মামাবাড়ি পৌঁছতে সন্ধে হয়ে গেল। প্রথমেই ট্রেন লেট, তারপরে এমন মেঘ করল, যে বিকেল সাড়ে তিনটেতেই মনে হচ্ছিল সন্ধে হয়ে গেছে। তারপরে বৃষ্টি। এরকম বৃষ্টি টাপলু জীবনে দেখেনি। চারিদিক সাদা হয়ে গেল। ট্রেন থেমে গেল। একটা নাম-না-জানা স্টেশনে এক ঘণ্টা দাঁড়িয়ে সময় নষ্ট করে শেষ পর্যন্ত যখন তিন্তিড়িতে পৌঁছল, ততক্ষণে সত্যিই সন্ধে হয়ে গেছে। ভাগ্যিস এদিকে বৃষ্টি হয়নি! আর ভাগ্যিস মামা গাড়িটা পাঠিয়েছিল! সেই জিপের মতো মস্তো পুরোনো গাড়িটা – যেটাকে মা স্টেশন ওয়াগন বলে – চড়ে ওরা গ্রামের রাস্তা দিয়ে আস্তে আস্তে যতক্ষণে মামাবাড়ি পৌঁছল, ততক্ষণে পশ্চিম আকাশের শেষ লালচে আভাটাও মিলিয়ে গেছে।
ড্রাইভার কেরামৎ আলি আর গোবিন্দদার বড়ো ছেলেটা মালপত্তর নামিয়ে দোতলায় নিয়ে যাবার আগেই দিদিমার সঙ্গে খাবার ঘরে গিয়ে টাপলু আর টুপলু হাত মুখ ধুয়ে লুচি আর আলুর দম খাচ্ছে। দিদিমা খাবার ব্যাপারে সময় নষ্ট করে না। ওরা খেতে খেতেই সন্টুদা নেমে এল ওপর থেকে। বলল, “এত দেরি করে এলি! দুপুরে আসলে তোদের নিয়ে গ্রামটা ঘুরে আসতাম।”
দিদিমা বলল, “হবে’খন। ওরা তো আছে দু হপ্তা।”
সন্টুদা হাত পা নেড়ে বলল, “আরে দু হপ্তা একটা সময় হলো? এত তাড়াতাড়ি ফিরবি কেন? দাঁড়া, আমি পিসিকে বলছি...” বলে আবার বেরিয়ে গেল।
টাপলু আর টুপলু জানে, মা-কে বলে কোনও লাভ হবে না। যদিও স্কুলে এখন ছুটি, অনলাইন ক্লাসও বন্ধ, কিন্তু মা-বাবার ছুটি নেই। বাবা তো হাসপাতাল ছেড়ে আসতেই পারবে না বলে দিয়েছে – কোভিড হাসপাতালের ডাক্তারের আবার ছুটি কী? আর মা-ও অতি কষ্টে দু-সপ্তাহ ম্যানেজ করে মামাবাড়ি এসেছে।
যেমন ভেবেছিল, একটু পরেই ফিরে এল সন্টুদা। ব্যাজার মুখে বলল, “পিসি বলছে, হবে না। দু-সপ্তাহেই ফিরতে হবে। এমনিতেই বসের সাথে ঝগড়া করে আসতে হয়েছে।”
ভাই-বোন খেয়ে উঠে সন্টুদার সঙ্গে দোতলায় গেল। সন্টুদার সঙ্গে ভাব অবশ্য টাপলুরই বেশি। টুপলু অনেকটাই ছোটো। দুই দাদার সঙ্গে পেরে ওঠে না। আর ওর দৌড়োদৌড়ি, গাছে চড়া, পুকুরে সাঁতার কাটায় মন নেই। তাই মামীমার সঙ্গেই থাকে বেশি। তার একটা কারণ অবশ্য মামীমার পুতুলগুলো। মামীমা পুতুল জমায়, আর মামাবাড়ি এসেই টুপলু সেগুলো নিয়ে খেলা করে।
আজও তার অন্যথা হলো না। একটু পরেই মামীমা নিচ থেকে উঠে এসে টুপলুকে ডেকে নিয়ে গেল নিজের ঘরে। সন্টুদা নতুন বইগুলো দেখাল। তারপরে বলল, “সারাদিন বই নিয়ে বসে থাকলে চলবে না। আমি যখন ঘুমোব, আর পড়াশোনা করব, কেবল তখনই বই পড়তে পারবি।”
মামা পড়াশোনার ব্যাপারে খুব কড়া। যেমন সন্টুদাকে অনেক গল্পের বই কিনে দেয়, তেমনই রোজ পড়াশোনার ব্যাপারেও একেবারে ফাঁকি দিতে দেয় না। মা’র সঙ্গে মামার এ ব্যাপারে তর্ক হয়। মামা বলে, “চুন্নু, সন্টু হলো ডানপিটের চূড়ামণি। ছেড়ে দিলে, গাঁয়ের ছেলেগুলোর সঙ্গে শুধু বাগানে বাগানে ঘুরবে, ফল পেড়ে খাবে, আর নদীতে মাছ ধরবে। রোজ নিয়ম করে পড়াশোনা করে ওসব করুক – আমার আপত্তি নেই।”
কথাটা ঠিক। সন্টুদা ভীষণ ডানপিটে। এক মুহূর্ত চুপ করে থাকতে পারে না। সারাক্ষণ কিছু করছে – আর যদি অল্প সময়ের জন্যও নজরদারি না করা হয় – ওমনি যেটা করে তাকে বড়োরা বলে দুষ্টুমি। কখন গাছে উঠে পাখির বাসা থেকে ডিম নিয়ে আসে, কখন পুকুরে নেমে খাপলা জাল দিয়ে মাছ ধরার চেষ্টা করে – একবার তো নাকি বন্ধুদের সঙ্গে বাজি ধরে মামাবাড়ির দেওয়াল বেয়ে উঠতে চেষ্টা করেছিল ছাদ অবধি। মাঝপথে, একতলা পার করতে না করতে গেছিল আটকে। বেগতিক দেখে বন্ধুরাও পালিয়েছিল। সন্টুদা তখন সবে ভাবছিল এবারে লাফ মেরে নিচে পড়বে, এমন সময়ে ভাগ্যিস কেরামৎ ভাই দেখতে পেয়েছিল! ছাদ থেকে দড়ি ফেলে সন্টুদাকে উদ্ধার করা হয়। তাতে কি সন্টুদার শিক্ষা হয়েছে? বন্ধুরা দূর থেকে মোবাইলে ছবি তুলেছিল, সন্টুদা সেটা সবাইকে দেখিয়ে জিজ্ঞেস করেছিল তেনজিং নোরগের মতো লাগছে কি না?
শুধু দুষ্টুমি করা নয়, অন্যকেও দুষ্টুমির শিকার বানানোয় সন্টুদার জুড়ি নেই। টাপলু নিজেই কতবার সন্টুদার কথায় নেচে আপশোস করেছে। সেই তো, যেবার সন্টুদা বলেছিল, ধানগাছের খড় দিয়ে দরজা বানানো হয়, ওরা বিশ্বাস করেনি, কিন্তু সন্টুদা এমনভাবে বলেছিল যে দুই ভাইবোন সন্টুদার তত্ত্বাবধানে দু-আঁটি খড় টেনে টেনে নিয়ে গেছিল বাড়ির ছাদে – কাঠ বানানোর জন্য। রোজ সকাল-দুপুর জল দিত, আর রোদে ফেলে রাখত। দুদিন, চারদিন, দশদিন... একদিন সকালে মামা দেখেছিল সিঁড়িতে জল... সেই দেখে, “এখানে কে জল ফেলেছে রে...?” বলে গোয়েন্দাগিরি করে ছাদে পৌঁছে গেছিল। তারপরে, “আরে, ছাদে কে দু আঁটি খড় ভিজিয়ে পচাচ্ছে?” হাঁক-ডাকে সবাই জানতে পারল কী হয়েছে। তিন ভাইবোনই বকা খেল, কিন্তু সন্টুদা বেশি – একে বড়ো, তায় ওরই বদবুদ্ধি – তাই। তাতে অবশ্য সন্টুদার কিছুই হয়নি। বরং বলে দিল, “কেন, তুমিই তো বলেছিলে – ওদের যদি বলা হয় ধানগাছের পাটা দিয়ে দরজার পাল্লা তৈরি হয় – ওরা বিশ্বাস করবে। তাই শেখাচ্ছিলাম।” শুনে মামার দিকে মা চোখ পাকিয়ে তাকিয়েছিল, আর মামা-মামীর মুখ লাল!
টুপলু চলে যাবার পরেই সন্টুদা মুখ খুলল।
“গ্রামে একটা নতুন সমস্যা দেখা দিয়েছে জানিস?”
টাপলু জানে না। জানবেই বা কী করে? ওরা কি গ্রামে থাকে নাকি?
সন্টুদা কাছে ঘনিয়ে বসল। বলল, “রাত্তিরে গ্রামের সব ধানক্ষেতে কী সব দেখা যাচ্ছে।”
নিজের বাড়িতে টাপলুর কিছু হয় না, কিন্তু মামাবাড়ির বিশাল জানলার বাইরে ঘুটঘুটে অন্ধকার। বুক দুরদুর করে উঠল। “কী দেখা যাচ্ছে মানে? কী রকম জিনিস?”
গলাটা আরও নামিয়ে এনে সন্টুদা বলল, “জিনিস, না কী, কেউ জানে না। তবে অন্ধকারে মনে হয় সাদা ধোঁয়ায় তৈরি...” এদিক ওদিক তাকিয়ে সন্টুদা বলল, “মানুষের মতো...”
টাপলুর হাতে সন্টুদার ‘নিশুত রাতের হাহাকার’! মলাটের ছবিটার দিকে তাকিয়ে তাড়াতাড়ি নামিয়ে রাখল টাপলু। বলল, “মানে মানুষ না?”
“মানুষ তো না-ই।” মাথা নাড়ল সন্টুদা। “আর একটা নয়, অজস্র। কিছু দূরে দূরে... অনেকটা জম্বির মতো।”
মাথা নাড়ল টাপলু। জম্বি না। নেটফ্লিক্স আর অ্যামাজন প্রাইমের কল্যাণে ও জেনে গেছে যে জম্বিরা কেবল রাতে আসে না, দিনেও আসে – যদিও সিনেমায় ওদের রাতেই আক্রমণ করতে দেখা যায়। বাবা বলে, সে কেবল ভয় দেখাতে। আবার কোন কোরিয়ান সিরিয়ালে জম্বিরা শুধু রাতেই আক্রমণ করে বলে স্কুলের বন্ধু অমিতেন্দু বলেছিল – কিন্তু সেটা টাপলু এখনও দেখেনি।
বলল, “জম্বি হলে দিনেও দেখা যেত...”
একটু থমকাল সন্টুদা। তারপরে বলল, “যতটুকু জানা আছে ততটাই বললাম। আজকাল তো মানুষ রাতে বেরোনো বন্ধ করে দিয়েছে। তাই কেউ ভালো করে কিছু জানে না।”
টাপলুর গলাটা শুকিয়ে গিয়েছে। মামাবাড়ির বাগানের পাঁচিলের ওপারেই ধানক্ষেত। বলল, “তুমি দেখেছ?”
মাথা নাড়ল সন্টুদা। বলল, “নাঃ, তবে জানি রহস্যটা আমাকেই সমাধান করতে হবে। বড়োদের দ্বারা হবে না। অপেক্ষা করছিলাম – তুই কবে আসবি...”
চমকে উঠল টাপলু। “আমার জন্য অপেক্ষা করছিলে? কেন?”
সন্টুদা মাটিতে পাতা জাজিমে শুয়ে পড়ে বলল, “সাহস পাই। একা একা রাত্তিরে কে যাবে খুঁজতে – জম্বি না পিশাচ, কী কে জানে!”
টাপলুর কান মাথা বেয়ে একটা অদ্ভুত অনুভূতি। সন্টুদা ওর হিরো। সেই সন্টুদা কি না ওর জন্য অপেক্ষা করছিল সাহসের জন্য? ভাবা যায়! নিজেকে একটু বাহাদুর মনে হতে শুরু হলো। বলল, “কতদিন হয়েছে?”
সন্টুদা পাশ ফিরে কনুই থেকে হাত তুলে হাতের ওপরে মাথাটা রেখে বলল, “বেশিদিন না। এই তো তোরা আসবি বলে পিসি ফোন করল – তার দিন কয়েক আগে থেকে। সেই থেকে ব্যাপারটার দিকে নজর রাখছি। ঠিক করেছি তুই এলেই যাব – আজ রাতে যাবি তো?”
আজ রাতে? টাপলুর মুখটা আবার শুকনো লাগতে লেগেছে। সন্টুদা বলল, “আরে ভয়ের কিছু নেই। আমি থাকব।”
তা বটে... কী আর বলবে টাপলু, ঘাড় কাত করল। কিন্তু কথাটা আর এগোল না, বাইরে গুম-গুম শব্দ করে মামার মোটোরবাইক এসে দাঁড়াল, আর টুপলু পাশের ঘর থেকে, “গদাম এসেছে, গদাম এসেছে, দাদা, চল, নিচে চল...” বলে চলে এল। মামার ভারি বড়ো মোটোরসাইকেলের শব্দটার ছোটোবেলায় টুপলু নাম দিয়েছিল ‘গদাম’ আর সেই থেকে মামাকেও গদাম বলেই ডাকে।
টুপলুর পেছনে পেছনে দু-ভাইও গেল।
“দেখিস, বড়োরা যেন জানতে না পারে...” বলেছিল সন্টুদা। বড়োরা জানতে পেলে যেতেই দেবে না। আর সেইজন্যই টুপলুকেও জানানো যাবে না। টুপলু যত বড়ো হচ্ছে, তত ভয়ডর কমে যাচ্ছে। মা বলে আর কিছুদিনের মধ্যে সন্টুদার মতোই ডাকাবুকো হয়ে উঠবে। ফলে জানতে পারলে ওকে সঙ্গে নিতে হবে। তার দুটো – না, তিনটে সমস্যা। এক, যেখানে বিপদ বুঝে টাপলু পিছু হটবে, সেখানে টুপলু এগিয়ে যাবে। দুই, টুপলু ওদের চেয়ে ছোটো এবং খানিকটা বেঁটেও। দৌড়ে ওদের সঙ্গে পেরে ওঠে না – ফলে বিপদ হতে পারে। এবং – যেটা সন্টুদার মতে সবচেয়ে বড়ো সমস্যা, টুপলু মা-র সঙ্গেই শোয়। টাপলু আর সন্টুদার মতো সন্টুদার ঘরে শোয় না। আর মা-র ঘুম খুব পাতলা (“মনে আছে? সেই রাত্তিরবেলা ড্রেসিং টেবিলে ইঁদুর উঠেছিল, আর লিপস্টিক পড়ে যাবার শব্দে পিসির ঘুম ভেঙে গেছিল!”)।
টুপলুকে বলা যাবে না। ও যেতে চাইবে, আর যদি বোঝে ওর পক্ষে যাওয়া সম্ভব না, তাহলে দাদাদেরও যেতে দেবে না। বড়োদের বলে দিয়ে ব্যাগড়া দেবে। সেই দু-বছর আগে ওরা প্ল্যান করেছিল নুটুর বিলে নৌকা চালাতে যাবে – সেটা জানতে পেরে মা-কে বলে দিয়ে গোটা ব্যাপারটাই কেঁচিয়ে দিয়েছিল। সন্টুদা রেগে বলেছিল, “ভাগ্যিস আমার বোন নেই...” আর টুপলু বলেছিল, “বোন বলে বাদ দিলে ওরকমই হবে...” সে এক ঝগড়া হয়েছিল বটে।
শুতে যাবার সময় সন্টুদা মোবাইলে রাত দুটোয় অ্যালার্ম দিল। নইলে ঘুম ভাঙবে না।
সন্টুদার ঘরটা বিশাল। খাটটাও। ঠাণ্ডার জন্য গোবিন্দদা সব জানলা বন্ধ করে ভারি পর্দা টেনে দিয়েছে। বাইরেটা দেখা যাচ্ছে না।
সন্টুদার ঘুমিয়ে পড়তে দেরি হলো না। কিন্তু টাপলুর আর ঘুম আসে না। সারা দিনের ট্রেন যাত্রা, গাড়িতে করে মামাবাড়ি আসার ক্লান্তি সত্ত্বেও উত্তেজনায় একবার এপাশ, একবার ওপাশ করতে থাকল। বাগানের বাইরের ক্ষেতেই কি জম্বিরা ঘুরে বেড়ায়? না কি দূরে যেতে হবে? আগে খেয়াল হলে জিজ্ঞেস করে নিত সন্টুদাকে।
বেশ খানিকক্ষণ উশখুশ করে টাপলুর যখন মনে হচ্ছে, আর ঘুম হবে না, তার চেয়ে বরং অ্যালার্ম বাজা অবধি বই পড়া যাক, তখনই দেখল সন্টুদা ওকে ধাক্কা দিচ্ছে, আর ফিশফিশ করে বলছে, “ওরে, ওঠ, ওঠ, আচ্ছা ছেলে যা হোক। কতক্ষণ ধরে ধাক্কাচ্ছি!”
আরে, ঘুমিয়ে পড়েছিল? কখন? চট করে চোখ কচলে উঠে বসল টাপলু। সন্টুদার বুদ্ধিতে খাটের পাশেই দুজনের বাইরের পোশাক রাখা ছিল – চটপট প্যান্ট-শার্ট-সোয়েটার পরে নিল দুজনে। পায়ে স্নিকার গলিয়ে দরজা খুলে সন্টুদা আস্তে আস্তে উঁকি দিল। ডাইনে বাঁয়ে কেউ কোথাও নেই। ঘাড় ফিরিয়ে টাপলুকে মুখে আঙুল দিয়ে চুপ থাকতে বলে বেরিয়ে গেল। টাপলুও পেছনে পেছনে বেরিয়ে আস্তে আস্তে দরজাটা টেনে লাগিয়ে দিল যেন ফাঁক না থাকে। অবশ্য বিছানায় তখন কম্বলের তলায় দুটো পাশবালিশ লম্বা করে শুয়ে আছে – দেখে মনে হচ্ছে দুটো ছেলে ঘুমোচ্ছে অকাতরে।
সিঁড়িতে পৌঁছে সন্টুদা ওপরে উঠতে লাগল। টাপলু অবাক – কিন্তু এখন কথা বলার উপায় নেই। চুপচাপ থাকতে হবে। ছাদে উঠে জানতে চাইল, “এখানে কেন এলে?”
নিচু গলায় সন্টুদা বলল, “বাইরের দরজা বন্ধ। অতবড়ো দরজার হুড়কো, ছিটকিনি খুলতে গেলে শব্দ হবে। ওখানেই গোবিন্দদা শোয়। এদিকে আয়...”
ছাদের পাঁচিলে একটা নিচু গেট – বন্ধ, কিন্তু টপকাতে দেরি হলো না। একটা লোহার ঘোরান সিঁড়ি নেমে গেছে। টাপলু জানে আগেকার দিনে প্রায় সব বাড়িতেই এরকম সিঁড়ি থাকত কাজের লোকেদের ওঠানামার জন্য।
“সাবধানে নামবি। এই সিঁড়ির পাশেই মা-বাবার ঘর। শব্দ হলে উঠে যাবে।”
ফিশফিশিয়ে বলে প্রায় নিঃশব্দে সন্টুদা নেমে গেল ঘোরানো সিঁড়ি দিয়ে। টাপলুও পা টিপে টিপে পেছনে পেছনে। নিচে নেমে সন্টুদা প্রায় দৌড়ে চলে গেল একটু দূরে নিমগাছটার নিচে। পেছন পেছন টাপলু। টাপলুর বুকের মধ্যে ধুম ধুম শব্দ হচ্ছে প্রায় মামার মোটোরসাইকেলের মতো। পৌঁছন-মাত্র ওকে হাত ধরে টেনে গাছের আড়ালে এনে সন্টুদা বলল, “গেট থেকে নেয়ামৎ ভাই তাকালেই দেখতে পাবে। অবশ্য এখন ঘুমোচ্ছে। ঘরে আলো নেই। কিছুক্ষণ পরে পরে উঠে সারা বাগান ঘুরে বেড়ায়। তখন ঘরে আলো জ্বলে।”
দারোয়ান নেয়ামৎ আলির সাড়া পাওয়া গেল না। “এদিকে আয়,” বলে সন্টুদা হাঁটা দিল খিড়কির দরজার দিকে। দরজাটা সবসময়ই বন্ধ থাকে, কিন্তু সন্টুদা মামার চাবির গোছা থেকে চাবিটা খুলে নিয়ে রেখেছে। তালা খুলতে সময় লাগল না।
খিড়কির গেটটা খোলাই রইল, সন্টুদা বলল, “নেয়ামৎ আসলে দেখতে পাবে, কিন্তু কিছু করার নেই। চ’...”
সন্ধে থেকে না করা প্রশ্নটা জিজ্ঞেস করেই ফেলল টাপলু। “কতদূর?”
“গেট থেকে সরে আয়।”
একটু দূরেই রাস্তার ধারে একটা মস্তো কৃষ্ণচূড়া গাছের আড়ালে গিয়ে দাঁড়াল দুজন। ওপারেই ধানক্ষেত।
“দেখতে পাচ্ছিস কিছু?”
জোর করে বুকের ধড়ফড়ানি কমানোর চেষ্টা করে তাকাল টাপলু। আকাশে মেঘ নেই। চাঁদ রয়েছে আধখানার কিছু বেশি। বেশ আলো আছে। কিন্তু – ধানক্ষেতে তো কিছু নেই, কেউ নেই...
“এগুলো ধানক্ষেত নয়,” ফিশফিশ করে বলল সন্টুদা। “সামনের ক্ষেতটায় আর ফসল নেই। দূরেরটাতেও ধান নয় – ওগুলো পালং শাক।”
অত বোঝে না টাপলু। হয়ত সন্টুদা গল্প বানাচ্ছে, হয়ত নয়, কিন্তু ক্ষেত দেখাতে তো আনেনি ওকে – কোথায় সেই জম্বি!
সন্টুদা বলল, “আয়।”
বলে অপেক্ষা না করে রাস্তা পেরিয়ে চলে গেল।
টাপলুর এখন ভয় করছে রীতিমত। রাস্তার ওপারে একটা ঝোপের আড়াল থেকে উঁকি মেরে দেখছে সন্টুদা। ওর পাশে পৌঁছন মাত্র বলল, “চুপ, ওই দেখ।”
টাপলুর তখন হাত পা পেটের ভেতরে ঢুকে যাবার জোগাড়। কোনও রকমে গুঁড়ি মেরে সন্টুদার পাশ থেকে ঝোপের ওপর দিয়ে উঁকি মেরে যা দেখল তাতে মনে হলো এক্ষুনি অজ্ঞান হয়ে যাবে।
বেশি দূরে না, হাত দশেকও না। সাদা মূর্তিটা হাওয়ায় ভেসে ভেসে হাত পা নেড়ে ওদের দিকেই এগিয়ে আসছে!
পেছন ফিরতে গিয়ে আটকে গেল। সন্টুদা হাতটা ধরে রেখেছে। শক্ত করে।
“চুপ। শব্দ করিস না। কটা আছে? আমি পাঁচটা দেখতে পাচ্ছি।”
তাই তো! একটু পেছনেই আর একটা। আর একটু দূরে আরও একটা। সবাই একই রকম – সাদা! আর হাত পা নেড়ে এগোচ্ছে! কিন্তু পাঁচটা?
কথাটা সন্টুদাকে বলতে গিয়ে থমকে গেল টাপলু। ওর বাঁ হাত ধরা ছিল সন্টুদার হাতে। এখন আর নেই। এক মুহূর্ত মাথা ঘুরিয়ে দেখল পাশে কেউ নেই। কোথায় গেল সন্টুদা? আবার সামনে তাকিয়ে সামনের সাদা মূর্তিটা মনে হলো একেবারে কাছে এসে গিয়েছে...
আর দাঁড়াল না টাপলু। প্রাণপণে দৌড়ল খিড়কির দরজার দিকে। ভাগ্যিস বেশি দূরে যায়নি! রাস্তা পেরিয়েই কৃষ্ণচূড়া গাছটা, আর তারপরেই খিড়কির দরজা। খোলাই রয়েছে এখনও। ছুটল বাড়ির দিকে। আর দু-পা যেতে না যেতেই একটা গাছের শিকড় না কিসে পা আটকে হুমড়ি খেয়ে পড়ল।
খুব জোরে পড়েছে টাপলু। হাতে, হাঁটুতে, কাঁধে খুব লেগেছে। ব্যথায় কিছুক্ষণের জন্য অসাড় হয়ে গেছিল। তারপরে সম্বিৎ ফিরতেই দেখল একটা সাদা, বিশাল চেহারা ওর সামনেই। যত জোরে পারে চিৎকার করে উঠল টাপলু, “বাঁচাও, বাঁচাও! সন্টুদা, সন্টুদা, মামা, মা...”
সাদা পোশাক পরা নেয়ামৎ ভাই টর্চ জ্বেলে বলল, “কী হলো, টাপলুদা? এত রাতে তুমি বাগানে কী করছ?”
তারপরে কেরামৎ ভাই, তারপরে গোবিন্দদা, আর তারপরে মা আর মামা... এত রাতে দুই ভাই বাগানে কী করছিল? খিড়কির দরজা খোলা কেন?
কোনও রকমে টাপলু বলল, “মাঠে... সাদা সাদা জম্বি উড়ে উড়ে বেড়াচ্ছে...”
মামার নাক থেকে কেমন ঘোঁৎ করে শব্দ বেরোল। টাপলুকে আর কিছু না বলে সন্টুদার দিকে হাত বাড়িয়ে বলল, “চাবিটা দে। এই সব যে করিস, কী হতে পারে একবারও ভেবে দেখিস? এখন ওর যদি হাড়-গোড় ভাঙত? মাথা ফাটত?” সন্টুদা বকুনি খেলে কথা বলে না তখুনি, তাই বিনা বাক্যব্যয়ে পকেট থেকে চাবিটা বের করে দিয়ে দিল। মামা ওটা কেরামতের হাতে দিয়ে বলল, “তালাটা লাগিয়ে দে।” তারপরে হাঁটা দিল বাড়ির দিকে।
সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে টাপলু শুনল মামা মা-কে বলছে, “একটা ডাক্তারের ছেলে হয়ে... চল, এখন জল গরম করে কাটা ছেঁড়াগুলো পরিষ্কার কর। মনে হয় হাঁটুতেই বেশি কেটেছে, বাকিগুলো তেমন কিছু না।”
ডাক্তারের ছেলে কেন বলল? ডাক্তারের ছেলেরা ভয় পায় না? কিন্তু মাঠে ওগুলো কী ছিল? একবার ভাবল সন্টুদাকে জিজ্ঞেস করে। তারপরে রাগ হলো। কিছু বলল না।
পরদিন সকালে টাপলুর ঘুম ভাঙল মামা-র ডাকাডাকিতে। পাশে সন্টুদারও ঘুম ভাঙছে। মামা খুব হাসছে। বলল, “দেখি, হাঁটুটার কী অবস্থা? বেশ, ঠিকই আছে দেখছি... নে, ওঠ, সোয়েটার পর, জুতো পর – চল দেখি... কোথায় তোর জম্বি...”
সন্টুদাও সটান উঠে বসে হাসতে শুরু করেছে। বলল, “বাবা গো, মা গো, মামা গো... বলে টাপলুর কী কান্না!”
টাপলু বুঝতে পারছে আবার সন্টুদার চালাকির শিকার হয়েছে। সন্টুদার হাতে একটা ঘুঁষি মেরে বলল, “কোথায় হারিয়ে গেছিলে?”
সন্টুদা জুতো পরতে পরতে হাসতে হাসতে বলল, “হারাব কেন? ওখানেই লুকিয়ে দেখছিলাম তুই জম্বি দেখে কী করিস...”
এবার সদর দরজা দিয়েই বেরিয়ে মামা আর সন্টুদার সঙ্গে খিড়কির দিকে হাঁটা। পেছনে পায়ের শব্দে দেখল মা-ও আসছে, নাইটির ওপর হাউস কোট, আর তার ওপর শাল জড়িয়ে।
সকালের বাগান হালকা কুয়াশায় ঢাকা, পায়ের নিচে ঘাস শিশির-ভেজা। মামা তালা খুলে দরজা ফাঁক করে বেরিয়ে বলল, “দেখা তো, কোথায় তোর জম্বি?”
পাশে সন্টুদা হিহি করে হেসেই চলেছে। ওর দিকে কটমট করে তাকিয়ে রাস্তার ওপারের ঝোপটা দেখিয়ে টাপলু বলল, “ওই ঝোপের ওপারে...”
মামা বলল, “চল, দেখাবি।”
এখন কি আর আছে? কিন্তু সন্টুদা যখন চালাকি করেছে, তখন কিছু একটা থাকতেই পারে। রাস্তা পেরিয়ে ওপারে গিয়ে ঝোপের ওপর দিয়ে তাকিয়ে টাপলু আবার থমকে গেল। মাঠের ওপরেও কুয়াশা, কিন্তু তাও দেখা যাচ্ছে – একটা সাদা মানুষের মতো আকৃতি। এখন অবশ্য নড়ছে না। শিশিরে ভিজে ঝুলে রয়েছে দুটো হাত, দুটো পা আর একটা ঘোমটার মতো মাথা-ঢাকনি। সামনেরটাই ভালো করে দেখা যাচ্ছে, একটু দূরে দ্বিতীয়টা কুয়াশায় আবছা, আর তিন নম্বরটা দেখাই যাচ্ছে না।
পেছন থেকে মা বলল, “এটা তো কী রকম একটা পোশাকের মতো!”
এবার মামাও হেসে ফেলল। বলল, “তাই তো বলছি – তোরা একটা ডাক্তারের ছেলে, ডাক্তারের বউ – তোরা পি.পি.ই. দেখে চিনলি না? হ্যাঁ রে, তোর বাবা কোভিড হাসপাতালে কাজ করে না?”
অবাক হয়ে টাপলু বলল, “পি.পি.ই. মাঠের মধ্যে কী করছে?”
মামা
হেসে বলল, “এগুলো
ডিফেকটিভ পি.পি.ই।
ছেঁড়া, ফুটো
ছিল বলে
ব্যবহার করা যায়নি। ডিস্ট্রিক্ট
হাসপাতালে সেগুলো ফেলে দেওয়া
হচ্ছিল, চাষিরা
চেয়ে এনেছে। নিখরচায় কাকতাড়ুয়া।
আর সেই দেখেই তুই কালকে হাউ-মাউ
করে দৌড়তে গিয়ে পড়ে গেলি।
ভীতুর
ডিম কোথাকার! এখন
চল, বাবাকে
ফোন করি – হাঁটুর কাটার জন্য
টিটেনাস নিতে হবে কি না জিজ্ঞেস
করতে হবে তো?”
ফিরতে ফিরতে টাপলু ফিশফিশ করে সন্টুদাকে বলল, “দাঁড়াও, একদিন তোমাকে এমন দেখাব না, আমাকে ভয় দেখানো ঘুচে যাবে।”
সন্টুদা মুখ ভেঙচে বলল, “আরে যা, যা। জম্বি, জম্বি বলে যা দৌড়েছিলি! ভিডিও করে রাখা উচিত ছিল!”
