Saturday, February 29, 2020

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়



বাবা মা সাধ করে নাম রেখেছিলেন নবারুণ আর নবার্ক। এদের সঙ্গে আমার পরিচয় অনেক দিনের, বাবা-মা-কেও চিনতাম কিন্তু যখন সে দিন ওদের বাবা ফোন করে বললেন, দু-জনকে আমার চেম্বারে পাঠাতে চান, একটু অবাক হলাম। দু’ভাই এক সঙ্গে...? জানতে চাওয়ায় বাবা হেসে বললেন, “আপনার প্রফেশনাল হেল্প লাগবে।”
কথা না বাড়িয়ে দিনক্ষণ ঠিক করে নিলাম। যথাসময়ে হাজির হল ভাইয়েরা বললাম, “প্রতিবারের মতো বলো দেখি, কে অরুণ আর কে অর্ক?” হাসল, বলল, বসল, তার পরে জানা গেল আগমনের কারণ।
দু’ভাইকে সার্টিফিকেট দিতে হবে যে আমি ওদের চিনি এবং ওরা নাকি অব্‌ সাউন্ড মাইন্ড! বেশ কথা, কলম বাগিয়ে লিখতে বসলাম ‘এতদ্বারা নোটিফিকেশান... আমি শ্রীমান নবারুণ... শ্রীমান নবার্ককে... ছোটবেলা থেকে চিনি...’
লিখতে গিয়ে খেয়াল হল, বললাম, “নবারুণের নামের বানান ‘এ’ দিয়ে, কিন্তু নবার্কর নাম কেন ‘ও’ দিয়ে?”
নবারুণ হেসে বলল, “আর বোলো না কাকু! ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটি আমার নামের বানান ‘এ’ দিয়ে করে দিয়েছে। কী ঝামেলা সে কী বলব, আই.সি.এস.ই, আই.এস.সি.-তে ‘ও’ দিয়ে, আর তার পর থেকে সব ‘এ’! শেষে এফিডেভিট করে রাখতে হয়েছে, যে ‘এন-ও’ নবারুণ আর ‘এন-এ’ নবারুণ ইজ ওয়ান অ্যান্ড দ্য সেম। নবার্কর নামটা কেন জানি ছেড়ে দিয়েছে, ও ‘এন-ও’ দিয়েই নবার্ক লেখে
এক ধাক্কায় ফিরে গেলাম প্রায় ৩৫ বছর। গ্র্যাজুয়েশন পড়তে দেবদত্ত ঢুকেছিল দূর উত্তর কলকাতার কোনও এক কলেজে। সাদার্ন অ্যাভেন্যু থেকে দু’দিন যাতায়াত করতে না করতেই বুঝল তখনকার কলকাতার বাস ট্রামের ভিড় ঠেলে অতদূর গিয়ে পড়াশোনা পোষাবে না। খোঁজ করে দেখা গেল যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে কিছু সিট খালি আছে। যাদবপুর জানাল, ‘ঠিক হ্যায়, আ যাও, কিন্তু তাড়াতাড়ি করবে। কারণ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে যদি রেজিস্ট্রেশন হয়ে গিয়ে থাকে, তাহলে আবার ইন্টার-ইউনিভারসিটি ট্রান্সফার করতে হবে। কলকাতা ইউনিভার্সিটি থেকে মাইগ্রেশন বের করা আর এক ঝামেলা।’
দেবদত্ত পর দিন সকালে কলেজ পৌঁছেই রেজিস্ট্রেশন রদ করার উদ্দেশ্যে দৌড়ল কলেজ অফিস। ঢোকা মাত্র ক্লার্ক এক গাল হেসে ফাইল থেকে রেজিস্ট্রেশন সারটিফিকেটটা বের করে দিয়ে বললেন, “আমি নিজে দাঁড়িয়ে থেকে কাল করিয়ে এনেছি।”
শুরু হল ট্রান্সফার-প্রক্রিয়া। সপ্তাহে তিন দিন দেবদত্ত যাদবপুর থেকে উত্তর কলকাতার কলেজে ছুটোছুটি করে। রোজই শোনে এখনও আসেনি। শেষে এক দিন, যাদবপুর থেকে জানানো হল, আর বিলম্ব নয়। সামনে পরীক্ষা, এখনই চাই ইমিগ্রেশনের জন্য সারটিফিকেট। কলেজ থেকে বলে দেওয়া হল, এখানে ঘোরাঘুরি করে লাভ নেই। ইউনিভার্সিটি গিয়ে খোঁজ কর। মাইগ্রেশন ডিপার্টমেন্ট। দেবদত্ত আমাকে বলল, “যাবি আমার সঙ্গে?” আমার তখনও কলেজ শুরু হয়নি, অফুরন্ত সময়, চললাম আড্ডা দিতে দিতে।
খুঁজে খুঁজে ইমিগ্রেশন বিভাগ বের করা গেল। আমার বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে ঘোরার অভিজ্ঞতা কম, তাই জানি না এই কথাগুলো শুনে কেউ হাসবেন কি না, কিন্তু ঢোকার সময়ে মনে হচ্ছিল একটা চক দিয়ে দেওয়ালে চিহ্ন দিয়ে দিয়ে যাওয়া উচিত, নইলে হয়ত কোনও দিন আর বেরোতে পারব না!
সে যা হোক – এখানেও লোকে কাজ করে, রোজ আসে যায়, বেরোন’র রাস্তা নিশ্চয়ই খুঁজে পাব, সে ভরসায় বুক বেঁধে ঢুকে পড়লাম চক্রব্যূহের মধ্যে। এবং কী আশ্চর্য! নানা নির্দেশ অনুসরণ করে পেয়েও গেলাম ভারপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে। তিনি ডেস্কে বসে ‘দেশ’ পত্রিকা পড়ছিলেন – বললেন, “দেবদত্ত, দেবদত্ত... চৌধুরী?”
দেবদত্ত বলল, “হ্যাঁ, আমাকে যাদবপুর ইউনিভার্সিটি থেকে বলেছে আর দেরী না করে ইমিগ্রেশন জমা দিতে...”
মাছি মারার ভঙ্গীতে হাত নেড়ে ভদ্রলোক বললেন, “আরে ধুস্‌, যাদবপুর ওরকম বলেই থাকে। তবে চিন্তা নেই, এই তো, তোমার ফাইল আমার টেবিলেই রয়েছে...”
বরাভয় দিয়ে তিনি আবার মন দিলেন পত্রিকায়।
অনেক সাহসে বুক বেঁধে জিজ্ঞেস করলাম, “কবে আসব?”
ভুরু কপালের ওপরের অংশে তুলে বললেন, “পরশু এসো।”
পরশু? আজ তো শুক্রবার! মরা চোখে তাকিয়ে বললেন, “পরশু যখন বলছি, তার মানে শুধু ওয়র্কিং ডে গুনে
বলছি। পরশু মানে সোমবার।”
সরকারী অফিসের কর্মপদ্ধতি বা হিসেবের সঙ্গে তখনও আমরা ওয়াকিবহাল নই। সেটাই প্রথম পাঠ।
সোমবার আমাদের দেখে বললেন, “হয়নি।” এবার একটু রাগত স্বর মনে হল।
দেবদত্ত মিনমিন করে বলল, “হয়নি? কেন?”
বেশ গেস্টাপো স্টাইলে বললেন, “দেবদত্ত চৌধুরী নাম তোমার?”
দেবদত্ত বলল, “হ্যাঁ, ওই যে...”
“বাঙালি হিন্দু?”
“হ্যাঁ!” এবার দেবদত্ত অবাক!
“তাহলে নামের বানান কেন ‘ও’ দিয়ে শেষ?”
আমরা অবাক! দেবদত্ত বলল, “আমি তো ‘ও’ দিয়েই বানান লিখি – আমার মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক সব সারটিফিকেটেই...”
ভদ্রলোক থামিয়ে দিয়ে বললেন, “এখানে সে সব চলবে না।”
দেবদত্ত বলল, “এখানে মানে? এখানটা কোনখান?” বুঝতে পারছি এবার ও অধৈর্য হয়ে পড়ছে। তখন আজে বাজে প্রশ্ন করে।
ভদ্রলোকের গলায় এখন ইস্পাত। বললেন, “এখানে মানে ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটিতে। মনে রেখো, কোথায় দাঁড়িয়ে কথা বলছ। দিস ইজ দী ওলডেস্ট ইউনিভার্সিটি ইন ইন্ডিয়া।”
দেবদত্ত বলল, “সেই জন্য আপনি আমার নামের বানান কী হবে বলে দেবেন? আমার নামের বানান আমি আমার মতো করে লিখতে পারব না?”
খুব জোর দিয়ে ক্লার্ক ভদ্রলোক বললেন, “না, পারবে না। দেবদত্ত বানান ‘এ’ দিয়ে শেষ হবে, ‘ও’ দিয়ে নয়।”
আমি বললাম, “কার নামের বানান কী হবে সেটা কী করে স্থির করেন?”
এই বার ফেটে পড়লেন উনি। “আমার সঙ্গে ইয়ার্কি মারছ? জানো, এই জন্য গোটা একটা ডিপার্টমেন্ট আছে?”
আমার মুখের কাঁচুমাচু ভাব দেখে বুঝলেন ইয়ার্কি মারা আমার উদ্দেশ্য ছিল না। একটু সামলে নিয়ে বললেন, “এসো, এসো আমার সঙ্গে।”
নিয়ে গেলেন আরও ভেতরে। দুটো ঘর পেরিয়ে ‘রেজিস্ট্রেশন ডিপার্টমেন্ট’। তারও ভেতরে একটা ঘরে নিয়ে গেলেন। ইউনিভার্সিটির হিসেবে ছোট্ট ঘর। তিরিশ ফুট বাই তিরিশ ফুট মত, তাতে তিন চারটে টেবিল চেয়ার, প্রতি টেবিলে জনা দুয়েক বসে কাজ করে চলেছেন (মানে নবকল্লোল বা দেশ পড়ছেন আর কী) এই ঘরটার দ্রষ্টব্য হলো, এতে জানালা নেই। দুটো দরজা। আর এই দুটো দরজার ফোকর বাদ দিয়ে, চার দেওয়াল জুড়ে মাটি থেকে ওই সাহেবি আমলে তৈরি ঘরের আকাশছোঁয়া ছাদ অবধি সবটাই বইয়ের র‍্যাকে ভর্তি। আর র‍্যাকগুলো ভর্তি মোটা মোটা অভিধান-আকৃতির বইয়ে
গর্বে ফেটে পড়া স্বরে বললেন, “এগুলো দেখছ? এতে প্রত্যেক বাংলা নামের ইংরিজি বানান লেখা আছে। ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটিতে পড়লে এই বানানই হবে, অন্য কোনও বানান নয়, বুঝেছ? নিজের নামের বানান নিজের ইচ্ছে মতো যা খুশি লিখবে, সে চলবে না!”
ঘরভর্তি নামের অভিধান দেখে কেমন যেন দুর্বল লাগছিল। তাও সাহস করে বললাম, “এই বইগুলোতে যত বাংলা নাম আছে সব আছে? যদি এমন কোনও নাম কেউ দেয় যা এই বইয়ে নেই?”
গর্বের স্বরে ভদ্রলোক বললেন, “এই রকম পাঁচটা ঘর আছে, জানো? এমন কোনও বাংলা নাম নেই – থাকতে পারেই না – যার ইংরেজি বানান এই ডিপার্টমেন্টে নেই, বুঝলে? স্যর আশুতোষ নিজে দাঁড়িয়ে থেকে এই বানানের বই তৈরি করিয়েছিলেন।”
আগেকার দিনের লোকেদের হাতে অনেক সময় থাকত জানি। ইতিহাস বই পড়ে যখন শিখতাম ঘোড়া আর গোরুর গাড়ি করে লোকে পাটলিপুত্র থেকে তক্ষশীলা গিয়ে আবার ফিরে আসতেন, তখন বেশ অবাক লাগত। অতীশ দীপঙ্কর তো তিন বার পায়ে হেঁটেই তিব্বত গিয়েছিলেন, দু’বার ফিরেও এসেছিলেন! কিন্তু তা জানা সত্ত্বেও স্যর আশুতোষের ওপর নতুন করে আরও শ্রদ্ধা জন্মাল। এত সময় ছিল ভদ্রলোকের জীবনে!
সেই সঙ্গে মনে হলো, কতো লোকের উপকার করে গিয়েছেন! সরকারি পয়সায় একটা গোটা ডিপার্টমেন্ট না হলেও সেক্সন তো বসে কাগজ-ম্যাগাজিন পড়ছে – সেই বা কম কী?
দেবদত্ত বলল, “আর কারও নাম যদি দেবদত্তা হয়? তখন ইংরেজিতে কী লেখা হবে?”
উনি মুখ ভেঙিয়ে বললেন, “তোমার নাম তো দেবদত্তা নয়? হলে বানান বলে দিতাম, নিজের নাম নিয়ে ভাবো।”
দেবদত্ত বলল, “আপনি ‘এ’ দিয়েই ইমিগ্রেশন সারটিফিকেট দিন তাহলে।”
এই বার ভদ্রলোক একটু চুপসে গেলেন। বললেন, “কিন্তু তোমার রেজিস্ট্রেশনে তো ‘ও’ দিয়ে লেখা হয়ে গেছে। দুটোতে তো আলাদা হতে পারে না।”
লে হালুয়া। এত মোটা মোটা বানান অভিধান থাকতে ‘ও’ দিয়ে দেবদত্ত বানান হলোই বা কী করে?
“তোমার পদবী তো চৌধুরী, তাই বোঝা যায়নি। চৌধুরী তো অবাঙালিদেরও পদবী হয় – তাই না? এমনকি মুসলমানরাও চৌধুরী হতে পারে।”
“তার মানে এই নিয়ম শুধু হিন্দুদের জন্য?”
“শুধু বাঙালি হিন্দুদের জন্য। সেই জন্যই তো রেজিস্ট্রেশন হয়ে গিয়েছে। সেটা করার সময় তো যিনি করেছেন তিনি তোমার সঙ্গে কথা বলেননি। আমিও হয়ত ভুলটা করতাম, ভাগ্যিস তুমি এলে! এসে বাংলায় কথা বললে আমার সঙ্গে।”
ভাগ্যিস! হিন্দু বাঙালির সন্তান হবার সঙ্গে কত যে আপদ জড়িয়ে রেখেছেন সবজান্তা ব্রহ্মা, তা তো এ জগতে আসার আগে কেউ বলে দেয়নি!
শেষ অবধি ইমিগ্রেশন বেরিয়েছিল। ‘ও’ বানান লিখেই বেরিয়েছিল। সে অনেক গল্প। অনেক ঘোরাঘুরি, বহু দিন কলেজ স্কোয়্যারে পাইচারি করা, এক দিন সকালে কাজে আসার পথে ভারপ্রাপ্ত ক্লার্কের টিফিন হারিয়ে যাওয়া... দেবদত্তর ঘাড় ভেঙে সে টিফিনের বন্দোবস্ত... কত কী!
নবার্ক আর নবারুণকে সামনে বসিয়ে রেখেই খানিকক্ষণের জন্য হারিয়ে গিয়েছিলাম। সেই সঙ্গে ফিরে এসেছিল ৩৫ বছর আগের সেই অনুভুতিটা – পাঁচটা বিশাল ঘরে দেওয়াল জোড়া তাক ভরা হাজার হাজার বানান অভিধান নিয়ে বসে আছেন মাইনে করা কর্মচারী – তাদের একমাত্র কাজ হল কার নামের বানান কী হবে সেটা খুঁজে খুঁজে বের করা, আর তার পরে তাকে যাতে আদালতে গিয়ে অ্যাফিডেভিট করে ‘আমিই সেই লোক’ বলতে হয় তার ব্যবস্থা করা!
হঠাৎ মনে হল স্যার আশুতোষ হয়ত নবার্ক শব্দটা জানতেন না, তাই সেই বইয়ে ওই নামটা নেই। কেমন একটা আত্মতুষ্টি হল। সেটা ঠিক কী রকম তুষ্টি বলে বোঝান কঠিন।
ট্র্যাডিশন ভাল। ট্র্যাডিশনাল হওয়াও খারাপ নয় বলেই মনে করি। কিন্তু কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মানুষরা সেটাকে একটা অ্যাবসার্ড মাত্রায় নিয়ে যায় মাঝে মাঝে।
ঘটনাটা যিনি বলেছিলেন তিনি আজ আর নেই বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনও বিভাগের অধ্যাপক ছিলেন তিনি। এক দিন এক আড্ডায় বসে বলছিলেন এই গল্প। তাঁর কথাতেই বলি।
“বাবা-গো! আজকালকার বাবা-মায়েরা এত ন্যাকা, এত ন্যাকা হয়েছে যে কী বলব! আমার তো মনে পড়ে না আমার বাবা-মা কোনও দিন আমার স্কুলে পর্যন্ত গিয়েছে, আর কলেজ বা ইউনিভার্সিটি তো দূর অস্ত্‌! কিন্তু সে দিন আমাদের হেড অফ ডিপার্টমেন্ট-এর কাছে এসেছেন এক মেয়ের বাবা-মা। বক্তব্য এই, যে তাঁদের মেয়ে নাকি এম.. পার্ট ওয়ান পরীক্ষায় বসেছে ইউনিভার্সিটির হলে। সেই বেঞ্চি নাকি এতই নোংরা ছিল যে মেয়ের জামায় কালি লেগেছে, সে কালির দাগ নাকি কাপড় কেচেও ওঠেনি। ভাবতে পারো, কোনও ডিপার্টমেন্টের হেডের যেন আর কোন কাজ নেই।”
সবাই হাসল। মডার্ন বাবা-মায়েরা নিজেরাও কী রকম ন্যাকা এবং তাঁদের সন্তানদের কী রকম সমপরিমান ন্যাকা বানাচ্ছেন সে কথা ভেবে। আমার হাসি পাচ্ছিল না। এবং অধ্যাপক যখন একই গল্প দ্বিতীয় এবং তৃতীয়বার বলতে লাগলেন, মেয়ের জামার দাম কত এবং ওঁদের কত লোকসান হয়েছে সে হিসেব অবাঙালি বাবা টাকার অঙ্কে বলেছেন বলে, তখন রাগ হতে শুরু করল।
“ভাবো, মেয়েকে তিনি যে পোশাক পরিয়ে পরীক্ষা দিতে পাঠিয়েছেন তার দাম নাকি কয়েক হাজার টাকা! আমি তো বাপু ভাবতেই পারি না এত দাম দিয়ে কেনা জামা পরে কেন কেউ ইউনিভার্সিটি আসবে!”
“তা তোদের হেড কী বললেন?” জানতে চাইলেন শ্রোতাদের একজন।
বক্তা অধ্যাপক হেসে বললেন, “সেটাই তো বলছি। উত্তেজিত বাবা-মা বকেই চলেছে, বকেই চলেছে... শেষ পর্যন্ত আর থাকতে না পেরে হেড গম্ভীর হয়ে বললেন, ‘আপনি কী জানেন, যে ওই বেঞ্চিতে বসেই সি. ভি. রমন-ও পরীক্ষা দিয়েছিলেন?’”
সি. ভি. রমন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে কী পরীক্ষা দিয়েছিলেন সেটাই প্রশ্ন হতে পারত, কিন্তু ততক্ষণে সবাই হাসতে শুরু করেছে, আর আমার মাথা আরও গরম হতে লেগেছে, তাই জিজ্ঞেস করলাম, “সি. ভি. রমনের সময়ে যে নোংরা ওই বেঞ্চিতে লেগে ছিল, সে নোংরাই কি এখনও লেগে রয়েছে? আর সেই নোংরাই কি মেয়েটার গায়ে লেগেছে?”
সবাই থতমত। সেই সুযোগে বলে চললাম, “আমার সন্তান যেখানে বসে পরীক্ষা দিচ্ছে সে জায়গাটা পরিষ্কার থাকবে না থাকলে সেখান থেকে তার কোনও অসুখও হতে পারে... কোনও গার্জেনের এই উদ্বেগ শিক্ষকদের কাছে কেন এত অকিঞ্চিতকর? যে ঘরে বেঞ্চ এত নোংরা যে জামার দাগ কেচে তোলা যাচ্ছে না, সেই ঘরের অন্যান্য কোণায় কত দিনের সঞ্চিত ধুলো-বালি-ময়লা থাকতে পারে? সেটা থেকে যদি কোনও পরীক্ষার্থীর অ্যালার্জি হয়ে অ্যাজ্‌মা হয়? বা বেঞ্চের নোংরা থেকে অন্য কোন স্কিন ডিজিজ হয়, তার ফলে যদি তার পরীক্ষা খারাপ হয়, বা সে ফেল করে, তার দায়িত্ব কে নেবে?”
অধ্যাপক রেগে বললেন, “পরীক্ষার হল পরিষ্কার করার দায়িত্ব কী হেড-এর?”
আমি বললাম, “ঝাড়ু হাতে পরিষ্কার করার দায়িত্ব হয়ত হেড এর না। কিন্তু ডিপার্টমেন্ট-এর সমস্ত কাজ সুষ্ঠুভাবে চলছে কি না দেখাশোনার দায়িত্ব কি তাঁর নয়? তোরা তো শিক্ষক, দাবি করিস তোরা পিতা-বা-মাতা-সমান। তাহলে ছাত্ররা কি তোদের সন্তানসম নয়? সারাক্ষণ তো নালিশ করছিস যে স্টুডেন্টরা নাকি আর আগের মত রেসপেকটফুল আর ওবিডিয়েন্ট নেই। তা তোরা কি ছাত্রদের প্রতি আগের মত কেয়ারিং আর মাইন্ডফুল? যে সি. ভি. রমন-এর কথা বলে তোর হেড তাঁর দারুণ ইন্টেলেক্ট, প্রেজেন্স অব মাইন্ড, আর সেন্স অব হিউমর ডিস্‌প্লে করলেন, সেই সি. ভি. রমন কী তাঁর কোনও স্টুডেন্ট-এর জামা এমন নোংরা হলে এমন ক্যালাস্‌ মন্তব্য করে শ্লাঘা বোধ করতেন? স্যার আশুতোষ যদি জানতে পারতেন যে তাঁর প্রিয় ইউনিভার্সিটিতে পরীক্ষার হলে বেঞ্চে এত নোংরা যে জামা কেচেও পরিষ্কার হচ্ছে না, তিনি কি এই রকম একটা দায়সারা মন্তব্য করে দায়িত্ব এড়িয়ে যেতেন? তোর নিজের পোশাকে যদি এই নোংরাটা লাগত, তাহলে কি তুই নিজে এমন খুশি হয়ে হি-হি করে হাসতি? একবারও কি হিসেব করে দেখতি না কত টাকা লোকসান হয়েছে?”
মিনমিনে গলায় শুনলাম, “ক্লাস ফোর স্টাফেরা কাজ কেউ করে না, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই, তবে তাদের কাজ করান’র দায়িত্ব টিচারদের, তাও মনে করি না...”
বন্ধুদের আড্ডায় জোক বলতে গিয়ে কী বিপত্তি! আমি অবশ্য মনে করি সে বিপত্তি বাঙালির ওয়ার্ক কালচার আর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কল্যানেই, কিন্তু সে আর বললাম না!

Saturday, February 15, 2020

বোনামপল্লীর ছেলেটা

কলেজে পড়তে দেবাশিস পাখি দেখত জঙ্গলে জঙ্গলে ঘুরে। চাকরি পেয়ে সে সব মাথায় উঠেছিল, তবু ইচ্ছে ছিল ষোল আনা। তাই কুশল যখন ফোন করে বলল সামনের মাসে একটা সার্ভে শুরু হচ্ছে, এক বিরল প্রজাতির প্যাঁচার খোঁজে, তার খানিকটা দেশের বাইরে, এক কথায় রাজি হয়ে গেল। সে দেশে কাজ করেছে ও, ভাষাটা ভালোই বলতে পারে বলেই কুশল ওর কথা ভেবেছে।
দেবাশিস একলা। পিছুটান নেই। বেরোতে অসুবিধা নেই। কেবল বসকে একটা ধাতানি দিতে হয়েছিল — যে অফিস দু’সপ্তাহ আমাকে ছাড়া চলতে পারবে না, সেখানে কাজ করা উচিত কি না, ভাবতে হবে… এই রকম আর কি!
পাহাড়ী জঙ্গলে তাঁবু খাটিয়ে গ্রামে গ্রামে ঘুরে ঘুরে প্যাঁচা খোঁজে। পায় আর না। বয়স্ক লোকেরা ছবি দেখে, রেকর্ড করা ডাক শুনে বলে, এই বীভৎস ডাকে তারা ছোটোবেলায় ঘুম থেকে উঠে বসে কান্নাকাটি করত! ঠিক। জিম করবেট তো “মাই ইন্ডিয়া” বইতে লিখেছেন চুড়েল (পেত্নী)-এর চিৎকার।
একদিন কুশল বলল, “মনে হচ্ছে এ দিকে আর নেই। এক্সটিঙ্কট হয়ে গেছে। আরও ভেতরে যদি থাকে। ধর...” বলে ম্যাপ খুলে দেখাল, “এই হলো কণ্টাকাঁই। তার পরে পিকুলদাঁড়ি, আর তারও পরে দীঘলাগড়। পুরোটা ডেন্স ফরেস্ট। দিঘলাগড়েই আমাদের সার্ভে এরিয়া শেষ।”
“তাহলে চল, পা চালিয়ে আমরা তাড়াতাড়ি কণ্টাকাঁই যাই...”
কণ্টাকাঁইতে রেঞ্জ অফিসারকেই পাওয়া গেল। সবুজসুন্দর গাথানি। মজার মানুষ। হা-হা করে হাসেন, খুব আড্ডা দিতে পারেন। বললেন, “টেন্ট-ফেন্টের প্রশ্নই নেই। আপনারা আমার গেস্ট। সব ব্যবস্থা করে দেব। আরে আমি মশাই এখানকার খানদানি ফরেস্টার। আমার বাবাও এই জঙ্গলের রেঞ্জার ছিলেন। জঙ্গল ভালোবাসতেন বলে দাদু আমার নাম রেখেছেন সবুজসুন্দর। দাদু ফরেস্ট গার্ড ছিলেন।”
এক বেলার মধ্যে সবুজ-দা হয়ে গেলেন ভদ্রলোক।
কণ্টাকাঁইয়ের আশেপাশের জঙ্গলে কাঙ্খিত প্যাঁচার খোঁজ পাওয়া গেল না। দু-দিন কাটিয়ে ওদের যাবার কথা পিকুলদাঁড়ি। কুশলের মনে আশা — ওখানেই পাওয়া যাবে। পুরোনো বইপত্রে এ প্যাঁচার কথা রয়েছে।
সন্ধেবেলা জিনিসপত্র গোছাচ্ছে, সবুজদা এসে বললেন, “পিকুলদাঁড়ি গিয়ে কোনও লাভ নেই। বইয়ে যা লেখা আছে, তা পাবেন না। পঞ্চাশ-ষাট বছর আগে ছোটো শহর ছিল, বেড়ে বেড়ে বিশ্রী বিজনেস সেন্টার হয়ে গিয়েছিল। গত বছর দশেকে ওখানকার বিজনেস আবার বন্ধ — এখন তো পাহাড়ে গাছ কাটা বারণ। কেবল মাতাল আর গেঁজেলদের আড্ডা। সপ্তাহে এক-দুটো মার্ডার লেগেই আছে। অনেকে তো ছেড়ে চলেও গেছে।”
“কোথায় যাব তাহলে?” জানতে চাইল কুশল।
“বোনামপল্লী,” বললেন সবুজদা। “আমার এরিয়াতে ওখানেই মোস্ট ডেন্স ফরেস্ট। ওখানেই চান্স সবচেয়ে বেশি।”
ম্যাপে খুঁজতে খুঁজতে কুশল বলল, “কই, বোনামপল্লী বলে তো কোনও...”
আঙুল দিয়ে দেখিয়ে সবুজদা বললেন, “পিকুলদাঁড়ি যাবার পথে এইরকম কোথাও একটা রাস্তাটা সাউথে গেছে, সেই রাস্তা ধরে নামতে হবে। ম্যাপে নাম পাবেন না। অনেক বছর আগে ওখানে বোনামপল্লী ছিল। এখন কিছুই নেই।”
দেবাশিস জিজ্ঞেস করল, “কেন?”
হা হা করে হেসে সবুজদা বললেন, “কাল বলব, চলুন তো আগে।”
পিকুলদাঁড়ি গিয়েই বোঝা গেল কোনও কাজ হবে না। নোংরা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, মানুষজন সব কেমন যেন, সব মিলিয়ে পনেরো মিনিটেই হাঁপ ধরে গেল। সবুজদা রওয়ানা দিলেন বোনামপল্লীর দিকে।
পাহাড় বেয়ে কাঁচা রাস্তা নেমেছে কুটরি নদীতীর অবধি। সবুজদা বললেন, পাঁচ-সাড়ে পাঁচশো বছর আগে অবধি বোনামপল্লী ছিল এখানকার রাজধানীর পল্লী। রাজধানীর নাম ছিল কৃপাণগড়। পরে রাজা রাজধানী নিয়ে যান দিঘলাগড়ে। খালি কৃপাণগড় পড়ে থাকে পাহাড়ের মাথায়। বোনামপল্লীর মাহাত্ম্য কমে আসে।
নদীতীরের ওপারে থাকে থাকে পাহাড় উঠেছে — প্রথম সারির পাহাড় নিচু, তার পেছনে একটুউঁচু, তার পেছনে আরও, এমনি করে সবার পেছনে, আকাশের গায়ে আঁকা বরফে ঢাকা এক সারি পাহাড়। একেবারে নিচের পাহাড়ের চুড়োয় একটা ধ্বংসাবশেষ দেখিয়ে সবুজদা বললেন, “ওই দেখুন। কৃপাণগড় দুর্গ। এখন ওইটুকুই বাকি রয়েছে।”
কুশল বলল, “দুর্গ তো বিরাট হয়। আপনাদের দেশের দুর্গ আবার বেশ শক্ত পোক্ত। সবই যত্ন করে রাখা। এটার এরকম দুরবস্থা কেন?”
সবুজদা বললেন, “কৃপাণগড় অনেক আগেই নষ্ট হয়ে গেছে। দিঘলাগড়ের দুর্গই নয়-নয় করে প্রায় চার, সাড়ে চারশো বছরের পুরোনো। তখন থেকেই এখানে কেউ থাকে না। পড়ে আছে। প্রায় একশো বছর আগে কৃপাণগড়ে আগুন লাগে। সবটাই জ্বলে ছাই হয়ে ওইটুকুই আছে। তার পরেই বোনামপল্লীর লোকে ভয় পেয়ে এখান থেকে চলে গেছে। লোকাল লোকে মানে এই জায়গাটা খারাপ। তাই এখানে কেউ থাকে না। আশেপাশে কোনও ভিলেজ নেই, কোনও বসতি নেই।”
দেবাশিস হেসে বলল, “আচ্ছা লোক আপনি! এমন আনলাকি জায়গায় আমাদের থাকতে বলছেন?”
সবুজদা এত জোরে হাসলেন, যে গাছ থেকে একটা ঘুঘু উড়ে গেল ফটফটিয়ে। বললেন, “আপনারা এসব সুপার্স্টিশনে বিশ্বাস করেন না। নইলে আনতাম না। তবে আপনারা যে প্যাঁচার ডাকের রেকর্ডিং এনেছেন —তা আমি নিজের শুনেছি এই জঙ্গলে।মেন রোড দিয়ে যেতে যেতে, রাতের বেলা। যে দু’ দিন পিকুলদাঁড়িতে থাকবেন ভেবেছিলেন, এখানে থাকুন। ভালো লাগবে। ফুড নিয়ে ভাববেন না, আমি পাঠিয়ে দেব। দু’ দিন পরে আমার গাড়িতেই দিঘলাগড় যাবেন।”
টেন্ট খাটিয়ে, লোকজন দিয়ে শুকনো কাঠকুটো জোগাড় করে দিয়ে, ওদের সঙ্গে দ্বিপ্রাহরিক ভোজন সেরে সদলবলে চলে গেলেন সবুজদা। টিফিন-ক্যারিয়ার ভর্তি খাবার দিলেন রাতের জন্য।বললেন, “জঙ্গলে আগুন জ্বালবেন না, তবু ফায়ারউড থাক। কখন কী হয়। খাবারটাও থাক, প্যাক্‌ড্‌ ফুড খেয়ে খেয়ে চলে নাকি মশাই! সকালে আমার লোক আসবে ব্রেকফাস্ট নিয়ে। গুডলাক!”
সবুজদা চলে যাবার পরে জঙ্গলটা ঝিমিয়ে পড়ল। সূর্য আকাশের মাঝখানে। পাহাড়ে শীত শেষ হয়নি, রোদ্দুরেও জ্যাকেট পরতে হয়। বিকেলের আগেই সব সরঞ্জাম গুছিয়ে নিল ওরা। অন্ধকারে দেখার বাইনোকুলার, ক্যামেরা, স্ট্যান্ড — প্যাঁচার ডাক রেকর্ড করার জন্য সাউন্ড রেকর্ডিং-এর যন্ত্রপাতি, লম্বা মাইক্রোফোন সাজিয়ে নিল হাতের কাছে।
থমথমে জঙ্গলে দুজনে বসে। নদীর ওপারে পাহাড়ের মাথায় জঙ্গল থেকে মাথা উঁচিয়ে আছে দুর্গের ভাঙা মিনার। কুশল নদীর দিকে পেছন করে বসল।বলল, “অস্বস্তি হচ্ছে। একটা দুর্গ পুরোটা জ্বলে শেষ হয়ে গেল, ওইটুকু রয়ে গেল, তা হয় নাকি?”
নদীর দিকে পেছন করে বসলেও মজা কম। তাই দুজনেই নদীকে পাশে রেখে ফোল্ডিং চেয়ার ঘুরিয়ে মুখোমুখি বসল।
পাহাড়ে সন্ধে নামে হঠাৎ। এই ঝকঝক করছে সূর্য, এই সে পাহাড়ের ওপারে। নিচের উপত্যকায় ছায়া। ঘনিয়ে এল অন্ধকার। এই জঙ্গলে হিংস্র জন্তু নেই। একমাত্র শিকারী প্রাণী পাহাড়ি চিতাবাঘ অনেক ওপরে বরফের রাজ্যে থাকে। ক্রমে সূর্যের অভাব চোখে সয়ে গেল। আকাশ ছেয়ে গেছে তারায়। ফোল্ডিং চেয়ার আরও এলিয়ে দিয়ে দুজনে দৃষ্টি মেলে দিল আকাশের দিকে।
চারিদিক ঝিমঝিম করছে অন্ধকারে, রাতের জঙ্গল থেকে তারস্বরে চেঁচাচ্ছে ঝিঁঝিঁপোকা, দুই বন্ধু মৃদুস্বরে কথা বলছে, দূর থেকে কখনও ভেসে আসছে রাতচরা পাখির ডাক। কিন্তু সে কোথায়, যার সন্ধানে আসা?
প্যাঁচার খোঁজে আসা, তাই বেশি রাত অবধি অপেক্ষা করা উচিত। দুই বন্ধু জেগেই রইল। অন্ধকারে।
মাঝরাতের কাছাকাছি তীব্র কর্কশ ডাকে চমকে উঠল দুজনে।ছোঁ মেরে মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে তৈরি হল দেবাশিস। আরও তিন বার ডাক ভেসে এল, যন্ত্রবন্দী হয়ে গেল দুর্লভ প্যাঁচার কণ্ঠস্বর, রাত্তিরে যা শুনে ভীত গ্রামবাসীরা ভাবত পেত্নী।
ক্যামেরা হাতে এদিক ওদিক ঘুরে এল দুজনে। দেখা গেল না। উঁচু পাহাড়ের ওপরের আকাশটা উজ্জ্বল হয়ে উঠল। পুব আকাশে চাঁদ উঠেছে। পাহাড় পেরিয়ে মাঝ-আকাশে আসতে এখনও কিছু দেরি।
“আর অপেক্ষা করবি?” জিজ্ঞেস করল দেবাশিস। কুশল মাথা নেড়ে বলল, “নাঃ,।শুয়ে পড়ি। কাল সকালে একবার ওই দুর্গে যাব। কিছু একটা টানছে। মনে হচ্ছে ইন্টারেস্টিং কিছু পাব।”
দেবাশিস হেসে বলল, “গুপ্তধন?”
মাথা নেড়ে কুশল বলল, “না। চামচিকে বা বাদুড় জাতীয় কিছু ভাবছি।”
ব্যাটারি চালিত রিচার্জেব্ল লণ্ঠন বের করে দুজনে খেতে বসল। সামান্য আলোও জঙ্গলে অনেক, কিন্তু চারপাশের আলোর বৃত্তের বাইরেটা অদৃশ্য হয়ে গেল অন্ধকারে। নদীর কলকল শোনা গেলেও তার অস্পষ্ট সাদা ফেনাতোলা স্রোত আর দেখা যায় না, মাথার ওপরে ঝুঁকে পড়া গাছের পাতা কটার বাইরে আর সবই গাঢ় আঁধার।
দেবাশিস লক্ষ করল কুশল খানিক পরে পরে যেন অন্যমনস্ক হয়ে যাচ্ছে। বলল, “কী হয়েছে?”
কুশল বলল, “কিছু শুনতে পাচ্ছিস?”
শুনতে? কী শুনবে? রাতের জঙ্গলের আওয়াজ মানে তো ঝিঁঝিঁপোকা আর…
দেবাশিসের খেয়াল হলো, জঙ্গলটা একেবারে নিস্তব্ধ। কোনও শব্দ নেই। কান-ফাটানো ঝিঁঝিঁপোকার ডাক কখন থেমে গেছে।
জিজ্ঞেস করল, “রাত বাড়লে ঝিঁঝিঁপোকা চুপ করে যায়?”
কুশল মাথা নাড়ল। চাপা গলায় বলল, “আস্তে করে বাঁ হাতে তোর টর্চটা নে তো।”
দুজনেরই হাতের কাছে টর্চ আছে। আস্তে আস্তে টর্চটা তুলে নিয়ে দেবাশিস বলল, “কোনদিকে কী দেখব?”
কুশল তেমনই চাপা গলায় বলল, “আমার পেছন দিকে সরাসরি জ্বালা। মনে হচ্ছে কী যেন দাঁড়িয়ে আছে।”
অবাক হল দেবাশিস, কিন্তু কুশল চিরকালই ঠাণ্ডা মাথা ছেলে। চট করে কিছুতে ভয় পায় না। দ্বিরুক্তি না করে টর্চ জ্বালাল।
কিছু নেই।
কুশলও পেছনে ঘুরেছিল।বলল, “খালি মনে হচ্ছে পেছনে কি আছে।”
দুজনে আবার খাওয়ায় মন দিল। কিন্তু কুশলের অস্বস্তি কাটে না। খালি ঘুরে দেখে। একবার নিজের টর্চ জ্বালাল দেবাশিসের পেছনের জঙ্গলের দিকে। কিছুই নেই।
দেবাশিস খাওয়া শেষ করে থালা ধুয়ে নিল নদীর জলে। বলল, “চ’, শুয়ে পড়ি। রাত অনেক হয়েছে।”
কুশল মাথা নাড়ল। না। কিছু বলল না।
দেবাশিস বলল, “কুশল, একটা বেজে গেছে। এখন না ঘুমোলে সকালে উঠে দুর্গ দেখা যাবে না।”
কুশল বলল, “দুর্গ দেখতে হবে না। কাল এখান থেকে পালাব। অনেক হয়েছে।”
দেবাশিস অবাক, অনেক দিন কুশলের সঙ্গে জঙ্গলে ঘুরেছে। এই রূপ দেখেনি কখনও। বলল, “আচ্ছা বেশ, কিন্তু টেন্টে ঢুকে বস।ফোল্ডিং চেয়ারটা ঢুকিয়ে নে।” মনে মনে ভাবল, “আমি স্লিপিং ব্যাগে ঢুকলে আর বসে থাকতে ইচ্ছে করবে না।”
কুশল চেয়ারটা টেন্টের মধ্যে নিয়ে এল, কিন্তু দেবাশিসের ঘুম আসা অবধি চেয়ার ছেড়ে নড়ল না। অমনিই বসে রইল বাইরের দিকে চেয়ে।
রাত তখন কটা? কুশলের আলতো টোকায় ঘুম ভেঙে নিঃশব্দে উঠে বসল দেবাশিস।
বাইরে অস্পষ্ট... পায়ের শব্দ?
তাঁবুর ভেতরে অন্ধকার, কিন্তু বাইরে আলো বেড়েছে। আধখানা চাঁদ পুবের পাহাড় টপকে বেরিয়েছে নিশ্চয়ই। রাত প্রায় চারটে। ভোর হতে দেরি নেই। শীতও বেড়েছে। নদীর জল থেকে কুয়াশা উঠেছে।তাঁবুর ফ্ল্যাপ নামায়নি কুশল। বাইরেটা যতটুকু দেখা যাচ্ছে কেউ নেই।
নিঃশব্দে দেবাশিস সোয়েটার পরে নিল, মাথায় দিল উলের টুপি। পা টিপে টিপে দুজনে তাঁবুর দরজার কাছে গেল। বাইরে, ঝকঝকে চাঁদের আলোয়, ফায়ারউডের স্তুপের কাছে ঘুরছে একটা বাচ্চা ছেলে!
একসঙ্গে জ্বলে উঠল দুজনের টর্চ। ছেলেটা চমকাল না মোটেই। আস্তে আস্তে ঘুরে দাঁড়িয়ে একটু হাসল।
দেবাশিস বলল, “কে তুমি? এত রাতে এখানে কী করছ?”
ছেলেটা উত্তর দিল না। উলটে প্রশ্ন করল, “তোমরা কে? এখানে এসেছ কেন?”
কুশল ফিসফিস করে বলল, “সবুজদা বলল যে, এখানে কোনও গ্রাম নেই, তাহলে এই ছেলেটা এল কোত্থেকে?”
ওরা টর্চ নিভিয়ে দিয়েছিল। দেবাশিস এবার টর্চের আলো ছেলেটার পায়ের কাছে ফেলল যাতে চোখে আলো না পড়ে। দেখা গেল ছেলেটা বৌদ্ধ ভিক্ষু। দেবাশিসবলল, “তুমি ভিক্ষু? শ্রামনেরা? এখানে তোমার গুম্ফা কোথায়?”
ছেলেটাও দু’পা ওদের দিকে এগিয়ে এল। বলল, “গুম্ফা এখানে না।”
ছেলেটার পা খালি। পাহাড়ে ঠাণ্ডার জন্য গরিবরাও জুতো পরে। কুশল বলল, “তোমার জুতো কই?”
ছেলেটা বলল, “খুলে পড়ে গেছে। তোমরা এখানে কী করছ?”
দেবাশিস বলল, “আমরা পাখি খুঁজতে এসেছি। প্যাঁচা। এখানে কোনও ভয়ানক প্যাঁচার ডাক শুনেছ? শুনতে লাগে যেন পেত্নী চেঁচাচ্ছে? আমরা কাল সন্ধেবেলা শুনেছি। দেখিনি।”
কুশল দেবাশিসকে থামিয়ে দিয়ে আবার জিগেস করল, “তুমি কি এর আগেও এখানে এসেছিলে? আমরা যখন খাচ্ছিলাম?”
ছেলেটা কুশলের দিকে তাকিয়ে বলল, “আমি তো এখানেই থাকি — সবসময়।”
“এখানে? এই জঙ্গলে?”
নদীর ওপারের পাহাড়ের দিকে আঙুল তুলে বলল, “ওই ওখানে।”
দেবাশিস বলল, “ওই ধ্বংসস্তূপের মধ্যে? ওখানে কী করে থাক? তোমার সঙ্গে আর কে থাকে?”
মাথা নাড়ল ছেলেটা। “কেউ না। আমি একা।”
ইয়ার্কি মারছে। ওরা আবার তাকাল নদীর ওপারে। ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে পুবের আকাশে, কিন্তু নদীর গিরিখাত এখনও অন্ধকারে ঢাকা। কৃপাণগড়ের ধ্বংসাবশেষ প্রায় দেখাই যায় না।
দেবাশিস হঠাৎ বলল, “চলো, তোমার থাকার জায়গা দেখে আসি।”
কুশল আঁৎকে উঠল। একবার বলতে গেল, “না,” কিন্তু দেবাশিসের মাথায় কিছু ঢুকলে আর সেটা বেরোয় না। ছেলেটাকে বলল, “এক মিনিট। দাঁড়াও,” বলে তাঁবুতে ঢুকে গেল। বাধ্য হয়ে কুশলও গেল পিছু পিছু। বলল, “তুই এই অন্ধকারে ওই ছেলেটার পেছনে পেছনে কোথায় যাবি?”
“অন্ধকারে না,” বলল দেবাশিস। “তৈরি হয়ে বেরোতে বেরোতে আলো ফুটবে।”
“তাই বলে, কথা নেই, বার্তা নেই, একটা ছেলের সঙ্গে বেরিয়ে...”
এবার দেবাশিসের একটু রাগই দেখা গেল। “তোর ব্যাপারটা কী বলতো? কাল রাত থেকে কী হয়েছে তোর? এই একটা বাচ্চা ছেলে, তায় বৌদ্ধ ভিক্ষু — ট্রেইনি।নিপাট ভালোমানুষের দেশে নিপাট ভালোমানুষ ধর্মের শিক্ষানবিশী — তাকেও ভয় পাচ্ছিস?”
কথাটা ঠিক। দেশটাই ভালো। চুরি ডাকাতি ছিনতাই হয় না।তার ওপর…
কুশল বলল, “তবু... সবুজদা কিন্তু বলেছিল এখানে কোনও গ্রাম টাম নেই।”
“গ্রাম নেই, মনাস্ট্রি আছে নিশ্চয়ই কাছেপিঠে। আচ্ছা, ঠিক আছে। তোর যদি অস্বস্তি হয়, তাহলে তুই এখানে থাক। আমি ঘুরে আসি।”
এর পর আর থাকা যায় না। কুশলও তৈরি হয়ে নিল।ক্যামেরা, সাউন্ড রেকর্ডার, ইত্যাদি নিয়ে তৈরি হতে সময় লাগে, তার পরে টেন্টও গোছাতে হল। স্লিপিং ব্যাগ ফেলে রেখে বেরোনো ক্যাম্পিঙের নিয়মে বারণ। বাইরে বেরিয়ে দেবাশিস বলল, “কই গেল?”
বাইরে আলো বেড়েছে। ভোরও বলা যাবে না, ঊষা। ছেলেটার নামটাও জিজ্ঞেস করা হয়নি। দেবাশিস একটু গলা তুলে বলল, “এই ছেলে... লামা... আছো?”
নেই।
কুশল বলল, “ভেগেছে। চ’ আমরাই ঘুরে আসি। যাব তো ঠিকই করেছিস।”
কোথায় নদী পার হওয়া যায়? জল বেশি নেই, কিন্তু খরস্রোতা। নিচে পাথর। ঠিক মতো পা না পড়লে, বা পিছলে গেলে সমস্যা হতে পারে। জলের ওপরে শুকনো পাথরে পা রেখে রেখে পার হতে পারলে ভালো।
কুশল নদীর উজানে এগোল, দেবাশিস গেল স্রোত বরাবর।
কুশলের সঙ্গেই দেখা হল। একটা বড়ো পাথরের আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে বলল, “এখানে নদী পেরোতে পারবে। তোমার বন্ধুকে ডাকো।”
দুজনে সাবধানে নদী পেরোল। গোল পাথরে পা হড়কানোর সম্ভাবনা, তার ওপরে হাতে ভারি যন্ত্রপাতি। ওপারে দাঁড়িয়ে ছেলেটা। কুশল বলল, “আরে, ও কখন পেরোল?”
দেবাশিস বলল, “অন্য পাথর দিয়ে পেরিয়েছে। আমরা হয়ত তখন দেখছিলাম না।” তার পরে ছেলেটাকে বলল, “চলো, কোন দিক দিয়ে যাব?”
ছেলেটা এগিয়ে গেল, দুজনে চলল পেছনে।
ওপারে জঙ্গল ঘন। চলার পথ নেই বললেই চলে। ছেলেটা ছুটে ছুটে আগে আগে যাচ্ছে, পেছনে ওরা। পাহাড়টা খুব উঁচু না, কিন্তু খাড়া। ভারি ক্যামেরার ব্যাগ আর রেকর্ডিং-এর যন্ত্রপাতি নিয়ে চলা কঠিন।
দুর্গের ভাঙা অংশটায় পৌঁছে পেছনে তাকিয়ে দেখা গেল অল্প আলোয় নিচে নদী ছুটে চলেছে, চারপাশ স্বচ্ছ হচ্ছে ধীরে ধীরে। দুর্গ-প্রাচীরের যে ভাঙা টুকরোটা নদীর ওপার থেকেও দেখা যায়, তার চার দিকে আর কিছুই বাকি নেই। এমনকি প্রাচীর কোন দিক থেকে এসে কোন দিকে গিয়েছিল, ডাইনে না বাঁয়ে, সামনে না পেছনে, তা-ও বোঝার যো নেই।
কুশল আবার বলল, “আর কিছুর কোনও চিহ্নটুকুও রইল না, অথচ এই অংশটা রয়ে গেল, অদ্ভুত না?”
দেবাশিস কিছু বলার আগেই মিনারের আড়াল থেকে ছেলেটা বেরিয়ে এল, ঠোঁটে আঙুল দিয়ে চুপ করতে বলে হাতছানি দিয়ে ডাকল। সাবধানে দুজনে ভাঙা দেওয়াল টপকে ঢুকল মিনারের মধ্যে।এই অংশটা ছিল দুর্গের উঁচু প্রহরা কেন্দ্র। বড়ো ঘরের মতো এর আকার আকৃতি। এক সময়ে ভেতর থেকে প্রহরীরা নজর রাখত চারদিকে। ওপর দিকের ছোটো ছোটো জানলাগুলো আর প্রায় নেই। দেওয়াল থেকে সিঁড়ির মতো যে পাথরের টুকরোগুলো বেরিয়ে থাকত সেগুলোও আর বেশি বাকি নেই। ছেলেটা আঙুল তুলে অনেক ওপরে একটা পাথরের টুকরো দেখিয়ে বলল, “তোমরা যে প্যাঁচা খুজছ, সে ওই পাথরটার ওপরে বাসা করে আছে।”
উত্তেজিত কুশল আর দেবাশিস অনেক চেষ্টা করে বুঝল যে বাসা একটা আছে। নড়াচড়াও দেখা গেল। ওদের চলাফেরাতে বিরক্ত হয়ে পাখিটা বেরিয়ে গিয়ে বসল মিনারের দেওয়ালের ওপরে। নিঃসন্দেহে ওদের কাঙ্খিত প্যাঁচা। দু’চারটে ছবি উঠতে না উঠতে উড়ে চলে গেল।
কুশল ব্যস্ত হয়ে বলল, “এখান থেকে বেরিয়ে চল। ও আমাদের আসায় বিরক্ত হয়েছে।বাসা ছেড়ে চলে যেতে পারে।”
ছেলেটা একটু ম্লান হেসে বলল, “তোমরা যাও। ও আমাকে দেখে বিরক্ত হয় না। তা ছাড়া আমি আর যাব কোথায়? আমি তো এখানেই থাকি।”
চারিদিকে চেয়ে দেবাশিস বলল, “এখানে থাক? কী করে? এখানে তো কিচ্ছু নেই। শোও কোথায়? খাও কী?”
কুশল বলল, “অন্য লোকজন কোথায়? তোমার গুম্ফা কোথায়?”
ছেলেটা বলল, “আমি একাই থাকি। সঙ্গে কেউ নেই। আমার গুম্ফা ছিল উদ্রানগরে। সে অনেক দিন আগের কথা।”
কুশল চমকে বলল, “উদ্রানগর! সে তো অনেক দূর! সেখানকার গুম্ফা তো বিখ্যাত! সেখান থেকে তুমি এখানে এলে কেন? একাই এলে?”
ছেলেটা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “সে অনেক দিন আগের কথা।আমার বাবা-মার অনেকগুলো বাচ্চা, তাদের সবাইকে খেতে দিতে পারে না বলে আমাকে পাঠিয়েছিল উদ্রানগরের গুম্ফায়। লামা হতে।সে খুব কঠিন। বড়ো লামারা খেতে দিত না, মারত খুব। অনেকে পালিয়ে যেত। কেউ ফিরে যেত নিজেদের গ্রামে, কেউ রাস্তায় মরে যেত। আমাকে একবার এমন শাস্তি দিয়েছিল যে আমি রাত্তিরে পালিয়ে গেছিলাম। পরদিন সকালে আমার দেখা হল একজনের সঙ্গে। লোকটা আমাকে বলল আমার সঙ্গে এসো, আমি তোমাকে বাড়ি নিয়ে যাব।
“ওর সঙ্গে এলাম এখানে। তখন দুর্গ ছিল না। কেবল ন্যাড়া পাহাড়। পাহাড়ের মাথায় রাজা দুর্গ বানাচ্ছিল। লোকটা আমাকে মেরে মাটির গর্তে ফেলে দিল। ওইখানে।” ছেলেটা মিনারের কোনার দিকে আঙুল দেখাল। বলল, “তার পরে এখানে দুর্গ তৈরি হল। রাজা নাম দিলেন কৃপাণগড়। আর দুর্গ যে বানিয়েছিল, বোনামকৃষ্ণ গাথানি, তার নামে পল্লী বানালেন। বোনামপল্লী। তবে টিঁকল না। এখানে রাজা এক দিনও শান্তি পাননি। অনেকেই দেখেছিল আমি রাতের বেলায় পথে পথে, এমনকি লোকের বাড়িতেও ঘুরে বেড়াই। লোকে বলত ভূত। শেষে রাজা কানাঘুষোয় জানতে পারলেন যে এই দুর্গ বানাতে একটা বাচ্চা ছেলেকে মারা হয়েছিল। বোনামকৃষ্ণকে ডেকে সব জানলেন। বললেন অন্য দুর্গ বানাতে হবে। এই দুর্গ অভিশপ্ত। রাজার আদেশে বোনামকৃষ্ণ আর এদেশে বাড়ি বানাবার অনুমতি পায়নি। অনেক বছর পর একদিন রাজা কোথায় চলে গেলেন। দুর্গ খালি হয়ে গেল। তখন আমি রাতে বোনামপল্লীতে ঘুরে বেড়াতাম। কেন জানি না লোকে আমাকে ভয় পেত। শেষে একদিন বাজ পড়ে দুর্গে আগুন লাগল, দেখতে দেখতে তিন দিন তিন রাতে দুর্গ পুড়ে ছাই হয়ে গেল। কেবল মিনারটা রয়ে গেল। সবাই বলল এ ভূতের কাজ। নদীর এপারে-ওপারে বোনামপল্লীর সব লোক পালিয়ে গেল। আমি একা হয়ে গেলাম। রাতে জঙ্গলে ঘুরে বেড়াই, আর দিনে ঘুমিয়ে থাকি — ওখানে।” ছেলেটা আবার আঙুল দিয়ে দেখাল মিনারের মাটি।
তার পরে বলল, “এখন সূর্য উঠছে। আমাকে যেতে হবে। তোমরা থাকবে এখন এখানে? তোমাদের কাপড়ের বাড়িতে? তাহলে তোমাদের সঙ্গে রাতে কথা বলব। কেউ তো নেই, তাই কারোর সঙ্গে কথা বলতে পারি না...”
ছেলেটা থামার পর হা হা করে হেসে উঠল দেবাশিস। কাঁধ থেকে ভারি ব্যাগ নামিয়ে মাটিতে রাখতে রাখতে বলল, “ভাল গল্প বলেছিস, ছেলে! দারুণ! এবার চল, তোর বাড়িটা কোথায় দেখে আসি।”
বলে মুখ তুলে দেখল কুশল হাঁ করে ছেলেটার দিকে দেখছে। কুশলের দৃষ্টি অনুসরণ করে দেখল ছেলেটা আস্তে আস্তে মাটির নিচে ঢুকে গেল। বুক অবধি গিয়ে হাত তুলে বলল, “রাতে আসব।” তার পরে সবটাই চলে গেল মাটির নিচে।
জ্ঞান হারিয়ে দেবাশিসপড়ে গেল মাটিতে। ভাগ্যিস মাইক্রোফোনটা ব্যাগের ওপরেই পড়েছিল, নইলে ভেঙেই যেত।
মহাসমস্যা। দুটো ভারি ব্যাগ, একটা অজ্ঞান মানুষ। কুশল একে একে খানিকটা নামে একবার দুটো ব্যাগ নিয়ে, তারপরে দেবাশিসকে নামায় ধরে ধরে, হিঁচড়ে, এমনকি পাঁজাকোলা করেও। পনেরো মিনিটে পাহাড় চড়েছিল, নামতে লাগল প্রায় আধঘণ্টা। সকাল হয়ে গেছে। নদীর পাড়ে কুশল ঠাণ্ডা জলের ঝাপটা দিয়ে দেবাশিসের জ্ঞান ফেরাল। চোখ খুলেই দেবাশিস বলল, “মাইক্রোফোনটা?” তার পরে উঠে বসে বলল, “ইশ, প্যান্টটার কী দশা করেছিস! আমাকে টেনে টেনে এনেছিস নাকি?”
কুশল রেগে বলল, “ইয়ার্কি! একটা বাচ্চা ছেলে দেখে অজ্ঞান হয়ে গেলি, তার আগে অবধি আমাকে বলছিলি — তোর কী হয়েছে বল দেখি?”
দেবাশিসের খেয়াল হল। তাকাল পাহাড়ের মাথায় দুর্গের দিকে।“ছেলেটা সত্যিই ভূত!”
“ভূত তো বটেই। কিন্তু একটা বাচ্চা ছেলে ভূত,” বলল কুশল।
“তুই ভূত বিশ্বাস করিস?” অবাক হয়ে বলল দেবাশিস।
কুশল হেসে বলল, “তুই করিস না?”
সজোরে ডাইনে বাঁয়ে মাথা নাড়তে গিয়ে থেমে গেল দেবাশিস। আর তখনই নদীর ওপারে, যেদিকে ওদের তাঁবু, সে দিক থেকে শব্দ পাওয়া গেল জিপের।
“চ’, সবুজদা না আসলেও লোক পাঠিয়েছে, যেমন বলেছিল। নিজে নিজে নদী পেরোতে পারবি, না কি কোলে করে নিয়ে যাব?”
দেবাশিস উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “পারব। চল। আগে প্যান্টটা চেঞ্জ তো করি।”
নদী পেরোতে পেরোতে কুশল বলল, “আমি আজ রাতে এখানে থাকব না। এখনই দীঘলাগড় রওয়ানা দেব।”
দেবাশিস বলল, “দরকারও নেই। প্যাঁচা যে এখানে আছে, বাসাও করে — সবই জেনেছি। এখানে আর থাকার দরকার নেই।”
রেঞ্জ অফিসারের অ্যাসিস্ট্যান্ট দাওয়াং সেরিং যখন এসে পৌঁছলেন, তখন কুশল বাইরে গোছগাছ করছে, আর দেবাশিস টেন্টের ভেতরে। কুশল বলল, “আমাদের কাজ মিটে গেছে সেরিং-জী, পাখি পেয়েছি। কল রেকর্ড করেছি, ছবি নিয়েছি। নেস্ট করে তাও জেনেছি। আজই রওয়ানা দেব দীঘলাগড়।”
সেরিং গাড়ি থেকে টিফিন ক্যারিয়ার নামাচ্ছিলেন। থতমত খেয়ে বললেন, “আজই? স্যার যে আমাকে বললেন কাল আসবেন...”
তাঁবুর থেকে বেরিয়ে দেবাশিস দুটো ব্যাগ নামিয়ে বলল, “খালি করে দিয়েছি। খেয়ে নিয়ে টেন্ট তুলে নেব, কেমন?”
সেরিং বললেন, “সে আমার লোক করবে, কিন্তু আপনারা চলে যাবেন? গাথানি স্যার খুব দুখ্‌ পাবেন।আমাকে বললেন...”
দেবাশিস ক্যামেরা চালু করে ছবি দেখিয়ে বলল, “এই দেখুন।সবুজদাকে বলবেন, পাখির ছবি পেয়েছি। ফিরে গিয়ে ই-মেইল করে পাঠাব।”
উৎসাহিত হয়ে সেরিং বললেন, “গাথানি স্যার খুব খুশ হবেন। কাল থেকে অনেক বার বলেছেন, হামার রেঞ্জে উল্লু মিলবেই।” তারপরে চমকে গিয়ে বললেন, “এ কোথাকার ছবি?” হাত তুলে দুর্গ দেখিয়ে বললেন, “ওখানে?”
দেবাশিস বলল, “হ্যাঁ। ভোরে গিয়েছিলাম।”
সেরিং কী বলতে গিয়ে থেমে গেলেন। কুশল ওঁর হাত থেকে টিফিন ক্যারিয়ার নিয়ে বলল, “এটা ব্রেক-ফাস্ট? খিদে পেয়েছে।”
প্লেটে আলু পরোটা আর চাটনি নিয়ে দুজনে বসল, জোর করে সেরিং-এর হাতেও ধরিয়ে দেওয়া হল এক প্লেট।
কুশল জানতে চাইল, “আচ্ছা, গাথানি কোথাকার নাম? এ নাম তো আপনাদের দেশের না?”
মুখে পরোটা ভরে মাথা নাড়লেন সেরিং। বললেন, “ওরা অরিজিনালি এদেশের লোক না। কৃপাণগড় বানানোর সময় রাজা দক্ষিণ দেশ থেকে পাথরের গাঁথনির কাজ জানা কারিগর আনিয়েছিলেন। এই থেকেই গাথানি নাম হয়েছে। প্রথম যে এসেছিল, তার নাম ছিল বোনামকৃষ্ণ। ওর নামেই বোনামপল্লী নাম হয়েছিল। কিন্তু বোনামকৃষ্ণ ওদের দেশের এক ভয়াবহ প্রথাএখানে এনেছিল। দুর্গ তৈরির আগে একটা বাচ্চা ছেলেকে ধরে এনে দুর্গের ভিতে বলি দিয়েছিল রাতের অন্ধকারে। সে ছেলে কে কেউ জানে না। কত শো বছর আগের কথা — কিন্তু লোকে বলে ওই জন্যই দুর্গ অভিশপ্ত। ছেলেটাকে নাকি দুর্গের আশেপাশে দেখা যেত। রাজা জানতে পেরে বোনামকৃষ্ণকে নির্বাসন দেন। কিন্তু ততোদিনে সে বড়োলোক হয়ে গেছে। রাজত্ব ছেড়ে কিছুদিনের জন্য এধারে ওধারে কোথাও গেলেও বেশি দূর যায়নি।ক্রমে লোকে ভুলেও গেছে, ওরা ফিরেও এসেছে। তবে গাথানি নাম সত্ত্বেও ওরা আর বাড়ি বানায় না। সে ব্যবসা বোনামকৃষ্ণর সঙ্গেই শেষ হয়ে গেছে। বোনামপল্লী যে ওর পূর্বপুরুষের নামে সে কথা গাথানি স্যার কাউকে বলেননা। আপনারা বলবেন না, আমি বলেছি।”
ওরা সেদিনই কণ্টাকাঁই রেঞ্জ ছেড়ে চলে গিয়েছিল। এর পরে দিঘলাগড়ের আশেপাশে অনেক প্যাঁচা পাওয়া গেছিল, তাই আর বোনামপল্লী ফেরেনি। সবুজসুন্দর গাথানির সঙ্গেও আর দেখা হয়নি কোনও দিন।

ছবি — অমৃতা দত্ত

Thursday, February 06, 2020

মৌলি হত্যা রহস্য

~এক~
মেয়েটাকে নিয়ে স্মৃতি চৌধুরী পড়েছেন বিপদে। এইটুকু মেয়ে, সবে চার পেরিয়ে পাঁচে পড়েছে, এরই মধ্যে এত মিথ্যে কী করে বলতে শিখল? নিজের আঠাশ বছর বয়সে তো আঠাশটাও মিথ্যে বলেছেন কি না সন্দেহ। অবশ্য স্কুল কলেজে পড়তে হোমওয়ার্ক, পরীক্ষার নম্বর, আর প্রেম করার বিষয়গুলো আলাদা...
স্কুল থেকে বাচ্চাদের নিয়ে গিয়েছে সায়েন্স সিটি। ফিরে এসে গল্প – ওখানকার ডাইনোসরগুলো, জানো মা, হঠাৎ জ্যান্ত হয়ে গিয়ে তাড়া করেছে। বাচ্চারা তো চিৎকার করতে করতে বাসে উঠে পড়েছে, কিন্তু আন্টিরা তো মোটা, ওরা ছুটতে পারে না, তাই ডাইনোসরগুলো এক এক করে ধরে ধরে কপ কপ করে গিলে ফেলেছে। প্রিন্সিপ্যাল ম্যাডাম তো মাঝরাস্তায় আছাড় খেয়ে গড়াগড়ি, তখন মস্তো টিরানোসরাসটা জিভ দিয়ে তাঁকেও তুলে নিয়ে...
মোদ্দা কথা, কাল থেকে স্কুলে না গেলেও চলবে।
সেদিন স্মৃতির বাবা বললেন, “এত মিথ্যে বলে, বড়ো হয়ে ‘একদিন ফাঁসি যাবে, নয় যাবে জেলে’।” ঠাট্টা করেই বললেন, কিন্তু স্মৃতির কান্না পেয়ে গিয়েছিল। গুরুজনের কথা ফলে যায়। মা-ই বলেছিলেন। মেয়ের বাবার কোনও হুঁশ নেই, বরং আরও মজা পায়। মেয়েকে আরও আশকারা দেয়। সেদিন বলল, “অত বড়ো টির‍্যানোসরাসটা ওইটুকু আন্টি গিলে থামল? ওতে তো ওর পেট ভরবে না?” চিল চিৎকার করে থামাতে হল লোকটাকে।
স্কুলে টিচাররা প্রথম দিকে বেশি পাত্তা দেননি। বলেছিলেন, “ইম্যাজিনেটিভ চাইল্ড।” কিন্তু যেদিন টায়ার পাংচার হয়ে দেরী হয়েছে না বলে গিয়ে গল্প বলেছিল যে পাড়ায় ভূমিকম্প হয়ে বিরাট ফাটল হয়েছে বলে বাবাকে গাড়ি ঘুরিয়ে আনতে হয়েছে - তাই দেরি হয়েছে, সেদিন ক্লাস টিচার বলেছিলেন, “মিসেস চৌধুরী, ওকে একবার কাউনসেলিং করান।”
ভয়ে স্মৃতি চৌধুরীর হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে গিয়েছিল। ওইটুকু বাচ্চাকে সাইকিয়াট্রিস্ট, সাইকোলজিস্ট দেখান!
আজও একই অবস্থা। কাদা মেখে খেলা থেকে ফিরে মা-কে বলতে লেগেছে, “জানো মা, ও ব্লকের মাঠে পুজোর প্যাণ্ডেল বাঁধছে, ওখানে হঠাৎ কী আগুন! কী আগুন! দাউ দাউ করে জ্বলছে, দমকল ইঞ্জিন এসেছে বারোটা, হুশ হুশ করে জল দিচ্ছে, আর আগুন নেভাচ্ছে, আর চারিদিকে প্যাচপ্যাচে কাদা, তারই মধ্যে আছাড় খেয়ে... স্মৃতির চোখ থেকে জল বেরিয়ে এল। আজকাল বাচ্চাদের মারা বারণ। নিজের ছোটোবেলায় এমন গল্প বললে বাবা-মার হাতের চড় খেয়ে সিধে হয়ে যেতে হত। মেয়েকে দুধ দিয়ে বেডরুমে এসে সবল স্বাস্থ্য ম্যাগাজিনের পুরোনো সংখ্যাগুলো নিয়ে বসলেন। মেয়ের বাবার দ্বারা হবে না। স্মৃতিই স্থির করবেন কোন সাইকোলজিস্টের কাছে মেয়েকে নিয়ে যাবেন।
সবে একটা ইশ্যু শেষ করে দ্বিতীয়টা খুলেছেন, খাবার ঘর থেকে মেয়ের ডাক, “মা, মা দেখে যাও, পাশের বাড়ির নতুন আন্টির বাড়িতে ডাকাত পড়েছে, আন্টিকে চেয়ারে বেঁধে মারছে...”
নিকুচি করেছে মডার্ন চাইল্ড রেয়ারিং-এর। এই মেয়েকে আর আশকারা দেওয়া যায় না। আজ ওরই একদিন কি আমারই একদিন। হাড় মাস যদি... গণগণ করতে করতে খাবার ঘরে এসে পাশের বাড়ির ঘরের খোলা জানলার হাওয়া-ওড়া পরদার ফাঁক দিয়ে যা চোখে পড়ল, তা দেখেই স্মৃতি চৌধুরী চিৎকার করে উঠলেন, “ডাকাত, ডাকাত, খুন, কে কোথায় আছ...”
নিমেষের মধ্যে হাউজিং সোসাইটির সব ভীড়টা উপচে পড়ল সেনগুপ্ত নবদম্পতির দরজায়।
~দুই~
ডিকটেশন নিতে নিতে রিটা আড়চোখে বার বার তাকাচ্ছিল বসের মুখ আর নিজের হাতঘড়ির দিকে। পাঁচটা প্রায় বাজে। প্রদীপ সেনগুপ্ত কাজপাগল লোক। সাতটার আগে অফিস ছাড়তেন না এই কিছুদিন আগে পর্যন্তও। অবশ্য সব সময় যে অধস্তন কর্মচারীদের বসিয়ে রাখতেন, তা-ও নয়, কিন্তু বেশিরভাগ দিন খেয়ালই করতেন না। ছটা, সাড়ে-ছটা, কখনও নিজে বেরোন’র সময় খেয়াল করে বলতেন, “মিস গোমেজ, আপনি কেন বসে আছেন এখনও? আমি না বললেও নিজে বেরিয়ে যাবেন পাঁচটার পরে আপনাকে থাকতে হবে না।”
রিটার মাথা খারাপ নয়। সে শুনেছে এই কাণ্ড করে চাকরি খুইয়েছে এই ব্যাঙ্কে অনেকেই। তাই সে পথে যায়নি কখনও। কিন্তু আজ বৌদিকে বলে এসেছিল ছটার মধ্যে বাড়ি ফিরে এসে ভাইপোকে ফিজিক্স দেখিয়ে দেবে। সেনগুপ্ত স্যার না উঠলে অবশ্য...
“অ্যাজ পার আওয়ার প্রিভিয়াস করেসপন্ডেনস, আই লুক ফরোয়ার্ড টু মিটিং ইউ অন দ্য টুয়েলফথ ইনস্ট্যান্ট। ইওরস এটসেটরা...” থেমে, একটু জল খেয়ে সেনগুপ্ত টেবিলের পাশের সুইচ টিপলেন। বেয়ারা মোতিকে ডাকার সঙ্কেত। সাবধানে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল রিটা। স্যারের নতুন বউ এখনও নতুনই রয়েছে তাহলে।
“এই চিঠিগুলো কাল সকালে আমাকে দিয়ে সই করিয়ে নেবেন। আর কাল ফার্স্ট আওয়ারে আমার সি-এম-ডির সঙ্গে মিটিং। মনে আছে তো?”
রিটা হেসে ফেলল। এই লোকটার সেক্রেটারির প্রয়োজন নেই। কিন্তু ব্যাঙ্কের নিয়ম অনুযায়ী থাকতেই হয়।
মোতি এসে বাক্স নিয়ে গেল। তার খানিকক্ষণ পরে প্রদীপ বেরিয়ে গেলেন ব্যাঙ্ক থেকে। রিটা চট করে হাত মুখ ধুয়ে ফিরে এসে গোছগাছ করতে শুরু করে দিল। এখনই বেরিয়ে যদি মেট্রো ধরতে পারে, তাহলে বাড়ি পৌঁছে অনায়াসেই ছটার মধ্যে ভাইপোকে নিয়ে বসতে পারবে। বৌদির ব্যাজার মুখ থেকে নিষ্কৃতি।
“সাহেব তো বেরিয়ে গেলেন। হাতে তাহলে ঘণ্টা দুয়েক আছে তো? কফি খেতে যাওয়া যায়?”
রিটা উত্তর না দিয়ে উঠে পড়ল। এই শ্রীবাস্তব লোকটার সঙ্গে ‘না’ বলেও সময় নষ্ট করতে রাজি নয় রিটা।
পেছন থেকে শুনতে পেল, “এখন তো সাহেব আর পাত্তা দেয় না। বউকে নিয়েই আছে। তা-ও এত ঘমণ্ড কেন?”
রিটা ঠিক করল, কালই সুচেতাদির সঙ্গে কথা বলতে হবে। এইভাবে চলতে পারে না। এতদিন বড়ো সাহেবের পেয়ারের পি-এ বলে খানিকটা ভয়েই কিছু বলত না রিটা। নিজের চাকরিটাও নতুন। কিন্তু এখন যে দিকে লোকটা মোড় নিচ্ছে, রিটার ভয় করে আজকাল।
ব্যাঙ্কের চৌহদ্দি থেকে পার্কিং পর্যন্ত পৌঁছতে পৌঁছতে প্রদীপ সেনগুপ্ত ক্রমে ক্রমে কাজ থেকে বাড়ি ফেরার মানসিকতায় এলেন। সেই সঙ্গে মনে পড়ল, আজ দুপুর থেকে মৌলির কোনও ফোন বা মেসেজ আসেনি। অজান্তেই ভুরু কুঁচকে গেল। কেন? যে মেয়েটা রোজ বারোটা ফোন করে, আজ তার একটাও ফোন কেন নেই? পকেট থেকে ফোনটা বের করে দেখলেন ভুলটা নিজেরই। দুপুরের মিটিঙের পর থেকে ফোনটা সেই সাইলেনটই রয়ে গেছে। তিনটা মিসড কল। সবকটাই মৌলির। সাতটা মেসেজ। প্রথম ছটার বক্তব্য ‘এখনও মিটিং?’, ‘শেষ হয়নি?’, ‘ফোনটা সাইলেন্ট আর কতক্ষণ?’ থেকে নিয়ে ‘ধ্যাৎ, মশাই, ফোনুটা কি সাইলেন্টই থাকবে?’ আর শেষ মেসেজটার বক্তব্য, আজ বাড়ি ফিরলে ওই মোবাইলটা ওয়াশিং মেশিনে যদি না-কেচেছে মৌলি...
প্রদীপ নিজের মনে হাসলেন। তারপরে মৌলিকে ফোন করতে গিয়েও ঠিক করলেন, বকুনিটা সামনাসামনি খাওয়াই ভালো। তাই, ‘কামিং, ড্রাইভিং,’ লিখে মেসেজ পাঠিয়ে গাড়ি চালু করলেন।
~তিন~
আগে হলে সল্ট লেক কোন দিক দিয়ে যাবেন স্থির করতে গিয়ে প্রদীপকে রোজ ভাবতে হত। কিন্তু পার্ক সার্কাস থেকে বাইপাস অবধি লম্বা এলিভেটেড করিডোরটার সঙ্গে সার্কুলার রোড ফ্লাইওভারে কানেকশন হয়ে যাবার পর থেকে আর ভাবেন না। ব্যাঙ্ক থেকে বেরিয়ে একটুখানি উলটো দিকে গিয়েও আগের চেয়ে অন্তত চার ভাগের এক ভাগ সময়ের মধ্যে বাড়ি ফিরতে পারেন।
আজও তাই করলেন।
ক্রমে বাইপাস, নিকো পার্ক, করুণাময়ী পার করে, প্রায় শীতের হিম-ধরা আকাশের আবছা তারার আলোয় প্রদীপের গাড়ি আবাসনের গেট দিয়ে ঢুকল। এই আবাসনটায় ফ্ল্যাট কিনতে গিয়ে বেশ কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে প্রদীপকে। প্রথমে মৌলিকে বোঝাতে হয়েছিল। মৌলির ইচ্ছে ছিল দক্ষিণ কলকাতা। কিন্তু শ্বশুরবাড়ির খুব কাছে থাকার ব্যাপারে প্রদীপের যথেষ্ট আপত্তি ছিল। পুকু-দার কী হয়েছিল ওর নিজের চোখে দেখা। তাছাড়া কলকাতায় এসে অবধি সল্ট লেকের ফাঁকা ফাঁকা রাস্তাঘাটগুলো যেন ছোটোবেলার কলোনিতে বাস করার মতো লাগত প্রদীপের। তাই সেই রাস্তা দিয়ে গাড়ি চালিয়ে চালিয়ে দিনের পর দিন ঘোরা... ফাঁকা রাস্তাতেও কী রকম পাড়া-মনোভাব বিদ্যমান, সেটা বার বার দেখান’, এইসব করে করে আস্তে আস্তে মৌলির মনটাকে ঘোরাতে হয়েছে। তারপরে এই আবাসনটায় ফ্ল্যাট জোগাড় করাটা তো আর এক কাহিনি।
আজ আবাসনের ভেতরটা রোজকার মতো খালি খালি নয়। বরং বেশ ভীড়। লোকে বেশ উত্তেজিত হয়ে ঘোরাফেরা করছে। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই কারণটা বোঝা গেল। একটা অ্যাম্বুলেনস দাঁড়িয়ে প্রদীপদের বাড়িরই নিচে। কারও শরীর খারাপ। প্রদীপের মনে হল কাউকেই তো সেরকমভাবে চেনে না। নিজের বিল্ডিঙের ষোলোটা ফ্ল্যাটের মধ্যেও শুধু ওপরতলার প্রিয়নাথ ব্যানার্জীকেই চেনে, বাকিদের সঙ্গে তো কেবল লিফটে দেখা হওয়া। কার কী হল? প্রিয়নাথদার...
ভাবনাটা শেষ হতে না হতেই প্রিয়নাথদা ভীড় থেকে প্রায় ছুটে বেরিয়ে এলেন। তার মানে ওঁর কিছু হয়নি। তাহলে কি বৌদির...
প্রিয়নাথ ছুটে এসে গাড়ির বনেটের ওপর চাপড় মারতে মারতে কী সব বলছেন। প্রদীপ গাড়িটা একপাশ করে দাঁড় করিয়ে বেরিয়ে বললেন, “কী হয়েছে, প্রিয়নাথদা? কার শরীর খারাপ?”
এর পরের কয়েক ঘণ্টা কী হয়েছিল, প্রদীপ সেনগুপ্ত আর কখনওই ভালো করে মনে করতে পারেননি। সবটাই কেমন যেন ছেঁড়া ছেড়া, ছায়া ছায়া... সকালে উঠে যেমন স্বপ্ন দেখেছি মনে থাকে, কিন্তু কী কী দেখেছি মনে থাকে না, অনেক ভেবেও ধরা যায় না, অনেকটা সেরকম। প্রিয়নাথ ব্যানার্জী কী বলছেন প্রথমে তো বুঝতেই পারেননি প্রদীপ। ডাকাত... সল্ট লেকে... ফ্ল্যাটের মধ্যে... ওদের ফ্ল্যাট? ওদের ফ্ল্যাটে কেন? ডাকাতি করতে এসে ছুরি মেরেছে... ধরাও পড়েছে... কাকে ছুরি মেরেছে? মৌলিকে? কেন? কেন, ছুরি মেরেছে কেন? মৌলি কোথায়? অ্যাম্বুলেনসে... কিন্তু অ্যাম্বুলেনসে দাঁড়িয়ে রয়েছে কেন? নিয়ে যাচ্ছে না কেন হাসপাতালে? ওকে কেউ অ্যাম্বুলেনসের কাছে যেতে দিচ্ছে না কেন? পুলিশ অফিসারটা কেন ওর হাতের ডানাটা শক্ত করে ধরে রেখেছেন?
সেই সঙ্গে আসপাশ থেকে ভেসে আসা নানা অপরিচিত কণ্ঠস্বর... ওই তো, উনি-ই তো... জানি না। চৌরঙ্গীতে কোনও ব্যাঙ্কে... প্রিয়নাথ চেনে। ও-ই তো ইন্ট্রোডিউস করেছিল সোসাইটিতে... না, না, ছেলেমেয়ে কই? একদম সদ্য-বিবাহিত। বোধহয় বছরও ঘোরেনি... এই তো সে দিন এল, সোসাইটির সবাইকেই তো নেমন্তন্ন করেছিল গৃহপ্রবেশে। তুমি যাওনি? ইশ, দেখো, এক্কেবারে বাচ্চা ছেলে গো... আহা রে...
তার পরে সেই ভয়াবহ রাত। প্রথমে থানা। পুলিশরা খুব নম্র, বিনয়ী, কিন্তু প্রশ্নের শেষ নেই। কবে, কোথায়, কেন, কিসের জন্য... অন্তহীন। সারাক্ষণ পাশে বসেছিলেন প্রিয়নাথদা। শেষে, প্রায় রাত একটার সময় দুজনে যখন ক্লান্ত দেহে ফিরছেন, প্রিয়নাথদা লিফটে ঢুকে নিজের ফ্লোরের বোতাম টিপলেন। প্রদীপ নিজের ফ্লোরের নম্বরটা টিপতে যাবেন, প্রিয়নাথদা বাধা দিলেন। বললেন, “আজ রাত্তিরটা আমার ঘরে শোবেন।”
“তার কী প্রয়োজন...” বলতে গিয়ে বাধা পেলেন প্রদীপ।
“পুলিশ বলল, আপনি বোধহয় খেয়াল করেননি। আজ রাতে ওরা আপনার বাড়িতে তদন্ত চালাবে। পুলিশ কুকুর আসবে, সি-আই-ডি আসবে, অনেক কিছু হবে। আপনি আমার বাড়িতে থাকবেন। চলুন, আপনার বৌদি অপেক্ষা করছে।”
~চার~
অনেকক্ষণ লাগল ব্যানার্জী বৌদির কথা শেষ হতে। ব্যানার্জীদা অনেক বার থামাবার চেষ্টা করে শেষে বিরক্ত হয়ে শুতে চলে গিয়েছিলেন। কিন্তু বৌদির কাহিনি শেষ হয় না। অবশ্য প্রদীপ নিজেও চেষ্টা করেননি থামাতে। কী হয়েছিল জানার জন্য। অনেক কথার পরে এটুকু বুঝলেন যে সবাই মনে করছে যে দুটো লোক ডাকাতি করতে এসেছিল, কিন্তু কিছু একটা ঘটেছিল যার ফলে মৌলিকে চেয়ারে বেঁধে ফেলার পরেও ওরা ছুরি চালাতে বাধ্য হয়। এবং তখনই হাওয়ায় পর্দা উড়ে যাওয়ার ফলে পাশের বাড়ির মিসেস চৌধুরীর চোখে পড়ে ঘটনাটা। হয়ত আর একটু আগে হলে ছুরি চালান’র আগেই দেখতে পেতেন...
ফ্ল্যাটগুলো একই রকম। যে ঘরটায় ব্যানার্জীবৌদি শুতে দিলেন মৌলি-প্রদীপের ফ্ল্যাটে সেটা প্রদীপের স্টাডি। এই ঘরেই ওদের কম্পিউটার, বই, ম্যাগাজিন, পড়ার টেবিল, প্রদীপের আরাম কেদারা। প্রদীপ যখন জানলার নিচের চেয়ারটায় বসে কাগজ পড়তেন, তখন মৌলি ওই দেওয়ালের গায়ে টেবিলে কম্পিউটারে বসত।
ও বাড়িতে আর কোনও দিন ওই চেয়ারটায় মৌলি বসবে না? তা কি হতে পারে? কী করে সম্ভব সেটা?
দুটো সম্পূর্ণ অপরিচিত লোকের ওপর হঠাৎ ভয়ানক রাগ হল প্রদীপের। কোনও দিন এত রেগেছেন বলে মনে পড়ে না। ঘাড়-গলা থেকে একটা গরম আভা উঠে কান, মাথা, সমস্তটা তাতিয়ে দিচ্ছে। ছটফট করে বিছানা ছেড়ে উঠে পড়লেন প্রদীপ। মনে হচ্ছে একটু ঠাণ্ডা হাওয়ায় দাঁড়ালে ভালো হত। এই ফ্ল্যাটগুলোতে দুটো করে বারান্দা। একটা ব্যানার্জীদার শোবার ঘরের সঙ্গে লাগোয়া। অন্যটা বসার ঘরের দিকে, কিন্তু সেটা থেকে নিচে তাকালে প্রদীপের ফ্ল্যাট দেখা যায়। প্রদীপের মনের মধ্যেটা একটা অপরিচিত আশঙ্কায় ভরে গেল। ব্যানার্জীদা একটা জলের বোতল রেখে গিয়েছেন, সেটা নিয়ে ঘরের মধ্যেই গায়ে মাথায় জল ছেটালেন প্রদীপ। পাখাটা জোর করতে গিয়ে বুঝলেন যে ওটা এর চেয়ে জোরে চলেই না। বিছানায় এসে বসলেন। তার পরে ক্লান্তির ভারে আবার শুলেন। কখন চোখ লেগে গিয়েছে, জানেন না।
পরদিন সকালে প্রায় ভোর না হতেই দরজায় ধাক্কা দিয়ে ঘুম ভাঙিয়ে ঢুকলেন ব্যানার্জীদা।
বললেন, “চলুন, তৈরি হয়ে নিন। আপনার তো থানায় হাজিরা এখন। আমি আপনার আলমারি থেকে কিছু জামাকাপড় এনেছি পুলিশের পারমিশন নিয়ে।”
আধঘুমন্ত অবস্থায় উঠে চান সেরে নতুন পোশাকটা পরতে গিয়ে থমকে গেলেন। একটা প্যান্ট আর একটা টি-শার্ট। আজ থেকে প্রায় চার বছর আগে, মৌলিদের বাড়িতে প্রথম কয়েক বার যাবার পর একদিন এই রকম টি-শার্ট আর প্যান্ট পরে গিয়েছিলেন। তখনও কলেজ স্টুডেন্ট। এম-বি-এ করছেন। দেখে মৌলির কী হাসি! বাঙাল বলে অপমান করা। টি-শার্টের সঙ্গে কেউ প্যান্ট পরে? প্যান্টের সঙ্গে কেউ স্পোর্টস শু পরে? সেই থেকে কখনওই প্রদীপ টি-শার্টের সঙ্গে জিনস ছাড়া পরেননি। জুতোর ব্যাপারেও তেমনই সাবধান ছিলেন। প্যান্টের সঙ্গে জুতো, জিনসের সঙ্গে স্নিকার্স।
আর কোনও দিন মৌলির সঙ্গে দেখা হবে না। কোনও দিন মৌলির গলা শুনবেন না।
ব্যানার্জী খানিক পরে তাগাদা দিতে এসে উঁকি মেরে থমকে দাঁড়িয়ে কিছু না বলে ফিরে গেলেন। স্ত্রীকে বললেন, “একটু একা থাকতে দাও। কাল থেকে ব্যাপারটা মাথায় ঢোকেনি। এখন রিয়েলাইজেশন হচ্ছে। বেচারা।”
থানায় আজ নতুন লোক। ইউনিফর্ম ছাড়া। পরিচয় দিলেন। অর্ধেন্দু দাস, সি-আই-ডি। কথায় বোঝা গেল, মৌলির মেজোমামা, যিনি চিফ সেক্রেটারি ছিলেন, কলকাঠি নেড়েছেন। কেস এখন সি-আই-ডির হাতে। ঝকঝকে স্মার্ট, প্রদীপের চেয়ে বয়সে অনেকটাই বড়ো, সুতরাং অভিজ্ঞতাও নিশ্চয়ই অনেক। থানা থেকে প্রদীপকে নিয়ে গেলেন নিজের অফিসে – কিছু দূরে। ব্যানার্জীদাও সঙ্গে হাঁটা দিয়েছিলেন, কিন্তু অফিসার নমস্কার করে বলেছিলেন, “আচ্ছা, মিঃ ব্যানার্জী, আমরা আসি। আপনার সঙ্গে পরে কথা হবে। কাল যাঁরা ওখানে ছিলেন সকলের সঙ্গেই আমদের কথা বলতে হবে।”
নিজের অফিসে বসে বেয়ারাকে “দুটো চা বলো তো,” বলে অফিসার প্রদীপের দিকে তাকালেন।
“লিটন আর পুঁটে – নামগুলো শুনেছেন কখনও?”
প্রথম প্রশ্নেই থতমত প্রদীপ। বললেন, “না। এরা কারা?”
“আপনার স্ত্রীর খুনি। কাল যারা ধরা পড়েছে।”
“ওঃ, কিছু স্বীকার করেছে?”
“স্বীকার করার তো কিছু নেই। খুন তো ওরাই করেছে। কিন্তু সমস্যাটা কী জানেন?”
প্রদীপ ভাবলেন ভদ্রলোক আরও কিছু বলবেন। তাই চুপ করে ছিলেন। কিন্তু খানিকক্ষণ বাদে বুঝলেন পুলিশ অফিসার ওঁর কাছ থেকে কিছু উত্তর আশা করছেন। বললেন, “কী সমস্যা?”
অর্ধেন্দু তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলেন। চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন, “লিটন আর পুঁটে পুলিশের খাতা অনুযায়ী ছোটোখাট মস্তানি করে। তোলাবাজি, ভয় দেখান’ – এই সব আর কী। খুব বড়োজোর ছিনতাই বা স্মল ডেস্ট্রাকশন। দোকানদার তোলা দিল না, ওরা দোকানে ভাঙচুর করে এল... এমন আর কী। এই রকম দুটো গুণ্ডা হঠাৎ কিসের আশায় খুন করে ফেলল, সেটাই একটা আশ্চর্য ব্যাপার।”
পুলিশের কিসে আশ্চর্য লাগে তা সম্বন্ধে প্রদীপের কোনও আন্দাজ নেই, তাই কিছু বললেন না। অর্ধেন্দু বলে চললেন, “তা ছাড়াও আর একটা খুব অদ্ভুত ব্যাপার আছে।”
এবার অপেক্ষা না করেই প্রদীপ বললেন, “কী?”
“লিটন আর পুঁটে দুজনেই খিদিরপুর অঞ্চলের গুণ্ডা।”
“সে কী!” আশ্চর্য হলেন প্রদীপ। “এত দূর থেকে ডাকাতি করতে এসেছিল?”
চোখদুটো কুঁচকে তাকিয়ে রইলেন অর্ধেন্দু। “ডাকাতি করতে এসেছিল কে বলল আপনাকে?”
প্রদীপ সেনগুপ্ত জীবনে কোনও দিন এত অস্বস্তিতে পড়েছেন বলে মনে করতে পারলেন না। অফিসারের চোখদুটো যেন তুরপুনের মতো কুরে কুরে ঢুকছে। হিপনোটিজম জানে নাকি রে বাবা!
“ইয়ে, মানে,” আমতা আমতা করে বললেন প্রদীপ, “তাই তো সবাই বলছিল। হাউসিং-এ – যে দুজন ডাকাত নাকি ডাকাতি করতে গিয়ে...”
“কাগজে কী লিখেছে দেখেছেন?”
কাগজ? আজ তো কাগজ পড়েননি প্রদীপ। ব্যানার্জীদার বাড়িতে সকালে কাগজ ছিল কি? মনে পড়ছে না।
মাথা নাড়লেন। কাগজ দেখেননি আজ।
“ভালো। দেখলে কনফিউশন বাড়ত। আচ্ছা, ভাবুন তো, খিদিরপুরের দুটো স্মল-টাইম ক্রুক, সারা শহর পার করে সল্ট লেকে এসে ডাকাতি করতে গিয়ে মানুষ খুন করছে – শুনেছেন কখনও?”
শোনেননি। মাথা নাড়লেন। না।
“তবে?”
তবে কী? জানেন না প্রদীপ। উত্তর দেবার চেষ্টা না করে চুপ করে রইলেন।
“ওটা আপনার ফোন?” হঠাৎ বিষয় পরিবর্তনের ফলে প্রদীপ থতমত খেয়ে গেলেন। তাকিয়ে দেখলেন নিজের হাতের দিকে।
“হ্যাঁ।”
“এক মিনিট – দেখি?”
প্রদীপ ফোনটা দিলেন পুলিশ অফিসারকে। উনি নিঃশব্দে খানিকক্ষণ নাড়াঘাঁটা করে ফিরিয়ে দিলেন। বললেন, “আর কোনও ফোন আছে?”
“না। আর তো কোনও ফোন নেই...”
এবারেঅনেকটা বন্ধুত্বপূর্ণ সুরে অর্ধেন্দুবললেন, “কালকের ঘটনাবলী আপনি একবার থানায় বলেছেন। আর একবার আমাকে বলতে হবে।”
সেটা আন্দাজ করেছিলেন প্রদীপ। বললেন, “কী বলব?”
গতকাল সকাল থেকে নিয়ে অফিস থেকে ফিরে প্রিয়নাথ ব্যানার্জীর সঙ্গে দেখা হওয়ার সব কথাই জানলেন অর্ধেন্দু। বেশিক্ষণ লাগল না। তারপরে বললেন, “দুপুরে বারাসাত কোর্টে গুণ্ডাদুটোকে তোলা হবে। প্রিলিমিনারি। সময় বেশি লাগবে না। আপনি কি আসবেন?”
বারাসাত কোর্টে? কেন? প্রদীপ গেলে কি কিছু সুবিধে হবে?
বললেন। “আচ্ছা। কখন?”
অফিসার বললেন, “চাইলে আসতে পারেন। সেরকম কোনও কাজ নেই। তবে আসতে পারেন। এখানে আসবেন সাড়েবারোটার সময়। আমার জীপেই যাবেন। নইলে মিডিয়া ছিঁড়ে খাবে। ভালো কথা, আমার রিকোয়েস্ট, এখন মিডিয়ার সঙ্গে কথা বলবেন না। তদন্তে অসুবিধা হবে। আর, ইয়ে, আপনার বাড়িতে আমাদের কাজ শেষ। আপনি আজ থেকেই থাকতে পারেন।” বলে একটু ইতস্তত করে বললেন, “অবশ্য যদি কাউকে দিয়ে পরিষ্কার করিয়ে নিতে পারেন... অনেকটা রক্তারক্তি কাণ্ড তো...”
প্রদীপ চলে যাবার পরে পাশের ঘর থেকে আর একজন এসে ঢুকলেন।
“কী বুঝলে প্রসূন?”
প্রসূন, অন্য অফিসার, তাঁর বয়েস অনেকটাই কম, একটু ইতস্তত করে বললেন, “সেরকম তো কিছু বুঝলাম না, স্যার। আপনার কিছু মনে হল?”
“বলা যায় না, প্রসূন, বলা যায় না। মনে রেখো, সব অ্যাঙ্গেল ভাবতে হবে। আর তাছাড়া, চিফ সেক্রেটারির ফোনটা ভুলো না। মিস্টেক হলে আর দেখতে হবে না।”
রাস্তায় পৌঁছতে না পৌঁছতেই প্রদীপের ফোনটা বাজতে শুরু করল। শ্বশুরবাড়ির নম্বর। গতকাল রাতে পুলিশ বলেছিল খবর ওরাই দিয়েছে। যতক্ষণে প্রদীপকে ওরা ছেড়েছিল ততক্ষণে আর ফোন করার সময় ছিল না। পুলিশ কাল খবর দিয়েছিল?
“হ্যালো?”
মৌলির কাকার গলা এল। “তোমাকে কি পুলিশ ছেড়েছে?”
“ছেড়েছে মানে আমি এখন সি-আই-ডির অফিস থেকে বেরোচ্ছি। কাল রাতেও একটা নাগাদ ফিরেছি। আজ দুপুরে কোর্টে যেতে বলেছে। ওই লোকদুটোকে নাকি কোর্টে তুলবে...”
“তাতে তোমার কী?” জানতে চাইলেন মৌলির কাকা।
“জানি না। বললেন সি-আই-ডি অফিস থেকে ওদের জিপেই যেতে। নইলে মিডিয়া ঝামেলা করবে।”
“মিডিয়া তো এখানে হামলে পড়েছে। সকাল থেকে রাস্তায় দশটা গাড়ি দাঁড়িয়ে। দরজা জানলা বন্ধ করে বসে আছি, আর টিভিতে ওই বন্ধ দরজার ছবিই দেখাচ্ছে।”
মিডিয়া এখনও প্রদীপকে যোগাযোগ করেনি... ভাগ্যিস...
কাকু বলে চলেছেন, “দাদা-বৌদির অবস্থা খুব খারাপ। আমার মনে হয় তুমি একবার এসো...”
“কোর্ট থেকে আসব।”
~পাঁচ~
বাড়িটা অন্ধকার, দরজা জানলা সব বন্ধ। হঠাৎ দেখলে মনে হবে কেউ নেই। রাস্তায়, দোকানে, বিক্রেতা, খরিদ্দার, প্রতিবেশীদের জানলায় নড়ে ওঠা পর্দার আড়ালে চোখ। আর সেই সঙ্গে সামনে সত্যিই সারি দিয়ে টিভির ও-বি ভ্যান। তাদের কেউ কেউ সামনে মাইক নিয়ে কথাও বলছে। ওখান দিয়ে প্রদীপ যাবেন কী করে?
পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে খেয়াল হল কোর্টে ঢোকার আগে পুলিশ অফিসার বলেছিলেন, “সুইচ অফ করে দিন,” কিন্তু এখনও চালু করেননি। বাড়িটা থেকে একটু দূরে দাঁড়িয়ে শ্বশুরমশাইয়ের মোবাইলে ফোন করলেন প্রদীপ। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ফোনটা ধরল আরতি – ওদের অনেক দিনের কাজের লোক। বেশিরভাগ ফোন ও-ই ধরে।
“হ্যালো?”
“আরতি, আমি প্রদীপ। বাইরে এসেছি। সামনে অনেক লোক। কী করে ঢুকব?”
আরতি বলল, “আমি বাড়ির পাশের দরজাটা খুলছি, দাদা। আপনি গেট খুলে ঢুকে পাশের দরজা দিয়ে আসুন।”
হনহন করে হেঁটে বাড়ির গেট খুলতে যাবেন, একজন কে যেন ছুটে এসে মুখের সামনে একটা মাইক ধরে বলল, “আপনি প্রদীপ সেনগুপ্ত? আপনাকে একটা প্রশ্ন করতে পারি?”
প্রদীপ প্রায় ধাক্কা মেরে সরিয়ে দিয়ে ভেতরে ঢুকে গেট বন্ধ করে দিলেন। ভাগ্যিস গেটটা বড়ো এবং লোহার পাত দিয়ে তৈরি। তাই এক ছুটে দরজায় পৌঁছলেন আর কোনও বিপত্তি ছাড়াই। দরজাটা একটু ফাঁক করে দাঁড়িয়ে ছিল আরতি। প্রদীপ ঢোকামাত্র দরজাটা আবার বন্ধ করে দিয়ে বলল, “সকাল থেকে রিপোর্টারের জ্বালায় আমরা এক্কেবারে জেরবার। মেসোমশাই বলেছেন, কোনও ফোন ধরবে না। দরজা খুলবে না।”
বলতে বলতে আরতি ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল। “দাদা, কী হয়ে গেল?”
কী বলবেন প্রদীপ? চুপ করে রইলেন। আরতি চোখ মুছতে মুছতে বলল, “ভেতরে এসো।”
প্রদীপ বললেন, “মেসোমশাই, মাসীমা কোথায়?”
“শুয়ে আছেন। দুজনেই কাল থেকে কিছু খাননি। তুমি ভেতরে এসো।”
দরজার পাশে জুতো খুলতে খুলতে প্রদীপ বললেন, “তুমি আগে গিয়ে বলো আমি এসেছি।”
অন্ধকার ঘরে আলো জ্বালল আরতি। মৌলির বাবা খাটে আধশোয়া। মা পাশ ফিরে শুয়ে। শ্বশুর খাট থেকে নামলেন। শরীরটা থরথর করে কাঁপছে। প্রদীপ তাড়াতাড়ি গিয়ে ধরলেন। ভদ্রলোকের বয়স বেশি না, শরীরও শক্ত। কিন্তু আজ বুড়িয়ে গিয়েছেন।
বললেন, “মা তো কাল থেকে ওঠেননি।”
প্রদীপ বললেন, “আপনি উঠলেন কেন? বাথরুম যাবেন?”
উনি বোকার মতো খানিকক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললেন, “না, এই তো গেলাম।”
প্রদীপের শাশুড়ি উঠে বসলেন। বললেন, “এই আশা করে তোমার হাতে মেয়ে দিয়েছিলাম?”
শ্বশুরমশাই বাধা দিয়ে বললেন, “আহা, শিখা, ওরকম বলতে নেই।” উনি উত্তর না দিয়ে শুয়ে পড়লেন আবার।
বাইরের ঘরে প্রদীপকে নিয়ে গিয়ে মৌলির বাবা বললেন, “খেয়েছ?”
দুপুরে ব্যানার্জীবৌদি জোর করে দুমুঠো ভাত আর ডাল তরকারি খাইয়েছিলেন। খিদে পাচ্ছে। বললেন, “হ্যাঁ, খেয়েছি। ব্যস্ত হবেন না।”
আড়চোখে দেওয়াল ঘড়ি দেখলেন। প্রায় সাতটা বাজে। খিদে পাওয়াই স্বাভাবিক।
“কোথায় খেয়েছ? অফিসে? অফিস গেছিলে?”
“না। অফিস যাইনি। কোর্টে যেতে হয়েছিল। অফিস থেকে ফোন করেছিল, বড়োসাহেব বলেছেন এখন ক’দিন না আসলেও চলবে।” বলতে বলতে প্রদীপের গলা ধরে এল। কিন্তু এখানে কান্না সমীচিন হবে না। তাই জোর করে থামালেন – কিন্তু কথাও আটকে গেল।
ভিতরের ঘরের দরজায় মৌলির মা। আরতির হাত থেকে কী নিচ্ছেন। ঘরে ঢুকলেন হাতে একটা বাটি নিয়ে। পিছনে আরতি। আরতি বলল, “দাদা, একটু চিঁড়ে দুধ খেয়ে নাও।”
মৌলির মা প্রদীপের সামনে বাটিটা রেখে মাটিতে বসে প্রদীপের হাঁটু ধরে হাউ হাউ করে কেঁদে ফেললেন। বললেন, “আমার মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছে, প্রদীপ। আমাকে ক্ষমা করে দাও।”
প্রদীপ কী বলবেন? দাঁড়াতে পারছেন না। পায়ে মায়ের ওজন।
ঘরে ঢুকলেন মৌলির কাকীমা। ওঁরা বাড়ির দোতলায় থাকেন। মৌলির জ্যেঠু থাকেন বেহালায়।
“দিদি, এরকম করে না, এসো, ওঠো।”
যন্ত্রচালিতের মতো উঠে গেলেন মৌলির মা।
প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই বেজে উঠল ফোনটা। সি-আই-ডি অফিসার অর্ধেন্দু দাস।
“দুই মক্কেল খুন কবুল করেছে। অবশ্য না করেও কোনও উপায় ছিল না।”
বেশ...
“আর একটা কথা বলার ছিল। আপনাকে নানা মিডিয়া খুঁজে বেড়াচ্ছে। আমাদের কাছে খবর ওরা কেউ কেউ ফাইনালি আপনার মোবাইল নম্বর জোগাড় করেছে আপনার অফিসের কারও কাছ থেকে। কিন্তু আপনার ফোন অফ ছিল বলে যোগাযোগ করতে পারেনি। আমার রিকোয়েস্ট, আপনি কাউকে কোনও ইনটারভিউ দেবেন না। আমাদের তদন্তে অসুবিধে হতে পারে।”
ভদ্রলোক কয়েক ঘণ্টা আগেই এ কথা প্রদীপকে বলেছেন।
লাইন কেটে শ্বশুরমশাইকে সব কথা বললেন প্রদীপ। উনি মাথা নেড়ে বললেন, “আমি কোনও রিপোর্টারকেই ঢুকতে দিইনি।” এইটুকু সময়ের মধ্যেই ভদ্রলোক খানিকটা আত্মস্থ হয়েছেন।
কথা শেষ না হতেই ফোন বাজল। অপরিচিত নম্বর। একটু ইতস্তত করে উত্তর দিলেন প্রদীপ।
“মিঃ প্রদীপ সেনগুপ্ত কথা বলছেন?” অপরিচিত মহিলাকণ্ঠ।
“বলছি।”
একটা বাংলা চ্যানেলের নাম করে মেয়েটি বলল, “আপনার বাড়িতে কাল যে দুর্ঘটনা ঘটেছে, সেই সম্বন্ধে আপনার একটা ইন্টার্ভিউ নিতে চাই...”
প্রদীপ কথা কেটে বললেন, “আমাকে পুলিশের তরফ থেকে বারণ করা হয়েছে কিছু বলতে।”
মেয়েটি ইনিয়ে বিনিয়ে কথা চালিয়ে যেতে লাগল। প্রদীপ একবার ভাবলেন, জিজ্ঞেস করতেন, আপনার নিজের বাড়িতে এরকম ঘটলে কি আপনি নিজের ইন্টার্ভিউ নিয়ে টিভিতে প্রচার করতেন? তারপরে মনে হল যে এ-দেশের সংবাদমাধ্যমের মধ্যে এই রুচিবোধটুকু কোনও পর্যায়েই নেই। সাংবাদিকদের খবর সংগ্রহ করা বা জনগণের কাছে সেই খবর পেশ করার ধরণ সম্বন্ধে কোনও রকম ভিন্নমতের প্রতি তাঁদের যে প্রতিক্রিয়া দেখা যায়, তাতে সেটা স্পষ্ট। ফোন কেটে দিলেন।
তাতে রেহাই পেলেন না। পর পর ফোন আসতে লাগল। বিভিন্ন টিভি চ্যানেল আর খবরের কাগজের সাংবাদিকরা নাকি তাঁদের দর্শক-শ্রোতা-পাঠকের কাছে প্রদীপবাবুর স্ত্রীবিয়োগের পর ওঁর ব্যক্তিগত অনুভূতির কথা পৌঁছে দিতে চান – না হলে আকুল দর্শক-শ্রোতা-পাঠকমণ্ডলীর কাছে তাঁরা হেয় হয়ে যাবেন। এবং সেই জনগণেরই বা কী হবে, যাঁদের প্রদীপবাবুর ব্যক্তিগত কথা না জেনেই দিন কাটাতে হবে!
পাঁচ ছটা এমন ফোনের পর শ্বশুরমশাই বিরক্ত হয়ে বললেন, “ফোনটা অফ করে দাও।”
“পুলিশ যদি ফোন করে?”
“নিকুচি করেছে...” বলে শ্বশুরমশাই কী বলতে যাবেন, ফোনটা আবার বেজে উঠল। এবার টেবিলের ওপার থেকে, “আমি দেখি?” বলে উনিই ফোনটা ধরলেন। “আবার সাংবাদিক,” বলে ফোনটা না-কেটেই নামিয়ে রাখলেন টেবিলের ওপর। বললেন, “তুলিকে ডাকি। আজকালকার মেয়ে, এসব ব্যাপারে অনেক ওয়াকিবহাল।”
তুলি মৌলির খুড়তুতো বোন। সবে স্কুল শেষ করে কলেজে ঢুকেছে। স্মার্ট, ঝকঝকে সপ্রতিভ। এবং ইলেকট্রনিক্সে ওস্তাদ। তাই সবাই ওকে স্কুল শেষে ক্লাস ইলেভেনে জোর করে সায়েন্স পড়াতে চাইলেও ও একেবারে রাজি হয়নি। হিউম্যানিটিজ পড়বে। এখন যাদবপুরে ইংরিজির ছাত্রী।
কাকীশাশুড়ি এসে বসলেন পাশে।
“কী কান্নাই না কেঁদেছে সকাল থেকে। ওকে তো রাতে বলা হয়নি। দু’বোন তো হরিহরাত্মা ছিল।
রাতে কে খবর দিয়েছিল ওঁদের? পুলিশ, না সংবাদমাধ্যম?
প্রশ্নটা কী ভাবে করবেন? ভাবতে ভাবতেই শ্বশুরমশাইয়ের সঙ্গে তুলি এসে পড়ায় আর করতে হল না।
তুলির চোখমুখও ফোলা। কিন্তু এখন সামলেছে খানিকটা।প্রদীপের দিকে একটা ম্লান হাসি হেসে বলল, “ফোনটা দাও।”
প্রদীপ দিলেন। তুলি খানিকক্ষণ নাড়াচাড়া করে বলল, “শুধু রিপোর্টারদের ফোন আসবে না, এমন তো হবে না, তবে এমনটা করতে পারি যে কোনও অপরিচিত নম্বর থেকে ফোন আসবে না। চলবে?”
প্রদীপ ভাবলেন। বললেন, “এখন ভয় শুধু যদি পুলিশ ফোন করে আমাকে না পায় – সেটা চলবে না। এ ছাড়া অন্য উপায় না থাকলে তা-ই কর, কিন্তু কী করছিস বলে দিস।”
কী একটা করে ফোনটা ফেরত দিয়ে তুলি বলল, “এই নাও। হয়ে গেছে।”
“কী করলি?”
“বুঝবে না। ব্যাস, এখন সেভড নাম্বার ছাড়া অন্য কোনও নম্বর থেকে ফোন আসলে বাজবেই না।”
“এটা এরকমই রয়ে যাবে?”
“না। যখন চাইবে তখন বদলাতে পারবে।”
“আমার দ্বারা হবে না। তোকেই করে দিতে হবে। আমি অর্ধেন্দু দাসকে বরং ফোন করে বলে দিই...”
হঠাৎ মৌলির বাবা বললেন, “প্রদীপ, তুমি বোধহয় রাত্তিরে ঘুমোওনি। একটু শুয়ে নেবে?”
প্রদীপ বলল, “আপনারাও নিশ্চয়ই ঘুমোননি। আমি শোব, আর আপনারা...”
“সেইজন্যই বলছি,” বললেন মৌলির বাবা। “তুমি একটু শোও। মৌলির ঘরে তুমি শুয়ে পড়ো একটু।”
মৌলির ঘরে! চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়লেন প্রদীপ। “না, না। তার দরকার হবে না। আমি বরং...”
“তুমি বরং ওপরে এসে আমাদের বাড়িতে শোও,” বলল তুলি। “ছোজ্জেঠু, প্রদীপদাকে এখন দিদিভাইয়ের ঘরে না শুতে দেওয়াই ভালো।”
সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে প্রদীপের আর একটা কথা খেয়াল হল।
“বাবলুদাকে খবর দেওয়া হয়েছে?” বাবলু মৌলির দাদা। হোটেল ব্যবসায়ী।
“না। কাল যখন ফোন করা হয়, তখন ফোন বন্ধ। মালডিভসে ফোন করে জানা গিয়েছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ গেছে। ইমেইল করেছি সকালে – যেখানেই পৌঁছোক, ও-ই ফোন করবে।
~ছয়~
পরদিনও অফিসে আবহাওয়াটা থমথমে। রিটা জীবনে প্রথম শ্রীবাস্তবের কাছে ধন্যবাদার্হ। আগের দিন মাঝরাত অবধি টিভিতে খবর দেখে ও-ই মেসেজ করে জানিয়েছিল। সকালে মোবাইল চালু করে চমকে গিয়েরিটা চট করে টিভিতে খবর দেখে নিয়েছিল, দাদার হাতের কাগজটা টেনে নিয়ে পড়েও নিয়েছিল ঘটনাটা। নইলে এমনি দিনে অফিসে এসে তবেই খবরের কাগজ দেখার সময় পায়।
অফিসে আসার দশ মিনিটের মধ্যে সি-এম-ডি-র ঘর থেকে ডাক এসেছিল। বলা হয়েছিল, মিঃ সেনগুপ্ত আপাতত কিছুদিন আসবেন না – সুতরাং মিঃ রঙ্গরাজন ওঁর সব কাজ দেখবেন। যতদিন না সেই সব কাজ শেষ হচ্ছে, ততদিন রিটা রঙ্গরাজনের সেকেন্ড পি-এ।
রিটা আগের দিনের চিঠিপত্র আর পেন্ডিং কাজের ডায়েরি নিয়ে পি-এ স্মিতাকে দিয়ে এসেছিল, রঙ্গরাজনকে দেবার জন্য। আরও ঘণ্টাখানেক পরে রিটাকে ডেকে রঙ্গরাজন সব কাজই বুঝে নিয়েছেন, কিন্তু তার পরে আর ডাকেননি। কালকেও সারা দিন হাঁ করে বসেছিল, আজও এখন অবধি সেই অবস্থা। খবরের কাগজগুলো পড়া শেষ করে রিটা হাঁ করে কম্পিউটারের মনিটরের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। কিছুই করার নেই। মাঝে মাঝে বাঁ হাতের মাঝের আঙুলের নখটায় হাত লাগছে, মনে হচ্ছে একটা খোঁচা লাগছে, কিন্তু দেখতে পাচ্ছেন না কিছুই। ব্যাগ থেকে নেইল ফাইলটা বের করে ঘষে নিলে হয়, কিন্তু সিটে বসে সেটা করা বারণ। ওয়াশরুমে যাওয়ার এনার্জি পাচ্ছে না।
একদৃষ্টে কোনও দিকে না চেয়ে বসেছিল বলে ব্যাঙ্কের আবহাওয়ার পরিবর্তনটা রিটার নজর এড়িয়ে গিয়েছিল। হঠাৎ মনে হল কেউ যেন স্যারের ঘরের দরজা খুলছে। মুখ তুলে তাকিয়েই চমকে উঠল। ত্রস্ত পায়ে উঠে সেনগুপ্তর পিছনে পিছনে দরজা খুলে ঢুকল। স্যার তখন চেয়ারে বসছেন। টেবিলে কোনও কাগজপত্র নেই দেখে মুখ তুলে জিজ্ঞেস করলেন, “আমার পরশুর পেন্ডিং কাজগুলো? চিঠি কয়েকটা দিয়েছিলাম...”
“ওগুলো সি-এম-ডি বললেন মিঃ রঙ্গরাজনকে দিতে...”
প্রদীপ সেনগুপ্ত ফোন তুলে রঙ্গরাজনের সঙ্গে কথা বলতে শুরু করলেন। বেশিক্ষণ লাগল না। ফোন নামিয়ে রাখলেন। সামনের টেবিলের কাচের দিকে তাকিয়ে আছেন। কিছু বলছেন না।
মোতিও লক্ষ করেছিল স্যার এসেছেন। কিছু না বলতেই কফি নিয়ে এসেছে। অন্যমনস্কভাবে থ্যাঙ্ক ইউ বলে অন্যমনস্কভাবেই কম্পিউটার চালালেন প্রদীপ।
এর পর কী করবে বা বলবে, রিটা সেটা ঠিক করতে পারছিল না। বাঁচালেন সি-এম-ডি। হঠাৎ দরজায় একটা টোকা পড়ল, দরজা খুলে ঢুকলেন অভয়ঙ্কর। “মাই বয়, লেট মি টেল ইউ হাউ স্যরি আই অ্যাম অ্যাবাউট দ্য মিসহ্যাপ...”
দরজা খুলে পালাল রিটা। খেয়াল হল সমবেদনাসূচক কোনও কথাই বলেনি ও স্যারকে।
“কী বললেন রসের নাগর?”
রিটা যথেষ্ট বাংলা জানে, কিন্তু শ্রীবাস্তবের এই শেষ কথাগুলোর অর্থ বুঝতে পারল না। বোকার মতো তাকিয়ে রইল।
“এখন তো বউ আর নেই। কী বলল? কোথায় যাবে কফি খেতে?”
রিটা আড়চোখে তাকিয়ে দেখল সুচেতাদি ওদের দিকেই দেখছে নিজের ঘর থেকে। একটু গলা তুলেই বলল, “আমার কাজ আছে, মিঃ শ্রীবাস্তব। আপনার যদি বিশেষ কিছু বলার না থাকে...”
শ্রীবাস্তব শুধু এই কথায় থামত? তবে তক্ষুনি অভয়ঙ্কর বেরিয়ে এলেন বলে বেঁচে গেল। চাপা গলায়, “তোমার ঘমণ্ড কী করে ভাঙতে হয় আমি জানি...” বলে শ্রীবাস্তবও ব্যস্ত পায়ে সি-এম-ডির পিছনে হাঁটা দিল।
রিটার মাথা ঘুরতে শুরু করেছিল। সবে বসতে যাবে, খেয়াল হল সুচেতাদি নিজের ডেস্ক ছেড়ে উঠে এসেছে। সুচেতাদি অনেক সিনিয়র। নিয়ম মতো ওরই সি-এম-ডি-র পি-এ হবার কথা, কিন্তু সি-এম-ডি সঙ্গে করে নিজের পেয়ারের পি-এ নিয়ে এসেছেন বলে সুচেতাদি এখন প্রেসিডেন্টের পি-এ। শ্রীবাস্তবের মতো নিজের অফিস আছে, কিন্তু সেই অফিসের কাচের ভেতর দিয়ে পুল টেবিলগুলো দেখতে পায়।
“কী বলছিল রে?”
অল্প কথায় আজকের আর আগের দিনের ঘটনা বলল রিটা।
“টেকনিকালি এটা সেক্সুয়াল হ্যারাসমেন্ট। আমি সেদিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে কথা বলেছি। উনিও লোকটাকে দেখতে পারেন না মনে হল। বললেন কমপ্লেন করতে। যা যা করেছে, তাতে ওর এক্ষুনি চাকরি যাবে। করবি কমপ্লেন?”
করবে? তারপরে কী হবে? কী কী হতে পারে ভাবতে গিয়ে রিটার চোখে জল ভরে এল। বলল, “সুচেতাদি, চাকরিটা আমার খুব দরকার।”
“দূর বোকা মেয়ে,” সুচেতাদি সস্নেহে বকলেন। “আচ্ছা, অফিসের মধ্যে আর এসব কথা বলে কাজ নেই। আজ আমরা পাঁচটার পরে কফি খেতে যাব, কেমন?”
ঘাড় নাড়ল রিটা।
নিজের ঘরের দিকে ফিরতে ফিরতে সুচেতাদি ফিরে বললেন, “টেনশন করিস না। বিগ সিস্টার ইজ ওয়াচিং ওভার ইউ।”
ফোনটা বাজতে শুরু করেছে। রিটা তুলে কানে লাগান’মাত্র শুনতে পেল, “সুচেতাদিও বাঁচাতে পারবে না।”
লাইনটা কেটে গেল।
রিটা ঘামতে শুরু করেছে। কাঁপা হাতে ফোনটা নামিয়ে রাখামাত্র আবার বাজল। রিটা স্তম্ভিতের মতো তাকিয়ে রইল। ফোনটা তোলার ক্ষমতাও নেই। দু-চারবার বাজার পরে রিটা খেয়াল করল আসেপাশের টেবিল থেকে সবাই তাকিয়ে আছে। টেবিলে কেউ বসে রয়েছে, অথচ ফোন ধরছে না, এটা এই অফিসের দস্তুর নয়। হাতের তেলোটা শাড়িতে মুছে নিয়ে রিটা ফোন তুলে হ্যালো বলতে গিয়ে একটা ফিশফিশে স্বর বেরোল।
“মিস গোমেজ?” প্রদীপ সেনগুপ্তর গলায় বিস্ময়। “আপনার কিছু হয়েছে?”
~সাত~
দুটো দিন আরও কেটেছে। এর মধ্যে প্রদীপ মৌলিদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছেন। পরদিন সন্ধেবেলা অবধি ঠিক ছিল, কিন্তু তার পর থেকে মৌলির বাবা-মা, বেহালা থেকে দেখা করতে আসা জ্যেঠুদের মধ্যে যেন একটা পরিবর্তন লক্ষ করছিলেন। কেউ সরাসরি কিছু বলছেন না, কিন্তু কথাবার্তায়, নিজেদের মধ্যের আলোচনায় বার বার শুনতে হয়েছে – যদি মেয়েটা বাড়ি থেকে অত দূরে ওই গোবিন্দপুরে গিয়ে না থাকত, যদি একটা একান্নবর্তী ফ্যামিলিতে বিয়ে হত, এবং শেষ অবধি যখন মৌলির জেঠিমা প্রায় বলেই ফেললেন যে উনি চানইনি যে মৌলি প্রদীপকে বিয়ে করে, তখনই ঠিক করলেন – এখানে আর না। সেদিনই, কাজ আছে, বলে বেরিয়ে এসেছিলেন। যাবার আগে অবশ্য মৌলির কাকু, কাকীমা আর তুলি বলবার চেষ্টা করেছিল এসব কথায় কান না দিয়ে ওদের বাড়িতেই থাকতে, কিন্তু দাদা-ভাইয়ের একটা খারাপ সম্পর্ক তৈরি হোক, প্রদীপ চাননি। বেরোবার সময় কাকীমা চোখ মুছে বলেছিলেন, “কিন্তু যখন চাইবে, চলে এসো।” সেটাও আর হবে কি না, প্রদীপ জানেন না।
অফিসে যান, কাজে মন লাগে না। বাড়িতে বসে থাকলে স্মৃতি কুরে কুরে খায় আর ব্যানার্জীদার উপদ্রব বেড়ে চলে। রোজই একবার না একবার হয় পুলিশের ফোন পান – কখনও ডেকেও পাঠান অফিসে। তদন্ত এগোয়নি। লিটন আর পুঁটে খুচরো মস্তান হলেও বেশ টেঁটিয়া। কিছুতেই ভাংছে না কার কাছ থেকে বরাত পেয়ে খুন করতে এসেছিল... ও, হ্যাঁ, নিশ্চিন্ত থাকুন, কেউ টাকা দিয়েই এ কাজ করিয়েছে। “এমনি এমনি খিদিরপুরের মাস্তান সল্ট লেক অবধি এসে খুন করে না। বি শিওর।”
প্রদীপ সেনগুপ্ত বুঝতে পারেন না। মৌলিকে কেউ টাকা দিয়ে খুন করিয়েছে! কেন? কী উদ্দেশ্য থাকতে পারে কার?
চতুর্থ দিনে ঘটনাটা ঘটল।
রিটা সবে ফাইলটা নিয়ে সেনগুপ্তর দরজায় টোকা দিয়ে ঢুকেছে, প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই দরজা ঠেলে ঢুকল তিন জন পুলিশ অফিসার।
খোলা দরজা দিয়ে রিটা দেখল দু-জন পুলিশ দরজার বাইরে দু-দিকে পাহারার মতো দাঁড়িয়ে।
তিনজন পুলিশের মধ্যে যিনি দৃশ্যত সিনিয়র, তাঁকে দেখে সেনগুপ্ত স্যার দাঁড়িয়ে উঠে বললেন, “আরে, আসুন আসুন, কী হল?”
অর্থাৎ, প্রদীপ সেনগুপ্তর সঙ্গে ওঁর আগে দেখা হয়েছে।
কিন্তু পুলিশ অফিসারের গলায় কোনও বন্ধুত্বপূর্ণ সুর শুনতে পেল না রিটা। বসলেনও না। বললেন, “আপনাকে আমাদের সঙ্গে যেতে হবে মিঃ সেনগুপ্ত।”
প্রদীপ সেনগুপ্তর মুখ থেকে হাসিটা মিলিয়ে গেল। বললেন, “এখনই?”
“মিঃ সেনগুপ্ত,” পুলিশ অফিসার গম্ভীর গলায় বললেন, “আপনি ব্যাপারটা বুঝতে পারছেন না, না আমি বোঝাতে পারছি না? আপনি কি আমাদের সঙ্গে আসবেন? না হলে আমরা আপনাকে অ্যারেস্ট করে হাতকড়া লাগিয়ে নিয়ে যাব। আপনার অ্যারেস্ট ওয়ারেন্ট আমাদের সঙ্গে রয়েছে।”
দরজার বাইরে উৎসুক ব্যাঙ্ক কর্মীদের উঁকিঝুঁকি শুরু হয়েছে।
হতভম্ব প্রদীপ সেনগুপ্ত বললেন, “আপনি আমাকে অ্যারেস্ট করছেন? কেন?”
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে পুলিশ অফিসার শ্লেষভরা স্বরে বললেন, “নাঃ আপনি দেখছি বোঝেন সত্যিই কম। না, আপনাকে আমরা কোনরে দড়ি, হাতে হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে যেতে চাই না। আপাতত কিছু জিজ্ঞাসাবাদ করতে চাই। তবে আপনি যদি কোঅপারেট না করেন, সেগুলো করতে হেজিটেট-ও করব না।”
কথা বলতে বলতে অফিসার সরে গিয়ে সেনগুপ্ত স্যারের বেরোন’র রাস্তা করে দিলেন। প্রদীপ সেনগুপ্ত কিংকর্তব্যবিমূঢ়ের মতো এদিক ওদিক দেখলেন, একবার রিটাকে কী বলতে গেলেন, তারপরে কলমটা বন্ধ করে, টেবিলের কাগজগুলো একটু গুছিয়ে, রিটার দিকে আর একবার তাকিয়ে বেরিয়ে গেলেন। সঙ্গে সঙ্গে পুলিশরাও চলে গেল।
রিটা আস্তে আস্তে স্যারের টেবিলের খোলা কাগজপত্র গোছাতে শুরু করে দিল। ব্যাপারটা কী ঘটেছে প্রদীপ সেনগুপ্ত না বুঝলেও, রিটা ঠিকই বুঝেছে। পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে স্যারকে। এই ফাইলগুলো জরুরী। সেনগুপ্ত স্যারকে সি-এম-ডি নিজে ডেকে দিয়েছেন। এগুলো ফেলে রেখে ঘর থেকে বেরোনও ঠিক হবে না। কিন্তু কী করবে? ভেবেচিন্তে সি-এম-ডির ঘরে ফোন করল রিটা।
সঙ্গে সঙ্গে শ্রীবাস্তব বলল, “তা, তুমি ওগুলো আগলে একটু বসো। আমি পরে গিয়ে নিয়ে আসছি। আর এখন তো সেনগুপ্ত আর নেই, আমার দিকে তাকান’র কি সময় পাবে একটু? দেখো, তোমার ভালোর জন্যই বলছি - এখন সেনগুপ্তর সব বিষয় কিন্তু ব্যাঙ্ক খতিয়ে দেখবে। তোমার সঙ্গে ওর কী সম্পর্ক ছিল, সেটা আমি যাতে পাবলিক না করে দিই, সেটাও তো তোমার দেখা উচিত।”
ফোনটা নামিয়ে রেখে একটু ভাবল রিটা। তারপরে ফাইলগুলো গুছিয়ে নিয়ে অভয়ঙ্করের ঘরে ঢুকল। সি-এম-ডি-র ঘরের বাইরের চেম্বারে শ্রীবাস্তব বসে। সেই ঘর দিয়ে ঝড়ের মতো চলে গিয়ে যখন ভিতরের ঘরে ঢুকল, তখন অভয়ঙ্কর জরুরি মিটিঙে ব্যস্ত। ফাইলটা পাশে রেখে রিটা বিনা বাক্যব্যয়ে আবার ঘুরে বেরিয়ে গেল।
“হোয়াট ইজ দ্য মিনিং অফ দিস?” ভয়ানক ভ্রূকুটি করে অভয়ঙ্কর মুখ তুলে তাকালেন। এই মুখ দেখলে অফিসে নাকি সকলেরই হাঁটু কাঁপে। কিন্তু রিটা ততক্ষণে প্রায় দরজার বাইরে। স্প্রিং লাগানো দরজা বন্ধ হবার আগেই অভয়ঙ্কর বাজখাই গলায় হাঁক দিয়েছেন, “শ্রীবাস্তব!”
রিটা তখন সে ঘর থেকেও বেরিয়ে যাবার মুখে। ‘দেখে নেব,’ গোছের একটা দৃষ্টি তার দিকে ছুঁড়ে দিয়ে শ্রীবাস্তব দৌড়ে ঢুকল বসের ঘরে - হাঁটুর কাঁপুনি সামলাতে সামলাতে।
“আসক দ্যাট গার্ল টু কাম ব্যাক অ্যান্ড এক্সপ্লেন হার ইন্‌সাবরডিনেশন।
শ্রীবাস্তব বেরিয়ে প্রথমে হাঁটা দিল রিটার চেয়ারের দিকে। খানিকটা গিয়ে লক্ষ করল যে রিটা ব্যাঙ্কের বাইরের দরজা দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। আবার ছুটে বাইরের দরজায় যতক্ষণে পৌঁছেছে, রিটাকে ততক্ষণে আর দেখা যাচ্ছে না।
কিংকর্তব্যবিমূঢ় শ্রীবাস্তব ফিরে আসার আগেই অভয়ঙ্কর ফাইলটা দেখে ব্যাপারটা আন্দাজ করে নিয়েছেন। তাই শ্রীবাস্তবকে আর বকুনি দিলেন না। শুধু বিরক্তির ভুরু কুঁচকে বললেন, “এইচ-আর হেড-কে জানিয়ে রাখো কী হয়েছে, আর ও কাল আসলেই যেন এইচ-আর-এ রিপোর্ট করে।”
~আট~
“মিঃ সেনগুপ্ত, আপনার স্ত্রী যেদিন মারা গেলেন, সেদিন সকাল থেকে আপনার অ্যাক্টিভিটি কী কী ছিল?”
এগুলো পুলিশ আগেও প্রদীপকে জিজ্ঞেস করেছেন, কিন্তু সেদিন মনোভাব অনেক বন্ধুত্বপূর্ণ ও সহানুভূতিশীল ছিল। কাল অবধিও ছিল। আজ কী হল?
“সেদিন আমি সকালে ব্রেকফাস্ট করে রওয়ানা দিই অফিসে আমার রেগুলার টাইমে...”
“কী খেয়েছিলেন ব্রেকফাস্টে?”
“কর্নফ্লেক্স আর দুধ। সেই সঙ্গে চা...”
“বেশ মনে আছে দেখছি, এতদিনের কথা?”
একটু অবাক হলেন প্রদীপ। “আমি তো রোজই একই ব্রেকফাস্ট করি, তাই...”
“বেশ। রেগুলার টাইমে বেরোলেন মানে কটায়?”
“নটা।”
“কোথায় গেলেন?”
“ব্যাঙ্কে।”
“সোজা?”
“হ্যাঁ। নটা পঁয়তাল্লিশের মধ্যে ঢুকি। বাড়ি থেকে আধঘণ্টা থেকে চল্লিশ মিনিট লাগে।”
“তারপর?”
“তারপরে তো ব্যাঙ্কেই ছিলাম।” এ সব প্রশ্নের কী অর্থ বুঝতে পারছেন না প্রদীপ। কিন্তু অর্ধেন্দুর মুখ দেখে কিছু জিজ্ঞেস করতে সাহসও হচ্ছে না।
“আমরা আপনার মোবাইল ফোন সারভিস প্রোভাইডারের কাছে যে ডিটেল পেয়েছি, তাতে দেখছি আপনার স্ত্রী আর আপনি সকাল থেকে বহুবার ফোনে কথা বলতেন। এবং বিয়ের পর ওনার ফোনের সংখ্যা বেড়ে গিয়েছিল।”
ঠিক। মৌলির একা লাগত, দুপুরের পর থেকে ফোনও বেশি করত।
“ঠিক।” অর্ধেন্দুও একমত। “নতুন বিয়ে করে এসে একা একা অসুবিধা হয় বইকি।”
খানিকক্ষণ চুপচাপ। অর্ধেন্দুর হাতে একটা কম্পিউটার প্রিন্ট-আউট। সেটার দিকে তাকিয়ে আছেন আর খানিক পর পর মুখ তুলে তাকাচ্ছেন। কিছু বলছেন না।
প্রদীপের অস্বস্তি হতে শুরু করল। কী হতে চলেছে?
“কিন্তু,” খুব আস্তে আস্তে শুরু করলেন আবার। “সে দিন, শেষ ফোন হয়েছে দুপুরের আগে। তার পর থেকে আর কোনও ফোনের রেকর্ড নেই। কিছু টেক্সট মেসেজ আছে মৌলিদেবীর তরফ থেকে আপনার ফোনে। কিন্তু আপনার তরফ থেকে নেই কেন?”
সেদিনের মিটিং, এবং তার পরে ফোন সাইলেন্ট থেকে যাওয়ার কথা বললেন প্রদীপ।
“দুটোর সময় ছিল মিটিং। তার পরে আপনি দেখছি পাঁচটার পরে একটা মেসেজ করেছেন। অর্থাৎ, তিন ঘণ্টা আপনি জানেনই না যে আপনার ফোন বন্ধ ছিল?”
কথাটা ঠিক। তিন ঘণ্টা। তার মধ্যে মৌলি অজস্র ফোন করেছিল।
“ঠিক বন্ধ নয়। সাইলেন্ট ছিল। মিটিঙের পর চেঞ্জ করতে ভুলে গিয়েছিলাম।”
“আপনি কি একবারও ভেবে দেখেছেন, যে ওই সময়ে মিসেস সেনগুপ্ত যদি বিপদের মধ্যে আপনাকে ফোন করতেন, তাহলে আপনাকে পেতেন না?”
একবার নয়। এক লক্ষ বার। কিন্তু একটা কথা ভেবে সান্ত্বনা দেবার চেষ্টা করেছেন নিজেকে – শেষ মিসড কল ছিল বিকেল তিনটের সময়। কিন্তু তারও পরে অন্তত চারতে কুড়ি অবধি মৌলি এস-এম-এস করেছে, যার সুর ছিল বেশ ইয়ার্কি মার্কা।
সেটা কি এই সময়ে পুলিশকে বলা ঠিক হবে?
জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি কি ওই প্রিন্ট আউটে মৌলির করা মিস্‌ড কল-এর লিস্ট পেয়েছেন?”
অর্ধেন্দু অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন, “আপনি কি জানেন না, যে ফোন কম্পানির বিলে শুধু কমপ্লিটেড কল-এরই রেকর্ড থাকে, মিস্‌ড কল রেকর্ডই হয় না?”
ফোন কম্পানির বিল-এ কী কী থাকতে পারে, সে সম্বন্ধে প্রদীপের কিছু আন্দাজ আছে। এর আগে যাদের সঙ্গে ব্যাঙ্কের বোঝাপড়া ছিল, তারা এমন সব ফোনের বিল পাঠাত, যেগুলোর আজগুবিত্ব নিয়ে কারওর কোনও সন্দেহ থাকত না। সুতরাং তারা কী কী রেকর্ড রাখতে পারে, তা প্রদীপ জানেনও না।
এত কথা কি বলবেন? কিন্তু মৌলির কখন ফোন করেছিল আর কখন মেসেজ লিখেছিল, সেটা না বললে যদি পুলিশ অফিসার নিজে ভেবে না পান?
বলেই ফেললেন।
একটু ম্লান হেসে অর্ধেন্দু বললেন, “বাঃ, বেশ তৈরি উত্তর তো! আমি দেখেছি সেটা। আপনার ফোনটা নিয়েছিলাম পরদিন সকালেই। মৌলিদেবী আপনাকে শেষ কল করেছেন, যেটা আপনি ধরেননি, তিনটে ষোলো মিনিটে। আর শেষ মেসেজ করেছেন চারটে ছাপ্পান্ন। সেটা আপনার ফোনে এসেছে চারটে সাতান্ন মিনিটে। আপনি তারপরে পাঁচটা আট মিনিটে লিখেছেন, ‘কামিং, ড্রাইভিং।’ ব্যাস। এই শেষ।”
‘শেষ’ কথাটা হঠাৎ কেমন ধাক্কা দিল - শেষ, সব শেষ। কত স্বপ্ন ছিল মৌলির। কত আশা। আজ শেষ।
“লিটন আর পুঁটের সঙ্গে আপনার কদিনের চেনা?”
অ্যাঁ? প্রদীপ খানিকক্ষণ কিছু বলতে পারলেন না। মনে হলো ভুল শুনছেন। লিটন আর পুঁটেকে তো উনি সেই বারাসাত কোর্টেই প্রথম...
“তাই বুঝি?” অর্ধেন্দুর ঠোঁটের কোণে ব্যঙ্গের হাসিটা ফিরে এসেছে। “তাহলে কবে ওদের হাতে টাকা দিয়ে বলেছিলেন মৌলিদেবীকে খুন করতে?
প্রদীপের চারিদিক অন্ধকার হয়ে আসছে? চিন্তা করতে তো অসুবিধা হচ্ছেই। মনে হচ্ছে দূর থেকে পুলিশ অফিসারের কথা ভেসে আসছে। “আপনি আর ডিনাই করতে পারবেন না, মিঃ সেনগুপ্ত। লিটন আর পুঁটে কনফেস করেছে। আপনি কী লোক মশাই? অতগুলো টাকা খরচ করে মেয়েটাকে মারতেই যদি হবে, তাহলে বিয়ে করেছিলেন কেন?” তারপর, “আপনি খুনি, মিঃ সেনগুপ্ত। আপনার স্ত্রীর খুন আপনিই করিয়েছেন।”
সব তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে প্রদীপের।
“আপনার কোনও উকিল আছে?”
উকিল? কোনও উকিলই চেনেন না প্রদীপ।
“আপনার যদি উকিল না থাকে তাহলে কোর্টের তরফ থেকে উকিল ঠিক করে দেওয়া হবে। আপাতত আপনি আমাদের সঙ্গে কোঅপারেট করুন।”
হঠাৎ প্রদীপের ভীষণ রাগ হল। বললেন, “আমার উকিল না থাকলে আমি কোঅপারেট করব না। আপনারা জানেন না, উকিলের উপস্থিতি ছাড়া আমাকে আপনারা জেরা করতে পারেন না?”
পুলিশ অফিসার অর্ধেন্দু যে হাসিটা হাসলেন, সেটাকে খিঁক-খিঁক ছাড়া কিছুই বলা যায় না।
“খুব ইংরিজি সিনেমা দেখা হয়, না? শুনুন মশাই, অত্তো নকল করে চলে না। আমাদের আইন অনু্যায়ী অবশ্য আপনি আপনার কোনও আত্মীয়কে খবর দিতে পারেন। কাকে ফোন করবেন?”
আত্মীয়? কানপুরে অশীতিপর বৃদ্ধা বিধবা কাকীমা? না কি ল্যুইজিয়ানায় খুড়তুতো দাদা?
“আত্মীয় বলতে তো আপনার কেবলমাত্র শ্বশুরবাড়ি, তাই না? তা, শ্বশুরমশাইয়ের মেয়েকে খুন করে তাঁকেই ফোন করে তো আর সাহায্য চাওয়া যায় না, কী বলেন?”
কী বলবেন, প্রদীপ?
দরজা অবধি হেঁটে গিয়ে অর্ধেন্দু ফিরলেন। বললেন, “ডাক্তার আসবেন আপনাকে পরীক্ষা করতে। হার্ট অ্যাটাক যদি তার আগে করতে পারেন, তাহলে আমার নামে দোষ দিতে পারবেন। তারপরে আর চান্‌স্‌ নেই।”
দরজা খুলে অর্ধেন্দু একজন শার্ট-প্যান্ট পরিহিত মাঝবয়সী ভদ্রলোককে নিয়ে এলেন। হাতে দুটো ব্রিফকেস। দুটো কেন? ভদ্রলোক দুটো বাক্সই টেবিলে রেখে বললেন, “আমার নাম ডাঃ বাসু। আপনার কোনও শারীরিক সমস্যা আছে?”
নেই।
ডাঃ বাসু একটা ব্যাগ থেকে স্টেথোস্কোপ বের করে প্রদীপের বুকে পিঠে বসাতে আরম্ভ করলেন। স্তম্ভিত প্রদীপের মাথা কি ঠিক কাজ করছে? নইলে ডাঃ বাসুর দিকে তাকিয়ে খালি একটাই প্রশ্ন মাথায় ঘুরছে কেন - আচ্ছা ওঁর মা-বাবা কি ওঁর নামই রেখেছিল ডাঃ বাসু? নইলে উনি কেন বললেন, ওঁর নাম ডাঃ বাসু?
কিন্তু কী যেন জিজ্ঞেস করছেন - “আপনার কোনও অ্যালার্জি আছে কি?”
জানেন না প্রদীপ। আজ অবধি অ্যালার্জি হয়নি।
ডাক্তার অন্য বাক্সটা খুলে একটা ই-সি-জি মেশিন বের করে বসা অবস্থাতেই প্রদীপের ই-সি-জি করলেন, তারপরে কাগজটা খানিকক্ষণ মন দিয়ে দেখে উঠে দাঁড়ালেন।
“হেল অ্যান্ড হার্টি। ফিট অ্যাজ আ ফিড্‌ল্‌,” বলে বেরিয়ে গেলেন।
অর্ধেন্দু এতক্ষণ চুপ করে দরজার পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। এখন সামনে এসে বসলেন।
“দেখলেন তো? শরীরে কোথাও কোনও সমস্যা নেই। এখন যা যা জিজ্ঞেস করব, লক্ষ্মী ছেলের মতো উত্তর দিন দেখি?”
নীরবে তাকিয়ে রইলেন প্রদীপ।
“কবে থেকে প্ল্যান করেছিলেন, মৌলিদেবীকে মারার?”
“আমি মৌলিকে মারিনি।”
“সে আমি জানি। প্ল্যান করেছিলেন কবে থেকে?”
“আমি প্ল্যান করিনি।”
“করেছিলেন। ভালো চান তো উত্তর দিন বলছি।”
উত্তর দেবেন না প্রদীপ। চোখ বন্ধ করে টেবিলে মাথাটা নামাবার জন্য নিচু করছেন, হঠাৎ বিরাশি সিক্কার একটা চড় এসে পড়ল গালে। “শালা...” কয়েকটা অকথ্য গালাগালির পরে অফিসার বললেন, “ভালো চাস তো উত্তর দে বলছি।”
তড়াক করে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন প্রদীপ। “তুই তোকারি কাকে করছেন? ভদ্রভাবে কথা বলতে জানেন না?”
“তবে রে,” বলে টেবিলের ওপার থেকে অফিসার এগিয়ে আসতে গিয়েছেন, প্রদীপ আঙুল তুলে বললেন, “খেয়াল রাখবেন, কাল আমাকে কোর্টে তুলতে হবে। আমি প্রথমেই জজকে বলব আপনি আমাকে কী ভাবে মারধর করেছেন।”
অর্ধেন্দু চুপ করলেন না, কিন্তু আর এগোলেনও না। ওখানে দাঁড়িয়েই গর্জন করতে লাগলেন।
দরজা খুলে গেল বাইরে থেকে। একজন অনেকটাই কমবয়স্ক অফিসার ঢুকল। “স্যার, এক মিনিট।”
দুজনে বেরিয়ে গেলেন।
কয়েক মিনিট কাটল। প্রদীপের বাঁ গালটা টনটন করছে। কানের মধ্যেও ভোঁ-ভোঁ। দাঁতেও কি ব্যথা করছে? বুঝতে পারছেন না।
আবার দরজা খুলল। ঢুকলেন দুজন অফিসারই। সামনে বসল কম-বয়সী। অর্ধেন্দু প্রদীপের বাঁদিকে। কথা শুরু করল জুনিয়র অফিসার।
“আমার নাম প্রসূন মজুমদার। আপনাকে কয়েকটা প্রশ্ন করব। দেখুন, লিটন আর পুঁটে আপনার স্ত্রীকে মেরেছে, এ বিষয়ে কোনও সন্দেহই নেই, দুজনে স্বীকারও করেছে। কিন্তু সেই সঙ্গে তারা এ-ও বলেছে, যে তারা আপনার নির্দেশেই টাকা পেয়ে কাজটা করেছে।”
“মিথ্যে কথা। আমি ওদের কোনও দিন চোখেই দেখিনি ওই আদালতে দেখার আগে।”
“তবে কি আপনি অন্য কারওর হাতে টাকা পাঠিয়েছিলেন?”
মাথা নাড়লেন প্রদীপ। “আমি কাউকে টাকা-পয়সা কিচ্ছু দিইনি। মৌলির মৃত্যুর পিছনে আমার কোনও হাত নেই।”
“এ শালাকে আড়ং ধোলাই না দিলে...” তেড়ে উঠেছিলেন অর্ধেন্দু। কিন্তু প্রসূন মজুমদার শান্তভাবেই বলেছিল, “আপনাকে আমরা মৌলিদেবীর খুনের অভিযোগে গ্রেপ্তার করছি, মিঃ সেনগুপ্ত।”
প্রদীপ সেনগুপ্তকে যে সেলটায় রাখা হল, সেটায় আর কেউ ছিল না। ফলে ঘরের এক কোণে মাটিতে বসে নিজের মতো নানা চিন্তায় মগ্ন হয়ে গিয়েছিলেন। কী হলো এটা? দুটো ছিঁচকে গুণ্ডা, যারা কোনও দিন প্রদীপকে দেখেনি, প্রদীপের সঙ্গে কোনও কথা বলেনি, তারা শহর ছেড়ে অন্য দিকে এসে মৌলিকে খুন করে গেল, আর ধরা পড়ার পর প্রদীপকে দায়ী করল। কেন? কোন হিসাবে এই ঘটনার তল পাবেন তিনি?
প্রসূন আর অর্ধেন্দুও একই বিষয়ে কথা বলছিলেন। “ব্যাপারটা আপনার স্ট্রেঞ্জ লাগছে না স্যার? প্রদীপ সেনগুপ্ত যদি ওনার ওয়াইফকে খুন করাতেই চাইবেন, তাহলে অনেক বেশি এফিশিয়েন্ট খুনি এমপ্লয় করতেন না কি? এই দুটো হাফ-বয়েল গুণ্ডা, যারা কোনও দিন সাকসেসফুলি গুণ্ডামী করেছে কি না সন্দেহ, তাদের অত টাকা কেউ দেয়? তার ওপর, এই দুজন প্রথমে মুখই খুলল না, আপনি নিজেই বললেন, একেবারে যেন ঘাঘু ক্রিমিন্যাল... তারপরে হঠাৎ প্রদীপ সেনগুপ্তকে ইমপ্লিকেট করল... তাহলে আগেই কেন করল না? প্রদীপ সেনগুপ্ত কোনও বিরাট আন্ডারওয়ার্ল্ড ডন নন, যে ভয়ে চুপ করে থাকবে, তাহলে?”
“অত তাহলে-তাহলে কোরো না প্রসূন। সন্দেহ হয়, তো প্রদীপ সেনগুপ্তর ব্যাকগ্রাউন্ড চেক করো গে যাও। আমার মনে হয় না সেটা আমাদের কাজ। এখন যা ইনফরমেশন পেয়েছি, তা দিয়েই কেস বিল্ড আপ করি। চার্জ শিট দিতে হবে। হোম সেক্রেটারি রোজ মাথা খাচ্ছে। আর হাজবেন্ড ওয়াইফ রিলেশনশিপ ভালো ছিল না। এমন কথাও শুনছি।”
“কোত্থেকে? এই তো সেদিন ওর শ্বশুর-শাশুড়ি দুজনেই বললেন এত হ্যাপি কাপ্‌ল্‌ ওনারা কল্পনাও করতে পারেন না।”
“আজ সকালে মৌলির বাবা ফোন করেছিলেন। যতটা ভালো মনে করেছিলেন ততটা নয়। আমি ডেকেছি অফিসে। কাল সকালে আসবেন। তুমিও থেকো।”
অর্ধেন্দু চলে যাবার পরেও প্রসূন খানিকক্ষণ ভুরু কুঁচকে বসে রইল। ভালো ঠেকছে না। কোথায় যেন হিসেবটা পুরো মিলছে না, অথচ কেস এগিয়ে চলেছে প্রদীপ সেনগুপ্তর বিরুদ্ধে। প্রেশার আছে বটে ওপর থেকে, কিন্তু এত হালকা ইনভেস্টিগেশনের ওপরে অর্ধেন্দু দাসকে এতটা এগিয়ে যেতে কখনওই দেখেনি প্রসূন।
~নয়~
কোর্ট। থইথই করছে লোক চারিদিকে। অর্ধেন্দু একবার মুখ ঘুরিয়ে বললেন, “রিপোর্টাররা চেঁচিয়ে অনেক প্রশ্ন করবে। আমার অ্যাডভাইস – আপনি মুখ বন্ধ করে কোর্টে ঢুকবেন ভালো ছেলের মতো।”
“একটা তোয়ালে দেব?” একজন সিপাই জিজ্ঞেস করল।
তোয়ালে? কেন? প্রদীপ বুঝতে পারলেন না।
“মুখটা ঢাকার জন্য?”
মুখ ঢাকবেন প্রদীপ? চোর, ডাকাত, রেপিস্টের মতো? কে তাতে চিনবে না?
মাথা নাড়লেন। না। চাই না।
গাড়িটা কোর্ট প্রাঙ্গনে ঢোকামাত্র চারিদিক থেকে মাইক আর ক্যামেরা ঘিরে ধরল – পুলিশ যদিও একটা কর্ডনের মতো করে নিয়েছিল, তবু চিৎকার ভেসে আসতে থাকল – “আপনার কি কিছু বলার আছে?” “মৌলি সেনগুপ্তর মৃত্যুর জন্য আপনি কি দায়ী?” “পুলিশ আপনাকে অ্যারেস্ট করেছে কেন?” এবং সেই সঙ্গে দু-একটা “শালা খুনি” জাতীয় চিৎকারও।
কোর্টের ভেতরে তিলধারণের জায়গা নেই। এত লোক ওঁর ব্যাপারে ইন্টারেস্টেড? কোনও দিন ভেবেছিলেন যে তিনি এত লোকের উৎসাহ উদ্রেক করবেন?
শুনলেন, জজসাহেবকে বলা হলো যে মৌলির মৃত্যু হয়েছে ছুরিকাঘাতে, সেই সঙ্গে এ-ও শুনলেন, যে তিনিই নাকি টাকা দিয়ে লিটন আর পুঁটেকে পাঠিয়েছিলেন খুন করতে।
খানিকক্ষণ কী সব কথা হল, তার পরে জজ ফিরলেন প্রদীপের দিকে।
“আপনার উকিল নেই কেন?”
“হুজুর ধর্মাবতার...” সম্বোধনটা অটোমেটিক্যালি বেরিয়ে এল মুখ থেকে। জজসাহেবের ঠোঁটের কোণে একটু হাসি দেখা দিল কি? “আমাকে হয় ‘ইওর অনার’, নয়ত শুধু ‘স্যার’ বলবেন।”
ঘাড় নেড়ে হ্যাঁ বলে প্রদীপ বললেন, “ইয়ে, স্যার, আমি কোনও উকিল চিনি না।”
“আপনি যদি চান, কোর্টের তরফ থেকে আপনার উকিল ঠিক করে দেওয়া হবে। তবে ফ্রি নয়। আপনি ফ্রি লিগ্যাল এইড পাবেন না।”
“ফ্রি আমার চাই না, ধর্ম্‌... স্যার... শুধু কাউকে চিনি না, তাই...”
জজ আর কিছু বললেন না। সরকারী উকিল, জজ, আর কোর্টের নানা লোকজন নানা কথা বলল, জজসাহেব কী সব লিখতে লাগলেন, একজন এসে বললেন, “সরকারী পুল থেকে আপনার জন্য উকিল ঠিক করা হবে। তিনি আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করবেন।”
প্রদীপ বলে উঠলেন, “স্যার, আমি কিন্তু খুন করিনি...”
জজসাহেবের ভুরুটা কুঁচকে গেল। সরকারী উকিল বললেন, “এ সব কথা আপনাকে জিজ্ঞেস করা হয়নি। যা জিজ্ঞেস করা হবে, তারই উত্তর দেবেন।”
জজ উঠে চলে গেলেন, বিশাল ঘরটা আস্তে আস্তে ফাঁকা হয়ে এল, প্রদীপ বুঝলেন আজ ওঁর কথা শোনার কেউ নেই।
বেরোবার মুখে আবার বিশাল ভীড় ঠেলতে হল। ক্যামেরা আর মাইকের জঙ্গল ঠেলে প্রদীপকে বের করতে গিয়ে পুলিশ গলদ্ঘর্ম। শেষ পর্যন্ত প্রায় ধাক্কা দিয়ে জার্নালিস্টদের ভীড় ঠেলে ভ্যানে তোলা হলো প্রদীপকে। আবার ভেসে এল প্রশ্নগুলো। একবার ভাবলেন চেঁচিয়ে বলবে, “আমি খুনি নই। আমাকে কেন গ্রেপ্তার করা হল, জানি না।” কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর চেঁচালেন না।
আবার সওয়াল, আবার সেই ঘর।
“এবার প্রশ্নের জবাব দেবেন কি?”
“বলুন,” বললেন ক্লান্ত প্রদীপ।
“প্রদীপবাবু, মৌলিদেবীর সঙ্গে আপনার সম্পর্ক কেমন ছিল?”
কেমন ছিল? মৌলির সঙ্গে প্রদীপের সম্পর্ক কেমন ছিল? ওই অনুভূতি কি প্রদীপ ভাষায় বোঝাতে পারবেন? এই কাঠখোট্টা পুলিশ অফিসার কি তা বুঝবেন?
“খুবই ভালো ছিল,” অল্প কথায় সারার চেষ্টা করলেন প্রদীপ।
“তাই?” অর্ধেন্দুর মুখে কি শ্লেষাত্মক হাসি আবার? “ঝগড়া হত না?”
ঝগড়া? যেগুলো হত, সেগুলোকে কি ঝগড়া বলা চলে? বিশেষ করে সেগুলো যেভাবে শেষ হত...
কোনটা ঝগড়া? সেই যে সেদিন মৌলি বলেছি, “তোমার জন্য ফার্স্ট অ্যানিভার্সারিতে কী কিনব জানো? একটা মোটা লাঠি।”
“কেন?” জানতে চেয়েছিলেন প্রদীপ। “এর মধ্যেই লাঠি হাতে হাঁটাতে চাও?”
“বটেই তো,” বলেছিল মৌলি। “ফার্স্ট অ্যানিভার্সারি হলো উড্‌ অ্যানিভার্সারি। তোমাকে লাঠি দেব, সেই লাঠি দিয়ে পেটাবই।”
“ঝাঁটায় শানাচ্ছে না বুঝি?”
“আমি তোমায় ঝাঁটা মারি?” বলে ঝাঁপিয়ে পড়ে দু-হাতে মুঠো করে প্রদীপের চুল ধরে মৌলি চুমু খেয়েছিল। তার পরে যা হয়েছিল, তার মধ্যে কোনটা ঝগড়া ছিল?
হঠাৎ মনে পড়ল, ইন্টারনেট ঘেঁটে জেনেছিলেন, ফার্স্ট অ্যানিভার্সারিকে উড্‌ অ্যানিভার্সারি বলে না। পেপার অ্যানিভার্সারি বলে। মৌলিকে বলা হয়নি। আর কোনও দিন কি বলার সুযোগ পাবেন? অন্য কোনও জগতে?
“কী হল?” অফিসারের কথায় ঘোর ভাঙল প্রদীপের।
“ঝগড়া কোনও দিন হয়েছে বলে মনে পড়ে না।”
“তাই? গতবছর আপনার শ্বশুর-শাশুড়ির গোল্ডেন ওয়েডিং অ্যানিভার্সারি ছিল?”
গোল্ডেন? মৌলির দাদার বয়স আটত্রিশ। চল্লিশ বছরের বিয়ে ওঁদের।
“গোল্ডেন না। এখন একচল্লিশ চলছে।”
“বা-বা! অবাক হলে অর্ধেন্দু। “শ্বশুর শাশুড়ির কত দিন বিয়ে হয়েছে, তা-ও মুখস্ত?” বলে উত্তরের অপেক্ষা না করে বলে চললেন, “সেদিন আপনার অফিস থেকে ফেরার পথে ফুল নিয়ে যাবার কথা ছিল, আপনি তা করেননি। এবং সেদিন আপনাদের সাংঘাতিক ঝগড়া হয়েছিল – এমনকি কথাও বন্ধ ছিল বহুদিন।”
এই রূপকথার গল্পটা অর্ধেন্দুকে কে বলল? ফুল নিতে ভুলে গিয়েছিলেন সত্যি – শুধু ফুল আনা নয়, সেদিন যে গলফ গ্রিন যেতে হবে, তা-ও ভুলে গিয়েছিলেন। কিন্তু সেটা নিয়ে তো ঝগড়া হয়নি – বরং বাড়ি ঢোকামাত্র মৌলি বলেছিল, “ফুল আনতে ভুলে গিয়েছ তো?” তারপরে বলেছিল, “জানতাম তুমি ভুলে যাবে। এই দেখো।”
সুসজ্জিত পুষ্পস্তবকটা দেখে প্রদীপ মুগ্ধ। এরকম তো নিজেও আনতেন না। নিউ মার্কেট থেকে বড়োজোর বারোটা রজনীগন্ধা নিয়ে আসতেন। জিজ্ঞেস করেছিলেন, “কোথায় পেলে?”
“ব্লকের মার্কেটে নতুন দোকান খুলেছে। আমাদের পাড়ারই একজন – ওই যে, ওই বাড়ির ষোলো নম্বরে থাকেন...” নামটাও বলেছিল মৌলি। প্রদীপের মনে নেই। সেই পুষ্পস্তবক নিয়ে গলফ গ্রিন যাওয়া, সবাইয়ের খুব প্রশংসা পাওয়া, প্রদীপের রজনীগন্ধা স্টিক কেনার গল্প নিয়ে হাসাহাসি – শেষ পর্যন্ত শ্বশুরমশাই-ই এসে বলেছিলেন, “আহা, ছেলেটার পেছনে মিছিমিছি লাগছিস তোরা। আমি নিজেও তো কিনতে হলে রজনীগন্ধাই কিনতাম। আমরা ব্যাটাছেলে। আমরা কি অত কিছু জানি?”
“ঝগড়া হয়নি,” প্রদীপের গলায় ক্লান্তি। “আলোচনা, কথাবার্তা, হাসাহাসি হয়েছিল।”
“ও বাবা! আ-লো-চ-না-আ-আ-আ-আ, কথাবার্তা-আ-আ-আ-আ, হাসাহাসি-ই-ই-ই-ই - এত কিছু?” টেনে টেনে বললেন অর্ধেন্দু।
প্রদীপের আবার মেজাজ খারাপ হতে শুরু হয়েছে। কেন মিছিমিছি লোকটা ওকে হ্যারাস করছে? লিটন আর পুঁটে মিথ্যে বলে পার পেয়ে যাবে, পুলিশ তার বেলায় কিছু করবে না?
কিন্তু কিছু বলার আগে অন্য অফিসার ঢুকলেন। প্রসূন। ঝুঁকে পড়ে অর্ধেন্দুর কানে কানে কিছু বললেন। অর্ধেন্দু একটু অবাক হয়েই উঠে প্রসূনের সঙ্গে বেরিয়ে গেলেন। প্রদীপকে কিছু বললেন না।
~দশ~
বসে বসে প্রদীপের ঘুম পাচ্ছিল। মিনিট পাঁচেক কেটে যাবার পর হাতদুটো টেবিলে রেখে যেই না মাথাটা নামিয়েছেন, ঘটাস করে দরজা খুলে ঢুকলেন অর্ধেন্দু।
“দেখুন তো, এনাকে চেনেন কি না?”
অফিসারের পেছনে যিনি ঢুকলেন, মোটামুটি প্রদীপেরই বয়সী, তাঁকে প্রদীপ কোনওদিন দেখেছেন বলে মনে করতে পারলেন না। একমাথা কোঁকড়া চুল, ধবধবে ফর্সা রং, গোলগাল, প্রায় মেয়েলি চেহারা।
ভদ্রলোক ঘরে ঢুকেই দরজাটা বন্ধ করতে করতে ভীষণ সাহেবি গলায় বললেন, “থ্যাঙ্ক ইউ, অফিসার,” বলে প্রায় ধাক্কা দিয়েই অর্ধেন্দুকে ঘর থেকে বের করে দিয়ে দরজাটা বন্ধ করে দিলেন। তারপরে গটগট করে এসে টেবিলে একটা সুদৃশ্য ব্রিফকেস রেখে বললেন, “চিনতে পারছিস?”
প্রদীপ হাঁ। প্রথমে অর্ধেন্দুর হাবভাব দেখে মনে হয়েছিল কোনও আরও বড়ো অফিসার বোধহয়। কিন্তু ঊর্ধ্বতন অফিসার নিশ্চয়ই জুনিয়রকে ‘অফিসার’ বলে সম্বোধন করবেন না। কিন্তু প্রদীপকে তুই বলতে পারে এমন কেউ পুলিশের হেপাজতে এসে দেখা করবে এমনটা ভাবতেও পারছিলেন না।
“কী হলো?” আবার জানতে চাইলেন ভদ্রলোক। “এক্কেবারে ভুলে গিয়েছিস আমাকে?”
তা তো বটেই। নইলে চিনতে পারছেন না কেন?
“আমার নাম অতনু। অতনু সিনহা।”
নাম, বা পদবী, বা দুয়ের সমাহার কোনওভাবেই প্রদীপের মনে কোনও দাগ কাটল না।
অতনু সিনহা বেশ নাটকীয়ভাবে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। “বেশ, না হয় আমাকে চিনলি না। রজার হার্পারকে মনে আছে?”
এক লহমায় প্রদীপ সেনগুপ্ত প্রায় অর্ধেক জীবন পিছিয়ে গেলেন স্মৃতির সিঁড়ি বেয়ে।
ক্লাস এইট, না সেভেন বোধহয়। কে প্রথম অতনুকে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ক্রিকেটার রজার হার্পারের মতো দেখতে বলেছিল, প্রদীপের মনে নেই, কিন্তু ক্লাসসুদ্ধু ছেলে সেই নিয়ে অতনুর পিছনে লাগত। প্রথম দিকে অতনু মৃদু আপত্তি করেছিল। সাহেবদের মতো ফর্সা নিজের গায়ের রং নিয়ে বলতে গিয়েছিল, যে ওয়েস্ট ইন্ডিজের কালো ক্যারিবিয়ানের মতো দেখতে সে কী করে হবে? কিন্তু সবাই বলেছিল – না, তোর মুখের কাটিংটা ওইরকমই।
নামটা টিঁকে গিয়েছিল।
ক্লাস সেভেন। কারণ এইটের শুরুতেই প্রদীপ চলে গিয়েছিলেন কানপুরে। কাকার বদলির সূত্রে।
“তুমি এখানে কী করে?” জানতে চাইলেন প্রদীপ।
“স্কুলে তো তুই বলতি। এখন তুমি কেন?”
“ইয়ে, অনেক দিন পর তো... তুমি... তুই কি পুলিশে চাকরি করিস?”
হা হা করে হেসে উঠে অতনু বললেন, “না। বরং আমার সঙ্গে পুলিশের সম্পর্কটা অনেকটা আদায় কাঁচকলায়। লাইক জিনজার অ্যান্ড গ্রিন ব্যানানা।”
প্রদীপের মনে পড়ল, ছোটোবেলায়ও অতনুর এরকম অভ্যাস ছিল – একটা কথা বাংলায় বলেই সেটাকে অর্থহীনভাবে ইংরেজিতে অনুবাদ করার।
কিন্তু এটা রি-ইউনিয়নের সময় নয়। বললেন, “তুই তাহলে, এখানে...”
“আমি উকিল। তুই রাজি হলে আমি তোর উকিল।”
“ও,” এতক্ষণে ব্যাপারটা বুঝলেন প্রদীপ। “তুই সরকারী পুলের উকিল।”
মাথা নাড়লেন অতনু। “না। আমি সরকারী নই। সরকারী উকিল আগামীকালের আগে এসে পৌঁছবে না। আমি নিজেই তোর কাছে এসেছি। আমি আজ কোর্টে ছিলাম।”
উকিল কোর্টে ছিলেন তাতে অবাক হবার কী আছে।
কিন্তু অতনু বলে চলেছেন, “আমি অবশ্য আর প্র্যাকটিস করি না। আর যখন কোর্টে গিয়ে মামলা লড়তাম, তখন প্রধানত সুপ্রিম কোর্টেই কাজ করেছি।”
সুপ্রিম কোর্টের উকিল এখানে কী করছেন? “কিন্তু,” প্রশ্ন করলেন প্রদীপ, “আজ কেন কোর্টে গেছিলি?”
টেবিলে ব্রিফকেস পেতে ঢাকনা খুলতে খুলতে অতনু বললেন, “আমি উকিলি ছেড়েছি কিছুদিন হলো। অনেক পয়সা কামানো হয়েছে। এবার কিছু পরোপকার করব। ডেস্টিট্যুট উইমেন নিয়ে কাজ করার ইচ্ছে ছিল অনেক দিন ধরে। গত তিন বছর হলো একটা এন-জি-ও খুলেছি কলকাতা বেস করে। অল্প অল্প কাজ করে কিছু নামও কিনেছি। ছ’মাস হলো প্র্যাকটিস ছেড়ে এসে বসেছি কলকাতায়। এখন শুধু এই কাজ। বাঁকুড়া আর বীরভূমে দুটো হোম-ও হয়েছে। সেখানে মেয়েদের হাতের কাজ শেখানো হয়, এবং তারপরে সমাজে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করা হয়।”
বাক্সটা বন্ধ করে নামিয়ে রাখলেন অতনু। বললেন, “সে যা হোক, আমার কথা পরে জানলেও চলবে। আমি কাগজে তোর খবর দেখলাম। পুরোনো বন্ধুদের ফোন করে জানতে পারলাম যে তুই-ই সেই প্রদীপ – যদিও কানপুর থেকে ফিরে তুই স্কুলের কোনও বন্ধুর সঙ্গে আর যোগাযোগ রাখিসনি।”
“ইয়ে, কে যে কোথায় থাকে তা জানতামও না।”
“ধ্যাৎ, আজকাল এই ইন্টারনেট আর সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং-এর যুগে যোগাযোগ করা একটা ব্যাপার হলো? যাই হোক, আমি ভাবলাম, আমাদের ব্যাচের কোনও স্টুডেন্ট তো আর ফেমাস হয়নি, কাগজ-টাগজে কারও নাম দেখা যায় না। তা, তুই-ই প্রথম যার নাম, ছবি – সবই ছাপা হয়েছে। দেখে আসি মক্কেলকে কোর্টে।”
ব্রিফকেস থেকে বের করা কাগজপত্র সাজাতে সাজাতে বললেন, “ফেম আর নোটোরাইটি – টু সাইডস অফ দ্য সেম কয়েন।” কয়েকটা কাগজ আলাদা করে টেবিলে রাখলেন, বাকি ঢুকিয়ে দিলেন ব্রিফকেসে। “কোর্টে তোকে দেখে বুঝলাম তুই তোর বউকে খুন করিসনি। তারপর দেখলাম, তোর উকিল নেই। ভাবলাম, তোকে দিয়েই আমার জীবনের শেষ কেসটা না-হয় করি।”
কী বলবেন প্রদীপ?
“কিন্তু আমি যে কোর্টে বললাম আমার উকিল নেই – ওরা বলল উকিল দেবে?”
“ডাজন্ট ম্যাটার। সে সব আমি দেখে নিচ্ছি। শোন, তুই নিজেই বললি তুই উকিল টুকিল চিনিস না। তাই বলছি। আমি এসেছি দুটো কারণে – প্রথমত, তুই আমার ক্লাসমেট ছিলি। আর দ্বিতীয়ত, তুই খুনটা করিসনি এটা আমার বিশ্বাস।”
এই নিয়ে দ্বিতীয়বার অতনু কথাটা বলল। কী করে জানল প্রদীপ খুনী নয়?
“বোঝাতে পারব না। এটা আমার বিশ্বাস।”
“বেশ। কী ভাবে তোকে আমার উকিল করব?”
“আমাকে উকিল করবি?”
প্রদীপ বুজলেন না অতনু কী বলতে চাইছেন। বললেন, “তাই তো বললাম।
“কেন?”
“কী কেন?”
“আমি কেন তোর কেস নেব তা তো তোকে বললাম। তুই আমাকে কেস দিবি কেন? কাল তো তোর জন্য সরকারী উকিল আসবে।”
অবাক হয়ে প্রদীপ ভাবলেন এর মানে কী? নিজেই লোকটা এল ওঁর উকিল হতে, তারপরে নিজেই কৈফিয়ৎ চাইছে কেন বহাল করা হবে? কিন্তু উত্তরটা প্রদীপের জানা ছিল, তাই দিতে দেরি হলো না।
“দুটো কারণ। প্রথম হলো তুই...” বলে থেমে বললেন, “না, এটা দ্বিতীয় কারণ। তুই আমার ক্লাসমেট ছিলি, সুতরাং বন্ধুস্থানীয়। আর প্রথম এবং প্রধান কারণ হলো তুই বললি তুই বিশ্বাস করিস, যে খুন আমি করিনি।”
“ইজ দ্যাট এনাফ?” জানতে চাইলেন অতনু।
“আমার জন্য এনাফ। কাল সরকারী উকিল যিনি আসবেন, তিনি আমার সম্বন্ধে কী ধারণা নিয়ে আসবেন আমি তার কী জানি?”
“বেশ। তবে এই নে,” বলে টেবিলে রাখা কাগজগুলোর একটা দিলেন প্রদীপকে। হাতে পেন দিয়ে বললেন, “এখানে সই কর। এটাতে লেখা আছে, যে তুই আমাকে তোর হয়ে সওয়াল করার ওকালতনামা দিলি। এর সঙ্গে কিছু ফি দেবার ব্যাপার আছে, যার কোনও বাঁধাধরা অ্যামাউন্ট নেই। তুই আমাকে আপাতত হাজার টাকা দিলি, তাই লেখা আছে।”
প্রদীপ বললেন, “টাকা তো আমার কাছে কিছু নেই...”
“তারজন্য এই নোট-টা সই করবি। এটকে বলে প্রমিসরি নোট। যে তুই আমাকে হাজার টাকা দিবি।”
“আর তোর ফি? কত ফি তোর?”
“সুপ্রিম কোর্টে সওয়াল করার সময় আমার ফি গগনচুম্বী ছিল। কিসিং দ্য স্কাই। সে তোর মতন মাঝারি সাইজের ব্যাঙ্ক এগজিকিউটিভ অ্যাফোর্ডই করতে পারবে না। কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট ছাড়া আর কোনও কোর্টে আমি কোনও দিন ফি নিইনি। সব প্রো-বোনো কাজ। তবে সেগুলো সব গরিব মক্কেলের জন্য। তুই অত গরিব না। তাই তুই ফি দিবি। তোকে বের করে আনার পর তোর স্থাবর অস্থাবর সব সম্পত্তি, মায় তোর জীবন – সবই তুই আমার এন-জি-ও-কে উৎসর্গ করবি। তবে সেটা পরের কথা।”
“সেগুলোও কি এখনই সই করে দিতে হবে?”
হাসলেন অতনু। “মোটেই না। ওটা ইয়ার্কি।”
“আমিও ইয়ার্কি মারছিলাম।”
“বাঃ! আমি তো ভালো উকিল দেখছি। পনেরো মিনিটের মধ্যেই খুনের মামলা ভুলে আসামি ইয়ার্কি মারতে লেগেছেন। নে, নে, সই কর। আমার অনেক কাজ। গ্যাঁজালে হবে না। ডিফেনস রিসার্চ সহজ কাজ নয়।”
“সেটা কী?”
প্রদীপের সই করা কাগজদুটো ভাঁজ করে নিজের বাক্সে ভরতে ভরতে বললেন, “গোয়েন্দাগিরি। ভালো উকিল হতে গেলে আগে ভালো গোয়েন্দা হতে হয়। কী ভাবে তোকে এই অন্যায় কেস থেকে মুক্তি দিতে হবে, সেটার স্ট্র্যাটেজি ঠিক করতে হবে। আমি চললাম। তুই এখন থেকে পুলিশের কোনও প্রশ্নের উত্তর দিতে গেলে আমার প্রেজেন্স চাইবি। নইলে কথা বলবি না। টা টা।”
“ইয়ে,” অনেকক্ষণ ধরে চেপে থাকা প্রশ্নটা করেই ফেললেন প্রদীপ। “আমাকে এখানেই থাকতে হবে? বেইল হবে না?”
“ও, সেটাও বুঝিয়ে দিতে হবে ভাবিনি। বেইল হবে। সেটাই আমার প্রথম কাজ। ও-কে। পরে দেখা হবে। বাই।”
একটু পরে দরজা ঠেলে ঢুকলেন অর্ধেন্দু।
“আপনি তাহলে মিঃ অতনু সিংহকে চেনেন?”
গলাটা খুব সাবধানী শোনাল। একটু সাহস করে গলার জোর এনে বললেন, “খুব ভালো করে। কেন?”
চেয়ার টেনে বসলেন অর্ধেন্দু। “হি ইজ আ ভেরি কম্পিটেন্ট লইয়ার।”
কম্পিটেন্ট? অর্থাৎ? পরের স্টেপটা নিলেন প্রদীপ। বললেন, “আপনার এখানে বসে লাভ নেই। আমার লইয়ার না থাকলে আমি আর আপনাদের কোনও প্রশ্নেরই উত্তর দেব না।”
অর্ধেন্দু কী একটা বলতে গিয়েও না বলে উঠে গেলেন।
খানিক পরে ঢুকল অন্যজন। প্রসূন। বলল, “আপনি অর্ধেন্দু দাসের সঙ্গে কো-অপারেট করলে কিন্তু আপনারই মঙ্গল।”
প্রদীপ বললেন, “মঙ্গল তো এত দিন বুঝেছি। এখন দেখছি অর্ধেন্দু কম্পিটেন্ট উকিল দেখে ঘাবড়েছেন। আর মারধরের কথা বলছেন না।”
প্রসূন একটু ম্লান হাসল। “কম্পিটেন্ট বললে কম বলা হয়। অতনু সিনহার মতো বাঘা উকিল আমরা খুব কম দেখেছি। দুঁদে উকিল বলতে যা বোঝায়, তাই।”
অনেক দিন পরে সেই রাত্তিরে প্রদীপ নিশ্চিন্তে ঘুমোলেন।
~এগারো~
“সরকারী কেস কেবলমাত্র একটা পয়েন্ট-নির্ভর, বুঝলি? লিটন আর পুঁটের জবানবন্দিটা একবার মিথ্যে প্রমাণ করতে পারলেই, কেল্লা ফতে।”
“আমি একটা কথা বলব?” বললেন প্রদীপ।
দু দিন পরে, অতনুর নতুন ফ্ল্যাটের সুসজ্জিত বসার ঘরে দুজনে কথা বলছেন। জামিনে খালাস করে অতনু প্রদীপকে নিয়ে এসেছেন নিজের বাড়িতে। অতনুর বাড়ি এখন খালি, সকালে অতনুর স্ত্রী বেরিয়ে গেছেন কাজে। “আমার এন-জি-ও-তেই কাজ করে।” অতনুর ঠিকে কাজের লোক চা বানিয়ে দিয়ে বেরিয়ে গেছে, তারপরে অতনু চিজ-অমলেট আর টোস্ট বানিয়ে এনে ডাইনিং টেবিলে বসেছেন প্রদীপের সঙ্গে।
প্রদীপের কথার উত্তর বললেন, “বল। তোকেই সব বলতে হবে। আমি এখন থেকে শ্রোতা।”
“লিটন আর পুঁটে দুজনই পুলিশের খাতায় দাগী হলেও, স্মল-টাইম ক্রুক। কথাটা পুলিশ অফিসারই আমায় বলেছেন। তারা দু-জন খিদিরপুর থেকে অল দ্য ওয়ে সল্ট লেকে এসে মৌলিকে মারল, ধরা পড়ে পাকা আসামির মতো প্রথমে কোনও কথাই বলল না, তিন দিন পরে হঠাৎ আমাকে দোষ দিয়ে জবানবন্দি দিল – ব্যাপারটা তোর অদ্ভুত ঠেকছে না?”
“ঠেকছে। তো?”
“সেটাই তো সবার আশ্চর্য লাগা উচিত, তাই না? সেটাই যদি জজসাহেবকে বোঝানো যায়...”
“বুঝেছি কি বলছিস,” কথা কেটে বলল অতনু। “রিজনেব্ল ডাউট। রজার হার্পারের বল ব্যাটসম্যানের ব্যাটের কোণায় লেগেছে কি না বোঝা না গেলে ব্যাটসম্যান নট-আউট। কিন্তু আমরা বেশ কয়েকজনকে জানি যারা লিটন আর পুঁটের কথা বিশ্বাস করেছে। যেমন ধর তোর আই-ও – অর্ধেন্দু দাস। যদি জজসাহেবও বিশ্বাস করেন?”
“আই-ও?”
“ইনভেস্টিগেটিং অফিসার।”
“তুই মনে করিস ও বিশ্বাস করেছে লিটন আর পুঁটের কথা?”
“না করলে তোকে গ্রেফতার করে কোর্টে তুলল কেন? কেনই বা পাবলিক প্রসিকিউটরকে দিয়ে কেস সাজাচ্ছে? না রে, প্রদীপ, রিস্ক নেওয়া যাবে না। ধর এমনও তো হতে পারে, যে জজ বিশ্বাস করলেন না যে তুই অপরাধী, তোকে ছেড়ে দিলেন – যথেষ্ট প্রমাণের অভাবে। তখন পুলিশ তোকে ছাড়বে? আবার তোর এগেনস্টেই প্রমাণ জোগাড় করতে উঠে পড়ে লাগবে না? তার ওপর এমন প্রিসিডেনস রয়েছে, যে পাবলিক প্রেশারে একই কেস আবার কোর্টে উঠেছে। তুই জেসিকা লাল-এর কেস ভুলে গেছিস?”
ভোলেননি প্রদীপ। মেয়েটিকে পাবলিকলি গুলি করে মেরেছিল ক্ষমতাসম্পন্ন বাবার ছেলে। কোর্টে সাক্ষ্যপ্রমাণের অভাবে খালাস হয়। সেটার জন্য দায়ী ছিল পুলিশের হিজিবিজি গোয়েন্দাগিরি, আর খুনির বাবার লম্বা হাত। একটা টিভি চ্যানেল লক্ষ লক্ষ মানুষের মতামত টেক্সট মেসেজের মাধ্যমে জোগাড় করে পুলিশ আর আদালতকে বাধ্য করে কেস আবার চালু করে সেই খুনিকে শাস্তি দিতে। এই সেদিনের ঘটনা। প্রদীপ-ও টেক্সট করেছিলেন।
“গত কয়েকদিনে মিডিয়ার কল্যাণে তুই-ও ভিলেন। টিভি, খবরের কাগজ, সবাই ধরে নিয়েছে যে তুই-ই মৌলিকে মেরেছিস। সুতরাং শুধু প্রমাণের অভাব বললে হবে না। আমাদের অকাট্যভাবে প্রমাণ করতে হবে যে তুই মৌলিকে মারার পেছনে ছিলি না, আর সেটা করার একমাত্র উপায় হলো প্রমাণ করা, যে লিটন আর পুঁটে মিথ্যে বলছে।”
ব্রিফকেস থেকে একটা টাইপ করা কাগজের গোছা বের করলেন অতনু। “এটা লিটন আর পুঁটের জবানবন্দি। পুলিশকে বলা। এটা ভালো করে পড়বি। এটা যদি সত্যি না হয়, তাহলে এটাতে নিশ্চয়ই গলদ আছে। সেগুলো খুঁজতে হবে।”
“এখনই?”
“এখন না তো কখন? হিয়ারিং-এর পরে?”
“না, ভাবছিলাম, কয়েকদিন বাড়ি যাইনি। তুই বলছিস এখন এখানেই থাকতে। ঘরদোরের কী অবস্থা একবার দেখে আসা উচিত কি না?”
“কী দেখবি? গিন্নী-বান্নির মতো কথা বলছিস। আমাকে চাবি দে। দেখে আসি।”
“চাবি ব্যানার্জীদার কাছে। আমার চাবি ওনার কাছেই থাকে। ওনার বাড়িতে সবসময় কেউ না কেউ থাকে। আর মৌলির চাবিটা বাড়িতে ঢুকেই দেওয়ালে চাবি ঝোলানোর একটা জিনিস আছে, তাতে ঝুলছে। ওটা নিয়ে নিস।”
“তুই ব্যানার্জীদাকে ফোন কর। আমি ঘুরে আসি।”
অতনু বেরোবার পরে গেস্ট রুমে গিয়ে বসলেন প্রদীপ। অতনু, বা ওর স্ত্রী, যে-ই বাড়ি সাজিয়ে থাকুক, বেশ কাজের করে সাজানো। গেস্ট রুমটা হোটেল হোটেল। ডবল বেড, আলমারি, ড্রেসিং টেবিল, একটা স্টাডি টেবিল, চেয়ার, সবই রয়েছে। প্রদীপ গিয়ে টেবিলে কাগজগুলো রাখলেন। একটা রিডিং ল্যাম্পও রয়েছে। যদিও দিনের বেলা, বাইরে যথেষ্ট আলো, তবু পর্দা টেনে আলো কমালেন, তারপরে রিডিং ল্যাম্পটা জ্বেলে পড়তে বসলেন।
ছোটোবেলার অভ্যেস। ছোট্ট আলোর বৃত্তে কনসেন্ট্রেশন ভালো হয়।
জবানবন্দির শুরু থেকেই প্রদীপের চোখ কপালে উঠতে থাকল। অর্ধেকের কিছু বেশি পড়া হবার পর হঠাৎ মোবাইল বেজে উঠল। অতনু।
“শোন, তোর ব্যানার্জীদার পুরো নাম আর ফ্ল্যাট নাম্বার বল। তোদের সিকিউরিটি এখন এক্সট্রা কশাস। তোর ফ্ল্যাট-এর সামনের ফ্ল্যাট বললে মানছে না। আমার ছবিও তুলে নিল।”
“ছবি তুলল? কী দিয়ে?”
“মোবাইল ফোন। ব্যাপারই আলাদা।”
অতনুকে নাম আর ফ্ল্যাট নম্বর বলে প্রদীপ আবার লেখায় মন দিলেন।
লিটন আর পুঁটের বক্তব্য অনুযায়ী প্রদীপ বহুবার ওদের সঙ্গে দেখা করেছেন। নিজের গাড়িতে করে ওদের নিয়ে গঙ্গার ধার দিয়ে চলতে চলতে খুনের খুঁটিনাটি প্ল্যান করেছেন, এমনকি নিজের ফ্ল্যাটের চারপাশের রাস্তাঘাটের ম্যাপ আর ফ্ল্যাটের প্ল্যান এঁকে দিয়েছেন। কবে কোথায় দেখায় হয়েছে, সবই লেখা রয়েছে। গাড়ির মডেল, নম্বর সবই ওরা জানে। এমনকি প্রদীপের ছোটোখাট অভ্যাস, যেমন গাড়ি চালাতে চালাতে মাঝে মাঝে স্টিয়ারিং-এ আঙুল দিয়ে তবলা বাজানো – সেটাও বর্ণনা করেছে দুজনে।
সম্পূর্ণ লেখাটা পড়ে নিয়ে প্রদীপ খানিকক্ষণ চুপ করে বসে রইলেন।
এত ডিটেল কে বলল ওদের? কেন? কে এই গল্পটা বানাল? কেন বানাল?
প্রদীপ গিয়ে জানলার সামনে দাঁড়ালেন। বাইরে দুপুরের রোদে চারিদিক ঝকঝক করছে। কেউ কোত্থাও নেই। সামনের বাড়ির নিচে গ্যারেজে একটা ভোকসওয়াগেন দাঁড়িয়ে। প্রদীপ একসময় ভেবেছিলেন এই মডেলটা কিনবেন। কিন্তু শেষে মৌলির ইচ্ছায় মারুতির গাড়িই কিনেছিলেন। ওই গাড়িটার কথাই বলেছে লিটন আর পুঁটে। কিন্তু একটা অদ্ভুত উচ্চারণে। ফলে পুলিশের টাইপিস্ট বানানটা ঠিক করে টাইপ করেনি। প্রথমে প্রদীপ বুঝতেই পারেননি ওরা কিসের কথা বলেছে। পরে দেখলেন লেখা আছে, মারুতির গাড়ি। হয়ত টাইপিস্টও বুঝতে পারেনি।
কিন্তু তারিখগুলো? হঠাৎ কী খেয়াল হতে ছুটে গিয়ে ছোঁ মেরে কাগজগুলো তুলে নিলেন আবার। আর তখনই অতনু চাবি দিয়ে দরজা খুলে বাড়িতে ঢুকে বললেন, “কী রে, কী করছিস?”
বসার ঘরে প্রদীপকে না দেখে গেস্ট রুমে এলেন। “তোর বাড়ি নিয়ে চিন্তা নেই। ব্যানার্জী তোদের কাজের মেয়েকে দিয়ে রোজ পরিষ্কার করিয়েছে, বলল, ফ্রিজে কিছু তরকারি আর মাছ-মাংস ছিল, সেগুলো খেয়েছে – তবে তোর চিন্তা নেই, ফেরত দিয়ে দেবে। উগরে, না কিনে এনে, আমি জানতে চাইনি... তোর শোবার ঘরের একটা জানলার ছিটকিনি ভালো করে লাগে না। খোলা ছিল। আমি ওটা একটা দড়ি দিয়ে...”
হঠাৎ খেয়াল করলেন যে প্রদীপ বোকার মতো ওঁর দিকে তাকিয়ে আছে। বললেন, “কী হলো?”
প্রদীপ তেমনই হতভম্বের মতো কাগজগুলো বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, “দিস ইজ ইম্পসিব্ল।”
~বারো~
“ইওর অনার, আসামি প্রদীপ সেনগুপ্ত আপাতদৃষ্টিতে সভ্য, মার্জিত, ভদ্র, কিন্তু ওনার পেটে পেটে অনেক শয়তানি। এক দিকে বিবাহিত, অন্যদিকে অফিসে সেক্রেটারির সঙ্গে তলায় তলায় সম্পর্ক তৈরি করেছেন।”
কাঠগড়ায় প্রদীপের চোখ ছানাবড়া। এ আবার কী নতুন প্যাঁচ? তাকালেন অতনুর দিকে। অতনু একটু মুচকি হাসলেন। তাতে কি প্রদীপ নিশ্চিন্ত বোধ করবেন? বুঝলেন না।
জামিনে ছাড়া পাবার পরে তিন মাস কেটে গিয়েছে। এই তিন মাস প্রদীপের বাড়ি ফেরা হয়নি। নানা অজুহাতে অতনু আটকে রেখেছে নিজের বাড়িতেই। সবচেয়ে বড়ো কারণ কেস তৈরি করা, এবং বার বার পুলিশের জেরার সময় সেখানে অতনুর উপস্থিতির প্রয়োজন। শেষ পর্যন্ত, তিন মাস পরে, কোর্টে কেস উঠেছে।
সরকারী উকিল বলে চলেছেন, “প্রদীপ সেনগুপ্তর সঙ্গে মৌলি সেনগুপ্তর প্রেম অনেক দিনেরই, কিন্তু বিয়ের কিছু দিন আগে ওনার জীবনে আসে ওনার সেক্রেটারি রিটা গোমেজ। মিঃ সেনগুপ্ত মিস গোমেজকে প্রেম নিবেদন করতে থাকেন। ইওর অনার, আমরা জেনেছি কী ভাবে তিনি মিস গোমেজকে নিয়মিত দামী দামী উপহার দিতেন, গাড়িতে করে নানা জায়গায় বেড়াতে নিয়ে যেতেন – ফলে অফিস থেকে ফিরতে দেরি হত। বিয়ের কিছুদিন আগে থেকেই দুজনের সম্পর্ক খারাপ হতে থাকে, এবং হানিমুনের সময়েই একেবারে তলানিতে এসে ঠেকে। এর পরের ঘটনা এই রকম, যে হানিমুন থেকে ফিরে আসার কিছুদিন পরেই প্রদীপ সেনগুপ্ত প্রথম যান লিটন আর পুঁটের কাছে। এবং কী ভাবে তিনি মৌলিদেবীর মৃত্যু প্ল্যান করেন তা-ও আমরা ক্রমে ক্রমে তুলে ধরব মহামান্য আদালতের কাছে।”
অতনু কিছু বলছে না কেন? এই সব আজেবাজে কথা সরকারী উকিল বলে যাবে, আর দুজনকে চুপ করে বসে শুনতে হবে? অতনু চোখ পাকিয়ে তাকিয়ে আছেন। প্রদীপের উত্তেজনা অনুভব করেছেন। প্রদীপ নিজেকে সংযত করলেন।
আরও খানিকক্ষণ একই কথা চর্বিত চর্বং করে সরকারী উকিল থামলেন। তারপরে অতনু উঠে ছোটো বক্তব্য রাখলেন। “ইওর অনার, সরকারী উকিল যা যা বললেন, সবই মিথ্যার জাল। আমরা প্রমাণ করব, সরকারী কেস কোনও ফ্যাকটভিত্তিক নয়, কেবলমাত্র পুলিশের আধাখ্যাঁচড়া তদন্তভিত্তিক। এবং সেগুলো যে সবই সম্পূর্ণ মিথ্যা, তারও প্রমাণ আমরা দেব। সে শুধু সাক্ষ্যপ্রমাণ নয়, তথ্যের প্রমাণ।”
এর পর সওয়াল শুরু হলো। প্রথম সরকারী সাক্ষী লোকাল থানার অফিসার, যিনি প্রথম দিন অনেক রাত্তির অবধি প্রদীপককে থানায় বসিয়ে কথা বলেছিলেন। ওঁর সাক্ষ্য বেশিক্ষণ চলল না। কবে, কোথা থেকে কী ফোন থানায় এসেছিল, সেই ফোনের পরে ক’জন পুলিশ প্রদীপদের হাউসিং-এ গিয়েছিলেন, সেখানে তখন দুজন লোককে ধরে মারা হচ্ছিল, ওঁরা কী ভাবে তাদের উদ্ধার করে গ্রেফতার করেন, হাউসিঙের জনৈক লেডি ডাক্তার উপস্থিত ছিলেন – তিনিই মৌলিকে মৃত ঘোষণা করেন, ইত্যাদি। এই সময় আদালতের অবগতির জন্য পুলিশ ফটোগ্রাফারের তোলা কিছু ছবি জজসাহেবের হাতে দেওয়া হলো, জজ সেগুলো দেখে পাশে সরিয়ে রাখলেন। প্রদীপের মনে হলো তিনি নিজে এই দৃশ্য কোনওদিনই দেখেননি। ছবিগুলোও দেখান হবে না। সরকারী উকিলের জেরা শেষ হবার পরে অতনুর পালা। অতনু কিছুই জানতে চাইলেন না। অফিসার চলে গেলেন। সরকারী উকিল দ্বিতীয় সাক্ষীকে ডাকলেন। ইনভেস্টিগেটিং অফিসার, অর্ধেন্দু দাস।
সরকারী উকিলের জেরা চলল অনেকক্ষণ ধরে। কী ভাবে, কখন, কেস ওঁর হাতে এল – থেকে শুরু করে, একে একে অর্ধেন্দু কাকে কী জিজ্ঞেস করে কী কী জানতে পেরেছেন বললেন, এবং সব শেষে লিটন আর পুঁটের জেরা এবং তারপরে প্রদীপকে জেরা করে কী পেয়েছেন তার ফিরিস্তি। প্রত্যেকবারই অতনু উঠে বাধা দিয়ে বললেন, যাদের কথা বলা হচ্ছে, অর্থাৎ, প্রদীপের প্রতিবেশীরা, লিটন, পুঁটে, মায় প্রদীপ স্বয়ং – যখন আদালতে নিজেরাই সাক্ষ্য দেবে, সুতরাং অর্ধেন্দুর মুখে তাদের বক্তব্য শুনে সময় অপচয় করার মানে হয় না।
শেষে, সরকারী উকিল বসলেন। অতনু উঠে জেরা শুরু করলেন। প্রদীপ অবাক হয়ে দেখলে যে অতনু শুরু করলেন অর্ধেন্দুর অতীত নিয়ে। কত দিনের চাকরি, কত দিন হলো উনি সি-আই-ডি-তে আছেন, কটা মার্ডার কেস-এ উনি ইনভেস্টিগেটিং অফিসার ছিলেন, ইত্যাদি। সরকারী উকিল একবার উঠে বলতে গিয়েছিলেন, “অবজেকশন ইওর অনার, এই সব প্রশ্নের অর্থ কী আমি বুঝতে পারছি না।”
প্রদীপ ভেবেছিলেন এইবার অতনু সরকারী উকিলের বোধবুদ্ধি নিয়ে কোনও দুরন্ত মন্তব্য করবেন, কিন্তু অতনু শুধু জজসাহেবের দিকে তাকিয়ে মৃদুস্বরে বললেন, “মে আই প্রোসিড, স্যার, অর শুড আই স্টপ?”
