সে দিন ঘুম
থেকে উঠেই পুঙ্কুর মনে হল, আজ যেন দিনটা অন্যরকম। অন্য দিন ওর ঘুম ভাঙে আরও সকালে, বাবা গান গেয়ে ঘুম ভাঙিয়ে দেয়। পুঙ্কুকে রোজ রাতে ঘুমপাড়ানি গান গেয়ে ঘুম পাড়িয়ে
দিয়ে যায় মা, আর সকালে বাবা যে গানগুলো গায়, সেগুলোকে বাবা বলে ‘ঘুমভাঙানি গান’।
প্রথম গানটাই হয়, “দেখোরে, নয়ন মেলে জগতের বাহার, দিনের আলোয় কাটে অন্ধকার...”
বাবা খুব ভাল গান গাইতে পারে। মাও ভাল গায়, কিন্তু বাবা আরও ভাল। বাবার গান শোনার জন্য রোজ নাকি কাকটা আসে
সকালে। পুঙ্কু রোজ চোখ খুলে দেখে জানালার বাইরে কার্নিসের ওপর কাকটা বসে রয়েছে –
ঘাড় বাঁকিয়ে ভেতরে দেখার চেষ্টা করছে। প্রথম গানটা শেষ হলে কাকটা রোজ উড়ে চলে যায়
কোথায়।
আজ গান হয়নি। বাইরে অনেক আলো। আকাশ ঝকঝক করছে। কাকটা নেই।
এতক্ষণে পুঙ্কুর দাঁত মেজে জলখাবার খাওয়া হয়ে যাবার কথা। এতক্ষণে বাবার সঙ্গে
বাগান দেখতে বেরিয়ে গেছে। পুঙ্কু ঘর থেকে বেরিয়ে এসে মা বাবার ঘরে উঁকি দিল। কেউ
নেই। এখন কারও থাকারও কথা নয়। দেওয়ালে ঘড়ি। পুঙ্কু সময় দেখতে জানে না। তবে দেখে
বুঝল এই রকম জায়গায় কাঁটাদুটো থাকলেই মা দিদিকে ডেকে বলে, “স্কুলের সময় হয়েছে,
ব্যাগ নিয়ে এস।”
পুঙ্কু নেমে এল সিঁড়ি দিয়ে। আজ ছুটির
দিন, তাই খাবার টেবিলে কেউ নেই। দিদি খাচ্ছে না, মা রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এসে
দিদিকে তাগাদা দিচ্ছে না, কাজের মাসি ছটফট করে এদিক ওদিক যাচ্ছে না।
কেউ কোত্থাও নেই!
জানালা দিয়ে পুঙ্কু দেখল বাগান
খালি। সেখানেও কেউ নেই। সবাই গেল কোথায়?
দরজা দিয়ে বাইরে যেতেই হঠাৎ
চারিদিক থেকে ভীষণ হইচই, বিরাট হুঙ্কার – “সারপ্রাইজ!” বাবা, দিদি আর মা যেন
লাফিয়ে সামনে এসে পড়ল, আর পুঙ্কু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে পেছোতে গিয়ে দরজার চৌকাঠে
গোড়ালি বেধে গিয়ে থপ করে বসে পড়ল।
ভয় পেয়ে, ঠকে গিয়ে, চমকে গিয়ে,
ব্যথা পেয়ে সবে কাঁদতে যাবে, এমন সময় দেখল, আরে! গেটের বাইরে একটা গাড়ি! সেই
গাড়িটা, ম্যাগাজিনে যেটার ছবি দেখে বাবাকে বলত, “এই গাড়িটা কেন না, বাবা!” আর বাবা
বলত, “দূর, তোর তো কত্তোগুলো গাড়ি আছে!” যেন পুঙ্কুর খেলার গাড়িগুলো নিয়ে ওরা
পিকনিক করতে যেতে পারবে জয়তীদের মত!
পুঙ্কু উঠে দাঁড়িয়ে ছুট্টে গিয়ে
গাড়িটার গায়ে দু হাত ছড়িয়ে সেঁটে দাঁড়াল। ওর আনন্দ আর ধরে না। ঠিক ছবির মতই লাল
রঙের, ঠিক ছবির মতই সুন্দর।
মা বলল, “কোথায় রাখবে ঠিক করতে
হবে।”
বাবা বলল, “কোথায় আবার রাখব?
এখানেই থাকবে, গেটের বাইরে, রাস্তার পাশে, বাগানের পাঁচিল ঘেঁষে।”
মা বলল, “আর হনুমান?”
বাবা বলল, “হনুমান কি আর গাড়ি
চড়বে? গাড়ি তো আর বাগানের গাছ নয়!”
পুঙ্কুদের বাড়িতে হনুমানের দৌরাত্ম
বড্ড বেশি। প্রায়ই হনুমানের দল এসে বাগানের ফলগাছ, ফুলগাছ তছনছ করে, মা’র সাধের
টমেটো, ভিণ্ডি, সীম, পেয়ারা গাছের পেয়ারা, গরমে আম – খায়, ফেলে, চটকে চটকে নষ্ট
করে।
মা হেসে বলল, “কী জানি বাপু।
পুঙ্কুর বন্ধু, হয়ত পুঙ্কুর মত ওরাও গাড়ি ভালবাসবে!”
হনুমানরা পুঙ্কুর বন্ধু। বাড়িতে
হনুমান পড়লে একমাত্র পুঙ্কুই বাইরে বেরোবার সাহস পায়। আর একমাত্র পুঙ্কু বেরোলেই
বড় হনুমানগুলো কিছু বলে না। আর কেউ বাড়ি থেকে বেরোলেই তারা বিরাট বিরাট দাঁত বের
করে তেড়ে আসে। পুঙ্কুকে দাঁত দেখায় বাচ্চাটা। আর তার পরে ছুটে গিয়ে হনু-মায়ের কোলে
মুখ লুকায়। বাবা বলে বাচ্চাটা আর পুঙ্কু একই সাইজ বলে বাচ্চাটা পুঙ্কুকে দেখে
ডরায়, আর বড়গুলো ওকে পাত্তাই দেয় না। তা ছাড়া ওরা ওকে দেখে চিনতে পারে নিজেদের
একজন বলে। বলে, “দেখ তো, কোমরে লেজটা গজাতে শুরু করেছে কি না?”
পুঙ্কু মাঝে মাঝে ওখানটা হাত
বুলিয়ে দেখে নেয়, যখন কেউ দেখছে না।
পুঙ্কুর বাবা বলল, “হনুমানগুলো যদি
গাড়িটার ক্ষতি করে, তাহলে তো গ্যারেজ তৈরি করতে হবে। আর তাহলে একমাত্র জায়গা ওই
বাড়ির বাঁ দিকের খালি জমিটা। ওখানে তো আবার তোমার লঙ্কা বাগান।”
পুঙ্কুর মা বাবার দিকে কটমট করে
তাকাল। লঙ্কা বাগান পুঙ্কুর মায়ের সাধের বাগান। পুঙ্কুর মায়ের বাগানে এত লঙ্কা হয়
যে ওদের কেন, সারা পাড়ার কাউকে কোনদিন লঙ্কা কিনতে হয় না বাজার থেকে। বাজারের
লঙ্কাওয়ালারা কেউ পুঙ্কুর মাকে পছন্দ করে না।
*
এর পর ক’দিন ওরা সবাই শুধু গাড়ি করে এদিক ওদিক ঘুরল, জামবনে
পিকনিক করল, সন্ধেবেলা তিরি নদীর ধারে বেড়িয়ে এল, এমনকি একদিন বাবা দুপুরবেলা ওদের
সবাইকে নিয়ে ফারানি গ্রামের বিখ্যাত মেলাও দেখিয়ে আনল।
তিনদিন নিরুপদ্রব কাটল। চার দিনের
দিন সকালে বাবা গাড়ি ধুতে গিয়ে মহা বিপদে পড়ল। হনুমানেরা এসেছে। প্রায়
চার পাঁচ জন ধাড়ি হনুমান গাড়ির ছাদে, ইঞ্জিনের বনেটে নানা ভঙ্গীতে শুয়ে আছে। আর
ছানাটা চতুর্দিকে লাফিয়ে বেড়াচ্ছে, বাইরের আয়নাটা ধরে দোল খাচ্ছে, আর আয়নায় নিজের
ছায়া দেখে চমকে চমকে উঠছে। অনেক ভেবেচিন্তে বাবা দোতলার বারান্দা থেকে পাইপে করে
পিচকিরির মত জল আকাশে ছিটিয়ে হনুমানদের গায়ে বৃষ্টি নামাল, তবে তারা গেল।
তার পর থেকে হনুমানরা যখনই আসে,
গাড়িটা তাদের খেলনা হয়ে যায়! শুধু বাচ্চাটা নয়, ধাড়ি হনুমানগুলোও দরজার হাতল,
বাইরের আয়না ধরে টানাটানি, ঝোলাঝুলি করে। দু’দিনেই শিখে গেল যে পুঙ্কুর বাবা
দোতলার বারান্দা থেকে পাইপে করে বৃষ্টি বানায় – তাই আর ভয় পায় না, বরং গায়ে জল
পড়লে বারান্দায় দাঁড়ান বাবার দিকে দাঁত খিঁচিয়ে তেড়ে যায়। হনুমানরা চলে গেলে বাবা
গাড়ির গায়ে আরও একটা নখের দাগ রং চটিয়ে দিয়েছে দেখে মুষড়ে পড়ে, আর বলে, “কি আর
করা, হনুমানের পাড়ায় গাড়ি কিনেছি...”
শেষে যে দিন পাঁচিলের ওপর থেকে লাফ
মেরে ধাড়ি হনুমানটা দমাস্ করে বাইরের আয়নাটার ওপর পড়ল, আর মটাস শব্দ করে আয়নাটা ঘাড়
ভাঙা ফুলগাছের মত ঝুলে রইল, পুঙ্কু আর ওর দিদি দু’ বোনে
একসঙ্গে ভ্যাঁ-ভ্যাঁ করে কাঁদতে শুরু করল, সে দিন বাধ্য হয়ে বাবা একটা গাড়ি-ঢাকা
কিনল। ভারি তেরপলে তৈরি, ফিনফিনে প্লাস্টিক নয়। বলল, “প্লাস্টিকের ঢাকনাগুলো পাতলা। হনুমানগুলো
ছিঁড়ে ফেলবে সহজে।”
*
ঢাকনা কেনার পর বেশ কয়েক দিন হনুমানরা আর ওদের দিকে আসেনি।
ওরা খবর পায়, পশ্চিমপাড়ায়, সাইমনপল্লীতে, কলেজবাগানে ঘুরে বেড়াচ্ছে হনুমানের দল।
দিদি এসে বলে একদিন ইশকুলের মাঠে হনুমানগুলো এসেছিল। সে দিন ওদের ক্লাস পণ্ড!
পুঙ্কু এখনও ইশকুল যায় না, ওর মন খারাপ করে – আগামী বছরের আগে ও ইশকুলে হনুমান
দেখতে পাবে না।
কিন্তু বেশি দিন গেল না, এক দিন
ভোরবেলা বাবার গান শুরু হবার আগেই পুঙ্কুর ঘুম ভেঙে গেল হনুমানদের লাফালাফি
দাপাদাপিতে। ঘুম চোখে দোতলার বারান্দায় বেরিয়ে দেখে সে এক হইহই কাণ্ড রইরই
ব্যাপার। আলো তখনও ফোটেনি ভাল করে, হনুমানগুলো ওদের আমগাছ থেকে এক এক করে পাশের
বাড়ির গুদামঘরের অ্যাজবেসটসের ছাদে লাফাচ্ছে, এক এক করে আবার গাছে ফিরছে, আবার
লাফাচ্ছে। দড়াম দড়াম করে শব্দ হচ্ছে, পাড়া শুদ্ধু লোক জেগে উঠেছে, পাশের বাড়ির
দামুবাবু চেঁচাচ্ছে, “সুবীর, সুবীররে, চকোলেট বোম লইয়া আয়, এক্কেরে দফা রফা কইরা
রাখব দেহি আজ!”
সবাই জেগে উঠেছে, বাবা, মা, দিদি।
সূর্য উঠতে আর বেশি দেরী নেই, পূবের আকাশ গোলাপি থেকে লাল হচ্ছে। হঠাৎ পুঙ্কুর নজর
পড়ল গাড়িটার দিকে। বাচ্চা হনুমানটা তেরপলের গাড়ি-ঢাকাটা টেনে তোলার চেষ্টা করছে,
ঢাকনার নিচে গাড়িটাকে দেখার চেষ্টা করছে।
“তবেরে পাজি!” বলে পুঙ্কু এক দৌড়ে
নিচে নেমে গেল। কাজের মাসি ততোক্ষণে বাইরের দরজা খুলেছে হনুমানের হট্টগোলে। কেউ
কিছু বোঝার আগে পুঙ্কু বেরিয়ে গিয়ে সটান হনুমানের বাচ্চাটার হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়ে
ঢাকনাটা আবার নিচে নামিয়ে দিল।
বাচ্চাটার গায়ে এত জোর ছিল না যে ও
পুরো ঢাকনাটা সরাতে পারবে। হয়ত ধাড়ি হনুমানগুলোও পারত না। অনেকক্ষণ টানাটানি করে
বাচ্চাটা একটুখানি তেরপলই সরাতে পেরেছিল। হাত ফসকে সেটা বেরিয়ে যাওয়াতে বাচ্চাটা
ভয়ানক রেগে গাড়ির ছাদে বসে বসেই পুঙ্কুর দিকে তাকিয়ে “চ্যাঁ” বলে চেঁচিয়ে দাঁত
দেখাল।
তাতে পুঙ্কু ডরায় না। পুঙ্কু জানে
ওর আর হনুমানের মধ্যে একটা বন্ধুত্ব আছে। মা-বাবা তো সারাক্ষণ বলে। ও-ও বাচ্চা
হনুমানটার মত দাঁত বের করে “চ্যাঁ”, বলে চেঁচাল।
দরজা থেকে কাজের মাসি ডাকছে, ওপরের
বারান্দা থেকে বাবা আর দিদি ডাকছে, মা “পুঙ্কু, পুঙ্কু,” ডাকতে ডাকতে সিঁড়ি দিয়ে
নামছে – আর পুঙ্কু আর হনুমানের ছানা দুজনে দুজনের দিকে তাকিয়ে দাঁত খিঁচিয়ে
চ্যাঁ-চ্যাঁ করে ভয় দেখাচ্ছে, এমন সময় আর এক কাণ্ড ঘটল।
পাশের বাড়ির দামুবাবু সুবীরের হাত
থেকে চকোলেট বোমা নিয়ে সলতেতে আগুন দিয়ে যেমনই গুদামঘরের দিকে ছুঁড়েছেন, নিজেরই
বারান্দার ছাদ থেকে ঝোলান ফুলের টবে লেগে সেই বোমা ঘুরতে ঘুরতে এসে পড়েছে পুঙ্কুদের
গাড়ির ছাদে। টং শব্দ শুনে চমকে হনুমানের বাচ্চাটা যেমনই পেছন ফিরেছে, ওমনি দড়াম
করে পটকা ফেটেছে!
সেই শব্দে ভয় পেয়ে পরিত্রাহী
চিৎকার করে লাফিয়ে উঠে হনুমানের বাচ্চাটা পা ফসকে এক্কেবারে পুঙ্কুর মাথায়! পুঙ্কু
সে ধাক্কায় মাটিতে চিৎপাত! বাচ্চাটা চেঁচাতে চেঁচাতে পুঙ্কুদের আমগাছের মগডালে,
বাচ্চার কান্নার শব্দে ভয় পেয়ে, রাগ করে হনুমানের দল হইহই করে অ্যাসবেসটসের ছাদ
ফেলে আম গাছে বাচ্চার কাছে হাজির! মা হনুমান বাচ্চাটাকে কোলে নিয়ে লাফিয়ে কোথায়
চলে গেল, আর দেখতে দেখতে হনুমানের দলও পেছন পেছন হাওয়া হয়ে গেল।
ততোক্ষণে পুঙ্কুর মাও ছুটে এসে
পুঙ্কুকে কোলে নিয়ে বাড়িতে নিয়ে গেছে। পুঙ্কুর কপালে, গালে হনুমানের ছানার নখের
দাগ, তাতে বিন্দু বিন্দু রক্ত; জামায়, ফ্রকে, মাথার চুলে ধুলো কাদা, গাল বেয়ে চোখের
জলের ধারা, গলা দিয়ে তারস্বরে কান্না! মা অনেক গায়ে-হাতে-মাথায় হাত বুলিয়ে, দু
হাতে দুটো ক্যাডবেরি চকলেট দিয়ে কান্না থামাল বটে, কিন্তু দশ মিনিটের মধ্যেই
ডাক্তারকাকু এসে ছুঁচ বের করে প্যাঁট করে টিটেনাস ইঞ্জেকশন দিয়ে সেই থেমে যাওয়া
কান্না আবার শুরু করে দিল।
*
কয়েকদিন কেটে গেছে। হনুমানের দল
এখনও ফিরে আসেনি। কিন্তু গাড়ির জন্য গ্যারেজ তৈরি শুরু হয়েছে। পুঙ্কুর বাবা
মিস্তিরিদের বলে দিয়েছে, “হনুমানের দল আসলে তোমাদের খন্তা, গামলা, সিমেন্টের
দায়িত্ব বাপু তোমাদেরই...”
লঙ্কা বাগানটা এখন আর
নেই। পুঙ্কুর মা ভাবছেবাড়ির পেছনে করা যায় কি না, কিন্তু ওখানেও জায়গা কই?
আর...
বাজারের লঙ্কাওয়ালারা
এখন খুব খুশী!
No comments:
Post a Comment