Monday, January 29, 2018

খোলা বারান্দা

সাদা পর্দা অল্প উড়ছে। কাচের শার্সি খোলা। বারান্দায় কাপড় মেলা নেই। লাল দরজা বন্ধ। গোটা বাড়িটাকে দুপুরের রোদ ভাসিয়ে দিচ্ছে...
হুশ করে বেরিয়ে যেতে যেতে এর চেয়ে বেশি দেখা যায় না। সত্যেশ ঘাড় ঘুরিয়ে দেখার চেষ্টা করলেন। বারান্দায় সে একা-ই। কিন্তু বেশিক্ষণ ঘাড় ফিরিয়ে রাখতে পারলেন না। গাড়ি চালাচ্ছে বাবা। বাবার নজর খুব কড়া। চট করে খেয়াল করে ছেলের হাবভাব। আবার নজর দিলেন সামনের রাস্তায়।
রোজই এক ঘটনা। রোজের মতই আজও কি অদ্ভুত কিছু দিয়ে শেষ হবে? ভাবতে ভাবতেই সত্যেশ দেখলেন – নৌকোয় উঠেছেন। শেষ হতে চলেছে। কাল গাছে উঠেছিলেন। গাছ থেকে পড়তে পড়তেই ঘুম ভেঙেছিল। আজ নৌকোয়।
প্রায় তখনই নৌকো ডুবতে শুরু করল। সামনের গলুই জলের নিচে চলে গেছে। নিশ্চিন্তের নিঃশ্বাস ছাড়লেন সত্যেশ। এইবার ঘুম ভাঙবে।
রাত এখন অনেক। সামনের ছাদ-ছোঁয়া, দেওয়াল-জোড়া কাচের জানলার বাইরের আকাশ একেবারেই নিকষ কালো। বিছানার পাশের টেবিলে ঘড়ি দেখাচ্ছে দুটো বেজে এক মিনিট।
এখন আর ঘুম আসবে না। তিন মাস হল রাতে ঘুম ভাঙছে। রোজ। বিছানা ছেড়ে উঠলেন সত্যেশ। সাবধানে, যাতে বিছানা না নড়ে। মাটিতে পা রেখেই মনে হল, এই সাবধানতার আর প্রয়োজন নেই। যার ঘুমের ব্যাঘাত না ঘটাতে সাবধানে উঠতে হত, সে চিরঘুমের দেশেই গেছে। দুবছর কেটে গেছে তার পরে। প্রায় আড়াই...
একবার ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলেন। পাশের খালি বালিশটা যেন চেয়ে আছে। কাচের দরজা পাশাপাশি টেনে খুললেন। বাইরেটা গুমোট। ভেতরে এ-সি চলছে বলে বোঝা যায় না। এই গুমোট ঝড়ের পূর্বাভাস। বহুদিনের অভিজ্ঞতায় জানেন সত্যেশ।
লম্বা শ্বাস নিলেন। বাতাস এতই নিথর, নাসারন্ধ্র দিয়ে ভেতরে আসতেও যেন তার আপত্তি। মুহূর্তের মধ্যে কপালে বিনবিনিয়ে ঘাম বেরোল। দরজা বন্ধ করে বাইরের দিকে এগিয়ে এলেন। বিশাল টেরেস শেষ হয়েছে কোমর-সমান পাঁচিলে। চওড়া পাঁচিল বানিয়েছিলেন, যাতে বসা যায় – যদিও বসেননি অনেকদিনই। আজ বসলেন। একটু পাশ করে, যাতে বাইরের দিকটা একেবারে পেছনে না পড়ে যায়। বাড়িটা যখন বানিয়েছিলেন, তখন কিছু দূরে সমুদ্র স্পষ্ট দেখা যেত, কিন্তু এখন বাগানের শেষের গাছগুলো বড়ো হয়েছে। ছোটোবেলায় মা-বাবার সঙ্গে হাজারিবাগ গিয়েছিলেন। সেখানকার গেস্ট-হাউসের বাগানের মতো বাগান করবেন ইচ্ছে ছিল সেই তখন থেকেই। বাগানের শেষে, তিনদিকে বড়ো বড়ো গাছ থাকবে। দুপুরের, বিকেলের হাওয়া সরসর করে বয়ে যাবে পাতার ফাঁকে ফাঁকে। তাই হয়েছে। ফলে এখন সমুদ্রের দৃশ্য আর দেখা যায় না।
সাগরপারের রাস্তায় বড়ো বড়ো আলোগুলো জ্বলে আছে একসার একচোখো দৈত্যের মত। নিথর প্রশান্ত মহাসাগরে ঢেউয়ের ছোঁয়া নেই। কিন্তু এই রূপ বেশিক্ষণ থাকবে না। আকাশের দিকে তাকালেন সত্যেশ। লাল। বৃষ্টি হবে রাতেই।
মুখ আর ঘাড় ঘামে ভিজে গেছে। নাইটশার্টটা পিঠে সেঁটে যাচ্ছে। এই নিয়ে ভেতরে গেলে চট করে ঠাণ্ডা লেগে যাবে। বয়স বাড়ার নানা চিহ্নর মধ্যে এও একটা। ভেতরে গিয়ে আগে এসি-টা বন্ধ করলেন। বাথরুমে গিয়ে জামা খুলে তোয়ালে দিয়ে ঘাম মুছলেন মুখ, গা, বুক-পিঠ থেকে। বেরিয়ে এলেন খালি গায়েই। বেডসাইড টেবিলে জলের বোতল নেই। শুতে আসার আগে আনতে ভুলে গেছেন। আগে হলে এটা হত না। ভুলে গেলেও, মাঝরাতে ঘুম ভেঙে দেখতেন ভরা বোতল রয়েছে টেবিলে সাজান। পরদিন সকালে সেটা চলেও যেত। রোজ রাতে নতুন, ভরা বোতল আসত। আজকাল খালি হওয়া অবধি পড়েই থাকে। অগোছাল না হলেও সত্যেশ অত গোছান কোনও কালেই ছিলেন না।
শোবার ঘরের বন্ধ দরজা খুলতেই চৌকো একটা আলোর-বাক্স গিয়ে পড়ল বাইরের মেঝেতে। থমকে দাঁড়ালেন সত্যেশ। আজ মেঝে পরিষ্কার, কিন্তু এখানেই ছিল অনু। আজকের মতোই মাঝরাতে ঘুম ভেঙে খেয়াল করেছিলেন, বিছানা খালি। বাথরুমে নেই, টেরেসে নেই, দেখে, এই দরজা খুলেই দেখেছিলেন। এই আলোতেই। ওই শয়নভঙ্গীমাকেই ইংরেজিতে বলে ‘ক্রাম্‌প্লড’। অনুর লম্বা শরীরটা কেমন কুঁকড়ে ছোট্ট হয়ে গিয়েছিল। মাথার নিচে অতটা রক্ত জমে কালচে হতে শুরু করেছিল।
প্রায় বছরখানেক সত্যেশ জায়গাটা লম্বা পা বাড়িয়ে পেরিয়ে যেতেন। যেন অনুর দেহ আর রক্ত ওখানেই রয়েছে। খানিকক্ষণ তাকিয়ে থাকলে যেন দেখতে পেতেন, মুছে দেবার পরেও রক্তের আবছা ছায়া। আজ অবশ্য আর লম্বা পা ফেলে পার হন না। কিন্তু থমকে দাঁড়ানোটা বদলায়নি।
কেন বেরিয়েছিল অনু? সন্দীপ জিজ্ঞেস করেছিল হাসপাতালে। উত্তরে বলেছিলেন, জানেন না। জল খেতে? জানতে চেয়েছিল সন্দীপ। না। একটা ভরা বোতল অনুর দিকের বেডসাইড টেবিলেও ছিল, বাড়ি ফিরে সত্যেশ দেখেছিলেন। মাঝরাতে অনু কোনও দিন বিছানা ছেড়ে উঠত বলে সত্যেশ জানেন না। বিয়াল্লিশ বছরের বিয়েতে কোনও দিনই না।
খাবার টেবিলে, সাইডবোর্ডে একাধিক জলের বোতল। প্রায় সবকটাই খালি। টেবিলে একটা আধভর্তি বোতল থেকে গ্লাসে ঢেলে জল খেলেন। আগে বোতল থেকেই খেতেন সরাসরি। ডাঃ সিওয়ার্ড বারণ করার পর থেকে আর খান না। স্পন্ডিলোসিস আছে। মাথা পেছনে হেলানো ভালো না। মাথা ঘুরে পড়ে যেতে পারেন।
অনুর মাথা ঘুরে গিয়েছিল? না কি পা পিছলেছিল? হোঁচট খেয়েছিল? না। পায়ে আটকানোর মতো সাহেবি কায়দায় রাগ বা পাপোষ, দেশি ন্যাকড়া, কোনওটাই ছিল না। সাহেবী ঢঙে বানানো বাড়িতে দরজায় চৌকাঠও নেই। জল থাকার প্রশ্নই ওঠে না। কাঠের প্যানেল করা মেঝেতে জল ফেলা বারণ। রক্ত ছাড়া কিছু ছিল বলে মনেও করতে পারেননি পরে।
সায়ক বলেছিল, মার জ্ঞান ফিরলে জিজ্ঞেস করতে। সে সুযোগ দেয়নি অনু। পোস্ট মর্টেম রিপোর্টে লেখা ছিল কিছুই পাওয়া যায়নি। রক্তক্ষরণের ফলেই মৃত্যু।
জল খেয়ে ঘরে ঢুকে খেয়াল হল এবারও বোতলটা আনেননি। ঘড়ি বলছে দুটো আটত্রিশ। অর্থাৎ ঘণ্টা দুয়েক পরে আবার ঘুম ভাঙবে। আবার জল খেতে হবে। গিয়ে নিয়ে আসবেন বোতলটা? থাক।
বিছানায় বসতেই স্বপ্নটা মনে পড়ে গেল। বারান্দা না, ছাদ ছিল। খোলা বারান্দা। অনেকটা সত্যেশের টেরেসটার মতো, কিন্তু অনেক ছোটো। বাইরের রেলিংটা ছিল লোহার শিকের ওপরে কাঠের বাটাম। রং বোধহয় ছিল সবুজ। সবুজ কি ছিল? নাকি সেটা সত্যেশের স্মৃতিতেই? লোহার শিকগুলো কি মরচে ধরা ছিল? মনে নেই। কতবার দেখেছেন সত্যেশ? কয়েকশো? হবে। ক্লাস এইট থেকে টেন, তিন বছর সপ্তাহে তিন দিন ওই রাস্তায় যাতায়াত। যাওয়ার সময় রোদের আলো, ফেরার পথে সন্ধের আঁধার। কোণে বোগানভিলিয়ার গাছ ছিল? নাকি সেটা নিজের বাগানে রেখেছেন বলেই মনে হচ্ছে ছিল? দেওয়ালটা হলদে ছিল। টেরেসের ওপারের ঘরের দেওয়াল উজ্জ্বল হলুদ, কিন্তু বাইরের, দোতলা থেকে যে দেওয়ালটা রাস্তায় নেমে এসেছে, সেটা ছিল শ্যাওলা মেখে কালচে। মনে আছে।
আর মনে আছে দরজাটা। লাল দরজা। পোস্ট-অফিস রেড। এমন রঙের দরজা ছোটোবেলায় গৃহস্থবাড়িতে কখনও দেখেছেন বলে মনে পড়ে না।
না, আরও কিছু মনে আছে। গত ক’দিন স্বপ্নে যে এসেছে তার কথা মনে আছে। সাকুল্যে দু-দিন তাকে দেখেছিলেন। প্রথম দিন দাঁড়িয়ে ছিল রেলিঙে ভর দিয়ে। একলহমার দেখা, তবু সেই স্বপ্নালু চোখের দৃষ্টি দেখে চমকে উঠেছিলেন। গাড়ি পেরিয়ে গিয়েছিল পরমুহূর্তে। চট করে ঘাড় ঘুরিয়েছিলেন। না, সত্যেশকে দেখেনি। দেখলেও ফিরে তাকানোর যোগ্য মনে করেনি।
পরের দিনটা ছিল কয়েক মাস পরে। গাড়িটা রাস্তার বাঁকটা ঘোরার পরেই দেখেছিলেন, রেলিং থেকে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে ঘুরে ঘরের দিকে হাঁটা দিয়েছে। পরনে লাল-পাড় সাদা শাড়ি। এই বয়সের মেয়েরা সাধারণত এই রঙ পরে না। শুধু পুজোটুজোর দিনে। লম্বা বিনুনিটা প্রায় হাঁটুর কাছে দুলছে। ওই আর এক মুহূর্তের দেখা। ব্যাস। তারপর থেকে রোজ শুধু খালি বারান্দা, রেলিং আর বন্ধ একটা লাল দরজা।
কিন্তু আজ, এতদিন পরে সে কেন স্বপ্নে ফিরতে শুরু করল অনু চলে যাবার পরেই? অস্বস্তি নিয়ে পাশ ফিরলেন সত্যেশ। এতদিন মনের কোন কোণে লুকিয়েছিল সেই অপরিচিতা?
সত্যেশের চোখ বন্ধ হয়ে এল। গভীর ঘুমে কখন গুমোট আকাশ ভেঙে বৃষ্টি এল, জানতে পারলেন না।
**
পরদিন সকালে ব্রেকফাস্ট টেবিলে বসে অস্বস্তিটা ফিরে এল। কেন হচ্ছে এমন? চোদ্দ বছর বয়সে যাকে দেখে মনে হয়েছিল সুন্দরী, সে কেন আজ স্বপ্নে ফিরে আসে? যে মুখটা সত্যেশের স্মৃতিতে রয়েছে, সেটা আসল না-ও হতে পারে। যাকে জীবনে দু’বার মাত্র দেখেছেন, তাও একবার পেছন থেকে, তাকে কি এত মনে রাখা সম্ভব? তবু, সে এত কেন ফিরে আসে, অসতর্ক স্বপ্নের আড়াল ধরে?
ছেলেবেলায় ডাকাবুকো ছিলেন না মোটেই। বরং ভীতু ছিলেন। বিদেশ যাবার খবরে মামা হেসেছিল। বলেছিল, “তুই যাবি অ্যামেরিকা? দেখিস ভয়ে প্লেনে অ্যা করে দিবি না তো?”
করেননি। কিন্তু সাহসের অভাব ছিল বইকি। জায়গাটা সত্যেশের পাড়া থেকে অনেকটাই দূরে। বয়ঃসন্ধিতে বন্ধুদের সঙ্গে যখন রাস্তা-হাঁটা অভ্যেস করছেন তখন কখনও ধারেকাছেও যাননি। শুধু একবার একা একা, সেদিন অন্য কেউ আসেনি কী কারণে, হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে গেছিলেন।
দোতলার বারান্দা খালি ছিল। লাল দরজা বন্ধ। বোকার মতন হেঁটে পেরিয়ে গিয়েছিলেন। পরের মোড়ে পৌঁছে আবার ফিরে এসেছিলেন। আড়চোখে দেখেছিলেন, বারান্দায় কেউ নেই। দরজাও খোলেনি। সেই সঙ্গে চোখে পড়েছিল, চোয়াড়ে চেহারার ছ-সাতটা ছেলে উলটো দিকের ফুটপাথে দাঁড়িয়ে ক্যারম খেলছে। সবাই তাকিয়ে ছিল বোর্ডের দিকে, কিন্তু একটা ছেলে, পেছনে দাঁড়িয়ে খেলা দেখছিল, হঠাৎ সিগারেট জ্বালিয়ে দেশলাইটা ফেলতে গিয়ে মুখ তুলে চেয়েছিল সত্যেশের দিকেই। মনে হয়েছিল, একটা বেপাড়ার ছেলেকে এখানে ঘুরঘুর করতে দেখলে ওরা সহ্য করবে না। মাথা নিচু করে পা-চালিয়ে চলে গিয়েছিলেন।
অনেক ফন্দি করেছিলেন। যেমন, কাগজে একটা বানানো নাম লিখে নিয়ে গিয়ে বলবেন, “এই বাড়িতে অনুপ স্যার থাকেন? ফিজিক্স পড়ান? আমাকে একজন এই ঠিকানা দিয়েছে।” যাননি। সাহস হয়নি।
খবরের কাগজটা নামিয়ে রেখে টোস্ট তুলতে গিয়ে দেখলেন, প্লেট খালি। কাগজও পড়েননি, কখন টোস্ট খেয়েছেন, খেয়ালও করেননি। কফির কাপটা ভরে, নিয়ে গেলেন বসার ঘরে।
কাগজে মন বসছে না। টিভি চালালেন। সি-এন-এন চ্যানেলে মহিলার মুখ ভেসে উঠল। মিউট বোতামটা টিপে দিলেন কী বলছে শোনার আগেই।
মতলব করেছিলেন অনেকই। ভেবেছিলেন, কাঞ্চনকে বলবেন। কাঞ্চনের সাহস ছিল, বেপাড়ার ছেলেদের ভয়ে কাঁপত না। বন্ধু-বান্ধবও ছিল অনেক, হয়ত দেখা যেত ওদের কাউকে চেনেও। কিন্তু কাঞ্চনকে বলায় সমস্যা ছিল। পলুর ঘটনাটার জন্য। পলু একটা চিঠি দিয়েছিল, কুতুবদের পাড়ার কোঁকড়া চুলওয়ালা মেয়েটাকে দেবার জন্য। কয়েকমাস পরে পলু দেখে লেকে মেয়েটাকে আলুকাবলি খাওয়াচ্ছে কাঞ্চন। পলুকে বলেছিল, “আরে, দেখছিলাম মেয়েটা কেমন। যে-কোনও মেয়ের সঙ্গে তোকে যেতে দেব, এমন বন্ধু পেয়েছিস আমাকে?”
বলতে-পারা-যায় এমন আর কেউ ছিলই না। তারপরে ক্লাস ইলেভেনে ওই টিউশনে যাওয়া বন্ধ হয়ে গেল, ফলে রাস্তাটাই সত্যেশের জিওগ্রাফির বাইরে চলে গেল। তবে প্রায়ই মনে পড়ত। অনেক বেশিই মনে পড়ত। নতুন কো-এড স্কুলে মেয়েদের সঙ্গ ভালো লাগত না। ভাবতেন, হয়ত এই স্কুলেই অন্য ক্লাসে পড়ে, নাইন, বা টেন-এ? ভয়ও হত, যদি বয়স বেশি হয়?
অন্তু গল্প করত, কেমন বাসে উঠে একটা দারুণ দেখতে মেয়ের পেছনে পেছনে লেডিস সিটের দিকে চলে গেছিল। আশেপাশের মহিলারা যখন বলেছেন একটা ছেলে কেন মেয়েদের দিকে এসেছে? বাসের ওদিকে জায়গা নেই? তখন মেয়েটাকেই জিজ্ঞেস করেছিল, “ক্যান ইউ টেল মি, হোয়াই আই কেম দিস ওয়ে?”
তারপরে মেয়েটার পেছনে পেছনে নেমে, বাড়ি দেখে এসেছিল। তিন মাস পরে গল্প বলত, মেয়েটাও একই ক্লাসে পড়ে, অন্য স্কুলে। মেয়েটার মা’র কাছে ও-ও ইংরেজি শিখছে। কেমন মাঝখানে বসে মা পড়ান উল বুনতে বুনতে, আর ওরা দুজনে দু দিক থেকে মায়ের সামনে বই ধরে থাকে, বইয়ের আড়ালে আঙুলে আঙুল জড়িয়ে।
নপুংসক মনে হত নিজেকে।
ভুলেই তো গেছিলেন। কিন্তু হঠাৎ কেন স্মৃতির সিংহদরজা খুলে গেল? হাত বাড়িয়ে রিমোটটা তুলে নিয়ে নিঃশব্দ টিভিটা বন্ধ করে দিলেন আবার। রাতের ঝড়ের পরে বাগানটা এলোমেলো হয়ে আছে। আকাশে বৃষ্টির সম্ভাবনা। তাই বাগানে না গিয়ে আবার দোতলায় ফিরে গেলেন। বারান্দাতেই পায়চারি করবেন খানিকক্ষণ।
ওপরের বসার ঘরের দরজা দিয়ে টেরেসে গেলেন। দরজা টেনে খুলতে গিয়ে মনে পড়ে গেল। শিক ছিল না। লোহার গ্রিল ছিল। আগেকার দিনের ডিজাইন। দুদিকে দুটো লোহার রড, তার নিচের দিক থামের পায়ার মতো চওড়া, আর মাথা দুটো নুয়ে পড়েছে যেন পদ্মের আকারে। মাঝখানে ওপর নিচে একসার ফুল, আলপনার মতো করে সাজানো।
বাঁ হাত তুলে চুলের ভেতর দিয়ে চালালেন সত্যেশ। কেন এত কথা মনে পড়ছে? কলেজ ছেড়ে বেরোবার পরে তো আর…
সম্বিত ফিরল ফোন বাজার শব্দে। শোবার ঘরের ফোন। এই নম্বরে ফোন করে কেবল ছেলেরা। পা চালিয়ে গিয়ে ধরলেন। “হ্যালো?”
সায়ক। “সেল ফোনটা সাথে রেখো বাবা, কত বার বলেছি, আমিও, দাদাও – একটা সমস্যা হলে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারবে না।”
খেয়াল থাকে না। সকালে উঠে গেছেন, বেডসাইড টেবিলে সেল-ফোনটা পড়ে আছে।
বললেন, “জানিস তো, খেয়াল থাকে না। তুই কোথায়? ফিনিক্সেই?”
সায়ক এর আগে ছিল হার্ভার্ডে। বছরখানেক হল এসেছে ফিনিক্স বিশ্ববিদ্যালয়ে কী কাজ নিয়ে। বোঝেন না সত্যেশ। বুঝতে চানও না। দুই ছেলেই বায়োটেকনোলজি নিয়ে পি-এইচ-ডি করে বাপের জ্ঞানবুদ্ধি থেকে অনেক দূরে চলে গেছে। একসময় ভাবতেন, যতই বায়ো হোক, টেকনোলজি তো – ইঞ্জিনিয়ার হয়ে বুঝবেন না? কিন্তু ছেলেরা কলেজে থাকাকালীনই পরস্পর কথা বললে একবার এর দিকে, আর একবার ওর দিকে চেয়ে থাকতেন হাঁ করে।
“ফিনিক্সেই। তুমি বাড়ি আছ তো? আমি আসছি।”
“এখন?” একটু থতমত খেলেন সত্যেশ।
“এখন রওয়ানা দিচ্ছি। সন্ধের আগে পৌঁছব না।”
“আচ্ছা। রাতে খাবি তো?” এদেশে খাবার-দাবার নিয়ে চিন্তা করতে হয় না, তবু, সত্যেশ আর অনু দুজনেই ছেলেরা এলে বাইরে থেকে খাবার আনাতেন না।
“না-না,” ওদিক থেকে সায়কের গলা এল। “তুমি রান্না করবে না। আমি এসে রান্না করব। আমি ধরো আর ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যেই বেরোব। সুতরাং সন্ধে সাতটা সাড়ে-সাতটার মধ্যেই পৌঁছে যাব। তুমি এখনও সাড়ে নটাতেই খাও তো?”
তা খান। “রাতে বৃষ্টি হয়েছে। একটু সময় হাতে নিয়ে বেরোস।”
“জানি। ওয়েদার দেখে নিয়েছি। চিন্তা কোরো না। লবস্টার খাও তো এখনও? না কি সিওয়ার্ড বারণ করেছে?”
করেনি জেনে নিশ্চিন্ত হয়ে সায়ক বলল, “আর তাহলে… আচ্ছা থাক। গিয়েই কথা হবে।” বলে লাইন কেটে দিল।
কিছু একটা বলতে গিয়েও বলল না। ছেলেদের চেনেন সত্যেশ। ফোন রেখে সেল ফোনটা হাতে নিয়ে দেখলেন, আর কোনও ফোন কি এসেছিল?
না। কেবল সায়কই করেছিল। ফোনটা পকেটে নিয়ে আবার নিচে গেলেন সত্যেশ। সায়ক রান্নাবান্না করতে ভালোবাসে। মায়ের কাছে শিখত ছোটো থেকে। বলেছে যখন, সবই নিয়ে আসবে, তবু একবার ফ্রিজটা খুলে দেখে নিলেন। ফ্রোজেন ডিনার, স্যালাডের উপকরণ, স্যুপ, কোনওটারই অভাব নেই। দু’জনের মতো হয়ে যাবে। রান্না সত্যেশ করেন না, তবে ভ্যারাইটির অভাব থাকে না।
বেলা হয়নি বেশি। সকালে ভেবেছিলেন দুপুরে ম্যাডেলিন’স বা রবিন’স-এ গিয়ে খেয়ে আসবেন। ম্যাডেলিন’স-এর সী-ফুড – সী বাস, স্ক্যালপ, কাঁকড়া আর লবস্টার সবই দারুণ। ফিলে মিঁয়ঁর-ও তুলনা নেই। তুলনায় রবিনের গোটা আম্বিয়েন্স, সেই সঙ্গে লবস্টার এঞ্চিলাডা, বিস্ক – এগুলোও অনেকদিন খাননি। আগে অনুর সঙ্গে প্রায়ই যাওয়া হত…
কিন্তু সায়কের রান্না বেশ রিচ। দুপুরে হালকা খাওয়াই উচিত।
ফ্রিজে আধখাওয়া খোলা স্যুপের প্যাকেটগুলো কী কী আছে জানেন। তবু আর একবার দেখে নিলেন। নাহ, বিফ-স্টু, স্টেক-অ্যান্ড-পটেটো, কোনওটাই খেতে ইচ্ছে করছে না। নতুন প্যাকেট খুলতেই হবে। রান্নাঘরের লাগোয়া লার্ডারের তাকে সাজানো স্যুপের প্যাকেটগুলোর আঙুল বুলিয়ে দেখলেন। গোটা ত্রিশেক প্যাকেট। সবকটা আলাদা। একই জিনিস বেশি রাখা পছন্দ করেন না সত্যেশ। সৌখিন খাইয়ে। কোনটা নেবেন? খানিক ভেবে তুলে নিলেন চেডার-ব্রকলি স্যুপ মিক্স। রান্নাঘরের কাউন্টারে রেখে চান করতে গেলেন। বললেন, “সিওয়ার্ড, দেখো। সত্যেশ আজ লাঞ্চ করবে ভেজিটেব্ল স্যুপ দিয়ে।”
**
খেয়ে একবার ভাবলেন শোবেন। দুপুরে শোয়া অভ্যেস নেই, মনে হল, যদি আবার দেখতে পান! লোভ সামলাতে হল। বয়স হয়েছে, ঘুম কমেছে। দুপুরে ঘুমিয়ে পড়লে রাতে জেগে থাকতে হয় অনেকক্ষণ। সত্যেশ সেটা পছন্দ করেন না।
বেরিয়েই পড়লেন। গাড়ি করে ঘুরলেন এদিক ওদিক। প্যাসিফিক কোস্ট হাইওয়ে ধরে খানিকটা গিয়ে মেঘলা আকাশের নিচে সমুদ্রের ভেজা হাওয়া খেলেন কিছুক্ষণ। পাশ দিয়ে শেরিফ গেল। প্যাক্সটার গাড়ির গতি কমিয়ে কাচ নামিয়ে জিগেস করল, “এভরিথিং অল রাইট?”
হাত নেড়ে আস্বস্ত করলেন। অনেক দিন পাশাপাশি থাকার সুবাদে সকলেরই মুখ চেনা। অনুর শেষ সময়ে প্যাক্সটারও এসেছিল। টুইন সিটিজ কমিউনিটি হসপিটাল থেকে ফিনিক্সে মেয়ো হসপিটালে নিয়ে যাবার জন্য হেলিকপ্টার আনাতে ফোন করেছিল ও-ই।
অস্থির লাগছে। গাড়ি চালিয়ে গেলেন আরও মিনিট দশেক দূরে মরো-বে সিনিয়র সিটিজেন সেন্টারে। কেউ নেই দিনের এই সময়ে, কোনও অ্যাকটিভিটিও হচ্ছে না, তবে কিছুদিন আগে একটা বুক-ক্লাবের কথা আলোচনা করেছিলেন বারবারা গিলেস্পির সঙ্গে। তারই বাহানা নিয়ে হাজির হলেন।
অফিসে নেই বারবারা। আজ আর ফিরবে না। গাড়ি ঘুরিয়ে আবার ফিরলেন, আগেই লাইব্রেরি যাওয়া উচিত ছিল।
পাব্লিক লাইব্রেরির রিডিং রুমটা সত্যেশের খুব প্রিয়। আজকাল সপ্তাহের অনেক ঘণ্টাই কাটে এখানে। আজও একটা বই নিয়ে বসলেন। বই খোলাই রয়ে গেল সামনে।
হায়ার সেকেন্ডারি পাশ করে ফিরে গিয়েছিলেন সেই রাস্তায়। সে দিন ফুটপাথে ক্যারমের আসর ছিল না। তবে ছাদও খালি ছিল। লাল দরজাটা খোলা ছিল। রোদে জ্বলে যাওয়া একটা পাতলা পর্দা – বোধহয় পুরনো শাড়ি সেলাই করে বানানো – হালকা বাতাসে নড়ছিল অল্প অল্প। উলটো ফুটপাথে পানের দোকানে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন একটা মিঠা পান বানিয়ে দিতে। মা যেরম চাইত, তেমন। চুন কম, খয়ের, মিষ্টি সুপারি, চমনবাহার, আর কী কী এখন মনে নেই… হাতে নিয়ে কী মনে হয়েছিল, পানটা মুখে দিয়ে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, আর একটা বানাও। সেটা সঙ্গে নিয়েছিলেন মা-কে দেবেন বলে। কিন্তু বারান্দায় কেউ আসেনি। আরও একটু সময় কাটানোর জন্য এক প্যাকেট ফিলটার উইলস চেয়েছিলেন। তারপর একটা দেশলাই চেয়েছিলেন। তারপরে একটা বড়ো নোট দিয়েছিলেন, যাতে ভাঙানি পেতে দেরি হয়। তাও বারান্দা খালিই রয়ে গিয়েছিল। প্রায় সারাক্ষণ আড়চোখে খোলা দরজার দিকে চেয়েছিলেন সত্যেশ। হাওয়ায় পর্দার নড়ায় চমকে চমকে উঠেছিলেন। বুঝি এল…
আসেনি। সে দিনই শেষ গিয়েছিলেন…
সাইলেন্ট ফোনে আলো জ্বলে উঠল। সায়ক। বাইরে দিনের আলো যথেষ্ট রয়েছে। এরই মধ্যে বাড়ি এসে দরজা বন্ধ দেখেছে তা হতে পারে না। দ্রুতপায়ে বেরিয়ে গিয়ে ফোন ধরলেন।
সায়ক এখনও ঘণ্টা দেড়েক দূরে। রাস্তায় বৃষ্টি নেই বলে দেরি হয়নি। সত্যেশ ফিরলেন। লাইব্রেরিতে কিছুই পড়েননি। কোন বইটা হাতে নিয়েছিলেন তাও মনে নেই। বাড়িতে একা থাকলে সামান্য কিছু আলো জ্বালেন। আজ ছেলে আসবে, তাই গেট থেকে ড্রাইভ-ওয়ে, পোর্চ, বসার ঘর আর ডাইনিং রুমের আলো জ্বেলে রাখলেন। দোতলার ঘরের আলো জ্বাললেন সামান্য, যাতে বাইরে থেকে অন্ধকার না লাগে। টেরেসের আলো জ্বাললেন। পাঁচিলের নিচে কনসিলড আলোর সারি, বাইরে ভেতরে দু-দিক থেকেই মোহময়ী লাগে। অনুর খুব প্রিয় ছিল এই আলোগুলো।
আরও ঘণ্টা দেড়েক সময় পার করে সায়কের গাড়ি যখন গেটের সামনে এসে দাঁড়াল, সত্যেশ তখন সন্ধের ঘনায়মান অন্ধকারে পোর্চে বসে। রিমোট দিয়ে গেট খুলে দিয়ে পোর্চের দরজা খুলে ছেলেকে স্বাগত জানাতে বাইরে সিঁড়িতে এলেন।
দুই ছেলেই কলেজে পড়ায়। তাদের চেয়ে সত্যেশের ঠাট-বাট অনেক বেশি রিটায়ার্মেন্টের পরেও। সায়কের কাদামাখা তোবড়ানো গাড়িটা দেখে অল্প বিরক্ত লাগল সত্যেশের। সত্তরের দশকে এরকম গাড়ি চড়ে বেড়াত প্রফেসররা। জমানা পালটেছে, কিন্তু সত্যেশের দুই ছেলে ওঁর সৌখিনতার ছোঁয়াও পায়নি। শুধু সায়ক তবু ভালো খেতে পছন্দ করে। সন্দীপ তাও নয়।
সায়ক গাড়ি থেকে মাথা বের করে বলল, “হাই, ড্যাড, তুমি সন্ধের পরে বাইরে বসে আছ কেন?”
“তুই আসবি বলে বসে আছি,” বলে জ্যাকেটের পকেট থেকে গ্যারেজের দরজার রিমোটটা বের করে বললেন, “গাড়ি কি পেছনে নিয়ে যাবি? মালপত্তর অনেক আছে? বের করে নিয়ে গ্যারেজ করিস?”
সায়ক নেমে বলল, “হ্যাঁ, পেছনে নিয়ে যাব। দাঁড়াও। তার আগে একটা কাজ আছে।”
সায়কের কথা শেষ হতে না হতে সত্যেশ দেখলেন, গাড়ির ডানদিকের সামনের দরজাও খুলতে লেগেছে। থতমত খেলেন। সায়ক সঙ্গে কাউকে আনছে বলেনি। সত্যেশ দুজনের খাবার মত থালা বাটি বের করেছেন। টেবিলে এখন আর একটা জায়গা করতে হবে।
দরজা খুলে বেরোল একটা মেয়ে। একে সত্যেশের থেকে অনেকটা দূরে, তায় গাড়িটা সায়ক দাঁড় করিয়েছে ছায়ায় – পোর্চের বাইরের আলোটা ওখানে ম্লান। তবু বুঝলেন মেয়েটা ভারতীয়, বা ভারতীয় বংশোদ্ভূত। ওরকম কালো চুলে লম্বা এক-বিনুনি আর কোনও জাতির মেয়ে করে বলে উনি জানেন না।
সেই সঙ্গে একটা অসহায়তা এসে বসল মাথা জুড়ে। না-বলে একটা মেয়েকে নিয়ে এল সায়ক? এখন রাতে থাকবে কোথায় মেয়েটা? না কি এই অজুহাতে সায়কও হোটেলে গিয়ে রাতে থাকবে?
মেয়েটা একটা ক্যাসেরোল হাতে গাড়ির পেছন দিক থেকে হেঁটে এগিয়ে আসছে, সায়ক ওর ডান পাশে পৌঁছে হাত বাড়িয়ে দিল। মেয়েটা ওর কনুইয়ের ভাঁজে ডান হাত রেখে আসছে, মাথা নিচু, হিল তোলা জুতো… পোর্চে ওঠার জন্য চারটে সিঁড়ি, তার নিচে এসে মেয়েটা মুখ তুলে তাকাল আর সত্যেশের মনে হল যেন ক্যালিফোর্নিয়ার কুখ্যাত ভূমিকম্প পায়ের নিচের মাটি নড়িয়ে দিয়ে গেল। এ সেই মুখ। যে মুখের ছবি গত চার দশকেরও বেশি বয়ে বেড়াচ্ছেন সত্যেশ। যে মুখ গত তিন মাস রোজ রাতে দেখা দিয়ে যাচ্ছে স্বপ্নে।
হতভম্ব ভাবটা কাটিয়ে উঠতে উঠতে চারটে সিঁড়ি পেরিয়ে দুজনে সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। হাত থেকে গ্যারেজের দরজার রিমোটটা নিয়ে সায়ক বলল, “এ হল প্রমিতি। আমি গাড়ি পেছনে নিয়ে যাচ্ছি।”
সত্যেশ কিছু বলার আগে সায়ক স্ক্রিন ডোর ঠেলে খুলে বলল, “কাম ইনটু মাই ফাদার্স পার্লার।” সত্যেশও হাতটা বাড়িয়ে বললেন, “প্লিজ, কাম ইন,” আর প্রমিতিও ভেতরে গেল। বসার ঘরে ঢুকে এদিক ওদিক দেখে বলল, “আঙ্কল, আমি ফুল আনতে চেয়েছিলাম, সায়ক আমাকে বলল, আপনি ফুল-টুলের ধার ধারেন না। তাই আমাকে দিয়ে এটা আনাল।” বলে হাতে ধরা ক্যাসেরোলটা বাড়িয়ে দেবার মুহূর্তে সায়ক এসে, “এতে ডিনার আছে,” বলে নিয়ে নিল। প্রমিতি বলে চলল, “অবশ্য ফুল আনলে অতিরিক্ত হত!”
সায়কও এদিক ওদিক চেয়ে বলল, “তাই তো, এত ফুল আমি আগে কখনও দেখিনি… বাবা ফুল দিয়ে ঘর সাজাচ্ছে… বাপরে!” সত্যেশ কিছু বললেন না। অনুর শেষ ক’বছরের এই সখটা গত তিন মাসে আর বদলাননি। বরং গেল মাসে আবার ফ্লোরিস্টের সঙ্গে কনট্র্যাক্টটা রিনিউও করেছেন।
বসার ঘরে বসে সত্যেশের মনে হল, এই মুখ যতই একই রকম হোক না কেন, এটা সায়কের জেনারেশনের মুখ। সত্যেশের স্মৃতির মুখ এর চেয়েও কমবয়সী। কিন্তু আজ সে মুখ এমন অল্পবয়সী আর নিশ্চয়ই নেই।
পরিচয়ের পালা শেষ হয়নি। সায়ক বলে চলল, “প্রমিতিও আপাতত ফিনিক্সে। ও ইথাকায় কোর্নেলে আর্কিটেকচার নিয়ে পি-এইচ-ডি করছে। ওর স্পেশালাইজেশন ইন্টিরিয়র। থিসিসের সাব্জেক্ট মোজাইকস অফ অ্যামেরিকান পাস্ট। ওকে বললাম হার্স্ট কাস্ল্‌-এর মোজাইক শুনেছি বিশ্ববিখ্যাত। চলো দেখে আসি।”
সত্যেশ বলেই ফেললেন, “আমাকে একবার বলবি তো! স্পেয়ার বেডরুমটা একেবারে অগোছাল হয়ে রয়েছে...”
থেমে গেলেন। যদি বলে – আমরা দুজনে আমার ঘরেই থাকব – কী করবেন সত্যেশ? কী বলবেন? কিন্তু সায়ক হেসে বলল, “ও আজ দাদার ঘরেই শোবে। দাদা পারমিশান দিয়েছে।”
ও।
পরদিন সকালেই ওরা হার্স্ট কাস্ল্‌ যাবে। সারা দিন ওখানেই কাটিয়ে সন্ধের কন্ডাকটেড ট্যুর দেখে চলে যাবে ফিনিক্স। আরও এক দিনের ছুটি। সে দিন ওরা দুজনে যাবে স্যান ডিয়েগো। প্রমিতির মা-র সঙ্গে দেখা করতে।
বললেন, “তোমার বাবা…?”
প্রমিতি বলল, “বাবা নেই। মা এখন একাই থাকে। আমার দাদা থাকে ক্যানাডায়। টরোন্টো।”
ভীষণ লোভ লাগছিল আরও কথা জিজ্ঞেস করতে। কী ভাবে করবেন? জানতে চাইলেন, “দেশে কে আছে? আমাদের আর কেউ নেই। আমার ভাইবোন ছিল না, আর ওদের মা-র একমাত্র দাদাও আর নেই। দাদার ছেলেমেয়ের সঙ্গে শুধু ই-মেইলেই যোগাযোগ। তাই দেশে ফেরা হয় না।”
প্রমিতিও দেশে যায়নি বহুদিন। সুতরাং ওরা কোথা থেকে এসেছে, কোথায় বাড়ি ছিল, ইত্যাদি জানা গেল না। এদেশের রীতি নয় সেটা, তবে দেশজ-রা করে থাকে। সন্দীপের বউ লাটভিয়ান। ওর ক্ষেত্রে কিছু জিজ্ঞেস করার সুযোগই ছিল না। আগ বাড়িয়ে কতটা জিজ্ঞেস করা যায় ভেবে পাচ্ছিলেন না। কথাটা ঘুরিয়ে নিলেন হার্স্ট কাস্ল-এর দিকে। খানিকক্ষণ একথা-সেকথার পরে সায়ক উঠল গাড়ি থেকে বাজার বের করে এনে রান্না করতে। এক ফাঁকে বাবা-সুলভ প্রশ্ন করে নিলেন একটা। বললেন, “লবস্টার-ইন-বাটার বানাচ্ছিস, শার্ডনে বের করব, না শ্যাম্পেন খুলব?”
সায়ক বলল, “শার্ডনেই খোলো।”
ডিনার ভালোই হয়েছিল। কিন্তু আড্ডা জমল না। কী বলবেন দুজনকে, কী জিজ্ঞেস করবেন প্রমিতিকে, ভেবে পেলেন না। অনু থাকলে এমন অসহায় লাগত না। সায়ক আর প্রমিতিও জমাতে পারল না। কথা হোঁচট খেতে খেতে চলল, শেষে যখন শুতে গেলে আর অভদ্রতা হবে না, তখন সত্যেশ গুডনাইট বলে চলে গেলেন নিজের ঘরে।
শুতে না গিয়ে টেরেসে বসে রইলেন অনেকক্ষণ। গ্রীষ্মে বৃষ্টি এখানে কমই হয়। কাল রাতের মেঘ উড়ে গেছে, আকাশ পরিষ্কার, গরমও নেই। কী মনে হল, ফোনটা বের করলেন পকেট থেকে। চমকে দেখলেন, ফোন বাজছে। সন্দীপ। ধরলেন।
“আবার ফোন দূরে রেখেছিলে?” সন্দীপের নালিশভরা গলা ভেসে এল।
সায়ক আর প্রমিতি এখনও ওঠেনি সিঁড়ি দিয়ে। বললেন, “না রে ছিল পকেটেই। কিন্তু দুপুরে সেই যে লাইব্রেরিতে গিয়ে সাইলেন্ট করেছি, সেটা আর বদলানো হয়নি।”
“বড্ডো দুশ্চিন্তা করাও। ভাগ্যিস আজ সায়ক আছে বাড়িতে…” বলে গলা নামিয়ে জিজ্ঞেস করল, “কী হল? পছন্দ হয়নি তোমার?”
একটু অবাক হলেন। “কী পছন্দ হবে?”
তেমনই ফিসফিস করে সন্দীপ বলল, যেন সামনেই বসে আছে, “আরে মেয়েটাকে। কী নাম – ওই যে, প্রমিতি...”
এবার সত্যেশও গলা নামালেন। বললেন, “কে বলল পছন্দ হয়নি? বেশ মেয়ে।”
“কিন্তু ঠিক করে কথা টথা বললে না, সায়ককেও কিছু বললে না...”
এবার বাবা-সুলভ গাম্ভীর্য এনে বললেন, “সায়কও তো আমাকে কিছু বলল না। তাও তো আমি জিজ্ঞেস করেছি শার্ডনে, না শ্যাম্পেন? বলল, শার্ডনে।”
মহাদেশের ওপার থেকে সন্দীপের হাসির শব্দ ভেসে এল। “বাবা, ও তোমার এই সব ধাঁধা-মার্কা প্রশ্ন কোনওদিন বুঝতও না, আজও বোঝেনি। যাই হোক। আমি ওকে জানিয়ে দিচ্ছি, চিন্তা নেই – বাবা অ্যাপ্রুভস, তাই তো?”
তাই। সায়ক সবসময়েই সত্যেশের অ্যাপ্রুভাল খুঁজত। ওর ক্লাস টিচার বলেছিল, “হি থিঙ্কস দ্য ওয়ার্ল্ড অফ ইউ। ও ভাবে ওর দাদা তোমার প্রিয়। তাই তোমার ভালোবাসা পেতে আরও একটু খাটে।”
তার দরকার ছিল না। দুজনকে কখনওই আলাদা চোখে দেখেননি সত্যেশ। মাথা নেড়েছিল ক্লাস টিচার। “হি ডাজ নট নো দ্যাট। ও ভাবে আরও একটু এফর্ট দিলেই বাবার চোখে অ্যাপ্রুভাল পাবে। ইট ইজ আপ টু ইউ টু প্রুভ ইওরসেলফ ইন হিজ আইজ।”
সন্দীপ ফোনে আগে জানিয়েছিল লাটভিয়ার জোয়ানার কথা। তারপরে নিয়ে এসেছিল দেখা করতে। সায়ক দাদার সঙ্গে কথা বলেছে। এখনও বিয়ে ঠিক করেনি। আগে বাবার কাছে নিয়ে এসেছে প্রমিতিকে। বাবা অ্যাপ্রুভ করলে তবেই কথা এগোবে।
“বাবা?” লাইনের ওপারে সন্দীপ এখনও রয়েছে। ভাবছিলেন এখনই যাবেন কি সায়ককে বলতে? কিন্তু সন্দীপের ঘাড়ে দায়িত্বটা দিয়ে দিলে কাজ কমে। বললেন, “হ্যাঁ। আমার আপত্তি নেই। মেয়েটা দেখতে শুনতে ভালোই। কিন্তু ওর বাড়ির সম্বন্ধে কিছুই জানি না...”
“সে জেনে নেওয়া যাবে। ওর মা তো দূরে থাকে না। বলে দিচ্ছি তাহলে?”
রাত তিনটেয় ঘুম ভাঙল আজ। বাইরে তারাভরা রাত উজ্জ্বল। আজ গাড়ি চালাচ্ছিলেন সত্যেশ নিজেই। আর আজ বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল প্রমিতি।
**
সকালে ঘুম ভেঙে আর ভালো করে মনে করতে পারলেন না। প্রমিতি কি ছিল বারান্দায়? না কি ছেলেবেলায় দেখা সেই মুখটাই? বাথরুমে গিয়ে মুখ ধুয়ে বারান্দার দিকের ফ্রেঞ্চ উইন্ডোর পর্দা সরিয়ে দেখলেন টেরেসে দাঁড়িয়ে প্রমিতি আর সায়ক।
আড়াআড়ি দরজা টানার শব্দে মুখ ফিরিয়ে তাকাল দুজনেই। এক ঝলক উদ্বেগ কি দেখা গেল চোখেমুখে? সত্যেশ একগাল হেসে বললেন, “গুড মর্নিং। তোমরা কি তাড়াহুড়ো করে বেরোবে, না কি ধীরেসুস্থে ব্রেকফাস্ট করে?”
প্রমিতির মুখ থেকে মেঘটা কেটে গেল। উচ্ছ্বসিত স্বরে বলল, “আঙ্কল্‌ আপনার এই ছাদটা না, জাস্ট দারুণ। মা দেখলে একেবারে ফিদা হয়ে যেত। মা বারান্দা খুব পছন্দ করে।”
খুব সাবধানে, যাতে গলার সুরে কিছু ধরা না পড়ে, বললেন, “তোমাদের বাড়িতেও বারান্দা আছে?”
ঠোঁট উলটে প্রমিতি বলল, “বারান্দা নেই। ওই, স্যান ডিয়েগোর অ্যাপারটমেন্ট। তবে মা নাকি ছোটোবেলায় বারান্দাওয়ালা বাড়িতে থাকত। ভাড়া বাড়ি ছিল। তারপরে অবশ্য সল্ট লেকে ফ্ল্যাটবাড়িতে চলে যায়।”
সায়ক বলল, “আমি কফি বানিয়ে আনি। বাবা, কোন কফি বানাব?”
আগে তিন চার রকম কফি থাকত, এখন নেই। বললেন, “অ্যারাবিকাই আছে খোলা। দেখ, কিচেন কাউন্টারে।”
সায়ক চলে গেলে প্রমিতি বলল, “কী দারুণ আপনার বাড়িটা! বাগানটাও খুব সুন্দর। গাছের ফাঁক দিয়ে সমুদ্রটা কী অদ্ভুত ভালো!”
সত্যেশ বললেন, “আগে গাছগুলো যখন ছোটো ছিল, তখন আরও সুন্দর দেখাত। তখন খেয়াল হয়নি, হলে সামনের গাছগুলো লম্বা হবার মত লাগাতাম না। এখন তো আর কাটার উপায় নেই, আর এগুলোর আয়ু আমার চেয়ে বেশি। ফলে আর আমি আগের মত সমুদ্র দেখতে পাব না।”
প্রমিতি বলল, “মা সমুদ্র খুব ভালোবাসে। সেই জন্যই বাবা খুঁজে খুঁজে চাকরি নিত সমুদ্রের তীরেই। ইচ্ছে ছিল কোনও দিন নিজের বাড়ি করবে এরকমই কোথাও।”
আবার সাবধানে, অতি উৎসুক ভাব যাতে প্রকাশ না পায়, বললেন, “তোমার বাবা…?”
“আমার বাবা ডাক্তার ছিল। সার্জন। মারা গেছেন প্রায় ন’বছর হল। হঠাৎই হার্ট অ্যাটাক হয়েছিল। হাসপাতালেই। ওয়ার্ড থেকে আই-সি-ইউ-তে নিয়ে যাবার সময়ও পাওয়া যায়নি।”
এক ধাক্কায় পেছিয়ে গেলেন কতগুলো দশক। জয়েন্ট এন্ট্রান্সে চান্স পাওয়ার পর ডাক্তারি ভার্সাস ইঞ্জিনিয়ারিং-এর টানাপোড়েন। শেষে, ‘মড়া-কাটতে-পারব-না’ বলে ইঞ্জিনিয়ার হয়েছিলেন সত্যেশ।
“আর মা?” এবার সাহস পেয়ে আরও কনফিডেন্টলি প্রশ্ন করলেন।
“মা হোম-মেকার। আগে টুকটাক কাজ করত, আজকাল বাড়িতেই থাকে।”
“তুমি তো অনেক দূরে। তোমার দাদাও টরোন্টোতে...” এটা প্রশ্ন নয়, কিন্তু এর উত্তর আর পাওয়া হল না। কফি নিয়ে ছাদে বেরিয়ে এল সায়ক। বলল, “আঃ, যা গন্ধ বেরিয়েছে! মাঝে মাঝে মনে পড়ে আর ভাবি সব ছেড়েছুড়ে এসে বাবার হোটেলেই বাসা বাঁধি।”
সত্যেশ বললেন, “কেন, কাছেপিঠে কাজ নিয়ে আয় না?”
সায়ক বলল, “কাছেপিঠে বলতে তো লস এঞ্জেলস। সেও সাড়ে তিন ঘণ্টার রাস্তা। রোজ সাতঘণ্টা গাড়ি চালানো পোষাবে না।”
কথাটা আবার ঘুরে গেল হার্স্ট কাস্ল্‌-এর দিকে। কখন বেরোবে, কী কী করবে, কোথায় খাবে… আস্তে আস্তে আলোচনাটা থেকে সত্যেশ বেরিয়ে গেলেন কখন, তারপরে ব্রেকফাস্ট, তারপরে টা-টা, তারপরে গাড়িটা গেট থেকে বেরিয়ে বাঁ দিকে মোড় নিয়ে চলে যাওয়া… সত্যেশ দেখলেন বাগান পরিচর্যা করতে এসেছে কেয়ারটেকার, তাই ফুলগাছের তদারকির জন্য সে দিকে এগোলেন।
**
এক সপ্তাহর মধ্যেই সন্দীপ জানাল যে প্রমিতির মা ‘হ্যাঁ’ বলেছেন। “কিন্তু তোমার সঙ্গে দেখা করতে চান। বলেছেন, আজকালকার পাকামি মারা বিয়েতে রাজি নন। মা-বাবার অ্যাপ্রুভাল প্রতি পদে লাগবে।”
সত্যেশ কী বলবেন বুঝতে না পেরে বললেন, “হুঁ...”
“যাই বলো, এই সব ঝামেলার হাত থেকে তোমাদের আমি মুক্তি দিয়েছিলাম।”
তা দিয়েছিল। কিন্তু প্রমিতির মা আসবে, সেটা কি ঝামেলা? সত্যেশের স্বপ্ন কমে এসেছে। কিন্তু এখন যখনই দেখেন, তখনই প্রমিতি বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকে। আর স্বপ্ন তখনই শেষ হয়। বললেন, “দেখাসাক্ষাতের উপায় কী হবে?”
সন্দীপ সে সব জানে না। বলল, “তুমি যাবে, না কি উনি আসবেন?”
হাসলেন সত্যেশ। “ট্র্যাডিশনালিস্ট হলে কিন্তু ওনার আসা উচিত। কনে পক্ষ।”
টেলিফোনের ওপারেও সত্যেশ সন্দীপের মুখ বাঁকানোটা দেখতে পেলেন। বলল, “সে উনি আসতে পারবেন। এমনিতে শক্তসমর্থ। বয়স তোমার চেয়ে একটু বেশি হলেও চলাফেরায় অসুবিধে নেই।”
“তুই বয়সও জানিস?”
ওপার থেকে হাসল সন্দীপ। বলল, “আরে তুমি তো সায়ককে পাত্তাই দিচ্ছ না। তাই ও বেচারা আমাকেই ফোন করে করে বলে।”
সায়কের ভুল ভাঙেনি এখনও। তবে এখন সে আর বাচ্চা নেই। তার ভ্রান্তি নিয়ে সে চললে তার খেসারত নিজেকেই দিতে হবে।
সন্দীপ বলে চলেছে, “অবশ্য ভদ্রমহিলা আসার জন্য উৎসুক। মেয়ে এমন টেরেসের গল্প শুনিয়েছে...”
ফোন রেখে ঘড়ি দেখলেন। বিকেল হয়নি। সায়ক এখনও ইউনিভার্সিটিতেই। হয়ত ক্লাস নিচ্ছে। ফোন করলে যদি দুশ্চিন্তা করে, বাবার কী হল? তাই ভেবেচিন্তে একটা ই-মেইলই লিখলেন। বক্তব্য সামান্য – কল মি হোয়েন ফ্রি।
পাঠানর দু মিনিটের মধ্যে মোবাইল বাজল।
“বাবা?”
“স্যান-ডিয়েগো গিয়েছিলি? কী বললেন প্রমিতির মা?”
খানিকটা অস্বস্তিভরা নৈঃশব্দের পরে সায়ক বলল, “ইয়ে, না, মানে ঠিক আছে, মানে...”
সন্দীপ ফোন করেছিল কি বলবেন? এক লহমা ভেবে ঠিক করলেন, না। বললেন, “দিন-টিন ঠিক হয়েছে?”
“না… ইয়ে… মানে… উনি তোমার সঙ্গে কথা বলবেন...”
“উনি মানে প্রমিতির মা?”
“হ্যাঁ। মানে সামনা সামনি। ফোনে না...”
“বেশ তো। কে যাবে কোথায়? আমি যাব, স্যান ডিয়েগো?”
সায়কের উত্তর শুনে বুঝলেন সায়ক এই সম্ভাবনাটায় হাতে চাঁদ পেয়েছে। “তুমি যাবে? তাহলে তো খুব ভালো হয়। না কি...”
“যে কেউ একজন গেলেই হল। এ তো দেশের বিয়ে নয়, যে উভয়পক্ষকে ঘর-দুয়ার দেখতে হবে, ফ্যামিলি কী রকম জানতে হবে। দাদা বলল এসব ঝামেলা থেকে আমাদের মুক্তি দিয়েছিল। আসলে মুক্তিটা যে আমি দিয়েছি অ্যামেরিকায় সেটল্‌ করে, সেটা তোরা জানিস না।”
“তাহলে আমি ফোন করে...”
“নম্বরটা আমাকে দে...” সাহস করে বলেই ফেললেন।
সায়ক হতবাক। “নম্বর, মানে প্রমিতির মার নম্বর? তুমি ফোন করবে?”
সত্যেশ বললেন, “কেন, অসুবিধে কী? বরং তুই ফোন করে দিন ঠিক করবি, সে দিন আবার আমার যদি সিওয়ার্ডের সঙ্গে বা অ্যাকাউন্টেন্টের সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্ট থাকে, যেগুলো ক্যানসেল করা ঝামেলা, তখন আবার ফিরে ফোন করতে হবে। তারচে’ আমিই যদি ফোন করে কথা বলে দিন ঠিক করে তোকে জানিয়ে দিই?”
সন্দীপ হলে ঠিক বলত, আর সেদিন যদি আমার অসুবিধে থাকে? সায়ক সে কথা বলল না। নম্বরটা বলে দিল। সত্যেশ লিখে নিয়ে বললেন, “কখন ফোন করা উচিত?”
সায়ক বলল, “সন্ধের পরে সাধারণত বাড়িতেই থাকেন।”
সন্ধে অবধি একবার এঘর একবার ওঘর, একবার টিভি, একবার বারান্দা করে কাটল। সন্ধের পর ফোন করলেন। পরিচয় দিতে হল না। বোঝা গেল খবর পৌঁছে গেছে। বললেন, “আপনার সুবিধেমত একদিন আমি যেতে পারি। তবে আমার একটা সাজেশন আছে। চাইলে এখানে দু’দিন ছুটি কাটিয়ে যেতে পারেন। সুন্দর শহর, আমার বাড়িতে আপনাদের দুজনের থাকার ব্যবস্থা হবে অনায়াসে। আগে এসেছেন এখানে?”
এক কথায় রাজি হয়ে যাবেন এটা ভেবেছিলেন, হয়েও গেলেন।
যেদিন সন্ধেবেলা সায়কের গাড়িতে আবার প্রমিতি আর প্রমিতির মা এসে পৌঁছল, সেদিন সারা বাড়ি আর বাগান আলোয় ঝলমল করছে। রাই বাড়িতে ঢোকামাত্র যেন আনন্দ আর খুশি ঝড় বয়ে গেল। সায়ককে এত হাসতে কখনওই দেখেননি সত্যেশ। নিজেও এত হইহই কবে শেষ করেছেন মনে পড়ে না।
টেরেস দেখে মুগ্ধ রাই। বলল, “আমার ছোটোবেলার বাড়িতে এমন একটা ছাদ ছিল, জানেন? দৈর্ঘে-প্রস্থে এত বড়ো না। এত সুন্দর দৃশ্যও ছিল না। ছোটোবেলায় বাবা-মা ছাদে গানের আসর করতেন। পরে দুপাশের বাড়ি এত উঁচু হয়ে গেল, আর সামনের রাস্তায় আজেবাজে ছেলেপিলের ভীড় বাড়তে শুরু করল...”
সত্যেশের মনে সন্দেহ নেই আর। ভাবলেন বলেন, তারা সামনের ফুটপাথে ক্যারম খেলত?
এ প্রশ্ন করা যায় না। রাই বলে চলেছে, “পরে বাড়ির ভেতরে গানের আসর হত, কিন্তু অত জমত না। পরে অবশ্য সল্ট লেকের ছাদে আসর হত - তখন সল্ট লেকে ভীড় ছিল না, আকাশ অনেক পরিষ্কার থাকত...”
সারা সন্ধে রাই আর প্রমিতি দাপিয়ে গল্প করল। সত্যেশ কখনওই বেশি হইচই করতেন না, কিন্তু বিশেষত রাইয়ের কী একটা অদ্ভুত শক্তি আছে, সত্যেশের বাকসংযম ভেঙে গেল রাত বাড়ার আগেই। কত গল্প করলেন সত্যেশ নিজেও। অবাক হয়ে গেলেন এত কথা মনে আছে দেখে। প্রথম ইউ-এস-এ আসা, তখন এমনই হাবা-গোবা, যে আসার আগে বাটার দোকানে গিয়ে বলেছিলেন, “আমি বরফের দেশে যাব, একটা উপযুক্ত জুতো দিন তো...”, বলে সেলসম্যানের বুদ্ধিতে অ্যাম্বাসেডর কিনে নিয়ে তিন দিনে সে জুতোর দফা রফা করা…, প্রথম তিন মাস কী ভাবে কেবল পাউরুটি খেয়ে ডিনার করা…
“কেন, কেবল পাউরুটি কেন?” অবাক হয়ে জানতে চাইল প্রমিতি।
“প্রথম যখন এসেছি, আমার এমপ্লয়ার আমার থাকার ব্যবস্থা করেছে একটা মোটেলে। সামনে মস্তো ফ্রি-ওয়ে। আট লেন, না বারো লেন, মনে নেই। উলটো দিকে সুপারমার্কেট, কিন্তু রাস্তা পেরোন’র উপায় নেই। অন্তত মাইল দুয়েক গেলে তবে পেডেস্ট্রিয়ান ক্রসিং। নতুন অ্যাম্বাসেডর জুতোর যা অবস্থা, ওই পরে অত হাঁটা সম্ভব না। আর রাক্ষসের মতো স্পিডে দানবের মতো বিশাল বিশাল ট্রাক যাচ্ছে, যেখানে সেখানে পার হওয়া যায় না! ফলে কী করি, দুপুরে অফিসে ক্যান্টিনের লাঞ্চ খাই, আর সন্ধেবেলা মোটেলের গায়ে একটা স্যান্ডুইচ বার – তাতে ঢুকে দেওয়ালে লাগানো ছবি দেখে, যেটা মনে হয় সবচেয়ে কম অখাদ্য হবে, সেটাই খাই। শেষে এক দিন ঘরে এসে স্যান্ডুইচে কামড় দিয়েছি - প্যাৎ করে এক তাল কাঁচা রক্ত পড়ল আমার জামায়। সঙ্গে সঙ্গে যতটুকু খেয়েছি, সব বমি হয়ে গিয়েছিল। তারপর থেকে বহুদিন, যতদিন না গাড়ি কিনে নিজে চলতে শিখেছি, ওখান থেকে স্যান্ডুইচ কিনতাম, মাংস-টাংস সব ফেলে দিতাম, আর শুধু রুটি খেয়ে ফেলতাম।”
অবাক হয়ে সায়ক বলল, “কিন্তু তুমি তো কোনওদিন রেয়ার ছাড়া বিফ্‌-স্টেক খাওনি। কাটলে রক্ত বেরোত। আমার গা গোলাত।”
ততোধিক অবাক হয়ে সত্যেশ বললেন, “কোনওদিন তো বলিসনি? আমি তো তোদের জন্মের অনেক আগেই পাকা সাহেবি খানায় অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলাম। সে দিকে আমার কোলিগ, স্যামুয়েল-এর অবদান অনস্বীকার্য। আমাকে হাতে ধরে স্টেক খেতে শিখিয়েছিল। ধাপে ধাপে।”
এসব গল্প ছেলেরা কেন, অনুও শোনেনি কোনওদিন।
প্রমিতি বলল, “বাবাও বলত, শুরুতে খুব অসুবিধা করে থেকেছে। ভোরবেলা গ্যাস-স্টেশনের অ্যাসিস্ট্যান্টের কাজ করত। তখন বড়োলোক মহিলারা বেরোতেন, তাঁরা কখনও নিজে হাতে গাড়িতে গ্যাস ভরতেন না, আর অনেক টিপস-ও দিতেন।”
রাই বলল, “আর খাওয়াদাওয়ায় এমনই অসুবিধে যে শেষে ওর বাবা টেলিফোন ডিরেক্টরি খুলে খুঁজে খুঁজে বাঙালি পদবীওয়ালা লোকেদের ফোন করতে শুরু করেছিল – একদিন আপনার বাড়িতে ডেকে আমাকে ডালভাত খাওয়াবেন?”
উৎসুক হয়ে সত্যেশ বললেন, “তার কী ফল হল? তখন কি বাঙালিরা এমন আতিথেয়তা করত আজকের মত?”
মাথা নেড়ে রাই বলল, “মোটেই না! বরং উলটো। কেউ কেউ দুটো বাজে কথাও শুনিয়েছিল। অবশ্য এও ঠিক, যে বেশিরভাগই বলেছিল, হ্যাঁ, হ্যাঁ, অবশ্য অবশ্য, আমি ফোন করব। বলে আর করেনি।”
রাইয়ের কথার রেশ ধরে প্রমিতি বলে চলল, “শেষে একদিন কাকে ফোন করেছে বাবা, বাড়ির মালিকের মা সবে দেশ থেকে দু’দিন হল এসে পৌঁছেছে। বিদেশে বাঙালি ছেলের এই দুর্দশা শুনে সেদিনই ছেলেকে পাঠিয়েছে - যা গিয়ে নিয়ে আয়। মজা হচ্ছে, এই অপরিচিত বাঙালি মহিলা আমার মায়ের আপন পিসি… সুতরাং এর পরের গল্পটাও বোঝা যাচ্ছে...”
প্রমিতির হাতের ডানায় আলতো থাপ্পড় মেরে রাই বলল, “ধ্যাৎ, চুপ কর তো!”
এই বয়সেও মানুষ এমন ব্লাশ করতে পারে? অবাক হয়ে চেয়ে রইলেন সত্যেশ।
**
পরদিন সকালে, ব্রেকফাস্টের পরেই চলে যেতে হল ওদের। স্যান ডিয়েগোতে মা-কে নামিয়ে আবার ফিনিক্স – পৌঁছতে ভোর রাত। পরদিন সকাল সকাল সায়ক আর প্রমিতিকে ইউনিভার্সিটি যেতে হবে। ওরা বেরিয়ে যাবার পরে সত্যেশের মনে হল চিরকালের শান্ত, নির্বাক বাড়িটার নিস্তব্ধতা যেন আরও বেড়ে গেছে। কোথাও গিলে খেতে আসছে সত্যেশকে। বাধ্য হয়ে বেরিয়ে গেলেন বাড়ি থেকে।
সন্দীপ ফোনে বলল, “ভাইকে বেশ নিশ্চিন্ত শোনাল, বুঝলে? মনে হল, তুমি অ্যাপ্রুভ করেছ।”
“অ্যাপ্রুভ তো করেইছিলাম। এই ভিজিটের সঙ্গে তো তার সম্পর্ক কিছু ছিল না,” বললেন সত্যেশ।
“তবু...”
“বিয়ে কবে তার কিছু ঠিক করেছে দুজনে?” জানতে চাইলেন সত্যেশ।
সন্দীপকে এবার একটু বিরক্ত শোনাল। “আরে, এ বিষয়েও মায়ের কথা মেনে বিয়ে করবে। প্রমিতির মা আর দাদা এখন আলোচনায় মগ্ন।”
সত্যেশ তামাশা করে জানতে চাইলেন, “পাঁজি দেখা চলছে?”
সন্দীপ হাসল। “হয়ত। জানি না। তবে না চললেই আশ্চর্য হব। সবাই তোমার মতো নয়, বাবা। মা-ও আমার বিয়ের দিন পঞ্জিকা দেখেই ঠিক করতে চেয়েছিল।”
তা বটে।
দিন কাটে। বিয়ে নিয়ে অফিশিয়াল পারিবারিক ইনভলভমেন্ট প্রমিতির দিক থেকে বেশি। ফলে সন্দীপকে প্রমিতির দাদার সঙ্গে নানা আলোচনা করতে হয়, আর কখনও কখনও রাই ফোন করে সত্যেশকে। নানা ছোটোখাট সমস্যা আলোচনা হয়। এগুলো কোনওটাই সত্যেশের কাছে জরুরি নয়। তবু শোনেন। রাইয়ের ফোন পেতে ভালো লাগে।
এই বয়সে এসে নতুন করে প্রেমে পড়েছেন, ভাবতেই অবাক লাগে সত্যেশের। আবার ভাবেন। নতুন প্রেম কি? নাকি পুরোনো প্রেম? আগে ওটা কি প্রেম ছিল? কী ছিল প্রেম না হলে?
উত্তর পান না।
ভালোও লাগে। মনে মনে বাড়িতে নানা জায়গায় রাইকে দেখতে ভালো লাগে। কিচেনে ব্রেকফাস্ট বানাতে বানাতে ভাবেন, ওই চেয়ারে…, বসার ঘরে দেখেন ঘর সাজাচ্ছে… সবচেয়ে বেশি দেখতে পান টেরেসে। সেটা জেগে নয়, ঘুমিয়ে। স্বপ্নে আজকাল সেই রাস্তা দিয়েই যান সত্যেশ। কিন্তু রাস্তার পাশের বাড়িটা আর ওই পুরোনো, রং জ্বলা দোতলা বাড়িটা নয়। ওটা সত্যেশের বাড়ি। ছাদটা সত্যেশের টেরেস। কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার হল, টেরেসের শেষে দরজাটার রং লাল।
সাহস করে রাইকে জিজ্ঞেস করতে পারেননি ওর ছোটোবেলার ছাদওয়ালা বাড়িটার কথা। অনেকবার ভেবেছেন, জিজ্ঞেস করবেন, “তোমাদের বাড়িটা দোতলায় ছিল? তার দরজার রং লাল? তার ঠিকানা...”
যদি বলে, “কই, না তো?” ছাদওয়ালা বাড়ি কি একটাই হয়?
সায়ক বেশি ফোন করে না। সন্দীপ জানায়। কথা চলছে। সবই ছোটোখাট কথা। এত সত্যেশের না জানলেও চলে। বললেন, “সাজানো গোছানো এত চলছে, বিয়ে কবে?”
সন্দীপ অপছন্দের সুরে বলল, “জানি না। আজ দাদা, কাল মামা, নানা ইস্যু উঠে আসছে। সায়ক বুঝছে না। আমিও না।”
“আমি কি একবার ওর মা-কে ফোন করে দেখব?”
“না, থাক। ভাই চাইছে না আমরা এর মধ্যে ঢুকি।”
বেশ।
কয়েকদিন পরে, প্রথম দিনের পর কয়েক মাস কেটেছে, আবার সন্দীপের ফোন। “বাবা, বিয়ে হবে না।”
ধক্‌ করে একটা ধাক্কা লাগল যেন। বললেন, “সে কী রে! কেন?”
“অত জানি না। তবে গত মাস তিন চারেক হল দুজনে ঠিক পরস্পরের সান্নিধ্য পছন্দ করছে না। ঠিক কী হয়েছে সেটা সায়ক আমাকে বলেনি।”
মনে হল, রাইকে ফোন করেন একবার? তারপরে ভাবলেন, থাক। অতিরিক্ত কৌতুহল দেখান ওঁর স্বভাবসিদ্ধ নয়। এটা সায়কের পার্সোনাল ব্যাপার। সায়কই এর সল্যুশন খুঁজবে। সায়কের বাবা নয়।
তবে সত্যেশ না করলেও, রাই করল। রাই যতদূর বুঝেছে, প্রমিতিই সম্পর্কে যতি টেনেছে। কেন, তা রাই জানে না। প্রমিতি নাকি বলেনি।
সত্যেশ কী বলবেন ভেবে পেলেন না। হুঁ, হাঁ করে কাটিয়ে গেলেন। রাই লাইন কেটে দেবার পরে মনে হল, কত আরও কথা ছিল। কোনওটাই বলা হল না।
**
দিন কাটে। সত্যেশের রাতে ঘুমোন দায় হয়ে ওঠে। চোখ বুজলেই আজকাল চমকে জেগে ওঠেন। লাল দরজা আর বারান্দা ছাড়া আর কিছুই দেখেন না। আর সে স্বপ্নে আজকাল রাই সেই বারান্দা থেকে পড়ে যাচ্ছে, সত্যেশ গাড়ি থামাবার চেষ্টা করছেন, কিন্তু ব্রেক লাগছে না। রাই পড়ছে… পড়ছে… পড়ছে…
রোজই ঘেমে নেয়ে ঘুম ভাঙে।
সায়ক এল একদিন। ফোন-টোন না করেই। বেশ ক’দিন দাড়ি কামায়নি। ঘুমও হচ্ছে না ভালো করে। চোখের কোণে কালি। বলল, ছুটি নিয়ে এসেছে। পাঁচ দিন বাড়িতে থাকতে পারে কি? তিন দিনের দিন সায়ক বাবার সঙ্গে জীবনে প্রথম কথা বলল। বলল, প্রমিতির জীবনে অন্য কেউ ছিল আগে। সেই ছেলেটা ফিরে এসেছে বলেই প্রমিতি এক কথায় সায়ককে বিদায় দিয়েছে।
অবাক সত্যেশ জানতে চাইলেন, তার জন্য এই দশা? এর আগে সায়কের জীবনে প্রেম শেষ হয়নি কখনও?
হয়েছে। কিন্তু এবারে সায়ক ভাবেনি প্রমিতি চলে যাবে।
পাঁচ দিন পরে চলে গেল সায়ক। দেড় মাস পরে ফোন করে জানাল, আয়ারল্যান্ড চলে যাচ্ছে। ওখানে ইউনিভার্সিটিতে ফ্যাকালটি হয়ে। সন্দীপ ফোন করল। বলল, এটাই ভালো হল, জানো, ড্যাড?
হল? হবে হয়ত। এমনিতেই সন্দীপ বছরে একবার আসে ক্রিসমাসের ছুটিতে, বউ বাপের বাড়ি গেলে। সায়ক তবু কয়েকবার ঘুরে যেত। রান্নাবান্না করত।
সত্যেশের বাড়িতে আলো জ্বলা কমে গেল আরও। সিনিয়র সিটিজেন ফোরামে সময় কাটে আরও বেশি। বাড়িতে ফিরেও অন্ধকারে টেরেসে বসে থাকেন, আর ভাবেন।
সে দিন রাতে, ব্রেক না লাগা গাড়ির স্বপ্ন থেকে উঠে বুকের ধড়ফরানি থামতে দিলেন। বাঁ দিকে হাত বাড়িয়ে টেনে নিলেন জলের বোতল। মনে হল, গাড়ির ব্রেক নিজের পায়েই থাকে। ব্রেক লাগালেই গাড়ি থামে। এত বছরে ব্রেক লাগিয়েও গাড়ি থামেনি এমন কখনও হয়নি সত্যেশের।
জীবনটা চলে যাবে এইভাবেই? ব্রেক আর লাগাবেনই না?
পরদিন, সকাল দশটায় ফোন করলেন বহুদিন ফোন না-করা নম্বরে।
রাই একটু অবাক হয়ে বলল, “আপনি? কেমন আছেন? সায়কের খবর কী?”
কেমন আছেন বললেন, সায়কের খবর দিলেন। রাই কেমন আছে, প্রমিতির খবরও নিলেন।
তারপরে বললেন, “একটা কথা জানার ছিল। যদি কিছু মনে না করেন?”
একটু চুপ করে থেকে রাই বলল, “বলুন...”
“আপনার ছোটোবেলার যে বাড়িটার কথা বলেছিলেন – যার ছাদ ছিল আমার ঘর-লাগোয়া ছাদের মত – সেটা কোথায় ছিল? মানে রাস্তার নামটা...”
আবার খানিকক্ষণের স্তব্ধতা। রাই বললেন, “কেন বলুন তো?”
এবার প্রায় বাঁধভাঙা তোড়ে সত্যেশ বলে ফেললেন, “হলদে রঙের দেওয়াল, তাতে শ্যাওলা ছিল? ছাদের রেলিং ছিল লোহার গ্রিল, তার ওপর সবুজ কাঠের ব্যানিস্টার? আর… আর ছাদে আসার দরজার রং ছিল লাল…? আর ছাদের কোণায় একটা...”
কথা কেটে রাই বললেন, “বোগানভিলিয়ার গাছ। গোলাপি আর হলুদ দুটো রঙেরই ফুল হত।”
ঠিক। সত্যেশ জানতেন কী শুনবেন, তবু শরীর ছেড়ে দিল চেয়ারে।
রাই বললেন, “আপনি…?”
সত্যেশ বললেন, “আমি আমার ক্লাস এইট থেকে টেনের শেষ অবধি, তিন বছর ওই রাস্তায় যাতায়াত করেছি। সপ্তাহে তিন দিন। বাবার গাড়িতে যেতাম, ফিরতাম। বাবা নিয়ে যেতেন। ও বাড়িতে আপনি ছাড়া আর কোনও কাছাকাছি বয়সের মেয়ে ছিল?”
প্রায় অস্ফূটে রাই বললেন, “না...”
“তাহলে আপনাকে আমি দেখেছি। দু’বার। প্রথম দিন আপনি ছাদে দাঁড়িয়ে ছিলেন। রেলিঙে ভর দিয়ে। আর অন্য এক দিন আপনি হেঁটে চলে যাচ্ছিলেন। পেছন ফিরে। লাল পাড় সাদা শাড়ি।”
“সেই, কত… পঞ্চাশ বছর আগের কথা আপনার মনে আছে এত পরিষ্কার?”
পঞ্চাশ না। ষাট। উনষাট বছর আগে এই যাত্রার শুরু। শেষ ছিল ছাপ্পান্ন বছর আগে। বললেন, “তিন বছর, সপ্তাহে তিন দিন আপনাকে খুঁজতাম ওই রাস্তায় যাবার পথে। এত সহজে ভুলে যাব?”
রাই বললেন, “গাড়িতে করে চলে যেতেন। হুশ করে। তাকে কী খোঁজা বলে?”
বলে না? চোখ দিয়ে খোঁজার সময় কম হলেও, মন দিয়ে কম খুঁজেছেন?
সে কথা বললেন না। বললেন, “পায়ে হেঁটেও গিয়েছি...” কবার গেছেন না বললেও চলবে…
রাই বললেন। “সে মাত্র একদিন। উলটোদিকের পানের দোকান থেকে পান কিনে খেয়েছিলেন, সিগারেট কিনেছিলেন। তারপরে হেঁটে চলে গেছিলেন...”
“না, মাত্র এক দিন না...” বলতে গিয়ে থমকালেন সত্যেশ। বললেন, “আপনি কী করে জানলেন?”
একটু হাসির শব্দ ভেসে এল। তারপর রাই বললেন, “সবুজ অ্যাম্বাসেডর। নম্বর ফোর থ্রি থ্রি ওয়ান।”
সত্যেশ কিছু বললেন? না কি কেবল অব্যক্ত শব্দ বেরিয়ে এল মুখ থেকে?
“আমি রোজ দেখতাম। মানে সোম, বৃহস্পতি, শুক্র। ঠিক তো?”
ঠিক। কিন্তু, দেখতাম মানে? “কোথা থেকে দেখতেন?”
“ছাদের পাশের ঘরটা আমার ছিল। জানলা ছিল মাটি থেকে ছাদ অবধি। ওই জানলায় বসে গল্পের বই পড়তাম। আপনার গাড়ি চলে গেলে পড়তে বসতাম। কেন জানি মনে হত, আপনি খুব পড়ুয়া ছেলে। তাই আপনার সঙ্গে কম্পিটিশন করে পড়তাম।”
সত্যেশ এবারে আর অস্ফূট শব্দও করতে পারলেন না।
“যেদিন আপনি সামনের দোকানে এসেছিলেন, আমি বাড়ির পোশাকে ছিলাম। আমি প্রাণপনে পোশাক বদলে শাড়ি পরে মাকে শর্মিষ্ঠার বাড়ি যাচ্ছি বলে বেরিয়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে বেরিয়ে দৌড়েছিলাম আপনার পেছনে। অনেকক্ষণ হেঁটেছিলাম। পাইনি।”
পায়নি তো বটেই। হনহনিয়ে হাঁটা সত্যেশের চিরকালের অভ্যেস। এখনও নাকি সমবয়সীরা পাল্লা দিয়ে পারে না।
দুজনেই খানিকটা চুপ করে রইলেন। তারপরে রাই বললেন, “কে জানে, সেদিন আপনাকে পেয়ে গেলে কী হত!”
সে কথা ভেবে আর লাভ নেই। সত্যেশ বললেন, “এতদিন পরে এভাবে দেখা হবে সেটা কখনও ভেবেছিলেন?”
“না। তবে আমি দেখেই আপনাকে চিনতে পেরেছিলাম। বসার ঘরে ম্যানটেলপিসে আপনার ছোটোবেলার ছবি আছে। সেও দেখেছি। কিন্তু আপনি আমাকে কোনওদিন দেখেছিলেন, মনে রেখেছেন, সেটা বুঝিনি।”
আবার খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে সত্যেশ বললেন, “তাহলে আর একটা কথা...”
“বলুন।”
সত্যেশ মাথা নাড়লেন। বললেন, “না। এটা এখানে না। অনুমতি দিন, আমি এবার স্যান ডিয়েগো যাই। একটা প্রপার্টি বিষয়ক কথা আছে। অন্য একটা টেরেসের সহ-মালিকানার কথা। সেখানে একসঙ্গে বসে কফি খাওয়ার কথা। বাকিটা না হয় ফোনে না বলে সামনাসামনিই বলি?”

Saturday, January 20, 2018

হলধরের হানাবাড়ি

ইয়ে, একটা কথা বলে রাখা ভালো,” কনুইয়ের পাশে রাখা গড়গড়ায় গুড়ুক করে একটা টান মেরে হলধর হালদার বললেন, “বাড়িটার একটু বদনাম আছে। মানে, ওই কী বলে... ভূ-পেরেত টাইপ আর কি!”
গত পাঁচ মিনিট ধরে পঞ্চানন গড়াই প্যাঁচ আর পাঁয়তাড়া কষছিলেন পান্তুয়ার শেষ টুকরোটার সঙ্গে। চ্যাপ্টা রেকাবি থেকে কোন জিনিষেরই শেষ টুকরোটা তোলা বড়ো তরিবতের ব্যাপার। সাবধানে না তুললে বাঁ হাতের বুড়ো আঙুলটা বার বার এগিয়ে যায় টুক করে ঠেলে দেবার উদ্দেশ্যে। বেখেয়াল হলেই গেল। পান্তুয়ার রস লেগে সারা সন্ধে বুড়ো আঙুলটা চট-চট করবে। আর খালি মনে হবে একটু চেটে নিয়ে ধুতির খুঁটে মুছে নিই...
সবে বাগে পেয়েছিলেন বলে মনে হচ্ছিল, কিন্তু ওমনি ব্যাটাচ্ছেলে ভূতের কথা তুলল! এমন চমকালেন পঞ্চানন, যে হাত কেঁপে পান্তুয়ার টুকরোটা তো মাটিতে পড়লই, পিরিচ থেকে চলকে খানিকটা রসও পড়ল পাঞ্জাবির ঝুলের শেষে, সেখান থেকে গড়িয়ে ধুতিতে। গেল – বাড়ি গিয়ে গিন্নির কথা শুনতে হবে। বেরোবার সময়ে পই পই করে বলে দিয়েছিল অনুভা, “দেখো, দু দিন আরো পরতে হবে এমন ভাবে চলাফেরা করবেরোজ রোজ এসেই জামা ধুতি কাচতে দেবে, আমার বুড়ো হাড়ে আর সয় না।”
খালি প্লেটটা সাবধানে নামিয়ে রেখে আড় চোখে পঞ্চানন তাকালেন ভাইপো নিবারণের দিকে। ভূতের কথায় কোন ভাববিকার হয়েছে বলে মনে হলো না। বলল, “সে দেখা যাবে। কিন্তু বাড়ির ভেতরটা একবার দেখা যায় কি?”
পুচি---?” গলা মেলে হলধর ডাকলেন।
যাই বাবা,” বাড়ির ভিতর থেকে হলধরের মেয়ের গলা পাওয়া গেল।
চাবিটা নিয়ে আসিস মা,” আবার ডেকে বললেন হলধর। “কাকুকে আর দাদুকে একটু ও বাড়িটা দেখিয়ে আনতে হবে।”
কাকু? দাদু? পান্তুয়া খাওয়া হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও পঞ্চানন প্রায় বিষম খেলেন। আলাপের শুরুতেই এ কথা সাব্যস্ত হয়েছিল যে পঞ্চানন আর হলধর প্রায় সমবয়সী। আর চা মিষ্টি নিয়ে আসার সময় হলধর তো বলেইছিলেন, “মেয়ে আমার বড়ো লক্ষ্মী। পড়াশোনায়ও ভালো। ষোল বছর বয়স হলো, এর মধ্যেই ইশকুল পাশ দিয়ে কলেজের জন্য অপিক্ষে করছে। কেলাস শুরু হলো বলে।” আর এখন পঞ্চানন হয়ে গেলেন দাদু আর ওনার চব্বিশ বছরের ভাইপো হয়ে গেল তার কাকু?
ইয়ে, সন্ধে হয়ে গেছে, এখন কি আর বাড়ি দেখে কোন লাভ হবে?” কাঁপা গলায় জানতে চাইলেন পঞ্চানন।
একগাল হেসে নিবারণ বলল, “কাকা ভূতের ভয়ে রাতে ইয়ে পর্যন্ত করতে যায় না। তুমি বসো, কাকা, আমি দেখে আসছি। চাবিটা আমাকে দাও, তোমাকেও আর রাত্তিরে ওই অন্ধকারে যেতে হবে না।”
উঁহু,” ফস করে আঁচলের তলায় চাবি লুকিয়ে পুচি বলল, “সে হবে না। দশ মাসের ভাড়া আগাম না দেওয়া ওব্‌দি চাবি পাচ্ছ না, বাবা বলেনি বুঝি? তা ছাড়া, ভূতের ভয় আমার নেই। বরং আমি থাকলে ভূত ধারেপাশে ঘেঁষবেও না। সবাই বলে আমি নিজেই এক পেত্নি কি না!”
আজকালকার ছেলে-ছোকরাদের সঙ্গে কথায় পেরে ওঠার জো নেই। হয়েছে এক জ্বালা। কী দরকার ছিল রাতের বেলা ইয়ে করার গপ্পো বলবার? বাধ্য হয়ে পঞ্চানন উঠলেন। হালদার মশাই বললেন, “আরে বসুন, বসুন, আপনি আর ওখানে কী দেখবেন? তার চেয়ে বৈকুণ্ঠকে বলছি, সুন্দর করে তামাক সেজে দেবে ডাবা হুঁকোয়, খেয়ে দেখুন, কাশীর সেরা অম্বুরি তামাক, আজকাল আর কোত্থাও পাওয়া যায় না।”
পঞ্চাননের মনে পড়ল কোন বিখ্যাত লেখকের গল্প ছিল, বাবাকে ছেলে জিজ্ঞেস করেছে, “বাবা হুঁকো কাকে বলে?” বাবা সারা কলকাতা খুঁজে খুঁজে শেষে এমন এক জায়গায় হুঁকোর খোঁজ পেয়েছেন, সেখানে দশ বছরের ছেলেকে নিয়ে গিয়ে মাথা কাটা যায় আরকি! সেখানে বাইজী নাচে। আগে জানলে ওই লেখককে ‘হলধর হালদার, ল্যান্ডওনার’-এর ঠিকানা দিয়ে দিতেন।
মুখে বললেন, “না হালদার মশাই, তামাক পোষায় না। কাশির ধাত কি না!” বলে বেরিয়ে এলেন এক নমস্কার ঠুকে। পা দিয়ে পান্তুয়ার টুকরোটা ঠেলে দিলেন তক্তপোষের নিচে, রাস্তায় বেরিয়ে বাঁ হাতে লাগা রসটা চুষে হাতটা পাঞ্জাবিতেই মুছলেন, বকুনি তো আছেই কপালে, হাতটাও চ্যাটচ্যাটে রেখে আর কী লাভ!
বাড়িটা বেশি দূরে নয়, মিনিট দশেকের চলা পথ। মেয়েটা প্রায়ান্ধকার রাস্তা দিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে নিয়ে চলল। বেশ চটুল মেয়ে। বক বক করতে পারে।
এই দিকে দেখে আসবে, এখানে গর্ত আছে একটা... তাতে জল আছে... পড়লে একেবারে দেখতে হবে না। পা মচকে না... গত সপ্তাহেই রুমির বাবা পড়েছিল, তার পর সে কী কাণ্ড! রাতের বেলা না পাওয়া যায় ডাক্তার, না আছে একটা গাড়ি, হাসপাতালে নিয়ে যেতে... শেষে আমিই উঠে এসে গরম চুন হলুদ লাগিয়ে ব্যান্ডেজ বেঁধে দিলাম...
আচ্ছা, ওখানে তুমি কী করবে?”
ব্যবসা...” সংক্ষেপে বলল নিবারণ। “তুমি কোন কলেজে পড়? কি স্ট্রীম তোমার?”
মেয়েটা বলল, “হুঁঃ! কলেজ না ছাই। বাবা নিজে ক’ অক্ষর গোমাংস। নামটা পর্যন্ত সই করতে পারে না, তাই আমাকে সারাক্ষণ কলেজ পাঠাচ্ছে। আমি ইশকুলই পাশ করিনি। ক্লাস এইটে তিন বার ফেল মেরে বাবাকে বলেছি আর আমাকে পাঠাতে পারবে না। বাবা তাও কি মানে? বলছে টাকা দিয়ে কলেজে ভর্তি করে দেব। শেষে আমি বললাম, তাহলে আমার মরা মুখ দেখবে। তখন ক্ষান্ত দিল। ভাবো অবস্থা! এখন বলছে, পয়সা দিয়ে ডিগ্রী কিনে এনে দেবে। তাতে অবিশ্যি আমার আপত্তি নেই। পড়াশোনা না করতে হলেই হলো... এই যে, এই দিকে, এসে গিয়েছি
মুখ তুলে তাকিয়ে অন্ধকার বাড়িটা দেখেই পঞ্চাননের বুকটা দুরদুর করে উঠল। বিশাল, অন্ধকার, দেখতেই গা-ছমছমে। এ সব জায়গায় আসা কেন বাপু! মা বাপ মরা ভাইপোটাকে কখনও না বলেননি বলেই এখনও কিছু বললেন না। নিবারণ কিন্তু দিব্যি লোহার গেট খুলে ঢুকে পড়ল। খোলার সময় তেল না-পড়া বিশাল কবজাগুলো কেমন গাড়ি চাপা পড়া বেড়ালের মতো ক্যাঁ-অ্যাঁ-অ্যাঁ-অ্যাঁ-চ্‌ করে আর্তনাদ করে উঠল, সেটাকেও পাত্তা না দিয়ে মেয়েটার সঙ্গে ঢুকে পড়ল। একবার ফিরে পঞ্চাননের দিকে তাকালও না! একবার ভাবলেন ওখেনেই দাঁড়িয়ে থাকবেন, যাঃ হতভাগা, একাই ভূতের সঙ্গে দেখা করে আয়। কিন্তু তারপরে চারপাশের দৃশ্য দেখে পা চালালেন ভাইপোর পেছনে।

দু’চার দিনের মধ্যেই নিবারণ এসে হলধরকে টাকা-কড়ি বুঝিয়ে দিয়ে বাড়ি ভাড়া করে কাজ শুরু করে দিল। আসতে যেতে ব্যাপার স্যাপার দেখে পুচি হতভম্ব। কই, আসবাব টাসবাব তো নেই! ব্যবসা করতে গেলেও তো অফিস চালাবার চেয়ার টেবিল লাগবে – তার কোন বালাই নেই! বাবাকে গিয়ে জিজ্ঞেস করতে বাবা ব্যাপারটা হেসে উড়িয়ে দি। বলল, “আরে, ওই ভূতের বাড়িতে কি বউ বাচ্চা নিয়ে কেউ থাকতে আসবে নাকি? তবু একটা লোক তো ভাড়া নিয়েছে, অফিস করবে, গুদাম বানাবে যা করবে করুক না, নইলে পড়েই নষ্ট হতনা, আর কথা বাড়াসনে। যা দিকিন, আমার জন্য নতুন টিকে নিয়ে আয় দিকিন।”
কল্কেতে নতুন গনগনে টিকে আনতে আনতে পুচি ঠিক করে ফেলল ব্যাপারটা অনুপের সঙ্গেই আলোচনা করতে হবে। না হলে ওর মনে শান্তি হবে না।
অনুপও কিন্তু খুব আমল দিল না।
ও বাড়ির বদনাম হয়ে গেছে রে পুচি, ওই সাঁতরা ফ্যামিলিটা যখন ছিল, বাচ্চা মেয়েটা রাতের বেলায় ভয় পেল না? তখন থেকেই...”
কথা কেটে ঝাঁঝিয়ে উঠল পুচি। “বাজে কথা। আমি পিঙ্কির সঙ্গে নিজে কথা বলেছি। মেয়েটা কিছুই দেখেনি – রাতের বেলা বাৎরুম যেতে গিয়ে বারান্দার কোনে ছায়া দেখে ভয় পেয়েছিল। কতগুলো বাজে গুজবের জন্য বাড়িটার বদনাম হয়ে গেল।”
আহা, তা কি আমি অস্বীকার করছি?” পুচির রোখ দেখে তাড়াতাড়ি সুর বদলাল অনুপ। “আমি বলছিলাম যে ওদের জন্যই বদনাম হয়েছে। এর মুখ থেকে তার কানে ছড়িয়েছে। এখন সব্বাই জানে, ও নাকি ভূতের বাড়ি। তাছাড়া তোর বাবাও তো নাকি আজকাল কেউ ভাড়া নিতে এলে নিজেই বলে দেন, বাড়িতে ভূত আছে, জেনেশুনে ভাড়া নেবেন মশাই।”
কথাটা ঠিক। পুচি অনেক বলেছে বাবাকে, শুনতেই চায় না। বলে, “না রে পুচি, রিক্‌স্‌ নিয়ে কাজ নেই। তার পরে ভাড়াটে বলবে কী বাড়ি ভাড়া দিয়েছেন মশাই – সে ঝঞ্ঝাটে গিয়ে লাভ কী?”
তাই বলে একটা ভালো বাড়ি গুদাম হয়ে যাবে?”
ক্ষতি কী?” জানতে চাইল অনুপ। “গুদাম হলে তো ভাড়াও বেশি পাওয়া যাবে।”
গুম হয়ে রইল পুচি খানিকক্ষণ। কথাটা ঠিক, কিন্তু বাড়িটা আর বাড়ি থাকছে না, সেটা ওকে বিব্রত করছে। ছোটোবেলায় ওই বাড়িতেই ও বড়ো হয়েছে বেশ কিছু বছর। বাবা পরে নতুন বাড়ি করে উঠে গেছিল বলে এই বাড়িটা ভাড়া দেওয়া হয়েছে। তবু পুচির কেমন একটা মায়া আছে বেচারা বাড়িটার জন্য।
বলল, “তোর জানলা থেকে তো বাড়িটা পষ্ট দেখা যায়। কখনও সেরকম কিছু দেখেছিস? মানে, এই ভৌতিক কিছু?”
অনুপ দাঁত বার করে বিরাট খিঁচিয়ে উঠে বলল, “হ্যাঁ, আমার তো আর খেয়েদেয়ে কাজ নেই, তোমার বন্ধ বাড়ির অন্ধকার জানলার দিকে সারা রাত তাকিয়ে বসে থাকব!”
না, মানে তোর জানলা দিয়ে তাকালেই তো দেখা যায়...” বলতে গিয়ে থমকে গেল পুচি। বলতে চেয়েছিল, “তোর পড়ার টেবিলটা যদি একটু ডান দিকে টেনে আনিস, তাহলে তো পড়তে পড়তে মুখ তুললেই দেখতে পাবি...”
যে চায় না, তাকে দিয়ে কোন কিছু করান তো উচিতও নয়, সম্ভবও নয়।
চিন্তিতমুখে বাড়ি ফিরল পুচি। সারা রাত ঘুম হলো না ভালো করে। কেবলমাত্র ভূতের বদনাম আছে বলে অত সুন্দর একটা বাড়ি নিয়ে লোকটা গুদাম বানাবে সেটা ঠিক নয়। শুতে যাবার আগে মাথায় একটা বুদ্ধি এল। কাউকে কিছু না বলে হলধরের ঘর থেকে ভাড়াটের খাতা বের করে নিবারণের ঠিকানাটা টুকে নিল। সকালে বাবাকে খেতে দিয়ে, “এই একটু আসছি,” বলে বেরিয়ে গেলেই হবেতিনটে পাড়া পরেই ওদের বাড়ি। হেঁটেই যেতে পারবে। রিকশও নিতে হবে না।

অনুপও পুচি চলে গেলে চিন্তিত মুখে বসে ছিল। বাড়িটা এক সময়ে ওদের সবার খুব প্রিয় ছিল। পুচিরা যখন ওখানে থাকত তখন অনুপ অনেক গিয়েছে ও বাড়িওর মার মুখে শুনেছে যখন ওরা মাঝেরপাড়ায় থাকত তখন থেকেই পুচির মায়ের সঙ্গে ওর মায়ের বন্ধুত্ব ছিল। মাঝেরপাড়া এখান থেকে দূরে নয়। পুচিদের ওই গুদাম বাড়িটার পেছনের রাস্তাটাই মাঝেরপাড়া। ওখান দিয়েই গিয়েছে রেল লাইন। পুচিদের বাড়ির পেছন দিয়ে। কিন্তু সে পাড়ায় কী যেন একটা হয়েছিল বলে ওর বাবা ও বাড়ি ছেড়ে এইখানে বাড়ি করেছেন। তখন অনুপ ছোটো... না কি জন্মায়নি... কিন্তু কী যেন একটা কথা ছিল...
পড়া ছেড়ে অনুপ রান্নাঘরে মায়ের কাছে গিয়ে হাজির হলো। মা কড়াই থেকে এক লহমা মুখ ঘুরিয়ে বলল, “পুচি চলে গেল? ভাবলাম বলব গরম গরম মালপো করছি, খেয়ে যা...”
অনুপ বলল, “মা, তোমরা মাঝেরপাড়ার বাড়িটা ছেড়ে দিলে কেন?”
অনুপের মা কড়াই থেকে চোখ না সরিয়ে বলল, “বাবাকে জিজ্ঞেস করিস। ওই ওপাড়ার ভাঙা বাড়ি নিয়ে কী যেন। আমার অত মনে নেই।”
বাবাকে জিজ্ঞেস করে সদুত্তর পাওয়া যাবে না, জানে অনুপ। মার কাছ থেকেই বের করতে হবে ঘটনাটা। বলল, “ভাঙা-বাড়িটার ব্যাপারটাই বল না?”
অনুপের মা বলল, “বেশি জানি না। সে তো আমার বিয়ের আগেকার ঘটনা। কী যেন হয়েছিল।”
মাকে দিয়ে হলো না। ঘরে ফিরে খানিক ভেবে বেরিয়ে গেল। যাবার আগে হাঁক পেড়ে বলে গেল, “মা, আমি বিধানদা’র কাছে যাচ্ছি।”
বিধান চক্রবর্তী এক সময়ে অনুপকে পড়াত। বয়সে অনুপের চেয়ে খানিকটা বড়ো হলে কী হবে, ওকে পছন্দ করে খুব। দুজনে আড্ডাও হয় অনেক সময়।
মালপো ভাজছি, দেরি করিস না,” ডেকে বলল অনুপের মা, কিন্তু অনুপ ততক্ষণে বেরিয়ে গিয়েছে।
মাঝেরপাড়ায় বিধানদার বাড়িতে অনুপ সংগ্রামের দোকানের তেলেভাজায় কামড় দিয়ে বলল, “বিধানদা, মাঝেরপাড়ার ওই ভাঙা-মতন বাড়িটায় কী হয়েছিল তুমি জান? ওই আমাদের পুরোনো বাড়িটার কাছে যেটা ছিল?
বিধানদাও তেলেভাজা খাচ্ছিল। অনুপের কথার উত্তর না দিয়ে বলল, “সংগ্রামের দোকানে তেলটা আগের মতো নেই। আজকাল দু’কামড় খেয়েই দু হাতে পেট চেপে দৌড়োতে হয়ওটা তো হরিতকি সামন্তর দোকান ছিল। বাড়িও ছিল।
বিধানদার সঙ্গে কথা বলা মানে স্লিপে ফিল্ডিং করা। কথাটা অনুপের নয়, ওদের পুরনো সহপাঠীর দাদা, অমিতদার। কোথায় সংগ্রামের তেলেভাজা খেয়ে দৌড়নো আর কোথায় কোন সামন্তর দোকান! অনুপ বলল, “কে সামন্ত? কোন দোকানের মালিক?”
বিধানদা তেলেভাজাটা খেয়ে ফেলে আর একটা তুলে নিয়ে বলল, “ওই তো তোদের বাড়ির কোনাকুনি উল্টোদিকের বাড়িটার কথা বলছিস তো? পুলিশ এসেছিল...
আমাদের পুরনো বাড়ি,” মাথা নেড়ে বলল অনুপ।
ওই হলো। তোদেরই বাড়ি। এখনও সকালে মনে হয় এক্ষুনি লাল আলো জ্বলা গাড়ি এসে দাঁড়াবে, আর মেসোশাই ইউনিফর্ম পরে, কোমরে পিস্তল নিয়ে বেরিয়ে চড়ে বসবেন।”
অনুপ হেসে ফেলল। বাবার পিস্তল কত দিন নেই, তার ঠিক নেই। ওর জন্মের আগেই বাবা পুলিশের চাকরি ছেড়ে দিয়েছিল। বলল, “সামন্তদের কী দোকান ছিল?”
বিধানদার মাথাটা এবারে ডাইনে বাঁয়ে হেলতে থাকল। “সেটা জানলে তো হয়েই যেত। আমি ছোটোবেলায় দেখেছি ওখানে পিতল কাঁসা এসবের কাজ হত। থালা বাটি কলসি ঘড়া তৈরি হত, বিক্কিরি হত।”
তবে পুলিশ কেন এসেছিল?”
লোকে বলত ওরা নাকি ডাকাতের ফ্যামিলি। জানিস তো পাড়াটা নতুন। তিরিশ বছর আগেও এখানে কর্পোরেশন ছিল না, পঞ্চায়েত এলাকা ছিল। তারও আগে তো একেবারে অজ পাড়াগাঁ। ওরা নাকি ডাকাতি করত। পরে, আমরা যখন ছোটো, তখন ডাকাতি করত কি না জানি না, লোকে বলত ওরা নাকি ডাকাতদের কাছ থেকে সোনা দানা কেনে।”
সত্যি?” অনুপ অবাক।
অনুপের দিকে একটা তেলেভাজা বাড়িয়ে দিয়ে বিধানদা বলল, “সত্যি নাতো কি? নে, খা এই কাগজটা নে, ওতে তেল মুছবি তা নইলে অত বড়োলোক হলো কী করে? এক্কেবারে ডিজেল!”
অনুপ হাঁ করে খানিকক্ষণ বসে রইল, বিধানদার কথাগুলো আলাদা করার চেষ্টা করল খাওয়া আর কাগজে তেল মোছাতেলেভাজা বড়োলোক হওয়া সামন্ত সম্বন্ধেকিন্তু… “ডিজেল কী?” জানতে চাইল
হাতের আধখাওয়া তেলেভাজাটা নাড়িয়ে নাড়িয়ে বিধানদা বলল, “আরে এইটা – ডিজেলে ভাজা। তেল নয়।
, তাই লো হাতে ধরা তেলেভাজাটা খানিকক্ষণ দেখে আবার নামিয়ে রাখল অনুপবিধানদার নজর এড়াল না, বলল, “কী হলো?”
একটু নাকটা কুঁচকে অনুপ বলল, “নাঃ, থাক, পেটটা...”
বিধানদাকে পেটের কথা বেশি বুঝিয়ে বলতে হয় না। এক টানে তেলেভাজার থালাটা অনুপের নাগালের বাইরে সরিয়ে নিয়ে বলল, “থাক, তাহলে কষ্ট করে খেতে হবে না। তবে সিল করে দেওয়া হয়েছে কেন?”
কী সিল হয়েছে?”
বিধানদা বলল, “আরে সামন্তর বাড়ি সিল করা কেন?”
এবারে উত্তর না দিয়ে অনুপ চুপ করে রইল। বিধানদা বলে চলল, “মেসোমশাইমানে তোর বাবা – রেড করল, বাড়ি হলো সিল। তার পরে শোনা গেল মেসোমশাইকে তদন্ত থেকে সরিয়ে দিয়ে ওপর মহল থেকে আরেকটা কাউকে বহাল করা হলো – তার পরেই তো মেসোমশাই রিজাইন করল। আরে এসব কথা কি আমারও মনে আছে? মেসোমশাই তখন সবে বিয়ে করেছেন, আমার আর কত বয়েস বল তো?”
বিধানদাও বলতে পারবে না?
তুমি কাউকে জিজ্ঞেস করতে পারবে না?”
বিধানদা তেলেভাজার থালা থেকে শেষ বেগুনিটা তুলে নিয়ে বলল, “আরে, জিজ্ঞেস করার বেস্ট লোক তো তোর বাড়িতেই বসে আছে...”
মাথা নাড়ল অনুপ। “তুমি বুঝছ না, বিধানদা, বাবা কিচ্ছু বলেই না।

পঞ্চাননের মেজাজ ভালো নেইসকাল থেকে নিবারণ আর ওর কাকিমার ধুন্ধুমার লেগেছে। কী নিয়ে সেটা আগে হলে পঞ্চানন খোঁজ নিতেন, আজকাল আর ইচ্ছে করে না। যত দিন যাচ্ছে গিন্নী অনুভার রাগ আর রাগের প্রকাশ আর আর বেড়ে যাচ্ছে। কারণও আজকাল বেশি লাগে না। সে দিন শুনলেন নিবারণ নাকি ঘরে ঢোকার সময় পা মোছার জন্য ভাঁজ করা চটটার ভাঁজ খুলে দিয়েছে লাথি মেরে... নিবারণ খানিকক্ষণ বোঝানর চেষ্টা করেছিল যে সেটা ইচ্ছে করে নয়, কিন্তু তার পরে আর চুপ করে না থেকে চেঁচিয়ে উঠেছিল।
নিবারণও আজকাল আগের মতো চুপচাপ শান্ত ছেলে নেই। আগে কাকিমার রাগারাগি চুপ করে মেনে নিত। এখন আর সহ্য করে না। দাবড়ে দেয়। রোজগার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গলাও বেড়েছে। সেটা গিন্নী বোঝেন, তাই বেশি ঘাঁটান না।
কিন্তু ছেলেটা বেরিয়ে গেলে ঝড়টা নেমে আসে পঞ্চাননের ওপর। অপদার্থ, অকালকুষ্মাণ্ড ভাইপো, তাকে বসিয়ে খাওয়ানর কী তাগিদ যে পান পঞ্চানন, কেন যে ঘাড় ধরে বের করে দেন না... এই সব গজগজ চলতে থাকে অনেকক্ষণ ধরে। পঞ্চানন জবাব দেন না। দু’জনেই ভালো করে জানেন যে বাড়ি কেবল ওঁদের নয়, বাপ মা মরা নিবারণের অর্ধেক ভাগ রয়েছে। তা ছাড়া অপদার্থ বা অকালকুষ্মাণ্ড তো নয়ই, বসে খাওয়ার কথাটাও মিথ্যেইদানিং ছেলেটা বাড়িটার দেখাশোনাও শুরু করেছে। শুধু ইলেকট্রিক বিল আর ট্যাক্সের টাকা দেওয়া নয়, রীতিমত বাড়ি রং করাচ্ছে, মেরামত করছে... জায়গায় জায়গায় তো নোনা ধরে, প্লাস্টার খসে পোড়ো বাড়ির মতো দেখাত।
শুধু তাই? আজকাল সমস্ত বাজারটা নিবারণই করেএই আজই দেখলেন চারা পোনা কাটছে তার কাকিমা। ছেলেটা আসার আগে তো বাজার থেকে মাসে একদিন মাছ আসত কী না সন্দেহ। আর এখন...
পঞ্চাননের চিন্তায় ব্যাঘাত ঘটে। বাইরের দরজাটা ক্যাঁচ করল না? তার মানে কেউ এসেছে। আগে পঞ্চানন দিনের বেশিরভাগ সময়টা বারান্দাতেই ইজি চেয়ারে বসে থাকতেন। কেউ এলে সঙ্গে সঙ্গে দেখতে পেতেন। এখন বারান্দায় মিস্তিরি কাজ করছে, ফলে...
বলি গতরটা একটু নাড়াবে, না কী আমাকেই রান্না ফেলে গিয়ে দেখতে হবে দরজায় কে এল?”
বাধ্য হয়ে বেতো কোমরটা সোজা করে উঠলেন পঞ্চানন। চলতেও কষ্ট হয় আজকাল। কোমর, হাঁটু, পিঠ, সব ধরে আছে। কত বয়েস হলো? পঞ্চান্ন, ছাপ্পান্নর বেশি তো নয়। এখনই এই দশা হলে...
ঘর থেকে বেরিয়ে পঞ্চানন থমকে গেলেন। একটা বাচ্চা মেয়ে... বছর পনের ষোল বয়েস হবে, বা’র দরজা দিয়ে ঢুকে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে হাসিমুখে। মুখটা যেন চেনা চেনা।
কী দাদু? হাঁ করে দাঁড়িয়ে থাকবেন, না কি ভেতরে আসতে বলবেন?”
গলা শুনে চিনতে পারলেন সঙ্গে সঙ্গে। ওই হলধর হালদারের মেয়েটা। কী যেন নাম?
থতমত খেয়ে বললেন, “নিবারণ তো নেই মা, ওবাড়ি গিয়েছে, তোমাদের বাড়িতে, যেটা ভাড়া নিয়েছে...”
মেয়েটা বলল, “আমি আপনার সঙ্গেই দেখা করতে এসেছি, দাদু।”
আবার দাদু! মেয়েটাকে ডেকে ঘরে নিয়ে এলেন পঞ্চানন। আগে বিশাল বারান্দায় বাইরের লোক বসত। বসার ঘরের ছাদের অংশ ভেঙে পড়ায় পঞ্চানন ওখানকার সোফা সেটটা বার করে এনেছিলেন। সময়ে তার অবস্থাও হয়ে দাঁড়িয়েছিল ঘরের ছাদের মতন। শেষে সেদিন নিবারণ কাজ সেরে ফিরে ওতে ধপ করে বসেই “বাপরে!” বলে লাফিয়ে উঠেছিল। আদ্যিকালের সোফার স্প্রিং ভেঙে কাপড় ফুটো করে উঁকি দিচ্ছিল...
কাকিমা প্যান্ট রিফু করে দেবার আগেই নিবারণ সে সোফা বিদায় করেছিল বাড়ি থেকে। পঞ্চানন বলতে গিয়েছিলেন আর একটা আসার আগেই কেন জিনিসটা ফেলে দেওয়া? কিন্তু শোনেনি নিবারণ। এখন এই মেয়েটাকে কোথায় বসাবেন?
নিজের ঘরেই ডাকলেন, ইজি চেয়ারে বসিয়ে রান্নাঘরে গিয়ে গিন্নীকে বললেন, “বাইরের লোক এসেছে। চা বানাও একটু।” হতভম্ব অনুভার হাঁ বন্ধ হবার আগেই ফিরে এলেন।
তোমার নামটা মা ভুলে গিয়েছি,” বললেন মেয়েটাকে।
মেয়েটা বলল, “পুচি,” বলে এক লাফে উঠে ধুপ্‌ করে পঞ্চাননকে একটা প্রণাম করে ফেলল। তারপর এদিক ওদিক তাকিয়ে বলল, “আপনি চেয়ারে বসুন, আমি তক্তপোষে বসছি
পঞ্চানন একটু লজ্জা পেলেন। তাই তো, একটা বসার জায়গা যদি নিবারণ রাখত তবু একটা কথা ছিল। এখন এই মেয়েটাকে নিজের খাটে বসাবেন, নাকি রান্নাঘর থেকে একটা পিঁড়ে নিয়ে আসবেন...
কই, বসুন!” মেয়েটার ধমকের সুরে বলা কথায় পঞ্চাননের চমক ভাঙল। বলতে গেলেন, “ইয়ে, না, মানে তুমি বসো...” কিন্তু “ইয়ে” পর্যন্ত বলার সুযোগ পেলেন – মেয়েটা টরটর করে বলতে লাগল, “আরে, মানুষ যখন দুটো, আর বসার জায়গা যখন একটা, তখন গুরুজন বসবে, সেটাই স্বাভাবিক, তাই নয় কি? আর তাছাড়া আমি তো বসতে আসিনি, একটা কাজের কথা বলেই চলে যাব।”
পঞ্চানন ইতস্তত করে বসলেন। বললেন, “কাজের কথা, মানে... ওই বাড়িভাড়ার ব্যাপারে যদি কিছু...”
পুচি বলল, “হ্যাঁ, বাড়িটার ব্যাপারেই বইকি!”
পঞ্চানন আরও ইতস্তত করতে থাকলেন, “মানে, ও বাড়িটা তো নিবারণ ভাড়া করেছে... মানে, ওতে আমার বা নিবারণের কাকিমার বিশেষ মতামত... ইয়ে মানে, ওটার মালিক... মানে ভাড়াটে আসলে নিবারণই...”
পুচি ততোক্ষণে এদিক ওদিক চেয়ে দেখে নিয়েছে। বলল, “এ আপনার নিজের বাড়ি?”
পঞ্চানন বললেন, “মানে, পৈত্রিক বাড়ি আরকি... আমার বাবা আর নিবারণের বাবা-র বাবা, মানে নিবারণ তো আমার ভাইপো... মানে, আমাদের ঠাকুর্দার আমলের বাড়ি। আমার ঠাকুর্দার বাবাও এ ভিটেতেই থাকতেন, কিন্তু সে বাড়ি আর নেই। তার ওপরেই আমার ঠাকুর্দা এ বাড়ি বানান।”
কিন্তু এটার তো একেবারে ভাঙাচোরা অবস্থা!”
মেয়েটা তো বেশ অসভ্য! পরের বাড়ি এসে এমন কথা বলে নাকি! পঞ্চানন গলাটা একটু খাঁকরে বললেন, “হ্যাঁ, মানে, এই ক’দিন হলো – আসলে একটু মেরামত-টত...”
জোরের সঙ্গে মাথা নেড়ে সায় দেয়ার ভঙ্গীতে পুচি বলল, “তাই তো ভাবছি। বাড়ি সারাতে মিস্তিরি তো লাগাতেই হবে। তা যতদিন মিস্তিরি কাজ করবে, সারা বাড়িতে ধুলো-কাদা-ময়লা... কোথায় বসবেন, কোথায় শোবেন, কোথায় বা খাবেন... আর ওদিকে তো আমাদের কাছ থেকে ভাড়া নেওয়া বাড়িটা পড়েই রয়েছে। তা যে ক’দিন মিস্তিরি কাজ করবে, সে ক’দিন আপনারা সক্কলে গিয়ে ওখানেই থাকুন না কেন? তাহলে এই ভাবে থাকতে হয় না, বেশ নিশ্চিন্ত হয়ে, মিস্তিরি চলে গেলেই ফিরবেন নাহয় নতুন বাড়িতে?”
পঞ্চানন খানিকক্ষণের জন্য হতভম্ব হয়ে চুপ করে গেলেন। তার পরে হঠাৎ মনে পড়ল, বললেন, “কিন্তু, ও বাড়িতে তো থাকা যাবে না, ওখানে তো... ইয়ে, মানে... তোমার বাবা যে বললেন... সেই জন্যই তো নিবারণ ওখানে বলল, মালপত্তর রাখবে...”
আরে ছাড়ুন তো বাবার কথা,” খুব জোরের সঙ্গে পুচি বলতে শুরু করেছিল, “বাবার ব্যাপারই ওরকমকবে কী জানি কে কী এক...” হঠাৎ থেমে গেল। হাতে চায়ের কাপ নিয়ে ঘরে ঢুকেছে নিবারণের কাকিমা অনুভা
কে তুমি, মেয়ে?” হাড় পর্যন্ত ঠাণ্ডা করে দেওয়া গলায় বলল অনুভা। এই সুর পঞ্চানন চেনেন বহুদিন ধরেই। ওঁ হাড় ঠাণ্ডা হয়ে এল। “কী দরকার তোমার এখানে? কে পাঠিয়েছে? নিবারণ? তোমাকে দিয়ে বলে পাঠিয়েছে যে এ বাড়ি আমাদের ছেড়ে যেতে হবে? বলে দিও, সে গুড়ে বালি! আমরা আমিত্যু এবাড়ি ছেড়ে যাব না। সে তার যাই মতলব থাকুক না কেন! বলে দিও তাকে।”
এই প্রথম পঞ্চানন দেখলেন পুচির মুখ শুকিয়ে গেছে। আমতা আমতা করে বলল, “না মানে, দিদা, আমাকে কেউ পাঠায়নি। আমি নিজেই বলতে এসেছিলাম... মানে আমি জানতাম না এ বাড়িতে মেরামত করতে হবে... মানে, আমি... ইয়ে...”
অনুভা অপেক্ষা করছিল পুচির কথা শেষ হবার জন্য। দম ফুরিয়ে যাওয়া পুতুলের মতো পুচি থেমে যাবার পর বলল, “বেশ, মানলাম তোমাকে কেউ পাঠায়নি। যে পাঠায়নি তাকে বলে দিও যে তার এ বাড়িতে যতটা অধিকার, ততটাই অধিকার আমাদের। আমরা ম’লে সে এ বাড়ি নিয়ে যা খুশি করতে পারে। তার আগে যেন রোয়াবী না করতে আসে।”
পুচির হাতে চায়ের কাপটা ধরিয়ে দিয়ে নিবারণের কাকিমা ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। দরজার বাইরে থেকে গলার আওয়াজ এল, “চা খেয়ে বিদেয় হয়ে যেও। আর এসো না।”
হতভম্ব পঞ্চানন চেয়ারেই বসে রইলেন, পুচি খানিকক্ষণ চায়ের কাপ হাতে দাঁড়িয়ে থেকে ঘরের একটা তেপায়া টেবিলে কিছু কাগজ, একটা হোমিওপ্যাথির বই আর পঞ্চাননের পুরনো পানের বাটাটার মধ্যেই ঠেলেঠুলে জায়গা করে চায়ের কাপটা নামিয়ে রেখে বেরিয়ে গেল।

রাস্তায় আসতে আসতে পুচির চোখে জল আসছিল ঠেলে। তার এই ক’বছরের অনতিদীর্ঘ জীবনে এত অপমানিত কোনওদিন হয়নি সে। বাবা মা’র একমাত্র মেয়ে, তাও আবার বেশি বয়সের সন্তান। ছোড়দার চেয়েই আট বছরের ছোটো। বাড়িতে ওর কথাই শেষ কথা বলে মানে সকলে। তার ওপর দাদারা বাবার নানা ব্যবসা সামলাতে তো সারা দিন বাড়িতেই থাকার সময় পায় না। বড়দা তো মাসের মধ্যে বিশ দিন হিমপুরেই কাটায়। মা যাবার পর থেকে তো ও-ই বাড়ির কর্ত্রী হয়ে থেকেছে। কোনওদিন কারও কাছে পুচি বকুনি দূরের কথা, বারণ পর্যন্ত শোনেনি। আর আজ কি না!
কী এমন খারাপ কথা বলতে গেছিল পুচি? বলতে গেছিল, “দাদু, আপনারা ক’দিন যদি নিবারণকাকুর বাড়িতে গিয়ে থাকেন, তাহলে বাড়িটার ভূতুড়ে বলে বদনামটা কেটে যায়, আমরাও ভবিষ্যতে ভাড়া দিতে পারি নিশ্চিন্তে...” গিয়ে বাড়ির অমন দুরবস্থা দেখে মনে হলো, বাড়ি তো সারাতেই হবে, মিস্তিরি কাজ করবে, ততদিন তো অনায়াসেই রা গিয়ে ভাড়া বাড়িতে থাকতে পারেন... তা বলতে না বলতেই দজ্জাল বুড়িটা এসে হাউমাউ জুড়ে দিল। কী সাংঘাতিক মুখ বাবা! সাধে কী দাদুটা সারাক্ষণ খালি মানে মানে করে আর অমন মিউ মিউ করে কথা বলে! অমন খাণ্ডারণী বউয়ের পাল্লায়... ধ্যাৎ!
এর আগে দু’বার হোঁচট খেয়ে, একবার কাদাজলে ভর্তি গর্তে পা পড়েও পুচির খেয়াল হয়নিশেষে গলির মুখে পাড়ার ষাঁড়টা বসে ছিল – তার ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে হুঁশ হলো। পাড়ার বখাটে ছেলেগুলো বাবাজীবন সুইটস্‌-এর সামনে ক্যারাম খেলছিল, তাদের হাসির হররায় রাগও হলো সাংঘাতিক। উঠে শাড়ি থেকে ধুলো ঝেড়ে নিজের মনেই বলল, “দাঁড়াও, দেখাচ্ছি।”
দু’দিন গেল শুধু কাকে কী দেখাবে তা ভাবতেই। কিন্তু ভেবে যে কিছু পেল তা নয়। সকাল থেকে সন্ধে অবধি নিবারণের বাড়ির দিকে যতটা সম্ভব নজর রেখে বুঝল লোকটা মোটামুটি একটা রুটিনে চলে। সকাল সকাল এসে বাড়িতে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেয়। তার পরে দুপুর নাগাদ একবার ঘণ্টাখানেকের জন্য বেরিয়ে কোথায় যায়, বোধ হয় খেতে টেতে। দুপুর থেকে সন্ধে অবধি আবার বাড়ির মধ্যে থাকে, অন্ধকার হবার আগে আবার দরজায় বাইরে থেকে তালা দিয়ে চলে যায় পরদিন অবধি।
তাহলে ব্যবসা করে কখন? পুচি একদিন দুপুরবেলা নিবারণ ফিরে দরজা বন্ধ করার পরে পিছনের বাগানের দিকের ভাঙা জানলাটা দিয়ে উঁকি দিয়ে অবাক! ব্যবসা না হাতি! লোকটা তো শুধু একটা তেপায়া খাটিয়ে তুলি দিয়ে ছবি আঁকে! পাগল নাকি!
পুচি পড়ল বিপদে। বিষয়টা কারওর সঙ্গে আলোচনা করার নেই। পুচিকে হলধর ছোটোবেলা থেকে মানা করেছে ভাড়াটেদের ব্যাপারে মাথা গলাতে, বলত, “ভাড়া নেবার পরে মালিক ওরাই। ওর মধ্যে নাক গলানতে আমি নেই, তুইও থাকবি না।” আজও বলে, “এমনিতেই বদনাম, কেউ ভাড়াই নিতে চায় না। তার মধ্যে ভাড়াটে যদি দেখে আমরা নাক গলিয়ে ছোঁক ছোঁক করছি, আগেই পালাবে।”
পুচির অবশ্য অত দরদ নেই ভাড়াটের প্রতি। সব সময়েই ওরা কী করছে জানার চেষ্টা করেছে, আজ তার অন্যথা হবে কেন তাও বোঝে না। যখন ভাড়াটে নেই, তখনও তো পুচি রোজ একবার করে দেখে যায় বাড়ির ভিতরটা। তখন তো বাবার আপত্তি হয় না!
সেদিন থেকে নিবারণ বেরিয়ে যাবার পরে রোজই একবার করে ঘুরে যায় পুচি। তালার অন্য চাবিটা তো দেয়নি নিবারণকে। সে চায়ওনি অবশ্য! অনেক ভাড়াটে চায়। পুচি তাদের দিয়ে দেয়। তবে তিন নম্বর চাবির কথা সে কারোক্কে বলেনি। বাবাকেও না।
তবে বেশিক্ষণ থাকে না পাড়ার লোকে বাড়িটার বদনাম দেয়, বলে রাতে নাকি নানা অদ্ভুত ঘটনা ঘটে। সেই জন্যই ক্রমে ক্রমে বাসাবাড়ি থেকে নামতে নামতে বাড়িটা এখন গুদামে পরিণত হয়েছে। শহর এখানে শেষ, কিন্তু যাতায়াত করতেও সময় লাগে না বেশি। এমন যায়গায় সুন্দর দোতলা বাড়ি পুচির মনে পড়ে ছোটোবেলায় ওদের মতো লোকই থাকত। একটা মেয়ের সঙ্গে ও খেলতেও আসত মা’র হাত ধরে। বাড়িটা রাস্তার শেষের বাড়ি। তার পরেই রেল লাইন। পুচি আর সেই মেয়েটা ছাদে উঠে এক্কাদোক্কা খেলত আর দূর থেকে ট্রেনের হুইসিল শুনলে ছুট্টে গিয়ে ডিঙ্গি মেরে ছাদের রেলিং ধরে ট্রেন দেখত। তখন মনে পড়ে অনেকেই আসত এমনিই খোঁজ পেয়ে – আপনার নাকি সুন্দর একটা বাড়ি আছে... যারা শহরে কাজ করে কিন্তু শহরের ভীড়ে থাকতে চায় না, এমন কত লোক আসত, আর আজ...
তালা খুলে ঢুকল পুচি। বাইরের দরজাটা বন্ধ করতে সাহস হয় না, কিন্তু সন্ধের অন্ধকার নামছে একেবারে হাট করে খোলা রাখাও বুদ্ধিমানের কাজ নয়। আলতো করে ভেজিয়ে দিল। নিবারণ রাতে থাকে না, কিন্তু ঘরগুলোতে দারুণ দারুণ আলো লাগিয়েছে। তারই একটা জ্বালল পুচি। ছাদের চার দিক থেকে একটা মোলায়েম আলো জ্বলে উঠল। ঘরে দেওয়াল ধরে সাজান অন্তত চার পাঁচটা ছবি। দুটো সমুদ্রতীরের, একটা পাহাড়ের, একটা শহরের রাস্তা, সবকটাই বেশ বড়ো, কিন্তু ঠিক দেওয়াল জোড়া নয়। পাঁচ নম্বরটা ছোট্ট ছবি – নৃসিংহ অবতার।
আর তেপায়াতে লাগান একটা বিশাল ছবি। পুচির ঘরের যে কোন দেওয়ালের থেকে লম্বা। তাতে কী আঁকা পুচি বুঝতে পারল না – কেমন বালি বালি দেখতে।
লোকটা এ বাড়িতে এসে ছবি আঁকে? কেন? তার নিজের বাড়িতে জায়গা নেই? সে যাক গে, পুচির কাজ শেষ। বাড়িতে এমন কোন কিছু করছে না নিবারণ যার জন্য পুচিকে উদ্বিগ্ন হতে হবে। আলো নিভিয়ে ফিরে গেলেই হয়। ভূতের ভয় পুচির নেই, কিন্তু গা ছমছম করে বইকি!
দরজার দিকে ঘুরতেই পুচির বুকটা ধড়াস করে প্রায় গলা দিয়ে বেরিয়ে এল। খোলা দরজায় দাঁড়িয়ে নিবারণ। দৃষ্টি পুচির দিকেই।

নিবারণ এক পা এগিয়ে এসে ঘরে ঢুকে পিছন ফিরে দরজাটা বন্ধ করল আবার।
ছিটকিনি দেবেন না কিন্তু,” ধমকের সুরে কথাটা বলতে চেয়েছিল পুচি, কিন্তু গলা দিয়ে শব্দ প্রায় বেরোলই নারোজই তো লোকটা চলে যায়, আর আসে না। আজ ফিরে এল কেন?
না,” বলল নিবারণ। “অতটা বুদ্ধি আমার আছে। কিন্তু তুমি এখানে কী করছ?”
বাবার কাছে নালিশ গেলে পুচির সর্বনাশ। এর আগে রোজ যে আসত, আজ যে ওর অন্য বাড়িতে পুচি গিয়েছিল, এ সব কথা জানে নাকি নিবারণ? লোকটাকে খুশি করতে হবে। তাই চট করে বলল, “ইয়ে, সেদিন আপনি দরজা দেবার আগে দেখলাম ভিতরে কত সুন্দর ছবি। তাই...”
তাই আমাকে না জিজ্ঞেস করে আমার চলে যাবার পরে ঢুকে এলে?” ঘরের এক কোনে একটা টেবিল, তার পেছন থেকে একটা প্লাস্টিকের চেয়ার বের করে নিবারণ তাতে বসল। পুচিকে বসতে বলল না।
ক’দিন হলো এই ভাবে আসছ?”
এই রে! আগেও দেখেছে নাকি? পুচি তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নিল।
কই, আগে তো কোনওদিন আমি...” অবাক ভাবটা বাড়াবাড়ি হলো না তো?
নিবারণ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে পুচির দিকে তাকিয়ে বলল, “তার মানে এখানে যে সব বিদঘুটে ব্যাপার ঘটছে তার জন্য তুমি দায়ী নও?”
পুচির মুখটা শুকিয়ে গেল। ক’ মাস হলো? দু’মাসও না। এর মধ্যেই...
কী হয়েছে?”
এদিকে এসো,” বলে চেয়ার ছেড়ে উঠে নিবারণ পাশের ঘরের দিকে গেল। একটু দোনোমনো করে পুচি গেল পিছনে।
ঘরটায় বেশি ছবি নেই, এবং সেগুলো ও ঘরের মতো যত্ন করে সাজানও নয়। একটার গায়ে একটা হেলান দিয়ে মাটিতে দাঁড় করিয়ে রাখা। সামনের ছবিটাই বেশ বড়োতার সামনে দাঁড়িয়ে নিবারণ বলল, “দেখো।”
মস্ত ছবি। সামনে ধানক্ষেত, পিছনে কিছু গাছ, আকাশে ঘন কালো মেঘ – বৃষ্টি এল বলে, সেই কালো মেঘের গায়ে উড়ে যাচ্ছে একসার সাদা বক। কী দারুণ! পুচির কেমন মন খারাপ হয়ে গেল ছবিটা দেখে। কিন্তু সারা ছবিতে এগুলো কী?
পুচিকে ঝুঁকে পড়ে কালো কালো ফুটকিগুলো দেখতে দেখে নিবারণ বলল, “এগুলোর কথাই বলছি। আমারই কালো রঙের টিন থেকে রঙ নিয়ে ছিটিয়ে ছিটিয়ে ছবিটাকে নষ্ট করেছে কেউ।”
পুচি অবাক হয়ে বলল, “রঙ ছেটালে এরকম ছোট্ট ছোট্ট বিন্দু কী করে হয়? কী দিয়ে ছিটিয়েছে?”
উত্তরে ঘরের কোনা থেকে একটা দাঁত মাজার বুরুশ তুলে এনে পুচিকে দেখাল নিবারণ। বুরুশটা একেবারে কালোএই যে। এইটা আমার রঙের বালতিতে ডুবিয়ে ডুবিয়ে বুড়ো আঙুল দিয়ে বুরুশের দাঁড়াগুলো টেনেছে, আর ছোট্ট ছোট্ট কালির বিন্দু আমার ছবিতে ছিটিয়ে দিয়েছে
পুচির হঠাৎ খুব রাগ হলো। যতটা হলো অজানা কালি ছেটানেওয়ালার ওপর, ততটাই নিবারণের ওপরেও। কেন? কালি ছিটিয়ে থাকলে ওর কথাই মনে হয়েছে কেন নিবারণের?
মুখটা গম্ভীর করে বলল, “ক’দিন হলো শুরু হয়েছে এমন?”
নিবারণ বলল, “সে তো প্রায় শুরু থেকেই। এই যে সাতটা ছবি রয়েছে, সবকটাই নানাভাবে নষ্ট করা।”
একটা একটা করে ছবি টেনে বাইরে আনল নিবারণ – সেগুলোর চেহারা দেখে পুচির চোখে জল এল। একটায় পানের পিক ফেলা, একটা ওপর থেকে নিচ অবধি ব্লেড বা ছুরি দিয়ে চেরা, আরও একটার নিচের দিকে কী লেখা দেখে নিচু হয়ে দেখল নীল আকাশের গায়ে লাল দিয়ে লেখা, ‘নবারুণ না হাতি!’ দেখল তার নিচে আর্টিস্টের সই, নবারুণ। অবাক হয়ে অন্য ছবিগুলোর দিকে তাকিয়ে দেখল সবকটার নিচেই ডান দিকে অস্পষ্ট ভাবে যেখানে আঁকিয়ের সই রয়েছে সেখানে নাম কোনওটাই নিবারণ না, লেখা রয়েছে, নবারুণ!
নিবারণের দিকে তাকিয়ে বলল, “আপনার নাম, নবারুণ, না নিবারণ?”
নিবারণের মুখ লাল। অন্য দিকে তাকিয়ে বলল, “ইয়ে, আসলে কী জান, নিবারণ নাম নিয়ে তো আর্টিস্ট হওয়া যায় না, তাই...”
চোখাচুখি হলে পাছে হেসে ফেলে, সেই ভয়ে মাটির দিকে তাকিয়ে পুচি বলল, “অনেক ক্ষতি হয়েছে?”
দীর্ঘশ্বাস ফেলে ছবিগুলো আবার গুছিয়ে রেখে নিবারণ বলল, “ক্ষতি আর কি, এগুলো তো আমি কিনে আনিনি, তবে খাটনি তো জলে গেল... আর বিক্‌কিরি তো করা যাবে না...”
তাই তো, কত ক্ষতি হলো?
বাড়ি ফেরার পথে অনুপের বাড়ি গেল পুচি। ওর বাড়িতে ইনটারনেট আছে। যে কোন কিছুই ওখান থেকে বের করে আনতে পারে সে। নিবারণের ছবির কত দাম হতে পারে তাও নিশ্চয়ই পারবে।
অলরেডি ভূতের উপদ্রব শুরু?” সব শুনে বলল অনুপ। কিন্তু এ তো বড়ো সমস্যার ব্যাপার! ভূতেরা যে রকমের ঝামেলা করে বলে জানি, এ তো সেরকমের সমস্যা বলে মনে হচ্ছে না!”
মাঝে মাঝে অনুপটাকে ধরে মারতে ইচ্ছে করে পুচিরভূত কী কী সমস্যা করে তার লিস্টি তোর কাছে আছে?”
না, তা নেই, তবে তুইও জানিস ভূত কী করতে পারেকোনওদিন শুনেছিস, ভূত কারো ছবিতে লিখেছে, বা কালি ছিটিয়েছে? আমি সারা জীবনে অন্তত দুহাজার ভূতের গল্প পড়েছিকোনওদিন এমন কথা কোথাও দেখিনি
ভূতের গল্প কেন, কোন ধরণের বই পড়ারই কোনঅভ্যেস পুচির নেই, কোনওদিনই ছিল নাসুতরাং অনুপের কথাটা কাটতেও পারল নাবলল, “তুই ইন্টারনেটটা খুলে দেখবি, নিবারণ গড়াই নামে আর্টিস্টের ছবির দাম রয়েছে কিনা?”
ইন্টারনেট অনুপের কম্পিউটারে খোলাই থাকেফেসবুক না চললে ওর জীবন নাকি অচল হয়ে যায়কম্পিউটার খুলে খানিকক্ষণ খুটুর খাটুর করে বলল, “নিবারণ গড়াই বলে কোনআর্টিস্টের নাম তো পাচ্ছিনাঅনুপের ঘাড়ের ওপর দিয়ে পুচিও দেখছিলঅনুপের হাত যে স্পিডে চলে, তাতে পুচির পক্ষে সে কী দেখছে আর কী পাচ্ছে না বোঝা সম্ভব নয়বলল, “আরে দাঁড়া, দাঁড়াওর ছবি আঁকার নাম নিবারণ নয়, নবারুণনবারুণ গড়াই দেখ
অবাক হয়ে অনুপ বলল, “ছবি আঁকার নাম আবার কী বস্তু?”
বস্তু কী সে বুঝে অনুপের হাসি আর থামেনা! কম্পিউটারের ভুলভাল বোতাম টেপা হতে থাকল হাসির দমকেকী আশ্চর্য! নিবারণ গড়াই থেকে নবারুণ হয়ে গেল ছবি বিক্কিরি করবে বলে, তোর ভাড়াটেটা নিগ্ঘাত পাগলরে পুচি!”
তেড়ে ধমক দিল পুচি, “এত হাসির কী হয়েছে বুঝিনা বাপু। কেন, লেখকরা যদি নাম ভাঁড়িয়ে লিখতে পারে, সিনেমা আটিসরা যদি বেনামে অ্যাক্টো করে, ছবি আঁকার ব্যাপারে কেন নতুন নিয়ম হতে হবে?”
হাসি থামিয়ে অনুপ আবার খানিকক্ষণ বোতাম টিপে বলল, “নাহ্, নবারুণ গড়াই বলেও তো কাউকে দেখছি নাতবে নিবারণ যদি নামটা বদলে নবারুণ করে থাকে, তবে কি আর গড়াইয়ের মতো পদবীকে ছেড়ে কথা বলবে? দেখ সেখানেও হয়ত অন্য কিছু লেখে

পঞ্চাননের মেজাজ ভালো ছিল না সেদিনও। সকালবেলা বাড়ি থেকে রাস্তায় বেরিয়ে পড়েছেন। ওই পুচি মেয়েটা আসার পর থেকে অনুভার মেজাজ সপ্তম থেকে নামেইনি। পঞ্চাননকে তো ছেড়ে কথা বলেইনি, নিবারণকেও নৈঃশব্দের শিকার হতে হয়েছে। নিবারণকে অবশ্য তাতে খুব অখুশি দেখায়নি। নিজের মতো এসেছে, খেয়েছে, বাজার করে এনে দিয়েছে, সময়মত বেরিয়ে গেছে।
এ হয়েছে আর এক জ্বালাগত কয়েক বছর হলো কাজ বলতে ওই একটাই ছিল, সকালে বাজার করা। নিবারণ সে দায়িত্ব নিয়ে নেবার পর থেকে পঞ্চাননের বাড়ি থেকে বেরোনরই দরকার আর নেইযাবার কোথাও না থাকলে রাস্তায় ঘুরে বেড়ানোও এক বিড়ম্বনা। ভাদ্র মাস। গরমে কাহিল সকাল আটটা থেকেই
তৃতীয় বার পাড়ার মুদিখানার সামনে দিয়ে যাবার সময় দোকানদারের সঙ্গে চোখাচোখি হয়ে গেল। সকালের ভীড় আর নেই, কর্মচারী দোকান গোছাচ্ছে, রসময় মুদি হাতে সবে চায়ের গেলাসটা তুলেছে। “গড়াইবাবু,” দোকান থেকে হেঁকে বলল রসময়, “ব্যস্ত নাকি? এদিকে আসেন না একটু?”
কাঁধের গামছাটা দিয়ে টুলটা ঝেড়ে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, “বসেন, বসেন, চা খাবেন?”
পঞ্চাননের “না-না-থাক,”-টা এমনই জোলো সুরে বেরোল, যে নিজেরই লজ্জা করল। বাড়িতে থাকলে এতক্ষণে আর এক কাপ চা পেতেন গিন্নীর মেজাজ ভালো থাকলে, কিন্তু সে গুড়ে এখন বালি। দু’বেলা দু’কাপ পাবেন কি পাবেন না, তাও জানেন না। “আরে, খান, খান,” বলে রসময় একটা খালি গেলাস টেনে বের করল নিজের কাউন্টারের নিচ থেকে এবার পঞ্চানন একটু জোর দিয়ে বললেন, “আহা, আবার আপনার নিজের ভাগেরটা কেন...”
নিজের গেলাস থেকে খানিকটা চা খালি গেলাসে ঢেলে সেটা পঞ্চাননের হাতে ধরিয়ে দিয়ে রসময় বলল, “নিন, ধরুন। এইটুকুতে আমার হবে না, আপনারও হবে না, তবে তার ব্যবস্থা করছি।” কর্মচারীর দিকে ফিরে বলল, “যা, চট করে আর দুটো ডবল হাপ্‌ নিয়ে আয়, যাবি আর আসবি, এই চা শেষ হবার আগেই, বুঝলি? আর বলবি, ফ্রেশ বানাতে, সকালের চা যেন না দেয়...”
ছেলেটা বেরিয়ে গেল, রসময় ফ-ড়্‌-ড়্‌-ড়্‌ শব্দে চায়ে চুমুক দিয়ে বলল, “এই ভালো, একটা চা একজন খাবে, অন্যজন জুলজুল করে চেয়ে দেখবে, তারপরে যতক্ষণে অন্য চা আসবে ততোক্ষণে প্রথম জনের চা শেষ – এর চেয়ে এটা হাপ্‌ হাপ্‌ খেলাম, এটা শেষ হতে হতে আবার দুটো হাপ্‌ চা নিয়ে হেবো ফিরেও আসবে... তা আছেন কেমন? আজকাল তো দেখিই না একেবারে...”
একটু থতমত খেলেন পঞ্চানন। আগে মাসকাবারি বাজার এখান থেকেই যেত – নিবারণ এসে থেকে বাজারের সব দায়িত্ব নিজের ঘাড়েই নিয়ে নিয়েছে। ও কি আর রসময়ের দোকানে আসে না?
বললেন, “দাদার ছেলেটা ফিরেছে যে, -ই এখন আমাদের বাজার টাজার করছে – বলে, ‘কাকা, এখন আমি এসেছি, তোমার আর বেশি খাটাখাটনি না করলেও চলবে...’”
রসময়ের মুখের হাসিটা বেড়ে গেল। “ও, তাই বলেন, ওই ছেলেটা গড়াইদার ছেলে?” পঞ্চাননের গুষ্টিশুদ্ধ সবাই গড়াই তবু একমাত্র দাদাকেই সবাই কেন গড়াইদা বলত, সেটা পঞ্চানন ভেবে পান না। রসময় তো পঞ্চাননকে গড়াইবাবু বলে, দাদা-টাদার ধার ধারে না। রসময় বলে চলল, “তা অনেক দিন বাদে ফিরল, কী বলেন? এর আগে তো সেই গড়াইদার শ্রাদ্ধের সময় এসেছিল ক’দিনের জন্য... কোথায় ছিল? বিলেত?”
না, না! বিলেত না, গিয়েছিল দিল্লী – সেখানে আঁকতে শিখে সেখান থেকে গিয়েছিল ঢাকা। তারপর ওই সিঙ্গাপুর, হংকং, ব্যাংকক, আর কোথায় কোথায়... সব বিদঘুটে চিনা-জাপানি নাম বাপু মনেও থাকে না। তারপরে এই ফিরেছে দেশে। এখন নাকি এখানেই থিতু হবে।”
তা বেশ, তা বেশ,” নিজের চায়ে শেষ চুমুক দিয়ে রসময় বলল, “হতভাগাটা দুটো চা আনতে গিয়ে ভাত রান্না করে ফেলবে দেখছি। তা সংসারী হয়েছে?”
পঞ্চাননেরও চা শেষ হয়ে এসেছিল। এবারে বুঝেছেন রসময় কেন ডেকে গপ্পো জুড়েছে। মুদিখানা ছাড়াও রসময়ের আর একটা জীবিকা আছে – ঘটকালী। বললেন, “নাঃ, সে দিকে মন নেই ভাইপোর। বলেছে, আটি মানুষ, সংসার করা তার দ্বারা হবে না!”
রসময় হা হা করে হেসে বলল, “আরে অমন কথা সব্বাই বলে বয়সকালে – তার পরেই সুর পালটায়। তা ভাইপো কাকার বাজার করার কষ্ট কমাবে, কাকিমার রান্না করার কষ্ট কমাবার ব্যবস্থা করবে না?”
পঞ্চানন চা-টুকু শেষ করে রসময়ের কাউন্টারের ওপর গেলাসটা রেখে উঠে পড়লেন। নিবারণের বিয়েই যদি আলোচ্য বিষয় হয়, তবে সে সম্বন্ধে তাঁর কোন বক্তব্য নেই। যেমন নেই নিবারণের প্রায় সব বিষয়েই। রসময় কী একটা বলতে যাবে, এমন সময় দোকানে এলেন উকিল শ্যামাচরণের স্ত্রী অবন্তী। প্রায় দেড় ফুট লম্বা ফর্দ ধরিয়ে দিয়ে বললেন, “দেখুন তো...”
রসময় ফর্দে চোখ বোলাচ্ছে, দোকানে কর্মচারী কেউ নেই, এই সু্যোগে পঞ্চানন “আসি রসময়,” বলে বেরিয়ে পড়লেন। শুনতে পেলেন, রসময় গলা তুলে বলছে, “কাকা হিসেবে আপনারও তো দায়িত্ব থাকে, ভাইপোটার একটা হিল্লে করার, ভাবলে বলবেন, গড়াইবাবু, ভালো দু-চার ঘরের মেয়ে আমার হাতে আছে...”

মেজাজ ভালো ছিল না পুচিরও। সকাল থেকে কী যেন একটা অস্বস্তি তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। সেদিনের পর থেকে আর নিবারণের বাড়িতে ঢোকেনি পুচি। ঢোকার উপায়ও ছিল না, দরজায় নতুন একটা বোম্বাই মার্কা তালা এনে নিবারণ লাগিয়ে রেখেছে পরদিন থেকেই। পুচির কাছে একটা দ্বিতীয় চাবি আছে জানা সত্ত্বেও ওর কাছে চেয়ে নেয়নি। তবে রোজই সন্ধেবেলা অভ্যেসমত নিবারণ বেরিয়ে যাবার পরে এক চক্কর লাগিয়ে এসেছে চার পাশে, ভাঙা জানলা দিয়ে উঁকি মেরে দেখেছে ভিতরের অন্ধকার। দু-একবার ভেবেছে নিবারণ থাকতে থাকতেই গিয়ে জিজ্ঞেস করবে সব ঠিক আছে কি? আর কোন ছবিতে কেউ কালি ছেটায়নি, বা আজে বাজে কথা লিখে দেয়নি তো?
যায়নি। নিবারণ সেদিন বেরোবার সময় বলেছিল, “অদ্ভুত কিছু কাণ্ড যখন ঘটছেই – তুমি আর হুট-হাট এখানে এসো না। আগে আমাকে ব্যাপারটা বুঝতে দাও। তার পরে তোমাদের জানাব কী হচ্ছে।”
দু’এক বার গিয়েছে অনুপের কাছে। অনুপ বলছে ও রোজই একবার করে নানা ভাবে নিবারণ বা নবারুণের ছবি সম্বন্ধে জানার চেষ্টা করেছে ইনটারনেট থেকে। কিন্তু কিছুই জানতে পারেনি। গতকাল অনুপও বুঝিয়ে দিয়েছে, রোজ রোজ নিবারণের ছবি সম্বন্ধে গোয়েন্দাগিরি করা ওর আর পোষাচ্ছে না। “তোর কি আজকাল আর কোন কথাই নেই?”
সকালে বাবাকে জলখাবার দেবার পরে পুচি রান্নার মাসিকে দুপুরের খাবার কী করতে হবে বলে দিল। আজ ছোড়দা ভালো বাজার এনেছে – দুপুরে বড়দা আসবে হিমপুর থেকে। এ মাসে এই প্রথম। রাতের রান্না পুচিই করবে আজ, তাই দুপুরের রান্না সামান্যই। দু’এক বার ভেবেছে, বড়দাকে ব্যাপারটা বলবে কি না। তার পরে ভেবেছে, নাঃ, বড়দা প্রথম থেকেই বাড়িটা বেচে দেওয়ার পক্ষে। তাছাড়া বাবাকে না বলে আগ বাড়িয়ে দাদাদের কাউকে বলাও ঠিক হবে না।
বাড়ি ভেতরটা চার বার চক্কর দেওয়া হয়ে গেল রান্নার মাসি মিনতির কাজ শেষ হবার আগেই। বড়দার ঘরটা বৈকুণ্ঠ ঝেড়ে ঝুড়ে সাফ করছে। বৈকুণ্ঠ অনেকদিনের লোক, ওর কাজে বেশি খবরদারি করতে হয় না, তবে আজকাল চোখে দেখে কম। এক দিন পুচির ঘরের কোণে একটা টিকটিকির ডিম কুড়িয়ে পেয়ে ন্যাপথালিনের গুলি মনে করে ড্রয়ারে রেখে দিতে গিয়েছিল। ভাগ্যিস পুচি ঘরেই ছিল তখন!
নাহ, বড়দার ঘরে সে রকম কোন অঘটনের লক্ষণ নেই। দরজা জানালা টান টান করে খোলা, কাচা পর্দা ঝুলছে, বিছানায় পাটভাঙা চাদর – ঘরের কোনে ধুলো, কোথাও মাকড়সার জাল, টিকটিকির ডিম, কিছুই নেই।
ব্যস, পুচিরও কাজ নেই আরবাড়ির ভেতর পুচি কেমন হাঁপিয়ে উঠছিল। কিন্তু বেরিয়েই বা যাবে কোথায়? তিন বছর হলো পড়াশোনা আর গত বছর থেকে ইশকুল যাওয়া ছেড়ে দেবার ফলে বন্ধুবান্ধব আর তেমন কেউ বাকি নেই। এক আছে অনুপ। অনুপ এখন ইশকুলে গেছে। তবে অনুপের মা রয়েছে বাড়িতে। পুচিকে খুব ভালোবাসে অনুপের মা। গিয়ে খানিকটা গেঁজিয়ে আসা যায়, কিন্তু অনুপের মা আবার মাস কয়েক হলো পুচিকে দেখলেই ‘পড়াশোনাটা এক্কেবারে ছেড়ে দিলি রে...’ বলে দুঃখ করতে শুরু করছে। সেখানেও যাওয়া মুশকিল।
শেষে একরকম আর কিছু করার নেই বলেই পুচি বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ল। রাস্তায় বেশ গরম। এই রাস্তাটা রেল লাইনের ধারে গিয়ে শেষ হয়েছে, পুচিদের বাড়ির পরে খান দশেকও বাড়ি নেই, তার মধ্যেও শেষ কয়েকটা বাড়ি বেশ ছাড়া ছাড়া। কোন দোকান বাজারও নেই – তাই লোকচলাচলও কম।
পুচি হেঁটে যাচ্ছিল নিবারণের বাড়ির দিকেই, হঠাৎ দেখল নাইটির ওপর দোপাট্টা চড়িয়ে চক্কোত্তি মাসিমা বাগানের গেটে দাঁড়িয়ে একটা লোককে খেতে দিচ্ছে। লোকটা ঊর্ধ্বাঙ্গ সম্পূর্ণ উলঙ্গ, গায়ের চামড়া আবলুশ কাঠের মতো – পুচি হঠাৎ কথাটা ভেবে থমকে গেল – আবলুশ কাঠ কোনওদিন দেখেনি, শুধু লোকমুখে শুনে জানে যে তার চেয়ে কালো আর কিছু হয় না বোধহয়। কোমরে একটা প্যান্ট, কোনওদিন ফুল প্যান্ট ছিল, তার এক পায়া হাঁটুর নিচ অবধি, তাও পাশের সেলাই খোলা, আর অন্য পায়া উরুর মাঝখান অবধি। সে প্যান্টের রঙও তার গায়ের রঙের মতই খোলতাই। সারা মাথা ভর্তি এক রাশ চুল, আর মুখ ভর্তি লম্বা লম্বা দাড়ি গোঁফ – তাতেও রাজ্যের নোংরা আর ধুলো। চক্কোত্তি মাসিমার হাত থেকে কয়েকটা আটা রুটির মধ্যে তরকারি হাত পেতে নিয়ে লোকটা ওদেরই গেটের বাইরে রাস্তার ধুলোয় বসে খেতে শুরু করল। পুচি ততক্ষণে কাছে এসে গিয়েছে, লোকটার দিক থেকে চোখ তুলেই চক্কোত্তি মাসিমা ওকে দেখতে পেলেন – বললেন, “আরে পুচি, কেমন আছিস?”
পুচি একটু দূরেই দাঁড়িয়ে বলল, “ভালো, মাসিমা, আপনারা কেমন আছেন? মেসোমশাই? বান্টি?” বলে একবার রুটি তরকারি ভক্ষণরত লোকটার দিকে তাকালএটা কে?”
চক্কোত্তি মাসিমা হেসে বললেন, “আরে এটা একটা পাগল। গত দিন দুয়েক দেখছি এসে হাজির হয়েছে। তোদের ওই বাড়িটার বাগানে আস্তানা গেড়েছে, জানিস না?”
ওদের ওই বাড়ির বাগানে? কই না তো! পুচি অবাক, “কবে থেকে?”
চক্কোত্তি মাসিমা বললেন, “আমি তো পরশু না তার আগের দিন প্রথম দেখলাম, সকালবেলা তোদের ওই বাড়ির বাগানের গেট খুলে বেরোচ্ছে। তালা তো দিস না। অবশ্য সেরকম তো তালা দেবার মতো কিছু নেইও।”
রাতে ওখানেই থাকে?” জানতে চাইল পুচি।
তাই তো মনে হয়। সকালবেলা আবার এখানে ওখানে থাকে, আমার গেটের সামনে বসে থাকে খানিকক্ষণ, তার পরে কোথায় যায়, কে জানে! মায়া হয়, তাই সকালে দুপুরে দেখতে পেলে চারটে রুটি দিই – বাড়িতে যা হয়েছে, তারই একটু দিয়ে দিই – আজ কুমড়োর ছক্কা করেছিলাম... সে দিন বান্টির একটা টি-শার্ট – পুরনো, আর পরে না – দিয়েছি ভাবলাম পরুক না! তা নয়, ওই পোঁটলার মধ্যে গুঁজে রাখল...”
পুচি দেখল সত্যিই লোকটার পাশে একটা মাঝারি সাইজের পোঁটলা – তা থেকে নানা রকমের কাপড়, প্লাস্টিক আর কাগজের টুকরো উঁকি দিচ্ছে
মাসিমা বলে চললেন, “তোর মেসোমশাই আবার বলছেন এ সব আপদ জুটিও না, পুলিশে খবর দাও, ওরা তুলে নিয়ে যাক – আচ্ছা বল, ঘর দুয়োর নেই, কারও কোন ক্ষতি করছে না, পাগল লোক একটা – তাকে পুলিশের হাতে দেওয়া যায়? অ্যাই, অ্যাই, রুকো, রুকো, প্যান্টমে হাত নেই মুছেগা, এই নাও জল, মানে, পানি নাও, হাত মুখ ধো লো...”
পাগলটা সত্যিই খাওয়া শেষ করে প্যান্টে হাত মুছতে গেছিল। পুচির হাসি পেল। চক্কোত্তি মাসিমার হিন্দী শুনে যতটা, পাগলকে হাত ধোয়ান’র তাগিদেও ততটাই। হাতটা তো এমনিই এমন নোংরা যে কালিমাখা দেখাচ্ছে – তার আবার হাত ধোয়ান’!
লোকটা হাত ধুল না, বরং মাসিমার আলগোছে ঢালা জলের ধারায় হাতটা দিয়ে এমনভাবে দোলাতে লাগল যে ছিটে ছিটে চারিদিকে ছড়াতে লাগল। মাসিমা রেগে জল ঢালা বন্ধ করে দোপাট্টার খুঁট দিয়ে মুখ মুছে বললেন, “দূর হ’, নোংরার ডিপো কোথাকার!” আর লোকটাও কোন কথা না বলে মাটি থেকে কাপড় আর কাগজের পোঁটলাটা তুলে নিয়ে তার গায়েই হাতের এঁটো, জল সবই মুছে চক্কোত্তি আর সেনগুপ্তদের বাড়ির মাঝের পায়ে চলা গলি দিয়ে চলে গেল।
পুচি অবাক হয়ে বলল, “ওদিকে কোথায় গেল? ওদিকে তো কিছু নেই!”
চক্কোত্তি মাসিমা একটু লজ্জা মতন পেয়ে বললেন, “না, ওখানেই ও সব ইয়ে টিয়ে করে আরকি! বাথরুম টাথরুমের তো কোন বালাই নেই! যাই আমি চান সারি গে – সর্বাঙ্গে নোংরা জল ছিটিয়ে গেল হতভাগা!”
মাসিমা চলে গেলে পুচির হঠাৎ মনে হলো, তাইতো, ওদের বাড়ির বাগানে থাকে, ওখানেও নোংরা করে রাখেনি তো? পুচি পা চালাল নিবারণের বাড়ির দিকে।
সকালে নিবারণ এসে গেছে – দরজায় তালা নেই, ভিতর থেকে বন্ধ। পুচি সাবধানে গেটটা খুলল। নিবারণ কবজায় তেল দিয়েছে, সে তেল চুঁইয়ে পড়ে দেওয়ালের ইঁট কালো হয়েছে। গেট আর ক্যাঁচকোচ করে না বটে, কিন্তু ছিটকিনিটা যাতে খটাং করে না পড়ে সেদিকে নজর রাখতে হবে।
বেশ বড়ো বাগান ছিল, এখন যদিও আগাছা ভর্তি বাগানের সখ ছিল মায়েরতাই দু’বাড়িতেই বাগানের জমি রেখেছিল বাবা। নতুন বাড়িতে যাবার পরেও মা থাকতে দু’বাড়িতেই বাগান করত। মালী আসত রোজ। এখন নিজের বাড়ির বাগানটা রেখেছে পুচি। মাঝে মাঝে ভেবেছে এ বাড়িতেও বাগান করলে হয় – কিন্তু শেষ অবধি হয়ে ওঠেনি।
মাটির দিকেই নজর ছিল – কোথায় পাগলটা কী করে রেখেছে, কে জানে! কিন্তু ইতিউতি চাইতে চাইতে বাড়ির সামনে থেকে ঘুরে পাশ দিয়ে পেছনটায় গিয়েও কিছু দেখতে পেল না। ভাবছিল বাড়িটার চারিদিকে চক্কর লাগিয়ে বেরিয়ে চলে যাবে, নাকি এই অজুহাতে নিবারণের দরজায় কড়া নেড়ে পাগলের কথাটা বলে যাবে?
আবার বাড়ির পেছনে ঘুরঘুর করছ?” জোর গলায় কথাটা হঠাৎ শুনে পুচি সাত হাত লাফিয়ে উঠল। মাটিতে পড়ল যখন তখন বুকের ভেতরে হামানদিস্তা! গলার স্বর লক্ষ করে ওপরের দিকে তাকিয়ে দেখল দোতলার পিছনের বারান্দায় দাঁড়িয়ে নিবারণ।
বুকে হাত চাপা দিয়ে খানিকক্ষণ নিঃশ্বাসটা স্বাভাবিক হবার অপেক্ষা করল পুচি। তার পরে বকুনির সুরে বলল, “আচ্ছা লোক তো মশায় আপনি! কথা নেই বার্তা নেই, দুপুর বেলা মনিষ্যিকে এমন চমকে দিতে আছে? এখনও বুকটা হাপ্পর হাপ্পর করছে!”
সকাল সাড়ে এগারোটা তোমার কাছে দুপুর হলো?” নিবারণ বারান্দার রেলিং-এর ওপর কনুই ভর দিয়ে ঝুঁকে পড়ল। “আর অতই যদি ভয়, তবে চুপি চুপি বাড়ির পেছনে ঘুর ঘুর করছ কেন আবার? কী খুঁজছ?”
পুচি বিরক্ত হয়ে বলল, “খুঁজছি না কিছুই – দেখছি পাগলটা এখানে নোংরা করেছে কি না।”
অবাক হয়ে নিবারণ বলল, “পাগল, কোন পাগল?”
পুচি বলল, “গ্যাঁজানর ইচ্ছে থাকলে নিচে নেমে আসুন। ঘাড় তুলে কথা বলতে গেলে লাগে যে! এই মাত্তর চক্কোত্তি মাসিমা বললেন, একটা পাগলা এসে এখানে রাত্তিরেতে থাকতে লেগেছে গত পরশু থেকে। তাই দেখছিলাম, কিছু নোংরা করেছে কি না...”
পুচির কথা শেষ হলো না, নিবারণ বলল, “দাঁড়াও, আসছি...” বলে পিছন ফিরে বারান্দা থেকে ঘরে ঢুকে ভিতর থেকে দরজাটা বন্ধ করে দিল। খানিক পরেই রান্নাঘরের পিছনের দরজা খোলার শব্দ হলো – পিছনের দিক থেকে বাইরে বেরোন’র দরজাগুলোতে সামনের দরজার চেয়ে কম কিছু ছিটকিনি আর হুড়কো নেই। বাড়ি বানান’র সময় এখানে কাছাকাছি আর বাড়ি ছিল না বলে বাবা ভালো করে দরজা আঁটার বন্দোবস্ত করেছিল।
দরজা খুলে বাইরে এসে রোদের ঝলসানিতে চোখ কুঁচকে নিবারণ বলল, “কই, কোথায় নোংরা করেছে?”
পুচি হাত নেড়ে বলল, “ধ্যাৎ, যেমন মানুষ! আমি কি বলেছি নোংরা করেছে? বলেছি নোংরা করেছে কি না দেখতে এসেছি। এমনিতে তো পাহারা দেবার কেউ নেই। রাতের বেলায় কেউ তো থাকে না – বসত বাড়ি হলে অন্য কথা ছিল।” ভাবল, কথাটা শুনে রাতে থাকার কথা যদি ভাবে নিবারণ।
নিবারণ অবশ্য জবাব দিল না। পুচির মতই ঘুরে ঘুরে বাগানে খুঁজতে লাগল নোংরার কোন নিশানা পাওয়া যায় কি না। এক বার মাথা তুলে বাগানের শেষের পাম্পের ঘরটা দেখিয়ে বলল, “আচ্ছা, ও ঘরটার চাবি তোমার কাছে আছে? ওটা কিন্তু আমাকে দাওনি।”
ছিল সঙ্গেই, বাড়ির চাবির গোছাটা রয়েছে কোমরে গোঁজা, পাম্প ঘরের চাবিটা তারই সঙ্গে। তবু, “ওটা পাবেন না,” বলে মাথা নাড়ল পুচি। “রিপেয়ার মেরামত সব বাবার দায়িত্ব না? সেই জন্য বাবা দেয় না। এক বার এক সে ভাড়াটে পাম্প খারাপ করে দিয়ে ভেগেছিল। তখন থেকেই বাবা এই ব্যবস্থা করেছে।”
নিবারণ আবার মাথা নামিয়ে বাগানের মাটি দেখতে দেখতে হাঁটতে হাঁটতে বলল, “তবে ওটার তালা যে আঁটা সে তো এখান থেকেই দেখা যাচ্ছে – তালাটাও বেশ নতুন। সুতরাং তোমার পাগল যে ওর ভেতরে আস্তানা গাড়েনি তাও তো স্পষ্ট।”
নিবারণ বাড়ির সামনের দিকে এগিয়ে গেছে, পুচি পা চালিয়ে ওকে ধরে ফেলল। দু’জনে মিলে বাগানের বাকিটা দেখে নিয়ে বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল। নিবারণ বলল, “আমি তো পেছন থেকে এই পর্যন্ত দেখলাম, তুমি ওদিকটা ঠিক দেখেছ তো?”
ঘাড় নাড়ল পুচি। দেখেছে ওইটুকু তো বাগান। বলল, “তোমার...” বলেই জিভ কেটে শুদ্ধ করে বলল, “আপনার পবলেমটা মিটেছে? মানে ওই ছবি নষ্ট করার পবলেম?”
আপনি-তুমির ব্যাপারটা নিবারণ শুনেছে বলে মনে হলো না। বলল, “মিটেছে কি না জানি না। তবে তার পরে আর সেরকম কিছু হয়নি।”

আর কথা না বাড়িয়ে পুচি বাগানের গেট খুলে বেরিয়ে এল। রাস্তাটা এখন ফাঁকা, পাগলটার আর দেখা নেই। বেলা বেড়েছে, মঞ্জুদি চান সেরে বাগানে কাপড় মেলছে মঞ্জুদি এ পাড়ায় বেশি দিন আসেনি। শুভ্রদাকে বিয়ে করেছে এক বছরও হয়নিভীষণ মিষ্টি মেয়ে। নিয়ম অনুযায়ী পুচির বৌদি বলার কথা, কিন্তু বৌভাতের দিনই সকালে গিয়ে আড্ডার সম্পর্ক পাতিয়ে পুচি বলে এসেছিল, “আমি তোমাকে বৌদি টৌদি বলতে পারব না, বলে দিচ্ছি, হুঁ, তুমি এখন থেকে আমার দিদি হলে...”
মঞ্জুদি কাপড় মেলতে মেলতেই গলা মেলে বলল, “অ্যাই মেয়ে, কোথায় গিয়েছিলি রে?”
পুচি বাগানের গেট খুলে ঢুকল। তারপরে সাবধানে বাগানের গেটটা বন্ধও করল। মঞ্জুদির শ্বশুরমশাই চিত্তরঞ্জনবাবুর বাগানের শখ ছিল, কিন্তু দু’বার স্ট্রোক হয়ে যাবার পরে নিজে আর বাগান সামলাতে পারেন না, তাই ছেলের বিয়ের আগে অবধি মালির হাতেই ছিল বাগান। এখন মঞ্জুদির হাতে। এখন বাগানটা আরও সুন্দর হয়েছে। চিত্তজ্যাঠা যত ভালো করে বাগান রাখত, এখন তার চেয়েও বেশি সুন্দর। তাই সাবধানে গেট বন্ধ করল পুচি। মঞ্জুদি দাঁড়িয়ে আছে কাপড় মেলা শেষ করে কোমরে হাত দিয়ে। মুখের হাসিটা দেখেই বুঝল পুচি, মঞ্জুদির মাথায় কিছু দুষ্টুবুদ্ধি এসেছে। মঞ্জুদির মাথা দুষ্টুবুদ্ধির আখড়া। ওর মুখেই শোনা, কেমন ইশকুলে পড়ার সময়ে দিদিমণিরা নাকি মঞ্জুদির মাকে ডেকে বলেছিলেন, ওকে ছেলেদের ইশকুলে ভর্তি করুন। ওর বদমাইশিগুলো নাকি একেবারে ছেলেদের মতো। কবে কোন টিচারের চেয়ারে গঁদ ঢেলে রাখা, কবে ক্লাসশুদ্ধু মেয়ের জলের বোতলে জর্দা মেশান, দেওয়াল থেকে জ্যান্ত টিকটিকি ধরে সবচেয়ে ভীতু মেয়েটার টিফিন বক্সে ভরে রাখা... বিয়ের পরে যদিও অত সুযোগ নেই, কিন্তু তেমনই দুষ্টুমির চেষ্টা সারাক্ষণ।
পুচি কাছে আসা মাত্র মঞ্জুদি ভুরু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করল, “আজকাল যে মঞ্জুদিকে ভুলেই গেছিস দেখছি?”
কথাটা ঠিক নয়, এই সেদিনই আড্ডা হয়েছে দু’জনে – মঞ্জুদি বাজার যাবার পথে এসেছিল – কিন্তু মঞ্জুদি থামিয়ে দিয়ে বলল, “সেদিনটা কোনদিন বাপু? তোমার পুরনো বাড়ির নতুন বাসিন্দা আসার পরে কোনদিন তুমি আমার দরজা মাড়িয়েছ, হে?”
পুচি বুঝল আজকের মুরগি ও-ই। বলল, “কী যে বল, মঞ্জুদি, কোন ঠিক নেই...”
ঠিক নেই বুঝি?” মঞ্জুদির চোখেমুখে উল্লাস আর ধরে না। “তবে কেন রোজ রোজ ও বাড়িতে ঘুর ঘুর করিস? ভাবিস আমি দেখি না? আর সেদিন সন্ধেবেলা দুজনে ভিতরে ছিলি তো ঘণ্টাখানেক... বলি হচ্ছিল কী?”
পুচির মুখ লাল। “মঞ্জুদি, তুমি না! এক ঘণ্টা কোথায়? পনের মিনিটও না। ওর ছবিতে কে কালি ছিটিয়ে নষ্ট করেছে, তাই দেখাচ্ছিল...”
মঞ্জুদির ভুরু এবার কথাকলির মতো তিরবিড়িয়ে উঠল। “ও’- ছবি? -টা কে শুনি?”
আর কথা না বাড়িয়ে পুচি মঞ্জুদির হাত ধরে টেনে ঘরের ভেতরে নিয়ে গেল, তার পরে মঞ্জুদির শোবার ঘরে, খাটে বসে আদ্যোপান্ত সবই বলল।
কিন্তু লোকটাকে নিয়ে তোর সমস্যাটা কী বলতে পারবি?” ভুরু কুঁচকে বলল মঞ্জুদি। “তোদের ও-বাড়িতে তো আমি এসে থেকে দেখেছি ফ্যামিলি নিয়ে কেউ আসতে চায় না। আর ভাড়া হলেও সে ভাড়াটে টেঁকে না বেশি দিন। তবে এই নিবারণের ব্যাপারে তোর এত উৎসাহ কেন?”
আরে ও তো এসেছিল ওর কাকাকে নিয়ে। তাই ভাবলাম কাকারা যদি এসে থাকে-টাকে...”
পুচির কাঁধে একটা আলতো ঘুঁষি মেরে মঞ্জুদি বলল, “কাকাকে আর এর ভেতর আনতে হবে না বাছাধন, তার চেয়ে বল না কেন, ছেলেটা দেখতে দারুণ হ্যান্ডসাম, একেবারে রাজপুত্তুর... তার ওপরে আর্টিস্ট... এতো রাজযোটক রে!”
আর কী বলত মঞ্জুদি শোনা হলো না, এই সময়ে রাস্তা থেকে হঠাৎ একটা চেঁচামেচি হইচই-এর শব্দ ভেসে এল, দু’জনে ছুটে গিয়ে মঞ্জুদির শোবার ঘরের জানলায় গিয়ে দেখল এক অদ্ভুত দৃশ্য – সকালের পাগলটা রাস্তায় শুয়ে আছে, আর তার শরীরের দু’দিকে দুই পা দিয়ে মাথার ওপর একটা চ্যালাকাঠের মতো কাঠ হাতে দাঁড়িয়ে নিবারণ।
দু’জনে যতক্ষণে ছুটে বেরিয়েছে বাগানে, নিবারণ চ্যালাকাঠ দিয়ে পড়ে থাকা পাগলটার পিছনে সপাটে মেরেছে দুটো বাড়ি। পাগলটা কিছু বলছে না, কিন্তু ওর মুখ থেকে একটা চিঁ-চিঁ কুঁ-কুঁ চিৎকার বেরোচ্ছে অনবরত। দেখতে দেখতে নিবারণ বাঁ হাত দিয়ে পাগলটার চুলের মুঠি ধরে টেনে তুলে, ডান হাত দিয়ে আবার চ্যালাকাঠ তুলে বলেছে, “অ্যাই, বল, আর ঢুকবি? আর ঢুকবি আমার বাড়ি?”
তাড়াতাড়িতে গেট খুলতে গিয়ে টানাটানি লেগে গেছে মঞ্জুদির। ওখান থেকেই চেঁচিয়ে বলেছে, “এই, মারছেন কেন? মারছেন কেন? কী ক্ষতি করেছে আপনার...”
আসেপাশের বাড়িঘরের বাগানে বেরিয়ে এসেছে আরও অনেকেই। চক্কোত্তি মাসীমাও। উনিও ডেকে বলেছেন, “ও তো কারও কোন ক্ষতি করে না। চুপচাপ থাকে, চলে যায়, আপনার কোন সমস্যা করেছে কি?”
মঞ্জুদি ততক্ষণে গেট খুলে বেরিয়ে নিবারণের মুখোমুখি। আঙুল তুলে বলেছে, “একটা মানুষকে চ্যালাকাঠ দিয়ে মারার অধিকার কে দিয়েছে আপনাকে? কে?”
দাঁত মুখ খিঁচিয়ে নিবারণ বলেছে, “আপনাদের কী? আপনাদের বাগানে ঢুকে তো আর নোংরা করছে না!”
মঞ্জুদিও তেমনি তেরিয়া হয়ে বলেছে, “কী নোংরা করেছে? কী নোংরা করেছে, শুনি? পুচি তো এক্ষুনি বলছিল আপনারা দু’জনে খুঁজে-পেতেও কোন নোংরার চিহ্নমাত্র পাননি!”
বাগানের গেটে দাঁড়ান’ পুচির দিকে এই প্রথম তাকাল নিবারণ। এই প্রথম ওর চোখে একটু থতমত ভাব দেখা গেল। চ্যালাকাঠ-ধরা হাত নেমে এল আস্তে আস্তে। তার পরে পাগলটার দিকে বাঁ হাতের আঙুল তুলে বলল, “এবারের মতো বেঁচে গেলি। কিন্তু আবার যদি বাড়িতে ঢুকতে দেখেছি...”
চ্যালাকাঠটা টান মেরে রাস্তার ধারে ফেলে গট গট করে ফিরে গিয়ে বাগানের গেট বন্ধ না করেই বাড়ির মধ্যে ঢুকে দড়াম করে দরজা বন্ধ করে দিল নিবারণ।
পাগলটা আস্তে আস্তে মঞ্জুদির হাত ধরে উঠে দাঁড়াচ্ছে। ওর মুখ থেকে কুঁ-কুঁ আওয়াজটা হয়েই চলেছে। মঞ্জুদির আবার নোংরার বাতিক কম। নির্দ্বিধায় পাগলটার হাত ধরে তুলছে, আর মিষ্টি গলায় বলছে, “তুমি ওখানে আর যেও না, কেমন? আমাদের বাগানে ওখানে গিয়ে রাতে শুয়ে পড়বে, কেমন?”
পাগলটা কুঁই কুঁই করছে, আর আঙুল দিয়ে মঞ্জুদিকে কী দেখাচ্ছে। আঙুল লক্ষ করে পুচি দেখল ওর পুঁটলিটা রাস্তায় খুলে ছড়িয়ে গেছে। জামা কাপড়, সুতোর টুকরো, প্লাস্টিক, ধুপের খালি হয়ে যাওয়া চ্যাপ্টা প্যাকেট, কী নেই তাতে... এমনকি কিছু পচে যাওয়া খাবার জাতীয় কিছুও পড়ে রয়েছে রাস্তার ধুলোয়।
আহা রে,” বলে মঞ্জুদি নিচু হয়ে কয়েকটা কাপড়ের টুকরো, একটা গোলাপি টি-শার্ট – নিগঘাৎ এটাই বান্টির – তুলে নিয়ে দিতে গেছে, পাগলটা হঠাৎ ভীষণ দাঁত খিঁচিয়ে এক ছুটে আবার সেই চক্কোত্তি মাসীমাদের বাড়ির পাশের গলি দিয়ে কোথায় চলে গেল
মঞ্জুদি ছড়িয়ে থাকা কাপড়ের মধ্যে যেগুলো বড়ো জিনিস, সেগুলো কুড়িয়ে নিয়ে ওদের গেটের কোনায় রাখতে রাখতে বলতে থাকল, “রেখে দিই বাবা, পাগল মানুষ... কোনটা ওর দরকারি... কখন আবার মনে পড়বে...” আর পুচি স্থানুর মতো রাস্তার দিকে তাকিয়ে সেই দৃশ্যটাই দেখতে থাকল – আর্টিস্ট, হ্যান্ডসাম নিবারণ – ওরফে নবারুণ গড়াই – দু’পা ফাঁক করে ভূপতিত একটা মানুষকে চ্যালাকাঠ দিয়ে মারতে উদ্যত – আর ওর মাথার ভিতরে ফাটা রেকর্ডের মতো একটাই কথা চলতে থাকল – মহিষাসুর, মহিষাসুর, মহিষাসুর...

১০
সংগ্রামের আসল নাম কী কেউ জানে না। অনেকে বলে, সংগ্রাম নিজেও ভুলে গেছে। ভুলে না গেলেও, সংগ্রাম কাউকে নিজের নাম বলে না। ওর ছেলেদের ইশকুলে ভর্তি করার সময়েও নিজের নাম লিখিয়েছিল সংগ্রাম। কেন সংগ্রাম, কোন সংগ্রাম, এ সব কথা বাজারে কেউ আর জিজ্ঞেস করার নেই। এক সময়ে ছিল, তখনও কেউ উত্তর পায়নি।
সংগ্রামের তেলেভাজার ব্যবসার বয়স কম হলো না। মনে আছে, এখানেই, এই জায়গাটাতেই, রাস্তার ধারের নর্দমার ওপরে তক্তপোষ পেতে প্রথম যখন তেলেভাজার দোকান দেয়, তখন জায়গাটা বাজারও হয়নি, সংগ্রামেরও বয়সই বা কত আর, এক কুড়ি পেরিয়েছে মোটেরাস্তা হয়নি। লোকজনের আসা যাওয়া ছিল কম। সেখান থেকে ক্রমে ক্রমে শুধু সংগ্রামের তেলেভাজা খেতেই লোকে ভীড় করে আসত। আজ এখানে বাজার। তেলেভাজার দোকানও বেড়েছে আয়তনে। এখন আর শুধু তেলেভাজা নয়, বড়ো ছেলে সকালে বিক্কিরি করে সিঙ্গাড়া কচুরি জিলিপি, ছোটোছেলে তুলে নিয়েছে তেলেভাজার দায়িত্ব। শুধু মেজছেলের মিষ্টির ব্যবসাটা দাঁড়াচ্ছে না তেমন। ছেলেগুলোর মতিগতি ভালো না। আজকাল সংগ্রাম নিজে আর কিছু দেখতে পারে না। চলতেই পারে না ভালো করে, তা দেখাশোনা। কিন্তু মনে হয় ছেলেগুলো যেন দু’নম্বরী মালপত্তর ঢোকাচ্ছে। দোকানে ভীড় কমে না, কিন্তু পুরনো লোকেরা চলতে ফিরতে সংগ্রামকে দোকানের সামনে বসে থাকতে দেখলে দাঁড়িয়ে অভিযোগ করে – আগের মতো আর নেই। একবার ছোটোছেলেকে ডেকে বলতে গিয়েছিল, সে মুখ ঝামটা দিয়ে বলেছিল, “তোমার ওই সুধাংশুর ঘানির তেল দিয়ে তেলেভাজা করলে আর দুটো লাভের মুখ দেখতে হবে না।” সংগ্রাম কিছু বলেনি আর। আগে হলেও বলত না, বাপের সঙ্গে কী করে কথা বলতে হয় শিখিয়ে দিত এক থাপ্পড়ে ছেলের মুণ্ডু ঘুরিয়ে দিয়ে। সংগ্রাম যত অশক্ত হচ্ছে, ততই ছেলেগুলো বেয়াড়া হচ্ছে। বিয়ে থা করেছে, নিজেরা ছেলের মেয়ের বাপ হচ্ছে, লাগাম টানতে শিখছে না।
এই প্রসঙ্গেই কী যেন একটা কথা বাকি ছিল, সংগ্রাম সেটা মনে করতে পারছে না। আজকাল বুড়ো হয়ে গিয়ে কথাবার্তা মনে থাকে না ঠিক করে। তবে বোধহয় এবারে সময় এসেছে ছেলে তিনটেকে আর একটু ধাতানি দেবার। বাউণ্ডুলেপনার একটা সীমা থাকা দরকার। সময়কালে সংগ্রামও সামন্তদের থেকে সরে এসেছিল। নইলে পুলিশ যখন সামন্তদের কোমরে দড়ি পরিয়ে নিয়ে গিয়েছিল, তখন সংগ্রামকে নিয়ে গেল না কেন...
মনে পড়েছে। এদিক ওদিক তাকিয়ে বেতো শরীরটাকে টেনে তুলল সংগ্রাম। ছেলেগুলোর কেউ কাছে থাকলে একটু ধরতে বলত। লাঠিতে ভর দিয়ে আস্তে আস্তে বাড়ির ভেতরে গেল। ঢুকতে না ঢুকতেই একটা বছর সাত আটেকের ছেলের মুখোমুখি। ছেলেটা থমকে দাঁড়াল। দাদু চলাফেরা করলে তাদের ছুটোছুটি করা বারণ। কত জোরে চললে দাদু রেগে যাবে তারা জানে না, তাই সকলেই ওরা দাঁড়িয়ে পড়ে।
লাঠির আগাটা আলতো করে নাতির বুকে লাগিয়ে সংগ্রাম বলল, “কোথায় চললি?”
দাদুর মেজাজ খারাপ নেই। ছেলেটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, “পাকুরের মাঠে – ম্যাচ আছে।”
হুঁ,” লাঠি নামিয়ে বলল, “হারান বাড়ি আছে?”
হারান মেজো ছেলে। নাতি ঘাড় কাত করে বলল, “জ্যাঠা ঘরে আছে।”
তাহলে ছেলেটা ছোটোছেলের ঘরের। সংগ্রামের আজকাল মনে থাকে না। বলল, “যা, গিয়ে বলগে আমার ঘরে আসতে, তারপরে মাঠে যাস।”
সংগ্রামের ঘরটা বাড়ির সবচেয়ে বড়ো ঘর। মাথা হেঁট করে নিচু দরজা পার করে ঘরে ঢুকে সংগ্রাম ভাবল, বেঁচে থাকতে থাকতে এই ঘরটাকে কেটেকুটে ছোটো করে নিজের খাটিয়ার জায়গাটুকু রেখে বাকি জায়গাটা তিন ছেলের নামে ভাগাভাগি করে দিতে হবে। নইলে ম’লে পরে কুকুর বেড়ালের মতো মারপিট করবে তিন ছেলে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে সংগ্রাম ইজি চেয়ারটায় বসল। এই চেয়ারটা ওর বড়ো প্রিয়। ওর শ্বশুরমশাইয়ের ছিল।
দরজা দিয়ে ঘরে ঢুকল হারান। “ডেকেছিলেন?”
হাত দিয়ে নিজের বিছানাটা দেখিয়ে দিল সংগ্রাম। ঘরে বসার জায়গা আর নেই। একটু অবাক হলেও বাবার আদেশ অমান্য করার ক্ষমতা হারানের নেই। তিন ভাইয়ের মধ্যে ওরই রোয়াব একটু কম। ওরই ব্যবসাটা চলে সবচেয়ে খারাপ।
খাটে বসে বাবার দিকে তাকিয়ে রইল হারান। সংগ্রামও খানিকক্ষণ কিছু না বলে তার পরে বলল, “সামন্তদের একটা ছেলেকে দেখলাম যেন সেদিন দোকানে?”
দেখলাম’ কথাটা সত্যি নয়। ছেলেটা এসেছিল দুপুরে, তখন সংগ্রাম থাকে বিছানায়। দোকানে তখন আর কেউ ছিল না। কর্মচারী ছেলেগুলোকে হারান একসঙ্গে ছুটি দিয়েছিল – বলেছিল, “খেয়ে আয় সবাই।” দুপুরে খদ্দের থাকে না, এই অছিলায়।
ওদেরই মধ্যে একজনের চোখে পড়ে সামন্তদের বাড়ির একটা ছেলে এসে হারানের সঙ্গে কথা বলে গিয়েছে।
হারান প্রথমে, “কই না তো... কবে?... আপনি ভুল দেখেছেন...” এ সব বলার চেষ্টা করছিল। কিন্তু সংগ্রাম যখন কড়া গলায় বলল, “শোন, তোরে আমি জম্মো দিছি। তুই আমারে দিসনি...” তখন চুপ করে গেল। কিন্তু আর একটাও কথা বলল না।
শেষে সংগ্রাম আঙুল তুলে বলে দিল, “ওই কুজাতের সঙ্গে কোন সংশ্রব আমি বেঁচে থাকতে চলবে না, বলে দিলুম। আর নিজের ভালো যদি বুঝ, তবে আমি ম’লেও ওদের ছায়া মাড়াবি না। মনে থাকে যেন। ওদের হলো কালনাগিনীর জাত। ওদের সাত হাতের মধ্যে গেলেই বিষের ছোঁয়া লাগে। মনে থাকে যেন।”

১১
দিন কয়েক কেটে গেছে। এর মধ্যে দিনের বেলা আর কেউ সেই নোংরা পাগলটাকে দেখতে পায়নি। চক্কোত্তি মাসিমাও ক’দিন হাতে একটা প্লাস্টিকের ঠোঙার মধ্যে রুটি তরকারি নিয়ে এদিক ওদিক ঘোরাঘুরি করে শেষে এখন হাল ছেড়ে দিয়েছেন। তবে রোজই সকালে একবার বাগানের গেটের ওপর দিয়ে রাস্তায় ডান দিক বাঁদিক দেখে নেন।
সেদিন সকালেও তেমনি প্রথমে গেটের ওপর দিয়ে উঁকি মেরে রাস্তাটা, তার পরে পাঁচিলের ওপর দিয়ে বাড়ির পেছনে যাবার গলিটা দেখতে গেছেন, কিন্তু যেমনই পেছনে তাকান’ তেমনই চমকে ওঠা, তার পরে ত্রস্তপায়ে বাড়ি গিয়ে বলা, “অ্যাই, শুনছো? একবার এদিকে আসবে?”
শোবার ঘরে, আলমারির দরজায় লাগান’ আয়না থেকে মুখ না-তুলেই ছিদাম চক্রবর্তী বললেন, “কী হলো?”
আহা, সোই না, দেখবে এসো।”
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে দাড়ি কামান’ থামিয়ে ছিদাম ঘুরে দাঁড়ালেন। বললেন, “কী হলো? কোন সিরিয়ালের হিরোইনকে আবার দেখলে আমাদের রাস্তায়?”
এবার রেগে গেলেন চক্কোত্তি গিন্নি। বললেন, “বাজে কথা রেখে আসবে এক মিনিট? লোকটা চলে গেলে আর এসে লাভ হবে না কিচ্ছু।”
অগত্যা,” বলে গিন্নির পেছু পেছু গিয়ে রান্নাঘরের খোলা দরজা দিয়ে নির্দেশ মতো উঁকিঝুঁকি মেরে পেছনের পতিত জমিটা দেখে বললেন, “কই, নেই তো কেউ!”
রো, রো,” বলে স্বামীকে ঠেলেঠুলে চক্কোত্তি মাসিমা বাইরে বেরিয়ে নিজেই দেখলেন, তার পরে বললেন, “চলে গেছে... তুমি এত দেরি করলে...”
চক্রবর্তী বললেন, “আরে কী মুশকিল, কে এমন প্রেসিডেন্ট অব ইন্ডিয়া ছিল?”
গিন্নি গলা নামিয়ে বললেন, “আরে ওখানে একটা লোক ঘুরে বেড়াচ্ছিল, তোমার ওই সামন্তর মতো দেখতে
এক লহমার জন্য চক্রবর্তীর মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেল। তারপরে জোর দিয়ে বললেন, “আরে, তোমার কি মাথা-ফাতা গেছে নাকি? লোকটা মরেছে কত বছর হয়ে গেল...”
সেই জন্যই তো বললাম! তুমি বিশ্বাস করবে না, একেবারে এক রকম, ঠিক ওই চেহারা...” এবার একটু সন্দেহ দেখা দিল, “কিন্তু বয়েস কম।”
বিশ্বাস করলাম না,” চানের ঘরের দিকে যেতে যেতে যেতে ছিদাম চক্রবর্তীর খেয়াল হলো দাড়ি কামান’ শেষ হয়নি। আবার ঘুরলেন শোবার ঘরের দিকে। তারপরে থমকে দাঁড়িয়ে বললেন, “কী বললে? বয়েস কম?”
চক্কোত্তি গিন্নি বললেন, “অনেক কম, তাই তো ডাকলাম তোমায়...”
ভুরু কুঁচকে, “হুঁ,” বলে দাড়ি কামাতে গেলেন ছিদাম চক্রবর্তী।
বাড়ির পিছনে ঝোপের আড়াল থেকে যে লোকটা উঠে দাঁড়াল, তাকে দেখলে ছিদাম চক্রবর্তীও মানতেন, একেবারে কমবয়সের সামন্তর মতই দেখতে তাকে। খানিকক্ষণ চক্কোত্তিদের বাড়ির দিকে দেখে অন্য দিক দিয়ে বেরিয়ে গেল লোকটা। মনে মনে বলল, এই সময়ে আসাটা উচি হয়নি এখানে।

১২
দুপুরে এক ঘুম দিয়ে বিকেলবেলা নিচে নেমে, বাবাকে চা দিয়ে বাইরের দরজা খুলতেই, অবাক! গেটের দরজা খুলে ভিতরে আসছে অনুপ। আশ্চর্য হয়ে বলল, “কী রে? এদিকে কী মনে করে?”
অনুপ একটু কিন্তু কিন্তু হেসে বলল, “ইয়ে, মেসোমশাই বাড়ি আছেন?”
জিভ ভেঙচে পুচি বলল, “না তো কি অফিস করতে গেছেন? তোর আবার বাবার সাথে কিসের দরকার? বাড়ি ভাড়া চাই?”
বিরক্ত হয়ে অনুপ পুচির পাশ কাটিয়ে রোয়াকের কোনে জুতো খুলতে খুলতে বলল, “বাজে না বকে আমার জন্য একটু হালুয়া বানিয়ে আন তো, খিদে পেয়েছে। দেখি তোদের কাজের মাসির মতো বানাতে পারিস কি না?” তার পরে বাড়ির ভিতরে ঢুকে গেল।
পুচিও পিছন পিছন তেড়ে গেল অনুপের মাথায় এক চাঁটি মারবে বলে, কিন্তু অনুপ ঢুকেছে বাবার ঘরে। একদিন অনুপকে ওই ঘরেই বাবার সামনেই মেরে চটকে খাটের তলায় গুঁজে দিয়েছিল, কিন্তু আজ কেমন লজ্জা করল। একছুটে রান্নাঘরে গিয়ে কাজের মাসিকে হালুয়া বানাতে বলে আবার ফিরে এল। বাবার কাছে অনুপের কী দরকার যে স্কুল থেকে বাড়ি না গিয়ে সোজা এখানে এসেছে?
বৈকুণ্ঠ গড়গড়া সাজাচ্ছে। পুচিকে দেখে বাবা বলল, “অনুপের জন্য কিছু খাবার বলে দে, ক্লাস সেরে এসেছে...”
পুচি হাত নেড়ে বলল, “ও নিজের কাজে এসেছে, খিদে পেটে এসেছে মানে ওর খুব তাড়া। খাবার সময় নেই। এই অনুপ, বল, কী বলার আছে, বলে নে...”
অনুপ কটমট করে দেখল, কিছু বলল না। পুচি মুখ টিপে হাসল। হলধর বিরক্ত স্বরে বললেন, “আরে মেয়ের কথা শোনো, নিজে তো জীবনে পড়াশোনা করলি না, দুপুরবেলা খেয়েদেয়ে ঘুমিয়ে নামলি নিচে। ছেলেটার দিকে চেয়ে দেখ, বেচারা সারাদিন খেটেখুটে এল – পড়াশোনা করতে কী কষ্ট, কত খাটনি, জানিসও তো না।”
পুচিও কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই মিনতি মাসি ঘরে এসে এক গেলাস জল আর দুটো রসগোল্লা অনুপের হাতে দিয়ে বলল, “হালুয়া আনচি, চলে যেওনি যেন।”
অনুপ আবার পুচির দিকে কটমট করে চেয়ে জল খেয়ে মিষ্টি খেল। তার পরে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “মেসোমশাই, আপনার কাছে একটা বিষয় জানতে এলাম।”
হলধর এমনিতেই অনুপকে পছন্দ করেন, তার ওপরে ক্লাস ইলেভেনে অনুপ সায়েন্স নেওয়ায় আরও খুশি ওর ওপর। একগাল বিগলিত হেসে বললেন, “আরে আমি আর কতটুকু জানি, তোমরা পড়াশোনা করছ...”
অনুপ বলল, “এটা আমার পড়ার বইয়ে লেখা নেই। মেসোমশাই, ওপাড়ার সামন্তদের বাড়ির গল্প বলবেন?”
হলধর হালদার গল্প বলতে ভালোবাসেন। তক্তপোষে পা মুড়ে বসা থেকে পা ঝুলিয়ে বসে বললেন, “---আঃ, তাই বলো। তা সে গপ্পো তো আমি ছাড়া কেউ বলবে বলে মনে হয় না, কী বলো?” বলে পুচিকে বললেন, “তুইও বস। সে এক গপ্পো বটে।”
মন দিয়ে তামাক খেতে খেতে হলধর শুরু করলেন, “সামন্তরা এক সময় ডাকাত ছিল। আমার বা-ঠাকুদ্দারা জানত, ওরা ডাকাতি করে খায়। সেই তখন এ জায়গায় কোন পাড়াটাড়া ছিল না। কেবল ওই সামন্তদের আখড়া। সে ধর আমার ঠাকুদ্দার বাবা, বা তারও আগেকার কথা।”
তখন এখানে কী ছিল?” জানতে চাইল অনুপ।
কিছুই না,” বললেন হলধর। “ফাঁকা মাঠ, আর নইলে জঙ্গল। অত কি আর আমি জানি? তবে জঙ্গল কিছু ছিল, আমার ঠাকুদ্দা তো কাঠের ব্যবসা করত এইখানেই।”
পুচি জানতে চাইল, “ফাঁকা মাঠ আর জঙ্গলে ডাকাতি করত কার ওপর?”
হলধর মুখ থেকে গড়গড়ার নল সরিয়ে বললেন, “আরে, এই তো ছিল ব্যবসায়ীদের চলার রাস্তা। আজকের মতোই সব দামি ফসল – সে গোলমরিচই বল, আর বড়ো এলাচই বল, আর সে কফিই হোক, সবই তো শহর হয়েই ঢুকত বেরোত। ঢুকত এক পথে, আর আগেকার দিনে তো আর রেলগাড়ি, পেলে-টেলে ছিল না – সবই এই পথে শহর ছেড়ে যেত। আর খানেই সুযোগ বুঝে ডাকাতি করত সামন্তরা।”
শহর তখন অনেক দূরে ছিল এখান থেকে?” জিজ্ঞেস করল অনুপ।
---নে-,” এলিয়ে পড়ে তক্তপোষে কাত হলেন হলধর। হাত তুলে দূরত্ব বোঝানোর চেষ্টা করলেনএখান থেকে পশ্চিমে অন্ততঃ মাইল দশেক তো বটিই। তক্ষোনকার দিনে ঘোড়া, গাধা, গরুর গাড়িতে মাল চাপিয়ে যাত্রা, এই পর্যন্ত পৌঁছতেই অন্ধকার, ফলে রাতে আস্তানা গাড়া, আর সেই সুযোগে ডাকাতি। মজার কথা হলো, লোকে বলত, শহরে নাকি সামন্তদেরই গোলমরিচ-এলাচের বিজনিস ছিল, আর ওদের বিক্কিরি করা মালই নাকি ওরা ডাকাতি করে ওদেরই আড়তে ফিরিয়ে নিয়ে যেত আবার বিক্কিরির জন্য।”
সত্যি?” জানতে চাইল পুচি।
তবে? আর তাছাড়া, বস্তা বস্তা গোলমরিচ নিয়ে ডাকাতরা করবেই বা কী তখনকার দিনে? খেতে তো পারবে না। কেনার লোক তো চাই, না কি? এ চত্বরে কিনবেই বা কে? সামন্ত না হলেও অন্য কোন আড়তদার, তাই না?”
অনুপ একটু ভাবিত হয়ে বলল, “কিন্তু অত বড়ো তিনতলা বাড়ি বানিয়ে নিশ্চয়ই ডাকাতি করত না?”
মাথা নেড়ে হলধর বললেন, “না না, বাড়িটাড়ি তো অনেক পরের কথা। শহর বাড়তে শুরু করার অনেক আগেই ওদের ডাকাতির গল্প শেষ হয়ে গেছে। ইংরেজ সরকার আর যাই করুক, ডাকাতিটা রুখেছিল নিজেদেরই স্বার্থে। একদিকে পুলিস, আর অন্য দিকে আমার ঠাকুদ্দার বাবার মতো কাঠের ব্যবসায়ী। গাছ কেটে সমস্ত জঙ্গলটা সাফ করে দিলে, লুকিয়ে ডাকাতি করার জায়গা কমে গেল। ফলে সামন্তরা ডাকাতি বন্ধ করে শুরু করেছিল ডাকাতির মাল কেনার ব্যবসা। সেও প্রায় সত্তর-আশি, হয়ত একশো বচ্ছর আগেকার কথা। সামন্তরা আর ডাকাতি করত না, কিন্তু ডাকাতরা সহজে মাল পাচার করতে সামন্তদের কাছে বেচে দিত। তারপর স্বাধীনতা এল, শহর বাড়তে শুরু করল, সামন্তরা ওদের আখড়ায় বাড়ি বানিয়ে ভালোমানুষ হয়ে গেল। ভাব, কি চালাকি – ওই বাড়ি ছিল ওদের গুদোম। মন মন গোলমরিচ, এলাচ জমা থাকত। রাতের আঁধারে ডাকাতি করেই ওদের কাছে রাতারাতি মাল বেচে চম্পট দিত ডাকাতরা।”
পুচি আর অনুপ মাথা নাড়ল। সত্যিই চমৎকার বুদ্ধি। গোলমরিচ আর এলাচের আড়তে চোরাই গোলমরিচ এলাচ ধরা পুলিশের পক্ষেও কঠিন।
কিন্তু ক্রমে তাও কঠিন হয়ে উঠল,” বলে চললেন হলধর। “ডাকাতরা গোলমরিচ এলাচ ছেড়ে এবার নজর দিল গোলমরিচ আর এলাচের ব্যবসায়ীদের ওপর। দশ বস্তা গোলমরিচ নে’ পালানোর চেয়ে দু তোলা সোনা আর টাকাকড়ি তুলে পালানো সোজা।”
ঠিক কথা। “তাহলে এবার ডাকাতি হতে শুরু হলো শহরে?” জানতে চাইল পুচি।
আঙুল নেড়ে একমত হলেন হলধর। “ঠিক কথা। সেও কিন্তু আজকের কথা নয় কো, তখন আমি সবে বিয়ে করিচি আমরা জানতাম ওই সামন্তরা চোর ডাকাতদের কাছে চোরাই মাল কেনে। সন্ধে হলে ওই রাস্তায় যাদের আনাগোনা শুরু হত, তারা কক্‌খনো সাধারণ লোক না। তখন মাঝেরপাড়ার ভদ্দরলোকেদের রাস্তায় বেরোনো বন্ধ হয়ে যেত, বাচ্চাদের আগলে রাখত মায়েরা।”
তারপর?” জিজ্ঞেস করল অনুপ।
তারপরে তোমার বাবা,” বললেন হলধর। “আগে এদিকে কোন থানা ছিল না। থানা হলো, তোমার বাবা আমাদের থানার প্রথম ওসি হয়ে এলেন। ভালোমানুষ লোক, কিন্তু দুঁদে দারোগা। দু’দিনে সিধে হয়ে গেল লোকজন। কিন্তু সামন্তদের হলো বিপদ। ব্যবসা লাটে ওঠে ওঠে...”
ওদের কি সব কাঁসা পিতলের ব্যবসা ছিল না?” আবার জানতে চাইল পুচি।
ও তো লোক-দেখানো ব্যবসা,” বললেন হলধর। “ছিল সত্যিই। কিন্তু আসল ছিল চোরাই মাল পাচার। সে ব্যবসা ডকে উঠতে শুরু করল অনুপের বাবা অনঙ্গ দারোগার কল্যানে। পাড়ার লোকেরা যেমন হাঁপ ছেড়ে বাঁচল, সামন্তরা পড়ল তেমনই বিপদে।”
অনুপ ভুরু কুঁচকে বলল, “আমি তখন জন্মেছি?”
হলধর একটু ভাবলেন। তারপরে বললেন, “না। তখনও অনঙ্গর বিয়ে হয়নি... নাকি সবে হয়েছে, আমার মনে নেই। তবে আমার মনে আছে, ওই সংগ্রাম তখন সবে তেলেভাজার দোকান করেছে।”
সংগ্রামের তেলেভাজা!” হঠাৎ এই নামটা ফিরে আসাতে অনুপ ভয়ানক ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল।
হলধর বললেন, “সংগ্রাম ছিল ওদের ডানহাত। ভয় দেখানো, বোমাবাজি, চাকু চালানো, এসবে তখন ওর জুড়ি মেলা ছিল ভার। সে যাই হোক, সংগ্রাম চালাক মানুষ। যেই দেখল থানা তৈরি হয়েছে, একটা দুঁদে পুলিশ এসেছে, সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে তেলেভাজার দোকান দিয়েছিল। ঠিক, ঠিক – মনে পড়েছে… তখনও পুচি জন্মায়নি, সুতরাং তুমিও না।”
তারপর?”
তারপর ঠিক কী হয়েছিল কেউ জানে না। তোমার বাবা হয়ত জানতে পারেন, তবে আমরা যতটুকু শুনেছি, সামন্তরা সংগ্রামকে বলেছিল দারোগাকে বোমা মারতে, বা খুন করতে বা কিছু একটা। সংগ্রাম নাকি সাফ না বলে দেয়। আর সেদিনই, না তার পরদিন, বিকেলে প্রায় পর পর দুটো বোমা পড়ে, একটা থানার চত্বরে, সবে যখন তোমার বাবা থানা থেকে বেরিয়ে জীপে উঠতে যাবেন, আর একটা সংগ্রামের তেলেভাজার দোকানে। তখন দোকান ছিল না, রাস্তাও ছিল না এখন যেটা মাঝেরপাড়ার বাজারের রাস্তা, সেটা কাঁচা ছিল। সে কাঁচা রাস্তার ধারে একটা কাঠের তক্তপোষের ওপর সংগ্রাম তেলেভাজা বানাতো। মাঝেরপাড়ার লোকে তো কিনতই, আমরা সবাই কিনতাম।”
হলধর গড়গড়ার নলে টান দিয়ে বললেন, “পুচি রে! বৈকুণ্ঠকে ডাক।
টিকেতে আর আগুন নেই। পুচি উঠে দোপাট্টার আঁচল দিয়ে কল্কেটা তুলে নিয়ে বলল, “আসছি। অ্যাই, আমি ফেরা ওবদি কিন্তু গল্প বন্ধ।”
পুচির কথা শুনেই যেন ঘরে ঢুকল মিনতি মাসি, হাতে দু বাটি ধোঁয়া ওঠা হালুয়া। বলল, “ঘী শেষ হয়ে গেচে কবে থেকে বলিচি...”
হলধর বাতাসে নাক টেনে বললেন, “তো বানালি কী দিয়ে? বেশ তো গন্ধ আসতেছে।”
মিনতি হেসে বলল, “আমি কী অতই বোকা? ঘীয়ের শিশি ধুয়ে খালি করলুম।” একটা বাটি অনুপের সামনে রেখে, অন্যটা পুচির দিকে বাড়িয়ে বলল, “দাও, ওটা আমি ভরে আনি, তুমি হালুয়া খেয়ে নাও।”
কল্কে নিয়ে মিনতি চলে গেল। অনুপের খিদে পেয়েছিল, মন দিল হালুয়ায়। ছোটোবেলা থেকে জানে, হাতে গড়গড়ার নল আর সে নলে ধোঁয়া না থাকলে হলধর মেসোর অন্য কোন দিকে হুঁশ থাকে না।
মিনতি গনগনে কল্কে হুঁকোয় বসিয়ে দিয়ে চলে যাবার পরে হলধর আবার শুরু করলেন। “তোমার বাবার খবর তো কেউ জানে না, শুধু জানে এক দিকে অনঙ্গ দারোগা, অন্য দিকে সংগ্রামকে নিয়ে লোকে দৌড়েছে হাসপাতাল। সংগ্রামের যমে-মানুষে, অনঙ্গ দারোগার ঘরের সামনে পুলিশের পাহারা... এ অবস্থায় রাত হয়েছে। তদ্দিনে তোমার বাবার বে’ হয়েছে, মাঝেরপাড়ায় তোমাদের বাড়ি প্রায় সামন্তদের বাড়ির উলটো দিকেই। পুলিশের গাড়ি সেখান থেকে তোমার মাকে নিয়ে গেছে কোথায় কেউ জানে না। সামন্তর দুই ছেলে সে দিন সন্ধেবেলা বুক ফুলিয়ে সারা পাড়া টহল দিয়ে এ, মানুষজন কেউ কোথাও নেই, সবাই যে যার ঘরে তালাবন্ধ।”
গল্পের উত্তেজনায় কখন হালুয়া শেষ হয়েছে অনুপ খেয়াল করেনি। বাটি সরিয়ে রেখে মিনতির দিয়ে যাওয়া জল খেল গেলাস থেকে।
হলধর বলে চললেন, “সে দিন সন্ধে থেকে আবার সামন্তর বাড়িতে আস্তে আস্তে ভীড় বাড়তে শুরু করল। যে লোকগুলো আসা বন্ধ ছিল, তারা আবার আসা-যাওয়া শুরু করলে। ক্রমে হপ্তাখানেকের মধ্যে এমন হলো যে সন্ধে নামতে-না-নামতে রাস্তা ফাঁকা, কেউ কোত্থাও নেই, পাড়ার সব দরজা জানলা বন্ধ।
এক হপ্তা পরে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে সংগ্রাম ফিরলে বাড়ি সেই তখন থেকেই লাঠি নিয়ে চলতে হয় ওকে, কিন্তু অনঙ্গ দারোগার কোনও খবর আমরা পাচ্ছি নে।”
অনুপ প্রায় জিজ্ঞেস করতে যাচ্ছিল, “বাবার খুব লেগেছিল?” কিন্তু হলধর মেসো গল্প চালিয়ে যাচ্ছে, “সেদিন রাতেই, তখন বেশি রাতও নয়, আটটা নটা হবে, হঠাৎ পুলিশ হানা দিল সামন্তদের বাড়ি। পিস্তল হাতে স্বয়ং অনঙ্গ দারোগা।”
গড়গড়ায় টান দিতে দিতে অনুপের অবাক ভাবটা তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করলেন হলধর। বললেন, “দারোগার তেমন কিছুই হয়নি। কিন্তু সেই পেত্থরাত্তিরেই পুলিশের প্ল্যান পাক্কা! দারোগা মর’মর’ এই গুজব রটিয়ে সামন্তদের ব্যবসা শেষ। আর সেই সঙ্গে বাড়ি সিল।”
এবার যত্ন করে হুঁকোর নলটা গুটিয়ে রেখে খাট থেকে নেমে হলধর বাইরে গেলেন। ছোটো বাইরের কাজ সেরে পায়ে জল দিয়ে উঠোন পেরিয়ে দাওয়ায় উঠে হাঁক পেড়ে বললেন, “মিনতি, আমাকে একটু চা দিস তো, বকবক করে গলাটা শুকিয়ে গেছে...”
তার পরে ঘরে ঢুকে আবার তক্তপোষে উঠে, গামছা দিয়ে মুছে বিছানায় পা তুললেন। কাত হয়ে শুয়ে বললেন, “এই বারেই, শুরু হলো বড়ো খেলা। সামন্তদের যে ভাইরা এখানে থাকত তারা ছিল ছোটোখাট চুনোপুঁটি। ওদের যে ভাইরা শহরে থাকত, তারা এখনও বিরাট ক্ষমতা রাখে। ওরা মিনিস্টারদের ধরাধরি করে দিল অনঙ্গ দারোগাকে বদলি করে শহরের ওপ্রান্তে।”
পুচি বলল, “কেন?”
কেন আবার? নতুন দারোগা এলে তো অত চট করে কেস ধরতেও পারবে না, ঘুষ খাওয়ানোও সহজ হবে, তাই। কিন্তু তা তো হলো না, কারণ অনঙ্গ দারোগা পুলিশ মহলেও পপুলার ছিল। বদলি হওয়া মাত্র দিল ঠক্‌ করে রিজাইন করে। সেই নিয়ে ধুন্ধুমার! কাগজ-কলম, লেখালেখি, তখন আজকালকার মতো এত টিভি চ্যানেল ট্যানেল ছিল না, তবু সে নিউজ হয়ে গেল। ফলে হলো কী, বাড়িটার সিল আর খোলা গেল না। সামন্তরা কোনওভাবে কেসটা হতে দিল না, বুড়ো সামন্তর পুলিশের হেপাজতেই হার্ট অ্যাটাক হলো, মরে গেল হাসপাতালে। কিন্তু বাড়ি এখন সিআইডি না সিবিআই, কার হাতে জানি না, কিন্তু কেসও এগোয় না, বাড়ির সিলও খোলে না। সামন্তরা নাকি অনেক চেষ্টা করেছে, কিন্তু কেস না মিটলে সিল খুলবে না, কেস এগোলে কে কোথায় ফাঁসবে তাও কেউ জানে না। তাই ওমনিই পড়ে আছে।”
অনুপ জিজ্ঞেস করতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই পুচি বলল, “বাড়িটা কে চায়? সামন্ত তো মরে গেছে
এক গাল হেসে ঢুলুঢুলু চোখে হলধর বললেন, “দুই ছেলে আছে, অপোগণ্ড। তবে আমার ধারণা সামন্তদের আত্মীয়-স্বজনরা সবাই চায়। চুপি চুপি হয়ত সংগ্রামও চায়। তখনকার দিনে লোকে বলত, ও বাড়ির দেওয়ালে দেওয়ালে সোনাদানা পোঁতা আছে।”

১৩
কিন্তু তার জন্য আমাদের বাড়িটা ভূতের বাড়ি হবে কেন?” জানতে চাইল পুচি
পুচি আর অনুপ এখন অনুপের ঘরে। দুজনে গল্প শুনে ফিরেছে। পুচি অনুপের খাটে হাঁটু মুড়ে দু’হাঁটু হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে বসে অনুপের পায়চারি দেখছে।
অনুপ মাথা নেড়ে বলল, “জানি না। সবটা বুঝছি না। কিন্তু একটা ব্যাপার খেয়াল করলাম সেদিন। তোদের বাড়িটার দিকে সন্ধের অন্ধকারে চেয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ মনে হলো, আমরা সবাই ধরে নিচ্ছি ভূতের আখড়া তোদের বাড়ি, কিন্তু তোদের বাড়ির পেছনেই তো হরিতকি সামন্তর বাড়ি। সে বাড়ি না-হয় আজকাল তোদের বাড়ির পেছনের গাছ, ওদের বাড়ির পেছনের জঙ্গলের জন্য দেখা যায় না। এমন যদি হয় যে ভূত ওদের বাড়িতেই? তবে?”
পুচি এখনও বুঝছে না। বলল, “তবে কী? ভূতুড়ে কাণ্ড তো সব আমাদের বাড়িতেই হয়েছে। নিবারণকাকুর... না নবারুণের ছবি তো আর হরিতকী সামন্তর বাড়িতে ছিল না?”
অনুপ মাথা নাড়ল আবার। “ছিল না। কিন্তু তবু আমার কী একটা খটকা লেগেছিল, তাই সেদিন গেলাম বিধানদাকে জিগেস করতে। কী বলল জানিস?”
কী?”
বলল, হরিতকী সামন্তর বাড়ির দু দিকের বাড়িই হঠাৎ খালি হয়ে গেছে। দুটো বাড়িই তালা বন্ধ হয়ে পড়ে আছে।”
আমি এখনও কিছু বুঝতে পারছি না...”
এবার অনুপ পায়চারি থামিয়ে পুচির সামনে দাঁড়িয়ে দুহাতে ওর দুই হাঁটু ধরে ঝাঁকানি দিয়ে বলল, “তুই বোকা সাজা থামাবি? আমি জানি তুই হয় ইয়ার্কি মারছিস, নইলে ইচ্ছে করে ভাবছিস না।”
আস্তে আস্তে খাট থেকে নেমে অনুপের জানলার কাছে গিয়ে দাঁড়াল পুচি। বলল, “আমার কিচ্ছু ভালো লাগছে না।”
কেন? নিবারণ সে দিন পাগলটাকে মেরেছে বলে?”
পুচি খানিকক্ষণ কিছু বলল না। অনুপ বলল, “তুই যদি আর্টিস্ট হতিস, আর তোর ছবিতে কেউ যদি কালি ছিটিয়ে যেত, আর তারপর তুই যদি জানতে পারতিস তোর বাড়ির বাগানে রাতে কে যেন এসে শুয়ে থাকে, তুই কী করতিস?”
ডাইনে বাঁয়ে মাথা নাড়ল পুচি। “আমি কাউকে ওর’মভাবে মারতাম না। আর তাছাড়া, পাগল মানুষ বাগানে শুতে পারে। বাড়িতে ঢুকবে কী করে?”
অনুপও মাথা নাড়ল। “ঠিক কথা, কিন্তু এক একটা ছবি কত হাজার টাকা দাম তার ইয়ত্তা নেই। অমন আঘাত খেলে যে কেউ পাগল হয়ে যেতে পারে।”
পুচি উত্তর দিল না। আস্তে আস্তে বলল, “তুই বলছিস ওই দুপাশের বাড়ি আর আমাদের বাড়ি খালি রাখার পেছনে কোন ষড়যন্ত্র রয়েছে?”
উৎসাহিত হয়ে অনুপ বলল, “ঠিক। আর সেই জন্যই তোর নিবারণকে তাড়ানোর জন্য ওর ছবিতে কালি ছেটানো, ব্লেড চালানো, বাজে কথা লেখা হচ্ছে।”
পুচি মানল নাবলল, “নিবারণ তো এই সেদিন এলতাহলে এর আগে থেকে কেন আমাদের বাড়িতে ভূত দেখা দিল?”
অনুপ বলল, “সব প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছি নাজানিও নাকিন্তু এর মধ্যে একটা বিষয় নিশ্চিতসামন্তদের বাড়ির পেছনে তোদের বাড়িতোদের বাড়ির ভাড়াটে এল নিবারণ, তার পরেপরেই সামন্তদের দুপাশের দুটো বাড়ি প্রায় একসঙ্গে খালি হয়ে গেল গত মাসেই। তারপরে নিবারণের ছবিতে কালি আর ব্লেড। এই বিষয়ে তোর সঙ্গে আমার আগেও কথা হয়েছে, মনে আছে? আমি বলেছিলাম... কী বলেছিলাম?”
কী বলেছিলি?”
মনে করে দেখ।”
পুচি রেগে বলল, “আরে, কত কথাই তো বলিস সারাক্ষণ। অন্তত কী বিষয়ে বলেছিলি না বললে কী করে বলব?”
অনুপ বলল, “ভূতে কী করে না করে সম্বন্ধে কী বলেছিলাম?”
পুচিকে অপেক্ষা করতে হলো না। “বলেছিলি যে ভূতে যে সব করে ওই ছবির ঘটনাগুলো সে রকম কিছু বলে মনে হচ্ছে না।”
অনুপ লাফিয়ে উঠে বলল, “অ্যাই দেখ। দেখেছিস? এই রকম ব্রেন তোর, আর তুই কী না পড়াশোনা ছেড়ে বসে আছিস...”
পুচির হঠাৎ কান্না পেল। অনুপ ছাড়া কেউ এমন কোনওদিন ওকে বলেনি ওর ব্রেন বলে কিছু আছে। বিশেষ করে ওকে যারা পড়াত, সেই সব মানুষগুলো – কী ইশকুলে, কী বাড়িতে – সারাক্ষণ বলে এসেছে, ও একটা অপোগণ্ড বুদ্ধিহীন, ওকে না পড়িয়ে দুটো বাঁদর, হনুমান, বা ছাগল টাগলদের পড়ালেও হত... কিন্তু অনুপ কী জিজ্ঞেস করছে।
...তাহলে এর আগে কে ভূতের কী অত্যাচার সহ্য করেছে?”
কিসের অত্যাচার?” জানতে চাইল পুচি।
আঃ, অন্য কথা ভাবছিলি তো? এই তোর এক দোষ। বলছিলাম, তোদের বাড়িতে এর আগে কী কী ভাবে ভূতের প্রমান পাওয়া গেছে? ভূতেরা আর কী করেছে যাতে কেউ বলতে পারবে বাড়িতে ভূত আছে?”
পুচি একটু ভাবল। তারপরে বলল, “তেমন তো কিছু করেনি কখনও – লোকে এখানে ওখানে ছায়া দেখে, আলো দেখে, শব্দ শুনে ভয় পেত।”
অনুপ বলল, “ঠিক। তাহলে কী দাঁড়াল? এই প্রথম ভূত কোনও ক্ষতি করল, তাই না? একজন আর্টিস্ট ছবি আঁকে তোদের বাড়িতে, সেই ছবিতে কালি ঢেলে, আজে বাজে কথা লিখে নষ্ট করে... কী চাইছে ভূত?”
পুচি আস্তে আস্তে বলল, “চাইছে নিবারণকাকু যাতে বাড়ি ছেড়ে চলে যায়।”
এগজ্যাক্টলি। আর আমার মনে হচ্ছে, কোথাও, কোনওভাবে, এর সঙ্গে সামন্তদের বাড়িটা জড়িয়ে আছে। আরও কিছু খবরাখবর লাগবে। তুই এসব নিয়ে আর কিচ্ছু ভাববি না। কাল আমি আবার যাব বিধানদার কাছে। স্কুলের পরে। যাবি?”
মাথা নাড়ল পুচি। “বিধানদার কাছে আমি জীবনেও যাব না।” ওর জীবনের সমস্ত টিচারের মধ্যে বিধানদাকেই পুচি সবচেয়ে অপছন্দ করে। বিধানদাই ওকে সবচেয়ে হেনস্থা আর অপমান করত।
বেশ, আমিই যাব। আরও কিছু খবর লাগবে। তুই এখন বাড়ি যা। সন্ধে হয়ে গেছে অনেকক্ষণ। আমি পড়তে বসব। অনেক ল্যাব খাতা লেখার আছে।”
বেরোতে গিয়ে হঠাৎ থেমে দরজা থেকে ঘুরে দাঁড়াল পুচি। বলল, “অনুপ, আমি যদি আবার ক্লাস ইলেভেনে ভর্তি হই, তুই আমাকে পড়াবি?”
অনুপ অবাক হয়ে পেছন ফিরে দেখল পুচির চোখে জল।

১৪
রোজ রাতে বাবাকে খাইয়ে দাইয়ে শুতে পাঠিয়ে তবে খেতে বসে পুচি। ছোড়দার জন্য অপেক্ষা করে না, এক যদি না ছোড়দা সময়ে বাড়ি ফেরে, কিংবা ফোন করে বলে এক্ষুনি আসছে। আজ অবশ্য অপেক্ষা করার দরকার নেই। ছোড়দা গেছে শিবাস্তপুর। কাল ফিরবে, বা পরশু।
খেয়ে উঠে হাত মুখ ধুয়ে বাবা কিন্তু রোজের মতো শোবার ঘরের দিকে গেল না। হাঁটা দিল বাইরের ঘরের দিকে। গলা মেলে বলল, “বৈকুণ্ঠ, একটু তামাক সেজে দিয়ে যা...”
পুচি খাবার ঘরে থালা তুলছিল। আবার নামিয়ে বেরিয়ে এল। “বাবা, তুমি শুতে যাবে না?”
বাইরের ঘরে ঢুকতে ঢুকতে হলধর ঘুরে দাঁড়িয়ে বললেন, “না রে, কাজ আছে একটু। তুই গিয়ে শুয়ে পড়।”
কাজ! বাবার কাজ আছে? কত বছর হয়ে গেল বাবা সব কাজ শুধু বড়দা আর ছোড়দার সঙ্গে কথা বলেই সেরেছে। আজ দুজনের কেউ নেই। রাত্তির দশটার পরে বাবার ঘরে আলো নেভে রোজ। আড়চোখে ঘড়ি দেখল পুচি। দশটা বাজতে এখনও দশ মিনিট বাকি।
বাবার থালা নামিয়ে নিজের খাওয়া শেষ করতে করতে সাড়ে দশটা। অন্যদিন হলে নিচতলাটা এতক্ষণে অন্ধকার। পুচি খাবার ঘরের দরজা বাইরে থেকে বন্ধ করে দালানের আলো, সিঁড়ির আলো নিভিয়ে শুতে যায় ওপরে। আজ?
বাইরের ঘরে উঁকি দিয়ে দেখল বাবা তক্তপোষে বসে আস্তে আস্তে গড়গড়া টানছে। হাতে পঞ্জিকা। বাবা পড়ে শুধু খবরের কাগজ আর পঞ্জিকা। পুচি সারা জীবনে বাবাকে অন্য কিছু পড়তে দেখেনি।
দরজার কাছে পুচির নড়াচড়ায় মুখ তুলে তাকালেন হলধর। বললেন, “শুয়ে পড়। আমি পরে শোব।”
পুচি বলল, “আলো?”
হলধর বললেন, “থাক, আমি নিবিয়ে দেব’খন।”
পুচি বলল, “দালানের আলো নেভালে সব অন্ধকার হয়ে যাবে। পারবে যেতে?”
নাকের ভেতরে ঘুৎঘুৎ শব্দ করে হাসল বাবা। বলল, “সারা জীবন আমিই তো সব আলো নিভিয়ে শুতে গেলাম। আর আজ পারব না?”
নিজের ঘরে পোশাক বদলে বিছানায় গিয়েও পুচির ঘুম আসছিল না। সারা জীবন বাবা আলো নিভিয়েছে বটে, কিন্তু গত বছর তিন চার নেভায়নি। বয়সও বেড়েছে। অন্ধকারে যদি...
ছটফট করে উঠে পড়ল। বেরিয়ে সিঁড়ির ওপর ওবধি গিয়ে আবার ঘরে ফিরে এল। কী বলবে বাবাকে গিয়ে? আবার খাটে শুল। আবার উঠল। ওর ঘরের বাইরে ছোটো ঝুল-বারান্দা আছে একটা। বাইরে বাগান। বাড়ির পাশে। জানলার বাইরে শিউলি গাছ একটা। আর ক’দিন পরেই সাদা-কমলায় ছেয়ে যাবে ওর জানলার বাইরেটা। এখন অন্ধকার। পুচি ছিটকিনি খুলে বারন্দায় গিয়ে দাঁড়াল। বেশ গরম। হাওয়া নেই। গাছের পাতা নড়ছে না। ডালে তিনটে কাক বসে ঘুমোচ্ছে। পুচির বেরোন’র শব্দে একটা কাক এ-পা ও-পা করে নড়ে বসল। এখান থেকে বাঁ-দিকে তাকালে পুচি বাইরের রাস্তাটা দেখতে পায়, কিন্তু ওদের বাড়ির গেটটা দেখা যায় না। নিচের তলায় বাবার ঘরের জানলা দিয়ে আলো পড়েছে বাগানে। বাগানের ফুলগাছগুলো দেখা যায়, ফুল চেনা যায় না। পুচি জানে ওখানে নয়নতারার ঝোপ, পেছনে জবা গাছ।
শহর হলে এখন রাত বেশি নয়। রাস্তায় জমজমাট। কিন্তু এখানটা তা নয়। বাড়িগুলো ছাড়া-ছাড়া। রাস্তার আলো উজ্জ্বল হলেও দূরে দূরে। পুচির বাঁদিকে বাড়ির সামনেটা আধো অন্ধকার। সামনে তাকালে গাছপালার আড়াল থেকে পাশের বাড়ির জানলায় টিভির আলো।
বাবার ঘরে আলো এখনও জ্বলছে। কটা বাজে? ঘরে গিয়ে টেবিল ল্যাম্পটা জ্বেলে দেখল। এগারোটা বাজেনি এখনও। তবে দেরিও নেই আর। বারান্দার দরজাটা দিয়ে শুলেই হয়। বাবা যখন ইচ্ছে ঘুমোক। দরজাটা বন্ধ করতে গিয়ে দেখল বাইরের রাস্তায় একটা লোক আসছে। আধো-অন্ধকারে মুখ দেখা যায় না, তবে ওই একটু খুঁড়িয়ে হাঁটাটা পুচি চেনে। এ পাড়ায় সবাই চেনে।
ছিদাম চক্কোত্তি এত রাতে কোথায় চলল?
পুচির ঘরটা বাড়ির পেছন দিকে, সামনেটা পুচির চোখের আড়াল – কী মনে হলো, এক ছুটে বড়দার ঘরে ঢুকল। ঘর খালি। অন্ধকার। বড়দার বারান্দাটা বাইরের দিকে। কিন্তু সেখানে দরজা খুলে যেতে হবে না। বারান্দার দরজার পাশে কাচের জানলা। পরদার আড়াল থেকে রাস্তার দিকে তাকিয়েই পুচি অবাক! ছিদাম চক্কোত্তি ওদেরই বাড়ির গেট খুলে ঢুকছে!
এত রাতে চক্কোত্তি মেসো বাবার কাছে কেন? তার মানে আগে থেকেই কথা ছিল আসবে... নইলে বাবাও কেন জেগে বসে আছে?
গেট খোলা-বন্ধর শব্দ বাবারও কানে গেছে। তাই চক্কোত্তি মেসো গেট পার করতে না করতেই বাইরের দরজা খুলে আলো পড়ল বাগানের রাস্তায়। ছিদাম চক্কোত্তি খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে এসে ঘরে ঢোকার পর আবার দরজা বন্ধ হয়ে বাইরেটা অন্ধকার হয়ে গেল।
এত রাতে ছিদাম চক্কোত্তি বাবার কাছে?
সাবধানে বড়দার দরজাটা এঁটে পুচি এসে দাঁড়াল সিঁড়ির ওপরে। বাবার ঘরের আলো জ্বলছে, দরজা খোলা। নিচে নামবে? দালানের আলোও জ্বলছে। বাবা, বা চক্কোত্তি মেসো বাড়ির ভেতর দিকে বেরোলেই দেখতে পাবে। আবার নিজের ঘরে ফিরে গেল, কিন্তু তবু, ঔৎসুক্য বড়ো তাগিদ। ঘরে খানিকক্ষণ পায়চারি করে আবার বারান্দা থেকে উঁকি মারল। বাবার ঘরের আলো আর বাগানে নেই। কী হলো? আলো নিভে গেল কেন? চক্কোত্তি মেসো এসেই চলে গেল? আবার ত্রস্ত পায়ে সিঁড়ি অবধি গিয়েই থমকে দাঁড়াল। ভেতরের দরজা খোলা। আলো এখনও জ্বলছে। হলদে আলো বাইরের বারান্দা পেরিয়ে সান-বাঁধানো উঠোনের খানিকটা আলো করে দিয়েছে। মানে বাবা বাইরের জানলার ভারি পরদা টেনে দিয়েছে। কিন্তু দালানের আলোটা আর জ্বলছে না। বাবা নিভিয়ে দিয়েছে। বেশ আনন্দ হলো। পায়ে পায়ে নেমে এসে বাবার দরজার কাছে দাঁড়াল পুচি।
শুনতে পেল চক্কোত্তি মেসোর গলা। বলছেন, “...আপনি তো দেখেছেন ওদের। সব্বাইকে একরকম দেখতে। আমি শুনে থেকে ভাবছি কী করা। লুকিয়ে আমার বাড়ির পেছনে কেন? ভাবলাম, আপনাকে জিজ্ঞেস করি...”
বাবার গলা, “সামন্তর মতো দেখতে, কম বয়স – তা সে তোমার বাড়ির পেছনে কী করছিল, ছিদাম?”
ছিদাম চক্কোত্তির গলা আরও খাদে। “আপনি তো জানেন, বয়সকালে আমার তো সামন্তর সঙ্গে, ইয়ে...”
বাবা কথা কেটে বলল, “জানি। কিন্তু সে তো কবেকার কথা। আজ সামন্তর ছেলে সে নিয়ে তোমার বাড়ি এলেও পেছনের পতিত জমিতে ঘুরবে কেন দিনের বেলা?”
জানি না। তারা যা-ই করুক, ভালো কিছু করবে বলে আমার মনে হয় না। আমি কী করব হলধরদা?”
খানিকটা চুপচাপ। পুচি মনে মনে দেখতে পেল বাবা যেন মাথা নাড়ছে। গড়গড়ায় গুড়ুক করে একটা শব্দ হলো। তারপরে বাবা বলল, “সে তোমাকে তখনই বলেছিলাম, বাঁচতে চাও তো পাড়া ছেড়ে, শহর ছেড়ে পালাও। সে তো বাবু শুনলে না, সস্তায় জমি বেচছি শুনে এখানেই এসে বাসা বাঁধলে। এক্ষুনি কিছু মাথায় আসছে না। বয়স হয়েছে, বুদ্ধি-শুদ্ধি চলে ধীরেসুস্থে। আর তাছাড়া জানতে হবে সে লোক সামন্তরই ছেলে কি না, হলেও সে দিনের বেলা তোমার বাড়ির পেছনে কী করছিল, লুকিয়ে আসতে গেলেও তো দিনের বেলায় না, রাতের বেলায় আসতেই পারত। আসছিলই যদি তাহলে এল না কেন?”
চক্কোত্তি মেসো বলল, “মাতঙ্গিনী দেখে ফেলল বলে হয়ত...”
বাবা আবার কথা কেটে বলল, “আহা, তাই তো বললাম, তোমার বউ ওকে দেখে ফেললে যদি পালাতেই হবে, তবে দিনের বেলা আসা কেন? রাতে আসতে পারত, তোমার কাজের ঠাঁইয়ে গিয়ে কথা বলতে পারত... না বাপু, অতো সোজা না। আমি বলি, একটু সবুর করো। এখুনি কিছু হুট করে করতে যেও না। ব্যাপারটা বোঝো।”
এর পরে খানিকক্ষণ চুপচাপ দুজনেই। পুচি পায়ে পায়ে আর একটু কাছে গেল।
চক্কোত্তির গলা এল। বলছে, “তাহলে...”
বাবা বলল, “বাড়ি যাও। কিছু এমন হয়নি যে ভেবে ভেবে রাতের ঘুম নষ্ট করতে হবে। তবে চোখ খোলা রেখো। বৌমাকে বলো, নজর রাখতে। আবার যদি সামন্তকে দেখা যায়, আমাকে খবর দিও।”
পুচি আর অপেক্ষা করল না। সিঁড়ি বেয়ে উঠল চটপট করে। সিঁড়ির বাঁকে দাঁড়িয়ে দেখল বাবার ঘরের দরজার আলোতে দুজনের ছায়া। আরও এক-দুটো কথা হলো, যেটা ও পরিষ্কার শুনতে পেল না। তারপরে বাইরের দরজা খোলা বন্ধ হবার শব্দ, বাবা বেরিয়ে এসে দালানের আলো জ্বালাল। তারপরে বাইরের ঘরে ফিরে গিয়ে আলো নেভাল। আবার বেরিয়ে এল। পুচি সরে গেল সিঁড়ির বাঁকের অন্ধকার কোণে। একটু পরে আবার বাবার পায়ের শব্দ। ফিরে এসে দালানের আলো নেভাল। পুচি উঁকি দিয়ে বুঝল বাবা আগে নিজের শোবার ঘরের আলো জ্বালিয়ে তবে ফিরে এসে দালানের আলো নিভিয়েছে।
সামন্ত আর চক্কোত্তির ব্যাপারটা না বুঝলেও, বাবা যে সাবধানে চলাফেরা করেছে, অন্ধকারে হাতড়ে হাতড়ে চলেনি, সেটা ভেবে খুশিমনে পুচি শুতে গেল।

১৫
রোজের মতন ব্যাগ-টিফিন বক্স গুছিয়ে, “মা---, আসছি,” বলে হাঁক পেড়ে অনুপ বেরিয়ে পড়ল। আজ দুটো টেস্ট। সেও আবার ফিজিক্স আর কেমিস্ট্রি। দুই স্যারের দ্বন্দ্ব আর শেষ হয় না, আর ছাত্রদের যত বিপদ।
অনুপ অবশ্য ফিজিক্স নিয়ে ডরায় না। কেমিস্ট্রিটা কখনও কখনও সমস্যা করে, তবে আজ পিরিয়ডিক টেবিল, প্রব্লেম নেই।
মনে মনে অপটিক্সের লেন্স ফর্মুলাগুলো আওড়াতে আওড়াতে রাস্তায় নেমেই চমক। পুচি।
তুই এখানে, এখন?”
পুচি কাছে ঘেঁষে এল। “একটা কাণ্ড হয়েছে।”
অনুপ একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল আলতো করে। “পুচি, এখন ক্লাস আছে। দুটো পরীক্ষা। ইম্পর্ট্যান্ট। এখন তোর আর্টিস্টের গপ্পো শুনতে পারব না, মাইরি।”
ভীষণ রেগে পুচি বলল, “বাজে কথা বলবি না। নিবারণকাকু না, আরেকটা কথা আছে,” বলে গলা নামিয়ে বলল, “চক্কোত্তি মেসো।”
চক্কোত্তি মেসো? অনুপের সব গুলিয়ে গেল। সে আবার কে?
আরে ধ্যাৎ, পরীক্ষা বলে সব ভুলে যায় নাকি মানুষ? ছিদাম চক্কোত্তি রে।”
, চক্কোত্তি কাকু? মেসো বলিস নাকি? তা সে কী ব্যাপার?”
কাল রাতে আমাদের বাড়ি এসেছিল। বাবার সঙ্গে দেখা করতে।”
অনুপ স্কুলের দিকে হনহন করে হাঁটছে, পুচি খানিকটা হেঁটে, খানিকটা দৌড়ে, খানিকটা লাফিয়ে সঙ্গে সঙ্গে চলছে। চলতে চলতে আড়চোখে অনুপ পুচিকে দেখে নিয়ে বলল, “তো, কী হয়েছে?”
আবার বিরক্তি মেশানো গলায় পুচি বলল, “তোর ব্যাপারটা কী বলত, ক’দিন আছিস এই পাড়ায়? কোনওদিন দেখেছিস, ছিদাম চক্কোত্তি কারোর বাড়ি যাচ্ছে?”
দেখেনি? ওয়ান বাই অবজেক্ট ডিস্ট্যান্স, প্লাস ওয়ান বাই ইমেজ ডিস্ট্যান্স ইজ ইকোয়ালটু ওয়ান বাই ফোকাল লেংথ... অর্থাৎ...
কোনওদিন কারোর বাড়ি যায় না। আর আমাদের বাড়ি এসেছিল কখন জানিস? রাত্তির এগারোটায়। বাবাকে কী বলছিল – সামন্তদের ছেলে সম্বন্ধে। বাবা আমাকে শুতে পাঠিয়েছিল। আমি নিচে এসে চুপি চুপি শুনেছি। বাবা বলল, তোমাকে তো বলেছিলাম, পাড়া ছেড়ে চলে যাও। যাওনি কেন?”
অবজেক্ট ডিস্ট্যান্স মাথায় উঠল। থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে অনুপ বলল, “সামন্তদের ছেলে মানে?”
পুচিও দাঁড়াল। তারপরে অনুপের হাত ধরে টেনে বলল, “চল চল, ইশকুলে দেরি হয়ে যাবে।” দুজনে আবার চলতে শুরু করল। পুচি বলল, “সামন্তর ছেলে নাকি কাল সকালে চক্কোত্তিদের বাড়ির পেছনে ঘুরঘুর করছিল। চক্কোত্তি মাসিমা দেখেছে। চক্কোত্তিমেসো বাবাকে জিগেস করতে এসেছিল – কী করা উচিত।”
তা তোর বাবা কী বলল?”
বলল, অপেক্ষা করতে। দেখতে আবার আসে কি না।
তা তুই আমাকে বলতে এসেছিস কেন?”
আবার রেগে গেল পুচি। “বা রে, তুই-ই বলছিস আমাদের বাড়িতে ভূতের উপদ্রবের সঙ্গে সামন্তদের বাড়ির যোগাযোগ আছে। এদিকে বাবা বলল সামন্তদের বাড়িতে নাকি সোনাদানা আছে। যেদিন বললি, সে দিনই শোনা গেল সকালে সামন্তর ছেলে এ পাড়ায় ঘুরঘুর করছিল...”
মাথা নাড়ল অনুপ। “না চক্রবর্তীদের বাড়ির পেছনটা সামন্তদের বাড়ির একেবারে উলটো দিক। ওখান থেকে...”
কথা কেটে পুচি বলল, “হোক উলটো দিক। কাছেপিঠে তো। এতদিন কেউ সামন্তদের এ পাড়ায় দেখেনি। আজ কেন?”
স্কুল এসে গিয়েছে। গেট দিয়ে ঢোকার আগে অনুপ বলল, “জিগেস কর না, মেসোমশাইকে?”
এক হাত জিভ কেটে পুচি বলল, “পাগল! ঠিক ধরে ফেলবে আমি আড়ি পেতেছি। সে আমার দ্বারা হবে না।”
অনুপ বলল, “আমিও তো জিগেস করতে পারব না, মেসোমশাই, ছিদাম চক্রবর্তী আপনার কাছে কেন এসেছিল?”
তুই অন্য কাউকে জিগেস করিস,” বলল পুচি। “বিধানদাকে...”
বিধানদাকে জিগেস করা যায়... যদিও বিধানদা আগের দিন তেমন কিছু বলতে পারেনি। তবে তাকেও তো আর সটান জিগেস করা যায় না, কী করে জিগেস করি?”
পুচি ঠোঁট উলটে বলল, “আমি তার কী জানি? তোর সঙ্গে এত বন্ধুত্ব, তুই কোনও রাস্তা বের করে নে।”
যাবি বিকেলে? তাহলে স্কুল শেষ হবার পরে চলে আসিস।”
না। যাবে না। মাথা নাড়ল পুচি। অনুপ স্কুলে ঢুকে যাবার পরে আস্তে ধীরে বাড়ির দিকে ফিরল। ওর পুরোনো বন্ধুরা কেউ কেউ আসছে স্কুলে, তাদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে, কী রে, তুই কী করছিস? স্কুলে আসিস না কেন? পড়াশোনা ছেড়েই দিলি? মার্কা প্রশ্নের উত্তর দিয়ে আবার পাড়ায় ঢোকামাত্র, মুদির দোকানের সামনে দেখা মঞ্জুদির সঙ্গে।
এই, দাঁড়া,” কড়া গলায় মঞ্জুদির হুকুম শুনে থেমে গেল পুচি। “আমার হয়ে এসেছে। একটা ব্যাগ নিয়ে যাবি সঙ্গে।”
দাঁড়াল পুচি। দু-ব্যাগ ভর্তি বাজার নিয়ে একটা পুচির হাতে ধরিয়ে দিয়ে মঞ্জুদি বলল, “চ’, কথা বলতে বলতে বাড়ি যাই। আজ একটা লাউ-চিংড়ি রেঁধেছি। একটু খেয়ে যাবি।”
রাস্তা চলতে চলতে মঞ্জুদি এ-কথা সে-কথা বলছে, পুচির মন নেই। শেষে মঞ্জুদি বলল, “কী ভাবছিস রে? তোর সেই হ্যান্ডসাম আর্টিস্টের কথা?
নিবারণের কথা ভাবছিল না পুচি। ভাবছিল সামন্তদের বাড়ির কথা। কিন্তু সে কথা এখন মঞ্জুদিকে বলা যাবে না। চক্কোত্তি মাসিমার সঙ্গে মঞ্জুদির খুব ভাব। দুজনে গেটে দাঁড়িয়ে বিকেলে অনেক আড্ডা মারে। তাই বলল, “না, -ই আর কী।”
মঞ্জুদির সঙ্গে আড্ডাটা জমল না। এমনকি দারুণ একটা লাউ-চিংড়ি খেয়েও পুচির মন ভালো হলো না, মঞ্জুদিও আর কথা না বলে ছেড়ে দিল ওকে। বলল, “কী হয়েছে তোর কে জানে... পরে আসিস, মন ভালো হলে।”

১৬
স্কুল থেকে বেরিয়ে বিধানদার বাড়ি যাবার পথে সংগ্রামের তেলেভাজার দোকান। দিনটা খুব গরম। বিকেলে সংগ্রামের ছেলে তেলেভাজার দোকানে বাইরে রাস্তায় উনুন নিয়ে বসে তেলেভাজা তুলে তুলে রাখছে ঝুড়িতে। দোকান খালি। অনুপের মনে হলো, আজ গরম বলে ভীড় নেই। বৃষ্টির দিন বা শীত হলে এতক্ষণে দোকান উপচে রাস্তায় লোক দাঁড়াত। আজ একটাই লোক দোকানে দাঁড়িয়ে আছে। লোকটা তেলেভাজা কিনছে? হেঁটে হেঁটে কাছে যত আসে অনুপ, ততই মনে হয়, ওটা খদ্দের না। এমনিই এসে কেউ দাঁড়িয়ে কথা বলছে।
এতক্ষণে লোকটার দিকে তাকাল অনুপ। আর তাকিয়েই থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। লোকটা ছিদাম চক্কোত্তি।
দাঁড়াল কেন অনুপ? ছিদাম চক্কোত্তি তো পাড়ারই লোক। আর আশেপাশের দশটা পাড়ার লোক তো সবাই সংগ্রামের তেলেভাজাই খায়। তবে?
তবু মনে হচ্ছিল, ও যতক্ষণ দেখেছে, ছিদাম চক্কোত্তিকে খদ্দের মনে হয়নি।
কাঁধ থেকে ব্যাগটা খুলে মাটিতে রেখে উবু হয়ে বসে অনুপ এক এক করে জুতোর ফিতেবাঁধতে বাঁধতে আড়চোখে দেখল দেখল, যা ভেবেছিল তাই। ছিদাম চক্কোত্তি কথা বলছে। হাত পা নেড়ে, হাবেভাবে একটা তাড়াহুড়ো। সংগ্রামের ছেলের হাবভাব অবশ্য সে রকম না। মনে হচ্ছে যেন সে চক্রবর্তীকে পাত্তাই দিচ্ছে না।
আর একটু কাছে যাবে কি? জুতোর ফিতে বাঁধা হয়ে গেলে আর তো উবু হয়ে বসে থাকা যায় না। আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়াল অনুপ। আর তখনই, দোকানের পাশের দরজা দিয়ে বেরিয়ে এল লাঠি হাতে এক বুড়ো। শরীরটা ভেঙে গেছে, কোমর থেকে সামনে ঝুঁকে রয়েছে। সংগ্রাম। অনুপ কোনওদিন সংগ্রামকে তেলেভাজা বেচতে দেখেনি, কিন্তু চারপাশের সবাই সংগ্রামকে চেনে।
নিচু দরজা দিয়ে আরও নিচু সংগ্রাম বেরিয়েই ছিদাম চক্কোত্তিকে দেখে দাঁড়াল। তারপরে লাঠি তুলে ছিদামের দিকে দেখিয়ে কী বলল। বেশ চেঁচিয়েই, কিন্তু অনুপের দিকে সংগ্রামের পেছন, তাই অনুপ বুঝতে পারল না।
ছিদাম চক্কোত্তি হাত তুলে এগিয়ে গেল সংগ্রামের দিকে। কী বলল, কিছুই শোনা গেল না, কিন্তু সংগ্রাম একেবারে লাঠি উঁচিয়ে তেড়ে গেল। প্রায় মারে আরকি! সেই সঙ্গে চিৎকার করে কী সব বলল, তার মধ্যে ‘শয়তান’, ‘বদমাস্‌, জাতীয় কয়েকটা কথা অনুপ শুনতে পেল। ছিদাম চক্কোত্তি উলটোদিকে ফিরে খোঁড়া পায়েই হনহন করে চলে গেল।
সংগ্রামের ছেলে চুপ করে বসে তেলেভাজা ভেজেই চলেছে। দু’জনেই ওর দিকে পিঠ ফিরিয়ে। সংগ্রাম কী বলছে ওকে? যতটা সম্ভব নিঃশব্দে পা চালিয়ে কাছে গেল অনুপ।
সেদিন সামন্তর ছেলে, আজ ছিদাম চক্কোত্তি...” চিৎকার করছে সংগ্রাম। “কী চায় কী শয়তানগুলো? কী বলছিল তোকে?”
তোমার সঙ্গে দেখা করতে চাইছিল।”
সংগ্রামের ছেলের গলায় উত্তেজনা নেই।
ওই শয়তানের বাচ্চাদের সঙ্গে আবার আমি কথা বলব? খবরদার যদি আবার কোনওদিন...”
সংগ্রামের ছেলে কড়াই নামাতে গিয়ে অনুপকে দেখে ফেলল। “কী চাই?”
অনুপ তৈরি ছিল না। থতমত খেয়ে গেল। সংগ্রাম আস্তে আস্তে ঘুরে তাকাল। “তেলেভাজা নেবে?”
ইয়ে, হ্যাঁ...” পকেট হাতড়ে যা বেরোল, তা দিয়ে চারটে তেলেভাজা কেনা গেল মাত্র। হাতে গরম ঠোঙা ধরে হাঁটা দিল বিধানদা-র বাড়ির দিকে।
বিধানদা দুপুরে ঘুম থেকে উঠে বিকেলের টিউশন ক্লাসের তৈরি করছিল। আড়চোখে অনুপের হাতে ঠোঙাটা দেখে বলল, “ওতে আর কটা তেলেভাজা?”
আর পয়সা ছিল না,” বলে ঠোঙাটা বাড়িয়ে দিল বিধানদার দিকে।
বলল, “ওপাড়ার ছিদাম চক্রবর্তীকে তুমি চেন?”
পেঁয়াজিতে কামড় বসিয়ে বিধানদা একটু ফু-ফু করে গরম কমাল। তারপর বলল, “আমরা ছোটোবেলায় ল্যাংড়া ছিদাম বলতাম। কী আশ্চর্য দেখ, আমরাও ছোটোবেলায় শুনেছি, কানা-কে কানা, খোঁড়াকে খোঁড়া বলতে নেই। কিন্তু সে সব মানতাম না। কিন্তু তোরা মানিস। কেন জানিস? তোরা আমাদের চেয়ে বেশি সাহেবি আদব-কায়দা শিখেছিস। আগের দিন সামন্তর বাড়ি, আজ ছিদাম চক্কোত্তি – কেন?”
এই প্রশ্নটা আসবে ভাবেনি কেন অনুপ? চট করে বলল, “আমি যখন সংগ্রামের ছেলের কাছ থেকে পেঁয়াজি কিনছি, তখন ছিদাম চক্রবর্তী গিয়েছিল ওদের দোকানে। সংগ্রাম ওকে লাঠি নিয়ে তেড়ে গিয়েছে, এমন যেন লাঠিপেটা করবে। আমি তো অবাক! সংগ্রাম একটা তেলেভাজার দোকানদার, আর ছিদাম চক্রবর্তী...”
একটা পেঁয়াজি শেষ করে বিধানদা দ্বিতীয়টা নিয়েছে। কামড় দিতে গিয়ে থমকে গেল। বলল, “ইঁইঁইঁইঁইঁহ্‌, কে আমার ছিদাম চক্রবর্তী রে? চক্রবর্তী নাম বলে কি মাথা কিনে নিয়েছে? ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে, নে, নে...” এইটা অনুপকে তেলেভাজা খেতে বলা। “সে তো একসময় ওই সংগ্রামেরই স্যাঙাত ছিল। সবাই সামন্তর দলবল। ওই যে তোর বাবা রেড করে ধরপাকড় করল, সেদিন ছিদাম ছিল না। তাই ধরা পড়েনি। কিন্তু কামড় দে, কামড় দে, তেলেভাজা কেউ ধরে দাঁড়িয়ে থাকে? সে যা হোক, তোর বাবা রিজাইন করলেন, হইচই হলো, চাকরি ছেড়ে ওপাড়ায় বাড়ি করলেন, তার পরে কবে একটা আবার ফিরে এল। এখন কোথায় চাকরি করে ভদ্দরলোক হয়েছে ব্যাটা।”
অনুপের মাথা ভনভন করছিল। বলল, “কী কাজ করত ছিদাম? এখন কী করে?”
মুখ বাঁকাল বিধানদা। “অত কি আমি জানি? সামন্তদের কী কাজ ছিল, চুরিডাকাতি, না কি রাহাজানি, তাই কি কেউ জানে? আর এখন? তাই বা কে বলবে? হয়ত ওয়াচম্যান বা বেয়ারা। হয়ত কোনও অফিসে কেরানি। দেখে মনে হয় পড়াশোনা করেছে। আমার ছাত্ররা আসবে। তুই বসবি? বস না, ক্লাস এইটের ছাত্র। তুইও পড়াবি...”
পড়ানোয় লোভ নেই অনুপের। ওদিকে মা-কে বলেও আসা হয়নি। বেরিয়ে পড়ল। বিধানদার পাড়া থেকে নিজেদের রাস্তায় যেতে একটা সরু গলি আছে পুচিদের বাড়ির দুটো বাড়ি পরেই। শর্টকাট। সেই গলির ও-মুখে দাঁড়িয়ে ছিল পুচি। বলল, “যে দিক দিয়েই ফিরিস, এখান দিয়ে তো যেতেই হবে। জানতে পারলি কিছু?”
হুঁ, চ’, বাড়ি চ’, বলছি।”
দুজনে হাঁটল অনুপের বাড়ির দিকে। রাস্তায় অনুপ কিছু বলল না। বাড়ি গিয়ে দুজনে পরোটা আর আলু-ছেঁচকি খেতে খেতে কী কী হয়েছে, সবই বলল।
সব শুনে ভুরু কুঁচকে খানিকক্ষণ বসে রইল পুচি। তারপর বলল, “ব্যাপারটা তুই কী বুঝছিস, বল তো?”
অনুপ খায় গবগবিয়ে। পুচির পাতে এখনও একটা, আর প্রায় আধখানা পরোটা বাকি। অনুপ চেয়ার ছেড়ে উঠে বলল, “ঘরে আয়...” বলে টেবিলের পাশের বেসিনে হাত ধুয়ে নিজের ঘরে চলে গেল।
বিরক্ত হয়ে পুচি চেঁচাতে যাবে, রান্নাঘর থেকে অপর্ণামাসি এসে টেবিলে বসল। পুচিকে বলল, “তুই অনুপকে বলেছিস আবার ক্লাস ইলেভেনে পড়বি?”
পুচি আরও বিরক্ত হলো। এই ছেলেকে নিয়ে আর পারা যায় না। কিছু জানল কী না জানল, মা-কে জানান চাই! তারপরে হঠাৎ মনে হলো, আরে, এই সব কথাও বলে দেয়নি তো?
কোনওরকমে এটা ওটা বলতে বলতে পরোটা শেষ করে পুচি পালাল অনুপের ঘরে।
মাসিকে আমার সব কথা বলিস তুই?” গনগনে গলায় জিজ্ঞেস করল।
অনুপ অবাক। “কী বলেছি?”
সেই যে আমি বলে গেলাম, আমি ইলেভেনে পড়া শুরু করলে তুই আমাকে পড়াবি কি না... এই সামন্ত, নিবারণ, পাগল, ভূত... সব বলেছিস?”
অনুপ খানিকক্ষণ চেয়ে থেকে বলল, “বললে কী হবে? তবে না, বলিনি। আগেরদিন তুই যাবার পরে মা এসে আমার কাছেই ঘ্যানঘ্যান করছিল, মেয়েটা কী করছে? বুদ্ধিশুদ্ধি আছে, পড়াশোনা ছেড়ে দিল... তখন থামানোর জন্য বলেছিলাম তুই বলেছিস আবার ক্লাস ইলেভেনে ভর্তি হবার প্ল্যান করছিস – কী এমন খারাপ বলেছি রে?”
কী খারাপ বলেছে অনুপ ভেবে পেল না পুচি। খানিকটা সময় কাটল অনুপের টেবিলে বইগুলো এধার ওধার করতে। শেষে অনুপ বলল, “এর পরে আমি কোথায় কী রেখেছি খুঁজে পাব না।” তখন থেমে বলল, “তুই কী বুঝেছিস বলবি বলছিলি?”
অনুপও রেগে ছিল, কিন্তু ওর রাগ পড়তে সময় নেয় না। উৎসাহের সঙ্গে এগিয়ে বসল খাটে। বলল, “দেখ, চক্রবর্তী যদি সামন্তদের সঙ্গে কাজ করত, তাহলে এখনও কেন এই পাড়ায় পড়ে আছে? বিধানদা কথাটা ঠিকই বলেছে। গুণ্ডাদের সর্দার যদি ধরা পড়ে, তাহলে গুণ্ডাদের দলবল তল্লাট ছেড়ে পালায়। চক্রবর্তী পালায়নি। কেন?”
জানে না পুচি। কিন্তু আর একটা কথা মনে পড়ল। বলল, “চক্কোত্তিমেসো একা না। তুই দেখ, সামন্তদের সঙ্গে সংযোগ ছিল এমন আরও লোক এখনও এ পাড়ায় রয়ে গেছে। সংগ্রাম, অনঙ্গকাকু...”
তালিকায় নিজের বাবার নাম যোগ হওয়ায় অনুপ থতমত খেয়ে গেল। বলল, “আমার বাবা সামন্তদের দলে ছিল না...”
মাথা নাড়ল পুচি। বলল, “তা বলছি না। চক্কোত্তিমেসোর কথা বলছিলি তাই বললাম। সংগ্রামের না হয় যাবার জায়গা নেই। গরিব লোক, হুটহাট এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় গিয়ে বাড়ি করতে পারে না। কিন্তু চক্কোত্তিমেসো পারত। বাবা কী বলল তোকে বলেছি তো। বাবা চক্কোত্তিমেসোকে বলেছিল, বাঁচতে চাইলে পাড়া ছেড়ে পালাতে। কিন্তু সে বাবার কাছ থেকেই জমি কিনে এখানে বাড়ি করেছে। সস্তায় জমি কিনেছে বটে, কিন্তু জমি কেনা, বাড়ি করা, সে কি সহজ, না সস্তা?”
আর বাবা?” জানতে চাইল অনুপ।
মাথায় আসছে না। অনঙ্গকাকু হয়ত ভেবেছে সামন্তদের থেকে আর ভয় নেই। নিজে পুলিশের চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে দিয়েছে বলে, বা হয়ত কিছু ভাবেনি। এমনিই রয়ে গেছে, পাড়াটা ভালো লেগেছে, চাকরিটাও কাছেপিঠে...”
অনুপের মনে হলো পুচি যে কথাটা ভেবেছিল, সেটা চেপে গেল। আর কিছু বলল না। বিকেলের আলো কমে এসেছে। অনুপ উঠে গিয়ে জানলার সামনে দাঁড়াল। ওদের বাড়ির থেকে পুচিদের ভূতের বাড়ি খানিকটা দূর হলেও রাস্তাটা ঘুরে গেছে বলে এখান থেকে বাড়ির পাশটা আর পেছনের বাগানটা স্পষ্ট দেখা যায়।
একটু পরে পুচি বলল, “আমি আসি রে...”

১৭
সারাদিন পড়ায় মন বসেনি অনুপের। পরীক্ষাও কেমন হয়েছে জানে না। ক্লাস-টেস্ট বলে কোশ্চেন পেপারও নেই যে আর একবার অঙ্কগুলো করে দেখবে। সামনে দু-চার দিন কোনও পরীক্ষা নেই, সাংঘাতিক চাপও নেই। সন্ধেবেলাও পড়তে বসে খালি মাথায় ঘুরছে সংগ্রাম আর চক্কোত্তি, আর বিধানদা আর পুচির কথাগুলো। টেবিল থেকে উঠে জানলায় দাঁড়াল আবার। সামনেই পুচিদের বাড়ি। অন্ধকার – বাগানও, বাড়িও। সন্ধে হবার আগেই নবারুণ আর্টিস্ট বাড়ি চলে যায়। আজও গেছে।
বাগানের কোনে... ও কী? ওই অন্ধকার ঘুপচিটার মধ্যে, টগরের ঝোপটা সাদা-সাদা ফুলে ভরে আছে, সেই ঝোপের সামনে... অন্ধকারে বোঝা যায় না। কিন্তু মানুষ একটা, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। হেঁটে চলে যাচ্ছে বাড়িটার ওধার দিয়ে বাইরের রাস্তার দিকে।
তিরবেগে ছুটল অনুপ ছাদের দিকে। এ পাড়ার সব বাড়িই হয় একতলা, নইলে দোতলা। ওদেরটাও দোতলা। ছাদ থেকে পুচিদের বাড়ির অনেকটাই দেখা যায়।
অনুপ ছাদে পৌঁছতে পৌঁছতে লোকটা গেট খুলে রাস্তায় বেরোচ্ছে। পুচিদের গেটের সামনের রাস্তার আলোটা খারাপ। কিন্তু দুটো বাড়ি দূরে চিত্তরঞ্জনবাবুর বাড়ির বাগানের আলো জ্বলছে। আগে কখনও না দেখলেও, জামাহীন, ঝাঁকড়াচুলো, বগলে একটা পুঁটলি, রোগা চেহারাটা চিনতে দেরি হলো না অনুপের। ফিরে এসেছে। আবার সেই বাগানেই ঘোরাফেরা করছে। কেন? পুচির কাছে শুনেছিল নিবারণের হাতে ভয়ানক মার খেয়েছিল লোকটা। ভয়ডর নেই? অবশ্য পাগল – তার যে কিসে ভয় আর কিসে নয়, কে বলবে?
টেবিলে ফিরে একটা কাগজ বের করল অনুপ। এই লুজ শিটে ও ক্লাস-নোট নেয়। খাতা নিয়ে যায় না। এক, দুই করে নম্বর দিয়ে দিয়ে পুরো ব্যাপারটায় কী কী আশ্চর্য বা বিদঘুটে ঘটনা আছে, সব লিখে রাখল। যেমন –
) বাড়িতে ভূত আছে?
) ভূত ছবি নষ্ট করে কেন?
) আর্টিস্ট নবারুণ না নিবারণ?
) পাগল কেন বার বার ভূতের বাড়ির বাগানেই আসে?
) সামন্তর বাড়ির দু-দিকের বাড়ি খালি হলো কেন?
) সামন্তর মতো দেখতে কে এসেছিল?
) এ সবের সঙ্গে ছিদাম চক্রবর্তির আর সংগ্রামের কী সম্পর্ক?
) এ সবের সঙ্গে বাবার কী সম্পর্ক?
তারপরে খানিক ভেবে লিখল – ৯) এ সবের সঙ্গে পুচির বাবার কী সম্পর্ক?
খানিকক্ষণ ভাবল শেষ প্রশ্নটা রাখবে, কি না। পুচি ওর বাবার প্রসঙ্গটা এনেছে বলেই কী ও হলধর হালদারের কথাটা ভেবেছে? তারপরে ভাবল, না। হলধর হালদার ছিদাম চক্রবর্তীকে বুদ্ধি দেয়। জমি বেচেছে। এইবারও সমস্যা হওয়ামাত্র ছিদাম চক্রবর্তী পুচির বাবার কাছেই গেছে রাতের অন্ধকারে। তাই ন’ নম্বর প্রশ্নটা আর কাটল না। রেখে দিল।
রাতে খেতে বসে বাবা জিজ্ঞে করল, “পুজোয় কী চাই?”
অনুপ প্রতি পুজোয় চারটে জামা-প্যান্ট পায় দুই মাসি, এক কাকা আর এক পিসির কাছ থেকে। তাই বহু বছর হয়ে গেল মা-বাবা ওকে জামা প্যান্ট দেয় না। অন্য কিছু দেয় একটা। ও যা চায়।
এ বছর অনুপ এখনও ভাবেনি। বলল, “দেখি, বলব।”
বাবা একটু হেসে বলল, “বাবা! খুব ভাবুক দেখছি আজ? কথাই বলছিস না?”
অনুপ মনে মনে বলল, “আমি যেটা জানতে চাই সেটা জিগেস করলে তুমিও তো কথা বন্ধ করে দেবে।”
সবার আগেই অনুপের খাওয়া শেষ হলো। টেবিল ছেড়ে যাচ্ছে, মা ডেকে বলল, “দেখো ছেলের কাণ্ড! ওরে, জল খাসনি যে। জল খেয়ে যা...”
অনুপ ততোক্ষণে হাত ধুচ্ছে। বলল, “থাক, একটু পরে খাব।”
মাঝরাতে যখন জলতেষ্টায় বুকটা শুকিয়ে ঘুম ভাঙল, অনুপের মনে পড়ল জল শেষ পর্যন্ত খায়নি। ঘরে মৃদু নাইটল্যাম্প জ্বলছে। নীল আলো। অনুপ বিছানায় বসে দেখল ওর টেবিলে ঢাকাচাপা এক গ্লাস জল। মা রেখে গেছে তা হলে। বাইরে অন্ধকার রাত। চাঁদ নেই। বিশ্বকর্মা পুজোর এখনও দিন দশেক বাকি। আগে হলে জানত। বাবার অফিসে বিশ্বকর্মা পুজোর ছুটি থাকত, ওদের স্কুলেও। আজকাল ওরও থাকে না, বাবারও না।
জলটা খেয়ে কী মনে হলো, গ্লাসটা টেবিলে রেখে আবার গিয়ে জানলার পাশে দাঁড়াল। এবার চমকে গেল। অন্ধকার, কিন্তু কোনও ভুল নেই, পুচিদের বাগানে লোকের চলাফেরা। অন্তত চারটে লোক। একটু দাঁড়িয়ে থাকতেই বুঝল, বাগানের পেছন দিক থেকে দুজন করে ধরাধরি করে ভারি কিছু একটা নিয়ে পুচিদের বাড়িতে ঢুকে গেল। পেছনের দরজা দিয়ে। কিন্তু বাড়ির ভেতরটা একেবারেই অন্ধকার। ঘুটঘুটে। কোনও আলোর ছোঁয়া নেই কোথাও। বাগানও অন্ধকার।
অনেকক্ষণ চুপ করে অন্ধকার বাগান, বাড়ির দিকে চেয়ে দাঁড়িয়ে রইল অনুপ। কিন্তু আর কিছুই দেখা গেল না। খানিক পরে অনুপের চোখ জুড়িয়ে এল, বিছানায় গিয়েই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ল।
পরদিন সকালে মা আর ডেকে তুলতে পারে না, “কী রে! স্কুল যাবি না নাকি?”

১৮
অনুপ ঠিক করে রেখেছিল স্কুলের পরে পুচির সঙ্গে দেখা করে আসবে। তবে আগে বিধানদার সঙ্গে দেখা করবে। বিধানদার যদি কিছু মনে পড়ে থাকে। সে গুড়ে বালি। বিধানদা নতুন কিছুই বলতে পারল না, শুধুমুধু খানিকটা সময় গেল। ফেরার পথে পুচির বাড়ি ঢুকবে ভেবেছিল, কিন্তু রাস্তা থেকেই দেখতে পেল পুচি বাইরের ঘরের ওপরে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে। অনুপকে দেখতে পেয়েই হাত নেড়ে বলল এগিয়ে যেতে, বাড়ি না ঢুকতে। অনুপ ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে পা চালাল বাড়ির দিকে, কিন্তু একটু যেতেই পেছন থেকে ডাকল পুচি। বেরিয়ে এসেছে রাস্তায়।
অনুপ দাঁড়াল। পুচি ছুটে এসে ধরে ফেলে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, “বাবা বাইরের ঘরে বসে আছে। আজ আমাকে জিগেস করেছিল – অনুপ কেন সামন্তদের কথা জিগেস করছিল রে?”
কী বললি তুই?”
বললাম, জানি না। ওকে জিগেস করব? তাতে বলল, না, থাক। আসলে সবাই জানতে চাইছে...”
সবাই আবার কে? আমিই তো।”
মাথা নেড়ে পুচি বলল, “না, শুধু তুই না। বাবার হিসেবে চক্কোত্তিমেসোও। আর আজ অনঙ্গকাকু।”
বাবা!” থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল অনুপ। “বাবা? বাবা গিয়েছিল কেন?”
আবার মাথা নাড়ল পুচি। “জানি না। সেটাই আশ্চর্য। আজ সকাল এগারোটা নাগাদ অনঙ্গকাকু হঠাৎ হাজির। বাবার কাছে। দু-জনে কী কথা হলো, জানি না। তার পরে কাকু চলে গেল, আর বাবা আমাকে ডেকে বলে দিল, আমি যেন আর ও-বাড়ি না যাই।”
অনুপ হতভম্ব। এর মানে কী?
এর মানে কী?”
আমি জানি না রে, অনুপ,” কাঁদো কাঁদো গলায় বলল পুচি। “বাড়িটা নিয়ে কিছু হচ্ছে একটা। আমি ঠিক বুঝছি। ঠিক, ঠিক...”
অনুপের মনে হলো, গত রাতের ঘটনাটা পুচিকে বলা হয়নি। বলল, “তোদের বাড়িতে কাল রাতে প্রায় রাত্তির আড়াইটে নাগাদ...” বলে পুরোটা ঘটনাটা বলল পুচিকে।
শুনে পুচির হাত পা পেটের ভেতরে চলে যায় আর কী! “এক্ষুনি চল। এক্ষুনি।”
কোথায়?” অনুপ অবাক।
কোথায় আবার? -বাড়ি। বুঝছিস না, ওরা নিগঘাৎ নিবারণকাকুর ছবি নষ্ট করতে এসেছিল।”
আরে না, রে! ওরা কী সব মালপত্তর ধরাধরি করে নিয়ে গেল বাড়ির ভেতরে।”
ছটফটিয়ে উঠে পুচি বলল, “আর তারপরে বেরোয়নি। তুই বুঝছিস না, ওই বাড়িতে তার পরে নিবারণকাকু সকালে এসেছে। এসেই ওদের খপ্পরে পড়েছে।”
একটু ভাবল অনুপ। “তাহলে আমরা যদি ওখানে গিয়ে হাজির হই, আমরাও বিপদে পড়ব না? তার চেয়ে বড়োদের বলা ভালো। তোর বাবাকে, আমার বাবাকে...”
মাথা ঝেঁকে পুচি বলল, “বাবা আমাকে বলেই দিয়েছে বাড়ির ধারেকাছে না যেতে। বাবা শুনবেই না।”
অনুপ এবারে একটু ঝাঁঝিয়ে বলল, “ভগবান তোর মাথাটা দিয়েছে কেন? ভেতরে ঘিলু দিয়েছে কেন? একটু মাথাটা খাটা পুচি। ও বাড়িতে কিছু একটা হচ্ছে। পর পর কথাগুলো ভেবে দেখ।” বলে আগের দিনের নটা প্রশ্ন লেখা কাগজটা পুচির হাতে দিল।
পুচি কাগজটা পড়ল। বলল, “বাবাও কিছু জানে, যেটা আমরা জানি না।” তারপর রাস্তায় একটা ল্যাম্পপোস্টের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে বলল, “একটা কথা ভাবার আছে।”
অনুপ কাগজটা ওর হাত থেকে নিয়ে ভাঁজ করে পকেটে ঢোকাতে ঢোকাতে বলল, “কী?”
তুই যে লোকগুলোকে দেখেছিস, তারা সামন্তদের বাড়ির দিক থেকে আসছিল। আর আমাদের বাড়িতে পেছন থেকে ঢুকেছিল, তাই না?”
ঠিক।
কিন্তু পেছনের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ হয়। বাইরে থেকে বন্ধ করার উপায় নেই। তার মানে পেছনের দরজা দিয়ে বাড়িতে ঢুকতে গেলে হয় ভাঙতে হবে, নইলে ভেতর থেকে কাউকে খুলে দিতে হবে। কাল সন্ধেবেলা নিবারণকাকু বেরিয়ে গেছে, আমি আমার বাড়ির ছাদ থেকে দেখেছি।”
তাহলে?”
তাহলে মনে হচ্ছে, নিবারণকাকু হয় আবার ফিরে এসেছিল, নইলে দরজাটা খুলে রেখেই গেছিল।”
চিন্তিতমুখে “হুঁ,” বলল অনুপ। ওর সব গুলিয়ে যাচ্ছিল।
কী করা উচিত আমাদের?” জানতে চাইল পুচি।
সেটাই তো বুঝতে পারছি না। মেসোমশাই তোকে ও-বাড়ি নিয়ে মাথা ঘামাতে বারণ করেছে, মেসোমশাইকে বলা যাবে না। বাবাকে বললেও কাজ হবে বলে মনে হয় না। বাবাও তো আজ মেসোমশাইয়ের বাড়ি গিয়েছিল, তাই না?”
তাহলে?
এই তাহলে-টা আর ভাবা হলো না, হঠাৎ অনুপের মা সেখানে হাজির, “অনুপ, তোর হয়েছেটা কী? ইশকুল শেষ হয়েছে কতোক্ষণ হয়ে গেল, তুই এখনও বাড়ি ফিরলি না। আমি চিন্তায় অস্থির হয়ে গেছি, ক্লাস থেকে বেরিয়ে মোবাইলটা পর্যন্ত চালাসনি? ফোন করলে বলছে সুইচ অফ...”
অনুপ বলল, “এ হে, বিধানদার বাড়ি গেছিলাম, মা, আর ফেরার পথে পুচির সঙ্গে দেখা হয়ে গেল... ফোন নিয়ে তো স্কুলে যাইনি। বাড়িতেই রয়েছে। অফ করে রেখে গেছি...”
অনুপ মা’র সঙ্গে চলে গেল। পুচিকে মাসিমা ডাকল না, ফলে পরের প্ল্যানটা করাই হলো না।

১৯
রাত্তিরে ঘুম আসছিল না পুচির। সন্ধে থেকে অনেকবার ভেবেছিল বাবাকে জিজ্ঞে করেই ফেলবে। কিন্তু বাবা কোনও কথা না বলে খাওয়া শেষ করে, “আমি শুতে চললাম রে, পুচি,” বলে রোজের মতো চলে গেল। পুচিও নিজের খাওয়া শেষ করে দালানের আলো নেভাতে গিয়ে একবার বাবার ঘরের দরজা অবধি গিয়ে বন্ধ দরজার ওপারে বাবার প্রবল নাক-ডাকার শব্দ শুনে নিয়ে দোতলায় নিজের ঘরে গেল।
কিন্তু ঘুম আসছিল না। ছটফট করে বারান্দায় গেল, তারপরে ছাদে গেল। অন্ধকার রাস্তা আর পাশের বাড়ির বাগান ছাড়া ওদের বাড়ি থেকে কিছু দেখা যায় না। নেমে এল ঘরে। ওর মোবাইল ফোন নেই। একবার ভাবল নিচে গিয়ে বাড়ির ফোন থেকে অনুপকে ফোন করে। কিন্তু সে ফোনের একটা লাইন বাবার বিছানার পাশে। একটা থেকে ফোন করতে গেলে অন্যটায় কুট-কাট, টুং-টাং শব্দ হয়।
আজই কিছু করা উচিত? যাওয়া উচিত ওদের? একবার ভাবল নিজেই চলে যাবে? কিন্তু একা একা কীই বা করবে? রাত্তির আড়াইটের সময়ে কাল অনুপ দেখেছিল লোকগুলোকে। এখন তো মাত্র এগারোটা বাইশ।
অনুপ পড়ছিল। কিন্তু পড়ায় আজও মন ছিল না। মোবাইল ফোনে অ্যালার্ম দিয়ে রেখেছে রাত একটায়। ফোন বাজবে না। ভাইব্রেট করবে বালিশের তলায়। পরীক্ষার দিন ভোরে উঠে পড়ার জন্য এইভাবে অ্যালার্ম দেয় অনুপ। কিন্তু এখন শুলে ঘুম আসবে না, জানে। তাই যতক্ষণ পারা যায় পড়া এগিয়ে রাখার জন্য বসেছিল। কিন্তু পড়া হচ্ছিল না কিছুই।
কাল পরীক্ষা আছে?” দরজার কাছে দাঁড়িয়ে বাবা জানতে চাইল। নিস্তব্ধ ঘরে হঠাৎ কথা শুনে অনুপ চমকে উঠল। বাবা বলল, “কী হলো? চমকে গেলি কেন?”
অনুপ প্রথম প্রশ্নের উত্তর দিল। “না, এখন পরীক্ষা-টরিক্ষা নেই।”
তাহলে মিছিমিছি রাত জাগছিস কেন? শুয়ে পড়।”
বাবা ওকে রাতজাগা, শোয়া – এ সব নিয়ে কখনও কোনও জ্ঞান দেয় না। আজ হঠাৎ? সব হিসেব গুলিয়ে যাচ্ছে অনুপের।
বাবা শুতে গেল কি? অনুপ ঘরের আলো নিভিয়ে দিয়ে বাইরে এল ফ্রিজ থেকে জল খেতে। মা-বাবার ঘরের আলো নেভা। কিন্তু বাবা কি শুয়েছে? অনুপ আর না ভেবে নিজের ঘরে এসে শুল। খানিকক্ষণ উসখুস করে ঘুমও এসে গেল।
পুচিও খানিক এপাশ ওপাশ করে ঘুমিয়ে পড়েছে।
রাত একটার সময় বালিশের নিচে মোবাইলের ঘোঁ-ঘোঁ কাঁপুনিতে ঘুম ভাঙল অনুপের। চারিদিক অন্ধকার। অনুপ নিঃশব্দে বিছানা ছেড়ে উঠে জানলার কাছে গেল। পুচিদের বাড়ির বাগানের যতটুকু দেখা যাচ্ছে, সেখানে কিছুই হচ্ছে না। ছাদে গেলে আর একটু ভালো দেখা যেতে পারে।
অনুপ পায়ে পায়ে দেওয়াল ধরে ছাদের সিঁড়ি দিয়ে উঠল। কিন্তু এ কী! ছাদের দরজা খোলা! রোজ রাতে বাবা সিঁড়ি দিয়ে উঠে ছাদের দরজা বন্ধ আছে দেখে তবে শুতে যায়। আজও গেছে। অনুপ জানে। শব্দ পেয়েছে। ছাদ থেকে নেমে আসার শব্দও পেয়েছে।
দরজাটা হাট করে খোলা নয়। দুটো পাল্লাই ভেজানো। কিন্তু পাল্লাদুটো বাইরের দিকে খুলে যায় বলে বাইরে থেকে একটা থান ইঁট রেখে বন্ধ রাখা হয়। সেই ইঁটটা রাখা একটু দূরে, তাই দরজাটা প্রায় ইঞ্চি দুয়েক ফাঁক।
সাবধানে, যাতে দরজায় ছোঁয়া না লাগে, অনুপ চোখ রাখল সেই ফাঁকে। বেশি দেখা যাচ্ছে না, কিন্তু যতটুকু দেখা যাচ্ছে তাই যথেষ্ট। জলের ট্যাঙ্ক, আর ছাদের পাঁচিলের ফাঁকে, যেখানে বাড়ির পাশের নারকেল গাছের পাতাগুলো নেমে এসেছে, সেখানে একটা ফোল্ডিং চেয়ারে বসে আছে যে মানুষটা, তাকে অন্ধকারে দেখা না গেলেও অনুপ তাকে বিলক্ষণ চেনে।
বাবা।
সাবধানে আবার ঘরে ফিরল অনুপ। কী হচ্ছেটা কী? বাবা কেন রাত জেগে পুচিদের বাড়ির দিকে তাকিয়ে বসে আছে? সব গুলিয়ে গেছে। বাবা যদি নেমে আসে, ওর ঘরের পাশ দিয়েই যাবে। তাই বসে না থেকে বিছানায় শুল। কিন্তু ঘুম এল না বাকি রাত।
পুচির অবশ্য রাতে ঘুম ভা না। ভা অনেক ভোরে। ঘুম থেকে উঠেই মনে হলো, রাতে... ও বাড়িতে...
বাইরে আকাশ ফর্সা হয়েছে। ঘড়িতে এখনও পাঁচটা বাজেনি। পুচি তড়াক করে বিছানা ছেড়ে লাফিয়ে উঠে বেরিয়ে এল। ছাদে গিয়ে দেখতে হবে, যদিও কিছুই দেখা যায় না...
পুচি ঘর থেকে বেরোন মাত্র নিচে টেলিফোন বাজতে শুরু করেছে, এক লহমার জন্য থমকে পুচি ঠিক করল, ছাদে না গিয়ে ফোনটাই ধরা উচিত। তরতরিয়ে নেমে বসার ঘরের দরজা খুলে ঘরে ঢুকে দু লাফে টেলিফোন তুলল।
হ্যালো?”
ঠিক তখনই বাবার গলা এল টেলিফোনের লাইন বেয়ে, “হ্যালো...” বাবাও প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ফোন তুলেছে।
ওদিক থেকে যে ফোন করেছে, সে এতই উত্তেজিত, যে পুচির বাবাও যে ফোনে কথা বলেছে, সেটা শুনতেই পেল না। “পুচি, শিগগির, এক্ষুনি আমাদের বাড়ি আয়। ছাদ থেকে দেখবি তোদের বাড়িতে কী হচ্ছে।”
পুচি ফোন নামিয়ে বাইরের দরজা খুলে ছুটে বেরোল। নাইটি পরেই। খালি পায়েই। পেছনে পেছনে হলধর, “পুচি, পুচি রে, যাসনি...” বলে তাড়াহুড়ো করে এসে পৌঁছতে পৌঁছতে পুচি বাগানের গেট খুলে বেরিয়ে গেছে।
বাড়ির বাইরে অনুপ দাঁড়িয়ে। বলল, “আয়।” পুচি বলল, “ছাদে কেন? রাস্তা দিয়ে গেলেই তো হয়।”
মাথা নাড়ল অনুপ। “না, পুলিশ আছে। বন্দুক নিয়ে – গুলি গোলা চলতে পারে। আয় শিগগির...”
অনুপের কথা শেষ না হতেই পুচির পেছন থেকে সাইরেন বাজিয়ে প্যাঁ-পোঁ-প্যাঁ-পোঁ করে একটা পুলিশের জীপ দুদ্দাড়িয়ে পেরিয়ে গেল। ভর্তি পুলিশ জনা চারেক বন্দুকধারী তো বাইরে ঝুলছে।
কথা না বাড়িয়ে বাইরের দরজা বন্ধ করে অনুপের পেছন পেছন ছাদে উঠে গেল পুচি।
অনুপের ছাদে অনঙ্গকাকু আর অপর্ণামাসি দুজনেই দাঁড়িয়ে। কাকু একবার ঘাড় ঘুরিয়ে পুচিকে দেখে আবার মন দিল পুচিদের বাড়ির দিকে।
বাড়ির সামনে একটা লরি দাঁড়িয়ে কেন? লরিটার চারদিকে পুলিশ। ড্রাইভার আর খালাসিকে নামিয়ে ওরা হাতে হাতকড়া পরাচ্ছে।
অনুপ ফিসফিস করে বলল, “নিবারণ আজ অন্ধকার থাকতে ট্রাক নিয়ে এসেছে – বাড়ি খালি করে মাল তুলতে। পুলিশ তৈরি ছিল। দেখ।”
বাগান ভর্তি পুলিশ। সকলের হাতেই বন্দুক। বাগানে পাঁচটা লোক মাথার ওপরে হাত তুলে দাঁড়িয়ে। আর দুটো মস্তো সিন্দুকের মতো ট্রাঙ্ক, বা বাক্স মাটিতে রাখা।
ওদের চোখের সামনে বাড়ি থেকে ধাক্কা দিতে দিতে পুলিশ বের করে আনল নিবারণকে। নিবারণ হাতজোড় করে হাউমাউ করে কী বলছে। এবারে বাড়ি থেকে বেরোল যে, তাকে দেখে ওদের চক্ষু চড়কগাছ। কালো, নোংরা, ছেঁড়া প্যান্ট পরা, একমুখ ধুলোমাখা দাড়ি, একমাথা ঝাঁকড়া চুল – পুলিশগুলো লাইন করে দাঁড়িয়ে স্যালুট করল!
অবাক হয়ে পুচি বলল, “পাগলাটাকে স্যালুট করছে!”
অনঙ্গকাকু বললেন, “কে পাগল? ও সাব-ইনস্পেক্টর ধীরেশ গাঙ্গুলি। খুব ট্যালেন্টেড অফিসার। ভালো নাটক করে। এবারে প্রোমোশন বাঁধা।”
এবারে হইচই শোনা যাচ্ছে। এবাড়ি ওবাড়ির লোকজনও বেরিয়েছে, বা জানলা থেকে উঁকিঝুঁকি মারছে। মঞ্জুদি আর শুভ্রদা। রিমির মা। আরও কেউ কেউ। শুধু চক্কোত্তিদের বাড়ির সব জানলা দরজা বন্ধ। কেউ নেই বোধহয়।
নিবারণের পেছন থেকে পাগলবেশী ইনস্পেক্টর পিঠে বিরাশি সিক্কার একটা চাপড় মেরে বললেন, “চলো হে, এতক্ষণে পুলিশ তোমার বস্‌দেরও নিয়ে থানায় পৌঁছে গেছে। আমি চান-টান করে, -সব রং-টং তুলে আসছি একখানা চ্যালাকাঠ নিয়ে। তখন কথা হবে, কেমন?”

২০
দিন কয়েক পরে, অনুপের বাড়িতে পুচির নেমন্তন্ন। অনঙ্গকাকু জোর করে বাবাকেও ধরে এনেছে। অপর্ণামাসি রান্না করে খুব ভালো, কিন্তু বাবার তো খাওয়াদাওয়ার অনেক বাছ-বিচার, অনেক বারণ।
আপনি ভাববেন না,” বাবাকে বলেছিল অনঙ্গকাকু। “অপর্ণা আপনার খাওয়াদাওয়ার কথা জানে। পুচি বলে দিয়েছে।
খেতে বসে আর তর সইল না পুচির। “কাকু, তুমি এখনও পুলিশে কাজ কর?”
হা হা করে হেসে মাথা নাড়ল অনঙ্গকাকু। বলল, “না রে। কিন্তু পুলিশে আমার বন্ধুবান্ধবরা এখনও আছে। বছরখানেক আগে ওরা আমাকে আবার যোগাযোগ করেছিল। ওদের খবর ছিল, সামন্তরা আবার ওই বাড়িতে ঢোকার চেষ্টা করবে।”
অনুপ বলল, “আমি যদ্দূর বুঝেছি, সামন্তদের প্ল্যান ছিল এই, যে নিজেদের বাড়ির দু-দিকের বাড়ি আর পুচিদের বাড়িটা ওরা দখল করে পুচিদের বাড়ি দিয়ে বের করবে। কী ছিল ওই বাক্সগুলোতে?”
অনঙ্গকাকু বলল, “সোনা। সত্যিই বাড়ির দেওয়ালে সোনা ছিল। সেগুলো দেওয়াল ভেঙে বের করার জন্যই দু-দিকের বাড়ি দখল করেছিল। যাতে শব্দ হলে শোনা না যায়। রাত্তিরে পুচিদের বাড়ির দেওয়াল পার করে ওরা সামন্তদের বাড়িতে ঢুকত। পুলিশ এখনও ওদের বাড়িতে ঢোকেনি। আদালতের অনুমতি লাগবে। সিল করা বাড়িতে গুণ্ডা বদমাশরা বিনা অনুমতিতে ঢুকতে পারে, পুলিশ পারে না...”
অবাক হয়ে পুচি বলল, “আমি যে দেখলাম, সেদিন...”
ঠোঁটে আঙুল দিয়ে পুচিকে থামিয়ে কাকু বলল, “চুপ চুপ, বলতে নেই। সে যাই হোক, দেওয়াল বোধহয় হাতুড়ি দিয়ে ভাঙতে হয়নি। জায়গামত ঠুকতেই সরানো গেছে, আর ঠিকঠাক ইঁট সরিয়ে সোনা বের করে এনেছে ওরা।”
আর নিবারণকাকু কী করছিল?”
ও ওদের নতুন রিক্রুট। ও সত্যিই আর্টিস্ট, তবে ছবি আঁকা, বিক্রি করা ছিল ওর ভেক। বেশ কিছুদিন হলো সামন্তদের নানা কুকর্মের সঙ্গী ছিল। এ দেশেও, থাইল্যান্ডেও। এখানে ওর কাজ ছিল পুচিদের বাড়িটা ভাড়া করা, আর কাজটা তদারক করা।”
এখন জেল খাটবে,” বলল অপর্ণামাসি।
পুচি বলল, “ওই সাব-ইনস্পেক্টর, যে পাগল সেজে ছিল…”
অনঙ্গকাকু বলল, “ধীরেশ?”
হ্যাঁ, হ্যাঁ। ওকে তো নিবারণকাকু সেই চ্যালাকাঠ দিয়ে খুব মেরেছিল।”
অনঙ্গকাকু বলল, “ধীরেশ বলেছিল, ওটাই ওর সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং মোমেন্ট ছিল। ধীরেশ খালি হাতে লড়তে জানে। কারাটে। ও অনায়াসে নিবারণকে সামলাতে পারত। কিন্তু সেটা করলে নিবারণ বুঝে যেত। ভাগ্যিস মাথায় বা বুকে মারেনি। তাহলে তো ধীরেশকে আত্মরক্ষা করতেই হত। পেছনে মেরেছে বলে কিছু বলেনি। মার খেয়ে পালিয়েছে। তোমরাই তো সেদিন বাঁচিয়েছিলে। তুমি আর মঞ্জু...”
আর চক্কোত্তিমাসিমা,” বলল পুচি। বলেই কী মনে হলো, বাবাকে বলল, “নিবারণের বুড়ো কাকা-কাকী একটা ভাঙা বাড়িতে...”
হলধর বললেন, “ওই পঞ্চানন গড়াই? ওর আবার কী হলো?”
পুচি বলল, “না, মানে ওই বুড়ো-বুড়ি একা...”
কথাটা আর এগোলো না। অনুপ বলল, “সংগ্রাম আর ছিদাম চক্রবর্তীর ব্যাপার কী ছিল?”
অনঙ্গকাকু বলল, “সংগ্রামের সঙ্গে সামন্তদের আর কোনও সংশ্রব নেই। ও যখন থেকে তেলেভাজার দোকান দিয়েছে, তখন থেকেই ওদের সঙ্গে আর কোনও লেনাদেনা রাখেনি। কিন্তু শ্রীদামকে আমি ধরেছিলাম। আমি যখন সামন্তদের বাড়িতে প্রথম রেড করি, ওকে তখন রা বাইরে পাঠিয়েছিল কোনও কাজে। আমি গিয়ে ওখান থেকে ওকে তুলে আনি। ও যখন বোঝে যে সামন্তদের আর রক্ষে নেই, রাজি হয়ে যায়। ও এখন পুলিশের ইনফরমার। আর এই মামলা যখন কোর্টে উঠবে, তখন রাজসাক্ষী হবে। ওর কাজ ছিল পুলিশের হয়ে বাড়িটার দিকে নজর রাখা।”
সামন্তর ছেলে কেন ছিদাম চক্কোত্তির বাড়ির পেছনে ঘুরঘুর করছিল?” অনুপের প্রশ্নে অবাক হয়ে অনঙ্গ বললেন, “তুই কী করে জানলি?”
অনুপ একটু হেসে বলল, “আমিও তো পুলিশের ছেলে, না কী?”
হা হা করে আবার হাসল অনঙ্গকাকু। বলল, “সেটার সঙ্গে ছিদাম চক্কোত্তির কোনও যোগ আছে বলে মনে হয় না। ও সরেজমিনে তদন্ত করতে এসেছিল – যাকে বলে পাড়াটা রিকনয়টার করা। বোকামি আর কী।”
আর আমার বাবা?” জানতে চাইল পুচি।
আমি আবার কী?” অবাক হলধর জিজ্ঞেস করলেন।
ছিদাম চক্কোত্তিও তোমার কাছে আসে, অনঙ্গকাকুও...”
অনঙ্গকাকু আবার হেসে উঠল। বলল, “সে তোর বাবার মাথাটা পাকা বলে। আর ওই বাড়িটা তো হলধরদার, না কি?”
ঠিক।
কতোটা সোনা পাওয়া গেল? ক’ ভরি?” জানতে চাইল অপর্ণামাসি।
ভরি?” চোখ কপালে তুলল অনঙ্গকাকু। “কেজিতে মাপতে হবে। সে সবই অবশ্য এখন আদালতের জিম্মায়।”
পুচি বলল, “তাহলে নিবারণের ছবিতে কে কালি ছিটিয়েছিল? আজেবাজে লিখেছিল? সেটা তো বোঝা গেল না।”
এবার একটু ভাবতে হলো কাকুকে। বলল, “সেটা এখনও জানা হয়নি। তবে আমার ধারণা নিবারণই ওটা করেছে, বা ওর দলবল। এমনিতে প্রতিবেশীরা ওর বাড়িতে আসে-টাসেনি। কেউ আসলে ও ওই ছবিগুলো দেখিয়ে ভূতের কথা বলে ভয় দেখাত হয়ত। তবে এটা আমার ধারণা।”
সব ভালো যার শেষ ভালো,” বললেন হলধর। “রাত হলো। চ’ পুচি, বাড়ি চ’।”
ফিরতে ফিরতে পুচি বলল, “শেষ আর ভালো কী হলো? বাড়িটার ভূতুড়ে অপবাদ তো ঘুচলই না, বরং এখন লোকে ডাকাতের আখড়া বলতেও ছাড়বে না। হানাবাড়ি হয়ে যাবে শেষে।

হোকগে...” বলল বাবা। “অনেক আছে আমাদের। বেশি লোভ করতে নেই।”