Saturday, August 08, 2020

করোনা-কালের ছোটো ছোটো গল্প

করোনা হয়েছে


দুপুরবেলা বারবাড়ির উঠোনের ধানগোলার ওধারে খেলছিল তানি। এখন ইশকুল টিশকুল নেই। অন্য সময় হলে গাঁয়ের মেয়েরা সবাই দুপুরে আসত ভীড় করে। এখন তার উপায় নেই। দাদাজান বলে দিয়েছে, কারওর আসা চলবে না, কেউ বেরোবে না। এমনকি আব্বাজানও না। আব্বাজান তো কলকাতায় ডাক্তারি করে — তাই আব্বাজানেরও বাড়ি আসা বারণ — বলেছে দাদাজান। তানির তাই মন খারাপ থাকে। কিন্তু এর জন্য দাদাজান দায়ী নয়। দায়ী ওই সাংঘাতিক অসুখ। করোনা। আব্বাজান হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরলে দাদাজান আর দাদি-আম্মার অসুখ হতে পারে। হতে পারে তানি আর বাবানেরও। তানি তো তবু বড়ো হয়েছে, সাত পেরিয়ে আট বছর বয়স হলো। ইশকুল খোলা থাকলে এখন ক্লাস থ্রি। বাবান তো এখনও তিন-বছরও নয়।

আজকাল তানির সব খেলার নামই করোনা-ভাইরাস দিয়ে। আজ খেলল করোনা-ভাইরাসদের ইশকুল। ক্লাসসুদ্ধ ছাত্র সবাই করোনা-ভাইরাস। তানি প্রথমে শেখাল, কী করে মানুষকে জ্বালাতন না করে নিজেদের মতো বাঁচা যায়। তারপরে পরীক্ষা নিল। খুব খারাপ ছাত্র সবাই। কেউ পাশ করল না। খালি মানুষ মারতে চায়! আশ্চর্য!

তারপরে হোম-ওয়ার্ক দিল। বলল, সবাই কাল পর্যন্ত পুকুরে ডুবে থাকবে। গভীরে। শুধু গ্রামের এঁদো পচা পুকুরটায়। যেটাতে মাছ-টাছ নেই, কেউ সাঁতার কাটে না, যেটাতে মশা হয় বলে পঞ্চায়েত থেকে বছরে দু’বার ব্লিচিং পাউডার দিয়ে যায়। আব্বা বলেছে ব্লিচিং দিলে মরে যায়। ভিডিও পাঠিয়েছে, ব্লিচিং-এর ধোঁয়া দিয়ে হাসপাতাল সাফ করা হচ্ছে। সেটা তানি পড়ায়নি। ওরা শিখে গেলে পুকুরে যাবে না — তানির অতটা বুদ্ধি আছে।

তারপরে মা’র ডাক শুনে বিকেলের জলখাবার খেতে দৌড়ল। মনে হলো দৌড়তে দৌড়তেও ‘করোনা হয়েএএএছে’ বলে চেঁচাতে হবে। যেমন মনে হওয়া, তেমন কাজ। ধানের গোলার পেছন থেকে বেরিয়ে, ঢেঁকিঘরের সামনে দিয়ে, গোয়ালঘর পেরিয়ে, ভেতরের বাড়ির উঠোনে ঢুকে, ‘করোনা হয়েএএএছে’ বলে চেঁচাতে চেঁচাতে যেমন রান্নাঘরের দাওয়ার দিকে দৌড়েছে, ওমনি মনে হয়েছে, এই খেলাটার আর একটা ধাপ থাকলে ভালো হয়। দৌড়তে দৌড়তে না চেঁচিয়ে দৌড়বে চুপ করে, আর একটু পরে পরে, এক পায়ে দাঁড়িয়ে “করোনা হয়েএএএছে’ বলে চেঁচিয়ে আবার দৌড়বে।

প্রায় পৌঁছে গেছে রান্নাঘরের দাওয়ায়, এমন সময়ে প্রথম বার থেমে ‘করোনা হয়েএএএছে’ বলে চেঁচাতে গিয়েই বিপদে পড়ল। প্রাণপণ ছুটতে ছুটতে হঠাৎ থামলে কী হয়, সেটা জানত না তানি। তা-ও আবার এক পায়ে! হুমড়ি খেয়ে পড়ল সামনের দিকে। আর তক্ষুনি রান্নাঘরের পাশের খাবার ঘর থেকে ছুট্টে বেরিয়েছে ভাই। টলোমলো পায়ে নিয়ে আসছে দিদির জন্য মুড়ির বাটি। “দিদি, মুই--! দিদি, মুই--!” সিঁড়ির ওপর মুখ থুবড়ে পড়ে তানির চোখে অন্ধকার, দিদিকে পড়তে দেখে বাবানও ভয় পেয়ে উল্টোদিকে দৌড়তে গিয়ে দাওয়ার ওপরে থ্যাপাস, বাটি থেকে সব মুড়ি বাবানের মাথায় আর গায়ে, আর তারপরে দুই ভাইবোনের পরিত্রাহী কান্না।

সব্বাই ছুটে এল, দাদি-আম্মা ধরল বাবানকে, আম্মিজান ধরল তানিকে, জল দেওয়া হলো, মুখ মুছিয়ে দেওয়া হলো, চোখের জল শুকিয়ে দেওয়া হলো — ঠিক তখনই চাচি এসে বলল, “এই দেখ, আব্বা ফোন করেছে...”

ভিডিওতে আব্বাজান! কাজ সেরে হাসপাতাল থেকে ফিরেছে। আব্বাকে দেখে তানির কান্না থেমে গেল। বাবানও — বাবা বাবা, বলে ঝাঁপিয়ে পড়ল দাদির কোল থেকে।

ভাইবোন কিছুক্ষণ বাবার সঙ্গে গল্প শেষ করে যখন আম্মির সঙ্গে খাটে শুয়ে রয়েছে, বাইরে থেকে দাদাজানের গলা খাঁকরানির শব্দ এল।

আম্মি বলল, “আসুন, আব্বা,” বলে উঠে বসল। ঘোমটা টেনে দিল মাথায়।

দাদাজান ঢুকে দরজার পাল্লার দিকে তাকিয়ে বলল, “তানি, মা আমার, তুমি পড়ে যাবার আগে কী বলছিলে? করোনা হয়েছে... করোনা হয়েছে... কার হয়েছে করোনা? গাঁয়ের কারও?”

তানি খুব গম্ভীর হয়ে বলল, “না, দাদাজান, গাঁয়ের কারওর না। সারা পৃথিবীর করোনা হয়েছে।”

দাদাজান নিশ্চিন্ত হয়ে নমাজ পড়তে গেল বাইরের ঘরে।

মে, ২০২০

দাদাজানের খাবার প্যাকেট


সকালবেলা দাদাজান আর চাচা নাস্তা খেয়েই রওয়ানা দিল বা’র বাড়ির দিকে। তানি-ও গেল পেছন পেছন কাউকে কিছু না বলেই। পাছে জিজ্ঞেস করলে বড়োরা বলে — যেও না? একবার বারণ করে দিলে তো আর যাওয়া যাবে না, তার চেয়ে না বলে যাওয়াই ভালো।

আজকাল বারবাড়িতে কাজের লোক নেই। সবাই করোনার ভয়ে বাড়িতেই আছে। তবে তানি জানলা দিয়ে, পেছনের বাগানের নিচু বেড়ার ওপর দিয়ে দেখতে পায়, কেউ বাড়িতে থাকে না। সেদিন দেখল, সাদেক চাচা, মিন্টু চাচা, আরও তিন চার জন্য গাঁয়ের লোক পুকুরপাড়ে উবু হয়ে বসে বিড়ি খাচ্ছে, আর গল্প করছে। দাদাজান দেখে গম্ভীর হয়ে গেল। খিড়কির পুকুরের ওপারে পাকাচুল ফতিমার কুঁড়ে, সে এসে দাদি-আম্মাকে বলে গেল, “কেবল তোমরাই তো বলছ আসতে হবে না, আর সবাই তো বলছে কাজ করো। নইলে তাদের সংসার চলবে না। আর তাছাড়া তোমরা ন’য় মাইনে দিয়ে দিলে, অন্যে তো কাজ না করলে পয়সাও দেবে না। তাইলে আমাদের কী হবে? আবার ওই সোনার মায়ের কথাই ধরো — বয়স তো কম হলো না। ছেলেও বিদেশে, মেয়ে-ও শ্বশুরবাড়িতে। আমি গিয়ে রেঁধে দিলে খেতে পায়...”

কাল বিকেলে দাদাজান সাদেক চাচা আর মিন্টু চাচাকে ডেকে বারবাড়ির উঠোনে বসিয়ে নিজে ভেতর বাড়ির দরজায় দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করেছিল, “কী রে, পঞ্চায়েত থেকে যে বলে দিয়েছে, জটলা করবেন না, ভীড় করবেন না... তার কোনও মূল্য নেই বুঝি? কেন রে এমন মারণব্যাধিকেও তোরা বুদ্ধির অভাবে আরও ভয়ানক করে তুলবি?”

ওরা মাথা চুলকে, “আচ্ছা কর্তা...” “ঠিক আছে কর্তা...” বলে চলে গেছিল, কিন্তু রাতে খেতে বসে দাদি-আম্মা বলেছিল, “ওরা এখন নিশ্চয়ই ওই দিকে গিয়ে আড্ডা দিচ্ছে — যাতে আপনি দেখতে না পান। এ গাঁয়ে কেবল আমরাই ঘরবন্দী, বুঝলেন? বাকি সব্বাই কিন্তু মনের আনন্দে বেড়িয়ে বেড়াচ্ছে।”

রেগে দাদু নাক দিয়ে ঘুঁৎ শব্দ করেছিল। প্রতিবারের মতো বাবান আর তানি খিলখিল করে হেসে গড়িয়ে পড়েছিল। মা বার বার চোখ পাকিয়ে তাকানোতেও কোনও লাভ হয়নি।

ভেতরবাড়ির উঠোনের দরজায় দাঁড়িয়ে তানি দেখল বারবাড়ির দাওয়ায় রাখা প্যাকেট প্যাকেট চাল, তরকারি আর ডাল। চাচাজান একবার আঙুল দিয়ে কী যেন গুনল, তারপরে দুজনে কী আলোচনা করল। একটু পরেই বাইরের দরজা দিয়ে একটা ভ্যান রিকশ ঠেলে ঠেলে নিয়ে এল স্টেশনের মোরতাজা পানু। পানু চাচা ওদের ফাই ফরমাশ খাটে, আর মাসকাবারি বাজার নিয়ে আসে ভ্যান রিকশয়। পানু চাচার সঙ্গে ওর বড়ো ছেলে মেহের। মেহের আর পানু চাচা হাতে হাতে ধরাধরি করে প্লাস্টিকের প্যাকেটগুলো তুলে ফেলল ভ্যানে। তারপরে দুজনে টানাটানি করে ভারি ভ্যান রিকশটা বের করে নিয়ে গেল।

দাদাজান আর চাচা বাড়ির দিকে ঘুরতেই দেখতে পেল তানিকে। দাদাজান হেঁকে বলল, “কী হে, তানি-রানি? ওখান থেকে দাদাজানকে পাহারা দিচ্ছ? আমি কিন্তু বাইরে যাইনি।”

তানি অপেক্ষা করল দাদাজান কাছে আসা অবধি। তারপরে বলল, “অত খাবার কোথায় পাঠালে দাদাজান, পানু চাচা ওগুলো নিয়ে বাজারে বিক্রি করবে?”

দাদাজান খুব হাসল। বলল, “আগে হাত ধুই। যদিও কিছু ধরিনি, পানুর কাছেও যাইনি, তবু — কী শিখেছ? সময় পেলেই হাত ধোবে। চলো, তুমিও হাত ধোও। কলকাতা থেকে আব্বাজান শিখিয়ে দিয়েছে না? দেখি তো কী শিখেছ?”

তানির ডাক্তার বাবা ওদের ভিডিওতে হাত ধোয়া শিখিয়েছে। বলেছে, বার বার সাবান দিয়ে হাত ধোবে, নাকে মুখে চোখে যেন নোংরা হাত না যায়। যতবার নাকে মুখে চোখে হাত দেবে, তার আগে হাত ধোবে। হাঁচি পেলে, কাশি এলে কনুইয়ের ভাঁজে কাশবে। আর কারওর কাছে যাবে না। শুধু বাড়ির লোকের কাছে যাবে। সব্বাই যেন এই নিয়ম মেনে চলে।

আব্বাজানের শেখান নিয়ম মেনে হাত ধুয়ে দেখাল তানি। প্রথমে হাতের তালু। এটাকে বলে সোজা। ইংরেজিতে S। তারপরে উলটো পিঠ। এ হাত, ও হাত। উলটো বলে ইংরেজিতে U। তারপরে মুঠো বানিয়ে এ হাত, ও হাত। ইংরেজিতে M। তারপরে বুড়ো আঙুল — এটা ইংরেজিতে A। বুড়ো আঙুলটা উলটো করে ধরতে হবে। সোজা ধরলে আঙুলের ডগাটা বেরিয়ে থাকে, সাবান লাগে না। তারপরে নখ, ইংরেজিতে N। আর সব শেষে, কবজি — KSUMAN-K। তারপরে জল দিয়ে সাবান ধুতে হবে।

দাদাজান বলল, “ভেরি গুড। এবারে আমি ধুই। তারপরে চাচা...”

হাত ধুয়ে সবাই গিয়ে বৈঠকখানায় বসল। আম্মি আর খালা কফি নিয়ে এল। দাদাজানকে তানি বলল, “খাবার কোথায় পাঠালে?”

দাদাজান বলল, “গাঁয়ের গরিব লোকের বাড়িতে। কাজ নেই, রোজগার নেই, খাবে কী? কাল হরি মুদির দোকান থেকে আনালাম, আজ থেকে রোজ পানু আর ওর ছেলে সবার বাড়িতে বাড়িতে দিয়ে আসবে।”

তানি বলল, “সবাইকে খাওয়ালে আমরা গরিব হয়ে যাব না?”

দাদাজান বলল, “আল্লা আমাদের অনেক দিয়েছে। তার থেকে ওদের দিলে আমরা গরিব হব না। ওরা তো আমাদের জমিতেই কাজ করে, তাই না?”

তানি একটু ভাবল। পানু তো ওদের জমিতে কাজ করে না। “পানু চাচাও পাবে?”

দাদাজান বলল, “আলবাত পাবে। ও-ও তো গরিব।”

তানি বলল, “কিন্তু ওকে পয়সা দেবে না? ও তো সবার বাড়িতে খাবার দিচ্ছে।”

দাদাজান তানি-কে কোলে টেনে নিয়ে বলল, “পয়সা দেব না। তাহলে ও সেটা নষ্ট করবে। কিন্তু ওর মজুরি দেব। ওকে বলেছি ওর ঘরের চালাটা সারিয়ে দেব আমি এবারে বর্ষার আগেই।”

মাথা নাড়ল তানি। বলল, “না, সব্বাই কাজ করে পয়সা পায়। ওকেও পয়সা দেবে। বাবা যেমন টাকা পায় হাসপাতালে কাজ করে, তেমনি।”

দাদি-আম্মা বলল, “কার নাতনি দেখতে হবে তো?”

দাদাজান হেসে বলল, “আমার, আবার কার!”

দাদি-আম্মা বলল, “মোটেই না। আপনি বলেছিলেন ছাদ বানিয়ে দেবেন। আমি বলেছি মাইনে দিন। এখন আপনার নাতনি আমার কথাই দোহরাল।”

দাদাজান বলল, “বেশ। তবে তিনজনের কথাই থাকবে। মাইনে পাবে রোজের কাজের। আর বর্ষার আগে ঘরের চালও সারিয়ে দেব। কারণ ও নিজের বিপদ তোয়াক্কা না করে সবার উপকার করছে।”

মে, ২০২০

নিশাপুরের আতর


~এক~

আজকাল তানির ভালো লাগে না। কতদিন হয়ে গেল। সেই মার্চ মাসের শেষ থেকে লকডাউন। এখন অগস্ট। সেদিন চুপিচুপি দাদাজানের টেবিলের ক্যালেন্ডারটায় গুনে দেখল কটা পাতা উল্টেছে। এক, দুই, তিন, চার, পাঁচটা। ছ’ নম্বর পাতা চলছে। স্কুল খোলেনি, বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হয়নি কতদিন। কত আর খেলা যায় একা একা? বাবানটাও বড়ো হচ্ছে না।

খালি বাড়ি। এখন চাচা-চাচি-ও নেই। চাচির বাড়ি গেছে। চাচির মা-র শরীর খারাপ। করোনা নয়। এমনি। বাড়ির সব কাজ এখন আম্মা আর দাদি-আম্মা করে। দুজনেই ক্লান্ত থাকে। তাই আজকাল বাবান আর তানিও অনেকটা সময় একা একা থাকে। তানির দায়িত্ব ভাইকে দেখাশোনা করা। বাবানকে গল্প বলে। দাদাজান আর দাদি-আম্মার কাছে শোনা গল্প, আব্বাজানের গল্প, আম্মির গল্প, আর কিছু নিজে বানিয়ে বানিয়ে বলে।

কিন্তু ভালো লাগে না। সারাক্ষণ একা একা।


~দুই~

কিছুদিন আগে আব্বা এসেছিল। আজকাল আসলে অনেক দিন থাকে, কিন্তু প্রথম কয়েক দিন কাছেই আসে না। বার-বাড়িতে কাছারির একটা ঘরে থাকে। দাদাজান বলে দিয়েছে তানি আর বাবান যেন কিছুতেই আব্বার কাছে না যায়। তাই প্রথম দিকে আব্বা একটা মোড়া নিয়ে বসে বারবাড়ির বারান্দায়, আর ভেতরের উঠোনের দরজার ভেতরে বসে তানি আর বাবান। চিৎকার করে করে গল্প করে।

ভাল্লাগে না। এরকম করে আব্বাজানের সঙ্গে গল্প করা যায়? ছুটে গিয়ে জড়িয়ে ধরা যায় না, কোলে ওঠা যায় না, ভোরবেলা ঘুম ভেঙে আব্বাজানের খোঁচা খোঁচা দাড়িতে গাল বোলানো যায় না...

অনেকদিন পরে আব্বাজান যখন বাড়ির ভেতরে ঢুকল, তানি আর বাবানের কী আনন্দ। দুজনে আর কোল থেকে নামবেই না। কিন্তু সে আনন্দও রইল না, আব্বাজান ক’দিন পরেই বাক্স গুছিয়ে আবার বাইক নিয়ে বেরিয়ে গেল। শহরে হাসপাতালে অনেক কাজ। অনেকের করোনা হচ্ছে শহরে। এমনকি ডাক্তারদেরও।

সেদিন বিকেলে তানি ভয়ে ভয়ে আম্মাকে জিজ্ঞেস করল, “আম্মি, বাবারও যদি করোনা হয়?”

আম্মি বলল, “চলো নমাজ পড়ি। আল্লাহ্‌কে বলি, সবাইকে সুস্থ রাখেন যেন।”

সেদিন খুব মন দিয়ে নমাজ পড়ল তানি। দিদির দেখাদেখি বাবানও পাশে বসল।


~তিন~

সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে বাইরে এসে তানি দেখে দাওয়ায় দাদাজান নেই। রোজই বসে থাকে। আজ কোথায় গেল? তাড়াতাড়ি ঘরে উঁকি দিয়ে দেখল খালি। উঠোন পেরিয়ে রান্নাঘর, ওখানে আম্মি আর দাদি ব্যস্ত। বলল, “দাদাজান কই?”

দাদি-আম্মা আটা মাখতে মাখতেই বলল, “একটু বেরিয়েছে, এক্ষুনি এসে যাবে, তানি-মা, তুমি দাঁত মেজেছ?”

দাদাজান বেরিয়েছে! আশ্চর্য! করোনার শুরু থেকে ওরা কেউ বাড়ি থেকে বেরোয়নি। শুধু চাচা আর চাচি, আর আব্বাজান... দাদাজান বেরিয়ে গেল? কোথায় গেল?

আরও মন খারাপ হলো তানির। দাদাজান ওকে একা ফেলে বেরিয়ে গেল? মন খারাপ করে তানি দাঁত মাজতে গেল কলতলায়। ভালো করে দাঁত মাজতে হয়। আব্বাজান শিখিয়েছে। দাঁত মাজতে মাজতে অন্যদিকে মন দিতে নেই। তাই খুব ভালো করে দাঁত মেজে, ব্রাশ ধুয়ে যেই ঘুরেছে, দেখে দাদাজান ঢুকছে ভিতরবাড়িতে। তানিকে দেখে হাত তুলে বলল, “আমি আগে চান করে আসি, মা?”

পাশেই কলঘর। তানি এক দৌড়ে শোবার ঘরের দাওয়ায় উঠে পড়ল, কানের পেছন থেকে মাস্ক খুলতে খুলতে দাদাজান আস্তে আস্তে কলঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল। রান্নাঘর থেকে লুচি আলুর তরকারির থালা হাতে খাবার ঘরে যেতে যেতে মা বলল, “খেতে এসো।”

খাওয়া শেষ করে, পড়া শেষ করে তানি আস্তে আস্তে উঁকি দিল দাদাজানের ঘরে। দাদাজান ইজি-চেয়ারে বসে, কপালের ওপর হাত দিয়ে, ছাদের দিকে তাকিয়ে। দরজায় দাঁড়িয়ে বলল, “দাদাজান?”

হাত নামিয়ে দাদাজান ওর দিকে ঘুরল। “তানি? এসো।”

তানি গিয়ে দাঁড়াল দাদাজানের পাশে। দাদাজান বলল, “পড়াশোনা শেষ?”

শেষ,” বলে তানি দাদাজানের পায়ের কাছে মাটিতে বসে পড়ে বলল, “সকালে কোথায় গেছিলে?”

দাদাজান আঙুল দিয়ে জলচৌকিটা দেখিয়ে বলল, “গেছিলাম গ্রাম প্রধানের কাছে। গ্রামের লোকেদের জন্য কাজের বন্দোবস্ত করতে।”

তানি জলচৌকি নিয়ে এসে বসল দাদাজানের পাশে। গ্রামের লোকেদের কাজ নেই। তার ওপর যে সব ছেলে বুড়ো বাইরে গেছিল চাকরি করতে, সবাইকে ফিরে আসতে হয়েছে। অনেকে দিন-রাত হেঁটে হেঁটে এসেছে বম্বে না কোথা থেকে। দেখেছে, বাড়িতে তাদের জন্য দাদাজান, আব্বাজান, চাচা, চাচি, মা, দাদি — সবাই দিনের পর দিন, রাতের পর রাত দুশ্চিন্তা করেছে। গ্রামের স্কুলে ওদের থাকার ব্যবস্থা হয়েছে দু’সপ্তাহ, তাহলে ওদের কারও করোনা হয়ে থাকলে অসুখ গ্রামে ছড়াবে না। স্কুলের নাম এখন আর স্কুল নয়। কোয়ারান্টাইন-বাড়ি। তখনও আব্বাজান দু’বার হাসপাতাল থেকে ছুটি নিয়ে এসেছিল। কোয়ারান্টাইন-বাড়ি গিয়ে গিয়ে ওষুধ দিয়েছে। দাদাজান পানুচাচাকে দিয়ে খাবার দেবার ব্যবস্থা করেছে। এখন অবশ্য সবাই যে যার বাড়িতে চলে গেছে।

বলল, “ওই যারা পরিযায়ী শ্রমিক? তাদের জন্য?”

দাদাজান বলল, “পরিযায়ী মানে যারা বাইরের থেকে আসে। কিন্তু এরা তো এ গ্রামেরই লোক। বাইরে গিয়েছিল, ফিরে এসেছে। কিন্তু কারওর ঘরে কোনও খাবার নেই। আমাদেরই ব্যবস্থা করতে হবে — তাই না?”

তানি বলল, “কী কাজ দেবে ওদের গ্রাম প্রধান?”

দাদাজান বলল, “তোমার মনে আছে, তানি মা, গত বছর শীতে আমরা রাজস্থান বেড়াতে গেছিলাম?”

তানি বলল, “বেশি মনে নেই। কত জায়গা, কত বড়ো বড়ো দুর্গ... এখন ভাবলে এটার সঙ্গে ওটা গুলিয়ে যায়...”

দাদাজান বলল, “ঠিক। আমারও। তবে তোমার নিশ্চয়ই যোধপুরের কথা মনে আছে — ওই যে, বিরাট মেহেরানগড় দুর্গ?”

তানি একটু ভেবে বলল, “দাঁড়াও, মার ট্যাব-টা নিয়ে আসি। ওতে সব ছবি রয়েছে।”

যোধপুরের ছবিগুলো দাদাজানের হাতে দিয়ে বলল, “এই দেখো।”

দাদাজান একটা ছবি দেখিয়ে বলল, “এই দেখো। এই যে প্রাসাদের সামনে আমরা দাঁড়িয়ে আছি, এটার নাম উমেদ ভবন। এটা কেন তৈরি হয়েছিল জান? একবার যোধপুরে ভীষণ খরা হয়েছিল। জল নেই, খাওয়া দাওয়া নেই, লোকে মারা যাচ্ছিল। তখন ওখানকার রাজা গ্রামের লোকেদের এই প্রাসাদ তৈরির কাজ দিয়েছিলেন। তারা খেতে পেয়েছিল।”

তানির চোখ বিস্ময়ে গোল গোল হয়ে গেল। দাদাজান প্রাসাদ তৈরি করাবে? এই গ্রামে?

তানির দিকে তাকিয়ে দাদাজান হঠাৎ হা হা করে হেসে উঠল। বলল, “বুঝছি তুমি কী ভাবছ। না। আমি প্রাসাদ তৈরি করার কথা ভাবছি না। তখনকার দিনে রাজারা নিজেদের কথা ছাড়া ভাবত না। আমি গেছিলাম প্রধানের কাছে। গ্রামের উন্নয়নের অনেক কাজ জমে আছে। সেগুলো এক এক করে শুরু করলে গ্রামের লোককে দিয়েই গ্রামের কাজ করানো যাবে। তারাও খেয়ে পরে বাঁচবে, গ্রামের উন্নয়ন-ও হবে।”

প্রধান কী বললেন?”

নানা সমস্যার কথা — টেন্ডার নোটিস দিতে হবে, তার উত্তর আসবে, যারা সবচেয়ে কম দর দিয়েছে তাদের সঙ্গে কথা বলতে হবে — এই করোনা লকডাউনে কী করে সম্ভব?”

তানি কিছুই বুঝল না। তবে বুঝল দাদাজানের কথা প্রধান মানেনি। বলল, “তাহলে কী হবে?”

দাদাজান কিছুক্ষণ বাইরের দিকে তাকিয়ে রইল। বেলা বেড়েছে, উঠোনে রোদ এখন বেশি। কাল রাতে বিষ্টি হয়েছে বলে মাটি ভিজে। সেখানে দুটো শালিক লাফিয়ে লাফিয়ে কী খাবার খুঁজছে, কে জানে। তানিও ওদের দিকে তাকিয়ে মনে মনে “টু-ফর-জয়, টু-ফর-জয়” বলে নিল।

ফোঁস করে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে দাদাজান বলল, “বলে এলাম, যদি ছোটো কাজও করানো যায় — যার জন্য এত ঝামেলা করতে হবে না... বলল দেখবে ভেবে। কী করবে কে জানে?”

তানিও চুপ করে বসে, দাদাজানও। বাইরে বাবান দাওয়া থেকে নেমে এদিক ওদিক দেখছে। ওকে দেখে শালিক দুটো উড়ে গেল।

তানি বলল, “কী হবে দাদাজান? আমরা কী করোনা থেকে কোনও দিন ছাড়া পাব না?”

দাদাজান এবার তানির দিকে তাকাল। কিছুক্ষণ পরে বলল, “ভরসা রাখো। ভরসা ছাড়া কিছুই হয় না। নিশাপুরের আতরের গল্প জানো?”

দাদাজান দারুণ গল্প বলে। উৎসাহে তানি এগিয়ে এল। বলল, “সে কে? নিশাপুরই বা কোথায়?”

দাদাজান বলল, “নিশাপুর ইরান দেশে। অন্য নাম নিশাবুর। সেখানে থাকতেন এক জ্ঞানী ব্যক্তি — আবু হামিদ বিন আবু বকর ইব্রাহিম। অনেক বই লিখেছেন আতর তৈরি করতেন। সেইজন্য ওনার নামই হয়েছিল নিশাপুরের আতর। তিনি গল্প বলে লোককে শেখাতেন।”


~চার~

দাদাজান গল্প বলতে শুরু করার আগে গ্লাসে জল নিয়ে আসতে হয়। বিনা বাক্যব্যয়ে তানি এক ছুটে ঘর থেকে বেরিয়ে খাবার ঘরে গিয়ে দাদাজানের বড়ো কাঁসার গ্লাসে জল ভরে বেরোতে যাবে, রান্নাঘর থেকে ছুটে এল বাবান।

দিদি, কোথায় যাচ্ছিস?”

তানি সাবধানে বেরোতে বেরোতে বলল, “দাদাজানের ঘরে। গল্প শুনবি?”

বাবানও গল্প শুনতে ভালোবাসে। তাই তানির ফ্রকের কোণাটা ধরে রওয়ানা দিল। দুজনে দাদাজানের ঘরে ঢুকল। তানি জলটা দাদাজানের হাতের কাছে ছোটো টেবিলে রেখে দিল। বাবান বলল, “দাদাজান, গল্প?”

দাদাজান চোখ খুলে বলল, “ওরে বাবা, তুমিও এসেছ? এসো, কোলে বসো।”

বাবান ছোটো বলে ওর বসার জায়গা দাদাজানের কোলে। তানি আবার বসল দাদাজানের পাশে। দাদাজান শুরু করল।

এক দেশে এক রাজা ছিল। সে চাইত সবসময় আনন্দে থাকতে। দুঃখ চাইত না। কিন্তু তা তো সম্ভব না। সবসময় কে আনন্দে থাকতে পারে? দুঃখ তো মানুষকে পেতেই হবে — তাই না?”

বাবান মাথা নাড়ল। “আব্বাজান হাসপাতালে চলে গেল, আমার দুঃখ হলো।”

দাদাজান ঘাড় নাড়ল। “ঠিক। আমরা সবাই দুঃখ পেলাম। কিন্তু রাজা ভাবল, আমি তো রাজা। আমি কেন দুঃখ পাব? তাই সে দেশের সব জ্ঞানী গুণী মানুষকে ডেকে বলল, এমন কিছু উপায় বলো, যাতে দুঃখ থেকে মুক্তি পেয়ে শুধু আনন্দে থাকতে পারি।”

তানি একটু ভেবে বলল, “হবে না। দুঃখ আর আনন্দ একই মোহরের এপিঠ ওপিঠ — দাদি-আম্মা বলেছে, জীবনে এটা থাকলে ওটা থাকবেই।”

দাদাজান বলল, “কিন্তু রাজা তো তা জানে না। তাই বলল, আমাকে এমন কিছু বানিয়ে দাও, যাতে আর আমি দুঃখ না পাই।”

বাবান বলল, “তারপর?”

দাদাজান বলল, “সেই সব জ্ঞানীরা অনেক ভেবে রাজাকে একটা আংটি বানিয়ে দিয়েছিলেন। তাতে লেখা ছিল, ‘একদিন এ-ও শেষ হবে’। রাজা সেই আংটি পরে থাকতেন। দুঃখের সময়ে আংটির লেখার দিকে তাকিয়ে শান্তি পেতেন। কারণ সত্যিই কোনও দুঃখই চিরদিন থাকে না। একদিন শেষ হবেই। সেটাই আমাদের আশা। সেটাই আমাদের ভরসা।”

দাদাজান থামল। বাবান একটু ভেবে বলল, “তারপর?”

দাদাজান একটু অবাক হয়ে বলল, “আর পর নেই। এটাই শেষ।”

বাবান লাফ দিয়ে দাদাজানের কোল থেকে নেমে, “দুঃ, বাজে গল্প, পচা গল্প... একটাও রাক্ষস নেই, জিন নেই, ফরিস্তা নেই, দানো নেই...” বলতে বলতে ছুটে ঘর থেকে চলে গেল। তানি একটু বসে ভাবল, তারপরে উঠে জলচৌকিটা জায়গায় রেখে বলল, “আমি আসি, দাদাজান।”

দাদাজান আবার চোখ বুজে, কপালে হাত রেখে ভাবতে লেগেছে। ওইভাবেই বলল, “তোমারও গল্পটা ভালো লাগল না, তানি-মা?”

তানি বলল, “ছোটো গল্প। মাঝে মাঝে ছোটো গল্প ভালো লাগে। এটা থেকে শিক্ষা পেলাম। তাই না?”

দাদাজান বলল, “কী শিখলে?”

তানি বলল, “করোনাও একদিন শেষ হবে। মিছিমিছি হতাশ হয়ে লাভ নেই। সবই শেষ হয়। এ-ও শেষ হবে।”

দাদাজান কিছু বলল না। তানি দরজা পর্যন্ত গিয়ে ফিরে দাঁড়াল। দাদাজান আবার হাত নামিয়ে ওর দিকে তাকিয়ে আছে। মনে হলো অপেক্ষা করছে, তানি কিছু বলবে।

তানি বলল, “কিন্তু আনন্দের সময় রাজা কী করত? ওই আংটি দেখে দুঃখ পেত?”

দাদাজানের ঠোঁট আস্তে আস্তে হাসিতে ভরে উঠল, চোখের দুপাশে চামড়া কুঁচকে গেল, দুচোখ প্রায় বন্ধ হয়ে এল। ডান হাতের আঙুল তুলে নাড়াতে নাড়াতে বলল, “ভেরি গুড, তানি-মা। দেখছিলাম, তুমি ধরতে পার কি না। ঠিক বলেছ। ওই আংটি যেমন রাজাকে দুঃখের দিনে শান্তি দিত, ওটাই আবার আনন্দের দিনে দুঃখ নিয়ে আসত। কারণ — তুমিই বলে দিয়েছ... আনন্দ আর দুঃখ একই মোহরের এপিঠ আর ওপিঠ। দু-ই আমাদের নিত্যসঙ্গী। একে ছাড়া ওকে পাওয়া যায় না।”

অগস্ট, ২০২০

No comments: