ফরাসডাঙ্গার শেষে, যেখানে বাড়িটার পাঁচিলটা ফেটে গেছে, সেখানে তালগাছটার ওপরে একানড়েটা বসে বসে পা দোলাচ্ছিল। আজকাল ওর কাজকম্মো বিশেষ নেই। বাড়িটায় তেমন কেউ থাকে না। তাও কিছুদিন হলো ছোকরা বিশু বুড়ো হয়ে ওর বুড়ি বউকে নিয়ে আস্তানা গেড়েছে বলে সন্ধের পরে আলো জ্বলে। এর আগে কত বছর কেউ আসেইনি…
বিশুর দাদু বাড়িটা বানিয়েছিল। মস্তো বাড়ি। দাদুর ছেলেমেয়ে ছিল অনেকগুলো। তখনই একানড়ে এই বাড়িতে থাকতে আসে। বাড়িতে মানে বাড়ির বাইরে, বাগানের শেষে পাঁচিলের ধারের তালগাছটায়। তখন পাঁচিলটা ফাটা ছিল না।
এর আগে পুটুসপল্লীর গ্রামে থাকত একানড়ে। গ্রামের লোকে বড্ডো জ্বালাত। বছরে দুবার তালগাছ থেকে শাঁস পাড়া, তাল পাড়া, লেগেই থাকত। কথা নেই, বার্তা নেই, হুড়মুড়িয়ে গাছে উঠে পড়লেই হলো! তা ছাড়া অনেক দিন গ্রামে থেকেও একটা বাচ্চাও হাতে পায়নি। কেবল মিছিমিছি গল্পই শুনেছে - এক যে আছে একানড়ে / সে থাকে তালগাছে চড়ে। বাচ্চারা কাঁদলেই তাদের ধরে নিয়ে গিয়ে তালগাছের ওপর থেকে আছাড় মেরে ফেলে দেয়। ও যখন নতুন ছিল, দিনের পর দিন সন্ধের পরে গ্রামে কোনও বাচ্চা কাঁদলেই গিয়ে দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকত। একবার মা-বাবা বাচ্চাটাকে বাইরে বের করে দিক…
কেউ কোনও দিন দেয়নি। একানড়ে গাছ থেকে নামা বন্ধ করে দিয়েছিল। তবে একেবারে আশা ছাড়েনি। তালগাছের ওপর থেকেই জ্বলজ্বলে চোখে চেয়ে থাকত। যদি আজ… কিন্তু কোনও দিন কোনও বাচ্চা হাতে পায়নি।
এমন গাঁয়ে, এমন গাছে থাকা কেন? তার ওপর গাছ বেয়ে উঠে মানুষগুলোও এমন জ্বালায়! তাই পুকুরপাড়ের ব্রহ্মদৈত্য যখন বলল ফরাসডাঙ্গার শেষে নতুন বাড়ি তৈরি হয়েছে, বাড়ির সাতটা বাচ্চার চেঁচামেচিতে ঘুমোনো দায় হয়েছে, ও ভেবে দেখল ওখানেই চলে যাবে। নতুন বাড়ি নতুন মানুষ - নতুন নতুন বাচ্চা - একদিন নিশ্চয়ই সুযোগ আসবে!
আসেনি। সাতটা বাচ্চা ছিল, বদের ধাড়ি সবকটা। সবকটাকেই তুলে আছাড় দেবার মতো। কিন্তু এখানেও সুযোগ পায়নি। সাতটা বাচ্চাই বড়ো হয়নি, পাঁচটা হয়েছে। তিনটে মেয়ে, দুটো ছেলে। বড়ো হয়ে সবাই চলে গেছিল বাড়ি ছেড়ে, গ্রাম ছেড়ে। কেবল রয়ে গিয়েছিল বিশুর বাবা। ভাইবোনের মধ্যে সবচেয়ে কুঁড়ে আর অকর্মণ্য। সারা জীবন বাবার পয়সায় খেল। ওর নিজের তিন ছেলেমেয়ে বিশু আর ওর দুই ভাইবোনও বড়ো হয়ে চলে গেছিল। তার পর বিশুর বাবা মা-ও মরে গেল, বাড়িটাও বন্ধ হয়ে গেল। অন্ধকার হয়ে গেল চারিদিক। বাড়িতে আলো জ্বলে না, সন্ধেয় তুলসীতলায় কেউ প্রদীপ জ্বালে না। পাড়ার ভূতরা একানড়েকে হিংসে করতে শুরু করল। কী কপাল! আজকের যুগে মানুষের জ্বালাতন বাদ দিয়ে থাকতে পারা, ভাবা যায়!
ভাবা যায় না, কিন্তু একানড়ে তো তা-ও খুশি হতে পারে না, রোজ সন্ধেবেলা বসে বসে তালগাছে পা দুলিয়ে দুলিয়ে গুনগুনিয়ে গান করে,
এক যে আছে একানড়ে
বাড়ি তার তালগাছ পরে
যে ছেলেটা কাঁদে
তারে ঝুলির ভেতর বাঁধে
গাছের ওপর চড়ে
আর তুলে আছাড় মারে।
সেদিনও বসে বসে পা দোলাচ্ছিল আর গুনগুন করে গান করছিল। ভাবছিল, বিশু বুড়ো হয়ে বাড়ি ফিরেছে। ওর ছেলেটার বয়স হলো, বিয়ে থা কি করেনি? নাতি নাতনি নিয়ে দাদুর সঙ্গে দেখা করতে আসবে না? আর বিশুর ভাইবোনগুলো? তারাও কি কোনও দিন আসবে না? তাদের কি নাতি নাতনি নেই?
এসব সাত পাঁচ ভাবছে আর ভাবছে একদিন নিশ্চয় আসবে যেদিন একটা - বেশি নয়, একটাই সই - বাচ্চাকে ঝুলিতে ভরে গাছের ওপর থেকে… এমন সময় হঠাৎ শুনল বাড়ির পাঁচিলের বাইরের দিকে যেন কার সাথে কার কথা কাটাকাটি হচ্ছে। স্যাট করে পা দিয়ে তালগাছের পাতার গোড়ায় আঁকড়ে সাঁই করে মাথাটা নিচে ঝুলিয়ে দেখল, আরে! এ যে বিশু! বাড়ির বাইরে! বিশু বুড়ো হয়ে ফেরার পর থেকে বাগানের চৌহদ্দির বাইরে তো দেখাই যায়নি কোনও দিন। বাগানেই কালেভদ্রে বেরিয়েছে কখনও। সেই বিশু কী না বিরাট বাগানের বাইরে এসে লোকের সঙ্গে কথা কাটাকাটি করছে! বিষয়টা কী?
খানিকটা শুনে বুঝল, বিশু ঝগড়া করছে একদল লোকের সঙ্গে, যারা কী একটা বানাতে এসেছে। বার বার মোবাইল টাওয়ার কথাটা শুনল। মানুষ কত কী বানায়! বিশু কিছুতেই বানাতে দেবে না। কথা বলতে বলতে গলা মেলে চেঁচাতে লাগল, দেখে নেব, কোর্টে যাব, সবাইকে হাজতে দেব, থানায় যাব, এই সব। শেষে বিশুর বউ এসে টেনে নিয়ে গেল - ছাড়ো তো বলে। বিশু গেল বটে, কিন্তু চেঁচাতে চেঁচাতেই, আমার পাঁচিলের ধারেই কেন? ওপাশে তো এত খালি জমি আছে। আমার পাঁচিলটা ফাটিয়ে দেবে আরও।
ঝগড়া কথাকাটাকাটিতে সূর্য ডুবেছে। চারিদিকে ঝুপসি অন্ধকার। লোকগুলো তাদের তাঁবুর কানাতের মধ্যে একটা আলো জ্বালিয়েছে। রাতের অন্ধকারে মানুষের আলো ভূতের চোখে লাগে। চোখ বুজে একানড়ে আবার শরীরটা সোজা করে গাছের ওপরে উঠতেই, অবাক! ওর গাছেই বসে বিরাটদেহ ব্রহ্মদৈত্য!
ব্রহ্মদৈত্য ওর কাছে? বুড়ো কারওর কাছে যায় না - আজ পুকুরপাড়ের বেলগাছ ছেড়ে এখানে কেন?
কী হে ভায়া, কী ভাবছ?
প্রশ্ন শুনে আরও ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল একানড়ে। বলল, কী ভাবছি মানে… কী বিষয়ে যদি একটু বলেন…
ব্রহ্মদৈত্য একটু বিরক্ত হয়ে দাঁত দিয়ে ছিক করে একটা শব্দ করে বলল, বিষয় তো শুনলে এতক্ষণ। মোবাইল টাওয়ার উঠবে। শুনলে না?
তাও একানড়ে বুঝল না। উঠবে তো উঠবে। তাতে ওদের কী?
একানড়ের মুখের ভাব দেখে হতাশ গলায় ব্রহ্মদৈত্য বলল, মোবাইল টাওয়ার কাকে বলে জানো না, তাই তো?
হাতে চাঁদ পেল একানড়ে। ঘনঘন ওপর নিচে ঘাড় নাড়ল। ব্রহ্মদৈত্য রাগেনি। বাঁচোয়া। ব্রহ্মদৈত্য রাগলে কী হয় কেউ জানে না, কিন্তু ভূতের রাজ্যে কেউ সে কথা জানতেও চায় না।
কিছুই তোমরা জানতেও চাইবে না, বুঝবেও না, মনেও রাখবে না। কী যে করি তোমাদের নিয়ে?
ব্রহ্মদৈত্যর দৃষ্টি অনুসরণ করে ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকাল একানড়ে। মুখ শুকিয়ে গেল ওরও।
গ্রামের ওপারে, গাছগাছালির ওপর দিয়ে, মাথা উচিয়ে রয়েছে বিশাল জিনিসটা, দেখতে দেখতে লাল চোখটা মেলে খানিকক্ষণ ওর দিকে চেয়ে থেকে আবার চোখ বুজল।
ওটাই মোবাইল টাওয়ার? গাঁয়ের ভূতরা, ওটার নাম দিয়েছে লোহার তালগাছ। একানড়েও তাই বলে। একানড়ের মনে আছে, ওটা যখন তৈরি হয়েছিল, ভূতেদের কী উত্তেজনা! সবাই বলেছিল, একানড়ের নতুন বাড়ি! একানড়েও খুব খুশি। মানুষরা বানিয়ে চলে গেলেই ও গিয়ে দখল নেবে! কিন্তু সে আর হলো না। মানুষরা যাবার আগে ওখানে এক জবরদস্ত ভূত বসিয়ে গেল। প্রথম যেদিন তার ভাঁটার মতো লাল চোখ দেখেছিল গাঁয়ের ভূতরা, সবার অবস্থা ঢিলে। এত বড়ো চোখ যার, সে নিজে কত বড়ো? অবাক কাণ্ড! এ কোন ভূত? সেদিনই গ্রামের সব ভূতকে নিজের গাছতলায় ডেকেছিল ব্রহ্মদৈত্য। পুকুরপাড়ে, বেলগাছের নিচে সবাইকে বসিয়ে বলেছিল, খবর আছে - ও গাছের ভূত শহরের ভূত। একানড়ের চেয়েও বড়ো। দশগুণ বড়ো। ওর নাম দশানড়ে। ওর ধারেকাছে যাওয়া মানেই সর্বনাশ। তার পর থেকে গ্রামের ওদিকেই যায়নি কোনওদিন একানড়ে। কোনও ভূতই যায়নি। খালপাড়ের শাঁকচুন্নি আজকাল পচা-ডোবার মেছোভূতের গাছতলায় ভাড়া থাকে। কী যন্ত্রণা!
আবার ফিরে দেখে ব্রহ্মদৈত্য নেমে যাচ্ছে। হেঁকে বলল, চললেন?
ব্রহ্মদৈত্য নামতে নামতে মুখ তুলে বলল, কী আর করি? তোমার গাছে একটা ডাল এমন নেই যে দু মিনিট পা ঝুলিয়ে বসব। যা হোক, আমি চলে যাব। এ গাঁয়ে থাকা যাবে না। দশানড়ের সঙ্গে আমরা পারব না।
আজই যাবেন? জিগেস করল একানড়ে।
ব্রহ্মদৈত্য মাটিতে নেমে ঘাড় উঁচিয়ে বলল, আজই। এখনই। পিছুটান তো নেই। থাকব কেন?
একানড়ে খানিকক্ষণ গাছে বসে পা দোলালো। হঠাৎ খেয়াল হলো, গুনগুনিয়ে এক যে ছিল একানড়ে গাইছে। গানটা শুনলে ওর খুব দুঃখেও ভালো লাগে। আজও লাগল। নিচে তাকিয়ে দেখল লোকগুলো রাতের অন্ধকারেই লোহার তালগাছ তৈরির তোড়জোড় করছে। পাছে কাজ শুরু হবার আগেই বিশু আদালত চলে যায়!
বিশু অবশ্য আদালত গেল না। সারা গ্রামে চেঁচিয়ে বেড়ালো, থানায় নালিশ করতে গেল, চায়ের দোকানে, বাজারে, লাইব্রেরিতে বসে গজগজ করতে লাগল - কোথাও পাত্তা পেল না। সবাই বলল, মোবাইল টাওয়ার তো লাগবেই! নইলে কথা বলা যাবে না। থানার দারোগা আবার বিশু যখন ঢুকেছে তখনই শ্বশুরমশাইয়ের সঙ্গে গাল গলা ফুলিয়ে হ্যালো হ্যালো করছেন। বিশুকে প্রায় লাঠির গুঁতো দিয়ে বিদায় করলেন। বললেন, আপনার জমিতেও বানাচ্ছে না! পাঁচিলের বাইরে পোড়ো জমিতে বানাচ্ছে। আপনার কী?
বিশু মিনমিন করে বলতে গেছিল, আমার পাঁচিল!
তেড়ে এসেছিলেন দারোগা। যান, যান! পাঁচিল মজবুত করে মেরামত করান। বাড়ির চারদিকে পাঁচিল ভেঙে পড়ছে এমনিতেই, আর উনি এসেছেন টাওয়ার সম্বন্ধে নালিশ করতে। ওনার জন্য ধানিজমিতে গিয়ে টাওয়ার বানাতে হবে!
বিশু আজকাল আর বাগানেও বেরোয় না। একানড়ে রোজ দেখে তরতর করে লোহার তালগাছ বেড়ে উঠছে। দেখতে দেখতে সে গাছ একানড়ের গাছ ছাড়িয়ে গেল। যত দেখে একানড়ে তত ভয় পায়। এত বড়ো! এত উঁচু! দশানড়ে নয়, এ তো শতনড়ে! না! হাজারনড়ে!
সেদিন সন্ধেবেলা মানুষরা লোহার তালগাছের ওপর মস্তো লাল চোখটা লাগাল। নিজের গাছে, অনেক নিচে বসে সেইদিকে চেয়ে ছিল একানড়ে। চোখ মেলে তাকে দেখে কী বলবে, দশানড়ে?
কিন্তু লাল চোখটা আগুনের ভাঁটার মত যেই জ্বলে উঠে ওর দিকে তাকাল, ও বাবা! দশানড়ে কই? এমনকি একশো, হাজার, কোনওটাই না। কম করে এক লাখ! একানড়ে সে দৃষ্টি সহ্য করতে না পেরে জ্ঞান হারিয়ে ঝুপ করে পড়ে গেল গাছ থেকে।
জ্ঞান ফিরে এলে একানড়ে আর কোনও দিকে না তাকিয়ে গ্রাম ছেড়ে চলে গেল। গত পরশু রাতেই খবর পেয়েছে ব্রহ্মদৈত্য আস্তানা গেড়েছে উত্তর পশ্চিমে বকুলগ্রামে। বেশি দূর না। অনেক তালগাছ সেখানে। বকুলগ্রামের একানড়েরা বলেছে, আর একজন এলে ওদের কোনও অসুবিধেই হবে না।
মানুষের উপদ্রব আছে বটে, কিন্তু সে আর কতটুকু? লোহার নারকেলগাছে লক্ষনড়ের চেয়ে কম নিশ্চয়ই!
No comments:
Post a Comment