Saturday, March 11, 2023

গ্রামের বাড়ি

রাতে খেতে বসে শ্রীপর্ণ বলল, “মিনি, একবার গ্রামের বাড়িতে যাবে?”

মিঞ্জিরি চমকাল। বারো বছরের বিয়ে। শ্রীপর্ণ গ্রামের বাড়ির কথা-ই বলেনি কোনও দিন, যাবার কথা দূর অস্ত্‌। মিঞ্জিরি মাঝে মাঝে তামাশা করে যদি নতুন বিয়ের পরে ‘তোমার ছোটোবেলার ছবি দেখব’ বলে আবদার না করতাম, তাহলে হয়ত কোনও দিন ওবাড়ির কথা জানতেই পারতাম না।” বিয়ের পরে পরে জোর করেই গ্রামে নিয়ে গিয়েছিল শ্রীপর্ণকে। তিন দিনের বিশ্রাম মোটেই বিশ্রাম হয়নি। প্রতি মুহূর্তে গ্রাম্য জীবনে, গ্রামের বাড়িতে আরাম আর স্বাচ্ছন্দ্যের অভাবে শ্রীপর্ণ এমনই অস্বস্তি আর বিরক্তি প্রকাশ করেছিল, যে চার দিনের দিন শহরের ফ্ল্যাটে ফিরে একরকম হাঁপ ছেড়েছিল মিঞ্জিরি। শ্রীপর্ণর সারাক্ষণের নালিশ বাদে ওর অবশ্য খুব খারাপ লাগেনি। খোলা হাওয়া, সবুজের সমারোহ, ভোরবেলার পাখির ডাক আর সন্ধের ঘনিয়ে আসা আঁধারে নদীর তীরে বসে সূর্যের আলোর মুছে যাওয়া ওর ভালো লাগে। বাড়িটাও, মাটির দালান যদিও, বেশ বড়ো। হাত পা ছড়িয়ে থাকা যায়। কিন্তু ফিরে আসার পরেও কয়েক সপ্তাহ ধরে গ্রাম্য জীবনের নানা অসুবিধার কথা শ্রীপর্ণ এমন ফলাও করে বলেছে থাকার অস্বাচ্ছন্দ্য, রাস্তাঘাটের অভাব, গাড়িটাকে পর্যন্ত গাছতলায় পড়ে থাকতে হলো — শীতে মশা, গ্রীষ্মে গরম, বর্ষায় কাদাভরা রাস্তাঘাট, শরতে গ্রাম্য পুজো... অজুহাতের প্রাচুর্যে মিঞ্জিরিও আর ফিরে যাবার কথা বলেনি।

তাই খাবার মুখে তুলতে গিয়ে থমকে গিয়ে মিঞ্জিরি বলল, “কী বললে? আবার বলো?”

হেসে ফেলল শ্রীপর্ণ। বলল, “প্যাঁক দেবার কোনও দরকার নেই। সত্যিই ভাবছি।”

আবার খেতে শুরু করে মিঞ্জিরি বলল, “বেশ, শুনি কী ভাবছ।”

শ্রীপর্ণ বলল, “দেখো, রিটায়ারমেন্টের বয়স আরও না পেছোলে আমার কর্মজীবন আর একুশ বছর। তোমার কুড়ি। এখন অবধি ভালোই আছি... তোমার চাকরির কল্যাণে শহরের পশ্‌ এলাকায় এই বিরাট ফ্ল্যাট। কিন্তু ট্যাঁকের টাকায় ফ্ল্যাট কিনতে গেলে শহরতলী ছেড়ে নতুন গড়ে ওঠা বসতিতে যেতে হবে। তাই না?”

তাই। এবং সেজন্যই শহরপ্রেমী শ্রীপর্ণর এখনও নিজের বাড়ি নেই।

তাহলে, যদি বাজার-হাট-মল্‌-আড্ডা ছেড়ে দিকশূন্যপুরেই যেতে হয়, তাহলে কেন গ্রামের বাড়িতেই ফিরে যাই না?”

ওই বাড়িতে?” অবাক হয়ে আবার খাওয়া থামাল মিঞ্জিরি। “এত দিন বলতে, আদ্যিকালের বাড়ি, ছোটো ছোটো ঘর, অ্যাটাচড বাথরুম-টয়লেট নেই…”

এবার উৎসাহিত হয়ে বাঁ-হাতে টিভির রিমোটটা তুলে নিল শ্রীপর্ণ। বলল, “সেটাই বলছি। তোমার মনে আছে, আমাদের বাড়ির পেছনের পুকুরের ওপারে চৌধুরীদের জমিদারবাড়ি?”

আছে। বারো বছর আগে দেখা শ্বশুরবাড়ির পেছনের পুকুরের ওপারে প্রতিবেশীর বাড়ির কথা মনে থাকার একাধিক কারণ আছে। “সেখানে কী হয়েছে?”

রিমোটের বোতাম টিপে টিভি চালু করল শ্রীপর্ণ। ফুটে উঠল একটা এমন অদ্ভুত ছবি, যে মিঞ্জিরি একেবারে হাঁ হয়ে গেল। সামনে, যাকে বলে ফোরগ্রাউন্ডে একটা গ্রামীণ পুকুর। তার ওপারে, গাছের ফাঁকে ফাঁকে যেটা দেখা যাচ্ছে, সেটা কোনওভাবেই এদেশি গ্রাম্য বাড়ি নয়।

খাওয়া মাথায় উঠল। কুড়িটারও বেশি ছবি পাঠিয়েছে শ্রীপর্ণর খুড়তুত দাদা। শ্রীপর্ণ সেগুলোকে মোবাইল থেকে স্ক্রিন-কাস্টিং করে টেলিভিশনে দেখাল। বলল, “একদম মডার্ন — চৌধুরীদের মেয়ে বানিয়েছে। ওই শানু। নাকি অ্যামেরিকায় থাকত। এখন গ্রামের বাড়িতে এসে থাকবে।”

মিঞ্জিরি অবাক হয়ে বলল, কিন্তু জিতুদা এই ছবি পেল কোত্থেকে?”

হোয়াটস-অ্যাপে। গ্রাম থেকে চিতু ছবি তুলে ওকে পাঠিয়েছে, আর ও পাঠিয়েছে আমাকে।”

চিতু শ্রীপর্ণর আর এক খুড়তুতো ভাই। গ্রামেই থাকে। জমিজমা দেখাশোনা করে। শ্রীপর্ণ বলেছিল, ছোটোবেলা থেকে নাকি ওকে সবাই বোকা বলত। পড়াশোনা হয়নি, তাই। তবে শ্রীপর্ণ মনে করে চিতুর বুদ্ধি কম নয়। পড়াশোনায় ইন্টারেস্ট ছিল না, তাই স্কুলের গণ্ডী পেরোয়নি। মিঞ্জিরিরও তাই মনে হয়েছে। গ্রামে বড়ো হওয়া তিন ভাইয়ের মধ্যে জিতু ছিল পড়াশোনায় সবচেয়ে উজ্জ্বল। ও এখন কানাডায় ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর, শ্রীপর্ণ (ডাক নাম শীতু) পড়াশোনায় মাঝারি — দেশেই কলেজে পড়ায়, আর চিতু গ্রামেই থাকে, জমিজমার দেখাশোনা করে।

ফোন বন্ধ করে খাবার থালায় মন দিল শ্রীপর্ণ। বলল, “শানুরা নাকি ফিরেছে দেশে। বাড়ি বানিয়ে গ্রামে গিয়ে উঠেছে।”

, প্রাক্তন প্রেমিকা এখন গ্রামে? সেইজন্যই দেশের বাড়ির প্রতি টান বেড়েছে হঠাৎ?”

শ্রীপর্ণর চোখে এখন চালশে। খেতে বসে চশমা লাগে। অর্ধচন্দ্র রিডিং-গ্লাসের রেলিং টপকে তাকাল মিঞ্জিরির দিকে। মনে রেখেছে মিঞ্জিরি। শ্রীপর্ণদের স্কুলে পড়ার বয়সে বাংলার গ্রামে ছেলে-মেয়ের মধ্যে বন্ধুত্ব ছিল বিরল। বিশেষত যেখানে একটা পরিবার এককালে জমিদার ছিল আর অন্য পরিবার সেই-কালে ছিল সে জমিদারেরই নায়েব। তবু, একই বয়সী, কাছাকাছি স্কুলে পড়া দু-জন প্রায় ঘণ্টাখানেক হেঁটে বা সাইকেলে একই সঙ্গে যাওয়া আসার সুবাদে বন্ধু হয়ে গিয়েছিল। আর একটু বয়স বাড়ার পরে হয়ত সে বন্ধুত্বের অনুভূতিতে একটা রোমান্সের ছোঁয়াও ছিল। তবে সাহস, সময় আর সুযোগের অভাবে সে অনুভূতি সেখানেই থেকে গেছে। দুজনের বন্ধুত্ব যেখানে পৌঁছেছিল, সেটা তখন তাদের গুরুজনেরা জানতে পারলে তড়িদাহত হতেন সন্দেহ নেই, কিন্তু আজকের নিরিখে ‘কিছু’-ই হয়নি। শানুর সঙ্গে ওর সম্পর্কের প্রত্যেকটা কথা না জানলেও, এতটা মিঞ্জিরি জানে, তবু পেছনে লাগতে ছাড়ল না

যা ছিল তাকে প্রেমিকা হয়ত তখনকার দিনে হয়ত বলা যেত, কিন্তু আজ বলা যাবে না। বন্ধু ছিলবেস্ট ফ্রেন্ড। তখন তো আর একটা ছেলে আর একটা মেয়ের মধ্যে তেমন ভাবে প্রেম হতে পারত না — তাই…”

মিঞ্জিরি বলল, “তবু, কিছু একটা ছিল তো।”

ছিল কিছু একটা। সমবয়সী একজোড়া ছেলে-মেয়ে বাড়ির নজর এড়িয়ে বন্ধু। বয়ঃসন্ধিতে বন্ধুত্বে রোম্যান্সের ছোঁয়া। সে কথা কাউকে বলার উপায় ছিল না। তবে তার ঠিক পরেই দুজনের জীবন দু’দিকে মোড় নেয়। শ্রীপর্ণ যায় শহরে, শানু ভর্তি হয় স্থানীয় কলেজে। শ্রীপর্ণ চট করেই শহরের প্রেমে পড়ে, কলেজের তিন বছর পেরোতে না পেরোতেই গ্রামে ফেরা কমে যায়... পঁচিশ — না, প্রায় সাতাশ বছর হয়ে গেল, দু’জনের আর যোগাযোগ হয়নি। শানু কবে গ্রাম ছাড়ল জানলেও, কবে দেশ ছেড়ে বিদেশে পাড়ি দিয়েছে, কোথায় গিয়েছিল, কিছুই জানে না শ্রীপর্ণ।

তোমাদের তো শরিকী বাড়ি। সবাই রাজি না হলে বাড়ি ভেঙে নতুন করে বানাতে পারবে?”

শ্রীপর্ণর হাসি পেল। বাবারা তিন ভাই এক বোন। বাবা আর কাকাদের ছেলেরা মিলিয়ে ওরা তিন খুড়তুতো-জ্যাঠতুতো ভাই-ই উত্তরাধিকারী। বোন নেই। প্রবাসী পিসিও সন্তানহীন ছিলেন। বলল, “শরিক তো এখন আমরা মাত্র তিনজন। জিতুদারই আইডিয়া, পুরোনো বাড়িটা ভেঙে নতুন করে বানানো — শানুদের মতো। আমাকে জিজ্ঞেস করেছে। চিতুর আপত্তি নেই। ও তো জিতুদার কথায় সবসময়ই রাজি। জিতুদা বলেছে, তিনটে উইং হবে — যাতে আমরা একসঙ্গে, এবং পৃথকান্নও থাকতে পারি। একেবারে মডার্ন কনস্ট্রাকশন। শানুদের মতো সাহেবি হবে কি না সেটা ঠিক করেনি এখনও। মানে শরিকরা সবাই রাজি।”

আচ্ছা, ানুদের বাড়ি সম্বন্ধে গ্রামের লোকের কী মত? এত মডার্ন একটা কনস্ট্রাকশন দেখে কী বলছে তারা?”

মাথা নাড়ল শ্রীপর্ণ। অত জানে না। তবে আজকাল কি এরকম বিলিতি বাড়ি একেবারে অপরিচিত? গ্রামে তো এখন ইলেকট্রিসিটি আর ইন্টারনেট দুই-ই পৌঁছে গেছে। চিতুর কথায় বোঝা যায় ও অ্যামাজন প্রাইম আর নেটফ্লিক্স-টেটফ্লিক্সে মাঝেমাঝেই হলিউডের ছবি দেখে। এখন আর আগের মতো ব্যাক-অফ-বিয়ন্ড নয় ওদের গ্রাম


আগের বারের মতো প্রায় সাত ঘণ্টা নয়, ঘণ্টা চারেকেই পৌঁছে গেল। চিতু উঠোনের গাছতলায় বাঁশের কাঠামোর ওপর পাতার ছাউনি দিয়ে গ্যারেজ বানিয়েছে। বলল, “এবারে তো আর তিন দিন থেকে দশ বচ্ছরের জন্য পালাতে পারবি না — বার বার আসতেও হবে, তাই…”

প্রায় ছ’মাস কেটে গেছে শ্রীপর্ণ আর মিঞ্জিরির প্রথম আলোচনার পরে। কাগজপত্রে কাজ এগিয়েছে অনেকটাই। জিতুদার আর্কিটেক্ট বন্ধু সুজন মাথাই দায়িত্ব নিয়েছেন। সুজনকে চেনে না শ্রীপর্ণ। এরা সব জিতুদার বড়ো বয়সের বন্ধু — অনেককেই বিদেশে গিয়ে চিনেছে জিতুদা। আজ হাতেকলমে কাজ শুরু। জমি মাপজোকের জন্য সুজনের কর্মচারীরা আসবে। জিতুদা চাইছে, তখন যেন অন্তত শ্রীপর্ণ থাকে — সবটা চিতুর ওপর ছেড়ে দেওয়া ঠিক হবে না।

খিড়কির পুকুরে ডুব দিতে গিয়ে শানুর নতুন বাড়িটা দেখে চমকে গিয়েছিল, যদিও ছবিতে দেখা ছিল সবটাই। খিড়কির পুকুরের ওদিকের পাড়টাকেও যা করেছে, তাকে সাদা বাংলায় সৌন্দর্যায়ন বলে। শানু নাকি বাড়ি এসে চিতুকে বলে গেছে, ওরা যেন নিজেদের দিকটাকেও কিছু করে। গ্রাম্য খিড়কির পুকুর হলেও তাকে সুন্দর করতে তো আপত্তি নেই — স্নান, কাপড়-কাচা বন্ধ না করেও করা যায়। পুকুরটা নিয়ে কয়েক পুরুষ ধরে একটা আইনি সংঘর্ষ ছিল দু-পক্ষে। চৌধুরীদের জমিদারি থাকতেই শ্রীপর্ণদের পারিবারিক উত্থান হয় — শ্রীপর্ণর বাবার ঠাকুর্দা দাবী করেন পুকুরটা তাঁর। জমিদারের তখন পড়তি দশা, তবু জমিজমা বিক্রি করে মামলা করেন। আশ্চর্য ব্যাপার হলো, সেসব জমির-ও অনেকটাই নামে-বেনামে কিনে নেন শ্রীপর্ণর বাবার ঠাকুর্দা-ই। তারপরে সে মামলার দায়িত্ব এসে পড়ে শ্রীপর্ণদের ঠাকুর্দার ওপর। ব্যাস, ওই পর্যন্তই। তারপরে শ্রীপর্ণদের বাবা-াকারা আর মামলা চালিয়ে যেতে চাননি, নিশ্চিন্ত হয়েছিলেন শানুর বাবা-ও। আর এই প্রজন্মের তিন ভাইয়ের দু’জনের তো জমিজমা নিয়ে অত মাথাব্যথাও নেই। তাই শানু যখন পুকুরের মালিকানা নিয়ে কোনও উচ্চবাচ্য না করে কেবল চিতুকে প্রস্তাব দিয়েছিল, “তোমরা তোমাদের দিকটার দেখাশোনা করো, আর আমরা এ-দিকটা করব,” তখন জিতুদা লিখেছিল, “মেয়েটা তো ভালোই বলেছে। মামলায় টাকাকড়ির ফালতু অপচয় না করে মালিকানাটা শেয়ার করলেই ঝামেলা চুকে যায়।”

অত হাজার মাইল দূরে থাকলে যায়। যে মানুষগুলোর এই জমি, আর এই পুকুরের ওপরেই সমস্ত পরিচিতি নির্ভর করছে তাদের যায় না। চিতু যেমন শ্রীপর্ণর পাশে দাঁড়িয়ে চাপা গলায় বলল, “তোরা বললি বলেই আমি ছেড়ে দিলাম। নইলে…”

শ্রীপর্ণ ওদের দিকের পুরোনো ঘাটে দাঁড়িয়ে শানুদের ঘাটটা দেখছিল। নতুন ঘাট। পুকুরপাড়ও বাঁধানো। বাড়ির পেছনের জমির শেষে রেলিং। আগে এদিকে কোনও প্রাচীর বা বেড়ার বাধা ছিল না, দুই বাড়ির মধ্যে অনায়াসে হেঁটে যাতায়াত করা যেত অবশ্য যেত না কেউ-, মাঝে মাঝে, লুকিয়ে চুরিয়ে শ্রীপর্ণ ছাড়া। পেছনের বাগান নিয়ে মাথাব্যথা ছিল না শ্রীপর্ণদের। শানুদের ফলের বাগানও দেখাশোনার অভাবে জংলা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এখন শানুদের দিকটা যেন শহুরে প্রমোদকানন। বড়ো বড়ো আমগাছগুলো নেই। কিছু পেয়ারা আর বোধহয় সবেদা গাছ রয়েছে। আর ঘাসের গালচে। কিন্তু এদিকটা এখনও আগের মতোই জঙ্গুলে। জিতুদার পরামর্শে চিতু আর শ্রীপর্ণও কথা দিয়েছে, বাগান না হোক, ওদের দিকের পুকুরপাড়টাও ওরা এমনভাবেই সাজিয়ে নেবে। পুকুরে চিরাচরিত কাজ — যেমন স্নান করা, কাপড় কাচা, বাসন মাজা আপাতত চলবে, কিন্তু শ্রীপর্ণদের বাড়িটাও যখন নতুন করে তৈরি হবে, সেখানেও বাথরুম, কলের জল, ইত্যাদির ব্যবস্থা হবে। তখন পুকুরের কাজ কমে আসবে — কেবল অভ্যাসে আর ব্যতিক্রম খুঁজতে পুকুরঘাটে আসবে কেউ কেউ।

জিতুদা লিখেছিল সুজন মাথাই শানুদের বাড়ির ছবি দেখে খুব হেসেছে। বলেছে নাকি এরকম বাড়ি এই আবহে বেমানান, টিঁকবেও না। এরকম আমেরিকাতেই হয়। শ্রীপর্ণদের বাড়ি এরকম হবে না। অনেক স্থানোপযোগী হবে, কিন্তু মডার্ন। সুজন ছবি দিয়েছে — বাংলার সাবেকি স্টাইলে তৈরি ওদের নতুন বাড়ির ভেতরে থাকবে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা।

গাছপালার ফাঁক দিয়ে শানুদের বাড়িটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে শ্রীপর্ণর মনে হলো, বেমানান নয়। যদি এখানকার মাটিতে কোনও বাড়ি দাঁড়াতে না পারে, বা আবহাওয়ায় সহজে নষ্ট হয়, তাহলে অন্য কথা। নইলে যে বাড়ি আমেরিকায় মেপ্ল্‌, স্প্রুস্‌, সিডার, সাইপ্রেসের বাগানে থাকতে পারে, তাকে এই পেয়ারা, কাঁঠাল, কৃষ্ণচূড়ার দেশে তো বেমানান লাগছে না! কেবল অভ্যাস-অনভ্যাসের ব্যাপার। এ দেশে এমন বাড়ি দেখে মানুষ অভ্যস্ত নয় — এই যা।

দুপুরে খাওয়া-দাওয়ার পরে পুরোনো সিন্দুক ঘেঁটে বাড়ির বা বাগানের কোনও প্ল্যান পাওয়া গেল না। মান্ধাতার আমলের গ্রাম্য দালান — তখন কি কেউ ব্লু-প্রিন্ট বানিয়ে বাড়ি করত? চিতু বেরিয়ে গেল। ওর এসবে মন নেই, তা ছাড়া মাঠে কাজও আছে। শ্রীপর্ণ সিন্দুক থেকে নানা কাজের-অকাজের জিনিস তখনও বের করছে, এমন সময় মিঞ্জিরি এসে বলল, “কী গো, পুরোনো কাগজ ঘাঁটলেই চলবে? একবার ওদের বাড়ি যাবে না?”

শানুদের বাড়ি। শ্রীপর্ণ বলল, “কেন? দরকার কী?”

মিঞ্জিরি চোখ কপালে তুলে বলল, “সে কী! এতদিনের পুরোনো বন্ধু — দেখা করতেও মন চাইছে না?”

চাইছে। কিন্তু অস্বস্তিও আছে। সে কেবল মিঞ্জিরির প্রতিক্রিয়ায় নয়, শানুরও একজন জীবনসঙ্গী রয়েছে। ওদের ছোটোবেলায় জমিদারবাড়ির সঙ্গে কারও যোগাযোগ ছিল না। দেখা হলেও মুখ ঘুরিয়ে চলে যাওয়াই দস্তুর ছিল। একমাত্র শানু আর ও-ই সে দস্তুর ভাঙে।

তবে সত্যিই হয়ত না গেলে আরও বিসদৃশ দেখাবে। হাতের কাগজপত্র থেকে মুখ তুলে মিঞ্জিরির দিকে তাকিয়ে বলল, “মনে হচ্ছে শানুকে চাক্ষুস না দেখে তোমার মন মানছে না?”

মুখ ভেটকে, “আমার বয়ে গেছে, আমি তো আর যাচ্ছি না, তোমাকে যেতে বলছি,” বলে মিঞ্জিরি ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।


সামনে মুখ ভেটকালেও, মিঞ্জিরি বিকেলে শ্রীপর্ণর সঙ্গেই তৈরি হয়ে নিল। শ্রীপর্ণ নিজের জন্য যে টি-শার্টটা বের করেছিল, সেটা সরিয়ে আমেরিকা থেকে আগেরবারে জিতুদার এনে দেওয়া নীল, সবুজ, মেরুন স্ট্রাইপ দেওয়া টি-শার্টটা বের করে দিল। আড়চোখে শ্রীপর্ণ লক্ষ করল, িজেও না সেজেই সাবধানে সাজল। শাড়ি পরল, যদিও আসার আগে বলেছিল, “শাড়ি-টাড়ি নিয়ে কাজ নেই, কী বলো? বর্ষায় গ্রামে ম্যানেজ করতে পারব না।”

জমিদারবাড়ির রাস্তা অনেকটা ঘুরে। পেছন দিয়ে গেলে চট করে যাওয়া যায়, কিন্তু শ্রীপর্ণ সেদিকে গেল না। না জানিয়ে কারও বাড়িতে পেছন দিক দিয়ে ঢোকা উচিত না। মিঞ্জিরির সাদা শাড়ি আর সাদা জুতোর দিকে আড়চোখে তাকিয়ে গাড়িটা বের করল।

বাইরের গেটও বদলেছে। এখন কায়দার স্লাইডার গেট। নিচে পাতা রেললাইনের ওপর গেটের চাকা থাকে, পাশাপাশি খোলে। উর্দিপরা দারোয়ান নয়, ফতুয়া আর খেটো ধুতি পরা মালি বাগানে কী কাজ করছিল, ছুটে এসে খুলে দিল। শ্রীপর্ণ জিজ্ঞেস করল, “দিদি বাড়িতে আছেন তো?”

মালি ঘাড় নেড়ে একগাল হেসে বলল, “শীতুদা, কতদিন পরে এলে! ভালো আছ তো?”

শীতু চিনতে পারল না। বলল, “আছি ভালো।” তারপরে ‘তোমরা’ আর ‘আপনারা’-র মাঝামাঝি একটা শব্দ করে জানতে চাইল, “...ভালো?”

মালি একগাল হেসে ঘাড় কাত করে বলল, “আমায় চিনলে না তো? হারান। ওই যে জেলেপাড়ার... বাবার সাথে তোমার বাড়ি মাছ নে যেতাম…”

ছোটো ছেলেটাকে আবছা মনে পড়ল শ্রীপর্ণর। বলল, “হ্যাঁ, হ্যাঁ। তা তোমাদের খবর কী? বাবা কেমন আছে?”

হারান মাথা নাড়ল। “ভালো নেইকো। এখন তো এস্টোক হয়ে বিছনা-শয্যা। শুয়ে-শুয়েই সবকিছু। মাছ টাছ আর ধরে না।”

তুমিও না?”

সকালে যাই নদীতে। তবে মাছ ধরে আর চলে না। তাই এখেনে...” বলে বাগানের দিকে হাত দিয়ে দেখিয়ে বলল, “শীতুদা, তোমাদের বাড়ি বানানোর কাজ শুরু হবে?”

শ্রীপর্ণ হেসে বলতে যাচ্ছিল, কত জায়গায় কাজ করবে, হারান? কিন্তু না বলে বলল, “হবে, কিন্তু সে এখনও দেরি আছে। আর সত্যি বলতে কী, কতটা কী কাজ হবে, তা আমিও জানি না।”

কাঁকড় বিছানো চওড়া গাড়ি-ঢোকার রাস্তাটা আধুনিক বাড়িটার সামনে শেষ হয়েছে। হারান আগে আগে দৌড়ে গিয়ে দরজায় দাঁড়িয়ে কথা বলছে, শ্রীপর্ণ গাড়ি থেকে বেরিয়ে হিল পরা মিঞ্জিরির হাত ধরে কাঁকড়ের ওপরে হাঁটতে সাহায্য করল। বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলেন একজন সুঠাম চেহারার ব্যক্তি — বয়সে শ্রীপর্ণর চেয়ে কিছু বেশিই হবেন, কিন্তু অনেক বেশি পেটানো চেহারা। একসময়ে কায়িক শ্রম করতেন, এখনও নিশ্চয়ই ব্যয়াম-ট্যায়াম করেন। হাতজোড় করে নমস্কার করে বললেন, “আসুন, আসুন।”

দেখতে যেন কাঠের ফ্লোর, কিন্তু জুতো খুলে চলতে গিয়ে কাঠের মতো লাগল না। দুটো সিঁড়ি উঠে বাড়িতে ঢুকতে হয়েছিল, তেমনই বাড়ির ভেতরের বড়ো ঘরের মধ্যেই দুটো সিঁড়ি নেমে একটা নিচু বসার ঘর — যাকে সাঙ্কেন লিভিং রুম বা ড্রইং রুম বলে। শ্রীপর্ণকে মেঝের দিকে তাকাতে দেখে ভদ্রলোক বললেন, “একেবারে ওখানকার মতো করে বানিয়েছি। তবে ওখানে তো মেঝে কাঠের হয় — এখানে কাঠ দিয়ে ঠিক হবে না, তাই লুক-অ্যালাইক মেটিরিয়ালের তৈরি। ফাইবার না কী বলে...” শ্রীপর্ণ নিজের পরিচয় দিয়ে মিঞ্জিরির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিল, ভদ্রলোক নিজের পরিচয় দিলেন — সোমেশ্বর নাথ। “আমি শান্তার হাজবেন্ড।” বসার ঘরে বসিয়ে ভেতরের দিকে গিয়ে গলা উঁচু করে বললেন, “শানু, এসো, দেখো কে এসেছে।” তারপরে ফিরে এসে বললেন, “আমরা ঠিক এরকম জায়গায় থাকতে অভ্যস্ত নই — যদিও শানু এখানেই বড়ো হয়েছে — আমি তো শহরে মানুষ…”

কোথায় থাকতেন ছোটোবেলায়?” ভদ্রতা করে জানতে চাইল শ্রীপর্ণ। একটু শ্রাগ করে সোমেশ্বর বললেন, “কোথায় না বলুন? জন্ম আর একেবারে ছোটোবেলা এলাহাবাদে। পড়াশোনায় মন ছিল না, বাবার মারের চোটে বাড়ি থেকে পালাই, তখন বয়স চোদ্দ। ক্লাস সেভেন। তারপরে কিছুদিন বম্বে, তারপরে সেখান থেকে জাহাজের খালাসীর কাজ নিয়ে দেশ ছাড়ি। প্রথমে কিছু বছর জাহাজে জাহাজে কাটে। তারপর সাউথ অ্যামেরিকায় — ব্রেজিল, আর্জেন্টিনা, সেখান থেকে মেক্সিকো হয়ে সোজা হাজির হই ক্যানাডায়। ইউ.এস.এ যাই সেখান থেকে। তারপরে ইউরোপে। জার্মানি, স্পেন, ইতালি, গ্রিস... কিছুদিন ইংল্যান্ডেও ছিলাম। তারপরে সব শেষে ব্রাসেলসে, তখনই আলাপ হয় শানুর সঙ্গে। তখন থেকে ভবঘুরেপনা শেষ।”

অবাক হয়ে মিঞ্জিরি বলল, “বাপরে! আপনি তো গ্লোব ট্রটার মশাই!”

আবার শ্রাগ করলেন সোমেশ্বর। “কই আর? গোটা আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া আর ফার ইস্ট-টা তো বাকি। আর সাউথ অ্যামেরিকাতেও বেশি দেশ দেখা নেই। সত্যি বলতে কী, সবচেয়ে বেশি সময় কাটিয়েছি ইউরোপেই... এই যে শানু... দেখো, ওই পুকুরের ওপারের বাড়ির — চিতুবাবুর দাদা এসেছেন…”

শ্রীপর্ণ অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিল। ষোলো বছরের যে মেয়েটা স্মৃতিতে আঁকা ছিল, এই মহিলার সঙ্গে তার অনেক তফাত। গোলগাল শানু এখন ছিপছিপে — প্রায় অ্যাথলিটের মতো চেহারা। শ্রীপর্ণ একগাল হেসে বলতে যাবে, তোর চেহারাটা তো একেবারে সাংঘাতিক বানিয়েছিস রে... বা ওরকম কিছু, কিন্তু ওকে অবাক করে শানু দু’হাত জোড় করে নমস্কার করে বলল, “আপনারা তো আজই সকালে এলেন, না? হারান বলছিল, ও বাড়ির মেজোভাই এসেছে।”

মিঞ্জিরির ভুরু কুঁচকে গেল। শানু আগেই জেনেছে মেজোভাই, আর তারপরেও হাত জোড় করে নমস্কার, আপনি সম্বোধন? শ্রীপর্ণও অবাক হয়ে বলল, “শানু, আমি শীতু।” মিঞ্জিরির কোঁচকানো ভুরু আর শ্রীপর্ণর হাসি-মুখের দিকে তাকিয়ে যেন থমকে গেল শানু। চট করে একবার চেয়ে দেখল সোমেশ্বরের দিকে। তারপরে হাসল। বলল, “, হ্যাঁ, তাই তো! আসলে আমি এতদিন গ্রামছাড়া, যে কাউকে মনে নেই আর।” তারপর সোমেশ্বরের পাশে বসে বলল, “ও তো বলে, তোমাকে নিয়ে গ্রামে ফেরাটা এত এম্ব্যারাসিং হবে জানলে...” মিঞ্জিরির চোখে পড়ল সোমেশ্বর পাথরের মতো স্থির দৃষ্টিতে শানুর দিকে তাকিয়ে। শানু এবার খেলাচ্ছলে সোমেশ্বরের কাঁধে হাত দিয়ে ঠেলা দিতে সোমেশ্বর একটা কাষ্ঠহাসি হেসে বললেন, “ভাবুন, এত ভুলে যায় মানুষ — হতে পারে?”

মিঞ্জিরির মনে হলো, হতে পারে না। আরও কিছু আছে। আড়চোখে শ্রীপর্ণকে দেখে নিল। ও-ও অবাক হয়ে শানুর দিকে তাকিয়ে আছে। অর্থাৎ শানুর রি-অ্যাকশন স্বাভাবিক নয়। এর মধ্যে আর কী আছে, সেটা জানতে হবে।

আড্ডা জমল না। কিছুক্ষণ প্রায় কেবলই কাজের কথা হলো। শানুরা শ্রীপর্ণদের মতন আগের বাড়ির জায়গাতেই নতুন বাড়ি বানায়নি। পাশের খালি জমিতে বানিয়েছে। “পুরোনো বাড়িটা ভেঙে ফেলব, জানেন,” বললেন সোমেশ্বর। “আর কিছু করা যাবে না। আর্কিটেকচারাল ভ্যালু নেই, থাকাও যাবে না। ভেঙে বাগান করলে তবু দেখতে ভালো লাগবে।” তারপরে পেছনের পুকুরের ঘাট কেমন হবে, পাড় কী ভাবে বাঁধানো হবে — এ সব আলোচনা হলো। দুই বাড়ির জমি গায়ে গায়ে নয়, াঝের কয়েক গজ সরকারি জমির মাপ নিয়ে আলোচনা দরকার। কিছুক্ষণ পরে দুজনে উঠে পড়ল। গল্প তেমন হলো না বটে, তবে মানতে হলো, জমিদারকন্যার বাড়ির চা সাধারণ গ্রাম্য চা নয়, চমৎকার সুগন্ধী চা। শহর থেকে আনা।

াবার আগে ওরা শানুর পিসির সঙ্গে দেখা করে গেল। নামেমাত্র দেখা। অতিবৃদ্ধা পিসি আগেও শ্রীপর্ণকে চিনতেন না, এখন তো কাউকে চেনার অবস্থায় নেই। শানু বলল, “ও বাড়িতে যে ঘরটায় থাকতেন, দেখে কান্না পায়। আলো নেই, হাওয়া নেই… তারই মধ্যে বিছানায় শুয়ে রয়েছেন রাত দিন। দেখাশোনা করার জন্য একটা মেয়ের বন্দোবস্ত করা ছিল, সে তো হয়ত মাঝেমধ্যে কয়েক দিন আসতই না। খেতে পেতেন কি না, বাথরুম-টাথরুম… এখানে এনে একটু নিশ্চিন্ত হয়েছি...”

বেরোবার সময় গাড়ি পর্যন্ত এসে বলল, “আসবেন আবার, আছেন তো ক’দিন।” তারপরে মিঞ্জিরির হাত ধরে বলল, “তুমিও ভাই সময় পেলে চলে এসো। আমরা এখন রিটায়ার্ড, প্রায় কখনওই বাড়ি থেকে বেরোই না। একা একা বোর লাগে — একটু গল্প করে সময় কাটাব।”


ফেরার পথে এবং বাড়ি ফিরেও শ্রীপর্ণ এতটাই গম্ভীর, যে মিঞ্জিরিও কথা বলেনি। তবে সারা সন্ধে উসখুস করে শেষে রাতে শুতে গিয়ে আর ধৈর্য রাখতে পারল না। বলল, “তোমাদের ব্যাপারটা কী আমাকে বলবে?”

প্রায় চমকে উঠে শ্রীপর্ণ বলল, “কী ব্যাপার আবার?”

মিঞ্জিরি বলল, “তোমরা দুজন একেবারেই সমবয়সী, একসঙ্গে বড়ো হয়েছ, একসঙ্গে স্কুলে যেতে আসতে, এক সময় নাকি বেস্ট ফ্রেন্ড ছিলে — তুমি মানতে চাও কি না চাও, ালোবাসাও ছিল হয়ত। আরও কিছু ছিল কি? নইলে এত অদ্ভুত আচরণ কেন করলে দুজনে?”

অবাক শ্রীপর্ণ বলল, “আমার আচরণে অদ্ভুত কী দেখলে?”

উনি তোমাকে চিনতে পারলেন না, আর তুমিও এক কথায় মেনে নিলে যে অনেক দিন বাইরে থাকার ফলে উনি সব্বাইকে ভুলে গেছেন? এতক্ষণ রইলে, পুরোনো দিনের কোনও গল্পই করলে না?”

শ্রীপর্ণ একটু বিরক্ত মুখে বলল, “কী গল্প করব? পুরোটা সময় যে আমাকে আপনি আপনি করল, তার সঙ্গে পুরোনো দিনের গল্প করা যায়?”

মিঞ্জিরি বলল, “সেই তো বলছি। আমাকে পর্যন্ত বেরোবার সময় তুমি বললেন, তোমাকে আপনি। ব্যাপারটা কী?”

শ্রীপর্ণ বলল, “এমন অনেকেরই হয় শুনেছি। তুমিও জানো। এই তো সেদিন অমিত এসে বলল — অতি কষ্টে দেবাশিসের নম্বর জোগাড় করে ফোন করেছিল, দেবাশিস প্রথমে আপনি আপনি করে কথা বলেছে, আর তারপরে, যখন অমিত শালা-হারামজাদা বলে গালাগাল করেছে, তখন তুমিতে নেমেছে। তুই বলেনি।”

মিঞ্জিরি বলল, “কিন্তু তুমি তো সে চেষ্টাটাও করলে না। এক কথায় মেনে নিলে।”

শ্রীপর্ণ কেন সে-চেষ্টা করেনি সেটা মিঞ্জিরিকে বলার দরকার মনে করল না। একবার ভাবল বলে, “শানু আমাকে ভুলে গেছে, সেটা আমি কিছুতেই মেনে নিতে পারছি না।” কিন্তু তাহলে আবার সেটা এক্সপ্লেন করতে হবে। তাই বলল, “ওর হাজবেন্ড ওখানে বসে আছেন, সেখানে ও আমাকে চিনতে পারেনি... এ সব নিয়ে বেশি আলোচনা ঠিক হত?” মিঞ্জিরি শাড়িটা খুলে ভাঁজ করতে করতে বলল, “সেটাও... সোমেশ্বরবাবুও কী রকম একটা দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলেন তখন। আমার দেখেই অস্বস্তি লাগছিল। তাই বলছি…”

কী বলছ?”

তোমাদের মধ্যে কি এমন কিছু ছিল, যেটা এখন ওদের বিবাহিত জীবনে কোনও অসুবিধার সৃষ্টি করতে পারে? এমন কিছু — যা আমি জানি না?”

এমন কিছু? যা ছিল সেটা এত বছর পরে বিঘ্ন-সৃষ্টি করতে পারে? দীর্ঘ ইউরোপ-বাসের পরে দু’জন অ্যাডাল্ট মানুষ এমন সামান্য একটা বন্ধুত্ব নিয়ে এতটাই বিব্রত হতে পারে? তবে শ্রীপর্ণ সোমেশ্বরের অভিব্যক্তিটা দেখেনি, তাই মিঞ্জিরি কী দেখেছে বুঝতে পারল না। দুজনে কিছুক্ষণ খিটিমিটি তর্কাতর্কি করে শুতে গেল।

তারপরে প্রায় এক সপ্তাহ শ্রীপর্ণ কোনও দিকে তাকানোর সময় পেল না। পরদিন দুপুরেই সুজন মাথাইয়ের লোকজন এসে হাজির হলো, আর প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হয়ে গেল হই-হই করে জমি মাপা, প্ল্যান করা, ছবি আঁকা, তার ছবি তোলা, সেগুলো সব প্রথমে সুজন মাথাইকে, তারপরে জিতুদাকে পাঠানো... সকাল থেকে সন্ধে পর্যন্ত শ্রীপর্ণকে মিঞ্জিরি দেখতেই পায় না। সারা দিন বাড়ির বাইরে কাটিয়ে দুপুরে খেতে আসে কি আসে না, আর সন্ধের পরে এসেই চান করে খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। এর মধ্যে আবার সকালে উঠে পরীক্ষার খাতা-ও দেখতে হয়।

প্রথম দিনের পরে ওদের প্রায় দু’সপ্তাহের ছুটিতে শানু আর সোমেশ্বরকে ওরা আর দেখতেই পেল না। শানু বলেছিল, পেছনের বাগানে বেড়াতে বা বসে বই পড়তে ওর ভালো লাগে, তাই মিঞ্জিরিও প্রায়ই বাড়ির পেছনের ঝোপেঝাড়ে অগোছালো জমিতে পায়চারি করত, কিন্তু দেখে মনে হত না যে বাড়িতে জনমানুষ আছে। শেষে একদিন গ্রামের পথে দেখা হলো পিসিমাকে দেখাশোনা করা মেয়েটার সঙ্গে। শানু আর সোমেশ্বর গ্রামেই নেই। কয়েক দিন হলো কোথায় গেছে। অবাক মিঞ্জিরি কথাটা শ্রীপর্ণকে বলতে সে অবশ্য অবাক হলো না। কেউ কোথাও, কাজে, বা বেড়াতে যেতেই পারে... “এই তো, তুমি আর আমি বাড়ি বন্ধ করে এখানে পড়ে আছি, দু’সপ্তাহ প্রায় হয়ে গেল, সেরকম…”

মিঞ্জিরি কথা বাড়াল না, কিন্তু বার বার মনে হতে লাগল যে ওদের সঙ্গে যাতে দেখা না হয়, সেজন্যই গ্রামছাড়া হয়েছেন সোমেশ্বর আর শানু।

তখন কিছু না বললেও, মিঞ্জিরি বাড়ি ফিরে বেশিদিন চুপ করে থাকতে পারল না। দিন দুয়েক পরে রাতে খেতে বসে বলেই ফেলল।

শ্রীপর্ণ ভুরু কোঁচকাল।

এতটা কি করবে কেউ? মানে, আমাদের তো বাড়ি তৈরি হবে এখন। আমরা নিশ্চয়ই বার বার গ্রামে যাব? প্রতিবারই কি এভাবে পালিয়ে যাবে নাকি? দুর!”

আবার মাসখানেকের মধ্যেই ফিরে যেতে হলো ওদের। এবারে আর ব্যাপারটা আলোচনা করেনি আগে শ্রীপর্ণর সঙ্গে, কিন্তু শ্রীপর্ণ মাথাইয়ের কন্ট্র্যাকটর মানিকের সঙ্গে পঞ্চায়েত অফিসে রওয়ানা দেবার পর প্রথম দিনই মিঞ্জিরি বেরিয়ে গেল। হাতের ব্যাগে ছোট্ট একটা কাটগ্লাসের প্যাঁচা, সুদৃশ্য মখমলের পাউচের মধ্যে বন্দি। আজ জিনস পরেই বেরিয়েছে। বর্ষাকাল শেষ হয়নি, রাস্তাঘাট এখনও ভেজা, কিন্তু গত ক’দিন বৃষ্টি হয়নি বলে কাদা কম। হাঁটতে অসুবিধে না হলেও একটু ঘেমেই গেল মিঞ্জিরি। আগের দিনের মতো বাইরের গেট খুলে দিল হারান, তারপরে নানা কথা বলতে বলতে মিঞ্জিরিকে নিয়ে গেল বাড়ি অবধি। ঝাড়ন দিয়ে বাইরের দরজা মুছছিল সৌদামিনী। তার হাতে মিঞ্জিরিকে সঁপে ফিরে গেল নিজের কাজে। সৌদামিনী মিঞ্জিরিকে ভেতরে নিয়ে গিয়ে একটা ঘরের দরজা খুলে বলল, “দিদি গো, ও বাড়ির বউদিদি এয়েচে।”

ঘরটা লাইব্রেরি? না হলে এত পুরোনো বই কেন একসঙ্গে? আগেও ছিল, না নতুন? আগেকার দিনের জমিদারবাড়িতে লাইব্রেরি থাকত? হয়ত। জলসাঘর থাকলে লাইব্রেরি থাকবে না কেন? শানু একটা ডিভান গোছের খাটে আধশোয়া হয়ে বই পড়ছিল। উঠে এল বইটা বন্ধ করে পাশের টেবিলে রেখে।

এতদিনে সময় পেলে? বাপরে, তোমাদের বাড়িতে তো অনেক কাজ চলছে মনে হচ্ছে!” একগাল হাসি দেখে মনে হয় না যে মিঞ্জিরি এসেছে বলে কোনও রকম অস্বস্তিতে পড়েছে শানু।

মিঞ্জিরি বলল, “কাজ তো শুরু হয়নি কিছুই। এখনও শুধু মাপজোক চলছে।”

শানু হাত তুলে নিজের বাড়িটা দেখানোর মতো করে বলল, “বাবা, এখানে যা হয়েছিল, সে আর বলার না। আর সোমু, মানে সোমেশ্বর তো নিজে সিভিল ইঞ্জিনিয়ার, তাই অর্ধেকের বেশি কাজ নিজে হাতে করেছে। মাটি খোঁড়া থেকে আরম্ভ করে বাড়ি বানানো…”

মিঞ্জিরি অবাক হয়ে বলল, “তখন তুমি এখানে থাকতে?”

এখানেই তো। ও বাড়িতে। আবার কোথায়? আমি ওকে ছেড়ে থাকতে পারি না বাবা।”

এদিক ওদিক তাকিয়ে মিঞ্জিরি বলল, “সোমেশ্বরবাবু এখন কোথায়?”

বাজার গেছে। শহরে। গাড়ি নিয়ে মাসে চার দিন যায় ওইটুকু সময় একা থাকতে পারি। তবে সত্যিই বিয়ের পর থেকে ছেড়ে থাকিনি একদিনও। খুব অসুবিধে হত যখন বাড়িটা তৈরি হচ্ছে। ও বাড়িটা তো বাসযোগ্য নেই আর। ও বলত সিটি-তে গিয়ে থাকতে… ওখানে ফ্ল্যাট আছে আমাদের — ওপিডান অ্যাপার্টমেন্টসে... আমি যাইনি। ভীষণ ভয় কর...”

মিঞ্জিরি আরও অবাক। “শহরে আবার কিসের ভয়?”

ানু বলল, “ভূতের, আবার কিসের? আমার ছোটো থেকে ভীষণ ভূতের ভয়। একা ঘরে শুতে পারি না...”

বকবক করতে করতে উঠে দরজায় গিয়ে শানু সৌদামিনীকে ডেকে চা করতে বলল, তারপরে ফিরে এসে বলল, “দিনের বেলায় ঠিক আছে। রাত্তিরেই সমস্যা…”

মিঞ্জিরি ঠিক করে গিয়েছিল আজ শানুকে দিয়ে শ্রীপর্ণর ছোটোবেলার গল্প করাবে। সরাসরি জিজ্ঞেস করা মুশকিল, তাই বলল, “আমি গ্রামে ফিরলাম বারো বছর পর। এতেই এত বদলে গেছে, তুমি নিশ্চয়ই আরও অনেক বেশি পরিবর্তন দেখছ?”

চোখ কপালে তুলে শানু বলল, “বোলো না! কিছু চিনতেই পারছি না। তবে কী জানো, আমার তো গ্রামের সঙ্গে তেমন আত্মার সম্পর্ক কখনোই ছিল না।”

অবাক হবার ভান করে চোখ কপালে তুলে মিঞ্জিরি বলল, “ও মা! কেন? তুমি এখানে জন্মাওনি? শ্রীপর্ণ তো সারাক্ষণ ছোটোবেলার গল্প করে। এখানে ফল পাড়তে আসতাম, ওখানে খেলার মাঠ ছিল, কোথায় সাঁতার কাটা, কোথায় সরস্বতী পুজো…”

কথা কেটে শানু বলল, “আসলে কী জানো তো, আমাদের তো জমিদারের ফ্যামিলি, ফলে জমিদারী না থাকলেও আমাকে কক্ষনও গ্রামে কারওর সঙ্গে মিশতে দেওয়া হত না। স্কুলেও আমি একা গেছি, একা এসেছি। বিশ্বাস করবে না, বাবা বলে দিত, নিচের দিকে তাকিয়ে চলবে। মুখ তুলে কারও দিকে তাকাবে না। এমন ভয় করতাম, যে সত্যি সত্যি সেইভাবে স্কুলে গেছি এসেছি আট বছর। এই তো দেখো না, তোমার হাজবেন্ডকে আমি তো ছোটোবেলায় চিনতামই না...”

ঘণ্টাখানেক পরে মিঞ্জিরি ফিরল। মুখটা একেবারে তেতো। মনটাও। কারও ছোটোবেলার বন্ধু এ-ভাবে বন্ধুত্ব অস্বীকার করতে পারবে, স্বপ্নেও ভাবেনি। রাগে ভেতরটা ফুলছে মিঞ্জিরির। একবার ভেবেছিল তখনই উঠে চলে আসে শানুকে দু’কথা শুনিয়ে। কিন্তু দুটো কারণে করেনি। এক, ওর বাবার ছোটোবেলার শিক্ষা। বঙ্কিমচন্দ্র হাতে ধরিয়ে শিখিয়েছিল ‘তুমি অধম, তাই বলিয়া আমি উত্তম হইব না কেন?’ আর দ্বিতীয়, অভদ্রতা করে বেরিয়ে এলে সেটা শ্রীপর্ণর কানেও যাবে কোনওভাবে। আর শ্রীপর্ণ যদি শোনে শানু ওর সম্বন্ধে এমন একটা কথা বলেছে, তাহলে নিশ্চয়ই ওর ভালো লাগবে না।

শ্রীপর্ণও ফিরেছে কিছুক্ষণ আগেই। ওকে দেখে বলল, “কোথায় যাওয়া হয়েছিল?”

মিঞ্জিরি জুতো খুলতে খুলতে বলল, “গিয়েছিলাম জমিদারনী সন্দর্শনে।”

শ্রীপর্ণ হেসে বলল, “সন্দর্শনে! বাপরে! কী দেখল?” তারপরে মিঞ্জিরিকে হাতব্যাগ থেকে সুদৃশ্য ভেলভেটের ব্যাগটা বের করে সুটকেসে রাখতে দেখে বলল, “ওটা কী? জমিদারনী দিলেন নাকি?”

মুখটা বেঁকিয়ে মিঞ্জিরি বলল, “ওটা আমি নিয়ে গেছিলাম জমিদারনীর জন্য। জানো না, রাজা-রানিদের দর্শনে গেলে উপঢৌকন নিয়ে যেতে হয়?”

ঘাড় নাড়ল শ্রীপর্ণ। “তা বটে। তাহলে দিলে না যে? আবার ফেরত নিয়ে এলে…”

মিঞ্জিরি প্রায় বলেই ফেলেছিল, যে তোমাকে ছোটোবেলায় চিনতই না, তাকে দিতে মন চাইল না। তারপর মনে হলো সেটা বলবে না বলেই তো ওখানে শানুকে দু’কথা শুনিয়ে আসেনি। এখনও বলা উচিত হবে না। শ্রীপর্ণ খুব কষ্ট পাবে। শানুর প্রতি ওর একটা সফট কর্নার আছে, সেটা মিঞ্জিরির কাছে পরিষ্কার। সেইজন্যই শানুকে দেখতে চেয়েছিল মিঞ্জিরি। প্রথম দিনের অদ্ভুত ব্যবহার সত্ত্বেও আজ আবার গিয়েছিল, সঙ্গে উপহার নিয়ে। কিন্তু যে ছোটোবেলার বন্ধুকে আপনি বলে, বন্ধুত্বই স্বীকার করে না, তাকে সেই বন্ধুর বউ উপহার দেবেই বা কেন? কিন্তু কিছুই বলতে হলো না, তখনই সুজন মাথাইয়ের ফোন এল, কথা বলতে বলতে বেরিয়ে গেল শ্রীপর্ণ। ফিরল দেরি করে, সবার খাওয়াদাওয়ার পরে। কোনও রকমে খেয়ে আবার বেরিয়ে গেল। যতক্ষণে ফিরল, ততক্ষণে শ্রীপর্ণ প্যাঁচার কথাটা ভুলেই গেছে।


বাড়ি তৈরি এত ঝকমারি জানলে কে তখন ‘হ্যাঁ’ বলত?” শ্রীপর্ণর শর্টস ভাঁজ করে বাক্সে ভরতে ভরতে বলল মিঞ্জিরি। আরও মাস তিনেক কেটেছে। এই তিন মাসে শ্রীপর্ণকে দেশের বাড়ি যেতে হয়েছে আট বার। কোনও বারই বেশিদিনের জন্য নয়, বেশিরভাগই সকালে গিয়ে সন্ধেয় ফেরা, থাকতে হলেও খুব বড়োজোর দিন দুয়েক, কিন্তু ক্লান্তিকর এই বার বার যাত্রা।

আর বলো না। বেশিরভাগ সিদ্ধান্তগুলো কিন্তু চিতু অনায়াসে নিতে পারত। কিন্তু জিতুদা ওর ওপর একেবারে ভরসা করে না, আর চিতুও সেই সুযোগে, ‘আমি জানি না, শিতুদাকে জিজ্ঞেস কর,’ বলে ঘাড় থেকে নামিয়ে দেয়।”

এখন আর গাড়ি নিয়ে নয়, ট্রেনে-বাসেই যায় শ্রীপর্ণ। সময় একটু বেশি লাগে, কিন্তু প্রত্যেকবার গাড়ি নিয়ে যাবার খরচ অনেক বেশি, ক্লান্তিকরও বটে।

মিঞ্জিরি আর যাওয়ার সুযোগ পায়নি, আজও শ্রীপর্ণ একাই যাবে। বাক্সটা গুছিয়ে দরজার কাছে নিয়ে রেখে বলল, “অত গিলে গিলে খেও না। বিষম খাবে।” শ্রীপর্ণ কিছু না বলে চোখ দিয়ে ঘড়ির দিকে দেখাল। মিঞ্জিরি বলল, “তাহলে কলেজ থেকে একটু তাড়াতাড়ি বেরোলে কী হয়?”

কোনও রকমে মুখের গ্রাসটা গিলে শ্রীপর্ণ বলল, “কী করব? ঠিক বেরোবার আগে প্রিনসিপ্যাল ডাকলেন... এইজন্যই তো বলেছিলাম কলেজ থেকে চলে যাব...”

মিঞ্জিরি বলল, “না, বাড়ি এসে যাবে। এইটুকুই তো বলি — রাতে বাড়ি না ফিরলে বাড়ি থেকে বেরোবে। অন্য কোথাও থেকে রওয়ানা হবে না। তাও তো তোমার গার্লফ্রেন্ডের মতো না। হলে তো সঙ্গে করে আমাকেও নিয়ে যেতে হত। তখন দেখতাম...”

হাত ধুয়ে সুটকেস তুলে দরজা দিয়ে বেরোতে বেরোতে শ্রীপর্ণ ফিরে দাঁড়িয়ে বলল, “কী দেখতে গার্লফ্রেন্ডের মতো হলে?”

মিঞ্জিরি বলল, “কেন, জানো না? ছোটোবেলা থেকে ভূতের ভয়ে একা রাত কাটাতে পারে না?”

সিঁড়ি দিয়ে কয়েক ধাপ নেমে গেছিল শ্রীপর্ণ। থেমে বলল, “কে? শানু? কে বলল?”

দরজায় দাঁড়িয়ে মিঞ্জিরি বলল, “কেন? ও নিজে-ই বলেছিল — সেই যে বার আমি একা ওর বাড়ি গেছিলাম...”

শ্রীপর্ণ ভুরু কুঁচকে বলল, “শানু? ভূতের ভয়? ও নিজে বলেছে? কবে?”

মিঞ্জিরি বলল, “কেন? তাতে কী হয়েছে? ভূতের ভয় পায়, তাই বলেছিল...”

শ্রীপর্ণ আঙুল তুলে কী বলতে গেল, কিন্তু আবার বাধ সাধল মোবাইল ফোনের ঝঙ্কার। চট করে তাকিয়ে দেখে মিঞ্জিরির দিকে তাকিয়ে বলল, “ট্যাক্সি এসে গেছে।” বলে ফোন চালু করে বলল, “হাঁ, সুরিন্দরজী, আপ কাহাঁ হো? ঠিক হ্যায়, রুকিয়ে ম্যায় আ হি রহা হুঁ...” সিঁড়ির বাঁকে গলাটা মিলিয়ে যাওয়া অবধি অপেক্ষা করল মিঞ্জিরি, তারপরে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল, শ্রীপর্ণ বেরিয়ে পেছন ফিরে ওকে দেখে ট-টা বলে হাত দিয়ে একটা উড়ন্ত চুমু দিয় গেট দিয়ে বেরিয়ে গেল। মিঞ্জিরি নিজের মনেই বলল, “বাড়ি তৈরি শুরু হবার পর থেকে কোনও কথাই যেন শেষ আর হচ্ছে না...”


ুজনের কাজ চমৎকার, সন্দেহ নেই। কিছুদিন আগেই চিতুর অংশটা তৈরি শেষ হয়েছে, তখনও শ্রীপর্ণকেই আসতে হয়েছিল সব ঠিক আছে কি না দেখতে, তখনও মনে হয়েছিল কাজের চমৎকারিত্বের কথা, আজ আবার নিজের অংশটা তৈরি হতে দেখেও মনে হলো। বাংলার পাড়াগেঁয়ে বাহ্যিকের মধ্যে ভিতরের আধুনিকতা ভালোই মিলে গেছে, কোথাও জোড়া-লাগার দাগ নেই।

এযাত্রা শ্রীপর্ণর আসার কারণ খুবই জরুরি। বাথরুম-টয়লেট সম্বন্ধে শেষ কথা বলতে হবে। ছবি দেখেছে, কিন্তু সুজন বলেছেন অত সহজে তিনি ক্লায়েন্টকে রেহাই দেন না। ব্লু-প্রিন্ট দেখে বোঝা একরকম, আসল বাড়িতে ঢুকে আর একরকম। কতবার তিনি শুনেছেন, “না, না… বুঝলেন, এটা না, আসলে এরকম চাইনি...” সুতরাং ঘরের ভেতরের দেওয়াল তোলার আগে আর একবার শ্রীপর্ণকে সরেজমিনে দেখে যেতে হবে।

পরদিন চিতুর বাড়িতে দুপুরের খাওয়া হতে হতে দেরি হলো, ট্রেন ধরতে গেলে এখনই বেরোনো উচিত, কিন্তু মানিক, সুজনের কন্ট্র্যাকটর ছেলেটা বলল, “আপনি রামনাথ অ্যাভিনিউয়ে থাকেন না? তাহলে ট্রেন যাবেন কেন? ভ্যান ফিরবে তো, আমি যাব। গ্যারেজ তো আপনার পেছনেই... আমাদের সঙ্গেই চলে আসুন।

রাজি হয়ে গেল শ্রীপর্ণ। তবে একটাই অসুবিধে, ওরা বেরোবে সন্ধে সাতটায়। “শহরে রাত দশটার আগে ভ্যান নিয়ে ঢুকলেই বুঝলেন, রাস্তার মোড়ে মোড়ে পুলিশকে দিতে দিতে যেতে হয়। দশটার পরে ঢুকলে নিশ্চিন্ত।” শ্রীপর্ণ ফোন করে মিঞ্জিরিকে জানিয়ে দিল। তারপরে গেল জিতুদার ঘরে বিশ্রাম করতে।

বিকেলে একটু হাঁটতে গেল বাড়ির পেছনে। এখন এদিকটা একেবারে জংলী আর নোংরা। বাড়ির কাজ শেষ না হলে সুজন ল্যান্ডস্কেপিং-এর কাজ শুরু করতে পারছে না। তুলনায় ওদিকের বাড়িটার পেছনের লন-টা একেবারে, যাকে বলে নয়নাভিরাম। কিছুক্ষণ চেয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ খেয়াল হল ডানদিকের একটা ছোটো গাছের আড়ালে যেন একটা নড়াচড়া। তাকিয়ে চোখাচোখি হলো শানুর সঙ্গে।

শানু হাত নাড়ল। শ্রীপর্ণও দায়সারা হাত নেড়ে বাড়ির দিকে ফিরতে যাচ্ছিল, খেয়াল করল, শানুর হাতনাড়াটা যেন একটু অন্যরকম। ওকে ইশারায় ডাকছে।

একেবারে সরাসরি ডাকছে উপেক্ষা করতে না পেরে শ্রীপর্ণ এগিয়ে গেল। গত তিন মাসে অনেকবারই শানুকে দেখেছে এই বাগানেই, বা গ্রামের পথে। শানু আজ অবধি কখনোই চোখে চোখ না রেখে অন্য দিকে চলে গিয়েছে। প্রতিবার শ্রীপর্ণর অস্বস্তি হয়েছে। বার বার নিজেকে বলেছে, সময়ের সঙ্গে মানুষ আমূল বদলে যেতে পারে, কিন্তু কোথাও একটা খচখচ করে লেগেছে। সেটা কী, অনেকবার জানতে চেয়েছে মিঞ্জিরি, শ্রীপর্ণ কেবল এইটুকু বলতে পেরেছে — মানুষটা এতটা বদলে গেল, সেটাই বুঝতে পারি না… কোন মানুষটা চল্লিশে পৌঁছে ঠিক সেই রকম রয়েছে যেমনটা ছিল চোদ্দো বা ষোলো বছর বয়সে তা অবশ্য শ্রীপর্ণ বলতে পারে না, শুধু বলে, তবু…

তবু কী তা জানে না। এখনও শানুর ডাকটা দেখে একটা অনেক অতীতের কথা মনে পড়ে গেল, তবু সেই ডাক আর আজকের এই ডাক…

পুকুরটা পাক দিয়ে ঘুরে শ্রীপর্ণ নিজেদের অংশের আগাছার জঙ্গল পার করে শানুদের বাগানে গেল। গেট খুলে ঢুকল ওদের লনে। শানু ওদিক থেকে এগিয়ে এসেছে।

আজও কি একদিনের ভিজিট?”

শ্রীপর্ণ স্বীকার করল, তা-ই বটে।

তার মানে মিঞ্জিরি আসেনি, তাই তো?”

আবার ঘাড় নাড়ল শ্রীপর্ণ। ঠিক।

কতদিন ধরে ভাবছি দুজনকে খাওয়াব বাড়িতে ডেকে… সে আর হয়ে উঠছে না।”

হওয়ার কথাও নয়। মিঞ্জিরি সেই প্রথমবারের পরে আর আসেনি। শ্রীপর্ণ একটু মন দিয়ে শানুর কথার ধরণ লক্ষ করছিল। যেন অপরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে বাধ্য হয়ে দীর্ঘদিনের পরিচিতর মতো আচরণ করতে হচ্ছে। কেন এই বাধ্যবাধকতা? শ্রীপর্ণ তো জোর করে পুরোনো বন্ধুত্ব চাগাড় দিতে চাইছে না, তাহলে?

কথা বলতে বলতে শানু বাড়ির দিকে হাঁটছে, শ্রীপর্ণও চলেছে সঙ্গে। শানুর পরনে একটা হালকা শাড়ি। কাপড়টা খুবই ফিনফিনে। আঁচলের আড়ালে কি আছে প্রায় স্পষ্টই দেখা যায়। এই শানুর সঙ্গে শ্রীপর্ণর পরিচয় নেই। যখন স্কুলে পড়ত, তখন শানুর সঙ্গে বন্ধুত্ব হবার সময় থেকেই শানু শাড়ি ধরেছিল দেরি করে, এবং সে-ও স্কুলের ইউনিফর্মের শাড়ি। মোটা সাদা জমির ওপর তিন ইঞ্চি নীল পাড়। ব্লাউজ পরত পুরো গলাবন্ধ, হাতা থাকত কনুই পার করা। মেয়েদের স্কুলে তখন খুব কড়াকড়ি ছিল, তবে শানুর মতো কলার দেওয়া ব্লাউজ আর কেউ পরত না। ক্লাস এইটের পরে স্কার্ট ব্লাউজ বারণ ছিল। আর কেউ কেউ তো সিক্স, বা সেভেন থেকেই শাড়ি ধরত। শানু বোধহয় একমাত্র, যে ক্লাস ইলেভেনে…

শানুর কাঁধের ওপর একটা ছোটো চাদর... স্টোল। গাঢ় মেরুন স্টোলটা সাদা শাড়ির ওপরে বেশ মানিয়েছে। দু’কাঁধের ওপর দিয়ে সামনে এনে দু’দিক ওড়নার মতো ঝুলিয়ে রেখেছে শানু। স্টোলের নিচ থেকে দু’হাত বেরিয়ে রয়েছে। এত ফর্সা কি ছিল শানু? প্রায় কনুই অবধি ব্লাউজের হাতার নিচ থেকে যে বাহু শ্রীপর্ণর স্মৃতিতে রয়েছে, তা এর চেয়ে অনেক পোঁচ বেশি বাদামী ছিল না? বহু বছর বিদেশবাসের ফল।

বাগানের দিকে বসার ঘরের কাচের দরজা। শ্রীপর্ণর মনে হচ্ছিল ওর বাড়িতেও এমন একটা বিরাট দেওয়াল জোড়া কাচের দরজা চাইলে হত। স্লাইডিং ডোর টেনে খুলে শানু ঢুকছে, বাগানের জুতো বাইরে খুলে কাঁধের স্টোলটা খুলে ছুঁড়ে সোফায় ফেলে ভেতরে রাখা ঘরে পরার চটি পায়ে দিচ্ছে। শ্রীপর্ণও বাইরে চটি খুলে খালি পায়ে ঘরে ঢুকতে যাবে, হঠাৎ যেন দেহের ভারসাম্য রাখতে পারল না, হাত পড়ল স্লাইডিং দরজার ওপর, যেখানে চাপ পড়লে দরজা খোলে। আধখোলা দরজা পুরো খুলে গেল। শ্রীপর্ণ হুমড়ি খেয়ে পড়তে পড়তে সামলে নিল। শানু চমকে জিজ্ঞেস করল, “কী হলো?” শ্রীপর্ণর ডান বাহু ধরে নিল দু’হাতে। আবার জিজ্ঞেস করল, “কী হলো?” শ্রীপর্ণ বলতে চেষ্টা করছিল কিছু হয়নি, শুনল না, ধরে ঘরের ভেতরে নিয়ে গেল।

সোফায় বসিয়ে বলল, “শরীর খারাপ লাগছে?”

মাথা নেড়ে না বলল শ্রীপর্ণশানু ছুটে ভেতরে গিয়ে এক গ্লাস জল নিয়ে এল। শ্রীপর্ণ ততক্ষণে অনেকটা সামলে নিয়েছে। বলল, “আমার তেমন কিছু হয়নি কিন্তু। পা স্লিপ করে গেছিল।”

শানু বলল, “বললেই হলো? আমি তিন বার জিজ্ঞেস করলাম কী হয়েছে? কিছু বললে না। তারপরে শরীর খারাপের কথা বললাম যখন তখন কেবল মাথা নাড়লে।”

কেন কথা বলতে পারেনি শ্রীপর্ণ বলল না। জল খেয়ে বলল, “না, ঠিক আছি, ভেবো না।”

শানু আজ নিজে থেকেই ‘তুমি’ বলল?। শ্রীপর্ণও ‘তুমি’ বলা শুরু করল।

বসার ঘরে মেঝে থেকে এক ধাপ নেমে সোফা। বাইরের বাগানের থেকেও হয়ত কয়েক ফুট নিচে। শ্রীপর্ণর মনে হলো, বৃষ্টির সময়ে বাইরের জমি, নিচের জমি ভিজে যায় না? তখন এই নকল কাঠে ড্যাম্প লাগে না? শ্রীপর্ণর ডান দিকে পেছনের বাগানের দরজা। আগের দিন বোধহয় পর্দা বা ব্লাইন্ড টানা ছিল, তাই দেখা যায়নি, আজ খেয়াল করল, বাইরের বাগানের জমি ওর কাঁধের কাছে।

কিছু বলছ না যে?”

আবার শানুর ‘তুমি’ বলা-টা খট করে কানে লাগল শ্রীপর্ণর। চট করে তাকাল ওর দিকে। বলল, “কী বলব?”

কোনও কথাই নেই?” কথার সুরে তামাশা? প্রগল্ভতা? বুঝল না শ্রীপর্ণ। কথা তো অনেক আছে। কিন্তু সেগুলো কি বলা যাবে? জানতে চাওয়া যাবে, কেন শানু বিদেশ গিয়ে যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছিল? বিদেশ যাবার আগে অল্প কিছু হলেও তো চিঠি-চালাচালি হয়েছিল দু’জনের। শেষ কখন? শ্রীপর্ণ যখন কলকাতায়, আর শানু দিল্লিতে?

হাসল শ্রীপর্ণ। বলল, “তোমার কথা বলো। দিল্লিতে পৌঁছসংবাদ দেওয়া সেই পোস্ট-কার্ডের পরে তো আর কোনও খবরই জানি না তোমার…”

শানুও হাসল। বলল, “আমার খবর সামান্য। দিল্লিতে গ্র্যাজুয়েশনের পরে সোজা ইউ-এস-, সেখানে পড়াশোনা শেষে চাকরি... -চাকরি, -চাকরির পরে ইউরোপ, তারপরে আর ইউরোপ ছাড়িনি। ব্রাসেলসেই সেটল করেছি।”

ব্রাসেলসে কী করতে?” জানতে চাইল শ্রীপর্ণ।

শানু উঠে এসে শ্রীপর্ণর সঙ্গে একই সোফায় পাশাপাশি বসল। এতক্ষণ পাশের সোফায় ছিল, তাকাতে অসুবিধে হচ্ছিল না। এখন পাশাপাশি হয়ে যাওয়াতে শ্রীপর্ণকে শানুর দিকে ঘুরে বসতে হলো। সোফাটা বড়ো, দু’জন আরামে বসতে পারে। কিন্তু শ্রীপর্ণ এতক্ষণ একা ছিল বলে প্রায় মাঝখানে বসে ছিল। ফলে দুজনের মধ্যে দূরত্ব এখন বেশি নেই। শ্রীপর্ণ ঘুরে বসে খেয়াল করল, দুজনের হাঁটুতে হাঁটুতে খুব বড়োজোর ইঞ্চি-দুয়েকের ফারাক।

শ্রীপর্ণর মুখের ভেতরটা শুকিয়ে গেল। শানু ব্রাসেলসে কী করত বলছে, কিন্তু ওর কানে ঢুকছে না। ওর মন-প্রাণ-সত্তা একভাবে লক্ষ করছে শানুর হাঁটুটা ওর হাঁটুর কত কাছে। একই সঙ্গে শানুর ডান হাত ওর গলার হারের একটা সিংগ্ল মুক্তো লাগানো লকেটটা নিয়ে খেলছে, সেদিকে। সেটা শানুর চোখ এড়াল না। থেমে বলল, “আমি ব্রাসেলসের কথা বলছি, তোমার নজর কোন দিকে?”

চোখ সরিয়ে নিয়ে শ্রীপর্ণ শুকনো ঠোঁট চেটে বলল, “বাড়িতে... তুমি একা?

শানু বলল, “এখনও পর্যন্ত একা। সোমু গেছে বাজারে। ফিরতে রাত হবে। আমাকে দেখে বোঝা যায় না, যে আমি একা?”

শ্রীপর্ণ অবাক হয়ে বলল, “দেখে কী করে বুঝবে কেউ?”

শানু বলল, “তুমি অবশ্য আমাকে অতটা দেখনি, তাই... এই যে এোশাক...”

শ্রীপর্ণ বুঝল না। চেয়ে রইল।

শানু বলল, “ও বেশ প্রাচীনপন্থী। স্লিভলেস, ডিপ-কাট — পছন্দ করে না। দেখবে আমি সব সময়েই হাতা-ওয়ালা, গলাবন্ধ ব্লাউজ বা কামিজ পরি।”

বুকের অনেকটা খোলা ্লিভলেস ব্লাউজটা খেয়াল না করা কঠিন এবং স্টোলটা খুলে ফেলার পর থেকে সেদিক থেকে নজর সরাতে অসুবিধেও হয়েছে, কিন্তু সে নিয়েিছু বলল না শ্রীপর্ণ। বলল, “কাজের লোকও কেউ নেই?”

খিলখিল করে হেসে উঠল শানু। বলল, “আশ্চর্য লোক তো! লোকের বাড়ি এসে কাজের লোকের খোঁজ করো?”

তা-ও শ্রীপর্ণ এদিক ওদিক দেখছে বলে বলল, “সৌদামিনীকে আজ ছুটি দিয়েছি। তোমার ভয় নেই... কেউ জানতে পারবে না…”

শ্রীপর্ণর বুকটা আবার ঢিপঢিপ করে উঠল। বলল, “কী জানতে পারবে না?”

শানু আবার হাসল। এই হাসি কি অভ্যর্থনার হাসি? কাম-হিদার কি একেই বলে? তাহলে শ্রীপর্ণর কেন বুকের ভেতরটা শুকিয়ে যাচ্ছে? হাত পা ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে?

শানু হঠাৎ গম্ভীর হয়ে গেল। বলল, “শোনো। আমি জানি তোমার আমার সম্পর্কটা বন্ধুত্বের ছিল না আমাদের সোশ্যাল সিচুয়েশনের জন্য। কিন্তু সে তো কেবল তোমার-আমার নয় — গ্রামের কারওর সঙ্গেই তো আমার বন্ধুত্ব ছিল না। সে তো আমি বন্ধুত্ব করতাম না বলে নয়, সে আমার বাড়ির রেস্ট্রিকশনের জন্য…”

কী বলছে শানু! শ্রীপর্ণর এবারে ভয় করতে শুরু করেছে।

শানু বলে চলল, “আমি যদি জমিদারবাড়ির মেয়ে না হতাম, তাহলে তো অবশ্যই তোমাদের সঙ্গে এক্কাদোক্কা খেলে বড়ো হতাম, হয়ত মাঠে গিয়ে ক্রিকেট ফিকেটও খেলতাম... কে জানে…”

আর সন্দেহ নেই। আর বসে থাকা যাবে না। শ্রীপর্ণ ঘড়ির দিকে তাকিয়ে আঁতকে ওঠার ভাব করে বলল, “এই রে! ওরা আবার এক্ষুনি বেরোবে। আচ্ছা, আমি তবে উঠি।”

হাতের ঘড়ি দেখে শানু বলল, “াড়ি এনেছ? এখন তো আর ট্রেন পাবে না?”

শ্রীপর্ণ বলল, “কনট্র্যাক্টরের সঙ্গেই যাব। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই রওয়ানা দিতে হবে। গিয়ে বাক্স গোছাই।”

শানু বলল, “বেশ। আমারও এখন পোশাক বদলের সময় এসে গেছে। সোমু এখনই ফিরবে না, তবু সাবধানের মার নেই। গিয়ে ঢাকাঢুকি দেওয়া জামা পরে বসতে হবে। কিন্তু কথাটা মনে রেখো। তখন বন্ধু ছিলাম না বলে এখন বন্ধু হতে পারব না, এমন কেউ বলে দেয়নি। বিশেষত এখন আমার গুরুজন কেউ বাকি নেই — পিসি তো আর আমার চলাফেরা আটকাতে পারবে না... উই ক্যান বি ফ্রেন্ডস নাও।”

বাগানের দিকের স্লাইডিং ডোরটা ধরে টানতে গিয়ে শ্রীপর্ণ বুঝল শানু পাল্লাটার অন্য দিকটা ধরে আছে শক্ত করে। শ্রীপর্ণর খুব কাছে এসে বুকে অন্য হাতের দুটো আঙুল রেখে হেঁটে যাবার ভঙ্গী করে বলল, “বাগানটা পেরোলেই আমার বাড়ি। কাম এগেইন, মাই ফ্রেন্ড...”


সারা রাস্তা শ্রীপর্ণর মাথাটা ঝিমঝিম করছিল। অনেক বার ভেবেছে ট্রেনে ফিরে আসলেই হত। তাহলে ফেরার পথে মানিকের অনন্ত বকবক শুনতে হত না, আর — তার চেয়েও বেশি জরুরি, বিকেলের ঘটনাটাও ঘটত না। যত ভাবছে তত মাথা জ্যাম হয়ে যাচ্ছে, আর যত ভাবছে আর ভাববে না, তত চিন্তাগুলো আরও জড়িয়ে ধরছে।

বাড়ি ফিরতে মাঝরাত পেরিয়ে গেল। ভেবেছিল মিঞ্জিরি নিশ্চয়ই এতক্ষণে ঘুমিয়ে পড়েছে, কিন্তু দেখল মিঞ্জিরি কেবল জেগে বসে আছে নয়, খায়ওনি। বলল, “কাল অফিস নেই? এত রাত অবধি না খেয়ে বসে রইলে?”

মিঞ্জিরি বলল, “না হয় রইলাম। বেশি তো সুযোগ পাই না এরকম পতিসেবা করার… পতিসঙ্গ দেবার… দেখে এলে বাড়ি? কী অবস্থা?”

বাড়ির অবস্থা বোঝাতে দু’কথাই লাগল। বলল, “বাথরুম-টয়লেট নিয়ে ব্যাপার, আমাকে মানিক বলল, সাধারণত ম্যাডামরা আসেন, আপনি ম্যাডামকে ছাড়াই এলেন?”

মিঞ্জিরি হেসে বলল, “তুমি কী বললে? যে টয়লেট বাথরুমের ব্যাপারে তুমিই বেশি পিটপিট?”

শ্রীপর্ণ হাসল না। রুটির ক্যাসেরোল খুলে আর একটা রুটি নিয়ে এক টুকরো ছিঁড়ে মুরগির ঝোলের বাটিতে ডোবাল। মিঞ্জিরি বলল, “কী হয়েছে?”

অন্যমনস্ক শ্রীপর্ণ বলল, “কই, কিছু না তো?”

মিঞ্জিরি বলল, “ঠিক বললে না। তোমাকে আমি কম দিন চিনি না। কী হয়েছে?”

শ্রীপর্ণ বলল, “আরে, কিছু হয়নি। ওদের গাড়িতে ফেরাটা ভুল হয়েছে। ও তো গাড়ি নয়, একেবারে লজঝড়ে ভ্যান-কাম-ট্রাক। সারা রাস্তা ঝাঁকিয়ে শরীর একেবারে খেয়ে নিয়েছে। টায়ার্ড কেবল।”

মিঞ্জিরি আর কথা বাড়াল না, কিন্তু খুব যে আশ্বস্ত হয়েছে, তা-ও মনে হলো না।

শ্রীপর্ণ জীবনে এই প্রথম মিঞ্জিরি বাদে দ্বিতীয় একজন কাছের মানুষের অভাব বোধ করল। কলেজ জীবনের শেষ থেকেই জীবনসঙ্গীনী মিঞ্জিরি, আর খুব বেশি হলে জিতুদার কাছেই পরামর্শ নেওয়া অভ্যেস। কখনও ভাবেনি ওদের কাছ থেকে লুকোতে হবে এমন কোনও সমস্যা ওর জীবনে আসবে। স্কুল বা কলেজ জীবনের কোনও বন্ধু আজ ওর ‘কাছের’ নয়। চাকরি-জীবনে? পরদিন কলেজের স্টাফরুমে চারিদিকে তাকিয়ে সুবিধে হলো না। সমবয়সী হতে হবে। পুরুষ হতে হবে। বুদ্ধিমান হতে হবে। গোপনীয়তা বজায় করতে পারবে... সব কটা গুণবিশিষ্ট কেউ নেই কলেজে। আজ যদি মোইদুলটা থাকত…

হঠাৎ শ্রীপর্ণর প্রায় লাফিয়ে ওঠার ফলে পাশের চেয়ারে সুধীরবাবু চমকে উঠলেন। কিন্তু কিছু বলার আগেই শ্রীপর্ণ ঘর থেকে বেরিয়ে গেছে।

মোইদুল শ্রীপর্ণর কোলিগ ছিল এই কিছুদিন আগেও। বছর দুয়েক হলো যাতায়াতের সুবিধের জন্য মফস্বলে ওর বাড়ির কাছাকাছি একটা নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতার চাকরি নিয়ে চলে যাওয়ার পরে যোগাযোগ কমে গেছে। শ্রীপর্ণর চেয়ে বয়স কয়েক বছর কম, কিন্তু চিন্তাভাবনা একেবারে ঝকঝকে সাফ।

কপাল ভালো। ফোনটা বাজামাত্র ধরল মোইদুল। নিজের চিন্তায় শ্রীপর্ণ এতটাই মগ্ন ছিল, যে মোইদুল ফোন ধরে, “কী খবর দাদা, কেমন আছ? মিনি কেমন আছে...?” দিয়ে আরম্ভ না করলে হয়ত মোইদুল আর ওর বাড়ির কুশল জানতে ভুলেই যেত। প্রাথমিক কথাবার্তা সেরে মোইদুল বলল, “তারপরে, কী মনে করে ফোন করেছিলে?” তখন বলল, “তোর সঙ্গে একটা বিশেষ প্রয়োজন আছে। ব্যাপারটা একটু গোপন। দেখা করে বলতে হবে। কবে সময় হবে তোর?”


মোইদুল-ই শহরে এল। বলল, “তোমার কথা যদি গোপন হয়, তাহলে তো আমার ঘরে বসে বলা যাবে না, কারণ ইউনিভার্সিটি এখনও আমার নিজের ঘর দিতে পারেনি। দু’জন কোলিগের সঙ্গে শেয়ার করতে হয়। আর আমার ইউনিভার্সিটির ওই নো-ম্যান’স-ল্যান্ডে অন্য বসার জায়গা কই? স্টুডেন্টস’ ক্যানটিনেও পাউরুটি ঘুগনি আর অখাদ্য এক চা ছাড়া আর যে কিছুই পাওয়া যায় না।”

কলেজের কাছের ক্যাফে-টা খালিই ছিল। কফিতে চুমুক দিতে দিতে শ্রীপর্ণ পুরো ব্যাপারটা খুলে বলল। সব শুনে মোইদুল গম্ভীর হয়ে গেল। বলল, “আশ্চর্য! সারা গ্রামে কেউ নেই, যে ওকে আগে দেখেনি? কোনও ছেলে ছিল না যে ওর দিকে তাকিয়ে থাকত? ওর স্কুলে পড়ত যে মেয়েরা...”

শ্রীপর্ণকে কিছুটা সময় কাটাতে হলো মোইদুলকে ব্যাপারটা বোঝাতে। এক, শানু গ্রামে ফিরেইছে প্রায় বছর পঁচিশেক পরে। ফলে তখনকার শানুর চেহারাটা খুব কম লোকেরই মনে আছে। গ্রামটা অনেক আগে থেকেই খালি হতে শুরু করেছিল। ওদের সমবয়সী মেয়েদের শ্রীপর্ণ ভালো করে তখনও চিনত না, আর এখন তো তারা বিয়েটিয়ে হয়ে কোথায় চলে গেছে, ওর পক্ষে খোঁজ করা স্বাভাবিকও না, সম্ভবও না। ছেলেরাও, যারা শ্রীপর্ণর বন্ধু ছিল, প্রায় কেউ নেই বললেই চলে আর। চাকরি-টাকরি নিয়ে চলে গেছে। যারা আছে, তাদের সকলকে জনে জনে জিজ্ঞেস করতে পারেনি শ্রীপর্ণ, কিন্তু যাদের সঙ্গে কথা হয়েছে, তারাও কেউ আজকের শানুকে কাছ থেকে দেখেনি। শানু হয় বেরোয়ই না বাড়ি থেকে, বেরোলেও জমিদারবাড়ি-সুলভ দূরত্ব বজায় রাখে। চোখে বিরাট রোদ-চশমা থাকে, চুলে, গলায় স্কার্ফ থাকে… সে বেশ শ্রীপর্ণও দেখেছে। রইল পড়ে ওর বাড়িতে যারা কাজ করে। তারাও আগের শানুকে চেনে না... শানু যখন গ্রাম ছাড়ে তখন তাদের একজন জন্মায়নি, একজনের বয়স সাত-আট, আর একজন বড়োজোর বছর দশেক।

তোমার যে ভাই... সে তো অত ছোটো না... সে-ও চিনতে পারবে না?”

শ্রীপর্ণ কী বলবে বুঝতে পারল না। চিতুকে ও বুদ্ধিহীন মনে করে না। কিন্তু ছোটোবেলা থেকে ‘বোকা’, ‘হাঁদা’, ‘গঙ্গারাম’ জাতীয় কথা শুনে শুনে চিতুর কোনও বিষয়ে আত্মপ্রত্যয় একেবারেই নেই। তাই কোনও কিছু নিয়ে দাদাদের কাছে কোনও মতামত চট করে প্রকাশ করে না। বিশেষ করে জিজ্ঞেস করলে তো নয়ই... তবে জিতুদা হয়ত...

ছবি নেই? তোমার দাদাকে পাঠাও। সে ঠিক বলতে পারবে।”

জিতুদা হয়ত পারবে। কিন্তু ছবি তো নেই। যে যে পরিস্থিতিতে ওদের সঙ্গে দেখা হয়েছে, তাতে ঠিক আসুন, বা নিদেন এসো, একটা সেলফি তুলি... বলে ছবি তোলা যায় না, যায়ওনি। আর আগের দিনের ঘটনার পরে তো ছবি তুলতে চাওয়া আরওই অদ্ভুত দেখাবে।

মিনিও তোলেনি?”

মাথা নাড়ল শ্রীপর্ণ। “প্রথম দিন তো প্রশ্নই ছিল না। আর মিনি যেদিন পরে গেছিল, সেদিনও বোধহয় কিছু একটা হয়েছিল।”

কী হয়েছিল?”

মিঞ্জিরি কী একটা উপহার আবার ফিরিয়ে এনেছিল না দিয়ে...

মিনিকে বলতেই হবে শ্রীপর্ণদা। ওকে না বলে তুমি এগোতে পারবে না।”

কথাটা শ্রীপর্ণরও মনে হয়েছিল, কিন্তু সেটা এড়াতে করতে চাইছিল বলেই এত ভাবনাচিন্তা, এত আলোচনা, মোইদুলকে ডাকা… শ্রীপর্ণর বিমর্ষ ভাবটা মোইদুলের নজরে পড়ল। বলল, “এত ভাবার কিছু নেই। দেখো, ব্যাপারটা তো তোমার মনের ভুল নয়…”

মাথা নাড়ল শ্রীপর্ণ। ভুল নয়।

তাহলে তোমার সামনে দুটো রাস্তা রয়েছে। হয় ব্যাপারটা ইগনোর করা…”

ইগনোর?”

ঠিক... মানছি, ইগনোর করা সম্ভব না। তাহলে দ্বিতীয় রাস্তা হলো কিছু একটা করা…”

কী?”

ভেবে দেখো... করার যদি হয়, তারও অপশন বেশি নেই।”

আমার মাথা কাজ করছে না। তুই বল…”

মোইদুল হাতের আঙুলের ডগা টেনে টেনে বলতে থাকল, “গ্রামে কারও সঙ্গে আলোচনা করা যাবে না — কেউ ওদের চেনে না, অতীতে যারা চিনত তারা হয় নেই, নয় অতিবৃদ্ধ ওই পিসি, এবং যেহেতু ওরা জমিদার, আগেও কেউ ওদের কাছের লোক ছিল না। তাই তারা কেউ এগিয়ে এসে তোমার পাশে দাঁড়াবে না।”

দ্বিতীয় আঙুলের ডগা ধরে মোইদুল বলে চলল, “জমিদারবাড়ির ফ্যামিলি প্রায় শেষ, ওই মহিলার অন্তত কোনও আপন ভাইবোন, বা আপন খুড়তুতো, জ্যাঠতুতো ভাইবোন নেই, মামাবাড়ির কোনও খবর তোমার কাছে নেই।”

ঘাড় নাড়ল শ্রীপর্ণ। ঠিক।

তা ছাড়াও, যে কারণে তোমার মনে খটকা লেগেছে, সেটা এতই গোপন একটা ব্যাপার, যে সেটা যে কোনও লোককে বুঝিয়ে বলা-ই মুশকিল। কিন্তু সেটা না বললে ব্যাপারটা দাঁড় করানো যাবে না।”

শ্রীপর্ণর একটা কথা খেয়াল হলো। বলল, “একটা উপায় আছে। তা হলো শানুর অতীতের ইনফরমেশন বের করা। কোথাও না কোথাও তো ওকে লোকে চেনে। তাদের সঙ্গে যদি যোগাযোগ করা যায়…” বলতে বলতেই ব্যাপারটা কতটা অসম্ভব ভেবে থেমে গেল।

কে যাবে কোথায়? ও কোথায় কোথায় ছিল, তা-ই তুমি বলছ কেউ ভালো করে জানে না। ওকে তো জিজ্ঞেস করেছ। বলেছে?”

আগের দিন ব্রাসেলস সম্বন্ধে কী যেন বলছিল, কিন্তু শ্রীপর্ণ খেয়াল করে শোনেনি।

তাহলে? এবারে এই সমস্যা নিয়ে কার কাছে যাওয়া যায়?”

শ্রীপর্ণ মূঢ়ের মতো তাকিয়ে রইল মোইদুলের দিকে।

একমাত্র পুলিশের কাছে যাওয়া যায়, শ্রীপর্ণদা। আর পুলিশের কাছে যাওয়া মানে সেটা নিয়ে জল ঘোলা হবেই। পুলিশ তোমাকেও একেবারে ছেড়ে কথা বলবে না। কোনও স্টেপ নেওয়ার আগে সব খতিয়ে দেখে তবেই নেবে। পুলিশ ঘাসে মুখ দিয়ে চলে না। বিশেষ করে ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্ট, বা সিবিআই অত্যন্ত করিৎকর্মা, তুখোড় বুদ্ধিমান সব অফিসার…”

ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্ট... ডিডি... শ্রীপর্ণর খেয়ালই ছিল না। মুখটা হাসিতে ভরে উঠতে যাচ্ছিল, কিন্তু পরমুহূর্তেই হাসি মিলিয়ে গেল। এবারে মিঞ্জিরিকে পুরো ব্যাপারটা না বলে আর কিছুই করা যাবে না।

বলল, “তাহলে মিনিকে বলতেই হবে…”

মোইদুল বলল, “দাদা, একটা কথা বলো তো? এই মহিলার সঙ্গে তোমার কোনও অ্যাফেয়ার হয়েছে এর মধ্যে?”

শ্রীপর্ণ অস্বস্তির হাসি হেসে বলল, “কাছাকাছি চোখের দেখা দেখেছি দু’বার। তার মধ্যে একবার মিনিও ছিল…”

আর দ্বিতীয়বার? সেদিন যখন ওদের বাড়িতে ওর হাজবেন্ড ছিল না... খোলামেলা পোশাক পরে সামনা-সামনি…”

মাথা নাড়ল শ্রীপর্ণ। “না। ততক্ষণে তো আমি শিওর হয়ে গেছি।”

তাহলে তোমার মিনিকে বলার ব্যাপারে এত হেজিটেশন কেন?”

কারণ ছোটোবেলার সব কথাগুলো মিনি জানে না।”

হুস করে উড়িয়ে দেবার ভাব করে মোইদুল বলল, “আরে, ধ্যাত, ওইটুকু ব্যাপার নিয়ে ভাবলে চলবে?”

শ্রীপর্ণ হেসে বলল, “ওরে, তুই একটা পুরুষমানুষ। তোর ভাবনা আর মিনির ভাবনা একই খাতে বইতে হবে এমন কোনও আইন নেই...” তারপরে কথা ঘুরিয়ে বলল, “এলিই যখন, বাড়ি চল, মিনিকে বলে দিচ্ছি, একেবারে খেয়ে ফিরবি…”

পরে, রাতে, যখন মোইদুল লাস্ট ট্রেন ধরতে বেরিয়ে গেছে, ফ্ল্যাটের বারান্দা থেকে ওকে টা-টা বলে ওখানেই দাঁড়িয়ে শ্রীপর্ণ সিগারেট ধরিয়েছে, মিঞ্জিরি এসে বলল, “সিগারেটটা একটু বেশি হয়ে যাচ্ছে না আজকাল?”

শ্রীপর্ণ সিগারেট এখন আগের চেয়ে অনেক কমই খায়, এখনও খুব যে খেতে ইচ্ছে করছিল, তা-ও নয়, শুধু অভ্যেসবশতই বারান্দায় দাঁড়িয়ে ধরিয়ে ফেলেছিল। “বেশি খাচ্ছি? কই?” বলে ফেলে দিয়ে মিঞ্জিরির মুখোমুখি দাঁড়াল। সন্ধেটা গেছে খোশগল্পে। মোইদুল স্মার্ট ছেলে, অযাচিতভাবে শ্রীপর্ণর দুশ্চিন্তার কথা মিঞ্জিরির সামনে বলেনি। এবার শ্রীপর্ণকেই বলতে হবে সবটা।

কই আবার কী?” বলে মিঞ্জিরি শ্রীপর্ণর টি-শার্টের বুকের বোতাম খুলতে খুলতে বলল, “আজ মোইদুল আসার সুযোগ নিয়ে কটা খেলে বলো? অন্তত চারটে... না পাঁচটা?”

গোনেনি শ্রীপর্ণ। মিঞ্জিরির কোমর ধরে কাছে টেনে নিয়ে এসে বলল, “গুনিনি। শোনো। কথা আছে।”

সে আমি জানি,” বলে মিঞ্জিরি জামা ধরে টেনে ঘরে নিয়ে এল। “সেই সেদিন থেকে দেখছি বাবু আনমনা…”

দাঁতে দাঁত চেপে শ্রীপর্ণ কথাটা বলেই ফেলল। একবার বলতে শুরু করলে হয়ত অত কঠিন লাগবে না…

একটা বাজে ব্যাপার। কী করব ভাবছি।”

মিঞ্জিরি সুরে এবার উদ্বেগ, “কী হলো?”

হুড়মুড়িয়ে বলে ফেলল শ্রীপর্ণ। “সেদিন মানিকের সঙ্গে ফিরব ঠিক করার পরে স্টেশনে ফেরার তাগিদ ছিল না, আমি পেছনের বাগানে পুকুরটা দেখতে গেছিলাম। বাড়ি তৈরি শেষ হলে ওদিকটা নিয়ে পড়তে হবে। ওদের বাগানে শানু ছিল। আমাকে ডাকল।”

শ্রীপর্ণ বুঝতে পারল দু’হাতের মধ্যে মিঞ্জিরির শরীরটা কাঁটা হয়ে উঠল। বলল, “শোনো মন দিয়ে। ব্যাপারটা সিরিয়াস কিন্তু...” বলেই বুঝল এরকম ভাবে বললে মিঞ্জিরি মোটেই নিশ্চিন্ত হবে না। তাই আর দেরি না করে সেদিনের ঘটনার সবটাই বলল।

মিঞ্জিরি বলল, “তারপর? এরকম তো প্রথম থেকেই। চিনতে পেরেও চিনছে না। তুমি এত কেন বিচলিত হচ্ছ? বাড়িতে ডেকে ফ্লার্ট করেছিল বলে? সেটাও তো আমি বলব স্বাভাবিকের পর্যায়ে পড়ে...”

শ্রীপর্ণ বলল, “বিচলিত হচ্ছি, কারণ শানু সেদিন দুটো কথা বলেছিল, যেগুলো একেবারেই মেনে নেওয়া যায় না।”

কী বলেছিল?”

বলেছিল, যে আমাদের দুটো পরিবারের সামাজিক অবস্থানের জন্য আমাদের ছোটোবেলায় বন্ধুত্ব হয়নি, কিন্তু তার মানে এই নয় যে এখন আমরা বন্ধু হতে পারব না…”

মিঞ্জিরি অবাক হলো না। এমন কথাই ও-ও আগে শুনেছে। বলল, “বলল? তুমি বললে না তোমাদের কতটা বন্ধুত্ব ছিল, আর সেটা ও ভুলে গেছে বলে তুমি কতটা আপসেট?”

আপসেট আমি নই, কিন্তু যে বন্ধুত্ব ভুলে যায়, তাকে এরকম কথা বলে মনে করানো যায়?”

তা বটে। আর দ্বিতীয়টা কী বলেছিল?”

বলেছিল, ও জমিদারের মেয়ে না হলে আমাদের সঙ্গে এক্কাদোক্কা খেলে বা ক্রিকেট খেলে বন্ধু হতে পারত…”

মিঞ্জিরির মুখ হাঁ হয়ে গেল। “তোমাদের গ্রামে ছেলেরা এক্কাদোক্কা খেলত আর মেয়েরা ক্রিকেট?”

শ্রীপর্ণ বলল, “সেটাই বলছি। ছেলেরা যে এক্কাদোক্কা খেলে না, আর তখন গ্রামে ক্রিকেট কেউই খেলত না, ফুটবল খেলত, সেটা ও জানেই না। অর্থাৎ, এই মহিলা কোনও দিন কেবল আমাদের গ্রামে না, হয়ত কোনও গ্রামেই থাকেনি।”

পর্ণো, খুব সাংঘাতিক অ্যালিগেশন। শিওর না হয়ে বোলো না কিন্তু।”

শ্রীপর্ণ অসহিষ্ণুভাবে মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, “কাউকে কিছু বলছি না। কিন্তু আরও আছে…” এবার, আর অপেক্ষা না করে বলে ফেলতে হবে... “শানুর বিষয়ে দুটো জিনিস আমি জানি, যেটা গ্রামের আর কেউ জানে বলে আমার মনে হয় না।”

মিঞ্জিরি কিছু না বলে ভুরু বাঁকিয়ে তাকাল।

শানুর দুটো জন্মগত অসঙ্গতি ছিল। একটা সহজে দেখা যায়, অন্যটা অত সহজে চোখে পড়ে না। তুমি শানুর পা দেখেছ?”

একটু অবাক হলো মিঞ্জিরি। “পা? কই না। দু’দিনই চটি পরে ছিল না?”

শ্রীপর্ণ বলল, “এক্স্যাক্টলি। ক্রক’স। পা ঢাকা... আমারও তাই চোখে পড়নি। কিন্তু কাল… মানে সেদিন, সন্ধেবেলা যখন ও দরজা খুলে বাগান থেকে বাড়িতে ঢুকছে তখন চটি বদলাচ্ছিল বলে চোখে পড়ল।”

শ্রীপর্ণ থেমে ঘরে ঢুকে খাবার টেবিল অবধি হেঁটে গিয়ে গ্লাস তুলে নিয়ে জল খেল। মিঞ্জিরি পেছন পেছন এসেছিল, বলল, “আরে, আরে, কী চোখে পড়ল? বলবে তো, এখনই জল খেতে বসল...”

শ্রীপর্ণ হেসে বলল, “তেষ্টা পেলে কী করব?”

কপট রাগ দেখিয়ে টেবিল থেকে জলের জগ হাতে নিয়ে মিঞ্জিরি বলল, “দেব জল ঢেলে?”

শ্রীপর্ণ হাসি থামিয়ে বলল, “না, শোনো, ব্যাপারটা সিরিয়াস। ওর বাঁ পায়ে ছটা আঙুল ছিল। এখন নেই।”

নেই মানে? এখন পাঁচটা আঙুল?”

হ্যাঁ। তোমার-আমার মতো।”

ভুল দেখোনি তো? হয়ত বাঁ পায়ে নয়, ডান পায়ে? তুমি ভুলে গেছ। শানু তো তোমাকেই ভুলে গেছে।”

শ্রীপর্ণ মাথা নাড়ল জোরে। “না, না। ভুল হয়নি। বাঁ পায়ে, আমি জানি। শুধু তাই না, ও যখন চটি খুলছে, তখন ওর বাঁ পা আমার দিকে। তখনই খেয়াল হয়েছে। আর ভেতরে ঢুকে ও ঘুরে দাঁড়িয়ে চটি পরছে, তখন ওর ডান পা দেখতে পাচ্ছি। কোনও পায়েই ছটা আঙুল নেই। আমি এতটাই বিচলিত হয়ে গেছিলাম, যে ঘরে ঢুকতে গিয়ে একটা মিস-স্টেপ করে প্রায় পড়ে গেছিলাম। শানু ধরে না ফেললে হয়ত পড়েই যেতাম...”

প্লাস্টিক সার্জারি?”

জানি না। কিন্তু আর একটা ব্যাপার আছে।”

মিঞ্জিরি বলল, “আবার কী ব্যাপার।”

বললাম না, শানুর দুটো জন্মগত অসঙ্গতি ছিল? অন্যটা দেখা যায় না।”

আবার মিঞ্জিরির ভুরু বেঁকে উঠল।

ঢোঁক গিলে শ্রীপর্ণ বলেই ফেলল। “ওর বাঁ গলার নিচ থেকে বাঁদিকের কাঁধ, বুক, পেট, পিঠে — একটা জন্মদাগ ছিল...”

তুমি জানলে কী করে?”

বন্দুকের গুলির মতো প্রশ্নটা এল। এটাই শ্রীপর্ণর অস্বস্তি ছিল। এবারে পুরো ঘটনাটা বলতেই হবে। “-ই বলেছিল। ওর মা-বাবা সারাক্ষণ দুশ্চিন্তা করত। বিয়ে হবে কী করে? যত দিন যাচ্ছিল, তত নাকি মা-বাবার আলোচনা বাড়ছিল। ওর সামনেই। ফ্যামিলি বলতএ তো ওর বাবা একা ভাই, নিঃসন্তান বালবিধবা পিসি, আর ও-ও একমাত্র সন্তান। মা-বাবা-পিসির আলোচনা সারাক্ষণ চলত বিয়ে হবে না। ওরকম একটা বিরাট জন্মদাগের কথা না বলে বিয়ে দেওয়া যাবে না, আর বললে কি মেয়েকে কেউ ঘরে নেবে?”

তখনকার দিনে একটা সমস্যা বটে,” মেনে নিল মিঞ্জিরি।

ওর-ও আলোচনা করার কেউ ছিল না। তখন তো ওর একমাত্র বন্ধু আমি। একদিন বলেছিল। আমার মাথায় দুষ্টুবুদ্ধি এসেছিল, বলেছিলাম, কেমন দাগ না দেখলে বলব কী করে, কেউ বিয়ে করবে কি না? তখন একটুখানি দেখিয়েছিল...”

মেয়েদের বুক দেখার জন্য কতো বুদ্ধি!”

শ্রীপর্ণ বলল, “কী করি বলো? গ্রামের ছেলে... এক্সপোজারই বা কতটুকু? তবে না, বুক দেখিনি। গলা আর কাঁধ-টুকুই দেখিয়েছিল...”

-হা-রে, বেচারা...” কপট সহানুভুতি ঝরে পড়ল মিঞ্জিরির কণ্ঠে। “সাধে কী মা বাবা নাম রেখেছে শ্রী-পর্ণো?

শ্রীপর্ণ উত্তর দিল না। এই তামাশাটা পরিচয়ের প্রথম থেকেই মিঞ্জিরি করে। শানুকে রক্ষা করার জন্য মিথ্যে বলে সব দায় নিজের ওপরেই নিয়েছে। ও শানুকে বলেনি কিছু। শানুই দেখাতে চেয়েছিল ওর সাহস-ই হচ্ছিল না। কাঁধ আর ঘাড়ে দাগ দেখেই ক্ষান্ত দিয়েছিল। শানুই সবটা খুলে দেখায়। শানুই ওর হাতটা টেনে নিয়ে বুকের ওপর রাখে, বলে, “দেখ, হাত দিয়ে কিছু বোঝা-ই যায় না।” শ্রীপর্ণর জীবনে সেই প্রথম নারী-শরীর, সেই প্রথম প্রেমের অঙ্গীকার। ‘তোকে কেউ বিয়ে করবে না কেন ভাবিস? তুই এত সুন্দর…’ ‘এই দাগ নিয়ে কে আমাকে বিয়ে করতে চাইবে বল? তুই করবি?’ ‘আমাদের বাড়ি থেকে করতে দেবে না।’ ‘পালিয়ে গিয়ে? পারবি না, আমাকে নিয়ে পালাতে?’ পারত? জানে না শ্রীপর্ণ। তখনও জানত না, কিন্তু বলেছিল, ‘পারব। একদিন তোকে নিয়ে পালিয়ে যাব...’ সে স্মৃতি আজও শিহরিত করে শ্রীপর্ণকে। সে সব শানু ভুলে গেছে — সেটাই ও মানতে পারছে না শুরু থেকেই…

নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, “তুমি তো ওকে দেখেছ বেশ কয়েকবার। কী পোশাকে দেখেছ?”

একটু ভেবে উত্তর দিল মিঞ্জিরি। “বেশিরভাগ সময়েই সালোয়ার কুর্তা। একদিন দেখেছিলাম বাগানে শার্ট আর জিন্‌স্‌ পরে।”

শ্রীপর্ণ বলল, “মানে সবসময়েই গলা, বুক, পেট ঢাকা — তাই তো?”

মিঞ্জিরি বলল, “ইয়েস। আর যতদূর মনে পড়ছে কামিজ বা কুর্তিরও বেশ গলা উঁচু, আর কলার — ওই স্ট্যান্ড আপ ম্যান্ডারিন কলার দেওয়া।”

শ্রীপর্ণ বলল, “ইয়েস। ছোটোবেলায় ওর স্কুলের শাড়ির ব্লাউজও ওরকম উঁচু কলারওয়ালা ছিল। কাল শাড়ি পরেছিল। বলেছিল সোমেশ্বরবাবু নাকি পছন্দ করেন না শরীর দেখানো পোশাক। তাই উনি নেই বলে পরেছিল। শাড়ি, আর খুব ছোটো স্লিভলেস ব্লাউজ। একটা স্টোল ছিল কাঁধে। ঘরে ঢুকে সেটা খুলে ফেলেছিল। তারপরে যখন কাছে এসেছিল, তখন সামনা সামনি দেখেছিলাম... শাড়িটাও বেশ সি-থ্রু। ওই তোমাদের কী — জর্জেট না শিফন...”

মিঞ্জিরি হেসে বলল, “জর্জেট, শিভন, ভয়েল, কোটা… সবই সি-থ্রু হতে পারে। তা থ্রু দিয়ে কী সি করলে?”

কোনও দাগ নেই। পরিষ্কার স্কিন।”

একটু চুপ করে থেকে মিঞ্জিরি বলল, “কোনও দাগ নেই? তা হয়? তুমি যে জায়গাটা আগে দেখেছিলে, কালও সেটাই দেখেছিলে?”

ঘাড় কাত করে হ্যাঁ বলে শ্রীপর্ণ হাতের তালুটা বাঁ কাঁধ আর ঘাড়ের সংযোগস্থলে রেখে বলল, “এইখানটা। বলেছিল, ছাড়া বাঁ কাঁধ, বুক, আর পেটের ওপরের ভাগ সর্বত্র রয়েছে। বগলেও। সেদিন ওর সরু, স্লিভলেস ব্লাউজে কেবল বুকটুকুই ঢাকা ছিল। বগল, কাঁধ, গলা, পেট — সবই খোলা।”

বয়সের সঙ্গে মিলিয়ে যেতে পারে জন্মদাগ? বা চিকিৎসা করা যায়?”

শ্রীপর্ণ ভুরু কুঁচকে রয়েছে। বলল, “জানি না। যায়?”

ানে না মিঞ্জিরি। বলল, “জানো, আমিও তোমাকে বলিনি, তুমি কষ্ট পাবে বলে, কিন্তু দ্বিতীয় দিন যেদিন আমি একা ওর সঙ্গে দেখা করতে গেলাম, সেদিনও বলেছিল ছোটোবেলায় তোমাকে ও চিনতই না।”

চিনত না? বলে দিল?”

তুমি বললে তো ও তোমাদের গ্রামে ছোটোবেলায় থাকত না। না থাকলে চিনবে কী করে? সেইজন্যই গ্রামের কিছুই চিনতে পারে না... হতে পারে না?”

শ্রীপর্ণ বলল, “ভাবতে পারছ তার অর্থ কী দাঁড়ায়?”

পারছি,” বলল মিঞ্জিরি। সেই জন্যই বলছি, এত সাংঘাতিক একটা অ্যালিগেশন করার আগে ভাবতে হবে।”

আমি ভেবে পাচ্ছি না। কী করা যায় বলো তো?”

জানি না। দাঁড়াও, একটু ভাবি,” বলে বিছানায় শুয়ে পড়ল মিঞ্জিরি। “রাত প্রায় দেড়টা। ঘুমোবে, না গার্লফ্রেন্ডের বুকের জন্মদাগ নিয়ে বসে থাকবে? কালে কলেজ নেই? আমার আটটায় প্রিনসিপ্যাল সেক্রেটারির সঙ্গে মিটিং আছে অনলাইন… তারপরে বিহানতলা যাব। ঘুমোতে হবে।”

বলল বটে, কিন্তু ঘণ্টাখানেক বাদে মিঞ্জিরিই শ্রীপর্ণকে ঠেলে তুলে ফোনটা বাড়িয়ে দিয়ে বলল, “এই দেখো, উইকিপিডিয়া বলছে কিছু জন্মদাগ বড়ো হবার সঙ্গে হালকা হয়ে যায়, আবার লেজার ট্রিটমেন্টও করা যায়...”


পরদিন সকালে প্রিনসিপ্যাল সেক্রেটারির সঙ্গে অনলাইন মিটিং করতে করতে মিঞ্জিরিকে টেবিলের নিচ থেকে লুকিয়ে ফোন কর শ্রীপর্ণকে ঘুম থেকে তুলতে হলো। মিঞ্জিরির মিটিং শেষ হতে হতে শ্রীপর্ণ বেরিয়ে গেছে। খাবার টেবিলে এক টুকরো কাগজে লিখে রেখে গেছে — থ্যাঙ্কস ফর দি ওয়েক আপ কল। সায়ংকালে দেখা হবে? বিহানতলা থেকে কখন ফিরবে?

আজকাল কেউ নোট লেখে না। সবই মোবাইল ফোন খেয়ে নিয়েছে। শ্রীপর্ণ অভ্যাসটা ছাড়েনি। ওর ছোটো ছোটো নোটের কাগজ থাকে — কলেজ থেকে সব বাড়তি কাগজ পুরোনো নোটিস, অপ্রয়োজনীয় চিঠি, রাফ কাগজ... নিয়ে আসে, তারপরে নোট-পেপারের সাইজে কেটে নেয়। চট করে ঘড়ি দেখে নিয়ে ব্রেকফাস্টের টোস্ট বানাতে বানাতে মিঞ্জিরি মোবাইল তুলে উত্তর লিখল, ‘বিহানতলা থেকে দ্বিপ্রহরেই ফিরব। সায়ংকালে বাড়িতে থাকব।’

শ্রীপর্ণ সন্ধে ছটা নাগাদ ফোন কল। “মেট্রোতে ঢুকছি।”

ঘণ্টাখানেক বাদে বাড়িতে ঢুকল। মিঞ্জিরি জিজ্ঞেস করল, “এখনই বেরোবে? না কফি খাবে?”

শ্রীপর্ণ ওর দিকে তাকিয়ে বলল, “এখনই… কোথায় বেরোব? সেজেগুজে তৈরি হয়ে বসে আছ? কোথায় যাবে...”

মিঞ্জিরি বলল, “দেবাঙ্কনদার বাড়ি যাব। ফোন করে বলে রেখেছি।”

শ্রীপর্ণ হাত মুখ ধুতে ধুতে থেমে ঘুরে দাঁড়াল। “দেবাঙ্কন? তার মানে তোমার মাথায়ও এখন শানু ঘুরছে?”

মিঞ্জিরি বলল, “ঘোরা থামাতে পারছি না। অনেকগুলো গণ্ডগোল — তাই না? েমন তোমাকে না-চিনতে পারা, ছোটোবেলার কথা অসমাপ্ত রেখে, কিছু না বলে, কথা ঘুরিয়ে দেওয়া, ভুলভাল বলা… তারপর এই... সব… সব...

সারা দিন শ্রীপর্ণও কথাটা বার বার ভেবেছে। সেদিনও শানু যখন সোমেশ্বরের ইচ্ছেমতো শরীর-ঢাকা পোশাক পরার কথাটা বলছিল — তখনও জন্মদাগ দেখানোর বিষয়টা ওর মনে পড়ল না? ওই বাগানেই তো ঘটেছিল সব। স্কুল থেকে ফেরার পথে শানু বলেছিল, “পুকুরপাড়ে আসবি?” শ্রীপর্ণ যাবার পরে ঠিক ওই ভঙ্গীতে হাত নেড়ে ডেকেছিল। দু’বাড়ির চোখের এড়িয়ে পেছনের জংলা জায়গাটায় বিশাল একটা ঝোপঝাড়ের মধ্যে ঘটেছিল ঘটনাটা। এই রকম একটা কথা শানু ভুলে গেছে, তা-শ্রীপর্ণ মানতে রাজি নয়।

আগের দিন ক্যাফেতে বসে মোইদুল যখন বলেছিল পুলিশকে জানাতে হবে তখনও শ্রীপর্ণর দেবাঙ্কনের কথাই মনে হয়েছিল। মিঞ্জিরিরও ওর পাতানো দাদার কথাই মনে হয়েছে। না হলেও আজ শ্রীপর্ণই মনে করাতো।


১০

এটা পুলিশের কাজ নয়।”

ক কথায় ডিসমিস করে দিল দেবাঙ্কন।

তবে কার কাজ?” জানতে চাইল শ্রীপর্ণ

জানি না। ফেলুদা, ব্যোমকেশ, নিদেন শার্লক হোমস… কিন্তু পুলিশ তো নির্দিষ্ট কমপ্লেন না পেলে তদন্ত করতে পারে না। পারে কি? থানায় একটা কমপ্লেন হবে, ডায়রি হবে… তবে না?”

দেবাঙ্কন ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টের অফিসার। হবু বড়োকর্তা হিসেবে ওর নাম মাঝেমাঝেই ঘনিষ্ট মহলে আলোচিত হয়। শ্রীপর্ণ ভেবেছিল ওর কাছে এলে একটা সুরাহা হবে। কিন্তু…

বলল, “ওই নামগুলো তো কাল্পনিক চরিত্রের। আসল জীবনে এমন কেউ আছে?”

দেবাঙ্কন কফিতে চুমুক দিয়ে বলল, “তোর নালিশটাও তো কাল্পনিক। কোনও প্রমাণ আছে যেহিলা নকল?”

শ্রীপর্ণ বলল, “রিজনেব্ল্‌ সাসপিশনেরও জায়গা নেই বলছিস?”

দেবাঙ্কন ঘাড় নাড়ল। বলল, “রিজনেব্ল্‌ কি না জানি না, সাশপিশনের জায়গা আছে। কিন্তু সেটার ওপর স্টেপ নেবার রাস্তাটা কোথায়? কে কমপ্লেন করবে, কার কাছে? তুই ডায়রি করবি?”

শ্রীপর্ণ বলল, “একটাই সমস্যা। যদি আমি ডায়রি করি, সেটা প্রকাশ হলে কী হবে? যদি তদন্তে দেখা যায় যে আমার ভুল হয়েছিল, তাহলে ভবিষ্যতে আমার সঙ্গে আদায়-কাঁচকলায় হবে।”

দেবাঙ্কন বলল, “বললি তো তোদের সঙ্গে ওদের এমনিই আদায়-কাঁচকলায় ছিল দুই তিন পুরুষ আগে।”

শ্রীপর্ণ বলল, “সেটা তো আমাদের বাবা-রা ঘুচিয়ে দিয়েছিল। আবার তৈরি করার কারণ দেখি না তো।”

মিঞ্জিরি ঝুঁকে পড়ে নাটকীয় ফিশফিশ করে বলল, “তার ওপর আবার তিনি গার্লফ্রেন্ডও ছিলেন ছোটোবেলায়।”

দেবাঙ্কন বলল, “লেট আস বি প্র্যাকটিক্যাল। ধর তুই কমপ্লেন করলি। তারপরেও এগোন’র রাস্তা কী? পুলিশ ওদের কাছে গিয়ে পেপার্স চাইবে? তোর ধারণা মেয়েটা আসল না, অন্য কেউ উড়ে এসে জুড়ে বসেছে। তা-ই যদি হয়, তাহলে নকলথির অভাব হবে? সে সব ইনভেস্টিগেট করা মুখের কথা?

জানে না শ্রীপর্ণ। এসব কি একজন কলেজ-শিক্ষকের জানার কথা? চুপ করে রইল।

মিঞ্জিরি বলল, “ওদের কাছে না জিজ্ঞেস করে বের করার অন্য উপায় নেই?”

দেবাঙ্কন বলল, “কী সেটা? এরকম পরিস্থিতিতে দু’রকম উপায় থাকতে পারে। এক কাগজপত্র — যেমন আধার কার্ড, পাসপোর্ট, ইত্যাদি। অন্যথায় উইটনেস। তোদের গ্রামে কেউ নেই, যে ওকে চিনতে পারবে? বা ওর আত্মীয়স্বজন কাউকে খবর দেওয়া যেতে পারে?”

বার মাথা নাড়ল শ্রীপর্ণ। আবার বলল, “গ্রামে কেউ ওক চোখেই দেখেনি বিশ বছরের ওপর। তার ওপর তখনও শানুর বন্ধুবান্ধব কেউ ছিল না আমি ছাড়া। জমিদারি না থাকলেও জমিদার সুলভ চলাফেরা আচার আচরণ ওদের। বাড়ি থেকেও অনুমতি ছিল না কারও সঙ্গে বেশি দহরম-মহরম করার।”

ফ্যামিলি? আত্মীয়?”

আবার মাথা নাড়া। “শানুর পিসি ও বাড়িতেই থাকেন। অশীতিপর বৃদ্ধা — চোখে দেখেন না, কানে শোনেন না, কথা বলতে পারেন না ঠিক করে। শানু প্রথম দিন মাদের নিয়ে গিয়েছিল।” বার বার — শ্রীপর্ণ... পাশের বাড়ি… বাবার নাম, ঠাকুর্দার নাম বলা সত্ত্বেও কোনও স্মৃতিই জাগানো যায়নি। “মামাবাড়ির খবর জানি না। গ্রামে আর কেউ জানে কি না খোঁজ করা যেতে পারে, কিন্তু সে-ও কেউ বলতে পারবে কি না কে জানে... উপরন্তু সে খবর যদি ওদের কাছে আবার পৌঁছে যায়...”

মিঞ্জিরি একটু ভাবিত হয়ে বলল, “কাম টু থিঙ্ক অফ ইট, সেদিনও পিসিকে শানু কেবল — দেখো কে এসেছে, বলে আর কিছু বলেনি। তোমার নাম, ডাকনাম, বা-ঠাকুর্দার নাম — এমনকি পদবিটাও তুমিই বলেছ।”

শ্রীপর্ণ বলল, “আমি যত দেখছি, তত ভাবছি ব্যাপারটা পুরোটা গোলমেলে।”

দেবাঙ্কন কিছুক্ষণ তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে চেয়ে থেকে বলল, “গুড। তাহলে তুই থানায় যাবি, তাই তো?”

থানায়? দেবাঙ্কনের দিকে অনিশ্চয়তার দৃষ্টিতে চেয়ে রইল শ্রীপর্ণ। দেবাঙ্কন হেসে বলল, “দেখলি? যতই দেখছিস, ততই ভাবছিস, কিন্তু শিওর হতে পারছিস না। তাহলে?”

কলেই চুপ। দেবাঙ্কন বলল, “তাহলে আমিই বলি। সত্যিই এমন পরিস্থিতিতে প্রাইভেট ডিটেকটিভরা ভালো রেজাল্ট দিতে পারে। কিন্তু তাদের তো ফি দিতে হবে। কে দেবে? তুই?”

শ্রীপর্ণ বলল, “ফি কত? খুব বেশি হলে...”

দেবাঙ্কন বলল, “কমও হবে না। কাজটাতেই খরচা আছে। বে-আইনি কিছু করতে হতে পারে… যেমন ধর আধার কার্ড বা পাসপোর্টের ডিটেইল জোগাড় করা... আমি আনঅফিশিয়ালি হেল্প করতে পারি, কিন্তু আনঅফিশিয়াল হেল্প কতটা করা যায়? তারও লিমিটেশন আছে। কোথাও কোথাও টাকা দিয়ে ইনফরমেশন বের করতে হতে পারে। তার বাজেট কেউ দিতে পারে? তবে সবার আগে ঠিক কর পরের বাড়ির মালিক নিয়ে এইরকম খরচ করার দরকার আছে কি না।”

একটু ভাবল শ্রীপর্ণ। তারপর বলল, “একটা কথা বলি… একটু আগে যেমন বললাম, পাশের বাড়িতে যে থাকবে তার সঙ্গে অসদ্ভাব যেমন করতে চাই না, তেমনই পাশের বাড়ির বাসিন্দা হয়ত ভুয়ো, আসলে অন্য কেউ — এমন হলেও সেটা নিতে পারব না। সারাক্ষণ স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে হবে, অথচ মনের মধ্যে খোঁচ থাকবে — এ অন্য কেউ না তো? এমনভাবে থাকা যাবে?”

বুঝলাম। তাহলে একটু দেরি হবে। তাড়া নেই তো? রাতে খেয়ে যা। আমি শ্রীমানকে বলে দিচ্ছি...”

অকৃতদার দেবাঙ্কনের বাড়ির তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব বহু বছর ধরে শ্রীমানের। ডাকামাত্র এসে বলল, “তাহলে আরসালানের বিরিয়ানি আর কাবাব বলে দি’? বাড়িতে তো তিনজনের খাবার মতো অত নেইকো।”

সে যা খুশি করো, তবে তিন নয়, চারজনের...” বলে শ্রীমানকে বিদায় করে দেবাঙ্কন ফোন করে কাকে বলল, “স্বপ্ন দেখছ, না খুব ব্যস্ত?” তারপরে বলল, “কিছু যদি না করো তাহলে আমার বাড়ি চলে এসো, বিরিয়ানি খেয়ে যাবে… আরে, হ্যাঁ, এখনই।”

ফোন রেখে বলল, “স্বপ্ননীল সখের গোয়েন্দা। বুদ্ধিশুদ্ধি আছে। আর সখের বলে খুব পয়সার খাঁই নেই। দেখি, কী বলে।”

এখনই আসছে?”

এই তো এখানেই থাকে — পাড়ার ছেলে। পনেরো মিনিটের মধ্যে আসছে।”


১১

ব্যাপারটা বুঝেছি। কিন্তু কোন দিক থেকে শুরু করি?”

্বপ্ননীলের বয়স কুড়ির কোঠায় পৌঁছেছে বেশিদিন নয়। উজ্জ্বল চোখ, পরিষ্কার গাল, গোঁফ নেই, ছোটো করে ছাঁটা চুল। ব্যয়াম করা চেহারা। টি-শার্টে লেখা — ‘আমার শহর’, আর হাওড়া ব্রিজের একটা হাতে-আঁকা আঁকাবাঁকা ছবি। মিঞ্জিরি ভাবছিল, এ কি এখনও ছাত্র? কলেজের পড়াশোনার সঙ্গে সখের গোয়েন্দাগিরি করে?

দেবাঙ্কন বলল, “প্রথমে যা যা ইনফরমেশন আছে সেটা যাচাই করো।”

স্বপ্ননীলকে বলল, “অ্যাভেলেব্ল্‌ ইনফরমেশন সামান্য। চৌধুরীবাড়ির একমাত্র ওয়ারিশ শানু, ওরফে শান্তা চৌধুরী, বিদেশে থাকতেন, কিছুদিন হলো দেশে ফিরেছেন স্বামীর সঙ্গে। স্বামীর নাম সোমেশ্বর — পদবী জানা নেই। কোথায় থাকতেন বিদেশে — তার কোনও হদিস আছে কি?”

াথা নাড়তে যাবে শ্রীপর্ণ, মিঞ্জিরি হঠাৎ বলল, “সোমেশ্বর নাথ। ব্রাসেলস্‌। প্রথম দিন পরিচয় দেবার সময় বলেছিলেন। কোথায় কোথায় থেকেছেন বলতে গিয়ে বলেছিলেন ‘সব শেষে ব্রাসেলসে — ওখানেই আলাপ হয় শানুর সঙ্গে।’ আরও বলেছিলেন — তখন থেকেই ভবঘুরেপনার অন্ত।”

কবে নাগাদ দেশে এসেছিলেন জানেন?” জানতে চাইল স্বপ্ননীল।

মিঞ্জিরি বলল, “না। কবে থেকে গ্রামের বাড়ি বানানো শুরু হলো সেই তারিখটা পাওয়া যাবে না? পঞ্চায়েত, ব্লক, কোথাও তো অনুমতি পেতে হয়েছে?”

স্বপ্ননীল জিজ্ঞেস করল, “গ্রামের লোকও বলতে পারতে পারে? মানে কবে বাড়ির কনস্ট্রাকশন শুরু হয়েছে...”

সে হয়ত আমার দেওর — শ্রীপর্ণর ভাই-ই বলতে পারবে। পাশাপাশি বাড়ি তো...”

্বপ্ননীল একটু ভেবে বলল, “ব্রাসেলসে উনি কোথায় ছিলেন জানেন? মানে কী করতেন… চাকরি-টাকরি, না কি সংসারী ছিলেন?”

শ্রীপর্ণ আর মিঞ্জিরি মুখ তাকাতাকি করল। শানু কী করত ওরা জানে না। প্রথম দিন শ্রীপর্ণ দু’চারবার প্রসঙ্গটা উত্থাপন করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু শানুর কাছ থেকে বিশেষ সাড়া পায়নি। কথা ঘুরিয়ে দিয়েছিল। শেষ দিন কি কিছু বলেছিল? মনে নেই শ্রীপর্ণর। ততক্ষণে ওর মাথায় অন্য চিন্তা ভীড় করেছিল...

হুঁ, তার মানে প্লেস অফ ওয়ার্ক থেকেও ইনফরমেশন পাওয়ার উপায় নেই,” বলল স্বপ্ননীল।

মিঞ্জিরির হঠাৎ খেয়াল হলো। শ্রীপর্ণকে বলল, “আচ্ছা, জিতুদা বলতে পারবে না? জিতুদা কোথা থেকে জানতে পেরেছিল, শানু বাড়ি বানাচ্ছে?”

একটু ভুরু কুঁচকে থেকে শ্রীপর্ণ বলল, “ওকে চিতু-ই খবর দিয়েছিল। তবু — জানতে পারে। দাঁড়াও জিজ্ঞেস করি। এখন তো ওর প্রায় দুপুর। ইউনিভার্সিটিতেই থাকবে এখন।”

কপাল ভালো, হোয়াটস-অ্যাপে ‘তোকে এখন একটা ফোন করতে পারি?’ লেখার প্রায় সঙ্গে সঙ্গে ফোন করল জিতুদা। ওকে কিছু বলল না শ্রীপর্ণ। শুধু জানতে চাইল, শানু কোথায় থাকত, কী করত, ও জানে কি না।

অ্যামেরিকায় ছিল না?” বলল জিতুদা। “কোথায় টোথায় জানি না।”

অ্যামেরিকায়, না ব্রাসেলসে?” জানতে চাইল শ্রীপর্ণ

ব্রাসেলস?” জিতুদা অবাক। “কেন, ব্রাসেলস কেন? ওখানে কী? কোনও পলিটিকাল অর্গানাইজেশনে ছিল নাকি? ইউনাইটেড নেশনস বা ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন? কেমিস্ট্রি পড়াত না অ্যামেরিকায়?”

ব্রাসেলসেও হয়ত পড়াত? ইউনিভার্সিটি নেই ওখানে?”

জিতুদা বলল, “আহা, থাকবে না কেন? তবে কেউ শুনেছিস কখনও ব্রাসেলসে পড়াতে গেছে?”

শোনেনি। তা বলে কি কেউ যেতে পারে না? কথা শেষ করতে না করতে ফোন থেকে চোখ তুলে মিঞ্জিরি বলল, “ব্রাসেলসে কেমিস্ট্রি ভ্রাই বা ভ্রাজে ইউনিভার্সিটি হতে পারে।”

স্বপ্ননীল বলল, “আর কিছু না পেলে ওখানে খোঁজ করা যেতে পারে — ডিপার্টমেন্টে ফোন করে জানতে চাওয়া — শান্তা চৌধুরীর সঙ্গে কথা বলতে চাই… কিন্তু সে সব পরে। কয়েকটা ব্যাপার আবার কনফার্ম করে নিই — আপনার সন্দেহের কারণ হলো এক, শান্তা চৌধুরীর সঙ্গে কথা বলে মনে হয়েছে, উনি আপনাকে একেবারেই চিনতে পারেননি, যদিও আপনাকে ভুলে যাবার কোনও কারণই নেই...”

শ্রীপর্ণ বলল, “শুধু তাই নয়, ও নিজেই বলেছে, গ্রামের কিছুই বা কাউকেই ওর মনে নেই। স্কুল, নিজের বাড়ি সমন্ধে যে কোনও অতীত আলোচনা সবসময়ই এড়িয়ে যয়।

স্বপ্ননীল বলল, “বেশ। দুই, শান্তা চৌধুরীর শরীরে দুটো জন্মগত বৈষম্য ছিল — এক পায়ে ছ’টা আঙুল, আর কিছু জন্মদাগ, যেগুলো আর নেই। ঠিক?”

মিঞ্জিরি বলল, “তবে দুটোই সম্ভবত প্লাস্টিক সার্জারি করে ঠিক করা যায়। কিছু জন্মদাগ বয়স বাড়লে মিলিয়ে আসে। আমি গুগ্‌ল্‌ করে দেখেছি, লেজার ট্রিটমেন্টের আগে-পরে জন্মদাগের ছবিতে দাগ খুঁজে পাওয়া কিন্তু দুষ্কর।”

শ্রীপর্ণ বলল, “আবার শানু নিজেই বলেছে, যে ওর স্বামী ওকে গা-ঢাকা ছাড়া পোশাক পরতে দেয় না।”

ভুরু কুঁচকে দেবাঙ্কন বলল, “কেন?”

শ্রীপর্ণ বলল, “আমার ধারণা যেহেতু শানু নকল, তাই সোমেশ্বর চানস নিচ্ছে না। শানুর শরীরের যেখানে যেখানে জন্মদাগ থাকার কথা, সেসব জায়গার অনেকটাই শাড়ি পরলে দেখা যাবে। গ্রামে অনেকেই শানুকে ছোটোবেলায় দেখেছে। অত বড়ো, বিস্তৃত জন্মদাগ দেখে থাকলে অনেকেরই মনে থাকা উচিত। আদতে শানু সবসময়ই শরীর ঢাকা পোষাক পরত। স্কুলেও যে বয়সে মেয়েদের শাড়ি পরতেই হবে, তখন ওর বাবা বিশেষ অনুমতি করিয়েছিল ও যাতে স্কার্ট-ব্লাউজ পরেই স্কুলে যেতে পারে। ফলে ওর সমবয়সীদের থেকে ও আরও আলাদা হয়ে যায়। পরে যখন শাড়ি পরেও, ওর ব্লাউজ আর পাঁচজন মেয়ের মতন ছিল না, কলার তোলা গলাবন্ধ, আর ঝুল প্রায় কোমর অবধি। কিন্তু সোমেশ্বর হয়ত সে সব কথা জানে না?”

স্বপ্ননীল বলল, “আপনার অস্বস্তিটা বুঝতে পারছি, কিন্তু কোনও সলিড গ্রাউন্ড নেই, এগোনোরও উপায় খুব অল্প।”

হঠাৎ শ্রীপর্ণ লাফিয়ে উঠে বলল, “আর একটা আছে, আরে, আমি ভুলেই গেছিলাম। এটাও আশ্চর্য। শানু মিনিকে বলেছে, ও নাকি ভীষণ ভীতু। সোমেশ্বর না থাকলে ও রাতে একা থাকতেই পারে না। কী, বলো?”

মিঞ্জিরি বলল, “বলেছে। তো?”

শ্রীপর্ণ বলল, “আরে, ওর মতো সাহসী খুব কম ছিল। একবার মাঝরাতে শ্মশানে গিয়ে ছেলেদের ভয় দেখিয়েছিল। একা।”

কেউ কিছু বলছে না, ওর দিকে তাকিয়ে আছে দেখে শ্রীপর্ণ বলে চলল, “ওই সময়েরই কথা — ক্লাস নাইন, বা টেন বড়োজোর। আমাকে ক্লাসের ছেলেরা চ্যালেঞ্জ করেছিল অমাবস্যার রাতে শ্মশানে যেতে। আমি চ্যালেঞ্জ নিয়ে রাত্তিরে শ্মশানে যাচ্ছি, আর আমার বন্ধুরা তিনজন মুখে চুন-কালি মেখে ভয় দেখাতে আসছে। ওদিকে শানু করেছে কী, আমার কাছ থেকে শুনে রাতে কয়লার বস্তায় ফুটো করে মাথায় পরে এসেছে শ্মশানে — একা একা। তারপরে ছেলেরা যখন কাছাকাছি এসেছে, ও রাস্তার ধার থেকে উঠে এসে ওদের ‘আঁয়, আঁয়,” বলে ডেকেছে। ওরা তো দুদ্দাড়িয়ে পালিয়েছে। তারপর আমি যখন যাচ্ছি, তখন নাকি সুরে, ‘শীঁতুঁ এঁলিঁ? এঁখাঁনেঁ আঁয়...’ বলে ডেকেছে।”

তুমি কী করেছিলে?” জানতে চাইল মিঞ্জিরি।

আমি কি জানি ওটা কে? আমি ভেবেছি আমার বন্ধুরাই কেউ। লাঠি উঁচিয়ে ‘তবে রে’ বলে তেড়ে গেছি। তখন দৌড়ে আমার সঙ্গে পারবে না বলে, ‘শীতু, শীতু, আমি…’ বলে বস্তা খুলেছে। ওর কাছে শুনলাম বন্ধুরা আমাকে ভয় দেখাতে আসছিল, ও ওদের ভয় দেখিয়ে তাড়িয়েছে। ওকে বাড়ি অবধি পৌঁছে দিয়ে আমি ফিরি। তারপরে কয়েক দিন স্কুলে আসেনি। সকালে ঘুম ভাঙার আগে মা দেখেছিল সারা গায়ে কয়লার কালি, ঘরের মেঝেতে বস্তা। এমন মার খেয়েছিল — গরম খুন্তির ছ্যাঁকা দিয়েছিল — সময় লেগেছিল সারতে… মা-বাবা দু’জনেই খুব মারত। জমিদারের মেয়ে, জমিদারী চালে চলতে হবে... আর শানু ছিল গেছো মেয়ে। মা-বাবা যত কনট্রোল করার চেষ্টা করত, ততই চুপচাপ বিদ্রোহ করে মা-বাবার বিরুদ্ধে যেত... সেই জন্যেই আমার সঙ্গে অত বন্ধুত্ব...” একটু চুপ করে থেকে শ্রীপর্ণ বলল, “এই শানু আমাকে আজ চিনতে পারছে না, আমি মেনে নিতে পারব?”

মিঞ্জিরি বলল, “শুধু তাই নয়, এরকম একজন ভূতের ভয়ে রাতে একা থাকতে পারে না?”

হাত নেড়ে স্বপ্ননীল বলল, “পরিণত বয়সে সত্যি ভূত দেখেছেন হয়ত? শোনা যায় তো এমন...”

মিঞ্জিরি বলল, “না। আমাকে বলেছে ছোটো থেকে ভীষণ ভূতের ভয়। সোমেশ্বর যখন গ্রামের বাড়ির কনস্ট্রাকশনে যেত, তখন একা থাকতেই পারত না শহরের ফ্ল্যাটে।”

স্বপ্ননীল একদৃষ্টে তাকিয়ে বলল, “কোন শহরে? কী ফ্ল্যাট?”

মিঞ্জিরি বলল, “এখানে ওদের ফ্ল্যাট আছে তো।”

দেবাঙ্কন বলল, “আচ্ছা লোক তো? এতক্ষণ ব্রাসেলস আর ক্যানাডা করলি — এখানে ফ্ল্যাট আছে বলছিস না?”

শ্রীপর্ণ বলল, “আমি জানতামই না। কোথায় ফ্ল্যাট?”

মিঞ্জিরি লজ্জা পেয়ে বলল, “আমাকে বলেছিল। মনে ছিল না। ওপিডান অ্যাপার্টমেন্টস-এ।”

শ্রীপর্ণ বলল, “বাব্বা! ওপিডান? ওখানে সব আপমার্কেট ফ্ল্যাট। এন.আর.আই!”

দেবাঙ্কন বলল, “এন.আর.আই-ই তো। তাহলে, স্বপ্ননীল, শুরু করার জায়গা পেয়ে গেলে…”

স্বপ্ননীল বলল, “কোনও ছবি আছে?”

আবার মুখ তাকাতাকি করল শ্রীপর্ণ আর মিঞ্জিরি। স্বপ্ননীল বলল, “কোই বাত নেহি। নেক্সট কবে যাচ্ছেন?”

শ্রীপর্ণ বলল, “এখন তো তেমন কোনও কারণ নেই...”

স্বপ্ননীল বলল, “একটা অজুহাত বানিয়ে যান। একটা ছেলে সঙ্গে যাবে। বলবেন আপনার কোলিগের-টোলিগের ছেলে কেউ। পাখি দেখে। তাই অ্যাত্তোবড়ো লেন্‌স্‌ লাগানো ক্যামেরা নিয়ে গ্রামে গেছে। পাখি-টাখি আছে নিশ্চয়ই বাগানে?”

পাখি! দ্রুতগতিতে পরিস্থিতি শ্রীপর্ণর ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যাচ্ছে। অসহায়ের মতো তাকাল মিঞ্জিরির দিকে। মিঞ্জিরি বলল, “পেছনের বাগানে আছে। দোয়েল, হাঁড়িচাচা, ছাতারে…”

স্বপ্ননীল বলল, “তাই চলবে। অভাবে কাক, চিল, চড়াই দিয়েই কাজ চালানো হবে।”

শ্রীপর্ণ বলল, “খরচের একটা আন্দাজ যদি পেতাম...”

স্বপ্ননীল বলল, “সত্যি বলতে কী, ফাইনালি খরচ কত হতে পারে বলা খুব কঠিন। সেইজন্যই ডিটেকটিভরা দৈনিক ফি, আর তার সঙ্গে এক্সপেনসেস বলে কড়ার করে। ক্লায়েন্ট বাজেট অনুযায়ী বলে দেয় এতদিনের এক্সপেনস দেবে, তার বেশি হলে আবার অনুমতি নিতে হবে। আমার ওসব নেই। এতটুকু বলতে পারি, আপনার অসুবিধে হবে এমন অ্যামাউন্ট বিল করব না।”


১২

দিন পাঁচেক পরে দেবাঙ্কনের ফোন এল। “সন্ধেবেলা আয়।”

রেজাল্ট কিছু এল? পজিটিভ?”

পুলিশ বা ডাক্তার যদি বলে রেজাল্ট পজিটিভ সেটা কি আদতে পজিটিভ? আয় তো, খেয়ে যাবি। স্বপ্ননীলকেও ডেকেছি।”

সাড়ে আটটায় এসে ওরা দেখল স্বপ্ননীল অপেক্ষমান। তৈরি ছিল শ্রীমানও, সঙ্গে কফি আর পকোড়া।

পকোড়া?” ঠাট্টা করে বলল মিঞ্জিরি। “রাতে শুনলাম খাওয়াবে?”

খাওয়াব তো। সোনামুগের ডাল, পোস্ত-বড়া, ধোঁকার ডালনা আর পাবদা মাছের ঝাল। আগের দিন সময় দাওনি, দোকানের খাবার আনতে হয়েছিল।”

রাত্তিরে দুপুরের ভোজ খাওয়াচ্ছিস?” জানতে চাইল দেবাঙ্কন।

শ্রীমান বলল, “দুপুরে আসলেই দুপুরে খাওয়াব। ভাবলাম সুযোগ তো পাইনে, তাছাড়া কাল রোববার আছে...”

শ্রীমান চলে গেল রান্নাঘর সামলাতে, ওরা তাকাল স্বপ্ননীলের দিকে।

এখন পর্যন্ত যা পেয়েছি তার ওপর এগোন’ যায়।”

কী জানতে পারলেন?” ঝুঁকে পড়ল মিঞ্জিরি।

ওয়েল, প্রথমত ওপিডানের টাওয়ার ‘সি’-তে ২২০২ নম্বর ফ্ল্যাট কিনেছিলেন ডঃ শান্তা চৌধুরী। বাইশ তলার দু’নম্বর ফ্ল্যাট। বছরখানেক আগে দিয়ে দেন স্বামী সোমেশ্বর নাথ-কে। এই যে, ওনারশিপ, আর দানপত্রের দলিলের ছবি। দুটোতেই শান্তা চৌধুরীর সইয়ের আছে, দশ আঙুলের ছাপ।”

ওরা শান্তা চৌধুরীর সই দেখল, বড়ো ছবি, স্পষ্ট পড়া যায় শান্তার নাম।

এটা গ্রাম পঞ্চায়েত আর ব্লক অফিসে গ্রামে নতুন বাড়ি বানানোর আবেদনপত্র। সেই সঙ্গে আঙুলের ছাপ...”

মন দিয়ে দেখে শ্রীপর্ণ বলল, “একই?”

মাথা নাড়ল স্বপ্ননীল। “হ্যান্ডরাইটিং এক্সপার্ট দেখেছেন। ফ্ল্যাট যিনি কিনেছেন, আর যিনি হ্যান্ডওভার করেছেন তিনি একই লোক, কিন্তু গ্রাম পঞ্চায়েত, আর ব্লক অফিসে আবেদনে হাতের লেখা আলাদা।”

মিঞ্জিরি জানতে চাইল, “আর আঙুলের ছাপ?”

এবার উত্তর এল দেবাঙ্কনের কাছ থেকে। “আলাদা। ওই একই ব্যাপার। ফ্ল্যাট কিনেছেন, আর হ্যান্ডওভার করেছেন একই আঙুল, কিন্তু গ্রাম পঞ্চায়েতের কাছে আবেদন করেছে অন্য লোক।”

কোনটা আসল, কোনটা নকল — বোঝার কি উপায় আছে?”

নকল লোক ফ্ল্যাট কিনে দান করল, আর আসল লোক এসে গ্রামে বাড়ি বানাল? বোধহয় না। এখন যে আছে, সে-ই নকল। যিনি আজ থেকে চার বছর আগে বিদেশ থেকে এসে ‘একদিন এখানেই সেটল করব’ বলে ফ্ল্যাট কিনেছিলেন, তাঁর সই আর আঙুলের ছাপ মিলে যাচ্ছে দানপত্রের আঙুলের ছাপের সঙ্গে। ওপিডানের ফাইলে ছবিও রয়েছে… এই যে।”

পাসপোর্ট ছবিটা দেখেই লাফিয়ে উঠল শ্রীপর্ণ। “এই যে শানু, এইটা শানু। কোনও সমস্যা নেই। দেখেই চেনা যাচ্ছে।”

উঁকি মেরে পাশ থেকে ছবিটা দেখল মিঞ্জিরি। “কিন্তু এটা কোনও ভাবেই আমাদের দেখা শানু নয়। তাহলে এখন কে রয়েছে গ্রামে?”

স্বপ্ননীল বলল, “শুধু তা-ই নয়। ছবির এই মহিলা — শান্তা চৌধুরী বলে তাঁকে এখন কনফিডেন্টলি ডাকতেই পারি… প্রায়ই শাড়ি পরতেন। তখন ওনার ব্লাউজের নিচে, পেটের বাঁদিকে, এবং ব্লাউজের বাঁ হাতার নিচে হাতের কিছুটা অংশে হালকা জন্মদাগ পরিষ্কার দেখা যেত। সিকিউরিটি সার্ভিসের একাধিক মেম্বার, বাড়িতে যে মেয়েটা কাজ করত, কমিউনিটি সেন্টারের লাইব্রেরিয়ান, সবাই দেখেছে। তবে যা করার এবারে তাড়াতাড়ি করতে হবে। কোনও রকমে যদি ওপিডান, বা গ্রাম পঞ্চায়েতের অফিস থেকে ওদের কাছে খবর পৌঁছয় যে কেউ খোঁজ নিয়েছে, তাহলে ওরা সাবধান হয়ে যাবে

মহিলাটি কে?” আবার জানতে চাইল মিঞ্জিরি।

মাথা নাড়ল স্বপ্ননীল। “বোঝা যাচ্ছে না। চার বছর আগে বাড়ি কেনার পর শান্তা চৌধুরী প্রতি বছর এসেছেন, থেকেছেন। দু’বছর আগে প্রথম আসেন এই ভদ্রলোককে নিয়ে — নাম সোমেশ্বর নাথ, পরিচয় — স্বামী। পরে নেমপ্লেটে সোমেশ্বর নাথের নাম যোগ করা হয়। এখনও আছে। বছরখানেক আগে দু’জনের সঙ্গে আসন এই মহিলা। এনার নাম ধাম কেউ জানে না, কিন্তু মাস দুয়েক পরে সবাই একসঙ্গে চলে যান। তার আগে সোমেশ্বর নাথ কথায় কথায় কিছু লোককে জানান, পরদিন ভোরে শান্তার গ্রামের বাড়িতে শিফট করব — কবে ফিরব জানা নেই। গ্রামের বাড়ি নতুন করে বানানো হবে, ইত্যাদি। রেজিস্টারে লেখা আছে পরদিন ভোর চারটেয় ওদের গাড়ি বেরিয়ে যায়। গাড়িতে কে কে ছিল সেটা লেখার কথা নয়, তাই লেখাও নেই; অন-ডিউটি সিকিউরিটির গাড়ির ভেতরে দেখার অধিকার নেই, তাই দেখেওনি। তার পর থেকে ডঃ শান্তা চৌধুরীকে কেউ দেখেনি। ফ্ল্যাট বন্ধ, কারও হদিস নেই।”

ওরকম সব বাড়ি-টাড়িতে তো সিসিটিভি থাকে?” জানতে চাইল শ্রীপর্ণ।

অত পুরোনো ফুটেজ থাকে না। মাসখানেক, বড়োজোর মাস দেড়েক… তার বেশি মেমরি কারও কম্পিউটারে নেই। কোনও প্রব্লেম যদি তার মধ্যে রিপোর্ট করে কেউ, তাহলে সেই জায়গাটা হয়ত রাখা হয়। নইলে নিজে নিজেই ওভার-রাইট হতে থাকে।”

শ্রীপর্ণ দেবাঙ্কনের দিকে তাকিয়ে বলল, “অতঃ কিম?”

এবার তুই থানায় যাবি? কমপ্লেন করতে?”

যাব। বোঝা-ই যাচ্ছে মহিলা দু’নম্বরী, আর সোমেশ্বর নাথ ইজ সামহাউ ইনভলভড।”

দেবাঙ্কন বলল, “সামহাউ না, দেখা যাবে ও-ই ব্রেন। মহিলা ইজ আ পন।”

দেখিস বাবা, ভালো করে তদন্ত করিস। শেষে বেকসুর খালাস পেয়ে ফিরে হাজির না হয়…”

দেরি করা যাবে না। আজ রাতেই গেলে ভালো হত, কিন্তু অফিশিয়াল কিছু কাজ সেরে যেতে হবে... তাই কাল সকালেই...”


১৩

পরদিন শ্রীপর্ণ আর মিঞ্জিরিসঙ্গে ওদেরই গাড়িতে দেবাঙ্কন আর স্বপ্ননীল রওয়ানা দিল। প্রথমে ডিস্ট্রিক্ট হেডকোয়ার্টার অফ পুলিশ — সেখানে অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনার মহঃ য়েকে ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলল দেবাঙ্কন।

স্যার, বুঝতেই পারছেন, উই ফিয়ার দ্য ওয়ার্স্ট। পুলিশ মাস্ট মুভ কুইকলি।”

মহঃ সয়েফ হাসলেন। “এখনও ঘোড়ায় জিন দিয়েই চলো, দেবাঙ্কন? গুড। তবে ঠিক, দেরি করে লাভ নেই। কোন থানা বললে? িয়োগীপাড়া?” ফোন তুলে বললেন, “িয়োগীপাড়ায় বড়োবাবু কে?… বেশ… ফোন করে আমাকে কানেক্ট করে দাও...”

ফোন নামিয়ে কী বলতে যাবেন, আবার ফোন বাজল। ফোন তুলে বললেন, “পেয়েছ? বড়োবাবুকেই? বাঃ, লাইন দাও...” তারপরে বড়োবাবুকে কম কথায় বলে দিলেন কে যাচ্ছে, এবং কেন। বললেন, “দেখো, চট করে মুভ করতে হবে। রেডি থাকো, ওরা যাচ্ছে, ডায়রি করেই মুভ করবে। কতদূরে থানা থেকে?… , আচ্ছা… কী হয় আমাকে জানাবে।”

ফোন নামিয়ে বললেন, “সবই হলো, এবার এর পরিচয়? নাম তো স্বপ্ননীল — তার পরে? এই কেসে ওর কী রোল?”

দেবাঙ্কন বলল, “-ই কেসটা ক্র্যাক করেছে। প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটর। ব্রাইট ফিউচার...”

সম্ভাবনাময়?” হাসলেন সয়েফ। স্বপ্ননীলের দিকে তাকিয়ে বললেন, “এর চেয়ে বড়ো বার্ডেন আর হয় না, জানো তো?”

নম্রভাবে স্বপ্ননীল বলল, “হ্যাঁ, স্যার।”

বেশ বেশ। মাই বেস্ট উইশেস। মনে থাকবে তোমার কথা। কার্ড আছে?

গলার সুরে বোঝা গেল সময় শেষ হয়ে গেছে। স্বপ্ননীল বিজনেস কার্ড দিল, ওরা উঠে পড়ল।

-আড়াই ঘণ্টা লাগল না, এক ঘণ্টা পঁয়তাল্লিশ মিনিটেই পৌঁছে গেল নিয়োগীপাড়া। ডায়েরি নিয়ে বড়োবাবু বললেন, “আপনারা সকলেই যাবেন তো?”

দেবাঙ্কন শ্রীপর্ণর দিকে তাকিয়ে বলল, “তোরা যাবি? ওরা জেনে যাবে কে কমপ্লেইন্যান্ট। জামিন তো হবেই… তখন যদি গ্রামেই ফিরে যায়?”

এক মুহূর্ত ভেবে নিয়ে শ্রীপর্ণ বলল, “না, রে। আমাদের না দেখলে অন্য কাউকে সন্দেহ করবে — যেমন চিতু, হারান, বা সৌদামিনী। সঙ্গেই যাই বরং...”

এবারে দেবাঙ্কন ও-সির সঙ্গে জিপে উঠল, পুলিশের দুটো জিপ আর শ্রীপর্ণর গাড়ি সারি বেঁধে গ্রামে ঢুকে সবাইকে সচকিত করে দিল। গ্রামটা ছড়ানো ছেটানো প্রথমে প্রাইমারি স্কুল, তারপরে োমিওপ্যাথ নারায়ণচন্দ্র ভটচাজের আদি বাড়ি, তারপরে কুমোরপাড়া। বাজারের পরে ডানদিকে ঘুরে মুখুজ্জেদের বাড়ি। ইংরেজদের আমলে এদের বদনাম ছিল, সাহেবদের পা’চাটা বলে। ছোটোবেলায় শুনত এই বদনামের জন্যই ওরা গাঁ-ছাড়া হয়েছে। এবারে ডাইনে গেলে শ্রীপর্ণদের বাড়ি, আর সোজা গেলে জমিদার চৌধুরীদের বসত।

ুলিশের জিপ দুটো গিয়ে দাঁড়াল গেট জুড়ে। হারান তখনই ঢুকছে, পুলিশ দেখে বিনা-বাক্যে গেট খুলে দিল। জিপগুলো ঢুকল, শ্রীপর্ণর গাড়ি রইল বাইরেই।

স্বপ্ননীল, তুমি যাবে না?”

না, স্যার। আমি থাকলাম আপনাদের সঙ্গে। পুলিশের কাজ পুলিশ করবে।”

মিঞ্জিরি বলল, “তুমি কেসটা সল্‌ভ্‌ করলে, ওদের কাছ থেকে দেখতে ইচ্ছে করছে না?”

মাথা নাড়ল স্বপ্ননীল। বলল, “কাছ থেকে দেখেছি, ম্যা’ম। ইনভেস্টিগেশনে এসেছিলাম।”

চমকে শ্রীপর্ণ বলল, “মানে? এই বাড়িতে?”

স্বপ্ননীল বলল, “হ্যাঁ, স্যার। একটা প্রশ্নের উত্তর আমরা এখনও জানি না। ডঃ শান্তা চৌধুরী কোথায়? সেটাই বোঝা যায় কি না দেখতে এসেছিলাম।”

মিঞ্জিরি জিজ্ঞেস করল, “কিছু বুঝলে?”

মাথা নাড়ল স্বপ্ননীল। “না। দুটো বাড়িই ভালো করে খুঁজতে হবে।”

চমকে শ্রীপর্ণ বলল, “ওই ভাঙা বাড়িতেও থাকতে পারে?”

স্বপ্ননীল বলল, “ওখানেই থাকার সম্ভাবনা বেশি। এ বাড়িটা বেশি বড়ো না। আপনারা দেখেছেন কি না জানি না, দুটো বেডরুম — একটা পিসিমার, একটা ওদের। মাঝখানে ড্রইং রুম, ওদিকে একটা বইয়ের ঘর, আর কিচেন কাম ডাইনিং। এ বাড়িতে সৌদামিনী প্রায় সারাক্ষণ থাকে, আরও দুজন কাজের লোক আসে — হারানকে আসতে হয় বাড়ির ভেতরের গাছপালাগুলোর দেখাশোনা করতে, আর সপ্তাহে দু’দিন আসে নিয়তি — ওর কাজ সোফা, টেবিল, খাট বিছানা — এগুলোর ধুলো ঝাড়া। এখানে লুকিয়ে রাখা কঠিন, নয়, অসম্ভব।”

অবাক হয়ে মিঞ্জিরি বলল, “ সব জেনে গেলে এক দিনে? আমি তো প্রতিবেশী হয়ে এত খবর জানি না!”

স্বপ্ননীল হেসে বলল, “আপনি তো গোয়েন্দাগিরি করতে আসেননি। আমি এসেছিলাম জমি-বাড়ির দালাল হয়ে। বলেছিলাম, পুরোনো বাড়িটা কিনতে চাই। যেমন বেচবেন — জমিসুদ্ধ গোটা বাড়ি, জমি ছাড়া বাড়ি... যদি বলেন, বাড়ি ভাঙবেন, তাহলে পুরোনো ইঁট, কাঠ, জানলা, দরজা, কড়ি-বরগা কিনব।”

শ্রীপর্ণ বলল, “কী বললেন?”

বললেন, বাড়ি সারিয়ে বাসযোগ্য করবেন! আমিও ছাড়বার পাত্তর নই, বললাম, আমার কনস্ট্রাকশন বিজনেস আছে। বাড়ি সারিয়ে নতুন করে দেব।”

শ্রীপর্ণ আর মিঞ্জিরি হাসল। বলল, “রাজি হলেন?”

স্বপ্ননীল বলল, “না। হাঁকিয়ে দিলেন। তাই ভাবছি ওই বাড়িটাতে শান্তা চৌধুরী থাকতেও পারেন। বার বার বলা সত্ত্বেও দেখতে দিলেন না বাড়িটা।”

শ্রীপর্ণ চেয়ে রইল গাছপালার আড়ালে পুরোনো জমিদারবাড়ির দিকে। আছে ওখানে শানু? কী অবস্থায় রয়েছে? এখনই ছুটে যাওয়া যায়? হঠাৎ বুঝতে পারল ওর বুকের ভেতরে দুম দুম করে ধাক্কা দিয়ে হার্ট ছুটতে শুরু করেছে দ্রুতগতিতে। মুখের ভেতরটা শুকনো। হাঁটুতে জোর কম... একটু দম নিয়ে চোখ বন্ধ করল। গাড়ির বনেটে হেলান দিয়ে দাঁড়াল।

অন্যরা খেয়াল করেনি শ্রীপর্ণর মনের অবস্থা। মিঞ্জিরি বলল, “বাড়িতে কেউ থাকলে জানা যাবে না? সামনে রাস্তা, বাগানে লোক কাজ করছে...”

স্বপ্ননীল বলল, “বাগান তো এখানে। ও বাড়িটা আরও কতটা ওদিকে দেখেছেন? এ রাস্তায় তো কেউ যাতায়াতও করে না, আরও ওদিকে তো কেবল ধানজমি। আগেকার দিনের বাড়ি, হয়ত জানলা-টানলা নেই এমন ঘর আছে। বা কোথাও বেঁধে রেখেছে — একবেলা আধপেটা খেতে দেয়, দুর্বল ডাকাডাকি চেঁচামেচি করতে পারেন না… ওই, যে পুলিশ বেরিয়ে আসছে। সঙ্গে ওরাও রয়েছে দেখছি। বেশ চটপট অ্যারেস্ট করেছে তো!”

একটা জিপ নকল শানু আর সোমশ্বরকে নিয়ে বেরিয়ে গেল। যাবার সময় ওরা দেখতে পেল ভেতর থেকে কটমট করে ওদের দিকে চেয়ে রয়েছে সোমেশ্বর। হঠাৎ আর বুকের কষ্টটা নেই বরং হাত তুলে টা-টা বলার একটা অদম্য ইচ্ছে চেপে রাখতে হলো শ্রীপর্ণকে। বাড়ির সামনে থেকেই হাত নেড়ে ওদের ডাকল দেবাঙ্কন। ওরা ঢুকল।

দেবাঙ্কন বলল, “বেশি দেরি হয়নি স্বীকারোক্তি পেতে। এস-আই গিয়ে ডঃ শান্তা চৌধুরীর সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছেনপ্রথমে তো ওই মহিলাকেই শান্তা চৌধুরী বলে চালাবার চেষ্টা করেছে, তখন ও শান্তা চৌধুরীর ছবি দেখিয়ে বলেছে, কই, এঁরা তো একই ব্যক্তি নন? দেখি, পাসপোর্ট? তখন বলেছে পাসপোর্ট ওপিডানের ফ্ল্যাটে রয়েছে। পুলিশ বলেছে, কোনও ব্যাপার না। জন্মদাগটা দেখি? তখন আবার গরম নিচ্ছে — একজন মহিলার শরীরে জন্মদাগ দেখতে চাইছেন কেন, এই সব। তখন পুলিশ স্বরূপ ধারণ করেছে। বলেছে দাগ গলাতেও রয়েছে, পেটেও। আমরা মহিলা এস্কর্ট দিয়ে নিজেরাই খুলিয়ে দেখে নিচ্ছি, চলুন থানায়। আর আপনার পেপার্স কোথায়? বের করুন। তখন মহিলা ভেঙে পড়ে। বলে ওর নাম শ্যামলী খান। সোমেশ্বর ওকে জোর করে শান্তা চৌধুরীর ভূমিকায় নাটক করাচ্ছে।”

শ্রীপর্ণ বলল, “আর শানু?”

একটু চুপ করে থেকে দেবাঙ্কন বলল, “লেছে মেরে ফেলেছে। ভিতের মধ্যে পুঁতে রেখেছে।”

এক লহমায় শ্রীপর্ণর ভেতরটা ঠাণ্ডা হয়ে এল। শানু নেই! যদিও ওর-ও মনে হচ্ছিল বিশেষত স্বপ্ননীল ছবিগুলো দেখানোর পরে যে শানুকে আর কোনও দিন দেখতে পাবে না, তবু মনে যে একটা আশা ছিল না, তা নয়।

-সি এগিয়ে এলেন। “আসুন। ও বাড়িটা ভালো করে খুঁজে দেখতে হবে… হতেও তো পারে ওরা মিথ্যে বলছে... এখানকার ব্যবস্থা করেই ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে নিয়ে যাব। কনফেশন আজই লিখিয়ে নিতে হবে। সোমেশ্বরের মাথা ঠাণ্ডা হলে নইলে স্টেটমেন্ট উইথড্র করে নেবে।”

দেবাঙ্কন বলল, “আপনি আপনার কাজ করুন। ওই বৃদ্ধার দেখাশোনারও ব্যবস্থা করতে হবে। আপনারা ওবাড়িটা সার্চ করে বেরোনোর পরে আমরাও বেরিয়ে যাব।”

চট করে বললেও চট করে হলো না। প্রায় সাতজন পুলিশকর্মী তিনতলা বাড়িটা ঘুরে, অজস্র বন্ধ দরজার তালা ভেঙে ঘরে ঢুকে ঢুকে খুঁজতে সময় নিল প্রায় ঘণ্টা তিনেক। শানুর কোনও হদিসই পাওয়া গেল না।


১৪

দিন দশেক পরে দেবাঙ্কন এসে হাজির। বলল, “তোদের কফি ধ্বংস করতে এলাম। বাপরে বাপ, া গেল! যাক, চার্জশিট হয়ে গেছে। সাংঘাতিক কনস্পিরেসি। সোমেশ্বর নাথ আর শ্যামলী খান বহুদিনের পার্টনার্স ইন ক্রাইম। আগেও নাকি এরকম করেছে। এখন সিবিআই তদন্ত করছে। তোদের আর ভয় নেই। ওদের জামিন হবে না। সিবিআই স্পেশাল কোর্ট জামিন না-মঞ্জুর করে দিয়েছে। অ্যাবস্কন্ডিং রিস্ক।”

কী করত?” জানতে চাইল মিঞ্জিরি।

প্রথমত একলা মহিলা বা পুরুষ খুঁজে বের করত। তারপরে, পার্টি বুঝে দুজনের একজন ঘনিষ্ঠ হত। সে ঘনিষ্ঠতা কতটা হবে, কী হবে, সব নির্ভর করত শিকারের ওপর। কারও হয়ত কেবল দেখাশোনা করা, কারও সঙ্গে বিয়ে... কারও সঙ্গে হয়ত আরও কিছু… কিন্তু মরে যাবার পরে পয়সাকড়ি হাতিয়ে পালাত। ওরা বলছে মরে যাবার পরে, কিন্তু আমাদের সন্দেহ ওটা খুন করার পরে। সমস্যা হলো এগুলো ওরা বিদেশেই করে বেড়িয়েছে — ব্রেজিল, জার্মানি, স্পেন, ইতালি… একা কোনও বৃদ্ধ বা বৃদ্ধা... মৃত্যু রিপোর্টেড হতে সময় লাগে... ততদিনে ওরা একেবারে দেশ ছেড়েই উধাও। ফলে ধরা পড়েনি। বেশিরভাগ এমন লোককে ধরত, যাদের চেনাজানার সার্কেল এতই ছোটো, যে কেউ হয়ত জানতই না যে তাদের বাড়িতে একজন মহিলা বা পুরুষ এসে বাসা বেঁধেছিল শেষ ক’দিন। তা-, সিবিআই খোঁজ করছে, ওই সব দেশে কোনও বৃদ্ধ-বৃদ্ধার মৃত্যুর সঙ্গে সন্দেহজনক কোনও ভারতীয়র খবর পেয়েছে কি না। পেলে কেস ইন্টার্ন্যাশনাল হয়ে যাবে। ইন্টারপোল আসবে!”

শ্রীপর্ণ বলল, “কী কাণ্ড, কিন্তু শানুর কী হলো? সত্যিই মেরে ফেলেছে?”

তা-ই বলেছে। গ্রামের বাড়িদুটোতে তো কোথাও পাওয়া যায়নি। এখানে ফ্ল্যাটেও না। তবে মেরেছে এখানেই। দু’জনে ঠিক করেছিল, ওপিডানেই মারা সবচেয়ে সুবিধে — কারণ ওদের টাওয়ারে এখনও বেশি লোক নেই — ওই সময়ে ওদের ফ্লোরের বাকি সাতটা ফ্ল্যাট খালি ছিল। ওপরে নিচে মিলিয়েও নাকি তিনটে ফ্ল্যাটে লোক থাকত। গ্রামে নিয়ে গেলে লোকে দেখতে পাবে, তারপরে মারা কঠিন। তাই ঠিক করে শহরেই মেরে ফেলে শ্যামলী ওখানে গিয়ে শান্তা হয়ে বসবে।

কিন্তু তার আগে কিছু ঘটনা আছে। শান্তার সঙ্গে সোমেশ্বরের ব্রাসেলসেই পরিচয় করে। ওখানেই প্রেম, ওখানেই বিয়ে — শান্তা চৌধুরী এতদিন বিয়ে করেননি, জানতিস? না? ওয়েল, করেননি। সোমেশ্বরই প্রথম। প্রথমে প্ল্যান ছিল ব্রাসেলসেই শান্তাকে মেরে টাকাকড়ি নিয়ে পালানো। কিছুদিন পরে যখন বোঝা যায় যে শান্তা দেশে অনেক সম্পত্তির একচ্ছত্র মালিক, তখন মোডাস অপারেন্ডিতে বদল… এন্টার শ্যামলী খান। ওখানেই শান্তার বন্ধু হয়ে যায়। সোমেশ্বরের সঙ্গে কোনও চেনাজানা-ই ছিল না যেন। ওরা আলাদা করে শান্তাকে বুদ্ধি দেয় দেশে ফিরতে। সোমেশ্বর রিটায়ার করতে প্ররোচনা দেয়। স্বামী-স্ত্রী দেশে ফেরার কথা ঘোষণা করলে শ্যামলী চালাকি করে বল, -ও ফিরতে চায়, যেন শান্তাকে ছাড়া ওর চলবে না। ততদিনে শান্তা পুরোপুরি শ্যামলী আর সোমেশ্বরের বুদ্ধিতে চলছে — শান্তার মাঝবয়সের ক্রাইসিস সব ওরা-ই সামলেছে। শান্তার মনে কী ছিল আমরা জানি না, তবে সম্ভবত আলাদা করে স্বামী হিসেবে সোমেশ্বর আর বন্ধু হিসেবে শান্তার ওপর ভরসা করতে শুরু করেছিল।

দেশে ফিরে ওরা বেশ কিছুদিন ওপিডানের ফ্ল্যাটে থাকে। সম্পত্তির খতিয়ান নিয়ে সোমেশ্বর আর শ্যামলী ঠিক করে ওরা সবই নিয়ে নেবে। তাই শান্তাকে আর গ্রামে ফিরতেই দেবে না। যে কারণেই হোক, এত বছর শান্তা দেশে ফেরেনি, এবং পিসির দেখাশোনার জন্য টাকা পাঠিয়েই দায়িত্ব শেষ করেছিল। কে চিনতে পারবে, পারবে না, তার ওপর শান্তার জন্মদাগ — যেটার কথা দেশে কেউ জানে বা মনে রেখেছে কি না কে জানে... সেইজন্যই ঠিক করেছিল যে অন্তত আপাতত বেশ কিছুদিন শ্যামলী গলাবন্ধ, গা-ঢাকা জামাকাপড় ছাড়া পরবে না, আর যথাসম্ভব বাড়ি-বন্দি হয়েই থাকবে।

বছরখানেক আগে ওরা শান্তাকে ঘুমের ওষুধ দিয়ে বেহুঁশ করে মুখে বালিশ চাপা দিয়ে মেরে ফেল। সে সবের এভিডেন্স পাওয়া গেছে। বালিশটাও ওপিডানের ফ্ল্যাটেই ছিল। ওটা নিয়ে ওরা ভাবেনি। ফ্ল্যাট তো সোমেশ্বরের নামে। পরে কোনও সময় ডিসপোজ করে দিলেই হবে। ওপিডানে কারওর সঙ্গে ওদের ব্যক্তিগত পরিচয় ছিল না। শান্তা ফ্ল্যাট কিনেছিল ব্রাসেলস থেকে, এবং কেনার সময় এবং পরে বার কয়েক এসেছিল বটে, কিন্তু প্রোমোটার ছাড়া আর কারওর সঙ্গে পরিচয় হয়নি। সোমেশ্বর ফ্ল্যাটের মালিকানা পাবার পর ওদিকটা আর খতিয়ে ভাবেনি। ফ্ল্যাটের অরিজিনাল মালিকের ছবি ফাইল থেকে বের করে শ্যামলীর মুখের সঙ্গে মেলানো হবে, সেটা ভাবেইনি।”

আর ভাবেনি শ্রীপর্ণর কথা,” বলল মিঞ্জিরি।

জানতই না। শান্তা চৌধুরী সোমেশ্বরকে শ্রীপর্ণর সম্বন্ধে কিচ্ছু বলেননি। ফলে তোরা যেদিন প্রথম যুগলে হাজির হলি, বললি শান্তা চৌধুরীর বন্ধু, সেদিন নাকি দু’জনে একেবারে নার্ভাস হয়ে গেছিল। ঠিক করে কথাও বলতে পারেনি তোদের সঙ্গে, এবং খুব ভয় পেয়েছিল যে শ্রীপর্ণ যদি বুঝতে পেরে থাকে। পালিয়েছিল গ্রাম ছেড়ে। একটা হলিডে হোমে গিয়ে সাত দিন কাটিয়ে ফিরেছিল। তার পর থেকে তোদের অ্যাভয়েড করত।”

িঞ্জিরি বলল, “তা ঠিক, পথে ঘাটে দেখা হলে মুখ ফিরিয়ে নিত, পারলে অন্য রাস্তায় চলে যেত... মুখোমুখি হয়ে গেলে হেসে ব্যস্ততা দেখিয়ে চলে যেত। তবে খুব ভয় পেয়েছে মনে হয়নি — কী, পর্ণো, বুঝেছিলে? ভালো অ্যাক্টর। প্রথম দিন কেমন আমার হাত ধরে বলল, তুমি এসো কিন্তু…”

দেবাঙ্কন বলল, “সেদিন প্রথমে নাকি বেশ ভয়ে ভয়েই ছিল। পরের দিন তোর সঙ্গে কথা বলে যখন মোটামুটি শিওর হয়েছিল, যে তোরা কিছু সন্দেহ করিসনি, তখনই তোকে ডেকেছিল, শ্রীপর্ণ। বাজিয়ে দেখতে...”

শ্রীপর্ণ বলল, “এবং সেদিন সোমেশ্বর ছিল না বলে গা-ঢাকা জামা পরেনি।”

দেবাঙ্কন বলল, “সোমেশ্বর ওকে শাড়ি পরতে দিত না, কিন্তু শ্যামলী ওটা তোকে টেস্ট করার জন্যই পরেছিল একরকম চ্যালেঞ্জ কেউ জানে না জন্মদাগের কথা... তুইও নিশ্চয়ই জানিস না। ক্রিমিনালরা অনেক সময় ওভার-কনফিডেন্ট হয়ে ভুল করে, এটা তার এক উৎকৃষ্ট উদাহরণ।”

শ্রীপর্ণ বলল,আর সেদিনই আমার সামনে চটি- খুলেছিল। ওরা শানুর পায়ের ছটা আঙুলের কথা জানত না? হতে পারে না। ওটা কিন্তু গ্রামের অনেকেই জানত।”

েবাঙ্কন একটু ধন্ধে পড়ে মাথা নাড়ল। “সে বিষয়ে কোনও কথা হয়েছে বলে আমি জানি না। ভালো কথা বলেছিস — সিআইডির ইনভেস্টিগেটিং অফিসারকে জানাব...”

মিঞ্জিরি বলল, “শানুকে নিয়ে কী করল?”

দেবাঙ্কন বলল, “রাত সাড়ে তিনটে নাগাদ ওরা মালপত্র বের করে। সোমেশ্বরের একটা বিশাল ছ’ফুট লম্বা বিদেশী ডাফেল ব্যাগ ছিল। অনায়াসে একটা গোটা মানুষকে ঢুকিয়ে নেওয়ার পরেও জায়গা থাকে। তাতে শানুর বডি শুইয়ে ওরই জামাকাপড় ভরে বডিটাকে ঢেকে দেয়। তারপরে তো জানিসই ভোর চারটেয় গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে যায়। তখনও চারিদিক অন্ধকার। ওপিডানে কেউ ওদের চেনে না, েউ মাথা ঘামায়নি। গ্রামে পৌঁছে গাড়িটাকে পুরোনো বাড়ির খুব কাছাকাছি পার্ক করে। তখনও তো নতুন বাড়ি নেই। রাত্তিরে আবার দুজনে মিলে ধরাধরি করে ব্যাগটাকে নিয়ে যায় একটা অব্যবহৃত ঘরে। শ্যামলী শান্তা চৌধুরী হয়ে বিরাজ করতে থাকে। প্রথম দিকে বিশেষ বেরোত না। পরে যখন বোঝে, এখানে কারও অল্পবয়সী শান্তাকে মনে নেই, এবং সেরকম কোনও ছবি-টবিও নেই কোথাও, তখন বেরোতে থাকে, কিন্তু ওই — বড়ো সানগ্লাস আর গা-ঢাকা পোশাক পরে। এদিকে সোমেশ্বর ইঞ্জিনিয়ার টিঞ্জিনিয়ার কিস্যু না, কিন্তু সত্যিই বাড়ি তৈরি করতে জানে। সেজন্যই বিদেশী স্টাইলে বাড়ি ডিজাইন করে, যাতে নিজেই বেশিরভাগটা করতে পারে। মজুর লাগিয়ে মাটি খোঁড়ায়। বাড়ির দেওয়াল যেহেতু অনেকটাই ইঁটের নয়, হালকা কাচ এবং ফাইবারের, তাই গভীর ভিত করতে হয়নি। চার-ফুট গর্তথেষ্ট। আবার রাত্তিরে বাড়ির ঠিক মাঝখানে ব্যাগসুদ্ধু শান্তা চৌধুরীর বডি ফেলে সিমেন্ট দিয়ে চাপা দেয়। ওখানেই শান্তা চৌধুরী রয়েছেন এখন। সিমেন্টের ওপর মাটি, তার ওপর ইঁট। সোমেশ্বর নিজেই করেছে। ইঁট দিয়ে গর্তটা ভর্তি করে তার ওপর পাথরকুচি আর বেলেমাটি ফেলেছে। এর পরে আবার লোক ডেকে কংক্রিটের ভিত বানিয়েছে তার ওপরে।”

্তম্ভিত শ্রীপর্ণ বলল, “বাপরে! এত কাণ্ড?”

ভুরু তুলে দেবাঙ্কন বলল, “সম্পত্তি কত জানিস? ওপিডানের ফ্ল্যাট বিক্রি করেই বাকি জীবন সুখে কাটত।”

মিঞ্জিরি একটু কাতর সুরে বলল, “তাহলে? ওটা তো পেয়েই গেছিল — ওটা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকলেই হত। কী দরকার ছিল খুন করার?”

দেবাঙ্কন বলল, “ওটাই তো ওদের বৈশিষ্ট্য। লোভ, আর খুন। কিন্তু এখানে এসে যে শ্রীপর্ণর পাল্লায় পড়বে সেটা জানত না।”

শ্রীপর্ণ অন্য দিকে তাকিয়েছিল, কী ভাবছিল। মুখ তুলে তাকাল, কিছু বলল না। মিঞ্জিরি হঠাৎ খিলখিল করে হাসতে গিয়ে থেমে গেল। দেবাঙ্কন বলল, “কী হলো?”

মিঞ্জিরি হাসি থামিয়ে বলল, “স্যরি। উচিত হয়নি। হঠাৎ মনে হলো, ওই বাড়িতেই শানুর ডেডবডির ওপরে ভূতের ভয়ে কাতর শ্যামলী দিন রাত থাকত। সাধে কি সোমেশ্বরকে ছাড়া ওর চলত না!”

দেবাঙ্কন বলল, “উঠি, রাত হলো।”

মিঞ্জিরি তড়াক করে লাফিয়ে উঠে বলল, “তা কী করে হবে… না খেয়ে যাবে না।”


িছানায় শুয়ে মিঞ্জিরি বলল, “তখন থেকে কিছু বলছ না — কী ভাবছ?”

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে শ্রীপর্ণ বলল, “ভাবছি, বিয়ে-থা না করেই তো বেশ ছিল। বুড়ো বয়সে কেন হতভাগা সোমেশ্বরকে বিয়ে করতে গেল?”

মিঞ্জিরি বলল, “ভালো লেগেছিল নিশ্চয়ই? তা ছাড়া, বয়স হলে একটা সাপোর্ট লাগে। ভেবেছিল সোমেশ্বর সাপোর্ট দেবে।”

আলো নিভিয়ে মিঞ্জিরি শ্রীপর্ণর কাছে ঘেঁষে এল। “আমি একটা কথা ভাবছি। কথা দাও রাগ করবে না, তাহলে বলি।”

বলো।”

তোমার সঙ্গে যদি শানুর প্রেম হত, বিয়ে হত, তাহলেও বেচারাকে মরতে হত না…”

শ্রীপর্ণ চুপ করে রইল। বহুবার এর মধ্যে নিজেকে জিজ্ঞেস করেছে, ভালোবাসত কি ও শানুকে? না কি কেবল বয়ঃসন্ধির মোহ ছিল? নিজেকে সন্তুষ্ট করার মতো উত্তর পায়নি। নিজেকে ছিঁড়ে নিয়ে এল শানুর স্মৃতির হাত থেকে। পাশ ফিরল।

তাহলে তোমার সঙ্গে কার বিয়ে হত?”

হত কারও একটা… সে দিয়ে তোমার কী বাপু?”

দেখাচ্ছি মজা...”

উফফ, ছাড়ো… ভাল্‌লাগছে না।”

No comments: