Saturday, August 15, 2020

ছাদ

মৃণালিনী স্কুলের রি-ইউনিয়নে যায় না। বাবার রিটায়ারমেন্টের পর চণ্ডীগড় থেকে এখানে এসে ভীষণ মনখারাপ হয়েছিল, স্কুলটা ভালো লাগেনি, দু’বছর কোনও রকমে কাটিয়ে কলেজে গিয়ে হাঁপ ছেড়ে বেঁচেছিল। কলেজের বন্ধুরা এখনও ওর বন্ধু। স্কুলের বন্ধু যে দুজন কলেজে ছিল, তাদের সঙ্গে যোগাযোগ আছে, রেগুলার আড্ডা দেয়ওরা বলে আয় না একবার রি-ইউনিয়নে? মৃণালিনী বলে এই তো ভালো আছি, তোদের সঙ্গে আড্ডা দিই, র কাউকে তো চিনিও না! গিয়ে কী হবে?

এবারে যেতে হল। ঋতিকা, ওর বিজনেস পার্টনার, বলল, “একবার যাও। দেখো এবছর বুটিক চলছে না ভালো। রিসেশনের ফলে খুব সেল কম। তোমার স্কুলের বন্ধুরা বেশ মালদার। তোমাকে দেখে যদি দু-চারজনও আসে...”

লাঞ্চের মধ্যে মৃণালিনীর মনে হতে শুরু হলো আসাটা সার্থক হলেও হতে পারে। ওর ব্যাচেরই অন্তত জনা কুড়ি বলল আসবে। আর অন্য ব্যাচের কতজন যে কার্ড নিল তার ইয়ত্তা নেই। তিন চারজন বলল ওরা প্রায়ই যায় যদিও মৃণালিনী বুটিকে ওদের দেখেছে বলে মনে করতে পারল না। দেখতে দেখতে একশো-কার্ডের বাক্স প্রায় খালি, লাঞ্চ খেতে গেল বেশ খুশি মনেই।

লাঞ্চের সময় হঠাৎ একজন এসে বলল,তুই মৃণালিনী না? কী মিষ্টি গান গাইতি... কী করিস এখন?”

আশেপাশে যারা দাঁড়িয়ে ছিল তারা প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়ল তোর কী ছিরি হয়েছে রে? দেরি করে আসিস, আর ক্লাসের কাউকে চিনতে পারিস না! মৃণালিনী গুপ্ত-র নাম চারিদিকে হোর্ডিঙে হোর্ডিঙে সবাই সারাক্ষণ দেখছে বছরে তিনটে অ্যালবাম, অন্তত চারটে লাইভ শো! তা ছাড়াও, পঁচিশে বৈশাখ, বাইশে শ্রাবণ, পয়লা বৈশাখ, শহরের সমস্ত বড়ো মঞ্চে আলো করে... তাকে জিজ্ঞেস করছিস কী করছিস এখন?

ড়ালে সরে গিয়ে মৃণালিনী তিস্তাকে জিজ্ঞেস করল, “কে রে?”

তিস্তা বলল, “ওর নাম অরিত্রী। তোর মনে থাকার কথা নয়। সায়েন্স-এ ছিল।”

হবে, ও চিনত না। অরিত্রী কিন্তু দেখতে দেখতে ফিরে এল। বলল, “আমি খুব সরি তোর গানের সিডি আমি কিনিনি। স্কুলে তোর বেশ ফ্যান মতো ছিলাম, যদিও পরিচয় ছিল না। তবে এবারে কিনব। ফেরার পথেই মেলোডি যাব।”

ফ্যান শুনে সাহস করে মৃণালিনী বুটিকের কথা বলল। অরিত্রী খুব খুশি। বলল, “আমি যাব আজই যাওয়া যাবে? তাহলে একবার দেখে নিই...”

ঋতিকা ঠিকই বলেছিল। রি-ইউনিয়নে আসাটা জলে গেল না। লাঞ্চের পরে অরিত্রীকে ডেকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল দুজনে। বুটিকটা কাছেই। হেঁটেই আসা যায়। সারা রাস্তা বকবক করতে করতে এল অরিত্রী। এখানেই থাকত আগে। খুব কাছেই শ্বশুরবাড়ি ছিল এক সময় তারপরে চলে যায়... তোর ছেলে কত বড়ো? আমার বড়ো ছেলে... আর মেয়ে...

মৃণালিনীর বুটিকের রাস্তায় ঢুকে চুপ করল অরিত্রী। মৃণালিনীর মনে হলো কানের পোকাগুলো যেন বলল, “আঃ, শান্তি!”

ঋতিকা নেই। নিয়তিদি বলল, “প্রিতমদা এসেছিল, দুজনে কফি খেতে গেছে।” এই হয়েছে জ্বালা মেয়েটাকে নিয়ে। মৃণালিনী বেরোলেই ওর বেরোন চাই। অথচ ওর যখন মেয়ের স্কুলে পেরেন্ট টিচার মিটিঙে যেতে হয়, বাবাকে নিয়ে ডাক্তার দেখাতে যায়, তখন মৃণালিনী বুটিক আঁকড়ে পড়ে থাকে। যাকগে, নিয়তিদি বলল, ক্লায়েন্ট আসেনি কেউ। নিশ্চিন্ত।

বুটিক দেখে অরিত্রী উচ্ছ্বসিত। বলল, “এই পাড়ায় এরকম একটা বাড়িতে কী করে জায়গা পেলি রে?”

মৃণালিনী বলল, “এটা আমার পার্টনার ঋতিকার বাপের বাড়ি। আমরা ভাড়া নিয়েছি। ওপরে ওর বাবা-মা থাকেন। আমরা নিচে।”

অরিত্রী এটা দেখে, ওটা দেখে, সরিয়ে রাখে... ক্লায়েন্টরা এমনটা করে বটে, অনেকে তো অনেক সময় দেড়শো দুশো ড্রেস, শাড়ি, নামিয়ে তবে একটা কেনে। কিন্তু অরিত্রীর হাবভাব দেখে মৃণালিনীর মনে হতে লেগেছে, এ কিছু কিনবে না। আর কেমন মনে হচ্ছে, সব ঠিক থাকলেও, প্রাইস-ট্যাগটা দেখেই সরিয়ে রাখছে। দাম নিয়ে বলছে না কিছু যদিও।

ব্রাইট মভ্‌ আর ময়ূরকণ্ঠী নীলের কম্বিনেশনটা সবাই পছন্দ করে না, কিন্তু ওটা ওদের সিগনেচার ডিজাইন। তাই শো-রুমে কখনওই একটার বেশি থাকে না। সেটা নিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে মন দিয়ে দেখছিল অরিত্রী। হঠাৎ বলে উঠল, “উঃ”। মৃণালিনী তখন সবে নিয়তিদির দিকে ঘুরেছিল, একটু কফি বানাতে বলবে বলে। ফিরে অরিত্রীকে দেখে ছুটে গিয়ে ধরল। ভাগ্যিস! সান বাঁধান মাটিতে আছড়ে পড়লে আর দেখতে হত না।

কফি বলা হলো না। সাবধানে ড্রেসটা সরিয়ে নিয়ে বুটিকের মেঝেতেই মুখে চোখে জলের ছিটে দেওয়া মাত্র চোখ পিটপিট করে খুলল অরিত্রী। তারপরে, “ওঃ, আই অ্যাম সো সরি,” বলে ধরফরিয়ে উঠে বসল। মৃণালিনী বলল, “আরে, আরে, সাবধানে...”

শুনল না অরিত্রী। উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “ছি ছি, তোর ড্রেসটা কোথায়, নষ্ট হয়নি তো?”

মৃণালিনী আর সেদিক মাড়াল না। বলল, “তুমি ঠিক আছ তো? কী হয়েছিল? এরকম আগে হয়েছে?”

মাথা নাড়ল অরিত্রী। বলল, “অনেক বছর পরে এই দ্বিতীয় বার। খুব বাজে হলো। সরি...”

তারপরে বলল, “মৃণালিনী, আমি আজ যাব। এই পাড়ায় আমরা আর আসি না। জানিস, ওই যে বাড়িটা...” অরিত্রী খোলা জানলার কাছে দাঁড়িয়ে আঙুল দিয়ে রাস্তার উলটো দিকের গলির মধ্যে দ্বিতীয় বাড়িটা দেখিয়ে বলল, “ওই যে ভাঙামতো বাড়িটা, জানিস ওটা?”

জানে, কারণ ওর উলটো দিকে একটা স্টেশনারি দোকান থেকে প্রায়ই সেফটিপিন, ছুঁচ-সুতো এসব কিনতে হয়। বাড়িটা দেখে বলেছিল, “ইশ, এখানে এরকম একটা প্রায় ভাঙা বাড়ি কোনও মেন্টেনেন্স নেই?”

ঋতিকা বলেছিল, “আরে মালিক থাকে না এখানে... আর ভাড়াটেও নেই। দেখো না, বাড়ির কোনও ছিরি নেই। পার্কিং নেই, আর এই সরু গলিতে গাড়ি রাখার উপায় নেই। সব বাড়ি দোতলা, এটা কী করে চারতলা হলো? সেইজন্যই ভাড়া পায় না। কেবল একতলায় দুচারটে দোকান। গ্যারেজ না থাকলে এইসব বাড়িতে কেউ থাকতে চায় না। আর এখন তো ভগ্নদশা।”

অরিত্রী বলল, “বিয়ের পরে ওই বাড়িটাতেই আমরা এসেছিলাম...”

নিয়তিদি এসে বলল, “একটু কফি বানাই দিদি, খান?”

অরিত্রী একটু ভেবে বলল, “কফি? আচ্ছা, দাও একটু... মাথাটা এখনও ঘুরছে।”

মৃণালিনী বলল, “কী হয়েছিল? বলবে?”


*

বাড়িটা দেখে অরিত্রীর মোটেই ভালো লাগল না। এ আবার কী ছিরি! কোথায় যেতে হবে শুনে যতটাই মনটা নেচে উঠেছিল শহরের এই অঞ্চলটা ওর বড়োই প্রিয় ― এসে পৌঁছে ততটাই হতাশ লাগল। বড়ো রাস্তার পরে মাঝারি রাস্তা, তারপরে ছোটো রাস্তার অভাব এ পাড়ায় নেই ― কিন্তু তা বলে এ রকম একটা গলি! ড্রাইভার বলল, “এখানে পার্কিং করা যাবে না, ওদিকের রাস্তায় রাখছি।” তারও গলায় কেমন তাচ্ছিল্য... তার ওপর বাড়ির দিকে তাকিয়েই বুবুনদা যখন আঁতকে উঠে বলেছিল, “বাপরে! এ তো দেখছি খণ্ডহর!” তখন অরিত্রীরও মন খারাপ হয়ে গেছিল।

পরে যদিও বোঝা গেছিল, অত খারাপ না, আসেপাশের বাড়িগুলোর তুলনায় খারাপ ― এই যা। তীর্থর বাবা অবশ্য অনেক ক্ষমা-টমা চাইলেন, “কী জানেন, এই সরু গলিতে গাড়িওয়ালা লোকেরা বাড়ি নিতে চায় না। আর এই সাইজের ফ্ল্যাট যারা চায়, তাদের আজকাল একটা না, সব দু’টো করে গাড়ি। আমার ছেলে তো গাড়ি পার্ক করে ওই মোড়ের পেট্রোল পাম্পে। আর আমার গাড়িটা পড়ে আছে শ্বশুরবাড়িতে। বাড়ি ভাড়া নেবার লোক নেই, ভাড়াও তুলনায় কম ― তাই বাড়িওয়ালা মেন্টেনেন্‌সের পেছনে খরচা করতে চায় না...”

চারতলা বাড়ি, লিফট নেই। বাবা-মা দুজনেরই সিঁড়ি চড়তে অসুবিধে হয়েছিল। চারতলা উঠতে হয়নি অবশ্য ― তিনতলায়ই তীর্থর মা-বাবা থাকেন। তাতেই বাবা ফোঁস-ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলছিল। আর মা-র হাঁটু...

বসার ঘরে বসে জল টল খাইয়ে বাবাকে ধাতস্থ করে অধীরবাবু বাকি কথা বললেন ― শহরের উপকণ্ঠে নতুন টাউনশিপে যত্ন করে বাড়ি বানাতে গিয়ে কেন খরচও বেশি হচ্ছে, সময়ও বেশি লাগছে। এখানে সাময়িকভাবে ভাড়া এসেছেন। বেশিদিন থাকবেন না। বছর দুয়েকের মধ্যেই বাড়ি হয়ে যাবে। কিন্তু তীর্থর বিয়েটা আর ফেলে রাখতে চাইছেন না। সে দিক থেকে এই বাড়িটা খুব সুবিধের ― ওপর নিচে দুটো ফ্ল্যাট ― কোনওটাই খুব বড়ো না, কিন্তু দুটো সিংগ্ল্‌ ফ্যামিলির জন্য যথেষ্ট, “তুমি নিপার সঙ্গে গিয়ে দেখে এসো না...”

এটা দাদার শোবার ঘর... মানে...” নিপা থতমত খেয়ে থেমে গিয়েছিল। তিন কামরার ফ্ল্যাট। একটা বসার ঘর, একটা শোবার আর একটা খাবার। রান্নাঘর, বাথরুম। খাবার ঘর, রান্নাঘর, বসার ঘর ― কোনওটাই তীর্থর দরকার নেই, হয়ত অরিত্রীরও লাগবে না। নিচেই নিশ্চয়ই রান্নাবান্না খাওয়াদাওয়া হবে? বারান্দাটা সুন্দর, সামনের সরু গলির দিকে হলেও সামনের কয়েকটা বাড়ি দোতলা বলে অনেকটা দূর অবধি দেখা যায়...

অরিত্রীকে সেদিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে নিপা বলল, “এদিকটা দক্ষিণ। গরমে যা হাওয়া দেয়... সব উড়িয়ে নিয়ে যাবে। আর এখন দিনের বেলা রোদ্দুর। সকাল দশটা থেকে প্রায় বিকেল তিনটে, সাড়ে তিনটে অবধি ― সব ঝকঝক করবে।”

মানতেই হল, পাড়াটা ভালো, ফ্ল্যাটদুটো ভালো, বাড়িটাই যা একটু পুরোনো। একতলায় কয়েকটা দোকান, তারা সন্ধে হলে সব গুটিয়ে চলে যায়, দোতলাটা বাড়িওয়ালারা নিজেদের জন্যে রেখেছে। দু-তিন মাস অন্তর অন্তর এসে ক’ দিন থেকে যায়। আর থাকতেও তো হবে না বেশিদিন।

মা-ও বাড়ি ফিরে তা-ই বলল।

দেখ, বাড়ি দেখে মন খারাপ করিস না। ক’দিনের মধ্যেই নতুন বাড়িতে শিফট করবি। ভদ্রলোক বললেনই তো, কনট্র্যাক্টর অনেক টাকা নিয়ে পালিয়েছে। নতুন কন্ট্র্যাক্টর ধরে বাড়ি শেষ করতে গিয়ে নাজেহাল হয়ে যাচ্ছেন। ফলে টাকা বাঁচানোর জন্যই এই বাড়ি নেওয়া। আমার মনে হয় বাড়ির যা ভগ্নদশা, তাতে বাজারদরের চেয়ে অনেকই কম ভাড়া দিতে হচ্ছে।”

রুটি ছিঁড়ে ভিণ্ডি-র মাখা তরকারি মুড়িয়ে মুখে দিতে গিয়ে বাবা থমকাল। বলল, “শুধু, এই বাড়িতে যতদিন থাকবি, আমার বিশেষ যাওয়া হবে না। বাবা গো, আমার আজই দম বেরিয়ে গিয়েছিল। বার বার যেতে গেলে হার্ট অ্যাটাক হয়ে যাবে।”

বাবা নিজের অসুখ বা মরে যাবার কথা বললেই মা-র মেজাজ গরম হয়ে যায়। ঠক করে ডালের ডেকচিটা টেবিলে রেখে বলল, “থাক, আর রাতের বেলা কু-গাইতে হবে না। কটা দিনের আর ব্যাপার। এরকম একটা পাত্র হাতছাড়া হয়ে গেলে পরে পস্তাতে হবে।”

কথাটা আর এগোল না। অরিত্রীর মনটা খারাপ হয়ে গেল। চিরকাল শুনেছে, সম্বন্ধ করে বিয়ে করলে মেয়েরা বিয়ের আগে থেকেই বস্তু হয়ে দাঁড়ায়। মনে হলো, নিজের বেলায়ও তা-ই দেখছে।


*

রিতি, বাইরে বারান্দায় কুল রয়েছে। একটু ভেতরে নিয়ে এসো। তোমার বাবা আবার গন্ধ গন্ধ বলে চিৎকার শুরু করে দেবেন।”

অরিত্রী এখনও শ্বশুরকে বাবা ভাবতে পারে না। এবং শাশুড়ির মুখে রিতি নামটায় অভ্যস্ত হয়নি। এখনও শুনেই ভুরুটা নিজে থেকেই কুঁচকে গেল। নামটা তীর্থর দেওয়া। ফুলশয্যার রাতে। অরিত্রীর মুখের ওপর থেকে লাল ওড়নাটা সরিয়ে ডানহাতের তর্জনীটা কেমন বন্দুকের ঘোড়া ধরার মতো করে ধরে নুয়ে থাকা মুখ তুলে নিয়ে চুমু খেয়েছিল ঠোঁটে। অরিত্রীর হঠাৎ রাগ হয়েছিল। কথা নেই, বার্তা নেই, প্রথমেই চুমু আর প্রথমেই ঠোঁটে? অবশ্য পরে বুঝেছিল সেটা তীর্থর অনভিজ্ঞতা। রোম্যানটিকতার অভাব নয়। শেষ পর্যন্ত অরিত্রীর ধড়াচূড়ো ছাড়িয়ে নাইটি পরিয়ে দিয়েছিল তীর্থই। তারপরে দুজনে পাশাপাশি, মুখোমুখি শুয়ে আবার ঠোঁটে ঠোঁট ছুঁইয়ে যখন তীর্থ জিজ্ঞেস করেছিল, “তোমার ডাক নাম কী?” তখন অবশ্য আর খারাপ লাগেনি, বা রাগ হয়নি। বলেছিল, “আমার ডাক নাম নেই। আমাকে সবাই অরিত্রী বলেই ডাকে।”

তীর্থ বলেছিল, “এ মা! অরিত্রীই ডাকনাম?”

তা বলতে পারো।”

তীর্থ বলেছিল, “এ বাবা, মেয়েটার ভালো নাম নেই।”

অরিত্রী কপট রাগে তীর্থর বুকে কিল মেরেছিল। তীর্থ হাত দিয়ে সে মুঠো ধরে নিয়ে বলেছিল, “আমি তোমাকে একটা ডাকনাম দেব। মঞ্জুর?”

যেখানে কিল মেরেছিল, সেখানে মুখ গুঁজে অরিত্রী বলেছিল, “উঁ-উঁ-উঁ... নির্ভর করছে ― কী নাম তার ওপর।”

তীর্থও একটুক্ষণ উঁ-উঁ-উঁ বলে ভেবে বলেছিল, “রিতি। কেমন নাম?”

সারাদিনের ক্লান্তি পেয়ে বসেছিল অরিত্রীকে। তাও আড়চোখে তীর্থর দিকে চেয়ে বলেছিল, “ঠাকুরবাড়ির মতো? নতুন নাম?”

তীর্থ বলেছিল, “না। এটা কেবল আমার আর তোমার। শুধু আমি ডাকব।”

তিন দিন টিঁকেছিল। চার দিনের দিন সকালে নিপা সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে শুনে ফেলেছিল তীর্থ অরিত্রীকে ডেকে বলছে, “রিতি, আমি নিচে নামছি... এসো চটপট...” সেদিনই খেতে বসে বলে দিয়েছিল, “দাদা বৌদিকে কী স্পেশাল নাম দিয়েছে জানো?”

সেদিন থেকে শাশুড়িও অরিত্রীকে রিতি বলে ডাকেন। কিন্তু কেবলই যখন দুজনে একান্তে ― আর কখনওই না। অরিত্রীর মনে হয়, এর চেয়ে নামটা সবাই ব্যবহার করতে শুরু করলেও হয়ত অত খারাপ হত না।

বারান্দায় গিয়ে বারকোশের ওপর শুকোতে দেওয়া কুলগুলো ভেতরে এনে রান্নাঘরের পাশের ভাঁড়ারে নির্দিষ্ট জায়গায় রাখল অরিত্রী। আদ্যিকালের বাড়ি বলেই এতবড়ো রান্নাঘর আর ভাঁড়ার। নিজেদের বাড়িতে গেলে এই সুখ আর থাকবে না। মডার্ন বাড়িতে এসব থাকে না।

অরিত্রী ফিরে খাবার টেবিলের পাশে দাঁড়াল। শাশুড়ি রান্নাঘরে সকালের তোড়জোড় শেষ করছেন। উনি রান্নাঘরে থাকলে আর কেউ ঢুকবে সেটা উনি পছন্দ করেন না। অরিত্রীকে অপেক্ষা করতে হবে, কতক্ষণে শাশুড়ি চানে যান। চান করে, ঠাকুরকে জল দিয়ে শাশুড়ি রান্নাঘরে আসবেন। তার মধ্যে ওকে রান্নার কাজ শেষ করতে হবে। রোজ একটা কিছু করতে বলেন শাশুড়ি। দ্বিরাগমনের পরে একমাস কেটে গেছে। সাতদিনের হনিমুন সেরে এসে থেকে বাড়ির খুঁটিনাটি রুটিনগুলো প্রায় সড়গড় হয়ে গেছে ওর। নীপাও ফিরে গিয়েছে ব্রহ্মপুরে, তীর্থর অফিস শুরু হয়ে গেছে পুরোদমে।

শাশুড়ি বাথরুম যাবার পথে রোজের মতো বলে গেলেন, “তুমি সেরে নাও।” অরিত্রী রান্নাঘরে ঢুকেই প্রথমে বাইরের দিকের দরজার ছিটকিনিটা খুলে দিল। পুরোনো বাড়ি, তাই সিঁড়ি থেকে বাড়িতে ঢোকার তিনটে দরজা। একটা বাইরের বসার ঘরের, একটা রান্নাঘরের আর একটা ওদিকের একটা ঘরের। সেই তৃতীয় ঘরটা ওর দেওরের। এ বছর বি-এস-সি ফাইনাল দেবে। তাই এখন থেকেই পড়ার চাপ বেড়েছে।

কমলা আসবে এখনই। ওর ঢোকার রাস্তা এটা। আগে রান্নাঘরে বাসন ধোবে, তারপরে ঘর ঝাঁট দিতে মুছতে যাবে। দরজাটা দেখে অরিত্রীর মা একেবারে গদগদ হয়ে গিয়েছিল! “কী ভালো, এই দরজা দিয়েই ঢুকবে, এই দরজা দিয়েই বেরোবে। আর বাড়ির ভেতরে যেতে হবে না।” অরিত্রী অবাক, এই কি তার মা? বলেছিল, “ঘর ঝাঁট দেবে, মুছবে, বারান্দায় কাপড় মেলবে ― সে তো এমনিই সারা বাড়ি ঘুরবে। সদর দরজা দিয়ে ঢুকলে কী আর হবে?”

যা-ই হোক, রান্নাঘরের দরজা খুলে রেখে অরিত্রী রান্নায় মন দিল। এ বাড়ির রান্নায় একটা ঝকমারি হলো এই, যে গুঁড়ো মশলা বা প্যাকেটের পেস্ট ব্যবহার হয় না। পেঁয়াজ, আদা, রসুন, লঙ্কা, জিরে, ধনে ― সবই তখুনি তখুনি বেটে নিতে হয়।

ফ্রিজ থেকে সবে লঙ্কা নিয়ে এসে, জলে ধুয়ে, বোঁটা ছাড়িয়ে, শিলে ফেলে, নোড়া দিয়ে একবার পিষেছে, সিঁড়িতে তীর্থর পায়ের শব্দ পেল। তীর্থ? এই সময়ে? ঘড়িটা হাত থেকে খুলে সামনের তাকে রেখেছিল, আড়চোখে দেখল, এতক্ষণে ওর প্রায় অফিস পৌঁছে যাবার কথা! কী আশ্চর্য! মাঝরাস্তা থেকে ফিরে এল? লঙ্কাপেষা থামিয়ে বাইরের দিকের দরজার দিকে চেয়ে রইল অরিত্রী। দরজাটা খোলা, কিন্তু হাট করে নয়। ছিটকিনি খোলার পরে নিজের ওজনে একটা পাল্লা ভেতরের দিকে ইঞ্চিখানেক খুলে এসেছে। অরিত্রী যেখানে দাঁড়িয়ে সেখান থেকে বাইরের ল্যান্ডিং-টা একটুখানিই দেখা যাচ্ছে। খচ্‌, খচ্‌, খচ্‌ করে জুতোর সামনেটুকু কেবল সিঁড়িতে ঘষে তীর্থ ওঠে। এতদিনে অরিত্রী শিখে গেছে। লঙ্কামাখা হাতে দরজা ধরতে পারছে না, খেয়াল করল বাইরের দরজার সামনে দিয়ে দুটো পায়ের ছায়া বেরিয়ে গেল ওপর দিকে, খচ্‌ খচ্‌ খচ্‌... ক্রমে আরও উঠে গেল ওপরে।

বাবা বাইরের ঘরে বসে খবরের কাগজ পড়ছেন, সামনে দিয়ে অসময়ে ছেলে উঠে গেল, বাবা-ছেলেতে কোনও কথা হলো না? আশ্চর্য হয়ে লঙ্কাবাটা থামিয়ে সবে সিঙ্কে হাত ধুতে গিয়েছে, বাইরের দরজা ঠেলে ঢুকল কমলা। বলল, “মশলা বাটা হয়ে গেছে, বৌদি?”

অরিত্রী হ্যান্ড-টাওয়েলে চট করে হাতটা শুকিয়ে নিয়ে বলল, “না, কমলা, দেরি আছে একটু। তুমি সিঁড়ি দিয়ে উঠলে, সামনে দাদাকে দেখলে?”

অবাক হয়ে কমলা বলল, “বড়দা? কই না তো? বড়দা অফিসে যায়নে?”

অরিত্রীর তখন দুশ্চিন্তা শুরু হয়েছে। তীর্থ কাউকে কিছু না বলে চারতলায় কেন উঠে গেল? শরীর খারাপ না তো? কথা না বাড়িয়ে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে খাবার ঘর পেরিয়ে বসার ঘরে গিয়ে বুঝল কেন তীর্থ বাবার সঙ্গে কথা বলার জন্য থামেনি। শ্বশুরমশাই সোফাতেই এলিয়ে বসে নাক ডাকাচ্ছেন। হাত থেকে খবরের কাগজ খসে পড়েছে কখন।

পা টিপে টিপে বাইরে গিয়ে অরিত্রী চারতলায় উঠল। সিঁড়ির শেষে কোল্যাপসিব্ল গেট। এরকম গেট তিনতলার মুখেও রয়েছে, চারতলারও। দরকার পড়লে চারতলা, বা তিন আর চারতলাকে বাড়ির অন্যদের থেকে আলাদা করা যায়। বাড়িতে সবসময়ই লোক, তাই দিনের বেলা কোল্যাপসিব্ল গেটে তালা থাকে না, কিন্তু অরিত্রী আর তীর্থ টেনে দিয়ে নিচে নামে।

গেটটা টানাই আছে। অরিত্রী হালকা হাতে টানামাত্র খুলে গেল নিঃশব্দে। তেল দিয়ে মসৃন করে রাখা কোল্যাপসিব্ল।

কিন্তু ফ্ল্যাটের দরজার হুড়কো তো বাইরে থেকেই আটকানো! ছাদেও কেউ যায়নি। এখান থেকেই দেখা যাচ্ছে চিলেকোঠার দরজার ছিটকিনি বন্ধ। ওখানে বসে বাবু পড়ে। তার মানে ও-ও উঠে আসেনি। তাহলে?

অর্থহীন জেনেও অরিত্রী দরজা খুলে বাড়িতে ঢুকে ঘরগুলো একবার ঘুরে দেখল। বলা বাহুল্য কেউ নেই। তাহলে ভুল শুনল? কে জানে! শুধু শুনেছে তা না, অনেকক্ষণ ধরে শুনেছে। দেখতেও পেয়েছে দরজার বাইরে দিয়ে কাউকে হেঁটে যেতে। তবে?

তবে এখানে থেকে আর লাভ নেই। রান্না শেষ করে ফেলতে হবে শাশুড়ি রান্নাঘরে ঢোকার আগেই। তরতর করে সিঁড়ি নেমে আবার বসার ঘরে ঢুকল অরিত্রী। শ্বশুরমশাইয়ের ঘুম ভাঙেনি, শাশুড়ি এখনও চানে। বাড়িতে কারওর নড়াচড়া বোঝা যাচ্ছে না। অরিত্রী কাগজটা তুলে ভাঁজ করে রাখতে গেল, বোধহয় ওই শব্দেই ঘুম ভেঙে শ্বশুরমশাই বললেন, “, কী হলো? পড়ে গিয়েছিল? আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।”

অরিত্রী হেসে বলল, “এরকম ভাবে ঘুমোলে ঘাড়ে ব্যথা হবে, বাপি। ঘুম পেলে বিছানায় শুয়ে নিন না?”

শ্বশুরমশাই মাথা নেড়ে সোফা ছেড়ে উঠে পড়লেন। বললেন, “বেপাড়ায় বন্ধুটন্ধু নেই, তাই... আগের পাড়া হলে বুড়োদের আড্ডায় বেরিয়ে পড়া যেত। তবে কাল থেকে তো যাব নতুন বাড়ি তৈরির তদারকিতে...”

অরিত্রী রান্নাঘরে ঢুকতে ঢুকতে বলল, “-পাড়াতেও নিশ্চয়ই রিটায়ার্ড লোকেরা গল্পটল্প করে। বেরোলেই দেখতে পাবেন।”

শ্বশুরমশাই উত্তর দিলেন না। বললেন, “বাবু এখনও ওঠেনি, না?”

বাবু দেওরের নাম। অরিত্রী রান্নাঘর থেকেই বলল, “না, বাপি...” তারপরে হাত লাগাল লঙ্কাবাটায়।

বড়দা এয়েচে?” উত্তর দেবার আগেই মোবাইলে টুং করে মেসেজ ইন্টিমেশন এল। মিলিয়ে যাবার আগে চোখ তুলে দেখে নিল অরিত্রী ― তীর্থ লিখেছে, ‘রিচ্‌ড্‌! খুব জ্যাম।’ বলল, “না, আসেনি, বরং অফিস পৌঁছে গেছে। কিন্তু কী আশ্চর্য, আমি কিন্তু পরিষ্কার পায়ের শব্দ পেয়েছি, এই দরজাটার ফাঁক দিয়ে মনে হয়েছে, কেউ সিঁড়ি দিয়ে উঠল চারতলায়!”

কমলা কিছু বলল না। অরিত্রী বলে চলল, “অথচ ওপরে জানো, আমাদের ফ্ল্যাটের দরজাও বাইরে থেকে বন্ধ, ছাদের দরজাও ছিটকিনি তোলা।”

কমলা অস্ফূটে একটা হুঁ বলে কাজ করতে থাকল। অরিত্রীকেই বলতে হলো, “আমারই ভুল হয়েছে হয়ত...”

আশ্চর্য, স্বভাবত বকবক করে কমলা, সে চুপই রয়ে গেল। এমন সময় দরজার কাছে এসে দাঁড়াল বাবু। “বৌদি, কফি...”

সারাদিন অরিত্রীর ব্যাপারটা আর মনে ছিল না, কিন্তু বিকেলের যখন সকলে বসার ঘরে চা খাচ্ছে, শাশুড়ি সিঁড়িতে তীর্থর পায়ের শব্দ পেয়ে বললেন, “ওই, বিলু এল।” তখন আবার মনে পড়ল। মন দিয়ে শুনল তীর্থর সিঁড়ি ওঠা। অবিকল এই শব্দই শুনেছিল সকালে। তীর্থ দরজার সামনে রোজের মতো বলল, “আসছি...” বলে ওপরে উঠতে শুরু করল। অরিত্রী রোজের মতো সঙ্গে সঙ্গে উঠল না। তীর্থর ওপরে ওঠার শব্দও যখন অরিত্রীর সকালে শোনা শব্দের সঙ্গে মিলে গেল, তখন চট করে বাকি চা’টা শেষ করে বলল, “আমি আসছি মা...”

সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে শুনতে পেল, শাশুড়ি বলছেন, “এত বছর অফিস থেকে ফিরে যখন নিজের পাজামা নিজে বের করে পরতে পেরেছে, আজ-ও পারবে। আরাম করে চা-টা খেতেই পারো।” ভাবল, একদিন নিশ্চয়ই আসবে, যেদিন তীর্থ ফেরা মাত্র ছুটে যাবে না ― কতদিন লাগবে এমন হতে?

ওপরে আলনা থেকে পাজামা পাঞ্জাবি নিয়ে তীর্থ বাথরুমে ঢুকছে হাতমুখ ধুতে। বলল, “কী খবর?”

একটু দোনামনা করে অরিত্রী বলেই ফেলল, সকালের অভিজ্ঞতাটা। শুনে তীর্থ হেসে আর বাঁচে না। “পরিষ্কার শুনলে? আমার পায়ের শব্দ? দেখতেও পেলে? তোমার তো ক্যালি আছে বলতে হবে, রিতি! আর ওপরে আসতে ভয় পেলে না? চোর-ডাকাত যদি হত?”

সত্যি কথা বলতে কী, চোর ডাকাতের সম্ভাবনার কথা অরিত্রীর মাথাতেই আসেনি। আর ওপরে উঠেও যখন কেউ নেই, চারতলার দরজা, ছাদের দরজা সব বন্ধ দেখেছে তখনও নিজেরই ভুল হয়েছে ধরে নিয়ে নেমে এসেছিল। তবু, পায়ের শব্দ, দরজার একচিলতে ফাঁক দিয়ে কারও চলে যাওয়া ― পুরোটা নিজের ভুল বলে মেনে নিতে পারছে না বলেই তীর্থকে বলেছিল।

বলাটা ভুলই হয়েছে। তীর্থ চায়ের টেবিলে বসেই রসিয়ে রসিয়ে অরিত্রীর ভুলের গল্প করল। বাবু আর শ্বশুরমশাই খুব হাসলেন। বাবু বলল, “তুমি এ ক’দিনেই দাদার পায়ের শব্দ চিনে গেছ, বৌদি? আমি তো সারা জীবন চিনি, কিন্তু তা-ও হয়ত বলতে পারব না।”

অরিত্রী একবার ভাবল বলবে, ও বাড়ির সবার, এমনকি কমলারও পায়ের শব্দ চেনে। কিন্তু সেটা বললে আরও পেছনে লাগবে বাবু ― কারণ আজই প্রমাণ হয়েছে যে ও তীর্থর পায়ের শব্দ ভুল শুনেছে। তাই কিছু বলল না। কিন্তু কী মনে হওয়াতে শাশুড়ির দিকে আড়চোখে তাকাল। উনি কিছু বললেন না তো? দেখল শাশুড়ি একদৃষ্টে ওরই দিকে তাকিয়ে। কিন্তু সে এক লহমার জন্য। তারপরেই উনি ব্যস্ত হয়ে পড়লেন বিস্কিটের টিন খুলে তীর্থর হাতে বিস্কিট তুলে দিতে।


                                                *

সপ্তাহ তিনেক পরে অরিত্রী যখন সকালে রান্না করছে, বাবু এসে দাঁড়াল। “বৌদি, আমি ফিল্টারটা চিলেকোঠায় নিয়ে যাই?”

অরিত্রী রান্না করতে করতে বলল, “আমার আপত্তি নেই। মাকে বলেছ? গরম জল কোথায় পাবে?”

বাবু বলল, “আমার ছোটো একটা ইমার্শন হিটার আছে। গ্লাসে জল দিয়ে সুন্দর গরম করা যায়। তাহলে আর বার বার আসতে হয় না। আর... প্লিজ আজ যখন ব্রেকফাস্ট পাঠাবে, দুজনের জন্য পাঠাবে? আমার এক বন্ধু এসেছে পড়তে।”

অরিত্রী অবাক হলো। এতদিন এবাড়িতে এসেছে, বাবুর কোনও বন্ধু আসেনি কোনও দিন। অরিত্রী ভাবার চেষ্টা করেছে বিয়ে বা বউভাতের দিনও কি বাবুর কোনও বন্ধু এসেছিল? ওর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়েছে? মনে পড়েনি। বাড়িতেও কম কথা বলে ছেলেটা। দরকার হলে তবেই।

এমন মানুষের কাছে বন্ধু এসেছে পড়তে? দেখতে হচ্ছে! অরিত্রী বলল, “আমি নিয়ে যাচ্ছি। তুমি যা খাও তা-ই খাবে তো? না কি কিছু স্পেশাল করতে হবে?”

বাবু ব্যস্ত হয়ে বলল, “না, না। তোমাকে আসতে হবে না। তুমি কমলার হাতে পাঠিয়ে দিও। আমি যা খাই তা-ই দিও। ওই একই... আর এক প্লেট।”

বাবু রোজ একই ব্রেকফাস্ট খায়। মাল্টিগ্রেন পাউরুটির চারটে স্লাইস, আর দুটো ডিমের পোচ। রান্না করতে করতেই পাশের টোস্টারে পাউরুটি বসিয়ে অরিত্রী ডিমের পোচ তৈরি করতে শুরু করল। বাবু অরিত্রীর পোচ পছন্দ করে। কারণ দুটো ডিমের কুসুম প্রায় সার্কেলের ঠিক মধ্যিখানে থাকে। বৌভাতের পর তৃতীয় দিনেই ও মাকে জানিয়ে দিয়েছে যে এখন থেকে ও বৌদির বানানো পোচ-ই খাবে।

নিয়ে গেল অরিত্রীই। কমলা ঝাড়ু হাতে চারতলার ফ্ল্যাটে ঝাঁট দিতে গেছে। ট্রে-তে করে দুজনের ব্রেকফাস্ট নিয়ে চিলেকোঠার দরজা থেকেই বাবুকে দিয়ে ফিরেই শাশুড়ির মুখোমুখি।

বড়ো ট্রে-টা নিয়ে গেলে?” অবাক হয়ে জানতে চাইলেন শাশুড়ি।

অরিত্রী হাত নেড়ে বলল, “বাবুর এক বন্ধু এসেছে, তার জন্যও খাবার চাইল...”

শাশুড়ি এবারে আরও অবাক হয়ে বললেন, “বন্ধু? বাবুর বন্ধু? কে?”

অরিত্রী বলল, “আমি তো জিজ্ঞেস করিনি... বাবু বলল বন্ধু এসেছে...”

শাশুড়ি কথা কেটে বললেন, “না, যখন খাবার নিয়ে গেলে?”

অরিত্রী বলল, “চিলেকোঠার ঘরে কেউ ছিল না। তবে ছাদের দরজা খোলা ছিল, হয়ত ওরা ছাদে বসে পড়ছে, রোদ্দুরে...”

শাশুড়ি আর কথা বাড়ালেন না, কিন্তু অরিত্রী লক্ষ করল, সাড়ে এগারোটা নাগাদ, যখন বাবুর কফি নিতে আসার কথা, তার কিছু আগেই নিজে ট্রে-তে দু-কাপ কফি নিয়ে উঠে গেলেন। অরিত্রী তখন শশুরমশাইয়ের রেখে যাওয়া কাগজটা ওল্টাচ্ছিল, একটু পরে শাশুড়ি নেমে এসে বললেন, “অরিত্রী কফি খাবে? বাবুর এই তিতকুটে কফি আমি খেতে পারি না বাপু।”

অরিত্রী কাগজ রেখে তাকাল, শাশুড়ি বলে চললেন, “আরে, আমি গেছিলাম দু’কাপ কফি নিয়ে, তুমি বললে না, বাবুর বন্ধু এসেছে? তা বলল, বন্ধু নাকি চলে গেছে...”

অরিত্রী উঠে শাশুড়ির হাত থেকে কাপটা নিয়ে বলল, “আপনি বসুন, আমি এতে দুধ জল দিয়ে আপনার মতো করে বানিয়ে আনছি। সত্যিই বাবুর কফি খুব স্ট্রং।”

রান্নাঘরে ঢুকতে ঢুকতে শুনল শাশুড়ি বলছেন, “কী জানি কখন গেল। তুমি ব্রেকফাস্ট দিয়ে যাবার সময় থেকে তো আমি বসার ঘরেই রয়েছি। কই, কাউকে তো যেতে দেখিনি।”

দুপুরে খেতে বসে শাশুড়ি জানতে চাইলেন, “হ্যাঁ রে, বাবু, তোর নাকি কোন বন্ধু এসেছিল সকালে?”

বাবু অন্যমনস্কভাবে খেতে খেতে হাত দিয়ে কোন অজানার দিকে দেখিয়ে বলল, “দীপাঞ্জন। তুমি চিনবে না।”

তোর কলেজের?”

মাথা নাড়ল বাবু। “না। তবে একই সাবজেক্ট, একই ইয়ার। তাই একসঙ্গে পড়তে সুবিধে।”

শাশুড়ি ছাড়ার পাত্রী ন’ন। বললেন, “তোর সঙ্গে কী করে পরিচয় হলো? আগে থেকে চিনতি, না কি...”

বাবু কাঁধ ঝাঁকিয়ে খাওয়ায় মন দিল। এ ক’দিনে অরিত্রী জেনে গেছে, এর পরে বাবু আর কথাই বলবে না।

দুপুরে খেয়ে দেয়ে একটু শুল অরিত্রী। বিয়ের আগে ঘুমোন’র অভ্যেস ছিল না। নিজের ঘরে টেবিলেই বসে পড়াশোনা করত, বা বই পড়ত। এবাড়িতে একটা গোটা ফ্ল্যাট ওর অধীনে থাকা সত্ত্বেও ও দুপুরে শোয়। আজকাল টায়ার্ডও লাগে। রাতে ঘুমও কম হয়, তাই মাঝে মাঝে চোখও লেগে যায়।

আজও গেছিল। হঠাৎ চটকাটা ভেঙে গেল। তীর্থর পায়ের শব্দ। সিঁড়ি দিয়ে উঠছে। অরিত্রীর এক মুহূর্তের জন্য মনে হয়েছিল ঘুমিয়ে পড়েছিল, সন্ধে হয়ে গেছে, কিন্তু হাত বাড়িয়ে মোবাইলটা নিয়ে দেখল মাত্র দুটো তেইশ। অর্থাৎ মিনিট পনেরোর বেশি ঘুমোয়নি। কিন্তু...

চট করে উঠে বসতেই দুটো কথা মনে পড়ল। এক হলো তিনতলার ফ্ল্যাটের সামনের সিঁড়ির কোল্যাপসিব্ল বন্ধ, এবং তালা দেওয়া। অরিত্রী নিজেই দুপুরে ওঠার আগে তালা দিয়ে উঠেছে। এ বাড়িতে দরজা বন্ধ রাখার চল বিশেষ নেই, কিন্তু ওই কোল্যাপসিব্ল-টা টেনে দিলে তিনতলা থেকে ওপরে সবটাই বন্ধ হয়ে যায়।

আর দ্বিতীয়টা সেদিন রান্না করতে করতে এ-ই পায়েরই শব্দ পাওয়ার কথা। শব্দ আরও কাছে আসছে। সিঁড়ি বেয়ে উঠছে। এ বাড়ির রেওয়াজ মেনে অরিত্রী ওর ফ্ল্যাটের বাইরের দরজা বন্ধ করেনি, যদিও বাইরে বেরোন’র বাকি দুটো দরজা বন্ধই আছে। চট করে খাট থেকে নেমে পায়ে চটি গলিয়ে শোবার ঘর থেকে বেরিয়ে ভেতরের করিডোর দিয়ে হেঁটে বাইরের ঘরে ঢুকে খোলা দরজা দিয়ে কাউকে দেখতে পেল না অরিত্রী। বেরিয়ে এল ল্যান্ডিং-এ। কেউ কোথাও নেই। ওদের ফ্লোরে আসার কোল্যাপসিব্ল খোলা, ছাদের সিঁড়ি ওঠার কোল্যাপসিব্ল খোলা, চিলেকোঠার দরজা ভেতর থেকে বন্ধ ― মানে বাবু পড়ছে। তাহলে কি বাবু সিঁড়ি দিয়ে উঠল? না। বাবু বাড়িতে হাওয়াই চটি পরে, বেরোলে কোলাপুরী। অরিত্রী জুতোর শব্দ শুনেছে। তাহলে কি... বাবুর বন্ধু? সেদিনও কি বাবুর বন্ধু... না। সেদিন সব দরজাই বাইরে থেকে বন্ধ ছিল। একবার আস্তে আস্তে সিঁড়ি দিয়ে নেমে গিয়ে দেখল ― না, নিচের কোল্যাপসিব্ল-এর তালা যেমন বন্ধ করে শুতে গিয়েছিল, তেমনই বন্ধ আছে। বাবুর বন্ধু এসে থাকলে বাবুকে গিয়ে গেট খুলে দিতে হত। শুধু জুতোর আওয়াজ হত না। বাবুর চটির শব্দও পেত। আর তাছাড়া... এত কথা ভাবছে কেন? ঘুমিয়ে ছিল। আধো-ঘুমের স্বপ্ন দেখেছে নির্ঘাৎ। বাড়ি ঢুকে কী ভেবে ফ্ল্যাটের দরজাটা বন্ধ করে ভেতর থেকে ছিটকিনি তুলে দিল।

অনেক ভেবে, আগের দিন সবাই হাসাহাসি করেছিল বলে অরিত্রী সেদিন কাউকে কিছু বলল না, কিন্তু সে দিন থেকে দিনের বেলা একা থাকলে ফ্ল্যাটের দরজাটা বন্ধ রাখত ভেতর থেকে।


*

সকালে হোক, দুপুরে হোক, বাবুর বন্ধু প্রায়ই আসে। বাবু প্রায়ই হয় সকালের জলখাবার, বা বিকেলে কফি নিয়ে যায় ওর জন্য। শাশুড়ি কৌতুহলে মরেই যাচ্ছেন প্রায়। প্রায় রোজই একবার না একবার, কোনও না কোনওভাবে, ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে ছেলেকে বলেন, বন্ধুকে নিয়ে আসতে। দুপুরে খেতে না হোক, রাতে খেতে না হোক, অন্তত বিকেলের চা’জলখাবারে?

বাবুর কোনও ভ্রূক্ষেপ নেই। ওর যখন কথা পছন্দ হয় না, কিছু উত্তরও দেয় না।

শেষে একদিন অরিত্রীর ঘাড়েই দায়িত্ব পড়ল।

তুমি তো কতটা সময় ওপরেই থাক। চট করে একটু দেখে এসো না, কোনও সময়?”

অরিত্রীর নার্ভাস লাগে। “কী দেখব?”

না, মানে হাব-ভাব... চাল-চলন... বুঝতেই পারো, আজকালকার ছেলে, চিলেকোঠায় বসে মদ-গাঁজা খায় কি না...”

অরিত্রীর মনে হয় না বাবু নেশা করে। অন্তত নিয়মিতভাবে মোটেই করে না। মদ খাওয়ার ফল ও অনেকবার দেখেছে কলেজের ছেলেদের মধ্যে। আর গাঁজা খেতে দেখেছে বেদু-কে। বেদু ওর মাসতুতো দাদা। একসময় তো খাওয়াদাওয়া ছেড়ে গাঁজার নেশা করত দিন রাত। সে এক সময় গেছিল মাসি মেসোর। এখন অবশ্য সামলে নিয়েছে, চাকরি বাকরি করে, বিয়েও করেছে। মাঝে মধ্যে নেশা করে, তবে সে আর আগের মতো নয়। বেদুইন নাম রাখলে ওরকই ভ্যাগাবন্ড হবে। বলেছিল কোন ডাক্তার। যাই হোক, সে রকম কিছু বাবুর মধ্যে নেই।

তবু, শাশুড়ির ভয়ে কয়েকবার গিয়েছে। কফি নিয়ে, পকোড়া নিয়ে, এমনকি আচার শুকোতে দেবার নামেও। কিন্তু কখনওই দীপাঞ্জনকে দেখতে পায়নি। ব্যাপারটা কয়েকটা সময় খুব আশ্চর্য লেগেছে অরিত্রীর। যেমন একবার বাবু কফি নিয়ে যাবার কয়েক মিনিট পরেই শাশুড়ি অরিত্রীকে বলেছিলেন, “পাঁপড়গুলো কেমন সেঁতিয়ে গেছে, গো, একটু রোদে দিয়ে আসবে? বাবুকে বোলো, ও যেন সন্ধের আগে তুলে আনে যখন চা খেতে নামবে।”

চিলেকোঠার ঘরে বাবু একা-ই ছিল। অরিত্রীর অবাক প্রশ্নের উত্তরে বলেছিল, “বাড়ি গেছে।”

ভর্তি কফির কাপের দিকে আঙুল তুলে অরিত্রী বলেছিল, “সে কী? কফি না খেয়েই?”

বই থেকে মুখ না তুলে বাবু বলেছিল, “এক্ষুনি আসবে। খাতা আনতে গেছে।”

ছাদে পাঁপড় শুকোতে দিয়ে অরিত্রী ফেরার পথে বলেছিল, “কফিটা নিয়ে যাব? দীপাঞ্জন ফিরলে আর এক কাপ...”

না না, দরকার নেই। এই তো এক্ষুনি আসবে।”

অরিত্রী আর কথা না বাড়িয়ে নেমে গিয়েছিল, আর তখন থেকে শাশুড়ি ঠায় বসে রইলেন বসার ঘরে যতক্ষণ না বাবু দুপুরের খাবার খেতে নামে। বাবু নামল দু-হাতে দুটো খালি কফির কাপ নিয়ে। কেউ কিছু জিজ্ঞেস করল না। সবাই চুপচাপ খেতে বসল।

দুপুরে বাবু ছাদে উঠে যাবার পরে শাশুড়ি কোল্যাপসিব্লটা নিজেই তালা দিয়ে চাবি নিয়ে শুতে গেলেন। অরিত্রী উঠে গেল ওপরে। ফ্ল্যাটের সদর দরজা বন্ধ করে ছিটকিনি লাগিয়ে ভেতরের ঘরে শুয়ে সবে শারদীয়া আনন্দবাজারটা হাতে নিয়েছে, শুনতে পেল পায়ের শব্দ। আজ ঘুমের মধ্যে নয়। আজ ও একেবারেই জেগে। তড়াক করে খাট থেকে নেমে বেরিয়ে গিয়ে বন্ধ দরজার ভেতর দিকে দাঁড়াল। আজ ও তৈরি। একেবারে সামনে পায়ের শব্দ এলেই দরজা খুলবে।

নিচের ফ্ল্যাট পেরিয়ে খচ্‌ খচ্‌ করে জুতোর শব্দ উঠতে শুরু করেছে। এখনও নিচের সিঁড়িতেই। এবারে ডানদিকে মোড় নিয়ে অরিত্রীদের ফ্ল্যাটের দিকে মুখ করে উঠবে...

কিন্তু পায়ের শব্দ থেমে গেল। অরিত্রী একটু অবাক হয়ে গেল। থামল কেন? এক লহমা অপেক্ষা করে দরজায় কান লাগাল। পা-টিপে টিপে কেউ পেরিয়ে যাচ্ছে? তা-ই বা করবে কেন? যে উঠছে তার তো বোঝার কথা নয় যে অরিত্রী ঘরের ভেতরে রয়েছে... তবে?

হঠাৎ কী মনে হলো, দরজাটা খুলে বেরিয়ে এল বাইরে। কেউ নেই। সিঁড়ি খালি। ওপরে তাকিয়ে দেখল বাবুর চিলেকোঠার দরজাটা খোলা। ও ভেতরেই রয়েছে। নিচে নেমে দেখল, কোল্যাপসিব্ল গেটে তালা। পায়ে পায়ে ওপরে উঠে গিয়ে একটা আঙুল দিয়ে দরজাটা ঠেলে আর একটু ফাঁক করে দেখল, ঘর খালি। কোথায় গেল?

দরজাটা আর একটু ঠেলতেই দেখতে পেল বাবু কোথায়। চিলেকোঠার ওদিকের দরজাও খোলা, ছাদের ওপর মাদুরে বসে বাবু দুলে দুলে পড়ছে। একা। আর দাঁড়াল না অরিত্রী। এমনিতেই বাবুকে কৈফিয়ত দিতে ওর ভালো লাগে না, তার ওপর এরকম একটা ঘটনা আবার বর্ণনা করতে ওর ইচ্ছে করছিল না।

কিন্তু সে প্রতিজ্ঞা আর রাখা গেল না। পরদিনই এমন একটা ঘটনা ঘটল যে অরিত্রীর রাতে ঘুমোন দায় হয়ে উঠল।

সন্ধেবেলা তীর্থ বাড়ি ফিরে খবর দিল ওর বস সকালে গ্যারেজে গিয়ে দেখেছেন টায়ারে হাওয়া নেই। ট্যাক্সি পেতে দেরি ― তাড়াহুড়ো করে ট্যাক্সিতে উঠতে গিয়ে পড়ে পায়ের হাড় ভেঙেছে। বস ভর্তি নার্সিং হোমে, ওদিকে বসের বউয়ের যে কোনও দিন বাচ্চা হবে। বসের বাড়িতে পুরুষ বলতে আর কেবল তাঁর বৃদ্ধ বাবা। ফলে ওর ওপরই দায়িত্ব পড়েছে, যদি দরকার হয়, তাহলে ওকেই গাড়ি নিয়ে গিয়ে বসের বউকে নার্সিং হোমে ভর্তি করতে হবে। তাই আজ তীর্থ গাড়ি গ্যারেজে না রেখে, বাড়ি অবধি নিয়ে এসে ওদিকের মিত্র মেসোমশাইকে বলে ওঁর গ্যারেজের সামনে রেখে এসেছ ― নইলে তো রাস্তায় গাড়ি রাখার জায়গাই পাওয়া যায় না রাতে।

ফোনটা এল রাত সাড়ে এগারোটায়, সেদিনই। তীর্থ চটপট রেডি হয়ে বলল, “আমি চাবি নিয়ে যাচ্ছি, রিতি... দুটো কোলাপসিব্ল্‌-এই তালা দিয়ে যাব। তোমাকে জাগতে হবে না। আমি নিজে এসে শুয়ে পড়ব। তবে কখন ফিরতে পারব তো জানি না।”

অরিত্রীর ঘুম আসছিল না। তীর্থর বসের বাড়ি দূরে নয়, দিনের বেলায় যেতে আসতে মিনিট কুড়ি লাগে। নার্সিং হোমটাও ওদিকেই কোথায় ― বসও ওখানেই ভর্তি। সামান্য হলেও সেটা একটা নিশ্চিন্তি। তবু, তীর্থ তো চট করে ফিরতে পারবে না। হঠাৎ অত বড়ো ফ্ল্যাটটা কেমন দম-বন্ধ-করা ছোট্টো মনে হতে শুরু করল। শীত কমেছে, কিন্তু বাইরের হাওয়া ঠাণ্ডা, তাই বারান্দার দরজাটা বন্ধ ছিল। অরিত্রী দরজা খুলে বাইরে গিয়ে দাঁড়াল। আজকাল রাত বারোটা এমন কিছু বেশি রাত নয়, এদিকে ওদিকে বাড়িতে আলো জ্বলে। সামনের বাড়ির ছাদের ওপর বাইরে থেকে আলো পড়েছে অরিত্রীদের বাড়ির দিক থেকে। ওটাই মিত্রদের বাড়ি। কিন্তু এদিক থেকে আলো? একটু ভেবে বুঝল অরিত্রীর মাথার ওপরে কোথাও আলো জ্বলছে। তার মানে বাবু এখনও পড়ছে। অনেক রাত অবধি পড়ে বাবু। কেন জানি বাবুর জেগে থাকাটা অরিত্রীকে নিশ্চিন্ত করল।

কিছুক্ষণ পরে নাকটা সুরসুর করে ওঠায় ঠাণ্ডা লেগে যাবার ভয়ে অরিত্রী ঘরে ঢুকেই থমকে দাঁড়াল। নাইটল্যাম্পের আলোয় দরজার বাইরে পর্দার নিচে দুটো পা। হাওয়াই চটি... সাদা পাজামা... ওটা তীর্থ না। তীর্থ বাড়িতে পাজামা পরে না। বার্মুডা পরে। শ্বশুরমশাই না। ওঁর সব পাজামা রঙিন। ওরা কেউ হাওয়াই চটি পরে না। ক্রক্স পরে। অব্যক্ত একটা চিৎকার বেরিয়ে এল গোঙানির মতো শব্দ করে। অরিত্রী বুঝল ও অজ্ঞান হয়ে যাবে। কিছু না করলে...

তারপরে আর কিছু মনে নেই।


*

জ্ঞান ফিরল ― ঘরের আলো জ্বলছে, অরিত্রী শুয়ে আছে খাটে, তীর্থ একটা ভিজে কাপড় দিয়ে মুখ, কপাল মুছিয়ে দিতে দিতে মাঝে মাঝে, “রিতি, রিতি...” বলে গালে মারছে আস্তে আস্তে। “উঁ?” বলেই ধরফর করে উঠে বসল রিতি।

কটা বাজে?”

কী হয়েছিল তোমার?”

দুজনের প্রশ্নদুটো একই সঙ্গে বেরিয়ে এল। অরিত্রীর চোখ চলে গেল দরজার দিকে। বাইরে কেউ নেই। ঘাড় ঘুরিয়ে বাইরের দিকে তাকাল। বারান্দার দরজা বন্ধ।

আমি এসে দেখি বারান্দার দরজা খোলা, তুমি ওখানে শুয়ে ― তারপরে বুঝলাম অজ্ঞান।”

কতক্ষণ...” অরিত্রীর চোখে পড়ল ঘড়িটা। একটা কুড়ি। বারোটা দশ পনেরো নাগাদ ও বারান্দায় গেছিল ― ছিল অন্তত মিনিট কুড়ি পঁচিশ ― আধঘণ্টাও হতে পারে। মানে প্রায় পৌনে একটা... তারপরে... মানে আধঘণ্টার মতো অজ্ঞান ছিল...

কী হয়েছে? কোনও কষ্ট হচ্ছে? ডাঃ মুখার্জিকে ফোন করব?”

অরিত্রী মাথা নাড়ল। বলল, “ভয় পেয়েছিলাম। দাঁড়াও।” নেমে খাটের পাশে রাখা জলের জগ থেকে গ্লাসে জল নিয়ে খেয়ে বলল কী দেখেছিল। আশ্চর্য এই, যে আজ তীর্থ আগের দিনের মতো হাসল না। ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে থেকে বলল, “তুমি কি স্বভাবত ভীতু প্রকৃতির? তোমাকে দেখে সেরকম মনে হয় না কিন্তু। আগে কখনও অজ্ঞান হয়েছ?”

মাথা নাড়ল অরিত্রী। বলল, “অজ্ঞান তো হই-ইনি, বরং আমি মোটেই ভীতু নই। খুব সাহসী না, যেমন ভূতের বাড়ি, শ্মশানে রাত কাটানো এসব করিনি কখনও। সুযোগও হয়নি, হলেও যেতাম না। তবে ভীতু আমি নই... এই বাড়িটাতেই কেমন... তোমার ওদিকে কী হলো?”

তীর্থ বলল, “অজ্ঞান হয়ে যাওয়াটাই অদ্ভুত ঠেকছে। খালি বাড়িতে এটা সেটা মনে হতেই পারে। দুপুরবেলা বা রাত দুপুরে। কিন্তু... যা-ই হোক, ওদিকে মেয়ে হয়েছে। আমরা গিয়ে পৌঁছন’র আধঘণ্টার মধ্যেই সব হয়ে গেছে। শুভদীপ স্যারের দিদি এসে পড়েছেন, মা আছেন ― স্যার তো আছেনই। বাচ্চা আর মা ভালো আছে, এক্ষুনি কোনও কিছু লাগবে না, আর ওরা দেখলাম নার্সিং হোমের সব্বাইকে চেনে। তাই আমিও চলে এলাম। কাল অফিস যাবার আগে একবার ঘুরে যাব ― চিন্তার কিছু নেই। সেরকম হলে খবর দেবে...”

শুয়ে দুজনের ঘুম আসতে দেরি হলো না।

রাতে হাসাহাসি না করলেও তীর্থ সকালে খেতে বসে বেশ রসিয়ে রসিয়ে গল্পটা বলল। ভরসার কথা এই, যে অরিত্রীর অজ্ঞান হয়ে যাওয়া নিয়েও কেউ খুব দুশ্চিন্তা প্রকাশ করল না। তবে অরিত্রী আবার মুখ তুলে তাকিয়ে লক্ষ করল যে শাশুড়ির চোখের দৃষ্টি ওর দিকেই নিবদ্ধ। আবার চোখাচোখি হওয়ামাত্র অন্য দিকে চোখ ফেরালেন তিনি।



*

বেড়ে গেল। রাতে একেবারেই একা থাকে না অরিত্রী, কিন্তু দিনে আজকাল আর অসুবিধে হয় না ― দুপুরে, বিকেলে, অনেক সময় নিচের তলায় সবাই যখন একসঙ্গে খাবার ঘরে খাচ্ছে, তখন ― ও সিঁড়িতে পায়ের শব্দ পায়। ও একাই শোনে। ওই একই শব্দ। অন্তত বার চারেক আরও ওপর তলায় পা-দুটো দেখেছে। সেই পাজামা, সেই হাওয়াই চটি। সিঁড়িতে শব্দ হলে ও আর পাত্তা দেয় না। ওপরে একা থাকলেও না। তবে ঘরের ভেতরে পা দুটো অস্বস্তি সৃষ্টি করে। বার দুয়েক সিঁটিয়ে গিয়েছিল। তারপরে উঠে গিয়ে পর্দা সরিয়ে কাউকে দেখতে পায়নি। অনেকবার ভেবেছে, আধো অন্ধকারে ভুল দেখেছে কি না। কিন্তু সে ভাবনা সরিয়ে দিতেও দেরি হয়নি। মনে হয়েছে, হ্যামলেট ঠিকই বলেছিল ― ফিলজফির স্বপ্নাতীত অনেক কিছুই সত্যিই পৃথিবীতে আছে, স্বর্গেও আছে নিশ্চয়ই।

কমলা একদিন ওপরের ঘর ঝাঁট দিতে এসে অরিত্রীকে একা পেয়ে জানতে চেয়েছিল, “বৌদি, সেই যে একদিন বলেছিলে দাদার পায়ের শব্দ পেয়েছিলে, অমনটা আর হয়েছিল, গো?”

অরিত্রী প্রায় বলে ফেলেছিল ওর অভিজ্ঞতাগুলোর কথা, হঠাৎ খেয়াল হওয়াতে থেমে জানতে চেয়েছিল, “কেন বলো তো? তোমার মনে আছে?”

কমলা ঝাঁটা ফেলে কাছে এসে বলেছিল, “তোমাদের আগে এবাড়িতে থাকত যে বৌদি, সে-ও অমন শুনতে পেত।”

কী শুনতে পেত?”

কমলা উবু হয়ে বসে বলেছিল, “ওই যে, তুমি ঝ্যামন শুনলে, সিঁড়ি দিয়ে কে উঠতেছে... ওমনিই।”

আর কিছু শুনত? বা দেখত?”

এবারে কমলার চোখে একটা ধূর্ত দৃষ্টি খেলে গেল। বলল, “কেন? তুমি কিছু দ্যাখেছ নাকি, বৌদি?”

অরিত্রী নিচের ফ্ল্যাট থেকে ওর বিয়েতে পাওয়া একটা রান্নার বই নিতে এসেছিল। শাশুড়ি চেয়েছিলেন ডাব চিংড়ির রেসিপি দেখবেন বলে। নিচ থেকে ওঁর গলা ভেসে এল, “কই গো, পাচ্ছ না নাকি? সেদিনই তো তোমার বাইরের ঘরে ছিল...”

পেয়েছি, মা...” বলে অরিত্রী নিচে নেমে গেল। কমলার কথার উত্তর দিতে হলো না।

দিন কয়েক বাদে, সকালে বাবু আর ওর বন্ধুর জন্য ব্রেকফাস্ট দিয়ে এসে অরিত্রী দেখল পাশের বাড়ির মিত্র মেসোমশাই হাঁপাতে হাঁপাতে সিঁড়ি দিয়ে উঠছেন। তাড়াতাড়ি গিয়ে বলল, “আপনি এত কষ্ট করে ওপরে উঠলেন...”

মেসোমশাই শেষ সিঁড়িটা উঠে হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন, “অধীরবাবু আছেন?”

গলা পেয়ে তীর্থর বাবা বেরিয়ে এসেছেন, বললেন, “আসুন আসুন! কী কাণ্ড, এত কষ্ট করে উঠে এলেন? ফোন করলেই তো পারতেন...”

মিত্র মেসোমশাই জুতো খুলে ঢুকতে ঢুকতে বললেন, “আরে মশাই, সব কথা কি আর ফোনে বলা যায়?”

অরিত্রী জল এনে দিল, বলল, “চা খাবেন তো? চিনি ছাড়া, তাই না?”

ঘাড় নাড়লেন মেসোমশাই। অরিত্রী রান্নাঘরে গিয়ে বলল, “মা, মিত্র মেসোমশাই এসেছেন। তুমি যাও, আমি রান্না দেখছি ― চা নিয়ে আসব। তোমার জন্য বানাব? বাপি খাবে বলল।”

শাশুড়ি হেসে বললেন, “তোমার বাপি চা পেলে ছাড়ে? আমি খাব না। তুমি দু’কাপ-ই বানাও।” বলে আঁচলে হাত মুছে বেরিয়ে গেলেন।

রান্না নামার আগেই জল ফুটে গেল। টি-পটে চা ভিজিয়ে অরিত্রী ঘড়ির কাঁটার দিকে নজর দিল। এ বাড়িতে চা ভেজানোর দু-মিনিট পরে ট্রে-তে নিয়ে যেতে হয়। ঠিক তিন মিনিটের মাথায় ছাঁকা হয়। কখনও, শ্বশুরমশাইয়ের মর্জি হলে চার মিনিটে। ট্রে-তে দু’টো কাপ, টি-কোজি দিয়ে ঢাকা পট রেডি করে রান্নাটা নেড়ে দিয়ে অরিত্রী গ্যাসের আগুন কমিয়ে দিল। তারপরে ঠিক দু’মিনিট পরে চায়ের ট্রে নিয়ে বাইরের ঘরে গেল।

... এ বছরও হবে না, আই-লিগ...” বলছিলেন শ্বশুরমশাই। ইস্টবেঙ্গলের আই-লিগ না পাওয়াটা উনি আজকাল সব বক্তব্যেই নিয়ে আসেন, বলেন, “এ জীবনে আর দেখে যেতে পারব না...”

মিত্র মেসোমশাই অরিত্রীকে ঢুকতে দেখে বললেন, “তুমিও বসো মা। আমি কথাটা সকলকেই বলি। বিলু যাবার আগে আসতে পারলে ভালো হত...”

অরিত্রী বলল, “রান্না চাপানো আছে...”

শাশুড়ি বললেন, “ও তো প্রায় শেষ হয়ে গেছে...”

অরিত্রী বলল, “আগুন কমিয়ে এসেছি।”

উনি বললেন, “তাহলে নিভিয়ে, ঢেকে দিয়ে এসো। যদি কিছু আর করার থাকে পরে করা যাবে।”

অগত্যা। অরিত্রী ফিরে এসে ডিভানে বসল ওর নির্দিষ্ট জায়গায়। শাশুড়ি চা ছেঁকে ফেলেছেন। অরিত্রী টেবিল থেকে বিস্কিটের কৌটোটা নিয়ে এল। শ্বশুরমশাই বিস্কিট ছাড়া চা খেতে পারেন না। মেসোমশাই হাত নেড়ে ‘না’ বললেন। তারপরে চায়ে চুমুক দিয়ে বললেন, “--আঃ!”

অরিত্রী একবার মেসোমশাই, একবার শ্বশুরমশাই, একবার শাশুড়ির মুখের দিকে তাকিয়ে নিল। শ্বশুরমশাই চায়ে চুমুক দিচ্ছেন, শাশুড়ি নির্নিমেষে চেয়ে আছেন মিত্র মেসোমশাইয়ের দিকে।

মেসোমশাই চায়ের কাপটা নামিয়ে রেখে গলা নামিয়ে বললেন, “আপনার ছোটো ছেলে বাড়িতে আছে? বুড়ো?”

শ্বশুরমশাই চায়ে চুমুক দিতে দিতে বললেন, “বাবু। বুড়ো না। আছে, ছাদে। চিলেকোঠায় পড়ছে, ও আর ওর এক বন্ধু। ওকেও লাগবে? কী ব্যাপার মশাই?”

মাথা নেড়ে মিত্র মেসোমশাই বললেন, “না না। ওকে লাগবে না। তবে কথাটা কী জানেন, ওকে নিয়েই। বলছিলাম কী, ওকে না, ছাদে একা পড়তে পাঠাবেন না।”

চমকে উঠে শাশুড়ি বললেন, “কেন? কী হয়েছে? ও আর ওর বন্ধু কি কোনও...”

মিত্র মেসোমশাই বললেন, “না, না। বন্ধু-টন্ধু আমি দেখিনি। তবে কি জানেন, ও দেখছি গত কয়েক দিন ছাদের আলসের ওপরে চিত হয়ে শুয়ে আকাশের দিকে দু হাত তুলে বইটা চোখের সামনে রেখে পড়ছে। খুব ডেঞ্জারাস জানেন...”

এবারে শাশুড়ি আর শ্বশুরমশাই দু’জনেই সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছেন। শ্বশুরমশাই বললেন, “কী বলছেন? ছাদের আলসের ওপরে?”

মিত্র মেসোমশাই বললেন, “আজ্ঞে হ্যাঁ। তাই বলছিলাম, আলসেটাও কত সরু, ফুট খানেকের বেশি তো না...”

শাশুড়ি আবার বসে পড়ে বললেন, “কিন্তু বাবু তো এরকম হঠকারি কাজ কখনও করে না। তবে কী ওই দীপাঞ্জন ছেলেটা...?”

শ্বশুরমশাইও বসলেন, বললেন, “রোজই দেখেন?”

মিত্র মেসোমশাই বললেন, “রোজই কি তাকাই? বাড়ির এদিক দিয়ে দেখলে চোখে পড়ে। তবে একবার না, বেশ কয়েকবার দেখেছি...”

আর কথা চলে না। অরিত্রীর দিকে ফিরে শাশুড়ি বললেন, “এক্ষুনি ডাকো বাবুকে। বলো বাবা ডাকছে...”

অরিত্রীও চমকে গেছিল। ও যদিও বহুবার ছাদে গেছে শাশুড়ির কথায়, বাবুকে কফি দিতে, টিফিন দিতে, শাশুড়ির নির্দেশে বাবুর বন্ধুকে দেখতে, ও কিন্তু কখনও বাবুকে ছাদের আলসের ধারে কাছে দেখেনি। তবু... সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে ভাবল মিত্র মেসোমশাই এত বয়স্ক মানুষ, বাড়ি বয়ে কি বাজে কথা বলতে আসবেন এত কষ্ট সহ্য করে?

চিলেকোঠার ঘরের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। অরিত্রী আস্তে আস্তে টোকা দিয়ে বলল, “বাবু, একটু আসবে, বাপি ডাকছেন।”

প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই দরজা খুলে গেল। বাবু নিশ্চয়ই টেবিলেই বসে ছিল। রোজের মতো বাবু ঘরে একা-ই। দু’টো ব্রেকফাস্টের প্লেট, দু’টো কফির কাপ-ই খালি। বাবু বেরিয়ে নেমে গেল, অরিত্রী ভেতরে গিয়ে কফির কাপ-প্লেটদুটো তুলে নিয়ে ছাদের দরজা দিয়ে উঁকি মেরে দেখল, কেউ নেই ― যেমন রোজই হয়, বাবুর বন্ধুর দেখা নেই।

কাপ-প্লেট নিয়ে ফিরে দেখল সকলে মিলে বাবুকে ঘিরে ধরেছে। বাবুর মুখে হতভম্ব ভাব। “আমি... আমি... ছাদের আলসে কী?” এবং তারপরে, ব্যাপারটা বুঝে, “আমি কক্ষনও রেলিঙের ওপরে শুইনি... মেসোমশাই আপনি ভুল দেখেছেন...”

মিত্র মেসোমশাই খুব স্থিরভাবে মাথা নেড়ে বললেন, “না বাবা। ভুল আমার হয়নি। আমি অনেকবার দেখেই বলতে এসেছি।”

এর পর আর বাবুর কথা শোনা হলো না। ওর বাবা খুব দৃঢ় কণ্ঠে বলে দিলেন, “তুমি ওই চিলেকোঠার ঘরে আর পড়াশোনা করবে না। বই-খাতা সব ওখান থেকে নিয়ে এসো। তোমার ঘর পড়াশোনার পক্ষে যথেষ্ট ভালো। আলো হাওয়া আছে, নিরিবিলি-ও। আর এবাড়িতে কোনও হট্টগোল হয় না, যে তোমাকে ওপরে গিয়ে পড়তে হবে...”

অধীরবাবু, সবার বাবার মতোই, বলে খালাস। কিন্তু অরিত্রী আর অরিত্রীর শাশুড়ি লক্ষ করল, বাবুর পড়াশোনায় আর মন নেই। আগে সকালে সাড়ে ন’টা-দশটার মধ্যে উঠে, খেয়ে চলে যেত ছাদের ঘরে। যেদিন কলেজ যেতে হত না, সেদিন দুপুরে খেতে নামত, খেয়েই আবার চলে যেত চিলেকোঠায়। সন্ধে অবধি পড়ে নামত। সন্ধের পরে বিশেষ পড়াশোনা করত না, মা-বাবার আর অরিত্রীর সঙ্গে বসে কথা বলত, তীর্থ এলে গল্প করত। ডিনারের পর আবার পড়ত অনেক রাত অবধি। সন্ধেটা ওদের ফ্যামিলি-টাইম ছিল। অরিত্রীর খুব ভালো লাগত বিকেল পাঁচটা থেকে রাত দশটা-সাড়ে দশটার এই সময়টা।

আজকাল বাবু ঘুম থেকে উঠে আসতে আসতেই প্রায় এগারোটা বাজে। ব্রেকফাস্ট, কফি খেয়ে আবার চলে যায় নিজের ঘরে। দুপুরে প্রায় রোজই খেতে ডাকতে হয়। নিজে থেকে আসে না। দরজায় ধাক্কা দিলে উঠে দরজা খুলে খেতে আসে। চোখ ফুলে থাকে ঘুমে। বোঝাই যায় গভীর ঘুম থেকে উঠে এসেছে। সন্ধের আড্ডায় আর বসে না, নিজের চায়ের কাপ নিয়ে ঘরে চলে যায়। দু’এক দিন শাশুড়ি ডেকেছেন, বলেছে ― পড়তে হবে। তবে পড়ে না। অরিত্রী দু’একবার ঘরে ঢুকে দেখেছে, পড়াশোনার কোনও লক্ষণ নেই। চিলেকোঠার ঘরে যেমন বই-খাতা, নোটস খোলা ছড়ানো থাকত, এখানে তার কোনও হদিস নেই। এ বিষয়ে অরিত্রীর কোনও সন্দেহ নেই, যে আজকাল বাবু প্রায় সারাক্ষণ শুয়ে কাটায়। তার মধ্যে অনেকটা সময় গভীর ঘুমেই। এখন ছলে, কৌশলে ওর ওপর নজর রাখতে পারেন না শাশুড়ি, তাই বলপ্রয়োগ করেছেন, ফতোয়া দিয়েছেন, “কমলা ঘর ঝাঁট দিতে, মুছতে ঢুকবে, তাই রাতে ঘর বন্ধ করে শুবি না...”

বাবু আপত্তি করেনি। চুপ করে মেনে নিয়েছে। তাই, সকালে বাবু ওঠা অবধি শাশুড়ি বার বার উঁকি দিয়ে দেখে ফিরে আসেন, আর বলেন, “ওঠেনি এখনও।”

রাতেও, সবাই লক্ষ করেছে, খেয়েদেয়ে সবাই শুতে যাবার আগেই বাবুর ঘরের আলো নিভে যায়। পরে কোনও সময় আর জ্বলতে দেখা যায় না।

বাবু পড়ছে না।

সপ্তাহ দুয়েক ― দিন গুনলে বারো দিন পরে অরিত্রী কথাটা একদিন রাতে পাড়ল তীর্থর কাছে। লক্ষ করেছিল বাবু সম্বন্ধে সমালোচনাসূচক কিছু বললেই তীর্থ মেনে নিতে চায় না, তাই অনেক ভেবে কথাটা তৈরি করে রেখেছিল সারাদিন ধরে।

তীর্থর কপালে ভাঁজ পড়ল। বলল, “তুমি শিওর, সারা দিন পড়ছে না? ও তো আমার সঙ্গেও আড্ডা মারে না আজকাল। সন্ধেবেলা আমি ফিরে দেখি ঘরে দরজা বন্ধ।”

মাথা নাড়ল অরিত্রী। “মনে হচ্ছে না। দেখো, সকালে ও উঠতে উঠতে প্রায় লাঞ্চের সময় হয়ে যায়। দুপুরের পরে ওর দরজা বন্ধ থাকে, কিন্তু চায়ের জন্য যখন ডাকি, তখন তো একেবারে গভীর ঘুম থেকে উঠে আসে বলে মনে হয়...”

ওর সেই বন্ধু? কী যেন নাম? ও আর আসে না?”

দীপাঞ্জন। আসে না। বাবুও ওর কথা আর বলে না।” অরিত্রী বলল না যে ওর সন্দেহ যে দীপাঞ্জন বলে কেউ আসতই না। ওটা বাবুর মনগড়া বন্ধু। বাচ্চাদের মতো। আরও একটা কথা বলল না, যে আজকাল আরও একজনের আসা টের পায় না। গত বারো দিন অরিত্রী না শুনেছে সিঁড়িতে পায়ের শব্দ, না দেখেছে পর্দার নিচে একজোড়া পাজামা-হাওয়াই চটি পরা পায়ের চলাফেরা।

পরদিন রবিবার। সকালে বাবু যখন খেতে এল, তীর্থ জানতে চাইল, “তোর পড়াশোনা কেমন হচ্ছে রে?”

ভালো।” সংক্ষিপ্ত উত্তর বাবুর।

তোর বন্ধু আজকাল আসে?”

কে বন্ধু?”

ওই যে, মা বলত, কাকে একটা খেতে আসতে ― তোর বন্ধু তোর সঙ্গে পড়তে আসে...”

না, ও আসে না। ও এখন বাইরে গেছে একটু...” কফির কাপ হাতে নিয়ে বাবু নিজের ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিল।

তীর্থ একটু অপেক্ষা করে বলল, “ছাদের ঘরটা বন্ধ করে দেবার ফলে ছেলেটা পড়াশোনাই বন্ধ করে দিল?”

বাবু লেখাপড়ায় খুব ভালো। ওকে নিয়ে ওর মা-বাবার খুব আশা। ফলে দুজনেই চিন্তিত মুখে তাকালেন বড়ো ছেলের দিকে।

তীর্থ বলল, “আর একটু ভালো করে ভেবে দেখে ওর ছাদের যাওয়াটা বন্ধ করা উচিত ছিল।”

অরিত্রীর শ্বশুরমশাই বললেন, “কী ভাবব? মিস্টার মিত্তির ওই শরীরে হাঁপাতে হাঁপাতে তিন তলা উঠে এসে বলছেন...”

তীর্থ কথা কেটে বলল, “বলছেন, কিন্তু কী বলছেন? যে বাবু ছাদের আলসের ওপরে শুয়ে থাকে? কী করে দেখলেন? মিত্র মেসোমশাইয়ের বাড়িটা দুতলা। ছাদে উঠলে তিন তলা। আমাদের ছাদ আমাদের চারতলার ফ্ল্যাটের ওপরে ― পাঁচতলায়। ওখান থেকে মিত্র মেসোমশাই কী করে দেখলেন?”

অরিত্রীর শাশুড়ি বললেন, “কিন্তু ভদ্রলোক বললে কথাটা ফেলি কী করে?”

তীর্থ বলল, “তক্ষুনি তক্ষুনি ওনার সামনেই বাবুকে ডেকে এনে না ধমকে, পরে আলাদা করে জিজ্ঞেস করা যেত না? যা-ই হোক, আমার মনে হয় তুমি আর একবার মিত্র মেসোমশাইয়ের সঙ্গে কথা বলো। চাও তো আমিও বলতে পারি...”

শাশুড়ি বললেন, “উনি তো নেই। হায়দ্রাবাদ গেছেন। দু’মাসের জন্য।”

বাবু বলল, “আহা, হায়দ্রাবাদ তো মঙ্গলগ্রহে নয়। ফোন করলেই পাওয়া যাবে।”

অরিত্রী বলল, “আমার কিন্তু মনে হয় ওনাকে কিছু জিজ্ঞেস করে লাভ নেই। উনি যখন বলেছিলেন, স্থির বিশ্বাসেই বলেছিলেন। বাবু যখন বলেছিল ও কখনও রেলিঙে শোয়নি, উনি বলেছিলেন উনি বার বার দেখেই বলতে এসেছিলেন। এখন বাবুর কথা আমাদেরই বিশ্বাস বা অবিশ্বাস করতে হবে।”

ভুরু কুঁচকে তীর্থ বলল, “বাবু একটা পাঁচ বছরের বাচ্চা নয়। ছাদের আলসেতে শুলে কী কী হতে পারে সে ও ভালোই বোঝে। ওই ঘরে ওর পড়াশোনার একটা আবহ তৈরি হয়ে গেছিল। বন্ধুও আসত। এখন হঠাৎ সেটা বন্ধ হয়ে যাওয়াতে ওর আর পড়ায় মন বসছে না, এটা স্বাভাবিক নয়?”

অরিত্রীর শাশুড়ি মাথা নেড়ে বললেন, “ওই বন্ধুর ব্যাপারটাও কিন্তু স্বাভাবিক মনে হচ্ছে না। বন্ধু আসে যায়, আমরা দেখতেই পাই না?”

তীর্থ বলল, “দেখতে পাওনি মানেই অস্বাভাবিক, না-ও হতে পারে।”

সবাই চুপ করে রইল। তীর্থ বলল, “আমার মনে হয় ওকে ওপরে পড়তে অ্যালাউ করা উচিত।”

তীর্থর বাবা বললেন, “আমারও তাই মনে হচ্ছে। নইলে ছেলেটার পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাবে। তবে ওই ব্যাপারটা...”

তীর্থ বলল, “ওকে বলে দাও, ছাদে যেন না যায় ― তবে পুরোটাই আমার বোকা-বোকা ঠেকছে।”

সন্ধেবেলা বাবুকে ওর বাবা বললেন, “তোর চিলেকোঠায় বসে পড়াশোনা করলে সুবিধে হয়?”

সাত মাসের বিবাহিত জীবনে ওর দেওরের মুখটা এত উজ্জ্বল হয়ে উঠতে অরিত্রী দেখেনি।



*

পুরোনো রুটিনে ফিরতে দেরি হলো না। আর সেই সঙ্গে একটা গম্ভীর মানুষ গম্ভীর থেকেও কী ভাবে নিজে খুশি হতে পারে, আর তার ফলে বাড়িসুদ্ধ সবাই কী রকম খুশি হয়ে উঠতে পারে, বাবু দেখিয়ে দিল। মাঝে মাঝে দাঁত মাজতে মাজতে, বা সকালে খেতে বসে গুনগুন করে গানও করে।

শাশুড়ির নির্দেশে শুধু না, নিজের দুশ্চিন্তাতেও অরিত্রী বার বার হঠাৎ হঠাৎ ছাদে চলে যায়। যান শাশুড়িও। বাবুকে ছাদে পড়তে যেতে অনুমতি দেওয়া হয়ছে, তবে বলা হয়েছে ও ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করতে পারবে না। কিন্তু বাবু আজকাল কখনও ছাদেও থাকে না। যতবার পরীক্ষা করে দেখা হয়েছে, বাবুকে ঘরে বসেই পড়তে দেখে সবাই ফিরে এসেছে। অরিত্রী লক্ষ করেছে, ছুটির দিনে তীর্থও উঠে গিয়ে চুপচাপ উঁকি দিয়ে আসে বার দু-তিনেক।

অরিত্রীর অবশ্য সবটাই ভালো মনে হচ্ছে না। বাবুর রুটিন আগের মতো হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাবুর রহস্যজনক বন্ধুর আনাগোনাও শুরু হয়েছে। আর সেই সঙ্গে শুরু হয়েছে সিঁড়িতে জুতোর শব্দ, আর অরিত্রীর বাড়িতে একজোড়া পায়ের চলাফেরা। এদিকে অবশ্য মনে হচ্ছে বাড়িটা তৈরি শেষ হতে আর দেরি নেই। আজকাল শ্বশুরমশাই আরও ঘনঘন যাওয়া আসা শুরু করেছেন, ফিরেও আসেন হাসি হাসি মুখেই। বলেন, “মানস ছেলেটা ভালো। আগের বারে...”

একদিন সাহস করে শাশুড়িকে জিজ্ঞেসই করে বসল, “মা, আমরা এখান থেকে কবে যাব?”

শাশুড়ি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “চাইছিলাম তো যত তাড়াতাড়ি পারি... কিন্তু বাবু যে বলছে এখান থেকে পরীক্ষা দিয়ে তবেই যাবে।”

তবেই? অরিত্রী অবশ্য বাবুর কথায় অতটা অবাক না হলেও অবাক হলো দুটো ব্যাপারে। এক, শাশুড়ির হাবেভাবে একটা দুশ্চিন্তা আর হতাশা, যেন তাড়াতাড়ি যাওয়া হচ্ছে না বলে উনি উদ্বিগ্ন ― এমনিতে বহুবার শ্বশুর শাশুড়ির বহু কথোপকথন শোনার সুযোগ হয়েছে, যেখানে দুজনেই যেন ‘এ-পাড়া’ ছেড়ে চলে যেতে হবে বলে অখুশি, আর দুই, বাবু কখন মা-বাবাকে বলল যে ও এখান থেকে পরীক্ষা দেবে? বাবু তো ঘুম থেকে ওঠে অরিত্রী নিচে নামার পরে, দুপুরের খাবার সময় অবধি অরিত্রী নিচেই থাকে, আর বাবু থাকে চিলেকোঠায়। দুপুরের খাবার পরে থালা-বাসন নামিয়ে, খাবার টেবিল মুছে অরিত্রী আর শাশুড়ি শুতে যেতে যেতে বাবু আবার উঠে যায় ওপরে, নামে বিকেলের চায়ের সময়। তার পর থেকে ওরা সারা সন্ধে একসঙ্গেই থাকে, বাবু রাতের খাবার পরে পড়তে যায়, নামে কখন, কে জানে... ততক্ষণ নিশ্চয়ই ওর বাবা মা জেগে অপেক্ষা করেন না!

তারপরে আবার মনে হলো, কেন? দুপুরে অরিত্রী অন্তত ঘণ্টা আড়াই তিন শুতে যায় চারতলায়। সেই সময়ে ওর বাইরের দরজা আজকাল বন্ধই থাকে। সেই সময়ে কোনও দিন মা-বাবা-ছেলের আলোচনা হয়ে থাকতেই পারে।

হঠাৎ খেয়াল করল শাশুড়ি কেমন অনিমেষ দৃষ্টিতে তাকিয়েই আছেন ওর দিকে। এই দৃষ্টিটা আজকাল অরিত্রী চিনে গেছে, বিশেষত সেই দিনগুলোতেই শাশুড়ি ওর দিকে এমন ভাবে চেয়ে থাকেন, যে দিন ও সিঁড়িতে জুতোর আওয়াজ শোনে, বা ওপরের ঘরে পা-জোড়া দেখতে পায়। অথচ আজকাল আর ও বলেই না। কেউ বিশ্বাস করে না, হাসে, ভয় পায় ― যদি আবার অরিত্রী অজ্ঞান হয়ে যায়... কিন্তু শাশুড়ি অবিশ্বাসের কথা বলেন না, হাসেন না, শুধু নির্নিমেষে চেয়ে থাকেন। চোখাচোখি হলে মুখটা এমন কঠিন করে ফিরিয়ে নেন, যে অরিত্রী কখনও সাহস করে জিজ্ঞেস করতে পারে না, “মা আপনি শুনেছেন পায়ের শব্দটা? কখনও দেখেছেন দুটো পাজামা পরা পা?”

আজ অবশ্য মুখ ফিরিয়ে নিলেন না। বললেন, “কেন জিজ্ঞেস করলে?”

অরিত্রী সাহস করে বলেই ফেলল, “এ বাড়িটা আমার ভালো লাগে না। মনে হয় চলে গেলেই ভালো হবে।”

শাশুড়ি আবার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “গেলেই হত...” তারপরে মন দিলেন কাপড় ভাঁজ করায়।

অরিত্রী কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে ভাঁজ করা কাপড় আলনায় সাজানো শুরু করল।

পরের মাস দুয়েকে অরিত্রী মানসিকভাবে একটা অদ্ভুত জায়গায় পৌঁছে গেল। আজকাল রোজ সকালে উঠেই ও বুঝতে পারে, আজ সিঁড়িতে পায়ের শব্দ হবে কি না, বা পাজামা পরা পা জোড়া ও দেখতে পাবে কি না। এমনকি কখন দেখতে পাবে, তা-ও আন্দাজ করতে পারে। এবং কোথাও যেন মনে মনে অপেক্ষা করে ― জুতোর শব্দ পেলে, বা পা-জোড়া দেখা গেলে, একরকম শান্তি। নিশ্চিন্তে নিজের কাজে ― বা বিশ্রামে ― মন দিতে পারে।

গরম পড়ে গেছে। সেদিন দুপুরে শেষ বারের মতো লেপ-কম্বল রোদে দিয়ে অরিত্রী আর ওর শাশুড়ি তোরঙ্গে তুলে রাখছিল। রবিবার, বিকেল শেষ হয়েছে। বাবু ছাদে পড়ছে, ওপরের ফ্ল্যাট থেকে তীর্থ নেমে এসে বসার ঘরে ঢুকে চেঁচিয়েছে, “কী গো, শাশুড়ি বউমা কি চা বানাচ্ছে?” অরিত্রী সবে বলতে যাবে, “মা আমি জল বসাই?” এমন সময়...

অরিত্রীর কখনওই ভালো করে মনে পড়েনি, কোনটা সত্যি হয়েছিল। ধুপ শব্দটা শুনেছিল, না কি ওর স্মৃতিতে সৃষ্টি হয়েছে পরে? চিৎকার চেঁচামেচিগুলো কি অব্যক্ত ছিল, না কি সত্যিই তিনতলা থেকে রাস্তার কথাগুলো স্পষ্ট শোনা গেছিল?

মনে আছে, ওরা ছুটে ভেতরের ঘর থেকে বেরিয়েছিল। বাপি বেরিয়ে এসেছিলেন নিজের শোবার ঘর থেকে। কেমন উদভ্রান্তের মতো লাগছিল। বার বার জিজ্ঞেস করছিলেন, “কী হলো? কী হলো?” ওরা বারান্দা থেকে উঁকি দিয়ে নিচে ভীড় ছাড়া কিছু দেখতে পায়নি। সবে ওরা বেরিয়ে চটি-জুতো পরছে, তীর্থ হাঁপাতে হাঁপাতে উঠে এসে বলেছিল, “বাবু ছাদ থেকে পড়ে গেছে...” তারপরে জোর করে ওদের ঘরের ভেতরে ঢুকিয়ে দিয়েছিল। বলেছিল, “যাবে না। কিছু করার নেই। ও দৃশ্য সহ্য করতে পারবে না।”


*

কেটে গেছে আরও ছ’ মাস। কিন্তু বাড়িটায় কিছুই আগের মতো হয়নি। শ্বশুরমশাই আর কথা বলেন না, কাগজ পড়েন না, রোজ সকাল থেকে সন্ধে চুপ করে সোফায় বসে থাকেন, খোলা দরজা দিয়ে সিঁড়ির দিকে তাকিয়ে। শাশুড়ি আজকাল দিনের বেলা তবু কাজ করতে পারেন অল্প, কিন্তু সন্ধে হলেই কাঁদতে থাকেন। নিঃশব্দে। একদিন শুধু অরিত্রীকে বলেছিলেন, “তুমিও তো বুঝেছিলে, আমিও ― তবু কেন ছেড়ে গেলাম না বাড়িটা...?”

এবার ছেড়ে যাবার সময় হয়েছে। তীর্থ গত মাস তিন-চার ধরে দায়িত্ব নিয়ে অফিস থেকে গিয়ে গিয়ে মানসের সাহায্যে বাড়িটা বাসযোগ্য করে তুলেছে। বাইরের কাজ কিছু বাকি রয়েছে, কিন্তু ভেতরটা প্রায় শেষ। দোতলায় থাকা ― একতলায় মিস্তিরির কাজ চলবে এখনও কয়েক সপ্তাহ। সেটা ওরা মানিয়ে নেবে।

কাল থেকে প্যাকার আসবে। গত দু’দিন ধরে ওরা তীর্থর এনে দেওয়া প্রচুর কার্ডবোর্ড কার্টনে কাগজ দিয়ে মুড়ে মুড়ে দামী, ভঙ্গুর আর ব্যক্তিগত জিনিসপত্র ভরে রাখছে। জামাকাপড় ভরছে স্যুটকেসে। বাবুর ঘরে এখনও হাত দেওয়া হয়নি। তীর্থ বলেছে, ওই ঘরটা ও নিজে হাতে করবে। মা-বাবা, বা অরিত্রীর না গেলেও চলবে ওখানে। আজ তীর্থ অফিস থেকে হাফ ডে নিয়ে ফিরবে। কাল পরশু শনি রবি ― তার মধ্যেই সব শেষ করা হবে।

দুপুরের খাওয়া শেষ করতে করতে তীর্থ ফিরল। বলল, “পরশু সকালে ট্রাক মা-বাবার ফার্নিচার আর জিনিসপত্র নিয়ে বেরিয়ে যাবে। সঙ্গে আমরাও যাব। ওখানে তোমাদের নামিয়ে, খাট বিছানা সাজিয়ে আমি আর অরিত্রী ফিরে আসব। ততক্ষণ প্যাকাররা ওপরতলার আলমারি, চেয়ার-টেবিল প্যাক করবে। তোমরা প্যাকার-মুভারের লোককে দিয়ে অন্যান্য আসবাবগুলো জায়গামতো বসিয়ে নিও। পারবে তো?”

অরিত্রীর শ্বশুরমশাই একটা অব্যক্ত হুঁ বললেন। অরিত্রীর শাশুড়ি বললেন, “রিতি-কেও আসতে হবে?” আজকাল উনি মাঝে মাঝেই অরিত্রীকে সবার সামনেই রিতি বলে ডাকছেন। অরিত্রী খেয়াল করেছে, এখন ওর আর অত খারাপ লাগে না।

তীর্থ বলল, “অতগুলো জিনিস ― বাঁধবে, নামাবে, তুলবে, দু’জন না থাকলে অসুবিধে হবে।”

রাতে শুতে গিয়ে বলল, “কাল বিকেলে মিত্র মেসোমশাই আমাদের, মানে তোমাকে আর আমাকে ডেকেছেন। বলেছেন জরুরি দরকার। কিছু আলোচনা করবেন।”

অবাক হয়ে অরিত্রী বলল, “মিত্র মেসোমশাই ফিরেছেন?”

তীর্থ বলল, “চার-পাঁচ দিন হয়ে গেল।”

আর বাপির সঙ্গে দেখে করতে আসেননি?”

বললেন শরীর খারাপ। হাঁটতে চলতে পারছেন না বিশেষ। আরও বললেন ― ফোন করতে পারতাম, কিন্তু কী-ই বা বলব?”

অরিত্রী কিছু বলল না। পাশ ফিরে চোখ বুজল।


*

এসো, বসো। আজ রাতে এখানেই খেয়ে যাও ― ওবাড়িতে খাওয়া-দাওয়া...”

মিত্র মাসির কথায় দুজনেই নিশ্চিন্ত বোধ করল। সকাল থেকে এক দফা মালপত্র টানাটানি করে ও-বাড়িতে নিয়ে গিয়ে সাজিয়ে গুছিয়ে রেখে ফিরে এসে দুজনে ফিরে সারা দিন খেটেছে। দুপুরে খেয়েছে কেবল একটা করে রোল আর চা। বিকেলেও পাড়ার দোকানে গিয়ে চা খেয়ে এসেছে। এখন আবার বাইরে গিয়ে খেতে হবে ভাবতেই কেমন লাগছিল।

মিত্র মেসোমশাই এসে ঢুকলেন। সত্যিই, ক’মাসে বেশ বুড়িয়ে গিয়েছেন। আগে বাড়িতে লাঠি নিয়ে চলতেন না। মাসি বললেন, “হায়দ্রাবাদের ওয়েদারটা সহ্য হলো না। একটা হার্ট অ্যাটাক হয়ে গেল। ফোর্টিসে ভর্তি ছিলেন তো...”

মেসোমশাই বসতে বসতে হাত নেড়ে মাছি তাড়ানোর ভঙ্গী করে বললেন, “ও কিছু না। বয়স হয়েছে, যেতে হবে। বুড়ো ছুতো খুঁজছে।”

অবাক হয়ে অরিত্রী বলল, “বুড়ো কে?”

মাসিমা দুহাত জোড় করে কপালে ঠেকিয়ে বললেন, “আর বোলো না। ওইরকম কথার ছিরি। তিন কাল গিয়ে এককালে ঠেকেছে... এখনও ভক্তিভাব জন্মাল না।”

মেসোমশাই বললেন, “ও আর জন্মাবেও না। তোমার ভক্তির ভাগ নিয়ে বৈতরণী পেরোব। ডবল ডবল পুজো দিয়েছ কি এমনি এমনি?” তারপরে, মাসি কিছু বলার আগে, তীর্থকে বললেন, “বাবা কেমন আছেন? মা? বড়ো শোক পেলেন ― এই বয়সে এসে...”

অরিত্রী ভাবল এবারে বুঝি ― আমি বলেছিলাম, জাতীয় কিছু না শুরু করেন, কিন্তু ভদ্রলোক সেদিকে গেলেন না। বললেন, “আমার খুব খারাপ লাগছে ― আমার বলা উচিত ছিল পুরোটাই, কিন্তু এমন একটা কথা তো বলা যায় না...

তোমাদের বাড়িতে অনেক আগে এ বাড়ির মালিকই থাকত, জানো? মুখুজ্জে ফ্যামিলি। এক ছেলে ছিল, সে ওই বুড়োরই বয়সী...”

বাবু...” শুধরে দিলেন মিত্র মাসিমা।

অ্যাঁ? , হ্যাঁ, বাবু। বাবুরই বয়সী ছিল। সে অনেক দিনের কথা। ধরো তখন আমার কত আর বয়স হবে? এই পনেরো কী ষোলো ― সবে স্কুল শেষ করছি। আমরা দাদা বলতাম ― কলেজে পড়ত। চিলেকোঠার ঘরে পড়ত। ওর অভ্যেস ছিল ওরকম ছাদের আলসেতে শুয়ে শুয়ে পড়ার। আর ওখান থেকে আছড়ে পড়েছিল ― এসে শুনলাম, ঠিক যেখানে বু... বাবু পড়েছিল, সেইখেনেতেই। ওই, তোমাদের বাড়ি যেখানে শেষ হয়েছে, আর তারপরে একতলায় ওই কাজের লোকের পাইখানা যেখানে, সেই মাঝ-বরাবর।”

তীর্থ অবাক হয়ে বলল, “কী বলছেন? সে কবেকার কথা?”

একটু ভেবে মিত্র মেসোমশাই বললেন, “কবেকার কথা হবে বলো তো?”

মাসিমা বললেন, “ঘটনাটা তোমার পনেরো বছর বয়সের হলে পঁয়ষট্টি বছর আগেকার কথা। তবে আমি তো সেদিন তোমার মুখেই শুনলাম। তখন আমি কোথায়?”

মেসোমশাই বললেন, “সেদিন যাবার আগে একবার ভেবেছিলাম, তোমার বাবা-মাকে ঘটনাটা বলব। কিন্তু ওনারা এত চট করে কনভিনসড হয়ে গেলেন, যে ভাবলাম যথেষ্ট বলা হয়েছে, মিছিমিছি আর ডরানো কেন? এমনিতেই তো ওনারা বলে দিলেন বাবুকে ― আর ছাদের ঘরে পড়বে না... কিন্তু কী হলো বলো তো? কেন আবার ওখানে পড়তে যেতে দিলে?”

কী আর বলবে অরিত্রীরা।

খেতে বসে অরিত্রী জিজ্ঞেস করেছিল, “মেসোমশাই, ও বাড়িতে কি কোনও এমন ঘটনা আর ঘটেছে, এই পঁয়ষট্টি বছরে?”

মাথা নেড়ে মিত্র মেসোমশাই বলেছিলেন, “না। মৃত্যু আর হয়নি। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যে মুখুজ্জেরা বাড়ি ছেড়ে চলে যায়। সারা বাড়িতে নাকি কেবল ওর পা-জোড়া দেখা যেত। পাজামা পরা, হাওয়াই চটি পায়ে। আর প্রায়ই শোনা যেত সিঁড়ি দিয়ে উঠছে। ওরা কেমন পাগল মতো হয়ে গেছিল বাড়ির সবাই। বাড়ি ছেড়ে যাবার পরে বিক্রি করার অনেক চেষ্টা করেছিল, কিন্তু খদ্দের পায়নি। মুখুজ্জেমশাই মারা গেলেন, সে-ও অনেক দিন হয়ে গেছে। এখন তো বড়ো ছেলে আর ছোটো ছেলে মালিক। ওরাই ভাড়া-টাড়া দেয়, কিন্তু ভাড়াটেরাও একই কথা বলে। পায়ের শব্দ, আর ওই পাজামা-পরা পা একজোড়া। তোমরা তো অনেক দিন রইলে... তোমরা দেখনি কিছু?”

উৎসুক চোখে মিত্ররা চেয়ে আছে, তীর্থ কিছু বলার আগেই অরিত্রী বলল, “না তো... আমরা সেরকম কিছু শুনতে পাইনি বা দেখিনি।”


*

মৃণালিনীর দিকে তাকিয়ে অরিত্রী বলল, “-ই হলো ঘটনা। তার পর থেকে আমরা আর কোনও দিন এই পাড়ায় আসিনি। ইন ফ্যাক্ট, এদিকে বাজার পর্যন্ত করতে আসতাম না।”

কফির খালি কাপটা নামিয়ে রেখে বলল, “আমি না, এবারে চলি, বুঝলি? একটা উবার ডাকি। মাথাটা এখনও কেমন করছে...”

উবার বুক করে অরিত্রী বলল, “বলছে ওয়ান মিনিট, চল বাইরে গিয়ে দাঁড়াই।”

মৃণালিনী বলল, “বাইরে যেতে হবে না। বললে মাথা ঘুরছে... আসুক না, তারপরে যাবে।”

দুজনে চেয়ে রইল মোবাইলের স্ক্রিনের দিকে। কারও কিছু বলার নেই। কাছেই ছিল গাড়িটা। দেখতে দেখতে নীল ফুটকিটা মোড় ঘুরল। অরিত্রী এগোল গেটের দিকে। একবার উলটো দিকের গলিটার দিকে চোখ তুলে তাকিয়ে কেমন শিউরে উঠল। বলল, “এতদিন পরেও গা শিরশির করছে। ওই যে, ওই দরজাটার সামনে পড়েছিল ― আমি অবশ্য দেখিনি... উলটো দিকের ওই গোলাপি বাড়ির সবুজ দরজাটা ― ওটাই ছিল মিত্র মেসোমশাইদের।”

উবারে উঠে ঝুঁকে পড়ে বলল, “তোর বুটিকের অনলাইন সেল হয়? তাহলে...”

মৃণালিনী একটু কাঁচুমাচু হয়ে বলল, “না গো, আমরা ওসব ব্যাপারে বেশ আনাড়ি। তবে একটা কাজ করব, আমার যখন নতুন প্রডাক্ট লিস্ট বেরোবে, তোমাকে হোয়াটস-অ্যাপে পাঠিয়ে দেব।”

দিস কিন্তু,” বলে অরিত্রী ড্রাইভারকে বলল, “চলুন। লোকেশন পেয়েছেন তো?”

মৃণালিনী গেটের দিকে ঘুরে দেখল ওর বিজনেস পার্টনার ফিরছে। দুজনে গেটের মুখে পৌঁছে থামল। ঋতিকা জিজ্ঞেস করল, “ক্লায়েন্ট?”

মৃণালিনী বলল, “আমার স্কুলের বন্ধু। অনেক দিন পরে দেখা হলো। ও এখানে থাকত জানিস ― ওই বাড়িটা... ওটাতে বিয়ে হয়ে এসেছিল। তারপরে কী হয়েছিল জানিস?”


*

পুরো গল্পটা যখন শেষ হল ওরা তখন বুটিকের বাইরের ঘরে কফির কাপ হাতে বসে। নিঃশব্দে সবটা শুনেও ঋতিকা কিছু বলল না, চুপ করে চেয়ে রইল মৃণালিনীর দিকে।

মৃণালিনী বলল, “কী বীভৎস ঘটনা, না? ভাব, মা-বাবার অবস্থা?”

ঋতিকা খুব আস্তে আস্তে বলল, “মৃণাল, ওনার বিয়ে কবে হয়েছিল?”

মৃণালিনীকে একটু ভাবতে হলো। বলল, “দাঁড়া, বলছি। হিসেব করলাম যে ওর বড়ো ছেলে পিপলির চেয়ে দেড় বছরের বড়ো। আর বলল ওর বিয়ের তিন বছর পরে ছেলে হয়েছে। পিপলি এখন সতেরো... তাহলে কুড়ি... ওই একুশ-বাইশ বছরের মতো।”

ঋতিকা বলল, “আর আজ থেকে একুশ বছর আগে আমার বয়স কতো?”

কত?”

তুমি জানো ভালো করে। ষোলো।”

এক লহমা লাগল মৃণালিনীর হিসেব করতে। বলল, “হ্যাঁ, তা-ই হবে।”

ঋতিকা বলল, “আমার ষোলো বছর বয়সে আমার বাড়ির সামনের গলিতে ছাদ থেকে একটা লোক পড়ে মরে গেল, আর আমি জানলাম না?”

মৃণালিনী গোল গোল চোখে চেয়ে রইল। ঋতিকা বলল, “আর ওই গোলাপি বাড়ি, তার সবুজ দরজা ― ওটা প্রসূনদার বাড়ি। আমাদের দূর্গাপুজোয় যিনি ভোগের দায়িত্বে থাকেন। মনে পড়ে? গোলগাল, হিটলারি গোঁফ... ওটা প্রসূনদার ঠাকুর্দার বাড়ি। ওরাই থাকে। ভাড়া-টাড়া দেয় না। ওরা মিত্র না। ভটচাজ। চলো তো বাবার কাছে...”

দোতলায় নিজের ঘরে বসে সমস্তটা শুনে ঋতিকার বাবা হেসেই বাঁচেন না। বললেন, “কোনও দিন শুনিনি ওটা ভূতের বাড়ি! আর মালিকও মুখুজ্জে-টুখুজ্জে না। শর্মা। নন-বেঙ্গলি। এ পাড়ায় যত বাড়ি মোটামুটি প্রায় সবই একই সময়ে তৈরি। ওটা পরে তৈরি হয়েছে। আর ওই একটা বাড়িই চারতলা। তার কারণ ওরা কর্পোরেশনকে টাকা খাইয়ে প্ল্যানিং পার্মিশন করে নিয়েছিল। কেউ মারা-টারা যায়নি। ছাদ থেকে পড়েনি তো বটেই। ওদের এক ছেলে ছিল ― কী নাম ভুলে গেছি। সে বিদেশ চলে গেল, তারপরে আর আসেনি। এদিকে বাবা-মা মারা যাবার পরে বাড়িটা পড়ে আছে। ছেলেটা আগে কলকাতা এলে এখানেই উঠত, কিন্তু তারপরে কোথায় ফ্ল্যাট-ট্যাট কিনল, আর এল না। ফলে বাড়িটার ভগ্নদশা। শর্মার নাতিপুতি কী জানি না, তবে থাকলেও নিশ্চয়ই এদেশে কোনও ইন্টারেস্ট নেই।”

কী হলো ব্যাপারটা বুঝল না মৃণালিনী। দু-একবার ভেবে ফোনে অরিত্রীর নম্বরটা বের করেও ফোন করতে গিয়ে রেখে দিল। কী বলবে? ওরকম একটা ঘটনা পুরো মিথ্যে বলেছে এমনটা কাউকে বলা যায়?

মাস দুয়েক বাদে হঠাৎ বুটিকে এল নিমিশা। নিমিশা থাকে বম্বেতে ― সেক্রেটারি অফ স্টেট। তবে দেশে এলে নিয়মিতভাবে মৃণালিনীদের বুটিক থেকে সারা বছরের পার্টি-পোশাক কিনে নিয়ে যায়।

কথা বলতে বলতে মৃণালিনীর হঠাৎ মনে পড়ল ব্যাপারটা। জিজ্ঞেস করল, “তোর অরিত্রীকে মনে আছে?”

নিমিশা ভুরু কুঁচকে বলল, “কোন অরিত্রী? দ্য স্টোরি-টেলার?”

মৃণালিনী চমকে বলল, “স্টোরি-টেলার কেন?”

নিমিশা বলল, “তোর মনে নেই? কী সাংঘাতিক ভালো গল্প বলত ― ক্লাস ফাইভ, সিক্স, সেভেন ― ইফ আই অ্যাম নট মিস্টেকেন, ক্লাস এইটেও! ওর গল্প শুনতে কী ইন্টারেস্ট ছিল আমাদের! ক্লাসে কোনও টিচার না আসলেই আমরা বলতাম অরিত্রী গল্প বলবে। আর ও-ও এক পায়ে খাড়া। অ্যামেজিং সব গল্প বলত বানিয়ে বানিয়ে। আমরা গোগ্রাসে গিলতাম। তোর মনে নেই?”

মৃণালিনী হেসে বলল, “তুই ভুলে গেছিস ― আমি নিচু ক্লাসে তোদের সঙ্গে ছিলাম না। আমি তো এলামই ক্লাস ইলেভেনে। ইন ফ্যাক্ট আমি অরিত্রীকে চিনতামই না। ও-ই এবারের রি-ইউনিয়নে এসে আলাপ করল। তারপরে এল আমার সঙ্গে এখানে। একটা সাংঘাতিক গল্প বলল। ওই বাড়িটায় বিয়ের পরে থাকত, আর ওখানে ওর দেওর মারা যায় একটা অ্যাকসিডেন্টে। বলেছিল বাড়িটা ভূতুড়ে... কিন্তু পরে জানলাম অমন কিছু নাকি হয়ইনি।”

নিমিশা বলল, “অত তো জানি না রে... আমি অরিত্রির খবর পাইনি বহু বছর। বিয়ের পরে ও কিন্তু এপাড়ায় কোথাও ছিল কিছুদিন। আমিও কাছেই থাকতাম তখন, তবে ওর সঙ্গে সের’ম বন্ধুত্ব ছিল না। কয়েকবার রাস্তায় দেখা হয়েছে, বারিস্তায় বসে কফি খেয়েছি ― এই মাত্র। তারপরে জানলাম কবে জানি ওই নতুন টাউনশিপে বাড়ি করে চলে গেছে। আর দেখাসাক্ষাত হয়নি। যতদূর জানি, কারওর সঙ্গে যোগাযোগও তেমন রাখে না।”

নিমিশা চলে গেল। মৃণালিনী চুপ করে বসে রইল হাতে ধরা ফোনের দিকে তাকিয়ে। ছড়িয়ে থাকা কাপড় জামাগুলো ভাঁজ করে তুলে নিয়তিদি বলল, “দিদি, ঋতিকাদি বোধহয় আজ আর আসবে না। টেলরকে ফোন করবে না? নিমিশা ম্যাডামের অর্ডারগুলো...”

মৃণালিনী ফোনটা ব্যাগে রেখে বলল, “অর্ডারের কাগজটা দাও, বাড়ি গিয়ে ফোন করব। আর তারপরে তুমি সব বন্ধ করে চলে যেও। আমি বাড়ি যাই, খুব ক্লান্ত লাগছে...”

                                          শেষ