Saturday, March 17, 2018

ফ্রিজের মতো

“পেঁয়াজ দাও, এক কিলো।”
প্রতীপ, আমার সবজিওয়ালা, আড় চোখে তাকিয়ে বলল, “পেঁয়াজের দাম কমিয়ে দিয়েছি।”
খুশি হলাম। “বাঃ, বেশ কথা। আমার একটা পুরোনো দিনের কথা মনে পড়ে গেল।”
প্রতীপ বুঝল, আমি গল্প বলার মুডে আছি। বলল, “কী কথা?”
গল্পটা বললাম ওকে।
রাঁচি শহর, উনিশশো একানব্বইয়ের কথা। জীবনের প্রথম ফ্রিজ কিনব, তার আগে মার্কেট সার্ভে চলছে। বন্ধুদের কাছ থেকে নানা খবর নিয়েছি। কে কোথা থেকে কিনেছে, দাম কতো পড়েছে, কেমন চলছে, ইত্যাদি।
ঘুরতে ঘুরতে পৌঁছেছি রাঁচির সবচেয়ে বড়ো শপিং এরিয়া-তে। তখন সে বাড়ির দোতলায় একটা মস্ত ডিপার্টমেন্ট স্টোর ছিল, তার নাম এক্সপ্রেস শপ। আজকাল আর নেই বোধহয়। তার একতলায়, মাড়োয়ারী, বা গুজরাতি নামের শো-রুম — ফ্রিজ, টিভি, এ-সি, ওয়াশিং মেশিন — এসবের বড়ো দোকান। দোকান ফাঁকা। আমরা ছাড়া আর এক জন খদ্দের, দোকানের কর্মচারী তার সঙ্গে কথা বলছেন। ভিতরে গিয়ে একটা মোটামুটি নামকরা কোম্পানির ফ্রিজ দেখছি, উঠে এলেন দোকানের মালিক। কাছে এসে নিজের নাম বলে বিজনেস কার্ড এগিয়ে দিলেন। বললেন , “কী করতে পারি?”
আমাদের চাহিদা জেনে বললেন, “এটা দেখছেন? এটা কি পছন্দ হয়েছে?”
আমি বললাম, “কিছুই পছন্দ হয়নি। আগে দেখি। এটার বিশেষত্ব কী? দাম কত?”
উনি বললেন, “এটার বিশেষত্ব হল এই, যে এটা ভারতীয় ফ্রিজ মার্কেটে সবচেয়ে ওঁচা ফ্রিজ। যেমন কোম্পানি, তেমনই তাদের প্রোডাক্ট।”
মনে পড়ল, আমার শালা এদেরই তৈরি কী একটা ব্যবহার করে, আমাকে একবার বলেছিল, “এদের বিশেষত্ব কী জান? এরা একটা বাজে মাল সস্তায় দেয়, তার পরে এক্সেলেন্ট আফটার সেলস সার্ভিস দেয়। খারাপ হলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সারিয়ে দেয়। আজ-না-কাল, কাল-না-পরশু — করে না।”
বললাম, “দাম কত? এখানে সার্ভিস কেমন?”
ভদ্রলোক বললেন, “আচ্ছা, মনে ধরেছে দেখছি। তাহলে দেখুন।” বলে ভদ্রলোক আমাকে — দরজা ভাল করে বন্ধ হয় না, হ্যান্ডেলের স্ক্রু-তে মরচে পড়ে গিয়েছে, পেছনের ওমুকটা ঢিলে, ভেতরের তসুকটা ইনফিরিয়র কোয়ালিটি... এ সব প্রায় তেরো রকম সমস্যা দেখিয়ে বললেন, “আর যদি সার্ভিসের কথা বলেন, রাঁচিতে সার্ভিস নেই। এখানে বিক্কিরিই নেই। কেউ কেনে না। আর রাঁচির মতো ছোটো শহরে কটা আর কাস্টমার, বলুন?”
বটেই তো।
“এ দিকে আসুন, এইটা দেখাই,”বলে নিয়ে গেলেন আর একটা ফ্রিজের দিকে। আরও নামকরা কোম্পানির তৈরি ফ্রিজ। বললেন, “ডবল ডোর, ডবল কম্প্রেসর। আজকাল আর কেউ বানায় না। দাম একটু বেশি পড়বে, কিন্তু আহা, কী জিনিস... জাস্ট ভাবুন...” বলে এটারও প্রায় পাঁচ-সাতটা গুনকীর্তণ করলেন, ভিজিটিং কার্ডটা আবার নিয়ে ফ্রিজের নাম আর মডেল নাম্বার লিখে দিলেন, আর আমরা সে দিনের মতো মার্কেট সার্ভে করে ফিরে গেলাম।
নানা বিচার বিবেচনা করে, ন’-দশদিন বাদে আবার ফিরে গিয়েছি। সাব্যস্ত করেছি, ওই দারুণ ফ্রিজটাই কিনব। দুটো কম্প্রেসর বলে কথা!
দোকানে ঢুকে দেখি সেই কর্মচারী, সেই মালিক। আজ আর কোনও খদ্দের নেই। আমাদের দেখে কর্মচারী এগিয়ে এলেন। আমি বললাম, “আগের দিন একটা ফ্রিজ দেখে গিয়েছিলাম, ওইখানে ছিল, কালো রঙের — ওমুক কোম্পানীর তৈরি — ডবল ডোর, ডবল কম্প্রেসর...”
কর্মচারী কিছু বলার আগে মালিক উঠে এলেন। কাছে এসে নিজের নাম বলে বিজনেস কার্ড এগিয়ে দিলেন। বললেন, “আপনাদের একটা কথা বলি, এ সব ছেলে-ভুলানো কথায় আপনারা কেন পড়েন? ডবল কম্প্রেসর ফ্রিজ হয়? লোকে বলে, আপনারা বিশ্বাস করেন, আর কিছু ঠগবাজ আপনাদের কাছ থেকে রোজগার করে।”
আমি হতভম্ব। বললাম, “এই যে এখানে ডবল ডোর ফ্রিজটা ছিল, আমি এই ক’দিন আগে দেখে গেলাম, ওটা ডবল কম্প্রেসর... না?”
স্মিত হেসে উনি বললেন, “স্যার, আমাদের দেশে ডবল কমপ্রেসর ফ্রিজ তৈরিই হয় না।”
আমি কী বলব বুঝতে না পেরে অবাক হয়ে থেমে আছি, সেই সুযোগে উনি আমাকে বললেন, “আসুন, স্যার আপনাকে একটা দারুণ ফ্রিজ দেখাই। দিস ইজ দ্য বেস্ট ফ্রিজ অ্যাভেলেব্ল ইন ইন্ডিয়া টুডে।”
নিয়ে গেলেন আর একটা ফ্রিজের কাছে। এটাও আমার চেনা ফ্রিজ। এর সঙ্গে অনেকক্ষণ ধরে আলাপ হয়েছিল। বললেন, “এটা তমুক কম্পানির ফ্রিজ। বেস্ট সেলার। এর মতো ফ্রিজ আমাদের দেশে আর তৈরি হয়নি কোনও দিন।”
আমি বললাম, “কিন্তু আগের দিন আপনি বললেন, এটা অত্যন্ত ওঁচা ফ্রিজ, এটাতে তেরো রকমের বাজে ব্যাপার আছে, দরজা বন্ধ হয় না, হ্যান্ডেলের স্কু-তে মরচে... এই তো, এটাই তো আমাকে দেখিয়েছিলেন, পেছনের ওমুকটা ঢিলে, ভেতরের তসুকটা ইনফিরিয়র কোয়ালিটি... সার্ভিস নেই...”
ভদ্রলোকের চোখ কপালে উঠে গেল। “সার্ভিস নেই? কী বলছেন! কে বলেছে এ সব আজে বাজে কথা? একটা দুটো মরচে পড়া স্ক্রু কোন ফ্রিজে নেই দেখাতে পারবেন?”
আমি বললাম, “আরে মশাই আপনিই বলেছেন। এই সে দিন।”
খুব গম্ভীরভাবে মাথা নেড়ে বললেন, “হতেই পারে না। জানেন, আমরা এই ফ্রিজ কটা বেচেছি? গত এক মাসে নয় নয় করে পঁচিশটা।” বলে সেলসম্যানের দিকে তাকিয়ে বললেন, “পঁচিশটা? না আরও বেশি?”
মিন মিন করে সেলসম্যান বলল, “ওই ওরকমই হবে। গোটা পঁচিশেক।”
আমার মনে পড়ল। বললাম, “আপনি বলেছিলেন, প্রথম চার পাঁচ জন ক্রেতা ফ্রিজ ফেরত দিয়ে গেছে, তাই আপনি এটা আর বিক্রি করছেন না।”
আবার গম্ভীরভাবে মাথা নাড়লেন। বললেন, “আপনি অন্য কোনও দোকানের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলছেন।”
হাতের কার্ডটার দিকে নজর পড়ল, ওটা ভদ্রলোকের হাতে ফেরত দিয়ে বললাম, “দাঁড়ান।” পকেট থেকে আগের দিনের কার্ডটা বের করলাম। বললাম, “দেখুন, এই মডেলটা কেনা উচিত, আপনি নিজে লিখে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন এটা ডবল ডোর, ডবল কম্প্রেসর। বলেছিলেন, এই ফ্রিজটা বাজে, এখন ওই ফ্রিজ আর নেই, এটা সবচেয়ে ভালো হয়ে গেল?”
এক সেকেন্ড লাগল। বললেন, “আরে সে তো সে দিনের কথা। আজ এই ফ্রিজ আলাদা।”
হতভম্ব হয়ে তো ছিলামই, এখন আমি হতভোম্বল!
বললেন, “আগের দিন বললাম না, চার পাঁচ জন ফেরত দিয়ে গেছে? সেই ফেরত দেওয়ার রিপোর্ট আমরা কোম্পানিতে পাঠিয়েছি। কোম্পানি গোটা ডিজাইন পালটে ফেলেছে। খোল নলচে। এখন এটা ইন্ডিয়ার বেস্ট ফ্রিজ।”
দশ দিন আগে রাঁচির মতো নগন্য শহর থেকে রিপোর্ট গেল, আর ফ্রিজের ডিজাইন বদলে ফিরেও এল?
“তবে! রাঁচিকে আপনারা বাইরের লোকেরা তাচ্ছিল্য করেন, আসলে দিস ইজ আ ভেরি ইম্পরট্যান্ট টাউন।”
সে আর বলতে, আমরা পালিয়ে বাঁচলাম।
প্রতীপ একদৃষ্টে আমার দিকে তাকিয়ে। বললাম, “ও ফ্রিজের ডিজাইন বদলে দিল, আর তুমি পেঁয়াজের দাম কমিয়ে দিলে।”
প্রতীপ বলল, “কমে গিয়েছে বলা উচিত ছিল, তাই না?” বলে পেঁয়াজ ওজন করায় মন দিল। মনে হল, আমার কথাটা পছন্দ হয়নি। আমি চেপে গেলাম।
এটা সেটা কিনে বেগুনে পৌঁছেছি — প্রথম বেগুনটা তুললাম, একটা ফুটো। পরেরটায় দুটো। বললাম, “বেগুন, না অভয়ারণ্য?” তৃতীয় বেগুনটার চারপাশ ঘুরিয়ে দেখে প্রতীপের হাতে দিয়েছি, প্রতীপ মাথা নেড়ে বলল, “বড্ডো ভারি। বিচি ভর্তি হবে।” বলে আর একটা বেগুন নিয়ে ওজন করল।
ব্যাগে ভরতে ভরতে বলল, “তবে কাল এলে, আজকের এইটাই ভালো বেগুন হবে... আপনার ফ্রিজের মতো।”

Saturday, March 10, 2018

ভাম


- এক -
সন্ধে থেকেই আকাশ কালো হয়ে এসেছিল সেদিন। রাত একটু বাড়তেই আকাশ ভেঙে নেমেছিল বৃষ্টি। বিদ্যুতের চমকের সঙ্গে সঙ্গে চারিদিক আলো হয়ে উঠছিল।
বাগানের নর্দমার পাশে একটা বড়ো কচুপাতার নিচে মা-ভামটা অনেকক্ষণ অপেক্ষা করে ছিল। রাত বাড়ে – বৃষ্টি থামার নাম নেই। আর দেরি করা যায় না। কচুপাতাগুলোর মধ্যে লুকোনো ছোট্ট গর্তটা জলে ভরে গিয়েছে। জল শুকোতে শুকোতে অন্ততঃ কাল বিকেল। আর উপায় না পেয়ে মা-ভাম এক ছুট্টে বাগানের অন্য দিকে চলে গেল। পথে দুটো ব্যাং ছিটকে পালিয়ে গেল। কিন্তু তখন মা-ভামের ব্যাঙের দিকে তাকান’র সময় নেই। সে যাচ্ছে বাগানের কোণায় ছোটো ঘরটায়, যেখানে আগে চাকরবাকর থাকত, এখন সবসময়েই বন্ধ পড়ে থাকে। নর্দমার ভাঙা ঝাঁঝরা দিয়ে মা-ভাম ঘরের মধ্যে ঢুকল। আর সেই ঘরেই, গভীর রাত্তিরে, কিছু ছেঁড়া কাগজের মধ্যে, জন্মাল একটা ছোট্ট ভাম বাচ্চা। এই, আমার বুড়ো আঙুলটার মতো লম্বা। বাইরে তখন প্রবল বৃষ্টি।
বাচ্চাটা হবার পরে মা-ভামটা একটু অপেক্ষা করল, কিন্তু আর বাচ্চা হল না। অবাক হল মা-ভাম। এর আগে ওর যতবার বাচ্চা হয়েছে, অন্ততঃ দুটো জন্মেছিল। একবার তো ছটা হয়েছিল। কিন্তু তখন আর ভাবার সময় নেই। বাচ্চাটা চার পায়ের ফাঁকে মায়ের পেটের কাছে শুয়ে দুধ খেতে শুরু করেছে। মা-ভামটা খানিকক্ষণ ওর পিঠ চেটে পরিষ্কার করে তার পর ওখানেই শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ল।
তিন দিন একই ভাবে বাচ্চাকে দুধ খাইয়ে মা-ভামটার খিদে পেল। রাত্তির বেলা, বাচ্চাটা তখন দুধ খেয়ে ঘুমিয়েছে, মা ঘর থেকে বেরিয়ে বাগানের গাছে চড়ে কয়েকটা আধপাকা আম, উচ্চিংড়ে আর মথ খেয়ে আবার ফিরে এল ঘরের মধ্যে।
এইভাবে চলতে লাগল রোজ। একদিন মা ফিরে এসে দেখল, বাচ্চাটা চোখ মেলে তাকিয়ে আছে। আর বেশি দেরি নেই। এবার কিছুদিনের মধ্যেই ও মায়ের মতো চলতে, ফিরতে, খেতে শিখে যাবে।
বাগানটা বাড়ির পিছন দিকে। সামনে চওড়া রাস্তা। রাস্তার ওপারে আবার বাড়ি, আর একটা পার্ক। বাচ্চা-ভাম যখন নিজে নিজে চলতে শিখল, তখন, একদিন অনেক রাত্তিরে, সবাই ঘুমিয়ে পড়ার পর, মা তাকে নিয়ে পাঁচিলের ওপর দিয়ে হেঁটে এল রাস্তার ধারে। গেটের ওপর বাগানবিলাস গাছের পাতার আড়ালে লুকিয়ে ছেলেকে দেখাল, “ওই দেখ। ওই কালো জিনিসটা হল রাস্তা। ওটা দিয়ে মস্তো মস্তো গাড়ি চলে। খুব সাবধান। ওগুলোর নিচে পড়লে এক্কেবারে মরে যাবি। কুকুর বেড়াল মরে যায়, কিন্তু আমরা ভামেরা বেশি মরি না। আমরা রাস্তা পেরোই না বেশি।”
বাচ্চা ভাম জিজ্ঞেস করল, “রাস্তার ওপারে কী আছে, মা?”
মা বলল, “এদিকে যা আছে, ওদিকেও তাই। চল, এদিকটা তোকে দেখাই।”
রাস্তার পাশের সবকটা বাড়ির পেছনে বাগান। বাগানগুলো সবকটাই একমানুষ-দেড়মানুষ সমান পাঁচিল দিয়ে দিয়ে আলাদা করা। মানুষরা সেই পাঁচিলের আড়ালে থাকে, কিন্তু ভামদের তো পাঁচিল দিয়ে আলাদা করা যায় না, তাই ওদের কাছে সব বাড়িগুলোর বাগান মিলিয়ে এক বিশাল রাজত্ব। তাতে কত ফলের গাছ, কত পোকা, কত ব্যাং, কত ইঁদুর – সবই তাদের খাদ্য।
রাত্তিরে, যখন মানুষরা ঘুমিয়ে পড়লে ওরা পোড়ো ঘরটা থেকে বেরোত খাবার খুঁজতে। মাঝরাত্তির অবধি খুঁজে খুঁজে খাবার খেত ওরা। তারপর, শেষ রাত থেকে শুতে যেত। সারা দিন ঘুমোত। উঠত আবার সূর্য ডোবার পরে।
মা শেখাত কী করে ফল চিনতে হয়। কোনটা পাকা, কোনটা ভালো – কোনটা টুকটুকে লাল হলেও ভেতরে তেতো; শেখাত কী করে পোকা, ইঁদুর আর ব্যাং শিকার করতে হয় – বর্ষাকালে কখনও একটা-দুটো সাপও ঢুকে পড়ত বাগানগুলোতে। মা-ভাম সাবধানে ঝোপের আড়াল থেকে লুকিয়ে গিয়ে সেগুলোও শিকার করতে জানত। সবই শেখাত।
ওই ছাই-রঙের বাড়িটা দেখে রাখ,” শেখাত মা-ভাম। “ওদের কুকুরটা ছোটো হলে কী হবে, সাংঘাতিক চালাক আর পাজি। কী করে জানি ঠিক বুঝে যায় আমরা কোনখান দিয়ে পাঁচিলটা টপকাব। আর পা টিপে টিপে ঝোপের আড়াল দিয়ে কাছে এসে অপেক্ষা করে। ওদের বাগানে কক্ষনো পাঁচিল থেকে মাটিতে নামবি না। কোন গাছের আড়াল থেকে এসে খপ করে গলাটা ধরবে, বুঝতেও পারবি না। পাঁচিল থেকে সোজা গাছের ডালে লাফ মারবি। তবে ওই হলদে বাড়ির বিরাট কুকুরটা কিন্তু কোনও সমস্যা করে না। ওদের বাগানে ঘুরে বেড়ালেও কিচ্ছুটি বলবে না, শুধু এক-চোখ ফাঁক করে দেখে নেবে তুই কতটা দূরে। যদি বেশি কাছে যাস, তাহলে জোর হইচই করে উঠে তাড়া করবে, কিন্তু সে সব দেখান’র জন্য। ধরে ফেললেও কামড়াবে না। নাক দিয়ে ঠেলবে।”
পাঁচিলের ওপর বসে বাচ্চা-ভাম অবাক হয়ে ভাবত, তাই তো! বড়ো কুকুরটার থেকে ভয় কিছু নেই, ছোট্ট ওইটুকু একটা কুকুর – তাকে ভয় পেতে হবে!
মা-ভাম আরও সাবধান করত, “বেড়ালদের থেকে দূরে থাকবি। বেড়ালরা খুব বিপজ্জনক। ওদের থাবার ভেতরে লুকোনো নখে ভীষণ ধার – ফ্যাঁশ্‌ করে বের করে চোখে মুখে আঁচড়ে দেয়।”
বাচ্চা-ভাম বলল, “কিন্তু ওদের দেখতে খানিকটা আমাদের মতো, না?”
মা-ভাম ভয়ানক রেগে গেল। বলল, “কক্ষনো না! বললেই হল? তুই তো দেখছি মুর্খ মানুষদের মতো বলছিস। বোকা মানুষগুলো আমাদের ভাম বেড়াল বলে। আমরা মোটেই বেড়াল নই। আমরা আলাদা।

- দুই -
দিন কাটে। বাচ্চা-ভাম বড়ো হয়। নিজে নিজে শিকার ধরতে শেখে। দেখতে দেখতে মায়ের সমান বড়ো হয়ে গেল। এক দিন আর ফিরে এল না মায়ের সঙ্গে সেই ভাঙা ঘরটায় শুতে। মা-ভাম অপেক্ষা করল ভোর অবধি। তার পর ও-ও চলে গেল ঘরটা ফেলে। আবার যদি কখনও দরকার পড়ে, তাহলে ফিরবে।
আগের দিন রাত্তিরে, সব যখন শুনশান, গাড়িঘোড়া আর চলছে না, বাচ্চা-ভামটা রাস্তা পেরিয়ে চলে গেছিল ওই পারে। গিয়ে দেখল, মা যেমন বলেছিল তেমনই – একই রকম। ওর আর ফিরতে মন চাইল না। চার-পাঁচটা বাগান জুড়ে থাকতে শুরু করল। রাতে বাগানে শিকার করে, গাছের ফল খায় আর দিনে একটা তিনতলা বাড়ির তিন তলায় থাকে।
বাড়িটা পুরোনো। একেবারে ওপরের তলায় কেউ থাকে না। ঘরের দরজাগুলো তালাবন্ধ, কিন্তু ভাঙাচোরা। ঢুকতে বেরোতে ওর মোটেই অসুবিধা হত না। বাড়ির দোতলায় শুধু এক বুড়ো আর এক বুড়ি থাকত। তারা সন্ধে হলেই ঘরে ঢুকে কাঁথামুড়ি দিয়ে ঘুমোত। টিভি-ও দেখত না। আর একতলায় ছিল সামনের দিকে একসার দোকান, পেছনে দোকানগুলোর ভাঁড়ার ঘর। দিনের বেলা লোকজন থাকত, রাত্তিরে সারা বাড়িতে ওই একটা ঘরে কেবল বুড়ো আর বুড়ি।
ভামের ভারি মজা। সন্ধে নামলে ওর ঘুম ভাঙত। আগে যে বাড়িতে থাকত, সেখানে সন্ধেবেলা ঘরের বাইরে যাওয়া যেত না, কারণ মানুষরা জেগে থাকত, চলাফেরা করত। আর বাড়ির সামনের দিকে যাওয়ার তো প্রশ্নই উঠত না। আলোয় তখন চারিদিক ঝলমল করছে।
কিন্তু এই ভাঙা বাড়ির তিনতলার সামনের অন্ধকার বারান্দার রেলিং-এ বসে ভাম রাতের রাস্তার আলো দেখত, গাড়ি দেখত আর অপেক্ষা করত, কতক্ষণে লোকে আলো নিভিয়ে শুতে যাবে – ও বেরোবে খাবার খুঁজতে।
বাড়ির একতলার দোকানগুলোর মধ্যে একটা ছিল ফলের দোকান। একদিন রাত্তিরে ঘুরতে ঘুরতে ভাম দেখল ফলের দোকানের গুদাম ঘরের দেওয়ালের একটা ঘুলঘুলি ভাঙা। পুরোনো দিনের বাড়ি তো, দেওয়ালে ছাদের কাছে ফুটো থাকত – তাকে বলে ঘুলঘুলি। সেগুলো জাফরি দিয়ে বন্ধ থাকত – যাতে বেড়াল বা পাখি ঢুকতে না পারে। পুরোনো জাফরি ভেঙে গেছে, ভাম ঢুকল সেই ফাঁক দিয়ে।
ঢুকে তো ভাম আনন্দে ডগমগ! কত ফল! কত রকমের ফল! মনের সুখে খানিকটা খেল, খানিকটা নষ্ট করল। তারপর, পেট ভরে যাবার পরে, আবার ঘুলঘুলির ফুটো দিয়ে বেরিয়ে চলে গেল তিনতলায় নিজের ঘরে।
সেদিন থেকে আর খাবার চিন্তা রইল না। রোজই ঘুলঘুলি দিয়ে ঢুকে ইচ্ছেমত ফল খেত। এমন সব ফল, যেগুলো ওর মা কোনও দিন চোখেই দেখেনি।
দোকানদার ভাবত ইঁদুর বুঝি। রোজ রাত্তিরে দোকান বন্ধ করার আগে ইঁদুর ধরার ফাঁদ পেতে রাখত। মাঝে মাঝে দু-একটা ইঁদুর মরত, কিন্তু ফল খাওয়া কমত না। দোকানি আর ওর কাজের ছেলেটা খুঁজে খুঁজে ইঁদুর ঢোকার সব গর্তই বন্ধ করে দিল, কিন্তু কোনও দিন ওপরের দিকে তাকিয়ে দেখত না বলে ভামের ঢোকার রাস্তাটা দেখতেই পেত না।

- তিন -
কাজের ছেলেটা কিন্তু বলত, “বাবু, ইঁদুর না। চোরের কাজ। রাত্তিরে চোর ঢোকে – ভাত রেঁধে ফল দিয়ে খায়।”
দোকানি রেগে বলত, “রোজ তোর ওই এক কথা। গাধা কোথাকার! দরজা-জানলা ভাঙা নেই কোথাও, তালাগুলো পর্যন্ত আস্ত – চোর ঢোকে কোথা দিয়ে শুনি? আবার বলে, ভাত দিয়ে ফল খায়! যেমন বুদ্ধি! দুনিয়ায় কোথায় চোর চুরি করতে ঢুকে ভাত রান্না করে খায়, শুনি?”
ছেলেটা বকুনি খেয়ে কাঁদোকাঁদো হয়ে বলে, “কিন্তু পেছনের ঘরটা যে রোজ সকালে আতপ চালের গন্ধে ভুরভুর করে! এত কড়া গন্ধ যে সকালে পাকা ফলের গন্ধ ছাপিয়ে সে গন্ধ পাই!”
দোকানি বলত, “বাজে কথা রেখে, যা, গিয়ে আধখাওয়া ফলগুলো ফেলে, দোকান পরিষ্কার করে খদ্দেরদের দেখগে যা। এই ইঁদুরটার জন্য অনেক লোকসান হচ্ছে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব মারতে হবে।”
একদিন, দোকানি আর কাছের ছেলেটা রোজের মত এই ঝগড়া করছে, তখন পাশের বাড়ির ছেলেটা এসেছে ফল কিনতে।
ছেলেটা জানতে চাইল, “কী ব্যাপার কাকু? ওকে বকছেন কেন?”
দোকানি রেগে বলল, “আরে আর বলো না। রোজ রাত্তিরে একটা বদমাশ ইঁদুর ফল খেয়ে, ফেলে, ছড়িয়ে রেখে যাচ্ছে, আর আমার এই বুদ্ধিমান সাকরেদের বক্তব্য হল রোজ নাকি চোর ঢুকে ভাত রান্না করে আমার ফল দিয়ে মেখে সেই ভাত খায়!”
পাশের বাড়ির ছেলেটা অবাক! “চোর রোজ রান্না করে ভাত খায়? সে-ও আবার হয় নাকি?”
কাজের ছেলেটা বলল, “দাদা, সে কী আতপ চালের গন্ধ! ভুরভুর করে! আবার যে সে চাল নয়! হয় গোবিন্দভোগ, নয়ত বাসমতি। আমি বাবুরে বলছি, ভাত যদি না-ই রান্না হবে, তার গন্ধ কেন পাব? শুনছেনই না।”
দোকানদার বলল, “এবারে ইঁদুর মারার বিষ দিতে হবে দেখছি।”
আতপ চালের গন্ধ! দারুন তো,” বলে ছেলেটা ফল নিয়ে বাড়ি ফিরল।

- চার -
ছেলেটা বন্য জন্তু সম্বন্ধে অনেক জানত। অনেক পড়াশোনা করে, অনেক জঙ্গলে ঘুরে ও এতই শিখেছিল যে অনেক বিশারদের চেয়েও বেশি জানত। তারাও কোথাও আটকে গেলে ছেলেটাকে ডাকত। ও শুনেই বুঝেছিল কোনও মানুষ দোকানে ঢুকেছে বলে গন্ধ হচ্ছে না। কিন্তু তখন কিছু বলেনি কারণ দোকানি বিষ দেবার কথা বলেছিল। কোনও প্রাণীকে মেরে ফেলা পছন্দ করত না ও।
সন্ধেবেলা ওর বন্ধুকে বলল সব কথা। ওর বন্ধুও অনেক জানত। প্রায় ওরই মতন। শুনে বলল, “আতপ চালের গন্ধ? তার মানে ভাম, তাই না?”
পাশের বাড়ির ছেলেটা বলল, “তাই হবে। অনেক জন্তু জানোয়ারেরই শরীরে খুব কড়া গন্ধ থাকে। ভামের গায়ের গন্ধ এক্কেবারে আতপ চাল রান্না হবার মতো। ওদের আর এক নাম গন্ধগোকুল। সেই জন্যই দোকান থেকে চলে যাবার পরেও অনেকক্ষণ ফলের গন্ধ ছাপিয়ে থেকে যায় ওর গায়ের গন্ধটা।”
কী করবি?” জানতে চাইল বন্ধু।
আজ রাত জেগে দেখব দেখতে পাই কি না। ওই দেখ। ফলের দোকানের পেছনের ঘরটা ঠিক আমার শোবার ঘরের সামনেই। সারা দিন ভালো করে দেওয়ালটা দেখেছি। একটা ঘুলঘুলি ভাঙা। ওই যে – দেখ বাইনকুলার দিয়ে – হয়ত ওখান দিয়েই ঢোকে।”
পরের দিন ভোরেই পাশের বাড়ির ছেলেটা বন্ধুকে ফোন করল। “দেখেছি। ভাম। ইংরেজিতে কমন পাম সিভেট বলে যেটাকে। ওই ফুটোটা দিয়েই ঢুকল।”
তার পরে?” উত্তেজিত বন্ধু জিজ্ঞেস করল।
আধঘণ্টা পরে বেরিয়ে জলের পাইপ বেয়ে তিনতলায় চলে গেল। ওখানেই থাকে বোধহয়। ওদের বাড়ির তিনতলায় কেউ তো থাকে না।”
কী করবি?” জানতে চাইল বন্ধু।
দোকানিকে বলে দেব ঘুলঘুলিটা বন্ধ করে দিতে। আর কিছু বলব না, মিছিমিছি ভয় পাবে।”
তাই হল। সেদিন সকালেই ছেলেটা গিয়ে দোকানিকে ঘুলঘুলির ফুটোটা দেখাল, আর সেদিনই দুপুরে মিস্তিরি ডেকে সেই ফুটো বন্ধ করে দেওয়া হল। রাতে যখন ভাম নেমে এসে দেখল ওর ঢোকার রাস্তা বন্ধ, এদিক ওদিক ঘুরে আর কোনও পথ না পেয়ে আবার তিনতলায় উঠে গেল – কয়েকটা আরশোলা মেরে খেয়ে ঘুমোতে গেল।

- পাঁচ -
ক’দিন পরে কয়েকটা বাড়ি দূরের একটা ছেলে পাশের বাড়ির ছেলেটাকে ফোন করে বলল, “আমার একটা সমস্যা হয়েছে। তুই কি কিছু করতে পারবি?”
পাশের বাড়ির ছেলেটা বলল, “কী হয়েছে?”
তুই তো জানিস আমাদের বাড়ির ছাদে অনেক পাখির খাঁচা আছে।”
ছেলেটা বলল, “জানি তো। কত বার গেছি তোদের ছাদে।”
গত তিন রাত্তির রোজ একটা করে পাখি মেরে যাচ্ছে কোন জন্তু। দুটো বদ্রীপাখি আর একটা পায়রা মেরেছে। খাঁচার নিচের দিকের জালটা দাঁত বা নখ দিয়ে টেনে খুলে ঢুকেছে।”
পাশের বাড়ির ছেলেটা একটু ভেবে বলল, “আর কিছু? কোনও অদ্ভুত কিছু খেয়াল করেছিস?”
হ্যাঁ, হ্যাঁ। সকালে খাঁচাগুলোতে একটা হালকা আতপ চালের গন্ধ থাকে।”
ছেলেটা ফোন নামিয়ে বন্ধুকে ফোন করল।
বন্ধু জিজ্ঞেস করল, “ভামটাই তো? একই জন্তু পাখিও খায়, ফলও খায়?”
পাশের বাড়ির ছেলেটা হেসে ফেলল। বলল, “এ তো বড়ো অদ্ভুত কথা! সেদিনই তোর বাড়িতে আমরা মুরগির মাংসও খেলাম, ফ্রুট স্যালাডও খেলাম, তাই না? শোন, ভাম সর্বভূক। মাংস, পাখি, ফল, পোকামাকড় – কোনওটাতেই আপত্তি নেই। শিকারও করে, মরা পেলেও খায়। জানিস, মালয়েশিয়াতে কফি-বাগানে ভাম পোষে। ওরা বাগান থেকে বেছে বেছে সবচেয়ে ভালো কফির ফলগুলো খায়। পুরোটা হজম করতে পারে না, শরীর থেকে কফি বীজগুলো আস্তই বেরিয়ে আসে। তখন সেগুলো থেকে যে কফি তৈরি হয় – সেটা পৃথিবীর সবচেয়ে দামি কফি। তার স্বাদগন্ধ নাকি অতুলনীয়। তার নাম নাকি লুওয়াক।”
বন্ধু বলল, “ঈশ! লুওয়াক না। ওয়াক, থু! চাই না দামি কফি। কিন্তু এখন কী করবি?”
এখন ব্যাটাকে ধরতে হবে। নইলে আরও যদি পাখি মারে, তাহলে ওরা একদিন মেরে ফেলবে ভামটাকে।”

- ছয় -
এর পর ক’দিন পাশের বাড়ির ছেলেটা ভালো করে ভেবেচিন্তে একটা শক্তপোক্ত ফাঁদ বানাল কাঠ দিয়ে। তারপরে গেল ভামের বাড়ির দোতলায় বুড়োবুড়ির কাছে।
বলল, “আপনাদের বাড়ির ওপরে একটা জন্তু থাকে। ওটা রাত্তিরে গিয়ে ও--ই বাড়ির খাঁচা থেকে পাখি মেরে খাচ্ছে। আমি ওটাকে ধরব বলে একটা ফাঁদ তৈরি করিয়েছি। আপনারা অনুমতি দিলে ওটা ধরে নিয়ে যাই।”
বুড়োবুড়ি শুনে এতই ভয় পেয়ে গেল, যে বলল, “হ্যাঁ, বাবা, নিয়ে যাও, তাড়াতাড়ি নিয়ে যাও।”
ছেলেটা বার বার বলল, ভামটা মোটেই হিংস্র জন্তু নয়, কিন্তু কে কার কথা শোনে। ছেলেটা তিনতলায় গিয়ে ভালো করে ঘুরে দেখল। দরজাগুলো সবই বন্ধ, কিন্তু সবকটা দরজা জানলাই এত ভাঙাচোরা যে মানুষ ঢুকতে না পারলেও ভামের পক্ষে ঢোকা-বেরোন মোটেই কঠিন না।
চারিদিকে ধুলো ময়লা, পুরোনো কাগজ, প্যাকিং বাক্সের ছড়াছড়ি। রবারের জুতো পায়ে সাবধানে ছেলেটা ঘুরে দেখল। ভামটা তিনতলায় একাই থাকতে অভ্যস্ত। মানুষের চলাফেরার শব্দে যদি পালিয়ে যায় – তাহলে কোথায় চলে যাবে, আর ধরা যাবে না।
একটা একটা করে ঘরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ভালো করে নাক টেনে টেনে গন্ধ নিল ছেলেটা। সাবধানে। নাকে ধুলো ঢুকে হ্যাঁচ্চো হলেই ভাম বুঝে যাবে মানুষ এসেছে। শেষে একটা ঘরের কাছে আসতেই বুঝল ভামটা ওই ঘরের মধ্যেই রয়েছে। দরজায় দাঁড়িয়ে শুঁকতেও হল না। দূর থেকেই ভুরভুরে আতপ চাল রান্না হবার গন্ধ পেয়ে আস্তে আস্তে আবার নেমে গেল নিচে। বুড়োবুড়িকে বলল, “ভয় নেই। আমি আজই সন্ধেবেলা আসব ফাঁদটা নিয়ে।”
সেদিন, সূর্য ডুবতে না ডুবতেই, ছেলেটা এল ফাঁদটা নিয়ে। তার ভেতরে রাখল কিছু সদ্য কাটা মুরগির মাংস। রক্ত-মাখা। রক্তের গন্ধে ভামটা বুঝবে খাবার আছে ওর ভেতরে। আর খেতে ঢুকে যেমনই মাংসটা ধরে টানবে, ব্যাস! দরজাটা খট্‌ করে বন্ধ হয়ে যাবে। ভাম বাবাজী বন্দী হবেন।
কিন্তু পরদিন সকালে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতেই ছেলেটা বুঝল যে ভামটা ধরা পড়েনি। দূর থেকে ফাঁদের দরজাটা খোলাই দেখা যাচ্ছে। মাংসটাও ছোঁয়নি। কিন্তু ওই ঘরটার মধ্যে চালের গন্ধ এতই কড়া যে বোঝাই যাচ্ছিল ভামটা তার মধ্যেই রয়েছে। আর অপেক্ষা না করে ছেলেটা ফাঁদটা নিয়ে চলে গেল।
তাই বলে হাল ছেড়ে দিল না ছেলেটা। রোজই সন্ধেবেলা ফাঁদ নিয়ে হাজির হয়, যত্ন করে লাগায় মাংসের টুকরো, কিন্তু রোজই পরের দিন সকালে গিয়ে না-খাওয়া মাংস আর খালি ফাঁদ নিয়ে ফিরে আসতে হয়। হয় মুরগির মাংস ভামটার পছন্দ নয়, নয়ত ফাঁদটা দেখে কিছু একটা সন্দেহ করেছে। এখন কী করা?
এক সপ্তাহ হয়ে গেল। ভামের ধরা দেবার নাম নেই। বন্ধু জিজ্ঞেস করল, “মাছ দিলে কেমন হয়?”
মাছ কি খায় ওরা?” ভুরু কুঁচকে জানতে চাইল ছেলেটা। “কোনও বইতে তো মাছের কথা লেখা নেই। পাখি, ডিম, পোকা – মাছ তো লেখা নেই...”
বন্ধু বলল, “এমন তো হতে পারে যে ভামটা জ্যান্ত পাখি মেরে খায় – কাটা মাংস খাচ্ছে না। কিন্তু ছোটো মাছ যদি দিস, সেগুলো আস্ত দেখে খাবে।”
সেদিন বাজার থেকে কিছু ছোটো মাছ কিনে এনে পাশের বাড়ির ছেলেটা মাংসের সঙ্গে ফাঁদে রেখে এল।
পরদিন ভোরবেলাই বুড়োর ফোন। “শিগগির এসো। কাল মাঝরাত্তির থেকে তিনতলায় কী প্রচণ্ড শব্দ হচ্ছে, যেন কেউ একটা কাঠের বাক্স চারিদিকে ছোঁড়াছুঁড়ি করছে – আমরা ঘুমোতে পারছি না।”
ছেলেটা এক ছুট্টে নিচে গিয়ে, গেট খুলে, পাশের বাড়ি ঢুকে, এক এক লাফে তিনটে করে সিঁড়ি পেরিয়ে তিনতলায় উঠল। উঠতে উঠতেই শুনতে পেল ভামটা ফাঁদে পড়ে ধাক্কাধাক্কি করছে আর বাক্সটা খটখট করে নড়ে উঠছে।
সাবধানে কাছে গিয়ে দেখল সারা রাত ধরে ছটফট করে ভামটার নাক কেটে রক্ত পড়ছে। ওকে দেখেই খ্যাঁক করে ঝাঁপিয়ে পড়ল ফাঁদের দরজার ছোট্ট ফুটোর ওপর।
দরজাটা ঠিকমত বন্ধ আছে কি না দেখে নিয়ে সাবধানে ফাঁদটা হাতে নিয়ে নিচে নামল ছেলেটা। দোতলায় গিয়ে একবার ডেকে বলল, “দেখবেন নাকি? বাক্সে বন্ধ। কিছু করতে পারবে না।”
বুড়োবুড়ি শোবার ঘর থেকেই চেঁচিয়ে বলল, “না, বাবা, না! নিয়ে যাও, নিয়ে যাও! এক্ষুনি নিয়ে যাও!”
বাড়ি পৌঁছে ছেলেটা দেখল বন্ধু অপেক্ষা করছে। দুজনে মিলে বাক্সটা নিয়ে ছাদে গেল। সেখানে আগে থেকেই একটা বড়ো খাঁচা তৈরি ছিল ভামটার জন্য। দুই বন্ধু মিলে বন্দী ভামের বাক্সটা সেই খাঁচায় রেখে বড়ো খাঁচার দরজা বন্ধ করে বাইরে থেকে যেই একটা লাঠি দিয়ে বাক্সের দরজায় ঠিক জায়গায় খুঁচিয়েছে, ওমনি খটাশ করে দরজাটা খুলে গিয়েছে।
এতক্ষনে ভামটা রেগেই অস্থির। গত বেশ কয়েকদিন ও বুঝেছিল একটা মানুষ রোজ সন্ধেবেলা এসে কাঠের বাক্সে মাংস রেখে যায় – আর পরদিন সকালে সেটা নিয়ে চলে যায়। মাংস খেতে যে ওর মন চায়নি তা নয়, কিন্তু মানুষের গন্ধটা এতই বেশি, যে কাছে যেতে সাহস হয়নি। কিন্তু কাল রাত্তিরে মাছের গন্ধটা এতই কড়া ছিল, যে মানুষের গন্ধ ঢাকা পড়ে গেছিল। লোভ সামলাতে পারেনি। পায়ে পায়ে যেই গিয়ে বাক্সে ঢুকে ট্যাংরা মাছটা মুখে ধরে টেনেছে, খটাশ্‌ করে দরজাটা বন্ধ হয়ে গেছিল। তার পরিণতি এই বন্দী দশা।
শরীরটা ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে মস্তো করে কটমট করে তাকিয়ে, অনেকক্ষণ ফ্যাঁশ ফ্যাঁশ করে রাগ দেখিয়ে কোনও লাভ হল না। ছেলেটা আর তার বন্ধু দিব্যি নিজেদের মধ্যে খানিকটা কথা টথা বলে, খাঁচার সামনে আর পাশের খোলা দিকগুলো ভারি তেরপল দিয়ে ঢেকে দিল। বেশ অন্ধকার হয়ে এল ভেতরটা। সারা রাত ফাঁদের সঙ্গে যুদ্ধ করে ক্লান্ত ভাম একটা আড়াল খুঁজে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ল। একটু পরে ঘুম ভাঙলে দেখল একটা কলাই করা থালায় খানিকটা জল আর আর একটা থালায় কিছু খাবার রেখে গেছে কে। খিদেয় পেট চুঁই চুঁই করছে, ভাম একটু জল খেয়ে খানিকটা ভাত, মাংসের কিমা, আর ডিম মাখা খেল। তারপর ফাঁদের বাক্সটার ওপরে উঠেই ঘুমিয়ে পড়ল আবার।
দিন কাটে। ছেলেটা আর ওর বন্ধু রোজ দুবেলা ওর জন্য খাবার নিয়ে আসে। শুরুতে খাবারে ওষুধ মেশান থাকত, কিন্তু আস্তে আস্তে নাকের কাটাটা সেরে যাবার পরে আর ওষুধ দরকার পড়ত না। শুরুতে ওদের দেখলে ভাম রাগ করত, ফ্যাঁশ-ফ্যাঁশ শব্দ করে ভয় দেখাত। কিন্তু পরের দিকে খাবার নিয়ে আসলে ছুটে দরজার কাছে এসে অপেক্ষা করত।
চিনে যাচ্ছে আমাদের,” বন্ধু বলল একদিন।
ছেলেটা বলল, “বটেই তো। রোজ দেখছে খাবার আনি, দেখাশোনা করি। বাচ্চা বয়স থেকে থাকলে এতদিনে পোষা হয়ে যেত। কিন্তু পোষ মানবে না। এক্কেবারে জংলী তো – তার ওপর খাঁচার পাখির স্বাদ পেয়েছে। ওকে এখানে ছাড়া যাবে না।”
বন্ধু জানতে চাইল, “তাহলে কী করবি? খাঁচায় থাকবে সারা জীবন?”
না। প্ল্যান করেছি একটা। কাল যাব ফরেস্ট অফিসারের সঙ্গে দেখা করতে।”

- সাত -
ফরেস্ট অফিসার বললেন, “ভাম তো উপকারী প্রাণী। থাকতে দাও না, তোমার বাগানে ইঁদুর টিঁদুর মারবে।
ছেলেটা মাথা নেড়ে বলল, “না। তিনটে বাড়ি দূরে একটা ছেলে থাকে। ওরা ছাদে খাঁচায় পাখি পোষে। ভামটা ওই খাঁচার সন্ধান পেয়েছে। কয়েকটা পাখি মেরেওছে। ছাড়া যাবে না।”
অফিসার বললেন, “বেশ। তাহলে একটা কাজ করি। শহর থেকে একশো কিলোমিটার দূরে ওই ডিয়ার পার্কটা – ওতেই ছেড়ে দিই, কী বল?”
তাই হল। কিছুদিন পরে ছেলেটা আবার ভামের জন্য কিছু মাংসের টুকরো ওই ফাঁদটার মধ্যে রেখে দিল। এবারে আর সেটা খেতে ভাম ঢুকতে দেরি করল না। আর এবারে যখন ফাঁদের দরজাটা খটাশ্‌ করে বন্ধ হয়ে গেল, ভাম অত রেগেও গেল না। ফাঁদের ফুটো দিয়ে নাক বের করে বাইরের জগতের গন্ধ শুঁকতে শুঁকতে চলল গাড়ি চড়ে।
গাড়ি অনেক ঘণ্টা চলে চলে একটা মস্তো ঘেরা জায়গায় গেটের সামনে এসে থামল – তার সামনে বিরাট বড়ো বোর্ডে লেখা – ডিয়ার পার্ক। এখানে বন্য জন্তুরা নিরাপদে থাকে। তাদের বিরক্ত করা, ফাঁদ পেতে ধরা, শিকার করা বারণ। সেখানে একটা বাড়ি আছে, তাতে লোকে রাতে থাকতে পারে। ছেলেটা আর ফরেস্ট অফিসার সেখানে গিয়ে রাতে থাকল।
সেদিন রাতে ভামকে ওরা যত্ন করে কিমা আর ডিম মেখে ভাত খাওয়াল। সেই শেষ বার। পরদিন সকালে আলো ফোটা মাত্র হাতে বাক্স নিয়ে ওরা জঙ্গলের ভেতরে ঢুকল। একটা ফাঁকা জমি, তার পরে একটা ছোটো পুকুরের পাড়ে ফাঁদটা রেখে একটু দূর থেকে ছেলেটা একটা লাঠি দিয়ে খুঁচিয়ে ফাঁদের দরজাটা খুলে দিল।
এবারে কিন্তু ভামটা আগের বারের মতো এক লাফে বেরিয়ে এল না। ফাঁদের ভিতর থেকেই উঁকি মেরে দেখতে লাগল। যেদিকে তাকায় – কত গাছ! একসঙ্গে এত গাছ ও কোনও দিন দেখেইনি। এক পা বেরোল, ডানদিকে তাকাল – আরও গাছ। বাঁদিকে তাকাল, আরও গাছ, কিন্তু সেই সঙ্গে মানুষগুলোও দাঁড়িয়ে আছে।
সেই দেখে ভামটা আর দাঁড়াল না। টুক টুক করে হেঁটে ঝোপের আড়ালে চলে গেল। আর ফিরে এল না।

ছবি - দেবাশিস দেব

Saturday, March 03, 2018

উল্টোরথ


ভূদেব ছিল অসম্ভব দুষ্টু। ওর মাথা ছিল দুষ্টুমির ফ্যাকটরি। যতরাজ্যের বদমাইশি খুঁজে বের করে কাজে লাগানোর ব্যাপারে ওর জুড়ি মেলা ছিল ভার। তাই একদিন যখন বলল, “আচ্ছা, কাল উল্টোরথ না? আমাদের স্কুলে ছুটি নেই কেন?” আমরা বুঝলাম মাথায় কিছু এসেছে।
ভূদেব বলে চলল, “রথের দিন রথ টেনেছি। উল্টোরথের দিন জগন্নাথ মাসির-বাড়ি থেকে ফিরবে না? কাল রথ না টানলে পাপ হবে!”
ওরে বাবা! ভূদেবের পাপ নিয়ে চিন্তা? আমরা খুব হাসলাম। কিন্তু ভূদেব তাতে থামল না। বলে চলল, “কালও রথ টানতে হবে।”
টান! কে বারণ করেছে?
ভূদেব দমবার পাত্র নয়। “কী করে? কাল স্কুল ছুটি দেয়নি।”
স্কুল ছুটি না দিলে রথ টানা যাবে না? রথ তো সন্ধেবেলা টানা হয়। চিরকালই সারাদিন রথ সাজিয়ে বিকেলবেলা টানতে বেরিয়েছি।
ভূদেব বলল, “কিন্তু ছুটি থাকে তো। কাল ছুটি নেই। স্কুলেই রথ টানব।”
আমরা হতভম্ব! স্কুলে রথ! ইয়ার্কি নাকি? না-হয় বড়ো হয়েছি। ক্লাস নাইন বলে কথা! কিন্তু তাই বলে স্কুলে রথ – বা অন্য কিছু...
কে যেন বলল, “আমি ওর মধ্যে নেই। দোলের আগের দিন কী হয়েছিল মনে নেই?”

মনে নেই আবার! দোলের আগের দিন, ক্লাসের মেয়েরা প্ল্যান করে আবির নিয়ে এসেছিল। যেই আমরা ক্লাসে ঢুকেছি, ওমনি খপাখপ ধরে আবির মাখানো। আজকাল যারা দোলের দু’ দিন আগে থেকেই স্কুল কলেজ থেকে বাঁদুরে রং মেখে বেরোয়, তারা এই ব্যাপারটা বুঝবে না, যে আমাদের সময়ে দোলের আগে রং খেলত কেবল উত্তর কলকাতার আর ভবানীপুরের ‘অবাঙালি’ এলাকার ‘অভদ্ররা’। আমরা দোল খেলতাম কেবল দোলের দিন – সকালে।
সে যা হোক, অতর্কিতে আবিরাক্রান্ত হয়ে আমরাও ছেড়ে দেবার পাত্র নই – ওই আবিরই কেড়েকুড়ে নিয়ে মেয়েদেরও মাখান হল। ফলে আবির শেষ হল অচিরেই। বেঞ্চে-ডেস্কে যা পড়েছিল সেও শেষ হতে সময় লাগল না। ক্রমে দেখা গেল ক্লাসে গোটা চল্লিশেক ছেলেমেয়ের মধ্যে মাত্র দশ-বারোজন ছেলেমেয়ে গোলাপি আবির মাখা, বাকিদের ইউনিফর্ম ধবধবে সাদা।
ক্লাসে এসে টিচার যারপরনাই বিরক্ত হলেন। কিন্তু তখন তো আর কিছু করার নেই, তাই পড়াতেও দ্বিধা করলেন না। কিন্তু খানিকক্ষণ যেতে না যেতেই ডাক এল রঙিন ছাত্রদের। প্রিনসিপ্যালের ঘরে। শুধু ছেলেরা। মেয়েদের ডাকা হল না। তারা যেমন গোলাপি ছিল তেমনই রয়ে গেল ক্লাসে। আমরা জনা সাতেক গেলাম।
প্রিনসিপ্যালের অফিসে বোর্ড বসল। রয়েছেন ভাইস প্রিনসিপ্যাল, অঙ্কের হেড, ইত্যাদি। কে তাঁদের খবর দিয়েছিল আমরা আজও জানি না। আমাদের বলা হল একটাই প্রশ্নের উত্তর দিতে। কে এনেছে আবির?
ভাইস-প্রিনসিপ্যাল বললেন, “আমরা বুঝতে পারছি, ছেলেদের মধ্যেই কেউ এনেছে। যে এনেছে সে নিজে হয়ত রং মাখেনি। হয়ত সে এখানে নেই-ও। সুতরাং কে এনেছে আবির আমাদের বলে দাও। আমরা তোমাদের ছেড়ে তাকেই শাস্তি দেব।”
ছেলেরা কেউ আনেনি। মেয়েদের মধ্যেই কেউ এনেছিল। কিন্তু সে কথা বলার জন্য কেউ তৈরি না। প্রথমত, বন্ধুদের / বন্ধুকে ঝোলালে কী হতে পারে সবই আমরা জানি। দ্বিতীয়ত, ভাইস-প্রিনসিপ্যালকে আমরা মোটেই বিশ্বাস করতাম না। দেবদত্তর দাদা আমাদের বলে রেখেছিল – মনে রাখিস – হি ইজ আ স্নেক ইন দ্য গ্রাস। এক্কেবারে বিশ্বাস করবি না। তৃতীয়ত, সত্যিই মেয়েদের মধ্যে কে আবির এনেছিল, আমরা জানতাম না।
আমরা চুপ করে রইলাম। আমাদের নানারকম জোরাজুরি করা হল। মিষ্টি কথায়, কড়া কথায় কাজ হল না। বলা হল আমাদের তাহলে সাসপেন্ড করে দেওয়া হবে।
ভয় পেলাম, তবু কেউ ভাঙল না। শেষে বলা হল, যাও বাইরে যাও। অফিসের বাইরে বেঞ্চ আছে, সেখানে বসো গিয়ে। এখানে তোমাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করার মিটিং হবে।
বসলাম। সেখানে ক্লার্করা এসে বলে গেল, “সাবধানে বসবে। এই সবে প্ল্যাস্টিক পেন্ট করা হয়েছে দেওয়ালে। সেখানে রং লাগলে কিন্তু...”
সত্যিই নতুন রং। প্রিনসিপ্যাল, ভাইস-প্রিনসিপ্যালের অফিসের সামনে বসার বেঞ্চে নতুন বার্নিশ, নতুন রেক্সিনের গদি। আমরা বসলাম সাবধানে।
বসে আছি, বসেই আছি। হঠাৎ ভূদেব বলে, “নতুন গদিগুলোর স্পঞ্জগুলো খুব ভালো রে!”
ভালো তো বটেই। বসে আছি তো তারই ওপরে! ভূদেব বুঝিয়ে বলল, “না, এই দেখ ঝকঝকে সাদা স্পঞ্জ।”
আড়চোখে তাকিয়ে চোখ চড়কগাছ! হাতে ইয়াব্বড়ো একমুঠো স্পঞ্জ। “কোথায় পেলি?”
হাতে ধরা একটা আধখানা ব্লেড। বলল, “দু আঙুলের ফাঁকে রেখে রেক্সিনটা কেটে ছিঁড়ে ছিঁড়ে বের করলাম!”
আমি কোনদিকে তাকাব বুঝতে পারছি না। আরে ব্যাটা লুকো, লুকো! কে কোত্থেকে দেখে ফেলবে! ভূদেব নির্বিকারভাবে স্পঞ্জের তালটা পকেটে ভরে ফেলল।
খানিক বাদে অফিস থেকে ডেকে আমাদের হাতে হাতে সাতদিনের সাসপেনশন নোটিস দেওয়া হল। সাত দিনের সাসপেনশন ফর গ্রস মিসকন্ডাক্ট।
ন’বছর স্কুলে আছি। কোনও দিন এত বড়ো শাস্তি পাইনি। আজও নিজের দোষে নয় – পেলাম। ভূদেবের খুব আনন্দ। সাত দিন পড়াশোনা না করলেও চলবে। বললাম, “বাড়িতে বকা খাবি।”
ভূদেব বলল, “কেন খাব? আমি তো রোজ বই ব্যাগ নিয়ে স্কুলে বেরিয়ে যাব।”
কোথায় যাবি?
যাব কোথাও... বন্ধুর বাড়ি...”
ভূদেবের বাড়ি চেতলায়। ওর চেতলা বয়েজের বন্ধুরা প্রায়ই স্কুল যায় না। কিন্তু সে সুখ তো আমার জীবনে নেই। সাত দিন বাড়িতে না-জানিয়ে স্কুলের নাম করে বেরিয়ে সকাল দশটা থেকে বিকেল চারটে ঢাকুরিয়া লেকে বসে থাকাও আমার দ্বারা হবে না।
তবে?
ক্লাসে পৌঁছলাম। সবাই জানতে পারল শাস্তির কথা। কেউ বলল, “বা রে! মেয়েরা বেঁচে গেল কেন?”
ভূদেবের খুব আনন্দ। হাঃ হাঃ, ওরা ভাবতেই পারেনি মেয়েরা আবির এনেছে। খালি বলে চলেছে – আমরা জানি তোমাদেরই কেউ এনেছ। বা অন্য কোনও ছেলে!
সান্টা বান্টার এরকম গল্প আছে। লোকে সান্টার ওপর খুব খ্যাপা। সবাই মিলে গ্রামছাড়া করেছে – ফিরলে মেরে তক্তা বানিয়ে দেবে প্রতিজ্ঞা করে। সান্টা চলে গেছে, কিন্তু কিছুদিন পরে গ্রামে ফিরেছে সান্টার জমজ ভাই বান্টা। লোকে তাকেই ধরে মারতে লেগেছে মার-সান্টাকে, মার-সান্টাকে বলে। সে মার খায় আর হাসে। যত হাসে তত আরও মার খায় – আর আরও জোরে হাসে। শেষে লোকে রেগে জিজ্ঞেস করেছে, আরে এত হাসছ কেন? মার খেতে ভালো লাগছে? বান্টা কোনও রকমে হাসি থামিয়ে বলেছে, দূর তোমরা এত বোকা তাই হাসছি। আমি তো বান্টা!
ক্লাস ভণ্ডুল হল। পিরিয়ড শেষ হতে সকলে ঘিরে ধরল। বুঝলাম সকলেরই খুব আনন্দ আমরা ফোকটে সাতদিনের ছুটি পাচ্ছি বলে। এর মধ্যে কে আবার বলল, “আমি যদ্দূর জানি, সাসপেনশন মানে বাড়িতে থাকা নয়। সাসপেনশন হলে সকাল থেকে বিকেল অবধি এসে প্রিনসিপ্যালের ঘরের সামনে বসে থাকতে হবে ইউনিফর্ম পরে, ব্যাগ-পত্তর নিয়ে!”
কেলো করেছে!
পরের পিরিয়ড শুরু হল। জোর করে বসিয়ে পড়াতে শুরু করলেন স্যার। এমন সময় আবার প্রিনসিপ্যালের চামুণ্ডা হাজির। যাদের সাসপেন্ড করা হয়েছে, তারা আবার প্রিনসিপ্যালের অফিসে যাবে। সাসপেনশন নোটিস হাতে নিয়ে।
এ আবার কী! গেলাম আবার। এবারে সে ঘরে ঢুকে দেখি চোরের মত মুখ করে আমাদের ক্লাসের রঙিন মেয়েরা দাঁড়িয়ে। ওরা আবার কখন সমন পেল? ওদের তো কেউ ডেকেছে বলে দেখিনি... ক্লাস থেকে বেরোলই বা কখন? আচ্ছা, যখন আমাদের সবাই ঘিরে ধরে জানতে চাইছে কী হল, তখনই ওরা চলে গেছে।
প্রিনসিপ্যাল মুখ খোলা মাত্র বুঝলাম, ঠিক। ওদের ডেকে পাঠায়নি কেউ। ওরা নিজেরাই এসেছে।
প্রিনসিপ্যাল বললেন, “তোমাদের ক্লাসের মেয়েরা এসে বলেছে যে ওরাই নাকি আবির এনেছিল, ওরাই নাকি জোর করে তোমাদের আবির মাখিয়েছে, তোমাদের কোনও দোষ ছিল না। মেয়েরা আবির এনে মাখিয়েছে, এ কথা বিশ্বাস করতে আমাদের অসুবিধা হচ্ছে। তবে ওরা যখন স্বীকার করেছে, তখন আর কিছু বলার নেই। তোমাদের সাসপেনশন তুলে নেওয়া হল। ক্লাসে যাও।” বলে মেয়েদের দিকে তাকিয়ে বললেন, “তোমাদের সাহস আছে। তাই তোমাদের শাস্তি দেওয়া হল না। কিন্তু ওয়ার্নিং দিলাম। এর পর কিন্তু আর ছাড়া পাবে না। যাও। এমন আর কোরো না।”
বেরোবার আগে ভাইস-প্রিনসিপ্যাল বললেন, “মনে রেখো, মেয়েদের আঁচলে মুখ ঢেকে বেঁচে গেলে। তোমাদের লজ্জা হওয়া উচিত। সারা জীবন মনে রাখবে...”

মোটেই লজ্জা হয়নি। কিন্তু এই স্কুলে উল্টোরথ টানা? সে-ও কি সম্ভব?
ভূদেব বলল, “পারমিশন নিতে হবে।”
আর কিছুই বলল না।
পরদিন ক্লাসে ঢুকে দেখি তিনতলা রথ রাখা পেছনে। শুইয়ে, যাতে টিচারের চোখে না পড়ে। ভূদেব গেটের কাছে ঘুরঘুর করছে। প্রিনসিপ্যাল আসলেই ঘরে যাবে। ভাইস-প্রিনসিপ্যাল বোঝার আগেই কাজটা করতে হবে। ভাইস-প্রিনসিপ্যাল জানতে পারলে...
প্রথম পিরিয়ড শুরু হবার কয়েক মিনিট পরেই ভূদেব ফিরল। টিচার ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলেন, “এতক্ষণ কোথায় ছিলে?”
ভূদেব বলল, “প্রিনসিপ্যালের ঘরে গিয়েছিলাম।”
এইরে! টিচারের মুখ শুকিয়ে গেল। “কেন? আবার কী করেছ?”
ভূদেব অভয় দিয়ে বলল, “না না, আমার কিছু কাজ ছিল।” সিটে ফিরল বিজয়গর্বে।
ঝুঁকে পড়লাম আমরা। “কী হল?”
পার্মিশন দিয়ে দিয়েছেন। এখন চেপে যা। পরে বলছি।”
সে কী!
আমরা অবাক! উত্তেজনা চাপা দায়! কোনও রকমে শেষ হল ক্লাস। ঘণ্টা পড়ামাত্র সবাই ছেঁকে ধরল – কী হল? কী হল?
ভূদেব বলল, “তোদের যা বলেছিলাম, তা-ই বলেছি। বললাম, রথের দিন রথ টেনেছি, স্যার। উল্টোরথে না টানলে পাপ হবে। টিফিনের সময়ে চালাব। একটু পারমিশন দিয়ে দিন।”
কী বললেন?”
কিছু না। চিঠিতে সই করে দিয়েছেন। অ্যালাউড – লিখে!”
বাপরে!

ভূদেবকে দেখে বোঝা যেত বসুন্ধরা সত্যিই বীরভোগ্য। সাহস করে কতো কী করে ফেলত – কত কী নিজে নিজে হয়ে যেত! একবার লাইটহাউস না নিউ এম্পায়ারে গেছে ‘এন্টার দ্য ড্রাগন’ সিনেমা দেখতে। ব্রুস-লী, ব্রুস-লী করে কলকাতা তখন পাগল। ভূদেব ক্লাসের প্রায় পনেরোজনকে উদ্বুদ্ধ করে নিয়ে গেছে নুন শো দেখতে। টিকিট নেই।
সে ছিল টিকিট না-পাওয়া আর ব্ল্যাকে টিকিট কাটার যুগ। সস্তাতম টিকিট তখন সবে পঁচাত্তর পয়সা থেকে বেড়ে নব্বই পয়সা হয়েছে। সবচেয়ে দামী টিকিটের দাম দশ-বারো টাকাও হবে না। কিন্তু হাউস ফুল, কোত্থাও টিকিট নেই। দু’টাকা তিন টাকার টিকিট ব্ল্যাকাররা হই হই করে পঞ্চাশ ষাট টাকায় বিক্রি করছে। তেমন সিনেমা হলে টিকিটের দামের পঞ্চাশগুণও হাঁকত নাকি।
এর পরের ঘটনাটা চেষ্টা করি ভূদেবের জবানীতেই বলতে।
আমি অনেক সিনেমার টিকিট কেটেছি মাইরি - কিন্তু এমন ভীড় জীবনে দেখিনি। এক হাত চলা যাচ্ছে না। লোকে হাহাকার করছে। ভেবেছিলাম ফ্লাইং ধরে ঢুকে যাব... (এখানে প্যারেন্থিসিস-এ ভূদেবের ফ্লাইং ধরার গল্প বলি - সিনেমা হলে অনেক সময়েই এমন লোক পাওয়া যায় যারা অ্যাডভানস টিকিট কেটেছে কিন্তু দেখতে পারবে না। তারা এসে টিকিট বিক্রি করে দিয়ে যায় – দামের দাম দিয়েই। সেটাই ফ্লাইং টিকিট। ভূদেব একবার আমাদের জনা দশেককে নিয়ে মধ্য কলকাতার কোন সিনেমা হলে এক কোণে দাঁড় করিয়ে বলেছিল, কেউ যদি এসে বলে টিকিট চাই? নিয়ে নিবি। বলে আধ ঘণ্টার মধ্যে সবাইয়ের শুধু টিকিট জোগাড় করেনি, হলে ঢোকার আগেই এক্সচেঞ্জ করে আমাদের সবার একসঙ্গে বসার ব্যবস্থা করেছিল। সেই ভূদেব এখন ফ্লাইং পাচ্ছে না... ফিরে যাই এন্টার দ্য ড্রাগনে)
ফ্লাইং নেই দেখে সবে ভাবছি, এবারে আর হল না, এমন সময় পুলিশের রেড হয়েছে। ব্ল্যাকারগুলো এদিক ওদিক পালাচ্ছে, একটা ব্ল্যাকারকে পুলিশ ধরেছে, আর ও-, বমাল সমেত ধরা দেবে না বলে ওর টিকিটের বাণ্ডিলটা ছুঁড়ে দিয়েছে। হবি তো হ, বাণ্ডিলশুদ্ধু টিকিট আমার জামার – এই বুকের বোতামটা তো খোলা থাকে - ভেতর গলে আমার পেটে আটকে গেছে। ভাগ্যিস জামাটা গুঁজে পরেছিলাম!
তারপর?
তারপর আর কী! সবাই টিকিট পেলাম। আশেপাশে যারা টিকিট চাইছিল তাদের দিলাম, ওখানে কয়েকটা চাইনিজ ছেলে ছিল, গার্লফ্রেন্ড নিয়ে এসেছিল, ওরাও টিকিট পাচ্ছিল না। ওদের দিলাম। এখন হেবি দোস্তি হয়েছে। ওরা হল যমুনা সিনেমা হলের তল্লাটের ছেলে। এখন থেকে যমুনায় টিকিট পেতে কোনও অসুবিধে হবে না।

ভূদেব পকেট থেকে চিঠি বের করল। তাতে কাঁচা, কিন্তু নির্ভুল ইংরিজিতে ওই কথাই লেখা। কিন্তু সবচেয়ে বড়ো কথা - চিঠির নিচে লেখা ‘অ্যালাউড’ আর তার নিচে প্রিনসিপ্যালের সই আর স্ট্যাম্প।
কে যেন বলেছিল, “কিন্তু রথ তো সাজানো নেই। টিফিনের আধঘণ্টায় রথ সাজিয়ে কতটুকু আর চালানো যাবে?”
এক গাল হেসে ভূদেব বলল, “কে বলেছে, টিফিনের সময় তো চিঠিতে লেখা নেই। সুতরাং কতক্ষণ চালাব সে আমাদের ওপর!”
বুদ্ধি দেখে আমরা চমৎকৃত! টিফিনের আগেই প্রিনসিপ্যাল বাড়ি যান। সুতরাং কেউ গিয়ে জিগেসও করবে না। আর ফোন করলে? সে দেখা যাবে ’খন।

টিফিনের সময় আমাদের খাওয়া ফেলে রথ সাজানোর সে কী ধুম! ভূদেব গাইড করছে সবাইকে। আমাকে দায়িত্ব দিয়েছে, “অনি, তুই ঘোষের পোকে ওই কীর্তনটা শিখিয়ে দে। ওই যে রবীন্দ্রনাথের কবিতায় সুর দেওয়াটা। ওটাই আজ সংকীর্তন হবে।
কবিতা সহজ। সুরও। ঘোষ-কে শিখিয়ে দিলাম। সে-ও সাদা ফুলপ্যান্টের ওপর নেভি ব্লু হাফ প্যান্ট চড়িয়ে নিল। ও-ই প্রধান গায়ক। ব্যাগ থেকে খঞ্জনি বের করল ভূদেব। ও বাজাবে। বলল, “খোল আনতে পারতাম, কিন্তু বড্ডো বড়ো। ধরা পড়ে যাব।”
ক্লাস নাইন – এ সেক্সন থেকে রথ বেরোল। হই হই করতে করতে তিনতলা করিডোর ধরে বার দুয়েক তিনেক প্রবল গর্জনে কীর্তনের সঙ্গে সবাই চলল। দেখতে দেখতে তিনতলার সব ক্লাস (বাকি ক্লাসগুলো ক্লাস এইটের ছিল) খালি। হইচই শুনে টিচার্স রুম থেকে টিচাররা বেরিয়ে এল। ছাত্রদের দুষ্টুমিতে সকলেরই মুখে প্রশ্রয়ের একটু হাসি।
ভূদেব বলল, “নিচের করিডোরে চল। এখানে টিচারদের ভীড় বাড়ছে।”
দূরের সিঁড়ি দিয়ে আমরা নেমে গেলাম দোতলায়, সেখান থেকে একতলায়। ক্লাস এইট, সেভেন, সিক্স এবং শেষে ফাইভের ছেলেমেয়েরা সবাই বেরিয়ে এসেছে, সে বিরাট মিছিল। এবারে রথ নিয়ে গান গাইতে গাইতে চারতলায় – সেখানে আমাদের ক্লাসের অন্যান্য সেক্সন। এবং তারও ওপরে ক্লাস টেন আর ইলেভেন।
তারাও আগে থেকেই অনেকে যোগ দিয়েছিল। এখন বাকিরাও ক্লাস থেকে বেরিয়ে এল। একটা করে ক্লাসরুমের পাশ দিয়ে রথ যায়, আর সে ক্লাসের ছেলেরা বেরিয়ে এসে মিছিলে যোগ দেয়। তুমুল হইচই, আর সেই সঙ্গে গান -
রথযাত্রা, লোকারণ্য, মহা ধুমধাম,
ভক্তেরা লুটায়ে পথে করিছে প্রণাম।
পথ ভাবে আমি দেব রথ ভাবে আমি,
মূর্তি ভাবে আমি দেব – হাসে অন্তর্যামী।
এই কবিতা গাওয়া হচ্ছে কীর্তনের সুরে, ফিরে ফিরে, বার বার। প্রতি দু লাইনের পরে যে বিরতি, সেই বিরতিতে যারা গাইছে না তারা ধুয়ো দিচ্ছে, কানফাটে ‘হেই’ শব্দে।
রথযাত্রা, লোকারণ্য, মহা ধুমধাম,
ভক্তেরা লুটায়ে পথে করিছে প্রণাম। (হেই)
পথ ভাবে আমি দেব রথ ভাবে আমি,
মূর্তি ভাবে আমি দেব – হাসে অন্তর্যামী। (হেই)
টিফিন শেষের ঘণ্টা কখন পড়েছে, কেউ শুনতেই পায়নি।
আমি পেয়েছিলাম। ভূদেব আমাকে বলেছিল, “তুই এখন ক্লাসে যা। ওখানেই থাক। টিফিনের পরে টিচার এলে বলে দিবি, ক্লাসে কেউ নেই, সবাই রথ টানছে।”
আমি তাই করেছিলাম। হিস্ট্রি স্যারকে বিদায় দিয়ে আবার ফিরে এসেছি। রথ চলছে দোতলার করিডোর দিয়ে, হঠাৎ সিঁড়ি দিয়ে নেমে এলেন স্বয়ং অঙ্কের হেড – আশুবাবু। দশাসই চেহারা, হাতে মিটার স্কেল!
সঙ্গে ভাইস-প্রিনসিপ্যাল। তিনি তেমনই শুঁটকো এবং বেঁটে। কিন্তু ভয়াবহতায় কম যান না। বাজখাই গলায় আশুবাবু বললেন, “ক্লাস টাস নেই?”
কিছু স্টুডেন্ট আশুবাবু আর ভাইস-প্রিনসিপ্যালকে দেখেই সটকেছিল, আরও কিছু আশুবাবুর হুঙ্কার শুনে হাওয়া। কিন্তু ভীড় তেমন কমল না। বরং “হেই... রথযাত্রা লোকারণ্য মহা ধুম ধাআআআম...”-এর জোর কিছু বাড়ল। সর্পিল ভঙ্গীতে সেই সুরের সঙ্গে নাচতে নাচতে ভূদেব আশুবাবুর মুখের সামনে মেলে ধরল চিঠি - তাতে লেখা আছে, “উই বেগ ইউ টু অ্যালাউ আস টু পুল দ্য চ্যারিয়ট অন দ্য করিডোর ইন ফ্রন্ট অফ আওয়ার ক্লাসরুমস, সো দ্যাট উই আর সেভড ফ্রম সিন...” আর তার নিচে প্রিনসিপ্যালের সই। নিজে হাতে অ্যালাউড লেখা।
সময় দেওয়া নেই।

আশুবাবু আর ভাইস-প্রিনসিপ্যাল মুখ-তাকাতাকি করতে থাকলেন, মিছিলটা পাশ দিয়ে বেরিয়ে তিনতলায় চলে গেল।