গভীর জঙ্গলের এক কোনায় থাকত একটা সুন্দর ময়ূর। তার নাম মল্লার। বর্ষার রাগের
নামে তার বাবা সারঙ্গ নাম রেখেছিল। বলেছিল, “আমার মত বিখ্যাত হবে আমার ছেলে। আমি যেমন মেঘ দেখে নাচি, তেমনই মল্লার নাচবে বড় হয়ে। সবাই যেমন আমার নাচ দেখতে আসে, তেমনই নাচ দেখাবে
মল্লার।”
মল্লার বড় হয়ে ওর বাবার চেয়েও ভাল নাচতে শিখেছিল। তাই
মল্লার যখন নাচত, তখন বনের সব পশু পাখি দল বেঁধে দেখতে আসত। গ্রীষ্মের সন্ধেবেলা
যখন ঈশান কোনে কালো মেঘ ঘনিয়ে আসত, তার নীল ছায়া পড়ত জঙ্গলের দীঘির কালো জলে,
বর্ষায় যখন পূবে হাওয়ার মুখে গাঢ় মেঘ ধেয়ে আসত আকাশ জুড়ে – যখন বৃষ্টির সাদা
পর্দার আড়ালে ঢেকে যেত জঙ্গলের দৃশ্য, তখন মল্লার নাচত, আর সারা জঙ্গল ঘিরে ধরে
দেখত সেই নাচ, অবাক হয়ে।
মল্লারের নাচ দেখে সবাই কিন্তু আনন্দ পেত না। অন্য
ময়ূররা, যাদের নাচ দেখার জন্য কেউ ভিড় করে আসত না, তারা দুঃখ পেত। ভাবত, আমরা কি
এমন খারাপ নাচি যে কেউ দেখতে আসবে না?
শেষে এক দিন ওদের মধ্যে যে সবচেয়ে হিংসুটে ময়ূর, সে
সব্বাইকে ডেকে নিয়ে গেল জঙ্গলের মধ্যে একটা ফাঁকা জায়গায়। বলল, “মল্লারের জ্বালায়
আর পারা যাচ্ছে না। ও নাচলে জঙ্গলে কেউ আর আমাদের নাচ দেখতেই আসে না।”
অন্য ময়ুররাও একই কথা বলল। বলল, “ময়ূরীরাও আজকাল সব্বাই মল্লারের নাচই দেখতে যায়।”
হিংসুটে ময়ূর বলল, “মল্লারের নাচ বন্ধ করতে পারলেই
সব্বাই আমার নাচ দেখতে আসবে।”
অন্য ময়ূররা বলল, “তোমার নাচ কেন? আমাদের সবার নাচই
দেখতে আসবে সবাই।”
“না, কারণ আমার নাচই সবচেয়ে সুন্দর,” বলল হিংসুটে
ময়ূর।
শুরু হল ঝগড়া – কিছুই ঠিক করা গেল না, মাঝখান থেকে
পরের এক সপ্তাহ কেউ আর কারওর সঙ্গে কথাই বলল না।
এক সপ্তাহ পরে ওদের মধ্যে যে সবচেয়ে বুদ্ধিমান ময়ূর,
সে আবার সবাইকে জড় করল জঙ্গলের সেই জায়গাটায়। বলল, “আমরা যদি নিজেরাই ঝগড়া করি,
তাহলে মল্লারকে কোন দিন হারাতে পারব না।”
“কী করা উচিত?” জানতে চাইল সকলে।
“ওকে মেরে ফেলতে হবে,” বলল বুদ্ধিমান ময়ূর।
মেরে ফেলতে হবে! হতভম্ব ময়ূররা মুখ তাকাতাকি করল। ওরা
নিজেরা পোকা-মাকড় মেরে খায় না তা নয়, ব্যাং, গিরগিটিও খায়। অনেক সময় সাপও ধরে খায়,
কিন্তু তাই বলে আরেকটা ময়ুরকে মারা… তার ওপর মল্লার আবার রোগা, দুর্বল ময়ূর নয়, বেশ গাঁট্টাগোট্টা শক্তপোক্ত!
“আরে, আমরা মারব নাকি!” বলল বুদ্ধিমান ময়ূর। “ফোঁসকে বলব।”
শিউরে উঠল ময়ূররা। ফোঁস! ওরা অজগর সাপকে পছন্দ করে
না। কোন সাপকেই পছন্দ করে না, ছোট সাপ তো ধরেই খায়, কিন্তু অজগরকে তো খাওয়া যায়
না, বরং সুযোগ পেলে অজগরই ওদের ধরে খায়। তার ওপর ফোঁস তো বিরাট অজগর।
জঙ্গলের সবাই ওকে ভয় পায়। বড় বড় হরিণ ধরে খায়। ময়ূরও খায়, কিন্তু সহজে পায় না। ময়ূর
উড়ে পালায়, ফোঁসকে লুকিয়ে গিয়ে ধরতে হয়।
অনেক আলোচনা হল। কী ভাবে, কোথায়, কখন ফোঁসকে বলা হবে,
কে যাবে, কী বলবে? শেষে স্থির হল, দূর থেকে, খোলা মাঠের মধ্যে ফোঁসকে বলা হবে।
তাহলে ফোঁস যদি তাড়া করে, ময়ূররা ছুটে বা উড়ে পালাতে পারবে। বুদ্ধিমান ময়ূর বলল,
“ও যখন খেয়ে দেয়ে পেট পুরে বিশ্রাম করবে, তখন বলব। তাহলে ও তেড়ে আসবে না।”
কিন্তু তাতে সময় গেল অনেক। শেষে, তখন শীত পেরিয়ে
গ্রীষ্ম, গ্রীষ্মের গরম দিন গুলো শেষ হয়ে বর্ষা আসতে আর বেশি দেরী নেই। এমন সময়ে
এক দিন, একটা ময়ূর এসে খবর দিল, ফোঁস নাকি ছোট দীঘির পাড়ে একটা হরিণ খেয়েছে।
ময়ূররা দল বেঁধে দেখতে গেল। পেট মোটা করে অজগর শুয়ে আছে ঘাসের বনে। বুদ্ধিমান ময়ূর বলল, “আজ নয়, পরশু আসব।
এখন ও কারও কথা শুনতে পাবে না।”
দুদিন পর, আবার ময়ূররা সবাই দল বেঁধে গেল দীঘির পাড়। ফোঁস
তখনও শুয়ে, তবে ওর পেটটা আজ আর অত মোটা নয়। সাবধানে, নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে
বুদ্ধিমান ময়ূর বলল, “ইয়ে…”
জ্বলজ্বলে চোখে ময়ূরের দিকে তাকিয়ে ফোঁস বলল, “কী
চাই?”
আমতা আমতা করে বুদ্ধিমান ময়ূর বলল, “ময়ূরের মাংস
খাবে?”
“কেন?” জানতে চাইল ফোঁস, “তুমি কি আমার শিকার হতে
চাও?”
বুদ্ধিমান ময়ূর বলল, “না, না, আমি না। তুমি মল্লারকে
খেতে চাও? আমাদের কোন আপত্তি নেই। ওকে কোথায় ধরতে হবে আমরা দেখিয়ে দেব। তাহলে তুমি
চুপি চুপি পিছন থেকে গিয়ে ধরতে পারবে।”
ময়াল বলল, “তা বেশ, কিন্তু আমি তো সবে একটা হরিণ
খেয়েছি, এখন কিছু খেতে পারব না। এখন এখানেই শুয়ে হরিণটা হজম করতে হবে। তোমরা যখন
দেখবে আমি আবার নড়ছি, তখন এস।”
ময়ূররা খুশি হয়ে চলে গেল।
ওই কয়েক দিনের মধ্যেই দেশের দক্ষিণ দিকে বর্ষা এসে
পড়ল। সেই দেশ অনেক দূর, কিন্তু ওই জঙ্গলের মধ্যেও সবাই বুঝতে পারছে বৃষ্টি এসে পড়ল
বলে। এমন সময় এক দিন, হরিণটা খাবার প্রায় সাত দিন পরে, ফোঁস আবার চলতে শুরু করল।
বেচারা মল্লার এ সব কিছুই জানে না। সে ঘাস জমিতে পোকা
ধরে খাচ্ছে, আর অপেক্ষা করছে, কবে বৃষ্টি আসবে – মাঝে মাঝে আকাশের দিকে তাকিয়ে
মেঘকে ডাকছে: “ফিঁ-আঁ-আঁ-আঁ-আঁ-ও!”
ফোঁস চলতে শুরু করার পরে ময়ূররা স্বস্তির নিঃশ্বাস
ফেলল। বৃষ্টি এসে পড়ার আগেই মল্লারকে মারতে হবে। ময়ূররা সকলে একে একে উড়ে, ছুটে
এল। বুদ্ধিমান ময়ূর এসে বলল, “ফোঁস, তোমার মনে আছে, মল্লারকে খাওয়ার কথা?”
ফোঁস বলল, “আছে। কোথায় মল্লার?”
“ওই ঘাসজমিতে চরছে। এদিক দিয়ে এস, তাহলে ও দেখতে পাবে
না,” বলল বুদ্ধিমান ময়ূর।
খুশিতে ডগমগ ফোঁস সরসরিয়ে চলতে শুরু করল ঘাসজমির
দিকে। দূরে দেখতে পেল, মল্লার ঘাসজমিতে চরছে, ওর দিকে পিছন করে, দক্ষিণ দিকের
আকাশের দিকে মুখ তুলে।
আর ঠিক তখন, দক্ষিণের পাহাড় পেরিয়ে শনশনিয়ে ধেয়ে এল
ঠাণ্ডা বৃষ্টিভেজা হাওয়া, বনের সকলে আকাশের দিকে মুখ তুলে দেখল, দক্ষিণের পাহাড়ের ওপারে
আকাশে জমছে কালো মেঘের আর একটা পাহাড়। জঙ্গলের সব ময়ূর এক সঙ্গে মুখ তুলে ডেকে
উঠল, “ফি-আ-আ-আ-আ-ও!”
মল্লারের ডাক শেষ হয়েছে। মনে ভাবল, এই বার নাচ করা
উচিত। মেঘ আসছে, বৃষ্টি আসছে, সেই আনন্দে। ও জানেও না, ওর পিছনে মস্ত অজগর ফোঁস
প্রায় এসে পড়েছে ওকে ধরতে।
ফোঁস প্রায় পৌঁছে গিয়েছে। আর একটু! মাটি থেকে মুখ
তুলে ঝাঁপাতে যাবে, এমন সময় মল্লার ফট করে পেখম মেলে ধরল, নাচতে শুরু করবে।
ফোঁস-এর অবাক চোখের সামনে পাখার মত পেখম খুলে গেল! এই
ছিল একটা ময়ূর, ধরে খাবার জন্য তৈরি, এই একটা বিশাল পাখার মত পেখম। ফোঁসের বিরাট
মুখের চেয়েও বড়।
ফোঁস এর আগে কখনও ময়ূরের নাচ দেখেনি। এতই অবাক হয়ে
গেল, যে আনন্দে আর উল্লাসে আর নড়তেই পারল না, মুগ্ধ হয়ে দেখতে লাগল।
আর, সেই মেঘে ঢাকা কালো আকাশের নিচে, সবুজ ঘাসের
জমিতে, বিশাল বিশাল সবুজ গাছের সামনে, মল্লার নেচে চলল। গুরু গুরু শব্দে জড়ো হতে
থাকল আরও, আরও কালো মেঘ। কালোর ছায়ায় মল্লারের নীল-সবুজ পালক ঝলমল করতে থাকল,
পাখার মত বড় লেজের পালক থরথর করে কাঁপতে লাগল নাচের তালে তালে। চেয়ে রইল অনিমেষে
সারা জঙ্গলের প্রাণীরা।

6 comments:
নতুন বছরে নতুন একটা গল্প দরকার ছিল। আগেই পড়েছিলাম। আবার পড়লাম। দারুণ ভাল গল্প। গল্পের শেষটা খুব আরামদায়ক।
এই গল্পের দুটো শেষ আছে। এটা রিভাইজড। ওরিজিন্যাল শেষ সম্বলিত গল্প গত কাল প্রকাশ হয়েছে একটা ঈ-ম্যাগাজিনে - ফেসবুকে সে ম্যাগাজিনের হদিস রয়েছে। যাঁরা ফেসবুক করেন, তাঁরা "অনেক কথা রইল বাকি" খোঁজ করলে পাবেন।
Eta pore aamar School'er Moral science'er Mishti Orthobodhok golpogulor kotha mone porlo...
ortho khunjo na. emni peley amakey janio.
Bhari sundor roopkatha... Notun bochhorer brishTi bheja gomRa mukhe hasi foTanor moto golpo....
besh unusual golpo. amar o lekhalikhir sokh ache.
Rimi
South Carolina
Post a Comment