Saturday, February 29, 2020

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়



বাবা মা সাধ করে নাম রেখেছিলেন নবারুণ আর নবার্ক। এদের সঙ্গে আমার পরিচয় অনেক দিনের, বাবা-মা-কেও চিনতাম কিন্তু যখন সে দিন ওদের বাবা ফোন করে বললেন, দু-জনকে আমার চেম্বারে পাঠাতে চান, একটু অবাক হলাম। দু’ভাই এক সঙ্গে...? জানতে চাওয়ায় বাবা হেসে বললেন, “আপনার প্রফেশনাল হেল্প লাগবে।”
কথা না বাড়িয়ে দিনক্ষণ ঠিক করে নিলাম। যথাসময়ে হাজির হল ভাইয়েরা বললাম, “প্রতিবারের মতো বলো দেখি, কে অরুণ আর কে অর্ক?” হাসল, বলল, বসল, তার পরে জানা গেল আগমনের কারণ।
দু’ভাইকে সার্টিফিকেট দিতে হবে যে আমি ওদের চিনি এবং ওরা নাকি অব্‌ সাউন্ড মাইন্ড! বেশ কথা, কলম বাগিয়ে লিখতে বসলাম ‘এতদ্বারা নোটিফিকেশান... আমি শ্রীমান নবারুণ... শ্রীমান নবার্ককে... ছোটবেলা থেকে চিনি...’
লিখতে গিয়ে খেয়াল হল, বললাম, “নবারুণের নামের বানান ‘এ’ দিয়ে, কিন্তু নবার্কর নাম কেন ‘ও’ দিয়ে?”
নবারুণ হেসে বলল, “আর বোলো না কাকু! ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটি আমার নামের বানান ‘এ’ দিয়ে করে দিয়েছে। কী ঝামেলা সে কী বলব, আই.সি.এস.ই, আই.এস.সি.-তে ‘ও’ দিয়ে, আর তার পর থেকে সব ‘এ’! শেষে এফিডেভিট করে রাখতে হয়েছে, যে ‘এন-ও’ নবারুণ আর ‘এন-এ’ নবারুণ ইজ ওয়ান অ্যান্ড দ্য সেম। নবার্কর নামটা কেন জানি ছেড়ে দিয়েছে, ও ‘এন-ও’ দিয়েই নবার্ক লেখে
এক ধাক্কায় ফিরে গেলাম প্রায় ৩৫ বছর। গ্র্যাজুয়েশন পড়তে দেবদত্ত ঢুকেছিল দূর উত্তর কলকাতার কোনও এক কলেজে। সাদার্ন অ্যাভেন্যু থেকে দু’দিন যাতায়াত করতে না করতেই বুঝল তখনকার কলকাতার বাস ট্রামের ভিড় ঠেলে অতদূর গিয়ে পড়াশোনা পোষাবে না। খোঁজ করে দেখা গেল যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে কিছু সিট খালি আছে। যাদবপুর জানাল, ‘ঠিক হ্যায়, আ যাও, কিন্তু তাড়াতাড়ি করবে। কারণ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে যদি রেজিস্ট্রেশন হয়ে গিয়ে থাকে, তাহলে আবার ইন্টার-ইউনিভারসিটি ট্রান্সফার করতে হবে। কলকাতা ইউনিভার্সিটি থেকে মাইগ্রেশন বের করা আর এক ঝামেলা।’
দেবদত্ত পর দিন সকালে কলেজ পৌঁছেই রেজিস্ট্রেশন রদ করার উদ্দেশ্যে দৌড়ল কলেজ অফিস। ঢোকা মাত্র ক্লার্ক এক গাল হেসে ফাইল থেকে রেজিস্ট্রেশন সারটিফিকেটটা বের করে দিয়ে বললেন, “আমি নিজে দাঁড়িয়ে থেকে কাল করিয়ে এনেছি।”
শুরু হল ট্রান্সফার-প্রক্রিয়া। সপ্তাহে তিন দিন দেবদত্ত যাদবপুর থেকে উত্তর কলকাতার কলেজে ছুটোছুটি করে। রোজই শোনে এখনও আসেনি। শেষে এক দিন, যাদবপুর থেকে জানানো হল, আর বিলম্ব নয়। সামনে পরীক্ষা, এখনই চাই ইমিগ্রেশনের জন্য সারটিফিকেট। কলেজ থেকে বলে দেওয়া হল, এখানে ঘোরাঘুরি করে লাভ নেই। ইউনিভার্সিটি গিয়ে খোঁজ কর। মাইগ্রেশন ডিপার্টমেন্ট। দেবদত্ত আমাকে বলল, “যাবি আমার সঙ্গে?” আমার তখনও কলেজ শুরু হয়নি, অফুরন্ত সময়, চললাম আড্ডা দিতে দিতে।
খুঁজে খুঁজে ইমিগ্রেশন বিভাগ বের করা গেল। আমার বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে ঘোরার অভিজ্ঞতা কম, তাই জানি না এই কথাগুলো শুনে কেউ হাসবেন কি না, কিন্তু ঢোকার সময়ে মনে হচ্ছিল একটা চক দিয়ে দেওয়ালে চিহ্ন দিয়ে দিয়ে যাওয়া উচিত, নইলে হয়ত কোনও দিন আর বেরোতে পারব না!
সে যা হোক – এখানেও লোকে কাজ করে, রোজ আসে যায়, বেরোন’র রাস্তা নিশ্চয়ই খুঁজে পাব, সে ভরসায় বুক বেঁধে ঢুকে পড়লাম চক্রব্যূহের মধ্যে। এবং কী আশ্চর্য! নানা নির্দেশ অনুসরণ করে পেয়েও গেলাম ভারপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে। তিনি ডেস্কে বসে ‘দেশ’ পত্রিকা পড়ছিলেন – বললেন, “দেবদত্ত, দেবদত্ত... চৌধুরী?”
দেবদত্ত বলল, “হ্যাঁ, আমাকে যাদবপুর ইউনিভার্সিটি থেকে বলেছে আর দেরী না করে ইমিগ্রেশন জমা দিতে...”
মাছি মারার ভঙ্গীতে হাত নেড়ে ভদ্রলোক বললেন, “আরে ধুস্‌, যাদবপুর ওরকম বলেই থাকে। তবে চিন্তা নেই, এই তো, তোমার ফাইল আমার টেবিলেই রয়েছে...”
বরাভয় দিয়ে তিনি আবার মন দিলেন পত্রিকায়।
অনেক সাহসে বুক বেঁধে জিজ্ঞেস করলাম, “কবে আসব?”
ভুরু কপালের ওপরের অংশে তুলে বললেন, “পরশু এসো।”
পরশু? আজ তো শুক্রবার! মরা চোখে তাকিয়ে বললেন, “পরশু যখন বলছি, তার মানে শুধু ওয়র্কিং ডে গুনে
বলছি। পরশু মানে সোমবার।”
সরকারী অফিসের কর্মপদ্ধতি বা হিসেবের সঙ্গে তখনও আমরা ওয়াকিবহাল নই। সেটাই প্রথম পাঠ।
সোমবার আমাদের দেখে বললেন, “হয়নি।” এবার একটু রাগত স্বর মনে হল।
দেবদত্ত মিনমিন করে বলল, “হয়নি? কেন?”
বেশ গেস্টাপো স্টাইলে বললেন, “দেবদত্ত চৌধুরী নাম তোমার?”
দেবদত্ত বলল, “হ্যাঁ, ওই যে...”
“বাঙালি হিন্দু?”
“হ্যাঁ!” এবার দেবদত্ত অবাক!
“তাহলে নামের বানান কেন ‘ও’ দিয়ে শেষ?”
আমরা অবাক! দেবদত্ত বলল, “আমি তো ‘ও’ দিয়েই বানান লিখি – আমার মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক সব সারটিফিকেটেই...”
ভদ্রলোক থামিয়ে দিয়ে বললেন, “এখানে সে সব চলবে না।”
দেবদত্ত বলল, “এখানে মানে? এখানটা কোনখান?” বুঝতে পারছি এবার ও অধৈর্য হয়ে পড়ছে। তখন আজে বাজে প্রশ্ন করে।
ভদ্রলোকের গলায় এখন ইস্পাত। বললেন, “এখানে মানে ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটিতে। মনে রেখো, কোথায় দাঁড়িয়ে কথা বলছ। দিস ইজ দী ওলডেস্ট ইউনিভার্সিটি ইন ইন্ডিয়া।”
দেবদত্ত বলল, “সেই জন্য আপনি আমার নামের বানান কী হবে বলে দেবেন? আমার নামের বানান আমি আমার মতো করে লিখতে পারব না?”
খুব জোর দিয়ে ক্লার্ক ভদ্রলোক বললেন, “না, পারবে না। দেবদত্ত বানান ‘এ’ দিয়ে শেষ হবে, ‘ও’ দিয়ে নয়।”
আমি বললাম, “কার নামের বানান কী হবে সেটা কী করে স্থির করেন?”
এই বার ফেটে পড়লেন উনি। “আমার সঙ্গে ইয়ার্কি মারছ? জানো, এই জন্য গোটা একটা ডিপার্টমেন্ট আছে?”
আমার মুখের কাঁচুমাচু ভাব দেখে বুঝলেন ইয়ার্কি মারা আমার উদ্দেশ্য ছিল না। একটু সামলে নিয়ে বললেন, “এসো, এসো আমার সঙ্গে।”
নিয়ে গেলেন আরও ভেতরে। দুটো ঘর পেরিয়ে ‘রেজিস্ট্রেশন ডিপার্টমেন্ট’। তারও ভেতরে একটা ঘরে নিয়ে গেলেন। ইউনিভার্সিটির হিসেবে ছোট্ট ঘর। তিরিশ ফুট বাই তিরিশ ফুট মত, তাতে তিন চারটে টেবিল চেয়ার, প্রতি টেবিলে জনা দুয়েক বসে কাজ করে চলেছেন (মানে নবকল্লোল বা দেশ পড়ছেন আর কী) এই ঘরটার দ্রষ্টব্য হলো, এতে জানালা নেই। দুটো দরজা। আর এই দুটো দরজার ফোকর বাদ দিয়ে, চার দেওয়াল জুড়ে মাটি থেকে ওই সাহেবি আমলে তৈরি ঘরের আকাশছোঁয়া ছাদ অবধি সবটাই বইয়ের র‍্যাকে ভর্তি। আর র‍্যাকগুলো ভর্তি মোটা মোটা অভিধান-আকৃতির বইয়ে
গর্বে ফেটে পড়া স্বরে বললেন, “এগুলো দেখছ? এতে প্রত্যেক বাংলা নামের ইংরিজি বানান লেখা আছে। ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটিতে পড়লে এই বানানই হবে, অন্য কোনও বানান নয়, বুঝেছ? নিজের নামের বানান নিজের ইচ্ছে মতো যা খুশি লিখবে, সে চলবে না!”
ঘরভর্তি নামের অভিধান দেখে কেমন যেন দুর্বল লাগছিল। তাও সাহস করে বললাম, “এই বইগুলোতে যত বাংলা নাম আছে সব আছে? যদি এমন কোনও নাম কেউ দেয় যা এই বইয়ে নেই?”
গর্বের স্বরে ভদ্রলোক বললেন, “এই রকম পাঁচটা ঘর আছে, জানো? এমন কোনও বাংলা নাম নেই – থাকতে পারেই না – যার ইংরেজি বানান এই ডিপার্টমেন্টে নেই, বুঝলে? স্যর আশুতোষ নিজে দাঁড়িয়ে থেকে এই বানানের বই তৈরি করিয়েছিলেন।”
আগেকার দিনের লোকেদের হাতে অনেক সময় থাকত জানি। ইতিহাস বই পড়ে যখন শিখতাম ঘোড়া আর গোরুর গাড়ি করে লোকে পাটলিপুত্র থেকে তক্ষশীলা গিয়ে আবার ফিরে আসতেন, তখন বেশ অবাক লাগত। অতীশ দীপঙ্কর তো তিন বার পায়ে হেঁটেই তিব্বত গিয়েছিলেন, দু’বার ফিরেও এসেছিলেন! কিন্তু তা জানা সত্ত্বেও স্যর আশুতোষের ওপর নতুন করে আরও শ্রদ্ধা জন্মাল। এত সময় ছিল ভদ্রলোকের জীবনে!
সেই সঙ্গে মনে হলো, কতো লোকের উপকার করে গিয়েছেন! সরকারি পয়সায় একটা গোটা ডিপার্টমেন্ট না হলেও সেক্সন তো বসে কাগজ-ম্যাগাজিন পড়ছে – সেই বা কম কী?
দেবদত্ত বলল, “আর কারও নাম যদি দেবদত্তা হয়? তখন ইংরেজিতে কী লেখা হবে?”
উনি মুখ ভেঙিয়ে বললেন, “তোমার নাম তো দেবদত্তা নয়? হলে বানান বলে দিতাম, নিজের নাম নিয়ে ভাবো।”
দেবদত্ত বলল, “আপনি ‘এ’ দিয়েই ইমিগ্রেশন সারটিফিকেট দিন তাহলে।”
এই বার ভদ্রলোক একটু চুপসে গেলেন। বললেন, “কিন্তু তোমার রেজিস্ট্রেশনে তো ‘ও’ দিয়ে লেখা হয়ে গেছে। দুটোতে তো আলাদা হতে পারে না।”
লে হালুয়া। এত মোটা মোটা বানান অভিধান থাকতে ‘ও’ দিয়ে দেবদত্ত বানান হলোই বা কী করে?
“তোমার পদবী তো চৌধুরী, তাই বোঝা যায়নি। চৌধুরী তো অবাঙালিদেরও পদবী হয় – তাই না? এমনকি মুসলমানরাও চৌধুরী হতে পারে।”
“তার মানে এই নিয়ম শুধু হিন্দুদের জন্য?”
“শুধু বাঙালি হিন্দুদের জন্য। সেই জন্যই তো রেজিস্ট্রেশন হয়ে গিয়েছে। সেটা করার সময় তো যিনি করেছেন তিনি তোমার সঙ্গে কথা বলেননি। আমিও হয়ত ভুলটা করতাম, ভাগ্যিস তুমি এলে! এসে বাংলায় কথা বললে আমার সঙ্গে।”
ভাগ্যিস! হিন্দু বাঙালির সন্তান হবার সঙ্গে কত যে আপদ জড়িয়ে রেখেছেন সবজান্তা ব্রহ্মা, তা তো এ জগতে আসার আগে কেউ বলে দেয়নি!
শেষ অবধি ইমিগ্রেশন বেরিয়েছিল। ‘ও’ বানান লিখেই বেরিয়েছিল। সে অনেক গল্প। অনেক ঘোরাঘুরি, বহু দিন কলেজ স্কোয়্যারে পাইচারি করা, এক দিন সকালে কাজে আসার পথে ভারপ্রাপ্ত ক্লার্কের টিফিন হারিয়ে যাওয়া... দেবদত্তর ঘাড় ভেঙে সে টিফিনের বন্দোবস্ত... কত কী!
নবার্ক আর নবারুণকে সামনে বসিয়ে রেখেই খানিকক্ষণের জন্য হারিয়ে গিয়েছিলাম। সেই সঙ্গে ফিরে এসেছিল ৩৫ বছর আগের সেই অনুভুতিটা – পাঁচটা বিশাল ঘরে দেওয়াল জোড়া তাক ভরা হাজার হাজার বানান অভিধান নিয়ে বসে আছেন মাইনে করা কর্মচারী – তাদের একমাত্র কাজ হল কার নামের বানান কী হবে সেটা খুঁজে খুঁজে বের করা, আর তার পরে তাকে যাতে আদালতে গিয়ে অ্যাফিডেভিট করে ‘আমিই সেই লোক’ বলতে হয় তার ব্যবস্থা করা!
হঠাৎ মনে হল স্যার আশুতোষ হয়ত নবার্ক শব্দটা জানতেন না, তাই সেই বইয়ে ওই নামটা নেই। কেমন একটা আত্মতুষ্টি হল। সেটা ঠিক কী রকম তুষ্টি বলে বোঝান কঠিন।
ট্র্যাডিশন ভাল। ট্র্যাডিশনাল হওয়াও খারাপ নয় বলেই মনে করি। কিন্তু কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মানুষরা সেটাকে একটা অ্যাবসার্ড মাত্রায় নিয়ে যায় মাঝে মাঝে।
ঘটনাটা যিনি বলেছিলেন তিনি আজ আর নেই বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনও বিভাগের অধ্যাপক ছিলেন তিনি। এক দিন এক আড্ডায় বসে বলছিলেন এই গল্প। তাঁর কথাতেই বলি।
“বাবা-গো! আজকালকার বাবা-মায়েরা এত ন্যাকা, এত ন্যাকা হয়েছে যে কী বলব! আমার তো মনে পড়ে না আমার বাবা-মা কোনও দিন আমার স্কুলে পর্যন্ত গিয়েছে, আর কলেজ বা ইউনিভার্সিটি তো দূর অস্ত্‌! কিন্তু সে দিন আমাদের হেড অফ ডিপার্টমেন্ট-এর কাছে এসেছেন এক মেয়ের বাবা-মা। বক্তব্য এই, যে তাঁদের মেয়ে নাকি এম.. পার্ট ওয়ান পরীক্ষায় বসেছে ইউনিভার্সিটির হলে। সেই বেঞ্চি নাকি এতই নোংরা ছিল যে মেয়ের জামায় কালি লেগেছে, সে কালির দাগ নাকি কাপড় কেচেও ওঠেনি। ভাবতে পারো, কোনও ডিপার্টমেন্টের হেডের যেন আর কোন কাজ নেই।”
সবাই হাসল। মডার্ন বাবা-মায়েরা নিজেরাও কী রকম ন্যাকা এবং তাঁদের সন্তানদের কী রকম সমপরিমান ন্যাকা বানাচ্ছেন সে কথা ভেবে। আমার হাসি পাচ্ছিল না। এবং অধ্যাপক যখন একই গল্প দ্বিতীয় এবং তৃতীয়বার বলতে লাগলেন, মেয়ের জামার দাম কত এবং ওঁদের কত লোকসান হয়েছে সে হিসেব অবাঙালি বাবা টাকার অঙ্কে বলেছেন বলে, তখন রাগ হতে শুরু করল।
“ভাবো, মেয়েকে তিনি যে পোশাক পরিয়ে পরীক্ষা দিতে পাঠিয়েছেন তার দাম নাকি কয়েক হাজার টাকা! আমি তো বাপু ভাবতেই পারি না এত দাম দিয়ে কেনা জামা পরে কেন কেউ ইউনিভার্সিটি আসবে!”
“তা তোদের হেড কী বললেন?” জানতে চাইলেন শ্রোতাদের একজন।
বক্তা অধ্যাপক হেসে বললেন, “সেটাই তো বলছি। উত্তেজিত বাবা-মা বকেই চলেছে, বকেই চলেছে... শেষ পর্যন্ত আর থাকতে না পেরে হেড গম্ভীর হয়ে বললেন, ‘আপনি কী জানেন, যে ওই বেঞ্চিতে বসেই সি. ভি. রমন-ও পরীক্ষা দিয়েছিলেন?’”
সি. ভি. রমন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে কী পরীক্ষা দিয়েছিলেন সেটাই প্রশ্ন হতে পারত, কিন্তু ততক্ষণে সবাই হাসতে শুরু করেছে, আর আমার মাথা আরও গরম হতে লেগেছে, তাই জিজ্ঞেস করলাম, “সি. ভি. রমনের সময়ে যে নোংরা ওই বেঞ্চিতে লেগে ছিল, সে নোংরাই কি এখনও লেগে রয়েছে? আর সেই নোংরাই কি মেয়েটার গায়ে লেগেছে?”
সবাই থতমত। সেই সুযোগে বলে চললাম, “আমার সন্তান যেখানে বসে পরীক্ষা দিচ্ছে সে জায়গাটা পরিষ্কার থাকবে না থাকলে সেখান থেকে তার কোনও অসুখও হতে পারে... কোনও গার্জেনের এই উদ্বেগ শিক্ষকদের কাছে কেন এত অকিঞ্চিতকর? যে ঘরে বেঞ্চ এত নোংরা যে জামার দাগ কেচে তোলা যাচ্ছে না, সেই ঘরের অন্যান্য কোণায় কত দিনের সঞ্চিত ধুলো-বালি-ময়লা থাকতে পারে? সেটা থেকে যদি কোনও পরীক্ষার্থীর অ্যালার্জি হয়ে অ্যাজ্‌মা হয়? বা বেঞ্চের নোংরা থেকে অন্য কোন স্কিন ডিজিজ হয়, তার ফলে যদি তার পরীক্ষা খারাপ হয়, বা সে ফেল করে, তার দায়িত্ব কে নেবে?”
অধ্যাপক রেগে বললেন, “পরীক্ষার হল পরিষ্কার করার দায়িত্ব কী হেড-এর?”
আমি বললাম, “ঝাড়ু হাতে পরিষ্কার করার দায়িত্ব হয়ত হেড এর না। কিন্তু ডিপার্টমেন্ট-এর সমস্ত কাজ সুষ্ঠুভাবে চলছে কি না দেখাশোনার দায়িত্ব কি তাঁর নয়? তোরা তো শিক্ষক, দাবি করিস তোরা পিতা-বা-মাতা-সমান। তাহলে ছাত্ররা কি তোদের সন্তানসম নয়? সারাক্ষণ তো নালিশ করছিস যে স্টুডেন্টরা নাকি আর আগের মত রেসপেকটফুল আর ওবিডিয়েন্ট নেই। তা তোরা কি ছাত্রদের প্রতি আগের মত কেয়ারিং আর মাইন্ডফুল? যে সি. ভি. রমন-এর কথা বলে তোর হেড তাঁর দারুণ ইন্টেলেক্ট, প্রেজেন্স অব মাইন্ড, আর সেন্স অব হিউমর ডিস্‌প্লে করলেন, সেই সি. ভি. রমন কী তাঁর কোনও স্টুডেন্ট-এর জামা এমন নোংরা হলে এমন ক্যালাস্‌ মন্তব্য করে শ্লাঘা বোধ করতেন? স্যার আশুতোষ যদি জানতে পারতেন যে তাঁর প্রিয় ইউনিভার্সিটিতে পরীক্ষার হলে বেঞ্চে এত নোংরা যে জামা কেচেও পরিষ্কার হচ্ছে না, তিনি কি এই রকম একটা দায়সারা মন্তব্য করে দায়িত্ব এড়িয়ে যেতেন? তোর নিজের পোশাকে যদি এই নোংরাটা লাগত, তাহলে কি তুই নিজে এমন খুশি হয়ে হি-হি করে হাসতি? একবারও কি হিসেব করে দেখতি না কত টাকা লোকসান হয়েছে?”
মিনমিনে গলায় শুনলাম, “ক্লাস ফোর স্টাফেরা কাজ কেউ করে না, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই, তবে তাদের কাজ করান’র দায়িত্ব টিচারদের, তাও মনে করি না...”
বন্ধুদের আড্ডায় জোক বলতে গিয়ে কী বিপত্তি! আমি অবশ্য মনে করি সে বিপত্তি বাঙালির ওয়ার্ক কালচার আর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কল্যানেই, কিন্তু সে আর বললাম না!

No comments: