Sunday, December 02, 2018

পিঙ্কি


টুকটুকের একটা টেডি বেয়ার ছিল। ছোটোবেলার কাজের মাসি দিয়েছিল প্রথম জন্মদিনে। সেটা দেখে মা-বাবা একটু মুখ টিপে হেসেছিল। অমন গাঢ় গোলাপি রঙ!
অতিথিরা সবাই চলে যাবার পর বাবা বলেছিল, “দেখো, রঙ ওঠে না তো? তারপর মেয়ের মুখ থেকে পেটে যাবে।”
বাবা বলেছিল, “পেট্রলের! সরিয়ে রাখো, সরিয়ে রাখো! কী জানি কী দিয়ে তৈরি!”
মা বলেছিল, “দেখি জলে একটুখানি ধুয়ে!” কিন্তু প্লাস্টিকের প্যাকেট খুলে মা চমকে বলেছিল, “এ কী! এটা কিসের গন্ধ?”
মা আর কথা বাড়ায়নি। কিন্তু বারান্দার কাপড়-মেলার তারে টেডির দুই কানে দুই ক্লিপ দিয়ে ঝুলিয়ে রেখেছিল। তারপরে ভুলে গেছিল ওটার কথা।
মা বলেছিল, “এ বাবা! কালই আসবে, দেখতে না পেলে কী ভাববে?”
বাবা এবারে একটু রেগে বলেছিল, “ভাবুকগে! তাই বলে এটা টুকটুককে দিতে হবে না।”


*
এসব কথা অবশ্য একবছরের টুকটুক জানত না। ও তার প্যাঁকপ্যাঁকে হাঁস, টিংটিং বাজনা আর লাল নীল পুতুলে আর আরও তিনটে টেডি নিয়ে মগ্ন। এসব কথা টুকটুক এখনও জানে না। জানবে কী করে? ওর মা-বাবা ছাড়া তো কেউ জানতও না। আর মা-বাবা তো কিছুদিন পরে ভুলেই গেছিল। তাই টুকটুককে কেউ বলেওনি। তবে টেডি জানত। বলতেও পারত, কিন্তু টেডিরা কথা বলতে পারে না। তাই বলেনি। কানে ক্লিপ লাগানো অবস্থায় টেডি ওখানেই ঝুলে রইল। প্রথম দিকে একটু ভয়-ভয় করছিল। বারান্দার সামনেটা খোলা, মনে হচ্ছিল, হঠাৎ যদি ক্লিপের মুঠো থেকে হাওয়ার টানে উড়ে বেরিয়ে যায়! তারপরে ভয় করছিল কাকগুলোকে দেখে। তখন বসন্তকাল। সামনের পার্কের গাছে কাক বাসা বানাচ্ছে। এখান ওখান থেকে কাঠ, কাঠি, তারের টুকরো নিয়ে বাসা তৈরি করে, প্লাস্টিক, তুলো - এ সব নিয়ে এসে বাসায় রাখছে। আর টেডি ভয় পাচ্ছিল, ওকেও যদি টান মেরে নিয়ে যায়? কাক আসেনি অবশ্য। তবে চড়াই এসেছিল। বিশাল জোরে কিচমিচ কিচমিচ করে ওর চারপাশে কাপড়-মেলা তারে বসেছিল। টেডি ভয় পায়নি। ভেবেছিল, ওরা ওকে নিয়ে হাসাহাসি করছে। রাগ করেছিল, কিছু বলেনি। বলতেই তো পারে না। কাজের মাসি পরদিন আসেনি। তারপরে আরও দু-দিন আসেনি। মা তিন দিন কাজে যায়নি। দ্বিতীয় দিনে ওয়াশিং মেশিনে কাপড় কেচে মেলতে গিয়ে দেখতে পেল গোলাপি টেডিটা। কাছে গিয়ে নাক লাগিয়ে গন্ধ নিয়ে অবাক হয়ে বলল, “আরে! গন্ধ নেই! শুনছ?” টুকটুকের বাবা অফিস যাবার জন্য জামা পরছিল। বলল, “তাহলে উড়ে গেছে। পেট্রলের গন্ধ তো!” মা বলল, “কী করি? কাল মাসি আসবে তো।” বাবা নাক আর মুখ না খুলে ‘ঘোঁৎ’, না ‘ফোঁৎ’ কী বলে চলে গেল, মা বুঝল না। তাই ক্লিপ খুলে টেডিকে নিয়ে রেখে দিল টুকটুকের খেলনার আলমারিতে। আলমারিতে কী অন্ধকা-া-া-া-র! টেডি তো ভয়েই সারা। তার ওপর, কালো মোটা গরিলাটা যখন গাঁ-গোঁ করে নাক ডাকতে শুরু করল, টেডি তো ভয়েই অজ্ঞান হয়ে যায় আরকি! পরদিন, মা অফিস যাবার পর, দুপুরবেলা টুকটুককে খাইয়ে দাইয়ে শোয়ানোর সময়, মাসি আলমারি খুলে টকটকে গোলাপি টেডিটা বের করে দিল। নতুন খেলনা পেয়ে টুকটুক আনন্দে মাতোয়ারা, দু-হাত বাড়িয়ে বলল, “গ্নুইইইই।” তারপর টেডিকে জড়িয়ে ঘুমিয়ে পড়ল। টেডিও আবার আলোয় বেরিয়ে খুব খুশি! ও-ও ওর লোমওয়ালা ছোট্টছোট্ট দুটো হাত দিয়ে টুকটুককে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে পড়ল। সন্ধেবেলা মা ফিরে এসে কিছু বলল না, কিন্তু মাসি চলে গেলে পরে টুকটুককে বলল, “ওই টেডিটা নিয়ে খেলো না। রেখে দাও। আমি ওটা আলমারিতে রেখে দেব।” শুনে তো টেডির হয়ে গেছে! আবার ওই গোরিলার সঙ্গে! বাপরে। শুকনো মুখে টুকটুকের হাত জড়িয়ে ধরল। টুকটুক হাত ধরাটা বুঝল কি না, কে জানে, জোরে মাথা নেড়ে বলল, “নান্নান্নান্নান্নান্না…” টুকটুকের মা বলল, “ওটা ভালো না, দেখো, এই টেডিটা কী সুন্দর! ওর গায়ের রঙ বাদামী, নাক চোখ কালো…” টুকটুক আরও জোরে মাথা নেড়ে বলল, “নান্নান্নান্নান্নান্না…” টুকটুকের মা আলমারি থেকে একটা একটা করে খেলনা বের করে বলতে থাকল, “এটা নাও, এটা নাও…” কিন্তু টুকটুক খালি মাথা নাড়ে, আর বলে, “নান্নান্নান্নান্নান্না!” বাবা ফিরলে মা বলল, “মাসি-ই বের করে দিয়ে গেছে। দেখো তো, নিতে পারো কি না?” বাবা টুকটুকের পাশে বিছানায় বসে বলল, “এটা তোমার ভালো লাগে?” টুকটুক বিছানায় গড়িয়ে পড়ে বলল, “গ্নিইইইইই!” বাবা বলল, “এতই পছন্দ? থাক তাহলে!”

*
সেই থেকে টুকটুকের বিছানায়, ওর বালিশের পাশেই থাকে টেডি। একটু বড়ো হবার পর, কথা বলতে শুরু করার পর টুকটুক ওর নাম রেখেছিল, পিঙ্কি। সব খেলনা, সব পুতুল জানত, পিঙ্কি টুকটুকের প্রিয়। সারা দিন যাই খেলুক না কেন, যাই পড়ুক না কেন, রাতে শুতে যাবার সময় ওর পিঙ্কিকেই চাই। আরও বড়ো হয়ে ইশকুল থেকে ফিরে বিশ্রাম করার সময় পিঙ্কিকে জড়িয়ে ধরে ফিসফিস করে সারাদিনের গল্প শোনাত। কবে কোন টিচার বকেছে, কোন বন্ধুর সঙ্গে ঝগড়া হয়েছে, কোন পরীক্ষা ভালো হয়েছে - সব বলত। কখনও টেডি ওকে বলে দিত ওর কী করা উচিত, কিন্তু টুকটুক শুনতে পেত না। টেডি কথা বলতে পারে না তো, তাই। বড়ো হয়ে গেল টুকটুক। ওর সেই মাসি কবেই চলে গেছে কাজ ছেড়ে। পিঙ্কিও বুড়ো হয়েছে। ওর গোলাপি রঙ আর আগের মত উজ্জ্বল নেই। তবু ও এখনও টুকটুকের বালিশের পাশেই থাকে। পড়াশোনা করতে টুকটুক বিদেশ চলে যাবার পর ওর মা ঘর পরিষ্কার করতে গিয়ে সব পুতুল গুছিয়ে একটা বাক্সে ভরে রাখল। বিছানায় বসে ভয়ে ভয়ে পিঙ্কি দেখছিল। ওকেও ওই বাক্সে ঢুকতে হবে? এখন অবশ্য আগের মতো অত নেই - আলমারিটাও বই ভর্তি। গোরিলাটাও কোথায় গেছে কে জানে, তবু... বিছানা ঝাড়তে এসে টুকটুকের মা পিঙ্কিকে তুলে নিল, তারপর কী ভেবে আবার রেখে দিল বালিশের পাশে। পিঙ্কি খুব আস্তে আস্তে, স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়ল, কেউ যাতে বুঝতে না পারে।

*
অনেক দূরের পথ। অনেক টাকা লাগে প্লেনের টিকিট কিনতে। টুকটুক ফিরল অনেক দিন পর। মা যত্ন করে ঘর গুছিয়ে রেখেছে আগের দিনই। লাফাতে লাফাতে ঘরে ঢুকেই টুকটুক বলল, “মা-া-া-া, আমার পুতুলগুলো সব ফেলে দিয়েছ? মা রান্নাঘর থেকে বলল, “দেখ, ওই কোণায় একটা কার্টনে রয়েছে সব।” টুকটুক কার্টনের ঢাকনা খুলে বলল, “কই, এখানে তো…” বলে এক ঝটকায় বিছানার চাদরটা সরিয়ে দিয়েই, “পিঙ্কি!” বলে জড়িয়ে ধরল পিঙ্কিকে। এখন অবশ্য টুকটুক আর পিঙ্কির সঙ্গে কথা বলে না - বড়ো হয়ে গেছে কি না! কিন্তু পিঙ্কি কত কথা বলল! বলল, “তুমি কোথায় চলে গেছিলে? এখন এখানেই থাকবে? না কি আবার যাবে? আমাকে নিয়ে যাবে?” টুকটুক অবশ্য উত্তর দিল না। শুনতেই পেল না। মা ডাকল বলে লুচি আলুর দম খেতে গেল।

*
টুকটুক একদিন আবার চলে গেল। এর পর আবার অনেকদিন পরে ফিরল। পিঙ্কি তখনও ওর বিছানায়, কিন্তু টুকটুক আর ওর দিকে তাকাল না। ওকে ঠেলেঠুলে সরিয়ে ল্যাপটপটা বালিশের পাশে রেখে সিনেমা চালাল। ল্যাপটপের পেছনে পিঙ্কি কী করছে দেখলও না। সেবার যাবার সময় মা বলল, “তোর ছোটোবেলার খেলনা, পুতুল, যা বাকি রয়েছে, সেগুলো কাউকে দিয়ে দেব? আমি একদল লোকের খোঁজ পেয়েছি - ওরা গরিবদের দেয়…” বাক্সটা নিয়ে বেরোতে বেরোতে টুকটুক বলল, “ওই কার্টনটা তো গত তিন বছরে খুলেও দেখিনি। দিয়ে দাও।” মা বলল, “আর পিঙ্কি?” দরজা থেকে মুখ ফিরিয়ে তাকাল টুকটুক। ল্যাপটপ-টা নিয়ে ব্যাগে ভরার পরে কেউ পিঙ্কিকে সোজা করে দেয়নি। চারটে খাটো খাটো হাত পা আকাশের দিকে তুলে শুয়ে আছে বালিশের পাশে। মুখ ফিরিয়ে নিয়ে বলল, “ঠিক আছে, দিয়ে দিও।”

*
বাইরের লোকগুলো যেদিন কার্টনের খেলনা, পুরোনো জামা, বিছানার চাদর, এ সব নিতে এল, পিঙ্কি রয়ে গেল বিছানার চাদরের নিচেই। ওরা একটা পেছন-খোলা অটোতে থলেতে সব বেঁধে নেবার পর মার খেয়াল হল, ছুটে গিয়ে জানলা দিয়ে পিঙ্কিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, “এই যে, এই যে, এটাও নিয়ে যাও, এটাও…” ওরা পিঙ্কিকে নিয়ে এসে এদিক-ওদিক দেখল। একজন বলল, থলের মুখের বাঁধাটা খুলি?” অন্যজন বলল, “একটা টেডি বেয়ার, তাও আবার পিঙ্ক! ছাড় তো! এমনিই রেখে দে পেছনে।” প্রথম জন তা-ও থলেগুলোর নিচে পিঙ্কিকে গুঁজে দিল। তারপর অটো চালিয়ে দিল। ওদের অফিস শহরের অন্য প্রান্তে। ভারি থলের চাপে পিঙ্কির দম-বন্ধ লাগছিল। কিন্তু রাস্তায় অটোর ঝাঁকুনিতে থলেটা একটু একটু করে সরে গেল। পিঙ্কি সবে একটু নিশ্চিন্ত হয়েছে, এমন সময়, খালপাড়ে বড়ো ব্রিজটার নিচে একটা গর্তে পড়ে অটোটা এমন ঝাঁকুনি দিয়েছে, যে পিঙ্কি ছিটকে পড়েছে বাইরে। খানিকক্ষণ হাঁপিয়ে পিঙ্কি বুঝল ও রাস্তায় পড়ে গেছে। আশপাশ দিয়ে বিশাল বিশাল গাড়ি ছুটছে। ও অবশ্য গাড়ি কী তাই জানে না! তা-ও ভয় করে বইকি! রাস্তার ধারে, খালপাড়ে একটা ঝুপড়ির বাইরে ছোট্ট বাচ্চাটা হাত তুলে পিঙ্কির দিকে দেখিয়ে বলল, “গ্নুইইইইই!” ওর দিদিও দেখেছিল অটো থেকে একটা টেডি পড়ে গেছে। গাড়ির ফাঁকে-ফাঁকে গিয়ে তুলে এনে দিল ভাইকে। বাচ্চাটা দু হাত দিয়ে পিঙ্কিকে জড়িয়ে ধরে ওর গালে লালাভরা মুখ লাগিয়ে বলল, “আব্লাব্লিব্লিব্লি!” আরামে পিঙ্কির চোখ বুজে এল। ও-ও দু হাতে বাচ্চাটাকে জড়িয়ে ধরে বলল, “ব্লিব্লিব্লিব্লি।”
কেউ শুনতে পেল না। টেডি বেয়ার তো কথা বলতে পারে না, তাই।

কুটুরকুটুর

রাজার ভুঁড়ি খালি বেড়েই চলেছে। রাজ্যশুদ্ধু সবাই খুব চিন্তা করছে। রানি, রাজবৈদ্য, মন্ত্রী, এমনকি সেনাপতি, পুরোহিত সকলেই দুশ্চিন্তায় মাথা চুলকোচ্ছে। প্রাসাদে প্রহরী, কাজের লোক, রানির সখী, রাজার বয়স্য; রাজধানীর পথে পথে লোকজন, বাজারে দোকানি-খদ্দের, মাঠে চাষি, ঘাটে মাঝি – সকলেই উদ্বিগ্ন। রাজা যখন রাজকুমার ছিল, তখন ছিল ছিপছিপে রোগা। যখন সদ্য রাজা হল, তখন গাঁট্টাগোঁট্টা ছিল। কিন্তু যত দিন যায়, ততো যেন আরও মোটা হচ্ছে। ভুঁড়িটা প্রথমে বেরিয়ে আসতে শুরু করল, তারপরে এত বড়ো হল, যে রাজা আর নিচে তাকিয়ে নিজের পা দেখতে পান না। রাজার পোষাক ঢিলে হতে শুরু করল, পাজামার দড়িতে শানায় না – ফিতে দিয়ে কাঁধের ওপর দিয়ে আটকে রাখতে হয়! শেষে যখন ভুঁড়ি ঝুলে পড়ে প্রায় হাঁটুর কাছে, তখন একদিন রাজামশাই সভাশেষে হাঁসফাঁস করতে করতে অন্দরমহলে এসে বলল, “প্রতিহারী, মন্ত্রীকে ডাকো। ছুতোরকে খবর দাও। রাজসিংহাসনও যে ছোটো হয়ে গেল! আরও চওড়া করতে হবে,” সেদিন রানি রেগে বলল, “জামা পাজামা বড়ো করছ, এখন রাজসিংহাসন! এর পরে কি রাজপ্রাসাদও বড়ো করবে নাকি? তার চেয়ে রোগা হবার চেষ্টা করলে হয় না?” রাজা কাতর চোখে রানির দিকে চেয়ে বলল, “কী করি, বলো তো রানি?” রানি প্রতিহারীকে বলল, “মন্ত্রী-ছুতোরকে ডাকতে হবে না। রাজবৈদ্যকে ডাকো।” রাজবৈদ্য এল। রানি বলল, “রাজার ভুঁড়ি কমানোর ব্যবস্থা করো।” রাজবৈদ্য বলল, “সে তো সহজ হবে না! রাজা যে অনেক খায়!” রাজা অবাক! “আমি বুঝি বেশি খাই? এই তো দুপুরে এক দিস্তা মাত্র লুচি, চার বাটি পোলাও, সামান্য ছ’ রকম তরকারি, ডাল, মুরগি, পাঁঠা আর মাছ, ছো-ও-ও-ট্ট এক ডেকচি চাটনি, দুবাটি পায়েস... আজকাল তো রসগোল্লা-সন্দেশ প্রায় খাই-ই না। দুয়ে মিলে এক ডজন। আর এইটুকু এইটুকু মিহিদানা, সীতাভোগ আর শীতকাল বলে অল্প কেক...” রাজবৈদ্য রানিকে বলল, “এ তো প্রায় দশ জোয়ানের খোরাক! কমাতে হবে। ভাত একেবারে বন্ধ...” রাজা বলল, “ভাত খাই কই? অল্প চাট্টি পোলাও...” বৈদ্য বলল, “চাল দিয়ে তৈরি সবই বন্ধ। ভাত, পোলাও, বিরিয়ানি, দোসা, ইডলি, পরমান্ন...” রাজা মিনমিন করে বলল, “ডাল কী দিয়ে মাখব?” “ডাল খাবে সামান্য। চামচ দিয়ে ছোটো বাটি থেকে তুলে।” রাজা খাটে বসেছিল। ধপাস করে শুয়ে পড়ল। রানি বলল, “রুটি?” বৈদ্য বলল, “বন্ধ। গম বন্ধ। রুটি, পাউরুটি, পরোটা, কচুরি, লুচি, রাধাবল্লভী, বিস্কুট, কেক, পেস্ট্রি... তার সঙ্গে লাল মাংস বন্ধ। আর সব রকম মিষ্টি।” রাজা খাটে শুয়ে শুয়েই চেঁচিয়ে বলল, “তা’লে খাব কী ছাতা?” রাজবৈদ্য বলল, “প্রধানত কাঁচা সবুজ তরকারি, আর ফল। কিছু বাদাম, কিছু কল বেরোনো ডাল, সামান্য তেল – দু’চার ফোঁটা…” রাজা ধড়ফড় করে উঠে বসার চেষ্টা করে পারল না। থপ করে পড়ে গেল আবার। শুয়ে শুয়ে চেঁচাতে লাগল, “দূর হয়ে যাও, দূর হয়ে যাও। রানি, ওর কথা শুনো না। আমাকে না খাইয়ে মেরে ফেলবে ব্যাটা।” রাজার চেঁচামেচি বৃথা হল। পরদিন থেকে রাজার সূপকার আর রাঁধুনি স্যালাড আর সূপ বানাতে শুরু করল। রাজা রোজ দুবেলা কচর কচর করে শাক পাতা আর ফলমূল চিবোয়, রাজবৈদ্যর মুণ্ডপাত করে, আর বলে, “এবার আমি মরে যাব। ঠিক মরে যাব। মরেই যাব!” ছমাস কাটল। রাজা মরল না। কিন্তু ভুঁড়িও কমল না। ছমাস পরে রাজার চাপকান বানাতে হল নতুন করে। রানি রেগে বলল, “পাঞ্জাবি ছোটো হয় বুঝি। মানলাম পাজামাও ছোটো হয়। চাপকান কী করে ছোটো হয়, বোঝাতে পারো?” এলেন রাজবৈদ্য। শলা পরামর্শ হল। পরদিন থেকে একটা মুশকো জোয়ান এল। রাজাকে বগলদাবা করে সকালে বাগানে হাঁটা, বিকেলে পুকুরে সাঁতার শুরু হল। রাজা থুপথুপিয়ে হাঁটে, ছপছপিয়ে সাঁতার কাটে। সন্ধে থেকে ক্লান্ত হয়ে ঘুমোয়। দিনে রাজসভায় ঢুলে পড়ে, ফড়ফড়িয়ে নাক ডাকায়। আরও ছমাস কাটে। রাজা চেঁচামেচি করে। খেতে পায় না, ভোরবেলা উঠতে হয়। সারা দিন ঘুমিয়েও ক্লান্তি কাটে না। মনের আনন্দে কিছুই করতে পায় না। একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে রাজা হ্যাঁচ্চো করে হেঁচেছে, আর পটাং করে পাজামার দড়ি গেছে ছিঁড়ে। রাজা চেঁচিয়ে বলেছে, “নিকুচি করেছে সব খাদ্য আর ব্যয়ামের। আমি এসব আর খাব না। হাঁটতেও যাব না, সাঁতারও কাটব না। মন্ত্রী, ওই ষণ্ডাকে বলে দাও, ও যেন অন্য কাজ খুঁজে নেয়। আমার সৈন্যদলে ওকে কাজ দাও। রাঁধুনি – আমার জন্য লুচি, আলুর দম, হালুয়া, আর চিনি দিয়ে চা এনে দাও।” রানি হাঁ-হাঁ করে ছুটে এল, রাজা বলল, “চোপরাও!” আবার মন্ত্রীকে ডাকল রানি। দেশে বিদেশে দূত গেল। নানা দেশের ডাক্তার বৈদ্য হাজির হল। রাজা বলল, “যা করবে করো। আমি যা ইচ্ছে খাব, কম কম হলেও। আর যথেচ্ছ ব্যয়াম করব না।” শুরু হল নানা চিকিৎসা। কেউ বলল, দলাই মলাই। কেউ বলল, গরম জলে ডুবে থাকা। কেউ বলল, ঠাণ্ডায় পুকুরে চান করা। কেউ বলল, গরম হাওয়া। কেউ বলল… আচ্ছা সে থাক। মোটের ওপর অনেকেই অনেক কিছু বলল। কিন্তু ভুঁড়ি কমল না। রাজা বিদেশী বৈদ্যদের বলল, “এখন আমার খাটে রানির জায়গা হয় না। রানি অন্য খাটে শুচ্ছেন। তোমরা পারলে না। তোমরা আসতে পারো।” রাজা সবাইকে বিদায় দিল। সেদিন রাজধানীতে এক নাবিক এসেছে দূর দেশ থেকে। রাজপ্রাসাদ থেকে দল বেঁধে নানা দেশের বৈদ্যদের বেরোতে দেখে জিজ্ঞেস করল, “কী হচ্ছে?” সব শুনে বলল, “আমি জানি রাজার ভুঁড়ি কী করে কমবে।” সবাই জিজ্ঞেস করল, “কী করে? কী করে?” নাবিক বলল, “সে আছে ব্যবস্থা।” পথের লোকজন সবাই নাবিককে ধরে নিয়ে গেল রাজপ্রাসাদে। রাজসভায় হইচই শুনে রাজা তাকাল, দেখলেন একটা লোককে ধরে আনছে সবাই। চোর নাকি! কিন্তু খেয়াল করল, কেউ ওকে মারছে না, বরং কেমন আদর করে এসো, এসো বলে পথ দেখিয়ে আনছে। রাজার সামনে এসে সবাই বলল, “রাজা, এ বলছে তোমার ভুঁড়ি নাকি কমিয়ে দিতে পারবে।” এই লোকটা? সবাই অবাক। রাজা বলল, “তুমি বদ্যি?” নাবিক মাথা নাড়ল। না। বলল, “আমি নাবিক। এক দূরের দেশে এক বদ্যি দেখেছি। তার এক যন্ত্র আছে। সে দিয়ে তিনি লোকের ভুঁড়ি কমিয়ে দেন।” সবাই অবাক। যন্ত্রে ভুঁড়ি কমে? সবাই বলল, “দ্যুৎ, সে হয় নাকি?” রাজা বলল, “দূত পাঠাও। দেখাই যাক, কেমন সে যন্ত্র।” দূত গেল দূর বিদেশে। আরও অনেক দিন পরে ফিরে এল বিদেশী বৈদ্যকে সঙ্গে নিয়ে। সঙ্গে তার বিরাট বাক্স। বৈদ্য বলল, “আমার যন্ত্রের নাম কুটুরকুটুর। ভুঁড়িতে লাগিয়ে দেব, আর কুটুরকুটুর করে কেটে সব ভুঁড়ি ফেলে দেবে। পেট আবার আগের মতো সরু হয়ে যাবে।” রাজা আঁতকে উঠে বলল, “ওরে বাবা! লাগবে যে!” বৈদ্য বলল, “মোটেই লাগবে না - এমনভাবে বানিয়েছি…” রানি বলল, “যা খুশি খেতে পারবে?” বৈদ্য বলল, “যা প্রাণে চায়। ভুঁড়ি বাড়লেই কুটুরকুটুর কুচকুচিয়ে কেটে ফেলবে। পেটে লাগানোই থাকবে যে!” রাজা উৎসাহে লাফাতে গিয়ে সিংহাসন থেকে প্রায় পড়েই গেল। বলল, “লাগাও, লাগাও।” * রাজার আর ভুঁড়ি নেই। পেটে কুটুরকুটুর লাগিয়ে রাজা যা-খুশি খায়, সাঁতার কাটে, ঘোড়া চড়ে, শিকার করে। ভুঁড়ি হয় না। হলেই কুচ-কুচ। রাজার আনন্দ আর ধরে না। শুধু তখন থেকে রাজার আর নতুন জামা বানানো হয়নি। দরজি এসে মাপ নিতে গেলেই কুটুরকুটুর তাদের আঙুল কেটে ফেলে। দরজিরা আর রাজার বাড়ি আসে না। রাজার পেয়াদাকে তাদের দোকানের দিকে আসতে দেখলেই দোকান বন্ধ করে পালিয়ে যায়। রাজা তাই পুরোনো জামা পরেই চালাচ্ছে। আর রানি আজও রাজার খাটে শোয় না।