১
কলেজে পড়তে দেবাশিস পাখি দেখত জঙ্গলে জঙ্গলে ঘুরে। চাকরি পেয়ে সে সব মাথায় উঠেছিল, তবু ইচ্ছে ছিল ষোল আনা। তাই কুশল যখন ফোন করে বলল সামনের মাসে একটা সার্ভে শুরু হচ্ছে, এক বিরল প্রজাতির প্যাঁচার খোঁজে, তার খানিকটা দেশের বাইরে, এক কথায় রাজি হয়ে গেল। সে দেশে কাজ করেছে ও, ভাষাটা ভালোই বলতে পারে বলেই কুশল ওর কথা ভেবেছে।
দেবাশিস একলা। পিছুটান নেই। বেরোতে অসুবিধা নেই। কেবল বসকে একটা ধাতানি দিতে হয়েছিল — যে অফিস দু’সপ্তাহ আমাকে ছাড়া চলতে পারবে না, সেখানে কাজ করা উচিত কি না, ভাবতে হবে… এই রকম আর কি!
পাহাড়ী জঙ্গলে তাঁবু খাটিয়ে গ্রামে গ্রামে ঘুরে ঘুরে প্যাঁচা খোঁজে। পায় আর না। বয়স্ক লোকেরা ছবি দেখে, রেকর্ড করা ডাক শুনে বলে, এই বীভৎস ডাকে তারা ছোটোবেলায় ঘুম থেকে উঠে বসে কান্নাকাটি করত! ঠিক। জিম করবেট তো “মাই ইন্ডিয়া” বইতে লিখেছেন চুড়েল (পেত্নী)-এর চিৎকার।
একদিন কুশল বলল, “মনে হচ্ছে এ দিকে আর নেই। এক্সটিঙ্কট হয়ে গেছে। আরও ভেতরে যদি থাকে। ধর...” বলে ম্যাপ খুলে দেখাল, “এই হলো কণ্টাকাঁই। তার পরে পিকুলদাঁড়ি, আর তারও পরে দীঘলাগড়। পুরোটা ডেন্স ফরেস্ট। দিঘলাগড়েই আমাদের সার্ভে এরিয়া শেষ।”
“তাহলে চল, পা চালিয়ে আমরা তাড়াতাড়ি কণ্টাকাঁই যাই...”
কণ্টাকাঁইতে রেঞ্জ অফিসারকেই পাওয়া গেল। সবুজসুন্দর গাথানি। মজার মানুষ। হা-হা করে হাসেন, খুব আড্ডা দিতে পারেন। বললেন, “টেন্ট-ফেন্টের প্রশ্নই নেই। আপনারা আমার গেস্ট। সব ব্যবস্থা করে দেব। আরে আমি মশাই এখানকার খানদানি ফরেস্টার। আমার বাবাও এই জঙ্গলের রেঞ্জার ছিলেন। জঙ্গল ভালোবাসতেন বলে দাদু আমার নাম রেখেছেন সবুজসুন্দর। দাদু ফরেস্ট গার্ড ছিলেন।”
এক বেলার মধ্যে সবুজ-দা হয়ে গেলেন ভদ্রলোক।
কণ্টাকাঁইয়ের আশেপাশের জঙ্গলে কাঙ্খিত প্যাঁচার খোঁজ পাওয়া গেল না। দু-দিন কাটিয়ে ওদের যাবার কথা পিকুলদাঁড়ি। কুশলের মনে আশা — ওখানেই পাওয়া যাবে। পুরোনো বইপত্রে এ প্যাঁচার কথা রয়েছে।
সন্ধেবেলা জিনিসপত্র গোছাচ্ছে, সবুজদা এসে বললেন, “পিকুলদাঁড়ি গিয়ে কোনও লাভ নেই। বইয়ে যা লেখা আছে, তা পাবেন না। পঞ্চাশ-ষাট বছর আগে ছোটো শহর ছিল, বেড়ে বেড়ে বিশ্রী বিজনেস সেন্টার হয়ে গিয়েছিল। গত বছর দশেকে ওখানকার বিজনেস আবার বন্ধ — এখন তো পাহাড়ে গাছ কাটা বারণ। কেবল মাতাল আর গেঁজেলদের আড্ডা। সপ্তাহে এক-দুটো মার্ডার লেগেই আছে। অনেকে তো ছেড়ে চলেও গেছে।”
“কোথায় যাব তাহলে?” জানতে চাইল কুশল।
“বোনামপল্লী,” বললেন সবুজদা। “আমার এরিয়াতে ওখানেই মোস্ট ডেন্স ফরেস্ট। ওখানেই চান্স সবচেয়ে বেশি।”
ম্যাপে খুঁজতে খুঁজতে কুশল বলল, “কই, বোনামপল্লী বলে তো কোনও...”
আঙুল দিয়ে দেখিয়ে সবুজদা বললেন, “পিকুলদাঁড়ি যাবার পথে এইরকম কোথাও একটা রাস্তাটা সাউথে গেছে, সেই রাস্তা ধরে নামতে হবে। ম্যাপে নাম পাবেন না। অনেক বছর আগে ওখানে বোনামপল্লী ছিল। এখন কিছুই নেই।”
দেবাশিস জিজ্ঞেস করল, “কেন?”
হা হা করে হেসে সবুজদা বললেন, “কাল বলব, চলুন তো আগে।”
দেবাশিস একলা। পিছুটান নেই। বেরোতে অসুবিধা নেই। কেবল বসকে একটা ধাতানি দিতে হয়েছিল — যে অফিস দু’সপ্তাহ আমাকে ছাড়া চলতে পারবে না, সেখানে কাজ করা উচিত কি না, ভাবতে হবে… এই রকম আর কি!
পাহাড়ী জঙ্গলে তাঁবু খাটিয়ে গ্রামে গ্রামে ঘুরে ঘুরে প্যাঁচা খোঁজে। পায় আর না। বয়স্ক লোকেরা ছবি দেখে, রেকর্ড করা ডাক শুনে বলে, এই বীভৎস ডাকে তারা ছোটোবেলায় ঘুম থেকে উঠে বসে কান্নাকাটি করত! ঠিক। জিম করবেট তো “মাই ইন্ডিয়া” বইতে লিখেছেন চুড়েল (পেত্নী)-এর চিৎকার।
একদিন কুশল বলল, “মনে হচ্ছে এ দিকে আর নেই। এক্সটিঙ্কট হয়ে গেছে। আরও ভেতরে যদি থাকে। ধর...” বলে ম্যাপ খুলে দেখাল, “এই হলো কণ্টাকাঁই। তার পরে পিকুলদাঁড়ি, আর তারও পরে দীঘলাগড়। পুরোটা ডেন্স ফরেস্ট। দিঘলাগড়েই আমাদের সার্ভে এরিয়া শেষ।”
“তাহলে চল, পা চালিয়ে আমরা তাড়াতাড়ি কণ্টাকাঁই যাই...”
কণ্টাকাঁইতে রেঞ্জ অফিসারকেই পাওয়া গেল। সবুজসুন্দর গাথানি। মজার মানুষ। হা-হা করে হাসেন, খুব আড্ডা দিতে পারেন। বললেন, “টেন্ট-ফেন্টের প্রশ্নই নেই। আপনারা আমার গেস্ট। সব ব্যবস্থা করে দেব। আরে আমি মশাই এখানকার খানদানি ফরেস্টার। আমার বাবাও এই জঙ্গলের রেঞ্জার ছিলেন। জঙ্গল ভালোবাসতেন বলে দাদু আমার নাম রেখেছেন সবুজসুন্দর। দাদু ফরেস্ট গার্ড ছিলেন।”
এক বেলার মধ্যে সবুজ-দা হয়ে গেলেন ভদ্রলোক।
কণ্টাকাঁইয়ের আশেপাশের জঙ্গলে কাঙ্খিত প্যাঁচার খোঁজ পাওয়া গেল না। দু-দিন কাটিয়ে ওদের যাবার কথা পিকুলদাঁড়ি। কুশলের মনে আশা — ওখানেই পাওয়া যাবে। পুরোনো বইপত্রে এ প্যাঁচার কথা রয়েছে।
সন্ধেবেলা জিনিসপত্র গোছাচ্ছে, সবুজদা এসে বললেন, “পিকুলদাঁড়ি গিয়ে কোনও লাভ নেই। বইয়ে যা লেখা আছে, তা পাবেন না। পঞ্চাশ-ষাট বছর আগে ছোটো শহর ছিল, বেড়ে বেড়ে বিশ্রী বিজনেস সেন্টার হয়ে গিয়েছিল। গত বছর দশেকে ওখানকার বিজনেস আবার বন্ধ — এখন তো পাহাড়ে গাছ কাটা বারণ। কেবল মাতাল আর গেঁজেলদের আড্ডা। সপ্তাহে এক-দুটো মার্ডার লেগেই আছে। অনেকে তো ছেড়ে চলেও গেছে।”
“কোথায় যাব তাহলে?” জানতে চাইল কুশল।
“বোনামপল্লী,” বললেন সবুজদা। “আমার এরিয়াতে ওখানেই মোস্ট ডেন্স ফরেস্ট। ওখানেই চান্স সবচেয়ে বেশি।”
ম্যাপে খুঁজতে খুঁজতে কুশল বলল, “কই, বোনামপল্লী বলে তো কোনও...”
আঙুল দিয়ে দেখিয়ে সবুজদা বললেন, “পিকুলদাঁড়ি যাবার পথে এইরকম কোথাও একটা রাস্তাটা সাউথে গেছে, সেই রাস্তা ধরে নামতে হবে। ম্যাপে নাম পাবেন না। অনেক বছর আগে ওখানে বোনামপল্লী ছিল। এখন কিছুই নেই।”
দেবাশিস জিজ্ঞেস করল, “কেন?”
হা হা করে হেসে সবুজদা বললেন, “কাল বলব, চলুন তো আগে।”
২
পিকুলদাঁড়ি গিয়েই বোঝা গেল কোনও কাজ হবে না। নোংরা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, মানুষজন সব কেমন যেন, সব মিলিয়ে পনেরো মিনিটেই হাঁপ ধরে গেল। সবুজদা রওয়ানা দিলেন বোনামপল্লীর দিকে।
পাহাড় বেয়ে কাঁচা রাস্তা নেমেছে কুটরি নদীতীর অবধি। সবুজদা বললেন, পাঁচ-সাড়ে পাঁচশো বছর আগে অবধি বোনামপল্লী ছিল এখানকার রাজধানীর পল্লী। রাজধানীর নাম ছিল কৃপাণগড়। পরে রাজা রাজধানী নিয়ে যান দিঘলাগড়ে। খালি কৃপাণগড় পড়ে থাকে পাহাড়ের মাথায়। বোনামপল্লীর মাহাত্ম্য কমে আসে।
নদীতীরের ওপারে থাকে থাকে পাহাড় উঠেছে — প্রথম সারির পাহাড় নিচু, তার পেছনে একটুউঁচু, তার পেছনে আরও, এমনি করে সবার পেছনে, আকাশের গায়ে আঁকা বরফে ঢাকা এক সারি পাহাড়। একেবারে নিচের পাহাড়ের চুড়োয় একটা ধ্বংসাবশেষ দেখিয়ে সবুজদা বললেন, “ওই দেখুন। কৃপাণগড় দুর্গ। এখন ওইটুকুই বাকি রয়েছে।”
কুশল বলল, “দুর্গ তো বিরাট হয়। আপনাদের দেশের দুর্গ আবার বেশ শক্ত পোক্ত। সবই যত্ন করে রাখা। এটার এরকম দুরবস্থা কেন?”
সবুজদা বললেন, “কৃপাণগড় অনেক আগেই নষ্ট হয়ে গেছে। দিঘলাগড়ের দুর্গই নয়-নয় করে প্রায় চার, সাড়ে চারশো বছরের পুরোনো। তখন থেকেই এখানে কেউ থাকে না। পড়ে আছে। প্রায় একশো বছর আগে কৃপাণগড়ে আগুন লাগে। সবটাই জ্বলে ছাই হয়ে ওইটুকুই আছে। তার পরেই বোনামপল্লীর লোকে ভয় পেয়ে এখান থেকে চলে গেছে। লোকাল লোকে মানে এই জায়গাটা খারাপ। তাই এখানে কেউ থাকে না। আশেপাশে কোনও ভিলেজ নেই, কোনও বসতি নেই।”
দেবাশিস হেসে বলল, “আচ্ছা লোক আপনি! এমন আনলাকি জায়গায় আমাদের থাকতে বলছেন?”
সবুজদা এত জোরে হাসলেন, যে গাছ থেকে একটা ঘুঘু উড়ে গেল ফটফটিয়ে। বললেন, “আপনারা এসব সুপার্স্টিশনে বিশ্বাস করেন না। নইলে আনতাম না। তবে আপনারা যে প্যাঁচার ডাকের রেকর্ডিং এনেছেন —তা আমি নিজের শুনেছি এই জঙ্গলে।মেন রোড দিয়ে যেতে যেতে, রাতের বেলা। যে দু’ দিন পিকুলদাঁড়িতে থাকবেন ভেবেছিলেন, এখানে থাকুন। ভালো লাগবে। ফুড নিয়ে ভাববেন না, আমি পাঠিয়ে দেব। দু’ দিন পরে আমার গাড়িতেই দিঘলাগড় যাবেন।”
টেন্ট খাটিয়ে, লোকজন দিয়ে শুকনো কাঠকুটো জোগাড় করে দিয়ে, ওদের সঙ্গে দ্বিপ্রাহরিক ভোজন সেরে সদলবলে চলে গেলেন সবুজদা। টিফিন-ক্যারিয়ার ভর্তি খাবার দিলেন রাতের জন্য।বললেন, “জঙ্গলে আগুন জ্বালবেন না, তবু ফায়ারউড থাক। কখন কী হয়। খাবারটাও থাক, প্যাক্ড্ ফুড খেয়ে খেয়ে চলে নাকি মশাই! সকালে আমার লোক আসবে ব্রেকফাস্ট নিয়ে। গুডলাক!”
সবুজদা চলে যাবার পরে জঙ্গলটা ঝিমিয়ে পড়ল। সূর্য আকাশের মাঝখানে। পাহাড়ে শীত শেষ হয়নি, রোদ্দুরেও জ্যাকেট পরতে হয়। বিকেলের আগেই সব সরঞ্জাম গুছিয়ে নিল ওরা। অন্ধকারে দেখার বাইনোকুলার, ক্যামেরা, স্ট্যান্ড — প্যাঁচার ডাক রেকর্ড করার জন্য সাউন্ড রেকর্ডিং-এর যন্ত্রপাতি, লম্বা মাইক্রোফোন সাজিয়ে নিল হাতের কাছে।
থমথমে জঙ্গলে দুজনে বসে। নদীর ওপারে পাহাড়ের মাথায় জঙ্গল থেকে মাথা উঁচিয়ে আছে দুর্গের ভাঙা মিনার। কুশল নদীর দিকে পেছন করে বসল।বলল, “অস্বস্তি হচ্ছে। একটা দুর্গ পুরোটা জ্বলে শেষ হয়ে গেল, ওইটুকু রয়ে গেল, তা হয় নাকি?”
নদীর দিকে পেছন করে বসলেও মজা কম। তাই দুজনেই নদীকে পাশে রেখে ফোল্ডিং চেয়ার ঘুরিয়ে মুখোমুখি বসল।
পাহাড়ে সন্ধে নামে হঠাৎ। এই ঝকঝক করছে সূর্য, এই সে পাহাড়ের ওপারে। নিচের উপত্যকায় ছায়া। ঘনিয়ে এল অন্ধকার। এই জঙ্গলে হিংস্র জন্তু নেই। একমাত্র শিকারী প্রাণী পাহাড়ি চিতাবাঘ অনেক ওপরে বরফের রাজ্যে থাকে। ক্রমে সূর্যের অভাব চোখে সয়ে গেল। আকাশ ছেয়ে গেছে তারায়। ফোল্ডিং চেয়ার আরও এলিয়ে দিয়ে দুজনে দৃষ্টি মেলে দিল আকাশের দিকে।
চারিদিক ঝিমঝিম করছে অন্ধকারে, রাতের জঙ্গল থেকে তারস্বরে চেঁচাচ্ছে ঝিঁঝিঁপোকা, দুই বন্ধু মৃদুস্বরে কথা বলছে, দূর থেকে কখনও ভেসে আসছে রাতচরা পাখির ডাক। কিন্তু সে কোথায়, যার সন্ধানে আসা?
প্যাঁচার খোঁজে আসা, তাই বেশি রাত অবধি অপেক্ষা করা উচিত। দুই বন্ধু জেগেই রইল। অন্ধকারে।
মাঝরাতের কাছাকাছি তীব্র কর্কশ ডাকে চমকে উঠল দুজনে।ছোঁ মেরে মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে তৈরি হল দেবাশিস। আরও তিন বার ডাক ভেসে এল, যন্ত্রবন্দী হয়ে গেল দুর্লভ প্যাঁচার কণ্ঠস্বর, রাত্তিরে যা শুনে ভীত গ্রামবাসীরা ভাবত পেত্নী।
ক্যামেরা হাতে এদিক ওদিক ঘুরে এল দুজনে। দেখা গেল না। উঁচু পাহাড়ের ওপরের আকাশটা উজ্জ্বল হয়ে উঠল। পুব আকাশে চাঁদ উঠেছে। পাহাড় পেরিয়ে মাঝ-আকাশে আসতে এখনও কিছু দেরি।
“আর অপেক্ষা করবি?” জিজ্ঞেস করল দেবাশিস। কুশল মাথা নেড়ে বলল, “নাঃ,।শুয়ে পড়ি। কাল সকালে একবার ওই দুর্গে যাব। কিছু একটা টানছে। মনে হচ্ছে ইন্টারেস্টিং কিছু পাব।”
দেবাশিস হেসে বলল, “গুপ্তধন?”
মাথা নেড়ে কুশল বলল, “না। চামচিকে বা বাদুড় জাতীয় কিছু ভাবছি।”
ব্যাটারি চালিত রিচার্জেব্ল লণ্ঠন বের করে দুজনে খেতে বসল। সামান্য আলোও জঙ্গলে অনেক, কিন্তু চারপাশের আলোর বৃত্তের বাইরেটা অদৃশ্য হয়ে গেল অন্ধকারে। নদীর কলকল শোনা গেলেও তার অস্পষ্ট সাদা ফেনাতোলা স্রোত আর দেখা যায় না, মাথার ওপরে ঝুঁকে পড়া গাছের পাতা কটার বাইরে আর সবই গাঢ় আঁধার।
দেবাশিস লক্ষ করল কুশল খানিক পরে পরে যেন অন্যমনস্ক হয়ে যাচ্ছে। বলল, “কী হয়েছে?”
কুশল বলল, “কিছু শুনতে পাচ্ছিস?”
শুনতে? কী শুনবে? রাতের জঙ্গলের আওয়াজ মানে তো ঝিঁঝিঁপোকা আর…
দেবাশিসের খেয়াল হলো, জঙ্গলটা একেবারে নিস্তব্ধ। কোনও শব্দ নেই। কান-ফাটানো ঝিঁঝিঁপোকার ডাক কখন থেমে গেছে।
জিজ্ঞেস করল, “রাত বাড়লে ঝিঁঝিঁপোকা চুপ করে যায়?”
কুশল মাথা নাড়ল। চাপা গলায় বলল, “আস্তে করে বাঁ হাতে তোর টর্চটা নে তো।”
দুজনেরই হাতের কাছে টর্চ আছে। আস্তে আস্তে টর্চটা তুলে নিয়ে দেবাশিস বলল, “কোনদিকে কী দেখব?”
কুশল তেমনই চাপা গলায় বলল, “আমার পেছন দিকে সরাসরি জ্বালা। মনে হচ্ছে কী যেন দাঁড়িয়ে আছে।”
অবাক হল দেবাশিস, কিন্তু কুশল চিরকালই ঠাণ্ডা মাথা ছেলে। চট করে কিছুতে ভয় পায় না। দ্বিরুক্তি না করে টর্চ জ্বালাল।
কিছু নেই।
কুশলও পেছনে ঘুরেছিল।বলল, “খালি মনে হচ্ছে পেছনে কি আছে।”
দুজনে আবার খাওয়ায় মন দিল। কিন্তু কুশলের অস্বস্তি কাটে না। খালি ঘুরে দেখে। একবার নিজের টর্চ জ্বালাল দেবাশিসের পেছনের জঙ্গলের দিকে। কিছুই নেই।
দেবাশিস খাওয়া শেষ করে থালা ধুয়ে নিল নদীর জলে। বলল, “চ’, শুয়ে পড়ি। রাত অনেক হয়েছে।”
কুশল মাথা নাড়ল। না। কিছু বলল না।
দেবাশিস বলল, “কুশল, একটা বেজে গেছে। এখন না ঘুমোলে সকালে উঠে দুর্গ দেখা যাবে না।”
কুশল বলল, “দুর্গ দেখতে হবে না। কাল এখান থেকে পালাব। অনেক হয়েছে।”
দেবাশিস অবাক, অনেক দিন কুশলের সঙ্গে জঙ্গলে ঘুরেছে। এই রূপ দেখেনি কখনও। বলল, “আচ্ছা বেশ, কিন্তু টেন্টে ঢুকে বস।ফোল্ডিং চেয়ারটা ঢুকিয়ে নে।” মনে মনে ভাবল, “আমি স্লিপিং ব্যাগে ঢুকলে আর বসে থাকতে ইচ্ছে করবে না।”
কুশল চেয়ারটা টেন্টের মধ্যে নিয়ে এল, কিন্তু দেবাশিসের ঘুম আসা অবধি চেয়ার ছেড়ে নড়ল না। অমনিই বসে রইল বাইরের দিকে চেয়ে।
পাহাড় বেয়ে কাঁচা রাস্তা নেমেছে কুটরি নদীতীর অবধি। সবুজদা বললেন, পাঁচ-সাড়ে পাঁচশো বছর আগে অবধি বোনামপল্লী ছিল এখানকার রাজধানীর পল্লী। রাজধানীর নাম ছিল কৃপাণগড়। পরে রাজা রাজধানী নিয়ে যান দিঘলাগড়ে। খালি কৃপাণগড় পড়ে থাকে পাহাড়ের মাথায়। বোনামপল্লীর মাহাত্ম্য কমে আসে।
নদীতীরের ওপারে থাকে থাকে পাহাড় উঠেছে — প্রথম সারির পাহাড় নিচু, তার পেছনে একটুউঁচু, তার পেছনে আরও, এমনি করে সবার পেছনে, আকাশের গায়ে আঁকা বরফে ঢাকা এক সারি পাহাড়। একেবারে নিচের পাহাড়ের চুড়োয় একটা ধ্বংসাবশেষ দেখিয়ে সবুজদা বললেন, “ওই দেখুন। কৃপাণগড় দুর্গ। এখন ওইটুকুই বাকি রয়েছে।”
কুশল বলল, “দুর্গ তো বিরাট হয়। আপনাদের দেশের দুর্গ আবার বেশ শক্ত পোক্ত। সবই যত্ন করে রাখা। এটার এরকম দুরবস্থা কেন?”
সবুজদা বললেন, “কৃপাণগড় অনেক আগেই নষ্ট হয়ে গেছে। দিঘলাগড়ের দুর্গই নয়-নয় করে প্রায় চার, সাড়ে চারশো বছরের পুরোনো। তখন থেকেই এখানে কেউ থাকে না। পড়ে আছে। প্রায় একশো বছর আগে কৃপাণগড়ে আগুন লাগে। সবটাই জ্বলে ছাই হয়ে ওইটুকুই আছে। তার পরেই বোনামপল্লীর লোকে ভয় পেয়ে এখান থেকে চলে গেছে। লোকাল লোকে মানে এই জায়গাটা খারাপ। তাই এখানে কেউ থাকে না। আশেপাশে কোনও ভিলেজ নেই, কোনও বসতি নেই।”
দেবাশিস হেসে বলল, “আচ্ছা লোক আপনি! এমন আনলাকি জায়গায় আমাদের থাকতে বলছেন?”
সবুজদা এত জোরে হাসলেন, যে গাছ থেকে একটা ঘুঘু উড়ে গেল ফটফটিয়ে। বললেন, “আপনারা এসব সুপার্স্টিশনে বিশ্বাস করেন না। নইলে আনতাম না। তবে আপনারা যে প্যাঁচার ডাকের রেকর্ডিং এনেছেন —তা আমি নিজের শুনেছি এই জঙ্গলে।মেন রোড দিয়ে যেতে যেতে, রাতের বেলা। যে দু’ দিন পিকুলদাঁড়িতে থাকবেন ভেবেছিলেন, এখানে থাকুন। ভালো লাগবে। ফুড নিয়ে ভাববেন না, আমি পাঠিয়ে দেব। দু’ দিন পরে আমার গাড়িতেই দিঘলাগড় যাবেন।”
টেন্ট খাটিয়ে, লোকজন দিয়ে শুকনো কাঠকুটো জোগাড় করে দিয়ে, ওদের সঙ্গে দ্বিপ্রাহরিক ভোজন সেরে সদলবলে চলে গেলেন সবুজদা। টিফিন-ক্যারিয়ার ভর্তি খাবার দিলেন রাতের জন্য।বললেন, “জঙ্গলে আগুন জ্বালবেন না, তবু ফায়ারউড থাক। কখন কী হয়। খাবারটাও থাক, প্যাক্ড্ ফুড খেয়ে খেয়ে চলে নাকি মশাই! সকালে আমার লোক আসবে ব্রেকফাস্ট নিয়ে। গুডলাক!”
সবুজদা চলে যাবার পরে জঙ্গলটা ঝিমিয়ে পড়ল। সূর্য আকাশের মাঝখানে। পাহাড়ে শীত শেষ হয়নি, রোদ্দুরেও জ্যাকেট পরতে হয়। বিকেলের আগেই সব সরঞ্জাম গুছিয়ে নিল ওরা। অন্ধকারে দেখার বাইনোকুলার, ক্যামেরা, স্ট্যান্ড — প্যাঁচার ডাক রেকর্ড করার জন্য সাউন্ড রেকর্ডিং-এর যন্ত্রপাতি, লম্বা মাইক্রোফোন সাজিয়ে নিল হাতের কাছে।
থমথমে জঙ্গলে দুজনে বসে। নদীর ওপারে পাহাড়ের মাথায় জঙ্গল থেকে মাথা উঁচিয়ে আছে দুর্গের ভাঙা মিনার। কুশল নদীর দিকে পেছন করে বসল।বলল, “অস্বস্তি হচ্ছে। একটা দুর্গ পুরোটা জ্বলে শেষ হয়ে গেল, ওইটুকু রয়ে গেল, তা হয় নাকি?”
নদীর দিকে পেছন করে বসলেও মজা কম। তাই দুজনেই নদীকে পাশে রেখে ফোল্ডিং চেয়ার ঘুরিয়ে মুখোমুখি বসল।
পাহাড়ে সন্ধে নামে হঠাৎ। এই ঝকঝক করছে সূর্য, এই সে পাহাড়ের ওপারে। নিচের উপত্যকায় ছায়া। ঘনিয়ে এল অন্ধকার। এই জঙ্গলে হিংস্র জন্তু নেই। একমাত্র শিকারী প্রাণী পাহাড়ি চিতাবাঘ অনেক ওপরে বরফের রাজ্যে থাকে। ক্রমে সূর্যের অভাব চোখে সয়ে গেল। আকাশ ছেয়ে গেছে তারায়। ফোল্ডিং চেয়ার আরও এলিয়ে দিয়ে দুজনে দৃষ্টি মেলে দিল আকাশের দিকে।
চারিদিক ঝিমঝিম করছে অন্ধকারে, রাতের জঙ্গল থেকে তারস্বরে চেঁচাচ্ছে ঝিঁঝিঁপোকা, দুই বন্ধু মৃদুস্বরে কথা বলছে, দূর থেকে কখনও ভেসে আসছে রাতচরা পাখির ডাক। কিন্তু সে কোথায়, যার সন্ধানে আসা?
প্যাঁচার খোঁজে আসা, তাই বেশি রাত অবধি অপেক্ষা করা উচিত। দুই বন্ধু জেগেই রইল। অন্ধকারে।
মাঝরাতের কাছাকাছি তীব্র কর্কশ ডাকে চমকে উঠল দুজনে।ছোঁ মেরে মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে তৈরি হল দেবাশিস। আরও তিন বার ডাক ভেসে এল, যন্ত্রবন্দী হয়ে গেল দুর্লভ প্যাঁচার কণ্ঠস্বর, রাত্তিরে যা শুনে ভীত গ্রামবাসীরা ভাবত পেত্নী।
ক্যামেরা হাতে এদিক ওদিক ঘুরে এল দুজনে। দেখা গেল না। উঁচু পাহাড়ের ওপরের আকাশটা উজ্জ্বল হয়ে উঠল। পুব আকাশে চাঁদ উঠেছে। পাহাড় পেরিয়ে মাঝ-আকাশে আসতে এখনও কিছু দেরি।
“আর অপেক্ষা করবি?” জিজ্ঞেস করল দেবাশিস। কুশল মাথা নেড়ে বলল, “নাঃ,।শুয়ে পড়ি। কাল সকালে একবার ওই দুর্গে যাব। কিছু একটা টানছে। মনে হচ্ছে ইন্টারেস্টিং কিছু পাব।”
দেবাশিস হেসে বলল, “গুপ্তধন?”
মাথা নেড়ে কুশল বলল, “না। চামচিকে বা বাদুড় জাতীয় কিছু ভাবছি।”
ব্যাটারি চালিত রিচার্জেব্ল লণ্ঠন বের করে দুজনে খেতে বসল। সামান্য আলোও জঙ্গলে অনেক, কিন্তু চারপাশের আলোর বৃত্তের বাইরেটা অদৃশ্য হয়ে গেল অন্ধকারে। নদীর কলকল শোনা গেলেও তার অস্পষ্ট সাদা ফেনাতোলা স্রোত আর দেখা যায় না, মাথার ওপরে ঝুঁকে পড়া গাছের পাতা কটার বাইরে আর সবই গাঢ় আঁধার।
দেবাশিস লক্ষ করল কুশল খানিক পরে পরে যেন অন্যমনস্ক হয়ে যাচ্ছে। বলল, “কী হয়েছে?”
কুশল বলল, “কিছু শুনতে পাচ্ছিস?”
শুনতে? কী শুনবে? রাতের জঙ্গলের আওয়াজ মানে তো ঝিঁঝিঁপোকা আর…
দেবাশিসের খেয়াল হলো, জঙ্গলটা একেবারে নিস্তব্ধ। কোনও শব্দ নেই। কান-ফাটানো ঝিঁঝিঁপোকার ডাক কখন থেমে গেছে।
জিজ্ঞেস করল, “রাত বাড়লে ঝিঁঝিঁপোকা চুপ করে যায়?”
কুশল মাথা নাড়ল। চাপা গলায় বলল, “আস্তে করে বাঁ হাতে তোর টর্চটা নে তো।”
দুজনেরই হাতের কাছে টর্চ আছে। আস্তে আস্তে টর্চটা তুলে নিয়ে দেবাশিস বলল, “কোনদিকে কী দেখব?”
কুশল তেমনই চাপা গলায় বলল, “আমার পেছন দিকে সরাসরি জ্বালা। মনে হচ্ছে কী যেন দাঁড়িয়ে আছে।”
অবাক হল দেবাশিস, কিন্তু কুশল চিরকালই ঠাণ্ডা মাথা ছেলে। চট করে কিছুতে ভয় পায় না। দ্বিরুক্তি না করে টর্চ জ্বালাল।
কিছু নেই।
কুশলও পেছনে ঘুরেছিল।বলল, “খালি মনে হচ্ছে পেছনে কি আছে।”
দুজনে আবার খাওয়ায় মন দিল। কিন্তু কুশলের অস্বস্তি কাটে না। খালি ঘুরে দেখে। একবার নিজের টর্চ জ্বালাল দেবাশিসের পেছনের জঙ্গলের দিকে। কিছুই নেই।
দেবাশিস খাওয়া শেষ করে থালা ধুয়ে নিল নদীর জলে। বলল, “চ’, শুয়ে পড়ি। রাত অনেক হয়েছে।”
কুশল মাথা নাড়ল। না। কিছু বলল না।
দেবাশিস বলল, “কুশল, একটা বেজে গেছে। এখন না ঘুমোলে সকালে উঠে দুর্গ দেখা যাবে না।”
কুশল বলল, “দুর্গ দেখতে হবে না। কাল এখান থেকে পালাব। অনেক হয়েছে।”
দেবাশিস অবাক, অনেক দিন কুশলের সঙ্গে জঙ্গলে ঘুরেছে। এই রূপ দেখেনি কখনও। বলল, “আচ্ছা বেশ, কিন্তু টেন্টে ঢুকে বস।ফোল্ডিং চেয়ারটা ঢুকিয়ে নে।” মনে মনে ভাবল, “আমি স্লিপিং ব্যাগে ঢুকলে আর বসে থাকতে ইচ্ছে করবে না।”
কুশল চেয়ারটা টেন্টের মধ্যে নিয়ে এল, কিন্তু দেবাশিসের ঘুম আসা অবধি চেয়ার ছেড়ে নড়ল না। অমনিই বসে রইল বাইরের দিকে চেয়ে।
৩
রাত তখন কটা? কুশলের আলতো টোকায় ঘুম ভেঙে নিঃশব্দে উঠে বসল দেবাশিস।
বাইরে অস্পষ্ট... পায়ের শব্দ?
তাঁবুর ভেতরে অন্ধকার, কিন্তু বাইরে আলো বেড়েছে। আধখানা চাঁদ পুবের পাহাড় টপকে বেরিয়েছে নিশ্চয়ই। রাত প্রায় চারটে। ভোর হতে দেরি নেই। শীতও বেড়েছে। নদীর জল থেকে কুয়াশা উঠেছে।তাঁবুর ফ্ল্যাপ নামায়নি কুশল। বাইরেটা যতটুকু দেখা যাচ্ছে কেউ নেই।
নিঃশব্দে দেবাশিস সোয়েটার পরে নিল, মাথায় দিল উলের টুপি। পা টিপে টিপে দুজনে তাঁবুর দরজার কাছে গেল। বাইরে, ঝকঝকে চাঁদের আলোয়, ফায়ারউডের স্তুপের কাছে ঘুরছে একটা বাচ্চা ছেলে!
একসঙ্গে জ্বলে উঠল দুজনের টর্চ। ছেলেটা চমকাল না মোটেই। আস্তে আস্তে ঘুরে দাঁড়িয়ে একটু হাসল।
দেবাশিস বলল, “কে তুমি? এত রাতে এখানে কী করছ?”
ছেলেটা উত্তর দিল না। উলটে প্রশ্ন করল, “তোমরা কে? এখানে এসেছ কেন?”
কুশল ফিসফিস করে বলল, “সবুজদা বলল যে, এখানে কোনও গ্রাম নেই, তাহলে এই ছেলেটা এল কোত্থেকে?”
ওরা টর্চ নিভিয়ে দিয়েছিল। দেবাশিস এবার টর্চের আলো ছেলেটার পায়ের কাছে ফেলল যাতে চোখে আলো না পড়ে। দেখা গেল ছেলেটা বৌদ্ধ ভিক্ষু। দেবাশিসবলল, “তুমি ভিক্ষু? শ্রামনেরা? এখানে তোমার গুম্ফা কোথায়?”
ছেলেটাও দু’পা ওদের দিকে এগিয়ে এল। বলল, “গুম্ফা এখানে না।”
ছেলেটার পা খালি। পাহাড়ে ঠাণ্ডার জন্য গরিবরাও জুতো পরে। কুশল বলল, “তোমার জুতো কই?”
ছেলেটা বলল, “খুলে পড়ে গেছে। তোমরা এখানে কী করছ?”
দেবাশিস বলল, “আমরা পাখি খুঁজতে এসেছি। প্যাঁচা। এখানে কোনও ভয়ানক প্যাঁচার ডাক শুনেছ? শুনতে লাগে যেন পেত্নী চেঁচাচ্ছে? আমরা কাল সন্ধেবেলা শুনেছি। দেখিনি।”
কুশল দেবাশিসকে থামিয়ে দিয়ে আবার জিগেস করল, “তুমি কি এর আগেও এখানে এসেছিলে? আমরা যখন খাচ্ছিলাম?”
ছেলেটা কুশলের দিকে তাকিয়ে বলল, “আমি তো এখানেই থাকি — সবসময়।”
“এখানে? এই জঙ্গলে?”
নদীর ওপারের পাহাড়ের দিকে আঙুল তুলে বলল, “ওই ওখানে।”
দেবাশিস বলল, “ওই ধ্বংসস্তূপের মধ্যে? ওখানে কী করে থাক? তোমার সঙ্গে আর কে থাকে?”
মাথা নাড়ল ছেলেটা। “কেউ না। আমি একা।”
ইয়ার্কি মারছে। ওরা আবার তাকাল নদীর ওপারে। ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে পুবের আকাশে, কিন্তু নদীর গিরিখাত এখনও অন্ধকারে ঢাকা। কৃপাণগড়ের ধ্বংসাবশেষ প্রায় দেখাই যায় না।
দেবাশিস হঠাৎ বলল, “চলো, তোমার থাকার জায়গা দেখে আসি।”
কুশল আঁৎকে উঠল। একবার বলতে গেল, “না,” কিন্তু দেবাশিসের মাথায় কিছু ঢুকলে আর সেটা বেরোয় না। ছেলেটাকে বলল, “এক মিনিট। দাঁড়াও,” বলে তাঁবুতে ঢুকে গেল। বাধ্য হয়ে কুশলও গেল পিছু পিছু। বলল, “তুই এই অন্ধকারে ওই ছেলেটার পেছনে পেছনে কোথায় যাবি?”
“অন্ধকারে না,” বলল দেবাশিস। “তৈরি হয়ে বেরোতে বেরোতে আলো ফুটবে।”
“তাই বলে, কথা নেই, বার্তা নেই, একটা ছেলের সঙ্গে বেরিয়ে...”
এবার দেবাশিসের একটু রাগই দেখা গেল। “তোর ব্যাপারটা কী বলতো? কাল রাত থেকে কী হয়েছে তোর? এই একটা বাচ্চা ছেলে, তায় বৌদ্ধ ভিক্ষু — ট্রেইনি।নিপাট ভালোমানুষের দেশে নিপাট ভালোমানুষ ধর্মের শিক্ষানবিশী — তাকেও ভয় পাচ্ছিস?”
কথাটা ঠিক। দেশটাই ভালো। চুরি ডাকাতি ছিনতাই হয় না।তার ওপর…
কুশল বলল, “তবু... সবুজদা কিন্তু বলেছিল এখানে কোনও গ্রাম টাম নেই।”
“গ্রাম নেই, মনাস্ট্রি আছে নিশ্চয়ই কাছেপিঠে। আচ্ছা, ঠিক আছে। তোর যদি অস্বস্তি হয়, তাহলে তুই এখানে থাক। আমি ঘুরে আসি।”
এর পর আর থাকা যায় না। কুশলও তৈরি হয়ে নিল।ক্যামেরা, সাউন্ড রেকর্ডার, ইত্যাদি নিয়ে তৈরি হতে সময় লাগে, তার পরে টেন্টও গোছাতে হল। স্লিপিং ব্যাগ ফেলে রেখে বেরোনো ক্যাম্পিঙের নিয়মে বারণ। বাইরে বেরিয়ে দেবাশিস বলল, “কই গেল?”
বাইরে আলো বেড়েছে। ভোরও বলা যাবে না, ঊষা। ছেলেটার নামটাও জিজ্ঞেস করা হয়নি। দেবাশিস একটু গলা তুলে বলল, “এই ছেলে... লামা... আছো?”
নেই।
কুশল বলল, “ভেগেছে। চ’ আমরাই ঘুরে আসি। যাব তো ঠিকই করেছিস।”
কোথায় নদী পার হওয়া যায়? জল বেশি নেই, কিন্তু খরস্রোতা। নিচে পাথর। ঠিক মতো পা না পড়লে, বা পিছলে গেলে সমস্যা হতে পারে। জলের ওপরে শুকনো পাথরে পা রেখে রেখে পার হতে পারলে ভালো।
কুশল নদীর উজানে এগোল, দেবাশিস গেল স্রোত বরাবর।
কুশলের সঙ্গেই দেখা হল। একটা বড়ো পাথরের আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে বলল, “এখানে নদী পেরোতে পারবে। তোমার বন্ধুকে ডাকো।”
দুজনে সাবধানে নদী পেরোল। গোল পাথরে পা হড়কানোর সম্ভাবনা, তার ওপরে হাতে ভারি যন্ত্রপাতি। ওপারে দাঁড়িয়ে ছেলেটা। কুশল বলল, “আরে, ও কখন পেরোল?”
দেবাশিস বলল, “অন্য পাথর দিয়ে পেরিয়েছে। আমরা হয়ত তখন দেখছিলাম না।” তার পরে ছেলেটাকে বলল, “চলো, কোন দিক দিয়ে যাব?”
ছেলেটা এগিয়ে গেল, দুজনে চলল পেছনে।
ওপারে জঙ্গল ঘন। চলার পথ নেই বললেই চলে। ছেলেটা ছুটে ছুটে আগে আগে যাচ্ছে, পেছনে ওরা। পাহাড়টা খুব উঁচু না, কিন্তু খাড়া। ভারি ক্যামেরার ব্যাগ আর রেকর্ডিং-এর যন্ত্রপাতি নিয়ে চলা কঠিন।
দুর্গের ভাঙা অংশটায় পৌঁছে পেছনে তাকিয়ে দেখা গেল অল্প আলোয় নিচে নদী ছুটে চলেছে, চারপাশ স্বচ্ছ হচ্ছে ধীরে ধীরে। দুর্গ-প্রাচীরের যে ভাঙা টুকরোটা নদীর ওপার থেকেও দেখা যায়, তার চার দিকে আর কিছুই বাকি নেই। এমনকি প্রাচীর কোন দিক থেকে এসে কোন দিকে গিয়েছিল, ডাইনে না বাঁয়ে, সামনে না পেছনে, তা-ও বোঝার যো নেই।
কুশল আবার বলল, “আর কিছুর কোনও চিহ্নটুকুও রইল না, অথচ এই অংশটা রয়ে গেল, অদ্ভুত না?”
দেবাশিস কিছু বলার আগেই মিনারের আড়াল থেকে ছেলেটা বেরিয়ে এল, ঠোঁটে আঙুল দিয়ে চুপ করতে বলে হাতছানি দিয়ে ডাকল। সাবধানে দুজনে ভাঙা দেওয়াল টপকে ঢুকল মিনারের মধ্যে।এই অংশটা ছিল দুর্গের উঁচু প্রহরা কেন্দ্র। বড়ো ঘরের মতো এর আকার আকৃতি। এক সময়ে ভেতর থেকে প্রহরীরা নজর রাখত চারদিকে। ওপর দিকের ছোটো ছোটো জানলাগুলো আর প্রায় নেই। দেওয়াল থেকে সিঁড়ির মতো যে পাথরের টুকরোগুলো বেরিয়ে থাকত সেগুলোও আর বেশি বাকি নেই। ছেলেটা আঙুল তুলে অনেক ওপরে একটা পাথরের টুকরো দেখিয়ে বলল, “তোমরা যে প্যাঁচা খুজছ, সে ওই পাথরটার ওপরে বাসা করে আছে।”
উত্তেজিত কুশল আর দেবাশিস অনেক চেষ্টা করে বুঝল যে বাসা একটা আছে। নড়াচড়াও দেখা গেল। ওদের চলাফেরাতে বিরক্ত হয়ে পাখিটা বেরিয়ে গিয়ে বসল মিনারের দেওয়ালের ওপরে। নিঃসন্দেহে ওদের কাঙ্খিত প্যাঁচা। দু’চারটে ছবি উঠতে না উঠতে উড়ে চলে গেল।
কুশল ব্যস্ত হয়ে বলল, “এখান থেকে বেরিয়ে চল। ও আমাদের আসায় বিরক্ত হয়েছে।বাসা ছেড়ে চলে যেতে পারে।”
ছেলেটা একটু ম্লান হেসে বলল, “তোমরা যাও। ও আমাকে দেখে বিরক্ত হয় না। তা ছাড়া আমি আর যাব কোথায়? আমি তো এখানেই থাকি।”
চারিদিকে চেয়ে দেবাশিস বলল, “এখানে থাক? কী করে? এখানে তো কিচ্ছু নেই। শোও কোথায়? খাও কী?”
কুশল বলল, “অন্য লোকজন কোথায়? তোমার গুম্ফা কোথায়?”
ছেলেটা বলল, “আমি একাই থাকি। সঙ্গে কেউ নেই। আমার গুম্ফা ছিল উদ্রানগরে। সে অনেক দিন আগের কথা।”
কুশল চমকে বলল, “উদ্রানগর! সে তো অনেক দূর! সেখানকার গুম্ফা তো বিখ্যাত! সেখান থেকে তুমি এখানে এলে কেন? একাই এলে?”
ছেলেটা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “সে অনেক দিন আগের কথা।আমার বাবা-মার অনেকগুলো বাচ্চা, তাদের সবাইকে খেতে দিতে পারে না বলে আমাকে পাঠিয়েছিল উদ্রানগরের গুম্ফায়। লামা হতে।সে খুব কঠিন। বড়ো লামারা খেতে দিত না, মারত খুব। অনেকে পালিয়ে যেত। কেউ ফিরে যেত নিজেদের গ্রামে, কেউ রাস্তায় মরে যেত। আমাকে একবার এমন শাস্তি দিয়েছিল যে আমি রাত্তিরে পালিয়ে গেছিলাম। পরদিন সকালে আমার দেখা হল একজনের সঙ্গে। লোকটা আমাকে বলল আমার সঙ্গে এসো, আমি তোমাকে বাড়ি নিয়ে যাব।
“ওর সঙ্গে এলাম এখানে। তখন দুর্গ ছিল না। কেবল ন্যাড়া পাহাড়। পাহাড়ের মাথায় রাজা দুর্গ বানাচ্ছিল। লোকটা আমাকে মেরে মাটির গর্তে ফেলে দিল। ওইখানে।” ছেলেটা মিনারের কোনার দিকে আঙুল দেখাল। বলল, “তার পরে এখানে দুর্গ তৈরি হল। রাজা নাম দিলেন কৃপাণগড়। আর দুর্গ যে বানিয়েছিল, বোনামকৃষ্ণ গাথানি, তার নামে পল্লী বানালেন। বোনামপল্লী। তবে টিঁকল না। এখানে রাজা এক দিনও শান্তি পাননি। অনেকেই দেখেছিল আমি রাতের বেলায় পথে পথে, এমনকি লোকের বাড়িতেও ঘুরে বেড়াই। লোকে বলত ভূত। শেষে রাজা কানাঘুষোয় জানতে পারলেন যে এই দুর্গ বানাতে একটা বাচ্চা ছেলেকে মারা হয়েছিল। বোনামকৃষ্ণকে ডেকে সব জানলেন। বললেন অন্য দুর্গ বানাতে হবে। এই দুর্গ অভিশপ্ত। রাজার আদেশে বোনামকৃষ্ণ আর এদেশে বাড়ি বানাবার অনুমতি পায়নি। অনেক বছর পর একদিন রাজা কোথায় চলে গেলেন। দুর্গ খালি হয়ে গেল। তখন আমি রাতে বোনামপল্লীতে ঘুরে বেড়াতাম। কেন জানি না লোকে আমাকে ভয় পেত। শেষে একদিন বাজ পড়ে দুর্গে আগুন লাগল, দেখতে দেখতে তিন দিন তিন রাতে দুর্গ পুড়ে ছাই হয়ে গেল। কেবল মিনারটা রয়ে গেল। সবাই বলল এ ভূতের কাজ। নদীর এপারে-ওপারে বোনামপল্লীর সব লোক পালিয়ে গেল। আমি একা হয়ে গেলাম। রাতে জঙ্গলে ঘুরে বেড়াই, আর দিনে ঘুমিয়ে থাকি — ওখানে।” ছেলেটা আবার আঙুল দিয়ে দেখাল মিনারের মাটি।
তার পরে বলল, “এখন সূর্য উঠছে। আমাকে যেতে হবে। তোমরা থাকবে এখন এখানে? তোমাদের কাপড়ের বাড়িতে? তাহলে তোমাদের সঙ্গে রাতে কথা বলব। কেউ তো নেই, তাই কারোর সঙ্গে কথা বলতে পারি না...”
ছেলেটা থামার পর হা হা করে হেসে উঠল দেবাশিস। কাঁধ থেকে ভারি ব্যাগ নামিয়ে মাটিতে রাখতে রাখতে বলল, “ভাল গল্প বলেছিস, ছেলে! দারুণ! এবার চল, তোর বাড়িটা কোথায় দেখে আসি।”
বলে মুখ তুলে দেখল কুশল হাঁ করে ছেলেটার দিকে দেখছে। কুশলের দৃষ্টি অনুসরণ করে দেখল ছেলেটা আস্তে আস্তে মাটির নিচে ঢুকে গেল। বুক অবধি গিয়ে হাত তুলে বলল, “রাতে আসব।” তার পরে সবটাই চলে গেল মাটির নিচে।
জ্ঞান হারিয়ে দেবাশিসপড়ে গেল মাটিতে। ভাগ্যিস মাইক্রোফোনটা ব্যাগের ওপরেই পড়েছিল, নইলে ভেঙেই যেত।
বাইরে অস্পষ্ট... পায়ের শব্দ?
তাঁবুর ভেতরে অন্ধকার, কিন্তু বাইরে আলো বেড়েছে। আধখানা চাঁদ পুবের পাহাড় টপকে বেরিয়েছে নিশ্চয়ই। রাত প্রায় চারটে। ভোর হতে দেরি নেই। শীতও বেড়েছে। নদীর জল থেকে কুয়াশা উঠেছে।তাঁবুর ফ্ল্যাপ নামায়নি কুশল। বাইরেটা যতটুকু দেখা যাচ্ছে কেউ নেই।
নিঃশব্দে দেবাশিস সোয়েটার পরে নিল, মাথায় দিল উলের টুপি। পা টিপে টিপে দুজনে তাঁবুর দরজার কাছে গেল। বাইরে, ঝকঝকে চাঁদের আলোয়, ফায়ারউডের স্তুপের কাছে ঘুরছে একটা বাচ্চা ছেলে!
একসঙ্গে জ্বলে উঠল দুজনের টর্চ। ছেলেটা চমকাল না মোটেই। আস্তে আস্তে ঘুরে দাঁড়িয়ে একটু হাসল।
দেবাশিস বলল, “কে তুমি? এত রাতে এখানে কী করছ?”
ছেলেটা উত্তর দিল না। উলটে প্রশ্ন করল, “তোমরা কে? এখানে এসেছ কেন?”
কুশল ফিসফিস করে বলল, “সবুজদা বলল যে, এখানে কোনও গ্রাম নেই, তাহলে এই ছেলেটা এল কোত্থেকে?”
ওরা টর্চ নিভিয়ে দিয়েছিল। দেবাশিস এবার টর্চের আলো ছেলেটার পায়ের কাছে ফেলল যাতে চোখে আলো না পড়ে। দেখা গেল ছেলেটা বৌদ্ধ ভিক্ষু। দেবাশিসবলল, “তুমি ভিক্ষু? শ্রামনেরা? এখানে তোমার গুম্ফা কোথায়?”
ছেলেটাও দু’পা ওদের দিকে এগিয়ে এল। বলল, “গুম্ফা এখানে না।”
ছেলেটার পা খালি। পাহাড়ে ঠাণ্ডার জন্য গরিবরাও জুতো পরে। কুশল বলল, “তোমার জুতো কই?”
ছেলেটা বলল, “খুলে পড়ে গেছে। তোমরা এখানে কী করছ?”
দেবাশিস বলল, “আমরা পাখি খুঁজতে এসেছি। প্যাঁচা। এখানে কোনও ভয়ানক প্যাঁচার ডাক শুনেছ? শুনতে লাগে যেন পেত্নী চেঁচাচ্ছে? আমরা কাল সন্ধেবেলা শুনেছি। দেখিনি।”
কুশল দেবাশিসকে থামিয়ে দিয়ে আবার জিগেস করল, “তুমি কি এর আগেও এখানে এসেছিলে? আমরা যখন খাচ্ছিলাম?”
ছেলেটা কুশলের দিকে তাকিয়ে বলল, “আমি তো এখানেই থাকি — সবসময়।”
“এখানে? এই জঙ্গলে?”
নদীর ওপারের পাহাড়ের দিকে আঙুল তুলে বলল, “ওই ওখানে।”
দেবাশিস বলল, “ওই ধ্বংসস্তূপের মধ্যে? ওখানে কী করে থাক? তোমার সঙ্গে আর কে থাকে?”
মাথা নাড়ল ছেলেটা। “কেউ না। আমি একা।”
ইয়ার্কি মারছে। ওরা আবার তাকাল নদীর ওপারে। ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে পুবের আকাশে, কিন্তু নদীর গিরিখাত এখনও অন্ধকারে ঢাকা। কৃপাণগড়ের ধ্বংসাবশেষ প্রায় দেখাই যায় না।
দেবাশিস হঠাৎ বলল, “চলো, তোমার থাকার জায়গা দেখে আসি।”
কুশল আঁৎকে উঠল। একবার বলতে গেল, “না,” কিন্তু দেবাশিসের মাথায় কিছু ঢুকলে আর সেটা বেরোয় না। ছেলেটাকে বলল, “এক মিনিট। দাঁড়াও,” বলে তাঁবুতে ঢুকে গেল। বাধ্য হয়ে কুশলও গেল পিছু পিছু। বলল, “তুই এই অন্ধকারে ওই ছেলেটার পেছনে পেছনে কোথায় যাবি?”
“অন্ধকারে না,” বলল দেবাশিস। “তৈরি হয়ে বেরোতে বেরোতে আলো ফুটবে।”
“তাই বলে, কথা নেই, বার্তা নেই, একটা ছেলের সঙ্গে বেরিয়ে...”
এবার দেবাশিসের একটু রাগই দেখা গেল। “তোর ব্যাপারটা কী বলতো? কাল রাত থেকে কী হয়েছে তোর? এই একটা বাচ্চা ছেলে, তায় বৌদ্ধ ভিক্ষু — ট্রেইনি।নিপাট ভালোমানুষের দেশে নিপাট ভালোমানুষ ধর্মের শিক্ষানবিশী — তাকেও ভয় পাচ্ছিস?”
কথাটা ঠিক। দেশটাই ভালো। চুরি ডাকাতি ছিনতাই হয় না।তার ওপর…
কুশল বলল, “তবু... সবুজদা কিন্তু বলেছিল এখানে কোনও গ্রাম টাম নেই।”
“গ্রাম নেই, মনাস্ট্রি আছে নিশ্চয়ই কাছেপিঠে। আচ্ছা, ঠিক আছে। তোর যদি অস্বস্তি হয়, তাহলে তুই এখানে থাক। আমি ঘুরে আসি।”
এর পর আর থাকা যায় না। কুশলও তৈরি হয়ে নিল।ক্যামেরা, সাউন্ড রেকর্ডার, ইত্যাদি নিয়ে তৈরি হতে সময় লাগে, তার পরে টেন্টও গোছাতে হল। স্লিপিং ব্যাগ ফেলে রেখে বেরোনো ক্যাম্পিঙের নিয়মে বারণ। বাইরে বেরিয়ে দেবাশিস বলল, “কই গেল?”
বাইরে আলো বেড়েছে। ভোরও বলা যাবে না, ঊষা। ছেলেটার নামটাও জিজ্ঞেস করা হয়নি। দেবাশিস একটু গলা তুলে বলল, “এই ছেলে... লামা... আছো?”
নেই।
কুশল বলল, “ভেগেছে। চ’ আমরাই ঘুরে আসি। যাব তো ঠিকই করেছিস।”
কোথায় নদী পার হওয়া যায়? জল বেশি নেই, কিন্তু খরস্রোতা। নিচে পাথর। ঠিক মতো পা না পড়লে, বা পিছলে গেলে সমস্যা হতে পারে। জলের ওপরে শুকনো পাথরে পা রেখে রেখে পার হতে পারলে ভালো।
কুশল নদীর উজানে এগোল, দেবাশিস গেল স্রোত বরাবর।
কুশলের সঙ্গেই দেখা হল। একটা বড়ো পাথরের আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে বলল, “এখানে নদী পেরোতে পারবে। তোমার বন্ধুকে ডাকো।”
দুজনে সাবধানে নদী পেরোল। গোল পাথরে পা হড়কানোর সম্ভাবনা, তার ওপরে হাতে ভারি যন্ত্রপাতি। ওপারে দাঁড়িয়ে ছেলেটা। কুশল বলল, “আরে, ও কখন পেরোল?”
দেবাশিস বলল, “অন্য পাথর দিয়ে পেরিয়েছে। আমরা হয়ত তখন দেখছিলাম না।” তার পরে ছেলেটাকে বলল, “চলো, কোন দিক দিয়ে যাব?”
ছেলেটা এগিয়ে গেল, দুজনে চলল পেছনে।
ওপারে জঙ্গল ঘন। চলার পথ নেই বললেই চলে। ছেলেটা ছুটে ছুটে আগে আগে যাচ্ছে, পেছনে ওরা। পাহাড়টা খুব উঁচু না, কিন্তু খাড়া। ভারি ক্যামেরার ব্যাগ আর রেকর্ডিং-এর যন্ত্রপাতি নিয়ে চলা কঠিন।
দুর্গের ভাঙা অংশটায় পৌঁছে পেছনে তাকিয়ে দেখা গেল অল্প আলোয় নিচে নদী ছুটে চলেছে, চারপাশ স্বচ্ছ হচ্ছে ধীরে ধীরে। দুর্গ-প্রাচীরের যে ভাঙা টুকরোটা নদীর ওপার থেকেও দেখা যায়, তার চার দিকে আর কিছুই বাকি নেই। এমনকি প্রাচীর কোন দিক থেকে এসে কোন দিকে গিয়েছিল, ডাইনে না বাঁয়ে, সামনে না পেছনে, তা-ও বোঝার যো নেই।
কুশল আবার বলল, “আর কিছুর কোনও চিহ্নটুকুও রইল না, অথচ এই অংশটা রয়ে গেল, অদ্ভুত না?”
দেবাশিস কিছু বলার আগেই মিনারের আড়াল থেকে ছেলেটা বেরিয়ে এল, ঠোঁটে আঙুল দিয়ে চুপ করতে বলে হাতছানি দিয়ে ডাকল। সাবধানে দুজনে ভাঙা দেওয়াল টপকে ঢুকল মিনারের মধ্যে।এই অংশটা ছিল দুর্গের উঁচু প্রহরা কেন্দ্র। বড়ো ঘরের মতো এর আকার আকৃতি। এক সময়ে ভেতর থেকে প্রহরীরা নজর রাখত চারদিকে। ওপর দিকের ছোটো ছোটো জানলাগুলো আর প্রায় নেই। দেওয়াল থেকে সিঁড়ির মতো যে পাথরের টুকরোগুলো বেরিয়ে থাকত সেগুলোও আর বেশি বাকি নেই। ছেলেটা আঙুল তুলে অনেক ওপরে একটা পাথরের টুকরো দেখিয়ে বলল, “তোমরা যে প্যাঁচা খুজছ, সে ওই পাথরটার ওপরে বাসা করে আছে।”
উত্তেজিত কুশল আর দেবাশিস অনেক চেষ্টা করে বুঝল যে বাসা একটা আছে। নড়াচড়াও দেখা গেল। ওদের চলাফেরাতে বিরক্ত হয়ে পাখিটা বেরিয়ে গিয়ে বসল মিনারের দেওয়ালের ওপরে। নিঃসন্দেহে ওদের কাঙ্খিত প্যাঁচা। দু’চারটে ছবি উঠতে না উঠতে উড়ে চলে গেল।
কুশল ব্যস্ত হয়ে বলল, “এখান থেকে বেরিয়ে চল। ও আমাদের আসায় বিরক্ত হয়েছে।বাসা ছেড়ে চলে যেতে পারে।”
ছেলেটা একটু ম্লান হেসে বলল, “তোমরা যাও। ও আমাকে দেখে বিরক্ত হয় না। তা ছাড়া আমি আর যাব কোথায়? আমি তো এখানেই থাকি।”
চারিদিকে চেয়ে দেবাশিস বলল, “এখানে থাক? কী করে? এখানে তো কিচ্ছু নেই। শোও কোথায়? খাও কী?”
কুশল বলল, “অন্য লোকজন কোথায়? তোমার গুম্ফা কোথায়?”
ছেলেটা বলল, “আমি একাই থাকি। সঙ্গে কেউ নেই। আমার গুম্ফা ছিল উদ্রানগরে। সে অনেক দিন আগের কথা।”
কুশল চমকে বলল, “উদ্রানগর! সে তো অনেক দূর! সেখানকার গুম্ফা তো বিখ্যাত! সেখান থেকে তুমি এখানে এলে কেন? একাই এলে?”
ছেলেটা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “সে অনেক দিন আগের কথা।আমার বাবা-মার অনেকগুলো বাচ্চা, তাদের সবাইকে খেতে দিতে পারে না বলে আমাকে পাঠিয়েছিল উদ্রানগরের গুম্ফায়। লামা হতে।সে খুব কঠিন। বড়ো লামারা খেতে দিত না, মারত খুব। অনেকে পালিয়ে যেত। কেউ ফিরে যেত নিজেদের গ্রামে, কেউ রাস্তায় মরে যেত। আমাকে একবার এমন শাস্তি দিয়েছিল যে আমি রাত্তিরে পালিয়ে গেছিলাম। পরদিন সকালে আমার দেখা হল একজনের সঙ্গে। লোকটা আমাকে বলল আমার সঙ্গে এসো, আমি তোমাকে বাড়ি নিয়ে যাব।
“ওর সঙ্গে এলাম এখানে। তখন দুর্গ ছিল না। কেবল ন্যাড়া পাহাড়। পাহাড়ের মাথায় রাজা দুর্গ বানাচ্ছিল। লোকটা আমাকে মেরে মাটির গর্তে ফেলে দিল। ওইখানে।” ছেলেটা মিনারের কোনার দিকে আঙুল দেখাল। বলল, “তার পরে এখানে দুর্গ তৈরি হল। রাজা নাম দিলেন কৃপাণগড়। আর দুর্গ যে বানিয়েছিল, বোনামকৃষ্ণ গাথানি, তার নামে পল্লী বানালেন। বোনামপল্লী। তবে টিঁকল না। এখানে রাজা এক দিনও শান্তি পাননি। অনেকেই দেখেছিল আমি রাতের বেলায় পথে পথে, এমনকি লোকের বাড়িতেও ঘুরে বেড়াই। লোকে বলত ভূত। শেষে রাজা কানাঘুষোয় জানতে পারলেন যে এই দুর্গ বানাতে একটা বাচ্চা ছেলেকে মারা হয়েছিল। বোনামকৃষ্ণকে ডেকে সব জানলেন। বললেন অন্য দুর্গ বানাতে হবে। এই দুর্গ অভিশপ্ত। রাজার আদেশে বোনামকৃষ্ণ আর এদেশে বাড়ি বানাবার অনুমতি পায়নি। অনেক বছর পর একদিন রাজা কোথায় চলে গেলেন। দুর্গ খালি হয়ে গেল। তখন আমি রাতে বোনামপল্লীতে ঘুরে বেড়াতাম। কেন জানি না লোকে আমাকে ভয় পেত। শেষে একদিন বাজ পড়ে দুর্গে আগুন লাগল, দেখতে দেখতে তিন দিন তিন রাতে দুর্গ পুড়ে ছাই হয়ে গেল। কেবল মিনারটা রয়ে গেল। সবাই বলল এ ভূতের কাজ। নদীর এপারে-ওপারে বোনামপল্লীর সব লোক পালিয়ে গেল। আমি একা হয়ে গেলাম। রাতে জঙ্গলে ঘুরে বেড়াই, আর দিনে ঘুমিয়ে থাকি — ওখানে।” ছেলেটা আবার আঙুল দিয়ে দেখাল মিনারের মাটি।
তার পরে বলল, “এখন সূর্য উঠছে। আমাকে যেতে হবে। তোমরা থাকবে এখন এখানে? তোমাদের কাপড়ের বাড়িতে? তাহলে তোমাদের সঙ্গে রাতে কথা বলব। কেউ তো নেই, তাই কারোর সঙ্গে কথা বলতে পারি না...”
ছেলেটা থামার পর হা হা করে হেসে উঠল দেবাশিস। কাঁধ থেকে ভারি ব্যাগ নামিয়ে মাটিতে রাখতে রাখতে বলল, “ভাল গল্প বলেছিস, ছেলে! দারুণ! এবার চল, তোর বাড়িটা কোথায় দেখে আসি।”
বলে মুখ তুলে দেখল কুশল হাঁ করে ছেলেটার দিকে দেখছে। কুশলের দৃষ্টি অনুসরণ করে দেখল ছেলেটা আস্তে আস্তে মাটির নিচে ঢুকে গেল। বুক অবধি গিয়ে হাত তুলে বলল, “রাতে আসব।” তার পরে সবটাই চলে গেল মাটির নিচে।
জ্ঞান হারিয়ে দেবাশিসপড়ে গেল মাটিতে। ভাগ্যিস মাইক্রোফোনটা ব্যাগের ওপরেই পড়েছিল, নইলে ভেঙেই যেত।
৪
মহাসমস্যা। দুটো ভারি ব্যাগ, একটা অজ্ঞান মানুষ। কুশল একে একে খানিকটা নামে একবার দুটো ব্যাগ নিয়ে, তারপরে দেবাশিসকে নামায় ধরে ধরে, হিঁচড়ে, এমনকি পাঁজাকোলা করেও। পনেরো মিনিটে পাহাড় চড়েছিল, নামতে লাগল প্রায় আধঘণ্টা। সকাল হয়ে গেছে। নদীর পাড়ে কুশল ঠাণ্ডা জলের ঝাপটা দিয়ে দেবাশিসের জ্ঞান ফেরাল। চোখ খুলেই দেবাশিস বলল, “মাইক্রোফোনটা?” তার পরে উঠে বসে বলল, “ইশ, প্যান্টটার কী দশা করেছিস! আমাকে টেনে টেনে এনেছিস নাকি?”
কুশল রেগে বলল, “ইয়ার্কি! একটা বাচ্চা ছেলে দেখে অজ্ঞান হয়ে গেলি, তার আগে অবধি আমাকে বলছিলি — তোর কী হয়েছে বল দেখি?”
দেবাশিসের খেয়াল হল। তাকাল পাহাড়ের মাথায় দুর্গের দিকে।“ছেলেটা সত্যিই ভূত!”
“ভূত তো বটেই। কিন্তু একটা বাচ্চা ছেলে ভূত,” বলল কুশল।
“তুই ভূত বিশ্বাস করিস?” অবাক হয়ে বলল দেবাশিস।
কুশল হেসে বলল, “তুই করিস না?”
সজোরে ডাইনে বাঁয়ে মাথা নাড়তে গিয়ে থেমে গেল দেবাশিস। আর তখনই নদীর ওপারে, যেদিকে ওদের তাঁবু, সে দিক থেকে শব্দ পাওয়া গেল জিপের।
“চ’, সবুজদা না আসলেও লোক পাঠিয়েছে, যেমন বলেছিল। নিজে নিজে নদী পেরোতে পারবি, না কি কোলে করে নিয়ে যাব?”
দেবাশিস উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “পারব। চল। আগে প্যান্টটা চেঞ্জ তো করি।”
নদী পেরোতে পেরোতে কুশল বলল, “আমি আজ রাতে এখানে থাকব না। এখনই দীঘলাগড় রওয়ানা দেব।”
দেবাশিস বলল, “দরকারও নেই। প্যাঁচা যে এখানে আছে, বাসাও করে — সবই জেনেছি। এখানে আর থাকার দরকার নেই।”
রেঞ্জ অফিসারের অ্যাসিস্ট্যান্ট দাওয়াং সেরিং যখন এসে পৌঁছলেন, তখন কুশল বাইরে গোছগাছ করছে, আর দেবাশিস টেন্টের ভেতরে। কুশল বলল, “আমাদের কাজ মিটে গেছে সেরিং-জী, পাখি পেয়েছি। কল রেকর্ড করেছি, ছবি নিয়েছি। নেস্ট করে তাও জেনেছি। আজই রওয়ানা দেব দীঘলাগড়।”
সেরিং গাড়ি থেকে টিফিন ক্যারিয়ার নামাচ্ছিলেন। থতমত খেয়ে বললেন, “আজই? স্যার যে আমাকে বললেন কাল আসবেন...”
তাঁবুর থেকে বেরিয়ে দেবাশিস দুটো ব্যাগ নামিয়ে বলল, “খালি করে দিয়েছি। খেয়ে নিয়ে টেন্ট তুলে নেব, কেমন?”
সেরিং বললেন, “সে আমার লোক করবে, কিন্তু আপনারা চলে যাবেন? গাথানি স্যার খুব দুখ্ পাবেন।আমাকে বললেন...”
দেবাশিস ক্যামেরা চালু করে ছবি দেখিয়ে বলল, “এই দেখুন।সবুজদাকে বলবেন, পাখির ছবি পেয়েছি। ফিরে গিয়ে ই-মেইল করে পাঠাব।”
উৎসাহিত হয়ে সেরিং বললেন, “গাথানি স্যার খুব খুশ হবেন। কাল থেকে অনেক বার বলেছেন, হামার রেঞ্জে উল্লু মিলবেই।” তারপরে চমকে গিয়ে বললেন, “এ কোথাকার ছবি?” হাত তুলে দুর্গ দেখিয়ে বললেন, “ওখানে?”
দেবাশিস বলল, “হ্যাঁ। ভোরে গিয়েছিলাম।”
সেরিং কী বলতে গিয়ে থেমে গেলেন। কুশল ওঁর হাত থেকে টিফিন ক্যারিয়ার নিয়ে বলল, “এটা ব্রেক-ফাস্ট? খিদে পেয়েছে।”
প্লেটে আলু পরোটা আর চাটনি নিয়ে দুজনে বসল, জোর করে সেরিং-এর হাতেও ধরিয়ে দেওয়া হল এক প্লেট।
কুশল জানতে চাইল, “আচ্ছা, গাথানি কোথাকার নাম? এ নাম তো আপনাদের দেশের না?”
মুখে পরোটা ভরে মাথা নাড়লেন সেরিং। বললেন, “ওরা অরিজিনালি এদেশের লোক না। কৃপাণগড় বানানোর সময় রাজা দক্ষিণ দেশ থেকে পাথরের গাঁথনির কাজ জানা কারিগর আনিয়েছিলেন। এই থেকেই গাথানি নাম হয়েছে। প্রথম যে এসেছিল, তার নাম ছিল বোনামকৃষ্ণ। ওর নামেই বোনামপল্লী নাম হয়েছিল। কিন্তু বোনামকৃষ্ণ ওদের দেশের এক ভয়াবহ প্রথাএখানে এনেছিল। দুর্গ তৈরির আগে একটা বাচ্চা ছেলেকে ধরে এনে দুর্গের ভিতে বলি দিয়েছিল রাতের অন্ধকারে। সে ছেলে কে কেউ জানে না। কত শো বছর আগের কথা — কিন্তু লোকে বলে ওই জন্যই দুর্গ অভিশপ্ত। ছেলেটাকে নাকি দুর্গের আশেপাশে দেখা যেত। রাজা জানতে পেরে বোনামকৃষ্ণকে নির্বাসন দেন। কিন্তু ততোদিনে সে বড়োলোক হয়ে গেছে। রাজত্ব ছেড়ে কিছুদিনের জন্য এধারে ওধারে কোথাও গেলেও বেশি দূর যায়নি।ক্রমে লোকে ভুলেও গেছে, ওরা ফিরেও এসেছে। তবে গাথানি নাম সত্ত্বেও ওরা আর বাড়ি বানায় না। সে ব্যবসা বোনামকৃষ্ণর সঙ্গেই শেষ হয়ে গেছে। বোনামপল্লী যে ওর পূর্বপুরুষের নামে সে কথা গাথানি স্যার কাউকে বলেননা। আপনারা বলবেন না, আমি বলেছি।”
ওরা সেদিনই কণ্টাকাঁই রেঞ্জ ছেড়ে চলে গিয়েছিল। এর পরে দিঘলাগড়ের আশেপাশে অনেক প্যাঁচা পাওয়া গেছিল, তাই আর বোনামপল্লী ফেরেনি। সবুজসুন্দর গাথানির সঙ্গেও আর দেখা হয়নি কোনও দিন।
ছবি — অমৃতা দত্ত
কুশল রেগে বলল, “ইয়ার্কি! একটা বাচ্চা ছেলে দেখে অজ্ঞান হয়ে গেলি, তার আগে অবধি আমাকে বলছিলি — তোর কী হয়েছে বল দেখি?”
দেবাশিসের খেয়াল হল। তাকাল পাহাড়ের মাথায় দুর্গের দিকে।“ছেলেটা সত্যিই ভূত!”
“ভূত তো বটেই। কিন্তু একটা বাচ্চা ছেলে ভূত,” বলল কুশল।
“তুই ভূত বিশ্বাস করিস?” অবাক হয়ে বলল দেবাশিস।
কুশল হেসে বলল, “তুই করিস না?”
সজোরে ডাইনে বাঁয়ে মাথা নাড়তে গিয়ে থেমে গেল দেবাশিস। আর তখনই নদীর ওপারে, যেদিকে ওদের তাঁবু, সে দিক থেকে শব্দ পাওয়া গেল জিপের।
“চ’, সবুজদা না আসলেও লোক পাঠিয়েছে, যেমন বলেছিল। নিজে নিজে নদী পেরোতে পারবি, না কি কোলে করে নিয়ে যাব?”
দেবাশিস উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “পারব। চল। আগে প্যান্টটা চেঞ্জ তো করি।”
নদী পেরোতে পেরোতে কুশল বলল, “আমি আজ রাতে এখানে থাকব না। এখনই দীঘলাগড় রওয়ানা দেব।”
দেবাশিস বলল, “দরকারও নেই। প্যাঁচা যে এখানে আছে, বাসাও করে — সবই জেনেছি। এখানে আর থাকার দরকার নেই।”
রেঞ্জ অফিসারের অ্যাসিস্ট্যান্ট দাওয়াং সেরিং যখন এসে পৌঁছলেন, তখন কুশল বাইরে গোছগাছ করছে, আর দেবাশিস টেন্টের ভেতরে। কুশল বলল, “আমাদের কাজ মিটে গেছে সেরিং-জী, পাখি পেয়েছি। কল রেকর্ড করেছি, ছবি নিয়েছি। নেস্ট করে তাও জেনেছি। আজই রওয়ানা দেব দীঘলাগড়।”
সেরিং গাড়ি থেকে টিফিন ক্যারিয়ার নামাচ্ছিলেন। থতমত খেয়ে বললেন, “আজই? স্যার যে আমাকে বললেন কাল আসবেন...”
তাঁবুর থেকে বেরিয়ে দেবাশিস দুটো ব্যাগ নামিয়ে বলল, “খালি করে দিয়েছি। খেয়ে নিয়ে টেন্ট তুলে নেব, কেমন?”
সেরিং বললেন, “সে আমার লোক করবে, কিন্তু আপনারা চলে যাবেন? গাথানি স্যার খুব দুখ্ পাবেন।আমাকে বললেন...”
দেবাশিস ক্যামেরা চালু করে ছবি দেখিয়ে বলল, “এই দেখুন।সবুজদাকে বলবেন, পাখির ছবি পেয়েছি। ফিরে গিয়ে ই-মেইল করে পাঠাব।”
উৎসাহিত হয়ে সেরিং বললেন, “গাথানি স্যার খুব খুশ হবেন। কাল থেকে অনেক বার বলেছেন, হামার রেঞ্জে উল্লু মিলবেই।” তারপরে চমকে গিয়ে বললেন, “এ কোথাকার ছবি?” হাত তুলে দুর্গ দেখিয়ে বললেন, “ওখানে?”
দেবাশিস বলল, “হ্যাঁ। ভোরে গিয়েছিলাম।”
সেরিং কী বলতে গিয়ে থেমে গেলেন। কুশল ওঁর হাত থেকে টিফিন ক্যারিয়ার নিয়ে বলল, “এটা ব্রেক-ফাস্ট? খিদে পেয়েছে।”
প্লেটে আলু পরোটা আর চাটনি নিয়ে দুজনে বসল, জোর করে সেরিং-এর হাতেও ধরিয়ে দেওয়া হল এক প্লেট।
কুশল জানতে চাইল, “আচ্ছা, গাথানি কোথাকার নাম? এ নাম তো আপনাদের দেশের না?”
মুখে পরোটা ভরে মাথা নাড়লেন সেরিং। বললেন, “ওরা অরিজিনালি এদেশের লোক না। কৃপাণগড় বানানোর সময় রাজা দক্ষিণ দেশ থেকে পাথরের গাঁথনির কাজ জানা কারিগর আনিয়েছিলেন। এই থেকেই গাথানি নাম হয়েছে। প্রথম যে এসেছিল, তার নাম ছিল বোনামকৃষ্ণ। ওর নামেই বোনামপল্লী নাম হয়েছিল। কিন্তু বোনামকৃষ্ণ ওদের দেশের এক ভয়াবহ প্রথাএখানে এনেছিল। দুর্গ তৈরির আগে একটা বাচ্চা ছেলেকে ধরে এনে দুর্গের ভিতে বলি দিয়েছিল রাতের অন্ধকারে। সে ছেলে কে কেউ জানে না। কত শো বছর আগের কথা — কিন্তু লোকে বলে ওই জন্যই দুর্গ অভিশপ্ত। ছেলেটাকে নাকি দুর্গের আশেপাশে দেখা যেত। রাজা জানতে পেরে বোনামকৃষ্ণকে নির্বাসন দেন। কিন্তু ততোদিনে সে বড়োলোক হয়ে গেছে। রাজত্ব ছেড়ে কিছুদিনের জন্য এধারে ওধারে কোথাও গেলেও বেশি দূর যায়নি।ক্রমে লোকে ভুলেও গেছে, ওরা ফিরেও এসেছে। তবে গাথানি নাম সত্ত্বেও ওরা আর বাড়ি বানায় না। সে ব্যবসা বোনামকৃষ্ণর সঙ্গেই শেষ হয়ে গেছে। বোনামপল্লী যে ওর পূর্বপুরুষের নামে সে কথা গাথানি স্যার কাউকে বলেননা। আপনারা বলবেন না, আমি বলেছি।”
ওরা সেদিনই কণ্টাকাঁই রেঞ্জ ছেড়ে চলে গিয়েছিল। এর পরে দিঘলাগড়ের আশেপাশে অনেক প্যাঁচা পাওয়া গেছিল, তাই আর বোনামপল্লী ফেরেনি। সবুজসুন্দর গাথানির সঙ্গেও আর দেখা হয়নি কোনও দিন।
ছবি — অমৃতা দত্ত

No comments:
Post a Comment