রা
|
জকন্যার মন খারাপ। হবেই
বা না কেন? বাবার কাছে বকুনি খেতে কারই বা ভাল লাগে? সকাল বেলা বাবাকে বলতে
গিয়েছিল, “পিতাশ্রী, নতুন গুরুমশাইয়ের কাছে দীক্ষা নিতেই হবে? পূর্বের গুরুমশাইয়ের
মন্ত্রে তো আমি রোজই পুজো করছি।” বাবা হঠাৎ রেগে বলল, “তুমি জানো, একমাত্র ইনিই
আমাদের সবাইকে, বিশেষ করে তোমাকে, বিপদ থেকে রক্ষা করতে পারবেন। উনি যেমন বলবেন,
তেমনই হবে। কোনও কথা বলবে না। গুরুমশাই মন্ত্র দেবেন, তুমি নেবে। ভক্তিভরে।”
কী
করে বাবাকে বোঝাবে, ভক্তি আসে না গুরুমশাইকে দেখলে – আসে ভয়! মনে হয় তীব্র দৃষ্টি
দিয়ে কঙ্কাবতীর মনের ভেতরটা নারকেল কোরার মতো কুরে কুরে বের করে আনছে।
বাবার
কথা অমান্য করতে পারবে না, কঙ্কাবতী ঠিক সময়ে মন্দিরে গিয়ে কালীমা’র সামনে বসল।
এটা নতুন মন্দির। গুরুমশাইয়ের আদেশে বাবা আগের মন্দির ভেঙে নতুন মন্দির তৈরি করছে।
এটা
কঙ্কাবতীর পছন্দ হয়নি বলে রাজামশাই রাজকারিগরকে বলেছে, “মন্দিরগাত্রে অনেক মূর্তি
তৈরি করবে রাজকন্যার মুখ সামনে রেখে। তা হলেই রাজকন্যার পছন্দ হবে।” বাইরেটা শেষ
হয়েছে, কিন্তু কঙ্কাবতীর তাও পছন্দ হয়নি। এটা ওর মন্দির বলে মনেই হয় না। মনে হয়
নতুন গুরুমশাইয়ের ডেরা।
গুরুমশাইয়ের
চোখের দিকে তাকানোর উপায় নেই। তাই মাটির দিকে তাকিয়ে রইল। মনে মনে ঠিক করল,
গুরুমশাইয়ের মন্ত্র শিখবে না। আগের গুরুর মন্ত্রই বলবে মনে মনে।
না
তাকিয়ে উপায় নেই। গুরুমশাই গম্ভীর গলায় বলল, “আমার দিকে তাকাও, রাজকুমারি।
মন্ত্রোচ্চারণ করো। সজোরে। আমি
যাতে শুনতে পারি। মনে রেখো, আর কিছুদিন পরেই তোমার বিপদ
আসন্ন। বাঁচতে চাইলে আমার মন্ত্রই তোমাকে বাঁচাবে।”
মন্ত্র
নিয়ে ফিরে আসার পথেই রাজকন্যা কঙ্কাবতী মনে মনে আগের মন্ত্র বলতে শুরু করল। কখনওই
এই গুরুর মন্ত্র ও বলবে না। আগের মন্ত্র বলবে। আগের মন্ত্র। ওর স্থির বিশ্বাস, ওই
মন্ত্রই ওকে বাঁচাবে। নতুন গুরুমশাইয়ের মন্ত্র নয়।
নিজের
মহলে ফিরে কঙ্কাবতী পুজোর ঘরে বসে আবার আগের গুরুর মন্ত্র বলে ঠাকুরকে জল দিল। তার
পরে সুন্দর করে সেজে তৈরি হল রাজসভায় যাবে বলে। আজ বাবা রাজকন্যার স্বয়ম্বর ঘোষণা
করবে। তার জন্য রাজকন্যাকে সভায় থাকতেই হবে।
রাজসভা
লোকারণ্য। রাজধানীর সবাই শুনেছে, রাজামশাই কিছু একটা ঘোষণা করবে। কী সে ঘোষণা কেউ
জানে না, তবে সবাই আন্দাজ করেছে, সে রাজকন্যার স্বয়ম্বর। বারো বছর বয়েস হতে চলেছে
রাজকন্যার। আগামী পূর্ণিমায় তার জন্মতিথি। রাজসভা আর বাইরের আঙিনা গমগম করছে।
রাজা
সিংহাসনে বসার পরে মহামন্ত্রী সভার কাজ ঘোষণা করল। সবাই আস্তে আস্তে চুপ করল,
রাজামশাই হাত জোড় করে রাজগুরুর দিকে তাকিয়ে বলল, “গুরুদেব, আশীর্বাদ করুন। শুভকাজ
শুরু করি।”
গুরুমশাই
মাথা হেলাল। তার পরে এক পা এগিয়ে এসে দু’হাত তুলে উদাত্তকণ্ঠে
মন্ত্রোচ্চারণ শুরু করল।
রাজার
ডানদিকে, চিক এবং ঝালর দেওয়া বারান্দায় বসে রাজকন্যা উৎকণ্ঠিত হয়ে ছিল, হঠাৎ
মাথাটা কেমন হালকা লাগতে শুরু করল। পাশে তাকিয়ে অবাক হয়ে দেখল, সখীরা,
রানিমা, সবাই কেমন আচ্ছন্নের মতো হয়ে আছে। হঠাৎ খট করে শব্দ হওয়াতে নিচে তাকিয়ে
দেখল, রাজসিংহাসনে বসা রাজার হাত থেকে রাজদণ্ড খসে পড়েছে। দেখতে দেখতে রাজার
প্রাণহীন দেহ সিংহাসন থেকে লুটিয়ে পড়ল মাটিতে। রাজকন্যা অবাক হয়ে দেখল চারিদিকে
মন্ত্রী, সেনাপতি, সান্ত্রী, প্রহরী, সভাসদ, সকলে একে একে মাটিতে পড়ে যাচ্ছে –
সকলেই মৃত। তাকিয়ে দেখল আশে পাশে সকলেই মাটিতে পড়ে গিয়েছে।
দেখেই বোঝা যাচ্ছে কারওরই নিঃশ্বাস পড়ছে না। কেবল গুরুদেব দাঁড়িয়ে মন্ত্র পড়েই
যাচ্ছে, পড়েই যাচ্ছে...
ভয়ে,
আতঙ্কে রাজকন্যার মাথা ঘুলিয়ে গেল। তাড়াতাড়ি উঠে পালাতে গেল, কিন্তু গুরুদেব ঘুরে
তাকাল, একটা হাতের আঙুল ঘুরে গেল রাজকন্যার দিকে, রাজকন্যা জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে
পড়ে গেল।
*
জ্ঞান ফিরল, তখন
চারিদিক ঘুটঘুটে অন্ধকার। প্রথমে বুঝতে পারছিল না অন্ধ হয়ে গেছে কি না। হাতড়ে
হাতড়ে বুঝল ওর বিছানাতেই শুয়ে আছে। কে নিয়ে এল এখানে? উঠে বসল রাজকন্যা। সঙ্গে
সঙ্গে দেওয়ালে কুলুঙ্গিতে একটা প্রদীপ জ্বলে উঠল। গাঢ় অন্ধকারের পরে ছোট্টো
প্রদীপের আলোই চোখে লাগল যেন আগুনের ছ্যাঁকা। হাত
দিয়ে চোখ আড়াল করল রাজকন্যা কঙ্কাবতী।
হঠাৎ
ঘরটা গমগম করে উঠল গুরুদেবের কথায়। গুরুদেব বলল, “নিজেকে খুব চালাক মনে করো, তাই
না? আমার মন্ত্র উচ্চারণ করোনি। তাই বেঁচে আছ।
কিন্তু বেঁচে যাওনি। তোমার রাজত্ব এখন আমার। তোমার মা, বাবা, দাদা, দিদি, আত্মীয়রা
কেউ বেঁচে নেই। তুমি মরনি, কিন্তু এখন থেকে এই ঘরের বাইরে আর বেরোতে পারবে না। আজ
তোমার ঘরবাড়ি সবই মাটির নিচে। এখানেই ঘুমিয়ে থাকবে তুমি অনন্তকাল। আমার কালসাপ বাইরে
পাহারা দেবে। তার নিঃশ্বাসের বিষে তুমি চিরদিন ঘুমিয়ে থাকবে।”
রাজকন্যা
চেঁচিয়ে বলল, “ভবিষ্যৎবাণী রয়েছে। ভিনদেশী রাজপুত্র এসে আমাকে মুক্তি দেবে।”
হা
হা করে হেসে উঠল গুরুদেব। বলল, “সে তোমায় খুঁজে পেলে তো। খুঁজে পেয়ে কালসাপ পেরিয়ে
ঘরে ঢুকলে তো। আর তার পরে আমি নেই?”
অন্ধকারে
রাজকন্যা শুনতে পেল এক মস্ত সাপের হিংস্র ফোঁস-ফোঁসানি।
গল্পের
সময়ে
বে
|
শি দিন আগের না,
এই সেদিনের কথা। এখান থেকে খুব দূরেও না,
কাছেই। শহর থেকে ঘণ্টা তিনেক বাসে করে গেলে পুখরি।
পুখরিবাজারের পাশ দিয়েই বয়ে চলেছে সিন্তনা নদী। নদীতির
ধরে পায়ে হেঁটে দেড় ঘণ্টা হাঁটলে গাভারি গ্রাম। নৌকোয় গেলে ভাঁটার টানে কুড়ি
মিনিটেই পৌঁছন যেত। গাভারি গ্রামে থাকত একটা ছেলে – শীতল।
শীতলের বাবা গ্রামের মুদিখানার মালিক। শীতল পড়ত গ্রামের ইশকুলে। পড়াশোনায় ভাল।
মা-বাবা স্বপ্ন দেখত, একদিন শীতল শহরে গিয়ে বড়ো অফিসার
হবে। মস্তো গাড়ি করে অফিসে যাবে। শীতলের বিরাট ঘরটা হবে পাহাড়ের বরফের মতো ঠাণ্ডা।
মস্তো উঁচু বাড়ির এক্কেবারে ওপরতলায় শীতলের বাড়ি... ঠিক যেমন সিনেমায় দেখায়।
শীতল
অবশ্য অতশত ভাবত না। ও গাঁয়ের ছেলে। গ্রামের ইশকুলে যতোই ভালো ফল করুক,
মা বাবার স্বপ্নের মতো চাকরি পাওয়া,
অতো বড়ো বাড়ি কেনা, কোনওটাই
সহজ না। ও খুব বড়োজোর একটা লেখাপড়া জানা গ্রাম্য মুদি-দোকানদার হবে! ওর মন থাকত
অন্যদিকে। গ্রামের চারপাশের জঙ্গলে জঙ্গলে ঘুরে বেড়াত। জঙ্গলে অনেক ভাঙা বাড়ি ঘরের
ধ্বংসাবশেষ। কেউ জানতো না সেগুলো কবেকার। গ্রামের লোকে বিশ্বাস করত বহু বছর আগে
নিশ্চয়ই কোনও বড়ো রাজত্ব ছিল ওখানে। তবে সে এখন জঙ্গলের গভীরে। অত দূরে কেউ আর যায়
না। শীতল যেত। জঙ্গলে নানা কিছু দেখে অবাক হয়ে ফিরে এসে মা বাবাকে বলত। ওর মা বাবা
ওর মত অবাক হত না। ভাবত, ছেলে যদি বনে
বাদাড়ে এত না ঘুরে আর একটু পড়াশোনা করত...
সে
দিন শীতল ফিরে এসে বলল, জঙ্গলে একটা কুয়ো
দেখেছে, পাথর দিয়ে বাঁধানো।
ওর
মা বাবাও অবাক হল। কিন্তু অন্য কারণে। পাথরে বাঁধানো পুরোনো কুয়ো কি জঙ্গলে আর নেই?
তাহলে এই একটা কুয়ো দেখে ছেলে অবাক হল কেন?
শীতল
বলল, “জঙ্গলের অন্য সব কিছুই
ভাঙা-চোরা, এটা একেবারে নতুনের মতন।”
এই
বার ওর মা বাবা ব্যাপারটা বুঝল। কিন্তু এত ভাবতে হবে কেন বুঝল না। বাকি সব ভেঙে
গেছে। এটা ভাঙেনি কেন? কারণ আছে নিশ্চয়ই – কিন্তু সে
কি কেউ জানে? কেউ না। তাই অতো ভেবে কোনও লাভ
নেই। ব্যস।
মা
তো বলেই বসল, “এ রকম আদাড়ে বাদাড়ে না ঘুরে
একটু অঙ্ক করলেও তো হয়?”
কিছু
বলল না শীতল। দু-মাস আগেই পরীক্ষার রেজাল্ট বেরিয়েছে। শীতল শুধু ফার্স্ট হয়নি,
অঙ্কে, আর পদার্থবিদ্যায়
পুরো নম্বর পেয়েছে। মা বাবা আজকাল ওর নম্বর দেখে অবাক তো হয়ই না,
বরং এমন ভাব করে যেন এ কিছুই না। আর যতোই ভালো করে ততোই
ওর মা বাবা আরও ধরেই নেয়, যে শহরে গিয়ে
শীতলের অফিসার হতে আর দেরি নেই।
পরদিন
ইশকুলে কথাটা সমরকে বলল। সমর গ্রামের জমিদারের খাজাঞ্চীর ছেলে। ওর সঙ্গে পড়ে।
শীতলের সঙ্গে ওর বন্ধুত্বর কারণই হল এই, যে
সমরও ওরই মতন জঙ্গলে ঘুরতে ভালোবাসে। সমরও অবাক হল। জঙ্গলের মধ্যে কুয়ো?
একেবারে আস্ত? আর
কিছু দেখেছিস?
মাথা
নাড়লো শীতল। না। সে দিন ঘুরতে ঘুরতে জঙ্গলেরর অনেক ভেতরে চলে গিয়েছিল,
সন্ধে হতে দেরি ছিল না। তাড়াতাড়ি ফিরতে হয়েছিল।
“চ’,
আর একদিন যাই। রাস্তা চিনে যেতে পারবি তো?”
শীতল
ঘাড় হেলালো। পারবে।
দু-জনে
রবিবার বেরোলো দুপুর-দুপুর। অনেকটাই রাস্তা। জঙ্গল এখানে বেশ ঘন। কিন্তু শীতলের
দিক-জ্ঞান ভালো, কুয়োটা খুঁজে পেতে বেশি দেরি
হল না। সাবধানে কুয়োর দেওয়াল ধরে উঁকি দিল দু-জনে। হয় জল নেই,
নইলে এতোই নিচে, যে
দেখা যাচ্ছে না। সমর একটা বড়োসড়ো পাথর নিয়ে এল। শীতলের হাতে দিয়ে বলল,
“আমি ‘হ্যাঁ’
বললেই ফেলবি।” পাথরটা ফেলার কতক্ষণ পরে জলের ঝপাং শব্দটা
পাওয়া যায়, তা থেকে জল কত নিচে বোঝার একটা
অঙ্ক আছে। সমর জানে শীতল সেই অঙ্কটা মুখে মুখে করে দিতে পারবে।
ঘড়ির
দিকে চোখ রেখে সমর বলল, “হ্যাঁ।” তখুনি
পাথরটা কুয়োর ভিতর ফেলে দিল শীতল। দু-জনে কান বাড়িয়ে দিল কুয়োর দিকে। শুনতে পাওয়া
যায় কি কিছু?
নাঃ।
অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। কোনও শব্দই এলো না। জঙ্গলের নিস্তব্ধতাতেও অনেক শব্দ পাওয়া
যায় – গাছের পাতায় হাওয়ার সরসর শব্দ, কাছে,
দূরে কোকিলের ডাক, এমনকি
ওদের নিজেদের বুকের ধুকপুকুনিও। কিন্তু পাথরটা বড়োই ছিল। জল অনেক নিচে থাকলেও শুনতে
পাওয়া উচিত ছিল।
“পাতালে
গেছে,” বলে সমর রওয়ানা দিল কুয়ো ছেড়ে। “চ’
দেখি আর কিছু পাই কি না।”
*
দুজনে বাড়ি ফিরল
সন্ধের কাছাকাছি। খুব উত্তেজিত দু-জনেই। জঙ্গল-জুড়ে এখানে ওখানে আরও অনেক কিছু
পেয়েছে ওরা। এগুলো অন্য ধ্বংসস্তুপের মতো না। এক সময় ওগুলো বিরাট বিরাট বাড়ি ছিল।
কোনওটাই আর আস্ত নেই, তবু পাথরের দেওয়াল আর পাথরের
মেঝে দেখে বোঝা যায় বাড়িগুলো ছিল প্রাসাদের মতো। গাঁয়ের জমিদারবাড়ির চেয়েও বড়ো।
সমরের
বাবা জমিদারের খাজাঞ্চি। অনেক লেখাপড়া শিখেছে।
বলল, “এতো বড়ো বাড়ি?
তার মানে সে রাজা সত্যিই বড়ো রাজা ছিল বলতে হবে!” শীতলের
বাবা মা তেমন অবাক হল না। বলল, “তাতে কী হয়েছে?”
কী
হয়েছে, দেখা গেল পর দিন ভোর না হতে।
সূর্য তখনও ওঠেনি, দরজায় দমাদ্দম ধাক্কা। জমিদারের
পেয়াদা এসেছে। শীতলের বাবা হরনাথ মুদি তড়িঘড়ি গিয়ে দরজা খোলার আগেই মড়মড় করে ভেঙে
পড়ল দরজা, পেয়াদাদের সর্দার ঘরে ঢুকে এক
ধাক্কায় বাবাকে ছিটকে ফেলে দিল মাটিতে, জুতো
মসমস করে ঘরে ঘরে ঢুকে কী খুঁজতে শুরু করল।
ভিতরের
ঘরে শীতল আর ওর মা ঘুম ভাঙা চোখে ভয়ে ভয়ে বসেছিল, সর্দার
এক ঝটকায় ওকে টেনে নামাল খাট থেকে।
“এই
ছোঁড়া, গুপ্তধন কোথায়?”
গুপ্তধন?
কিসের গুপ্তধন? শীতল
অবাক।
“বলবি
না?” এক চড়ে শীতলকে ঘরের
অন্যপ্রান্তে ছিটকে ফেলে সর্দার ওর লোকেদের বলল, “সব
খুঁজে দেখ। এর মধ্যেই নিশ্চয়ই লুকোনো আছে।”
শীতলদের
যতোটুকু সোনা ছিল, সবটা, তার
সঙ্গে ওদের সব থালা-বাটিও নিয়ে গেল সেপাইরা। ওরা কত করে বলল যে ওগুলো কোনও গুপ্তধন
না – এমনকি কোনও ধনই না, শুনলই না। ঘর-বাড়ি
তছনছ করে চলে গেল, শীতলের মা হাহাকার করে কাঁদতে
লাগল, মার খেয়ে আহত শীতল আর ওর বাবা
ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল। প্রতিবেশীরা দূর থেকে ভীড় করে দেখতে থাকল,
কেউ এগিয়ে এল না। জমিদারের যার ওপর রাগ হয়েছে,
তাকে বাঁচাতে গিয়ে বিপদ ডেকে আনতে কেউ চায় না।
হতভম্ব
অবস্থাটা
খানিকটা কাটতে না কাটতেই হঠাৎ ছুটে এলো সমর। ঘরে ঢুকে ভাঙা পাল্লাটা দিয়েই যতটা
পারা যায় বাইরের দরজাটা ঢাকল। তারপরে শীতলের বাবাকে বলল, “কাকু
আমাদের একখুনি গ্রাম ছেড়ে পালাতে হবে।”
এমন
অদ্ভুত কথা শুনে অবাক হয়ে শীতলের বাবা মা সমরের দিকে চেয়ে রইল। গ্রাম ছেড়ে পালাতে
হবে? কোথায়? কী
করে... যে মানুষগুলো জীবনে কোনও দিন আশেপাশের কোনও
গ্রাম ছাড়া কোত্থাও যায়নি, তারা বাড়ি ঘর ছেড়ে
যাবে কোথায়? করবে কী?
খাবে কী করে? থাকবে
কোথায়?
সমর
বলল, “হরকাকু, আমাদের
সর্বনাশ হয়েছে। কাল আমি আর শীতল জঙ্গলে যে পুরোনো বাড়ি-ঘরের ধ্বংসাবশেষ পেয়েছি,
কে গিয়ে সেই খবর জমিদারের কানে তুলেছে এই বলে,
যে আমরা নাকি ওখানে গুপ্তধন পেয়েছি। জমিদার সঙ্গে সঙ্গে
পেয়াদা পাঠিয়েছে, বলেছে, গুপ্তধন
নিয়ে এসো। পেয়াদা আমাদের বাড়িতে এসেও এই রকম ভাঙচুর, লণ্ডভণ্ড করে সব সোনাদানা,
গয়না, বাসন-কোসন নিয়ে চলে গেছে। কিন্তু
তাতে তো আমরা বাঁচবো না। জমিদার যেই স্যাকরা ডেকে জিজ্ঞেস করবে,
ওরা বলে দেবে, এগুলো
কোনওটাই গুপ্তধন না – তখন জমিদার আমাদের ধরে নিয়ে গিয়ে মারধোরও করবে,
মেরেও ফেলতে পারে।”
ওরা
মুখ তাকাতাকি করল। দেশে এখন আর রাজা মহারাজার যুগ নেই বটে, কিন্তু
ওদের জমিদার যদি কারওর ওপর রেগে যায় কী হতে পারে সে ওরা দেখেছে এই কদিন আগেই।
উপেন
ছিল ওদের গ্রামের পয়সাওয়ালা চাষী। ওর বাপ-ঠাকুর্দার অনেক জমি জায়গা ছিল,
কিন্তু উপেনের ছেলেবেলার বদ অভ্যাসের জন্য সবই গিয়ে বাকি
ছিল মাত্র দু বিঘা। জমিদারের নজর পড়েছিল সে দু বিঘার ওপর। ফলের বাগান করেছিল
জমিদার, উপেনের ওই দু-বিঘা পেলে
কেবলমাত্র বাগানটা চৌকো হয় তা নয়, উপেনের আম ছিল
গ্রামের সেরা আম। আম উঠলে গ্রামের সবাই সে আমের ভাগ পেত। জমিদার উপেনকে ডেকে
পাঠিয়ে বলেছিল, “জমি আমাকে বিক্কিরি করে দাও।”
উপেন রাজি হয়নি। তার ক’দিন পরে রাতে
উপেনের বাড়িতে আগুন লাগল, পরদিন সকালে দেখা
গেল সব ছাই হয়ে গেছে। কেউ কোত্থাও নেই। তারও কিছুদিন পর জমিদারের বাগানের পাঁচিল
বেড়ে উপেনের বাগান ঘিরে নিয়েছিল। উপেনকে আর গ্রামে দেখা যায়নি। কেউ বলে ও মরে গেছে,
কেউ বলে সন্ন্যাসী হয়ে চলে গেছে পাহাড়ে।
হতাশ
চোখে শীতলের বাবা বলল, “কোথায় পালাব?”
সমর
বলল, “গ্রামের বাইরে বাবা-মা আর দিদি
লুকিয়ে আছে। পালিয়ে আমাদের যেতে হবে অনেক দূর। শহরে যেতে হবে। সেখানে জমিদারের হাত
পৌঁছবে না। তোমরা এতো ভয় পেলে চলবে না। জমিদারের
পেয়াদা ফিরে এল বলে। অল্প কিছু কাপড় জামা নিয়ে নাও। আর, টাকাকড়ি
আছে কিছু?”
বোকার
মতো হরনাথ মুদি বলল, “টাকা তো সব দোকানে!”
শীতলের
মা উঠে পড়ল। বলল, “ছেলেটা ঠিক বলছে।
আর দেরি করা যায় না। কিন্তু যাব কোথায়?”
সমর
বলল, “এক্ষুণি যাব ওই সেখানে,
যেখানে জঙ্গলের মধ্যে সেই ভাঙা বাড়িগুলো দেখেছি। শীতল,
তুই এক কাজ কর। আমি হরকাকু আর কাকীমাকে নিয়ে এগোচ্ছি।
তুই এক ছুটে দোকানে যা। যতো পারিস টাকাকড়ি আর কিছু চাল-ডাল-নুন নিয়ে আসিস। দিন
কয়েকের আগে জঙ্গল থেকে বেরোনো যাবে না। তারপরে নদীর ঘাট থেকে রাত্তিরে একটা নৌকো
চুরি করে পালাবো। এ ছাড়া গতি নেই।”
আর
অপেক্ষা না করে শীতল দৌড়ল বাবার মুদিখানায়। বাড়ির গায়েই দোকান। কপাল ভালো
পেয়াদাদের ওখানে ঢোকার কথা খেয়াল হয়নি।
*
অনেক দিন কেটে
গেছে। শহরে শীতল আজ বড়ো অফিসার না হলেও বড়ো চাকরিই করে। বিরাট উঁচু বাড়িতে না হলেও
মাঝারি উচ্চতার বাড়িতে ওর ফ্ল্যাট। সেই পাড়াতেই, একটু
দূরে, ছিল ওর বাবার ছোট্টো মুদির
দোকান। এখন বয়েস হয়েছে, পারে না,
তাই দোকান বিক্রি করে বাড়িতেই থাকে। আজকাল শীতলের সঙ্গে
আর সমরের দেখাসাক্ষাৎ হয় না। সমরের বাবা-মা-দিদিও
আর ওর বা ওর বাবা মায়ের সঙ্গে যোগাযোগ রাখে
না। প্রথম প্রথম ওরা গ্রামের মতো একই সঙ্গে একই ইসকুলে পড়ত। পরে সমরের বাবা ওকে
একটা নামকরা স্কুলে ভর্তি করে দেয়। তার পর থেকেই দু’জনের
যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। কলেজে ভর্তি হয়ে শীতল কয়েকবার
সমরের সঙ্গে দেখা করেছিল, কিন্তু এই ক’
বছরে ওরা কেউই আর আগের মতো নেই, বড়ো
হয়ে গেছে। বন্ধুরাও আলাদা, ইচ্ছেগুলোও অন্য।
বন্ধুত্ব এগোয়নি আর।
ছোটোবেলার
ইচ্ছে সফল করেই বড়ো হয়ে শীতল এখন প্রত্নতাত্ত্বিক। মানে আর্কিওলজিস্ট। সরকারি
চাকরি করে। প্রাচীন বাড়িঘর খুঁজে বের করাই ওর কাজ। মাটি খুঁড়ে দেশের নানা কোণে ও
বড়ো বড়ো মন্দির, রাজবাড়ি –
এ সব খুঁজে পেয়েছে। তবে সবই ওর ওপরওয়ালার নির্দেশমত।
নিজের ইচ্ছে, জ্ঞান, বুদ্ধি
অনু্যায়ী কিছু করার অধিকার ওর এখনও নেই।
সেই জন্যই ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও একটা বিশেষ রাজবাড়ি
খুঁজতে যেতে পারেনি এখনও। সে রাজবাড়িটাও আজকাল প্রায়ই স্বপ্নে দেখে ও। দেখে একটা
বিরাট জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। যেতে যেতে সেই বাড়িটায় ঢুকে যায় যেটা সমর আর ও
খুঁজে পেয়েছিল।
সেদিনও
স্বপ্নটা দেখছিল শীতল, মা’র
ডাকে ঘুম ভেঙে গেল। রাগ করে উঠে ঘড়ির দিকে চোখ পড়তেই হুড়মুড়িয়ে দৌড়ল বাথরুমে – আজ
জীবনে প্রথম বার অফিস যেতে দেরি হবে।
কোনও
রকমে নেয়ে খেয়ে, মা আনা
সম্বন্ধের কয়েকটা ছবি অফিস থেকে ফিরে দেখবে, এমন
কথা দিয়ে, ছুটে, বাসে
করে, হেঁটে অফিস পৌঁছলো প্রায় দশ
মিনিট দেরিতে। ঢুকেই শুনলো পাকড়াশি স্যার ডেকেছে।
“খেয়েছে,”
আজই দেরি হতে হল! তাড়াতাড়ি স্যারের ঘরে দৌড়ল শীতল। ভয়ে
হাত ঘেমে গেছে। প্যান্টের পেছনে মুছে স্যারের ঘরের ব্যাট-উইং-ডোর ঠেলে ঢুকে দেখল
স্যারের বেয়ারা কফি নিয়ে এসেছে। স্যার মুখ তুলে শীতলকে দেখে বলল,
“শীতলের জন্য আর এক কাপ। এসো, শীতল,
বোসো। বুদ্ধ কফি আনুক, তারপরে
ওকে টাকা দিও, সবার জন্য মিষ্টি আনতে।”
বকুনি
খেতে হয়নি, সেই আনন্দেই শীতল মিষ্টি আনাতে
পারত। কিন্তু, স্যার কেন মিষ্টি আনাতে বলছে?
জিজ্ঞেস করল, “কেন
স্যার?”
পাকড়াশি
স্যার একগাল হেসে বলল, “তোমার প্রোমোশন
হয়েছে।”
পাকড়াশি
স্যারের ঘর থেকে শীতল ফিরল প্রায় নাচতে নাচতে। প্রোমোশন মানে কেবল উঁচু পদ আর বেশি
মাইনে নয়, এখন শীতল ইচ্ছেমত যেখানে চায়
সেখানে নিজে নিজে পুরোনো বাড়ি ঘর খুঁজতে যেতে পারে। শীতল ঠিক করল দেরি করবে না। শিগগিরিই
শুরু করবে।
*
মা বাবার আপত্তি
অগ্রাহ্য করে, “আরে, কিচ্ছু
হবে না, আমাকে জমিদার দেখতেও পাবে না,
দেখলে চিনতেও পারবে না,” বলে
ভরসা দিয়ে শীতল একা একাই চলে গেল গাভারি।
তবে
মা বাবার কথা মেনে সরাসরি গাভারি
না গিয়ে উঠল পুখরিবাজারে। শুনল, গাভারির এ ক’বছরে
কোনও উন্নতিই হয়নি। বরং জমিদারের অত্যাচারে আরও অনেকেই গ্রাম ছেড়ে চলে গেছে।
বাইরের লোকের থাকার কোনও জায়গাই নেই।
পুখরিবাজার
থেকে সাইকেল ভাড়া করে শীতল গিয়ে পৌঁছল গাভারি। কিন্তু গ্রামে ঢুকল না। প্রথম
বাড়িতে সাইকেলটা রেখে হেঁটে ঢুকল জঙ্গলে। এ ক’বছরে
গ্রামের গরিব লোক অনেক গাছ কেটেছে, কিন্তু সেটা বাইরের
দিকে। যত ভিতরে যায়, জঙ্গল ততো আগের মতোই ঘন। শেষ পর্যন্ত
পৌঁছল সেইখানে, যেখানে, একদিন,
ছোটোবেলায়, ওরা
ভয়ে ভয়ে লুকিয়েছিল কয়েকদিন, আর বাইরে ওদের
খুঁজে বেড়াচ্ছিল জমিদারের পেয়াদা।
সঙ্গে
ক্যামেরা ছিল। ভেঙে-পড়া বাড়িগুলোর ছবি তুলল অনেক। ফিরে গিয়ে এগুলো বইয়ের ছবির
সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে হবে। কতোদিনের পুরোনো হিসেব করতে হবে।
দিনের
শেষে অনেক ছবি তুলে পুখরিবাজার ফিরে গেল শীতল। ক্লান্ত। চান করে,
খেয়ে, বিছানায় শোয়ামাত্র
ঘুমিয়ে পড়ল।
স্বপ্নে
দেখল, জঙ্গলের মধ্যে সেই বিরাট
রাজপ্রাসাদ।
পরদিন
শীতল আবার সকালে সাইকেল নিয়ে জঙ্গলে গেল। ছোটোবেলায় যে বাড়িটা খুঁজে পেয়েছিল,
যেখানে ওরা এসে লুকিয়ে ছিল, সবটাই
গতকাল ও ঘুরে দেখেছে, এখন আর কী কী আছে,
দেখতে হবে। এমন রাজপ্রাসাদের মতো বিরাট বাড়ির চারপাশে আর
কিছু কি ছিল না? সেগুলোর মধ্যে কিছুই কি আর বাকি
নেই?
চারপাশের
জঙ্গল এতোই ঘন, যে কিছু থাকলেও দেখা মুশকিল।
কিন্তু হাল ছাড়ল না শীতল। কিছুক্ষণের মধ্যেই একটু দূরে একটা ভীষণ গভীর ঝাড়ের কাছে
এসে মনে হল, এখানে একটা কিছু আছে। কিন্তু
এতো ঘন জঙ্গল কি কুঠার আর বড়ো কাস্তে ছাড়া কেটে ঢোকা যাবে? গ্রামে
ফিরে গিয়ে লোক ডেকে আনবে?
সাত-পাঁচ
ভাবতে ভাবতে শীতল একটা লতা ধরে টেনে বুঝল এমন কাঁটা-লতা ভেতরের বাড়িটাকে
আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রেখেছে। কী মনে হল, লতাটাকে
ধরে দিল এক হ্যাঁচকা টান। ওমনি সরসর সরসর করে ফিতের মতো লতাটা খুলতে খুলতে আলগা
হয়ে শীতলের পায়ের কাছে এসে পড়তে থাকল। আর পেছনের দেওয়ালের অনেকটাই ফাঁকা হয়ে গেল।
অবাক হয়ে শীতল দেখল – একটা মন্দির। মন্দিরের একটা দেওয়ালের খানিকটা,
আর দরজাটাও বেরিয়ে এসেছে কাঁটালতার ঘেরাটোপ থেকে।
মন্দিরের গায়ে অনেক মূর্তি। অনেক জায়গায় এমন নানা মূর্তি মন্দিরের গায়ে খোদাই করা
থাকে। মানুষ, পশু, রোজকার
জীবন, ঠাকুর-দেবতা,
সব। কিন্তু সে অন্য জায়গায়। এখানকার মন্দিরে ঠাকুর-দেবতা
ছাড়া আর কিছু থাকেই না। কিন্তু এখানে তা মনে হচ্ছে না। বিশেষ
করে এই পাশের মূর্তিটা – একটা মেয়ে চোখে কাজল লাগাচ্ছে – কোনও দেবীমূর্তি হতেই পারে না। কোনও সন্দেহ নেই। মূর্তিটা
আস্ত তাই আরোই, ভুল হবে
না। এটা মানুষের চেহারা। খানিকক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল,
তার পরে ক্যামেরা নিয়ে ছবি তুলল। অনেকগুলো। তারপর মন্দিরের ভিতরে
ঢুকল। কিন্তু ভিতরটা ফাঁকা। দেওয়ালগুলো একেবারে ন্যাড়া। মন্দিরের চুড়োর ভিতর
দিকটাও একেবারে ফাঁকা। এমনটা কেন? এমন তো হয় না!
মন্দিরটা কি তৈরি শেষ হয়নি? বাইরে এসে আবার
ঘুরে ঘুরে পাথরে খোদাই করা মূর্তিগুলো দেখল। বুঝল ওই মুখটা ফিরে আসছে বার বার।
নানা মূর্তিতে ওই মুখ। কোথাও সে চুল বাঁধছে, কোথাও
লিখছে, কোথাও আয়না দিয়ে মুখ দেখছে...
সেই সঙ্গে আর একটা জিনিস লক্ষ করল। পুরোনো মন্দিরের মূর্তি ভাঙাই থাকে। কোথাও হাত
ভাঙা, কোথাও পা ভাঙা। এখানে তেমন
ভাঙাচোরা মূর্তি বেশি নেই। প্রায় সব মূর্তিই আস্ত। কী করে?
সারা
দিন লেগে গেল মন্দিরের ছবি নিতে নিতে। চারিদিকে অজস্র কাজ। মূর্তি ছাড়াও কারুকার্য
অনেক। কিন্তু ভিতরটা খালি। কিচ্ছু নেই। যেন কোনও দিন ছিলই না।
*
সে দিন রাতে আবার
একই স্বপ্ন। সেই রাজবাড়ি। কিন্তু আজ রাতে শীতল রাজবাড়ির ভিতরে। সে রাজবাড়ি দেখেই
বুঝতে পারছে, ও মাটির অনেক নিচে। অনেক।
কিন্তু সিঁড়িটা কই?
ঘুম
ভেঙে গেল। নিচে নামতে হবে! মাটির নিচে! মাটির নিচে যাবার উপায়?
মন্দির, আর যে কটা ভাঙা
বাড়ি দেখেছে, কোনওটারই তো এমন কোনও দরজা
নেই...
ভোর
না হতে আবার গেল জঙ্গলে। মন্দিরের আসেপাশে আতি পাতি করে খুঁজল। অনেক ভাঙা বাড়ি-ঘর।
এক সময়ে এখানে হয় রাজার বাড়ি, না হয় একটা
ছোটোখাটো শহর ছিল। কিন্তু মন্দিরটা ছাড়া কিছুই আর বাকি নেই। কোথাও নিচে নামার কিছু
পেল না।
দুপুরবেলা
গ্রামে ফিরে গিয়ে দুপুরের ভাত খায় শীতল। যেখানে সাইকেল রেখে জঙ্গলে যায়,
সে বাড়িতেই। আজ দেরি হয়েছে। জঙ্গলের গভীরে ঢোকার আগে সেই
কুয়োটার পাশে ভারি ব্যাগটা রেখেছিল, যে কুয়োটা ও প্রথম
আবিষ্কার করেছিল। নিচু হয়ে ব্যাগটা তুলতে গিয়ে থমকে গেল শীতল। তারপরে কুয়োর দেওয়াল
টপকে ভিতরে উঁকি দিল। সেই কবে সমর আর ও উঁকি দিয়েছিল, তার
পর এই প্রথম। কুয়োটা আগের মতোই গভীর, অন্ধকার।
যদিও নিচটা দেখা যাচ্ছে না, তবু,
শীতল পরিষ্কার বুঝতে পারল, এ
কুয়োতে জল নেই, শুকনো। মনে মনে বলল,
“এটাই পথ।”
গভীর
কুয়োতে নামার নিয়ম শীতল জানে। সরঞ্জাম আনতে শহরে ফিরতে হবে। তবে শহরে ফেরার প্রধান
কারণ হবে লোকজন নিয়ে আসা। এত গভীর কুয়োতে একা নামা উচিত হবে না।
সাত
পাঁচ ভাবতে ভাবতে গ্রামের দিকে এগোচ্ছিলো, হঠাৎ,
জঙ্গল ভেঙে ছুটে এল একটা ছোটো ছেলে। ছোটো মানে,
বাচ্চা নয় – যে বয়সে শীতল গ্রাম ছেড়ে পালিয়েছিল,
সেরকমই বয়স। এরই বাড়িতে শীতল সাইকেল রেখে জঙ্গলে ঢোকে।
এরই বাড়িতে দুপুরে খায়।
ছেলেটা
ওকে দেখে থমকে দাঁড়াল। তারপর হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, “মামু,
মা আমাকে পাঠালে, তোমায়
কইতে, তুমি গাঁয়ে ফিরো না। পলায়ে
যাও।”
শীতলের
বুকটা ধক করে উঠল। অনেক দিন আগের বিপদের কথা মনে পড়ে গেল। তাও,
মুখে হাসি টেনে এনে বলল, “কেন
রে?”
ছেলেটা
চট করে ঘাড় ফিরিয়ে পেছনে দেখে নিয়ে বলল, “জমিদারের
লোক এয়েচে। জানতে চাইচে,
তুমি কে, কী করতে আস,
জঙ্গলে যাও কেন?”
শীতলের
বুকের ভেতরে দামামা বাজছে। বলল, “কিন্তু আমার
সাইকেলটা যে...”
ছেলেটা
বলল, “সাইকেল আমি নিয়ে পাইলেছি।
ওদেরকে মা কয়েচে তুমি আজ আসোইনিকো। ওরা বিশ্বেস
করেনি। বসে আছে। চলো।”
ছেলেটার
সঙ্গে জঙ্গলের ভেতর দিয়ে অনেকটাই পথ পার করে একটা ঝোপের আড়াল থেকে ভাড়া করা
সাইকেলটা বের করে দিয়ে ছেলেটা ফিরে গেল গ্রামে, আর
শীতল ফিরে গেল পুখরিবাজার।
যেতে
যেতেই ঠিক করে নিয়েছিল কী করতে হবে। তাই হোটেলে না গিয়ে চলে গেল সোজা থানায়। থানায়
ঢুকে, অবাক! ওসি-র চেয়ারে বসে আছে
একটা মেয়ে! মেয়ে পুলিশ অফিসার শীতল আগে দেখেছে, কিন্তু
এমন অজ পাড়া-গাঁয়ে মেয়ে পুলিশ!
পুলিশ
অফিসারও শীতলকে দেখে অবাক! “শীতলদা, তুমি এখানে?”
শীতল
ভালো করে তাকিয়ে দেখল, আরে! শিঞ্জিনী! কলেজে ওর দু’বছরের
জুনিয়র, এক সঙ্গে স্টুডেন্টস ইউনিয়ন
করত। আজ পুলিশ হয়েছে?
বলল,
“জানো তো, আমার বাবা পুলিশ
ছিল। তাই ছোটোবেলা থেকে ইচ্ছে ছিল পুলিশ হব। সুতরাং বাবা যখন অন ডিউটি
হঠাৎ চলে গেল...”
শিঞ্জিনীর বাবার সঙ্গে
শীতলের পরিচয় ছিল। বলল, “তোর বাবা পুলিশ হলেও বড়ো ভালো মানুষ ছিলেন...” বলেছিল ওর
খারাপ লেগেছিল বলে, কিন্তু শিঞ্জিনী ইয়ার্কি করে বলল, “আমিও পুলিশ, কিন্তু ভালো
মানুষ... টেস্ট করে দেখতে পারো।” শীতলও
ইয়ার্কি করে বলল, “আর্কিওলজীর পরে
পুলিশগিরি ভালো লাগে?” কিছুক্ষণ দুজনে পুরোনো দিনের গল্প
করল, শেষে শিঞ্জিনী বলল, “তুমি হঠাৎ থানায় কেন?” তখন সিরিয়াস হয়ে ওর
সমস্যাটা বলল।
শিঞ্জিনী
গম্ভীর হয়ে শুনল। তারপরে বলল, “আজ হবে না, কাল।
কিন্তু তুমি নিশ্চিন্তে ঘুমোওগে, কাল
তোমার সঙ্গে আমি যাব গাভারি। শুনেছি, ওই
জমিদার প্রদ্যুম্নশঙ্করকরের
আগে খুব প্রতাপ ছিল। ওর অত্যাচারে অনেক লোক গ্রাম ছেড়ে পালিয়েছে। তবে আজকাল আর অত
হম্বিতম্বি নেই। বুড়ো হয়েছে, একমাত্র ছেলেও
বাবাকে ফেলে চলে গেছে শহরে।”
এই
খবরটা শীতল জানত না। জমিদারের ছেলে ওদের চেয়ে বছর চারেকের বড়ো ছিল। ওদের পাত্তা
দিত না।
শিঞ্জিনী
আরও বলল, বুড়ো জমিদারের এখন আর অত তেজও
নেই। তাছাড়া গ্রামের অবস্থাও খারাপ।
চাষ-বাস, মাছ-ধরা,
ব্যবসা-পত্র, সবই
প্রায় বন্ধ। তারপর বলল, “কখন যাবে কাল?
সক্কাল সক্কাল?”
সক্কাল
নয়। সাইকেলে আসতে আসতে শীতল ঠিক করেছিল, শহরে
ফিরে গিয়ে সরঞ্জাম, লোকজন নিয়ে ফিরে আসা যাবে না।
যতই বিপদ হোক, প্রথমবার কুয়োতে ওকে একাই নামতে
হবে। তাই পুখরির বাজার খোলা অবধি ওকে অপেক্ষা করতেই হবে।
*
পরদিন,
অন্যদিনের চেয়ে অনেক বেলায়, গাভারি
গ্রামে পৌঁছে শীতল প্রথম বাড়িতে থামল না। আজ ও একা নয়। সঙ্গে
সাইকেলে সাতজন পুলিশ। সাইকেল মিছিলের মাথায় মহিলা পুলিশ অফিসার পুখরি থানার ওসি।
আর নিজের সাইকেলে সব পুলিশদের পিছু
পিছু শীতল। এখানকার গ্রামের রাস্তায় গাড়ি
চলে না, তাই পুলিশও সাইকেলেই। গ্রামের
মানুষ উঁকি মেরে দেখল লুকিয়ে। ছ’জন পুলিশ,
আর শীতল গেল সোজা জমিদারবাড়ি। জমিদারের বুড়ো,
রোগা দারোয়ান দূর থেকেই পুলিশ দেখে দৌড়ে চলে গেল একেবারে
বাড়ির ভেতরে। ফলে ওরা গিয়ে যখন গাড়িবারান্দায় গিয়ে সাইকেল থেকে নামল,
তখন জমিদারের নায়েব বাইরে দাঁড়িয়ে। জমিদারবাবুর
শরীর খারাপ। শয্যাশায়ী। দেখা করা যাবে না।
শিঞ্জিনী
খুব কড়া গলায় শীতলের পরিচয় দিয়ে বলল, “উনি
সরকারি অফিসার। গাভারির বাইরের জঙ্গলে প্রত্নতাত্ত্বিক কাজে এসেছেন।
আপনাদের লোকজন ওঁকে বিরক্ত করছে। সেটা বন্ধ হওয়া দরকার।”
নায়েব
খুব জোর দিয়ে বলল যে এমন অঘটন ঘটতেই পারে না, এবং
শিঞ্জিনী আবার কড়া গলায়, “মনে থাকে যেন,”
বলে বিদায় নিল। ফিরে গেল পুখরি। শীতলও সাইকেল ঘোরালো
জঙ্গলের দিকে। কেউই লক্ষ করল না, দোতলার জানালায়
দাঁড়িয়ে ওদের তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে নজর করছে বুড়ো জমিদার। বিড়বিড় করে বলল,
“মেয়েছেলে দারোগা, তারও
রোয়াব কত! কালে কালে কতই দেখব – ভগবান!”
শীতল
জঙ্গলের কুয়োর পাড়ে পৌঁছে দেরি করল না। ব্যাগ থেকে বের করল নাইলনের শক্ত,
কিন্তু হালকা দড়ি। এ রকম দড়ি পুখরিবাজারে পাবে,
ভাবেনি শীতল। কিন্তু মাছ ধরার জন্য এখানেও
নানা সরঞ্জাম পাওয়া যায় আজকাল। লম্বা, কুণ্ডলী-পাকানো
দড়ির একটা দিক
কুয়োর পাড়ে একটা গাছের সঙ্গে শক্ত করে বেঁধে অন্যদিকটা ফেলে দিল কুয়োর ভেতরে।
তারপরে শুরু করল আর এক ব্যবস্থা। বাজার থেকে কেনা একটা লণ্ঠনে কেরোসিন তেল ভরল।
লণ্ঠনটা জ্বালিয়ে, আর একটা,
তিন মানুষ লম্বা দড়ির এক দিকে বেঁধে,
অন্য দিকটা বেঁধে নিল আগের, বেশি
লম্বা দড়িটায়। লণ্ঠনটা কুয়োর পাড়ে রেখে বাকি সব কিছু গুছিয়ে নিল। কোমরের বেল্টে
টর্চ, ব্যাটারি,
ছুরি, চক,
আর যা যা নিয়ে যেতে হয়, সবই
আছে। ক্যামেরার ব্যাগটা নিল পিঠে। তারপরে দড়িটা হাতে আর শরীরে জড়িয়ে নিয়ে কুয়োতে
বেয়ে নামতে শুরু করল। লণ্ঠনটা নামিয়ে দিল, ওর
থেকে আরও অন্তত কুড়ি ফুট নিচে তার আলো। বদ্ধ জায়গার হাওয়ায় অক্সিজেন কম থাকতে
পারে। আলোটা ওর থেকে কুড়ি ফুট নিচে জ্বলতে থাকলে শীতল বুঝবে নিঃশ্বাস নেওয়া যাবে। নিভে
গেলে শীতল আর নামবে না।
অবশ্য
তার অনেক আগেই হয়ত দড়িই ফুরিয়ে যাবে – কে জানে!
নামতে
নামতে শীতল বুঝল, অনেক নিচেই নেমেছে কুয়োটা। ওপরে
তাকিয়ে দেখল, কুয়োর মুখটা অনেকটাই ছোটো হয়ে
গেছে। তাও নামছে শীতল। অনেকটা নিচে জ্বলন্ত লণ্ঠনটা এখনও দুলছে। শেষে,
আরও খানিক পরে, বুঝল
লণ্ঠনটা মাটি ছুঁয়েছে। থামল শীতল। নিচে তাকিয়ে লণ্ঠনের অল্প আলোয় কিছু তেমন দেখা
গেল না। বেল্ট থেকে টর্চ বের করে জ্বালিয়ে নিচে আলো ফেলে বুঝল,
সত্যিই নিচটা দেখা যাচ্ছে। জল নেই। মাটি। শ্যাওলা আর
আগাছা ভর্তি। নিচে নেমে এদিক ওদিক চেয়ে দেখল, কোথাও
কিছু দেখতে পেল না। একটা কুয়োর নিচে জল না থাকলে যেমনটা দেখানো উচিত,
তেমনই।
মাটির
অনেক নিচে বলে আলো কম। লণ্ঠনের আলোটা যথেষ্ট নয়। আবার টর্চ জ্বালালো শীতল। দেওয়ালে
একটা আংটা গাঁথা। কী মনে হল, দরকার না থাকলেও,
কোমর থেকে দড়িটা ছাড়িয়ে নিয়ে সেটায় বাঁধল শীতল। বেঁধে
যেই টেনে দেখতে গেছে, শক্ত হয়েছে কি না,
অমনি সরসর করে পাথরের দেওয়াল ফাঁক হয়ে একটা দরজা খুলে
গেল। ও-দিকে গভীর অন্ধকার।
লণ্ঠনের
শিখাটা
একটু বাড়িয়ে শীতল সেটা খোলা দরজা দিয়ে ঠেলে দিল। বন্ধ জায়গায় ঢোকার আগে এটা খুব
জরুরী। আলো এখনও অল্প। কিন্তু শিখাটা স্থির।
কোমরের
বেল্ট থেকে এবার একটা ছোটো লাঠি বের করল শীতল।
অ্যালুমিনিয়ামের তৈরি, টানলে রেডিওর অ্যান্টেনার মতো
লম্বা হয়। হালকা, কিন্তু পোক্ত। ওটার আগায়
লণ্ঠনটা ঝুলিয়ে নিয়ে শীতল দরজা দিয়ে ঢুকল।
লণ্ঠনের
আলোতেও শীতল বুঝল এই ঘরটা ও চেনে। এই ঘরটাই ও স্বপ্নে দেখেছে। সাবধানে,
কোনদিকে যাচ্ছে চক দিয়ে দাগ টেনে টেনে এগোলো শীতল। ফেরার
পথে এই চকের দাগ দেখে দেখেই আসবে।
ঘরের
শেষে সিঁড়ি, সিঁড়ির শেষে বারান্দা,
বারান্দার এক দিকে দেওয়াল, এক
দিকে সারি সারি দরজা। বন্ধ।
কয়লার
মতো কালো অন্ধকার। লণ্ঠনের আলোতেই চারিদিক উজ্জ্বল! মাটির এত নিচে,
কতদিনের বন্ধ ঘর, তার
নেই ঠিক, কিন্তু বাতাস পরিষ্কার। শীতল
বুঝল, কুয়োর দিক থেকে বা,
অন্য কোনও দিক থেকে হাওয়া ঢোকার ব্যবস্থা আছে।
একটা
একটা করে দরজায় থেমে শীতল দরজা ঠেলতে লাগল। সবকটাই খোলা, ঠেললেই
খোলে। খালি ঘরের সারি। কোনওটায় শুধু আসবাব, কোনওটা
খালি। একটা রান্নাঘর। একটা ঠাকুরঘর। একে একে সব ঘর দেখা
হলে শেষ দরজার সামনে থামল শীতল। বন্ধ দরজা হাত দিয়ে ঠেলামাত্র খট শব্দ করে আলগা
হয়ে ভেতরের দিকে খুলে গেল।
দরকার
নেই জানা সত্ত্বেও শীতল লণ্ঠনটা ভেতরে ঢুকিয়ে দশ গোনা অবধি অপেক্ষা করল। তার পরে,
দরজাটা পুরোটা খুলে ভেতরে তাকানোমাত্র এমন চমকালো,
যে লণ্ঠনটা প্রায় ফেলেই দিয়েছিল আর কি!
ঘরে,
দেওয়ালের কুলুঙ্গিতে, একটা
প্রদীপ জ্বলছে। প্রদীপের আলোর কালিতে তার চারপাশের দেওয়াল কালো হয়ে আছে। আর,
ঘরের ঠিক মাঝখানে, একটা
বিরাট খাটে, আড়মোড়া ভাঙতে ভাঙতে ঘুম থেকে
উঠছে একটা মেয়ে।
আড়মোড়া
ভাঙা শেষ করে মেয়েটা শীতলের দিকে ফিরে খাট থেকে নেমে মাটিতে মাথা ঠেকিয়ে
প্রণাম করে বলল, “রাজন,
এতোদিনে সময় হল তোমার? গরিবের
কুটিরে তোমাকে অভ্যর্থনা জানাব কী দিয়ে? আমার
তো কিছুই নেই!”
*
শীতল অবাক। “তুমি
কে? আমি আসব তুমি জানলে কী করে?”
মেয়েটা
এবার লজ্জা পেল। মাথা নিচু করে বলল, “রাজন,
আমাদের রাজ্যে সবাই জানে... জানত। জ্যোতিষী যে বলেছিল?”
শীতলের
চেয়ে ছোটো। অনেকটাই ছোটো – না, ভালো করে চেয়ে
শীতল দেখল, বাচ্চা মেয়ে একটা। শাড়ি পরেছে বলে বড়ো বড়ো
দেখাচ্ছে।
বলল,
“তোমার নাম কী? মাটির
নিচে এই বাড়ি কার? তুমি এখানে ঘুমোচ্ছ কেন?
আর বাকি সবাই কোথায়?”
জিজ্ঞেস
করতে করতেই শীতলের মনে হল, ঠিক ছোটোবেলার
রূপকথার গল্পের রাজকুমারের মত প্রশ্ন করছে ও। আর উত্তরগুলোও ও জানে।
মেয়েটা
ততক্ষণে মাটি
ছেড়ে উঠে দু’হাত জোড় করে বলল,
“আমার নাম কঙ্কাবতী, রাজন।
গাভারি রাজ্যের রাজকন্যা...”
অন্য
কোথাও হলে শীতল ভাবতো মেয়েটা ওকে বাজে গল্প শোনাচ্ছে। কিন্তু এখানে ও নিজেই এসেছে।
মাটির নিচে কতদূর নেমেছে তার ইয়ত্তা নেই। একেই তো
পাতালপুরী বলে।
হঠাৎ
মনে হল, এতোদূর যদি সত্যি হয়,
তা হলে বাকিটা?
বলল,
“তাহলে অন্যরা? এ
রাজপুরীতে আর কেউ নেই?”
কঙ্কাবতী
গল্পের কথাগুলোই বলল। ওর জন্মের সময়েই রাজজ্যোতিষী গুনে বলেছিল,
রাজকন্যার বিয়ের আগে এক দুষ্টু সাধু ওর মা,
বাবা, ভাই,
বোন, সবাইকে মেরে রাজত্ব
কেড়ে নেবে। কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও কঙ্কাবতীকে মারতে পারবে না। তখন সে মন্ত্রের
বলে রাজকুমারীকে ঘুম পাড়িয়ে রাখবে।
অনেক,
অনেক বছর পর, এক
রাজকুমার আসবে। সে-ই অজগর মেরে রাজকন্যার ঘুম ভাঙাবে। সে-ই হবে রাজকন্যার বর।
রাজকন্যা
যখন খুবই ছোটো, রাজ-জ্যোতিষী মারা গেল। রাজা
অনেক খুঁজে এক পণ্ডিত নিয়ে এল, যে অনেক মন্ত্র
জানে, রাজাকে রক্ষা করতে পারবে। রাজা
সেই পণ্ডিতকে রাজ-পুরোহিত এবং গুরুর পদও দিয়ে দিল। কিছুদিন
পরে নতুন রাজ-পুরোহিত বলল, রাজকন্যার প্রাণের ভয় দূর হয়েছে, এখন ওর স্বয়ম্বরের
ব্যবস্থা করা যাবে। কিন্তু সে-ই যে রাজত্বের লোভে
সবাইকে মেরে ফেলবে, কে জানত!
একদিন,
ভরা রাজসভায়, যখন
রানি, রাজপুত্র,
রাজকন্যা, সকলেই উপস্থিত,
দুষ্টু রাজগুরু রাজসভাতেই মন্ত্রবলে সবাইকে মেরে ফেলল।
সবাইকে, শুধু রয়ে গেল রাজকন্যা
কঙ্কাবতী। নিজের সৈন্য-সামন্ত, সিপাই-শান্ত্রী
দিয়ে রাজগুরু রাজত্ব দখল করে নিল। কিন্তু রাজকন্যাকে আর
মারতে চেষ্টা করল না। মন্ত্র দিয়ে রাজকন্যার
মহল লুকিয়ে ফেলল মাটির নিচে। তার ওপর তৈরি করল নিজের প্রাসাদ। রাজকন্যার প্রাসাদে
যাবার রাস্তা হল নতুন প্রাসাদের বাগানের দীঘির নিচে। সে পথ পাহারা দেয় এক বিশাল অজগর।
কারওর সাধ্য নেই সে অজগর পার করে রাজকন্যার কাছে পৌঁছয়।
মাটির
ওপর রয়ে গেছিল রাজার কিছু বাড়িঘর, আর একটা মন্দির।
মন্দিরের গায়ে অনেক মূর্তিই রাজকন্যার আদলে তৈরি। রাজকন্যাকে মারতে না পারার রাগে
সে সবই ভেঙে ফেলল গুরুদেব, কিন্তু, কঙ্কাবতী শুনেছে রাজার
বাড়ি আর মন্দির ভাঙতে পারেনি। ভাঙতে পারেনি কঙ্কাবতীর আদলে তৈরি মন্দিরের মূর্তিও।
তার পরে যখন বুঝল, ওর পাহারাদার সবাই আসলে
কঙ্কাবতীর ভালো চায়, তাই ওদের দূর করে নিয়ে এল
সেই সাপকে, রাজকন্যাকে পাহারা দেবার জন্য।
কঙ্কাবতী
চট করে চোখ তুলে শীতলকে দেখে নিয়ে বলল, “কিন্তু
তোমার সবই কেমন অত্যাশ্চর্য! কথাবার্তা, পোশাক-আশাক
কেমন কেমন! তুমি কোন দেশের রাজকুমার? তোমার
পিতার নাম কী?”
শীতল
কী উত্তর দেবে বুঝতে পারল না। ও যে রাজার ছেলে না, ওর
বাবা আদতে মুদি, সে কথা জানতে পারলে রাজকন্যা না
অজ্ঞান হয়ে যায়! তাছাড়া ওর লোকজনও কোথায় সবাই, কে
জানে – যদি তারাও ঘুম ভেঙে তেড়ে আসে?
তাই বলল, “আমার কথা পরে। রাজকুমারী,
আগে তুমি নিজের কথা শেষ করো। সে অজগরটা কোথায়,
যে তোমাকে পাহারা দিচ্ছে?”
রাজকন্যা
আর শীতলের সামনে নেই। ঘরের চারিদিকে ঘুরে ঘুরে নানা প্রদীপদানী থেকে প্রদীপ নিয়ে
কুলুঙ্গির প্রদীপ থেকে জ্বালিয়ে নিচ্ছে। একটা একটা করে প্রদীপ জ্বলছে,
আর ঘরটা আরও উজ্জ্বল হচ্ছে।
হাতের
জ্বলন্ত প্রদীপটা পিলসুজের ওপর নামিয়ে রেখে রাজকন্যা খিলখিল করে হেসে বলল,
“অজগর তো আর নেই। একটাই ছিল। তাকেই তুমি হত্যা করে এখানে
এসেছ, রাজন।”
মাথা
নেড়ে শীতল বলল, “না, আমি
কোনও সাপ-টাপ মারিনি। বিশ্বাস করো!”
রাজকন্যার
সব আলো জ্বালানো হয়ে গেছে। ঘরটা এখন ঝকঝক করছে। বিরাট ঘর। তার দরজায় জানলায় সোনার
ঝালর। ঘরে চেয়ার টেবিল নেই, কিন্তু তিনটে খাট,
সবকটাই সোনার তৈরি, হিরে-পান্না-পোখরাজ
বসানো।
আর
এক কুলুঙ্গি থেকে একটা হলুদ রঙের চিরুনি তুলে নিল কঙ্কাবতী। সোনার তৈরি। পাশে
দেওয়ালে ঝোলানো একটা আয়নায় তাকিয়ে চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতে বলল,
“দীঘির তলদেশে এই রাজপুরীতে ঢোকার একমাত্র পথ। সেই পথই
আগলে বসে আছে ওই ভয়াবহ সর্প। তার নিঃশ্বাসে বিষ...”
শীতল
ভাবল বলে, তাহলে অজগর না,
অজগরের বিষ নেই। কিন্তু বলা হল না। রাজকন্যা বলে চলেছে,
“তাকে হত্যা না করে তুমি এখানে আসতেই পার না,
রাজন।”
এবার
শীতল একটু রাগ করে বলল, “রাজকন্যা,
আমি এখানে এসেছি জঙ্গলে একটা কুয়োর মধ্যে নেমে। আমি কোনও
দীঘির জলে নামিনি। তাকিয়ে দেখ, আমার জামা প্যান্ট
শুকনো। ভিজে নয়!”
এবার
রাজকন্যার মুখ শুকিয়ে গেল। বলল, “সর্পের এখনও মৃত্যু
হয়নি? তবে আমাদের আর রক্ষা নেই। সর্প
এখানে আসে অনেকদিন পরে পরে। ওর নিঃশ্বাসের বিষই আমার নিদ্রা এনে দেয়।”
শীতলের
মাথায় চিন্তা কিলবিল করতে লেগেছে। বলল, “সাপ
কতবার এসেছে আজ অবধি?”
মাথা
নেড়ে কঙ্কাবতী বলল, “আমি কী করে জানব,
রাজকুমার? আমি তাকে একবারই
দেখেছি – সেই প্রথমবার। শয়তান রাজগুরু বলেছিল,
আমার ঘুম ভাঙার সময় হলেই সাপ আবার এসে আমাকে বিষাক্ত
নিঃশ্বাস দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে যাবে।”
লাফিয়ে
উঠে শীতল বলল, “তার মানে তোমার ঘুম ভাঙার সময়
হলে সাপ আপনি জানতে পায়?”
রাজকন্যা
শীতলের লাফ দেখে অবাক হয়ে চেয়ে ছিল। বলল, “তা-ই
হবে, রাজপুত্র!”
শীতল
রাজকন্যার সামনে এসে বলল, “তা হলে এখন সে
কোথায়?”
আস্তে
আস্তে রাজকন্যার চোখ গোলগোল হয়ে গেল। বলল, “তাই তো!”
শীতল
বলল, “আর সে রাজগুরু?
সে-ই বা কোথায়?”
রাজকন্যার
মুখ থেকে অনিশ্চয়তার ছায়াটা আবার চলে গেল। বলল, “সে-ও
আছে নিশ্চয়ই, কোথাও। আসবে আপনার সঙ্গে লড়াই
করতে। জ্যোতিষী বলেছিলেন, রাজপুত্র লড়াইয়ে
তাকে হারিয়ে আমাকে উদ্ধার করবেন।” তারপরে আবার ভালো করে আপাদমস্তক শীতলকে দেখে
নিয়ে বলল, “রাজন, তোমার
তরবারি কোথায়?”
বেল্টের
একটা পকেটে একটা সুইস আর্মি নাইফ – সেটার কথা বলবে কি? বলল
না। বলল, “রাজকন্যা,
তোমার রাজগুরুকে তরোয়াল দিয়ে মারা যায়?”
রাজকন্যা
বলল, “রাজপুত্র,
আমাকে বিবাহ করতে গেলে রাজগুরুকে পরাজিত করতেই হবে।”
এবার
শীতলের খুব হাসি পেল। বলল, “রাজকন্যা,
দুটো কথা বলি। প্রথমটা এই, যে
আমি কোনও রাজপুত্র-টুত্র নই। আমি একজন সাধারণ মানুষ।”
রাজকন্যার
মুখটা প্রথমে থমথমে, তার পরে রাগে লাল হয়ে গেল। বলল,
“তোমার সাহস তো অসীম, তুমি
রাজকন্যা কঙ্কাবতীর ঘরে ঢুকেছ, তাকে নিদ্রা থেকে
তুলেছ, তাকে বিবাহ করতে চাও – অথচ তুমি
রাজপুত্রই না?”
দীর্ঘশ্বাস
ফেলে শীতল বলল, “আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই না,
রাজকন্যা। আর তাছাড়া, তুমি
আমার চেয়ে অনেক ছোটো। কতো বয়েস হবে তোমার? পনেরো?
ষোল? আমার বয়েস তেত্রিশ
পেরিয়ে চৌত্রিশের দিকে চলেছে।”
রাজকন্যা
আবার চোখ পাকিয়ে বলল, “বটে?
বিবাহ করতে চাও না? রাজকন্যাকে
বিবাহ করতে চায় না, এমন কেউ আছে?
রাজত্বের লোভ সব্বার আছে। কত বয়েস বললে তোমার?
আমারই বা কত বললে? আমি
এখন দ্বাদশী। এ বছরই পিতাশ্রী আমার স্বয়ম্বর অনুষ্ঠান করতেন।”
“দ্বাদশী!”
আঁৎকে উঠল শীতল। “এইটুকু মেয়েকে আবার কেউ বিয়ে করে?”
এইবার
কোমরে হাত দিয়ে উঠে দাঁড়াল কঙ্কাবতী। বলল, “তার
মানে? কত বয়েস তোমার?
বলছ না যে?”
শীতলকে
এবার ভাবতে হল। বারো-কে যে দ্বাদশ বলে, তেত্রিশ-কে
সে কী বলবে?
খানিক
ভেবে, ইশকুলে পড়া সংস্কৃত জ্ঞান
কুড়িয়ে বাড়িয়ে বলল, “ত্রো- ত্রি...
ত্রি-ত্রিংশ। মানে ত্রিংশর পরে আরও তিন।” আঙুল তুলে তিন দেখাল।
“ত্রয়োত্রিংশতি
বর্ষ!” অবাক হয়ে বলল রাজকন্যা। “তাহলে আমি ছোটো হলাম কী করে?
স্বয়ম্বরে যে রাজারা আসবেন তাঁদের অনেকেরই বয়স ত্রিংশ
বৎসরের বেশি।”
“কবেকার
কথা বলছ?” শীতল এবার জিজ্ঞেস করল,
“কোন সাল?”
রাজকন্যা
ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে জিগেস করল, “সাল অর্থ কী?
কী বলছ তুমি, বুঝতেও
পারছি না।”
শীতল
একটা একটা করে প্রশ্ন করে করে বুঝল কঙ্কাবতী বাইরের জগত সম্বন্ধে কিছুই জানে না।
ওর বাবা মহারাজাধিরাজ ত্রিবিক্রম বর্মার রাজত্বকালের চৌত্রিশ বছর চলছে।
চতুস্ত্রিংশত বর্ষ। ও যীশুখ্রীষ্টের নাম শোনেনি, গৌতম
বুদ্ধ কে জানে না। সে কি ও বুদ্ধর আগে জন্মেছিল বলে, নাকি
দুনিয়ার এই কোণে তাদের খবর পৌঁছয়নি?
কবেকার
রাজত্ব? কবেকার রাজকন্যা?
কত বয়েস তার? কে
জানে! সেই আদ্যিকাল থেকে ওর বয়েস বারোতেই আটকে আছে।
হঠাৎ
খেয়াল হল, অনেকক্ষণ সময় পেরিয়ে গেছে।
শিঞ্জিনী বলে দিয়েছিল সন্ধেবেলা পুখরি পৌঁছে ফোন করতে, কিংবা
থানায় যেতে। পকেট থেকে মোবাইল বের করে সময় দেখল, বিকেল
হয়েছে। কিন্তু মাটির এতো নিচে মোবাইলের সিগন্যাল নেই।
বলল,
“রাজকন্যা, আমাকে তো বাড়ি যেতে
হবে। তুমি কী করবে? আমার সঙ্গে যাবে তো?”
কঙ্কাবতী
বলল, “আমাকে তো যেতেই হবে। সে ভয়ানক
সর্প যদি আমাকে যেতে দেয়...”
তারপর
শীতলের হাতের দিকে দেখিয়ে বলল, “ওটা কী?”
শীতল
বলতে শুরু করেছিল, “এটা মোবাইল...”
কিন্তু থামল। বলল, “এটা একটা
জাদু-বাক্স... পেটিকা। এটাতে সময় দেখা যায়।”
রাজকন্যা
উৎসাহী হয়ে এগিয়ে এসে বলল, “কই,
দেখি?”
শীতল
ফোনটা দেখিয়ে কঙ্কাবতীকে দেখিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করল, কিন্তু
কঙ্কাবতী কিছুই বুঝল না। তখন শীতল বলল, “দাঁড়াও,”
বলে ফোনের ক্যামেরায় ওর ছবি তুলে বলল,
“এই দেখো।” নিজের মুখ ফোনের স্ক্রীনে দেখে কঙ্কাবতী অবাক,
চোখ ফেরাতে পারে না। বার বার দেখে,
তখন শীতল বলল, নিজের ছবি তুলবে? আর রাজকন্যাকে পায় কে!
পরপর সেল্ফি তোলে! শেষে বলল, “আমাদের বিবাহ হলে
আমাকে একটা এরকম পেটিকা দেবে?”
শীতল
বলল, “বিয়ে আমাদের হবে না। তবে তুমি
চাইলে আমার সঙ্গে গিয়ে পড়াশোনা করে বড়ো হয়ে এমন অনেক নিজেই কিনতে পারবে।”
রাজকন্যা
মুখ বেঁকিয়ে বলল, “পড়াশোনা?
আমার দ্বারা পড়াশোনা হবে না। গুরুমশাই বলে দিয়েছেন। পড়ার
নামেই আমার উদরাময় হয়।”
বলে
পেটে হাত দিয়ে নাক-মুখ কুঁচকে বলল, “আমার পেট ব্যথা
করছে, আমি ক্ষুধার্থ। তোমার কাছে
খাদ্য আছে কিছু?”
কঙ্কাবতীর
কথায় শীতলেরও খেয়াল হল, দুপরে খাওয়া হয়নি
কিছু। পিঠের ব্যাগ নামিয়ে এনার্জি বার বের করে ওকে দিয়ে নিজেও একটা নিল। তারপরে
কঙ্কাবতীর হাত থেকে ওরটা আবার নিয়ে প্যাকেট খুলে দিল।
এক
কামড় দিয়ে থু-থু করে ফেলে দিল কঙ্কাবতী। “এটা কী? গাভীর
জাবনা?”
শীতল
বলল, “ভালো লাগল না?
আচ্ছা, দাঁড়াও। চকোলেট
খাও।”
চকোলেট
খেয়ে কঙ্কাবতীর চোখ গোল হয়ে গেল। শীতল বলল, “ভালো
লাগল? আচ্ছা, দু
তিনটে খেয়ে নাও। তারপরে চলো। পালাই, তোমার অজগর আর
রাজগুরু আসার আগেই।”
মুখভর্তি
চকোলেট, ঠোঁটে, গালে,
হাতে চকোলেট, মাথা
নেড়ে কঙ্কাবতী বলল, “উঁ-উঁ-উঁ-উঁ-উঁ-হুঁ,
পলায়ন সম্ভব না। দেখো। ঠিক ধরবে।”
খেয়ে
দেয়ে দুজনে বেরোলো। রাজকন্যার ঘরের বাইরে অন্ধকার গাঢ়। কঙ্কাবতী একটা প্রদীপ হাতে
নিতে যাচ্ছিল, শীতল ওকে থামিয়ে বলল,
“আমার সঙ্গে লণ্ঠন আছে, টর্চ
আছে, জাদু-বাক্সেও আলো আছে। ওটা নিতে
হবে না।”
অবাক
কঙ্কাবতীকে সঙ্গে নিয়ে আবার কুয়োর দিকে রওয়ানা দিল শীতল। টর্চ দেখে কঙ্কাবতী
চমৎকৃত – বার বার জ্বালে আর নেভায়। শীথল বলল, “রাজকুমারী, ওটা খারাপ হয়ে গেলে এই
অন্ধকারে বিপদ হবে। আমাকে দাও। পরে খেলা কোরো।“
সিঁড়ি
দিয়ে উঠে, বড়ো ঘর পার করে,
আবার দুজনে এসে পৌছলো কুয়োর নিচের দরজায়। কিন্তু দরজা
দিয়ে বেরিয়ে, কী আশ্চর্য! শীতলের দড়ি-দড়া সব
দলামোচা হয়ে পড়ে আছে পায়ের কাছে। কেউ ওপরে গাছের বাঁধাটা খুলে বা কেটে দড়িটা কুয়োর
ভিতরে ফেলে দিয়েছে। এ পথে আর বেয়ে ওঠা সম্ভব নয়।
সমস্যাটা
বুঝে নিয়ে কঙ্কাবতী বলল, “তুমি এখান থেকে ওই
অত উঁচুতে দড়ি ধরে উঠতে? আর আমাকে কী করে
তুলতে?”
শীতল
বলল, “প্ল্যান,
মানে, বুদ্ধি একটা
করেছিলাম। কিন্তু এখন তো আর সে ভেবে লাভ নেই। কে যে দড়িটা কেটে কুয়োর মধ্যে ফেলে
দিল কে জানে!”
ভয়ে
ভয়ে এদিক ওদিক তাকিয়ে কঙ্কাবতী বলল, “রাজগুরু! আসছে
বোধহয়।”
“আর
কোনও রাস্তা আছে?”
ঘাড়
কাত করল রাজকন্যা। “আছে। ওটাই পাহারা দিচ্ছে ওই অজগর সর্প।”
“যা
থাকে কপালে, ওই সাপের দিকেই যেতে হবে। চলো,
আগে তোমার ঘরে ফিরি।”
রাজকন্যার
ঘরে যাবার পথে রান্নাঘর থেকে একটা দা নিয়ে পাশের ঘরের কাঠের তক্তপোষের পায়াটা কুপিয়ে
কুপিয়ে কাটল শীতল। তারপর রাজকন্যার ঘরের বিছানার চাদর ছিঁড়ে ফালি ফালি করে পায়াটার
একদিকে পেঁচিয়ে বাঁধল। লণ্ঠনটা নিভিয়ে সেটা থেকে খানিকটা কেরোসিন ঢেলে কাপড়ের
ফালিগুলো ভালো করে ভিজিয়ে নিল। তারপরে পকেট থেকে লাইটার বের করে আবার লণ্ঠনটা
জ্বালিয়ে নিয়ে বলল, “এটা কী জানো?”
রাজকন্যা
ভুরু কুঁচকে বলল, “মশাল?”
“ঠিক
বলেছ। সাপের হদিশ মেলা মাত্র মশালটা জ্বালিয়ে নেব। তারপর আগুন নিয়ে লড়ব তোমার
সাপের সঙ্গে।”
রাজকন্যাকে
খুব সাহসী দেখালো না, কিন্তু শীতলের নির্দেশে লণ্ঠনটা
তুলে নিল। শীতল এক হাতে নিল মশাল, আর
এক হাতে নিল দা-টা। কঙ্কাবতী একবার শীতলের হাত ধরার জন্য হাত বাড়িয়েছিল,
কিন্তু শীতলের দু-হাত আটকা দেখে ওর বেল্টটা ধরল।
শীতল
বলল, “না, তুমি
আমার পেছনে থাকলে কী করে হবে? পথ দেখাবে কে?”
কঙ্কাবতী
মাথা নাড়ল। ধরা গলায় বলল, “না। তুমি অগ্রে...”
আর
কথা না বাড়িয়ে দুজনে হাঁটা দিল। কঙ্কাবতী এদিক ওদিক চলে, আর
কিছু দূর গিয়ে সিঁড়ি চড়ে।
শেষে
বলল, “প্রাসাদশিখরে ওঠার পরে বাইরে
যাবার দ্বার বানিয়েছে রাজগুরু। সে সকলই মৃত্তিকার অভ্যন্তরে।
সেই দ্বারের বাইরে বহির্বিশ্বে যাবার বিশাল সুড়ঙ্গ। সেই
সুড়ঙ্গে রয়েছে সর্প।”
চিলেকোঠার
দরজার ওপারে সাপের সুড়ঙ্গ। দরজায় কান রাখল শীতল। কোনও সাড়াশব্দ নেই। ভয়ে সিঁটিয়ে
ঘরের অন্য দেওয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে কঙ্কাবতী। শীতল বরাভয় দেবার মতো হাত নাড়ল। বেল্টের
পকেট থেকে লাইটার বের করে মশালটা জ্বালালো। তার পরে, দরজাটা
খুলে মশাল ধরা হাতটা ঢুকিয়ে দিল সুড়ঙ্গে।
খানিকক্ষণ
কাটল। কিছুই হল না। উঁকি মেরে দেখল দাউ-দাউ মশালের আগুনের ধোঁয়া বেশি,
আলো কম। ডেকে বলল, “কঙ্কাবতী,
লণ্ঠনটা কাছে আনো। এখানে কী একটা আছে,
মশালের আলোয় ভালো দেখতে পাচ্ছি না।”
ভয়ে
কাঁপতে কাঁপতে কঙ্কাবতী আস্তে আস্তে লণ্ঠনটা বাড়িয়ে দিল। কিন্তু তার আলোতেও স্পষ্ট
হল না কিছুই। কঙ্কাবতী বলল, “তোমার জাদু-বাক্সতে
আলো আছে বলেছিলে?”
তাইতো!
কোমরের বেল্টে টর্চ-টা রয়েছে। শীতল কঙ্কাবতীর হাতে মশাল দিয়ে
টর্চ জ্বালালো।
এবার
দেখা গেল।
শীতল
ধরা গলায় বলল, “রাজকন্যা,
দেখবে এসো। ওটা সাপ না,
সাপের হাড়!”
সত্যিই।
কুণ্ডলী পাকানো হাড় সুড়ঙ্গের মাটি থেকে ছাদ পর্যন্ত, দেওয়াল
থেকে দেওয়াল জুড়ে পথ আটকে রয়েছে।
শীতল
বলল, “আমার এটাই আশা ছিল। তোমার ঘুম
ভাঙার পরেও সাপ যখন এল না, আমি আশা করেছিলাম
সাপটা মরে গেছে। কিন্তু এরকম পথ আটকে মরবে ভাবিনি। এই হাড়গোড় না সরালে যাওয়া যাবে
না। আর কোনও রাস্তা নেই?”
রাজকন্যার
ভীত চোখদুটো সাপের কঙ্কাল থেকে সরছেই না। মাথা নেড়ে জানালো,
না। নেই। শীতল মনে মনে বলল, কুয়োর
পথের কথাও রাজকন্যা জানতো না। আরও পথ থাকতেই পারে। ফিরে
গিয়ে চিলেকোঠা থেকে নিচের তলায় নেমে শীতল এক এক করে ঘরের দরজা খুলতে শুরু করল। সবই
বন্ধ ঘর। কোনওটা থেকেই বেরোনোর আর কোনও দরজা নেই।
চার
নম্বর ঘরটা একটা ঠাকুরঘর। দরজাটা খুলতেই শীতল দেখল উলটো দিকের দেওয়ালে আর একটা
দরজা। পিছন ফিরে রাজকন্যাকে বলল, “ওই দরজাটা দিয়ে
কোথায় যাওয়া যায়?” আবার বোবার মতো
মাথা নাড়ল কঙ্কাবতী। জানে না।
হাতের
দা বাগিয়ে ধরে শীতল গিয়ে দরজা খুলল। ঘোরানো সিঁড়ি উঠে গিয়েছে ওপরে। “চলো,
ওপরে যখন উঠছে, আশা
করি এখান দিয়েই মুক্তি পাব।”
নেভানো
মশালটা হাতে নিয়ে, সে হাতেই লণ্ঠন ধরে,
দা-টা রাজকন্যার হাতে দিয়ে দুজনে হাত ধরে উঠতে শুরু করল।
ঘোরানো সিঁড়ি, বাইরের দেওয়াল ধরে ধরে চলা।
পায়ে ব্যথা করে, ক্লান্তি আসে,
মাথা ঘোরে। রাজকন্যা কঙ্কাবতীর শরীর টলে।
তবু,
চলতে চলতে চলা শেষ হয়। ক্রমে ক্রমে ওরা কোনও মন্দিরের
সন্ধ্যারতির শব্দ শুনতে পেল। প্রথমে দূরে, আস্তে।
পরে শব্দ কাছে আসতে লাগল, জোর বাড়তে থাকল।
সিঁড়ি
শেষ হল একটা পাথরের দেওয়ালে। লণ্ঠনের আলোয় ভালো দেখা যায় না।
মনে হল পাথরের দেওয়াল আলগা, তার চারিদিক দিয়ে
আলো আসছে। প্রাণপনে গায়ের জোরে ঠেলা দিতেই ঘসঘস করে পাথরের দেওয়াল খুলে গেল দরজার
মতো, দুজনে এসে ঢুকলো একটা মন্দিরে,
একটা কালীমূর্তির পেছন থেকে। মূর্তির সামনে পুরোহিত আরতি
করছিল, হঠাৎ দুজন মানুষ কালীর পেছন থেকে
বেরিয়ে আসায় হাউমাউ করে চেঁচামেচি করে প্রদীপ, ঘণ্টা
সব ফেলে দৌড়ে পালিয়ে গেল। যে ছেলেটা কাঁসর বাজাচ্ছিল, সেও
পুরোহিতের পেছনে ছুটল, ঘণ্টা বাজাতে বাজাতেই।
সাবধানে,
পুজোর সামগ্রীতে পা না-লাগে এমন ভাবে এগোচ্ছিল শীতল।
কঙ্কাবতী বলল, “পাদুকাসুদ্ধই
মন্দিরে প্রবেশ করলে?”
শীতলের
মাথায় তখন অন্য চিন্তা। ওরা কি মাটির ওপর আদৌ উঠতে পেরেছে? না
কি এটাও সেই গুরুদেবের রাজত্ব? সেখান থেকে বেরিয়ে
এলেও, এটা কোথায়?
গাভারিতেই? এমন
মন্দির গ্রামে কোথায়?
কঙ্কাবতীর
কথায় শীতল নিজের পায়ের দিকে না, কঙ্কাবতীর পায়ের
দিকে তাকাল। “তোমার পা খালি। বাইরে হাঁটবে কী করে?”
বাইরে
তখন অন্ধকার হয়ে এসেছে। শীতল মন্দিরের দরজা থেকে উঁকি দিয়ে দেখল। গাঢ় নীল আকাশের
গায়ে জমিদারবাড়ির ছাদ দেখা যাচ্ছে। সামনে একটা বিরাট দীঘি।
জমিদারবাড়ির
মন্দির। এখানে গাঁয়ের লোকের ঢোকা মানা। শীতল কেন, ওর
চেনাশোনা কেউই এখানে কখনও আসেনি।
পালাতে
হবে। কিন্তু কোনদিক দিয়ে? জুতো ছাড়া ক্লান্ত একটা
মেয়েকে নিয়ে মাঠেঘাটে বনে বাদাড়ে দৌড়োনো মুশকিল। কিন্তু আর
ভাবার সময় পাওয়া গেল না। দীঘির পাড়ের ধার দিয়ে যে পথটা রাজবাড়ির দিকে গেছে,
সেদিক দিয়ে অনেকগুলো লোক ছুটে এল,
তাদের অনেকের হাতে টর্চ, মুখে
হইচই, তাদের সবার আগে যে,
সে চিৎকার করে ডাকছে, “শীতলদা,
শীতলদা!”
শিঞ্জিনী।
হাঁপ ছেড়ে বাঁচল শীতল।
“কোথায়
ছিলে?” প্রায় রাগ-রাগ গলায় বলল
শিঞ্জিনী। “বার বার ফোন করে পেলাম না। শেষে তোমার ফেরার অপেক্ষায় না থেকে আমিই
আবার এলাম। গ্রামের একটা ছেলে দেখিয়ে দিল কোথায় গেছ তুমি।
গিয়ে দেখি জমিদারের হুকুমে ওর লোকেরা গিয়ে তোমার দড়ি কেটে কুয়োতে ফেলে দিয়েছে,
যাতে তুমি আর বেরোতে না পারো। তারপরে ওখানকার ভাঙা বাড়ির
পাথর জোগাড় করছিল, কুয়োর মধ্যে ফেলবে বলে। ভাবো,
তুমি কুয়োর মধ্যে, আর
ওই পাথর এসে পড়ল মাথায়! সব ব্যাটাকে অ্যারেস্ট করেছি। আর তারপরে জমিদারবাড়ি এসে
জমিদার আর নায়েবকেও...”
কথায়
কথায় ওরা ফিরে এসেছে জমিদারবাড়ির সামনে, সেখানে
পুলিশ লাইন করে দাঁড় করিয়ে রেখেছে – কর্মচারী, নায়েব
জমিদার, সব্বাইকে। শিঞ্জিনী বলছে,
“চালান দেব সবাইকে শহরে। খুন করার চেষ্টা – ছোটো মামলা
নয়...”
আর
ওদিকে, পেছন থেকে শীতলের কনুইয়ের ওপরটা
খামচে ধরেছে কঙ্কাবতী।
“কী
হল?” ফিসফিসিয়ে জিজ্ঞেস করল শীতল।
প্রায়
বন্ধ গলায় কঙ্কাবতী বলল, “গুরুদেব,
ওই যে, গুরুদেব!”
বৃদ্ধ
জমিদারের মাথায় এখন টাক, মুখভর্তি দাড়ি।
কঙ্কাবতীর ভয়বিহ্বল, বিস্ফারিত চোখ ওই দিকেই চেয়ে।
শীতল
ওর হাতটা নিজের হাতে নিয়ে বলল, “ধুর,
ও তো আমাদের জমিদার! ওকে আমি চিনি। ও-ই আমাদের গাঁ-ছাড়া
করেছিল। এখন পুলিশ ধরেছে।”
কিন্তু
তা বললে কি কঙ্কাবতী আশ্বস্ত হয়? বার বার মাথা নাড়ে
আর বলে, “না, এটাই
ও। দেখো।”
শীতল
বলল, “আরে না রে,
তোর গুরুদেবকে আমি দেখিনি, কিন্তু একে আমি জানি। আমাদের
ছোটোবেলায় বুড়ো ছিল না। মাথাভর্তি কালো চুল, কামানো
গাল।”
শিঞ্জিনী
এগিয়ে এলো। “তুমি এতক্ষণ কোথায় ছিলে, শীতলদা?
জঙ্গলে কুয়োতে নেমে মন্দিরের ভেতর থেকে বেরোলে কী করে?
এ কে? একেই বা কোথা থেকে
নিয়ে এলে?”
শীতল
বলল, “সব বলব। আপাতত এইটুকু জেনে রাখ,
কুয়োর নিচে একটা দরজা আছে। সেই দরজা দিয়ে ঢুকে একটা
রাজপ্রাসাদ। তার আরও অন্তত দুটো দরজা। একটা ওই দীঘির নিচে কোথাও,
আর অন্যটা ওই মন্দিরের ভেতরে খোলে। মেয়েটাকেও ওখানেই
পেলাম। সে অনেক কথা, কিন্তু সে পরে। সবার আগে ওর
জন্য একজোড়া পাদুকা, মানে চটির বন্দোবস্ত
করতে হবে।”
|
অ
|
গল্প
শেষের পরে
নেক বছর কেটে গেছে।
শীতলের বয়েস বেড়েছে, ও এখন বিখ্যাত প্রত্নতাত্ত্বিক।
গাভারি গ্রামের জঙ্গলের গভীরে বিশাল রাজপ্রাসাদ,
তার নানা আসবাবপত্র, আর,
বিরাট রত্নভাণ্ডারের আবিষ্কারক। দেখা গেছে সে আসবাবের
বয়স হাজার বছরেরও বেশি। সে কথা জেনে
শীতল কঙ্কাবতীকে বলেছিল, “তা হলে তোর বয়েস
কতো জানিস?”
কঙ্কাবতী
ঘাড় নেড়ে বলেছিল, “হ্যাঁ গো মশাই,
জানি। আমি তোমার দিদিমার দিদিমার দিদিমার দিদিমা হই।”
মাথা
নেড়ে শীতল বলেছিল, “না। আরও একটা দুটো
দিদিমা লাগা, তবে যদি হয়!”
তবে
কঙ্কাবতীর বয়সটা বারোতেই ঠেকে ছিল। তার পর যেমন বাড়া উচিত, তেমনই
বেড়েছে। এখন স্কুল শেষ করে কলেজের পাটও শেষ হল বলে।
শহরে
প্রথম দিকের কঙ্কাবতী আর আজকের কঙ্কায় অনেক তফাৎ। কোথায়
সেই ভয়ে সিঁটিয়ে থাকা বাচ্চা মেয়ে, সব কিছুতেই ছুটে
এসে শীতলকে আঁকড়ে ধরা – গাড়ি, বাস,
ট্রাক, ট্রেন,
মানুষের ভীড়, ইলেকট্রিক
আলো, টেলিভিশন,
মোবাইল ফোনের শব্দ!
আজ
কঙ্কা একা একাই কলেজ যায়। ইতিহাসে বি.এ. পড়ছে।
শীতলের মতো প্রত্নতাত্ত্বিক হতে চায়।
শীতলের অনুরোধে বৃদ্ধ জমিদার প্রদ্যুম্নশঙ্করকে শিঞ্জিনী ছেড়ে দিয়েছিল। প্রদ্যুম্নশঙ্করের বাবা, ঠাকুর্দা, তার বাবা, যতো ছবি পাওয়া গেছিল, সবার মুখ দেখে শীতল কঙ্কাকে বলেছিল, “জানিস, আমার মনে হয়, ওরাই তোর বাবার রাজত্ব চুরি করা সেই গুরুদেবের বংশধর। সেই গুরুদেব সন্ন্যাসী ছিল, তাই মন্তর-তন্তর জানত। এরা কিস্যু জানে না।”
শীতলের অনুরোধে বৃদ্ধ জমিদার প্রদ্যুম্নশঙ্করকে শিঞ্জিনী ছেড়ে দিয়েছিল। প্রদ্যুম্নশঙ্করের বাবা, ঠাকুর্দা, তার বাবা, যতো ছবি পাওয়া গেছিল, সবার মুখ দেখে শীতল কঙ্কাকে বলেছিল, “জানিস, আমার মনে হয়, ওরাই তোর বাবার রাজত্ব চুরি করা সেই গুরুদেবের বংশধর। সেই গুরুদেব সন্ন্যাসী ছিল, তাই মন্তর-তন্তর জানত। এরা কিস্যু জানে না।”
পরে
যখন মাটির নিচে বিশাল ধন-সম্পত্তি আবিষ্কার হবার পরে
দেশের আইনমাফিক তার খানিকটা জমিদারকে দেওয়া হয়, তখন কঙ্কা
শীতলের কাছে একটু দুঃখপ্রকাশ করেছিল। বলেছিল,
“ওগুলো সব আমার, জানো?
ওই বদমাস গুরুদেব আমাকে মারতে না পেরে আমার কোনও
গয়নাগাটিও নেয়নি, ভয়ে। সব আমার সঙ্গেই মাটির নিচে
পুঁতে দিয়েছিল। আর আজ সবই ওর সিন্দুকে ঢুকল!”
শীতল
বলেছিল, “কী করব, বল,
তোর বার্থ সার্টিফিকেটটা রাখিসনি কেন?”
কঙ্কা
রেগে চলে গেছিল। ভোটার কার্ড, আধার কার্ড বানানোর চক্করে
ততদিনে বার্থ সার্টিফিকেট কী, সে
কথা ও জেনে গেছে।
কলেজে
ভর্তি হবার কিছুদিন পর কঙ্কা একটা ছেলেকে নিয়ে ফিরে
এসেছিল। বলেছিল,
“এ হল উদো। উদয়েন্দু। পুরো
নাম উদয়েন্দুশঙ্কর। জানো, ওরও আদি বাড়ি
গাভারিতে?” তখন এক লহমার জন্য শীতলের মুখ
শুকিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ছেলেটা শীতলকে প্রণাম করে বলেছিল, “আমার
বাবা প্রণয়েন্দুশঙ্কর। বাবা বলতে বলেছেন, তুমি
মহান। দাদু তোমাকে খুন করার চেষ্টা করেছিল, তাও
তুমি দাদুকে পুলিশে দাওনি।”
পরে
উদয়ের বাবার সঙ্গেও দেখা হয়েছে। প্রণয়েন্দু শীতলের
কাঁধে চাপড় মেরে বলেছিল, “আরে! তুই সেই শীতল?
হরনাথ মুদির ছেলে? তোদেরই
না গুপ্তধনের লোভে বাবা গাঁ-ছাড়া করেছিল? আর
তুই সেখান থেকেই গুপ্তধন বের করে আমারই বাবার হাতে তুলে দিলি! বাঃ,
এ-ও তো বড়ো মজা!”
পরে
কঙ্কা চোখ পাকিয়ে বলেছিল, “তোমার বাবা মুদি
ছিল? তোমার সাহস তো
সত্যিই সাংঘাতিক! মুদির ছেলে হয়ে রাজকন্যাকে বিয়ে করার সখ হয়েছিল!
ঠিক করেছিল জমিদার গাঁ-ছাড়া করে। আমার
বাবা হলে শূলে দিত।”
হাতের
খবরের কাগজটা দিয়ে চটাস করে কঙ্কার মাথায় মেরে শীতল বলেছিল,
“রাজকন্যা, গুপ্তধন,
কোনওটারই লোভ আমার নেই, বুঝিসনি
অ্যাদ্দিনে?”
হি-হি
করে হেসে পালিয়েছিল কঙ্কা।
*
আজ শীতলের ছুটি।
সারাদিন বাড়িতে একাই ছিল। বিকেল হয়ে সন্ধে হল,
দুপুরে কঙ্কা বেরিয়েছে, একটাই
ক্লাস আছে বলেছিল। বিকেলে একবার এস-এম-এস করে জানিয়েছিল, একটু
দেরি হবে। এখনও দেখা নেই। হলো কী, মেয়েটার।
বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ানো-মাত্র দেখল কঙ্কা আসছে। তাড়াতাড়ি গিয়ে দরজা খুলল। কঙ্কা
লিফট চড়ে না, তিন তলা পায়ে হেঁটেই উঠে এল।
“এত
দেরি হল যে?” শীতলের প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে
কঙ্কা বলল, “বৌদী কোথায়?”
শোবার
ঘরের দিকে দেখিয়ে শীতল বলল, “দুপুরে ফিরে
ঘুমিয়েছে। কাল থানায় কাজ ছিল অনেক, খুব ক্লান্ত,
জাগাস না। কী কাজ, আমায়
বল।”
মাথা
নাড়ল কঙ্কা। “এসব মেয়েলি ব্যাপার। তোমার দ্বারা হবে না।” বলে শোবার ঘরে ঢুকে গেল।
বেরোলো
দু’জনে প্রায় ঘণ্টাখানেক পরে।
শিঞ্জিনী হাই তুলতে তুলতে এসে বসল শীতলের কাছে, কঙ্কা
গেল রান্নাঘরে।
চোখ
কপালে তুলে শীতল বলল, “ব্যাপার কী?”
শিঞ্জিনী
বলল, “আমাকে অসময়ে ঘুম থেকে তোলার
সাজা। আজ রান্নাঘরের বাকি সব কাজ ও-ই করবে। চা করতে গেছে এখন।”
শীতল
বলল, “আরে তা নয়,
কী বলল তোমাকে? বলল
কী মেয়েলি কথা!”
আবার
একটা হাই চাপতে চাপতে শিঞ্জিনী বলল, “ও,
হ্যাঁ। ওরা বিয়ে করবে। উদয় আর কঙ্কা।”
এ-এ-এই
কথা! আবার কাজে মন দিল শীতল। কঙ্কা রান্নাঘর থেকে উঁকি দিচ্ছিল,
বলল, “কিছু বলছ না যে?”
শীতল
মুখ তুলে বলল, “কী বলব? তুই
উদয়কে বিয়ে করবি – সে তো আমি দু’বছর ধরে জানি।”
কঙ্কা
বলল, “আমার শত্রুর বংশধরকে আমি বিয়ে
করব, তুমি আমাকে বারণ করবে না?”
শীতল
এবারে খুব হাসল বলল, “তোর শত্রু। আমার
তো না! বিয়ে করে নাহয় শোধ তুলবি! আর
তুই তো রাজার ছেলে না হলে বিয়ে করবিই না বলেছিলি।
উদয় অন্তত জমিদারের ছেলে।”
ট্রে-তে
করে চায়ের কাপ এনে সেন্টার টেবিলে রেখে কঙ্কা বলল, “মুদির
ছেলেকে বিয়ে করতামই না! ভাগ্যিস তুমি আগেই শিঞ্জিনী বৌদীকে বিয়ে করলে!”
শীতল
জিজ্ঞেস করল, “কিন্তু বিয়ের পরে করবি কী দুজনে?
তোর পড়াশোনার কী হবে?”
কঙ্কা
বলল, “আমার পড়াশোনা চলবে। আর উদয় ঠিক
করেছে গাভারি ফিরে যাবে। আমিও যাব মাঝে মাঝে।”
অবাক
হয়ে শিঞ্জিনী বলল, “গাভারি গিয়ে কী
করবে উদয়?”
“গ্রামোন্নয়ন।
আমাকে বলল, ‘কঙ্কস্, আমার
পূর্বপুরুষেরা গ্রামটাকে চুষে খেয়েছে। এবার আমি ফেরত দেব।’ এন-জি-ও
খুলেছে। নাম দিয়েছে গাভারি গ্রামোন্নয়ন প্রতিষ্ঠান। এমন বিশ্রী গোদা নাম! আমি একটা
দারুণ নাম ভাবছি। এখন বলব না। আপাতত আমার যে গয়নাগুলো ওরা পেয়েছে,
সেগুলোই বিক্রি করে টাকা জোগাড় করবে। এ ছাড়াও অনেক
পারিবারিক ধন-সম্পত্তি আছে।”
শীতল
লাফিয়ে উঠে বলল, “সেকি! তোর গয়না বিক্রি করে দেবে,
তুই কিছু বলবি না?”
মিষ্টি
হেসে কঙ্কা বলল, “আমার পূর্বপুরুষরাও নিশ্চয়ই
গ্রামটাকে চুষেই খালি করেছিল। তাই আমিও না হয় আমার গয়না কটা দিলাম?
আমারও তো দায়িত্ব আছে একটা, না
কি?”
তারপরে
একটু হেসে বলল, “তবে আমার দিদিমার একটা সাতনরী
হার আর ঠাকুমার সীতাহারটা আমি ছাড়ছি না। ওগুলো আমার।”
শিঞ্জিনী
চোখ কপালে তুলে বলল, “বলেছিস নাকি ওকে সে
সব কথা?”
কঙ্কাবতী
হেসে বলল, “সে কথা বলা যায়?
তুমিই প্রথমে বিশ্বাস করছিলে না! তখন তো গরম গরম ছিল। মনে
আছে, সেদিনের কথা? তোমাদের ভাষাতে কথাই বলতে পারতাম না।
তুমি শেষে মাটির নিচে গিয়ে সব দেখে, সাপের কঙ্কাল দেখে, তবে আড়চোখে আমার দিকে চেয়ে
বলেছিলে, তাহলে ওর বয়স কত? এখন কাউকে বলতে গেলে সে নিগঘাৎ
পালাবে! না বাবা, সে গল্প কাউকে বলব না।”
তার
পরে চলে গেল ঠাকুরঘরে। রোজ সকালে সন্ধেয় পুরোনো গুরুদেবের মন্ত্র পড়ে ঠাকুরকে জল
দেয় ও এখনও।
শেষ