জজ বললেন, “প্রোসিড।”
অর্ধেন্দুর অতীত জেনে নিয়ে অতনু বললেন, “এই কেসে আমার মক্কেল প্রদীপ সেনগুপ্তর বিরুদ্ধে লিটন আর পুঁটের বক্তব্য ছাড়া আর কিছু আছে কি?”
ঘাড় গোঁজ করে অর্ধেন্দু বললেন, “আর কিছু দরকার নেই।”
“প্রশ্নের উত্তর দিন। আপনার সাক্ষ্যপ্রমাণের তালিকায় আর কী কী আছে?”
“আর কিছু নেই।”
“ইওর অনার, এত বছরের অভিজ্ঞতা সত্ত্বেও যে পুলিশ অফিসার দু’জন খুনির কথার ওপর ভরসা করে, আর কোনও প্রমাণ জোগাড় না করে চার্জশীট তৈরি করেন, তাঁকে আর কী প্রশ্ন করব?” বলে অতনু সওয়াল শেষ করলেন।
সরকারী উকিল আবার উঠলেন। “মিঃ দাস, আপনি অনেক দিন দায়িত্বপূর্ণ পদে কাজ করেছেন। আপনি যদি দুজন তথাকথিত খুনির কথার ওপর ভরসা করেন, সেটাকে কি আপনি আপনার অভিজ্ঞতা অনুযায়ী যথেষ্ট মনে করেন?”
“যথেষ্ট মনে করেছি বলেও ওদের জবানবন্দির ওপর নির্ভর করেছি, স্যার।”
অর্ধেন্দু দাসের পরে এলেন ডাক্তার। তিনি পোস্ট মর্টেম করেছেন। তাঁর বর্ণনায় জানা গেল যে মৌলিকে চেয়ারের সঙ্গে বেঁধে খুন করা হয়েছে – ফলে হাতে-পায়ে, আর পেটে দড়ির দাগ পাওয়া গিয়েছে। দুটো ছুরি দিয়ে বার বার আঘাত করা হয়েছে মুখে, গলায় আর বুকে-পেটে। অনেকগুলোই তার মধ্যে মৃত্যুর কারণ হতে পারে। আঘাতের মধ্যে কোনও পূর্বপরিকল্পনা ছিল বলে মনে হয় না, কারণ হিজিবিজি হ্যাপহ্যাজার্ড আঘাত কাঁধে আর বাহুতেও ছিল।
প্রদীপ স্থাণুবৎ বসে শুনলেন মৌলির অন্তিম মরণযন্ত্রণার কথা। জজকে বার বার হাতুড়ি দিয়ে টেবিলে আঘাত করে দর্শকদের শান্ত করতে হলো।
“ডাঃ নিয়োগী,” জানতে চাইলেন সরকারী উকিল, “আপনি যে দুটো ছুরির কথা বলছিলেন, সে দুটো কি এই ছুরি দুটো?”
সরকারী উকিল দুটো সিল করা প্লাস্টিকের প্যাকেট এনে দিলেন ডাক্তারকে। উনি ভালো করে দেখে বললেন, “হ্যাঁ, এই দুটো ছুরিই পুলিশ আমাকে দিয়েছিল।”
“এই ছুরির আঘাতের সঙ্গে কি মৌলিদেবীর শরীরের আঘাত মেলানো গেছে?”
“এই ছুরি দিয়েই মৃতা মহিলাকে মারা হয়েছিল। আঘাতের চিহ্ন মিলেছে, এবং ছুরির ফলায় যে রক্ত ছিল, তার গ্রুপ আর মৃতা মহিলার ব্লাড গ্রুপ একই।”
অতনু উঠে বলল, “ব্লাড গ্রুপ যে এক, তা কি আপনিই পরীক্ষা করেছিলেন, ডাঃ নিয়োগী?”
ডাক্তার একটু অবাক হয়ে বললেন, “স্টেট ফরেনসিক ল্যাবরেটরিতে আমার তত্ত্বাবধানে হয়েছিল, ইওর অনার।”
“ডি এন এ টেস্ট করেছিলেন?”
“ডি এন এ তো রুটিন টেস্ট নয়, কোর্ট নির্দেশ দিলে করতে পারি।”
সরকারী উকিল চেয়ার ছেড়ে উঠতে যাচ্ছিলেন, তার আগেই অতনু বললেন, “নাহ্‌, তার বোধহয় দরকার হবে না। ধন্যবাদ, ডাঃ নিয়োগী। ইওর অনার, আমার আর কিছু জিজ্ঞেস করার নেই।”
ডাক্তারের পরে ফিঙ্গারপ্রিন্ট বিশেষজ্ঞ। তিনি বললেন প্রদীপ আর মৌলি সেনগুপ্তর ফ্ল্যাটে, এবং ছুরিদুটোর বাঁটে লিটন আর পুঁটের আঙুলের ছাপ পাওয়া গিয়েছে।
নিজের সওয়ালের সময় অতনু জানতে চাইলেন, “ছুরিদুটোর বাঁটে কি প্রদীপ সেনগুপ্তর আঙুলের ছাপ পাওয়া গিয়েছে?”
উত্তর দেবার আগেই লাফ মেরে উঠলেন সরকারী উকিল।
“ইওর অনার, আমার লার্নেড কলিগ আজেবাজে প্রশ্ন করে আদালতের মহামূল্যবান সময় নষ্ট করছেন। আমাদের বক্তব্য পরিষ্কার। আসামি প্রদীপ সেনগুপ্ত নিজে খুন করেননি। টাকার বিনিময়ে লোক লাগিয়ে খুন করিয়েছেন। এক্ষেত্রে ছুরিতে ওনার আঙুলের ছাপ কীভাবে আসতে পারে জানতে পারি?”
জজসাহেবের দিকে তাকিয়ে অতনু নম্রভাবে বললেন, “ইওর অনার, কী কী ভাবে প্রদীপ সেনগুপ্তর আঙুলের ছাপ ওই ছুরিতে থাকতে পারে তার সম্ভাবনা সরকারী উকিলেরই ভেবে পাওয়া উচিত। কিন্তু তার ফিরিস্তি দিতে গেলেই বরং মহামান্য আদালতের অমূল্য সময় নষ্ট হবে। কিন্তু প্রশ্নটা নিয়ে আমার কলিগের আপত্তি থাকার কথা নয় – কারণ আঙুলের ছাপ যদি পাওয়া যেত, তাহলে ওনার কেসটাই দৃঢ় হবে – আমারটা নয়।”
জজসাহেবের ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসি? সুপ্রিম কোর্টের দুঁদে লইয়ার হঠাৎ কী খেলা শুরু করেছেন তা কি তিনি আন্দাজ করতে পেরেছেন?
না, দুটো ছুরির কোথাও প্রদীপ সেনগুপ্তর আঙুলের ছাপ ছিল না। এবং এর পর অতনুর আর কোনও প্রশ্ন নেই। ফিঙ্গারপ্রিন্ট এক্সপার্টের ছুটি হলো, জজসাহেবও সেদিনের মতো শুনানি মুলতুবি রাখলেন।
~তেরো~
“কী হলো?” খাবার টেবিলে জানতে চাইলেন অতনুর স্ত্রী নবনীতা, সংক্ষেপে বনি। গত তিন মাসে বনিকে দেখে প্রদীপ খুবই ইম্প্রেসড। অতনুর অবর্তমানে এন-জি-ওর সব কাজটা সামলাচ্ছেন, এবং সেই সঙ্গে সংসারও। সকাল নটায় বেরিয়ে, কাজ সেরে, সন্ধেবেলা জুম্বা নাচের ক্লাস করে এসে রান্নাও করেছেন কোনও কোনও দিন।
অতনু বললেন, “আজ তো প্রথম দিন। কেস ওপেন হলো, প্রিলিমিনারি উইটনেসরা তাঁদের বক্তব্য রাখলেন – এরা তো ইশ্যু নয়। আমাদের ইশ্যু পরে।”
সারাদিনের ক্লান্তির সঙ্গে প্রদীপের একটু বিরক্তি হয়েছিল অতনুর ক্রস-এগজামিনেশনের ধরণে। তাই ফেরার পথে কোনও কথা বলেননি। অতনুও নিশ্চয়ই ক্লান্ত ছিলেন, তাই গাড়িতে উঠে চোখ বুজে মাথা এলিয়ে শুয়ে ছিলেন প্রায় সারা রাস্তা।
কিন্তু-কিন্তু করে প্রশ্নটা করেই ফেললেন।
“তোকে একটা কথা জিজ্ঞেস করব?”
“খুব এম্ব্যারাসিং না হলে করেই ফেল।”
“কোর্ট সম্বন্ধে কোনও ধারণাই নেই। তবে যতটুকু জানি, লইয়াররা পরস্পরের পেছনে লাগে, অপমান করে, হাসাহাসি করে, সেটা সরকারী উকিল তোকে নিয়ে করল, কিন্তু তুই সুযোগ পেয়েও সেরকম কিছু করলি না। তারপরে, সত্যি বলতে কী, ফিঙ্গারপ্রিন্ট এক্সপার্টকে যে প্রশ্নটা করলি, সেটার কি প্রয়োজন ছিল?”
অতনু মাথা নেড়ে বললেন, “অপরপক্ষের উকিলকে হেয় করা, অপদস্থ করা – এগুলো আমার স্টাইল না। নিজের কাজটা সেট করাই আসল। আর কোর্টরুমে ভুলভাল প্রশ্ন যে হয় না তা নয়, অনেকসময় সাক্ষীকে টলিয়ে দেওয়া যায়। যেমন ধর ফিঙ্গারপ্রিন্ট এক্সপার্ট বললেন যে উনি তোর ফিঙ্গারপ্রিন্ট খুঁজেছেন, পাননি। যদি বলতেন যে তোর ফিঙ্গারপ্রিন্ট খোঁজার কোনও চেষ্টাই করেননি, তাহলে বলতে পারতাম তাহলে আর কার কার ফিঙ্গারপ্রিন্ট আছে খুঁজুন গিয়ে। হয়ত আরও কারও আছে। যেহেতু উনি খুব কনফিডেনসের সঙ্গে বললেন যে শুধু লিটন আর পুঁটের আঙুলের ছাপ আছে, তাতে ওদের ইনভলভমেন্টটা আরও জোরদার হলো।”
ওহ। স্বস্তিতে প্রদীপ বললেন, “লিটন আর পুঁটে কোথায়? ওদের কেন দেখা গেল না?”
“ওরা এই কেস-এ আসামি না। সাক্ষী।”
“ওদের কোনও শাস্তি হবে না?”
“ওরা রাজসাক্ষী হয়েছে। সুতরাং সরকারের সঙ্গে ওদের একটা বোঝাপড়া হয়েছে। ওদেরও বিচার হবে, সাজা কিছু হবে, কিন্তু সেটা কী, তা আমরা এখন জানতে পারব না।
“এ আবার কী অন্যায়?”
“তুই যদি খুন না করিয়ে থাকিস, তাহলে অন্যায়। যদি করিয়ে থাকিস, তাহলে তো প্রধান শাস্তি তোরই হওয়া উচিত, তাই না?”
প্রদীপ কী বলবেন বুঝতে না পেরে চুপ করে রইলেন। খানিকক্ষণ পরে বনি বললেন, “প্রদীপদা, আপনি বরং শুয়ে পড়ুন। আপনার ধকল গিয়েছে অনেক। কাল আবার সকালেই কোর্টে দৌড়তে হবে।”
ইঙ্গিতটা ধরতে পেরে প্রদীপ হাত ধুতে উঠে গেলেন। বেসিন থেকে শুনতে পেলেন অতনু বলছে, “আমারও ধকল গিয়েছে অনেক, আমিও শুতে চললাম।”
বনি বলল, “এঁজ্ঞে না। সমস্যা হয়েছে অফিসে। কাল আমাকে সামলাতে হবে। সুতরাং চুপটি করে বসে শোনো।”
হাত ধুয়ে নিজের ঘরে বিছানায় শুতে গিয়ে প্রদীপের মনে হলো, ওঁর জীবনটাও তো এরকমই হবার কথা ছিল – কাজ শেষে ফিরে এসে, খেয়ে উঠে মৌলির সঙ্গে গল্প করতে করতে শুতে যাওয়া – কী অপরাধ করেছিলেন, কোন পাপে এরকম হলো ওঁর?
পরদিন আবার কোর্ট। এবার কয়েকজন প্রতিবেশীর সাক্ষ্যের পরে ডাকা হলো মৌলির বাবাকে।
সেই যেদিন মৌলির বাড়ি থেকে বেরিয়ে অফিসে গেছিলেন, তার পর থেকে আর ওদের কারওর সঙ্গে দেখা হয়নি প্রদীপের। আজও হলো না। ডাকার পর থেকে আদালতে ঢুকে সাক্ষীর কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে শপথ নেওয়া থেকে শুরু করে কথা শেষ করে বেরিয়ে যাওয়া পর্যন্ত একবারও উনি জামাইয়ের দিকে তাকালেন না। অবশ্য কথাবার্তা যা হলো তাতে তাকান’র উপায়ও ছিল না।
সাধারণ পরিচিতির পরে সরকারি উকিল প্রশ্ন করলেন, “আপনার মেয়ে-জামাইয়ের পারস্পরিক সম্পর্ক কেমন ছিল?”
“ভালো না,” অম্লানবদনে বললেন মৌলির বাবা।
তারপরে, সরকারি উকিলের নানা প্রশ্নের উত্তরে, একে একে বর্ণনা করলেন, কেমন মৌলি তাঁর কাছে এবং ওর মায়ের কাছে বিয়ের পর থেকেই নানা অত্যাচারের কথা বলেছে, হানিমুন থেকে ফিরে এসে মৌলিকে খুবই দুঃখী দেখে তিনি বার বার জিজ্ঞেস করে জেনেছেন যে সেই কয়েকদিনের ছুটি মৌলির কাছে দুর্বিসহ বিভীষিকা ছাড়া আর কিছুই ছিল না। মৌলির সামান্যতম ইচ্ছেটুকুও প্রদীপ কোনও দিন পূর্ণ করেননি বিয়ের পরদিন থেকে – এমনকি মৌলির বাবা-মায়ের বিবাহবার্ষিকীতে ফুল নিয়ে ফেরেনি অফিস থেকে – শেষে মৌলিই গোলপার্কের মোড় না কোথা থেকে ফুলের গোছা নিয়ে আসে... অন্তহীন, যাকে বলে অন অ্যান্ড অন।
অতনু ভদ্রলোককে কোনও প্রশ্ন না করেই ছেড়ে দিল।
মৌলির বাবার পর মৌলির দাদা বাবলু। অল্প বয়সেই বাবলু ওদের নিঃসন্তান পিসি-পিসেমশাইয়ের সঙ্গে শিকাগো চলে গিয়েছিল কারণ পিসি ছিল বাবলু বলতে অজ্ঞান। পড়াশোনায় খুব ভালো বাবলু ইউনিভার্সিটি শেষ করে এখন হোটেল ব্যবসায়ী। দুটো হোটেল বাবলুর – একটা ওয়েস্ট ইন্ডিজে, অন্যটা মালডিভস-এ। মৌলি আর প্রদীপ ওই মালডিভস-এর হোটেলেই ছিলেন হানিমুন করতে।
বাবলুও ওর বাবার মতোই দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলল যে প্রদীপকে পাত্র হিসেবে কোনও দিনই ওর পছন্দ ছিল না। শো-অর, এবং মৌলির মতন নরম মনের মেয়ের সঙ্গী হবার মতো মানসিকতা ওর আছে বলে বাবলুর মনে হয়নি। হানিমুনের সময়েও বাবলু যে তিন দিন মালডিভস-এ ছিল, প্রায়ই মৌলিকে একা একা চোখের জল ফেলতে দেখেছে ঘরে বসে – জামাইবাবাজি তখন সুইমিং পুলের পাশে অর্ধনগ্ন নারী দেখতে ব্যস্ত।
মিথ্যে, মিথ্যে, সব মিথ্যে!
প্রদীপের নড়াচড়া দেখে অস্বস্তিতে অতনু প্রদীপের দৃষ্টি আকর্ষণ করে খুব আস্তে আস্তে মাথা নাড়লেন, পাছে প্রদীপ হঠাৎ আদালতের মধ্যেই চিৎকার করে কিছু বলে ফেলে।
বাবলুকেও অতনু কোনও প্রশ্ন করল না।
সরকারি তরফে পরবর্তী সাক্ষী শ্রীবাস্তব। মার্কণ্ডেয় শ্রীবাস্তব। প্রদীপের ব্যাঙ্কে কর্মরত সেক্রেটারি। সরকারি উকিলের প্রশ্নের উত্তরে শ্রীবাস্তব গুছিয়ে বলল, কী ভাবে, গত কয়েক বছর ধরে রিটা ব্যাঙ্কে জয়েন করার পর থেকেই প্রদীপ ওর পিছনে লেগেছে। প্রায় রোজই দামি দামি উপহার, বিদেশী চকলেট, ঘড়ি, ইত্যাদি দিয়ে দিয়ে ওর মন জয় করার চেষ্টা করেছেন। প্রায় রোজই চিঠি লিখতেন রিটাকে – কোনও চিঠিতে লেখা থাকত উনি রিটাকে ভালোবাসেন, কোনওটাতে লিখতেন উনি রিটাকে ছাড়া বাঁচবেন না, কোনওটাতে প্রতিজ্ঞা করতেন রিটা ওকে বিয়ে করলে উনি রিটাকে কতই না সুখে রাখবেন।
“আপনি কী করে জানলেন এসব কথা?” জিজ্ঞেস করলেন সরকারি উকিল।
“রিটা আমাকে বলত সব। মিঃ সেনগুপ্ত অফিসের শেষে জোর করে তুলে ড্রাইভে নিয়ে যেতেন। রিটা বেচারা গরিব। দাদা-বৌদির সঙ্গে থাকে। কিছু বলতে পারত না চাকরি যাবার ভয়ে।”
এর পরে ধীর সুস্থে উঠলেন অতনু।
“মিঃ শ্রীবাস্তব, খুব ভালো বাংলা বলেন আপনি।”
“নামেই শ্রীবাস্তব, স্যার। কলকাতার ছেলে আমি। ছোটোবেলায় থাকতাম লেক-মারকেটে।”
“কিন্তু মাঝে অনেক দিন কলকাতায় ছিলেন না।”
“না, স্যার। আমি অনেক দিন পাটনা শহরে ছিলাম, তারপরে কানপুরে। কানপুরে ব্যাঙ্ক থেকে রিজাইন করে নতুন চাকরি নিয়ে আসি কলকাতায়।”
“কত দিন হলো?”
“পাঁচ বছর।”
“কানপুরে কী করতেন?”
“আমি জি-এম-এর পি-এ ছিলাম।”
“কে ছিলেন জি-এম?”
শ্রীবাস্তব একটু ইতস্তত করে সরকারি উকিলের দিকে চাইল। উনি অপেক্ষাই করছিলেন, লাফিয়ে উঠে বললেন, “ইওর অনার, আমার লার্নেড কলিগ আবার আদালতের সময় নষ্ট করছেন।”
উত্তর দিলেন জজসাহেব স্বয়ং। বললেন, “কেন? মিঃ শ্রীবাস্তবের বস-এর নাম কি স্টেট সিক্রেট? তাছাড়া ডিফেন্ড্যান্টের লইয়ার তো প্রায় কথাই বলছেন না। সময় নষ্ট করবেন কী করে? সাক্ষী প্রশ্নের উত্তর দেবেন।”
“থ্যাঙ্ক ইউ, ইওর অনার। বলুন, মিঃ শ্রীবাস্তব,” বললেন অতনু।
এবার শ্রীবাস্তবের গলার স্বর একটু নরম। “জি-এম ছিলেন মিঃ চন্দ্রপাল অভয়ঙ্কর।”
“চন্দ্রপাল অভয়ঙ্কর,” আস্তে আস্তে বললেন অতনু। “এখানে, কলকাতায়, আপনার বস কে?”
“উনিই,” বলল শ্রীবাস্তব।
“আই সি, দুজনে এক সঙ্গেই চাকরি বদল করেছিলেন?”
“না। আমি চাকরি ছেড়েছি স্যারের একবছর আগে। আমি কলকাতায় চলে আসি। আমার বাড়ি তো এখানেই। তার পরে, স্যার কলকাতায় এলেন, তখন থেকেই...”
শ্রীবাস্তব চুপ করল।
“ওই এক বছর কী করতেন আপনি?”
শ্রীবাস্তব কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল। তারপর বলল, “কিছু না। আই ওয়াজ টেকিং আ ব্রেক।”
“ব্রেক,” বলে অতনুও খানিকক্ষণ চুপ করে রইল। তারপরে হঠাৎ-ই প্রশ্ন করলেন, “মিঃ শ্রীবাস্তব, আদালতে শপথ নিয়ে মিথ্যা সাক্ষী দেওয়া শাস্তিযোগ্য অপরাধ। আশাকরি আপনি জানেন।”
শ্রীবাস্তব কিছু বলল না – দৃশ্যতই ঘামছে লোকটা।
“ইওর অনার, এবার কিন্তু ডিফেন্ড্যান্টের লইয়ার অনর্থক সাক্ষীকে হ্যারাস করছেন।”
এবারে সাড়া দিলেন জজসাহেব। অতনুর দিকে চেয়ে বললেন, “আপনার এই প্রশ্নের উদ্দেশ্য কী জানতে পারি?”
অতনু বললেন, “ইওর অনার, আমি সাক্ষীকে একটা চানস দিতে চাই, উনি যদি ওনার সাক্ষ্যে কোনও পরিবর্তন করতে চান।”
সরকারি উকিল বললেন, “তার কি কোনও প্রয়োজন আছে, ইওর অনার? সাক্ষী আন্ডার ওথ্‌ বয়ান দিয়েছেন...”
জজসাহেব বললেন, “প্রশ্নটায় কোনও দোষ হয়ত নেই। সাক্ষীকে সুযোগ দেওয়াই যেতে পারে, যাতে বয়ানের বিভিন্ন অংশ পরস্পরবিরোধী না হয়... প্রোসিড...”
অতনু বললেন, “মিঃ শ্রীবাস্তব, আপনি এখন পর্যন্ত যা যা বলেছেন, তার কি কোনও পরিবর্তন করতে চান?”
শ্রীবাস্তব কিছুক্ষণ কিছু বলল না। তারপরে হঠাৎ মুখ তুলে বলল, “না। কোনও পরিবর্তন করব না। আমি কোনও কথাই ভুল বলিনি।”
“আপনি যদি চান, সাক্ষ্যে কী কী বলেছেন একবার দেখে নিতে পারেন।”
“দরকার নেই,” ঘাড় গোঁজ করে বলল শ্রীবাস্তব।
“বেশ। তাহলে মিঃ শ্রীবাস্তব, আপনি বলেছেন, মিঃ সেনগুপ্ত রিটাকে অজস্র উপহার দিতেন – নানা রকম চকলেট, ঘড়ি, এবং সে কথা আপনাকে রিটা নিজেই বলেছেন।”
“বলেছে তো,” জোর দিয়ে বলল শ্রীবাস্তব।
“কবে বলেছেন? যে যে দিন উপহারগুলো পেয়েছেন, সেই সেই দিনেই? না তার পরে?”
“তখনই। পরে বলে আর কী লাভ?”
“তাহলে উপহারগুলোও নিশ্চয়ই আপনাকে রিটা দেখিয়েছিলেন? নইলে তো নালিশ করার কোনও মানেই থাকে না।”
খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে শ্রীবাস্তব বলল, “দেখেছি।”
“কটা ঘড়ি দিয়েছিলেন মিঃ সেনগুপ্ত?”
“একটা।”
“হাতঘড়ি, না দেওয়াল ঘড়ি, না কি টেবিল ঘড়ি?”
“টেবিল ঘড়ি।”
“কেমন দেখতে ছিল, বর্ণনা করতে পারবেন?”
“গোল,” বলতে বলতে হাত দিয়ে একটা গোলাকৃতি দেখিয়ে শ্রীবাস্তব বলল, “হলুদ রং, একটা পাখি একদিকে আর একদিকে একটা পরী।”
“দেখুন তো, এইটা কি না?”
স্তব্ধ আদালত আর শ্রীবাস্তবের শিরদাঁড়ায় শিহরণ তুলে অতনু একটা ঘড়ি বের করলেন একটা ব্যাগ থেকে। গোল, এক হাতে ধরার মতো ছোটো, হলুদ রং, তার একদিকে একটা পাখি আর একদিকে একটা পরী।
“এটাই কি?”
শ্রীবাস্তব মাটির দিকে তাকিয়ে। মুখ তুলে ঘড়িটা দেখছেও না।
“মিঃ শ্রীবাস্তব, আপনি যদি ঘড়িটার দিকে না তাকান, কী করে বুঝবেন এটাই সেটা কি না?”
শ্রীবাস্তব এবার ভীষণ রেগে বলল, “ঘড়িটা দেখতে এরকমই ছিল। কিন্তু এটাই সেটা কি না আমি জানব কী করে?”
“এই, এইটা দেখে চিনতে পারবেন কি?” অতনু ঘড়িটা উলটে দেখে বললেন, “এই যে, এই লেখাটা?”
শ্রীবাস্তব এখনও ঘড়িটার দিকে তাকাল না।
অতনু বললেন, “আপনি না দেখলেও আমরা সকলেই দেখতে পাব। আমি কোর্টের অবগতির জন্য এটা পড়ে দিচ্ছি। এতে লেখা আছে, ‘ডার্লিং রিটা, আই ওয়ান্ট টু স্পেন্ড অল মাই টাইম উইথ ইউ, মার্ক।’ কে এই মার্ক, মিঃ শ্রীবাস্তব? আপনার নাম মার্কণ্ডেয় শ্রীবাস্তব, এবং আপনার বন্ধুরা আপনাকে মার্ক বলে ডাকে, এ কথা কি সত্যি?”
হতভম্ব আদালতের সামনে দিয়ে হেঁটে গিয়ে অতনু বললেন, “ইওর অনার, এই ঘড়িটা আমাদের তরফের এক্সিবিট হিসেবে আদালতকে দিতে চাই। আমার মক্কেল প্রদীপ সেনগুপ্ত যে ঘড়িটা দিয়েছেন বলে সরকারি সাক্ষী বয়ান দিয়েছেন, সে ঘড়ি আসলে তিনিই রিটা গোমেজকে দেন। এটা এক্সিবিট-এ।”
আবার লাফিয়ে উঠলেন সরকারি উকিল। “ইওর অনার, এসব কথার অর্থ বোঝা দায়। হঠাৎ কেন একজন সাক্ষী কোন বাইরের লোককে কী উপহার দিয়েছে, সেটা কোর্ট কেনই বা এক্সিবিট হিসেবে অ্যাকসেপ্ট করবেন?”
অতনু বললেন, “ইওর অনার, সরকারি উকিল নিজেই সাক্ষী ডেকে এনে রিটা গোমেজ-এর নাম মামলায় ঢুকিয়েছেন। এখন উনিই সেই রিটা গোমেজকে বাইরের লোক বলছেন – এ কী রকম অন্যায়?”
“কিন্তু,” আবার তেড়ে উঠলেন সরকারি উকিল। “ডিফেনড্যান্টের উকিল এই ঘড়ি পেলেন কোথা থেকে? পুলিশের তদন্তে জানা গিয়েছে যে রিটা গোমেজ মিসিং। যে দিন মিঃ সেনগুপ্ত অ্যারেস্ট হন, সেদিন রিটা গোমেজ তার পরেই ব্যাঙ্ক থেকে বেরিয়ে যান, এবং তার পরে পুলিশ যত দিন বৌবাজারে তাঁর দাদার বাড়িতে যায়, জানতে পারে যে তিনি ফেরেননি। এখন রিটা গোমেজকে সরকারি সাক্ষী কবে কোন ঘড়ি দিয়েছেন, তা আমার লার্নেড কলিগ কোথা থেকে হঠাৎ জাদুকরের মতো বের করে আনলেন, এবং কোর্টকে কেন সেটা এক্সিবিট হিসেবে গণ্য করতে হবে, এটা আমার বোধগম্য হচ্ছে না।”
অতনু বললেন, “ইওর অনার, পুলিশ সত্যিই রিটা গোমেজের বাড়ি একাধিকবার গিয়েছে। তদন্ত করেছে, এবং রিটা ফিরলে যেন পুলিশের কাছে রিপোর্ট করে সে কথা বলে বিদায় নিয়েছে। তারা যদি রিটার ব্যক্তিগত জিনিসপত্র ঘাঁটাঘাঁটি করত, এবং রিটার বৌদিকে জিজ্ঞেস করত, জানতে পারত যে মিঃ শ্রীবাস্তবই রিটাকে প্রেমপত্র লিখেছেন এবং নানা উপহার দিয়েছেন। উপহারগুলি রিটা প্রথমে ফেলে দিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু পরে ব্যাঙ্কের একজন সিনিয়র কলিগের উপদেশে জমিয়ে রেখেছেন। সেই সঙ্গে রেখেছে শ্রীবাস্তবের লেখা অনেকগুলো চিঠিও। মহামান্য আদালত যদি সাক্ষীকে আমার প্রশ্নের উত্তর দিতে নির্দেশ দেন, তাহলে এই বিষয়ে আরও আলোকপাত করতে পারব বলে আমার ধারণা।”
জজ শ্রীবাস্তবের দিকে তাকিয়ে বললেন, “প্রশ্নের উত্তর দিন।”
“থ্যাঙ্ক ইউ, ইওর অনার,” বলে অতনু আবার জিজ্ঞেস করলেন, “আপনার নাম মার্কণ্ডেয় বলে আপনার বন্ধুরা আপনাকে মার্ক বলে ডাকে?”
শ্রীবাস্তব মাথা নাড়ল। উপরে নিচে।
“ইঙ্গিতে বললে চলবে না, মিঃ শ্রীবাস্তব। কোর্টের রিপোর্টার আপনার বয়ান লিখিত রেকর্ড করছেন। কথা বলে উত্তর দিন। আবার জিজ্ঞেস করছি। আপনার নাম মার্কণ্ডেয় বলে আপনার বন্ধুরা আপনাকে মার্ক বলে ডাকে?”
ধরা গলায় শ্রীবাস্তব বলল, “হ্যাঁ।”
“ওই ঘড়িতে যে মার্ক – সে কি আপনার নাম?”
“হ্যাঁ।”
“ওই ঘড়িটা আপনিই রিটাকে উপহার দিয়েছিলেন?”
“হ্যাঁ।”
“ওই ঘড়িটা কি মিঃ প্রদীপ সেনগুপ্ত রিটাকে উপহার দিয়েছিলেন?”
“না।”
“মিঃ সেনগুপ্ত কি কখনও কোনও ঘড়ি রিটাকে উপহার দিয়েছিলেন?”
মাথা নেড়ে ‘না’ বলল শ্রীবাস্তব।
“শব্দ করে বলুন, মিঃ শ্রীবাস্তব।”
“না।”
“ঠিক জানেন?”
“হ্যাঁ।”
“কী করে জানলেন?”
থতমত খেয়ে শ্রীবাস্তব চেয়ে রইল অতনুর দিকে।
অতনু একটু বরাভয় স্টাইলে হেসে বললেন, “আহা, আপনি কি জানেন মিঃ সেনগুপ্ত সত্যিই রিটা গোমেজকে কোনও উপহার দিয়েছেন কি না?”
বোকার মতো শ্রীবাস্তব বলল, “আজ্ঞে তা তো আমি জানি না...”
“এক্স্যাক্টলি,” সাহস দেবার সুরে বলল অতনু। “জানেন না, তো চট করে ‘না’ বলবেন না। বলুন, জানি না। আবার জিজ্ঞেস করছি – মিঃ সেনগুপ্ত কি কখনও কোনও ঘড়ি রিটাকে উপহার দিয়েছিলেন?”
“আমি জানি না।”
“এই তো। এইবার ঠিক হয়েছে। মিঃ সেনগুপ্ত কখনও কোনও উপহার দিয়েছেন মিজ রিটা গোমেজকে?”
“আমি জানি না।”
“রাইট,” উৎসাহের সঙ্গে বললেন অতনু। “মিজ গোমেজকে প্রদীপ সেনগুপ্ত যে চিঠি লিখতেন, যেগুলোর কথা আপনি একটু আগেই আদালতকে বলেছেন, সেগুলোও কি মিজ গোমেজ আপনাকে দেখিয়েছিলেন?”
শ্রীবাস্তব আবার চুপ।
“চুপ করে থাকলে চলবে না, মিঃ শ্রীবাস্তব। আপনি একটু আগে বলেছেন,” অতনু হেঁটে গিয়ে নিজের টেবিল থেকে একটা রাইটিং প্যাড নিয়ে পড়লেন, “‘প্রায় রোজই চিঠি লিখতেন রিটাকে – কোনও চিঠিতে লেখা থাকত উনি রিটাকে ভালোবাসেন, কোনওটাতে লিখতেন উনি রিটাকে ছাড়া বাঁচবেন না, কোনওটাতে প্রতিজ্ঞা করতেন রিটা ওকে বিয়ে করলে উনি রিটাকে কতই না সুখে রাখবেন’। তাই তো?”
প্রায় ফিসফিসে গলায় শ্রীবাস্তব বলল, “না।”
“না? আপনি তাহলে যা বলেছিলেন সেগুলি কি সত্যি নয়?”
“না।”
“আপনি যা যা অভিযোগ এখানে এনেছেন মিঃ প্রদীপ সেনগুপ্তর বিরুদ্ধে, সেগুলির কোনটা কোনটা সত্যি?”
শ্রীবাস্তবের চোখ দিয়ে জল গড়াচ্ছে। কোনও রকমে বলল, “কোনওটাই না।”
জজসাহেবের দিকে ফিরে অতনু বললেন, “ইওর অনার, আমার কাছে কয়েকটি চিঠির জেরক্স আছে, যেগুলির অরিজিন্যাল রয়েছে মিজ রিটা গোমেজের বৌদির হেপাজতে। এই চিঠিগুলি সবকটাই লেখা মিঃ মার্কণ্ডেয় শ্রীবাস্তবের। কোনওটাতে তিনি লিখেছেন যে তিনি রিটাকে ভালোবাসেন, কোনওটাতে তিনি রিটাকে ছাড়া বাঁচবেন না, কোনওটাতে প্রতিজ্ঞা করতেন রিটা ওকে বিয়ে করলে উনি রিটাকে সুখে রাখবেন। আদালত অনুমতি করলে এই চিঠির জেরক্সগুলি এক্সিবিট হিসেবে দিতে চাই। কিন্তু আমার বিরুদ্ধপক্ষের উকিল আদালতের সময় নষ্ট করা নিয়ে চিন্তিত, তাই আমার নিবেদন এই, যে আদালত যদি মিঃ শ্রীবাস্তবের সাক্ষ্য পুরোটাই ডিসরিগার্ড করেন এবং এক্সপাঞ্জ করেন, তাহলে সেই সময়ের কিছুটা আমরা বাঁচাতে পারব।”
জজসাহেব বললেন, “সরকারি উকিলের কি এই বিষয়ে কিছু বলবেন?”
সরকারি উকিল উঠে বললেন, “মহামান্য আদালত ইচ্ছা করলে এই সাক্ষীকে বাদ দেওয়া যেতে পারে।”
জজসাহেব বললেন, “বেশ, শ্রী মার্কণ্ডেয় শ্রীবাস্তবের দেওয়া সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য নয় বলে বাতিল করা হলো। আপনি উইটনেস বক্স ছেড়ে বেরিয়ে আসুন মিঃ শ্রীবাস্তব। বেইলিফ, মিঃ শ্রীবাস্তবকে অ্যারেস্ট করুন। আপনার বিরুদ্ধে আদালতকে মিসগাইড করা এবং মিথ্যা সাক্ষী দেওয়ার জন্য পারজুরির আইন মোতাবেক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
কোর্ট থেকে শ্রীবাস্তবের বেরিয়ে যাওয়া এবং তৎপরবর্তী গুঞ্জন বন্ধ হওয়া অবধি অপেক্ষা করে জজসাহেব বললেন, “মিঃ সিনহা, আপনি এখনও আমার সামনে দাঁড়িয়ে – আর কিছু বলবেন?”
অতনু বললেন, “আদালতের অনুমতি হলে আমার এই বিষয়ে আরও একটা সামান্য তথ্য দেবার আছে।”
অনুমতি পেয়ে অতনু বলে চললেন, “ইওর অনার, মিজ রিটা গোমেজ সাক্ষী দেবার ভয়ে বা কোনও অন্যায়ের ফলে ফেরার হয়েছেন বলে পুলিশ যে রিপোর্ট কোর্টে জমা দিয়েছে, আমার এই নিবেদন সেই সম্বন্ধেই। মিজ গোমেজ ফেরার হননি। যেদিন মিঃ সেনগুপ্ত অ্যারেস্ট হন, সেদিন তার পরেই মিঃ শ্রীবাস্তব ওনাকে ভয়ানক বিরক্ত করতে আরম্ভ করেন। এর আগেও একদিন মিজ গোমেজ ওনার এক সিনিয়র কোলিগকে বলেছিলেন মিঃ শ্রীবাস্তব ওনাকে কী রকম বিরক্ত করতেন। সেই কোলিগ বলেন সেক্সুয়াল হ্যারাসমেন্ট চার্জ আনতে, কিন্তু মিজ গোমেজ সাহস পাননি। মিঃ সেনগুপ্ত অ্যারেস্ট হবার পরে মিজ গোমেজ ব্যাঙ্ক থেকে বেরিয়ে যান, কিন্তু তার পর থেকে তাঁর আর খোঁজ পাওয়া যায়নি। তিন দিন পর ওনাকে পাওয়া যায় লখনৌ শহরের রাস্তায়, সেখানে উনি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে উদভ্রান্তের মতো ঘুরছিলেন। রাস্তার লোকজনই ওনাকে নূর মঞ্জিল সাইকিয়াট্রিক সেন্টারে নিয়ে যায়, সেখানে ভর্তি করে চিকিৎসার ফলে উন্নতি হয়, এবং গত পরশু দিন ওনার কাছ থেকে ঠিকানা ইত্যাদি পেয়ে ওনার দাদাকে খবর দেওয়া হয়। ওনার দাদা আমাকে জানান যে ছোটোবেলায় ওনারা লখনৌ শহরে থাকতেন। মিজ গোমেজকে ওনার দাদা গতকাল রাতে কলকাতা নিয়ে আসেন। উনি এখন এখানে একটা সাইকিয়াট্রিক নার্সিং হোমে ভর্তি। ডাক্তারের মতে উনি এখন সাক্ষী দেবার অবস্থায় নেই। তবে আজ সকালে ওনার একটা এফিডেভিট করা বয়ান ওনার দাদা আমাকে দিয়েছেন। আমি মিঃ গোমেজকে বলেছিলাম পুলিশকে খবর দিতে। ভদ্রলোক জানেন না বলে আজ সকালে চেষ্টা করেছিলেন লালবাজারে জানাতে, কিন্তু তাতে খুব সুবিধে করতে পারেননি। আমি বলে দিয়েছি কী করে সি-আই-ডি-তে খবর দিতে হবে – এতক্ষণে আশাকরি তিনি খবর দিয়ে দিয়েছেন। এই সার্টিফিকেট, অ্যাফিড্যাভিট – এসবের কপি আমার কাছে রয়েছে, কিন্তু এগুলো আর অর্থপূর্ণ কি না জানি না। মহামান্য আদালত চাইলে এগুলো আমি জমা দিতে পারি।”
“এক্ষুনি জমা দিতে হবে না,” বললেন জজসাহেব। “জানা রইল, দরকার পড়লে জমা নেওয়া হবে।”
এর পর সেদিনের মতো শুনানী শেষ হয়ে গেল। আদালত থেকে বেরোতে বেরোতে প্রদীপের মনে হলো, অতনু বলেছিল, ভালো উকিল হতে গেলে ভালো ডিটেকটিভও হতে হয়।
~চোদ্দো~
“আজ আমার পার্ফরমেন্স সম্বন্ধে তোর কী মত?”
“আজ তো তোর বিজয় দিবস।”
মাথা নাড়লেন অতনু। “আজ না। তোকে খালাস করে নিয়ে আসব যেদিন – বা-ইজ্জৎ রিহা... সেদিন বিজয়া।”
“তবে দুটো প্রশ্ন আছে। তুই প্রথমে শ্রীবাস্তবকে যে প্রশ্নগুলো করছিলি – কানপুরে চাকরি, কলকাতা চলে আসা – সেগুলো কেন করছিলি? বলেছিলি পরে এক্সপ্লেন করবি। করলি না তো?”
“করতাম। আদালৎ ওকে বাতিল না করলে। তোর শ্রীবাস্তব ঘাঘু লোক। কানপুরের চাকরি যায় এই একই অপরাধে। সেক্সুয়াল হ্যারাসমেন্টের কমপ্লেন। একজন দুজন নয়, চার-পাঁচ জন মহিলা সেক্রেটারি, টাইপিস্ট – ইত্যাদির কাছ থেকে। সেই সময় অভয়ঙ্কর ওকে স্যাক করেন। কিন্তু কাজ করে ভালো। অভয়ঙ্কর একটু সদয়ও ছিলেন। হি ইজ আ গুড ম্যান – অভয়ঙ্কর। কলকাতায় আসার পর শ্রীবাস্তব আবার অ্যাপ্রোচ করে – ভুল হয়ে গিয়েছিল, আই অ্যাম আ চেঞ্জড ম্যান নাউ... ইত্যাদি। অভয়ঙ্কর বোঝেননি ব্যাঙ্কে কী ঢোকাচ্ছেন। শ্রীবাস্তবের এফিশিয়েনসি নিয়ে কিন্তু নো কোশ্চেন, আবার বলছি।”
“কিন্তু আমি তো কোনও দিন সেরকম কিছু শুনিনি ওর সম্বন্ধে।”
“তা ঠিক, চেষ্টা করেছিল, বছর চারেক – ও কোনও মহিলাকে কোনও রকম অ্যাপ্রোচ করেনি, তা নয়। ইন ফ্যাক্ট, আমার কাছে যা ইনফরমেশন, ও নাকি প্রথমেই প্রেম নিবেদন করে সুচেতা বলে কাউকে। শি ইজ নো-বডিজ ফুল। এমন ধমক দেয়, যে বছর তিনেক চুপচাপ থাকে। রিটা যখন জয়েন করে, ও আর নিজেকে সামলাতে পারেনি।”
“ও কি পাগল নাকি?” জানতে চাইলেন প্রদীপ।
“জানি না। তোর ইচ্ছে হলে তুই খোঁজ করিস।”
“তবে আমার জানিস, শেষ দিকে ওর জন্য বেশ কষ্টই হচ্ছিল। যখন কেঁদে ফেলল।”
“অত প্রেম করতে হবে না। ও তোর জন্য ভালোই ব্যবস্থা করেছিল।”
“আমার ওপর এত রাগ কেন?”
“ওর স্থির বিশ্বাস, তুই আর রিটা প্রেমিক-প্রেমিকা। সেইজন্যই রিটা ওকে পাত্তা দেয় না। ইন ফ্যাক্ট, আগের ব্যাঙ্কেও এরকম হয়েছিল। সেখানে অবশ্য অন্য একজন পুরুষ পি-এ-কে টার্গেট করে।”
“নির্ঘাৎ পাগল,” বললেন প্রদীপ।
“ছি, বার বার পাগল বলবেন না,” বললেন বনি। “বলুন মেনটালি ইল, বা ওরকম কিছু।”
প্রদীপ বললেন, “স্যরি। এগুলো পুরোনো অভ্যাস...”
“ইয়েস,” বললেন অতনু। “ব্যক্তিগত মুহূর্তেও উই মাস্ট বি পলিটিক্যালি কারেক্ট। নইলে আমরাও শ্রীবাস্তবের মতো চিতাবাঘই থেকে যাব।”
“মানে?” জানতে চাইলেন প্রদীপ।
“মানে আমাদের ফুটকি বদল হবে না। দ্বিতীয় প্রশ্ন কী?”
প্রথম প্রশ্নের আলোচনা করতে করতে প্রদীপ ভেবেছিলেন যে দ্বিতীয়টা আর জিজ্ঞেস করবেন না, কিন্তু আর অপেক্ষা করাও বোধহয় উচিত হবে না।
“আমার ধারণা ছিল, মৌলির বাড়ির লোকেরা আমাকে খুব অপছন্দ করে না। কিন্তু আজ যা দেখলাম...”
অতনুর মুখভঙ্গীর বদল দেখে থমকে গেলেন প্রদীপ।
খানিকক্ষণ ভীষণ ভুরু কুঁচকে মেঝের দিকে তাকিয়ে রইলেন অতনু। তারপরে বললেন, “তুই কতটা জানিস তা জানি না, তবে তোর শ্বশুরবাড়িতে তোর অ্যাক্সেপ্ট্যানস কিন্তু খুবই সামান্য। তোর শাশুড়ি তোকে বেশ পছন্দ করেন। তোর শ্বশুরমশাই শুরুতে তোকে পছন্দ করতেন না, পরে মৌলি, তার মা, আর বিশেষ করে তোর খুড়শ্বশুর-শাশুড়ি অনেক বুঝিয়ে ভদ্রলোককে বাগে আনেন। এ ছাড়া, তোর জ্যাঠাশ্বশুরের ফ্যামিলি তোকে মোটেই পছন্দ করে না। আর যে লোকটা তোকে দুচক্ষে দেখতে পারে না, সে হলো তোর শালা – বাবলু, ওরফে পুলস্ত্য – কোনও দিনই তোকে সহ্য করতে পারেনি।”
প্রদীপ বললেন, “কিন্তু সে সব তো আদ্যিকালের কথা। বাবলুদা বাদে সবটাই আমি জানি। বাবলুদা আমাকে পছন্দ করে না আমি কখনও ওর হাবেভাবে বুঝিনি। হি ওয়জ ডিস্ট্যান্ট, অনেকটা বড়ো দাদাসুলভ, কিন্তু দুচক্ষে দেখতে না পারা...”
মাথা নেড়ে অতনু বললেন, “সেই আদ্যিকালটাই আবার হঠাৎ উঠে এসেছে। তোর শালা নাকি অনেক চেষ্টা করেছিল যাতে তোদের বিয়ে না হয়। কিন্তু প্রধানত তোর শাশুড়ির জন্য হয়নি।”
“কিন্তু কেন?” অবাক হয়ে জানতে চাইলেন প্রদীপ।
ঠোঁট উলটে অতনু বললেন, “আমার মনে হয় বাবলু চেয়েছিল মৌলির বিয়ে কোনও অ্যামেরিকান ভারতীয়র সঙ্গে হোক। সেই জন্য মৌলির জেঠিমার পছন্দের ছেলেকেও বাতিল করে দিয়েছিল।”
আবার প্রদীপের চোখ কপালে। জেঠিমারও পছন্দের ছেলে ছিল?
“কেন, না থাকার কী আছে? জেঠিমা কি সমাজবহির্ভূত নাকি?”
“কিন্তু তুই এত কথা জানলি কী করে?”
চোখগুলো ঢুলুঢুলু করে স্মিত হাসিতে মুখ ভরিয়ে অতনু বললেন, “ওই যে, ভালো উকিল ইকোয়ালস ভালো ডিটেকটিভ! কিন্তু প্রশ্নটা এই নয়, যে আমি জানলাম কী করে। প্রশ্নটা এই – যে এসব তুই জানিস না কেন?”
সেটাও প্রদীপ জানেন না।
পরদিন আদালতের পথে অতনু হঠাৎ ফাইল থেকে মুখ তুলে বললেন, “আজ ওরা লিটন আর পুঁটেকে তুলবে।”
প্রদীপের বুকটা ধড়াস করে উঠল।
“তার মানে ওদের আর উইটনেস নেই?”
“কেস তো ওদের লিটন আর পুঁটের ওপরেই দাঁড়িয়ে। আগের সবাই তো সেরেফ অ্যাটমসফিয়ার তৈরির জন্য। সো দ্যাট দেয়ার ইজ আ মোটিভ। মোটিভ না থাকলে কেস সলভ হবে না। যাকেই আসামি খাড়া করো, মোটিভ মাস্ট বি ক্লিয়ার। সে কথা তোমার অর্ধেন্দু খুব ভালো করে জানে।”
কোর্টে তিলধারণের জায়গা নেই। প্রদীপ লক্ষ করলেন আজ দর্শকাসনের সামনের দিকেই মৌলির বাবা আর দাদা দুজনেই রয়েছেন। মৌলির মা-কে একদিনও দেখতে পাননি। হয়ত আদালতে আসেনইনি। উনিও কি ওরকম মিথ্যে কথা বলতেন সাক্ষী দিতে হলে? আর কে কে প্রদীপের সম্বন্ধে ওরকম হীন ধারণা পোষণ করে? মৌলির জ্যেঠু জেঠিমা হয়ত করেন, কিন্তু তুলির মা-বাবা? তুলি নিজে?
জজসাহেব এসে যাওয়াতে প্রদীপের চিন্তায় বাধা পড়ল। আদালতকে শান্ত করে জজ সরকারি উকিলকে বললেন পরের সাক্ষীকে ডাকতে।
সরকারি পক্ষের পরের উকিল পুঁটে সর্দার। পুঁটের সঙ্গে একজন ইঁদুর-সদৃশ লোক, পরণে সাদা প্যান্ট আর একটা চকচকে নতুন কালো কোট দেখে প্রদীপ বুঝলেন ওদের উকিল। অবশ্য লোকটা সারাক্ষণ কোনও কথাই বলল না, চুপ করে বসেই রইল।
আদালতে মৃদু গুঞ্জন জজসাহেবের হাতুড়ির আঘাতে থেমে গেল।
সরকারি উকিল শুরু করলেন। “নাম বলুন।”
“হুজুর আমার নাম পুঁটে সর্দার।”
“কোথায় বাড়ি?”
“খিদিরপুরে হুজুর।”
“কী করা হয়?”
“হুজুর, আমরা মুখ্যু-সুখ্যু মানুষ।”
“তা জিজ্ঞেস করিনি। কী করো বলো।”
“আমরা পড়াশোনা শিখিনি। আমরা আর কী করব, বলুন স্যার... এই একটু গুণ্ডামী বদমাসী করে খাই।”
“কী কী করো?”
“গুরু যা যা বলেন, তাই করি। পকেট কাটা, ছিনতাই, তোলা আদায়, কখনও অটোর লাইন কনটোল।”
“খুনোখুনি?”
এক হাত জিভ কেটে পুঁটে বলল, “কী যে বলেন না, স্যার, খুনোখুনি আমরা করি না। তবে, হ্যাঁ, কখনও কখনও দরকার পড়লে একটা বোমা বা পেটো মারা হয় বইকি! গুরুর হুকুম তো মানতে হয়।”
“গত আঠেরোই অক্টোবর, বিকেলবেলা কোথায় ছিলে?”
পুঁটে অনেক ভাবল, তারপরে বলল, “স্যার, তারিক টারিক তো অত মনে থাকে না – আপনি কি ওই খুনের দিনের কথা বলছেন? সল্ট লেকে ওই মৌলি সেনগুপ্তর খুনের কথা?”
সরকারি উকিল বাস্তবিক ওই খুনের দিনের কথাই বলছেন। বললেন, “সেদিনের কথা কী বলবে?”
“কী আর বলি হুজুর,” ব্যাজার মুখে বলল পুঁটে। “সেদিন আমাদের লাকটাই খারাপ। আমি আর আমার স্যাঙাত লিটন দুজনে গিয়েছি সলট লেকে হাউসিং-এ। কথা ছিল, যাব, চাকু চালিয়ে শেষ করব, আর বাড়ি-ঘর-দোর ওলট-পালত করে রেখে যাব, যেন ডাকাতি হয়েছে। এমন কপাল, যেমন চাকু চালিয়েছি, ওমনি মেয়েটা চিৎকার করেছে, আর ওমনি হাওয়ায় পর্দা উড়ে গিয়ে পাশের বাড়ির মেয়েটা দেখে নিয়েছে। ব্যাস, আমাদের আর পালান’ হলো না। রঙ্গে হাথ ধরা পড়লাম।”
“খিদিরপুর থেকে এতদূরে কেন গিয়েছিলে? খুন করতে, না ডাকাতি করতে?”
“না হুজুর, ডাকাতি করতে অতদূর যাব কেন? কথা ছিল মেয়েটাকেই সাবাড় করে, আলমারি থেকে টাকা-পয়সা-গয়না যা পাব নিয়ে চলে আসব। তাহলে পুলিশ ভাববে ডাকাতি করতে গিয়ে খুন হয়েছে।”
“মৌলি সেনগুপ্তকে খুন করতে গেছিলে কেন?”
“স্যার, সে তো ওনার হাজবেন্ড টাকা দিয়ে আমাদের খুন করাতে চেয়েছিলেন – তাই।”
আদালতের গুঞ্জন বাড়ার আগেই জজের হাতুড়িতে থেমে গেল।
“মৌলিদেবীর স্বামী তোমাদের বলেছিলেন স্ত্রীকে খুন করতে?”
“হ্যাঁ, হুজুর।”
“তোমাদের খোঁজ উনি পেলেন কোথায়?”
“সে তো বলতে পারব না, হুজুর। আমাদের গুরু বললেন, তাই আমরা দেখা করলাম।”
“কবে দেখা করেছিলে?”
“তারিক-টারিক মনে নেই, স্যার। তবে বিশ্বকর্মা পুজোর কয়েক দিন আগে।”
“বিশ্বকর্মা পুজো ছিল ১৭ই সেপ্টেম্বর। তার কদিন আগে?”
“বলতে পারব না স্যার, দুদিন বা তিন দিন।”
“বেশ। দুতিন দিন আগে। কোথায় দেখে করেছিলে?”
“খিদিরপুরে স্যার, ওনার গাড়িতে।”
“গাড়িতে?”
“হ্যাঁ, স্যার। ওনার একটা ঝাকাস গাড়ি আছে। মারুতি রিচ গাড়ি। ছোট্ট, কিন্তু হেবি দাম। এক্কেবারে সাদা রং – দুধের মতো।”
অতনু চট করে একবার প্রদীপের দিকে তাকালেন। প্রদীপের হেলদোল নেই। প্রদীপ জানেন পুঁটেরা তৈরি রয়েছে মিথ্যের ঝুড়ি নিয়ে।
“সে গাড়ি দেখলে চিনতে পারবে?”
“পারব স্যার। সে গাড়ি আমি অনেকবার দেখেছি। নামবারও মুখস্ত হয়ে গিয়েছিল। লিটন তো গাড়ি দেখলেই বলত, ‘ওই আসছে, সিক সিক থিরি ফোর।’”
সরকারি উকিল কয়েকটা রিট্‌জ্‌ গাড়ির ছবি পুঁটের হাতে দিয়ে বললেন, “এগুলোর মধ্যে গাড়িটার ছবি রয়েছে?”
পুঁটে দু-তিনটে ছবি সরিয়ে একটা ছবি আলাদা করে বলল, “এই ছবিটা স্যার।”
প্রদীপ ছবিটা দেখতে পাচ্ছেন না। সরকারি উকিল বললেন, “কী করে বলছ? সাদা রং আর নম্বর দেখে?”
পুঁটে বলল, “শুধু তাই না স্যার, এই দেখুন গাড়িটার সিটের রঙও কেমন আলাদা।”
গাড়ি ডেলিভারি নেবার সময় প্রদীপ বলেছিল, “এ আবার কী? এ তো মেরুন রং।”
মৌলি বলেছিল, “এঁজ্ঞে না মশাই, একে বলে বার্গান্ডি। ওয়াইন-এর রং। সত্যি বাবা, কী বাঙাল!”
পরে প্রদীপ লক্ষ করেছিলেন, সাদার মধ্যে এই রঙের সিট কভার সত্যিই বিশেষ দেখা যায় না।
“আর তাছাড়া,” বলে চলেছে পুঁটে, “এই দেখুন স্যার, এই যে ছোট্ট মূর্তিটা ঝুলছে আয়না থেকে, এটাও বিশেষ দেখা যায় না। রাক্ষসের মতো কালো একটা মেয়ে, কিন্তু শাড়ি পরেছে, সে শাড়ি আবার দেখতে গামছার মতো।”
পুতুলটা গাড়ি কেনার দিন থেকেই ঝুলছে। অস্ট্রেলিয়া থেকে মৌলি কিনেছিল তার দু-তিন মাস আগে – বিয়েরও আগে – যখন ওর বাবার সঙ্গে মেলবোর্ন গিয়েছিল। “অস্ট্রেলিয়া থেকে শাড়ি পরা মেয়ে এনেছি। এটা রিয়ারভিউ মিররে লাগিয়ে দিই?”
প্রদীপের অস্বস্তি ছিল, সামনে একটা পুতুল ঝুললে গাড়ি চালাতে অসুবিধা হতে পারে, কিন্তু মৌলির উৎসাহে আপত্তি করতে পারেননি। অসুবিধা হয়নি কিন্তু। পরে মৌলির দাদা ওদের বলেছিল পুতুলটা আদি মরিশিয়ান। মরিশাস দ্বীপ থেকে অস্ট্রেলিয়ার কোন পুতুল মিউজিয়ামে নিয়ে যাওয়া হয়।
হঠাৎ মনে হলো, পুতুলটা এখন কোথায়?
কিন্তু অত ভাবার সময় নেই। জজ সাহেবের হাতে পুতুল তুলে দিয়েছেন উকিল, জজ একটা আতশ কাচ দিয়ে মন দিয়ে ছবিতে পুতুলটা দেখার চেষ্টা করছেন।
সরকারি উকিল ফিরলেন পুঁটের সামনে।
“প্রথম দিন আপনাদের সঙ্গে কী করে আসামি প্রদীপ সেনগুপ্তর দেখা হলো, বলবেন?”
“স্যার, আমরা সেদিন দাঁড়িয়ে রয়েছি রাস্তার মোড়ে, এমন সময় ওই বাবুর গাড়ি আসছে দেখে লিটন বলেছে, ‘কী ঝাকাস গাড়ি দেখেছিস?’ গাড়ি এসে আমাদের সামনে দাঁড়িয়েছে, ওই বাবু বেরিয়ে বলেছে, গুরুর নাম করে, ‘কোথায় পাব?’ আমরা বলেছি, ‘কী চাই?’ বলেছে, ‘তাতে তোমাদের কী? কোথায় পাব, বলে দাও।’ লিটন সিঁড়ি দিয়ে উঠে গুরুকে বলেছে, গুরু বলেছে, ‘হাঁ, জানতা হুঁ। উপর লে আও।’ লিটন ওকে উপর নিয়ে গেছে, গুরু বলেছে, ‘তু ঔর পুঁটে নিচে রহনা।’ আমরা দাঁড়িয়ে রয়েছি, একটু বাদে বাবু নেমে এসেছে। বলেছে, ‘তোমাদের ডাকছে।’ আমরা উপরে গেছি, গুরু বলছে, ‘বাবুকা সাথ যা, যো বোলে, সো কর দেনা। পয়সা মিলেগা।’ আমরা নিচে এসে দেখছি বাবু গাড়িতে বসে আছে। আমাদের দেখে দরজা খুলে নেমে পিছে দরজা খুলে বলেছে, ‘ওঠো।’ আমরা উঠেছি, বাবু গাড়ি চালাতে চালাতে বলেছে ওনার ওয়াইফকে মারতে হবে। লিটন বলেছে, ‘আমরা মাডার করি না।’ আমি বলেছি, ‘গুরু বলেছে, করতে হবে – করতে হবে। কত দেবেন?’ বাবু দর বললে, আমরা রাজি হলাম না। দরাদরি হলো, লিটন বলল বিড়ি খাবে। বাবু বলল গাড়িতে না, গন্ধ হবে। গাড়ি গিয়ে থামল পিনসেপ ঘাটে। ওখানে আমরা বিড়ি খেলাম, বাবু নাক কুঁচকে দাঁড়িয়ে রইল। তারপরে আমাদের নিয়ে গিয়ে খিদিরপুরের মোড়ে ছেড়ে দিল।”
“এর পরে আর কোনও দিন দেখা হয়েছিল?”
“হয়েছিল হুজুর,” বলল পুঁটে। “দু দিন পরে বাবু টাকা নিয়ে এল। আগে গুরুকে ফোন করেছিল। গুরু আমাদের বলেছে, ‘তোরা রুপিয়া নিয়ে যা করার কর, আমার কাছে আনবি না। বাবু এল গাড়িতে, আমি আর লিটন উঠলাম। বাবু বলল, ‘টাকা আছে পিছনের সিটে। আমরা টাকা গুনলাম। দেখি পুরো টাকা নেই। কেবল যা বয়ান হয়েছিল, তার এক পোয়া। বললাম, ‘বাকি টাকা?’ বলল, ‘বাকি কাম কা বাদ।’ আবার দরাদরি হলো। আমরা বললাম, ‘না, আধা দিতে হবে।’ বাবু বলল, ‘বাকি টাকা কাজ করলে হবে।’ আমরা গুরুকে ফোন করলাম, গুরু বাবুর সাথে কথা বলল, তারপরে বাবুর কথাই রইল। বাবু বলল, ‘আলমারিতে টাকা থাকবে। তোরা টাকা নিয়ে যাবি। আলমারিতে যত গয়নাগাটি থাকবে, সব নিবি। লোকে ভাববে ডাকাতি।’”
“এটা কে বলেছিল?” জানতে চাইলেন সরকারি উকিল। “তুমি, না আসামি প্রদীপ সেনগুপ্ত?”
“ও-ই বলেছিল স্যার। ছবি এঁকে দিল, কী করে যেতে হবে, ফ্ল্যাটের কোথা কী ঘর, কোথা আলমারি, সব।”
“তারপরে কী হলো?”
“আবার আমাদের নামিয়ে দিয়ে চলে গেল। আর দেখা হয়নি।”
“তাহলে কবে খুন করতে যাবে, সেই দিন কী ভাবে ঠিক হলো?”
“বাবু ফোন করে জানিয়েছিল গুরুকে। গুরু আমাদের সব বলে দিয়েছিল।”
এর পর অতনুর পালা।
“গুরু কে? যার সঙ্গে প্রদীপ সেনগুপ্ত দেখা করতে গিয়েছিলেন?”
হাত জোড় করে পুঁটে বলল, “মাপ করবেন স্যার, ও নামটা নেওয়া যাবে না। পুলিশকেও বলিনি।”
“আচ্ছা, বেশ। আচ্ছা, লিটন আর আপনি – আপনারা দুজনেই প্রদীপ সেনগুপ্তর গাড়ির নম্বরটা দেখেছিলেন?”
“হাঁ স্যার।”
“সেই গাড়ি – যার নম্বর সিক্স সিক্স থ্রি ফোর?”
“হাঁ, হুজুর।”
“দু-দিনই একই গাড়িতে এসেছিলেন উনি?”
“হাঁ, সার।”
“যেদিন আপনারা প্রথম সেই গাড়িতে চড়েছিলেন, প্রিনসেপ ঘাটে গিয়ে বিড়ি খেয়েছিলেন, আর প্রদীপ সেনগুপ্ত আপনাদের বলেছিলেন যে ওনার স্ত্রীকে খুন করতে হবে, সেদিনও ওনার গাড়ির নম্বর ৬৬৩৪ ছিল?”
“ছিল হুজুর।”
“সেদিন ওই পুতুলটা আয়না থেকে ঝুলছিল?”
“হাঁ, হুজুর।”
“আর তার পরদিন, যেদিন আগাম টাকা পেলেন, সেদিনও কি ওই একই গাড়ি? ওই সাদা রিট্‌জ্‌?”
“হাঁ হুজুর।”
“সিটের রং-ও একই?”
“হাঁ হুজুর।”
“সেদিনও নম্বর ৬৬৩৪?”
“হুজুর।”
“সেদিনও ওই পুতুল ঝুলছিল?”
“ঝুলছিল হুজুর।”
অতনু ক্রস-এক্সামিনেশন শেষ করে বসলেন। পুঁটেকে ছেড়ে দেওয়া হলো।
সরকারি পক্ষের পরের সাক্ষী লিটন গুণ্ডা।
“আপনার নাম লিটন গুণ্ডা?”
“আজ্ঞে হ্যাঁ, স্যার।”
“গুণ্ডা আবার কী রকম নাম?”
“স্যার আমার বাবার নাম কেউ জানে না। মা নাম রেখেছিল লিটন, আর ছোটোবেলাতেই মরে গিয়েছিল। সবাই লিটন লিটন করত, আর কোনও নাম ছিল না। তারপরে ভোটার কার্ড বানাবার সময় আমাকে বলল, পুরো নাম কী? তখন কে পেছন থেকে বলে দিল লিটন গুণ্ডা, বাস, তখন থেকেই সবাই লিটন গুণ্ডা বলে, ওই ফুল নেম হয়ে গেছে।”
লিটনের বয়ানের সঙ্গে পুঁটের বয়ানের তফাৎ সামান্যই। তবে ওর তারিখ মনে আছে। বিশ্বকর্মা পুজোর তিন দিন না, পাঁচ দিন আগে, অর্থাৎ ১২ই সেপ্টেম্বর ওরা প্রথম বাবুর সঙ্গে দেখা করে। দ্বিতীয়বার দেখা হয় বিশ্বকর্মা পুজোর পর। কুড়ি সেপ্টেম্বর। তার পরে আর দেখা হয়নি।
সরকারি উকিল লিটনকে অতনুর সব প্রশ্নই করলেন। অর্থাৎ, দু-দিনই একই গাড়ি ছিল কি না, দু-দিনই তার রং সাদা ছিল কি না, দু-দিনই তার সিটের রং একই ছিল কি না, তার নম্বর ৬৬৩৪ ছিল কি না, এবং ওই পুতুলটা দু-দিনই ছিল কি না।
ছিল, ছিল, ছিল।
অতনু কোনও প্রশ্ন করলেন না, লিটন বেরিয়ে গেল, সঙ্গে ওদের মৌন উকিলও।
সরকারি পক্ষের সওয়াল শেষ হলো। জজ ঘড়ি দেখে বললেন, “মিঃ সিনহা, আপনার সাক্ষীরা তৈরি?”
অতনু উঠে বললেন, “ইওর অনার, আমরা তৈরি।”
“বেশ। শুরু করুন।”
অতনু বললেন, “আমার প্রথম সাক্ষী মিঃ দুর্গাপতি সেনয়।”
লম্বা দোহারা চেহারার অবাঙালি একজন ভদ্রলোক কোর্টে এসে শপথ নিলেন। হাতে একটা রেজিস্টার জাতীয় খাতা।
“আপনার নাম দুর্গাপতি সেনয়?” ইংরেজিতে জিজ্ঞেস করলেন অতনু।
“হ্যাঁ,” ইংরেজিতেই উত্তর দিলেন সেনয়।
“আপনি বাঙালি না?”
“না, স্যার। তবে তিন বছর হলো কলকাতা এসেছি, একটু একটু বুঝতে পারি।”
“বুঝতে হবে না। আপনাকে ইংরেজিতে প্রশ্ন করা হবে, আপনি ইংরেজিতেই উত্তর দেবেন। আপনি কখনও কোর্টে সাক্ষী দিয়েছেন?
“না।”
“কী করতে হবে বুঝিয়ে দিচ্ছি। আপনাকে সওয়াল করব আমি। আমি ডিফেন্ড্যান্ট প্রদীপ সেনগুপ্তর উকিল। আমি শেষ করলে সরকারি পক্ষের উকিল আপনাকে সওয়াল করতে পারেন। ওই যে উনি সরকারি উকিল।” সেনয় মাথা নাড়লেন। বুঝেছেন।
“যে-ই প্রশ্ন করুক না কেন, আপনার সব উত্তরই কিন্তু আপনি দেবেন মহামান্য আদালতকে। আদালতকে রিপ্রেজেন্ট করছেন জজ। আপনি জজকে অ্যাড্রেস করবেন হয় ইওর অনার, না হলে স্যার বলে। লর্ডশিপ নয়। বুঝেছেন?”
“হ্যাঁ।”
“আপনার সব উত্তরই হবে ভার্বাল। অর্থাৎ ইঙ্গিতে নয়।”
“ঠিক আছে, স্যার।”
“গুড। আপনি শপথ নিয়েছেন, যা বলবেন, সত্যি বলবেন, সত্যি ছাড়া মিথ্যা বলবেন না। কোর্টে শপথ নিয়ে মিথ্যা বলা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। যদি কোনও প্রশ্নের উত্তর না জানা থাকে, তাহলে আপনি রেকর্ড দেখে বলতে পারেন। আন্দাজে ভুল বলবেন না।”
নার্ভাস সেনয়ের ডান হাতটা উঠে গেল কলারের বোতামের দিকে। প্রদীপের মনে হলো বোধহয় সবসময় টাই পরে থাকে লোকটা।
“ঠিক আছে, স্যার।”
“বেশ। শুরু করছি।” অতনু একবার জজসাহেবের দিকে তাকালেন, জজ মাথা নুইয়ে অনুমতি দিলেন। প্রদীপের মজা লাগছে। যেন একটা খেলা শুরু হতে চলেছে। অন্য কোনও পরিস্থিতিতে অতনু বলতেই পারতেন, “ঔর, পাঁচ হাজার রুপিয়াকে লিয়ে আপকা পহেলা সওয়াল হ্যায়...”
“মিঃ সেনয়, আপনি কী করেন?”
“ইওর অনার, আমি প্রফেশনালি অটোমোবাইল এনজিনিয়ার। মারুতি কম্পানিতে এমপ্লয়েড। আপাতত নিউ আলিপুরের সার্ভিস স্টেশনে পোস্টেড।”
“এই সার্ভিস স্টেশন কি মারুতি কম্পানি চালায়?”
“না, স্যার। এগুলো সবই ফ্র্যানচাইজির হাতে। তবে কম্পানির একটা রিপ্রেজেন্টেশন থাকে। আমি কলকাতার রিপ্রেসেন্টেটিভ। পোস্টিং আমার নিউ আলিপুরে, কিন্তু আমি সারা কলকাতার সব সার্ভিস স্টেশনেই যাই।”
“বেশ। কত দিন আপনি মারুতিতে কাজ করছেন?”
“প্রায় দশ বছর হতে চলল।”
“কলকাতায় কবে এসেছেন?”
“প্রায় তিন বছর।”
“আপনি কি কাঠগড়ায় দাঁড়ানো ডিফেনড্যান্টকে চেনেন?”
এক ঝলক প্রদীপকে দেখে নিয়ে সেনয় বললেন, “চিনি ইওর অনার, উনি প্রদীপ সেনগুপ্ত। ব্যাঙ্ক এমপ্লয়ী।”
“ওনার সঙ্গে কী ভাবে পরিচয় আপনার?”
“মাস দুয়েক আগে একটা পার্টিতে পরিচয় হয়। কথায় কথায় জানতে পারি উনি ওনার নতুন রিটজ্‌ গাড়ি কিনেছিলেন কিছুদিন আগে। কেনার পরপরই একটা অ্যাক্সিডেন্ট হয়। তার পর থেকে উনি গাড়িটার পারফর্ম্যানস নিয়ে স্যাটিসফাইড হতে পারছিলেন না। আমাকে সব বলেন, আমি বলি আমাকে ফোন করে ওটা নিউ-আলিপুরের ওয়ার্কশপে নিয়ে আসতে।”
“তার পরে কী হয়?”
“গত সেপ্টেম্বরের ৯ তারিখ উনি গাড়িটা নিয়ে আসেন। আমার হেড মেক্যানিক গাড়ি দেখে বলে সেটা তক্ষুনি রিসিভ করতে হবে। ওই অবস্থায় আর চালানো উচিত নয়। আমরা গাড়ি রিসিভ করি। ১০ তারিখ আমাকে ওরা রিপোর্ট দেয়...” এই পর্যন্ত বলে সেনয় থেমে বলেন, “আমি একটু রেজিস্টারটা দেখে বলি?”
“নিশ্চয়ই,” বললেন অতনু, “আমি তো আপনাকে বলেইছি, শিওর হয়ে বলবেন।”
ভদ্রলোক রেজিস্টার খুলে বললেন, “এই যে – নাইনথ্‌ সেপ্টেম্বর সকালে গাড়ি রিসিভ করা হয়েছে, দশ তারিখ দুপুর দুটোর সময় ওয়ার্কশপ ইন-চার্জ গাড়ির কন্ডিশন রিপোর্ট করে। রিপেয়ার ওয়ার্ক শুরু হয় ১৬ তারিখ। শেষ হয় ২২শে। গাড়ি ডেলিভারি হয় ২৩ তারিখ।”
“কোন মাসের?”
“২৩শে সেপ্টেম্বর,” বললেন সেনয়।
“৯ তারিখ গাড়ি রিসিভ করে ২৩ তারিখে ডেলিভারি – এত সময় লাগা কি নরমাল?”
“অ্যাকচুয়ালি,” কথাটা শুরু করে থতমত খেয়ে থেমে গিয়ে সেনয় নিজেকে শুদ্ধ করে বললেন, “ইওর অনার, গাড়িটা নিয়ে একটা সমস্যা ছিল। ওটা অ্যাক্সিডেন্টের পরে লোক্যাল ওয়ার্কশপে গিয়েছিল, কিন্তু ওখানে কাজটা ঠিক করে করা হয়নি। ইন ফ্যাক্ট, টু টেল ইউ দ্য ট্রুথ, দ্য কাস্টমার ওয়াজ সর্ট অফ চিটেড। অ্যাজ আ রেজাল্ট আমাকে কম্পানির সঙ্গে নেগোশিয়েট করতে হয়, গাড়িটা তখনও ওয়ারান্টি পিরিয়ডে থাকলেও যে পার্টটা চেঞ্জ করা হয়েছিল...”
“অত টেকনিক্যাল ডিটেল না দিলেও চলবে মিঃ সেনয়, আপনি একটু সংক্ষেপে বলতে পারেন।”
থতমত খেয়ে সেনয় একটু ভেবে বললেন, “প্রথমে দেরি হয় ইওর অনার, কারণ কম্পানির সঙ্গে নেগোশিয়েট করতে হয় যে রিপ্লেসমেন্টগুলো সব ফ্রি অফ কস্ট দিতে হবে, কারণ আগের বার আমাদেরই ওয়ার্কশপ ঠিক করে কাজটা করেনি। তার পরে একটা ইম্পর্ট্যান্ট রিপ্লেসমেন্ট পার্ট ফলটি বেরোয়। ফলে ওটা দিল্লি ফেরত পাঠিয়ে আবার রিপ্লেসমেন্ট আনাতে হয়, সেইজন্য অনেক সময় লেগে যায়।”
“আপনারা যখন গাড়ি রিপেয়ারের জন্য নিয়েছিলেন, তখন ওতে যে অর্নামেন্টস ছিল সেটা শুদ্ধ নিয়েছিলেন কি?”
“এটা তো রেকর্ড নেই, স্যার, তবে আমরা সাধারণত কোনও অর্নামেন্ট, পেপার্স – এসব রাখি না। ফেরত দিয়ে দেওয়া হয়।”
“সেটা কাসটমার যখন নিয়ে যান, তখন কোনও লিস্ট করে সই করিয়ে রাখা হয়?”
“জব শীটে একলাইন লেখা হয়। সেটায় কোনও ডেস্ক্রিপশন থাকে না।”
“বেশ। আপনার রেজিস্টারটা ভালো করে দেখে বলুন তো, ১২ আর ১৭ই সেপ্টেম্বর গাড়িটা কি ওয়ার্কশপ থেকে বেরিয়েছিল?”
“রেজিস্টার দেখতে হবে না, স্যার। আমি ডেফিনিট। বেরোয়নি।”
“কোনও অবস্থাতেই, কয়েক মিনিটের জন্য বেরিয়ে নিয়ে যায় যদি কেউ?”
“ইম্পসিব্ল, স্যার। গাড়ির ইন্‌জিন খোলা, বনেট খোলা, চারটে চাকা খোলা... ওই অবস্থায় ওই গাড়ি নিয়ে বেরোতে গেলে ট্রাকে করে নিয়ে যেত হত।”
“এই সময়ে আপনারা কি মিঃ সেনগুপ্তকে কোনও রিপ্লেসমেন্ট গাড়ি দিয়েছিলেন?”
“নট ইমিডিয়েটলি,” বললেন সেনয়। “রিপ্লেসমেন্ট গাড়ি বেশি থাকে না। তাই সবাইকে দেওয়া যায় না। তবে ১০ তারিখ যখন আমরা বুঝতে পারি যে গাড়িটা আমরা মিঃ সেনগুপ্তকে খুব তাড়াতাড়ি ফেরত দিতে পারব না, তখন ১১ তারিখ গাড়ির ব্যবস্থা করে ওনাকে ফোনে খবর দিই, উনি ১২ তারিখ বিকেলে গাড়ি নিয়ে যান।”
“কী গাড়ি ছিল? কী রঙের?”
“অল্টো, স্যার। কালো রং।”
“কত নম্বর ছিল?”
রেজিস্টার থেকে একটা কাগজ বের করে সেনয় বললেন, “ডব্লুবি ০৬ ডি ১২৯৭।”
“এই গাড়িটা কতদিন ছিল মিঃ সেনগুপ্তর কাছে?”
“তেইশ তারিখে উনি যখন গাড়ির ডেলিভারি নেন, তখন ফেরত দিয়ে গিয়েছিলেন।”
অতনু এগিয়ে এসে “এক্সকিউজ মি” বলে রেজিস্টারটা সেনয়ের হাত থেকে নিয়ে জজসাহেবের সামনে রেখে বললেন, “ইওর অনার, মারুতি কম্পানির ওয়ার্কশপের এই রেকর্ড থেকে দেখা যাচ্ছে যে অ্যাকিউজড প্রদীপ সেনগুপ্তর গাড়ি ১০ই সেপ্টেম্বর থেকে ২২শে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ওয়ার্কশপে ছিল। তার মধ্যে রেলেভ্যান্ট পেপার্সের জেরক্স আমি কোর্টে জমা করছি। অর্থাৎ, রাজসাক্ষী লিটন আর রাজসাক্ষী পুঁটে কোনও অবস্থাতেই ওই গাড়ি করে প্রিনসেপ ঘাটে বিড়ি খেতে যায়নি, এবং ওই গাড়িতে বসে টাকাও গোনেনি।” বলে জেরক্সের একটা সেট জজের সামনে রেখে অন্যটা রাখলেন সরকারি উকিলের সামনে। সরকারি উকিলকে বললেন, “ইওর উইটনেস।”
সরকারি উকিলের তখন আর উঠে দাঁড়ানোর ক্ষমতা নেই। উনি কাগজে আঙুল বুলিয়ে রেজিস্টারের কপি পড়ছেন। পাশে পুলিশ অফিসার অর্ধেন্দু। তিনিও বিশাল থালার মতো চোখ করে তাকিয়ে আছেন জেরক্সগুলোর দিকে। উকিল ফিরে কী বললেন, অর্ধেন্দু উঠে প্রায় ছুটে বেরিয়ে গেলেন কোর্ট থেকে।
“আপনি কি উইটনেসকে ক্রস এক্সামিন করবেন?” জানতে চাইলেন জজ।
“ইয়ে, হ্যাঁ, ইওর অনার,” সরকারি উকিল একেবারেই অনভিজ্ঞ লইয়ারের মতো উঠে এসে বললেন, “মিঃ সেনয়, এই যে রেজিস্টার, এতে যা যা লেখা আছে, তা কি আপনাকে দেখিয়ে লেখা হয়েছে?”
সেনয় একটু অবাক হয়ে বললেন, “প্রতিটা কথা আমাকে দেখান হয়নি। কারণ এটা ওয়ার্কশপ রেকর্ড। এটা আমার কাছে রুটিনলি আসে না।”
“তাহলে আপনি কী করে হলপ করে বলছেন, যে এতে যা লেখা আছে, সব সত্যি?”
“ইওর অনার, এতে যা লেখা আছে, তা সত্যি আমি হলপ করে বলতে পারব না।”
অতনু লাফিয়ে উঠে বলল, “ইওর অনার, আমার লার্নেড কলিগ যদি কোর্ট রিপোর্টারের কথা পড়েন, তাহলে দেখতে পাবেন উনি কিন্তু কখনওই হলপ করে বলেননি রেজিস্টারের লেখা সব সত্যি।”
সরকারি উকিল খুব জোর দিয়ে বললেন, “তাই যদি হয়, তাহলে ওই সাদা মারুতি রিট্‌জ্‌ যে সারাক্ষণ ওয়ার্কশপে পড়ে ছিল, তারই বা গ্যারান্টি কোথায়?”
“ইওর অনার,” আস্তে আস্তে বললেন সেনয়, “গাড়ি ৯ তারিখ থেকে ২৩ তারিখ অবধি ওয়ার্কশপ ছেড়ে কোথাও যায়নি। এর মধ্যে ১০ থেকে ২৩ তারিখ অবধি গাড়ি কোথাও যাওয়ার অবস্থায়ও ছিল না। এ আমি হলপ করে বলছি।”
“আপনি কি সবসময় ওয়ার্কশপে থাকেন?”
“না, স্যার।”
“তাহলে?”
“গাড়ির ইঞ্জিন খোলা ছিল। এমন সমস্ত কম্পোনেন্ট আমরা বাই কুরিয়ার দিল্লি পাঠিয়েছিলাম, যেগুলো ছাড়া গাড়ি চলতেই পারে না। ইওর অনার, আপনি যদি আদেশ করেন, তাহলে সে সব ডিটেল আমার সঙ্গেই রয়েছে।”
“অন্য কোনও গাড়ির পার্টস দিয়ে আবার অ্যাসেম্বল করা যেতে পারত কি?”
অতনু উঠে বললেন, “ইওর অনার, হঠাৎ একটা ওয়ার্কশপে কয়েক ঘণ্টার জন্য একটা অকেজো গাড়িকে কেনই বা কেউ চালু করে দেবে সেটা নিয়ে যাতে অভিযুক্ত প্রিনসেপ ঘাটে পুঁটেকে বিড়ি খাওয়াতে নিয়ে যেতে পারেন? আমার মনে হচ্ছে এসবে আদালতের মহামূল্যবান সময় নষ্ট হচ্ছে। আমি অবজেকশন জানাচ্ছি।”
“অবজেকশন সাস্টেনড,” বললেন জজ। “আপনার কি কোনও রেলেভ্যান্ট প্রশ্ন আছে?”
সরকারি উকিল চুপচাপ বসে পড়লেন।
অতনু উঠে বললেন, “ইওর অনার, আমি চাইছি পুঁটে সর্দার আর লিটন গুণ্ডাকে আবার সাক্ষীর কাঠগড়ায় আনতে। ওরা হস্টাইল উইটনেস, কিন্তু এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ওদের আবার সাক্ষ্য খুব জরুরি।”
জজসাহেব এর উত্তরে কী বলতেন সেটা আর কারওর জানা হলো না। অর্ধেন্দু আবার আদালতে ঢুকলেন, প্রায় দৌড়ে। সরকারি উকিলের পেছনে এসে ঝুঁকে পরে কী বললেন। সরকারি উকিল উঠে বললেন, “ইওর অনার, আমরা আপাতত এই কেসটার অ্যাজোর্নমেন্ট চাইছি। রাজসাক্ষী লিটন, পুঁটে আর ওদের লইয়ারকে কোর্ট চত্বরে কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না।”
এতক্ষণ আদালত কক্ষে জনতার মৃদু গুঞ্জন জজের হাতুড়ির আঘাতে থেমে যাচ্ছিল, কিন্তু এখন আর সামলানো গেল না। বার বার হাতুড়ি মেরেও শান্তি ফেরাতে না পেরে জজসাহেব ওই হট্টগোলের মধ্যেই শুনানী মুলতুবি রেখে উঠে গেলেন।
~পনেরো~
“স্টুপিড, ক্যালাস অ্যান্ড ইনকম্পিটেন্ট,” রাগে গনগন করতে করতে বললেন অতনু।
বলা বাহুল্য রাগ পুলিশের ওপর।
“কাস্টোডি থেকে আসামি ফেরারি হয়ে যায় – এ তো কিছুই না,” বললেন প্রদীপ। “এর পর কী?”
“এর পর যথাসাধ্য চেষ্টা যাতে তোর বিরুদ্ধে কেসটা ডিসমিসড হয়ে যায়।”
“এর পরও ডিসমিসড না হতে পারে?”
“পারে বইকি! ধর সরকার কেসটা আর তুললই না। নতুন করে পুলিশ তদন্ত করে নতুন কেস তুলল। এর মধ্যে এই কেসটা ক্লোজ না করলে তোকে ইমপ্লিকেট করা সুবিধা।”
“মুক্তি নেই?”
“সহজ না। পুলিশে ছুঁলে ক’ ঘা ভুলে গেছ? এইটিন ব্লো-জ। তোকে একটা ঘটনা বলি। কয়েক বছর আগেকার। কলকাতার উপকণ্ঠে বরানগর অঞ্চলে একটা মস্তো পুরোনো শিশি-বোতলওয়ালার বাড়ি আছে। ওই যারা রাস্তায় ঘুরে ঘুরে পুরোনো কাগজ, শিশি-বোতল, ভাঙা গ্রামোফোন – এসব কেনে, তারা এদেরকে গিয়ে বিক্রি করে। বিলেত হলে বলত জাংক ইয়ার্ড। দশ বারো কাঠা জমি ছিল, এখন কমে কমে বোধহয় পাঁচ ছ’ কাঠা। তিন পুরুষের ব্যবসা ওদের। এখন যে মালিক সে তৃতীয় পুরুষ। যেদিন ঘটনার শুরু, তখনও সে মালিক না। মালিকের বড়ো ছেলে। সেদিন মালিকের ছোটো ছেলের বৌভাত। দাদা ভোর থেকে ব্যস্ত। আগের দিন ওই জাংক ইয়ার্ড থেকে জঞ্জাল সরিয়ে জায়গা বের করে প্যান্ডেল হয়েছে। সকাল থেকে ভিয়েন বসেছে, নানা লোকজন ব্যস্ত, এমনসময় তিনজন লোক মাথায় করে কিছু হিজিবিজি বিক্রি করতে এসেছে। কোথায় পুরোনো বাড়ি ভাঙা হচ্ছে, সেখান থেকে কিছু জানলার খড়খড়ি-কপাট, কিছু চেয়ারের পায়া, একটা কালো হয়ে যাওয়া আয়না – এই সব। দাদা বলেছে, আজ কিছু হবে না। আমাদের ব্যবসা আজ বন্ধ। আজ ভাইয়ের বৌভাত। ওরা প্রায় পায়ে পড়ে বলেছে, “বাবু, একটাও পয়সা নেই। কিছু চাই না, আমাদের তিনজনকে মিলিয়ে একশোটা টাকা দিন বাবু, আমরা সেই প্রায় সুন্দরবন থেকে এসেছি।”
প্রদীপ আশ্চর্য হয়ে বললেন, “সুন্দরবন থেকে বরানগর এসেছে?”
“ওদের ব্যবসা ক্যানিং-নামখানা থেকে নিয়ে প্রায় মালদা অবধি – তাই সে মোটেই আশ্চর্য হয়নি। ঘ্যানঘ্যান বন্ধ করার জন্য ওদের হাতে একশো টাকার একটা নোট ধরিয়ে দিয়ে বলেছে, “যা, ওই প্যান্ডেলের পেছনে মালগুলো নামিয়ে দিয়ে বাড়ি যা।” ওরাও তাই করেছে, আর তারপরে দাদা ভুলেও গেছে সকালের ওই লোকগুলোর কথা।
“সন্ধেবেলা বৌভাতের আসর সরগরম, এমন সময় ক্যানিং থানা থেকে পুলিশ এসে হাজির। কী হয়েছে? না, আপনারা চোরাই মাল রেখেছেন, অ্যারেস্ট করতে এসেছি। বাড়িতে তিনজন পুরুষ – বৃদ্ধ বাবা, সদ্য বিয়ে করে আসা ভাই, আর তার দাদা। বাধ্য হয়ে দাদাকেই সামনে গিয়ে কথা বলতে হল। জানা গেল, সকালে যে তিনজন ভাঙা জিনিসপত্র দিয়ে গিয়েছিল – তাদের বিরুদ্ধে থানায় নালিশ হয়েছে – তারা কোথায় কোন বাড়ি ভাঙা হচ্ছিল, সেখান থেকে কী সব চুরি করে পালিয়েছে।
“দাদা ওদের দেখিয়ে দিল কী কী জিনিস এনেছিল লোকগুলো, পুলিশ হাসাহাসি করল, দেখেছ, কী সব লোকে চুরির রিপোর্ট লেখায়। তারপরে সেগুলো গাড়িতে তুলে নিল। বাড়িতে অনুষ্ঠান বলে ওদের ছেড়ে দিল, কিন্তু বলে গেল পরদিন সকালেই যেন ক্যানিং থানায় রিপোর্ট করে।
“পরদিন ভোরবেলা বেরিয়ে শেয়ালদা থেকে ট্রেন ধরে দাদা গেল ক্যানিং। দেখল সে এক হইহই ব্যাপার! ও-সি ওকে ডেকে বলল, ‘দেখুন, আপনার ওখান থেকে যে তিনটে ঝুড়ি এনেছি, তাতে নানা জিনিসের মধ্যে কী পেয়েছি...’ দাদা দেখে একটা তালাবন্ধ ড্রয়ারের মধ্যে তিনটে সিকো ঘড়ি, আর একটা ক্যাননের এস-এল-আর ক্যামেরা। দেখে তো প্রায় অজ্ঞান!”
প্রদীপ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “কোত্থেকে এল?”
“পুলিশই রেখেছে! ক্যানিং অঞ্চলে তো স্মাগলড মালের অভাব নেই থানায়।”
“কিন্তু কেন?”
“কেন-টা অদ্ভুত। ওই যে তিনটে লোক, ওরা একশো টাকা হাতে নিয়ে শেয়ালদা থেকে লোক্যাল ট্রেনে ক্যানিং গেছে, বিনা টিকিটে। যখন পৌঁছেছে, তখন স্টেশনে বিশাল চেকিং চলছে। তিনজনের কারওরই টিকিট নেই, ওরা লাইন পেরিয়ে দৌড়েছে তিন দিকে। একজন গিয়ে পড়েছে একটা পুলিশ-অপারেশনের মধ্যে। তার ঠিক আগেই ক্যানিং-এ ব্যাঙ্ক ডাকাতি হয়েছে একটা। পুলিশ, অ্যাজ ইউজুয়াল, ডাকাতরা বাড়ি গিয়ে চান-খাওয়া শেষ করে ঘুমোতে যাবার পরে ব্যাঙ্কে পৌঁছে দারোয়ান থেকে ম্যানেজার, সবাইকে অ্যারেস্ট করার হুমকি দিয়ে সো-কলড্‌ এনকোয়ারি করে প্যান্ট টেনে তুলতে তুলতে বেরিয়েছে, এমন সময় ওই লোকটা সামনে দিয়ে দৌড়ে যাচ্ছে – ইনস্পেকটর অগ্রপশ্চাত না ভেবে রিভলভার বের করে দেগে দিয়েছে।
“দ্য ম্যান গট ফেটালি উন্ডেড।
“লোকটা মরে না গেলে ওকেই ডাকাত বানিয়ে নির্ঘাৎ চালান দিত পুলিশ, কিন্তু মরে যাবার পরে একটু যত্ন করে তদন্ত তো করতে হয়, এবং তাতে জানা গেল যে বেচারা নেহাতই হার্মলেস একটা পুরোনো কাগজ বিক্রিওয়ালা। অন্য দুজন আগেই ধরা পড়েছে রেলপুলিশের হাতে, ওরাই আইডেন্টিফাই করল, সব গল্প জানা গেল তখন।
“পুলিশ পড়ল ফাঁপড়ে। ফলে পুলিশের বাঁধা-ধরা লোককে দিয়েই একটা ফলস কেস দায়ের করা হলো। সো দ্যাট মৃত ব্যক্তিকে বড়ো চোর বা চোরাচালানকারী বলা যায়। পুলিশ বিরাট তদন্তে বেরোল সেই বরানগর অবধি – আর পরদিন সেই দাদা এসে সোজা ওয়াকড ইন্টু দ্য পুলিশ ট্র্যাপ।”
“আমার নিজের জীবনে যদি এই ঘটনাটা না ঘটত, বলতাম তুই সেরেফ গাঁজাখুরি গপ্পো মারছিস।”
“এটা আমার জীবনের একটা বিরাট রিসার্চ ওয়ার্ক, বা গোয়েন্দাগিরি। তবে এখনও আমি নেই। এ সব গল্প প্রি-অ্যাম্বল।”
“তাহলে এবারে কাহিনিটা বল।”
“ধৈর্যং রহু। বি অ্যাজ পেশেন্ট অ্যাজ আ রুই মাছ। এখনও ইন্ট্রো চলছে। দাদা তো কন্ট্রাব্যান্ডের লিস্ট দেখে প্যান্টে প্রায় ইয়ে করে ফেলেছে। পুরোনো কাগজ, ভাঙা ট্র্যানজিস্টর, আর পায়াভাঙা খাটিয়ার বিজনেস করে – সে তো কোনও দিন সিকো ঘড়ি, ক্যাননের ক্যামেরা – এসব চোখেই দেখেনি। আর তাছাড়া জানেও না কী করে পুলিশের ঝামেলা হ্যান্ডেল করতে হয়। পুলিশও বুঝেছে, একে ধরে মজা আছে – ওরাও ছেলেটাকে এপাশ ওপাশ রগড়ানি দিতে লেগেছে।”
“মেরেছে?”
“মেরেছে তো বটেই। পুলিশ তোকেও চড় মেরেছিল। মনে নেই এর মধ্যেই? যাই হোক, বেচারা তো অনেক চড়-থাপ্পড় খেয়ে শেষে বেশ কিছু টাকা খেসারত দিয়ে ফিরল। ওর ধারণা কেস মিটে গেছে। কিন্তু এমনই কপাল, বা অন্য ভাষায় – এমনই অবিমৃষ্যকারিতা, যে খবরও নেয়নি কিছু, উকিলও ফিট করেনি। তিন মাস পরে আবার পুলিশের আগমন – আবার অ্যারেস্ট, কেস উঠবে। ও-ও আসামি। রিসিভার অফ স্টোলেন গুডস।”
“মাই গড! তার পর?”
“তার পর আর কী! আবার আদালত, আইন, এবারে উকিল! দেখা গেল পুলিশ আগের বার টাকা খেয়ে ‘ছেড়ে দিচ্ছি’ বলে যে সব কাগজে সই করিয়েছিল, তার মধ্যে একটা কনফেশনও ছিল – আমি একটি সিকো ঘড়ি রিসিভ করেছি। জজ সম্ভবত বুঝেছিলেন ব্যাপারটা, কিন্তু ওকে কিছু বলেননি। শুধু একটা রেপ্রিমান্ড দিয়ে ছেড়ে দিয়েছিলেন। এদিকে, ওর উকিল – সম্ভবত কনফেশনটা রয়েছে বলেই – কোর্টে বলে, এটা ওর ফার্স্ট অফেনস, ইত্যাদি।”
“আরে, ও শুনল এসব কোর্টে, কিছু বলল না?”
“আরে সবাই তো আর ইংরেজি মিডিয়াম স্কুলে পড়েনি তোর মতো। একবর্ণ ইংরেজি জানে না। তার ওপর হাবাগোবা। যাকে বলে স্ট্রিট স্মার্ট – সে-ও না। পুঁটে বা লিটনকে এরকম সিচুয়েশনে ফেলে দিলে যা হবে তা হয়নি। কী হচ্ছে, কী বলছে – কাকে বলছে, কিছুই বুঝতে পারছে না। ভ্যাবলার মতো এদিক ওদিক চাইছে, আর লোকে ওর ওপরে চিৎকার করছে – পুলিশ, উকিল, জজ – সব্বাই। যা হোক, শেষে মিটল। অন্তত, ও তাই ধারণা নিয়ে বাড়ি ফিরল বেশ কিছু খেসারত দিয়ে। ফিরে বলল, ‘সব ভালো যার শেষ ভালো।’”
প্রদীপ বললেন, “তবে এটা নিশ্চয়ই শেষ নয়?”
অতনু হাসলেন। বললেন, “না। এটা মুখবন্ধ শেষ। গল্পের শুরু এর পরে। প্রায় সাত আট বছর পরে। বাবা নেই, ভাই নিজে একটা ব্যবসা করে উঠে গিয়েছে। দাদা একাই ওই বিরাট জমিতে পুরোনো কাগজ, শিশি-বোতলের কাবাড়ি ব্যবসার মালিক। একদিন ভোরবেলা দাঁতন করতে বেরিয়েছে – গঙ্গার পাশে বাড়ি, গঙ্গার ঘাটেই আচমন-স্নান। দরজা খুলেই দেখে বাড়ির সামনে জিপ থেকে পুলিশ নামছে। এবার কলকাতা পুলিশ। কিছু বোঝার আগেই জিপে তুলে নিয়ে গিয়েছে মধ্য কলকাতার কোন থানায়। সে সেকেন্ড ও-সি। ভীষণ রাগী, ভীষণ হাত চলে। প্রশ্ন করার আগেই চড় থাপ্পড়। কোথায় রেখেছিস?”
“কী রেখেছে?”
“এটা একরকম টেকনিক। তোকে যদি জিজ্ঞেস করি তোর গাড়ির শাড়ি-পরা পুতুল কোথায় রেখেছিস, তাহলে তুই বলে দিলে আমি ওটুকুই জানব। আর কিছু জানতে পারব না। কিন্তু তুই যদি মার খেয়ে ভয় পেয়ে আমার বাড়ির টি-ভি, মাইক্রোওয়েভ চুরি করে কোথায় রেখেছিস, তা-ও বলে দিস, তাহলে আমি সেটাও জেনে যাব।”
“অদ্ভুত লজিক।”
“লজিক অফ টরচার হিসেবে মন্দ না। যাই হোক, মারের চোটে প্রায় অজ্ঞান, দুটো দাঁত খুলে গিয়েছে, চোখ ফুলে প্রায় দেখতে পাচ্ছে না কিছু – এমন সময় ওসি ঢুকলেন। অবস্থা দেখে জিজ্ঞেস করলেন কে ওটা? উত্তর শুনে তিনি তো সেকেন্ড অফিসারকে এই মারেন কী সেই মারেন! তোমার কাণ্ডজ্ঞান নেই? শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথের নোবেল চুরির দায়ে বরানগরের জাঙ্ক ব্যবসায়ীকে নিয়ে আসার কী মানে?”
প্রদীপ খানিকক্ষণ কথাই বলতে পারলেন না। বললেন, “নোবেল চুরি আবার কী?”
একগাল হেসে অতনু বললেন, “হুঁ, হুঁ, বাবা! স্টোলেন গুডস-এর রিসিভার হিসেবে লোকটার নাম পুলিশের খাতায় উঠে গিয়েছে সেই তখন থেকেই। ফলে যখনই কোনও বড়ো চুরি হবে, যদি কোনও পুলিশ কর্তার মাথায় ঢোকে, ওকে আবার আসতে হবে থানায়। যে থানার অফিসারের ইচ্ছে হবে, সে-ই তুলে আনতে পারে।”
“চুরি তো সারাক্ষণ হচ্ছে। যে কোনও চুরির ক্ষেত্রেই নিয়ে আসতে পারে?”
“থিওরেটিকালি পারে বইকি! রাজাভাতখাওয়ায় কারওর ঘড়ি ছিনতাই হলেও পারে, ইনডিয়ান মিউজিয়ামে যদি কাল মমি চুরি হয়, তাহলেও পারে।”
“কী বিপদ!”
“হুঁ হুঁ বাবা! ওনলি সিন দ্য ডাভ, নট পেইড অ্যাটেনশন টু দ্য ট্র্যাপ? পুলিশে ছুঁলে ক’ঘা? জানো না? যাই হোক, সেই সহৃদয় অফিসারকেও ও জিজ্ঞেস করেছিল, কী করলে এই অত্যাচারের হাত থেকে বাঁচা যায়? অফিসার বলেছিলেন, “বাড়ি বেঁচে পালিয়ে যান। কোথায় যাচ্ছেন, কাউকে বলবেন না। তখনই নার্ভাস ব্রেকডাউন হয়।”
“এটা আমি কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছি না। আমার অভিজ্ঞতা সত্ত্বেও না।”
“তোর সংগ্রামকে মনে আছে?”
“সংগ্রাম ব্যানার্জী?”
“হ্যাঁ। ও এখন সাইকিয়াট্রিস্ট। বড়ো বড়ো নামী হাসপাতাল-টালে বসে। ও কেসটা হ্যান্ডেল করেছিল। ও-ই আমাকে ফোন করে জিজ্ঞেস করে কিছু করা যাবে কি না। ও-সি ব্যাপারটা বুঝে সেকেন্ড অফিসারের হাত থেকে ওকে বাঁচিয়ে দেন, কিন্তু ততক্ষণে মিডিয়া খবর পেয়ে গেছে। ফলে বেচারা যখন মাথায় ব্যান্ডেজ আর গালে স্টিচ নিয়ে বাড়ি ঢুকছে, ততক্ষণে ওদের গলিতে টি-ভি চ্যানেলের আউট-ডোর ভ্যানে ছয়লাপ। সবার মুখে একই খবর। এই জাঙ্ক ইয়ার্ডে নোবেল পাওয়া গিয়েছে। অবশ্য ব্যাপারটা বোঝার আধঘণ্টার মধ্যেই সেই ভীড় পাতলা হয়ে গিয়েছে, কিন্তু ওই ফিফটিন মিনিটস অফ ফেমই ওর সাইকোলজিকাল ব্রেকডাউনের পক্ষে যথেষ্ট ছিল। তখন সংগ্রাম ওকে দেখে। তারপরে মাঠে নামি আমি। ভাব, ক্যানিং গিয়ে গিয়ে ওই তদন্ত। তাও ঘটনার সাত-আট বছর পরে! তবে ভাগ্যিস, ওই যে তিনজন কাবাড়িওয়ালা, তাদের দুজনকে পাওয়া গেল – ওদেরও সিকো ঘড়ির কেস-এ ফাঁসিয়েছিল ওই ও-সি। সেখান থেকে তাকে ট্র্যাক ডাউন করা... সে তখন বারাসতে। ওর কাছ থেকে কনফেশন আদায় করা... ছেলের হাতের মোয়া ছিল না মোটেই। নটা কেস অফ ডিপ্রাইভিং আ চাইল্ড অফ হিস সুইটমিট। ভাগ্যিস, তখন যিনি এস-পি, তাঁকে খুব ভালো করে চিনতাম। তিনি বললেন, কনফেস না করলে তবু কিছু দয়া হবে, নইলে সাসপেন্ড করে ডিপার্টমেন্টাল প্রোসিডিংস শুরু করবেন। ও-সির তখন আর বছর দুয়েক চাকরি বাকি। বুঝে গেল কোঅপারেট না করলে কপালে দুঃখ আছে। তারপরে মামলা করলাম। জজসাহেব হেসেই বাঁচেন না। হি ওয়াজ আ গ্রেট ম্যান। পরে ক্যালকাটা হাই কোর্টের চিফ জাস্টিস হয়েছিলেন।”
“পুলিশের খাতা থেকে নাম কাটা গেছিল?”
“সে অত সস্তা নয়। কোন খাতায় কোথায় নাম রয়েছে, তা কে জানে? রিসিভার অফ স্টলেন গুডস বলে কোনও সেন্ট্রাল লিস্ট আছে কি না তা-ও পুলিশ বলতে পারেনি। থাকলেও সেটা কোথায়? কিন্তু এনাফ ট্রাব্ল ওয়াজ ক্রিয়েটেড ফর সাম পুলিশ অফিসারস। বিশেষ করে ক্যানিং-এর ওই ও-সি আর কলকাতার এই সেকেন্ড অফিসারের জন্য। আশা করছি এর পরে অন্তত বছর পনেরো কোনও পুলিশ অফিসার উইদাউট অ্যাডেকোয়েট প্রুফ লোকটাকে নিয়ে টানাটানি করবে না। আর তারপরে ওই রিসিভারের লিস্টই হয়ত উইয়ে খেয়ে দেবে, কে জানে?”
নিজের অজান্তেই শিউরে উঠলেন প্রদীপ।
~ষোলো~
পরদিন সকালে প্রদীপ বললেন, “আমি একবার বাড়ি যাব।”
“কেন?” এতদিন বাড়ি যেতে চাইলে বাধা আসত অতনুর কাছ থেকে। আজ কথা বললেন বনি। “এখানে ভালো লাগছে না?”
লাগছিল না। বরং গত কাল থেকে অনিশ্চয়তার ভারটা অনেকটাই বেড়ে গিয়েছে। এতদিন ভেবেছিলেন সেনয়ের সাক্ষ্য শুনে জজ ওঁকে এক কথায় রেহাই দিয়ে দেবেন – তা তো কই হলোই না, বরং এখন কী হবে, কেউই আর বলতে পারবে না। তা ছাড়া সারাক্ষণ চোখের সামনে অতনু-বনির দাম্পত্য সুখটাও মনটাকে ভারাক্রান্ত করে দিচ্ছে।
“খারাপ লাগবে কেন?” গলার স্বরটা হালকা করলেন প্রদীপ। “কিন্তু আর কত দিন?”
“থাক না,” বললেন অতনু। “আমরাও কলকাতায় নতুন লোক। তোর মতোই প্রবাসী। আমি তো স্কুল শেষ করে আর ফিরিইনি, বনিও জানিস কোনও দিন কলকাতায় থাকেনি। তোরও তো একই অবস্থা।”
“না রে,” অতনু রাজি হলেন না। “এ ভাবে হয় না। তার চেয়ে আমি বাড়ি যাই বরং। অনেক কাজ আছে। অফিসেও যেতে হবে।”
“হ্যাঁ। অফিসে যা। দরকার পড়লে আমাকে ফোন করিস।”
প্রদীপ পরদিন সকাল সকাল অতনুর বাড়ির বেসমেন্টের গ্যারেজ থেকে গাড়ি বের করে নিজের বাড়ি গিয়ে চান করে জামা-প্যান্ট পরে ব্যাঙ্ক গেলেন। পার্কিং লটে গাড়ি রেখে ব্যাঙ্কে ঢুকলেন। সাধারণত প্রদীপ যখন ঢুকতেন তখন ব্যাঙ্ক কাস্টমারদের জন্য খোলেনি। আজ অনেকটাই দেরি হয়েছে। ব্যাঙ্কের বিজনেস হই-হই করে চলছে। প্রদীপ বুঝলেন, সারা ব্যাঙ্কেই সব কর্মচারি কাজ থামিয়ে ওঁর দিকেই চেয়ে রয়েছে। ভীষণ অস্বস্তির সঙ্গে হেঁটে গিয়ে নিজের ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। দরজায় রঙ্গরাজনের নাম। টোকা দেবার জন্য আঙুল তুলেছেন, হঠাৎ সামনে রঙ্গরাজনের সেক্রেটারি। “গুড মর্নিং, স্যার,” বলে দরজাটা খুলে দিল। ভিতরে রঙ্গরাজন চেয়ার ছেড়ে উঠছেন। “সেনগুপটা, আইয়ে, প্লিজ কাম ইন।”
সামনের চেয়ারটা দেখিয়ে বসতে বললেন। বললেন “অ্যাম সো গ্ল্যাড ইউ আর হিয়ার। কেস ডিসমিসড হয়ে গিয়েছে কি?”
“নট ইয়েট,” প্রদীপ বললেন। এদিক ওদিক যতটা দেখা যায়, এ ঘর এখন রঙ্গরাজনের। প্রদীপের সময়কার কিছুই প্রায় নেই। “কিন্তু এখন তো পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে যে আমি ইনভলভডই ছিলাম না।”
“এক মিনিট, আমি অভয়ঙ্করকে জানাই। আমাকে বলা আছে, আপনি এলেই যেন ওঁকে খবর দেওয়া হয়।”
ফোন তুলে অভয়ঙ্করকে খবর দিয়ে রঙ্গরাজন বেল দিয়ে বেয়ারাকে ডেকে প্রদীপের জন্য কফি আনতে বললেন। প্রদীপের অস্বস্তি হচ্ছে। রঙ্গরাজন যদি প্রদীপের ঘরে এসে থাকে, তাহলে রঙ্গরাজনের আগের ঘরে কে বসছে? কেন?
প্রদীপের জন্য কফিটা আসার আগেই অভয়ঙ্করের ফোন এল। রঙ্গরাজন ফোন নামিয়ে বললেন, “হি ওয়ান্টস ইউ অ্যালোন। কফিটা আসুক, আমি ওয়েট করব। উই উইল ড্রিঙ্ক ইট টুগেদার।”
হাজার দৃষ্টিতে পুড়তে পুড়তে প্রদীপ গেলেন অভয়ঙ্করের ঘরে। রঙ্গরাজনের দরজার দিকে তাকিয়ে দেখলেন, তাতে একটা নাম রয়েছে বটে – ভট্টাচার্য কি? তারপরে সেক্রেটারির পুলের দিকে তাকালেন। রিটার মুখ দেখলেন না।
অভয়ঙ্করের বাইরের ঘরে সুচেতা। দরজা খুলে ‘গুড মর্নিং, স্যার,’ বলে আবার বাইরে থেকে দরজা বন্ধ করে দিল। অভয়ঙ্কর ঘরে একা। “কাম, কাম, পারদীপ, সিট ডাউন, মাই বয়...”
প্রদীপ বসলেন। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই অভয়ঙ্ককরের বেয়ারা এসে প্রদীপের সামনে ধূমায়িত কফির কাপ রেখে গেল। “টেক,” বললেন অভয়ঙ্কর।
“আপনারটা, স্যার?” জিজ্ঞেস করলেন প্রদীপ।
“আমি এই খেলাম। টেক, টেক।” প্রদীপ কফির কাপ তুলে নিলেন। দু-এক চুমুক নেবার মধ্যেই অভয়ঙ্কর প্রদীপের কোর্ট কেস সম্বন্ধে কিছু প্রশ্ন করে অবস্থাটা জেনে নিলেন। বললেন, “সো, ইউ আর নট আউট অফ ইট...”
“আই অ্যাম নট,” বললেন প্রদীপ। “তবে আমার ল’ইয়ারের বক্তব্য যে এখন পুলিশ আমাকে বিশেষ ঘাঁটাবে না, কারণ ওদের একবার মুখে চুনকালি লেগেছে। আর যদি ঠিক করে তদন্ত করে, তাহলে নিশ্চয়ই আসল অপরাধীর খোঁজ পাবে, তখন বোঝা-ই যাবে তার সঙ্গে আমার কোনও যোগাযোগই নেই।”
“হুম্‌ম্‌,” অভয়ঙ্করের মুখে চিন্তার ছাপ। “কিন্তু এখানে একটা সমস্যা হয়েছে।”
এটাই আশঙ্কা হচ্ছি‌ল। “কী হয়েছে স্যার?”
“ব্যাঙ্ক স্থির করেছে, আপনাকে আর এমপ্লয়মেন্টে রাখবে না।”
এতটা ভাবেননি প্রদীপ।
“কেন স্যার?”
“ওয়েল, আসল কারণটা হলো যে ওরা এই পাবলিসিটিটা চায় না। লোক আসবে, আপনার ঘরের দিকে তাকিয়ে থাকবে, ফিসফিস করবে, এগুলো ব্যাঙ্ক চায় না।”
“কিন্তু সে আর কত দিন, স্যার?” প্রদীপের গলায় আকুতি।
মাথা নাড়লেন অভয়ঙ্কর। “পাওয়ার্স দ্যাট বি।”
“তার মধ্যে কি আপনিও নেই স্যার? ওয়ান অফ দ্য পাওয়ার্স?”
“না। আমি নেই। আমাকে জিজ্ঞেসও করা হয়নি। আই ওয়াজ ইনফর্মড অ্যাজ ইওর বস।” অভয়ঙ্করের চোয়াল শক্ত। “আই অ্যাম স্যরি, কিন্তু আমার কিছুই করার নেই। ইউ আর অফ কোর্স ফ্রি টু মুভ দ্য কোর্ট। আমার বিশ্বাস, ইউ উইল গেট রিড্রেসাল।”
কোর্ট? আবার? কী হবে? কোর্টে গিয়ে জিতে আসলেও কি প্রদীপ নিশ্চিন্তে এই ব্যাঙ্কে আর কাজ করতে পারবেন?
মাথা নাড়লেন। বললেন, “কিন্তু কোন গ্রাউন্ডে আমাকে বরখাস্ত করা হচ্ছে সেটা কি জানতে পারব?”
হাসলেন অভয়ঙ্কর। বললেন, এদের একটা এক্সটেনুয়েটিং সার্কমস্ট্যানস ক্লজ রয়েছে। তার মস্তো লিস্ট থেকে কী কী সব বের করেছে ব্যাঙ্কের ল’ইয়াররা। বরখাস্তের চিঠিতে সে সব লেখা রয়েছে। কিন্তু সব বাজে কথা।”
অভয়ঙ্কর বোতাম টিপলেন। “সিরাজকে পাঠাও।” তারপরে বললেন, “আপনাকে এখান থেকে ওখানে গিয়ে কাগজপত্র সই করা, ফাইনাল পেমেন্ট-এর চেক নেওয়ার অপমান সহ্য করাব না। এই ঘরেই সব হবে। ইউ উইল গো আউট অফ দিস রুম আ ফ্রি ম্যান। ফ্রি টু টেক লিগ্যাল অ্যাকশন এগেনস্ট দিস ব্যাঙ্ক।”
প্রদীপের ভাবনার ক্ষমতা আবার লোপ পেতে শুরু করেছে।
সিরাজ এল। ওর বরখাস্তের চিঠি দিল। কোথায় কোথায় সই করতে হবে দেখিয়ে দিল। তারপরে অভয়ঙ্কর ডাকলেন অ্যাকাউন্টসের দীপককে। মস্তো খাতা খুলে ওর সব হিসেব বুঝিয়ে দিল অভয়ঙ্করের টেবিলেই। তারপরে তিনটে চেক দিল প্রদীপকে। স্যালারি, কম্পেনসেশন, আর পি.এফ। বলল, “আরও কিছু ডিউ থাকবে। সেগুলো রেডি হলে আপনার অ্যাকাউন্টে ডিরেক্টলি ক্রেডিট করে দেব স্যার।” বলে অস্ফূটে “আই অ্যাম সো স্যরি,” বলে বিদায় নিলেন। সিরাজ কিছু বলল না, হাতটা বাড়িয়ে দিল করমর্দনের জন্য।
ঘরটা খালি হলে পরে অভয়ঙ্কর ফোন তুলে শুধু বললেন, “ইয়েস, ইউ ক্যান কাম নাউ।” দরজা ঠেলে ঢুকল সুচেতা। অভয়ঙ্কর বললেন, “শি হ্যাজ ইওর এক্সপেরিয়েন্স সার্টিফিকেট।”
সুচেতা একটা কাগজ রাখল প্রদীপের সামনে, আর একটা দিল অভয়ঙ্করকে। প্রদীপ পড়ে দেখল, এত তারিখ থেকে এত তারিখ অবধি কাজ করেছেন এই ব্যাঙ্কে। সেই সময়ে ওঁর কাজ, চরিত্র, হাব-ভাব ইত্যাদি নিয়ে ব্যাঙ্কের কোনও নালিশ নেই, ওদের তরফ থেকে কামনা করা হচ্ছে প্রদীপ যেন জীবনে উন্নতি পান।
“এই কপিটাতে রিসিভড বলে সই করে দেবেন, প্লিজ।”
প্রদীপ করল। ততক্ষণে নিজের কাগজটায় সই করে অভয়ঙ্কর সেটাও বাড়িয়ে দিয়েছেন প্রদীপের দিকে। সুচেতা চলে গেল। প্রদীপ অভয়ঙ্করের কাগজটা নিয়ে দেখল একটা টেস্টিমোনিয়াল। পড়ে জল এসে গেল প্রদীপের। বলল, “থ্যাঙ্ক ইউ, স্যার। আপনি অনেক উপকার করলেন।”
“লিস্ট আই কুড হ্যাভ ডান, আফটার দ্য ওয়ে দিস ব্যাঙ্ক ট্রিটেড ইউ,” অভয়ঙ্কর একটু চুপ করে রইলেন তার পরে। চোখ থেকে চশমা খুলে মুছলেন। বললেন, “আমি একটু বেশি রকমই ইমোশন্যাল। আই বিলিভ ইন দোজ হু ওয়ার্ক আন্ডার মি। মাঝে মাঝে ঠকি, তবে আপনার ক্ষেত্রে সে ভয় আমার নেই।”
কী বলবে প্রদীপ ভেবে পেলেন না।
এবার অভয়ঙ্কর উঠে নিজেই ঘরের কোণা থেকে একটা কার্ডবোর্ডের কার্টন বের করে টেবিলে রাখলেন। বললেন, “আপনার ঘরে ব্যক্তিগত কিছুই প্রায় ছিল না। আমিই সেগুলো আলাদা করে রেখেছি। যদি কিছু না চান, ফেলে যেতে পারেন, আমি ডিস্পোজ করে দেব।”
বাক্সে সত্যিই সেরকম কিছু নেই। একটা ফ্রেমে বাঁধানো ছবি ছিল মৌলির, উঁকি মেরে বুঝলেন, অভয়ঙ্কর সেটা খবরের কাগজ দিয়ে মুড়ে রেখেছেন। বললেন, “থ্যাঙ্ক ইউ স্যার, আমি সবটাই নিয়ে যাব।”
“বেশ, তাহলে আপনার গাড়ির চাবিটা দিন।”
অবাক প্রদীপ পকেটে হাত দিতে গিয়েও থমকে গেলেন। অভয়ঙ্কর হাত বাড়িয়ে আঙুল নেড়ে বললেন, “আরে দিন, দিন...”
প্রদীপ চাবি দিলেন অভয়ঙ্করকে। অভয়ঙ্কর বেয়ারাকে ডেকে চাবি হাতে দিয়ে বললেন, “ইয়ে কার্টন সাব কা গাড়ি মে রাখ দেনা।” তারপরে বেয়ারা চলে যাবার পরে বললেন, “আপনাকে আর এই কার্ডবোর্ডের বাক্স হাতে করে নিয়ে বেরোতে হবে না। কিন্তু আর একটা কাজ আছে...”
ফোন তুলে ডাকলেন সুচেতাকে। বললেন, “গিভ হার ইওর চেকস। সুচেতা, প্লিজ গেট সামওয়ান টু ডিপোজিট দেম ইন পারদীপ’স অ্যাকাউন্ট।”
সুচেতা বেরিয়ে গেল। প্রদীপ “থ্যাঙ্ক ইউ” বলতে যাবেন, অভয়ঙ্কর হাত তুলে থামিয়ে দিয়ে বললেন, “এখন না। একটু পরে থ্যাঙ্কস দেবেন। আমি এই ব্যাঙ্ক ছেড়ে দিচ্ছি।”
প্রদীপ চুপ করে রইলেন। কীই বা বলার আছে?
“আমি পিপ্‌ল্‌স পার্সন। এই ব্যাঙ্কের পার্সোনেল পলিসি আমার অপছন্দ। কোথায় যাচ্ছি, কী করছি, আপনাকে এক্ষুনি বলছি না – বুঝতেই পারছেন, তাতে সমস্যা আছে। তবে বলে রাখলাম, আপনি চাইলে আমি আপনার জন্য ওপেনিং রাখব। চলে আসবেন, ইফ ইউ সো উইশ। আপনি বোধহয় জানেন না, দ্য ব্যাঙ্ক হ্যাজ অলরেডি টার্মিনেটেড দ্য জব অফ রিটা গোমেজ। রিটাকেও আমি বলে রেখেছি।”
বাড়ি ফিরে লিফটের মধ্যে ঢুকে মনে পড়ল রঙ্গরাজনের সঙ্গে কফিটা খাওয়া হয়নি।
~সতেরো~
বাড়িতে ঢুকে সোজা খাবার ঘরে গিয়ে টেবিলে কার্টনটা নামিয়ে রেখে প্রদীপের খানিকটা সময় লাগল ভবিষ্যৎ কার্যপদ্ধতি স্থির করতে। মনে হলো, একটু চা খাবেন। গত ক’দিন চা খাননি। কফিই চলে অতনুর বাড়িতে, চায়ের পাট ওদের নেই। এমনিতে প্রদীপ চা খান না, কিন্তু মৌলির দার্জিলিং চায়ের কৌটো রয়েছে রান্নাঘরে। প্রদীপকে কতবার বলেছিল, খেয়ে দেখো দার্জিলিং চা খেলে কফি-প্রেম ছুটে যাবে। খাননি। খেলেই পারতেন... চোখের দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে এল...
জল বসিয়ে চায়ের টিন খুঁজে পেতে সময় লাগল। কৌটোর ঢাকনা খুলে প্রদীপের ভুরু কুঁচকে গেল। চা-পাতায় সাদা সাদা কিসের দাগ? ছাতা পড়েছে? প্রদীপ কোনও দিন চা-পাতায় এমন দাগ দেখেছেন? গ্যাসটা নিভিয়ে দিলেন। মিছিমিছি আগুন নষ্ট করে কি লাভ?
একবার মনে হল, অতনুকে বলা হয়নি অফিসে কী হয়েছে। তারপরে ভাবলেন, এখনই বলে কী লাভ? কখনওই বলে কী লাভ? শেষে ঠিক করলেন, পরে বলা যাবে ’খন।
আবার খাবার ঘরে ফিরলেন। একটু একটু খিদে পাচ্ছে। কী খাবেন? বাড়িতে তো কোনও খাবার নেই। অতনুর বাড়ি হলে বনির বানানো চপ বা পকোড়া ফ্রিজ থেকে বের করে গরম করে খেতে পারতেন। নয়ত কফি আর বিস্কিট। প্রদীপ কৌটোগুলো নেড়ে দেখলেন সবই খালি। ফ্রিজের গায়ে মৌলির হাতের লেখায় টেক-অ্যাওয়ের লিস্ট আর ফোন নম্বর। পিৎজা, ডাল-ভাত, মোগলাই, রোল – কী নেই! কাকে ফোন করবেন? ভাবতে ভাবতেই মোবাইলটা বাজতে শুরু করল। প্রদীপ টেবিল থেকে ফোনটা হাতে নিয়ে দেখলেন অতনুর ফোন।
“হ্যালো?”
“কোথায়?” অতনুর গলায় কি উদ্বেগ?
প্রদীপ বললেন, “বাড়িতে।”
প্রদীপ অফিসে নয়, বাড়িতে – শুনে অতনুর কোনও হেলদোল প্রকাশ পেল না। কিন্তু পরের কথাটা অদ্ভুত।
“একা, নাকি কেউ আছে?”
“কেউ নেই। কেন?”
“বাইরের দরজা বন্ধ কর।”
প্রদীপ অত্যন্ত আশ্চর্য হয়ে বললেন, “দরজা তো বন্ধই আছে, কিন্তু কেন? কী হয়েছে?”
“দরজায় লক লাগা। ছিটকিনি লাগা। হুড়কো আছে? তাহলে তা-ও লাগা।”
“কী আশ্চর্য...”
“এক্ষুনি। আমি আসছি। ততক্ষণ কাউকে দরজা খুলবি না। চেনা হলেও না। আমি এসে দরজায় দাঁড়িয়ে ফোন করছি। তবে আমাকে দরজা খুলে দিবি।”
লাইন কেটে গেল। প্রদীপ একবার ভাবলেন ফিরে ফোন করবেন কি না। তারপরে ভাবলেন, থাক। দরজায় হুড়কো নেই। ছিটকিনিও নেই। শুধু নাইটল্যাচের লক। ইচ্ছে ছিল বাইরে একটা গ্রিলের দরজা লাগিয়ে তাতে তালার ব্যবস্থা করবেন। কিন্তু সোসাইটি রাজি হয়নি। বলেছিল, ইউনিফর্মিটি নষ্ট হয়ে যাবে। ওটা থাকলে হয়ত... অ্যামেরিকা হলে স্যু করতেন প্রদীপ?
খাওয়ার কথা এখন আর ভেবে কাজ নেই। অতনু এলে ভাবা যাবে। প্রদীপ টেবিলে রাখার কার্টনটা খুললেন। নিচ থেকে টেনে বের করলেন মৌলির ছবিটা। বসার ঘরের টেবিলে মৌলির সাধের ট্রে। সিজনাল ফুল থাকত। রাস্তা থেকে কুড়িয়ে আনত মৌলি। কখনও কৃষ্ণচূড়া, কখনও জারুল, কখনও টগর বা কামিনী, আবার পুজোর আগে শধুই শিউলি। থালাটা এখন খালি। ব্যানার্জীদার কাজের মেয়ে বোধহয় শেষ শুকনো ফুলগুলো ফেলে দিয়েছে। প্রদীপ ক্রিস্টালের ট্রে-টা সরিয়ে রাখলেন। বসার ঘরের টেবিল এখন খালি। ফ্রেমে বাঁধান’ মৌলির ছবিটা রাখলেন টেবিলের মাঝখানে। তারপরে সরিয়ে রাখলেন এক কোণে। পছন্দ হলো না। অন্য কোণে নিয়ে গেলেন। তারপরে চুপ করে ছবিটার দিকে চেয়ে রইলেন। সম্বিৎ ফিরল কলিং বেল বেজে ওঠায়। চমকে উঠলেন প্রদীপ। এই অসময়ে কে? অতনু এত তাড়াতাড়ি এসে পড়ল? কিন্তু ওর তো দরজায় দাঁড়িয়ে ফোন করার কথা। বাইরে বেশ কিছু লোকের সমাগম বোঝা যাচ্ছে। তারা নিজেদের মধ্যে কথা বলছে, এবং খুব আস্তেও নয়।
প্রদীপ আস্তে আস্তে এগিয়ে গেল। পিপ-হোলটা কোনও কাজের নয়। ভালো পিপ-হোল হলে গোটা ল্যান্ডিং-টাই দেখা যেত। এটা দিয়ে শুধু সামনের লোকটার কাঁধ আর গলার অংশ দেখা গেল। একটু কাঁপা গলায়ই প্রদীপ জিজ্ঞেস করলেন, “কে?”
“আমরা সোসাইটির তরফ থেকে এসেছি, মিঃ সেনগুপ্ত।”
নিশ্চিন্ত। দরজা খুলে প্রদীপ ভিতরের দিকে ঢুকে এলেন। একে একে যাঁরা ঢুকলেন, তাঁদের প্রদীপ চেনেন, কিন্তু চেনেনও না। প্রথমে সুধীরবাবু। সোসাইটির প্রেসিডেন্ট। ব্যানার্জীদা এঁর সম্বন্ধেই বলেন, যে হাবভাব ভারতের প্রেসিডেন্টের মতো।
পিছনে যাঁরা, তাঁরা সকলেই নিশ্চয়ই এখানকারই সিনিয়র বাসিন্দা সব। প্রদীপ পিছিয়ে এসে ড্রইং রুমে ঢুকে বললেন, “বসুন।”
ওঁরা বসলেন না। সুধীরবাবু বললেন, “না, না। আমরা বসতে আসিনি। আমরা আপনার সঙ্গে আপনার ক্যালামিটির পরে আর দেখা করে উঠতে পারিনি, তাই... ইয়ে, আর একটা ব্যাপার আছে। শেখর?”
শেখরবাবু সোসাইটির সেক্রেটারি। এগিয়ে এসে বললেন, “আমরা সোসাইটির পত্তনের সময়ই স্থির করেছিলাম, দ্যাট উই উইল অর্গানাইজ আ কন্ডোলেনস মিটিং ফর এভরি ডেথ। মৌলিদেবীর মতো ইয়ং ডেথ আমাদের এখনও হয়নি। ভেরি আনফর্চুনেট। আপনি যদি এগ্রি করেন তাহলে আগামী রবিবার, সকাল সাড়ে দশটায়...”
“এ কী! বাইরের দরজা খোলা কেন!” অতনুর আর্তনাদে থতমত খেয়ে সেক্রেটারি থেমে গেলেন। বসার ঘরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে অতনু ভীষণ রেগে বললেন, “তোকে যে আমি বললাম, দরজা লক করে রাখতে, কাউকে না খুলতে...”
শীতল কণ্ঠে সুধীরবাবু বললেন, “আমরা সোসাইটির ম্যানেজিং কমিটির তরফ থেকে এসেছি। আপনি?”
অতনু আগে বাইরের দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে এসে বললেন, “আমি ওঁর ল’ইয়ার।”
“নমস্কার। আমরা মৌলিদেবীর কনডোলেনস মিটিং-এর বিষয়টা প্রদীপবাবুর সঙ্গে আলোচনা করতে এসেছি।”
অন্যমনস্কভাবে দু-হাত জোড় করে নমস্কারের প্রত্যুত্তর দিতে দিতেই অতনু বললেন, “তা বেশ, কিন্তু ব্যাপারটা কী জানেন? এটা ঠিক আলোচ্য বিষয় নয়। অর্থাৎ, এটা প্রদীপের সঙ্গে আলোচনা করা যাবে না। আপনারা বোধহয় দেখেছেন যে প্রদীপ এখনও ছাড়া পায়নি। যদিও গতকাল অবধি কেস এমনই অবস্থায় ছিল, যে ওনার বিরুদ্ধে কেস দাঁড়াবেই না। আজ-কালের মধ্যেই ডিসমিস করানো যেত। কিন্তু আপাতত যা হয়েছে, তাতে বোঝা যাচ্ছে যে তা-ও হবে না। ইন ফ্যাক্ট, রাইট নাও মিঃ সেনগুপ্ত ইজ ইন গ্রেভ ডেন্‌জার। ওনার জীবনের আশঙ্কা রয়েছে। ফলে ওনাকে এখানে রাখা যাবে না। কারণ হঠাৎ ওনার ওপর কোনও অ্যাটাক হলে আশেপাশের লোকেরাও যে বিপদে পড়তে পারেন, তা নিশ্চয়ই আপনাদের বলে দিতে হবে না?”
সোসাইটির লোকজনের মুখ ফ্যাকাশে। একজন একটু ভুরু কুঁচকে বললেন, “তার মানে? আমাদের কেন বিপদ হবে?”
“হবে না? আগামী অ্যাটাকটা যদি ছুরি দিয়ে না হয়ে ওনার গাড়িতে বোমা লাগিয়ে হয়, বা যখন উনি গেট দিয়ে ঢুকছেন, তখন গেটের বাইরে যদি কেউ ওনাকে লক্ষ করে দশ-বারোটা গুলি চালায়, তাহলে সেই বোমায় বা সেই গুলিতে সোসাইটির অন্য কারওর – কোনও বাচ্চার ক্ষতি হতে পারে না?”
সোসাইটির হর্তাকর্তারা মুখ চাওয়া-চাওয়ি করলেন।
“মিঃ সেনগুপ্ত এখানে আর থাকবেন না। হয়ত কোনও দিন ফিরবেন, কিন্তু আপাতত আমি ওনাকে নিয়ে যাচ্ছি। বলা বাহুল্য, কোথায় নিয়ে যাচ্ছি, তা বলছি না। আপনারা এসেছেন, ধন্যবাদ। কিন্তু পুলিশ ওনার সেফটির ব্যবস্থা না করা অবধি আমি কোনও চানস নিতে চাই না। তাই, আপনাদের কথা ভেবেই বলছি – আপনারা যদি সকলে এখন, মানে...”
মানে বোঝাতে হলো না। বিদায় সম্ভাষণ মুলতুবি রেখেই সকলে যাকে বলে দুড়দাড় করে পালাল। রয়ে গেলেন প্রেসিডেন্ট সুধীরবাবু। সবাই চলে গেলে প্রদীপকে বললেন, “ইয়ে, আমি কথাটা পরে বলতাম, কিন্তু পরে আর সুযোগ হবে কি না...”
খানিক এদিক ওদিক তাকিয়ে বললেন, “আপনি যদি এখানে না থাকার কথা ভাবেন, তাহলে আপনার ফ্ল্যাটটা নিশ্চয়ই রেখে দেবেন না। যদি বিক্রি করার কথা ভাবেন, তাহলে...”
প্রদীপ কিছু বলছেন না দেখে ভদ্রলোক একটু থতিয়ে গেলেন। বললেন, “ইয়ে, মানে...”
প্রদীপ দেখলেন সুধীরবাবুর পেছনে দাঁড়ানো অতনু মাথা নেড়ে ‘না’ বলছেন। তাই চুপ করে রইলেন।
“আমি ভালো দাম দেব...” বলতে শুরু করেছিলেন সুধীরবাবু, কিন্তু অতনু সামনে এসে কথা কেটে বললেন, “দাম আপনি নিশ্চয়ই ভালো দেবেন, কিন্তু একটা বিষয় আপনাকে ভেবে দেখতে হবে – প্রদীপ এখনও বাড়ি বিক্রি সম্বন্ধে কিছু ভাবেইনি। সুতরাং...”
এবার অতনু যে ভাবে সুধীরবাবুর দিকে এগিয়ে গেলেন, যে সুধীরবাবুর বেরিয়ে যাওয়া ছাড়া আর গতি রইল না।
দরজাটা আবার লক করে দিয়ে প্রদীপের দিকে ঘুরে অতনু বললেন, “খানিকক্ষণ আগে লিটন আর পুঁটেকে পাওয়া গেছে।”
প্রদীপ বললেন, “সেটা তো ভালো কথা। ওরা কী বলছে, এখন?”
“কিছুই না। ইন ফ্যাক্ট, ওরা আর কোনও দিন কিছু বলবেও না। ওদের পাওয়া গিয়েছে মানে ওদের ডেডবডি পাওয়া গিয়েছে।”
প্রথম খণ্ড শেষ
দ্বিতীয় খণ্ড
~এক~
“রিটায়ার করতে আর দু’বছর বাকি,” ঘামে ভেজা মুখটা মুছতে মুছতে বললেন অর্ধেন্দু। “খুব যে সাংঘাতিক ভালো ইনভেস্টিগেটর ছিলাম, তা নয়। তবে একেবারে ওঁচাও তো ছিলাম না, প্রসূন? এই বুড়ো বয়সে, রিটায়ার্মেন্টের দরজায় এই কেসটা কেন এল বলো তো?”
প্রসূনের কষ্টই হচ্ছিল। অর্ধেন্দুদা বড্ড হড়বড় করছিলেন। লোকটার হাত ধরে প্রসূনের ডিটেকটিভ জীবনে ঢোকা। খারাপ গোয়েন্দা তো নন’ই, বরং অনেকের চেয়ে খুবই ভালো। অনেক সাকসেস রয়েছে। কিন্তু প্রদীপ সেনগুপ্তকে নিয়ে কী না বোকামী করলেন ভদ্রলোক।
“অর্ধেন্দুদা, আমি কিন্তু লেটেস্ট ডেভেলপমেন্টটা জানি না।”
দীর্ঘশ্বাস ফেললেন অর্ধেন্দু। “জানার আর কী আছে ভাই? লিটন আর পুঁটের ডেডবডি পেয়েছি, জানো তো?”
“হ্যাঁ, কিন্তু...”
“কাল থেকে হন্যে হয়ে ছুটে বেরিয়েছি দুটোকে খুঁজতে। না পেয়েছি ওদের, না পেয়েছি উকিলটাকে... ওর অ্যাড্রেসও জানতাম না। সে নিয়েও কী দাবড়ানি! আচ্ছা ভাই, কোন আই.ও সাক্ষীর উকিলের অ্যাড্রেস রাখে, বলো তো? বিশেষ করে যখন সাক্ষীরা জেল কাস্টোডিতেই রয়েছে? সকালে কোর্ট থেকে অ্যাড্রেস নিয়ে গিয়েছি বাড়ি – সেই ঠাকুরপুকুর ছাড়িয়ে কোথায়! কেউ নেই। দরজায় অ্যাত্তো বড়ো তালা। ফোন করলাম ইনস্পেক্টরকে। বললেন, ওয়ারেন্ট নিয়ে যাও। তালা ভেঙে ঢোকো। জাস্ট ভাবো, ল’ইয়ারের বাড়িতে তালা ভেঙে...? যাই হোক, ডি.আই.জি বলে দিয়েছেন, ওয়ারেন্ট রেডি ছিল। আবার গেলাম ফিরে। লোকাল থানা থেকে ফোর্স নিয়ে তালা ভেঙে ঢুকে দেখি বাড়িতে জনমানুষ নেই, শুধু লিটন আর পুঁটের ডেডবডি।”
“কী ভাবে মরেছে?”
“পয়জন। ইনজুরি নেই। মুখে ফেনা। পোস্ট মর্টেম রিপোর্ট আসুক, দেখো কী বলে? আবার ফোন করলাম, কী গালাগালি খেলাম বিশ্বাস করবে না। যেন আমিই মেরেছি। আচ্ছা, বলো তো, আদালতে লিটন আর পুঁটেকে ধরে রাখার দায়িত্বও কি আমার ছিল? আমাকে বলা হলো লোক্যাল থানার ও.সি-কে তদন্ত হ্যান্ডওভার করে আমি যেন ফিরে আসি – অফিসে অপেক্ষা করি।”
দরোয়াজা ঢুকল। অর্ধেন্দুকে স্যালুট করে বলল, “ডি.আই.জি সাব সেলাম দিয়া।”
অর্ধেন্দু, প্রসূন, দু-জনেরই মুখ চূন।
“চলি ভাই, না ফিরলে একটা পুজো দিয়ে দিও।” অর্ধেন্দু বেরিয়ে গেলেন।
পাঁচ মিনিটও লাগল না, অর্ধেন্দু ফিরে এলেন ঘাম মুছতে মুছতে। সঙ্গে সেই সিপাই। “সাব আপকো সেলাম ভেজা।” এবারে প্রসূনের পালা।
ডি.আই.জি-র ঘরে ঢুকে স্যালুট করতে গিয়ে প্রসূন বুঝল ওর হাঁটু কাঁপছে। রাশভারি নন্দী-সাহেবের মুখে কিন্তু স্মিত হাসি। “সিট ডাউন।”
স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে অস্ফূটে থ্যাংক ইউ জানিয়ে সামনের চেয়ারে বসল প্রসূন।
“কত দিন হলো এ.এস.আই হয়েছেন?”
“আড়াই, প্রায় তিন বছর, স্যার,” বলল প্রসূন।
“আপনার রেকর্ড দেখছিলাম। নট ব্যাড।” ডি.আই.জি-র চোখ সামনের খোলা ফাইলের দিকে।
“থ্যাংক ইউ, স্যার।” প্রসূনের গলায় একটু জোর।
“খুব অল্প বয়সে এসেছেন সি.আই.ডি-তে।”
প্রসূন চুপ।
“সবসময়েই অর্ধেন্দু দাসের আন্ডারে কাজ করেছেন।”
“স্যার।”
“হি অলসো ওয়াজ গুড, কিন্তু এই মৌলি সেনগুপ্তর কেসটা নিয়ে হি ফেল ডাউন ব্যাডলি। খুব ব্যাড পাবলিসিটি হয়েছে।”
প্রসূন চুপ। বলারই বা কী আছে?
“দ্য কেস ইজ নাও ইন দ্য হ্যান্ডস অফ এস.আই সুব্রত গাঙ্গুলি অ্যান্ড ইনস্পেক্টর নকুল সেন। আপনি রিপোর্ট করবেন গাঙ্গুলিকে।”
“ইয়ে...”
“খুব টাফ কেস বলে তো মনে হচ্ছে না। অর্ধেন্দু ডিড আ শডি জব। সেটার জন্য ও নিজেও সম্পূর্ণ দায়ী নয়। আমরাও চাইছিলাম তাড়াতাড়ি ইনভেস্টিগেশন শেষ হয়ে চার্জশিট দেওয়া হোক। প্রেশার ছিল, কিন্তু এখন আর নেই। অর্ধেন্দুকে বাধ্য হয়ে সাসপেন্ড করতে হয়েছে। রাইট নাও, হি হ্যাজ বিন টোল্ড, ও ইনভেস্টিগেশন করবে না, কিন্তু আপনাদের সবরকম সাহায্য করবে।”
“আচ্ছা স্যার।”
ডি.আই.জি পাশে রাখা পাইপ তুলে নিয়ে মুখে দিলেন। লাইটার নিয়ে জ্বালাতে গিয়ে থেমে বললেন, “আপনি সব ডিটেল ওর কাছেই পেয়ে যাবেন। হি উইল নট কাম টু দি অফিস নাও, কিন্তু আপনি ওর সঙ্গে দেখা করতে যেতেই পারেন।”
প্রসূন ঢোকামাত্র ফেটে পড়লেন অর্ধেন্দু। “ওই শ্‌...”
দরজা ঠেলে ক্যান্টিন বয় চা নিয়ে ঢুকল। দুজনের সামনে ছোটো ছোটো কাপে চা দিয়ে চলে যাবার পরে আবার মুখ খুললেন অর্ধেন্দু। “ওই রিটায়ার্ড চিফ সেক্রেটারিই যত নষ্টের গোড়া। বার বার আই.জি, ডি.আই.জি-কে ফোন করে করে বিরক্ত করতে থাকল... ওনারাও আমার মাথায় চড়ে বসলেন... আমি সমস্তটা তালগোল পাকিয়ে কী যে করলাম... মাঝখান থেকে সাসপেনশন হলো আমারই।” অর্ধেন্দু একটা থুতু ফেলা আর গালি দেওয়ার মাঝামাঝি শব্দ করলেন। উঠে চায়ের কাপটা নামিয়ে রেখে ড্রয়ার খুলে চাবির গোছা বের করে ঝনাৎ করে রাখলেন প্রসূনের সামনে।
“সাসপেনশনের আইন-টাইন জানা আছে?”
“না।”
“আমারও না। তবে চাবিটা বোধহয় তোমারই হাতে যাবে। আমার হাতে পেন্ডিং কিছু তো আর নেই। আচ্ছা থাক। সিনিয়র কেউ আসুক। প্রোসিডিওরাল মিসটেক করে কাজ নেই।”
~দুই~
সন্ধেবেলা অতনুর বসার ঘরে বসে ব্যাঙ্কের সমস্ত কথা শুনে অতনু বললেন, “ওই জন্যই বলেছিলাম, ব্যাঙ্কে কী হলো আমাকে জানাস। তোর চাকরি গিয়েছে সেটা কোর্টে মামলা ওঠার আগেই ডিসিশন হয়ে গিয়েছিল। আমি ভাবছিলাম অভয়ঙ্কর যদি খালাসের পরে কলকাঠি নাড়তে পারেন। সে দেখছি হলো না।”
বনি জানতে চাইলেন, “ব্যাঙ্কের এগেনস্টে মামলা করা যায় না?”
অতনু বললেন, “যায় বইকি। বিলেত, অ্যামেরিকা হলে এক্ষুনি মামলা হত, তিন মাসে ইনভেরিয়েব্ল ভিক্টরি। চাকরি ফিরে না পেলেও অনেক টাকা কম্পেনসেশন। আমাদের দেশে কী হবে বলা কঠিন। এত বড়ো একটা অর্গানাইজেশন, ওদের টাকার যা জোর, মামলা টেনে নিয়ে যাবে আরও চল্লিশ বছর। উকিলের ফি দিতে দিতে জেরবার হয়ে যাবি।”
“আমি মামলা করতে চাই না।”
“কী করবেন?” জিজ্ঞেস করলেন বনি।
প্রদীপ উত্তর দিলেন না। মাথা নিচু করে বসে রইলেন। কী ইচ্ছে করছে বললে ওরা কী ভাববে? আপাতত ইচ্ছে করছে বিছানায় কুঁকড়ে শুয়ে থাকতে। কিন্তু সে কি সম্ভব?
“তুই কালকের দিনটা ঘুমো।” অতনু কি প্রদীপের মনের কথা বুঝলেন? “ইওর রুম ইজ স্টিল ইওরস। চাইলে পরশুও ঘুমো। তারপরে আর শুতে দেব না। তুই আমাদের সঙ্গে বেরোবি।”
প্রদীপ কিছু বললেন না। কৃতজ্ঞ চোখে তাকালেন অতনুর দিকে।
“খুব ভালো হবে।” বনির গলায় উৎসাহ। “আপনি আমাদের ফাইনানশিয়াল মেস্‌-টা একটু ক্লিয়ার করে দেবেন। আমাদের অ্যাকাউন্ট্যান্ট্‌ ছেলেটা আনাড়ি।”
প্রদীপের ফোনটা বেজে উঠল। প্রদীপ আড়চোখে তাকালেন। অচেনা নম্বর। ধরবেন কি? অতনু খুব ভয় দেখিয়ে রেখেছে। সারা দিন দরজার বাইরে একজন পুলিশের লোক বসেছিল। অতনুর বক্তব্য ওদের বাড়ির গেটেও একজন রয়েছে। প্রদীপ একবার দরজা খুলে লোকটিকে দেখে বলেছিলেন, “আপনি ভিতরে এসে বসবেন? এখানে তো একটা ফ্যানও নেই।” লোকটা ভীষণ স্মার্ট একটা স্যালুট দিয়ে বলেছিল, “এখানেই ডিউটি স্যার। ডেনজার কিছু এলে আগেই রুখতে হবে।” প্রদীপ তাতে স্বস্তি বোধ করবেন, না ভয় পাবেন, বুঝতে পারেননি।
ফোনটা বেজে চলেছে। অতনু হাত বাড়িয়ে তুলে নিয়ে বললেন, “এই নম্বরটা যেন...” প্রদীপের দিকে তাকিয়ে বললেন, “আমি দেখছি।” ফোন তুলে বললেন, “আমি প্রদীপ সেনগুপ্ত নই। আমার নাম অতনু সিনহা। আমি...”
তারপরে থেমে খানিকক্ষণ শুনে বললেন, “হ্যাঁ। একমিনিট।” ফোনটা বাড়িয়ে বললেন, “প্রসূন মজুমদার। এখন কেস ওনার হাতে।”
প্রদীপ ফোন নিলেন। কিছুক্ষণ প্রসূনের বক্তব্য শুনে বললেন, “ঠিক আছে।”
ফোন নামিয়ে বললেন, “আবার জিজ্ঞাসাবাদ শুরু। আসছেন এখানে।”
অতনু বললেন, “তা তো আসতেই হবে...”
কথাটা শেষ না হতেই দরজায় ঘণ্টা বেজে উঠল। এত তাড়াতাড়ি কি প্রসূন এসে পৌঁছবেন? তবে নতুন নিয়ম অনুযায়ী ওদের কারওর দরজা খুলতে হয় না। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই দরজা খুলে বাইরে দাঁড়ানো পুলিশের লোকটি বলল, “মিঃ ব্যানার্জী আয়ে হ্যায়।”
কে ব্যানার্জী?
জানা গেল তিনি প্রদীপের প্রতিবেশী। অনুমতি পেয়ে দরজার পুলিশ মোবাইল ফোনে নিচের পুলিশকে জানাল, তার খানিকক্ষণ পরে লিফটে উঠে এলেন ব্যানার্জীদা। গলায় কপট বিস্ময় মাখিয়ে বললেন, “বা-বা! আপনার সঙ্গে দেখা করতে আসা তো বেশ কঠিন হয়ে উঠল দেখছি।”
প্রদীপ হেঁহেঁ শব্দ করলেন, অতনুর নাক থেকে যে ঘোঁত-টা বেরোল, সেটা বিরক্তিও হতে পারে।
খানিক সৌজন্যমূলক বার্তালাপের পর ব্যানার্জীদা বললেন, “আপনি সুধীরকে ফ্ল্যাট বিক্রি করছেন?”
ওঁরা দুজনেই অবাক। প্রদীপ বললেন, “কই, সেরকম তো কিছু...”
“দেখেছেন, কী বজ্জাত!” ব্যানার্জীদার গলায় উত্তেজনা। “সব্বাইকে বলে বেড়াচ্ছে – আপনি নাকি কমিট করেছেন।”
অতনু বললেন, “কমিট তো দূরের কথা, প্রিলিমিনারি কথাও হয়নি।”
ব্যানার্জী সামনে ঝুঁকে পড়লেন। বললেন, “আপনাকে বলছি, ওই বদমাশ-টাকে দেবেন না ফ্ল্যাট। ও আপনাকে ঠিক দাম দেবে না। বিক্রি করলে আমাকে বলবেন। ভালো কাস্টমার জানা আছে...”
প্রদীপের মনে পড়ল, ওর বেলাতেও এজেন্ট ব্যানার্জীদার সঙ্গেই যোগাযোগ করিয়ে দিয়েছিল। লোকটা দালাল নাকি?
বলল, “আমি এখনও বাড়ি বিক্রির কথা কিছু ভাবিনি, ব্যানার্জীদা।”
ব্যানার্জী হাত নেড়ে মাছি-তাড়ানোর ভঙ্গীতে বললেন, “আহা, এখনের কথা বলছি না। বলছি, যখন বিক্রি করবেন... তা দাম কত ভেবেছেন?”
আরে! এ বলে কী!
“দাম... মানে...” আড়চোখে প্রদীপ দেখল অতনু মিটমিট করে হাসছে।
“আমি বলছি,” ব্যানার্জী বলে চললেন। “দেখুন, আপনার ফ্ল্যাটটা রিলেটিভলি নতুন। খুব বেশি লোক থাকেওনি কখনও। তবে সাউথ তো নেই, নর্থ আর ইস্ট ফেসিং... তবে আপনি তো বেশ দামি টাইলস-ফাইলস লাগিয়েছেন, তাতে কস্ট বাড়বে খানিকটা, কিন্তু আবার খুন হওয়া বাড়ি, তার জন্য খদ্দের পাওয়া মুশকিল হতেই পারে... তাই ধরুন...”
“এক মিনিট।” এবার বাধা দিলেন অতনু। “আমার মনে হয় এই আলোচনাটা এখন না হওয়াই ভালো। পুলিশ আসছে প্রদীপের সঙ্গে দেখা করতে। ওরা যদি এসে দেখে আপনি ফ্ল্যাট কিনতে এসেছেন...”
“পুলিশ? আবার পুলিশ কেন? কেস তো মিটে গেছে!”
“মিটে গেছে?” অতনুর কণ্ঠে অবাক বিস্ময়। “খুনি কে?”
“কিন্তু প্রদীপবাবু তো আর খুনি নন, সেটা তো...”
অতনু মাথা নেড়ে বলল, “তাহলে প্রদীপকে আসামির কাঠগড়ায় দাঁড়াতে না হলেও উইটনেস্‌ তো হতেই হবে। কেস শেষ হয়নি, মিঃ ব্যানার্জী। তাই বলছিলাম, পুলিশ যদি এসে দেখে যে আপনি আপনার শালীর জন্য প্রদীপের ফ্ল্যাটের দর কষাকষি করছেন, তাহলে আপনাকেই না সাসপেক্ট করে বসে!”
ব্যানার্জীর চোখ কপালে।
“আমার শালীর জন্য ফ্ল্যাট! কে বলল আপনাকে?”
“কে আবার বলবে? আপনি যে শালীর জন্য ফ্ল্যাট খুঁজছেন, সে তো আপনার আবাসনের সব্বাই জানে। পুনে থেকে তিনি সপরিবারে কলকাতায় শিফট করেছেন তিন মাস আগে, আর আপনি হন্যে হয়ে ফ্ল্যাট খুঁজছেন আপনার বাড়ির কাছে... চৌধুরীদের ফ্ল্যাট কতয় বিক্রি হবে?”
ব্যানার্জী-দার চোখ ক্রমেই ওপরে উঠছিল, এখন প্রায় চাঁদির কাছে। “কে চৌধুরী?”
“বা রে!” অবাক হয়ে বললেন অতনু, “আপনাদের প্রতিবেশী – যাঁর মেয়ে প্রথম মৌলির ওপর আক্রমণটা দেখে চেঁচিয়ে তার মা-কে বলে। আপনি নিশ্চয়ই জানেন, যে সেই মেয়ে তার পর থেকে রাত্তিরে ঘুমোতে পারে না, ঘুমের মধ্যে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে, তাই ডাক্তারের পরামর্শে বাবা-মা তাঁকে নিয়ে চলে যাচ্ছেন অন্য কোথাও – বাড়ি বিক্কিরি করে... জানেন না?”
ব্যানার্জীদা মাথা নাড়লেন। হ্যাঁ-না কিছু বললেন না। বোঝা গেল জানেন।
“ইন ফ্যাক্ট, মেয়েটাকে নিয়ে তো আবাসনের সবাই খুব দুশ্চিন্তায়। সুতরাং আপনার কানে নিশ্চয়ই গিয়েছে। চৌধুরিরা তো বেশ রিজনেব্ল দাম চেয়েছে বাড়ির। ওদের সঙ্গে কথা বলেছেন?”
এখনও নির্বাক ব্যানার্জী মাথা নাড়লেন। না।
অতনু বলে চলল, “তবেই দেখুন – বিক্রির ফ্ল্যাটের খোঁজ না করে, আপনি প্রদীপকে বলতে এসেছেন ওর ফ্ল্যাট আপনাকে বেচে দিতে – যে ফ্ল্যাট বিক্রির কোনও সিদ্ধান্তই মালিক নেয়নি। ভাবুন, সেটা জানতে পারলে পুলিশ যদি আপনাকে সন্দেহ করে আপনাকে নিয়েই টানাটানি শুরু করে – তাই বলছিলাম, এই সব দরাদরি এখন না করে কেসটা মিটে যাবার পরই করা ভালো নয় কি?”
রান্নাঘর থেকে ব্যানার্জীদার জন্য কফি নিয়ে বেরিয়ে বনি বললেন, “কোথায় গেলেন?”
অতনু বললেন, “পুলিশের ভয়ে পালিয়েছে। দাও, ওটা আমাকেই দাও।”
প্রদীপ বললেন, “শালীর জন্য ফ্ল্যাট খালি করতে কেউ পাশের বাড়ির লোককে খুন করতে পারে? এটা একটা লজিক হলো ?”
কফিতে চুমুক দিয়ে অতনু বললেন, “ওয়েল, সেটা ডিপেন্ড করে সে তার শালীকে কতটা ভালোবাসে তার ওপর। আমি কথাগুলো বলেছিলাম ভাগানোর জন্য। তোর যদি অতই ইচ্ছে, তাহলে যা, বারান্দা থেকে হেঁকে ডাক। এখনও নিশ্চয়ই সামনেই আছে।”
প্রসূনের অফিস থেকে অতনুর ফ্ল্যাট দূরে নয়। এসে পড়লেনও তাড়াতাড়ি। অনেকটাই অল্পবয়সী আগের অফিসারের চেয়ে। অর্ধেন্দুর চেয়ে অনেক স্মার্টও মনে হয়েছিল প্রথমে। এখনও সেরকমই দেখলেন – এর আগের বার প্রদীপকে অনর্থক অ্যারেস্ট করে হ্যারাস করার জন্য খুব মার্জিতভাবে ক্ষমা চাইলেন। তার মধ্যে কোনও বাড়াবাড়ি নেই। কোনও অপ্রয়োজনীয় স্পর্ধারও প্রকাশ নেই।
“আমরা নতুন করে কেস ওপেন করেছি – বুঝতেই পারছেন, এখন কাজটা আরও অনেক বেশি কঠিন। কারণ সত্যিই যে দুজন মাত্র ব্যাকগ্রাউন্ড ইনফরমেশন হোল্ডার ছিল – তারা দুজনেই এখন মৃত। নর্ম্যাল সার্কমস্ট্যানসে আমরা ওদের উকিলকে জেরা করতাম, এখন তো উনিই প্রাইম সাসপেক্ট।”
“কিন্তু উনিও তো নট অ্যাভেলেব্ল্‌।”
“ফেরার।” প্রসূন দ্বিধাহীন। “একেবারেই গন। কোথাও নেই। উকিল নেই, উকিলের স্ত্রী, দুই মেয়ে... আমরা প্রায় একই সঙ্গে জনা সত্তর আত্মীয়-বন্ধুর বাড়ি হাজির হয়েছি – যাতে একজন আর একজনকে ওয়ার্ন না করতে পারে, কেউ কিচ্ছু জানে না। বরং সকলেই অবাক। সেটার মধ্যে অ্যাক্টিং নেই। বেশ ছা’পোষা মধ্যবিত্ত পরিবার সব। তবে উকিলের সংসারে-বাড়িতে একটা সচ্ছ্বলতার ছাপ রয়েছে, যেটা উকিলি দিয়ে এক্সপ্লেন করা যাবে না। পাড়ার লোকেরা এ-ও বলেছে, যে উকিলবাবু নাকি মাঝে মাঝেই দু-তিন সপ্তাহের জন্য ভ্যানিশ করে যেতেন। বাড়ির লোকেরা, এবং উনি নিজেও পাড়ার লোকেদের জানাতেন যে অন্য কোনও স্টেটের হাই কোর্টে মামলা করতে যাচ্ছেন। সবাই ভাবত হাবেভাবে তো অত বড়ো উকিল বলে মনে হয় না? কিন্তু ইট ইজ নট ট্রু। কেবল কলকাতার পুলিশ কোর্টেই উকিলি করতেন।
“উনিও ডেড না তো?” জানতে চাইলেন অতনু।
“কে জানে বলতে পারবেন? হু নোজ,” বললেন প্রসূন।
“এত কথা আমাদের বলছেন কেন?”
“বলছি, কারণ মিঃ সেনগুপ্ত, আপনার আর মৌলিদেবীর লাইফ আমরা ছিঁড়ে-খুঁড়ে দেখেছি। আপনাদের দু-জনের মতো এত অ্যাবাভ বোর্ড লোক কম দেখা যায়। গত বিশ বছরে আপনারা দু-জনে কে কোথায় ছিলেন, এবং কী করেছেন, তা প্রায় ঘণ্টায় ঘণ্টায় বলে দেওয়া যাবে। কিন্তু ভাবুন, কথা নেই বার্তা নেই, আপনারা দু-জনে একত্র হবার এক বছর পেরোন’র আগেই একজনকে নৃসংসভাবে খুন হতে হলো। খুনিরা ধরা পড়ে আপনাকে ইমপ্লিকেট করার চেষ্টা করল। আপনার কপাল ভালো যে পুলিশ যথেষ্ট গা লাগিয়ে ইনভেস্টিগেট করেনি। যদি করত, আর যদি জানতে পারত যে ওই ক্রুশিয়াল দিনগুলোতে আপনার গাড়ি ছিল না, আর পুঁটে আর লিটন যদি শুধু এইটুকুই বলত, যে আপনি খিদিরপুরে ওদের আড্ডাতে কী ভাবে গিয়েছেন ওরা জানে না, আর কোনও একটা বারে বসে মদ খেতে খেতে এই খুনের কথা হয়েছে, তাহলে কিন্তু আপনি এত সহজে বাঁচতে না-ও পারতেন।”
অতনু বলল, “আপনি প্রায় কনফেস করছেন যে লিটন আর পুঁটের কাছে পুলিশের তদন্তের সব ডিটেল ছিল?”
“ছিল না ভাবার কারণ আছে? এই ধরুন, আমি তো আপনাদের বিশ্বাস করে কিছু কিছু কথা বলছি। কী আইডিয়া নিয়ে বলছি? যে আমার কথা থেকে আপনাদের যদি কিছু মনে পড়ে বা খেয়াল হয় – যদি আপনারা কোনও নতুন তথ্য দিতে পারেন। তেমনই লিটন আর পুঁটের ক্ষেত্রেও অর্ধেন্দুদা তা করেননি কী করে জানলেন?”
সকলেই চুপ করে রইল।
“শুধু তাই নয়,” বললেন প্রসূন। “ভেবে দেখুন, আপনারা এমন একটা ভীমরুলের চাকে ঢিল মেরেছেন যে তার জন্য তিনটে মানুষকে এক কথায় প্রাণ দিতে হয়েছে। অ্যাজ ইউ নো, মিঃ সেনগুপ্ত, আপনিও হয়ত সেফ নন। কথায় কথায় এত মানুষের প্রাণ নিতে যে পারে, সে – বা তারা – কিন্তু আমাদের দেশেও বেশ ক্ষমতাবান লোক। ওদের কাছে কী কী ইনফরমেশন আছে, কে জানে?”
প্রদীপ বললেন, “আপনি কী বলতে চাইছেন, সেটা যদি একটু পরিষ্কার করে বলেন...”
প্রসূন সামনে ঝুঁকে পড়ল। “যেটা বলছি তা হলো এই, যে আপনাদের জীবনের অতীতে এমন কিছু নেই যার জেরে মৌলিদেবীকে খুন করা হয়ে থাকতে পারে। বর্তমানেও তেমন কিছু খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। কিন্তু মৌলিদেবীকে সুপরিকল্পিতভাবে মারা হয়েছে, এবং তার পরে আপনাকে ফাঁসানোর একটা অ্যাটেম্‌ট্‌ হয়েছে। আপনি খুনের পরিকল্পনা করেননি। তাহলে ইট ইজ সেফ টু অ্যাজিউম, যে যিনি মৌলিদেবীর খুনের প্ল্যান করেছিলেন, তিনিই প্ল্যান করে দু-জনকে সরানোর চেষ্টা করেছিলেন। এবং আমি বিশ্বাস করি যে এই ঘটনার মূল লুকিয়ে আছে আপনাদের হানিমুনের ছুটিতে। আমার বিশ্বাস, ওই মালডিভ্‌স্‌ ট্রিপেই কিছু ঘটেছিল, যার ফলে আপনার স্ত্রীকে খুন করা হয়েছে। আপনি যদি সেটা মনে করতে পারেন, তাহলেই কাজটা অর্ধেক শেষ।”
“কিন্তু সেরকম তো কিছুই...”
প্রদীপের কথাটা মাঝখান থেকে কেটে প্রসূন বললেন, “প্লিজ ডোন্ট ক্লোজ ইওর মাইন্ড। ভেবে দেখুন। সামথিং মাস্ট হ্যাভ হ্যাপেন্‌ড্‌ – এটা ধরে নিন। তারপরে ভাবতে শুরু করুন। যত আগে থেকে পারেন। প্ল্যানিং, টিকিট কাটা, মালডিভ্‌সের দিনগুলো, এবং ফিরে আসা... কোথাও কিছু আনওটুয়ার্ড কিছু ঘটেছিল কি? আনটুওয়ার্ড না হলেও আনইউজুয়াল? সমস্ত সময়টা কি আপনারা একসঙ্গে ছিলেন? যখন ছিলেন না, তখন কি কিছু ঘটে থাকতে পারে?”
ইয়ার্কির সুরে ফোড়ন কাটলেন অতনু, “এই যেমন ধর, তুই যখন তোর বউকে ফেলে সুইমিং পুলের সামনে অর্ধনগ্ন মেমসাহেব দেখতে যেতি...”
“মিথ্যে কথা,” বললেন প্রদীপ। “আমি কোনও দিন হোটেলের সুইমিং পুলে যাই-ইনি। আমি সাঁতার জানি না, তাই। বরং আমি ঘুম থেকে ওঠার আগে মৌলি প্রায় রোজই সাঁতার কেটে আসত। একবার দুবার কথাও হয়েছিল আমাকে সাঁতার শেখাবে, কিন্তু আমি জলে ভয় পাই, তাই যাইনি।”
“এক্স্যাক্টলি,” খুব আস্তে আস্তে বলল প্রসূন, “এরপরে একটা দ্বিতীয় কথা আছে। এই কথাটার উত্তরও আমি আপনার কাছ থেকেই চাই, মিঃ সেনগুপ্ত, ভালো করে ভেবে রাখবেন। শুরু থেকে আপনার শ্বশুর আর শাশুড়ি বলে এসেছেন, যে আপনার মতো জামাই হয় না। কিন্তু হঠাৎ মাঝখানে একদিন আপনার শ্বশুরমশাই অর্ধেন্দু দাসকে ফোন করে ডেকে পাঠিয়ে আপনাদের রিলেশনশিপের সমস্যার কথা বলেন – কথাগুলো উনি কোর্টেও বলেছেন, আপনারা দুজনেই শুনেছেন। হঠাৎ এই মত পরিবর্তনের কারণ কী হতে পারে?”
“সেটা ওনাকেই জিজ্ঞেস করলে হয় না?” বললেন অতনু।
“করব। কিন্তু আপনার কি মনে হয়, জিজ্ঞেস করলেই ভদ্রলোক বলে দেবেন? অলরেডি জিজ্ঞেস করা হয়েছে। বলেছেন, উনি অত খেয়াল করতেন না। মৌলিদেবীর মায়ের কাছ থেকে শুনেছেন – এবং এখন মনে পড়ছে। আশ্চর্য ব্যাপার হচ্ছে মৌলিদেবীর মা কিন্তু আর কোনও স্টেটমেন্ট দেননি। শরীর খারাপ, ডাক্তার বারণ করেছে – এইসব অজুহাতে আপনার শ্বশুরমশাইও আর অর্ধেন্দুদাকে ঘেঁষতে দেননি। তখন অত ইমপর্ট্যান্ট মনে করা হয়নি, কিন্তু আমি অবশ্যই আবার সবটা খতিয়ে দেখব। ওনার এক্স-চিফ সেক্রেটারি দাদাকেও দাবড়ে দেবার ব্যবস্থা করা হয়েছে। উনিও আর খাপ খুলবেন না। আপনি কিন্তু আমার রিকোয়েস্টটা রাখবেন। বেশ রাত করে দিলাম, আপনারা তো নিশ্চয়ই রাতের খাবার দাবার এখনও খাননি। আমি চলি, আবার যোগাযোগ করব।”
এক চুমুকে আধকাপ ঠাণ্ডা কফি শেষ করে প্রসূন চলে গেলেন। প্রদীপ, অতনু আর বনি উঠলেন খাবার গরম করতে।
ডিনারের পরে বনি প্রদীপকে বললেন, “দাদা, আমি একটা সাজেশন দেব? আপনি তো এখন অফিস যাবেন না, আর আমাদের অফিসেও যে যেতে হবে এমন কোনও ধরাবাঁধা নিয়মও নেই। আপনি বরং বাড়িতেই থাকুন, আর একটা ডায়রি মতন লিখুন। ওই যেরকম বললেন পুলিশ অফিসার – প্ল্যানিং থেকে শুরু করে। গল্পের মতন। উইথ এভেরি ডিটেল। লিখে যান – যদি আগের কথা মনে কিছু পড়ে – আগের জায়গাটায় গিয়ে ফিল ইন দ্য ব্ল্যাঙ্ক করে দিন। নিশ্চয়ই কিছু মনে পড়বে।”
“গুড আইডিয়া,” দুটো গ্লাসে অল্প অল্প হুইস্কি ঢালতে ঢালতে বললেন অতনু।
“হঠাৎ হুইস্কি কেন?” জানতে চাইলেন প্রদীপ।
“তোর মুক্তির সেলিব্রেশন। খাস যে, তা তো আগেই বলেছিস। রোজ দেব না। একদিনই খা।”
“ইয়ে, আপনি খাবেন না?” আমতা আমতা করে বনিকে জিজ্ঞেস করল প্রদীপ।
“খাবে, তবে ও হুইস্কি খায় না। ও খায় ভডকা। ওকেও দিচ্ছি।”
~তিন~
ডায়রি।
জীবনে কোনও দিন ডায়রি লেখেননি প্রদীপ। কী লিখবেন? প্রসূন বলে গেল কোনও আনইউজুয়াল কিছু। কী কী আনিউজুয়াল ঘটেছিল মালডিভ্‌সে? সবই তো আনইউজুয়াল। সবচেয়ে বড়ো আনইউজুয়াল প্রদীপের জীবনে জীবনসঙ্গিনী। প্রতিটি মুহূর্তের আনন্দ... দুজনে আত্মহারা হয়ে ছিলেন... তার ওপরে মালডিভ্‌সের মতো জায়গা, প্রাসাদোপম হোটেলে মালিকের ব্যক্তিগত অতিথি হয়ে দিন কাটানো... এর মধ্যে ইউজুয়াল কোথায়? এর আগে পাঁচতারা হোটেলের অভিজ্ঞতার সঙ্গে এর কোনও তুলনাই নেই। প্রদীপ ঠাট্টা করে বলেছিলেন, “আগে জানলে দশ দিনের জন্য না এসে তিন মাস থাকতাম।” মৌলি বলেছিল, “আর দেশে ফিরে নতুন চাকরি
প্রদীপ বলেছিলেন, “নিকুচি করেছে চাকরির। এখানেই বাকি জীবনটা কাটিয়ে দেব। তোমার দাদা আমাকে একটা চাকরি দিতে পারবে না? এই ধরো দারোয়ান, বা জমাদারের কাজ?”
কথাটা এর পরে ঠিক কোন দিকে এগিয়েছিল, বা এগিয়েছিল কি না, প্রদীপ মনে করতে পারলেন না।
সবই তো আনইউজুয়াল। ওই নীল আকাশ, ওই পান্নার মতো সবুজ জল, ওই দুধের মতো সাদা বালির বিচ... খাওয়া দাওয়া... দু-বাহুর মধ্যে মৌলি... মৌলির কাছে নিজেকে সমর্পণ...
কাজ ছেড়ে দুহাতে মাথা রেখে প্রদীপ নিঃশব্দ কান্নায় ভেঙে পড়লেন।
অনেকক্ষণ পরে আবার উঠে বসলেন। কোথা থেকে শুরু করবেন? টিকিট কাটার সমস্যা থেকে? নাকি দেশ ছাড়ার আগে বম্বে এয়ারপোর্টে প্লেন ধরার সময় বাসের গতি সামলাতে না পেরে যে বয়স্ক সাহেব ভদ্রলোক ছিটকে মৌলির কোলে এসে পড়েছিলেন, এবং তারপরে ক্ষমা চাওয়া দূরে থাকুক, বিশ্রী সুরে এমনভাবে বাস-চালক এবং ভারতীয় ড্রাইভারদের দোষ দিয়েছিলেন, যেন সবটাই মৌলির দায়িত্ব – সেখান থেকে?
নাকি মালডিভ্‌স্‌-এ পৌঁছন’র পর থেকে? প্লেন থেকেই প্রদীপের পেটটা ঠিক মনে হচ্ছিল না। হোটেলে পৌঁছেই দৌড়তে হয়েছিল বাথরুমে। বাবলুদা বলেছিল, “হানিমুনে এসে বাথরুমে বসে থাকা ঠিক না।” ডাক্তার ডেকে ওষুধ খাইয়েছিল। তারপর মৌলি বলেছিল, “তুমি বরং একটু ঘুমিয়ে নাও। ওষুধ বলো, আর যা-ই বলো, রেস্টের চেয়ে বড়ো কিওর হয় না।”
প্রদীপের মনটা হঠাৎ লাগাম-ছাড়া হয়ে দৌড়তে শুরু করল। বাবলুদা তখন ঘরে ছিল না। ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলতে বলতে করিডোরে গিয়েছিল। ফিরে এসে মৌলির শেষ কথাটা শুনে বলেছিল, “তাহলে আমি মৌলিকে নিয়ে একটু ঘুরে আসি। হানিমুনে আসা বোনকে নিয়ে বেড়ানোর সুযোগ তো আর পাব না। আমরা ব্রাদার সিস্টার বন্ডিং করে আসি খানিকটা।”
হঠাৎ ঘুম ভেঙে প্রদীপের মনে হয়েছিল শরীরটা বেশ ঝরঝরে লাগছে। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখেছিলেন, ঘণ্টাখানেক কেটেছে। সন্ধে হয়ে গিয়েছে। মনে হয়েছিল, চট করে একটু ঘুরে আসি। হোটেল থেকে বেরিয়ে রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছেছিলেন, একটা বাজার জাতীয় জায়গায়। এ গলি, ও গলি চলতে চলতে হঠাৎ দেখেছিলেন একটা রেস্টুরেন্টে বসে মৌলি আর বাবলুদা খাচ্ছে। রাস্তার ওপারে। একটু দাঁড়িয়ে দেখেছিলেন প্রদীপ। বাবলুদা বহু বছর দেশছাড়া। প্রায় ছোটো থেকেই। তা সত্ত্বেও ভাইবোনের সহজ সম্পর্কটা নষ্ট হয়নি। সেটা জানলা দিয়ে দেখেও বোঝা যায়।
একবার ভেবেছিলেন ওদের সঙ্গে গিয়ে বসবেন। পরে মনে হয়েছিল, ওরা আড্ডা দিচ্ছে, দিক। চলে গিয়েছিলেন। কিন্তু কয়েকটা বাড়ি পরেই রাস্তাটা অন্ধকারে শেষ হয়ে গেল। ফলে ওই পথেই ফিরতে হয়েছিল। চোখে পড়ে গিয়েছিল বাবলুদার। পরক্ষণেই রেস্তোরাঁ থেকে ছুটে বেরিয়েছিল একজন ওয়েটার। বাবলুদা ডেকেছে।
“এই রেস্তোরাঁটা এককালে আমার ছিল, বুঝলে? বেচে দিয়েছি।”
বাকি সন্ধেটা কী চমৎকারই না কেটেছিল! হা-হা হাসি, ঠাট্টা-তামাশা, গল্প, ওয়েস্ট ইন্ডিজের হোটেলে আসার নেমন্তন্ন... সেই লোকটা কেন কোর্টে এমন উলটো কথা বলল?
যাকগে যাক, মন থেকে সব চিন্তাগুলো ঝেড়ে ফেলে প্রদীপ ঠিক করলেন রোজনামচাই লিখবেন। টিকিট কাটার ঘটনা দিয়ে শুরু। চেন্নাই থেকে সস্তা, না মুম্বাই?
~চার~
দিন তিনেক পরে রাতে শুতে গিয়ে দরজা বন্ধ করে বনি বললেন, “কিছু লক্ষ করেছ গত কয়েক দিনে?”
অতনু দাঁত মাজছিলেন। বললেন, “ব্লি লক্ক ব্ল ব্ললব্ল?”
দাঁতে দাঁত চেপে হিস হিস করে বনি বললেন, “থুথুটা ফেলে, মুখ ধুয়ে এদিকে এসো, আর দোহাই তোমার, গাঁকগাঁক করে ষাঁড়ের মতো চেঁচিও না।”
অতনু ভালোমানুষের মতো তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে বেরিয়ে ফিসফিসিয়ে বললেন, “কী লক্ষ করার কথা বলছ?”
বনি বললেন, “তোমার বন্ধুকে।”
“কেলো করেছে। এই তো সেদিন বললে আমার বন্ধু আর আমার একার নেই, তোমারও বন্ধু হয়ে গেছে। আজ আবার আমার বন্ধু হয়ে গেল?”
“আজেবাজে কথা বলে সময় নষ্ট করো না। ব্যাপারটা নজর করেছ কি না বলো।”
“প্রদীপ আজকাল কথা কম বলছে, বেশিরভাগ সময় ঘরে বসে ল্যাপটপ নিয়ে লিখে চলেছে – এই তো? ওকে তো আমরাই বলেছিলাম মন দিয়ে লিখতে। তা-ই করছে।”
“শুধু তাই হলে আমি তোমাকে কিছু বলতাম না। আমরা ওনাকে কাজটা করতে বললাম, একবারও ভাবলাম না, যে তাহলে ভদ্রলোককে সারাক্ষণ ওনার মৃত স্ত্রীর কথা ভাবতে হবে – প্রব্যাব্লি জীবনের সেই সময়টা যেটা ওয়াজ দ্য মোস্ট ফুলফিলিং অ্যান্ড লাভলি। ভাবতে পারছ, কী চলছে ওনার মনের মধ্যে?”
অতনু খানিকক্ষণ চুপ করে বসে রইলেন। তারপরে আস্তে আস্তে বললেন, “কিন্তু কী আর করা যাবে, বলো?”
বনি অসহিষ্ণু হয়ে বললেন, “তুমি তো ভাবছই না ব্যাপারটা নিয়ে। সারা দিন তুমি আর আমি দুজনে বাইরে। ভদ্রলোক সারাক্ষণ একা ঘরে। জিনিসটা কতটা সেফ তা-ও তো ভাবতে হবে?”
অতনু উঠে ঘরে পায়চারি শুরু করলেন।
“তুমি যে ডিস্‌অ্যাড্‌ভান্টেজ্‌ড্‌ মহিলাদের নিয়ে সারাক্ষণ পড়ে আছ, তাঁদের কেউ যদি ওই একই অবস্থায় ও-ঘরে থাকতেন, তুমি তাহলে আর একটু ওরিড কি হতে না?”
রাইটিং টেবিলের গায়ে হেলান দিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে বনির দিকে তাকিয়ে রইলেন অতনু।
ওদিকে নিজের ঘরে অস্থির হয়ে টেবিল থেকে উঠে এলেন প্রদীপ। গত দু’দিনে মালডিভ্‌সের প্রধান ঘটনাবলী লেখা হয়ে গেছে। কিন্তু কী যেন একটা মিসিং। কিছুতেই মনে পড়ছে না – কী মনে পড়ছে না। কী ভুলে গেছেন? কবে যেন কী একটা ঘটেছিল, বা ঘটেনি – কিন্তু ঘটা উচিত ছিল...
আজ সারাদিন মনে হয়েছে ছুটে গিয়ে রাস্তায় ঘুরে বেড়াই। সন্ধের পর থেকে মনে হয়েছে একটা সিগারেট খেলে হত – ছাত্রজীবনে যেমন পড়া মনে না পড়লে পথে বেরিয়ে যেতেন সিগারেট খেতে। মনে হয়েছে, কাকে জিজ্ঞেস করব?
পায়ে পায়ে এসে জানলার কাছে দাঁড়ালেন। একমাত্র যাকে জিজ্ঞেস করা যেত, তাকে কি আর কোনও দিন কিছু জিজ্ঞেস করতে পারবেন? আকাশের দিকে চোখ তুলে নিঃশব্দে প্রশ্ন করলেন, “তুমি কি সত্যিই ওখানে?”
প্রদীপের ঘরের লাগোয়া বারান্দা নেই। জানলা দিয়ে নব্বই ডিগ্রি সমকোণে অতনুর ঘরের লাগোয়া একচিলতে বারান্দার খানিকটা দেখা যায়। বারন্দার দরজা বন্ধ, তার পাশের জানলা বন্ধ, পর্দার পেছনে আলোর আভা। হঠাৎ প্রদীপের খেয়াল হলো ওখানে এখন অতনু আর বনি একান্ত সময় কাটাচ্ছে, অস্বস্তি লাগতে শুরু করেছিল – কিন্তু হঠাৎ একটা কী কথা মনে হতে থমকে গেলেন। বারান্দা। বারন্দা নিয়ে কিছু একটা...
মনে পড়েছে!
কবে ছিল সেই দিনটা? হানিমুনের তৃতীয় – না চতুর্থ দিন? প্রদীপের শরীরটা ক্লান্ত ছিল। সকালবেলা বাবলুদা প্রদীপের ক্লান্তি আর স্ট্যামিনা নিয়ে নোংরা একটা মন্তব্য করে গেছেন। মৌলি তখন সাঁতার সেরে বাথরুমে স্নান করছিল বলে ও জানে না। প্রদীপ বেরোবে না শুনে বলেছিল, “তাহলে আমি একটু ঘুরে আসি। হোটেলের বাইরে একটু রাস্তায় ঘুরে বেড়াব, লোক্যাল বাজারটা দেখব, একটু ছবি টবি তুলব।”
মৌলির ছবি তোলার সখ। ওর হাতে ক্যামেরা থাকলে ওর সঙ্গে কোথাও যাওয়া এক বিড়ম্বনা। অবশ্য মৌলি চেষ্টা করে প্রদীপের বিরক্তির উদ্রেক না করতে, কিন্তু সেটাও প্রদীপ বোঝেন।
প্রদীপ সেদিন স্যুইট থেকে বেরিয়ে বিশাল বারান্দাটায় বসে আকাশ দেখছিলেন। মৌলির বেশ পছন্দ ছিল বারান্দাটা। বলেছিল, “আমরা যখন বাড়ি করব, তখন এরকম বারান্দা থাকবে, কেমন?”
প্রদীপ হেসে বলেছিলেন, “এই কোয়ালিটির বাড়ি করার মতো অবস্থা হতে গেলে ব্যাঙ্কের চাকরি ছেড়ে বলিউডের হিরো হতে হবে।”
“তা কেন?” জিজ্ঞেস করেছিল মৌলি। “ব্যাঙ্কাররা বড়োলোক হয়নি?”
বারান্দায় বসে আকাশ দেখতে দেখতে হঠাৎ মনে হয়েছিল ঘরে কেউ রয়েছে? ওয়ান ওয়ে গ্লাস, বাইরে থেকে দিনের বেলা ভিতরে দেখার উপায় নেই। কে এল? দেখতে গিয়ে দরজা খুলে ঘরে ঢুকতে গিয়ে থমকে গিয়েছিলেন প্রদীপ। খাটে বসা মৌলি ভীষণ চমকে গিয়ে হাত থেকে ক্যামেরাটা বিছানায় ফেলেই দিয়েছিল। তারপরে বলেছিল, “কী ভীষণ ভয় পেয়েছি – আমি এতক্ষণ ভাবছি তুমি বুঝি বাথরুমে, আর পিছন থেকে তোমার আসার শব্দে ভেবেছি কে না কে!”
তখনই প্রদীপ প্রশ্নটা করতে যাচ্ছিলেন। কিন্তু করা হয়নি। মৌলি ক্যামেরাটা বিছানাতেই ফেলে রেখে উঠে এসে প্রদীপের হাতটা বুকে রেখে বলেছিল, “দেখো, কী জোরে ধকধক করছে – যেন ফেটে বেরিয়ে আসবে।”
মিনিট দুয়েক পরে প্রদীপকে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে বলেছিল, “না, এখন না। চলো না, একটু বাগানটা ঘুরে আসি?”
প্রদীপ যতক্ষণে বাথরুম থেকে প্যান্ট আর টি-শার্ট চড়িয়ে বেরিয়েছিলেন, ততক্ষণে মৌলি ক্যামেরাটা গুছিয়ে বাক্সবন্দী করে নিয়েছিল। ফলে ব্যাপারটা আর মাথায় ছিল না। কিন্তু এখন সেই প্রশ্নটা আবার ফিরে আসছে – এরকম কিছু একটা – “এ কী! কালই তো নতুন মেমরি কার্ড ঢোকালে ক্যামেরায়। এর মধ্যেই পাঁচ হাজার ছবি তুলে নিলে?”
এখন আবার মনে পড়ছে। পরে যখন মালডিভ্‌সের অজস্র ছবি দেখিয়েছিল মৌলি – তখন ওই ছবিগুলো কোথায় ছিল? যে ছবি তোলার সময় প্রদীপ ছিলেন না? যেগুলো দেখেছেন, সেগুলোর কোনওটাই তো অপরিচিত বা মনে-না-পড়া পরিস্থিতির ছিল না। তবে?
মৌলির ছবিগুলো দেখতে হবে আবার। এক এক করে। ওই ছবিগুলো কী হলো?
কাল সকালে বাড়ি যাবেন একবার। গাড়িটাও চালানো হবে। গত ক’দিন তো অতনুর গ্যারেজেই পড়ে আছে।
আলো বন্ধ করে বিছানায় গেলেন প্রদীপ। বারান্দার দিকের জানলার পর্দার আধ ইঞ্চি ফাঁকটা বন্ধ করে বনি ফিসফিস করে বললেন, “শুতে গেলেন বোধহয়।”
~পাঁচ~
আলো বন্ধ করলেও ঘুম আসছিল না তুলির। গত কয়েক দিন ওদের বাড়িতে কারওরই ঠিক করে ঘুম হয়নি। মৌলিদির মা তো সারা রাত কাঁদেন। খানিকটা মেয়ের জন্য, খানিকটা জামাইয়ের দুঃখে। গত দিন দশেক হলো জেঠিমার সঙ্গে দেখা হয়নি তুলির। ওদের বাড়ির কারওর সঙ্গেই না। বাবার সঙ্গে জ্যেঠুর বেশ কথা কাটাকাটি হয়েছিল প্রদীপদাকে অযথা ফাঁসানোর চেষ্টা করার জন্য। কেন জ্যেঠু এমন মত বদলাল? এখন তো তার ফলে মুখে চুনকালিও পড়েছে খানিকটা।
তুলি ব্যাপারটার আদ্যন্ত কিছুই ভেবে পাচ্ছে না। মৌলিদির মতো মাটির মানুষকে কেউ যে খুন করতে চাইতেও পারে, তা তুলি হৃদয়ঙ্গম করতে পারছে না। বার বার ভেবেছে কারওর সঙ্গে আলোচনা করতে পারলে হত, কিন্তু কার সঙ্গে করবে ভেবে পায়নি।
আজ দুপুরে সেই সু্যোগটা হয়েছে। কলেজ থেকে বেরিয়ে তুলিদের দলটা সবে গেটের সামনে দাঁড়িয়ে শেষবারের মতো আজকের টা-টা বাই-বাই বলছে, এমন সময় তিস্তা হঠাৎ বলে উঠেছে, “মাই গড্‌, কী হ্যান্ডসাম একটা পুলিশ, দেখ!”
সবাই একযোগে ঘাড় ফিরিয়ে দেখে সত্যিই একটা দারুণ দেখতে পুলিশ অফিসার খাকি ইউনিফর্ম পরে রাস্তা পেরিয়ে ওদের দিকেই আসছে।
অরিত্র আবার পুলিশ দেখলে ডরায়। ও, “আচ্ছা কাল দেখা হবে,” বলে সামনে যে অটোটা পেল, তাতেই উঠে পড়ল। পুলিশ অফিসারটা গাড়িগুলোকে হাত দেখিয়ে থামিয়ে রাস্তা পেরিয়ে ওদের সামনে এসে দাঁড়িয়ে ভীষণ স্মার্টলি বলল, “ম্যা’ম, এক্সকিউজ মি, আপনিই কি মৈথিলী দত্তগুপ্ত?”
তুলি এতই ঘাবড়ে গিয়েছে, যে কিছুই বলে উঠতে পারছে না। আশেপাশের মেয়েরা একটু খুক খুক করে হাসছে। তিস্তা বলেছে, “হ্যাঁ, ও-ই মৈথিলী। কেন বলুন তো?”
অফিসারটা পকেট থেকে একটা পার্স বের করে তা থেকে একটা ভিজিটিং কার্ড দিয়ে বলল, “আমার নাম প্রসূন মজুমদার। আমি এখন আপনার দিদির... ইয়ে, ব্যাপারটা এখন আমার হাতে আর কী... আমি একটু আপনার সঙ্গে কথা বলতে চাইছিলাম ওই ব্যাপারেই। আপনি যদি...”
ততক্ষণে তুলি সম্বিৎ ফিরে পেয়েছে। বলল, “এখন?”
প্রসূন বলল, “আপনার যদি অসুবিধে না থাকে, ম্যা’ম...”
মেয়েরা তখনও দাঁড়িয়ে। তুলির মনে হচ্ছে ওরা চলে গেলেই পারে। বলল, “কোথায়? এখন তো ক্যান্টিনে...”
প্রসূন ওকে থামিয়ে দিয়ে বলল, “আমি তো ইউনিফর্মে রয়েছি, ক্যাম্পাসে ঢুকতে গেলে পারমিশনের ব্যাপার থাকে একটা। আপনার আপত্তি না থাকলে আপনি যদি আমার সঙ্গে আসেন, তাহলে যাদবপুর থানায় বসে কথা বলা যেতে পারে।”
থানায়! “আমি কী বলতে পারব যে...”
অফিসার ততক্ষণে হাঁটতে শুরু করেছে আবার রাস্তা পার করতে, আর তুলিও হঠাৎ খেয়াল করল ও-ও কথা বলতে বলতে অর্ধেক রাস্তা পেরিয়ে এসেছে। একবার চট করে পিছন ফিরে হাত তুলে বিদায় জানাল বন্ধুদের। তারপরে রাস্তা পেরিয়ে এসে দাঁড়াল পুলিশের জিপ-টার পাশে।
ড্রাইভার নেমে এল, প্রসূন তুলিকে সামনে তুলে নিজে গিয়ে বসল পিছনের সিটে।
“বলবেন মানে আমি একটা ক্যারেকটার স্কেচ চাই। আপনার দিদির সম্বন্ধে যা যা জানা আছে সব না জানলে আমরা এগোতে পারব না। ইউনিভার্সিটিতে এসে এইভাবে আপনাকে বিরক্ত করার জন্য আমি সত্যিই দুঃখিত, কিন্তু আপনার বাড়ি যেতে চাইনি। আপনার বাবার সঙ্গেও আমি আজ অফিসে কথা বলেছি। উনি জানেন আমি এখন আপনার কাছে আসছি।”
থানায় ঢুকেই তুলি বুঝেছিল যে সঙ্গের লোকটা সত্যিই বেশ সমীহ আদায় করে। দরজায় বসা পুলিশটা থেকে শুরু করে ভিতরে সবাই প্রসূনকে ভালোই চেনে এবং সঙ্গে সঙ্গে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। যখন প্রসূন বলল, “একটা ঘর চাই। বসে কথা বলার মতো।” তখন উত্তর এল, “ও.সি-র ঘর খালি, স্যার। ও.সি বেরিয়েছেন। আজ আর ফিরবেন না।”
ও.সি-র ঠাণ্ডা ঘরে বসে কথা হলো। প্রথমে শীতল পানীয়, তারপরে সিঙাড়া, এবং সব শেষে কফি সহযোগে। কখন যে দু’ঘণ্টা কেটে গেছে মৌলিদির গল্প বলতে বলতে, তুলি খেয়ালই করেনি। খানিকক্ষণের মধ্যেই তুলির সমস্ত আড়ষ্টতা কেটে গেছিল। লোকটা মজার। হঠাৎ জিজ্ঞেস করেছিল, “মৌলি আর তুলি। আপনার ভালো নাম মৈথিলী, আর মৌলির নাম শুধুই মৌলি – এমন কেন?”
তুলি বলেছিল, “কে বলল আপনাকে মৌলির নাম শুধুই মৌলি? মৌলিদির ভালো নাম বৈদেহী। কিন্তু নামটা ওর পছন্দ ছিল না। তাই মৌলি ইউজ করত। এমনকি অফিশিয়াল জায়গাতেও।”
ফটোগ্রাফির হবির কথা পুলিশ জানতই না। তুলি যখন বলল, প্রসূন সেটা লিখতে লিখতে বলেছিল, “কতদিন ধরে উনি ছবি তুলতেন?”
মৌলিদির ছবি তোলার ইতিহাস তুলির মুখস্ত। প্রথম দিকে তো ওকে নিয়েই যেত সব ওয়ার্কশপে, ক্লাসে, এক্সিবিশনে। মৌলিদির ফোটোগ্রাফিতে সখ কী করে হয়েছিল, কবে কোথায় ওয়ার্কশপ করেছিল, কী কী এক্সিবিশনে ছবি দিয়েছিল, সব বলে দিয়েছিল গড়গড় করে।
কফিতে চুমুক দিয়ে বিকট মুখ ভেটকিয়ে প্রসূন বলেছিল, “ইশ, ছ্যা, ছ্যা! খাবেন না। খাবেন না। অখাদ্য কফি।”
শান্ত হয়ে কফিতে চুমুক দিয়ে তুলি বলেছিল, “একে যদি খারাপ বলেন, তাহলে একদিন ইউনিফর্ম না পরে প্লেন ড্রেসে আসুন, কলেজ ক্যান্টিনের কফি খেয়ে যান।”
প্রসূন বলেছিল, “সে তো হয় না, কিন্তু আপনি বললেন, তার জন্য ধন্যবাদ।”
তুলির গাল এতই লাল হয়েছিল যে অনেকক্ষণ মুখ তুলে তাকাতেই পারেনি।
এখনও বাড়ির জানলার চওড়া তাকে বসে হাঁটু-দুটো জড়িয়ে তুলির শরীরে একটা শিহরণ খেলে গেল কথাগুলো মনে করে।
~ছয়~
“একবার বাড়ি যাব,” সকালবেলা ব্রেকফাস্ট টেবিলে বসে অতনুকে বললেন প্রদীপ।
অতনু বুঝলেন ওঁর বাঁ পাশে বসে বনি ইশারায় কিছু একটা বলার চেষ্টা করছেন, কিন্তু বনির মুখটা দেখতে পাচ্ছেন না বলে বুঝে উঠতে পারলেন না।
“কী হয়েছে?” জানতে চাইলেন।
“কিছু একটা হয়েছে,” বললেন প্রদীপ। “কাল সারাদিন ধরে একটা ইনসিডেন্ট মনে পড়ছিল না। শেষে, যখন খেয়ে উঠেছি, তখন মনে পড়ল।”
মালডিভ্‌সের ঘটনাটা বলে বললেন, “আনিউজুয়াল, আশ্চর্য দুটো ব্যাপার ছিল এই ঘটনাটায়। এক তো এক দিনের মধ্যে মেমরি কার্ড বদলানো, আর দ্বিতীয় হলো, মৌলির চমকে ওঠা। মৌলি চমকাত না। শি ওয়াজ আ উম্যান অফ এক্সট্রিমলি স্ট্রং নার্ভস। তুলি বলত – আমার খুড়তুত শালী – দিদিকে ছোটোবেলাতেও অন্ধকারে ভয় দেখান যেত না। ওই যে, অন্ধকার ঘর থেকে হঠাৎ কেউ বেরিয়ে এসে ‘ভূ-ঊ-ঊ” বলে ভয় দেখায়, সে রকম আরকি। সেটা আমিও প্রত্যক্ষ করেছি। মৌলিকে অনেক দিন চিনি। কোনও দিন ওরকম চমকাতে দেখিনি। তখন খটকা লেগেছিল, কিন্তু কথায় কথায় সাবজেক্টটা আর ওঠেনি। এখন মনে হচ্ছে, মৌলি তখন হয়ত ইচ্ছে করেই কথাটা ঘুরিয়ে দিয়েছিল। আর তৃতীয় হলো, ছবিগুলো গেল কোথায়?”
বনি জানতে চাইলেন, “সবসুদ্ধু কত ছবি তুলেছিলেন – তার মধ্যে হয়ত খেয়াল নেই, বা বাতিল করে দেওয়া ছবি...”
প্রদীপ কথা কেটেই বললেন, “মৌলি অমন হাজারে হাজারে ছবি তুলত না। কম তুলত। চট করে ডিলিটও করতনা। এক্কেবারে নড়ে গিয়েছে, বা কালো একটা ধাব্বা, বা তোলার সময় কেউ সামনে এসে পড়েছে – এমন না হলে মৌলি সব ছবিই কম্পিউটারে প্রোসেস করত। তারপরে – অন্তত গত চার পাঁচ বছর ধরে – আমাকে সব ছবি দেখাত। তারপরে ঠিক করত কোনগুলো রাখবে। সেগুলো রাখত এক্সটার্নাল হার্ড ড্রাইভে। ওর মতো এত অর্গানাইজড মানুষ আমি কম দেখেছি। সুতরাং ওই ছবিগুলো নিশ্চয়ই কোথাও আছে। আজ গিয়ে খুঁজব।”
“বি কেয়ারফুল। দুজন পুলিশকেই নিয়ে যাস। অ্যান্ড কিপ ওয়ান অফ দেম ইনসাইড উইথ ইউ। অন্যজন যেন বাইরে সিঁড়িতে থাকে। কিছু যদি পাস, কেঁচো খুঁড়তে সাপ – স্নেক হোয়াইল ডিগিং ফর আর্থওয়ার্মস – বাড়ি থেকে বেরোবি না। আমাকে আর প্রসূন মজুমদারকে ফোন করবি। আমরা যাব, তারপরে কথা।”
সাবধানবাণীটা অদ্ভুত লাগলেও প্রদীপ তর্ক করলেন না। পড়েছেন মোগলের হাতে, খানা খেতে হবে সাথে! উপমাটা ঠিক হলো কি না, না বুঝেই অতনুর স্টাইলে বললেন, “ইন দ্য হ্যান্ডস অফ দ্য মুঘলস, হ্যাভ টু ইট মিলস উইথ দেম।”
স্নান সেরে বেরোতে বেরোতে অতনু বেরিয়ে গিয়েছে কাজে। আজ বনি বাড়িতে। অতনু আর বনি আজকাল একজন করে কাজে যায়। গত দু-তিন দিন হলো, হয় অতনু বাড়িতে, নইলে বনি। একবার ভেবেছিলেন জিজ্ঞেস করবেন কেন, তারপরে মনে হয়েছে, ওদের ব্যক্তিগত ব্যাপার...
রান্নাঘর থেকে বনি বললেন, “আপনার কি ফিরতে দেরি হবে?”
“বলতে তো পারছি না। ছবিগুলো খুঁজে পেতে কত সময় লাগে তার ওপর...”
বনি বললেন, “তাহলে পাঁচ মিনিট দাঁড়িয়ে যান। একটা নতুন জিনিস ভাজছি। একটা খেয়ে যান। ঠাণ্ডা হলে, বা মাইক্রোওয়েভে গরম করলে ভালো লাগবে না।”
এইজন্যই পরের ঘটনার খবরটা প্রদীপ অতনুর বাড়িতে বসেই পেলেন।
ব্যানার্জীদার ফোনটা ধরে প্রদীপ বলতে গিয়েছেন যে উনি আর খানিকক্ষণের মধ্যেই বাড়ি আসছেন, কিন্তু ব্যানার্জীদার উত্তেজিত কণ্ঠস্বর ওঁকে থামিয়ে দিল।
“ইয়ে, একটা কাণ্ড হয়েছে। কাল রাত্তিরে আপনার বাড়িতে চোর এসেছিল।”
“চোর? রাত্তিরে?”
“হ্যাঁ। সকালে আপনার কাজের লোক আমার বাড়ি থেকে চাবি নিয়ে গিয়ে দরজা খুলে দেখে বাড়িতে সব ছত্র... ইয়ে, লণ্ডভণ্ড, তছনছ... ছুটে এসে আমাকে বলে। আমি এবার দরজায় তালা লাগিয়ে দিয়েছি। আপনি পুলিশে খবর দিন, আর চলে আসুন।”
বনিকে ব্যাপারটা বলে প্রদীপ বললেন, “আগে অতনুকে ফোন করছি – তারপরে পুলিশে।”
অতনু খানিকটা শুনেই বললেন, “প্রসূন মজুমদারকে জানা। ওকে জিজ্ঞেস কর তুই কখন যাবি। পুলিশ যাবার আগে গিয়ে কাজ নেই। তারপরে আমাকে ফোন করিস।”
প্রসূন বলল, “আমি লোকাল থানা থেকে ফোর্স পাঠাচ্ছি। দশ মিনিটে আমিও পৌঁছব। আপনি ওরকম সময়েই আসুন। আর, হ্যাঁ, কাজের লোকটাকে যেন যেতে না দেওয়া হয়। মিঃ ব্যানার্জীর নম্বর আমার কাছে রয়েছে। আমি বলে দিচ্ছি।”
মিনিট পনেরো পরে হাউসিং-এ পৌঁছে আবার সেই পুলিশে পুলিশে চতুর্দিক ছয়লাপ – দিনের বেলা, অফিসের সময় – তাই আবাসিকদের ভীড় কম, কিন্তু যে ক’জন রয়েছেন, আজ তাদের মুখের ভাব মোটেই বন্ধুত্ব বা সহানুভূতিপূর্ণ মনে হলো না প্রদীপের।
নিজের ফ্ল্যাটের দরজা হাট করে খোলা। সেখানেও অনেক পুলিশ। প্রসূন মজুমদার প্রদীপকে দেখে বেরিয়ে এসে বলল, “স্যরি। এখানে নয়। চলুন মিঃ ব্যানার্জীর বাড়িতে। আপনাকে দু-তিনটা ব্যাপার জানানোর রয়েছে।”
ব্যানার্জীদার বাড়িতে কাজের মেয়েটা উবু হয়ে বসে কাঁদছে। প্রসূন তাকে একটা আলতো ধমক দিয়ে বলল, “আঃ, তুই এখনও কেঁদে চলেছিস কেন? তোকে তো বললাম, কিছু বলব না। থানাতেও নিয়ে যাব না। শুধু ওই লোকটা কোনও দিন তোর কাছে আসলে তুই বাবুকে খবর দিবি। থানাতে গিয়েও জানাতে হবে না। বুঝলি?”
মেয়েটা কাঁদতে কাঁদতেই মাথা নেড়ে ‘হ্যাঁ’ বলল। প্রসূন বলল, “যাঃ, পালা এখন।”
বেরিয়ে যাবার পরে প্রদীপ বললেন, “ও কি চুরিতে ইন্‌ভল্‌ভ্‌ড্‌ নাকি?”
ব্যানার্জীদা, “আরে আর বলবেন না...” বলে শুরু করেছিলেন, কিন্তু প্রসূন থামিয়ে দিয়ে বলল, “ব্রেক-ইন – যদিও তালা ভেঙে নয়, তবে চুরি এখনও বলা যাবে না। কেন না কী মিসিং বা না-মিসিং, তা আমরা এখনও জানি না। কাল রাতেই হয়েছে, তা-ও বলা যাচ্ছে না।”
“ও?” প্রদীপের গলায় বিস্ময়।
“গত তিন দিন মেয়েটা কাজেই আসেনি। জানা-মতে কেউ আপনার বাড়িতে ঢোকেনি। সুতরাং গত তিন দিন বা রাতের মধ্যে যে কোনও দিনই ঘটনাটা ঘটে থাকতে পারে। আমাদের লোক গত তিন চার দিনের সমস্ত ভিজিটর্স লিস্ট চেক করছে। রাত্তিরে পাঁচিল টপকেও ঢুকে থাকতে পারে – সেটা অবশ্য ভিজিটর্স বুকে থাকবে না।”
“কাজের মেয়েটাকে কী বলছিলেন?” জানতে চাইলেন প্রদীপ।
“ও-ই তো নষ্টের গোড়া। কয়েকদিন আগে সকালে চাবি নিয়ে কাজে যাবার নাম করে ওটা হাউজিং-এর বাইরে নিয়ে গিয়ে একটা অপরিচিত লোককে দিয়ে দিয়েছিল। লোকটা দুপুর-বেলা ওর হাতে চাবি ফেরত দেয়। সেই সঙ্গে পাঁচ হাজার টাকা। ধরেই নেওয়া যেতে পারে যে লোকটা হয় সেই সময়েই চাবিটা নকল করে রাখে, বা তখনই বাড়িতে ঢুকে তছনছ করে।”
পাঁচ হাজার? কী থাকতে পারে প্রদীপের বাড়িতে যার জন্য কেউ পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে চাবি নিতে পারে?
প্রসূন বলল, “সেটাই বের করতে হবে প্রদীপবাবু। আমাদের ফিঙ্গারপ্রিন্ট এক্সপার্টরা চলে যাক, আপনি দেখলে আশাকরি বুঝতে পারবেন কী নেই।”
“আমি একটা বিষয় আপনার সঙ্গে একটু আলোচনা করতে চাই।” প্রদীপ আর প্রসূন সিঁড়ি দিয়ে নেমে প্রদীপের দরজার সামনে দাঁড়ালেন। অল্প কথায় ছবি খুঁজতে আসার ব্যাপারটা বললেন প্রসূনকে।
প্রসূন মাথা নাড়ল। বলল, “ছবি কোথায় থাকে?”
“কম্পিউটারে। আমাদের মাঝের ঘরে। যেটা স্টাডি – সেখানেই বই, ম্যাগাজিন, কম্পিউটার – সব আছে।”
প্রদীপের বাড়ি থেকে একজন বেরিয়ে এসে বললেন, “স্যার, হয়ে গেছে...”
প্রসূন দরজাটা পুরোটা খুলে বলল, “আসুন। দেখে যান।”
সারা বাড়িতে জিনিস ছড়ান। কাগজ, খাতা-বই, বাসন-পত্র – কিছু কাচের প্লেট-বাটির ভাঙা টুকরো পড়ে আছে।
প্রদীপ বললেন, “যে দিনই হোক, দিনেই হয়েছিল।”
“কী করে বলছেন?” জানতে চাইল প্রসূন।
“এই বাড়িগুলোতে একটু জোরে হাঁটলেই নিচের তলায় শব্দ পাওয়া যায়। সেখানে এত বই খাতা, বাসন-কোসন মাটিতে ফেলা হয়েছে, কাচের প্লেট, বাটি, গ্লাস ভেঙেছে – নিচের লোক নিশ্চয়ই শুনতে পেত। কিন্তু ওদের বাড়িতে সারাদিন কেউ থাকে না। ফিরতে ফিরতে সন্ধে হয়ে যায়।”
“বেশ, ওদের জিজ্ঞেস করতে হবে, রাতে বাসনকোসন পড়ার শব্দ পেয়েছেন কি না। এবার আসুন। কোথায় ক্যামেরা আর ছবি থাকত?”
প্রথমে প্রদীপ, তারপরে প্রসূন কাচ আর অন্যান্য ছড়ান জিনিসপত্র বাঁচিয়ে ভিতরে ঢুকলেন। বেশিক্ষণ লাগল না। চুরি হওয়া জিনিসের তালিকা লিখে নিল প্রসূন মজুমদার।
“ক্যামেরা – ক্যাননের। ক্যামেরার ব্যাগ। আট-দশটা ডেটা কার্ড, তিনটে এক্সটার্নাল হার্ড ড্রাইভ – দুটো পাঁচশো জিবি, একটা এক টিবি। অজস্র পেন ড্রাইভ। এই ড্রয়ারে কটা সিডি আর ডিভিডি ছিল তার ইয়ত্তা নেই।”
“সবই কি ছবি?”
না, না। ছবি কেবল ছিল ক্যামেরার ডাটা কার্ডগুলোতে, আর ওয়ান টিবি হার্ড ড্রাইভে। বাকিটায় নানা কিছু – গান, সিনেমা, অন্যান্য ডাটা – এই সব আর কী।”
“কম্পিউটারে ছবি নেই?”
“সাধারণত থাকে না। তবু দেখি একবার।”
প্রদীপ ঝুঁকে পরে কম্পিউটারের বোতাম টিপলেন। কম্পিউটারের আলো জ্বলে উঠল, কিন্তু তারপরে কিছুই হলো না। খানিকক্ষণ পরে মনিটরে লেখা ফুটে উঠল, “বুট ডিভাইস নট ফাউন্ড।”
“এ কী!” অবাক হয়ে প্রদীপ আবার সুইচ টিপে কম্পিউটার অফ্‌ করে আবার অন করলেন।
একই ঘটনা ঘটল আবার। প্রদীপ বললেন, “এ আবার কী খেলা?”
“দেখি?” বলে নিচু হয়ে প্রসূন টেবিলের নিচে রাখা কম্পিউটারটা টেনে বের করতেই তার পাশের ঢাকনাটা খুলে পড়ে গেল।
“আরে!” আশ্চর্য হয়ে বললেন প্রদীপ।
“আশ্চর্য হবার কিছুই নেই,” বলল প্রসূন। “ওরা আপনার এক্সটার্নাল হার্ড ড্রাইভ নিয়ে গিয়েছে, ইন্টার্নালটাও নিশ্চয়ই ফেলে যায়নি – এই দেখুন। আপনার ডেস্কটপে কোনও হার্ড ড্রাইভ নেই।”
~সাত~
“মিঃ মজুমদার, আপনি যা-ই বলুন, এ বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই, যে প্রদীপ আপনাদের আর কোনও সাহায্য করতে পারবে না। এবং করলেও সেটা খুবই মিনিম্যাল – কিছু ইনফরমেশন দিয়ে – যেমন কোনও কথা মনে পড়লে সেটা জানিয়ে। আমার মনে হয় এবার ওকে কলকাতা ছাড়তে হবে।”
অতনুর বসার ঘরে বসে কথা হচ্ছে – উপস্থিত প্রদীপ আর প্রসূন। অতনু উত্তেজিত হয়ে পায়চারি করছে। বলছে, “এইভাবে যদি ওর বাড়ি আর ফ্যামিলির ওপরে অ্যাটাক হতে থাকে – কাল যদি ওর ওপর আক্রমণ হয়? ধরুন কোনও দিন যখন ও বাড়িতে একা এরকম একটা সময়ে ওরা এসে হাজির হয় – তাহলে হি উইল বি ইন গ্রেভ ডেঞ্জার।”
“ওরা যা চাইছিল, তা যদি পেয়েই গিয়ে থাকে তাহলে তো ওনার আর বিপদ নেই।”
“ওরা কী চাইছিল, তা কি আপনি জানেন? প্রদীপ জানে? আপনারা তো আন্দাজে কথা বলছেন। আর যদি পেয়ে গিয়েও থাকে, তাহলেও প্রদীপ যদি শহরে না থাকে – আপনাদের অসুবিধে কি?”
অনেকক্ষণ চুপ করে ছিলেন প্রদীপ। এবারে বললেন, “আমি কি হিন্দি ছবির হিরোইন, যে আমার ভবিষ্যৎ নিয়ে তোরা আলোচনা করবি, কিন্তু আমাকে একবারও জিজ্ঞেস করবি না, আমি কী চাই?”
অতনু বললেন, “তুই যদি বলিস যে তুই এখন থেকে তোর ওই ফ্ল্যাটে গিয়ে থাকতে চাস, তাহলে আমরা নিশ্চয়ই তোকে হিন্দি ছবির হিরোইনের মতো ট্রিট করব।”
প্রদীপ মাথা নেড়ে বললেন, “তা চাই না। তবে বাড়িতে আমাকে আবার যেতে হবে। জিনিস গোছানোর জন্য। আমি মনস্থির করে নিয়েছি। আমি কলকাতায় আর থাকব না। এই একটাই কাজ আপনি আমাকে দিয়েছিলেন। আমার মনে হয় সেই কাজটা আমি যথেষ্ট দক্ষতার সঙ্গে করেছি। শুধু যদি আর একটা দিন আগে করতাম, তাহলে হয়ত ছবিগুলো আমরাই পেয়ে যেতাম।”
“ছবি তো দু-তিন দিন আগেও চুরি গিয়ে থাকতে পারে,” বলল প্রসূন।
প্রদীপ মাথা নাড়লেন। “বোধহয় না। তাহলে কাজের লোকটা তিন দিন কামাই করত না হয়ত। কিন্তু সে যা-ই হোক, ও সবই এখন শত্রুপক্ষের হাতে। সুতরাং আমার আর হাঁ করে এখানে বসে থেকে লাভ নেই। চাকরি খুঁজতে হবে। আমি যেখানেই থাকি আপনি আমার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারবেন। পুলিশের কোনও প্রয়োজনে আমি চলে আসব। তাতে কি আপনার কোনও আপত্তি আছে?”
প্রসূন বললেন, “আপত্তির কারণ দেখি না। তবে একবার আমার সুপিরিয়রদের সঙ্গে আলোচনা করব।”
“না।” আপত্তি করলেন অতনু। “ব্যাপারটা অত সহজ করে নিলে চলবে না, মিঃ মজুমদার। আরও একটু প্ল্যানিং করতে হবে।”
“কী রকম?” জানতে চাইলেন প্রদীপ।
“তুই একটু মাথা ঠাণ্ডা করে ভাব, প্রদীপ। আমরা ধরে নিচ্ছি মৌলি খুন হয়েছে ওর ছবির জন্য। আমরা ধরে নিচ্ছি এর মধ্যে তোর কোনও রোল নেই। কিন্তু এমন যদি হয় যে আসলে ব্যাপারটা তোকে নিয়েই? তোরই এমন কিছু একটা আছে, যেটা চুরি করতে বা ডাকাতি করতে পুঁটে আর লিটন এসেছিল? মৌলির খুনটা কেবলই কাকতালীয়? তা যদি না-ও হয়, ওটা যদি ওই অজানা ছবিগুলোই হয়, তাহলে সেগুলো এতই ইমপর্ট্যান্ট যে তার জন্য তিনটে খুন হয়ে গেছে। আর লিটন-পুঁটের উকিল আর উকিলের বউ-মেয়ের খবর তো আমরা জানিই না। ওরা যা খুঁজছে তা যদি না পেয়ে থাকে? তার পর যদি তোর পেছনে লোক পাঠায়?”
প্রদীপ একটু ঘাবড়ে গেলেন। “তাহলে?”
“তাহলে তোকে ডুব দিতে হবে। ইউ উইল হ্যাভ টু ড্রাউন। সবাইকে জানিয়ে – এই আমি দিল্লি চললাম, এই আমি বোম্বাইতে চাকরি নিলাম, এসব বলে গেলে চলবে না। এখানকার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট বন্ধ করতে হবে। মোবাইল ফোন ফেরত দিতে হবে। যেখানে যাবি, সেখানে নতুন করে সব করতে হবে – এমন একটা প্ল্যান করতে হবে।”
প্রদীপ একটু রেগেই বললেন, “আর কী কী করতে হবে? নাম বদলাতে হবে, নকল আইডেন্টিটি কার্ড, র‍্যাশন কার্ড, ভোটার আইডেন্টিটি কার্ড, আধার কার্ড? প্লাস্টিক সার্জারি?”
“ইয়ার্কি মারিস না,” একটু ধমকের সুরেই বললেন অতনু। “এটা অ্যামেরিকা হলে হয়ত তা-ই করা হত। অতটা না হলেও তোকে হাওয়া হতেই হবে। সেটা তুই আর আমি প্ল্যান করব।”
প্রসূনের দিকে তাকিয়ে বললেন, “প্রদীপের সঙ্গে আপনার যোগাযোগের মাধ্যম থাকব আমি। কেমন? বুঝতেই পারছেন, আপনাদের নেটওয়ার্কের ওপর আমার খুব ভরসা নেই। কিন্তু আপনি আমার নেটওয়ার্কের ওপর ভরসা রাখতে পারেন।”
বোকা হয়ে যাওয়া প্রসূনকে বিদায় দিয়ে অতনু ফিরে এসে প্রদীপের সামনে বসলেন। বললেন, “তুই যদি আমার সাজেশন মানিস, তাহলে আমার কিছু অ্যাসোশিয়েট আছেন, তাঁদের ধরে তোর একটা চাকরি জোগাড় করে দেব। নট ভেরি হাইলি পেইং, কিন্তু আরামে থাকবি – সেভিংস-এ হাত দিতে হবে না, লুকিয়েও থাকতে পারবি।”
“কী চাকরি?”
“এন.জি.ও-তে। অ্যাডমিনিস্ট্রেশন। শুধু ডেস্ক জব হয় না। কিছু ফিল্ড ওয়ার্ক করতেই হবে – কাজে আনন্দ আছে।”
“তোর অর্গানাইজেশনেই তো দিতে পারিস।”
“ট্রেস করা সহজ হবে। আমি অনেক ঘুরপথে ভাবছিলাম। ধর আমি তোকে পাঠালাম দিল্লি। সেখানে আমার পরিচিত কেউ তার পরিচিত কারওর সংস্থায় তোকে পাঠাল। এমন একজনের কাছে, যারা বিভিন্ন জায়গায় কাজ করে। তোকে কোনও একটা ছোটো শহরে প্লেস করবে। সেখানে তোর নতুন সবকিছু হবে। ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট, ই-মেইল আই.ডি, ফেসবুক প্রোফাইল – আগের কোনও কিছুর সঙ্গে যোগাযোগ না রেখেই।”
“ফেসবুক আমার নেই, এবং নতুন করে করার কোনও ইচ্ছেও আমার নেই,” বললেন প্রদীপ।
“ফেসবুক তোর না থাকলেও তোর অর্গানাইজেশনের থাকতে পারে। অনেক ছোটো বড়ো কম্পানি আজকাল ফেসবুক বা হোয়াটস অ্যাপ জাতীয় সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং মাধ্যম নিজেদের বিজ্ঞাপনের জন্য ব্যবহার করে। সেটা খারাপ না, তবে ইনফরমেশন সহজে পাওয়া যায় – সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।”
প্রদীপের বেশ ভয় করতে শুরু করেছে। “তাহলে কি নাম-টাম বদলে নেওয়াই উচিত হবে?”
“হলে ভালো হত। কিন্তু সব আইডেন্টিটি, ভোটার, প্যান, আধার – এ সব বদলানো অনেক হাঙ্গামার ব্যাপার। দরকার হলে করতে হবে। পুলিশের আর সরকারী সাহায্য ছাড়া তো সম্ভব না। আজ তোকে পুলিশ কিছু না হোক, দু’জন লোক দিয়ে গেছে। কাল ওদের কাজের প্রেশার বাড়বে, চট করে লোক দুটোকে তুলে নিয়ে যাবে অন্য কোথাও। ব্যাস, তোর আর প্রোটেকশন থাকবে না।”
প্রদীপ বললেন, “কিন্তু তুই যেখানে পাঠাবি সেখানেও তো কেউ আমাকে প্রোটেক্ট করবে না।”
“সেখানে তো তোকে কেউ চিনবে না। ছোটো শহর, কিন্তু গ্রাম নয়। বা হয়ত ছোটো শহরও নয়। মস্ত শহর। চেন্নাই কিংবা ব্যাঙ্গালোর। বা দিল্লি কিংবা মুম্বাই। সেখানে তোকে কেউ চেনে না। অ্যাননিমিটি ইজ প্রোটেকশন।”
~আট~
“এবারে কী হবে?” ধরা গলায় জিজ্ঞেস করল তুলি।
“ভাবতে হবে,” চিন্তিত মুখে বলল প্রসূন। “সব কথা তো আপনাকে বলতে পারব না, কিন্তু একটা বিষয়ে আপনার সাহায্য চাই।”
জানতেও পারবে না তুলি, আবার সাহায্যও করতে হবে।
“ও,” গলাটাকে যতটা সম্ভব ঠাণ্ডা করে উত্তর দিল তুলি। “কী করতে হবে?”
ক্যাফে কফি ডে-তে বসে দুজনে। প্রসূন তুলিকে ফোন করে বলেছিল সাহায্য চাই। আলোচনা দরকার। তুলি কি আবার যাদবপুর থানায় আসবে? তুলি বলেছিল আপত্তি নেই, কিন্তু আবার যাদবপুর থানার অখাদ্য কফি না খাওয়ালেই হলো। সেখান থেকে প্রসূনের আহ্বান গোলপার্ক ক্যাফে কফি ডে অবধি গড়ায় – তুলি একটু দোনামনা করে রাজি হয়ে গিয়েছিল।
প্রসূন বলল, “দেখুন, ব্যাপারটা আপনাকে বুঝিয়ে দিই। পরশু দিন প্রদীপবাবুর বাড়িতে চুরিটা ধরা পড়েছে। সেদিনই দুপুরে প্রদীপবাবু সমস্ত বাড়িটা গুছিয়েছেন। কাল আমরা প্রদীপবাবুকে নিয়ে সারা বাড়িটা তন্নতন্ন করে খুঁজেছি। কিছুই পাইনি। মৌলিদেবী আপনার দিদি ছিলেন। আপনি ওনার চিন্তাভাবনার হদিস পাবেন চট করে। আপনি কি আমায় কিছুটা সময় দেবেন, ওই বাড়িতে গিয়ে খুঁজব আবার?”
গলাটা বেশিক্ষণ ঠাণ্ডা রাখা গেল না।
“কী খুঁজবেন?”
“ছবিগুলো।”
“কিন্তু সে তো বললেন সবসুদ্ধু চুরি হয়ে গিয়েছে। সে আর কী করে খুঁজে পাবেন?”
“আমার ধারণা – চুরি না-ও হয়ে থাকতে পারে। আমার লজিকটা একটু বোঝার চেষ্টা করুন। মৌলিদেবী ওই ছবিগুলো কাউকে দেখাননি, তাই তো? তাহলে এমনও তো হতে পারে, যে ছবিগুলো সুদ্ধু মেমরি কার্ডটা রেখেছেন অন্য কোথাও? অর্থাৎ, ছবিগুলো যদি দেখান’র মতো মনে না করে থাকেন, তাহলে যেখানে কেউ হাতে পেয়ে যেতে পারে, সেরকম কোথাও না-ও রাখতে পারেন?”
তুলি মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলল। যুক্তিটা মনে ধরেছে। বলল, “সেটা কোথায় হতে পারে?”
“সেটাই আপনার কাছে আমি জানতে চাইছি। প্রদীপবাবুর সঙ্গে কাল আমি আলমারির মধ্যে, বইয়ের তাকে – তন্নতন্ন করে খুঁজেছি। মৌলিদেবীর হ্যান্ডব্যাগ ঘেঁটে দেখেছি। কোনও চিহ্নই পাইনি।”
“আর আপনি মনে করছেন আমি পাব?”
“ওই যে বললাম, আপনি মৌলির চিন্তার ধারা আমাদের চেয়ে বেশি জানেন। আমার চেয়ে তো বটেই, আমার ধারণা প্রদীপবাবুর চেয়েও। এই চিন্তাগুলো অর্গানাইজড চিন্তা নয়। এগুলো রিফ্লেক্স অ্যাকশনের মতো। হয়ত আনকনশাস থেকে উঠে আসে।”
পুলিশের মুখে ফ্রয়েডের কথা শুনে হঠাৎ তুলির হাসি পেল। “আপনি সাইকোলজি পড়েছেন?”
একটু হেসে প্রসূন বলল, “ইতিহাসে বি.এ করেছি। সাইকোলজি সাবজেক্ট ছিল না, তবে পড়েছি কিছু। ট্রেনিং-এও পড়তে হয়েছে। একবার মাথায় আই.পি.এস হবার ভূত চেপেছিল, তখনও শিখেছিলাম কিছু।”
“আপনি আই.পি.এস না?” তুলি পুলিশের ব্যাপারে কিছুই জানে না।
এক হাত জিভ কেটে প্রসূন বলল, “না, ম্যা’ম। আমি স্টেট ক্যাডার। আই.পি.এস হওয়া আমার ভাগ্যে ছিল না... যাই হোক, আপনি কি কাল আসবেন? তাহলে সকালে গাড়ি পাঠিয়ে দেব আপনার বাড়িতে।”
“মৌলিদির ব্যাগ, আলমারি, এসব কি তালাবন্ধ থাকবে না?”
“থাকবে। আমি প্রদীপবাবুর কাছ থেকে চাবি চেয়ে রেখেছি। বলেছি আপনাকে নিয়ে যাব।”
তুলির বুকটা অকারণেই ধড়াস করে উঠল। বলল, “প্রদীপদা জানে, আপনি আমাকে নিয়ে যাবেন?”
প্রসূন একটু অবাক হয়ে বলল, “জানেন বইকি! আপনি রাজি হলে আমি আপনার বাবার সঙ্গে কথা বলব।”
ফলে তুলিকে কথাটা পাড়তে হলো না। রাতে খাওয়া শেষে রসগোল্লার প্লেট টেনে নিয়ে বাবা-ই বললেন, “তুই কাল সকালে প্রদীপের বাড়ি যাচ্ছিস?”
তুলি বলল, “হ্যাঁ। তোমাকে পুলিশ ফোন করেছিল?”
“করেছিল। আমি তো প্রথমে বুঝতেই পারছিলাম না কী বলছে – চুরি হয়েছে, কোথায় হয়েছে – এমন ভাবে বলছে যেন তুই যাবি চুরির মাল উদ্ধার করতে। পুলিশ অফিসারটা বেশ গাধা।”
“কে ফোন করেছিল?” ভয়ে ভয়ে জানতে চাইল তুলি। “আমার সঙ্গে যিনি দেখা করলেন তার নাম প্রসূন মজুমদার। আমার তো বোকা মনে হয়নি।”
“ওই প্রসূন মজুমদারই। আগের দিন অফিসে এসেছিল। তখন আমারও বেশ স্মার্ট ইয়ং অফিসার মনে হয়েছিল। আজ ফোনে এমন আমতা আমতা করতে লেগেছে... হ্যাঁ, ভালো কথা, আমি বাড়িতে গাড়ি পাঠাতে বারণ করেছি। কী দরকার? আবার দাদা দেখবে, চেঁচামেচি হবে... আমি তোকে অফিসে নিয়ে যাব সকালে, ওখানেই ও গাড়ি পাঠাবে – তুই গুরুসদয় রোড থেকে চলে যাস।”
বাধ্য মেয়ে তুলি ঘাড় হেলিয়ে টেবিল থেকে উঠতে যাবে – বাবার খেয়াল হলো। “তোর সঙ্গে দেখা হয়েছে? কোথায়?”
ক্যাফে কফি ডে। না, সেটা বলার সময় এখনও আসেনি।
“কলেজের সামনে।”
“হুঁ,” বলে খাওয়ায় মন দিলেন তুলির বাবা। “রসগোল্লাটা দারুণ কিন্তু,” প্লেটের দিকে তাকিয়ে বললেন, যেন কাউকেই না।
দরজা পর্যন্ত গিয়ে তুলি ঘুরে দাঁড়িয়ে হেসে বলল, “ও সব বলে আমাকে লোভ দেখাতে পারবে না, বাবা। আমার পেট আরও আড়াই ইঞ্চি কমবে, তবে মিষ্টি খাব আবার।”
“হুঁঃ, যত্তোসব রোগা হবার রোগ,” বললেন তুলির বাবা। “পি জি উডহাউস ডায়েটিং সম্বন্ধে কী বলেছেন জানিস?”
“জানি। বলেছেন গান্ধীজী যদি সবজি খাওয়া ছেড়ে বিফ-স্টেক খেতেন, ভারতে সিভিল ডিসওবিডিয়েনস হত না।” তুলির বাবা ঠিক ওই অংশটার কথা বলছিলেন না, তবে তুলি ততক্ষণে বেরিয়ে গেছে। ঘর থেকে চেঁচিয়ে বলল, “তাহলে ভারত স্বাধীনও হত না।”
~নয়~
পরদিন বাবার অফিসের সামনে থেকে জিপে ওঠার সময় একজন পুলিশের খটাশ করে মারা স্যালুটে বেশ ভালো লাগলেও, জিপে প্রসূন নেই দেখে বেশ হতাশই হলো তুলি। গাড়িটা একটা লজঝড়ে সুমো। বাইরে যদিও মোটা মোটা অক্ষরে ‘পুলিশ’ লেখা, কিন্তু রংটা সাদা, আর লাল আলো-টালো নেই। আগের জিপটার মতো রেডিও-ও নেই। সামনে বসা পুলিশটা অবশ্য সল্ট লেকে গাড়ি ঢুকতে না ঢুকতেই মোবাইল বের করে ‘স্যার’ সম্বোধন করে কাকে খবর দিয়ে দিল, আর ‘ক্রাইম রেকর্ডস হাউস’ লেখা একটা বাড়ির গাড়ি-বারান্দায় এসে দাঁড়ান-মাত্র প্রসূন জিপে উঠে পড়ল। এবার তুলির পাশেই। ড্রাইভারকে, “চলো,” বলে তুলির দিকে ফিরে বলল, “নমস্কার।”
তুলির কান কেন লাল? অস্পষ্ট স্বরে “নমস্কার” বলে বাইরে তাকিয়ে রইল।
দেখা গেল প্রসূনের অফিস থেকে প্রদীপদার ফ্ল্যাট বেশি দূরে না। শীত এখন তুঙ্গে, কিন্তু স্কুলগুলো এক এক করে খুলছে, কয়েকজন ইউনিফর্ম পরা বাচ্চা মায়েদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে আছে হাউসিঙের গেটের বাইরে, স্কুল বাসের অপেক্ষায়। খুব ছোটো বাচ্চারা সকালের রোদে খেলে বেড়াচ্ছে আয়া-মাসি, বা মায়েদের সঙ্গে। প্রসূন আর তুলিকে দেখে অবাক হয়ে ওরা খেলা ফেলে তাকিয়ে রইল। প্রসূন ইউনিফর্মে নেই আজও, কিন্তু জিপ, সঙ্গী, আর হাবভাবে পুলিশ বলে সহজেই ওকে চেনা গেছে নিশ্চয়ই।
অন্তত বিশ জোড়া চোখের দৃষ্টিতে ভাজা হতে হতে দুজনে লিফটে উঠল। প্রদীপদার ফ্ল্যাটের দরজায় একটা মস্তো তালা। এই তালা আগে থাকত না। একজন ইউনিফর্ম পরা পুলিশ দরজায় পাহারা দিচ্ছিল। প্রসূনকে সেলুট করে সরে দাঁড়াল। প্রসূন পকেট থেকে চাবি বের করে দরজা খুলল। হাট করে দরজাটা ঠেলে খুলে দিয়ে বলল, “আসুন।”
মৌলিদি খালি বাড়ি পছন্দ করত। অযথা জিনিসপত্র, আসবাবের বালাই নেই। কার্পেটটা গোটানো পড়ে আছে দেওয়ালের ধারে। অভ্যাসমতো বাইরের দরজার কাছে জুতো রাখার জায়গায় তুলি চটি খুলতে যাবে, প্রসূন বলল, “না, খুলবেন না। পরশু প্রচুর ভাঙা কাচ ছিল সারা বাড়িতে। কাল যদিও কাজের মেয়ে পরিষ্কার করেছে, তবু ও চলে যাবার পরেও আমরা কাচ পেয়েছি এখানে ওখানে। আজ এখনও পরিষ্কার করা হয়নি।”
পায়ে পায়ে ভিতরে এল তুলি। গলার কাছটা পাকিয়ে উঠছে। কত আনন্দ করে ফ্ল্যাট সাজিয়েছিল মৌলিদি। প্রথমে ফাঁকা ফ্ল্যাটের ছবি নিয়ে এঁকে এঁকে টেবিল চেয়ার সোফা। তারপর নিজে দাঁড়িয়ে থেকে এই সমস্ত ফার্নিচার – কাঠের মিস্ত্রী ডেকে বানানো।
“এই ঘরে ছিল কম্পিউটার,” ডেকে বলল প্রসূন।
“জানি,” বলে ও ঘরে না ঢুকে শোবার ঘরে ঢুকল তুলি। ভাগ্যিস প্রদীপদা নেই। দুই ফ্যামিলির মধ্যে যা চলছে, যদি প্রদীপদার মুখোমুখি হতে হত...
পিছন থেকে প্রসূন বলল, “ঘরগুলো এক এক করে খুঁজলে হত না?”
তুলি বলল, “এটাই মৌলিদির ঘর ছিল। প্রথমে কম্পিউটারটাও এই ঘরেই ছিল। ওই কোণে – টেবিলে। পরে প্রদীপদা বলে, না শোবার ঘর শুধু শোবার জন্যই থাকবে। তাই কম্পিউটার, বই-খাতা, সবই চলে যায় ওই স্টাডিতে।”
ঘরের মধ্যে একটা বড়ো ডবল বেড, একটা আরাম কেদারা – শোয়ার জন্য না, বসার জন্য – আর্ম চেয়ার। তুলি গিয়ে সেটাতে বসল। পাশে একটা সাদা কাঠের ফোলডিং টেবিল।
“মৌলিদি এই চেয়ারেই বসত সারা দিন। নইলে ওই খাটে। বই পড়ত এখানে বসে, লিখত এই টেবিলে। প্রদীপদা আসার আগে সব পাশের ঘরে সরিয়ে রাখত। প্রদীপদা মাটির মানুষ, কিন্তু মৌলিদি চাইত অপছন্দের কাজ না করতে।”
চেয়ার থেকে উঠে তুলি হেঁটে একবার ঘরের মধ্যে ঘুরল। আজকালকার ফ্ল্যাটবাড়ির শোবার ঘর। খুব বড়ো না। আলমারির সামনে দাঁড়াল। একবার হ্যান্ডেল ধরে টানল। তালা বন্ধ।
পকেটে হাত ঢুকিয়ে প্রসূন বলল, “চাবি আছে। খুলি?”
“না,” মাথা নাড়ল তুলি। “কাল আপনারা এ সব দেখেছেন। আবার হাতড়ে কী লাভ? চলুন স্টাডিতেই।”
স্টাডিতে বই ভর্তি। প্রদীপদা খুব পড়তে ভালোবাসে। বাংলা, ইংরেজি – দুরকম বইয়েরই সমাহার। প্রদীপদা তুলিকে পছন্দ করত ও অনেক বই পড়ে বলে। কত বই দিয়েছে ওকে। মৌলিও পড়ত – কিন্তু অত বেশি না। টিভি দেখত, আর ফোটোগ্রাফির ম্যাগাজিন রাখত। প্রদীপদা বেশ দামি দুটো ম্যাগাজিনের গ্রাহক করে দিয়েছিল মৌলিদিকে। তুলির চোখ গেল বইয়ের তাকের দিকে। ওই তো। এক্সপোজার, আর ব্লাইন্ড স্পট।
“ওই ম্যাগাজিনগুলোর মধ্যে খুঁজেছেন?”
“হ্যাঁ। ইয়ে, কী খুঁজছি আপনার কোনও আন্দাজ আছে?”
“আপনিই তো বললেন – মৌলিদির কোন একটা মেমরি কার্ড।”
“হ্যাঁ। এস.ডি কার্ড বলে।”
“জানি,” বলে তুলি গিয়ে ফোটোগ্রাফি জার্নালের তাকগুলোর সামনে দাঁড়াল। “সমস্যাটা কী জানেন? এ যদি প্রিন্টেড ছবি হত, যে কোনও বইয়ের মধ্যে রাখা যেত। কিন্তু এস.ডি কার্ড। এইটুকু একটা জিনিস – যেখানে খুশি রাখা যায়।”
“না,” আপত্তি জানাল প্রসূন। “যেখানে খুশি না। একটু সাবধানে রাখতেই হবে।”
“কিসের সাবধানতা? মোটা কাগজে, বা মোটা করে কাগজে মুড়ে রাখলেই চলবে – ড্রয়ারের কোণে, ব্যাগের ভিতরে, এমনকি ফ্রিজেও রাখা যায়।”
“ফ্রিজে?” অবাক হলো প্রসূন।
“রাখা যায় বলেছি। মৌলিদি রাখেনি। ফ্রিজে রাখতে গেলে একটা কৌটোয় ভরে রাখা সবচেয়ে ভালো।”
“জল লাগবে না?”
“জল কেন লাগবে? জিনিসটা ফ্রিজ থেকে বের করে আনলে বাইরের ময়শ্চার কন্ডেনস করে জমবে ওপরে। সে তো ফিনল্যান্ড থেকে কলকাতায় আসলেও হবে।”
দ্রুত পায়ে রান্নাঘরে গিয়ে ফ্রিজের দরজা খুলল প্রসূন। ফ্রিজ খালি। কিছু নেই। সুইচ বন্ধ। ভিতরে ভ্যাপসা গন্ধ। প্রসূন দেখেই বুঝল ওতে কৌটো জাতীয় কিছু নেই। কিছুই নেই।
“ফ্রিজে ছিল না। মৌলিদি রাখতই না ওখানে। একটা ওয়ালেট ছিল। ওই যে, জিপ ফাসনার লাগানো, ভেতরে প্লাস্টিকের পাউচ, অনেকগুলো... সে নিশ্চয়ই চুরি হয়েছে...” তুলি পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে। কথাটা বলতে বলতেই প্রসূনের ঘাড় হেলিয়ে ‘হ্যাঁ’ দেখে বলল, “ভালো কথা, মৌলিদির ছোটো স্যুটকেসটা কোথায়?”
“কী স্যুটকেস?”
“মৌলিদির একটা স্যুটকেস ছিল। ছোটো। নরম কাপড়ের তৈরি। বিদেশী। মিষ্টি নীল রঙের। বাবলুদা – মানে ওর দাদা এনে দিয়েছিল।”
“ও, হ্যাঁ, দেখেছি – শোবার ঘরে ছিল।”
“শোবার ঘরেই থাকত। মৌলিদির ড্রেসিং টেবিলের পাশে। এখন নেই।”
“চলুন তো?”
দুজনে গিয়ে ঢুকলেন মাস্টার বেডরুমে। আঙুল দিয়ে ড্রেসিং টেবিলের দিকে দেখিয়ে তুলি বলল, “ওখানটায় থাকত।”
ঘাড় নাড়ল প্রসূন। “রাইট। আমিও দেখেছি। কালও দেখেছি। সুতরাং চুরি হয়নি। ওটা চাই?”
“ওটা মৌলিদির ভীষণ প্রিয় ছিল।”
“কিন্তু তেমন কিছু ছিল না ওতে। কয়েকটা সফট টয়, বাচ্চাদের টেডি বেয়ার জাতীয়...”
“জানি,” অসহিষ্ণু সুরে বাধা দিয়ে তুলি বলল, “কোথায় ওটা?”
“কাল প্রদীপবাবু কোথায় রাখলেন, তা তো আমি...” বলে পকেট থেকে মোবাইল বের করে ফোন করতে গিয়েও থমকে গেল প্রসূন। আজ সকাল থেকেই প্রদীপের আগের মোবাইল অফ্‌ থাকার কথা। প্রসূনের কাছে নতুন নম্বর নেই। অতনু সিংহকে ফোন করতে হবে। তুলির সামনে সেটা করা কি উচিত হবে? কিন্তু স্যুটকেসটা যাবে কোথায়? কাল প্রদীপ সেনগুপ্ত সেটা হাতে নিয়ে বেরোননি। তাহলে এখানেই আছে। স্যুটকেস কোথায়?
“আসুন তো,” উত্তেজিত প্রসূন হঠাৎ তুলির হাত ধরে টেনে নিয়ে গেল দ্বিতীয় বেডরুমটায়। দেওয়াল আলমারির ওপরে একসারি কাঠের পাল্লা দেওয়া লফট আলমারি। এখানেই কি...
“দাঁড়ান,” বলে খাবার ঘর থেকে একটা চেয়ার এনে জুতো খুলে তার ওপর চড়ল প্রসূন। তিন জোড়া পাল্লা। দুটো দরজার মাঝখানে দাঁড়িয়ে বাঁ হাত দিয়ে টেনে একটা খুলল। একই সঙ্গে ডানহাত দিয়ে পাশেরটা। খাটের ওপারে দাঁড়িয়ে তুলি। ওর হাতে এখনও প্রসূনের ছোঁয়া লেগে রয়েছে। বলল, “ওই তো, প্রথমটাতেই।”
হাত বাড়িয়ে বাক্সটা বের করল প্রসূন। তুলি এগিয়ে এসে ওর হাত থেকে নিয়ে নিল, প্রসূন নেমে এল পাশে।
তুলি খাটের ওপর বাক্সটা রেখে তার ঢাকনা খুলল। বাক্সভর্তি পাঁচটা মাঝারি সাইজের সফট টয়। একটা টেডি বেয়ার, একটা কাঠবিড়ালি, একটা জিরাফ, একটা স্লথ আর একটা লম্বা লেজওয়ালা লীমার। বাবলুদা বলেছিল, রিং টেলড লীমার। বলেছিল, বাঙালের মতো লেমুর বলবি না। এটার ওপর লোভ ছিল তুলির। কিন্তু তুলিকে না দিয়ে মৌলিকে দিয়েছিল এটা – যেবারে তুলির জন্য একটা সিংহ নিয়ে এসেছিল। আর একটা ছোটো জিরাফ। ঠিক এই জিরাফটার মতো।
সব খালি করে বাক্সটা ঝেড়ে দেখল তুলি। কিছুই নেই কোথাও। ঢাকনায় একটা পকেট। সেটা খুলে হাত ঢুকিয়ে দেখল। কিছুই নেই।
একে একে সফট টয়গুলো তুলে রাখতে রাখতে একবার ভাবল, লীমারটা নিয়ে যাবে? তারপরে ভাবল, না। উচিত হবে না। অনুমতির ব্যাপার আছে। প্রদীপদা এখানে নেই। ওর-ও বউয়ের জিনিসের প্রতি টান থাকতে পারে।
বাক্সের ঢাকনাটা বন্ধ করতে করতেই প্রসূনের ফোন বাজল। প্রসূন একবার তাকিয়ে নিয়ে উত্তর দিল, “বলুন মিঃ সিনহা...” তারপর বলল, “ও, আপনি? বলুন... হ্যাঁ। আছি, আপনার বাড়িতেই... না, কিছুই পাইনি এখনও... আচ্ছা, বলুন... বেশ, তো, না, না। আমার আপত্তি কিসের?... না। সেটা আমার বলা-টা ঠিক হবে না। আমি দিচ্ছি, আপনি বলুন।”
ফোনটা তুলির দিকে বাড়িয়ে বলল, “প্রদীপবাবু। আপনার সঙ্গে কথা বলতে চান।”
প্রদীপদাকে প্রসূন ‘মিঃ সিনহা’ বলল কেন? তুলি হাতে নিয়ে ফোনের দিকে তাকিয়ে বুঝল প্রদীপদা ওঁর উকিলের ফোন থেকে ফোন করেছে। কেন?
“হ্যালো,” ধরা গলায় বলল তুলি। কী বলবে প্রদীপদাকে? কী বলবে প্রদীপদা?
“তুলি,” প্রদীপদার গলাও কি ওর গলার মতোই ধরা? “আমি আজ কলকাতা ছেড়ে চলে যাচ্ছি – মানে, যেতে হচ্ছে। কবে ফিরব, কোনও দিন ফিরতে পারব কি না জানি না। তোমার সঙ্গে যে পুলিশ অফিসার রয়েছেন, উনি তোমাকে ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলবেন। শোনো, তোমাকে একটা কথা বলি – ও বাড়িতে মৌলির যা কিছু আছে, তার মধ্যে তোমার যদি কিছু নিতে ইচ্ছে করে – শাড়ি, জামা, বইপত্র – তুমি নিয়ে যেও।”
তুলির চোখ দিয়ে জল বেরিয়ে এল। এক্ষুনি ওর ইচ্ছে করছিল লীমারটা নিয়ে যেতে। এখন আর কিছু ইচ্ছে করছে না। কথা বলতে গিয়ে অব্যক্ত একটা শব্দ হলো।
“কেঁদো না,” প্রদীপদার গলা পেল আবার। “আজই নিতে হবে না। আমি আমার বন্ধু অতনুকে বলব চাবির একটা সেট তোমাদের কাছে পৌঁছে দিতে – পুলিশের কাজ শেষ হয়ে গেলে। তুমি পরে সুবিধামতো মৌলির পারসোনাল জিনিসগুলোর দায়িত্ব নিও। দিয়ে দিও, বা নিও – যদি চাও। পড়ে থেকে নষ্ট হতে দিও না, কেমন?”
তুলি উত্তর দিতে পারছিল না। কোনও রকমে “আচ্ছা,” বলে ফোনটা বন্ধ করে প্রসূনকে দিয়ে দিল। তারপরে বাক্সটা বন্ধ করতে করতে বলল, “এটা আমি নিয়ে যাব।” গলা কান্নায় ধরে এল। ঠিক করে বেরোল না।
“হ্যাঁ,” বলল প্রসূন। “প্রদীপবাবু আমাকে বলছিলেন আপনি এ বাড়ি থেকে যা খুশি নিয়ে যেতে পারেন।”
তুলির হাত কাঁপছে। প্রসূন নিচু হয়ে বাক্সটার ঢাকনা লাগিয়ে বলল, “আপনি কি একটু বিশ্রাম করবেন? আমাদের কাজ কিন্তু শেষ হয়নি।”
তুলি ঠোঁট চেপে কান্না আটকানোর চেষ্টা করছিল। মাথা নেড়ে ‘না’ বলল। প্রসূন বাক্সটা হাতে নিয়ে দরজার দিকে যেতে গিয়ে থেমে গেল।
“এর মধ্যে আলগা কিছু একটা রয়েছে। নড়বড় করল।”
তুলি থমকে গেল। “এক্ষুনি তো দেখলাম। কিছু তো পেলাম না।”
প্রসূনের ভুরু কোঁচকান। বাক্সটা আবার খাটে রেখে, খুলে, সফট টয়গুলো বিছানায় নামিয়ে ভিতরটা দেখল। খালি। ঢাকনা বন্ধ করে আবার তুলে ঝাঁকাল। এবার তুলিও শুনতে পেল। ভিতরে কিছু একটা নড়বড় করছে। ছোট্ট কিছু একটা। প্রসূন আবার ঢাকনার পকেটের চেনটা খুলল। কিছুই নেই। তা-ও তুলির মতো হাত ঢুকিয়ে একবার অনুভব করল। খালি।
“কিন্তু ডেফিনিটলি কিছু একটা রয়েছে। এটা জিপ্‌ ফাস্‌নারের চেনের ঝুনঝুন নয়।”
তুলি বলল, “আর কোনও পকেট রয়েছে কোথাও?”
প্রসূন বলল, “থাকলে ভিতরে আছে? দেখলাম না তো? বলে আবার ঢাকনাটা খুলে প্রায় চেঁচিয়ে উঠল। “এই দেখুন, এক্কেবারে ধার ঘেঁষে।”
দুজনে ঝুঁকে পড়ল। প্রসূন ঠিক বলেছে। ঢাকনার ধার ঘেঁষে ভিতর দিকে একটা চেন রয়েছে। তিন দিকে চেন – অর্থাৎ খুললে ঢাকনার নিচটা একেবারে বইয়ের পাতার মতো খুলে ভিতরে ঝুলে পড়বে।
প্রসূন সাবধানে চেনটা খুলল। ভিতরে প্রায় কিছুই নেই। প্রায়। মোটা কাগজে মোড়া একটা ছোট্ট প্যাকেট। ইঞ্চিখানেকও লম্বা নয়। চওড়া আরও কম।
“এটাই,” রুদ্ধশ্বাস উত্তেজনায় বলল তুলি।
প্রসূন কাগজের মোড়কটা খুলে একটা এস.ডি কার্ড বের করে আনল। ক্যামেরায় ব্যবহার হবার মতোই বটে।
“চলুন,” তুলি উঠে দাঁড়াল।
প্রসূন অবাক হয়ে বলল, “কোথায়?”
“ওই ঘরে – কম্পিউটার ওখানেই।”
প্রসূন মাথা নেড়ে বলল, “না। দুটো ব্যাপার আছে। প্রথমত, ও ঘরে কম্পিউটার নেই। খাঁচা আছে। ল্যাপটপ, এক্সটার্নাল হার্ড ড্রাইভগুলো, পেন ড্রাইভ – সবার সঙ্গে ডেস্কটপের হার্ড ড্রাইভও কেউ নিয়ে গেছে।”
“দুটো হার্ড ড্রাইভ ছিল ওর ভিতরে।”
“তা তো প্রদীপবাবু বলেননি?”
তুলি বলল, “প্রদীপদা কম্পিউটার সামান্যই বোঝে। চালাতে জানে নিজের যতটুকু দরকার ততটুকুই। তার বেশি হলেই শেষ। ওই – ই-মেইল, মাইক্রোসফট ওয়ার্ড, পাওয়ার পয়েন্ট, এক্সেল, আর টুকটাক এটা-সেটা। চলুন তো, দেখি।”
বেশিক্ষণ লাগল না। এক ঝলক দেখেই তুলি বলল, “হুঁ। দুটোই গেছে। আমার ল্যাপটপটা আনা উচিত ছিল।” অসহিষ্ণুভাবে প্রসূনের দিকে তাকিয়ে বলল, “আপনার অফিসে কম্পিউটারে দেখা যায় না?”
অস্বস্তিভরে খানিকক্ষণ তুলির দিকে তাকিয়ে থেকে প্রসূন বলল, “ইয়ে, অফিসেই দেখতে হবে। কিন্তু, মানে, দ্বিতীয় ব্যাপারটা হচ্ছে – সেটা তো আপনি দেখতে পাবেন না। কারণ এটা ইনভেস্টিগেশনের ইমপর্ট্যান্ট ক্লু হতে পারে। সেটা...” তুলির মুখের দিকে তাকিয়ে চুপ করে গেল প্রসূন।
“তার মানে? আমি আপনার পুলিশ-কুকুর হয়ে এসেছি এখানে?”
তুলির মুখ লাল, নাকের পাটা ফুলে উঠেছে রাগে।
“না, প্লিজ, ভুল বুঝবেন না। ব্যাপারটা সেরকম নয়।”
“ব্যাপারটা কী, আমি ঠিকই বুঝেছি, প্রসূনবাবু। আমি এখন যাব। আপনি আপনার গাড়িতে কি আমাকে নামিয়ে দেবেন, নাকি এস.ডি কার্ডটা পেয়ে গেছেন বলে আমাকে ট্যাক্সি করে যেতে হবে?”
“না, ট্যাক্সি করতে হবে না,” মিষ্টি গলায় বলল প্রসূন। “আমি ড্রাইভারকে বলছি, আপনাকে সুমোর পিছনে বেঁধে নিয়ে যাবে।”
তুলি এমন একটা অদ্ভুত কথায় থতমত খেয়ে চুপ করে গেল।
“আপনার ট্যাক্সিভাড়া বেঁচে যাবে।”
দৃশ্যটা ভেবে তুলির হঠাৎ এমনই হাসি পেল, যে রাগ ঠেলে হাসি প্রায় বেরিয়ে এল। মুখ ঘুরিয়ে নিল, পাছে প্রসূন দেখতে পায়। প্রসূন বলল, “রাগের ফাঁক দিয়ে যদি ব্যাপারটা দেখেন, তাহলে বলি, যে আমার কোনও কথায় আপনার কাল যদি মনে হয়ে থাকে যে আমি আপনাকে এই ছবিগুলো দেখাব বলেছিলাম, তাহলে আমি দুঃখিত এবং ক্ষমাপ্রার্থী। সে কথা বলার এক্তিয়ার আমার নেই – ছিলও না।”
তুলি এতক্ষণে সেটা বুঝেছে, কিন্তু অভিমানটা যায়নি এখনও।
“এবং আপনি কিন্তু এটাও ভেবে দেখবেন, যে আপনি যদি জানতে পারেন এতে কী আছে, তাতে আপনার একটা সাংঘাতিক বিপদ হতে পারে। ইন ফ্যাক্ট, আমাদের এখান থেকে খালি হাতে বেরোন উচিত। যেন আমরা কিছুই খুঁজে পাইনি। হতাশ-ভাবে।”
হঠাৎ ভীষণ ভয় করল তুলির। বড়ো বড়ো চোখে তাকিয়ে রইল প্রসূনের দিকে।
প্রসূন ওর হাত থেকে বাক্সটা নিয়ে সফট টয়গুলো ভরে বন্ধ করে রেখে দিল ঘরের কোণে। বলল, “পরে এসে নিয়ে যাব, কেমন?”
~দশ~
“ওই তুলি মেয়েটি এই ছবিগুলো দেখেছে?”
সি.আই.ডির অফিসে ইনসপেক্টর নকুল সেন কম্পিউটারের মনিটরের ওপর ঝুঁকে পড়েছেন। প্রসূন একটু দূরে। ও আগেই অনেকক্ষণ ধরে দেখেছে।
“না, স্যার।”
“বেটার নট। দেখলে বিপদ বাড়ত।”
হন্তদন্ত হয়ে সাব-ইনসপেক্টর সুব্রত গাঙ্গুলি ঢুকলেন।
“পাওয়া গিয়েছে?”
“গিয়েছে,” বললেন ইনসপেক্টর সেন। “কিন্তু কী পাওয়া গিয়েছে, আর সে বিষয়ে আমাদের কী করা উচিত, সে সম্বন্ধে আমাদের এক্ষুনি একটা ডিসিশন নিতে হবে। দেখো।”
নকুল সেন সরে বসলেন। গাঙ্গুলি চেয়ার টেনে কম্পিউটারের সামনে বসলেন। প্রসূন আবার প্রথম ছবিটা দেখাল।
“এটা কী?”
প্রসূন বুঝিয়ে দিল। “যেদিন মৌলিদেবী একা একা শহরে ঘুরতে গিয়েছিলেন, সেদিন নানা ছবি তুলে এনেছিলেন। একশোটারও বেশি ছবি। বেশিরভাগ ছবিই মালে শহরের লোক্যাল মার্কেট বা বাজারের ছবি। তার মধ্যে শেষ তেইশটা ছবিতেই এই দৃশ্য।”
সুব্রত গাঙ্গুলির হোমওয়ার্ক করার বিশেষ অভ্যাস নেই। বললেন, “এরা কারা? এটা কোথায়?”
“এটা মালে লোক্যাল মার্কেটেরই কোনও রাস্তার ছবি বলে ধরে নেওয়া যেতে পারে। আমি ইন্টারনেটে ছবি দেখলাম, লোক্যাল মার্কেটের রাস্তাঘাটের ছবি সব এরকমই।”
“রাস্তার ওপার থেকে একটা দোকানের ভিতরের ছবি? কাচের ভিতর দিয়ে কি?”
প্রসূন বলল, “হ্যাঁ, স্যার। রেস্টুর‍্যান্টের ভিতরকার ছবি। কাচের ওপর অল্প ছায়া আছে – কিন্তু ভিতরটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।”
“আর এই লোকগুলো? ওরা কারা?” বলে সুব্রত গাঙ্গুলি আরও কাছে ঝুঁকে পড়লেন। প্রসূন ছবিটাকে বড়ো করল। হাই রেজোলিউশন ছবি। মুখগুলো স্ক্রিনে আরও বড়ো হয়ে উঠল।
“মাই গড!” বললেন গাঙ্গুলি। “এটা তো ওই খুনিদুটো – লিটন আর পুঁটে – ওরা মালদ্বীপে কী করছিল?”
“সেটাও আমাদেরই বের করতে হবে,” বললেন নকুল সেন।
“আর এই অন্য লোকগুলো কে?” জানতে চাইলেন সুব্রত গাঙ্গুলি।
প্রসূন জবাব দেবার আগেই ইনস্পেক্টর সেন সামনে এগিয়ে এসে একটু বিরক্তভাবে বললেন, “এদেরও তোমার চেনা উচিত ছিল, সুব্রত। এই রোগা লোকটা সনত সরখেল। ও ছিল লিটন আর পুঁটের ল’ইয়ার। যাকে এখন আমরা ফেরার মনে করছি। আর এই অন্যজন, টি-শার্ট, গোঁফ, গোলগাল – ইনিই হলেন পুলস্ত্য দত্তগুপ্ত, ওরফে বাবলু, অর্থাৎ মৌলি সেনগুপ্তর আপন দাদা।”
“মাই গড,” বলে চেয়ারে হেলান দিয়ে বিস্ফারিত চোখে চেয়ে রইলেন সুব্রত গাঙ্গুলি।
খানিকক্ষণ ব্যাপারটা গাঙ্গুলিকে হজম করতে দিয়ে ইনস্পেক্টর সেন বললেন, “প্রসূন, বাকি ছবিগুলো দেখাও।”
প্রসূন পর পর ছবিগুলো দেখিয়ে যেতে লাগল। হঠাৎ গাঙ্গুলি থামিয়ে বললেন, “কী দিচ্ছে, পুঁটেকে?”
উত্তর না দিয়ে ছবিটা বড়ো করে দিল প্রসূন। পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে, বাবলু পুঁটের হাতে যা তুলে দিচ্ছে, সেটা নোটের তাড়া যদি না-ও হয়, তাহলে নিশ্চয়ই ওই আকারে কাটা কাগজের বান্ডিল।
আরও কয়েকটা ছবি দেখা গেল। পুঁটেকে টাকা দেওয়া শেষ করে বাবলু লিটনকেও নোটের তাড়া দিচ্ছে, তখন পুঁটে টাকা গোনার চেষ্টা করছে। একটা ছবিতে দেখে গেল সরখেল উকিল পুঁটেকে হাত নেড়ে কিছু বলছে। তারপর সবাই কথা বলছে, ইত্যাদি।
কার্ডে সবসুদ্ধ একশো ষোলোটা ছবি, তার শেষ তেইশটা ছবিতে এই একই দৃশ্য, এবং এই ছবিগুলোর পরে কার্ডে আর ছবি নেই। অর্থাৎ, এই ছবিগুলো তুলেই, আরও প্রায় চার হাজার ন’শো ছবি না-তুলেই মৌলি ক্যামেরা থেকে কার্ড বের করে নিয়েছিলেন।
“এ-এ-এ কেস হাতে রাখবেন না,” উত্তেজিত গাঙ্গুলি হাত নাড়তে শুরু করলেন যেন হাতপাখা নাড়ছেন। “এ আমাদের কেস না। এটা সি.বি.আই... কিংবা এনফোরসমেন্ট। ইন্টার্ন্যাশনাল সিনারিও। ইন্টারপোলের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে।”
“কী হয়েছিল বলে তোমার ধারণা?” জানতে চাইলেন সেন।
“কী হয়েছিল তো পরিষ্কার। মেয়েটা দাদাকে দেখতে পেয়ে ছবি নিয়েছে। নিশ্চয়ই ব্যাপারটা সন্দেহজনক লেগেছে, তাই একগাদা ছবি নিয়েছে। তারপরে দাদাকে চ্যালেন্‌জ করেছে, ব্যাপারটা কী? দাদা দেখেছে এই উইটনেস রাখা ঠিক না – তাই মেরে দিয়েছে।”
“কিন্তু ওই ছবিতে দাদা এমন কী করছিল যেখানে বোনের উপস্থিতি একেবারে মার্ডারে পরিণত হলো?”
“ওই যে, লিটন আর পুঁটে?” হাত নেড়ে উত্তেজিত সুব্রত গাঙ্গুলি বললেন। “ওরকম মার্ডারারদের সঙ্গে দাদাকে দেখল যে?”
ইনস্পেক্টর সেন বললেন, “সুব্রত, লিটন আর পুঁটে মৌলিকে ছাড়া আর কাউকে খুন করেছে বলে জানো? তাহলে দু-তিনজন লোকের সঙ্গে দাদা যদি রেস্টুরেন্টে বসে খাচ্ছে – বোন দেখেই ফেলে, তাহলে কেন খুন করতে যাবে?”
“সেটাই তো প্রশ্ন নকুলদা, জাস্ট ভাবুন... কী এমন সাংঘাতিক জিনিস দেখেছে বোন? নিশ্চয়ই মারাত্মক কিছু।”
সেন ফিরলেন প্রসূনের দিকে। “তোমার থিওরি কী?”
প্রসূন বলল, “আমারও ওরকমই থিওরি, স্যার। বোন দাদাকে বলেছে কী দেখেছে – হয়ত বলেছে, কী করছিল না বললে মা-বাবাকে বলে দেবে। দাদার নিশ্চয়ই এমন কিছু ব্যাপার যার জন্য বোনকেও স্যাক্রিফাইস করতে হেজিটেট করেনি।”
অধৈর্য হয়ে মাথা নাড়লেন ইনস্পেক্টর সেন। “তোমরা হাইন্ডসাইটে ভাবছ। তোমরা এখন জানো, যে লিটন আর পুঁটে মৌলিকে মেরেছে। তোমরা জানো যে সনত সরখেল সম্ভবত লিটন পুঁটেকে মেরে ফেরার হয়েছে। কিন্তু সে সব ঘটনার আগে এই ছবিগুলো কি সেরকম ইনক্রিমিনেটিং কিছু? মোটেই নয়। এই ছবি দিয়ে কাউকে ভয় দেখান বা ব্ল্যাকমেল করা কঠিন। আরও কিছু লাগবে। এক যদি না মৌলি অলরেডি জানে যে পুলস্ত্যর কোনও কোশ্চেনেব্ল ডিলিংস, বা ব্যবসা রয়েছে। তাহলে মানতে হবে গোটা ফ্যামিলিই ইনভলভড...”
প্রসূনের হঠাৎ মনে হলো – গোটা ফ্যামিলি হলে তুলিও...? বলল, “তাহলে স্যার?”
নকুল সেন বললেন, “এমনও তো হতে পারে, যে বোন দাদাকে চ্যালেন্‌জ্‌ করেনি? কিন্তু দাদা বুঝেছিল ছবিগুলো বোন তুলেছে। পুলস্ত্য দত্তগুপ্ত জানে ও যা করছে সেটা ইনক্রিমিনেটিং হতে পারে। তাই বোনের হাতে কোনও ছবিই রাখতে চায়নি। লিটন আর পুঁটেকে পাঠিয়েছিল শুধু ছবিগুলো উদ্ধার করতে। হয়ত বলেছিল দাদা চেয়েছে বলতে, হয়ত বলেছিল ভয় দেখিয়ে নিয়ে নিতে... সেই অপারেশনটা ফেল করে কারণ লিটন আর পুঁটে মাথা ঠিক রাখতে না পেরে মৌলিকে মেরে দেয়। হয়ত মৌলি ছবিগুলো দেখাতে, বা দিতে, বা কোথায় আছে বলতে রিফিউজ করেছিল, কে জানে, হয়ত পুলিশে ফোন করতে গিয়েছিল?”
প্রসূন বলল, “সেটা হতে পারে, স্যার। তুলি বলছিল, মৌলি নাকি হানিমুন থেকে ফিরে এসে খুব ভালো ছিল। একেবারে উচ্ছ্বসিত। হয়ত ব্যাপারটা কতটা সিরিয়াস সেটা বোঝেনি, শুধু আউট অফ দ্য অর্ডিনারি মনে করে আলাদা করে রেখেছিল। হয়ত ভেবেছিল, দাদাকে সামনা-সামনি জিজ্ঞেস করবে, কিন্তু সুযোগ পায়নি।”
সুব্রত গাঙ্গুলী বললেন, “কিন্তু এ ছবি তো ভিকটিম সামনা-সামনি তোলেননি। লুকিয়ে তুলেছেন, দূর থেকে, তাই না? দেখুন, রেস্টুরেন্টের সামনের দেওয়াল, সামনের কাচ দেখেই বোঝা যাচ্ছে...”
ইনস্পেক্টর সেন বললেন, “এক্স্যাক্টলি। দূর থেকে তোলা ছবি সন্দেহ নেই। আর যাদের ছবি উঠছে তারাও কেউ ক্যামেরা সম্বন্ধে অ্যাওয়েয়ার বোধহয় নয়... শুধু... প্রসূন, ছবিগুলো একবার আবার দেখাও তো...”
প্রসূন এক এক করে ছবিগুলো আবার দেখাতে থাকল। হঠাৎ একটা ছবির দিকে আঙুল দেখিয়ে সেন বললেন, “এই ছবিটাতে পুলস্ত্যর মুখটা বড়ো করো দেখি?”
বড়ো করা হলো।
সেন বললেন, “দেখো, ভালো করে। প্রায় ক্যামেরার দিকেই তাকিয়ে রয়েছে না?”
সবাইকে মানতে হলো। বাবলুর মুখটা পুরো ক্যামেরার দিকে ফিরে নেই, কিন্তু চোখদুটো প্রায় সোজা-ই ক্যামেরার দিকে
সেন বললেন, “এর পরেও দেখো, আর বেশি ছবি নেই, কিন্তু প্রায় সবকটাতেই বাবলু ক্যামেরার দিকেই তাকিয়ে – কিন্তু আড়চোখে।”
সেটাও মানতে হলো।
ইনস্পেক্টর সেন বললেন, “তাহলে আরও একটা পরিস্থিতির কথা ভাবতে হবে। বোন যদি দাদাকে রেস্টুরেন্টে দেখে দূর থেকে ছবি তুলে বাড়ি ফিরে সে ছবি লুকিয়ে রাখে, তাহলে সে নিশ্চয়ই ভাবেনি যে দাদা খুব ভালো কোনও কাজে লিপ্ত? তাহলে তো ‘আরে, দাদা, তুই এখানে কী করছিস?’ বলে টেবিলে গিয়ে বসত, তাই না?”
সুব্রত গাঙ্গুলি জানতে চাইলেন, “কিন্তু এবার করণীয় কী?”
“চলো, একবার ডি.এস.পি-র সঙ্গে আলোচনা করি।”
তিনজনে ডি.এস.পি-র ঘরের দিকে রওয়ানা হলেন। প্রসূনের হঠাৎ মনে হলো, ডি.এস.পি যদি বলেন, ‘প্রসূন, তুমি মালডিভ্‌স্‌ গিয়ে পুলস্ত্যকে অ্যারেস্ট করে আনো...’ তাহলে বেশ মজা-ই হয়।
~এগারো~
‘সহায়’-এর অফিসে অ্যাকাউন্টেন্ট সমীর ছুটে এল অতনুর ঘরের দরজায়। হাতে মোবাইল ফোন।
“স্যার, ওই সেই নম্বরটা থেকে মিসড-কল দিয়েছে, যেটা থেকে কল আসলে আপনি জানাতে বলেছেন।”
অতনু মুখ তুলে বললেন, “ঠিক আছে, তুমি কল লিস্ট থেকে নম্বরটা ডিলিট করে দাও।”
সমীর চলে গেল। ঘরের অন্য প্রান্ত থেকে বনি মুচকি হেসে বললেন, “বেশ স্পাই-থ্রিলার টাইপ চালাচ্ছ!”
অতনু হেসে পকেট থেকে একটা ছোটো বাক্স থেকে একটা সিম-কার্ড বের করে নিজের ফোনে ঢোকালেন। বনি আবার বললেন, “একটা ডুয়াল সিম ফোন কিনেই নাও না? ওই খুদে সিম-কার্ড ঢোকানো, বের করা... মিছিমিছি ঝকমারি।”
অতনু মন দিয়ে সিম-কার্ড বদল করতে করতে বললেন, “দেখি কতদিন এইভাবে চালাতে হয়, তারপরে কিনব। নইলে মিছিমিছি ফোনটা বাতিল করতে হবে। পার্ফেক্টলি ওয়ার্কিং একটা ফোন বাতিল করতে ইচ্ছে করে না, জানো?”
সিম-কার্ড ঢুকিয়ে ফোন অন করে অতনু ফোন করলেন।
“অতনু?” ফোন বাজতে না বাজতেই প্রদীপের গলা পেলেন।
“বল।”
“আমাকে কোথায় পাঠালি, বাবা?”
“কেন? ভালো লাগছে না? সবে তো কাল পৌঁছলি – এর মধ্যেই মন কেমন করছে?”
“তা নয় – বরং নৌকো চালান’ শিখতে হবে বলে খুব এক্সাইটিং লাগছিল। কলেজ ছাড়ার পরে তো আর রোইং করিনি। আর কেরালার এই ডোঙাগুলো খুব ইন্টারেস্টিং।”
“রোইং-এর গল্প করতে ফোন করেছিস?”
“না। একটা সমস্যা হয়েছে।”
“কী?”
“এখানে, আমাদের অফিসের লাগোয়া দেওয়ালেই একটা কেরালা আয়ুর্বেদিক মাসাজ সেন্টার আছে।”
“জানি। আমি তোদের অফিসে গিয়েছি বছর দুয়েক আগে। তখন দেখেছি। প্রায় ফাইভ-স্টার রিসর্ট একটা।”
“হ্যাঁ। গোটা অ্যালেপ্পিই ওরকম সেন্টারে ভর্তি। তবে এটার স্পেশালিটি হলো – চলছিল না ভালো। এসেই গল্প শুনতে হল, ভালো চলে না, ম্যানেজমেন্ট ভালো না, তাই বিক্রি হয়ে গেছে, ইত্যাদি...”
“তো?” অতনু কিছুই বুঝতে পারছেন না প্রদীপ কী বলতে চাইছে।
“আমাকে বলল, চলুন স্যার, নতুন মালিকের নাম-টাম লেগে গেছে। আমি বললাম, তোমরা এত ইন্টারেস্টেড যখন, তখন চলো... গেলাম দেখতে নতুন মালিকের নাম লেখা সাইনবোর্ড”
“বেশ?”
“নতুন মালিক হলো পলটেল কম্পানি।”
খানিকক্ষণ পরে প্রদীপের, “হ্যালো, অতনু, আছিস?” শুনে অতনুর খেয়াল হলো, কোনও উত্তর দেননি। প্রদীপের শালার ভালো নাম পুলস্ত্য, সেটা থেকে অ্যামেরিকান স্টাইলে ছোটো করে পল, আর ওর হোটেল কম্পানির নাম পলটেল, সেটা অতনু জানেন।
বললেন, “তাতে কী হয়েছে? তোর শালা হোটেল ব্যবসায়ী। আলাপ্পুজাতে হোটেল কিনেছে। তো?”
“ঘুরতে ফিরতে এখানে ওখানে আমার সঙ্গে দেখা হোক, আর আমাকে গালাগালি করুক?”
“প্রদীপ,” শান্ত গলায় বললেন অতনু। “অতগুলো হোটেলের মালিক, সারা দুনিয়া ঘুরে বেড়ায়, কবে তোর ওখানে আসবে...”
“কালকে,” বাধা দিয়ে বললেন প্রদীপ।
“কীঃ? জানলি কী করে?”
“আমাদের একজন স্টাফ ওখানকার দারোয়ানের ভাইপো না কীযেন। ও রাত্তিরে ওখানে শুতে যায়। ওকে ওর কাকা বলেছে, এখন কিছুদিন তোমার অফিসে বলে অফিসের ঘরেই শোও। কাল নতুন মালিক আসছে, যদি অ্যালাউ না করে – দু দিন পরে চলে যাবে, তখন আবার এসো। সেইজন্যই এত কথা আমাকে জানতে হল... ছেলেটা আমার কাছে পার্মিশন নিতে এসেছিল...”
“প্রদীপ, টেনশন করিস না। ওটা একটা ফাইভ স্টার রিসর্ট। ওদের মেন-গেট তোদের উলটো দিকে। তোর অফিস ব্যাকওয়াটারের দিকে মুখ করা, ওদের মেন গেট রাস্তার ওপর। বাবলু থোড়াই তোদের অফিস দেখতে আসবে। ও কোচি কিংবা তিরুঅনন্তপুরম এয়ারপোর্ট থেকে গাড়ি করে সোজা রিসর্টে ঢুকবে, দু-দিন থেকে চলে যাবে।”
“আমার ভালো ঠেকছে না রে, দুনিয়ার এত জায়গা থাকতে এখানেই আমাকেও আসতে হলো, ওকে-ও?”
“ও তোর কী করবে রে! শোন, খুব অস্বস্তি হলে এক কাজ কর, ফিল্ড ওয়ার্ক নিয়ে ভিলেজ সেন্টারটায় চলে যা।”
প্রদীপ একটুচুপ করে রইলেন, তারপরে বললেন, “ঠিক আছে। আমি দেখি, কী করতে পারি।”
অতনু বুঝলেন, সদ্য কাজে যোগ দেওয়া একজনের জন্য পরামর্শটা যুক্তিযুক্ত হয়নি। বললেন, “শোন, আমি দেখছি। টমাস এখন ইন্ডিয়াতে নেই। এখন তো একটা বড়ো ডিসিশন নেওয়া যায় না, তাই না?”
অসহিষ্ণুভাবে, “ঠিক আছে, আমি আগামী ক’দিন অফিস থেকে না-বেরোনরই চেষ্টা করব,” বলে প্রদীপ ফোন কেটে দিলেন।
চিন্তিতভাবে ফোনের সিম-কার্ড আবার বদল করতে করতে অতনু বনিকে দু-কথায় ব্যাপারটা বুঝিয়ে দিলেন। আবার ল্যাপটপের দিকে তাকিয়েছেন কি তাকাননি, ফোন বাজল। অপরিচিত ল্যান্ডনম্বর।
“হ্যালো,” বললেন অতনু।
“আমি ডি.এস.পি-র অফিস থেকে প্রসূন মজুমদার বলছি। আপনার সঙ্গে দেখা করা জরুরী দরকার। আপনি কি ঘণ্টাখানেকের মধ্যে আসতে পারবেন?”
“সল্ট লেকে?”
“হ্যাঁ।”
ঘড়ি দেখলেন অতনু। “ট্র্যাফিকে আটকে না গেলে পারব।”
“আচ্ছা। ডি.এস.পি স্যার একটু বেরোবেন তারপরে, কিন্তু আমি থাকব।”
সব শুনে বনি বললেন, “আবার কী হলো ?”
দরজা দিয়ে বেরোতে বেরোতে অতনু বললেন, “জানি না। দেখি...”
কপাল ভালো, বাইপাস ফাঁকা। একঘণ্টা দূরে থাক, পঁয়তাল্লিশ মিনিটে পৌঁছে গেলেন।
অতনুকে ডি.এস.পি-র অফিসে নিয়ে গেল প্রসূন। দু কথায় পরিচয় পর্ব সমাধা করে ডি.এস.পি সোজা আসল কথায় চলে গেলেন।
“প্রদীপ সেনগুপ্ত কোথায়?”
এখানে তর্ক চলবে না বুঝে অতনু বললেন, “কেরালায়। অ্যালেপ্পিতে আমার এক বন্ধুর প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে দিয়েছি?”
“ইজ হি সেফ?”
“কেন বলুন তো?” ভুরু কুঁচকে বললেন অতনু।
“প্রসূন, ছবিগুলো দেখাও।”
“মৌলির সেই মিসিং ছবি? পাওয়া গিয়েছে?” উত্তেজনায় চেয়ারের সামনে এগিয়ে এলেন অতনু।
“হ্যাঁ। একবার দেখুন, তাহলেই বুঝবেন কেন বলছি।”
কয়েকটা ছবি দেখার পরেই অতনু বললেন, “এক মিনিট, এক্সকিউজ মি।” বলে মোবাইল থেকে ফোন করলেন।
“শোন... হ্যাঁ, আমিই... না, ডাজ্‌ন্‌ট্‌ ম্যাটার। আমি ভুল করিনি। ইচ্ছে করেই আমার মোবাইল থেকে ফোন করেছি। শোন, তুই এক্ষুনি ওখান থেকে বেরো। কাউকে কিছু বলবি না। শুধু বলবি, তোর জরুরি কাজ পড়েছে, তুই যদি রাত্তিরে না ফিরিস, তাহলে ওই দারোয়ানের ভাইপো যেন রাতে অফিস বন্ধ করে শুয়ে পড়ে। তুই বেরিয়ে সোজা যাবি কোচি। সেখানে পৌঁছবার আগেই আমি তোর টিকিট করে রাখব। ফার্স্ট অ্যাভেলেব্ল ফ্লাইটে হয় ব্যাঙ্গালোর নয় চেন্নাই। সেখান থেকে কলকাতা। যেখানেই যাবি, কলকাতার আগে এয়ারপোর্ট থেকে বেরোবি না। আমি টিকিট তোকে ইমেইল করছি। কলকাতায় আমি তোকে এয়ারপোর্টে মিট করব। বুঝলি?”
“টিকিট কি আমার নামেই কাটবি, না জটায়ু-র নামে?” অতনু প্রদীপের এই গলার সুর চেনেন। এ হলো, ‘আমাকে নিয়ে তোরা কী আরম্ভ করেছিস, কিছু বলছিস না, কিন্তু ক্যারমের ঘুঁটির মতো একবার-এখানে-একবার-ওখানে – ইয়ার্কি নাকি...’ সুর।
বললেন, “তুই এলেই সবটা জানতে পারবি। ফোনে বোঝাতে গেলে অনেক সময় লাগবে। তুই বেরো ওখান থেকে। বাবলুর প্রতিবেশী হয়ে থাকতে হবে না।”
লাইন কেটে উৎসুক পুলিশ অফিসারদের বললেন, “বাবলু, ওরফে পুলস্ত্য, ওরফে পল – প্রদীপের অফিসের পাশের ফাইভ-স্টার রিসর্টটা কিনেছে। আগামী কাল সকালেই বোধহয় ওখানে পৌঁছবে। তাই প্রদীপকে ডেকে নিলাম।”
চারজন অফিসার পরস্পর মুখ তাকাতাকি করলেন। ডি.এস.পি বললেন, “ভালো করেছেন। আপনারা এখানেই বসুন। আমি এস.পি-র সঙ্গে কথা বলে নেক্সট প্ল্যান অফ অ্যাকশন ঠিক করছি। মিঃ সিনহা, আপনি এখান থেকেই প্রদীপ সেনগুপ্তর টিকিট করে নিন। প্রসূন, হেল্প হিম। ফ্লাইট ডিটেল অনুযায়ী প্রদীপ সেনগুপ্তর জন্য বডিগার্ডের ব্যবস্থা করবে। আপনি বডিগার্ডদের সঙ্গেই এয়ারপোর্ট যাবেন, মিঃ সিনহা।”
~বারো~
“টমাসকে বলে দিলাম।”
মোবাইল বন্ধ করতে করতে এসে টেবিলে বসলেন অতনু। বললেন, “ওর অফিসটাই বেস হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন। যে ছেলেটা রাতে থাকবে, ওর নাম বিজয়ন। অফিস অ্যাসিস্ট্যান্ট। ও নাকি বেশ চালাক চতুর। ওরই কাকা না জ্যাঠা কে – ওই রিসর্টের দারোয়ান। সুতরাং হি উইল গিভ ইউ কারেক্ট ইনসাইড ইনফরমেশন অলসো।”
কলকাতা বিমানবন্দরের একটা অফিসে ওরা পাঁচ জন কফির কাপ নিয়ে বসে। ইনসপেক্টর সেন, সাব ইনসপেক্টর গাঙ্গুলি, আর অ্যাসিস্ট্যান্ট সাব ইনসপেক্টর মজুমদার। সঙ্গে অতনু আর প্রদীপ। প্রদীপ সন্ধের ফ্লাইটে পৌঁছেছেন। পুলিশ তিনজন রাতের ফ্লাইটে চেন্নাই যাচ্ছেন। সেখান থেকে কাল ভোরে কোচি। সকাল সাতটার মধ্যে কোচি পৌঁছে ওঁরা স্থানীয় পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করবেন। আর এদিকে বিজয়ন, প্রদীপের অফিস অ্যাসিস্ট্যান্ট, প্রয়োজন-মতো বাবলুর নতুন রিসর্টের খবর এনে দেবে ওঁদের।
“এই বিজয়নকে বেশি কিছু বলার দরকার নেই,” বললেন সেন। “ও যদি ওর কাকাকে সব কথা বলে দেয়, তাহলে সব জানাজানি হয়ে যেতে পারে।”
আশ্বাস দিয়ে অতনু বললেন, “ও কিছুই জানে না। ওকে টমাস বলে রেখেছে যে ও প্রদীপকে অন্য অফিসে পাঠিয়েছে, তার জায়গায় তিনজন আসবেন – তাঁরা যা বলবেন, বিজয়ন যেন তা-ই করে।”
সেন বললেন, “চমৎকার।”
গাঙ্গুলি একটু কিন্তু কিন্তু করে বললেন, “সি.বি.আই-কে জানান’ হয়েছে কি না...”
এক ধমক দিয়ে সেন বললেন, “থামো তো তোমার সি.বি.আই! কোথায় গিয়ে চট করে একটা অ্যারেস্ট সেরে ফিরে আসবে, তা নয়, দুনিয়ার লোক নিয়ে যাব নাকি?”
করুণ চোখে চেয়ে গাঙ্গুলি বললেন, “স্যার, অত সহজ হবে না। ও ব্যাটা ড্রাগ লর্ড। সঙ্গে নিশ্চয়ই আর্মড গার্ড থাকবে। বিদেশ বিভূঁই জায়গা – আমরাই না বেকায়দায় পড়ে যাই।”
আরও রেগে গেলেন সেন। “কী বেকায়দায় পড়বে শুনি? আমরা কি খালি হাতে যাচ্ছি নাকি? লোক্যাল ফোর্স থাকবে। আর শুনলেই তো, এস.পি বললেন, আই.জি-কে বলে সি.বি.আই-কে ইনফর্ম করবেন। কিন্তু সি.বি.আই-কে বললেই তো ওরা আসবে না। ওরা তো আর আমাদের দারোয়ান নয়।”
অতনু বললেন, “এবারে আমরা আসি। প্রদীপও খুব টায়ার্ড। সারাদিন খুব ধকল গেছে।”
দু-জনে বিদায় নিয়ে বেরোলেন। প্রদীপ জানতে চাইলেন, “বাবলুদা কি ড্রাগ ডিলার নাকি?”
মাথা নাড়লেন অতনু। “কেউ জানে না। আন্দাজ করা হচ্ছে। হি মাইট বি এনিথিং।”
এয়ারপোর্টে ঘন ঘন ঘড়ি দেখতে দেখতে তিন পুলিশ অফিসার তিনরকম ভঙ্গী ধারণ করেছেন। সেন হাতের খবরের কাগজে মন দিয়েছেন, গাঙ্গুলি চেয়ারে এলিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছেন, প্রসূন খানিকক্ষণ পায়চারি করে হঠাৎ কী মনে হওয়াতে নিজের ল্যাপটপ খুলে বসেছে।
মিনিট তিন-চারেক পরেই মুখ তুলে ইনসপেক্টরক সেনের দিকে তাকিয়ে বলল, “স্যার।”
সেন আবার ঘড়ির দিকে তাকালেন। ফ্লাইটের সময় হয়ে এসেছে, কিন্তু চেন্নাই থেকে যে ফ্লাইটটা আসবে, সেটা এখনও আসেনি। দেরি করলে অসুবিধে নেই – চেন্নাইতে ওদের অনেকক্ষণ অপেক্ষা করতেই হবে। ক্যানসেল না হলেই হলো।
“স্যার?” প্রসূন আবার ডাকল। চোখ ল্যাপটপের দিকেই।
“হুঁ,” অন্যমনস্ক সেন উত্তর দিলেন।
“স্যার, ড্রাগ নয়।”
“কী?”
“ড্রাগ নয়, স্যার। বাবলু ইজ নট ইনভলভড ইন ড্রাগ স্মাগলিং।”
“তুমি কি ইন্টারনেট থেকে ইনফরমেশন পেলে?”
“না, স্যার। আমি বাবলু সম্বন্ধে যে ফাইলটা তৈরি করেছি, তাতেই আছে। আমি খেয়াল করিনি। আমরা আপাতত সাতটা হোটেল কম্পানির নাম পেয়েছি, যারা বাবলুর কম্পানির সঙ্গে নিয়মিত কাজ করে। কোনটা কোন দেশে লোকেটেড, তা-ও আমি লিখে রেখেছি – কিন্তু খেয়াল করিনি।”
সেন ততক্ষণে উঠে এসেছেন প্রসূনের পিছনে। ঝুঁকে পড়েছেন স্ক্রিনের দিকে।
“এই যে, স্যার,” প্রসূন আঙুল দিয়ে দেখাল। “দুটো থাইল্যান্ডে, একটা সাউথ অ্যাফ্রিকায়, তিনটে মিডল-ইস্টে – বাহরেইন, দুবাই, ওমান। আর শেষটা ফিলিপিনস-এ। ড্রাগ নয় বোধহয়।”
“মাই গড,” ফিসফিস করে বললেন সেন। “সি.বি.আই-কে এই সন্দেহের কথাটা এক্ষুনি জানাতে হবে।”
পকেট থেকে ফোন বের করে আই.জি-র নম্বর ডায়াল করলেন।
তখনই চেন্নাই থেকে ফ্লাইট এসে পৌঁছনর খবর পাওয়া গেল পাবলিক অ্যাড্রেস সিস্টেমে।
ধড়ফড় করে ঘুম থেকে উঠে সুব্রত গাঙ্গুলি বললেন, “কী হলো ? কী হলো ?”
এত স্মার্ট দেখতে একটা লোক কী করে লালমোহনবাবুর মতো আচরণ করতে পারে, প্রসূন ভেবে পায় না।
~তেরো~
পরদিন সকালে কোচি বিমানবন্দরে নেমে গাঙ্গুলি বললেন, “বাবা, এটা সকাল সাড়ে সাতটা? এখনও তো সূর্য ওঠেইনি ভালো করে।”
সেন বললেন, “কলকাতার থেকে কোচি অনেক পশ্চিমে। ভোর হয় দেরিতে। সন্ধেও নামে দেরি করে। দিন অনেক লম্বা লাগে।”
দু’জন সিনিয়রের সামনে প্রসূনের মুখ বন্ধ। নিঃশব্দে চলেছে।
অপেক্ষমান এয়ারপোর্ট পুলিশ ওদের নিয়ে গেল কনট্রোল রুমে।
“ডোন্ট ওরি,” বললেন ও.সি। “বাবলু, পুলস্ত্য, পল – যে নামেই আসুক, আমরা আপনাদের জানিয়ে দেব। ছবিও তো রয়েছে। অন্য কোনও নামে আসলেও আমরা চিনে নেব। আমি তিরুঅনন্তপুরমেও জানিয়ে রাখছি। ছবির কপিও পাঠিয়ে দেব।”
“ভীষণ এফিশিয়েন্ট,” জীপে করে তিরবেগে অ্যালেপ্পির দিকে যেতে যেতে বললেন গাঙ্গুলি।
“কোচি পুলিশ তো?” সামনে থেকে ঘাড় ঘুরিয়ে বললেন সেন। সাংঘাতিক। ওরাই ভারতের প্রথম পুলিশ ফোর্স যারা ব্ল্যাকবেরি ফোন ইউজ করে নিজেদের মধ্যে এনক্রিপ্টেড কমিউনিকেশনের জন্য, জান?”
প্রসূন জানত। কালকেই জেনেছে, কোচি পুলিশ সম্বন্ধে পড়তে গিয়ে। কিন্তু সুব্রত গাঙ্গুলি, বোঝাই গেল, জানতেন তো না-ই, বরং এখনও কিছু বুঝতে পারলেন না। ভাগ্যিস ইনসপেক্টর এসেছেন, নইলে এমন একজন এস.আই-এর সঙ্গে প্রসূন তো জলে পড়ে যেত।
অ্যালেপ্পি – আলাপ্পুজা – পৌঁছে গাড়ি প্রথমে গেল এস.পি-র অফিসে। আলেপ্পুজার পুলিশ সুপার, তিন জন ডি.এস.পি – সকলেই উপস্থিত।
“আমরা ওই এন.জি.ও-র ছেলেটার সঙ্গে কনস্ট্যান্ট টাচ-এ আছি। ওই বিজয়ন,” বললেন ডি.এস.পি ক্রাইম ডিটারেন্ট। “খুব করিতকর্মা ছেলে। ওর কাকাকে কিছু জানাবে না। তবে খবর রাখবে। ইওর ম্যান হ্যাজ নট কাম ইয়েট।”
এস.পি বললেন, “ও এলেই আমাদের ফোর্স নিয়ে জায়গাটা ঘিরে ফেলব। তারপরে আপনারা অ্যারেস্ট করবেন। সেটাও আমরা করতে পারলেই আনন্দিত হতাম, কিন্তু এখানে তো ও কোনও অন্যায় কাজ করেনি।”
ইনসপেক্টর সেন বললেন, “এর মধ্যে সি.বি.আই কেসটা নিয়ে নিলে অবশ্য আমাদের কিছু করতে হবে না...”
এস.পি সুব্রমনিয়ম বললেন, “সি.বি.আই এখনও কিছু জানায়নি। ওরা কিছু না জানালে আপনারাই নিয়ে যান। বোনের খুন-টা তো রয়েছেই।”
বড়ো সাহেবদের সঙ্গে মিটিঙের শেষে তিনজনকে নিয়ে যাওয়া হলো পুলিশ ব্যারাকে। সুব্রত গাঙ্গুলি বললেন, “বাবা, আমি তো ভাবলাম ওখান থেকেই বলবে বাড়ি যাও। খাওয়া-দাওয়া কিছু পাওয়া যাবে? অবশ্য খাবই বা কী, এই পোড়া দেশে।”
গাঙ্গুলির আশঙ্কা ফলে গেল। ব্যারাকের ব্রেকফাস্ট – ইডলি আর সম্বর ডাল ওঁর মুখে রুচল না। এমনকি কফিটাও ভালো লাগল না। “বড্ড কড়া, বুঝলে প্রসূন। এরকম রান্নাবান্নার ছিরি বলেই এরা জীবনে কিছু করতে পারে না।”
প্রসূনের বিরক্ত লাগতে শুরু করেছে। এমনিই একটা টেনশন রয়েছে – বাবলুকে অ্যারেস্ট তো করবেন, কিন্তু ওর বিরুদ্ধেও কি যথেষ্ট এভিডেনস আছে? এই কেসটাও যদি না দাঁড়ায়? ইন্টার্ন্যাশনাল অ্যাঙ্গেল যদি বেরোয়, কেস সি.বি.আই নিয়ে নিলে... তার মধ্যে সুব্রত গাঙ্গুলির বাঙালিয়ানা মোটেই সইছিল না।
সেন কফি খেতে খেতে অন্যমনস্কভাবে মোবাইল নাড়াচাড়া করছিলেন। এমন সময় ফোনটা বাজল। সেন কথা বলে, “থ্যাংক ইউ,” বলে লাইন কেটে বললেন, “এয়ারপোর্ট কন্ট্রোল রুমের ও.সি। পুলস্ত্য বম্বে পৌঁছেছে সবে। এখন টার্মিনাল বদল করতে হবে। এখানে তিনটে পঁচিশে ল্যান্ড করবে। আমরা খানিকটা সময় পেলাম। একটু রেস্ট নিতে পারব।”
“বাবা! বাঁচা গেল,” বলে যে তৎপরতায় গাঙ্গুলি চেয়ার ছেড়ে উঠলেন, তাতে মনে হলো না যে উনি প্রায় সারা রাতই চেন্নাই এয়ারপোর্টে আরাম কেদারায় গা এলিয়ে নাক ডাকিয়ে ঘুমিয়েছেন।
ব্যারাকের একটা অপেক্ষাকৃত খালি ডরমিটরিতে তিনজনের থাকার ব্যবস্থা হয়েছে। প্রসূন স্যুটকেস খুলে ইউনিফর্মটা বের করে খাটের ওপর বালিশের পাশে রাখল। যত বেশিক্ষণ বাক্সে থাকবে, ততই আরও কুঁচকে যাবে। গাঙ্গুলি ততক্ষণে নিজের বাক্স থেকে পাজামা বের করে কোমরে তোয়ালে জড়িয়ে প্যান্ট খুলতে ব্যস্ত, আর ইনসপেক্টর সেন জিজ্ঞেস করেছেন, “এখানে সিগারেট খাওয়া যাবে? কাল দুপুর থেকে তো সারাক্ষণ নো-স্মোকিং জোন-এর মধ্যেই রয়েছি।” এমন সময় দরজায় এসে একজন আর্দালি ভীষণ ভারি ইংরেজিতে জানাল যে ডি.এস.পি ক্রাইম ডিটারেন্ট মিঃ ম্যাথিউ ডেকে পাঠিয়েছেন।
“লে হালুয়া,” বললেন সাব ইনসপেক্টর গাঙ্গুলি।
আবার জামা জুতো পরে চললেন তিনজনে। এর মধ্যে আর্দালি দূতকে ‘স্মোকিং ওকে?’ জিজ্ঞেস করে ‘নো, নো’ জেনে নকুল সেন বিমর্ষ হয়ে পড়েছেন। গাঙ্গুলি খুবই বিরক্ত। গজগজ করতে করতে যাচ্ছেন, “এই সব বড়ো সাহেবদের নিয়ে যত ঝামেলা। কেন রে বাবা, এই মোবাইলের যুগে ডেকে পাঠাস কেন? ফোন করতে তোর কী হয়েছে?” প্রসূনেরও ক্লান্তি লাগছিল। তিনজনের মধ্যে সবচেয়ে কম-বয়সী, এবং পোস্টেও সর্বকনিষ্ঠ বলে ওকেই সবচেয়ে বেশি ছোটাছুটি করতে হয়েছে সারা রাত। তার ওপর বিছানাটা দেখে লোভও হয়েছিল। এখন ক্লান্তি পেয়ে বসেছে।
ডি.এস.পি ওদের বসতে বলে বললেন, “সি.বি.আই হ্যাজ টেকন ওভার ইওর কেস।” আরও বললেন, এ.সি.বি (তিরুঅনন্তপুরম) আলাপ্পুজার দিকে রওয়ানা হয়ে পড়েছেন। এলেন বলে, সুতরাং প্রসূনরা যেন এখানেই অপেক্ষা করে।
বাইরের ওয়েটিং রুমে বসে গাঙ্গুলি ফেটে পড়লেন। “এটা কী ধরণের ইয়ার্কি? সি.বি.আই হলেই মাথা কিনে নেয়। কী হত আমারা যদি একটু রেস্ট নিতাম?”
প্রসূন আস্তে আস্তে নকুল সেনকে বলল, “স্যার, আমাদের কি প্লেন ড্রেসে এ.সি.বি-র সঙ্গে দেখা করা উচিত হবে?
সেন বললেন, “কতক্ষণ লাগবে পৌঁছতে? যদি এসে পড়েন?
প্রসূন বলল, “না স্যার। দেড়শো কিলোমিটার পথ। আড়াই ঘণ্টা তো লাগবেই। সকাল ছটায়ই কি আর রওয়ানা দিয়েছেন? এখনও সাড়ে আটটা হয়নি। আপনি চট করে যান, ইউনিফর্ম পরে আসুন। তারপরে সুব্রত স্যার আর আমি যাব।”
“ভালো বলেছ,” বলে সেন বেরিয়ে গেলেন।
গাঙ্গুলি বললেন, “পাঠিয়ে তো দিলে। আর এখনই যদি এসে পড়েন?”
প্রসূন কী বলবে বুঝল না। একটু হাসল কেবল। পেটের মধ্যে ধড়ফড় করছে টেনশনে আর উত্তেজনায়। এ.সি.বি নিজে আসছেন? তার মানে পরিস্থিতি খুব জটিল?
সেন কেন, সুব্রত গাঙ্গুলি আর প্রসূনও ইউনিফর্ম পরে ফিরে আসার পরেও কেউ ডাকতে এল না ওদের। সাড়ে নটা নাগাদ তিন কাপ কফি নিয়ে যে এল সে কিছুই জানে না। গাঙ্গুলি আবার মাথা এলিয়ে ঘুমোচ্ছেন, সেন সেদিনের হিন্দু-টা প্রায় শেষ করে ফেলেছেন, এমন সময় ডাক এল।
এ.সি.বি বলবিন্দর সিং।
“হুইচ ওয়ান অফ ইউ ইজ প্রাসূন মাজুমদার?”
বুকটা ধক্‌ করে উঠল প্রসূনের। কী হবে?
“আই অ্যাম, স্যার,” প্রথমবার শুকনো গলায় ফ্যাসফ্যাসে কণ্ঠস্বর বেরোল বলে প্রসূনকে আবার বলতে হলো কথাগুলো।
ভদ্রলোক উঠে দাঁড়িয়ে ডান হাত বাড়িয়ে দিলেন। “ইউ হ্যাভ ডান আ গ্রেট জব, ম্যান। তোমার মতো আরও ইয়ংস্টার চাই। আরও সাকসেসফুল হও কামনা করি।”
প্রসূন চট করে হাতের তেলোটা প্যান্টে মুছে নিয়ে করমর্দন করল সিং-এর সঙ্গে।
“ইনসপেক্টর সিং?” এবার জানতে চাইলেন বলবিন্দর সিং।
“নট সিং, স্যার,” বললেন নকুল সেন। “সেন। নকুল সেন।”
“আই সি,” সামনের কাগজে কী একটা কেটে আবার লিখলেন কিছু। ইংরেজিতে বললেন, “সিচুয়েশনটা এ রকম – সি.বি.আই কেস টেক-ওভার করেছে, কিন্তু এখনই ওয়ারেন্ট নেই। আবার ফসকে যায় যেটাও চাই না। লোকটা কখন কোন দেশে থাকে সেটা ট্র্যাক করতে করতেই আমরা গলদ্ঘর্ম হয়ে যাব। আমরা ইন্টারপোলকে কন্ট্যাক্ট করেছি। ওরা লোক্যাল পুলিশকে যোগাযোগ করেছে। ওই সরখেল লোকটাকে যদি পাওয়া যায়, তাহলে অনেকটাই সুবিধা হবে। সরখেল যেদিন ফেরারি হয়, তার তিন দিন পরে দিল্লি থেকে ফ্লাই করে ব্যাংকক। ওর পাসপোর্টের নাম হলো সুমিত সিনহা রয়। তাই আপনারা হদিশ পাননি। ওটা ওর অফিশিয়াল নেম। এফিডেভিট করে বদলানো। তার পরে অবশ্য সনত সরখেল নাম ইউজ করা বে-আইনি... তবে থাক সে কথা। ব্যাংকক থেকে হি রিচড্‌ মালডিভ্‌স্‌ আরও চার দিন পরে। যাই হোক, আপাতত একটাই ইশ্যু – এই বাবলু লোকটার অ্যারেস্ট। সেটা করার অবস্থায় একমাত্র আপনারাই আছেন। কারণ আমাদের ওয়ারেন্ট পাবার মতো এভিডেনস জোগাড় করতে হবে। লোক্যাল ফোর্স আপনাদের হেল্প করবে। আমরা প্ল্যান করছি রিসর্টে ঢোকার মিনিট পনেরো পরে ওকে ধরব। রিসর্ট এখন বন্ধ – সুতরাং রিসর্টে যত লোক আছে, সবাইকে তুলে নিয়ে পরে হিসেব করলেও চলবে কে ইনভলভড, আর কে নয়। গেস্ট হ্যারাস্‌ড্‌ হবার ভয় নেই। দ্য অপারেশন উইল বি লেড বাই ইউ, ইনসপেক্টর সেন। কারণ আপনারই সবচেয়ে বেশি অধিকার। এখানকার লোক্যাল ফোর্সের ইনসপেক্টর কে. ডি. সাজি আপনার সঙ্গে যাবেন – হি নোজ দ্য প্লেস ভেরি ওয়েল। একসময় ওখানে কাজও করেছেন নাকি। এনি কোশ্চেন?”
~চোদ্দো~
“ব্যাস?” হতাশ হয়ে তুলি কফির কাপ নামিয়ে রাখল। “তারপর?”
“তারপর আর কী?” প্রসূন কফিতে চুমুক দিল। “এখন ওর বিচার হবে। ওর এগেনস্টে যা এভিডেন্‌স্‌, তাতে ওর পালান’ মুশকিল হবে। তার ওপর বিভিন্ন দেশের পুলিশ অপেক্ষা করছে, ইন্টারপোল অপেক্ষা করছে – নেপাল, থাইল্যান্ড – সবাই মুখিয়ে রয়েছে। সবখানেই শ্রীঘর অপেক্ষমান।”
“ধ্যাৎ, আমি মোটেই তা বলিনি। অ্যারেস্টের গল্প বলুন। কী ভাবে গেলেন, কী করলেন? বাবলুদাকে কোথায় পেলেন?”
“ও,” প্রসূন কফি শেষ করে কাপ নামিয়ে রুদ্ধশ্বাস সাসপেনসভরা গলায় বলতে শুরু করল। “তখন রাত্রি ঠিক বারোটা উনিশ। বাইশ জন লোক্যাল পুলিশ পা টিপে টিপে বাইরের রাস্তা ধরে গিয়ে রিসর্টটা ঘিরে ফেলল। আরও আট জন সাঁতারু পুলিশ ব্যাকওয়াটার দিয়ে গিয়ে সাঁতার কেটে পিছন থেকে উঠল। তারপরে আমি তিরবেগে ছুটে গিয়ে সোজা বাবলুর শোবার ঘরে ঢুকলাম। বাবলু গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন! আমার দু-হাতে দুটো পিস্তল, এক হাতে টর্চ...”
ঘরসুদ্ধ লোক হেসে উঠল। তুলি লজ্জায় লাল হয়ে বলল, “আমি কি বাচ্চা, যে আমাকে রূপকথার গপ্পো শোনাচ্ছেন? অ্যারেস্টটা কী ভাবে হলো জিজ্ঞেস করা কি খুব ভুল হলো?”
অতনুর বাড়িতে ডিনার। তুলি, তার বাবা-মা, অতনু, বনি, প্রদীপ আর প্রসূন উপস্থিত। প্রধানত তুলির বাবার অনুরোধেই এই সমাগম।
প্রসূন বলল, “আসলে সেটা সেরকম বলার মতো কিছু হয়নি। বাবলুর প্লেন কোচিতে ল্যান্ড করল চারটে দশে। ও এসে পৌঁছল সাড়ে পাঁচটা নাগাদ। ফলে আমরা প্ল্যান-মাফিক ঢুকলাম পাঁচটা চল্লিশ থেকে পঁয়তাল্লিশের মধ্যে। ওখানকার পুলিশের সময়জ্ঞান সাংঘাতিক। তার ওপর বলবিন্দর সিং ওভার-সী করছেন। ওই যেমন বললাম, আমরা সবসুদ্ধ বাইশজন গাড়ি নিয়ে সামনের গেট ব্লক করলাম। উঁচু পাঁচিল এবং পেছনের দিক ছাড়া বেরোন’র রাস্তা নেই বলে ব্যাকওয়াটারে পুলিশের একটা লঞ্চ ছিল – সাঁতারু পুলিশ ছিল তাতে, তবে তাদের জলে নামতে হয়নি। আমরা সদলবলে গেট খুলিয়ে রিসর্টের দারোয়ানকে – ওই, আপনার বিজয়নের কাকা – ধরে নিয়ে গেলাম অফিসে। সেখানে নতুন কেনা রিসর্টের অফিসারদের নিয়ে বাবলু মিটিং করছিল। আমরা ঢুকলাম, মিঃ সেন বললেন, “ইউ আর আন্ডার অ্যারেস্ট, ইত্যাদি,” বাবলু বোকার মতো তাকিয়ে রইল, আমরা সবকজনকে ধরলাম, দু’ঘণ্টার মধ্যে হেডকোয়ার্টারে। ততক্ষণে মিঃ সিং খবর পেয়েছেন যে মালডিভ্‌সে ইন্টারপোল সনত সরখেলকেও অ্যারেস্ট করেছে। সি.বি.আই-এর কেস তৈরি হয়ে গেল আমাদের ইনিশিয়াল জিজ্ঞাসাবাদ শেষ হতে না হতেই। তারপরেই সি.বি.আই হ্যান্ড-ওভার নিয়ে নিল। অ্যালেপ্পির রিসর্টে যারা আগে থেকে ছিল, তারাও অ্যারেস্টেড – হয়ত তাদের কোনও ইনভলভমেন্ট-ই নেই, কিন্তু সে তো প্রমাণসাপেক্ষ... আমরা গিয়ে সব কাজটা করা সত্ত্বেও খালি হাতেই ফিরে এলাম। ব্যাস, এই হলো গল্প।”
তুলির বাবা একটু অসহিষ্ণুভাবে বললেন, “তা তো বুঝলাম। মৌলি বাবলুর ছবি তুলল গুণ্ডাদের সঙ্গে, বাবলু মৌলিকে খুন করল – মানে লিটন আর পুঁটেকে দিয়ে করালো, সেই খুনের দায় প্রদীপের ওপরে চাপান’র চেষ্টা করল, না পেরে লিটন আর পুঁটেকে খুন করালো সনত সরখেলকে দিয়ে। এ সব আপনারা বুঝতে পেরে ওকে অ্যারেস্ট করলেন। কিন্তু বাবলু হঠাৎ মৌলিকে খুন করতে গেল কেন? কী ছিল ওই ছবিতে?”
প্রসূন আশা করছিল এই কথাগুলো ওকে বলতে হবে না। আস্তে আস্তে বলল, “বাবলুর একটা অনেকদিনের কারবার ছিল – সম্ভবত ও যখন কলেজ ছেড়ে প্রথম সৌদি আরবে চাকরি শুরু করে, তখন থেকেই। ক্রমে হি বিকেম আ বিগ প্লেয়ার। ওর মালডিভ্‌স্‌ আর ওয়েস্ট ইন্ডিজের হোটেল ব্যবসা ওর গোটা ব্যবসার মাত্র দশ, বা বারো পার্সেন্ট। শুধু লোক দেখান’। এর পরের ইনফরমেশন কিন্তু পুরোটা নেই। খানিকটা জানা গেছে সনত সরখেলের কাছ থেকে, বাকিটা কনজেকচার।”
প্রসূন একটু জল খেল। সবাই উদগ্রীব হয়ে তাকিয়ে। প্রসূন বলে চলল, “বাবলু আমাদের কোনও কাজের কথা বলেননি। বলতে চেয়েছেন লিটন, পুঁটে, সনত সরখেল - এদের কাউকে উনি চেনেন না। আমরা ওঁকে সবে বলতে গিয়েছিলাম, যে ছবিগুলো আমাদের কাছে আছে, কিন্তু তার আগেই সি.বি.আই হ্যান্ড-ওভার নিয়ে নিল। তারপরেও বাবলু মুখ খোলেননি বলেই জানি। মৌলি বাবলুর ব্যাপারে আগে কিছু জানতেন কি না তা-ও জানা যায়নি। কিন্তু মালডিভ্‌সে হানিমুনের সময়ে মৌলি একদিন সকালে একটা রেস্টুরেন্টে বাবলু, সনত সরখেল, লিটন আর পুঁটেকে দেখতে পান। ছবি তোলেন। এর পরে ভাই-বোনে কোনও কথা হয়েছিল কি না তা-ও বলতে পারব না। সম্ভবত না। আমার ধারণা মোলি ছবিগুলো তুলেছিলেন, কিন্তু তার সিগ্‌নিফিক্যান্‌স্‌ বুঝতে পারেননি। ওগুলো নিয়ে কিছু করেননি।”
“আমারও তাই মত,” হঠাৎ বলল তুলি।
“ইয়ে,” সবাই ওর দিকে তাকান’র ফলে তুলি থতমত খেল। “না, মানে হানিমুন থেকে ফিরে এসে মৌলিদি আমাকে কিচ্ছু বলেনি। ওর সেরকম কিছু মনে হলে আমাকে অন্তত বলত।”
“এক্স্যাক্টলি,” বলল প্রসূন। “তা ছাড়া আপনি বলেছিলেন যে মালডিভ্‌স্‌ থেকে ফিরে এসে শি ওয়াজ ভেরি হ্যাপি। কোনও রকম দুশ্চিন্তার ছায়া ছিল না।”
তুলি বলল, “হ্যাঁ। তাহলে কী করে...”
“আমাদের ধারণা বাবলু দেখতে পেয়েছিল যে মৌলি ওদের ছবি তুলছেন। কয়েকটা ছবিতে সেরকম দেখাও যাচ্ছে – বাবলু যেন সোজা ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে। মৌলি নিজে হয়ত ছবিগুলো দেখে সেরকম ইমপর্ট্যান্ট কিছু মনে করেননি।”
“একেবারে তা-ও নয়,” বললেন প্রদীপ। “আলাদা করে রেখেছিল, এবং সেই সময়ে আমার ঘরে ঢোকার যে রি-অ্যাকশন...”
প্রসূন বলল, “তা-ও ঠিক, কিন্তু এটাও ভেবে দেখুন... যেখানে পাওয়া গেল, অর্থাৎ স্যুটকেসের ফ্ল্যাপে – সেটা যত্ন করে রাখা বলে মনে হয় না। বরং অনেকটা রেখে দিয়ে ভুলে যাওয়ার মতো। আনফরচুনেটলি সেটা আর আমাদের জানার উপায় নেই, এক যদি না জানা যায় যে মৌলি বাবলুর সঙ্গে পরে কথা বলেছিলেন, স্কাইপ করে বা ফোনে। সেগুলোও বোঝার উপায় আছে, তবে সবই সময়সাপেক্ষ। যা-ই হোক, সনত সরখেল অনেক কথা বলছে। স্বীকার করেছে, যে এর পরে ওরই মাধ্যমে লিটন আর পুঁটেকে দায়িত্ব দেওয়া হয়, ‘যেন তেন প্রকারেণ’ ওই ছবি ফেরত চাই। এই প্রকারের মধ্যে খুন ইনক্লুডেড ছিল কি না জানা নেই – হয়ত ছিল না, হয়ত বাবলু ভেবেছিল ভয় পেয়ে মৌলি দিয়ে দেবে, হয়ত সত্যিই লিটন আর পুঁটে ব্যাপারটা ঘেঁটে যেতে ঘাবড়ে গিয়েই ছুরি চালিয়ে দিয়েছিল... কিন্তু রেজাল্ট কী তো আমরা জানিই। সনত সরখেলের বক্তব্য, যে এর পরের ষড়যন্ত্রও বাবলুর বুদ্ধিতেই করা। প্রদীপকে ফাঁসালে, বাড়ির চাবি ইত্যাদি তো মৌলির ফ্যামিলির হাতেই চলে যাবে – তখন পরে ধীরে-সুস্থে গিয়ে ছবি খোঁজা যাবে। কিন্তু সেটা যখন ফেল করল, তখন লিটন আর পুঁটে বিকেম আ ডেন্‌জার ফর হিম। তাই ওদেরও শেষ করে, কলকাতার পাট চুকিয়ে সনত সরখেল পালাল মালডিভ্‌স্‌ – বউ মেয়েকে আগেই রেখে এসেছিল ফরিদাবাদে এক আত্মীয়ের বাড়ি – প্ল্যান নাকি ছিল পরে ওদেরও নিয়ে যাবে, কিন্তু তার আগেই ইন্টারপোল ওকে ধরল এসে।”
অতনু বললেন, “এর পরে আপনার সি.বি.আই-তে যাওয়া আর কেউ আটকাতে পারবে না।”
মাথা নাড়ল প্রসূন। “আমি সি.বি.আই যাব না। আমি আর পুলিশের চাকরিই করব না। রেজিগনেশন দিয়ে দিয়েছি। সেই সঙ্গে চেষ্টা করছি ইংল্যান্ডে ইতিহাসে এম.এ করতে। অক্সফোর্ডে যদি পাই...”
আবার বাধা দিলেন তুলির বাবা। “বাবলুর ব্যবসাটা কী? ড্রাগ?”
প্রসূন ভীষণ অস্বস্তিতে একবার প্রদীপ, আর একবার অতনুর দিকে তাকাল। প্রদীপ মোবাইল ফোনে কী দেখতে ব্যস্ত। অতনু বললেন, “না। ড্রাগ নয়। বাবলুর ব্যবসা, আমার মতে, তার চেয়ে হাজার গুণ বেশি খারাপ। বাবলু মেয়ে চালান করত।”
স্তম্ভিত তুলি, আর তার বাবা-মার দিকে তাকিয়ে অতনু বলল, “এইজন্যই প্রসূন আপনাদের বলতে চাইছিল না। বাবলু ওয়াজ আ উম্যান ট্র্যাফিকার। উত্তর পূর্ব ভারত, নেপাল, অন্ধ্রপ্রদেশ, তামিলনাডু, পশ্চিমবঙ্গ, সিকিম – এই সব জায়গা থেকে মেয়ে নিয়ে যেত ব্যাংকক, দক্ষিণ অ্যাফ্রিকা, মিড্‌ল্‌ ইস্ট... যেহেতু ওর মালডিভ্‌স্‌ আর ওয়েস্ট ইন্ডিজে ব্যবসা, আর ও পারতে কোনও দিন নিজে এসব জায়গায় যায়নি, প্রথম দিকে সন্দেহ করার কারণই ছিল না। কিন্তু বেশ কিছুদিন হলো, ইন্টারপোল গন্ধ পায়, নজর রাখতে শুরু করে। এর ফলে সি.বি.আই-এর তরফ থেকে ইন্টারপোলকে যোগাযোগ করার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ওরা অ্যাকশন নেয়... এই হলো কাহিনি।”
হঠাৎ তুলির মা তুলির বাবাকে বললেন, “তোমার কি শরীর খারাপ করছে?”
সবাই চমকে তুলির বাবার দিকে তাকাল। উনি চোখ মুছে বললেন, “না। আমি দাদা-বৌদির কথা ভাবছিলাম। এই বয়সে একসঙ্গে ছেলে-মেয়ে দু’জনের শোক পাওয়া... তার ওপর গত কয়েক মাস তো আমাদের কারও সঙ্গে ভালো করে কথাই বলেনি। আর মৌলির মৃত্যুর জন্য যে বাবলু দায়ী, সেটা জেনে থেকে তো কেমন যেন উদভ্রান্তের মতো দেখায় সারাক্ষণ।”
সবাই কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল।
প্রদীপ বললেন, “সত্যিই, ওনারা তো কোনও দোষ করেননি। আচ্ছা, আমরা যদি চেষ্টা করি? উনি আমাদের দূরে সরিয়ে দিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু আমরাও তো একই কাজ করেছি।”
এমন সময় কাজের লোক রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এসে বনিকে বলল, “বৌদি?”
বনি উঠে ভিতরে গেলেন। একটু পরে ফিরে এসে বললেন, “ডিনার তৈরি। চলুন, খেতে খেতে কথা বলা যাবে।”
খেতে বসে তুলির বাবা প্রসূনকে জিজ্ঞেস করলেন, “ইতিহাসে এম.এ করে তারপরে কী করবে? পুলিশের চাকরি তো ভালো চাকরি। এক কথায় ছেড়ে দিলে?”
প্রসূন বলল, “ভালো চাকরি না, মেসোমশাই। বড়ো দুঃখের কাজ। বিশেষ করে এই মার্ডারগুলো – চোখের সামনে দেখি, কী করে এক একটা গোটা ফ্যামিলি নষ্ট হয়ে যায়। খুনিকে ফ্যামিলির লোক, বা পরিচিত লোকও হতে হবে না। ইনভেরিয়েব্লি, একটা খুন হলে তার পরের ঘটনাগুলো মানুষকে বদলে দেয়। আরও তিরিশ বছর এই করলে আমি আর আমি থাকব না।”
অতনু বললেন, “ঠিক বলেছেন। আমিও এইরকম সব কারণেই ক্রিমিনাল ল’ ছেড়েছি।”
বেরোবার সময় তুলির মা প্রদীপকে জিজ্ঞেস করলেন, “এখন তো তোমার আর কলকাতায় থাকার কোনও বাধা নেই? তুমি কী করবে?”
প্রদীপ একটু চুপ করে থেকে বললেন, “আমার তো কলকাতায় থাকার দুটো মাত্র কারণ ছিল – একটা মৌলি, আর একটা চাকরি। শহরটার প্রতি আমার বিশেষ ভালোবাসা তৈরি হয়নি কোনও দিনই। এখানে থাকব না। দেখি, কোথায় যাই। আলাপ্পুজা ফিরতেই পারি – ওখানে যদি...”
প্রদীপের কথা কেটে অতনু বললেন, “ওখানে তোকে ফিরিয়ে নিয়ে যাবার রিস্ক আমি আর নেব না। এটা তোকে আমি আগামীকাল বলতাম, কিন্তু কথাটা এখন উঠল, তাই এখনই বলি। টমাসের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে, টমাসও একমত। ওখানে না। টমাস দেখছে। ওর তো বিশাল অর্গানাইজেশন – সাত-আটটা সেন্টারে কাজ চলছে। গোয়া থেকে কাশ্মীর যে কোনও জায়গায় ওর প্রেজেনস রয়েছে।”
প্রদীপ বলল, “আই ডোন্ট মাইন্ড। তুই ব্যবস্থা কর।”
উপসংহার
তিন সপ্তাহ পরে, কলকাতা এয়ারপোর্টে এয়ার ইন্ডিয়ার আইজলগামী ফ্লাইটের সিকিউরিটি চেক ঘোষণা হবার পরে কাঁধে ল্যাপটপ ব্যাগটা তুলে প্রদীপ সেনগুপ্ত বললেন, “চলি রে। ভালো থাকিস।”
তুলি বলল, “তুমিও ভালো থেকো প্রদীপদা। চিঠি দিও। ই-মেইল লিখো।”
প্রদীপ বললেন, “হ্যাঁ। যদি ওদিকে ছুটিতে আসিস, আইজল ঘুরে যেতে ভুলিস না।”
তুলি বলল, “তার আগে তুমি আসবে না? কালই জ্যেঠুকে বলেছ কিন্তু যে তুমিই এখন ওদের ছেলে।”
হাসলেন প্রদীপ। বললেন, “আসব। কিন্তু কবে আসব কি এখনই বলতে পারব? ছুটি নিয়ে নর্থ ইস্ট-টা ঘুরব না?”
তুলি বলল, “তাহলে তোমার সঙ্গে ইংল্যান্ডেই দেখা হবে। আসবে কিন্তু – আমি নেক্সট ইয়ারই যাচ্ছি। অ্যাপ্লিকেশন শুরু করে দিয়েছি।”
প্রদীপ হেসে প্রসূনের দিকে ঘুরলেন। হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, “থ্যাংক ইউ ফর এভরিথিং। শিগগির দেখা হবে আশা করি।”
প্রসূন হাত মিলিয়ে বলল, “নিশ্চয়ই হবে। ভালো থাকবেন।”
সিকিউরিটিতে ঢোকার আগে প্রদীপ ঘুরে তাকালেন। দু’জনকে আর দেখতে পেলেন না।
শেষ