Friday, October 28, 2016

ঘরছাড়া

ঘুমভাঙা কুয়াশার ভোরে ভালো করে দেখা যায় না কিছু। জলাজমির ধারে বেজিটা ঘাড় তুলে আকাশের দিকে তাকাল। আকাশে মেঘ? বোঝা যায় না। রোদ উঠলে আর নড়াচড়া করা যাবে না। এই জায়গাটা সুবিধের না। পাশে একটা বাড়ি। মানুষের বাড়ি। তিনতলা। তার জানালা থেকে স্পষ্ট দেখা যায় জলাটা। সেটা পছন্দ নয় ওর। তাই আলো ফুটলে ঘাপটি মেরে থাকে।
জলার শেষে একটা পাঁচিল। পাঁচিলের গায়ে একটা ঝোপ। ঝোপের ভেতরে একটা টুনটুনি পাখি বাসা বেঁধেছে। এখনও ওদের ওড়াউড়ি লেগে আছে। তার মানে ডিম পাড়েনি। পাড়লেই বেজি হানা দেবে। ওইটুকু পাখি ওকে আটকাতে পারবে না। ওরা বোধহয় কোনওদিন বেজি দেখেইনি। তাই গিয়ে ওই পাঁচিলের ধারে বাসা করেছে। পাঁচিল বেয়ে উঠতে পারবে বেজি। ওদের ডিম খাবে প্রথম রাতেই।
জলাটায় খাবারদাবার নেই বিশেষ। তিন দিকে বাড়ি, এক দিকে একটা রাস্তা। এই রাস্তারই ওই পারে ও থাকতো। ওখানে বিরাট জলা ছিল একটা। যখন সে জলায় মাটি ফেলে ফেলে ভরাট করা শুরু হল, তখন এক দিন সন্ধের পর, অনেক রাতে, যখন রাস্তা দিয়ে গাড়ি চলা বন্ধ হয়ে গেছে, তখন অন্ধকারের সুযোগে বেজি এ পারে চলে এসেছিল। এসে অবশ্য দেখেছে যে এই জলাটা ছোট্ট। এখানে বেশি জলও নেই, খাগড়ার বনটা তো একেবারেই খুদে। খানিকটা কচুরিপানা আর নলবন। ব্যাস। রাস্তার এপার থেকে গত কয়েক বছর ধরে দেখেছে কেমন করে মানুষ ওপারে ওর থাকার জায়গাটা ভরাট করে বিরাট বিরাট বাড়ি বানিয়েছে এক এক করে।
বাঁ দিকে যেন কী নড়ল একটা। একটা জলঢোঁড়া। এদিকেই আসছিল, ওর গন্ধ পেয়েছে। সরু সরু দু-ভাগ জিভ দিয়ে বাতাস চেটে বেজির গন্ধ পেয়ে থমকে দাঁড়িয়েছে। এবার ঘুরে পালাবার চেষ্টা করবে।
পালাতে হলো না। এক লাফে ছোটো মাটির ঢিবিটা পেরিয়ে বেজি ঝাঁপিয়ে পড়ল ওর ওপর। গলাটা কামড়ে ধরে খানিকক্ষণ অপেক্ষা। তার পরে আস্তে আস্তে সাপের শরীরটা স্থির হয়ে গেল। টেনে নিয়ে গেল নলবনের মধ্যে। সারাদিনের মতো পেটভরা। নিশ্চিন্ত।
*
বেলা বেড়েছে। সূর্য তখনও মাঝ আকাশে ওঠেনি। হঠাৎ বিকট ঘরঘর শব্দে চমকে ঘুম ভাঙল বেজির। মাটি কেঁপে কেঁপে উঠছে সেই শব্দে। মুখ তুলে দেখল একটা বিরাট গাড়ি এসে দাঁড়িয়েছে জলার ধারে। দেখতে দেখতে তার পেছন দিকটা উঁচু হয়ে উঠল, আর হুড়হুড় করে তাল তাল মাটি এসে পড়তে লাগল জলার মধ্যে।
এই যন্ত্রটা চেনে বেজি। এই গাড়িতে অনেক অনেক মাটি এনে ফেলে ফেলে জলা বুজিয়ে ফেলে মানুষ। তার পরে সেখানেই তৈরি হয় ওদের বাড়ি। যেমন তৈরি হয়েছে রাস্তার ওপারে।
সারা দিন হাঁ করে মাটি ফেলা দেখল বেজি। সেই সঙ্গে ছুটে ছুটে খুঁজে বেড়াল, আর কোথাও কি যাবার জায়গা আছে?
নেই। আগেই দেখে নিয়েছিল, আবারও দেখল – জলাটার তিন দিকে মানুষের বড়ো বড়ো বাড়ি। আর এক দিকে রাস্তাটা – যেটা পেরিয়ে ও এসেছিল কয়েক সপ্তাহ আগেই। ওর থাকার জায়গা ভরে মানুষ ওকে তাড়িয়ে দিয়েছিল বলে।
জলার ধারে এখন একটা দুটো নয়, এক সঙ্গে সারি দিয়ে মাটি ফেলছে চার চারটে গাড়ি। বিরাট বিরাট সেই গাড়ির শব্দে আর ধোঁয়ার গন্ধে টেঁকা দায়।
*
সে দিন রাতে যখন সব নিস্তব্ধ, আধ বোজা জলা ছেড়ে নিরুদ্দেশের পথে বেরিয়ে পড়ল বেজি। রাস্তার পাশ দিয়ে চলে, মুখ তুলে গন্ধ শোঁকে – কোথায় বিপদ, কোথায় কুকুর, কোথায় মানুষ... সেই সঙ্গে খোঁজে, কোথাও কি জলার গন্ধ পাওয়া যায়?
চলতেই থাকে চলতেই থাকে – জলা কোথায়? দু’দিকে কেবল বাড়ি আর বাড়ি। তবু চলে – মনে এই আশা নিয়ে, যে মানুষ নিশ্চই সব জায়গায় থাকবে না? কখনও তার দাপট শেষ হবে – কালো রাস্তার শেষে বেজি দেখতে পাবে জলাজমি...

No comments: