Saturday, February 24, 2018

পুকুর কুকুর দুপুর

পুকু ভারি দস্যি মেয়ে। লেখাপড়া না করে পাড়া-বেরিয়ে বেড়াত। একদিন হয়েছে কী, গরম কাল, খাওয়া শেষ করে মা পুকুকে পাশে নিয়ে শুয়েছে। যেমনি মা ঘুমিয়েছে, পুকু টুক করে বিছানা থেকে নেমে পা টিপে টিপে বেরিয়ে গেছে। এদিক ওদিক ঘুরতে ঘুরতে হাজির হয়েছে নাদুবাবুর বাড়ির পাশে। মস্তো বাড়ি নাদুবাবুর। তবে এখন বাড়ি বন্ধ। কেউ নেই। নাদুবাবু অসুস্থ বলে ছেলে আর বউ নিয়ে গেছে ভেলোর। পাঁচিলের বাইরে ঝোপে একটা পাখি বাসা বানাচ্ছে। পাখিটা চেনে পুকু। টুনটুনি। ওরা গাছের পাতা সেলাই করে জুড়ে একটা পকেট মতো বানিয়ে তাতে ডিম পাড়ে। আগেও দেখেছে পুকু, কিন্তু প্রতিবারই দেখতে বেশ লাগে। তাই চুপচাপ দাঁড়িয়ে বাসা বানানো দেখতে লাগল।
হঠাৎ ঝুপ করে বাড়ি পাঁচিল টপকে দুটো লোক বেরিয়ে এ। কাঁধে থলে। খালি বাড়ি থেকে এরা কারা...?
ভাবার আগেই একজন এসে ওকে খপ করে ওর মুখ চেপে ধরল, তারপর দুজনে মিলে চ্যাংদোলা করে ওকে নিয়ে ঢুকল আবার নাদুবাবুর বাগানে। নিজেদের মধ্যে বলাবলি করতে লাগল, কী করবে এখন? মেয়েটা যে ওদের দেখে ফেলেছে!
চোর। নাদুবাবুর বাড়ি থেকে অনেক কিছু চুরি করেছে। থলে ভরে নিয়ে পালাচ্ছিল, পড়েছে পুকুর সামনে।
একটা লোক একটু বুড়ো মতো, অন্যটা ষণ্ডা। ষণ্ডা বলল, “কী করি একে নিয়ে?” বুড়োটা বলল, “এখানেই বেঁধে রেখে যাই। যতক্ষণে কেউ খুঁজে পাবে, ততক্ষণে আমরা ট্রেন ধরে অনেক দূরে।
ওর হাতদুটো পিছমোড়া করে বেঁধে, যে দরজা ভেঙে বাড়িতে ঢুকেছিল সেই দরজা দিয়ে আবার ঢুকে বসার ঘরের একটা থামের সঙ্গে ওকে বেঁধে দিল।
ওরা চলে গেলে পুকু বসে বসে ভাবছে, কেউ না আসলে ও তো নিগঘাত না খেয়ে মরবে! এমন সময়, ফোঁৎ ফোঁৎ, ফোঁশ ফোঁশ করে আরে, এ যে একটা বাচ্চা কুকুর! না, পুকুর কাছে বিস্কুট খাওয়া রাস্তার কুকুরটার মতো ছোট্টো না, তবে বড়োও নয় একেবারে খালি পুকুর নাকে মুখে জিভ দিয়ে চেটে আদর করে, আর হাতে নাক দিয়ে খোঁচায়। ভাবখানা, হাতদুটো পেছন থেকে বের করো না! আদর করে দাও। পুকু বলে, আরে আমার হাত তো পিছমোড়া করে বাঁধা! দাঁত দিয়ে কামড়ে দড়ি কেটে দে!
দেখতে দেখতে দাঁত দিয়ে চিবিয়ে থামে বাঁধা দড়ি কেটে ফেলল কুকুরটা। পুকু দৌড়ল বাইরে কুকুরটাও সঙ্গেহাতদুটো অবশ্য তখনও বাঁধা।
ওদের বাড়ির সামনেটা থানা। পুকু সোজা সেখানেই গেল। ওর বাবা ওসি গরমে বসে ঘামছে। ইউনিফর্মের জামা খোলা, গেঞ্জি ঘামে ভেজা।
পুকু বলল, বাবা, নাদুবাবুর বাড়িতে চুরি হয়েছে।”
বাবা লাফিয়ে উঠে ওর হাতের বাঁধন খুলে দিল। পুকুও চট করে বলে দিল কেমন দুটো লোক নাদুবাবুর বাড়ি থেকে পাঁচিল টপকে বেরিয়ে ওকে ধরে নিয়ে গিয়ে বেঁধে রেখেছিল। বাবা জামা পরতে পরতে জিজ্ঞেস করল, কোনদিকে গেছে দেখেছিস?”
বলছিল স্টেশনে যাবে। ট্রেনে করে অনেক দূর চলে যাবে।
হাবিলদার বলল, ট্রেন আসতে ভি ঢের দেরি।" বাবা দেরি না করে চারজন পুলিশ নিয়ে, জিপে চড়ে বেরিয়ে গেল। পুকুকে বলল থানার ভেতর দিয়েই বাড়ি চলে যেতে।
খানিক বাদেই আবার জিপের শব্দ পুকু চুপিচুপি জানলা দিয়ে উঁকি মেরে দেখল হ্যাঁ, ওই দুজনই বটে।
সন্ধেবেলা বাবা ফিরে বলল চোরাই মাল সব পাওয়া গেছে।
মা জানতে চাইল পুকু বাঁধন কেটে বেরোল কী করে?
সব শুনে বলল, কুকুরটাকে বাড়ি নিয়ে আয়।”
তাই এখন ও পুকুর বাড়িতে থাকে। মাংস ভাত খায়। বিস্কুট খায়। পুকুর সঙ্গে ইশকুল গিয়ে বাইরে বসে থাকে। রাত্তিরে ওর বিছানার নিচে শোয়।
দুপুর বেলা ও প্রথম এসেছিল বলে পুকু ওর নাম দিয়েছে, দুপুর।

পুকুর কুকুর দুপুর।

ছবি - প্রণবেশ মাইতি
এই গল্পটি শারদীয়া "শিশুমেলা" ১৪২৪-এ প্রকাশিত হয়েছিল।

No comments: