Saturday, June 03, 2023

ভূতুড়ে গ্রাম

 

ভটভটি থেকে একলা খেয়াঘাটে নেমেই হারানের গাটা কেমন ছমছম করে উঠল। বড্ড দেরি করে ফেলেছে আজ। আগের ভটভটি-টা ধরা উচিত ছিল। কিন্তু তখন সবে বিক্রি বাটা জমে উঠেছে। সারা দিন খেটে দুপুরের পর অবধি মাত্র অর্ধেক মাল বিক্কিরি করে বাড়ি ফেরা যায় না। আর ঘরের জন্যও কিছু সওদা তো করতে হয়, না কী? বউকে না হয় আরও ক’দিন শাড়ির জন্য অপেক্ষা করানো যায়, কিন্তু মেয়েটার জন্য তো আজই একটা কাপড় নিয়ে আসার দরকার ছিল। নইলে পুকুরে যাওয়াই বন্ধ হয়ে যেত বেচারার। এমন অবস্থায় যদি বিকেলের আগে হু-হু করে খদ্দেরের ঢল নামে হাটে, তখন মানুষ করে কী?

হাট থেকে কেনা মুদিখানার মাল আর মেয়ে-বউয়ের দুটো কাপড় বগলদাবা করে আর অপেক্ষা না করে হনহনিয়ে হারান পা চালাল গাঁয়ের দিকে। জোর কদমে বিশ মিনিটের রাস্তা। ভাগ্যিস হাত খালি, বিক্রি না-হওয়া সওদার ওজন বইতে হচ্ছে না। কোমরের গেঁজেতে টাকাগুলো খচখচ করছে, কিন্তু সে নিয়ে ভয় নেই হারানের। এখানে চোর ডাকাতের চেয়ে ভয় অন্য কিছুর বেশি।

মরাগাঙের পাড়ের ধানজমিগুলো পার করে ডাইনে ঘুরে পশ্চিমমুখো হাঁটছে হারান। সামনের আকাশে দিকচক্রবালের কাছের শেষ লাল আভাটাও মিলিয়ে আসছে। গ্রামে ঢোকার ঢের আগেই আঁধার হবে। প্রায় ছুটতে ছুটতে চলছ হারান। একবার গ্রামে ঢুকতে পারলে তবু কিছুটা স্বস্তি পায়।

এইবারে কালীতলার শ্মশান। কালীমন্দিরে পুজো শেষ করে রোজকার মতো পুরুতমশাইও পালিয়েছেন। কেউ কোথাও নেই। এখানে রাতে কেউ আসে না। আশেপাশের সাতটা গাঁয়ের এই একটাই শ্মশান হলেও সুজ্জি ওঠার আগে কেউ এমুখো হয় না।

কালীমন্দির পার করে ঝাঁকড়া পঞ্চবটী। বটে-অশ্বত্থয়-বেলে-অশোকে-আমলকিতে মিলেমিশে একাকার। এখান দিয়ে যাবার কালেই বিপদ সবচেয়ে বেশি। কত বছর ধরে গাঁয়ের লোক সন্ধের পরে এধার দে’ যায় না... সবাই জানে, এখানেই হাজার বছরের ব্রহ্মদত্যির আস্তানা। গাছের নিচের দিকের ডালে বসে সন্ধের পরে পা দোলায়। পথচলতি মানুষের মাথায় পায়ের ছোঁয়া লাগলে আর রক্ষা নেই। তিন মাসের মধ্যে অক্কা অবধারিত। হারান সাবধানে মাথা নুইয়ে পঞ্চবটী পার করল। এতেও শেষ নেই, শ্মশানঘাট পেরিয়েই বগুলা বিল, তার পাড়ে শাঁকচুন্নির বাসা — ওদের পাল্লায় পড়লে অপেক্ষা করতে হবে না। আজই মৃত্যু। ব্রহ্মদৈত্যর ধারেকাছে রামনাম করতে নেই, তারা আরও রেগে যায়, কিন্তু এখন তারস্বরে রাম-রাম-রাম-রাম জপতে জপতে হারান দৌড়ল গ্রামের দিকে।

হারান যতক্ষণে গ্রামে ঢুকল ততক্ষণে আকাশে রাতের কালো। ওদের গ্রামটা সত্যিই সৃষ্টিছাড়া। আশপাশের সব গাঁয়ে গত তিরিশ বছরে বিজলি বাতি এল, এখানে খাম্বা বসিয়েই বাবুরা খালাস। প্রতিবার ভোট আসলেই শুনতে পায়, এই এল বলে। ভোটপর্ব শেষ হলেই যে কে সেই। দশ-বারো বচ্ছর আগে একবার সে ভোট উপলক্ষেই বাবুরা সোলার ল্যাম্প বিলি করেছিল। সূূূর্যের আলোতে রাখলে সে দিনের আলোর মতো রোশনাই দিত রাতে। কিন্তু সে-ও দশ বচ্ছর আগে। দশ বছরে একে একে খারাপ হতে হতে এখন সারা গাঁয়ে পাঁচটা বাড়িতেও সে বাতি জ্বলে কি না সন্দেহ। আর জ্বললেও সে এমনই টিমটিমে যে অনেকেই লণ্ঠন আর প্রদীপের ওপর আবার ভরসা করতে লেগেছে। হারান কতবার ভেবেছে উঠে যাবে। শহরে না হলেও অন্তত কাছের কোনও গঞ্জে গেলেও হয়। সারাক্ষণ এরকম ভয়ে ভয়ে থাকতে ভালো লাগে না।

গ্রামের ঠিক বাইরে বড়ো দুটো বাঁশঝাড়, এইটুকু ভালোয় ভালোয় পেরোতে পারলেই আর চিন্তা নেই।

সে-ও পেরোনো গেল। পথেঘাটে কেউ নেই, সবাই ঘরে ঢুকে দোর দিয়ে বসে আছে। কাল সকালে রোদ ফোটার আগে আর কাউকে দেখা যাবে না।


বাড়ির কিছু আগে রাস্তার ধারে একটা বাঁশ আর দর্মার চালাঘরে বাতি জ্বলছে। যোগেন ভটচায্যি কবিরাজের রোগী দেখার চালা। যোগেন ঠাকুর্দা কোনও দিনই গাঁয়ের পাঁচটা লোকের মতো ভয় পেতেন না। আর যোগেন ভটচায্যির সাহসে ভর দিয়ে গাঁয়ের অন্যান্য বৃদ্ধরাও এসে ভীড় করেন সেখানে।

হারান কাছাকাছি আসতে ভটচায্যির আড্ডার বৃদ্ধদের নজরটা ঘুরে গেল ওর দিকে। এ গাঁয়ে সন্ধের পরে পথেঘাটে কাউকে দেখলে লোকে প্রথমেই সন্দেহের চোখে তাকায়। হারান চট করে দেখে নিল কে কে আছে — যোগেন কবিরাজ, নিমাই-জ্যাঠা, তারানাথ সিদ্ধান্ত আর শশী-জ্যাঠাকে দেখতে পেল। ভেতর দিকে আরও কেউ কেউ আছে, দেখা যাচ্ছে না। রোজ সবাই আসে না। বয়স্ক লোকের ব্যাপার, কারও শরীরে দেয় না, তো আর কারও ইচ্ছে করে না। উঁকিঝঁকি দেখে হারান সাড়া দিল। বুড়োদের চোখের জোর কম, কানেও কম শোনে অনেকে, হারান হেঁকে বলল, ঠাকুর্দা, ভালো তো?

দোকানের ভেতর থেকে একটা ঘড়ঘড়ে ভাঙা গলা ডেকে বলল, কে? হারান নাকি?

হারান একটু অবাক হলো। বাবা! এই আড্ডায়? বেশ অনেক দিন পরে তো! পা চালিয়ে চালাটার সামনে এসে ভেতরে উঁকি দিল। ভূতনাথ কাকা আর বাবা পাশাপাশি বসে। বলল, হ্যাঁ, বাবা। আপনি এয়েচেন আজ? একটু ভালো বোধ করছেন?

একটু কেশে গলা থেকে শ্লেষ্মা বের করে থু করে ফেলে হারানের বাবা নিতাই বলল, আর ভালো... কাশির চোটে তো…

নিতাইকে মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে তারানাথ বললেন, আঃ, নেতাই, থামো তো! সারাজীবন কাটিয়ে দিলে কেবল শরীর খারাপের দোহাই দিয়ে। তারপর হারানের দিকে চেয়ে বললেন, নেবুতলার হাট থেকে এলি, হারান? ভালো হাট হলো?

বৃদ্ধের দিকে চেয়ে হারান সসম্ভ্রমে বলল, হ্যাঁ, জ্যাঠামশাই। ভালো হলো।

বাবা বলল, কিনলি কী?

