Saturday, April 01, 2023

রাঘবেন্দ্রর বিয়ে হলো না

বৃষ্টি আইসবে...

দারোয়ানজীর কথাটা অপ্রয়োজনে বলা, তা-, অপ্রয়োজনেই রাঘবেন্দ্র আবার আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল, হাঁ।

গিরধরলাল আগরওয়ালার কাছে আজ আসার ইচ্ছে ছিল না রাঘবেন্দ্রর, মা-ও বেরোবার আগে বলেছিল, টিভিতে বলছে বৃষ্টি হবে খুব, এর মধ্যে আজই অতদূর যেতে হবে তোকে?

মাথা নেড়ে রাঘবেন্দ্র বলেছিল, অনেকগুলো টাকা, মা... ফোন করে জানাল চেক রেডি হ্যায়…

ঘরের ওদিক থেকে বাবা বলেছিল, চেকই যদি হবে, তো সেটা পরে গেলেও পাবি তো?

কথাটা অন্য কারও বেলায় খাটত হয়ত, কিন্তু গিরধরলাল আগরওয়ালার বেলায় সে ঝুঁকি নিতে রাজি নয় রাঘবেন্দ্র। এর আগে যখন অতুলবাবুর ক্লার্ক ছিল তখন দেখেছিল একদিনের দেরিতে গিরধরলালের রেডি চেক কেমন আন-রেডি হয়ে গেছিল তিন মাসের জন্য। তাই কথা না বাড়িয়ে বেরিয়ে পড়েছিল, “চেকটা নিয়েই চলে আসব” বলে।

হাওড়া থেকে লোকাল ট্রেন পঁচিশ মিনিটের পথ কাবার করেছিল প্রায় বিয়াল্লিশ মিনিটে। তার মধ্যেই আকাশের গাঢ় ছাই-রং থমথমে হয়ে এসেছে। স্টেশন থেকে পাক্কা কুড়ি মিনিটের হাঁটা। রাঘবেন্দ্র হনহনিয়ে হেঁটে প্রায় হাঁপাতে হাঁপাতে এসে পৌঁছেছিল। রাস্তাটাও অদ্ভুত। বাড়ি ঘর নেই। দুইদিকে কেবল বড়ো বড়ো গোডাউন। প্রায় চার-পাঁচ তলা উঁচু গুদামের দেওয়ালে মাঝখান দিয়ে ইঁট বিছানো রাস্তা। তার দুপাশেই সারি দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ট্রাক, লাইন করে মজুররা তাতে বস্তা বস্তা মাল লোড করছে। দুপুরের মধ্যে ট্রাক বোঝাই হয়ে যাবে। আজ রাতেই তারা সারি দিয়ে বেরিয়ে যাবে। ছড়িয়ে যাবে সারা দেশে। কিছুক্ষণের মধ্যেই তাদের জায়গা নেবে আরও দুই সারি ট্রাক। রাতে মাল নামানো হবে, কাল লোড হবে... রোজ এই একই রুটিন।

রেডি চেকও পেতে সময় লাগল প্রায় চার ঘণ্টা। বসে বসেও হাঁপিয়ে গেছিল রাঘবেন্দ্র। বিরক্তও হচ্ছিল। গিরধরলালের অফিসও ওরকমই একটা গুদামের ওপরদিকে, ভেতরটা ঝকঝকে হলেও কোনও দিকে বহির্জগতের সঙ্গে কোনও যোগাযোগ নেই। বাইরে আকাশের অবস্থা কী দাঁড়াল, বৃষ্টি নামল কি না বোঝার উপায় নেই। তাই চেক হাতে নিয়েই দৌড়েছিল রাঘবেন্দ্র। লিফটে নামতে নামতেই সঙ্গে আনা প্লাস্টিকের ব্যাগ বের করে চেকটা বের করে ভালো করে মুড়ে ব্যাগের গভীরে ঢুকিয়ে রাখল। এখন বৃষ্টি নামলেও চেকটা ভিজবে না। ওর ছোট্ট বিজনেসের পক্ষে এই চেকটা একটা বিরাট প্রাপ্তি। চেয়েছিল আজই ব্যাঙ্কে জমা দেবে, কিন্তু সে হলো না। কাল সকালেই...

বাইরে আকাশের অবস্থা দেখে বুক দুরদুর করে উঠল। দারোয়ানজীর সাবধানবাণী — বৃষ্টি আইসবে...-র উত্তরে সংক্ষেপে — হাঁ, বলে দৌড় দিল স্টেশনের দিকে।

এখন আবার চারপাশের দৃশ্য বদলে গেছে। প্রায় সব গোডাউনেরই কাজ শেষ। ট্রাক লোড হয়ে গেছে, মজুররা চলে গেছে। গোডাউনের দরজা সব বন্ধ। ট্রাকের ড্রাইভার খালাসিরাও খেয়েদেয়ে বিশ্রাম নিচ্ছে। বিকেল হলে একে একে ওরা বেরিয়ে যাবে। আগেও এই পথে এই সময়ে গিয়েছে রাঘবেন্দ্র, কেউ কোথাও নেই এমনই যে দিনের বেলাতেও গা ছমছম করে।

আজ অবশ্য চারপাশ দেখার সময় নেই, রাঘবেন্দ্র দৌড়চ্ছে ঘাড় গুঁজে। কোনও রকমে স্টেশনে অন্তত যদি পৌঁছাতে পারে...

শেষরক্ষা হলো না। অর্ধেক রাস্তা যাবার আগেই আকাশ ভেঙে নামল। বৃষ্টির এমন তোড়, যে ফোঁটাগুলো যেন তিরের মতো বিঁধছে। সামনে পেছনে কিছু দেখার উপায় নেই। এক লহমায় ভিজে চুবড়ি হয়ে গেছে রাঘবেন্দ্র। ব্যাগ থেকে ছাতা বের করা দূরে থাক, ছাতার কথা ভাবার আগেই ভিজে গেল। অবশ্য এ বৃষ্টিতে হাতে ছাতা থাকলেও খোলার সময় পেত কি না সন্দেহ। এক ছুটে সামনে যে গোডাউনটা ছিল, তার মধ্যেই ঢোকার চেষ্টা করে বিফল হলো। গেট বন্ধ। বিশাল গেটটা বাইরের দু-ফুট চওড়া দেওয়ালের ভেতর দিকে, নিচে চাকা লাগানো বলে খোলে পাশাপাশি।

গেটটা এতটাই উঁচু, যে দু-ফুটিয়া দেওয়াল বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচাচ্ছে সামান্যই। তার ওপর, এমন তুমুল বৃষ্টিতে সাধারণত যা হয়, হঠাৎ হঠাৎ হাওয়ার ঝাপটায় যতটা ছিটে আসছে, তা-ও প্রায় প্রতিবারই পুরোই ভিজিয়ে দিচ্ছে। এভাবে চললে ওয়াটারপ্রুফ ব্যাগের ভেতরটাও ভিজে যাবে। এতক্ষণে জিপ-ফাসনারের ফাঁক দিয়েও নিশ্চিতভাবে ভেতরে জল ঢুকেছে। যদিও চেকটা আবার প্লাস্টিকে মোড়া, তবু বৃষ্টির ভাবগতিক দেখে ভয় পেল। এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখল গেট আর দেওয়ালের ফাঁকে যতটা জায়গা, তা দিয়ে ভেতরে ঢোকা যায়। কোনও রকমে ঠেলেঠুলে ঢুকে পড়ল, আড়চোখে জামাকাপড়ের হাল দেখে হাহাকার করতে ইচ্ছে করল! তা-ও ভাগ্যিস একেবারে নতুনগুলো পরেনি আকাশের অবস্থা দেখে। তবু এগুলো তো গেছেই।

নিজের দিকে তাকিয়ে দেখতে দেখতেই মনে হলো বৃষ্টির শব্দ ছাপিয়েও যেন মানুষের কথার শব্দ শোনা যাচ্ছে। মুখ তুলেই রাঘবেন্দ্র হতবাক। গোটা গোডাউনে গিজগিজ করছে লোক! অন্তত হাজার খানেক বা আরও বেশি। এবং তারা প্রায় কেউই ওখানে থাকার মতো নয়। মানে, এধারে ওধারে ছড়িয়ে ছিটিয়ে হয়তো সত্তর আশি বা শ’খানেক — পরে যদিও মনে হয়েছিল কয়েকশোও হতে পারে — কুলি-মজদুর শ্রেণীর লোক, আর বাকিরা মোটেই তা নয়। শার্ট-প্যান্ট-সুট পরিহিত পুরুষ, শাড়ি-চুড়িদার-ম্যাক্সি-বোরখাধারী মহিলা, টিকিধারী ব্রাহ্মণ, মাথায় স্কালক্যাপ পরা মুসলমান... এমনকি, আরও অবাক হয়ে দেখল একেবারে পিরিয়ড কস্টিউম পরা সাহেব মেম পর্যন্ত রয়েছে! সাহেবের লাল টেল-কোট, চোঙা ব্রিচেসের নিচে আঁটোসাটো বুট, মেমসাহেবের ফুলে ওঠা স্কার্ট, ফল-ফুল লাগানো টুপি, হাতে লেসের ছাতা…

কিছুক্ষণ হাঁ করে তাকিয়ে থেকে হঠাৎ ব্যাপারটা বুঝল রাঘবেন্দ্র। ফ্যানসি ড্রেস পার্টি! গো-অ্যাজ-ইউ-লাইক প্রতিযোগিতা। এই ভীড়ের মধ্যেই কোথাও রয়েছে এক বা একাধিক সার্কাসের জোকার, রয়েছেন বেশ কিছু চার্লি চ্যাপলিন, কয়েকজন মহাত্মা গান্ধী।।... একসময়ে অরণ্যদেেব, ম্যানড্রেক থাকত, এখন থাকে শক্তিমান, বা ছোটা ভীম... যদিও সেরকম কাউকে দেখতে পেল না রাঘবেন্দ্র। তাছাড়া সপ্তাহের দিনে এরকম একটা গুদামঘরে কেন এরকম একটা প্রতিযোগিতা হবে? আজ তো কোনও পরব, বা অন্য ছুটির দিনও না। কাছেই একজন দৃশ্যত খেটে-খাওয়া মানুষ বসে বসে একমনে নখ খুঁটছিল, রাঘবেন্দ্র তার কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, ভাই, এখানে কী হচ্ছে?

কথাটা বলামাত্র একটা বিকট ঘটনা ঘটল। লোকটা হাউমাউ করে বিকট রকম, আরি বাপ রে বাপ, জিন্দা আদমি আছে! বলে রাঘবেন্দ্রর চোখের সামনে মিলিয়ে গেল!

রাঘবেন্দ্রও ভীষণ চমকে গেছিল। তারপর আরও আঁতকে উঠে দেখল চোখের সামনে পট পট পট করে একজন দুজন করে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে, যেন কোথাও অদৃশ্য সুইচ টিপে টিপে আলো নিভিয়ে দিচ্ছে কেউ। আর একই সঙ্গে একটা হাহাকারের মতো ওরে বাবারে, মা-রে, গেলুম রে, বাঁচাও রে জাতীয় আর্তনাদ ক্রমে ক্রমে বেড়েই চলেছে।

রাঘবেন্দ্রর চোখের সামনে দেখতে দেখতে গুদামঘরটা প্রায় অর্ধেক খালি হয়ে গেছে, রাঘবেন্দ্র কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে, এমন সময় হইচই ছাপিয়ে একটা বাজখাঁই গলা চেঁচিয়ে বলল, অ্যা----, চোপ, টোমরা সব চোপ!

দেখতে দেখতে হট্টগোল কমে একটা মৃদু গুনগুন রয়ে গেল কেবল, তার পরেই সামনে যে ক’জন ভীড় করে দাঁড়িয়ে ছিল তারা দু’দিকে সরে গিয়ে রাঘবেন্দ্রর সামনেটা ফাঁকা করে দিল, আর রাঘবেন্দ্র দেখল ওর সামনে, হাত দশেক দূরে একজন সাহেব ওর দিকে কটমটিয়ে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সাহেবের পরনে লাল কোট, মাথায় ত্যারচা টুপি, হাতে লম্বা নলওয়ালা বন্দুক, কোমরে রিভলভার। রাঘবেন্দ্রর দিকে আঙুল তুলে বলল, এইও ছোকরা, টুমি কে আছ? সামনে আইস!

রাঘবেন্দ্রর প্রথম চমকটা কাটার পরে আবার একটু সাহস ফিরেছে। বুঝতে পারছে অত চমকে যাবার মতো কিছু হয়নি। মানুষ হাওয়ায় মিলিয়ে যায় না, ওই কুলিমার্কা লোকটা নিশ্চয়ই ভীড়ে মিশে গেছে, তাই মনে হয়েছে মিলিয়ে গেছে। তাই এই নাটুকে নকল সাহেবের দিকে ও-ও আঙুল নেড়ে ডেকে বলল, এইও, সায়েব, তুমি কে হে? সামনে এসো দেখি?

উত্তরে সাহেবের ফর্সা মুখ লাল হয়ে গেল। পিছন ফিরে বলল, কোন হ্যায়!

একটা রোগা, বেঁটে চাপরাশি, তার কাঁধে বুকে নানা রকম ব্যাগ আর থলি, পেছন থেকে এগিয়ে এল। সাহেব তার দিকে বাড়িয়ে দিল বন্দুকটা। লোকটাও সঙ্গে সঙ্গে একটা থলে থেকে একটা চোঙা দিয়ে কিছু কালো কালো পাউডার ভরে দিল বন্দুকের নলে, তারপর একটা লম্বা কাঠি দিয়ে খোঁচাল কিছুক্ষণ, এবং সব শেষে আর একটা ব্যাগ থেকে একটা লোহার গুলি নিয়ে সেটাও নলের মধ্যে ঢুকিয়ে আবার কাঠি দিয়ে ঠুকে সাহেবের হাতে দিল।

গাদা বন্দুক। প্রাচীন বন্দুকের বুলেটে বারুদ থাকত না। আলাদা বারুদ দিয়ে, তারপর গুলি ভরে কাঠি দিয়ে ঠুকে টাইট করে তবে ঘোড়া টিপলে বারুদ জ্বলত, গুলি বেরোত। রাঘবেন্দ্রর মুখ শুকিয়ে গেল। এ আবার কী? সাহেব কি সত্যি সত্যি গুলি ভরাল? সাহেব বন্দুকটা ওর দিকে তাক করে বলল, আমি মেজর লরেন্স ওয়াগনার। সেকেন্ড বেঙ্গল ইউরোপীয়ান লাইট ক্যাভ্যালরি। তোমার নাম কী? বাড়ি কোথায়? কবে, কী ভাবে মারা গিয়েছ?

রাঘবেন্দ্রর এবার সত্যিই ভয় করছে। ভরদুপুরে, দিনের বেলা এ কী আপদ!

আমতা আমতা করে বলল, আমার নাম রাঘবেন্দ্র রঞ্জন। আমি... আমি…

কী আমি, আমি করিটেছ? সাহেব আবার ধমক দিল। কবে মৃট্যু হইয়াছে? কী করিয়া মরিলে?

রাঘবেন্দ্রর আসপাশ থেকে সকলেই সরে গেছে। রাঘবেন্দ্র একাই বন্দুকের সামনে। বলল, আমি ফুলবাগানে থাকি। আমি মরিনি। বৃষ্টির জন্য এখানে আশ্রয় নিয়েছি।

চারিদিকে সকলের সমবেত হিঁইঁইঁইঁ করে নিঃশ্বাস টানার শব্দে রাঘবেন্দ্র চমকে উঠল। আবার মৃদু গুঞ্জন উঠল। মানুষ, মানুষ রে... সত্যি জ্যান্ত মানুষ... সকলে কয়েক পা পিছিয়ে গেল।

ওয়াগনার সাহেব একটু ভেবে বলল, টাহা হইলে আমার বন্ডুকের গুলি কি ইহাকে হত্যা করিতে পারিবে?

কেউ উত্তর দিতে পারল না, সবাই নানা কথা বলছে, আর রাঘবেন্দ্র এই সু্যোগে আস্তে আস্তে বাইরের দরজার দিকে এগোচ্ছে, যদিও বাইরে বৃষ্টির তোড় এখনও একটুও কমেনি... হঠাৎ নজরে পড়ে গেছে আর একজন সাহেবের। তিনি চেঁচিয়ে বলেছেন, ওয়াগনার, দ্য স্কাউন্ড্রেল ইজ অ্যাটেম্পটিং টু এসকেপ…

মেজরের বন্দুক তৎক্ষণাৎ আবার রাঘবেন্দ্রর দিকে। কোথায় যাইটেছ?

রাঘবেন্দ্র কাঁপা গলায় বলল, কোথাও না, স্যার। এই দেখছিলাম কোথায় একটু বসা যায়। একেবারে ভিজে গেছি কি না?

সবাই গুনগুন করে মাথা নেড়ে নেড়ে বলল, তা বটে তা বটে, মানুষ তো। ভিজেবেই তো।

ওয়াগনার বলল, ভিটর ডিকে আইস। দরজার কাছে ঠাকিবে না। পলাইবে। ওইখানে বসিয়া থাকো

রাঘবেন্দ্র না, না বলে আস্তে আস্তে ভেতরের দিকে গেল। একটা ওলটানো বালতি দেখিয়েছিল সায়েব। তার ওপরেই বসল। সতৃষ্ণ নয়নে দরজার দিকে দেখল, এখন আর পালানোর সময় পাবে না। আগেই ওয়াগনার গুলি চালিয়ে দেবে। ভূতের বন্দুকের গুলি কি ওর কিছু করতে পারবে? কিন্তু সে পরীক্ষা করার সাহস হলো না।

ওয়াগনার বলল, ভূট না হইয়া টুমি এখানে কী করিতেছ? সট্য করিয়া বলো।

রাঘবেন্দ্র বলল, সত্যি বলছি, স্যার, আমি বাইরে দিয়ে যাচ্ছিলাম, বৃষ্টি এল বলে ঢুকেছি মাথা বাঁচাতে…

ওয়াগনার আবার বন্দুক নামিয়ে বলল, কিন্টু টুমি আমাডিগকে ডেখিয়া ফেলিয়াছ। বলে চারিদিকে চেয়ে বলল, ইহাকে কী করা যায়? টোমাডিগের কী মটামট? ইহাকে যাইতে ডেওয়া যাইবে?

বলামাত্র একটা কোলাহল উঠল। কেউ বলে রাঘবেন্দ্র চলে গেলেই বাইরের লোকে জেনে যাবে যে এই পোড়ো গুদামঘরে ভূতের আস্তানা হয়েছে, ওমনি জীবন্তের দল এসে হয় এখানে কাজ করতে শুরু করবে, নয়ত ভেঙে ফেলবে। সুতরাং রাঘবেন্দ্রকে ছেড়ে দেবার প্রশ্নই ওঠে না, ওকে এখনই মেরে ফেলতে হবে, যাতে ও-ও ভূত হয়ে এখানেই থেকে যায়। ও তো এখানে এসেছে নিজের ইচ্ছায়, সুতরাং থাক এখানেই।

আর একদল বলতে লাগল, অত নিষ্ঠুর হয়ে কাজ নেই, কারণ তাহলেও তো ওর মৃতদেহ এক দিন না এক দিন পাওয়া যাবে। তখন আবার ভূতেদেরই বিপদ হবে। বদনাম হবে - ওরা মানুষ মারে। তার চেয়ে ওকে কান ধরে, নাকে-খত দিয়ে প্রতিজ্ঞা করানো হোক, যে ও কাউকে এখানকার কথা বলবে না। এ কথা শুনে রাঘবেন্দ্রও বেশ জোর দিয়ে বলতে গেছিল যে ও মোটেই কাউকে কিছু বলবে না, কিন্তু কথা বলতে যেতেই একটা ষণ্ডামার্কা পালোয়ান এমন চোখ পাকিয়ে ওকে চোপ বলে বকে দিল, যে ও কিছু না বলে আবার চুপ করে গেল।

চারিদিকে হট্টগোল চলছে, তার মধ্যে একরাশ ভূত পরিবেষ্টিত হয়ে রাঘবেন্দ্র বসে আছে, এমন সময় হঠাৎ একটা কমবয়েসী মেমসাহেব ছুটে এসে দু’হাত মেলে রাঘবেন্দ্রর সামনে দাঁড়িয়ে সুর করে ইংরেজিতে বলল, ড্যাডি... ওকে কিছু কোরো না, ওকে আমি বিবাহ করিব!

এই শুনে চারিদিকে সবাই নিশ্চুপ হয়ে গেল। এ ওর মুখের দিকে তাকাচ্ছে। রাঘবেন্দ্র দেখে ধবধবে সাদা বিয়ের পোশাক পরা একটা মেমসাহেব, হাতে ফুলের তোড়া নিয়ে দাঁড়িয়ে। ওয়াগনার বিরক্ত হয়ে বলল, তুমি তো অত্যন্ত অবুঝ মেয়ে দেখছি ফেলিসিটি... কথা নেই বার্তা নেই একটা কালো নেটিভকে বিয়ে করবে? ফ্র্যানসিস, এই মেয়েকে নিয়ে আমি কী করি বলো তো?

অন্য সাহেবটা কিছু বলার আগেই ফেলিসিটি বলল, ফ্রানসিস কী বলবে? আমি বিয়ে করতে চাই, ব্যাস।

এমন সময় আর একটা সাহেব, তার সাদাকালো সুট আর শার্ট, মাথায় টপ হ্যাট, এগিয়ে এসে বলল, ফেলিসিটি, তুমি কি পাগল হলে? তুমি তো আমার বিয়ে করা বউ!

ফেলিসিটি বলল, বিয়ে করা না হাতি। বিয়ের আগেই আমাদের মৃত্যু হয়নি? আর বিয়ের পরে তো তুমি পাদ্রী জোগাড় করতেই পারলে না।

এবারে একটা বিকট হইচই পড়ে গেল। ফেলিসিটি বলছে ও জীবন্ত রাঘবেন্দ্রকেই বিয়ে করবে। সেই নিয়ে হট্টগোল। কেউ বলে ভূতের সঙ্গে জীবন্ত মানুষের বিয়ে হতে পারে না, কেউ বলে অসুবিধে কী? কেউ বলল, রাঘবেন্দ্রকে মেরে ফেললেই ও ভূত হয়ে যাবে, তখন বিয়ে করতে বাধা থাকবে না। সেই শুনে রবার্ট - যে কি না নিজেকে ফেলিসিটির স্বামী বলে দাবী করছিল, রাঘবেন্দ্রকে বলল, বিয়ে করেই দেখো না, জ্যান্ত বা মরা - যে অবস্থাতেই বিয়ে করো, আমার হাতে তোমার নিস্তার নেই।

এদিকে ওয়াগনার চেঁচাচ্ছে - তোর কি কোনও আক্কেল নেই? কোন বুদ্ধিতে তুই একটা কালা নেটিভকে বিয়ে করতে চাস? এখানে এত সাহেব ভূত আছে, তাদের কাউকে বিয়ে কর না…

আর ফেলিসিটি বলছে, কাকে বিয়ে করব? সবারই তো বউ আছে কেবল রবার্ট ছাড়া... আর ওকে আমি আর পছন্দ করি না।

অনেকে আবার বলছে, না না। ফেলিসিটি বিয়ে করতে চাইলে এই লোকটাও পালিয়ে যাবে। ফেলিসিটি যাকেই বিয়ে করতে চেয়েছে আজ পর্যন্ত, সবাই পালিয়ে গেছে…

এমন সময় রাঘবেন্দ্রর কানের কাছে কে ফিসফিস করে বলেছে, কী বুঝছ?

চমকে তাকিয়ে দেখে একজন ব্রাহ্মণ, পরনে ধুতি আর উড়নি, ন্যাড়া মাথায় মস্তো টিকি, এসে পেছনে দাঁড়িয়েছেন।

বলল, কিছুই বুঝছি না, কী ব্যাপার বলবেন? এখানে এত ভূত কেন?

ব্রাহ্মণ বললেন, আরে সে তো তোমাদের জ্বালায়। একটা নিরিবিলি অন্ধকার জায়গা আর তোমরা বাকি রেখেছ? পোড়ো বাড়িগুলো ভেঙে ভেঙে মাল্টিস্টোরিড ফ্ল্যাটবাড়ি, তাছাড়া শ্মশানঘাট, ফাঁকা মাঠ, কালভার্টের নিচ... এমনকি হাইওয়েতে পর্যন্ত ঝকঝকে আলো দিয়ে রেখেছ। এমন করলে আমরা যাই কোথায়? তাই কোনও রকমে কয়েক হাজার ভূত... এখানে বাসা বেঁধে আছি। বাধ্য হয়ে। সব এই জেলার বাসিন্দা।

রাঘবেন্দ্র বলল, কিন্তু আমি তো এই জেলার নই…

ব্রাহ্মণ বললেন, তাতে কী? এখানে মরলে তো এখানকার ভূতই হবে। তবে ফেলিসিটি তোমাকে মারতে চাইছে না। বলছে জ্যান্তই বিয়ে করবে। খুব চিত্তাকর্ষক হবে ব্যাপারটা।

রাঘবেন্দ্রর বুক দুরদুর করে উঠল। বলল, কেন?

ব্রাহ্মণ বললেন, এরকম বিবাহ হয়েছে বলে শুনেছি আগে, কিন্তু চোখে কখনও দেখিনি। এবার দেখব।

রাঘবেন্দ্র বলল, আপনাদের তো রক্তমাংস নেই। আপনাদের সঙ্গে জীবন্ত মানুষের বিয়ে কী করে হবে? বলে আঙুল বাড়িয়ে যেই ব্রাহ্মণকে ছুঁতে গেছে, ওর আঙুলটা ঢুকে গেছে ব্রাহ্মণের পেটে।

ব্রাহ্মণ তো রেগে কাঁই, কোন জাত তুমি? হ্যাঁ হে, কথা নেই বার্তা নেই, ছুঁয়ে দিলে? মহা পাতক হবে!

রাঘবেন্দ্রর সেদিকে নজর নেই। বলল, তাহলে এই পেত্নি আমাকে বিয়ে করবে কী করে?

ব্রাহ্মণ বিরক্তস্বরে বললেন, আমরা ইচ্ছেমতো দেহধারণ করতে পারি। করি না, তার কারণ তোমাদের ছোঁয়া আমাদের কাছে দুর্বিসহ। ওই দেখো, আসছে মেমসাহেব। এবারে দেখবে।

রাঘবেন্দ্র ব্রাহ্মণের থেকে দৃষ্টি ফেরাতে না ফেরাতে ফেলিসিটি ছুটে এসে দুম করে ওর কোলে শুয়ে পড়ে বলল, তুমি তো আমাকে বিয়ে করতে চাও, তাই না, ডার্লিং - বলো, বলো আমার বাবাকে বলো…

রাঘবেন্দ্র লক্ষ করল, ব্রাহ্মণের পেটের ভেতরে ওর আঙুল যেমন ঢুকে গেছিল, ফেলিসিটির বেলায় সেরকম হলো না, ওর কোলেই বসে রইল। কিন্তু কোনও ওজন নেই। হালকা। মনে হলো, ভূত তো, হাওয়ায় ভেসে নেই তো? সাবধানে ফেলিসিটির হাতে হাত ছুঁইয়ে দেখল, না। ছুঁতে পারল। ব্রাহ্মণ ঠিকই বলেছিল তবে।

এর মধ্যে এক দিক থেকে ওয়াগনার আর অন্য দিক থেকে রবার্ট এসে দাঁড়িয়েছে ওর দু’দিকে। ওয়াগনার বন্দুক তুলে ওর কপালে ঠেকিয়ে বলল, ইউ নেটিভ, টুমি আমার কন্যাকে বিবাহ করিতে সম্মটো আছ? সঠিক জবাব দাও।

আর অন্য দিকে রবার্ট বলছে, ইউ ডার্টি নেটিভ, কোন সাহসে তুমি আমার স্ত্রীর শরীর স্পর্শ করিটেছ, টোমাকে আমি উচিত শিক্ষা দেব।

বিরক্ত হয়ে রাঘবেন্দ্র বলল, দেখো সাহেব, তোমাদের বাংলার চেয়ে আমার ইংরেজি ঢের ভালো। বলে ইংরেজিতে বলল, তোমরাই ঠিক করো আমি তোমার মেয়ে - বা তোমার বউ - বা যে-ই হোক, তাকে বিয়ে করব কি না। তারপরে আমার কাছে এসো বরং।

রাঘবেন্দ্রর মুখে ইংরেজি শুনে সাহেব দুজন মুখ তাকাতাকি করল, ওয়াগনার বলল, ওয়েল, বাবু, তুমি কি ফেলিসিটিকে বিয়ে করতে চাও?

এদিকে ফেলিসিটি রাঘবেন্দ্রর গলা জড়িয়ে আনন্দে চেঁচাচ্ছে, ড্যাডি, ড্যাডি... দেখো ও তো ইংরেজিতেই আমার সঙ্গে কথা বলতে পারবে... আর আমার কী চিন্তা! এই নাও ডার্লিং, আমার এই রুমাল তোমার পকেটে রাখো... বলে একটা রুমাল গুঁজে দিল রাঘবেন্দ্রর বুক পকেটে।

ওয়াগনার বলল, মাই গার্ল, তুমি আমার কাছে এসো তো, ভালো করে আমরা আলোচনা করি।

ফেলিসিটি বাবার সঙ্গে চলে গেল, পেছন থেকে ব্রাহ্মণ বলল, হলো তো? বিদ্যে ফলাতে গিয়ে আরও ফেঁসে গেলে। দেহাতি হিন্দি বললে হয়ত মেয়েটা বিরক্ত হত, তা না, ঠ্যাস ঠ্যাস করে সাহেবের মতো ইংরিজি বলতে হলো?

রাঘবেন্দ্রও বিরক্ত হয়ে বলল, তা কী করব? এমনি এমনি তো সেন্ট জেভিয়ার্স স্কুলে পড়িনি সারা জীবন।

রাঘবেন্দ্রর ইংরিজি শুনে অন্য ভূতেরাও বেশ উৎসাহিত। তারাও একে একে মত দিতে শুরু করেছে, রাঘবেন্দ্র যদি ইংরিজিতেই ফেলিসিটির সঙ্গে কথা বলতে পারবে, তাহলে রাঘবেন্দ্রই বিয়ে করুক ওকে, সেই ভালো হবে।

সমস্যা হলো এর পরে। রবার্ট দুই বুড়ো আঙুল নাচিয়ে বলল, ভালো তো হবে। কিন্তু বিয়ে দেবে কে? পাদ্রী কোথায়? পাদ্রী পেলে তো আমিই ফেলিসিটিকে বিয়ে করতাম।

রাঘবেন্দ্র ব্রাহ্মণকে বলল, এত ভূত, তার মধ্যে পাদ্রী নেই কেন?

ব্রাহ্মণ বলল, আরে, বলো কেন, দেখো না, এই ফেলিসিটি আর রবার্ট - ওদের তো বিয়ে হবার আগের মুহূর্তে গীর্জাঘরে বাজ পড়ে সবাই মরে গেল। ফেলিসিটা আর রবার্ট তো গেলই, তার সঙ্গে ওই ওয়াগনার, তার বন্ধু ফ্রানসিস, আরও কে কে - পাদ্রীটাও মরেছিল, কিন্তু সে এখেনে নেই।

রাঘবেন্দ্র বলল, এমন কেন?

ব্রাহ্মণ বলল, ওদের ব্যাপারস্যাপার আলাদা। আমাদের মতো না। আমরা জীবনে কী কী অপরাধ করেছি, তার ওপরে বিচার হয়, তারপরে কে কতদিন কী যন্ত্রণা ভোগ করবে তার সিদ্ধান্ত নেন চিত্রগুপ্ত। সে শাস্তি সবার জন্য সমান। এই তো দেখো না, আমি ব্রাহ্মণ পুরোহিত, সারা জীবন পুজো আচ্চা, তর্পণ করলাম, কিন্তু দুই স্ত্রীকে সমান ভালোবাসিনি বলে, আর ভাইয়েদের সম্পত্তি একা ভোগ করেছি বলে আমার এখনও মর্ত্যদশা শেষ হলো না।

রাঘবেন্দ্র বলল, ওদের বিচার হয় না?

ব্রাহ্মণ বলল, হয় বইকি, কিন্তু অন্যরকম। পাদ্রীরা ভূত হয়ে ঘোরে না। ঈশ্বরের কথা লোকেদের বলে পুণ্যার্জন করে কি না!

রাঘবেন্দ্র বলল, অপরাধ করলেও না?

ব্রাহ্মণ বলল, না। ওদের জন্য অন্য কিছু বিধান আছে কি না জানি না, কিন্তু মর্ত্যে অশরীরী দশা হয় না।

রাঘবেন্দ্র বলল, তাহলে বিয়ে হবে না?

ব্রাহ্মণ বলল, দুঃখ হচ্ছে? মেমসাহেবের রূপ দেখে মজলে নাকি? মনে রেখো, এই মেয়েকে বিয়ে করলে সারা জীবন ওই ওয়াগনারকে নিয়ে চলতে হবে।

রাঘবেন্দ্রর দুঃখ হচ্ছিল না, কিন্তু তক্ষুনি আর কিছু করার আছে বলে মনে হচ্ছিল না। এর মধ্যে বাইরে বৃষ্টির তোড় এতই যে রাস্তা থেকে জল উঠে গুদামের দরজার নিচ দিয়ে কুলকুল করে ভেতরে জল ঢুকতে আরম্ভ করেছে। ফলে বেরিয়েও যেতে পারবে বলে মনে হচ্ছে না। আর যেতে চাইলেও ভূতেরা যেতে দিলে তো!

ব্রাহ্মণ বলল, বিয়ে করতে চাও? না পালাবে?

রাঘবেন্দ্র বলল, পাগল হয়েছি নাকি? পেত্নিকে কেউ বিয়ে করে? কিন্তু পালাব কী করে?

ব্রাহ্মণ বলল, আপাতত চুপ করে বসে থাকো। কিচ্ছু করবে না। আমি বললে তবেই নড়বে। বলে গলা মেলে বলল, পাদ্রী নেই তো কী হয়েছে? হিন্দুমতে বিয়ে দিয়ে দাও, আমি মন্তর বলে দেব।

আঁতকে উঠে কিছু বলতে যাবে রাঘবেন্দ্র, ব্রাহ্মণ ততক্ষণে চলে গেছে, আর আবার বিরাট হইচই শুরু হয়ে গেছে... এবারে আর কী হচ্ছে বুঝতে পারছে না রাঘবেন্দ্র। আসেপাশে এমন কেউ নেই যাকে জিজ্ঞেস করতে পারে, কারণ কেউ খুব কাছাকাছি নেই। অথচ বুদ্ধি করে দুজন ভূত আবার দাঁড়িয়ে আছে বেরোবার দরজার কাছেই, ফলে পালানোরও উপায় নেই। বসে বসে রাঘবেন্দ্র পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে দেখল অফ হয়ে গিয়েছে। এমন বৃষ্টিতে নিশ্চয়ই ভেতরে জল টল ঢুকে গেছে। কটা বাজে? বিকেল হয়ে এসেছে। পেটে কিছ দানাপানি পড়েনি প্রায় ঘণ্টা ছয় সাত। ছুঁচোয় ডন দিচ্ছে। ভূত হয়ে গেলে চিন্তা নেই, খেতে টেতে হবে না। বাইরে বৃষ্টি কি কমেছে? বোধহয়…

হঠাৎ মনে হলো কে যেন ওর হাত ধরে নাড়াচ্ছে। চমকে উঠে বুঝল খিদেয়, ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পড়েছিল। কতক্ষণ, কে জানে! দেখে ব্রাহ্মণ হাতে একটা লাঠি নিয়ে ওর কনুইয়ে গুঁতো মারছে, বলল, আচ্ছা লোক যা হোক, বসে বসে ঘুমুচ্ছ? ওদিকে তোমার বিয়ে প্রায় ঠিক…

রাঘবেন্দ্রর লজ্জা হলো, বলল, না এই... বসে বসে চোখ লেগে গেছিল। বিয়ে কি করতেই হবে?

ব্রাহ্মণ বলল, তাই তো বলছি - আমি বলেছি, হিন্দুমতে বিয়ে করতে গেলে মেমসায়েবকে হিন্দু হতে হবে। সে নিজে রাজি। তাই ওকে পঞ্চগব্যের বিধান দিয়ে এসেছি। এখন কোথায় গরু পাওয়া যাবে তা নিয়ে বখেরা চলছে। এদিকে তুমি কী করছ? গেটে যে পাহারা নেই - সে দেখছ না?

তাই তো! অবাক হয়ে তাকাল রাঘবেন্দ্র। বলল, আমি পালাই?

ব্রাহ্মণ বলল, আবার আমার অনুমতি নিচ্ছ? আর কার কার অনুমতি লাগবে? মেমসায়েব, ওয়াগনার সকলকেই ডাকি?

আরে না না, বলে আঁতকে উঠে রাঘবেন্দ্র পায়ে পায়ে গেটের দিকে যাচ্ছে, ব্রাহ্মণ তাড়া দিয়ে বলল, আ মলো যা। এই ভাবে গেলে তো দরজা পৌঁছতেই রাত হয়ে যাবে। দৌড়ে যাও, আমি এদিক সামলাচ্ছি।

রাঘবেন্দ্র আর অপেক্ষা না করে লাগাল এক দৌড়। গেটের পাশের ফাঁক দিয়ে ঘষে ঘষে বেরোচ্ছে, শুনতে পেল ব্রাহ্মণের গলা - এই পালাচ্ছে পালাচ্ছে…

সঙ্গে সঙ্গে ভেতর থেকে নানা ভূতের কোলাহল! রাঘবেন্দ্র আর না দাঁড়িয়ে কোনও রকমে বেরিয়ে পড়ল। বাইরে বৃষ্টি এখনও হচ্ছে, কিন্তু এটা ঝিরঝিরে বৃষ্টি। দু’চারটে ট্রাক পেরিয়ে চট করে ব্যাগ থেকে ছাতাটা বের করে মাথার ওপর ধরে দৌড়ল স্টেশনের দিকে। ছাতায় নিজে বাঁচবে না, কারণ নিজেকে বাঁচানোর কিছু নেই, এখনও সর্বাঙ্গ পুরো ভেজা, কিন্তু অন্তত ব্যাগ আর ভেতরের চেকটা যদি বাঁচানো যায়…

বাড়িতে ফিরে বকুনি খেতে হলো - বর্ষার দিনে বেরোনোর জন্য, দেরি করার জন্য আর ভিজে ফেরার জন্য। মা তাড়াতাড়ি জামাকাপড় খুলতে বাধ্য করে বাথরুমে পাঠাল, যা যা, নেয়ে আয়, এই নোংরা জলে জামাকাপড় ভেজা…

বাথরুমে ঢুকে রাঘবেন্দ্রর হাসি পেল। গুদামঘরে আধো অন্ধকারে জব্বর একখানা স্বপ্ন দেখেছে যা হোক। রাতে খেতে বসে মা-বাবাকে বলতে হবে। মেমসাহেব পেত্নির সঙ্গে বিয়ে হবার স্বপ্ন! মা ওমনি বলবে, বলছি বিয়ে করে নে, নইলে এমন আরও কত স্বপ্ন যে দেখতে হবে...

বাথরুম থেকে বেরিয়ে দেখে মা জামাগুলো কাচতে দিতে গিয়ে পকেট থেকে ভেজা একটুকরো কাপড় বের করে এক গাল হেসে বলছে - ও ছেলে, এই তোমার ব্যবসার চেক আনতে যাওয়া? পকেটে মেয়েদের রুমাল নিয়ে বাড়ি ফিরেছ?

মায়ের হাতে একটা লেসের লেডিজ রুমাল।

মা ভালো করে দেখে বলল, ও মা, কী ভালো রুমালটা। এটা কায়দা করে কী অক্ষর লেখা রে, ইংরিজিতে? এস্‌? না টি? না…

রাঘবেন্দ্র বলল, ওটা এফ্‌, মা। কায়দা করে লিখলে ওমনিই দেখায়।

মা ভুরু কুঁচকে বলল, এফ্‌? এফ্‌ দিয়ে মেয়েদের কী নাম হয়? ফাল্গুনী? না, সে তো পি দিয়ে। কী নাম রে? বাঙালি?

রাঘবেন্দ্র বলল, বাঙালি এফ্‌ নাম অনেক আছে মা, তবে সে বেশিরভাগ ওপার বাঙলার। ইনি বাঙালি না। এনার নাম ফেলিসিটি। মেমসাহেব। আহা আহা, চেঁচিও না। আমার গার্লফ্রেন্ড না। তবে বলতে পারো কোনও রকমে বেঁচে ফিরেছি। পরে গল্প শুনো। এখন খিদে পেয়েছে, ভাত দাও।