Monday, February 02, 2015

আশ্চর্য ঝিনুক - অনিরুদ্ধ দেব

তিতি আর তুয়া মা বাবার সঙ্গে সমুদ্রের ধারে বেড়াতে গেছে। দুপুর বেলা হোটেলে পৌঁছে বিকেলে গেছে সমুদ্রের ঢেউ দেখতে। তুয়া প্রতিবারই প্রথম দিন বড় বড় ঢেউ দেখে আর গর্জন শুনে একটু ভয় পায়, তাই ও শক্ত করে মা’র হাত ধরে দূরে দাঁড়িয়ে রয়েছে। তবে তিতি তো বড়, ওর ভয় পেলে চলে না। ও তাই বাবার হাত ধরে সেই সেখানে গিয়েছে যেখানে ঢেউগুলো ভেঙে গিয়ে ফেনা হয়ে ছুটে আসছে আর শুধু ওদের পায়ের পাতাগুলো ভিজিয়ে দিয়ে আবার ফিরে যাচ্ছে।

চারিদিকে চেয়ে তুয়া মাকে বলল, “মা, ঝিনুক কুড়োই?” ওরা প্রত্যেক বার ভাল ভাল ঝিনুক নিয়ে গিয়ে বাড়ি সাজায়। মা বলল, “চ’।” তুয়া লাফাতে লাফাতে মায়ের সঙ্গে ঝিনুক কুড়িয়ে ফ্রকের সামনে কোঁচড় করে তাতে গুছিয়ে রাখতে লাগল। সেই দেখে একটু পরে তিতিও বাবার হাত ছেড়ে ঝিনুক কুড়োতে লাগল।

তিতি জানতে চাইল, “ঝিনুক কোথা থেকে আসে মা?” মা বলল, “এগুলো সাগরের একরকম জীবের গায়ের খোলস। ওরা থাকে জলের নিচে। ওরা মরে গেলে ওদের খোলসগুলো ডাঙায় নিয়ে আসে ঢেউ । তখন আমরা ওগুলো নিয়ে ঘর সাজাতে পারি।” ঝিনুক কুড়োতে কুড়োতে তুয়া হঠাৎ দেখে, আরে! কী দারুণ একটা ঝিনুক পড়ে আছে। দিদিকে ডেকে বলল, “দিদি, দিদি, দেখে যা! কী দারুণ ঝিনুক!” তিতি গিয়ে দেখে, তাইত’! কী ভাল দেখতে, লম্বা, এক দিক সরু ছুঁচের মত, অন্যদিকটা গোল, চওড়া, আবার ভেতরটা দেখাও যাচ্ছে যেন একটুখানি! মা বলল,

“বাঃ, এটা আমাদের একোয়ারিয়ামে রাখব, কেমন?”

বাবা বলল, “আমার হাতে দে, আমি সাবধানে আলগোছে নিয়ে যাই।” হোটেলে গিয়ে টেবিলের ওপর ঝিনুকগুলো রাখল তুয়া, বাবাও ওই ঝিনুকটা সাবধানে রাখল ওগুলোর সঙ্গে।

পরদিন সকালে দু’বোন ঘুম থেকে উঠেছে, হোটেলের ঘরের বাইরে টেবিল চেয়ারে তখন মা বাবা চা খাচ্ছে আর দূরে সাগরের জল দেখছে। তিতিও গেল ঢেউ দেখবে বলে। তুয়াও যেতে গিয়ে, কী দেখে থেমে গেল। বলল, “আরেঃ! এই ঝিনুকটা এদের চেয়ে আলাদা কী করে হয়ে গেল?”

তিতি গিয়ে দেখে, তাই তো! বলল, “গড়িয়ে চলে এসেছে।” বলে আবার ওটা তুলে একসঙ্গে রেখে দিল।

মা বলল, “চল, আমরা এখন চান করতে যাব। দু’জনে চট করে তৈরি হয়ে নাও।”

তুয়া দাঁত মেজে বাথরুম থেকে বেরিয়ে এসেই আবার চেঁচিয়ে উঠল, “দিদি, দেখ, ঝিনুকটা আবার গড়িয়ে চলে এসেছে!”

তিতিও দেখে, তাইত’!

বাবা এবারে বলল, “কী হয়েছে?”

তিতি বলল, “দেখ না, বাবা, আমরা যতবার ঝিনুকটাকে একসঙ্গে রাখছি, তত বার ওটা আলাদা হয়ে যাচ্ছে। সকালে উঠে এ-এ-এ-ই-খানটায় ছিল। আমরা দাঁত মাজতে যাবার আগে ওটাকে একসঙ্গে রেখে গিয়েছি, ফিরে দেখি এখানে!”

বাবা বলল, “তাই? দেখি কী করে হচ্ছে।” বলে ঝিনুকটা নিয়ে আবার সব ঝিনুকের সঙ্গে রেখে দিল। তার পরে বলল, “এবারে চুপ করে বস। কোন আওয়াজ নয়, নড়াচড়া নয়, দেখি কী হয়!”

চার জনে চুপ করে বসল খাটের ওপর, পা ঝুলিয়ে। তুয়ার কেমন ভয় করে উঠল। বাবার কোল ঘেঁষে সেঁটে বসল। বাবা ফিসফিস করে বলল, “কেউ আওয়াজ করবে না।”
চার জনে চুপ করে বসে রইল, ঝিনুকটার দিকে চেয়ে।

বেশি অপেক্ষা করতে হল না, হঠাৎ ঝিনুকটা যেন একটু নড়ে উঠল। তুয়া আঙুল তুলে বলতে গিয়েছিল, “ওই, ওই!” কিন্তু বাবা হাতটা ধরে আবার ফিসফিস করে বলল, “চু-উ-উ-প!”
এর পরেই, অবাক! ঝিনুকটার খোলা দিকটা থেকে কেমন একটা বালির রঙের পা বেরিয়ে এল, আর সেই পায়ের মালিক যে প্রাণীটা, সেটা কেমন হেঁচড়ে হেঁচড়ে, ধীরে ধীরে, ঝিনুকটাকে টেনে টেনে এগোতে লাগল।

মা অবাক হয়ে বলল, “ওর ভিতরের প্রাণীটা কি বেঁচে আছে নাকি? ওরা তো জলের বাইরে বাঁচেইনা!”

বাবা তেমনই ফিসফিস করে বলল, “ওটা ঝিনুকের প্রাণী না। জোরে কথা বোল না। শুনতে পেলে আবার লুকিয়ে পড়বে ঝিনুকের খোলসে। চুপ করে বসে থাক।”

ঝিনুকটা খানিকটা গিয়ে থামল, তার পর, ভিতর থেকে বেরিয়ে এল পায়ের মালিক! চারজনে ঝুঁকে পড়ল সামনে, মা চেঁচিয়ে উঠল, “আরে! এটা তো একটা কাঁকড়া! কী ছোট্ট, কী মিষ্টি!”
ওদের নড়াচড়ায়, আর মায়ের চিৎকারে কাঁকড়াটা আবার গিয়ে সেঁধিয়েছে ওর খোলসে। তিতি বলল, “বাবা, কাঁকড়া এল কোত্থেকে?”

বাবা বলল, “এটাকে বলে হার্মিট ক্র্যাব! হার্মিট মানে কী?”

তুয়া জানে না। তিতি বলল, “হার্মিট মানে সাধু।”

বাবা বলল, “ঠিক! সাধুবাবাদের যেমন বাড়ি থাকে না, এদেরও তেমনই কাঁকড়ার শক্ত খোলস নেই। ওরা তাই এরকম ঝিনুকের মধ্যে লুকিয়ে থাকে, আর বেরিয়ে এসে শিকার ধরে। যেই দেখে বিপদ, ওমনি ছুটে গিয়ে ঢুকে পড়ে খোলসের ভেতরে। দেখলে তো কেমন করে ঢুকে গেল।”

তুয়া বলল, “এটা ছোট্ট বাচ্চা? তাই ওইটুকু?” ও সাগরপাড়ে, বাজারে কাঁকড়া দেখেছে, তারা তো অনেক বড়! বাবা বলল, “হতে পারে, আমি তো অত জানি না। তবে বাচ্চা হতেও পারে। বড় হলে, এই ঝিনুকের খোলস ছেড়ে আরেকটা ঝিনুকের মধ্যে গিয়ে ঢুকবে আবার!”

মা বলল, “এটাকে নিয়ে কী করা যায়?”

বাবা বলল, “চল, সমুদ্রের ধারে ছেড়ে দেব।”

বাবা ঝিনুকটা হাতে নিল। সবাই মিলে গেল সমুদ্রের ধারে। একটা পাথরের পাশে বালির ওপর ঝিনুকটা নামিয়ে দিয়ে বাবা বলল, “আমরা চলে যাই। ও নিশ্চয়ই ভয় পেয়ে আছে। আমরা থাকলে আরও ভয় পাবে। ভাগ্যিস রাত্তিরে পড়ে যায়নি টেবিল থেকে! তাহলে ঝিনুকটা ভেঙে যেত আর ও যে কোথায় পালাত, খুঁজেই পাওয়া যেত না।”

তুয়ার কেন জানি গলাটা ব্যথা ব্যথা করছে। কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, “তাহলে ও মরে যেত?”

বাবা বলল, “যেতেও পারত। হোটেল থেকে সমুদ্র তো ওইটুকু প্রাণীর পক্ষে অনেকখানি রাস্তা। অত বড় একটা ঝিনুক টানতে টানতে যদি যেতে না পারত…”

তুয়া বাবাকে থামিয়ে দিয়ে বলল, “এখন ও ঠিক থাকবে তো?”

বাবা বলল, “নিশ্চয়ই!”

No comments: