~এক~
সমুদ্রের
ধার থেকে বেশি দূরে নয় পাহাড়ি
গ্রামটা। ওদের দেশে পাহাড় আর
সমুদ্রের দূরত্ব বেশি নয়,
তাই।
সুর্য ওঠার আগে বাসে করে
সমুদ্রের পাড় থেকে রওয়ানা
দিলে সকাল বেলা কোথাও থেমে
টিফিন করলেও দুপুরের খাওয়ার
আগেই লোকে পৌঁছে যায় শহরে।
তাই
ওই পাহাড়ি গ্রামের সব লোকই
সমুদ্র দেখেছে। সবাই গরমকালে
সমুদ্রস্নানে যায়,
আর
সমুদ্রতীরে যাদের বাড়ি,
তারা
আসে পাহাড়ে। সবাই যায়,
কিন্তু
বুড়ো এস্তেফান যায় না। এস্তেফান
গ্রামের স্কুলে কাজ করে। ওর
কাজ স্কুল সাফ করা। বাচ্চারা
স্কুলে আসার আগে ও ঘরে ঘরে
গিয়ে দেখে নেয়,
সব
ঘর সাফ সুতরো আছে কি না,
আর
দিন শেষ হলে ওর কাজ স্কুলটাকে
ঝকঝকে পরিষ্কার করে তবে বাড়ি
ফেরা। কত বছর হয়ে গেল এস্তেফান
সেই ছোকরা বয়স থেকে এ-ই
করে চলেছে। শীত নেই,
গ্রীষ্ম
নেই,
বর্ষায়,
হেমন্তে।
তবু
ওরও তো স্কুলের ছুটির সময় ছুটি
রয়েছে। তখন তো ও যেতেই পারে
সমুদ্রের ধারে। যেতেই পারে
গরমের ছুটির সময় বালিতে শুয়ে
শুয়ে সমুদ্রের ঢেউ দেখতে?
যায়
না কেন?
এস্তেফানের
বাড়িতে আজ আর কেউ থাকে না। ওর
বউ আর নেই,
ওর
তিন ছেলে বড়ো হয়ে শহরে চলে
গেছে। ওরা বাবার কাছে বেড়াতে
আসে। বাবা ওদের কাছে যায় না।
আজ
থেকে প্রায় কুড়ি বছর আগে,
জোয়ান
এস্তেফান একদিন গরমকালে
বিকেলবেলা ওর বাড়ির পেছনের
নদীতে মাছ ধরছিল। হঠাৎ শুনল
শিকারীর বন্দুকের শব্দ।
এস্তেফানের দেশে গ্রীষ্মকালে
বহু দক্ষিণের পাখি উড়ে আসে
গরমটা কাটাতে। তখন শিকারীরা
বন্দুক নিয়ে বেরিয়ে পড়ে সেই
পাখি মেরে খাবার জন্য। এরকম
কোনও শিকারীর দল এসেছে শহর
থেকে।
এস্তেফানের
মনে হলো,
নদীর
ধারে না থাকাই ভালো। শহর থেকে
যারা শিকারে আসে তারা সবাই
পাকা শিকারী না। দূর থেকে ওকেই
যদি হাঁস মনে করে গুলি করে
দেয়,
তখন
বিপদ হবে। তার চেয়ে বাড়ি ফিরে
যাওয়াই উচিত। এই মনে করে মাছধরার
সরঞ্জাম গুটিয়ে নিয়ে সবে
রওয়ানা দিয়েছে,
হঠাৎ
ডানা ঝটপট করে ওর সামনে এসে
মুখ থুবড়ে পড়ল একটা সাদা সারস।
এস্তেফান গ্রামের ছেলে,
এরকম
সারস ও অনেক দেখেছে। একবার
তাকিয়েই বুঝল,
ওর
ডানায় গুলি লেগে ওর ডানাটা
ভেঙে গেছে।
~দুই~
এই
জাতের সাদা সারস ওদের দেশে
হাজারে হাজারে আসে। দূর দক্ষিণের
কে-জানে-কোন-দেশ
থেকে ওরা কত হাজার মাইল উড়ে
আসে প্রতি বছর। ওদের বাড়ির
ছাদে-ছাদে,
চিমনির
পাশে ― ওরা বাসা বাঁধে। সারা
গ্রীষ্মকাল ওরা থাকে,
ডিম
পাড়ে,
বাচ্চা
বড়ো করে,
তারপরে
গ্রীষ্ম শেষ হলে,
শীতের
আগেই,
হেমন্তকালে
ওরা উড়ে যায় দক্ষিণের দেশে।
ওখানে তখন গ্রীষ্ম। ওরা শীত
সহ্য করতে পারে না। এস্তেফানের
পাহাড়ি শহর ঢেকে যায় পুরু
বরফের আস্তরণে। সেখানে ওরা
বাঁচতে পারে না।
কিন্তু
এই সারসটা ডানা ঝটপট করছে,
উড়ে
যাচ্ছে না। মাছ ধরার বালতি
আর ছিপটা মাটিতে নামিয়ে রেখে
এস্তেফান আস্তে আস্তে এগিয়ে
গেল পায়ে পায়ে। মস্তো লম্বা
ঠোঁট দিয়ে সারসটা ঠোকরানোর
চেষ্টা করল। বড্ডো ধারাল ঠোঁট।
একবার লাগলে আর রক্ষা নেই।
তরোয়ালের মতো ঢুকে যাবে।
কিন্তু এস্তেফানের আর কাছে
যাওয়ার প্রয়োজনও নেই। ও দেখে
নিয়েছে কেন সারসটা উড়তে পারছে
না। কেন আকাশ থেকে ধপাস করে
পড়েছে। ওর ডান দিকের ডানাটা
খুলেই আছে। ভাঁজ হয়ে পিঠের
ওপর উঠছে না। ডানার পালক বেয়ে
একটা পাতলা রক্তের ধারা নেমে
আসছে আস্তে আস্তে।
গুলি
খেয়েছে। এস্তেফান ঠিকই বুঝেছিল।
আনাড়ি শিকারী। নইলে এ দেশে
সাদা সারসকে কেউ গুলি করে না।
এদেশের লোকে বিশ্বাস করে সাদা
সারস সৌভাগ্যের প্রতীক। ওরা
ঠোঁটে করে ছোটো ছোটো থলেতে
মানুষ-ছানা
নিয়ে আসে মায়েদের কাছে।
গ্রামের
ছেলে এস্তেফান। নানা জন্তু
জানোয়ারের মধ্যেই ওর জীবন।
আহত প্রাণীকে কী করে সেবা করতে
হয়,
ওর
জানা আছে। তাই আস্তে আস্তে
গা থেকে কোট খুলে,
পেছন
থেকে গিয়ে কোট-টা
ফেলে দিল সারসটার মাথায়। গোটা
মাথাটাই,
আর
ঠোঁটের অর্ধেকটা ঢেকে গেল,
আর
বাকি কোট-টা
গিয়ে পড়ল পিঠে। হঠাৎ অন্ধকারে
হয়ে গিয়ে কিছু দেখতে না পেয়ে
সারসটা ছটফট বন্ধ করে নিশ্চল
হয়ে গেল। এস্তেফান আস্তে আস্তে
গিয়ে ওকে কোলে তুলে নিল। সাবধানে
বগলের নিচে চেপে ধরল ওর শরীর,
আর
অন্য হাত দিয়ে আলগা করে চেপে
ধরল ঠোঁট জোড়া। হাঁটা দিল
বাড়ির দিকে।
বাড়ি
গিয়ে এস্তেফান বড়ো ছেলে আইভানকে
ডেকে বলল,
একটা
বড়ো রুমাল নিয়ে এসে সারসটার
ঠোঁটটা ভালো করে বেঁধে দিতে
― যাতে ও আর মুখ খুলতে না পারে।
তারপরে ওমনি বগলদাবা করেই
সারসটাকে নিয়ে রওয়ানা দিল
পশু-ডাক্তারখানায়।
আইভানকে বলল,
“ওই
দেখ,
ওই
তিনটে গাছের ওপারেই আমার
মাছ-ধরার
বালতি আর ছিপটা রয়েছে। নিয়ে
আয়। দেখিস,
সাবধানে
যাস,
এই
শিকারীগুলো ওদিকেই কোথাও
রয়েছে।”
~তিন~
“গুলি
লেগেছে,”
বললেন
ডাক্তারবাবু। “অপারেশন করে
বের করতে হবে। এই হাড়টা ভেঙেছে
অবশ্যই। সেইজন্যই ডানাটা
ঝুলে আছে অমন করে। এখন ওর পেট
ভর্তি,
অনেক
মাছ খেয়েছে। এখন অপারেশন করা
যাবে না। কাল সকালে অপারেশন
করব। সকালে এসো।”
এস্তেফান
বলল,
“অপারেশন
করলে ও ঠিক হয়ে যাবে?”
ডাক্তারবাবু
বললেন,
“গুলি
বের করা সমস্যা হবে না। বাচ্চা
সারস। একবছরের মতো বয়স। গত
বছরই ওর জন্ম হয়েছে ― হয়ত এই
গ্রামেই কারওর বাড়ির ছাদে,
বা
জঙ্গলের গাছে। ওরা একই জায়গায়
ফিরে আসে কি না?
অল্প
বয়েস,
অপারেশনে
সমস্যা নেই। তারপরে ভাঙা হাড়টা
মুখে মুখে বসিয়ে প্লাস্টার
করব। তারপরে অবশ্য...”
পরদিন
সকালে এস্তেফান গিয়ে দেখল
গ্রামের পুলিশ টমাস-ও
হাজির। সঙ্গে চারটে লোক। ওরাই
শিকার করতে এসেছিল। হাঁস শিকার
করার নামে সারস পাখির ওপর গুলি
চালিয়েছে। ওদের দেশে সেটা
শাস্তিযোগ্য অপরাধ। সারসটা
বাঁচবে না মারা যাবে তার ওপর
নির্ভর করছে ওদের ভাগ্য।
ডাক্তারখানার এক কোণে বসে
ওরা নিচু গলায় ঝগড়া করছে,
আর
একজনকে বকছে ― কেন সে তড়িঘড়ি
গুলি চালাল,
ভালো
করে না দেখেই?
ডাক্তারবাবু
অপারেশন করে গুলি বের করলেন,
ভাঙা
হাড় মুখে মুখে লাগিয়ে প্লাস্টার
করে বললেন,
“পাখির
হাড় জোড়া লাগা খুব কঠিন। তবু,
আশা
করতে তো দোষ নেই...”
এস্তেফান
কোটের পকেটে হাত গুঁজে বাড়ি
ফিরল। টমাস ওই চারজন শিকারীকে
নিয়ে গেল থানায়।
পশু
হাসপাতালের খাঁচায় সারসটা
সেরে ওঠে,
হাসপাতালের
কর্মচারীরা ওকে মাছ এনে খাওয়ায়,
ও
কপকপ করে খেয়ে নেয়। এস্তেফান
রোজ গিয়ে ঘুরে আসে একবার করে।
মাঝে মাঝে একটা দুটো মাছ নিয়ে
যায়,
ও-ও
খাঁচার ভেতরে ছুঁড়ে দিলে কোনও
দিন সারসটা খায়,
কোনও
দিন খায় না।
একমাস
পরে ডাক্তারবাবু এক বুধবারে
পাখিটার ডানার ব্যান্ডেজ
খুললেন। খোলামাত্র ডানাটা
আবার ঝুলে পড়ল আগের মতো।
ভয়ে
ভয়ে এস্তেফান বলল,
“কী
হলো,
ডাক্তারবাবু?”
মাথা
নেড়ে ডাক্তারবাবু বললেন,
“ভাঙাটা
সারল না।”
এস্তেফান
জিজ্ঞেস করল,
“এবারে
কী হবে?”
ডাক্তারবাবু
দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন,
“এবারে
খুব বিপদ। ও আর উড়তে পারবে না
কোনও দিন। ফলে,
খাবার
জোগাড় করতে পারবে না। ওকে ছেড়ে
দিলে ও না-খেতে-পেয়ে
মরে যাবে। আর...
তারও
চেয়ে বড়ো কথা,
ও
শীতে দক্ষিণে যেতে পারবে না।
ফলে এখানে ওর বেঁচে থাকাই
দুষ্কর।”
এস্তেফান
একটু ভেবে বলল,
“ওকে
আমি বাড়ি নিয়ে যাই,
ডাক্তারবাবু?”
~চার~
কয়েক
মাস কেটে গেছে। এস্তেফানের
বাড়ির গ্যারেজে আস্তানা হয়েছে
সারসটার। ওরা ওকে নদী থেকে
ধরে ধরে মাছ এনে খাওয়ায়। গরমের
ছুটির শেষে এস্তেফান আর ওর
ছেলেদের স্কুল খুলে গেছে।
তাই ওরা দিনে একবার করে মাছ
ধরে। এস্তেফান যায় সকালে,
ওর
ছোটো ছেলে মার্কোর ছুটি হয়ে
যায় তাড়াতাড়ি,
তাই
ও যায় দুপুরে। আর দিনের শেষে,
যখন
ওদের সবার ছুটি হয়ে গেছে,
কিন্তু
বাবা তো স্কুল সাফ না করে বাড়ি
ফিরতে পারবে না,
তখন
বড়ো আর মেজো ছেলে আইভান আর
জোসিপ পালা করে যায় মাছ ধরতে।
এখন সারসটা জানে কখন ওরা মাছ
ধরতে যাবে। যেই শোনে বালতির
শব্দ,
যেখানেই
থাকুক,
লম্বা
লম্বা পা ফেলে বেরিয়ে আসে।
এস্তেফানের
বউ মারিয়া বলল,
“সারাদিন
বাড়িতে থাকে,
আমার
পেছনে পেছনে ঘোরে। ওর একটা
নাম দেওয়া উচিত।”
মার্কো
বলল,
“ওর
নাম দাও কুট্টু!”
সবাই
বলল,
বাচ্চা
পাখি ― ওর নাম কুট্টু-ই
হওয়া উচিত।
তাই
কুট্টু নাম-ই
রয়ে গেল পাখিটার।
কিছুদিনের
মধ্যেই বোঝা গেল পাখিটা ওর
নামটা চিনে নিয়েছে। যেই বাড়িতে
কেউ বলে,
“কুট্টু
কোথায় রে?”
বা
অন্য কোনওভাবে নাম ধরে ডাকে,
ওমনি
কোথা থেকে এসে হাজির হয়।
সব্বাইকে ভালোবাসে পাখিটা।
সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে এস্তেফান
আর মার্কোকে। ওরা এসে বসলেই
কুট্টু যেখানে থাকুক,
চলে
আসে। সোফায় উঠে কোলে মাথা দিয়ে
বসে। মাথায় হাত বুলিয়ে দিলে
খুব আরাম পায়।
মাস
কাটে,
বাড়িতে
বাড়িতে সারসের বাসায় বাচ্চারা
বড়ো হয়। এস্তেফান যখনই গ্রামের
ভেতর দিয়ে হাঁটে,
বাড়ির
ছাদে ছাদে বাসাগুলো দেখে।
প্রায় সব বাড়ির ছাদেই একটা
করে বাসা। কারওর বাড়িতে দুটো,
অনেক
সময় গায়ে গায়ে। আর সারসের বাসা
বিশাল বলে সেই বাসায় ফাঁকে
ফাঁকে চড়াই,
আর
কোথাও টিয়াপাখিও বাসা করেছে।
ভাবে,
কুট্টু-র
এরকম বাসা কোনও দিন হবে না।
তার চেয়েও বেশি চিন্তা হয় যখন
ভাবে আর কিছুদিন পরেই ঠাণ্ডা
পড়বে। বরফে ঢেকে যাবে চারিদিক
― তখন কী হবে?
দেখতে
দেখতে বাসা ছেড়ে সারসের দল
চলে যেতে শুরু করল। এস্তেফানের
বাগানে দাঁড়িয়ে কুট্টু আকাশে
তাকিয়ে দেখে সারি সারি সারসের
দল উড়ে চলেছে ― গলা ছেড়ে ডাকে,
ডানা
ঝাপটায় ― একটা ডানা খোলে,
অন্যটা
ঝুলে থাকে মাটির দিকে ― মাটি
ছেড়ে উঠতে পারে না।
একদিন,
গ্রামে
আর একটাও সারস রইল না। গাছের
পাতাগুলো সবুজ থেকে আস্তে
আস্তে হলুদ,
কমলা,
লালচে
হয়ে গেল। এস্তেফান গেল
ডাক্তারবাবুর কাছে। জানতে
চাইল,
শীত
এসে গেলে কুট্টুকে কী খাওয়াবে।
বলল,
“এখন
ও বাগানের ঘুরে ঘুরে ব্যাঙটা,
গিরগিটিটা
ধরে খায় ― তবে সে আর কটা?
আর
শীতে তো পাওয়াও যাবে না।”
এস্তেফান
জানে,
কিছু
মাছ পাওয়া যাবে। নদীর জল যতদিন
না জমে যাবে ততদিন চিন্তা নেই,
জমে
গেলেও জলের ওপরের বরফে ঠুকে
ঠুকে গর্ত করে ছিপ ফেলে মাছ
ধরা যাবে। কিন্তু শীতে মাছ
কমে যাবে। তখন?
ডাক্তারবাবু
খাবার তালিকা দিয়ে দিলেন।
এগুলো সারসের সাধারণ খাদ্য
নয়,
কিন্তু
কুট্টুকে এইসব খাবারেও অভ্যেস
করাতে হবে আস্তে আস্তে। এস্তেফান
বলল,
“ও
অভাগা। ওকে এসবই খেতে হবে।
নইলে উপোস করে থাকবে ― খিদে
পেলে বুঝবে...
কী
আর করা।”
শীতের
দেশে শীতকালে বাড়ি গরম করার
ব্যবস্থা আছে। এস্তেফানদের
গ্রামে সব বাড়িতেই রয়েছে
বয়লার। সেই আগুনের কাছে এস্তেফান
কুট্টু-র
বাসা তৈরি করল। এমনিতে কুট্টু
বাড়ির ভেতরে বেশি সময় কাটায়
না। কিন্তু এখন ও নিজে থেকেই
এসে দাঁড়িয়ে থাকে ওর বাসার
কাছে। গ্যারেজের দেওয়ালে,
যেদিকে
বাড়ি ― সেদিকে একটা তাক,
তার
ওপরে একটা কার্ডবোর্ডের বাক্স।
কাছেই বয়লারটা। বেশ ওম হয়।
কিন্তু কাউকে এসে কুট্টুকে
তুলে দিতে হয়,
দিনের
শেষে যে-ই
দেখে কুট্টু এসে দাঁড়িয়ে আছে
গ্যারেজে ওর বাসার সামনে,
সে-ই
কুট্টুকে দুহাত দিয়ে তুলে
দেয় ওর তাকে। ও তখন ওর বাক্সে
গুটিসুটি মেরে শুয়ে পড়ে।
ঠাণ্ডা
বাড়ে। বরফ পড়া শুরু হয়। মাটি
ঢেকে যায় বরফে। কয়েকবার বরফে
হাঁটার চেষ্টা করেছে কুট্টু।
পা ডুবে যায়। ভয় পেয়ে ফিরে আসে
গ্যারেজে। এস্তেফান ওকে কোলে
করে বাড়িতে নিয়ে যায়। ও গুটিসুটি
মেরে এস্তেফানের কোলে উঠে
বসে। ভয়ে ভয়ে তাকিয়ে থাকে
বাইরের দিকে। এই সাদা জগতটা
ওর অচেনা।
কিন্তু
এই দিনও বেশিদিন থাকে না।
ক্রমে বরফ কমে,
গলে
যায়,
মাটি
ফুঁড়ে বেরিয়ে আসে সবুজ কচি
ঘাস,
গাছে
গাছে নতুন পাতা হয়। আবার
স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসে
কুট্টু। ফিরে আসে সারসরা।
আবার তাদের পুরোনো বাসাগুলোই
ঝেড়েঝুড়ে নতুন করে কাঠ-কাঠি
দিয়ে সারিয়ে সুরিয়ে নিয়ে নতুন
করে বাসা বাঁধে। আবার তারা
ডিম পাড়ে,
বাচ্চা
হয়...
আবার
শীতের গন্ধ পেলে তারা উড়তে
শুরু করে দক্ষিণ দিকে ― একে
একে চলে যায় সবাই,
একটা
গ্যারেজের ঘরে পড়ে থাকে কেবল
একজন কুট্টু।
~পাঁচ~
বছর
তিনেক পরে একদিন এক বসন্তের
দিনে হঠাৎ জোসিপ এস্তেফানকে
ডেকে বলল,
“বাবা
দেখে যাও,
কুট্টু
কী করছে যেন?”
এস্তেফান
তাড়াতাড়ি বেরিয়ে দেখে বাগানে
ঘুরে ঘুরে কুট্টু রাজ্যের
কাঠ আর কাঠি জোগাড় করেছে। আর
এখনও কোথা থেকে যেন মুখে করে
নিয়ে আসছে আরও।
এস্তেফান
বলল,
“বাসা
করতে চাইছে,
বেচারা।”
ডাকাডাকি শুনে বেরিয়ে এসেছে
মারিয়া। বলল,
“ওকে
ছাদে তুলতে পারবে না?
ওখানেই
সারসরা বাসা করে তো।”
এস্তেফানের
বাড়ি উঁচু নয়,
গ্রামের
বাইরের দিকে বলে ওর বাড়ির
আসেপাশে গাছপালাও অনেক। ওর
বাড়িতে আজ অবধি কোনও সারস বাসা
করেনি। মারিয়ার কথা শুনে
এস্তেফান ওপরে তাকাল। গ্রামের
অনেক বাড়ির মতোই ওর বাড়িও
একতলা। ঢালু টালির চাল,
যাতে
ছাদের ওপর বরফ না জমতে পায় ―
বেশি বরফ জমলে তার ওজনে ছাদ
ভেঙে পড়তে পারে। ছাদের এক দিকে
বড়ো চিমনি। সেই চিমনি দিয়েই
শীতে ওদের বসার ঘরের ফায়ারপ্লেস
আর গ্যারেজের বয়লারের ধোঁয়া
বেরোয়। অন্য দিকে একটা ছোটো
চিমনি রান্নাঘরের জন্য।
এস্তেফান
বলল,
“ওই
বড়ো চিমনির গা ঘেঁষেই বাসা
করতে হবে।”
সেদিন
থেকে এস্তেফান,
আইভান,
জোসিপ
আর মার্কোর এক নতুন কাজ শুরু
হলো ― কুট্টু-র
জন্য বাসা বানানো। ছাদের গায়ে
মই লাগিয়ে এস্তেফান ওঠে ছাদে,
আর
ছেলেরা ওর হাতে তুলে দেয়
কুট্টু-র
জড়ো করা সব কাঠকুটো। এস্তেফান
সেগুলো একসঙ্গে করে বাসা
বানায়।
দু’তিন
দিন পরে যখন মনে হলো যথেষ্ট
হয়েছে,
তখন
কুট্টুকে কোলে নিয়ে মই বেয়ে
ছাদে উঠল এস্তেফান। কুট্টু
মন দিয়ে পরীক্ষা করল মানুষের
বানানো সারসের বাসা। পছন্দই
হলো বলে মনে হলো। কটা কাঠ আর
কাঠি এধার ওধার করল ― তারপরে
ওতেই বসে পড়ল,
যেন
ওটাই কতদিন ওর বাড়ি ছিল।
রোজ
সকাল থেকে সন্ধে কুট্টু সময়
কাটায় ওর ওই ছাদের বাড়িতেই।
মাঝে মাঝেই যখন আকাশ দিয়ে উড়ে
যায় গ্রীষ্মে আসা সারসের দল,
কুট্টু
ওর লম্বা গলাটা বাঁকিয়ে মাথাটা
নিয়ে যায় পিঠের ওপর। ওই অবস্থায়
দুটো ঠোঁট দিয়ে খটখট খটখট করে
শব্দ করতে করতে মাথা তুলে আবার
নিয়ে আসে আগের জায়গায়। এভাবেই
ওরা ওদের সাথীদের ডাকে ― দেখো,
এসো,
আমার
বাসায় এসো,
এখানে
ডিম পেড়ে বাচ্চা বড়ো করবে এসো।
বাগানে
দাঁড়িয়ে কুট্টু-র
মানুষ আত্মীয়রা দেখে,
আর
ভাবে ― ডানা-ভাঙা
কুট্টুকে কোনও পুরুষ সারস কি
তার জীবনসঙ্গিনী করতে চাইবে?
চায়
না।
দিনের
পর দিন কুট্টু ছাদে অপেক্ষা
করে,
একে
একে গ্রীষ্মের দিনগুলো শেষ
হয়ে যায়,
সব
সারস ফিরে যায় তাদের শীত কাটানোর
দেশে। এস্তেফান ওকে নামিয়ে
আনে ওর গ্যারেজের বাসায়।
কয়েক
দিন পরে স্কুল থেকে ফিরে দেখে
আইভান আর জোসিপ কী করছে,
আর
ওদের সাহায্য করছে ছোট্টো
মার্কো। এস্তেফান জিজ্ঞেস
করল,
“কী
করছিস তোরা?”
মার্কো
বলল,
“বাবা,
আমরা
কুট্টু-র
জন্য একটা সিঁড়ি বানাচ্ছি।
ওই দেখো,
কী
রকম আস্তে আস্তে সিঁড়িটা উঠবে
বাড়ির পাশ দিয়ে,
যাতে
কুট্টু নিজে নিজেই ছাদে চড়তে
পারে...”
এস্তেফান
দেখে বলল,
“খুব
ভালো আইডিয়া। তবে সিঁড়ি দিয়ে
পারবে না। ওর জন্য একটা সড়সড়ি
করতে হবে। কিন্তু ডানা নেই
তো,
তাই
ব্যালেন্স করে উঠতে নামতে
পারবে না,
পড়ে
যাবে। আমি ছবি এঁকে দিচ্ছি ―
তোরা সেটা দেখে দেখে একটা
সড়সড়ি বানা দেখি...”
তা-ই
হলো। এখন বাড়ির পাশের সড়সড়ি
দিয়ে সহজেই কুট্টু ওঠানামা
করে ― ওদের আর ছাদ অবধি কোলে
করে মই বেয়ে তুলতে হয় না।
~ছয়~
আরও
বছর চারেক কেটে গেছে,
এর
মধ্যে আইভান চলে গেছে দূরের
শহরে,
কলেজে
পড়তে। জোসিপেরও স্কুল প্রায়
শেষ,
কেবল
মার্কোর এখনও কয়েক বছর বাকি।
সেদিন সকালে স্কুলে যাবে বলে
তৈরি হচ্ছিল এস্তেফান। ওকে
ছাত্র আর টিচারদের আগে যেতে
হয়,
সবার
পরে ফেরে স্কুল থেকে। হঠাৎ
বাইরে থেকে মার্কোর ডাকে
বেরিয়ে এল।
উত্তেজিত
মার্কো বাগানে দাঁড়িয়ে আকাশের
দিকে দেখাচ্ছে। অবাক হয়ে ওরা
দেখল একটা সারস কুট্টু-র
মাথার ওপরে উড়ছে। কুট্টু ঘাড়
তুলে ঠোঁটের খটখট শব্দ করছে
― সেটা দেখছে সারসটা,
আর
গোল গোল চক্কর কাটতে কাটতে
নিচে নামছে। দেখতে দেখতে অন্য
পাখিটা নেমে এল কুট্টু-র
পাশে,
দুজনে
একসঙ্গে মাথা উঁচিয়ে ঠোঁটে-ঠোঁটে
খটখট শব্দ করল। ততক্ষণে মার্কো
ছুটে গিয়ে আইভানকে ফোন করছে
― দাদা,
দাদা,
জানিস
কী হয়েছে?
সন্ধের
ট্রেনে আইভান ফিরে এল শহর
থেকে।
সারা
গ্রীষ্ম ওরা ছাদেই রইল একসঙ্গে।
আর বাইরের ওই সারসটা,
সে-ও
বুঝে গেল যে কুট্টু-র
দেখাশোনা করে ওই মানুষগুলো।
প্রথমে ওকে ভয় দেখাবে না বলে
ও যখন খেতে যেত,
তখনই
এস্তেফান মাছের বালতি নিয়ে
উঠত কুট্টুকে খাওয়াবে বলে,
পরের
দিকে ও সরে যেত ছাদের অন্য
দিকে,
ওদের
ভয় পেত না।
মার্কো
বলল,
“ওর
নাম কটকটি। ও ঠোঁট দিয়ে কট-কট
শব্দ করে ― খট খট শব্দ করতে
পারে না।”
ওর
নাম হলো কটকটি।
গ্রীষ্মের
শেষে কুট্টু আর কটকটির বাসা
থেকে দুটো সারস ছানা উড়ে গেল
দক্ষিণের দেশে।
তার
কিছুদিন পরে কটকটিও উড়ে গেল
― প্রকৃতির নিয়মে। কুট্টু
নেমে এল ছাদ থেকে। ঢুকল ওর
গ্যারেজের বাসায়।
~সাত~
সাদা
সারস পাখিরা সারা জীবনের জন্য
সঙ্গি-সঙ্গিনী
বেছে নেয়। তাই প্রতি বছর,
আগের
বাসায় ফিরে আসে সেই আগের দু’জন
সারস-ই।
তারপরে আবার কাঠ নিয়ে আসে,
ওদের
বিশাল বাসাগুলো সহজে ভেঙে
পড়ে না,
তাই
ওই পুরোনো বাসা-ই
আবার মেরামত করে তাতেই ডিম
পাড়ে। বছর বছর আস্তে আস্তে
আরও বড়ো হয়ে ওঠে বাসাগুলো।
পরের
বছর সারসরা ফিরতে শুরু করতেই
গ্রামসুদ্ধ লোক ভেঙে পড়ল
এস্তেফানের বাড়িতে। সারা
গ্রামে কয়েকশো সারসের বাসা,
গ্রামের
আসেপাশে জঙ্গলে দেখলে হয়ত
কয়েক হাজার সারস বাসা বানায়
― কিন্তু কুট্টু যে ওদের গ্রামের
মেয়ে। তাই ওর ব্যাপারে সবার
আগ্রহ।
দেখতে
দেখতে একদিন এস্তেফানের বাড়ির
ওপরে দেখা দিল কটকটি ― দু’তিন
বার পাক দিয়ে নেমে এল কুট্টু-র
পাশে। এবারে যখন এস্তেফান
দুপুরবেলা কুট্টু-র
জন্য মাছ নিয়ে এল,
কটকটি
গেল না। ঠোঁট-টা
বাড়িয়ে দিল,
ভাবখানা
যেন,
আমাকেও
একটা দেবে?
এস্তেফান
বলল,
“দূর
হ,
আবার
তোর জন্যও মাছ আনতে হবে?
আমার
বয়েস হয়েছে না,
অত
ওজন বইতে পারি?”
মার্কো
বলল,
“আমি
ওর জন্য মাছ নিয়ে আসব...”
সেদিন
থেকে মার্কো যখন মাছ ধরতে যেত,
দুজনের
জন্যই মাছ নিয়ে আসত।
কুট্টু-র
চিকিৎসা করেছিলেন যে ডাক্তারবাবু,
তিনি
কয়েকদিন পরে এলেন। সঙ্গে একদল
বিজ্ঞানী। বললেন,
“ওরা
কটকটির পায়ে একটা আঙটি পরিয়ে
দেবে। ওই আঙটিতে রেডিও আছে
ছোট্টো এতটুকু। রেডিও থেকে
বোঝা যাবে কটকটি কতদূরে যায়
শীতকালে।”
অন্য
পাখিদের পায়ে আঙটি পরাতে গেলে
ওদের জাল ফেলে ধরতে হয়। কটকটিকে
সে সব করতে হলো না। মার্কো মই
বেয়ে ছাদে উঠে বিজ্ঞানীরা
যেভাবে দেখিয়ে দিয়েছিল,
সেভাবে
আঙটি পরিয়ে দিল। সে বছর চার-চারটি
বাচ্চা হলো কটকটি আর কুট্টু-র।
পরের বছর বিজ্ঞানীরা এসে ওদের
বলল,
কটকটি
আট হাজার মাইল পাড়ি দিয়েছিল
দক্ষিণ আফ্রিকায় শীত কাটাবে
বলে। ওখানে তখন গ্রীষ্মকাল।
স্কুলের ভূগোল শিক্ষিকা ম্যাপ
খুলে ক্লাসে দেখালেন ― কত দূরে
দক্ষিণ আফ্রিকা।
দেখতে
দেখতে কুট্টু আর কটকটি বিখ্যাত
হয়ে গেল। আজকাল শরতকাল এলে
এস্তেবানের বাগানে সারাক্ষণ
ক্যামেরা চলে। সারা গ্রামের
এত সারস ― তারা এল কী গেল,
তাতে
কারওর নজর নেই। কিন্তু কটকটি
যেই এস্তেবানের বাড়ির ওপরে
আকাশে গোল গোল ঘুরতে শুরু করে,
ওমনি
গ্রামসুদ্ধ শুধু নয়,
সারা
দেশে আনন্দের বন্যা বয়ে যায়।
কারণ
কটকটি আসে আট হাজার মাইল উড়ে।
পথে বিপদের অন্ত নেই। শিকারী
প্রাণী,
এবং
তারও চেয়ে বড়ো বিপদ – শিকারী
মানুষ। সেই সব বিপদ অগ্রাহ্য
করে রাতের পর রাত অচেনা অজানা
শহরে গ্রামে,
পাহাড়ে
মরুভূমিতে কাটিয়ে ওকে আসতে
হয়। সমুদ্রও পেরোতে হয় একটা।
~আট~
কুট্টুকে
খুঁজে পাবার পরে সাতাশ বছর
কেটে গেছে। পাহাড়ের ওই গ্রামের
ওই বাড়িতে আজ এস্তেফান একাই
থাকে। মারিয়াও নেই। ছেলেরাও
শহরে চলে গেছে। ওরা ফিরে আসে
প্রতি গ্রীষ্মে কয়েকদিনের
জন্য ― কটকটির সঙ্গে দেখা
করতে। তা নাহলে এস্তেফান আর
কুট্টু ― ওরা এখন একা। এস্তেফান
বলে ― কটকটি ওর ছোটো ছেলে।
এস্তেফান
আজ জানে,
কটকটির
চলার পথে কত বিপদ। তাই ভয় পায়।
আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবে,
বুড়ো
কটকটি কি এবারে আসবে?
এখনও
অবধি কটকটির আসা বন্ধ হয়নি।
কুট্টুও প্রতি বছর ওর বাসায়
অপেক্ষা করে কটকটির জন্য।
প্রতি বছর আসে কটকটি।
তবু
প্রতি বছর এস্তেফান আকাশের
দিকে তাকিয়ে থাকে। যদি এবছর
ওর ছোটো ছেলেটা ফিরে আসতে
না পারে?
_________________________
ক্রোয়েশিয়ার বিখ্যাত সাদা সারস ক্লেপেতান ও মালেনা-র জীবনী অবলম্বনে।

No comments:
Post a Comment