
মা
বার বার বারণ করত, রাতের
ট্রেনে আসিস না, আসিস
না। এত টাকার লোভ কেন রে তোর?
আমাদের কী
এতই অভাব? না-হয়
কয়েক হাজার টাকা কমই রোজগার
করলি? সোমত্থ
মেয়ের অত রাতে একা চলাফেরা
করার কী দরকার?
মা-কে
বোঝাতে পারি না, রাত্তির
দশটা তেতাল্লিশ শেয়ালদা,
বা শেয়ালদা
স্টেশনের পক্ষে বেশি রাত না।
লোকাল বলে লাস্ট ট্রেনে যাত্রী
থাকে অনেক। আর আমি কখনও লেডিজ-এ
উঠি না। লেডিজ অনেক সময়ই খালি
যায়। জেনারেল কম্পার্টমেন্ট
কখনওই খালি থাকে না। অবশ্য
যেটা বলি না, সেটা
হল, আমি
নামার দু-তিনটে
স্টেশন আগে থেকে গাড়ি প্রায়
একেবারেই খালি হয়ে যায়। অনেকদিনই
শেষ পনেরো বিশ মিনিট আমি একাই
থাকি। মিছিমিছি মা-কে
ভয় দেখিয়ে কাজ নেই। ওইটুকু
রাস্তা তো। এমনিতেই মনে হয়
বাড়িই পৌঁছে গেছি। আর স্টেশনে
একবার পৌঁছলে আর চিন্তা নেই।
স্টেশন থেকে বাড়ি পর্যন্ত
সবাই চেনে আমাকে।
মাঝে মাঝে
ভয় করে না যে তা নয়। বিশেষ করে
ওই, প্রায়
মিনিট আটেকের যাত্রা,
যেখানে দু-দিকে
কোনও আলো দেখা যায় না। মাঝে
একটা যায়গায় বাইশ সেকেন্ডের
জন্য আলোও নিভে যায়... তখন
কামরায় কেউ না থাকলে রীতিমত
গা ছমছম করে। আর কেউ — তখন কেউ
মানে এক জন দু-জন
— থাকলে আরও ভয় করে। আমি সবসময়
ওই অন্ধকারটা হলেই সিট বদলে
নিই। চট করে চলে যাই অন্য একটা
সিটে। আগে থেকে তাক করে রাখি
কোথায় যাব। যেই অন্ধকার হয়,
ওমনি এদিক
থেকে ওদিক, বা
ডানদিক থেকে বাঁদিকে চলে যাই।
কামরায় কেউ না থাকলেও যাই।
তবু...
মা মুখে যা-ই
বলুক, আমাদের
অভাবের সংসার। বাবা চলে যাবার
পরে দাদা চাকরিটা পেয়েছে,
কিন্তু দাদারও
তো দায়িত্ব আছে। বউ আছে,
আর মেয়েটা
বড়ো হচ্ছে। তার ওপরে মা বৌদির
সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারেনি
বলে দাদাকে বাড়িভাড়া করতে
হয়েছে। ফলে আমার মাইনের সঙ্গে
মাস-গেলে
বাড়তি সাত আট হাজার টাকা অনেক।
মা’র ওষুধগুলো তো নিশ্চিন্তে
কেনা যায়। ভাইয়ের স্কুল ফি
দেবার সময় ভাবতে হয় না।
রাত অবধি কাজ
করি। শচীনবাবু আমার ওপর তাই
খুশিই থাকেন। বলেন,
“মেয়েদের
কথা বাদ দে, একটা
ছেলেও তো দেখলাম না, যে
লাস্ট ট্রেনের জন্য অপেক্ষা
করে। সাতটা বাজতে না বাজতেই
সবাই পালায়। তবে লাস্ট ট্রেন
মিস করবি না। শেষে মাঝরাতে
ফিরে এসে বলবি, শচীনদা,
রাতে থাকব,
সে হবে না...”
তবে মার ভয়টা
এমনভাবে সত্যি হবে ভাবিনি।
রাস্তায় বেরিয়েই বুঝলাম আজ
এত দেরি করে বেরোনো উচিত হয়নি।
আজ গান্ধী জয়ন্তী। সব অফিস
কাছারি সারাদিন বন্ধ ছিল।
এমনকি হোলসেল মার্কেটের
দোকান-পাটও
এতক্ষণে বন্ধ হয়ে গিয়েছে।
গলিটা এমনিতেই অন্ধকার থাকে,
আজ যেন আরও
বেশি শুনশান। ব্যাকপ্যাকটা
পিঠে নিয়ে নিলাম। আজ হনহন করে
হাঁটতে হবে। রাস্তার কুকুরগুলো
রোজের মতো আজও ছুটে এল আমি পাশ
দিয়ে যাবার সময়। ওরা আমাকে
চেনে। মাঝরাতে ফিরতে হয় বলে
প্রায়ই ওদের আমি বিস্কুট
খাওয়াই। নইলে ঘেউউউউউ করে
তাড়া করে। আমাকে আর করে না।
লেজ নাড়তে নাড়তে ছুটে আসে
বিস্কুটের আশায়। আমি খাওয়াই।
আজ থামলাম না। হাঁটতে হাঁটতেই
বিস্কুট ফেলতে থাকলাম। বললাম,
“দাঁড়ানোর
সময় নেই রে... কাল
ভালো করে খাওয়াব...”
গলি থেকে
বেরিয়ে বৌবাজার ধরে খানিকটা
গিয়ে খেয়াল হল, মা
বলেছিল মাংস রান্না করবে,
এটিএম থেকে
যেন কিছু ক্যাশ টাকা তুলে আনি।
কাল রবিবার দাদা-বৌদি
আসবে। এমনিতে মা বৌদির পেছনে
নানা কথা বলতে ছাড়ে না,
কিন্তু বাড়িতে
দাদা-বৌদি
এলে আদিখ্যেতা করে। এটা আমার
ভালো লাগে না, কিন্তু
অশান্তি এড়াতে টাকা তুলে দিই।
ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলাম। পেছনে
ফেলে আসা এটিএম-এ
কি আলো জ্বলছে? নইলে
মা-কে
বলতে পারব, এটিএম-ও
বন্ধ ছিল গান্ধী জয়ন্তী উপলক্ষে।
আলো জ্বলছে।
ঘুরে ফিরে গেলাম আবার। ভেতরে
একটা লোক দাঁড়িয়ে আছে। মেশিনের
সামনে, আমার
দিকে পেছন করে। টাকা তুলছে?
আমি বাইরেই
দাঁড়িয়ে রইলাম। মোবাইলে ঘড়ি
দেখছি। তাড়াতাড়ি করতে হবে।
লোকটা বেরিয়ে
এল। আমার মুখের দিকে ভালো করে
তাকাল কি? বেসবল
ক্যাপ পরে আছি। চট করে বোঝার
উপায় নেই, কিন্তু
মুখ দেখতে পেলে বুঝতে পারবে
আমি মেয়ে, ছেলে
নই। চট করে মাথাটা উলটো দিকে
ঘুরিয়ে নিলাম। দরজা ঠেলে ঢুকে
পড়লাম ভেতরে। লোকটা বলল,
“দু-হাজারের
নোট নেই। শুধু পাঁচশো।”
আমার সাতশো
টাকা দরকার। কাল এক কেজি মাংস
আর আনুসঙ্গিক। চট করে টাকা
বের করে নিয়ে জিনসের ছোটো
পকেটে গুঁজে নিলাম। দরজা ঠেলে
বেরিয়ে প্রায় দৌড়লাম স্টেশনের
দিকে। দশ মিনিটে ট্রেন ছাড়বে।
পেছনে এটিএম-এর
লোকটা কি আসছে? দেখার
সময় নেই।
অন্য দিন এসব
জায়গায় বৈঠকখানা বাজারের
মুটে আর অন্য লোকের চলাফেরা
থাকে। আজ প্রায় কেউ নেই। মুটেরাও
যারা আছে, তারা
একত্রে বসে নেশা করছে। গাঁজার
গন্ধ চারপাশে। আমার ছুটে যাওয়া
দেখে তারা মুখ তুলে তাকাচ্ছে।
ওরাও চেনে আমাকে। রোজই এই সময়ে
যাই। কে একজন হেঁকে কী বলল,
তাড়াহুড়ো না
করতে ধরনের কিছু, কিন্তু
আমার সময় নেই। ফ্লাইওভারের
নিচ দিয়ে এক ছুটে নর্থ স্টেশনে
ঢুকে দেখলাম আমার ট্রেন দাঁড়িয়ে
আছে এখনও। সময় নেই। এক ছুটে
প্ল্যাটফর্ম ধরে এগোলাম —
ট্রেনটা কি আজ একেবারেই ফাঁকা?
কেউ নেই?
ছড়িয়ে ছিটিয়ে
এক-দুজন
লোক। মুখ চেনা নয় তারা। অনেকটা
এগিয়ে গেলে যদি আরও কেউ থাকে,
হনহনিয়ে
এগোচ্ছি, এমন
সময় ট্রেনটা ছেড়ে দিল। ছুটে
এগিয়ে গিয়ে সামনের দরজাটা
দিয়ে উঠে পড়লাম।
যাক। এ কামরাটায়
তবু জনা পাঁচ-ছয়েক
লোক রয়েছে। তিন-জনকে
আমি প্রায়ই দেখি। তাদের মধ্যে
দু-জন
বেশি দূর যাবে না। চার-পাঁচটা
স্টেশন পরেই নেমে যাবে। তবু,
মানুষ তো।
আমি উঠে একটা ফাঁকা দিক দেখে
জানলার পাশে বসলাম। লক্ষ
করলাম, কামরার
একেবারে ওদিকে একটা ইয়ং মেয়ে
বসে আছে। আমারই বয়সী হবে। চোখে
পড়ল ওর কয়েকটা সিট দূরে একটা
লোক — হাবভাব ভালো না। এরকম
চোখের দৃষ্টি দেখলে সে লোকের
ধারে কাছে আমি বসি না। খেয়াল
রাখতে হবে।
পিঠ থেকে
ব্যাকপ্যাক নামিয়ে কোলে রেখে
বই খুলে বসলাম। ইংরিজি পেপারব্যাক।
হাতে ইংরিজি বই থাকলে লোক্যাল
ট্রেনে কথা বলতে হয় না। বেসবল
ক্যাপের ওপরের ভাইজরটা টেনে
নামিয়ে নিলাম যাতে মুখটা আরও
ঢাকা পড়ে। বই পড়ার চেয়েও খেয়াল
রাখতে হয় বেশি কেউ খুব কাছে
এসেছে কি? আবার
বইও পড়তে হয়। কে জানে,
কেউ নজর করছে
কি না, আমার
হাত সময় মতো পাতা ওল্টাচ্ছে
কি...?
রাতের ট্রেন
মনে হয় খুব জোরে চলে। কিন্তু
তা নয়। দিনের ট্রেনের মতোই
সে চলে, থামে,
স্টেশনে লোক
নামে ওঠে... এই
ট্রেন অবশ্য কেবল নামানোরই
ট্রেন। অন্যান্য দিন বিধাননগর
রোড এবং দমদম জংশন থেকে কিছু
লোক তবু ওঠে, আজ
কেউ উঠল না। আমাদের কামরায়
অন্তত না। দমদমের পরে আলো কমে
এলো, কোথাও
হালকা কুয়াশাও দেখা যাচ্ছে।
এখনও পুজো আসেনি, তাই
হাওয়ায় শীতের শিরশিরানি টের
পাচ্ছি না। ট্রেনের জানলা
দরজার আলো-ই
লাইনের ধারের গাছপালাকে যা
আলোকিত করছে, তার
বাইরে অন্ধকারে টুকরো টুকরো
অল্প আলোর চমক। জেগে থাকা
জানলার নীলচে সাদা ফ্লুরোসেন্ট
চৌকো।
একঘণ্টা দশ
মিনিট। এই আমার যাত্রাপথ।
তারপরে মিনিট পনেরো হাঁটা।
বাড়ি পৌঁছতে মাঝরাতই হয়ে যায়।
ক্লান্তিতে শরীর ভেঙে আসছে।
মাঝে মাঝে বইটা বেঁকে যাচ্ছে
হাতে ধরা অবস্থায়। কোনও কোনও
দিন আমার মনে হয় আমি বুঝি ঘুমিয়ে
পড়ব, আর
আমার স্টেশন পেরিয়ে যাবে।
তাহলে যে কী করব, আমি
জানি না...
মা-কে
ফোন করে কথা বলা যেত। কিন্তু
মা-র
বিশ্রাম দরকার। বেচারার সারা
দিন এত খাটনি যায় যে ফোন করে
বকবক করতে মন চায় না। ভাই পড়ছে,
বা ঘুমিয়ে
পড়েছে। ওকে জ্বালানোর মানে
নেই। বেখেয়ালে টুপিটা খুলে
পাশে রেখে চোখ রগড়ে ঘুম তাড়িয়ে
বুঝলাম ভুল করেছি। কামরায়
প্রায় আর লোকই নেই, সবাই
নেমে গেছে। কেবল কিছু দূরে
একজন বসে আছে আমার দিকে পেছন
করে। কিন্তু ওই প্রান্তে সেই
মেয়েটা আর লোকটা দুজনেই লক্ষ
করেছে আমার টুপি খোলা চেহারা।
টুপির নিচ থেকে বেশ খানিকটা
চুল খুলে আমার পিঠের মাঝামাঝি
অবধি নেমে এসেছে। দুজনেই
একদৃষ্টে চেয়ে আছে আমার দিকে।
ধরা যখন পড়েই
গেছি, তখন
আর করার কিছু নেই। ধীরেসুস্থে
আবার চুলটাকে গুছিয়ে মাথার
ওপরে এনে টুপি দিয়ে ঢেকে দিলাম।
সোজা হয়ে বসলাম বই হাতে। ট্রেনটা
কয়েকটা স্টেশন ছাড়াল। এবার
যে স্টেশনটা আসবে তাতে নামবে
ওই পেছন ফেরা লোকটা। রোজই
নামে। স্টেশন আসার বেশ কিছুক্ষণ
আগে থেকে এসে দরজায় দাঁড়ায়।
তারপরে ট্রেন স্লো হলে থামার
আগেই রানিং-এ
নেমে যায়, পেছন
দিকে ঘুরে দৌড় লাগায়। আমার
মনে হয়, এত
রাতে বোধহয় আবার কোনও বাস টাস
ধরে।
স্টেশন এল।
লোকটা নেমে দৌড় লাগাল। এবারে
সেই গা-ছমছমে
অন্ধকারের মধ্যে দিয়ে আট
মিনিটের রান। যার মধ্যে কোনও
সময়ে আলো নিভবে কারণ ট্রেন
যাবে দুটো ফেজ-এর
মধ্যে দিয়ে। বাইশ সেকেন্ডের
অন্ধকার। আমি দেখতে শুরু করেছি
কোথায় উঠে যাব, এমন
সময় কামরার ওপার থেকে একটা
নড়াচড়ায় নজরটা ওদিকে চলে গেল।
ওই বদমাশ
গোছের লোকটা উঠে গিয়ে মেয়েটার
পাশে বসেছে। হাত ধরার চেষ্টা
করছে। মেয়েটা হাত টেনে নিচ্ছে,
লোকটা ঝুঁকে
পড়ে হাত আবার টানছে।
কী করব?
আমার কি উঠে
ওদিকে যাওয়া উচিত? লোকটা
ষণ্ডামতো। আমি প্যাংলা। খড়কে
কাঠির মাথায় আলুদ্দম। আমার
চেয়ে ওই মেয়েটা অনেক বেশি
তাগড়া। তবু, দুজন
হলে হয়ত মেয়েটা সাহস পাবে...
কিন্তু আমি
ভেবে কিছু ঠিক করার আগেই মেয়েটা
উঠে এসে আমার উলটো দিকে বসে
বলল, “দিদি,
আমি এদিকে
এসে বসলাম, ওই
লোকটা খুব অসভ্যতা করছে...”
আমি তো আর
বেশিদূর যাব না। মেয়েটা কতদূর
যাবে? আমি
কিছু না বলে জানলা দিয়ে বাইরে
তাকালাম। অন্ধকার। লাইনের
দু-দিকে
শুধু জলা। বসতি নেই। তাই
অন্ধকার। আমি কিছু বলার আগেই
লোকটা উঠে এসে মেয়েটার উলটো
দিকে বসল। বলল, “এদিকে
এসে বসলে লাভ কী হবে? এই
তালপাতার সেপাই তোমাকে রক্ষা
করবে? আমি
তো বলছি, কিছু
করব না। একটু শুধু হাতটা ধরব।
আর দু-একটা
চুমু খাব। ব্যাস। দাও না,
হাতটা?”
বলে আবার
হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে মেয়েটার
হাতটা ধরল, সেই
সঙ্গে ঝুঁকে পড়ে ঠোঁটে চুমু
খেতে চেষ্টা করল। মেয়েটা ঘাড়
ঘুরিয়ে নিয়েছিল, তাই
চুমুটা পড়ল বাঁ গালে।
আমি ভেবে
পাচ্ছিলাম না কী করব। লোকটা
আমার বাঁ দিকে। মেয়েটা উলটো
দিকে। লোকটা আর আমার মধ্যে
একটা খালি সিট। মেয়েটার পাশে,
আমার উলটো
দিকে দুটো খালি সিট। দুজনের
বসা এমন যে ট্রেনের ভেতরটা
অন্ধকার হবার পরে আমি দূরে
যেতে পারব না। বড়োজোর নিজের
জায়গা থেকে উঠে মেয়েটার পাশে
গিয়ে বসতে পারব। তাতে আমি
রক্ষা পাব কি? আমার
মনে হচ্ছে, খুব
শিগগিরি আক্রমণ আমার ওপরে
শুরু হবে।
লোকটা এবার
দু-হাতে
মেয়েটার দু-গাল
চেপে ধরে ঠোঁটে চুমু খাচ্ছে।
মেয়েটা ছটফট করছে, আর
বলছে, “ছাড়ুন,
ছাড়ুন...”
কিন্তু কথা
স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে না। লোকটা
চুমু খাওয়া থামিয়ে এবার আমার
দিকে ফিরল। বলল, “দেখেছেন,
আপনার দিদি
কেমন আপনাকে রক্ষা করবে বলে
ঘুঁষি পাকিয়েছে!” আমিও
আমার হাতের দিকে তাকালাম।
অজান্তেই আমার হাতটা মুঠো
হয়ে গিয়েছিল। মেয়েটাও তাকাল।
আমি আবার বাইরে তাকালাম। ঘন
অন্ধকার বাইরে। ভেতরের আলো
নেভারও দেরি নেই। কিন্তু আমি
আর বসে থাকলাম না। উঠে দাঁড়িয়ে
ব্যাগটা তুলে নিলাম। এবারে
পিঠে না, সামনে।
বুকটা প্রোটেক্ট করার জন্য।
আমি ওদের চালটা ধরে ফেলেছি।
ওরা রেপিস্ট আর ভিক্টিম না।
ওরা দুজনে একসঙ্গে কাজ করছে।
ওরা ডাকাত। আমার ব্যাগ কেড়ে
নেবে, আমার
জামাকাপড়ের পকেট সার্চ করবে।
তারপরে আমাকে চলন্ত ট্রেন
থেকে ফেলে দেবে লাইনের ধারের
জলায়। কপাল ভালো থাকলে কোনও
দিনই ডেডবডি খুঁজে পাওয়া যাবে
না।
মুখোমুখি
বসে আছে বলে দুজনের হাঁটুতে
হাঁটুতে লেগে একটা ব্যারিয়ারের
মতো হয়ে আছে। সেটা দেখেই আমার
সন্দেহ হয়েছিল। এ-দিকে
হাত ধরতে দিচ্ছে না, চুমু
খাওয়ায় আপত্তি, কিন্তু
হাঁটুতে হাঁটু লাগিয়ে দুজনে
বসে আছে যাতে আমি বেরোতে না
পারি। লোকটা চুমু খাওয়া বন্ধ
করেছে, কিন্তু
মেয়েটা এক চুলও সরে বসছে না।
ব্যাগের ওপর
দিয়ে আমি দুজনের হাঁটুর দিকে
তাকালাম, তারপরে
তাকালাম মেয়েটার দিকে। মেয়েটা
তখনও নাটক করছে। বলল,
“দিদি,
আপনি চলে
যাবেন — ও তো আমাকে ছিঁড়ে খাবে
তারপরে।”
আমি উত্তর
দিলাম না। লোকটা বলল,
“চলেই যাবে
ডিয়ার? কোথায়
নামবে? এখনও
তো পরের স্টেশন আসতে দেরি আছে।
তার চেয়ে বসো। তোমাকেও একটা
চুমু খাই...”
পরের স্টেশনে
আমি নামব না। আমার নামতে আরও
দুটো স্টেশন বাকি। কিন্তু
আমি চুপ করে চেয়ে রইলাম। লোকটা
আমার খুব কাছে। আমি দাঁড়িয়ে
আছি বলে চট করে আমার কোমর জড়িয়ে
ধরতে পারবে। কিন্তু আমার ধারণা
ও এখন কিছু করবে না। ও আমাকে
ধরার চেষ্টা করবে যখন ট্রেনের
ভেতরের সব আলো নিভে যাবে। ওর
ধারণা আমি তখন কিছু দেখতে পাব
না।
আমি ছোট্ট
এক পা পিছিয়ে জানলার দিকে
গেলাম। একবার ভাবলাম চট করে
সিটের ওপরে উঠে সিট টপকে দরজার
দিকে চলে যাব কি না। কিন্তু
চেষ্টা করলাম না। পালানোর
জায়গা নেই। তাই এখানে দাঁড়িয়ে
লড়া-ই
ভালো।
লোকটা বলে
চলেছে, “বসো,
দিদিমণি,
বসো। আমার
পাশে বসো। একটা চুমু দাও আমাকে।
দাও না...”
আলোটা নিভে
গেল। ওমনি লোকটা আমার দিকে
থাবা মেরেছে। যেটা ও জানত না,
সেটা হল আমি
অন্ধকারে ওর চেয়ে অনেক ভালো
দেখতে পাই। আর জানত না আমার
গায়ে কতটা জোর। খপ করে হাতটা
ধরে কবজিটা এত জোরে ওপর দিকে
তুলে দিলাম, যে
রিস্ট-জয়েন্টটা
ভেঙে হাতটা একেবারে উলটো দিকে
ঘুরে গেল। লোকটা কেবল একটা
গোঙানির মতো শব্দ করে নেতিয়ে
পড়ছিল, আমি
ঘাড়টা ধরে এত জোরে ওর মাথাটা
জানলার নিচের অংশের সঙ্গে
ঠুকে দিলাম, যে
গোটা ট্রেনটাই যেন ঝনঝন করে
উঠল। লোকটা মাটিতে পড়ে গেল,
আর নড়ল না।
আর নড়বেও না। কোনও দিনই।
প্রায় সঙ্গে
সঙ্গেই আলতো পায়ে লাফিয়ে উঠলাম
সিটের ওপর, মেয়েটার
পাশে। মেয়েটার কাছে ছুরি আছে
একটা। বড়ো ছুরি। সেটা নিয়ে
আক্রমণ করবে যখন দেখবে ওর
শাগরেদ, বা
লিডার, যে-ই
হোক, আছড়ে
পড়ে আছে। সিটের পেছন টপকে সবে
ওদিকের সিটের ওপর গিয়ে দাঁড়িয়েছি,
ট্রেনের আলো
জ্বলে উঠল। এক লহমায় কী হয়েছে
দেখে নিয়ে মেয়েটা আমার দিকে
ঝাঁপ মারল ছুরিটা বাগিয়ে।
আমি ততক্ষণে সিট ছেড়ে নেমেছি।
ছুরিটা চালিয়েছিল আমার শরীরের
মাঝামাঝি। অনভিজ্ঞ বলে সেটা
গিয়ে ঢুকল আমার বুকের সামনের
ব্যাগে। বই বা কিছুতে আটকে
গেছে। মেয়েটা টানাটানি করছে,
আর সেই ফাঁকে
আমি এক হ্যাঁচকায় ওকে কাছে
টেনে এনে দু হাতে ওর চোয়াল ধরে
এমন ঘোরালাম এক দিকে, যে
মট করে ঘাড় ভেঙে নেতিয়ে পড়ল।
আমার গায়ে
কত জোর ওরা জানত না। আমি যে
অন্ধকারে দেখতে পাই,
তা-ও
জানত না। ওরা যাদের আক্রমণ
করে তাদের দিকে ওরা ভালো করে
তাকায় না বলে মুখটাও চিনতে
পারেনি।
ট্রেন এখনও
মিনিট দুয়েক যাবে জলার পাশ
দিয়ে। আমি দুজনকে হিঁচড়ে টেনে
এনে দরজা দিয়ে বাইরে ছুঁড়ে
ফেললাম এক এক করে। ঝপ ঝপ করে
দুটো শব্দ হল। ফাঁকা ট্রেনে
কেউ শোনার নেই। আর শুনলেও
স্পষ্ট বুঝতে পারবে না ট্রেনের
শব্দের ওপর দিয়ে। কিছুক্ষণের
মধ্যেই পানা আর জলার জঙ্গলের
মধ্যে ডুবে যাবে ওরা। কপালে
থাকলে কোনও দিনই আর খুঁজে
পাওয়া যাবে না ওদের মৃতদেহ।
যেমন পাওয়া
যায়নি আমাকেও। গত বছরে এই
দিনেই ওরা আমাকে ছুঁড়ে ফেলেছিল
এখানেই কোথাও। এখনও আমার মা
রোজ ক্লান্ত দেহ-মন
নিয়ে অপেক্ষা করে মাঝরাতের
পর অবধি, যদি
ফিরে আসি আমি...
No comments:
Post a Comment