“পারে বইকি! ধর সরকার কেসটা আর তুললই না। নতুন করে পুলিশ তদন্ত করে নতুন কেস তুলল। এর মধ্যে এই কেসটা ক্লোজ না করলে তোকে ইমপ্লিকেট করা সুবিধা।”
“সহজ না। পুলিশে ছুঁলে ক’ ঘা ভুলে গেছ? এইটিন ব্লো-জ। তোকে একটা ঘটনা বলি। কয়েক বছর আগেকার। কলকাতার উপকণ্ঠে বরানগর অঞ্চলে একটা মস্তো পুরোনো শিশি-বোতলওয়ালার বাড়ি আছে। ওই যারা রাস্তায় ঘুরে ঘুরে পুরোনো কাগজ, শিশি-বোতল, ভাঙা গ্রামোফোন – এসব কেনে, তারা এদেরকে গিয়ে বিক্রি করে। বিলেত হলে বলত জাংক ইয়ার্ড। দশ বারো কাঠা জমি ছিল, এখন কমে কমে বোধহয় পাঁচ ছ’ কাঠা। তিন পুরুষের ব্যবসা ওদের। এখন যে মালিক সে তৃতীয় পুরুষ। যেদিন ঘটনার শুরু, তখনও সে মালিক না। মালিকের বড়ো ছেলে। সেদিন মালিকের ছোটো ছেলের বৌভাত। দাদা ভোর থেকে ব্যস্ত। আগের দিন ওই জাংক ইয়ার্ড থেকে জঞ্জাল সরিয়ে জায়গা বের করে প্যান্ডেল হয়েছে। সকাল থেকে ভিয়েন বসেছে, নানা লোকজন ব্যস্ত, এমনসময় তিনজন লোক মাথায় করে কিছু হিজিবিজি বিক্রি করতে এসেছে। কোথায় পুরোনো বাড়ি ভাঙা হচ্ছে, সেখান থেকে কিছু জানলার খড়খড়ি-কপাট, কিছু চেয়ারের পায়া, একটা কালো হয়ে যাওয়া আয়না – এই সব। দাদা বলেছে, আজ কিছু হবে না। আমাদের ব্যবসা আজ বন্ধ। আজ ভাইয়ের বৌভাত। ওরা প্রায় পায়ে পড়ে বলেছে, “বাবু, একটাও পয়সা নেই। কিছু চাই না, আমাদের তিনজনকে মিলিয়ে একশোটা টাকা দিন বাবু, আমরা সেই প্রায় সুন্দরবন থেকে এসেছি।”
“ওদের ব্যবসা ক্যানিং-নামখানা থেকে নিয়ে প্রায় মালদা অবধি – তাই সে মোটেই আশ্চর্য হয়নি। ঘ্যানঘ্যান বন্ধ করার জন্য ওদের হাতে একশো টাকার একটা নোট ধরিয়ে দিয়ে বলেছে, “যা, ওই প্যান্ডেলের পেছনে মালগুলো নামিয়ে দিয়ে বাড়ি যা।” ওরাও তাই করেছে, আর তারপরে দাদা ভুলেও গেছে সকালের ওই লোকগুলোর কথা।
“সন্ধেবেলা বৌভাতের আসর সরগরম, এমন সময় ক্যানিং থানা থেকে পুলিশ এসে হাজির। কী হয়েছে? না, আপনারা চোরাই মাল রেখেছেন, অ্যারেস্ট করতে এসেছি। বাড়িতে তিনজন পুরুষ – বৃদ্ধ বাবা, সদ্য বিয়ে করে আসা ভাই, আর তার দাদা। বাধ্য হয়ে দাদাকেই সামনে গিয়ে কথা বলতে হল। জানা গেল, সকালে যে তিনজন ভাঙা জিনিসপত্র দিয়ে গিয়েছিল – তাদের বিরুদ্ধে থানায় নালিশ হয়েছে – তারা কোথায় কোন বাড়ি ভাঙা হচ্ছিল, সেখান থেকে কী সব চুরি করে পালিয়েছে।
“দাদা ওদের দেখিয়ে দিল কী কী জিনিস এনেছিল লোকগুলো, পুলিশ হাসাহাসি করল, দেখেছ, কী সব লোকে চুরির রিপোর্ট লেখায়। তারপরে সেগুলো গাড়িতে তুলে নিল। বাড়িতে অনুষ্ঠান বলে ওদের ছেড়ে দিল, কিন্তু বলে গেল পরদিন সকালেই যেন ক্যানিং থানায় রিপোর্ট করে।
“পরদিন ভোরবেলা বেরিয়ে শেয়ালদা থেকে ট্রেন ধরে দাদা গেল ক্যানিং। দেখল সে এক হইহই ব্যাপার! ও-সি ওকে ডেকে বলল, ‘দেখুন, আপনার ওখান থেকে যে তিনটে ঝুড়ি এনেছি, তাতে নানা জিনিসের মধ্যে কী পেয়েছি...’ দাদা দেখে একটা তালাবন্ধ ড্রয়ারের মধ্যে তিনটে সিকো ঘড়ি, আর একটা ক্যাননের এস-এল-আর ক্যামেরা। দেখে তো প্রায় অজ্ঞান!”
“কেন-টা অদ্ভুত। ওই যে তিনটে লোক, ওরা একশো টাকা হাতে নিয়ে শেয়ালদা থেকে লোক্যাল ট্রেনে ক্যানিং গেছে, বিনা টিকিটে। যখন পৌঁছেছে, তখন স্টেশনে বিশাল চেকিং চলছে। তিনজনের কারওরই টিকিট নেই, ওরা লাইন পেরিয়ে দৌড়েছে তিন দিকে। একজন গিয়ে পড়েছে একটা পুলিশ-অপারেশনের মধ্যে। তার ঠিক আগেই ক্যানিং-এ ব্যাঙ্ক ডাকাতি হয়েছে একটা। পুলিশ, অ্যাজ ইউজুয়াল, ডাকাতরা বাড়ি গিয়ে চান-খাওয়া শেষ করে ঘুমোতে যাবার পরে ব্যাঙ্কে পৌঁছে দারোয়ান থেকে ম্যানেজার, সবাইকে অ্যারেস্ট করার হুমকি দিয়ে সো-কলড্ এনকোয়ারি করে প্যান্ট টেনে তুলতে তুলতে বেরিয়েছে, এমন সময় ওই লোকটা সামনে দিয়ে দৌড়ে যাচ্ছে – ইনস্পেকটর অগ্রপশ্চাত না ভেবে রিভলভার বের করে দেগে দিয়েছে।
“লোকটা মরে না গেলে ওকেই ডাকাত বানিয়ে নির্ঘাৎ চালান দিত পুলিশ, কিন্তু মরে যাবার পরে একটু যত্ন করে তদন্ত তো করতে হয়, এবং তাতে জানা গেল যে বেচারা নেহাতই হার্মলেস একটা পুরোনো কাগজ বিক্রিওয়ালা। অন্য দুজন আগেই ধরা পড়েছে রেলপুলিশের হাতে, ওরাই আইডেন্টিফাই করল, সব গল্প জানা গেল তখন।
“পুলিশ পড়ল ফাঁপড়ে। ফলে পুলিশের বাঁধা-ধরা লোককে দিয়েই একটা ফলস কেস দায়ের করা হলো। সো দ্যাট মৃত ব্যক্তিকে বড়ো চোর বা চোরাচালানকারী বলা যায়। পুলিশ বিরাট তদন্তে বেরোল সেই বরানগর অবধি – আর পরদিন সেই দাদা এসে সোজা ওয়াকড ইন্টু দ্য পুলিশ ট্র্যাপ।”
“আমার নিজের জীবনে যদি এই ঘটনাটা না ঘটত, বলতাম তুই সেরেফ গাঁজাখুরি গপ্পো মারছিস।”
“এটা আমার জীবনের একটা বিরাট রিসার্চ ওয়ার্ক, বা গোয়েন্দাগিরি। তবে এখনও আমি নেই। এ সব গল্প প্রি-অ্যাম্বল।”
“ধৈর্যং রহু। বি অ্যাজ পেশেন্ট অ্যাজ আ রুই মাছ। এখনও ইন্ট্রো চলছে। দাদা তো কন্ট্রাব্যান্ডের লিস্ট দেখে প্যান্টে প্রায় ইয়ে করে ফেলেছে। পুরোনো কাগজ, ভাঙা ট্র্যানজিস্টর, আর পায়াভাঙা খাটিয়ার বিজনেস করে – সে তো কোনও দিন সিকো ঘড়ি, ক্যাননের ক্যামেরা – এসব চোখেই দেখেনি। আর তাছাড়া জানেও না কী করে পুলিশের ঝামেলা হ্যান্ডেল করতে হয়। পুলিশও বুঝেছে, একে ধরে মজা আছে – ওরাও ছেলেটাকে এপাশ ওপাশ রগড়ানি দিতে লেগেছে।”
“মেরেছে তো বটেই। পুলিশ তোকেও চড় মেরেছিল। মনে নেই এর মধ্যেই? যাই হোক, বেচারা তো অনেক চড়-থাপ্পড় খেয়ে শেষে বেশ কিছু টাকা খেসারত দিয়ে ফিরল। ওর ধারণা কেস মিটে গেছে। কিন্তু এমনই কপাল, বা অন্য ভাষায় – এমনই অবিমৃষ্যকারিতা, যে খবরও নেয়নি কিছু, উকিলও ফিট করেনি। তিন মাস পরে আবার পুলিশের আগমন – আবার অ্যারেস্ট, কেস উঠবে। ও-ও আসামি। রিসিভার অফ স্টোলেন গুডস।”
“তার পর আর কী! আবার আদালত, আইন, এবারে উকিল! দেখা গেল পুলিশ আগের বার টাকা খেয়ে ‘ছেড়ে দিচ্ছি’ বলে যে সব কাগজে সই করিয়েছিল, তার মধ্যে একটা কনফেশনও ছিল – আমি একটি সিকো ঘড়ি রিসিভ করেছি। জজ সম্ভবত বুঝেছিলেন ব্যাপারটা, কিন্তু ওকে কিছু বলেননি। শুধু একটা রেপ্রিমান্ড দিয়ে ছেড়ে দিয়েছিলেন। এদিকে, ওর উকিল – সম্ভবত কনফেশনটা রয়েছে বলেই – কোর্টে বলে, এটা ওর ফার্স্ট অফেনস, ইত্যাদি।”
“আরে সবাই তো আর ইংরেজি মিডিয়াম স্কুলে পড়েনি তোর মতো। একবর্ণ ইংরেজি জানে না। তার ওপর হাবাগোবা। যাকে বলে স্ট্রিট স্মার্ট – সে-ও না। পুঁটে বা লিটনকে এরকম সিচুয়েশনে ফেলে দিলে যা হবে তা হয়নি। কী হচ্ছে, কী বলছে – কাকে বলছে, কিছুই বুঝতে পারছে না। ভ্যাবলার মতো এদিক ওদিক চাইছে, আর লোকে ওর ওপরে চিৎকার করছে – পুলিশ, উকিল, জজ – সব্বাই। যা হোক, শেষে মিটল। অন্তত, ও তাই ধারণা নিয়ে বাড়ি ফিরল বেশ কিছু খেসারত দিয়ে। ফিরে বলল, ‘সব ভালো যার শেষ ভালো।’”
অতনু হাসলেন। বললেন, “না। এটা মুখবন্ধ শেষ। গল্পের শুরু এর পরে। প্রায় সাত আট বছর পরে। বাবা নেই, ভাই নিজে একটা ব্যবসা করে উঠে গিয়েছে। দাদা একাই ওই বিরাট জমিতে পুরোনো কাগজ, শিশি-বোতলের কাবাড়ি ব্যবসার মালিক। একদিন ভোরবেলা দাঁতন করতে বেরিয়েছে – গঙ্গার পাশে বাড়ি, গঙ্গার ঘাটেই আচমন-স্নান। দরজা খুলেই দেখে বাড়ির সামনে জিপ থেকে পুলিশ নামছে। এবার কলকাতা পুলিশ। কিছু বোঝার আগেই জিপে তুলে নিয়ে গিয়েছে মধ্য কলকাতার কোন থানায়। সে সেকেন্ড ও-সি। ভীষণ রাগী, ভীষণ হাত চলে। প্রশ্ন করার আগেই চড় থাপ্পড়। কোথায় রেখেছিস?”
“এটা একরকম টেকনিক। তোকে যদি জিজ্ঞেস করি তোর গাড়ির শাড়ি-পরা পুতুল কোথায় রেখেছিস, তাহলে তুই বলে দিলে আমি ওটুকুই জানব। আর কিছু জানতে পারব না। কিন্তু তুই যদি মার খেয়ে ভয় পেয়ে আমার বাড়ির টি-ভি, মাইক্রোওয়েভ চুরি করে কোথায় রেখেছিস, তা-ও বলে দিস, তাহলে আমি সেটাও জেনে যাব।”
“লজিক অফ টরচার হিসেবে মন্দ না। যাই হোক, মারের চোটে প্রায় অজ্ঞান, দুটো দাঁত খুলে গিয়েছে, চোখ ফুলে প্রায় দেখতে পাচ্ছে না কিছু – এমন সময় ওসি ঢুকলেন। অবস্থা দেখে জিজ্ঞেস করলেন কে ওটা? উত্তর শুনে তিনি তো সেকেন্ড অফিসারকে এই মারেন কী সেই মারেন! তোমার কাণ্ডজ্ঞান নেই? শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথের নোবেল চুরির দায়ে বরানগরের জাঙ্ক ব্যবসায়ীকে নিয়ে আসার কী মানে?”
একগাল হেসে অতনু বললেন, “হুঁ, হুঁ, বাবা! স্টোলেন গুডস-এর রিসিভার হিসেবে লোকটার নাম পুলিশের খাতায় উঠে গিয়েছে সেই তখন থেকেই। ফলে যখনই কোনও বড়ো চুরি হবে, যদি কোনও পুলিশ কর্তার মাথায় ঢোকে, ওকে আবার আসতে হবে থানায়। যে থানার অফিসারের ইচ্ছে হবে, সে-ই তুলে আনতে পারে।”
“থিওরেটিকালি পারে বইকি! রাজাভাতখাওয়ায় কারওর ঘড়ি ছিনতাই হলেও পারে, ইনডিয়ান মিউজিয়ামে যদি কাল মমি চুরি হয়, তাহলেও পারে।”
“হুঁ হুঁ বাবা! ওনলি সিন দ্য ডাভ, নট পেইড অ্যাটেনশন টু দ্য ট্র্যাপ? পুলিশে ছুঁলে ক’ঘা? জানো না? যাই হোক, সেই সহৃদয় অফিসারকেও ও জিজ্ঞেস করেছিল, কী করলে এই অত্যাচারের হাত থেকে বাঁচা যায়? অফিসার বলেছিলেন, “বাড়ি বেঁচে পালিয়ে যান। কোথায় যাচ্ছেন, কাউকে বলবেন না। তখনই নার্ভাস ব্রেকডাউন হয়।”
“হ্যাঁ। ও এখন সাইকিয়াট্রিস্ট। বড়ো বড়ো নামী হাসপাতাল-টালে বসে। ও কেসটা হ্যান্ডেল করেছিল। ও-ই আমাকে ফোন করে জিজ্ঞেস করে কিছু করা যাবে কি না। ও-সি ব্যাপারটা বুঝে সেকেন্ড অফিসারের হাত থেকে ওকে বাঁচিয়ে দেন, কিন্তু ততক্ষণে মিডিয়া খবর পেয়ে গেছে। ফলে বেচারা যখন মাথায় ব্যান্ডেজ আর গালে স্টিচ নিয়ে বাড়ি ঢুকছে, ততক্ষণে ওদের গলিতে টি-ভি চ্যানেলের আউট-ডোর ভ্যানে ছয়লাপ। সবার মুখে একই খবর। এই জাঙ্ক ইয়ার্ডে নোবেল পাওয়া গিয়েছে। অবশ্য ব্যাপারটা বোঝার আধঘণ্টার মধ্যেই সেই ভীড় পাতলা হয়ে গিয়েছে, কিন্তু ওই ফিফটিন মিনিটস অফ ফেমই ওর সাইকোলজিকাল ব্রেকডাউনের পক্ষে যথেষ্ট ছিল। তখন সংগ্রাম ওকে দেখে। তারপরে মাঠে নামি আমি। ভাব, ক্যানিং গিয়ে গিয়ে ওই তদন্ত। তাও ঘটনার সাত-আট বছর পরে! তবে ভাগ্যিস, ওই যে তিনজন কাবাড়িওয়ালা, তাদের দুজনকে পাওয়া গেল – ওদেরও সিকো ঘড়ির কেস-এ ফাঁসিয়েছিল ওই ও-সি। সেখান থেকে তাকে ট্র্যাক ডাউন করা... সে তখন বারাসতে। ওর কাছ থেকে কনফেশন আদায় করা... ছেলের হাতের মোয়া ছিল না মোটেই। নটা কেস অফ ডিপ্রাইভিং আ চাইল্ড অফ হিস সুইটমিট। ভাগ্যিস, তখন যিনি এস-পি, তাঁকে খুব ভালো করে চিনতাম। তিনি বললেন, কনফেস না করলে তবু কিছু দয়া হবে, নইলে সাসপেন্ড করে ডিপার্টমেন্টাল প্রোসিডিংস শুরু করবেন। ও-সির তখন আর বছর দুয়েক চাকরি বাকি। বুঝে গেল কোঅপারেট না করলে কপালে দুঃখ আছে। তারপরে মামলা করলাম। জজসাহেব হেসেই বাঁচেন না। হি ওয়াজ আ গ্রেট ম্যান। পরে ক্যালকাটা হাই কোর্টের চিফ জাস্টিস হয়েছিলেন।”
“সে অত সস্তা নয়। কোন খাতায় কোথায় নাম রয়েছে, তা কে জানে? রিসিভার অফ স্টলেন গুডস বলে কোনও সেন্ট্রাল লিস্ট আছে কি না তা-ও পুলিশ বলতে পারেনি। থাকলেও সেটা কোথায়? কিন্তু এনাফ ট্রাব্ল ওয়াজ ক্রিয়েটেড ফর সাম পুলিশ অফিসারস। বিশেষ করে ক্যানিং-এর ওই ও-সি আর কলকাতার এই সেকেন্ড অফিসারের জন্য। আশা করছি এর পরে অন্তত বছর পনেরো কোনও পুলিশ অফিসার উইদাউট অ্যাডেকোয়েট প্রুফ লোকটাকে নিয়ে টানাটানি করবে না। আর তারপরে ওই রিসিভারের লিস্টই হয়ত উইয়ে খেয়ে দেবে, কে জানে?”
বাড়িতে ঢুকে সোজা খাবার ঘরে গিয়ে টেবিলে কার্টনটা নামিয়ে রেখে প্রদীপের খানিকটা সময় লাগল ভবিষ্যৎ কার্যপদ্ধতি স্থির করতে। মনে হলো, একটু চা খাবেন। গত ক’দিন চা খাননি। কফিই চলে অতনুর বাড়িতে, চায়ের পাট ওদের নেই। এমনিতে প্রদীপ চা খান না, কিন্তু মৌলির দার্জিলিং চায়ের কৌটো রয়েছে রান্নাঘরে। প্রদীপকে কতবার বলেছিল, খেয়ে দেখো দার্জিলিং চা খেলে কফি-প্রেম ছুটে যাবে। খাননি। খেলেই পারতেন... চোখের দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে এল...
জল বসিয়ে চায়ের টিন খুঁজে পেতে সময় লাগল। কৌটোর ঢাকনা খুলে প্রদীপের ভুরু কুঁচকে গেল। চা-পাতায় সাদা সাদা কিসের দাগ? ছাতা পড়েছে? প্রদীপ কোনও দিন চা-পাতায় এমন দাগ দেখেছেন? গ্যাসটা নিভিয়ে দিলেন। মিছিমিছি আগুন নষ্ট করে কি লাভ?
একবার মনে হল, অতনুকে বলা হয়নি অফিসে কী হয়েছে। তারপরে ভাবলেন, এখনই বলে কী লাভ? কখনওই বলে কী লাভ? শেষে ঠিক করলেন, পরে বলা যাবে ’খন।
আবার খাবার ঘরে ফিরলেন। একটু একটু খিদে পাচ্ছে। কী খাবেন? বাড়িতে তো কোনও খাবার নেই। অতনুর বাড়ি হলে বনির বানানো চপ বা পকোড়া ফ্রিজ থেকে বের করে গরম করে খেতে পারতেন। নয়ত কফি আর বিস্কিট। প্রদীপ কৌটোগুলো নেড়ে দেখলেন সবই খালি। ফ্রিজের গায়ে মৌলির হাতের লেখায় টেক-অ্যাওয়ের লিস্ট আর ফোন নম্বর। পিৎজা, ডাল-ভাত, মোগলাই, রোল – কী নেই! কাকে ফোন করবেন? ভাবতে ভাবতেই মোবাইলটা বাজতে শুরু করল। প্রদীপ টেবিল থেকে ফোনটা হাতে নিয়ে দেখলেন অতনুর ফোন।
“হ্যালো?”
“কোথায়?” অতনুর গলায় কি উদ্বেগ?
প্রদীপ বললেন, “বাড়িতে।”
প্রদীপ অফিসে নয়, বাড়িতে – শুনে অতনুর কোনও হেলদোল প্রকাশ পেল না। কিন্তু পরের কথাটা অদ্ভুত।
“একা, নাকি কেউ আছে?”
“কেউ নেই। কেন?”
“বাইরের দরজা বন্ধ কর।”
প্রদীপ অত্যন্ত আশ্চর্য হয়ে বললেন, “দরজা তো বন্ধই আছে, কিন্তু কেন? কী হয়েছে?”
“দরজায় লক লাগা। ছিটকিনি লাগা। হুড়কো আছে? তাহলে তা-ও লাগা।”
“কী আশ্চর্য...”
“এক্ষুনি। আমি আসছি। ততক্ষণ কাউকে দরজা খুলবি না। চেনা হলেও না। আমি এসে দরজায় দাঁড়িয়ে ফোন করছি। তবে আমাকে দরজা খুলে দিবি।”
লাইন কেটে গেল। প্রদীপ একবার ভাবলেন ফিরে ফোন করবেন কি না। তারপরে ভাবলেন, থাক। দরজায় হুড়কো নেই। ছিটকিনিও নেই। শুধু নাইটল্যাচের লক। ইচ্ছে ছিল বাইরে একটা গ্রিলের দরজা লাগিয়ে তাতে তালার ব্যবস্থা করবেন। কিন্তু সোসাইটি রাজি হয়নি। বলেছিল, ইউনিফর্মিটি নষ্ট হয়ে যাবে। ওটা থাকলে হয়ত... অ্যামেরিকা হলে স্যু করতেন প্রদীপ?
খাওয়ার কথা এখন আর ভেবে কাজ নেই। অতনু এলে ভাবা যাবে। প্রদীপ টেবিলে রাখার কার্টনটা খুললেন। নিচ থেকে টেনে বের করলেন মৌলির ছবিটা। বসার ঘরের টেবিলে মৌলির সাধের ট্রে। সিজনাল ফুল থাকত। রাস্তা থেকে কুড়িয়ে আনত মৌলি। কখনও কৃষ্ণচূড়া, কখনও জারুল, কখনও টগর বা কামিনী, আবার পুজোর আগে শধুই শিউলি। থালাটা এখন খালি। ব্যানার্জীদার কাজের মেয়ে বোধহয় শেষ শুকনো ফুলগুলো ফেলে দিয়েছে। প্রদীপ ক্রিস্টালের ট্রে-টা সরিয়ে রাখলেন। বসার ঘরের টেবিল এখন খালি। ফ্রেমে বাঁধান’ মৌলির ছবিটা রাখলেন টেবিলের মাঝখানে। তারপরে সরিয়ে রাখলেন এক কোণে। পছন্দ হলো না। অন্য কোণে নিয়ে গেলেন। তারপরে চুপ করে ছবিটার দিকে চেয়ে রইলেন। সম্বিৎ ফিরল কলিং বেল বেজে ওঠায়। চমকে উঠলেন প্রদীপ। এই অসময়ে কে? অতনু এত তাড়াতাড়ি এসে পড়ল? কিন্তু ওর তো দরজায় দাঁড়িয়ে ফোন করার কথা। বাইরে বেশ কিছু লোকের সমাগম বোঝা যাচ্ছে। তারা নিজেদের মধ্যে কথা বলছে, এবং খুব আস্তেও নয়।
প্রদীপ আস্তে আস্তে এগিয়ে গেল। পিপ-হোলটা কোনও কাজের নয়। ভালো পিপ-হোল হলে গোটা ল্যান্ডিং-টাই দেখা যেত। এটা দিয়ে শুধু সামনের লোকটার কাঁধ আর গলার অংশ দেখা গেল। একটু কাঁপা গলায়ই প্রদীপ জিজ্ঞেস করলেন, “কে?”
“আমরা সোসাইটির তরফ থেকে এসেছি, মিঃ সেনগুপ্ত।”
নিশ্চিন্ত। দরজা খুলে প্রদীপ ভিতরের দিকে ঢুকে এলেন। একে একে যাঁরা ঢুকলেন, তাঁদের প্রদীপ চেনেন, কিন্তু চেনেনও না। প্রথমে সুধীরবাবু। সোসাইটির প্রেসিডেন্ট। ব্যানার্জীদা এঁর সম্বন্ধেই বলেন, যে হাবভাব ভারতের প্রেসিডেন্টের মতো।
পিছনে যাঁরা, তাঁরা সকলেই নিশ্চয়ই এখানকারই সিনিয়র বাসিন্দা সব। প্রদীপ পিছিয়ে এসে ড্রইং রুমে ঢুকে বললেন, “বসুন।”
ওঁরা বসলেন না। সুধীরবাবু বললেন, “না, না। আমরা বসতে আসিনি। আমরা আপনার সঙ্গে আপনার ক্যালামিটির পরে আর দেখা করে উঠতে পারিনি, তাই... ইয়ে, আর একটা ব্যাপার আছে। শেখর?”
শেখরবাবু সোসাইটির সেক্রেটারি। এগিয়ে এসে বললেন, “আমরা সোসাইটির পত্তনের সময়ই স্থির করেছিলাম, দ্যাট উই উইল অর্গানাইজ আ কন্ডোলেনস মিটিং ফর এভরি ডেথ। মৌলিদেবীর মতো ইয়ং ডেথ আমাদের এখনও হয়নি। ভেরি আনফর্চুনেট। আপনি যদি এগ্রি করেন তাহলে আগামী রবিবার, সকাল সাড়ে দশটায়...”
“এ কী! বাইরের দরজা খোলা কেন!” অতনুর আর্তনাদে থতমত খেয়ে সেক্রেটারি থেমে গেলেন। বসার ঘরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে অতনু ভীষণ রেগে বললেন, “তোকে যে আমি বললাম, দরজা লক করে রাখতে, কাউকে না খুলতে...”
শীতল কণ্ঠে সুধীরবাবু বললেন, “আমরা সোসাইটির ম্যানেজিং কমিটির তরফ থেকে এসেছি। আপনি?”
অতনু আগে বাইরের দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে এসে বললেন, “আমি ওঁর ল’ইয়ার।”
“নমস্কার। আমরা মৌলিদেবীর কনডোলেনস মিটিং-এর বিষয়টা প্রদীপবাবুর সঙ্গে আলোচনা করতে এসেছি।”
অন্যমনস্কভাবে দু-হাত জোড় করে নমস্কারের প্রত্যুত্তর দিতে দিতেই অতনু বললেন, “তা বেশ, কিন্তু ব্যাপারটা কী জানেন? এটা ঠিক আলোচ্য বিষয় নয়। অর্থাৎ, এটা প্রদীপের সঙ্গে আলোচনা করা যাবে না। আপনারা বোধহয় দেখেছেন যে প্রদীপ এখনও ছাড়া পায়নি। যদিও গতকাল অবধি কেস এমনই অবস্থায় ছিল, যে ওনার বিরুদ্ধে কেস দাঁড়াবেই না। আজ-কালের মধ্যেই ডিসমিস করানো যেত। কিন্তু আপাতত যা হয়েছে, তাতে বোঝা যাচ্ছে যে তা-ও হবে না। ইন ফ্যাক্ট, রাইট নাও মিঃ সেনগুপ্ত ইজ ইন গ্রেভ ডেন্জার। ওনার জীবনের আশঙ্কা রয়েছে। ফলে ওনাকে এখানে রাখা যাবে না। কারণ হঠাৎ ওনার ওপর কোনও অ্যাটাক হলে আশেপাশের লোকেরাও যে বিপদে পড়তে পারেন, তা নিশ্চয়ই আপনাদের বলে দিতে হবে না?”
সোসাইটির লোকজনের মুখ ফ্যাকাশে। একজন একটু ভুরু কুঁচকে বললেন, “তার মানে? আমাদের কেন বিপদ হবে?”
“হবে না? আগামী অ্যাটাকটা যদি ছুরি দিয়ে না হয়ে ওনার গাড়িতে বোমা লাগিয়ে হয়, বা যখন উনি গেট দিয়ে ঢুকছেন, তখন গেটের বাইরে যদি কেউ ওনাকে লক্ষ করে দশ-বারোটা গুলি চালায়, তাহলে সেই বোমায় বা সেই গুলিতে সোসাইটির অন্য কারওর – কোনও বাচ্চার ক্ষতি হতে পারে না?”
সোসাইটির হর্তাকর্তারা মুখ চাওয়া-চাওয়ি করলেন।
“মিঃ সেনগুপ্ত এখানে আর থাকবেন না। হয়ত কোনও দিন ফিরবেন, কিন্তু আপাতত আমি ওনাকে নিয়ে যাচ্ছি। বলা বাহুল্য, কোথায় নিয়ে যাচ্ছি, তা বলছি না। আপনারা এসেছেন, ধন্যবাদ। কিন্তু পুলিশ ওনার সেফটির ব্যবস্থা না করা অবধি আমি কোনও চানস নিতে চাই না। তাই, আপনাদের কথা ভেবেই বলছি – আপনারা যদি সকলে এখন, মানে...”
মানে বোঝাতে হলো না। বিদায় সম্ভাষণ মুলতুবি রেখেই সকলে যাকে বলে দুড়দাড় করে পালাল। রয়ে গেলেন প্রেসিডেন্ট সুধীরবাবু। সবাই চলে গেলে প্রদীপকে বললেন, “ইয়ে, আমি কথাটা পরে বলতাম, কিন্তু পরে আর সুযোগ হবে কি না...”
খানিক এদিক ওদিক তাকিয়ে বললেন, “আপনি যদি এখানে না থাকার কথা ভাবেন, তাহলে আপনার ফ্ল্যাটটা নিশ্চয়ই রেখে দেবেন না। যদি বিক্রি করার কথা ভাবেন, তাহলে...”
প্রদীপ কিছু বলছেন না দেখে ভদ্রলোক একটু থতিয়ে গেলেন। বললেন, “ইয়ে, মানে...”
প্রদীপ দেখলেন সুধীরবাবুর পেছনে দাঁড়ানো অতনু মাথা নেড়ে ‘না’ বলছেন। তাই চুপ করে রইলেন।
“আমি ভালো দাম দেব...” বলতে শুরু করেছিলেন সুধীরবাবু, কিন্তু অতনু সামনে এসে কথা কেটে বললেন, “দাম আপনি নিশ্চয়ই ভালো দেবেন, কিন্তু একটা বিষয় আপনাকে ভেবে দেখতে হবে – প্রদীপ এখনও বাড়ি বিক্রি সম্বন্ধে কিছু ভাবেইনি। সুতরাং...”
এবার অতনু যে ভাবে সুধীরবাবুর দিকে এগিয়ে গেলেন, যে সুধীরবাবুর বেরিয়ে যাওয়া ছাড়া আর গতি রইল না।
দরজাটা আবার লক করে দিয়ে প্রদীপের দিকে ঘুরে অতনু বললেন, “খানিকক্ষণ আগে লিটন আর পুঁটেকে পাওয়া গেছে।”
প্রদীপ বললেন, “সেটা তো ভালো কথা। ওরা কী বলছে, এখন?”
“কিছুই না। ইন ফ্যাক্ট, ওরা আর কোনও দিন কিছু বলবেও না। ওদের পাওয়া গিয়েছে মানে ওদের ডেডবডি পাওয়া গিয়েছে।”
“রিটায়ার করতে আর দু’বছর বাকি,” ঘামে ভেজা মুখটা মুছতে মুছতে বললেন অর্ধেন্দু। “খুব যে সাংঘাতিক ভালো ইনভেস্টিগেটর ছিলাম, তা নয়। তবে একেবারে ওঁচাও তো ছিলাম না, প্রসূন? এই বুড়ো বয়সে, রিটায়ার্মেন্টের দরজায় এই কেসটা কেন এল বলো তো?”
প্রসূনের কষ্টই হচ্ছিল। অর্ধেন্দুদা বড্ড হড়বড় করছিলেন। লোকটার হাত ধরে প্রসূনের ডিটেকটিভ জীবনে ঢোকা। খারাপ গোয়েন্দা তো নন’ই, বরং অনেকের চেয়ে খুবই ভালো। অনেক সাকসেস রয়েছে। কিন্তু প্রদীপ সেনগুপ্তকে নিয়ে কী না বোকামী করলেন ভদ্রলোক।
“অর্ধেন্দুদা, আমি কিন্তু লেটেস্ট ডেভেলপমেন্টটা জানি না।”
দীর্ঘশ্বাস ফেললেন অর্ধেন্দু। “জানার আর কী আছে ভাই? লিটন আর পুঁটের ডেডবডি পেয়েছি, জানো তো?”
“হ্যাঁ, কিন্তু...”
“কাল থেকে হন্যে হয়ে ছুটে বেরিয়েছি দুটোকে খুঁজতে। না পেয়েছি ওদের, না পেয়েছি উকিলটাকে... ওর অ্যাড্রেসও জানতাম না। সে নিয়েও কী দাবড়ানি! আচ্ছা ভাই, কোন আই.ও সাক্ষীর উকিলের অ্যাড্রেস রাখে, বলো তো? বিশেষ করে যখন সাক্ষীরা জেল কাস্টোডিতেই রয়েছে? সকালে কোর্ট থেকে অ্যাড্রেস নিয়ে গিয়েছি বাড়ি – সেই ঠাকুরপুকুর ছাড়িয়ে কোথায়! কেউ নেই। দরজায় অ্যাত্তো বড়ো তালা। ফোন করলাম ইনস্পেক্টরকে। বললেন, ওয়ারেন্ট নিয়ে যাও। তালা ভেঙে ঢোকো। জাস্ট ভাবো, ল’ইয়ারের বাড়িতে তালা ভেঙে...? যাই হোক, ডি.আই.জি বলে দিয়েছেন, ওয়ারেন্ট রেডি ছিল। আবার গেলাম ফিরে। লোকাল থানা থেকে ফোর্স নিয়ে তালা ভেঙে ঢুকে দেখি বাড়িতে জনমানুষ নেই, শুধু লিটন আর পুঁটের ডেডবডি।”
“কী ভাবে মরেছে?”
“পয়জন। ইনজুরি নেই। মুখে ফেনা। পোস্ট মর্টেম রিপোর্ট আসুক, দেখো কী বলে? আবার ফোন করলাম, কী গালাগালি খেলাম বিশ্বাস করবে না। যেন আমিই মেরেছি। আচ্ছা, বলো তো, আদালতে লিটন আর পুঁটেকে ধরে রাখার দায়িত্বও কি আমার ছিল? আমাকে বলা হলো লোক্যাল থানার ও.সি-কে তদন্ত হ্যান্ডওভার করে আমি যেন ফিরে আসি – অফিসে অপেক্ষা করি।”
দরোয়াজা ঢুকল। অর্ধেন্দুকে স্যালুট করে বলল, “ডি.আই.জি সাব সেলাম দিয়া।”
অর্ধেন্দু, প্রসূন, দু-জনেরই মুখ চূন।
“চলি ভাই, না ফিরলে একটা পুজো দিয়ে দিও।” অর্ধেন্দু বেরিয়ে গেলেন।
পাঁচ মিনিটও লাগল না, অর্ধেন্দু ফিরে এলেন ঘাম মুছতে মুছতে। সঙ্গে সেই সিপাই। “সাব আপকো সেলাম ভেজা।” এবারে প্রসূনের পালা।
ডি.আই.জি-র ঘরে ঢুকে স্যালুট করতে গিয়ে প্রসূন বুঝল ওর হাঁটু কাঁপছে। রাশভারি নন্দী-সাহেবের মুখে কিন্তু স্মিত হাসি। “সিট ডাউন।”
স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে অস্ফূটে থ্যাংক ইউ জানিয়ে সামনের চেয়ারে বসল প্রসূন।
“কত দিন হলো এ.এস.আই হয়েছেন?”
“আড়াই, প্রায় তিন বছর, স্যার,” বলল প্রসূন।
“আপনার রেকর্ড দেখছিলাম। নট ব্যাড।” ডি.আই.জি-র চোখ সামনের খোলা ফাইলের দিকে।
“থ্যাংক ইউ, স্যার।” প্রসূনের গলায় একটু জোর।
“খুব অল্প বয়সে এসেছেন সি.আই.ডি-তে।”
প্রসূন চুপ।
“সবসময়েই অর্ধেন্দু দাসের আন্ডারে কাজ করেছেন।”
“স্যার।”
“হি অলসো ওয়াজ গুড, কিন্তু এই মৌলি সেনগুপ্তর কেসটা নিয়ে হি ফেল ডাউন ব্যাডলি। খুব ব্যাড পাবলিসিটি হয়েছে।”
প্রসূন চুপ। বলারই বা কী আছে?
“দ্য কেস ইজ নাও ইন দ্য হ্যান্ডস অফ এস.আই সুব্রত গাঙ্গুলি অ্যান্ড ইনস্পেক্টর নকুল সেন। আপনি রিপোর্ট করবেন গাঙ্গুলিকে।”
“ইয়ে...”
“খুব টাফ কেস বলে তো মনে হচ্ছে না। অর্ধেন্দু ডিড আ শডি জব। সেটার জন্য ও নিজেও সম্পূর্ণ দায়ী নয়। আমরাও চাইছিলাম তাড়াতাড়ি ইনভেস্টিগেশন শেষ হয়ে চার্জশিট দেওয়া হোক। প্রেশার ছিল, কিন্তু এখন আর নেই। অর্ধেন্দুকে বাধ্য হয়ে সাসপেন্ড করতে হয়েছে। রাইট নাও, হি হ্যাজ বিন টোল্ড, ও ইনভেস্টিগেশন করবে না, কিন্তু আপনাদের সবরকম সাহায্য করবে।”
“আচ্ছা স্যার।”
ডি.আই.জি পাশে রাখা পাইপ তুলে নিয়ে মুখে দিলেন। লাইটার নিয়ে জ্বালাতে গিয়ে থেমে বললেন, “আপনি সব ডিটেল ওর কাছেই পেয়ে যাবেন। হি উইল নট কাম টু দি অফিস নাও, কিন্তু আপনি ওর সঙ্গে দেখা করতে যেতেই পারেন।”
প্রসূন ঢোকামাত্র ফেটে পড়লেন অর্ধেন্দু। “ওই শ্...”
দরজা ঠেলে ক্যান্টিন বয় চা নিয়ে ঢুকল। দুজনের সামনে ছোটো ছোটো কাপে চা দিয়ে চলে যাবার পরে আবার মুখ খুললেন অর্ধেন্দু। “ওই রিটায়ার্ড চিফ সেক্রেটারিই যত নষ্টের গোড়া। বার বার আই.জি, ডি.আই.জি-কে ফোন করে করে বিরক্ত করতে থাকল... ওনারাও আমার মাথায় চড়ে বসলেন... আমি সমস্তটা তালগোল পাকিয়ে কী যে করলাম... মাঝখান থেকে সাসপেনশন হলো আমারই।” অর্ধেন্দু একটা থুতু ফেলা আর গালি দেওয়ার মাঝামাঝি শব্দ করলেন। উঠে চায়ের কাপটা নামিয়ে রেখে ড্রয়ার খুলে চাবির গোছা বের করে ঝনাৎ করে রাখলেন প্রসূনের সামনে।
“সাসপেনশনের আইন-টাইন জানা আছে?”
“না।”
“আমারও না। তবে চাবিটা বোধহয় তোমারই হাতে যাবে। আমার হাতে পেন্ডিং কিছু তো আর নেই। আচ্ছা থাক। সিনিয়র কেউ আসুক। প্রোসিডিওরাল মিসটেক করে কাজ নেই।”
সন্ধেবেলা অতনুর বসার ঘরে বসে ব্যাঙ্কের সমস্ত কথা শুনে অতনু বললেন, “ওই জন্যই বলেছিলাম, ব্যাঙ্কে কী হলো আমাকে জানাস। তোর চাকরি গিয়েছে সেটা কোর্টে মামলা ওঠার আগেই ডিসিশন হয়ে গিয়েছিল। আমি ভাবছিলাম অভয়ঙ্কর যদি খালাসের পরে কলকাঠি নাড়তে পারেন। সে দেখছি হলো না।”
বনি জানতে চাইলেন, “ব্যাঙ্কের এগেনস্টে মামলা করা যায় না?”
অতনু বললেন, “যায় বইকি। বিলেত, অ্যামেরিকা হলে এক্ষুনি মামলা হত, তিন মাসে ইনভেরিয়েব্ল ভিক্টরি। চাকরি ফিরে না পেলেও অনেক টাকা কম্পেনসেশন। আমাদের দেশে কী হবে বলা কঠিন। এত বড়ো একটা অর্গানাইজেশন, ওদের টাকার যা জোর, মামলা টেনে নিয়ে যাবে আরও চল্লিশ বছর। উকিলের ফি দিতে দিতে জেরবার হয়ে যাবি।”
“আমি মামলা করতে চাই না।”
“কী করবেন?” জিজ্ঞেস করলেন বনি।
প্রদীপ উত্তর দিলেন না। মাথা নিচু করে বসে রইলেন। কী ইচ্ছে করছে বললে ওরা কী ভাববে? আপাতত ইচ্ছে করছে বিছানায় কুঁকড়ে শুয়ে থাকতে। কিন্তু সে কি সম্ভব?
“তুই কালকের দিনটা ঘুমো।” অতনু কি প্রদীপের মনের কথা বুঝলেন? “ইওর রুম ইজ স্টিল ইওরস। চাইলে পরশুও ঘুমো। তারপরে আর শুতে দেব না। তুই আমাদের সঙ্গে বেরোবি।”
প্রদীপ কিছু বললেন না। কৃতজ্ঞ চোখে তাকালেন অতনুর দিকে।
“খুব ভালো হবে।” বনির গলায় উৎসাহ। “আপনি আমাদের ফাইনানশিয়াল মেস্-টা একটু ক্লিয়ার করে দেবেন। আমাদের অ্যাকাউন্ট্যান্ট্ ছেলেটা আনাড়ি।”
প্রদীপের ফোনটা বেজে উঠল। প্রদীপ আড়চোখে তাকালেন। অচেনা নম্বর। ধরবেন কি? অতনু খুব ভয় দেখিয়ে রেখেছে। সারা দিন দরজার বাইরে একজন পুলিশের লোক বসেছিল। অতনুর বক্তব্য ওদের বাড়ির গেটেও একজন রয়েছে। প্রদীপ একবার দরজা খুলে লোকটিকে দেখে বলেছিলেন, “আপনি ভিতরে এসে বসবেন? এখানে তো একটা ফ্যানও নেই।” লোকটা ভীষণ স্মার্ট একটা স্যালুট দিয়ে বলেছিল, “এখানেই ডিউটি স্যার। ডেনজার কিছু এলে আগেই রুখতে হবে।” প্রদীপ তাতে স্বস্তি বোধ করবেন, না ভয় পাবেন, বুঝতে পারেননি।
ফোনটা বেজে চলেছে। অতনু হাত বাড়িয়ে তুলে নিয়ে বললেন, “এই নম্বরটা যেন...” প্রদীপের দিকে তাকিয়ে বললেন, “আমি দেখছি।” ফোন তুলে বললেন, “আমি প্রদীপ সেনগুপ্ত নই। আমার নাম অতনু সিনহা। আমি...”
তারপরে থেমে খানিকক্ষণ শুনে বললেন, “হ্যাঁ। একমিনিট।” ফোনটা বাড়িয়ে বললেন, “প্রসূন মজুমদার। এখন কেস ওনার হাতে।”
প্রদীপ ফোন নিলেন। কিছুক্ষণ প্রসূনের বক্তব্য শুনে বললেন, “ঠিক আছে।”
ফোন নামিয়ে বললেন, “আবার জিজ্ঞাসাবাদ শুরু। আসছেন এখানে।”
অতনু বললেন, “তা তো আসতেই হবে...”
কথাটা শেষ না হতেই দরজায় ঘণ্টা বেজে উঠল। এত তাড়াতাড়ি কি প্রসূন এসে পৌঁছবেন? তবে নতুন নিয়ম অনুযায়ী ওদের কারওর দরজা খুলতে হয় না। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই দরজা খুলে বাইরে দাঁড়ানো পুলিশের লোকটি বলল, “মিঃ ব্যানার্জী আয়ে হ্যায়।”
কে ব্যানার্জী?
জানা গেল তিনি প্রদীপের প্রতিবেশী। অনুমতি পেয়ে দরজার পুলিশ মোবাইল ফোনে নিচের পুলিশকে জানাল, তার খানিকক্ষণ পরে লিফটে উঠে এলেন ব্যানার্জীদা। গলায় কপট বিস্ময় মাখিয়ে বললেন, “বা-বা! আপনার সঙ্গে দেখা করতে আসা তো বেশ কঠিন হয়ে উঠল দেখছি।”
প্রদীপ হেঁহেঁ শব্দ করলেন, অতনুর নাক থেকে যে ঘোঁত-টা বেরোল, সেটা বিরক্তিও হতে পারে।
খানিক সৌজন্যমূলক বার্তালাপের পর ব্যানার্জীদা বললেন, “আপনি সুধীরকে ফ্ল্যাট বিক্রি করছেন?”
ওঁরা দুজনেই অবাক। প্রদীপ বললেন, “কই, সেরকম তো কিছু...”
“দেখেছেন, কী বজ্জাত!” ব্যানার্জীদার গলায় উত্তেজনা। “সব্বাইকে বলে বেড়াচ্ছে – আপনি নাকি কমিট করেছেন।”
অতনু বললেন, “কমিট তো দূরের কথা, প্রিলিমিনারি কথাও হয়নি।”
ব্যানার্জী সামনে ঝুঁকে পড়লেন। বললেন, “আপনাকে বলছি, ওই বদমাশ-টাকে দেবেন না ফ্ল্যাট। ও আপনাকে ঠিক দাম দেবে না। বিক্রি করলে আমাকে বলবেন। ভালো কাস্টমার জানা আছে...”
প্রদীপের মনে পড়ল, ওর বেলাতেও এজেন্ট ব্যানার্জীদার সঙ্গেই যোগাযোগ করিয়ে দিয়েছিল। লোকটা দালাল নাকি?
বলল, “আমি এখনও বাড়ি বিক্রির কথা কিছু ভাবিনি, ব্যানার্জীদা।”
ব্যানার্জী হাত নেড়ে মাছি-তাড়ানোর ভঙ্গীতে বললেন, “আহা, এখনের কথা বলছি না। বলছি, যখন বিক্রি করবেন... তা দাম কত ভেবেছেন?”
আরে! এ বলে কী!
“দাম... মানে...” আড়চোখে প্রদীপ দেখল অতনু মিটমিট করে হাসছে।
“আমি বলছি,” ব্যানার্জী বলে চললেন। “দেখুন, আপনার ফ্ল্যাটটা রিলেটিভলি নতুন। খুব বেশি লোক থাকেওনি কখনও। তবে সাউথ তো নেই, নর্থ আর ইস্ট ফেসিং... তবে আপনি তো বেশ দামি টাইলস-ফাইলস লাগিয়েছেন, তাতে কস্ট বাড়বে খানিকটা, কিন্তু আবার খুন হওয়া বাড়ি, তার জন্য খদ্দের পাওয়া মুশকিল হতেই পারে... তাই ধরুন...”
“এক মিনিট।” এবার বাধা দিলেন অতনু। “আমার মনে হয় এই আলোচনাটা এখন না হওয়াই ভালো। পুলিশ আসছে প্রদীপের সঙ্গে দেখা করতে। ওরা যদি এসে দেখে আপনি ফ্ল্যাট কিনতে এসেছেন...”
“পুলিশ? আবার পুলিশ কেন? কেস তো মিটে গেছে!”
“মিটে গেছে?” অতনুর কণ্ঠে অবাক বিস্ময়। “খুনি কে?”
“কিন্তু প্রদীপবাবু তো আর খুনি নন, সেটা তো...”
অতনু মাথা নেড়ে বলল, “তাহলে প্রদীপকে আসামির কাঠগড়ায় দাঁড়াতে না হলেও উইটনেস্ তো হতেই হবে। কেস শেষ হয়নি, মিঃ ব্যানার্জী। তাই বলছিলাম, পুলিশ যদি এসে দেখে যে আপনি আপনার শালীর জন্য প্রদীপের ফ্ল্যাটের দর কষাকষি করছেন, তাহলে আপনাকেই না সাসপেক্ট করে বসে!”
ব্যানার্জীর চোখ কপালে।
“আমার শালীর জন্য ফ্ল্যাট! কে বলল আপনাকে?”
“কে আবার বলবে? আপনি যে শালীর জন্য ফ্ল্যাট খুঁজছেন, সে তো আপনার আবাসনের সব্বাই জানে। পুনে থেকে তিনি সপরিবারে কলকাতায় শিফট করেছেন তিন মাস আগে, আর আপনি হন্যে হয়ে ফ্ল্যাট খুঁজছেন আপনার বাড়ির কাছে... চৌধুরীদের ফ্ল্যাট কতয় বিক্রি হবে?”
ব্যানার্জী-দার চোখ ক্রমেই ওপরে উঠছিল, এখন প্রায় চাঁদির কাছে। “কে চৌধুরী?”
“বা রে!” অবাক হয়ে বললেন অতনু, “আপনাদের প্রতিবেশী – যাঁর মেয়ে প্রথম মৌলির ওপর আক্রমণটা দেখে চেঁচিয়ে তার মা-কে বলে। আপনি নিশ্চয়ই জানেন, যে সেই মেয়ে তার পর থেকে রাত্তিরে ঘুমোতে পারে না, ঘুমের মধ্যে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে, তাই ডাক্তারের পরামর্শে বাবা-মা তাঁকে নিয়ে চলে যাচ্ছেন অন্য কোথাও – বাড়ি বিক্কিরি করে... জানেন না?”
ব্যানার্জীদা মাথা নাড়লেন। হ্যাঁ-না কিছু বললেন না। বোঝা গেল জানেন।
“ইন ফ্যাক্ট, মেয়েটাকে নিয়ে তো আবাসনের সবাই খুব দুশ্চিন্তায়। সুতরাং আপনার কানে নিশ্চয়ই গিয়েছে। চৌধুরিরা তো বেশ রিজনেব্ল দাম চেয়েছে বাড়ির। ওদের সঙ্গে কথা বলেছেন?”
এখনও নির্বাক ব্যানার্জী মাথা নাড়লেন। না।
অতনু বলে চলল, “তবেই দেখুন – বিক্রির ফ্ল্যাটের খোঁজ না করে, আপনি প্রদীপকে বলতে এসেছেন ওর ফ্ল্যাট আপনাকে বেচে দিতে – যে ফ্ল্যাট বিক্রির কোনও সিদ্ধান্তই মালিক নেয়নি। ভাবুন, সেটা জানতে পারলে পুলিশ যদি আপনাকে সন্দেহ করে আপনাকে নিয়েই টানাটানি শুরু করে – তাই বলছিলাম, এই সব দরাদরি এখন না করে কেসটা মিটে যাবার পরই করা ভালো নয় কি?”
রান্নাঘর থেকে ব্যানার্জীদার জন্য কফি নিয়ে বেরিয়ে বনি বললেন, “কোথায় গেলেন?”
অতনু বললেন, “পুলিশের ভয়ে পালিয়েছে। দাও, ওটা আমাকেই দাও।”
প্রদীপ বললেন, “শালীর জন্য ফ্ল্যাট খালি করতে কেউ পাশের বাড়ির লোককে খুন করতে পারে? এটা একটা লজিক হলো ?”
কফিতে চুমুক দিয়ে অতনু বললেন, “ওয়েল, সেটা ডিপেন্ড করে সে তার শালীকে কতটা ভালোবাসে তার ওপর। আমি কথাগুলো বলেছিলাম ভাগানোর জন্য। তোর যদি অতই ইচ্ছে, তাহলে যা, বারান্দা থেকে হেঁকে ডাক। এখনও নিশ্চয়ই সামনেই আছে।”
প্রসূনের অফিস থেকে অতনুর ফ্ল্যাট দূরে নয়। এসে পড়লেনও তাড়াতাড়ি। অনেকটাই অল্পবয়সী আগের অফিসারের চেয়ে। অর্ধেন্দুর চেয়ে অনেক স্মার্টও মনে হয়েছিল প্রথমে। এখনও সেরকমই দেখলেন – এর আগের বার প্রদীপকে অনর্থক অ্যারেস্ট করে হ্যারাস করার জন্য খুব মার্জিতভাবে ক্ষমা চাইলেন। তার মধ্যে কোনও বাড়াবাড়ি নেই। কোনও অপ্রয়োজনীয় স্পর্ধারও প্রকাশ নেই।
“আমরা নতুন করে কেস ওপেন করেছি – বুঝতেই পারছেন, এখন কাজটা আরও অনেক বেশি কঠিন। কারণ সত্যিই যে দুজন মাত্র ব্যাকগ্রাউন্ড ইনফরমেশন হোল্ডার ছিল – তারা দুজনেই এখন মৃত। নর্ম্যাল সার্কমস্ট্যানসে আমরা ওদের উকিলকে জেরা করতাম, এখন তো উনিই প্রাইম সাসপেক্ট।”
“কিন্তু উনিও তো নট অ্যাভেলেব্ল্।”
“ফেরার।” প্রসূন দ্বিধাহীন। “একেবারেই গন। কোথাও নেই। উকিল নেই, উকিলের স্ত্রী, দুই মেয়ে... আমরা প্রায় একই সঙ্গে জনা সত্তর আত্মীয়-বন্ধুর বাড়ি হাজির হয়েছি – যাতে একজন আর একজনকে ওয়ার্ন না করতে পারে, কেউ কিচ্ছু জানে না। বরং সকলেই অবাক। সেটার মধ্যে অ্যাক্টিং নেই। বেশ ছা’পোষা মধ্যবিত্ত পরিবার সব। তবে উকিলের সংসারে-বাড়িতে একটা সচ্ছ্বলতার ছাপ রয়েছে, যেটা উকিলি দিয়ে এক্সপ্লেন করা যাবে না। পাড়ার লোকেরা এ-ও বলেছে, যে উকিলবাবু নাকি মাঝে মাঝেই দু-তিন সপ্তাহের জন্য ভ্যানিশ করে যেতেন। বাড়ির লোকেরা, এবং উনি নিজেও পাড়ার লোকেদের জানাতেন যে অন্য কোনও স্টেটের হাই কোর্টে মামলা করতে যাচ্ছেন। সবাই ভাবত হাবেভাবে তো অত বড়ো উকিল বলে মনে হয় না? কিন্তু ইট ইজ নট ট্রু। কেবল কলকাতার পুলিশ কোর্টেই উকিলি করতেন।
”
“উনিও ডেড না তো?” জানতে চাইলেন অতনু।
“কে জানে বলতে পারবেন? হু নোজ,” বললেন প্রসূন।
“এত কথা আমাদের বলছেন কেন?”
“বলছি, কারণ মিঃ সেনগুপ্ত, আপনার আর মৌলিদেবীর লাইফ আমরা ছিঁড়ে-খুঁড়ে দেখেছি। আপনাদের দু-জনের মতো এত অ্যাবাভ বোর্ড লোক কম দেখা যায়। গত বিশ বছরে আপনারা দু-জনে কে কোথায় ছিলেন, এবং কী করেছেন, তা প্রায় ঘণ্টায় ঘণ্টায় বলে দেওয়া যাবে। কিন্তু ভাবুন, কথা নেই বার্তা নেই, আপনারা দু-জনে একত্র হবার এক বছর পেরোন’র আগেই একজনকে নৃসংসভাবে খুন হতে হলো। খুনিরা ধরা পড়ে আপনাকে ইমপ্লিকেট করার চেষ্টা করল। আপনার কপাল ভালো যে পুলিশ যথেষ্ট গা লাগিয়ে ইনভেস্টিগেট করেনি। যদি করত, আর যদি জানতে পারত যে ওই ক্রুশিয়াল দিনগুলোতে আপনার গাড়ি ছিল না, আর পুঁটে আর লিটন যদি শুধু এইটুকুই বলত, যে আপনি খিদিরপুরে ওদের আড্ডাতে কী ভাবে গিয়েছেন ওরা জানে না, আর কোনও একটা বারে বসে মদ খেতে খেতে এই খুনের কথা হয়েছে, তাহলে কিন্তু আপনি এত সহজে বাঁচতে না-ও পারতেন।”
অতনু বলল, “আপনি প্রায় কনফেস করছেন যে লিটন আর পুঁটের কাছে পুলিশের তদন্তের সব ডিটেল ছিল?”
“ছিল না ভাবার কারণ আছে? এই ধরুন, আমি তো আপনাদের বিশ্বাস করে কিছু কিছু কথা বলছি। কী আইডিয়া নিয়ে বলছি? যে আমার কথা থেকে আপনাদের যদি কিছু মনে পড়ে বা খেয়াল হয় – যদি আপনারা কোনও নতুন তথ্য দিতে পারেন। তেমনই লিটন আর পুঁটের ক্ষেত্রেও অর্ধেন্দুদা তা করেননি কী করে জানলেন?”
সকলেই চুপ করে রইল।
“শুধু তাই নয়,” বললেন প্রসূন। “ভেবে দেখুন, আপনারা এমন একটা ভীমরুলের চাকে ঢিল মেরেছেন যে তার জন্য তিনটে মানুষকে এক কথায় প্রাণ দিতে হয়েছে। অ্যাজ ইউ নো, মিঃ সেনগুপ্ত, আপনিও হয়ত সেফ নন। কথায় কথায় এত মানুষের প্রাণ নিতে যে পারে, সে – বা তারা – কিন্তু আমাদের দেশেও বেশ ক্ষমতাবান লোক। ওদের কাছে কী কী ইনফরমেশন আছে, কে জানে?”
প্রদীপ বললেন, “আপনি কী বলতে চাইছেন, সেটা যদি একটু পরিষ্কার করে বলেন...”
প্রসূন সামনে ঝুঁকে পড়ল। “যেটা বলছি তা হলো এই, যে আপনাদের জীবনের অতীতে এমন কিছু নেই যার জেরে মৌলিদেবীকে খুন করা হয়ে থাকতে পারে। বর্তমানেও তেমন কিছু খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। কিন্তু মৌলিদেবীকে সুপরিকল্পিতভাবে মারা হয়েছে, এবং তার পরে আপনাকে ফাঁসানোর একটা অ্যাটেম্ট্ হয়েছে। আপনি খুনের পরিকল্পনা করেননি। তাহলে ইট ইজ সেফ টু অ্যাজিউম, যে যিনি মৌলিদেবীর খুনের প্ল্যান করেছিলেন, তিনিই প্ল্যান করে দু-জনকে সরানোর চেষ্টা করেছিলেন। এবং আমি বিশ্বাস করি যে এই ঘটনার মূল লুকিয়ে আছে আপনাদের হানিমুনের ছুটিতে। আমার বিশ্বাস, ওই মালডিভ্স্ ট্রিপেই কিছু ঘটেছিল, যার ফলে আপনার স্ত্রীকে খুন করা হয়েছে। আপনি যদি সেটা মনে করতে পারেন, তাহলেই কাজটা অর্ধেক শেষ।”
“কিন্তু সেরকম তো কিছুই...”
প্রদীপের কথাটা মাঝখান থেকে কেটে প্রসূন বললেন, “প্লিজ ডোন্ট ক্লোজ ইওর মাইন্ড। ভেবে দেখুন। সামথিং মাস্ট হ্যাভ হ্যাপেন্ড্ – এটা ধরে নিন। তারপরে ভাবতে শুরু করুন। যত আগে থেকে পারেন। প্ল্যানিং, টিকিট কাটা, মালডিভ্সের দিনগুলো, এবং ফিরে আসা... কোথাও কিছু আনওটুয়ার্ড কিছু ঘটেছিল কি? আনটুওয়ার্ড না হলেও আনইউজুয়াল? সমস্ত সময়টা কি আপনারা একসঙ্গে ছিলেন? যখন ছিলেন না, তখন কি কিছু ঘটে থাকতে পারে?”
ইয়ার্কির সুরে ফোড়ন কাটলেন অতনু, “এই যেমন ধর, তুই যখন তোর বউকে ফেলে সুইমিং পুলের সামনে অর্ধনগ্ন মেমসাহেব দেখতে যেতি...”
“মিথ্যে কথা,” বললেন প্রদীপ। “আমি কোনও দিন হোটেলের সুইমিং পুলে যাই-ইনি। আমি সাঁতার জানি না, তাই। বরং আমি ঘুম থেকে ওঠার আগে মৌলি প্রায় রোজই সাঁতার কেটে আসত। একবার দুবার কথাও হয়েছিল আমাকে সাঁতার শেখাবে, কিন্তু আমি জলে ভয় পাই, তাই যাইনি।”
“এক্স্যাক্টলি,” খুব আস্তে আস্তে বলল প্রসূন, “এরপরে একটা দ্বিতীয় কথা আছে। এই কথাটার উত্তরও আমি আপনার কাছ থেকেই চাই, মিঃ সেনগুপ্ত, ভালো করে ভেবে রাখবেন। শুরু থেকে আপনার শ্বশুর আর শাশুড়ি বলে এসেছেন, যে আপনার মতো জামাই হয় না। কিন্তু হঠাৎ মাঝখানে একদিন আপনার শ্বশুরমশাই অর্ধেন্দু দাসকে ফোন করে ডেকে পাঠিয়ে আপনাদের রিলেশনশিপের সমস্যার কথা বলেন – কথাগুলো উনি কোর্টেও বলেছেন, আপনারা দুজনেই শুনেছেন। হঠাৎ এই মত পরিবর্তনের কারণ কী হতে পারে?”
“সেটা ওনাকেই জিজ্ঞেস করলে হয় না?” বললেন অতনু।
“করব। কিন্তু আপনার কি মনে হয়, জিজ্ঞেস করলেই ভদ্রলোক বলে দেবেন? অলরেডি জিজ্ঞেস করা হয়েছে। বলেছেন, উনি অত খেয়াল করতেন না। মৌলিদেবীর মায়ের কাছ থেকে শুনেছেন – এবং এখন মনে পড়ছে। আশ্চর্য ব্যাপার হচ্ছে মৌলিদেবীর মা কিন্তু আর কোনও স্টেটমেন্ট দেননি। শরীর খারাপ, ডাক্তার বারণ করেছে – এইসব অজুহাতে আপনার শ্বশুরমশাইও আর অর্ধেন্দুদাকে ঘেঁষতে দেননি। তখন অত ইমপর্ট্যান্ট মনে করা হয়নি, কিন্তু আমি অবশ্যই আবার সবটা খতিয়ে দেখব। ওনার এক্স-চিফ সেক্রেটারি দাদাকেও দাবড়ে দেবার ব্যবস্থা করা হয়েছে। উনিও আর খাপ খুলবেন না। আপনি কিন্তু আমার রিকোয়েস্টটা রাখবেন। বেশ রাত করে দিলাম, আপনারা তো নিশ্চয়ই রাতের খাবার দাবার এখনও খাননি। আমি চলি, আবার যোগাযোগ করব।”
এক চুমুকে আধকাপ ঠাণ্ডা কফি শেষ করে প্রসূন চলে গেলেন। প্রদীপ, অতনু আর বনি উঠলেন খাবার গরম করতে।
ডিনারের পরে বনি প্রদীপকে বললেন, “দাদা, আমি একটা সাজেশন দেব? আপনি তো এখন অফিস যাবেন না, আর আমাদের অফিসেও যে যেতে হবে এমন কোনও ধরাবাঁধা নিয়মও নেই। আপনি বরং বাড়িতেই থাকুন, আর একটা ডায়রি মতন লিখুন। ওই যেরকম বললেন পুলিশ অফিসার – প্ল্যানিং থেকে শুরু করে। গল্পের মতন। উইথ এভেরি ডিটেল। লিখে যান – যদি আগের কথা মনে কিছু পড়ে – আগের জায়গাটায় গিয়ে ফিল ইন দ্য ব্ল্যাঙ্ক করে দিন। নিশ্চয়ই কিছু মনে পড়বে।”
“গুড আইডিয়া,” দুটো গ্লাসে অল্প অল্প হুইস্কি ঢালতে ঢালতে বললেন অতনু।
“হঠাৎ হুইস্কি কেন?” জানতে চাইলেন প্রদীপ।
“তোর মুক্তির সেলিব্রেশন। খাস যে, তা তো আগেই বলেছিস। রোজ দেব না। একদিনই খা।”
“ইয়ে, আপনি খাবেন না?” আমতা আমতা করে বনিকে জিজ্ঞেস করল প্রদীপ।
“খাবে, তবে ও হুইস্কি খায় না। ও খায় ভডকা। ওকেও দিচ্ছি।”
~তিন~
ডায়রি।
জীবনে কোনও দিন ডায়রি লেখেননি প্রদীপ। কী লিখবেন? প্রসূন বলে গেল কোনও আনইউজুয়াল কিছু। কী কী আনিউজুয়াল ঘটেছিল মালডিভ্সে? সবই তো আনইউজুয়াল। সবচেয়ে বড়ো আনইউজুয়াল প্রদীপের জীবনে জীবনসঙ্গিনী। প্রতিটি মুহূর্তের আনন্দ... দুজনে আত্মহারা হয়ে ছিলেন... তার ওপরে মালডিভ্সের মতো জায়গা, প্রাসাদোপম হোটেলে মালিকের ব্যক্তিগত অতিথি হয়ে দিন কাটানো... এর মধ্যে ইউজুয়াল কোথায়? এর আগে পাঁচতারা হোটেলের অভিজ্ঞতার সঙ্গে এর কোনও তুলনাই নেই। প্রদীপ ঠাট্টা করে বলেছিলেন, “আগে জানলে দশ দিনের জন্য না এসে তিন মাস থাকতাম।” মৌলি বলেছিল, “আর দেশে ফিরে নতুন চাকরি
প্রদীপ বলেছিলেন, “নিকুচি করেছে চাকরির। এখানেই বাকি জীবনটা কাটিয়ে দেব। তোমার দাদা আমাকে একটা চাকরি দিতে পারবে না? এই ধরো দারোয়ান, বা জমাদারের কাজ?”
কথাটা এর পরে ঠিক কোন দিকে এগিয়েছিল, বা এগিয়েছিল কি না, প্রদীপ মনে করতে পারলেন না।
সবই তো আনইউজুয়াল। ওই নীল আকাশ, ওই পান্নার মতো সবুজ জল, ওই দুধের মতো সাদা বালির বিচ... খাওয়া দাওয়া... দু-বাহুর মধ্যে মৌলি... মৌলির কাছে নিজেকে সমর্পণ...
কাজ ছেড়ে দুহাতে মাথা রেখে প্রদীপ নিঃশব্দ কান্নায় ভেঙে পড়লেন।
অনেকক্ষণ পরে আবার উঠে বসলেন। কোথা থেকে শুরু করবেন? টিকিট কাটার সমস্যা থেকে? নাকি দেশ ছাড়ার আগে বম্বে এয়ারপোর্টে প্লেন ধরার সময় বাসের গতি সামলাতে না পেরে যে বয়স্ক সাহেব ভদ্রলোক ছিটকে মৌলির কোলে এসে পড়েছিলেন, এবং তারপরে ক্ষমা চাওয়া দূরে থাকুক, বিশ্রী সুরে এমনভাবে বাস-চালক এবং ভারতীয় ড্রাইভারদের দোষ দিয়েছিলেন, যেন সবটাই মৌলির দায়িত্ব – সেখান থেকে?
নাকি মালডিভ্স্-এ পৌঁছন’র পর থেকে? প্লেন থেকেই প্রদীপের পেটটা ঠিক মনে হচ্ছিল না। হোটেলে পৌঁছেই দৌড়তে হয়েছিল বাথরুমে। বাবলুদা বলেছিল, “হানিমুনে এসে বাথরুমে বসে থাকা ঠিক না।” ডাক্তার ডেকে ওষুধ খাইয়েছিল। তারপর মৌলি বলেছিল, “তুমি বরং একটু ঘুমিয়ে নাও। ওষুধ বলো, আর যা-ই বলো, রেস্টের চেয়ে বড়ো কিওর হয় না।”
প্রদীপের মনটা হঠাৎ লাগাম-ছাড়া হয়ে দৌড়তে শুরু করল। বাবলুদা তখন ঘরে ছিল না। ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলতে বলতে করিডোরে গিয়েছিল। ফিরে এসে মৌলির শেষ কথাটা শুনে বলেছিল, “তাহলে আমি মৌলিকে নিয়ে একটু ঘুরে আসি। হানিমুনে আসা বোনকে নিয়ে বেড়ানোর সুযোগ তো আর পাব না। আমরা ব্রাদার সিস্টার বন্ডিং করে আসি খানিকটা।”
হঠাৎ ঘুম ভেঙে প্রদীপের মনে হয়েছিল শরীরটা বেশ ঝরঝরে লাগছে। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখেছিলেন, ঘণ্টাখানেক কেটেছে। সন্ধে হয়ে গিয়েছে। মনে হয়েছিল, চট করে একটু ঘুরে আসি। হোটেল থেকে বেরিয়ে রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছেছিলেন, একটা বাজার জাতীয় জায়গায়। এ গলি, ও গলি চলতে চলতে হঠাৎ দেখেছিলেন একটা রেস্টুরেন্টে বসে মৌলি আর বাবলুদা খাচ্ছে। রাস্তার ওপারে। একটু দাঁড়িয়ে দেখেছিলেন প্রদীপ। বাবলুদা বহু বছর দেশছাড়া। প্রায় ছোটো থেকেই। তা সত্ত্বেও ভাইবোনের সহজ সম্পর্কটা নষ্ট হয়নি। সেটা জানলা দিয়ে দেখেও বোঝা যায়।
একবার ভেবেছিলেন ওদের সঙ্গে গিয়ে বসবেন। পরে মনে হয়েছিল, ওরা আড্ডা দিচ্ছে, দিক। চলে গিয়েছিলেন। কিন্তু কয়েকটা বাড়ি পরেই রাস্তাটা অন্ধকারে শেষ হয়ে গেল। ফলে ওই পথেই ফিরতে হয়েছিল। চোখে পড়ে গিয়েছিল বাবলুদার। পরক্ষণেই রেস্তোরাঁ থেকে ছুটে বেরিয়েছিল একজন ওয়েটার। বাবলুদা ডেকেছে।
“এই রেস্তোরাঁটা এককালে আমার ছিল, বুঝলে? বেচে দিয়েছি।”
বাকি সন্ধেটা কী চমৎকারই না কেটেছিল! হা-হা হাসি, ঠাট্টা-তামাশা, গল্প, ওয়েস্ট ইন্ডিজের হোটেলে আসার নেমন্তন্ন... সেই লোকটা কেন কোর্টে এমন উলটো কথা বলল?
যাকগে যাক, মন থেকে সব চিন্তাগুলো ঝেড়ে ফেলে প্রদীপ ঠিক করলেন রোজনামচাই লিখবেন। টিকিট কাটার ঘটনা দিয়ে শুরু। চেন্নাই থেকে সস্তা, না মুম্বাই?
~চার~
দিন তিনেক পরে রাতে শুতে গিয়ে দরজা বন্ধ করে বনি বললেন, “কিছু লক্ষ করেছ গত কয়েক দিনে?”
অতনু দাঁত মাজছিলেন। বললেন, “ব্লি লক্ক ব্ল ব্ললব্ল?”
দাঁতে দাঁত চেপে হিস হিস করে বনি বললেন, “থুথুটা ফেলে, মুখ ধুয়ে এদিকে এসো, আর দোহাই তোমার, গাঁকগাঁক করে ষাঁড়ের মতো চেঁচিও না।”
অতনু ভালোমানুষের মতো তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে বেরিয়ে ফিসফিসিয়ে বললেন, “কী লক্ষ করার কথা বলছ?”
বনি বললেন, “তোমার বন্ধুকে।”
“কেলো করেছে। এই তো সেদিন বললে আমার বন্ধু আর আমার একার নেই, তোমারও বন্ধু হয়ে গেছে। আজ আবার আমার বন্ধু হয়ে গেল?”
“আজেবাজে কথা বলে সময় নষ্ট করো না। ব্যাপারটা নজর করেছ কি না বলো।”
“প্রদীপ আজকাল কথা কম বলছে, বেশিরভাগ সময় ঘরে বসে ল্যাপটপ নিয়ে লিখে চলেছে – এই তো? ওকে তো আমরাই বলেছিলাম মন দিয়ে লিখতে। তা-ই করছে।”
“শুধু তাই হলে আমি তোমাকে কিছু বলতাম না। আমরা ওনাকে কাজটা করতে বললাম, একবারও ভাবলাম না, যে তাহলে ভদ্রলোককে সারাক্ষণ ওনার মৃত স্ত্রীর কথা ভাবতে হবে – প্রব্যাব্লি জীবনের সেই সময়টা যেটা ওয়াজ দ্য মোস্ট ফুলফিলিং অ্যান্ড লাভলি। ভাবতে পারছ, কী চলছে ওনার মনের মধ্যে?”
অতনু খানিকক্ষণ চুপ করে বসে রইলেন। তারপরে আস্তে আস্তে বললেন, “কিন্তু কী আর করা যাবে, বলো?”
বনি অসহিষ্ণু হয়ে বললেন, “তুমি তো ভাবছই না ব্যাপারটা নিয়ে। সারা দিন তুমি আর আমি দুজনে বাইরে। ভদ্রলোক সারাক্ষণ একা ঘরে। জিনিসটা কতটা সেফ তা-ও তো ভাবতে হবে?”
অতনু উঠে ঘরে পায়চারি শুরু করলেন।
“তুমি যে ডিস্অ্যাড্ভান্টেজ্ড্ মহিলাদের নিয়ে সারাক্ষণ পড়ে আছ, তাঁদের কেউ যদি ওই একই অবস্থায় ও-ঘরে থাকতেন, তুমি তাহলে আর একটু ওরিড কি হতে না?”
রাইটিং টেবিলের গায়ে হেলান দিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে বনির দিকে তাকিয়ে রইলেন অতনু।
ওদিকে নিজের ঘরে অস্থির হয়ে টেবিল থেকে উঠে এলেন প্রদীপ। গত দু’দিনে মালডিভ্সের প্রধান ঘটনাবলী লেখা হয়ে গেছে। কিন্তু কী যেন একটা মিসিং। কিছুতেই মনে পড়ছে না – কী মনে পড়ছে না। কী ভুলে গেছেন? কবে যেন কী একটা ঘটেছিল, বা ঘটেনি – কিন্তু ঘটা উচিত ছিল...
আজ সারাদিন মনে হয়েছে ছুটে গিয়ে রাস্তায় ঘুরে বেড়াই। সন্ধের পর থেকে মনে হয়েছে একটা সিগারেট খেলে হত – ছাত্রজীবনে যেমন পড়া মনে না পড়লে পথে বেরিয়ে যেতেন সিগারেট খেতে। মনে হয়েছে, কাকে জিজ্ঞেস করব?
পায়ে পায়ে এসে জানলার কাছে দাঁড়ালেন। একমাত্র যাকে জিজ্ঞেস করা যেত, তাকে কি আর কোনও দিন কিছু জিজ্ঞেস করতে পারবেন? আকাশের দিকে চোখ তুলে নিঃশব্দে প্রশ্ন করলেন, “তুমি কি সত্যিই ওখানে?”
প্রদীপের ঘরের লাগোয়া বারান্দা নেই। জানলা দিয়ে নব্বই ডিগ্রি সমকোণে অতনুর ঘরের লাগোয়া একচিলতে বারান্দার খানিকটা দেখা যায়। বারন্দার দরজা বন্ধ, তার পাশের জানলা বন্ধ, পর্দার পেছনে আলোর আভা। হঠাৎ প্রদীপের খেয়াল হলো ওখানে এখন অতনু আর বনি একান্ত সময় কাটাচ্ছে, অস্বস্তি লাগতে শুরু করেছিল – কিন্তু হঠাৎ একটা কী কথা মনে হতে থমকে গেলেন। বারান্দা। বারন্দা নিয়ে কিছু একটা...
মনে পড়েছে!
কবে ছিল সেই দিনটা? হানিমুনের তৃতীয় – না চতুর্থ দিন? প্রদীপের শরীরটা ক্লান্ত ছিল। সকালবেলা বাবলুদা প্রদীপের ক্লান্তি আর স্ট্যামিনা নিয়ে নোংরা একটা মন্তব্য করে গেছেন। মৌলি তখন সাঁতার সেরে বাথরুমে স্নান করছিল বলে ও জানে না। প্রদীপ বেরোবে না শুনে বলেছিল, “তাহলে আমি একটু ঘুরে আসি। হোটেলের বাইরে একটু রাস্তায় ঘুরে বেড়াব, লোক্যাল বাজারটা দেখব, একটু ছবি টবি তুলব।”
মৌলির ছবি তোলার সখ। ওর হাতে ক্যামেরা থাকলে ওর সঙ্গে কোথাও যাওয়া এক বিড়ম্বনা। অবশ্য মৌলি চেষ্টা করে প্রদীপের বিরক্তির উদ্রেক না করতে, কিন্তু সেটাও প্রদীপ বোঝেন।
প্রদীপ সেদিন স্যুইট থেকে বেরিয়ে বিশাল বারান্দাটায় বসে আকাশ দেখছিলেন। মৌলির বেশ পছন্দ ছিল বারান্দাটা। বলেছিল, “আমরা যখন বাড়ি করব, তখন এরকম বারান্দা থাকবে, কেমন?”
প্রদীপ হেসে বলেছিলেন, “এই কোয়ালিটির বাড়ি করার মতো অবস্থা হতে গেলে ব্যাঙ্কের চাকরি ছেড়ে বলিউডের হিরো হতে হবে।”
“তা কেন?” জিজ্ঞেস করেছিল মৌলি। “ব্যাঙ্কাররা বড়োলোক হয়নি?”
বারান্দায় বসে আকাশ দেখতে দেখতে হঠাৎ মনে হয়েছিল ঘরে কেউ রয়েছে? ওয়ান ওয়ে গ্লাস, বাইরে থেকে দিনের বেলা ভিতরে দেখার উপায় নেই। কে এল? দেখতে গিয়ে দরজা খুলে ঘরে ঢুকতে গিয়ে থমকে গিয়েছিলেন প্রদীপ। খাটে বসা মৌলি ভীষণ চমকে গিয়ে হাত থেকে ক্যামেরাটা বিছানায় ফেলেই দিয়েছিল। তারপরে বলেছিল, “কী ভীষণ ভয় পেয়েছি – আমি এতক্ষণ ভাবছি তুমি বুঝি বাথরুমে, আর পিছন থেকে তোমার আসার শব্দে ভেবেছি কে না কে!”
তখনই প্রদীপ প্রশ্নটা করতে যাচ্ছিলেন। কিন্তু করা হয়নি। মৌলি ক্যামেরাটা বিছানাতেই ফেলে রেখে উঠে এসে প্রদীপের হাতটা বুকে রেখে বলেছিল, “দেখো, কী জোরে ধকধক করছে – যেন ফেটে বেরিয়ে আসবে।”
মিনিট দুয়েক পরে প্রদীপকে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে বলেছিল, “না, এখন না। চলো না, একটু বাগানটা ঘুরে আসি?”
প্রদীপ যতক্ষণে বাথরুম থেকে প্যান্ট আর টি-শার্ট চড়িয়ে বেরিয়েছিলেন, ততক্ষণে মৌলি ক্যামেরাটা গুছিয়ে বাক্সবন্দী করে নিয়েছিল। ফলে ব্যাপারটা আর মাথায় ছিল না। কিন্তু এখন সেই প্রশ্নটা আবার ফিরে আসছে – এরকম কিছু একটা – “এ কী! কালই তো নতুন মেমরি কার্ড ঢোকালে ক্যামেরায়। এর মধ্যেই পাঁচ হাজার ছবি তুলে নিলে?”
এখন আবার মনে পড়ছে। পরে যখন মালডিভ্সের অজস্র ছবি দেখিয়েছিল মৌলি – তখন ওই ছবিগুলো কোথায় ছিল? যে ছবি তোলার সময় প্রদীপ ছিলেন না? যেগুলো দেখেছেন, সেগুলোর কোনওটাই তো অপরিচিত বা মনে-না-পড়া পরিস্থিতির ছিল না। তবে?
মৌলির ছবিগুলো দেখতে হবে আবার। এক এক করে। ওই ছবিগুলো কী হলো?
কাল সকালে বাড়ি যাবেন একবার। গাড়িটাও চালানো হবে। গত ক’দিন তো অতনুর গ্যারেজেই পড়ে আছে।
আলো বন্ধ করে বিছানায় গেলেন প্রদীপ। বারান্দার দিকের জানলার পর্দার আধ ইঞ্চি ফাঁকটা বন্ধ করে বনি ফিসফিস করে বললেন, “শুতে গেলেন বোধহয়।”
~পাঁচ~
আলো বন্ধ করলেও ঘুম আসছিল না তুলির। গত কয়েক দিন ওদের বাড়িতে কারওরই ঠিক করে ঘুম হয়নি। মৌলিদির মা তো সারা রাত কাঁদেন। খানিকটা মেয়ের জন্য, খানিকটা জামাইয়ের দুঃখে। গত দিন দশেক হলো জেঠিমার সঙ্গে দেখা হয়নি তুলির। ওদের বাড়ির কারওর সঙ্গেই না। বাবার সঙ্গে জ্যেঠুর বেশ কথা কাটাকাটি হয়েছিল প্রদীপদাকে অযথা ফাঁসানোর চেষ্টা করার জন্য। কেন জ্যেঠু এমন মত বদলাল? এখন তো তার ফলে মুখে চুনকালিও পড়েছে খানিকটা।
তুলি ব্যাপারটার আদ্যন্ত কিছুই ভেবে পাচ্ছে না। মৌলিদির মতো মাটির মানুষকে কেউ যে খুন করতে চাইতেও পারে, তা তুলি হৃদয়ঙ্গম করতে পারছে না। বার বার ভেবেছে কারওর সঙ্গে আলোচনা করতে পারলে হত, কিন্তু কার সঙ্গে করবে ভেবে পায়নি।
আজ দুপুরে সেই সু্যোগটা হয়েছে। কলেজ থেকে বেরিয়ে তুলিদের দলটা সবে গেটের সামনে দাঁড়িয়ে শেষবারের মতো আজকের টা-টা বাই-বাই বলছে, এমন সময় তিস্তা হঠাৎ বলে উঠেছে, “মাই গড্, কী হ্যান্ডসাম একটা পুলিশ, দেখ!”
সবাই একযোগে ঘাড় ফিরিয়ে দেখে সত্যিই একটা দারুণ দেখতে পুলিশ অফিসার খাকি ইউনিফর্ম পরে রাস্তা পেরিয়ে ওদের দিকেই আসছে।
অরিত্র আবার পুলিশ দেখলে ডরায়। ও, “আচ্ছা কাল দেখা হবে,” বলে সামনে যে অটোটা পেল, তাতেই উঠে পড়ল। পুলিশ অফিসারটা গাড়িগুলোকে হাত দেখিয়ে থামিয়ে রাস্তা পেরিয়ে ওদের সামনে এসে দাঁড়িয়ে ভীষণ স্মার্টলি বলল, “ম্যা’ম, এক্সকিউজ মি, আপনিই কি মৈথিলী দত্তগুপ্ত?”
তুলি এতই ঘাবড়ে গিয়েছে, যে কিছুই বলে উঠতে পারছে না। আশেপাশের মেয়েরা একটু খুক খুক করে হাসছে। তিস্তা বলেছে, “হ্যাঁ, ও-ই মৈথিলী। কেন বলুন তো?”
অফিসারটা পকেট থেকে একটা পার্স বের করে তা থেকে একটা ভিজিটিং কার্ড দিয়ে বলল, “আমার নাম প্রসূন মজুমদার। আমি এখন আপনার দিদির... ইয়ে, ব্যাপারটা এখন আমার হাতে আর কী... আমি একটু আপনার সঙ্গে কথা বলতে চাইছিলাম ওই ব্যাপারেই। আপনি যদি...”
ততক্ষণে তুলি সম্বিৎ ফিরে পেয়েছে। বলল, “এখন?”
প্রসূন বলল, “আপনার যদি অসুবিধে না থাকে, ম্যা’ম...”
মেয়েরা তখনও দাঁড়িয়ে। তুলির মনে হচ্ছে ওরা চলে গেলেই পারে। বলল, “কোথায়? এখন তো ক্যান্টিনে...”
প্রসূন ওকে থামিয়ে দিয়ে বলল, “আমি তো ইউনিফর্মে রয়েছি, ক্যাম্পাসে ঢুকতে গেলে পারমিশনের ব্যাপার থাকে একটা। আপনার আপত্তি না থাকলে আপনি যদি আমার সঙ্গে আসেন, তাহলে যাদবপুর থানায় বসে কথা বলা যেতে পারে।”
থানায়! “আমি কী বলতে পারব যে...”
অফিসার ততক্ষণে হাঁটতে শুরু করেছে আবার রাস্তা পার করতে, আর তুলিও হঠাৎ খেয়াল করল ও-ও কথা বলতে বলতে অর্ধেক রাস্তা পেরিয়ে এসেছে। একবার চট করে পিছন ফিরে হাত তুলে বিদায় জানাল বন্ধুদের। তারপরে রাস্তা পেরিয়ে এসে দাঁড়াল পুলিশের জিপ-টার পাশে।
ড্রাইভার নেমে এল, প্রসূন তুলিকে সামনে তুলে নিজে গিয়ে বসল পিছনের সিটে।
“বলবেন মানে আমি একটা ক্যারেকটার স্কেচ চাই। আপনার দিদির সম্বন্ধে যা যা জানা আছে সব না জানলে আমরা এগোতে পারব না। ইউনিভার্সিটিতে এসে এইভাবে আপনাকে বিরক্ত করার জন্য আমি সত্যিই দুঃখিত, কিন্তু আপনার বাড়ি যেতে চাইনি। আপনার বাবার সঙ্গেও আমি আজ অফিসে কথা বলেছি। উনি জানেন আমি এখন আপনার কাছে আসছি।”
থানায় ঢুকেই তুলি বুঝেছিল যে সঙ্গের লোকটা সত্যিই বেশ সমীহ আদায় করে। দরজায় বসা পুলিশটা থেকে শুরু করে ভিতরে সবাই প্রসূনকে ভালোই চেনে এবং সঙ্গে সঙ্গে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। যখন প্রসূন বলল, “একটা ঘর চাই। বসে কথা বলার মতো।” তখন উত্তর এল, “ও.সি-র ঘর খালি, স্যার। ও.সি বেরিয়েছেন। আজ আর ফিরবেন না।”
ও.সি-র ঠাণ্ডা ঘরে বসে কথা হলো। প্রথমে শীতল পানীয়, তারপরে সিঙাড়া, এবং সব শেষে কফি সহযোগে। কখন যে দু’ঘণ্টা কেটে গেছে মৌলিদির গল্প বলতে বলতে, তুলি খেয়ালই করেনি। খানিকক্ষণের মধ্যেই তুলির সমস্ত আড়ষ্টতা কেটে গেছিল। লোকটা মজার। হঠাৎ জিজ্ঞেস করেছিল, “মৌলি আর তুলি। আপনার ভালো নাম মৈথিলী, আর মৌলির নাম শুধুই মৌলি – এমন কেন?”
তুলি বলেছিল, “কে বলল আপনাকে মৌলির নাম শুধুই মৌলি? মৌলিদির ভালো নাম বৈদেহী। কিন্তু নামটা ওর পছন্দ ছিল না। তাই মৌলি ইউজ করত। এমনকি অফিশিয়াল জায়গাতেও।”
ফটোগ্রাফির হবির কথা পুলিশ জানতই না। তুলি যখন বলল, প্রসূন সেটা লিখতে লিখতে বলেছিল, “কতদিন ধরে উনি ছবি তুলতেন?”
মৌলিদির ছবি তোলার ইতিহাস তুলির মুখস্ত। প্রথম দিকে তো ওকে নিয়েই যেত সব ওয়ার্কশপে, ক্লাসে, এক্সিবিশনে। মৌলিদির ফোটোগ্রাফিতে সখ কী করে হয়েছিল, কবে কোথায় ওয়ার্কশপ করেছিল, কী কী এক্সিবিশনে ছবি দিয়েছিল, সব বলে দিয়েছিল গড়গড় করে।
কফিতে চুমুক দিয়ে বিকট মুখ ভেটকিয়ে প্রসূন বলেছিল, “ইশ, ছ্যা, ছ্যা! খাবেন না। খাবেন না। অখাদ্য কফি।”
শান্ত হয়ে কফিতে চুমুক দিয়ে তুলি বলেছিল, “একে যদি খারাপ বলেন, তাহলে একদিন ইউনিফর্ম না পরে প্লেন ড্রেসে আসুন, কলেজ ক্যান্টিনের কফি খেয়ে যান।”
প্রসূন বলেছিল, “সে তো হয় না, কিন্তু আপনি বললেন, তার জন্য ধন্যবাদ।”
তুলির গাল এতই লাল হয়েছিল যে অনেকক্ষণ মুখ তুলে তাকাতেই পারেনি।
এখনও বাড়ির জানলার চওড়া তাকে বসে হাঁটু-দুটো জড়িয়ে তুলির শরীরে একটা শিহরণ খেলে গেল কথাগুলো মনে করে।
~ছয়~
“একবার বাড়ি যাব,” সকালবেলা ব্রেকফাস্ট টেবিলে বসে অতনুকে বললেন প্রদীপ।
অতনু বুঝলেন ওঁর বাঁ পাশে বসে বনি ইশারায় কিছু একটা বলার চেষ্টা করছেন, কিন্তু বনির মুখটা দেখতে পাচ্ছেন না বলে বুঝে উঠতে পারলেন না।
“কী হয়েছে?” জানতে চাইলেন।
“কিছু একটা হয়েছে,” বললেন প্রদীপ। “কাল সারাদিন ধরে একটা ইনসিডেন্ট মনে পড়ছিল না। শেষে, যখন খেয়ে উঠেছি, তখন মনে পড়ল।”
মালডিভ্সের ঘটনাটা বলে বললেন, “আনিউজুয়াল, আশ্চর্য দুটো ব্যাপার ছিল এই ঘটনাটায়। এক তো এক দিনের মধ্যে মেমরি কার্ড বদলানো, আর দ্বিতীয় হলো, মৌলির চমকে ওঠা। মৌলি চমকাত না। শি ওয়াজ আ উম্যান অফ এক্সট্রিমলি স্ট্রং নার্ভস। তুলি বলত – আমার খুড়তুত শালী – দিদিকে ছোটোবেলাতেও অন্ধকারে ভয় দেখান যেত না। ওই যে, অন্ধকার ঘর থেকে হঠাৎ কেউ বেরিয়ে এসে ‘ভূ-ঊ-ঊ” বলে ভয় দেখায়, সে রকম আরকি। সেটা আমিও প্রত্যক্ষ করেছি। মৌলিকে অনেক দিন চিনি। কোনও দিন ওরকম চমকাতে দেখিনি। তখন খটকা লেগেছিল, কিন্তু কথায় কথায় সাবজেক্টটা আর ওঠেনি। এখন মনে হচ্ছে, মৌলি তখন হয়ত ইচ্ছে করেই কথাটা ঘুরিয়ে দিয়েছিল। আর তৃতীয় হলো, ছবিগুলো গেল কোথায়?”
বনি জানতে চাইলেন, “সবসুদ্ধু কত ছবি তুলেছিলেন – তার মধ্যে হয়ত খেয়াল নেই, বা বাতিল করে দেওয়া ছবি...”
প্রদীপ কথা কেটেই বললেন, “মৌলি অমন হাজারে হাজারে ছবি তুলত না। কম তুলত। চট করে ডিলিটও করতনা। এক্কেবারে নড়ে গিয়েছে, বা কালো একটা ধাব্বা, বা তোলার সময় কেউ সামনে এসে পড়েছে – এমন না হলে মৌলি সব ছবিই কম্পিউটারে প্রোসেস করত। তারপরে – অন্তত গত চার পাঁচ বছর ধরে – আমাকে সব ছবি দেখাত। তারপরে ঠিক করত কোনগুলো রাখবে। সেগুলো রাখত এক্সটার্নাল হার্ড ড্রাইভে। ওর মতো এত অর্গানাইজড মানুষ আমি কম দেখেছি। সুতরাং ওই ছবিগুলো নিশ্চয়ই কোথাও আছে। আজ গিয়ে খুঁজব।”
“বি কেয়ারফুল। দুজন পুলিশকেই নিয়ে যাস। অ্যান্ড কিপ ওয়ান অফ দেম ইনসাইড উইথ ইউ। অন্যজন যেন বাইরে সিঁড়িতে থাকে। কিছু যদি পাস, কেঁচো খুঁড়তে সাপ – স্নেক হোয়াইল ডিগিং ফর আর্থওয়ার্মস – বাড়ি থেকে বেরোবি না। আমাকে আর প্রসূন মজুমদারকে ফোন করবি। আমরা যাব, তারপরে কথা।”
সাবধানবাণীটা অদ্ভুত লাগলেও প্রদীপ তর্ক করলেন না। পড়েছেন মোগলের হাতে, খানা খেতে হবে সাথে! উপমাটা ঠিক হলো কি না, না বুঝেই অতনুর স্টাইলে বললেন, “ইন দ্য হ্যান্ডস অফ দ্য মুঘলস, হ্যাভ টু ইট মিলস উইথ দেম।”
স্নান সেরে বেরোতে বেরোতে অতনু বেরিয়ে গিয়েছে কাজে। আজ বনি বাড়িতে। অতনু আর বনি আজকাল একজন করে কাজে যায়। গত দু-তিন দিন হলো, হয় অতনু বাড়িতে, নইলে বনি। একবার ভেবেছিলেন জিজ্ঞেস করবেন কেন, তারপরে মনে হয়েছে, ওদের ব্যক্তিগত ব্যাপার...
রান্নাঘর থেকে বনি বললেন, “আপনার কি ফিরতে দেরি হবে?”
“বলতে তো পারছি না। ছবিগুলো খুঁজে পেতে কত সময় লাগে তার ওপর...”
বনি বললেন, “তাহলে পাঁচ মিনিট দাঁড়িয়ে যান। একটা নতুন জিনিস ভাজছি। একটা খেয়ে যান। ঠাণ্ডা হলে, বা মাইক্রোওয়েভে গরম করলে ভালো লাগবে না।”
এইজন্যই পরের ঘটনার খবরটা প্রদীপ অতনুর বাড়িতে বসেই পেলেন।
ব্যানার্জীদার ফোনটা ধরে প্রদীপ বলতে গিয়েছেন যে উনি আর খানিকক্ষণের মধ্যেই বাড়ি আসছেন, কিন্তু ব্যানার্জীদার উত্তেজিত কণ্ঠস্বর ওঁকে থামিয়ে দিল।
“ইয়ে, একটা কাণ্ড হয়েছে। কাল রাত্তিরে আপনার বাড়িতে চোর এসেছিল।”
“চোর? রাত্তিরে?”
“হ্যাঁ। সকালে আপনার কাজের লোক আমার বাড়ি থেকে চাবি নিয়ে গিয়ে দরজা খুলে দেখে বাড়িতে সব ছত্র... ইয়ে, লণ্ডভণ্ড, তছনছ... ছুটে এসে আমাকে বলে। আমি এবার দরজায় তালা লাগিয়ে দিয়েছি। আপনি পুলিশে খবর দিন, আর চলে আসুন।”
বনিকে ব্যাপারটা বলে প্রদীপ বললেন, “আগে অতনুকে ফোন করছি – তারপরে পুলিশে।”
অতনু খানিকটা শুনেই বললেন, “প্রসূন মজুমদারকে জানা। ওকে জিজ্ঞেস কর তুই কখন যাবি। পুলিশ যাবার আগে গিয়ে কাজ নেই। তারপরে আমাকে ফোন করিস।”
প্রসূন বলল, “আমি লোকাল থানা থেকে ফোর্স পাঠাচ্ছি। দশ মিনিটে আমিও পৌঁছব। আপনি ওরকম সময়েই আসুন। আর, হ্যাঁ, কাজের লোকটাকে যেন যেতে না দেওয়া হয়। মিঃ ব্যানার্জীর নম্বর আমার কাছে রয়েছে। আমি বলে দিচ্ছি।”
মিনিট পনেরো পরে হাউসিং-এ পৌঁছে আবার সেই পুলিশে পুলিশে চতুর্দিক ছয়লাপ – দিনের বেলা, অফিসের সময় – তাই আবাসিকদের ভীড় কম, কিন্তু যে ক’জন রয়েছেন, আজ তাদের মুখের ভাব মোটেই বন্ধুত্ব বা সহানুভূতিপূর্ণ মনে হলো না প্রদীপের।
নিজের ফ্ল্যাটের দরজা হাট করে খোলা। সেখানেও অনেক পুলিশ। প্রসূন মজুমদার প্রদীপকে দেখে বেরিয়ে এসে বলল, “স্যরি। এখানে নয়। চলুন মিঃ ব্যানার্জীর বাড়িতে। আপনাকে দু-তিনটা ব্যাপার জানানোর রয়েছে।”
ব্যানার্জীদার বাড়িতে কাজের মেয়েটা উবু হয়ে বসে কাঁদছে। প্রসূন তাকে একটা আলতো ধমক দিয়ে বলল, “আঃ, তুই এখনও কেঁদে চলেছিস কেন? তোকে তো বললাম, কিছু বলব না। থানাতেও নিয়ে যাব না। শুধু ওই লোকটা কোনও দিন তোর কাছে আসলে তুই বাবুকে খবর দিবি। থানাতে গিয়েও জানাতে হবে না। বুঝলি?”
মেয়েটা কাঁদতে কাঁদতেই মাথা নেড়ে ‘হ্যাঁ’ বলল। প্রসূন বলল, “যাঃ, পালা এখন।”
বেরিয়ে যাবার পরে প্রদীপ বললেন, “ও কি চুরিতে ইন্ভল্ভ্ড্ নাকি?”
ব্যানার্জীদা, “আরে আর বলবেন না...” বলে শুরু করেছিলেন, কিন্তু প্রসূন থামিয়ে দিয়ে বলল, “ব্রেক-ইন – যদিও তালা ভেঙে নয়, তবে চুরি এখনও বলা যাবে না। কেন না কী মিসিং বা না-মিসিং, তা আমরা এখনও জানি না। কাল রাতেই হয়েছে, তা-ও বলা যাচ্ছে না।”
“ও?” প্রদীপের গলায় বিস্ময়।
“গত তিন দিন মেয়েটা কাজেই আসেনি। জানা-মতে কেউ আপনার বাড়িতে ঢোকেনি। সুতরাং গত তিন দিন বা রাতের মধ্যে যে কোনও দিনই ঘটনাটা ঘটে থাকতে পারে। আমাদের লোক গত তিন চার দিনের সমস্ত ভিজিটর্স লিস্ট চেক করছে। রাত্তিরে পাঁচিল টপকেও ঢুকে থাকতে পারে – সেটা অবশ্য ভিজিটর্স বুকে থাকবে না।”
“কাজের মেয়েটাকে কী বলছিলেন?” জানতে চাইলেন প্রদীপ।
“ও-ই তো নষ্টের গোড়া। কয়েকদিন আগে সকালে চাবি নিয়ে কাজে যাবার নাম করে ওটা হাউজিং-এর বাইরে নিয়ে গিয়ে একটা অপরিচিত লোককে দিয়ে দিয়েছিল। লোকটা দুপুর-বেলা ওর হাতে চাবি ফেরত দেয়। সেই সঙ্গে পাঁচ হাজার টাকা। ধরেই নেওয়া যেতে পারে যে লোকটা হয় সেই সময়েই চাবিটা নকল করে রাখে, বা তখনই বাড়িতে ঢুকে তছনছ করে।”
পাঁচ হাজার? কী থাকতে পারে প্রদীপের বাড়িতে যার জন্য কেউ পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে চাবি নিতে পারে?
প্রসূন বলল, “সেটাই বের করতে হবে প্রদীপবাবু। আমাদের ফিঙ্গারপ্রিন্ট এক্সপার্টরা চলে যাক, আপনি দেখলে আশাকরি বুঝতে পারবেন কী নেই।”
“আমি একটা বিষয় আপনার সঙ্গে একটু আলোচনা করতে চাই।” প্রদীপ আর প্রসূন সিঁড়ি দিয়ে নেমে প্রদীপের দরজার সামনে দাঁড়ালেন। অল্প কথায় ছবি খুঁজতে আসার ব্যাপারটা বললেন প্রসূনকে।
প্রসূন মাথা নাড়ল। বলল, “ছবি কোথায় থাকে?”
“কম্পিউটারে। আমাদের মাঝের ঘরে। যেটা স্টাডি – সেখানেই বই, ম্যাগাজিন, কম্পিউটার – সব আছে।”
প্রদীপের বাড়ি থেকে একজন বেরিয়ে এসে বললেন, “স্যার, হয়ে গেছে...”
প্রসূন দরজাটা পুরোটা খুলে বলল, “আসুন। দেখে যান।”
সারা বাড়িতে জিনিস ছড়ান। কাগজ, খাতা-বই, বাসন-পত্র – কিছু কাচের প্লেট-বাটির ভাঙা টুকরো পড়ে আছে।
প্রদীপ বললেন, “যে দিনই হোক, দিনেই হয়েছিল।”
“কী করে বলছেন?” জানতে চাইল প্রসূন।
“এই বাড়িগুলোতে একটু জোরে হাঁটলেই নিচের তলায় শব্দ পাওয়া যায়। সেখানে এত বই খাতা, বাসন-কোসন মাটিতে ফেলা হয়েছে, কাচের প্লেট, বাটি, গ্লাস ভেঙেছে – নিচের লোক নিশ্চয়ই শুনতে পেত। কিন্তু ওদের বাড়িতে সারাদিন কেউ থাকে না। ফিরতে ফিরতে সন্ধে হয়ে যায়।”
“বেশ, ওদের জিজ্ঞেস করতে হবে, রাতে বাসনকোসন পড়ার শব্দ পেয়েছেন কি না। এবার আসুন। কোথায় ক্যামেরা আর ছবি থাকত?”
প্রথমে প্রদীপ, তারপরে প্রসূন কাচ আর অন্যান্য ছড়ান জিনিসপত্র বাঁচিয়ে ভিতরে ঢুকলেন। বেশিক্ষণ লাগল না। চুরি হওয়া জিনিসের তালিকা লিখে নিল প্রসূন মজুমদার।
“ক্যামেরা – ক্যাননের। ক্যামেরার ব্যাগ। আট-দশটা ডেটা কার্ড, তিনটে এক্সটার্নাল হার্ড ড্রাইভ – দুটো পাঁচশো জিবি, একটা এক টিবি। অজস্র পেন ড্রাইভ। এই ড্রয়ারে কটা সিডি আর ডিভিডি ছিল তার ইয়ত্তা নেই।”
“সবই কি ছবি?”
না, না। ছবি কেবল ছিল ক্যামেরার ডাটা কার্ডগুলোতে, আর ওয়ান টিবি হার্ড ড্রাইভে। বাকিটায় নানা কিছু – গান, সিনেমা, অন্যান্য ডাটা – এই সব আর কী।”
“কম্পিউটারে ছবি নেই?”
“সাধারণত থাকে না। তবু দেখি একবার।”
প্রদীপ ঝুঁকে পরে কম্পিউটারের বোতাম টিপলেন। কম্পিউটারের আলো জ্বলে উঠল, কিন্তু তারপরে কিছুই হলো না। খানিকক্ষণ পরে মনিটরে লেখা ফুটে উঠল, “বুট ডিভাইস নট ফাউন্ড।”
“এ কী!” অবাক হয়ে প্রদীপ আবার সুইচ টিপে কম্পিউটার অফ্ করে আবার অন করলেন।
একই ঘটনা ঘটল আবার। প্রদীপ বললেন, “এ আবার কী খেলা?”
“দেখি?” বলে নিচু হয়ে প্রসূন টেবিলের নিচে রাখা কম্পিউটারটা টেনে বের করতেই তার পাশের ঢাকনাটা খুলে পড়ে গেল।
“আরে!” আশ্চর্য হয়ে বললেন প্রদীপ।
“আশ্চর্য হবার কিছুই নেই,” বলল প্রসূন। “ওরা আপনার এক্সটার্নাল হার্ড ড্রাইভ নিয়ে গিয়েছে, ইন্টার্নালটাও নিশ্চয়ই ফেলে যায়নি – এই দেখুন। আপনার ডেস্কটপে কোনও হার্ড ড্রাইভ নেই।”
~সাত~
“মিঃ মজুমদার, আপনি যা-ই বলুন, এ বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই, যে প্রদীপ আপনাদের আর কোনও সাহায্য করতে পারবে না। এবং করলেও সেটা খুবই মিনিম্যাল – কিছু ইনফরমেশন দিয়ে – যেমন কোনও কথা মনে পড়লে সেটা জানিয়ে। আমার মনে হয় এবার ওকে কলকাতা ছাড়তে হবে।”
অতনুর বসার ঘরে বসে কথা হচ্ছে – উপস্থিত প্রদীপ আর প্রসূন। অতনু উত্তেজিত হয়ে পায়চারি করছে। বলছে, “এইভাবে যদি ওর বাড়ি আর ফ্যামিলির ওপরে অ্যাটাক হতে থাকে – কাল যদি ওর ওপর আক্রমণ হয়? ধরুন কোনও দিন যখন ও বাড়িতে একা এরকম একটা সময়ে ওরা এসে হাজির হয় – তাহলে হি উইল বি ইন গ্রেভ ডেঞ্জার।”
“ওরা যা চাইছিল, তা যদি পেয়েই গিয়ে থাকে তাহলে তো ওনার আর বিপদ নেই।”
“ওরা কী চাইছিল, তা কি আপনি জানেন? প্রদীপ জানে? আপনারা তো আন্দাজে কথা বলছেন। আর যদি পেয়ে গিয়েও থাকে, তাহলেও প্রদীপ যদি শহরে না থাকে – আপনাদের অসুবিধে কি?”
অনেকক্ষণ চুপ করে ছিলেন প্রদীপ। এবারে বললেন, “আমি কি হিন্দি ছবির হিরোইন, যে আমার ভবিষ্যৎ নিয়ে তোরা আলোচনা করবি, কিন্তু আমাকে একবারও জিজ্ঞেস করবি না, আমি কী চাই?”
অতনু বললেন, “তুই যদি বলিস যে তুই এখন থেকে তোর ওই ফ্ল্যাটে গিয়ে থাকতে চাস, তাহলে আমরা নিশ্চয়ই তোকে হিন্দি ছবির হিরোইনের মতো ট্রিট করব।”
প্রদীপ মাথা নেড়ে বললেন, “তা চাই না। তবে বাড়িতে আমাকে আবার যেতে হবে। জিনিস গোছানোর জন্য। আমি মনস্থির করে নিয়েছি। আমি কলকাতায় আর থাকব না। এই একটাই কাজ আপনি আমাকে দিয়েছিলেন। আমার মনে হয় সেই কাজটা আমি যথেষ্ট দক্ষতার সঙ্গে করেছি। শুধু যদি আর একটা দিন আগে করতাম, তাহলে হয়ত ছবিগুলো আমরাই পেয়ে যেতাম।”
“ছবি তো দু-তিন দিন আগেও চুরি গিয়ে থাকতে পারে,” বলল প্রসূন।
প্রদীপ মাথা নাড়লেন। “বোধহয় না। তাহলে কাজের লোকটা তিন দিন কামাই করত না হয়ত। কিন্তু সে যা-ই হোক, ও সবই এখন শত্রুপক্ষের হাতে। সুতরাং আমার আর হাঁ করে এখানে বসে থেকে লাভ নেই। চাকরি খুঁজতে হবে। আমি যেখানেই থাকি আপনি আমার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারবেন। পুলিশের কোনও প্রয়োজনে আমি চলে আসব। তাতে কি আপনার কোনও আপত্তি আছে?”
প্রসূন বললেন, “আপত্তির কারণ দেখি না। তবে একবার আমার সুপিরিয়রদের সঙ্গে আলোচনা করব।”
“না।” আপত্তি করলেন অতনু। “ব্যাপারটা অত সহজ করে নিলে চলবে না, মিঃ মজুমদার। আরও একটু প্ল্যানিং করতে হবে।”
“কী রকম?” জানতে চাইলেন প্রদীপ।
“তুই একটু মাথা ঠাণ্ডা করে ভাব, প্রদীপ। আমরা ধরে নিচ্ছি মৌলি খুন হয়েছে ওর ছবির জন্য। আমরা ধরে নিচ্ছি এর মধ্যে তোর কোনও রোল নেই। কিন্তু এমন যদি হয় যে আসলে ব্যাপারটা তোকে নিয়েই? তোরই এমন কিছু একটা আছে, যেটা চুরি করতে বা ডাকাতি করতে পুঁটে আর লিটন এসেছিল? মৌলির খুনটা কেবলই কাকতালীয়? তা যদি না-ও হয়, ওটা যদি ওই অজানা ছবিগুলোই হয়, তাহলে সেগুলো এতই ইমপর্ট্যান্ট যে তার জন্য তিনটে খুন হয়ে গেছে। আর লিটন-পুঁটের উকিল আর উকিলের বউ-মেয়ের খবর তো আমরা জানিই না। ওরা যা খুঁজছে তা যদি না পেয়ে থাকে? তার পর যদি তোর পেছনে লোক পাঠায়?”
প্রদীপ একটু ঘাবড়ে গেলেন। “তাহলে?”
“তাহলে তোকে ডুব দিতে হবে। ইউ উইল হ্যাভ টু ড্রাউন। সবাইকে জানিয়ে – এই আমি দিল্লি চললাম, এই আমি বোম্বাইতে চাকরি নিলাম, এসব বলে গেলে চলবে না। এখানকার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট বন্ধ করতে হবে। মোবাইল ফোন ফেরত দিতে হবে। যেখানে যাবি, সেখানে নতুন করে সব করতে হবে – এমন একটা প্ল্যান করতে হবে।”
প্রদীপ একটু রেগেই বললেন, “আর কী কী করতে হবে? নাম বদলাতে হবে, নকল আইডেন্টিটি কার্ড, র্যাশন কার্ড, ভোটার আইডেন্টিটি কার্ড, আধার কার্ড? প্লাস্টিক সার্জারি?”
“ইয়ার্কি মারিস না,” একটু ধমকের সুরেই বললেন অতনু। “এটা অ্যামেরিকা হলে হয়ত তা-ই করা হত। অতটা না হলেও তোকে হাওয়া হতেই হবে। সেটা তুই আর আমি প্ল্যান করব।”
প্রসূনের দিকে তাকিয়ে বললেন, “প্রদীপের সঙ্গে আপনার যোগাযোগের মাধ্যম থাকব আমি। কেমন? বুঝতেই পারছেন, আপনাদের নেটওয়ার্কের ওপর আমার খুব ভরসা নেই। কিন্তু আপনি আমার নেটওয়ার্কের ওপর ভরসা রাখতে পারেন।”
বোকা হয়ে যাওয়া প্রসূনকে বিদায় দিয়ে অতনু ফিরে এসে প্রদীপের সামনে বসলেন। বললেন, “তুই যদি আমার সাজেশন মানিস, তাহলে আমার কিছু অ্যাসোশিয়েট আছেন, তাঁদের ধরে তোর একটা চাকরি জোগাড় করে দেব। নট ভেরি হাইলি পেইং, কিন্তু আরামে থাকবি – সেভিংস-এ হাত দিতে হবে না, লুকিয়েও থাকতে পারবি।”
“কী চাকরি?”
“এন.জি.ও-তে। অ্যাডমিনিস্ট্রেশন। শুধু ডেস্ক জব হয় না। কিছু ফিল্ড ওয়ার্ক করতেই হবে – কাজে আনন্দ আছে।”
“তোর অর্গানাইজেশনেই তো দিতে পারিস।”
“ট্রেস করা সহজ হবে। আমি অনেক ঘুরপথে ভাবছিলাম। ধর আমি তোকে পাঠালাম দিল্লি। সেখানে আমার পরিচিত কেউ তার পরিচিত কারওর সংস্থায় তোকে পাঠাল। এমন একজনের কাছে, যারা বিভিন্ন জায়গায় কাজ করে। তোকে কোনও একটা ছোটো শহরে প্লেস করবে। সেখানে তোর নতুন সবকিছু হবে। ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট, ই-মেইল আই.ডি, ফেসবুক প্রোফাইল – আগের কোনও কিছুর সঙ্গে যোগাযোগ না রেখেই।”
“ফেসবুক আমার নেই, এবং নতুন করে করার কোনও ইচ্ছেও আমার নেই,” বললেন প্রদীপ।
“ফেসবুক তোর না থাকলেও তোর অর্গানাইজেশনের থাকতে পারে। অনেক ছোটো বড়ো কম্পানি আজকাল ফেসবুক বা হোয়াটস অ্যাপ জাতীয় সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং মাধ্যম নিজেদের বিজ্ঞাপনের জন্য ব্যবহার করে। সেটা খারাপ না, তবে ইনফরমেশন সহজে পাওয়া যায় – সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।”
প্রদীপের বেশ ভয় করতে শুরু করেছে। “তাহলে কি নাম-টাম বদলে নেওয়াই উচিত হবে?”
“হলে ভালো হত। কিন্তু সব আইডেন্টিটি, ভোটার, প্যান, আধার – এ সব বদলানো অনেক হাঙ্গামার ব্যাপার। দরকার হলে করতে হবে। পুলিশের আর সরকারী সাহায্য ছাড়া তো সম্ভব না। আজ তোকে পুলিশ কিছু না হোক, দু’জন লোক দিয়ে গেছে। কাল ওদের কাজের প্রেশার বাড়বে, চট করে লোক দুটোকে তুলে নিয়ে যাবে অন্য কোথাও। ব্যাস, তোর আর প্রোটেকশন থাকবে না।”
প্রদীপ বললেন, “কিন্তু তুই যেখানে পাঠাবি সেখানেও তো কেউ আমাকে প্রোটেক্ট করবে না।”
“সেখানে তো তোকে কেউ চিনবে না। ছোটো শহর, কিন্তু গ্রাম নয়। বা হয়ত ছোটো শহরও নয়। মস্ত শহর। চেন্নাই কিংবা ব্যাঙ্গালোর। বা দিল্লি কিংবা মুম্বাই। সেখানে তোকে কেউ চেনে না। অ্যাননিমিটি ইজ প্রোটেকশন।”
~আট~
“এবারে কী হবে?” ধরা গলায় জিজ্ঞেস করল তুলি।
“ভাবতে হবে,” চিন্তিত মুখে বলল প্রসূন। “সব কথা তো আপনাকে বলতে পারব না, কিন্তু একটা বিষয়ে আপনার সাহায্য চাই।”
জানতেও পারবে না তুলি, আবার সাহায্যও করতে হবে।
“ও,” গলাটাকে যতটা সম্ভব ঠাণ্ডা করে উত্তর দিল তুলি। “কী করতে হবে?”
ক্যাফে কফি ডে-তে বসে দুজনে। প্রসূন তুলিকে ফোন করে বলেছিল সাহায্য চাই। আলোচনা দরকার। তুলি কি আবার যাদবপুর থানায় আসবে? তুলি বলেছিল আপত্তি নেই, কিন্তু আবার যাদবপুর থানার অখাদ্য কফি না খাওয়ালেই হলো। সেখান থেকে প্রসূনের আহ্বান গোলপার্ক ক্যাফে কফি ডে অবধি গড়ায় – তুলি একটু দোনামনা করে রাজি হয়ে গিয়েছিল।
প্রসূন বলল, “দেখুন, ব্যাপারটা আপনাকে বুঝিয়ে দিই। পরশু দিন প্রদীপবাবুর বাড়িতে চুরিটা ধরা পড়েছে। সেদিনই দুপুরে প্রদীপবাবু সমস্ত বাড়িটা গুছিয়েছেন। কাল আমরা প্রদীপবাবুকে নিয়ে সারা বাড়িটা তন্নতন্ন করে খুঁজেছি। কিছুই পাইনি। মৌলিদেবী আপনার দিদি ছিলেন। আপনি ওনার চিন্তাভাবনার হদিস পাবেন চট করে। আপনি কি আমায় কিছুটা সময় দেবেন, ওই বাড়িতে গিয়ে খুঁজব আবার?”
গলাটা বেশিক্ষণ ঠাণ্ডা রাখা গেল না।
“কী খুঁজবেন?”
“ছবিগুলো।”
“কিন্তু সে তো বললেন সবসুদ্ধু চুরি হয়ে গিয়েছে। সে আর কী করে খুঁজে পাবেন?”
“আমার ধারণা – চুরি না-ও হয়ে থাকতে পারে। আমার লজিকটা একটু বোঝার চেষ্টা করুন। মৌলিদেবী ওই ছবিগুলো কাউকে দেখাননি, তাই তো? তাহলে এমনও তো হতে পারে, যে ছবিগুলো সুদ্ধু মেমরি কার্ডটা রেখেছেন অন্য কোথাও? অর্থাৎ, ছবিগুলো যদি দেখান’র মতো মনে না করে থাকেন, তাহলে যেখানে কেউ হাতে পেয়ে যেতে পারে, সেরকম কোথাও না-ও রাখতে পারেন?”
তুলি মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলল। যুক্তিটা মনে ধরেছে। বলল, “সেটা কোথায় হতে পারে?”
“সেটাই আপনার কাছে আমি জানতে চাইছি। প্রদীপবাবুর সঙ্গে কাল আমি আলমারির মধ্যে, বইয়ের তাকে – তন্নতন্ন করে খুঁজেছি। মৌলিদেবীর হ্যান্ডব্যাগ ঘেঁটে দেখেছি। কোনও চিহ্নই পাইনি।”
“আর আপনি মনে করছেন আমি পাব?”
“ওই যে বললাম, আপনি মৌলির চিন্তার ধারা আমাদের চেয়ে বেশি জানেন। আমার চেয়ে তো বটেই, আমার ধারণা প্রদীপবাবুর চেয়েও। এই চিন্তাগুলো অর্গানাইজড চিন্তা নয়। এগুলো রিফ্লেক্স অ্যাকশনের মতো। হয়ত আনকনশাস থেকে উঠে আসে।”
পুলিশের মুখে ফ্রয়েডের কথা শুনে হঠাৎ তুলির হাসি পেল। “আপনি সাইকোলজি পড়েছেন?”
একটু হেসে প্রসূন বলল, “ইতিহাসে বি.এ করেছি। সাইকোলজি সাবজেক্ট ছিল না, তবে পড়েছি কিছু। ট্রেনিং-এও পড়তে হয়েছে। একবার মাথায় আই.পি.এস হবার ভূত চেপেছিল, তখনও শিখেছিলাম কিছু।”
“আপনি আই.পি.এস না?” তুলি পুলিশের ব্যাপারে কিছুই জানে না।
এক হাত জিভ কেটে প্রসূন বলল, “না, ম্যা’ম। আমি স্টেট ক্যাডার। আই.পি.এস হওয়া আমার ভাগ্যে ছিল না... যাই হোক, আপনি কি কাল আসবেন? তাহলে সকালে গাড়ি পাঠিয়ে দেব আপনার বাড়িতে।”
“মৌলিদির ব্যাগ, আলমারি, এসব কি তালাবন্ধ থাকবে না?”
“থাকবে। আমি প্রদীপবাবুর কাছ থেকে চাবি চেয়ে রেখেছি। বলেছি আপনাকে নিয়ে যাব।”
তুলির বুকটা অকারণেই ধড়াস করে উঠল। বলল, “প্রদীপদা জানে, আপনি আমাকে নিয়ে যাবেন?”
প্রসূন একটু অবাক হয়ে বলল, “জানেন বইকি! আপনি রাজি হলে আমি আপনার বাবার সঙ্গে কথা বলব।”
ফলে তুলিকে কথাটা পাড়তে হলো না। রাতে খাওয়া শেষে রসগোল্লার প্লেট টেনে নিয়ে বাবা-ই বললেন, “তুই কাল সকালে প্রদীপের বাড়ি যাচ্ছিস?”
তুলি বলল, “হ্যাঁ। তোমাকে পুলিশ ফোন করেছিল?”
“করেছিল। আমি তো প্রথমে বুঝতেই পারছিলাম না কী বলছে – চুরি হয়েছে, কোথায় হয়েছে – এমন ভাবে বলছে যেন তুই যাবি চুরির মাল উদ্ধার করতে। পুলিশ অফিসারটা বেশ গাধা।”
“কে ফোন করেছিল?” ভয়ে ভয়ে জানতে চাইল তুলি। “আমার সঙ্গে যিনি দেখা করলেন তার নাম প্রসূন মজুমদার। আমার তো বোকা মনে হয়নি।”
“ওই প্রসূন মজুমদারই। আগের দিন অফিসে এসেছিল। তখন আমারও বেশ স্মার্ট ইয়ং অফিসার মনে হয়েছিল। আজ ফোনে এমন আমতা আমতা করতে লেগেছে... হ্যাঁ, ভালো কথা, আমি বাড়িতে গাড়ি পাঠাতে বারণ করেছি। কী দরকার? আবার দাদা দেখবে, চেঁচামেচি হবে... আমি তোকে অফিসে নিয়ে যাব সকালে, ওখানেই ও গাড়ি পাঠাবে – তুই গুরুসদয় রোড থেকে চলে যাস।”
বাধ্য মেয়ে তুলি ঘাড় হেলিয়ে টেবিল থেকে উঠতে যাবে – বাবার খেয়াল হলো। “তোর সঙ্গে দেখা হয়েছে? কোথায়?”
ক্যাফে কফি ডে। না, সেটা বলার সময় এখনও আসেনি।
“কলেজের সামনে।”
“হুঁ,” বলে খাওয়ায় মন দিলেন তুলির বাবা। “রসগোল্লাটা দারুণ কিন্তু,” প্লেটের দিকে তাকিয়ে বললেন, যেন কাউকেই না।
দরজা পর্যন্ত গিয়ে তুলি ঘুরে দাঁড়িয়ে হেসে বলল, “ও সব বলে আমাকে লোভ দেখাতে পারবে না, বাবা। আমার পেট আরও আড়াই ইঞ্চি কমবে, তবে মিষ্টি খাব আবার।”
“হুঁঃ, যত্তোসব রোগা হবার রোগ,” বললেন তুলির বাবা। “পি জি উডহাউস ডায়েটিং সম্বন্ধে কী বলেছেন জানিস?”
“জানি। বলেছেন গান্ধীজী যদি সবজি খাওয়া ছেড়ে বিফ-স্টেক খেতেন, ভারতে সিভিল ডিসওবিডিয়েনস হত না।” তুলির বাবা ঠিক ওই অংশটার কথা বলছিলেন না, তবে তুলি ততক্ষণে বেরিয়ে গেছে। ঘর থেকে চেঁচিয়ে বলল, “তাহলে ভারত স্বাধীনও হত না।”
~নয়~
পরদিন বাবার অফিসের সামনে থেকে জিপে ওঠার সময় একজন পুলিশের খটাশ করে মারা স্যালুটে বেশ ভালো লাগলেও, জিপে প্রসূন নেই দেখে বেশ হতাশই হলো তুলি। গাড়িটা একটা লজঝড়ে সুমো। বাইরে যদিও মোটা মোটা অক্ষরে ‘পুলিশ’ লেখা, কিন্তু রংটা সাদা, আর লাল আলো-টালো নেই। আগের জিপটার মতো রেডিও-ও নেই। সামনে বসা পুলিশটা অবশ্য সল্ট লেকে গাড়ি ঢুকতে না ঢুকতেই মোবাইল বের করে ‘স্যার’ সম্বোধন করে কাকে খবর দিয়ে দিল, আর ‘ক্রাইম রেকর্ডস হাউস’ লেখা একটা বাড়ির গাড়ি-বারান্দায় এসে দাঁড়ান-মাত্র প্রসূন জিপে উঠে পড়ল। এবার তুলির পাশেই। ড্রাইভারকে, “চলো,” বলে তুলির দিকে ফিরে বলল, “নমস্কার।”
তুলির কান কেন লাল? অস্পষ্ট স্বরে “নমস্কার” বলে বাইরে তাকিয়ে রইল।
দেখা গেল প্রসূনের অফিস থেকে প্রদীপদার ফ্ল্যাট বেশি দূরে না। শীত এখন তুঙ্গে, কিন্তু স্কুলগুলো এক এক করে খুলছে, কয়েকজন ইউনিফর্ম পরা বাচ্চা মায়েদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে আছে হাউসিঙের গেটের বাইরে, স্কুল বাসের অপেক্ষায়। খুব ছোটো বাচ্চারা সকালের রোদে খেলে বেড়াচ্ছে আয়া-মাসি, বা মায়েদের সঙ্গে। প্রসূন আর তুলিকে দেখে অবাক হয়ে ওরা খেলা ফেলে তাকিয়ে রইল। প্রসূন ইউনিফর্মে নেই আজও, কিন্তু জিপ, সঙ্গী, আর হাবভাবে পুলিশ বলে সহজেই ওকে চেনা গেছে নিশ্চয়ই।
অন্তত বিশ জোড়া চোখের দৃষ্টিতে ভাজা হতে হতে দুজনে লিফটে উঠল। প্রদীপদার ফ্ল্যাটের দরজায় একটা মস্তো তালা। এই তালা আগে থাকত না। একজন ইউনিফর্ম পরা পুলিশ দরজায় পাহারা দিচ্ছিল। প্রসূনকে সেলুট করে সরে দাঁড়াল। প্রসূন পকেট থেকে চাবি বের করে দরজা খুলল। হাট করে দরজাটা ঠেলে খুলে দিয়ে বলল, “আসুন।”
মৌলিদি খালি বাড়ি পছন্দ করত। অযথা জিনিসপত্র, আসবাবের বালাই নেই। কার্পেটটা গোটানো পড়ে আছে দেওয়ালের ধারে। অভ্যাসমতো বাইরের দরজার কাছে জুতো রাখার জায়গায় তুলি চটি খুলতে যাবে, প্রসূন বলল, “না, খুলবেন না। পরশু প্রচুর ভাঙা কাচ ছিল সারা বাড়িতে। কাল যদিও কাজের মেয়ে পরিষ্কার করেছে, তবু ও চলে যাবার পরেও আমরা কাচ পেয়েছি এখানে ওখানে। আজ এখনও পরিষ্কার করা হয়নি।”
পায়ে পায়ে ভিতরে এল তুলি। গলার কাছটা পাকিয়ে উঠছে। কত আনন্দ করে ফ্ল্যাট সাজিয়েছিল মৌলিদি। প্রথমে ফাঁকা ফ্ল্যাটের ছবি নিয়ে এঁকে এঁকে টেবিল চেয়ার সোফা। তারপর নিজে দাঁড়িয়ে থেকে এই সমস্ত ফার্নিচার – কাঠের মিস্ত্রী ডেকে বানানো।
“এই ঘরে ছিল কম্পিউটার,” ডেকে বলল প্রসূন।
“জানি,” বলে ও ঘরে না ঢুকে শোবার ঘরে ঢুকল তুলি। ভাগ্যিস প্রদীপদা নেই। দুই ফ্যামিলির মধ্যে যা চলছে, যদি প্রদীপদার মুখোমুখি হতে হত...
পিছন থেকে প্রসূন বলল, “ঘরগুলো এক এক করে খুঁজলে হত না?”
তুলি বলল, “এটাই মৌলিদির ঘর ছিল। প্রথমে কম্পিউটারটাও এই ঘরেই ছিল। ওই কোণে – টেবিলে। পরে প্রদীপদা বলে, না শোবার ঘর শুধু শোবার জন্যই থাকবে। তাই কম্পিউটার, বই-খাতা, সবই চলে যায় ওই স্টাডিতে।”
ঘরের মধ্যে একটা বড়ো ডবল বেড, একটা আরাম কেদারা – শোয়ার জন্য না, বসার জন্য – আর্ম চেয়ার। তুলি গিয়ে সেটাতে বসল। পাশে একটা সাদা কাঠের ফোলডিং টেবিল।
“মৌলিদি এই চেয়ারেই বসত সারা দিন। নইলে ওই খাটে। বই পড়ত এখানে বসে, লিখত এই টেবিলে। প্রদীপদা আসার আগে সব পাশের ঘরে সরিয়ে রাখত। প্রদীপদা মাটির মানুষ, কিন্তু মৌলিদি চাইত অপছন্দের কাজ না করতে।”
চেয়ার থেকে উঠে তুলি হেঁটে একবার ঘরের মধ্যে ঘুরল। আজকালকার ফ্ল্যাটবাড়ির শোবার ঘর। খুব বড়ো না। আলমারির সামনে দাঁড়াল। একবার হ্যান্ডেল ধরে টানল। তালা বন্ধ।
পকেটে হাত ঢুকিয়ে প্রসূন বলল, “চাবি আছে। খুলি?”
“না,” মাথা নাড়ল তুলি। “কাল আপনারা এ সব দেখেছেন। আবার হাতড়ে কী লাভ? চলুন স্টাডিতেই।”
স্টাডিতে বই ভর্তি। প্রদীপদা খুব পড়তে ভালোবাসে। বাংলা, ইংরেজি – দুরকম বইয়েরই সমাহার। প্রদীপদা তুলিকে পছন্দ করত ও অনেক বই পড়ে বলে। কত বই দিয়েছে ওকে। মৌলিও পড়ত – কিন্তু অত বেশি না। টিভি দেখত, আর ফোটোগ্রাফির ম্যাগাজিন রাখত। প্রদীপদা বেশ দামি দুটো ম্যাগাজিনের গ্রাহক করে দিয়েছিল মৌলিদিকে। তুলির চোখ গেল বইয়ের তাকের দিকে। ওই তো। এক্সপোজার, আর ব্লাইন্ড স্পট।
“ওই ম্যাগাজিনগুলোর মধ্যে খুঁজেছেন?”
“হ্যাঁ। ইয়ে, কী খুঁজছি আপনার কোনও আন্দাজ আছে?”
“আপনিই তো বললেন – মৌলিদির কোন একটা মেমরি কার্ড।”
“হ্যাঁ। এস.ডি কার্ড বলে।”
“জানি,” বলে তুলি গিয়ে ফোটোগ্রাফি জার্নালের তাকগুলোর সামনে দাঁড়াল। “সমস্যাটা কী জানেন? এ যদি প্রিন্টেড ছবি হত, যে কোনও বইয়ের মধ্যে রাখা যেত। কিন্তু এস.ডি কার্ড। এইটুকু একটা জিনিস – যেখানে খুশি রাখা যায়।”
“না,” আপত্তি জানাল প্রসূন। “যেখানে খুশি না। একটু সাবধানে রাখতেই হবে।”
“কিসের সাবধানতা? মোটা কাগজে, বা মোটা করে কাগজে মুড়ে রাখলেই চলবে – ড্রয়ারের কোণে, ব্যাগের ভিতরে, এমনকি ফ্রিজেও রাখা যায়।”
“ফ্রিজে?” অবাক হলো প্রসূন।
“রাখা যায় বলেছি। মৌলিদি রাখেনি। ফ্রিজে রাখতে গেলে একটা কৌটোয় ভরে রাখা সবচেয়ে ভালো।”
“জল লাগবে না?”
“জল কেন লাগবে? জিনিসটা ফ্রিজ থেকে বের করে আনলে বাইরের ময়শ্চার কন্ডেনস করে জমবে ওপরে। সে তো ফিনল্যান্ড থেকে কলকাতায় আসলেও হবে।”
দ্রুত পায়ে রান্নাঘরে গিয়ে ফ্রিজের দরজা খুলল প্রসূন। ফ্রিজ খালি। কিছু নেই। সুইচ বন্ধ। ভিতরে ভ্যাপসা গন্ধ। প্রসূন দেখেই বুঝল ওতে কৌটো জাতীয় কিছু নেই। কিছুই নেই।
“ফ্রিজে ছিল না। মৌলিদি রাখতই না ওখানে। একটা ওয়ালেট ছিল। ওই যে, জিপ ফাসনার লাগানো, ভেতরে প্লাস্টিকের পাউচ, অনেকগুলো... সে নিশ্চয়ই চুরি হয়েছে...” তুলি পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে। কথাটা বলতে বলতেই প্রসূনের ঘাড় হেলিয়ে ‘হ্যাঁ’ দেখে বলল, “ভালো কথা, মৌলিদির ছোটো স্যুটকেসটা কোথায়?”
“কী স্যুটকেস?”
“মৌলিদির একটা স্যুটকেস ছিল। ছোটো। নরম কাপড়ের তৈরি। বিদেশী। মিষ্টি নীল রঙের। বাবলুদা – মানে ওর দাদা এনে দিয়েছিল।”
“ও, হ্যাঁ, দেখেছি – শোবার ঘরে ছিল।”
“শোবার ঘরেই থাকত। মৌলিদির ড্রেসিং টেবিলের পাশে। এখন নেই।”
“চলুন তো?”
দুজনে গিয়ে ঢুকলেন মাস্টার বেডরুমে। আঙুল দিয়ে ড্রেসিং টেবিলের দিকে দেখিয়ে তুলি বলল, “ওখানটায় থাকত।”
ঘাড় নাড়ল প্রসূন। “রাইট। আমিও দেখেছি। কালও দেখেছি। সুতরাং চুরি হয়নি। ওটা চাই?”
“ওটা মৌলিদির ভীষণ প্রিয় ছিল।”
“কিন্তু তেমন কিছু ছিল না ওতে। কয়েকটা সফট টয়, বাচ্চাদের টেডি বেয়ার জাতীয়...”
“জানি,” অসহিষ্ণু সুরে বাধা দিয়ে তুলি বলল, “কোথায় ওটা?”
“কাল প্রদীপবাবু কোথায় রাখলেন, তা তো আমি...” বলে পকেট থেকে মোবাইল বের করে ফোন করতে গিয়েও থমকে গেল প্রসূন। আজ সকাল থেকেই প্রদীপের আগের মোবাইল অফ্ থাকার কথা। প্রসূনের কাছে নতুন নম্বর নেই। অতনু সিংহকে ফোন করতে হবে। তুলির সামনে সেটা করা কি উচিত হবে? কিন্তু স্যুটকেসটা যাবে কোথায়? কাল প্রদীপ সেনগুপ্ত সেটা হাতে নিয়ে বেরোননি। তাহলে এখানেই আছে। স্যুটকেস কোথায়?
“আসুন তো,” উত্তেজিত প্রসূন হঠাৎ তুলির হাত ধরে টেনে নিয়ে গেল দ্বিতীয় বেডরুমটায়। দেওয়াল আলমারির ওপরে একসারি কাঠের পাল্লা দেওয়া লফট আলমারি। এখানেই কি...
“দাঁড়ান,” বলে খাবার ঘর থেকে একটা চেয়ার এনে জুতো খুলে তার ওপর চড়ল প্রসূন। তিন জোড়া পাল্লা। দুটো দরজার মাঝখানে দাঁড়িয়ে বাঁ হাত দিয়ে টেনে একটা খুলল। একই সঙ্গে ডানহাত দিয়ে পাশেরটা। খাটের ওপারে দাঁড়িয়ে তুলি। ওর হাতে এখনও প্রসূনের ছোঁয়া লেগে রয়েছে। বলল, “ওই তো, প্রথমটাতেই।”
হাত বাড়িয়ে বাক্সটা বের করল প্রসূন। তুলি এগিয়ে এসে ওর হাত থেকে নিয়ে নিল, প্রসূন নেমে এল পাশে।
তুলি খাটের ওপর বাক্সটা রেখে তার ঢাকনা খুলল। বাক্সভর্তি পাঁচটা মাঝারি সাইজের সফট টয়। একটা টেডি বেয়ার, একটা কাঠবিড়ালি, একটা জিরাফ, একটা স্লথ আর একটা লম্বা লেজওয়ালা লীমার। বাবলুদা বলেছিল, রিং টেলড লীমার। বলেছিল, বাঙালের মতো লেমুর বলবি না। এটার ওপর লোভ ছিল তুলির। কিন্তু তুলিকে না দিয়ে মৌলিকে দিয়েছিল এটা – যেবারে তুলির জন্য একটা সিংহ নিয়ে এসেছিল। আর একটা ছোটো জিরাফ। ঠিক এই জিরাফটার মতো।
সব খালি করে বাক্সটা ঝেড়ে দেখল তুলি। কিছুই নেই কোথাও। ঢাকনায় একটা পকেট। সেটা খুলে হাত ঢুকিয়ে দেখল। কিছুই নেই।
একে একে সফট টয়গুলো তুলে রাখতে রাখতে একবার ভাবল, লীমারটা নিয়ে যাবে? তারপরে ভাবল, না। উচিত হবে না। অনুমতির ব্যাপার আছে। প্রদীপদা এখানে নেই। ওর-ও বউয়ের জিনিসের প্রতি টান থাকতে পারে।
বাক্সের ঢাকনাটা বন্ধ করতে করতেই প্রসূনের ফোন বাজল। প্রসূন একবার তাকিয়ে নিয়ে উত্তর দিল, “বলুন মিঃ সিনহা...” তারপর বলল, “ও, আপনি? বলুন... হ্যাঁ। আছি, আপনার বাড়িতেই... না, কিছুই পাইনি এখনও... আচ্ছা, বলুন... বেশ, তো, না, না। আমার আপত্তি কিসের?... না। সেটা আমার বলা-টা ঠিক হবে না। আমি দিচ্ছি, আপনি বলুন।”
ফোনটা তুলির দিকে বাড়িয়ে বলল, “প্রদীপবাবু। আপনার সঙ্গে কথা বলতে চান।”
প্রদীপদাকে প্রসূন ‘মিঃ সিনহা’ বলল কেন? তুলি হাতে নিয়ে ফোনের দিকে তাকিয়ে বুঝল প্রদীপদা ওঁর উকিলের ফোন থেকে ফোন করেছে। কেন?
“হ্যালো,” ধরা গলায় বলল তুলি। কী বলবে প্রদীপদাকে? কী বলবে প্রদীপদা?
“তুলি,” প্রদীপদার গলাও কি ওর গলার মতোই ধরা? “আমি আজ কলকাতা ছেড়ে চলে যাচ্ছি – মানে, যেতে হচ্ছে। কবে ফিরব, কোনও দিন ফিরতে পারব কি না জানি না। তোমার সঙ্গে যে পুলিশ অফিসার রয়েছেন, উনি তোমাকে ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলবেন। শোনো, তোমাকে একটা কথা বলি – ও বাড়িতে মৌলির যা কিছু আছে, তার মধ্যে তোমার যদি কিছু নিতে ইচ্ছে করে – শাড়ি, জামা, বইপত্র – তুমি নিয়ে যেও।”
তুলির চোখ দিয়ে জল বেরিয়ে এল। এক্ষুনি ওর ইচ্ছে করছিল লীমারটা নিয়ে যেতে। এখন আর কিছু ইচ্ছে করছে না। কথা বলতে গিয়ে অব্যক্ত একটা শব্দ হলো।
“কেঁদো না,” প্রদীপদার গলা পেল আবার। “আজই নিতে হবে না। আমি আমার বন্ধু অতনুকে বলব চাবির একটা সেট তোমাদের কাছে পৌঁছে দিতে – পুলিশের কাজ শেষ হয়ে গেলে। তুমি পরে সুবিধামতো মৌলির পারসোনাল জিনিসগুলোর দায়িত্ব নিও। দিয়ে দিও, বা নিও – যদি চাও। পড়ে থেকে নষ্ট হতে দিও না, কেমন?”
তুলি উত্তর দিতে পারছিল না। কোনও রকমে “আচ্ছা,” বলে ফোনটা বন্ধ করে প্রসূনকে দিয়ে দিল। তারপরে বাক্সটা বন্ধ করতে করতে বলল, “এটা আমি নিয়ে যাব।” গলা কান্নায় ধরে এল। ঠিক করে বেরোল না।
“হ্যাঁ,” বলল প্রসূন। “প্রদীপবাবু আমাকে বলছিলেন আপনি এ বাড়ি থেকে যা খুশি নিয়ে যেতে পারেন।”
তুলির হাত কাঁপছে। প্রসূন নিচু হয়ে বাক্সটার ঢাকনা লাগিয়ে বলল, “আপনি কি একটু বিশ্রাম করবেন? আমাদের কাজ কিন্তু শেষ হয়নি।”
তুলি ঠোঁট চেপে কান্না আটকানোর চেষ্টা করছিল। মাথা নেড়ে ‘না’ বলল। প্রসূন বাক্সটা হাতে নিয়ে দরজার দিকে যেতে গিয়ে থেমে গেল।
“এর মধ্যে আলগা কিছু একটা রয়েছে। নড়বড় করল।”
তুলি থমকে গেল। “এক্ষুনি তো দেখলাম। কিছু তো পেলাম না।”
প্রসূনের ভুরু কোঁচকান। বাক্সটা আবার খাটে রেখে, খুলে, সফট টয়গুলো বিছানায় নামিয়ে ভিতরটা দেখল। খালি। ঢাকনা বন্ধ করে আবার তুলে ঝাঁকাল। এবার তুলিও শুনতে পেল। ভিতরে কিছু একটা নড়বড় করছে। ছোট্ট কিছু একটা। প্রসূন আবার ঢাকনার পকেটের চেনটা খুলল। কিছুই নেই। তা-ও তুলির মতো হাত ঢুকিয়ে একবার অনুভব করল। খালি।
“কিন্তু ডেফিনিটলি কিছু একটা রয়েছে। এটা জিপ্ ফাস্নারের চেনের ঝুনঝুন নয়।”
তুলি বলল, “আর কোনও পকেট রয়েছে কোথাও?”
প্রসূন বলল, “থাকলে ভিতরে আছে? দেখলাম না তো? বলে আবার ঢাকনাটা খুলে প্রায় চেঁচিয়ে উঠল। “এই দেখুন, এক্কেবারে ধার ঘেঁষে।”
দুজনে ঝুঁকে পড়ল। প্রসূন ঠিক বলেছে। ঢাকনার ধার ঘেঁষে ভিতর দিকে একটা চেন রয়েছে। তিন দিকে চেন – অর্থাৎ খুললে ঢাকনার নিচটা একেবারে বইয়ের পাতার মতো খুলে ভিতরে ঝুলে পড়বে।
প্রসূন সাবধানে চেনটা খুলল। ভিতরে প্রায় কিছুই নেই। প্রায়। মোটা কাগজে মোড়া একটা ছোট্ট প্যাকেট। ইঞ্চিখানেকও লম্বা নয়। চওড়া আরও কম।
“এটাই,” রুদ্ধশ্বাস উত্তেজনায় বলল তুলি।
প্রসূন কাগজের মোড়কটা খুলে একটা এস.ডি কার্ড বের করে আনল। ক্যামেরায় ব্যবহার হবার মতোই বটে।
“চলুন,” তুলি উঠে দাঁড়াল।
প্রসূন অবাক হয়ে বলল, “কোথায়?”
“ওই ঘরে – কম্পিউটার ওখানেই।”
প্রসূন মাথা নেড়ে বলল, “না। দুটো ব্যাপার আছে। প্রথমত, ও ঘরে কম্পিউটার নেই। খাঁচা আছে। ল্যাপটপ, এক্সটার্নাল হার্ড ড্রাইভগুলো, পেন ড্রাইভ – সবার সঙ্গে ডেস্কটপের হার্ড ড্রাইভও কেউ নিয়ে গেছে।”
“দুটো হার্ড ড্রাইভ ছিল ওর ভিতরে।”
“তা তো প্রদীপবাবু বলেননি?”
তুলি বলল, “প্রদীপদা কম্পিউটার সামান্যই বোঝে। চালাতে জানে নিজের যতটুকু দরকার ততটুকুই। তার বেশি হলেই শেষ। ওই – ই-মেইল, মাইক্রোসফট ওয়ার্ড, পাওয়ার পয়েন্ট, এক্সেল, আর টুকটাক এটা-সেটা। চলুন তো, দেখি।”
বেশিক্ষণ লাগল না। এক ঝলক দেখেই তুলি বলল, “হুঁ। দুটোই গেছে। আমার ল্যাপটপটা আনা উচিত ছিল।” অসহিষ্ণুভাবে প্রসূনের দিকে তাকিয়ে বলল, “আপনার অফিসে কম্পিউটারে দেখা যায় না?”
অস্বস্তিভরে খানিকক্ষণ তুলির দিকে তাকিয়ে থেকে প্রসূন বলল, “ইয়ে, অফিসেই দেখতে হবে। কিন্তু, মানে, দ্বিতীয় ব্যাপারটা হচ্ছে – সেটা তো আপনি দেখতে পাবেন না। কারণ এটা ইনভেস্টিগেশনের ইমপর্ট্যান্ট ক্লু হতে পারে। সেটা...” তুলির মুখের দিকে তাকিয়ে চুপ করে গেল প্রসূন।
“তার মানে? আমি আপনার পুলিশ-কুকুর হয়ে এসেছি এখানে?”
তুলির মুখ লাল, নাকের পাটা ফুলে উঠেছে রাগে।
“না, প্লিজ, ভুল বুঝবেন না। ব্যাপারটা সেরকম নয়।”
“ব্যাপারটা কী, আমি ঠিকই বুঝেছি, প্রসূনবাবু। আমি এখন যাব। আপনি আপনার গাড়িতে কি আমাকে নামিয়ে দেবেন, নাকি এস.ডি কার্ডটা পেয়ে গেছেন বলে আমাকে ট্যাক্সি করে যেতে হবে?”
“না, ট্যাক্সি করতে হবে না,” মিষ্টি গলায় বলল প্রসূন। “আমি ড্রাইভারকে বলছি, আপনাকে সুমোর পিছনে বেঁধে নিয়ে যাবে।”
তুলি এমন একটা অদ্ভুত কথায় থতমত খেয়ে চুপ করে গেল।
“আপনার ট্যাক্সিভাড়া বেঁচে যাবে।”
দৃশ্যটা ভেবে তুলির হঠাৎ এমনই হাসি পেল, যে রাগ ঠেলে হাসি প্রায় বেরিয়ে এল। মুখ ঘুরিয়ে নিল, পাছে প্রসূন দেখতে পায়। প্রসূন বলল, “রাগের ফাঁক দিয়ে যদি ব্যাপারটা দেখেন, তাহলে বলি, যে আমার কোনও কথায় আপনার কাল যদি মনে হয়ে থাকে যে আমি আপনাকে এই ছবিগুলো দেখাব বলেছিলাম, তাহলে আমি দুঃখিত এবং ক্ষমাপ্রার্থী। সে কথা বলার এক্তিয়ার আমার নেই – ছিলও না।”
তুলি এতক্ষণে সেটা বুঝেছে, কিন্তু অভিমানটা যায়নি এখনও।
“এবং আপনি কিন্তু এটাও ভেবে দেখবেন, যে আপনি যদি জানতে পারেন এতে কী আছে, তাতে আপনার একটা সাংঘাতিক বিপদ হতে পারে। ইন ফ্যাক্ট, আমাদের এখান থেকে খালি হাতে বেরোন উচিত। যেন আমরা কিছুই খুঁজে পাইনি। হতাশ-ভাবে।”
হঠাৎ ভীষণ ভয় করল তুলির। বড়ো বড়ো চোখে তাকিয়ে রইল প্রসূনের দিকে।
প্রসূন ওর হাত থেকে বাক্সটা নিয়ে সফট টয়গুলো ভরে বন্ধ করে রেখে দিল ঘরের কোণে। বলল, “পরে এসে নিয়ে যাব, কেমন?”
~দশ~
“ওই তুলি মেয়েটি এই ছবিগুলো দেখেছে?”
সি.আই.ডির অফিসে ইনসপেক্টর নকুল সেন কম্পিউটারের মনিটরের ওপর ঝুঁকে পড়েছেন। প্রসূন একটু দূরে। ও আগেই অনেকক্ষণ ধরে দেখেছে।
“না, স্যার।”
“বেটার নট। দেখলে বিপদ বাড়ত।”
হন্তদন্ত হয়ে সাব-ইনসপেক্টর সুব্রত গাঙ্গুলি ঢুকলেন।
“পাওয়া গিয়েছে?”
“গিয়েছে,” বললেন ইনসপেক্টর সেন। “কিন্তু কী পাওয়া গিয়েছে, আর সে বিষয়ে আমাদের কী করা উচিত, সে সম্বন্ধে আমাদের এক্ষুনি একটা ডিসিশন নিতে হবে। দেখো।”
নকুল সেন সরে বসলেন। গাঙ্গুলি চেয়ার টেনে কম্পিউটারের সামনে বসলেন। প্রসূন আবার প্রথম ছবিটা দেখাল।
“এটা কী?”
প্রসূন বুঝিয়ে দিল। “যেদিন মৌলিদেবী একা একা শহরে ঘুরতে গিয়েছিলেন, সেদিন নানা ছবি তুলে এনেছিলেন। একশোটারও বেশি ছবি। বেশিরভাগ ছবিই মালে শহরের লোক্যাল মার্কেট বা বাজারের ছবি। তার মধ্যে শেষ তেইশটা ছবিতেই এই দৃশ্য।”
সুব্রত গাঙ্গুলির হোমওয়ার্ক করার বিশেষ অভ্যাস নেই। বললেন, “এরা কারা? এটা কোথায়?”
“এটা মালে লোক্যাল মার্কেটেরই কোনও রাস্তার ছবি বলে ধরে নেওয়া যেতে পারে। আমি ইন্টারনেটে ছবি দেখলাম, লোক্যাল মার্কেটের রাস্তাঘাটের ছবি সব এরকমই।”
“রাস্তার ওপার থেকে একটা দোকানের ভিতরের ছবি? কাচের ভিতর দিয়ে কি?”
প্রসূন বলল, “হ্যাঁ, স্যার। রেস্টুর্যান্টের ভিতরকার ছবি। কাচের ওপর অল্প ছায়া আছে – কিন্তু ভিতরটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।”
“আর এই লোকগুলো? ওরা কারা?” বলে সুব্রত গাঙ্গুলি আরও কাছে ঝুঁকে পড়লেন। প্রসূন ছবিটাকে বড়ো করল। হাই রেজোলিউশন ছবি। মুখগুলো স্ক্রিনে আরও বড়ো হয়ে উঠল।
“মাই গড!” বললেন গাঙ্গুলি। “এটা তো ওই খুনিদুটো – লিটন আর পুঁটে – ওরা মালদ্বীপে কী করছিল?”
“সেটাও আমাদেরই বের করতে হবে,” বললেন নকুল সেন।
“আর এই অন্য লোকগুলো কে?” জানতে চাইলেন সুব্রত গাঙ্গুলি।
প্রসূন জবাব দেবার আগেই ইনস্পেক্টর সেন সামনে এগিয়ে এসে একটু বিরক্তভাবে বললেন, “এদেরও তোমার চেনা উচিত ছিল, সুব্রত। এই রোগা লোকটা সনত সরখেল। ও ছিল লিটন আর পুঁটের ল’ইয়ার। যাকে এখন আমরা ফেরার মনে করছি। আর এই অন্যজন, টি-শার্ট, গোঁফ, গোলগাল – ইনিই হলেন পুলস্ত্য দত্তগুপ্ত, ওরফে বাবলু, অর্থাৎ মৌলি সেনগুপ্তর আপন দাদা।”
“মাই গড,” বলে চেয়ারে হেলান দিয়ে বিস্ফারিত চোখে চেয়ে রইলেন সুব্রত গাঙ্গুলি।
খানিকক্ষণ ব্যাপারটা গাঙ্গুলিকে হজম করতে দিয়ে ইনস্পেক্টর সেন বললেন, “প্রসূন, বাকি ছবিগুলো দেখাও।”
প্রসূন পর পর ছবিগুলো দেখিয়ে যেতে লাগল। হঠাৎ গাঙ্গুলি থামিয়ে বললেন, “কী দিচ্ছে, পুঁটেকে?”
উত্তর না দিয়ে ছবিটা বড়ো করে দিল প্রসূন। পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে, বাবলু পুঁটের হাতে যা তুলে দিচ্ছে, সেটা নোটের তাড়া যদি না-ও হয়, তাহলে নিশ্চয়ই ওই আকারে কাটা কাগজের বান্ডিল।
আরও কয়েকটা ছবি দেখা গেল। পুঁটেকে টাকা দেওয়া শেষ করে বাবলু লিটনকেও নোটের তাড়া দিচ্ছে, তখন পুঁটে টাকা গোনার চেষ্টা করছে। একটা ছবিতে দেখে গেল সরখেল উকিল পুঁটেকে হাত নেড়ে কিছু বলছে। তারপর সবাই কথা বলছে, ইত্যাদি।
কার্ডে সবসুদ্ধ একশো ষোলোটা ছবি, তার শেষ তেইশটা ছবিতে এই একই দৃশ্য, এবং এই ছবিগুলোর পরে কার্ডে আর ছবি নেই। অর্থাৎ, এই ছবিগুলো তুলেই, আরও প্রায় চার হাজার ন’শো ছবি না-তুলেই মৌলি ক্যামেরা থেকে কার্ড বের করে নিয়েছিলেন।
“এ-এ-এ কেস হাতে রাখবেন না,” উত্তেজিত গাঙ্গুলি হাত নাড়তে শুরু করলেন যেন হাতপাখা নাড়ছেন। “এ আমাদের কেস না। এটা সি.বি.আই... কিংবা এনফোরসমেন্ট। ইন্টার্ন্যাশনাল সিনারিও। ইন্টারপোলের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে।”
“কী হয়েছিল বলে তোমার ধারণা?” জানতে চাইলেন সেন।
“কী হয়েছিল তো পরিষ্কার। মেয়েটা দাদাকে দেখতে পেয়ে ছবি নিয়েছে। নিশ্চয়ই ব্যাপারটা সন্দেহজনক লেগেছে, তাই একগাদা ছবি নিয়েছে। তারপরে দাদাকে চ্যালেন্জ করেছে, ব্যাপারটা কী? দাদা দেখেছে এই উইটনেস রাখা ঠিক না – তাই মেরে দিয়েছে।”
“কিন্তু ওই ছবিতে দাদা এমন কী করছিল যেখানে বোনের উপস্থিতি একেবারে মার্ডারে পরিণত হলো?”
“ওই যে, লিটন আর পুঁটে?” হাত নেড়ে উত্তেজিত সুব্রত গাঙ্গুলি বললেন। “ওরকম মার্ডারারদের সঙ্গে দাদাকে দেখল যে?”
ইনস্পেক্টর সেন বললেন, “সুব্রত, লিটন আর পুঁটে মৌলিকে ছাড়া আর কাউকে খুন করেছে বলে জানো? তাহলে দু-তিনজন লোকের সঙ্গে দাদা যদি রেস্টুরেন্টে বসে খাচ্ছে – বোন দেখেই ফেলে, তাহলে কেন খুন করতে যাবে?”
“সেটাই তো প্রশ্ন নকুলদা, জাস্ট ভাবুন... কী এমন সাংঘাতিক জিনিস দেখেছে বোন? নিশ্চয়ই মারাত্মক কিছু।”
সেন ফিরলেন প্রসূনের দিকে। “তোমার থিওরি কী?”
প্রসূন বলল, “আমারও ওরকমই থিওরি, স্যার। বোন দাদাকে বলেছে কী দেখেছে – হয়ত বলেছে, কী করছিল না বললে মা-বাবাকে বলে দেবে। দাদার নিশ্চয়ই এমন কিছু ব্যাপার যার জন্য বোনকেও স্যাক্রিফাইস করতে হেজিটেট করেনি।”
অধৈর্য হয়ে মাথা নাড়লেন ইনস্পেক্টর সেন। “তোমরা হাইন্ডসাইটে ভাবছ। তোমরা এখন জানো, যে লিটন আর পুঁটে মৌলিকে মেরেছে। তোমরা জানো যে সনত সরখেল সম্ভবত লিটন পুঁটেকে মেরে ফেরার হয়েছে। কিন্তু সে সব ঘটনার আগে এই ছবিগুলো কি সেরকম ইনক্রিমিনেটিং কিছু? মোটেই নয়। এই ছবি দিয়ে কাউকে ভয় দেখান বা ব্ল্যাকমেল করা কঠিন। আরও কিছু লাগবে। এক যদি না মৌলি অলরেডি জানে যে পুলস্ত্যর কোনও কোশ্চেনেব্ল ডিলিংস, বা ব্যবসা রয়েছে। তাহলে মানতে হবে গোটা ফ্যামিলিই ইনভলভড...”
প্রসূনের হঠাৎ মনে হলো – গোটা ফ্যামিলি হলে তুলিও...? বলল, “তাহলে স্যার?”
নকুল সেন বললেন, “এমনও তো হতে পারে, যে বোন দাদাকে চ্যালেন্জ্ করেনি? কিন্তু দাদা বুঝেছিল ছবিগুলো বোন তুলেছে। পুলস্ত্য দত্তগুপ্ত জানে ও যা করছে সেটা ইনক্রিমিনেটিং হতে পারে। তাই বোনের হাতে কোনও ছবিই রাখতে চায়নি। লিটন আর পুঁটেকে পাঠিয়েছিল শুধু ছবিগুলো উদ্ধার করতে। হয়ত বলেছিল দাদা চেয়েছে বলতে, হয়ত বলেছিল ভয় দেখিয়ে নিয়ে নিতে... সেই অপারেশনটা ফেল করে কারণ লিটন আর পুঁটে মাথা ঠিক রাখতে না পেরে মৌলিকে মেরে দেয়। হয়ত মৌলি ছবিগুলো দেখাতে, বা দিতে, বা কোথায় আছে বলতে রিফিউজ করেছিল, কে জানে, হয়ত পুলিশে ফোন করতে গিয়েছিল?”
প্রসূন বলল, “সেটা হতে পারে, স্যার। তুলি বলছিল, মৌলি নাকি হানিমুন থেকে ফিরে এসে খুব ভালো ছিল। একেবারে উচ্ছ্বসিত। হয়ত ব্যাপারটা কতটা সিরিয়াস সেটা বোঝেনি, শুধু আউট অফ দ্য অর্ডিনারি মনে করে আলাদা করে রেখেছিল। হয়ত ভেবেছিল, দাদাকে সামনা-সামনি জিজ্ঞেস করবে, কিন্তু সুযোগ পায়নি।”
সুব্রত গাঙ্গুলী বললেন, “কিন্তু এ ছবি তো ভিকটিম সামনা-সামনি তোলেননি। লুকিয়ে তুলেছেন, দূর থেকে, তাই না? দেখুন, রেস্টুরেন্টের সামনের দেওয়াল, সামনের কাচ দেখেই বোঝা যাচ্ছে...”
ইনস্পেক্টর সেন বললেন, “এক্স্যাক্টলি। দূর থেকে তোলা ছবি সন্দেহ নেই। আর যাদের ছবি উঠছে তারাও কেউ ক্যামেরা সম্বন্ধে অ্যাওয়েয়ার বোধহয় নয়... শুধু... প্রসূন, ছবিগুলো একবার আবার দেখাও তো...”
প্রসূন এক এক করে ছবিগুলো আবার দেখাতে থাকল। হঠাৎ একটা ছবির দিকে আঙুল দেখিয়ে সেন বললেন, “এই ছবিটাতে পুলস্ত্যর মুখটা বড়ো করো দেখি?”
বড়ো করা হলো।
সেন বললেন, “দেখো, ভালো করে। প্রায় ক্যামেরার দিকেই তাকিয়ে রয়েছে না?”
সবাইকে মানতে হলো। বাবলুর মুখটা পুরো ক্যামেরার দিকে ফিরে নেই, কিন্তু চোখদুটো প্রায় সোজা-ই ক্যামেরার দিকে
সেন বললেন, “এর পরেও দেখো, আর বেশি ছবি নেই, কিন্তু প্রায় সবকটাতেই বাবলু ক্যামেরার দিকেই তাকিয়ে – কিন্তু আড়চোখে।”
সেটাও মানতে হলো।
ইনস্পেক্টর সেন বললেন, “তাহলে আরও একটা পরিস্থিতির কথা ভাবতে হবে। বোন যদি দাদাকে রেস্টুরেন্টে দেখে দূর থেকে ছবি তুলে বাড়ি ফিরে সে ছবি লুকিয়ে রাখে, তাহলে সে নিশ্চয়ই ভাবেনি যে দাদা খুব ভালো কোনও কাজে লিপ্ত? তাহলে তো ‘আরে, দাদা, তুই এখানে কী করছিস?’ বলে টেবিলে গিয়ে বসত, তাই না?”
সুব্রত গাঙ্গুলি জানতে চাইলেন, “কিন্তু এবার করণীয় কী?”
“চলো, একবার ডি.এস.পি-র সঙ্গে আলোচনা করি।”
তিনজনে ডি.এস.পি-র ঘরের দিকে রওয়ানা হলেন। প্রসূনের হঠাৎ মনে হলো, ডি.এস.পি যদি বলেন, ‘প্রসূন, তুমি মালডিভ্স্ গিয়ে পুলস্ত্যকে অ্যারেস্ট করে আনো...’ তাহলে বেশ মজা-ই হয়।
~এগারো~
‘সহায়’-এর অফিসে অ্যাকাউন্টেন্ট সমীর ছুটে এল অতনুর ঘরের দরজায়। হাতে মোবাইল ফোন।
“স্যার, ওই সেই নম্বরটা থেকে মিসড-কল দিয়েছে, যেটা থেকে কল আসলে আপনি জানাতে বলেছেন।”
অতনু মুখ তুলে বললেন, “ঠিক আছে, তুমি কল লিস্ট থেকে নম্বরটা ডিলিট করে দাও।”
সমীর চলে গেল। ঘরের অন্য প্রান্ত থেকে বনি মুচকি হেসে বললেন, “বেশ স্পাই-থ্রিলার টাইপ চালাচ্ছ!”
অতনু হেসে পকেট থেকে একটা ছোটো বাক্স থেকে একটা সিম-কার্ড বের করে নিজের ফোনে ঢোকালেন। বনি আবার বললেন, “একটা ডুয়াল সিম ফোন কিনেই নাও না? ওই খুদে সিম-কার্ড ঢোকানো, বের করা... মিছিমিছি ঝকমারি।”
অতনু মন দিয়ে সিম-কার্ড বদল করতে করতে বললেন, “দেখি কতদিন এইভাবে চালাতে হয়, তারপরে কিনব। নইলে মিছিমিছি ফোনটা বাতিল করতে হবে। পার্ফেক্টলি ওয়ার্কিং একটা ফোন বাতিল করতে ইচ্ছে করে না, জানো?”
সিম-কার্ড ঢুকিয়ে ফোন অন করে অতনু ফোন করলেন।
“অতনু?” ফোন বাজতে না বাজতেই প্রদীপের গলা পেলেন।
“বল।”
“আমাকে কোথায় পাঠালি, বাবা?”
“কেন? ভালো লাগছে না? সবে তো কাল পৌঁছলি – এর মধ্যেই মন কেমন করছে?”
“তা নয় – বরং নৌকো চালান’ শিখতে হবে বলে খুব এক্সাইটিং লাগছিল। কলেজ ছাড়ার পরে তো আর রোইং করিনি। আর কেরালার এই ডোঙাগুলো খুব ইন্টারেস্টিং।”
“রোইং-এর গল্প করতে ফোন করেছিস?”
“না। একটা সমস্যা হয়েছে।”
“কী?”
“এখানে, আমাদের অফিসের লাগোয়া দেওয়ালেই একটা কেরালা আয়ুর্বেদিক মাসাজ সেন্টার আছে।”
“জানি। আমি তোদের অফিসে গিয়েছি বছর দুয়েক আগে। তখন দেখেছি। প্রায় ফাইভ-স্টার রিসর্ট একটা।”
“হ্যাঁ। গোটা অ্যালেপ্পিই ওরকম সেন্টারে ভর্তি। তবে এটার স্পেশালিটি হলো – চলছিল না ভালো। এসেই গল্প শুনতে হল, ভালো চলে না, ম্যানেজমেন্ট ভালো না, তাই বিক্রি হয়ে গেছে, ইত্যাদি...”
“তো?” অতনু কিছুই বুঝতে পারছেন না প্রদীপ কী বলতে চাইছে।
“আমাকে বলল, চলুন স্যার, নতুন মালিকের নাম-টাম লেগে গেছে। আমি বললাম, তোমরা এত ইন্টারেস্টেড যখন, তখন চলো... গেলাম দেখতে নতুন মালিকের নাম লেখা সাইনবোর্ড”
“বেশ?”
“নতুন মালিক হলো পলটেল কম্পানি।”
খানিকক্ষণ পরে প্রদীপের, “হ্যালো, অতনু, আছিস?” শুনে অতনুর খেয়াল হলো, কোনও উত্তর দেননি। প্রদীপের শালার ভালো নাম পুলস্ত্য, সেটা থেকে অ্যামেরিকান স্টাইলে ছোটো করে পল, আর ওর হোটেল কম্পানির নাম পলটেল, সেটা অতনু জানেন।
বললেন, “তাতে কী হয়েছে? তোর শালা হোটেল ব্যবসায়ী। আলাপ্পুজাতে হোটেল কিনেছে। তো?”
“ঘুরতে ফিরতে এখানে ওখানে আমার সঙ্গে দেখা হোক, আর আমাকে গালাগালি করুক?”
“প্রদীপ,” শান্ত গলায় বললেন অতনু। “অতগুলো হোটেলের মালিক, সারা দুনিয়া ঘুরে বেড়ায়, কবে তোর ওখানে আসবে...”
“কালকে,” বাধা দিয়ে বললেন প্রদীপ।
“কীঃ? জানলি কী করে?”
“আমাদের একজন স্টাফ ওখানকার দারোয়ানের ভাইপো না কীযেন। ও রাত্তিরে ওখানে শুতে যায়। ওকে ওর কাকা বলেছে, এখন কিছুদিন তোমার অফিসে বলে অফিসের ঘরেই শোও। কাল নতুন মালিক আসছে, যদি অ্যালাউ না করে – দু দিন পরে চলে যাবে, তখন আবার এসো। সেইজন্যই এত কথা আমাকে জানতে হল... ছেলেটা আমার কাছে পার্মিশন নিতে এসেছিল...”
“প্রদীপ, টেনশন করিস না। ওটা একটা ফাইভ স্টার রিসর্ট। ওদের মেন-গেট তোদের উলটো দিকে। তোর অফিস ব্যাকওয়াটারের দিকে মুখ করা, ওদের মেন গেট রাস্তার ওপর। বাবলু থোড়াই তোদের অফিস দেখতে আসবে। ও কোচি কিংবা তিরুঅনন্তপুরম এয়ারপোর্ট থেকে গাড়ি করে সোজা রিসর্টে ঢুকবে, দু-দিন থেকে চলে যাবে।”
“আমার ভালো ঠেকছে না রে, দুনিয়ার এত জায়গা থাকতে এখানেই আমাকেও আসতে হলো, ওকে-ও?”
“ও তোর কী করবে রে! শোন, খুব অস্বস্তি হলে এক কাজ কর, ফিল্ড ওয়ার্ক নিয়ে ভিলেজ সেন্টারটায় চলে যা।”
প্রদীপ একটুচুপ করে রইলেন, তারপরে বললেন, “ঠিক আছে। আমি দেখি, কী করতে পারি।”
অতনু বুঝলেন, সদ্য কাজে যোগ দেওয়া একজনের জন্য পরামর্শটা যুক্তিযুক্ত হয়নি। বললেন, “শোন, আমি দেখছি। টমাস এখন ইন্ডিয়াতে নেই। এখন তো একটা বড়ো ডিসিশন নেওয়া যায় না, তাই না?”
অসহিষ্ণুভাবে, “ঠিক আছে, আমি আগামী ক’দিন অফিস থেকে না-বেরোনরই চেষ্টা করব,” বলে প্রদীপ ফোন কেটে দিলেন।
চিন্তিতভাবে ফোনের সিম-কার্ড আবার বদল করতে করতে অতনু বনিকে দু-কথায় ব্যাপারটা বুঝিয়ে দিলেন। আবার ল্যাপটপের দিকে তাকিয়েছেন কি তাকাননি, ফোন বাজল। অপরিচিত ল্যান্ডনম্বর।
“হ্যালো,” বললেন অতনু।
“আমি ডি.এস.পি-র অফিস থেকে প্রসূন মজুমদার বলছি। আপনার সঙ্গে দেখা করা জরুরী দরকার। আপনি কি ঘণ্টাখানেকের মধ্যে আসতে পারবেন?”
“সল্ট লেকে?”
“হ্যাঁ।”
ঘড়ি দেখলেন অতনু। “ট্র্যাফিকে আটকে না গেলে পারব।”
“আচ্ছা। ডি.এস.পি স্যার একটু বেরোবেন তারপরে, কিন্তু আমি থাকব।”
সব শুনে বনি বললেন, “আবার কী হলো ?”
দরজা দিয়ে বেরোতে বেরোতে অতনু বললেন, “জানি না। দেখি...”
কপাল ভালো, বাইপাস ফাঁকা। একঘণ্টা দূরে থাক, পঁয়তাল্লিশ মিনিটে পৌঁছে গেলেন।
অতনুকে ডি.এস.পি-র অফিসে নিয়ে গেল প্রসূন। দু কথায় পরিচয় পর্ব সমাধা করে ডি.এস.পি সোজা আসল কথায় চলে গেলেন।
“প্রদীপ সেনগুপ্ত কোথায়?”
এখানে তর্ক চলবে না বুঝে অতনু বললেন, “কেরালায়। অ্যালেপ্পিতে আমার এক বন্ধুর প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে দিয়েছি?”
“ইজ হি সেফ?”
“কেন বলুন তো?” ভুরু কুঁচকে বললেন অতনু।
“প্রসূন, ছবিগুলো দেখাও।”
“মৌলির সেই মিসিং ছবি? পাওয়া গিয়েছে?” উত্তেজনায় চেয়ারের সামনে এগিয়ে এলেন অতনু।
“হ্যাঁ। একবার দেখুন, তাহলেই বুঝবেন কেন বলছি।”
কয়েকটা ছবি দেখার পরেই অতনু বললেন, “এক মিনিট, এক্সকিউজ মি।” বলে মোবাইল থেকে ফোন করলেন।
“শোন... হ্যাঁ, আমিই... না, ডাজ্ন্ট্ ম্যাটার। আমি ভুল করিনি। ইচ্ছে করেই আমার মোবাইল থেকে ফোন করেছি। শোন, তুই এক্ষুনি ওখান থেকে বেরো। কাউকে কিছু বলবি না। শুধু বলবি, তোর জরুরি কাজ পড়েছে, তুই যদি রাত্তিরে না ফিরিস, তাহলে ওই দারোয়ানের ভাইপো যেন রাতে অফিস বন্ধ করে শুয়ে পড়ে। তুই বেরিয়ে সোজা যাবি কোচি। সেখানে পৌঁছবার আগেই আমি তোর টিকিট করে রাখব। ফার্স্ট অ্যাভেলেব্ল ফ্লাইটে হয় ব্যাঙ্গালোর নয় চেন্নাই। সেখান থেকে কলকাতা। যেখানেই যাবি, কলকাতার আগে এয়ারপোর্ট থেকে বেরোবি না। আমি টিকিট তোকে ইমেইল করছি। কলকাতায় আমি তোকে এয়ারপোর্টে মিট করব। বুঝলি?”
“টিকিট কি আমার নামেই কাটবি, না জটায়ু-র নামে?” অতনু প্রদীপের এই গলার সুর চেনেন। এ হলো, ‘আমাকে নিয়ে তোরা কী আরম্ভ করেছিস, কিছু বলছিস না, কিন্তু ক্যারমের ঘুঁটির মতো একবার-এখানে-একবার-ওখানে – ইয়ার্কি নাকি...’ সুর।
বললেন, “তুই এলেই সবটা জানতে পারবি। ফোনে বোঝাতে গেলে অনেক সময় লাগবে। তুই বেরো ওখান থেকে। বাবলুর প্রতিবেশী হয়ে থাকতে হবে না।”
লাইন কেটে উৎসুক পুলিশ অফিসারদের বললেন, “বাবলু, ওরফে পুলস্ত্য, ওরফে পল – প্রদীপের অফিসের পাশের ফাইভ-স্টার রিসর্টটা কিনেছে। আগামী কাল সকালেই বোধহয় ওখানে পৌঁছবে। তাই প্রদীপকে ডেকে নিলাম।”
চারজন অফিসার পরস্পর মুখ তাকাতাকি করলেন। ডি.এস.পি বললেন, “ভালো করেছেন। আপনারা এখানেই বসুন। আমি এস.পি-র সঙ্গে কথা বলে নেক্সট প্ল্যান অফ অ্যাকশন ঠিক করছি। মিঃ সিনহা, আপনি এখান থেকেই প্রদীপ সেনগুপ্তর টিকিট করে নিন। প্রসূন, হেল্প হিম। ফ্লাইট ডিটেল অনুযায়ী প্রদীপ সেনগুপ্তর জন্য বডিগার্ডের ব্যবস্থা করবে। আপনি বডিগার্ডদের সঙ্গেই এয়ারপোর্ট যাবেন, মিঃ সিনহা।”
~বারো~
“টমাসকে বলে দিলাম।”
মোবাইল বন্ধ করতে করতে এসে টেবিলে বসলেন অতনু। বললেন, “ওর অফিসটাই বেস হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন। যে ছেলেটা রাতে থাকবে, ওর নাম বিজয়ন। অফিস অ্যাসিস্ট্যান্ট। ও নাকি বেশ চালাক চতুর। ওরই কাকা না জ্যাঠা কে – ওই রিসর্টের দারোয়ান। সুতরাং হি উইল গিভ ইউ কারেক্ট ইনসাইড ইনফরমেশন অলসো।”
কলকাতা বিমানবন্দরের একটা অফিসে ওরা পাঁচ জন কফির কাপ নিয়ে বসে। ইনসপেক্টর সেন, সাব ইনসপেক্টর গাঙ্গুলি, আর অ্যাসিস্ট্যান্ট সাব ইনসপেক্টর মজুমদার। সঙ্গে অতনু আর প্রদীপ। প্রদীপ সন্ধের ফ্লাইটে পৌঁছেছেন। পুলিশ তিনজন রাতের ফ্লাইটে চেন্নাই যাচ্ছেন। সেখান থেকে কাল ভোরে কোচি। সকাল সাতটার মধ্যে কোচি পৌঁছে ওঁরা স্থানীয় পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করবেন। আর এদিকে বিজয়ন, প্রদীপের অফিস অ্যাসিস্ট্যান্ট, প্রয়োজন-মতো বাবলুর নতুন রিসর্টের খবর এনে দেবে ওঁদের।
“এই বিজয়নকে বেশি কিছু বলার দরকার নেই,” বললেন সেন। “ও যদি ওর কাকাকে সব কথা বলে দেয়, তাহলে সব জানাজানি হয়ে যেতে পারে।”
আশ্বাস দিয়ে অতনু বললেন, “ও কিছুই জানে না। ওকে টমাস বলে রেখেছে যে ও প্রদীপকে অন্য অফিসে পাঠিয়েছে, তার জায়গায় তিনজন আসবেন – তাঁরা যা বলবেন, বিজয়ন যেন তা-ই করে।”
সেন বললেন, “চমৎকার।”
গাঙ্গুলি একটু কিন্তু কিন্তু করে বললেন, “সি.বি.আই-কে জানান’ হয়েছে কি না...”
এক ধমক দিয়ে সেন বললেন, “থামো তো তোমার সি.বি.আই! কোথায় গিয়ে চট করে একটা অ্যারেস্ট সেরে ফিরে আসবে, তা নয়, দুনিয়ার লোক নিয়ে যাব নাকি?”
করুণ চোখে চেয়ে গাঙ্গুলি বললেন, “স্যার, অত সহজ হবে না। ও ব্যাটা ড্রাগ লর্ড। সঙ্গে নিশ্চয়ই আর্মড গার্ড থাকবে। বিদেশ বিভূঁই জায়গা – আমরাই না বেকায়দায় পড়ে যাই।”
আরও রেগে গেলেন সেন। “কী বেকায়দায় পড়বে শুনি? আমরা কি খালি হাতে যাচ্ছি নাকি? লোক্যাল ফোর্স থাকবে। আর শুনলেই তো, এস.পি বললেন, আই.জি-কে বলে সি.বি.আই-কে ইনফর্ম করবেন। কিন্তু সি.বি.আই-কে বললেই তো ওরা আসবে না। ওরা তো আর আমাদের দারোয়ান নয়।”
অতনু বললেন, “এবারে আমরা আসি। প্রদীপও খুব টায়ার্ড। সারাদিন খুব ধকল গেছে।”
দু-জনে বিদায় নিয়ে বেরোলেন। প্রদীপ জানতে চাইলেন, “বাবলুদা কি ড্রাগ ডিলার নাকি?”
মাথা নাড়লেন অতনু। “কেউ জানে না। আন্দাজ করা হচ্ছে। হি মাইট বি এনিথিং।”
এয়ারপোর্টে ঘন ঘন ঘড়ি দেখতে দেখতে তিন পুলিশ অফিসার তিনরকম ভঙ্গী ধারণ করেছেন। সেন হাতের খবরের কাগজে মন দিয়েছেন, গাঙ্গুলি চেয়ারে এলিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছেন, প্রসূন খানিকক্ষণ পায়চারি করে হঠাৎ কী মনে হওয়াতে নিজের ল্যাপটপ খুলে বসেছে।
মিনিট তিন-চারেক পরেই মুখ তুলে ইনসপেক্টরক সেনের দিকে তাকিয়ে বলল, “স্যার।”
সেন আবার ঘড়ির দিকে তাকালেন। ফ্লাইটের সময় হয়ে এসেছে, কিন্তু চেন্নাই থেকে যে ফ্লাইটটা আসবে, সেটা এখনও আসেনি। দেরি করলে অসুবিধে নেই – চেন্নাইতে ওদের অনেকক্ষণ অপেক্ষা করতেই হবে। ক্যানসেল না হলেই হলো।
“স্যার?” প্রসূন আবার ডাকল। চোখ ল্যাপটপের দিকেই।
“হুঁ,” অন্যমনস্ক সেন উত্তর দিলেন।
“স্যার, ড্রাগ নয়।”
“কী?”
“ড্রাগ নয়, স্যার। বাবলু ইজ নট ইনভলভড ইন ড্রাগ স্মাগলিং।”
“তুমি কি ইন্টারনেট থেকে ইনফরমেশন পেলে?”
“না, স্যার। আমি বাবলু সম্বন্ধে যে ফাইলটা তৈরি করেছি, তাতেই আছে। আমি খেয়াল করিনি। আমরা আপাতত সাতটা হোটেল কম্পানির নাম পেয়েছি, যারা বাবলুর কম্পানির সঙ্গে নিয়মিত কাজ করে। কোনটা কোন দেশে লোকেটেড, তা-ও আমি লিখে রেখেছি – কিন্তু খেয়াল করিনি।”
সেন ততক্ষণে উঠে এসেছেন প্রসূনের পিছনে। ঝুঁকে পড়েছেন স্ক্রিনের দিকে।
“এই যে, স্যার,” প্রসূন আঙুল দিয়ে দেখাল। “দুটো থাইল্যান্ডে, একটা সাউথ অ্যাফ্রিকায়, তিনটে মিডল-ইস্টে – বাহরেইন, দুবাই, ওমান। আর শেষটা ফিলিপিনস-এ। ড্রাগ নয় বোধহয়।”
“মাই গড,” ফিসফিস করে বললেন সেন। “সি.বি.আই-কে এই সন্দেহের কথাটা এক্ষুনি জানাতে হবে।”
পকেট থেকে ফোন বের করে আই.জি-র নম্বর ডায়াল করলেন।
তখনই চেন্নাই থেকে ফ্লাইট এসে পৌঁছনর খবর পাওয়া গেল পাবলিক অ্যাড্রেস সিস্টেমে।
ধড়ফড় করে ঘুম থেকে উঠে সুব্রত গাঙ্গুলি বললেন, “কী হলো ? কী হলো ?”
এত স্মার্ট দেখতে একটা লোক কী করে লালমোহনবাবুর মতো আচরণ করতে পারে, প্রসূন ভেবে পায় না।
~তেরো~
পরদিন সকালে কোচি বিমানবন্দরে নেমে গাঙ্গুলি বললেন, “বাবা, এটা সকাল সাড়ে সাতটা? এখনও তো সূর্য ওঠেইনি ভালো করে।”
সেন বললেন, “কলকাতার থেকে কোচি অনেক পশ্চিমে। ভোর হয় দেরিতে। সন্ধেও নামে দেরি করে। দিন অনেক লম্বা লাগে।”
দু’জন সিনিয়রের সামনে প্রসূনের মুখ বন্ধ। নিঃশব্দে চলেছে।
অপেক্ষমান এয়ারপোর্ট পুলিশ ওদের নিয়ে গেল কনট্রোল রুমে।
“ডোন্ট ওরি,” বললেন ও.সি। “বাবলু, পুলস্ত্য, পল – যে নামেই আসুক, আমরা আপনাদের জানিয়ে দেব। ছবিও তো রয়েছে। অন্য কোনও নামে আসলেও আমরা চিনে নেব। আমি তিরুঅনন্তপুরমেও জানিয়ে রাখছি। ছবির কপিও পাঠিয়ে দেব।”
“ভীষণ এফিশিয়েন্ট,” জীপে করে তিরবেগে অ্যালেপ্পির দিকে যেতে যেতে বললেন গাঙ্গুলি।
“কোচি পুলিশ তো?” সামনে থেকে ঘাড় ঘুরিয়ে বললেন সেন। সাংঘাতিক। ওরাই ভারতের প্রথম পুলিশ ফোর্স যারা ব্ল্যাকবেরি ফোন ইউজ করে নিজেদের মধ্যে এনক্রিপ্টেড কমিউনিকেশনের জন্য, জান?”
প্রসূন জানত। কালকেই জেনেছে, কোচি পুলিশ সম্বন্ধে পড়তে গিয়ে। কিন্তু সুব্রত গাঙ্গুলি, বোঝাই গেল, জানতেন তো না-ই, বরং এখনও কিছু বুঝতে পারলেন না। ভাগ্যিস ইনসপেক্টর এসেছেন, নইলে এমন একজন এস.আই-এর সঙ্গে প্রসূন তো জলে পড়ে যেত।
অ্যালেপ্পি – আলাপ্পুজা – পৌঁছে গাড়ি প্রথমে গেল এস.পি-র অফিসে। আলেপ্পুজার পুলিশ সুপার, তিন জন ডি.এস.পি – সকলেই উপস্থিত।
“আমরা ওই এন.জি.ও-র ছেলেটার সঙ্গে কনস্ট্যান্ট টাচ-এ আছি। ওই বিজয়ন,” বললেন ডি.এস.পি ক্রাইম ডিটারেন্ট। “খুব করিতকর্মা ছেলে। ওর কাকাকে কিছু জানাবে না। তবে খবর রাখবে। ইওর ম্যান হ্যাজ নট কাম ইয়েট।”
এস.পি বললেন, “ও এলেই আমাদের ফোর্স নিয়ে জায়গাটা ঘিরে ফেলব। তারপরে আপনারা অ্যারেস্ট করবেন। সেটাও আমরা করতে পারলেই আনন্দিত হতাম, কিন্তু এখানে তো ও কোনও অন্যায় কাজ করেনি।”
ইনসপেক্টর সেন বললেন, “এর মধ্যে সি.বি.আই কেসটা নিয়ে নিলে অবশ্য আমাদের কিছু করতে হবে না...”
এস.পি সুব্রমনিয়ম বললেন, “সি.বি.আই এখনও কিছু জানায়নি। ওরা কিছু না জানালে আপনারাই নিয়ে যান। বোনের খুন-টা তো রয়েছেই।”
বড়ো সাহেবদের সঙ্গে মিটিঙের শেষে তিনজনকে নিয়ে যাওয়া হলো পুলিশ ব্যারাকে। সুব্রত গাঙ্গুলি বললেন, “বাবা, আমি তো ভাবলাম ওখান থেকেই বলবে বাড়ি যাও। খাওয়া-দাওয়া কিছু পাওয়া যাবে? অবশ্য খাবই বা কী, এই পোড়া দেশে।”
গাঙ্গুলির আশঙ্কা ফলে গেল। ব্যারাকের ব্রেকফাস্ট – ইডলি আর সম্বর ডাল ওঁর মুখে রুচল না। এমনকি কফিটাও ভালো লাগল না। “বড্ড কড়া, বুঝলে প্রসূন। এরকম রান্নাবান্নার ছিরি বলেই এরা জীবনে কিছু করতে পারে না।”
প্রসূনের বিরক্ত লাগতে শুরু করেছে। এমনিই একটা টেনশন রয়েছে – বাবলুকে অ্যারেস্ট তো করবেন, কিন্তু ওর বিরুদ্ধেও কি যথেষ্ট এভিডেনস আছে? এই কেসটাও যদি না দাঁড়ায়? ইন্টার্ন্যাশনাল অ্যাঙ্গেল যদি বেরোয়, কেস সি.বি.আই নিয়ে নিলে... তার মধ্যে সুব্রত গাঙ্গুলির বাঙালিয়ানা মোটেই সইছিল না।
সেন কফি খেতে খেতে অন্যমনস্কভাবে মোবাইল নাড়াচাড়া করছিলেন। এমন সময় ফোনটা বাজল। সেন কথা বলে, “থ্যাংক ইউ,” বলে লাইন কেটে বললেন, “এয়ারপোর্ট কন্ট্রোল রুমের ও.সি। পুলস্ত্য বম্বে পৌঁছেছে সবে। এখন টার্মিনাল বদল করতে হবে। এখানে তিনটে পঁচিশে ল্যান্ড করবে। আমরা খানিকটা সময় পেলাম। একটু রেস্ট নিতে পারব।”
“বাবা! বাঁচা গেল,” বলে যে তৎপরতায় গাঙ্গুলি চেয়ার ছেড়ে উঠলেন, তাতে মনে হলো না যে উনি প্রায় সারা রাতই চেন্নাই এয়ারপোর্টে আরাম কেদারায় গা এলিয়ে নাক ডাকিয়ে ঘুমিয়েছেন।
ব্যারাকের একটা অপেক্ষাকৃত খালি ডরমিটরিতে তিনজনের থাকার ব্যবস্থা হয়েছে। প্রসূন স্যুটকেস খুলে ইউনিফর্মটা বের করে খাটের ওপর বালিশের পাশে রাখল। যত বেশিক্ষণ বাক্সে থাকবে, ততই আরও কুঁচকে যাবে। গাঙ্গুলি ততক্ষণে নিজের বাক্স থেকে পাজামা বের করে কোমরে তোয়ালে জড়িয়ে প্যান্ট খুলতে ব্যস্ত, আর ইনসপেক্টর সেন জিজ্ঞেস করেছেন, “এখানে সিগারেট খাওয়া যাবে? কাল দুপুর থেকে তো সারাক্ষণ নো-স্মোকিং জোন-এর মধ্যেই রয়েছি।” এমন সময় দরজায় এসে একজন আর্দালি ভীষণ ভারি ইংরেজিতে জানাল যে ডি.এস.পি ক্রাইম ডিটারেন্ট মিঃ ম্যাথিউ ডেকে পাঠিয়েছেন।
“লে হালুয়া,” বললেন সাব ইনসপেক্টর গাঙ্গুলি।
আবার জামা জুতো পরে চললেন তিনজনে। এর মধ্যে আর্দালি দূতকে ‘স্মোকিং ওকে?’ জিজ্ঞেস করে ‘নো, নো’ জেনে নকুল সেন বিমর্ষ হয়ে পড়েছেন। গাঙ্গুলি খুবই বিরক্ত। গজগজ করতে করতে যাচ্ছেন, “এই সব বড়ো সাহেবদের নিয়ে যত ঝামেলা। কেন রে বাবা, এই মোবাইলের যুগে ডেকে পাঠাস কেন? ফোন করতে তোর কী হয়েছে?” প্রসূনেরও ক্লান্তি লাগছিল। তিনজনের মধ্যে সবচেয়ে কম-বয়সী, এবং পোস্টেও সর্বকনিষ্ঠ বলে ওকেই সবচেয়ে বেশি ছোটাছুটি করতে হয়েছে সারা রাত। তার ওপর বিছানাটা দেখে লোভও হয়েছিল। এখন ক্লান্তি পেয়ে বসেছে।
ডি.এস.পি ওদের বসতে বলে বললেন, “সি.বি.আই হ্যাজ টেকন ওভার ইওর কেস।” আরও বললেন, এ.সি.বি (তিরুঅনন্তপুরম) আলাপ্পুজার দিকে রওয়ানা হয়ে পড়েছেন। এলেন বলে, সুতরাং প্রসূনরা যেন এখানেই অপেক্ষা করে।
বাইরের ওয়েটিং রুমে বসে গাঙ্গুলি ফেটে পড়লেন। “এটা কী ধরণের ইয়ার্কি? সি.বি.আই হলেই মাথা কিনে নেয়। কী হত আমারা যদি একটু রেস্ট নিতাম?”
প্রসূন আস্তে আস্তে নকুল সেনকে বলল, “স্যার, আমাদের কি প্লেন ড্রেসে এ.সি.বি-র সঙ্গে দেখা করা উচিত হবে?”
সেন বললেন, “কতক্ষণ লাগবে পৌঁছতে? যদি এসে পড়েন?
প্রসূন বলল, “না স্যার। দেড়শো কিলোমিটার পথ। আড়াই ঘণ্টা তো লাগবেই। সকাল ছটায়ই কি আর রওয়ানা দিয়েছেন? এখনও সাড়ে আটটা হয়নি। আপনি চট করে যান, ইউনিফর্ম পরে আসুন। তারপরে সুব্রত স্যার আর আমি যাব।”
“ভালো বলেছ,” বলে সেন বেরিয়ে গেলেন।
গাঙ্গুলি বললেন, “পাঠিয়ে তো দিলে। আর এখনই যদি এসে পড়েন?”
প্রসূন কী বলবে বুঝল না। একটু হাসল কেবল। পেটের মধ্যে ধড়ফড় করছে টেনশনে আর উত্তেজনায়। এ.সি.বি নিজে আসছেন? তার মানে পরিস্থিতি খুব জটিল?
সেন কেন, সুব্রত গাঙ্গুলি আর প্রসূনও ইউনিফর্ম পরে ফিরে আসার পরেও কেউ ডাকতে এল না ওদের। সাড়ে নটা নাগাদ তিন কাপ কফি নিয়ে যে এল সে কিছুই জানে না। গাঙ্গুলি আবার মাথা এলিয়ে ঘুমোচ্ছেন, সেন সেদিনের হিন্দু-টা প্রায় শেষ করে ফেলেছেন, এমন সময় ডাক এল।
এ.সি.বি বলবিন্দর সিং।
“হুইচ ওয়ান অফ ইউ ইজ প্রাসূন মাজুমদার?”
বুকটা ধক্ করে উঠল প্রসূনের। কী হবে?
“আই অ্যাম, স্যার,” প্রথমবার শুকনো গলায় ফ্যাসফ্যাসে কণ্ঠস্বর বেরোল বলে প্রসূনকে আবার বলতে হলো কথাগুলো।
ভদ্রলোক উঠে দাঁড়িয়ে ডান হাত বাড়িয়ে দিলেন। “ইউ হ্যাভ ডান আ গ্রেট জব, ম্যান। তোমার মতো আরও ইয়ংস্টার চাই। আরও সাকসেসফুল হও কামনা করি।”
প্রসূন চট করে হাতের তেলোটা প্যান্টে মুছে নিয়ে করমর্দন করল সিং-এর সঙ্গে।
“ইনসপেক্টর সিং?” এবার জানতে চাইলেন বলবিন্দর সিং।
“নট সিং, স্যার,” বললেন নকুল সেন। “সেন। নকুল সেন।”
“আই সি,” সামনের কাগজে কী একটা কেটে আবার লিখলেন কিছু। ইংরেজিতে বললেন, “সিচুয়েশনটা এ রকম – সি.বি.আই কেস টেক-ওভার করেছে, কিন্তু এখনই ওয়ারেন্ট নেই। আবার ফসকে যায় যেটাও চাই না। লোকটা কখন কোন দেশে থাকে সেটা ট্র্যাক করতে করতেই আমরা গলদ্ঘর্ম হয়ে যাব। আমরা ইন্টারপোলকে কন্ট্যাক্ট করেছি। ওরা লোক্যাল পুলিশকে যোগাযোগ করেছে। ওই সরখেল লোকটাকে যদি পাওয়া যায়, তাহলে অনেকটাই সুবিধা হবে। সরখেল যেদিন ফেরারি হয়, তার তিন দিন পরে দিল্লি থেকে ফ্লাই করে ব্যাংকক। ওর পাসপোর্টের নাম হলো সুমিত সিনহা রয়। তাই আপনারা হদিশ পাননি। ওটা ওর অফিশিয়াল নেম। এফিডেভিট করে বদলানো। তার পরে অবশ্য সনত সরখেল নাম ইউজ করা বে-আইনি... তবে থাক সে কথা। ব্যাংকক থেকে হি রিচড্ মালডিভ্স্ আরও চার দিন পরে। যাই হোক, আপাতত একটাই ইশ্যু – এই বাবলু লোকটার অ্যারেস্ট। সেটা করার অবস্থায় একমাত্র আপনারাই আছেন। কারণ আমাদের ওয়ারেন্ট পাবার মতো এভিডেনস জোগাড় করতে হবে। লোক্যাল ফোর্স আপনাদের হেল্প করবে। আমরা প্ল্যান করছি রিসর্টে ঢোকার মিনিট পনেরো পরে ওকে ধরব। রিসর্ট এখন বন্ধ – সুতরাং রিসর্টে যত লোক আছে, সবাইকে তুলে নিয়ে পরে হিসেব করলেও চলবে কে ইনভলভড, আর কে নয়। গেস্ট হ্যারাস্ড্ হবার ভয় নেই। দ্য অপারেশন উইল বি লেড বাই ইউ, ইনসপেক্টর সেন। কারণ আপনারই সবচেয়ে বেশি অধিকার। এখানকার লোক্যাল ফোর্সের ইনসপেক্টর কে. ডি. সাজি আপনার সঙ্গে যাবেন – হি নোজ দ্য প্লেস ভেরি ওয়েল। একসময় ওখানে কাজও করেছেন নাকি। এনি কোশ্চেন?”
~চোদ্দো~
“ব্যাস?” হতাশ হয়ে তুলি কফির কাপ নামিয়ে রাখল। “তারপর?”
“তারপর আর কী?” প্রসূন কফিতে চুমুক দিল। “এখন ওর বিচার হবে। ওর এগেনস্টে যা এভিডেন্স্, তাতে ওর পালান’ মুশকিল হবে। তার ওপর বিভিন্ন দেশের পুলিশ অপেক্ষা করছে, ইন্টারপোল অপেক্ষা করছে – নেপাল, থাইল্যান্ড – সবাই মুখিয়ে রয়েছে। সবখানেই শ্রীঘর অপেক্ষমান।”
“ধ্যাৎ, আমি মোটেই তা বলিনি। অ্যারেস্টের গল্প বলুন। কী ভাবে গেলেন, কী করলেন? বাবলুদাকে কোথায় পেলেন?”
“ও,” প্রসূন কফি শেষ করে কাপ নামিয়ে রুদ্ধশ্বাস সাসপেনসভরা গলায় বলতে শুরু করল। “তখন রাত্রি ঠিক বারোটা উনিশ। বাইশ জন লোক্যাল পুলিশ পা টিপে টিপে বাইরের রাস্তা ধরে গিয়ে রিসর্টটা ঘিরে ফেলল। আরও আট জন সাঁতারু পুলিশ ব্যাকওয়াটার দিয়ে গিয়ে সাঁতার কেটে পিছন থেকে উঠল। তারপরে আমি তিরবেগে ছুটে গিয়ে সোজা বাবলুর শোবার ঘরে ঢুকলাম। বাবলু গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন! আমার দু-হাতে দুটো পিস্তল, এক হাতে টর্চ...”
ঘরসুদ্ধ লোক হেসে উঠল। তুলি লজ্জায় লাল হয়ে বলল, “আমি কি বাচ্চা, যে আমাকে রূপকথার গপ্পো শোনাচ্ছেন? অ্যারেস্টটা কী ভাবে হলো জিজ্ঞেস করা কি খুব ভুল হলো?”
অতনুর বাড়িতে ডিনার। তুলি, তার বাবা-মা, অতনু, বনি, প্রদীপ আর প্রসূন উপস্থিত। প্রধানত তুলির বাবার অনুরোধেই এই সমাগম।
প্রসূন বলল, “আসলে সেটা সেরকম বলার মতো কিছু হয়নি। বাবলুর প্লেন কোচিতে ল্যান্ড করল চারটে দশে। ও এসে পৌঁছল সাড়ে পাঁচটা নাগাদ। ফলে আমরা প্ল্যান-মাফিক ঢুকলাম পাঁচটা চল্লিশ থেকে পঁয়তাল্লিশের মধ্যে। ওখানকার পুলিশের সময়জ্ঞান সাংঘাতিক। তার ওপর বলবিন্দর সিং ওভার-সী করছেন। ওই যেমন বললাম, আমরা সবসুদ্ধ বাইশজন গাড়ি নিয়ে সামনের গেট ব্লক করলাম। উঁচু পাঁচিল এবং পেছনের দিক ছাড়া বেরোন’র রাস্তা নেই বলে ব্যাকওয়াটারে পুলিশের একটা লঞ্চ ছিল – সাঁতারু পুলিশ ছিল তাতে, তবে তাদের জলে নামতে হয়নি। আমরা সদলবলে গেট খুলিয়ে রিসর্টের দারোয়ানকে – ওই, আপনার বিজয়নের কাকা – ধরে নিয়ে গেলাম অফিসে। সেখানে নতুন কেনা রিসর্টের অফিসারদের নিয়ে বাবলু মিটিং করছিল। আমরা ঢুকলাম, মিঃ সেন বললেন, “ইউ আর আন্ডার অ্যারেস্ট, ইত্যাদি,” বাবলু বোকার মতো তাকিয়ে রইল, আমরা সবকজনকে ধরলাম, দু’ঘণ্টার মধ্যে হেডকোয়ার্টারে। ততক্ষণে মিঃ সিং খবর পেয়েছেন যে মালডিভ্সে ইন্টারপোল সনত সরখেলকেও অ্যারেস্ট করেছে। সি.বি.আই-এর কেস তৈরি হয়ে গেল আমাদের ইনিশিয়াল জিজ্ঞাসাবাদ শেষ হতে না হতেই। তারপরেই সি.বি.আই হ্যান্ড-ওভার নিয়ে নিল। অ্যালেপ্পির রিসর্টে যারা আগে থেকে ছিল, তারাও অ্যারেস্টেড – হয়ত তাদের কোনও ইনভলভমেন্ট-ই নেই, কিন্তু সে তো প্রমাণসাপেক্ষ... আমরা গিয়ে সব কাজটা করা সত্ত্বেও খালি হাতেই ফিরে এলাম। ব্যাস, এই হলো গল্প।”
তুলির বাবা একটু অসহিষ্ণুভাবে বললেন, “তা তো বুঝলাম। মৌলি বাবলুর ছবি তুলল গুণ্ডাদের সঙ্গে, বাবলু মৌলিকে খুন করল – মানে লিটন আর পুঁটেকে দিয়ে করালো, সেই খুনের দায় প্রদীপের ওপরে চাপান’র চেষ্টা করল, না পেরে লিটন আর পুঁটেকে খুন করালো সনত সরখেলকে দিয়ে। এ সব আপনারা বুঝতে পেরে ওকে অ্যারেস্ট করলেন। কিন্তু বাবলু হঠাৎ মৌলিকে খুন করতে গেল কেন? কী ছিল ওই ছবিতে?”
প্রসূন আশা করছিল এই কথাগুলো ওকে বলতে হবে না। আস্তে আস্তে বলল, “বাবলুর একটা অনেকদিনের কারবার ছিল – সম্ভবত ও যখন কলেজ ছেড়ে প্রথম সৌদি আরবে চাকরি শুরু করে, তখন থেকেই। ক্রমে হি বিকেম আ বিগ প্লেয়ার। ওর মালডিভ্স্ আর ওয়েস্ট ইন্ডিজের হোটেল ব্যবসা ওর গোটা ব্যবসার মাত্র দশ, বা বারো পার্সেন্ট। শুধু লোক দেখান’। এর পরের ইনফরমেশন কিন্তু পুরোটা নেই। খানিকটা জানা গেছে সনত সরখেলের কাছ থেকে, বাকিটা কনজেকচার।”
প্রসূন একটু জল খেল। সবাই উদগ্রীব হয়ে তাকিয়ে। প্রসূন বলে চলল, “বাবলু আমাদের কোনও কাজের কথা বলেননি। বলতে চেয়েছেন লিটন, পুঁটে, সনত সরখেল - এদের কাউকে উনি চেনেন না। আমরা ওঁকে সবে বলতে গিয়েছিলাম, যে ছবিগুলো আমাদের কাছে আছে, কিন্তু তার আগেই সি.বি.আই হ্যান্ড-ওভার নিয়ে নিল। তারপরেও বাবলু মুখ খোলেননি বলেই জানি। মৌলি বাবলুর ব্যাপারে আগে কিছু জানতেন কি না তা-ও জানা যায়নি। কিন্তু মালডিভ্সে হানিমুনের সময়ে মৌলি একদিন সকালে একটা রেস্টুরেন্টে বাবলু, সনত সরখেল, লিটন আর পুঁটেকে দেখতে পান। ছবি তোলেন। এর পরে ভাই-বোনে কোনও কথা হয়েছিল কি না তা-ও বলতে পারব না। সম্ভবত না। আমার ধারণা মোলি ছবিগুলো তুলেছিলেন, কিন্তু তার সিগ্নিফিক্যান্স্ বুঝতে পারেননি। ওগুলো নিয়ে কিছু করেননি।”
“আমারও তাই মত,” হঠাৎ বলল তুলি।
“ইয়ে,” সবাই ওর দিকে তাকান’র ফলে তুলি থতমত খেল। “না, মানে হানিমুন থেকে ফিরে এসে মৌলিদি আমাকে কিচ্ছু বলেনি। ওর সেরকম কিছু মনে হলে আমাকে অন্তত বলত।”
“এক্স্যাক্টলি,” বলল প্রসূন। “তা ছাড়া আপনি বলেছিলেন যে মালডিভ্স্ থেকে ফিরে এসে শি ওয়াজ ভেরি হ্যাপি। কোনও রকম দুশ্চিন্তার ছায়া ছিল না।”
তুলি বলল, “হ্যাঁ। তাহলে কী করে...”
“আমাদের ধারণা বাবলু দেখতে পেয়েছিল যে মৌলি ওদের ছবি তুলছেন। কয়েকটা ছবিতে সেরকম দেখাও যাচ্ছে – বাবলু যেন সোজা ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে। মৌলি নিজে হয়ত ছবিগুলো দেখে সেরকম ইমপর্ট্যান্ট কিছু মনে করেননি।”
“একেবারে তা-ও নয়,” বললেন প্রদীপ। “আলাদা করে রেখেছিল, এবং সেই সময়ে আমার ঘরে ঢোকার যে রি-অ্যাকশন...”
প্রসূন বলল, “তা-ও ঠিক, কিন্তু এটাও ভেবে দেখুন... যেখানে পাওয়া গেল, অর্থাৎ স্যুটকেসের ফ্ল্যাপে – সেটা যত্ন করে রাখা বলে মনে হয় না। বরং অনেকটা রেখে দিয়ে ভুলে যাওয়ার মতো। আনফরচুনেটলি সেটা আর আমাদের জানার উপায় নেই, এক যদি না জানা যায় যে মৌলি বাবলুর সঙ্গে পরে কথা বলেছিলেন, স্কাইপ করে বা ফোনে। সেগুলোও বোঝার উপায় আছে, তবে সবই সময়সাপেক্ষ। যা-ই হোক, সনত সরখেল অনেক কথা বলছে। স্বীকার করেছে, যে এর পরে ওরই মাধ্যমে লিটন আর পুঁটেকে দায়িত্ব দেওয়া হয়, ‘যেন তেন প্রকারেণ’ ওই ছবি ফেরত চাই। এই প্রকারের মধ্যে খুন ইনক্লুডেড ছিল কি না জানা নেই – হয়ত ছিল না, হয়ত বাবলু ভেবেছিল ভয় পেয়ে মৌলি দিয়ে দেবে, হয়ত সত্যিই লিটন আর পুঁটে ব্যাপারটা ঘেঁটে যেতে ঘাবড়ে গিয়েই ছুরি চালিয়ে দিয়েছিল... কিন্তু রেজাল্ট কী তো আমরা জানিই। সনত সরখেলের বক্তব্য, যে এর পরের ষড়যন্ত্রও বাবলুর বুদ্ধিতেই করা। প্রদীপকে ফাঁসালে, বাড়ির চাবি ইত্যাদি তো মৌলির ফ্যামিলির হাতেই চলে যাবে – তখন পরে ধীরে-সুস্থে গিয়ে ছবি খোঁজা যাবে। কিন্তু সেটা যখন ফেল করল, তখন লিটন আর পুঁটে বিকেম আ ডেন্জার ফর হিম। তাই ওদেরও শেষ করে, কলকাতার পাট চুকিয়ে সনত সরখেল পালাল মালডিভ্স্ – বউ মেয়েকে আগেই রেখে এসেছিল ফরিদাবাদে এক আত্মীয়ের বাড়ি – প্ল্যান নাকি ছিল পরে ওদেরও নিয়ে যাবে, কিন্তু তার আগেই ইন্টারপোল ওকে ধরল এসে।”
অতনু বললেন, “এর পরে আপনার সি.বি.আই-তে যাওয়া আর কেউ আটকাতে পারবে না।”
মাথা নাড়ল প্রসূন। “আমি সি.বি.আই যাব না। আমি আর পুলিশের চাকরিই করব না। রেজিগনেশন দিয়ে দিয়েছি। সেই সঙ্গে চেষ্টা করছি ইংল্যান্ডে ইতিহাসে এম.এ করতে। অক্সফোর্ডে যদি পাই...”
আবার বাধা দিলেন তুলির বাবা। “বাবলুর ব্যবসাটা কী? ড্রাগ?”
প্রসূন ভীষণ অস্বস্তিতে একবার প্রদীপ, আর একবার অতনুর দিকে তাকাল। প্রদীপ মোবাইল ফোনে কী দেখতে ব্যস্ত। অতনু বললেন, “না। ড্রাগ নয়। বাবলুর ব্যবসা, আমার মতে, তার চেয়ে হাজার গুণ বেশি খারাপ। বাবলু মেয়ে চালান করত।”
স্তম্ভিত তুলি, আর তার বাবা-মার দিকে তাকিয়ে অতনু বলল, “এইজন্যই প্রসূন আপনাদের বলতে চাইছিল না। বাবলু ওয়াজ আ উম্যান ট্র্যাফিকার। উত্তর পূর্ব ভারত, নেপাল, অন্ধ্রপ্রদেশ, তামিলনাডু, পশ্চিমবঙ্গ, সিকিম – এই সব জায়গা থেকে মেয়ে নিয়ে যেত ব্যাংকক, দক্ষিণ অ্যাফ্রিকা, মিড্ল্ ইস্ট... যেহেতু ওর মালডিভ্স্ আর ওয়েস্ট ইন্ডিজে ব্যবসা, আর ও পারতে কোনও দিন নিজে এসব জায়গায় যায়নি, প্রথম দিকে সন্দেহ করার কারণই ছিল না। কিন্তু বেশ কিছুদিন হলো, ইন্টারপোল গন্ধ পায়, নজর রাখতে শুরু করে। এর ফলে সি.বি.আই-এর তরফ থেকে ইন্টারপোলকে যোগাযোগ করার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ওরা অ্যাকশন নেয়... এই হলো কাহিনি।”
হঠাৎ তুলির মা তুলির বাবাকে বললেন, “তোমার কি শরীর খারাপ করছে?”
সবাই চমকে তুলির বাবার দিকে তাকাল। উনি চোখ মুছে বললেন, “না। আমি দাদা-বৌদির কথা ভাবছিলাম। এই বয়সে একসঙ্গে ছেলে-মেয়ে দু’জনের শোক পাওয়া... তার ওপর গত কয়েক মাস তো আমাদের কারও সঙ্গে ভালো করে কথাই বলেনি। আর মৌলির মৃত্যুর জন্য যে বাবলু দায়ী, সেটা জেনে থেকে তো কেমন যেন উদভ্রান্তের মতো দেখায় সারাক্ষণ।”
সবাই কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল।
প্রদীপ বললেন, “সত্যিই, ওনারা তো কোনও দোষ করেননি। আচ্ছা, আমরা যদি চেষ্টা করি? উনি আমাদের দূরে সরিয়ে দিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু আমরাও তো একই কাজ করেছি।”
এমন সময় কাজের লোক রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এসে বনিকে বলল, “বৌদি?”
বনি উঠে ভিতরে গেলেন। একটু পরে ফিরে এসে বললেন, “ডিনার তৈরি। চলুন, খেতে খেতে কথা বলা যাবে।”
খেতে বসে তুলির বাবা প্রসূনকে জিজ্ঞেস করলেন, “ইতিহাসে এম.এ করে তারপরে কী করবে? পুলিশের চাকরি তো ভালো চাকরি। এক কথায় ছেড়ে দিলে?”
প্রসূন বলল, “ভালো চাকরি না, মেসোমশাই। বড়ো দুঃখের কাজ। বিশেষ করে এই মার্ডারগুলো – চোখের সামনে দেখি, কী করে এক একটা গোটা ফ্যামিলি নষ্ট হয়ে যায়। খুনিকে ফ্যামিলির লোক, বা পরিচিত লোকও হতে হবে না। ইনভেরিয়েব্লি, একটা খুন হলে তার পরের ঘটনাগুলো মানুষকে বদলে দেয়। আরও তিরিশ বছর এই করলে আমি আর আমি থাকব না।”
অতনু বললেন, “ঠিক বলেছেন। আমিও এইরকম সব কারণেই ক্রিমিনাল ল’ ছেড়েছি।”
বেরোবার সময় তুলির মা প্রদীপকে জিজ্ঞেস করলেন, “এখন তো তোমার আর কলকাতায় থাকার কোনও বাধা নেই? তুমি কী করবে?”
প্রদীপ একটু চুপ করে থেকে বললেন, “আমার তো কলকাতায় থাকার দুটো মাত্র কারণ ছিল – একটা মৌলি, আর একটা চাকরি। শহরটার প্রতি আমার বিশেষ ভালোবাসা তৈরি হয়নি কোনও দিনই। এখানে থাকব না। দেখি, কোথায় যাই। আলাপ্পুজা ফিরতেই পারি – ওখানে যদি...”
প্রদীপের কথা কেটে অতনু বললেন, “ওখানে তোকে ফিরিয়ে নিয়ে যাবার রিস্ক আমি আর নেব না। এটা তোকে আমি আগামীকাল বলতাম, কিন্তু কথাটা এখন উঠল, তাই এখনই বলি। টমাসের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে, টমাসও একমত। ওখানে না। টমাস দেখছে। ওর তো বিশাল অর্গানাইজেশন – সাত-আটটা সেন্টারে কাজ চলছে। গোয়া থেকে কাশ্মীর যে কোনও জায়গায় ওর প্রেজেনস রয়েছে।”
প্রদীপ বলল, “আই ডোন্ট মাইন্ড। তুই ব্যবস্থা কর।”
উপসংহার
তিন সপ্তাহ পরে, কলকাতা এয়ারপোর্টে এয়ার ইন্ডিয়ার আইজলগামী ফ্লাইটের সিকিউরিটি চেক ঘোষণা হবার পরে কাঁধে ল্যাপটপ ব্যাগটা তুলে প্রদীপ সেনগুপ্ত বললেন, “চলি রে। ভালো থাকিস।”
তুলি বলল, “তুমিও ভালো থেকো প্রদীপদা। চিঠি দিও। ই-মেইল লিখো।”
প্রদীপ বললেন, “হ্যাঁ। যদি ওদিকে ছুটিতে আসিস, আইজল ঘুরে যেতে ভুলিস না।”
তুলি বলল, “তার আগে তুমি আসবে না? কালই জ্যেঠুকে বলেছ কিন্তু যে তুমিই এখন ওদের ছেলে।”
হাসলেন প্রদীপ। বললেন, “আসব। কিন্তু কবে আসব কি এখনই বলতে পারব? ছুটি নিয়ে নর্থ ইস্ট-টা ঘুরব না?”
তুলি বলল, “তাহলে তোমার সঙ্গে ইংল্যান্ডেই দেখা হবে। আসবে কিন্তু – আমি নেক্সট ইয়ারই যাচ্ছি। অ্যাপ্লিকেশন শুরু করে দিয়েছি।”
প্রদীপ হেসে প্রসূনের দিকে ঘুরলেন। হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, “থ্যাংক ইউ ফর এভরিথিং। শিগগির দেখা হবে আশা করি।”
প্রসূন হাত মিলিয়ে বলল, “নিশ্চয়ই হবে। ভালো থাকবেন।”
সিকিউরিটিতে ঢোকার আগে প্রদীপ ঘুরে তাকালেন। দু’জনকে আর দেখতে পেলেন না।
শেষ