পাহাড়ি উপত্যকার গ্রামটা গরিব। তিন দিকে আকাশছোঁয়া পাহাড়, আর এক দিকে গভীর খাই। একটা নালা মাঝখান দিয়ে বয়ে গিয়েছে।
নালার দু দিকে এক চিলতে করে সবুজ জমি। এখানে লোক চাষ করে। শীতের শেষে তারা ফল গাছের চারা লাগায়। সারা বছর নালা থেকে জল এনে সিঁচোয়। যখন আবার শীত আসব আসব করছে, তখন পাকা ফল তুলে আনে। ব্যবসায়ীরা ফল কিনে নিয়ে যায়। বদলে দিয়ে যায় আটা, আলু, নুন আর মাংস। তার পরেই পাহাড় থেকে নেমে আসে কনকনে ঠাণ্ডা হাওয়া, গাছের পাতা হলুদ হয়ে খসে পড়ে, নালার জল জমে যায়, বরফের আস্তরণে ঢাকা পড়ে যায় গোটা উপত্যকা।
গাঁয়ের মানুষ গরিব। সারা বছর খেটে খেটে সামান্য ফল ফলায়। সালেম গ্রামের সবচেয়ে গরিব চাষি। ওর জমি কম, তাতেই ওর চার ছেলে আর বউয়ের চলে। বড়ো তিন ছেলে সারা দিন সালেমকে সাহায্য করে। ছোটো ছেলেটার বয়স পাঁচ, কিন্তু এখনও কথা বলতে পারে না, নিজের নাম জানে না। বাবা, মা, দাদা, চেনে না। কিন্তু ওর মিষ্টি হাসিটা দেখে মন ভরে না এমন মানুষ নেই সে গাঁয়ে। ও সালেমের নয়নের মণি
এমন ছিল না। যখন ওর বয়েস দু’বছর, তখন ওর ভয়ঙ্কর অসুখ হয়েছিল। অজ্ঞান হয়ে হাতে পায়ে খিঁচুনি আসত। গাঁয়ের ডাক্তার চিকিৎসা করেছিল কিছু দিন। সালেমের গাঁয়ে মানুষ পয়সা দিয়ে চিকিৎসা করাতে পারে না। সালেম মাংস দিতে চেয়েছিল, কিংবা আটা। ডাক্তার নেয়নি। মাথা নেড়েছিল। বলেছিল, “এর চিকিৎসা জানি না। শহরে নিয়ে যাও।”
সালেমের মাথায় বাজ পড়েছিল। শহর কোথায় তাই কেউ জানে না! ব্যবসায়ীরা বলেছিল, “নিয়ে যেতে পারি, কিন্তু থাকবে কোথায়? খাবে কী? চিকিৎসার খরচ জানো?”
যাওয়া হয়নি। অসুখটাও আস্তে আস্তে কমে এসেছিল। আর অজ্ঞান হয় না। কিন্তু একটা নতুন অসুখ এল। ঘুমের মধ্যে চলে যায় খেতের দিকে। হামা দেয় নালার পাশে। শীতকালে সকালে দেখা যায় বরফের মধ্যেই ঘুমিয়ে আছে। লোকে বলল, “দরজায় তালা লাগিয়ে দিও। নইলে কবে নালায় ডুবে যাবে তোমার ছেলে।”
ঘরে দর্মার দরজা, তাতে আবার তালা! বাধ্য হয়ে সালেম একটা উপায় করল। বাছুরের গলার ছোট্ট ঘণ্টাটা বেঁধে দিল ছেলের গলায়। এখন দিনে রাতে যেখানেই যাক, ঘুঙুরের মতো ঘণ্টাটা টুং টাং করে বাজে। ছেলেটা মজা পায়। মাথা ঝাঁকিয়ে ঘণ্টা বাজানোর চেষ্টা করে খালি। গাঁয়ের লোক ওর নাম দিয়েছে ঘুংরু।
রাত বিরেতে যখনই ছেলে উঠে বেরিয়ে যায়, ঘণ্টার শব্দে সালেমের ঘুম ভাঙে। সঙ্গে সঙ্গে ফিরিয়ে আনা যায়। সালেম ওর পাশেই শোয়। সকালে ঘুম থেকে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে ঘুংরু ঘুম ভেঙে এক গাল হাসে। সালেম ওকে কোলে নিয়ে বাইরে আসে। দুজনে দাওয়ায় বসে কত কী খেলে। তার পরে সালেম কাজে যায়, ঘুংরু রয়ে যায় মায়ের সঙ্গে।
২
সে বছর, ফল পাড়া তখনও শেষ হয়নি, ব্যবসায়ীরা তখনও দরদাম করছে। এক দিন হঠাৎ দুপুর বেলা হালকা দুপ্-দুপ্ শব্দে যেন মাটি কেঁপে উঠল। সবাই এদিক ওদিক দেখছে – ভূমিকম্প না কি!
কিন্তু ভূমিকম্পের মতো নয়। থামছেও না। দুপ দুপ করে মাটি কেঁপেই চলেছে!
গাঁয়ের লোক মুখ তাকাতাকি আরম্ভ করল। এই পাহাড়ে, আসে-পাশের পাহাড়ে এমন কোনও মানুষ নেই যে ছোটোবেলা থেকে এই গল্প শুনে বড়ো হয়নি। যে যা করছিল, ফেলে রেখে দৌড়ল বাড়ির দিকে। মাঠ থেকে চাষি, নালার পাড় থেকে বাড়ির মেয়েরা, খেলা ছেড়ে বাচ্চারা ছুটল বাড়ির দিকে।
ব্যবসায়ীরাও এই মাটি কাঁপা চেনে! তারাও ত্রস্ত পায়ে ফিরে যাচ্ছে নিজেদের গাড়ির দিকে। পড়ে রইল কেনাকাটা, তাঁবু-কানাত, পড়ে রইল কারও চটি-জুতোও।
নতুনরা পুরনোদের পেছনে ছুটতে ছুটতে জিজ্ঞেস করল, “কী হলো, দাদা? হঠাৎ সব ছেড়ে কোথায় যাচ্ছ?”
হাঁপাতে হাঁপাতে বুড়ো ব্যবসায়ী বলল, “আপনি বাঁচলে বাপের নাম! পাহাড় পেরিয়ে দানব আসছে। এখন এখানে থাকা নয়।”
হতভম্ব নতুন ব্যবসায়ীও ছুটলো। যেতে যেতে শুনল, দানব আসে পাহাড় পেরিয়ে কোন দূরের দেশ থেকে। কবে আসে, কত দিন পরে আসে, কেউ জানে না। কিন্তু আসে যখন, তখন ওর দুপ দাপ পায়ের শব্দে মাটি কাঁপে। কোনও একটা গ্রামে এসে হাজির হয়। সেখান থেকে কাউকে না কাউকে তুলে নিয়ে যায়। যে যায়, সে ফিরে আসে না।
ব্যবসায়ীরা পড়ি মরি করে ছুটল পাহাড় থেকে সমতলের দিকে।
ব্যবসায়ীরা অবশ্য পুরোটা জানত না। এ সব অঞ্চলে কখনও কখনও দৈত্য মানুষ ধরে নিয়ে যায় বটে, কিন্তু সে সবসময়েই ছোটো বাচ্চা। কখনোই বড়ো মানুষ নয়।
সে দিন, সে গাঁয়েও সবাই লুকিয়ে পড়ল। ক্রমে পায়ের দুপ দুপ শব্দ আর মাটির কাঁপুনি দুই-ই বাড়তে লাগল। সন্ধ্যা নাগাদ শব্দ থামল। তার পর দুপ্ করে সজোরে পায়ের শব্দ হল দু’বার। “পাহাড় ডিঙিয়ে এদিকে এল,” ফিসফিসিয়ে বলল সালেম। ওর বউ চোখ কপালে তুলে বলল, “এত বড়ো দৈত্য!”
পায়ের শব্দ আরও কাছে এগিয়ে এসে আবার থামল। দৈত্যর গলায় চারদিক গম গম করে উঠল। দৈত্য বলল, “লুকিয়েই থাকলেও আমার হাত থেকে বাঁচতে পারবে না। একজন বাচ্চাকে নিয়ে যাব। কাল সারা দিন রইল সময়। ফিরব পরশু ভোরে। তখন যেন কেউ আমার জন্য অপেক্ষা করে বাড়ির বাইরে। নইলে আমি ছাদ উপড়ে ফেলে একজন কাউকে নিয়ে যাব।”
দৈত্যের পায়ের শব্দ মিলিয়ে গেল। সব চুপচাপ।
পরদিন সকালে অসীম উত্তেজনা। লোকে দিনের আলোয় ভয়ে ভয়ে বেরিয়েছে। জায়গায় জায়গায়, জটলা করে, ফুস-ফুস গুজগুজ করতে লেগেছে।
বিকেল বেলা সালেমরা ঘরের দরজা দেবার তোড়জোড় করছে, এমন সময় গাঁয়ের লোকজন জটলা বাঁধাল সালেমের বাড়িতে। বলল, “আমরা অনেক ভাবলাম। দৈত্য একজনকে নিয়ে যাবেই। সবচেয়ে ভালো হয় যদি ঘুংরুকে দিয়ে দাও। দেখো, ঘুংরু কোনও দিন কথা বলতে পারবে না, খেতে কাজ করতে পারবে না। ওর অনেক অসুখ। ওকে দৈত্য যদি খেয়েই নেয়, তাহলে কার কী ক্ষতি?”
গরিব সালেম শুধু মাথা নাড়ল, ‘না’, ঘুংরুকে জড়িয়ে ধরল। বোকা ছেলেটা বাবার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি হাসল। দু হাতে জড়িয়ে ধরল সালেমের গলা।
সালেম বউ ছেলেদের বলল, “তোমাদেরও কি ওই মত? ঘুংরুকে দিয়ে দেব?”
কেউ কিছু বলল না।
রাত বাড়ে। সালেমের ঘরে কারও ঘুম নেই। শুধু বোকা ঘুংরু ঘুমিয়ে কাদা। সালেমের বউ ছেলেরা বোঝায় – কী করবে ঘুংরুকে রেখে? কাউকে তো যেতেই হবে। দৈত্য যদি অন্য তিন ছেলের এক জনকে নিয়ে যায়? যদি নিয়ে যায় সালেমের বউকে? সালেম আঁকড়ে ধরে ঘুমন্ত ঘুংরুকে। বড়ো ছেলে বলে, “যদি গাঁয়ের অন্য কারওর ছেলেকে নিয়ে যায়? গাঁয়ের লোক তোমাকে বাড়ি ছাড়া করবে। তাড়িয়ে দেবে আমাদের সক্কলকে। কোথায় যাব তখন?”
সালেমের হাত আলগা হয়ে আসে। ছেলেরা ঘুমন্ত ঘুংরুকে সাবধানে কোলে তুলে বাইরে শুইয়ে দিয়ে আসে। একটা বড়ো পাথর দিয়ে দর্মার দরজা আটকে দেয় – ঘুংরুর ঘুম ভাঙলেও যাতে ঘরে ঢুকতে না পারে।
রাত থাকতেই আবার শুরু হয় দুপ দুপ। পায়ের শব্দ কাছে আসে, থামে। ঘুংরুর ঘুম ভেঙে গিয়েছে। ছুটে এসে দরজায় ধাক্কা দিচ্ছে। কান্নার শব্দ দর্মার দরজার আড়ালে। ছোটো ছোটো হাতে ঠেলে পাথর সরিয়ে দরজা খুলতে পারে না। সালেম ফ্যাকাসে মুখে বিড়বিড় করে বলতে থাকে, “মাপ করে দাও, আমায় মাপ করে দাও।” হঠাৎ ঘণ্টাটা বেজে ওঠে সজোরে। ছিলেছেঁড়া ধনুকের মতো উঠে দাঁড়ায় সালেম। ছেলেরা ওকে জাপটে ধরে। ঘণ্টার শব্দ থেমে যায়, দুপ-দুপ পায়ের শব্দ মিলিয়ে যায় দূরে। সব শান্ত, নিস্তব্ধ হয়ে যায় – যেমন হওয়া উচিত রাত্রিশেষে।
পরদিন গ্রামের বাইরে থেকে সালেম ঘুংরুর গলার ঘণ্টাটা কুড়িয়ে এনে রেখে দেয় ঘরের এক কোনায়, যেখানে ও ওর ভগবানকে ডাকে রোজ সকাল সন্ধ্যা।
৩
গ্রামের লোকেরা সালেমের মুখোমুখি হলে আজকাল মাথা নিচু করে চলে যায়। সালেমও কারওর দিকে তাকায় না, খেতের কাজ থেকে ফিরে বসে থাকে ওর কুটিরের বাইরের দাওয়ায়, দূরের পাহাড়চুড়োর দিকে তাকিয়ে।
দিন কাটে, মাস গড়িয়ে বছর যায়, সালেম নিঃশব্দে কারওর দিকে না তাকিয়ে কাজ করে, ফিরে আসে, আর দাওয়ায় বসে পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে থাকে। আজকাল বড্ড বুড়িয়ে গেছে।
এক দিন সালেমের বউ বাড়ি ফিরে দেখল সালেম খেত থেকে ফিরেছে সকাল সকাল। উঠোনে একটা পাথর ভিজিয়ে ওর এক হাত লম্বা চাকুটা শান দিচ্ছে। এই চাকু দিয়ে ও ভেড়া, ছাগল কাটে।
“কী করছ?” জানতে চাইল।
সালেম রা কাড়ল না।
সালেম আর কাজে যায় না। সকাল থেকে কেবল ওর চাকুতে শান দেয়। কারওর কথার কোনও উত্তর দেয় না।
আট দিন পরে সালেম ধার দেওয়া থামিয়ে সাবধানে ধারালো চাকুটা কাপড়ের ফালিতে পেঁচিয়ে রাখল। তার পরে রান্নাঘরে গিয়ে রাতের খাওয়া শেষ করে বউকে বলল, “কাল সকালে আমি যাব। দৈত্যকে মেরে, ঘুংরুকে ফিরিয়ে আনব। চারটে রুটি করে দেবে। নিয়ে যাব।”
হতবাক বউ ছেলেরা বসে রইল, সালেম ঘুমিয়ে পড়ল।
পরদিন বাড়ির সামনে গাঁয়ের লোকের ভীড় – সবাই বলছে, “এমন বোকামি কোরো না। দৈত্য কোথায় থাকে কেউ জানে না। সেখানে মানুষ যেতেই পারে না। পৌঁছবার আগেই মরে যাবে। পৌঁছতে পারলেও, সে দৈত্য কত বড়ো জান? কত সহজে সে পাহাড় ডিঙিয়ে আসে। টান মেরে ছিঁড়ে ফেলবে।”
সালেম বোবা। সাবধানে ধারালো চাকুটা গুছিয়ে কাঁধের ঝোলায় রেখে, বউ ছেলের দিকে তাকিয়ে বলল, “আমি না ফিরলে ভাগাভাগি করে জমি চাষ করবে।”
আস্তে আস্তে বেরিয়ে গেল। গাঁয়ের লোক পেছন পেছন গেল। সালেমের বউ, ছেলেরা বার বার বলল, “ফিরে চলো।” উত্তর দিল না।
পাথুরে পথে চলল সালেম। উপত্যকার শেষের পাহাড় পৌঁছতেই লাগল সারা দিন। গ্রাম থেকে পাহাড় দেখতে কত কাছে। কিন্তু সারা দিনের শেষে ফিরে তাকিয়ে, গ্রামটা দেখতেই পেল না।
বউয়ের দেওয়া রুটি থেকে আধখানা খেল, তার পরে জল খেয়ে ঘুমোতে গেল।
৪
সালেম রোজ সকালে হাঁটতে শুরু করে, সন্ধের সময় থেমে আধখানা রুটি আর জল খেয়ে ঘুমোয়। পরদিন আবার চলে। দেখতে দেখতে রুটি শেষ হল। সালেম পথে গ্রাম দেখলে থামত। বলত, “পাহাড়ের দৈত্য কোন পথে গেছে আমাকে দেখিয়ে দেবে?”
লোক শিউরে উঠত। বলত, “তুমি কি পাগল? কেন যাচ্ছ? জান দৈত্য কত বড়ো? তোমাকে টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে ফেলবে।”
সালেম মাথা নেড়ে বলত, “না। আমার চাকু আছে। আমার ছেলেকে নিয়ে গেছে দৈত্য। আমি চাকু নিয়ে এসেছি। দৈত্যর সঙ্গে লড়াই করে ফিরিয়ে আনব আমার ছেলেকে।”
লোকে বলত, “মরতে যাচ্ছে,” কিন্তু ওদের গ্রাম থেকেও দৈত্য কারওর ছেলে, কারওর মেয়ে, কারওর ভাই-বোনকে নিয়ে গেছে। সালেমের দুঃখ বুঝত। পথ দেখিয়ে দিত। রুটি দিত।
দেখতে দেখতে সব বসতি পার করে এল। এখন শুধু পাহাড়। আরও আরও উঁচু পাহাড়। শীত এসে পড়েছে। হু-হু করে হাওয়া দিচ্ছে – তাতে বরফের টুকরো উড়ে আসছে। সালেম এসে দাঁড়াল একটা বিশাল পাথরের দেওয়ালের সামনে। এরই ওপর দৈত্যের প্রাসাদ, শুনেছে সে।
সালেম রুটির শেষ টুকরোটা খেয়ে রাত কাটাল। পরদিন, ভোর না হতে উঠতে শুরু করল পাথরের দেওয়াল বেয়ে। এতই উঁচু, তার মাথা মেঘের আড়ালে ঢাকা।
কোথাও একটু ধরার জায়গা, কোথাও একটু পা রাখার ফাটল। সালেম উঠছে, আস্তে আস্তে। হাওয়ার ধার বাড়ে। ঝটকা মেরে সালেমকে ফেলে দেয় প্রায়! বড়ো বড়ো ঈগল পাখি শনশন করে উড়ে আসে। নখের আঁচড়ে, পাখার ঝাপটায় ওকে ফেলে দেবার চেষ্টা করে। সালেম থলে থেকে চাকু বের করে ওদের ভয় দেখিয়ে তাড়ায়।
সারা দিনের পরে সালেম পৌঁছল পাহাড়ের ওপরে চাতালে। ঠাণ্ডায়, ক্লান্তিতে শরীর চলছে না। সামনেই দৈত্যের প্রাসাদ। তার বিশাল আকার দেখে সালেমের ভিরমি খাবার অবস্থা! এত্ত বড়ো? এত বড়ো দৈত্যের সামনে ও তো পিঁপড়ের চেয়েও ছোটো।
সাহসে বুক বেঁধে হাতের মুঠো দিয়ে দরজায় ধাক্কা দিল। এক বার, দু বার, তিন বার। কোনও শব্দই হল না। সালেম চেঁচিয়ে বলল, “এই দৈত্য, সাহস থাকে তো দরজা খোল। আমি তোর সঙ্গে যুদ্ধ করতে এসেছি। আমার ছেলেকে আমি ফিরিয়ে নিয়ে যাব।”
দমকা হাওয়া সালেমের কথা উড়িয়ে নিয়ে গেল। কেউ সাড়া দিল না।
এদিক ওদিক অনেক পাথর পড়ে আছে চারিদিকে। দরজায় ছুঁড়ে ছুঁড়ে মারতে লাগল। অল্প শব্দ হতে শুরু হল। সেই সঙ্গে সালেম চেঁচাতে লাগল, “দৈত্য, দরজা খোল। দরজা খোল বলছি। বেরিয়ে আয়।”
হঠাৎ, নিঃশব্দে, দরজা খুলে গেল। সামনে একটা বিশাল চাতাল। অনেক উঁচু ছাদে বিরাট বিরাট ঝাড়লণ্ঠন। আলোয় চারিদিক ঝলমল করছে। কেউ কোত্থাও নেই।
গমগমে একটা গলা বলল, “কে তুমি? এখানে কেন এসেছ?”
সালেম বলল, “দৈত্য, আমার ছেলেকে তুই তুলে এনেছিস। আমি এসেছি তোকে মেরে ঘুংরুকে নিয়ে যাব। বেরিয়ে আয়, যুদ্ধ কর।”
সালেম ভেবেছিল, এই কথা শুনে দৈত্য হাসবে। কিন্তু হাসির শব্দ পেল না। তার বদলে একটা দীর্ঘশ্বাস ভেসে এল। তার পর দৈত্য – দৈত্যই হবে, আর কে – বলল, “তোমার ছেলের নাম ঘুংরু? তাকে আমি নিয়ে এসেছি?”
“হ্যাঁ,” বলল সালেম। “কোথায় তুমি? বেরিয়ে এসো, লড়াই করো।”
কোনও উত্তর এলো না। আঙিনার উলটো দিকের একটা দরজা খুলে গেল। গলা ভেসে এল আবার। “আমার প্রাসাদে অতিথিরা আগে বিশ্রাম করে, খাওয়া দাওয়া করে এবং তার পরে কাজের কথা বলে। ভিতরে এসো। খাও, দাও। তারপরে দেখা যাবে।”
সালেম আঙিনা পেরিয়ে দরজা দিয়ে ঢুকল। এগোতে এগোতে দেখল হাত মুখ ধোবার ব্যবস্থা। হাত মুখ ধুয়ে শেষ দরজা দিয়ে ঢুকে দেখল একটা খাবার ঘর। সেখানে খাবার টেবিলে কত রকম খাবার সাজানো, সালেম তা কোনও দিন খায়নি, দেখেনি, এমনকি নামও জানে না।
গলাটা আবার ভেসে এল। “ভাল করে খেয়ে নাও। রাতে বিশ্রাম করো। কাল কথা হবে।”
সালেম অনেক পথ চলে ক্লান্ত। অনেক দিন শুধু রুটি খেয়ে থেকেছে – খিদেও পেয়েছে। দ্বিরুক্তি না করে বসে পড়ল। খাওয়া শেষ হওয়া মাত্র ঘরের আর একটা দরজা খুলে গেল, সালেম সেই দরজা দিয়ে বেরিয়ে পৌঁছল একটা শোবার ঘরে। মখমলের বিছানা, গালচে পাতা মেঝে। এত নরম কোনও কিছুই আগে ও হাতে ধরেনি। ভয়ে ভয়ে ঘরের কোনে মাটিতে গিয়ে শুল। গালচেটাও ওর বাড়ির বিছানার চেয়ে নরম।
৫
ভোর না হতে সালেমের ঘুম ভেঙে গেল। দেখল ঘরটা আগের মতোই রয়েছে, কিন্তু বাইরে বেরোবার দরজাটা বন্ধ। খানিকক্ষণ ধাক্কাধাক্কি করে দরজাটা খুলে গেল। সালেম আবার খোলা দরজা দিয়ে বেরিয়ে, অনেক হেঁটে এবার যে ঘরে গিয়ে পৌছল, তাতে দরজা বাদে বাকি সমস্ত দেওয়ালগুলোই পর্দা দিয়ে ঢাকা।
সালেম ঘরে ঢুকে দাঁড়াল। দরজা বন্ধ হয়ে গেল। কালকের সেই গলাটা আবার গম গম করে উঠল। “তুমি সত্যিই তোমার ছেলেকে নিয়ে যেতে চাও?”
“চাই,” চেঁচিয়ে উঠল সালেম। “কেন তুমি সামনে আসছ না? দেখা দাও।”
উত্তর এল না। চারিদিকের পর্দা নিঃশব্দে উঠে যেতে শুরু করল। সামনে একটা বাগান। ফুলগাছ, ফল গাছ, সুন্দর কেয়ারি করা, মাঝে মাঝে পায়ে চলা পথ, ছোটো ছোটো বসার জায়গা, বাচ্চাদের খেলার জায়গা...
আর, বাচ্চা! কত বাচ্চা! শ’য়ে শ’য়ে, না, হাজারে? ছুটে গিয়ে জানালা দিয়ে বাইরে দেখল সালেম। এত বাচ্চা!
“দেখতে পাচ্ছ তোমার ছেলেকে?” সালেমের বুকটা ধক্ করে উঠল। কী করে চিনবে এত ছেলের মধ্যে নিজের ছেলেকে?
দৈত্যের বলে চলল, “ভালো করে দেখো।”
চারিদিকে বাচ্চারা ছোটাছুটি করে খেলা করছে। সালেম পাগলের মত মাথা নাড়ল। “না, চিনতে পারছি না। আমাকে বলে দাও, কে আমার ছেলে?”
“আমি বলে দেব না। তুমি নিজে চিনতে পার কি না দেখ। এই বাচ্চারা সকলেই তোমার ছেলের মতো। তাদের যখন আমি নিয়ে এসেছি, তখন তাদের সকলেরই কিছু না কিছু খুঁত ছিল। কেউ অসুস্থ, কিংবা কথা বলে না – ঘুংরুর মত, কেউ বোকা। কারওর হাত-পা নেই, কেউ বা অন্ধ। তাদের মা-বাবারা, গাঁয়ের লোকেরাই ওদের বের করে দিয়েছে। আমি কাউকে সত্যি সত্যি কেড়ে আনিনি। ওরাই বের করে দিয়েছে বাচ্চাদের। এখানে সবাই সুস্থ। আমি ওদের সারিয়েছি। ওরা এখানেই থাকবে। এখানেই বড়ো হবে। ওরা এখানেই আনন্দে আছে।”
হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠল সালেম, “ওই যে! ওই যে – ওই আমার ঘুংরু। ওই গোলাপ ঝাড়ের পাশে খেলছে। এনে দাও ওকে।”
দৈত্য বলল, “আমি না। তুমি নিয়ে এসো। কিন্তু মনে রেখো – ওকে সুস্থ সুন্দর নীরোগ জীবন দিতে পারবে? দু’বেলা দু’মুঠো খেতে দিতে পারবে? অসুখ করলে ডাক্তার বদ্যি ডাকতে পারবে? রাতের অন্ধকারে যদি বেরিয়ে গিয়ে নদীতে পড়ে যায়, বাঁচাতে পারবে?”
সালেমের সামনে মস্তো জানালা খুলে গেল। চাইলেই সালেম বেরিয়ে গিয়ে ঘুংরুকে কোলে নিয়ে ফিরে আসতে পারে।
সালেম দাঁড়িয়ে রইল।
বলল, “তুমি ওকে অসুখ থেকে বাঁচাতে পারবে?”
দৈত্যে বলল, “এখন তো ও আর অসুস্থ নয়। এখানে কারওরই কোনও অসুখ নেই।”
সালেম বলল, “আমি ওর সঙ্গে কথা বলতে পারি?”
দৈত্যের গলা বলল, “ও কিন্তু তোমাকে চিনতে পারবে না। ও পুরনো কথা ভুলে গেছে।”
পায়ে পায়ে গিয়ে সালেম ঘুংরুর সামনে দাঁড়াল। বলল, “ঘুংরু?”
ঘুংরু খেলা থামিয়ে মুখ তুলে তাকাল। বলল, “কে তুমি?”
উল্লসিত সালেম ঘুংরুকে জড়িয়ে ধরল। “তুই কথা বলতে শিখেছিস! আমি তোর বাবা! সালেম।”
ঘুংরু ছটফট করে সালেমের হাত থেকে বেরিয়ে এল। বলল, “বাবা?”
ঘুংরুর চোখে কোনও বিকার নেই। সালেম ওর অচেনা মানুষ।
সালেম চোখ মুছে ফিরে গেল আবার সেই ঘরে।
দৈত্য বলল, “চাইলে ছেলেকে নিয়ে যেতে পারো। লড়াই করতে হবে না। কিন্তু ও যদি এখান থেকে চলে যায়, আর ফিরতে পারবে না। আর তুমি যদি ওকে না নিয়ে যাও, আর কোনও দিন আসতে পারবে না এখানে।”
সালেম চুপ করে রইল।
“চল, সকালের খাবার তৈরি।”
সালেম খাবার ঘরে ঢুকে বলল, “ও আর আমাদের চিনতে পারবে?”
“আবার নতুন করে চিনবে।”
সালেম খাবার টেবিলে বসে বলল, “ও কি এমন ভালো ভালো খেতে পায়?”
“দিনে তিন বার।”
সালেম খাবার সামনে নিয়ে চুপ করে বসে রইল। সময় বয়ে যাচ্ছে, খাবার ঠাণ্ডা হয়ে গেল। দুপুর গড়িয়ে গেল। সালেম ছটফট করে দু’ হাতে মাথা আঁকড়ে চিৎকার করে বলল, “নিষ্ঠুর! তুমি নিষ্ঠুর!”
গলা ভেসে এলো। “তাই কি? নিষ্ঠুর? না দয়ালু?”
সালেম নিঃশব্দে ফিরে গেল সেই ঘরে – নিষ্পলক চেয়ে রইল বাগানে ঘুংরুর দিকে। দু এক বার চোখে চোখ পড়ল। তার পরে চোখ মুছে ফেলল সালেম।
সারা দিনের শেষে, সূর্য তখন ডোবে ডোবে, সালেম বাইরের দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়াল।
আস্তে আস্তে দরজা খুলে গেল। দৈত্যের গলা গম গম করে উঠল। “এই জলের বোতলটা নিয়ে যাও। এই বোতলের জল তোমার গ্রাম অবধি চলবে। সাবধানে যেও।”
দরজার পাশে রাখা বোতলটা তুলে নিয়ে সালেম বেরিয়ে এল। কী মনে হল, ফিরে বলল, “ঘুংরুকে একবারও হাসতে দেখলাম না। ওর হাসিটা ফিরিয়ে দিও।”
কোনও উত্তর এল না। মেঘ, কুয়াশা আর অন্ধকারে প্রাসাদটাও আর দেখা গেল না।
৬
দু বছর কেটে গিয়েছে। সালেমের বউ রোজ ঘরের দরজায় বসে কাঁদে। সেদিনও বসে ছিল, হঠাৎ দেখে দূর থেকে কে যেন আসছে। কুকুরগুলো, আর বাচ্চারা হই হই করতে করতে আসছে তাকে ঘিরে। দু’একজন করে বড়োরাও বেরিয়ে আসছে বাড়ি থেকে, খেত থেকে মুখ তুলে দেখছে চাষিরা।
“সালেম?” সালেমের বউ ছুটে গিয়ে জড়িয়ে ধরল।
সালেম ঝুলি থেকে একটা বোতল বের করে দেখল, খালি। বলল, “একটু জল।”
সকলে ধরাধরি করে সালেমকে নিয়ে এসে ঘরের দাওয়ায় বসাল।
বউ জিগেস করল, “ঘুংরুর খোঁজ পেলে?”
জল খাওয়া শেষ করে সালেম খানিকক্ষণ ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে রইল। তার পর বলল, “ঘুংরু?”
সকলে বলল, “আরে, দৈত্যের বাড়ি যাওনি?”
সালেম ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল।
৭
অনেক বছর কেটে গেছে। সালেম এখন বুড়ো। সারা দিন বাড়ির দাওয়ায় বসে রোদ পোহায়। ওর বাড়ি এখন বড়ো। পাকা। গ্রামের সবারই বাড়ি এখন বড়ো আর পাকা। রাস্তা এখন চওড়া। সালেম ফেরার পর থেকে ওদের গ্রামের খেতে ফসলের বন্যা বয়েছে। কোনও বছর এমন যায়নি যে ফসল খারাপ হয়েছে। ফলে সকলেরই অবস্থা ফিরেছে।
সালেমের চোখে ছানি, কানে শোনে কম। ছেলের বউরা ধরে ধরে নাইয়ে খাইয়ে দেয়। মাঝে মাঝে বাইরের লোক ওকে দেখতে আসে – এই হল সালেম। দৈত্যের বাড়ি গিয়েছিল। ফিরেছে দু’বছর পর। কিন্তু কিছুই মনে নেই।
সালেমকে দৈত্যের কথা জিগেস করে লোকে। ওর বউ জানতে চায় – ঘুংরুর কথা কিছু মনে পড়ল? সালেম কিছুই বলে না। চেয়ে থাকে।
শুধু, কখনও, সালেমের ছেলেরা মাঝরাতে ঘুম ভেঙে দেখে সালেম ঘরে নেই। বিছানা খালি। ওরা ছুটে যায়। দেখে সালেম বাইরে রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে। বলে, “বাবা, বাড়ি এস।”
সালেম ছানিপড়া চোখে তাকায়। বলে, “একটা ঘুঙুরের শব্দ শুনলি বাবা? ঘণ্টার শব্দ? বাজছে না কোথায়?”
ছেলেরা মুখ তাকাতাকি করে। বলে, “না বাবা, তুমি ভুল শুনছ। কোথায় ঘুঙুর? কোথায় ঘণ্টা? চল শোবে চল।”
ধরাধরি করে সালেমকে নিয়ে শুইয়ে দেয় বিছানায়।
-----------------------------
খালেদ হোসেইনি রচিত ‘অ্যান্ড দ্য মাউন্টেনস ইকোড’-এর আফগানী রূপকথা অবলম্বনে
No comments:
Post a Comment