Sunday, September 25, 2016

টুস্কির রান্নাবাটি

টুস্কির আজ দারুণ আনন্দ। সন্ধেবেলা বাবা বাড়ি ফিরে বলেছে, দাদাভাই আসছে। আর আসছে মানে, শুধু আসছে না, একেবারে থাকতে আসছে। জগদ্ধাত্রীপুরে দাদাভাই চাকরি পেয়েছে লোহা কারখানায় — লোহা বানাবে! আর ওদের বাড়ি বর্ধিষ্ণুনগর থেকে জগদ্ধাত্রীপুর বেশি দূর না হলেও, দাদাভাই জগদ্ধাত্রীপুরেই থাকবে। ওদেরই বাড়িতে! এর চেয়ে বড়ো আনন্দের কথা আর কিছু হতে পারে?
টুস্কি আর হাঁটছে না। নাচছে। একবার তো টেবিলের পাশ দিয়ে যেতে গিয়ে চেয়ারে পা লেগে হাউমাউ কান্না। শেষে মা’র কাছে প্রবল বকুনি খেয়ে থামল। মা বেশি বকে টকে না, কিন্তু আহ্লাদ করলে একেবারে ছেড়ে কথা বলে না। না বকলে কী হবে, রেগে গেলে গুমগুমিয়ে কিলিয়ে ছাড়ে। হুঁ!
দাদাভাই খুব ভালো। সবসময়ে হাসিখুশি, মুখে গুনগুন গান। সবাই অবশ্য বলে ওতে সুরটুর নেই। শুনলে টুস্কির আর গান শেখা হবে না। টুস্কি তাই দাদাভাইয়ের গান শোনে, সুর বাদ দিয়ে। দাদাভাই অনেক গান জানে। আর সেতার বাজাতে পারে। আচ্ছা, দাদাভাই সেতার নিয়ে আসবে? তাহলে বাবা বেহালা বাজাবে, আর দাদাভাই সেতার? বাবা বলল, না। সেতার রাখারই জায়গা নেই। দাদাভাই শোবে কোথায়? বসার ঘরেই না? তক্তপোশে। সেখানে সেতার রাখার জায়গা কোথায়? টুস্কি চট করে একবার ঘুরে দেখে এল। নাঃ, বাবা ঠিকই বলেছে। সোফা, তক্তপোশ, শোকেস, বইয়ের র‍্যাক, মা’র তানপুরা — সব মিলে সেতার রাখার জায়গা নেই। এ হে।
টুস্কির নাচা দেখে দাদাও ধমকালো। হচ্ছেটা কী? পড়তে দিবি না নাকি? দাদার সবতাতেই বেশি বেশি। পড়ে তো ক্লাস ওয়ানে। হাব ভাব যেন বাবার কলেজে পড়ায়। ওই দেবদত্ত জ্যেঠুর মতো। হুঁঃ।
দিন কাটে। বাবা টুস্কির রোজের প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে ক্লান্ত হয়ে ক্যালেন্ডারে একটা দিনে গোল দাগ দিয়ে দিয়েছে, আর টুস্কিকে বলেছে, একটা করে দিন গেলে পেনসিল দিয়ে কেটে দিতে। তা হলে ও নিজেই গুনে নিতে পারবে দাদাভাই ক’দিন বাদে আসবে। টুস্কি অবশ্য এখনও দশের বেশি গুনতে পারে না। তাই দশ দশ করে গুনে দেখেছে, তিনটে দশ আর চার – এখনও বাকি। অন্নে-এ-এ-এক দিন।
দাদাভাই এল, যেমন আসার কথা। সঙ্গে সেই সুটকেসটা, যেটায় জামা নিয়ে আসে। টুস্কির স্কুলের বাক্সের চেয়ে বড়ো। দাদারটার চেয়েও বড়ো। শক্ত কার্ডবোর্ড দিয়ে তৈরি। ঢাকনার দিকে একটা পকেট। ইলাস্টিক দেওয়া, কিন্তু ইলাস্টিকটা ঢিলে হয়ে লটপট করে। তাই ওর মধ্যে কিছু রাখলে বেরিয়ে যায়। ওতে করেই দাদাভাই প্রতিবার টুস্কি আর দাদার জন্য লজেন্স আনে, আর প্রতিবারই সারা সুটকেস হাতড়ে বের করতে হয় — কোথায় গেল!
এবারও তাই হল। টুস্কি একটা লজেন্স নিয়ে দাদাকে দিয়ে এল। দাদাকে মা পড়াচ্ছে। ক্লাস ওয়ান। অনেক পড়া। উসখুস করছে, কিন্তু মা’র কিলের ভয়ে নড়ছে না। ফিরে এসে চুপিচুপি দাদাভাইকে বলল, আমাকে একটা রান্নাবাটি দেবে?
দাদাভাই বলল, রান্নাবাটি আবার কী?
দাদাভাইয়ের বোকামির পরিচয়ে টুস্কিও অবাক! না হয় বোন নেই, তা বলে রান্নাবাটি জানো না! ল্যাবা ল্যাবা ল্যাবা — ল্যাবা খায় থুথু! বলে আড়চোখে দরজাটা দেখে নিল। মা এখনও দাদাকে পড়াচ্ছে। শুনতে পেলে আর দেখতে হবে না।
ফিসফিস করে বলল, ওই যে, রান্নার জিনিসপত্রের খেলনা। কড়াই, ডেকচি, হাতা, খুন্তি, উনুন, বঁটি…
দাদাভাই মাথা নেড়ে বলল, বুঝেছি। কোথায় পাওয়া যায়?
কোথায় পাওয়া যায়? টুস্কি তো জানে না। বলল, দোকানে পাওয়া যায়।
দাদাভাই বলল, তোদের পাড়ার দোকানে? উফ্‌, এরম করলে চলে!
ঝাঁকিয়ে মাথা নেড়ে টুস্কি বলল, আঃ, ওটা তো মুদির দোকান। বাজারে পাবে। বেনাপোকা বাজারে।
দাদাভাই মাথা নাড়ল, কিন্তু ঠিক বুঝেছে বলে মনে হল না টুস্কির।
পরদিন থেকে টুস্কির কাজ হয়ে দাঁড়াল দাদাভাই বেরোনোর আগে মনে করিয়ে দেওয়া। দাদাভাই, মনে আছে তো?
আছে রে আছে।
টুস্কির বিশ্বাস হয় না। শোনো না, রান্নাবাটি। মানে রান্নাঘরের জিনিস। হাঁড়ি, কড়াই, হাতা, খুন্তি, বঁটি, থালা, বাটি… উনুন… আর, হ্যাঁ, ঝাড়ু। ঝাড়ুও আনবে।
আনব রে আনব। বলে দাদাভাই রোজ বেরোয়, আর ফিরে বলে, কই রে, কোনও দোকানেই নেই।
টুস্কি জানে দাদাভাই বেনাপোকার বাজারে যায়নি। বেনাপোকার বাজারের দোকানে আছে, ও দেখেছে। কিন্তু বেনাপোকা কোথায় ও জানে না। অনেক দূরে। জিগেস করারও উপায় নেই। মা-বাবা জানতে পারলে হবে ওর। বাবা তো বার বার বারণ করেছে, রোজ রোজ দাদাভাইয়ের কাছে লজেন্স চাইবে না। ও এখনও মাইনে পায়নি।
মা বলেছে, মাইনে পেলেই বা চাইবে কেন? দেখেছি যদি চাইতে, একেবারে…
তাই সাবধানে বলতে হয়। বাবা মা শুনতে পেলে… ওরে বাবা!
চলছিল ভালোই, কিন্তু সেদিন উনুনটার কথা বলতে ভুলে গিয়েছিল। তাই দাদাভাই বেরিয়ে বাগানের গেটের কাছে পৌঁছেছে — টুস্কি ছুট্টে বাইরের দরজায় দাঁড়িয়ে মনে করিয়ে দিতে গিয়েছিল। দাদাভাই, উনুন। একটা উনুন। দাদাভাই গেট বন্ধ করতে করতে চেঁচিয়ে বলেছিল, হ্যাঁ রে, মনে আছে। আর দুটো ঝাঁটা, তাই না?
আর মা-ও তক্ষুনি রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে ফ্রিজ খুলে কী বের করছিল, শুনতে পেয়েছে, এগিয়ে এসে বলেছে, কী রে? কী বলছিস? কিসের ঝাঁটা?
দাদাভাই গেট থেকেই হেসে বলেছে, আরে কিছু না কাকিমা, রান্নাবাটি।
ব্যাস। যেই না দাদাভাই রাস্তার মোড় ঘুরেছে, ওমনি, রান্নাবাটি? রান্নাবাটি চাওয়া হয়েছে মেয়ের… বলে দরজা বন্ধ করে… সে অনেক গুম্‌গুম্‌, অনেক ভ্যাঁ-ভ্যাঁ… ভাগ্যিস বাবা তক্ষুনি চান করে বাথরুম থেকে বেরিয়েছে, তাই, আ-হা-হা-হা, করো কী, করো কী… বলে বাঁচিয়ে দিল, কিন্তু মা ওকে, আবার যদি খবরদার কিছু চেয়েছ… বলে রান্নাঘরে ঢুকে গেল।
সে দিন থেকে টুস্কির চাওয়া বন্ধ।
দাদাভাইও কিছু বলে না।
রোজ দাদাভাই কাজ থেকে আসে, টুস্কি আড়চোখে হাতের দিকে চেয়ে দেখে। কোনও দিনই কিছু থাকে না। রোজ রাস্তার মোড়ের বটগাছের ঝুরি ধরে দোল খেতে খেতে টুস্কি দাদাভাইয়ের পথ চেয়ে থাকে। আজ বুঝি আসে, আজ বুঝি…
আসে না।
মাস গেল। মাইনে পেয়ে দাদাভাই মা’কে শাড়ি দিল, বাবাকে ধুতি। বর্ধিষ্ণুনগরে জেঠিমার জন্যও শাড়ি নিয়ে গেল। দাদামণির জন্য শার্ট। কিন্তু টুস্কির জন্য আর দাদার জন্য সেই লজেন্স। ধুর!
বর্ষা এল। এল রথ। রথের মেলা শুরু হয়েছে, কিন্তু স্কুলের কাজ, বাড়ির কাজ শেষ করে মা সময়ই পাচ্ছে না, বাবাও আজকাল বড্ডো দেরি করে আসে। শেষে দাদাভাইকে বলেই ফেলল, রথের মেলা নিয়ে যাবে?
দাদাভাই পরদিন অফিস থেকে এসে মাকে বলল, দু’জনকে নিয়ে একটু মেলা ঘুরে আসি, কাকিমা? মা চোখ ছোটো করে বলল, ওরা বলেছে?
তাড়াতাড়ি মাথা নেড়ে দাদাভাই বলল, না, না। আমি ভাবছিলাম আমি তো খালিই বসে আছি…
দুজনে জামা পরে দাদাভাইয়ের হাত ধরে বেরোলো। দাদাভাই মেলা ঘুরিয়ে দেখাল, পাঁপরভাজা কিনে দিল, নাগরদোলায় চড়ালো, দাদাকে বলল, বন্দুক দিয়ে বেলুন ফাটাবি? দাদা পারল না, তখন নিজেই বন্দুক নিয়ে ফট্‌-ফট্‌ করে দশটা বেলুন ফাটিয়ে বলল, বড়ো হ’, তখন শিখিয়ে দেব।
হঠাৎ পাশের দোকানের দিকে তাকিয়ে টুস্কি দেখে, আরে! বাক্সে বাক্সে রান্নাবাটি সাজানো। দুটো, পাঁচটা, সাতটা, দশটা… না, আরও বেশি। কত্তোওওওওওগুলো! দোকান ভর্তি রান্নাবাটি, একটাও ওর না। এমন অন্যায়!
দাদাভাই অন্য দিকে তাকিয়ে আছে। দেখছেই না। আস্তে আস্তে হাতে ধরা দাদাভাইয়ের হাতটা নাড়িয়ে বোঝানোর চেষ্টা করল টুস্কি। দাদাভাই ওর দিকে তাকিয়ে বলল, কী রে?
টুস্কির মনে পড়ল মা কী বলেছিল। কিছু বলল না। আস্তে আস্তে মাথা নাড়ল। তার পরে বাড়ি ফিরে এল। চোখ ফেটে জল আসছিল। সারা সন্ধে কথাই বলতে পারল না। মা এসে জানতে চাইল, তোকে এটা দাও, ওটা দাও বলে বিরক্ত করেনি তো?
দাদাভাই বলল, কী যে বলো কাকিমা, ওরা কত্তো ভালো। বিরক্ত করেই না।
হুঁঃ।
পরদিন অফিস থেকে ফিরে চা খেতে খেতে দাদাভাই বলল, টুস্কি, দাদাকে ডাকতো।
দাদা খেলতে গেছিল পাশের বাড়ি। টুস্কিও ঘুম থেকে উঠে দুধ খেয়ে যাবে। কিন্তু দাদাভাই ডেকেছে বলে দাদাকে আগে ডেকে আনল। তার পরে দুধ খেতে বসল। দুধটা একটু ঠাণ্ডা করে খায় টুস্কি। তাতে গরম দুধের ওপরে সর পড়ে — মাকড়সার জালের মতো লাইনটানা একটা পাতলা চাদর। খেতে বেড়ে লাগে। সবে দু আঙুলের চিমটি দিয়ে সরটা টেনে তুলে মুখে দিতে যাবে, দাদাভাই দাদার হাতে একটা বাক্স দিয়ে বলল, দেখ তো, চলে কী না!
চমকে তাকাল টুস্কি। দাদার হাতের বাক্সের ওপর ছবি আছে, বলে দিতে হয় না, ওটা কী। উজ্জ্বল মুখে দাদা বের করে আনল পিস্তলটা। ট্রিগার ধরে টানতেই কড়কড়, কড়কড় করে গুলি ছোটার শব্দ বেরোল। ঠিক কলকাতায় বুগ্লুদারটার মতো। কিন্তু বুগ্লুদারটার চেয়েও ভালো। বুগ্লুদারটা কালো। এটা লাল।
কিন্তু, কিন্তু… দাদাভাইয়ের কাছে তো আর কোনও বাক্স নেই! টুস্কি একটু উঁকি দিতে গেল, কিন্তু হাত থেকে সরটা ত্যাপ করে টেবিলে পড়ে গেল বলে তাড়াতাড়ি মুছে ফেলে মা আসার আগে বেসিন থেকে হাত ধুয়ে আসতে হল…
দাদাভাইয়ের হাতে আর কিছুই নেই।
চোখ ফেটে জল আসছে টুস্কির। তাড়াতাড়ি দুধ খেয়ে উঠে চলে গেল ঘরে। একটু আগেই ঘুম থেকে উঠে এসেছে দুধ খেয়ে খেলতে যাবে বলে। কিন্তু এখন আর খেলতে যেতে ইচ্ছে করছে না। আবার শুয়ে পড়বে।
যেই না বালিশে মাথা দিয়ে দরজার দিকে পেছন ফিরেছে, ওমনি…
ইইইইইইইইইইইইইইইইইইইইইই…
চিৎকার শুনে রান্নাঘর থেকে মা, খাবার টেবিল থেকে দাদাভাই, বাইরের দরজা থেকে বাবা… সবে এসে ঢুকেছিল, সব্বাই হুড়মুড়িয়ে ছুটে এসেছে, কী হলো, কী হলো…?
টুস্কির কারওর দিকে নজরই নেই। বালিশের ওপাশে রাখা বাক্স খুলে বের করছে — হাঁড়ি, কড়াই, ডেকচি, হাতা, খুন্তি, বঁটি, উনুন… আর ঝাঁটা! একটা না, দুটো! দুটো ঝাঁটা!
উল্লাসে লাফিয়ে উঠে টুস্কি দাদাভাইয়ের কোলে উঠে পড়ল। আবার লাফ মেরে নামল, ঘরময় নাচল, আবার খাটে উঠে রান্নাঘর বানাল, আবার ইইইইইই বলে চেচিয়ে বেরিয়ে গেল বাইরে, রিক্তা, মিষ্টু, দীপা-কে ডেকে দেখানোর জন্য।
নতুন রান্নাবাটি, টুস্কির!
রিক্তা, মিষ্টু আর দীপার সঙ্গে রান্না করতে করতে শুনল, দাদাভাই টেবিলে বসে চা খেতে খেতে বলছে, আরে আমি তো জানিই না জিনিসটা কী! দুদিন বেনাপোকার বাজারেও গেছি। দোকানে দোকানে জিগেস করেছি, এ বলে ওখানে যান, ও বলে জানি না। শেষে রথের মেলায় দেখি টুস্কি চেয়ে আছে, কিচ্ছুটি বলেনি। কাল কিনিনি। কাকিমা ভাববে চেয়েছে, মিছিমিছি বকুনি খাবে মেয়েটা।
সেদিন রাতে সব্বাই খেতে বসে টুস্কির রান্না করা রুটি, আলু-পোস্ত, ধোঁকার ডালনা, আর পাবদা মাছের ঝাল খেল। মা বলল, পোস্তটা সবচেয়ে ভালো হয়েছে, কিন্তু এর পরে যেন আর খাবার টেবিলে বালি আর মাটি নিয়ে না আসে…

টুস্কি আজ বড়ো হয়ে গেছে। অতো কথা মনে নেই। থাকলেও ভান করে যেন ভুলে গেছে। বলে, আহা, আমি যেন চেয়েছিলাম... বেশি বেশি।
তবে কোনও বাচ্চা মেয়ের বাড়িতে প্রথম নেমন্তন্ন থাকলে টুস্কি আজও একটাই উপহার নিয়ে যায়। রান্নাবাটি।

No comments: