Friday, October 28, 2016

ঘরছাড়া

ঘুমভাঙা কুয়াশার ভোরে ভালো করে দেখা যায় না কিছু। জলাজমির ধারে বেজিটা ঘাড় তুলে আকাশের দিকে তাকাল। আকাশে মেঘ? বোঝা যায় না। রোদ উঠলে আর নড়াচড়া করা যাবে না। এই জায়গাটা সুবিধের না। পাশে একটা বাড়ি। মানুষের বাড়ি। তিনতলা। তার জানালা থেকে স্পষ্ট দেখা যায় জলাটা। সেটা পছন্দ নয় ওর। তাই আলো ফুটলে ঘাপটি মেরে থাকে।
জলার শেষে একটা পাঁচিল। পাঁচিলের গায়ে একটা ঝোপ। ঝোপের ভেতরে একটা টুনটুনি পাখি বাসা বেঁধেছে। এখনও ওদের ওড়াউড়ি লেগে আছে। তার মানে ডিম পাড়েনি। পাড়লেই বেজি হানা দেবে। ওইটুকু পাখি ওকে আটকাতে পারবে না। ওরা বোধহয় কোনওদিন বেজি দেখেইনি। তাই গিয়ে ওই পাঁচিলের ধারে বাসা করেছে। পাঁচিল বেয়ে উঠতে পারবে বেজি। ওদের ডিম খাবে প্রথম রাতেই।
জলাটায় খাবারদাবার নেই বিশেষ। তিন দিকে বাড়ি, এক দিকে একটা রাস্তা। এই রাস্তারই ওই পারে ও থাকতো। ওখানে বিরাট জলা ছিল একটা। যখন সে জলায় মাটি ফেলে ফেলে ভরাট করা শুরু হল, তখন এক দিন সন্ধের পর, অনেক রাতে, যখন রাস্তা দিয়ে গাড়ি চলা বন্ধ হয়ে গেছে, তখন অন্ধকারের সুযোগে বেজি এ পারে চলে এসেছিল। এসে অবশ্য দেখেছে যে এই জলাটা ছোট্ট। এখানে বেশি জলও নেই, খাগড়ার বনটা তো একেবারেই খুদে। খানিকটা কচুরিপানা আর নলবন। ব্যাস। রাস্তার এপার থেকে গত কয়েক বছর ধরে দেখেছে কেমন করে মানুষ ওপারে ওর থাকার জায়গাটা ভরাট করে বিরাট বিরাট বাড়ি বানিয়েছে এক এক করে।
বাঁ দিকে যেন কী নড়ল একটা। একটা জলঢোঁড়া। এদিকেই আসছিল, ওর গন্ধ পেয়েছে। সরু সরু দু-ভাগ জিভ দিয়ে বাতাস চেটে বেজির গন্ধ পেয়ে থমকে দাঁড়িয়েছে। এবার ঘুরে পালাবার চেষ্টা করবে।
পালাতে হলো না। এক লাফে ছোটো মাটির ঢিবিটা পেরিয়ে বেজি ঝাঁপিয়ে পড়ল ওর ওপর। গলাটা কামড়ে ধরে খানিকক্ষণ অপেক্ষা। তার পরে আস্তে আস্তে সাপের শরীরটা স্থির হয়ে গেল। টেনে নিয়ে গেল নলবনের মধ্যে। সারাদিনের মতো পেটভরা। নিশ্চিন্ত।
*
বেলা বেড়েছে। সূর্য তখনও মাঝ আকাশে ওঠেনি। হঠাৎ বিকট ঘরঘর শব্দে চমকে ঘুম ভাঙল বেজির। মাটি কেঁপে কেঁপে উঠছে সেই শব্দে। মুখ তুলে দেখল একটা বিরাট গাড়ি এসে দাঁড়িয়েছে জলার ধারে। দেখতে দেখতে তার পেছন দিকটা উঁচু হয়ে উঠল, আর হুড়হুড় করে তাল তাল মাটি এসে পড়তে লাগল জলার মধ্যে।
এই যন্ত্রটা চেনে বেজি। এই গাড়িতে অনেক অনেক মাটি এনে ফেলে ফেলে জলা বুজিয়ে ফেলে মানুষ। তার পরে সেখানেই তৈরি হয় ওদের বাড়ি। যেমন তৈরি হয়েছে রাস্তার ওপারে।
সারা দিন হাঁ করে মাটি ফেলা দেখল বেজি। সেই সঙ্গে ছুটে ছুটে খুঁজে বেড়াল, আর কোথাও কি যাবার জায়গা আছে?
নেই। আগেই দেখে নিয়েছিল, আবারও দেখল – জলাটার তিন দিকে মানুষের বড়ো বড়ো বাড়ি। আর এক দিকে রাস্তাটা – যেটা পেরিয়ে ও এসেছিল কয়েক সপ্তাহ আগেই। ওর থাকার জায়গা ভরে মানুষ ওকে তাড়িয়ে দিয়েছিল বলে।
জলার ধারে এখন একটা দুটো নয়, এক সঙ্গে সারি দিয়ে মাটি ফেলছে চার চারটে গাড়ি। বিরাট বিরাট সেই গাড়ির শব্দে আর ধোঁয়ার গন্ধে টেঁকা দায়।
*
সে দিন রাতে যখন সব নিস্তব্ধ, আধ বোজা জলা ছেড়ে নিরুদ্দেশের পথে বেরিয়ে পড়ল বেজি। রাস্তার পাশ দিয়ে চলে, মুখ তুলে গন্ধ শোঁকে – কোথায় বিপদ, কোথায় কুকুর, কোথায় মানুষ... সেই সঙ্গে খোঁজে, কোথাও কি জলার গন্ধ পাওয়া যায়?
চলতেই থাকে চলতেই থাকে – জলা কোথায়? দু’দিকে কেবল বাড়ি আর বাড়ি। তবু চলে – মনে এই আশা নিয়ে, যে মানুষ নিশ্চই সব জায়গায় থাকবে না? কখনও তার দাপট শেষ হবে – কালো রাস্তার শেষে বেজি দেখতে পাবে জলাজমি...

Saturday, October 08, 2016

পুঙ্কুর লাল গাড়ি

সে দিন ঘুম থেকে উঠেই পুঙ্কুর মনে হল, আজ যেন দিনটা অন্যরকম অন্য দিন ওর ঘুম ভাঙে আরও সকালে, বাবা গান গেয়ে ঘুম ভাঙিয়ে দেয়পুঙ্কুকে রোজ রাতে ঘুমপাড়ানি গান গেয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিয়ে যায় মা, আর সকালে বাবা যে গানগুলো গায়, সেগুলোকে বাবা বলে ‘ঘুমভাঙানি গান’। প্রথম গানটাই হয়, “দেখোরে, নয়ন মেলে জগতের বাহার, দিনের আলোয় কাটে অন্ধকার...”
বাবা খুব ভাল গান গাইতে পারেমাও ভাল গায়, কিন্তু বাবা আরও ভাল। বাবার গান শোনার জন্য রোজ নাকি কাকটা আসে সকালে। পুঙ্কু রোজ চোখ খুলে দেখে জানালার বাইরে কার্নিসের ওপর কাকটা বসে রয়েছে – ঘাড় বাঁকিয়ে ভেতরে দেখার চেষ্টা করছে। প্রথম গানটা শেষ হলে কাকটা রোজ উড়ে চলে যায় কোথায়।
আজ গান হয়নি। বাইরে অনেক আলো। আকাশ ঝকঝক করছে। কাকটা নেই। এতক্ষণে পুঙ্কুর দাঁত মেজে জলখাবার খাওয়া হয়ে যাবার কথা। এতক্ষণে বাবার সঙ্গে বাগান দেখতে বেরিয়ে গেছে। পুঙ্কু ঘর থেকে বেরিয়ে এসে মা বাবার ঘরে উঁকি দিল। কেউ নেই। এখন কারও থাকারও কথা নয়। দেওয়ালে ঘড়ি। পুঙ্কু সময় দেখতে জানে না। তবে দেখে বুঝল এই রকম জায়গায় কাঁটাদুটো থাকলেই মা দিদিকে ডেকে বলে, “স্কুলের সময় হয়েছে, ব্যাগ নিয়ে এস।”
পুঙ্কু নেমে এল সিঁড়ি দিয়েআজ ছুটির দিন, তাই খাবার টেবিলে কেউ নেই। দিদি খাচ্ছে না, মা রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এসে দিদিকে তাগাদা দিচ্ছে না, কাজের মাসি ছটফট করে এদিক ওদিক যাচ্ছে না।
কেউ কোত্থাও নেই!
জানালা দিয়ে পুঙ্কু দেখল বাগান খালি। সেখানেও কেউ নেই। সবাই গেল কোথায়?
দরজা দিয়ে বাইরে যেতেই হঠাৎ চারিদিক থেকে ভীষণ হইচই, বিরাট হুঙ্কার – “সারপ্রাইজ!” বাবা, দিদি আর মা যেন লাফিয়ে সামনে এসে পড়ল, আর পুঙ্কু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে পেছোতে গিয়ে দরজার চৌকাঠে গোড়ালি বেধে গিয়ে থপ করে বসে পড়ল।
ভয় পেয়ে, ঠকে গিয়ে, চমকে গিয়ে, ব্যথা পেয়ে সবে কাঁদতে যাবে, এমন সময় দেখল, আরে! গেটের বাইরে একটা গাড়ি! সেই গাড়িটা, ম্যাগাজিনে যেটার ছবি দেখে বাবাকে বলত, “এই গাড়িটা কেন না, বাবা!” আর বাবা বলত, “দূর, তোর তো কত্তোগুলো গাড়ি আছে!” যেন পুঙ্কুর খেলার গাড়িগুলো নিয়ে ওরা পিকনিক করতে যেতে পারবে জয়তীদের মত!
পুঙ্কু উঠে দাঁড়িয়ে ছুট্টে গিয়ে গাড়িটার গায়ে দু হাত ছড়িয়ে সেঁটে দাঁড়াল। ওর আনন্দ আর ধরে না। ঠিক ছবির মতই লাল রঙের, ঠিক ছবির মতই সুন্দর
মা বলল, “কোথায় রাখবে ঠিক করতে হবে।”
বাবা বলল, “কোথায় আবার রাখব? এখানেই থাকবে, গেটের বাইরে, রাস্তার পাশে, বাগানের পাঁচিল ঘেঁষে।”
মা বলল, “আর হনুমান?”
বাবা বলল, “হনুমান কি আর গাড়ি চড়বে? গাড়ি তো আর বাগানের গাছ নয়!”
পুঙ্কুদের বাড়িতে হনুমানের দৌরাত্ম বড্ড বেশি। প্রায়ই হনুমানের দল এসে বাগানের ফলগাছ, ফুলগাছ তছনছ করে, মা’র সাধের টমেটো, ভিণ্ডি, সীম, পেয়ারা গাছের পেয়ারা, গরমে আম – খায়, ফেলে, চটকে চটকে নষ্ট করে।
মা হেসে বলল, “কী জানি বাপু। পুঙ্কুর বন্ধু, হয়ত পুঙ্কুর মত ওরাও গাড়ি ভালবাসবে!”
হনুমানরা পুঙ্কুর বন্ধু। বাড়িতে হনুমান পড়লে একমাত্র পুঙ্কুই বাইরে বেরোবার সাহস পায়। আর একমাত্র পুঙ্কু বেরোলেই বড় হনুমানগুলো কিছু বলে না। আর কেউ বাড়ি থেকে বেরোলেই তারা বিরাট বিরাট দাঁত বের করে তেড়ে আসে। পুঙ্কুকে দাঁত দেখায় বাচ্চাটা। আর তার পরে ছুটে গিয়ে হনু-মায়ের কোলে মুখ লুকায়। বাবা বলে বাচ্চাটা আর পুঙ্কু একই সাইজ বলে বাচ্চাটা পুঙ্কুকে দেখে ডরায়, আর বড়গুলো ওকে পাত্তাই দেয় না। তা ছাড়া ওরা ওকে দেখে চিনতে পারে নিজেদের একজন বলে। বলে, “দেখ তো, কোমরে লেজটা গজাতে শুরু করেছে কি না?”
পুঙ্কু মাঝে মাঝে ওখানটা হাত বুলিয়ে দেখে নেয়, যখন কেউ দেখছে না।
পুঙ্কুর বাবা বলল, “হনুমানগুলো যদি গাড়িটার ক্ষতি করে, তাহলে তো গ্যারেজ তৈরি করতে হবে। আর তাহলে একমাত্র জায়গা ওই বাড়ির বাঁ দিকের খালি জমিটা। ওখানে তো আবার তোমার লঙ্কা বাগান।”
পুঙ্কুর মা বাবার দিকে কটমট করে তাকাল। লঙ্কা বাগান পুঙ্কুর মায়ের সাধের বাগান। পুঙ্কুর মায়ের বাগানে এত লঙ্কা হয় যে ওদের কেন, সারা পাড়ার কাউকে কোনদিন লঙ্কা কিনতে হয় না বাজার থেকে। বাজারের লঙ্কাওয়ালারা কেউ পুঙ্কুর মাকে পছন্দ করে না।
*
এর পর ক’দিন ওরা সবাই শুধু গাড়ি করে এদিক ওদিক ঘুরল, জামবনে পিকনিক করল, সন্ধেবেলা তিরি নদীর ধারে বেড়িয়ে এল, এমনকি একদিন বাবা দুপুরবেলা ওদের সবাইকে নিয়ে ফারানি গ্রামের বিখ্যাত মেলাও দেখিয়ে আনল
তিনদিন নিরুপদ্রব কাটল। চার দিনের দিন সকালে বাবা গাড়ি ধুতে গিয়ে মহা বিপদে পড়লহনুমানেরা এসেছে। প্রায় চার পাঁচ জন ধাড়ি হনুমান গাড়ির ছাদে, ইঞ্জিনের বনেটে নানা ভঙ্গীতে শুয়ে আছে। আর ছানাটা চতুর্দিকে লাফিয়ে বেড়াচ্ছে, বাইরের আয়নাটা ধরে দোল খাচ্ছে, আর আয়নায় নিজের ছায়া দেখে চমকে চমকে উঠছে। অনেক ভেবেচিন্তে বাবা দোতলার বারান্দা থেকে পাইপে করে পিচকিরির মত জল আকাশে ছিটিয়ে হনুমানদের গায়ে বৃষ্টি নামাল, তবে তারা গেল।
তার পর থেকে হনুমানরা যখনই আসে, গাড়িটা তাদের খেলনা হয়ে যায়! শুধু বাচ্চাটা নয়, ধাড়ি হনুমানগুলোও দরজার হাতল, বাইরের আয়না ধরে টানাটানি, ঝোলাঝুলি করে। দু’দিনেই শিখে গেল যে পুঙ্কুর বাবা দোতলার বারান্দা থেকে পাইপে করে বৃষ্টি বানায় – তাই আর ভয় পায় না, বরং গায়ে জল পড়লে বারান্দায় দাঁড়ান বাবার দিকে দাঁত খিঁচিয়ে তেড়ে যায়। হনুমানরা চলে গেলে বাবা গাড়ির গায়ে আরও একটা নখের দাগ রং চটিয়ে দিয়েছে দেখে মুষড়ে পড়ে, আর বলে, “কি আর করা, হনুমানের পাড়ায় গাড়ি কিনেছি...”
শেষে যে দিন পাঁচিলের ওপর থেকে লাফ মেরে ধাড়ি হনুমানটা দমাস্‌ করে বাইরের আয়নাটার ওপর পড়ল, আর মটাস শব্দ করে আয়নাটা ঘাড় ভাঙা ফুলগাছের মত ঝুলে রইল, পুঙ্কু আর ওর দিদি দু বোনে একসঙ্গে ভ্যাঁ-ভ্যাঁ করে কাঁদতে শুরু করল, সে দিন বাধ্য হয়ে বাবা একটা গাড়ি-ঢাকা কিনল। ভারি তেরপলে তৈরি, ফিনফিনে প্লাস্টিক নয়। বলল, “প্লাস্টিকের ঢাকনাগুলো পাতলা হনুমানগুলো ছিঁড়ে ফেলবে সহজে।”
*
ঢাকনা কেনার পর বেশ কয়েক দিন হনুমানরা আর ওদের দিকে আসেনি। ওরা খবর পায়, পশ্চিমপাড়ায়, সাইমনপল্লীতে, কলেজবাগানে ঘুরে বেড়াচ্ছে হনুমানের দল। দিদি এসে বলে একদিন ইশকুলের মাঠে হনুমানগুলো এসেছিল। সে দিন ওদের ক্লাস পণ্ড! পুঙ্কু এখনও ইশকুল যায় না, ওর মন খারাপ করে – আগামী বছরের আগে ও ইশকুলে হনুমান দেখতে পাবে না।
কিন্তু বেশি দিন গেল না, এক দিন ভোরবেলা বাবার গান শুরু হবার আগেই পুঙ্কুর ঘুম ভেঙে গেল হনুমানদের লাফালাফি দাপাদাপিতে। ঘুম চোখে দোতলার বারান্দায় বেরিয়ে দেখে সে এক হইহই কাণ্ড রইরই ব্যাপার। আলো তখনও ফোটেনি ভাল করে, হনুমানগুলো ওদের আমগাছ থেকে এক এক করে পাশের বাড়ির গুদামঘরের অ্যাজবেসটসের ছাদে লাফাচ্ছে, এক এক করে আবার গাছে ফিরছে, আবার লাফাচ্ছে। দড়াম দড়াম করে শব্দ হচ্ছে, পাড়া শুদ্ধু লোক জেগে উঠেছে, পাশের বাড়ির দামুবাবু চেঁচাচ্ছে, “সুবীর, সুবীররে, চকোলেট বোম লইয়া আয়, এক্কেরে দফা রফা কইরা রাখব দেহি আজ!”
সবাই জেগে উঠেছে, বাবা, মা, দিদি। সূর্য উঠতে আর বেশি দেরী নেই, পূবের আকাশ গোলাপি থেকে লাল হচ্ছে। হঠাৎ পুঙ্কুর নজর পড়ল গাড়িটার দিকে। বাচ্চা হনুমানটা তেরপলের গাড়ি-ঢাকাটা টেনে তোলার চেষ্টা করছে, ঢাকনার নিচে গাড়িটাকে দেখার চেষ্টা করছে।
“তবেরে পাজি!” বলে পুঙ্কু এক দৌড়ে নিচে নেমে গেল। কাজের মাসি ততোক্ষণে বাইরের দরজা খুলেছে হনুমানের হট্টগোলে। কেউ কিছু বোঝার আগে পুঙ্কু বেরিয়ে গিয়ে সটান হনুমানের বাচ্চাটার হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়ে ঢাকনাটা আবার নিচে নামিয়ে দিল।
বাচ্চাটার গায়ে এত জোর ছিল না যে ও পুরো ঢাকনাটা সরাতে পারবে। হয়ত ধাড়ি হনুমানগুলোও পারত না। অনেকক্ষণ টানাটানি করে বাচ্চাটা একটুখানি তেরপলই সরাতে পেরেছিল। হাত ফসকে সেটা বেরিয়ে যাওয়াতে বাচ্চাটা ভয়ানক রেগে গাড়ির ছাদে বসে বসেই পুঙ্কুর দিকে তাকিয়ে “চ্যাঁ” বলে চেঁচিয়ে দাঁত দেখাল।
তাতে পুঙ্কু ডরায় না। পুঙ্কু জানে ওর আর হনুমানের মধ্যে একটা বন্ধুত্ব আছে। মা-বাবা তো সারাক্ষণ বলে। ও-ও বাচ্চা হনুমানটার মত দাঁত বের করে “চ্যাঁ”, বলে চেঁচাল।
দরজা থেকে কাজের মাসি ডাকছে, ওপরের বারান্দা থেকে বাবা আর দিদি ডাকছে, মা “পুঙ্কু, পুঙ্কু,” ডাকতে ডাকতে সিঁড়ি দিয়ে নামছে – আর পুঙ্কু আর হনুমানের ছানা দুজনে দুজনের দিকে তাকিয়ে দাঁত খিঁচিয়ে চ্যাঁ-চ্যাঁ করে ভয় দেখাচ্ছে, এমন সময় আর এক কাণ্ড ঘটল।
পাশের বাড়ির দামুবাবু সুবীরের হাত থেকে চকোলেট বোমা নিয়ে সলতেতে আগুন দিয়ে যেমনই গুদামঘরের দিকে ছুঁড়েছেন, নিজেরই বারান্দার ছাদ থেকে ঝোলান ফুলের টবে লেগে সেই বোমা ঘুরতে ঘুরতে এসে পড়েছে পুঙ্কুদের গাড়ির ছাদে। টং শব্দ শুনে চমকে হনুমানের বাচ্চাটা যেমনই পেছন ফিরেছে, ওমনি দড়াম করে পটকা ফেটেছে!
সেই শব্দে ভয় পেয়ে পরিত্রাহী চিৎকার করে লাফিয়ে উঠে হনুমানের বাচ্চাটা পা ফসকে এক্কেবারে পুঙ্কুর মাথায়! পুঙ্কু সে ধাক্কায় মাটিতে চিৎপাত! বাচ্চাটা চেঁচাতে চেঁচাতে পুঙ্কুদের আমগাছের মগডালে, বাচ্চার কান্নার শব্দে ভয় পেয়ে, রাগ করে হনুমানের দল হইহই করে অ্যাসবেসটসের ছাদ ফেলে আম গাছে বাচ্চার কাছে হাজির! মা হনুমান বাচ্চাটাকে কোলে নিয়ে লাফিয়ে কোথায় চলে গেল, আর দেখতে দেখতে হনুমানের দলও পেছন পেছন হাওয়া হয়ে গেল।
ততোক্ষণে পুঙ্কুর মাও ছুটে এসে পুঙ্কুকে কোলে নিয়ে বাড়িতে নিয়ে গেছে। পুঙ্কুর কপালে, গালে হনুমানের ছানার নখের দাগ, তাতে বিন্দু বিন্দু রক্ত; জামায়, ফ্রকে, মাথার চুলে ধুলো কাদা, গাল বেয়ে চোখের জলের ধারা, গলা দিয়ে তারস্বরে কান্না! মা অনেক গায়ে-হাতে-মাথায় হাত বুলিয়ে, দু হাতে দুটো ক্যাডবেরি চকলেট দিয়ে কান্না থামাল বটে, কিন্তু দশ মিনিটের মধ্যেই ডাক্তারকাকু এসে ছুঁচ বের করে প্যাঁট করে টিটেনাস ইঞ্জেকশন দিয়ে সেই থেমে যাওয়া কান্না আবার শুরু করে দিল
*
কয়েকদিন কেটে গেছে। হনুমানের দল এখনও ফিরে আসেনি। কিন্তু গাড়ির জন্য গ্যারেজ তৈরি শুরু হয়েছে। পুঙ্কুর বাবা মিস্তিরিদের বলে দিয়েছে, “হনুমানের দল আসলে তোমাদের খন্তা, গামলা, সিমেন্টের দায়িত্ব বাপু তোমাদেরই...”
লঙ্কা বাগানটা এখন আর নেই। পুঙ্কুর মা ভাবছেবাড়ির পেছনে করা যায় কি না, কিন্তু ওখানেও জায়গা কই?
আর...
বাজারের লঙ্কাওয়ালারা এখন খুব খুশী!

Monday, October 03, 2016

জয়বাণ



বদ্রী কুয়ো থেকে জল তুলে বালতিটা ভেতরে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললযত গরম বাড়ছে, ততো জল শুকোচ্ছে আর কিছুদিন পরে কাদা, আর তার পরে বালি উঠবে শুধুএকবার মুখ তুলে তাকাল দূরের আকাশের গায়ে পাহাড়ের দিকে স্পষ্ট দেখা যায় না, কিন্তু ওই পাহাড়ের ওপরে রাজার প্রাসাদে কাজ করছে ওর বাবা অপেক্ষা না করে কুয়োর বালতির কাদাজলটা নিজের বালতিতে ঢেলে নিয়ে আবার বালতিটা কাদাজল ভরে টেনে তুলল
দু বালতি কাদাগোলা জল নিয়ে সাবধানে আঙিনায় ঢুকতেই ছুটে এল বোন বালতিতে উঁকি দিয়ে মুখটা শুকিয়ে গেল ওরও একবার রাজপ্রাসাদের দিকে তাকিয়ে বলল, “বাবা যে কবে ফিরবে...”
বাবা কি কুয়োর জল নিয়ে আসবে?” বলতে গিয়ে থমকে গেল বদ্রী মনে পড়ল বালতিতে কাদা দেখে ও নিজেও মুখ তুলে বাবার দিকেই তাকিয়েছিল বলল, “দাঁড়া, আগে সাবধানে ঘরে নিয়ে রাখি ভাল করে থিতিয়ে যাক...”
ঘরের কোনে বালতি দুটো রাখতে না রাখতেই মা ঢুকল ভেতরবাড়ি থেকে
দাদা এল, গিরিজা?” ছেলেকে দেখে এগিয়ে এসে বালতি দেখে বলল, “সারাদিন রেখে দিলে যদি আধ বালতি জল বেরোয়... মরুভূমির দেশ, কী আর আশা করা যায়!”
কাদাজল থিতোতে দিয়ে বদ্রী জলখাবার খেয়ে দৌড়ল কামারশালায় বাবা গাঁয়ের কামার ওস্তাদ হিসেবে নাম আছে বলেই রাজা ডেকে নিয়ে গেছেকামান তৈরির জন্য বাবা নেই বলে এখন কামারশালা চালায় বদ্রী কাজ সামান্যই, এর ওর ঘটিবাটির ফুটো সারানো, আর কালেভদ্রে কারও ঘোড়ার পায়ে নাল পরানো
আজও কাজ নেই কামারশালার গরম থেকে বাঁচতে আগুনের আঁচ কমিয়ে বদ্রী গিয়ে দরজার কাছেবসল মাটি তেতে উঠেছে দূরের গাছপালা তিরতির করে কাঁপতে লেগেছে গরম হাওয়ায় পাহাড়ের মাথায় রাজার প্রাসাদ আর দেখাই যায় না
বসে বসে ঝিম ধরছিল হঠাৎ একটা ঘোড়ার পায়ের শব্দে চটকা ভেঙে গেল তারপরেই ঘোড়ার নাক ঝাড়ার শব্দ, আর মানুষ আর ঘোড়ার ঘামের গন্ধ ভেসে এল বাতাসেধড়ফড়িয়ে উঠে দাঁড়াল বদ্রী এই শব্দ আর গন্ধ, দুইই ওর চেনা বাবা আসছে
দেখতে দেখতে ঘোড়াটা টিলার উঁচু জায়গাটা পার করে উঠল সারা গা বেয়ে ঘাম ঝরছে বদ্রী একটু অবাক হল, বাবা কখনও ঘোড়াটাকে কষ্ট দেয় না কিন্তু আজ যেন না থেমেই আমের থেকে এসেছে?
ছুটে গিয়ে লাগাম ধরল বদ্রী বাবা নেমে লাগামটা আবার নিয়ে নিল বলল, “দলাই মলাই আমি করব ছুট্টে বাড়ি যা, মা আর বোনকে নিয়ে সরপঞ্চের বাড়ি আয় কথা আছে রাস্তায় সবার বাড়িতে একই কথা বলে আসবি ভীষণ জরুরী
ঘোড়া ছেড়ে দৌড় লাগাতে যাবে, বাবা বলল, “এই মশকটা নিয়ে যা, পরিষ্কার জল আছে
মশক কাঁধে ছুটল বদ্রীসরপঞ্চের বাড়ি যাও, জলদি, সব্বাই...” হাঁক পাড়তে পাড়তে

মা আর বোনকে নিয়ে যতক্ষণে বদ্রী এসে সরপঞ্চের বাড়ির সামনে পৌঁছলো, তখন গ্রামের প্রায় সব লোকই এসে পৌঁছে গেছে এমনিতেই বদ্রীদের বাড়ি গ্রামের বাইরের দিকে, তার ওপর মা সবে রান্না চড়িয়েছিল
সবাই এসে হাজির হবার পর বাবা সরপঞ্চের বাড়ির ভেতরে গিয়ে সরপঞ্চের ছেলেরসঙ্গে ধরাধরি করে বৃদ্ধ সরপঞ্চকে এনে দাওয়ার খাটিয়াতে বসাল
বদ্রী দেখছিল, বাবা ছটফট করছে সরপঞ্চ অনুমতি দেবার আগেই বলল, “মুখিয়া, মাফি মাঙ্গে, আমাদের এক্ষুণি গ্রাম ছেড়ে চলে যেতে হবে এক্ষুণি
সবাই থতমত খেয়ে চুপ করেছে, এই ফাঁকে বাবা বলেই চলেছে, “মুখিয়া, গত সাত মাস ধরে আমি রাজবাড়িতে একটা কামান বানানোর কাজে সাহায্য করেছি এত বড় কামান কেউ কোনও দিন বানায়নি কামান বানানো শেষ হয়েছে গত সপ্তাহেকাল সেটা চালানো হবে কাল বিকেলে ওটার মুখ ঘুরিয়ে তাক করেছে রাজার সৈন্যরা
বাবা দম নেবার জন্য থামল, সরপঞ্চ বলল, “তো?”
বাবা বলল, “কামানের মুখ আমাদের গাঁয়ের দিকেই তাক করা, মুখিয়া
এবার লোকে হাসতে শুরু করল গোয়ালা দীনদয়াল আমেরের দিকে হাত তুলে বলল, “আমের এত দূরে, যে দেখাই যাচ্ছে না সেখান থেকে কামান ছুটলে আমাদের গাঁয়ে এসে পড়বে? তোমার মাথা খারাপ হয়েছে, রামপ্রকাশ? তুমি জান না, চাকসু থেকে আমের কত দূর?”
বাবা জানেবারো ক্রোশ
বারো ক্রোশ দূর থেকে কামানের গোলা আসবে এখানে?”
দীনদয়ালের কথায় রামপ্রকাশ আরও উৎকণ্ঠিত হয়ে বলল, “মুখিয়া, ও যে সে কামান নয় রাজার নতুন কামান পনেরো হাতেরও বেশি লম্বা তার চাকাই সাড়ে তিন হাত উঁচু ডাইনে বাঁয়ে ঘোরাতে চারটে হাতি লাগে কাল রাজা জয় সিংহর হুকুমে দশ মন বারুদ এনে রাখা হয়েছে একবার দাগতেই নাকি দুমনের বেশি বারুদ লাগবে একএকটা গোলার প্রায় এক মন ওজন
এবার একটা সোরগোল শুরু হয়ে গেল কেউই প্রায় বাবার কথা বিশ্বাস করতে চায় না বলে, অত বড় কামান হয় নাকি! অত বড় গাছই হয় না! তো কামান
রামপ্রকাশ রেগে বলল, “বেশ তবে তোমরা থাক আমি চললাম আমার বউ বাচ্চা নিয়ে
এই হট্টগোলের মধ্যে সরপঞ্চ হাত তুলল সবাই চুপ করলে সরপঞ্চ রামপ্রকাশকে বলল, “কামান কখন চলবে?”
রামপ্রকাশ বলল, “কাল সকালে
সরপঞ্চ বলল, “গোলা এ গাঁয়েই মারা হবে?”
রামপ্রকাশ বলল, “তা নয়তবে এ দিকেই কামানের মুখ সে কামান চললে কী হবে কেউ জানে না কত দূর গোলা যাবে কেউ জানে না কেউ বলছে পাঁচ ক্রোশ, কেউ বলছে আট কাল এক সর্দার বলল, ‘দশ বারো ক্রোশও যেতে পারে সেই শুনে আমি আর দাঁড়াইনি, ভোর না হতেই জয়গড় ছেড়ে বেরিয়ে এসেছি
দাঁতের ফাঁকে ধ্যাৎ শব্দ করে গোয়ালা দীনদয়াল বলল, “রাজাকে একবার বলবে তো, যেএখানে আমাদের গ্রাম আছে!”
আরও বিরক্তিভরে রামপ্রকাশ বলল, “আরে আমি কি রাজাকে কোনও দিন দেখেইছি? রাজা কি গাঁয়ের মুখিয়া, যে দরজার সামনে এসে ডাকলেই হবে?”
ভুরু তুলে দীনদয়াল বলল, “তুমি রাজার কামান বানালে, রাজা তোমার কথা শুনবে না?”
এবার দীনদয়ালকে ছেড়ে আবার সরপঞ্চের দিকে ফিরল রামপ্রকাশ, “এই বোকাটাকে বোঝাই কী করে মুখিয়া, ওখানে কত কামার আমি তো তাতে ছোটো মিস্তিরি আসল কারিগর তো দিল্লী থেকে এসেছিল বাদশা পাঠিয়েছে
সরপঞ্চ বলল, “দীনু, রামু, বাচ্চাবেলা থেকে তোমাদের ঝগড়া থামল না দীনু, এবার চুপ কর রামপ্রকাশের দিকে তাকিয়ে বলল, “গোলা কোথায় পড়বে যদি না জানি, তাহলে যাব কোথায়?”
রামপ্রকাশ বলল, “বারো ক্রোশের বেশি তো গোলা যাবে না বলেই সবাই বলছে, তাহলে আমরা আরও দূরে চলে যাই...”
দুর্বল পায়ে উঠে দাঁড়িয়ে সরপঞ্চ বলল, “আমরা আর এক প্রহরের মধ্যে বেরোবো সবাই যাবে গাড়ি জুতে নাও যত পেয় জল আছে সব নেবে দামি জিনিস সামান্য নেবে উত্তরে চিল কা টিলা পাহাড়ের মাথায় রোদের তেজে আবছা জয়গড় কেল্লার দিকে এক আঙুল তুলে বলল, “কামান ওখানে,” তারপর অন্য হাত দিয়ে দক্ষিণ দিকের দিকচক্রবাল দেখিয়ে বলল, “আমরা যাব ওখানে সারা দিন সারা রাত চলে যতদূর সম্ভব এর বেশি আর কী করব? এর পর রণছোড়জীর কৃপা

সারা দিন রোদ্দুরের মধ্যে চলে কতটুকু এল ওরা? “বেশিদূর না,” বলল বাবা গাঁয়ের অনেকেই তাড়াতাড়ি পথ চলতে পারে না বুড়োবুড়িরা, মেয়েরা, বাচ্চারা আস্তে হাঁটে রাস্তায় দুটো গাড়ি বসে গেল - সেগুলো খালি করে ভৈঁসদের খুলে, মালপত্র অন্যগাড়িতে তুলতে সময় গেছে
সন্ধেবেলা সরপঞ্চ বলল, এখন বিশ্রাম তার পর আবার চাঁদ উঠলে চলারামু,” ডেকে জিজ্ঞেস করল বাবাকে, “কাল সকালের আগে তো কামান চলবে না?”
বাবা ভুরু কুঁচকে দূর দিগন্তে আবছা চিল কা টিলার দিকে তাকিয়ে বলল, “দিল্লীর বাদশা মহম্মদ শাহ নাকি আসবেন তাঁকে অভ্যর্থনা করতে কামান চলবে আজ সকাল অবধি তিনি তো আসেননি
সরপঞ্চ বলল, “আর দেড় প্রহরে চাঁদ উঠবে চাঁদের আলোয় চলব রাতে হয়ত দিনের চেয়ে চলা সহজ হবে... জয় রণছোড়জী
রাত বাড়লে সবাই আবার চলা শুরু করল রোদের তেজ না থাকলেও চলা সহজ হল না চাঁদের আলো সামান্য পথ বলে কিছু নেই বাচ্চারা কাঁদছে বাচ্চাদের মায়েরা বিরক্ত হচ্ছে গ্রামের পুরুষরাও বিরক্ত এমন অজানার দিকে কতক্ষণ হাঁটবে মুখিয়া? কামানের গোলা যদি বারো ক্রোশ না হয়ে পনেরো ক্রোশ আসে? এখন কত দূর ওরা? সাতাশ-আঠাশ ক্রোশ? গোলা যদি আঠাশ ক্রোশ পেরিয়ে এসে ওদের মাথায়ই পড়ে? তার চেয়ে এখানে থাকাই ভাল না?
সরপঞ্চের এক কথা, যে চাও চল, যে চাও থাক, যে চাও গাঁয়ে ফিরে যাও
সবাই চলল
শেষে, পুবের আকাশ যখন ফর্সা হচ্ছে, তখন সরপঞ্চ বলল, এবার থাম এবারে রণছোড়জী ভরসা
মাটিতে পড়েই ঘুমিয়ে পড়ল মানুষগুলো বদ্রীও

বদ্রীর ঘুম যখন ভাঙল, তখন সূর্য উঠছে পুব দিগন্তে লাল থালার ওপরটুকু উঁকি দিচ্ছে ধড়ফড়িয়ে উঠে দেখল আশেপাশে কেউই প্রায় ওঠেনি বাবা শুধু উবু হয়ে বসে ঠায় দৃষ্টি উত্তরের পাহাড়েরদিকে একটু দূরে সরপঞ্চও তেমনই বসে বাবা বলল, “সূর্য উঠেছে এতক্ষণে রাজপুরোহিত কালীর আরতি শেষ করেছে আর দেরী নেই
কেমন যেন বাবার কথা শুনেই এক এক করে সকলে উঠে বসল চোখ কচলে দীনদয়াল বলল, “কামান দেগেছে?”
আর তখনই, ভোরের কুয়াশা ফুঁড়ে দূর পাহাড়ের গায়ে একটা আলোর ঝলকানি, আর তার পরেই বাজ পড়ার মত গর্জন, বাতাস চিরে কিছু একটা ছুটে আসার চিল চিৎকার, আর তার পর...
প্রচণ্ড শব্দে মাটি কেঁপে উঠল এত জোরে, যে বদ্রী সামলাতে না পেরে পড়েই গেল খানিকক্ষণ সময় লাগল সম্বিৎ ফিরে পেতে তারপর দেখল কেবল ও একা নয়, অনেকেই মাটিতে কুমড়ো গড়াচ্ছে সরপঞ্চকে ধরে তুলছে দীনদয়াল বাবা ধরেছে আর একজন বৃদ্ধকে লজ্জা পেয়ে বদ্রী তাড়াতাড়ি উঠে গেল অন্যদের সাহায্য করতে একবার মুখ তুলে তাকিয়ে দেখল অনেকটা দূরে, ওদের পেরিয়ে আসা পথের কোথাও, একটা বিশাল ধুলোর মেঘ আস্তে আস্তে পাকিয়ে উঠছে আকাশের দিকে
সব জানা সত্ত্বেও ঘটনার ভয়াবহতায় সকলেই বিহ্বল বাচ্চারা প্রায় সকলেই, বড়রাও কেউ কেউ হাউহাউ করে কাঁদছে দু চারজন বমি করছে কেউ দু হাতে মাথা চেপে ধরে দুলতে দুলতে ইষ্টনাম জপছে যারা অতটা থতমত খায়নি, তারা আশেপাশের বড় পাথরে চড়েবোঝার চেষ্টা করছে কোথায় পড়েছে কামানের গোলা
এরই মধ্যে সরপঞ্চের গলা শোনা গেলআরও চল এতদূরও নিরাপদ নয় এর পরের গোলাটা যদিআরও এগিয়ে পড়ে? চল, চল, ওঠো, জলদি!”
এবার আর কেউ দ্বিরুক্তি করল না
কিন্তু আর গোলা এল না বার বার ফিরে দেখা সত্ত্বেও পাহাড়ের গায়ে আলোর ঝলক বা কামানের নির্ঘোষ শুনতে পাওয়া গেল না
দুপুরের আগেই রামপ্রকাশই সরপঞ্চকে বলল, “মুখিয়া, আর মনে হচ্ছে বিপদ নেই আবার কামান দাগলে এতক্ষণে হয়েযেত আমি বলি কী, বাকি দিনটা এখানেই বসে যাই রাত নামলে আবার ফেরা যাবে
সরপঞ্চ বলল, “তাই ভাল কাল থেকে তো ঠিক করে কেউ খায়ওনি
গাড়ি দাঁড়াল কয়েকটা পাথরের ছায়ায়, কাঠকুটো জড়ো করে আগুন জ্বেলে রান্নাও হল সামান্য কিছু তার পরে, ক্লান্তিতে সকলেই ছায়া খুঁজে ঘুমিয়ে পড়ল

এক এক করে সকলে উঠল রোদ পড়ে সন্ধে নামছে তখন সরপঞ্চ গ্রামের বয়স্কদের নিয়ে পরামর্শ করে ঠিক করল এখনই ফেরা গাই ভৈঁসগুলো অত ক্লান্ত নয় যারা পারছে না, তারা গাড়িতে যাবে
শুরু হল ফেরার পথচলা খানিক চলে, খানিক থামে, খানিক বিশ্রাম নেয় রাত নামল, কেউ থামার কথা বলল না তবে সরপঞ্চ নিজেই কিছুক্ষণ পর পর বিশ্রাম ঘোষণা করল সারা রাত চলল, থামল ভোর যখন হল তখন গ্রাম আর বেশি দূরে না
গ্রামের যত কাছে আসে ততই যেন মানুষের হইচই শুনতে পায়? পা চালিয়ে চলে ওই তো, গাঁয়ের চারপাশের টিলাগুলো দেখা যাচ্ছে আর দেরি নেই
কিন্তু গাঁয়ে মানুষ কোথা থেকে এল? ওরা তো সকলেই একসঙ্গে! 
হাত তুলে সবাইকে দাঁড় করাল সরপঞ্চ আর তখনই, এক এক করে আটজন ঘোড়সওয়ার এসে দাঁড়াল টিলার ওপরে, আকাশের গায়ে
খানিককাল দুপক্ষই নিশ্চল, তার পর সওয়াররা ঘোড়া ছুটিয়ে এগিয়ে এল
রাজার সৈন্য
সৈন্যদের দলপতি এগিয়ে এসে বলল, “তোমরা কে? এখানে কী করছ?”
সরপঞ্চের ছেলে বলল, “আমরা গ্রামবাসী, ওই পাথরের ওপারের গ্রাম
অবাক হয়ে দলপতি বলল, “গ্রামশুদ্ধ লোক?কোথা থেকে আসছ?”
সরপঞ্চ বলল, “আমরা কামানের গোলার ভয়ে গ্রাম ছেড়ে গেছিলাম আবার ফিরে এসেছি তোমরা এখানে কেন?”
দলপতি জবাব দিল না একজন সৈনিককে কী বলা মাত্র সে ঘোড়া ঘুরিয়ে দৌড় দিল গ্রামের দিকে সরপঞ্চ বলল, “আমাদের রাস্তা আটকাচ্ছ কেন?”
দলপতি কী ভেবে বলল, “গ্রামে রাজা এসেছেন
রাজা!
কিন্তু কেউ কিছু বলার আগেই শান্ত্রী ফিরে এসে বলল, “রাজামশাই সবাইকে ডাকছেন
রাজা ডাকছে! সরপঞ্চ পা চালিয়ে পাথরগুলো পার করে গ্রামের চৌহদ্দিতে পা দিয়েই থমকে দাঁড়াল আস্তে আস্তে তার চারপাশে ভীড় করে এল বাকি গ্রামবাসীরা
এক ভয়ানক দৃশ্য অপেক্ষা করে ছিল তাদের জন্য গ্রামের মাঝখানটা, যেখানে সরপঞ্চের বাড়ি ছিল, সেটা আর নেইএক বিরাট গহ্বর সেখানে সরপঞ্চের বাড়ি, আসেপাশের চার পাঁচটা বাড়ি সেই গহ্বরের ভিতরে তাদের কোনও চিহ্নই আর অবশিষ্ট নেই তাদের চারিপাশে অজস্র বাড়ি সম্পূর্ণ ধূলিসাৎ, তাছাড়া, প্রায় সব বাড়িই অল্পবিস্তর ক্ষতিগ্রস্ত
কিন্তু ধ্বংস নিয়ে হাহাকার করার সময় পাওয়া গেল না দূরের বাড়ি-ঘরের আড়াল থেকে বেরিয়ে এল একটা অশ্বারোহী মূর্তি, তার পেছনে আরও কয়েকজন
বাইরের লোক, রাজার মত পোষাক পরা লোক এ গাঁয়ে কোনওদিন দেখেইনি কেউ হাঁ করে তাকিয়ে রইল সবাই
প্রথম জন ঘোড়া থেকে নেমে জিজ্ঞেস করল, “তোমরাই গ্রামবাসী? মুখিয়া কে?”
সরপঞ্চ এগিয়ে এসে হাত জোড় করে বলল, “প্রণাম, মহারাজ,” তার পর মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসে মাটিতে মাথা ঠেকাল
সবাই অবাক রাজা! রাজা জয় সিংহ! তাদের এই গ্রামে! বদ্রীর হঠাৎ খেয়াল হল, পাশে বাবা অনেকক্ষণ ধরেই প্রণাম করছে আসেপাশে সকলেই এক এক করে হাঁটু মুড়ে বসছে বদ্রীও তাড়াতাড়ি মাথা নুইয়ে প্রণাম করল
রাজা ঘোড়া থেকে নামল বদ্রী আড়চোখে দেখল পাশে বাবা মাথা তুলছে বদ্রীও মাথা তুলল সরপঞ্চও মাথা তুলেছে রাজা এগিয়ে এসে নিজে হাতে সরপঞ্চকে তুলল বলল, “কী নাম, এই গ্রামের?”
সরপঞ্চ হাতজোড় করে বলল, “চাকসু, হুজুর
রাজা জিজ্ঞেস করল, “কত পুরনো গ্রাম?”
এবার সরপঞ্চ একটু থতমত খেল বলল, “সরকার, সে কি কেউ জানে, আমাদের বাপ দাদা পরদাদা, সবাই এখানেই থাকত
রাজা ঘাড় ঘুরিয়ে জিজ্ঞেস করল, “রাজার খাজনা দেয় এরা?”
এবার পেছন থেকে একজন এগিয়ে এসে বলল, “জী হুজুর বেশি দেয় না, আছেই বা কি!”
রাজা হাত তুলে থামিয়ে দিয়ে বলল, “বেশি না কম আমি জানতে চাইনি খাজনা দেওয়া গ্রামের ওপর কামান দাগা হল সেটা কার দায়িত্ব? মন্ত্রী, সেনাপতি কাল সকালের মধ্যে সে লোককে আমি দেখতে চাই
আবার সরপঞ্চের দিকে তাকিয়ে বলল, “ক্ষতি কী হয়েছে তো দেখছিই জান গেছে ক জনের?”
সরপঞ্চ বলল, “কারও জান যায়নি, মহারাজ, আমরা গাঁয়ে ছিলাম না আমরা চলেগিয়েছিলাম এই ফিরছি
রাজা আরও অবাক হয়ে বলল, “কেউ গাঁয়ে ছিলে না?”
না
রাজা বলল, “এই গ্রাম আবার তৈরি হবে রাজকোষের টাকায় আর সেই সঙ্গে, এই গ্রামের আজকের সব বাসিন্দা, আর তাদের বংশধরদের, কখনও খাজনা দিতে হবে না মুন্সী, লিখে নাও
রাজা ফিরল গ্রামের সবাই মুখ তাকাতাকি করছে, বদ্রী দেখল বাবা এগিয়ে গিয়ে সৈনিকদের সঙ্গে কথা বলছে
রাজা এবার এগিয়ে গেল আর এক জনের দিকে এরও রাজার মত পোশাক, মাথায় পাগড়ি। এ-ও ঘোড়ায় করে রাজার সঙ্গেই এসেছিল, কিন্তু ঘোড়া থেকে নামেনিরাজা সেই লোকটার সামনে দাঁড়িয়ে অল্প মাথা নুইয়ে বলল, “জাঁহাপনা, এই সব গ্রামের লোক এরা গ্রাম থেকে চলে গিয়েছিল বলে বেঁচে গিয়েছে...”
বদ্রীর পিছনে ফিসফিস করে কে বলল, “বাদশা মহম্মদ শা!”
চমকে উঠল বদ্রী একই সঙ্গে দিল্লীর বাদশা আর আমেরের রাজা তাদের এই গ্রামে!
কিন্তু রাজার ভুরু আবার কুঁচকে গেছে সরপঞ্চের দিকে ফিরে বলল, “কিন্তু গাঁ শুদ্ধু লোক গিয়েছিল কোথায়?”
সরপঞ্চের উত্তর শুনে রাজা আরও অবাক বাদশাও বলল, “তওবা! এই সরপঞ্চের তো দারুণ বুদ্ধি! বহোৎ খুব! রাজা, এদের এই গর্তে একটা বড় পুকুর বানিয়ে দাও দেখেই বোঝা যাচ্ছে এদের খুব জলকষ্ট
রাজা বলল, “খুব ভালো কথা, জাঁহাপনা কারিগরদের খবর দাও এ গ্রামে যেন আর জলকষ্ট না থাকে... কিন্তু,” আবার ফিরল রাজা সরপঞ্চের দিকেতুমি জানলে কী করে, আজ সকালে কামান চলবে?”
সরপঞ্চ এবার মুখ তুলে ডাকল, “রামু?”
রামপ্রকাশ এগিয়ে এল পায়ে পায়ে
বাবার দিকে দেখিয়ে সরপঞ্চ বলল, “ওই যে, ওই ছোকরা কামান তৈরির দলে ছিল-ই কাল সকালে এসে আমাদের খবর দেয় তারপরেই…”
ইধর আও,” বলে বাবাকে কাছে ডেকে রাজা বাবার পিঠ চাপড়ে দিল গর্বে বদ্রীর বুক ফুলে উঠলআড় চোখে তাকিয়ে দেখল সবাই তেমনি গর্বের হাসি হাসছে পেছন থেকে কে পিঠে হাত রাখল দীনু চাচা বলল, “তোর বাবা সবার প্রাণ বাঁচিয়েছে
রাজা বলল, “তুমি কামান তৈরির কাজে ছিলে? কিন্তু কামান দাগার সময়ে থাকনি ভালই করেছ কামানের পাশে মস্ত চৌবাচ্চা ছিল, সলতেয় আগুন দিয়ে কামান চালানেওয়ালারা যাতে তার মধ্যে ডুব দিয়ে বাঁচতে পারে তারা আটজন মারা গিয়েছে একটা হাতি মরে গেছে বিষ্ফোরণের ধাক্কায় জয়পুর গ্রামে পর্যন্ত ছোটো ছোটো বাড়ি ভেঙে গিয়েছে! আমেরে কত গর্ভবতী মায়েদের বাচ্চা হয়ে গেছে!”
রাজা থেমে মুখ মুছল বলল, “জয়বাণ আর চলবে না কিন্তু আমার আরও কামান চাই এত বড় না ছোটো মেবারের সঙ্গে যুদ্ধ হবে তুমি আমের চল
বাবা হাত জোড় করে বলল, “যথা আজ্ঞা, মহারাজ

অলঙ্করণ - সুজিত রায়