ভাসুপেত্নির মনটা আজ বড়োই খারাপ। ওর শেষ বন্ধুও আজ চলে গেল পাড়াছাড়া হয়ে। খালপাড়ের এই বিরাট শ্যাওড়া গাছে আজ আবার ও একা। আগেও একা-ই ছিল, কিন্তু বন্ধুরা থাকত আশেপাশের গাছেই। আজ আর কেউ নেই। খালের জলের ওপর ঝুঁকে পড়া ডালটায় বসে পা দোলাতে দোলাতে ভাসুপেত্নি চুপচাপ ভাবছিল সেই দিনগুলোর কথা, যখন এই পুরো তল্লাটটাই ছিল ভূতেদের দখলে। আজ তারা কোথাও কেউ নেই।
পরাণখালী থেকে নিবিন্ধির ঢালাই ব্রিজ যেতে মাঝামাঝি কোথাও হাঁসুডাঙা। বছর পঞ্চাশেক আগেও এই সব জায়গাগুলো ছিল অজ পাড়াগাঁ। দিনের বেলাতেও জনমানুষ দেখা যেত না। সন্ধের পরে তো ঘুটঘুটে অন্ধকার। তখন পরাণখালী থেকে নিবিন্ধি আসার উপায় ছিল কেবল নৌকো। রাস্তা ছিল না।
কিন্তু সে ছিল পঞ্চাশ বছর আগেকার কথা। এই কটা বছরে বদলে গেছে সবকিছু। সবার আগে এল নিবিন্ধির ঢালাই ব্রিজ। শহর থেকে দূরে উতকোশ যাবার নতুন উপায়। উতকোশ আরও দূরের শহর। সেখানে কলকারখানা তৈরি হবে, তাই সহজে যাতায়াত করার উপায় বের করল মানুষ। নতুন রাস্তা হলো। যেমনি হলো রাস্তা, তেমনি রাস্তার ধারে তৈরি শুরু হলো বাড়ি ঘর। পরাণখালি, নিবিন্ধি, সব এখন শহর। কে বলবে, আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগে এখানে ছিল কেবল জলাজমি আর একটা খাল?
শুধু রাস্তা যখন ছিল, তখনও অতটা জ্বালাতন হয়নি। জঙ্গলের ভেতর দিয়ে রাস্তা, চারিদিকে অজস্র গাছ, ভাসু আর ওর দলবল মিলে তখনও ভালোই ছিল ওখানে। জ্বালাতন শুরু হলো বছর তিরিশেক আগে থেকে, যখন শুরু হলো বাড়ি বানানো। এখন আর অন্ধকার বাকি নেই। ভাসু-র বন্ধুরা সবাই দূরে দূরে চলে গেছে।
ভাসু যেতে পারেনি। খালপাড়ের ঝাঁকড়া-চুলো বিশাল শ্যাওড়া গাছটা — যেটায় ওর বাসা প্রায় নব্বই বছর হয়ে গেল, আজও দাঁড়িয়ে আছে। শুধু এখন ওটা একা। এককালে ছিল খালপাড়ের জঙ্গলের গাছ, কিছুদিন পরে যখন জঙ্গল কেটে বসতি হলো, পরাণখালি আর নিবিন্ধি শহর হয়ে উঠল, তখনও হাঁসুডাঙায় শহর আসেনি। কেবল দূরের শহরের বড়োলোকরা বাগানবাড়ি বানিয়েছিল অনেক। তখন বহু গাছ কাটা পড়লেও ভাসু-র গাছটা কেন জানি রয়ে গেছিল। একটা বড়োলোকের বাগানবাড়ির বাগানের শেষটা ছিল খালেরই পাশে। আশেপাশের সব গাছ লাগল নতুন করে। বাগানের ধার ঘেঁষে শিশু, কৃষ্ণচূড়া, রাধাচূড়া, নিম, জাম, আমের গাছ, সারি দিয়ে নারকেল, আর বাগানের মধ্যে কিছু ফুল, কিছু ফলের গাছ — কটা গুলঞ্চ, কটা সবেদা, জারুল, ফুরুস... ন্যাকা ন্যাকা গাছ। পাতলা ডাল, পাতার আব্রু নেই।
তবু ভাসু আর ওর বন্ধুদের অভাব ছিল না। আরামেই ছিল। কিন্তু দেখতে দেখতে বাগানবাড়িগুলোও পুরোনো হয়ে গেল। উঁচু উঁচু ফ্ল্যাটবাড়িগুলো সব একে একে খেয়ে নিল ওদের। একে একে কাটা পড়ল সব বাগানের গাছগুলো। আজ আর গাছ কারও প্রয়োজনে লাগে না। হঠাৎ একদিন একদল লোক আসে, তারা দুটো দলে ভাগ হয়ে গিয়ে শুরু করে গাছ কাটা, আর বাড়ি ভাঙা।
কয়েক দিন ভাসু খুব ভয়ে ভয়ে ছিল। আমগাছের নিমি, জামগাছের কেনু, শিশুগাছের দিন্দা — সকলেই একে একে ঘরছাড়া হলো। কিছুদিন ওরা ভাসু-র গাছে এসে রইল। তারপরে দিন্দা প্রথম বলল, “অনেক হয়েছে। আমি আরও দূরে কোথাও চলে যাব।”
ভাসু বলল, “কেন যাবি? এত্তবড়ো গাছ — এত ডালপালা, আরামে সবাই থাকতে পারব।
দিন্দা বলেছিল, “শোন ভাসু, তোর মুখে এ কথা মানায় না। তুই খানদানী পেত্নি। আমরা সবাই খানদানী ভূত, পেত্নি বা শাঁকচুন্নি। আমরা কোনও দিন গাছ ভাগ করেছি?”
কথাটা ঠিক। ভাসু তো প্রথম থেকেই একটা-গাছ-একটা-ভূত পদ্ধতিতে বাসা বানানোয় বিশ্বাসী। কিন্তু করে কী? গাছ যদি একটাও বাকি না থাকে...
কেনু বলেছিল, “তুই এখানে একা থাকবি কেন? তোর তো উপায় আছে...”
উপায়টা ভাসু জানে। সেই নব্বই বছর ধরে ওরা খুব চেষ্টা করছে ওর সঙ্গে দিগনগরের বেলগাছের বেম্মোদত্তির সঙ্গে ওকে এক করার। ভেটকু বেম্মো ওর নাম। তারও খুব ইচ্ছে ভাসুকে বিয়ে করার। ভাসু প্রথম থেকেই আপত্তি করেছিল। ভেটকুকে ওর মোটেই পছন্দ নয়। তার হাবভাব, চালচলন, কথাবার্তা — সবই কেমন গাঁইয়া ধরণের। কোথাকার মানুষ ছিল, কে জানে? ব্রহ্মদৈত্য হলেই কি আর খানদানী হয়? ভাসু বড়ো বংশের পেত্নি। জীবদ্দশায় খানদানী ব্রাহ্মণী ছিল। সেইজন্যই সবাই ভাবে ও ব্রহ্মদৈত্যর সঙ্গিনী হবে।
ঘণ্টা হবে। কচু হবে। বিশেষ করে সে বেম্মোদত্তি যদি ভেটকু হয়, তবে সে গুড়ে বালি। তাই কেনুর কথায় ঝাঁঝিয়ে উঠে ভাসু বলেছিল, “তোর পছন্দ হয়, তুই গে থাক ওর সঙ্গে বেলগাছে।”
কেনুপেত্নি ভাসু-র কথায় মনমরা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেছিল, “ও যদি আমাকে থাকতে দিত, আমি কবেই যেতাম। কিন্তু আমি এসে থেকে দেখছি, ও তোর দিকেই কেবল তাকায়, আর কারওর দিকে নজরই নেই।”
কথাটা ঠিক। ভাসু তাই উত্তর না দিয়ে খালের দিকে তাকিয়ে ছিল।
মুখে যা-ই বলুক না কেন, সবাই চলে গেলে পরে সত্যিই বড্ডো খালি খালি লাগছিল ভাসু-র। আগে হলে গাছের মগডালে চড়ে চিল চিৎকার করত, আশেপাশের লোকে শুনতে পেয়ে ভয় পেত। বলত, “পেত্নির কান্না,” বলে তল্লাট ছেড়ে চলে যেত। এইখানে যে বাগানবাড়ি ছিল, সেখানে কাজের লোক টিঁকত না, ভয়ে। বাইরের কেউ থাকতে এলে ভাসু তেরাত্তির থাকতে দিত। তারপরে এমন চিৎকার জুড়ত, যে কেউ থাকতই না। পরের দিকে তো কেউ আসতই না। অবশ্য সেটাই কাল হলো — বাড়িওয়ালা বাড়িটা দিল বিক্রি করে।
এখন সেসবে লাভ হয় না। এই সেদিন দিন্দার বাগানে যখন সব গাছ কেটে নতুন বাড়ি হলো, ওরা অপেক্ষা করে ছিল। রাত যখন অনেক, লোকজন যারা এসেছে, তারা আলো-টালো নিভিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে, তখন তিনজনে গিয়ে বসেছিল তেরো তলায় একটা জানলার কার্নিসে। তারস্বরে গলা মেলে চেঁচামেচি জুড়েছিল, যাতে লোকজন ভয় পায়। তাহলে চলে যাবে।
ও মা! কী আশ্চর্য! কেউ এতটুকু ভয় তো পেলই না, বরং কেউ কেউ বাইরে বেরিয়ে এসে জোরালো টর্চের আলো জ্বেলে প্যাঁচা খুঁজতে লাগল! অদ্ভুত মানুষ আজকাল। তারা না জানে ভূত, না জানে প্যাঁচা। নইলে ভূতের চিৎকারকে কখনও প্যাঁচা বলে ভুল করে কেউ? ভয় তো কেউ পেলই না, মাঝ থেকে চোখে আলো লেগে দিন্দা প্রায় কার্নিস থেকে পড়ে যায় আর কী!
রাত বাড়লে চুপি চুপি গাছের মগডালে উঠল ভাসু। কিন্তু শান্তি নেই। খালের দিকে তাকালেও পেছনে নতুন গড়ে ওঠা বহুতলের চারিদিকের বাগানে আলোর রোশনাইয়ের আভা এসে লাগে চোখে। সত্যি বলতে কী, একেবারে নিচের ডালগুলো ছাড়া আর কোথাও বসারই জো নেই। বাধ্য হয়ে জলের ধারে নেমে এসে খালপাড়েই ঝোপঝাড়ে বসে বসে রাত কাবার করল ভাসু।
তিন চার দিনের মধ্যে সেটুকুও মুছে গেল জীবন থেকে। শুরু থেকেই বজ্জাত মানুষগুলো ভেবে রেখেছিল, তাই খালের দিকে ওদের দেওয়ালে গেট বানিয়ে রেখেছিল। তারপরে শুরু হলো খালপাড় সাফ করা! পরিষ্কার করে, সেখানে আলো লাগিয়ে মানুষরা সন্ধের পর থেকে সতরঞ্চি পেতে গানের আসর বসাল! তবে আসর জমল না বেশিদিন — বোকা মানুষগুলো যেমন ভূত আর প্যাঁচার কথা জানে না, খালপাড়ে বসলে যে মশায় ছিঁড়ে খাবে, তা-ও জানত না। ফলে আড্ডা-গান বন্ধ হয়ে গেল কিছুদিনের মধ্যেই, কিন্তু আলোগুলো গেল না। দিনে রাতে শান্তিতে কিছু করা দায় হয়ে উঠল ভাসুপেত্নির।
দু-সপ্তাহের মাথায় হাজির হলো ভেটকু। তখন সবে সন্ধে হয়েছে, শ্যাওড়া গাছের মাঝের মোটা ডালে ঘুম ভেঙে উঠে ভাসুপেত্নি চোখ থেকে পিচুটি খুঁটে নখের ডগায় এনে, বুড়ো আঙুলে লাগিয়ে চট করে আঙুল সোজা করে জলে ফেলছিল, আর দেখছিল কতদূরে ফেলতে পারে। এমন সময় সামনে এসে দাঁড়াল ভেটকু বেম্মোদত্তি।
ভেটকুর নামটা অমন আর হাবেভাবে গাঁইয়া হলে কী হবে, চেহারাটা খোলতাই। তিনতলা বাড়ির সমান লম্বা, ভাসু-র শ্যাওড়া গাছটা অত লম্বা হলে কী হবে, ওর সামনে দাঁড়ালে ভেটকুর মাথা ছাড়িয়ে যায় গাছের ওপরে। তাই খালের জলে নেমেই দাঁড়িয়েছে, এখন ওর মাথাটা ভাসু-র সামনেই।
আর তখনই ভাসু টুসকি দিয়ে একটুকরো পিচুটে ফেলেছে জলে।
পিচুটিটা গিয়ে ভেটকুর বাঁ চোখের নিচে আটকে গেল। ভাসু লজ্জা পেয়ে কিছু বলতে যাবে, ভেটকু বলল, “ও মা! পিচুটিগুলা ফালাই দিচ্ছ কেনে? এমন নষ্ট করার কুনো মানে আছে?”
ভাসু অবাক হয়ে বলল, “পিচুটি নষ্ট মানে?”
ভেটকুও ততোধিক অবাক হয়ে বলল, “সে কী! তুমি পিচুটি খাও না?”
ঘেন্নায় ভাসু-র শরীর রী-রী করে উঠল। বলল, “ছ্যা, পিচুটি আবার খায় নাকি?”
একগাল হেসে ভেটকু বলল, “খায় না আবার! আমি তো আগেও খেতাম — যখন পেরানডা ছেল।” বলে আঙুল দিয়ে নিজের গাল থেকে ভাসু-র পিচুটি ছাড়িয়ে নিয়ে মুখে পুরে দিল। বলল, “উম্ম্, বড়ো সোয়াদ!”
ভাসু-র সর্বাঙ্গ গুলিয়ে উঠল। ভাগ্যিস নাড়িভুঁড়ি নেই — নইলে নিগঘাত বমি হয়ে যেত। একে বিয়ে করে সংসার করতে পারবে না ভাসু। গলাটা শক্ত করে বলল, “এখানে কী মনে করে?”
ভেটকু হেঁ-হেঁ করে বলল, “এ জায়গাটা আর ভালো নেইকো।”
ভাসু বলল, “তাতে তোমার কী? তোমাকে তো আর এখানে থাকতে নেমন্তন্ন করছি না।”
ভেটকু সুযোগ পেয়ে বলল, “তাই তো আমি এয়েছি। তোমারে বলতে...”
“কী?”
ভেটকু মিনমিন করে বলল, “মানে আমার ওদিকে বেলগাছখান মস্তো, আর বেশ সরেস। দুজনে বেশ হেসেখেলে থাকা যাবে।”
ভাসু তেড়ে উঠে যেই না বলেছে, “আমার বয়ে গেছে তোমার সঙ্গে...” ওমনি ধ্বক করে জ্বলে উঠেছে খালপাড়ে লাগানো মানুষের আলো। ভাসু-র পিঠ ছিল আলোর দিকে, কিন্তু আলো এসে পড়েছে ভেটকুর চোখে! আর্তনাদ করে চোখ ঢেকে ভেটকু কেঁদে উঠেছে, “লাগে, লাগে, চোখে লাগে...” দু হাত দিয়ে চোখ ঢেকে কোনও রকমে পালাতে পালাতে বলে গেল, “এরকম ভয়ঙ্কর জায়গায় থাকে না, মা গো! পালিয়ে এইসো। আমার গাছেতে এইসো। আরামে থাকবে — ওখানে এখনও গেরাম...”
কথাটা ঠিক। ভেটকু চলে যাবার পরে ভাসু খানিকক্ষণ বসে বসে পা দোলাতে দোলাতে ভাবছিল। একে তো এই একা একা থাকা। তায় আবার দিন রাত আলো। তবুও যদি গ্রামের দিকে চলে যেতে পারে...
কিন্তু তাহলে তো খালপাড়টা ছাড়তে হবে। ভাসু যে মাছ বড়ো ভালোবাসে! খেতে পারে না, কিন্তু মাছের গন্ধটা ওর বড্ডো প্রিয়। আর হতভাগা ব্রেম্মোদত্তিটার প্রিয় কেবল বেল আর শসা। আর একলা? ওখানে গেলে সঙ্গী বলতে তো হবে সেই ভেটকুই। রোজ সকালে যদি ভাসু-র চোখ থেকে... ইশ, মা গো!
ভাবনাটাই সহ্য করতে না পেরে ভাসু বেরিয়ে পড়ল ঘর থেকে। একবার গিয়ে দেখে আসবে, দিন্দা আর কেনু কেমন আছে। সেই সঙ্গে জেনে নেবে উন্তির কথাও। উন্তি অনেক দিন আগেই ওদের দল ছেড়ে চলে গেছিল। ওদিকের কোন গ্রামে কোন ভূতের সঙ্গে সংসার পাতবে বলে।
অনেকটা চলতে হলো। জঙ্গল ছিল এই জায়গাটা — এখন আর নেই। গাছপালা প্রায় নেই বললেই চলে। আর এখানে ওখানে যে কটা বাকি, তাতেও ভূতেদের দঙ্গল। একটা জায়গায় দেখে পঞ্চবটিতেও ভূতদের আখড়া। পঞ্চবটিতে ভূত! এত দিন তো বট, অশ্বত্থ, আমলকি আর অশোকের ধার মাড়াত না ভূতেরা। বেল গাছে থাকত কেবল ব্রহ্মদৈত্য। ওর মনে আছে নাককাটা কবন্ধকে কে যেন বলেছিল নিমগাছে থাকবি? তাতে বাকি সবাই তাকে এই মারে কী সেই মারে! আর আজ... চোখে জল এল ভাসু-র — ভূতেদের দুরবস্থা দেখে।
মাঝরাত পেরিয়ে দেখা পেল কেনুর। কেনু নিয়ে গেল দিন্দার কাছে। সে থাকে আরও একটু দূরে। ওরা ভাসুকে দেখে আনন্দে আত্মহারা। বলে এখানেই থেকে যা। আমার গাছে এখনও দুটো ডাল খালি আছে, ও বলে, আরে আমাদের ওখানে তো তিনটে জারুল গাছে কেউ থাকেই না।
ভাসু কিছু বলল না। জারুল গাছে ভূত থাকে? একটা গাছে একজনের বেশি থাকে? ওরা মানুষের মতো হয়ে গেছে। ফ্ল্যাটবাড়িতে না থেকে গাছে গাছে ফ্ল্যাট বানিয়েছে যেন।
ওদের কথায় ভাসু-র মন নেই। ভাবছে, সময় কাটাতে চলে এলাম এত দূর। আবার ফিরে গিয়ে কাল রাতে কী করব? ভূত-জীবনে বড়ো জ্বালা। কিছুই করার থাকে না, সময় কাটে না। মনুষ্য-জীবনে কত কাজ থাকত, ভূত হয়ে কিছুই করার নেই। না আছে রান্না-খাওয়ার পাট, না আছে ছেলে-পিলে, না আছে সংসার...
মনে পড়ল উন্তির কথা। জানতে চাইল, “উন্তির কোনও খবর পাস? কেমন আছে-টাছে?”
ওরা কেমন গম্ভীর হয়ে গেল। বলল, “আছে ভালো। বিয়ে করেছে জানিস তো?”
জানে বইকি। কিন্তু আর কিছুই যে জানে না। কাকে বিয়ে করেছে, কোথায় থাকে...
নাকটা একটু বেঁকিয়ে দিন্দা বলল, “ওই পথে আরও পোয়াটাক যা, বাঁশবনের মাঝে থাকে।”
কেনু ঝাঁঝিয়ে উঠে বলল, “কেন, যাবে কেন? কোনও দরকার নেই। যেতে হবে না।”
কেন যাবে না? উৎসুক হয়ে ভাসু তাকাল ওদের দিকে।
কেনু বলল, “উন্তি আর আমাদের মতো নেই। বেঁশোভূত বিয়ে করে ও-ও বেঁশো হয়ে গেছে।”
বেঁশোভূত কী আবার!
এবারে দিন্দা আর কেনু খুব অবাক হলো। বেঁশোভূত জানিস না, তুই কতদিন ভূত হয়ে আছিস রে?
সে আছে প্রায় একশো বছর — কিন্তু ভূত হয়ে তো বটেই, বেঁচে থাকতেও জানত না বেঁশোভূতের কথা। কী ব্যাপার?
জানা গেল বেঁশোভূত বাঁশবাগানে থাকে। ওরা নাকি বাঁশঝাড় থেকে একটা বাঁশ নুইয়ে সন্ধেবেলা রাস্তার ওপর নামিয়ে রাখে। পথ চলতি মানুষ যদি বাঁশটার নিচে দিয়ে যেতে চেষ্টা করে, তাহলে বাঁশ চাপা দিয়ে মেরে ফেলে, আর যদি টপকে যাবার চেষ্টা করে, তাহলে হঠাৎ বাঁশটা ছেড়ে দেয় — লোকটা উ-উ-উ-উ-উড়ে কোথায় গিয়ে আছড়ে পড়ে থাকে হদিশ পাওয়া যায় না।
ভাসু শুনে গম্ভীর হয়ে গেল। একটু পরে বলল, “তবে আমি এগোই।”
দিন্দা ওকে কিছুটা এগিয়ে দিল, কেনুর কী কাজ আছে বলে এল না। ভাসু কেনুকে জড়িয়ে আদর করে দিয়ে বলল, “পরে আসব।” তারপরে দিন্দাকে নিয়ে রওয়ানা দিল।
দূর থেকে বাঁশবনটা দেখিয়ে দিয়ে আর এগোল না দিন্দা। বলল, “আমি আসি রে, সকাল হচ্ছে। তোর তো দিনে আর ফেরা হবে না, রাতে ফেরার পথে আমাদের সঙ্গে আবার দেখা করে যাস।
বাঁশবনটা বিশাল। দূর থেকেই বোঝা গেছিল — কিন্তু যত কাছে আসে, তত দেখে আর হাঁ হয়ে যায়। বাড়ি থেকে তো খুব দূরে নয় — এক রাতের পথ। কই, জানত না যে এখানে এত বড়ো বাঁশবন রয়েছে একটা। অবশ্য এদিকে শেষ যখন এসেছে তখন তো সবটাই জঙ্গল ছিল। এখন সে সব সাফ হয়ে ধানক্ষেত হয়েছে। তার মধ্যে এত্তবড়ো একটা বাঁশবন...
আরও একটু কাছে আসার পরে দেখতে পেল বাঁশঝাড়ে, বাঁশের ফাঁকে ফাঁকে নড়াচড়া। ওরা আছে তাহলে — বেঁশোভূতের দল। মনে হচ্ছে কম নয়, অনেক। ভাসু যত কাছে আসে, তত তারাও আসে — পিলপিল করে। থিকথিক করতে লেগেছে।
হঠাৎ, সেই ভীড় থেকে ছুটে বেরিয়ে এল একজন, তাকে ভাসু চেনে। চিৎকার করে ডাকছে, “ভাসু, ভাসু, ভাসু...”
ভাসুও ছুটতে লেগেছে — ওর মুখেও ডাক, “উন্তি, উন্তি...”
দুজনে দুজনকে জড়িয়ে ধরে সে কী কান্না। কতদিন পরে দেখা।
উন্তি বলে, “ভাসু তুই এখানে কী করছিস? কতদিন পরে এলি? হাঁসুডাঙার খবর কী? সবাই কেমন আছে? দিন্দা? কেনু? ইতোন? চটাস... সবাই? তোর বিয়ে হয়েছে? ওই গগনপুরের বেলগাছের বেম্মোদত্তি — কী যেন নাম, ভতাং? না কি দিগনগরের ভেটকু? কাকে নিলি বর করে?”
ভাসু বলে, “আরে রোস, রোস, এত তাড়া করলে বলি কী করে? এক এক করে বলি শোন। তোর খবর বল। তুই নাকি বিয়ে করেছিস? বেঁশোভূত বিয়ে করেছিস? কী নাম রে? কোথায় থাকে? এখানে সবাই বেঁশোভূত? এত বড়ো বাঁশঝাড় কেন? কেউ কেটে ফেলেনি?”
উন্তি বলে, “উরিবাবারি! তুই তো প্রশ্নের বন্যা বইয়ে দিলি। শিগগিরি বাঁশবনে আয়। রোদ উঠবে এক্ষুনি। বাঁশঝাড়ের আঁধারে গল্প হবে। চল। সবাইকার সাথে পরিচয় করিয়ে দিই... দেখবি অনেককেই তুই চিনিস...”
কত ভূত! অবাক হয়ে গেল সবাইকে দেখে। সত্যিই অনেক দিন আগে তাদের কারও কারও সঙ্গে পরিচয়ও ছিল। সবাই বেঁশোভূতও নয়। কিন্তু এই বাঁশবনের মধ্যে আশ্রয় নিয়েছে। সবাইকে ডেকে আনল উন্তি। বলে, “এই দেখো, আমার সেই ছোটোবেলার সই – ভাসুপেত্নি – আমি বলতাম ভেসো। খুব নামী পরিবারের পেত্নি।” সবাই প্রণাম করতে চায়। ভাসু বলে, “আরে দূর, সে আম-ও নেই, সে অযোধ্যাও নেই। প্রণাম-টনাম করতে হবে না।”
জানতে চায়, “এখানে বিপদ নেই? এত বড়ো বাঁশবন কী করে না-কেটে রেখে দিল মানুষ?”
জানল, মানুষ কাটে, কিন্তু প্রয়োজনে। মানুষের তো সারাক্ষণ বাঁশের দরকার। এই পুজো হবে, প্যান্ডেলে বাঁশ লাগবে, এই বিয়েবাড়ি... প্যান্ডেল। এই বাড়ি রং হবে, ভারা বাঁধার জন্য বাঁশ। এমনকি মিছিলে, মিটিঙে, পুজোর সময় রাস্তায় বেড়া দিতেও বাঁশ লাগে। তাছাড়া কত কত বাড়িতে বাগানের বেড়ার জন্যেও বাঁশ দরকার হয়। মোদ্দা কথা, এই বাঁশবন মানুষ যত্ন করে রেখেছে, যাতে কখনওই বেশি না কাটা পড়ে — এক দিক থেকে কাটলে, অন্যদিকে বাড়তে দেয়। তাই এখানে সবাই সুখে আছে — শুধু, কখনও এই বাঁশঝাড় কখনও ওই বাঁশঝাড়ে যেতে হয়। ঘরছাড়া হবার চেয়ে সে অনেক বেশি সুখের।
ভাসু বলল, “শুনলাম তোর বর হয়েছে? কই তাকে তো দেখলাম না...?”
লজ্জা লজ্জা হেসে উন্তি বলল, “তোর সামনে আসতে লজ্জা পাচ্ছে। বেঁশোভূত তো... নিচু জাত...”
ভাসু এক চাঁটি মেরে বলল, “জাত আবার কী রে? মার খাবি। এক্ষুনি নিয়ে আয়...”
উন্তি ছুটে গিয়ে ধরে নিয়ে এল। বলল, “আরে, আয় আয়, ভেসো ডেকেছে, আমার কতদিনের বন্ধু...”
লাজুক লাজুক যে লোকটাকে হাত ধরে টেনে আনল উন্তি তার রূপ দেখে ভাসু চমকে উঠল। মানুষ... ইয়ে, ভূত এত সুন্দর হয়?
তারপরে বুঝল, এতক্ষণ যাদের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে, তারা কেউই বেঁশোভূত নয়! বেঁশোভূতরা আড়ালে ছিল, কেউ সামনে আসেনি। দেখল বেঁশোভূতেরা সকলেই খুব সুপুরুষ, পেত্নিরা সকলেই সুন্দরী। নিজের চেহারাটা নিয়ে ভাসু-র একটা গর্ব ছিল — সেটা একেবারে ধূলিসাত হয়ে গেল।
সবার সঙ্গে পরিচয় হতে হতে বেলা অনেকটাই বেড়ে গেল। উন্তি বলল, “এবারে শোবার ব্যবস্থা করি, কী বল? নইলে সন্ধেবেলা ঘুম ভাঙবে না।”
শোবার ব্যবস্থা! তাই তো! এখানে শোবে কোথায় ভাসু? চারিদিকে তো কেবল বাঁশঝাড়! চারিদিকে চেয়ে বলল, “কোথায় শোব?”
উন্তি কিন্তু কিন্তু করে বলল, “এখানেই...”
ভাসু দেখে, ভূতেরা সবাই বাঁশঝাড়ের ফাঁকে ফোকরেই শোবার জোগাড় করছে। বলল, “কিন্তু... গাছ না হলে...”
এখানে তো গাছ নেই!
ভাসু কাঁদোকাঁদো হয়ে গেল। সারা ভূত-জীবন ও গাছেই শুয়েছে। আজ কি না বাঁশবাগানে শুতে হবে?
ভাসু-র অবস্থা দেখে উন্তিরও চোখে জল এল। এদিক ওদিক চেয়ে বলল, “কী করি?”
এমন সময় ভীড় ঠেলে এগিয়ে এল যে, তার সঙ্গে ভাসু-র এখনও পরিচয় হয়নি। উন্তির সঙ্গে নিচুগলায় কী আলোচনা হলো, উন্তির মুখটা উজ্জ্বল হয়ে উঠল। বলল, “তাহলে তুই নিয়ে যা না?”
ভূতের মুখও যে লজ্জায় লাল হয়ে যায়, ভাসু এই প্রথম দেখল। শুনল, বলছে, “না না, না না। আমি না...”
উন্তি ওকে আরও দূরে টেনে নিয়ে গেল। তারপরে কী সব কথা বলে দুজনে ফিরে এল। উন্তি বলল, “ভাসু, এ হলো পটাস। আমার বন্ধু। এ-ও এখানকার পুরোনো বেঁশোভূত। ও বলছে, বাঁশবনের ওধারে একটা শ্যাওড়া গাছ আছে — সেখানে কেউ থাকে না। তুই ওর সঙ্গে যা। ওখানেই শুয়ে পড়।”
আনন্দে লাফিয়ে উঠে পটাসের সঙ্গে রওয়ানা দিল ভাসু। মস্তো বাঁশবনের ওপারে যেতে হবে। ভাসু-র খুব ইচ্ছে করছে পটাসের সঙ্গে গল্প করে, কিন্তু পটাস ওর সঙ্গে হাঁটছে না। হয় একটু এগিয়ে, নয় একটু পিছিয়ে পড়ছে। খানিকটা গিয়ে ভাসু-র কী মনে হলো, হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ে বলল, “আচ্ছা, এখানে এত ভূত, তবু শ্যাওড়া গাছে কেউ থাকে না কেন?”
পটাসও দাঁড়িয়ে পড়েছিল। মাটির দিকে চেয়েই বলল, “আসলে ওদিকে তো মানুষ বেশি, তাই বাঁশবনের ওদিকেই কেউ থাকে না। সবাই ভয় পায়।”
ভাসু বলল, “আলো বেশি থাকে রাতে?”
পটাস বলল, “ওদিকে গ্রাম, ইলেকট্রিক বাতি আছে, তবে বেশি নয়। শহরের মতো নয়।”
ভাসু বলল, “তুমি শহরের বাতি দেখেছ?”
পটাস মাথা নেড়ে বলল, “শুনেছি দিনের আলোর মতো।”
ভাসুও মাথা নাড়ল। বলল, “না। অতও না, তবে খুব জোর। আচ্ছা, আমি তোমাকে নিয়ে যাব। দেখে আসবে।”
ভয়ে মাথা নেড়ে পটাস বলল, “না না, আমি এখানেই ভালো আছি।”
ভাসু হেসে বলল, “দূর বোকা। অত খারাপ না বলছি না? আমি তো ওখানেই থাকি।”
আর কথা হলো না, বাঁশবন পেরিয়ে একটা খালি মাঠ, তার ওপারে গ্রাম। গ্রামের ধারে মস্তো শ্যাওড়া গাছটা দেখে ভাসু-র আনন্দ আর ধরে না। বলল, “আহা, এমন সুন্দর একটা গাছ কি না খালি পড়ে থাকে?”
কেউ উত্তর দিল না। ভাসু তাকিয়ে দেখে, পটাস অনেকটা দূরেই দাঁড়িয়ে দেখছে।
ভাসু ডাকল, “আর আসবে না?”
ভয়ে ভয়ে পটাস পায়ে পায়ে বেরিয়ে এল বন থেকে। দুজনে নিঃশব্দে হেঁটে গিয়ে পৌঁছল গাছটার কাছে। গ্রামটা কাছেই, কিন্তু এত দূরে যে গ্রামের বাড়ির আলো রাতে এসে গাছে পড়লেও সে রোশনাই ভাসু যেখান থেকে এসেছে, তার তুলনায় কিছুই হবে না। পটাস বলল, “আমি ওই বনের মধ্যেই যাই? ওখানেই থাকব। দিনে যদি কোনও বিপদ-আপদ...”
ভাসু অত ডরায় না। তবু বলল, “গাছের ডালে শুয়েছ কখনও?”
মাথা নাড়ল পটাস। বলল, “আমি বেঁশোভূত। বাঁশ জড়িয়ে ঘুমোই।”
এক লাফে গাছের নিচু ডালে উঠে ভাসু তরতরিয়ে উঠে গেল অনেকটা ওপরে। নিচে তাকিয়ে বলল, “নিচের চওড়া ডালে শুয়ে দেখতে পারো। খুব আরাম।”
তারপরে পাশ ফিরে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ল সঙ্গে সঙ্গে।
সন্ধেবেলা দুজনে বাঁশবনে ভূতেদের আড্ডায় ফিরল অনেকটাই দেরি করে। উন্তি বলল, “আমরা কতবার বনের ওধারে গিয়ে উঁকিঝুঁকি মেরে এসেছি। ভাবছি তোদের হলোটা কী?”
ভাসু বলল, “আমরা দেখছিলাম গ্রামের আলো শ্যাওড়া গাছ অবধি কতটা আসে। আর গল্প করছিলাম।”
তারপরে বলল, “আমি আজ ফিরে যাব। পটাসভূতও যাবে আমার সঙ্গে। ওখান থেকে কিছু আনতে হবে। তারপরে আমি ফিরে এসে এই শ্যাওড়া গাছেই বাসা করব।”
সবাই অবাক! ভূত-পেত্নির তো কিছু থাকে না, ওদের জামা-কাপড়, খাবার-দাবার, টাকা-কড়ি — কিছুই লাগে না। তাহলে কী আনবে ভাসু? আর পটাসভূতই বা কেন যাবে?
পটাসভূতের মুখের দিকে তাকিয়ে কারও বুঝতে বাকি রইল না কেন যাবে পটাস।
দুজনে রওয়ানা দিল আর দেরি না করে। ভাসু বলল, “যাব সোজা রাস্তায়। আবার যখন ফিরব, তখন একটু ঘুরপথে ফিরব। আমাদের দুজন পুরোনো বন্ধু আছে। ওদের সঙ্গে দেখা করে বলে আসব আমিও বাঁশবনের ঠিকানায় আসছি।”
দুজনে আবার যখন হাঁসুডাঙায় পৌঁছল, তখন সূর্য ওঠে ওঠে। তাড়াতাড়ি দুজনে শুয়ে পড়ল পাতা দিয়ে চোখ ঢেকে। রাত বাড়লে যখন চারিদিকের আলো জ্বলে উঠল, তখন পটাসের ভয় দেখে কে! রাত হতেই উঠে পড়ে বলল, “এখানে থাকব না। চলো, চলো, বাঁশবনে ফিরে চলো।”
ভাসু বলল, “হ্যাঁ, যাব। কিন্তু একটা জিনিস নিয়ে যেতে হবে।”
বলে ভূতুড়ে কারসাজি করে শ্যাওড়া গাছ থেকে একটা পাতাওয়ালা ডাল ভেঙে নিয়ে বলল, “ওখানে, পুকুরপাড়ে এই ডালটা পুঁতে দিলে আর একটা শ্যাওড়া গাছ হবে। দুটো গাছ থাকা ভালো। কখন প্রয়োজন পড়ে...”
দুজনে রওয়ানা দিল। দু-দিন আগেই এই পথে হেঁটে গেছে ভাসু। সেদিন ছিল একা। যখন গিয়ে দিন্দার কাছে পৌঁছল, তখন মাঝরাত। দেখল এ-কদিন দিন্দা আর কেনু একই সঙ্গে রয়েছে। কেনু ফেরেনি। ভাবছে দুজনে একসঙ্গে আবার থাকা যায় কি না। তবে কার কাছে কে গিয়ে থাকবে, সে নিয়ে দুজনে তর্ক চলছে।
ভাসু বলল, “তার চেয়ে তোরা আমার সঙ্গে চল। বাঁশবনে তোরা ভালো থাকবি। এখন যেরকম আছিস, তার চেয়ে ভালো। আর আমি এই শ্যাওড়ার কলমটা নিয়ে এসেছি, এটা যখন বড়ো হবে, তখন না-হয় আমার পাশে চলে আসবি?”
কেনু চোখ পাকিয়ে বলল, “আর ওইটা কে?”
পটাস ওদের কাছে আসেনি। ভাসু বার বার বলা সত্ত্বেও বলেছিল, “আমি এখানেই থাকছি।” বসে রয়েছে দূরে একটা পাথরের ওপরে।
কেনুর প্রশ্নে ভাসু-র রাগ হলো। বলল, “ও যে-ই হোক, তোর কী রে? তোকে তো ওর সঙ্গে থাকতে বলছি না?”
কেনুও রেগে গেল। বলল, “তা-বলে তুই ব্রাহ্মণের মেয়ে হয়ে একটা বেঁশোভূতের সঙ্গে... এতদিন ধরে দু-দুজন বেম্মোদত্তি তোকে বিয়ে করতে চাইল...”
ভাসু বলল, “দেখ, আমি কাকে বিয়ে করব, আমি মানুষ থাকতেও কেউ বলে দেয়নি। আমার বাবা-মা-ও না। আজ তোর চোখ রাঙানিতে আমি ডরাই না। ওই হাভাতে ভতাং, আর মাথামোটা ভেটকুকে আমার জন্য তোরা জোগাড় করেছিলি ওরা বেম্মোদত্তি বলে। জেনে রাখ, ভাসুপেত্নি কখনও নিয়মের ধার ধারেনি। আমি নিয়ম মানি না, নিয়ম আমাকে মেনে চলে...”
রেগে ভাসু দুমদুম করে চলে গেল। পটাসের কাছে গিয়ে বলল, “চলো, ফিরি।”
দু-পা যেতে না যেতেই ছুটে এল দিন্দা। বলল, “আমাকে নিবি?”
দিন্দার পেছনে পেছনে এল কেনু। বলল, “আমিও আসব?”
আজ দিন্দা আর কেনু দুজনেই বাঁশবনে থাকে। উন্তি, দিন্দা, কেনু আর ভাসু আবার দারুণ বন্ধু। অবশ্য ওদের মধ্যে ভাসু একাই শ্যাওড়া গাছে থাকে। ওরা এখনও থাকে বাঁশবনের মধ্যেই, আর রোজ একবার করে দেখে যায় ভাসু-র লাগানো শ্যাওড়া গাছটা। অনেকটা বড়ো হয়ে গেছে দশ বছরে। আর কিছুদিনের মধ্যেই বাসা করে থাকা যাবে।
এখন ওরা থাকে বাঁশঝাড়েই। ভাসু বার বার ডাকা সত্ত্বেও ওর কাছে এসে থাকতে চায়নি। বলেছে, “না রে, তোর চিরকাল একা থাকার অভ্যেস...”
ভাসু-র তাতে আপত্তি হয়নি। পটাস এসে আস্তানা গেড়েছে ওর শ্যাওড়া গাছে। রোজ সন্ধেবেলা ওরা শ্যাওড়ার ডাল থেকে পা ঝুলিয়ে গল্প করে। রোজ সকালে শ্যাওড়ার ডালে ঘুমোয়।
দিন্দা একবার ফিসফিস করে জানতে চেয়েছিল, “কী করে বেঁশোভূতকে বিয়ে করলি?”
দিন্দার ওপরে রাগ করে লাভ নেই। ভাসু বলেছিল, “আমার নামের সঙ্গে মিল আছে বলে। ও বেঁশোভূত, আমি ভেঁসোপেত্নি। কেমন সমান সমান, তাই না?”
তার কিছুদিন পরে দিন্দা আর কেনু দুজনেই এসে হাজির ভাসুর কাছে। ওদের আসতে দেখে, “ওই রে!” বলে পটাস হনহনিয়ে রওয়ানা দিল বনের দিকে। ওরা দুজনে এসে ভাসু-র দুই পাশে পা ঝুলিয়ে বসল গাছের ডালে।
“কী মনে করে?” জানতে চাইল ভাসু।
দুজনে আমতা আমতা করতে শুরু করল। ভাসু কিছুই বুঝতে পারে না ওরা কী বলতে চাইছে। শেষে এক ধমক দিয়ে বলল, “কী হয়েছে বলবি? এখানে থাকতে মন চাইছে না? চলে যাবি?”
ওরা বলল না, তা নয়, কিন্তু এতদিন এখানে আছে, কই - একদিনও তো দেখেনি বেঁশোভূতেরা বাঁশ দিয়ে মানুষ মারছে?”
ভাসু ওদের দিকে তাকিয়ে বলল, “দেখা কি খুব দরকার?”
“বা, রে! বেঁশোভূত তো ওইভাবে মানুষ মারে।”
“কেন মারে?”
“কেন আবার... ভূতে মানুষ মারে না?”
“মারে?”
ভাসু-র প্রশ্নের উত্তরে ওরা কলরব করে উঠল, “তোর হয়েছে কী? মামদো ভূত ঘাড় মটকায়, ব্রহ্মদৈত্য মানুষের মাথা বেলের মতো ফাটিয়ে দেয়, একানড়ে বাচ্চাদের নিয়ে তালগাছ থেকে ছুঁড়ে ফেলে মেরে ফেলে, কাণাভুলো রাতের অন্ধকারে মানুষকে ভুল রাস্তা দেখিয়ে নিয়ে গিয়ে মেরে ফেলে, আর শাঁকচুন্নি...”
ভাসুপেত্নি এবারে থামিয়ে দিল ওদের। বলল, “এ সব আমি জানি। দিন্দা, তুই শাঁকচুন্নি। তুই কবে কোন মানুষের প্রাণ নিয়েছিস? আমরা — আমি আর কেনু পেত্নি। আমরা কোনওদিন কাউকে মেরেছি? এত একানড়ে দেখেছিস, কেউ কোনওদিন বাচ্চাদের মেরেছে? কোন নিশি রাত্তিরে মানুষকে ডেকেছে রে? কোন মেছোভূত মাছ খায়? আমাদের শরীর আছে, যে আমরা মানুষ মেরে মাছ খাব? আমরা তো শুধু গন্ধ শুঁকে বেড়াই... কবে কোন মানুষ রাতের বেলা বাড়ি থেকে পালিয়েছে, পরদিন গাঁয়ের লোক বলেছে, ওকে নিশিতে ডেকেছিল। কবে কোন মানুষ নৌকোডুবি হয়ে মরে গেছে, লোকে বলেছে শিকলবুড়ি মেরেছে। সব দোষ আমাদের ঘাড়ে চাপিয়ে মানুষ ভাবে ওদের কোনও দায় নেই। আজকাল মানুষ আর আমাদের ভয়ও পায় না, বিশ্বাসও করে না। তাই মানুষ মরলে ডাক্তারদের ধরে মারে জানিস না? কত ডাক্তার ভূত আসছে আজকাল..."
ভাসু-র লম্বা লেকচারে থতমত খেয়ে ওরা আর কিছু বলতে পারল না। সব আবার আগের মতো চলতে থাকল।
সবই ভালো আজকাল। শুধু মাঝে মাঝে ভাসুপেত্নি পটাসভূতের কাছে জানতে চায়, “বেঁশোপেত্নিরা এত সুন্দরী, তাও তুমি আমাকে কী করে ভালোবাসলে?”
পটাসভূত বলে, “নিজেকে তো দেখতে পাও না, তাই তুমি জান না তুমিও কত সুন্দরী।”