Saturday, March 10, 2018

ভাম


- এক -
সন্ধে থেকেই আকাশ কালো হয়ে এসেছিল সেদিন। রাত একটু বাড়তেই আকাশ ভেঙে নেমেছিল বৃষ্টি। বিদ্যুতের চমকের সঙ্গে সঙ্গে চারিদিক আলো হয়ে উঠছিল।
বাগানের নর্দমার পাশে একটা বড়ো কচুপাতার নিচে মা-ভামটা অনেকক্ষণ অপেক্ষা করে ছিল। রাত বাড়ে – বৃষ্টি থামার নাম নেই। আর দেরি করা যায় না। কচুপাতাগুলোর মধ্যে লুকোনো ছোট্ট গর্তটা জলে ভরে গিয়েছে। জল শুকোতে শুকোতে অন্ততঃ কাল বিকেল। আর উপায় না পেয়ে মা-ভাম এক ছুট্টে বাগানের অন্য দিকে চলে গেল। পথে দুটো ব্যাং ছিটকে পালিয়ে গেল। কিন্তু তখন মা-ভামের ব্যাঙের দিকে তাকান’র সময় নেই। সে যাচ্ছে বাগানের কোণায় ছোটো ঘরটায়, যেখানে আগে চাকরবাকর থাকত, এখন সবসময়েই বন্ধ পড়ে থাকে। নর্দমার ভাঙা ঝাঁঝরা দিয়ে মা-ভাম ঘরের মধ্যে ঢুকল। আর সেই ঘরেই, গভীর রাত্তিরে, কিছু ছেঁড়া কাগজের মধ্যে, জন্মাল একটা ছোট্ট ভাম বাচ্চা। এই, আমার বুড়ো আঙুলটার মতো লম্বা। বাইরে তখন প্রবল বৃষ্টি।
বাচ্চাটা হবার পরে মা-ভামটা একটু অপেক্ষা করল, কিন্তু আর বাচ্চা হল না। অবাক হল মা-ভাম। এর আগে ওর যতবার বাচ্চা হয়েছে, অন্ততঃ দুটো জন্মেছিল। একবার তো ছটা হয়েছিল। কিন্তু তখন আর ভাবার সময় নেই। বাচ্চাটা চার পায়ের ফাঁকে মায়ের পেটের কাছে শুয়ে দুধ খেতে শুরু করেছে। মা-ভামটা খানিকক্ষণ ওর পিঠ চেটে পরিষ্কার করে তার পর ওখানেই শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ল।
তিন দিন একই ভাবে বাচ্চাকে দুধ খাইয়ে মা-ভামটার খিদে পেল। রাত্তির বেলা, বাচ্চাটা তখন দুধ খেয়ে ঘুমিয়েছে, মা ঘর থেকে বেরিয়ে বাগানের গাছে চড়ে কয়েকটা আধপাকা আম, উচ্চিংড়ে আর মথ খেয়ে আবার ফিরে এল ঘরের মধ্যে।
এইভাবে চলতে লাগল রোজ। একদিন মা ফিরে এসে দেখল, বাচ্চাটা চোখ মেলে তাকিয়ে আছে। আর বেশি দেরি নেই। এবার কিছুদিনের মধ্যেই ও মায়ের মতো চলতে, ফিরতে, খেতে শিখে যাবে।
বাগানটা বাড়ির পিছন দিকে। সামনে চওড়া রাস্তা। রাস্তার ওপারে আবার বাড়ি, আর একটা পার্ক। বাচ্চা-ভাম যখন নিজে নিজে চলতে শিখল, তখন, একদিন অনেক রাত্তিরে, সবাই ঘুমিয়ে পড়ার পর, মা তাকে নিয়ে পাঁচিলের ওপর দিয়ে হেঁটে এল রাস্তার ধারে। গেটের ওপর বাগানবিলাস গাছের পাতার আড়ালে লুকিয়ে ছেলেকে দেখাল, “ওই দেখ। ওই কালো জিনিসটা হল রাস্তা। ওটা দিয়ে মস্তো মস্তো গাড়ি চলে। খুব সাবধান। ওগুলোর নিচে পড়লে এক্কেবারে মরে যাবি। কুকুর বেড়াল মরে যায়, কিন্তু আমরা ভামেরা বেশি মরি না। আমরা রাস্তা পেরোই না বেশি।”
বাচ্চা ভাম জিজ্ঞেস করল, “রাস্তার ওপারে কী আছে, মা?”
মা বলল, “এদিকে যা আছে, ওদিকেও তাই। চল, এদিকটা তোকে দেখাই।”
রাস্তার পাশের সবকটা বাড়ির পেছনে বাগান। বাগানগুলো সবকটাই একমানুষ-দেড়মানুষ সমান পাঁচিল দিয়ে দিয়ে আলাদা করা। মানুষরা সেই পাঁচিলের আড়ালে থাকে, কিন্তু ভামদের তো পাঁচিল দিয়ে আলাদা করা যায় না, তাই ওদের কাছে সব বাড়িগুলোর বাগান মিলিয়ে এক বিশাল রাজত্ব। তাতে কত ফলের গাছ, কত পোকা, কত ব্যাং, কত ইঁদুর – সবই তাদের খাদ্য।
রাত্তিরে, যখন মানুষরা ঘুমিয়ে পড়লে ওরা পোড়ো ঘরটা থেকে বেরোত খাবার খুঁজতে। মাঝরাত্তির অবধি খুঁজে খুঁজে খাবার খেত ওরা। তারপর, শেষ রাত থেকে শুতে যেত। সারা দিন ঘুমোত। উঠত আবার সূর্য ডোবার পরে।
মা শেখাত কী করে ফল চিনতে হয়। কোনটা পাকা, কোনটা ভালো – কোনটা টুকটুকে লাল হলেও ভেতরে তেতো; শেখাত কী করে পোকা, ইঁদুর আর ব্যাং শিকার করতে হয় – বর্ষাকালে কখনও একটা-দুটো সাপও ঢুকে পড়ত বাগানগুলোতে। মা-ভাম সাবধানে ঝোপের আড়াল থেকে লুকিয়ে গিয়ে সেগুলোও শিকার করতে জানত। সবই শেখাত।
ওই ছাই-রঙের বাড়িটা দেখে রাখ,” শেখাত মা-ভাম। “ওদের কুকুরটা ছোটো হলে কী হবে, সাংঘাতিক চালাক আর পাজি। কী করে জানি ঠিক বুঝে যায় আমরা কোনখান দিয়ে পাঁচিলটা টপকাব। আর পা টিপে টিপে ঝোপের আড়াল দিয়ে কাছে এসে অপেক্ষা করে। ওদের বাগানে কক্ষনো পাঁচিল থেকে মাটিতে নামবি না। কোন গাছের আড়াল থেকে এসে খপ করে গলাটা ধরবে, বুঝতেও পারবি না। পাঁচিল থেকে সোজা গাছের ডালে লাফ মারবি। তবে ওই হলদে বাড়ির বিরাট কুকুরটা কিন্তু কোনও সমস্যা করে না। ওদের বাগানে ঘুরে বেড়ালেও কিচ্ছুটি বলবে না, শুধু এক-চোখ ফাঁক করে দেখে নেবে তুই কতটা দূরে। যদি বেশি কাছে যাস, তাহলে জোর হইচই করে উঠে তাড়া করবে, কিন্তু সে সব দেখান’র জন্য। ধরে ফেললেও কামড়াবে না। নাক দিয়ে ঠেলবে।”
পাঁচিলের ওপর বসে বাচ্চা-ভাম অবাক হয়ে ভাবত, তাই তো! বড়ো কুকুরটার থেকে ভয় কিছু নেই, ছোট্ট ওইটুকু একটা কুকুর – তাকে ভয় পেতে হবে!
মা-ভাম আরও সাবধান করত, “বেড়ালদের থেকে দূরে থাকবি। বেড়ালরা খুব বিপজ্জনক। ওদের থাবার ভেতরে লুকোনো নখে ভীষণ ধার – ফ্যাঁশ্‌ করে বের করে চোখে মুখে আঁচড়ে দেয়।”
বাচ্চা-ভাম বলল, “কিন্তু ওদের দেখতে খানিকটা আমাদের মতো, না?”
মা-ভাম ভয়ানক রেগে গেল। বলল, “কক্ষনো না! বললেই হল? তুই তো দেখছি মুর্খ মানুষদের মতো বলছিস। বোকা মানুষগুলো আমাদের ভাম বেড়াল বলে। আমরা মোটেই বেড়াল নই। আমরা আলাদা।

- দুই -
দিন কাটে। বাচ্চা-ভাম বড়ো হয়। নিজে নিজে শিকার ধরতে শেখে। দেখতে দেখতে মায়ের সমান বড়ো হয়ে গেল। এক দিন আর ফিরে এল না মায়ের সঙ্গে সেই ভাঙা ঘরটায় শুতে। মা-ভাম অপেক্ষা করল ভোর অবধি। তার পর ও-ও চলে গেল ঘরটা ফেলে। আবার যদি কখনও দরকার পড়ে, তাহলে ফিরবে।
আগের দিন রাত্তিরে, সব যখন শুনশান, গাড়িঘোড়া আর চলছে না, বাচ্চা-ভামটা রাস্তা পেরিয়ে চলে গেছিল ওই পারে। গিয়ে দেখল, মা যেমন বলেছিল তেমনই – একই রকম। ওর আর ফিরতে মন চাইল না। চার-পাঁচটা বাগান জুড়ে থাকতে শুরু করল। রাতে বাগানে শিকার করে, গাছের ফল খায় আর দিনে একটা তিনতলা বাড়ির তিন তলায় থাকে।
বাড়িটা পুরোনো। একেবারে ওপরের তলায় কেউ থাকে না। ঘরের দরজাগুলো তালাবন্ধ, কিন্তু ভাঙাচোরা। ঢুকতে বেরোতে ওর মোটেই অসুবিধা হত না। বাড়ির দোতলায় শুধু এক বুড়ো আর এক বুড়ি থাকত। তারা সন্ধে হলেই ঘরে ঢুকে কাঁথামুড়ি দিয়ে ঘুমোত। টিভি-ও দেখত না। আর একতলায় ছিল সামনের দিকে একসার দোকান, পেছনে দোকানগুলোর ভাঁড়ার ঘর। দিনের বেলা লোকজন থাকত, রাত্তিরে সারা বাড়িতে ওই একটা ঘরে কেবল বুড়ো আর বুড়ি।
ভামের ভারি মজা। সন্ধে নামলে ওর ঘুম ভাঙত। আগে যে বাড়িতে থাকত, সেখানে সন্ধেবেলা ঘরের বাইরে যাওয়া যেত না, কারণ মানুষরা জেগে থাকত, চলাফেরা করত। আর বাড়ির সামনের দিকে যাওয়ার তো প্রশ্নই উঠত না। আলোয় তখন চারিদিক ঝলমল করছে।
কিন্তু এই ভাঙা বাড়ির তিনতলার সামনের অন্ধকার বারান্দার রেলিং-এ বসে ভাম রাতের রাস্তার আলো দেখত, গাড়ি দেখত আর অপেক্ষা করত, কতক্ষণে লোকে আলো নিভিয়ে শুতে যাবে – ও বেরোবে খাবার খুঁজতে।
বাড়ির একতলার দোকানগুলোর মধ্যে একটা ছিল ফলের দোকান। একদিন রাত্তিরে ঘুরতে ঘুরতে ভাম দেখল ফলের দোকানের গুদাম ঘরের দেওয়ালের একটা ঘুলঘুলি ভাঙা। পুরোনো দিনের বাড়ি তো, দেওয়ালে ছাদের কাছে ফুটো থাকত – তাকে বলে ঘুলঘুলি। সেগুলো জাফরি দিয়ে বন্ধ থাকত – যাতে বেড়াল বা পাখি ঢুকতে না পারে। পুরোনো জাফরি ভেঙে গেছে, ভাম ঢুকল সেই ফাঁক দিয়ে।
ঢুকে তো ভাম আনন্দে ডগমগ! কত ফল! কত রকমের ফল! মনের সুখে খানিকটা খেল, খানিকটা নষ্ট করল। তারপর, পেট ভরে যাবার পরে, আবার ঘুলঘুলির ফুটো দিয়ে বেরিয়ে চলে গেল তিনতলায় নিজের ঘরে।
সেদিন থেকে আর খাবার চিন্তা রইল না। রোজই ঘুলঘুলি দিয়ে ঢুকে ইচ্ছেমত ফল খেত। এমন সব ফল, যেগুলো ওর মা কোনও দিন চোখেই দেখেনি।
দোকানদার ভাবত ইঁদুর বুঝি। রোজ রাত্তিরে দোকান বন্ধ করার আগে ইঁদুর ধরার ফাঁদ পেতে রাখত। মাঝে মাঝে দু-একটা ইঁদুর মরত, কিন্তু ফল খাওয়া কমত না। দোকানি আর ওর কাজের ছেলেটা খুঁজে খুঁজে ইঁদুর ঢোকার সব গর্তই বন্ধ করে দিল, কিন্তু কোনও দিন ওপরের দিকে তাকিয়ে দেখত না বলে ভামের ঢোকার রাস্তাটা দেখতেই পেত না।

- তিন -
কাজের ছেলেটা কিন্তু বলত, “বাবু, ইঁদুর না। চোরের কাজ। রাত্তিরে চোর ঢোকে – ভাত রেঁধে ফল দিয়ে খায়।”
দোকানি রেগে বলত, “রোজ তোর ওই এক কথা। গাধা কোথাকার! দরজা-জানলা ভাঙা নেই কোথাও, তালাগুলো পর্যন্ত আস্ত – চোর ঢোকে কোথা দিয়ে শুনি? আবার বলে, ভাত দিয়ে ফল খায়! যেমন বুদ্ধি! দুনিয়ায় কোথায় চোর চুরি করতে ঢুকে ভাত রান্না করে খায়, শুনি?”
ছেলেটা বকুনি খেয়ে কাঁদোকাঁদো হয়ে বলে, “কিন্তু পেছনের ঘরটা যে রোজ সকালে আতপ চালের গন্ধে ভুরভুর করে! এত কড়া গন্ধ যে সকালে পাকা ফলের গন্ধ ছাপিয়ে সে গন্ধ পাই!”
দোকানি বলত, “বাজে কথা রেখে, যা, গিয়ে আধখাওয়া ফলগুলো ফেলে, দোকান পরিষ্কার করে খদ্দেরদের দেখগে যা। এই ইঁদুরটার জন্য অনেক লোকসান হচ্ছে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব মারতে হবে।”
একদিন, দোকানি আর কাছের ছেলেটা রোজের মত এই ঝগড়া করছে, তখন পাশের বাড়ির ছেলেটা এসেছে ফল কিনতে।
ছেলেটা জানতে চাইল, “কী ব্যাপার কাকু? ওকে বকছেন কেন?”
দোকানি রেগে বলল, “আরে আর বলো না। রোজ রাত্তিরে একটা বদমাশ ইঁদুর ফল খেয়ে, ফেলে, ছড়িয়ে রেখে যাচ্ছে, আর আমার এই বুদ্ধিমান সাকরেদের বক্তব্য হল রোজ নাকি চোর ঢুকে ভাত রান্না করে আমার ফল দিয়ে মেখে সেই ভাত খায়!”
পাশের বাড়ির ছেলেটা অবাক! “চোর রোজ রান্না করে ভাত খায়? সে-ও আবার হয় নাকি?”
কাজের ছেলেটা বলল, “দাদা, সে কী আতপ চালের গন্ধ! ভুরভুর করে! আবার যে সে চাল নয়! হয় গোবিন্দভোগ, নয়ত বাসমতি। আমি বাবুরে বলছি, ভাত যদি না-ই রান্না হবে, তার গন্ধ কেন পাব? শুনছেনই না।”
দোকানদার বলল, “এবারে ইঁদুর মারার বিষ দিতে হবে দেখছি।”
আতপ চালের গন্ধ! দারুন তো,” বলে ছেলেটা ফল নিয়ে বাড়ি ফিরল।

- চার -
ছেলেটা বন্য জন্তু সম্বন্ধে অনেক জানত। অনেক পড়াশোনা করে, অনেক জঙ্গলে ঘুরে ও এতই শিখেছিল যে অনেক বিশারদের চেয়েও বেশি জানত। তারাও কোথাও আটকে গেলে ছেলেটাকে ডাকত। ও শুনেই বুঝেছিল কোনও মানুষ দোকানে ঢুকেছে বলে গন্ধ হচ্ছে না। কিন্তু তখন কিছু বলেনি কারণ দোকানি বিষ দেবার কথা বলেছিল। কোনও প্রাণীকে মেরে ফেলা পছন্দ করত না ও।
সন্ধেবেলা ওর বন্ধুকে বলল সব কথা। ওর বন্ধুও অনেক জানত। প্রায় ওরই মতন। শুনে বলল, “আতপ চালের গন্ধ? তার মানে ভাম, তাই না?”
পাশের বাড়ির ছেলেটা বলল, “তাই হবে। অনেক জন্তু জানোয়ারেরই শরীরে খুব কড়া গন্ধ থাকে। ভামের গায়ের গন্ধ এক্কেবারে আতপ চাল রান্না হবার মতো। ওদের আর এক নাম গন্ধগোকুল। সেই জন্যই দোকান থেকে চলে যাবার পরেও অনেকক্ষণ ফলের গন্ধ ছাপিয়ে থেকে যায় ওর গায়ের গন্ধটা।”
কী করবি?” জানতে চাইল বন্ধু।
আজ রাত জেগে দেখব দেখতে পাই কি না। ওই দেখ। ফলের দোকানের পেছনের ঘরটা ঠিক আমার শোবার ঘরের সামনেই। সারা দিন ভালো করে দেওয়ালটা দেখেছি। একটা ঘুলঘুলি ভাঙা। ওই যে – দেখ বাইনকুলার দিয়ে – হয়ত ওখান দিয়েই ঢোকে।”
পরের দিন ভোরেই পাশের বাড়ির ছেলেটা বন্ধুকে ফোন করল। “দেখেছি। ভাম। ইংরেজিতে কমন পাম সিভেট বলে যেটাকে। ওই ফুটোটা দিয়েই ঢুকল।”
তার পরে?” উত্তেজিত বন্ধু জিজ্ঞেস করল।
আধঘণ্টা পরে বেরিয়ে জলের পাইপ বেয়ে তিনতলায় চলে গেল। ওখানেই থাকে বোধহয়। ওদের বাড়ির তিনতলায় কেউ তো থাকে না।”
কী করবি?” জানতে চাইল বন্ধু।
দোকানিকে বলে দেব ঘুলঘুলিটা বন্ধ করে দিতে। আর কিছু বলব না, মিছিমিছি ভয় পাবে।”
তাই হল। সেদিন সকালেই ছেলেটা গিয়ে দোকানিকে ঘুলঘুলির ফুটোটা দেখাল, আর সেদিনই দুপুরে মিস্তিরি ডেকে সেই ফুটো বন্ধ করে দেওয়া হল। রাতে যখন ভাম নেমে এসে দেখল ওর ঢোকার রাস্তা বন্ধ, এদিক ওদিক ঘুরে আর কোনও পথ না পেয়ে আবার তিনতলায় উঠে গেল – কয়েকটা আরশোলা মেরে খেয়ে ঘুমোতে গেল।

- পাঁচ -
ক’দিন পরে কয়েকটা বাড়ি দূরের একটা ছেলে পাশের বাড়ির ছেলেটাকে ফোন করে বলল, “আমার একটা সমস্যা হয়েছে। তুই কি কিছু করতে পারবি?”
পাশের বাড়ির ছেলেটা বলল, “কী হয়েছে?”
তুই তো জানিস আমাদের বাড়ির ছাদে অনেক পাখির খাঁচা আছে।”
ছেলেটা বলল, “জানি তো। কত বার গেছি তোদের ছাদে।”
গত তিন রাত্তির রোজ একটা করে পাখি মেরে যাচ্ছে কোন জন্তু। দুটো বদ্রীপাখি আর একটা পায়রা মেরেছে। খাঁচার নিচের দিকের জালটা দাঁত বা নখ দিয়ে টেনে খুলে ঢুকেছে।”
পাশের বাড়ির ছেলেটা একটু ভেবে বলল, “আর কিছু? কোনও অদ্ভুত কিছু খেয়াল করেছিস?”
হ্যাঁ, হ্যাঁ। সকালে খাঁচাগুলোতে একটা হালকা আতপ চালের গন্ধ থাকে।”
ছেলেটা ফোন নামিয়ে বন্ধুকে ফোন করল।
বন্ধু জিজ্ঞেস করল, “ভামটাই তো? একই জন্তু পাখিও খায়, ফলও খায়?”
পাশের বাড়ির ছেলেটা হেসে ফেলল। বলল, “এ তো বড়ো অদ্ভুত কথা! সেদিনই তোর বাড়িতে আমরা মুরগির মাংসও খেলাম, ফ্রুট স্যালাডও খেলাম, তাই না? শোন, ভাম সর্বভূক। মাংস, পাখি, ফল, পোকামাকড় – কোনওটাতেই আপত্তি নেই। শিকারও করে, মরা পেলেও খায়। জানিস, মালয়েশিয়াতে কফি-বাগানে ভাম পোষে। ওরা বাগান থেকে বেছে বেছে সবচেয়ে ভালো কফির ফলগুলো খায়। পুরোটা হজম করতে পারে না, শরীর থেকে কফি বীজগুলো আস্তই বেরিয়ে আসে। তখন সেগুলো থেকে যে কফি তৈরি হয় – সেটা পৃথিবীর সবচেয়ে দামি কফি। তার স্বাদগন্ধ নাকি অতুলনীয়। তার নাম নাকি লুওয়াক।”
বন্ধু বলল, “ঈশ! লুওয়াক না। ওয়াক, থু! চাই না দামি কফি। কিন্তু এখন কী করবি?”
এখন ব্যাটাকে ধরতে হবে। নইলে আরও যদি পাখি মারে, তাহলে ওরা একদিন মেরে ফেলবে ভামটাকে।”

- ছয় -
এর পর ক’দিন পাশের বাড়ির ছেলেটা ভালো করে ভেবেচিন্তে একটা শক্তপোক্ত ফাঁদ বানাল কাঠ দিয়ে। তারপরে গেল ভামের বাড়ির দোতলায় বুড়োবুড়ির কাছে।
বলল, “আপনাদের বাড়ির ওপরে একটা জন্তু থাকে। ওটা রাত্তিরে গিয়ে ও--ই বাড়ির খাঁচা থেকে পাখি মেরে খাচ্ছে। আমি ওটাকে ধরব বলে একটা ফাঁদ তৈরি করিয়েছি। আপনারা অনুমতি দিলে ওটা ধরে নিয়ে যাই।”
বুড়োবুড়ি শুনে এতই ভয় পেয়ে গেল, যে বলল, “হ্যাঁ, বাবা, নিয়ে যাও, তাড়াতাড়ি নিয়ে যাও।”
ছেলেটা বার বার বলল, ভামটা মোটেই হিংস্র জন্তু নয়, কিন্তু কে কার কথা শোনে। ছেলেটা তিনতলায় গিয়ে ভালো করে ঘুরে দেখল। দরজাগুলো সবই বন্ধ, কিন্তু সবকটা দরজা জানলাই এত ভাঙাচোরা যে মানুষ ঢুকতে না পারলেও ভামের পক্ষে ঢোকা-বেরোন মোটেই কঠিন না।
চারিদিকে ধুলো ময়লা, পুরোনো কাগজ, প্যাকিং বাক্সের ছড়াছড়ি। রবারের জুতো পায়ে সাবধানে ছেলেটা ঘুরে দেখল। ভামটা তিনতলায় একাই থাকতে অভ্যস্ত। মানুষের চলাফেরার শব্দে যদি পালিয়ে যায় – তাহলে কোথায় চলে যাবে, আর ধরা যাবে না।
একটা একটা করে ঘরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ভালো করে নাক টেনে টেনে গন্ধ নিল ছেলেটা। সাবধানে। নাকে ধুলো ঢুকে হ্যাঁচ্চো হলেই ভাম বুঝে যাবে মানুষ এসেছে। শেষে একটা ঘরের কাছে আসতেই বুঝল ভামটা ওই ঘরের মধ্যেই রয়েছে। দরজায় দাঁড়িয়ে শুঁকতেও হল না। দূর থেকেই ভুরভুরে আতপ চাল রান্না হবার গন্ধ পেয়ে আস্তে আস্তে আবার নেমে গেল নিচে। বুড়োবুড়িকে বলল, “ভয় নেই। আমি আজই সন্ধেবেলা আসব ফাঁদটা নিয়ে।”
সেদিন, সূর্য ডুবতে না ডুবতেই, ছেলেটা এল ফাঁদটা নিয়ে। তার ভেতরে রাখল কিছু সদ্য কাটা মুরগির মাংস। রক্ত-মাখা। রক্তের গন্ধে ভামটা বুঝবে খাবার আছে ওর ভেতরে। আর খেতে ঢুকে যেমনই মাংসটা ধরে টানবে, ব্যাস! দরজাটা খট্‌ করে বন্ধ হয়ে যাবে। ভাম বাবাজী বন্দী হবেন।
কিন্তু পরদিন সকালে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতেই ছেলেটা বুঝল যে ভামটা ধরা পড়েনি। দূর থেকে ফাঁদের দরজাটা খোলাই দেখা যাচ্ছে। মাংসটাও ছোঁয়নি। কিন্তু ওই ঘরটার মধ্যে চালের গন্ধ এতই কড়া যে বোঝাই যাচ্ছিল ভামটা তার মধ্যেই রয়েছে। আর অপেক্ষা না করে ছেলেটা ফাঁদটা নিয়ে চলে গেল।
তাই বলে হাল ছেড়ে দিল না ছেলেটা। রোজই সন্ধেবেলা ফাঁদ নিয়ে হাজির হয়, যত্ন করে লাগায় মাংসের টুকরো, কিন্তু রোজই পরের দিন সকালে গিয়ে না-খাওয়া মাংস আর খালি ফাঁদ নিয়ে ফিরে আসতে হয়। হয় মুরগির মাংস ভামটার পছন্দ নয়, নয়ত ফাঁদটা দেখে কিছু একটা সন্দেহ করেছে। এখন কী করা?
এক সপ্তাহ হয়ে গেল। ভামের ধরা দেবার নাম নেই। বন্ধু জিজ্ঞেস করল, “মাছ দিলে কেমন হয়?”
মাছ কি খায় ওরা?” ভুরু কুঁচকে জানতে চাইল ছেলেটা। “কোনও বইতে তো মাছের কথা লেখা নেই। পাখি, ডিম, পোকা – মাছ তো লেখা নেই...”
বন্ধু বলল, “এমন তো হতে পারে যে ভামটা জ্যান্ত পাখি মেরে খায় – কাটা মাংস খাচ্ছে না। কিন্তু ছোটো মাছ যদি দিস, সেগুলো আস্ত দেখে খাবে।”
সেদিন বাজার থেকে কিছু ছোটো মাছ কিনে এনে পাশের বাড়ির ছেলেটা মাংসের সঙ্গে ফাঁদে রেখে এল।
পরদিন ভোরবেলাই বুড়োর ফোন। “শিগগির এসো। কাল মাঝরাত্তির থেকে তিনতলায় কী প্রচণ্ড শব্দ হচ্ছে, যেন কেউ একটা কাঠের বাক্স চারিদিকে ছোঁড়াছুঁড়ি করছে – আমরা ঘুমোতে পারছি না।”
ছেলেটা এক ছুট্টে নিচে গিয়ে, গেট খুলে, পাশের বাড়ি ঢুকে, এক এক লাফে তিনটে করে সিঁড়ি পেরিয়ে তিনতলায় উঠল। উঠতে উঠতেই শুনতে পেল ভামটা ফাঁদে পড়ে ধাক্কাধাক্কি করছে আর বাক্সটা খটখট করে নড়ে উঠছে।
সাবধানে কাছে গিয়ে দেখল সারা রাত ধরে ছটফট করে ভামটার নাক কেটে রক্ত পড়ছে। ওকে দেখেই খ্যাঁক করে ঝাঁপিয়ে পড়ল ফাঁদের দরজার ছোট্ট ফুটোর ওপর।
দরজাটা ঠিকমত বন্ধ আছে কি না দেখে নিয়ে সাবধানে ফাঁদটা হাতে নিয়ে নিচে নামল ছেলেটা। দোতলায় গিয়ে একবার ডেকে বলল, “দেখবেন নাকি? বাক্সে বন্ধ। কিছু করতে পারবে না।”
বুড়োবুড়ি শোবার ঘর থেকেই চেঁচিয়ে বলল, “না, বাবা, না! নিয়ে যাও, নিয়ে যাও! এক্ষুনি নিয়ে যাও!”
বাড়ি পৌঁছে ছেলেটা দেখল বন্ধু অপেক্ষা করছে। দুজনে মিলে বাক্সটা নিয়ে ছাদে গেল। সেখানে আগে থেকেই একটা বড়ো খাঁচা তৈরি ছিল ভামটার জন্য। দুই বন্ধু মিলে বন্দী ভামের বাক্সটা সেই খাঁচায় রেখে বড়ো খাঁচার দরজা বন্ধ করে বাইরে থেকে যেই একটা লাঠি দিয়ে বাক্সের দরজায় ঠিক জায়গায় খুঁচিয়েছে, ওমনি খটাশ করে দরজাটা খুলে গিয়েছে।
এতক্ষনে ভামটা রেগেই অস্থির। গত বেশ কয়েকদিন ও বুঝেছিল একটা মানুষ রোজ সন্ধেবেলা এসে কাঠের বাক্সে মাংস রেখে যায় – আর পরদিন সকালে সেটা নিয়ে চলে যায়। মাংস খেতে যে ওর মন চায়নি তা নয়, কিন্তু মানুষের গন্ধটা এতই বেশি, যে কাছে যেতে সাহস হয়নি। কিন্তু কাল রাত্তিরে মাছের গন্ধটা এতই কড়া ছিল, যে মানুষের গন্ধ ঢাকা পড়ে গেছিল। লোভ সামলাতে পারেনি। পায়ে পায়ে যেই গিয়ে বাক্সে ঢুকে ট্যাংরা মাছটা মুখে ধরে টেনেছে, খটাশ্‌ করে দরজাটা বন্ধ হয়ে গেছিল। তার পরিণতি এই বন্দী দশা।
শরীরটা ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে মস্তো করে কটমট করে তাকিয়ে, অনেকক্ষণ ফ্যাঁশ ফ্যাঁশ করে রাগ দেখিয়ে কোনও লাভ হল না। ছেলেটা আর তার বন্ধু দিব্যি নিজেদের মধ্যে খানিকটা কথা টথা বলে, খাঁচার সামনে আর পাশের খোলা দিকগুলো ভারি তেরপল দিয়ে ঢেকে দিল। বেশ অন্ধকার হয়ে এল ভেতরটা। সারা রাত ফাঁদের সঙ্গে যুদ্ধ করে ক্লান্ত ভাম একটা আড়াল খুঁজে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ল। একটু পরে ঘুম ভাঙলে দেখল একটা কলাই করা থালায় খানিকটা জল আর আর একটা থালায় কিছু খাবার রেখে গেছে কে। খিদেয় পেট চুঁই চুঁই করছে, ভাম একটু জল খেয়ে খানিকটা ভাত, মাংসের কিমা, আর ডিম মাখা খেল। তারপর ফাঁদের বাক্সটার ওপরে উঠেই ঘুমিয়ে পড়ল আবার।
দিন কাটে। ছেলেটা আর ওর বন্ধু রোজ দুবেলা ওর জন্য খাবার নিয়ে আসে। শুরুতে খাবারে ওষুধ মেশান থাকত, কিন্তু আস্তে আস্তে নাকের কাটাটা সেরে যাবার পরে আর ওষুধ দরকার পড়ত না। শুরুতে ওদের দেখলে ভাম রাগ করত, ফ্যাঁশ-ফ্যাঁশ শব্দ করে ভয় দেখাত। কিন্তু পরের দিকে খাবার নিয়ে আসলে ছুটে দরজার কাছে এসে অপেক্ষা করত।
চিনে যাচ্ছে আমাদের,” বন্ধু বলল একদিন।
ছেলেটা বলল, “বটেই তো। রোজ দেখছে খাবার আনি, দেখাশোনা করি। বাচ্চা বয়স থেকে থাকলে এতদিনে পোষা হয়ে যেত। কিন্তু পোষ মানবে না। এক্কেবারে জংলী তো – তার ওপর খাঁচার পাখির স্বাদ পেয়েছে। ওকে এখানে ছাড়া যাবে না।”
বন্ধু জানতে চাইল, “তাহলে কী করবি? খাঁচায় থাকবে সারা জীবন?”
না। প্ল্যান করেছি একটা। কাল যাব ফরেস্ট অফিসারের সঙ্গে দেখা করতে।”

- সাত -
ফরেস্ট অফিসার বললেন, “ভাম তো উপকারী প্রাণী। থাকতে দাও না, তোমার বাগানে ইঁদুর টিঁদুর মারবে।
ছেলেটা মাথা নেড়ে বলল, “না। তিনটে বাড়ি দূরে একটা ছেলে থাকে। ওরা ছাদে খাঁচায় পাখি পোষে। ভামটা ওই খাঁচার সন্ধান পেয়েছে। কয়েকটা পাখি মেরেওছে। ছাড়া যাবে না।”
অফিসার বললেন, “বেশ। তাহলে একটা কাজ করি। শহর থেকে একশো কিলোমিটার দূরে ওই ডিয়ার পার্কটা – ওতেই ছেড়ে দিই, কী বল?”
তাই হল। কিছুদিন পরে ছেলেটা আবার ভামের জন্য কিছু মাংসের টুকরো ওই ফাঁদটার মধ্যে রেখে দিল। এবারে আর সেটা খেতে ভাম ঢুকতে দেরি করল না। আর এবারে যখন ফাঁদের দরজাটা খটাশ্‌ করে বন্ধ হয়ে গেল, ভাম অত রেগেও গেল না। ফাঁদের ফুটো দিয়ে নাক বের করে বাইরের জগতের গন্ধ শুঁকতে শুঁকতে চলল গাড়ি চড়ে।
গাড়ি অনেক ঘণ্টা চলে চলে একটা মস্তো ঘেরা জায়গায় গেটের সামনে এসে থামল – তার সামনে বিরাট বড়ো বোর্ডে লেখা – ডিয়ার পার্ক। এখানে বন্য জন্তুরা নিরাপদে থাকে। তাদের বিরক্ত করা, ফাঁদ পেতে ধরা, শিকার করা বারণ। সেখানে একটা বাড়ি আছে, তাতে লোকে রাতে থাকতে পারে। ছেলেটা আর ফরেস্ট অফিসার সেখানে গিয়ে রাতে থাকল।
সেদিন রাতে ভামকে ওরা যত্ন করে কিমা আর ডিম মেখে ভাত খাওয়াল। সেই শেষ বার। পরদিন সকালে আলো ফোটা মাত্র হাতে বাক্স নিয়ে ওরা জঙ্গলের ভেতরে ঢুকল। একটা ফাঁকা জমি, তার পরে একটা ছোটো পুকুরের পাড়ে ফাঁদটা রেখে একটু দূর থেকে ছেলেটা একটা লাঠি দিয়ে খুঁচিয়ে ফাঁদের দরজাটা খুলে দিল।
এবারে কিন্তু ভামটা আগের বারের মতো এক লাফে বেরিয়ে এল না। ফাঁদের ভিতর থেকেই উঁকি মেরে দেখতে লাগল। যেদিকে তাকায় – কত গাছ! একসঙ্গে এত গাছ ও কোনও দিন দেখেইনি। এক পা বেরোল, ডানদিকে তাকাল – আরও গাছ। বাঁদিকে তাকাল, আরও গাছ, কিন্তু সেই সঙ্গে মানুষগুলোও দাঁড়িয়ে আছে।
সেই দেখে ভামটা আর দাঁড়াল না। টুক টুক করে হেঁটে ঝোপের আড়ালে চলে গেল। আর ফিরে এল না।

ছবি - দেবাশিস দেব

No comments: