Saturday, June 13, 2020

লাল শেয়াল


~এক~
লাল শেয়ালটার যখন ঘুম ভাঙল, তখন দিন শেষ হতে আর বেশি দেরি নেই। জঙ্গলে যেখানটায় ও ঘুমোচ্ছিল, সেখানটা ছায়া-ছায়া, অন্ধকার হয়ে এসেছে। গাছপালার আড়ালে পশ্চিমের আকাশে আলো, কিন্তু পুবের আকাশটা কালচে। সূর্য ডুবতে চলেছে।
গর্ত থেকে বেরিয়ে এল শেয়ালটা। গা ঝাড়া দিল একবার – গায়ে লেগে থাকা শুকনো মাটি আর ধুলো ঝরে পড়ল। খিদে পেয়েছে। শিকার ধরতে হবে। শেয়াল শিকারী প্রাণী। ছোটো পাখি, ছোটো প্রাণী ধরে খায়। ফলও খায়। আর খায় মানুষের ফেলে দেওয়া খাবার। জঙ্গলে শীতকালে শিকার করা কঠিন। যারা মানুষের কাছাকাছি থাকে, তাদের পক্ষে মানুষের ফেলে দেওয়া খাবার পাওয়া সহজ। আজকাল শীতকালে কিছু মানুষ ওদের জন্য খাবারের ব্যবস্থাও করে। জঙ্গলের ধারে, মানুষের চলার পথের পাশে পাশে, কিছু দূরে দূরে ওরা শীতকালে মাংস, রুটি, ভাত, এসব রেখে যায় কেউ কেউ।
এখন আর শীত নেই। কিন্তু গরমও পড়েনি। শীতের দেশে শীত কমলেই গরম আসে না। প্রথমে বরফ কমে, তারপরে মাটি থেকে মাথা তোলে সবুজ চারা। গাছে গাছে নতুন পাতা আসে। ন্যাড়া জঙ্গলে আবার শোনা যায় পাখির ডাক। আস্তে আস্তে সবুজ বাড়ে, কমে আসে সাদা। গ্রীষ্ম আসে পায়ে পায়ে।
এখনও অবশ্য সবুজের দেখা নেই কোথাও। বরফ কমলেও এখানে ওখানে চাপড়া চাপড়া সাদা। বরফের শেষটুকু। মাঝে মাঝে নিঃশব্দ জঙ্গলের মধ্যে থপ্‌ করে গাছের ডাল থেকে খসে পড়ছে বরফের তাল। তবে আর ক’দিনের মধ্যে এ-ও থাকবে না।
পায়ে পায়ে শেয়ালটা বেরিয়ে এল জঙ্গলের বাইরে। সামনে, ঝোপঝাড়ের আড়ালে মানুষের রাস্তা। কালো, চওড়া। ওখান দিয়ে সারা দিন, সারা রাত বড়ো বড়ো গাড়ি যায়। ওগুলো বিপজ্জনক। একবার সামনে পড়লে রক্ষা নেই। শেয়ালরা বুদ্ধিমান প্রাণী। ওরা জানে কী করে ওই গাড়িগুলো এড়িয়ে রাস্তা পার হতে হয়। কিন্তু যারা জানে না, তারা প্রায়ই বাঁচতে পারে না। আস্তে আস্তে এসে শেয়ালটা রাস্তার ধারের ঝোপের আড়াল থেকে উঁকি দিল। এখন একটাও গাড়ি নেই। দিনের শেষে গাড়ি চলে কম। এই জায়গাটা ভালো। শীতকালে মানুষ এখানে প্রায়ই খাবার রেখে যায় যাতে বন্যপ্রাণীদের কষ্ট কমে। এখানে প্রায়ই কিছু না কিছু পাওয়া যায়। আজও নিশ্চয়ই কিছু আছে?
নেই। অন্যদিন রোজই এখানে কিছু খাবার, কিছু প্রাণীর ভীড় থাকে। আজ কেউ নেই। কিছু নেই। শেষ হয়ে গেছে বোধহয়। আশেপাশে গাছের ডালে কয়েকটা কাক বসে আছে, ওরাও আসে খাবার খেতে ভীড় করে। ওদের সঙ্গে ঝগড়া করে খেতে হয়। আজ খাবার নেই বলে ওরা গাছেই বসে আছে। শেয়ালকে দেখে সবাই একসঙ্গে কা-কা করে চিৎকার করে উঠল। শেয়াল পাত্তা দিল না। অত পাত্তা দিতে নেই। সবাইকে পাত্তা দিলে চলে না। তবে এখানে আর অপেক্ষা করেও লাভ নেই। শেয়াল জানে রাস্তার ধারে আর কোথায় কোথায় মানুষ ওদের জন্য শীতের খাবার রেখে যায়। রাস্তা ধরে গেলেই পাওয়া যাবে। কিন্তু কোন দিকে যাবে? শহরের দিকে, না উলটো দিকে? খানিক ভেবে শহরের দিকে যাওয়াই ঠিক করল শেয়াল। মানুষের কাছ থেকে খাবার নিতে গেলে, মানুষের কাছে যাওয়াই ভালো।

~দুই~
শেয়ালটা অনেকটা হাঁটল রাস্তার পাশে পাশে। শহরের খুব কাছে এসে গেছে। একটু দাঁড়াল। দিনের আলো একেবারে নিভে না গেলে, রাস্তাঘাটে মানুষের চলাফেরা একেবারে বন্ধ না হলে ও কখনও মানুষের শহরে যায় না। একবার আকাশের দিকে মুখ তুলে তাকাল দেখার জন্য কতটা অন্ধকার হয়েছে।
হয়েছে অন্ধকার, কিন্তু এত কম অন্ধকারে মানুষ ঘুমোয় না। এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখল রাস্তার ধার ঘেঁষে শুয়ে আছে একদল হরিণ। ওরা দিনের প্রাণী। ওরা এখন শোবার জোগাড় করছে। রাতে মানুষের চলাফেরা কমে যায় বলে ওরা বেরিয়ে আসে রাস্তায়, ওখানে ঘুমোয় আরামে।
শেয়াল কাছে আসায় হরিণগুলো ছটফট করে উঠছে। যদিও শেয়াল সাধারণত হরিণ শিকার করে না, তবু, ও তো শিকারী প্রাণী। ওর শরীরের গন্ধে শিকারীর পরিচয়। শেয়াল ওদের থেকে দূরে সরে গেল। মিছিমিছি ভয় দেখিয়ে লাভ নেই।
আর একটু হাঁটলেই শহরের পৌঁছে যাবে। দাঁড়াল শেয়াল। এতটা রাস্তা এল, একটুও খাবার নেই কোথাও। বসন্তের শুরু থেকেই মানুষ ওদের জন্য খাবার দেওয়া কমিয়ে দেয়। এবারও তাই হয়েছে।
পায়ে পায়ে এগোল আবার শহরের দিকেই। বুঝতে পেরেছে খাবার পেতে হলে মানুষের কাছেই যেতে হবে। ওরা বাড়ির বাইরে বড়ো বড়ো বাক্সে বা ড্রামে খাবার দাবার ফেলে দেয়। ওখানে খুঁজলে সব সময়েই পেট ভরার মতো কিছু না কিছু পাওয়া যায়। মাছ-মাংস, ফেলে দেওয়া ভাত, ফলমূল...

~তিন~
শহরের বাইরের দিকে, একটা বাড়ির থেকে একটু দূরে একটা ঝোপের আড়ালে লাল শেয়ালটা লুকিয়ে বসে রইল। আরও রাত হলে মানুষের বাড়ির বাগানে ঢুকবে। ও জানে মানুষের বাড়িতে কোথায় ওরা না-খাওয়া খাবার ফেলে দেয়। কিন্তু বাড়িতে এখনও আলো জ্বলছে। এখন বাইরে অন্ধকার হলেও আর কাছে যাওয়া উচিত হবে না।
লোকটাকে বাজার থেকে ফিরতে দেখল। দু হাতে অনেকগুলো বাজারের থলে। বাড়ির দরজা খুলে লোকটার ছেলে বেরিয়ে এল। বাবার হাত থেকে থলে নিল কয়েকটা। এবার ওরা রান্না করবে। তারপরে খাবে। তারপরে বাইরে এসে খাবার ফেলবে। মানুষ অনেক খাবার নষ্ট করে। তাতে অবশ্য ওরই ভালো।
কাচের জানলার দিয়ে দেখা যাচ্ছে বাড়ির ভেতরে লোকটা ওর ছেলে আর বউয়ের সঙ্গে কথা বলল। তার পরে ছেলেটা আবার দরজা খুলে দিল। দরজা দিয়ে বেরিয়ে এল একটা কুকুর, সঙ্গে পাঁচটা ছোটো ছোটো বাচ্চা।
বাড়িতে কুকুর থাকা শেয়ালের পক্ষে ভালো না। তবে বাচ্চা থাকলে কুকুররা অন্য কোনও দিকে নজর দেয় না।
ওখানেই বসে রইল শেয়ালটা – একে একে আশেপাশের সব বাড়িগুলোয় আলো নিভতে শুরু করল। ওই বাড়িটা থেকে একজন বেরিয়ে এসে দরজা খুলে কুকুরটাকে ভেতরে ডাকল – শেয়াল দেখতে পেল না কে। কুকুরটা বাড়িতে ঢুকে গেল, সঙ্গে বাচ্চারা। একই সঙ্গে আর একজন পেছনের দরজা খুলে বেরিয়ে ময়লা ফেলার ড্রামে কী সব ফেলে আবার ঢুকে গেল। ওগুলোই ওর খাবার। শেয়াল লক্ষ করল – আস্তে আস্তে আরও দু-একটা লাল শেয়াল ঝোপঝাড়ের আড়াল থেকে বেরিয়ে এদিকে ওদিকে, এবাড়ি ওবাড়ির বাগানে ঢুকে গেল। ওরাও কখন চুপি চুপি এসেছে ও দেখতে পায়নি। লাল শেয়ালরা দল বেঁধে থাকে না, একা থাকে, একা শিকার করে। ও-ও ঝোপের আড়াল থেকে বেরিয়ে বাগানের বেড়ার একটা ফাঁক দিয়ে গলে ঢুকে পড়ল। পেট এখন খিদেয় চোঁ-চোঁ করছে।
ময়লা ফেলার বড়ো ড্রামটা অনেকটাই উঁচু। পেছনের দু-পায়ে দাঁড়িয়ে সামনের দুটো পা শেয়াল ড্রামের ওপরে রাখল। মাথা বাড়িয়ে দেখল, ভেতরে ময়লা যা আছে, অনেকটাই নিচে। দাঁড়িয়েও নাগাল পাবে না। দুটো উপায় আছে। এক লাফিয়ে ড্রামের মধ্যে নামা, অথবা ড্রামটাকে সামনের দু-পা দিয়ে টেনে ফেলে দেওয়া। লাফিয়ে ভেতরে নামলে যদি ভেতর থেকে কেউ বেরিয়ে আসে, চট করে আবার লাফিয়ে বেরোন মুশকিল হতে পারে। ওদিকে ড্রামটা ফেলে দিলে শব্দ হতে পারে। সে শুনে ভেতরে যারা আছে...
এদিক ওদিক দেখে শেয়াল বুঝল, ড্রামটা যেখানে আছে, সেখানে মাটিতে ড্রাম উলটে পড়লেও শব্দ হবে না। কুকুরটা হয়ত শুনতে পাবে, কিন্তু শেয়াল জানে, মা-কুকুরের নজর থাকবে কেবল তার বাচ্চাদের দিকেই। তাই পেছনের পা-দুটো একটু পেছিয়ে নিয়ে সামনের পা-দুটো দিয়ে ড্রামের ওপরটা ধরে মারল টান।
একবারে হলো না। বার কয়েক টানার পরে ড্রামটা কাত হয়ে পড়ে গেল, আর ভেতরের সব ময়লা বেরিয়ে এল বাইরের দিকে।
এবারে আর ড্রামের ভেতরে ঢুকে খাবার খুঁজতে অসুবিধে হলো না।
অনেক কিছুই আছে। মাছ, মাংস তো আছেই, বিশেষত বেশ কিছু হাড়, সেগুলো মন দিয়ে চিবিয়ে খাওয়া যাবে খাওয়া শেষ করেও। কিছু ভাত, পাউরুটি, আর কয়েকটা আপেলের মাঝখানটা। পেটটা বেশ ভরেই গেল শেয়ালের। হাড়গুলো চিবিয়ে চিবিয়ে যতটা গিলে ফেলা যায় গিলে নিল, বাকিটা চিবিয়ে টুকরো টুকরো করে ফেলল। তারপরে কিছুক্ষণ ময়লার ড্রামের মধ্যেই নাক দিয়ে ঠেলে ঠেলে খুঁজল। নাঃ, খাবার মতো আর কিছুই নেই। এখন প্রশ্ন, এই যা খেয়েছে তা খেয়েই জঙ্গলে ফিরবে, না কি এখান থেকে বেরিয়ে অন্য বাগানে খাবার খুঁজবে? এখন ফিরলে ভোর বেলা আবার খিদে পাবে। আবার খাবার খুঁজতে বেরোতে হবে।
পিছিয়ে ড্রাম থেকে বেরিয়ে এসে ঘুরতেই থমকে দাঁড়াল শেয়াল। একি! কুকুরের একটা বাচ্চা এখানে কেন? ওর কাছে এসে নাক দিয়ে ওর পায়ে ঠেলছে। এক মুহূর্তে ব্যাপারটা বুঝে গেল শেয়াল। কুকুরটা বেরিয়ে এসেছিল ওর সবকটা বাচ্চা নিয়েই। ভেতরে যাবার সময় একজনকে না নিয়েই চলে গেছে। কুকুররা খুব বোকা হয়। গুনতে জানে না। একটা বাচ্চাকে ফেলে রেখে গেছে, সে নিশ্চয়ই টেরই পায়নি।
ছানাটার খিদে পেয়েছে। আস্তে আস্তে কুঁই কুঁই করছে, আর নাক দিয়ে শেয়ালকে ঠেলছে। ভাবছে ওর কাছে দুধ পাওয়া যাবে। শেয়ালের দুধ নেই। ও মা-শেয়াল না। সেটা বুঝছে না।
কুকুরছানাটার ছোট্ট দেহটা দেখে শেয়ালের জিভে জল এল। এই সুযোগে ছানাটাকে মুখে নিয়ে বাগানের বেড়ার ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে গেলে কাল ভোরে ওকে আর খাবার খুঁজতে হবে না। এদিক ওদিক দেখল শেয়াল। কেউ কোত্থাও নেই। এরই মধ্যে ছানাটা ওর পেটের নিচে গিয়ে পেছনের দু-পায়ে দাঁড়িয়ে উঠে দুধ খুঁজছে। এখনই নিয়ে পালাতে হবে...
দু-পা পিছিয়ে গিয়ে মুখ নিচু করে বাচ্চাটাকে কামড়ে ধরতে গেছে, হঠাৎ একটা নিচুস্বরে গর্জন শুনে মুখ তুলে তাকাল শেয়াল। বাগানের বেড়ার ফাঁক দিয়ে ঢুকে এসেছে জঙ্গলের বুড়ো শেয়ালটা। ওর-ও নজর কুকুরছানাটার দিকেই। গর্জন করে শেয়ালকে বলতে চাইছে ও যেন বাচ্চাটাকে ছেড়ে সরে যায়। শিকার দেখেছে বুড়ো।
লাল শেয়ালটাও ঘাড় নিচু করে ঘাড়ের লোমগুলো ফুলিয়ে নিল। এরকম করলে ওদের শরীরটা বড়ো দেখায়। দাঁত বের করে চাপাস্বরে গর্জে উঠল। লাল শেয়ালের বয়স কম। বুড়োটার চেয়ে অনেক বড়ো। গায়ের জোরও বেশি। বুড়োটা বুঝল লড়াই হলে পেরে উঠবে না। তাই কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে পিছু হটল। বেরিয়ে চলে গেল বাগান থেকে অন্য কোথাও খাবার খুঁজতে।
ছানাটা এসব কিছুই বোঝেনি। একেবারেই ছোটো তো, তায় মানুষের বাড়িতে থাকে – তাই বিপদ কাকে বলে ও জানেই না। কোনও দিন শেখেইনি। শেয়ালটা কিছুক্ষণ ওর দিকে তাকিয়ে রইল। তারপরে ঘাড় ধরে তুলে নিল। একটা বুড়ো শেয়াল গেছে মানেই বিপদ গেছে – এমন নয়। আরও অনেক শেয়াল আছে, আছে বেজি। রাতের আকাশে নিঃশব্দে উড়ে বেড়ায় পেঁচা। তারা লুকিয়ে চলে, লুকিয়ে ওড়ে। যখন ওরা শিকার ধরে, তখন শিকার টেরও পায় না কে এসে ধরল কোথা থেকে। এরা কেউ দেখতে পেলেই কুকুরছানার আর রক্ষে নেই।

~চার~
রাত থাকতেই ঘুম ভেঙে গেল শেয়ালটার। কিন্তু নড়তে পারল না। বাগানের যেখানে বেড়াটা ফাঁক হয়ে রয়েছে, সেখানেই শুয়েছিল, যাতে কোনও বিপদ হলে চট করে পালাতে পারে। বাচ্চাটা খিদের জ্বালায় অনেকক্ষণ ধরে কেঁদে কেঁদে শেষে ওর পেটে পিঠ ঠেকিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে, এখনও ওঠেনি। ওকে ফেলে যেতে পারছে না শেয়ালটা। একবার ভাবছে উঠে চলে যায়, ভোর হতে আর দেরি নেই, আর একবার ভাবছে আর একটু থাকি। উঠুক ঘুম থেকে।
শেষে যখন ভাবছে, এখনই যদি না যাই, তাহলে দেরি হয়ে যাবে, তখনই বাড়ির ভেতরে সব আলোগুলো এক এক করে জ্বলে উঠল। ভেতরে জোরে জোরে কথা বলছে মানুষরা। ওরা বুঝতে পেরেছে একটা কুকুরছানা বাড়িতে নেই। শেয়াল উঠে দাঁড়াল। ওরা বাড়ির ভেতরে খুঁজে ছানাটাকে না পেলে বেরিয়ে আসবে। এইবেলা পালাতে হবে।
কিন্তু যাওয়া হল না, তখনই দরজাটা খুলে গেল, আর বেরিয়েই ছেলেটা দেখতে পেল ওকে।
দেখেই চিৎকার করে উঠল।
শেয়াল শুনতে পেল, ভেতর থেকে বাবাও চিৎকার করে কী বলছে।
এবারে পালাতেই হবে। মানুষের কাছে থাকাই বিপদ। কিন্তু বাচ্চাটা? এক লহমার জন্য চোখ ফিরিয়েই চমকে উঠল শেয়াল। নেই। কোথায় গেল?
বেরিয়ে গেছে। ছোটো ছোটো পায়ে বেড়ার ফাঁকটা দিয়ে এরই মধ্যে বাইরে চলে গেছে কুকুরছানাটা। এক মুহূর্ত অপেক্ষা করল শেয়ালটা। তারপরে ও-ও বেরিয়ে গেল। ওই তো! বেশিদূরে যেতে পারেনি। শেয়াল মুখ নামিয়ে ঘাড় ধরে তুলে নিল বাচ্চাটাকে।
বাড়ি থেকে বাবা বেরিয়ে এসেছে বাগানে। ছেলেও বেরিয়েছে বাবার পেছনে। বাবা সবে দৌড়ে গেটের দিকে গেছে, ছেলে দেখতে পেয়েছে শেয়ালটাকে। বাগানের বেড়ার ফাঁক দিয়ে ঢুকেছে আবার। মুখে কুকুরছানা।
ছেলের ডাক শুনে বাবা ঘুরে দেখে শেয়ালের মুখে কুকুরছানা। দুজনেই থমকে দাঁড়িয়ে গেল। অবাক হয়ে দেখল, পায়ে পায়ে এগিয়ে এসে শেয়াল বাগানের মাঝখানে বাচ্চাটাকে নামিয়ে রাখল।
শেয়াল আবার ফিরে গেল বাগানের বেড়ার কাছে, বেরোবার আগে একবার ফিরে তাকাল। দেখল ছেলেটা এসে বাচ্চাটাকে কোলে তুলে নিয়েছে। বাবাও এগিয়ে এসেছে। ওরা তাকিয়ে আছে ওর দিকেই। একবার ভাবল বেরিয়ে যায়, কিন্তু লোকটাও ওর দিকে এগোচ্ছে না, ছেলেটাও না। কী মনে হল, লাল শেয়ালটা গেল না। দাঁড়িয়ে রইল বেড়ার কাছেই।
ছেলেটা কুকুরছানাটা নিয়ে এক ছুটে বাড়িতে ঢুকে গেল। বাবাও গেল ওর পেছনে পেছনে। এবারে চলে গেলেই হয়। মানুষের কাছে এতক্ষণ থাকার মানেই হয় না। মানুষ জানে কুকুর আর শেয়াল চিরকালের শত্রু। কেন একটা শেয়াল একটা কুকুরছানাকে সারারাত আগলে, বাঁচিয়ে রেখেছে, মেরে ফেলেনি মানুষ তা বুঝতেই পারবে না।
সবে আবার মাথাটা নিচু করে বেরোতে যাবে, একটা ডাক শুনে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল ছেলেটা আবার বেরিয়ে এসেছে। হাতে একটা বাটি। শেয়াল দাঁড়িয়ে গেল আবার। ছেলেটা আস্তে আস্তে এগিয়ে এল বাগানের মাঝখানে। যেখানে শেয়ালটা কুকুরছানাটা নামিয়ে রেখেছিল, সেখানে বাটিটা নামিয়ে রাখল। তারপরে পায়ে পায়ে পিছিয়ে গিয়ে দাঁড়াল বাড়ির দরজায়।
শেয়াল এক পা এগোল। বাটিতে খাবার আছে? কী আছে? কিন্তু আর এগোল না। দরজায় ছেলেটা দাঁড়িয়ে আছে। মানুষের এত কাছে শেয়াল কোনও দিন যাবে না।
ছেলেটাও বুঝল। বাড়িতে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল। শেয়াল দেখল ওরা জানলা দিয়ে দেখছে। জানলা বন্ধ। নিরাপদ কাচের ওপারে ছেলেটা, ওর বাবা, আর মা। মায়ের কোলে কুকুরছানাটা। ভাবল, মানুষগুলোও বোকা। ছানাটা সারা রাত দুধ পায়নি। এখন ওকে মায়ের কাছে দেওয়া উচিত।
কিন্তু সে তো আর মানুষকে ও বলতে যেতে পারবে না – তার চেয়ে বাটিতে কী আছে দেখাই ভালো।
আর একটু এগোতেই গন্ধ পেল। ঠাণ্ডা মাংস-ভাত। আর একটু এগিয়ে গিয়ে আর থাকতে না পেরে বাটিতে মুখ দিয়ে এক মুখ মাংসভাত খেতে শুরু করল।
ঠাণ্ডা। শীতের বরফের মতো ঠাণ্ডা। তবে এরকম ঠাণ্ডা খাবার শীতের দেশের সব প্রাণীই খেতে পারে, তাই ওর অসুবিধে হল না।
ঘরের ভিতর থেকে মানুষরা চেয়ে দেখল শেয়াল ওদের দেওয়া ভাত মাংস খাচ্ছে। এর মধ্যে ছেলেটার মা গিয়ে কুকুরছানাটাকে মা-কুকুরের কাছে নামিয়ে দিয়ে এল।
বাগানে শেয়ালটা মাংস-ভাতটা চেটেপুটে শেষ করল। তারপরে আর অপেক্ষা না করে বেরিয়ে রওয়ানা দিল সোজা জঙ্গলের দিকে। রোদ উঠবার আগেই ওর গর্তে ঢুকে পড়তে হবে। আবার সন্ধের আগে ওকে খাবার চিন্তা করতে হবে না আজকে।

No comments: