‘মাই হার্ট লেপ্ট’ — এই ইংরেজি কথাটার মানে আমি বুঝতাম না। মানে, ডিকশনারিতে কী লেখা আছে জানতাম, কিন্তু কী ধরণের আনন্দ পেলে মানুষের হৃদপিণ্ড হঠাৎ তাদের মুখে এসে হাজির হবে, তা মাথায় ঢুকত না। বুঝেছিলাম হঠাৎ, এক বাইশে জুলাইয়ের সন্ধ্যায় — যে দিনটা মনে রাখার আর কোনও কারণই ছিল না।
জানতাম, মেরি লু আবার ফিরে আসবে। আমার বন্ধুরা, বিশেষ করে শুভায়ু, বলত ওর কথা ভাবা ছেড়ে দে, গুপি। অ্যামেরিকান বন্ধুরা, কেবল সাদা চামড়া নয়, যারা বহু বছর, বা সারা জীবন এখানে আছে, বলত, ওর কথা ভাবা ছেড়ে দে, গুপি। অ্যামেরিকান বন্ধুরা, কেবল সাদা চামড়া নয়, যারা বহু বছর, বা সারা জীবন এখানে আছে, বলত, একটা মেয়ের জন্য এমন হা-হুতাশ করার কোনও মানে হয়? ওরে, ও যে সমুদ্র থেকে এসেছিল, তাতে আরও অনেক মাছ আছে... এত হতাশ হোস না। অনেক বন্ধুকে বাদ দিয়েছিলাম জীবন থেকে — কেবল এই জন্যই। রয়ে গেছিল সবচেয়ে কাছের আর পুরোনো বন্ধু — বাবান। ও অন্তত কখনও বলেনি, মেরি লু আর আসবে না।
প্রায় তিন বছর পরে যখন একটা বার্-এ হঠাৎ ওকে দেখলাম, তখন এতটাই অবাক হয়ে গেছিলাম, যে সত্যিই বুঝেছিলাম, মুখে কী করে হৃদপিণ্ড পৌঁছে যায়। সে অবশ্য শুধু তিন বছর পরে মেরি লু-কে দেখেছিলাম বলে, তা নয়। স্যাক্রামেন্টো থেকে প্রায় পঁয়তাল্লিশ মাইল দূরে (এ দেশে থেকে থেকে আমার মাইলে হিসেব বলা অভ্যেস হয়ে গেছে। আমাদের হিসেবে সত্তর কিলোমিটার মতো) প্লেসারভিল-এর মতো এঁদো জায়গায় সখ করে মেরি লু...
অবশ্য তিন বছর আগেও আমরা এখানেই থাকতাম। ন-বছর হল চাকরি করি স্যাক্রামেন্টোতে, থাকি প্লেসারভিলে। দেশি বন্ধুবান্ধবরা হাসাহাসি করে, কিন্তু আমার প্লেসারভিল-ই ভালো লাগে... যাক সে কথা। মেরি লু-র কথায় আসি। আমার প্লেসারভিলের বাড়ি থেকেই চলে গেছিল। তিন বছরে দেখিওনি। চিঠি-চাপাটি-ক্রিসমাস-কার্ড দূর-অস্ত, ফোনও করেনি — এমনকি এই সেদিনও ফোনটা বন্ধই ছিল। ই-মেইলেরও উত্তর দেয়নি কোনও দিন। তার দর্শন তিন বছর বাদে... তা-ও আবার এই পুরুষ অধ্যুষিত মদিরালয়ে — বার্ — যেখানে একলা মেয়েরা একটা উদ্দেশ্যেই আসে!
মেরি লু বার-এ গিয়ে মদ খাওয়া পছন্দ করত না। মদ খাওয়াই পছন্দ করত না — ওর পাল্লায় পড়ে আমারই বরং বার্-এ যাওয়া বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। বাড়িতে মদ রাখতাম। আজ মেরি লু নিজেই বার্-এ! চোখ সরাতে পারছিলাম না। বার থেকে দূরে কোনের টেবিলে আমি। এখান থেকে ঘরের সবটাই প্রায় দেখতে পাই। বার্টা তো বটেই।
একা-ই ছিল। বার্-এ যে অন্য তিনটি মেয়ে ঘোরাফেরা করছে, তাদের সঙ্গে ওর খুব একটা কথাবার্তা হচ্ছিল না। আমি চোখ দিয়ে গিলছিলাম। দেখতে একেবারে একই আছে। ঠিক সেই হাসি, সেই চোখের চাহনি, সেই গালে টোল... শুধু বদলেছে আচরণ। এত প্রগলভ ছিল না। হেসে হেসে দৃশ্যত অপরিচিত পুরুষের গায়ে ঢলে পড়ত না। আর মদ খেত না। খুব কালেভদ্রে — ঈস্টারে, থ্যাঙ্কসগিভিং-এ বা ক্রিসমাসে আধ গ্লাস ওয়াইন...
বার্ থেকে দূরে বলে আমার সঙ্গে চোখাচোখি হতে সময় লাগল। ততক্ষণে আমার দৈনিক বরাদ্দ দু-গেলাস মদের একটা শেষ করে ফেলেছি প্রায়। থমকাল। স্বাভাবিক। তারপরে লাস্যময়ী ভঙ্গীতে এ-টেবিল, ও-টেবিল ঘুরে এগোতে লাগল — খদ্দেরদের সঙ্গে ইয়ার্কি করতে করতে। এই মেরি লু আমার পরিচিত নয়। আমার চেনা মেরি লু সিরিয়াস, গম্ভীর, ঠাট্টা ইয়ার্কি ওর চলে না তা নয় — কিন্তু প্রগলভতা নেই। তিন বছরে অনেক বদলেছে।
বদলাক। তবু, ও মেরি লু।
ক্রমে আমার টেবিলের কাছে এসে ঘাড় বেঁকিয়ে, আড়চোখে তাকিয়ে বলল, “হাই, হ্যান্ডসাম!”
অ্যামেরিকার বার্-এ বহু অভিজ্ঞতার ফলে মেয়েদের এই ভ্রূভঙ্গী আর সম্বোধন আমার অপরিচিত না হলেও, এই মানুষটার ক্ষেত্রে দুটোই অবাক করা। তাই উত্তর দিতে দেরি হল। কিন্তু মুখে আহ্বান না থাকলেও আমার শরীরের ভাষায় নিশ্চয়ই কিছু ছিল, আমার উলটো দিকের চেয়ার টেনে নিয়ে বসে বলল, “আমাকে এক পাত্তর খাওয়াবে না?”
বললাম, “অবশ্যই... কী ইচ্ছা করো? তোমার প্রিয় বিষ কী?”
বলা বাহুল্য, কথাগুলো ইংরিজিতেই হচ্ছিল — তাই বাংলা করে লিখতে গিয়ে আটকাচ্ছে — ‘হোয়াট ইজ ইওর উইশ’ এবং ‘হোয়াট’স ইওর ফেভারিট পয়জন’ — কথাগুলোর সাদা-সাপটা বাংলা হয় না।
পয়জন কথাটা ব্যবহারের আরও একটা কারণ ছিল। মেরি লু মদকে বলত — বিষ। ডোন্ট ড্রিঙ্ক দ্যাট পয়জন। তাই ইচ্ছে করেই বলেছিলাম।
কটাক্ষটায় পাত্তা দিল না। বলল, “একটা হুইস্কি সাওয়ার।”
বেশ তাড়াতাড়ি খায়। একটা শেষ করে ফেলল আমি তিন চুমুক দেবার মধ্যে। বলল, “আর একটা।”
বেশ নেশার মতো লাগছিল। প্রাক্তন প্রেমিকার সঙ্গে নতুন সম্পর্ক, তায় আজ ও দেহ পসারিনী। কোনও দিন ভাবিনি এমন পরিস্থিতিতে পড়ব। মজা-ও, আবার কোথাও যেন একটা ভালো না-লাগা। আমি শরীরভিত্তিক প্রেমে বিশ্বাসী নই। কায়মনোবাক্যে ভালোবেসেছিলাম মেরি লু-কে। তাই ওর চলে যাওয়ায় এতটাই ভেঙে পড়েছিলাম।
কখন কথাটা তুলব? এখনই? না। আজই? হয়ত। বা হয়ত আজ না, কয়েক দিন পর জানতে চাইব — কেন চলে গেছিলে আমাকে ছেড়ে?
বেরোলাম বেশ রাত করে। মেরি লু বেরোবার আগে বাথরুম গেল। সেই ফাঁকে চট করে সেলফোন বের করে বাবানকে লিখলাম — মেরি লু ব্যাক। বাবান আর আমি একসঙ্গেই অ্যামেরিকা এসেছিলাম। ও আমার গার্জিয়ান মতোও বটে। ও যেখানে যায়, আমি সঙ্গে সঙ্গে সেখানেই চলি। আমার একাকীত্ব নিয়ে বাবান আর ওর বউ টুকু বেশ উদ্বিগ্ন থাকে। বার বার বলে বিয়ে করতে। মেয়ে দেখে আসে। দেশে আমার মা-মাসিদের সঙ্গে যোগাযোগ করে। ওদের বলে, চেষ্টা তো করছি। কিন্তু জানেন তো গুপির স্বভাব। নিজে যা ঠিক করবে তা-ই করবে। মেসেজটা পাঠিয়ে সঙ্গে সঙ্গে ফোন বন্ধ করে দিলাম। বাবান না হোক, এই মেসেজ দেখলে টুকু সঙ্গে সঙ্গে ফোন করবে। টুকু মেরি লু-কে খুব পছন্দ করত না। সেটা আমি জানি। বাবান লুকোবার চেষ্টা করত, তাও আমি বুঝতাম।
অভ্যেসের চেয়ে বেশিই মদ খেয়েছি। গাড়ি নেই আমাদের কারওরই। আমি মদ খেতে এলে গাড়ি নিয়ে আসি না। অফিস থেকে ফিরে বাড়িতে রেখে হেঁটে আসি। মেরি লু-র জুতোয় হাই হিল। বলল, “কতদূর?”
মেরি লু ও-বাড়িতেই থাকত। তাই উত্তর দিলাম না। ও-ও আর কিছু না বলে হাঁটা শুরু করল। টলছে। এক হাতে আমার কনুই জড়াল। জুতো খুলে হাতে নিল। এ দেশের মেয়েরা প্রায়ই এরকম করে। আমার অস্বস্তি হয়। তারপরে এই পায়েই বিছানায় শোবে। পা ধুতে বলতে হবে। অবশ্য এ দেশের লোক তো জুতো পায়েও বিছানায় উঠে যায়... যত্তোসব।
বাড়িতে ঢুকে মেরি লু বলল, “বেডরুম কোনদিকে?”
জানতে চাইলাম, “ঘুম পেয়েছে? এত তাড়াতাড়ি?”
মেরি লু আমার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল, “দেরি করতে চাও? বেশ তো, হানি... ইট’স ইওর মানি...”
পয়সার কথা বলছে কেন? কিন্তু আমি কিছু জিজ্ঞেস করার আগে বলল, “বাড়িতে মদ আছে? কোথাও তো লিকার ক্যাবিনেট দেখছি না।”
মেরি লু যাবার পরেও প্রায় এক বছর আমি বার্-এ যেতাম না। বাড়িতে ফিরে অপেক্ষা করতাম ওর জন্য। বাড়িতেই মদ খেতাম। তারপরে কবে আবার বার্-এ যাওয়া শুরু করেছিলাম। বোতলগুলো পড়ে থাকত। একদিন টুকু এসে সব কিচেন ক্যাবিনেটে ঢুকিয়ে দিয়েছিল।
ধুলোমাখা হুইস্কির বোতলটা নিয়ে এসে মেরি লু বোতলে মুখ লাগিয়েই চুমুক দিয়ে বলল, “তুমি?”
মনে হল কেন নয়? যদিও আমি সাধারণত যা খাই তার ডবলেরও বেশি খাওয়া হয়েছে আজ — মেরি লু-কে সঙ্গ দিতে গিয়ে। কাল না হয় অফিস যাব না। দেরি করে দু-জনে একসঙ্গে ব্রেকফাস্ট করব। কাছে গিয়ে ওর কোমর জড়িয়ে ধরে কাছে টেনে এনে হাত থেকে বোতল নিয়ে চুমুক দিলাম। আমার শরীরে ইলেকট্রিকের শক লাগল। এই সেই চিরপরিচিত শরীর। কত আদর করেছি...
মেরি লু আমার ঢিলে টাই টেনে খুলে ফেলল। ছুঁড়ে ফেলল ওদিকের সোফায়। শার্টের বোতাম খুলতে খুলতেই ফাঁক করে বুকের লোমে হাত বোলাতে বোলাতে চুমু খেল। ওই অবস্থায় দাঁড়িয়েই বিবস্ত্র করতে থাকলাম আমরা একে অপরকে। তারপর, কেবল অন্তর্বাস পরা অবস্থায় আমাকে ঠেলে সোফায় বসিয়ে দিল মেরি লু। আমার দু-দিকে হাঁটু গেড়ে বসে এক হাত ভাঁজ করে পেছনে নিয়ে গিয়ে ব্রা খুলে ফেলল। আমার হাত থেকে হুইস্কির বোতলটা নিয়ে যখন চুমুক দিচ্ছে — তখন আমি ওর প্যান্টি খুলছি। আমার নজর ওর বাঁ কোমরে...
খোলার আগেই সন্দেহ হচ্ছিল। অত সরু প্যান্টির কাপড়ের আড়ালে অতটা চামড়া ঢাকা পড়ে না। কিন্তু প্যান্টিটা ইঞ্চিখানেক নামিয়েই নিঃসন্দেহ হলাম। মেরি লু-কে আমার ওপর থেকে সরিয়ে উঠে দাঁড়ালাম। মেরি লু বোতলটা সামলাতে গিয়ে সোফায় প্রায় চিত হয়ে পড়ল। বলল, “কী হল?”
আমি কথা না বলে ওকে সম্পূর্ণ বিবস্ত্র করে ওর কোমরের দিকে তাকিয়ে বললাম, “তিমিটা কোথায়?”
অবাক চোখে আমার দিকে তাকিয়ে মেরি লু বলল, “কোন তিমি?”
মেরি লু উল্কিটার কথা ভুলে গেছে হতে পারে না। ওর কোমরে ওটা রয়েছে ওর পনেরো ষোলো বছর বয়স থেকে। আমার সঙ্গে যখন পরিচয়, তখনই ওটা সময়ের সঙ্গে একটু ধেবড়ে গেছে। নীল তিমি, ছোট্ট, দৈর্ঘ্যে-প্রস্থে ইঞ্চি দেড়েক। মাথা থেকে জল ছিটছে ফোয়ারার মতো। অনেকটা বাচ্চাদের কার্টুনের স্টাইলে আঁকা। ও লজ্জা পেত। বলত, মুছে ফেলবে। আমি বলতাম, না। ওটা আমার আদরের। ওটার গায়ে চুমু খেতাম। জিভ দিতাম। মেরি লু বলত, ওটা ওর সতীন। আমি ওটাকে যত ভালোবাসি, মেরি লু-কে তত ভালোবাসি না। মুছে ফেলেছে ওটা। আমি কেমন যেন হয়ে গেলাম। ওর শরীরটাকে ডাইনে বাঁয়ে, সামনে পেছনে ঘোরাতে থাকলাম। জিজ্ঞেস করতে থাকলাম, “কোথায় গেল? কোথায় তোমার উল্কি? তিমিমাছটা কোথায়?” কোথাও নেই। ওর শরীরে আজ কোনও উল্কিই নেই।
মেরি লু হাত দিয়ে ঝাপটা দিয়ে আমাকে সরিয়ে দিয়ে উঠে বসল। বলল, “হোয়াট ইজ রং উইথ ইউ?”
আমার ততক্ষণে খেয়াল হয়েছে। আমি সরে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “কেন মুছেছ? কার ওস্কানিতে? মার্ক? না ডেভিড? এতদিন কার কাছে ছিলে? ওদের কাছে, না আর কেউ এসেছিল তোমার জীবনে?”
এক লহমায় মেরি লু-র চোখের বিহ্বলতাটা কেটে গিয়ে ফুটে উঠল একই সঙ্গে ভয় আর ঘৃণা। এই দুটোই আমি আগে দেখতাম। চলে যাবার আগে। কোনও রকমে সোজা হয়ে বসতে বসতে হাতড়াতে শুরু করল ওর জুতোজোড়া। দৃষ্টি ইতিউতি। জামাকাপড় সব সারা ঘরে ছড়িয়ে আছে। আমরা এর ওর পোশাক খুলে ঘরের ডানদিকে বাঁদিকে ছুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলেছি। কোনওটাই হাতের কাছে নেই। আমার দিকে ভয়ার্ত দৃষ্টিতে চেয়ে বলল, “ও মাই গড্! ইউ আর ক্রেজি...”
আমার মাথায় আগুন জ্বলে গেল। এই কথাটা... এই কথাটাই বার বার বলত চলে যাবার আগে। দু হাত মুঠো করে ওর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লাম। বললাম, “খবরদার যদি তুমি আমাকে ক্রেজি বলেছ আবার...”
মেরি লু ডানহাতি। হুইস্কির বোতলটা ওর বাঁ হাতে। আড় চোখে দেখতে পেলাম বোতলটা আমার দিকে ধেয়ে আসছে, খোলা মুখ দিয়ে হুইস্কির ফোয়ারা ছিটছে সারা ঘরে... সরে যেতে চেয়েছিলাম, কিন্তু আমারও ভারসাম্য কম। বেশি সরতে পারলাম না, তবু বোতলটা আমার মাথার মাঝখানে না পড়ে কপালের পাশে লাগল। বেশ জোরে।
তারপরে কিছু মনে নেই।
জ্ঞান ফিরল পরদিন — জ্ঞান ফিরল, না ঘুম ভাঙল জানি না, কিন্তু চোখ মেলে দেখলাম, আমি আমার বিছানাতেই। পরনে রাত পোশাক। মাথা ছিঁড়ে যাচ্ছে যন্ত্রণায়। বাইরে ঝাঁ-ঝাঁ করছে রোদ। কত বেলা হয়েছে? কটা বাজে? মোবাইলটা? মনে পড়ল, কাল রাতে ফোনটা অফ করে প্যান্টের পকেটে রেখেছিলাম। নিশ্চয়ই নিচে বসার ঘরেই পড়ে আছে। উঠে আগে বিছানার পাশে রাখা বোতল থেকে জল খেলাম। তারপরে বাইরের ঘরে যেতে গিয়ে দেখি আমার জামাকাপড় শোবার ঘরেই বিছানার পাশে চেয়ারে ভাঁজ করা রয়েছে। কে রাখল? মেরি লু? কিন্তু সে কোথায়? ঘরে তো নেই।
মোবাইল সুইচ অন করামাত্র টুং-টুং শব্দের সারি জানিয়ে দিল অজস্র মেসেজ ঢুকছে। ফোনটা হাতে নিয়েই শোবার ঘর থেকে বেরোলাম। বাড়িটা বেশি বড়ো না। দোতলায় দুটো শোবার ঘর, একটা বাথরুম। বাথরুমে কেউ নেই, অন্য ঘরটাও খালি। সিঁড়ি দিয়ে নেমে নিচে বসার ঘর, খাবার ঘর আর রান্নাঘর। কোথাও নেই মেরি লু। মেরি লু নেই, মেরি লু-র জামা-জুতো-ব্যাগ — একটা হালকা নীল ছোটো ব্যাগ ছিল বটে ওর সঙ্গে — ফোন আর সামান্য কিছু টাকাকড়ি রাখার মতো। নেই। জানি ফোন থাকলেও নম্বর আর একই নেই, তবু একবার ফোন করে দেখব...
ফোনের দিকে তাকিয়ে আবার চমকে উঠলাম। সকাল সাড়ে এগারোটা প্রায়। অজস্র মেসেজ। বেশিরভাগই বাবানের। কাল রাত থেকে — “আরিব্বাস! মেরি লু? আবার কোত্থেকে হাজির হল?” থেকে শুরু হয়ে কাল রাতেই শেষ পর্যন্ত, “কী হচ্ছে-টা কী? মেরি লু-কে পেয়ে আমাদের ভুলেই গেলি, শালা...” হয়ে আজ সকালে, “তুই কোথায় রে? অফিসে আসিসনি কেন?” পর্যন্ত।
একটা মেসেজ রায়ানের। রায়ান আমার বস। আজ কোনও বিশেষ কাজ নেই, তাই একটাই মেসেজ — খবর না দিয়ে কাজে আসিনি কেন, গোছের।
মাথা ছিঁড়ে যাচ্ছে। এখন কথা বলতে পারব না। কফির জল বসিয়ে বসলাম উত্তর লিখতে। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ফোন বাজল। ভিডিও কল করেছে বাবান।
ধরতেই হল। স্ক্রিনে বাবানের উদ্বিগ্ন মুখ। “কী হয়েছে তোর? আমি তো টুকুকে বললাম, গিয়ে খোঁজ নিতে।”
বাবান থাকে স্যাক্রামেন্টোর খুব কাছে। আটত্রিশ মাইল। টুকু গাড়ি চালিয়ে এতদূর আসবে? বললাম, “আরে দরকার নেই, বারণ করে দে। রাতে বেশি মদ খেয়ে ফেলেছি। ঘুম ভাঙেনি।” গলায় স্বাভাবিক কথা বলার সুর আনার চেষ্টা করলাম।
বাবান বলল, “এখনও বেরোয়নি। বারণ করে দিচ্ছি... মেরি লু কোথায়? দেখি?”
বললাম, “মেরি লু নেই।”
“নেই? সে কী? চলে গেছে আবার?”
আমার কথা বলতে ইচ্ছে করছিল না। বললাম, “হুঁ।”
“কেন গেছে? কিছু হয়েছিল? ঝগড়া করেছিলি আবার?”
ভালো লাগছে না। বললাম, “শোন, রায়ানকে বলে দিবি, যে আমি কাল রাতে মদ খেয়ে আজ কাজে আসতে পারিনি? হ্যাংওভারে মাথা ছিঁড়ে যাচ্ছে। কথা বলতে পারছি না। কফিও খাইনি। ঘুমোব। পরে কথা বলছি।”
লাইন কেটে দিয়ে গরম জলে কফি মিশিয়ে কাপটা নিয়ে এসে বসার ঘরে বসলাম। দুটো অ্যাসপিরিন ট্যাবলেটও নিলাম। খাবারও খেতে হবে। সে পরে হবে। আপাতত কফিতে মোটা করে দুধ আর চিনি দিয়েছি।
সোফায় বসতে গিয়ে দেখি পায়ের কাছে মেরি লু-র প্যান্টি। অবাক হলাম। তাড়াহুড়ো করে খুলে ওখানেই ফেলে দিয়েছিলাম। ওখানেই পড়ে আছে? আর ব্রা-টা? ওটা ও নিজেই খুলেছিল। তারপরে ছুঁড়ে ফেলেনি। হাতটা মেলে ছেড়ে দিয়েছিল। তাকিয়ে দেখি সোফার ওপাশের সাইড টেবিলের পাশে পড়ে আছে। পুরোটা মাটিতে পড়েওনি। টেবিলের ওপরে একটা সুদৃশ্য বাটিতে একটা হুক আটকে ঝুলে আছে।
মেয়েটা অন্তর্বাস ফেলে রেখে চলে গেল? আশ্চর্য! অথচ — সারা ঘরটা দেখলাম... আমি ওর জামা আর স্কার্ট খুলেছিলাম। জামাটা টান মেরে ফেলেছিলাম ওই সোফার ওপরে — আমার জামার পাশে গিয়ে পড়েছিল। আর স্কার্টটা পড়েছিল অন্য দিকের সোফার সামনে — কার্পেটে।
নেই। তাহলে তাড়িঘড়ি জামাকাপড় পরে বেরিয়ে গেছে — ভয়ে? বোতল দিয়ে মারার আগে ভয় পেয়েছিল। কিন্তু তাহলে আমার জামাকাপড় ভাঁজ করে রাখল কেন? আমাকে রাত-পোশাক পরিয়ে, বিছানায় শুইয়ে...
মেয়েদের মন বোঝা ভার।
সন্ধেবেলা বাবান আর টুকু এসে হাজির হল। আমাকে দেখে বাবান আঁতকে উঠল। সকালে কপালটা ফোনের অ্যাঙ্গেল দিয়ে লুকিয়েছিলাম। এখন বাড়িটা আধো-অন্ধকারে রেখেও শেষরক্ষা হল না।
“কী করে হল?”
বললাম, “কাল টালমাটাল হয়ে পড়ে গেছি...”
“বাজে বকিস না গুপি। কেউ মেরেছে। কে? মেরি লু?”
বাধ্য হয়ে পুরোটাই বলতে হল। বাবান গম্ভীর হয়ে গেল। টুকু বলল, “তুমি সব ব্যাপারে এত বুদ্ধি রাখো গুপি, এই একটা ব্যাপারে কেন এত অবুঝ? বার বার একটা মেয়েকে প্রাক্তন প্রেমিকের কথা জিজ্ঞেস করলে সে থাকবে?”
আমি উত্তর দিলাম না। আমি চাইনি জিজ্ঞেস করতে, কিন্তু উল্কিটা নেই দেখে আর থাকতে পারিনি। উল্কির কথাটা বাবানকে টুকুর সামনে বলা যাবে না। এর আগেও দেখেছি, অন্য মেয়ের শরীর নিয়ে আলোচনার মধ্যে বাবান থাকুক, টুকু চায় না। টুকু সমানে বলে যেতে থাকল, আমারই দোষ। বিরক্ত করে নাকি আগের বারেও মেরি লু-কে তাড়িয়েছি, এবারও... আমি কিছু বললাম না। টুকু কিছু বোঝে না। নিজের মতো ভাবে, নিজের মতো বলে — মাথায় একবার কিছু ঢুকলে আর বেরোয় না। বাবানকে বললাম, “হুইস্কি খাবি?”
বাবান গাড়ি নিয়ে এসেছে, টুকুকে বললাম, “তুই চালাতে পারবি না?” টুকুটা মহা পাজি। বলল, “সকালে আসব বলেছিলাম, বাবানকে বললে, টুকু একা এতদূর গাড়ি চালিয়ে আসবে? আর এখন বন্ধুকে হুইস্কি খাওয়ানোর তাগিদে টুকুকে দিয়ে রাত্তিরে গাড়ি চালানোতে আপত্তি নেই?” ঠিকই বলেছে। আমারই দোষ। বললাম, “তা হলে আমি-ই খাই।”
বোতলটা দেখে বাবান ভুরু কোঁচকাল। বলল, “তুই আবার বাড়িতে মদ রাখছিস?”
বললাম, “আবার কোথায়? এতো সেই তিন বছরের পুরোনো। টুকু তুলে রেখেছিল।”
বাবান বলল, “কাল বের করেছিলি? কেন? মেরি লু এসেছিল বলে?”
খেয়াল না করে বলে ফেলেছি, “মেরি লু-ই বের করেছিল। নিজে খাবে বলে।”
“মেরি লু? মেরি লু হুইস্কি খেল?” বাবান আর টুকু মুখ তাকাতাকি করল। টুকু বলল, “মেরি লু তো মদ খাওয়া একেবার পছন্দ করত না।”
আমি উত্তর না দিয়ে দু-কাঁধ ঝাঁকালাম। সাহেবি এই কাঁধ ঝাঁকানির অনেক অর্থ হয়। তার মধ্যে যেটা আমি বোঝাতে চেয়েছিলাম তা হল, ওসব নিয়ে আমার অত ভাবার সময় নেই। বাস্তবিক, আমি ছোটো থেকে দেখেছি, মানুষ বদলে যায়। তাই মেরি লু কখনও মদ খেত না, আজ খায়, সে নিয়েও আমার বিশেষ মাথা ঘামানি নেই।
আমি মদ খাচ্ছি, বাবান আর টুকু নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে পিৎজা অর্ডার দিচ্ছে, তারপরে টুকু বলল, ওয়াশরুমে যাবে। আমি তক্কে তক্কে ছিলাম। যেই দরজা বন্ধ হয়েছে, বলেছি, “ওর উল্কিটা আর নেই।”
বাবান অবাক হয়ে বলল, “উল্কি? কার উল্কি? কী উল্কি?”
বাবান মেরি লু-র ওই উল্কি অন্তত হাজার বার দেখেছে। মেরি লু সাঁতার কাটতে ভালোবাসত। বিকিনি পরলে তিমি মাছের অন্তত খানিকটা সবসময়েই দেখা যেত। আর মেরি লু উল্কিটা আছে বলে যতটা লজ্জা পেত, উল্কিটা দেখাতে লজ্জা পেত না বলে লুকোত না।
নিজের কোমরের বাঁ দিকে হাত দিয়ে বললাম, “আরে এখানে যে...”
সঙ্গে সঙ্গে বাবান বলল, “ও, ওই তিমি মাছের ট্যাটু-টা? নেই মানে?”
“নেই মানে নেই। চামড়ার ওখানটা এখন পরিষ্কার। ইন ফ্যাক্ট ওর শরীরে কোথাও আর ট্যাটু নেই।”
বাবান একটু ভেবে বলল, “ট্যাটু ভ্যানিশ করে যায়?”
আমি বললাম, “নিজে থেকে যায় না, তবে করা অবশ্যই যায়। কতবার বলত ওটা লেজার করে পরিষ্কার করে নেবে। আমিই বারণ করতাম। খুব মিষ্টি ছিল তিমিমাছটা।”
বাবান কিছু বলল না। আমি বললাম, “ওটা নেই দেখেই আমার মনে হয়েছিল মার্ক, বা ডেভিডের কাছে ও যদি ফিরে গিয়ে থাকে? ওরা তো ওকে বলত ওটা মুছে ফেলতে।”
বাবান কী বলত জানা হল না, সিঁড়ির ওপর থেকে বাথরুমের দরজা খোলার শব্দ পাওয়া গেল। বাবান মন দিল মোবাইল ফোনে। নিচে এসে টুকু বলল, “বাবা, মেয়েটা এল গেল... কোথাও কোনও নিশানা পর্যন্ত নেই,” ভাবলাম বলি, আছে। ব্রা আর প্যান্টি। বললাম না। আগেরবার একটা নাইটি, দু-চারটে জামাকাপড় আর কয়েকটা প্রায় শেষ হয়ে যাওয়া লিপস্টিক ফেলে গেছিল। এসব কথা ওদের বলিনি — আজও বললাম না। টুকুর সামনে মেরি লু-র ব্রা আর প্যান্টির গল্প করতে পারি না আমি। আবার বাবানকে আলাদা করেও ওসব পোশাকের কথা বলা যায় না। যদি দেখতে চায়? কী বলব? সেই তখনই তিন বছর আগে একটা কার্ডবোর্ড কার্টনে ওর সবকিছু তুলে রেখেছিলাম বেডরুমের ক্লোজেটের ওপরের তাকে, আজও ব্রা আর প্যান্টি-টা ওখানেই রেখে দিয়েছি।
সোফায় বসে টুকু বলল, “আবার দুজনে কাজের কথা বলছ নাকি? অ্যাই, ফোনটা রাখবে? একটা জরুরি কথাই তো জিজ্ঞেস করা হয়নি। কোথায় দেখা হল মেরি লু-র সঙ্গে? কী ভাবে?”
কথাটা জিজ্ঞেস করা হয়নি নয়, আমিই আলোচনাটা ওদিকে যেতে দিইনি। কোথায় দেখা হয়েছে বললে ওরা কী ভাবে নেবে, কী জানি... সরাসরি জিজ্ঞেস করায় বলতেই হল। আবার কর্তা-গিন্নী মুখ তাকাতাকি করল। টুকু বলল, “আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। মেরি লু-র সঙ্গে বার্-এ দেখা হয়েছে... ভাবতেই পারছি না।”
আবার কাঁধ ঝাঁকালাম। আমার কিছু এসে যায় না। টুকু বলল, “তাহলে কাল যদি তোমাদের ওই বার্-এ দেখা হয়ে থাকে তাহলে আজ তুমি ওখানে যাওনি কেন? ওখানেই তো আবার দেখা পাবার সবচেয়ে বেশি সম্ভাবনা।”
আমি মাথা নাড়লাম। মেরি লু যদি আমার কোনও আচরণে ভয় পেয়ে বা রাগ করে চলে গিয়ে থাকে, তাহলে আজ ওখানে আমাকে দেখতে পেলে হয়ত দরজা থেকেই ফিরে যাবে। তার চেয়ে আমি প্যাট্রিককে ফোন করে বলে দিয়েছি...
প্যাট্রিক বারম্যানের নাম।
“ও তোকে বলে দেবে বার্-এ কোন মেয়ে আসছে, না-আসছে?” জানতে চাইল বাবান।
কেন বলবে না? ও তো জানে না মেরি লু আমার কে। ও দেখেছে মেরি লু-কে আমি বার্ থেকে তুলে নিয়ে — যাকে বলে পিক-আপ করে নিয়ে বেরিয়েছি। পরদিন আমি ফোন করে বলেছি, আমি ইন্টারেস্টেড। আমি রোজ বার্-এ যাই না। তাই যদি মেরি লু আসে, আমাকে ফোন করে জানালে আমি আবার যাব। আমি একটা আপস্ট্যান্ডিং মেম্বার অফ দ্য সোসাইটি। আমার নামে কোনও অপরাধের রেকর্ড নেই। বার্-এও আমি যথেষ্ট রেস্পেক্টেড খদ্দের।তাহলে?”
টুকু বলল, “মেরি লু বেশ্যাবৃত্তি করছে? ছি!”
বললাম, “ও কী কথা! আদ্যিকালের মনোবৃত্তি? সেক্স ওয়ার্কার কথাটা জানো না?”
টুকু মুখ ভেটকে বলল, “নাম দিয়ে কি আর পরিচিতি আটকাবে? বেশ্যা বেশ্যাই।”
রাগ হয়ে গেল। বাবানকে বললাম, “তোর বউয়ের মতো মানসিকতার মহিলারা কমছে না বলেই উইমেন্স লিব মার খাচ্ছে।”
ওরা কিছু বলল না, বুঝলাম আমার কথাটা পছন্দ হয়নি।
মেরি লু আর এলই না। প্যাট্রিকও কিছু খবর দিতে পারল না। বলল, “ও ঠিক অ্যাভারেজ হুকার নয়, বুঝলেন? হুকাররা সাধারণত একা আসে না। অন্তত এই বয়সের মেয়েরা তো নয়ই। দু-জন চারজন একসঙ্গে থাকে — একে অপরের দেখাশোনাও করে বটে। তবে ও একাই এসেছিল — দিন দুয়েক আগে থেকে আসতে শুরু করেছিল। আবার চলে গেছে কোথায়...” সাড়ে সাত বছর কেটে গেছে সেই রাতের পরে। আমি বুঝতে পারছিলাম, মেরি লু আমার জীবন থেকে চলে গেছে চিরদিনের মতো।
আমিও চলে গেছি। করোনার ফলে বাবানের চাকরি গেল ২০২০র মাঝামাঝি। কয়েক মাস পরে জানাল নতুন চাকরি পেয়েছে — মিনিয়াপোলিস শহরে। ইউ-এস-এ আসার পর আজ পর্যন্ত আমরা সব জায়গায় একসঙ্গে গিয়েছি। এই প্রথম আলাদা হলাম। বাবান বাড়ি এসে খবরটা দিয়েছিল, টুকুও এসেছিল সঙ্গে। তাই কী চাকরি, কোথায় চাকরি — এসব কথা টুকুর সামনে আর জিজ্ঞেস করিনি। বাবান আগেই লিখে জানিয়েছিল। হোটেলে হাউসকিপারের চাকরি। মানে ঘর পরিষ্কার করা, বিছানা করা, বাথরুম ধুয়ে মুছে সাফ করে শুকিয়ে খটখটে করে বেরোনো। বড়ো হোটেলে একটা ঠেলাগাড়ি থাকে, তাতে সাবান, ঝাড়ন, ঝাড়ু — এইসব থাকে। এ সমস্যা আমাদের জীবনে প্রথম না। রিসেশন হয়েছে, চাকরি গেছে, আমরা গতর খাটিয়ে কাজ করেছি — আবার চাকা ঘুরেছে, চাকরি এসেছে। এ দেশে ডিগনিটি অফ লেবার আছে, কেউ বাঁকা চোখে তাকায় না। কিন্তু এবারে অন্যরকম। এখন বাবানের জীবনে টুকু আছে। টুকু কিছুতেই বুঝতে পারছে না, ওর কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার স্বামী কী করে মেথরের কাজ করবে। আমি হেসে বাঁচি না।
কিন্তু বাবান চলে যাওয়ার পরে আর ভালো লাগছিল না। একা থাকা, একা খাওয়া, কাজে গিয়ে বাবানের সঙ্গে দেখা না-হওয়া, বাড়ি ফেরার আগে ওর সঙ্গে ক্যাফেতে বসে আড্ডা না-দেওয়া, সপ্তাহান্তে তিনজনের মাঝে মাঝে এদিক ওদিক বেড়াতে না-যাওয়া... মনে হতে শুরু করল, বাড়ির চাপ মেনে নিয়ে বিয়েটা করেই নিই। কিন্তু যেদিনই সন্ধেবেলা মনে হত, অনেক হয়েছে, এবারে রাজি হয়ে যাই... সেদিনই বা পরদিন রাত্তিরে এত তীব্রভাবে মেরি লু স্বপ্নে আসত, যে অনেক সময় সকালে উঠে এদিক ওদিক ওকে খুঁজতাম। বুঝলাম, এতটাই ভালোবাসি, যে অন্য কাউকে আমার জীবনে বা শয্যায় স্থান দিলে দুজনের প্রতিই অন্যায় করা হবে।
অনেক ভেবেচিন্তে ঠিক করলাম, বাবানের কাছাকাছি চাকরি খুঁজব। ট্রাম্প গিয়ে বাইডেন এসেছে, কিন্তু ইকোনমির হাল বদলানোর তেমন চিহ্ন নেই। বাবান বার বার চেষ্টা করছে কম্পিউটার ইন্ডাস্ট্রিতে ফিরতে, পারছে না। এদিকে বাড়িতেও অশান্তি তুঙ্গে। আজকাল টুকু ওকে ছোঁয় না। বিছানায় শুতে দেয় না। বলে পায়খানা ঘেঁটে এসেছ — দূরে থাকো। ও বাইরের ঘরে সোফায় শোয় — এ দেশে যার নাম কাউচ। আমি দূর থেকে সাহস দিই। বলি, আমি চেষ্টা করছি আসতে। তারপরে আর চিন্তা থাকবে না।
মিনিয়াপোলিসে শীতে বড়ো ঠাণ্ডা। কিন্তু খুঁজতে খুঁজতে অদ্ভুতভাবে ওখান থেকে ঘণ্টা চার সাড়ে চার দূরে সু সিটিতে একটা দারুণ চাকরি পেয়ে গেলাম। সু মানে জুতো নয়। বানান সিউক্স। ওখানেও শীতে খুব ঠাণ্ডা, কিন্তু মিনিয়াপোলিসের অর্ধেকেরও কম। তবে চাকরিটা পছন্দসই হওয়াতে আর ভাবলাম না। তার ওপর, মালিক বলল, এক্সপ্যানশনের সম্ভাবনা আছে — বন্ধুকেও চাকরিতে ডেকে নিতে পারব।
চাঁটিবাটি তুলে হাজির হলাম নতুন শহরে, নতুন বাড়িতে। বাড়ি থেকে অফিস দূরে নয়, আবার উলটো দিকে কিছু দূরেই স্টোন স্টেট পার্ক — শহুরে বন্যপ্রাণ সংরক্ষণ অভয়ারণ্য। ছবির মতো সুন্দর। মাস তিনেকের মধ্যেই বাবানেরও চাকরি হল। পরের মাসে ওরা আসবে। এসে বাড়ি-টাড়িও দেখে গেল। সবে ভাবতে শুরু করেছিলাম, আবার আগের মতো আমরা তিনজনে হইচই করে থাকব নতুন শহরে...
মানুষ ভাবে এক, হয় আর পোশাক ছেড়ে তাড়াতাড়ি বিছানায় এসো দেখি?”
আমার পোশাক ছাড়া মন দিয়ে দেখতে দেখতে বলল, “ইউ আর ভেরি হ্যান্ডসাম, ইউ নো?”
জানি। তবু এবারে ওর বলাটা আমাকে আরও উত্তেজিত করল। আগের বারের হাই হ্যান্ডসামের চেয়ে এটা অনেক ভালো। আস্তে আস্তে বিছানায় গিয়ে ওর পাশে শুলাম। তারপরে দু হাতে ওকে জড়িয়ে ধরলাম।
আহ... কতদিন পরে... সাড়ে দশ..., প্রায় এগারো বছর।
অস্ফূটে মেরি লু বলল, “আলো জ্বলবে?”
বললাম, “জ্বলুক। নইলে দেখতে পাব না তোমাকে।”
অনেকক্ষণ পরে মেরি লু বলল, “কাল সকালে তুমি শহরে যাবে?”
“কেন?”
“তাহলে আমাকে নামিয়ে দেবে?”
“তুমি যেতে চাইলে নামিয়ে দেব।”
“যেতে চাইলে মানে?”
“যদি না যেতে চাও? যদি থেকে যেতে চাও? আমি তো চাই তুমি থেকে যাও।”
মেরি লু হাসল। বলল, “থেকে যাব? কত দিন?”
“চিরদিন?”
মেরি লু হেসে আমাকে চুমু খেল। বলল, “ইউ আর কিউট। আই হ্যাভ নেভার সিন এনিওয়ান লাইক ইউ বিফোর।”
ভেতর থেকে ঠেলে আসা রাগটাকে দমিয়ে রেখে চুমু খেলাম।
অনেক রাতে, তখন মেরি লু ঘুমিয়ে পড়েছে, আমি আস্তে আস্তে চাদর সরিয়ে আবার ওকে দেখলাম। এখন ওর শরীরে অনেকগুলো উল্কি। ডান কাঁধে, দুই হাতে, ডান বুকের ওপরে, পিঠের ওপরে — অনেক উল্কি। সব কিম্ভূত, আজকালকার, অর্থ-বোঝা-যায়-না, এমন উল্কি। কোনওটাই বাচ্চাদের কার্টুন নয়। আর হ্যাঁ, কোমরে কিছু নেই।
কোমরের সাদা, নিখুঁত, অকলঙ্কিত চামড়ার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে আবার রাগ ঠেলে বেরোচ্ছিল। কিন্তু আমি তো রাগ করব না। রাগ করে কিছু বলব না। প্রতিজ্ঞা করেছি। তাই চুপ করে আবার চাদর দিয়ে ওকে ঢেকে বালিশে মাথা দিয়ে চোখ বন্ধ করলাম।
পরদিন রবিবার। দেরি করে ঘুম ভাঙলে ক্ষতি নেই। সেইজন্যই দেরি করেই ঘুম ভাঙল বোধহয়। শেষ কয়েক মুহূর্তের আধোঘুম আধোজাগার মধ্যে সেদিনের আনন্দবোধটা আমার চিরদিন মনে থাকবে। আবার চোখ খুলে দেখব, বালিশে আমার পাশে শুয়ে রয়েছে মেরি লু।
চোখ খুলে পাশে তাকালাম।
কেউ নেই। বালিশ খালি।
ধড়ফড় করে উঠে বসলাম। কোথায় গেল? বাথরুমে?
উঠে বাথরুমের দরজা খুললাম। “আর ইউ ইন হিয়ার?”
বাথরুম খালি।
শোবার ঘরের বাইরেই বসার ঘর। কেউ নেই। বসার ঘরের ওদিকে খাবার ঘর, তারও ওপারে রান্নাঘর — সব খালি। আবার ফিরলাম শোবার ঘরে। কাল রাতে মেরি লু পোশাক খুলে ভাঁজ করে রেখেছিল ওখানে — সাইডবোর্ডের ওপর।
নেই। পোশাক নেই, জুতো নেই, ব্যাগ নেই। কিচ্ছু নেই।
না। আছে। খাটে শুয়ে দু-হাত থেকে ছটা আঙটি, দুটো কানের দুল, নাকের মাকড়ি আর গলার হার খুলে রেখেছিল বেডসাইড টেবিলে। সবই রয়েছে ওখানেই। একটাও গয়না নিয়ে যায়নি। এর মানে কী?
কখন গেল? রোদ উঠেছে সবে। এখানকার হিসেবে খুব দেরি হয়নি। বাইরে আমার গাড়ি এখনও রয়েছে। নিয়ে যায়নি। তাহলে, হেঁটে গেল, না ট্যাক্সি সার্ভিস ডাকল? কেনই বা ডাকবে? আমিই তো পৌঁছে দিয়ে আসতাম। না কি শেষ মুহূর্তে এখানেই থেকে যাওয়ার কথায় ভয় পেয়েছে আবার? কেন? আমি তো খারাপ করে কিছু বলিনি...
গাড়ি নিয়ে বেরোলাম। যদি ট্যাক্সি নিয়ে গিয়ে থাকে তাহলে ধরতে পারব না। কিন্তু শহর অবধি হাঁটা অনেকটাই। পেলে বাকি রাস্তাটা পৌঁছে দেব।
ভোরের শিশির শুকোয়নি এখনও। দ্রুত গাড়ি চালালাম। যে রাস্তাটা শহর অবধি পাঁচ সাত মিনিটে পার করলাম, সেটাই হেঁটে যেতে অন্তত দেড় দু-ঘণ্টা লাগবে। অত আগে কি বেরিয়েছে মেরি লু? না বোধহয়।
রাস্তায় মেরি লু নেই। আস্তে আস্তে ফিরে এলাম গাড়ি নিয়ে। দু-গাল বেয়ে চোখের জল পড়ছে। জামার হাতায় মুছতে মুছতে চালাচ্ছি। কেন? কেন ঘুমিয়ে পড়লাম? কেন ঘুম ভাঙল না? কেন ডাকল না মেরি লু? কেন? কেন? কেন?
কত কেন... কোনও জবাব এবারে বাবান কিছু বলল না। টুকু আবার বলল, “দু’বারের একবারও কিন্তু ওর কাছে কোনও প্রমাণ নেই যে মেরি লু এসেছিল।”
বাবান বলল, “কী প্রমাণ থাকতে পারে?”
“কেন? মোবাইলে ছবি তুলে রাখতে পারত...”
“তা অবশ্য।”
মোবাইলে ছবি নেই যদিও, কিন্তু এক রাশ গয়না রয়েছে। আর আগেরবারের ব্রা আর প্যান্টি। কিন্তু সে আমি ওদের দেখাব না। বলবও না। ওরা আমার কথা বিশ্বাস করছে সকলে মুখ তাকাতাকি করল। মহিলা পুলিশ মেয়েটার কাছ থেকে মোবাইল ফোন নিয়ে বলল, “দেখুন তো, একে চিনতে পারেন কি না?”
আবছা মিল আছে মেরি লু-র মুখের সঙ্গে? মেয়েটা বলল, “এরকম দেখতে লাগত না। মেক আপ নিয়ে বেরোই আমরা সন্ধেবেলা।” তা-ই তো। সেইজন্যই এই মেয়েটাকেও চিনতে সময় লেগেছে। মেক আপের জন্যই আলাদা দেখাচ্ছিল সেই রাতে।
বললাম, “দেখুন, একটা আপাত মিল আছে দুজনের। তবে মেরি লু-কে আমি বহু বছর চিনি। এ সে মেয়ে নয়।”
মেয়েটা বলল, “মিথ্যে! আপনি তো বললেন, আমার বন্ধু আপনার সঙ্গে বার থেকে বেরিয়েছে।”
মেয়ে পুলিশটা ওর হাতটা ধরে রেখেছে। বললাম, “আমি বার থেকে বেরিয়েছিলাম আমার বন্ধু মেরি লু-র সঙ্গে। আমি সেক্স ওয়ার্কারের সঙ্গে কিছু করি না।”
পুলিশ আর বিশেষ কিছু জানতে চাইল না। একবার ঘরগুলো উঁকি দিয়ে দেখল আর কেউ নেই, তারপর আমার ফোন নম্বর নিয়ে চলে গেল। যাবার আগে বলল আমি যে মহিলাকে মেরি লু বলে জানি, বা এই মেয়েটির বন্ধু সুসান — দুজনের কারও সম্বন্ধেই যদি কিছু জানতে পারি, যেন পুলিশকে জানাই। সঙ্গের মেয়েটা অবশ্য চিৎকার করছিল — ওরা আমাকে যেন গ্রেফতার করে — আমিই নিশ্চয়ই কিছু করেছি...
পরদিন ঘটনাটা শুনে বাবান রেগে গেল। বলল, “তোর এই মেরি লু অবসেশনটা ছাড়বি এবার? ফালতু ঝামেলা শুরু হল।”
আমি রাগের কারণ বুঝলাম না। অন্যায় তো কিছু করিনি। পুরোনো বন্ধু। এক সময়ে লিভ টুগেদার করতাম। মানছি দশ বছর আগে সন্দেহ করতাম বলে চলে গেছিল। কিন্তু এখন আবার দেখা হলে আবার বন্ধুত্ব হতে পারে না? আগের মতো আবার আমরা একসঙ্গে থাকতে পারি না? এতদিন তবে একা রইলাম কেন?
বাবান উত্তর দিতে পারল না।
পুলিশে ছুঁলে আঠেরো ঘা। আবার ক-দিন পরে বাড়ির দরজায় হাজির। সবে কাজ থেকে ফিরে জামাকাপড় বদলে রান্না চাপিয়েছি। এবারে জানতে চাইল মেরি লু-র বিষয়ে। কতদিন হল চিনি ওকে? কোথায় চিনতাম? কী সম্পর্ক ছিল? ওর কোনও ছবি আছে কি?
আছে। কম্পিউটারে। দেখালাম। পুলিশ জানতে চাইল, হারিয়ে যাওয়া সুসান আর এই মেরি লু-র মধ্যে মিল তো প্রায় নেই। তাহলে? আমি বললাম, “সেই জন্যেই তো বলছি — আমি জানি আমি মেরি লু-র সঙ্গে বার থেকে বেরিয়েছি, বাড়ি এসেছি, রাতে একসঙ্গে ছিলাম।”
পুলিশ একটু কিন্তু কিন্তু করে বলল, “এটা বলছেন প্রায় এগারো বছর আগেকার ছবি। অর্থাৎ আজকের মেরি লু সুসানের চেয়ে অনেক বড়ো।”
আমি বললাম, “আপনি মেরি লু-কে দেখলে বুঝতেন — ওকে দেখে বোঝা যায় না, ওর কত বয়েস। ওর রূপ আর চেহারা দুটোই ধরে রেখেছে।”
পুলিশ অফিসার বললেন, “পুরোনো ছবিতে শরীরে ট্যাটু নেই একটাও।”
আমি বললাম, “আছে। এই যে...” বলে আর একটা ছবি বের করে দেখালাম। পুলসাইড পার্টির ছবি। অনেকেই আছে — উল্কিটা দেখা যাচ্ছে না ভালো, ছবিটা জুম করাতে ঝাপসা হয়ে গেল...
বললাম, “তখন অত উল্কির চল ছিল না। আর এই উল্কিটা মেরি লু-র পছন্দ ছিল না। প্রায়ই বলত মুছে ফেলবে। ফেলেছেও।”
পুলিশ বলল, “অর্থাৎ এটা আর নেই?”
মাথা নাড়লাম। সেটা আগের বার-ও ছিল না।
“আগের বার?” পুলিশ ভুরু কোঁচকাল। “আগের বার মানে? আগের বারের ছবি এটা নয়? এখানে তো উল্কি আছে দেখালেন।”
আমি বললাম, “আগের বার মানে আজ থেকে বছর সাতেক আগে। তখনও এক রাতের... মানে এক সন্ধের জন্য এসেছিল — তারপরে চলে যায় আবার — এই সেদিন আবার দেখা পাই।”
পুলিশ ভাবিত হয়ে বলল, “সমাপতনটা অদ্ভুত নয়? এগারো বছর আগে আপনি স্যাক্রামেন্টোতে, মেরি লু-ও তাই। সাত বছর আগেও — সে নয় হতেই পারে... কিন্তু এখন আপনি সু সিটিতে, আর মেরি লু-ও এখানে...?”
আমি বললাম, “সাত বছর আগে আমি আর আমার বন্ধু স্যাক্রামেন্টোতে থাকতাম, কাজ করতাম। আজ আমরা দুজনেই এখানে থাকি, কাজ করি। ইউ-এস-এ-তে এখান থেকে ওখানে যাওয়া, চাকরি নেওয়া, থাকা — সবই সহজ... যে কেউ যেখানে খুশি যখন খুশি যেতে পারে, তাই না?”
তা-ই বটে। পুলিশ বলল, “আগেরবার উনি সারা রাত থাকেননি, কেবল সন্ধেটুকুই প্রমাণ নেই, তা নয়। কিছু গয়না ফেলে গেছে। অর্নামেন্টস।”
দু-জনে একেবারে যাকে বলে তড়িদাহতের মতো চমকে উঠলেন। ফাউন্ডার বললেন, “অর্নামেন্টস! জুয়েলরি?”
আমি মাথা নাড়লাম। তেমন কিছু না। জাঙ্ক জুয়েলরি।
“সেগুলো কী করেছেন আপনি?”
বললাম। গ্যারেজে নিয়ে গেলাম। দেখালাম। আমাকে ধরতে দিলেন না আর। প্যাটি ফিশার একটা সিল করা প্যাকেট খুলে নীল রঙের গ্লাভস বের করে পরল। একটা একটা করে আংটি, গলার হার, কানের দুল — সব আমাকে দেখিয়ে দেখিয়ে একটা প্লাস্টিকের ব্যাগে ভরে সিল করল। তারপরে বলল, “আর এই জামাকাপড় আর লিপস্টিক?”
বললাম, “লিপস্টিক আর জামাকাপড়গুলো প্রথমবারে ফেলে গেছিল। দ্বিতীয়বারে ব্রা আর প্যান্টি। হয়ত লিপস্টিকগুলো ইচ্ছে করেই ফেলে গেছিল — কারণ ওগুলো ছিল ওয়েস্টপেপার বাস্কেটে। আর কাপড়গুলো ছিল কাপড় কাচার হ্যাম্পারে। হয়ত ভুলে গেছিল।”
“আর দ্বিতীয়বারের ব্রা আর প্যান্টি?”
পরিস্থিতিটা বর্ণনা করতে হল। বললাম, “আমি যেখানে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, সেখানেই পড়ে ছিল। হয়ত আমার ঘুম ভেঙে যেতে পারে সেই ভয়ে ও দুটো নেয়নি।”
হঠাৎ প্যাটি আমার দিকে চেয়ে বলল, “উড ইউ সে ইউ আর আ ভায়োলেন্ট ম্যান?”
ভায়োলেন্ট? আমি? হেসে ফেললাম। বললাম, “একেবারেই না।”
“তা হলে একজন মহিলা আপনাকে এমনই ভয় কেন পেলেন, যে অন্তর্বাস ফেলে রেখে চলে গেলেন?”
“সে রকম ভয় না, ম্যাডাম। মেরি লু আমার ঘ্যানঘ্যানানি ভয় পেত। অনেক বার বলেছিল, গড্, আই হেট ইউ হোয়েন ইউ বেগ...”
দুজনে একটু দূরে সরে গিয়ে কী আলোচনা করল। আমি একটু একটু শুনতে পাচ্ছিলাম, অন্য কাপড়, জামা, লিপস্টিকও কি নিয়ে যাবে? না সেগুলো এই কেসের সঙ্গে জড়িত নয় বলে রেখে যাবে? তারপরে ঠিক করল, নিয়ে যাবে, সবই আলাদা করে ‘ব্যাগ করবে’ — অর্থাৎ আলাদা আলাদা প্লাস্টিকের ব্যাগে নেবে। দু-একবার ‘কন্ট্যামিনেশন’ কথাটা শুনলাম। কেন, বুঝলাম না। তারপরে সব ব্যাগবন্দী করে আমাকে রসিদ লিখে দিল প্যাটি ফিশার। ফাউন্ডার বললেন, “আপনি কাল একবার পুলিশ স্টেশনে আসবেন? আপনার ফিঙ্গারপ্রিন্ট আর ডি-এন-এ নেওয়া হবে। এগুলোতে নিশ্চয়ই আপনার ফিঙ্গারপ্রিন্ট বা ডি-এন-এ আছে — সেগুলো চিনে বাতিল করা হবে।” বেশ কথা... আমি প্যাটির দেওয়া রসিদটা মানিব্যাগে ঢোকাতে ঢোকাতে বললাম, “একটা অনুরোধ করছি। আমি জানি আপনারা এই সবগুলো থেকে কেবল মেরি লু-র হদিস পাবেন। আপনারা যাকে খুঁজছেন, তার কিছুই পাবেন না। তাহলে আপনাদের কাজ হয়ে গেলে আমাকে এগুলো ফেরত দেবেন? মেরি লু-র এইটুকু স্মৃতিই আমার রয়েছে...”
ফাউন্ডার হঠাৎ এক পা এগিয়ে এসে আমার কাঁধে হাত রেখে বললেন, “অবশ্যই। ডোন্ট ওয়ারি।”
আমি জানি এ দেশের পুলিশের পক্ষে এটা কত বড়ো জেশ্চার। মাথা নিচু করে সেটা মেনে নিলাম।
পরের রবিবার দুপুরে আমরা — মানে আমি, বাবান আর টুকু — ঠিক করেছিলাম স্টোন স্টেট পার্ক ওয়াইল্ড লাইফ স্যাংচুয়ারিতে পিকনিক করব। সকাল সকাল টুকু আর বাবান ওদের পিকনিক হ্যাম্পার নিয়ে হাজির হয়েছিল, আমি আমার হ্যাম্পারে ওয়াইন আর চিকেন প্যাক করছিলাম — এমন সময়ে হঠাৎ দূর থেকে পুলিশের গাড়ির সাইরেন শোনা গেল। টুকু বলল, “তোমার কাছে আসছে নাকি?”
আমি বরাভয় দিয়ে বললাম, “আমার কাছে অনেকবারই এসেছে। আমি ওদের সাসপেক্ট নই। এত সাইরেন বাজিয়ে কেন আসবে?”
আমরা বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলাম... সাইরেনের শব্দ কাছে আসছে... সারি দিয়ে প্রায় ছটা — না সাতটা পুলিশের গাড়ি — সবকটার মাথায় লাল-নীল আলো ঝলসাচ্ছে। দেখতে দেখতে ওরা এসে ক্যাঁচ ক্যাঁচ করে ব্রেক দিয়ে দাঁড়াল ঠিক আমারই বাড়ির সামনে। সাইরেনগুলো থামার পরে নিস্তব্ধ হয়ে গেল চারিদিক। গাড়িগুলো থেকে দু-জন করে পুলিশ বেরিয়ে গাড়ির আড়ালে লুকিয়ে বন্দুক উঁচিয়ে ধরল আমাদের দিকে। বিনা বাক্যব্যয়ে আমরা হাত তুললাম আকাশে।
মেগাফোনে ক্যাপটেন ফাউন্ডার আমার নাম করে জিজ্ঞেস করলেন আমাদের কাছে কোনও অস্ত্র আছে কি না। আমি চেঁচিয়ে বললাম, “না।” আমাদের তিনজনকেই মাটিতে উপুড় হয়ে শুতে বললেন। শুনতে পাচ্ছিলাম আমার পেছনে টুকু ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। হাঁটু গেড়ে বসতে বসতে বললাম, “আমাদের কোনও ভয় নেই। ওরা কিছু একটা ভুল করছে। শান্ত হয়ে ওরা যা বলে কর... দেখবি, সব ঠিক হয়ে যাবে।”
উপুড় হয়ে শুয়ে দেখলাম কয়েক জোড়া পুলিশের জুতো এসে আমার চারপাশে থামল। কেউ একজন আমার দু-হাত ধরে পেছনে নিয়ে হাতকড়া পরাতে গেলে আমি ব্যথায় চেঁচিয়ে উঠলাম, বললাম, “আমার ফ্রোজেন শোলডার আছে। পেছনে হাত নিতে গেলে খুব ব্যথা হয়।” একটু পরে আমার দু-হাতের বাহু ধরে তুললেন ক্যাপ্টেন ফাউন্ডার আর একজন পুলিশ যাকে আমি আগে দেখিনি। সামনের দিকেই দু-হাতে হাতকড়া পরাতে পরাতে ফাউন্ডার বললেন, “আপনাকে আমি সুসান বেরেঞ্জারের খুনের দায়ে গ্রেফতার করছি। আপনি কিছু না-ও বলতে পারেন, কিন্তু যা-ই বলেন, বিচারের সময় আপনার বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হতে পারে। আপনি একজন উকিল পেতে পারেন, উকিলের খরচ দিতে না পারলে সরকার উকিল দেবে।”
কথাগুলো কত শুনেছি টিভিতে। মাথা নেড়ে বললাম, “ভুল হচ্ছে, কোথাও ভুল হচ্ছে। আমি সুসান বেরেঞ্জারকে চিনি না, কোনও দিন দেখিনি।”
দু-দিন, না তিন দিন জানি না, পুলিশ স্টেশনে লাগাতার জেরা। ‘সুসান বেরেঞ্জারকে খুন করেছ, তুমি তাকে খুন করেছ... স্বীকার করো, করেছ...’
শেষ পর্যন্ত বাবান এল একদিন। বলল, “তোর মাথা খারাপ হয়েছে? ল-ইয়ার নিসনি কেন?”
কেন নেব ল-ইয়ার? আমি কী করেছি?
“গুপি, তোকে গ্রেফতার করা হয়েছে তুই জানিস না? তোর বিরুদ্ধে খুনের মামলা, তুই জানিস না? চুপ করে বসে আছিস, উকিল চাইছিস না... সরকার শেষ পর্যন্ত কী হিজিবিজি উকিল দেবে তুই জানিস?”
আবার মাথা নাড়লাম। আমি কাউকে খুন করিনি। কার খুনের দায়ে আমাকে ধরবে পুলিশ?
বাবান সব বলল। পুলিশ আমাকে কিছুই জানায়নি। ওই সুসান বেরেঞ্জার না কে, তার মৃতদেহ পাওয়া গিয়েছে। যেখানে আমরা পিকনিক করব ভেবেছিলাম, তারই কাছাকাছি কোথাও। মাটিতে একটা অগভীর গর্ত করে কেউ পুঁতে দিয়ে গেছিল। শেয়াল না ব্যাজার — জঙ্গুলে জন্তু খুঁড়ে বের করেছে।
“গলায় তার পেঁচিয়ে মারা হয়েছে। ওর ব্যাগের ওপর তোর আঙুলের ছাপ পাওয়া গিয়েছে। মাই গড্, তুই বুঝতে পারছিস তুই কী সাংঘাতিক বিপদে পড়েছিস? তুই মেয়েটাকে খুন করেছিস, গুপি?”
আমি বললাম, “অ্যামেরিকার পাসপোর্ট পাওয়ার পর থেকে তুই কেমন অ্যামেরিকানদের মতো চিন্তা না করেই হাত-পা ছুঁড়ে চেঁচাস আজকাল। একটু ভেবেচিন্তে কথা বল, বাবান। আমার সঙ্গে রাতে মেরি লু ছিল। ওই যার কথা পুলিশ বলছে, সে ছিল না। মেরি লু ওর আংটি, গলার হার, কানের দুল খুলে রেখে গেছে — সব আমি পুলিশকে দিয়েছি। পুলিশ তোকে বলেনি?”
আবার হাত-পা ছুঁড়ে ‘গড্’ বলে চোখ কপালে তুলল বাবান — ঠিক যেন হলিউডি সিনেমা। বলল, “ওই গয়নাগাটি সব সুসানের। টিভিতে বলেছে ওতে ওর ডি-এন-এ পাওয়া গেছে। কোনও মেরি লু সিনেই নেই। তুই কাকে কী গপ্পো বলছিস?”
আমি গল্প বলছি না, সুতরাং আমার কিছু বলার নেই। চুপ করে রইলাম।
বাবান বলল, “আমি তোর জন্য উকিল ঠিক করেছি। নামজাদা লোক। খরচা আছে। যা টাকাকড়ি জমিয়েছিস, সেগুলো কাজে লাগবে। তবে আমি হয়ত আর তোকে সাহায্য করতে পারব না। টুকু খুব আপসেট হয়ে গেছে। এত ভয় পেয়েছিল পুলিশ ওর দিকে বন্দুক তাক করেছিল বলে... ও আর এখানে থাকতে চাইছে না। আমি যদি বাধ্য হয়ে চলে যাই, তাহলে...”
অনেক দিন ধরে যে কথাগুলো বলিনি, সেগুলো বেরিয়ে এল। বললাম, “শোন, তুই চলে যাবি, তাতে আমার কোনও বক্তব্য নেই। বন্ধুরা চিরদিনই বন্ধুর বিপদের সময়ে পৃষ্ঠপ্রদর্শন করে। তুইও করবি, এ নতুন কিছু না। কিন্তু একটা কথা ভেবে নে। তোর পক্ষে চাকরি পাওয়া সহজ নয়। এখানে চাকরিটা জোগাড় করে দিতে গিয়ে আমাকে বেশ কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। সে-ও কিছু না। কিন্তু তুই এর পরে কোথায় চাকরি পাবি? মেথরের চাকরি করেছিস, এবারে কি করবি? ধাঙড়ের চাকরি? না ডোম-মুদ্দোফরাসের কাজ? ওই হারামি মাগি টুকু তোকে তখন বিছানায় শুতে দেবে? ভেবে দেখিস।”
কথাগুলো খুশি মনে বলিনি। বলতে বাধ্য হয়েছিলাম। আরও বলতাম, কিন্তু বাবানের মুখের অবস্থা দেখে বললাম না। কিন্তু বাবান তখনকার মতো উঠে চলে গেলেও, চলে যায়নি। তখনও না, আজও না। টুকুকে কী বলেছে আমি জানতেও চাইনি। চাইও না।
পরদিন বাবান এল উকিল নিয়ে। সিজার লুইস। লম্বা কালো ভদ্রলোক। অনেকটা উইল স্মিথের মতো দেখতে, কিন্তু অতটা ফ্ল্যামবয়ান্ট নন। ভদ্রলোক নানাভাবে কেস সাজানোর কথা বলছিলেন। আমার একটাই বক্তব্য। আমি খুন করিনি, আমি সুসান বেরেঞ্জারকে চিনি না, দেখিনি। আমার সঙ্গে সে রাতে আমার গার্লফ্রেন্ড মেরি লু ছিল, যে রাত থাকতেই চলে গেছে, কোথায়, জানি না। সুসান বেরেঞ্জারের ব্যাগে আমার আঙুলের ছাপ, আর মেরি লু-র গয়নাগাটিতে সুসানের ডি-এন-এ কোথা থেকে এল আমি জানি না — তবে আমি এক কথায় সবটাকেই ‘ভুল’ বলে অভিহিত করছি — কোথাও কারও ভুল হয়েছে।
সিজার লুইস বাবানের দিকে তাকিয়ে অস্ফূটে কী বললেন, আমি তেড়িয়া হয়ে বললাম, “আমি মোটেই ইনসেন নই। খবরদার যদি ইনস্যানিটির বাহানা বানিয়েছ, আমি তোমাকে বরখাস্ত করব।”
সিজার আর বাবান সেদিনের মতো বিদায় নিল।
পরদিন আমার অ্যারেইনমেন্ট। কোর্টে নিয়ে গেল আমাকে হাতকড়া পরিয়ে। অনেক কথা হল উকিল আর জজের মধ্যে। জজ আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, “হাউ ডু ইউ প্লিড?” অর্থাৎ আমি নিজে কী বলব — আমি কি অপরাধী, না নই? আমি উঠে দাঁড়িয়ে নিচু গলায়, কিন্তু দৃঢ়ভাবে বললাম, “আই অ্যাম নট গিল্টি, ইওর অনার।” আরও কিছু বলতে পারতাম, কিন্তু এখন আর কিছু বলা বারণ।
বেল পেলাম। অনেক খরচ হল, কিন্তু বন্দীদশা থেকে মুক্তি। পরদিন সকালে বাবানের সঙ্গে গেলাম সিজার লুইসের অফিসে। বললেন, “তোমার সমস্যা তো আরও বাড়ল। গতকাল সন্ধেবেলা ডি-এ — ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির অফিস থেকে ফ্যাক্স করে জানিয়েছে, তোমার দেওয়া ইনফরমেশন ভিত্তি করে প্লেসারভিল পুলিশ গত কয়েক দিন খোঁজাখুঁজি করে তোমার ওখানকার বাড়ির পেছনের জঙ্গলে দুটো মেয়ের মৃতদেহ পেয়েছে। তার মধ্যে একটা তোমার প্রাক্তন গার্লফ্রেন্ড, মেরি লু-র। ওটা প্রায় এগারো বারো বছরের পুরোনো। অন্যটা আর একজন মিসিং পার্সনের — তার নাম নিকোলেট মেরিংহ্যাম। সে সেক্স ওয়ার্কার ছিল। ওখানে পড়ে আছে কম করে বছর পাঁচ-সাত। দুজনেরই ফ্যামিলির সঙ্গে যোগাযোগ করে ডি-এন-এ জোগাড় করা হয়েছে। মেরি লু-র ডি-এন-এ তোমার দেওয়া লিপস্টকে পাওয়া গিয়েছে, আর নিকোলেটের ডি-এন-এ পাওয়া গিয়েছে তোমার দেওয়া ব্রা এবং প্যান্টিতে লেগে থাকা লোমে। এই দুজনকেও মারা হয়েছে যে ভাবে সুসানকে মারা হয়েছে, সেভাবেই। গলায় তার পেঁচিয়ে। প্লেসারভিল পুলিশ তোমার বিরুদ্ধে খুনের মামলা দায়ের করেছে। দুটো আলাদা স্টেট-এ অপরাধ হয়েছে বলে এখন এফ-বি-আইও এসেছে তদন্তে। তোমার কিছু বলার আছে?”
আমি লুইসের চোখে চোখ রেখে বললাম, “একটা কথাই বলব। মেরি লু মারা যায়নি। এই সেদিনও আমার সঙ্গে সারা সন্ধে আর রাত কাটিয়েছে। পুলিশ যদি সিরিয়াসলি খোঁজে, তাহলে ওকে পাবে। আর এই সব কী মৃতদেহ-টেহ বলছেন, তার রহস্য তার পরে সমাধান করবে।”
সিজার লুইস আমার দিকে হতভম্বের মতো তাকিয়ে রইলেন। বাবান বলল, “মিঃ লুইস, আমাকে একটু অনুমতি দেবেন — আমি ওকে মাতৃভাষায় কিছু বলি? ও হয়ত ব্যাপারটা ঠিক বুঝছে না।” বলে বাংলায় আমাকে বলল, “গুপি, তোর কী হয়েছে বল তো? তুই শুনলি না, মিঃ লুইস কী বললেন — পুলিশ মেরি লু-র ডেডবডি পেয়েছে, মৃতদেহ...”
আমি হাত তুলে বাবানকে থামিয়ে দিয়ে বললাম, “তোকে যেন স্পোকেন ইংলিশ কে শিখিয়েছিল?”
জোঁকের মুখে নুন পড়ার মতো গুটিয়ে গেল বাবান। আমি বললাম, “আজ তুই আমাকে শেখাচ্ছিস, ডেডবডি মানে মৃতদেহ? তুই ওদের সঙ্গে ভিড়ে আমাকে বোঝাচ্ছিস মেরি লু মরে গেছে? আর আমি যে বার বার বলছি, মেরি লু বেঁচে আছে, তার কোনও দামই নেই তোর কাছে? এতদিনে অন্তত কাগজে বিজ্ঞাপন দিতে পারতিস একটা — ‘মেরি লু, তোমাকে খুন করার দায়ে গুপিকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে, তুমি যেখানেই থাকো, এখনই আমার সঙ্গে যোগাযোগ করো...’ একবার মেরি লু যদি এসে পড়ে, তাহলে তো আর চিন্তা নেই। সব কেসই ফেল করে যাবে।”
ওরা দুজন আর কিছু না বলে উঠে গেল।
পরদিন, আমার আপত্তি সত্ত্বেও, সিজার লুইস জজসাহেবকে বলল, “ইওর অনার, ডিফেন্ড্যান্টের সঙ্গে কথা বললেই বুঝবেন, উনি পরিস্থিতিটা মোটেই বুঝছেন না। উনি মানতেই রাজি নন যে মেরি লু সায়ানসি আর বেঁচে নেই। বার বার বলেই চলেছেন, মেরি লু মারা যাননি। ডি-এ তো বলবেনই ডিফেন্ড্যান্ট লুসিড। কিন্তু, আমার অ্যাপিল যদি খারিজ করেন, তাহলে হয়ত আমরা একজন ইনকম্পিটেন্টকে সাজা দেব। সেটা আমাদের কনশায়েন্সে বোঝা হয়ে থেকে যাবে।”
জজসাহেব কোর্ট মুলতুবি রেখে আমাকে আর দুজন উকিলকে নিজের চেম্বারে নিয়ে গেলেন। আমাকে বললেন, “আপনার কী বলার আছে, সেটা আমাকে বলবেন?”
নতুন করে আর কী বলব? একই কথার পুনরাবৃত্তি। তা-ও সবই বললাম। তারপর বললাম, “ইওর অনার, আপনার হাতে অনেক ক্ষমতা। আমি আপনাকে কী বলব? কিন্তু যদি দয়া করে পুলিশকে নির্দেশ দেন, মেরি লু-কে খুঁজে বের করতে, তাহলেই জানা যাবে আমি যা বলছি, সব সত্যি। একমাত্র মেরি লু-ই এই রহস্যের চাবি।”
জজসাহেব সিজার লুইসের দিকে তাকিয়ে বললেন, “আই সি হোয়াট ইউ মিন।” তারপরে ডি-এ কে বললেন, “আই উইল আস্ক ফর অ্যান ওপিনিওন।” ডি-এ কাঁধ ঝাঁকালেন।
কোর্টরুমে জজসাহেব বললেন, “সামগ্রিক পরিস্থিতি বিচার করে আমি ডিফেন্ড্যান্টের মানসিক অবস্থার পর্যবেক্ষণের জন্য সাইকিয়াট্রিক সেন্টারে পাঠানো সাব্যস্ত করলাম। প্রশ্ন এই, যে সেটা কি সরকারি সংস্থা হবে, না ডিফেন্ড্যান্টের নিজের খরচে কোর্টের নির্দেশে কোনও প্রাইভেট ক্লিনিকে? ডিফেন্স কাউন্সেল কী বলেন?”
সিজার লুইস উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, “কোর্টের হুকুম-মতো কোনও প্রাইভেট ক্লিনিক, ইওর অনার।” বুঝলাম বাবানের সঙ্গে আগেই আলোচনা করা ছিল।
কোর্টের ইচ্ছেতে তাই আমি গত তিন সপ্তাহ হল কর্নারস্টোন সাইকিয়াট্রি সেন্টারের বাসিন্দা। আমার ‘কেস’-এর তত্ত্বাবধানে ডাঃ মাইকেল গ্রুট। দু-চক্ষে দেখতে পারি না ভদ্রলোককে।
দু-দিন আগে গ্রুট বাবান আর সিজার লুইস-কে রিপোর্ট দিয়েছেন। আমার দাবীতে আমি সেখানে ছিলাম। আমাকে নিয়ে আমার আড়ালেই আলোচনা হবে... সে আমি বরদাস্ত করব না। প্রথম থেকেই গ্রুটকে বিশ্বাস করিনি, এখন সিজার লুইসকে নিয়েও আমার সন্দেহ হচ্ছে। ওরা দুজনে বাবানকে কী বোঝাচ্ছে, আর বাবান ওদের কথায় নাচছে।
গ্রুট বলল, আমি নাকি মেরি লু-কে নিয়ে অবসেসড। ওকে মাথা থেকে বের করতে পারিনি বলেই এতদিন বিয়ে-থা করিনি, আর কোনও মেয়ের প্রতি আমার কোনও আকর্ষণ দেখা যায়নি।
এ পর্যন্ত আমার আপত্তির কারণ নেই।
মেরি লু-কে আমি খুন করেছি। সেই দশ-এগারো বছর আগেই। এটা অবশ্য প্রমাণিত সত্য নয়, এটা সন্দেহ, এবং বাকি দুজন মহিলার মৃতদেহ পরীক্ষা করে তা থেকে সূত্র পাওয়া...
যত বাজে কথা।
এর পরে যে কারণেই হোক, বছর তিনেক পরে একজনকে দেখে আমার মনে হয় এ-ই মেরি লু। এবং সেইজন্যই তাকে নিয়ে আসি বাড়িতে। মেরি লু মনে করেই তাকে খুন করি।
বাধা দিলাম। বললাম, “মেরি লু সেদিন আমাকে হুইস্কির বোতল দিয়ে মেরে মাথা আলু করে দিয়েছিল। চোখের পাশে কালশিটে পড়েছিল। আমি অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলাম। বাবান সে আঘাতের চিহ্ন পরদিন আমার মাথায় দেখেছে। আমি ওকে প্রথমে বলেছিলাম মদ খেয়ে পড়ে গেছিলাম, পরদিন জ্ঞান ফিরেছিল যখন, তখন মেরি লু নেই...”
আমাকে থামিয়ে ডাঃ গ্রুট বললেন, “মেরি লু নয়। নিকোলেট। নিকোলেট মেরিংহ্যাম। নিকোলেটকেও গলায় তার পেঁচিয়ে মারা হয়েছিল, দেহাবশেষ যা পাওয়া গিয়েছে, তাতে সেই তার পেঁচানো ছিল তখনও। প্লেসারভিলে আপনার বাড়ির সরাসরি পেছনে যে জঙ্গুলে জায়গা আছে, আপনার বাড়ি থেকে পাঁচশো গজের মধ্যে মেরি লু আর নিকোলেটের দেহ পাওয়া গিয়েছে। পরস্পরের পঞ্চাশ গজের মধ্যে। আপনার কপাল ভালো ওদিকে কেউ যায় না। তাই বছরের পর বছর মৃতদেহ পড়ে থাকতে পেরেছে। পাওয়াও গেছে আপনারই কল্যাণে। আপনিই তিনজনের ব্যক্তিগত জিনিস পুলিশকে দিয়েছেন। পুলিশই তিনজনের ডি-এন-এ পেয়েছে। বাকি দু-জনও মিসিং পার্সন। মেরি লু-র সম্বন্ধে আপনি রিপোর্ট করেননি, কিন্তু বছর তিনেক আগে তার মা করেছিলেন। নিকোলেট আর সুসানের মিস্-পার্ রিপোর্ট তো তখনই করা হয়েছে, যখন তারা হারিয়ে গেছে।”
এইসব ধানাইপানাই গেয়ে ওরা আমাকে পুলিশের হাত থেকে রক্ষা করবে। তবেই হয়েছে।
ডাঃ গ্রুট নাকি আমাকে অবজার্ভ করে প্রাথমিক চিকিৎসা করার জন্য কোর্টের কাছে অ্যাপিল করেছেন। কিসের চিকিৎসা? আমার নাকি ডেল্যুশন আছে। আমি বিশ্বাস করি মেরি লু মারা যায়নি। ও ফিরে আসবে।
বাবান জানতে চেয়েছিল, “আর ও যদি তিনজনকেই মেরে থাকে, তাহলে স্বীকার করছে না কেন? কেন বার বার বলছে ও কাউকে মারেনি। ওর কথা শুনে তো মনে হচ্ছে ও জানেই না কিছু।”
ডাঃ গ্রুট এবারে একটু থমকালেন। বললেন, “আমার ধারণা ও খুনগুলো করেছে একটা ডিসোসিয়েটিভ স্টেটে। দ্বিতীয়বারে মাথায় চোটও খেয়েছিলেন, তবে সেজন্যেই ডিসোসিয়েট করেছিলেন কি না তা বলা এখন আর সম্ভব নয়। সেই অবস্থায় খুন করে, ভিকটিমদের বডিগুলো জঙ্গলে ফেলে দিয়ে আসেন। ওই অবস্থায় হাতের কাছে মেয়েগুলোর যা যা পেয়েছেন, সব একসঙ্গে ফেলে দিয়েছেন, কিন্তু এদিক ওদিক যা পড়ে ছিল, সেগুলো প্ল্যান করে গুছিয়ে নিয়ে যাননি। ফিরে এসে জামা-কাপড় বদলে শুয়ে পড়েন। ঘুম ভাঙে পরদিন... তখন ডিসোসিয়েটিভ স্টেট-টা কেটে গেছে, সব ভুলে গেছেন।”
আমি গুনগুন করে গাইলাম, “অংবংচং চবং চবং চং, গো...” বাবানকেই বোঝানোর জন্য গেয়েছিলাম কিন্তু ওর খেয়াল নেই। হঠাৎ কিছু মনে পড়ে গেছে ভাব করে বলল, “আচ্ছা, তাহলে কোনও খুনই ও নিজে হাতে করেছে তার প্রমাণ নেই? সবই সার্কমস্ট্যানশিয়াল?”
মাথা নাড়লেন সিজার লুইস। “আগের দুটো সার্কমস্ট্যানশিয়াল বললেও শেষেরটা অত সহজে উড়িয়ে দেওয়া যাবে না। আর সেখান থেকেই আগের দুটো লিঙ্ক করা হবে। একই রকম ভাবে তিনজনের মৃত্যু, তিনজনের মৃতদেহ একই ভাবে ডিসপোজ করা... এটাকে পুলিশ এম-ও বলে। মোডাস অপারেন্ডি। এতটা মিল সার্কমস্টানশিয়াল হলেও কাকতালীয় নয়। কোর্টকে কনভিনস করা সহজ হবে না।”
যারা আমায় নির্দোষ প্রমান করবে, তারাই যদি আমাকে খুনি মনে করে, তাহলে আমার রক্ষা পাবার উপায় কতটুকু? তিনজন একবারের জন্যেও মেরি লু-কে খোঁজার কথা ভাবেনি। আমি বলা সত্ত্বেও না। বরং আমার দিকে কৃপা করে তাকিয়েছে — ভাবখানা যেন, আমি পাগল হয়ে গেছি...
এখন আমাকেই খুঁজে বের করতে হবে মেরি লু কোথায়। কিন্তু আমি তো এখানে বন্দী...
“একা একা কেন দাবা খেলছ? এখানে আর কেউ খেলে না?”
রিক্রিয়েশন রুমে একাই খেলছিলাম। কেউ খেলে না নয়, আমার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কেউ পারে না। একবার ডাঃ গ্রুট নিজেই এসেছিলেন, সাত দানে হেরে গিয়ে সেই যে পালিয়েছেন, রিক্রিয়েশন রুমে আমি দাবার ছক নিয়ে বসে থাকলে আর ঢোকেনই না। মুখ তুলে তাকিয়ে বললাম, “আমি একাই...” বলতে গিয়ে থেমে গেলাম। বললাম, “খেলবে?”
বসে পড়ল আমার সামনে। বলল, “সাজাতে হবে না। এই বোর্ডেই কন্টিনিউ করি?”
খুব সাহস! আজ অবধি ক-বার আমাকে দাবায় হারাতে পেরেছ?
কাঁধ ঝাঁকালাম। বললাম, “তোমার দান। আমি এইমাত্র...”
আমাকে থামিয়ে দিয়ে বলল, “জানি। দেখেছি। আমি ওখানে দাঁড়িয়ে দেখছিলাম।”
বটেই তো! দূর থেকে আমাকে লক্ষ করেছ, সেটাই তো স্বাভাবিক। দাবার বোর্ডের ওপর দিয়ে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল, “পরিচয় দিই। আমার নাম বার্নাডেট।”
বার্নাডেট? কাকে কী বলছে? তবে আমিও আজ অতিরিক্ত সাবধান। হাত বাড়ালাম। করমর্দন করে নাম বললাম। ও বলল, “তুমি এখানে কেন? তোমার কী হয়েছে?”
কী হয়েছে? আমার কী হয়েছে? কিছু তো হয়নি... তাহলে কী জবাব হবে?
তাকিয়ে রয়েছে আমার দিকে। কিছু বলতে হবে। বললাম, “ডাক্তাররা এখনও একমত হতে পারেননি। জুরি ইজ স্টিল আউট। আমাকে অবজারভেশনের জন্য রাখা হয়েছে।”
ও বলল, “আমার বর্ডারলাইন পার্সোনালিটি।”
সে কী... খায় না মাথায় মাখে আমি জানি না। কিছু না বলে আমি তাকিয়ে রইলাম বোর্ডের দিকে। ও একটা বোড়ে এগোল।
রানি পেছোলাম। সাবধানে। ওর দিকে বেশি তাকাচ্ছিও না। পাছে আমার মনোভাব প্রকাশ পায়, পাছে আবার ভুল কিছু বলে ফেলি...
শেষ পর্যন্ত আমার কথাই ঠিক হল তো? মেরি লু ফিরে এল। প্রথম থেকে বলেছিলাম, মেরি লু-কে পাওয়া গেলেই হবে। দেখা যাবে মেরি লু বেঁচে আছে, ও বলবে ও আমার কাছে ছিল, পরদিন চলে গিয়েছিল। তাহলেই হবে। খুন, পাগলামো — কোনও কথাই ধোপে টিঁকবে না আর।
মেরি লু চাল ভাবছে। আমি আড়চোখে তাকালাম। বদলেছে এ ক-বছরে, কিন্তু একই রয়ে গেছে মেরি লু। বয়সটাও মনে হয় যেন এই এগারো-বারো বছরে বাইশ-ই রয়ে গেছে। এক দিনও বাড়েনি। সেই চুলের লালচে আভা, সেই হাসি, ঠোঁটের কোনে সেই চামড়ার ভাঁজ...
কাল গ্রুটকে বলব। ততক্ষণে এমন কিছু করলে, বা বললে চলবে না যাতে মেরি লু আবার পালায়। কাল গ্রুট মেরি লু-কে দেখলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। তখন আমি এখান থেকে চলে যাব। ওকে সঙ্গে নিয়েই যাব। আর ওকে কোথাও যেতে দেব না। আমরা চিরদিন একসঙ্গেই থাকব।
কাল যখন মেরি লু-কে নিয়ে গ্রুটের অফিসে যাব, ওর মুখটা কেমন হবে ভাবতেই ভালো লাগছিল। বলব, “তুমি আর পুলিশ আর সিজার লুইস বাবানকে ভুলভাল বুঝিয়ে আমাকে ফাঁসানোর তাল করেছিলে... এখন দেখো... দাবায় তুমি আমার চেয়ে দড় নও। এই আমার...”
মেরি লু ওর রানিটা তিন ঘর এগিয়ে এনে বলল, “চেক-মেট।”
১৪৩০ (২০২৩) শারদীয়া "প্রতিসৃষ্টি"-তে প্রকাশিত
No comments:
Post a Comment