী?

মা বলেছে, ওটা মাছ। পাবদা মাছ।

নাক কুঁচকে খানিকক্ষণ দেখে কাকিমা রেসিপি চেয়েছে – মা সোৎসাহে বুঝিয়ে দিয়েছে।

এই ঘটনার কিছুদিন পর আমরা এক স্কুল ছুটির দিন গিয়েছি কাকিমার বাড়ি দিনের বেলায়। আমরা কাকুর ছেলের সঙ্গে খেলছি, মা গল্প করছে কাকিমার সঙ্গে – খাবার টেবিলে বসে। এমন সময়ে হঠাৎ মা আমাকে চাপা গলায় ডাকল, “শোন একটু।”

আমি ছুটে গিয়ে দেখি মা সামনে একটা প্লেট নিয়ে বসে আছে। তাতে সর্ষেবাটা ঝোলের মধ্যে ছোটো ছোটো পাবদা মাছের মতো কী যেন। বললাম, “কী?”

কাকিমা রান্নাঘরে গেছে। মা বলল, “দেখ, সেদিন কাকিমা আমার কাছে সর্ষেবাটা দিয়ে পাবদা মাছ রান্না শিখেছে, আজ আমাকে খেতে দিয়েছে সর্ষেবাটা দিয়ে উচ্ছে!”

তাকিয়ে দেখি উচ্ছেই বটে। মাঝখান থেকে ফালি করে কেটে সর্ষেবাটা ঝোলে যেন মাছ!

আমার আক্কেল গুড়ুম। তখন আমি বোধহয় ক্লাস সেভেন কি এইটে পড়ি। বললাম, “তুমি তো আধখানা খেয়েও ফেলেছ।”

মা কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, “আর বলিস না, কিন্তু আর পারছি না, বমি আসছে। এই টুকরোটা কোথাও ফেলে দে, আমি দেখি বাকি আধখানা কোনও রকমে গিলি।”

রান্নাঘর থেকে কাকিমার বেরোনোর শব্দ পেয়েই টুক করে না খাওয়া অর্ধেক উচ্ছেটা নিয়ে চলে গেলাম পাশে ঘরে। জানালা দিয়ে বাইরে তাকালে পাশের জমিতে মস্ত মালটি-স্টোরিড ফ্ল্যাটবাড়ি উঠবে বলে ভিত খোঁড়া হচ্ছে, ছুঁ-----ড়ে সেই গর্তে ফেলে দিলাম।

খানিক পরে মা আবার ডেকেছে, গিয়ে দেখি আধখাওয়া টুকরোটার কোনও সদ্গতিই মা করে উঠতে পারেনি তখনও। কী আর করি, বিপদভঞ্জন মধুসূদন হলাম আবার। মা কোনওরকমে ঝোলটা আঙুল দিয়ে চেটে চেটে খানিকটা খেয়ে বলল, “বাঃ চমৎকার।”

সাদার্ন অ্যাভেন্যু (মেঘনাদ সাহা সরণী) – লেক রোডের মোড়ে অশোকা নামের যে বিশাল বাড়িটা দাঁড়িয়ে আছে – তার গভীর ভিতের কোথাও এখনও হয়ত রয়েছে দেড় টুকরো উচ্ছে, সর্ষেবাটা মাখামাখি





হাওড়া যাওয়া

 “ভাবতে পারেন, ডাক্তারবাবু, বাড়িতে কিছু গণ্ডগোল হলেই সব দোষ আমার!”

উত্তেজিত রোগিনী পাশের চেয়ারে বসা স্বামীকে দেখিয়ে বললেন, “মেয়েকে বার বার বলা সত্ত্বেও সে ভুল বাসে উঠবে, কলেজ না গিয়ে রাস্তা হারিয়ে সারা দিন কাটিয়ে ফিরবে, সে-ও আমার দোষ।”

স্বামীও রেগে বললেন, “তোমারই তো দোষ। আমি মেয়েকে জিজ্ঞেস করেছি ও পরিষ্কার বলেছে, মা বলেছিল, ‘এসপ্ল্যানেডে নেমে রাস্তা পেরিয়ে বাসে উঠবি।’ মেয়েও তাই করে উলটো দিকে চলে গেছে। এসপ্ল্যানেডে তো রাস্তা পেরোবার কথা নয়।”

তা বলে একবার জিজ্ঞেস করবে না, অত বড়ো ধিঙ্গি মেয়ে? কনডাকটরকে যদি জিজ্ঞেস করত, পার্ক স্ট্রিট যায়? তাহলেই তো হত।”

সামনে বসা পেশেন্ট আর তার স্বামীর ঝগড়া থামানোর উদ্দেশ্যে জিজ্ঞেস করলাম, “কতদূর চলে গেছিল?”

তা বেশ অনেক দূর গেছিল, ডাক্তারবাবু! হাওড়া পৌঁছে গেছিল। সমস্যাটা হলো, ওখানে গিয়ে ঘাবড়ে গেছে। আমাকে ফোন করেছিল। আমি বলে দিলাম, কোথায় যেতে হবে, মেয়ে তারপরে বাড়ি ফিরেই মায়ের বকুনি খেতে শুরু করল।”

বাবা এসব বলে চলেছেন, আর আমি মনে মনে ভাবছি, মেয়েরা রাস্তা না চিনলে কত সহজে হাওড়া পৌঁছে যায়! এই সেদিন এক বেচারি মেয়ে ফোন করেছে, “শোনো না, আমি নিউ মার্কেট থেকে সল্ট লেক যাচ্ছি, নতুন ড্রাইভার কোন রাস্তা দিয়ে হাওড়া নিয়ে যাচ্ছে! একটু ওকে ডিরেকশন দিয়ে দাও — ও আবার হিন্দি ছাড়া কিছুই বলে না।”

ড্রাইভারকে ফোন দেওয়া হল। সে তো অবাক! “হাওড়া যানা হ্যায়? লেখিন দিদি বোলি ঘর চলো?”

আমি জানতে চাইলেম, “তো তুম হাওড়া নেহি যা রহে হো?”

সে বলল, “নেহি। ম্যায় আভি সেন্ট্রাল এভ্‌নু পর হুঁ। ইঁহা সে বিবেকানন্দ রোড পকড়েঙ্গে, সিধা জায়েঙ্গে কানকুরগাছি, ফির সল্ট লেক।”

আমি মেয়েটাকে জিজ্ঞেস করলাম, “তোর কেন মনে হল তুই হাওড়া পৌঁছেছিস?”

সদুত্তর পেলাম না।

আপনারা যারা ভাবছেন, এ তো হাওড়া যাবার গল্প নয়, এ তো হাওড়া যাচ্ছি ভাবার গল্প। তাদের বলি, হাওড়া যাবার গল্প আসছে এবার। সম্প্রীতির গল্প।


সম্প্রীতি বড়োলোক মা-বাবার মেয়ে। বাবা বড়ো পোস্টে কাজ করেন, বাড়িতে তিনটে গাড়ি থাকে (উনিশশো আশির দশকে যা খুব চমকানোর ব্যাপার), সুতরাং স্কুল (মধ্য কলকাতায় মেয়েদের নামী স্কুল) যেতে আসতে কোনওদিন অসুবিধায় পড়তে হয়নি — এবং রাস্তাঘাটও চেনা হয়নি কোনওদিন।

স্কুল শেষ করে যখন সম্প্রীতি কলেজে ভর্তি হল, তখন বাবা-মাকে জোর দিয়ে বোঝাল, যে দাদা, আর পাশের বাড়ি থেকে জামাইবাবু রোজ ডালহৌসি স্কোয়্যার যান অফিস করতে, সুতরাং প্রেসিডেনসি যেতে অসুবিধা হবে না। আর ফেরার সময় — আনোয়ার শা রোডে বান্ধবীর বাড়ি। একসঙ্গেই ফিরে আসবে।

তাই হল। রোজ সকালে সম্প্রীতি হয় দাদার বাইকে, নয়ত জামাইবাবুর গাড়িতে ডালহৌসি পৌঁছয়। জামাইবাবু (বা দাদা) একটা বাসের (বা ট্রামের) দিকে আঙুল তুলে বলেন, “ওটায় ওঠ!” সম্প্রীতি এক ছুটে গিয়ে উঠে, বাঁদিকের একটা সিটে বসে, জানলা দিয়ে দেখতে থাকে কখন মেডিক্যাল কলেজ পার করে কলেজ স্ট্রিটের বইয়ের দোকান দেখা যায়, দেখা গেলে গিয়ে গেটে দাঁড়ায়, পরের স্টপেই নামে, নেমেই দেখে সামনে প্রেসিডেনসি। দিনের শেষে বন্ধুরা হইহই করতে করতে বাসে-ট্রামে-হেঁটে চলে যায় ডালহৌসি, সেখান থেকে বি-বা-দী বাগ — টালিগঞ্জ লেখা মিনিবাসে চড়ে বাড়ি ফেরে।

সুখেই কাটছিল দিন, এমন সময় এক দিন এল, যেদিন কোনও কারণে অফিস কাছারিতে ছুটি, কিন্তু ইউনিভারসিটিতে নয় — এবং কলেজে সেদিন কী একটা পরীক্ষাও বটে। আশ্চর্য হলেও এরকম ঘটনা ঘটে — কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়েই ঘটে — আমার জীবদ্দশাতেই ঘটেছে।

আগের দিন সম্প্রীতির বাড়িতে বিশাল আলোচনা সভা। বাবা ডেকে পাঠিয়েছেন দাদা আর জামাইবাবুকে — কী ভাবে মেয়ে কলেজ যাবে? এই মিটিং-এর মধ্যে আড্ডা মেরে বাড়িতে ঢুকল সম্প্রীতি। আলোচনাসভা দেখে বলল, “কোনও দরকার নেই। আমি নিজেই কলেজ যাব, আবার ফিরবও। যেভাবে যাই সেই রাস্ততেই যাব। এখান থেকে মিনিবাসে ডালহৌসি, সেখান থেকে বাস ধরে কলেজ স্ট্রীট — সেকেন্ড ইয়ার হতে চলল, এখনও কলেজ যেতে পারব না? ভাব কী আমাকে? ইত্যাদি...”

সম্প্রীতির বাবা আমাকে বললেন, “অনিরুদ্ধ, তুমি ওকে নিয়ে যেতে পারবে? তুমি তো যাবে মেডিক্যাল কলেজে...”

আমি? আমার ক্লাস শুরু সকাল আটটায়। সম্প্রীতির পরীক্ষা সাড়ে দশটায়। আটটার সময় প্রেসিডেনসির সামনের গেটের তালা-ই খোলে না! বললাম, “তোর ওই আনোয়ার শা রোডের বন্ধু? ওর সঙ্গে যেতে পারবি না?”

বাজে কথা বোলো না তো! আমি কি নিজে কলেজ যেতে পারি না নাকি?” বলে সম্প্রীতি আমাকেই খানিক চেঁচামেচি করে টেনে নিয়ে গেল। আড়ালে বলল, “অদিতি তো কলেজ যাবার নামে মেট্রোতে সিনেমা যাবে ওর বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে। ওর তো আর পরীক্ষা নেই।”

আমিও নেই। তাড়াতাড়ি পালালাম।


পরদিন সকালে ফাঁকা (অফিস কাছারি বন্ধ) টালিগঞ্জ — বিবাদী বাগ মিনিবাসে চড়ে সম্প্রীতি কলেজে চললেন। সকাল থেকে দাদা-জামাইবাবু দুজনেই তৈরি — তাদেরকে “দূর হটো” বলে। ফাঁকা রাস্তা, শনশন করে বাস চলে একটা জায়গায় থামল। কন্ডাকটর ডেকে বলল, “দিদি, এসে গেছে, নামুন।”

ডালহৌসি স্কোয়ারের বাস চলা থামার ছবিটা তখন অন্যরকম ছিল, কিন্তু যা-ই হোক, বাস থামত যেখানে, আর যেখান থেকে ছাড়ত, দুটো একই জায়গা নয়। ফলে সম্প্রীতি বাস থেকে নেমে চারিদিক দেখে কিছুই চিনতে পারল না। বলল, “কলেজ স্ট্রীটের বাস কোথা থেকে পাব?”

কন্ডাকটর হাতটা আকাশে তুলে দূরের দিকে তাক করে বলল, “ওইখানে যান।”

সম্প্রীতি ওইখানে পৌঁছল। কেউ নেই যাকে জিজ্ঞেস করা যায়। হুশ হুশ করে বাস চলে যাচ্ছে, দেরি না হয়ে যায়! এমন সময়ে হঠাৎ দেখে একটা মিনিবাস। এটা ও প্রায়ই দেখেছে কলেজ স্ট্রিটে, কলেজের সামনেই। সল্ট লেক — হাওড়া স্টেশন। হাত দেখাতেই বাসটা ঘ্যাঁচ করে থামল। গেটে দাঁড়ান হেল্পার বলল, “তাড়াতাড়ি আসুন দিদি, এখানে দাঁড়ালে কেস দিয়ে দেবে।”

সম্প্রীতির কিছু জিজ্ঞেস করা হল না, এক ছুটে গিয়ে উঠতেই আবার বাসটা শনশনিয়ে ছুটল।

ভীড় না হলেও বাসটা খালি নয়, এবং বসার জায়গা নেই। সম্প্রীতি ঠেলেঠুলে ভেতরের দিকে গিয়ে একটু ফাঁকা জায়গা পেয়ে দাঁড়াল। সামনের জানলা দিয়ে নিচু হয়ে তাকালে রাস্তার বাঁ দিকের ফুটপাথ দেখা যায়।

কিন্তু যখনই নিচু হয়, বইয়ের দোকান তো দেখা যায় না!

এতক্ষণে পৌঁছে যাওয়া উচিত। কিন্তু — এ কী! বাসটা একটা বড়ো নদী পেরোচ্ছে যে — এই নদীটা সম্প্রীতি চেনে — এটা তো গঙ্গা! ওপারে ওই লাল বাড়িটা হাওড়া স্টেশন! কী বিপদ! এখান থেকে কী করে কলেজ যাবে?

সম্প্রীতি ঠেলেঠুলে আবার বাসের দরজায় পৌঁছে বলল, “কলেজ স্ট্রীট যায় না?”

কনডাকটর বলল, “আরে কলেজ স্ট্রীট তো ওদিকের বাস যাবে। আপনি তো হাওড়ার বাসে উঠেছেন। নেমে রাস্তা পেরিয়ে যান!”

তখন হাওড়া ব্রিজ পেরিয়ে বাসটা ট্র্যাফিক জ্যামে থেমেছে। সম্প্রীতি আবার এক ছুটে রাস্তা পেরিয়ে গেল। রাস্তার পাশে দাঁড়ান একজনকে জিজ্ঞেস করল, কলেজ স্ট্রিট যায় কোন বাস?”

লোকটা একটা ট্রামের দিকে দেখিয়ে বলল, “ওই তো ওটা যাবে।”

সম্প্রীতি দেখে ২৬ নম্বর ট্রাম। একটু খটকা লাগল। কই, কলেজ স্ট্রীটে তো এই ট্রামটা দেখিনি কখনও? কিন্তু ফাঁকা পাদানিতে দাঁড়ান কনডাকটরও যখন বলল, “হাঁ, হাঁ, যায়গা যায়গা...” তখন আর দ্বিরুক্তি না করে উঠে পড়ল।

লেডিজের দিকে বাঁ-ধারের সিট খালি। সম্প্রীতি তারই একটায় বসে রাস্তার দিকে নজর রাখল। বইয়ের দোকান দেখতে যাতে ভুল না হয়।

ট্রাম চলছে তো চলছেই। সম্প্রীতি জানে না হাওড়া থেকে কলেজ স্ট্রীট কত দূর। কনডাকটরও খানিক বাদে সামনের দিকের একটা সিটে বসে ঘুমিয়ে পড়ল। ছুটির দিনে তারও ব্যবসা মন্দা। ফাঁকা রাস্তায় ট্রাম চলছে, হঠাৎ একটা বিশাল সাতমাথার মোড়ে এসে সম্প্রীতির খেয়াল হল এই জায়গাটা ও চেনে। এর নাম পার্ক সার্কাস।

এ কী! চিৎকার করতে শুরু করল সম্প্রীতি, “ইয়ে তো পার্ক সার্কাস হ্যায়। আপ মুঝে বোলা কলেজ স্ট্রীট যায়গা, কিন্তু এটা কী রকম কলেজ স্ট্রীট হ্যায়?”

কনডাকটর ঘুম থেকে উঠে বলল ২৬ নম্বর ট্রাম তো কলেজ স্ট্রীটের মোড় পার করেই শেয়ালদা, মৌলালি, মল্লিকবাজার হয়ে পার্ক সার্কাস এসেছে। আপনি কলেজ স্ট্রিট — মহাত্মা গান্ধী রোডের মোড়ে নামেননি কেন?”

সম্প্রীতি আর কি বলবে, তাই, “যত্তোসব আজেবাজে কথা বোলতা হ্যায়,” বলে ট্রাম থেকে নেমে একটা ট্যাক্সি করে বাড়ি ফিরল।


গল্পটা কিন্তু এখানেই শেষ নয়। কিছুদিন পরে হঠাৎ প্রকৃতি-দা ফোন করল। এমনিতেই কম কথার লোক, সেদিন দুপুরে আরও গম্ভীর যেন।

কী করছ?”

বললাম, “বিশেষ কিছু না।”

আমার বাড়ি আসবে?”

প্রকৃতি-দার বাড়ি আমার পাড়াতেই। বললাম, “আসছি।”

খানিকক্ষণ পরে প্রকৃতিদার বাড়ির গেট খুলতে যাচ্ছি, পেছন থেকে হাঁক এল, “এই যে, আর ঢুকতে হবে না।”

দেখি প্রকৃতিদা বাড়ির পাশের পানের দোকানে। সঙ্গে দীনুদা।

ঈভ্‌স উইকলি বিল্ডিং কোথায় জান?” বলল প্রকৃতিদা।

ঈভ্‌স উইকলি তো সেই মেয়েদের ম্যাগাজিন। বম্বে থেকে পাবলিশ হয় না?”

সম্প্রীতি ফোন করেছিল। ওর কোন বন্ধু ওই বাড়িতে থাকে। ওদের বাড়িতে নাকি একটা ভাম ঢুকে আটকে গেছে। বুড়ো, কিংবা অসুস্থ। নড়তে পারছে না। উদ্ধার করে আনতে হবে।”

ভামোদ্ধার জাতীয় কার্যে প্রকৃতিদার সমকক্ষ কেউ নেই, কিন্তু ঈভস উইকলি বিল্ডিং কোথায়? আমরা এখন লিভিংস্টোনের মতো কোথায় যাব?

প্রকৃতিদা বলল, “সম্প্রীতি এখন ওখানে যাচ্ছে। আমাদের জন্য অপেক্ষা করবে। আমাকে মোটামুটি যা ডিরেকশন দিয়েছে, তাতে বুঝছি মিন্টো পার্কের কাছাকাছি কোথাও। চলো, গিয়ে মিন্টো পার্কের ওখান থেকে ফোন করব।”

তার চেয়ে এই ভালো নয় কি, যে সম্প্রীতি ওখানে পৌঁছে আমাদের ফোন করে ঠিকমত ডিরেকশন দিক?

দীনুদা ফিসফিস করে বলল, “আমিও তো তাই বলছি। কিন্তু কী তাড়া লেগেছে বুঝছি না।”

(এই ঘটনার মাস ছয়েক বাদে যখন প্রকৃতিদার মা আমাদের আলাদা আলাদা ডেকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, “সম্প্রীতি মেয়েটা কেমন গো?” তখন দীনুদা বলেছিল, “এইবার বুঝছি।”)

যাই হোক, আমরা বাসে করে গেলাম মিন্টো পার্ক (এখন ভগত সিং উদ্যান), সেখানে নেমে একটা দোকান খুঁজে ফোন করা হল (তখন মোবাইল ফোন তো ছিলই না, রাস্তায় রাস্তায় নানা প্রাইভেট কম্পানির ফোন বুথও ছিল না। শুধু ছিল ক্যালকাটা টেলিফোনস যাদের পাবলিক ফোন বুথ খুঁজে পাওয়া গেলেও তাতে ডায়াল টোন পাওয়া মুশকিল হত। সুতরাং দোকানে দোকানে গিয়ে জিজ্ঞেস করতে হত, “দাদা একটা টেলিফোন করা যাবে?”)

তা-ই করা হল। ফোনে কথা বলল প্রকৃতিদা-ই। তারপরে রাস্তা পেরিয়ে মিন্টো পার্কের পাশের সরু রাস্তা ধরে হাঁটা দিল।

এই রাস্তার শেষে বলেছে।”

এই রাস্তা? হাঙ্গারফোর্ড স্ট্রীটের শেষে ঈভস উইকলি বিলডিং? কই কোনও দিন দেখিনি তো?

যাই হোক, রাস্তার শেষ এল। যেমন চিরকাল ছিল, একদিকে সেন্ট জেভিয়ার্সের প্রাইমারি সেকশন, অন্য দিকে কয়েকটা বাড়ি। কোথাও ঈভস উইকলি বলে কিছু নেই।

একটা পানের দোকানে কিছু ছাত্র দাঁড়িয়ে সিগারেট কিনছিল আর জটলা করছিল। ওদের জিজ্ঞেস করলাম, “এখানে ঈভস উইকলি বলে কোনও বিল্ডিং আছে?” তারা অবাক হল, একে তাকে জিজ্ঞেস করল, কিন্তু কিছু বলতে পারল না। পানদোকানওয়ালা ভেবে পেল না এমন কোনও বিল্ডিং-এর নাম।

এমন সময় প্রকৃতিদা ডাকছে, “এই যে, এই বাড়ীটা।”

একটা পাঁচ না ছতলা বাড়ি — তাতে কোনও ঈভের দেখা নেই। কী করে জানলে?

এই তো নম্বর মিলে যাচ্ছে। আর সম্প্রীতির বন্ধুর নাম রেখা ঝুনঝুনওয়ালা, ফ্ল্যাট ৩বি। এই বাড়ির সিঁড়ির নিচের একটা লেটার বক্সে লেখা আছে — ৩বি ঝুনঝুনওয়ালা। এটাই হবে।”

গোয়েন্দাগিরি সাক্সেসফুল। রেখার বাড়িতে ঢুকে দেখা গেল, সম্প্রীতি অপেক্ষমানা, সেই সঙ্গে পোক্ত কাঠের একটা খাঁচা, যাতে এর আগে ওর বাড়িতেই রাখা হয়েছিল অসুস্থ কোনও প্রাণী।

কসরত করে তাতে ধরা হল রেখার বাড়িতে ঢুকে পড়া বুড়ো ভাম। সকলে নামলাম নিচে। দীনুদা ছুটল ট্যাক্সি ডাকতে।

সম্প্রীতিকে বললাম, “হ্যাঁ রে, ঈভস উইকলি বিল্ডিং কেন বলেছিলি রে?”

সম্প্রীতি বলল, “এটাই তো ঈভস উইকলি বিল্ডিং। সব্বাই জানে।”

কেউ জানে না।”

এই তো অ্যাত্তো বড়ো বড়ো করে লেখা আছে। দেখতে পাও না? অন্ধ নাকি?”

দেখি গ্যারেজের পাশে একটা নেম-প্লেট, তাতে লেখা ঈভস উইকলি — রিজিওনাল অ্যাডভার্টাইজমেন্ট অফিস। তারপরে কার নাম, ফ্ল্যাট নম্বর — এই সব। নেম-প্লেটটার সাইজ ৬” বাই ৪”-র বেশি নয়।

বললাম, “হাঙ্গারফোর্ড স্ট্রিট বলতে পারলি না, সেন্ট জেভিয়ার্সের উলটো দিকে বলতে পারলি না, এই গ্যারেজের পাশে রুমালের সাইজের কাঠের টুকরোয় ঈভস উইকলি লেখা — তাতে গোটা বাড়িটাই ঈভস উইকলি হয়ে গেল?”

যাও যাও, সারা কলকাতার লোক জানে আর তুমি জান না, তাই বলছ। আর আমার হাওড়া যাওয়া নিয়ে হাসাহাসি কর। লজ্জা করে না?”





সদ্য ডাক্তার ও মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভ

ডাক্তার হলে যে নানা রকম বিপদ সামলাতে হয়, তার মধ্যে একটাকে বলে “মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভ”। যখন ছাত্র, তখনও ডাক্তার হইনি, তখন মেডিক্যাল কলেজের হাসপাতালে স্মার্ট শার্ট-প্যান্ট পরা লোকগুলো আমাদের দিকে তাকিয়েও দেখত না। যেদিন থেকে প্রেসক্রিপশন লিখতে শুরু করলাম, তখন থেকে তারা ডাঃ দেব বলে ডাকতে শুরু করল, অনেকে ‘অনিরুদ্ধদা’ বলত : যদিও তারা বয়সে আমার চেয়ে কম সেরকম কোনও লক্ষণ দেখতাম না। আর স্পেশালিস্ট হবার পরে তো বেশিরভাগ রিপ্রেজেন্টেটিভ ‘স্যার’ বলেন, আজঅনিরুদ্ধদা’ বলার লোক প্রায় নেই-ই।

মেডিক্যাল কলেজে তাদের “বেচু” বলা হত। পরে জেনেছি সব কলেজেই ডাক্তাররা, বিশেষত সদ্য পাশ করা ডাক্তাররা তাদের বেচু-ই বলতেন। এখনও বলেন। আমার কথাটা ভালো লাগত না। মনে হত এমনও তো হতে পারত মেডিক্যাল এনট্রান্স পরীক্ষায় আমি পাশ করতে পারিনি? তাহলে তো আমি ডাক্তার হতাম না। হয়ত এমনই ব্যাগ বয়ে বয়ে দুপুর রোদে “আমার ওষুধটা লিখে দিন স্যার”, বলে ঘুরে বেড়াতাম। অবাক হয়ে ভাবতাম যে ডাক্তার দাদার নিজের ভাই মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভ, তিনিও অন্যদের কী অবলীলাক্রমে বেচু বলে নিজের ভাইয়ের সম্বন্ধে বলার সময়ে নাম ধরে বলেন।

পরে যখন স্পেশালিস্ট হয়ে কনসালট্যান্ট হয়েছি, তখন আর একটু অসুবিধা হয়েছে। আমরা যখন ডাক্তারি পাশ করেছি, তখন ওষুধ কোম্পানির তরফ থেকে শুধুই একজন রিপ্রেজেন্টেটিভ আসতেন ওষুধ সম্বন্ধে বলতে। কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলে গেছে। এখন অজস্র কোম্পানি, তাদের মধ্যে গলাকাটা কম্পিটিশন, সুতরাং এখন রিপ্রেজেন্টেটিভের ওপর এরিয়া ম্যানেজার, তার ওপরে জোন্যাল ম্যানেজার, ভাইস প্রেসিডেন্ট, জি. এম. মায় মালিক পর্যন্ত ডাক্তারদের সঙ্গে দেখা করে নিজের কোম্পানির ওষুধের জন্য অনুরোধ উপরোধ এমনকি নানারকম লোভ দেখিয়ে যান।

মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভরা ওষুধ সম্বন্ধে বলে চলে যায়, আর মাঝে মাঝে বাণী দিতে আসেন বড়ো সাহেবরা। যত বড়ো কোম্পানি, তত সাহেবদের সংখ্যা বেশি। কেউ কেউ সাইকিয়াট্রিস্ট পোষে। কেউ কেউ সায়েন্টিস্ট পাঠায়। কিন্তু উদ্দেশ্য সবার ওই একই – অন্য কোম্পানির চেয়ে আমার কোম্পানির ওষুধ বেশি লেখা হোক।

সেই উদ্দেশ্যে অনেক সময়ে নিজেরটাকে উত্তম প্রতিপন্ন করতে নানা কাহিনি সৃষ্টি করতে হয়। সেই কাহিনি এমনই মোড়কে মুড়ে দেওয়া হয় যে ডাক্তারের পক্ষে তার অসত্য উদ্‌ঘাটন করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। আমার কপাল ভালো যে আমি ডাক্তারি জীবনের শুরুতেই এরকম ধাক্কা খেয়ে ঠেকে শিখেছিলাম।

রোগ জীবানুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য ডাক্তারিতে প্রধান অস্ত্র আজও অ্যানটিবাইওটিক নামের ওষুধ। অ্যানটিবাইওটিক আবিষ্কারের আগের যুগে কিছুদিন কেমোথেরাপিউটিক জাতীয় ওষুধ ব্যবহার হত। কিছু এরকম ওষুধ এখনও পাওয়া যায়, অ্যান্টিবাইওটিকের যুগেও তারা আগের মতোই কার্যকরী। কোট্রাইমোক্সাজোল এরকম একটা ওষুধ (যা সেপট্রান বা ব্যাকট্রিম নামে তখন বাজারে চলত, আজ কী নামে পাওয়া যায় জানি না)

কোট্রাইমোক্সাজোল-এর ডোজ ছিল সকালে দুটো মোটা মোটা ট্যাবলেট আর রাত্রে আবার ওই দুটো মোটা মোটা ট্যাবলেট। অনেকেই খেতে পছন্দ করতেন না। তাই অনেক কোম্পানি ডবল স্ট্রেংথ বা ডি.এস. ট্যাবলেট তৈরি করেছিল, যাতে একটা করে সকালে রাতে খেলেই চলত।

একদিন, মেডিক্যাল কলেজের প্রাঙ্গনে দেখা হল এমন এক কোম্পানির রিপ্রেজেন্টেটিভের সঙ্গে যাদের ডি.এস. ট্যাবলেট নেই। তিনি একথা সেকথায় আমাকে খুব সরল মুখে বললেন, আজকাল অনেকেই ডি.এস. ট্যাবলেট লিখছেন, কিন্তু মুশকিল হল এই যে ডি.এস. ট্যাবলেট হতে পারে না। আমরা কোট্রাইমোক্সাজোল-এর আবিষ্কারকর্তা। আমাদের ল্যাবরেটরিতে টেস্ট করে দেখা গেছে যে দুটো ট্যাবলেট এক করলে ওই সাইজ হয় না। অ্যা-অ্যা-অ্যাত্তবড়ো, ডিউস বলের সাইজ হয়ে যায়। সুতরাং যে সব রোগীরা ওই সব কোম্পানির ডি.এস. ট্যাবলেট খাচ্ছেন, তাদের যে কী হচ্ছে কে জানে।

আমি তখন সদ্য ডাক্তার। ডিউস বল সাইজের গুলটা সম্পূর্ণই গিলে ফেলেছিলাম। মনে ভেবেছিলাম, বাবাগো, এই হল রিসার্চ। এই হল মালটিন্যাশনাল কোম্পানি। এবং তারপরে ওদের ছাড়া অন্য কোনও কোম্পানির কোট্রাইমোক্সাজোল লিখিনি – ভুল ভাঙা অবধি। আমার কপাল ভালো, এই কথা শোনার ২-৩ মাসের মধ্যে সেই কোম্পানিই কোট্রাইমোক্সাজোলের ডি.এস. ট্যাবলেট বিক্রি শুরু করেছিল। এবং তার সাইজ ক্রিকেট বল দূরে থাক, পিং পং বলের আকারও ধারণ করেনি। আমি অনেক চেষ্টা করেছিলাম সেই রিপ্রেজেন্টেটিভকে জিজ্ঞেস করব, কী মন্ত্রবলে সেই জাদু সম্ভব হয়েছিল, কিন্তু আমার কপাল খারাপ – তারপর আমি যখনই তাকে দেখেছি, তিনি তখন অনেক দূরে, আমার থেকে আরও দূরে হনহন করে চলে যেতে দেখেছি। ডাকলেও শুনতে পানি বেচারা।

অবশ্য ওই কোম্পানির দাবি যদি কখনও কোনও রিপ্রেজেন্টেটিভ করে থাকে তবে তারা সেটা কোম্পানির শিক্ষাতেই করে। এবং অনেক সময়েই সে শিক্ষক একজন ডাক্তার, যিনি কি না ওষুধ কম্পানির চাকরি করেন। মেডিক্যাল কলেজে থাকাকালীন আমি কিছুদিন নিউরোলজিতে কাজ করেছিলাম। সেখানে রোগীদের নানারকম ভিটামিন খেতে দেওয়াটা দস্তুর ছিল। এমন একদিন, ওই কম এক বিশাল বিদেশি কোম্পানির তখনকার রিপ্রেজেন্টেটিভ, বেশ বয়স্ক এক ভদ্রলোক এসে ক্যান্টিনে আমার অনুমতি নিয়ে আমার সামনে বসলেন। চা খেতে খেতে গল্প বললেন, কোম্পানি তাদের সকলকে নিয়ে গিয়েছিল ট্রেনিং-এর জন্য বোম্বাই। তিনদিনের ট্রেনিং হয়েছিল। সেখানে প্রথম দিন তাঁদের সবাইকে নিজের কোম্পানির ভিটামিন বি-কমপ্লেক্স খেতে হয়। যাঁরা কখনও বি-কমপ্লেক্স খেয়েছেন, তাঁরা সকলেই জানেন, যে ওষুধ খাবার খানিক পরেই প্রস্রাব হলুদ হয়ে যায়। প্রথমদিন তাঁদের ঘড়ি ধরে বলা হয়, কতক্ষণে হলুদ হল তা দেখতে। পরবর্তী দু’দিন, অন্যান্য বড়ো বড়ো কোম্পানির বি-কমপ্লেক্স খাওয়ানো হয়, বলা হয় আবার কতক্ষণে হয় দেখুন।

ডাঃ দেব”, ক্যান্টিনের বেঞ্চে বসে ঘটনাটা বলতে বলতে ভদ্রলোকের রোমাঞ্চ হচ্ছিল বুঝতে পারছিলাম। “ভাবতে পারেন, আমাদের বি-কমপ্লেক্স অন্য যে কোনও বি-কমপ্লেক্সের অন্তত ৪৫ মিনিট আগে ইউরিন হলুদ করে দিল। এখন আমার নিজের মনে আর কোনও সন্দেহ নেই, আমাদের বি-কমপ্লেক্স বাজারের সেরা।”

আমি আবার গিললাম গল্পটা, এবার বাঁচালেন নিউরোলজির মেডিক্যাল অফিসার, সুভাষ-দা। সুভাষ-দা যেমন সাংঘাতিক ভালো ডাক্তার, ততই ভালো অ্যাডমিনিস্ট্রেটর। কয়েক সপ্তাহ পরে ডাক পড়ল ওনার ঘরে।

অনিরুদ্ধ, ওই ভিটামিন কোম্পানিটা কি তোকে টাকা দিয়েছে?”

আমি অবাক। কেন?

তাহলে অন্য সব কোম্পানি ছেড়ে কেন শুধু ওদেরই ভিটামিন লিখছিস?”

আমি খুব উৎসাহের সঙ্গে সুভাষ-দাকে সবটা বললাম, শুনে সুভাষ-দা বললেন, “যা দেখ তো, লোকটা বোধহয় বাইরে দাঁড়িয়ে আছে, ডেকে আন।

ভদ্রলোক এলেন, সুভাষ-দা খুব তাচ্ছিল্যের গলায় বললেন, “তোদের বি-কমপ্লেক্স-এ নাকি চোখের পাতা পড়তে না পড়তে হিসি হলদে যাচ্ছে?”

ভদ্রলোক শ্লেষটা বুঝতে না পেরে আনন্দের সঙ্গে সুভাষ-দাকে সবটা বললেন। সুভাষ-দা ঢুলুঢুলু চোখে সবটা শুনে বলল, “বাঃ বাঃ, চমৎকার। তা সঙ্গে স্যাম্পেল আছে নাকি? দে তো একটা।”

ভদ্রলোক ব্যাগ থেকে বি-কমপ্লেক্স বের করে দিলেন। সুভাষ-দা ফয়েল থেকে একটা ট্যাবলেট বের করে সেটাকে সামনের খাবার জলের গ্লাসে ডুবিয়ে ঘষে ঘষে হলুদ রঙটা তুলে সাদা হয়ে যাওয়া ট্যাবলেটটা আবার ওঁর হাতে দিয়ে বললেন, “নে, খা। খা, খা”, বলে প্রায় জোর করেই ট্যাবলেটটা গেলালেন। তারপর বললেন, “ঘড়িটা দেখ। এবার লক্ষ কর কতক্ষণে হিসি হলদে হয়। কাল বলে যাস।”

ভদ্রলোক পালিয়ে বাঁচলেন। সুভাষ-দা আমার দিকে ফিরে বললেন, “তোর মতো বুদ্ধিমান একটা ছেলে এইরকম বোকা বনবে আমি ভাবিনি। তুই একবারও ভাবলি না যে ওদের ট্যাবলেটটাই হলদে রঙের?”

বুদ্ধিমান কতটা জানিনা। কিন্তু সেদিন থেকে ঠিক করেছিলাম, যে কোনও ওষুধ কোম্পানির কোনও দাবি খতিয়ে না দেখে বিশ্বাস করব না। সেই জন্যই ওষুধ কোম্পানির লোকেদের মধ্যে আমার ‘পড়ুয়া’ বলে নামডাক।

আমি তারপরে মেডিক্যাল কলেজে ছিলাম বহু মাস। কিন্তু ওই ভদ্রলোকের সঙ্গে আর দেখা হয়নি। তারপর কলকাতা ছেড়ে চলে যাই, ছ’বছর পর ফিরে এসে একদিন হঠাৎ উল্টোডাঙার মোড়ে মুখোমুখি। দুজনেই পরস্পরকে চিনেছি। উনি ততদিনে রিটায়ার করেছেন। উল্টোডাঙার কাছে থাকেন। খানিক কুশল বিনিময়ের পরে চলে গেলাম। হিসি হলদে হতে কত সময় নিয়েছিল আর জানা হল না।




পোক্ত ডাক্তার এবং মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভ

মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভদের নিয়ে সমস্যা ছিল এক রকম যখন জুনিয়র ডাক্তার ছিলাম। ক্রমে যখন বড়ো হলাম তখন সমস্যার পরিবর্তন হল।

আজকাল অনেক কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হয়। কখনও সখনও ভিটামিনের মতো রিপ্রেজেন্টেটিভ এসে একটা গল্প বলে যেগুলো বোঝা কঠিন হয় না। কিন্তু যখন কোম্পানির ডাক্তার আসেন, বা রিসার্চ সায়েন্টিস্ট, তখন খুব অসুবিধা হয়।

একবার কোনও এক কোম্পানির রিপ্রেজেন্টেটিভ, ধরা যাক তার নাম পরিতোষ, এসে বলল, “স্যার, আপনি অনুমতি দিলে একটা জিনিস দেখাই।” বলে ব্যাগ থেকে প্রথমে একটা গ্লাস বের করে টেবিলে রাখল। তারপর একটা জলের বোতল বের করে গ্লাসে জল ঢালল। তারপর, সেই ব্যাগ থেকেই বের করল তাদের কোম্পানির একটা ওষুধের পাতা এবং অন্য তিন-চারটে বড়ো বড়ো কোম্পানির সেই ওষুধের পাতা। বলল, “স্যার, এই সব ওষুধগুলো আমি দোকান থেকে কিনে এনেছি। অন্যগুলো তো বটেই, এমনকি আমাদের নিজেদেরটাও। দেখুন কোথাও ফিজিশয়ান’স স্যাম্পেল লেখা নেই। এবার আমি এক এক করে সবকটা জলে ফেলব, আপনি দেখবেন আমাদের ওষুধটা তাড়াতাড়ি গুলে যায়। অন্যদের চেয়ে অনেক তাড়াতাড়ি গোলে।”

এই বলে সে পাতা ছিঁড়ে ওষুধ বের করতে যাবে, আমি বাধা দিয়ে বললাম, “থাক, থাক, আমি মেনে নিচ্ছি তোমার ওষুধ ওদের চেয়ে তাড়াতাড়ি গোলে। তাতে কী প্রমাণ হয়?”

প্রবল উৎসাহের সঙ্গে পরিতোষ বলল, “স্যার, এই হল অকাট্য প্রমাণ যে আমাদের ওষুধই সবচেয়ে ভালো এবং ডিপ্রেশন সব চেয়ে তাড়াতাড়ি সারাবে। সুতরাং দাম একটু বেশি হলেও আমাদেরটাই লিখবেন।”

আমি বললাম, “তোমাদের ওষুধ অন্যদের চেয়ে কত আগে জলে গুলে যায়? দু’মিনিট? তিন মিনিট?”

পরিতোষ একটু সামান্য লজ্জার হাসি হেসে বলল, “না, অত নয়। পঁয়তাল্লিশ সেকেন্ড মতো।”

আমি চোখ কপালে তুলে বললাম, “তাই, পুরো পঁয়তাল্লিশ সেকেন্ড? তার মানে তোমার ওষুধটা পেটে গেলে ওই অন্যগুলোর চেয়ে পঁয়তাল্লিশ সেকেন্ড আগে গুলে যাবে? নাকি ওগুলোর চেয়ে পঁয়তাল্লিশ সেকেন্ড আগে ডিপ্রেশন সেরে যাবে?”

পরিতোষ চোখ গোল গোল করে চেয়ে রইল খানিকক্ষণ। তারপর বলল, “তাই তো বটে স্যর, ডিপ্রেশন তো সারতে সারতেই ছ’সপ্তাহ সময় লাগবে।”

কিন্তু তুমি বলছ, তোমার কোম্পানির ওষুধ খেলে পাঁচ সপ্তাহ, ছ’দিন, তেইশ ঘন্টা, ঊনষাট মিনিট, পনের সেকেন্ড পরেই ডিপ্রেশন সারতে শুরু করবে। এবং সেই জন্য ওগুলোর চেয়ে অন্তত ষোলোগুণ দামি তোমার কোম্পানির ওষুধ লিখতে হবে তাই তো?”

বিশাল জিভ কেটে পরিতোষ যখন গ্লাস, বোতল সব ব্যাগে ঢোকাচ্ছে, আমি তখন বললাম, “তোমার কোম্পানি নিজেদের রিসার্চ অরগানাইজেশন বলে বর্ণনা করে। এই কি গবেষণার ফল?”

আমার একজন শিক্ষককে এই গল্পটা যখন করেছিলাম তখন তিনি বলেছিলেন, “দেখো অনিরুদ্ধ, মাল বিক্রি করার জন্য কোম্পানির লোক বানিয়ে বানিয়ে অনেক কিছুই বলে, কিন্তু আমার গা জ্বলে যায় ওরা যখন আমাদের গাধা মনে করে গাধা বানাবার চেষ্টা করে।”

এটা বোঝা সোজা ছিল। কিন্তু এর পরের দুটো গল্প বড়ো-সাহেবদের নিয়ে। এরা গাধা বানানোয় সিদ্ধহস্ত। এবং অনেক তাবড় ডাক্তারকে বোকা বানিয়ে নিশ্চয়ই স্টুপিড-রত্ন টাইপের খেতাব টেতাব পেয়েছে – এদের সামলান সোজা নয়।


একটা ওষুধ ছিল যেটা একসময়ে এমনভাবে তৈরি হত যাতে দিনে দু’বার খেতে হত। কিন্তু রোগীরা মাঝে মাঝে দু’বার খেতে ভুলে যায় তাই অনেক কোম্পানি দিনে একবার খাওয়া যায় এমন ভাবে একটা দামি ট্যাবলেট তৈরি করে। এই ধরনের ওষুধকে এক্সটেনডেড রিলিজ বলে (এই ওষুধেও সাধারণত ডবল ডোজ একই ট্যাবলেটে থাকে, কিন্তু আগের কাহিনির ডবল-স্ট্রেংথ ওষুধের টেকনোলজি আর এই টেকনোলজি আলাদা)। ট্যাবলেট থেকে ধীরে ধীরে ওষুধ বেরোয়। কিন্তু অসুবিধা হল এই যে তাতে অনেক সময়ে সম্পূর্ণ ট্যাবলেটটা গোলেই না, তার আগেই শরীর থেকে বেরিয়ে যায়। অর্থাৎ ২৫-৩০% ওষুধ বেশি দিতে হয়। এমনিতেই দামি ওষুধ, তায় বেশি দিতে হয় – তাতে আরও খরচ বাড়ে। সেদিন এক বিখ্যাত কোম্পানির রিসার্চ অফিসার এসেছেন। এসে বললেন, “আমাদের এক্সটেন্ডেড রিলিজ ট্যাবলেট আপনি নিশ্চিন্তে কম ডোজই দিতে পারবে, আমাদের ওষুধ স্পেশাল ‘প্যারাশুট টেকনোলজি’ দিয়ে তৈরি। তার ফলে ট্যাবলেটটা খাদ্যনালীতে যে খাবার থাকে তার ওপর ভাসতে থাকবে। সুতরাং কোনও চিন্তা নেই, সমস্ত ট্যাবলেটটাই পেশেন্টের রক্তে মিশবে, স্যার।”

শুনে চমৎকৃত হয়ে গেলাম। এমন এক আশ্চর্য আবিষ্কার, অথচ আমি জানতামই না? অবশ্য জানার কথাও নয় : কারণ আমি তো ডাক্তারি পড়েছি আর ওষুধ তৈরির কারিকুরি জানা যায় ফার্মাসি পড়লে – যেটা আমাদের সময়ে ছিল ইঞ্জিনিয়ারিং-এর অঙ্গ

কম্পিউটারের যুগ। বাড়ি ফিরে “প্যারাশুট টেকনোলজির” সঙ্গে “ট্যাবলেট” লিখে ইন্টারনেট ঘেঁটে কিছুই না পেয়ে শেষে আমার পরিচিত কিছু ডাক্তারকে ই-মে লিখলাম, এই বিষয়ে কি কিছু জানেন? তাঁরা সকলেই লিখলেন এমন অত্যাশ্চর্য কথা তাঁরা কেউই আগে শোনেননি এবং একজন লিখলেন, “অনিরুদ্ধ, তুমি শিগগির এই ভদ্রলোককে বলো, তিনি যেন তাঁর আবিষ্কারের কাগজপত্র আমাকে পাঠিয়ে দেন এরকম একটা আবিষ্কার মেডিসিন-এ নোবেল প্রাইজ পাবেই পাবে।”

আমি ভালোমানুষের মতো এই সব কটা ই-মেইল সেই সায়েন্টিস্ট ভদ্রলোককে পাঠিয়ে দিলাম – পাছে হারিয়ে যায়, তাই ওই কোম্পানির বড় সাহেবকেও পাঠালাম। বলা বাহুল্য, কেউ নোবেল পায়নি এখনও, এবং আমিও ওই ভদ্রলোককে আর কোনও দিন দেখিনি। ওঁর এক সহকর্মী বহুদিন পরে আমার কাছে কবুল করেছিলেন যে আমার চিঠির পরে বিজ্ঞানীকে কোম্পানির তরফে বেশ ভালোরকম বকাবকি করা হয়েছিল। আমার কিন্তু এখন ওঁর ওপর রাগ আছে। আমরা ওষুধ কোম্পানির গবেষকদের পর ভরসা করতে না পারলে কার পরে করব? রিসার্চ তো আজকাল আর বিশ্ববিদ্যালয়ে হয় না, হয় কর্পোরেট হাউজে।

এইরকম আর একটা অভিজ্ঞতা সেই কোম্পানিরই একজন বড়ো সাহেবের কাছ থেকে, যে কোম্পানির রিপ্রেজেন্টেটিভ আমার কাছে জলের গ্লাস নিয়ে এসেছিল। তিনি সেদিন এসে বললেন, “জানেন, আমাদের ওষুধটা সবচেয়ে বেশি পরিশ্রুত – পিওর – কারণ এই ওষুধ তৈরি করতে গেলে নিউক্লিয়ার ম্যাগ্নেটিক রেজোনেন্স ইমেজিং মেশিন লাগে, যা ভারতবর্ষে আর কোনও ওষুধ কোম্পানির নেই।বলা বাহুল্য, এর পরের অব্যক্ত বাক্যটি হল - সুতরাং স্যার, বুঝে নিন, আমাদের ছাড়া অন্য কারো ওষুধ যদি লিখেছেন, তাহলে কী আপনার রোগীর হাতে আপনি তুলে দিচ্ছেন, জাস্ট ভেবে দেখুন।

খটকা লাগল। ভদ্রলোক বেরিয়ে যাওয়া মাত্র ইন্টারনেট ঘেঁটে ফেললাম। কিন্তু নিউক্লিয়ার ম্যাগনেটিক রেজোনেন্স ইমেজিং-এর সঙ্গে ওই ওষুধ তৈরির কোনও সম্পর্ক পেলাম না। ফলে বাধ্য হয়ে প্রশ্ন করলাম আবার একজন এক্সপার্টকে। তিনি চিঠি লিখে জানালেন, যে যন্ত্র দিয়ে ওষুধটা পরিশ্রুত করা হয় তার নাম সিমুলেটেড মুভিং বেড ক্রোমোটোগ্রাফি। নিউক্লিয়ার ম্যাগনেটিক রেজোনেন্স ইমেজিং-এর সঙ্গে তার কোনও সম্বন্ধ নেই। সেই সঙ্গে ভদ্রলোক এ-ও জানালেন, যে কোম্পানির কর্তা আমাকে এই গল্পটা মেরেছেন সেটা বিখ্যাত বিদেশি কোম্পানি হতেই পারে, কিন্তু একাধিক ভারতীয় কোম্পানির ক্ষমতা আছে ওই ওষুধ তৈরি করার।

সেই কোম্পানির একজন বড়ো সাহেবকে লিখলাম, “ওমুকবাবুকে আমার সঙ্গে দেখা করতে পাঠাবার আগে ভালো করে হোমওয়ার্ক করে আসতে বলবেন, এবং এ-ও বলে দেবেন, যে উনি গপ্পো বললে সে গরু গাছ থেকে নামানোর উপায় আমার জানা আছে।”

তারপর থেকে আমার সঙ্গে তাঁর আর দেখা হয়নি।




পরিষেবা


যে দেশে যে পরিষেবা নেই, সে দেশে সেই পরিষেবা দেবার একদল লোক জোটে যাদের বেনোজল বলা যেতে পারে। বেনোরা তিন রকম হয়। একদল, যাঁরা ভুক্তভোগী। তাঁরা মনে করেন, আমি এই সমস্যায় ভুগে বুঝেছি যে পরিষেবা জরুরি, কিন্তু তা নেই তাই আমিই তা তৈরি করব। তাদের যদি জিজ্ঞেস করা হয়, কী করতে হবে, তা আপনাকে কে বলে দেবে? তিনি বলবেন, বা-রে! আমি এতদিন ধরে সমস্যাটা নিয়ে ভুগলাম কি এমনি এমনি? কী কী করতে হবে, আমি স---ব জানি। মজার কথা হল এই, যে কেউ যদি বলেন আমার বাবার হার্ট অ্যাটাক হয়েছে বলে আমি হার্ট অ্যাটাকের স----ব জানি, লোকে হাসবে। কিন্তু কেউ যদি বলেন, যে তাঁর ছেলের চিকিৎসার অতীত মানসিক রোগ আছে, তাকে নিয়ে তিনি তিরিশ বছর চলেছেন, এবং এই অভিজ্ঞতার জোরেই তিনি সব ক্রনিক মানসিক রোগ সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল, তাহলে সে কথা মেনে নেবার লোকের অভাব হবে না। পরিষেবা না থাকলে এই হয়।

দ্বিতীয় ধরনের বেনোরা অনেকটা প্রথমের মতো, কিন্তু তাদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা নেই। তাঁরা স্পেশালিস্ট এবং তাঁরা মনে করেন মানসিক রোগের সমস্যা সম্বন্ধে যা কিছু জানার থাকতে পারে তা তাঁরা জেনে গেছেন এবং তার বেশি জানার কিছু নেই। তাঁরাও ভালো চেয়েই করেন, কিন্তু তাঁদের অন্ধত্বই তাঁদেরই পরিষেবা দেবার অন্তরায়, তা তাঁরা বোঝেনও না।

তৃতীয় বেনোরা সবচেয়ে বিপদজনক এবং আজকের কাহিনি এমনই একজনকে নিয়ে। তারা অন্যের অসুবিধের খোঁজে থাকে এবং সময়মত ঝোপ বুঝে কোপ মেরে হাওয়া হয়ে যায়।


মিঃ দেওয়ান উকিল ছিলেন। কলকাতা হাইকোর্টে নাকি কোনও সময়ে বেশ নামডাক ছিল। আমি যখন দেখি, তখন উনি আশি ছুঁই-ছুঁই, বয়স এবং জীবনের ভারে ন্যুব্জ। এসেছিলেন ছোটো ছেলেকে নিয়ে। ছেলেটির বয়স তখন তিরিশের কোঠায়, চিকিৎসার অতীত এক দূরারোগ্য ব্যাধিতে জর্জরিত। অনেক চিকিৎসার ফলেও কোনও উন্নতি হয়নি। ভদ্রলোককে বললাম, “অসুখ সারবে এমন ভরসা তো দেব না, তবে চিকিৎসা করে দেখতে পারি।”

কয়েক মাস চিকিৎসা করে বুঝলাম উন্নতির লক্ষণ খুবই অল্প। ভদ্রলোককে বললাম, “রাজ কোনও দিন নিজেরটা সামলে চলতে পারবে বলে মনে হয় না। আপনারও বয়েস হয়েছে। আপনি ওর দেখাশোনা আর বেশিদিন করতে পারবেন না। আপনি কি ওর ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে কিছু ভেবেছেন?”

এর উত্তরে ভদ্রলোক আমাকে তাঁর জীবনের অদ্ভুত কাহিনি শোনালেন। মিঃ দেওয়ানরা খুবই বড়োলোক, জমিদার-বংশীয়। বহু পুরুষ ধরে তাঁরা পাঞ্জাবের বাসিন্দা, কিন্তু মিঃ দেওয়ানের বাবা উকিল ছিলেন। ওকালতি করতেন লক্ষ্ণৌতে। তাঁর দুই ছেলে। একজনকে তিনি উকিল করেন, অন্যজনকে পাঠিয়ে দেন পাঞ্জাবে। অজস্র জমিজমায় দখল হাতছাড়া যাতে না হয়, তার নজরদারি করার জন্য।

কী কারণে মিঃ দেওয়ানের বাবা তাঁকে আইনজ্ঞ হতে কলকাতায় পাঠিয়েছিলেন, তা জানি না, কিন্তু সেখানেই বিপত্তির শুরু হয়। উত্তর কলকাতার এক নামী পরিবারের একটি মেয়ের সঙ্গে মিঃ দেওয়ানের পরিচয় হয় এবং তা থেকে শুরু হয় প্রেম। এই প্রেমের খবর বাবার কাছে পৌঁছয় কোনও বন্ধুর মারফত এবং বাবা তৎক্ষণাৎ ছেলেকে টেলিগ্রাম পাঠান – এখনি ফিরে এসো। তোমার আর পড়াশোনা করতে হবে না। তোমার বিয়ে স্থির হয়েছে।

উত্তরে মিঃ দেওয়ান বাবাকে চিঠি দিয়ে জানান যে তিনি বাবার কাজ কমিয়ে রেখেছেন, পাত্রী দেখা হয়ে গেছে, কলকাতার সম্ভ্রান্ত বাঙালি পরিবারের একমাত্র মেয়ে, হোমিওপ্যাথি পড়ছে এবং পাত্রী হিসেবে এক কথায় এবং এক্কেবারে দারুণ।

বাবার চিঠি এল – এমন কথা মাথায় এনোই না। ত্যাজ্যপুত্র হবে। জমিজমা, এবং পারিবারিক সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হবে।

কবি বলেছেন, ‘তারেই বলে প্রেম – যখন থাকে না ফিউচারের চিন্তা, থাকে না কো শেম’। ফলে বাবার ধমকানি সত্ত্বেও অনেক বিঘা জমির লোভ সামলানো মিঃ দেওয়ানের পক্ষে মোটেই অসুবিধা হল না, এবং বাবা কোর্টের কাগজে সই করে তাঁকে ত্যাজ্যপুত্র করলেন। মিঃ দেওয়ানের শ্বশুর বললেন, “কোই বাৎ নেহি। তুমি আমার বাড়িতে থাকবে। আমার পয়সায় উকিল হবে। আজ থেকে তুমি আমার পাতানো ছেলে।”

মিঃ দেওয়ান সেদিন থেকে শ্বশুরবাড়িতেই আছেন।

সমস্যা কিন্তু লেগেই রইল। মিঃ দেওয়ানের বাবা তাঁকে ছাড়লেও, জীবন পেছু ছাড়ল না। বড়ো ছেলের খুব অল্প বয়সেই মৃগীরোগ দেখা দিল। হাজার চিকিৎসা সত্ত্বেও মাঝে মাঝেই তার ফিট হয় – অজ্ঞান হয়ে যায় এবং হাতে পায়ে খিঁচুনি আসে। অজস্র চিকিৎসায় কিছু উন্নতি হল, পড়াশোনা করতে লাগল রূপ, কিন্তু কলেজে পড়াকালীন ছোটো ছেলে রাজের মানসিক রোগ দেখা দিল। কোনও চিকিৎসাতেই কোনও ফল হল না।

রূপ মৃগী জয় করে ডাক্তার হল। কিন্তু রাজের রোগের ফলে দুজনের মধ্যে মানসিক ব্যবধান তৈরি হল। রূপ বিয়ে করে বিলেত চলে গেল আরও পড়াশোনা করতে। বাবার সঙ্গে চিঠির আদানপ্রদান থাকলেও ভাইয়ের দেখাশোনা নিয়ে মতান্তর আর কথা-কাটাকাটি লেগেই থাকত। বাবা চাইতেন বিদেশী ডিগ্রির মোহ ছেড়ে দেশে এসে ভাইয়ের দায়িত্ব নেয় দাদা – রূপ কিন্তু তা চাইত না। তার জীবন কেন অসুস্থ ভাইয়ের জন্য উৎসর্গ করবে? ক্রমে মিঃ দেওয়ান আর রূপের চিঠি চালাচালি প্রায় বন্ধ হয়ে গেল।

রূপ আর রাজের বয়সের ব্যবধান অনেকটাই। রাজের বয়স যখন প্রায় ২২ বছর, মায়ের ক্যানসার ধরা পড়ল। বহু চিকিৎসার পর, অকথ্য যন্ত্রণা সহ্য করে তিনি শেষ পর্যন্ত ধনে মনে বিধ্বস্ত মিঃ দেওয়ানকে ভাসিয়ে মারা গেলেন। মায়ের কাজে একাই এসেছিল রূপ। স্ত্রী আসতে পারেনি, সন্তানসম্ভবা সে। মায়ের কাজ শেষ করে বাবাকে প্রণাম করে রূপ জানাল তার বিলেতের পাট শেষ, তবে দেশে ফিরবে না, যাবে কাটমান্ডু। সেখানকার মেডিক্যাল কলেজে শিক্ষকের পোস্ট পেয়েছে সে। আগামী তিনমাসের মধ্যে স্থানান্তরকরণ শেষ করেই বাবাকে খবর দেবে রূপ। মিঃ দেওয়ান মুখ ঘুরিয়ে নিলেন, চোখ জলে ভরে এল। কাটমান্ডু আসতে পারে রূপ, কলকাতায় নয়?

এর পর মিঃ দেওয়ানের জীবনে এমন একটা ঝড় নেমে এল যেটার কথা তিনি জীবনে ভাবতেও পারেননি কোনও দিন। রূপ চলে যাবার তিন দিনের মধ্যে মিঃ দেওয়ানের বড়ো শালা, স্ত্রীর একমাত্র দাদা – ডেকে বললেন, “আমার বাড়িতে বসে ঘরজামাইগিরি অনেক হয়েছে – এবার মানে মানে কেটে পড়ো।”

মিঃ দেওয়ান বললেন, “আমাকে তোমার বাবা কোনও দিন ঘরজামাই মনে করেননি। উপরন্তু আমি নিয়মিতভাবে সংসার চালান’র খরচায় কন্ট্রিবিউট করি। এমনকি এই বাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ, মেরামত, রেনোভেশনের কাজে আমার টাকাকড়ি যথেষ্ট খরচ হয়েছে এক সময়ে।

শালা হেসে বললেন, “এই সাইজের বাড়ি ভাড়া করে থাকতে গেলে যা খরচ হত, তার দশভাগের একভাগও নয়। সুতরাং তোমার বউ গেটের ধারে যে চেম্বার তৈরি করেছে, তাতে গিয়ে থাকো।”

ওখানে রান্না-বান্না করে আমি এই বয়সে ম্যানেজ করব কী করে? তার ওপর রাজ অসুস্থ...”

শালাবউ বলল, রান্না খাওয়ার চিন্তা আমি যতদিন আছি তোমাকে করতে হবে না...”

...শুধু খাওয়ার খরচটা দিয়ে দিও,” শেষ করলেন শালা।

কয়েক মাস পরে মিঃ দেওয়ান যখন বাড়ির রান্নাঘরের দরজায় টিফিন ক্যারিয়ার নিয়ে গেছেন, কাজের লোক বলল, “তুমারা খানা আজ থেকে বন্ধ। হামকো বৌদি বোলা হ্যায়।”

কেন এই নতুন নিয়ম চালু হয়েছে মিঃ দেওয়ান বুঝলেন না, শালাবউয়ের মৃত্যু হয়েছে বলেও মনে হয় না, দিব্যি হেঁটে চলে বেড়ান, ছায়াও পড়ে, শুধ আজকাল তিনি মিঃ দেওয়ানকে দেখলে মুখ ঘুরিয়ে চলে যান।

মিঃ দেওয়ান তাই এখন স্ত্রীর ডাক্তারির চেম্বারের বাইরের অংশটিতে – যেখানে রোগীরা অপেক্ষা করত – সেখানে রান্না করেন, আর ভিতরের ঘরে, যেখানে একসময় স্ত্রী রোগী দেখতেন, সেখানে রাজকে নিয়ে ঘুমোন।

আমি আর সহ্য করতে পারলাম না। বললাম, “এইভাবে থাকা যায়? কবে বলবে তুমি ওই জায়গাটাও ছেড়ে দাও। ওখানে আমি গাড়ি পার্ক করব – তখন কী করবেন?”

মিঃ দেওয়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “জানি না। আমার কোথাও যাবার আর উপায় নেই। আমি আর্থিকভাবে সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত। রূপকে সারা দেশের ডাক্তার দেখাতে হয়েছে এক সময়ে। রাজ আজ অবধি কম করে পঁচিশবার নানা নার্সিং হোমে ভর্তি হয়েছে। তার ওপর ওদের মায়ের চিকিৎসা – আমার আর কিছু বাকি নেই। এই ঘরটা থেকে শালা যদি বের করে দেয়, আমাকে ফুটপাথেই আশ্রয় নিতে হবে।”

মামলা করবেন... আপনি তো উকিল। আপনার কোনও অধিকার নেই? ওই সম্পত্তিতে আপনার স্ত্রীর অংশ অবশ্যই আছে?”

আছে। কিন্তু মামলা করার, সেই মামলা চালান’র – উকিলের খরচা, অন্যান্য খরচা চালান’র মতো আর্থিক অবস্থা, বা শারীরিক এবং মানসিক জোর, কোনওটাই আমার নেই।”

রূপ কোনও সাহায্য করবে না?”

রূপ তো আমার সঙ্গে কোনও যোগাযোগ রাখে না। মায়ের মৃত্যুর পর কাটমান্ডু গেছে, না এখনও ইংল্যান্ডেই আছে, আমাকে জানায়ওনি।”

কতদিন হল?”

ওদের মা মারা গেছেন তিন বছর হয়ে গেছে।”

খোঁজ করেছেন? কাটমান্ডুতে নিশ্চয়ই অনেক মেডিক্যাল কলেজ নেই?”

মিঃ দেওয়ানের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। “ডাক্তারসাব, আমি কোনও দিন আমার বাবার কাছেও হাত পাতিনি। আজ ছেলের কাছে ভিক্ষা করব? আমি আমার এক জুনিয়রের মুহুরির কাজ করছি। আমি হাত পাতি না কারও কাছে।”


অবস্থার ক্রমাবনতি হতে থাকল। অশীতিপর বৃদ্ধের পক্ষে অসুস্থ সন্তানের দেখাশোনা করার ক্ষমতা আর রইল না। আমাকে বলতে থাকলেন, “কিছু ব্যবস্থা করে দিন, আমি তো আর বেশিদিন নেই। আপনি রাজের একটা বন্দোবস্ত করুন।”

আমার ক্ষমতা সামান্যই, বিভিন্ন সংস্থার নাম-ঠিকানা দিলাম, বললাম, “শরীর শক্ত থাকতে থাকতে জায়গাগুলো দেখে আসুন।”

শুরু হল মিঃ দেওয়ানের জীবনের আর এক বিভীষিকাময় অধ্যায়। একবার করে আসেন, আর বলেন, “ওখানে তো কোনও ব্যবস্থা নেই, ডাক্তারসাহেব। কোনও নার্স নেই, সাইকিয়াট্রিস্ট নেই, মায় হঠাৎ অসুস্থ হলে ডাক্তার ডাকার লোকও নেই।” কিংবা, “এবারের জায়গাটা অত খারাপ না, কিন্তু ইলেকট্রিসিটি নেই, আর চালান এক অতিবৃদ্ধ ডাক্তার। আমাকে বললেন, আমি ডাঃ দেবের নাম শুনেছি। ওনাকে বলুন ওনার মতো কেউ এসে হাল ধরলে আমি নিশ্চিন্ত হই। তা নইলে আমি আর ক’দিন? আমি ঠিক করেছি আগামী ছ’মাসের মধ্যে কেউ এসে দায়িত্ব নিলে ভালো, নইলে আমি বন্ধ করে দেব। নতুন রোগী নিচ্ছি না।”

শেষ পর্যন্ত পছন্দ হল ব্যাঙ্গালোরের একটা সংস্থা। বললেন, “কিন্তু ডাঃ দেব, ওখানে দেব কী করে? বছরে লাখের হিসেবে বিল আমি কী করে মেটাব? আর আমি যাবার পরেই বা কে দায়িত্ব নেবে?”

আমি বললাম, “কিন্তু ওরাই বা চালাবে কী করে? আপনার টাকাতেই যদি রাজের চিকিৎসা করাতে হয়, তাহলে সেই টাকার ব্যবস্থা তো আপনাকেই করতে হবে। আর ভেবে দেখুন, আজ আপনি যেরকমভাবে রাজকে রেখেছেন, যদি ঠিক সেটুকুও পয়সা খরচ করে করাতে চান, একটা ঘর, বাথরুম, খাওয়া-পরার ব্যবস্থা, ওষুধ আর ডাক্তারের খরচে, তাতেও তো বছরে যা খরচ সে তো লাখেরই হিসেব দাঁড়াবে।”

কিন্তু অত টাকা আমি পাব কোত্থেকে?”

সেদিনের মত চলে গেলেন, ফিরে এলেন কয়েক মাস পরে।

ডাক্তারসাব, নতুন কোনও সংস্থা বা জায়গার কথা জানতে পারলেন?”

না, মিঃ দেওয়ান।”

মিঃ দেওয়ান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, “আমি একদফা ভিক্ষেই করে এলাম। গ্রামে গেছিলাম। ভাইয়ের কাছে। তারও বয়স হয়েছে অনেক। বললাম, ‘আমার ভাগের জমি আমাকে দিয়ে দাও। আমি বিক্রি করে কিছু ব্যবস্থা করি।’ ভাই বলল, ‘আইনত তোমার ভাগের জমি বলে কিছু নেই। বাবা তোমাকে ত্যাজ্যপুত্র করেছেন। কিন্তু তুমি আমার সহোদর ভাই। আমি তোমাকে ত্যাগ করিনি। তুমি যদি আস, আমৃত্যু তোমাকে দাদার মর্যাদা দিয়ে রাখব। আমার ছেলেরা জ্যাঠার সম্মান দেবে। কিন্তু ওই বঙ্গালিনীর ছেলেরা আসতে পারবে না।’ আমার ছেলে মানসিক অসুস্থ, সে নিজের দেখ্‌ভাল্‌ করতে পারে না – শুনে বলল, ‘তা হলে তো আরওই না।’

দিন কাটে, আবার ফিরলেন মিঃ দেওয়ান। বয়স বেড়েছে আর একটু, কিন্তু চোখের জ্যোতি যেন একটু উজ্জ্বল। বললেন, “একটা আশার আলো দেখেছি। মাদার টেরেসার একটা সংস্থা আছে। তারা বলেছে রাখবে।”

আমি একটু অবাক হলাম। মাদার টেরেসা তো গৃহহীনদের রাখেন। কিন্তু রাজের মতো রোগী কি তিনি নেন? ভদ্রলোক বললেন, “আমি ওদের কাগজপত্র এনেছি। আপনি একটু দেখুন।”

আমি উলটে পালটে দেখে বললাম, “এখানে যে শর্তগুলো রয়েছে, সেগুলো দেখেছেন?”

দেওয়ান ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলেন, “কী শর্ত?”

আমি বললাম, “এই যে,” বলে পড়লাম, “একবার রাজ ওদের ওখানে গেলে আপনি আর দেখা করতে পারবেন না, ওরা রাজকে খ্রিস্টান বানাবে, ওর চিকিৎসা বন্ধ হয়ে যাবে...”

মিঃ দেওয়ান হাসলেন। বললেন, “ডাক্তারসাব, এক এক করে বলি।” বলে উকিলি কায়দায় বলতে থাকলেন, “আপনি ওকে ব্যাঙ্গালোর পাঠাচ্ছিলেন। আজ আমার যা বয়স আর স্বাস্থ্য, তাতে আমি ক’দিন অন্তর অন্তর রাজের সঙ্গে দেখা করতে যেতে পারতাম বলে আপনার ধারণা? দুই, ওই পাগল ছেলে – যে ইন্দিরাজীর মৃত্যুর বিশ বছর পর এখনও ভাবে ইন্দিরা গান্ধী আমাদের দেশের প্রধানমন্ত্রী – তাকে খ্রিস্টান বানিয়ে মাদার টেরেসা যদি নিজের মৃত্যুর পর তাঁর ঈশ্বরকে পান, তাতে আমার আপত্তি নেই। এবং তিন, ওরা বলেছে কোনও অবস্থাতেই তারা রাজকে বাড়িতে ফেরত পাঠাবে না। সুতরাং ওকে যদি ওরা বিনা চিকিৎসায় ম্যানেজ করতে পারে, পারুক না!”

অকাট্য যুক্তি। বললাম, “বেশ। টাকাপয়সা কত নেবে?”

এক পয়সাও না,” বললেন মিঃ দেওয়ান।

সব দিক থেকেই ভালো বলছেন?”

ভালো বলেই মনে হচ্ছে। কিন্তু আপনি একবার রায় দেবেন। ওই ফাদার, যিনি দায়িত্বে আছেন, তাঁকে আমি নিয়ে আসব, আপনি একবার কথা বলবেন।”

তাই হল। যথাসময়ে এলেন তাঁরা। দেওয়ান আমার ঘরে ফাদারকে ঢুকিয়ে বললেন, “আমি বাইরে অপেক্ষা করছি।” বলে চলে গেলেন। আর আমি চমৎকৃত হয়ে চেয়ে রইলাম। “হাই, আই অ্যাম ব্রাদার জো,” বলে সাদা শার্ট, নীল-জিনস পরিহিত যে লোকটা ঘরে ঢুকে আমার দিকে হাত বাড়াল, অনায়াসেই সে আমাকে বলতে পারত, আমি ওমুক নাইটক্লাবের ডি.জে.। আমি বিশ্বাস করতাম সহজে। তার কোমরের বেল্টের দুটি মোবাইল ফোন আর একটি পেজার-এর থেকে আমি চোখ সরাতে পারছিলাম না। যখনকার কথা বলছি, তখন কাউকে যদি জিজ্ঞেস করা হত, ক’জন মোবাইল ফোন মালিককে চেন? বেশিরভাগ লোকই হাতে গুনে জবাব দিতে পারত। আমি নিজে তখনও মোবাইল-মালিক নই। তাই দুটো মোবাইল নিয়ে মানুষ কী করে আমি তখনও জানতাম না।

বিরক্তি এসেইছিল। তাই কথোপকথানে তার ছাপও পড়েছিল। ভদ্রলোক কিন্তু নির্বিকার, শান্তভাবে আমার জেরার উত্তর দিলেন। দেওয়ানকে যে প্রশ্নগুলো করেছিলাম, সেগুলোই করলাম। বললেন, “আরে, না না। চিকিৎসা তো করতেই হবে। আধুনিক পশ্চিমী চিকিৎসা ছাড়া মনের রোগ আবার কনট্রোল হয় নাকি? রাজের চিকিৎসা চলবে, আপনিই করবেন। আর রাজ তো আমাদের হোমে থাকবে না, ও আমাদের সঙ্গেই থাকবে। ওকে আমরা সেক্রেটারিয়াল কাজও দেব। ওই কথাগুলো না লিখলে চার্চ আমাদের তাদের সঙ্গে থাকতে দেবে না, তাই লেখা। বাড়ির লোকের সঙ্গে দেখা করতে না দেওয়া, খ্রিস্টান করা – এসবের প্রশ্নই উঠছে না, এক যদি না কেউ নিজে থেকে ধর্ম বদলাতে চায়। আগে অনেকেই চাইত, আজকাল আবার অনেকেই চায় না। তাতে কিছু এসে যায় না, সুতরাং ওই কাগজের সব কথা আক্ষরিকভাবে না নিলেও চলবে।”

কাজ শেষ করে বাড়ি যাচ্ছি, নার্সিং হোমের ম্যানেজিং ডিরেক্টর জিজ্ঞেস করলেন, “দেওয়ান কাকে নিয়ে এসেছিল?”

বললাম। বুদ্ধদা নাকটা একটু কুঁচকে বলল, “ওটা ফাদার? পাদ্রী-পাদ্রী লাগল না তো?”

হেসে বললাম, “পাদ্রী না। ব্রাদার।”

নাম যাই বল বাপু – আমার ভালো লাগল না।”

যথাসময়ে রাজ চলে গেল ব্রদার জো-এর তত্ত্বাবধানে বাস করতে। সময়ে সময়ে জো তাকে নিয়েও আসেন কখনও কখনও। দেখি রাজ ভালোই আছে। দেখাশোনা হচ্ছে। দুপক্ষই খুশি। ওষুধ লিখে দিই। চলে যায়। ওদের মুখেই শুনি – রাজের বাবাও ভালো আছেন। বয়স হচ্ছে, এই যা।

কয়েক বছর পরে হঠাৎ একদিন ফোন পেলাম ব্রাদার জো-র।

ডক্‌, আমরা একটা কনফারেনস-এ সিঙ্গাপুর যাব। তিন সপ্তাহের জন্য রাজকে ভর্তি করতে চাই আপনার নার্সিং হোমে।”

আমি অবাক। “কেন? আপনাদের হোম-এর সব রোগীকেই কি নার্সিং হোমে রাখবেন নাকি?”

আরে, না না। রাজ তো হোমে থাকে না। ও থাকে আমাদের সঙ্গেই। কিন্তু এখন তিন সপ্তাহ কেউ থাকবে না। রাজের দেখাশোনা করার কেউ নেই। তাই বলছিলাম।”

আমার কেমন অদ্ভুত লাগল। বললাম, “গার্জেন হিসেবে কে সই করবে?”

ব্রাদার জো বললেন, “কেন, আমি?”

আমি বললাম, “আপনার সই করার অধিকার আছে?”

উনি বললেন, “বইকি! রাজের বাবা অ্যাফিড্যাভিট করে আমাকে পাওয়ার অফ অ্যাটর্নি দিয়েছেন।”

আমি বললাম, “রাজের লিগ্যাল গার্জেন কি মিঃ দেওয়ান? সেটা কোর্ট থেকে তাঁকে মঞ্জুর করা হয়েছে তো? নইলে তিনি তো অ্যাফিড্যাভিট লিখতে পারেন না?”

আমার চেয়েও অবাক হয়ে ব্রাদার জো বললেন, “বাবা ছেলের গার্জেন হবে, তার জন্য কোর্ট কী লিখে দেবে?”

যে লোকটা নিয়মিতভাবে নিজের সংস্থায় লোককে বাকি জীবনের জন্য রাখছে, সে লিগ্যাল গার্জেন কী বস্তু জানে না? খুব আশ্চর্য লাগল। কিন্তু কথা না বাড়িয়ে বললাম, “মিঃ দেওয়ান যে পাওয়ার অফ অ্যাটর্নি দিয়েছেন, সেটার একটা কপি আনবেন।”

খানিক পরে আমাকে নিজের অফিস থেকে ফোন করলেন ম্যানেজিং ডিরেক্টর বুদ্ধদা।

অনিরুদ্ধদা, তুমি রাজকে ভর্তি নেবে না বলেছ?”

নেব না বলিনি। বলেছি রাজের বাবা ব্রাদারকে যে পাওয়ার অফ অ্যাটর্নিটা দিয়েছে, সেটার একটা কপি আনতে।”

গোলমাল ঠেকছে কিছু?”

ভালো ঠেকছে না – এইটুকুই। ওরা সিঙ্গাপুর যাবে তো একজন পেশেন্টকে কেন আমাদের কাছে ভর্তি করবে? ওদের নাকি হোম আছে? সেখানে অন্য পেশেন্ট থাকে – সেখানে রাখুক না?”

তা ঠিকই বলেছ,” এবারে বুদ্ধদারও গলাতেও চিন্তান্বিত সুর। “কিন্তু ওরা তো আগেও একবার রাজকে ভর্তি করেছিল।”

সে কী! কবে?

তুমি তখন ছুটিতে ছিলে। ডাঃ আশ-এর আন্ডারে ভর্তি করেছিল এক সপ্তাহ। সেবারও কী কনফারেনসে যাবে বলেছিল। গণ্ডগোল কিছু করেনি। টাকাকড়িও মিটিয়ে দিয়েছিল সময়মত। এমনিতে ওরা ভর্তি করলে কোনও ভুলভাল বে-আইনি কিছু তো হবে না।”

তা হবে না। বললাম, “আগে ভর্তি হয়েছিল জানতাম না। তা যখন হয়েইছিল, তখন এবারেও করেই নাও।”

রাজের স্থান হল মেল ওয়ার্ডের কোনের বেডটায়। রোজ দেখতে যাই – দেখার তো কিছু নেই – জিজ্ঞেস করি, “রাজ, কেয়া হাল হ্যায়?”

রাজ বলে, “অলরাইট ডক্টর। হাউ মেনি ডেজ মোর?”

আমি বলি, “তিন সপ্তাহের জন্য তো ব্রাদার জো-রা গেছে। এসেই নিয়ে যাবে তোমাকে।”

এমনি একদিন ওয়ার্ড থেকে বেরিয়েছি, ম্যানেজার আনন্দ্ বলল, “রাজের ব্যাপারে কিছু ভাবলেন?”

বললাম, “ভাবব আর কী? জো এসে নিয়ে যাবে তিন সপ্তাহ পরে।”

আনন্দ্‌ হেসে বলল, “ক’দিন হল জানেন? পাঁচ পেরিয়ে ছ’সপ্তাহ হচ্ছে। আপনি তো ওয়ার্ডে যান, পেশেন্ট দেখেন। দিন তো গুনতে হয় আমাকে। ভর্তির সময়ে যে অ্যাডমিশন ফি দিয়েছিল, তারপরে আর কোনও টাকাও আসেনি।”

বুদ্ধদা জানে?”

আনন্দ্‌ বলল, “জানে। আপনাকে বলতে সাহস পাচ্ছে না।”

ব্রাদার জো-কে ফোন করেছ?”

করেছি। মোবাইল বন্ধ।”

ওর বাবার কোনও নম্বর আছে?”

আনন্দ্‌ মাথা নাড়ল। “ওনার নিজের তো কোনও ফোন ছিল না। আগে একটা ওষুধের দোকানের নম্বর দিতেন, ওদের খবর দিলে ওরা লোক পাঠাত, উনি ফিরে ফোন করতেন। ওখানে ফোন করেছিলাম। ওরা পরে জানাল, বাড়ি বন্ধ। গ্যারেজে কেউ নেই। বেঁচে আছেন কি না, তাই বা কে জানে?”

বললাম, “তুমি রোজ ফোন করতে থাকো। এর পর পুলিশে খবর দেবে, না কী?”

আনন্দ্‌ বলল, “দেখি কী করা যায়, কারণ ওই ব্রাদারের পাওয়ার অফ অ্যাটর্নির কাগজের জেরক্সটাও তো বুদ্ধদা নেননি। আর এখন অ্যাডমিশনের কাগজ খুলে দেখছি দু’বারই ভদ্রলোক রাজের বাবার ঠিকানাই দিয়েছেন। একবারও নিজের অ্যাড্রেস দেননি। তখন ভর্তির সময়ে কেউ খেয়াল করেনি।”

আনন্দ্‌কে ভরসা দিয়ে বললাম, “খেয়াল করলে কী হত? আজেবাজে একটা অ্যাড্রেস দিয়ে দিলে কী কেউ ধরতে পারত?”

তাও বটে।”

যা হোক, ফোন করতে থাকো ঘণ্টায় ঘণ্টায়, আমি রোগী দেখি।”

বেশিক্ষণ লাগল না, আনন্দ্‌ আমাকে ফোন করল নিজের অফিস থেকে। “ব্রাদার জো-কে পেয়েছি। খুব কথা শুনিয়েছি। বলেছি আপনি কথা বলতে চেয়েছেন। এবার আপনি আপনার তরফ থেকে যা বলবার, বলুন।”

লাইন দিল আনন্দ্‌, কিন্তু আমি বেশি কিছু বলতে পারলাম না। ফোন ধরেই ব্রাদার জো অত্যন্ত বিনীতভাবে বলতে লাগলেন, “ডক্‌, আমি খুব দুঃখিত – আমাদের একজন ব্রাদার সিঙ্গাপুরে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন... গাড়িতে ধাক্কা লেগেছিল... আমরা ওকে ফেলেও আসতে পারছিলাম না... আমাদের কী দুরবস্থা... এইমাত্র কলকাতা পৌঁছেছি... এক্ষুনি ওই ব্রাদারকে অ্যাসেমব্লি অফ গড চার্চ হসপিটালে ভর্তি করতে যাব... হাতে টাকা পয়সা নেই... কাল সকালেই এ-টি-এম থেকে টাকা তুলে রাজকে ছাড়িয়ে আনব... প্রমিস... আপনাদের অসুবিধায় ফেলার জন্য দুঃখিত... ইত্যাদি।”

অসুস্থ ব্রাদারের কুশল জিজ্ঞেস করে ফোন ছেড়ে দিলাম।

পরদিন নার্সিং হোমে ঢোকামাত্র আনন্দ্‌ বলল, “নিয়ে গেছে।”

বুদ্ধদাকে বললাম, “গার্জেন ঠিক না করে ভর্তি কোরো না কোনও দিন আর।”

বুদ্ধদা কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, “তোমরাই তো বল, আইন অনুযায়ী যে কেউ এসে ভর্তি করতে পারে।”

বললাম, “সে তো বটেই। কিন্তু যে ভর্তি করেছে সে ফিরে না এলে কী করতে হবে সে কি আইনে বলা আছে? আর তোমার নার্সিং হোমের বিলই বা কী করে আদায় হবে, সে বিষয়ে কি আইনে বলেছে?”

রাজকে নিয়ে ব্রাদার জো তারপর আর কোনও দিন আসেনি।


রাজের গল্প কিন্তু এখানেই শেষ নয়। দু’বছর কেটে গেছে। রাজের কথা মনে পড়ে না, এমন নয়। কিন্তু অমন তো ডাক্তারের জীবনে কত রোগীরই আনাগোনা। সবার কথা নিয়ে চিন্তা করার অবকাশ কই?

একদিন ভিজিটর স্লিপ জমা পড়ল। নাম লেখা দীপ্তি দেওয়ান। রিসেপশনিস্ট বলল, “স্যার, এঁর অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেই, কিন্তু বলছেন ভীষণ জরুরী দরকার।”

ডাকলাম ঘরে। ভদ্রমহিলা এসে বললেন, “আপনার একজন পুরানো পেশেন্টের বৌদি আমি। তার নাম রাজ দেওয়ান।”

আমি বললাম, “রাজ কেমন আছে? আর ওর বাবা?”

ভদ্রমহিলা এক নিশ্চিন্তির নিঃশ্বাস ছেড়ে বললেন, “আমি রাজের ব্যাপারেই কথা বলতে এসেছি। রাজ কোথায় আপনি কি জানেন?”

শিরদাঁড়া দিয়ে ঠাণ্ডা স্রোত বয়ে গেল। গলাটা যথাসম্ভব স্থির রেখে বললাম, “ও কি ওই ব্রাদার জো’র সংস্থায় নেই?”

ভদ্রমহিলা বললেন, “ওটা একটা ভয়ানক জায়গা। ওরা বলছে রাজ ওদের কাছে কোনও দিন ছিলই না।”

আমি উত্তেজিত হয়ে বললাম, “বললেই হল? ব্রাদার জো আমার সঙ্গে নিজে দেখা করেছে কত বার – আমার কাছে রাজকে নিয়ে আসত। রাজ দু’বার ভর্তিও হয়েছে। বলত ওর কাছে নাকি পাওয়ার অফ অ্যাটর্নি দেওয়া আছে – রাজের বাবা দিয়েছেন।”

ভদ্রমহিলা বললেন, “জানেন, ওরা সাংঘাতিক দু’নম্বরি। বাবাকে ওরা বুঝিয়েছল ওরা মাদার টেরেসার সঙ্গে কাজ করে। আসলে মাদারের সঙ্গে ওদের কোনও যোগাযোগই নেই। আমি মাদার টেরেসার সঙ্গে দেখা করেছি। উনি ওই সংস্থা, আর ব্রাদার জো, কারওর নামই কোনও দিন শোনেননি। এদিকে ব্রাদার জো এখন বলছে, মাদার টেরেসার সঙ্গে কাজ করে – এমন কথা সে বাবাকে বলতেই পারে না, কারণ বাবাকে সে কোনও দিন দেখেইনি, এবং মাদার টেরেসার সঙ্গে ওদের কোনও যোগাযোগই নেই।”

আমাকে বলেছিল ওদের যোগাযোগ আছে।”

ও বলছে আপনার নামও ও শোনেনি কোনও দিন।”

কিন্তু আপনার দেওর যে ওখানে গেছে তার কোনও লিগ্যাল ডকুমেন্ট নেই?”

না। সেটাই আশ্চর্য ব্যাপার। বাবা নিজে উকিল হয়ে কী করে এরকম ভুল করলেন, তা বুঝতে পারছি না, কিন্তু বাবা যা কিছু কাগজ দেখাচ্ছেন, যেগুলোতে লেখা আছে যে রাজ এখন থেকে আজীবন ব্রাদার জো-র ওমুক সংস্থায় থাকবে, ইত্যাদি – তার সবকটাতে বাবার সই আছে, কিন্তু কোনওটাতেই ব্রাদার জো, বা ওই সংস্থার কারওর সই নেই।”

আর কত চমকাবেন ভদ্রমহিলা আমাকে?

মিঃ দেওয়ান নিজে কী বলছেন?”

বাবার বয়স এখন নব্বইয়ের ওপর। রূপের ধারণা চুরানব্বই। সব কথার বাঁধুনি আগের মতো আর নেই। তবে নিশ্চিতভাবে বলছেন যে ব্রাদার জো সই করেছেন। কিন্তু ব্রাদার জো কি অন্য কোনও কাগজে সই করে সেটা নিয়ে গেছেন, নাকি নিজের কপিতে সই করেছেন, বাবার কাছে যে কপি তাতে সই করেননি, তা বোঝা যাচ্ছে না।”

ভাবলাম একটু। বললাম, “কোনও সাক্ষী ছিল না?”

ছিল। বাবা বলছেন দুজন ছিল। একজন ব্রাদারের এক সঙ্গী, আর বাবার তরফে যে মেয়েটা বাড়ির কাজ করত, তার টিপসই। আর তো বাবার সাক্ষী হয়ে দাঁড়ানরও কেউ ছিল না। বাবার কাছে যে কপি তাতে কোনও সাক্ষীরই সই নেই। আর ওই মেয়েটা এখন কোথায়, কেউ জানে না। তখন সে যে বাড়িতে থাকত, আমরা ওখানে খোঁজ করে দেখেছি।”

তবু যদি রূপ তখন থাকত, তাহলে হয়ত সে-ই সই করত, এখন এই ঝামেলা হত না।

মহিলাকে লজ্জা দেবার উদ্দেশ্যে বললাম, “আসলে তখনই তো মিঃ দেওয়ানের অনেক বয়েস। গাইড করারও কেউ নেই। আপনারাও তখন নেই। তখন কি আপনারা নেপালে?”

সেও তো আর এক সাংঘাতিক ঘটনা। আমরা যেদিন কাটমান্ডু যাচ্ছি – গাড়িতে গিয়েছিলাম, বিহারে আমার বাপের বাড়ি থেকে। আমার ভাই ছিল সঙ্গে। ভাই বসেছিল আমার সঙ্গে, পিছনে, আর রূপ ছিল সামনে, ড্রাইভারের পাশে। আপনি জানেন কি, রূপের এপিলেপসি আছে?”

জানি। মহিলা বলে চললেন, “কাটমান্ডু আর বেশি বাকি নেই, হঠাৎ রূপের সাংঘাতিক ফিট হল। সেই ঝটকায় এমন জোরে হাত চালাল, যে ড্রাইভারের মুখে লেগে গাড়ির স্টিয়ারিং ঘুরে গিয়ে গাড়ি অ্যাকসিডেন্ট করল। ড্রাইভার স্পট ডেড, রূপ ব্যাডলি ইনজিওর্ড, আমার পাশে আমার ভাইয়ের মালটিপ্ল ফ্র্যাকচার... শুধু আমি আর আমার কোলে তিন মাসের ছেলে – আমাদের বিশেষ কিছু হয়নি।

এত চমক আমি জীবনে আর কোনও দিন পেয়েছি বলে মনে হয় না।

তারপর আর কী? হসপিটাল খুব করেছিল। রূপ প্রায় একবছর হাসপাতালেই ভর্তি ছিল। ভাইয়ের চিকিৎসা হল। কিন্তু রূপের এপিলেপসি বেড়ে গেল। আপনাকে আর কী বলব, আপনি তো এ-ও নিশ্চয়ই জানেন, যে রূপের এপিলেপসি কোনও সময়েই ভালো কনট্রোলে ছিল না। তার ওপর ওই সাংঘাতিক চোটের জন্য ব্রেনে কী আঘাত লাগল কে জানে, কোনও পরীক্ষাতেই কিছু ধরা পড়েনি, কিন্তু আগে দু-তিন মাস পর পর অ্যাটাক হত, কখনও হয়ত আট-ন’ মাস পরেও হত, কিন্তু এখন সপ্তাহে দু-তিনটে করে হতে লাগল। আমার অবস্থা ভাবুন – কোলে ছোট্ট বাচ্চা, ভাই বিছানায়, রূপের ওই অবস্থা – আমার মা নেই, ভাই-বোনও আর কেউ নেই যে এসে সাহায্য করে।”

ভদ্রমহিলা একটু জল চেয়ে খেলেন। তারপর বলে চললেন, “আপনি জানেন কী না জানি না, রাজের দেখাশোনার ব্যাপারে ওদের বাবার সঙ্গে রূপের একটা মতানৈক্য ছিল। বাবা বলতেন ‘কলকাতায় থাকো, ডাক্তারি করো, ভাইয়ের দেখাশোনা করো।’ রূপ বলত, ‘না। আমার নিজের অসুখ, ভাইয়ের অসুখ, দুয়ের-ই কস্টলি চিকিৎসা। আমাকে যত রোজগার করতে হবে সে টাকা এ-দেশে নেই।’ এই নিয়ে বাবার সঙ্গে খুব তর্কাতর্কি হত এক সময়ে। আমার শ্বশুরমশাই কোনও দিন ব্যাপারটা বুঝতেই পারেননি। উনি ভাবতেন রূপ বুঝি ভাইয়ের দায়িত্ব নিতে চায় না। তাই মা মারা যাবার পরে যখন রূপ বলল ওকে ফিরতে হবে, খুব আঘাত পেয়েছিলেন। রূপ ইংল্যান্ড থেকে ফোনে জানায় যে কাটমান্ডুতে চাকরি নেবে। ঠিক করেছিল তারপরে ইন্ডিয়াতে কোনও ভালো চাকরি নিয়ে ফিরবে। কলকাতা না হলেও কাছাকাছি তো হবে। কিন্তু মানুষ ভাবে এক, হয় আর এক। নিজের চিকিৎসার জন্যই ওকে আবার ইংল্যান্ড ফিরতে হল।”

আমি বললাম, “এ সব কোনও খবরই কিন্তু মিঃ দেওয়ান জানতেন বলে আমার মনে হয় না। তাহলে অন্তত বলতেন।”

মহিলা মাথা নেড়ে বললেন, “বাবাকে যে মামাবাবু বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছেন, তা তো আমরা জানতাম না। আমরা ফোন করাতে মামা বলেছিলেন, ওরা আর এখন এখানে থাকে না। মা মারা যাবার পর রাজ ওদের সঙ্গে অত্যন্ত খারাপ আচরণ করত, মামীমাকে মারধর করতে আসত, বাবাও রাজের হয়েই কথা বলত – এ থেকে কথা কাটাকাটি হয়ে ওরা চলে গেছে, কোনও যোগাযোগ নেই। তা-ও রূপ দুটো চিঠি দিয়েছিল। উত্তর আসেনি। আজ বুঝি চিঠি তো ওই বাড়িতেই ডেলিভারি হয়েছিল। মামা নিশ্চয়ই সে আর বাবাকে দেননি।”

তাহলে খোঁজ পেলেন কী করে?”

আমরা কাটমান্ডু ফিরেছি আবার মাস ছয়েক হল। রূপ এর মধ্যে খুব দুশ্চিন্তায় ছিল। শেষে বলল, বাবার একজন জুনিয়র উকিল ছিল। একবার গিয়ে দেখি উনি কিছু জানেন কি না। এই বলে কলকাতা আসে। প্লেন লেট ছিল, দুপুরের পরে ল্যান্ড করেছে। রূপ ওই ভদ্রলোকের ঠিকানা, ফোন নম্বর কিছুই জানে না। মনে করেছে, এখন তো হাইকোর্টে পাব না, কাল যাব। মামাবাড়ি যাবার প্ল্যান ছিল না, কিন্তু কী মনে হয়েছে, ভেবেছে, গিয়ে বলি, এখানেই উঠব। দেখে বাবা গ্যারেজে শুয়ে, দেখাশোনার কেউ নেই, জ্বর গায়েই দোকান থেকে রুটি তরকারি কিনে এনে এনে খাচ্ছে।”

মনটা আবার ঘোরালাম রাজের দিকে। বললাম, “একটা কথা... ব্রাদার জো কী উদ্দেশ্যে তাহলে রাজকে রাখল ওই ক’দিন? বিনে পয়সায় খাওয়ানোর জন্য?”

মাথা নাড়লেন রাজের বৌদি। “নামেই বিনে পয়সা। রাজ সবশুদ্ধু ওদের কাছে আছে বছর তিনেকের একটু বেশি। এই সময়ে নানা ছুতোয় আজ খানিকটা, কাল আরও খানিকটা করে ব্রাদার জো বাবার কাছ থেকে যা টাকা নিয়েছে, তাতে একটা ভদ্রস্থ হোটেলে এই ক’দিন রাজ থাকতে পারত।

আমার চোখ ছানাবড়া। “এরও নিশ্চয়ই রসিদ নেই?”

সে-ও তো আমার শ্বশুরমশাইয়ের বুদ্ধিভ্রষ্ট হবার আর এক লক্ষণ – ছোটো ছোটো চিরকুট, তাতে ওঁর নিজের হাতেই লেখা – আজ ব্রাদার জোকে তিরিশ হাজার টাকা দিলাম, বা চল্লিশ হাজার, বা বিশ হাজার, ইত্যাদি। তাতে আমার শ্বশুরেরই সই। বাবার যা কিছু সঞ্চয় ছিল আজ প্রায় কিছুই নেই। শেষ কয়েক বার বাবা বাজার থেকে চড়া সুদে টাকা ধার করে দিয়েছেন ব্রাদার জো-কে। এই দেখুন...” বলে ব্যাগ থেকে কয়েকটা চিরকুট বের করে দেখালেন। মিঃ দেওয়ানের অশক্ত হাতের লেখা, আর সই।

হঠাৎ একটা কথা খেয়াল হওয়ায় আমি লাফিয়ে উঠলাম প্রায়। বললাম, “মিঃ দেওয়ানের টাকাকড়ি আর নেই সে কথা যদি মিঃ দেওয়ান ব্রাদার জোকে বলে দিয়ে থাকেন, তাহলে সে বুঝে গেছে যে সোনার ডিম পাড়া রাজহংস আর নেই।”

ভদ্রমহিলা একটু ইতস্তত করে তারপরে মনে মনে কী একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে বললেন, “এর মধ্যে আরও একটা ব্যাপার আছে। আপনি সল্ট লেকের জমির ব্যাপারে জানেন কিছু?”

সল্ট লেকে কী জমি?

ভদ্রমহিলা বললেন, “আর্থিক অনটনের যে কথা বাবা আপনাকে বলেছেন, সেটা সবটা ঠিক না। বাবা উকিল হলেও ওঁরা হলেন আসলে জমিদার বংশের। বাবাকে প্রায়ই বলতে শুনেছি, জমিই সোনা। বাবা পারলেই জমি কিনতেন। কোথায় কোথায় কী কী আছে আমি জানি না, তবে সল্ট লেকে একটা জমি আছে। একদিন ওখানে বাড়ি করবেন ভেবেছিলেন, কিন্তু সে আর হয়নি। জমি তো কনস্ট্রাকশন না করে ফেলে রাখা যায় না, তাই ওখানে একটা ছোটো ঘর আছে, তাতে একটা লোক থাকে। লোকটা ইলেকট্রিকের মিস্তিরি। বাবা তাকে ছোটোবেলায় শেয়ালদা স্টেশন থেকে পান। খানিকটা লেখাপড়া শিখিয়ে, ইলেকট্রিকের কাজ শিখিয়ে ওকে ওখানে থাকতে দেন। ও নিজের মতো ইলেকট্রিকের কাজ করে, আর জমিটা বেদখল না হয়, সেই দেখাশোনা করে আর কী।”

বেশ কথা। তো?

জমিজমার কথা বাবা কেন জানি কাউকে বলেন না। দেখুন, আপনি সব জানেন, এমনকি রূপের কথাও জানেন, আপনিও জানতেন না। আমিও জমির কথা জানি না, রূপও জানত না। বাবা এখন রূপকে বলেছেন, ব্যাঙ্কের লকারে সব জমির কাগজ আছে, ও যেন দেখে নেয়। এইসব জমির কাগজ খুঁজতে গিয়ে রূপ একটা সাংঘাতিক দলিল পেয়েছে। এই দলিলের একটা কপি নিশ্চয়ই ব্রাদার জো-য়ের কাছে রয়েছে। তাতে লেখা আছে যে রাজের মৃত্যুর পরে ওর সমস্ত সম্পত্তির ৫০% পাবে ব্রাদার জো-য়ের সংস্থা। এবং এই কাগজে সব সই আছে। বাবার, ব্রাদার জো-য়ের, তার সাগরেদের, আর আমাদের সেই কাজের লোক, তার টিপসই, সব।”

এই কাগজেই তো প্রমাণ হবে যে জো আপনার দেওরের দায়িত্ব নিয়েছিল?”

আমরা বাবার সেই জুনিয়র উকিলের কাছে গেছিলাম। বাবা শেষ দিকে ওনার মুহুরির কাজ করতেন। ইন ফ্যাক্ট, উনিও জানতেন যে রূপ অতি অপোগণ্ড ছেলে, বাবা আর ভাইকে ফেলে মনের আনন্দে বিলেতে দিন কাটাচ্ছে। উনি ওনার ক্লার্ককে দিয়ে মাঝেমাঝে কিছু টাকাকড়ি পাঠাতেন, বাবার গত কয়েক মাসের গ্রাসাচ্ছাদন ওই টাকাতেই হয়েছে। সব শুনে উনি বলেছেন, মামলা করা যেতে পারে – কিন্তু এই দলিলে রাজের মৃত্যু ছাড়া আর কোনও উল্লেখ নেই, সুতরাং এ থেকে অকাট্য প্রমাণ হয় না যে ব্রাদার জো’র কাছে রাজ কোনও দিন ছিল।”

ব্রাদার জো কি এই জমির সন্ধান পেয়েছেন?”

পেয়েছেন। কী করে পেয়েছেন জানি না। হয়ত বাবাই বলেছেন – ওনার তো আজকাল মাথার ঠিক নেই – কিংবা রাজও বলে থাকতে পারে কখনও। কিন্তু কিছুদিন আগে ওই ইলেকট্রিশিয়ান ছেলেটি এসে বলে যে কিছু ইংরেজি বলা লোকে এসেছিল – এই জমির মালিক কে, কোথায় থাকে এই সব জিজ্ঞেস করতে। এই ছেলেটি নিশ্চিত, যে এরা সরকারি লোক ছিল না। বাবা বলছেন, লম্বা, চশমা পরা, গায়ের রঙ কালো, চুল ব্যাকব্রাশ করা – এই বর্ণনা ব্রাদার জো’র সঙ্গে মিলে যায়।”

আমিও মানলাম, যায়। বললাম, “তবে এখন কী উপায় বা কর্তব্য?”

ল’ইয়ার মিঃ ব্যানার্জি আমাদের বলেছেন সবাই যেন একটু ভেবে দেখি কোনও একটা ডকুমেন্ট যদি থাকে যেখানে ব্রাদার জো’র সঙ্গে আমার দেওরের যোগাযোগের প্রমাণ পাওয়া যায়...”

হঠাৎ মাথায় বিদ্যুৎ খেলে গেল। বুদ্ধদার অদূরদর্শিতা যুগ যুগ জিও। ফোন তুলে ডায়াল করলাম ম্যানেজারকে। “আনন্দ্‌, তোমার রাজ দেওয়ানকে মনে আছে?”

ও বাবা, মনে থাকবে না! কিত্না ঝামেলা হুয়া থা ও ব্রাদার জো’কে সাথ!”

ব্রাদার জো যে দুবার রাজকে ভর্তি করেছিল, সে দু বার গার্জেনের সই কে করেছিল?”

কে আবার? -ই করেছিল। রাজকে ওদের কাছে পাঠাবার পরে ওর বাবা তো কোনও দিন আসেনইনি।”

আনন্দ্‌, আমি রাজের বৌদিকে তোমার কাছে পাঠাচ্ছি। ওই অ্যাডমিশন ফর্মদুটো জেরক্স করে ওনাকে দিতে হবে।”

স্যার, ও তো কম-সে-কম দো সাল পুরানা হ্যায়... কোথায় পাব?”

হ্যাঁ। বছর দুয়েক তো হবেই। ওই সময়ের অ্যাডমিশন রেজিস্টার নেই?”

ভদ্রমহিলা বললেন, “আমার কাছে এক্স্যাক্ট ডেট আছে।” ওদিকে আনন্দ্‌ বলছে, “রেজিস্টার তো আছে স্যার, লেকিন ডেট বিনা কোথায় খুঁজব? কোন বছর, কোন মাস? অনেক টাইম লেগে যাবে।”

আনন্দ্‌কে বললাম, “এক্স্যাক্ট ডেট পেলে পারবে?”

ভদ্রমহিলা দেখলাম ব্যাগ থেকে কয়েকটা রসিদ বের করছেন। আনন্দ্‌ বলল, “ডেট পেলে তো পাঁচ মিনিট লাগবে!”

আমি বললাম, “ওই ব্রাদার জো এখন বলছে যে রাজ ওদের কাছে কোনও দিন ছিলই না। দেওয়ানজীর কাছে কোনও প্রমাণ নেই, তাই...”

আনন্দ্‌ খুব উত্তেজিত হয়ে বলল, “আপনি ওনাকে নিচে আমার কাছে পাঠিয়ে দিন। আমি অ্যাডমিশন ফর্ম বের করছি। সারাদিন লাগলে লাগুক। বললেই হল রাজ ছিল না? ওনাকে বলুন কেস করতে... আমি সাক্ষী দেব।”

রসিদগুলো দেখি আমাদেরই রসিদ। রাজের ভর্তি থাকার সময়কার। “এগুলো আপনি পেলেন কী করে?”

কী করে আবার! ব্রাদার কি নিজের গাঁটের পয়সা খরচা করতেন নাকি? বাবাকে দিয়েই করাতেন। আর বাবা আপত্তি করলে বলতেন, তাহলে নামিয়ে দিয়ে যাই বাড়িতে আবার? হাজার হাজার টাকা তো ওই ধমকিতেই দিয়েছেন বাবা।”

আমি আর হাঁ বন্ধ করার চেষ্টা করলাম না।

কয়েকদিন কেটে গেছে। আনন্দ্‌ আর বুদ্ধদা প্রায় রোজই জিজ্ঞেস করে, “খবর পেলে কিছু?” হঠাৎ একদিন আবার রাজের বৌদির ফোন। “ডাক্তারবাবু, আমদের আবার খুব বিপদ। রূপ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। ওর আবার ফিট শুরু হয়েছে। কিন্তু রাজকে পাওয়া গেছে। আমি আজ যদি রাজকে নিয়ে যাই, আপনি সঙ্গে সঙ্গে ওকে ভর্তি নেবেন? আমাকে আবার রূপের হাসপাতালে যেতে হবে সঙ্গে সঙ্গেই।”

কোথায় পাওয়া গেল?” বলতে বলতেই বুঝলাম এই প্রশ্ন করার সময় এখন নয়। বললাম, “নিয়ে আসুন।”

কয়েক ঘণ্টা পরে, পুলিশ পরিবেষ্টিত হয়ে রাজকে নিয়ে ঢুকলেন তার বৌদি। আমি বৌদিকে না দেখলে রাজকে চিনতে পারতাম না। রাজের বাবা আমাকে বলেছিলেন, দুই ছেলেকে রাজপুত্রের মতো দেখতে বলে তিনি তাদের নাম রেখেছিলেন রূপ আর রাজ। আজ রাজের সাড়ে ছ’ ফুট হাইট কোথায়? কুঁকড়ে ছোটো হয়ে গেছে – এইটুকু দেখাচ্ছে। ঝকঝকে সোনার মতো গায়ের রং আজ পাঁশুটে। একমাথা ঝাঁকড়া চুল আর নেই, কয়েকগাছা বাকি মাত্র। অসুস্থতার তুঙ্গে যখন, তখনও আমি রাজকে কোনও দিন ক্লিন-শেভ্‌ন্‌ ছাড়া দেখিনি। আজ রাজের গালে লম্বা দাড়ি – ফাঁকে ফাঁকে উকুন হাঁটছে দেখা যাচ্ছে। ওজন কমেছে অন্তত বিশ কেজি। হাড্ডিসার দেহ, সে যে পাঞ্জাবী, কে তা বলবে! মুম্বাইয়ের পুলিশের মতো বিশাল খাকি হাফ-প্যান্ট, তার তলা থেকে কাঠির মতো পা – সেই পা বেয়ে তরল বিষ্ঠা নেমেছিল কখনও – শুকিয়ে তা লেগে রয়েছে পায়েই।

আমার দিকে তাকিয়ে দুর্বল, ফিশফিশে গলায় বলল, “হেল্প মি, ডক্‌।” আমি কিছু বললাম না। শুধু চেয়েই রইলাম।

রাজের বৌদি বললেন, “ওকে ওরা মানকুণ্ডু মেন্টাল হসপিটালে ভর্তি করে রেখেছিল। বোধহয় আশা করেছিল যতটুকু সম্পত্তি পাওয়া যায়, ততটুকুই হাতিয়ে নেবে। আমরা থানায় জানিয়েছিলাম। পুলিশ কাল আমাদের সঙ্গে গিয়েছিল। আপনাদের অ্যাডমিশন ফর্মের কপি, আর উকিল মিঃ ব্যানার্জির চিঠি নিয়ে যেতেই কাজ হল। বলে দিল রাজ কোথায় আছে। আমরা কাল গিয়েছিলাম। বললাম, এক্ষুনি ছেড়ে দিতে হবে। ওরা বলল, সুপারিন্টেন্ডেন্ট নেই। ২৪ ঘণ্টা সময় লাগবে। আমরা থানায় জানালাম। পুলিশ বলল, আজ আমাদের সঙ্গে যাবে। কিন্তু কাল রাতেই রূপের ফিট শুরু হল। পুলিশের হেল্প নিয়ে হসপিটালাইজ করলাম। ও-সি বললেন, ডোন্ট ওরি। আমরা মানকুণ্ডুতে খবর দিয়ে রাখছি।”

পুলিশের দিকে কৃতজ্ঞ দৃষ্টিতে তাকালেন রাজের বৌদি। বললেন, “আজ গিয়ে নিয়ে এলাম। পুলিশ অনেক সাহায্য করেছে। ডকটর, মানকুণ্ডু কী অসহ্য খারাপ হাসপাতাল – সরকারি জায়গায় এত অব্যবস্থা! আপনারা কিছু করতে পারেন না?”

কিছুই পারি না। যাঁরা জানেন না, তাঁদের অবগতির জন্য বলি – মানকুণ্ডু এতই খারাপ হাসপাতাল ছিল – হ্যাঁ, ছিল – যে সরকার তা বন্ধ করে দেবার সিদ্ধান্ত নেই। পরিষেবাহীন দেশে মানুষের আরও ভোগান্তি তৈরি হলে তো সরকারের কিছু এসে যায় না।

তিন মাস ভর্তি ছিল রাজ। দশ কেজি ওজন বেড়েছিল। গায়ের রঙও ফিরেছিল অনেকটাই। ফেরেনি মানসিক ভারসাম্য আর মাথার চুল। সেই অবস্থায় ছুটি দিয়েছিলাম। রাজের সঙ্গে সেই আমার শেষ দেখা।

দুটো কথা না জানালে শেষ করতে পারব না। ব্রাদার জো-র কী হল? দেওয়ান পরিবারের কী হল?

ব্রাদার জো-র বিরুদ্ধে কিছু করা হয়নি, বা যায়নি। তারপরে যতদিন উকিলের চিঠি নিয়ে কেউ তাদের অফিসে গেছে, তখনই অফিস বন্ধ পাওয়া গেছে। তারপরে এক সময় কোর্টের সমন দরজায় লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। তারপরে আমি আর জানি না।

এই ঘটনার কিছুদিন পরে মিঃ দেওয়ান ইহলোক ত্যাগ করেন। আমার সঙ্গে তাঁর শেষ দেখা সেই ব্রাদার জো-কে নিয়ে আসার দিন-ই। বাবা মারা যাবার কিছুদিন পর রূপ আসে আমার কাছে। “আমি কলকাতা ছেড়ে চলে যাচ্ছি।”

কোথায়?”

সিঙ্গাপুর। আমার এই কঠিন এপিলেপসির চিকিৎসা কলকাতায় সম্ভব নয়। সিঙ্গাপুরে ভালো চাকরিও পেয়েছি। ওরা রাজকে ভিসা দিয়েছে। ইংল্যান্ডে রাজের ভিসা পেতাম না। আপনার সাহায্য আর অবদান জীবনে ভুলব না। আপনার জন্যই ভাইকে ফিরে পেয়েছি। এবং বাবা যে শেষ বয়সে নিশ্চিন্তে যেতে পেরেছেন, তা-ও আপনারই জন্য। ধন্যবাদ দিলে আপনাকে ছোটোই করা হবে।

চলি, নমস্কার।”




ঘুম

যত দিন যাচ্ছে, ততই দেখছি লোকে আরও আরও দেরি করে ঘুমোচ্ছে, আর পারলে আরও দেরি করে উঠছে। কবে একটা কথা শুনেছিলাম, আর্লি টু বেড অ্যান্ড আর্লি টু রাইজ, মেকস ওয়ান হেলথি, ওয়েলদি অ্যান্ড ওয়াইজ (পুরোটা লিখলাম কারণ আজকালকার লোকজন অনেকেই জানে না কথাটা), সেটা একেবারে মেকি আর ভুয়ো হয়ে উঠেছে।

আমি বাপু বেশি দেরি করে জাগতে টাগতে পারি না। লোকে যাতে মাঝরাত্তিরে হঠাৎ ‘কী খবর?’ বলে মেসেজ লিখে ঘুম ভাঙাতে না পারে তার জন্য ফোন নিঃশব্দ করে ঘুমোই। পরদিন অনু্যোগ শুনতে হয় – রাত দুটো অবধিও জেগে থাকতে পারিস না? সন্ধে থেকেই ঘুমোস নাকি?

তা কী আর করা? ঘুম পায় যে! রাত দশটা থেকে ঢুলতে শুরু করি, আর সাড়ে দশটার পর আলতো আমেজে শরীরটা টেনে আসে। এগারোটা কখনও দেখিনি বলব না, কিন্তু তার পর? হাঃ!

তাই যাঁরা ঘুমোতে পারেন না, তাঁদের জন্য আমার খুব কষ্ট হয়।

বন্ধুদের বোঝাতে পারি না, ঘুমের ব্যাপারটা সবটা আমার বুড়ো বয়সের অসুখ না। আমি চিরকালই ঘুমোতাম। সেই সেবারে সুন্দরবন গেলাম, তখন আমার বয়স কতই বা! বছর বাইশ? রাত্তিরে নদীর পাড়ে শুয়োর বেঁধে লঞ্চের ছাদে বসে অপেক্ষা করছি। প্রথম রাত্তিরে পাহারায় আমি আর কুশলদা। কুশলদা বলছে, “অনিরুদ্ধ, এত পায়চারি করলে চলবে না। বাঘ আসবে না।” আমি বলছি, “সুন্দরবনের বাঘ রাজ্যপালের লঞ্চে পর্যন্ত উঠেছিল। সে কি আর আমাকে দেখে ডরাবে? ভেবো না।” আর মনে মনে ভাবছি, জানো তো না, একবার যদি বসি, সকালের আগে চোখ খুলবে না।

শেষে রাত একটায় যখন কল্যাণদা আর সৌম্যদাকে দায়িত্ব দিয়ে লঞ্চের ছাদে শুয়ে নদীর জলে চাঁদের ছায়া কেমন টুকরো টুকরো হয়ে ভাঙছে দেখছি, আর ভাবছি, সবাই সামনের দিকে নদীতিরের দিকে তাকিয়ে বাঘের অপেক্ষায়, আমি উলটোদিকে ফিরে নদীর দিকটা দেখি। ওদিক দিয়ে যদি ওঠে? এমন সময় দেখি চারিদিক আলোয় আলো! ধড়ফড় করে উঠে বললাম, “সকাল হয়ে গেছে? বাঘ এল না?” কুশলদা হাসতে হাসতে বলল, “তোমার যা নাক ডাকা, বাঘ কেন, টিরানোসরাস রেক্স থাকলেও ভয়ে আসত না।” তাকিয়ে দেখি কল্যাণদা, সৌম্যদা, দেবাশিসদা মায় প্রজেক্ট টাইগারের ডিরেকটরও মুখ টিপে হাসছেন। সে এক লজ্জা!

মেডিক্যাল কলেজে নাইট ডিউটির সময়ে অনেক চেষ্টায় ঘুমের সময়টা পেছোতে পেরেছিলাম কিছুটা। অমিত নতুন ছেলেমেয়েদের বলত, “শোন, দাড়িকে দিয়ে যা কাজ করানোর রাত তিনটের আগে করিয়ে নিবি। তারপরে দাড়ি হস্টেল যাবে না বটে, কিন্তু আর সাড়াও দেবে না।”

মেডিক্যাল কলেজ ছাড়ার পরে সমস্যাটা আরও বেড়ে গেল। নার্সিং হোমে অন কল ডিউটি – জেগে বসে থাকার কোনও দরকার নেই, শুধু সময়মত ঘুম ভাঙলেই হল। একবার এমন হয়েছিল, যে একটা নার্সিং হোমে একরাত্তিরের জন্য ডিউটি করতে গিয়েছিলাম, সেখানে নার্স ডাকা সত্ত্বেও ঘুম ভাঙেনি। ভুল বললাম, ভেঙেছিল, কিন্তু ততক্ষণে নার্স চলে যাচ্ছেন। আমি তাড়াতাড়ি হনহন করে পিছনে হাঁটতে হাঁটতে ডেকেছি, “সিস্টার?” উনি ঘুরে আমাকে দেখে দৌড়ে কোথায় চলে গেলেন। আমি ভাবলাম, এই রে! হয়ত ডাকেননি! আমি ঘুমের মধ্যে ভুল শুনেছি। পরে শুনলাম তিনি নাকি বলেছেন আমাকে ডাকা সত্ত্বেও আমি যাইনি। আর ওরকম একরাতের ডিউটি করিনি কখনও।

পরবর্তী জীবনে নিজেকে ট্রেনিং দিয়ে এমন তৈরি করেছিলাম, যে ডিউটি রুমের বাইরে পায়ের শব্দে ঘুম ভাঙত – ফলে কেউ একবার ডাকলেই সাড়া পেত। এক নার্স একবার জিজ্ঞেস করেছিলেন, “স্যার রাতে ঘুমোন না? মাসিরা বলছিল, ডাঃ দেবকে একবার ডাকলেই সাড়া পাওয়া যায়। অনিমা-মাসি তো বলল, চল্লিশ বছর চাকরি হয়ে গেল, এমন ডাক্তার দেখিনি বাপু – সবসময় একডাকে সাড়া!”

হেসেছিলাম। তবু সময়মত ঘুমিয়ে পড়া বন্ধ করতে পারিনি।

ঘুম যখন আসে, তখন আমি কোথায় কী করছি, তার কোনও হিসেব থাকে না। একবার ব্যাঙ্গালোর থেকে ফিরছি রাঁচি। বর্ষাকালে দু’সপ্তাহ ব্যাঙ্গালোরে কাটিয়েছি। কৃষ্ণা, গোদাবরী আর মহানদীতে বন্যা হয়েছে, তা জেনেছি কাগজে, কিন্তু তার সঙ্গে ম্যাড্রাস (তখনও চেন্নাই হয়নি)- টাটানগর লাইনে রেলচলাচলের কী হাল হয়েছে তা আর অত দূরের কাগজ ছাপার দরকার মনে করেনি। ফলে নির্দিষ্ট দিনে আমি দুপুরবেলা ব্যাঙ্গালোর থেকে রওয়ানা হয়ে সন্ধেবেলা ম্যাড্রাস স্টেশনে নেমে দেখি সে এক হট্টমেলা। প্রায় দশদিন কলকাতা, টাটানগর, এবং পাটনাগামী সব ট্রেন বাতিল ছিল, সেদিনই রাতে প্রথম ম্যাড্রাস-হাওড়া মেল ছাড়বে। রাঁচি যাবার একমাত্র ট্রেন, অ্যালেপ্পি – বোকারো স্টিল এক্সপ্রেস শেষ কবে গিয়েছে, এবং আবার কবে যাবে, তার কোনও খবর নেই। ম্যাড্রাস স্টেশনে হাঁটার জায়গা নেই – বাঙালি আর বিহারি যাত্রীতে ভর্তি। তারা মাটিতে বসে আছে চাদর বা কাগজ পেতে। অনেক এনকোয়ারি কাউন্টার খোলা, জিজ্ঞেস করে জানলাম যে আমার টিকিটের দাম আমি ফেরত পেতে পারি, কিন্তু তার জন্য দরকার স্টেশন মাস্টারের সই। সেদিকে গিয়ে চক্ষু চড়কগাছ। কুড়ি ফুটের মধ্যে যাবার উপায় নেই – হাজার জনতার ভীড় সেখানে। প্রায় সবাই বাঙালি। বাঙলার বাইরে পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিরা (দলবদ্ধ হতে পারলে) এতই অসভ্যতা করে, যে নিজেকে সে ভীড় থেকে সরিয়ে রাখা শ্রেয় মনে করতাম, তাই আবার এনকোয়ারিতে ফিরে জিজ্ঞেস করলাম, “রাতের হাওড়া মেল-এ টিকিট কি পাওয়া যাবে?”

লোকটি বলল, “এখন তো টিকিট বিক্রি বন্ধ হয়ে গেছে, শুধু একঘণ্টা আগে কাউন্টার থেকে পঞ্চাশটা উইদাউট রিজার্ভেশন টিকিট পাওয়া যাবে।”

দেখিয়ে দেওয়া পথে সেই কাউন্টারের দিকে গিয়ে দেখি সেখানেও পৌঁছন’র যো নেই। সেখানে আর এক খণ্ডযুদ্ধ চলছে। হাজার বাঙালি চিৎকার, চেঁচামেচি, হাতাহাতি, গুঁতোগুঁতি করছে – কখন কাউন্টার খুলবে! স্টেশন মাস্টারের অফিসের সঙ্গে তফাৎ শধু এইটুকু, যে সেখানে বাঙালি লড়ছিল নানা প্রদেশের বাসিন্দার সঙ্গে, আর এখানে তাদের লড়াই প্রায় শুধুই অন্য বাঙালির সঙ্গে।

নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে ভাবছি এখানেই হাত-পা ছুঁড়ে কাঁদব, না কি ট্যাক্সি করে এয়ারপোর্টে গিয়ে দেখব প্লেনের টিকিট কাটার মত টাকা আছে কি না (মনে করিয়ে দিই, তখনও আমাদের দেশে মোবাইল ফোন নেই। সবার পকেটে – আমার তো নয়ই – ক্রেডিট বা ডেবিট কার্ড আসেনি। সুতরাং এয়ারপোর্ট গিয়ে নগদ টাকা দিয়ে ছাড়া টিকিট কাটার উপায় ছিল না), এমন সময় পাশে এসে দাঁড়ালেন এক অবাঙালি ভদ্রলোক। বললেন, “হাওড়ার টিকিট?”

তাকিয়ে টাউটের মত লাগল না। বললাম, “হ্যাঁ।”

ভদ্রলোক বললেন, “আরে এখানে দাঁড়িয়ে লাভ নেই। দেখুন না, এখনও কাউন্টার খুলতে দু’ঘণ্টা দেরি, এখনই এত ভীড় আর মারামারি। কাউন্টার খুললে পঞ্চাশটা টিকিট শেষ হতে কতক্ষণ? তবে কাল কিন্তু করোমণ্ডল এক্সপ্রেস যাবে।”

তো?

এখন রাত আটটা বাজতে দশ। অ্যাডভানস কাউন্টার বন্ধ হয়নি। ওই যে রাস্তার ওপারে, ওই বড়ো বাড়িটার দোতলায়। দেখুন যদি ওয়েটলিস্টেড টিকিট পেয়ে যান, তাহলে কাল অন্তত আনরিজার্ভড কামরায় উঠতে পারবেন। কাল তো সকালে এই পঞ্চাশটা টিকিটের জন্য মারামারি হবে আবার!”

ভদ্রলোককে ধন্যবাদ দিয়ে দৌড়লাম রাস্তা পেরিয়ে সেই বড়ো বাড়িতে। চারিদিক ফাঁকা – একটা ততোধিক ফাঁকা কাউন্টারে জিজ্ঞেস করলাম – ক্লার্ক বললেন, “এখানেই পাবেন। কিন্তু টিকিট কি আর আছে?” বলে কম্পিউটারে বোতাম টিপে বললেন, “ও বাবা! ওয়েট লিস্ট দুশো পঁয়ত্রিশ।”

বললাম, “দিয়ে দিন।”

উনি একটু অবাক হলেন। বললেন, “বেশ, নিন।”

টিকিট নিয়ে ফিরে এলাম স্টেশনের হট্টমেলায়। দোতলায় ওয়েটিং এবং রিটায়ারিং রুম। বলা বাহুল্য, রিটায়ারিং রুমে জায়গা নেই। ঢুকলাম ওয়েটিং রুমে। গিজগিজ করছে লোক। একটা জায়গায় দেখলাম, মাটিটা একটু খালি। অর্থাৎ লোকজন বসে নেই, এবং কোনও মালও রাখা নেই। সঙ্গে একটা মাদুর ছিল। কেরালার মাদুর, সুন্দর ফ্লোর ম্যাট হয়। সুটকেস খুলে সেটা বের করে মাটিতে পাতলাম। সুটকেসকে বালিশ করে শুলাম মাদুরে। খানিক পরে মনে হল বালিশ বড্ডো উঁচু। তখন সুটকেসটা চেন দিয়ে ওয়েটিং রুমের বেঞ্চের সঙ্গে বেঁধে মাদুরটা ভাঁজ করে মাথার নিচে দিয়ে সটান মাটিতেই শুয়ে পড়লাম – স্টেশনের বইয়ের দোকান থেকে কেনা বইটা মুখের সামনে খুলে।

পরমুহূর্তে একটা বিশাল হইচই শুনে তাকিয়ে দেখি চারিদিক রোদ্দুরে ঝকঝক করছে, ওয়েটিং রুমের বাঙালিরা হাঁকডাক করে মালপত্র তুলে কুলির মাথায় চাপিয়ে দৌড়চ্ছে। আমিও রওয়ানা হলাম। ট্রেনে উঠে কী হয়েছিল, সে আর এক গপ্পো। এইটা কেবলমাত্র আমি কেমন ঘুমোতে পারি – তার।

অনেকে মনে করেন ম্যাড্রাস স্টেশনের ওয়েটিং রুমের মেঝেতে শুয়ে ঘুমোন মোটেই বিরাট কিছু অ্যাচিভমেন্ট না। অন্তত কলকাতার কোনও স্টেশনের ওয়েটিং রুমের তুলনায় সে রঈসি – প্রায় রাজপ্রাসাদসম। তাঁদের জন্য এই ঘটনাটা...

দলমা গিয়েছিলাম কলেজে পড়াকালীন। ফেরার সময়ে কী কারণে ইস্পাত এক্সপ্রেস মিস করেছিলাম, তা দলমা ভ্রমণকাহিনীতে রয়েছে। মাঝরাত্তির অবধি অপেক্ষা করে ধরতে হয়েছিল সম্বলপুর এক্সপ্রেস। সেই রেলগাড়ির যা ভয়াবহ অবস্থা, ভাবলেই শিউরে উঠি এখনও। আনরিজার্ভড কামরায় তিলধারণের জায়গা নেই – তাতে দেবাশিসদা, কিংশুক আর আমি। এত জোরে ধাক্কা মেরে উঠেছিলাম, যে আমার এখনও ধারণা যে ওদিকের দরজা দিয়ে দু-একজন লোক হয়ত বাইরে পড়ে গিয়েছিল রেললাইনে।

গাড়িতে উঠে দেখি এক বীভৎস পরিস্থিতি। একটা বাথরুম থেকে ওভারফ্লো করে জল বেরিয়ে কামরার মেঝে থইথই। যেখানেই দাঁড়াই, প্রায় আধইঞ্চি জলের মধ্যে, আর সে জলে যা ছিরি, তা না বলাই ভালো। কাদা আর অন্যান্য নোংরায় খোলতাই!

ঠেলাঠেলি গুঁতোগুঁতি করে ভিতরে ঢুকে কয়েকটা কম্পার্টমেন্ট পেরিয়ে এমন একটা জায়গা পেলাম যেখানে একটু বুক টান করে নিঃশ্বাস নেওয়া যায়। জলও সেখানে হয়ত একপোয়া ইঞ্চি। ঘণ্টাদুয়েক দাঁড়ানোর পর মনে হল ভীড়টা একটু কমেছে। কিছু লোকে নেমেছে তাদের গন্তব্যে, আর অত রাতে নতুন যাত্রী ওঠেনি। একটু হাত পা ঝেড়ে দাঁড়ালাম।

দেবাশিসদা বলল, “মনে তো হচ্ছে না আজ বসার জায়গা পাব।”

কিংশুক একটু আতঙ্কিত স্বরে বলল, “কিন্তু সারা রাত এইভাবে দাঁড়িয়ে যাব? অলরেডি দু’ঘণ্টা হয়েছে। আরও ঘণ্টা সাতেক তো লাগবেই।”

দেবাশিসদা বলল, “আমার পিঠে ব্যাগে বড়ো প্লাস্টিক শীটটা রয়েছে। অনিরুদ্ধ আমার পিঠের দিক থেকে বের করো। চার ভাঁজ করলে যতটা বড়ো হবে ততটায় আমরা তিনজন বসতে পারব। আর জুতোগুলো খুলে নিচের ভাঁজের মধ্যে ঢুকিয়ে দেব।”

যেমন আইডিয়া, তেমন কাজ। দাঁড়িয়ে থাকা দু-একজন একটু আপত্তি করার চেষ্টা করছিলেন, তাঁদের বলা হল, “আপনাদের কোনও চিন্তা নেই। আমরা তিনজন যতটা জায়গা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি, তার চেয়ে এক ইঞ্চিও বেশি নেব না। দেখবেন! আর আপনারাও আপনাদের প্লাস্টিক পেতে বসুন না, দেখবেন আমরা কিচ্ছুটি বলব না।” তাতে তর্ক এগোল না।

তিনজনে মিলে প্লাস্টিক পেতে, ব্যাগ কোলে নিয়ে জুতো লুকিয়ে বসলাম। বসে বললাম, “অ্যাঃ! এইবার আড্ডা দিতে দিতে কখন হাওড়া পৌঁছে যাব, টেরও পাব না।”

এর পরেই যে জিনিসটা দেখতে পেলাম, তা হল নিচের বার্থের তলায় রাখা কিছু ট্রাঙ্ক-স্যুটকেস! মাথা ঘুরিয়ে দেখি আমি গুটি মেরে শুয়ে আছি প্লাস্টিকে, আর আমার মাথা আর পায়ের কাছে বসে আছে দেবাশিসদা আর কিংশুক – দুজনের মুখেই একই সঙ্গে আতঙ্ক আর হতাশা মেশান।

দেবাশিসদা কিংশুকের দিকে তাকিয়ে বলল, “দেখলে, কী দিল! এক্কেবারে হাওড়াতে ট্রেন ঢুকছে, তখন উঠল ব্যাটা!”

তাকিয়ে দেখি সকাল হয়েছে। চারিপাশে লোকে বসে বসে ঢুলছে, নয়ত জেগে আছে। মাটিতে তখনও জল আর কাদা ক্যাৎক্যাৎ করছে। আমার নড়াচড়ায় ছোটো ছোটো ঢেউও উঠছে। ঘাড়ের পেছনে, আর হাঁটুর পেছনে সামান্য জায়গায় প্লাস্টিকের ওপর পা গুটিয়ে বসে আছে দেবাশিসদা আর কিংশুক। লজ্জা পেয়ে বললাম, “তোমাদের সরিয়ে দিয়েছিলাম?”

কিংশুক বলল, “না। সেটাতেই তো বোর হলাম। আমরা ঠিক করেছিলাম তুমি যদি একবারও আমাদের ধাক্কা মেরে জলে ফেলার চেষ্টা কর, তাহলে তোমাকে আমরা ঠেলে প্লাস্টিক থেকে জলে ফেলে দেব। কিন্তু তুমি কী সাংঘাতিক চিজ মাইরি! একবারও আমাদের ছুঁলে পর্যন্ত না!”

অন্যদিক থেকে দেবাশিসদা বলল, “শুধু তাই না, এতবার এপাশ ওপাশ করলে, একবারও শরীরের কোনও অংশ প্লাস্টিকের বাইরে গেল না! আমরা বার বার ভাবছি – পা-টা যদি এক ইঞ্চি টান করে, তাহলেই সটান জলে। হাতটা যদি মাথার তলা থেকে বের করে, তাহলেই জলে। তুমি একেবারে বাচ্চাদের মতো গুটি মেরে শুয়ে রইলে এই তিনফুট লম্বা প্লাস্টিকে! হিসেব করলে কী করে?”

কী জানি!





মেডিক্যাল কলেজের ছাদে

মেডিক্যাল কলেজ ভাঙা হবে। কানাঘুষোও শোনা যাচ্ছে গোটা এম.সি.এইচ. বিল্ডিং-টাই ভেঙে নতুন মডার্ন বাড়ি তৈরি হবে, কুড়ি তলা। ছাত্র-ডাক্তার মহলে অসন্তোষ। কিন্তু কি হবে তা তো আর কেউ জানে না, তাই কেউ কিছু বলছে না। এস. এফ. আই. মেম্বাররা, একটা সবজান্তা ভাব নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে : আমরা সব জানি, কী হয়েছে, পুরোনো জিনিস ভাঙা তো হবেই, না হলে নতুন আসবে কোত্থেকে? অঙ্কণ একদিন বলল, “এম. সি. এইচ. ভাঙবেই। কেউ আটকাতে পারবে না। এক থেকে দেড় মাসের মধ্যেই কাজ শুরু হবে, দেখে নিস।” ওকে বললাম, “তা তো বলবিই। তোদেওই ওঁচা পার্টি হেরিটেজ মানে জানে না। তোদের যেমন কোনও হেরিটেজ নেই, তেমনি তোরা হেরিটেজকে সম্মান করতে জানিস না। যা মনে হবে তা- ভেঙে দাও গুঁড়িয়ে দাও করবি। আর যদি দেখিস জনমত উল্টোদিকে যাচ্ছে, সঙ্গে সঙ্গে আগুন লাগিয়ে ভস্মীভূত করে দিবি... ওরে, চললি কোথায়, ভস্মীভূত মানেটা জেনে যা...”

অঙ্কণের বাঙলা শেখার কোনও আগ্রহ নেই, চলে গেল। সেদিন সন্ধ্যাবেলা অজিতের সঙ্গে গেছি ওয়ার্ড রাউণ্ডে। সেই বিশাল সিঁড়ি দিয়ে উঠতে গিয়ে মন খারাপ লাগছে। যদিও জানি এই সবটাই আজকের দিনের নিরিখে জায়গার প্রচণ্ড অপচয় – এক একটা ফ্লোরে আজকের হিসেবে আড়াইটে থেকে তিনটে ফ্লোর হবে, ছাদই তিরিশ ফুটের ওপরে উঁচু।

একতলা দোতলা শেষ করে গেছি রুফটপ ওয়ার্ডে। স্থানাভাবের জন্য ছাদের ওপরে কোনওরকমে ইঁটের দেওয়াল, অ্যাসবেসটসের ছাদ। ফলস-সিলিং এত নিচু যে হাত দিয়ে ছোঁয়া যায়। গরমকালে এখানে রোগী সারার বদলে আরো অসুস্থ হয়ে পড়ে না কেন, কে জানে। অজিতকে বললাম, “এই রকম ওয়ার্ডে মানুষ থাকতে পারে? নতুন হলে ভালোই হবে, বল?”

অজিত পেশেন্ট ফাইলে কী লিখতে লিখতে আড়চোখে চেয়ে বলল, “হঠাৎ? এস.এফ.আই-য়ে নাম লিখলি নাকি?”

বললাম ওকে, অঙ্কণ কী বলেছে।

অজিতের হাত থেকে কলমটা প্রায় পড়ে গেল। “তাহলে সত্যিই ভাঙছে? তা না হলে অঙ্কণ এ কথা বলল কেন?”

আমারও তাই মনে হচ্ছিল। তাই সারা সন্ধ্যা কাজে মন দিতে পারছিলাম না।

রুফটপ ওয়ার্ডে কাজ শেষ হওয়া মানে দিনের কাজ শেষ। সাধারণত রাস্তা পেরিয়ে কুমার্স ক্যান্টিনে গিয়ে চা খাওয়া হয় একটা। আজ আর ভালো লাগছে না। জিত আর আমি বেরোতে গিয়ে হঠাৎ জিতের কী মনে হল, বলল, “দাড়ি, মেডিক্যাল কলেজের তিনকোণা ছাদটার ওপরে উঠেছিস কখনও?”

কখনও উঠিনি। বললাম, “, এই দিক দিয়ে আয়।”

দুজনে গিয়ে দাঁড়ালাম মেডিক্যাল কলেজ বিল্ডিং-এর তিনকোণা ছাদের ওপরে। যদিও তিনতলা বাড়ি, কিন্তু প্রায় ছ’সাত তলার ওপরে দাঁড়িয়ে আছি। নিচে ছোটো ছোটো মানুষ। ওই যে অঙ্কণ, ওই যে অংশুমান যাচ্ছে। ঞ্জয় এদিক দিয়ে যাচ্ছে কেন? থিন-সর্বাণীর কাজ শেষ দু’জনে সিনেমা চলল বোধহয়।

একটু অপেক্ষা করে মনে হল, আরে, আজ-বাদে-কাল এই বাড়িটা থাকবে কি না, জানাই নেই, আজ আমরা তার সবচেয়ে উঁচু পয়েন্টে দাঁড়িয়ে আছি, এই কথাটা লোকজনকে না জানালে কি চলবে? ব্যস, যেমনি ভাবা, তেমনি কাজ, ওখান থেকে দাঁড়িয়েই আমি আর অজিত হাঁক পাড়তে লেগেছি : “অ্যাই সুন্ত্র। ওরে হতভাগা বিশু! এসপি, আসবি নাকি? ভ্‌রতন, কুমার্স ক্যান্টিন যাচ্ছিস? না? কলেজ সুইটস? আমাদের জন্য দু প্লেট রসমালাই অর্ডার কর। আসছি।”

লোকেও তাদের চলার পথে দাঁড়িয়ে আমাদের পাগলামি দেখে হাসাহাসি করছে, কেউ কেউ আমাদের নানারকম জ্ঞান দিচ্ছে। হঠাৎ ওখান দিয়ে যাচ্ছে ফ্যাটি-দা (ফ্যাটি-দাকে প্রথম দেখে বলেছিলাম, “ওর নাম ফ্যাটি যারা দিয়েছে তাদের কোনও কাণ্ডজ্ঞান নেই।” তাই শুনে ফ্যাটি-দার কে এক বন্ধু বলেছিল, “তুই তো সেই সময়ে দেখিসনি, তাই বলছিস।” যাই হোক, বলার বিষয় যেটা সেটা হল যে ফ্যাটি-দা রোগা না হলেও নামের সঙ্গে কোনও মিলই নেই)

ফ্যাটি-দা আমাদের ওইরকম ভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে খানিকক্ষণ চুপ করে কোমরে হাত দিয়ে ওপরে তাকিয়ে রইল। তারপর হেঁটে চলে গেল হস্টেলের দিকে।

পরে যখন যথেষ্ট মন ভালো হয়েছে, কুমার্স-এ চা খেয়ে হস্টেলে ফিরেছি, সিঁড়ি দিয়ে উঠে ঘরের দরজা খুলতে যাব, ফ্যাটি-দা এসে ধরেছে।

বলি ব্যাপারটা কী? সাহস খুব? ওই ভাঙা বাড়ি, তার মাথায় চড়েছ। সবসুদ্ধু যদি পড়ত, কী হত?”

দরজা খোলা স্থগিত রেখে বললাম, “কী আর হত, দাদা, ভেতরে থাকলে যা হত তার থেকে হয়ত ভালই হত। আর বিপদ তো তোমাদের বেশি হত। ভেঙে পড়লে তোমাদের মাথায় পড়ত, আমাদের মাথায় তো আর পড়ত না, বাড়ি তো আমাদের পায়ের তলায়।”

ফ্যাটি-দা খানিকক্ষণ কটমট করে তাকিয়ে চলে গেল।

খানিক পরেই নির্মল এসেছে আমার ঘরে। “কীরে? ফ্যাটি-দাকে কি বলেছিলি?”

আমি ঘাবড়ে গেলাম। “কেন? রেগে গেছে নাকি?”

না না, রাগবে কেন? আমার সঙ্গে দেখা হতে বলে গেল, দাড়িকে বেশ বোকা-সোকা ভাবতাম, দেখলাম ওর যথেষ্ট বুদ্ধি আছে।”





অত্তোবড়ো নাক


ন্যাশনাল ইনস্টিট্যুট অফ মেনটাল হেলথ অ্যান্ড নিউরোসাইনসেস – নিমহ্যানস। ভারতবর্ষের প্রধান মনরোগ এবং স্নায়ুরোগ চিকিৎসা এবং শিক্ষাকেন্দ্র। শিক্ষাব্যবস্থার অঙ্গ হিসেবে ছাত্র-ছাত্রীদের নানারকম ঘষামাজার মধ্যে দিয়ে যেতে হত। বই পড়ে শেখা ছাড়াও রোগী দেখে সর্বক্ষণ সিনিয়রদের সঙ্গে আলোচনা, রোগী নিয়ে ছোটো-বড়ো দলে আলোচনা এবং সেই সঙ্গে বই এবং জার্‌নাল পড়ে সবাই মিলে আলোচনা – সবই ছিল শেখার অঙ্গ।

একজন রোগীকে নিয়ে অনেকে মিলে বসে আলোচনা করে তার রোগনির্নয় (ডায়াগনসিস), বা চিকিৎসা স্থির করা, ইত্যাদিকে কেস কনফারেনস বলা হয়। কেস কনফারেনস করার উদ্দেশ্য হল ছাত্ররা রোগী, রোগ ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা করলে প্রথমত নিজের চিন্তাভাবনা পরিষ্কার হয় এবং অন্যের সঙ্গে আলোচনা করলে তাদের চিন্তা থেকে লাভবান হওয়া যায়। সবচেয়ে বড়ো কথা, সব গ্রুপেই এমন কেউ থাকে যারা ভাবতে চায় না, বলতেই চায় না, কিন্তু এই ধরণের আলোচনায় সবাইকেই যেহেতু কথা বলতেই হয়, তাই আমরা সকলেই চিন্তায়, ভাবনায়, উপলব্ধিতে, সিদ্ধান্তে দৃঢ় হয়ে উঠছিলাম।

কিন্তু সমস্যা ছিল এই, যে প্রতি সপ্তাহে একটা করে কেস নিয়ে আলোচনা করতে গেলে একজন করে ইন্টারেস্টিং ‘কেস’, বা রোগী ধরে আনা বড্ড ঝঞ্ঝাট। সাদামাটা কেস নিয়ে গেলে তো আর রোজ রোজ আলোচনা সম্ভব নয়। ফলে অনেক সময়ে একটা দুর্বিসহ অবস্থার সৃষ্টি হত। সবসময়ে ভালো কেস আমার জন্য ওঁৎ পেতে না-ও থাকতে পারে। বরং উলটোটাই সম্ভব। ওদিকে কেস কনফারেনসের তারিখ তিন মাস আগে থেকে ঠিক করা থাকে – সুতরাং কেস পাইনি স্যার – বলাও সম্ভব না। আর বললেই বা শুনছে কে?

সেদিন ছিল সুনন্দা লক্ষ্মীনারায়ণের কেস কনফারেনস। অর্থাৎ, সুনন্দা কেস নিয়ে এসে তার সম্বন্ধে বলবে – আমরা, অর্থাৎ অন্যান্য বোদ্ধারা, আলোচনা করব।

সুনন্দা দু’সপ্তাহ আগে থেকে কেস খুঁজতে শুরু করেছে। কিন্তু কপাল ওর এমনই, যে কোনও কেস-ই পায় না। হয় ভর্তি হতে হবে শুনে রোগী পালিয়ে যায়, নয় ভর্তি হলেও তাড়াতাড়ি ছুটি হয়ে যায়, নয়ত ভর্তি হবার পরে দেখা যায় যেমন দারুণ কেস বলে মনে করা হয়েছিল তা নয়, সাদামাটা কিছু। শেষে সুনন্দা বলল, “একজন ভালো রোগী পেয়েছি, কিন্তু ভর্তি হতে চাইছে না। আচ্ছা, ভর্তি না করে যদি কনফারেনসের দিনই ডেকে পাঠাই, তাহলে হবে না? ভর্তি করা পেশেন্ট-ই নিতে হবে?”

সিনিয়র ছাত্রছাত্রীরা বলল, “নিশ্চয়ই নিতে পারিস... বরং ভর্তি না-করা পেশেন্ট হলে অনেক ভালো ভালো কেস পাবি। কিন্তু যদি শেষ অবধি পেশেন্টটা এলই না? তখন কী বলবি?”

দুশ্চিন্তায় প্রায় ঘুম হয় না, এই সময়ে সুনন্দা গিয়ে ধরল আমাদের গ্রুপের সবচেয়ে সিনিয়র শিক্ষককে। তিনি সব শুনে বললেন, “তুমি আউটডোর থেকেই কেস নিয়ে তৈরি হও। কনফারেনসে পেশেন্ট না-ই থাকতে পারে। আউটডোরের পেশেন্টকে ডাকা সত্ত্বেও না এলে তোমার কী করার আছে? ভর্তির মতো পেশেন্ট না পাওয়া গেলে, বা ভর্তি পেশেন্ট আলোচনার মতো না হলে তোমার কী দোষ? আবার ধরো, ওয়ার্ডের যে পেশেন্টকে নিয়ে কনফারেনস করবে ঠিক করেছ, সে যদি কনফারেনসের দিন সকালে পালিয়ে যায়? বা মারা-ই যায়? তখন? যাও, যাও – ও সব সামান্য জিনিস নিয়ে মাথা ঘামিও না।

আনন্দে সুনন্দা বলল, “এই জন্যই টিচাররা টিচার, আর সিনিয়র স্টুডেন্টরা টিচার নয়।” বলে কাজ শুরু করল আউটডোরেরই এক রোগীকে নিয়ে। তাতে অসুবিধে হল সেই ছাত্রদের যারা শিক্ষককে ইমপ্রেস করার জন্য আগে থেকে কেস দেখে, বই পড়ে রাখত।

তাতে সুনন্দার কী?

কেস কনফারেনসের দিন সকালের কাজ শেষ করে সুনন্দা খেতে গেল না। সোজা চলে গেল কেস কনফারেনসের ঘরে – সেখানেই আসতে বলেছিল রোগীকে।

আমরা ধীর-সুস্থে, খেয়ে-দেয়ে দুপুরে এসে পৌঁছলাম। সুনন্দার মুখ শুকনো। রোগীর দেখা নেই।

আমরা বললাম, “তো অত চিন্তার কী আছে? প্রফেসর নিজলিঙ্গাপ্পা তো বলেইছেন, রোগী লাগবে না।”

আমাদের সান্ত্বনায় নিশ্চিন্ত না হয়ে সুনন্দা বলল, “না রে। প্রফেসর নিজলিঙ্গাপ্পা আসবেন না। কী কাজ আছে। প্রফেসর রামকুমার চেয়ার করবেন। আর জুনিয়র টিচারদের মধ্যে ডা. শ্রীবাস্তবকে নিজলিঙ্গাপ্পা নিয়ে যাচ্ছেন কোথায় – সুতরাং রামাস্বামী থাকবে।

এইবার সুনন্দার দুশ্চিন্তার কারণ বুঝলাম। সুনন্দা দক্ষিণভারতের যে রাজ্যের আদি বাসিন্দা, রামকুমার আর রামাস্বামী দুজনেই তার পাশের রাজ্যের। এবং দুজনেই সাংঘাতিক প্যারোকিয়াল, পার্শিয়াল এবং ভিনরাজ্যবাসী সকলকেই তারা শত্রু মনে করে (আমাকেও – কিন্তু সুনন্দার রাজ্যবাসী দেখলে তেলেবেগুনে অবস্থা হয়)। নিজলিঙ্গাপ্পা অন্য রাজ্যবাসী, রামকুমারের ঊর্ধ্বতন বস। শ্রীবাস্তব উত্তর ভারতের, রামাস্বামীর সমগোত্রীয় পদে আসীন, কিন্তু রামাস্বামীর চেয়ে সিনিয়র। এঁরা থাকলে রামকুমার আর রামাস্বামী খুব ট্যাঁ-ফোঁ করতে পারেন না।

খানিক বাদেই রামাস্বামীর প্রবেশ। সুনন্দাকে বলল, “রেডি?”

সুনন্দা খানিকটা থতমত খেয়ে বলল, “রোগী এসে পৌঁছয়নি এখনও।”

চোখ কপালে তোলার ভান করে রামাস্বামী বলল, “তুমি আউটডোরের পেশেন্ট এনেছ? কেন? ভর্তি পেশেন্টের মধ্যে কেউ তোমার কেস কনফারেনসের যোগ্য বলে গণ্য হল না? তা হবে – তোমরা আজকালকার ছাত্রছাত্রী – তোমরা আমাদের চেয়ে বেশি জান।”

সুনন্দা কিছু বলার আগেই এসে পড়লেন প্রফেসর রামকুমার। “রেডি? রোগী কোথায়? পাঠায়নি ওয়ার্ড থেকে?”

সুনন্দা কিছু বলার আগেই রামাস্বামী বলল, “ও তো ওয়ার্ড থেকে কেস নেয়নি স্যার। আউটডোরের পেশেন্ট সিলেক্ট করেছে।”

আউটডোরের পেশেন্ট? কার অনুমতি নিয়ে তুমি আউটডোরের পেশেন্ট নিয়েছ?” ফেটে পড়লেন রামকুমার। “প্রফেসর নিজলিঙ্গাপ্পার কথা ছিল আজ চেয়ার করার। উনি জানেন?”

ধমক খেয়ে কান্নায় গলা ধরে এসেছে সুনন্দার। বলল, “হ্যাঁ, স্যার। ভর্তি কেস থেকে পাইনি বলেই উনি বললেন...”

পাওনি? পাওনি? বললেই হল? আমার ওয়ার্ডেই অন্তত চারজন ইন্টারেস্টিং পেশেন্ট আছে গত দু-সপ্তাহ ধরে – রামাস্বামী, তুমি ওকে আমাদের ওই কেসগুলোর কথা বলনি?”

রামাস্বামী দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “জানতে চাইলে তো বলব স্যার, আজকাল স্টুডেন্টরা কিছু জিজ্ঞেসই করে না তো!” অম্লানবদনে সম্পূর্ণ মিথ্যে কথাটা বলে সুট করে কনফারেনস রুমে ঢুকে গেল রামাস্বামী। সুনন্দা রামাস্বামীকে বার বার জিজ্ঞেস করেছিল – কোনও সাহায্য পায়নি। বরং ধর্মেন্দ্র যখন ওর কেস-এর কথা বলেছিল, তখনও ওপর-পড়া হয়ে এসে বলেছিল, “না, না। ওটা কনফারেনসের জন্য উপযুক্ত হবে না।”

রামাস্বামী কনফারেনস রুমে ঢুকে যাওয়ার পরে রামকুমারও ঢুকলেন। আমরাও গেলাম পেছন পেছন। নিজলিঙ্গাপ্পার অবর্তমানে রামকুমার চেয়ার করবেন। বললেন, “তুমি শুরু করো, সুনন্দা। ধর্মেন্দ্র, তুমি বাইরে দারোয়ানকে বলে এসো, পেশেন্ট এলে যেন বসিয়ে রাখে। না এলে সেটা অবশ্য তোমার পক্ষে ভালো হবে না, সুনন্দা।”

ধর্মেন্দ্র বেরিয়ে গেল। কাঁপা গলায় সুনন্দা বলল, “শুরু করি স্যার?”

রামকুমার বললেন, “ধর্মেন্দ্র আসুক। এক মিনিট তো লাগবে।”

এক মিনিট না – প্রায় পাঁচ মিনিট লাগল ফিরতে। রামকুমার রেগে বললেন, “কতক্ষণ লাগে?”

ধর্মেন্দ্র বলল, “স্যার সিকিউরিটির লোকটা গেটে ছিল না। তাই ওয়ার্ড-বয় গেল তাকে ডাকতে... ক্যানটিনে কফি খাচ্ছিল...”

রামকুমার নাক দিয়ে একটা হুঁঃ শব্দ করে বললেন, “আচ্ছা, সুনন্দা, শুরু করো।”

কাঁপা গলায় সুনন্দা শুরু করল। ব্যাঙ্গালোর শহরেরই একটি বছর কুড়ি বয়সের ছেলে। তার সমস্যা এই, যে তার নাকটা খুব বড়ো। সে নানা ডাক্তার বদ্যি দেখিয়েছে। শেষে কেউ বলে কোনও প্লাস্টিক সার্জনের কাছে যাও, সে নাক কেটেকুটে সাইজমতো করে দেবে। কিন্তু প্লাস্টিক সার্জন তাকে পাঠায় কোনও ই-এন-টি সার্জনের কাছে – এই মতামত চেয়ে যে নাকটা কতটা কাটলে ঠিক দেখাবে। সেই ই-এন-টি সার্জন নাকি ছেলেটার কথা শুনেই রাগ করে মানসিক রোগ চিকিৎসালয়ে পাঠিয়ে দিলেন।

এইটুকু জানতে জানতেই দরজা ঠেলে ঢুকল ডা. শ্রীবাস্তব। প্রফেসর রামকুমারকে বলল, “স্যার, প্রফেসর নিজলিঙ্গাপ্পা আপনাকে একবার ওনার ঘরে যেতে বললেন। ওই সেই প্রজেক্টের রিপোর্ট-টা আজই ডিরেকটর পাঠাতে বলেছেন।”

ওঃ, তাই? তাহলে চলো,” বলে উঠে দাঁড়ালেন রামকুমার। “রামাস্বামী – তুমি চালিয়ে নাও।”

শ্রীবাস্তব বলল, “না স্যার। আমি যাব না।” আমার পাশের খালি চেয়ারটায় বসে শ্রীবাস্তব বলল, “প্রফেসর নিজলিঙ্গাপ্পা আপনার সঙ্গে একান্তে কিছু আলোচনা করতে চান। আমাকে বললেন ততক্ষণ আমি যেন না যাই। এখানেই থাকব – ঘণ্টাখানেক পরে যাব আবার।”

রামকুমার চলে গেলেন, রামাস্বামী বলল, “শ্রীবাস্তব, তুমি চেয়ার করো?”

শ্রীবাস্তব বলল, “ও সব ফর্মালিটি করে কী হবে? কাজটা হওয়া নিয়ে কথা – চলো, চলো, সুনন্দা, আবার প্রথম থেকে বলবে? আমি তো ছিলাম না...”

সুনন্দার ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ল, কাগজপত্র গুছিয়ে নিয়ে আবার শুরু করল। শ্রীবাস্তব আমার দিকে ঝুঁকে পড়ে বলল, “পেছনে লেগে গেছিল দুজনে মিলে?”

আমি নাক দিয়ে শ্বাস ছেড়ে বললাম, “হুঁ।”

ধর্মেন্দ্র ফোন করল। নিজলিঙ্গাপ্পা আমাকে পাঠিয়ে দিলেন।”

ধর্মেন্দ্র আর সুনন্দা একই প্রদেশের বাসিন্দা। এবার বুঝলাম সিকিউরিটিকে পেতে কেন দেরি হয়েছিল।

সুনন্দা বলে চলেছে। দ্বিতীয়বারের পাঠে একটা বিষয় আমার কানে ঠেকল। ছেলেটার নাক শুধু বড়ো না। আর একটা ব্যাপার আছে। রোজ সকালে ওর নাকটা বিরাট বড়ো থাকে। যত বেলা গড়ায়, ততই আস্তে আস্তে কমে আসে। স্বাভাবিক হয় না কখনোই, কিন্তু অত আর বড়ো থাকে না।

সমস্ত কাহিনি শেষ হল মিনিট পনেরোর মধ্যে। এবারে একপ্রস্থ আলোচনা। এখনই রামকুমার-রামাস্বামী জুটি ছাত্রদের কিমা বানান। আজ রামকুমার নেই, কিন্তু রামাস্বামী একাই পঞ্চাশ। এর হাত থেকে শ্রীবাস্তব কাউকে বাঁচাবে না। সুতরাং আমরা নড়েচড়ে বসলাম।

যেমনটা আশা করা গেছিল, রামাস্বামী শুরু করল ওর প্রিয় ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে। “কী হতে পারে?”

কেউ বলল, “এমন হতে পারে যে ছেলেটা ভুল দেখছে। নাকটা স্বাভাবিক সাইজের। ও দেখেছে বড়ো... (ডাক্তারি পরিভাষায় হ্যালুসিনেশন বা ইল্যুশন)। কেউ বলল, “স্বাভাবিক নাক, দেখছেও স্বাভাবিক, কিন্তু ভ্রান্ত বিশ্বাস যে ওটা মস্ত বড়ো... (ডেল্যুশন)। এই ভাবে নানা আলোচনা চলছে, হ্যালুসিনেশন, ইল্যুশন, ডেল্যুশন, অবসেশন... সব শন্‌ শন্‌ করে শেষ হয়ে বডি ডিসমরফোফোবিয়ার মতো কঠিন বাক্যাংশও শেষ হয়েছে। সব রকম মনরোগভিত্তিক সিমটমের নাম যত শেষ হয়ে আসছে, পরের ছাত্রের পক্ষে বিষয়টা আরও কঠিন হয়ে উঠছে। আমি ভাবছি, রামাস্বামী আমাকে (সঙ্গত কারণেই) মহা পাকা মনে করে। সবার পরেই আমাকে ধরবে। তখন কী বলব রে বাবা! এমন সময়, সবার শেষেই, রামাস্বামী আমাকে বলল, “আনিরুধ, তুমি কী ভাবছ?”

রামাস্বামী না হয়ে অন্য কেউ হলে আমি বলতাম, “আমি ডা. ওমুকের সঙ্গে একমত। ওটাই সবচেয়ে বেশি সম্ভাবনা।” তাতে অল্পের ওপর দিয়ে যেত। কারও বলা কথার ওপর আরও দুটো কথা বলে দিলেই চলত, কিন্তু রামাস্বামী মানবে না। অন্য কিছু বলতে হবে।

বললাম, “এমনও তো হতে পারে, যে ছেলেটার নাক সত্যিই বড়ো। অর্থাৎ, ওর অ্যাবনরমালিটি যদি কিছু থাকে, তা নাকের সাইজেই। চিন্তায়, বা বিশ্বাসে নয়।”

রেগে উঠল রামাস্বামী। “এটা একটা সিরিয়াস আলোচনা, আনিরুধ্‌। হালকা কোরো না। সুনন্দা, ছেলেটার নাক কি বড়ো, না ছোটো?”

সুনন্দা একটু ভেবে বলল, “তেমন বড়ো কিছু না।”

এক্স্যাক্টলি,” রামাস্বামী লাফিয়ে উঠল। “বড়ো হলে সার্জন মানসিক হাসপাতালে পাঠাত?”

সেই কথাটা পেড়ে আনলাম। বললাম, “সার্জন নাকের সাইজের জন্য পাঠিয়েছেন বলে আমি মনে করি না।”

তবে?”

ছেলেটা বলেছে সকালে নাক বড়ো, আর বেলা বাড়লে অত বড়ো না। সেইজন্য পাঠিয়েছেন। নাকের সাইজ কি বাড়ে কমে নাকি?”

রামাস্বামী ভাবল আমাকে ধরেছে চেপে। বলল, “ঠিক। তবে কেন বলছ নাক বড়ো নয়?”

বললাম, “আমি মনে করছি, যে ছেলেটা যখন সকালবেলা উঠে আয়নায় মুখ দেখে, ওর মনে হয় ওরে বাবা, নাকটা কত্তো বড়ো! কিন্তু যত বেলা বাড়ে, দেখতে দেখতে চোখে সয়ে যায়। মনে হয়, নাঃ, অত বড়ো নয়।”

সবাই হাঁ করে আমার দিকে তাকিয়ে।

আমি বলে চললাম, “আমি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলছি। গত মাস-ছয়েক আমার মাথার চুল কমতে শুরু করেছে। রোজ সকালে যখন প্রথম ঘুম থেকে উঠে আয়নার দিকে তাকাই, বুকটা ধড়াস করে ওঠে। অ্যাত্তোবড়ো টাক হয়েছে? কিন্তু তারপর, যখন দাঁত-টাত মেজে, চোখ-মুখ ধুয়ে ফিরে আসি, চান-টান করে চুল আঁচড়াই – তখন আর অত ভয়ানক দেখায় না। মনে হয় গতকাল যেমনটা ছিল, আজও মোটামুটি একই রয়েছে।”

ঘরের মধ্যে হাসাহাসি শুরু হয়েছে। রামাস্বামীর মুখ ক্রমশ লাল থেকে বেগুনি হয়ে আরও নানা অদ্ভুত রঙের হয়ে যাচ্ছে – বুঝে ডা. শ্রীবাস্তব ডা. তরুণকে বলল, “এই ব্যাপারে তোমার কী মত?”

ডা. তরুণ আর ডা. বিক্রম আমাদের চেয়ে সিনিয়র ডাক্তার, কিন্তু পদমর্যাদায় একই পর্যায়ের। তাঁদের দুজনের মাথা মিলিয়ে সর্বমোট কুড়িটাও চুল হবে কি না সন্দেহ। তরুণ আবার বিক্রমের দিকে তাকিয়ে বলল, “বিক্রম, তোমার কি মনে পড়ে সেই দিনগুলোর কথা, যখন তোমাকে দেখে কেউ টেকো বলত না, বলত তোমার রিসিডিং হেয়ারলাইন?”

দুঃখের সঙ্গে মাথা নেড়ে বিক্রম বলল, “না বস্‌, স্যরি। অতদিনের কথা মনে নেই।”

একই রকম দুঃখী মুখে তরুণ বলল, “আমারও না।”

গদাম্‌ করে রামাস্বামীর মুষ্টিবদ্ধ হাত নেমে এল টেবিলে। আমরা চমকে উঠলাম।

যথেষ্ট হাসাহাসি হয়েছে। আনিরুধ্‌, তুমি ব্যাপারটাকে লঘু করে দিয়েছ। এটা একটা সিরিয়াস অ্যাকাডেমিক এক্সারসাইজ। এই আলোচনা এখানেই শেষ। সুনন্দা, তুমি বাইরে গিয়ে দেখো, রোগী এসেছে কি না। না-হলে আমরা শেষ আলোচনায় যাব।”

সুনন্দা সবে একটু নিশ্চিন্ত বোধ করতে শুরু করেছিল। রামাস্বামীর কথায় বেচারা আবার দুশ্চিন্তাগ্রস্ত মুখে উঠে দরজা খুলে বাইরে গেল। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ফিরে এল। চোখ-মুখের চেহারা পালটে গেছে। একগাল হেসে বলল, “এসেছে, এসেছে!” বলে দরজা খুলে দাঁড়াল। দরজা দিয়ে ওর পেছনে পেছনে ঢুকল রোগী।

ঘরে পিন-ড্রপ সাইলেনস।

মাইরি, অত বড়ো নাক আমি জীবনে দেখিনি।





মেডিক্যাল কলেজ ভাঙা হবে


মেডিক্যাল কলেজ ভাঙা হবে শোনা যাচ্ছে, কিন্তু কোনও নড়াচড়া কারওর দেখা যাচ্ছে না। ততদিনে (কানাঘুষোয়) জানা গেছে যে সামনের বিশাল বিশাল থাম আর সেই বিখ্যাত সিঁড়ির কোনও পরিবর্তন হবে না, তাই কারওর বেশি দুঃখও নেই। একদিন গোগোল এসে বলল যে ও নাকি কোন পি-ডব্লু-ডি ইন্‌জিনিয়ারের সঙ্গে কথা বলে জেনেছে যে পি-ডব্লু-ডি এখন আর মেডিক্যাল কলেজের প্রধান বাড়িটার মেরামত করবে না, কারণ অর্ডার এসেছে যে রেনোভেশন হবে।

কিন্তু তার কোনও লক্ষণ তো দেখা যায় না। শোনা গেল মেডিক্যাল কলেজের মেইন বিল্ডিং-এর সব ওয়ার্ড সরিয়ে গ্রিন-বিল্ডিং-এ নিয়ে যাবার কথা ছিল। কিন্তু গ্রিন যেহেতু গাইনিকলজির জন্য তৈরি হচ্ছিল, তাই তারা চ্যাঁ-চ্যাঁ শুরু করেছে, ইত্যাদি।

দিন, সপ্তাহ, মাস কেটে যায়। পি.ডব্লু.ডি-র মেরামত বন্ধ, ফলে এধারে ওধারে নানারকম সমস্যা – এখানে ইসকুরুপ খসে পড়া, ওখানে জানলার কাচ ভাঙা – আর সারানো হয় না। উত্তরের দক্ষিণের বারান্দার থামের মাঝে মাঝে যে বিশাল বিশাল তেরপলের পর্দা ঝুলত, সেগুলো ছিঁড়লে মেরামত হয় না। ফলে শীতের সময়ে ঠাণ্ডা হাওয়ায় পেশেন্টরা কাঁপে, বর্ষায় ওয়ার্ডে জল ঢুকে যায়। টুকটাক রঙ করা, দরজা সারানো, এই সব করতে গেলেও তিনবার চিঠি দিতে হয়।

একদিন, বর্ষাকাল। সেদিন কী কারণে আমি একা – সঙ্গীরা সবাই বাড়ি গেছে। সমস্যা হতে পারে এমন পেশেন্ট ছিল না নিশ্চয়ই। কিন্তু একা বলে সারা হাসপাতাল ঘুরে সব রোগী দেখতে সময় লেগেছিল। শেষ হয়েছিল এমার্জেনসিতে। রাত তখন প্রায় ন’টা। এমার্জেনসি থেকে বেরিয়ে দেখি এতক্ষণের টিপটিপ বৃষ্টি বেশ ঝিরঝিরে হয়েছে। সঙ্গে ছাতা নেই। ছাতা নিয়ে এ-ওয়ার্ড থেকে ও-ওয়ার্ডে যাওয়া সহজ নয় বলে ডিপার্টমেন্ট-এর অফিসে রেখে ওয়ার্ডে গেছিলাম। বেশিরভাগ ওয়ার্ড থেকে যাতায়াত করার টালি-ঢাকা পায়েচলা রাস্তা আছে, তাই অসুবিধা হয়নি। কিন্তু এখন আর সেই সুবিধা নেই। বৃষ্টি বেড়েওছে।

মেডিক্যাল কলেজে আমাদের অফিসটা ছিল প্রধান মেডিক্যাল কলেজ বিল্ডিং-এর মধ্যে। অর্থাৎ আমি যেখানে দাঁড়িয়ে, তার ঠিক উলটো দিকে। বৃষ্টির মধ্যে অজস্র সিঁড়ি বেয়ে উঠতে হবে। এক ছুটে। পা হড়কালে কিংবা হোঁচট খেলে হয় সিঁড়িতে মুখ থুবড়ে পড়া, নইলে গড়িয়ে নিচে নেমে আসা।

কিন্তু দাঁড়াবার উপায় নেই। রাতের খাবার পেতে গেলে সাড়ে-নটার বেশি দেরি করা চলবে না। তাই একছুটে উঠতে শুরু করলাম।

প্রবল বেগে সিঁড়ি ওঠা শেষ করেই দেখি সিঁড়ির শেষে বিল্ডিং-এ ঢোকার মুখে কল্যাপসিব্ল গেটটা প্রায় পুরোটাই বন্ধ। এক-মানুষ চওড়া ফাঁকটা জুড়ে দাঁড়িয়ে আছেন একজন মহিলা – সম্ভবত কোনও রোগীর বাড়ির লোক। তিনি আমাকে অমন উল্কার গতিতে সিঁড়ি চড়তে দেখে বোধহয় খানিকটা ঘাবড়ে গিয়েই চট্‌ করে গেট ছেড়ে ভিতরে ঢুকে গেলেন, আর আমিও আমার দৌড়ন’র গতি না কমিয়ে ওঁর ছেড়ে দেওয়া গেটের ফাঁক দিয়ে গলে গিয়ে সেই গতিতেই ভিতরে ঢুকে আরও সাত-আট পা গিয়ে আমাদের অফিসের দরজায় লাগানো তালায় চাবি ঢোকালাম।

চাবি ঘুরিয়ে তালা খোলার আগেই বাইরে থেকে প্রচণ্ড এক শব্দ – যেন কামানের গর্জন! দরজা, জানলা, আলমারি সব থরথর করে কেঁপে উঠল।

প্রথম যে চিন্তাটা মাথায় এল তা হল, ভূমিকম্প নাকি? তারপরে – তখনও ঘটনার আকস্মিকতায় স্থানুর মতো দাঁড়িয়ে আছি – মনে হল, না, তা নয়। তালা না খুলে চাবিটা বের করে আবার বাইরের দিকে গেলাম। ঘরের বাইরে তখনও সেই মহিলা দাঁড়িয়ে। আমাকে আসতে দেখে ছুটে এসে পায়ের ওপর আছড়ে পড়লেন। চিৎকার করে বলতে লাগলেন, আমি নাকি দেবতা, শুধু ওঁকে বাঁচাতেই স্বর্গ থেকে নেমে এসেছি।

বুঝতে পারছি না কী হচ্ছে। বাইরে বৃষ্টি বেড়েছে। সিঁড়ি দিয়ে আর কেউ উঠছেও না। কল্যাপসিব্ল গেটের বাইরের চাতালে সাদা সাদা থান ইঁট সাইজের অজস্র কিসের টুকরো পড়ে আছে – এক্ষুনি তো ছিল না! এল কোত্থেকে?

বাইরে বেরিয়ে দেখতে যাব, এমার্জেনসির গাড়ি বারান্দার নিচে দাঁড়ান’ বহু লোক একসঙ্গে হাঁ হাঁ করে চেঁচিয়ে উঠল। ততক্ষণে ওয়ার্ড থেকে আরও অনেকে বেরিয়ে এসেছেন – রোগী, তাঁদের বাড়ির লোক, স্টাফ – তাঁরাও আটকালেন। ওপর থেকে ছাদের বিশাল একটা অংশ ভেঙে সিঁড়ির সামনের চাতালে আছড়ে পড়ে টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে চারিদিকে। পড়েছে কল্যাপসিব্ল গেটটার ঠিক সামনেই। আমি দৌড়ে ঢোকার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই। অর্থাৎ এমন হতেই পারত যে আমি যদি বৃষ্টির জন্য না দৌড়তাম, তাহলে ওই বিশাল চাঙড়টা আমার মাথাতেই পড়ত। এবং ওই মহিলা তার কয়েক ফুটের মধ্যেই দাঁড়িয়ে ছিলেন, সুতরাং বেশিরভাগটাই ওঁর গায়ে লাগত বইকি। আমাকে জায়গা দিতেই উনি ভেতরে ঢুকেছিলেন, এবং সেই জন্যই আমি ওঁকেও বাঁচিয়েছি এ কথা একবাক্যে মেনে নিল সবাই।

এমার্জেনসির নিচের লোকেরা যখন বলল ছাদ থেকে আর কিছু পড়ছে বলে মনে হচ্ছে না, তখন এক ছুট্টে চাতালে বেরিয়ে বৃষ্টির হাত থেকে চোখ আড়াল করে যা দেখলাম তাতেই আত্মারাম খাঁচাছাড়া হবার যোগাড়! মেডিক্যাল কলেজের একেবারে ওপরে একটা তিনকোনা ডিজাইন আছে। স্থাপত্যবিদ্যার পরিভাষায় তাকে বলে পেডিমেন্ট। তার একেবারে ওপরের অংশ থেকে প্রায় চল্লিশ-পঞ্চাশ ফুট লম্বা একটা চাঙড় নেই। সেটা এবড়োখেবড়োভাবে ভেঙেছে, কিন্তু ওই দূরত্ব থেকে যা বুঝলাম – সবচেয়ে চওড়া অংশটা প্রায় সাত আট ফুট তো হবেই। যে টুকরোগুলো মাটিতে পড়ে আছে, সেগুলোই প্রায় এক ফুট চওড়া।

সরেজমিনে দেখে আবার ভেতরে ঢুকছি, আর ভাবছি, ফ্যাটিদার গল্পটা প্রায় উলটে গেছিল আর কী! এমন সময় টেলিফোন অপারেটর – যিনি বসেন সামনেই, ডেকে বললেন, “আমাদের কি এই বাড়িতেই মৃত্যু হবে?”

আমি বললাম, “কাজ ছেড়ে তো আর চলে যেতে পারি না।”

উনি বললেন, “সুপারকে ফোন করে জানান। ওনার গাফিলতিতেই তো কোনও কাজ এগোচ্ছে না।”

বললাম, “লাইনটা দিন।”

আমাদের অফিসে গিয়ে সুপারের সঙ্গে ফোনে কথা বললাম। উনি প্রথমেই জানতে চাইলেন কোনও হতাহতের ঘটনা ঘটেছে কি না। বললাম, না। সেরকম কিছু হয়নি। কিন্তু সন্ধের ওই সময়ে ওই চাতালটায় লোকজন থিকথিক করে। বৃষ্টি হচ্ছিল বলেই তখন কেউ ছিল না। আমি নিজেও অল্পের জন্য বেঁচে গেছি। উনি বললেন, “তুমি কিচ্ছুটি চিন্তা কোরো না। আমি সব ব্যবস্থা করে দিচ্ছি।”

দু’মিনিটের মধ্যে ফোন বাজল। অপারেটর। “কী বললেন, সুপার?”

বললাম, “বলেছেন চিন্তা না করতে – উনি দেখছেন।”

অপারেটর নির্লজ্জভাবে বললেন, “জানি। আমি লাইনে শুনেছি। কী দেখলেন জানেন? আপনার সঙ্গে কথা বলেই ওয়ার্ড-মাস্টারকে ফোন করে বললেন, এক্ষুনি সব পরিষ্কার করে দাও। কাল সকাল অবধি যেন কিচ্ছু না থাকে।”

আমি বললাম, “এক কাজ করুন। স্যারকে ফোন করুন। না, স্যার না। শশীদার বাড়িতে লাইনটা দিন।”

শশীদা জুনিয়র টিচার। লেকচারার হতে আর বাকি নেই। সব শুনল। বলল, “কাল সকালে দেখছি।”

পরদিন সকালে যখন কাজে ঢুকছি, দেখি ছাদের ভাঙা টুকরো আর সিঁড়ির চাতালে একটাও নেই। সব ঝেঁটিয়ে পরিষ্কার করা হয়েছে। কিন্তু সুইপারেরও তো সুপারের মতোই সরকারি চাকরি, তাই সারা চাতালে আর সিঁড়িতে নানা জায়গায় সাদা সাদা চুনের দাগ লেপা রয়েছে। শশীদা এসে দেখলেন। সব চেয়ে বড়ো সাক্ষী তো পেডিমেন্টের ওপরের অংশের ওই ভাঙা জায়গাটা। ওটা তো ঝেঁটিয়ে বিদেয় করা যায়নি। শশীদা সঙ্গে সঙ্গে অ্যাসোসিয়েশনের সব সিনিয়র ডাক্তারকে ফোন করে বললেন কী হয়েছে। “আমার হাউস-স্টাফের মাথা যদি পড়ত... ইত্যাদি...” তারপরে আমাকে নিয়ে গেলেন রেডিওলজির হেড-এর কাছে। উনি তখন অ্যাসোসিয়েশনের পাকা মাথা। সব শুনলেন। বিশেষত সুপারের কাণ্ড। ফিরে এলাম আমাদের ডিপার্টমেন্টে। সুনয়ন, সুনীপা আর জবাকে বললাম, “আজকের দিনটা মনে রাখিস। মেডিক্যাল কলেজ নতুন করে তৈরি হলে ভুলিস না – এর পেছনে আমারও অবদান ছিল।”

ঈঈঈঈ আর কী,” বলল সুনয়ন। “মার্বেলের ভিত্তিপ্রস্তর বানিয়ে তোমার নাম লিখে রাখা হবে।”

তা হবে না,” হিংসুটে সুনয়নকে আস্বস্ত করলাম। “ওখানে যতীন চক্কোত্তি লেখা থাকবে। তাই তো বলছি। মনে রাখিস।”

খানিক বাদে শশীদা বুক ফুলিয়ে ফিরে এল। “বলে দেওয়া হয়েছে আর সহ্য করা হবে না। সুপারকে একমাসের টাইম দেওয়া হয়েছে। তার মধ্যে আমাদের পেশেন্টদের গ্রিন বিল্ডিং-এ সরানোর কাজ শুরু না হলে অ্যাসোসিয়েশনের সব ডাক্তার স্ট্রাইক করবে। আমাদের রাইটার্স-ও সমঝে চলে। এবার কাজ হবেই হবে।”

একমাসে হয়নি। তিনমাস পরে মেডিক্যাল কলেজের হাল ফেরানোর কাজ শুরু হয়েছিল। সে আর এক গল্প।





শিয়রে সমন


কেন্দ্রিয় মনশ্চিকিৎসা সংস্থানে কর্মরত বাঙালিদের মধ্যে অনেকেই থাকত কলকাতায়। তারা প্রায়ই দ্বিতীয় শনিবারের সরকারি ছুটির সুযোগ নিয়ে মাসে একবার শনি-রবিবারের ছুটি কাটাতে চুপচাপ চলে যেত দেশে। আবার সোমবার ভোর-ভোর ফিরে এসে কাজে যোগ দিত সক্কাল সক্কাল।

রাঁচি থেকে কলকাতা যাবার সবচেয়ে সহজ রাস্তা ছিল বাস। সন্ধেবেলা কাজটাজ সেরে বাসে চড়ে বসা, ভোর-ভোর এসপ্ল্যানেডে নামা। তবু কিছু লোক ট্রেনটাই পছন্দ করত – যেমন আমি। ট্রেনের সুবিধে ছিল এই, যে সারা রাত শুয়ে ঘুমোন যেত (যেটা খুব জরুরি)। বাসের ঝাঁকুনিতে কোমর ব্যথা করে, জানলায় মাথা ঠুকে কপাল ফুলিয়ে কলকাতা পৌঁছতে হত না। আমার ধারণা যারা বাসে যেত, তারা বাড়ি গিয়ে অন্তত ঘণ্টা চারেক ঘুমোত। আর আমি, সকালবেলায় ট্রেনেই দাঁত-টাত মেজে, প্রাতঃকৃত্য শেষ করে, বাড়ি গিয়ে চা খেতাম।

ফেরার পথেও একই ব্যাপার। যারা শনি-রবি কাউকে কিছু না বলে দেশে পালিয়েছে, তারা বাসে ফিরত যাতে ছ’টা-সাতটার মধ্যে ঢুকে পড়তে পারে হস্টেলে। আর যারা আমার মতো ছুটি নিয়ে গেছে, তারা পাশ ফিরে আপার বার্থে ঘুমিয়ে নিত। ট্রেন সময়মত পৌঁছলে হাসপাতাল যেত, আর লেট করলে দেরি করে হাসপাতাল গিয়ে বলত, “ট্রেন লেট থা, বস্‌।”


একবার মেঘমন্দ্র আর আমি দু’জনেই একই সময়ে কলকাতায়। ফিরব একই সঙ্গে, তাই টিকিটও কাটা একসঙ্গে। আমি ট্রেন মিস করা ব্যাপারটায় খুব ডরাই, তাই দশটা কুড়িতে ট্রেন হওয়া সত্ত্বেও সাড়ে সাতটার মধ্যে খেয়ে দেয়ে তৈরি। মেঘমন্দ্রর বাড়ি আমার বাড়ির কাছেই। বেরোবার সময় ওকে ফোন করলাম।

কী রে? কখন বেরোবি? আমি ট্যাক্সি আনতে দিয়েছি। তোকে তুলে নেব?”

মেঘমন্দ্র খুব অবাক হয়ে বলল, “এখন? এখন তো ট্রেন ছাড়তে তিন ঘণ্টা দেরি! আমি যাদবপুরে। মাসির বাড়িতে। ডিনার খেয়ে বাড়ি যাব, বাড়ি থেকে হাওড়া বড়োজোর একঘণ্টা। দেরি হলে একঘণ্টা দশ মিনিট। এত তাড়া কিসের? আমি সাড়ে ন’টায় বেরোব।”

আমার পোষাবে না। বেরিয়ে পড়লাম। হাওড়া স্টেশন পৌঁছে গেলাম সাড়ে আটটার মধ্যে, প্ল্যাটফর্মে বসে বই পড়লাম দু’ঘণ্টা, তারপর, ন’টা পঞ্চাশে ট্রেন দিল, খুঁজে খুঁজে গিয়ে বার্থে বসলাম।

সময় যায়, মেঘমন্দ্রর দেখা নেই। আস্তে আস্তে আমার মনযোগ বই থেকে কমতে শুরু করল। আগেই বলেছি – মোবাইল ফোনের যুগ নয়, সুতরাং জানলা দিয়ে যতটা পারা যায়, মাথা বের করে গরাদে ঠেসে ধরে পিছনে দেখা ছাড়া গতি নেই। লাভ হল না। মেঘমন্দ্র এল না – ট্রেন ছেড়ে দিল।

একটু পরে টিকিট চেকার এলেন। বললাম, “এই বার্থে যিনি আছেন তিনি আসবেন আমি জানি, কিন্তু...”

টি.টি. বললেন, “অসুবিধে নেই। এমনিতেই খড়্গপুর অবধি তো কাউকে দেব না, সুতরাং উনি যদি অন্য কোনও বোগিতে উঠে থাকেন, এসে যাবেন। খড়্গপুর ছাড়ার পরেও কেউ না এলে আর..সি-কে দিয়ে দেব।”

খড়্গপুর ছাড়ার পরে টি.টি. বার্থটা আর..সি-কে দিয়ে দিলেন। আমরা আলো-টালো নিভিয়ে শুতে গেলাম।

ভোরবেলা ঘুম ভাঙল, দেখি সূর্যোদয়ের আভাস আসার আগের গভীর অন্ধকারের মধ্যে দিয়ে চলেছি। টি.টি. নিজের আসনে বসে ঢুলছিলেন, বাথরুমের কাজ সেরে বেরিয়ে দেখি জানলা দিয়ে বাইরে দেখার চেষ্টা করছেন। জিজ্ঞেস করলাম, “কত লেট?”

উনি বললেন, “বুঝছি না। মুরিতে একঘণ্টা লেট ছিল। এখন আরও বেশি।”

বুঝলাম আজ লাঞ্চের আগে হাসপাতাল যাওয়া হবে না। গিয়ে শুলাম।

ট্রেন রাঁচি পৌঁছল বেলা প্রায় দশটার কাছাকাছি। স্যুটকেস নিয়ে নেমে আড়মোড়া ভাঙছি, আর অটোওয়ালারা ঘিরে ধরেছে, “কহাঁ জাইয়েগা?”

বলছি, “বিদ্যাপতি নগর,” হঠাৎ কানের পেছনে শুনলাম, “থাক থাক, আর অটো দরাদরি করতে হবে না। চ’, চ’।”

চমকে ফিরে দেখি মেঘমন্দ্র মিট্‌মিট্‌ করে হাসছে।

বললাম, “তুই কোত্থেকে? কোন কামরায় ছিলি?”

বলল, “চ’, বলছি।”

বললাম, “একটা অটো নিয়ে নিই – আমি নেমে যাব, তুই বাড়ি চলে যাস।” রাঁচিতেও আমাদের বাড়ি ছিল পাশাপাশি পাড়ায়।

মেঘমন্দ্র বলল, “গাড়ি এনেছি।”

সে আবার কী!

চ’ তো! সেই কথাই তো বলছি।”

স্টেশন থেকে বেরিয়ে দুজনে গাড়িতে বসলাম। মেঘমন্দ্রর গাড়ি। শুক্রবার এই গাড়িই ওর রাঁচির বাড়ির গ্যারেজে রেখে তালা বন্ধ করে দু’জনে অটো নিয়ে স্টেশনে গিয়েছিলাম। আজ সোমবার সকালে সে গাড়ি স্টেশনের পার্‌কিং-এ কী করে দাঁড়িয়ে আছে?

মেঘমন্দ্র বলল, “তুই তো ফোন করলি – আমি ধীরে-সুস্থে খেয়ে দেয়ে উঠে মামাবাড়ি থেকে বাড়ি ফিরে বাক্স নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে দেখি কোথাও একটা ট্যাক্সির দেখা নেই। একটু পরে ‘সল্ট লেক হইতে হাওড়া’ মিনি বাস এল। উঠলাম। বাস ঢিকঢিক করে চলছে তো চলছেই। আমি বুঝছি দেরি হবে, কিন্তু কিছু করার নেই। একটু ঘুমিয়ে নিয়ে মনে মনে বলছি, ভগবান, ট্রেনটাকে একটু লেট করিয়ে দাও।”

বাস ঢিকঢিক করে চলছে, ট্রেন নিগঘাৎ মিস হবে, এর মধ্যে একটু ঘুমিয়ে নিয়ে... এই হল মেঘমন্দ্র। বললাম, “একদম ঠিক টাইমে ছেড়েছিল।”

তাই তো বলছি। রাঁচি এল আড়াই ঘণ্টা দেরি করে, তার পাঁচ মিনিট যদি হাওড়ায় দেরি করত, আমি ধরে নিতাম – দৌড়ে স্টেশনে ঢুকে দেখি ট্রেনের পিছনের লাল আলোটা শুঁউঁউঁউঁউঁ করে নেই হয়ে গেল।”

জিজ্ঞেস করলাম, “তাহলে?”

জানতে চাইলাম, খড়্গপুরের নেক্সট ট্রেন কখন? বলল, এক্ষুনি ছাড়বে। ওমুক প্ল্যাটফর্ম। দৌড়ে গিয়ে উঠলাম, ট্রেনও ছাড়ল।”

আমি বললাম, “কিন্তু লোক্যাল তো তিন ঘণ্টা নেয় খড়্গপুর পৌঁছতে। হাতিয়া এক্সপ্রেস তো দু’ঘণ্টায় যায়।”

আরে, তাই তো ভাবছিলাম – তোদের যদি লেট হয়! তা পৌঁছলাম গিয়ে খড়্গপুরে, কিন্তু তোরা ততক্ষণে আবার ছেড়ে গেছিস। জামশেদপুরের কোন ট্রেন আসবে? জানলাম বম্বে মেল। হাওড়া থেকে রওয়ানা হয়ে গেছে। খড়্গপুর হয়ে টাটানগর। বসে রইলাম। এল বম্বে মেল। কিন্তু সে-ও যখন গিয়ে টাটা পৌঁছল, তখন তোরা আধঘণ্টা লেট – কিন্তু ছেড়ে গেছিস। কী আর করা, ওয়েটিং রুমে গিয়ে একটা ঘুম দিলাম। চারটের সময় বেরিয়ে অটো ধরে বাস-স্ট্যান্ড। ফার্স্ট বাস ধরে বাড়ি গেলাম সাড়ে ছ’টা। তখন তুই অলরেডি একঘণ্টা লেট। হসপিটাল গিয়ে সই করলাম, পেশেন্ট টেশেন্ট দেখলাম। তারপর ভাবলাম যাই, তোকে স্টেশন থেকে তুলে আনি। তোর তো আজ সকালে হাসপাতালে যাওয়া হল না।”

আমি ভাবলাম, তাও তো আমি সকালে ট্রেনের বাথরুম ব্যবহার করতে পেরেছি। এই রকম সার্কাস করতে করতে কাজে ফেরা আমার দ্বারা হত না।

টাটানগর থেকে রাঁচি যেতে গেলে পাহাড় চড়তে হয়। গাড়ির রাস্তা পাহাড় কেটে উঠেছে, কিন্তু ট্রেনকে উঠতে হয় পাহাড়ের কোল বেয়ে, মুরি জংশন হয়ে। তাই ভোর চারটেয় বাসে চড়ে সকাল ছটায় রাঁচি পৌঁছন’ গেলেও, ট্রেন রাত্তির দুটোয় টাটা ছেড়েও রাঁচি পৌঁছয় সকাল সাড়ে সাতটায়। আর সেইজন্যই আমাদের সঙ্গীরা অনেক সময় টাটা পৌঁছে যদি বুঝত ট্রেন লেট করবে, তখন ট্রেন ছেড়ে বাস ধরত’ রাঁচি ফিরতে।


নাসিম আবার আরও এক-কাঠি ওপরে। ও আসত বম্বে থেকে, টাটা অবধি টিকিট কেটে। টাটানগর পৌঁছত মাঝরাত্তিরে। স্টেশনে নেমে জিজ্ঞেস করত, “হাওড়া হাতিয়া এক্সপ্রেসের কী খবর?” উত্তর শুনে যদি বুঝত সেই ট্রেন ধরলে সময়মত পৌঁছন’ যাবে না, তাহলে বাসের সন্ধানে যেত। না-হলে হাতিয়া এক্সপ্রেসে উঠে কোনও টিটিকে ধরে টিকিট এক্সটেন্ড করে নিত রাঁচি অবধি।

রাঁচির পাট চুকে যাবার পর নাসিমকে সার্টিফিকেট ইত্যাদি ছাড়াই বম্বে ফিরতে হয়েছিল বিদেশ যাবার কাগজপত্র তৈরি করতে। মাসখানেক পরে আমরা যখন খবর দিলাম, “নাসিম, এবার আয়, শোনা যাচ্ছে তোর সার্টিফিকেট সব তৈরি। ক্লার্করা বলছে, ‘নাসিম স্যার কাঁহা? বতাইয়ে সার্টিফিকেট রেডি হ্যায়।’” তখন ও ফিরল শেষ বারের মতো, সব কিছু গুছিয়ে (এবং ঘুচিয়ে), সার্টিফিকেট নিয়ে চলে যাবার জন্য।

সোমবার ফেরার কথা। কিন্তু সকাল থেকে কেউ নাসিমকে দেখেনি। আমি আর মেঘমন্দ্র মাঝে মাঝে আউটডোর আর হাসপাতালের ভিতরের ক্যান্টিনে খবর নিচ্ছি – আসেনি। দুপুরে দেখি আউটডোরের ক্যান্টিনে নাসিম বসে আছে। মুখ দেখেই বুঝলাম, মেজাজ তিরিক্কি। বললাম, “কী হল?”

এতই মেজাজ খারাপ, যে ভালো করে কথা বলা দূরস্থান, হাই-হ্যালোটুকুও বলল না। এমন সময় আউটডোরের ভেতর থেকে বেরিয়ে এল অরূপ। ক্যান্টিনের ভেতরে মুখ ঢুকিয়ে হাঁক পেড়ে এক কাপ কফি চেয়ে যেই আবার ফিরেছে, নাসিম উঠে গেল। খানিকটা গিয়ে পেছন ফিরে বলল, “তোদের ওই অরূপকে বলে দিস, সিনিয়রদের সঙ্গে ভদ্রভাবে বিহেভ করাটা তোদের কাছ থেকে যেন শিখে নেয়।”

অরূপ নাসিমের ছেড়ে যাওয়া সিটে সবে বসতে যাচ্ছিল। থমকে গেল। ছেলেটা আমাদের চেয়ে বেশ কয়েক বছরের ছোটো, কিন্তু বন্ধুস্থানীয়। কখনও মনে হয়নি যে সে সিনিয়রদের যথেষ্ট সম্মান দেয় না। আমরা একটু অবাক হয়েই ওর দিকে তাকালাম। নাসিম ততক্ষণে দৃষ্টির আড়ালে চলে গেছে। একটু অপেক্ষা করে অরূপ যখন বুঝল যে নাসিম ফিরে আসছে না, তখন বলল, “আজ নাসিমভাই মস্তো ঝামেলার হাত থেকে বেঁচে গেছে।”

কী হয়েছিল?

অরূপ কফিতে চুমুক দিয়ে বলল, “আরে আর বলবেন না। আমি তো আজ ফিরেছি কলকাতা থেকে। হাতিয়া এক্সপ্রেস প্রচণ্ড লেট করেছে। টাটা পৌঁছেছে তখনই ভোর প্রায় পাঁচটা। আমি তাড়াতাড়ি নামছি। জাস্ট নামব, দেখি নাসিমভাই ট্রেনে উঠছে। আমাকে দেখে বলল, ‘অরূপ, তুই নেমে যাচ্ছিস?’ আমি বললাম, ‘হ্যাঁ। আজ গাড়ি বারোটার আগে রাঁচি পৌঁছবে না। বাসে যাব।’

নাসিমভাই বলল, ‘ভেরি গুড। আমাকে চট্‌ করে তোর টিকিটটা দে। আমার টিকিটটা নিয়ে তুই চলে যা।’

আমি অবাক! প্রথমে বুঝতেই পারিনি নাসিমভাই কী বলছে। বুঝিয়ে বলল, ‘আমি টাটানগর অবধি টিকিট কেটেছি। এখন আমাকে টিকিটটা এক্সটেন্ড করতে হবে। তার চেয়ে তুই আমার টিকিটটা নিয়ে চলে যা। তোর নাম নাসিম আলি। আর আমি তোর টিকিটটা নিয়ে অরূপ ঘোষ হয়ে চলে যাই। আমাকে আর ফালতু পয়সা খরচা করতে হবে না।’

নাসিমভাই এসব বলছে, আর পেছনে টি.টি. উঠেছে। আমি কী বলব বুঝতে পারছি না, বলছি, ‘আরে আপ আইয়ে তো – নিচে প্ল্যাটফর্ম তক্‌ আইয়ে,’ নাসিমভাই তত রাস্তা আটকে দাঁড়িয়ে বলছে, ‘তোর টিকিট আমাকে দে, আমার টিকিটটা তুই নে – তুই নাসিম আলি হয়ে চলে যা, আমি অরূপ ঘোষ হয়ে চলে যাই। আমার তো রাঁচি পৌঁছন’র তাড়া নেই...’

আর টি.টি.-টা ঠিক নাসিমভাইয়ের পিছনে দাঁড়িয়ে... আমি বলতেও পারছি না টি.টি. আছে... শেষে লোকটা বুঝে গেছে নাসিমভাই কী বলতে চাইছে... খপ করে কাঁধটা চেপে ধরেছে, ‘কেয়া জী, কিসকা টিকেট লেকে জানে কা মৎলব কর রহে হো?’”

ততক্ষণে আমিরা হাসতে শুরু করেছি, আর সিনিয়রদের হাসি থেকে অরূপেরও একটু একটু হাসি এসেছে মুখে।

মেঘমন্দ্র জানতে চাইল, “তারপর?”

সাহস পেয়ে অরূপ ওর মতামতও মেলাতে শুরু করল।

আরে দাদা, যা-ই বলো, নাসিমভাইও একটু আকাট আছে। দেখছিস টি.টি. বুঝে গেছে, তখন একটু সমঝে গেলেই হয়, তা নয়, ফট করে টি.টি.-র সঙ্গে তক্কো করতে লেগে গেছে। টি.টি.-ও খেপে গেছে, বলে ‘আপ চোর হো। আপকো ম্যায় ট্রেনসে উতারকে আর.পি.এফ.-কে হাওয়ালে কর দুঙ্গা।’ নাসিম ভাই-ও তেড়ে গেছে, ‘কেয়া চোরি কিয়া ম্যায়নে?’ টি.টি. নাসিমভাইকে টেনে প্ল্যাটফর্মে নামিয়েছে, আর.পি.এফ. ডাকে আরকি! তখন আমিই টি.টি.-কে ডেকে বললেন, ‘দেখুন, উনি তো চুরি কিছু করেননি। ওনার টিকিটও ওনার কাছে রয়েছে, আমারটাও আমার কাছেই। অন্যায়টা কী হয়েছে? কিন্তু ততক্ষণে আরও অনেক টি.টি. জমা হয়ে গেছে – আর টি.টি.-টাও তেমনই পাজি, সবাইকে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলছে, ‘এই লোকটা অন্যের টিকিটে ট্র্যাভেল করার কথা ভাবছিল। আমি ধরে ফেলেছি, আবার এমন নির্লজ্জ, বলছে সে নাকি ডাক্তার। ভাবুন, ডাক্তাররা কী রকম বদমাশ হয়...’ সে এক বিতিকিচ্ছিরি অবস্থা, সবাই নাসিমভাইয়ের দিকে এমনভাবে তাকাচ্ছে যেন চুরি করে ধরা পড়েছে... এর মধ্যে নাসিমভাই আবার অ্যাবাউট টার্ন হয়ে ট্রেনে উঠেছে... তখন টি.টি.-টা বলেছে, ‘আপ অগর ইস ট্রেন পে চড়া, তো আপকা টিকিট ম্যায় এক্সটেন্ড নেহি করুঙ্গা। আপকো উইদাউট টিকেট করকে পুলিশকা হাওয়ালে কর দুঙ্গা।’ সেই শুনে নাসিমভাই আবার স্টেশন থেকে বেরিয়ে টাটা-রাঁচি টিকিট কেটে ট্রেনে উঠল।”

কে একটা বলল, “এত কাণ্ড না করে তোর মতো বাসে করে এলেই হত?”

আরে, আমি তো পেছন পেছন টিকিট কাউন্টার পর্যন্ত গেছি! বললাম, ‘নাসিমভাই আপ চলিয়ে একসাথ বাস মে চলেঙ্গে।’ তখন বলল, ‘ম্যায় জাহান্নাম ভি তেরা সাথ নেহি জাউঙ্গা।’ আমি আর কী করি, চলে এলাম।”

আমরা খানিক মুখ তাকাতাকি করলাম। মেঘমন্দ্র বলল, “চল, নাসিমকে ধরি।” বলে ক্যান্টিন থেকে বেরিয়ে বলল, “ওর বক্তব্যও তো শোনা উচিত।”

উচিত তো বটেই। কিন্তু নাসিম এখন কোথায়? ওর তো কোনও কাজ নেই – হাসপাতালের ভিতরে থাকবে না। হস্টেল চলে গেল নাকি? বেরিয়ে দেখি অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ অফিসের সামনে দাঁড়িয়ে আছে ভ্যাবলার মতো।

আমরা যাওয়া মাত্র হেঁকে বলল, “ওই অরূপের মতো বদ ছেলে আর হয় না। দেখ, তোরা জানিস আমি কক্‌খনও বম্বে থেকে সোজা রাঁচির টিকিট কাটি না। কবে ট্রেন সময়মত পৌঁছবে না, টাটা এসে দেখব রাঁচির ট্রেন ছেড়ে গেছে, আবার গাঁটের পয়সা খরচা করে বাসের টিকিট কাটতে হয়। তাই বম্বে-টাটা টিকিট কাটি, পৌঁছে যদি দেখি হাতিয়া এক্সপ্রেস আসেনি, তখন প্ল্যাটফর্মে বসে থাকি, হাতিয়া এক্সপ্রেস এলে টি.টি.-কে বলি আমার টিকিটটা এক্সটেন্ড করে দিন। তিন বছর এই করছি – কোনও দিন অসুবিধে হয়নি। আজ সকালে হাতিয়া দেরি করে এসেছে। আমি ভাবছি, আজ তো আর গিয়ে ডিউটি দিতে হবে না। তারচেয়ে ট্রেনেই যাই, -৬ ঘণ্টা আরামসে ঘুমোতে পারব। যেমনই উঠেছি, দেখি অরূপ নামছে। ও বাসে ফিরবে...”

মেঘমন্দ্র বলল, “তাই ওকে বললি ওর টিকিটটা নিয়ে নিবি?”

হাঁ, ইয়ার! আরে, ও তো নেমেই যাচ্ছে। ওর টিকিটটা রাঁচি অবধিই। আমার পকেটে টাটার টিকিট – এক্সচেন্‌জ করে নিলেই হত, তা না, ব্যাটা কিছুতেই বের করল না টিকিটটা! খালি তাইরে নাইরে করছে, মাঝখান থেকে টি.টি. উঠে পড়েছে... সে ব্যাটা শুনে নিয়েছে... তারপরে কী লাফড়া... বলে আর.পি.এফ.-এ দেবে!”

বাঁচলি কী করে?”

আরে, কী করে আবার! অরূপ তো দিব্যি নিজের টিকিট নিয়ে বাস ধরতে চলে গেল। আমাকে আবার টাটা-রাঁচি টিকিট কাটতে হল।”

বাসে এলেই পারতি।”

বাসে এলে ঘুমোতে পারতাম সকাল দশটা অবধি?”

বাসে এলে ছ’টার মধ্যে পৌঁছে যেতি – হস্টেলে আরামসে ১১টা অবধি ঘুম দিতি।”

ধ্যেৎ,” বলে নাসিম চলে গেল।

নাসিমের বিলীয়মান চেহারাটা দেখতে দেখতে মেঘমন্দ্র বলল, “ব্যাটাকে শিক্ষা দেওয়া দরকার।”

কেন?”

এ রকম রেলওয়ের টিকিট নিয়ে বেআইনি করতে চাওয়াটা কি উচিত?”

অবাক হয়ে তাকালাম মেঘমন্দ্রের দিকে। আইন কানুন নিয়ে কবে থেকে এত মাথা ঘামান’?

তাছাড়া বম্বের গুজরাতি হয়ে কী বলে একটা বাঙালি ছেলের নামে গালি দেয়?”

এইবার বুঝলাম। বললাম, “চ’, ডাঃ সিনহা’র ঘরে যাই।”

সিনহা’র ঘরে কেন?”

বললাম, “চল, গেলেই বুঝবি।”

গেলাম দুজনে ডাঃ সিনহার ঘরে। সিনহা জার্নাল বন্ধ করে বললেন, “কী ব্যাপার? টু মাস্কেটিয়ার্স কেন? থার্ড জন কোথায়? নাসিমের আজ ফেরার কথা ছিল না?”

বললাম, “নাসিম আজ ফিরেছে। আপনার কাছ থেকে একটা ‘অন ইন্ডিয়া গভমেন্ট সার্ভিস’ লেখা লেফাফা চাই। অনেকগুলো ব্যবহৃত খাম পড়ে আছে এদিক ওদিক, দেখতে পাচ্ছি। আমাকে দেওয়াটা বেআইনি না তো?”

কী করবেন নিয়ে?” জিগেস করলেন ডাঃ সিনহা।

নাসিমকে একটা শিক্ষা দেব। প্র্যাক্টিক্যাল জোক।”

ড্রয়ার খুলে একটা নতুন খাম বের করে আমাকে দিয়ে সিনহা বললেন, “এই রকম সৎ কাজে ব্যবহার করতে চাইলে মোটেই বেআইনি নয়।”

সরকারি নোটিস জারি করার যে একটা পাতলা ফিনফিনে কাগজ হয়, সেরকম কাগজ আপনার কাছে আছে?”

ড্রয়ার ঘেঁটে মাথা নেড়ে ডাঃ সিনহা বললেন, “নেহি জি – ও তো নেহি হ্যায়।”

সিনহার অফিস থেকে বেরিয়ে চললাম অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ অফিসের দিকে। মেঘমন্দ্র উত্তেজনায় ছটফট করছে। বললাম, “শোন, তোকে প্ল্যানটা বলি। তুই জেনে রাখলে সুবিধে হবে। না হলে বরং ভেস্তে যেতে পারে।”

সবটা শুনে মেঘমন্দ্র খানিকক্ষণ কথাই বলতে পারল না। তারপরে বলল, “তোর মাথায় এসব কী করে এত তাড়াতাড়ি আসে?”

তা আমিও জানি না। কিন্তু আসে। একবার ব্যাঙ্গালোরে গিরিজাকে ফোন করে বলতে চেয়েছিলাম, “তো কাছে আমার যে লাইব্রেরি-বইটা আছে, ওটা আজ ফেরত দেবার দিন। আমি এখন আসব নিতে?”

কেউ ফোন ধরেছে, ডাকতে গেছে। যতক্ষণে গিরিজা এসে ফোন ধরেছে ততক্ষণে আমার মাথায় দুষ্টুবুদ্ধি খেলে গেছে। গিরিজা সঙ্গে প্রায় আধঘণ্টা ধরে নানা কথা বলে টাইমস অফ ইন্ডিয়ার এক জার্নালিস্ট একটা ইনটারভিউয়ের অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়েছে। একেবারে খাঁটি দক্ষিণ ভারতীয় ইংরেজিতে কথা বলা জার্নালিস্ট। ইনটারভিউয়ের দিনক্ষণ স্থির হবার পরে সেই জার্নালিস্ট হঠাৎ বলেছে, “ম্যাডাম, একটা রিকোয়েস্ট আছে, বলব?” আধঘণ্টা ধরে জার্নালিস্টের নানা আবদারে বিরক্ত গিরিজা যেই বলেছে, “হোয়াট?” ওমনি জার্নালিস্ট (অনিরুদ্ধ দেবের গলায়) বলেছে, “আপনার কাছে আমার লাইব্রেরির যে ওমুক বইটা আছে, সেটা নিয়ে আপনি যদি এখন আসেন, তাহলে আমি সেটা লাইব্রেরিতে ফেরতও দিতে পারি, আপনাকে একটা কফিও খাওয়াতে পারি। খানিকক্ষণ নিশ্ছিদ্র নিস্তব্ধতার পরে চিল চিৎকার ভেসে এসেছিল, “--------নিরুধ দেব, জাস্ট দাঁড়াও, একবার হাতে পাই তোমাকে!”

বম্বের নাসিম আলি তো আমার বাঁ হাতের খেল।

অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ অফিসে এসে দেখি নাসিম তখনও দাঁড়িয়ে আছে অফিসের বারান্দায়। নানারকম অফিশিয়াল কাজ শেষ করা রাঁচিতে একটা বিরাট কঠিন কাজ। মেঘমন্দ্রকে বললাম, “তুই ওকে আটকে রাখ – আমি হেড-ক্লার্ক মেহেন্দির কাছ থেকে একটা কাগজ জোগাড় করি। যেন দেখতে না পায় আমি কী কাগজ নিচ্ছি।”

মেঘমন্দ্র নাসিমের সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলতে শুরু করল, আমি ভিতরে ঢুকলাম। সব ক্লার্কই তাদের নিজেদের টেবিলে বসে। টেবিলে থাকাকালীন কাগজ চাইলে সাধারণ কাগজ পাব। সরকারি নোটিসের পাতলা ফিনফিনে কাগজটা হাতে পাওয়া মুশকিল। এদিক ওদিক দেখছি, কী করা যায়, মেহেন্দি ঘরের দূরের কোণা থেকে জিজ্ঞেস করেছে, “কেয়া, ডাকসাব, কেয়া চাহি?”

এমন সময় ঝা-জি টেবিল ছেড়ে ঘরের অন্য দিকে যেতে শুরু করেছেন, আমি চট্‌ করে কাছে গিয়ে বললাম, “ঝা-জি, একটা সাদা কাগজ নেব? ডিরেকটরের কাছে একটা অ্যাপ্লিকেশন দেব।”

ঝা ততক্ষণে আলমারি খুলে ফেলেছেন। বললেন, “হাঁ, হাঁ, লিজিয়ে না, লিজিয়ে না।”

ঝা-জি খোলা আলমারির দরজার আড়ালে গিয়েছেন, আর আমিও ওঁর টেবিল থেকে একটা পাতলা ফিনফিনে কাগজ নিয়েছি একটা বড়ো খাতার ভেতরে লুকিয়ে, আর দেখান’র জন্য একটা সাদা কাগজ হাতে করে বেরিয়েছি।

বারান্দায় নাসিম গজগজ করছে, “শালা, বম্বে যাবার আগে সব নো-অবজেকশন জমা দিয়ে গিয়েছি। এক সপ্তাহ ঝা সেটাকে নিয়ে হাঁ করে বসে আছে। কোনও কাজ করেনি। আমি তিনদিনের জন্য এসেছি শেষ মাসের স্যালারি, সার্টিফিকেট সব নিয়ে যাব – কী করে কী হবে, কে জানে।”

তিনদিন!” আর্তনাদ করল মেঘমন্দ্র। “তিনদিনে কী হবে?”

নাসিম হতাশ সুরে বলল, “জানি না। বিদ্যুৎ বলেছিল ইউনিভারসিটি থেকে সার্টিফিকেট বের করে রাখবে, কিছুই করেনি। এখন বলছে, ‘আপ ওয়াপস জাও বস, ম্যায় ভেজ দুঙ্গা।’ সব শালা ঝুট্‌ বলে, যত দু’নম্বরি।”

এমন সময় ঝা বেরিয়ে এল একটা ফাইল নিয়ে। বলল, “নাসিম স্যার, আপনারই ফাইল নিয়ে ডিরেকটর সাহেবের কাছে যাচ্ছি। শুধু ওনার সইটাই বাকি। ওটা হলে আপনি এখনই আপনার স্যালারি পেয়ে যাবেন। দেব-স্যার, আপনি যে বললেন ডিরেকটরের কাছে যাবেন?”

আমি বললাম, “যাব। আগে দরখাস্তটা তো লিখি।” বলে পালাচ্ছি, নাসিম বলল, “ঝা-জী, চলুন, আমি আপনার সঙ্গে ডিরেকটরের সঙ্গে যাই।”

ক্যান্টিন পৌঁছে মেঘমন্দ্র বলল, “এবার কী? একটা টাইপরাইটার না হলে তো চলবে না।”

আমি বললাম, “টাইপরাইটার তো তোর আছে।”

সে তো পোর্টেবল টাইপরাইটার। ছোট্টো। অক্ষরের সাইজগুলো এইটুকু-টুকু। ধরে ফেলবে তো।”

কাঁচকলা ফেলবে। আর রাত্তিরেই লিখে ফেলব।”

তারপরে?” মেঘমন্দ্রের শঙ্কা যায় না। “ডাকে দিলে ক’ দিন লাগবে পৌঁছতে কে জানে!”

ডাকে দেব?” আমার চশমা কপালে উঠে গেল। “অন ইন্ডিয়া গভমেন্ট সার্ভিস লেখা খাম কে নিয়ে পোস্ট অফিসে জমা দেবে? তুই, না আমি? হাতে হাতে দেব।”

হাতে কী করে দিবি?”

দেখতে পাবি।”


পরদিন বেলা এগারোটা নাগাদ নাসিম অফিসে আসবে জানি, তাই সেরকম সময়েই বেরোলাম হাসপাতাল থেকে। দেখি নাসিম অফিসের সামনে দাঁড়িয়ে বাগানের ফুলের শোভা দেখছে।

বললাম, “এই, সকাল থেকে কোথায় ছিলি?”

বলল, “হস্টেলেই ছিলাম। আর কোথায় যাব?”

বললাম, “তাহলে তোর চিঠি নিয়ে যে লোকটা এসেছিল, সে তোকে না পেয়ে আমাকে চিঠি দিয়ে গেল কেন?”

বলে বিশাল হলদে খামটা বের করে দিলাম।

বাপরে! ইয়ে কেয়া হ্যায়?” বলে নাসিম হাতে নিল। “ডাঃ নাসিম আলি, সেন্ট্রাল ইনস্টিট্যুট অফ সাইকিয়াট্রি, কাঁকে, রাঁচি ৮৩৪০০৬।” বলে নাসিম দেখল নিচে লেখা আছে, ‘ডেসপ্যাচার’, কিন্তু তার নিচে কিছু বোঝা যাচ্ছে না।

আউটডোরের ক্যান্টিনে অপেক্ষা করছিল মেঘমন্দ্র। আমাকে নাসিমের সঙ্গে কথা বলতে দেখে উঠে এসেছে। বলল, “কী ওটা?”

গলাটাকে যথাসম্ভব স্বাভাবিক রেখে বললাম, “নাসিমের জন্য একটা চিঠি এসেছে।”

নাসিম তখনও খোলেনি খামটা। আমাকে বলল, “লেকিন কাহাঁসে আয়া হ্যায়?”

আরে, কাহাঁসে আয়া সে কি দাড়ি জানে নাকি?” খেঁকিয়ে উঠল মেঘমন্দ্র। “খুললেই তো বোঝা যাবে।”

আমি তাড়াতাড়ি বললাম, “সকালে আমি হাসপাতালে আসছি আটটার সময়, একটা লোক – খাকি পোশাক, কিন্তু পুলিশ নয় – বাইকে করে এসে আমাকে ওভারটেক করে বলল, ‘ডাক্তারলোগদের কোথায় পাব?’ লোকটাকে ঠিক পেশেন্ট মনে হল না, তা-ও বললাম, ‘আউটডোর মে নাম লিখানা পড়েগা।’ লোকটা বলল, ‘না, আমি চিঠি ডেলিভারি করতে এসেছি।’ চিঠিটা দেখাল। নাসিমের নাম দেখে আমি ওকে বলে দিলাম হস্টেল কোন দিকে। তারপরে আমি হাসপাতালে ঢুকে গেছি – খানিক বাদে লোকটা দেখি ওয়ার্ডের সামনে। বলল, ‘আমি ডাঃ নাসিমকে খুঁজে পাচ্ছি না। সব ওয়ার্ডে ঘুরেছি, হোস্টেল গিয়েছি... আপনি ওনাকে চেনেন, এই চিট্‌ঠিটা ওনাকে বলবেন হেড পোস্ট অফিস থেকে তুলে নিতে।’

আমি ভাবলাম নাসিম এই দু দিনের মধ্যে কখন হেড পোস্ট অফিস যাবে? তাই বললাম, ‘আপনার যদি আপত্তি না থাকে, আপনি আমাকে দিয়ে যেতে পারেন।’”

আমি এ সব বলছি, আর নাসিম খাম খুলে চিঠি বের করছে, ভাঁজ খুলছে, গোটা কাগজটায় চোখ বোলাচ্ছে, তারপর চোখ বিস্ফারিত করে পড়তে শুরু করেছে, প্রথম চার লাইন পড়েই বলেছে, “আবে, ইয়ে তো সামন্‌স হ্যায়!”

মেঘমন্দ্র বলেছে, “সামন্‌স?”

আমি বলেছি, “কেয়া?”

নাসিমের হাত থেকে খাম পড়ে গেছে, আমি ওটা কুড়িয়ে নিয়েছি, নাসিম আরও মন দিয়ে পুরোটা পড়েছে, তারপর মেঘমন্দ্রর হাতে দিয়েছে, মেঘমন্দ্রও হাঁ করে (নইলে হাসি চাপতে পারছিল না) পড়ছে... আমি বলেছি, “এখান থেকে চলে চল, ক্যান্টিনে গিয়ে বসি আগে।”

ক্যান্টিনে অনেক লোকের ভীড়, কিন্তু তার মধ্যে ডাঃ মাসুদ আছেন। তিনি আইন-টাইনের ব্যাপারে অনেক কিছু জানেন, অনেক উকিল-টুকিল চেনেন, আর রয়েছেন ডাঃ কুজুর। তিনি সব বিষয়েই অনেক কিছু জানেন বলেই লোককে বলে বেড়ান।

আমরা প্রথমেই চেয়ার টেনে ভীড় থেকে একটু দূরে বসলাম। তিনজনে মিলে আবার পড়লাম চিঠিটা। এক পাতার চিঠি – ঠিক যেমন সরকারি চিঠি হয়, তেমনই – পাতলা ফিনফিনে কাগজে টাইপ করা। চিঠির বয়ান হল এই, যে সরকারি রেলওয়ে কোর্ট থেকে নাসিম আলিকে জানানো হচ্ছে যে গত ওমুক তারিখে তিনি বেআইনিভাবে অন্যের টিকিট নিয়ে ট্রেনে যাবার চেষ্টা করছিলেন। এই মর্মে একটা আইনি শুনানিতে আদালত নাসিম আলির নামে সমন জারি করেছেন। তিনি যেন আগামী ওমুক তারিখে সেই শুনানিতে হাজির থাকেন চক্রধরপুরের রেলওয়ে আদালতে। অন্যথায় নাসিম আলির নামে পরোয়ানা জারি হবে। এই চিঠির অন্য একটি কপি নিম্নলিখিত ঠিকানায় পাঠানো হয়েছে। ডাঃ নাসিম আলি, প্রযত্নে – নাসিমের বাবার নাম, ঠিকানা – নাসিমের বম্বের ঠিকানা।

চিঠি পড়ে আমরা তিনজনেই খানিকক্ষণ ভোম হয়ে বসে রইলাম। নাসিম শুধু বিড়বিড় করে বলছে, “ইয়ে ক্যাইসে হো সকতা হ্যায়...” তারপর বলছে, “উসকো পতা ক্যায়সে চলা?” এই সব... এমন সময় আমাদের মুখের ভাব প্রথম লক্ষ করলেন ডাঃ মাসুদ। ক্যান্টিনের ওদিক থেকে হেঁকে জিজ্ঞেস করলেন, “কেয়া, ভাই? কেয়া হো রহা হ্যায়? ইৎনা পরেশান কিউঁ দিখ্‌ রহে হো?” মাসুদ আমাদের ভালোবেসে কখনও তুমি বা কখনও তুই বলতেন, কিন্তু বেশিরভাগ সময়ে বলতেন আপনি।

নাসিম ফিস্‌ফিস্‌ করে বলছে, “মৎ বোল্‌, মৎ বোল্‌!” কিন্তু বলতে না পারলে মজা কোথায়? মেঘমন্দ্র বলল, “আরে ওরা সিনিয়র লোক, ওরাই বলতে পারবে...”

আমি তখন উঠে গিয়ে ডাঃ মাসুদকে বলেছি, “বস্‌ আপ ইস তরফ আইয়েগা?”

সবাই গণ্ডগোল বুঝে চুপ করে গেছেন। মাসুদ নিজের ফোল্ডিং চেয়ারটা তুলে নিয়ে উঠে এসেছেন আমাদের কাছে। মেঘমন্দ্র চিঠিটা হাতে দিয়ে বলল, “এটা পড়ে দেখুন।”

মাসুদ সরকারি চিঠি পড়তে অভ্যস্ত। এক লহমায় পড়ে শেষ করে বললেন, “কেয়া কিয়া থা, রে?”

মাসুদকে টাটানগর স্টেশনের ঘটনাটা বলা হল। উনি ভুরু কুঁচকে খানিকক্ষণ চেয়ে রইলে কাগজটার দিকে। অস্ফূটে বললেন, “কালকের ঘটনা, আজই শমন এসে গেল” তারপরে মুখ তুলে হেঁকে বললেন, “, কুজুর, একবার ইধার আও।”

ক্যান্টিনের ওদিক থেকে সবাই আমাদের দিকে চেয়েই ছিলেন। ডাঃ কুজুর নিজের চেয়ার নিয়ে উঠে আসাতে এক এক করে সবাই উঠে এল। ডাঃ মাসুদ চিঠিটা কুজুরের হাতে দিয়ে বললেন, “দেখো জরা, নাসিমকো সামন্‌স মিলা হ্যায়।”

সবাই হতবাক! কিসের সমন? সবাই শুনল। অরূপও ছিল। ওর-ও মুখ শুকিয়ে আমসি। “বস্‌, আমার নামেও আসেনি তো?”

নাসিমের প্রথম উদ্বেগ হল, “আমার তো পরশু টিকিট কাটা আছে। বম্বে চলে যাব। আগামী সপ্তাহে কী করে চক্রধরপুরে যাব?”

হা হা করে হেসে কুজুর বললেন, “তোমার কি মাথা খারাপ হয়েছে, ভাই? কোর্টের শমন অগ্রাহ্য করা যাবে না। টিকিট ক্যানসেল করো।”

তখন মাসুদ (তখনও ভুরু কোঁচকান’) বললেন, “কুজুর, একটু ভেবে দেখো। কাল ভোরে যে ঘটনা ঘটেছে ৫টা নাগাদ, আজ সকালে তার শমন এসে গেল? তিরিশ ঘণ্টার মধ্যে? ব্যাপারটা একটু আশ্চর্য না?”

কুজুর তো প্রায় সবই জানেন। হাত নেড়ে সন্দেহটা উড়িয়ে দিয়ে বললেন, “না, না। এগুলো কী হয়, রোজই কেস লিস্ট তৈরি হয় না। রোজ কেস রিপোর্ট হয়। আর সপ্তাহে এক দিন বা দু’দিন কোর্ট থেকে কেস লিস্ট তৈরি করে। তার মানে কাল সকালেই টি.টি. রিপোর্ট করে দিয়েছে, আর কাল যে কেস লিস্ট তৈরি হয়েছে, তাতে নাসিমের কেস উঠে গেছে। আজ শমন জারি হয়েছে। রেলওয়ে কোর্টের শমন আমি দেখেছি। এরকমই হয়।”

ব্যস। যতটুকু সন্দেহ ছিল, তাও নিরসন হয়ে গেল।

এখন কী করে নাসিম?

একজন উকিল ঠিক করতে হবে কি?

আমি বললাম, “এখানে তো বলেনি কী জন্য ডেকেছে। যদি শুধু সাক্ষী হিসেবে হয়, তাহলে উকিল নিয়ে কী লাভ?”

মেঘমন্দ্র বলল, “কিন্তু ওখানে গিয়ে যদি দেখে যে আসামী হয়েই এসেছে, তাহলে তখন কোথায় উকিল খুঁজবে? তার চেয়ে এখনই জিজ্ঞেস করা ভালো।”

কে বলল, “না গেলে কী হয়? নাসিমভাই তো বম্বে চলে যাবে।”

নাসিম উৎসাহিত হয়ে বলল, “ঠিক। আমি তো পরশু চলেই যাব। কেউ জিজ্ঞেস করলে পরে বলব – আমি পাইনি।”

আমি হাঁ হাঁ করে উঠলাম! “না না! তাতে আমি বিপদে পড়ব। ওই কাগজে আমার সই আছে যে!”

মাসুদ ভুরু কুঁচকে বললেন, “আপকা সিগনেচার? ক্যায়সে?”

আবার মোটরসাইকেলারোহীকে নিয়ে আসতে হল সিনে!

মাসুদ মানতে রাজি নন। “একজনের নামে শমন আর একজনকে দিয়ে চলে গেল? এ আমি জীবনে শুনিনি বাপু!”

কুজুর আবার অজান্তেই আমার পাশে এসে দাঁড়ালেন। বললেন, “আরে দিয়ে যখন দিয়েছে তখন তো আর কিছু করার নেই। কিন্তু ডাঃ দেব, আপনি নিজের নাম সই করলেন কেন? নাসিম আলি লিখনা চাহিয়ে থা না?”

আমি খুব হতাশ সুরে বললাম, “তা কী করে লিখব? আমি তো লোকটাকে বলেই দিয়েছি, আমি নাসিম আলি না। আর ও-ও বলল, ‘আপনা নাম লিখিয়ে, ফর নাসিম আলি।’ আমিও তাই করলাম – তা-ই তো দস্তুর, না কী?”

নাসিম হঠাৎ খুব রেগে গেল। “তুই পাকামি মেরে নিলি কেন চিঠিটা? বললেই পারতি, আমি নাসিম আলি নই। এ চিঠি আমি অ্যাক্সেপ্ট করব না। যা খুশি করুন।”

অ্যাক্সেপ্ট করব না কী আবার? ও তো আমায় জোর করে দেয়নি। আমিই তোর ভালোর জন্য চেয়ে নিয়েছি। আমি কী করে জানব ওটা শমন? গভমেন্ট সার্ভিস দেখে ভাবলাম জরুরি চিঠি, তোর ভালো চেয়ে নিয়ে নিয়েছি। এই জন্যই তোর মতো বন্ধুর জন্য কিছু করতে নেই...”

যা যা! আমার মতো বন্ধু! তোর মতো বন্ধু দিয়ে কী লাভ হল আমার? কোথায় এখন ফাইনাল প্যাকিং করে কেটে পড়ব, তা না, এখন কোথায় শমন, কোথায় উকিল...”

ডাঃ মাসুদ আমাদের ঝগড়ার মাঝে বাধা দিলেন। “এক মিনিট, এক মিনিট... ডাঃ নাসিম, তুম বেকার রুঠ্‌ রহে হো। ডাঃ দেবের ওপর রাগ করে লাভ নেই। দেখুন, এই চিঠির কপি গিয়েছে বম্বেতেও। আপনার বাবার কাছে। সুতরাং ডাঃ দেব না নিলেও শমন আপনাকে নিতেই হত।”

আমি এক্ষুনি গিয়ে বাবাকে ফোন করে বলছি এরকম চিঠি এলে অ্যাক্সেপ্ট না করতে।” লাফ মেরে উঠল নাসিম।

আরে ধ্যাৎ,” বিরক্ত স্বরে কথাটা বলে মেঘমন্দ্র ওকে টান মেরে বসিয়ে দিল আবার। “এখন বম্বেরটা না নিলেই বা কী? এটা তো নেওয়াই হয়ে গেছে।”

আমি বললাম, “তা ছাড়া বলাই আছে, এটা অ্যাটেন্ড না করলে অ্যারেস্ট ওয়ারান্ট আসবে।”

হাঁ! ও ভি সোচ লিজিয়ে ডাকতার সাব! তারপরে আপনি যখন বম্বেতে, তখন ওয়ারান্ট গেলে আবার আপনাকে অ্যারেস্ট করে নিয়ে আসবে কিন্তু বিহারে সেটা খুব অপমানজনক হবে।”

তখনও বিহার ভেঙে ঝাড়খণ্ড আর বিহার দুই হয়নি।

নাসিম সাহস করে বলল, “আমি তো মাসের শেষে দুবাই পালাচ্ছি। কে ধরতে যাবে আমাকে দুবাইতে?”

আমি একটু রেগেই এবার বললাম, “বাজে বকিস না। কালই ধরা পড়ে আজকেই শমন এল। বাড়ি গিয়ে দেখবি বম্বেতে রেলপুলিশ থানা গেড়ে বসে আছে তোকে ধরবার জন্য।”

হা হা করে হেসে কুজুর বললেন, “তার চেয়েও ভালো হবে আপনি যদি ট্রেন থেকে টাটা স্টেশনে নেমে দেখেন ওখানেই অপেক্ষা করছে। আপনার মালপত্র আপনি ব্রেক ভ্যান থেকে নামাতে পারলেন না – সে চলে গেল হাওড়া! আর আপনি রেলওয়ে লক-আপে ঢুকলেন।”

এমন সময় ক্যান্টনের পেছনের গেট দিয়ে বেরিয়ে এলেন ডাঃ সিনহা।

কী ব্যাপার? সবাই এত সোরগোল করছে কেন? আউটডোরে বসে পেশেন্ট দেখতে পারছি না।”

সবাই হই-হই করে ব্যাপারটা ডাঃ সিনহাকে বুঝিয়ে দিল।

শমন? বাপরে! দেখি,” বলে সিনহা নাসিমের হাত থেকে খামটা নিয়ে টেনে টেনে পড়লেন, “অন ইন্ডিয়া---আ গভমে---এন্ট সার্ভিস... আরেব্বাস!” বলে একবার আড়চোখে আমার দিকে তাকালেন। আমি তখন চায়ে চুমুক দিতে ব্যস্ত।

চিঠি পড়ে ডাঃ সিনহার হাসি আর থামে না। সকলে অবাক! ডাঃ কুজুর বললেন, “আপনি এত হাসবেন না। ডাঃ নাসিম কিন্তু খুব বিপদে পড়েছেন। রেলওয়ে কোর্টের ক্ষমতা সাংঘাতিক! এর ফল মারাত্মক হতে পারে।”

ডাঃ সিনহা হাসি থামিয়ে বললেন, “কী হতে পারে? পালিয়ে গেলেই হল।”

নাসিম জিজ্ঞেস করল, “আর যদি টাটা স্টেশনে ধরে?”

ডাঃ সিনহা অবাক! “ধরলেই হল? কী করে ধরবে? ছবি টাঙানো আছে? ফেরারি আসামি নাকি? হা-হা-হা!”

ডাঃ কুজুর মানবেন না। “টিকিট তো কাটা আছে। আজকাল স---ব কম্পিউটারাইজড হয়ে গেছে। ডাঃ নাসিমের সব অ্যাড্রেস দেখুন ওই শমনেই আছে। ট্রেনেই টি.টি. ধরবে।”

সিনহা আর একবার শমনটায় চোখ বুলিয়ে বললেন, “আপনার বাবার নাম, বম্বের ঠিকানা – সব কী করে জানল রেলওয়ে?”

নাসিম বলল, “তা আমি কী করে জানব?”

আমি বললাম, “কেন, তুই কাল যে ফিরলি, বম্বে টাটা টিকিটটা কোত্থেকে কেটেছিলি? রাঁচি, না বম্বে?”

আমি কাটিনি। বম্বে থেকে বাবা কেটে রেখেছিলেন।”

আমি বললাম, “ব্যস, তবে তো হয়েই গেল। তোর বাবা নিশ্চয়ই নিজের নাম দিয়ে, নিজের ঠিকানা দিয়েই কেটেছিলেন?”

মাসুদের ভুরু আবার কুঁচকে গেল। “তাহলে এখানকার ঠিকানা কোত্থেকে পেল?”

আমার সম্বন্ধে মেডিক্যাল কলেজে প্রফেসর বসু বলেছিলেন, “অনিরুদ্ধর সাংঘাতিক প্রেজেনস অফ মাইন্ড।” সেটা আবার কাজে এল।

বললাম, “আমার ধারণা ওর জন্য নাসিম নিজেই দায়ী। কাল টি.টি.-র সঙ্গে ঝগড়া করতে করতে বলেছিল, আমি সি.আই.পি.-র ডাক্তার।”

আমি মোটেই বলিনি এ সব,” তেড়ে উঠল নাসিম।

হাঁ, হাঁ বস,” অনেকক্ষণ পরে মুখ খুলল অরূপ। “আপ বোলা থা। তখনই তো টি.টি. চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলল, ‘দেখিয়ে সবলোগ, ইয়ে ডাগদর লোগ কেইসা চোর হোতে হ্যায়।’”

নাসিম চুপ! সবাই ওর দিকে তাকিয়ে আছে, ভাবখানা, চুরিও করতে গেলি, গিয়ে ধরাও পড়লি। তা ধরা পড়লি, পড়লি। তার সঙ্গে ডাক্তারদের নাম ডুবিয়ে এলি? শেষে নাসিম আর সহ্য না করতে পেরে উঠে পড়ল। বলল, “আমি অফিস থেকে সার্টিফিকেটগুলো তুলতে যাই। ডাঃ মাসুদ, আপনি আজ সন্ধেবেলা কোনও ল’ইয়ারের সঙ্গে কথা বলে রাখবেন? আমি কাল সকালেই আপনার কাছ থেকে অ্যাড্রেস নিয়ে গিয়ে কথা বলে নেব।”

মাসুদ চলে গেলেন। অন্যান্যরাও সবাই নিজেদের মধ্যে আলোচনা করতে করতে রওয়ানা দিল যে যার কাজে। রয়ে গেলাম ডাঃ সিনহা, মেঘমন্দ্র আর আমি।

এ নিশ্চয়ই আপনাদের কাজ?” জানতে চাইলেন সিনহা।

বললাম, “একদম।”

মাথায়ও আসে বটে। শমনের বয়ানটা কার লেখা?”

মেঘমন্দ্র বলল, “দেব-এর।”

আর খামের কোনে ‘ডেসপ্যাচার’ লেখা স্ট্যাম্পটা কোত্থেকে জোগাড় হল?”

আরে ওটা আমাদের অফিসের ডেসপ্যাচারের স্ট্যাম্প। কাল আমরা গেছি ডেসপ্যাচার অফিসে। দেব কেয়ামৎকে বলেছে, ‘আমার একটা ইম্পর্ট্যান্ট চিঠি আসার ছিল কলকাতা থেকে – ইনকাম ট্যাক্সের। আমার বাবা খবর নিয়েছেন, চিঠি পাঠান’ হয়েছে অফিশিয়াল অ্যাড্রেসে। এখনও আসেনি। একটু দেখবেন, এখানে পড়ে আছে কি না?’ বলে কেয়ামৎকে টেনে নিয়ে গেছে অফিসের পেছনে – যেখানে হাজার হাজার চিঠি পড়ে থাকে বছরের পর বছর। কেয়ামৎ তো আর ওকে হাত লাগাতে দেবে না। তাই কেয়ামৎই খুঁজছে, আর দেব দেখাচ্ছে, ‘ওটা কী? আর ও--ইগুলো?’ আর ততক্ষণে আমি ডেসপ্যাচারের স্ট্যাম্পটা নিয়ে নিচের কোণে লাগিয়ে নিয়েছি। এমনভাবে লাগাতে হয়েছে, যাতে ডেসপ্যাচার শব্দটা পড়া যায়, কিন্তু সি-আই-পি নয়। ভাবতে পারেন – ওপরের লাইন পড়া যাবে, কিন্তু নিচের লাইন নয়! দেব আমাকে শিখিয়ে দিয়েছিল, কিন্তু আমি একটু আস্তে করে করেছি বলে খুব মন দিয়ে দেখলে পড়া যাচ্ছে – সেন্ট্রাল ইনস্টিট্যুট অফ সাইকিয়াট্রি। যাই হোক, এখনও সেটা কেউ দেখেনি।”

সিনহা জিজ্ঞেস করলেন, “এবার? কখন বলবেন যে কীর্তিটা আপনাদের?”

কোনও দিন না,” বলল মেঘমন্দ্র। “ভুগুক ব্যাটা।”

আমি মাথা নাড়লাম। “না। কাল বলে দেব। না হলে মজাটা জমবে না। কিন্তু তার চেয়ে বড়ো কথা, আজ বিকেলে মাসুদ বেরোন’র আগে ওনাকে জানিয়ে দিতে হবে। নইলে উনি আবার গিয়ে উকিলের সঙ্গে কথা বললে হাস্যাস্পদ হবেন।”

সিনহা হা-হা করে হাসলেন আবার। বললেন, “কুজুর আবার বেশি ওস্তাদ!”

হ্যাঁ। নাসিমের পরে উনিই সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস করেছেন।”

সারাদিন কাটল নানা লোকের কৌতুহল নিরসন করতে। নাসিমের কী হয়েছে, কোত্থেকে শমন? কেন? এবার কী হবে, ইত্যাদি। নাসিম দুপুরের মধ্যে অফিসের কাজ শেষ করে হস্টেলে গেছে। সেখানেও ওর অনেক গোছগাছ। তিন বছরের সম্পত্তি বাক্সবন্দি করতে হবে। খানিকক্ষণ ওকে সাহস দিলাম। ভাবিস না। কিচ্ছু হবে না। ডাঃ মাসুদ আজ ল’ইয়ারের সঙ্গে কথা বলবেন। উনি হয়ত বলবেন, কিচ্ছু করতে হবে না। নিজে যেতে হবে না। ল’ইয়ারই গিয়ে রিপ্রেজেন্ট করবেন। আর শাস্তি কী হবে? তুই তো আর অন্যের টিকিটে ট্র্যাভেল করিসনি। করতে চেয়েছিস। তাতে কী হবে? জেল তো হবে না। বড়োজোর ফাইন হবে... ইত্যাদি।

তারপর আমাদের তো হাসপাতাল ফিরতে হবে। নাসিমের কোর্স শেষ, ওর কাজ শেষ। আমাদের তো তা নয়। ফিরেই ডাঃ মাসুদকে বললাম উনি যেন সন্ধেবেলা কোনও উকিলের পরামর্শ নিতে না যান। উনি শুনে খানিকক্ষণ হাঁ করে রইলেন, তারপরে হা-হা করে হাসতে হাসতে বাড়ি গেলেন।

পরদিন মেঘমন্দ্র আর আমি সকাল থেকেই নাসিমের সঙ্গে ঘুরছি। লোকজন এসে জিজ্ঞেস করে যাচ্ছে সব ঠিক আছে কি না – কেউ কেউ আবার নাসিমকে বলে যাচ্ছে, সকাল থেকে ডাঃ মাসুদ খোঁজ করছেন।

আমি বললাম, “মাসুদের সঙ্গে তাহলে দেখা করা উচিত নয় কি?”

নাসিম বলল, “হ্যাঁ। মেহেন্দি আসুক, ওকে দিয়ে আজকের কাজটা শুরু করিয়ে দিয়েই যাব।”

খানিক বাদে হেলতে দুলতে এল মেহেন্দি। নাসিমকে দেখে বলল, “সালাম আলেইকুম ডাক’সাব। কেয়া হুয়া? সুনা আপকা কুছ লফড়া হুয়া?”

তাকেও গল্পটা বলতে হল। নাসিমের দুঃখে দুঃখী হয়ে মেহেন্দি তাড়াতাড়ি ওর সার্টিফিকেট তৈরি করতে বসে গেল। আমরা গেলাম ডাঃ মাসুদের সঙ্গে দেখা করতে।

মাসুদ কার সঙ্গে যেন বসে গল্প করছিলেন, আর খুব হাসছিলেন। নাসিমকে দেখে গম্ভীর হয়ে গেলেন। নাসিম বলল, “আপনি আমার খোঁজ করছিলেন?”

ওপর নিচে মাথা নাড়লেন মাসুদ। “কাল গিয়েছিলাম উকিলের সঙ্গে কথা বলতে। সমস্যা আছে। এখানকার উকিল দিয়ে হবে না।”

শুনে আমিও চমৎকৃত! এ আবার কী মজা শুরু?

নাসিমের মুখ শুকিয়ে গেছে। বলল, “কেয়া মতলব? কী করতে হবে?”

মতলব, এটা স্পেশাল রেলওয়ে কোর্টের মামলা। এখানে কোনও উইটনেস নেই। অর্থাৎ আপনাকে ডাকা মানেই আপনি আসামী। রেলওয়ের উইটনেস হল টি.টি.। আপনি যদি মনে করেন তাহলে আপনি আপনার পক্ষে উইটনেস নিয়ে যেতেই পারেন, তবে তাতে সময় লাগবে বেশি, ঝঞ্ঝাটা বাড়বে বই কমবে না। অর্থাৎ, আপনাকে যেতেই হবে, ফাইন দিতেই হবে – না হলে জেল হবেই হবে। এই হল সামারি।”

নাসিম অবাক হয়ে বলল, “বিচার হবার আগেই আসামী ঠিক হয়ে গেল, শুনানির রেজাল্ট পাক্কা? তাহলে এরকম কোর্ট দিয়ে কী লাভ?”

মাসুদ বুঝলেন বাড়াবাড়ি হয়ে গেছে। বললেন, “নেহি, ঠিক অ্যাইসা নেহি, মতলব, হাইকোর্ট মে অ্যাপিল করনে কা প্রোভিজন হ্যায়...”

নাসিম হতাশ হয়ে বলল, “ সে তো আরও সময় লাগবে।”

ঠোঁট ওলটালেন মাসুদ। “কোর্টে কিছু হলে সময় কম লাগে কবে?”

নাসিম বলল, “তাহলে আমার কালকের টিকিট ক্যানসেল করে দিই?”

তাই ভালো।”

এমন সময়ে দরজার সামনে এসে দাঁড়ালেন কুজুর। “কেয়া হুয়া ডাঃ নাসিম?”

নাসিম বলল, “স্যার, আপনি আপনার ঘরে যান, আমি ওখানে যাচ্ছি। আলোচনা আছে।”

কুজুর চলে গেলে নাসিম আমাদের বলল, “আমি কুজুরকে গিয়ে বলি। ওনার কয়েকজন রেলওয়ে ক্লার্কের সঙ্গে চেনাজানা আছে। এখানকার স্টাফরাও কুজুরকে মান্যি করে। যদি কাউকে পাঠিয়ে টিকিটটা ক্যানসেল করা যায়...”

নাসিম চলে গেল, মাসুদ আমাদের বললেন, “যান, যান। পিছনে যান। টিকিট না ক্যানসেল করতে পাঠিয়ে দেয়।”

আমরা দুজনে দৌড়লাম। কুজুর তখন মন দিয়ে আবার শমনটা পড়ছেন। আমরা ঢুকে নিঃশব্দে দুটো চেয়ারে বসলাম।

কুজুর নাসিমকে বোঝাচ্ছেন। “দেখিয়ে, ইয়ে ডিভিশনাল ম্যাজিস্ট্রেট ফার্স্ট ক্লাস (রেলওয়ে) কা কোর্ট হ্যায়।” হ্যায় তো বটেই – সে নামই তো লিখেছিলাম। “খুব উঁচু পোস্ট। এই সব সিচুয়েশনে ঝামেলায় না যাওয়াই ভালো। কত আর ফাইন হবে? হাজার-দুহাজার টাকার বেশি নয়। মিটিয়ে নিন। আপনি আপনার টিকিটটা দিন, আমি লোক পাঠিয়ে দিচ্ছি স্টেশনে। দেখি কম খরচে চেঞ্জ করে নেওয়া যায় কি না।”

এসব বলছেন, আর আমি অন ইন্ডিয়া গভমেন্ট সার্ভিস লেখা খামটা নিয়ে নাড়াচাড়া করছি। নাসিম পকেট থেকে ট্রেনের টিকিট বের করছে, আর আমি মেঘমন্দ্রকে বলছি, “একটা স্ট্যাম্পও ঠিক করে লাগাতে পারিস না। সেন্ট্রাল ইনস্টিট্যুট অফ সাইকিয়াট্রি নামটা পুরোটা পড়া যাচ্ছে।”

মেঘমন্দ্র বেশ রাগতস্বরে বলল, “বাজে বকিস না। তাড়াহুড়ো করে মারা – তাও কী সুন্দর মেরেছি! কেউ ধরতে পারেনি।”

নাসিম থমকে গেল। বলল, “কোথায় সেন্ট্রাল ইনস্টিট্যুট অফ সাইকিয়াট্রি পড়া যাচ্ছে?”

আমি বললাম, “এই তো। দেখ না। খামে – ডেসপ্যাচারের নিচে।”

ছোঁ মেরে খামটা নিয়ে ডাঃ কুজুর বললেন, “হ্যাঁ, ওই রকমই লাগছে বটে! কিন্তু পরিষ্কার নয়। সরকারি সিল। ছাপাটা অস্পষ্ট। কিন্তু ভেতরে তো লেখাই আছে ফ্রম দ্য কোর্ট অফ ডিভিশনাল ম্যাজিস্ট্রেট ফার্স্ট ক্লাস – রেলওয়ে, চক্রধরপুর।”

ততক্ষণে নাসিম খামটা নিয়ে নিয়েছে। “না, ডাঃ কুজুর, ভালো করে দেখুন, একটু ঘষা আছে বটে, কিন্তু পরিষ্কার পড়া যাচ্ছে। সেন্ট্রাল ইনস্টিট্যুট অফ সাইকিয়াট্রি। ইয়ে কেয়া তুম দোনো কা কাম হ্যায়?”

হাম দোনো, অর্থাৎ, মেঘমন্দ্র আর আমি ওদের কথা শুনতেই পাচ্ছি না। মেঘমন্দ্রর পালা এবার। বলল, “আমি তো এক সেকেন্ডের মধ্যে, কেয়ামৎ দেখে ফেলতে পারে এমন রিস্ক নিয়ে স্ট্যাম্প মেরেছি। তুই কী করেছিস? বাড়িতে বসে, জল দিয়ে কালি ফিকে করে করে একশোবার প্র্যাকটিস করে সইয়ের নিচে স্ট্যাম্প মেরেছিস, ওতেও আমার নামটা একটু চেষ্টা করলেই পড়া যাচ্ছে।”

আমি খুব উত্তেজিত হয়ে গেলাম। বললাম, “যা যা, বাজে বকিস না। কাল থেকে অন্তত একশো জন ওটা দেখেছে। ক’জন পড়েছে রে? ওটা তোর নামের স্ট্যাম্প! হুঁঃ!”

কুজুর চিঠিটা চোখের কাছে নিয়ে এসেছেন। বললেন, “মাই গড! এ তো সাফ নয়, কিন্তু তবু পড়া যাচ্ছে – ডাঃ মেঘমন্দর চকরবত্তি, ডিপিএম, এমডি, কনসালট্যান্ট সাইকিয়াট্রিস্ট! কেয়াবাৎ! কাল থেকে দেখছি, চোখেই পড়েনি!”

নাসিম হাত বাড়িয়ে কুজুরের হাত থেকে কাগজটা নিয়ে চেয়ে রইল। জলে ভেজানো, কালি প্রায় নেই এমন একটা ছাপ, কিন্তু মেঘমন্দ্রের স্ট্যাম্পটা নতুন, তাই বেশি কষ্ট না করেই পড়া যাচ্ছে ওর নাম।

কী? টিকিট চেঞ্জ হল?” বলতে বলতে ঘরে ঢুকলেন ডাঃ মাসুদ।

আরে না, এটা শমনই নয়...” বলতে শুরু করে মাসুদের দিকে তাকিয়ে থেমে গেলেন কুজুর। “আপনি জানতেন?”

কাল ডাঃ দেব বলে গেলেন বিকেলে। নইলে আমিও উকিলের কাছে গিয়ে অপদস্থ হতাম।”

ডাঃ নাসিম, রেলওয়ে পোলিস কা দো অফিসার আপকো বাহার ঢুন্ড রহা হ্যায়...” বলতে বলতে ঘরে ঢুকলেন ডাঃ সিনহা।

কুজুর অবাক! উনি ছাড়া আর কে কে জানত? বললেন, “আপনিও জানতেন? কেয়াবাৎ!”

, বলে দেওয়া হয়েছে?” বলে চেয়ার টেনে বসলেন সিনহা। আমরা বোঝালাম যে নইলে নাসিমের টিকিট ক্যানসেল করতে পাঠান হচ্ছিল প্রায়।


তারপর আর কী, নাসিম আমাদের ওপর সাংঘাতিক রেগে গেল। বার বার বলতে থাকল, তোদের মতো বন্ধু থাকলে লোকের শত্রুর কী প্রয়োজন, তোদের দেওয়ালের সামনে দাঁড় করিয়ে গুলি করে... না, পাগলা ষাঁড়ের গুঁতো মেরে মেরে ফেলা উচিত, ইত্যাদি। লোকজন এসে এসে জিজ্ঞেস করতে লাগল, নাসিমভাই, আপকা সামন্‌স জরা দিখাইয়ে... এই সব, কিন্তু তামাশাটা যে জব্বর হয়েছে, সেটা মানতে নাসিমও বাধ্য হল। কুজুরও বললেন, “বঢ়িয়া মজাক থা। আমিও ধরতে পারিনি শমনটা আসল না। মানতেই হবে, দারুণ দিয়েছেন।”

পরে অবশ্য জুনিয়র ডাক্তার আর ক্লার্কদের বলে বেরিয়েছিলেন, “আরে, আমি তো দেখেই বুঝেছি ওটা নকল। শমন কখনও ওরকম হয়? আমার চোখে ধুলো দেওয়া অতই সোজা? নেহাত বাচ্চা ছেলেগুলো একটু রগড় করছিল, তাই ওদের সঙ্গ দিয়েছিলাম।”





কত্তোবড়ো ‘ক’

সুনয়নের এক মামাতো দাদা ছিল, পড়াশোনায় খুব ভালো। চেয়েছিল ইতিহাস পড়তে, কিন্তু বাঙালি ভালো ছাত্রের যা হয়, ক্লাস ইলেভেনে বাড়ি থেকে ঘাড় ধরে সায়েনস পড়ান’ হল, এবং যেহেতু অঙ্কে, ফিজিক্সে দারুণ নম্বর পেত, তাই ঘাড়ে ধরে ইঞ্জিনিয়ারিং-এর জন্যও তৈরি করা হল।

পাড়াপড়শি জেগে বসে আছে, কিন্তু যার বিয়ে সে তো... না, ভুল হল... যার জয়েন্ট এন্ট্রান্স, সে মনে মনে ফন্দি আঁটছে। সকাল-বিকেল বই নিয়ে বসে। পড়াও করে মন দিয়ে – সে জানে হায়ার সেকেন্ডারির রেজাল্ট ভালো না হলে তার চলবে না – ওদিকে ফন্দিও এঁটে যায়।

ইঞ্জিনিয়ারিং-এ চানস পেতে গেলে তখনকার দিনে মোট নম্বর দেখা হত। অর্থাৎ, এক একটা সাবজেক্টে কে কত পেয়েছে তা নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে সব সাবজেক্ট-এর টোটালটাই গণ্য করা হত। অনেক হিসেব করে সুনয়নের মামাতো দাদা দেখল, যে ইংরেজিতে আর কেমিস্ট্রিতে যদি ফেল করে, তাহলে অঙ্ক আর ফিজিক্স-এর যুগ্ম নম্বর নিয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং-এ সুযোগ পাওয়া অসম্ভবের পর্যায়ে চলে যাবে। অর্থাৎ, প্রিয় ফিজিক্স আর অঙ্কে ফেল করতে তার গায়ে লাগছিল, আর কী!

যা হোক, ক্রমে ক্রমে জয়েন্ট এনট্রানসের দিন এসে গেল। প্রথম দিন ইংরেজি আর ফিজিক্স পরীক্ষা, দ্বিতীয় দিন দু-পেপার অঙ্ক বা ম্যাথস... ইংরেজিতে খারাপ করতে সময় লাগল না। ফিজিক্স পেপারটা কঠিন ছিল। ফলে চ্যালেন্‌জের মতো নিয়ে দুদ্দাড়িয়ে প্রব্লেম ইত্যাদি সলভ করে বেরিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে আলোচনা করে বুঝল, পরীক্ষা খুবই ভালো হয়েছে।

এই রে!

পরদিন অঙ্ক। যতই জয়েন্টে অ-সফল হবার ইচ্ছে থাকুক, ভালো অঙ্ক জানলে অঙ্ক পেপারে ইচ্ছে করে খারাপ করা কঠিন। ভালোই হল।

দুশ্চিন্তায় রাতে ঘুম হল না।

এর পরদিন কেমিস্ট্রি। একেবারে যাকে বলে মালকোঁচা মেরে পরীক্ষা দিতে গেছে সুনয়নের দাদা। আজকের প্রতিজ্ঞা – প্রশ্নপত্রই দেখবে না।

খাতা পেয়েছে। তখনকার দিনের নিয়ম অনুযায়ী পরীক্ষার হলে গিয়ে বসলে পরীক্ষা শুরুর একঘণ্টা আগে উঠতে পারবে না কেউ। খাতায় যত্ন করে নাম, রোল নম্বর, রেজিস্ট্রেশন নম্বর লিখেছে। তারপরে ভালো ছেলের মতো (অবশ্য মতো কেন, ছেলে তো ভালোই) বসে আছে প্রশ্নপত্রের জন্য।

প্রশ্নপত্র পেয়ে প্রথম দশ মিনিট সেটা পড়তে হবে। উত্তর লেখা বারণ। এ বড়ো কঠিন কাজ। কোনও রকমে প্রশ্নপত্রের দিকে তাকিয়ে কিচ্ছু না-পড়ে দশ মিনিট কাটানো – মোটেই সহজ নয়।

তা-ও হল।

এবার লেখার পালা। বাবু তো লিখবেন না কিছু। ব্ল্যাঙ্ক খাতা জমা দিয়ে শূন্য পাওয়াই উদ্দেশ্য। বসে আছেন। এদিক ওদিক দেখছেন। ইনভিজিলেটরের চোখে পড়েছে। তিনি এসে দু’চারবার পায়চারি করে গেছেন। বুঝেছেন, ছেলেটা টুকছে না, হল-কালেকশনেও মন নেই। তারপরে কাছে এসে জিজ্ঞেস করেছেন, “কিছু লিখছ না কেন?”

বাধ্য হয়ে খাতা টেনে বসেছে। ভাবছে কী লেখা যায়।

অনেক ভেবেচিন্তে খাতার প্রথম পাতায়, ঠিক মাঝখানে একটা ছোট্ট ‘ক’ লিখেছে। তারপরে চারদিকে একটু ডিজাইন টিজাইন করেছে। তারপরে পাতা উলটে পরের পাতায় তার চেয়ে বড়ো একটা ‘ক’ লিখেছে। এমনি করে খানিকটা ডিজাইন করে, আর পরের পাতায় আর একটু বড়ো একটা ‘ক’ লেখে। করতে করতে সময়ও যাচ্ছে, লেখাও চলছে। শেষ পাতায় পাতাজোড়া ‘ক’ লিখেছে। তখন এক ঘণ্টা প্রায় হয়ে গেছে।

সেই ‘ক’-এর পেটের ভেতর লিখেছে, “দেখ, শালা! কত্তোবড়ো ‘ক’!”

তারপরে খাতা জমা দিয়ে চলে গেছে।


সুনয়ন আর আমার খুব দুঃখ ছিল, আমরা ওর মামাতো দাদার মতো সাহস করে জয়েন্ট এন্ট্রানসের খাতায় কত্তোবড়ো ক লিখে (বা এঁকে) আসতে পারিনি। কিন্তু আস্ফালন করার হলেই সুনয়ন জোর গলায় বলত, “দ্যা----, শালা, কত্তোবড়ো ক!” আসেপাশে মহিলা থাকলে বলত, “দ্যাখ, উঁক্‌, কত্তোবড়ো ক!”

নিউরোলজিতে আমাদের কলিগ জবা আর সুনীপা খুব ইন্টারেস্টেড ছিল এই কত্তোবড়ো ক’ ব্যাপারটা নিয়ে? কিন্তু সুনয়ন কিছু বলত না। আমিও বলে দিতে পারতাম না। কারণ গল্পের অধিকার সুনয়নের। জবা আর সুনীপা জল্পনা করত। ‘ক’ মানে কী হতে পারে? সুনীপার বদ্ধমূল ধারণা ছিল ওটা ‘কেক’। মাঝে মাঝেই জিজ্ঞেস করত, “অ্যাই, তুই কবে কত্তোবড়ো ক খাওয়াবি, রে?”

শেষে একদিন কী কারণে সুনয়ন গেছে সুনীপার ওপর খুব চটে। বলে শিক্ষা দিতে হবে। কী করা যায় বলো তো দাড়ি?

আমি বললাম, “আমার যে ডায়রিটা আছে, যেটাতে আমি কোন পেশেন্টের জন্য কী করতে হবে, লিখে রাখি – সেটা আন তো?”

সুনয়ন নিয়ে এল। আমি তাতে একটা তারিখে যত্ন করে লিখে রাখলাম, “Sunipa fun and froliক”। আমরা জানতাম যে সুনীপা ওই ডায়রি মন দিয়ে পড়ে। তাতে সব রোগীর সম্বন্ধে সব তথ্য থাকে, সুতরাং অনেক হোমওয়ার্ক আলাদা করে করতে হয় না।

সেদিন আমরা কাজ সেরে ফিরে গেছি। রোজই সুনীপা আর জবা এসে লুকিয়ে খাতা খুলে পড়ে জানি। পরদিন দুজনের মধ্যে চাপা উত্তেজনা। একটু ঠারেঠোরে, তুই জিজ্ঞেস কর... না, আমার কী? তুই জিজ্ঞেস কর না?...

দিন কাটে। উত্তেজনা বাড়ে। আমার বা সুনয়নের মধ্যে কোনও হেলদোল নেই।

ক্রমে আগের দিন দেখা গেল “Sunipa fun and froliক”-এর পাশে লেখা “Remember – don’t forget ক”। উত্তেজনা তুঙ্গে। দিনের দিন আমি সুনীপা আর জবাকে বললাম, “আজ আমার আর সুনয়নের একটা কাজ আছে। ইভিনিং রাউন্ড-এর পরে আড্ডায় আসতে পারব না।”

অতি অবশ্যই! সে আর বলতে! ঠিক আছে, দাড়ি, নো প্রবলেম।

সন্ধেবেলা দৃশ্যত সুনয়ন আর আমি তাড়াতাড়ি কাজ শুরু করলাম। যথাসময়ে জবা আর সুনীপা অন্য ওয়ার্ডে গেল রোগী দেখতে।

আমরা আমাদের কাজ শেষ করে হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে গেলাম। খানিক বাদেই আবার নিউরোলজির ঘরে ঢুকে কী করে গেলাম, কেউ দেখতে পেল না।


ফিরলাম অনেক রাতে। চুপি চুপি নিউরোলজির ঘরে গেলাম। সুনয়ন খুব নার্ভাস। “দাড়ি, যদি লুকিয়ে থাকে... দরজা খুললেই দেবে মাথায় ডাণ্ডা... সাবধান...”

বললাম, “ধ্যাত, বাইরে থেকে তালা লাগান’... ভেতরে থাকবে কী করে?”

দুজনে তালা খুলে ঢুকলাম। সুনয়নের বুদ্ধিতে তালাটা নিয়েই ঢুকলাম। “আরে, প্রতিশোধ নিতে গিয়ে যদি বাইরে থেকে তালা দিয়ে চলে যায়? সারারাত এখানে থাকতে হবে।” আলমারির ওপরের তাকে সুদৃশ্য রাংতা মোড়া বিশাল বাক্সটা যেমন ছিল তেমনই আছে। কেউ আসেনি? ধুত্তোর! এত আয়োজন সব মাটি?

কিন্তু আমরা তো খুব যত্ন করে গিফট র‍্যাপ করেছিলাম। এখন এত ঢিলে দেখাচ্ছে কেন? সুনয়ন বাক্সটা বের করে এনেই উল্লাসে চিৎকার করে উঠল, “খুলেছে, খুলেছে, দাড়ি, দেখো...”

খুলে আবার মোড়া হয়েছে। কোনও রকমে। ভারি বাক্সটা টেবিলে রেখে তার ঢাকনা খুলে দেখা গেল নোংরা, শ্যাওলা ঢাকা এবড়োখেবড়ো সিমেন্টের টুকরোটা যেমন ছিল, তেমনই রয়েছে। কিন্তু তার সঙ্গে যে কাগজটা ছিল – যাতে লেখা ছিল ‘দেখ, শা..., কত্তোবড়ো ক’ – সেটা কই?

নেই।

পরদিন সকাল থেকে সুনীপার মুখ গম্ভীর। জবা আমাদের দিকে তাকায়, আর হেসে ফেলে। শেষে বলল, “বেচারা খুব আশা করেছিল ওই বাক্সে একটা কেক থাকবে। খুব আশাভঙ্গ হয়েছে। বেচারাকে তোমরা একদিন কেক খাইয়ে দিও।”





রাঁচির গল্প ২


লোকে আমার গল্প শুনে বলে, “তোমার ঝুলিতে রাঁচির গল্পের মতো নিমহ্যানসের গল্প নেই? রাঁচির পেছনে লেগেছ, ব্যাঙ্গালোরকে রেহাই দিলে কেন? তুমি তো দেখছি সাংঘাতিক পার্শিয়াল!” অনেক ভেবে দেখি, যে আছে বটে নিমহ্যানস বা ব্যাঙ্গালোরের গল্প, বলিনি, এমনও না... কিন্তু তাতে রাঁচির গল্পের মতো স্বাদও নেই, ধারও না।

যেমন সেই দিনটা – যে দিন সন্ধেবেলা জিনা আর আমি বিদ্যাপতি নগরের বাড়ির বাইরে বসে কফি খাচ্ছি – এমন সময়ে খুব কাছ থেকে খটাশ খটাশ করে অদ্ভুত শব্দ হতে শুরু করল। আমি জিনাকে সবে বলেছি “কী রকম বন্দুকের শব্দের মতো শোনাচ্ছে...” এমন সময় আসেপাশের বাড়ির ছেলে-ছোকরারা ছুটে ছুটে ফিরছে, আর বলছে, “আন্টি, আঙ্কল, শিগগির ভেতরে যান, ওবাড়িতে ডাকাত পড়েছে – গুলি চলছে, শুনতে পাচ্ছেন না?”

ভালো করে কিছু বোঝার আগেই দেখলাম চেয়ার, টেবিল, কফির কাপ ফেলে ঘরে ঢুকে দরজা দিয়ে দিয়েছি। খানিক্ষণ বাইরে খট্‌ খট্‌ করে গুলি চলল, তারপর সব শুনশান।

জানলার ফাঁক দিয়ে বোঝার চেষ্টা করছি কী পরিস্থিতি, এমন সময়ে দরজার ঘণ্টা বাজল। সাবধানে উঁকি দিয়ে দেখি প্রতিবেশী একজন। সাহস পেয়ে দরজা খুলে বেরোলাম। উনি বললেন, “আরে, ডাঃ দেব, আপনাকে বলা হয়নি। আপনি নতুন লোক... এই যে সামনের বাড়িটা... ওটার গেট উলটোদিকে... এখানে থেকে দেখা যায় না। কিন্তু ওদের বাড়িতে বছরে দু’বার ডাকাত পড়ে। এমনিতে আমার আপনার সমস্যা কিছু হবে না, কিন্তু এরাও গুলি চালায়, ওরাও গুলি চালায় – তাই সেই সময়টা রাস্তায় না থাকাই ভালো।”

হাঁ করে দাঁড়িয়ে রইলাম, ভদ্রলোক বাজারের ব্যাগ দোলাতে দোলাতে চলে গেলেন ওই বাড়িরই দিকে।

চার বছর ছিলাম রাঁচিতে আটবার না হলেও অন্তত পাঁচ-ছয়বার ডাকাত পড়তে দেখেছি বাড়িটাতে। প্রত্যেকবারই ঘটনাবলী একই রকম।

তারপরে সেই দিনের কথা – যে দিন পাড়ার কিছু লোকের সঙ্গে বসে গল্প করছিলাম, জিনা দূরের একটা বড়ো ছ’তলা বাড়ি দেখিয়ে বলল, “ওই বাড়িগুলো কাদের কোয়ার্টার?”

কোল ইন্ডিয়ার,” বলে ভদ্রলোক বললেন, “ওই যে বাড়িটা – ওটাতে কী হয়েছিল জানেন?” বলে শুরু করলেন, “ওই যে ওপরতলায় যেখানে অশ্বত্থের চারাটা উঠেছে, তার থেকে তিনটা জানলা বাঁয়ে... একটা নতুন বিয়ে করা দম্পতি থাকত – মেয়েটা বাঙালি, হাজব্যান্ড বিহারের। দু’জনেই ডাক্তার। একটা ছোট্ট বাচ্চা ছিল ওদের এক বছরের একটু বেশি। বাবা-মা ওই কোল ইন্ডিয়ার হাসপাতালে কাজ করত। পাশেই। বাচ্চাটার দেখাশোনা করত একটা কমবয়েসী আদিবাসী মেয়ে। একদিন কী হয়েছে, কী কারণে ওরা মেয়েটাকে কিছু বকাঝকা করেছে। সেদিন দুপুরে মা-বাবা ডিউটি থেকে ফিরে দেখে মেয়েটা নেই, বাচ্চাটাও নেই। একটু খোঁজাখুঁজি করেই বোঝা গেল মেয়েটা জামা-কাপড়, প্লাস মালিকের কিছু জিনিসপত্তর নিয়েই পালিয়েছে। বাচ্চাটারও খোঁজ নেই। পুলিশে খবর দেওয়া হল, সারা পাড়া তন্নতন্ন করে খোঁজাখুঁজি... কোত্থাও কিচ্ছু নেই... সারাদিনের পরে বর-বউ ঘরে ফিরেছে, সকাল থেকে কিছু খাওয়া হয়নি, বউ বলল, “একটু ভাতে-ভাত করে নিই...” বলে রান্নাঘরে গিয়ে প্রেশার কুকারটা নিয়ে বলেছে, “এতে কী ভরে রেখে গেছে? এত ভারি কেন?” বলে খুলে দেখে বাচ্চাটাকে কুচি-কুচি করে কেটে রান্না করে রেখে গেছে।”

আমরা খানিকক্ষণ কথা বলতে পারলাম না। শেষে বললাম, “তারপর?”

তার আর পর নেই। ওই ডাক্তার দম্পতি চাকরি ছেড়ে চলে গেছে।

জিনা আর থাকতে পারল না। বলল, “কিন্তু ওই আয়ার কিছু হলো না? পুলিশ ধরেনি ওকে?”

ভদ্রলোক হেসে নাক দিয়ে একটা ফুৎ শব্দ করে বললেন, “পুলিশ? এই বিহারি পুলিশের দ্বারা কিছু হয়? কিস্যু হয়নি। কোনও সুরাহা হয়নি।

এখন মনে হয়, এ গল্পের সত্যতা জাচাই করলেই আজকাল যাকে বলে ফেক নিউজ, তা-ই দাঁড়াত। কিন্তু তখন, রাঁচির আবহাওয়ায়, একবারও মনে হয়নি মিথ্যে হতে পারে।

তারপরে সেই গাঢ় গোলাপি মারুতি ভ্যানটা। একদিন দেখি কাঁকে রোডের পাশে একটা ভ্যান রাখা আছে তার পিছন দিকটা ফুলের পাপড়ি-মেলার মতো করে ফেটে খুলে এসেছে। পুড়ে কালোও বটে। লোকজনকে জিজ্ঞেস করে জানা গেল যে ঘটনাটা এমন:

রাঁচিতে সন্ধেবেলায় ঘণ্টায় ঘণ্টায় ইলেক্ট্রিসিটি যেত – সে গল্প আগে করেছি। রাঁচিতে কখন পেট্রল পাওয়া যাবে, বা যাবে না তারও কোনও ঠিক ছিল না। আমরা যারা কাঁকেতে থাকতাম, অনেক সময়েই পাঁচ কিলোমিটারের বেশি গিয়ে দেখতাম পেট্রোল পাম্প বন্ধ, বা সাপ্লাই নেই। যারা স্কুটার বা মোপেড চড়তাম, তারা সেই সময়ে বিভিন্ন রাস্তার মোড়ে ঝুপড়ি থেকে বে-আইনি পেট্রল কিনতাম, লিটারে দু’টাকা বেশি দিয়ে। কিন্তু সেই পেট্রোলে টু-টি, অর্থাৎ মোবিল মেশান’ থাকত’ বলে গাড়ি আর মোটরসাইকেলারোহীরা সেই দিয়ে কাজ চালাতে পারত না। তাদের বাড়িতে সবসময়েই পাঁচ কী দশ লিটার পেট্রোলের বন্দোবস্ত রাখতে হত।

সেই দিন সে বাড়িতে সন্ধেবেলা আড্ডা হচ্ছে, অনেক অতিথি অভ্যাগত সমাগম হয়েছে। এমন সময় মালিকের ভাইয়ের খেয়াল হয়েছে, আরে! মাত্র দশ মিনিট বাকি। এক্ষুনি কারেন্ট যাবে। আমি বরং এই ফাঁকে মারুতি ভ্যানটাতে পেট্রোল ভরে রাখি।

গিয়েছেন বাড়ির বাইরে, বাগান পেরিয়ে, গ্যারেজের সামনে – যেখানে ভ্যান দাঁড়িয়ে। জেরিক্যান থেকে পাইপ দিয়ে সাইফন করে পেট্রোল ভরছেন, এমন সময়, নির্দিষ্ট সময়ের পাঁচ মিনিট আগেই কারেন্ট চলে গিয়ে সব অন্ধকার হয়ে গিয়েছে।

তাড়াতাড়ি হেঁকে বলেছেন, “শম্ভু, জলদি বাত্তি লানা!”

বৃদ্ধ শম্ভু কাঁপা হাতে লম্ফ জ্বেলে তাড়াতাড়ি বেরিয়ে এসেছে।

বাবু খোলা আগুন দেখে ঘাবড়ে গিয়ে কিছু না বলে দিয়েছেন দৌড়, জেরিক্যান, পাইপ, পেট্রোল সব ফেলে...

শুম্ভু মালিককে পালাতে দেখে নিজেও ছুটে পালিয়েছে – লম্ফটা মাটিতে ফেলে...

শব্দটা নাকি সাড়ে পাঁচ কিলোমিটার দূরে কাঁকেতে আমার বন্ধুরা হস্টেলে শুনতে পেয়েছিল। আমি অবশ্য আধ কিলোমিটারের মধ্যে ছিলাম, কিন্তু কিছু শুনেছিলাম বলে মনে পড়ে না।

কিংবা হয়ত মনে করেছিলাম পাশের বাড়িতে ডাকাত পড়েছে।


রাঁচিতে মানসিক রোগ চিকিৎসার হাসপাতাল থাকার ফলে রাঁচি সম্বন্ধে কলকাতা, তথা পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিরা কি মত পোষণ করে, তা সর্বজনবিদিত। কাউকে রাঁচি যেতে বলা মানে তার মস্তিষ্কের অবিকৃত অবস্থা সম্বন্ধে সন্দেহ প্রকাশ করা হয়। এবং এই মত, আশ্চর্যভাবে, সারা দেশেই বিস্তৃত। অথচ বড়ো বড়ো মানসিক রোগ চিকিৎসার হাসপাতাল দেশের সব বড়ো, মাঝারি বা ছোটো শহরেই রয়েছে – কলকাতায়, পুণেতে, আগ্রায়, এমনকি তেজপুরেও। অনেক ভেবে দেখেছি যে একমাত্র রাঁচিতেই ছিল ‘ইউরোপিয়ান মেন্টাল হসপিটাল’। সেই জন্যই রাঁচির খ্যাতি এত। সাহেব পাগল যেত বলেই রাঁচির সুনাম।

রাঁচিতে আমরা যে হাসপাতালে কাজ করতাম, সেটাই সাহেব রাজ্যে ছিল ইউরোপিয়। সাহেবী আমলে ওখানে নেটিভরা চিকিৎসা পেত না। তাদের জন্য ছিল আলাদা হাসপাতাল নেটিভ অ্যাসাইলাম। তবে হ্যাঁ, দেশি সাহেবদের জন্য, অর্থাৎ রাজা-রাজড়ার জন্য ইউরোপিয়ান অ্যাসাইলামের বাইরে ছোটো ছোটো কটেজ বানান’ হয়েছিল। এই কটেজে পরিবার পরিজন, দাস-দাসী নিয়ে রাজা-রাজড়ারা চিকিৎসা পেতেন।

আমাদের সময়ে, বলা বাহুল্য, সাহেব-টাহেবের গল্প ছিলা না। সাধারণ ভারতীয় আর রাজবাড়ির লোক, সকলেই একাসনে চিকিৎসা পেত। আর বাইরের কটেজগুলো ক্রমে ভগ্নদশাপ্রাপ্ত হচ্ছিল।

সারা দেশে রাঁচি বললে যে রকম ফল হয়, রাঁচিতে কাঁকে বললে সেই রকম হত। কলকাতায় বসে লোকে বলে, বেশি পাগলামো করলে রাঁচি পাঠিয়ে দেব – রাঁচিতে বলে কাঁকে নিয়ে যাব। আমাদের এক উকিল বন্ধু ছিল, আমাদের প্রায়ই ডেকে নেমন্তন্ন খাওয়াত, কিন্তু কখনও যদি আমরা বলেছি, “একদিন আয় না, হস্টেলে?” বলত, “নেহি ভাই। ও নেহি হো সকতা। তুমি কাঁকে রোডে, বিদ্যাপতি নগরে, গান্ধীনগরে আমাকে নেমন্তন্ন করো, এমনকি চলো, আমরা কাঁকে পেরিয়ে পাত্রাতু যাই – সমস্যা নেই। কিন্তু ইট্‌ ক্যান্‌ নেভার বি সিন যে আমার গাড়ি কাঁকে চৌক থেকে ডান দিকে মোড় নিচ্ছে।”


কাঁকের হাসপাতালের ভেতরে যা হত, তা-ও খুব মজার। একদিন মেঘমন্দ্র ওয়ার্ডে কাজ করছে, কী একটা কথা স্টাফ নার্সকে বলতে হবে, ফাইল হাতে বেরিয়ে দেখে সেদিন ডিউটিতে রয়েছে মেল নার্স কুজুর। সব হাসপাতালে প্রথা অনুযায়ী মহিলা নার্সদের সিস্টার বলা হত, কিন্তু রাঁচির প্রথা অনু্যায়ী মেল নার্সদের বলা হত ব্রাদার।

মেঘমন্দ্র ডক্টর্স রুম থেকে বেরিয়ে দেখল কুজুর হাতে একটা সিরিন্‌জ নিয়ে ইন্‌জেকশন ভর্তি করে ইতিউতি তাকিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। ফাইল হাতে এগিয়ে গেল।

ব্রাদার?”

ডাক শুনে তাকাবার অবকাশ তখন কুজুরের নেই।

এক মিনিট, স্যার,” বলে চোখ-মুখ কুঁচকে একটা রোগীর দিকে তাকিয়ে বলল, “ইধর আও।”

রোগী এল। কুজুর তার হাত ধরে কাছে টেনে এনে খানিকক্ষণ তার মুখ দেখে বলল, “নেহি, তুম নেহি, তুম নেহি। যাও।”

মেঘমন্দ্র জানত, আমরা সকলেই জানতাম, কুজুর চোখে খুব কম দেখে, কিন্তু মানতে চায় না। ওর বক্তব্য, ও মিলিটারিতে যদি চশমা ছাড়া পনেরো বছর ডিউটি করতে পারে, তাহলে রিটায়ারমেন্টের পাঁচ বছর পরে রাঁচিতেও পারবে। কুজুর হেঁটে চলেছে, হাতে সিরিন্‌জ। পেছনে চলেছে মেঘমন্দ্র।

ব্রাদার?”

এক মিনিট, স্যার...” কুজুর আর একজন পেশেন্টের হাতের ডানা ধরে টেনে কাছে এনে চোখ কুঁচকে মুখ দেখে বলল, “নেহি, তুম নেহি।”

ব্রাদার, আপ কোন্‌ সা পেশেন্ট ঢুন্ড রহে হো?”

য়েহি, স্যার, য়েহিঁ হ্যায় কহিঁ... ইধার আও... নেহি, তুম নেহি...”

ক্রমশ কুজুর করিডোর-বারান্দা দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে একজন পেশেন্টকে দেখে বলল, “হাঁ-াঁ-াঁ, ইধর বৈঠে হো?” বলে প্যাঁট করে ছুঁচ ফুটিয়ে দিল তার হাতে। তারপরে মেঘমন্দ্রের দিকে ফিরে বলল, “হাঁ, স্যার, বোলিয়ে।”

ফাইলটা এগিয়ে দিয়ে মেঘমন্দ্র বলল, “রামশঙ্কর কো আজ সুঁই লাগনে কা হ্যায়। এক নেহি, দো অ্যাম্পুল দিজিয়েগা। আমি ফাইলে অ্যাডভাইজ লিখে দিয়েছি।”

লেকিন রামশঙ্করকা তো সুঁই লাগ গিয়া!”

কখন?”

সদ্য ইঞ্জেকশন দেওয়া রোগীর দিকে আঙুল তুলে ব্রাদার বলল, “য়েহি তো লাগায়া। আপকা সামনে।”

মেঘমন্দ্র (নিজের) কপাল চাপড়ে বলল, “ব্রাদার, ও রামশঙ্কর না, রামশঙ্কর এখনও ডক্টর্স রুমে বসে আছে। আমি বসিয়ে এসেছি।”

রামশঙ্কর নেহি হ্যায়? হায় রাম! তো ইয়ে কোন হ্যায়? এই ব্যাটা বুদ্ধু কাহিঁকা, তেরা নাম কেয়া হ্যায়?”

লোকটা বলল, “রামতীরথ্‌।”

দেখিয়ে কেয়া বাৎ, ম্যায় জানতা থা ইসকা নাম ভি রাম-সে কুছ হ্যায়... তু বাতায়া কিউঁ নেহি তু রামশঙ্কর নেহি হ্যায়?”

মেঘমন্দ্র বিরক্ত হয়ে বলল, “ব্রাদার আপনে উসসে উসকা নাম পুছা হি কব? ওর ফাইল বের করুন। ইঞ্জেকশন তো দিয়েছেন। ওর ডায়াগনসিস কী? কী ওষুধ চলছে? চলুন দেখি।”

কুছ নেহি হোগা, স্যার। দো হফতা মে ইঞ্জেকশন কা অসর চলা যায়েগা।”

ফাইল খুলে দেখা গেল রামতিরথেরও একই ওষুধ – আগামীকাল ইঞ্জেকশন পাবার কথা।

একগাল হেসে ব্রাদার কুজুর বলল, “ম্যায় জানতা থা, জেয়াদা গলতি নেহি হুয়া।”


হাসপাতালের বিশাল উঁচু দেওয়ালের ভিতরে রোগীরা ছাড়া থাকে। ভিতরে বিরাট বিরাট খোলা জমিও আছে। সাহেবদের সময়ে তা হয়ত সুন্দর কেয়ারি করা বাগান-টাগান ছিল, কিন্তু স্বাধীন ভারতের বিহারী ওয়ার্ক কালচারের কল্যাণে তা জঙ্গলে পর্যবসিত হয়েছে। সেখানে অনেক সময়ে রোগীরা লুকিয়েও পড়ত, কিংবা চড়ত গাছে। আমি থাকাকালীন গাছে চড়া নিয়ে মজার ঘটনা ঘটেনি, দুঃখের ঘটনা ঘটেছে। আমার শোনা দুটো মজার কাহিনি বলি।

একবার মডস্লে ওয়ার্ডের সামনের একটা গাছে চড়েছে এক রোগী। কিছুতেই নামবে না। তাকে নার্স, ওয়ার্ড বয়, ডাক্তার – সক্কলে মিলে সাধ্যসাধনা করছে, তার হেলদোল নেই। সে ফুট তিরিশেক উঠে একটা চওড়া ডালে গাছের কাণ্ডে হেলান দিয়ে বসে রয়েছে।

এমনই কপাল, ওয়ার্ড স্টাফের মধ্যে যারা তখন ডিউটিতে ছিল, তারা কেউই গাছে চড়তে পারে না। তখন আলোচনা হলো কী করা হবে – আর ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যে ডিউটি বদলাবে, তখন আসবে আসলাম। আসলাম এলে আর সমস্যা নেই। টুক করে উঠবে গাছে, আর পুট করে পেশেন্টকে বগলদাবা করে ফেরত নিয়ে আসবে। এর মধ্যে লাঞ্চ এসে গেল। মডস্লে ওয়ার্ডের বড়ো ডাক্তার, ডাঃ হাকিম বলে গেলেন, “গাছের নিচে খাবার দাও। খিদে পেয়েছে, ঠিক নেমে আসবে। তখন ধরে নিও।”

তা-ই করা হল। কিন্তু ওয়ার্ড স্টাফেরা স্লিপ ফিল্ডারদের মতো ওঁৎ পেতে আছে দেখে রোগীর নামার লক্ষণ নেই। তখন নার্সের কথায় স্টাফরা একটু দূরে গেল। কভার, মিড উইকেট, লং অফ, থার্ডম্যান... রোগীর ভবি ভোলে না। একজন ডাক্তার বলল, “আরে, ও তোমাদের দেখতে পেলে থোড়াই নামবে। তোমরা লুকিয়ে থাকো।”

সেই কথা শুনে তারা গাছের আড়ালে, থামের পেছনে এমন নানা জায়গায় লুকিয়ে পড়ল। কিন্তু সময় বয়ে যায়, ওয়ার্ডের কাজ ব্যাহত হচ্ছে – তাই একজনকে পাহারায় রেখে (থামের আড়ালে), অন্যরা নিজেদের কাজে গেল, কিন্তু একশোজোড়া চোখ রইল গাছের ডালে... এই বুঝি এল... এই এল খেতে...

আসে না।

আধ ঘণ্টা বা পঁয়তাল্লিশ মিনিট পরে, হঠাৎ একজন হাঁ হাঁ করে চেঁচিয়ে উঠেছে, “----রে, পেশেন্ট নেমে খাচ্ছে – ধর, ধর, ধর!”

আর ধর ধর, পেশেন্টের খাওয়া তখন শেষ, লোকে দৌড়ে কাছাকাছি আসার আগেই সে তড়াক করে এক লাফে আবার গাছের ডালে, সেখানে পৌঁছে, চেটেপুটে হাত পরিষ্কার করে দিব্যি বসে রইল।

সবাই নজরদারকে ধরল, “কী রে ব্যাটা? কী দেখছিলি?”

সে বলল, “আমি কী করব? এদিকে দুটো রোগী মারপিট করতে লেগেছে...”

এইবার আসলামের অপেক্ষা। খানিকক্ষণের মধ্যে আসলাম এসে গেল। আসার আগেই ঘটনার কথা শুনেছে ও – এসেই গাছতলায় গিয়ে জামা খুলে, জুতো খুলে গাছের গুঁড়ি ধরে ওপরে তাকাল রোগী কত উঁচুতে দেখার জন্য।

রোগী ফস করে একটানে ওর ধুতি খুলে, সম্পূর্ণ উলঙ্গ অবস্থায়, ধুতির এক দিক গাছের ডালে বেঁধে, অন্য দিক নিজের গলায় জড়িয়ে তৈরি হয়ে দাঁড়াল। লাফাবে।

আসলাম গাছ ছেড়ে তিন পা পিছিয়ে গেল।

রোগী গলা থেকে ফাঁস খুলে ডালে বসল।

আসলাম গাছের দিকে এক পা এগোল।

রোগী উঠে দাঁড়িয়ে ধুতির ফাঁসটা হাতে নিল।

আসলামের প্রচেষ্টার ইতি হল, খবর গেল ডিরেকটরের কাছে, উনি বলে পাঠালেন, একজন ওয়ার্ড স্টাফ যেন গাছের সামনেই থাকে সারাক্ষণ – যতক্ষণ রোগী না নামছে। তাই হল। স্টাফ, ডাক্তার, সবাই বলাবলি করতে লাগল, “রোগী যদি কোনও দিনই না নামে তাহলে?” কিন্তু সে প্রশ্ন কেউ ডিরেকটরকে জিজ্ঞেস করতে গেল না।

সারাদিন কাটল। সন্ধ্যা নামল। সবার ডিউটি শেষ হল। সবাই ফিরবার সময় একবার মডস্লের সামনে দিয়ে ঘুরে গেল। রোগী ভাবলেশহীন মুখে বসে আকাশ দেখছে।

রোদ পড়ে এল। মেট্রন হাঁকা-ডাকা শুরু করলেন, রাত্তিরে কে খোলা আকাশের নিচে বসে গাছের ডালে রোগী পাহারা দেবে?

এমন সময়ে, নির্বিকার মুখে ধুতিটাকে খুলে বগলদাবা করে গাছ থেকে নেমে এসে রোগী ওয়ার্ডে ঢুকে ধুতিটা পরে নিজের নির্দিষ্ট বিছানায় শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ল।

পরের যে পেশেন্টটা গাছে চড়ল, তার গল্পটা অত সহজে শেষ হয়নি। আগের জনের মতো সে অত ছোটো গাছে চড়েনি। হাসপাতালের ঠিক মাঝখানে বিশাল রেন-ট্রির মগডালে – অর্থাৎ মাটি থেকে অন্তত সত্তর আশি ফুট উঁচুতে উঠে বসেছিল। সেদিন হাসপাতালে কী ছুটি ছিল। সম্ভবত রবিবার। কিন্তু বেলা ন’টা দশটার মধ্যে লোকে লোকারণ্য। যত ডাক্তার – এমনকি যারা ক্যাম্পাসে থাকে না, তারাও ওই প্রাক-মোবাইল যুগে, রাঁচি, তথা কাঁকে, তথা সেন্ট্রাল ইনস্টিটিউটের টেলিফোনের বাধা ঠেলে হাজির। বেলা দশটা নাগাদ, যখন সবার মাথার বুদ্ধি শেষ, কারণ রোগী এতই ওপরে উঠে গেছে, যে সব বড়ো ডাক্তারেরই মত, যে ওর পেছনে কাউকে গাছে ওঠানো উচিত নয়, কারণ অত ওপরে যদি একটা ঝটাপটি হয়ে দুজনে পড়ে যায় – তাহলে আস্ত থাকবে না একজনও। সবাই তখন ডিরেকটরের দিকে তাকিয়ে, আর ডিরেকটর চোখ মুখ কুঁচকে একদৃষ্টে পেশেন্টের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন। অন্য সকলের ঘাড়ে ব্যথা হয়ে গেছে – তারা আর ওপরে তাকিয়ে থাকতে পারছে না, এদিকে ডিরেকটর এক মনে বোধহয় পেশেন্টকে হিপনোটাইজ করার চেষ্টায় রত, এমন সময় বাইরের গেট-এর সামনে প্রবল ঢং ঢং ঘণ্টা বাজিয়ে হাজির ফায়ার ব্রিগেডের একটা গাড়ি।

ভয়ানক বিরক্ত হয়ে ডিরেকটর বললেন, “আবার ফায়ার ব্রিগেডকে কে খবর দিল?”

ডাঃ লক্ষ্মণ বললেন, “আমি। ওদের গাড়িতে বিরাট সিঁড়ি থাকে – সে দিয়ে রোগীকে ধরা যাবে। না হলেও ওদের বিরাট বিরাট চাদর থাকে। গাছের তলায় সেই চাদর টেনে ধরে দাঁড়ালে কেউ যদি ওপরে ওঠে, তাহলে পড়ে গেলেও চিন্তা নেই।”

চিন্তা নেই!” খিঁচিয়ে উঠলেন ডিরেকটর। “আপনি জানেন না, যে ফায়ার ব্রিগেড ওদের প্রত্যেক ঘটনার রিপোর্ট সরকারকে দেয়? এবার সরকার যখন জিজ্ঞেস করবে, পেশেন্ট গাছে কী করে চড়ল, তখন সেই উত্তরটা তো আমাকে দিতে হবে, না?”

কাজটা ভুল করেছেন জেনে ডাঃ লক্ষণের মুখ শুকিয়ে গেল। কিন্তু ততক্ষণে যা হবার তা হয়ে গেছে। ফায়ার ব্রিগেডের বিশাল ট্রাক আস্তে আস্তে এসে দাঁড়িয়েছে কাছে। ফায়ার অফিসার এক লহমায় সমস্যাটা বুঝে নিয়ে বললেন, “চাদর আমাদের নেই। মই রয়েছে অবশ্য। তবে এই বাগানের মাঝে এত গাছ, তার ফাঁক দিয়ে তো ট্রাক গাছের নিচ অবধি আসবে না। আর এখান থেকে মই ওঠালে রোগীর ধারে কাছেও পৌঁছবে না। তবে অন্য একটা উপায় আছে। তার জন্য একটা চাদর তো লাগবে। আপনাদের হাসপাতালে বিছানার চাদর আছে নিশ্চয়ই? সিস্টারদের বলুন, সাত-আটটা চাদর সেলাই করে একসঙ্গে করতে।”

নিজের আগের ভুল শুধরে ডিরেকটরের চোখে আবার সম্মানের স্থান পেতে ডাঃ লক্ষ্মণ তেড়ে উঠলেন। “তাতে কী হবে? অত ওপর থেকে যদি কেউ পড়ে, তাহলে কি সেলাই করা চাদর তাদের ওজন রাখতে পারবে?”

আহা, কেউ যদি অত ওপর থেকে পড়ে, সটান তো পড়বে না। গাছের ডালে ডালে ধাক্কা খেতে খেতে পড়বে। ফলে তাদের পড়ার স্পিড তেমন বেশি থাকবে না। সেলাই করা চাদরেই ধরে নেবে। চোট লাগবে না। অবশ্য গাছের ডালে ধাক্কা লেগে মাথা-টাথা ফেটে যেতে পারে – তা তো কিছু করার নেই!”

এমন চমৎকার, বিশদে প্রাঞ্জল করে কেউ বুঝিয়ে দিলে যতটা আশ্বস্ত হওয়া উচিত, ডাঃ লক্ষ্মণকে মোটেই ততটা দেখাল না। আড়চোখে একবার ডিরেকটরকে দেখে নিয়ে চুপ করে রইলেন।

ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে সাড়া পড়ে গেল। সব নার্সরা হই হই করে কাঁথা সেলাইয়ের মতো ফোঁড় দিয়ে দিয়ে বিছানার চাদর জুড়তে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। দেখতে দেখতে আট-দশটা চাদর জুড়ে একটা বিশাল চাদর তৈরি হল। সেই চাদর এল গাছতলায়। দমকলের স্টাফ, হাসপাতালের কর্মচারী, সবাই চারদিক থেকে টেনে ধরে দাঁড়াল, আসলাম জুতো জামা খুলতে শুরু করল।

আরে, আরে, রুকিয়ে, রুকিয়ে...” বলে আসলামকে থামিয়ে দমকল অফিসার বললেন, “কাউকে গাছে চড়তে হবে না।”

তবে?

আমরা এই হোজপাইপ দিয়ে জল ছুঁড়ে ওকে স্থানচ্যুত করব। ও যখন পড়ে যাবে, তখন যাঁরা চাদর ধরে রয়েছেন, তাঁরা কপ করে ধরে নেবেন।”

অত উঁচুতে পৌঁছবে জল?

আরে ফুল ফোর্স দিলে এই জল একশো কুড়ি ফুট অবধি ওঠে। জলের তোড়ে আগুন নেভাতে হয় না? আপনারা সবাই সরে যায়, নইলে ভিজে যাবেন। শুধু যাঁরা চাদর ধরে থাকবেন, তাঁরা থাকুন।”

সবাই সরে গেল। জোরে ইঞ্জিন চালিয়ে হোজপাইপ তাক করে জল চালান’ হল।

তিনটে অসুবিধা দেখা গেল।

প্রথমত, পেশেন্ট পড়ে গেলে নিচের যে যে গাছের ডালে লেগে মাথা ফাটার ভয় ছিল, সেই সেই ডালগুলোই জলের তোড়টাকে কমিয়ে দিল। দ্বিতীয়ত, ওই তীব্রবেগে জল ছেড়ে চার-পাঁচজন দমকলকর্মী মিলেও জলের পাইপটা ঠিকমত তাক করতে গিয়ে হিমশিম খেয়ে গেল।

তৃতীয় সমস্যাটা এক-লাইনে চমৎকার সামারাইজ করলেন দমকল অফিসার। “আরে, ইয়ে পাগল হোনে সে কেয়া হোগা, বহোৎ সিয়ানা হ্যায়।”

কারণ জল যে দিক থেকে আসে, সে টুক করে অন্য দিকে সরে গিয়ে গাছের কাণ্ডের ওপাশে চলে যায়।

বিশাল ট্যাঙ্ক হলেও দমকলের জল ফুল ফোর্সে ছাড়লে শেষ হতে কয়েক মিনিট লাগে। এবং সেই নির্দিষ্ট মিনিটের পরে এই গাড়ির জলও শেষ হল। তখন সবাই দূর থেকে গুটি গুটি পায়ে ফিরতে শুরু করল। গাছের নিচে সম্পূর্ণ সিক্ত একটা বিশাল চাদর ধরে সম্পূর্ণ সিক্ত গুটিকতক লোক দাঁড়িয়ে, সেই গাছ এবং তার আসেপাশের গাছ থেকে তখনও ঝরঝর করে জল পড়ছে – যেন বৃষ্টি সবে থেমেছে, আর অতটা জলের কল্যাণে, লোকের পায়ে-পায়ে, গাছের নিচের জমি অনেকটাই কাদা-কাদা হয়ে গেল।

সবার মনে একটাই প্রশ্ন – পেশেন্ট কতটা ভিজেছে? ভিজে কী করছে?

যারা সামনের দিকে ছিল, তারা সভয়ে দেখল যে রোগী নির্বিকারভাবে তার ধুতির আড়াল সরিয়ে তার পার্সোনাল জলের সোর্স বের করে আনন্দে চারিদিকে ছড়িয়ে ছড়িয়ে ওই গাছের ওপর থেকেই হিসু করতে শুরু করল।

সামনের লোকেরা আঁতকে উঠে পিছিয়ে গেল। তার ফলে পেছন থেকে যারা ভীড় করে আসছিল, তাদের সঙ্গে ধাক্কাধাক্কি হল, আর যারা তাদেরও পেছনে ছিল, তারা মনে করল যেন কী না কী মিস হয়ে গেল, তাই তারা আরও পা চালিয়ে কাছে আসার চেষ্টা করতে লাগল।

এবং সেই প্রস্রাবের ধারা, গাছের ডালে এবং পাতায় লেগে, ছিটকে ছিটকে দমকলের জলের কমে আসা ধারার সঙ্গে মিলে বর্ষার মতো নামতে লাগল নিচে দাঁড়ান লোকেদের ওপরে।

সামনের লোকেরা চেঁচিয়ে উঠল, “আরে, আরে! পিসাব কর রহা হ্যায়!” সেই শুনে একটা স্টাম্পিড শুরু হল, সবাই একসঙ্গে পালাতে চেষ্টা করে কাদায় হড়কে কয়েকজন পড়েও গেল। কাদায়, জলে, প্রস্রাবে মাখামাখি হয়ে, নাকাল হবার পরাকাষ্ঠায় অভিজ্ঞ হয়ে সবাই দূরে সরে গেল।

দমকলের ট্যাঙ্কের চেয়ে কম সময়েই প্রস্রাব বর্ষণও শেষ হল, কিন্তু ওইটুকু সময়ের মধ্যেই সামান্য প্রস্রাব দমকলের বিশাল মেশিনকে হার মানিয়ে অনেক বেশি ক্ষতিসাধন করে থামল।

সিক্তবসন দমকলকর্মীরা বিদায় নিলেন, ডিরেকটর বললেন, “আমি চান করতে যাচ্ছি।”

ডিরেকটরের বিদায়ের সুযোগ নিয়ে অন্যান্য বড়ো ডাক্তাররাও চলে গেলেন স্নান করতে এবং যারা সত্যিই কাদা ইত্যাদি মেখেছিল, তারাও গেল।

আসলাম বলল, “যত্তসব বকনেওয়ালা। যেতে দিন সবাইকে। রোদে গাছটা একটু শুকোক। ততক্ষণ ওই চাদরটা মেলে রাখুন, শুকিয়ে যাক। তারপর দেখছি।”

বেলা বাড়ার পর শুকিয়ে যাওয়া চাদর ধরে ওয়ার্ড স্টাফ আর দারোয়ানরা দাঁড়াল – আর আসলাম গাছে উঠে বলল, “অ্যাই, চল, নেমে চল! নইলে এমন...”

পেশেন্ট সুড়সুড় করে নেমে আসলামের পেছনে পেছনে ওয়ার্ডে চলে গেল।


এই সব গল্পের সঙ্গে পাল্লা দেবে ব্যাঙ্গালোরের গল্প? হুঁঃ! রাঁচি ছাড়া কোন শহরে পাড়ার মুদির দোকানে পাউরুটি কিনতে গিয়ে ভালো করে দেখতে গিয়ে শুনতে পাব, “নিয়ে যান, নিয়ে যান... একেবারে ফ্রেশ রুটি। কাঁকে রোডে রাঁচির বেস্ট রুটি কিনতে পাওয়া যায়। সব বাসি রোটি সুবহ্‌ লে জাতা হ্যায় সিধা মেন্টাল হসপিটাল!” এবং সেই মেন্টাল হসপিটালে যেরকম রুটি পাওয়া যায়, তার কোনও তুলনা আমি অন্য কোথাও পাইনি। সবুজ রঙের পাউরুটি দেখেছেন কখনও? সম্পূর্ণ সবুজ? এমারেল্ড গ্রিন? আমি দেখেছি। ব্রেকফাস্টে আমার ওয়ার্ডে চোদ্দোজন রোগী সকলে প্লাস্টিকের প্যাকেটে ছ’টা করে স্লাইস রুটি পেয়েছে, ছয় চোদ্দোং চুরাশিটা রুটি, প্রত্যেকটাই গাঢ়, এমারেল্ড গ্রিন মার্কা সবুজ। তাতে কোনও সাদার অংশ নেই। আবার যত্ন করে প্রত্যেকটায় মাখন লাগান’। যে খাবার এনেছে, সে নির্বিকার চিত্তে সেগুলো বিলি করে চলেছে। রোগী, নার্স, কারওর আপত্তিতেই তার হেলদোল নেই। আমি তাকে বললাম, “এগুলো বিলি করছেন কেন? দেখতে পাচ্ছেন না, ছাতা পড়ে সবুজ হয়ে রয়েছে?”

সে বিহারি স্টাইলে সসম্ভ্রমে খেঁকিয়ে উঠল, “আমি কী করব? আমার কাজ তো খাবার দেওয়া। প্যাকিং কি আমি করেছি?”

(বিহারে বাস না করলে সসম্ভ্রমে খেঁকিয়ে ওঠার তফাৎ জানা যায় না। বাঙালিরা সসম্ভ্রমে খেঁকিয়ে উঠতে পারে না।)

আমি বললাম, “আনলেন কেন? এগুলো যে পচা তা তো তিন মাইল দূর থেকেই দেখা যাচ্ছে।”

সে বলল, “আমাকে বললে, আর নেই।”

আমি বললাম, “এগুলো নিয়ে আসুন আমার সঙ্গে।”

গেলাম ডিরেকটরের কাছে। তাকে বাইরে দাঁড় করিয়ে রেখে ডিরেকটরের অফিসে ঢুকলাম একটা রুটির প্যাকেট হাতে নিয়ে। উনি চোখমুখ কুঁচকে ফাইল থেকে মুখ তুলে বললেন, “কেয়া বাৎ হ্যায়, ডাঃ দেব?”

বললাম, “স্যার, দেখিয়ে, চাইল্ড ওয়ার্ড মে ক্যায়সা ব্রেড আয়া হ্যায়। সারে কা সারে ব্রেড অ্যায়সা হি সরা হুয়া হ্যায়।”

ভাবলেশহীন মুখে ডিরেকটর বললেন, “মেরা পাস নেহি, ডাঃ আলম কা পাস জাইয়ে। হি ইজ ইন চার্জ অফ ফুড।”

চললাম ডাঃ আলমের অফিসের দিকে, সে হলো হাসপাতালের বিশাল ক্যাম্পাসের অন্য প্রান্তে। গিয়ে শোনা গেল তিনি আজ আসেননি। শরীর খারাপ। কী করা? ততক্ষণে অন্যান্য ডাক্তাররাও জানতে পেরেছে। এইবার তারা বিরক্তি প্রকাশ করতে শুরু করল, “কী দরকার আপনার এত আগ বাড়িয়ে কাজ করার? একটা কমপ্লেন লিখে ছেড়ে দেওয়া যেত না? তা না, লোকটাকে সঙ্গে নিয়ে একবার ডিরেকটর, এর একবার আলমের অফিস... আব কেয়া কিজিয়েগা? আলম সাব-কা ঘর জাইয়েগা?”

আমার মাথা তখন গরম, দরকার হলে তা-ই যাব। আলমের বাড়ি তো ক্যাম্পাসেই। অফিস থেকে কিলোমিটার খানিক দূরে। নিয়ে আসছি মোপেড। এমন সময় দেখা গেল দূর থেকে আলম আসছেন হেঁটে।

কাছে আসতেই আলম আমার ওপরে ফেটে পড়লেন, “আপনার জন্য আমাকে অসুস্থ শরীর নিয়ে আসতে হল। শুনলাম পাউরুটিতে ছাতা পড়েছে বলে আপনি ডিরেকটরের অফিসে গিয়েছিলেন? ছাতাপড়া অংশটা ফেলে দিয়ে খাওয়া যেত না?”

ততক্ষণে বোধহয় আমার কান থেকে ধোঁয়া বেরোচ্ছে। ছাতাপড়া রুটি খাওয়ার কথায় ডাঃ আলম ইনস্টিট্যুটের অন্যতম সিনিয়র শিক্ষক হওয়া সত্ত্বেও (অসম্ভ্রমে) চেঁচিয়ে বললাম, “আমি কী করব? আপনি ফুড ইনচার্জ। আপনি আপনার অফিসে নেই এবং আপনার কাজ কে দেখছে আপনার ডিপার্টমেন্টে কেউ জানে না। সকাল সাড়ে ন’টা বাজতে চলল, আমার ওয়ার্ডে ছোটো ছোটো ৫-৬ বছরের বাচ্চারা না-খেয়ে বসে রয়েছে। এবার এই পাউরুটিগুলো দেখে বলুন তো, কোন অংশটা ফেলে দিয়ে কোন অংশটা খাওয়া যাবে? শুনেছি আপনি নাকি খাবার খেয়ে পরীক্ষা করার পরে রোগীরা খাবার পায় – যে কারণে আপনার বাড়িতে হাঁড়ি চড়ে না। এবারে এই পাউরুটিগুলো খেয়ে দেখান দেখি?”

সম্পূর্ণ সবুজ পাউরুটি দেখে আলম আর আমাকে কিছু বললেন না। লোকটাকে বললেন, “মেরা পাস তো ইয়ে ব্রেড নেহি আয়া থা?” বলে আমার দিকে আর না তাকিয়ে সোজা হাঁটা দিলেন রান্নাঘরের দিকে। আমি ভাবলাম, আমি এতদূর এসেছি – শেষটাও দেখেই যাই। গেলাম পেছনে।

কিচেন কমপ্লেক্সে ঢুকে আলম ভাবলেশহীন কণ্ঠে ইন-চার্জকে বললেন, “আমির, ইয়ে কেয়া ব্রেড ভেজা?”

আমিরও ততোধিক ভাবলেশহীন কণ্ঠে বলল, “সরি স্যার (ওখানকার উচ্চারণে ‘সোরি’), গলতিসে চলা গিয়া।” বলে আর একটা ট্রে ওয়ার্ড বয়ের দিকে এগিয়ে দিল। আমি অবাক হয়ে দেখলাম ট্রে-টা তৈরিই ছিল।

ওয়ার্ড বয় ট্রে-টা কোলে নিয়ে আবার বেরিয়ে গেল। আলম সাহেব আমাকে বললেন, “জাইয়ে ডাক-সাব। আপকা প্রোবলেম সোল্‌ভ্‌ হো গিয়া। আগে অ্যায়সা হোনে সে আপ সিধা মুঝে ফোন কিজিয়েগা। ম্যায় তো হুঁ হি আপলোগকা সেবা কে লিয়ে।” বলে আমিরকে বললেন, “চলো, ভাই। কুছ চায়-ওয়ায় তো পিলাও।”


সেন্ট্রাল ইনস্টিটিউটে একটা সময় ছিল যখন রোগী পালালে পাগলা ঘণ্টা বাজত। পরবর্তীকালে ঘণ্টার জায়গায় এসেছিল সাইরেন। আমি যতদিনে ওখানে পৌঁছেছি, ততদিনে ঘণ্টা, সাইরেন কিছুই বাজত না। রোগী পালাত যত নিঃশব্দে, তার হারিয়ে যাওয়ার রিপোর্ট, তাকে খোঁজা, সবই হত ততই নিঃশব্দে। কিন্তু আগেকার লোকের মুখে শুনেছি তাঁদের অভিজ্ঞতা। তখন ঘণ্টা, বা সাইরেন বাজলে যে যেখানে আছে জড়ো হত হাসপাতালে। ডাক্তার, সাইকোলজিস্ট ইত্যাদি হোয়াইট কলাররা হাসপাতালের ভিতরে খুঁজতেন, আর স্টাফ যেত হাসপাতালের একমাত্র (আলু-পেঁয়াজ আনার) অ্যামবুলেনসে করে (যারা আলু পেঁয়াজের গল্প জানেন না, তাঁদের বলি, দুটো পয়সা খরচা করে ‘কত্তোবড় ক’ বইটা কিনে নিয়ে পড়ুন)। অ্যামবুলেনস যেত শুধু দুটো জায়গায়। এক নম্বর রেল স্টেশন, আর দুই, রাতু রোড বাসস্ট্যান্ড। যখন এই নিয়ম তৈরি হয়েছিল, তখন রাঁচি ছেড়ে যাবার আর কোনও পথ ছিল না। আমি একবার জিজ্ঞেস করেছিলাম, “আজকাল তো মেন রোড, বারিয়াতু থেকেও সব দিকের বাস ছাড়ে – ওগুলো কেন দেখা হয় না? আর রাঁচি শহরে বাড়ি এমন পেশেন্ট পালালেও কি একইভাবে রেলস্টেশন আর বাসস্ট্যান্ডে খোঁজা হয়?”

সদুত্তর পাইনি।

তেমনই কবে, কেন, কী ভাবে হাসপাতালের ভিতরে খোঁজার চল বন্ধ হল, তা আমি জিজ্ঞেস করেও জানতে পারিনি। আমার চার বছরেই বহু পেশেন্ট হারিয়ে গেছে বলে শহর খুঁজে, পুলিশ রিপোর্ট লিখিয়ে পরে হাসপাতালের মধ্যেই পাওয়া গেছে। কোন গাছতলায় শুয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল – গুনতির সময় পাওয়া যায়নি।

যাই হোক, এটা সে গল্প নয়। এটা অরিন্দ্রজিতের গল্প। আমার শোনা-কথা। হিয়ারসে এভিডেনস পেশ করছি আবার। গাছের গল্পের মতো।

সেদিন অনেক রাতে সাইরেন বেজেছিল। শীত তখনও পড়েনি, কিন্তু পুজো শেষ হয়েছে, রাতের আকাশ পরিষ্কার, হিম পড়ছে। পূর্ণিমার রাত ছিল। বেশ ঠাণ্ডা – বিশেষ করে কলকাতার বাঙালি এবং ভুবনেশ্বরের ওড়িয়াদের কাছে তো বটেই। লোকে সোয়েটার, মাফলার, ইত্যাদি জড়িয়ে হাজির হল। জানা গেল যে পুরুষ রোগীদের মধ্যে একজন, তাকে সন্ধের গুনতিতে পাওয়া গেছিল, এমনকি রাত ১১টায় যখন ওয়ার্ড-বয় বিছানায় টর্চ মেরে মেরে গুনেছিল, তখনও ঘুমোচ্ছিল। কিন্তু রাত ১টার সময় টর্চের আলোয় দেখা যায় যে বিছানায় নেই। ওয়ার্ড-স্টাফ নিয়মমত বাথরুম, ওয়ার্ডের অন্যান্য ঘর এবং আসেপাশের এলাকায় টর্চ নিয়ে খুঁজে না-পেয়ে সাইরেন বাজিয়েছে।

ড্রিলের মতো দল ভাগ করাই থাকত। এক-একটা দলকে পাঁচ ব্যাটারির একটা করে টর্চ ধরিয়ে দেওয়া হল। তারা হাসপাতালের ভেতরে ঢুকে পড়ল খুঁজতে। কিছু লোকের সঙ্গে তাদের নিজেদের তিন, চার, বা পাঁচ ব্যাটারির টর্চ।

হাসপাতালের ভেতরটা বিশাল। ঘুরে ঘুরে নির্দিষ্ট জায়গায় প্রতিটি গাছ, ঝোপ, কালভার্ট, অব্যবহৃত বাড়ির জানলা-ভাঙা ঘরের ভেতরে আলো মেরে মেরে খুঁজতে সময় লাগে।

সৌম্য জুনিয়র পোস্টের অন্যতম সিনিয়র ডাক্তার। অনেকদিন কাজ করছে সি.আই.পি-তে। ওর দল খুঁজে খুঁজে শেষে পৌঁছল মহিলা রোগীদের দিকের শেষ ওয়ার্ডে। চারিদিক খুঁজে ক্ষান্ত দিয়ে তারা ব্লয়লার ওয়ার্ডে সিস্টার্স রুমে ঢুকল। ক্লান্ত ছাত্রদের জন্য সিস্টার জল বসালেন, কফি বানানোর উদ্দেশ্যে। খুঁজিয়েদের দল কফির কাপ হাতে ওয়ার্ডের বাইরে বাগানে এল। পূর্ণিমার চাঁদের আলোয় চারিদিক ধুয়ে যাচ্ছে যেন। ধূমায়িত কফিতে চুমুক দিয়ে সৌম্য সবে বলতে লেগেছে, “এই যে এই রকম পূর্ণিমার রাত্তিরে তিনটের সময় খোলা মাঠে দাঁড়িয়ে ঠাণ্ডায় কফি খাওয়া – এরকম অভিজ্ঞতা রাঁচি না এলে হত?” এমন সময় কেউ একজন হাত তুলে ওকে থামিয়ে দিয়ে বলল, “স্যার, সুনিয়ে...”

সবাই চুপ করে কান খাড়া করল। নৈঃশব্দ। সৌম্য সবে বলতে গেছে, “কেয়া ভাই, কেয়া হুয়া?” এমন সময় ছেলেটা আবার বলল, “ওইঃ...!”

এবারে আরও দু একজন বলল, “হাঁ, হাঁ, ম্যায় ভি সুনা।” সবাই আবার চুপ। খানিক বাদে সবার কানেই এল শব্দটা। একটা অদ্ভুত ক্যাঁচক্যাঁচ! একবার হয়েই থেমে গেল। আরও একটু পরেই আবার, ক্যাঁচক্যাঁচ! সবাই উৎকর্ণ। তার পরের বার শব্দটা হতে সৌম্য প্রায় ফিসফিস করে বলল, “ওয়ার্ড কা পিছে তরফ সে আ রহা হ্যায়।”

নিঃশব্দে সবাই কফির কাপ নামিয়ে রাখল। সৌম্য দুজনকে বলল ওয়ার্ডের ডান দিক দিয়ে ঘুরে যেতে। দুজনকে বলল বাঁ দিক দিয়ে ঘুরে যেতে। এবং নিজে (যেহেতু ও ‘আংরেজোঁ কে জমানে কা জেলর’ ছিল না) আর একটি ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে ওয়ার্ডের ভেতর দিয়ে গিয়ে আস্তে আস্তে পেছনের দরজা খুলল। সবাইকে বলা ছিল, যেই দেখবে ওয়ার্ডের পেছনের দরজা খুলছে, ওমনি আড়াল থেকে বেরিয়ে আসবে।

ঘাপটি মেরে সবাই প্রায় একই সঙ্গে পৌঁছল পিছনের বাগানে। ততক্ষণে ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ বেড়ে গেছে বহু পরিমাণ। সবাই ছুটে একসঙ্গে বাগানে পৌঁছে থমকে দাঁড়াল।

রোগীদের জন্য বানানো দোলনায় দুলছে অরিন্দ্রজিৎ। সবাইকে একঝলক দেখে নিয়ে বলল, “পূর্ণিমার রাত্তিরে তিনটের সময় কফি খেতে খেতে শীতের আমেজে দোলনায় দোলা – আহা, রাঁচি না এলে কোনও দিন এই আনন্দ উপভোগ করতাম?”


এই রকম গল্প অন্য শহরে হতে পারে? অন্য হাসপাতালে? কেউ বলতে পারবে? পারলে পয়সা ফেরত! রাঁচি ইউনিভার্সিটি থেকে একজন ডাক্তার ডার্মাটলজি (চর্মরোগ) বিষয়ে এম.ডি. পাশ করে যখন সার্টিফিকেট আনতে গেলেন, দেখলেন লেখা আছে – এম.ডি. জেনারেল মেডিসিন। ক্লার্ককে বললেন, “আরে, আপ তো মুঝে এম.ডি. জেন্‌রল মেডিসিন কা সার্টিফিকেট দিয়ে হো। ম্যায় তো ডারম্যাট কিয়া।”

সার্টিফিকেটটা আড়চোখে দেখে নিয়ে নির্বিকার, ভাবলেশহীন কণ্ঠে ক্লার্ক সসম্ভ্রমে খেঁকিয়ে উঠে বলেছিল, “তো? প্রাব্লেম কেয়া হ্যায়? আচ্ছা হী তো দিয়া হ্যায়, না? জেন্‌রল্ মেড্‌সিন ইস্‌কিন্‌ সে কুছ খরাব হ্যায় কেয়া?”





উড়ন্ত টেরোড্যাকটিল

দিল্লির কাকু (বাবার পিসতুতো ভাই) ছিলেন বিখ্যাত কমার্শিয়াল আর্টিস্ট। বেড়াতে গিয়ে এক সন্ধ্যায় গেলাম ওদের বাড়ি। দেখলাম কাকু-কাকিমা বেশ সাহেবি মেজাজের লোক। অবাঙালি কাকীমার ধারণা আমরা বাংলা ছাড়া কোনও ভাষাই বুঝি না, কিন্তু সে ভুল ভাঙার পরেও বিশেষ কথা বললেন না। কাকু বাবাকে বললেন, “তোমার ছেলেদুটো বেশ ছোটো। আমাদের আবার বাচ্চা-টাচ্চা পোষায় না। তাই আমরা চাইল্ড-লেস। তা যা হোক, তোমরা দু’জন (আমাকে আর ভাইকে উদ্দেশ্য করে) এই ঘরে এসে চুপ করে ওই সোফায় বসো। আর এই বইয়ের তাক থেকে যেকোনও বই নিয়ে পড়তে পার। কিন্তু এই তাক ছাড়া অন্য কোনও বইয়ে হাত দেবে না, আর ছুটোছুটি, হুড়োহুড়ি, গড়াগড়ি করবে না।”

আমি ক্লাস নাইন, ভাই ফোর। দুজনের কারোরই ছুটোছুটি, হুড়োহুড়ি, গড়াগড়ির বয়স নেই। তাই যথেষ্ট অপমানিত হয়ে দু’জন বসলাম চুপচাপ।

এটা সেটা পড়ছি – যে তাকটা দেখানো হয়েছে, তাতে প্রায় সব বই-ই কফি টেবল বুক – অর্থাৎ বড়ো-বড়ো, অনেক ছবি দেওয়া, কিন্তু লেখা কম, তাই শেষ হতে সময় নেয় সামান্য। দু-চারটে বই উলটে হঠাৎ দেখি একটা বই রয়েছে হাতের লেখার ওপর। কেন হাতে নিয়েছিলাম জানি না, কিন্তু আ বুক দ্যাট চেঞ্জড ইওর লাইফ গোছের একটা বই হাতে পেয়ে গেলাম।

অনেক কিছু পড়েছিলাম, তার প্রায় কিছুই মনে নেই। শুধু দুটো কথা মনে আছে, তার মধ্যে একটা আমার জীবনে এখনও কোনও প্রভাব ফেলেনি তাই সেটা আপাতত থাক – আর অন্যটা হল এই যে বই পড়ে শিখলাম যে যার হাতের লেখা যত পাঠ্য, তার ব্যক্তিত্ব ততই বিকশিত। অপাঠ্য হস্তাক্ষর অপরিণত ব্যক্তিত্বের লক্ষণ।

অপরিণত ব্যক্তিত্ব! সব্বোনাশ!

মনে আছে খানিকক্ষণ ভেবেছিলাম : ব্যক্তিত্ব কী করে পরিণত করতে হয় তো জানি না, কিন্তু হাতের লেখাটা তো নিজের চেষ্টায় ভালো করতে পারি – করেই দেখি না কী হয়?

ওই পরিবর্তিত হাতের লেখাটাই এখনও চলছে। ব্যক্তিত্বের কথা জানি না।

ওই সময়েরই কথা – কলকাতায় টেবিল টেনিস-এর বিশ্ব-চ্যাম্পিয়নশিপ হচ্ছে। তখনই নেতাজী ইন্ডোর স্টেডিয়াম তৈরি হয়েছিল। নানা দেশের খেলোয়াড়রা এসেছেন, গ্র্যাণ্ড আর পার্ক এই দুই হোটেলেই তাদের ঠাঁই, লোকে ভিড় করে দর্শন করতে যাচ্ছে। আমার প্রিয় পাড়ার দাদা, সে কোনও সময়ে বেলজিয়ান না জার্মান ভাষা শিখেছিল, সেই জন্য দূতাবাস থেকে তাকে চিঠি দিয়ে গেছে দোভাষীর কাজ করার জন্য। সুমনদা এসে বলল, “শোন, আমাকে ইস্তেবান জনিয়ার-এর দোভাষীর কাজ দিয়েছে। অটোগ্রাফ চাই?”

টেবিল টেনিসে কোনও বিশেষ ইন্টারেস্টই নেই, জনিয়ার কে তখনও জানি না (চ্যাম্পিয়ন হবার পর জেনেছিলাম অবশ্য), তবু, বিদেশি খেলোয়ারের সই পেলে তো বন্ধুদের অন্তত চমকানো যাবে! বিশেষ করে তখন বেঙ্গল সাব-জুনিয়র টেবিল টেনিস খেলোয়ারদের নধ্যে ১ এবং ২ নং দুজনেই আমাদের ক্লাসে পড়ে – তাদের তো তাক লেগেই যাবে। বললাম, “সুমনদা, নিশ্চয়ই – প্লিজ নিয়ে এসো।”

সুমনদা বলল, “না, তা হবে না। কারণ আমাদের মধ্যে অনেকেই ভাইকে দেব, বোনকে দেব বলে অনেক অনেক অটোগ্রাফ নিয়েছে, নিয়ে বিক্রি করেছে – তাই নিয়ম হয়েছে আমি যদি ভাইকে দিতে চাই, তাহলে তাকে নিয়ে যেতে হবে এবং দিনে একজনের বেশি নয়। এখনও অনেকদিন সময় আছে, একদিন গেলেই হল।

দরখাস্ত করলাম মায়ের দরবারে – মা ফরোয়ার্ড করল বাবার কোর্টে – কোনও হিয়ারিং হল না , আবেদন নাকচ হয়ে গেল।

আজকের যুগের মানুষদের জানিয়ে রাখি যে নাকচ হওয়ার পরে আমাদের সময়ে কৈফয়ত চাওয়া তো দূরের কথা, অ্যাপিল পর্যন্ত করা যেত না। তবু কাঁও মাঁও করলাম মায়ের কাছে ক’দিন – কোনও লাভই হল না। শুনতে পেলাম, অঙ্কে গোল্লা পাওয়া সত্ত্বেও কী করে টেবিল টেনিস খেলোয়াড়ের সই চাইবার সহস হল তা নাকি আমাকেই বুঝিয়ে বলতে হবে। মনমরা হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি, এমন সময়ে একদিন বাবার মেসোমশাই এসেছেন বেড়তে। দূর থেকে আমাকে দেখে মাকে জিজ্ঞেস করেছেন কী হয়েছে? মা বলেছে, তখন উনি হাঁক পেড়ে আমায় ডেকেছেন। আমি বাধ্য ছেলের মতো গিয়েছি, উনি বলেছেন, “--------রে অটোগ্রাফ না পেয়ে এত দুঃখ করছিস কেন? দেখবি যখন বড়ো হবি তখন কত লোকে তোরই অটোগ্রাফ নেবার জন্য ছুটে ছুটে আসবে।”

বাবা বলল, “হুঁঃ,” আর আমি জ্ঞানার্জন করে নিজের ঘরের দিকে ফিরে আসছি, শুনতে পেলাম মেসোদাদু খুব হাসছেন।

হাড়পিত্তি জ্বলে গেল। ভাবলাম, দাঁড়াও দেখাচ্ছি, যখন সত্যিই লোকে সই চাইবে তখন বুঝবে মজা।

ভেবে খুব করে কাগজ কলম নিয়ে একটা সই মকশো করলাম – খেলাধুলায় কাঁচকলা হবে, কিন্তু সিনেমা স্টার হলে বা নোবেল প্রাইজ পেলে বা ওই গোছের একটা কিছু করলে যদি লোকে সই চায়, তাহলে সোনার নিবওয়ালা পেন বের করে এমনভাবে সই করব যে লোকের তাক লেগে যাবে।

ওই সইটাই এখনও করি – যদিও এখনও সই-ই করি – অটোগ্রাফ দিইনি কখনও।

পরে দেখেছি লোকে যত না আমার হাতের লেখা নিয়ে কিছু বলে, তার চেয়ে বেশি রিঅ্যাক্ট করে সই দেখে। আমার হাতের লেখা নাকি যতই পাঠ্য, সই নাকি ততই অপাঠ্য। কলেজে পড়াকালীন হিংসুটে সুনয়ন বলেছিল উড়ন্ত টেরোড্যাকটিল – কী রকম করে নামটা টিঁকে গেছিল। আমি লোককে কিছুতেই বোঝাতে পারতাম না, দেখ, তাকিয়ে দেখ, , এন, আর, ইউ, ডি, ডি সব অক্ষরগুলো পরিস্কার পড়া যাচ্ছে। নামটা লম্বা বলে তোদের ওরকম লাগে – তা কে কার কথা শোনে! বলে, - তোমার নামের দুটো আর পদবির একটা – তিনটে ডি তিনরকম। কোনটা এন, আর কোনটা আই, বোঝা দায়! আইয়ের ফুটকিটা আবার কখনও এইচ-এর ওপরে ... মোদ্দা কথা অপাঠ্য!

কলেজ যখন প্রায় শেষ, তখন একদিন সুনয়ন এসে বলল, “শোনো, দাড়ি, তোমাকে আমার একটা উপকার করে দিতে হবে। আমাত মামাতো দাদা আমার জ্যাঠতুতো দিদির সঙ্গে প্রেম করছে। বিয়ে করতে চায়।”

আমি বললাম, “তো সমস্যাটা কী?”

সুনয়ন বলল, “বাড়ি থেকে বিয়েতে মত নেই।”

বললাম, “আমি কী করব? আমি তো কাউকেই চিনি না। তোর বাবাও তো আমাকে দেখলে ভুরু কুঁচকে থাকেন।”

সুনয়ন হেসে বলল, “না, না তোমাকে ঘটকালি করতে হবে না। ওরা বাড়িতে না জানিয়ে বিয়েটা করে রাখতে চায়। রেজিস্ট্রি। তার জন্য সই করতে যেতে হবে তোমাকে। উইটনেস।”

তোর বাবা বন্দুক নিয়ে তেড়ে আসবেন না তো?”

সুনয়নের আশ্বাস পেয়ে বললাম, ঠিক আছে, যাব।

নির্দিষ্ট দিনে সুনয়ন, নীলকমল আর আমি রওয়ানা দিলাম মেডিক্যাল কলেজ থেকে প্রাচী সিনেমা হলের দিকে। সেখানে তখন কলকাতার অন্যতম নামজাদা ম্যারেজ রিজিস্ট্রি অফিস। ভীষণ রাশভারি গম্ভীর মহিলা রেজিস্ট্রার। আমরা ঢুকলাম, আড়চখে তাকিয়ে পাত্র-পাত্রীর নাম জেনে বললেন, “ওইখানে বসুন।” আমরা চোরের মতো জড়োসড়ো হয়ে বসলাম, উনি পর পর নাম ডেকে বিয়ের কাজ চালিয়ে যেতে থাকলেন – আমরা ভয়ে ভয়ে দেখতে থাকলাম কেমন হেডমিস্ট্রেসের মতো ধমক দিয়ে, বকে, বর বউ, মায় তাদের মা-বাবাকে পর্যন্ত নাজেহাল করে তিনি কীভাবে বিয়ে দিচ্ছেন।

বসে বসে যে কর্মপদ্ধতি দেখলাম তা হল এই : প্রথমে তিনি পাত্র-পাত্রীকে ডাকেন। পাত্রর দিকে আঙুল তুলে পাত্রীকে জিজ্ঞেস করেন তিনি কি এই ব্যক্তিকে বিয়ে করতে রাজি? তারপর পাত্রকেও একই প্রশ্ন করেন পাত্রীকে দেখিয়ে। মিঞা-বিবি রাজি হলে তিনি বলেন, “আপনি সই করুন,” বলে পাত্রকে সই করান, তারপরে পাত্রীকে, তারপরে বলেন, “গ্রুমের উইটনেস কে? ব্রাইডের তরফে কে সই করবেন?” এবং সব শেষে নিউট্রাল উইটনেসকে ডাকেন। তারপরে এক এক করে পাত্র ও পাত্রীকে বলেন, “বলুন ঈশ্বর, ভারতীয় সংবিধান এবং এই তিনজনকে সাক্ষী রেখে, আমি শ্রী ওমুক, শ্রীমতী তমুককে বিয়ে করলাম।” পুরোটাই হয় সবাইকে প্রচণ্ড বকে-ধমকে।

গোটা ক’য়েক বিয়ে হবার পরে আমাদের পালা। আমি ভয় পাচ্ছিলাম যে উনি বুঝি আমাদের দেখে বলবেন, “এ কী! মা, বাবা, গার্জেন নেই কেন? যাও যাও, গার্জেন ডেকে আনো।” বলে বের করে দেবেন। কিন্তু সে সব হল না। তখন আর কোনও বাকি বিয়ে নেই – শুধু আমরা, তার আগের দল বেরিয়ে যাচ্ছে, উনি পাত্র-পাত্রী ডেকে আমাদের দিকে খানিকক্ষণ ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে বললেন, “, আপনাদের তো আবার মা বাবার অমতে বিয়ে।” বলে প্রায় মোলায়েম গলায় বললেন, “আসুন, আসুন, সামনে আসুন।”

আমরা গেলাম, ওনার সামনের চেয়ারে বসল বর কণে, আমরা পিছনে সারি বেঁধে দাঁড়ালাম। পাত্র-পাত্রী প্রথামত সই করার পর উনি রেজিস্টারটা ওনার ডান দিকে সরিয়ে বললেন, “আপনারা তো সবাই বন্ধু? দুজনেরই বন্ধু?”

একজন কাজিন। দুজনেরই কাজিন।

বেশ, তবে আপনি আসুন,” বলে সুনয়নকে ডেকে প্রথম উইটনেস-এ সই করতে বললেন। তারপরেই দাঁড়িয়েছিল নীলকমল, তাই ও করল দ্বিতীয় সই, আর শেষ সই করলাম আমি, নিউট্রাল আমি, নিউট্রাল উইটনেস হয়ে।

ফরমাল এবং অফিশিয়াল ওরকম জায়গায় সই করার সুযোগ তো বেশি পাইনি কখনও, তাই সোনার নিবওলা কলম না হলেও, তখনকার চার টাকার দারুণ ভালো ডট পেন বের করে ফস্‌ করে অনিরুদ্ধ-A -টা টেনেছি আর সুনয়নের দাদা ফিসফিস করে বলেছে, “আরিব্বাস!”

ততক্ষণে আমার পুরো সইটা শেষ, সুনয়ন একটু খিক খিক করে হেসে ততোধিক চাপা স্বরে বলল, “এই হল উড়ন্ত টেরোড্যাকটিল!”

এবার শপথ নেবার পালা, রেজিস্ট্রার বললেন, “এবার আপনারা উঠে দাঁড়ান।”

আমরা কিন্তু ঈশ্বরের নামে শপথ নেব না,” সুনয়নের দাদা বলল।

রেজিস্ট্রার এমন অনুরোধ আগে শোনেননি বলতে পারব না, কিন্তু মুখ দেখে মনে হল ফেটে পড়বেন।

কিছু বলার আগেই সুনয়নের দাদা বলতে থাকল, “ঈশ্বরের ওপরে বিশ্বাস চলে গেছে বলেই বন্ধুদের নিয়ে বিয়ে করতে এসেছি। আমি আপনাদের সাক্ষী মানতে রাজি আছি, ঈশ্বরকে নয়।”

ফেটে পড়ো-পড়ো মুখে গঙ্গাজলের ছিটে পড়ল। একগাল হেসে উনি বললেন, “তা হয় না। আমি কে? আপনি ভারতীয় সংবিধানকে সাক্ষী রাখতে রাজি তো? আফটারঅল, আমি তো সংবিধানের রেপ্রেজেন্টেটিভ।”

তাতে কারোর আপত্তি নেই, রেজিস্টারটা টেনে নিয়ে রেজিস্ট্রার বলতে থাকলেন, বলুন, “আমি অমুক, ভারতীয় সংবিধান, এবং ... এবং ...”

ভুরু কুঁচকে খানিকক্ষণ সুনয়নের সইয়ের দিকে তাকিয়ে থেকে মুখ তুলে বললেন, “কী নাম?”

সুনয়ন করুণ সুরে বলল, “সুনয়ন সেন।”

কটমট করে খানিকক্ষণ তাকিয়ে বললেন, “হাতের লেখার কী ছিরি! নিজের নামটাও পড়ার মতো করে লেখা যায় না?”

সুনয়নের মুখ ব্যাজার, নীলকমল বিড়বিড় করে বলল, “দাড়ির সইয়ের বেলায় কি বলবে কে জানে!”

রেজিস্ট্রার আবার শুরু করলেন, “হ্যাঁ, বলুন, আমি ওমুক, ভারতীয় সংবিধান এবং শ্রী সুনয়ন সেন, এবং ... এবং ...”

সুনয়ন খিক খিক করে হাসতে শুরু করেছে, নীলকমলের মুখ লাল হচ্ছে, রেজিস্ট্রার আবার মুখ তুললেন, “এ তো দেখছি আরও এক কাঠি ওপরে। কী নাম?”

মুখ কালো করে নীলকমল বলল, “নীলকমল পাত্র।”

আপনারা না ডাক্তার? এই রকম যদি হাতের লেখা হয়, রোগী তো ওষুধের জায়গায় বিষ কিনে খাবে!” বলে আবার খাতার দিকে তাকিয়েছেন, সুনয়ন বলছে, “---ই বা-------, উড়ন্ত টেরোড্যাকটিল।”

বলুন,” বলে উনি আবার বয়ান শুরু করলে, আর সুনয়ন কনুই দিয়ে নীলকমলের পাঁজরে, আর নীলকমল কনুই দিয়ে আমার পাঁজরে খোঁচা মারতে শুরু করল, “আমি ওমুক, ভারতীয় সংবিধান এবং শ্রী সুনয়ন সেন এবং শ্রী নীলকমল পাত্র এবং শ্রী অনিরুদ্ধ দেবের সামনে তমুককে স্ব-ইচ্ছায়, সজ্ঞানে বিবাহ করছি।”

এরপর কিছু বোঝার আগে বিয়ে শেষ এবং সার্টিফিকেট হাতে আমরা শেয়ালদার রাস্তায়।

সবার আগে মুখ খুলল নীলকমল। “শা..., এটা কী হল মাইরি? আমাদের নাম পড়া গেল না, আর দাড়ির উড়ন্ত টেরোড্যাকটিলটা একবারেই পড়ে ফেলল! দাড়ি মাইরি তুমি নিশ্চয়ই আরও বিয়েতে উইটনেস ছিলে। ব্যাটা প্রফেসনাল উইটনেস। টাকা খেয়ে সই করে যায় এখানে এসে...”

মিনমিন করে বলার চেষ্টা করলাম, আরে, সইটা দেখলেই বোঝা যায়, -এন-আই-আর-ইউ... কে শোনে কার কথা!





টরবটরপট

মেডিক্যাল কলেজের নানা হস্টেলের কোন একটার পাশের বাড়িতে কোন এক (বাঙালি) মা, তার ছেলেকে খুব মেরে ধরে পড়াতেন। সেই মারধর এবং তৎপরবর্তী কান্নাকাটির শব্দে হস্টেলের উদীয়মান ডাক্তাররা নিজেদের পড়া করতে পারতেন না বলে বিরক্ত হতেন, কিন্তু রোজ সন্ধ্যায় এই মারামারিটার জন্য অপেক্ষাও করতেন। সবচেয়ে মজা ছিল, মা পড়াতেন ইংরিজি বর্ণমালা – কিন্তু তাতেই সারা সন্ধে কেটে যেত। তারও চেয়ে মজা ছিল এই, যে পড়া হত যেটা সেটা পাশের বাড়ি থেকে শোনাত এমনঃ ‘এ-বি-সি-ডি... অটর্‌ বটর্‌ পট্‌!” এই অটর্‌ বটর্‌ পট্‌ যে ই, এফ, জি, এইচ... ইত্যাদি, তার সম্বন্ধে কোন সন্দেহ নেই, কিন্তু কী করলে ই, এফ ইত্যাদিকে অটর্‌ বটর্‌ পট্‌ বানানো যেতে পারে তা আমরা বুঝতাম না। হস্টেলবাসীদের কথায় যারা সন্দেহ করতেন, তাঁরা নিজেরা স্বকর্ণে শুনে বিবাদ ভঞ্জন করতে গিয়ে নিজেরাই ‘অটর্‌ বটর্‌ পট্‌ - অটর্‌ বটর্‌ পট্‌’ আওড়াতে আওড়াতে ফিরে আসতেন। শেষ দিন অবধি আমরা এ রহস্য সমাধান করতে পারিনি।

হস্টেলের ছেলেরা একদিন সাংঘাতিক বিরক্ত হয়ে গিয়েছে পাশের বাড়ির মারধরের ফলে। সামনে কোন পরীক্ষা-টরিক্ষা ছিল না নিশ্চয়ই, তাই সকলে মিলে ঠিক করেছে, যাই বাইরে খেয়ে আসি, হস্টেলের মেস-এ খাব না। চার পাঁচ জন মিলে গিয়েছে সামনের কুমার্স ক্যান্টিনে খেতে, খেয়ে দেয়ে ফুর্তির প্রাণ গড়ের মাঠ করে বেড়িয়েছে, -বি-সি-ডি- অটর্‌ বটর্‌ পট্‌ আওড়াতে আওড়াতে। বেরিয়েই দেখে রাস্তার ধারে মোটর সাইকেল দাঁড় করিয়ে এক জন সার্জেন্ট সিগারেটের দোকানে গিয়েছেন। দিনের শেষ, ক্লান্ত সার্জেন্ট সবে সিগারেট ধরিয়ে বাইকে ফিরেছেন, এমন সময় অভিজিৎ - ওর মাথাতেই সবচেয়ে তাড়াতাড়ি সিম্পল বদবুদ্ধিগুলো আসত – ধড়ফড় করে গিয়ে জানতে চেয়েছে, “আচ্ছা দাদা, মিছিলটা কি চলে গিয়েছে?”

রাত্তির প্রায় সাড়ে ন’টা – এ হেন সময়ে এমন বিদঘুটে প্রশ্নে হকচকিয়ে গিয়ে পুলিশ বলল, “কিসের মিছিল? এত রাতে?”

অভিজিৎ একেবারেই সিরিয়াস মুখ করে বলল, “শ্যামবাজার থেকে আসছে, এসপ্ল্যানেড ঈস্ট যাবে,” হাত উলটে ঘড়ি দেখে (উনিশশো আশির দশক। লোকে কব্জিতেই হাতঘড়ি পরত) বলল, “কী মুশকিল বলুন তো! বেরিয়ে গেলে এখন কোন দিকে দৌড়ব?”

স্বাভাবিক ভাবেই পুলিশের কাছে অত রাতে কোন মিছিলের খবর নেই। তাই সার্জেন্ট বললেন, “কাদের মিছিল?”

অম্লানবদনে অভিজিৎ, একেবারে না হেসে বলল, “অটর্‌ বটর্‌ পট্‌।”

হতভম্ব সার্জেন্ট বললেন, “কীঃ?”

অভিজিৎ বলল, “দেখেননি কখনও? ওদের স্লোগান হল, ‘-বি-সি-ডি-অটর্‌-বটর্‌-পট্‌।”

এমনটা কতক্ষণ চলত জানি না, তবে এখানে অভিজিতের সঙ্গীদের হাসি চাপা দুষ্কর হয়ে পড়ল। সার্জেন্ট খুব দুঃখের সঙ্গে বললেন, “আপনারা পড়াশোনা জানা ভদ্র ঘরের ছেলে। আমাদের সঙ্গে এমন ইয়ার্কি মেরে কী লাভ হয় আপনাদের?” বলে মোটরসাইকেল চালিয়ে চলে গেলেন।