Saturday, February 27, 2021

ওয়ান্‌স ইন ইওর লাইফটাইম

 

জীবনে প্রথম একা একা বিদেশে পাড়ি দেবার আগে অনু কতটা নার্ভাস ছিল বুঝেছিল কলকাতা-দিল্লি ফ্লাইটে উঠেই। মামার জন্য যে সাতটা বই নিয়ে যাবার কথা, তার দুটো রেখেছিল ক্যাবিন ব্যাগেজে – প্লেনে পড়ার জন্য। এখন দুটোই ওর পড়ার টেবিলের শোভাবর্ধন করছে। বেরোবার আগে ব্যাগে ঢোকাতে ভুলে গেছে। ছোটোমামাকে সামলাতে হবে টরোন্টো পৌঁছে, কিন্তু তার আগে সারা রাস্তা করবে কী? ইন-ফ্লাইট এন্টারটেনমেন্টের সিনেমা ছাড়া গতি নেই। অনু সিনেমার পোকা না, বই পড়তে পছন্দ করে – কিন্তু উপায়ান্তর নেই... দিল্লি এয়ারপোর্টের বইয়ের দোকান বন্ধ, এখন ফ্র্যাঙ্কফুর্ট অবধি আট ঘণ্টা আর ফ্র্যাঙ্কফুর্ট থেকে টরোন্টো প্রায় সাড়ে নয়-দশ ঘণ্টা ওর কিচ্ছু করার নেই।

একজন কাউকে যদি পেত, যার সঙ্গে গল্প করা যেতে পারে... তবে এয়ারপোর্টে সবাই খুব গম্ভীর থাকে। অচেনা লোকের সঙ্গে যেচে কথা বলে না কেউ। বসে বসে, বা লাইনে অপেক্ষা করতে করতে সবাই নিজের মনের জগতে হারিয়ে থাকে – বিশেষত যারা একা যাচ্ছে, তারা। অনু তাদের লক্ষ করে। সাধারণত একটা বইয়ের আড়ালে লুকিয়ে, কিন্তু আজ ফোনের দিকে তাকিয়ে।

মহিলাকে প্রথম দেখতে পেয়েছিল সিকিউরিটির লাইনে। দৃষ্টি আকর্ষণ করার মতোই ব্যক্তিত্ব। প্রথমত, এয়ারপোর্টের মতো জায়গায় বেশ জোরে কথা বলেন। তার ওপর ইংরেজিতে অ্যামেরিকান টান। দেশে বসে বিদেশী অ্যাকসেন্ট নকল করা নয়। বিদেশে বসবাস করার ফলে সহজাত অ্যামেরিকান ইংরেজি। কিন্তু সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে হাবভাব। একেবারে আকাট-আনাড়ি। বার বার পাসপোর্ট, টিকিট, বোর্ডিং পাস হারিয়ে ফেলছিলেন, ব্যাগ পড়ে যাচ্ছিল, খোলা ব্যাগ থেকে জিনিস পড়ে যাচ্ছিল, আর তার মধ্যেই ডাইনে-বাঁয়ে, আগে পিছে সবার সঙ্গে ঘাড় ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বকবক করছিলেন – সব মিলিয়ে প্রায় মিনিট পনেরো-কুড়ি পেছনের লোকেদের দেরি করিয়েছিলেন। বেশ কয়েকবার পেছন থেকে উচ্চৈঃস্বরের তাগাদা শুনতে হয়েছে। অনুর মনে হচ্ছিল, এ যদি যাত্রাসঙ্গী হয়, তাহলে অন্তত কথার অভাব হবে না!

ফলে, প্লেনে উঠে, নিজেরই সারিতে, দু সিট দূরে সেই মহিলাকেই দেখে অনু বেশ খুশিই হলো। কোভিড যুগের যাত্রা – ফলে প্লেনে দুটো করে সিট বাদ দিয়ে দিয়ে যাত্রীদের বসানো হয়েছে, একটা সারি বাদে আর একটা সারিতে বসতে দেওয়া হয়েছে, বার বার করে বলে দেওয়া হয়েছে, যাত্রীরা যেন নিজেদের নামাঙ্কিত আসনেই বসেন – অন্য সিটে না বসেন। বসতে না বসতেই মহিলা কথা শুরু করলেন। নাম মৃদুলা। ভদ্রতাজ্ঞান পশ্চিমীদের মতো। অনুর নাম জিজ্ঞেস করার আগে নিজের নাম বললেন। বললেন, অনু তো ডাকনাম নিশ্চয়ই? বা অপভ্রংশ? অনুভা, অনুশ্রী... অনু কিছু বলল না। ওর ভালো নাম তমা। সেটা ও পছন্দ করে না বলে ব্যবহার করে না - কেবল খাতায় কলমে থাকে। কথা ঘোরানোর জন্য মন্তব্য করল, “মৃদুলা তো বাঙালিদের মধ্যে খুব প্রচলিত নাম না!” এবং জানতে পারল মৃদুলার মা বাঙালি ছিলেন না। অনু টরোন্টো যাচ্ছে শুনে বললেন, উনিও টরোন্টোতেই থাকেন। পঁয়ত্রিশ বছর হয়ে গেল। তার আগে, বিয়ের পর থেকেই দিল্লিতে ছিলেন, ফলে কার্যত সম্পূর্ণ প্রবাসী। কলকাতার সঙ্গে পাট চুকেছে মা বাবার মৃত্যুর পর – সে-ও তো বাইশ বছরের ওপর।

অনু যাচ্ছে ছোটোমামার কাছে। ছোটোমামাও বহু বছরের প্রবাসী। অনুর জন্মের আগে থেকেই। বার বার ডাকেন, আয়, ঘুরে যা। এবারে বললেন, গ্র্যাজুয়েশন করে বসে আছিস – পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ক্লাস কবে শুরু হবে তার নেই ঠিক। এখানে এখন করোনা বেশি নেই – সেকেন্ড ওয়েভ শেষ হয়ে গেছে। আমরাও খুব সাবধানে আছি।

আর একটা আকর্ষণও আছে। মামার একটা ছুটি কাটানোর বাড়ি আছে। এই লেক হাউসটার গল্প খুব শুনেছে অনু। লেকের পাড়ে একেবারে জঙ্গলের মধ্যে একটা বাড়ি, তার অর্ধেক ডাঙায়, অর্ধেক জলে। একদিকে ভোরে আর সন্ধেবেলা দলে দলে হরিণ আসে মামার বাগানে গাছপালা খেতে, আর অন্যদিকে ঝাঁক বেঁধে মাছ লেকের ধারে জলে ঘুরে বেড়ায়মামা ঠিক করেছে বাড়িটা বিক্রি করে দেবে। এখন না আসলে আর দেখতে পাবে না। এই শেষ সুযোগ জেনে বাবা বলল, চলে যা। সত্যিই ওয়ানস ইন আ লাইফটাইম অভিজ্ঞতা হবে। বিশেষ করে এই ফল্‌-এর সিজনে গাছপালা একেবারে দেখবার মতো...

মৃদুলার মুখে একটা কিসের ছায়া পড়ল? অনু ভালো করে বুঝতে পারছে না। এর মধ্যে রাতের খাবারের পাট চুকে গেছে। মৃদুলা কিছু খাননি – এই বয়সে এই সময়ে ডিনার খেলে আর হজম হয় না – তাই একটা সফট ড্রিঙ্কের ক্যান চেয়ে নিয়েছিলেন মাত্র – অনুর খাওয়া শেষ হবার পরে ওকে সেটাও দিয়ে দিলেন। অনু খেয়েছিল, তাই ক্যানটা সিট পকেটে ঢুকিয়ে গল্প করছিল।

কোথায় মামা-র লেক হাউস? জানো?

মৃদুলার প্রশ্নের উত্তরে অনু বলল, যতদূর শুনেছে, বাড়ি থেকে ঘণ্টা দু-তিন দূরে, মাস্কোকা লেকের পাড়ে। মৃদুলা চেনেন লেকটা। বললেন, দূরে না। লোকে অনেক দূরে দূরে যায় এরকম বাড়িতে থাকতে। মালিকরা ভাড়া দেন। ওঁরাও ভাড়া নিয়ে প্রায়ই যেতেন। তবে আজকাল আর যান না।

কেন যান না? জিজ্ঞেস করতে গিয়ে অনু থমকে গেল। থাক, কোনও ব্যক্তিগত ব্যাপার থাকতে পারে। বলার হলে নিজেই বলবেন।

কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে মৃদুলা বললেন, “বছর পনেরো আগে একটা ঘটনা ঘটেছিল... তার পর থেকে...”

এবারে অনু জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছিল?”

মৃদুলা সময় দেখে বললেন, “অনেকটা কাহিনি। ঘুম পাচ্ছে না?”

পাচ্ছে না। সঙ্গে সময় কাটানোর আর রসদও নেই অনুর। তাই উৎসাহভরে বলল, “না না, আমি ঘুমোব না। বলুন, বলুন।”

মৃদুলা বললেন, “ক্যানাডার জঙ্গুলে কটেজের ব্যাপারে তুমি কি জানো? শহর থেকে অনেক দূরে দূরে অজস্র কটেজ-ক্যাবিন আছে। ইউরোপে, অ্যামেরিকাতেও আছে। মালিকরা সেগুলো হয় নিজেদের ছুটি কাটানোর জন্য ব্যবহার করে, বা ভাড়া দেয়।”

অনু জানেশুনেছে মামাও ভাড়া দেয়। দেশ থেকে কেউ গেলে ক’দিন সবাই মিলে ঘুরতে যায়। দারুণ অভিজ্ঞতা। জঙ্গল, লেক, হরিণ, মাছ – সব মিলিয়ে এক অনন্য অনুভূতি।

মৃদুলা বললেন, “ঠিক বলেছ। আমরা কটেজ কিনিনি। আমার হাজবেন্ড বলত, একটা কটেজ কেনা মানে নিজেকে বেঁধে ফেলা। ওখানেই ছুটি কাটাতে যেতে হবে। না কিনলে যেখানে খুশি যেতে পারব। সত্যিই প্রতি বছর বিভিন্ন জায়গায় যেতাম। কখনও নিউফাউন্ডল্যান্ড, কখনও ওন্টারিওতেই, কখনও অ্যালবার্টা। আমার প্রিয় ছিল অ্যালবার্টার দু-তিনটে জায়গা। ওখানে বার বার গেছি। প্রতি ফল্‌-এ ছুটি নিয়ে ফল-কালার্স দেখতে যেত প্রায় সারা জীবন। খুব ভালোবাসত ফল কালার্স। অভিদীপ্ত বলত – গাছেদের হোলিখেলা।”


বছর পনেরো আগেকার কথা। একটা নতুন কটেজের খোঁজ পেয়েছিল অভিদীপ্ত। বেশ লম্বা-ই ছুটি ছিল। বোধহয় পাঁচ দিন। আমরা চারজন। আমি, অভিদীপ্ত, অভীষ্ট আর অভীশা। ও, ভালো কথা, অভিদীপ্ত আমার হাজবেন্ডের নাম। অভীষ্ট আর অভীশা – ছেলে আর মেয়ে। তখন ওরা ১৩ আর ৮ বছরের।”

অন্ধকারের মধ্যে প্রায়ান্ধকার একটা প্লেন উড়ে চলেছে, ডানার ঝলসানো আলোগুলো প্লেনের ভেতরটাকে আলোকিত করে তুলছে ঝলকে ঝলকে।

কোথায় যাচ্ছি তখনও জানি না। সব ব্যবস্থা অভিদীপ্ত-ই করত... সারপ্রাইজ দিতে ভালোবাসত। সারা বছর ধরে প্ল্যান করত। আমরা প্রথম জানতে পারতাম যখন প্লেন ধরতে যাচ্ছি – অ্যালবার্টার প্লেন... স্যাস্কাচ্বেন-এর প্লেন..., বা হয়ত দেখতাম গাড়ি বাড়ি থেকে বেরিয়ে এয়ারপোর্টের দিকে যাচ্ছে না – তখন বুঝতাম এবারে কাছাকাছি কোথাও...

সেবারে অ্যালবার্টা। সাড়ে চারঘণ্টার ফ্লাইট ক্যালগারি। একসঙ্গে সিট পাইনি, ফলে কথা বলার লোক ছিল না। বই পড়তে ভালো লাগছিল না। অনেকক্ষণ কেটে যাবার পরে শেষে হাল ছেড়ে প্রায় বোর হয়েই কানে ইয়ারফোন লাগিয়ে টিভি চালিয়ে চ্যানেলগুলো ঘোরাচ্ছিলাম। হঠাৎ, একটা সিনেমা শুরু হলো – তার নামটা বেশ লাগল – ওয়ান্‌স ইন ইওর লাইফটাইম। দেখতে শুরু করলাম...”

মৃদুলা একটু চুপ করে থেকে বললেন, “কী কুক্ষণেই যে...” কিছুক্ষণ জানলা দিয়ে বাইরের নিকষ কালো আঁধারের দিকে তাকিয়ে থেকে আবার ফিরলেন।

অদ্ভুত, সিনেমাটা অনেকটা আমাদের মতো একটা পরিস্থিতি নিয়ে। চারজন মিলে কোথাও একটা কটেজে যাচ্ছে ছুটি কাটাতে। তবে মাইক আর রন্ডা বিবাহিত নয় – বাগদত্তা, প্রি-ম্যারাইটাল হানিমুনে যাচ্ছে। রন্ডার আপন ভাই জেফ, আর কাজিন লিন্ডা ওরফে লিনি সঙ্গে যাচ্ছে। কাজিনটির বছর আঠেরো বয়স, আর ভাইটিও টিন-এজার, সবার চেয়ে ছোটো।

কোথায় যাচ্ছে বলা কঠিন – তবে ক্যানাডার মতোই বরফ, লেক, পাহাড় আর জঙ্গলের দেশ। মাইক আর রন্ডা – আশানুরূপভাবে খুব উত্তেজিত, যদিও মাঝে মাঝে ইয়ার্কি মেরেই জেফ আর লিনি-কে বলছে, তোরা আমাদের মধ্যে কাবাব-মে-হাড্ডি হয়ে যাচ্ছিস, ওখানে গিয়ে জ্বালাবি না মোটেই... বলে দিলাম... এই সব।”

অনুর হঠাৎ মনে হলো মৃদুলা একেবারে ছোটোমামার মতো সিনেমার গল্প বলেন। প্রথমে দেখাচ্ছে, এই... তারপরে দেখাল, ওই... ছোটোবেলায় একবার ভাইফোঁটার দিন কাচ্চাবাচ্চাদের নিয়ে বসে ‘গানস অফ নাভারোন’-এর গল্প বলেছিল। সবে নেটফ্লিক্স না কোথায় দেখেছিল। প্রথমে দেখাচ্ছে, একটা গ্রিক দ্বীপে একটা বিরাট বাড়ির ধ্বংসাবশেষ... আর মাঝে মাঝে সমুদ্র। আকাশ থেকে প্লেনে ক্যামেরা বসিয়ে। আর বলছে...

রাস্তায় একটা জায়গায় ওদের গাড়িটা আটকে গেল। ইঞ্জিনের হুড খুলে মাইক টর্চ চাওয়ায় আবিষ্কার হলো, কোনও কারণে জেফ গুছিয়ে রাখা বড়ো টর্চটা নিয়েছিল আগের দিন, আবার ভরতে ভুলে গেছে। ওদের কাছে কেবল তিনটে ছোটো টর্চ – তাতে সামান্যই আলো হয়। এর পরেও দুটো ছোটো শহরের ভেতর দিয়ে ওদের যেতে হলো, বড়ো টর্চ কোনোও দোকানেই পাওয়া গেল না। মাইকের বেশ অস্বস্তি হচ্ছিল – বার বার বলছিল, একটা বড়ো টর্চ থাকা উচিত ছিল...

জঙ্গলের পথে অনেকটা যেতে হলো। রোদ পড়ে গিয়েছে, আর আকাশে মেঘ বলে বেশ অন্ধকার হয়ে গিয়েছে। চারিদিক ম্যারম্যারে। এরকম একটা আবহে গাড়ি থেকে নেমেই রন্ডার প্রথম অনুভূতি হয়েছে অস্বস্তির আর ভয়ের। কার্ডিগানটা গায়ে জড়িয়ে নিয়ে বলেছে, আমার কেমন যেন লাগছে – এটা কোথায় এলাম। মাইক অবশ্য বেশ উৎসাহিত – বলেছে, আরে, কাল সকালে রোদ উঠলেই দেখবে সব ঝকঝক করছে, তখন আর এরকম লাগবে না।

বাকি সবাই বেশ দমেই আছে। বাড়ি থেকে বেরোন’র সময় যে উৎসাহ ছিল, আর বাকি নেই। মাইকের কাছে চাবি। ও তালা খুলে বাড়িতে ঢুকল। বাড়ির ভেতরটা আরও বেশি ম্যারম্যেরে। বাইরের দরজা খুলে একটা এন্ট্রানস হল জাতীয় ছোটো ঘর – আমরা এরকম ঘরকে প্যাসেজ বলি। প্যাসেজের পরে দুদিকে দুটো করিডোর – আর সোজা গেলে বসার ঘর। একদিকের করিডোর দিয়ে গেলে দুটো শোবার ঘর, আর অন্য দিকের করিডোর দিয়ে গেলে খাবার ঘর আর রান্নাঘর। ওরা ভেতরে ঢুকে ইতস্তত করছে। মাইক একমাত্র একটু হইচই করার চেষ্টা করছে। বার বার বলছে, চলো চলো সাজিয়ে গুছিয়ে বসি... সব আলো জ্বালি – হাতের কাছে সব সুইচ জ্বেলে দিল মাইক। বেশ উজ্জ্বল আলো, কিন্তু সারা বাড়িতে, সব দেওয়ালে সারি সারি অয়েল পেন্টিং – তার কোনওটারই রং খুব উজ্জ্বল না। সবই কালো, গাঢ় বেগুনি, গাঢ় নীল, কালচে লাল, বাদামী ধরণের রঙের। মাইক বলল, ওর যে বন্ধুর বাড়ি, তার বাবা আর্টিস্ট ছিলেন। ওনারই নাকি ছবি সব। তবে সারা বাড়িতে, করিডোরে উঁচু উঁচু চারপেয়ে ছোটো ছোটো টেবিলের ওপরে নানা স্কাল্পচার আর পটারি – কাপ, ডিশ, ফ্লাওয়ার ভেস – সেগুলো কোথা থেকে এসেছে, তা মাইক বলতে পারল না।”

বহুদিন মৃদুলা অ্যামেরিকা মহাদেশে আছে। ফ্লাওয়ার ভাস-কে ভেস বলে। অনু মাস্কের আড়ালে হাসল, মৃদুলা ধরতে পারলেন না।

অনুর মনে একটা প্রশ্ন এসেছিল। জিজ্ঞেস করল, “আচ্ছা, এই সব কটেজে কেউ থাকে না? দেখাশোনা করে কে? আমাদের দেশে বাগানবাড়ি মালিকরা কেয়ারটেকার, দারোয়ান, বাড়ির কাজের লোক রাখে। বাড়ি পরিষ্কার করে, পাহারা দেয় – কখনও একই লোক সব কাজ করে – রান্নাও করে দেয়।”

মৃদুলা হেসে বললেন, “ওখানে সব নিজে করতে হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মালিকই করে। ভাড়াটে বা গেস্ট আসার আগে-পরে বাড়ি সাফা করা, ছোটোখাট রিপেয়ার... সব। যারা পারে না, তারা প্রপার্টি ম্যানেজার রাখে। সাধারণত আসেপাশের গ্রামের মহিলারা এসে বাড়িঘরদোর পরিষ্কার করে দেয়, আর তাদের বাড়ির পুরুষরা – স্বামী বা অ্যাডাল্ট ছেলে – রিপেয়ার করে, বাগানের দেখাশোনা করে, ঘাস কাটে – এসব আর কী। তবে আমাদের দেশের কাজের লোকের মতো অল্প টাকার কাজ নয়, অনেক খরচ করতে হয় ম্যানেজারের পেছনে। বুঝলে?”

ঘাড় নাড়ল অনু। কাজের লোক আছে, কিন্তু বেশি টাকা দিয়ে কাজ পেতে হয় বলে তাদের কাজের লোক বলা যায় না।

ঘরদোর গোছাতে হলো। নোংরা নয়, কিন্তু সব আসবাবে ভারি ডাস্ট কভার দেওয়া। সাধারণত বাড়ি ভাড়া দিলে মালিক এসে এগুলো সব সরিয়ে দেয়, আবার ভাড়াটে চলে গেলে লাগিয়ে দেয়, কিন্তু বন্ধুবান্ধবকে বলতেই পারে – ডাস্ট কভার খুলে নিস – বা ভাড়া সস্তা হলে সেগুলো ভাড়াটেরই দায়িত্ব থাকে। ওরা ডাস্ট কভার সরিয়ে ভাঁজ করে জায়গামতো গুছিয়ে রেখে গাড়ি থেকে ওদের খাবার দাবার নিয়ে এসে রান্নাঘরে লার্ডারে, ফ্রিজে ভরে রাখল। তারপরে বাকি মালপত্র বেডরুমে নিয়ে যাওয়া – দুটো শোবার ঘরের একটা বেশ বড়ো, অন্যটা অত বড়ো না। রন্ডা বলল, ও আর মাইক বড়ো বেডরুমে শোবে, জেফ আর লিনি ছোটো ঘরটা নিক।

জেফ ফট করে আপত্তি করল। বলল, লিনি সারা রাত বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে গল্প করবে। আমি ওর সঙ্গে এক ঘরে থাকতে পারব না।

সবাই থতমত খেয়ে গেছে – তাহলে জেফ শোবে কোথায়? লিনি রাগ করেছে, বলেছে, ঠিক আছে, শুতে না চাইলে ও গিয়ে বসার ঘরে শুতে পারে – ওখানে যথেষ্ট জায়গা আছে – কাউচ, মাটিতে রাগ্‌...

জেফ সবাইকে অবাক করে বলেছে, কেন? আর একটা বেডরুম আছে – সেটাতে শুতে পারি – মাইক, তোমার কাছে চাবির গোছা আছে। দেখো – ওই ঘরের চাবিটা আছে নিশ্চয়ই।

এবারে মাইক আমতা আমতা করতে লেগেছে। জানা গেল, সত্যিই আর একটা শোবার ঘর আছে, কিন্তু সেটা বাড়ির মালিক দেয়নি। বলেছে, ওদের দুটো শোবার ঘর, বসার ঘর, খাবার ঘর আর রান্নাঘরের চাবি দেওয়া হবে, কিন্তু আর একটা শোবার ঘর ব্যবহারের অনুমতি নেই। মাইক যত বলে, জেফ তত জেদ করে। মেয়েরাও বলতে শুরু করেছে, আরে, ওরা তো এখানে নেই। চুপচাপ ঘরটা ব্যবহার করে আবার গুছিয়ে রেখে দিলে কিছু হবে না। মাইক বলল, সব চাবিই আছে, বলে একটা একটা করে ট্যাগ লাগান চাবি দেখাল – কেবল ও ঘরের চাবিটা নেই। তা-ও সবার চাপাচাপিতে সেই চাবিগুলোই এক এক করে দরজায় লাগিয়ে দেখা গেল – ওগুলোর একটা দিয়েও দরজাটা খোলে না।

সবাই নানা প্ল্যান করছে, বন্ধ দরজা কী করে খোলা যায়, মাইক তখন প্রায় বাধ্য হয়ে ওদের জানাল, যে মালিক বলেছে, ঘরটা ভালো না। ওটা খুললে সমস্যা আছে, তাই। দরজা খুললে বিপদও হতে পারে।”

মৃদুলা থেমে জল খেলেন। তারপরে বললেন, উনি কিন্তু বুঝতে পারছেন চাবি কোথায়। সিনেমায় ওই ঘরের দরজাটা এমন ভাবে দেখান হচ্ছে, যে প্রতি শটেই দরজার পাশের একটা উঁচু টেবিলে একটা গাঢ় নীল আর সোনালী রঙের ফুলদানি দেখা যাচ্ছে। বোঝা-ই যাচ্ছে, ওই ফুলদানির ভেতরে কিংবা নিচে রাখা রয়েছে ঘরে ঢোকার চাবিটা – মৃদুলা সিনেমা দেখছেন, আর ভাবছেন, ঘরে যদি বিপদ কিছু থাকেই, তাহলে চাবিটা কেন ওখানে রাখা, আর এ-ও চাইছেন যে ওরা যেন বুঝতে না পারে চাবিটা কোথায় আছে।

বিপদের কথা শুনে সবাই একমুহূর্তের জন্য থমকে গেলেও, পরমুহূর্তেই জেফ দ্বিগুণ উৎসাহে বলতে শুরু করল, তাহলে ও ঘরে কী আছে দেখতেই হবে। কিন্তু মেয়েরা আর সাহস পায় না। লিনি বলতে শুরু করল, তাহলে বরং জেফ দ্বিতীয় ঘরে ঘুমোবে, লিনি না-হয় বসার ঘরে শোবে। বলল, ওর অভ্যেস আছে রাতে কাউচে ঘুমোনো। অনেক দিনই বাড়িতে এ-ভাবে ঘুমোয়। কিন্তু রন্ডা অনেকটাই ভয় পেয়েছে। বলতে শুরু করেছে, না, কাউকে আলাদা শুতে হবে না। লিনি আর জেফ যদি একই ঘরে ঘুমোতে না চায়, তাহলে জেফ আর মাইক এক ঘরে শুক, আর লিনি আর রন্ডা অন্য ঘরটা নেবে। শুনে মাইক খুব বিরক্ত। হানিমুন বুঝি মাটি হয়। এই সব আলোচনার মধ্যে জেফ হঠাৎ হাত নাড়াতে গিয়ে না কী করতে গিয়ে ধাক্কা দিয়েছে দরজার পাশের টেবিলটাতে, নড়ে গিয়ে ফুলদানিটা প্রায় পড়ে যায় যায়... লিনি খপ করে ধরে তুলে নিয়েছে আর তখন দেখা গেছে, মৃদুলা যা ভেবেছে, তা-ই – ওর নিচেই রয়েছে একটা চাবি।

চট করে চাবিটা নিয়ে নিয়েছে জেফ। দরজা ও খুলবেই। মেয়েরা তখন প্রাণপণে বাধা দিচ্ছে, মাইক বলছে, দেখাই যাক না খুলে – ব্যবহার না করলেই হলো তো... এসবের মধ্যে জেফ চাবি ঘুরিয়ে দরজার হাতল চেপে সবে দরজাটা খুলতে যাবে, এমন সময়ে মৃদুলার যাত্রা শেষ হতে চলেছে বলে প্লেনের ইন-ফ্লাইট এন্টারটেনমেন্ট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে!

অনু এমন হতাশ হলো, যে প্রায় চেঁচিয়ে বলে উঠেছিল, “আরে, এটা একটা গল্প হলো! তারপরে কী হলো জানতে পারলেন না?”

মৃদুলা মাথা নাড়লেন। বললেন, “আমি তো তোমাকে সিনেমার গল্প বলতে বসিনি। টা তো বলতে পারো ভূমিকা।

মৃদুলারা দুপুর হবার ঠিক আগে ক্যালগারি পৌছলেন। অভিদীপ্ত গাড়ি বুক করে রেখেছিল, হুন্ডাই টাক্‌সন, অটোমেটিক ট্র্যানসমিশন, সব বুঝে নিয়ে রওয়ানা দিতে দিতে দুপুর পেরিয়ে গেল।

সিনেমাটা অর্ধেক দেখে থেকে মৃদুলা একটা অস্বস্তিতে ছিলেন – একটা সিনেমা অর্ধেক দেখলে একটা অস্বস্তি হয়ই, কিন্তু এটা তার চেয়েও বেশি। খালি মনে হচ্ছিল, কী মিস করলেন? সুযোগ পেলেই একবার ফোনে গুগ্‌ল্‌ খুলে সিনেমাটা সার্চ করছিলেন – পাচ্ছিলেন না। একবার তো অভীষ্ট বলেই ফেলল, “মা ফোনে সারাক্ষণ কী দেখছ? জিজ্ঞেস করছি, শুনতেই পাচ্ছ না!” আর একবার অভিদীপ্ত জানতে চাইল, “তোমার কী হয়েছে বলো তো, প্লেন থেকে নেমে পর্যন্ত একটা কথা বলছ না?” তখন বাধ্য হয়ে ফোনটা ব্যাগে রেখেছিলেন। তা-, খাওয়া শেষ করে গাড়িতে ওঠার আগে, রেস্টুরেন্ট সংলগ্ন কনভিনিয়েন্স স্টোরে গিয়ে একটা ব্যাটারি চালিত বড়ো টর্চও কিনে নিলেন। সবাই অবাক। দরকার নেই। যেখানে যাচ্ছেন সেখানে ইলেক্‌ট্রিক্‌ বাতি আছে, আর প্রতি বারের মতই অভিদীপ্ত যথেষ্ট টর্চ, সোলার ল্যাম্প ইত্যাদি নিয়েছিল। তবু মানলেন না মৃদুলা। একটা টর্চ, আর তার দু-সেট ব্যাটারি কিনে আবার গাড়িতে উঠলেন।

ঘণ্টা চারেকের রাস্তা। অ্যালবার্টার এই অঞ্চলে ওরা আগে আসেনি। যদিও অভিদীপ্ত খুব ভালো ড্রাইভার, তবু কিছুটা পাহাড়ি রাস্তা পেরিয়ে ওদের প্রায় সাড়ে চার ঘণ্টা লাগল। তখনও সূর্যাস্ত হয়নি। শীতের আগে অবধি ওখানে দিন অনেক বড়ো থাকে। হাইওয়ে ছেড়ে জঙ্গলের রাস্তা পার করে, ওরা এসে পৌঁছল ওদের গন্তব্যে। জঙ্গলের শেষে, একটা খোলা জায়গায় একটা কটেজ, চারপাশের ঘাসজমিতে বাগানের চিহ্ন নেই, বাড়ির ওপারে লেক। চারপাশের জমি পাহাড়ি।

গাড়ি থামার পরে চারিদিক নিস্তব্ধ। জঙ্গুলে শব্দ, নিঃশব্দ থমথমে, কিন্তু তাতে ভয়ের কিছু নেই – বরং উজ্জ্বল শান্ত ভাব। তবু পৌঁছন-মাত্র মৃদুলাকে আবার একটা অস্বস্তি গ্রাস করল। কোনও মিল নেই, আবার আছে। জঙ্গল, লেক আর বাড়ির দৃশ্য আলাদা, তবু তো জঙ্গল, লেক আর বাড়ি! তবু তো একটা গাড়ি থেকে চারটে মানুষ নামল – হোক না তাদের মধ্যের সম্পর্ক আলাদা! হোক না, ঝকঝকে হলদে-কমলা দেওয়াল, আর লালচে ছাদ, তবু তো সেই জলের পাশে কটেজ! তবে সবচেয়ে বেশি মৃদুলাকে যেটা ধাক্কা দিল, তা হলো বাড়ি দুটোর আদল প্রায় এক। জলের ধারে লম্বা কটেজ, এক সারিতে সবকটা ঘর, মাঝখানে ঢোকার রাস্তা। এখানে বাড়ির বাইরে দিয়ে টানা বারান্দা ধরে এক ঘর থেকে আর এক ঘরে যেতে হয়, সিনেমায় খোলা বারান্দা ছিল না, ছিল বাড়ির ভেতরে করিডোর।

হাউসকিপাররা ওদের জন্য অপেক্ষা করছিল – এ বাড়ির সার্ভিসে সেটা লেখাই ছিল – ইডিথ আর বব স্বামী-স্ত্রী, থাকেন কাছেই গ্রামে। ওখানকার একাধিক হলিডে কটেজে কিপারের কাজ করেন। ঘর-দোর তৈরি, ওদের মালপত্র গুছিয়ে দিয়ে, খাবার-দাবার সাজিয়ে দিয়ে ওরা বিদায় নিলেন। বলে গেলেন, কোনও অসুবিধে হলে যোগাযোগ করতে, গ্রামে যাবার রাস্তা ওইদিকে।

ওরা চলে যাবার পরে মৃদুলার অস্বস্তিভাবটা আবার ফিরে এল। জোর করে সেটাকে দমন করে গেলেন সূর্যাস্ত দেখতে। লেকের ওপারে জঙ্গুলে পাহাড়ের ওদিকে সূর্য ডুবে গেল দেখতে দেখতে। ছায়া ছায়া অন্ধকার নেমে এল চারিদিকে। কটেজটার দু দিকেই টানা বারান্দা – মৃদুলা আর অভিদীপ্ত লেকের দিকের বারান্দায় ইজি চেয়ারে বসে ছিলেন। অভিদীপ্ত জানতে চাইলেন, “কটেজটা তোমার চেনা লাগছে?”

মৃদুলা এত চমক জীবনে কমই পেয়েছেন। কোনও রকমে দুরন্ত হৃদস্পন্দন উপেক্ষা করে বললেন, “কেন বলো তো? তোমার চেনা?”

অভিদীপ্ত হেসে বললেন, “তোমার মনে পড়ছে না? আমরা যখন প্রথম ক্যানাডা এলাম – প্রথম ফল্‌ কালার্স দেখতে গেছিলাম যেখানে সেই কটেজটা একদম এরকম ছিল।”

মৃদুলা ভুরু কুঁচকে চেয়ে রইলেন। প্রথম ক্যানাডা আসা অনেক বছর আগে। তখন গুড্ডু আর কুট্টিকে আনতে পারেননি। স্কুল চলছিল বলে ওরা ঠাকুর্দা-ঠাকুমার কাছেই ছিল দিল্লিতে। ওরা এসেছিল কয়েক মাস পরে। তখন এরকম কটেজে এসেছিলেন ওরা? না আসার কারণ নেই। ফল্‌ কালার্স দেখা অভিদীপ্তর একটা অবসেশনের মতো। কিন্তু, না। মৃদুলার মনে নেই সেই ছুটির কথা।

অভিদীপ্ত একটু হতাশ হলো। মৃদুলার স্মৃতিশক্তি চাগাড় দেবার জন্য বলল, “মনে নেই? আমরা বলেছিলাম এটাই আমাদের আসল হানিমুন। বিয়ের পর দু-পক্ষের মা-বাবাকে সঙ্গে নিয়ে পুরী-ভ্রমণ মোটেই হানিমুন ছিল না!”

তারপরে যেটা বলল অভিদীপ্ত, সেটা শুনে মৃদুলার মেরুদণ্ড দিয়ে একটা ঠাণ্ডা স্রোত বয়ে গেল।

অভিদীপ্ত বলল, “আমার এসে থেকে মনে হচ্ছে – দিস কুড বি আওয়ার সেকেন্ড হানিমুন!”

যথানিয়মে সন্ধে কাটল। যতক্ষণ বাইরের আলো থাকে ততক্ষণ বাইরে থাকা, তারপরে ঘরে ঢুকে মা-বাবা ছেলে-মেয়ে আড্ডা, গল্প, হাসি, তামাশা – তবে অভীষ্ট এখন বড়ো হচ্ছে, ওর বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গেও যোগাযোগ রাখার চেষ্টা বজায় রাখছে, তাই ও অনেকটা সময়-ই ওদের সঙ্গে ছিল না, এদিকে ওদিকে চলে যাচ্ছিল।

খাওয়া-দাওয়া সেরে শুতে যাবার সময় পরের ঘটনাটা ঘটল। মৃদুলা সবে জিজ্ঞেস করেছেন, “তোমাদের বিছানা তোমরা করে নিতে পারবে, না কি আমাকে করে দিতে হবে?” তখন অভীশা বলল, “দাদা গাড়িতে সারা রাস্তা, এখানে এসে থেকে সারা সন্ধে কেবল গার্লফ্রেন্ডের সঙ্গে গল্প করেছে, রাতেও নিশ্চয়ই রাত জেগে দুজনে গ্যাঁজাবে, সেলফোনের আলোতে আমার ঘুম আসে না, আমি দাদার সঙ্গে এক ঘরে ঘুমোব না।”

কথাটা অভীশা যখন বলেছে, তখন মৃদুলা কী করছিলেন, তা মনে নেই, কিন্তু এখনও, এত বছর পরেও পরিষ্কার মনে আছে, কথাটা শুনে থমকে গেছিলেন, দরজার থেকে মেঝের ওপর কাঠের দাগের দিকে চেয়ে ছিলেন – সে দাগের ডিজাইনটা চাইলেই এখনও দেখতে পান মনের চোখে।

মৃদুলা কিছুই বলতে পারেননি। অভিদীপ্ত বলল, “কোথায় ঘুমোবি তবে? বুড়ো বয়সে মা-বাবার সঙ্গে এক ঘরে ঘুমোতে পারবি?”

অভিশা বলল, “না, তা কেন? দাদাকে বলো, ও বসার ঘরে ঘুমোক।”

মৃদুলা ততক্ষণে ধরেই নিয়েছেন, যে ওদের জীবনের গতিও সিনেমাটার মতোই চলছে। সামান্য রদবদলগুলো কিছু না, আসলে সিনেমায় চারজনের যা হয়েছিল, ওদেরও তা-ই হবে এবং সিনেমার শেষে কী হয়েছিল সেটা জানা খুব দরকার। তাই, বাকিরা যতক্ষণ আলোচনা করছে – মৃদুলা চট করে সেলফোন খুলে নেট সার্চ করছেন – পাচ্ছেন না সিনেমা-টা। এর মধ্যে ছেলেমেয়ের ঝগড়া তুঙ্গে উঠেছে, মৃদুলা সেল ফোন থেকে মুখ তুলে দেখেন ওরা প্রায় হাতাহাতি করার মুখে, অভিদীপ্ত অসহায়ের মতো ওঁর দিকে তাকিয়ে – ওদের থামান’র জন্য ছেলেকে বললেন, “আচ্ছা, দুজনে না-হয় একই ঘরে শুলে না, কিন্তু বসার ঘরে শুতে তোমার আপত্তি কী? কাউচ-টা তো বেশ বড়ো...”

প্লেনের অল্প আলোয় মৃদুলা অস্পষ্ট, কিন্তু কোথা থেকে একটা আলো পড়ছে ওর মুখে। চোখ দুটো বিকট রকম জ্বলজ্বল করছে। অনু অস্বস্তিতে এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখে, ওরই সিটের ওপরের রিডিং ল্যাম্পটা জ্বলে রয়েছে। হাত বাড়িয়ে নেভাতে যাবে, মৃদুলা থামালেন। বললেন, “থাক। ওটা আছে বলে তোমার মুখ দেখতে পাচ্ছি। নইলে তুমি একেবারেই অন্ধকারে।”

ছেলে কী বলল?” জানতে চাইল অনু।

মৃদুলা বললেন, “ছেলে যা বলল, তাতে আবার আমার শরীরে হিমশীতল স্রোত বয়ে গেল। বলল, কেন, একটা স্পেয়ার বেডরুম আছে – সেখানে শুলেই তো হয়?”

মৃদুলা এতটাই হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলেন, যে কিছুক্ষণ কিছুই বলতে পারেননি। তারপরে হঠাৎ কথা ফিরে এল যেন। অভিদীপ্ত কী বলছিল, ওর কথা কেটে চেঁচিয়ে বললেন, “না, কক্ষনও না, কিছুতেই না – এই দুটো ঘরের মধ্যেই থাকতে হবে।”

অভিদীপ্ত এসে মৃদুলাকে দু’কাঁধে ধরে বলল, “মৃদু, কী হলো তোমার? চুপ করো, চেঁচিও না। এ বাড়িতে দুটোই বেডরুম। সুতরাং...”

অভীষ্ট আবার বলল, “না। আর একটা বেডরুম আছে। এই তো, এখানেই...”

মৃদুলা আবার অনুকে জিজ্ঞেস করলেন, “ঠিক সিনেমার মতো – বুঝতে পারছ?”

অনুর এতক্ষণ মনে হচ্ছিল, সিনেমার সঙ্গে মিলটা আপাতদৃষ্টিতে থাকলেও মহিলা জোর করে মিল খোঁজার চেষ্টা করছেন, এমন কিছু মিল নেই। বিশেষত হানিমুনের ব্যাপারে মিল টেনে আনায় ওর বেশ হাসিই পেয়েছিল। কিন্তু এখন ঘাড় নাড়ল। মিল আছে বইকি। বলল, তারপর?

অভীষ্ট বলল, “বসার ঘরের ওপাশের ঘরটাই বেডরুম।”

অভিদীপ্ত পকেট থেকে ফোন বের করে কটেজের মালিকের ইমেইলটা বের করে বলল, “পরিষ্কার লেখা আছে – দুটো বেডরুম, ডাইনিং, ড্রইং আর কিচেন – কটেজের দু’দিকে টানা বারান্দা – দু-দিকেই দরজা আছে, ইচ্ছেমতো এদিক বা ওদিক দিয়ে ঢোকা-বেরোনো যায়। তিনটে বেডরুমের কথা নেই।”

অভীষ্ট – উফফ্‌, বলে খাবার ঘর থেকে বেরিয়ে বারান্দা ধরে হাঁটা দিল। খাবার ঘর আর বসার ঘরের দরজার মাঝখানে আর একটা দরজা। বন্ধ। সব ঘরে, বারান্দায়, সর্বত্র আলো জ্বলছে, কিন্তু ওই ঘরটা অন্ধকার। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বলল, “এটা কী? ঘর না?”

ভুরু কুঁচকে অভিদীপ্ত বলল, “হতে পারে, কিন্তু এটা তো বন্ধ।”

অভীষ্ট বলল, “হাউসকিপারদের ফোন করে জিজ্ঞেস করা যায় না, আমরা এই ঘরটা খুলতে পারি কি না? ওদের কাছে চাবি আছে নিশ্চয়ই?”

অভিদীপ্ত কিন্তু কিন্তু করে বলল, “তা হতে পারে, কিন্তু যদি তিনটে ঘর আমাদের ওরা ভাড়া দিতেই চাইত, তাহলে সেটা বলল না কেন? ওদের বিজ্ঞাপনেও কিন্তু দু-বেডরুম বলা আছে, তৃতীয় বেডরুমের কথা লেখাই নেই – এই যে, বলে ফোন থেকে ওয়েবসাইটের বিজ্ঞাপনটা দেখিয়ে বলল, স্লিপিং স্পেস ফর ফোর পার্সন্স।”

মৃদুলা ততক্ষণে প্রাণপণে সেল ফোনে সিনেমাটা খুঁজছেন। কোথাও পাচ্ছেন না। এমন সময় ওঁর চোখ পড়ল এই ঘরের দরজার পাশে একটা স্টুলের ওপরে একটা ফুলদানী রাখা রয়েছে। পোর্সেলিনের তৈরি – উজ্জ্বল নেভি ব্লু আর সোনালীর ডিজাইন। সিনেমাতেও ঠিক এমনই কালার কম্বিনেশন ছিল ফুলদানীটার। যদিও ডিজাইনটা অন্যরকম ছিল। এই বাড়িতে অত ছবি আর আর্টওয়ার্ক নেই। গোটা বারান্দায় এই একটাই স্টুল, আর একটাই ফুলদানী – আর সেটাই এই দরজার পাশে। মৃদুলা জানেন, ওটা সরালেই তার নিচে কী পাওয়া যাবে।”

অনু খেয়াল করল ওর নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে গেছে। মৃদুলা লক্ষ করলেন ওর মুখের – না, চোখের ভাষা। বললেন, “আমিও খুব ভয় পেয়েছি। আমি কিছু বলতে পারছি না, আমি একদৃষ্টে চেয়ে আছি ফ্লাওয়ার ভেসটার দিকে, আর মনে মনে বলছি, না, না, কেউ যেন খেয়াল না করে ওটা যে রয়েছে...

অভীষ্ট বলছে, কেয়ারটেকারকে ফোন করে জিজ্ঞেস করাই যায়, ঘরটা ব্যবহার্য হলে আমরা এখনও গিয়ে চাবি নিয়ে আসতে পারি, অভিদীপ্ত বলছে সেটা উচিত হবে না, পরে কথায় কথায় জানা যেতে পারে, এমন সময় অভীশা বলল, আমি জানি চাবি কোথায় আছে। ওই ফ্লাওয়ার ভেস-এর নিচে।

মৃদুলা চিল চিৎকার করে বলেছেন, “না, ওখানে হাত দিও না...” কিন্তু কোনও শব্দ বেরিয়েছল কি না মনে নেই... কেউ শুনল না, অভিদীপ্ত ফুলদানীটা সরিয়ে দেখল, সত্যিই ওটার নিচে একটা দরজার চাবি। বলল, “খুলে দেখতে তো ক্ষতি নেই – আবার বন্ধ করে রেখে দিলেই হবে, তবে হ্যাঁ, মালিক বা কেয়ারটেকারের অনুমতি ছাড়া ঘর আমি ব্যবহার করতে দেব না। সেরকম হলে ওদের সঙ্গে তিনটে বেডরুমের কনট্র্যাক্ট করতে হবে...”

মৃদুলা ততক্ষণে কেমন উদ্ভ্রান্তের মতো হয়ে গেছেন। বলছেন, “না, না। ওই ঘর খুলবে না। খুলবে না। আমি আগে দেখি... দেখি...” আর খুঁজে চলেছেন... ওরা জিজ্ঞেস করছে, “কী দেখবে? কী হলো...” কিন্তু – কোথাও ফিল্মটা নেই – ওই ওয়ান্স ইন ইওর লাইফটাইম... কোনও ওয়েবসাইটে নেই, কোনও রেফারেনস নেই – আইএমডিবি, রটেন টমাটোজ, ইয়াহু মুভিজ, মুভি-ডট-কম... উইকিপিডিয়া... মৃদুলার খালি মনে হচ্ছে, দরজাটা খোলা যাবে না... উচিত হবে না... সাংঘাতিক একটা কিছু ঘটে যাবে... আর খালি মোবাইলে স্ক্রিন থেকে স্ক্রিনে যাচ্ছেন – কোথাও যদি জানতে পারেন সিনেমায় ওই তৃতীয় ঘরের দরজা খোলার পরে কী হয়েছিল... আর একই সঙ্গে মনে হচ্ছে ওই ছবি তো আর দেখতে পাবেন না – ওটার নামই তো ওয়ান্‌স ইন ইওর লাইফটাইম – একবারই দেখতে পাওয়া যাবে...”

ঠিক এই সময়ে ফট্‌ ফট্‌ করে আলো জ্বলে উঠল প্লেনের ভেতরে, পাবলিক অ্যাড্রেস সিস্টেমে শোনা গেল প্লেন প্রায় পৌঁছে গেছে – আর কিছুক্ষণের মধ্যেই ল্যান্ড করবে।

এর মধ্যেই আট ঘণ্টা কেটে গেছে? অনুর খেয়াল হলো ওদের দিকের জানলার বাইরে অন্ধকার থাকলেও অন্যদিকের আকাশে হালকা আলোর ছোঁয়া। সূর্য উঠছে। ফ্র্যাঙ্কফুর্ট পৌঁছন’র কথা সকাল সাতটা দশ মিনিটে – ওখানে সূর্য উঠবে সাড়ে সাতটার পরে।

দুজনে ওয়াশ রুম গেলেন। ফিরে এসে মৃদুলা কিন্তু আর বলতে চাইলেন না। বললেন অনেক বাকি আছে। শর্টে বলা যাবে না, আর তা ছাড়া চারপাশের লোকজনের কথাবার্তা, চলাফেরায় অসুবিধে হবে। সেটা অনুও বুঝছিল কিন্তু বাকিটা না জেনে তো যাওয়া যাবে না।

মৃদুলা বললেন ওঁর ফ্র্যাঙ্কফুর্টে একটু কাজ আছে, তাই এয়ারপোর্টেও একসঙ্গে থাকতে পারবেন না। দুজনে টিকিট বের করে মেলালেন – দুজনেরই ফ্র্যাঙ্কফুর্ট-টরোন্টো যাত্রাও একই প্লেনে। মৃদুলা বললেন, “তাহলে ট্রানসফার ডেস্কে দেখা হবে। ধরো ফ্লাইটের ঘণ্টা দুয়েক আগে – একসঙ্গে গিয়ে পাশাপাশি সিট চাইব, কেমন?”

দেখতে দেখতে প্লেন নামল ফ্র্যাঙ্কফুর্টে, আর ডিসেম্বার্কেশনের অনুমতি পাওয়ামাত্র, মৃদুলা, “দেখি, রে, আমি একটু চটপট বেরিয়ে যাই...” বলে অনুকে, অন্যান্য প্যাসেন্‌জারদেরও একটু ঠেলেঠুলেই বেরিয়ে গেলেন, কিছুদূর গিয়ে একবার ঘুরে হাত নেড়ে গেলেন, টা টা মার্কা।


ফ্র্যাঙ্কফুর্টে নেমে অনু কিছু করার খুঁজে পেল না। অতবড়ো এয়ারপোর্ট সকাল সাতটায় প্রায় ঘুমন্ত, প্রায় কোনও দোকানই খোলেনি – অবশ্য ওদেরই বা দোষ কী? সূর্যই তো ওঠেনি এখনও। খুঁজে-পেতে একটা ব্রেকফাস্ট খাওয়ার জায়গা পেল – বাবা বলে দিয়েছিল ফ্র্যাঙ্কফুর্টে গিয়ে অবশ্যই ফ্র্যাঙ্কফুর্টার খাবি। আর বিয়ার। অত সকালে বিয়ার খেতে ইচ্ছে করছিল না, তাই ফ্র্যাঙ্কফুর্টার সহযোগে এক মগ কফি অর্ডার দিল। গল্পটা মাথা থেকে বেরোচ্ছে না। হঠাৎ মনে হলো, মৃদুলা দুটো গল্পেই টর্চের কথা বলেছিলেন ফলাও করে। টর্চের একটা ভূমিকা ছিল নিশ্চয়ই? নইলে বার বার বলতেন না। সিনেমাটা যতদূর দেখেছিলেন তাতে টর্চ আসেনি। কিন্তু মৃদুলা যে টর্চ কিনেছিলেন, সেটা কী কাজে লাগল? সেটা জানতে হবে পরের যাত্রায়। গল্প বলতে জানেন বটে মহিলা। ভাষার দখলও সাংঘাতিক। ফল কালারকে ওর বর বলত – গাছেদের হোলিখেলা। থমকে গেল। অভিদীপ্ত বলত – গাছেদের হোলিখেলা। মৃদুলা কি ওর ফ্যামিলির কথা বলতে বার বার অতীতকালই শুধু ব্যবহার করছিলেন? আর কী বলেছিলেন? অভিদীপ্ত ফল্‌ কালার্স দেখতে যেত সারা জীবন, অভিদীপ্ত ভালো গাড়ি চালাত, ছুটি অর্গানাইজ করত, গাড়ি ভাড়া করত – সবই কেমন অতীতকাল মার্কা। কেন?

তারপরেই কয়েকটা অদ্ভুত গরমিলের কথা খেয়াল হলো। কতদিনকার আগের ঘটনা বলছিলেন মহিলা? পনেরো না? পনেরো বছর আগে... চট করে ফোনে সার্চ করল। এই ক’দিন আগে ওর মামাতো দাদা বলেছিল বস নতুন গাড়ি কিনেছে... হুন্ডাই টাক্‌সন, তাতে অটোমেটিক ট্রানসমিশন আছে।

উইকিপিডিয়া বলছে, গাড়িটা ২০১১তে প্রথম ইউ-এস--তে আসে। পনেরো বছর আগে এ গাড়ি নিয়ে ক্যানাডা বেড়ানোর সম্ভাবনা কতটা?

অনুর ভীষণ ঘুম পাচ্ছে বসে বসে। সারা এয়ারপোর্টটাই কেমন ঝিমন্ত। কিছুক্ষণ এদিক ওদিক হাঁটল। বসলেই ঢুলছে। সারা রাত জাগার ফল – কী নাম ছিল সিনেমাটার? ওয়ান্‌স ইন আ লাইফটাইম? না ওয়ান্‌স ইন ইওর লাইফটাইম? ট্রানসফার ডেস্কের কাছে এসে একটা চেয়ারে বসে ওরকম যতগুলো নাম হতে পারে, সবকটা দিয়েই সার্চ করল। একটা দুটো – যেমন ওয়ান্‌স ইন আ লাইফটাইম – নামে সিনেমা আছে, কিন্তু সে অন্য সিনেমা, কোনও ভাবেই মৃদুলার দেখা ছবির সঙ্গে তাদের মিল নেই। হঠাৎ আর একটা জিনিস খেয়াল হলো। অনু যে ভাবে ফোনের স্ক্রিনের ওপর আঙুল দিয়ে টাচ্‌-স্ক্রিন ফোনে সার্চ করছে, মৃদুলাও ঠিক সেরকমভাবেই হাতে ফোন ধরে আঙুল দিয়ে ঘষে ঘষে দেখাচ্ছিলেন উনিও সিনেমাটা সার্চ করছিলেন। কিন্তু পনেরো বছর আগে...

আবার গুগ্‌লের শরণাপন্ন। অ্যাপেল প্রথম টাচ স্ক্রিন ফোন আনে বাজারে – তার আগে-পরে স্যামসাং, বা এলজি – কিন্তু সে সবই দু-হাজারের দশকের শেষের দিকে। আজ থেকে পনেরো বছর আগে এরকম ফোন ছিল না। তাহলে? শুধুই কি অভ্যেসবশত সিনেমা সার্চ করার কথা বলার সময়ে মৃদুলা টাচ-স্ক্রিনে আঙুল বোলাচ্ছিলেন?

অনু ট্রান্‌স্‌ফার ডেস্কের সামনে হাঁটল কিছুক্ষণ। আরও একটা অসঙ্গতির কথা খেয়াল হলো... মহিলার বয়স কত? পঁয়ত্রিশ বছর ক্যানাডায়, তার আগে বারো বছর দিল্লিতে – বিয়ের পর থেকে। সাতচল্লিশ বছর আগের বিয়ের সময় যদি কুড়ি একুশ বছরও বয়স হয়ে থাকে – তাহলে আজ অন্তত সাতষট্টি। এত বয়স্ক লাগছিল না, পঞ্চাশ থেকে ষাটের মধ্যে মনে হচ্ছিল। তবে অনেকে বয়স ধরে রাখতে পারে।

কিন্তু সাতচল্লিশ বছর আগে যার বিয়ে – তার বড়ো ছেলের বয়স পনেরো বছর আগে তেরো? বিয়ের উনিশ বছর পরে ছেলে হয়েছে? এটা অসম্ভব না হলেও বিশ্বাস করা একটু কঠিন। যদিও নিজের ছেলে-মেয়ে না-ও হতে পারে, হয়ত ছেলেপিলে হয়নি বলে দত্তক নিয়েছেন...

ধ্যাৎ, বলে নিজেকে ধমকে অনু আবার গিয়ে বসল। ও গোয়েন্দা না – এত মাথা না ঘামালেও চলবে। কিন্তু মন থেকে বের করতে পারছিল না। আবার উঠল একা একা ওই বিশাল এয়ারপোর্টের এদিক ওদিক হাঁটতে হাঁটতে, বন্ধ দোকানের আলো-জ্বলা শো-কেসের উজ্জ্বল বিপনী দেখতে দেখতে এদিক ওদিক খুঁজল – যদি মৃদুলাকে দেখতে পায়, এখানেই ধরে বলবে, বাকিটা বলুন। এখনই।

সময় এসে গেল। মৃদুলার হদিস নেই। বলেছিল ফ্লাইটের দু’ঘণ্টা আগে আসতে। ক্রমে পাঁচ মিনিট গেল, দশ মিনিট... অনু ট্রানসফার ডেস্কে গিয়ে জানতে চাইল মৃদুলা কি এর মধ্যে ট্রানসফার করিয়ে চলে গেছেন?

অন্য যাত্রীর সম্বন্ধে কোনও ইনফরমেশন দেওয়া বারণ। আরও পাঁচ মিনিট অপেক্ষা করে অনু গেট-এর দিকে রওয়ানা দিল।

ওখানেও মৃদুলা নেই। ঘণ্টাখানেক পর ফ্র্যাঙ্কফুর্ট-টোরোন্টো ফ্লাইট এল। তখনও না। অনুর সিট আবার প্যাসেজের ধারেই। দেখতে পাচ্ছিল, ওর পরে কে উঠছে। কিন্তু এই বিরাট প্লেনগুলোতে একাধিক দরজা, ফলে অন্য দরজা দিয়ে কেউ ঢুকে অন্য দিকে চলে গেলে বোঝা যায় না।

এত বড়ো প্লেনে ঘুরে ঘুরে খুঁজে পাওয়া যাবে না। জিজ্ঞেস করতে হবে। কিন্তু চালাকি করে – নইলে এক যাত্রীর খবর আর এক যাত্রীকে বলবে না ওরা। এয়ার হোস্টেসকে ডেকে বলল, “আমার এক আন্ট এই ফ্লাইটে আছেন, কিন্তু ফোনে পাচ্ছিলাম না বলে যোগাযোগ করতে পারিনি। নাম মৃদুলা। কোথায় বসেছেন দেখতে পারবেন কি? বলবেন, আমি – অনু – এই সিটে আছি?”

আমি দেখছি,” বলে চলে গেলেন মহিলা। একটু পরে একজন স্টুয়ার্ড এসে বললেন, “এক্সকিউজ মি, আপনি কী নাম বলছিলেন?”

নাম জেনে, লিস্ট মিলিয়ে বললেন, “স্যরি, এই ফ্লাইটে ওই নামে কারও বুকিং-ই নেই।”

অত্যন্ত আশ্চর্য হল অনু – টিকিটটা ও-ও দেখেছে, ফ্লাইট নম্বর, সময় – ইত্যাদি সব মিলেছিল। কিন্তু মৃদুলা প্লেনে না উঠলেও তো নামটা দেখা যাবার কথা। ওর অবাক ভাব দেখে, এবং বয়সের জন্য, এবং মেয়ে বলেও বোধহয়, স্টুয়ার্ড একটা অ্যানাউনসমেন্টও করলেন – মৃদুলা নামে যদি কেউ এই ফ্লাইটে থাকেন, তাহলে ফ্লাইট-ক্রুর দৃষ্টি আকর্ষণ করবেন দয়া করে, আপনার আত্মীয় অনু এই ফ্লাইটে আছেন।”

কেউ সাড়া দিল না।

ব্যাপারটা বুঝল না অনু।

ফ্র্যাঙ্কফুর্টার খেয়ে পেট ভরা তাই সামান্য ব্রেকফাস্ট খেয়ে, একটা কাপ কফিতে আধচুমুক দিয়ে ফেলে দিয়ে অনু কখন ঘুমিয়ে পড়েছে, জানে না।


ঘুম ভাঙল – বাইরে দিনের আকাশ। তবে পাশে বসা সহযাত্রী জানলা বন্ধ করে ঘুমোচ্ছেন বলে অনুর চোখে এতক্ষণ আলো লাগেনি। ঘণ্টা তিনেক কেটেছে ঘুমিয়ে। এখনও প্রায় ঘণ্টা ছয়েক যাত্রা। অনু ভাবল, খাতা খুলে গল্পটা লিখে রাখবে। সিনেমার নামটাও লিখে রাখতে হবে। কোনও দিন যদি দেখার সুযোগ হয় – দুটো গল্পই অন্তত অর্ধেক হয়ে থাকবে না।

খাতা বের করে লিখতে বসল। আপাতত পয়েন্টগুলো লিখে রেখে পরে ডিটেল লেখা যাবে। তবে খটকার জায়গাগুলো বিশদে লিখল, যদি ভুলে যায়!

অনেকটা সময় লাগল লিখতে – মাঝে খেতেও দিয়ে গেল। খাওয়া শেষ করে আবার ঘুমিয়ে পড়ল। সারা রাত না ঘুমোনোর ফল।

এবার ঘুম ভেঙে দেখল যাত্রার আর বিশেষ বাকি নেই। ঘণ্টা খানেকের মধ্যেই টরোন্টো পৌঁছবে। কিছু করার নেই, সিটের হাতল থেকে রিমোটটা খুলে বোতাম টিপল অনু। টিভিটা চালু হতেই একটা সিনেমা শুরু হলো। অন্ধকার নীলচে ব্যাকগ্রাউন্ডে একটা জঙ্গুলে জায়গা, তাতে একটা কটেজ – বরফের দেশে যেমন হয় – উল্টোনো ‘ভি’ আকৃতির ছাদ, তার রং সবজেটে – আর পেছনে একটা লেক। দেখতে দেখতে পর্দায় ফুটে উঠল ছবির নাম – ওয়ান্‌স ইন ইওর লাইফটাইম! অনু হতবাক হয়ে চেয়ে রইল। কানে ইয়ারফোন নেই, কিছু শুনতে পাচ্ছে না – কিন্তু দেখতে পাচ্ছে চেনা গল্প। চারজন ছেলে মেয়ে – গাড়িতে মালপত্র তুলছে, বোঝা-ই যাচ্ছে তারা বেড়াতে যাচ্ছে। কিন্তু অনু শুধু দেখছে দুটি মেয়ের মধ্যে যে বড়ো, তাকে। তার বডি-ল্যাঙ্গুয়েজ থেকে পরিষ্কার, সে তার প্রেমিক, বা স্বামীর সঙ্গে কোথাও যাচ্ছে, আর অন্য দুটি ছেলেমেয়ে তাদের থেকে খুব ছোটো না। কিন্তু – এ যদি রন্ডা হয়, তাহলে একে অনু রন্ডা বলে চেনে না। দিল্লি থেকে ফ্র্যাঙ্কফুর্ট এই চোখ দুটোই সারা রাত চেয়ে ছিল ওর দিকে। এ-ই ওকে গল্প বলেছিল সারা রাত।

এই ছবিটা ওর দেখা উচিত না, শেষ হবার মতো সময় আর বাকি নেই ফ্লাইটে, ওর উচিত টিভিটা বন্ধ করে দেওয়া... কিন্তু ও এ সব কিছুই করল না। নিথর বসে দেখতে থাকল মৃদুলা... না, রন্ডা আর মাইক, আর জেফ আর লিনি গাড়ি করে রওয়ানা দিল নিরুদ্দেশের দিকে...

Saturday, February 13, 2021

প্রাপ্য

 

~এক~

ছোটোবেলাটা পরাগব্রতর ভালো করে মনে নেই। এতটুকু মনে আছে যে ওরা একটা গ্রামে থাকত। ওরা মানে, পরাগব্রত আর ওর মা-বাবা। ও যখন স্কুলে পড়ত, তখন কোনও এক অসতর্ক মুহূর্তে মা বলেছিল, বাবা চাষ করত, যজমানিও। কিন্তু একবার নাকি বছর-বছর ফসল হয়নি। তাই ওরা গ্রাম ছেড়ে শহরে আসছিল। বাবা লোকের মুখে শুনেছিল শহরে নাকি মাটিতে টাকা আছে।

আর কিছু বলেনি মা তারপর। পরাগব্রতরও মনে নেই। কত বয়স ছিল ওর? মা বলেছিল, চার কি পাঁচ। গ্রামের দিকে অত হিসেব রাখত না কেউ। তখনই নাকি পরাগব্রতর প্রথম রেলগাড়ি চড়া। সে যাত্রার সামান্যই এখন মনে পড়ে। একটা ভীষণ ভীড় জায়গায় ট্রেনটা এসে দাঁড়িয়েছিল, লোকজন ওদের পুঁটলি সমেত নামিয়ে দিয়েছিল, চারিদিকে কত লোক, ওদের পেরিয়ে চলে যাচ্ছে, কেউ তাকাচ্ছে, কেউ তাকাচ্ছে না — আর ওর মা উবু হয়ে বসে হাপুস নয়নে কেঁদে যাচ্ছে, প্রথম দিকে লোকে একটু দাঁড়িয়ে কথা বলেছিল, “আরে বাবা, গাড়িতে ডাকাত পড়েছে তো গিয়েছিল কেন ওখানে?” “কোথায় যাবে?” “পৌঁছে দেব… জানো কোথায় যাবে?” ও ভয়ে মাকে আঁকড়ে ধরে ছিল।

বাবাকে আর দেখেইনি কোনও দিন। পরেও মা’কে জিজ্ঞেস করতে গেলেই মা এমন ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করত, যে জিজ্ঞেস করতে সাহসই পেত না।

ভুবনব্রতবাবু ওদের নিয়ে এসেছিলেন বাড়িতে। ততক্ষণে পুলিশ এসে গেছিল। পরাগব্রত অবশ্য জানত না ওরা পুলিশ। কিন্তু ভয় পাওয়াটা মনে আছে। ওরা এসে হুমড়ি খেয়ে পড়া মায়ের গায়ে লাঠি দিয়ে খোঁচাচ্ছিল, আর কী সব বলছিল, “অ্যাই, অ্যাই...” ও আরও জোরে আঁকড়ে ধরেছিল মাকে। পাছে মা-ও কোথাও চলে যায়?

ভুবনব্রত মুখার্জি এসে দাঁড়ালে অবশ্য পুলিশ থাকে না বেশিক্ষণ, ওই পুলিশগুলোও চলে গেছিল। আর বড়োমা নিচু হয়ে বসে মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “, মা কী সুন্দর!” বলেছিলেন, “আহা রে, ব্রাহ্মণ...” কী সব কথা হয়েছিল ওদের তিনজনের মধ্যে। ওর তা-ও মনে নেই। কিন্তু মনে আছে, বড়োমা যখন ওকে, “আয় রে, আমার কাছে আয়!” বলে কাছে টেনে নিয়েছিলেন, তখন অত ভয় করেনি। পুঁটলিগুলো গুছিয়ে নিয়ে ওদের গাড়িতে উঠেছিল। ওদের মানে ভুবনব্রতবাবু — তাঁকে পরাগব্রত এতই ভয় পেত, যে কোনওদিন মুখ ফুটে কথাই বলেনি ভালো করে, ওঁর স্ত্রী — যাকে পরাগব্রত বড়োমা বলত, আর ওদের ছেলে দীপব্রত।

ওদের বাড়িতে পরাগব্রত বোধহয় কয়েক বছর কোনও কথাই বলেনি… না, এটা বাড়াবাড়ি হলো। দীপব্রতর সঙ্গে ওর বন্ধুত্ব হতে দেরি হয়নি। কিন্তু বাকিটা সবটাই ছিল ভয়াবহ। গাড়ি চড়া থেকে আরম্ভ করে শহরের রাস্তা, মস্তো বাড়ি থেকে নিয়ে বাড়িভর্তি কাজ করে দেবার লোক…

বছর দশেক বয়স থেকে বুঝতে শুরু করে, ওর আর ওর মায়ের কাজের লোকদের সঙ্গে থাকা উচিত ছিল। কিন্তু তা হয়নি। প্রথম থেকেই ওকে আর ওর মা-কে বড়োমা নিয়ে গিয়ে দোতলায় ঘর দিয়েছেন। প্রথম প্রথম মা কিছুই বুঝতে পারত না — বাথরুমে গিয়ে কেঁদে ফেলেছিল। বড়োমাকে বলেছিল, “দিদি, এ সব কী?” বড়োমা বলেছিলেন, “শিখিয়ে দেব। কিচ্ছু ভাবিস না।”

বলেছিলেন, “আমি তোর বড়োমা।” আর দীপব্রতকে বলেছিলেন, “ইনি তোর ছোটোমা।” দুজনেই ঘাড় নেড়েছিল লক্ষ্মী ছেলের মতো। দীপব্রত ওর হাতটা ধরে ছিল শক্ত করে। চোখে হারাত দুজনে দুজনকে।

বড়োমা সবাইকে বলতেন, “আমার দূর সম্পর্কের বোন… আর ওর ছেলে। দীপব্রতর একটা সাথী পেলাম। আমার তো আর...” বলেছিলেন, “পরাগব্রত। এখন থেকে তোমার নাম।” পরাগব্রতর আর একটা নাম ছিল। ওর মনে নেই সেটা। ন্যাড়া? নাড়ু? একবার মনে পড়েছিল কারণ ক্লাসের ছেলে বিজয় ন্যাড়া হয়েছিল। আর সবাই ওকে ন্যাড়া, নেড়ু… এসব বলে খ্যাপাচ্ছিল। বাড়ি ফিরে মাকে জিজ্ঞেস করেছিল, “মা, আমার নাম ন্যাড়া ছিল?” মা রেগে হিসহিস করে বলেছিল, “কিচ্ছু ছিল না। পরাগব্রত। পরাগব্রত মুখার্জী... মনে রাখবি...”

মা খুব রেগে থাকত। অনেক সময় ভালো করে কথা বলত না পরাগব্রতর সঙ্গে। বড়োমা পরাগব্রতর খাট দিয়েছিলেন দীপব্রতর ঘরে। ওদের বাড়িতে সব্বার আলাদা আলাদা ঘর ছিল। কেবল পরাগব্রতর ছিল না। ও কখনও শুত দীপব্রতর ঘরে, কখনও মায়ের ঘরে, এমনকী বড়োমার বিছানাতেও। কিন্তু মা-র সঙ্গে শুতে ভয় পেত। অনেক রাতে ঘুম ভাঙত কখনও, মার খাট থেকে বিজাতীয় ফোঁশ ফোঁশ শব্দ, মা-র ওপরে ছায়া-ছায়া একটা অবয়ব দুলছে। দুলছে, আর বলছে, “-আঃ, -আঃ...” মনে হত মাকে মারছে, মেরে ফেলবে। ভয়ে সিঁটিয়ে বিছনার সাথে মিশে যেত পরাগব্রত। কিন্তু চোখটা নিজেই খুলে যেত। ছায়াটা চলে যাবার পরে, কখনও আগেই আবার ঘুমিয়ে পড়ত পরাগব্রত। সকালে আবার সব যে কে সেই। ছায়াটা যেন ভুবনব্রতবাবু। সেজন্যই আরও ভয় করত ভুবনব্রতবাবুকে। দেখলে লুকিয়ে পড়ত। রাতে খাবার খেতে হত একসাথে। ওই একটা সময়ই ভুবনব্রতবাবুর সামনাসামনি হতে হত। রাতের খাবার গলা দিয়ে নামত না পরাগব্রতর।

না, মা সবসময় রেগে থাকত না। অনেক সময় মা খুব দুঃখে থাকত। এক এক দিন দেখতে পেত, মা খাটে শুয়ে কাঁদছে। কেন কাঁদছে জিজ্ঞেস করলে উত্তর দিত না।

রেগে থাকত বাড়ির কাজের লোকগুলোও। ওদের সঙ্গে কেউ থাকলে অন্য কথা, একা পেলেই গালাগালি করত। মানদা, যে ঘর ঝাঁট দিত, মুছত… জগন্নাথ, যে রান্না করত… মিশির-ড্রাইভার… এরা। সবচেয়ে বেশি একা সময় কাটত মিশিরের সঙ্গে। কারণ স্কুলের পরে পরাগব্রতকে আধঘণ্টা অপেক্ষা করতে হত দীপব্রতর জন্য। দীপব্রত এলে গাড়ি ফেরত নিয়ে আসত বাড়িতে। রোজ এই সময়টা পরাগব্রতর কাছে বিভীষিকার মতো ছিল। শেষে, অজান্তেই মিশির নিজের বিপদ ডেকে আনল।

কথাটা বলার ভঙ্গীতে পরাগব্রত বুঝেছিল খুব খারাপ গালাগালি দিয়েছে মিশির। বাড়ি ফিরে মা-কে আলাদা করে জিজ্ঞেস করেছিল, “মা, খানকির ছেলে মানে কী?”

মা উত্তর দেয়নি। কিন্তু উত্তরটা পেয়ে গিয়েছিল পরাগব্রত। থাপ্পড়টা খেয়ে ছিটকে পড়েছিল খাটের ওধারে। মশারির ডাণ্ডায় মাথা ঠুকে গিয়ে পড়েছিল মাটিতে। রক্তারক্তি কাণ্ড। চেঁচামেচি, ডাক্তার-বদ্যি, কান্নাকাটি… সেই প্রথম পরাগব্রত জেনেছিল, মানুষকেও সেলাই করা যায় জামা কাপড়ের মতো। সব মিটে যাবার পরে নিজের খাটে শুইয়ে মাথায় বরফের পুঁটলি ধরে বড়োমা জিজ্ঞেস করেছিল, কী হয়েছিল। কেন মা রেগে গেছিল ওর ওপরে। খেয়াল না করে বলে ফেলেছিল কারণটা। বলেই গালটা চিনচিন করে জ্বালা করে উঠেছিল আবার। মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গিয়েছিল, কথা আটকে গেছিল আতঙ্কে — যদি বড়োমাও রেগে যান? যদি মারেন মা’র মতো? কিন্তু বড়োমা শুধু মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে খুব কাছে এসে বলেছিলেন ঘুমিয়ে পড়তে।

কিন্তু বড়োমা রেগে গেছিলেন। এক মুহূর্তের জন্য পরাগব্রত চোখে রাগ জ্বলে উঠতে দেখেছিল। ঝুঁকে পড়ে পরাগব্রতর কপালে, যেদিকে ব্যান্ডেজ করে গিয়েছিল ডাক্তার, তার উলটো দিকে চুমু খেয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলেন।

পরাগব্রত তিন দিন স্কুলে যেতে পারেনি। পরদিন জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছিল — ডাক্তার এসেছিল আবার। তার পরদিন জ্বর নামল, তারও পরদিন, তিন দিন পরে যখন স্কুলে যাবে, দেখল মিসির আর নেই। গাড়ি চালাচ্ছে হরিহর বলে একটা নতুন ড্রাইভার।

দু’দিন পরে এক রবিবার দীপব্রত ওকে দুপুরবেলা যখন জগন্নাথের কাছ থেকে দুটো স্যান্ডউইচ চাইতে পাঠিয়েছিল, তখন ভয়ে ভয়ে গিয়েছিল একতলায়, রান্নাঘরে। দীপব্রতর ফরমাশ নিয়ে রান্নাঘরে গেলে এতদিন পরাগব্রতকে জগন্নাথ আর মানদা সাধারণত দুটো বাজে গালি দিত। আজ কিছু বলল না। জগন্নাথ কেবল ঘাড় নাড়ল, মানদা একটু ঘাড় গোঁজ করে বলেছিল, “আনতিছি...”

পরাগব্রত সেদিন বুঝল, মিশিরের কল্যাণে ওর এবাড়িতে কাজের লোকের গালি আর খেতে হবে না। বুঝেছিল, ওর অধিকারের জায়গাটা ওরা বুঝে গিয়েছে।

পরাগব্রত আর দীপব্রত সমবয়সী — সেটাই শুনে এসেছে শুরু থেকে। কিন্তু যেহেতু পরাগব্রত কখনও স্কুলে পড়েনি, ওকে শুরু করতে হয়েছিল দু’ক্লাস নিচ থেকে। স্কুলজীবনে পরাগব্রত দীপব্রতকে দাদা বলত। দীপব্রতদা কখনও বলেনি কিছু। কিন্তু পরাগব্রত যখন ক্লাস ইলেভেনে, দীপব্রতদা কলেজে, একদিন ওকে ডেকে বলেছিল সেদিন থেকে আর যেন পরাগব্রত ওকে দাদা বলে না ডাকে।

এই সময় থেকেই দীপব্রত ওকে আস্তে আস্তে একটা অ্যাডাল্ট জগতে নিয়ে গিয়েছিল। শুরু হয়েছিল সিনেমা দেখা দিয়ে। প্রথমে টিকিট কেটে ‘এ’ লেখা সিনেমা, তারপরে কোনও ব্যক্তিগত আড্ডায় ইন্টারনেটে, ডিভিডিতে নীল ছবি। সেই সঙ্গে ছিল অল্পবিস্তর নেশা করা। দীপব্রতর বন্ধুরা সকলেই নেশাখোর। কেউ বেশি, কেউ কম। দীপব্রত কিন্তু এই একটা ব্যাপারে খুব পরিমিত। শুরু থেকেই পরাগব্রতকে বলে রেখেছিল, “যেটা বলব সেটাই খাবি শুধু। যেটা বারণ করব, সেটায় হাত দিবি না। যতটা বলব ততটাই খাবি। একটুও বেশি খাবি না।” দীপব্রতর চ্যালা ছিল পরাগব্রত। শুরু থেকেই। মন্ত্রের মতো দীপব্রতর কথা শুনত।

একদিন দীপব্রতর নির্দেশমতো স্কুল পালিয়ে দীপব্রতর কলেজে গিয়ে ওর সঙ্গে একেবারেই একটা নতুন জগতে এসে হাজির হয়েছিল। তেমন জায়গার ছবি পরাগব্রত দেখেছে আগে। নানা সিনেমায়। কিন্তু এবারে যেটা হলো, সেটার জন্য পরাগব্রত তৈরি ছিল না। “করিসনি নিশ্চয়ই কখনও?” দীপব্রতর প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেনি পরাগব্রত। বলেছিল, “কী?”

ঢ্যামনা...” ভেঙিয়েছিল দীপব্রত। “জানিসই না?”

জানত না পরাগব্রত। দীপব্রত মেয়েটাকে বলেছিল, “আমরা দু’জন। আগে আমি, পরে ও। তবে দু’জনের সময়ই অন্যজন থাকবে।”

মেয়েটা দ্বিরুক্তি করেনি। হাতের বিড়িটা ফেলে ঢুকে গেছিল ঘরে। পেছনে ওরা।

বাড়ি ফেরার পথে পরাগব্রত জিজ্ঞেস করেছিল, “ও তাহলে বেশ্যা?”

ঘাড় নেড়েছিল দীপব্রত। “বেশ্যা, রেণ্ডী, খানকী… যা খুশি বলতে পারিস।”

পরাগব্রত একটা পুরোনো চেনা শব্দের অর্থ জানতে পেরে এতই চমকে গেছিল, যে পরের প্রশ্নটা আর করতে পারেনি। বাড়ি ফিরে থেকে বার বার তাকিয়ে দেখেছিল মায়ের দিকে, আর খাবার টেবিলে তাকিয়েছিল মায়ের দিকে, গম্ভীর ভুবনব্রতবাবুর দিকে, আর বড়োমার দিকে। অনেকটাই পরিষ্কার বুঝতে পেরেছিল সেদিন। বুঝেছিল, বড়োমারও হাত ছিল সবটাতেই। বুঝেছিল, ওকে মানুষ করাটাই বড়োমার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল না। সেদিন রাতে ক্লান্ত শরীরটাকে ঘুমোতে দেয়নি পরাগব্রত। দীপব্রত ঘুমিয়ে পড়ার পরে উঠে গিয়ে ওদের ঘরের খোলা দরজা ফাঁক করে আড়ালে দাঁড়িয়ে ছিল। দেখেছিল ভুবনব্রতবাবু নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে পা-টিপে-টিপে গিয়ে ঢুকছেন ওর মায়ের ঘরে। তারপরে কতক্ষণ পরে আবার পা-টিপে-টিপে ফিরে গিয়েছিলেন। পা-টিপে-টিপে কেন? বড়োমাকে লুকোতে? বড়োমা নিশ্চয়ই জানেন, নইলে সেই ছোটোবেলার সেই দিনটার পরে, যেদিন ও চুপিচুপি বড়োমাকে বলেছিল রাতে ওর ভয় করে, কেন আর ওকে মা’র কাছে ঘুমোতে দেননি? ঘুমিয়ে পড়লেও রাতে কখন তুলে নিয়ে গেছেন নিজের খাটে? ভুবনব্রতবাবু ছেলেদের কাছ থেকে লুকোন। আর হয়ত লুকোন বাড়ির কাজের লোকেদের কাছ থেকে। দীপব্রত জানে, ওর বাবা পরাগব্রতর মাকে…?

পরদিন দুজনে সিনেপ্লেক্সে সিনেমা দেখে বার-এ গেছিল বিয়ার খেতে। পরাগব্রত জানতে চেয়েছিল কেন আগের দিন দীপব্রত পারল, কিন্তু ও পারেনি?

একটু হেসে দীপব্রত বলেছিল, “তুই জানিস না। তাই।”

তুই জানিস?”

ঘাড় হেলিয়েছিল দীপব্রত। “জানি। শিখতে হয়।”

অবাক হয়েছিল পরাগব্রত। দীপব্রতর জীবনে কিছু তাহলে আছে, যা পরাগব্রত জানে না? “কে শিখিয়েছে তোকে?”

দীপব্রত হেসে বলেছিল, “আন্দাজ কর তো?”

আমি চিনি?”

দীপব্রত উত্তর দেয়নি। ঘাড় হেলিয়ে হেসেছিল।

সারা সন্ধে ভেবে পায়নি পরাগব্রত। রাতে দুজনে শুতে গিয়েছে, এমন সময় হঠাৎ বিদ্যুতের মতো মনে হলো, বলল, “মানদা?”

অন্ধকারে হেসেছিল দীপব্রত।

কিন্তু মানদা… একটা বুড়ি...”

কে বলল, বুড়ি? তুই ছোটোবেলা থেকে দেখছিস বলে মনে হয়। মানদার বয়স সবে চল্লিশ পেরিয়েছে।”

কিন্তু কী করে… মানদা তো পরাগব্রতকে মানুষ বলেই গণ্য করে না। সেই মানদাকে… “রাজি হলো?”

দীপব্রতর উত্তরে স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিল পরাগব্রত। “তার মানে, -ও বেশ্যা?”

দীপব্রত হেসে বলেছিল, “সব মেয়েই বেশ্যা। কী চায় জানতে হয়।”

সব মেয়েই বেশ্যা... রেণ্ডি… খানকি… পরাগব্রত খানকির ছেলে। এক মুহূর্তের জন্য মাথার ভেতরে আগুন জ্বলে উঠেছিল। জানতে চেয়েছিল, “কত নেয়?” উত্তর শুনে চুপ করে ভেবেছিল খানিকক্ষণ। দুই ছেলেকে সমান হাতখরচ দেন ভুবনব্রতবাবু। বড়োমার তা-ই নির্দেশ। এইটুকু খরচ করতে পারবে পরাগব্রত। এতদিন মায়ের কথায় টাকা কম খরচ করত। কিন্তু…

পরদিন সন্ধেবেলা, মানদা যখন ওদের চা নিয়ে এসেছে, দীপব্রত বলেছিল, “আজ রাতে তুই এ ঘরে আসবি। আমরা দু’জনেই থাকব। ভয় নেই। ডবল টাকা পাবি। তবে ওকে দেখিয়ে দিতে হবে। যেমন আমাকে দেখিয়েছিলি।”

মানদার হাসি দেখে মনে হয়নি একদিন এ-ই পরাগব্রতকে ওয়াক-থু করত…


~দুই~

সে সব দিন কেটে গেছে কবে। মানদা আর নেই। শেষ পর্যন্ত জগন্নাথের সঙ্গেই পালিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু দু’ভাইয়ের জীবনে নেশা আর নারীর অভাব হয়নি। ভুবনব্রতবাবু ক্রমশ অশক্ত হয়েছেন, দীপব্রত কাজ-কারবারের দায়িত্ব তুলে নিয়েছে। সেখানেও পরাগব্রত ওর চ্যালা। সব কাজেই আজ দীপব্রত আর পরাগব্রত একসঙ্গে। পরাগব্রত বুঝেছে কেন সারাদিন বাড়িতে বসে থেকেও ভুবনব্রতর এত টাকাকড়ি। কেন ভুবনব্রতবাবুর অফিসে সারাদিন, বিশেষত সন্ধের পর অতি নিকৃষ্টমানের লোকের আনাগোনা। ভুবনব্রতর বেশিরভাগ রোজগারই নানা ধরণের জালের কারবার থেকে। জাল ওষুধ, নকল পাঠ্যবই, এবং সেই সঙ্গে নানা ধরণের নকল প্যাকেজিং তৈরি করতেন উনি অন্যদের জন্য। সেই নকল মোড়কে বেবিফুড থেকে রান্নার মশলা, মিনারেল ওয়াটার থেকে বিস্কুট — কী পাওয়া যায় না বাজারে? আজ সেই অফিসে বসে দীপব্রত। সেই কাজগুলোই চালায়। সব কাজেই পরাগব্রত প্রতিনিয়ত ওর সঙ্গী।

আজ অবশ্য কাজ নেই। দুজনে সবে পরাগব্রতর মা-কে দাহ করে ফিরেছে শ্মশান থেকে। কেঁদেছে দীপব্রত। পরাগব্রতর চোখে জল নেই। ওরই জন্য বছরের পর বছর মুখ বুজে অপমান সহ্য করে ভুবনব্রতবাবু আর তাঁর স্ত্রীর খেলনা হয়ে ছিল বেচারা মা। সব কষ্ট, সব দুঃখ সহ্য করে পড়েছিল যাতে পরাগব্রত সুখী হয়। এমনকি নিজের নাম, ছেলেকে যে নাম দিয়েছিল, সে নাম — সবই জলাঞ্জলি দিয়েছিল। তাই যখন বুকে পর পর ফোঁড়া হয়ে সে ব্যাধি ছড়িয়ে পড়ছে, তখন আর কাউকে কিছু বলেনি। পরাগব্রত আজ বোঝে কেন ওর মা বেশ্যা ছিল না। কেন, কিসের তাগিদে দিনের পর দিন নিজের বিছানায় আশ্রয় দিয়েছিল নারীশরীরলোলুপ পরপুরুষকে। তার জন্য ও মা-কে আর দোষ দেয় না। দোষ দেয় মা’র ভাগ্যকে, আর ভুবনব্রত আর তাঁর মৃতা স্ত্রীকে, যিনি ধরাধাম ত্যাগ করেছেন বছর পাঁচেক আগেই।

ওপরের ঘরে অসুস্থ ভুবনব্রত জানেনও না, ওঁর জীবনসঙ্গিনী এবং শয্যাসঙ্গিনী দুজনেরই জীবনাবসান হয়েছে। বলা হয়নি। বললেও তিনি বুঝবেন না। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকবেন। পর পর স্ট্রোকে ভুবনব্রত আজ জীবন্মৃত।

হাতের গ্লাসটা তুলে দীপব্রত দেখাল।

নে।”

মাথা নাড়ল পরাগব্রত। ইচ্ছে করছে না। আজ ওর জীবনের সব হিসেবগুলো উলটে পালটে গেছে। গত কয়েক মাসে মায়ের মৃত্যুশয্যায় মায়ের সঙ্গে অনেকটা করে সময় কাটিয়েছে পরাগব্রত। সেই ছোটোবেলার পরে এই প্রথম। ধীরে ধীরে জানতে পেরেছে, কী অসহ্য যন্ত্রণায় এত বছর কাটিয়েছে ওর মা। সেই প্রথম থেকে, বাবাকে হারানো, অত বড়ো স্টেশনে আতঙ্কের হাহাকার, তারপরে হঠাৎ দেবদূতের মতো বড়োমার আগমন, বাড়িতে নিয়ে আসা… এবং কিছুদিন পরে, রইয়ে সইয়ে, আস্তে ধীরে এখানে নিয়ে আসার আসল কারণটা বলা। “তোমার ছেলে আমার ছেলের সঙ্গে আমার ছেলের মতো বড়ো হবে। তুমিও এখানে আমার মতো থাকো… এটা আমার মিনতি, তোমার নামটা ভুলো না… না বোলো না...” মা’র পায়ে পড়েছিলেন বড়োমা। যেটা বলেননি, কিন্তু বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, তা হলো এই, যে এ আশ্রয় আর পরাগব্রতর সব ভালোর দায়িত্ব তাঁরা নেবেন না, যদি না মা রাজি হয়। মা ভয় পেয়েছিল এই অচেনা বিশাল শহরে কী করে দিন কাটবে, কী করে ছেলেকে নিয়ে থাকবে…

প্রায় আট মাস মায়ের কথার শেষ ছিল না। পরাগব্রতর ছোটোবেলার কথা, নিজের ছোটোবেলার কথা, বিয়ের গল্প, শ্বশুরবাড়িতে আসা, এবং, সব শেষে, সেই ভয়াবহ সিদ্ধান্ত — শহরে চলে আসার। এত কথার পরে শেষ তিন দিন মায়ের জ্ঞান ছিল না। পরাগব্রত প্রায় সারা দিনই তখন বসে থাকত মায়ের পাশে। শেষ দিন মা হঠাৎ চোখ খুলে বলেছিল, “তুই যাতে ভালো একটা জীবন পাস, তাই এখানে পড়ে ছিলাম। এই জীবনটা নষ্ট করিস না। কথা দে...”

জবাব দেবার আগে মায়ের চোখ বুজেছিল। আর জ্ঞান ফেরেনি। দুপুরে শরীরটা নিথর হয়ে গেছিল।

বসার ঘরে সোফায় বসে পরাগব্রত মনে করার চেষ্টা করল মায়ের জীবনটা। শুরুটা তো ওর অজানা ছিল, আর নতুন শুরুটাও ভুলে গেছিল প্রায়। বহু বছর পরে বাবার কথাও মনে হলো। কোথায় গেছিল ট্রেনে? মা-ও ভালো করে জানে না। একটা হইচই হয়েছিল, বাবা নাকি দেখতে গেছিল। মা বারণ করেছিল… বলেছিল, এই আসছি। সত্যি ডাকাত পড়েছিল? পড়লেও, বাবাকে ওরা কী করেছিল? মেরে ফেলেছিল? ট্রেন থেকে ফেলে দিয়েছিল? কেনই বা? ওর বাবা কি ডাকাতদের সঙ্গে লড়তে গেছিল? কিছুই জানে না ও। কোনও দিন জানবেও না।

দেখতে দেখতে দু’ভাইয়ের জীবন ফিরে গেল আগের ছন্দে। বহু বছর হয়ে গেল, পরাগব্রত দিনের বেশ কিছুটা সময় দিত অসুস্থ বড়োমাকে, তারপরে নিজের মা-কে। একাই। দীপব্রত অসুখ, সেবা এসবের ধার দিয়ে যায় না। বলে ওর অস্বস্তি হয়। সেই সময়টায় আজকাল ওর কিছু করার থাকে না। বসে বসে ভাবতে পারে। বাড়িতে আর কেউ নেই এখন। দুই ছেলের একজনেরও বিয়ে দেননি তিনজন বাবা-মা! সময় পাননি। ভুবনব্রত অবশ্য যাননি এখনও, কিন্তু এ থাকা কেমনই বা থাকা? মনে হলো, কোনও দিন কাছে গিয়ে দেখেনি ভুবনব্রত কেমন আছেন, কী করছেন। ওই ঘরে, দুজন নার্স-এর হাতেই থাকেন। দীপব্রত বা পরাগব্রত কোনও দিন ঢুকেও দেখে না। পরাগব্রতর ঘেন্না হয়। দীপ-ও বাবাকে ভালোবাসে না। লোকটা কোনও দিন সত্যিকারের বাবা হয়নি। ঠারেঠোরে, এর ওর কাছ থেকে শুনে যতটুকু বুঝেছিল, শরীরী ছাড়া কোনও নারীর সঙ্গে কোনও সম্পর্কই করেননি উনি। যে কারণেই হোক, স্ত্রীর পক্ষে সঙ্গম করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়াল যখন, মন দিয়েছিলেন বাইরে। সেজন্যই অত সহজে পরাগব্রত আর ওর মা-কে স্থান দিয়েছিলেন বড়োমা। সবটাই নিজের চোখের সামনে রাখার জন্য।

এই লোকটাকে ছাড়া ওর জীবনটা কোথায় যেতে পারত, যেমন জানে পরাগব্রত, তেমনই ওর জন্য ওর মায়ের জীবন কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছিল, তা-ও আজ জানে। বোঝে, মা-কে কেন মাঝে মাঝেই ডাক্তার দেখাতে যেতে হত সারা দিনের জন্য। কেন, সেরকম কোনও অসুবিধে ছাড়াই, মা-কে অপারেশন করতে হয়েছিল। বড়োমা মা-কে বলতেন, “করিয়ে নাও। অনেক সুবিধা। না হলে বার বার...” তখন কথাগুলো বুঝত না পরাগব্রত। আজ বোঝে, কিসের সুবিধা চেয়েছিলেন বড়োমা।

সেদিন সকালে পরাগব্রত গিয়ে ভুবনব্রতর ঘরে ঢুকল। পারতপক্ষে যে ছেলেরা আসে না, তাদের একজন হঠাৎ দরজা খুলে ঢুকল দেখে নার্স চমকে উঠে দাঁড়াল। খবরের কাগজ নামিয়ে রেখে এসে দাঁড়াল বিছানার পাশে। ফ্যালফ্যালে দৃষ্টিতে চেয়ে রয়েছে ভুবনব্রত। পরাগব্রত জানে কথা বলে লাভ হবে না। হয়ত বুড়োর কোনও হুঁশ-ই নেই।

বেডসাইড টেবিলে ওষুধের কৌটোগুলো কয়েকটা তুলে দেখল, পাশে দেওয়ালে পেরেকে ঝুলছে একটা ক্লিপবোর্ড, তাতে ওষুধের চার্ট, খাদ্যতালিকা। খুলে নিয়ে সবকটা পাতা-ই উলটে দেখল। তারপরে কোনও কথা না বলে বেরিয়ে গেল।

সেদিন থেকে প্রায়ই সকালে হঠাৎ হঠাৎ ভুবনব্রতর ঘরে ঢুকত পরাগব্রত। কোনও কথা বলত না, শুধু চারিদিক দেখেশুনে চলে যেত। আস্তে আস্তে ওর যাওয়া দৈনিক হয়ে দাঁড়াল, নার্স-ও ওর আসা-যাওয়ায় অভ্যস্ত হতে শুরু করল। তারপরে একদিন সকালে সাহস করে বললও, “আজ খেতে চাইছেন না কিছু...”

এটা খবর না। ভুবনব্রতবাবু সপ্তাহে দু’তিন দিন খেতে চান না। এত দিন কেউ সে খবর ছেলেদের দেবার প্রয়োজন বোধ করেনি, কিন্তু রোজ যে মালিক আসছেন, তাকে কিছু একটা তো বলতে হয়।

বেরিয়ে যেতে যেতে একবার ঘুরে তাকাল পরাগব্রত। এতদিন নার্সের অস্তিত্বর কথা খেয়াল হয়নি তা নয়, কিন্তু আজ নার্সকে প্রথম ভালো করে দেখল। তাকিয়ে দেখার মতো কিছু না, কিন্তু তবু, অভ্যাসমতো পরাগব্রতর তলপেট শিরশির করে উঠল। কিন্তু না, এখানে এই কাজে আসেনি। ভুবনব্রতর ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করা-ই পরাগব্রতর একমাত্র উদ্দেশ্য। তা ছাড়া দু’ভাইয়ের মধ্যে শুরু থেকে এই বোঝাপড়া রয়েছে যে কখনও কোনও মেয়ে বা মহিলা-কে একা ভোগ করবে না। দীপব্রতর ঘুম ভাঙতে এখনও দু’ঘণ্টা বাকি। পরাগব্রত যে ভুবনব্রতর ঘরে রোজ আসছে, সেটা দীপব্রতকে জানানোর কোনও দরকার মনে করে না এখনই। হয়ত কখনই নয়।

পরাগব্রতর প্রধান উদ্দেশ্য ভুবনব্রতর ওষুধের নামগুলো জানা। তারপরে জানা, কোন ওষুধটা কেমন দেখতে। তারপরে প্রয়োজনের কাজ প্রয়োজনে…

পরদিন থেকে সকালের প্রায় দশ মিনিট সময় পরাগব্রত আর ভুবনব্রতর বিছানার পাশ থেকে নড়ত না। ওখানে দাঁড়িয়েই নার্সকে নির্দেশ দিত। “মেডিসিন আর ডায়েট চার্টটা...” নার্স নিয়ে আসত দেওয়ালের পেরেক থেকে খুলে। আস্তে আস্তে সাহস করে বুঝিয়ে দিত, কোনটার কী অর্থ। কতটা লিকুইড খেয়েছেন, কতটা সলিড, কতটা ইউরিন হয়েছে… মন দিয়ে শোনার ভান করত পরাগব্রত।

বেশ কিছুদিন দেখেশুনে বুঝল ভিটামিন-টাই সবচেয়ে ভালো। যে কারণেই হোক, ডাঃ সোম ওষুধটা বাড়িয়ে দিনে একবারের জায়গায় দু’বার থেকে তিনবার করেছেন গত দু’টো ভিজিটে। হয়ত এই কারণেই, যে কিছু করার নেই, অথচ পরাগব্রত আর দীপব্রতর মতো শাঁসালো খদ্দেরকে খুশিও করতে হবে। কিন্তু এটাই পরাগব্রতর সুযোগ।

কাজের জন্য বেরিয়ে ফোন করল ইয়াসিনকে। ইয়াসিন ওর অনেক দিনের স্যাঙাত। দীপব্রতর সঙ্গে ঝামেলা হবার পরেও পরাগব্রত ওকে হাতছাড়া করেনি। কাজেও লাগিয়েছে অনেক। আজও যেমন। ইয়াসিন তৈরিই ছিল। রাস্তার ধারের চায়ের দোকানেই বসে। বিড়ি খাচ্ছে। ওকে একটা ছোট্ট প্যাকেট দিল। বলল যে সামান্য কয়েক দানা ক্রিস্টাল ওতে রয়েছে, তার সবটা দিয়ে জনা দশেক লোককে মারা যাবে। সোজা ওষুধ ম্যানুফ্যাকচারারের কারখানা থেকে জোগাড় করা। ইয়াসিনকে ওর প্রাপ্য টাকা দিয়ে পরাগব্রত ফিরল। নিচের তলার বাইরের অফিস ঘরে দীপব্রত — এখনও দুপুরের খাবার সময় হয়নি। সঙ্গে কে? নার্স? দিনের নার্সকে পরাগব্রত ভালো করে চেনে না। ও সকালে যখন যায়, তখন রাতের নার্সের সঙ্গেই দেখা হয়।

এই তো, তুই এসে গেছিস...” দীপব্রতর গলায় স্বস্তি। “দেখ না, কী বলছেন উনি...”

সাড়া দিচ্ছেন না। সাড়া-টা কবে দেন, ভুবনব্রত? “চলুন...”

দুজনে সিঁড়ি দিয়ে উঠল। দীপব্রত নিশ্চিন্ত, ওকে যেতে হলো না। ও দাঁড়িয়ে রইল অফিসঘরের ভেতরের দরজায়।

পরাগব্রত তেমন কিছু তফাৎ বুঝল না। যেমন ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকার, তেমনই চেয়ে রয়েছেন। পায়ের কাছে দাঁড়িয়ে ভালো করে নজর করে মনে হলো, যেমন নিঃশ্বাস পড়ত তেমনই পড়ছে। কেন ডাকল নার্স?

নার্স মাথা নাড়ল। এই সময় এর চেয়ে বেশি চনমনে থাকেন। হয়ত। পরাগব্রত নিচে নামতে নামতে ফোন করে ডাঃ সোমকে বলল, এখুনি আসতে। তারপরে সে খবরটা দীপব্রতকে বলে, সকালের কাজ কী কী হয়েছে রিপোর্ট দিয়ে নিজের ঘরে গেল।

আলমারির মধ্যে লুকোনো দেরাজটা খুলে ভেতরে ছোট্ট প্যাকেটটা রেখে দিয়ে আবার আলমারি বন্ধ করে বাইরে এল। ডাক্তারবাবু ঢুকছেন। উনি জানেন দীপব্রত বা পরাগব্রত কেউই ভুবনব্রতর ঘরে যায় না। তাই ওদের জন্য না দাঁড়িয়েই সিঁড়ি দিয়ে উঠে গেলেন। ফিরে এলেন মিনিট কুড়ি বাদে।

ইনজেকশন দিলাম একটা। কেমন থাকেন জানাবেন।”

দুপুরের খাবার পর দু’জনেরই ঘুমোনো অভ্যেস হয়েছে। আজ পরাগব্রত ঘুমোল না। অপেক্ষা করল মিনিট কুড়ি। তারপরে আস্তে আস্তে দীপব্রতর ঘরের দরজায় দুটো টোকা মেরে সাড়া না পেয়ে আস্তে করে দরজা খুলে দেখল ঘুমিয়ে পড়েছে। এ-বাড়িতে দরজার ছিটকিনি এঁটে ঘুমোন’র দস্তুর নেই। বাড়ি ভর্তি অসুস্থ মানুষ, কখন দরকার হয়… কিন্তু আজ পরাগব্রত নিজের দরজা বন্ধ করবে।

নিঃশব্দে সিঁড়ি উঠে ভুবনব্রতর ঘরের দরজা খুলে ঢুকল। নার্স বসেছিল বিছানার পাশে। ওকে দেখে উঠে দাঁড়াল। পরাগব্রতর প্রশ্নের উত্তরে বলল যে ইনজেকশন দেবার পরে আগের মতো এখনও হননি, কিন্তু আগের চেয়ে ভালো আছেন। তাহলে ওপর থেকেও হঠাৎ ডাক পড়ার সম্ভাবনা কম। নিশ্চিন্ত হয়ে নিচে এসে পরাগব্রত দরজায় ছিটকিনি এঁটে টেবিলে বসল। টেবিলের ওপরে প্রথমে চাদর, তারপরে ট্রে, তাতে ওর সব সরঞ্জাম। ছোট্ট কানাতোলা থালা, এক শিশি ভিটামিন… প্রথমে গোটা কুড়ি পঁচিশ ক্যাপসুল বের করে রাখল। ওপরের ঘরের শিশিতে আজ মোটামুটি এতগুলোই দেখেছে। দু’হাতে গ্লাভস পরে সাবধানে দু’রঙা ক্যাপসুলের দুটো অর্ধেক আলগা করে খুলে ফেলল। সাবধানতার কারণ দুটো। একটা হলো হঠাৎ ছিটকে খুলে এলে ক্যাপসুলের ভেতরের ওষুধ চারিদিকে ছড়িয়ে যাবে। সেটা বড়ো কথা নয়। ওষুধ পড়ে গেলে কিছু হবে না। পরাগব্রতর প্ল্যান কাজ করলে এটাই হবে ভুবনব্রতর শেষ ওষুধ। কিন্তু পরে ঘর সাফ করতে এসে যে ঝাড়ু দেয়, সে যেন কোনও ওষুধ জাতীয় কিছুর অবশেষ না দেখতে পায়। কার পাওয়ার অফ অবজার্ভেশন কত, তা পরাগব্রত জানে না, কিন্তু সে নিয়ে কোনও ঝুঁকি নিতে ও রাজি নয়।

তার থেকেও বড়ো কথা, এ ক’দিনে বার বার আর একটা শিশির ক্যাপসুল নিয়ে খুলে খুলে ও দেখেছে, সামান্য চাপ পড়লেই ক্যাপসুল দুমড়ে যায়। একবার দুমড়োলে আর সেটা আগের মতো সমান করার কোনও রাস্তাই খুঁজে পায়নি। নার্সের যদি খটকা লাগে, যে একটা ক্যাপসুল দুমড়োন’ — সে যদি ওষুধটা না দেয়?

প্রায় একশো ক্যাপসুলের ওপর হাত পাকানো পরাগব্রতর ক্যাপসুল খুলে দুটো আধা আলাদা করতে সময় লাগল মিনিট দুয়েকের বেশি। দুটো অর্ধেক ক্যাপসুল কানা উঁচু ছোট্ট থালাটার ধারে খাড়া করে রেখে একটু সময় নিল হাত আর কপালের ঘাম মুছতে। এ-সি চলা সত্ত্বেও ঘেমে গেছে এইটুকু কাজ করতে। কিন্তু কাজটা হয়েছে সরেস। ক্যাপসুলের দুটো অর্ধেক একেবারে অক্ষত।

মিনিট কয়েক পর আবার চেয়ারে বসে সাবধানে ইয়াসিনের দেওয়া প্যাকেটটা খুলল। খুবই সামান্য কয়েকটা দানা। আর কিছু একেবারে পাউডারের মতো গুঁড়ো। ইয়াসিনের নির্দেশমতো চোখে একটা আতস কাচ লাগিয়ে নিল। ঘড়ির দোকানে যারা কাজ করে, তারা এরকম ছোট্ট টেলিসকোপের মতো দেখতে আতস কাচ লাগায় চোখে। নামটাও শিখে নিয়েছে পরাগব্রত। ল্যুপ। চোখে লাগান’মাত্র সামনের দানাগুলো বড়ো হয়ে ক্রিস্টাল হয়ে গেল। একটা সরু চিমটে দিয়ে সাবধানে পরাগব্রত দানাগুলো আলাদা করল, পড়ে রইল পাউডারটা। ইয়াসিন বলেছিল, এতে দশজনের মৃত্যু হতে পারে। তার মানে দশভাগের একভাগই যথেষ্ট। চোখের আন্দাজে বুঝল, দুটো দানা ক্রিস্টালেই কাজ হওয়া উচিত। চিমটে দিয়ে আলতো করে ধরে দুটো দানা ফেলে দিল ক্যাপসুলের মধ্যে। তারপরে চিমটে দিয়েই আরও সামান্য কিছু গুঁড়ো দিল তার সঙ্গে। সাবধানের মার নেই, কিন্তু অতিরিক্ত দিলে যদি এমন লক্ষণ দেখা যায় যা থেকে ডাক্তারের সন্দেহ হবে? সেটা খুব বিপজ্জনক।

প্রথমে চিমটেটা ভালো করে স্পিরিট দিয়ে ধুয়ে রাখল। তারপরে অ্যামাজন থেকে কেনা ভেষজ আঠার কৌটো থেকে সরু কাঠির মাথায় একটুখানি আঠা নিয়ে ক্যাপসুলের ভেতর দিকে লাগিয়ে দিল যাতে দুটো অংশ লাগান’র পরে ঢিলে হয়ে খুলে না আসে। দশ মিনিটের অপেক্ষার মধ্যে ইয়াসিনের পুরিয়াটা আবার ভাঁজ করে, দুটো প্লাস্টিকের পাতার মধ্যে শক্ত করে আঠা দিয়ে বন্দী করে সরু প্যাকেটটা চালান করল ওর ঘরের প্রাচীন ড্রেসিং টেবিলের আয়না আর তার পেছনের কাঠের ফাঁকে। আদ্যিকালের তৈরি — ফাঁকটা অতি সামান্য। স্কুলের সময়কার লোহার স্কেলটা বের করে সেটা দিয়ে ঠেলে ঠেলে ঢোকাতে হলো। এটা আবার পেতে গেলে আয়নাটাকে খুলে ফেলতে হবে। সে পরের কথা। কোনও রকমেই যদি কোনও সন্দেহ হয় কারও, এই পুরিয়াটা ওর ঘরে পেলে আর দেখতে হবে না। ফেলে দিলেই হত, কিন্তু যত টাকা খরচ করতে হয়েছে, সেটা ভেবে আর ফেলতে পারল না।

বাকি সব কিছু ফেলে দিতেই হবে, শুধু আঠার কৌটোটা ছাড়া। ওটা যে এসেছে সেটা দীপব্রত জানে। ওর ধারণা ওটা পরাগব্রতর হেলথ ড্রিঙ্ক। পরাগকে বিলিতি হুইস্কির বোতলটা দেখিয়ে বলেছিল, “এর পরেও আবার হেলথ ড্রিঙ্ক লাগবে?”

ক্যাপসুলটা শিশিতে ভরতে গিয়ে মনে হলো, কালকের আগে এই শিশিটা যদি ঘরে রাখা না যায়, তাহলে তার মধ্যে আরও তিনটে ওষুধ খাওয়ান’ হয়ে যাবে। তাই আরও তিনটে ক্যাপসুল বের করে নিল। তারপরে সাবধানে ওর তৈরি করা ক্যাপসুলটা ফেলে দিল শিশির ভেতর। বাকি ওষুধগুলো, স্পিরিটের শিশি, চিমটে, কানা উঁচু থালা — সবকটা আলাদা আলাদা প্যাকেট করে রেখে দিল ওর কাজের ব্যাগে। বিকেলে যখন বেরোবে, বিভিন্ন জায়গায় আস্তাকুঁড়ে একটা একটা করে ফেলে দেবে। আগামীকালও যদি ঘটনাটা ঘটে, সব খুঁজে মেলানো কঠিন হবে। আর তার কয়েকদিন পরে হলে তো কথাই নেই।

পরদিন সকালে নিয়মমতো পরাগব্রত দোতলায় ভুবনব্রতর ঘরে যখন ঢুকল, তখন ভুবনব্রত নিয়মমতো নিশ্চল, ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে আছেন। নিয়মমতো সিস্টার উঠে দাঁড়াল, পরাগব্রত খাটের চারিদিকে ঘুরল, ভুবনব্রতর মাথার কাছে এসে দাঁড়িয়ে বলল, “চার্টগুলো?”

সিস্টার যখন চার্টের ক্লিপ-বোর্ডটা নিয়ে এল, তখন পরাগব্রত রোজের মতো একটা একটা করে ওষুধের শিশি তুলে তুলে দেখছে। অন্যমনস্কভাবে সিস্টারের হাতে ভিটামিনের শিশিটা দিয়ে চার্টগুলো হাতে নিল। সিস্টার শিশিটা হাতে নেওয়া মাত্র পরাগব্রত জানতে চাইল, “কাল বাবার শরীরটা খারাপ করেছিল, দুপুরবেলা ডাঃ সোম এসে ইনজেকশন দিয়েছিলেন — সেটা এখানে লেখা আছে?” সিস্টারের আর তক্ষুনি ওষুধের শিশি ফেরত রাখা হলো না, পরাগব্রতর পাশে এসে বোঝাতে শুরু করল আগের দিনের ঘটনাবলী।

বেডসাইড টেবিলের ওপর থেকে কিছু তুলে সেটা সিস্টারের হাতে দিয়ে দেবার অভ্যেসটাও কয়েক সপ্তাহ হলো চালু করেছে পরাগব্রত। দিনে তিনবার ভিটামিনের ক্যাপসুল খাওয়ানোর দায়িত্ব দুজন নার্সেরই। তার মধ্যে রাতের —অর্থাৎ এই নার্স — খাওয়ায় রাতের ডোজ, আর সকালের ডোজ। দিনের নার্সের দায়িত্ব দুপুরের ডোজ খাওয়ানোর। সকালের ওষুধ খাওয়ান’ হয়ে গেছে। আজই দুপুরে যদি ঘটনাটা ঘটে, আর ডাক্তারবাবুর যদি সন্দেহ হয়, যদি পুলিশ কেস হয়, যদি পুলিশেরও সন্দেহ হয়, যদি সব ওষুধের শিশির আঙুলের ছাপ পরীক্ষা করে, তাহলে এই শিশিতে কেবল পরাগব্রত আর দিনের সিস্টারের আঙুলের ছাপ থাকলে খটকা লাগতেই পারে পুলিশের। তাই রাতের সিস্টারের হাতে ওষুধের শিশিটা একটু বেশিক্ষণ রাখার এই ব্যবস্থা করেছে পরাগব্রত। এর পরে দুপুরে তো দিনের সিস্টার ওষুধ খাইয়ে নিজের আঙুলের ছাপ শিশিতে লাগাবেই।

অবশ্য সে দিন হলো না ব্যাপারটা। পরদিনও না। তার পরদিনও না। পরাগব্রতর একটু সন্দেহ হতে শুরু করল। ক্যাপসুলটা তো ওপরেই ফেলেছিল, যাতে চট করে বেরিয়ে আসে। তাহলে? অবশ্য শিশি কাত করলে ওপরের ওষুধটাই বেরোবে এমন তো মাথার দিব্যি নেই। আর একবার যদি ওপরের ওষুধ না বেরোয়, তাহলে যেটা ওপরে ছিল, সেটা আর ওপরে না-ও থাকতে পারে… কতদিন লাগতে পারে বেরোতে…

যতই হোক, সত্তর-পঁচাত্তরটা ওষুধ দিনে তিনটে করে খরচ হলে এক মাসও লাগবে না…

লাগল আট দিন। রবিবার ছিল। পরাগব্রত আর দীপব্রত সবে দুপুরের খাবার খেতে বসেছে, এমন সময় ডাকতে ডাকতে ঘর থেকে বেরিয়ে এল দিনের নার্স। পরাগব্রতর প্রথম কথা মনে হলো, তাহলে দিনের বেলাই হলো?

দুজনে খাওয়া ফেলে হাত ধুয়ে সিঁড়ি বেয়ে উঠতে উঠতেই পরাগব্রত ডাঃ সোমকে ফোন করতে শুরু করেছিল। কিন্তু একই সঙ্গে বার বার ফোন বাজার আগেই কেটে দিয়ে ডাঃ সোমের ফোন ‘আউট অফ সার্ভিস এরিয়া’, বা ‘নট রিচেব্ল্‌’ — বলছিল দীপব্রতকে। দীপব্রত এরকম পরিস্থিতিতে কখনওই মাথা ঠাণ্ডা করে ভাবতে পারে না। ওর ফোন থেকেও যে চেষ্টা করা যেতে পারে, সেটা ও ভাবেইনি। স্থির হয়ে দরজার কাছেই দাঁড়িয়ে ছিল। শেষে যখন ভূবরব্রত হেঁচকি উঠতে উঠতে নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছে, তখন ফোনটা সত্যিই করল পরাগব্রত। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ধরলেন ডাঃ সোম।

ডাক্তারবাবু, আপনি শিগগির আসুন… বাবা বোধহয়...” কথাটা শেষ করতে পারল না পরাগব্রত।


~তিন~

যখন কোনও সমস্যা ছাড়া সবটাই মিটে গেল, পরাগব্রতর একটু হতাশই লাগল, অত সাবধানতার জন্য। ডাঃ সোম একবারের জন্যেও ভাবলেন না ভুবনব্রতর মৃত্যুতে কোনও সন্দেহের অবকাশ আছে। ডেথ সার্টিফিকেটে স্বাভাবিক মৃত্যুর ডাক্তারি কারণ লিখে দিলেন। ফলে বাকি সবকিছু নির্বিঘ্নে হয়ে গেল। দুজনেই মুখাগ্নি করল। ইলেকট্রিক চুল্লির দরজাটা বন্ধ হবার সময় পরাগব্রত নিঃশব্দে বলল, “যা, শালা হারামি। মনে রাখিস, মেরে বাঁচিয়ে দিলাম। আমার মায়ের জীবনটা ছারখার করেছিস, এখন নিজে পুড়ে শেষ হ’।”

ভুবনব্রত যাবার পর থেকেই আস্তে আস্তে যেন সব বদলাতে শুরু করল। মাস দুয়েকের মাথায় দীপব্রত একদিন বলল, “ওপরতলাটা খালি পড়ে আছে। আমরা ওপরেই শুতে পারি তো? আমি বাবার ঘরটা নেব — তুই ছোটোমার ঘরটা নে?”

একটু ভেবে পরাগব্রত বলল, “আমি থাকি নিচে?”

দীপব্রতর রাজি হতে এক মিনিট-ও লাগল না। দুজনে ঠিক করল, ওপরতলার ঘরগুলো দীপব্রত ব্যবহার করবে। নিচে যেমন অফিস, খাবার ঘর, বসার ঘর আছে, তেমনই থাকবে। বাকি দুটো ঘর ব্যবহার করবে পরাগব্রত। সংখ্যায় ঘর দীপব্রতর বেশি — এ কথায় পরাগব্রত হেসে বলেছিল, “এত বছর একটাই তো ঘরে আছি। কই দুটো তো লাগেনি।”

পরাগব্রত বলল বটে, কিন্তু বুঝেছিল, দীপব্রত আসলে বাবার বাড়ির আশি শতাংশ নিজের দখলে নিয়ে নিল।

দ্বিতীয় পরিবর্তনটা হলো মাস ছয়েক পরে। দীপব্রত সকালে খেতে বসে জানাল যে গত ছ’মাস ধরে তন্নতন্ন করে খুঁজেও ভুবনব্রতর কোনও উইল পায়নি।

উইল থাকার কথা ছিল? পরাগব্রত এসব কথা ভাবেনি কখনও। দীপব্রত বলে চলল যে উকিলের সঙ্গে কথা বলে বুঝেছে, যে ভুবনব্রত মারা গিয়েছে যাকে আইনত বলে ইন্‌টেস্টেট, সেই দশায়। এই অবস্থায় জীবিত ওয়ারিশরা সমস্ত সম্পত্তির সমান সমান ভাগ পায়।

সম্পত্তি কী, জানতে চাস না?” পরাগব্রতর তরফে কোনও উচ্চবাচ্য নেই বলে জানতে চাইল দীপব্রত।

মাথা নাড়ল পরাগব্রত। জানতে চায় না। পেটে ভাত আছে, মাথার ওপর ছাদ আছে, হাতে কাজ আছে — এর পর আর কী জানতে চাইবে?

উত্তরটা পছন্দ হলো না দীপব্রতর। বলল — জানতে হবে। নইলে হঠাৎ দীপব্রতর যদি কিছু হয়, তাহলে সামলাতে পারবে না। “জানিস ভালো করেই, কী রকম সব লোকের আনাগোনা আমাদের জীবনে।”

অফিসে গিয়ে কাগজপত্র খুলে দেখিয়ে দিয়েছিল, ভুবনব্রতর নানা বেনামী ঐশ্বর্যের কথা — তার কিছু জমি, কিছু বাড়ি, আর বাকি সবই জহরতে।

সব তোর কাছেই থাক,” বলে ব্যাপারটা শেষ করতে চাইল পরাগব্রত, কিন্তু শুনতে চাইল না দীপব্রত। তখনই বসে বসে সবটা ভাগ করার একটা হিসেব দেখিয়ে ওকে বলল, এটা উকিল মিঃ প্রামাণিকের তৈরি। সেদিনই দুপুরে গিয়ে দলিল সই হবে। আর সেই সঙ্গে দু’জনেই দু’জনের নামে উইল করবে — যে আগে যাবে, সে অন্যকে সব লিখে দেবে। উকিলবাবুর মতে সেটাই উচিত কাজ হবে। শুধু তাই নয়, এতদিন ভুবনবাবু বেঁচে ছিলেন বলে এই সিদ্ধান্ত দীপব্রত নিতে পারেনি, কিন্তু এখন থেকে মাসে মাসে ওদের সব কাজের যা লাভ, সেটাও দু-ভাগে ভাগ হবে। এটার অবশ্য কোনও দলিল হতে পারবে না, কারণ ওদের রোজগার তো প্রায় সবটাই দু’নম্বরী এবং কালো-টাকায়।

সিন্দুক খুলে অনেকগুলো বাণ্ডিল নোট ওর সামনে রেখে দীপব্রত বলল, “এটা গত ছ’মাসের।”

পরাগব্রত দ্বিরুক্তি না করে নোটগুলো নিয়ে নিজের ঘরে গেল বটে, কিন্তু সেদিন দুপুরে, উকিলের অফিসে বসে সব দলিলে আর উইলে সই করতে করতে বুঝল, যে দীপব্রত ওকে মাইনে করা কাজের লোকের পর্যায়ে নামিয়ে দিল। সেই সঙ্গে ওর জীবনের দামও কমে গেল অনেক। যে কোনও দিন ওকে সরিয়ে দিয়ে দীপব্রত সবকিছুর একছত্র মালিক হয়ে বসবে।

পরাগব্রতর সাবধানতা খরতর হয়ে উঠল। খেতে বসে পাতে সরাসরি খাবার নিতে আরম্ভ করল। কাজের লোক সুব্রত আর রাঁধুনি জবাকে বলে দিল, ওর জন্য যেন বাটিতে কিছুই না তোলে। অবাক হলো দীপব্রত — কিন্তু আপত্তি করল না। বহুদিন পরে পুরোনো সার্ভিং ডিশ আর বোল বেরোল আলমারি থেকে। চাল, ডাল তরকারি সব ওতেই এনে টেবিলে রাখা শুরু হলো। ওরা নিজেরাই নিয়ে নেয়। রুটি, পরোটা, ভাজা — যেগুলো একসঙ্গে রাখা থাকে, সেগুলো যখন প্লেট থেকে তুলতে হয়, তখন পরাগব্রতই আগে নেয়। কবে ওপরেরটা তুলবে, কবে নিচেরটা, কবে মাঝ থেকে খপ করে কোনও একটা — তার ঠিক থাকে না। যাতে দীপব্রত বুঝতে না পারে কোনটাতে কিছু মেশাবে।

সেই সঙ্গে প্রতি মাসে পাওয়া টাকার সদ্ব্যবহারও শুরু করে দিল পরাগব্রত। দীপব্রত যাতে হঠাৎ কিছু করে ফেললেও কিচ্ছু না পায়, এবং পরাগব্রত যখন সব কাজটা শেষ করবে, তখন যাতে হাতে এমন কিছু থাকে যা থেকে সবটা আবার নতুন করে শুরু করা যায়।

পরাগব্রতর কিছু সন্দেহ মিলে যেতে শুরু করল। দীপব্রত ওর সব কাজে পরাগব্রতকে ডাকে না। আজকাল নানা লোক ওর কাছে আসে — যাদের পরাগব্রত চেনে না। চেহারায়, পোশাকে এতদিন যারা আসত তাঁদের চেয়ে দেখতে সম্ভ্রান্ত, কিন্তু তা-বলে ভদ্রলোক না। হাবভাবে বোঝা যায় তারা আগের লোকেদের মতোই অমার্জিত, অপরাধপ্রবণ — শুধু পয়সাকড়ি বেশি।

কিসের ব্যবসা করে দীপব্রত এদের সঙ্গে? কেন তা থেকে পরাগব্রত বাদ? বোঝা যায় না। এমনিতে দীপব্রতর আচারে আচরণে, গল্পে আড্ডায়, পরাগব্রতর সঙ্গে ওর সম্পর্কের যে একটা পরিবর্তন হয়েছে বোঝা যায় না। কিন্তু ফল্গুধারাটা পরাগব্রত বুঝতে পারে। কিছু বলে না। চুপচাপ নিজের বুদ্ধি শানিয়ে যায়।

পরের ধাপটা এল যখন একদিন দীপব্রত পরাগব্রতকে “একটু আসছি,” বলে বেরিয়ে গেল। দু’জনে এতদিন কখনওই আলাদা বেরোত না, এক যদি না দীপব্রতকে পরাগব্রত কাজে কোথাও যেতে বলত। আড্ডা, ক্লাব, মদের ঠেক, মেয়েমানুষ — সবই দুজনের একই ছিল। এবং শুধু একদিন না, প্রায়ই দীপব্রত সন্ধেবেলা গাড়ি নিয়ে কোথাও চলে যাওয়া আরম্ভ করল। বাড়িটাকে আধা অন্ধকারে আবৃত করে পরাগব্রত কখনও মদের গেলাস হাতে, কখনও বা গেলাস ছাড়াই চুপ করে বসে ভাবত, অতঃ কিম?


~চার~

আজকাল পরাগব্রতর মাথায় প্রায় সারাক্ষণই আগুন জ্বলে। এই অন্ধকার জনমানবহীন দোতলা বাড়িতে একলা বসে মদ খেতে খেতে একটা সবুজ ধানক্ষেতে ছোট্ট গ্রাম দেখতে পায়। কিছুদূরে নদী। সেখানে ছোটো ছেলেদের জলে নেমে হইচই করতে দেখে নিজের হারিয়ে-যাওয়া, না-পাওয়া ছেলেবেলাটার জন্য দুঃখ করে। বেশি মদ খাওয়া হয়ে যায়। দীপব্রতর জন্য অপেক্ষা করা ছেড়ে দিয়েছে অনেক দিনই, কিন্তু একা একা খেতে ভালো লাগে না। বেশিরভাগ দিনই জবা আর সুব্রতর অনুরোধে একটা পাউরুটি বা আটার রুটি কিছু একটা তরকারি দিয়ে গিলে নিয়ে টলতে টলতে বিছানায় যায়। অনেক রাতে। তখনও অবশ্য দীপব্রতর দেখা নেই।

গত দু’মাসে পরাগব্রতর কাজ কমেছে অনেক। কাজ ওর নিজের কখনওই ছিল না, দীপব্রত যা বলত, তা-ই করত। তাই যখন অনেকটাই কম টাকা দিয়ে দীপব্রত বলল, “এ মাসে তো রোজগারের অবস্থা সঙ্গিন...” তখন পরাগব্রত বুঝল, এবারে দীপব্রত নতুন রোজগারের ধান্দা নিয়েছে, যার ভাগ পরাগব্রত আর পাবে না।

সেদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে পরাগব্রত আয়নার দিকে তাকিয়ে চমকে উঠল। এ কী চেহারা হয়েছে? এ তো এক অসুস্থ বৃদ্ধের মুখ ওর দিকে চেয়ে রয়েছে। চুলের ঠিক নেই, চোখের কোলে কালি, গাল ভেঙে গেছে — এক পাঁড় মাতালের চেহারা!

মদ খাওয়া কমিয়ে দিল। শুরু করল পরিমিত আহার। সেই সঙ্গে ব্যয়াম করা, আর চুল আর ত্বকের যত্ন। কেউ যেন বুঝতে না পারে ওর মনে কী আগুন জ্বলছে। আর শুরু করল দীপব্রত কোথায় কী করছে, সে বিষয়ে খোঁজখবর করা। সৌভাগ্যক্রমে, এই ক’মাসে দীপব্রত ওর বহু স্যাঙাতকে দলছাড়া করেছে নানা অজুহাতে। সবচেয়ে বেশি দিয়েছে কাজ না থাকার দোহাই। এদের নিয়ে পরাগব্রত আড়ালে কাজ শুরু করল। অনেককে আস্তে আস্তে স্বাবলম্বী করে দিতে পারল। তারা অনেকেই আজ ওর প্রতি অনুগত। তাদের কাজে লাগান’ শুরু করল পরাগব্রত। আস্তে আস্তে তৈরি হতে শুরু হলো দীপব্রতর সম্বন্ধে তথ্যের ভাণ্ডার।

দীপব্রতর সঙ্গে আজকাল সন্ধের পরে প্রায় দেখাই হয় না। সকালেও পরাগব্রত খাওয়া-দাওয়া শেষ করে নিজের কাজে লেগে যাওয়ার পরেই দীপব্রত নামে ব্রেকফাস্ট খেতে। দুপুরে তবুও মাঝে মাঝে দুজনে খেতে বসে একসঙ্গে। দীপব্রত আজকাল একটু একটু করে ওকে কাজ বেশি দিচ্ছে আবার। কিন্তু তার ফলে পরাগব্রতকে প্রায় সারা দিনই বাইরে থাকতে হচ্ছে। সন্ধেবেলা ফিরতে ফিরতে অনেক সময়ই এত দেরি হয়, যে দীপব্রত থাকে না।

সেদিন সকালে দীপব্রত খেতে নামল, সঙ্গে একটি মেয়ে। বলল, “ও মিনি…, আর এ আমার ভাই, পরাগব্রত।” পরাগব্রত বাধ্য হলো ভালো করে তাকিয়ে দেখতে। সাধারণত দীপব্রতর নজর থাকে একটু বয়স্কা, ভারিক্কে চেহারার মহিলার দিকে। পরাগব্রতর পছন্দের সঙ্গে ওর পছন্দের জায়গাগুলো যেখানে মেলে না, তার মধ্যে একটা এটা। বস্তুত, একবার দু’বার দীপব্রত ওর পছন্দ নিয়ে ওর পেছনেও লেগেছে শুরুর দিকে। এই সুন্দরী, তন্বী কিশোরীর দিকে তাকিয়ে তাই পরাগব্রত অবাক হয়ে গেল। হলো কী দীপব্রতর? সেই সঙ্গে শুরু হলো উত্তেজনা। দু’জনের মধ্যে অলিখিত শর্তের মতো সেই প্রথম দিন থেকে রয়েছে এই বোঝাপড়া। যে-ই মেয়ে আনুক, তাকে ভোগ করবে দু’জনেই। একসময় ছিল যখন তিনজনেই সবসময় একই সঙ্গে থাকত, কিন্তু সেটা যে আর হয় না, তার কারণ জানা সত্ত্বেও পরাগব্রতর আপত্তি হয়নি কখনও। শুধু এই মেয়েটিকে নিজের বিছানায় নিয়ে গিয়ে কী কী করবে সেটা ভাবতে ভাবতেই খাওয়া শেষ হয়ে গেল। কিন্তু আর কিছু হলো না। টেবিল থেকে উঠে দীপব্রত আর মিনি দুজনেই সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় চলে গেল, খাবার টেবিলে থুম হয়ে বসে রইল পরাগব্রত।

নতুন দুটো পরিবর্তন। প্রথমত, মিনি রয়ে গেল। দ্বিতীয়ত, দীপব্রত তৃতীয় দিনে পরাগকে মনে করিয়ে দিল, “তোর মনে আছে, একসময় আমাকে দাদা বলে ডাকতি?”

মনে ছিল। পরাগব্রত জানতে চাইল, “আবার বলতে হবে?”

হেসে দীপব্রত বলল, “না, তবে মিনি তোর বৌদি। মনে রাখিস।” মিনি আর দীপব্রত দুজনেই ওর দিকে তাকিয়ে। মিনির ঠোঁটের কোণে দুর্জ্ঞেয় হাসির ছোঁয়া।

পরাগব্রতও হাসল। কিছু বলল না। তবে সেদিন থেকে আর সরাসরি মিনির দিকে তাকান’ বন্ধ করে দিল।

দীপব্রতর দৈনন্দিন রুটিন আগের পর্যায়ে ফিরতে দেরি হলো না। কিছুদিনের মধ্যেই আবার সন্ধেবেলা বেরোন’ শুরু হলো। তার কোনও দিন সঙ্গে মিনি যেত, কোনোও দিন থাকত বাড়িতে। পরাগব্রত লক্ষ করল, সেই দিনগুলো মিনি ওর সঙ্গে বেশি কথা বলে। দীপব্রত থাকলে যে প্রায় মৌনী, সে একা পরাগব্রতর সঙ্গে খেতে বসে প্রায় প্রগলভ। পরাগব্রত নিজেকে সামলে রাখত। এখনও ওর সব প্ল্যান তৈরি হয়নি। কোথাও কিছু ভুল হবার সুযোগ রাখলে চলবে না।

মিনির মতো কেউ বাড়িতে থাকলে পরাগব্রতর মতো মানুষের পক্ষে সারাক্ষণ নিজেকে সামলান’ সহজ নয়। সেটা বুঝতে পেরে ও দীপব্রত বাড়িতে না থাকলে একা বেরোন’র অভ্যাস তৈরি করে নিল। একা খাবার টেবিলে পেলে মিনি কখনও এ নিয়ে অনুযোগ করলেও পাত্তা দিত না, কিন্তু শেষরক্ষা হলো না।

সেদিন বিকেলে দীপব্রত অভ্যাস মতো বেরিয়ে গেছে, সন্ধে নামার পরে আকাশে কালো মেঘ করে এল, আর কানফাটা একটা বাজ পড়ার সঙ্গে সঙ্গে সারা পাড়া অন্ধকার হয়ে গেল। আধঘণ্টা অপেক্ষা করে পরাগব্রত ইলেক্ট্রিক অফিসে ফোন করে শুনল ট্রানসফরমারে বাজ পড়েছে। সারাতে সময় লাগবে। বাইরে বৃষ্টি নামেনি এখনও। পরাগব্রত একটা হুইস্কি নিয়ে বসার ঘরে বসল। এই সময়ে দোতলাটা ছেড়ে দেবার জন্য ওর একটু খারাপ লাগে। ওপরে থাকলে এখন গাড়ি বারান্দার ওপরে খোলা আকাশের নিচে বসা যেত। অবশ্য গেলে দীপব্রত হয়ত কিছু বলবে না, কিন্তু তা-, পরাগব্রত যাবে না।

এতক্ষণ অন্ধকার কেন? আমার ভীষণ ভয় করছে। আমি এখানে একটু বসি?”

অন্ধকারে নেমে এসেছে মিনি। পরাগব্রত কথা না বলে হাত দিয়ে উলটো দিকের চেয়ারটা দেখিয়ে দিল। মিনি একটা ভদকা চেয়ে নিল। তারপরে সামনে বসে কথা বলতে শুরু করল।

মিনির ধারণা দীপব্রত ওকে মডেলিং-এর কাজ জোগাড় করে দেবে। গরিব মা-বাবার একমাত্র মেয়ে মিনি। গ্রামে বাড়ি। শহরে এসেছিল অনেক স্বপ্ন নিয়ে। এ-হাত থেকে ও-হাত, সে-হাত ঘুরেছে। একমাত্র দীপব্রতই ওকে মডেল হবার সুযোগ করে দেবে বলে ওকে নিজের কাছে এনে রেখেছে। অন্যরা ওর সঙ্গে কয়েকবার শুয়েছে, তারপরে হারিয়ে গেছে ওর জীবন থেকে। অবশ্য দীপব্রত ওকে নিজের করে রেখেছে বটে, কিন্তু ওকে এখনও কোনও সুযোগ দেয়নি। বরং শুয়ে বসে, খেয়ে দেয়ে, ও কেমন মোটা হয়ে যাচ্ছে। এরকম চললে তো আর মডেলিং করার সুযোগ পাবে না।

দীপব্রতর মডেলিং, বা বিজ্ঞাপনের জগতের সঙ্গে কোনও যোগাযোগ নেই। পরাগব্রতর মনে হলো এই মেয়েটা একেবারে ওরই মতো ছিল হয়ত। আজ শহুরে আবহাওয়ায় দুজনেই আবদ্ধ। অথচ থাকা উচিত ছিল গ্রামে। জানতে চাইল গ্রামের নাম কী, মা-বাবা কী করেন। বাবা বাড়িতে থাকেন না। ওখানকার মহকুমা টাউনের মিউনিসিপ্যালিটির কেরানি। ওদের ক্ষমতা নেই মেয়ের খোঁজ করেন। আর তাছাড়া মিনির বয়স উনিশ। এখন ও যা খুশি করতে পারে — মা বাবার অধিকার নেই ওকে আটকানোর।

এতটুকু একটা গ্রামের মেয়ে নিশ্চয়ই এত আইন নিজে শেখেনি? কে শেখাল? নামটাও কি ওর মা-বাবার দেওয়া? না কি পরাগব্রতর মতো নকল? কথা শুনতে শুনতে একটা বুদ্ধি এল মাথায়। এটা আগেই মাথায় আসা উচিত ছিল। মিনির জন্য না হলেও, দীপব্রতর জন্য।

অন্ধকার বাদলা সন্ধেয় মিনির অনেক দিনের সাধ পূর্ণ করল পরাগব্রত। প্রথম দিন থেকেই বুঝেছে কোথাও মিনির ওর প্রতি আকর্ষণ আছে। দীপব্রতর কাছে হাতেখড়ি হলেও, পরাগব্রত ওদের দুজনেরই প্রথম শিক্ষিকার কাছে অনেক বেশি শিখেছিল। তাই আজ প্রেমকলায় দীপব্রতর চেয়ে অনেক বেশি কুশলী। মেয়েদের মন আর শরীর দুই-ই জয় করতে পারে সহজে। ঘণ্টা দুয়েক প্রেমপর্বের পরে মিনিকে ওপরে পাঠিয়ে দিল চান করে পোশাক বদলাতে। দীপব্রত ফিরে এসে বুঝতে পারলে পরাগব্রতর যতটা ক্ষতির সম্ভাবনা, মিনির ক্ষতির সম্ভাবনা অনেক বেশি। নিজেও চান করে, পিঠে আর ঘাড়ে মিনির নখ আর দাঁতের ক্ষতচিহ্নে যথাসম্ভব হাত বাড়িয়ে ওষুধ লাগিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যখন খেতে এল, তখন বাইরে বৃষ্টি শেষ হয়েছে, বিদ্যুৎ এসেছে, দীপব্রতও ফিরেছে। সেদিন রাতে দীপব্রত বা মিনি কেউই খেতে এল না। দীপব্রত থাকলে মিনি একা পরাগব্রতর সামনে আসে না। সুব্রত একটা ট্রে-তে খাবার নিয়ে দোতলায় দিয়ে এল।

এতদিন পরাগব্রতর কেবল একটাই উদ্দেশ্য ছিল — কত তাড়াতাড়ি এ-বাড়ি থেকে মুক্তি পাওয়া যায়… কিন্তু পরদিন থেকে আরও একটা কাজ উদ্ধার করতে লেগে গেল উঠে পড়ে। দুটো লোকের মোবাইল ফোন অন্তত কিছুক্ষণের জন্য ওর হাতে চাই। ওর চেনা লোকের কাছ থেকে জেনে এসেছে কোন কোন অ্যাপ্‌ ডাউনলোড করলে ও দুজনের ফোনের লোকেশন এবং কলার লিস্ট পেতে পারবে। এগুলো সহজে পাওয়ার অ্যাপ্‌ নয়। তাই জোগাড় করে নিজের ফোনে রেখেছে, সুযোগমতো ব্লু-টুথ দিয়ে ওদের ফোনে পাঠান’ যাবে। ভেবেছিল তুলনায় দীপব্রতরটা সহজ হবে — ওর সঙ্গেই তো বেশিরভাগ সময় ওঠা-বসা চলা-ফেরা। মিনি-কে কতটুকুই বা একা দেখতে পায় — আজ অবধি তো কেবল এক দিন, ঘণ্টা তিনেক।

কাজটা কিন্তু মিনির ক্ষেত্রেই সহজ হলো। তিন-চার দিন পরেই দীপব্রত আবার একা বেরিয়ে গেল। পরাগব্রত ছিল না বাড়িতে। সন্ধের পরে ফিরে দেখল মিনি একতলার বসারঘরে ওর জন্য অপেক্ষা করছে। আজ নাকি দীপব্রত বলে গেছে ফিরতে অনেক রাত হবে। আজ ওদের মধ্যে প্রেমের বাঁধ ভাঙতে পারে আবার।

সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে দ্বিধা কখনওই ছিল না পরাগব্রতর। আজও তাই। প্রথম থেকেই মিনির ভদকায় খানিকটা করে বেশি দিতে শুরু করল। প্রথম বার এক পেগের একটু বেশি, দ্বিতীয়টায় দেড় পেগ, তৃতীয়টায় দু-পেগের বেশি। এর বেশি মিনি খায় না। তাই এবারে আর নেবে না বলেছিল। বলেছিল, কেন জানি না নেশাটা বেশিই হয়েছে আজ। পরাগব্রত শোনেনি। বলেছিল, এমন সন্ধ্যা হয়ত আর বেশি আসবে না। শেষ একটা নিতে। সেই গ্লাসে প্রায় তিন পেগ ভদকা দিয়ে বেশি করে লেবু আর নুন দিয়ে কোলড ড্রিঙ্ক ঢেলেছিল পরাগব্রত। তারপরে যখন মিনি ঝিমিয়ে পড়েছে, তখন ওর ফোন নিয়ে তাতে ওর দুটো অ্যাপ ঢুকিয়ে চালু করে লুকিয়ে ফেলতে সময় লেগেছে পাঁচ মিনিটের কম। মিনি অবশ্য তারপরে আর কিছু করতে পারেনি — কোনও রকমে ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করেছে। পরাগব্রতর নির্দেশে জবা খাবার নিয়ে গিয়ে ফিরে এসে বলেছিল, “ঘুমাইয়া পড়সে… রাইখ্যা আইসি।”

সপ্তাহ দুয়েক লেগে গেল দীপব্রতর মোবাইলে অ্যাপ দুটো লাগাতে। সবার আগে একদিন ফোনটার একটা আলাদা সিকিউরিটি লক সৃষ্টি করল। দীপব্রত মোবাইল ইত্যাদি ভালো বোঝে না। ওর ফোনের সিকিউরিটি হিসেবে ওর ফিঙ্গারপ্রিন্ট সেট আপ করে দিয়েছিল পরাগব্রতই। সেদিন ফোনটা চালু অবস্থায় টেবিলে নামিয়ে রেখে দীপব্রত বাথরুমে উঠে গেছিল, চট করে সেটা নিয়ে একটা নতুন আনলক্‌ প্যাটার্ন লাগাল পরাগব্রত। তারপরে অপেক্ষা করল কিছুদিন, একদিন রাতে তিনজনে ড্রিঙ্ক করে, ডিনার খেয়ে দীপব্রত আর মিনি শুতে যাবার প্রায় মিনিট পনেরো পরে ওদের দরজায় নক্‌ করল পরাগব্রত। “তুই কি আমার ফোনটা নিয়ে উঠে এসেছিস? আমি কিছুতেই আনলক করতে পারছি না, বলছে ফিঙ্গারপ্রিন্ট নট রেকগনাইজড।”

বিরক্ত হয়েই দরজা খুলেছিল দীপব্রত। কিন্তু যখন দেখল ওরই দোষ, -ই পরাগব্রতর ফোন নিয়ে উঠে এসেছে, তখন বোকা-বোকা হেসে ফোনটা দিয়ে দিয়েছিল।

ততক্ষণে ওর ফোনে দুটো অপরিচিত অ্যাপ চোখের আড়ালে তাদের কাজ শুরু করে দিয়েছে। পরাগব্রত একটা নতুন মোবাইল নিয়েছে, তাতে নতুন নম্বর — যে নম্বর শুধু কেউ জানে না তা নয়, যেটা সাধারণত অফ্‌ অবস্থায় বন্ধ থাকে ওর আলমারিতে। যেটা খোলা হয় কেবলমাত্র যখন দীপব্রত বেরিয়ে যায়, বা পরাগব্রত থাকে রাস্তায়।

মিনির ওপরেও নজরদারি চলে — কিন্তু মিনি তো বাড়িতেই থাকে। দীপব্রত ছাড়া আর কাউকে ফোন করে না। বা কারওর ফোন আসেও না।

দীপব্রতর কনট্যাক্ট লিস্ট, এবং তাদের মধ্যে কার কার সঙ্গে ও কখন কখন, আর কতক্ষণ কথা বলে, সবই জানে পরাগব্রত। সেই সঙ্গে জানে ও যখন বেরোয়, তখন ঠিক কোথায় কোথায় যায়। সে জায়গাগুলো দেখেও এসেছে পরাগব্রত। বুঝতেও পারে কেন কোথায় যায় — শুধু একটা জায়গায়তেই কেন বার বার যায় দীপব্রত, বুঝতে পারেনি এখনও। ওদের বাড়ি থেকে প্রায় মিনিট পনেরো দূরে দক্ষিণ শহরতলী পার করে যেখানে শহর আর গ্রাম প্রায় মিশছে, সেখানে প্রায় ভাঙাচোরা একটা বাড়ি। পাড়াটা পরিচিত, কিন্তু রাস্তাটা ওখানে অনেকটাই আগে পিছে বসতিহীন। এমন একটা জায়গায় এরকম বাড়ি? সন্দেহ হওয়ায় দীপব্রতর অবর্তমানে অফিসের সিন্দুক খুলে ভুবনব্রতর সম্পত্তির ফাইলটা দেখেছিল পরাগব্রত। ঠিক — ওটা, এবং ওর দু-পাশের সব জমিই ভুবনব্রতর ছিল। এখন সবই গেছে দীপব্রতর ভাগে। প্রথমবার গাড়ি নিয়ে যেতে গিয়েই দেখেছিল বাড়িটার অত্যন্ত ভগ্নদশা, কিন্তু দরজা জানলাগুলো মজবুত, আর সিসি-টিভি আছে। দেখতে পেয়েই দ্রুত গাড়ি চালিয়ে চলে গিয়েছিল, ফিরেছিল অন্য রাস্তা দিয়ে। এর পরে আরও দু’বার গেছে, দু’বারই সেলফ ড্রিভেন গাড়ি ভাড়া করে, যাতে কখনও দীপব্রত সিসি-টিভি ফুটেজের দিকে তাকিয়ে দেখলেও পরিচিত গাড়ি দেখতে না পায়।

কিন্তু বুঝতে পারেনি কেন ওই ভাঙাচোরা বাড়িটাতেই দীপব্রতকে যেতে হয় বার বার – দু’তিন মাসে একবার তো বটেই, কখনও মাসে বার দুয়েকও।

যতই ভাবে, ততই মনে হয়, এ রহস্য সমাধান করতেই হবে।

কিন্তু তা হবার আগেই এমন এক ঘটনা ঘটল, যা ওদের সবার জীবনকেই আমূল বদলে দিল।


~পাঁচ~

কিছুদিন ধরেই কানাঘুষোয় শোনা যাচ্ছিল যে চীন দেশে একটা নতুন ভাইরাস দেখা দিয়েছে, যা থেকে সাংঘাতিক এক অসুখ হচ্ছে, এবং তার ফলে হাজারে হাজারে লোক মারা যাচ্ছে। যতদিনে চীন বুঝেছে, যে তাদের উহান শহরকে বিচ্ছিন্ন করে এই অসুখকে রুখতে হবে, ততদিনে কয়েক হাজার লোক সেই শহর থেকে সারা পৃথিবীতে পাড়ি দিয়েছে, এবং কিছু ভালো করে কেউ কিছু বোঝার আগে, বা বলা ভালো, বুঝতে চাওয়ার আগেই সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছে সেই কোরোনা ভাইরাসবাহী কোভিড মহামারী। মজার কথা এই, যে তুলনায় ছোটো এবং গরিব দেশগুলো যে তৎপরতার সঙ্গে ভাইরাসবাহী রোগটাকে সামলাতে পেরেছে, বড়ো এবং ধনী দেশগুলো সেই তুলনায় পিছিয়ে পড়েছে প্রধানত তাদের সামগ্রিক এবং রাজনৈতিক বুদ্ধিহীনতায়।

পরাগব্রত বা দীপব্রত কেউই খবর-টবর বিশেষ শোনে না। তাই প্রধানমন্ত্রী যখন লক-ডাউন ঘোষণা করলেন, তখন পুরো ব্যাপারটা সম্বন্ধে ওদের আইডিয়া অতি অল্পই ছিল। মিনি ওদের বুঝিয়ে-সুঝিয়ে সুব্রত, জবা আর ড্রাইভারকে বাড়ি পাঠানোর ব্যবস্থা করল। দীপব্রত আপত্তি করেছিল — রান্না কে করবে? বাজার? মিনি বলল, রান্নার দায়িত্ব ও নেবে যদি পরাগব্রত বা দীপব্রত বাজার করে দেয়। দীপব্রত জীবনে বাজার চোখেই দেখেনি। বাধ্য হয়ে পরাগব্রতকেই বলতে হয়েছিল, “বাজার আমি করে দেব।”

তারপরে তিনজনের সংসারে শুরু হয়েছিল দুর্বিসহ এক অবস্থান। পরাগব্রত ভেবেছিল এই ক’দিনে কী ভাবে দীপব্রতর ভাঙা-বাড়ির রহস্য সমাধান করা যায় সেটা ভেবে বের করবে, কিন্তু দেখল সারা দিন কর্মহীন বসে থাকলে মাথাও কাজ করে না। ওদিকে, মিনি রান্না করতে পারে না, এমন নয়, কিন্তু কোনও রকমে। ভালোমন্দ খেতে অভ্যস্ত দীপব্রত আর পরাগব্রতর পক্ষে দিনের পর দিন সে খাওয়া অসহ্য হয়ে উঠল। সেই সঙ্গে বাড়িতে বসে বসে দীপব্রত ক্রমশ বদমেজাজী হতে শুরু করল। সারাক্ষণ বসে বসে মদ খায়, আর মিনি আর পরাগব্রতকে হুকুম করে — এটা করে দাও, ওটা করে দে। মাস খানেক পার হতে হতে পরাগব্রতর মনে হতে শুরু হলো, এরকম চলতে থাকলে ও হয়ত একদিন দুম করে দীপব্রতকে মেরেই ফেলবে।

প্রায় দু’মাস পরে প্রকৃতি এমন এক কাণ্ড করল, যে পরাগব্রতর কাজটা সহজ হয়ে গেল। মিনি টিভি দেখে বলেছিল, একটা ভয়ানক সাইক্লোন আসছে, তার নাম আম্ফান। সে ঝড় নাকি আসছে সোজা ওদের দিকেই। অমন ঝড় অনেক দেখেছে পরাগব্রত আর দীপব্রত। মাঝপথে সে ঝড় বেশিরভাগ সময়েই চলে যায় ওড়িশা, বা বাংলাদেশ। ওরা কিছু বেশি ভাবেনি।

কিন্তু সেদিন দুপুর থেকে আকাশের অবস্থা দেখে গতিক ভালো বোঝেনি পরাগব্রত। বিকেলের পর থেকেই কারেন্ট চলে গেল, দামাল হাওয়া আছড়ে পড়ল শহরে, আর সেই সঙ্গে বৃষ্টির তোড়! ওরা না দেখেছে জীবনে এমন হাওয়ার দাপট, না দেখেছে এমন বৃষ্টির জোর। বন্ধ দরজা জানলার ফাঁক দিয়েও তীব্রবেগে ছাঁট ঢুকছে ঘরে। ছাদের চিলেকোঠার দরজার ফাঁক দিয়ে কুলকুল করে ঢুকছে জল — সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসছে নিচ তলা অবধি। তিনজনে মিলে কোনও রকমে বসার ঘরের ফার্নিচার সরিয়ে কার্পেট গুটিয়ে রাখল। সেই সঙ্গে আকণ্ঠ মদ্যপান করা দীপব্রত লাগাতার গালাগালি দিতে থাকল মিনিকে — জবা আর সুব্রতকে বাড়ি পাঠিয়ে দেবার জন্য। মিনিও অনেকটাই মদ খেয়েছিল। সুতরাং তিনজনে রাত নটা নাগাদই খেয়ে নিয়ে শুতে গেল।

মদ বেশি খায়নি পরাগব্রত। তাই শুয়ে শুয়ে ঘুম আসছিল না, বরং দুশ্চিন্তা হচ্ছিল। সবে মোবাইলে একটা খবর ঢুকেছে, যে শহরে সব আপৎকালীন ব্যবস্থা — পুলিশ, দমকল এবং অ্যাম্বুলেনস — ঝড়ের জন্য তুলে নেওয়া হলো, এমন সময় ওর ঘরের দরজায় আলতো টোকা দিয়ে ঢুকল দীপব্রত।

তড়াক করে উঠে বসল পরাগব্রত। মোবাইলের টর্চ জ্বেলে বলল, “কী হয়েছে?”

একটু বেরোতে হবে।”

এখন? এই অবস্থায়?”

খুব জরুরী।”

দীপব্রতর কি মাথা খারাপ হয়েছে, ভাবতে গিয়ে মনে হলো হয়ত মিনির শরীর খারাপ হয়েছে। কিন্তু ঘর থেকে বেরিয়ে দেখল, মিনি কোথাও নেই। বলল, “কোথায় যাবি? মিনি যাবে না?”

মাথা নাড়ল দীপব্রত। “না। ও ঘুমিয়ে পড়েছে। ও না জানলেও চলবে। চল, এক্ষুনি চল। আমি গাড়ি চালাতে পারব না। তোকে চালাতে হবে। এক্ষুনি...”

দীপব্রতর গলার স্বর স্খলিত হলেও চোখে একাগ্রতা। একে ‘না’ বললে বিপদ হতে পারে। পরাগব্রত লক্ষ করল দীপব্রতর পরণে ভুবনব্রতর পুরোনো ভারি ওভারকোট। বিদেশ গেলে ব্যবহার করত ভুবনব্রত। কী করতে চায় দীপব্রত? বলল, “আমি প্যান্ট পরে আসছি।”

জামা বদলাতে বদলাতে পরাগব্রতর মাথায় বুদ্ধি খেলতে শুরু করল। দীপব্রত আর ও এখন বেরোবে। মিনি জানে না। বাড়িতে আর কেউ নেই। রাস্তায় পুলিশ নেই, এই ঝড়বাদলায় দেখতে আসারও কেউ নেই। সমাপতনে এমন সুযোগ হয়ত বহুদিনের মধ্যে আসবে না। পরাগব্রত ওর ঘরের একটা জানলার একটা পাট খুলে কড়ার সঙ্গে দড়ি দিয়ে অন্য পাটটা বেঁধে রাখল। এই জানলার গ্রিলটা ও অনেক আগেই দীপব্রতর অবর্তমানে কাটিয়ে রেখেছিল মিস্তিরি ডেকে। হঠাৎ যদি দরজা বন্ধ রেখে জানলা দিয়ে বেরোন’র প্রয়োজন হয়, তাই। আজ অবধি কখনওই দরকার পড়েনি। গ্রিলটা তালা দিয়ে বন্ধ করা থাকে, সেই তালাটা খুলে রেখে, জামা-প্যান্ট জুতো পরে বেরোল। ঘরের দরজাটায় চাবি লাগিয়ে চাবিটা পকেটস্থ করল। বাইরে থেকে খুলতে গেলে ভেতর থেকে ছিটকিনি দেওয়া আছে মনে হবে, আর এই চাবি দিয়ে পরে ঘরের ভেতর বা বাইরে যে কোনও দিক থেকে খোলা যাবে। দীপব্রত ততক্ষণে বড়ো স্করপিও গাড়িটার চাবি নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে বাইরের দরজার ঠিক ভেতরে।

রাস্তায় তখনও ঝড় আর বৃষ্টির তাণ্ডব চলছে। কোনও রকমে গাড়ি পনেরো মিনিটের পথ পার করল প্রায় চল্লিশ মিনিটে। ভাঙা বাড়িটা ওই ঝড়জলের তাণ্ডবে এখনও দাঁড়িয়ে আছে। গাড়ি থেকে নামার আগে দীপব্রত বলল, “ঘুরিয়ে পেছনটা গেটের কাছে রাখ। আমি আসছি। মাল পত্তর কিছু আছে।”

বিনাবাক্যব্যয়ে পরাগব্রত অনেক কসরত করে সরু রাস্তায় গাড়িটা ঘুরিয়ে রাখল। মালপত্তর থাকলে পেছনের দরজাটা খুলতে হবে। পাতলা রেনকোটটা কষে জড়িয়ে নিয়ে রাস্তায় নামা-মাত্র তুমুল হাওয়া আর তিরের মতো ধারালো বৃষ্টির ফোঁটা সারা মুখ আর মাথা আক্রমণ করল। কোনও রকমে গাড়ির আড়াল দিয়ে গাড়ির পেছনে গিয়ে দাঁড়াল পরাগব্রত। দীপব্রত ওকে ভেতরে যেতে বলেনি। তবু কি যাবে? ভাবার আগেই গাড়ির টেইল লাইটের লাল আলোয় দেখল দীপব্রত বাড়ির গেট দিয়ে বেরোচ্ছে, দু’হাতে দুটো ঢাউস সুটকেস। হাওয়ার তোড়ে আর মদের নেশায় দাঁড়াতে পারছে না ভালো করে। পরাগব্রত ছুটে গিয়ে সুটকেসদুটো ওর হাত থেকে নিয়ে নিল, দুজনে কোনও রকমে গাড়িতে পৌঁছে, পেছনের দরজাটা খোলামাত্র প্রায় ছিটকে হাত থেকে বেরিয়ে যায় আরকি! দুজনে একহাতে দরজা ধরে, আর এক হাতে ঠেলাঠেলি ধাক্কাধাক্কি করে সুটকেস দুটো গাড়িতে রেখে আবার হাওয়ার সঙ্গে যুদ্ধ করে দরজাটা বন্ধ করল।

এবারে?” হাওয়ার তোড়ের ওপরে চেঁচিয়ে জানতে চাইল পরাগব্রত।

আরও দুটো...” বলে আবার বাড়ির দিকে রওয়ানা দিল দীপব্রত। পরাগব্রত জানতে চাইল, “আসব আমি?”

দীপব্রতর “না”-টা ঝড়ের হাওয়ায় প্রায় অশ্রুতই রয়ে গেল।

এবারে দীপব্রত বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসে কিছুক্ষণ বাইরে অপেক্ষা করল — পরাগব্রত বুঝল, দরজায় তালা লাগাচ্ছে। তারপরে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসে, গেটের বাইরে দুটো ওইরকম ঢাউস সুটকেস নামিয়ে রেখে সবে গেটটা বন্ধ করছে, এমন সময় প্রলয় শুরু হলো।

বাড়ির পেছনের একটা মস্তো, প্রায় ছতলা সমান গাছ মড়মড় করে ভেঙে পড়ল ওদেরই দিকে। পরাগব্রত অনেকটাই দূরে দাঁড়িয়ে ছিল — ও ওখানেই রয়ে গেল, কিন্তু গাছটা ভেঙে পড়ল বাড়ির পাশের ঢোকার রাস্তা জুড়ে। দোতলার বারান্দা আর যে দরজাটা দিয়ে দীপব্রত ঢুকেছিল, সেটার ওপরের দেওয়ালটা, পুরোটা ভেঙে পড়ল হুড়মুড় করে। অজস্র ইঁট ছিটকে এল দীপব্রতর দিকে। দীপব্রত সময়ে সরতে পারেনি, তাই অনেকগুলো ইঁট বোধহয় ওর গায়েও পড়ল। পড়ে গেল দীপব্রত।

পরাগব্রত একটু অপেক্ষা করল। দীপব্রত পড়ে আছে রাস্তায়, ওঠার চেষ্টা করছে — গাছটা রাস্তায় পড়েনি, পড়েছে বাড়ির চৌহদ্দির মধ্যেই। গাছের কাণ্ডটা এখনও হেলে আছে বাড়ির গায়েই। বাড়িটার যা অবস্থা, তাতে অতবড়ো গাছের ওজন কতক্ষণ বইতে পারবে কে জানে…

পরাগব্রত গিয়ে দীপব্রতকে ধরে তুলল। “লেগেছে?”

আঃ,” দীপব্রতর মুখ দিয়ে অস্ফূটে একটা আধা আর্তনাদ বেরিয়ে এল। “আমার হাতটা... বোধহয়… ভেঙেছে...”

দাঁড়া,” পরাগব্রত দু’পা এগিয়ে গেল বাড়ির খোলা গেটের দিকে। হাতটা এগিয়ে গেল গাছটার একটা ভাঙা ডালের দিকে। “ওটা কী?”

দীপব্রত বলল, “কী? যাস না, বাড়িটা ভেঙে পড়লে...” এক পা এগিয়ে এল পরাগব্রতর দিকে।

গদাম করে ভাঙা ডালটা যখন মাথায় এসে পড়ল, দীপব্রত দেখতেই পেল না। নিঃশব্দে এলিয়ে পড়ল রাস্তার ওপরে। হাতের ডালটা নামিয়ে রেখে পরাগব্রত ওকে টেনে নিয়ে গেল বাড়ির ভেতরে। গাছটার ডালপালা যতদূর এসেছে, সেখানেও বাড়ির ইঁট পাটকেল অজস্র। সে সবের মধ্যেই দীপব্রতকে ফেলে, ডালটা নিয়ে এসে আরও অনেকগুলো আঘাত করল সর্বশক্তি দিয়ে। মাথায়, আর দেহেও নানা জায়গায়। তারপরে দু তিনটে ইঁট তুলে নিয়ে সেগুলো দিয়েও বার বার আঘাত করে যখন নিশ্চিন্ত হলো যে দীপব্রত আর নড়বে না কোনও দিন, তখন হাত ঢুকিয়ে ওর ওভারকোটের পকেটগুলো পরীক্ষা করল। একটা পকেটে একটা পাউচ ব্যাগ। এরকমই কিছু আশা করেছিল। ওটা নিজের রেনকোটের পকেটে ভরে খোলা গেট দিয়ে বেরিয়ে এল। ঢাউস সুটকেসদুটো রাস্তার ওপরে কাত হয়ে পড়েছে। দুটোকে টেনে নিয়ে যেতে যেতে বুঝল হাওয়ার গতিবেগ কমেছে সামান্য। কিন্তু এখনও ও একা হাতে পেছনের দরজা খুলে দুটো সুটকেস ঢুকিয়ে দরজা আবার বন্ধ করতে পারবে না। তাই গাড়ির পাশের দরজা খুলে সুটকেস-দুটো অতিকষ্টে তুলল সিটের ওপর।

তারপরে তিরবেগে গাড়ি চালাল বাড়ির দিকে।


~ছয়~

বড়ো রাস্তায় পৌঁছনর আগেই বুঝল, দীপব্রতর ডেডবডি ওখানে ফেলে রেখে ওর পক্ষে গাড়ি নিয়ে বাড়ি যাওয়া হবে বিপদ ডেকে আনার নামান্তর। সুটকেসগুলোরও ব্যবস্থা করতে হবে। অবশ্য সেটা কঠিন না। নিজের পাওয়া টাকার অংশে পরাগব্রত একাধিক ফ্ল্যাট কিনেছে। দীপব্রতর এই বাড়িটার খোঁজ পাওয়ার পরে কাছাকাছি একটা ফ্ল্যাট নিয়েছে। নতুন গড়ে ওঠা এই শহরতলীতে সহজে পাওয়া গিয়েছে ফ্ল্যাট — এখান থেকে তিন মিনিটও না।

নতুন বাড়িতে সবসুদ্ধ বারোটা ফ্ল্যাট। তার মধ্যে বিক্রি হয়েছে গোটা সাত-আষ্টেক। লোক এসেছে মাত্র দুটোয়। তাই এ বাড়িতে সিকিউরিটির বালাই নেই। প্রোমোটার দেয়নি, আর যারা মালিক, তারাও নিজেদের মধ্যে অনেক ইমেইল আদানপ্রদান করে সিদ্ধান্তে আসতে পারেনি। চারটে সিকিউরিটি ক্যামেরা পার করে লিফটে পৌঁছল পরাগব্রত। এগুলো নিয়েও চিন্তা নেই। এগুলো কেবল ক্যামেরার কেসিং। এখনও সিকিউরিটি ক্যামেরা বসানোর সাহস পায়নি ফ্ল্যাট মালিকরা — পাছে রাতের অন্ধকারে চুরি হয়ে যায়!

রাত এখন সাড়ে বারোটার কাছাকাছি। পরাগব্রতর মাথা এখন অনেকটাই সাফ। কী কী করতে হবে তার লিস্ট তৈরি। কপালের ওপর অনেকটাই নির্ভর — হঠকারিতা হয়েছে এভাবে দীপব্রতকে মেরে ফেলা, কিন্তু এখন আর কিছু করার নেই। সাহসীকে ভাগ্যও সাহায্য করে, এটাই মূলমন্ত্র করে এগোতে হবে।

ঝড়ের তোড় এখনও চলছে, ওই মারাত্মক গতিতে না হলেও, ভয়ানক ঝড়ের মতো। আর সেই সঙ্গে বৃষ্টি। ভাগ্যিস এখন রাস্তায় কেউ নেই… ফিরে যেতে হবে ওই বাড়িতেই। যেখানে ফেলে এসেছে দীপব্রতর দেহ।

আবার মিনিট তিনেকের রাস্তা পার করে গাড়ি এসে পৌঁছল সেখানে। গাড়ি থেকে নামল পরাগব্রত। আলো জ্বলতে থাকুক। অন্ধকারে একা এই ভূতের বাড়িতে দীপব্রত এসে থাকলে আলো নেভাবে না। চট করে দেখে নিল, কিছু কি ফেলে যাচ্ছে? না। হাতের গ্লাভস মুছে নিয়েছিল দীপব্রতকে মেরেই, যাতে গ্লাভসে রক্ত, বা বাড়ির ইঁটের কোনও চিহ্ন লেগে থাকলে সেটা স্টিয়ারিং-এ না লাগে। কিন্তু দীপব্রতর হাতে গ্লাভস নেই, এবং স্টিয়ারিং-এ দীপব্রতর হাত, বা আঙুলের ছাপ নেই। সেই রিস্কটা নিতেই হবে। এক যদি না…

চট করে ছুটে গিয়ে গ্লাভস-জোড়া দীপব্রতর কোটের পকেটে গুঁজে দিয়ে বেরিয়ে এল আবার। হালকা পায়ে জগিং করে বড়ো রাস্তার দিকে রওয়ানা দিল পরাগব্রত।


~সাত~

সকালে দরজায় প্রবল ধাক্কায় ঘুম ভাঙল পরাগব্রতর। এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো বোধহয় রাতে দরজার তালা খুলতে ভুলে গেছে। তারপরেই খেয়াল হলো, না। সব ঠিক ঠিক করেছিল। এক ঘণ্টার ওপর লেগেছিল ওই ঝড়বৃষ্টিতে বাড়ি ফিরতে। ততক্ষণে অবশ্য ঝড় আর বৃষ্টি দুই-ই কমেছে অনেক। ও যখন ঢুকেছে তখনও কারেন্ট আসেনি। গেট খোলাই ছিল। বাড়ির পাশের গলি দিয়ে এসে জানলা দিয়ে ঢুকেছিল, যদি অন্ধকারে মিনি বাইরের ঘরে বসে থাকে, সেই আশঙ্কায়। অন্ধকারেই রেনকোট আর ভিজে জামাকাপড় বাথরুমে খুলে রেখে আবার পাজামা পরে, যথাসম্ভব নিঃশব্দে চাবি ঘুরিয়ে দরজার লক খুলে বিছানায় শুয়েছিল। তখন দুটো বেজে গেছে।

এখন সকাল সাতটা। কারেন্ট এখনও নেই। আর একটু ঘুমোলে হত, কিন্তু দরজায় ধাক্কা অব্যাহত। উঠে গিয়ে দরজার হাতল ঘুরিয়ে দরজা খুলে বলল, “বাইরে থেকে দরজা ধাক্কাচ্ছ কেন? খোলাই তো আছে...”

মিনি উত্তর না দিয়ে বলল, “দীপ কোথায়?”

দরজা খুলে দিয়ে পরাগব্রত আবার বিছানার দিকে যাচ্ছিল। থমকে গিয়ে ঘুরে বলল, “মানে? তুমি জানো না?”

মাথা নাড়ল মিনি। জানে না। “আমি রাতে ঘুম থেকে উঠে দেখি বিছানায় নেই। আমি ভেবেছিলাম বাথরুমে গেছে, তারপরে আবার ঘুমিয়ে পড়েছি। এখন উঠে দেখি নেই। তাই খুঁজতে গিয়ে দেখি কোথাও নেই...”

পরাগব্রত মাথা নাড়ল। “কোথায় যাবে? এখানেই আছে।”

উৎকণ্ঠায় পরাগব্রতর হাত খামচে ধরল মিনি। “নেই। বাড়িতে নেই। বাইরের দরজায় লক নেই। বাড়ির গেট খোলা। বড়ো গাড়িটা নেই… স্করপিও…”

চমকে উঠে পরাগব্রত বলল, “কী বলছ!” মিনির হাত ছাড়িয়ে খাটের বাজুতে রাখা রাত-পোশাকের শার্টটা পরতে পরতে বেরিয়ে এল ঘর থেকে। হাট করে বাইরের দরজা খোলা। মিনিই নিশ্চয়ই খুলেছে। গাড়ি বারান্দায় তিনটে গাড়ি থাকে — দুটো দীপব্রতর, একটা স্করপিও, অন্যটা হন্ডা জ্যাজ। আর একটা পরাগব্রতর — আই টুয়েন্টি। স্করপিওটা নেই। সত্যিই গেট খোলা। কিন্তু গেটের সামনে রাস্তা জুড়ে একটা মস্তো গাছ পড়ে আছে। কাল পরাগব্রত ফেরার আগেই পড়েছিল। ওকে গাছের ওপর দিয়েই খানিকটা পেরিয়ে আসতে হয়েছে।

দরজার পাশে রাখা বাইরে যাবার চটিজোড়া পরে নিয়ে পরাগব্রত বেরোল। জুতো বাথরুমে। পরিষ্কার করে, না শুকিয়ে বের করা যাবে না। ওতে নিশ্চয়ই কাদা, গাছের পাতা — এসব লেগে আছে। সেগুলোকে বাইরে ফেলতে হবে। ঘরে কাদা আছে? দেওয়াল বেয়ে যে জল পড়েছিল খোলা জানলার ফাঁক দিয়ে, সেটা শুকোতে কত সময় লাগবে? তার আগে পুলিশ যদি ওর ঘর দেখতে চায়… প্ল্যান না করলে এরকম ভুল থেকে যায়। বাইরে গিয়ে উঁকি দিল পরাগব্রত। ডাইনে, বাঁয়ে। এ রাস্তায় কোথাও স্করপিওটা নেই। পরাগব্রত ফিরে এল। গাড়ি বারান্দায় দুশ্চিন্তাভরা চোখ নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে মিনি।

ফোন...” সংক্ষেপে কথাটা বলে আবার ঘরের চটি পরে নিজের ঘরের দিকে দৌড়ল পরাগব্রত।

আমি করেছি… অনেকবার। প্রথমে বাজছিল, তারপরে এখন বলছে সুইচ অফ...”

ব্যাটারি শেষ হয়ে গেছে। ফোনটা কোথায় ছিল? প্রথমে বেজেছে যখন, তখন নিশ্চয়ই গাড়িতেই ছিল। নাহলে ওই বৃষ্টিতে নিশ্চয়ই অনেক আগেই অফ হয়ে যেত জল ঢুকে। ফোন করল পরাগব্রত। সুইচড-অফ বাণী শুনে কেটে দিয়ে বলল, “দাঁড়াও, একটু ভাবি। চায়ের জল বসাও...”

চায়ের জল হতে হতে, চা ভিজতে ভিজতে এবং তারপরে চা খেতে খেতে পরাগব্রত দুশ্চিন্তাগ্রস্ত ভাইয়ের রোলটা একেবারে মুখস্তর মতো করতে শুরু করল। প্রথমে মিনিকে জিজ্ঞেস করল, রাতে শুতে গিয়ে দীপব্রত কিছু বলেছে কি না। তারপরে নিজেও ভাবল একই কথা। অন্য কোনও সময়ে কিছু বলেছিল মিনিকে? বলছে, চা খাচ্ছে, আর ভাবছে — কখন পুলিশের কথাটা বলবে। পরাগব্রতরা যে মহলে ঘোরাফেরা করে, তাতে চট করে পুলিশকে কিছু বলার কথা নয় ওদের। আবার, ওইখানে পাড়ার লোকজন ভাঙা গাছের নিচে দীপব্রতর ডেডবডি খুঁজে পেয়ে পুলিশকে কিছু জানানোর আগে যদি পুলিশে খবর না যায়…

যখন দীপব্রতর পরিচিতদের ফোন করতে চেয়ে ফোন হাতে নিয়ে দেখল কোনও সিগন্যাল নেই, মিনিকে বলল, “তোমার ফোনটা দাও তো… ওই মিশ্রজী, কাদের, হরিপদ-দের ফোন করে দেখি ওরা কিছু জানে কি না...” যখন মিনিও বলল ওর ফোনেও সিগন্যাল নেই তখন কাজটা সহজ হয়ে গেল, বলল, “আমি থানায় যাচ্ছি। তুমি কি আসবে?”

দেখতে পেল থানার নাম শুনে মিনির মুখটা শুকিয়ে গেল। এরকমটাই আশা করেছিল হবে। বলল, “তুমি বরং থাকো। আমি ঘুরে আসি। নইলে এর মধ্যে দীপব্রত ফিরে আসলে বাড়ি তালাবন্ধ দেখবে...”

মিনিকে রেখে পরাগব্রত বেরোল। রাস্তাঘাটের অবস্থা দেখে নিজেরই ভয় করতে শুরু করেছে। চারিদিকে শুধু ভাঙা গাছ, টেলিফোনের খুঁটি, আর ল্যাম্পপোস্ট। এরই ভেতর দিয়ে কাল এক ঘণ্টা হেঁটেছে। সত্যিই প্রাণ হাতে করে চলা। চারিদিকে মড়মড় করে গাছ ভেঙে পড়ছে, ল্যাম্পপোস্ট উপড়ে যাচ্ছে — ভাগ্যিস কোথাও কারেন্ট ছিল না — নইলে নানা যা কিছু পায়ে জড়িয়েছে, তার মধ্যে নিশ্চয়ই বিদ্যুৎবাহী তারও ছিল। তবু ভালো সন্ধে সাড়ে সাতটা বা আটটা নাগাদ যে গতিতে হাওয়া দিচ্ছিল, তার দমক কমেছিল, নইলে হয়ত ওর মৃতদেহও এখন কোথাও পড়ে আছে।

থানা খুব দূরে নয়। ওদের কাজের সূত্রে সবসময় পুলিশকে হাতে রেখে চলতে হয়, তাই ওদের সকলেই চেনে। বড়োবাবু, মেজোবাবু — কেউই নেই থানায়। আজ শহরের যা অবস্থা, থানায় থাকাটাই অদ্ভুত দেখাত। ডিউটি অফিসার একগাল হেসে জানতে চাইল, “চা খাবেন?” মুখ থেকে মাস্ক না খুলেই পরাগব্রত বলল, “না। থাক। একটা সমস্যা হয়েছে...”

কী সমস্যা বলল। ডিউটি অফিসার বলল ওসি বা সেকেন্ড ওসি এলেই খবর দেবে ওরা। ওদেরও কারও ফোন চালু নেই। সম্ভবত বাবুদেরও নেই। কী ভয়ঙ্কর ঝড় হলো… বাপরে!

পরাগব্রত উঠল না। বলল, “মিসিং পার্সন ডাইরি নেবেন কি?”

উনি কাঁচুমাচু মুখে বললেন, “আসলে এত তাড়াতাড়ি...”

পরাগব্রত এক-ঝলক ফোনের দিকে তাকিয়ে বলল, “সিগন্যাল নেই… নইলে আপনাদের বিরক্ত করতাম না। কমিশনারকেই ফোন করতাম।”

কমিশনারকে ফোন করতে পারে, এমন লোককে পুলিশ পছন্দ করে না। আবার চটাতেও চায় না। বলল, “আপনার কোনও চিন্তা নেই, স্যার। আমরা যে করে হোক স্যারকে জানাচ্ছি।”

একান্ত বাধ্য হয়ে ফিরে যেতে হচ্ছে, এমন ভাব করে থানা থেকে বেরোল পরাগব্রত।

বাড়িতে কারেন্ট নেই এখনও। ম্লানমুখে মিনি বসার ঘরে নিভে যাওয়া ফোন নিয়ে বসে। পরাগব্রত ওর ঘর থেকে একটা টর্চ নিয়ে এল। “বৃষ্টিতে কী কী ক্ষতি হয়েছে দেখতে যাচ্ছি। তুমি এখানেই থাকো। যদি দীপব্রত ফিরে আসে, আমাকে ডেকো।”

ছাদ থেকে শুরু করে সর্বত্র দেখল। খুব খারাপ কিছু হয়নি। পুরোনো দিনের বাড়ি, পুরু কাঠের জানলা, বাইরের দিকে খোলে, ভেতরে কাচের পাল্লা। সব বন্ধ ছিল। দু’ এক জায়গায় জানলার কাঠ নষ্ট হয়েছে, সেখান দিয়ে সামান্য জল ঢুকেছে কোনও ঘরে। কোথাও কার্নিসে ডালপালা পড়ে আছে। আছে ছাদেও। বাড়ির পেছনে ছোট্ট বাগান — সেখানে, আর সামনের বাগানেও আশ্চর্যভাবে কোনও ক্ষতি নেই। অবশ্য ওদের বড়ো গাছ নেই। শুধু অজস্র পাতা, গাছের ডাল, আর এবাড়ি-ওবাড়ির ভাঙা কাচ… এসবের জন্য লোক ডাকতে হবে।

টর্চের আলোয় নিজের ঘরটা ভালো করে দেখল। সত্যিই তেমন বেশি জল ঢোকেনি। বাড়ির এ-দিকটা হাওয়ার আড়ালে ছিল। তবে ও যখন জানলা দিয়ে ঢুকেছে, তখন বেশ খানিকটা জল ওর রেনকোট থেকে পড়েছিল। সেটা এখনও মেঝেতে শুকোচ্ছে। আলমারি থেকে একটা পুরোনো টি শার্ট নিয়ে ওখানে ফেলে বেরোল। শার্টটা ফেলে দিতে হবে — কিন্তু কোনও ভাবেই মিনি যেন না জানে যে ও ঘর পরিষ্কার করছে।

বাইরে মিনি এখনও বসে। বলল, “মিনি, খিদেয় পেট চোঁ চোঁ করছে।”

মিনি বলল, “কী খাবে?”

পরাগব্রত বলল, “যা হোক, এখন আর কী করব মাথায় আসছে না।”

মিনি উঠে রান্নাঘরের দিকে যাবে, পরাগব্রত বলল, “তোমার সঙ্গে দীপব্রতর বিয়েটা হয়েছে?”

মাথা নাড়ল মিনি। “বলেছিল, কিন্তু...”

পরাগব্রত বলল, “পুলিশ এসে যদি জিজ্ঞেস করে, করবেই — বলবে তুমি ওর বাগদত্তা। খেয়াল রেখো।”

মিনি ব্রেকফাস্ট নিয়ে আসার আগেই পুলিশ এল। বড়োবাবুই খবর পেয়ে এসেছেন। কিছুক্ষণ কী কাণ্ড, কী ভয়ানক ঝড়, এরকম জীবনে দেখিনি, আমাদের সব কমিউনিকেশন বন্ধ, দক্ষিণের গ্রামগুলোর কী অবস্থা শুধু আন্দাজ করতে পারছি — এসবের পরে বললেন, “আপনাদের কী ব্যাপারটা হলো? আমাকে থানায় বলল, দাদা নাকি রাতে বেরিয়ে কোথায় চলে গেছেন?”

পরাগব্রত সবে বলতে শুরু করেছে, “রাতেই হবে, কারণ...” এমন সময় ট্রে-তে তিন কাপ চা নিয়ে এল মিনি। বড়োবাবুর উৎসুক দৃষ্টির উত্তরে তৈরি করা পরিচয়টা দিল পরাগব্রত। দুজনে মিলে তাদের কিছু না-জানার কাহিনি বলল। পরাগব্রত যেমন মনে করেছিল, বড়োবাবু মিনির দিকেই ফিরলেন।

আপনার পাশ থেকে লোকটা উঠে চলে গেল, আপনি কিছু টের-ই পেলেন না?”

মিনি থতমত খেয়ে বলল, “আমার আসলে খুব গভীর ঘুম...”

আর মাঝরাতে যখন ঘুম ভেঙে দেখলেন, বিছানায় নেই, তখন? তখনও টের পাননি? কটা বাজে তখন?”

কাঁচুমাচু মুখে মিনি বলল, “সময় দেখিনি আসলে...”

পরাগব্রত বলল, “পুলিশকে সত্যি কথা বলতে হয়, মিনি।” বলে বলল, “আমরা তিনজনেই বেশ খানিকটা ড্রিঙ্ক করেছিলাম। বিছানায় পড়ে আমার অন্তত কোনও হুঁশ ছিল না...”

পুলিশ অফিসার কথা বাড়ালেন না, চায়ের দিকে নজর দিলেন। কিছুক্ষণ পরে মিনি ডিম-পাউরুটি ভাজা নিয়ে এল। বড়োবাবু না-না বলছিলেন, কিন্তু পরাগব্রত জিজ্ঞেস করল, “শেষ কখন খেয়েছেন? আবার কখন খাবার সময় পাবেন?” তখন আর দ্বিরুক্তি করলেন না। মিনি পুলিশের জিপের ড্রাইভার আর অন্য ডিউটিরত পুলিশের জন্যও চা আর পাউরুটি মাখন দিয়ে এল। ওরা দুহাত তুলে আশীর্বাদ করতে করতে খেয়ে নিল। সত্যিই ওরা সারা রাত ডিউটিতে ছিল, কেউ এখনও বাড়ি যাবার সময় পায়নি।

পুলিশকে গাড়ির নম্বর, মডেল, ইত্যাদি লিখে দিল পরাগব্রত। মিনিকে বড়োবাবু বললেন, “আপনার অ্যাড্রেস কি এখন এটাই? বেশ। আপাতত আপনি এ-বাড়ি ছেড়ে যাবেন না, তবে আপনার নাম, বাবার নাম, পার্মানেন্ট অ্যাড্রেস, দিন।”

পরাগব্রত দেখল মিনি ওকে যে গ্রামের নাম বলেছিল, সেটাই বলল। অতি সাহসী, না বোকা? পরাগব্রতর তিন সপ্তাহ লেগেছিল জানতে, যে ওই গ্রামে ওর বাবার নামের কোনও লোক থাকে না। নিকটবর্তী মিউনিসিপ্যালিটিতে কেরানি এমন লোকও না। পুলিশ চাইলে সে খবর তিন মিনিটে বের করে আনতে পারে।

যাবার আগে বড়োবাবু বললেন, “একজন অ্যাডাল্ট আপাতদৃষ্টিতে স্বেচ্ছায় বাড়ি ছেড়ে গেছে, সেটা মিসিং পার্সন হয় না। কিন্তু পরিস্থিতির জন্য আমি কাজটা এগিয়ে রাখি। এক তো কালকের ঝড়ের মধ্যে কেউ গাড়ি নিয়ে বেরিয়েছে সেটাই আশ্চর্য। উপরন্তু এখন কবে কারেন্ট আসবে, কবে কী হবে, আবার আপনাকে থানায় যেতে হবে… আমি একটা আন-অফিশিয়াল অ্যালার্ট দিয়ে রাখছি, কিছু জানতে পারলেই জানাব। আর এর মধ্যে যদি উনি এসে যান...”

নিজের ঘরে বিশ্রামের নাম করে টেবিলে ব্যাটারি দেওয়া পোর্টেবল ল্যাম্প জ্বেলে পরাগব্রত দীপব্রতর পকেট থেকে পাওয়া পাউচ-ব্যাগটা খুলল। প্রায় ছ ইঞ্চি লম্বা, ইঞ্চি চারেক উঁচু, আর আড়াই ইঞ্চি মতো চওড়া ব্যাগটার ভেতরে বাব্ল্‌-র‍্যাপে তুলো-মোড়া ঠাসাঠাসি হীরে। অজস্র। অন্তত কয়েক হাজার। বিভিন্ন সাইজের, বিভিন্ন ঔজ্জ্বল্যের। এটাই আশা করেছিল পরাগব্রত। গত কয়েক মাসে দীপব্রতর মোবাইলের ফোন আসা যাওয়ার নম্বরগুলো ট্রু-কলারে দিয়ে যে যে নামগুলো পেয়েছিল, সেগুলো বিচার করে হীরে-ই বোঝায়। কিন্তু এই হীরে, আর চার-বাক্সভর্তি টাকা কেন ওই গ্রামের বাড়িতে রাখত দীপব্রত, সেটা বোধহয় আর জানা যাবে না।

কতদিন এখানে নিরাপদ, এই সাত রাজার ধন? এখনই কি বাড়িতে নজর রাখা হচ্ছে? এক লহমা ভেবে পরাগব্রত ঠিক করল, না — কালকের পরে এখনই বিপদ নেই। বিপদ আসবে অন্তত দিন তিনেক পর থেকে। তার মধ্যে সরিয়ে ফেলতে হবে এগুলো। সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা ব্যাঙ্কের লকার।

পরদিন বিকেলে ইলেক্ট্রিসিটি এল, মোবাইলে সিগন্যাল এল তারই পরে। মিনিকে দেখান’র জন্য দীপব্রতর দু’জন বন্ধুকে ফোন করল পরাগব্রত। কারওর ফোনেই যোগাযোগ হলো না। তারপরে ফোন করল পুলিশ কমিশনারকে। প্রথম সাত বার ফোন ব্যস্ত, অষ্টমবারে ফোনে সেই পরিচিত গম্ভীর গলা, “হ্যালো...”

অল্প কথায় সবটা বুঝিয়ে দিল পরাগব্রত। দু’চারটে প্রশ্ন করে পরিস্থিতি সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল হলেন কমিশনার। তারপরে বললেন, “থানা ডায়রি নিয়েছে?”

না, স্যার, বললেন, অ্যাডাল্ট পার্সন, আপাতদৃষ্টিতে স্ব-ইচ্ছায়...”

দাঁত দিয়ে ছিক করে একটা শব্দ করে কমিশনার বললেন, “দেখছি।” বলে লাইন কেটে দিলেন।

দিন কাটে। পরাগব্রত আর মিনির সম্পর্ক এখন অন্যরকম। মিনির উৎসাহ বেড়েছে পরাগব্রতকে কাছে পাবার। পরাগব্রতর উৎসাহ নেই। ভাইরাস, দূরত্ব বজায় রাখা, এসব কথা বলে মিনিকে বেশ ভয় দেখিয়ে রেখেছে। এ-ও বলেছে, যে দীপব্রত হঠাৎ ফিরে এলে বিপদ হতে পারে। এবং সে বিপদ — আগেও বলেছে, এখনও বলল, পরাগব্রতর চেয়ে মিনির-ই হবার সম্ভাবনা বেশি।

থানা থেকে ফোন এল বারো দিন পর। কিছুক্ষণ কথা বলে পরাগব্রত মিনিকে বলল, থানা থেকে ডেকেছে। মিনিও যাবার জন্য তৈরি, পরাগব্রত নিরস্ত করল এই বলে, যে অফিসার বলেছেন মিনি যেন এখনই না আসে। রাস্তাঘাট পরিষ্কার হয়েছে অনেকটাই, তাই গাড়িটা নিয়েই বেরোল। কিন্তু থানায় অফিসার বললেন, যেখানে যেতে হবে, সেখানে হয়ত ও গাড়ি চলবে না। তাই ওদের সঙ্গে জিপে-ই আসতে। পরাগব্রত জানে ও রাস্তায় এ গাড়ি চলবে, কিন্তু সে তো পুলিশকে বলা সমীচিন নয়... তাই পুলিশের জিপেই উঠল। আর এক থানা। সেখানকার ও-সির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হলো। আর একটা জিপ বেরোল। এবার পরিচিত পাড়া, পরিচিত রাস্তা দিয়েই যেতে হলো। স্করপিওটা নেই। ভাঙা বাড়িটার সামনে জিপ দাঁড়াল। অফিসার বললেন, “আসুন।”

জিপ থেকে নেমে দাঁড়িয়ে রইল পরাগব্রত। আগে কোনও দিন দেখেনি এমন ভাব করে ডাইনে বাঁয়ে তাকিয়ে নিল। ও জানে, পুলিশ স্বভাবতই সন্দিহান। তাই ওকে নজর করছে। অফিসার ওর দিকে তাকিয়ে। ও উৎসুক চোখে তাকাল। অফিসার জানতে চাইলেন, “এ বাড়িটা আপনি চেনেন না?”

চেনে না। কোনও দিন এখানে আসেনি। অফিসারের কাছেই জানল যে এ বাড়ি একদিন ওর বাবার ছিল। বলল, “বাবা যাবার পরে দীপব্রত উকিলের পরামর্শে সব সম্পত্তি সমান ভাগ করেছে।” এও বলল যে পরাগব্রত কখনও দেখতে যায়নি কার ভাগে কোনটা পড়েছে — ওর নিজের ভাগের সব দলিল ইত্যাদি দীপব্রতর সিন্দুকেই রয়েছে।

অন্য থানার অফিসারের মুখের ভাব নরম হলো বোধহয়। দেখালেন স্করপিওটা কোথায় দাঁড়িয়ে ছিল। ইঞ্জিন চালু ছিল, হেডলাইট জ্বলছিল। পাড়ার লোকে খবর দিয়েছিল, মৃতদেহ নিয়ে গিয়েছে ওরা, গাড়িটাও নিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে — কারণ রাস্তাটা ব্লক হয়ে যাচ্ছিল। এখানে আর কিছু দেখার নেই। বাড়িটা পুলিশও দূর থেকেই দেখেছে। কারণ গাছটা এমনভাবে হেলে আছে, যে কোনও মুহূর্তে গোটাটাই ধ্বসে পড়তে পারে। ওটা না কেটে কিছু করা যাবে না। তবে তাতে সময় লাগবে — এখন সব ওয়ার্কফোর্স রাস্তা সাফ করতে ব্যস্ত।

এখনই আমরা আপনাকে এ বাড়িতে এন্ট্রি দেব না। এত রাতে ওই ঝড়ের মধ্যে কী করতে এসেছিলেন এখানে সেটা আমাদের বিচার করতে হবে।”

থানা, অজস্র ছবি। ভাগ্যিস নিজের হাতের এই কাজ স্বচক্ষে দেখতে হয়নি পরাগব্রতকে! শুনল, পোস্টমর্টেমে জানা গিয়েছে যে মাথায় আর শরীরে অজস্র আঘাত — সবই ওই গাছের ডাল, আর বাড়ির ইঁট-পাটকেল থেকে। তাতেই মৃত্যু হয়েছে। এতদিন দেহ রাখা যায়নি। ভয়াবহ ঝড় এবং লকডাউনের জন্য যোগাযোগেও সময় লেগেছিল। সত্যি বলতে কী, মফস্বলের থানা আর শহরের থানায় যোগাযোগ কম। কমিশনার ফোন না করলে হয়ত আজও খবর আসত না। গাড়ির নম্বরটাই কাজে দিয়েছে, কারণ দীপব্রতর কাছে আইডেন্টিফিকেশনের কিছুই ছিল না।

মোবাইল?” সত্যিই অবাক হয়ে জানতে চেয়েছিল পরাগব্রত। কারণ বাড়িতে মোবাইল সম্ভবত নেই — না কি ওর ঘরেই রয়েছে কোথাও, মিনি দেখতে পায়নি? পরাগব্রত ওই ঘরে ঢোকে না, এ কদিনেও ঢোকেনি।

মাথা নাড়লেন পুলিশ অফিসার। মোবাইল পাওয়া যায়নি। ইন-ফ্যাক্ট — একটা সিল করা প্লাস্টিকের প্যাকেট বের করে দিলেন — এইটুকুই ছিল ওনার পরনে। এটা পরাগব্রত নিয়ে যেতে পারেন।

প্যাকেটে দীপব্রতর জামাকাপড়, ভুবনব্রতর ওভারকোট, আর সেগুলোর সঙ্গে দেখা যাচ্ছে পরাগব্রতর ড্রাইভিং গ্লাভস। বিমূঢ়ের মতো প্যাকেটটা হাতে নিয়ে জিজ্ঞেস করল, মরদেহ কোথায় দাহ হয়েছে, তার অস্থি পাওয়া যাবে কি?

অপ্রস্তুত পুলিশ অফিসাররা মাথা নাড়লেন। সেরকম কোনও ব্যবস্থা নেই। — গাড়িটা থেকে মালিকের নাম ঠিকানা পাওয়া যেত না? ওটা তো দীপব্রতরই নামে?

পরাগব্রত রেগে গিয়ে পাছে কমিশনারকে আবার নালিশ করে — ওর থানার পুলিশ অফিসার জলদি ওকে বের করে নিয়ে এল। কেস ক্লোজড। অ্যাক্সিডেন্টাল ডেথ। গাড়িটাও পরাগব্রত নিয়ে যেতে পারে — বস্তুত, যত তাড়াতাড়ি নিয়ে যায় থানা থেকে — ততই থানার মঙ্গল।

স্করপিওটা চালিয়েই ফিরল পরাগব্রত। পথে অবশ্য ডিজেল ভরতে হলো। সারা রাত সেদিন ইঞ্জিন চলে তেল একেবারেই তলানিতে। বাড়ি ফিরে ফোনটাও পেল। দীপব্রত গাড়িতেই রেখে গেছিল, সম্ভবত সিটের ওপরেই। তারপর কখন নিচে পড়ে গেছে। ঝাঁকুনিতে ঢুকে গেছিল সিটের নিচে। ওখানেই নিশ্চয়ই বেজে বেজে ব্যাটারি শেষ হয়ে গেছে। পুলিশ খুঁজেও দেখেনি ভালো করে। বাড়িতে এসে চার্জে বসিয়ে দেখা গেল, মিনির ফোন থেকে বাইশটা মিসড কল।

মিনিকে বোঝাতে হলো। হাহাকার কান্না সামলাতে হলো। সেই সঙ্গে ওর শারীরিক সান্নিধ্যের চাহিদাকেও। আবার — থানা থেকে আসছি, অজস্র লোকের সঙ্গে দেখাশোনা, চান করলে কী হয়েছে, যদি ইনফেকশন হয়ে গিয়ে থাকে… ইত্যাদি। মিনির মোহে পড়লে চলবে না।

ফোনটা এল পরদিন। পরাগব্রতর মোবাইলে। যে নামটা ট্রু-কলার দেখাল, সে নামটা পরাগব্রত চেনে। দীপব্রতর মোবাইল থেকে পাওয়া।

দিপ্‌ব্রৎ-জী কা দেহান্ত হো গিয়া সুনা — ক্যা ইয়ে সাচ হ্যায়?”

পরাগব্রত ওর ভাঙা হিন্দিতে জবাব দিল, “জী আপ কোন বাত কর রহে হ্যায়?”

আপ পহচানিয়েগা নেহি...” নাম না বলেই বক্তা দীপব্রতর মৃত্যু নিয়ে অনেক দুঃখপ্রকাশ করতে শুরু করলেন বক্তা। পরাগব্রত শুনল, বুঝতে পারল অনেক কথার মধ্যে পরাগব্রতর কাছে দীপব্রতর মৃত্যুর সম্বন্ধে যতটা তথ্য সম্ভব জেনে নেবার চেষ্টায় আছেন বক্তা।

এই ব্যাপারটা নিয়ে পরাগব্রত আগেই ভেবে রেখেছিল। কয়েক কোটি টাকার হীরে ওরা এমনি এমনি ছেড়ে দেবে না। যদিও এই লোকগুলো জানে যে দীপব্রতর হীরের ব্যবসা পরাগব্রতর সঙ্গে ছিল না, কিন্তু ও যে কিছুই জানে না, তা-ও সহজে হয়ত মেনে নেবে না। অন্তত হীরে খুঁজতে লোক লাগাবে। সেই গুপ্তধন উদ্ধার, আর আর তার আনুষঙ্গিক সমস্যার সম্মুখীন হতে চায় না পরাগব্রত। তাই বলে দিল কোথায় গেছিল দীপব্রত, কোথায় পাওয়া গিয়েছে ওর দেহ, কী ভাবে মৃত্যু হয়েছে… সবটাই। ওরা যদি ওদিকে নজর দেয়, তাহলে হয়ত দুটো দিন বাড়তি পাওয়া যাবে সব গুছিয়ে নেবার।

সমস্যা একটা বাড়িতেও আছে। মিনি। দীপব্রতকে মেরে ফেলার আগে অবধি ও ভাবত মিনির জন্য একটা থোক টাকা রেখে যাবে। কিন্তু এখন আর ভাবে না। ভাগ্যিস মিনির ফোনে অ্যাপ্‌ দুটো দিয়েছিল! প্রথম দিকে দেখত মিনি শুধু দীপব্রতকেই ফোন করে, আর ফোন আসে কেবল দীপব্রতর ফোন থেকেই। তাই মিনির ফোনে নজরদারি কম করত। দীপব্রত যাবার পরে অনেকদিন ফোন চেক করার কথা মাথায় আসেনি পরাগব্রতর। সেদিন একেবারে খেয়ালেই অন্য ফোনটা নিয়ে দেখতে গিয়ে চমকে উঠল। দীপব্রত মারা যাবার পরে অন্য কয়েকটা নম্বর থেকে মিনির ফোনে ফোন আসা, আর ফোন করা দুই-ই বেড়ে গিয়েছে অনেক। দিনে দু-তিনটে ফোন এই দু-তিনটে নম্বর থেকে আসেই। সবকটাই পরাগব্রতর চেনা নম্বর, সবকটাই দীপব্রতর ফোন থেকেই পাওয়া — তার মধ্যে একটা নম্বর হলো দীপব্রতর ফোনের সেই নম্বরটা, যেটা থেকে ফোন এসেছিল দীপব্রতর মৃত্যু সম্বন্ধে জানতে চেয়ে।

পরাগব্রতর কাছে এখন খেলাটা পরিষ্কার। মিনিকে পাঠান’ হয়েছে — হীরে ব্যবসায়ীদের তরফ থেকেই। দীপব্রত জানত? হয়ত জানত, হয়ত নয়। সেটা জরুরী নয় আর। যেটা জরুরী, তা হলো এই, যে মিনিকে টাকাকড়ি দিয়ে বিদেয় দেওয়ার দরকার নেই। ও থাক এখানেই। এক লহমার জন্য এই বাড়িটা, যেখানে পরাগব্রত বড়ো হয়েছে, সেটা মিনির হাতে ছেড়ে যাবার দুঃখ ওর মনটাকে ভারাক্রান্ত করেছিল, কিন্তু এক লহমার জন্যই। এই বাড়িটা ওর নয়, এতে ওর কোনও অধিকার নেই। ওর যা আছে, তাতেও একই হিসেবে ওর অধিকার নেই, আবার আছে-ও। ওর প্রাপ্য যা ততটুকুতেই ওর শান্তি পাওয়া উচিত।

তিন দিনের দিন সন্ধেবেলা পরাগব্রত মদের গ্লাস হাতে নিয়ে বসল বিকেল শেষ হতে না হতেই। নিজের ঘর থেকে মিনি নেমে আসতে আসতে পরাগব্রতর চোখ ঢুলুঢুলু, নতুন বোতলটা অনেকটাই খালি। মিনি লক্ষ করল, একটা কটাক্ষও করল, পরাগব্রত পাত্তা দিল না। পরাগব্রতকে বেশি মদ খেতে দেখলে মিনির একটা আশা জাগে। পরাগব্রত ঠিক করে রেখেছিল আজ সেটাকে ভঙ্গ করবে না। তাই, মিনি যখন বসার ঘরের সব সোফা ছেড়ে পরাগব্রতর পাশেই এসে বসল, তখন অন্য দিনের মতো ছুতো করে উঠে গেল না। কিছুক্ষণ পরে বরং হাত বাড়িয়ে চানাচুর নেবার ছলে আর একটু কাছে গিয়ে বসল। মিনির হাত উঠে এল ওর হাঁটুর ওপরে। ও গ্লাসটা বাড়িয়ে দিয়ে বলল, “একটু হুইস্কি খাবে? খাও না? খেয়ে দেখো, খারাপ লাগবে না।”

মিনি কী বুঝল কে জানে, পরাগব্রতর গ্লাসটা নিয়ে একটা বড়ো চুমুক দিয়ে মুখটা বাঁকাল। ভালো লাগে না ওর। পরাগব্রত গ্লাসটা ফেরত নিয়ে চুমুক দিল। বলল, “দাঁড়াও, তোমাকে একটা হুইস্কি বানিয়ে দিই। হুইস্কি সাওয়ার খেয়েছ? বেশ ভালো লাগে কিন্তু...”

মিনি আহ্লাদী গলায় বলল, “না, গো… আমাকে ভদকা-ই দাও। আমার ওটাই রোচে।”

মিনিকে হুইস্কি খাওয়ানোর জন্য অনুরোধ করাটা ছিল পরাগব্রতর ছুতো। বিদেশী ভদকার বোতল ছিল হাতের কাছেই। ক্যাবিনেট থেকে বের করে এনে মিনির জন্য ছোটো একটা পেগ বানিয়ে দিল। আজই কিনে এনেছে ছোটো ছোটো বোতল কোল্‌ড ড্রিঙ্ক, তা থেকে ঢেলে দিল গ্লাসে। দীপব্রত চলে যাবার পর থেকে মিনি আর বেশি মদ খেয়ে বেহেড হয়ে যায় না। তাই অন্য ব্যবস্থা করতে হয়েছে পরাগব্রতকে। মিনি ওর ভদকায় মধু আর লেবুর রস দিয়ে বানানো একটা মিশ্রণ নেওয়া পছন্দ করে। আজ সেই মিশ্রণে অনেকটাই ঘুমের ওষুধ মেশানো।

আধ গেলাস মদের পরেই মিনির নেশা হতে শুরু হলো। তার প্রথম লক্ষণ পরাগব্রতর আরও কাছে আসা। আজ ওকে খুশি রেখে মদ খাওয়াতে হবে। পরাগব্রতর মদ খাওয়ার গতি কমে গেল, মিনির বাড়ল। কিন্তু পরাগব্রত যখন ওর গ্লাসে ভদকা ঢালছে, তখন চোখ গ্লাসের দিকে — ‘আর নয়’ বলায় ভুল নেই। নিশ্চয়ই মালিকের হুকুম — বেশি মদ খাওয়া চলবে না। বাকিটায় অবশ্যই কোনও বাধা নেই — বরং উৎসাহ আছে, কারণ তাহলে অসতর্ক মুহূর্তে পরাগব্রত বেফাঁস কিছু বলতে পারে।

পরাগব্রতর চোখ ঢুলুঢুলু, কথা জড়ান’। গ্লাসটা তুলে নিয়ে বাকিটুকু মুখে ঢেলে উঠে দাঁড়াল আর একটা পেগ বানাবে বলে। টলে গেল পা। মিনি জড়ান’ গলায় বলল, “সাবধানে...”

পরাগব্রত ‘হুঁ’, বলে সাইডবোর্ডে যেখানে মদের বোতলগুলো ক্যাবিনেট থেকে বের করেছিল, সেদিকে হাঁটতে হাঁটতে সাবধানে মুখের কাছে গ্লাস এনে প্রায় আধগ্লাস মদ ফেলে দিল আবার গ্লাসের মধ্যেই। তারপরে সাইডবোর্ডের সামনে দাঁড়িয়ে অল্প হুইস্কির মধ্যে অল্প রাম দিল যাতে রং-টা দেখে মনে হয় গাঢ় হুইস্কি। জল দিল, কিন্তু পুরোটা নয়। আবার গ্লাসটা তুলে মুখে দিয়ে ঘুরতে ঘুরতে ভাব করল যেন ওখানে দাঁড়িয়েই একটা বড়ো চুমুক দিয়ে প্রায় এক চতুর্থাংশ নিয়ে নিয়েছে ওখানেই।

কিন্তু এত সাবধানতার প্রয়োজন ছিল না। মিনির নজর পরাগব্রতর গ্লাসের দিকে নয়। ও দাঁড়িয়ে আছে ওখানেই, ওর দিকেই তাকিয়ে। দু-পা ফাঁক করে, দু হাত শরীরের দু দিকে তুলে বিজয়ীর ভঙ্গীতে — ওর বাঁ হাতে ওর শাড়ি, ডান হাতে ব্লাউজ। আর বোঝাই যাচ্ছে শাড়ির নিচে ব্রা আর প্যান্টি ছাড়া কিছুই ছিল না।

ব্লাউজটা ফেলে দিয়ে তর্জনী বাঁকিয়ে কাছে ডাকল পরাগব্রতকে।

পরাগব্রতর কোমর আর তলপেট থেকে আগুনের হলকা উঠে এল গাল, গলা অবধি। মিনির শরীরের আকর্ষণ অমোঘ, এতদিন সেটাকে এড়িয়ে চলাটা ওর পক্ষেও সহজ ছিল না। কিন্তু আজ সে সাবধানতার প্রয়োজন নেই। আজই শেষ।

তড়িঘড়ি মিনি ওকে বিবস্ত্র করল। তারপরে ঠেলে বসিয়ে দিল সোফার ওপরে। বলল, “চুপ করে বোসো। আজ আমি...” বলে ওর কোমরের দু’দিকে হাঁটু গেড়ে বসে আর কিছু করার আগেই ঘাড় এলিয়ে ঘুমিয়ে পড়ল নিল-ডাউন অবস্থাতেই।

নিজের অজান্তেই অস্ফূটে মুখ থেকে একটা গালি বেরিয়ে এল পরাগব্রতর। আজ এই আশাভঙ্গ মেনে নেওয়া কঠিন। মিনির অচৈতন্য নিরাবরণ দেহটা সোফা থেকে নামিয়ে রাখল কার্পেটের ওপর। তারপরে সহবাস করল একটা ঘুমন্ত দেহর সঙ্গে। উত্তেজনায় বেশিক্ষণ থাকতে পারল না। শেষ হয়ে গেল তাড়াতাড়ি। তারপরে ওরও হুঁশ হলো। এখন আর অপেক্ষা করার সময় নেই।

প্রথম কাজ, মধু আর লেবুর রসের বাটিটা সরান’। ওতে ঘুমের ওষুধ আছে। ঠিক ওরকম আর একবাটি ওর ঘরে রাখা আছে। তাতে মধু আর লেবুর রস রয়েছে, ওষুধ নেই। বাটিটা নিজের ঘরে নিয়ে গিয়ে ওষুধহীন বাটিটা থেকে বাড়তি মধু-লেবুর রস ফেলে দিয়ে সমান সমান করে, এতক্ষণ ব্যবহার করা বাটিটা ভালো করে ধুয়ে রেখে দিল। ওষুধবিহীন বাটিটা রেখে দিল সাইডবোর্ডে — যেখানে মদের বোতল, কোল্‌ড ড্রিঙ্ক এসব রয়েছে। ওগুলো, আর মদের গেলাস না হয় কাল মিনি সামলাবে। যতটা ঘুমের ওষুধ খেয়েছে আন্দাজে অন্তত আট থেকে দশ ঘণ্টা ঘুমোবে মিনি। হয়ত আরও বেশি। এবারে নিজের কাজে নজর দিতে হবে…

মিনিকে এখানে এরকম বিবস্ত্র অবস্থায় ফেলে যাওয়া ঠিক হবে না। যদি কোনও কারণে ঘুম ভাঙে, জামাকাপড় ছাড়া বসার ঘরের কার্পেটে শুয়ে আছে দেখলে মদ আর ঘুমের ওষুধ, দুইয়েরই প্রভাব কেটে যেতে পারে। নিজের বিছানায় ঘুম ভাঙলে অত অ্যালার্ট হবে না। দোতলায় গিয়ে পরাগব্রত আগে মিনির ঘরের দরজা খুলে, ভেতরে অল্প আলো জ্বেলে দিল। তারপরে মিনির অসাড় দেহটা দু’হাতে পাঁজাকোলা করে তুলে নিয়ে যেতে গিয়ে বুঝল পারবে না। হাত নেতিয়ে পড়ছে, পা এলিয়ে পড়ছে, সব ওজনটা কেবল ওর দু’হাতের ওপর। তাই ঘাড়ের ওপর দিয়ে ছবিতে দেখা ফায়ার-ম্যান’স লিফট্‌ ভঙ্গীতে নিয়ে দোতলায় উঠল। বিছানায় বসতে হলো মিনিকে খাটে শোয়ানোর জন্য। আড়াআড়ি শোয়াতে হলো, পরে আবার সোজা করতে হলো। মিনি কি কোনও রাত পোশাক পরে? আসেপাশে কিছু নেই। আলমারি খুলে কিছু কি পাবে? জানে না পরাগব্রত। ইচ্ছে হলো না খুঁজতে। কিন্তু আধো অন্ধকারে নগ্ন শরীরটাকে দেখে আবার উত্তেজিত হতে শুরু করল। রিস্ক নিচ্ছে জেনেও আর একবার সঙ্গম করল ঘুমন্ত-অচৈতন্য মিনির সঙ্গে। যথেষ্ট হয়েছে। এবারে বিদায়ের পালা।

নিজের ঘরের বাথরুমে সব তৈরি ছিল। চেয়ারের নিচে কাগজ পাতা ছিল, ধারাল কাঁচি, ট্রিমার, দাড়ি কামানোর সরঞ্জাম… সব। প্রথমে ট্রিমার দিয়ে মাথাভর্তি ঢেউ খেলানো যত্নে রাখা চুল, যা গত কয়েক মাসে কলার পার করে পিঠ অবধি নেমে এসেছে — ছেঁটে প্রায় মাথার সঙ্গে মিশিয়ে দিল। একই সঙ্গে ছেঁটে ফেলল মুখ ভর্তি দাড়ি — যা কী না ওর সারা জীবনের সঙ্গী। তারপরে দাড়ি কামানোর রেজার নিয়ে মাথা কামিয়ে সম্পূর্ণ ন্যাড়া হয়ে গেল। দাড়ি কামিয়ে ফেলল — জীবনে এই প্রথম। সবসুদ্ধ তিনটে ব্লেড লাগল। অনভ্যস্ত হাতে কামাতে গিয়ে অজস্র জায়গায় কাটল। এগুলো পরে জ্বালাবে, কারণ এখন থেকে কতদিন পরাগব্রত জানে না, ওকে ন্যাড়া এবং দাড়িহীন হয়েই থাকতে হবে।

প্রথমে সাবধানে সমস্ত চুলগুলো নিয়ে কাগজে মুড়িয়ে একটা কাপড়ের ব্যাগে ভরল — একটাও যেন না পড়ে থাকে। কাঁচিটা কাজে লাগেনি। ওটা, ট্রিমার, দাড়ি কামানোর সরঞ্জাম সবই আর একটা কাপড়ের ব্যাগবন্দী হলো — কিছুই রেখে যাওয়া যাবে না। পাছে কারওর সন্দেহ হয়, যে লোকটা কোনোওদিন দাড়ি কামায়নি, তার বাথরুমে হঠাৎ নতুন, ব্যবহার করা রেজার কেন?

চান করে, এখন থেকেই নতুন পোশাক। নতুন ধুতি, নতুন ফতুয়া। তাতে আপত্তি নেই। কিন্তু বাড়ি থেকে বেরোন’র সময় সেটা দেখা না-যাওয়াই ভালো। ধুতিটা লুঙ্গির মতো করে জড়িয়ে নিল। অনভ্যাস। ভালো করে গিঁট বাঁধতে হবে। সন্ধেবেলা যেগুলো পরেছিল, সেগুলো সযত্নে বাথরুমে ছাড়া কাপড়ের ঝুড়িতে রেখে দিল। পোশাক বদলেছে, কিন্তু যেহেতু ওর কটা জামা কাপড় আছে কেউ জানে না, তাই কী পরে বেরিয়েছে, তা-ও কেউ জানবে না। একটা জিনিস নিতে হবে। ওর আদ্যিকালের পুরোনো হুডি জ্যাকেটটা, যেটা এই সেদিন বের করেছে আলমারির ওপরের তাক থেকে। কত বছরের পরে আবার পরছে। মাথায় হুডটা তুলে দিয়ে একটা বেসবল ক্যাপ পরল তার ওপরেই। গাড়ি নিয়েই বেরোবে গাড়িবারান্দা থেকে। কিন্তু গেট খুলতে যেতে হবে রাস্তা অবধি। তখন যদি কেউ বাইরে থেকে নজর করে, সে যেন দেখতে না পায় একজন ক্লিন শেভন্‌, ন্যাড়ামাথা লোক পরাগব্রতর গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে গেল। দুটো কাপড়ের ব্যাগ, দুটো মানিব্যাগ, গাড়ির চাবি, আর, ভুবনব্রতকে মারার ক্রিস্টালগুলোর প্যাকেটটা। অতি কষ্টে আগের দিন রাতে অতবড়ো আয়নাটা খুলে প্যাকেটটা উদ্ধার করেছে পরাগব্রত। মিনিকে খাওয়ালে হত, কিন্তু মিনির মৃত্যুটা অত সহজে লুকোনো যাবে না। তাই লোভ হওয়া সত্ত্বেও ওদিকে পা বাড়ায়নি পরাগব্রত।

আর কিছু নেওয়ার নেই এ বাড়ি থেকে। যা নেবার, অনেক দিন ধরেই আস্তে আস্তে সরিয়েছে। বেশিরভাগটাই ক্যাশ, নিজের, আর পরে দীপব্রতর। আর সাত রাজার ধন এক প্যাকেট হীরে। বাকি যা কিছু, আজ পরাগব্রতরই প্রাপ্য। দীপব্রতর উইলের প্রোবেট নেবার নির্দেশ দেওয়া আছে উকিল মিঃ প্রামাণিককে। লকডাউনের পরে কোর্ট খুললে মিঃ প্রামাণিক যোগাযোগ করবেন। তখনও পরাগব্রত আসবে না। কী করবে ভাবা আছে। কিন্তু সে সব চিন্তা পরে।

রাত এখন এগারোটা। প্রথম রাতে বেরোবে না পরাগব্রত। নিজের ঘরে দরজা বন্ধ করে বসে রইল। রাত দুটোর সময় ঘর অন্ধকার করে দরজাটা এক ইঞ্চি ফাঁক করে উঁকি দিয়ে দেখল, সারা বাড়ি অন্ধকার। আগে দোতলায় সিঁড়ির আলোটা রোজ দীপব্রত জ্বালাত, আজকাল মিনি জ্বালায়। ওটা জ্বলছে না। মানে মিনি ঘুম থেকে উঠে ঘর থেকে বেরোয়নি। আস্তে আস্তে নিজের দরজা বন্ধ করে, তালা না-লাগিয়েই, দুটো কাপড়ের ব্যাগ হাতে বেরিয়ে গেল বাড়ি থেকে। অন্ধকার রাস্তার ওদিকে কেউ দাঁড়িয়ে আছে? দেখা যায় না। গেট খুলে গাড়িতে উঠে প্রায় তিরবেগে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে গেল পরাগব্রত। নজর যতটা সামনের রাস্তায়, ততটাই রিয়ার-ভিউ মিররে। কাল সকালে ঘুম থেকে উঠে মিনি আগের ঘটনার পুনরাবৃত্তি দেখবে। তার পরে যা হবার হবে। ওর আর কোনও ইন্টারেস্ট বাকি নেই।


~আট~

পরদিন দুপুরে শহরের অন্যপ্রান্তের নতুন গড়ে ওঠা বসতির নতুন ফ্ল্যাটবাড়ির নতুন ফ্ল্যাটে বেলা করে ঘুম ভাঙল যে লোকটার, তাকে আয়নায় দেখে ও নিজেই চিনতে পারল না। সদ্য কামানো মাথা আর গালে-গলার কাটা জায়গাগুলোয় আবার নতুন করে অ্যান্টিসেপটিক লাগিয়ে আবার শুল কিছুক্ষণ। তারপরে উঠে নতুন মোবাইলটা চালু করে জোম্যাটো অ্যাপ থেকে খাবার অর্ডার করল। বেলা হয়েছে, তাই ব্রেকফাস্ট নয় — সরাসরি লাঞ্চই চাইল। তারপরে ফোন করল ফার্নিচার দোকানে। ওরা এখনও খোলেনি। অর্ডার দেওয়া ফার্নিচার তৈরিই আছে স্যার, লকডাউন যেদিন উঠবে, সেদিনই ডেলিভারি দেব। বেশ, ততদিন খাটিয়া আর ওই আম-কাঠের টেবিলই ভরসা।

আধঘণ্টা পরে মোবাইল বাজল। জোম্যাটোর ডেলিভারি বয় জানতে চাইছে এন জি চক্রবর্তীর খাবার এসেছে, উনি কি নিচে আসবেন? সিকিউরিটি বলছে এ-সময়ে বাইরের লোককে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না। এন জি চক্রবর্তী জড়িয়ে পরা ধুতির ওপর ফতুয়াটা চাপিয়ে নিচে গিয়ে জোম্যাটোর দেওয়া ব্যাগটা নিয়ে এসে টেবিলে রেখে হাত ধুয়ে রান্নাঘর থেকে থালা বাটি চামচ এনে রাখল। এবাড়িতে এখনও সবই নতুন।

কাল বাড়ি থেকে বেরিয়ে গাড়ি নিয়ে অনেকক্ষণ পাড়ারই মধ্যে রাস্তায় ঘুরেছিল পরাগব্রত। যখন নিশ্চিন্ত হতে পেরেছিল, যে কোনও গাড়ি, বা দু-চাকার বাহন ওর পেছনে নেই, তখন একটা দুঃসাহসিক কাজ করেছিল। থানার দিকে রওয়ানা দিয়েছিল। থানা পৌঁছন’র কিছু আগে একটা সরু রাস্তায় ঢুকে একটা গাছের পেছনে গাড়িটা দাঁড় করিয়ে চুপচাপ ঘুমিয়েছিল ঘণ্টা তিন চার। প্রায় ছটার সময় দুটো থলে হাতে যে লোকটা গাড়ি থেকে বেরিয়ে হেঁটে প্রায় কিলোমিটার দুয়েক গিয়ে নতুন মোবাইল থেকে উবার বুক করেছিল, সে আর পরাগব্রত ছিল না। সে-ই এন জি চক্রবর্তী। পুরো নাম, নাড়ুগোপাল।

উবার নিয়ে এসেছিল শহর পার করে, পরাগব্রতর গাড়িটা রয়ে গেছিল ওই থানার পাশের রাস্তাতেই।

ন্যাড়া মাথায় হাত বুলিয়ে একটু হাসল নাড়ুগোপাল। এটাই ওর নাম ছিল। মা বলে গেছে। সবাই নাড়ুই ডাকত। ভুবনব্রতর বাড়িতে এসেই ও পরাগব্রত মুখার্জী হয়েছিল। ওর ঠিকই মনে ছিল।

মা’র কাপড়চোপড়ের তলায় একটা পুরোনো দুমড়োনো কাগজের খাম ছিল। তার মধ্যে কয়েকটা দামী দলিলের কথা পরাগব্রতকে বলে গিয়েছিল মা। একটা বার্থ সার্টিফিকেট, তাতে লেখা ছিল কোন সালের জানুয়ারির কত তারিখ শ্রী শ্রীগোপাল চক্রবর্তী আর শ্রীমতী দয়া চক্রবর্তীর ছেলে শ্রীমান নাড়ুগোপালের জন্ম হয়েছে। আর একটা দলিলে লেখা ছিল আকন্দপুর গ্রামের কোন বাড়িটা আর তার আশেপাশের কতটা জমি শ্রী শ্রীদাম চক্রবর্তীর ছেলে শ্রী শ্রীগোপাল চক্রবর্তীর মালিকানাধীন।

মা যাবার আগে থেকেই শুরু, কিন্তু তার পরে, আর ভুবনব্রত মারা যাবার পর থেকে আরও তাড়াতাড়ি ও বাড়ি ছেড়ে আসার কাজ শুরু করেছিল পরাগ… নাড়ুগোপাল। আধার কার্ড, প্যান কার্ড আর ভোটার আইডেন্টিটি কার্ড। নিজের ছবিই চুল-দাড়ি-গোঁফ বাদ দিয়ে তিনটে কার্ডে বসান’ সহজ হয়নি। সবচেয়ে বেশি খরচ হয়েছিল ভোটার কার্ডে। আজ চট করে ওই ছবি দেখলে কেউ বলতে পারবে না যে ওগুলো ফোটোশপ করে বদলানো। তবে যে ছেলেগুলোকে সরকার কার্ড বানানোর কাজে রেখেছে, তারা এসবে খুবই এক্সপার্ট, সন্দেহ নেই।

আকন্দপুরের কাছের ছোটো শহর আমোদপুর। ওখানে বাজারে বেশিরভাগ দোকানদারই মুসলমান। অনেক রকম দোকান আছে, কিন্তু জেরক্সের দোকান ছিল না। স্কুল আছে, মাদ্রাসা আছে — এমন জায়গায় জেরক্সের দোকান চলবে জেনে শেখ নাসিবুল্লার ছেলের দোকান ভাড়া নিয়ে ওখানে জেরক্সের দোকান খুলবে ঠিক করেছিল একজন নতুন লোক, নাম নাড়ুগোপাল চক্রবর্তী। এই সব লকডাউন-টাউন হলো বলে সে এখনও হয়নিকো, তবে নাড়ুগোপাল ফোন করেছে শেখ নাসিবুল্লার ছেলে শামিমকে। বলেছে, লকডাউন উঠলে চলে আসবে এখানে। যেটা বলেনি, তা হলো তারপরে আস্তে ধীরে আকন্দপুরের জমি জায়গা দাবী করবে। ওখানে কেউ পরাগব্রতর নাম জানে না, যেমন ভুবনব্রতর বাড়িতে এখন যে মানুষটা আছে, সে জানে না নাড়ুগোপালের কথা। দীপব্রত যাবার পর থেকে বার বার অফিসের সব কাগজপত্র একটা একটা করে নামিয়ে তন্নতন্ন করে খুঁজে দেখেছে, কোথাও নাড়ুগোপাল, শ্রীগোপাল, বা দয়া চক্রবর্তীর নাম লেখা একটা কাগজও নেই।

ও সব পরে। ভাইরাসমুক্ত একটা জগত আগে আসুক, তখন সে সব দেখা যাবে। আপাতত দুপুরবেলায় ফ্ল্যাটবাড়ির সামনের রাস্তায় মর্নিং ওয়াক করতে বেরোল নাড়ুগোপাল চক্রবর্তী — ডাক নাম ন্যাড়া।