১
স্বাধীনতার এত বছর পরেও দেশে এমন একটা জায়গা আছে, সত্যিই না দেখলে বিশ্বাস করতে পারতাম না। বাস স্টেশনে হেডমাস্টার আর তাঁর সঙ্গীদের দেখেই থমকে গেছিলাম। এ দৃশ্য না দেখলে ভাবতাম ওদের ওয়েবসাইটের মাস্টারমশাইদের ছবি আমার ছোটোবেলায় পড়া সেই ইংরিজি বইয়ের বোর্ডিং স্কুল থেকে নেওয়া। এই সবে মাথা থেকে মর্টার বোর্ড আর কাঁধ থেকে স্কলার্স গাউন নামিয়েছেন। এরকম স্কুল এখন ইংল্যান্ডেও কি আর আছে? আমার জিনস আর সারা রাত বাসজার্নি করা শার্টের দুর্দশার দিকে না তাকিয়ে এগিয়ে গেলাম।
করমর্দনের জন্য হাত বাড়িয়ে দিলেন চারজনের মধ্যে যিনি আধ পা এগিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। অভ্যর্থনা জানালেন। না বললেও বুঝতে অসুবিধে হত না, তবে নিজের পরিচয় দিলেন — চিত্রেশ আলোক, হেডমাস্টার। জানতে চাইলেন যাত্রা আরামদায়ক ছিল কি না। পথে কোনও অসুবিধে হয়নি তো? সঙ্গীদের পরিচয় দিলেন। কার্লটন সোমস্, প্রিতপাল সিং, মাকেনা কিমাঙ্গী — যথাক্রমে ইংরেজি, কমার্স আর সায়েন্সের হেড। সকলেই হ্যান্ডশেক, সকলেরই ইংরেজি চোস্ত। চিঠির বয়ানে ভালো ইংরেজি একরকম, কিন্তু এ আলাদা। ইংল্যান্ড ছাড়ার পরে এমন সাহেবি ইংরেজি আর আদবকায়দার একত্রিত সমাহার আর দেখিনি। এবার বুঝলাম, সৌমিকদা কেন বলেছিল, ওরে বাবা! ওখানে... আর তারপরে বলেছিল, অবশ্য কেউ যদি মানিয়ে নিতে পারে, তুই-ই পারবি। ওদেশে জন্ম কি না!
আমার জন্ম কোন দেশে আমি জানি। কিন্তু তার সঙ্গে নতুন চাকরির কী সম্পর্ক হবে তখন বুঝিনি। ক্রমে বুঝতে পারলাম। প্রথমে করমর্দনের ঘটা দেখে ভাবছিলাম, এঁরা কি করোনার নাম শোনেননি? কিন্তু দেখলাম সবার সঙ্গে আমার হ্যান্ডশেক শেষ হওয়ামাত্র সায়েন্সের হেড কিমাঙ্গী পকেট থেকে স্যানিটাইজারের বোতল বের করে বাড়িয়ে ধরলেন। বললেন, “এই এক জ্বালা হয়েছে। কিন্তু উপায় তো নেই, নিন...” আর ইংরেজির হেড বললেন, “তবু ভালো এতদিন পরে মাস্ক পরার জ্বালাতনের হাত থেকে মুক্তি পেয়েছি। আপনাদের ওখানেও শুনলাম মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক নয় আর?”
আমি বাসে মাস্ক পরেই ছিলাম, তবে নামার আগে খুলে নিয়েছি, সে ওঁরা জানেন না। বললাম, “হ্যাঁ, তবে বলা হচ্ছে পাবলিক প্লেসে মাস্ক পরে থাকাই বাঞ্ছনীয়।”
ওঁরা চারিদিকে তাকালেন, যেন করোনা গুঁড়ি মেরে আসছে কি না দেখছেন। তারপরে হেডমাস্টার বললেন, “চলুন, যাওয়া যাক?”
২
ওঁরা বলেছিলেন, ইন্টার্ভিউয়ের আগে কিছু সময় কাটানোর জন্য হাতে দিন দুয়েক নিয়ে এলে ভালো হয়। বলেছিলেন, স্কুল সানন্দে আমার থাকা-খাওয়ার দায়িত্ব নেবে, এবং যথোপযুক্ত কম্পেনসেশনও দেবে। আমি বলেছিলাম দু’ দিন ঠিক আছে, কিন্তু তার মধ্যেই ইন্টারভিউ হলে ভালো হয়। তাহলে আমি আগের দিন সকালে পৌঁছে, পরদিন ইন্টার্ভিউ দিয়ে আবার সন্ধের বাসে বেরিয়ে যাব। উত্তরে যখন ওঁরা জানালেন ইন্টার্ভিউ রবিবার হলে কি আমার আপত্তি হবে? তাহলে শনিবার পৌঁছে, রবিবার ইন্টার্ভিউ দিয়ে সেদিনই ফিরতে পারব। সানন্দে রাজি হয়েছিলাম। তা হলে আমার ছুটি খরচ হবে না।
চারজনে দুটো গাড়িতে এসেছেন। হেডমাস্টারের গাড়িতে আমি, বাকি তিনজন অন্য গাড়িটায় উঠলেন।
চলতে চলতে বললেন, যদিও স্কুলের নামটা এই শহরেরই নামে, আদতে কিন্তু স্কুলটা এখানে নয়। এখান থেকে প্রায় বাইশ কিলোমিটার দূরে। সেটা অন্য গ্রাম। রাস্তা ভালো — আধঘণ্টা থেকে পঁয়তাল্লিশ মিনিটে পৌঁছে যাব।
ছোট্ট গ্রাম। বরং বসতি বলাই ভালো। পাহাড়ি রাস্তা এঁকেবেঁকে উঠেছে স্কুলের গেট অবধি, তার আগে গোটা দশ-বারো বাড়ি। অবাক হয়ে দেখলাম, এ আমার পরিচিত ভারতীয় পাহাড়ি গ্রাম নয়। এ যেন ছবিতে আঁকা একটা ইউরোপীয় গ্রাম তুলে আনা হয়েছে! যেমন বাড়িঘরের গঠনসৌষ্ঠব, তেমনই সুন্দর বাগানের পরিচর্যা। আমার অব্যক্ত প্রশ্নের উত্তর দিলেন হেডমাস্টার। বললেন, “এখানে আসলে আমাদের স্কুলের সঙ্গে যুক্ত আছেন, বা ছিলেন, এমন মানুষই থাকেন। যেমন রিটায়ার্ড টিচার, বা সিনিয়র নন-টিচিং স্টাফ। তাই বাড়িগুলো ব্যতিক্রমী। চলুন, স্কুলের ভিতরটা দেখে বুঝবেন।”
স্কুল দেখে আমি সত্যিই চমৎকৃত হয়ে গেলাম। বিশাল মাঠ, আর গাছের সারি, সত্যিই একেবারে ইংল্যান্ডের মেডো যেন। তার মধ্যে পুকুর, দিঘী, বাগান। ছাত্রদের হস্টেল, টিচারদের কোয়ার্টার, সবই যেন গল্পের বইয়ের ছবি। দেশ বিদেশের নানা বোর্ডিং স্কুল দেখার সৌভাগ্য আমার হয়েছে, কিন্তু সত্যি বলতে কী, এখানকার আবহে যেন আরও কিছু আছে, যা সঙ্গে সঙ্গে আকর্ষণ করে।
গাড়ি থামল টিচারদের কোয়ার্টারের কমপ্লেক্সের ভিতরে হেডমাস্টারের বাড়ির সামনে। অন্য গাড়িটাও পিছনে এসেছে। সিটে রাখা আমার ছোটো সুটকেসটা নিতে যাচ্ছি, হেডমাস্টার বাধা দিলেন। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই বেরিয়ে এল ভেতর থেকে উর্দিপরা বেয়ারা, সকলকে সেলাম করে হেডমাস্টারের অল্প মস্তকান্দোলনের নির্দেশেই বোধহয় বাক্সটা নিয়ে ভেতরে গেল।
“ইট ইজ মাই প্লেজার টু হোস্ট ইউ ফর ইওর স্টে।” হেডমাস্টার বাড়ির দিকে হাত দেখালেন, দেখলাম ভেতর থেকে বেরিয়ে এলেন একজন মহিলা, আমার দিকে হাত বাড়িয়ে বললেন, “হেলো।”
“সুমেধা, মাই ওয়াইফ,” পরিচয় করিয়ে দিলেন হেডমাস্টার। আবার করমর্দন, আবার স্যানিটাইজার। হেডমাস্টার বললেন, “আপনার থাকার ব্যবস্থা আমার বাড়িতে, কিন্তু খাওয়ার ব্যবস্থা টিচার্স ডাইনিং রুমে। ছুটির দিন না হলে টিচাররা ওখানেই খাই, তাহলে নিজেদের মধ্যে আলোচনা, কথাবার্তার সময় পাওয়া যায় বেশি। আজ ছুটির দিন হওয়া সত্ত্বেও আমরা ওখানেই খাবার ব্যবস্থা করেছি, যাতে আপনি সবটার একটা আন্দাজ পান।” তারপরে স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বললেন, “হ্যাভিং সেড দ্যাট, মাই ওয়াইফ হ্যাজ ইনসিস্টেড দ্যাট ইফ ইউ আর স্টেইং ইন আওয়ার হোম, ইউ মাস্ট হ্যাভ সাম অফ দ্য মিলস উইথ আস। তাই, আপনাকে দুটো ব্রেকফাস্ট আমাদের সঙ্গে এ বাড়িতেই খেতে হবে।”
আমি এর সদুত্তর দেবার আগেই ইংরেজির হেড সোমস মাথা নিচু করে সুমেধাকে অভিবাদন জানিয়ে বললেন, “এবং সেই সুবাদে আজ আমাদেরও সৌভাগ্য হয়েছে ম্যামের অসাধারণ ব্রেকফাস্ট খেতে পাবার।” বলে আমাকে বললেন, “তবে ভাববেন না উনি আপনি এসেছেন বলেই আমাদের ডেকেছেন। আমরা প্রায়ই নিমন্ত্রিত হই।”
‘আমি নিজেকে ভাগ্যবান এবং ধন্য মনে করছি,’ জাতীয় কথা বলতে বলতে থমকে গেলাম। এটা হেডমাস্টারের কোয়ার্টার? এ তো পশ্চিমী সিনেমার বিলিওনেয়ারের বাড়ি! বাপরে! কথা বলতে বলতে আমরা একটা বসার ঘরের মধ্যে ঢুকেছি। বাড়িটা আদ্যিকালের হলেও আজকালকার ওপেন প্ল্যান। বসার ঘরের ওদিকে একটা সাইডবোর্ডের ওপর দিয়ে, কিছু ইনডোর গাছগাছালির ওপারে খাবার ঘরের কিছুটা দেখা যাচ্ছে। বসার ঘরের জানলায় পর্দা টানা, কিন্তু খাবার ঘরের জানলা খোলা, দেখে মনে হয় ফ্রেঞ্চ উইন্ডো। তার ভিতরে কী, দেখা যাচ্ছে না।
হেডমাস্টার বললেন, “জার্নির পরে ব্রেকফাস্টের আগে নিশ্চয়ই ফ্রেশ হয়ে নিতে চাইবেন? আমরা অপেক্ষা করব। সুমেধা আপনাকে দেখিয়ে দেবে... সুমেধা?”
“আসুন, প্লিজ...” বললেন সুমেধা। আমি বাকিদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ওঁর পেছনে রওয়ানা দিলাম। বসার ঘরের পরে আর একটা বসার ঘর — এটা আর একটু প্রাইভেট। সেটা পার করে প্রথম দেওয়াল আর দরজা। তারপরে বাড়ির ভেতর দিকটা। তাক লেগে যাবার মতো। বললাম, “হোয়াট আ বিউটিফুল হাউস।”
সুমেধা বললেন, “সত্যিই। আপনি আসলে দেখবেন, অ্যাসিস্ট্যান্ট হেডমাস্টারের কোয়ার্টারও প্রায় এতটাই বড়ো, এবং সুন্দর। আর থাকলে তো আপনিই তিন বছর পরে হেডমাস্টার হবেন। তখন এই বাড়িই আপনার হবে। এবং অনেক দিনের জন্য — এখানে রিটায়ারমেন্ট পঁয়ষট্টিতে। যার অর্থ আপনি — কত, বছর বাইশ...? — এই বাড়িতে থাকবেন” লম্বা করিডোর দিয়ে হেঁটে এসে একটা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে উনি প্রশ্নটা করে আমার দিকে তাকালেন।
মহিলা আমার বয়স জানার চেষ্টা করছেন। আমি কি এক কথায় বলে দেব? না। কথার খেলায় আমিও দড়। মাথাটা ঝুঁকিয়ে বললাম, “ম্যাম, এই অসাধারণ স্কুলের হেডশিপ আমার কপালে থাকলে আমি পাঁচ বছরের জন্যেও এই বাড়িতে থাকতে পেলে নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করব।”
সুমেধা কথা না বাড়িয়ে কোনটা বাথরুমের দরজা, কোন সুইচ বাজালে গৃহকর্মীরা আসবে এরকম প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে বিদায় হলেন। আমিও সময় নষ্ট না করে তাড়াতাড়ি তৈরি হতে শুরু করলাম। দাঁত মাজা, দাড়ি কামানো, স্নান করা — সবই বাকি।
সমস্যা হলো পোশাক পরতে গিয়ে। সৌমিকদা বলে দিয়েছিল, তিনটে সুট নিয়ে যাস। আমিই অবাক হয়ে বলেছিলাম, দু-দিনের জন্য কেউ তিনটে সুট নেয়? আমি কি রাজা-গজা নাকি? ভেবেছিলাম, ইন্টার্ভিউয়ের জন্য একটা আর যদি আগের দিন কোনও ফর্মাল ডিনার থাকে তাহলে আর একটা — সবসুদ্ধ দুটোই যথেষ্ট। এখন দেখছি এরা সকাল থেকে সবাই সুট পরে রয়েছে। তাহলে তো আমারও সুট-টাই পরেই ব্রেকফাস্টে যাওয়া উচিত। তাহলে একটাই সুট পরে আজ পুরোটা আর কাল অর্ধেক দিন — আমার ইন্টার্ভিউ তো দুপুরে — কাটাতে হবে?
সুট পরব না। আমি বাইরে থেকে এসেছি। আমার পক্ষে একরাশ সুট নিয়ে একরাতের সফরে আসা সম্ভব না হওয়াই স্বাভাবিক। সবচেয়ে বড়ো কথা — বিদ্যাসাগরের মতো আমার পরিচয় যদি আমার পোশাকে হয়, তবে সত্যিই আমি এই চাকরি চাই না।
সাত-পাঁচ ভেবে সুটকেস খুলে দুটো সুট-ই বের করে আলমারিতে ঝুলিয়ে কেবল শার্ট-প্যান্ট পরেই ব্রেকফাস্টে গেলাম। গিয়ে দেখি অন্যরাও সুটের ভারমুক্ত হয়ে বসেছেন। আমাকে দেখে সকলে উঠে দাঁড়ালেন। প্রীতপাল সিং প্রায় নিশ্চিন্দির সুরে বললেন, “যাক, আপনি দেরি করেন না। আমরা ভাবছিলাম — আপনাকে যাবার আগেই তাড়া দেওয়া উচিত ছিল কি না।”
আমি বললাম, “আপনারা ভুলে গেছেন, যে আমি সারা রাত বাস জার্নি করে এসেছি। সকালে খাইনি কিছু। আর তাছাড়া এসেই শুনলাম আপনারা সকলে ম্যামের ব্রেকফাস্টের সুখ্যাতি করছেন। সুতরাং দেরি করি কী করে?”
প্রাতরাশ সেরে — সত্যিই মিসেস সুমেধা চিত্রেশের খাবারের স্বাদ অতুলনীয় — বেরোলাম স্কুল পরিদর্শনে। হেডমাস্টারের কথায় প্রাথমিক পরিদর্শন। এখন ওপর ওপর দেখেশুনে নিতে হবে। যদি চাকরি পাই, তাহলে আরও ভালো করে দেখাবেন।
সঙ্গে চললেন সকলেই। এঁরাই স্কুলের সিনিয়র শিক্ষক, শিক্ষিকা। এবং অ্যাসিস্ট্যান্ট হেড ছাড়া সকলেই উপস্থিত। উনি চিকিৎসা করাতে গেছেন স্বদেশে। স্বাস্থ্য ভালো নয় বলেই কাজ ছেড়ে চলে যাবেন। ওই পদের জন্যই আমার কাল ইন্টার্ভিউ।
প্রাথমিক দেখাতেই লাগল লাঞ্চ অবধি। বিরাট ক্যাম্পাস, তার এ-কোনে ও-কোনে ছড়ানো ছাত্রদের নানা কর্মক্ষেত্র। এইখানে জিমনেশিয়াম, তো ও-ও-ও-ওইখানে হর্স রাইডিং, আবার বহু চলে যেতে হবে কোন কর্মশালায় — যেখানে ছাত্রদের হাতের কাজ শেখানো হয়। এ ছাড়া ছাড়া একাধিক ফুটবল, ক্রিকেট, হকি, আর ট্র্যাক অ্যান্ড ফিল্ড-এর মাঠ। গাড়ি বিনা, শুধু পায়ে হেঁটে এ রাজত্ব পরিদর্শন সম্ভব নয়। হেডমাস্টার আমাকে দেখালেন, এই জন্যই উনি ব্যাটারিচালিত গাড়ির ব্যবস্থা করেছেন। ছুটির দিন বলে আজ সেগুলি মেইন্টেনেন্স হচ্ছে, তাই উনি নিজের গাড়ি বের করেছেন।
শিক্ষকদের ডাইনিং রুমে দ্বিপ্রাহরিক ভোজনশেষে গেলাম অভ্যন্তর পরিদর্শনে। লাইব্রেরিতে আরও কয়েকজন সিনিয়র শিক্ষক শিক্ষিকা উপস্থিত, সেখান থেকে বিভিন্ন বিভাগীয় লাইব্রেরি এবং ল্যাবরেটরি, ইত্যাদি শেষ করতে করতে বিকেল। ততক্ষণে আমি বেশ ক্লান্ত। ভাগ্যিস সুট-টা পরিনি!
হেডমাস্টারের বাড়িতে ফিরলাম কেবল আমরা দুজনই। বাকিরা অনুমতি এবং বিদায় নিয়ে গেলেন যে যার বাড়ি। বলে গেলেন, ডিনারে দেখা হবে।
চা খেতে খেতে আলোক আর সুমেধার কাছে স্কুল সম্বন্ধে আরও কিছু জানলাম, তারপরে দম্পতি আমাকে অনুমতি দিলেন, ঘরে গিয়ে বিশ্রাম করার। ডিনার রাত আটটায়, সেখানে সুমেধাও যাবেন, এবং আমি যেহেতু গেস্ট অফ অনার, তাই আমার ওখানে আটটা বাজার দু’মিনিট আগে পৌঁছলেই হবে। বাড়ি থেকে আমরা বেরোব আটটা বাজতে দশে।
সুমেধা বললেন, “সন্ধে ছটায় উনি অল্প ড্রিঙ্ক করেন। আপনি চাইলে...”
মদিরারসে আমার কোনও উৎসাহ নেই বলে বিদায় নিলাম।
৩
আর একবার স্নান করতে হলো সারা দিনের ক্লান্তি দূর করতে। পাজামা পরে খাটে লম্বা হয়ে ভাবছি অভিজ্ঞতার কথা, এমন সময় মনে হলো অনেকক্ষণ ধরে একটা গান যেন গুনগুন করছি? গানটার কথাগুলো মাথায় আসতেই মনে হলো, আসলে কেবল এক্ষুনি না, দুপুর থেকেই গানটা মাথায় ঘুরছে। গাঁদাফুল সম্বন্ধে। কথাগুলো মনে করে গানটা গাইবার চেষ্টা করলাম। বাংলা আধুনিক গানে আমার কখনোই খুব ইন্টারেস্ট ছিল না, তাই ‘হলুদ গাঁদার ফুল দে এনে দে...’ আর তারপরে একটা কী ঝুমকোলতা আর কে যেন চুল বাঁধবে না — এইটুকু বাদ দিয়ে আর কিছুই মনে পড়ল না। কেন এই গান মাথায় ঘুরছে সারা দিন? এটা তো আমার প্রিয় গানও নয় — বস্তুত গানের কথাগুলোও জানি না ঠিক করে।
কিন্তু যতই চেষ্টা করি, না পারি গানটা বের করতে, না পারি বুঝতে কেন গানের ওইটুকু মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে।
সন্ধে ছ-টার কয়েক মিনিট পরে হেডমাস্টারকে সুরাপাত্র হাতে ভেতরের ড্রইং রুমে পেলাম। অনুমতি নিয়ে ওঁর সঙ্গে বসলাম। আমার জন্য কফি এল, সুরাপাত্র খালি হতে শুরু করল, এবং একটুক্ষণের মধ্যেই হেডমাস্টারের জিভ ঢিলে হয়ে গেল, আগামীকালের ইন্টার্ভিউয়ে আমাকে কী কী জিজ্ঞেস করা হবে এবং তার কোন উত্তরটা আমার দেওয়া উচিত বলতে শুরু করলেন।
আমি থামিয়ে বললাম, স্যার, এটা কি আপনার উচিত হচ্ছে? আপনি কাল নিশ্চয়ই ইন্টার্ভিউ বোর্ডে থাকবেন। সেই বোর্ডের ক্যান্ডিডেটকে এ ভাবে সাহায্য করছেন?
হেডমাস্টার মিষ্টি হেসে বললেন, আহ, দেয়ার ইউ আর মিস্টেকেন। আই উইল নট বি ইন দ্য বোর্ড টুমরো।
এটাও আশ্চর্য। তাই মেনে নিয়ে ভাবলাম সবচেয়ে বড়ো জিনিসটা জেনে নেওয়া ভালো। বললাম, একটা কথা জানতে চাই, যদি আপনি অনুমতি করেন।
উনি ঘাড় নেড়ে অনুমতি দিলে বললাম, এরকম একটা প্রতিষ্ঠানে হেড চলে গেলে সাধারণত অ্যাসিস্ট্যান্ট হেড-ই দায়িত্ব নেন। আপনাদের অ্যাসিস্ট্যান্ট হেড আপনার আগেই চলে যাবেন, কিন্তু সিনিয়রদের মধ্যে এমন কেউ কি নেই, যিনি দায়িত্ব নিতে পারেন? বাইরের লোক কেন চাইছেন আপনারা?
উনি বুঝেছি, গোছের মাথা নাড়লেন। বললেন, জানেন, সত্যিই নেই। অ্যাসিস্ট্যান্ট হেডের পরেই যিনি সিনিয়র টিচার, তিনি আর্ট টিচার। অভিষেক। লম্বা মতন, ঢিলে চশমা — লাল জামা আর নীল জিনস পরে এসেছিলেন লাঞ্চে।
মনে আছে। লাঞ্চে কেউই সুট পরে আসেননি, কিন্তু ওঁকে দেখেই একটু নিশ্চিন্ত বোধ করেছিলাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই অবশ্য বুঝেছিলাম, যে অভিষেকের মধ্যে বিদ্রোহী মনোভাব নেই, আছে কেবল খ্যাপাটে-পনা। টিচাররা তো ধর্তব্যের মধ্যেই আনেন না, ছাত্ররাও বোধহয় খুব মানে না।
হেডমাস্টার বলে চলেছেন, এ বাদে আর কারওর অ্যাসিস্ট্যান্ট হেডমাস্টার হবার মতো অভিজ্ঞতা নেই, এবং যে দু জন এক-দেড় বছরের মধ্যে অ্যাসিস্টান্ট হবার সিনিয়রিটি পাবেন, তাঁরা আবার কেউই আগামী তিন বছরের মধ্যে হেড হবার মতো বাড়তি অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারবেন না। ফলে আমাদের বাইরে থেকে কাউকে আনতেই হত। তাই...
বুঝলাম। কিন্তু ওঁর কথা এখনও শেষ হয়নি।
বলছেন, আমরা অনেক আলোচনা করে ঠিক করি, যে গত সাতজন হেডমাস্টার স্কুলেরই টিচার ছিলেন, এবারে বাইরের লোক আনা হোক না? আপনার নাম আমিই দিই। এডুকেশন, এক্সপিরিয়েন্স, মানসিকতা — সব দিক থেকেই আইডিয়াল হবেন, এ-ই আমার বিশ্বাস।
বললাম, এবং সেইজন্যই কি আপনি ইন্টার্ভিউ বোর্ডে থাকছেন না?
উনি হেসে মাথা নাড়লেন। না। আমার নিকটাত্মীয় আপনার কম্পিটিটর। তাই।
এবার আমি সত্যিই অবাক হলাম। নিকটাত্মীয়র চেয়ে বেশি আমাকে চাইছেন অ্যাসিস্ট্যান্ট হেডের পোস্টে? আশ্চর্য! উনি আমার মুখের ভাব দেখলেন না। বলতে থাকলেন, নিকটাত্মীয় আমার বড়ো মেয়ে। ও-ও এই স্কুলের না। ছাত্রীও না, শিক্ষকও না। এখান থেকে কিছু দূরে আর একটা স্কুলের সিনিয়র টিচার।
বাবা মেয়ের মধ্যে কোনও সমস্যা? থাক, এত কথায় আমার কী কাজ?
৪
অনুপস্থিত অ্যাসিস্ট্যান্ট হেডমাস্টার বাদে ডিনারে সব টিচারই এসেছিলেন। শুরুতে বেশ ফর্মাল ডিনারের রূপ নিয়ে শুরু হলেও, কিছুক্ষণের মধ্যেই বেশ হইচই আমুদে পার্টির আকার নিল, কোথা থেকে গিটার বের করে আনলেন আর্ট টিচার, গানে গলা মেলালেন অনেকেই। খাবার টেবিলে বসেও এমনই হালকা মেজাজে আলোচনা হচ্ছিল, এমন সময় ইংরিজির একজন টিচার — ভদ্রমহিলার নাম মনে নেই — হঠাৎ আমাকে জিজ্ঞেস করে বসলেন, আপনি তো স্যার কিছুই বলছেন না। আপনার কি কিছুই জানার নেই আমাদের সম্বন্ধে?
আমি তেমন কিছু না ভেবেই বলেছিলাম, একটা কথা দুপুর থেকে মাথায় ঘুরছে, জিজ্ঞেসই করলেন যখন, বলেই ফেলি। আজ সকালে এখানে আসার পথেই মনে হয়েছিল, একটা ফুল-প্রেমী কমিউনিটিতে ঢুকছি। স্কুলে এসেও দেখলাম, স্কুলে সকলেই প্রায় বাগান করেন — এবং সবাই প্রায় ফুলের বাগান ভালোবাসেন।
বুঝলাম সবাই মন দিয়ে শুনছেন। বললাম, কিন্তু একটা কথা বার বার মনে হয়েছে দুপুর থেকে — আমাদের দেশে শীতের একটা প্রধান ফুল হলো গাঁদা। এখানে অনেকই গাঁদা দেখলাম। অজস্র গাঁদা, কিন্তু আশ্চর্য, গাঁদার সবচেয়ে উজ্জ্বল এবং সবচেয়ে কমন ভ্যারাইটির হলুদ রংটা কোত্থাও দেখলাম না। সকালে পাহাড় বেয়ে ওঠার সময়েও না, আর এত বড়ো স্কুলের এত বাগানেও না...
টেবিলের চারিপাশে সকলেই আমি কথা বলা শুরু করা মাত্র চুপ করে গেছিলেন। সেটাই স্বাভাবিক। আমি অতিথি, তার ওপরে আর কিছুদিন পরেই আমি হয়ত অ্যাসিস্ট্যান্ট হেড হব, এবং ক্রমে ক্রমে হেডমাস্টার, সুতরাং আমি কথা বললে না-শুনবে এমন ক-জনই বা থাকবে?
কিন্তু নৈঃশব্দ্যটা খুব চট করে ভদ্রতা থেকে পিন-ড্রপ হয়ে অস্বস্তিকর হয়ে গেল। ফলে আমার প্রশ্নটাই শেষ হলো না। কেমন থতমত খেয়ে চুপ করে গেলাম।
সকলেই আমার দিকে তাকিয়ে। আমি প্রবল অস্বস্তিতে। এরকম সামান্য একটা প্রশ্নে সবাই কেন এমন চুপ করে যাবে আমার বোধগম্য হচ্ছিল না। নিস্তব্ধতাটা এতক্ষণ ধরে চলছে, যে আমার মনে হতে শুরু হয়েছিল আমারই কিছু বলা উচিত, কিন্তু কী বলব? আমি দুঃখিত, আপনাদের অস্বস্তিতে ফেলার উদ্দেশ্য আমার ছিল না? না কি আর কিছু বলা উচিত? না কি কেবলই বিষয়টা বদলে অন্য কিছু বলব? এমন সময় আমাকে বাঁচালেন হেডমাস্টার নিজে। বললেন, স্যার, আই মাস্ট কনগ্র্যাচুলেট ইউ অন ইওর ওয়ান্ডার্ফুল পাওয়ার্স অফ অব্জারভেশন। সত্যিই আমরা কেউ এখানে হলুদ গাঁদা লাগাই না। তবে এ বিষয়টা এখানে আলোচ্য নয়, আমি কথা দিচ্ছি, এর উত্তর আমি আপনাকে আপনি যাবার আগে দেব।
মুহূর্তে ডিনার টেবিলের থমথমে ভাবটা কেটে গেল, সবাই প্রায় একসঙ্গেই নানা বিষয় কথা বলতে শুরু করল, এবং আমিও হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম।
৫
যেমন সুমেধা বলেছিলেন, আমার অনুরোধ অনুযায়ী সকাল সাড়ে ছটাতেই দরজায় টোকা দিয়ে বেয়ারা বেড টি নিয়ে এল। চা খেয়ে জগিং-এ বেরিয়ে পড়লাম। কালকেই দেখে রেখেছিলাম কোথায় যাব। আধ কিলোমিটার মতো গিয়ে মস্তো লেকটার চারপাশে ঘুরলে কিলোমিটার দুয়েক হয়, আন্দাজ করেছিলাম, এক পাক মেরে হেঁটে ফিরলাম বাড়ি। পকেটে রাখা মোবাইল জানান দিল, আমি সবসুদ্ধ তিন কিলোমিটার সাতশো মিটার গিয়েছি। আজকের পক্ষে এ-ই যথেষ্ট।
ভিতরের বসার ঘরের মধ্যে দিয়েই প্রায় যেতে হবে, কারণ বাড়িটার এই অংশে কোনও দেওয়াল নেই। হেডমাস্টার আর সুমেধা চা খাচ্ছেন। সাহেবি কায়দায় অভিবাদন জানালাম। ওঁরাও উত্তর দিলেন। হেডমাস্টার বললেন, আপনাকে নিয়ে একটু বেরোব। ব্রেকফাস্টের পরেই। আপনার আপত্তি নেই তো?
আমি বললাম, না, না। অবশ্যই। আমি আটটাতেই আসছি ব্রেকফাস্টের জন্য।
যথাসময়ে হাজির হলাম খাবার ঘরে, চান করে, দাড়ি কামিয়ে। ব্রেকফাস্ট নিয়ে তৈরি সুমেধা। বললেন, আজ আপনার ইন্টার্ভিউ, কিন্তু সকালেই উনি আপনাকে নিয়ে বেরোবেন।
আমি হেসে বললাম, তাতে অসুবিধে নেই।
এমন সময়ে হেডমাস্টার এসে পড়ায় সুমেধা আর কিছু বললেন না।
খেয়ে দেয়ে হেডমাস্টার আর সুমেধা আমাকে নিয়ে বেরোলেন। হেডমাস্টার সুমেধার জন্য পেছনের দরজা খুলে ধরেছেন। নিজেই চালাবেন, তাই আমি বসলাম ওঁর পাশে। স্কুলের বাইরে যেতে হলো। একটু গিয়েই পাহাড়ের গা বেয়ে একটা রাস্তা চলে গেছে ডানদিকে। পাহাড় বেয়ে নামার রাস্তা দিয়ে না গিয়ে সেই রাস্তায় মোড় নিলেন হেডমাস্টার। বললেন, এখানে যদি আসেন, তাহলে পাহাড়ে গাড়ি চালানোর লাইসেন্স নিতে হবে।
হেসে বললাম, আমার মাতৃভাষায় একটা প্রবাদ আছে, কবে রাধা নাচবে, সাত মণ তেল পুড়বে।
উনিও হাসলেন। বললেন, আপনার সম্ভাবনাই বেশি।
কিছুক্ষণ স্কুলের দেওয়াল সঙ্গে চলল, তারপরে সে রাস্তার সংসর্গ ত্যাগ করে অন্য দিকে ঘুরল, রাস্তার দু দিকে আবার বসতবাড়ি। হেডস্যার বললেন, এখানকার বাসিন্দারাও স্কুলের কর্মচারী, বা শিক্ষক ছিলেন, রিটায়ার করে এখানেই থেকে গেছেন।
বেশিদূর যেতে হলো না। রাস্তাটা একটা পাহাড়ি বাঁক নিল, আর আমার সামনে, গাড়ির উইন্ডস্ক্রিন প্রায় পুরোটা জুড়ে দেখলাম একটা বাড়ি। যেমন এই পাহাড়ের সব বাড়ি — তেমনই, বাংলোর মতো। তার বাগান বেশি বড়ো নয়, কিন্তু প্রায় পুরোটা জুড়ে কেবল হলুদ গাঁদা। বাগানে হলুদ গাঁদা, বাংলোর বারান্দায় হলুদ গাঁদা, বারান্দার আলসে থেকে ঝুলছে ছোটো ছোটো টবে হলুদ গাঁদা... এত হলুদ গাঁদা আমি একসঙ্গে কখনও দেখিনি। হাজার হাজার ফুল বাড়িটার চতুর্দিকে।
গাড়িটাকে পাহাড়ি রাস্তার মাঝখানেই দাঁড় করিয়ে ইঞ্জিন বন্ধ করে দিলেন হেডমাস্টার। আমি একবার পেছনে ঘুরে বললাম, রাস্তাটা আটকে দাঁড়ালেন?
উনি বললেন, এই রাস্তা এই বাড়িতেই শেষ। এখানে গাড়ি আসবে না।
তারপরে বললেন, বলছিলেন না, এখানে কেন হলুদ গাঁদা নেই? এই দেখুন তার কারণ।
বলার ভঙ্গীতে কোনও অনুভূতি নেই। কেমন যেন মরা গলায় বললেন কথাগুলো।
এত হাজার হাজার হলুদ গাঁদা একসঙ্গে দেখা সত্যিই এক আশ্চর্য অভিজ্ঞতা, কিন্তু আমার মনে হলো আরও কিছু আছে। তা না হলে এ ভাবে আমাকে গাড়ি করে স্বামী-স্ত্রী দুজনে মিলে এই ফুলের বাড়ি দেখাতে আনতেন না।
কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকার পর আমি বুঝলাম, আমার কিছু জিজ্ঞেস করা উচিত। বললাম, কিন্তু সারা পাহাড়ের কোনও বাড়িতে, এমনকি আপনার স্কুলের বাগানেও যে ফুল নেই, এই একটা বাড়িতে সেই ফুল কেন?
ভদ্রলোক বললেন, এর পেছনের ঘটনাটা অদ্ভুত। যেন গল্পের বইয়ের কাহিনি। এই বাড়িটা — আপনাকে বলেছি, পাহাড়ের সব বাড়ির মতোই, এই স্কুলের একজন কর্মচারীর। তিনি শিক্ষক নন। মেইন্টেনেন্স এর স্টাফ। এঞ্জিনিয়ার।
একটু চুপ করে থেকে বললেন, এঞ্জিনিয়ারদের এ জমি পাওয়ার কথা নয়, কিন্তু ইনি পেলেন কারণ উনি বিয়ে করেছিলেন আমাদের স্কুলেরই এক সিনিয়র শিক্ষকের মেয়েকে। বিয়েতে শিক্ষক রাজি ছিলেন না, কিন্তু তার উত্তরে মেয়ে বলে তাদের আটকানো যাবে না — বিয়ে তারা করবেই। মেয়েটির অনেক গুণ ছিল, কিন্তু পড়াশোনায় ছিল দুর্বল। ফলে নিজের ক্ষমতায় কিছু করতে পারবে বলে মা-বাবার আশা ছিল না। ভাবতেন, ভালো বিয়ে দেবেন, মেয়ের সংসারী হবার অনেক গুণই রয়েছে। এবং সেজন্যই তিনি শেষ অবধি নিজের জন্য কিনে রাখা এই জমিটি মেয়ে-জামাইকে দেন, যাতে মেয়ে চোখের সামনে থাকতে পারে। এবং বিয়েটা হয়ে যায়।
এবারে পেছন থেকে সুমেধা বললেন, এখানে যে যা-ই বলুক, এ বিষয়ে সন্দেহ নেই যে স্বামী তাঁর স্ত্রীকে খুবই ভালোবাসতেন। অনেক স্বামী দেখেছি যারা মুখের কথা খসতে না খসতে বউয়ের ইচ্ছাপূরণ করেন, কিন্তু ইনি তার এককাঠি ওপরে। বউয়ের মনের কথা পড়ে নিতেন প্রায়।
বি দ্যাট অ্যাজ ইট মে, একটু জোর দিয়েই বললেন হেডমাস্টার। দে ওয়্যার হ্যাপি। সেটাও ফ্যাক্ট। ওই যে বললাম, মেয়েটার সংসার করার সব গুণই ছিল। আর এঞ্জিনিয়ারও যে স্বামী হবার সব যোগ্যতাই রাখেন, সে-ও সন্দেহাতীত।
মেয়েটির খুব বাগান করার সখ ছিল। আবার পেছন থেকে বললেন সুমেধা। আর প্রিয় রং — সে কী ছিল তা নিশ্চয়ই বলে দিতে হবে না আপনাকে। সারা বাগানের সব ফুলের রং ছিল হলুদ। বাড়ির রংও হলুদ। সে এক দেখবার মতো দৃশ্য।
আমি বললাম, বাড়ির রং তো এখন হলুদ নয়?
হেডমাস্টার বললেন, উই আর গেটিং অ্যাহেড অফ আওয়ারসেল্ভ্স। বিয়ের প্রথম শীতকালের আগে বউ বলেছিল, আই উইশ সারা বাড়ি আর বাগানে শুধু হলুদ ম্যারিগোল্ড থাকবে। ওপর থেকে নিচ, বারান্দায়, বাগানে... কেবল হলুদ ম্যারিগোল্ড। আর প্রেমে পাগল এঞ্জিনিয়ার শহরে গিয়ে ফুলের দোকানির সঙ্গে বোঝাপড়া করে এসেছে, যে সে বছর দোকানের সব হলুদ গাঁদার বীজ, আর কাউকে সে বিক্রি করবে না, সব ও-ই নিয়ে যাবে।
সুমেধা বললেন, বেশ ভুল বোঝাবুঝি হয়েছিল। কেউ আর নতুন করে হলুদ গাঁদা কিনতে পারেনি। তবে স্বামী-স্ত্রী সেটা সবাইকে বুঝিয়ে বলেছিল — আর কেউ হলুদ গাঁদা পাবে না, তা ওরা চাইনি। শুধু চেয়েছিলাম, কটেজটা হলুদ গাঁদায় ভরিয়ে দিতে। সব উদ্বৃত্ত বীজ দিয়ে দিয়েছিল সবাইকে।
হেডমাস্টার বললেন, যা-ই হোক, সুখেই ছিল দুজনে, কিন্তু সে সইল না।
সুমেধা বললেন, মেয়েটা মারা গেল।
আমি বললাম, সে কী! কবেকার কথা এ সব? কী হয়েছিল?
হেডমাস্টার বললেন, বিয়ের বছর তিনেকও হয়নি। একটা ফুটফুটে বাচ্চাও হয়েছে সবে। শীতকাল ছিল। গাঁদাফুল হয়েছে থরে থরে।
সুমেধা বললেন, একটা ফ্রিক অ্যাক্সিডেন্টে। বিশ্রী, যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যু। এক বছর একা ছিল ছেলেটা। বাবা... প্রতিবেশীরা দেখাশোনা করত। তারপরে আবার বিয়ে করেছে। এখন প্রায় পাঁচ বছর হলো দ্বিতীয় বিয়ের।
কিন্তু এখানে তখন থেকে আর কেউ হলুদ গাঁদাফুল লাগায় না। হলুদ গাঁদা হয় কেবল এই বাড়িতে। আর ওর স্বামী আর দ্বিতীয় স্ত্রী দুজনেই প্রতি শীতে বাড়িটা ওই মেয়েটার স্মৃতিতে হলুদ গাঁদাফুলে ভরিয়ে দেয়, আর এই একই কারণে এই পাহাড়ে আর কোথাও আপনি হলুদ গাঁদাফুল দেখতে পাবেন না।
শেষ কথাটা বলে হেডমাস্টার গাড়ি চালু করলেন আবার। বললেন, চলুন, আলাপ করিয়ে দিই। এখন অবশ্য এঞ্জিনিয়ার নেই, স্কুলে মেন্টেনেন্সের কাজে আছেন। তবে গৃহিণী আছেন।
গেট দিয়ে ঢুকে গাড়ি দাঁড়াল, আমরা সকলেই নামলাম। ভেতর থেকে বেরিয়ে এল একজন পরিচারিকা, বলল, গুড মর্নিং, স্যার, ম্যাম... মিস আসছেন, আপনারা ভিতরে এসে বসুন।
হেডমাস্টার বললেন, আমরা বসব না। মিসকে বলো, আমার গেস্টকে বাগান দেখাতে এনেছি।
দেখতে দেখতে বেরিয়ে এলেন একজন অতীব সুন্দরী মহিলা। এঁর ছবি আমি দেখেছি হেডমাস্টারের বাড়িতে। আমার সমবয়সী না হলেও বয়স আমার চেয়ে সামান্যই কম। বললেন, হ্যালো ড্যাডি, হ্যালো মাম্মি... তারপরে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ইনিই কী...? বাক্যটা শেষ না করলেও শেষে প্রশ্নবোধক চিহ্নটা বুঝতে অসুবিধে হয় না।
হেডমাস্টার ঘাড় হেলালেন। আমাকে বললেন, আপনারা দুজনেই দুজনের কথা জানেন। আপনি যে ইন্টার্ভিউয়ে আজ বসবেন, সেই পোস্টের জন্য ইনিই আপনার কম্পিটিটর — আমার বড়ো মেয়ে, পুষ্পা। পুষ্পাকে আমার নাম বললেন। পুষ্পা এখানকার সাহেবি দস্তুর মতো হ্যান্ডশেক করলেন, নমস্কার নয়।
পুষ্পা বললেন, আপনারা ভেতরে আসবেন? বলে একটু ভেতরের দিকে তাকিয়ে বললেন, হি হ্যাজ গন টু ওয়ার্ক।
হেডমাস্টার ঘাড় নেড়ে বললেন, আজ না, বলে আমার দিকে দেখিয়ে বললেন, আজ ওঁর ইন্টার্ভিউ। তাই আমি চাই না উনি ক্লান্ত হয়ে পড়ুন। ছেলে কই?
যেন এই প্রশ্নটার জন্যই অপেক্ষা করছিল এমনভাবে প্রায় ভেতর থেকে ছুটে বেরিয়ে এল একটি বছর ছয় সাতেকের ছেলে। গ্র্যান্ডপা, গ্র্যানি... দুজনকে একে একে জড়িয়ে ধরে ছেলেটি বলল, ওন্ট ইউ কাম ইন?
পুষ্পা ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, গ্র্যান্ডপা আর গ্র্যানির সঙ্গে গেস্ট আছে, সান্। বলে আমার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন। আমরাও করমর্দন করলাম। তারপরে আমি পুষ্পাকে শুভেচ্ছা জানালাম, জানতে চাইলাম আজই ওঁরও ইন্টার্ভিউ কি না, উনি বললেন না, আগামী রবিবার। তারপরে উনি আমাকে আজকের জন্য শুভেচ্ছে জানালেন, এবং আমরা আবার গাড়িতে উঠে ফিরে এলাম হেডমাস্টারের বাড়িতে।
এ বিষয়ে সারাদিন আলোক বা সুমেধা কিছু বলেনওনি, বা আমিও কোনও প্রশ্ন করিনি। শুধু ভেবেছি, মেয়ের সঙ্গে হেডমাস্টারের কোনও মনোমালিন্য দেখা গেল না। তবে তিনি কেন চান না মেয়ে অ্যাসিস্ট্যান্ট হেড পদে আসুন?
৬
সারাদিনের শেষে হেডমাস্টার আমাকে বাস-স্টেশনে নিয়ে যেতে পারলেন না বলে অনেক দুঃখ প্রকাশ করলেন। বললেন, যে দুর্ঘটনার ফলে একজন ছাত্রের পা ভেঙেছে, এবং আরও দুজন সলিল সমাধির হাত থেকে অল্পের জন্য বেঁচেছে, তারই তদন্তে আসবেন স্থানীয় থানার ও-সি।
বুঝতেই পারছেন, সম্পন্ন এবং ক্ষমতাবান বাবা মায়ের ছেলে সব।
মাথা নাড়লাম। আমি যেখানে কাজ করি সেখানেও ছবিটা অনেকটা এক, তবে এতটা নয়। তফাৎ কেবল ডিগ্রির। হেডমাস্টার বললেন, আমি চেয়েছিলাম, আমিই আপনাকে আবার বাস স্টেশনে নামিয়ে আসব। কিন্তু তা হবে না, এবং বাকি সব সিনিয়র টিচারদেরও পুলিশের জন্য অপেক্ষায় থাকতে হবে। তবে আপনি ভাববেন না, আপনাকে নিয়ে যাবার জন্য আমাদের আর একজন সিনিয়র টিচার প্রস্তুত। আর্ট টিচার অভিষেক — আপনার সঙ্গে দেখা হয়েছে, ওই যিনি গিটার বাজালেন... আপনাকে ড্রাইভারের সঙ্গে পাঠাব না।
আমি হাসলাম। ড্রাইভার হয়ত বেশি নিরাপদ হত, তা বললাম না।
অবশ্য চিন্তার কারণ ছিল না। হেডমাস্টারের মতো অভিষেকেরও হাত গাড়ি চালানোয় পাকা, যদিও গাড়িটা একটু পুরোনো, আর পেছনের সিটে নানা অপ্রয়োজনীয় জিনিসের সম্ভার। আমাকে তাকাতে দেখে বললেন, আমার গাড়িতে পেছনের সিটের দিকে তাকানো বারণ।
আমি হেসে আশ্বস্ত করলাম, বললাম, নিজে গাড়ি চালালে পেছনের সিটটা ক্রমে গুদামঘরে পরিণত হয়।
উনিও হাসলেন। বললেন, সে হয়ত আপনার গাড়ি। আমারটাকে গার্বেজ ডাম্প... আস্তাকুঁড় বলুন।
পথে চলতে চলতে কী ভাবে আলোচনাটা শুরু হয়েছিল মনে নেই, তবে এখন মনে হচ্ছে, উনিই বলেছিলেন, হলুদ গাঁদার ফুল দেখলেন?
বলেছিলাম, দেখেছি। সত্যিই দুটো ব্যাপারই মনে রাখার মতো। এক তো অত হলুদ গাঁদা একসঙ্গে আর দুই, একটা গোটা কমিউনিটি কী ভাবে একজনকে মনে রেখেছে, তার স্মৃতিকে শ্রদ্ধা জানাচ্ছে হলুদ গাঁদার বাগান না করে।
ঘাড় নাড়লেন আর্ট টিচার। বললেন, আসলে কী জানেন, পুরো কমিউনিটিটাই হেডমাস্টারকে খুব শ্রদ্ধা করে। শুধু তাই নয়, সুমেধাও আমাদের সকলের অতি প্রিয়। মেয়েদুটোকে আমরা জন্মাতে না দেখলেও বড়ো হতে দেখেছি।
সন্ধে হয়ে এসেছে, এবং সম্পূর্ণ মনোযোগ রাস্তায়, তাই আমার মুখের ভাবের সামান্য পরিবর্তনটুকু ধরতে পারলেন না, বলে চললেন, প্রীতি পড়াশোনায় ভালো ছিল না হয়ত, কিন্তু বাকি সব কিছু — গানের গলা, বাদ্যযন্ত্র বাজানো, ছবি আঁকা, রান্না, বাগান করা — এককথায় যা কিছুতে মানুষের সৌন্দর্যবোধ লাগে, সবেতেই ও ছিল এক নম্বর।
অন্ধকার হয়ে এসেছে, কিন্তু এখনও হেডলাইট জ্বালানোর মতো অন্ধকার নয়, গাড়ির সামনের আলো মৃদু হয়ে জ্বলে রয়েছে, স্বাভাবিকভাবেই গতি মন্থরতর হয়েছে।
অভিষেক বললেন, দুই বোনের একজনও কিন্তু বয়সকালে বিয়ে করতে চায়নি। তাই যখন ছোটো বোন এই ছেলেটির প্রেমে পড়ল, তখন আমরা সবাই খুব অবাক হয়েছিলাম। অনেকেই প্রীতিকে বারণ করেছিল। বলতে দ্বিধা নেই, আমিও করেছিলাম।
আমি এবারে আর থামতে না পেরে জিজ্ঞেস করেই ফেললাম, কিন্তু আপত্তির কারণ কী ছিল? এঞ্জিনিয়ার ছেলে, চাকরিও করে এই স্কুলেই...
এক লহমা আমাকে দেখলেন অভিষেক। তারপরে বললেন, ও। হেডমাস্টার সবটা বলেননি তাহলে। ওঃ...
কিছুক্ষণ চুপচাপ গাড়ি চলল, তারপরে বললেন, এতটা বলেছি, বাকিটাও বলি তাহলে। ছেলেটা এঞ্জিনিয়ার নয়। মিস্তিরি। এঞ্জিনিয়ার হবার কোনও যোগ্যতাই ওর নেই। আমাদের সবার ধারণা ছিল, ছেলেটা মেয়েটাকে ফাঁসিয়েছে ওর বাবার ধনসম্পত্তির লোভে।
আমি বললাম, একজন স্কুলটিচারের কী আর ধনসম্পত্তি থাকতে পারে?
হেসে অভিষেক বললেন, তাহলেই বুঝুন তার আর্থিক অবস্থা।
তারপরে একটু স্পিড বাড়িয়ে সামনের ট্রাকটাকে ওভারটেক করে বললেন, তবে পায়নি কম। হেডমাস্টারের জমি পেয়েছে, নিজের সঞ্চয় দিয়ে হেডমাস্টার বাড়ি করে দিয়েছেন... খারাপ কি, বলুন, সামান্য মাইনের পাম্পের মিস্তিরির পক্ষে?
আমি কিছু বললাম না।
উনি বলে চললেন, তবে কী জানেন, এত কিছু দিয়েছিলেন হেডমাস্টার, কিন্তু মেনে নেননি জামাইকে। শেষে নাতির জন্মের পরে একটু নরম হয়েছিলেন। তাও বোঝেনই তো অবস্থা। একটা কমন পারিবারিক অনুষ্ঠানে দুজনকে ডাকা যেত না। এ কী করে হতে পারে, যে এই স্কুলেরই একজন মিস্তিরি এই স্কুলের সব সিনিয়র টিচারদের সঙ্গে একসঙ্গে ড্রিঙ্ক করছে, বা কোমর জড়িয়ে নাচছে?
আমি মাথা নাড়লাম। নিজের আত্মীয় স্বজনের মধ্যে এরকম আশ্চর্য অবস্থা আমি দেখেছি বলে জানি।
বললাম, তাও তো মিঃ আলোক বা প্রীতির স্বামীর আত্মীয়স্বজন এখানে থাকেন না। থাকলে আরও সমস্যা হত।
নিঃসন্দেহে, বললেন অভিষেক। তারপরে বললেন, তবে হেডমাস্টার পরের দিকে অনেকটাই নরম হয়েছিলেন। বুঝেছিলেন, ছেলেটা ওঁর মেয়েকে সত্যিই খুব ভালোবাসে। ওকে সব দিক থেকে সুখী করতে চায়। মাঝের থেকে সব ওলটপালট করে দিল অ্যাক্সিডেন্টটা।
বললাম, আমি অবশ্য সবটাই বুঝতে পেরেছিলাম, ওঁরা আমাকে না বললেও। হেডমাস্টারের ভেতরের বসার ঘরের ম্যান্টেলপিসে দুই মেয়েরই ছবি রয়েছে। সদ্যোজাত নাতির ছবি রয়েছে প্রথমে ছোটো মেয়ের কোলে, আর পরে বড়ো মেয়ের সঙ্গে। তখন ছেলেটার বয়স বেড়েছে। কিন্তু সবাই বলছেন মেয়েটার মৃত্যু হয়েছিল অ্যাক্সিডেন্টে। আমি ওঁদের জিজ্ঞেস করতে পারিনি কী অ্যাক্সিডেন্ট।
অভিষেক বললেন, কোথা থেকে একটা ষাঁড় এসে খোলা গেট দিয়ে ঢুকে মনের আনন্দে গাঁদাফুল খেতে শুরু করেছিল। হাজবেন্ড সবে বেরিয়েছে কাজে — মানে স্কুলেই। মেয়েটা ওকে টা টা বলে ভেতরে গিয়েছিল, কাজের মেয়ে চেঁচিয়ে বলেছে গরুতে ফুল খাচ্ছে।
গরু ছিল না, ছিল ষাঁড়। সাধের ফুল খেয়ে নিচ্ছে বলে মেয়েটা বেরিয়ে এসে তাড়াতে গেছে, ষাঁড়টা পাত্তাও দিচ্ছে না। মেয়েটা সাত পাঁচ না ভেবে পিঠে কিল মেরেছে, তারপরে গেছে শিং ধরে সরিয়ে দিতে। ষাঁড়টাও সঙ্গে সঙ্গে মেরেছে গুঁতো। শিংটা সোজা পেটে ঢুকে গেছে।
ইন ফ্যাক্ট শিঙের সঙ্গে আটকে গেছিল, ষাঁড়টা ঝাঁকানি দিয়ে ফেলে দিয়ে চলে গেছিল।
কাজের মেয়েটা গিয়ে দেখে চতুর্দিক রক্তে ভেসে যাচ্ছে। কোনও রকমে তুলে বাড়িতে এনে, স্কুলে ফোন করে খবর দিয়েছিল। ওর স্বামী পড়িমরি করে ফিরল, কিন্তু ততক্ষণে দেরি হয়ে গিয়েছে। এখান থেকে হাসপাতালও প্রায় ঘণ্টাখানেক দূরে। শিং লিভারে ঢুকে গিয়েছিল।
আমি বললাম, কিন্তু তারপরে বড়ো মেয়েও কেন ওকেই বিয়ে করতে গেল? ও-ও কি ছেলেটার প্রেমে পড়েছিল নাকি? এমনটা তো জানা-ই আছে, দুই বোনই একই ছেলেকে ভালোবাসে।
মাথা নাড়লেন অভিষেক। বললেন, এই ব্যাপারটা আমরা কেউ-ই ঠিকমতো জানি না। এতটুকু জানি, যে প্রীতি মারা যাবার পরে হেডমাস্টার চেয়েছিলেন বাচ্চাটাকে মানুষ করবেন। অনেকবার জামাইকে বলেছিলেন, দত্তক নেবেন। জামাই রাজি হয়নি। পাড়ার লোকের বাড়িতে রেখে কাজে আসত। সে এক সময় গেছে। শেষে হঠাৎ একদিন পুষ্পা বলল, ওকেই বিয়ে করতে চায়। সেই নিয়ে আর এক তাইরে-নাইরে। আমরা অনেকেই ভেবেছিলাম, পুষ্পা কেবলমাত্র বাচ্চাটার জন্যই বিয়েটা করতে চেয়েছে। কিন্তু এখন আমরা কেউ অত শিওর নই। কারণ পুষ্পাও লুকস ভেরি হ্যাপি। দে আর আ হ্যাপি থ্রি-সাম!
বললাম, পুষ্পারও বোনের মতো হলুদ ফুলে, বিশেষ করে গাঁদায় ইন্টারেস্ট — সেটাও আশ্চর্য।
এবারে না সূচক মাথা নাড়লেন অভিষেক। বললেন, না... মানে, ওরা দুই বোনেরই এস্থেটিক সেন্স খুব বেশি, তবে হলুদ গাঁদা কেবল প্রীতিই চাইত। পুষ্পা নয়। হলুদ গাঁদা কেবল প্রীতির প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য।
উপসংহার
প্রায় মাসখানেক পরে স্কুলের বোর্ডের তরফে ইমেইল এল। খুব বিনম্র ভাষায় লেখা, যে সবরকম যোগ্যতা সত্ত্বেও আমাকে সহকারী প্রধান শিক্ষকের পদে বহাল করা গেল না, এ জন্য তাঁরা দুঃখিত। তবে, ভবিষ্যতে আমার যোগ্য কোনও পদ খালি হলে তাঁরা আমাকে জানাবেন, এবং তখন যদি আমি আবার ইন্টার্ভিউ দিতে চাই, তাঁরা যারপরনাই ধন্য হবেন, ইত্যাদি।
হেডমাস্টার চিত্রেশ অলোক আর একটু খোলসা করে লিখলেন কয়েক দিন পরে। তিনি জোরের সঙ্গেই বার বার বোর্ডের কাছে আমার নাম সুপারিশ করেছিলেন। বোর্ড প্রথম থেকেই ঘরের মেয়ের দিকে হেলে ছিল, কিন্তু হেডমাস্টারের জোরাজুরিতেই আমাকে ইন্টার্ভিউয়ের জন্য ডাকা হয়। ডেকে এনে আমাকে চাকরি না দেওয়ার জন্য আমার যে হয়রানি হলো তার জন্য নিজেকেই দায়ী করে আলোক ক্ষমা চেয়েছেন।
বহুদিন পরে দেখা হয়েছিল পুষ্পা চিত্রেশের সঙ্গে। দুবাই শহরে, শিক্ষকদের কনভেনশনে। দেখে আমিও চিনতে পারিনি, উনিও না। নিমন্ত্রিতদের তালিকায় নাম দেখে এগিয়ে গিয়ে আলাপ করেছিলাম। পুষ্পার মনে পড়েছিল। বলেছিলেন, বাবা মা ভালো আছেন। রিটায়ারমেন্টের পরে দেশে ফিরে গেছেন। ওখানে যৌথ পরিবারে আছেন। রাতে ডিনারে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন স্বামী আর চোদ্দ বছরের ছেলের সঙ্গে।
বলেছিলেন, স্বামী এঞ্জিনিয়ার। ওঁদের স্কুলেই কাজ করেন। ছেলের কাছে জানতে চেয়েছিলাম, তুমি কোন স্কুলে পড়ো? মায়ের স্কুলে?
ছেলে মাথা নেড়েছিল। বলেছিল, না। মা আগে যে স্কুলে পড়াত, সেই স্কুলে।
পুষ্পা বলেছিলেন, ওর স্কুল বদলাইনি। আমার স্কুল তো আপনি দেখেছেন। বড্ড নাক-উঁচু ভাব ছাত্রদের। যেখানে আছে, সেখানে থাকলে অনেক মাটির কাছাকাছি থাকতে পারবে। আমি নিজেও ওই নাক-উঁচু স্কুলেরই ছাত্রী কি না, তাই জানি।
জানতে চাইলাম, হলুদ গাঁদাফুল এখনও হয়, শীতকালে?
বললেন, আসুন একবার ফেব্রুয়ারিতে। দেখে যান নিজের চোখে। উই উইল বি হ্যাপি ইফ ইউ কাম।
No comments:
Post a Comment