লাল পাহাড়ের গায়ে, যেখানে পাহাড় প্রায় মাঠে এসে মিশেছে, সেখানে চাঁদনীর বাড়ি। গ্রাম থেকে খানিক দূরে, সেখানে আর বাড়ি ঘর নেই, সেখানে চাঁদনির বাবা খানিকটা জমি নিয়ে চাষ করে।
চাঁদনীদেরটা ছাড়া পাহাড়ের গায়ে আরও একটা বাড়ি আছে। সেখানে থাকে বুধ। আর ওর মা বাবা। বুধের বাবাও চাঁদনীর বাবার মতই এক ফালি জমিতে চাষ করে।
বুধ আর চাঁদনী একই সঙ্গে খেলা করে, পড়াশোনা করে। পাহাড় বেয়ে আধ মাইলটাক নেমে এসে বুধ রোজ ডাকে, চাঁদনী বেরিয়ে আসে। দুজনে গল্প করতে করতে ইস্কুল যায়। দিনের শেষে চাঁদনীকে পৌঁছে দিয়ে, পড়া শেষ করে বাড়ি ফেরে বুধ।
সে দিন ইস্কুল যাবার পথে বুধ হঠাৎ একটা অদ্ভুত প্রশ্ন করল। বলল, “লাল পাহাড়ে ওঠা মানা কেন?”
চাঁদনী অবাক হল একটু। লাল পাহাড়ে ওঠা বারণ, সেটা ওরা ছোটোবেলা থেকেই জানে। পাখিপড়ার মত গ্রামের বাবা মায়েরা তাদের ছেলেমেয়েদের শিখিয়েছে, “লাল পাহাড়ে যাবে না। কক্ষণও না। কোনও দিন না। বুঝেছ? কক্ষণও না...” তা সত্ত্বেও কেউ পাহাড়ে চড়ার চেষ্টা কখনও করেনি তা নয়, কিন্তু ধরা পড়ে এমন মার খেয়েছে, যে সখ মিটে গেছে।
বুধ বলল, “কিন্তু কেন? কারণ তো কিছু একটা থাকবে?”
চাঁদনী ঠোঁট ওল্টাল। বলল, “কী জানি! জানতে চাস, তো জিজ্ঞেস করলেই হয়?”
বুধ রাগ-রাগ গলায় বলল, “করেছি। বাবা কিছু বললই না।”
এটা আশ্চর্য কিছু না। বুধের বাবা কথা খুব কমই বলে। তাই চাঁদনী বলল, “আর মা?”
বুধ বলল, “মা বলল, ‘অত জানতে হবে না। যাও পড়া শেষ করে নাও।’“
চাঁদনী বলল, “আচ্ছা, আমি বাবাকে জিজ্ঞেস করব।”
চাঁদনীর বাবা সব সময় চাঁদনী বা ওর দাদার সব প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে। বুধ তাই একটু নিশ্চিন্ত হল।
চাঁদনী জানে বুধের বয়েসটা এখন ঠিক সেইখানে, যখন ছেলেমেয়েরা মা বাবার নিষেধ আর বারণ নিয়ে ভাবতে শুরু করে সিদ্ধান্ত নেয়, যে ওগুলো সব ফালতু, ওর কোনও মানে নেই। চাঁদনীর নিজের বয়সও অতটাই, কিন্তু এই প্রশ্নের উত্তর নিয়ে ওর অত মাথাব্যথা নেই। তবে বুধকে সামলাবার জন্য একটা ব্যবস্থা করতে হবে, নইলে ও যা ডানপিটে ছেলে, নিগ্ঘাৎ রওয়ানা দেবে পাহাড় চড়তে। মিছিমিছি মার খাবে।
বলল বটে বাবাকে জিগেস করবে, কিন্তু পরদিন এসে বুধকে কিছুই বলতে পারল না। ওর বাবা নাকি অনেক কথা বলেছে। বলেছে ছোটোদের সব সময় উচিত বড়োদের কথা শুনে চলা, বলেছে অনেক সময়েই ছোটোরা বড়োদের কথা না শুনে বিষম বিপদে পড়ে। বলেছে লাল পাহাড়ে ওঠা কেবল মাত্র বাচ্চাদের বারণ নয়। বড়োদেরও মানা।
আর থাকতে পারল না বুধ। বলল, “কিন্তু কেন?”
“জানি না, বাবা বলেনি।” অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে বলল চাঁদনী।
“জিজ্ঞেস করবি তো?”
“আরে জিজ্ঞেসই তো করলাম, তাতেই তো এত কথা শুনতে হল।”
রাগে পা ঠুকে বুধ বলল, “তা’লে জানা যাবে কী করে?”
একটু হেসে চাঁদনী বলল, “কেন? দাদুকে জিজ্ঞেস করব?”
চাঁদনীর এই আইডিয়াটা এতই দারুণ, যে বুধ থমকে দাঁড়িয়ে ওর দিকে চেয়ে রইল, চেয়েই রইল। শেষে বলল, “তোর মত বুদ্ধিমান মেয়ে আমি আর একজনও চিনি না।”
আড়চোখে বুধকে দেখে নিয়ে চাঁদনী বলল, “বোকা কোথাকার! আমি ছাড়া আর ক’জন মেয়ে চিনিস তুই?”
*
দাদু আসলে চাঁদনীর দাদু না। ওদের কারওরই কোনও আত্মীয় না। সত্যি বলতে কী, ঠাকুর্দার আত্মীয় বলতে কেউ কোনও দিন লছিল কি না তাও কেউ জানে না। বুড়ো একাই থাকে। আজকাল কাজ করতে পারে না, তাই গ্রামের লোকেরাই ওর দেখাশোনা করে। চাঁদনী আর বুধ ইস্কুল শেষ করে গেল দাদুর বাড়ি। দাদু বাড়ির দাওয়ায় একটা কোকো কোলার খালি ক্রেটের ওপর আসন পেতে বসে ছিল শূন্যদৃষ্টিতে সামনের দিকে চেয়ে। ওদের আসতে দেখে বলল, “বুধ আর চাঁদনী। ঠিক বলেছি?”
বুড়ো হলে কী হবে, দাদুর স্মরণশক্তি প্রখর। ছানিপড়া চোখ, তবু কেমন করে জানি সব ঠিকঠিক দেখতেও পায়! হাত দিয়ে কাছে ডেকে বলল, “বস।” ওরা দুজনে ব্যাগ থেকে ওদের টিফিন বের করল। দাদুকে দেবে বলে আজ ওরা সবটা খায়নি। খাবার পেয়ে দাদুর খুব আনন্দ। খেয়ে দেয়ে, দাওয়ায় রাখা বালতি থেকে জল নিয়ে হাত ধুয়ে বলল, “বেশ কথা। কিসের গল্প শুনবি আজ?”
সব দাদুর মত ওদের দাদুও গল্পের ঝুড়ি। কাউকে পেলেই ধরে গল্প আরম্ভ করে।
আজ ওরা গল্প শুনতেই এসেছে। চাঁদনী বলল, “আমাদের লাল পাহাড়ের গল্প বলো।”
প্রশ্নটা শুনে দাদু এতোক্ষণ চুপ করে রইল, যে বুধের মনে হতে লাগল দাদুও গল্পটা বলবেই না। শেষে দাদু আস্তে আস্তে বলতে শুরু করল, “সে সব এতো পুরোনো দিনের ঘটনা, যে আমার ভালো করে পুরোটা মনেও নেই। এক সময় ছিল, যখন লাল পাহাড়ে ওঠা আমাদের মানা ছিল না। তখন অবশ্য লাল পাহাড়ের নামও লাল ছিল না, কোনও একটা স্বাভাবিক সাধারণ নামই ছিল।”
বুধ বলল, “লাল পাহাড়ই বা কী এমন অদ্ভুত নাম?”
দাদু বুধের দিকে খানিকক্ষণ চেয়ে রইল। তারপর বলল, “তাই বুঝি? কতবার দেখেছিস পাহাড়টা?”
বুধ অবাক। ওই পাহাড়ের পায়েই তো ওদের বাড়ি। দাদু তো জানে সে কথা।
দাদু কিন্তু ওদের উত্তরের জন্য অপেক্ষা না করেই পরের প্রশ্নটা করল।
“পাহাড়ের গায়ে লাল রঙের কী কী দেখেছিস আজ অবধি?”
এর উত্তরটাও দিতে হল না। সবাই জানে, লাল পাহাড়ে লাল রঙের কিছুই নেই।
চাঁদনী জিজ্ঞেস করল, “তবে?”
দাদু বলল, “পাহাড়ের মাথায় একটা বড় পুকুর আছে। সে নাকি ভারি সুন্দর। অপরূপ। সেই পুকুর ডাইনিদের পুকুর। প্রত্যেক পূর্ণিমায় ডাইনিরা আসে সে পুকুরের পাড়ে তাদের মন্ত্রতন্ত্র নিয়ে ডাকিনীবিদ্যা, মারণ উচাটন করতে। তাদের দিকে তাকানো মানুষের মানা। তাই সে সময়ে কেউ সেখানে হাজির হলে তার আর রক্ষে থাকত না।”
চাঁদনীর মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেল। জানতে চাইল, “কী হত?”
দাদু ঠোঁট উল্টে বলল, “কে জানে! হয়ত ব্যাং বানিয়ে দিত। কিংবা টিকটিকি। তাদের পাওয়াই যেত না কোনও দিন।”
বুধ ভুরু কুঁচকে বলল, “ডাইনিরা যদি কেবলমাত্র পূর্ণিমায় আসে, তো অন্য দিন পাহাড়ে ওঠা বারণ কেন?”
দাদু বলল, “আরে, অতো কি আমি জানি নাকি? সে অনেক অনেক বছর আগের কথা। আমারও জন্মের অনেক আগে। ডাইনিরা চেয়েছিল আমরা এ পাহাড় ছেড়ে চলেই যাই। গাঁয়ের মানুষ ডাইনিদের সঙ্গে একটা বোঝাপড়া করেছিল, যে আমরা আর পাহাড়ে চড়বো না। কাজে, অকাজে কখনওই আমরা কালো পাথরের ওপরে যাই না। ডাইনিরাও আমাদের কিছু বলে না।”
বুধ বলল, “কিন্তু...”
দাদু ওর দিকে একটা আঙুল তুলে বলল, “কোনও কিন্তু নেই। মাঝে মাঝেই এমন হয়েছে, বহুদিন পরে পরে, কেউ একটা ধরেই নিয়েছে যে ডাইনি-টাইনি সব বাজে কথা। তারা কেউ কেউ পাহাড়ে চড়তে শুরু করেছে। প্রথম দিকে কিছু হয়নি। পরে হঠাৎ করে একে একে তার সব কিছুই নষ্ট হয়ে গেছে। কাজ, চাকরি, ব্যবসা... সবকিছুই। সেই জন্য, মনে রেখো, কালো পাথরের ওপরে যাওয়া বারণ।”
বুধ খানিক ভেবে বলল, “এমন কেউকে তুমি চেন, দাদু, যার অমনি হয়েছিল?”
দাদু মাথা নাড়ল। “না। সে অন্নে-এ-এ-এ-ক দিন আগের কথা। আমার জন্মই হয়নি।”
বুধ বলল, “কিন্তু লাল পাহাড় নাম হল কেন বললে না তো?”
দাদু আবার আঙুল নেড়ে বলল, “বিপদ। ভীষণ বিপদ, তাই।”
পাহাড়ের নিচে, যেখানে পাহাড়ের চড়াই শুরু হয়েছে, সেই ঢালেই, কালো পাথরের অনেক নিচে ওদের বাড়ি। চড়াইয়ের পথে উঠতে উঠতে বুধ হঠাৎ বলল, “সব বাজে কথা!”
চাঁদনী অবাক। “কী বাজে কথা? দাদুর কথাগুলো? কেন?”
বুধ বলল, “ভেবে দেখ, কেউ কোনওদিন যদি ডাইনিদের না দেখেই থাকে, তাহলে কী করে জানল ওরা মানুষদের ব্যাং বানিয়ে দিচ্ছে? দেখতেই যদি না পেল, কে গিয়ে ওদের সঙ্গে বোঝাপড়া করল? সব বাজে কথা।”
চাঁদনী ঝাঁঝিয়ে বলল, “বাজে কথা বলিস না। এসব কথা নিশ্চয়ই ওই বোকাগুলো বলে, যারা মনে করে ডাইনির গল্প সব মিথ্যে।”
বুধ আর কিছু বলল না। চাঁদনীও নিশ্চিন্ত হয়ে হাঁটা দিল বাড়ির দিকে। বুঝল না, চাঁদনী বোকা বলায় বুধ রাগ করেছে।
*
দিন কয়েক পরে সকালে বুধ চাঁদনীকে ডাকতে এল না। ওর জন্য অপেক্ষা করে করে চাঁদনীর দেরি হয়ে গেল, শেষে এক ছুট্টে স্কুল যখন পৌঁছল, তখন অ্যাসেম্বলির ড্রাম বাজাতে শুরু করেছে মনিটররা — অল্পের জন্য বকুনির হাত থেকে বেঁচে গেল।
সারা দিন ক্লাস করতে করতে বার বার জানালা দিয়ে বাইরে দেখছিল চাঁদনী — আসছে কি?
নাঃ।
দিনের শেষে অবশ্য গ্রামের বাইরে, যেখানে কাঠের ব্রিজ দিয়ে ঝোরা পেরিয়ে বাড়ি যেতে হয়, সেখানে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিল বুধ।
চাঁদনী অবাক হয়ে জানতে চাইল, “কোথায় ছিলি সারাদিন?”
বুধ কিছু না বলে ওর পাশে পাশে হাঁটা দিল। আড়চোখে চেয়ে চাঁদনী বুঝল বুধ কিছু একটা বলতে চায়, কিন্তু সাহসে কুলোচ্ছে না।
পাহাড়ে যেখানে মোড় ঘুরলেই চাঁদনীর বাড়ি, তার ঠিক আগে বুধ হঠাৎ বলল, “আমি আজ গিয়েছিলাম।”
থমকে দাঁড়াল চাঁদনী। কী শুনবে জানে, তাও নিঃশ্বাস বন্ধ করে বুকের ধুকপুকুনি কমতে দিল। তারপরে বলল, “কোথায়?”
চাঁদনীর চোখে চোখ না রেখেই বুধ বলল, “আমি লাল পাহাড়ে গিয়েছিলাম। এক্কেবারে ওপরে।”
বেখেয়ালে চাঁদনীর ভুরু কুঁচকে গেছিল। অবশ্য বুধ দেখেনি। ওর দৃষ্টি মাটির দিকেই। মুখটা স্বাভাবিক করে জিজ্ঞেস করল, “কী দেখলি?”
চাঁদনীর গলায় রাগের আভাস না পেয়ে বুধ সাহস পেয়ে মুখ তুলে হড়বড়িয়ে বলে উঠল, “কী অসম্ভব সুন্দর জায়গা, তুই না দেখলে বিশ্বাস করবি না। আকাশটা কী নীল, হাওয়ায় কী সুন্দর গন্ধ! ওই পুকুরটা, স্বপ্নের মতো, জানিস? একদিন তুই আর আমি যাব। কে বলে ওটা ডাইনির পুকুর? ওটা পরীদের দেশ, জানিস? ওটার নাম হওয়া উচিত পরী পুকুর। ওপর থেকে চারপাশটা দেখতে লাগে, যেন, যেন...” কথা খুঁজে না পেয়ে বুধ বলল, “আমি তোকে নিয়ে যাব একদিন। দেখবি কেমন...”
“না!” চাবুকের মতো জবাবটা এলো বুধকে থামিয়ে দিয়ে। চাঁদনীর চোখ দিয়ে আগুন বেরোচ্ছে। “আমি যাবো না। আর ভালো যদি চাস, তাহলে তুইও যাবি না। আর কোনও দিন না।”
ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বুধ বলতে গেল, “কিন্তু...”
বুধকে থামিয়ে দিয়ে কড়া গলায় চাঁদনী বলল, “কোনও কিন্তু নেই, বুধ। এর মধ্যে কোনও কিন্তু নেই। তোমার যদি ভবিষ্যতে কোনও দিন আমাকে বিয়ে করে আমার সঙ্গে সংসার করার ইচ্ছে থাকে, তাহলে — আর কোনও দিন — কোনও দিন — কালো পাথরের ওধারে যাবে না। মনে থাকে যেন।”
হতভম্ব বুধকে ওখানেই ফেলে রেখে চাঁদনী পাহাড়ী পথ ধরে নিজের বাড়ির দিকে চলে গেল। ঠিক করল কি? কে জানে? কিন্তু তক্ষুণি বুধকে বাঁচানোর জন্য আর কিছু মাথায় আসছিলো না, কী করে চাঁদনী?
রাতের অন্ধকার নামার পর চাঁদনী ওদের বাড়ির দরজার বাইরে মাটিতে তিনটে লাল কাঠি পুঁতে দিল। এখানেই দাঁড়িয়ে রোজ বুধ ওকে ডাকে। এই কাঠিই ওকে রক্ষা করবে। কতদিন? কে জানে?
*
কয়েক বছর কেটে গেছে। চাঁদনী আর বুধ ইস্কুলের পাট চুকিয়ে এখন বিয়ে থা করেছে। ওরা এখন বুধের বাড়িতেই থাকে। চাঁদনী বুধের বাড়িঘর, ওদের ছেলেমেয়ের দেখাশোনা করে, আর সেই সঙ্গে বুধের বাবার জমির দায়িত্বও ওর-ই। বুধ গ্রামে একটা খাবার দোকান চালায়। গ্রামের রাস্তা দিয়ে দূরের পাহাড়ে লোকে বেড়াতে যায়। তারা যেতে আসতে গ্রামে থেমে বুধের দোকানে চা, জলখাবার, ডাল-ভাত, মুরগির ঝোল খেয়ে রওয়ানা দেয় আবার।
বুধ ওদের কথা শোনে। শোনে আরও এক বেলা চলে লোকে একটা পাহাড়ে পৌঁছয়। সে নাকি খুব সুন্দর। অবাক হয়ে ভাবে, মানুষ কত দূর-দূরান্ত থেকে আসে শুধু পাহাড় দেখতে।
যাবার পথে ওদের কত উৎসাহ, নতুন কিছু দেখতে যাচ্ছে, ফেরার পথে কত আনন্দ, সুন্দর পাহাড় দেখে ফিরছে ওরা। ওদের মুখে বর্ণনা শোনে, আর নিজের চেয়ারে বসে পাশের জানালা দিয়ে তাকিয়ে বুধ দেখে ওর লাল পাহাড়। ভাবে, এর সৌন্দর্যের কাছে ওই দূরের পাহাড় কতোটুকু? কিন্তু কেউ যদি ওকে জিজ্ঞেস করে, “এখানে দেখবার কী আছে?” ও ঘাড় নাড়ে গাঁয়ের বাকি লোকেদের মতই বলে, “দেখার কিস্যু নেই।”
এ কথা গ্রামের অন্য লোকেদের মতো বিশ্বাস থেকে বলে না বুধ, যদিও সেই সে দিনের পর আর ও ফিরে যায়নি পাহাড়ে। চাঁদনীকে কথা দিয়েছিল। কাউকে বলেওনি। প্রথম দিকে ভাবত দাদুকে বলবে, কিন্তু বলি বলি করে দাদু সত্যিই একদিন মরে গেল, আর বলা হল না। কিন্তু সেদিনের পরে এমন একটাও দিন যায়নি যে দিন বুধ লাল পাহাড়ের মাথায় দিনটার কথা ভাবেনি, মনের চোখে পাহাড়টাকে দেখেনি। দিনে দিনে ওর মনের মধ্যেই আকাশের রঙ হয়ে উঠেছে ঘন নীল। ওর পরী পুকুরের গভীর জল হয়ে উঠেছে কাকের চোখের মতো কালো। চাঁদনী ভেবেছিল বুধকে পাহাড় থেকে দূরে গ্রামে কাজের মধ্যে রাখলে ওর আর পাহাড়ের যাবার কথা মনে থাকবে না। সেটা অবশ্য চাঁদনী বলেনি বুধকে, যেমন বুধও বলেনি চাঁদনীকে যে ও কোনও দিনই পাহাড়ের ওপরের সেই দারুণ দিনের কথা ভুলবে না। বলেনি ও এখনও রোজই পরী পুকুরের কথা ভাবে। বলেনি রোজ রাতেই ও স্বপ্নে পরী পুকুর দেখে। সে স্বপ্নে পরী পুকুরের পাড়ে পূর্ণিমা রাতে ডাইনিরা জড়ো হয়েছে। ওর স্বপ্নের ডাইনিরা কী সুন্দর! তারা হালকা ডানায় উড়ে আসে। তাদের পরনে মসলিন। বুধের মনে হয়, এ তো ওর নিজের জায়গা। লাল পাহাড়ের চুড়ো, পাহাড়ের জঙ্গল, পরী পুকুর, সবই বুধের। আর কারও নয়। সকালে বুধের ঘুম ভাঙে বুকভরা দুঃখ নিয়ে। আর একবার পাহাড়ে উঠে পরী পুকুর দেখার অদম্য ইচ্ছা নিয়ে। তারপরেই চোখ পড়ে চাঁদনীর দিকে। ঠাণ্ডামাথা, বুদ্ধিমান চাঁদনী, সারা দিন মুখ বুজে চারিদিকে নজর রেখে কাজ করে চলা চাঁদনী। মনে পড়ে সেদিনের কথা, বহু বছর আগে চাঁদনীকে দেওয়া কথা — দীর্ঘশ্বাস ফেলে দোকানে যায়, সেখানে, জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে লাল পাহাড় দেখতে পায়, আবার দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
বাড়িতে চাঁদনী বুধের মনের কথা না বুঝলেও মুখের ভাবটা বোঝে, মনে মনে তৈরি হয়, একদিন আসবে, যে দিন বুধকে আর ধরে রাখা যাবে না। রোজই রাতে চাঁদনী বুধের জুতোর নিচে মাটিতে তিনটে কাঠি পুঁতে রাখে। এখন অবশ্য তিনতেই লাল না। দুটো লাল, একটা হলদে। তিনটে লালে আর হবে না।
*
সে দিনটা এল একটা ছোকরা ছেলের হাত ধরে। বেলা শেষ হয়ে এসেছে, সন্ধের পরে গ্রামটা ঘুমিয়ে পড়ে, বুধও সূর্য ডোবার আগেই দোকান বন্ধ করে ফিরে যায় বাড়ি। কিন্তু সেদিন পিঠে একটা মস্ত ব্যাগ, রোগাটে গড়ন, ফর্সা ছেলেটা দোকানে ঢুকে বুধকে বলল, “রাত্রিটা আমাকে এখানে শুতে দেবেন?”
বুধ অবাক হয়ে চারিদিকে চেয়ে বলল, “এখানে? এখানে শোবার জায়গা কোথায়? এই চেয়ার টেবিল বেঞ্চির মধ্যে শোবেন কী করে?”
ছেলেটা বলল, “শোবার জায়গা আমি বানিয়ে নেব।”
বলে ব্যাগ থেকে আর একটা লম্বা, সরুমতো ব্যাগ বের করে বলল, “এটা আমার স্লিপিং ব্যাগ। আমি আপনার খাবার ঘরের দেওয়ালের পাশে ওই জায়গাটায় শুয়ে যাব। শুধু আপনি অনুমতি দিলেই হবে। কাল ভোরে সূর্য ওঠার আগেই চলে যাব।”
বুধ বলল, “কিন্তু এই গ্রামে আপনি থাকবেন কেন? আর অত ভোরবেলা যাবেনই বা কোথায়?”
ছেলেটা বলল, “যাব ওই পাহাড়ের মাথায়।” আঙুল দিয়ে দেখাল লাল পাহাড়ের দিকে।
অভ্যেসমত মাথা নাড়ল বুধ। বলল, “ওখানে দেখার কিছুই নেই।”
ছেলেটা হেসে বলল, “আমি যা দেখতে চাই তা অবশ্যই আছে। আমি পাখি দেখব।”
এবার বুধ এতোই অবাক হল, যে কিছুই বলতে পারল না। পাখি একটা দেখার জিনিস হল? ওর মুখের ভাব দেখে ছেলেটা ব্যাগ থেকে এবারে বের করল একটা বই। পাতা উল্টে দেখাল সারি সারি পাখির ছবি। বলল, “প্রায় আশি রকম পাখি পাওয়া যায় আশেপাশের তিন চারটে পাহাড়ে। লাল পাহাড়েও নিশ্চয়ই পাওয়া যাবে, তাই না?”
আবার মাথা নাড়ল বুধ। বলল, “খুব বিপদজনক।”
“কী বিপদ?” জানতে চাইল ছেলেটা।
বুধ কী বলবে? ডাইনি আর অভিশাপের কথা বললে ছেলেটা নির্ঘাত হেসে উড়িয়ে দেবে। তাই অল্প কথায় সেরে ফেলার মত করে বলল, “লোকে মরে যায়।”
তাও ছেলেটা হেসেই উড়িয়ে দিল। বলল, “সব গল্প। একজনেরও নাম বলতে পারবেন, যে পাহাড়ে গিয়ে মরে গিয়েছে?”
না। এমনকি দাদুও তেমন কাউকে চিনত না।
ওকে চুপ দেখে ছেলেটা বলল, “দেখলেন তো? আচ্ছা, শুনুন, কথায় কথায় সূর্য ডুবে গেল। এখন তো আমার আর কোথাও যাবার উপায়ও নেই। আমার জন্য সামান্য কিছু খাওয়ার ব্যবস্থা করে দিন। আমি দাম দেব।”
ছেলেটা ওর সামনে টাকাকড়ি যা রাখল তাতে বুধ দেখল ওর অনেক রোজগার হবে। ও আর আপত্তি করল না। ছেলেটার খাওয়া-শোয়ার বন্দোবস্ত করে বাড়ি ফিরল। খেয়াল করল না, চাঁদনী মন দিয়ে ওকে নজর করছে।
সারা রাত বুধের ঘুম প্রায় হলই না। খালি মনে হতে লাগল, ছেলেটাকে যেতে দেওয়া যাবে না। ছেলেটার বিপদ হতে পারে সেটা না, কিন্তু ওর লাল পাহাড়ের চুড়ো আর ওর পরী পুকুর! চাঁদনীকে কথা দিয়েছে বলে সেখানে ও নিজে যেতে পারবে না, কিন্তু এই অচেনা ছেলেটা যাবে, সেটা ও কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না।
পাশের ঘরে চাঁদনীও জেগে। আজ আর একটা ধাপ। আজ বুধের বিছানার নিচের মাটিতে দুটো হলদে কাঠি পুঁতে রেখেছে চাঁদনী। এতেও শানাবে না, চাঁদনী জানে। বুধকে বাঁচাবার ব্যবস্থা করতে হবে যে কোনও দিন।
পরদিন বুধ ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়ল সূর্য ওঠার আগেই। ছেলেটাকে পাহাড়ে ওঠার আগেই আটকাতে হবে।
কিন্তু হল না। গ্রামের রাস্তায় খানিকটা যেতে না যেতেই বুধ দেখল, ছেলেটা উঠে আসছে, পিঠে ওর বিশাল ব্যাগ, গলায় দূরবীন, ক্যামেরা। ওকে দেখে উল্লসিত হয়ে বলল, “আপনিও আসবেন আমার সঙ্গে?”
ছেলেটার সঙ্গে পাহাড়ের মাথায় যাবার কোনও চিন্তাই বুধের মাথায় আসেনি। কিন্তু প্রশ্নটা শুনে মনে হল, কেনই বা যাবে না? পাহাড় চুড়োটা তো ওরই, তাই না? ছেলেটার সঙ্গে পাহাড়ে উঠতে উঠতে বুধ ওকে ডাইনি পুকুরের গল্পটা বলেই ফেলল। প্রথমে দাদুর গল্পগুলোই বাড়িয়ে বাড়িয়ে বলছিল, কিন্তু ছেলেটার ভয় পাবার কোনও লক্ষণ নেই। একে একে সব কথাই ওকে বলে ফেলল বুধ। ছোটোবেলায় পাহাড়ের ওপরে ওঠার কথা,চাঁদনীকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি, এমনকি ওর খাবার দোকানে বসে জানালা দিয়ে বাইরে পাহাড় দেখতে দেখতে আস্তে আস্তে পাহাড়চুড়োটাকে নিজের মনে করা, সব।
ছেলেটা কিছু বলছে না দেখে ওর একটু রাগ হল। পাহাড়টা ওর নিজের বলেছে বলে ছেলেটার আপত্তি হল?
চারিদিকে তাকিয়ে আবার বুধের চোখ জুড়িয়ে গেল। এত সুন্দর জায়গা হয়? সেই সঙ্গে দুঃখও হল। এই সৌন্দর্য চাঁদনী দেখবে না কোনও দিন, ওদেরই গ্রামের লোকের বোকামির জন্য। রাগ রাগ গলায় বলল, “নয় কেন? আমার গ্রামের কোনও লোক কোনও দিনই এই দৃশ্য দেখতে আসবে না। এ আমি একাই ভোগ করব। এই পাহাড়, এই পুকুর, আমিই এসবের আসল মালিক। আসল, আসল...”
চোখে দূরবীন লাগিয়ে পাখি খুঁজতে খুঁজতে ছেলেটা বলল, “হ্যাঁ, তা তো বটেই।”
মাঠে কাজ করতে করতে চাঁদনী ওপরে মুখ তুলে, হাত দিয়ে চোখ আড়াল করে বোঝার চেষ্টা করছিল বুধ কতোদূর গেছে। যে দিন ইস্কুল থেকে ফেরার পথে বুধ ওকে প্রথম বলেছিল পাহাড়ে যাবার কথা, সেদিন থেকেই চাঁদনী অপেক্ষায় ছিল, একদিন আসবে এই দিন। এর পর, চাঁদনী জানে, কবে সব শেষ করে দিতে হবে, কেউ বলতে পারবে না। মাঠের কাজ ফেলে চাঁদনী ঘরে ফিরে গেল — বুধের বিছানার নিচে তিনটে কাঠিই এখন হলুদ। কিন্তু প্রয়োজনীয় সব জিনিসগুলোও গুছিয়ে রাখতে হবে। বেশি কিছু লাগবে না, তাও...
বুধ ছেলেটাকে পাহাড়ের ওপরে রেখে দোকান খুলতে নেমে এল। ছেলেটা বলেছিল সকাল শেষ হয়ে দুপুর হবার আগেই ফিরে আসবে, কিন্তু এল প্রায় বিকেলের কাছাকাছি। বলল, অনেক পাখি দেখেছে। খেয়ে দেয়ে দাম মেটানোর সময় বাড়তি কিছু টাকাকড়ি দিল বুধকে। বলল, “আমার সঙ্গে পাহাড় অবধি যাবার জন্য, আমাকে রাস্তা দেখানর জন্য, আর সব গল্পগুলো বলার জন্য এটা আপনার পারিশ্রমিক।”
সেদিন সন্ধেবেলা চাঁদনী বুধকে জিজ্ঞেস করল, “আজ কি তুই পাহাড়ের একেবারে ওপর অবধি গেছিলি?”
বুধ জানতো কেউ ওকে দেখলে চাঁদনীকে বলে দেবে। কিন্তু কেউ দেখেছে বলে ভাবেনি। চাঁদনী জানতে চেয়েছিল কেবল। বুধকে বারণ করার উদ্দেশ্য ছিল না, জানাটাই দরকার ছিল। কিন্তু বুধ হঠাৎ ভীষণ রেগে গেল। পকেট থেকে ছেলেটার দেওয়া টাকা ছুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলল চাঁদনীর সামনে। বলল, “তাকিয়ে দেখ, শুধু সঙ্গে যাবার জন্য কত টাকা পেলাম। এই টাকাটা ছেড়ে দেওয়াটা বোকামি হত না?”
চাঁদনী মুখ ফিরিয়ে নিল বলে বুধ মনে করল চাঁদনী ব্যাপারটা বুঝেছে। যেটা দেখতে পেল না সেটা হল চাঁদনীর চোখের গভীর দুঃখ। এই বাড়ি ছেড়ে ওদের চলে যেতে হবে সেই ভাবনার চোখের জল না ঝরানো কান্না।
সেদিন রাতে, বুধ যখন গভীর ঘুমে, চাঁদনী বেরিয়ে বাড়ির চৌহদ্দির চারিদিকে অনেকগুলো সরু সরু কাঠি পুঁতে এল। এগুলো সব সাদা। অনেক কষ্টে এগুলো জোগাড় করেছে চাঁদনী। কিন্তু এ-ও বেশিদিন চলবে না। চাঁদনী জানে। তবে আজ ও সেদিনের কথা ভাবতে চায় না। সেদিনের কথা তখনই ভাববে। *
ছেলেটা ফিরে এল মাস কয়েক পরে। বুধ ওর দোকানে বসে লাল পাহাড়ের দিকে চেয়ে বসেছিল। ছেলেটা ওর সামনে একটা পত্রিকা রেখে বলল, “এই দেখুন।”
বুধ বলল, “এ তো ইংরেজিতে লেখা। আমি ইংরেজি পড়তে পারি না।”
ছেলেটা হেসে বলল, “পাতা উল্টে দেখুন না, কাউকে বা কিছু চিনতে পারেন কি না?”
আস্তে আস্তে পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে বুধ হঠাৎ থমকে গেল। সামনের ছবি থেকে চোখ তুলে তাকাল জানালা দিয়ে বাইরে। দরকার ছিল না। জানালার বাইরের দৃশ্য ওর চোখে আঁকা। সেই দৃশ্যই ওর সামনে, দু পাতা জোড়া।
“আপনার দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে তুলেছি,” ছেলেটা বলল। “আপনি লাল পাহাড়কে সত্যিই ভালোবাসেন। গ্রামের কেউ তেমনি ভালোবাসে না। ভয় পায়।”
পাতার নিচে কী সব লেখা। ইংরেজি হরফের দিকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বুধ বলল, “কী লেখা আছে?”
ছেলেটা বলল, “‘লাল পাহাড়ের পাখি।’ এটা আমার লেখার নাম।”
চার পাতা জোড়া লেখা। পরের পাতা উল্টেও থমকে গেল বুধ। ওটা ওর এই দোকানটা না? আর তার পরে, ওটা? ওর দোকানে খেয়ে খুশি হয়ে ওর সঙ্গে ছবি তুলেছে এমন লোক আছে, কিন্তু ওর নিজের মুখের ছবি এর আগে দেখেনি বুধ।
ছেলেটা এবার ওর ব্যাগ থেকে আরও কয়েকটা কাগজ বের করল। ওই পাতাগুলোই, কেমন প্লাস্টিকে মোড়া। বলল, “এগুলো ল্যামিনেট করে এনেছি। দেওয়ালে লাগিয়ে দেব। পিন নিয়ে এসেছি। এই পত্রিকাটা শহরে বিখ্যাত। হাজার হাজার লোক পড়বে। তারা এখানে আসলে জানতে পারবে আপনিই সেই বুধ। পাহাড়চুড়োর আর পরী পুকুরের ছবি দিইনি, কিন্তু লিখেছি। ডাইনির কথা লিখিনি। হাতুড়ি দেবেন একটা?”
দেওয়ালে পত্রিকার পাতাগুলো আটকে ছেলেটা ওকে এবার আরও কয়েকটা ছবি দিল। বুধের ছবিটা, ওর দোকানের ছবি, গ্রামের ছবি আর — কী আশ্চর্য — পরী পুকুর আর পাহাড়চুড়োর ছবি!
বলল, “এগুলো আপনার। আপনার বউ ছেলেমেয়েদের দেখাবেন।”
ছেলেটা চলে গেল। বলল আরেকটা পাহাড় দেখতে যাচ্ছে। বুধ থুম হয়ে বসে রইল ছবিগুলো আর পত্রিকাটা সামনে নিয়ে। ওর কর্মচারীরা এসে ল্যামিনেট করা কাগজগুলো দেখে অবাক হল। বুধ একবার ভাবল, লাল পাহাড়চুড়োর ছবিগুলোও দেখায়, কিন্তু তার পরে কী ভেবে সরিয়ে রাখল। দিনটা কেমন স্বপ্নের মতো কেটে গেল। খদ্দেররা অনেকেই দেওয়ালে লাগানো ছবিগুলো দেখে ওকে বলল, আমাদের লাল পাহাড়ে নিয়ে চল। বুধ মাথা নেড়ে সবাইকে বলল, “ওখানে দেখার কিছু নেই।”
দিনের শেষে বুধ ছবিগুলো কাগজের মুড়ে বাড়ি নিয়ে যেতে গিয়েও দোকানেই ওর টেবিলের দেরাজে তালা বন্ধ করে রেখে দিল। লাল পাহাড়ে উঠেছে বলে চাঁদনী ওর ওপর সেদিন রাগ করেছিল। সেই কথা যেচে মনে না করালেও চলবে। খালি হাতেই বাড়ি ফিরল বুধ।
বুধ বাড়ি ফেরার পর চাঁদনী দীর্ঘশ্বাস ফেলে বাইরে গিয়ে বসল। আর কিছু করার নেই ওর। ওর বিদ্যা বুদ্ধিতে যা করার ছিল সবই শেষ। এখন শুধু অপেক্ষা।
*
যত দিন যায়, লাল পাহাড়ে বাইরের লোকের আনাগোনা বাড়ে। বুধের দোকান উপচে পড়ে। কেউ আসে পাখি দেখতে, কেউ আসে পিকনিক করতে, কেউ বা গাছের খোঁজে। কেউ চায় ডাইনিদের ইতিহাস জানতে। কেউ শুধু ঘুরে বেড়ায়।
তবে সবাই বুধকে চায়। রাস্তা দেখিয়ে ওপরে নিয়ে যাবার জন্য, গল্প বলার জন্য, ওপর থেকে নিচের দৃশ্য দেখাবার জন্য — আর সেই সঙ্গে ওরা বুধকে পয়সা দিয়ে যায়। বুধ আজকাল চাঁদনীকে নিয়ে আর মাথা ঘামায় না। ওর এখন অনেক পয়সা। দোকানের রোজগার, গাইডের কাজের রোজগার মিলিয়ে ও এখন গ্রামের বড়োলোক। বাইরের লোকেরা ওকে সম্মান করে কথা বলে। গ্রামের লোকেরা ভয় পায়।
শুধু বাড়িতেই ওর কদর বাড়েনি। চাঁদনী ওর উন্নতি দেখে কোনও আনন্দ দেখায় না। ওর জন্য, বাচ্চাদের জন্য কিছু নিয়ে গেলে শান্তভাবে নিয়ে নেয়, কিন্তু তারপরে সেটা বুধ আর কোনও দিন দেখতেও পায় না।
রোজ বুধ যখন বাইরের লোকেদের নিয়ে লাল পাহাড়ের ওপরে যায়, তখন গ্রামের উল্টো দিকের পথ দিয়ে ওঠে। এখন বুধ লাল পাহাড় চেনে খুব ভালো করে। তার কোন ঢালের কোন গাছে ভুতুম প্যাঁচার বাসা, কোন ঝোপের ফল কখন পাকলে কোন পাখি তা খেতে আসে, পাহাড়ের কোন বনে ছায়ায় পিকনিক জমে সবচেয়ে ভাল, কোন পাথরের ওপরে দাঁড়ালে নিচের দৃশ্য সবচেয়ে সুন্দর দেখা যায়, সব জানে বুধ।
বুধ ভাবে পাহাড়ের ওধার দিয়ে উঠলে চাঁদনী দেখতে পাবে না, গ্রামের লোকে ওকে খবর দেবে না। কিন্তু তা হয় না। গ্রামের লোক না বললেও চাঁদনী ঠিকই বোঝে। আরও একটা-দুটো জিনিস গুছিয়ে রাখে, চলে যাবার প্রস্তুতি।
গ্রামের লোকের কথাও কানে আসে। শুনতে পায়, আজকাল শহরের লোকেরাও বুধের নাম জানে। ওরা এসে বুধের দোকানের খোঁজ করে। বলে, “বুধের পাহাড়ে আমাদের নিয়ে যাবে?” বুধের ছবি বেরিয়েছে শহুরে ইংরিজি পত্রিকায়। বুধ এসব কিছুই বলেনি চাঁদনীকে। বলেনি লোকে লাল পাহাড়কে বুধের পাহাড় বলতে লেগেছে। চাঁদনী দুঃখ পায় না। রাগ করে না। ও জানে এটাই হবার ছিল। বোঝে, সময় হয়েছে।
গোছানো জিনিসগুলো গাঁঠরি বেঁধে নিল চাঁদনী। সাদা লাল হলদে কাঠিগুলো, ঠাকুরের আসনে সব ঠাকুরের আড়ালে লুকোনো একটা কালো গোল পাথর, ওদের সবার জামার তিনটে করে সুতো, উনুনের ছাই সাত চিমটি... এ সব, আর আরও কিছু, গোছানোই ছিল। চাঁদনী সেই বাণ্ডিলে নিল বাগানের সবকটা গাছের তিনটে করে পাতা। তার পরে বাচ্চাদের হাত ধরে বেরিয়ে গেল বাড়ি থেকে। দরজা বন্ধ করল না। তাহলে আর ফিরে আসা যায় না। পেছন ফিরে তাকাল না। তাহলে ছেড়ে যাওয়া যায় না।
রাত্তিরে দোকান থেকে ফিরে বুধ দেখল বাড়ি খালি, অন্ধকার। কেউ কোথাও নেই। বুধ খানিকক্ষণ চাঁদনী আর বাচ্চাদের নাম ডেকে ডেকে ঘুরে বেড়াল। তার পর পাহাড়ী রাস্তা ধরে নেমে গেল চাঁদনীর বাপের বাড়ি, যেখানে এখন থাকে চাঁদনীর দাদা।
চাঁদনীর দাদা রাগ-রাগ গলায় বলল, “আমি কী করে জানব চাঁদনী কোথায়? ওর দায়িত্ব এখন তোমার। তুমি যদি দিনরাত ওই পাহাড়ে ঘুরে না বেড়িয়ে ওদের দেখাশোনা করতে, যদি ওদেরকে নিজের মনে করতে ওই পাহাড়টাকে আপন না মনে করে, তাহলে আজ তুমিই জানতে ওরা এখন কোথায়।”
“আমি মোটেই...” বলতে গিয়েও বুধ থেমে গেল। ওই ছেলেটাকে বলেছিল ও পাহাড়চুড়ো আর পুকুরটাকে নিজের বলেই ভাবে। কে জানে, সে হয়ত সে কথা ওই ইংরেজী পত্রিকায় লিখে দিয়েছে। হয়ত গ্রামের আর পাঁচজনও সে কথা জানে। বুধের মুখ লাল হয়ে উঠল, কান গরম হয়ে গেল, ওর মনের গোপন কথা গ্রামের সবাই জেনে গেছে ভেবে।
চুপচাপ ফিরে গেল বাড়ি। ঘুম এল না রাতে।
*
পরদিন সকালে বুধ কাজে গেল, কিন্তু আর বাড়ি ফিরল না। দোকানেই রয়ে যেতে লাগল রাতে। অবশ্য ওটাকে আর ও দোকান বলে না। বলে রেস্টুরেন্ট। শহরের লোকে তাই শিখিয়েছে ওকে। কিছুদিন আগে বুধ লোক লাগিয়ে ওর দোকানটা আরও সুন্দর করে তুলেছে। যত দিন যাচ্ছে, বুধের ব্যবসা, প্রতিপত্তি দুই-ই বাড়ছে। গ্রামের বয়স্ক আর সমবয়সীরা অবশ্য ওর সঙ্গে আর কথা বলে না। ও-ও আর তাদের সঙ্গে কোনও সম্পর্ক রাখে না। কিন্তু ছোটোরা ওকে হিরো মনে করে, ভাবে বড়ো হয়ে ওরাও লাল পাহাড়ে যাবে রোজ। ওদের মা বাবারা বুঝিয়ে ধমকে ওদের নিরস্ত করে রেখেছে।
চাঁদনী আর বাচ্চাদের কোনও খোঁজ পায়নি বুধ। ওর ধারণা গাঁয়ের কেউ কেউ জানে, কিন্তু বুধকে বলছে না। সারা দিন সবার সামনে বুধ একটা কিছু-হয়নি ভাব করে বেড়ায়, কিন্তু ভেতরে ভেতরে একটা দুশ্চিন্তা কুরে কুরে খায়।
চাঁদনী সেটাও বোঝে। কিন্তু ও জানে, এখনও সময় হয়নি।
একদিন সকালে রেস্টুরেন্টে ঢুকতে গিয়ে বুধ শুনল ওর লোকেরা নিজেদের মধ্যে কথা বলছে ওরই সম্বন্ধে। “এই হল অভিশাপের ফল। বাড়ির লোক তো সবাই চলেই গেছিল, এখন কিছুদিনের মধ্যে বাড়িটাও পড়ে যাবে। আমি তো ঠিক করেছি গ্রাম ছেড়েই চলে যাব। কে জানে কবে বাচ্চাটা পাহাড় চড়তে শুরু করবে...”
বুধ অবাক হল। বাড়ি ভেঙে পড়ছে? ওর বাড়ি? এরই মধ্যে? ক’দিন হল বাড়ি ছেড়েছে? এই তো কয়েক সপ্তাহ... না কি কয়েক মাস?
সেদিন পিকনিকের জন্য একদল লোক নিয়ে বুধ পাহাড়ে চড়ল ওর বাড়ির রাস্তা ধরে। পাহাড়ের পথ এঁকে বেঁকে পাহাড়ী বাঁক পেরিয়ে ওর বাড়ির কাছে এসে পৌঁছন মাত্র বুধ থমকে দাঁড়াল। এ কী দুর্দশা বাড়িটার! খুব সুন্দর, বড় বাড়ি ছিল না কোনও দিনই, অনেক দিন ও চাঁদনীকে বলেওছিল এটা ছেড়ে গ্রামে গিয়ে থাকতে, চাঁদনী রাজী হয়নি — কিন্তু বাড়িটার সর্বাঙ্গে একটা যত্নের ছাপ ছিল, বোঝা যেত কেউ ভালবেসে বাড়িটার দেখাশোনা করে। প্রথমে বুধের মা, তার পরে চাঁদনী।
বুধের সঙ্গে যারা ছিল, তারাও নাক কুঁচকোল। একজন তো বলেই বসল, “এখানে কে থাকে?”
এটা ওরই বাড়ি, সে কথা বলতে লজ্জা করল। বলল, “এখানে যারা থাকত, তারা চলে গেছে।”
সে বলল, “তাহলে এই বাড়িটা এখানে এমন রয়ে গেছে কেন? কী বিশ্রী!”
বুধ আর কিছু বলল না। ওদের পিকনিকের জায়গায় পৌঁছে দিয়ে পাহাড় থেকে নেমে চলে গেল মিস্তিরি ডাকতে। বাড়িটাকে সারিয়ে নিতে সময় নিল মাস দুয়েক। তারপরে ফিরে গেল সেই বাড়িতে। দেখুক গ্রামের লোক, বুধের বউ বোকার মত পালিয়ে গিয়ে থাকতে পারে, কিন্তু বুধ ডরায় না।
কিন্তু বাড়ি এসে তো শান্তি নেই। রোজই কাজ থেকে ফিরে ক্লান্ত শরীরে শুতে যায় বুধ, রোজই জেগে এ পাশ, ও পাশ করে। ঘুম আসে না।
যত দিন যায়, দোকান থেকে আরও দেরি করে ফেরে। ভাবে, ক্লান্ত হয়ে ফিরলে বোধহয় ঘুম আসবে
আসে না।
রাত সেদিন অনেকটাই হয়েছিল। বাড়ি ফিরতে ফিরতে হঠাৎ আকাশের দিকে চোখ পড়ল বুধের। পূর্ণিমারাত, আকাশ জোছনায় ভেসে যাচ্ছে। মনে হল, আজই তো পরীরা আসবে। ওর পাহাড়ে। ওর পুকুরে। কী ভেবে বাড়ির দিকে না গিয়ে হাঁটা দিল পাহাড়চুড়োর দিকে।
থই থই জ্যোৎস্নায় বুধ যখন পাহাড়ে পৌঁছল, তখন পরিশ্রমে, উত্তেজনায় আর প্রত্যাশায় ওর সর্বাঙ্গ ঘামে ভেজা, বুক ধুকপুক করছে, হাপরের মত নিঃশ্বাস পড়ছে। পরী পুকুরের চারপাশের জঙ্গল নিস্তব্ধ নিথর, যেন নিঃশব্দে চাঁদের আলো শুষে নিচ্ছে।
হুড়মুড়িয়ে জঙ্গল থেকে বেরিয়ে এল বুধ। কই, কেউ তো কোথাও নেই! স্বপ্নের মতো সুন্দর পাহাড়চুড়ো। কিন্তু কেউ নেই। পুকুরের জলে তিরতিরে কাঁপুনিটুকু নেই, একটা গাছের পাতাও নড়ে না।
কিন্তু ছিল। বুধ জানে ছিল। এই একখুনি ছিল। বুধ গাছের আড়াল থেকে ছুটে বেরোনর আগের মুহূর্ত অবধি ছিল। ওদের থাকার রেশটা রয়ে গেছে হাওয়ায়, জলে, চাঁদের আলোয় — ওরা নেই।
পাগলের মত বুধ ছুটে ছুটে খুঁজল। শেষে মাটিতে আছড়ে পড়ে হাউ হাউ করে কাঁদল। বলল, “চাঁদনী, তুই এলি না কোনও দিন আমার সাথে, দেখলি না কী সুন্দর পরী পুকুর। কিন্তু পরীরা আমাকে দেখা দিল না।”
চাঁদনী আস্তে আস্তে বলল, “চুপ চুপ। এখনও সময় হয়নি, কিন্তু আর দেরি নেই।”
শুনতে পেল না বুধ। কাঁদতে কাঁদতে ওখানেই ঘুমিয়ে পড়ল। সকালে উঠে মনে হল, এত ভাল ঘুম অনেকদিনের মধ্যে ওর নিজের বিছানাতে হয়নি। সে দিন থেকে বুধ কাজ সেরে রোজ রাতে চলে যেত পরী পুকুরের পাড়ে। অনেকক্ষণ বসে থাকত। রাত বাড়লে নেমে আসত বাড়িতে। ফিসফিস করে চাঁদনীকে বলত, কী কী হয়েছে সারা দিন। জানতেও পারত না, চাঁদনী শুনছে, ওর চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ছে। তার পরে বুধ ঘুমিয়ে পড়ত নিশ্চিন্তে, চাঁদনীও ফিরে যেত নিঃশব্দে।
দিন কাটে, হপ্তা যায়। এগিয়ে আসে পরের পূর্ণিমা। উত্তেজনায় ফুটতে থাকে বুধ।
পূর্ণিমা রাতের একদিন বাকি থাকতে বুধ ওর রেস্টুরেন্টের ছেলেদের জানিয়ে দেয়, কাল দোকান বন্ধ। ছুটি। সারা দিন কাজের শেষে ফিরে সেদিন বুধ আর পাহাড়ে গেল না। পরদিন যাবে, সকালেই। অপেক্ষা করবে পরীদের জন্য।
বুধ ঘুমিয়ে পড়ল।
ঘুম ভাঙল, রাত তখন অনেক। জানালার বাইরে প্রায় দিনের মত আলো। আকাশের চাঁদ পূর্ণিমার পুরো থালাটা নয়, কিন্তু তার চেয়ে কমই বা কী?
বুধ বিছানা থেকে নেমে বাইরে এসে দাঁড়াল। ওর ভুরু কোঁচকানো। কে যেন ডাকল ওকে? না কি ভুল হল?
বাইরে, জোছনাধোয়া আঙিনায় লাল ফুলের গাছটার নিচে কে দাঁড়িয়ে? এত সুন্দর মানুষ হয়? তার লম্বা কালো চুল হাওয়ায় উড়ছে, তার পোষাকও যেন চাঁদের আলোয় তৈরি। তার গায়ে চাঁদের আলো পিছলে যাচ্ছে।
কিন্তু, কিন্তু... এ কে? অবাক বুধ পায়ে পায়ে এগিয়ে এসে থমকে গেল।
পরীটা কিচমিচ করে পাখির ভাষায় কী যেন বলল।
“চাঁদনী? তুই? তুই পরী?”
খিলখিল করে হাসল চাঁদনী। আবার কিচিমিচি করল, পাখিদের মত। কিন্তু এবার বুধ ঠিক বুঝল ওরই ভাষায়। চাঁদনী বলল, “পরী, না ডাইনি? কী বলে ডাকবি?”
বুধ মাথা নেড়ে বলল, “ডাইনি না, পরী। আমি জানি, পরী। আমি দেখতে পাচ্ছি — পরী।”
আবার হাসল চাঁদনী। বলল, “কিচ্ছু জানিস না, বোকা কোথাকার।”
তার পরে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল, “আয়, সময় হয়েছে। যেতে হবে।”
*
লাল পাহাড়ে ওঠার সব রাস্তাই এখন বন্ধ। গ্রামের লোক কাঁটাতার দিয়ে ঘিরে দিয়েছে। বাইরের লোককে আর যেতে দেওয়া হয় না। ওদের বলা হয়, “ও পাহাড়ে দেও আছে। যাওয়া মানা।”
যারা বুধকে চিনত তাদের কেউ জানতে চাইলে বলে, “বুধ? তাকে আর দেখা যায় না। ওই ওর দোকান, তালাবন্ধ। পাহাড়ের গায়ে ওর বাড়িটা আছে এখনও। মজবুত, তাই চট করে ভেঙে পড়েনি। কিন্তু ওরা কেউ নেই। কোথায় গেছে, কেউ জানে না।”
গ্রামের লোকেরা ছেলেমেয়েকে বুধের গল্প বলে। ভয় দেখায়। বলে, বুধ ডাইনির কথা বিশ্বাস করেনি। ও বিশ্বাস করত ডাইনি নেই। পরীদের কথা বলত। বলত ওটা পরী পুকুর। কিন্তু অভিশাপের কথাই ফলে গেল। বুধকে ডাইনিরা সাপ না ব্যাং কী বানিয়ে দিল কে জানে।
শুধু বুধ হাসে। গ্রামের মানুষ জানেও না, পরী আর ডাইনিতে কোনও তফাতই নেই।
No comments:
Post a Comment