বাবা যখন বাড়িতে এসে বলল এখন একটা দূরের গ্রামে গিয়ে থাকতে হবে তখন বুনু খুব একটা কিছু ভাবেনি। বাবা তো সারা জীবন নানা দূরে দূরেই কাজ করেছে, যার জন্য বুনু আর পুপাইকে হোস্টেলে থেকে পড়াশোনা করতে হয়। কেবল ছুটির সময়ই বাড়ি আসতে পারে। তবে সে আসা হয় খুব মজাদার! কোনও মার্চ মাসে ওরা হয়ত সমুদ্রের ধারের ছোটো গ্রাম থেকে বাড়ি ছেড়ে গেল হস্টেলে, গ্রীষ্মের ছুটিতে ফিরে এলো হয়তো মরুভূমির কাছে আর একটা ছোটো শহরে, কখনো বা পাহাড়ি ঝর্ণার পাশের একটা গ্রামে! এটা ওদের অভ্যাসই হয়ে গেছে। বাবা তো কখনও এক জায়গায় বেশিদিন থাকে না, তাই!
পুপাই
জিজ্ঞেস করল,
“আমরা
এখানে আর ফিরে আসবো না?”
মা
বলল,
“না,
এখানে
না। আমরা এরপর যাব একটা দারুণ
মজার জায়গায়।”
পুপাই
মন খারাপ করে উঠে গেল। ওরা
মাত্র দুমাস-ই
এই বাড়িটায় থেকেছে,
কিন্তু
পাশের বাড়ির সমবয়সী ছেলেটার
সঙ্গে পুপাইয়ের এ কদিনেই বেশ
বন্ধুত্ব হয়ে গেছিল। ওর সঙ্গে
আর দেখা হবে না ভেবেই পুপাইয়ের
দুঃখ হয়েছে। বুনুর অবশ্য কিছু
যায় আসেনি। এখানে ওর কোনও
সমবয়সী বন্ধু ছিল না,
তাই
বিশাল বাড়ি আর তার চারপাশের
বাগান-ই
ছিল বুনুর জগত। পরের বার ফিরে
এলে অন্য কোনও বাড়ি,
অন্য
কোনও বাগান,
অন্য
কোনও শহর। বুনু এতে অভ্যস্ত,
তাই
আর ভাবে না।
স্কুল
খুললো,
বুনুরা
চলে গেল হস্টেলে। নতুন ক্লাস,
পুরনো
বন্ধু,
নতুন
টিচার,
নতুন
পড়ার চাপ,
খেলাধুলো,
বন্ধুদের
সঙ্গে স্কুলের আশে পাশে বেড়ানো,
টিচারদের
সঙ্গে পিকনিক – এসবের ভিড়ে
বাকি সব কিছু চাপা পড়ে গেল।
মা অবশ্য চিঠিতে লিখেছিল
বাক্স-প্যাঁটরা
গুছিয়ে নতুন বাড়িতে যাচ্ছে
– কিন্তু সেটা তো প্রায়
প্রতিবছরই মা চিঠিতে লেখে।
আবার যখন বছরের শেষে অ্যানুয়াল
পরীক্ষার পর মা-বাবা
ওদের নিতে এল,
তখন
মনে পড়ল। গাড়িতে উঠে বুনু
জিজ্ঞেস করল,
“মা,
এবারে
আমরা কোথায় যাব?”
মা
একটু হেসে বলল,
“কেন?
চিঠিতে
লিখেছি,
ভুলে
গেছিস?
এবারে
কাছেই। ওই যে পাহাড়গুলো
দেখছিস,
ওখানে
একটু উঠে একটা গ্রাম আছে। সেই
গ্রামটা পার করে সামনের পাহাড়টা
টপকে আর একটা ছোট্ট গ্রাম,
সেখানে
বাবা এখন কাজ করে।”
ওদের
বাবা কখনও বড়ো শহরে কাজ করে
না। ওদের স্কুলের অন্য ছেলেমেয়েরা
হোস্টেলে আসে কারণ তাদের বাবা
মা হয় দূর দেশে থাকে,
নয়তো
বদলির চাকরি করে। কেউ বা হস্টেলে
আসে তাদের বাড়ীতে দেখাশোনা
করার কেউ নেই বলে। কিন্তু বুনু
আর পুপাই হোস্টেলে থাকে কারণ
ওদের বাবা সবসময়ই এমন এমন
জায়গায় কাজ করে যেখানে
ধারেকাছে কোন স্কুলই নেই।
বাবা
গাড়ি চালাতে চালাতে আস্তে
আস্তে সমতল ছেড়ে পাহাড়ে উঠতে
লাগল। কিছুক্ষণ দেখা গেল দূরে
স্কুলটা কেমন ছোট্ট হয়ে যাচ্ছে।
পুপাই খুব উত্তেজিত। খালি
বলে,
“ওই
দেখ,
ওই
দেখ,
বয়েজ
হস্টেল,
ওই
দেখ তোদের হস্টেল,
ওই
দেখ,
জিম্নেশিয়াম,
ওই
যে হেডস্যারের বাড়ি...”
তারপরে
একটা মোড় ঘুরে ওরা পাহাড়ের
আড়ালে চলে গেল। তখন চারিদিকের
দৃশ্য বদলে গেল। স্কুলটা আর
দেখা গেল না।
পাহাড়ী
রাস্তায় গাড়ি চলে আস্তে। তাই
সকাল থেকে চলে চলে যতক্ষণে
ওরা মার কথামতো পাহাড়ী গ্রামটায়
পৌঁছল,
ততক্ষণে
দুপুর হয়ে গেছে। বাবা গাড়িটা
একটা বাড়ির সামনে দাঁড় করিয়ে
বলল,
“এখানেই
দুপুরের খাবার খেয়ে নিই,
কী
বলো?
বাড়ি
পৌঁছতে বিকেল হয়ে যাবে।
বাচ্চাদের খিদে পেয়ে যাবে।”
পাহাড়ী
গ্রামে লোকে বাড়িতেই খাবার
রান্না করে বিক্রি করে। ওরা
সেরকম একটা বাড়িতে ঢুকল।
বাবাকে ওরা চেনে। বাবা যেহেতু
গ্রামে গ্রামে কাজ করে,
কোনও
একটা নতুন জায়গায় গেলেই বাবা
কাছাকাছি সব গ্রামে যায়। আর
সবাই বাবাকে চিনে যায় চট করে।
বাড়ির মালিক এক বুড়ি। এক গাল
হেসে ওদের ডেকে নিল। বলল,
“আজ
আমি মাংস রান্না করেছি। মাংস
ভাত দিই?
আর
একটু তরকারি...”
বাবা
বলল,
“মাসি,
তুমি
নিজের জন্য যা রান্না করেছ,
সেগুলো
সব দিয়ে দিও না।”
তারপরে
সবাই খুব হাসাহাসি করে গল্প
করে করে বুড়ির রান্না খেল।
খেয়েদেয়ে আবার রওয়ানা। চলতে
চলতে বিকেল হয় হয়,
এমন
সময় বাবা মাকে বলল,
“ওদের
কি এখন বলে দেবে,
না
কি ওরা বাড়ি গিয়ে অবাক হবে?”
ব্যাস,
এই
কথা শুনে কি ওরা আর থাকে!
“কী
হয়েছে,
কী
হয়েছে?”
“বাড়িতে
কী আছে?”
“বলো
না,
কী
আছে...”
এ
সব প্রশ্ন শুরু হলো। মা বাবা
খালি হাসে,
কিছু
বলে না। দেখতে দেখতে অবশ্য
একটা গ্রামে এসে পড়ল ওরা,
আর
বাবা গেট দিয়ে ঢুকে একটা বাগানের
মধ্যে বাড়ির সামনে দাঁড়াল।
প্রত্যেকবার
এরকম নতুন বাড়িতে আসা ব্যাপারটা
বুনুর দারুণ লাগে। এই বাড়িটাও
দারুণ লাগল। বাড়ির পেছনেই
একটা পাহাড় উঠেছে। জঙ্গলে
ঢাকা। বিকেলের ঢলে পড়া রোদে
সবুজ গাছগুলো ঝকঝক করছে।
বাড়িটা নতুন নয়,
কিন্তু
রোদের আলোয় দেখাচ্ছে স্বপ্নের
মতো। কিন্তু আজ বুনুর সেদিকে
নজর নেই। বাড়িতে একটা কিছু
আছে যেটা বাবা-মা
বলেনি...
গাড়িটা
থামা মাত্র ভেতর থেকে ফ্রক
পরা সমবয়সী একটা মেয়ে ছুটে
বেরিয়ে এল,
“বুনু,”
বলে
ডাক দিয়ে। আর বুনুও,
“টুনুদি...”
বলে
চিৎকার করে উঠল। টুনুদি ওর
চেয়ে মাত্র তিন মাসের বড়ো,
তবু
মা-বাবা
আর জ্যেঠু বলে দিয়েছে,
তিন
মিনিটের বড়ো হলেও দিদি বলতে
হবে। তাই টুনুদি বলে বুনু।
বুনুর পেছন পেছন পুপাইও
হুড়মুড়িয়ে,
“বুটুদা
এসেছে,
বুটুদা?”
বলে
নেমে পড়েছে। বুটুদা টুনুদির
আপন দাদা। ওদের জ্যাঠতুত
দাদা-দিদি।
পুপাইয়ের চেয়ে বেশ অনেকটা
বড়ো হলেও পুপাই বুটুদা বলতে
অজ্ঞান।
জেঠিমাও
বেরিয়ে এসেছে। পুপাই এক ছুটে
ওদের সবাইকে পার করে জেঠিমার
পায়ে ঢিপ করে একটা প্রণাম করেই
সোঁ করে বাড়ির ভেতরে ঢুকে গেল।
ও জানে জেঠিমা বাগে পেলেই খপ
করে ধরে গাল টিপবে,
আদর
করবে,
আর
ছাড়বে না। বুনু অবশ্য অত
ছোটাছুটি করে না – ও গিয়ে
টুনুদির দু হাত ধরল,
তারপরে
দুজনে বাঁইবাঁই করে কয়েকপাক
ঘুরে নিল। যেই না থেমে বুনু
জেঠিমাকে প্রণাম করেছে,
ওমনি
ভেতর থেকে আবার ছুটে এসেছে
পুপাই। “বুটুদার পা ভেঙেছে,
বুটুদার
পা ভেঙেছে...”
মা
বলল,
“ওরে
থাম থাম – এরকম কোনও দিকে না
তাকিয়ে দৌড়লে তোরও পা ভাঙবে।”
এবার
বুটুদা নিজেই বেরিয়ে এল। পায়ে
মোটা প্লাস্টার,
দু
বগলে ক্রাচ। বুনু ছুটে গিয়ে
ওর হাত ধরল। “কী হয়েছে,
বুটুদা?”
বুটুদা
বলল,
“আরে,
ছাড়,
ছাড়।
আমি নিজেই পারব। তেমন কিছু
হয়নি,
একটা
আঙুল ভেঙেছে। কিন্তু এখন কয়েক
সপ্তাহ প্লাস্টার করা অবস্থায়
থাকতে হবে আর ক্রাচ নিয়ে চলতে
হবে।”
বুনু
জিজ্ঞেস করল,
“ব্যথা
আছে?”
বুটুদা
মাথা নাড়ল। “না। তবে পা-য়ে
অন্য জায়গাতেও কেটেছে,
তাই
একটু সাবধানে...”
বলে
একটা চেয়ারে বসল।
পুপাই
জিজ্ঞেস করল,
“কী
করে হলো বুটুদা?”
বুটুদা
একটু হাসল,
কিছু
বলল না। মা বলল,
“হ্যাঁ,
বড়দি,
কী
করে হলো সকালে ভালো করে বুঝতেই
পারলাম না। তখন বেরোচ্ছিলাম
তো!”
জেঠি
হেসে বলল,
“আর
বলিস না,
ওর
বাবা অফিস থেকে বাড়ি ফিরেছে।
একটু বাদে বৃষ্টি এসেছে,
ওকে
বলেছে স্কুটারটা স্ট্যান্ড
থেকে নামিয়ে শেডের নিচে ঢুকিয়ে
দিতে। ও গিয়ে যেমন স্কুটার
নামিয়েছে,
ওমনি
হাত স্লিপ করে স্কুটার ওরই
পায়ের ওপরে...”
সবাই
হিহি করে হাসল,
কিন্তু
বুনুর হাসি পেল না। ও উঠে ভেতরে
গেল। বাড়িটাই দেখা হয়নি।
সাধারণত
স্কুল থেকে ফিরলে প্রথম ক’দিন
ভাইবোনে মিলে বাড়িটা আর তার
আশপাশ এক্সপ্লোর করে। প্রত্যেকবারই
এটা ওদের কাছে একটা অ্যাডভেঞ্চার।
কিন্তু এবারে জ্যেঠুরা থাকায়
সেটা ভালো করে হলো না। তার ওপর
বুটুদার পা ভাঙা। ও ক্রাচ নিয়ে
ওদের সঙ্গে আসতে পারবে না,
আর
ওকে ফেলে রেখে যাওয়াটাও মা-বাবা
যেমন পছন্দ করবে না,
বুনু
আর পুপাইয়েরও বুটুদাকে রেখে
যেতে মন চায় না।
তিন
দিনের দিন ব্যাপারটা সহজ করে
দিল জেঠিমা-ই।
সকালে খেতে বসে বুটুদাকে বলল,
“তোর
একটু বই নিয়ে বসা উচিত। ক্লাস
এইট এখন। একটু সিরিয়াস হ’।”
বলে ওদের দিকে তাকিয়ে বলল,
“তোদের
তো কোনও সেরকম কাজ নেই। তোরা
বুটুদার সঙ্গে সঙ্গে না থেকে
একটু ঘুরে আয়। তিন দিন বাড়ি
থেকে বেরোসনি...”
বুনু
আর টুনু এই ব্যাপারটা নিয়ে
আগের দিন রাতেই কথা বলছিল।
ওরা বাধ্য মেয়ের মতো ঘাড় নাড়ল,
কিন্তু
বুটুদাকে ছেড়ে পুপাই যাবে
না। তাই ও বলল,
“আমারও
কিছু হোম ওয়ার্ক আছে।” সেই
শুনে মা বলল,
“ঠিক
আছে,
কিন্তু
তুমি বুটুদার ঘরে যেতে পারবে
না। জেঠিমার সঙ্গে বাইরের
ঘরে বা এই টেবিলে বসে পড়াশোনা
করবে। বুঝলে?”
পুপাই
একটু ভেবে বলল,
“অবশ্য
তত বেশি হোমওয়ার্ক নেই। পরে
আর একদিন করে নেব।”
জলখাবার
শেষ করে তিনজনে বেরোল গ্রামটা
ঘুরে দেখতে। ছোট্ট গ্রাম।
পনেরো মিনিটেই ফুরিয়ে গেল।
একটাই রাস্তা,
আর
তার দু-দিকে
দু-সারি
বাড়ি। কয়েকটা বাড়ি অবশ্য
পাহাড়ের গায়ে একটু ওপরে বা
নিচে। একটা পোস্ট অফিস,
আর
একটা পুলিশ স্টেশন – পাশাপাশি।
পুলিশ আর পোস্ট মাস্টার দুজনে
বাইরে বসে গল্প করছে। ওদের
দেখে ডাকল। জানতে চাইল,
“তোমরা
ওই বাড়িতে নতুন এসেছ?”
ওরা
বলল,
“হ্যাঁ।”
তারপরে জানতে চাইল,
“এখানে
কী কী দেখার আছে?”
পুলিশ
আর পোস্ট মাস্টার দুজনেই অবাক।
এখানে আবার কী দেখার থাকবে!
এই
গ্রামে!
কিছুই
নেই। এটা কি শহর নাকি?
বাজার-হাট,
পার্ক-লেক,
জাদুঘর
থাকবে?
এখানে
খালি গ্রাম,
খেত
আর জঙ্গল।
বুনু
জানতে চাইল,
“জঙ্গলে
কী আছে?
বাঘ
ভালুক আছে?”
পুলিশটা
বলল,
“এদিকটা
তো গ্রাম,
তাই
বাঘ ভালুক বড়ো একটা আসে না।
তবে এই জঙ্গলেই আরও ভেতর দিকে
আছে। এটা তো মস্তো জঙ্গল –
জানো তো?
কত
মাইল লম্বা চওড়া কেউ জানে না।
ভেতরে অনেক বন্য প্রাণী আছে।
হরিণ আছে,
মাঝে
মাঝে এদিকে দেখা যায়। হাতি
আছে। আর বুনো শুওর। আমাদের
ক্ষেতে ফসল পাকলে খেতে আসে
দল বেঁধে। তখন তাদের তাড়িয়ে
দিতে হয়। সেইজন্যই তো তোমার
বাবা এখানে এসেছে। সরকার থেকে
আমাদের ক্ষেতের চারদিকে রাতে
বিজলি তারের বেড়া দেবে,
যাতে
সেই তার ছুঁলেই হাতি আর শুওরের
কারেন্টের ছ্যাঁকা লাগবে,
আর
ওরা পালাবে। হরিণও পালাবে।”
ওমা!
এ
আবার কী কথা!
অবাক
হয়ে মুখ চাওয়াচাওয়ি করল ওরা।
পুপাই বলল,
“কারেন্টের
ছ্যাঁকা মানে কী?
ছ্যাঁকা
তো গরম জিনিস ছুঁলে লাগে!”
ওরা
তো হেসে কুটিপাটি। আরে শহরের
বাচ্চারা কিছুই জানে না?
কারেন্টে
হাত দিলে ছ্যাঁকা লাগে না?
বাপরে
এমন ছ্যাঁকা লাগে যে লোকে
ভিরমি খায়!
টুনুদি
বুঝল। বলল,
“ওরা
শক খাবার কথা বলছে রে। হাতি,
হরিণ
এদের কাকু শক দেয় বুঝি?”
পরে
বাড়ি ফিরে ওরা চুপিচুপি বুটুদাকে
জিজ্ঞেস করল ব্যাপারটা।
বুটুদার পড়াশোনা শেষ হয়ে গেছিল
বলে শুয়ে শুয়ে গল্পের বই পড়ছিল।
বলল,
“আরে
তোরা জানিস না?
বাবা
আর কাকু,
তো
এ-ই
করে। বাবা ইলেকট্রিকের তার
বানায়। আর কাকু সেগুলো গ্রামে
গ্রামে ক্ষেতের চারিদিকে
লাগায়। এই তারগুলোতে ইলেকট্রিক
কারেন্ট থাকে,
আর
হাতি,
হরিণ,
শুওর,
গণ্ডার
– এরা যদি গ্রামে আসে ফসল খেতে,
তাহলে
এই তারগুলোতে ওদের শক লাগে।”
কাঁদোকাঁদো
হয়ে টুনু বলল,
“ওদের
ব্যথা লাগে না?”
হাতের
বইটার মধ্যে পেজ-মার্ক
গুঁজে বন্ধ করে টেবিলে রেখে
সাবধানে উঠে বসল বুটুদা। বলল,
“শোন।
জঙ্গলে প্রাণীদের অনেক খাবার
আছে,
কিন্তু
সেগুলো ওদের অনেক খুঁজে খুঁজে
খেতে হয়। কিন্তু মানুষ তো চাষ
করে,
তাই
ভালো ভালো খাবার সব একসঙ্গে
থাকে। বন্য প্রাণীরা অত বোঝে
না,
কোনটা
মানুষের ক্ষেত,
আর
কোনটা জংলি। তাই যা পায় খেয়ে
নেয়। কিন্তু মানুষ তো মানবে
না,
তাই
ওরা তাড়ায়। চেঁচায়,
ঢাকঢোল
পেটায়,
তাতে
কাজ না হলে আগুন জ্বালিয়ে মশাল
ছুঁড়ে মারে,
বড়ো
বড়ো বোমা ফাটায় – তাতে ওদের
অনেক বেশি ক্ষতি হয়। সে তুলনায়
এই ইলেকট্রিক শক কিছুই না।
ওদের চিনচিন করে ব্যথা লাগে,
আর
ওরা পালিয়ে যায়। কয়েক বার হলে
বুঝতে পারে এখানে আসলে শক
লাগবে,
তাই
আর আসে না।”
এতক্ষণ
পুপাই চুপ করে শুনছিল। এবার
বলল,
“গণ্ডারের
শক লাগে?”
অবাক
হয়ে বুটুদা বলল,
“অবশ্যই
লাগে। অ্যাফ্রিকাতে মাইলের
পর মাইল ইলেকট্রিক ফেনস আছে,
জানিস?”
পুপাই
আরও অবাক হয়ে বলল,
“অত
মোটা চামড়াতে শক লাগে?
তবে
যে শুনেছিলাম একটা লোক গণ্ডারকে
শুক্রবারে কাতুকুতু দিয়েছিল
আর গণ্ডারটা সোমবারে হেসেছিল?”
এবারে
সবাই হাসতে শুরু করল। বুটুদা
বলল,
“দূর,
ও
তো গল্প। সত্যি কেউ গণ্ডারকে
কাতুকুতু দিতে পারবে?
তার
আগেই দেবে না গুঁতিয়ে কাসুন্দি
বানিয়ে?”
পুপাই
হেসে বলল,
“মানুষ
কি কাসুন্দি হয়?
তার
জন্য আম লাগবে।”
সেদিন
সন্ধেবেলা ওদের বাড়িতে রাতে
নেমন্তন্ন খেতে এলেন একজন
বাইরের লোক। বাবা ওদের সঙ্গে
পরিচয় করিয়ে দিল। উনি জঙ্গলের
রক্ষণাবেক্ষণ করেন – ফরেস্ট
অফিসার,
মিঃ
সিং। মিঃ সিং-কে
জিজ্ঞেস করায় উনিও বললেন,
“এখানে
কোনও সেরকম বিপজ্জনক প্রাণী
নেই। তবে জঙ্গল পেছনে,
সাবধানে
ঘোরাফেরা করাই ভালো। আর কিছু
না হোক,
জঙ্গলে
তো হারিয়ে যেতে পারো,
তাই
না?”
রাতে
শুতে গিয়ে টুনুদি ঘুমিয়ে পড়ার
পরে বুনুর হঠাৎ জানলার বাইরের
অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে বুকটা
দুরুদুরু করে উঠল। মনে মনে
ভাবার চেষ্টা করল,
ওই
অন্ধকারে ও জঙ্গলের মধ্যে
একা একা!
দিনের
বেলা ঘুরতে গিয়ে হারিয়ে গেছে।
সারা দিন ঘুরে ঘুরে ও অন্ধকারে
একটা গাছে উঠছে...
চারিদিকে
হিংস্র জন্তুদের গর্জন...
রাতচরা
পাখির রক্ত-জল-করা
ডাক...
ওরে
বাবা!
বালিশটা
মাথার ওপরে দিয়ে কম্বল টেনে
ভয়ে বুনু চোখ বন্ধ করল।
স্বপ্নেও
হারিয়ে গেল আবার। জঙ্গলের
মধ্যে ঘুরে ঘুরে বেড়াচ্ছে
বুনু। দিনের বেলা অবশ্য।
পাহাড়ের গা থেকে একটু নিচেই
দেখতে পাচ্ছে বাড়ির লাল টালির
ছাদটা। কিন্তু পৌঁছতে পারছে
না। যতই এগোয়,
ততই
আরও ঘন হয়ে উঠছে জঙ্গল। পায়ে
জড়িয়ে যাচ্ছে লতা আর কাঁটাওয়ালা
ঝোপঝাড়ে জামাকাপড় আটকে ছিঁড়ে
যাচ্ছে। কিন্তু মুখ তুলে
তাকালেই,
ওই,
ঠিক
অত দূরেই রয়েছে ওর বাড়িটা...
সকালে
ঘুম থেকে উঠেই বুনু এক দৌড়ে
বাবার ওয়ার্কশপে গিয়ে একমুঠো
চক নিয়ে নিজের ব্যাগে ভরল।
আজ ওদের জঙ্গলের ভেতরে বেড়ানোর
কথা। গতকাল থেকে ঠিক করে রেখেছে
ওরা। টুনুদি মিঃ সিং-এর
কথায় মোটেই ডরায়নি। ঘুমিয়ে
পড়ার আগে বলেছে,
দূর,
কতদূর
আর যাব...
দেখবি
ঠিক ফিরে আসব। আমার ডিরেকশন
সেনস দারুণ। যে কোনও জায়গায়
আমাকে ছেড়ে দিবি,
আমি
ঠিক বাড়ি চলে আসব।
টুনুদি
শহরে থাকে। ও জানে না,
শহরে
রাস্তা খুঁজে বাড়ি ফিরে আসা
আর জঙ্গলে,
যেখানে
রাস্তাই নেই,
সেখানে
বাড়ি ফেরার মধ্যে অনেক তফাৎ।
এই সেদিন বুনু ‘চাঁদের পাহাড়’
পড়ছিল। সেখানে শঙ্কর আর দিয়েগো
আলভারেজ পথ হারিয়ে সপ্তাহের
পর সপ্তাহ জঙ্গলের ভেতরে ঘুরে
বেড়িয়েছিল। ওদের কম্পাস খারাপ
হয়ে গিয়েছিল। আর বুনুদের তো
কোনও কম্পাসই নেই। তাই এই
উপায়টাই ভালো। গাছের গায়ে
চকের দাগ দিয়ে দিয়ে যাওয়া।
খেয়েদেয়ে
দুই বোন ব্যাকপ্যাক পিঠে গেল
পুপাইকে ডাকতে। গিয়ে দেখে
পুপাই ব্রেকফাস্টের পরে সটান
ফিরে গেছে বিছানায়।
“কী
রে?
যাবি
না?”
টুনুদির
প্রশ্নে সজোরে মাথা নাড়ল
পুপাই। বলল,
“মিঃ
সিং বলেছে না যেতে। হারিয়ে
যাব।”
সকাল
থেকে পড়তে বসেছিল বুটুদা। বই
থেকে মুখ তুলে বলল,
“দূর
দূর,
এই
জঙ্গলে হারাবি না। বলে দিচ্ছি...”
বলে
চাকা লাগানো চেয়ারটা ঠেলে
জানলা দিয়ে আঙুল দেখিয়ে বলল,
“ওই
যে দেখেছিস,
পেছনের
বাগানের বাইরে ওই যে দুটো বড়ো
করঞ্জ গাছ,
ওর
মাঝখান দিয়ে একটা পায়ে-চলা
রাস্তা আছে। ওই রাস্তা ধরে
মিনিট পনেরো হাঁটলে একটা
গ্রাম। এখান থেকে ওই গ্রাম
পর্যন্ত জঙ্গল মোটেই গভীর
নয়,
আর
রাস্তাটা তো আছেই। এর মধ্যে
ঘুরে বেড়ালে হারিয়ে যাবার ভয়
নেই। তবে গ্রামের ওদিকে জঙ্গল
গভীর। ওদিকে গেলে গ্রাম থেকে
কাউকে সঙ্গে নিয়ে যাবি – ব্যাস।”
ওরা
অবাক হয়ে দেখছে,
বিছানা
থেকে পুপাই-ও
উঠে এসেছে,
বলেছে,
“তুমি
কী করে জানলে?
তুমি
তো ক্রাচ নিয়ে শুধু সামনের
বাগানেই যেতে পার। বাড়ির
পেছনেও যেতে পারো না,
এত
এবড়ো খেবড়ো।”
বুটুদা
হেসে বলল,
“কেন?
তোরা
যখন বেরিয়ে যাস,
আমি
গিয়ে জগন-এর
সঙ্গে গল্প করি। জগনের কাজ
শেষ হয়ে যায় সকাল দশটার মধ্যে।
ওর মার তখনও রান্না হয় না বলে
বসে থাকে। ওরা দুজনে আমাদের
খাওয়া শেষ হলে ওদের খাবার নিয়ে
বাড়ি যায়। ওই গ্রামটা জগনদের-ই।
তোরা দুপুরের পর গেলে জগনকে
সঙ্গে নিয়েই গভীর জঙ্গলে যেতে
পারবি।”
টুনুদি
বলল,
“দাদা,
তুই
একটা জিনিয়াস। জগনকে নিয়ে
পরে যাওয়া যাবে। আপাতত,
চল
এই পেছনের জঙ্গলটাই দেখে আসি।
সেই সঙ্গে জগনের গ্রাম।”
পুপাই
বলল,
“আরে,
দাঁড়াও,
দাঁড়াও...
আমিও
আসছি...”
পরের
কয়েকদিন ওদের দারুণ কাটল।
জঙ্গলের ছায়া-ছায়া
পাতাঝরা আধো আলোয় অজস্র পাখি
আর ছোটো প্রাণীর মধ্যে ঘুরে
বেড়াল। ওখানে একটা কাঠবিড়ালি,
সেখানে
একটা প্যাঁচা,
ওই
দূরে একটা ধনেশ উড়ে গেল...
মা
আর জেঠিমা ওদের টিফিনবাক্সে
লাঞ্চ দিয়ে দিত – কোনও দিন
স্যান্ডউইচ,
কোনওদিন
পরোটা,
কোনওদিন
রুটি দিয়ে রোল বানিয়ে দিত।
ওরা সেই নিয়ে,
ওয়াটার
বটল নিয়ে চলে যেত। ঘুরে ঘুরে
বেড়াত জঙ্গলে। নাম না জানা
পাখি দেখতে পেলে টুনুদির
মোবাইলে ছবি তুলে আনার চেষ্টা
করত,
যাতে
বুটুদা ইন্টারনেট থেকে দেখে
নাম বলতে পারে। জগনদের গ্রামে
যাবার পায়ে চলার পথটা আসলে
বেশ চওড়া। আর অনেকদূর অবধি
জিপ যেতে পারে। বাবা বলল জগনদের
গ্রামের কাছে কোনও সময় গাছ
কেটে আনার জন্য সরকার রাস্তা
লরি যাওয়ার বানাতে চেয়েছিল,
কিন্তু
স্থানীয় লোকেরা আপত্তি করায়
সে আর হয়ে ওঠেনি।
“ওই
জঙ্গলটা হাজার হাজার বছরের
পুরোনো। ওই গাছগুলোর অনেকগুলোরই
কয়েকশো বছর বয়েস হতেই পারে।
এগুলো কেটে ফেলবার প্ল্যান
করায় অনেকেই
খুব রেগে গেছিল। শেষে তখন দেশে
যিনি প্রধানমন্ত্রী ছিলেন,
তিনি
বন দপ্তরকে বলেন,
এই
জঙ্গলে হাত দেওয়া চলবে না।
তখন বন দপ্তর থামে। কিছু লোকে
বলেছিল,
এই
জঙ্গল বুড়ো জঙ্গল। এটা
বাঁচিয়ে রেখে লাভ নেই। এমনিই
গাছগুলো মরে যাবে,
তখন
আর দাম পাওয়া যাবে না। গাছেরা
কিন্তু দিব্যি বেঁচে আছে
এখনও।”
জিপ
চলা রাস্তাটা এখন আস্তে আস্তে
আবার ঘাসে,
চারাগাছে
ঢেকে যাচ্ছে। কিছুদিন পরেই
আবার পায়ে চলা পথ হয়ে যাবে।
রাস্তার থেকে দু-দিকে
সত্যিকারের
পায়ে চলা পথ গেছে এদিক
ওদিক কিছু দূরে দূরে। ওরা ওরকম
দুটো
ধরে হেঁটে গিয়েছে কয়েকদিন।
বেশি দূরে যায়নি,
কোথাও
দেখেছে মস্তো একটা পাথর,
কোথাও
সরু একটা জলের ধারা। দু’দিন
ওখানে বসেই ওরা দুপুরের খাবার
খেয়েছে পিকনিকের মতো।
ঘটনাটা
ঘটল ছ-দিনের
মাথায়। সেদিন টুনুদি বলল,
“চ’
আমরা আজ জগনদের গ্রামে যাই।
ওখান থেকে কোথাও যাব।”
জগনদের
গ্রামে ওরা আগেও গিয়েছে,
কিন্তু
ওখান থেকে কোথাও নিজেরা যায়নি।
দুপুরের পরে একদিন জগন ওদের
নিয়ে গিয়েছিল জঙ্গলের আরও
ভেতরে। তবে ওখানেও মনে হয়নি
জঙ্গল খুব ঘন,
রাস্তা
হারিয়ে যেতে পারে। জগন বলেছিল
সেরকম জঙ্গল আরও অনেকটা গিয়ে
তবেই পাওয়া যাবে। অনেকটাই
দূরে। ও নিজেও কোনওদিন যায়নি
অতদূর।
টুনুদির
কথায় বুনু বলল,
“কোথায়
যাবি?
ওদিকে
গেলে যদি হারিয়ে যাই?”
টুনুদি
বলল,
“না,
গ্রাম
ছাড়িয়ে যাব না। কিন্তু দেখেছিস,
জগনদের
গ্রামের পাশ দিয়ে একটা সরু
মতো নদী গেছে?”
দেখেছে
বইকি!
ওটা
পার হবার জন্য কাঠ বেঁধে বেঁধে
একটা সাঁকো বানিয়েছে গ্রামের
লোকে। নড়বড়ে,
সরু,
কিন্তু
গ্রামের লোকে হনহন করে হেঁটে
চলে যায়,
যেন
রাস্তা দিয়েই হাঁটছে। ওরা
পায়ে পায়ে খুব আস্তে আস্তে
পার হয়েছিল বলে জগন ওপারে
দাঁড়িয়ে খুব হাসছিল।
“ওই
নদীটার আগেই জঙ্গলের মধ্যে
একটা পায়ে চলা পথ গিয়েছে। ও
দিকে যাব।”
যেমন
কথা তেমনই কাজ। জঙ্গলের মধ্যে
বেড়াতে বেড়াতে ওরা দুপুরের
আগেই পৌঁছে গেল জগনের গ্রামে।
ভেবেছিল গ্রাম অবধি যাবে না,
কিন্তু
গ্রামের কয়েকজন কাঠ কেটে
ফিরছিল। ওদের সঙ্গে দেখা হল
বলে গল্প করতে করতে গ্রাম অবধি
যেতে হলো। জগন আর ওর মা নেই।
কাজে গেছে। জগনের দিদা ঘরের
বাইরে আটা বাছছিল,
ওর
সঙ্গে কিছুক্ষণ গল্প করল।
পুপাই একটু আটাও বেছে দিল।
আর জগনের কুকুরছানাটা – যার
নাম কি না পাট্টি,
তার
সঙ্গে খেলা করল। কুকুরছানাটাকে
ওরা গাছের ছোটো ছোটো ডালপালা
ছুঁড়ে ছুঁড়ে দিয়ে ফিরিয়ে আনতে
শেখাল। তারপরে জগনের দিদাকে
টা-টা
বলে ওরা রওয়ানা দিল আবার।
জগনের দিদা বলল জগনরা এক্ষুনি
ফিরে আসবে – তার পরে গেলে হয়
না?
ওরা
রাজি হলো না। জগন যদি ওদের
ইচ্ছেমতো ঘুরতে না দেয়?
পা
চালিয়ে নদী পেরিয়ে ওরা ঢুকে
গেল জঙ্গলে। পথে কারওর সঙ্গে
দেখা হলো না। চলতে চলতে বেশ
অনেকটা এসে শেষে পুপাই হঠাৎ
থেমে বলল,
“টুনুদি,
এখানে
কেন এসেছিস?
আমার
আর হাঁটতে ভালো লাগছে না। চল,
ফিরে
যাই।”
অবাক
হয়ে বুনু বলল,
“সে
কী রে!
এখনও
তো দুপুর হয়নি। খাওয়াই হলো
না। খাবি না?”
পুপাই
বলল,
“খিদে
পেয়েছে তো। আজ কিছু বেড়ানোও
হলো না,
তোরা
কেমন পাট্টির সঙ্গে খেললি।
আমি শুধু আটা থেকে পোকা বাছলাম।”
পকেট
থেকে মোবাইল ফোন বের করে টুনু
বলল,
“দুপুর
হয়েছে,
খেয়ে
নেওয়া যায়,
কী
বলিস?
ওই
নদীটা থেকে আমরা খুব দূরে নেই।
এদিকে গেলেই পাব। ওখানে গিয়ে
হাত ধুয়ে ওখানে বসে খাবি,
না
কি...”
পিঠ
থেকে ব্যাকপ্যাকটা খুলে থপ
করে মাটিতেই ফেলে দিল পুপাই।
বলল,
“আমি
এখানেই খাব। আর হাঁটব না।”
টুনু
ব্যাগটা তুলে নিয়ে বলল,
“ঠিক
আছে। কিন্তু এখানে তো বসার
জায়গা নেই। অন্তত একটা খালি
জায়গা পেলে সেখানে বসি চ’।
আমি তোর ব্যাগ নিয়ে যাচ্ছি।”
পুপাই
অনিচ্ছাসত্ত্বেও আস্তে আস্তে
ওদের সঙ্গে গেল – ওরা এদিক
ওদিক তাকাতে তাকাতে যাচ্ছে,
হঠাৎ
দেখল জঙ্গলটা শেষ হয়ে সামনে
একটা ফাঁকা জায়গা। জঙ্গলে
এরকম ফাঁকা জায়গা অনেক সময়
থাকে,
কিন্তু
এটা মস্তো বড়ো। বেশ গোটা দুয়েক
ফুটবল খেলার মাঠের মতো সাইজ।
ওরা আর দেরি করল না। পুপাই
ব্যাগ থেকে বসার চাদরটা বের
করল,
টুনু
বের করল হাত ধোবার জলের বোতল।
তিনজনে হাত ধুয়ে বুনুর ব্যাগ
থেকে টিফিন বক্স বের করল। আজকে
মা স্যান্ডউইচ আর কেক দিয়েছে।
তিনজনে খেয়ে দেয়ে কিছুক্ষণ
ওখানেই শুয়ে রইল। মাথার ওপরে
নীল আকাশ। তাতে সাদা মেঘ। টুনু
আর বুনু কিছুক্ষণ মেঘের মধ্যে
জন্তু-জানোয়ার,
মানুষের
মাথা,
দেশের
ম্যাপ খুঁজে বের করার খেলা
খেলল। পুপাই যোগ দিয়েছিল
খানিকক্ষণের জন্য,
কিন্তু
একটু পরে দুত্তেরি বলে উঠে
বসল। কিছুক্ষণ ঘাসের ওপর নানা
পোকামাকড় দেখল খুঁজে খুঁজে,
তারপরে
একটা পিঁপড়ে না কী দেখে হামা
দিয়ে একটু এগিয়ে গিয়ে হঠাৎ
একটা চিলের ডাকে মুখ তুলেই
বলল,
“দিদি,
ওটা
কী দেখ?”
টুনু
আর বুনু তখন সবে ঠিক করেছিল
ওই মেঘটা অনেক ভুরু কুঁচকে
দেখলে যেন মনে হয় সত্যিই কার্ল
মার্ক্সের মাথা। তাকিয়ে দেখল
পুপাই মাঠের ওদিকের জঙ্গলের
দিকে আঙুল তুলে দেখাচ্ছে। কী
ওটা?
কিছুক্ষণ
ধরে দেখে টুনু বলল,
“একটা
বাড়ি না?”
বাড়িই
বটে!
জঙ্গলটা
যেখানে শুরু হয়েছে,
তার
থেকে একটু ভেতরেই – ছায়াছায়া
অন্ধকারে – ওটা বাড়িই বটে।
“চ’ দেখে আসি,”
বলে
টুনুদি চট করে উঠে চাদর,
টিফিন
বাক্স,
জলের
বোতল গুছিয়ে নিল। খোলা জমিটা
পেরিয়ে ওরা পায়ে পায়ে জঙ্গলে
ঢুকে দেখল,
বাড়ি
নয়,
বরং
ঘর একটা। একসময়ে টালির চাল
ছিল,
এখন
কয়েকটা মাত্র টালি বাকি আছে।
বাঁশের চালটা রয়েছে। দরজা
জানলা নেই। কাঠ,
বাখারি,
যা
দিয়েই দরজা বানানো হয়ে থাকুক
না কেন,
রোদে
জলে পচে নষ্ট হয়ে গেছে। খালি
ফোকরগুলো রয়েছে।
আস্তে
আস্তে,
সাবধানে
ঘরে ঢুকল ওরা। ওরা জানে,
যে
কোনও জায়গায় ঢোকার আগেই ভালো
করে দেখে নেওয়া উচিত সেখানে
কোনও বিপদ আছে কি না। তাই ওরা
কিছুক্ষণ বাইরে দাঁড়িয়ে জোরে
জোরে কথা বলল,
তারপরেও
ভেতরে না ঢুকে দরজা জানলা দিয়ে
উঁকি দিয়ে দেখল ভেতরে কী আছে।
কিছুই নেই দেখে সাবধানে,
পায়ে
পায়ে ভেতরে ঢুকল। বুনু বলল,
“আগে
দেখে নে,
মাটিতে
কী আছে। সেদিন একটা সিনেমায়
দেখলাম একটা লোক একটা ঘরে
ঢুকল,
আর
ঘরের মেঝেটা কাঠের তৈরি,
ভেঙে
ভেতরে ঢুকে গেল।”
না।
মাটিতে কাঠ নেই। বরং মাটি থেকে
গাছপালাও গজাচ্ছে। ভেতরে
কিছুই নেই,
কিন্তু
একটা ভ্যাপসা গন্ধ রয়েছে। কী
রকম পচা পচা গন্ধ। নিজে নিজেই
নাক কুঁচকে যায়,
এমন
গন্ধ। হঠাৎ পুপাই বলল,
“শোন,
মিউমিউ
করছে না কী যেন?”
তাই
তো!
ওরা
মিউমিউ শুনে শুনে ঘরের কোণে
গিয়ে দেখে আরে!
চারটে
খুদে খুদে বেড়ালছানা!
বুনু
বলল,
“এখানে
বেড়ালছানা এল কোত্থেকে?”
টুনু
বলল,
“নিশ্চয়ই
ওই গ্রাম থেকে এসে বাচ্চা
দিয়েছে।”
পুপাই
বলল,
“কিন্তু
মা-বেড়ালটা
কোথায়?”
টুনু
বলল,
“কে
জানে,
মরে
গেছে হয়ত। চল,
এগুলোকে
নিয়ে যাই?”
বুনু
বলল,
“নিয়ে
যাবি?
যদি
মা বেড়ালটা এসে খোঁজে?”
টুনু
ঝুঁকে পড়ে একটা বেড়ালছানা
তুলে নিয়ে বলল,
“কিচ্ছু
হবে না। আমরা পুষব। দেখ না,
আমরা
চারজন,
তাই
চারটে ছানা। চট করে চল,
পালিয়ে
যাই...”
পুপাই
ততক্ষণে ওর ব্যাকপ্যাক নামিয়ে
টুক করে একটা বেড়ালছানা ভরে
নিয়েছে। বুনুও আর দেরি করল
না। টুপটাপ বাকি দুটো বেড়ালছানা
কোলে তুলে নিল। তারপরে তিনজনে
থেকে বেরিয়ে পড়ল।
পুপাই
দৌড় দিয়েছে আগে আগে। একটু গিয়ে
বুনু থেমে বলল,
“টুনুদি,
একটু
দাঁড়া। ছানাগুলো কেমন ছটফট
করছে। ধরে রাখতে পারছি না।
ব্যাগে ভরে নিই।”
তিনজনে
দাঁড়াল। টুনু বলল,
“সে-ই
ভালো। রাস্তায় আবার গ্রামের
লোকেদের সঙ্গে দেখা হতে পারে,
ওরা
যদি জানতে পারে ওদের গ্রামের
বেড়ালছানা আমরা নিয়ে যাচ্ছি...”
টুনু
আর বুনু ওদের ব্যাকপ্যাকে
বেড়ালছানাগুলো ভরে আবার চলতে
শুরু করল। রাস্তা পাহাড়ের
ঢাল দিয়ে নেমেছে। এখনও দুপুর,
আকাশ
রোদ্দুরে ঝকঝক করছে। দেখতে
দেখতে বাড়ির পেছনে পৌঁছে গেল
ওরা। এখন সবাই বিশ্রাম করছে।
রান্নাঘরের পেছনে জগন বা ওর
মা নেই। ওরা চলে গেছে অনেকক্ষণ।
ঘরের জানলা দিয়ে দেখা গেল
বুটুদা খাটে উপুড় হয়ে শুয়ে
ঘুমিয়ে পড়েছে। বেচারার কিছু
করার থাকে না,
তাই
দুপুরে ঘুমিয়ে পড়ে।
টুনুদি
বলল,
“কয়লার
ঘরটায় চল। ওখানে এখন কেউ যায়
না।”
আগেকার
দিনের বাড়ি,
একসময়
কয়লার উনুন ছিল। এখন আর নেই,
কিন্তু
বাড়ির পেছনে ঘরটা রয়ে গেছে।
সেখানে অপ্রয়োজনীয় জিনিস
রাখা থাকে। পুরোনো ভাঙা আসবাব,
রান্নাঘরের
হাঁড়ি-কড়াই,
বাগানের
সরঞ্জাম – এ সবে ভর্তি। এগুলো
কোনওটাই ওদের না। ওদের আগে
যারা এ বাড়িতে থাকত,
তাদেরই
জিনিসপত্র। একটা কোণে অনেকগুলো
পুরোনো বস্তা ছিল,
টুনুদি
সেগুলোর একটা নিয়ে একটা ফাঁকা
জায়গা দেখে পাতল। বুনু ওর
ব্যাকপ্যাক খুলে রেখে বলল,
“আমার
ব্যাগেরগুলো বের করে নে,
টুনুদি,
আমি
চট করে দুধ নিয়ে আসি রান্নাঘর
থেকে।”
টুনু
বলল,
“শোন,
অল্প
জল দিস। একটু। গরুর দুধ তো,
বেড়াল
হয়ত একটু পাতলা খাবে। আর শোন,
পুরোনো
শাড়ির পাড় আছে?
আছে?
নিয়ে
আসিস। ভিজিয়ে মুখে দিলে চুষতে
পারবে।”
পুপাই
বলল,
“দেখিস,
সাবধানে।
জেঠিমা জানতে পারে না যেন।”
চারটে
বাচ্চাই বেরিয়ে সাংঘাতিক
ছটফট করতে লেগেছে। টুনু বলল,
“ইশ,
বেচারা,
খিদে
পেয়েছে ওদের। কতক্ষণ ওদের মা
নেই কে জানে। কোথায় গিয়ে মরে
পড়ে আছে।”
দেখতে
দেখতে ফিরে এল বুনু। হাতে একটা
বাটি। দুধ ভর্তি। বলল,
“একটু
বেশি করেই নিয়ে এলাম। বার বার
তো রান্নাঘরে ঢোকা যাবে না...”
একটা
শাড়ির পাড়ও নিয়ে এসেছে বুনু।
টুনু দরজার পাশে ঘষে ঘষে তা
থেকে চারটে টুকরো ছিঁড়ে নিল।
তারপরে দুধে ভিজিয়ে বেড়ালছানার
মুখে ধরতেই ওরা চোঁ চোঁ করে
টানতে শুরু করল। অনেকক্ষণ
ধরে খেল বাচ্চাগুলো। তারপরে
টুনুদি বলল,
“অ্যাই,
থাম।
এরা একেবারে বাচ্চা,
কতটা
খেতে হয় জানে না। থাম,
নইলে
ওদের পেট খারাপ করবে।”
বাচ্চাগুলো
পেট ফুলিয়ে খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে।
ওরা সাবধানে আস্তে আস্তে
কয়লাঘর থেকে বেরিয়ে দরজাটা
বাইরে থেকে বন্ধ করে বাড়ি ফিরে
এল।
বুটুদার
ঘুম ভেঙেছে। ও টেবিলে বসেছিল।
পুপাই ছুটে গিয়ে ফিসফিস করে
বলল,
“বুটুদা,
বেড়ালছানা
এনেছি। চারটে!
জঙ্গলে
ছিল। একটা ভাঙা বাড়িতে। তোমার
একটা...”
বুটু
অবাক হয়ে বলল,
“জঙ্গলে
বেড়ালছানা কী করছিল?
বাঘের
বাচ্চা না তো?”
টুনু
বলল,
“ধ্যাত,
জঙ্গলে
বাঘই নেই,
তার
আবার বাচ্চা!
আর
বাঘের বাচ্চার গায়ে তো ডোরাকাটা
থাকবে। এগুলো ছাই-ছাই
রঙের। হালকা বুটি বুটি আছে।”
বুটুদা
বলল,
“নিয়ে
আয়,
দেখি।”
টুনু
বলল,
“মা
বেড়াল দেখলে কুরুক্ষেত্র
করবে। বাড়িতে আনা যাবে না।
কয়লার ঘরে রেখেছি। যাবি?”
বুটু
হাত বারিয়ে ক্রাচদুটো নিতে
নিতে বলল,
“চল
ওই ঘরটাতে অবশ্য যাওয়া মুশকিল।
তবু চেষ্টা করি।”
ওরা
সবাই ঘর থেকে বেরোল,
কিন্তু
যাওয়া হলো না। একেবারে মা আর
জেঠিমার মুখোমুখি। মা বলল,
“ওই,
তোরা
ফিরে এসেছিস?
ভালো।
হাত মুখ ধুয়ে নে। আমি আর জেঠিমা
পাকোড়া ভাজছি। বাবা আর জ্যেঠু
ফিরলেই বারান্দায় জলখাবার।”
ওরা
আর কী করে,
ভালো
ছেলেমেয়ের মতো হাতমুখ ধুয়ে
চুপ করে বারান্দায় গিয়ে বসে
রইল। একটু পরে বাবা আর জ্যেঠু
এল। এমনিতে সবাই মিলে বসে খেতে
ওদের খুব ভালো লাগে। বাবা আর
জ্যেঠু একসঙ্গে হলে অনেক মজা
হয়। আজও হচ্ছিল,
কিন্তু
ওদের মন পড়ে ছিল কয়লাঘরে। কে
জানে বাচ্চাগুলো কী করছে।
শেষে
বুটুদা বলল,
“আমি
একটু বাগানে ঘুরে আসি। আমি
সকাল থেকে ঘর থেকে বেরোইনি।”
সবাই
বলল,
“হ্যাঁ,
হ্যাঁ।
যা যা। হেঁটে আয়।”
সঙ্গে
সঙ্গে পুপাইও লাফ মেরে বলল,
“আমিও
যাব।” আর টুনু আর বুনুও উঠে
দাঁড়াল।
বারান্দা
থেকে সাবধানে চারটে সিঁড়ি
নেমে বুটু বাগানে গেল। সঙ্গে
ওরা সবাই। বাগানটা পুরোটা
হেঁটে পেছনের দিকে গিয়ে বুটু
দাঁড়াল কয়লার ঘরের দরজার
সামনে। ওখান থেকে কয়লার ঘরটা
বেশ অনেকটাই উঁচুতে। বুটু
বলল,
“দেখলি,
ওই
অতটা আমি ক্রাচ নিয়ে উঠতে পারব
না। তোরা গিয়ে বেড়ালছানাগুলো
নিয়ে এসে আমাকে দেখা।”
ওরা
তাই করল। বুটু ছানাগুলো দেখে
বলল,
“ও
বাবা,
এক্কেবারে
ছোটো তো,
এখনও
চোখ ফোটেনি। কিন্তু বেড়াল
বোধহয় না রে। বেড়ালের বাচ্চা
তো আমাদের পাশের গলিতে হয়েছিল।
মনে আছে,
টুনু,
এই
সাইজের বেড়ালছানার চোখ ফুটে
যায়।”
টুনু
বলল,
“তবে
কিসের বাচ্চা?
বাঘ
তো না,
তাই
না?”
বুটু
বলল,
“না,
বাঘ
তো না-ই।
তবে বেড়াল না। বাবাকে জিজ্ঞেস
করব। মা যখন থাকবে না। বাবা
বলতে পারবে।”
বুনু
আর পুপাই বলল,
“জ্যেঠু
যদি রাগ করে?”
বুটু
বলল,
“তাহলেও
তো জিজ্ঞেস করতেই হবে,
তাই
না?
নইলে
চারটে বেড়ালের মধ্যে দুটো
টুনু আর আমি কী করে নিয়ে যাব?”
তা-ও
তো বটে।
বুনু
আর টুনু আবার বাচ্চাদের একটু
করে দুধ খাইয়ে দিল। তারপরে
আবার ঘরে বন্ধ করে বেরোতে
যাবে,
বাইরের
রাস্তায় গাড়ির শব্দ। পুপাই
উঁকি দিয়ে দেখে ফিরে এসে বলল,
“ওই
মিঃ সিং। ফরেস্ট অফিসার।
এসেছেন।”
বুটু
বলল,
“চল,
আমরাও
যাই। মিঃ সিং চলে গেলেই বাবাকে
বলব।”
ওরা
বারান্দার নিচে এসে পৌঁছন
মাত্র মিঃ সিং ডেকে বললেন,
“এই
যে,
আমি
তোমাদের সঙ্গেই কথা বলতে
এসেছিলাম। এসো,
এসো।”
ওরা
আবার আস্তে আস্তে বারান্দায়
উঠল। বুটুর ক্রাচ নিয়ে সিঁড়ি
চড়তে আর নামতে দুটোতেই সময়
লাগে। এর মধ্যে মা চা ঢেলে
দিয়েছে মিঃ সিং-কে।
উনি চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে
বললেন,
“শোনো,
তোমরা
এখন থেকে আর জঙ্গলে ঘুরতে যেও
না,
কেমন?”
ওরা
খুব অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করতে
যাবে কেন,
মিঃ
সিং নিজেই বললেন,
“কাল
রাতে ওদিকের একজন গ্রামবাসী
এখানে একটা লেপার্ড দেখেছে।
এদিকে লেপার্ড ছিল না। হয়ত
জঙ্গল থেকে অন্য লেপার্ডের
বা বাঘের তাড়া খেয়ে ওদিক থেকে
এসেছে। মাদী লেপার্ড। বাচ্চা
দিয়েছে চারটে।”
টুনু,
বুনু,
বুটু
আর পুপাই মুখ তাকাতাকি করল।
ফিসফিস করে বুনু বলল,
“চারটে?”
মিঃ
সিং চা শেষ করে কাপটা নামিয়ে
রেখে বললেন,
“লেপার্ডের
চারটে বাচ্চা হতেই পারে। আমার
কাছে খবর কালই এসেছিল,
কিন্তু
আমি কাল রাতে এই রেঞ্জে ছিলাম
না। ওরা রেডিওতে আমাকে খবর
দিয়েছে। আমি সকালেই রওয়ানা
দিয়ে একটু আগে অফিসে এসেছি।
সব গ্রামে গ্রামে সাবধান করা
শুরু হয়েছে। এই বাড়ির পেছনের
জঙ্গলে একটা পুরোনো ফরেস্ট
গার্ড রুম আছে। ওটা আর ব্যবহার
হয় না। ওরই মধ্যে বাচ্চা দিয়েছে।
মা লেপার্ড বাচ্চা থাকলে খুব
ডেনজারাস জীব। তোমরা আর গ্রামের
বাইরে যেও না। অবশ্য লেপার্ড
বেশিদিন বাচ্চা নিয়ে এক জায়গায়
থাকে না। আমরা নজর রাখব। যেই
চলে যাবে আবার জানিয়ে দেব।”
বুনুর
মুখটা কাঁদো কাঁদো হয়ে গেছে।
মা বলল,
“আরে,
কাঁদিস
কেন?
জঙ্গলে
না গেলে হবে না?
এই
গ্রামেই তো কত বাচ্চা আছে...”
বুনু
মাথা নেড়ে কান্নাভরা গলায়
বলল,
“না,
তা
নয়।”
বাবা
বলল,
“তবে?”
বুনু
বলল,
“আমরা
বাচ্চাগুলো নিয়ে এসেছি...”
মিঃ
সিং সবে হাতে প্লেট নিয়ে একটা
পাকোড়ায় কামড় দিয়েছিলেন।
ডানহাতে সে আধ-কামড়ান
পাকোড়া রয়েই গেল। আর অসাড় বাঁ
হাতে ধরা প্লেট কাত হয়ে বাকি
সব পাকোড়া মাটিতে পড়ে গেল।
বাচ্চাগুলোকে
বস্তার ওপর জিপের ভেতরে শুইয়ে
মিঃ সিং বললেন,
“লেপার্ডেরই
বাচ্চা। সবে জন্মেছে কয়েক
দিন হলো। সদ্য জন্মানো লেপার্ডের
বাচ্চার গায়ের রং এরকম ছাই
ছাই-ই
থাকে। আর সেজন্য কালো ছোপগুলো
ভালো বোঝা যায় না।”
টুনু
বলল,
“আমরা
গ্রামে গেছিলাম,
কই
গ্রামের কেউ আমাদের বলেইনি
লেপার্ডের কথা।”
মিঃ
সিং হেসে বললেন,
“আরে
তোমরা নিশ্চয়ই এই পেছনের
রাস্তাটা দিয়ে যে গ্রামটা,
সেটাতে
গেছিলে। এটা অন্য একটা গ্রাম।
তোমরা যে পোড়ো ঘরটায় বাচ্চাগুলো
দেখেছ,
তারও
আরও কিছু দূরে একটা ছোটো বসতি
আছে। জনা বারো থাকে। ওই গ্রামের
লোকে দেখেছে।”
মা
একটু শিউরে উঠে বলল,
“এইটুকু
বাচ্চা রেখে মা লেপার্ডটা
কোথায় চলে গেছিল!
ভাগ্যিস
এরা যখন গিয়েছিল তখন ছিল না!”
মিঃ
সং বললেন,
“লেপার্ড
বা বাঘ এইটুকু বাচ্চা রেখে
দূরে যায় না। শিকার করে না।
তবে জল খেতে গিয়েছিল হয়ত।
সত্যিই তোমাদের কপাল ভালো।”
বলে ড্রাইভার আর সঙ্গের ফরেস্ট
গার্ডদের বললেন,
“চলো,
আমরা
একেবারে অন্ধকার হয়ে যাবার
আগে ঘরটাতে বাচ্চাগুলো রেখে
আসি। নাহলে বাচ্চা না পেয়ে
যদি মা-টা
এখান থেকে চলে যায়,
এইটুকু
বাচ্চা বাঁচিয়ে রাখা মুশকিল
হবে।”
মিঃ
সিং চলে যাবার পরে বাবা বলল,
“জঙ্গলে
কোনও প্রাণীর বাচ্চা দেখলেই
তাদের পোষার জন্য বাড়ি আনতে
নেই। লেপার্ড আমাদের দেশে
সংরক্ষিত প্রাণী। মানে ওদের
কোনও রকম ক্ষতি করা বারণ।
সুতরাং মিঃ সিং তোমাদের ধরে
নিয়ে যেতেই পারেন। যাবেন না,
উনি
জানেন তোমরা খারাপ কিছু করতে
চাওনি। কিন্তু মনে রেখো – এর
পরে কোনও দিন,
জঙ্গলে
গিয়ে কোনও প্রাণীরই কোনও
কিছুতে হাত দেবে না।”
মা
বলল,
“আর
কী ভয়ানক বিপদের মুখে ছিলে
বুঝতে পারছ?
ওই
ঘরের মধ্যে তোমরা যখন বাচ্চাগুলোকে
নিয়ে বেরোচ্ছ,
তখন
যদি লেপার্ডটা ফিরে আসত,
বা
যদি তখন ঘরেই থাকত,
তাহলে
তোমাদের আক্রমণ করত ঠিক।”
ওরা
বলল,
“এ
জঙ্গলে তো লেপার্ড টেপার্ড
থাকারই কথা নয়।”
জ্যেঠু
মাথা নেড়ে বলল,
“কথাটা
ঠিক। তবে সাবধানের মার নেই।
এর পরে জঙ্গলে গেলে,
জঙ্গলের
লোক সঙ্গে না থাকলে রাস্তা
ছেড়ে কোথাও যেওই না। মনে রেখো।”
রাত্তিরে
চারজনেই অনেকক্ষণ ছটফট করে
দেরি করে ঘুমোল। পরদিন যখন
ঘুম ভেঙেছে,
তখন
দেরি হয়ে গেছে। আকাশে সূর্য
অনেকটাই ওপরে। মা উঁকি দিয়ে
বলল,
“উঠলি?
মিঃ
সিং এসেছিলেন। কাল অনেক রাতে
মা লেপার্ড এসে বাচ্চাদের
নিয়ে জঙ্গলের মধ্যে চলে গেছে।
তবু মিঃ সিং বলে গেছেন,
যে
এখন কিছুদিন জঙ্গলের মধ্যে
এধার-ওধার
ঘোরাফেরা না করাই ভালো,
কেমন?”
