আজকাল তীর্থপ্রতীমবাবুর প্রায়ই মনে পড়ে দ্বীপটার কথা। একটা নদী, বা হয়ত বিশাল সরোবরের মাঝখানে ছোট্ট দ্বীপ, হেঁটে এধার থেকে ওধার দু-মিনিটও লাগে না। গাছপালা নেই। না, আছে। অনেক গাছ। ওপরে তাকালেই দেখা যায় বিশাল বিশাল গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে উজ্জ্বল নীল আকাশ চিকমিক করছে। কিন্তু মাটিতে গাছের চিহ্নমাত্র দেখা যায় না। চারিদিকে পরিষ্কার – আদিগন্ত।
সেটা আশ্চর্য লাগে না তীর্থপ্রতীমবাবুর। অবাক যেটা লাগে, তা হলো দ্বীপটায় অজস্র প্রজাপতি। শয়ে শয়ে, হাজারে হাজারে তারা উড়ে বেড়াচ্ছে। যে দিকে তাকান, সেদিকেই থিক থিক করছে প্রজাপতি। সাদা, লাল, নীল, কালো, কমলা আর হলুদের ছায়া-ছায়া ওড়া। ওপরে তাকালে গাছের কানাতের নিচে, আকাশের গায়ে আঁকা নিঃশব্দ ডানা মেলা প্রাণীগুলো যেন ওঁরই মাথার ওপরে পাক খেয়ে খেয়ে বেড়াচ্ছে। অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকেন।
কেন মনে পড়ে দ্বীপটার কথা? জানেন না। এমন কোনও দ্বীপে উনি কোনও দিন যাননি। এত প্রজাপতি একসঙ্গে দেখেননি কখনও। স্বপ্নেও না। স্বপ্নই দেখেন না তীর্থপ্রতীমবাবু। তাহলে? রোজ সকালে ঘুম থেকে উঠেই, তারপরে সারা দিনের ব্যস্ততার ফাঁকে ফাঁকে কেন চোখের সামনে ভেসে ওঠে ওই দৃশ্য? অথৈ জলের ধারে দাঁড়িয়ে রয়েছেন, শান্ত জল আস্তে আস্তে ছলাৎ ছলাৎ করে এসে পড়ছে পায়ের কাছে নদীর – না কি সরোবরের – পাড়ে। আর চারিদিকে ডানা মেলে-মেলে উড়ে বেড়াচ্ছে শয়ে শয়ে, না কি হাজারে হাজারে প্রজাপতি। এর মানে কী? কেন দেখেন এই দৃশ্য দিনের পর দিন?
*
“এখনও ওঠোনি?” নীলিমা ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে। গলায় সামান্য বিস্ময়।
তীর্থপ্রতীমবাবু প্রায় অনিচ্ছায় উঠে বসলেন। নীলিমা বললেন, “চা করছি। দাঁত মেজে এসো।”
তীর্থপ্রতীমবাবু চটি পায়ে দিয়ে উঠলেন বিছানা ছেড়ে। ছেলের হুকুম, বয়েস হয়েছে, ফটাফট বিছানা ছেড়ে উঠেই হনহনিয়ে হাঁটবে না। আস্তে আস্তে উঠবে, বসবে, দাঁড়াবে, তবে হাঁটবে।
পঁচিশ বছরের ওপর হয়ে গেল দীপ্তপ্রতীম এ কথা বলেছিল। আজ ও নিজেই ষাট ছুঁইছুঁই। আজ কি নাতি আয়ুষ্প্রতীম তার বাবাকে ওমনি সুরেই সাবধানে চলাফেরা করতে বলছে?
চা নিয়ে খাবার ঘরে এসে কেউ নেই দেখে নীলিমা অবাক হয়ে আবার শোবার ঘরে এলেন। আরও অবাক হয়ে দেখলেন তীর্থপ্রতীমবাবু জানলায় দাঁড়িয়ে বাগানের দেখছেন। বললেন, “কী হলো? এখনও এখানে দাঁড়িয়ে? দাঁত মেজেছ?”
তীর্থপ্রতীমবাবু ঘুরলেন। হাতে তোয়ালে। মানে মুখ ধুয়েছেন। তোয়ালেটা জায়গামতো রেখে নীলিমার পেছনে যেতে যেতে বললেন, “আজকাল বাগানে আর প্রজাপতি আসে না, না?”
নীলিমা উত্তর দিলেন টেবিলে বসে চায়ের কাপে প্রথম চুমুকটা দিয়ে। “অনেকদিন হলো আস্তে আস্তে প্রজাপতি কমছে। আশেপাশে আর ফাঁকা জমি, গাছপালা কই? বাড়ি-ঘর-দোরের মধ্যে তো আর প্রজাপতি জন্মায় না।”
অন্যমনস্কভাবে মাথা নাড়লেন তীর্থপ্রতীমবাবু। প্রজাপতিরা উড়ে গেছে এর মধ্যে। কাজের কথা গিজগিজ করতে লেগেছে। কাল বড়ো অর্ডার যাবে। চা খেতে খেতেই মনে মনে হিসেব করতে লাগলেন তীর্থপ্রতীমবাবু।
নীলিমা বললেন, “বাবান ফোন করেছিল। বলল দরকার আছে।”
চিন্তার সুতো ছিঁড়ে গেল। বললেন, “লাইনটা ধরো।” ওঁর আদ্যিকালের ফোনে আজকালকার নানা নতুন জিনিস চলে না। হোয়াটস-অ্যাপ না কী যেন – ভিডিও দেখা যায় ফোন করলে। ছেলে বিরক্ত হয়, কিন্তু উনি নাছোড়বান্দা। এই বয়সে নিত্যনতুন সামলাতে পারেন না।
মেলবোর্নে এখন দুপুর। বাবান অফিসে। ব্যবসারই কথা। এ বছর ওখানে যা অর্ডার হয়েছে, আর ওর এখন যা প্রোডাকশন, মনে করছে এখান থেকে কিছু পাঠাতে হবে না। সুতরাং তীর্থপ্রতীমবাবু যেন এই সিজনের জন্য এক্সপোর্টের কথা এখনই না ভাবেন।
কথা শেষ করে দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন তীর্থপ্রতীমবাবু। একটা সময় ছিল যখন অস্ট্রেলিয়াতে যা কেক এক্সপোর্ট করতেন, তাতে সারা বছরের রোজগার হয়ে যেত। সেজন্যই বাবানকে মেলবোর্নে পাঠান’। আজ ও ওখানে বেকারি খুলে এমনই ব্যবসা শুরু করেছে, যে এখান থেকে কিছুই লাগবে না।
পড়তি ব্যবসার মুখে ছাই নিজেই দিয়েছেন – নালিশও করতে পারেন না।
*
ভাবছিলেন অনেকদিন ধরেই। কথাটা শেষে বলল একদিন নীলিমা-ই।
“আর কতদিন এই শরীর নিয়ে বুড়ো বয়সে ব্যবসা করবে?”
সবে হেড-বেকার নেয়ামতের সঙ্গে কথা শেষ করেছেন। এরা আছে বলেই ব্যবসাটা চলছে। নইলে আজকাল তীর্থপ্রতীমবাবু আর কতক্ষণ দোকানে থাকেন? মাল কেনা, কেক বানানো, বিক্রি, টাকাকড়ির হিসেব – সবই নেয়ামৎ আর ওর দুই ছেলে ঘাড়ে তুলে নিয়েছে। বিশ্বস্ত লোক পাওয়া মুশকিল। ওরা না থাকলে কবে ব্যবসা লাটে উঠত।
সকালেই খেয়ে বেরোতেন আগে, আজকাল যান দুপুরে। চেয়ারে বসে বসে ঝিমোন। পাশে থাকে নেয়ামতের দুই ছেলে। একজন দোকান দেখে, অন্যজন হিসেবপত্তর বুঝে নেয়। ছেলেদুটোকে বেকিং শেখাতে পারেনি নেয়ামৎ। এটা একটা সমস্যা। নইলে ওদের হাতেই দোকান ছেড়ে দিতেন।
তা-ই বললেন নীলিমাকে। “কাকে দেব দোকান? বাবান তো ফিরবে না। নেয়ামৎ? ওর যদি অত ধক থাকত, এত বছর চাকরি করে অনায়াসে টাকাপয়সা জমিয়ে দোকান কিনে ফেলত। কিন্তু রয়ে গেল সেই তিমিরে। আমি নিজেই তো ওকে বলছি অন্তত বছর দশেক হলো। বলে, গরিবের হাতে টাকা থাকে না, বাবু – আমার দ্বারা হবে না।”
“ব্যাঙ্ক লোন নিতে পারে না?”
মাথা নাড়লেন তীর্থপ্রতীমবাবু। “দেবে না। কম তো বলিনি ম্যানেজারদের। ওদের একটাই কথা। চালাতে পারবে না, দোকান ডুবে যাবে। তারপরে পালাবে দেশে, তখন সে লোন উদ্ধার করা ব্যাঙ্কের পক্ষে অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে। দান করলেও পারবে না। তার ওপরে গুণ্ডা-বদমাশ তো আছেই। ওরকম প্রাইম লোকেশনে দোকান – দু’দিনে হাতছাড়া হয়ে যাবে।”
দোকান ছেড়ে দেবার কথা অনেক দিনই বলছে বাবান। বলছে, অস্ট্রেলিয়াতে যা রোজগার, বাবা অনায়াসে রিটায়ার করে জীবনের বাকি দিন ক’টা কাটাতে পারে। আর অস্ট্রেলিয়া সরকার ইমিগ্রেশনটাও দিয়ে দিলে বাড়িটাও বিক্রি করে ছেলের কাছে গিয়ে থাকতে পারে।
সে গুড়ে অবশ্য বালি – তীর্থপ্রতীম বা নীলিমা কেউ-ই এ বাড়ি ছেড়ে নড়ার পক্ষে নয়।
*
তিন পুরুষের ব্যবসা। শুরু করেছিলেন তীর্থপ্রতীমের বাবা। চাকরি ছেড়ে দিয়ে কিনে নিয়েছিলেন শহরের বিরাট বড়ো বেকারি – যার মালিক ততদিনে বুড়ো হয়ে গিয়ে ব্যবসা বিক্রি করে পালাতে চাইছেন। অস্ট্রেলিয়াতে ওদের বেকারির কেক-ই সাপ্লাই হত।
এখন দীপ্ত আর কেক আমদানি করতে চাইছে না। গত বারো বছর তো তীর্থপ্রতীমের ব্যবসা চালানোর মূল উদ্দেশ্যই ছিল দীপ্তকে কেক পাঠান’। এখানে তো আস্তে আস্তে সব বন্ধ হবার মুখে। শহরের প্রায় সব বড়ো হোটেলে পাউরুটির একচেটিয়া সাপ্লায়ার ছিলেন। প্রায় সব কেকের দোকানের মালিক বাইরে দাঁড়িয়ে হা-পিত্যেশ করতেন – কেক চাই। আজ সব বড়ো হোটেলেরই নিজেদের বেকারি। মাঝারি আর ছোটো হোটেলে ছুটোছুটি করে কনট্র্যাক্ট আদায় করার লোক নেই। পাড়ায় পাড়ায় ছোটো ছোটো বেকারির কেক এখন যথেষ্ট ভালো কোয়ালিটির। পড়ে কেবল রয়েছে অরিজিনাল দোকানটাই।
শহরের ব্যস্ত রাস্তায় ট্র্যাফিকে গাড়ি আটকে রয়েছে। আগে দুপুরের দিকে যানবাহনের ভীড় একটু কম থাকত। আজকাল সে সুখ নেই। হঠাৎ চমকে তীর্থপ্রতীম দেখলেন জানলার ঠিক বাইরে একটা প্রজাপতি। মেইন রোডের এই কংক্রিটের আবহে এমন হলদে-কমলা প্রজাপতি কোথা থেকে এল? প্রজাপতিটা থেমে থাকা গাড়ির পাশ দিয়ে উড়ে চলে গেল, তীর্থপ্রতীমবাবু অন্য দিকের জানলা দিয়ে তাকিয়ে আবার চমকে উঠলেন – এবারে একটা না, তিন চারটে। নিঃশব্দ ডানায় গাড়ির বাইরে উড়ছে।
চারপাশের যান্ত্রিক কোলাহল মিলিয়ে গেল। একটা ছোট্ট দ্বীপ। চারিপাশে শান্ত জল। স্রোত আছে? নেই বোধহয়। তবু হালকা ছোটো ছোটো ঢেউ এসে পড়ছে পায়ের কাছে। ওপরে তাকালে অনেক গাছের পাতা। চারিদিক ফাঁকা – না, ফাঁকা নয়। অজস্র প্রজাপতি। শব্দহীন অপার্থিব ওড়া।
কতক্ষণ দেখছিলেন দৃশ্যটা? হুঁশ ফিরল ড্রাইভারের ডাকে – “স্যার? এসে গেছি।” দোকানের ঢুকতে ঢুকতে ভাবলেন, অনেক বছর হলো, সাইনবোর্ডটা রং করানো হয়নি। নেয়ামৎকে বললেন রঙের মিস্তিরিকে ফোন করতে। এবারে বোর্ডের রং হবে কালচে মেরুন। লালের ভাব কম থাকলে রোদে জলে ফিকে হবে কম। দোকানের নাম চিরকালের মতোই অফ-হোয়াইট।
*
আজকাল শীত পড়ে না। মনে পড়ে, শহরতলীর এই বাড়িতেই শীতে অন্তত সপ্তাহ দুয়েক রুম হিটার জ্বালাতে হত। ভোরে আর সন্ধের পরে সোয়েটারের ওপরে চড়াতেন ওভারকোট। বয়স বেড়েছে, শীত সহ্য করতে পারেন কম। আগে সারা বছর কলের জলেই স্নান করতেন, এখন পুজোর পর থেকেই সে জল গায়ে লাগলে ছ্যাঁৎ করে ওঠে। মার্চ মাস অবধি জল গরম করতে হয়। কিন্তু কই, ওভারকোট তো পরতে হয় না। মাফলার, মাঙ্কি ক্যাপ লাগে না। আগে শীতের সময় গায়ে রোদ লাগলে ভালো লাগত। এখন চিড়বিড় করে।
শীতে সবার ছুটি। এ-ই তো কটা দিনের আনন্দের সময়। তীর্থপ্রতীমবাবু ছুটি নেননি কখনও। ফলে নীলিমা বা দীপ্তও ছুটি পায়নি। হয়ত কখনও মামাবাড়ি গিয়েছে মায়ের সঙ্গে। কিন্তু তীর্থপ্রতীমবাবু তিনশো পঁয়ষট্টি দিন দোকান খোলা রাখতেন। কেক না হলেও পাউরুটির প্রয়োজন মানুষের নিত্যকার। আর তখন তো হোটেলে নিত্য সাপ্লাই। নীলিমা রাগ করে বলত, “ভালো ব্যবসায়ী বলে বাবা এমন বিয়ে দিয়েছে – যেন কাগজওয়ালা, দুধওয়ালার ঘর করা। কাগজওয়ালারাও বছরে পাঁচটা ছুটি পায়। তোমার তো তা-ও নেই।”
এ বছর ছুটি নেওয়া যাবে? সকালবেলার মিঠে রোদে খবরের কাগজ হাতে বাগানে বসে চায়ে চুমুক দিতে দিতে ভাবছিলেন তীর্থপ্রতীমবাবু। এখনও রোদের তেজ বাড়েনি। পিঠে আরাম। এতদিন বছরের এই সময়ে ব্যস্ততার অন্ত থাকত না। হাজার হাজার কেক – বানানো, প্যাকিং করা, ইনভয়েস তৈরি করে করে পাঠান’ – বাবার সময়ে সব দৌড়োদৌড়ি করতেন তীর্থপ্রতীমবাবু-ই। এখন কুরিয়ার সার্ভিস সরাসরি বেকারি থেকেই সাপ্লাই করে বিদেশে। রপ্তানির আশি শতাংশ যেত অস্ট্রেলিয়ায়। এতদিন ওখানে সেই সাপ্লাইয়ের দায়িত্ব নিত দীপ্ত। কিন্তু এবছর কিছুরই আর দরকার নেই। স্থানীয় প্রয়োজন, আর প্রতিবেশী দেশে বা রাজ্যে যতটুকু রপ্তানি – সে দায়িত্ব নেয়ামৎ-ই নিতে পারবে। ছুটিতে যাবেন তীর্থপ্রতীম। কোথায় যাবেন? গত পঞ্চাশ ষাট বছর কোথাও যাননি। তাহলে?
তীর্থপ্রতীমবাবুকে ঘিরে ঘিরে একটা প্রজাপতি উড়ছে। হালকা নীল – যেন বরফের রং, আর তাতে কুচকুচে কালো লাইন টানা। এদিক ওদিক দেখলেন। আরে, বাগানে এত প্রজাপতি কোথা থেকে এল? না। তীর্থপ্রতীমবাবু বাগানে নেই আর। একটা দ্বীপে দাঁড়িয়ে আছেন। পায়ের কাছে এসে ছোটো ছোটো ঢেউ ভাঙছে। চারিদিক ফাঁকা। আর সেই ফাঁকা নৈঃশব্দ্যকে বাড়িয়ে তুলছে হাজার হাজার ছোটো ছোটো ডানা। হাজারে হাজারে প্রজাপতি উড়ে বেড়াচ্ছে তাঁকে ঘিরে।
*
কুরিয়ার কম্পানির ছেলেটা ক’দিন আগে এসেছিল। বলেছিল, চাকরি ছেড়ে ব্যবসা করবে। আপাতত পাহাড়ি এলাকায় একটা ছোটো হোটেল লিজ নিয়েছে। বিশাল বাগান, ঘর মাত্র দুটো। বলেছিল, “দারুণ ভিউ স্যার। সানরাইজ সানসেট দুই-ই ঘরের বারান্দা থেকে দেখবেন – এমনকি চাইলে খাটে শুয়েও। একবার ঘুরে যান। ভালো লাগবে। স্টেশন থেকে তুলে নেব, স্টেশনে নামিয়ে দেব। শুধু ট্রেনের টিকিট করে চলে আসুন। বললে, আমার বন্ধু আছে – ট্র্যাভেল এজেন্ট, সে টিকিট করে দেবে।”
কী মনে হয়েছিল, জানতে চেয়েছিলেন, “প্রজাপতি আছে তোমার বাগানে?”
ছেলেটা উৎসাহিত হয়ে বলেছিল, “আছে স্যার। কত প্রজাপতি! সে সব নামও জানি না। আমরা শহরে মানুষ... আপনি চিনবেন স্যার...”
তীর্থপ্রতীমবাবু যে প্রজাপতি চেনেন না, কোনও দিনই চেনেননি, সারা জীবনই গেছে কেক-পেস্ট্রি-পাউরুটি বিক্রি করে, সে আর বলেননি।
সেদিন দোকানে পৌঁছে ক্যাশের ড্রয়ার খুলে পাশে গুঁজে রাখা নানা কাগজপত্র, ভিজিটিং কার্ডের মধ্যে থেকে বের করে আনলেন কার্ডটা। নীলিমাকে সারপ্রাইজ দিতে হবে। তাই বাড়ি থেকে ফোন করা চলবে না। সব ব্যবস্থা করতে হবে দোকান থেকেই। আর তারপরে নেয়ামৎকে বলতে হবে চার দিন দোকান সামলাতে। নম্বরটা ডায়াল করে দোকান থেকে বেরিয়ে এলেন তীর্থপ্রতীম। ব্যস্ত রাস্তায় শব্দ বেশি, তবু, এখান থেকেই কথা বলে নিতে হবে। বয়সের সঙ্গে শক্ত হয়ে যাওয়া শরীরটা টেনে তোলা কঠিন। লাঠিতে ভর দিয়ে এগোতে হয়। তবু...
“কবে যাবেন, বলুন, স্যার। আমি এখান থেকেই সব ব্যবস্থা করে দেব। আর আমার বন্ধুর স্টাফ গিয়ে আপনাকে দোকানেই টিকিট দিয়ে আসবে, আপনাকে কিচ্ছু করতে হবে না – ম্যাডাম কিচ্ছুটি জানতে পারবেন না... স্যার, এবারে কত প্রজাপতি বাগানে! আপনি বলার পর থেকে আমি খালি দেখি। কত রকম প্রজাপতি...”
*
দোকানে কেবল বসে থাকা। নেয়ামৎও আজকাল বেকারিতে কম থাকে, দোকানেই আসে বেশি। বলে, “এবারে তো বাবু, কুছ কাম হি নেহি। ইতনাসা কেক বেচকে ক্যা ফাইদা!” উত্তর দেন না তীর্থপ্রতীম। আজকাল দোকানেও দেখতে পান প্রজাপতি দ্বীপটা। কেক, পেস্ট্রি, টার্ট, আর পাই-এর ফাঁকে ফাঁকে তারা উড়ছে – দোকানের বাইরে অথৈ জল, জল এসে প্রায় ছুঁয়ে যাচ্ছে তীর্থপ্রতীমের পা। আর চারিপাশে, আকাশের গায়ে আঁকা গাছের পাতার নিচে নিচে উড়ে বেড়াচ্ছে প্রজাপতিরা। অজস্র। অসংখ্য।
নীলিমাকে সত্যিকারের সারপ্রাইজ দিতে হলে দুটো স্যুটকেস গুছিয়ে ফেলতে হবে চুপিচুপি। কিন্তু সেটা ভাবতেই সমস্যাটাও খেয়াল হলো। নিয়ে যাবার মতো সুটকেস, ট্রাঙ্ক, ব্যাগ, বাক্স – কিছুই নেই বাড়িতে।
বাধ্য হয়ে বাজারে গেছিলেন তীর্থপ্রতীমবাবু। সুটকেসের দোকানে ঢুকে চোখ চড়কগাছ! এত রকম সুটকেস? কিন্তু কোনওটাই ওঁর পরিচিত চামড়ার চৌকোনা বাক্স নয়। এরকম বাক্স লোকের হাতে রাস্তাঘাটে চোখে পড়েনি এমন নয়, তবে ভালো করে চেয়ে দেখেননি কখনও।
শীতের দেশে একজনের তিন দিনের ছুটি কাটানোর মতো সাইজের বাক্স দু-চারটে দেখে একটা পছন্দ করে বললেন, “এরকম আর একটা দিন। নীল রঙের হবে?” নীলিমার প্রিয় রং। নামের জন্য – যৌবনে তামাশা করেছিলেন তীর্থপ্রতীমবাবু।
সেদিন বাড়িতে ওঁর পেছনে পেছনে ড্রাইভার রোজের মতো দুটো কেকের বাক্স আর বাজারের থলে নিয়ে এসেছিল, কিন্তু তার পরে যখন আবার ফিরে গিয়ে দুটো সুটকেস নিয়ে এল, তখন নীলিমার চোখগুলো গোল গোল হয়ে গেল।
তীর্থপ্রতীমবাবু ততক্ষণে বাথরুমে। হাত মুখ ধুচ্ছেন।
খেতে বসে বললেন, “বাক্সদুটোর একটাতে নিজের জন্য তিনটে শাড়ি-জামা ভরে নিও। আর সোয়েটার। শীতের দেশের জন্য। দু-দিনের ছুটি।” নীলিমা এতক্ষণ উত্তেজনায় ছটফট করছিলেন। বললেন, “তুমি ছুটিতে যাবে?”
তীর্থপ্রতীমবাবু বললেন, “তিনকাল গিয়ে এককালে ঠেকেছে। সারা জীবন কেক পাউরুটি বানিয়ে কাটল। আর তো কাজ নেই। ওই ছিল শীতকালে অস্ট্রেলিয়ায় কেক রপ্তানি, ছেলে তো সে-ও বন্ধ করে দিল। আর নিজে ছুটিতে চলেছে গাড়ি হাঁকিয়ে মেলবোর্ন থেকে সিডনি সমুদ্রের তীর ধরে। এর পরে, চলো বিছানা-শয্যা হবার আগে ঘুরে আসি অস্ট্রেলিয়া থেকেও।”
“আর ব্যবসা?” জানতে চাইলেন নীলিমা।
“বেচে দেব। আর খদ্দের পাওয়া অবধি এভাবেই চলুক, নেয়ামৎরা যতদিন পারে। যেদিন পারবে না, বন্ধ করে দেব। লোকসান শুরু হলে ছ’মাসও অপেক্ষা করব না।”
নীলিমা কী উত্তর দিল শুনলেন না তীর্থপ্রতীমবাবু। খাবার টেবিলের চারিদিকে তখন প্রজাপতিরা ভীড় করেছে। মাথার ওপর ঝিরঝিরে হাওয়ায় গাছের পাতার ফাঁকে ফাঁকে সূর্যের আলো এসে পড়ছে তীর্থপ্রতীমবাবুর পায়ের কাছে। সেখানে ছোটো ছোটো ঢেউ ভাঙছে কাদার চরে।
বললেন, “ওখানে পাহাড়ি বাগানে অজস্র নাকি প্রজাপতি।”
একটু অবাক হয়ে নীলিমা তাকালেন – আজকাল মাঝেমাঝেই প্রজাপতির কথা বলেন তীর্থপ্রতীমবাবু। বয়স হলে কতরকম অদ্ভুত খেয়াল হয় লোকের... তবে এ-ও সত্যি, যে এবছর শীতে যেন আগের চেয়ে বেশি প্রজাপতি দেখা যাচ্ছে বাগানে...
পরদিন সকালে বাবানের পরিত্যক্ত ঘরের আলমারি থেকে গরম জামা বের করতে করতে একজোড়া মোজা হাতে শোবার ঘরে এসে কী জিজ্ঞেস করতে গিয়ে থমকে গেলেন নীলিমা। বিছানায় শুয়ে তীর্থপ্রতীমবাবু। চোখ বোজা চিরদিনের মতো। অবাক হয়ে দেখলেন, ঘরের ভেতরে, খাটের চারিদিকে নানা রঙের ডানা মেলে নিঃশব্দে উড়ে বেড়াচ্ছে অসংখ্য প্রজাপতি।
তখন তীর্থপ্রতীমবাবুও সেই দ্বীপে দাঁড়িয়ে। প্রজাপতিরা তাঁর মাথার চারিপাশে উড়ে বেড়াচ্ছে। লাল, নীল, হলদে, কমলা, কালো, সাদা... আর পায়ের কাছে নিঃশব্দে ছোটো ছোটো ঢেউ ভাঙছে কাদার তীরে।
2 comments:
AMADER IST YEAR E EKDIN PROFESSOR ARUN SEN (SESOMOYER ONE OF THE BEST ECONOMIST)ESE JE GOLPOTA BOLECHILEN SETA E-ROKOM:-
PASAPASI DUTO BARI , TADER DUI MEYE, EKJONER BIE HOEYCHE SERVICE HOLDER ER SONGE AR EKJONER HUSBAND BUSINESSMAN. PROTHOM JONER SASUR BARITE PROTECH BOCHOR KHUB DHUMDHAM KORE JAMAISHATI HOI KINTU SECOND BARIR JAMAI ASTE PARENA.
BES KICHU BOCHOR PORE SASUR GIE JAMAIKE BOLLO BABA EBAR NA GELEI NOI, TOMAR MA BHALO NEI KOBE KI HOE JABE, TUMI EKBELAR JONNE HOLEO ESO. JAMAI KONOMOTE RAJI HOLO.
DUI BARITE MAHA DHUMDHAM.
JAMAISHOSTIR DIN SOKAL-E DUI JAMAI ER DEKHA, JAMAI NUMBER -1 TO SEJEGUJE HAZIR... SAMNE GIA HAT BARIEI DAKHE COMPANIR OWNER BOSE ACHE................
DIFFERENCE BETWEEN A SERVICE HOLDER AND A BUSINESSMAN.
দারুণ গল্প!
Post a Comment