মস্তো শহরের বিশাল উঁচু বাড়ির গায়ে গায়ে পাখি বাসা বানানোর জায়গা খুঁজে পায়। কোথাও একটা আলসের ধারে, কোথাও কার্নিসের কোণায়, কোথাও বা পাইপের বাঁকের কোলে। ওই যে কালো কালো পাখিগুলো সারাক্ষণ উড়ে উড়ে বেড়ায় - ওরা সত্যিই কখনওই মাটিতে, গাছের ডালে বা তারে বসে না, ওদের পা নেই, আংটার মতো নখ দিয়ে ঝুলে থাকে - ওরাও অনেক সময় উচু-তলার সিঁড়ির জানলা দিয়ে উড়ে এসে ছাদ আর দেওয়ালের কোণে বাসা করে। বাচ্চারা বড়ো হলে উড়ে যায় মা-বাবার পেছনে পেছনে।
মানুষ ওদের পছন্দ করে না। ওরা নোংরা করে। সে সব অবশ্য ওরা বোঝে কি না জানি না। ওরা ওদের মতো থাকে।
কিছুদিন হলো এক জোড়া পাখি একটা নতুন বাসা বাঁধার জায়গা খুঁজে পেয়েছে। পাখিদুটো ছেলে আর মেয়ে, কিন্তু দেখে তাদের আলাদা করা যায় না। কালচে বাদামী তাদের গায়ের রং, মাথাটা কালো। ডানায় সাদা ছোপ। পা, ঠোঁট, আর চোখের পেছনে একটা ত্রিকোণ - কী সুন্দর হলুদ, যেন তুলি দিয়ে আঁকা।
আমরা ওদের বলি শালিক। ওরা ওদের কিছু বলে কি না আমরা জানি না।
অনেক উঁচুতে একটা বাড়ির রান্নাঘরের দেওয়ালে লাগানো চিমনির বাইরের দিকে হালকা অ্যালুমিনিয়ামের পাত ঝুলছে তিনটে। যখন রান্না হয়, চিমনি চালু থাকে, তখন গরম হাওয়া আর রান্নার ধোঁয়া চিমনি দিয়ে বেরিয়ে আসে, পাতলা পাতগুলোকে ঠেলে। আর যখন চিমনির কাজ শেষ, তখন পাতগুলো নিচের দিকে ঝুলে পড়ে, চিমনির ঢাকনা হয়ে আটকে দেয় - যাতে পাখি বা পোকা উড়ে ঢুকতে না পারে।
পাখিগুলো দেখেছে, কিছুদিন হলো ঝড়ে-বৃষ্টিতে-রোদে-হাওয়ায় নষ্ট হয়ে হয়ে বাইরের দিকের পাতগুলো খুলে খুলে পড়ে গেছে নিচে। বাড়ির লোকেরা সেটা জানে না। তাই ওরা কাঠ-কুটো, ঘাস-খড়, কাগজ-ফিতে কুড়িয়ে এনে বাসা বানাতে শুরু করল ওই চিমনিরই ভেতরে।
বাড়ির ভেতরে মানুষ খেয়াল করল, চিমনির মুখের কাছে যেন খচর-মচর শব্দ! কেউ যে চিমনির ভেতরে ঘোরাফেরা করে! জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে দেখল, আরে! দুটো শালিক পাখি বাসা বাঁধছে যে!
এবারে কী করা? বাড়ির ভেতর থেকে চিমনির মধ্যে ঢোকার উপায় নেই। আর বাইরে যেতে হলে অত উঁচু মই লাগবে! চিমনিওয়ালাকে খবর দিয়ে চিমনির ঢাকনাটা লাগিয়ে দিতে হবে। কিন্তু এখন পাখির বাসা বানানো হয়ে গেছে, ডিমও পেড়ে ফেলেছে কি না কে জানে? মানুষরা ঠিক করল, তাহলে বরং এখন কিছুদিন চিমনিটা ব্যবহার না-করাই ভালো।
বাইরের দিকে পাখিরা অত জানেও না, বোঝেও না - আর বুঝতে ওদের বয়েও গেছে। ওরা যেখানে জায়গা পায়, নিজেদের মতো বাসা বানায়, বাচ্চা বড়ো করে, তারপরে উড়ে যায়।
কিছুদিন পরে ডিম পাড়ল শালিক-মা। ওরা ডিমে তা দেয়, উড়ে যায় খাবার আনতে, আবার ফিরে আসে - বাড়ির ভেতর থেকে চিমনির মধ্যে খচমচ শব্দ শোনে মানুষ - বোঝে, এখনও চিমনি চালু করার সময় আসেনি।
ডিম ফোটে, বাচ্চা বেরোয়। বাবা-মার ব্যস্ততা বাড়ে। এখন বাচ্চাদের খাবার এনে এনে খাওয়াতে হয়। আর সেই সঙ্গে লক্ষ রাখতে হয় শত্রুদের দিকে। যতদিন ডিম ছিল, ততদিন বাসায় নড়াচড়া ছিল না। এখন বাচ্চারা সারাদিন ছটফট করে - তাই নজরে পড়ে কাক, চিলের। ওরা সুযোগ পেলেই এসে হাজির হবে বাচ্চাদের ছিঁড়ে খেতে। কাছাকাছি কেউ এলেই তাই শালিক পাখিরা তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে - ঠোকর মারে, আঁচড়ে দেয়।
বাড়ির মানুষরা আর বারান্দায় দাঁড়িয়ে হাওয়া খেতে পারে না, কাপড় মেলতে হলে আগেই মস্তো একটা চাদর বারান্দার বাইরের দিকে মেলে দিতে হয়। নইলে হঠাৎ ছোঁ মেরে খটাস করে মাথায় ঠোকর মারে একটা শালিক। বার বার আসে, যতক্ষণ না মানুষরা ভেতরে চলে যায়।
পাখির বাচ্চা বড়ো হয় তাড়াতাড়ি। কিছুদিন মানুষকে জ্বালাতন করে ওরা উড়ে চলে যায়। খোলা চিমনির মুখে পড়ে থাকে খড়কুটো, সারা বছর হাওয়ায়, বৃষ্টিতে উড়ে যায়, নিচে পড়ে।
মানুষরা ভুলে যায়, চিমনির মুখ সারানো হয় না, আবার পরের বছর যখন পাখিরা খড়কুটো নিয়ে এসে বাসা বাঁধে, তখন ওদের মনে পড়ে, কিন্তু তখন আর সারানোর উপায় নেই, তাই আর এক বছর কিছুদিন ওদের পাখির বড়ো হয়ে ওঠা সহ্য করে চিমনি ব্যবহার বন্ধ করতে হয় - নইলে রান্নার তেল, ঝাল, মশলায় পাখির বাচ্চাদের কষ্ট হবে যে!
সে বছর গরম কালে পাখিরা আবার বাসা বাঁধতে শুরু করল। কিছুদিন পরে মানুষরা বুঝল ডিম ফুটে বাচ্চা হয়েছে। আবার বারান্দায় দাঁড়ানো দায় হয়েছে। তারা সবে ভাবতে শুরু করেছিল, আর কিছুদিন পরেই তো বাচ্চাগুলো উড়ে যাবে - এমন সময় হলো এক কাণ্ড।
সেদিন সকাল থেকে আকাশ কালো হয়ে এসেছিল। পাখিরা বুঝেছিল প্রবল একটা ঝড় আসছে, তাই বাসায় ফিরেছিল তাড়াতাড়ি। বেশি খাবার নিয়ে আসতে পারেনি বাচ্চাদের জন্য। দুপুরের পর থেকে বৃষ্টি আসল মুষলধারে। মা-বাবা শালিকরা যতটা পারে নিজেদের শরীর দিয়ে আগলে রাখল বাচ্চাদের আর বাসাটা। কিন্তু যত সন্ধে নামে, তত আরও জোরে আসে বৃষ্টি। সেই সঙ্গে ঝোড়ো হাওয়া আরও জোরে বইতে থাকে। বৃষ্টির ফোঁটাগুলো গায়ে লাগে - ব্যথা করে ওদের। এত জলের তোড়, যে চিমনির ভেতরে জল জমতে শুরু করে।
আস্তে আস্তে দিনের আলো নিভে আসে, প্রবল ঝড়ের তোড় একটু একটু করে বাসাটাকে ভেঙে ভেঙে বাইরে নিয়ে আসতে শুরু করে ভেতরে জমে থাকা জলের সঙ্গে।
পরদিন সকালে, বৃষ্টির ধারা তখন অত ভয়ঙ্কর নয়, ঝড়ের বেগও কমেছে অনেক - দিনের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে শালিকরা দেখল, ওদের বাচ্চারা আর নড়ছে না। ঝড়ে, বৃষ্টিতে মরে গেছে।
পাখিরা বাচ্চা মরে গেলে কাঁদে না। দু-দিন অভ্যেসমতো খাবার নিয়ে এল, যখন দেখল বাচ্চারা আর খাচ্ছে না, তখন দু-দিন উড়ে বেড়াল, তারপরে আবার নতুন করে কাঠকুটো নিয়ে এসে আর একটা বাসা বানানো শুরু করল।
বাড়ির ভেতরে মানুষ বুঝল, পাখিদুটো আর ওদের তাড়া করছে না। আর চিমনির ভেতরেও যেন নড়াচড়া নেই বেশি। বরং পাখিদুটো যেন আর একটা বাসা বানাচ্ছে। বুঝল আগের বাচ্চাদুটো মরে গেছে।
কিছুদিন পরে বাড়ির ভেতরে পচা গন্ধ পেয়ে মানুষরা বুঝল মরা বাচ্চাগুলো এখনও ওখানেই রয়ে গেছে - পাখিরা ওদের সরাতে না পেরে, ওখানেই আর একটা বাসা করেছে।
কিন্তু পাখিরা তো ওখানেই বাসা করতে পারেনি। ওদের এবারের বাসাটা আর একটু বাইরের দিকে - ফলে রোদ্দুরের তেজে বাচ্চাগুলোর কষ্ট হচ্ছে। সেই সঙ্গে মরে যাওয়া বাচ্চাদের লোভে লোভে এসে জুটেছে অজস্র পিঁপড়ে। ওরা মরা বাচ্চাগুলোকেও যেমন ছিঁড়ে খায়, তেমনই নতুন বাচ্চাদেরও গায়ে কামড় বসায়। বাবা-মা শালিক পিঁপড়ে তাড়িয়ে কূল পায় না।
কিছুদিন পরে, রোদে আর পিঁপড়ের অত্যাচারে এ বাচ্চাগুলোও মরে গেল। বাইরের দিক থেকে মানুষরা দেখতে পায় না, কিন্তু মানুষরা খেয়াল করল, পাখিরা আর ওদের আক্রমণ করছে না। ভাবল, আবার বুঝি বাচ্চাগুলো মরে গেছে। আর, কিছুদিন পরে আবার পচা গন্ধ পেয়ে বুঝল, এবারের বাচ্চারাও মরে গেছে।
সে বছর ওদের বাচ্চা বড়ো হলো না। বাসা বানানোর, ডিম পাড়ার সময় শেষ হয়ে গেল। ওরা এখন উড়ে চলে গেছে চিমনি থেকে - আর আসে না। সারা বছর ধরে বৃষ্টিতে, হাওয়ায় বাসাদুটো একটু একটু করে খসে পড়বে নিচে। তারপরে, আবার আগামী বছর ওরা আসবে। ওদের নিয়ম মতো।
আর ততদিনে মানুষ যদি চিমনির মুখটা মিস্তিরি ডেকে বন্ধ করে দেয়? তাহলে ওরা অন্য কোথাও উড়ে যাবে - যেখানে নিশ্চিন্তে বাসা বানিয়ে, ডিম পেড়ে বাচ্চা বড়ো করবে।
ওরা মোটেই বসে থাকবে না। ওরা চলবে ওদের নিয়ম মতোই।
No comments:
Post a Comment