হাতের থলেটা একটু তুলে হারান বলল, চাল, মুগডাল, সুপুরি, পান, আর আপনার বৌমা আর নাতনির জন্য কাপড়।

সমবেত সকলে সমর্থনের মাথা নাড়লেন। হারানকে ওঁরা সকলেই বড়ো হতে দেখেছেন, ছেলেটা ভালো হয়েছে। কাজে মন আছে, সংসারের দায়িত্ব বোঝে, নেশাভাঙ করে না…

যোগেন ভটচায্যি সবে হারানকে বলতে শুরু করেছেন সবার সঙ্গে ভেতরে ঢুকে বসতে, এমন সময় তারানাথ সিদ্ধান্ত অন্ধকারের দিকে চেয়ে বললেন, কে ওখানে?

সমবেত সকলের ঘাড় ঘুরে গেল অন্ধকারের দিকে। একটু আগে ওই পথেই এসেছে হারান।

একটা ছায়ামূর্তি এগিয়ে এল ওদের দিকে। হারানের হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে এল। তার মানে এ হারানের পেছনেই এসেছে সারা রাস্তা। বাবা গো!

আরও কাছে আসলে হারানের সাহসটা ফিরে এল খানিকটা। অশরীরী নয়। শহুরে ভদ্রলোকের মতো চেহারা। বয়েসও বেশি নয়। হাতে একটা বাক্স। সুটকেস। চালাঘরের বাতি থেকে লোকটার ছায়াও পড়েছে পেছনে। এগিয়ে এসে বলল, এটা কী গ্রাম?

যোগেন ঠাকুর্দা বললেন, মশাই যাবেন কোথায়?

লোকটা বলল, শিরিষগ্রাম।

সমবেত সকলেই এইবারে বুঝেছি গোছের মাথা নাড়ল। হারান বলল, আপনে শিরিষগ্রামের ইরিগেশন প্রোজেক্টে এয়েচেন।

লোকটা যেন হাতে চাঁদ পেল। বলল, হ্যাঁ, আমি নতুন ইঞ্জিনিয়ার। লেবুতলা হাট থেকে ভটভটিতে এলাম।

অবাক হয়ে হারান বলল, ভটভটিতে? লাস্ট ভটভটিতে তো আমি এলাম। আপনে তো ছেলেন না।

লোকটা বলল, আমি তো রুটের ভটভটি ধরতে পারিনি। হাটে বলল ভটভটি ভাড়া করতে। ভাড়া করা ভটভটি আমাকে একটা ঘাটে নামিয়ে দিয়ে বলল, এ পথে চলে যান... তারপর দূরে একজনকে দেখিয়ে বলল, ওই ওনার পেছনে যান। আমি তার পেছনে পেছনে চলছি, অনেক দূর, গলা মেলে ডাকলেও শোনা যাবে না... এদিকে অন্ধকার হয়েছে, খানিক বাদে আর দেখতে পাচ্ছি না... আন্দাজে এগিয়ে এখানে এসে পড়লাম।

হারান ভাবিত হলো। হারানের পেছনে আসছিল, না সাঁঝের আঁধারে আর কারও পেছনে কে জানে। হারানের পেছনেও তেনারা কেউ ছিল না তো?

মশাইয়ের নামটা জানা হলো না? জানতে চাইলেন ভূতনাথ। জ্যেঠু সবসময়ই কম কথা বলেন। এতক্ষণ কিছুই বলেননি।

লোকটা বলল, আমি সুন্দর সিংহ রায়। নতুন এসেছি। এটা শিরিষগ্রাম নয়?

না। ঘণ্টা খানেকের হাঁটা। ওই দিকে। আঙুল তুলে দেখাল হারান।

ওরে বাবা। লোকটা যোগেন ঠাকুর্দার আমন্ত্রণে বাক্সটা নামিয়ে রেখে চালাঘরের ভেতরে একটা বেঞ্চিতে বসল যোগেন ঠাকুর্দার পাশেই। বলল, হেঁটে যাওয়া ছাড়া আর কোনও…

প্রায় একসঙ্গেই মাথা নাড়ল সকলে। হারান বলল, আপনারে ভুল জায়গায় এনে ফেলেছে গো। হয় হেঁটে ধানক্ষেত পেরিয়ে যেতি হবে, নয়ত আবার ফিরে যেতি হবে ভটভটিতে। শিরিষগ্রামের ঘাটে নামলে প্রোজেক্ট এক্কেরে সামনে।

চিন্তিত মুখে সুন্দর বলল, এখন এই অন্ধকারে... পথ দেখিয়ে নিয়ে যাওয়ার কেউ আছে?

সকলে সমবেত মাথা নাড়ল। পথ দেখিয়ে কে নিয়ে যাবে ওই ভয়ঙ্কর মাঠ পেরিয়ে? আর এখন তো গেরামের লোকে ডাক শুনলেও দরজা খুলবে না কেউ।

একটু হতাশ সুরে সুন্দর বলল, তাহলে, আজ রাতে এখানেই থাকতে হবে?

যোগেন ঠাকুর্দা মাথা নেড়ে বললেন, এ গাঁয়ে থাকার জায়গা নেই।

সুন্দর আঁতকে উঠে বলল, তাহলে রাতে কী করব? আপনাদের কারও বাড়িতে থাকতে পারি না? আমি টাকা দেব…

আলোচনা এবারে কোন দিকে এগোবে বুঝতে পেরে হারান গুটিগুটি পায়ে বাড়ির দিকে রওয়ানা দিয়েছিল, শশী-জ্যাঠা উঠে এসে বলল, হারান, লোকটা বেপদে পড়েছে…

হারান বিরক্ত হলো। এ গাঁয়ে কেউ অতিথিবৎসল নয়। রাত-বিরেতে এরকম কাউকে ঠাঁই দেওয়ার মতো দুঃসাহস কেউ করবে না। বলল, কী বলছেন বুঝতে পারতেছি না, জ্যাঠামশাই। আমারে বাড়ি যেতি হবে। ঢের দেরি হয়েছে, এর পরে ঘরে কান্নাকাটি পড়ি যাবে। অন্য গাঁয়ের বউয়ের মতো বউটা ঘর-বারও করতি পারবে না।

শশী-জ্যাঠা বলল, আহা, ওটা তো মানুষই বটে। এত রেতে কার বাড়ি যাবে বল? কেউ তো দোর খুলবে না।

আ মলো। তাই বলে হারানের বাড়ি?

শশী-জ্যাঠা বলল, পয়সা দেবে বলল যে…

হারানের অত পয়সার লোভ নেই। থাকলে গঞ্জে বাড়ি করার আশ ছেড়ে কেউ এই এঁদো গ্রামের ভিটেয় পড়ে থাকে না। মাথা নেড়ে বলল, না জ্যাঠা, বাড়িতে সোমত্থ মেয়ে, আমি পারব না। বলতে পারত আপনাদের কারও বাড়ি নিয়ে যান গে... কিন্তু সে তো সম্ভব নয়।

শশী-জ্যাঠা ছাড়ার পাত্র নয়। বলল, দেখ না হারান, খেতিও তো দিতি হবে…

হারান বলল, ওই চালাতেই থাক না হয়? একটা রেতের তো মামলা।

শশী-জ্যাঠা বললেন, তুই কথাটা কী বললি হারান? ওই চালায় মানুষ থাকতি পারে? এই গাঁয়ে? মাঝরাতে কী হয় জানিস নে যেন?

জানে হারান। তবু একটু ঘাড় গুঁজে বলল, আমার বাড়িতে না।

শশী-জ্যাঠা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, বুড়ো মানুষগুলোকে বড্ড খাটাস তোরা, জানিস? এখন সারা রাত পাহারা কি আমরা দেব? আর খাওয়া? তার কী হবে?

হারান এবারে একটু ছাড় দেয়। বলে, সে আমি পুষ্পকে বলছি নয় একটা ভাতে-ডালে করে দিতে। কিন্তু নিয়ে আপনাদের যেতে হবে। আমি ঘরে ঢুকলে পুষ্প আর বেরোতি দেবে না।

শশী-জ্যাঠা হেসে বলল, এত ভয় পাস কেন? আমরা তো আছি, না কী?

হারান বলল, সে ভরসা করিনে জ্যাঠামশাই। আপনারা আছেন এখেনে। বাড়ি থেকে এতটা পথ অন্ধকারে কে আসবে-যাবে, প্রাণ হাতে করে?

শশী-জ্যাঠা বলল, দাঁড়া... বলে আবার আড্ডায় ফিরে গিয়ে নিজেদের মধ্যে কী আলোচনা করতে শুরু করামাত্র একটা হইচই পড়ে গেল। সবাই একসঙ্গে উঠে দাঁড়িয়ে হাত পা নেড়ে না-না বলতে লেগেছে। সবার কথা পরিষ্কার শুনতে না পেলেও হারান বুঝতে পারছিল, যে সারা রাত সুন্দর সিংহ রায়-কে পাহারা দিতে বৃদ্ধরা কেউ রাজি না। হারান আর দাঁড়াল না। বুড়োরা যদি ঠিক করে রাতে লোকটাকে ওখানে রাখা যাবে না, তাহলে হারানের বাড়িতেই পাঠিয়ে দেওয়া ছাড়া গত্যন্তর থাকবে না। তার আগেই চুপচাপ চলে যাওয়া ভালো।


বাড়িতে পৌঁছে পুষ্প বাজারের সওদা পেয়ে যত না খুশি হলো, তার চেয়ে বেশি বিরক্ত হলো বহিরাগতর জন্য ভাত রাঁধতে হবে বলে। খাটনিটা বা খরচাটা বড়ো কথা নয়, গ্রামের গরিব লোকে সে নিয়ে ভাবে না। ঘরে যা আছে, তা ভাগ করে নিতে তারা সিদ্ধহস্ত। কিন্তু এত রাতে রান্না করা খাবার কে পৌঁছে দেবে ওই ভূতুড়ে রাস্তা পেরিয়ে প্রায় গাঁয়ের বাইরে ওই ভূতুড়ে চালাঘরে? ওখান থেকে কেউ আসবে — কথাটায় পুষ্প আস্বস্ত হলো না। বলল, বললে তো বাবা ওখানেই ছিলেন। বাবা-ও কি ওই একই মতে মত দিয়েছেন?

বাবার সঙ্গে কথা তেমনি হয়নিকো। তার আগেই তো লোকটা এসে গেল।

গজগজ করতে করতে ভাত-ডাল চাপাল পুষ্প।

হাত মুখ ধুয়ে রাতের খাবার খাওয়ার আগে হারান বাইরের ঘরে বসে থেলো হুঁকোয় তামাক খাচ্ছিল। বাইরে থেকে আস্তে আস্তে ডাক এল। হারান, জেগে আছিস? ভাত হলো?

দরজাটা সাবধানে ফাঁক করে বাইরে তাকাল হারান। বাবা? না বাবারূপী কেউ...? এ গাঁয়ে তেমনটাও হয়েছে। চেনা লোকের গলা শুনে দরজা খুলে কেউ বেরিয়েছে, আর বাড়ি ফেরেনি।

নাঃ, মনে হচ্ছে বাবা-ই দাঁড়িয়ে বাইরে। বলল, দাঁড়ান, ভেতরে খোঁজ নিচ্ছি।

রান্নাঘর থেকে পদ্মপাতায় ভাত ডাল মুড়ে নিয়ে এল হারান। বাইরে আবছা অন্ধকারে বাবা দাঁড়িয়ে। একটু দূরে, আঙিনায় শশী-জ্যাঠা। অন্ধকারে বাবা একা আসেনি। হারান ভাতটা দিয়ে জিজ্ঞেস করল, পথে তেনারা আছেন?

বাবা বলল, জানিনে — দু’জনে এলাম, তাই বোধহয় দেখিনি কাউরে। তবে নেই কী আর? তেনারা কেউ না কেউ তো রোজই থাকেন…

এর পরের প্রশ্নটা করবে না ভেবেছিল, কিন্তু কেমন যেন ওর অজান্তেই বেরিয়ে এল।

লোকটা কি ওখেনেই থাকবে?

নিতাই বলল, আর কোথায় যাবে? কবরেজ মশাই বলছিল নে গে হারানের দাওয়ায় শুইয়ে দে। ঘরের ভেতরি নিতি হবে না। আমি রাজি হইনিকো। তা ছাড়া দাওয়াও তো রেতের বেলা ভালো নয়। তুই ভাবিসনে। আমরা দেখে রাখব নয়।

পদ্মপাতায় মোড়া খাবার নিয়ে দাওয়া থেকে নামতে নামতে বলল, তামুক খাচ্ছিলি? বাস আসে…

হারান একটু লজ্জা পেয়ে বলল, ওই একটু... খাবেন?

নিতাই দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, নাঃ আর তো উপায় নাই... কাশিটা... বলে কাশল জোরে। হ্যাক্‌ করে থুথু ছুঁড়ল বাগানের বেড়ার দিকে তাক করে। হারান জানতে চাইল, ফিরবেন?

বাইরের উঠোন পেরিয়ে যেতে যেতে নিতাই বলল, না রে। আমরা সকলেই রেতে ওখানে থাকব। তোরা সাবধানে থাকিস।

হারান দরজা বন্ধ করে দেখল পেছনে পুষ্প দাঁড়িয়ে। বলল, লোকটাও ওখানেই থাকবে?

হারানও দীর্ঘশ্বাস ফেলল। কিছু বলল না।

রোজ রাতের মতো সেদিনও সারা রাত বাইরে প্রবল ঝড়। হারান জানে ও ঝড় নয়, তেনাদের তাণ্ডব। সে-ও দেখতে যাওয়া মানেই বিপদ। গাঁয়ের লোকের অভ্যেস হয়ে গেছে, তার মধ্যেই ঘুমোয়। হারান অবশ্য আজ ঘুমোতে পারছিল না। খালি মনে হচ্ছিল না জানি ওই চালাঘরে কী হচ্ছে। তবে শেষরাতে ঘুমিয়ে পড়ল।


পরদিন সকালে রোদ ওঠার আগেই অভ্যেস মতো বাড়ি থেকে বেরিয়ে নিমের দাঁতনটা মুখে দিয়ে ঘষতে ঘষতে হারান কলতলায় যাচ্ছিল। হঠাৎ কী মনে পড়ায় খিড়কির দরজা খুলে বেরিয়ে হাঁটা দিল যোগেন ঠাকুর্দার চালার দিকে।

লোকটা সবে ঘুম ভেঙে উঠে বসে অবাক হয়ে এদিক ওদিক দেখছিল। ভূমিশয্যাই করতে হয়েছে বেচারাকে। হারানকে কাছে আসতে দেখে বলল, আচ্ছা, এখানে একটা চালাঘর...?

হারান কথা শেষ করতে দিল না। মুখ থেকে দাঁতন বের করে মুখের জমা থুথু ফেলে কাছে এসে বলল, রাতে ঘুম হইছিল? খেইছিলেন ঠিক? গরীবের ঘরের খাবার... ক্ষমাঘেন্না করে নেবেন আজ্ঞে।

সুন্দর সিংহ রায় থমকে চাইল। বলল, আপনি কাল ছিলেন? আপনিই চলে গেছিলেন...? যাঁর বাড়ি থেকে খাবার এল... আপনার বাবা নিয়ে এলেন?

এবারে হাতজোড় করে হারান বলল, আজ্ঞে ঠিক ধরেছেন ইঞ্জিনিয়ারবাবু। তারপর, সুন্দরবাবুকে কিছু বলতে না দিয়ে তড়িঘড়ি বলে চলল, বলছিলাম কী, আপনি এখনই রওয়ানা হয়ে পড়েন। এখনই গেলে শিরিষগাঁয়ের ভটভটি পেয়ে যাবেন। সারাদিনে ওই একটিই। ওটি না পেলি যেতি হবে সেই নেবুতলার ঘাটে, আর নইলে সেই ধানক্ষেত পেরিয়ে পায়ে হেঁটে এক ঘণ্টা।

হারান বলছে বটে, কিন্তু ইঞ্জিনিয়ারবাবুর যেন ভ্রূক্ষেপ নেই। কেবল এদিক ওদিক চাইছে। শেষে বলল, কিন্তু, কাল এখানে একটা চালাঘর ছিল না? বেঞ্চি ছিল, কয়েকজন বন্ধু মিলে কথা বলছিলেন... সে সব কোথায়? রাতে ঝড় হয়েছিল। সে ঝড়ে উড়ে গেল? চারপাশে তো তেমন কিছু...

হারান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, ও তেমন কিছু না। ঝড়-টড় হয় নাই, কেবল মনে হয়। তবে চালাটা নাই। কাল রাতে ছিল, আজ সকালে নাই। আবার আজ সন্ধেয় এলি পাবেন। এইখেনেই। যোগেন কোবরেজ থাকবেন ঠিক, কিন্তু সাথে কারা থাকবেন তার ঠিক নেই। কে কবে আসেন ঠিক নাই কি না?

লোকটার মুখ হাঁ হয়ে গেছে। বলল, চালাটা নাই, আবার সন্ধেয় পাব... মানে?

হারান বলল, চালাটা আজকের নয় যে। সে চালা আমিও স্বচক্কে দেখিনিকো। আমার জন্মের আগে ঝড়ে বাদলায় গেছে। যোগেন কোবরেজেরে দেখেছে এমন কেউ আর এ গাঁয়ে বেঁচে নাই। সে কবেকার কথা। তখন কোবরেজ এইখেনে চালাঘর বানিয়ে কোবরেজি করতেন। তিনি গত হবার পরে তেনার ছেলেও ছেল এখেনে। কিন্তু ছেলের ঘরে দুই মেয়ে কেবল, তারা বে’ করে চলে গেলে পরে কোবরেজ-বাড়িতে থাকার কেউ রইল না কো। এই এখেনেই ছিল চালাটা। আর পেছনে... বলে রাস্তার ধারের জঙ্গলটার দিকে দেখাল হারান। ওই জঙ্গলের মদ্দিখানে কোথাও ভিটে ছেল। এখন আর নাই... বাড়িঘর সব ধসে গেছে ঝড়ে বাদলায়…

ইঞ্জিনিয়ারের ভুরু কোঁচকানো। বলল, কিন্তু কাল যে একজনকে সবাই যোগেনদা, যোগেনকাকা বলে ডাকছিল, তিনিই তো কবিরাজ, না কি?

হারান হেসে বলল, হ্যাঁ গো। তিনিই উনি। কিন্তু তিনি নাই। কাল যাদের দ্যাখলেন, তেনারা কেউই নাই যে... যোগেন ঠাকুর্দা গত হয়েছেন তখনও আমি জম্মাইনিকো। শশী-জ্যাঠা গ্যালেন তখনও আমি পাঠশালায়। আমারই বয়স দু কুড়ি হতে চলল। বাবা — যিনি আমার বাড়ি থেকে আপনাকে ভাত এনে দিলেন গো... তিনিও গেছেন সাড়ে তিন বচ্ছর আগে।

লোকটা হেসে দাঁড়িয়ে উঠল। বলল, আচ্ছা, তাই বুঝি? বেশ কথা। কিন্তু এখানেই কি আমি শুয়েছিলাম... বলতে বলতে থমকে গেল। মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। তাড়াতাড়ি পকেটে হাত দিয়ে মানিব্যাগ বের করে ভেতরে উঁকি দিল।হারান বুঝল সে ভেবেছে গ্রামের লোকে ঘুমের মধ্যে বুঝি টাকাকড়ি চুরি করে নিয়েছে... মনে হলো যা দেখল তাতে অসন্তুষ্ট হবার কিছু পেল না। আসেপাশে তাকিয়ে কোনও বসার কিছু বা বাক্স রাখার মতো উঁচু কিছু না পেয়ে চট করে উবু হয়ে বসে মাটিতে রাখা বাক্স খুলল। দেখেই বোঝা যায়, সে বাক্সে কারও হাত পড়েনি, শহর থেকে যেমন গুছিয়ে এনেছিল তেমনই রয়েছে, তবু এটা সেটা সরিয়ে দেখল ভেতরে। হারান আশ্বাস দিয়ে বলল, আজ্ঞে, সে ভয় নাই, এখানে ওসব হয় না। টাকাকড়ি, গয়নাগাটি — এসবে কারও নজর নাই। বিপদ অন্য জায়গায়।

বাক্স বন্ধ করে ইঞ্জিনিয়ারবাবু উঠে দাঁড়াল। বলল, এখনই রওয়ানা হতে বলছেন?

হারান বলল, নইলে ভটভটি পাবেন না গো। খিদে লেগেছে? তাহলে ঘাটে একটা দোকান — সে এতক্ষণে খুলে গেছে। চলেন, আপনারে এগিয়ে দে’ আসি।

কথাটা বলে হারান বাবুর বাক্সটা নিয়ে নিল হাতে। সুন্দর সিংহ রায় দু’ একবার আমতা আমতা করে থামাতে গিয়ে থমকে গেল। বাক্সটা হালকা নয়, আগের দিন সন্ধ্যায় টেনে আনতে গিয়ে ঘাম বেরিয়েছিল, ফলে হারান ওটা বইলে ভালোই হবে। না হয় দু’দশটা টাকা দিয়ে দেওয়া যাবে।


চলেন, এই দিকে আসেন। এটা আমাদের শ্মশানের রাস্তা। পথে যেতে যেতে দেখায় হারান। এখেনে আগে ডাকাতের আড্ডা ছেল। সে অনেক বছর আগে। আমরা কেউ জন্মাইনি। তারা যত মানুষ মেরেছে, সব একে একে এখানেই রয়ে গেছে। রোজ রাতে গাঁয়ে তাণ্ডব করে। যারে পায় তারে শেষ করে। ওদের হাতে যার পরাণ যায়, সে ওদের দলে ভিড়ে আরও তাণ্ডব করে। এ ঝড় আমাদের গাঁয়ে রোজ হতিছে সে কত বচ্ছর কেউ জানে না।

ইঞ্জিনিয়ার চলতে চলতে অন্যমনস্কভাবে বলে, হুঁ।

হারান বলে চলে, এই জন্যিই পেত্থম যোগেন ঠাকুর্দা ফিরে আসেন। বলেন, রক্ষা করবেন গাঁয়ের মানুষরে। শশী-জ্যাঠা আসেন তার পরে। তারপরে আরও অনেকে আসে। রোজ সন্ধেবেলা থেকে তেনারা বসেন যোগেন ঠাকুদ্দার চালায়। সবাই রোজ আসতে পারেন না। যিনি আসেন, তিনি নিজের বাড়িতেও দেখা দেন। আমরা জানি আজ রেতের মতও রক্ষে পাব। তবু বাইরে বেরোনোর যো নেই। গাঁয়ে এমনই তেনাদের উপদ্রব।

ইঞ্জিনিয়ারবাবু চলতে চলতে ভাবে, কত রকম কাহিনি রয়েছে গ্রামদেশে — সরল সাধাসিধে মানুষ... কত কী বিশ্বাস করে। নিশ্চয়ই রাতের বেলা আমার দেখতে ভুল হয়েছিল। ওখানে চালা-টালা কিছুই ছিল না। আর ওই বুড়োগুলো গ্রামেরই বুড়ো সব। এই হারান ব্যাটা আমাকে ভয় দেখিয়ে কিছু টাকা হাতাবার তালে আছে।

ঘাটের চায়ের দোকানে নগেন সবে তখন উনুনে আঁচ দিয়েছে। হারানকে দেখে বলল, কী হে? এত সক্কালে এদিকে কী মনে করে? ইনি কে?

হারান বলল, শিরিষগাঁয়ের প্রজেক্টের বাবু গো। কাল ভুল করে আমাদের গাঁয়ে যেয়ে পড়েছেন। শিরিষের ভটভটি ধরিয়ে দিও। তার আগে চা-জলখাবার দিও।

নগেন বলল, বসেন, বাবু। হারান কই যাও? বসো, চা খাও…

সুন্দর সিংহ রায়ের বাক্সটা নামিয়ে দিয়ে হারান রওয়ানা দিয়েছিল। বলল, না গো, আজ সময় নেই। মেলা কাজ রয়েছে গো। কালও ছিলাম না, জানো তো, হাটে গিছিলাম।

সুন্দর সিংহ রায় পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করে বলল, শুনুন, আপনার জন্য... কয়েকটা টাকার নোট বাড়িয়ে দিল, এই যে…

জিভ বের করে কান ধরে হারান বলল, ও থাক, বাবু। আমরা চাষি মানুষ। আপনি ইরিগেশনের কাজে এয়েচেন, আপনি হলেন আমাদের অন্নদাতা। আপনার সেবা করে পয়সা নিলে পাতক হবো যে…

থতমত খেয়ে সিংহ রায় বলল, আচ্ছা, কালকের খাবার জন্য অন্তত…

আবার জিভ কাটল হারান। বাবু, গেরস্ত বাড়িতে অন্নের জন্যি পয়সা দিতি হয় না। অভাগা আমি, আপনারে ঘরে ঠাঁই দিতি পারিনি। আমি আসি আজ্ঞে... পেন্নাম হই।

কথাটা বলে হারান পেছন ফিরে হাঁটা দেয়। সুন্দরবাবু বেঞ্চিতে বসে আবার মুখ তুলে হারানকে দেখতে পায় না। ভাবে, ও ব্যাটাও বোধহয় ওর বাবার মতো... তারপরে নিজের মনেই হাসে। ভাবে, একরাত ওই গ্রামে থেকে আমিও ওদের মতো হয়ে যাচ্ছি নাকি? তারপরে দোকানদারকে বলে, চা হবে? সঙ্গে খাবার মতো কী আছে?

নগেন হেসে বলে, চা বসিয়েছি বাবু। মুড়ি খাবেন? মুড়ি দেব? সর্ষের তেল, চানাচুর দিয়ে মেখে? সঙ্গে পেঁয়াজ কেটে দেই, আর একটা কাঁচালঙ্কা?

ওদিকে হারান রাস্তা থেকে নেমে জলার ধারে হোগলা কাটছে — ঘরের চালটা ছাইতে হবে। মনটা আজ খুশি। কাল হাটে কেবল ভালো বিক্কিরি হয়নি, দেরি করে এসে আরও একটা ভালো জিনিস হয়েছে। বাবার সঙ্গে দেখা হয়েছে। বাবা জ্বর হয়ে মারা যাবার পরে তিন বছরে এই মাত্তর দু’বার।

No comments: