রাজার ভুঁড়ি খালি বেড়েই চলেছে। রাজ্যশুদ্ধু সবাই খুব চিন্তা করছে। রানি, রাজবৈদ্য, মন্ত্রী, এমনকি সেনাপতি, পুরোহিত সকলেই দুশ্চিন্তায় মাথা চুলকোচ্ছে। প্রাসাদে প্রহরী, কাজের লোক, রানির সখী, রাজার বয়স্য; রাজধানীর পথে পথে লোকজন, বাজারে দোকানি-খদ্দের, মাঠে চাষি, ঘাটে মাঝি – সকলেই উদ্বিগ্ন। রাজা যখন রাজকুমার ছিল, তখন ছিল ছিপছিপে রোগা। যখন সদ্য রাজা হল, তখন গাঁট্টাগোঁট্টা ছিল। কিন্তু যত দিন যায়, ততো যেন আরও মোটা হচ্ছে। ভুঁড়িটা প্রথমে বেরিয়ে আসতে শুরু করল, তারপরে এত বড়ো হল, যে রাজা আর নিচে তাকিয়ে নিজের পা দেখতে পান না। রাজার পোষাক ঢিলে হতে শুরু করল, পাজামার দড়িতে শানায় না – ফিতে দিয়ে কাঁধের ওপর দিয়ে আটকে রাখতে হয়! শেষে যখন ভুঁড়ি ঝুলে পড়ে প্রায় হাঁটুর কাছে, তখন একদিন রাজামশাই সভাশেষে হাঁসফাঁস করতে করতে অন্দরমহলে এসে বলল, “প্রতিহারী, মন্ত্রীকে ডাকো। ছুতোরকে খবর দাও। রাজসিংহাসনও যে ছোটো হয়ে গেল! আরও চওড়া করতে হবে,” সেদিন রানি রেগে বলল, “জামা পাজামা বড়ো করছ, এখন রাজসিংহাসন! এর পরে কি রাজপ্রাসাদও বড়ো করবে নাকি? তার চেয়ে রোগা হবার চেষ্টা করলে হয় না?”
রাজা কাতর চোখে রানির দিকে চেয়ে বলল, “কী করি, বলো তো রানি?”
রানি প্রতিহারীকে বলল, “মন্ত্রী-ছুতোরকে ডাকতে হবে না। রাজবৈদ্যকে ডাকো।”
রাজবৈদ্য এল। রানি বলল, “রাজার ভুঁড়ি কমানোর ব্যবস্থা করো।”
রাজবৈদ্য বলল, “সে তো সহজ হবে না! রাজা যে অনেক খায়!”
রাজা অবাক! “আমি বুঝি বেশি খাই? এই তো দুপুরে এক দিস্তা মাত্র লুচি, চার বাটি পোলাও, সামান্য ছ’ রকম তরকারি, ডাল, মুরগি, পাঁঠা আর মাছ, ছো-ও-ও-ট্ট এক ডেকচি চাটনি, দুবাটি পায়েস... আজকাল তো রসগোল্লা-সন্দেশ প্রায় খাই-ই না। দুয়ে মিলে এক ডজন। আর এইটুকু এইটুকু মিহিদানা, সীতাভোগ আর শীতকাল বলে অল্প কেক...”
রাজবৈদ্য রানিকে বলল, “এ তো প্রায় দশ জোয়ানের খোরাক! কমাতে হবে। ভাত একেবারে বন্ধ...”
রাজা বলল, “ভাত খাই কই? অল্প চাট্টি পোলাও...”
বৈদ্য বলল, “চাল দিয়ে তৈরি সবই বন্ধ। ভাত, পোলাও, বিরিয়ানি, দোসা, ইডলি, পরমান্ন...”
রাজা মিনমিন করে বলল, “ডাল কী দিয়ে মাখব?”
“ডাল খাবে সামান্য। চামচ দিয়ে ছোটো বাটি থেকে তুলে।”
রাজা খাটে বসেছিল। ধপাস করে শুয়ে পড়ল। রানি বলল, “রুটি?”
বৈদ্য বলল, “বন্ধ। গম বন্ধ। রুটি, পাউরুটি, পরোটা, কচুরি, লুচি, রাধাবল্লভী, বিস্কুট, কেক, পেস্ট্রি... তার সঙ্গে লাল মাংস বন্ধ। আর সব রকম মিষ্টি।”
রাজা খাটে শুয়ে শুয়েই চেঁচিয়ে বলল, “তা’লে খাব কী ছাতা?”
রাজবৈদ্য বলল, “প্রধানত কাঁচা সবুজ তরকারি, আর ফল। কিছু বাদাম, কিছু কল বেরোনো ডাল, সামান্য তেল – দু’চার ফোঁটা…”
রাজা ধড়ফড় করে উঠে বসার চেষ্টা করে পারল না। থপ করে পড়ে গেল আবার। শুয়ে শুয়ে চেঁচাতে লাগল, “দূর হয়ে যাও, দূর হয়ে যাও। রানি, ওর কথা শুনো না। আমাকে না খাইয়ে মেরে ফেলবে ব্যাটা।”
রাজার চেঁচামেচি বৃথা হল। পরদিন থেকে রাজার সূপকার আর রাঁধুনি স্যালাড আর সূপ বানাতে শুরু করল। রাজা রোজ দুবেলা কচর কচর করে শাক পাতা আর ফলমূল চিবোয়, রাজবৈদ্যর মুণ্ডপাত করে, আর বলে, “এবার আমি মরে যাব। ঠিক মরে যাব। মরেই যাব!”
ছমাস কাটল। রাজা মরল না। কিন্তু ভুঁড়িও কমল না। ছমাস পরে রাজার চাপকান বানাতে হল নতুন করে। রানি রেগে বলল, “পাঞ্জাবি ছোটো হয় বুঝি। মানলাম পাজামাও ছোটো হয়। চাপকান কী করে ছোটো হয়, বোঝাতে পারো?”
এলেন রাজবৈদ্য। শলা পরামর্শ হল। পরদিন থেকে একটা মুশকো জোয়ান এল। রাজাকে বগলদাবা করে সকালে বাগানে হাঁটা, বিকেলে পুকুরে সাঁতার শুরু হল। রাজা থুপথুপিয়ে হাঁটে, ছপছপিয়ে সাঁতার কাটে। সন্ধে থেকে ক্লান্ত হয়ে ঘুমোয়। দিনে রাজসভায় ঢুলে পড়ে, ফড়ফড়িয়ে নাক ডাকায়।
আরও ছমাস কাটে। রাজা চেঁচামেচি করে। খেতে পায় না, ভোরবেলা উঠতে হয়। সারা দিন ঘুমিয়েও ক্লান্তি কাটে না। মনের আনন্দে কিছুই করতে পায় না।
একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে রাজা হ্যাঁচ্চো করে হেঁচেছে, আর পটাং করে পাজামার দড়ি গেছে ছিঁড়ে। রাজা চেঁচিয়ে বলেছে, “নিকুচি করেছে সব খাদ্য আর ব্যয়ামের। আমি এসব আর খাব না। হাঁটতেও যাব না, সাঁতারও কাটব না। মন্ত্রী, ওই ষণ্ডাকে বলে দাও, ও যেন অন্য কাজ খুঁজে নেয়। আমার সৈন্যদলে ওকে কাজ দাও। রাঁধুনি – আমার জন্য লুচি, আলুর দম, হালুয়া, আর চিনি দিয়ে চা এনে দাও।”
রানি হাঁ-হাঁ করে ছুটে এল, রাজা বলল, “চোপরাও!”
আবার মন্ত্রীকে ডাকল রানি। দেশে বিদেশে দূত গেল। নানা দেশের ডাক্তার বৈদ্য হাজির হল। রাজা বলল, “যা করবে করো। আমি যা ইচ্ছে খাব, কম কম হলেও। আর যথেচ্ছ ব্যয়াম করব না।”
শুরু হল নানা চিকিৎসা। কেউ বলল, দলাই মলাই। কেউ বলল, গরম জলে ডুবে থাকা। কেউ বলল, ঠাণ্ডায় পুকুরে চান করা। কেউ বলল, গরম হাওয়া। কেউ বলল… আচ্ছা সে থাক। মোটের ওপর অনেকেই অনেক কিছু বলল। কিন্তু ভুঁড়ি কমল না।
রাজা বিদেশী বৈদ্যদের বলল, “এখন আমার খাটে রানির জায়গা হয় না। রানি অন্য খাটে শুচ্ছেন। তোমরা পারলে না। তোমরা আসতে পারো।”
রাজা সবাইকে বিদায় দিল।
সেদিন রাজধানীতে এক নাবিক এসেছে দূর দেশ থেকে। রাজপ্রাসাদ থেকে দল বেঁধে নানা দেশের বৈদ্যদের বেরোতে দেখে জিজ্ঞেস করল, “কী হচ্ছে?”
সব শুনে বলল, “আমি জানি রাজার ভুঁড়ি কী করে কমবে।”
সবাই জিজ্ঞেস করল, “কী করে? কী করে?”
নাবিক বলল, “সে আছে ব্যবস্থা।”
পথের লোকজন সবাই নাবিককে ধরে নিয়ে গেল রাজপ্রাসাদে। রাজসভায় হইচই শুনে রাজা তাকাল, দেখলেন একটা লোককে ধরে আনছে সবাই। চোর নাকি! কিন্তু খেয়াল করল, কেউ ওকে মারছে না, বরং কেমন আদর করে এসো, এসো বলে পথ দেখিয়ে আনছে।
রাজার সামনে এসে সবাই বলল, “রাজা, এ বলছে তোমার ভুঁড়ি নাকি কমিয়ে দিতে পারবে।”
এই লোকটা? সবাই অবাক। রাজা বলল, “তুমি বদ্যি?”
নাবিক মাথা নাড়ল। না। বলল, “আমি নাবিক। এক দূরের দেশে এক বদ্যি দেখেছি। তার এক যন্ত্র আছে। সে দিয়ে তিনি লোকের ভুঁড়ি কমিয়ে দেন।”
সবাই অবাক। যন্ত্রে ভুঁড়ি কমে? সবাই বলল, “দ্যুৎ, সে হয় নাকি?”
রাজা বলল, “দূত পাঠাও। দেখাই যাক, কেমন সে যন্ত্র।”
দূত গেল দূর বিদেশে। আরও অনেক দিন পরে ফিরে এল বিদেশী বৈদ্যকে সঙ্গে নিয়ে। সঙ্গে তার বিরাট বাক্স।
বৈদ্য বলল, “আমার যন্ত্রের নাম কুটুরকুটুর। ভুঁড়িতে লাগিয়ে দেব, আর কুটুরকুটুর করে কেটে সব ভুঁড়ি ফেলে দেবে। পেট আবার আগের মতো সরু হয়ে যাবে।”
রাজা আঁতকে উঠে বলল, “ওরে বাবা! লাগবে যে!”
বৈদ্য বলল, “মোটেই লাগবে না - এমনভাবে বানিয়েছি…”
রানি বলল, “যা খুশি খেতে পারবে?”
বৈদ্য বলল, “যা প্রাণে চায়। ভুঁড়ি বাড়লেই কুটুরকুটুর কুচকুচিয়ে কেটে ফেলবে। পেটে লাগানোই থাকবে যে!”
রাজা উৎসাহে লাফাতে গিয়ে সিংহাসন থেকে প্রায় পড়েই গেল। বলল, “লাগাও, লাগাও।”
*
রাজার আর ভুঁড়ি নেই। পেটে কুটুরকুটুর লাগিয়ে রাজা যা-খুশি খায়, সাঁতার কাটে, ঘোড়া চড়ে, শিকার করে। ভুঁড়ি হয় না। হলেই কুচ-কুচ। রাজার আনন্দ আর ধরে না।
শুধু তখন থেকে রাজার আর নতুন জামা বানানো হয়নি। দরজি এসে মাপ নিতে গেলেই কুটুরকুটুর তাদের আঙুল কেটে ফেলে। দরজিরা আর রাজার বাড়ি আসে না। রাজার পেয়াদাকে তাদের দোকানের দিকে আসতে দেখলেই দোকান বন্ধ করে পালিয়ে যায়। রাজা তাই পুরোনো জামা পরেই চালাচ্ছে।
আর রানি আজও রাজার খাটে শোয় না।
No comments:
Post a Comment