Saturday, November 10, 2018

সোনাতির





সে অনেক দিন আগের কথা। সে অনেক দূরের দেশ। সোনাতির নদীর পাড়ে ছোট্ট গ্রাম ঝুরঝুরি। গ্রামের মানুষ চাষবাস করে, নদীতে মাছ ধরে। গ্রামের বাচ্চারা পাঠশালায় পড়তে যায়, ক্ষেতের কাজ শেখে, মাছ ধরা শেখে, নদীতে সাঁতার কাটে, নৌকো চালায়।
গ্রামের গুরুমশাইকে ছেলে মেয়েরা জিজ্ঞেস করে, “গুরুমশাই, সোনাতির, না সোনাতীর? কী লিখব?”
গুরুমশাই বলে, “এই তো বিপদে ফেললি... কেউ বলে তির, কেউ বলে তীর। বলে,
রোদ পড়ে তিরতির
এই নদী সোনাতির।
আবার কেউ বলে,
সোনা রঙ শস্যের
সোনাতীর দীতীর
আগে দুই তির-এর বানান একই ছিল। তখন তো সমস্যা ছিল না। কিন্তু এখন রাজার বিদ্বানরা বলেছে আলাদা বানান। সেই থেকে তারাই ঝগড়া করছে, কেউ জানে না বানান।
গাঁয়ের ছেলে পুশ্চুওর বাবা নদীতে মাছ ধরে-ও একদিন মাছ ধরবেনদীর নামের বানান নিয়ে ওর মাথাব্যথা নেইকিন্তু ওর বন্ধু বিঙ্কার আছেবিঙ্কার বাবা ব্যবসাদারওরা ভাইবোনেরা সবাই লেখাপড়ায় ভালোবিঙ্কার দাদা-দিদিরা সবাই একে একে শহরে গেছে পড়তেবিঙ্কাও একদিন যাবে
পাঠশালা থেকে বেরিয়ে দুপুরে ছেলেমেয়েরা নদীতে স্নান করে বাড়িতে খেতে যায়। বিকেলে নদীর পাড়ে খেলা করে। পুশ্চু বিঙ্কাকে বলল, “সোনাতির হবে না। দেখ, জলে রোদ পড়েছে। বিকেলের রোদ হলুদ, কিন্তু জলে তো রুপোলি চিকিচিকি হচ্ছে। সোনালি তো না।

বিঙ্কা বলল, “আগে যখন নদীতে জল বেশি থাকত, তখন জলে সোনালি রোদ সোনার মতো দেখাত। আজকাল জলে কাদা বেশি। জল কম। তাই অমন রুপোলি দেখায়।
নদীতে জল কম? পুশ্চু অবাক। কই, ওর তো কখনও মনে হয়নি...
বিঙ্কা বলল, “কম। আমাদের বাবা মা যখন ছোটো ছিল, আমাদের দাদু দিদাদের সময়ে, নদীতে অনেক জল বেশি ছিল, অনেক পরিষ্কার জল ছিল। জিজ্ঞেস করিস তোর বাবাকে।
পুশ্চু পরদিন সকালে পাঠশালা যাবার পথে বিঙ্কাকে বলল, “ঠিক বলেছিস। বাবা বলছে, আজকাল জল অনেক ঘোলা। কমেও গেছে। কিন্তু জল কেন ঘোলা, বাবা বলতে পারল না।
বিঙ্কাও জানে না। ওর বাবা মা, দাদু দিদাও বলতে পারেনি। বলল, “চ’, পা চালিয়ে যাই। গুরুমশাইকে জিগেস করি।
গুরুমশাই প্রশ্ন শুনে বলল, “এত সব বলতে পারব না। তবে এ কথা ঠিক, যে নদী আগের চেয়ে কম গভীর হয়েছে, জল কমেছে, আগে যত মাছ আসত, তত মাছ আসছে না।
পুশ্চু বলল, “নদী আসে কোথা থেকে?”
গুরুমশাই বলল, “নদী আসে পাহাড় থেকেওই দূরে উত্তরে পাহাড়অনেক দূরেসে পাহাড়ের মাথায় বরফ, বরফ গলে জল হয়ে নদী হয়ে নেমে আসেকিন্তু কেন আর জল আসে না, তা বলতে পারব না
বিঙ্কা বলল, “আচ্ছা, জল কি আরও কমে যেতে পারে?”
গুরুমশাই মাথা নাড়ল, তার অর্থ হ্যাঁ-ও হতে পারে, না-ও হতে পারেতারপরে বলল, “সেরকমই তো মনে হচ্ছেএকদিন না শুকিয়েই যায়
দিন কাটেমাস যায়বছর ঘোরেনদীর জল কমে আরওপুশ্চুর বাবা ক্লান্ত দেহে নদী থেকে ফেরেআজও যথেষ্ট মাছ পায়নি
বিঙ্কা বলে, “উত্তরে, যেদিক থেকে নদী আসছে, সেদিকে গিয়ে দেখা যায় না? হয়ত কোথাও নদী বাধা পেয়েছেবাধা সরালে আবার জল আসবে
গুরুমশাই মাথা নেড়ে বলে, “নদীর জলে যদি সেরকম বাধা পড়ে, তাহলে জল অন্য রাস্তা খুঁজে নেয়। জল তো আর এক জায়গায় জমে থাকে না, তখন অন্য খাতে বইবে।তা ছাড়া…”
গুরুমশাই থামেপুশ্চু বললে, “তা ছাড়া কী?”
বিঙ্কা বুঝেছিলবলল, “তা ছাড়া, গ্রামের উত্তরে কুকুম্পার জঙ্গল
পুশ্চুর মুখ শুকিয়ে গেলওরা সবাই জানে কুকুম্পার জঙ্গল বড়ো ভয়ংকর জায়গাসেখানে দিনে অন্ধকার, রাতে মহা বিপদবড়ো বড়ো শিকারী জন্তু সেখানে
গুরুমশাই বলল, “ঠিককুকুম্পার জঙ্গল
আচ্ছা, এক কাজ করি, আজকে যখন পড়াব, তখন বলে দেব। সবাইয়েরই জানা উচিত, কেন জল কম, কেন ঘোলা।
সে দিন, গুরুমশাই বলল, “আজ চলো আমরা নদীর ধারে গিয়ে পড়াশোনা করি।বলে ওদের সবাইকে নিয়ে গেল নদীর পাড়ে। বলল, “এই দেখো নদীর পাড়। কেমন জলের তোড়ে মাটি ভেঙে নিয়ে গেছে, না? ওই যে ভাঙা শিবমন্দির, ওটা এক সময়ে ছিল নদীর পাড় থেকে অনেক দূরে। সারা বছর পুজো হত। আজ ওটা নদীর মধ্যেই প্রায় চলে গেছে। বর্ষাকালে জল উঠে মন্দির ডুবিয়ে দেয়। তাই পুরুতমশাই শিবলিঙ্গ নিয়ে গেছেন গ্রামের ওপারে। নতুন মন্দিরে। অথচ, এখন বর্ষা নয়, এখন জল মন্দির থেকে কত দূরে, তাই না?”
সবাই বলল, “হ্যাঁ, তাই।
গুরুমশাই ওপারের দিকে আঙুল দেখিয়ে বলল, “আমরা যখন ছোটো ছিলাম, তখন ওপারে একটা গ্রাম ছিল। তখন নদীর খাত এত চওড়া ছিল না। আমার মনে আছে, সাঁতার কেটে চট করে চলে যাওয়া যেত। কিন্তু এখন ওই গ্রামটা নেই। বর্ষায় নদীর জল এতই বেড়ে যায়, যে ওদিকের পাড় ভেঙে নিয়ে যায়।
কশটি বলল, “হ্যাঁ, এদিকেও ভাঙে – তাই তো বর্ষায় নদীতে যাওয়া আমাদের বারণ।
গুরুমশাই বলল, “হ্যাঁ। তাহলে তিনটে বিষয়। তার মধ্যে দুটো বিঙ্কা আমাদের বলে দিয়েছে। কেউ বলতে পারবে কী কী?”
পুশ্চু আড়চোখে বিঙ্কার দিকে তাকাল। বিঙ্কা পারবে বইকি! কিন্তু বিঙ্কা কিছু বলল না। ও সব প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে বলে অন্য ছেলেমেয়েরা ওকে একটু হিংসে মতো করে। তাই ও আজকাল প্রথমেই উত্তর দেয় না। গুরুমশাই ওকে জিজ্ঞেস করলেই বলে। পুশ্চু উত্তর দিতে পারত, কিন্তু বিঙ্কার অনীহা দেখে ও-ও নদীর ওপারের দিকে মুখ ফিরিয়ে রইল।
উত্তর দিল উতোন। বলল, “এক হল, জলে কাদা বেশি। দুই হল, জল আগের মত নেই, কমে গেছে। আর তিন হল বর্ষায় জল আগের চেয়ে বেড়ে গেছে।
গুরুমশাই আকাশে ঘুঁষি মেরে বলল, “বহোত খুব। এখন প্রশ্ন হল কেন। তার কারণ বুঝতে আমাদের আবার পাঠশালায় যেতে হবে। সেখানে ম্যাপ দেখব। মানচিত্র।

গুরুমশাইয়ের কথা সত্যি হতে বেশি সময় নিল না। কয়েক বছরের মধ্যেই বর্ষায় প্রবল বন্যার পরে হু-হু করে নদীর জল কমে গিয়ে শীতকালেই প্রায় শুকনো কাদার মধ্যে তিরতিরে জলের স্রোত হয়ে গেল। গরমে নদী গেল শুকিয়ে। গ্রামের লোকে কাঠ শুকনো বালির মধ্যে গর্ত খুঁড়ে খুঁড়ে জল ভরে আনে কলসি করে। তার পরের বছর জল কমে গে আরও। সারা দিনে তিন চার কলসিও জল হয় না। সূর্যের আলো যেন গায়ে পুড়িয়ে দেয়। গ্রামের লোক হাঁপিয়ে সারা। বুড়ো মানুষরা কেউ কেউ মরেই গেল।
পুশ্চু আর পাঠশালা যায় না। পুশ্চুর বাবা ওকে মাঠের কাজে লাগিয়েছে। বিঙ্কার বাবাও চাইছে বিঙ্কা তাড়াতাড়ি শহরে চলে যাক। সেখানে ওর দাদারা রয়েছে। তবে বিঙ্কার মা চাইছে না ও এত তাড়াতাড়ি গ্রাম ছেড়ে চলে যায়।
সে দিন বিঙ্কা এসে সকালে পুশ্চুর সঙ্গে দেখা করল। “তুই কখন মাঠে যাবি?”
পুশ্চু বলল, “এখনই বেরোবো। কেন?”
বিঙ্কা বলল, “কথা আছে। চ’ আমিও যাই।
দু’জনে বেরোল। নদীর পাড় দিয়ে খানিকটা রাস্তা। পাঁকের গন্ধে গা গুলিয়ে ওঠে। বিঙ্কা বলল, “আমি গুরুমশাইয়ের সঙ্গে কথা বলছিলাম। আমাদের গ্রাম উত্তরের পাহাড় থেকে খুব একটা বেশি দূরে না।
পুশ্চু বলল, “দূরে না, তো?”
বিঙ্কা বলল, “পাহাড়ে গেলে হয়ত নদী শুকিয়ে যাবার কারণ জানা যাবে?”
পুশ্চু বলল, “নদী শুকোনোর কারণ তো গুরুমশাই বুঝিয়ে দিয়েছিল। সেই যে, পাহাড়ে গাছ কাটার ফলে...”
বিঙ্কা ওকে থামিয়ে দিয়ে বলল, “তা বটে, কিন্তু তার তো একটা উপায় করতে হবে।
পুশ্চু অবাক হয়ে বলল, “কী উপায়?”
বিঙ্কা বলল, “জানি না। ওখানে গেলে জানা যাবে।
বেশ কথা। যাবে কে?
বিঙ্কার কথায় এবার পুশ্চু থমকে দাঁড়িয়ে গেল। “কেন, তুই আর আমি!”
তুই আর আমি! আমাদের বয়স কত? আমাদের বাড়ি থেকে যেতে দেবে একা একা?”
একা কেন? তুই আর আমি তো!”
তোর বাবা মা আর আমার বাবা মা আমাদের দুজনকে পাহাড়ে যেতে দেবে?”
বাড়িতে বলব না। পালিয়ে যাব।
এই বারে পুশ্চু একেবারে হতভম্ব হয়ে গেল। কী বলছে কী মেয়েটা। গরমে মাথা খারাপ হয়ে গেল নাকি? বলল, “আর কুকুম্পার জঙ্গল?”
বিঙ্কা বলল, “সেই জন্যই পাঠশালা যাচ্ছিগুরুমশাইকে অনেক কথা জিজ্ঞেস করার আছে। তুই ভালো করে ভেবে দেখ। আমরা না গেলে কে যাবে? দেখতে দেখতে গ্রামের বুড়ো মানুষগুলো প্রত্যেক গরমে মরে যাচ্ছেগ্রাম ছেড়ে চলে যাচ্ছে কত লোক
বিঙ্কা চলে গেলে পুশ্চু দাঁড়িয়ে রইল খানিকক্ষণবিঙ্কা ঠিকই বলেছেকিন্তু গ্রামের ছেলেমেয়ে ওরা। দেশ ছেড়ে কোথায় যাবে নদীর খোঁজ করতে?
হাঁটতে শুরু করল মাঠের দিকে। অনেক কাজ আছে ওর।
মনে হল, ওরা যদি না যায়, কেউই যাবে না। ওরা যদি যায়, তাহলে যদি একটা উপায় বেরিয়ে আসে?
থমকে দাঁড়াল। ও যদি গ্রাম ছেড়ে চলে যায়, তাহলে ওর মা বাবা কি সংসার চালানোর মতো রোজগার করতে পারবে? তাহলে ওরা খাবে কী? দাদু, ভাই?
আবার ফিরতে যাবে মাঠের দিকে, কিন্তু দূরে দেখে কে আসছে। পুন্তু। ওর ভাই। কেন আসছে? হাঁপাতে হাঁপাতে পুন্তু এসে বলল, “বাবা বলেছে, আজ আর মাঠে গিয়ে কাজ নেই। গাঁয়ে থাক। দাদুর শরীর ভালো না। বাবা মাঠে যাবে, আমি যাচ্ছি। এখনই।
পুশ্চু দৌড়ে বাড়ি ফিরলদাদু খাটে শুয়ে, বলছে, “আরে আমার এখনও সময় হয়নিতোমরা যে যার কাজে যাও
বাবা পুশ্চুকে বলল, “সামনে বসে থাকলে রাগারাগি করছেকাছে থাক, বেশি দূরে যাস না
পুশ্চুর মাথায় বুদ্ধি এলবলল, “পাঠশালায় যাব একটু?”
বাবা ভাবল পুশ্চুর পাঠশালা যাওয়া বন্ধ হয়ে গেছেতাই দুঃখ হয়েছেমাথায় হাত বুলিয়ে বলল, “যাতবে ডাকলে ছুট্টে আসিস
পুশ্চু বেরিয়ে গেল ঊর্ধ্বশ্বাসেপাঠশালার দিকেআশা করি বিঙ্কা বেরিয়ে যায়নি
নাবিঙ্কা রয়েছেওকে ঢুকতে দেখে গুরুমশাই অবাক হয়ে তাকালআজকাল পাঠশালে পোড়োর সংখ্যা কমে গেছেসবাই মাঠে, বনে কাজে যায়কেউ বাড়িতেই কাজ করেবিঙ্কার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠলবলল, “এসেছিস? আমি সবে গুরুমশাইকে জিজ্ঞেস করেছিলাম
গুরুমশাই হেসে বলল, “-ও বুঝি তোর পাগলামিতে সামিল? ওরে, নদী যে পাহাড় থেকে আসে সে পাহাড় এখান থেকে দূর না, কিন্তু যাওয়া তো সহজ নয়
বিঙ্কা বলল, “কেন? নদীতীর ধরে উজানে হাঁটলেই তো পৌঁছে যাবনদী তো পাহাড় থেকেই এসেছে
মাথা হেলাল গুরুমশাইএসেছেকিন্তু নদী তো সোজা পথে চলে নাএঁকেবেঁকে চলে এখানে-ওখানে ঘুরে ঘুরেঅনেক চলে পৌঁছবি এমন এক জায়গায়সেখানে দেখবি সোজা চললে অনেক আগেই পৌঁছে যেতিতা ছাড়া…”
গুরুমশাই থামলবিঙ্কা বলল, “কুকুম্পার জঙ্গল? কিন্তু গুরুমশাই, কেউ তো কোনও দিন সেখানে যায়ইনিকী করে জানল সেখানে কী বিপদ আছে?”
গুরুমশাই বলল, “ওরে বাবা! কুকুম্পার জঙ্গল সে সাংঘাতিক জঙ্গল। তার শেষ নেই। সে কত পুরোনো কেউ জানে না। সেখানে সব ভয়াবহ জন্তু জানোয়ার। আর ওই জঙ্গলের মানুষরা মানুষখেকো!”
মানুষখেকো! আজকের দিনে!
গুরুমশাই বলল, “সে সব সত্যি নাও হতে পারে। তবে ছোটবেলা থেকে যা শুনেছি, তাই বললাম।
কুকুম্পার জঙ্গলেতে অকুম্পাদের বাস
বনের মাঝে ইতিউতি ঘোরে বারো মাস।
মাছ ধরে না, চাষ করে না, খায় না তারা ঘাস
সুযোগ পেলেই ঝলসিয়ে খায় ভাল্‌মান্‌ষের মাস!”

চিন্তিত হয়ে দুজনে বাড়ি ফিরল। পুশ্চুর দাদুর শরীর ভালো হয়েছে। খাটে উঠে বসেছে। মা আলুর সুরুয়া খাওয়াচ্ছে, দাদু খেতে চাইছে না, বলছে, “কী দিন কাল পড়ল। একটু মাছের সুরুয়াও আজকাল পাওয়া যায় না?”
পুশ্চু গিয়ে দাদুর পাশে বসে বলল, “দাদু, কুকুম্পার জঙ্গল কোথায়?”
দাদু খানিকক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল, “ওরে বাবা! এ কথা কেন রে?”
পুশ্চু বলল, “আহা, লো না।”
দাদু বলল, “উত্তরে। তিন দিনের রাস্তা। সে বড়ো ভয়ংকর জায়গা।”
কেন?” জানতে চাইল পুশ্চু।
দাদু বলল, “গহীন বন। দাপিয়ে বেড়ায় ভয়ঙ্কর সব প্রাণী। সে বনে ঢুকে কেউ ফিরতে পারে না।”
পুশ্চু জানতে চাইল, “বনের শেষ কোথায়?”
দাদু মাথা নেড়ে বলল, “কেউ জানে না। সে বিরাট বন। তার গাছেরা আকাশ ছুঁই ছুঁই। ভিতরে আলো ঢোকে না।”
আর ওপারে কী আছে? কারা থাকে?”
কথায় কথায় দাদুর আলুর সুরুয়া শেষ – মা ভিজে তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছিয়ে দিয়ে আস্তে আস্তে দাদুকে আবার শুইয়ে দিল। দাদু বলল, “তা-কেউ জানে না। ওপার বলে কিছু আছে কি না তাই কেউ জানে না।”
আর বনের মানুষরা, তাদের অকুম্পা বলে?” জানতে চাইল পুশ্চু।
দাদু মাথা ঘুরিয়ে জানলা দিয়ে বাইরে তাকাল। বলল, “অকুম্পা। খুব মজার মানুষ ওরা।”
পুশ্চু অবাক হল। “মজার মানুষ? ওরা নাকি মানুষ খায়?”
দাদু এবার তাকাল ওর দিকে। “কে বলল?”
গুরুমশাই...” বলেই মনে হল, দাদু বলে গুরুমশাই বোকা। দাদু আগে পাঠশালায় পড়াত। গুরুমশাই দাদুর ছাত্র ছিল। দাদু নাক দিয়ে “ঘুৎ” করে একটা শব্দ করে বলল, “ও আবার কী জানে? ও কোনও দিন গিয়েছে?”
পুশ্চু একবার ভাবল জিজ্ঞেস করে, দাদুই কি গিয়েছে কুকুম্পার জঙ্গলে? কিন্তু দাদু কী যেন বলছে?
দাদু বিড়বিড় করে কবিতা বলছে একটা।
জঙ্গল, তার নাম কুকুম্পা বন
যেও নাকো সেথা কেউ যখন তখন
মনে রেখো আছে বনে বড়ো-বড়ো বাঘ,
খেয়ে নেবে গপ্‌ রে হলে তার রাগ
আর আছে অকুম্পা, বনেতেই বাসা,
গাছের মাথায় বাড়ি বানায় সে খাসা
ভুরু কুঁচকে একটু ভাবতে হল পুশ্চুকে। গুরুমশাইয়ের ছড়াটা মাথায় ছিল। একটু ভেবে বলতে গিয়ে দেখে দাদু ঘুমিয়ে পড়েছে।

কয়েক দিন পরে মা চা নিয়ে দাদুকে সকালে ডাকতে গিয়ে দেখল দাদু আর কোনও দিন উঠবে না। সে দিন, বাড়িভর্তি কান্নাকাটির মধ্যে বিঙ্কা পুশ্চুকে বলল, “শোন, আমরা যদি না যাই, আমাদের গ্রামে আর কোনও মানুষের বাস থাকবে না। আর আমরা যদি জল নিয়ে আসতে পারি আমাদের গ্রাম বেঁচে যাবে। তুই আমার কথাটা শোন। ভোর রাত থাকতে যদি আমরা বেরিয়ে পালিয়ে যাই, তাহলে কেউ আমাদের উত্তর দিকে খুঁজতে যাবে না। সবাই ভাববে শহরের দিকে পালিয়েছি। আমাদের গ্রামের লোক এমনিই উত্তরে যেতে চায় না। তাই ভালোভালোয় অনেক দূর চলে যেতে পারব।”
সারা দিন ভাবল পুশ্চু। পরদিন গিয়ে বিঙ্কাকে বলে এল, “দাদুর স্মৃতিসভা, তর্পণ, সব মিটে গেলে, পর দিন।”
এক মাস ধরে তর্পণ চলে। তার পরে স্মৃতিসভা দিয়ে শোক শেষ হয়। এই একমাস ধরে বিঙ্কা আস্তে আস্তে এটা সেটা গুছিয়ে রাখল, তার পরে একটা বড়সড় ব্যাগ নিয়ে গিয়ে স্মৃতিসভার দিন, ভিড়ের মধ্যে সকলের চোখ এড়িয়ে নিয়ে গেল পুশ্চুর কাছে।
পুশ্চু অবাক! “এটা কী?”
লুকিয়ে রাখ। যে দিন বেরোব, এটা নিয়ে যেতে হবে। এর পরে তোর বাড়িতে আর লোকজন আসবে না, লুকিয়ে আনতে পারব না। দিয়ে গেলাম। আমিও একটা ব্যাগ নিচ্ছি। তুই যা কিছু জামা কাপড় নিবি, এর মধ্যেই ভরে নিস।”
কবে যাবি? কালই?” পুশ্চুর মুখের ভেতরটা শুকিয়ে গেছে।
কাল হবে না। ক’ দিন পরে। আজই জামাকাপড় ঢোকাস না। মাসীমা বুঝে যাবে। অনেক আলোচনা আছে। গুরুমশাইকে রাজি করিয়েছি।”
গুরুমশাই? কুকুম্পার জঙ্গল পার করে নদী আনতে যাবে?
আরে ধ্যাৎ, যাবে কেন? কিন্তু আমাদের যাওয়া উচিত, সেটা মেনে নিয়েছে। পুরোনো তোরঙ্গ খুলে হলদে হয়ে যাওয়া মানচিত্র বের করেছে। কোন পথে কুকুম্পার জঙ্গল অবধি যাওয়া যায় দেখছে। পুরোনো পুঁথি আর বই বের করেছে। অকুম্পাদের সম্বন্ধে কিছু যদি পাওয়া যায়।”
সে দিন বিকেলে পুশ্চু আর বিঙ্কা আবার গুরুমশাইয়ের কাছে গেল। গুরুমশাই বলল, “এই নে, ছবি এঁকে দিয়েছি। এগুলো প্রাচীন মানচিত্র থেকে। এখন আর আগের মত নেই। এই দেখ সোনাতির নদী – নীল রং দিয়ে এঁকেছি – এঁকেবেঁকে গেছে। আর এই খানে, কুকুম্পার জঙ্গল।”
ওরা ঝুঁকে পড়ে দেখল, নদীতীর ধরে গেলে দেরি হবে, কারণ নদী সোজা পথে আসেনি। নদীতীরে অনেক গ্রামও আছে অবশ্য।

ও দিক দিয়ে যাওয়া যাবে না। সোজা পথেই যেতে হবে,” বলল পুশ্চু। দুটো ছেলেমেয়েকে একা যেতে দেখলে গ্রামের লোকের সন্দেহ হবে। ধরে রেখে খোঁজ করলেই বেরিয়ে যাবে ঝুরঝুরি গ্রাম থেকে দু জন পালিয়েছে।
এই মাঠের মধ্যে দিয়ে গেলে গ্রাম নেই। তবে এই মানচিত্র পুরোনো। ভালো করে দেখে শুনে এগোবি।”
পুশ্চু বলল, “শুধু দিকভুল না হলেই হল।”
বিঙ্কা বলল, “দিকভুল হবে কেন? সূর্য দেখতে দেখতে যাব। রাতে তো চলব না, ঘুমোবো।”
এবার দেরাজ থেকে একটা ছোট্ট গোল কী যেন বের করে আনল গুরুমশাই। বলল, “এটা নিয়ে যা।”
কী এটা?”
একটা ছোট্ট গোল বাটি। তার ওপরটা কাচ দিয়ে ঢাকা। আর তার ভিতরে একটা কালো কাঁটা। কাঁটার এক দিকের মাথায় লাল রং করা। তিরতির করে কাঁপছে। গুরুমশাই বলল, “এই দেখ, এই লাল দিকটা কোন দিকে?”
তোমার দিকে,” বলল পুশ্চু।
গুরুমশাই বাটিটা পাক খাওয়াল, উলটো না করে। বলল, “এবার?”
পুশ্চু বলল, “এখনও তোমার দিকেই।”
গুরুমশাই আরও কয়েক পাক খাওয়াল। “এবার?”
তোমার দিকে...” গুরুমশাইয়ের প্রশ্নের কারণ বুঝছে না পুশ্চু।
গুরুমশাই চাকতিটা পুশ্চুর হাতে দিয়ে বলল, “এটা নিয়ে ঘরের চারি দিকে ঘুরে ঘুরে দেখ, কোন দিকে দেখাচ্ছে লাল দিকটা?”
পুশ্চু হাতে নিল চাকতিটা। প্রথমে লাল কাঁটাটা গুরুমশাইয়েরই দিকে দেখাচ্ছে, তার পরে জানলার দিকে, তার পরে, জানলার পাশের আলমারির দিকে... পুশ্চু এবারে উলটো দিকে ঘুরে গেলওমনি কাঁটাটাও বোঁ করে ঘুরে গেল। পুশ্চু অবাক হয়ে বলল, “এবার দেখি আমার দিকে দেখাচ্ছে...”
তখুনি বিঙ্কা চেঁচিয়ে উঠল, “বুঝেছি – কাঁটাটা সারাক্ষণ উত্তর দিকেই দেখায়।”
পুশ্চুরও খেয়াল হল, তাই তো! বোঝা উচিত ছিল।
গুরুমশাই বলল, “ঠিক বলেছিস। এই কাঁটাটা চুম্বক। দিনে রাতে, সূর্য যখন মেঘের আড়ালে, ঘরের মধ্যে, এই কাঁটা সর্বদা উত্তর দিক দেখায়। এটা তোর দাদু এনেছিল পাঠশালার জন্য। আজ আমি তোকে দিলাম। নিয়ে যা।”
পুশ্চু চুম্বকের বাটিটা বিঙ্কাকে দিয়ে দিল। ও-ই ঠিক করে রাখবে।
গুরুমশাই বলল, “এই বার এগুলো দেখ। অকুম্পাদের সম্বন্ধে কিছুই পাইনি। কিন্তু কুকুম্পার জঙ্গল পার হবার কিছু উপায় পেয়েছি।”
একটা বই খুলল গুরুমশাইপাতাগুলো হলদে হয়ে গেছেসাবধানে একটা কাগজ-গোঁজা পাতা খুলে বলল,
জঙ্গলেতে পা দিও না
বাইরেতে থেকো খাড়া
ওপার যাবার জন্য কেউ
করবে নাকো তাড়া
অবাক হয়ে পুশ্চু বলল, “তবে যাব কী করে ওপারে?”
গুরুমশাই বলল, “এই বইয়ে নানা বিদ্বানের নানা কথা আছেআমি সবটা পড়ছি নাতবে একজন বলেছেন,
নদীপথে যেতে পারো,
যেতে পার উড়ে
এত যদি নাহি পার
যেও ঘুরে ঘুরে।
বিঙ্কা কী বলতে যাচ্ছিল, গুরুমশাই হাত তুলে থামিয়ে দিয়ে বলে চলল, “ঘুরে যাবার কোনও উপায় খুঁজে পাইনিসব পুঁথিতে, সব বইয়েতে, লেখা আছে, কুকুম্পার জঙ্গলের কোনও শেষ নেইডাইনে বাঁয়ে শেষ নেই, জঙ্গলের ভিতর দিয়ে গেলে শেষ নেইএই যে উড়ে যাওয়ার কথা, বা নদীপথে যাওয়ার কথা লিখেছে, তারাও কেউ লেখেনি, গেলে কোথায় যাওয়া যাবে
বিঙ্কা বলল, “তাহলে উপায়? উড়তে তো পারব না
পুশ্চু বলল, “নদীপথও তো আর নেইকাদাপথ হয়ে গেছে
গুরুমশাই বলল, “কাদাপথটা ভালো নাম, কিন্তু সে পথে চলার নৌকো এখনও আবিষ্কার হয়নিএই আকাশে ওড়ার ব্যাপারটা আমায় খুব কৌতুহলী করে তুলেছেঅনেক কিছু পড়েছিএকটা অনেক পুরোনো পুঁথিতে কিছু লেখা আছে। অকুম্পাদের সম্বন্ধেও কিছু আছে। অনেক লেখা, অতি প্রাচীন লিপি, সেটা থেকে এইটা আমি লিখে নিয়েছি। বেশি বড়ো না, পড়ে দেখ তোরা...”
ওরা কাগজটা হাতে নিয়ে দেখল, গুরুমশাইয়ের মুক্তোর মত হাতের লেখায় লেখা আছে
মুড়মুড়ার দক্ষিণ তীর থেকে দূরে দেখা যাবে কিঞ্চুর চঞ্চুএই চঞ্চু দেখা গেলেই নদীতীর থেকে দূরে সরে গিয়ে চঞ্চুর উদ্দেশ্যে প্রণাম করে এই মন্ত্র বলতে হবে –
কিঞ্চুপাখি, চঞ্চুধারী
দাঁড়িয়ে আছি সারি সারি
দাও না দেখা দয়া করি
নিয়ে যাও বন পার করি...
পুশ্চু বলল, “তাহলে কিঞ্চু একটা পাখির নাম?”
বিঙ্কা বলল, “দূর থেকে চঞ্চু, মানে ঠোঁট দেখা যাবে – মানে পাখিটা নিশ্চয়ই বিরাট!”
গুরুমশাই বলল, “কিঞ্চুপাখি নিয়েও পড়েছি। বইয়ে লেখা আছে, এই পাখি মানুষের মনগড়া। এমন কোনও পাখি আসলে নেই।”
ভুরু কুঁচকে বিঙ্কা আবার তাকাল কাগজের দিকে। বলল, “এটা মন্ত্র?”
গুরুমশাই বলল, “এটা প্রাচীন ভাষায় লেখা। আমি অর্থ করেছি।” তার পরে লজ্জা-লজ্জা হেসে বলল, “আসলটা অনেক ভালো কবিতা। আমি তো কবিতা লিখতে পারি না...”
দুজনে পড়তে থাকল –
কিঞ্চু পাখি যদি খোশমেজাজে থাকে তবে চিন্তা নেই। সে কাছে আসলে তার পা জড়িয়ে ধরলেই সে উড়ে যাবে কুকুম্পার জঙ্গলের ওপারেআর যদি সে ওখান থেকে দূরে চলে যায়, তবে সেখানে আর সেদিন ফিরবে নাফিরবে পরদিন, তখন আবার একই মন্ত্র বলতে হবেযেদিন কিঞ্চু পাখির দয়া হবে, সেদিন সে কাছে আসবে
পুশ্চু বলল, “মন্ত্রটা নিশ্চয়ই আসল ভাষায় বলতে হবে?”
গুরুমশাই নিঃশব্দে আর এক টুকরো কাগজ বাড়িয়ে দিল। সেই দেখে দুজনের চক্ষু চড়কগাছ! বিঙ্কা বলল, “এ কী ভাষা?”
গুরুমশাই বলল, “এটা আমাদের দেশের প্রাচীন কিসুঞ্চি ভাষা। এ ভাষা আজ আর কেউ জানেই না প্রায়।”
বিঙ্কা বলল, “এ আমরা উচ্চারণই করতে পারব না!”
গুরুমশাই বলল, “রাস্তায় যেতে যেতে পড়তে পড়তে যাবি। শিখে গেলে আর চিন্তা নেই। আর যদি কাজ না হয়, আমার কবিতাটা পড়বি...”
পরদিন ভোর রাতে ওরা গ্রাম ছেড়ে চলে গেল। কেউ জানল না। কেবল গুরুমশাই এল গ্রামের বাইরে অবধি, ওরা প্রণাম করলে ওদের আশীর্বাদ করে বলল, “নদীটা নিয়ে ফিরতে পারলে সবাই তোদের মনে রাখবে।”

দুজনে চলে, চলে আর চলে। সূর্য দেখে, গুরুমশাইয়ের দেওয়া চুম্বক-বাটি দেখে দিক ঠিক করে, আর চলে। খিদে পেলে থেমে খায়, মুড়ি কিংবা ছাতু – গুরুমশাইয়ের বুদ্ধি – তেল, অথবা জল দিয়ে মেখে। নদীতীরে কিছু দূরে দূরে গ্রামএক সময়ে নদীতে এতই মাছ ছিল, যে অনেকেই মাছ ধরে পেট চালাতকিন্তু এখন তারা সোনাতির গ্রামের মানুষের মতই চাষবাস করছেওরা নদী ধরে তাই চলছে নাচলছে অনেক দূর দিয়ে যতটা পারে, সোজাপথে, উত্তরদিকে
চলতে, চলতে, চলতে, কাটল তিন দিন, তিন রাত্তিরচারদিনের দিন সন্ধেবেলা ওরা দেখল দূরে, অন্ধকার জঙ্গল!
বিঙ্কা বলল, “আজ রাতে আর এগোন নয়। কে জানে, কী ভয়ানক জানোয়ার আছে ওখানে, যদি রাতে শিকার খুঁজতে বেরোয়?”
এর মধ্যে ওরা চলতে চলতে ফাঁকা মাঠ ছেড়ে হালকা বনের মধ্যে চলে এসেছে। এখানে আসেপাশে কয়েকটা উঁচু উঁচু গাছ। পুশ্চু বলল, “আজ রাতে আমরা একটা গাছে উঠে থাকি চল। কে জানে, যদি ওই জানোয়ারগুলো এ-পর্যন্ত এসে পড়ে?”
রাতের খাওয়া সেরে, দুজনে সামনের বিরাট গাছে উঠল। বিঙ্কা একটা চাদর বের করে দুজনকে গাছের ডালের সঙ্গে বেঁধে নিল। তার পরে অপেক্ষা শুরু হল রাত্তিরের।
অন্ধকার হয়ে এল। দলে দলে পাখি ফিরতে লাগল তাদের বাসায়। বিঙ্কা বলল, “এদের মধ্যে যদি কিঞ্চুপাখি থাকে?”
পুশ্চু বলল, “না, তাহলে জঙ্গল অবধি গিয়ে তার মন্ত্র বলার কথা কি লেখা থাকত?”
পুশ্চুর কথাই ঠিক হল। দলে দলে কাক, দাঁড়কাক, চড়াই, শালিক, চিল আর অনেক নাম না জানা পাখি উড়ে আসতে লাগল। কিন্তু সবই ছোটো পাখি। তারা অনেকেই বিঙ্কা আর পুশ্চুর ডালে বসতে গিয়ে থতমত খেয়ে উড়ে অন্য গাছে চলে গেল। বিঙ্কা বলল, “আমরা এখানে আছি বলে ওরা শুতে পারল না।”
পুশ্চু উত্তর দিল না। অনেক পথ চলে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে।
পরদিন দুজনের ঘুম ভাঙল অনেক পাখির গানে। গাছে গাছে পাখিরা জেগে উঠছে, পুবের আকাশ তখনও ফর্সা হয়নি। দূরে কুকুম্পার জঙ্গল কুয়াশায় ঢাকা। ওরা দুজন বাঁধন খুলে নামল। দূরে আবছায়া কুকুম্পার জঙ্গল দেখে পুশ্চু বলল, “বাপরে!”
বিঙ্কা ম্লান হাসল। ওরও ভয় করছে।
আস্তে আস্তে চলতে শুরু করল দুজনে। কিন্তু চলতে চলতে বুঝল, কুকুম্পার জঙ্গল যত কাছে মনে হয়েছিল, তত কাছে নয়। সারা দিন চলেও জঙ্গল যেমন দূরে অন্ধকার, তেমনই অন্ধকার দূর রয়ে গেল। সেদিনও ওরা একটা গাছে উঠে রাত কাটাল।
পরদিনও কেটে গেল পথ চলতে, তার পরদিনও। পুশ্চু বলল, “জঙ্গলটাও দূরে চলে যাচ্ছে, আমরা যত যাচ্ছি, তত আরও দূরে যাচ্ছে।”
বিঙ্কারও ভয় করছিল, মনে সাহস এনে বলল, “না, তা নয়, এখনও অনেক দূরে কিন্তু মাঝখানে কিছু নেই, তাই কাছে মনে হচ্ছে…”
বিঙ্কার কথাই ঠিক হলআরও একদিন চলার পর বোঝা গেল, কুকুম্পার জঙ্গল এখন আর দূরে নয়গাছগুলো আস্তে আস্তে যেন কাছে আসছে আর সেই সঙ্গে বোঝা যাচ্ছে, যে এমন বিশাল বিশাল গাছ তারা জীবনে চোখে তো দূরের কথা, স্বপ্নেও দেখেনি।
তার পর দিন দুপুরে ওরা এসে জঙ্গলের ধারে পৌঁছল।
তা বলে একেবারে কাছে নয় – অনেকটাই দূরে থামল ওরা। বিঙ্কা বলল, “আরও কাছে গেলে গাছের আড়ালে কিঞ্চুপাখির ঠোঁট দেখা নাও দেখা যেতে পারে।
পুশ্চু হেসে বলল, “তারও চেয়ে বড়ো কথা, জঙ্গলের ভয়ানক সব শিকারী প্রাণীরা বেরোলে আমরা দেখতে পাব।
বিঙ্কাও হাসল। বলল, “দেখে কী করবি? পালাতে পারবি দৌড়ে?”
পুশ্চু বলল, “গাছে চড়বতাতে তো বাঁচতেও পারি!”
দুজনে দুপুরের আলোয় চেয়ে রইল হাঁ-করেজঙ্গল এখনও বহুদূরেকিন্তু ডাইনে-বাঁয়ে, যত দূর দৃষ্টি যায়, কোত্থাও কোনও প্রাণের ছায়া নেই, কোনও নড়াচড়া নেই, দুপুরের আলোয় থমথম করছে জঙ্গল।
ভুরু কুঁচকে অনেকক্ষণ চেয়ে থেকে বিঙ্কা বলল, “নাঃ, আমার ধারণা ছিল একটা বিরাট পাখি জঙ্গলের মধ্যে থেকে মাথা উঁচিয়ে থাকলে হয়ত তার মুণ্ডুটা জঙ্গলের ওপরে দেখা যাবে। সে গুড়ে বালি। এত বড়ো বড়ো গাছ যে দুনিয়ায় কোথাও আছে, তাই জানতাম না। পাখি যদি উড়ে বেরোয় তবেই দেখতে পাব।
দুজনে একটা গাছতলায় বসে অপেক্ষা করতে থাকলচেয়ে চেয়ে খোঁজে, আর মাঝে মাঝে গুরুমশাইয়ের দেওয়া মন্ত্রটা চেঁচিয়ে-চেঁচিয়ে পড়েএকবার পড়ে প্রাচীন কিসুঞ্চি ভাষায়, আর একবার পড়ে গুরুমশাইয়ের লেখা। রোদ পড়ে আসে, অনেক পাখি উড়ে যায় চারিদিক থেকে জঙ্গলের গাছের আড়ালে। ওরা ভাবে, এত দূর থেকে ওদের গলা শুনতে পাবে কিঞ্চুপাখি!
পরদিন সকালে গাছ থেকে নেমে বিঙ্কা বলল, “সারা রাত্তির তো কোনও হিংস্র প্রাণী এল বলে মনে হল না।”
পুশ্চু বলল, “না। কোন হুংকার, গর্জন, কিছুই শুনলাম না।”
বিঙ্কা বলল, “জঙ্গলের কিনার ধরে হেঁটে যাই। এক জায়গায় বসে থাকলে চলবে না। কে জানে, এখানে হয়ত কিঞ্চুপাখি থাকেও না।”
কোন দিকে যাবে? কিছুই তো জানে না। আন্দাজে ভর করে চলতে শুরু করল পুবের দিকে। যে দিক থেকে সূর্য উঠে আস্তে আস্তে ঘাসের শিশির শুকিয়ে দিচ্ছে।
সারা দিন চলে, মাঝে মাঝে থেমে বিশ্রাম নেয়, আর তারস্বরে কিঞ্চুপাখির মন্ত্র বলে। একবার পুশ্চু বলল, “শোন, এখান থেকে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে গলা ভেঙে যাচ্ছে। তার চে’, চ’ না, জঙ্গলের আরও কাছে চ’। কোনও বড় জন্তু এখানে নেই বলেই মনে হচ্ছে।”
কিন্তু কিন্তু করে বিঙ্কা বলল, “তা হতে পারে, কিন্তু কাছে গেলে তো গাছগুলো আরও উঁচু দেখাবে। ওই আকাশছোঁয়া বিরাট বিরাট গাছের মধ্যে কিঞ্চুপাখি পাব কোথায়?”
পুশ্চু বিরক্ত হয়ে বলল, “কিঞ্চুপাখি না ঘেঁচু। বড়ো বড়ো কথা। বিশাল বিশাল ভয়াল জন্তু, বিরাট বিরাট পাখি... কই? একটাও দেখা গেল না কেন এখন অবধি? চল, কাছে গিয়ে দেখে আসি। এখন শুরু করলে সন্ধের মধ্যে ওই জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে যাব। তার পরে দেখা যাবে। শেষে দেখব খালি বাজে কথা লেখা সব বইতে – জঙ্গল মোটেই অত বড়ো না, চলতে চলতে পেরিয়েও যাব।”
বিঙ্কা খানিকক্ষণ ভেবে মাথা নেড়ে বলল, “উঁহু। পুরনো দিনের বইতে সবসময় বাজে কথা লেখা থাকে না। এত বড়ো গাছ যে আছে তা তো দেখাই যাচ্ছে। বড়ো জন্তু থাকতেই পারে। একটু ধৈর্য ধরি। আর ক’ দিন এখান থেকেই খুঁজি। তার পরে দেখা যাবে।”
পুশ্চু বলল, “বেশ, কিন্তু বেশি দিন না। এমনিতেই খাবার প্রায় ফুরিয়ে এসেছে। নতুন করে খুঁজতে হবে। এখানে তো বিশেষ খাবার দাবার দেখছি না কিছু। ফলমূলের গাছও নেই।”
দুজনে চলতে থাকল। পিঠের দিকে সূর্য হেলে পড়ছে, এবার রাতের মতো বিশ্রাম নিতে হবে। এমন সময় হঠাৎ পুশ্চু বিঙ্কার হাত ধরে থামাল। দূরে, জঙ্গলের গাছের ওপর দিয়ে হলদে তেকোনা, ছুঁচলো বিশাল কী ওই জিনিসটা উঁচিয়ে আছে?
দুজনে ভালো করে দেখেও কিছু বুঝল না। পা চালিয়ে চলল, যাতে সূর্য ডোবার আগেই যতটা পারা যায় রাস্তা পেরিয়ে যেতে পারে। কিন্তু যতক্ষণে কাছাকাছি পৌঁছল, ততক্ষণে সূর্যের আলো এতটাই ম্লান হয়ে গেছে, যে জিনিসটা কী, বোঝাই যাচ্ছে না।
পাখির ঠোঁটের মতোই লাগছে কিন্তু,” বলল বিঙ্কা।
পুশ্চুও এক মত। “কিন্তু,” কিন্তু কিন্তু করে বলল, “এত বড়ো?”
তা ঠিক! এত বড়ো পাখি হয় কি?

সে রাতও কাটল, পরদিন ওরা পায়ে পায়ে এগিয়ে গেল জঙ্গলের দিকে – যেখানে হলুদ রঙের তেকোনা জিনিসটা চেয়ে আছে আকাশের দিকে
ব্যাগ থেকে একটা লম্বা চোঙা-মত কী বের করে পুশ্চু টেনে টেনে লম্বা করে নিলবলল, “দাদুর দূরবীনটা নিয়ে এসেছিদূরবীন চোখে লাগিয়ে বলল, “পাখির ঠোঁটই তো মনে হচ্ছে, দেখ তো?”
বিঙ্কাও বলল, “পাখির ঠোঁটসন্দেহ নেই
বিঙ্কা আর পুশ্চু পরিত্রাহি চিৎকার করে
কিঞ্চুপাখি, চঞ্চুধারী
দাঁড়িয়ে আছি সারি সারি
দাও না দেখা দয়া করি
নিয়ে যাও বন পার করি...
মন্ত্র বলতে লাগলএকবার গুরুমশাইয়েরটা বলে, তারপরে বলে কিসুঞ্চি ভাষায়পাখির ঠোঁট কিন্তু নড়েনাপুশ্চু সবে বলতে গেছে, “আমি কিন্তু কোনও পাখিকে এতক্ষণ নড়াচড়া না করে থাকতে দেখিনি…” এমন সময় বিঙ্কা কাঁপা-কাঁপা গলায় বলল, “পুশ্চু…”
পুশ্চুও দেখল, জঙ্গলের ধার ঘেঁষে সারে-সারে দাঁড়িয়ে বেঁটে-বেঁটে মানুষ, তাদের পরনে কেবল নেংটি, কিন্তু সকলের হাতে তির ধনুক, কোমরে ছোটো-ছোটো তরোয়াল

পুশ্চুর একবার মনে হল, দেয় দৌড়কিন্তু বিঙ্কা হিস করে একটা শ্বাস ছেড়ে বলল, “পুশ্চু, অকুম্পা…”
বলে এগিয়ে গেল ওদের দিকেপুশ্চুও আর কী করে, গেল ওদের সঙ্গে
একটু এগোন মাত্র অকুম্পারা ঘিরে ধরল ওদেরদেখতে ভয়ানক, হাতে অস্ত্র, কিন্তু ওদের আক্রমণ করল নাবরং হাসি-হাসি মুখেকিসু-কিসু, ফিসু-ফিসু” করে কত কী বলল, ওরা কিছুই বুঝতে পারল না। ওরা কত জিজ্ঞেস করল, “তোমরাই অকুম্পা? কুকুম্পার জঙ্গলে থাক? ওই বিশাল ঠোঁটটাই কি কিঞ্চুপাখি? আমাদের জঙ্গলের ওপারে নিয়ে যাবে?” ওরাও কিছু বুঝল না। ঘিরে ধরে ওদের নিয়ে গেল জঙ্গলের ভেতরে।
জঙ্গলের ভেতরটা ঠাণ্ডা, ছায়া-ছায়া অন্ধকারশুকনো। চলে আর চলে। বিঙ্কা ফিসফিস করে বলল, “সকালে আমাদের খাওয়া হয়নি। পেট চুঁইচুঁই করছে।
পুশ্চু বলল, “কে জানে, আর হয়ত খাওয়া হবেও নাওরাই আমাদের খেয়ে ফেলবে
বিঙ্কা বলল, “নাঃ, অত খারাপ মনে হচ্ছে নাপুশ্চুরও মনে হচ্ছিল না, কিন্তু কিছু বলল না
অনেকক্ষণ চলার পরে ওরা থামল। চারিদিকে চেয়ে দেখল, জঙ্গল যেমন ছিল তেমনই। কোথায় এল ওরা? কিন্তু ভাবতে না ভাবতেই গাছের ওপর থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে নেমে এল মোটা মোটা দড়ি। দেখতে দেখতে ওদের সঙ্গের প্রায় সকলেই সেই দড়ি বেয়ে উঠে গেল কোন অদৃশ্য উপরে! তার পরে নেমে এল চারটে চারটে দড়িতে বাঁধা দুটো চেয়ারওদের সঙ্গে যে অকুম্পারা ছিল, হাত দিয়ে দেখাল, বোসো। তার পরে বুকে, কোমরে আর পায়ে দড়ি দিয়ে বেঁধে দিল যাতে চেয়ার টেনে তোলার সময় এ-দিক ও-দিক হলে ওরা পড়ে না যায়। বাকি অকুম্পারা দড়ি বেয়ে উঠে গেল, আর তার পরে কারা ওদের চেয়ার টেনে তুলতে শুরু করল আকাশের দিকে।
সে ওঠারও শেষ নেই। যত ওঠে, তত আলো বাড়ে। শেষে, অনেকক্ষণ পরে, গাছের একেবারে ওপরে না, ডাল পালা তখনও মোটা মোটা, ওদের টেনে তোলা হল একটা পাটাতনে। অকুম্পারা ওদের বাঁধন খুলে দিল, তার পরে ডাল বেয়ে, পাটাতন দিয়ে তৈরি শূন্যের রাস্তা দিয়ে নিয়ে গেল গাছের ডালেডালে, কাঠ দিয়ে বানানো একটা মস্ত বেদীতে, সেখানে অনেক অকুম্পা বসে রয়েছে।

একজন বয়স্ক অকুম্পার কাছে ওদের দাঁড় করানো হল। ওদের সঙ্গের অকুম্পারা এবারে কিন্তু আর সেই কিসু কিসু ফিসু ফিসু ভাষা বলল না। এবারে ওদের ভাষা একেবারেই অন্যরকম। পুশ্চুর মনে হল, কেমন যেন কুঁইকুঁই ওঁয়াওঁয়া করে কথা বলে ওরা।
বয়স্ক অকুম্পা ওদের দিকে তাকিয়ে স্পষ্ট বলল, “তোমরা কিঞ্চরী ভাষা জানো না?”
নিজেদের কথা শুনে বিঙ্কা আর পুশ্চু দারুণ আরাম বোধ করল। বিঙ্কা বলল, “তুমি আমাদের ভাষায় কথা বলতে জানো? তুমি কি অকুম্পাদের রাজা? কিঞ্চরী ভাষা কী?”
শুনে বয়স্ক লোকটা হাসতে লাগল। হাসি থামিয়ে প্রথমে নিজেদের ভাষায় সকলকে কী বলল, তার পরে ওদের বলল, “আমাদের দেশে কিঞ্চরীরা ছাড়া কেউ আসে না। তাই আমরা সকলেই কিঞ্চরী ভাষা জানি। তোমাদের ভাষা কেউ কেউ জানে। আমি জানি। আমি এদের রাজা নই, আমাদের রাজা-টাজা নেই, কিন্তু আমি রাজার মতোই। তোমরা কোথা থেকে এসেছ?”
বিঙ্কা আর পুশ্চু ওদের দুঃখ কষ্টের কথা সব খুলে বলল। ওদের রাজা, যে রাজা নয়, মাঝে মাঝে থেমে ওদের ভাষায় বুঝিয়ে দিল ওদের নিজেদের লোকেদের। ওরাও উত্তেজিত হয়ে মাথা নেড়ে-নেড়ে কী সব বলল
সব কথা শেষ হবার পরে বয়স্ক লোকটা ওদের বলল, “তোমাদের সাহস আছে, তাই তোমরা এত দূর এসেছ, নদীর খোঁজে। কিন্তু নদী আর আসবে না। আমাদের বলে গিয়েছে জল-সাধু
জল-সাধু?” পুশ্চু অবাক। সে আবার কী রকম নাম? বলল, “সে আবার কী রকম নাম?”
বয়স্ক রাজা একটু লজ্জা-লজ্জা হেসে বলল, “আসলে ওনার নামটা কী আমরা জানি না। আমাদের জলের ব্যবস্থা করে প্রাণ বাঁচিয়েছে, তাই আমরা ওকে জল-সাধু বলি।”
বিঙ্কা বলল, “তোমাদেরও জলের অভাব?”
রাজা বলল, “বা, রে! তোমাদের নদী শুকিয়েছে, আমাদের নদী শুকোয়নি? ওই একই নদী তো! নদী শুকোনোর ফলে আমাদের জঙ্গলে একে একে সব বড়ো প্রাণী আর পাখি মরে গিয়েছে। অত্তোবড়ো-বড়ো দেহ, তারা খাবার জল পাবে কোথায়!”
পুশ্চু বলল, “সবাই মরে গিয়েছে? কিঞ্চুপাখি?”
সবাই চুপ করে গেল। রাজা বলল, “এই বনের সব প্রাণীই আমাদের বন্ধু ছিল। কিন্তু কিঞ্চুপাখি ছিল সবচেয়ে বড়ো বন্ধু। চল।” বলে বয়স্ক লোকটা গাছ বেয়ে হাঁটতে শুরু করল। ওরাও পেছন পেছন চলল, সঙ্গে সব অকুম্পারা।
বেশি দূর যেতে হল না। খানিকটা দূরেই জঙ্গলে বিরাট একটা ফাঁকা জায়গা – সেখানে একটা বিশাল কালো পাখি আকাশে মুখ উঁচিয়ে রয়েছে। তার হলুদ ঠোঁট গাছের মাথা ছাড়িয়ে উঠে রয়েছে আকাশে, যেন এখনই সে ডানা মেলে উড়ে যাবে বলে তৈরি।
কিন্তু পাখিটা জীবন্ত নয়। মরা।
এটাই শেষ কিঞ্চুপাখি,” রাজা বলল। “আমাদের বৈজ্ঞানিকরা ওর দেহ এমনভাবে রেখেছে যাতে নষ্ট না হয়ে যায়।”
বিঙ্কা বলল, “ঘন জঙ্গলের মধ্যে এত বড়ো ফাঁকা জায়গা কী করে এল?”
রাজা বলল, “আগে এমন জায়গা ছিল না। এখন এমন জায়গা আছে। জলের অভাবে গাছ মরে যাচ্ছে। কোনও কোনও জায়গায় বেশি তাড়াতাড়ি। জল-সাধু বলেছে, এই জঙ্গল থাকবে না। এত বড়ো বড়ো গাছ বেঁচে থাকার মতো জল শেষ হয়ে গেছে অনেক দিন।”
সকলে নিঃশব্দে চেয়ে রইল।
বিঙ্কা বলল, “সাধু কি আমাদের নদীতে জল এনে দিতে পারবে? না বোধহয়। জলের অভাবে কুকুম্পার জঙ্গলের মত জায়গা যদি নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়, এখানকার বড়ো বড়ো প্রাণীরাও যদি মরে যায়, তাহলে সোনাতি কি আর ফিরে আসবে?”
রাজা উত্তেজিত হয়ে বলল, “না, না। আসবে। তোমরা সাধুর সঙ্গে দেখা করো। সাধু আমাদের বলেছে, ও এখন পাহাড়ে কাজ করছে, দেখছে কী ভাবে নদীতে আবার জল আনা যায়।”
কিঞ্চুপাখির বিশাল দেহটার দিকে তাকিয়ে পুশ্চু বলল, “তোমরা কি সত্যিই কিঞ্চুপাখির পিঠে চড়ে জঙ্গল পারাপার করতে?”
মাথা নেড়ে না বলল রাজা। বলল, “আমরা কিঞ্চুপাখির পিঠে চড়তাম না। আমরা জঙ্গলে যেখানে খুশি নিজেরাই যাই। চিরকাল যেতাম। তবে আমাদের পোষা কিঞ্চুদের পিঠে না, পায়ে চামড়ার বাঁধন দিয়ে বাইরের লোকেদের আমরা জঙ্গল পারাপার করিয়ে দিতাম। আমাদের মতন ওরা গাছের ডালের দড়ি দিয়ে দুলে দুলে চলতে পারে না কি না, তাই।”
গাছের ডালে বাঁধা দড়ি দিয়ে দুলে দুলে চলা! কাঠের পাটাতন থেকে বহু নিচে জঙ্গলের মাটির দিকে তাকিয়েই বিঙ্কার মাথা ঘুরে গেল। তাড়াতাড়ি এক পা পিছিয়ে গিয়ে বলল, “তাহলে, আমরা কী করে যাব?”
রাজা হেসে বলল, “কেন? আমাদের মতো করে! তোমরা তো বাচ্চা। তোমরা চট করে শিখে যাবে। আমাদের এখানে যারা তোমাদের বয়সী, তারা শিখিয়ে দেবে। এসো, তোমাদের সঙ্গে তাদের আলাপ করিয়ে দিই। আমরা এখন খেতে যাব। তোমাদেরও নিশ্চয়ই খিদে পেয়েছে?”
ওদের হঠাৎ একটু ভয় করল। পুশ্চু জিজ্ঞেস করল, “তোমরা কী খাও?”
রাজা হঠাৎ হা হা করে হেসে উঠে বলল, “ভয় নেই, আমরা মানুষ খাই না। অনেক পুরুষ আগেই ছেড়ে দিয়েছি!”
এর পরে রোজ বিঙ্কা আর পুশ্চু দড়ি ধরে ধরে দোল খেয়ে খেয়ে গাছের ডাল থেকে ডালে চলা শুরু করল। অকুম্পাদের বাচ্চারা ওদের সঙ্গে সঙ্গে আসে আর যত্ন করে করে শিখিয়ে দেয়। ওদের মতো পারে না – কেমন সাঁই করে উড়ে গিয়ে একটা সরু ডালে পা প্রায় না রেখেই আর একটা দড়ি ধরে ঝুলে আবার উড়ে চলে যায়... তবু পুশ্চু আর বিঙ্কা চেষ্টা করে চলে।
মাস তিনেক পরে একজন এসে ওদের বল, “তোমাদের ডাকছে।” এর মধ্যে ওরা অকুম্পাদের ভাষাও খানিকটা শিখেছে। ওরা গাছ থেকে গাছে দুলে দুলে আবার গিয়ে হাজির হ সেই গাছে যেখানে প্রথম দিন ওদের রাজার সামনে আনা হয়েছিল। রাজা বললেন, “ভালো শিখেছ তোমরা গাছে-গাছে চলা। এখন তোমরা জঙ্গলের ওপারে যাবার জন্য তৈরি। খবর পেয়েছি, জল-সাধু এসেছে কাছেই এক গ্রামে। আমাদের লোক তোমাদের এখান থেকে কিছুদূরে অকুম্পাদের পরের গ্রামের লোকেদের হাতে তুলে দেবে, ওরা তোমাদের নিয়ে যাবে তার পরের গ্রাম অবধি। ছেলে মেয়েরা বলছে, তোমাদের দিন দশেক লাগবে জঙ্গল পার করতে। এখনই বেরিয়ে যাও, তাহলে জল-সাধু থাকতে থাকতে পৌঁছে যাবে জঙ্গলের ওপারে।”
সেই মতো দু’বন্ধু আবার রওয়ানা দিল। এবারে আকাশপথে! গুরুমশাইয়ের কথাই সত্যি হল। হয় আকাশ, নয়ত নদীপথ। শুধু কিঞ্চুপাখি আর নেই।
গাছের মাথায় মাথায় গ্রাম। কিছু দূরে দূরেই। আধবেলা চললেই গ্রামে পৌঁছে যাচ্ছে ওরা। এক দিন অবশ্য সারা দিন চলেই পরের গ্রামে পৌঁছল। যেখানে যায়, সেখানেই আদর করে ওদের বসায়, খেতে দেয়। বলে, “কোনও চিন্তা নেই, জল-সাধুর কাছে খবর চলে গেছে। উনি তোমাদের জন্য অপেক্ষা করছেন।”
এক দিন বিঙ্কা জিজ্ঞেস করল, “সারা জঙ্গলে তোমাদের এত গ্রাম? কুকুম্পার জঙ্গলে কত অকুম্পা আছে?”
অকুম্পারা হেসে বলল, “বেশি নেই, কিন্তু তোমাদের জন্য আমরা সোজা রাস্তায় যাচ্ছি না। তা হলে দিনের পর দিন কোনও গ্রামই দেখতে পেতে না। তোমরা যাতে ক্লান্ত না হয়ে পড়, আমরা তোমাদের ঘুরপথে, গ্রামে গ্রামে বিশ্রাম করতে করতে যাচ্ছি।”
তিন দিন গেল? চার? না কি ছ’সাত দিন? ওদের গুলিয়ে গেছে। কিন্তু এক দিন জঙ্গল শেষ হয়ে গেল। জঙ্গলের ভিতরেই বিশাল গাছের মাথা থেকে অকুম্পারা ওদের নামিয়ে দিল মাটিতে। বলল, “আমরা বাইরে যাব না। তোমরা ওদিকে যাও, বাইরে গিয়ে উত্তরে পাহাড়ের দিকে রওয়ানা দেবে। একটু গেলেই পাবে জল-সাধুর গ্রাম।” ওরা হাত নেড়ে বিদায় জানিয়ে বলল, “আবার ফিরব, এই পথে। জল-সাধুকে সাথে নিয়ে।”
জঙ্গলের বাইরে বেরিয়ে বিঙ্কা ব্যাগ হাতড়াচ্ছে, পুশ্চু বলল, “কী খুঁজছিস?”
বিঙ্কা মুখ না তুলেই বলল, “চুম্বক বাটিটা। উত্তর কোন দিক দেখে না নিলে পাহাড় কোন দিকে দেখব কী করে?”
পুশ্চু হেসে বলল, “মুখ তুলে তাকিয়ে...”
বিঙ্কা মুখ তুলে তাকিয়ে চমকে উঠল। এমন দৃশ্য ও কোনও দিন দেখেনি। এই কী পাহাড়! বিশাল বিশাল মাটির ভাঁজ আকাশের দিকে উঠে গেছে থরে থরে। সবচেয়ে দূরেরগুলো সবচেয়ে উঁচু। সেগুলোর মাথায় সাদা বরফ সূর্যের আলোয় ঝকঝক করছে।
এমন দৃশ্য ওরা দুজনেই কোনও দিন দেখেনি। অবাক বিস্ময়ে চেয়ে ছিল বলে কখন একটা লোক এসে দাঁড়িয়েছে, দেখেওনি।
লোকটা বেঁটে। ওর মুখ চোখ অন্য রকম। চোখদুটো সরু। নাকটা চ্যাপ্টা। ওর মাথায় টুপি আর পরনে আলখাল্লার মত কী, বোঝাই যায়, পশুলোম দিয়ে তৈরি। লোকটা কিন-কিন করে কী বলল, ওরা চমকে তাকিয়ে দেখল ওদের দিকে তাকিয়ে সে হাসছে।
তার পরে ওর কাঁধ থেকে দুটো পশুলোমের আলখাল্লা নামিয়ে ওদের হাতে দিয়ে অঙ্গভঙ্গী করে বুঝিয়ে বলল, পরে নাও। ব্যাগ থেকে দুটো টুপিও বের করে দিল। হাত দিয়ে দেখাল, মাথায় পরো তারপরেই ঘুরে চলতে শুরু করল হনহনিয়ে।

ওরাও দৌড়ল পেছনে। কিন্তু লোকটার সঙ্গে পাল্লা দেওয়া সহজ না। তার ওপরে মাটি এখন পাথুরে, রাস্তা আর সমান না, ক্রমেই ওপর দিকে উঠছে। লোকটা হনহনিয়ে খানিক চলে, আর থেমে দেখে ওরা কতটা পিছিয়ে পড়েছে। তার পরে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করে।
বেশি দূর যেতে হল না। একটু গিয়েই একটা বিশাল পাথরের গা ঘেঁষে রাস্তাটা বাঁক নিয়ে হাজির হল একটা গ্রামে। সেখানে ওরা পৌঁছন মাত্র গ্রামের বাচ্চারা ওদের ঘিরে ধরল, সবাই মিলে কিন্‌-কিন্‌ করে চেঁচায়, কেউ ওদের হাত ধরে টানে, কেউ জামা ধরে, কিন্তু সকলেই আঙুল তুলে একই দিকে দেখায় – একটা বাড়ির দিকে। ওদের সঙ্গে যে আসছিল, সে লাঠি তুলে বাচ্চাদের বকল, কিন্তু বাচ্চারা গেল না। ওদের টানতে টানতে নিয়ে গেল সেই বাড়িটার আঙিনায়।
সেখানে একজন বসে চা খাচ্ছে। দু-জন দাঁড়িয়ে পেছনে। ওদের দেখে ঘাড় ফিরিয়ে কী বলল, দু-জনে ছুটে চলে গেল বাড়ির ভেতর থেকে দুটো চেয়ার নিয়ে এল।
লোকটা ওদের বলল, “তোমরাই অনেক দূর থেকে আমাকে খুঁজতে এসেছ কুকুম্পার জঙ্গল পার করে?”
ওরা মুখ চাওয়াচাওয়ি করে বলল, “তুমিই কি জল-সাধু?”
লোকটা হঠাৎ মাথাটা পেছনে এলিয়ে হা-হা করে হেসে বলল, “তাই তো, তোমরা তো অকুম্পাদের কাছ থেকে আমার নাম জানতে পেরেছ! তাই ওই নামটাই জেনেছ। আমি অনেক দিন অকুম্পাদের মধ্যে যাইনি, তাই নামটাও শুনিনি।”
পুশ্চু বলল, “তাহলে তোমার নাম কী?”
লোকটা বলল, “আমার নাম উচ্চারণ করা তোমাদের পক্ষেও কঠিন হবে। আমার নাম শ্রাধ্রুজ লড্রুয়া।”
এ আবার কী রকম নাম?
বিঙ্কা বলল, “তুমি তাহলে উত্তর সাগরের পারের লোক। ওই পাহাড়েরও ওপারে তোমার বাড়ি?”
লোকটা থেমে বলল, “ঠিক বলেছ। তুমি তো বেশ জানো। আমি পাহাড়ের ওপারের মানুষ। সাধুটাধু নই। অকুম্পারা আমাকে জল-সাধু বানিয়ে দিয়েছে।”
পুশ্চু বলল, “তাহলে তোমাকে আমরা জল-সাধু বলে ডাকব না। এমনিই নামটা কেমন বোকা বোকা। কিন্তু তোমার নাম উচ্চারণ করার ক্ষমতা আমাদের নেই। তাই তোমাকে ডাকব কাকু বলে।”
লোকটা চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বলল, “কিন্তু ডাকতে হবেই বা কেন? আমি গত ক’ দিন ধরে শুনছি, দুটো ছেলে-মেয়ে নাকি আসছে আমার সঙ্গে দেখা করতে। আমি যেন এখান থেকে না যাই। আমি কাজ কর্ম বন্ধ করে এখানে অপেক্ষা করছি। আজ তোমরা এসে বলছ, আমাকে কাকু ডাকবে। কেন?”
আবার দুজনে মুখ চাওয়াচাওয়ি করল। বিঙ্কা বলল, “আমরা কুকুম্পার জঙ্গল পার করেও ছয় দিন ছয় রাতের পথ পেরিয়ে থাকি একটা গ্রামে, তার নাম ঝুরঝুরি। আমাদের গ্রাম সোনাতির নদীর তীরে...”
লোকটা ওদের থামিয়ে বলল, “সোনাতির নদী? সে তো আর নেই। শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে।”
এইবার আর বাধা রইল না। ওদের সমস্ত কথাটাই ওরা হুড়মুড়িয়ে বলে ফেলল।
সব শুনে লোকটা খানিকক্ষণ চুপ করে বসে রইল। তার পরে হাতের কাপের চা-টা শেষ করে বলল, “তোমাদের কথা শুনে হাসব, না কাঁদব – তোমাদের সাহসের জন্য তোমাদের প্রশংসা করব... নাকি বোকামির জন্য রাগ করব বুঝতে পারছি না। গ্রামে নদী শুকিয়ে গেছে, সেটা আনতে তোমরা কথা নেই, বার্তা নেই, কাউকে কিছু না বলে বেরিয়ে পড়েছ? নদী কোথা থেকে কী ভাবে আসে জানো, যে নিয়ে যাবে আবার গ্রামে?”
দুজনে একটু চুপ করে থেকে বলল, “গুরুমশাই বলেছে, পাহাড়ের বরফ গলে নদী হয়।”
আর সে বরফ আসে কোথা থেকে?”
গুরুমশাই বলেনি। দুজনে চুপ।
লোকটা বলল, “যখন কোনও কাজ করবে, ভালো করে জেনে নিয়ে করা উচিত না? এই যে তোমরা এত দূর এসেছ, তাতে কী হবে? ওই দেখ।”
দুজনে তাকিয়ে দেখল লোকটা আঙুল দিয়ে দূরের পাহাড় দেখাচ্ছে। পাহাড়ের মাথায় বরফের টুপি।
লোকটা বলল, “ওই, আমাদের দেশের উত্তরের বিশাল পাহাড়। উঁচু পাহাড়হাজার হাজার মাইল লম্বাএই পাহাড়ের মাথায় বরফের চুড়োবর্ষায় বৃষ্টি পড়ে এখানে বরফ তৈরি হসেই বরফ সারা বছর ধরে গলতে গলতে কত নদীতে জল আসত
লোকটা বোঝাল, “এই দেখ, পাহাড়ের এই নিচের দিকে, যেখানে আমরা বসে আছি, সেখানে বরফ নেইএখানে এক সময় অনেক গাছপালা ছিল।এখানে বৃষ্টি হলে মাটিতে জল শুষে নিতগাছের শিকড়ের ফাঁকে-ফাঁকে জল জমে থাকতসারা বছর এই জল বেরিয়ে নেমে যেত নদীতেএমনই একটা নদী ছিল সোনাতি
কিন্তু…” বিঙ্কা বলতে শুরু করল, কিন্তু ওকে হাত তুলে থামিয়ে দিয়ে জল-সাধু বলল, “কিন্তু যত দিন যাচ্ছে, ততই মানুষ গিয়ে পাহাড়ের গায়ে বাসা বানাচ্ছেবাড়ি তৈরি করছেবড়-বড় শহর তৈরি হচ্ছেমানুষের কাঠের প্রয়োজন বাড়ছে, মানুষ গাছ কাটছে। পাহাড়ের ধারে গাছের জঙ্গল সাফ হয়ে যাচ্ছে।
পুশ্চু বুঝল না। বলল, “কিন্তু তার জন্য নদীর জল কমে যাবে কেন, কাকু?”
কাকু বলল, “গাছ কাটার জন্য পাহাড়ের মাটি আলগা হয়ে যাচ্ছে। তার ফলে মাটি আর বৃষ্টির জল ধরে রাখতে পারছে না। বৃষ্টি হলে মাটি ধুয়ে চলে আসছে নদীতে।
এবার বোঝা গেল কেন নদীর জল এত ঘোলা। কাকু বলল, “শুধু তাই না। অসংখ্য গাছ কাটার ফলে, শহর বানানোর ফলে, কলকারখানা, যন্ত্রপাতির ফলে পৃথিবী গরম হয়ে যাচ্ছে। যার ফলে পাহাড়ে বরফ আর জমতে পারছে না। ফলে বৃষ্টি হলে সব জলটাই হু-হু করে নদী নালা বেয়ে নেমে আসছে।
বিঙ্কা আর থাকতে পারল না। বলল, “এই জন্যই আজ কাল বন্যা বেশি হচ্ছে?”
কাকু মাথা নেড়ে বলল, “ঠিক। পাহাড়ে বরফ নেই, বর্ষার জল ধরে রাখছে না মাটি। সেই জন্য বর্ষায় বন্যা, আর অন্য সময়ে নদীতে জল কম।
এবার চেয়ার ছেড়ে উঠে পায়চারি করতে করতে অনেকটা নিজের মনেই আওড়াল
দুনিয়ার নিয়মের হেরফের করে
জগতটা যেন তেন চালাসনে ওরে।
এক দিন থেমে যাবে যে কল সচল
জীবন তোদের হবে ক্রমেই অচল।
সূর্যের তেজ হবে ভীষণ ভয়াল
গ্রীষ্মের দাবদাহ ক্রমেই করাল,
নদী নালা শুখা হয়ে মাটি হয়ে যাবে,
সাগরের ঢেউ এসে ঘরবাড়ি খাবে।
এই কথা মনে রেখে প্রকৃতির সাথে
গাছের যত্ন নিবি, জীবন বাঁচাতে।
গাছ এনে দেবে নব প্রাণের জোয়ার,
গাছ থেকে উন্নতি পাবিই অপার।
গাছ কেটে মরুভূমি, গাছ কেটে বিষ
গাছ লাগা, খুঁজে পাবি প্রকৃত আশিস।”
বিঙ্কা বলল, “কিন্তু তাহলে নদী ফিরে আসার কোনও উপায় নেই?”
কাকু বলল, “আছে, কিন্তু তার জন্য আরও অনেক বছর লাগবে। আগে পাহাড়ের গায়ে, শহরের মধ্যে, চারিপাশে, দুনিয়ার যত খালি জমি পড়ে আছে, সেগুলোকে গাছে গাছে ভরিয়ে দিতে হবে। একটা গাছ বড় হতে কুড়ি, তিরিশ, কখনও পঞ্চাশ ষাট বছর সময় নেয়। সেই গাছ মানুষ কেটে ফেলতে পারে মাত্র কয়েক মিনিটে। সেই গাছ আবার লাগাতে হবে, বাড়তে দিতে হবে, তবে না...”
বিঙ্কা বলল, “আমাদের তো অত সময় নেই, গ্রামশুদ্ধ মানুষ মরে যাবে যে!”
কাকু মাথা নাড়ল। “না, গ্রামশুদ্ধ মানুষ মরবে না। অনেকে মরতে পারে, তবে মানুষ নিজের মতো আবার নিজের জায়গা খুঁজে নেবে। এটা আমার বিশ্বাস। তবে হ্যাঁ, অসুবিধা হবে। জীবন কষ্টকর হয়ে যাবে।”
পুশ্চু বলল, “তুমি আমাদের সাহায্য করবে না?”
কাকু চুপ করে একটু ভাবল। তার পরে বলল, “তোমরা একটা কথা ভেবে দেখোতোমাদের আমি সাহায্য কেন করব? দূর থেকে এসেছ বলে? এই যে পাহাড় দেখছ, এই পাহাড় হাজার হাজার মাইল লম্বা। পাহাড় থেকে কটা নদী নেমেছে জানো? অন্ততঃ পঁচিশটা বড়ো নদী। আর ছোটো নদী কত তার ইয়ত্তা নেই। এই পঁচিশটা বড়ো নদী মিলে মিশে শেষ পর্যন্ত নটা মহানদী হয়েছে। এই নটা মহানদী কত হাজার গ্রাম, কত শত শহর, কত লক্ষ মাইল জল নিয়ে যেত, কেউ জানে না। আমি এই পাহাড়ের গায়ে কাজ করছি। গত দশ বছরের বেশি সময় আমি এই পাহাড়ে ঘুরে ঘুরে গ্রামবাসীদের শেখাচ্ছি কী করে আরও গাছ লাগাতে হবে, আরও যত্ন করতে হবেআমার আরও কাজ আছে। সে সব ছেড়ে আমি কোথায় কুকুম্পার জঙ্গলেরও ওপারে তিন দিন তিনরাত্তির দূরে এক ঝুরঝুরি গ্রাম, তাদের জলের সমস্যা মেটাতে আমি কেন যাব? তাতে অন্য হাজার হাজার গ্রামের মানুষের কী হবে? তাদের কাছেও তো তাহলে আমার যাওয়া উচিত।”
ঠিক কথা। বিঙ্কা হতাশ হয়ে পুশ্চুর দিকে তাকাল। পুশ্চু একটু ভেবে বলল, “কিন্তু তারা তো তোমার কাছে আসেনি সাহায্য চাইতে। আমরা এসেছি।”
কাকু হঠাৎ ওদের দিকে ফিরে হা হা করে হেসে উঠল। তার পরে বলল, “তাহলে তোমরা আমার জন্য কী করবে? আমি তো এমনি এমনি যাব না?”
আবার মুখ চাওয়া চাওয়ি করল ওরা। আমতা আমতা করে পুশ্চু বলল, “কাকু, আমরা তো পয়সা কড়ি নিয়ে আসিনি। তবে আমরা গ্রামের লোককে যদি বলি তুমি নদী ফিরিয়ে দিতে এসেছ, তাহলে ওরা নিশ্চয়ই তোমাকে...”
কাকু আঙুল তুলে ওদের থামিয়ে দিয়ে বলল, “কয়েকটা কথা বুঝে নাও – প্রথমত, আমি তোমাদের গ্রামে গেলে নদী ফিরে আসবে না। নদী নামবে এখান থেকে। এই পাহাড় থেকে। আমি তোমাদের গ্রামে গেলে তোমাদের শিখিয়ে দেব কী করে জলের অন্য ব্যবস্থা করতে হবে। যেমন অকুম্পাদের শিখিয়েছি। দ্বিতীয়ত, আমি টাকা পয়সা চাই না। আমি চাই অন্য কিছু।”
কী রে বাবা! দুজনে দুরুদুরু বুকে তাকিয়ে রইল।
কাকু বলল, “আমি খাটনি চাই। প্রথমত আগে তোমরা দু’জনে আমার পাহাড়ের কাজে সাহায্য করবে। আর তারপরে, আমি তোমাদের গ্রামে গিয়ে যদি তোমাদের জলকষ্ট দূর করতে পারি, তাহলে তোমরা তোমাদের আশেপাশের গ্রামে গিয়ে সেই পদ্ধতি সেসব গ্রামের লোকেদের শিখিয়ে দেবে। তোমরা তোমাদের গ্রামের চারিপাশের ফাঁকা জমিতে গাছ লাগাবে। সবাইকে শেখাবে গাছ লাগাবার কথা। কথা দাও।”
বিঙ্কা বলল, “কাকু, আমরা তো বড়ো হইনি। আমাদের মা বাবা যদি আমাদের অনুমতি না দেয়? আমরা বাড়ি থেকে পালিয়ে এসেছি এত দূর। এর ফলে তো আমাদের বাড়িতেই বন্ধ করে রেখে দিতে পারে মা বাবা।”
কাকু একটু হাসল। বলল, “আমি তোমাদের সঙ্গে এখনই যেতে পারব না। আমার কাজ খানিকটা গুছিয়ে নিয়ে যেতে হবে। তার মধ্যে যদি তোমরা দু’জনে আবার গ্রামে ফিরে যাও, তাহলে না বলে পালাবার জন্য খুব শাস্তি পাবে। আমাকে সঙ্গে করে যেতে পারলে অত শাস্তি পাবে না তোমরা। এবার ভেবে বল, কী করতে চাও।”



কত দিন পরে, সে দু-বছর না দশ বছর, কে জানে, সোনাতির নদীর বালির চরায় সামান্য জলে মাছ ধরছিল ঝুরঝুরি গ্রামের পাঠশালার গুরুমশাই। ঝুরঝুরি আর আগের মতো নেই। জলের অভাবে মাছ ধরে, চাষ-বাস মাথায় উঠেছে, ছেড়েছুড়ে দিয়ে চলেও গেছে অনেকেই। আজকাল পাঠশালায় ছাত্র আসে না বেশি। গুরুমশাইয়ের কাজও কম, রোজগারও কমে গেছে। তাই মাছ ধরে খায়।
জলে কার ছায়া পড়ল। গুরুমশাই ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল, পুন্তু। বলল, “আয়, বোস।”
পুন্তু পাশে বসে বলল, “আজ কত দিন হয়ে গেল, গুরুমশাই।”
গুরুমশাই জানে। বলল, “জানি। রোজই ভাবি আজ আসবে বুঝি।”
গ্রামের লোকেরা গুরুমশাইয়ের ওপরে ভীষণ রেগে গিয়েছিল। বলেছিল, “আপনার লজ্জা করে না? ওইটুকু বাচ্চা দু-জনকে একা একা পাঠিয়ে দিলেন নদী আনতে?”
গুরুমশাই বলেছিল, “আমি ওদের পাঠাইনি, ওরা নিজেরাই গেছে। আমি ওদের সাহায্য করেছি। সাহায্য না করলে কোথায় যেত, কী করত কে জানে!”
গ্রামের লোকে মানেনি। বলেছে, গুরুমশাইয়ের উচিত ছিল ওদের আটকান। ওদের বাবা-মায়েদের খবর দেওয়া। অনেকেই গুরুমশাইকে আর পছন্দ করে না। বিঙ্কা আর পুশ্চুর মা-বাবা গুরুমশাইকে দেখলে অন্য দিকে চলে যায়।
পুন্তু উত্তর দিকে তাকিয়ে দেখল। সকাল এখনও বেশি হয়নি, তবু, রোদের তাতে মাঠ গরম হয়ে হাওয়া তির-তির করে কাঁপছে। বলল, “হয়ত আর আসবে না।”
গুরুমশাই ফাতনার দিকে তাকিয়ে বলল, “আসবে। একদিন আসবে। ঠিক আসবে।”
পুন্তু উত্তর দিল না। গুরুমশাই বলল, “কেন, তোর কী মনে হয়?”
উত্তর নেই। ফাতনা থেকে চোখ সরিয়ে চট করে পুন্তুর দিকে তাকাল গুরুমশাই। পুন্তু তখনও উত্তর দিকে তাকিয়ে। আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়াচ্ছে। গুরুমশাই বলল, “কী রে, কথা বলছিস না, কোন দিকে চেয়ে আছিস? চেয়ে থাকলেই কি আসবে না কি?”
পুন্তু হাত দিয়ে চোখের ওপর ছায়া ফেলে বলল, “কে যেন আসছে।”
এবার গুরুমশাই তাকাল। কিন্তু বসা অবস্থায় ভালো বুঝতে পারল না। সাবধানে ছিপটা দুটো পাথরের ফাঁকে একটা খাঁজে আটকে নিজেও উঠে দাঁড়াল। মাঠের ওপারে কি কেউ চলছে? একজন, না দু’জন, না আরও বেশি?
খানিকক্ষণ দেখে গুরুমশাই বলল, “তিনজন আসছে, তাহলে বিঙ্কা আর পুশ্চু না। আর কেউ।”
পুন্তু তখনও তাকিয়ে। মাথা নেড়ে বলল, “আর একটু কাছে আসুক।”
দুজনে ঠায় তাকিয়ে রইল। সূর্যের তেজ বাড়ছে। তিনটে মানুষ আস্তে আস্তে কাছে আসছে। আরও অনেকক্ষণ বাদে লাফিয়ে উঠল পুন্তু। “ওটা দাদা! ওটা দাদা! ওটা দাদা!” বলে তিরবেগে গ্রামের দিকে ছুটল – “দাদা আসছে, বিঙ্কা আসছে, সঙ্গে আর একটা লোক।”
গুরুমশাই আস্তে আস্তে এগোতে শুরু করল ওদের দিকে।
বিঙ্কারা যতক্ষণে গ্রামের কাছাকাছি পৌঁছেছে, ততক্ষণে গ্রামশুদ্ধ মানুষ ভিড় করে এগিয়ে এসেছে।

সন্ধেবেলা ওরা সকলে আরাম করে পাঠশালার উঠোনে বসেছে। গ্রামের লোকে বিঙ্কা আর পুশ্চুকে ফিরে পেয়ে যত আনন্দিত, ততই অবাক ওদের কাকু শ্রাধ্রুজ লড্রুয়াকে দেখে। গ্রামের মোড়ল বিঙ্কার বাবা, বলল, “এ আবার কী নাম?”
গুরুমশাই বলল, “উত্তরের মানুষের নাম এরকম হয়।”

পুশ্চুর বাবা বলল, “এ নামে ডাকা খুব কঠিন। আমি উচ্চারণই করতে পারব না।”
শাধ্রুজ বলল, “সেই জন্যই তোমার ছেলে আমাকে কাকু বলে। বিঙ্কাও।”
বিঙ্কার বাবা, বলল, “কিন্তু আমরা তোমাকে কী বলে ডাকব। আমরা তো আর কাকু বলতে পারবো না!”
বিঙ্কা বলল, “আমি জানি। তোমরা সবাই ওঁকে জল-সাধু বলে ডাকবে!” বলেই হেসে গড়িয়ে পড়ল। শাধ্রুজ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “বুঝছি, ওটাই আমার নাম হয়ে দাঁড়াবে।”
তার পরে চায়ে চুমুক দিয়ে বলল, “শোন সবাই। বিঙ্কা আর পুশ্চু মাঠ-ঘাট-বন পেরিয়ে গিয়েছিল উত্তরের পাহাড়ে, তোমাদের জন্য নদী নিয়ে আসতে। কিন্তু পাহাড় থেকে নদী আর আসবে না। আসলেও সে অনেক অনেক বছরের ধাক্কা। তার আগে তোমাদের নিজেদের জলের ব্যবস্থা নিজেদেরই করে নিতে হবে।”
সবাই অবাক হয়ে এ-ওর মুখ দেখতে লাগল। বলে কী এই জল-সাধু? নিজেদের জলের ব্যবস্থা নিজেরা কী করে করবে লোকে?
শ্রাধ্রুজ বলল, “সারা দিন আমি গ্রামে ঘুরেছি। দেখেছি, এ গ্রামের বাড়ি ঘর দোর ভারি সুন্দর। কে বানিয়েছে, এ সব বাড়ি?”
মোড়ল, বিঙ্কার বাবা, একটু গর্বের সঙ্গে বলল, “আমাদের গ্রামে অনেক ভালো ভালো কারিগর আছে। এ সব তাদেরই তৈরি। রাজমিস্ত্রির অভাব নেই এ গ্রামে। তবে তাদের অনেকে এখন শহরে চলে গেছে।”
জল-সাধু বলল, “খুব ভালো কথা। তোমাদের আমি এমন এক রাস্তা বলে দেব, তাতে তোমাদের গ্রামে জলের অভাব থাকবে না, চাষের জলও পাবে। এমনকি গরমে ঠাণ্ডা থাকার উপায়ও তোমরা করতে পারবে। নদীতে জল আমি এনে দিতে পারব না, যত দিন না পাহাড়ের অবস্থা ফেরে। ওখানে অনেক কাজ বাকি।”
কয়েকজন রাজমিস্ত্রি এগিয়ে এল। বলল, “কী করতে হবে, বলে দাও।”
জল-সাধু বলল, “কুয়ো খুঁড়তে হবে। বিরাট কুয়ো।”
রাজমিস্ত্রিদের ভুরু কুঁচকে গেল। কুয়ো! এ আবার কী আবদার! কুয়ো তো খোঁড়ে কুয়োর মিস্তিরি। সেও অবশ্য আছে গ্রামে।
জল-সাধু বলল, “কুয়ো মানে কিন্তু সাধারণ কুয়ো নয়। এ কুয়ো রাজপ্রাসাদের মতো দেখতে। একে বলে বাওলি। কেউ জানো?”
সবাই অবাক। এ ওর দিকে তাকায়। মাথা নাড়ে।
সাধু বোঝালো, “কুয়ো যেমন মাটির নিচে নেমে যায়, তেমনই নামবে, কিন্তু কুয়ো হবে বিরাট চওড়া। আর মাটির নিচে কিছু দূর পরে পরে থাকবে ঘর। সিঁড়ি তৈরি হবে কুয়োর ধার ঘেঁষে। মানুষ কেন, গ্রাম শুদ্ধ সবাই নেমে যেতে পারবে এমন হবে কুয়ো। কুয়োর জল যেমন মাটির নিচ থেকে আসবে, তেমনই বর্ষার জল ধরার ব্যবস্থা থাকবে সে কুয়োতে। চার পাশের জমি থেকে কী করে বর্ষার জল টেনে এনে কুয়োতে ফেলতে হবে শিখিয়ে দেব আমি। সেই সঙ্গে গাছ লাগাতে হবে। গাছ লাগাতে হবে, দেখাশোনা করতে হবে, গাছ বেড়ে উঠলে সে গাছ মাটিতে জল ধরে রাখবে।”
যারা বাড়ি বানায়, তারা উৎসাহিত হয়ে এগিয়ে এল। বলল, “কী করতে হবে তুমি বলে দেবে?”
সাধু বলল, “অবশ্যই বলে দেবো। তোমাদেরও বুদ্ধি দিতে হবে। ছবি এঁকে দেবো। তোমরা বানাবে। আমি থাকবো। কোথাও অসুবিধা হলে আবার নতুন করে এঁকে দেবো ছবি।” বলে খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “তবে আমি তোমাদের জলের সমস্যা কমিয়ে দিলে তোমরা আমাকে কী দেবে? আমি পাহাড়ে আমার কাজ ফেলে এসেছি তোমাদের গ্রামে...”
গ্রামের লোকে সকলে জোর দিয়ে বলল, “কী চাও? আমাদের সাধ্যের মধ্যে হলে অবশ্যই দেবো।”
সাধু বলল, “বেশ কথা। আমি তিনটে জিনিস চাই। প্রথমত, আমি যেটা শেখাবো, তোমরা চারপাশের গ্রামে গিয়ে গিয়ে সেই উপায় শিখিয়ে দেবে যাতে সকলেই তাদের গ্রামে বাওলি তৈরি করতে পারে। তাতে সবারই জলকষ্ট কমবে। রাজি?”
সকলেই একবাক্যে রাজি।
সাধু বলল, “গাছ লাগাবে, আর আশেপাশে যেখানে যাবে তাদের শেখাবে অনেক গাছ লাগাতে। রাজী?”
হ্যাঁ।
সাধু বলল, “বেশ। এবার আমার তৃতীয় দাবি এই, যে আমি তোমাদের গ্রাম থেকে দু’জন সহকারী নিয়ে যাবো। একজন পুশ্চু আর অন্যজন বিঙ্কা।”
এবার আর সকলে একবাক্যে রাজি হল না। সকলে তাকাল পুশ্চু আর বিঙ্কার মা-বাবার দিকে। বিঙ্কা ফেরার পর থেকে ওর মার কান্না থামেনি। আবার চোখে আঁচল দিল। পুশ্চুর বাবা আর বিঙ্কার বাবাও মুখ তাকাতাকি করতে আরম্ভ করল।
এমন সময়ে পুশ্চুর মা বলল, “আমার আপত্তি নেই। তবে আমার একটা শর্ত আছে।”
আবার শর্ত? কী সেই শর্ত? বিঙ্কার বাবা গ্রাম প্রধান, বলল, “কী শর্ত?”
ওরা যদি জল-সাধুর সঙ্গে যায়, তাহলে ওদের বিয়ে করে যেতে হবে।”
এর উত্তরে বিঙ্কার বাবা-মা কী বলত আর জানা গেল না, তার আগেই জল-সাধুর পেছনে বসা বিঙ্কা উঠে ছুট্টে চলে গেল কোথায়। ওর দুই বোন ছুটলো ওর পেছনে, “দিদি, দিদি, তোর বিয়ে...” বলে চেঁচাতে চেঁচাতে।
গ্রামশুদ্ধ লোক বলল, “এটা দারুণ হবে। অনেক দিন সেরকম কোনও বিয়ে-শাদী হয়নি। তার ওপর গ্রাম-প্রধানের মেয়ের বিয়ে, খুব ভোজ হবে নিশ্চয়ই?”

পরদিন সাধু মস্ত কাগজ নিয়ে গুরুমশাইয়ের বাড়ির টেবিলে আঁকতে বসল। কী ভাবে কুয়ো নামবে, কী ভাবে তার চার ধারে মাটি খুঁড়ে খুঁড়ে বাড়ি তৈরি হবে, মাটির নিচে, একতলা, দোতলা... গ্রামের লোকে ভিড় করে দেখল।
তার পর শুরু হল মাটি খোঁড়া। সকাল থেকে সন্ধে পর্যন্ত কাজ চলে, কাকু দেখেপাশে পুশ্চু আর বিঙ্কা। মন দিয়ে দেখে, শোনে, প্রশ্ন করে জেনে নেয়, কোথায় কী হবে খুঁটিনাটি শিখে নেয়। শ্রাধ্রুজ লড্রুয়া ওদের বলেছে, বুড়ো হয়ে গিয়ে যখন আর পারবে না, তখন জল-সাধুর কাজের দায়িত্ব ওদেরই নিতে হবে।
গ্রামের লোক কাজের ফাঁকে ফাঁকে এসে ভিড় করে দেখে। কেউ চলে যায় দূর শহরে – সেখানে ওদের ছেলে, বাবা, কাকা, দাদা, ভাই – যারা রাজমিস্ত্রীর কাজ করে, তাদের ডেকে ডেকে ফিরিয়ে আনে। বলে, “শিখে নে, পরে কাজে দেবে!”
কাজের লোক বাড়ে। কাজ এগোয় তরতর করে।
বিঙ্কার বাবা বাড়ি ফিরে গম্ভীর থাকে। এক দিন বিঙ্কার মা বলে, “মেয়ের বিয়ের জোগাড় করতে হবে না? বসে বসে হুঁকো খেলেই চলবে?”
তখন বিঙ্কার বাবা বলে, “বিঙ্কার মা, আমি বড়োলোক ব্যবসায়ী, গ্রামের প্রধান। আমার মেয়ের বিয়ে হবে কি না এক গরিব মৎস্যজীবীর ছেলের সঙ্গে? আমি কত স্বপ্ন দেখেছিলাম...”
বিঙ্কার মা কোমরে হাত দিয়ে বলল, “, এই ব্যাপার! তুমি বড়োলোক ব্যবসায়ী আর পুশ্চুর বাবা গরিব? আর তোমার শ্বশুরমশাই কি ছিল? আমার বাবা গরিব বলে তো তার মেয়েকে বিয়ে করতে তোমার আটকায়নি! আজ নিজের মেয়ের বেলা আঁটিশুটি? চলবে না বলে দিলাম। পুশ্চুর মা আমার ছোটোবেলার বন্ধু। ওদের জন্ম থেকে আমরা বলে রেখেছি ছেলেমেয়ের বিয়ে হবে... তবে?”
বিঙ্কার বাবা চোখ গোলগোল করে বলল, “জন্ম থেকে! ওরে বাবা! তবে তো...” বলে গায়ে চাদর জড়িয়ে, চটি পরে গেল স্যাকরার দোকানে। বিয়ের গয়নার অর্ডার দিতে।

১০
তবে বিয়েটা হতে লাগলো আরও দু’বছর। ঝুরঝুরি গ্রামের মস্ত কুয়ো – বাওলি – বানানো শেষ হলো, তবে। ততদিনে চারিদিকে ঝুরঝুরি বিখ্যাত হয়ে গেছে। দূর দূরের গ্রাম থেকে লোকে আসতে শুরু করেছে, এই বলতে, যে আমাদের গ্রামেও জল-সাধু কি বাওলি তৈরি করে দেবে?

জল-সাধু অবশ্য আর নেই। ফিরে গেছে পাহাড়ে, তার নিজের জায়গায়। নিজের কাজে। দূর-গ্রামের মানুষদের সাহায্য করেছে বিঙ্কা আর পুশ্চু। কখনও ওদের গ্রামের কারিগর গিয়ে হাত লাগিয়েছে।
দু’বছর পরে, আজ ঝুরঝুরির বাওলি তৈরি শেষ। বিশাল কুয়ো। সে যেমন গভীর, তেমন চওড়া। মাটির নিচে, অনেক নিচে, কুয়োর জল। কুয়োর ভেতরে গোল করে ঘুরে ঘুরে নেমে গেছে চওড়া সিঁড়ি। বাচ্চারাও নেমে যেতে পারে অনায়াসে। কুয়ো এত বড়ো, যেন মাটির নিচে পুকুরআর এ ছাড়া, কুয়োর ভেতরে, গোল করে, থাকে থাকে ঘর। বর্ষায়, যখন কুয়োর জলে বৃষ্টির জল এসে পড়ে, তখন নিচের দিকের ঘরগুলো ডুবে যায়, কিন্তু, তার পরে, যত দিন যায়, জল কমে আসে। গরমে জল চলে যায় এক্কেবারে নিচে। তখন কুয়োর চারিপাশের ঘরগুলো থাকে ঠাণ্ডা। কী আরাম!
আজ গ্রামে ডবল উৎসব। বাওলির উদ্বোধন। গ্রাম প্রধান বিঙ্কার বাবা উদ্বোধন করবে। তার পরে বিঙ্কা আর পুশ্চুর বিয়ে। হইহই ব্যাপার।
বিকেলে উদ্বোধন, কিন্তু বিঙ্কার বাবার দেখা নেই। লোকে ভিড় করে এসেছে, অপেক্ষা করছে। বিঙ্কার মা উসখুস করছে। গেল কোথায় লোকটা?
শেষে, উদ্বোধনের সময় যখন প্রায় এসে গেছে, গম্ভীর মুখে এসে দাঁড়াল বিঙ্কার বাবা। লোকে বলল, “কোথায় ছিলে?”
বিঙ্কার বাবা বলল, “এই বাওলির উদ্বোধন কি আমার করা উচিত? না কি জল-সাধুর? এই বাওলি তো ওরই তৈরি খবর পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু এখনও তো এলো নাফলে আমাকেই...”
সবাই বলল, তা বটে। বাওলি তৈরি করেছে জল-সাধু। তবে এখন কোন পাহাড়ে ঘুরছে।
বাওলি উদ্বোধনের জন্য প্রদীপ জ্বালানো হল। ফিতে কাটতে হবে, নারকেল ভাঙতে হবে। এমন সময় গ্রামবাসীদের ভিড়ে কিসের হইচই? লোকে পেছন ফিরে ফিরে কী দেখে? দেখতে দেখতে হইচইটা বেড়ে গেল। শোনা গেল, “সাধু এসেছে, জল-সাধু, জল-সাধু!”
ভিড় ঠেলে সামনে এসে দাঁড়াল জল-সাধু শাধ্রুজ লোড্রুয়া। গ্রাম প্রধান বিঙ্কার বাবা উঠে নমস্কার করে বলল, “এসোএ কাজ তোমারই করা উচিত।”
সাধু মাথা নাড়ল। বলল, “না, আমি বাওলি উদ্বোধনের জন্য আসিনি। আমি এসেছি আমার প্রিয় বিঙ্কা আর পুশ্চুর বিয়েতে। আর উদ্বোধন করা উচিত আমারও না, তোমারও না, গ্রাম-প্রধান। বাওলির উদ্বোধন করা উচিত বিঙ্কা আর পুশ্চুর। তাই না? কই তোমরা? এসো এগিয়ে।”
কাছেই ছিল বিঙ্কা আর পুশ্চু। পেছন থেকে এগিয়ে এল কাকুর পাশে। প্রদীপ জ্বালাবার আগুনটা বিঙ্কার বাবার হাতে দিয়ে জল-সাধু বলল, “এসো, প্রদীপ আমরা সবাই মিলে জ্বালাই। আর তার পরে ফিতে কাটুক বিঙ্কা, নারকেল ভাঙুক পুশ্চু। তার পরে আমরা বিয়ের আসরে যাব।”
তাই হল। লোকে বলল, “এই ঠিক হয়েছে। কেন না বিঙ্কা আর পুশ্চুই তো বুদ্ধি করে নদী আনতে গিয়েছিল দূর পাহাড়ে!”

No comments: