Saturday, May 25, 2019

বুড়োর পাহাড়


সেই কবেকার কথা, সেই কতদূরের দেশ – সেখানে একটা গ্রাম, শহর থেকে অনেক 
অনেক দূরে। সে গাঁয়ের লোকের ভারি সমস্যা। গাঁয়ের বাইরে দুটি বিশাল পাহাড় – তারা
তাদের সব সমস্যার মূল। পাহাড়ের ছায়ায় তাদের চাষের ক্ষেতে আলো হয় না, পাহাড় 
পেরিয়ে নদী তাদের ফসলের জল নিয়ে আসে না, পাহাড়ে ধাক্কা খেয়ে বর্ষার মেঘ ফিরে 
যায় বছরের পর বছর অনাবৃষ্টিতে কাটে।
    দেশের রাজা গাঁয়ের মানুষের সমস্যার কথা বুঝতে চান না। বলেন, “ওখানে গিয়ে বাসা 
বাঁধতে তো আমি বলিনি? কিন্তু রাজার রাজ্যে বাস করবে, এদিকে খাজনা দেবে না, তা তো 
হয় না বাপু, তাহলে তো সক্কলেই ওই একই পোঁ ধরবে
     ফলে বছর বছর রাজার পেয়াদা আসে, অতি কষ্টে পাহাড় পার করে এসে দেখে খাজনা নেবার মত কিছুই নেই, তখন রাগ করে, ধরে মারে, বাড়ি ঘর ভেঙেচুরে যা পায় নিয়ে যায়।     এক দিন এক বুড়ো বললে, “ওই পাহাড় দুটোই সব নষ্টের গোড়া। ও দুটো কেটে ফেললেই তো হয়।
     যেমন ভাবা তেমন কাজ, চলল কোদাল আর ঝুড়ি নিয়ে
     লোকে বলল, “দাদু চললে কোথায়?”
     বুড়ো বলল, “পাহাড় দুটো কেটে মিশিয়ে দেব মাটিতে।
     শুনে সবাই হেসে কুটিপাটি। ভীমরতি হয়েছে বুড়োর। পাহাড় সরাবে কোদাল আর ঝুড়ি নিয়ে! ওরে শোন শোন কী বলছে দাদু।
     বুড়ো কথা না বলে হাঁটা দিল পাহাড়ের দিকে।
     খবর গেল বুড়োর ছেলের কাছে। সে ছুটলো বাবাকে আটকাতে।
     বুড়ো বলল, “সারা দিন হেঁটে অর্ধেক পাহাড় পার করে ঘাড়ে করে করে জল নিয়ে এসে বাড়ির বাগানের জলটুকু পাওয়া যায় না। পাহাড় দুটো না থাকলে জলের সমস্যা, ক্ষেতের সমস্যা, রোদ্দুরের সমস্যা সব মিটে যাবে।
     ছেলে বলল, “তা বলে, একা হাতে... ক’দিন লাগবে জানো?
     জানে না বুড়ো, কিন্তু তাতে কী সে দমবার পাত্র? বলল, “কেন? গাঁয়ের আর পাঁচটা 
লোক মিললেই তো সময় লাগবে কম। আর আমি ম’লে তুই, তোর পরে তোর ছাওয়াল... মানুষের কমি কই রে ব্যাটা?”
     কারো কথা শুনল না বুড়ো, সোজা গেল পাহাড়ের ধারে, রোজ মাটি কাটে আর ঝুড়ি 
ভর্তি করে এনে চারিদিকে ছড়িয়ে ফেলে দেয়। কয়েক মাস, নাকি কয়েক বছর, কে জানে কদিন পরে গাঁয়ের লোকে দেখল, আরে, কী আশ্চর্য! পাহাড়ের পাশটা কেমন খাওয়া মতন দেখাচ্ছে না?
     সবাই খুব উৎসাহ পেয়ে গেল আগে লোকে হাসাহাসি করত, এখন কয়েকজন করে বুড়োর সঙ্গে কোদাল ঝুড়ি-টুড়ি নিয়ে যেতেও শুরু করল পাহাড় কাটতে।
     আরও কিছুদিন পর, গাঁয়ের মাতব্বর তার ছেলেকে ডেকে বলল, “গাঁ শুদ্ধু লোক পাহাড় কাটতে যাচ্ছে। আমরাই কেবল বসে আছি।
     মাতব্বরের ছেলে বলল, “পাগল হয়েছ! আমরাও ওই আম জনতার মত কোদাল চালাতে যাব নাকি?
     মাতব্বর বলল, “পাগল হইনি, তবে মনে রেখো, সব্বাই যা করছে তা যদি না করেছো, কাল তোমার বাবার কথা এ গাঁয়ে আর কেউ মানবে না। সবাই ওই বুড়োর কথায় উঠবে বসবে। আর আমার পরে তোমাকেও কেউ কল্কে দেবে না, ওর ছেলেকেই পুঁছবেএখানে বসো, আমি বুঝিয়ে দিই কী করতে হবে।

কাজ চলছে, গাঁয়ের লোক পরিষ্কার দেখছে পাহাড় ক্ষইতে শুরু করেছে আরও দ্রুতগতিতে, এমন সময় একদিন বুড়োর খুব অসুখ করল। সবাই তাকে ধরাধরি করে বাড়ি নিয়ে এল, মাতব্বর নিজে এল বদ্যি নিয়ে। নাড়ি মেপে বদ্যি মাথা নেড়ে বলল, “এক্কেবারে বিশ্রাম। বলি বয়েসটা কত হল, খেয়াল আছে?
     বুড়োর কাজে যাওয়া বন্ধ, বাইরে বেরোন বন্ধ, খাট থেকে নামা বন্ধ। কিন্তু ছেলে রোজ এসে খবর দেয়, আজ এত মণ মাটি কেটেছে, সরেছে এত মণ পাথর।
     এক দিন বাড়ি ফিরে বলল, “আজ আমাদের পাহাড় কাটার পোকল্পের নাম দেওয়া 
হয়েছে তোমার নামে।
     বুড়ো জানতে চাইল, “পোকল্প মানে কী?
     ছেলে জানে না। গাঁয়ের মাতব্বরই কথাটা প্রথম সবাইকে বলে। সবাই মাতব্বরকে বলেছিল তার নামেই হোক প্রকল্প। মাতব্বর বলেছে, না। যার মাথা থেকে বেরিয়েছে বুদ্ধিটা, প্রকল্প তারই নামে হবে। মাতব্বর হবে পো...পো...পোধান পিষ্টোপোশাক।আরও বলেছে
বুড়োর ছেলে হবে সভাপতি, আর মাতব্বরের ছেলে হবে ওই কী বলে, কাজ্জো... নিব্বাহী... সম...সম... কী যেন একটা... হ্যাঁ, মনে পড়েছে, পাদক। কাজ্জো, নিব্বাহী, সম্, পাদক।
     না, এগুলোর কোনটার মানেই বুড়োর ছেলে কেন, গাঁয়ের কেউই জানে না। তবে 
মাতব্বর আর তার ছেলে জানে এবং বলেছে কোন চিন্তা নেই, ওকে ঠিক ঠিক বলে দেবে 
কখন কোনটা করতে হবে।
     ক’দিন পরে বুড়ো ছেলেকে ডেকে জিজ্ঞেস করল, “আজকাল আর রোজ পাহাড় কাটার কাজে যেন যাস না? কী হয়েছে?
     ছেলে বলল, “আরে, আমরা এখন পাহাড় কাটা সমিতির কম্মোকত্তা। আমরা তাই শুধু তদারকির কাজ করি। রোজ সব্বার না গেলেও চলে।
     আরও দিন যায়ছেলে খবর দেয়, পাহাড় আর নেই বললেই চলে। এক গ্রাম মানুষের জেদের কাছে প্রকৃতিকে হার মানতে হয়েছে। আর এ সব তারই জন্য। একটু গর্বও হয় বুড়োর। রোজ বৈদ্যকে বলে, “আজও অনুমতি দেবেন না?
     শেষে এক দিন বৈদ্য অনুমতি দিয়ে চলে যাবার পর ছেলে ধরে ধরে বুড়োকে বাড়ির বাইরে নিয়ে এল।
     থরোথরো দেহ নিয়ে লাঠিতে ভর দিয়ে বুড়ো বাইরে এসে ছানিপড়া চোখ নিয়ে মুখ 
তুলে তাকিয়েই আর্তনাদ করে উঠল, “তবে যে বলেছিলি পাহাড় প্রায় নেই? তবে আকাশ 
জুড়ে ও কী দেখছি সামনে?
     ছেলে গর্ব মাখা গলায় বলল, “ওটা তোমার পাহাড় নয়, বাবা, তোমার পাহাড় ওই দেখো পাশে, ওইটুকু। যেটা দেখছ সেটা তোমার পাহাড়ের মাটি ফেলে তৈরি হয়েছে।
     হতভম্ব বুড়ো বলল, “আমি তো পাহাড় খোঁড়া মাটি চারিদিকে ছড়িয়ে ফেলতাম।
     ছেলে বলল, “আমরাও তাই করতাম, কিন্তু দু তিন দিন পরেই সমিতি সিদ্ধান্ত নেয়
তাতে অনেক সময়ব্যয় হচ্ছে, তাই এখন থেকে কাটা মাটি ছড়িয়ে না ফেলে এক জায়গায় 
ডাঁই করা হবে।
     বুড়ো হাহাকার করে বলল, “আর আমাদের জলকষ্ট, ফসল ফলানো, আলো বাতাস 
বর্ষা?
     ছেলের মুখ দেখে বোঝা গেল প্রকল্পের সমিতি, তার সভাপতি, কার্যনির্বাহী সম্পাদক, প্রধান পৃষ্ঠপোষক, কেউই এতটা ভাবেনি।
     “তুই কালই গিয়ে বলবি,” ছেলেকে নির্দেশ দিল বুড়ো। “বলবি পাহাড় যদি থেকেই 
গেল, এত খাটনির মানে কী দাঁড়াল?
     কোনও রকমে ঘরে এসে আবার শুল বুড়ো।
     দিনের শেষে বাড়ি ফিরে ছেলে বলল, “সমিতি মানতে রাজি নয়। আমি খুব জোরাজুরি করাতে আমাকে ওরা পোতিক্কিয়াশীল না কী বলে ডাকল।
     বুড়ো পাশ ফিরে দেওয়ালের দিকে মুখ করে শুল। ভয়ে ছেলে বলতে পারল না, যে ও জোরাজুরি করেছে বলে সমিতি ওকে সভাপতিত্ব থেকে রেহাই দিয়ে অন্য একজনকে 
সভাপতি করেছে। এখন সবাই আলোচনা করছে, বুড়োর নাম বাদ দিয়ে গ্রামের নামেই 
প্রকল্পর নাম দেওয়া উচিত।

অনেক অনেক অনে-এ-এ-এ-এ-ক বছর কেটে গেছে। সেই নাম-না-জানা দেশের 
নাম-না-জানা গাঁয়ের লোকে আজ আর কেউ বুড়োর কথা, প্রকল্পের কথা, আর পাহাড় সরিয়ে ফেলার কথা জানেও না। সে প্রকল্পের রূপকার, যার মূর্তি পাহাড়ের পাদদেশে ছিল, সেই মাতব্বরের কথাও কারও মনে নেই। মূর্তিটাই নেই – কত বছর হয়ে গেল।
     কিন্তু পাহাড়ের আড়ালে বলে আজও সেই গাঁয়ে জল নেই, আলো নেই, চাষ হওয়া 
কঠিন, জল আনতে হয় আধখানা পাহাড় বেয়ে। আজও রাজার দূত এসে খাজনা না পেয়ে তাণ্ডব করে ফিরে যায় প্রতি বছর।
     এক দিন সকালে, গাঁয়ের এক জন লোক জল নিতে বেরোতে গিয়ে দেখে তার বুড়ো 
বাবা দাওয়ায় বসে হুঁকো খেতে খেতে চেয়ে আছে পাহাড়গুলোর দিকে।
     “কী দেখ, বাবা?” জানতে চাইল ছেলে।
     “ওই পাহাড়গুলো,” বলল বাবা। “ওগুলো আছে বলেই আমাদের গাঁয়ে না আছে আলো, 
না আছে নদী, না আছে বর্ষায় বিষ্টি। ওগুলোকে চেঁছে ফেলে দিলেই তো আমাদের দুর্দশার 
অন্ত হয়, না কি?”
     ছেলে বলল, “পাগল হলে নাকি? ওই অত্তো বড় পাহাড় চেঁছে ফেলবে কী দিয়ে? 
কোদাল শাবলের কম্মো নাকি!”
     “কেন নয়? সবাই মিলে হাত লাগালে একদিন পাহাড় ক্ষয়ে যেতে বাধ্য,” বলে বুড়ো 
বাবা হাতে কোদাল আর একটা ঝুড়ি নিয়ে রওয়ানা দিল পাহাড়ের দিকে।

No comments: