Monday, April 27, 2020

অভিশপ্ত দ্বীপ


নির্বাসিত
সভার কাজ শেষ করে রাজা আড়চোখে মন্ত্রীর দিকে তাকালেন। অল্প মাথা নুইয়ে মন্ত্রী সম্মতি দিলেন দেখে রাজা গলা উঁচু করে বললেন, “আজকের মতো সভার কাজ শেষ ঘোষণা করুন, মন্ত্রীমশাই।”
মন্ত্রী দু’বার হাততালি দিলেন। শান্ত্রী দরজার কাছের মস্তো ঘণ্টায় দু’বার ঘা দিল। ঢং-অং-অং-অং, শব্দটা কেঁপে কেঁপে মিলিয়ে গেল, সভাসদরা বেরিয়ে গেলেন। মন্ত্রীমশাই নিজে গিয়ে সভাঘরের ছাদছোঁয়া দরজাটা ভিতর থেকে বন্ধ করে দেবার আগে বাইরে বল্লমধারী শান্ত্রীকে বললেন, “কেউ যেন না আসে।”
দ্রুতপায়ে ফিরে এসে রাজার সামনে দাঁড়িয়ে মন্ত্রী প্রায় ফিসফিস করে যা বললেন, তা শুনে রাজার মুখ প্রথমে লাল, তারপরে রাগে প্রায় কালো হয়ে গেল। খানিকক্ষণ চুপ করে বসে রইলেন। তারপরে সিংহাসন থেকে উঠে, আস্তে আস্তে হেঁটে গিয়ে দাঁড়ালেন খোলা জানলার সামনে। বাইরে বিশাল বাগান, তার পরে প্রাসাদের দেওয়াল। দেখা যায় না, কিন্তু রাজা জানেন, দেওয়ালের বাইরে বিরাট শহর। কেল্লা-ঘেরা শহর। রাজার ঠাকুর্দা এ শহরের পত্তন করেন। কেল্লা-শহরের বাইরে মাইলের পর মাইল জুড়ে তাঁর রাজত্ব। কিন্তু আজ এই এত বড়ো রাজত্ব, এত বড়ো কেল্লা-শহর, প্রাসাদ, বিলাস, বৈভব উনি যেন দেখতেও পেলেন না। কোনও কথা না বলে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চলে গেলেন অন্তঃপুরের দিকে। রাজা বেরিয়ে যাবার পরেও যতক্ষণ না নাগরা জুতোর মশ্‌ মশ্‌ শব্দটা মিলিয়ে গেল, মন্ত্রীমশাই ওখানেই দাঁড়িয়ে রইলেন, তারপরে মাথা নিচু করে চলে গেলেন নিজের বাড়ির দিকে।

⧪⧪
অন্তঃপুরে ততক্ষণে রানির স্নান, সাজ, সব শেষ হয়ে গেছে। সোনার হাতল দেওয়া আয়নাটা দিয়ে শেষবারের মতো খোঁপাটা দেখে নিচ্ছেন। সভা শেষের ঘণ্টার শব্দ রাজসভা থেকে রানির কানেও এসেছে। এখন রাজা এলে দুজনে খেতে বসবেন।
এমন সময় ছুটে এল প্রধান সহচরী। ভয়ে মুখ সাদা। কথা আটকে যাচ্ছে বলতে গিয়ে। বাইরের দিকে হাত দেখিয়ে বলল, “মহারাজ... মহারাজ...” আর কিছু বলতে পারল না।
অবাক হয়ে রানি বললেন, “কী হয়েছে?”
সহচরী খানিকটা সামলে নিয়ে বলল, “মহারাজ আসছেন।”
রানি বললেন, “সে তো রোজই আসেন। তাতে এত ভয় পেলি কেন?”
সহচরী বলল, “মহারাজ ভয়ানক রেগে আছেন। মুখ এক্কেবারে লাল।”
রানি বললেন, “কী জানি, আবার কী হলো। যা, পালা তোরা সবাই। এখানে থাকতে হবে না।”
সহচরীরা সকলে অন্দরের দিকে ছুটে বেরোতে না বেরোতেই হ্যাঁচকা টান মেরে বাইরের দরজার পর্দা সরিয়ে ঢুকলেন রাজা। মুখ লাল। রানি কাছে গিয়ে নরম মসলিনের তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছিয়ে দিয়ে বললেন, “কী হয়েছে? এমন দেখাচ্ছে কেন আপনাকে?”
রানির হাত থেকে তোয়ালে ছিনিয়ে নিয়ে ছুঁড়ে ফেললেন রাজা। বললেন, “কুমার কোথায়, জান?”
রানি অবাক হয়ে বললেন, “তাকে তো আপনিই পাঠালেন, উত্তরের রাজ্য দেখাশোনা করে আসতে। কোনও সমস্যা হয়েছে কি?”
রাজা বললেন, “তোমার গুণধর ছেলে আজকাল উত্তরের প্রাসাদে থাকে না। সারাক্ষণ নাকি গ্রামে গ্রামে ঘুরে বেড়ায়। কী করে, কী খায়, রাতে কোথায় থাকে – কেউ জানতেও পারে না।”
রানি এতই অবাক হয়ে গেলেন, যে কিছুক্ষণ কথাই বলতে পারলেন না। শেষে বললেন, “আপনাকে কে বলল?”
রাজা বললেন, “উত্তরের রাজ্যের গুপ্তচর কাল এসেছে। কালই মহামন্ত্রীকে বলেছে। মন্ত্রী আজ আমাকে সব কথা বললেন।”
খানিকক্ষণ দুজনেই চুপ করে বসে রইলেন। তার পর রাজামশাই উঠে পায়চারি করতে করতে বললেন, “কোথায় ভাবছিলাম, রাজ্য চালান’ শিখে নিলে ওকে রাজত্ব দেব। এখন এ কী আপদ হাজির হলো।”
রানি বললেন, “আপনার ছেলে কোথায়, কী করছে – সে আপনি গুপ্তচরের কথায় বিশ্বাস করবেন? একবার ছেলেকে জিজ্ঞেস করবেন না?”
রাজা রানির দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থেকে দরজার দিকে তাকিয়ে ডাকলেন, “শান্ত্রী!”
শান্ত্রী এসে দাঁড়াল। রাজা বললেন, “ছোটো মন্ত্রীকে বলো, আমি ডেকেছি। কুমারকে খুঁজে আনতে হবে উত্তরের রাজ্য থেকে।”

⧪⧪
সাত দিন পরে, অনেক রাতে, গোপন, নিভৃত মন্ত্রণাকক্ষে রাজা, রানি, আর রাজকুমার বসলেন এক সঙ্গে। ঘরের একমাত্র দরজা ভিতর থেকে বন্ধ। কোনও জানলা নেই। আলো বলতে একটা মাত্র মশাল দপ্‌দপ্‌ করছে।
চারিদিকে দেখে কুমার বললেন, “এই বদ্ধ ঘরে মশালের আলো জ্বলতে থাকলে আমরা শ্বাস নেব কী করে?”
রাজা বললেন, “ভয় নেই। হাওয়া চলাচল, এবং পালাবার অন্য পথ রয়েছে। মশালটা যে আংটায় লাগান রয়েছে, ওটা ধরে ডানদিকে ঘোরালেই ওই দেওয়ালের অংশ সরে গিয়ে নিচে নামার সিঁড়ি দেখা যাবে। সেই পথ দিয়ে গেলে সোজা রাজঘাটে গিয়ে পড়বে নদীর ধারে।”
খানিক চুপ করে রইলেন সকলে। তারপরে রাজা বললেন, “কিন্তু এসব কথার জন্য তোমাকে ডাকিনি। আজ সভায় তোমাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম উত্তরের রাজ্যে তুমি কী করছ। তুমি বলেছিলে যা বলার আছে, আড়ালে বলবে। এখন বলো কী বলার আছে? তুমি নাকি আজকাল আর উত্তরের রাজপ্রাসাদে থাক না?”
উত্তরের রাজপ্রাসাদে আমি থাকি না।” স্বীকার করলেন কুমার। “আমি গত এক মাস গ্রামে গ্রামে ঘুরে বিভিন্ন মানুষের বাড়িতে থাকি। কোনও গ্রামে আমি দু-তিন দিনের বেশি থাকি না। এবং পর পর পাশাপাশি গ্রামেও কখনও যাইনি।”
রাজা অবাক হয়ে বললেন, “কেন?”
কুমার বললেন, “উত্তরের রাজ্যে গিয়ে দেখলাম, আমি গ্রাম দেখতে যাব বললেই প্রাসাদে সাজ-সাজ রব পড়ে যেত। আমার জন্য আসত হাতি, ঘোড়া, পালকি। বিরাট মিছিল করে, লোক-লস্কর, সিপাই-শান্ত্রী, রাঁধুনি-অমাত্য – সব নিয়ে যেতে হত গ্রাম দেখতে।”
রানি বললেন, “তাই তো হবার কথা। রাজা, বা রাজপুত্র কি একা একা গ্রামে গ্রামে ঘুরবে?”
কুমার বললেন, “কোথাও একা যাবার যো ছিল কই? এমনকি গ্রামের মধ্যেও আমাকে প্রায় বন্দি থাকতে হত মোড়লের বাড়িতে। কখনও যদি বলেছি একটু হেঁটে আসছি, ওমনি আগে পিছে পঞ্চাশজন চলতে লেগেছে। তাদের কাজই হলো রাস্তা থেকে, বাড়ি থেকে সব লোক তাড়িয়ে খালি করে দেওয়া। আমি যদি কাউকে দেখে বলেছি, ‘আমি ওই লোকটার সঙ্গে কথা বলতে চাই,’ বলা হয়েছে, ‘বেশ তো, যুবরাজ, আমরা এত্তেলা দিচ্ছি। ও মোড়লের বাড়ি এসে আপনার সঙ্গে দেখা করবে।’ দু’চার দিন পরে একটা লোক এসেছে বটে, কিন্তু আমার প্রত্যেকবার মনে হয়েছে যে আমি যার সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছি, এ সে নয়। অন্য কেউ।”
অন্য কেউ আবার কী?” রাজা অবাক। “গ্রামেরই লোক তো?”
রাজপুত্র বললেন, “হতে পারে গ্রামের লোক, কিন্তু তাদের শিখিয়ে পড়িয়ে পাঠান’ হয় আমার কাছে। আমি যদি জিজ্ঞেস করি, ‘তোমাদের কী কষ্ট? তোমরা কী চাও? তোমাদের কী অভাব-অভিযোগ?’ তারা খালি বলে, ‘যুবরাজ, আমাদের কোনও অভাব নেই। আমরা সুখে আছি। আমরা কিচ্ছু চাই না। আপনার জয় হোক।”
রাজা-রানি হাসলেন। তাঁরা ভাবতেন তাঁদের রাজত্বে লোকে সত্যিই সুখে থাকে – তাই তাঁরা খুশিই হলেন।
কুমার বলে চললেন, “এমনও মনে হত, বিভিন্ন গ্রামে, দূর দূরান্তের গ্রামে, যেন একই লোক দেখছি, কিন্তু প্রমাণ করতে পারছি না। শেষে, একদিন দেখলাম একটা লোকের হাতে একটা পোড়া দাগ। কিছুদিন পরে চল্লিশ মাইল দূরের একটা গ্রামে দেখলাম সেই লোকটা, হাতে সেই দাগ। এবং তার পর, যখন আবার এক মাস পরে, রাজ্যের অন্য প্রান্তে একটা গ্রামে সেই পোড়া দাগ দেখলাম, তখন বুঝলাম যে মন্ত্রীরা ইচ্ছে করে আমাকে সত্যিটা দেখতে দেবে না। পালালাম – নিজের চোখে দেখব বলে।”
কী দেখলে?” শান্ত গলায় জানতে চাইলেন রাজা।
দেখলাম লোকে সুখে নেই। দেখলাম তাদের কী অপরিসীম কষ্ট – তারা খেতে পায় না, তাদের পরণের পোশাক নেই। তারা একবেলা খেয়ে বেঁচে আছে। নুন আনতে পান্তা ফুরোয়...”
রাজা বললেন, “তাই তুমি সব্বার খাজনা মকুব করে দিয়েছ? আর আমি শুনেছি তোমার এক স্যাঙাত জুটেছে, তুমি নাকি তাকে সঙ্গে নিয়ে নিয়ে ঘুরছ?”
স্যাঙাত না। বন্ধু। গ্রামে গ্রামে ঘুরতে ঘুরতেই তার সঙ্গে আমার পরিচয়। সে-ও খুব গরীব। সে-ও খেতে পায় না...”
রাজা গর্জন করে বললেন, “তুমি জান সে কে? তুমি কি জান, তার বাপ-ঠাকুর্দা কী ধরণের লোক?”
শান্ত-স্বরে কুমার বললেন, “জানি। তারা দুজনেই আপনার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিল বলে তাদের আপনার সৈন্যরা ধরে এনেছিল রাজ কারাগারে। তারপরে ওদের বাড়ির লোক আর ওদের কোনও খবর পায়নি। ধরে নিচ্ছি, বিদ্রোহীদের যা শাস্তি হয়, তাই হয়ছে। আপনি তাদের প্রাণদণ্ড দিয়েছেন।”
রাজা একটু থামলেন। কী যেন ভাবলেন। তারপরে বললেন, “মৃত্যুদণ্ডটা বড়ো কথা নয়। রাজদ্রোহীদের শাস্তি হয়েই থাকে। কিন্তু যেটা বড়ো কথা, সেটা হলো এই, যে তুমি সব জানা সত্ত্বেও কী করে সেই লোকটাকেই তোমার বন্ধু বলতে পার? তার কথাতে তুমি গ্রাম সুদ্ধ সবার খাজনা মকুব করে দিলে?”
কুমার মাথা নাড়লেন। “তার সঙ্গে দেখা হবার অনেক আগে থেকেই আমি কিছু প্রজার খাজনা মকুব করেছি। সবার করিনি। যারা খুব গরীব, যাদের ক্ষেতের ফসল নষ্ট হয়েছে, আর যে গ্রামে মহামারী হয়েছে, কেবল তাদেরই খাজনা মাপ করেছি।
রাজা বললেন, “তা হয় না। খাজনা কারওর মাপ হয় না। রাজা যদি খাজনা না নেয়, গ্রামের লোকেরা চাষ করা বন্ধ করে দেবে। জেলেরা মাছ ধরবে না। কেউ কাজ করবে না।”
রাজপুত্র অবাক হয়ে বললেন, “তবে তারা খাবে কী?”
রাজা বললেন, “তা জানি না। কিন্তু খাজনা কারওরই মকুব হবে না। তুমি এবার যখন ফিরবে, রাজ আজ্ঞা নিয়ে ফিরবে। সবাইকে সমান খাজনা দিতে হবে।”
মাথা নেড়ে রাজপুত্র বললেন, “তা সম্ভব নয়।”
চমকে উঠলেন রাজা-রানি। “কুমার!” বলে উঠলেন রানি। “তুমি কী বলছ? রাজাকে মুখের ওপর বললে তুমি রাজ-আজ্ঞা মানবে না?”
এই অন্যায় আজ্ঞা মানা সম্ভব নয়,” ঘাড় গোঁজ করে বললেন রাজপুত্র।
রাজার আজ্ঞা অন্যায় হয় না। আমার কথাই আইন। অমান্য করার শাস্তি জান?” জানতে চাইলেন রাজা।
জানি,” বললেন রাজপুত্র।
তবে যাও। রাতে বিশ্রাম করো। ভালো করে ভেবে দেখো – কাল সকালে আমাকে জানাবে কী করতে চাও।”
পরদিন সভার মধ্যে রাজা রাজপুত্রকে নির্দেশ দিলেন, “তুমি আজই আবার উত্তরের রাজ্যে রওয়ানা হবে। একমাস সময় রইল তোমার। প্রত্যেক প্রজার কাছ থেকে বাকি খাজনা আদায় করে ফিরবে – কাউকে মাপ করবে না।”
রাজপুত্র উঠে দাঁড়িয়ে রাজাকে প্রণাম করে বললেন, “তা আমি পারব না। যারা গরীব, যারা খেতে পায় না – তাদের কাছ থেকে খাজনা আদায় করা পাপ।”
স্তব্ধ সভাঘর রাজার গলার স্বরে কেঁপে উঠল। “এর অর্থ কী, তুমি জান?”
শান্ত গলায় রাজপুত্র বললেন, “জানি। নির্বাসন।”
রাজা কিছু বলার আগে প্রধানমন্ত্রী উঠে প্রণাম করে বললেন, “মহারাজ, অনুমতি দিন, আমি রাজপুত্রের সঙ্গে কিছু কথা বলতে চাই। বয়সের উচ্ছ্বাসে রাজকুমার আপনাকে অপমান করেছেন। আমি জানি উনি আপনার বিরুদ্ধে যেতে চান না।”
হাত তুলে মন্ত্রীকে থামিয়ে দিয়ে রাজা বললেন, “রাজার আদেশ অমান্য করলে যদি অন্য কাউকে নির্বাসনে যেতে হয়, রাজার ছেলের ক্ষেত্রে অন্য নিয়ম হবে না।”
মহারাজ...” বললেন প্রধানমন্ত্রী।
মহারাজ...” বললেন রাজপুরোহিত।
চুপ,” রাজা গর্জন করে উঠলেন। “রাজার ছেলে যদি রাজাদেশ না মানে, তবে তারও একই শাস্তি। শুধু সেই শাস্তি হবে এমন যাতে আর কেউ আইন ভাঙার সাহসই না করে।” বলে রাজা রাজপুত্রের দিকে ফিরে বললেন, “তোমার নির্বাসন রাজ্যের বাইরে নয়। তোমার নির্বাসন পশ্চিমের দ্বীপে। ওখানে গিয়ে সবার কর মকুব করো গে, যাও।”
অবাক হয়ে সভাসুদ্ধ লোক চেয়ে রইল রাজার দিকে। প্রধানমন্ত্রীর কপালে বিন্দুবিন্দু ঘাম ফুটে উঠল। রাজপুরোহিত চোখ বুজে মন্ত্র বলতে থাকলেন। সেনাপতি ঘন ঘন গোঁফে হাত বোলাতে থাকলেন।
রাজা বলে চললেন, “পশ্চিমের দ্বীপে তুমি নিজের ইচ্ছেমতো রাজত্ব করো। যদি তুমি পশ্চিমের দ্বীপকে সুজলা, সুফলা করে তুলতে পার, আমি তোমাকে আমার রাজত্ব দিয়ে তীর্থে চলে যাব। কিন্তু একটা কথা বলে দিই – মনে রেখো চিরকাল। রাজার কোনও বন্ধু হয় না। রাজা সবার উপরে। রাজার মন্ত্রী হয়, উপদেষ্টা হয়, বয়স্য হয় – কিন্তু বন্ধু? না, আমাদের কোনও বন্ধু নেই।”
ধীর পায়ে রাজা চলে গেলেন সভাঘর ছেড়ে। প্রধানমন্ত্রী কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে সভা শেষ ঘোষণা করলেন। সবাই চলে গেলে মন্ত্রীরা সকলে কুমারকে ঘিরে বসলেন, পশ্চিমের দ্বীপ সম্বন্ধে বলার জন্য।

⧪⧪
তিন মাস কেটে গেছে। রাজপুত্র কুমার এখন পশ্চিমের দ্বীপের শাসক। একদিন সন্ধ্যায় নতুন মেরামত করা রাজবাড়ির ছাদ থেকে দূরে, পূব আকাশে ঘনিয়ে আসা অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন, হঠাৎ দেখলেন একটা নৌকা ভেসে আসছে যেন। ডাকলেন, “শান্ত্রী, দেখো তো, ওটা কী সত্যিই নৌকো, না কি ভুল দেখছি?”
শান্ত্রী এসে পাশে দাঁড়িয়ে বলল, “নৌকোর মতোই তো দেখাচ্ছে। কিন্তু এই সন্ধেবেলা এই ভয়ানক জায়গায় কে আসবে? রাজামশাই কি আরও কাউকে নির্বাসন দিলেন?”
কুমার বললেন, “সে পরে দেখা যাবে – এখন কাউকে তো পাঠাও, যে-ই থাকুক নৌকোয়, নিয়ে এসো আমার সামনে।”
শান্ত্রী চলে গেলে কুমার ছাদ থেকে নেমে দরবার ঘরে পায়চারি করতে থাকলেন। না, শান্ত্রীর কথা ঠিক নয়। রাজা অন্য কাউকে নির্বাসন দিলেও একটা ছোটো নৌকায় তাকে পাঠান’ হবে না। রাজার জাহাজে পাহারা দিয়ে পাঠান’ হবে। আর যদি কেউ ইচ্ছে করে আসতে চায়, কেনই বা কেউ পশ্চিমের দ্বীপে ইচ্ছে করে আসতে চাইবে, তা পরের কথা, সে কেন সন্ধ্যার অন্ধকারে আসবে? তবে কি কোনও জাহাজডুবি হলো?
এই সব সাতপাঁচ ভাবছেন, শান্ত্রী এসে খবর দিল, “যুবরাজ, নৌকোটাতে একটাই মাত্র লোক ছিল – বলছে আপনার বন্ধু।”
বন্ধু! চমকে উঠলেন কুমার। হঠাৎ মনে পড়ে গেল নির্বাসনের আগে রাজার শেষ কথাগুলো। তবে কী...?
ছুটে বাইরে গেলেন কুমার। অন্ধকার ঘনিয়ে এসেছে। মশালের আলোয় ছায়ামাখা বারান্দায়, সর্বাঙ্গে কাদা, পরণে ছেঁড়া পোশাক, রোগা শরীরে হাড় গোনা যায়, ভিজে, শীতের ঠাণ্ডা হাওয়ায় ঠকঠক করে কাঁপছে – ও কে?
এক পা এগোলেন কুমার। “বন্ধু?”
তারপর এক ছুটে এগিয়ে গিয়ে বন্ধুর অজ্ঞান শরীরটা মাটিতে আছড়ে পড়ার আগে ধরে নিলেন। মুখ তুলে শান্ত্রীদের বললেন, “বৈদ্যকে খবর দাও। ওষুধের বাক্স নিয়ে যেন আসেন। স্নানের জল তৈরি করতে বলো। রান্নাঘরে খবর দাও। আজ আমার সঙ্গে আর একজন খাবে।”

⧪⧪
রাত্রি তখন গভীর। দুই বন্ধু খেয়েদেয়ে যুবরাজের শোবার ঘরে বসে কথা বলছেন।
যুবরাজ বললেন, “আমি ভাবতেই পারছি না, যে আমার বাবা তোমাকে মারবার জন্য লোক পাঠিয়েছিলেন।”
বন্ধু বললেন, “তোমার বাবার দোষ নেই, কুমার। উনি রাজা। সবসময় নিজেকে রক্ষা করার কথা ভাবতে হয়। তুমি ছিলে ভালো। রাজাদের মতো ভাবতে। তুমি যে উত্তরের রাজ্যে গিয়ে দেশের মানুষের কথা ভাবতে শিখেছ নিজে নিজেই, তা তো উনি বোঝেননি। উনি ভেবেছেন যে আমিই তোমার মাথায় ভূত ঢুকিয়েছি।”
কুমার হেসে বললেন, “তার ওপর গুপ্তচরও সেরকম খবরই দিয়ে রেখেছে।”
আরও জোরে হেসে বন্ধু বললেন, “তার-ও ওপর আমার বাবা আর ঠাকুর্দা দুজনেই রাজার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে শাস্তি হিসেবে প্রাণ দিয়েছে।”
হাসি থামিয়ে রাজপুত্র বললেন, “কিন্তু তুমি উত্তরের রাজ্য থেকে পশ্চিমের দ্বীপে এলে কী করে? অনেক দূর তো!”
বন্ধু বললেন, “সে কাজটাও সহজ হয়নি। ভাবো, কত মাইল হাঁটতে হয়েছে। সারা দিন জঙ্গলে লুকিয়ে, কেবল রাতের বেলা পথ চলে। প্রথমে ভাবিনি তোমার কাছে আসব। প্রাণ বাঁচাতে গাঁ থেকে পালিয়েছিলাম। কিন্তু খুব শিগগিরই বুঝলাম, এ রাজ্যে কোথাও বাঁচতে পারব না। অন্য দেশে যেতে হবে। অন্য দেশ মানেই তো নির্বাসন। তখনই মনে হলো তোমার কথা। তাই চলতে শুরু করলাম। সমুদ্রতীরে পৌঁছে গ্রাম থেকে একটা নৌকো চুরি করে, সারা দিন সমুদ্রে ভেসে, সন্ধেবেলা দেখলাম পশ্চিমের দ্বীপ দেখা যাচ্ছে।”
যুবরাজ বললেন, “বেশ। তুমি এসেছ, ভালো হয়েছে। তুমি আমার উপদেষ্টা হবে। অনেক আলোচনা আছে। কিন্তু আজ আর না। তুমি ক্লান্ত। তোমার শোবার ঘর দেখিয়ে দিই, চলো।”

⧪⧪
চার দিন আরও কাটল। রাজপুত্র আর বন্ধু দ্বীপের সর্বত্র ঘুরে বেড়ালেন। বন্ধু যত দেখেন তত অবাক হন। বার বার রাজপুত্রকে নানা প্রশ্ন করেন। রাজপুত্র শুধু মাথা নাড়েন, আর বলেন, “আগে দেখো, তারপরে বলব।”
চার দিনের শেষে, দুজনে দরবার ঘরে বসেছেন – সিংহাসনে কুমার, পাশে, একটা নিচু আসনে বন্ধু। দ্বীপের গণ্যমান্য কিছু লোক রয়েছেন সভায়। কুমার বললেন, “বলো এবারে। কী জানতে চাও...”
বন্ধু বললেন, “প্রশ্ন তো একটাই। এত সুন্দর একটা দ্বীপ, তার কী চমৎকার প্রাকৃতিক রূপ – এত পাহাড়, এত নদী, চারিদিকে সমুদ্র! তবু এখানে কেউ কাজ করে না কেন? সামান্য কয়েক হাজার লোক বাস করে – তারা রাজার দেওয়া টাকায় হাত পেতে শুধু দুটো ডাল-ভাত খেয়ে বেঁচে আছে – কেন?”
যুবরাজ সভা থেকে দুজনকে সামনে ডাকলেন। বললেন, “এই দু’জন – এদের একজনের পূর্বপুরুষ ছিল চাষী। উর্বর জমি থেকে ফসল ফলাত। আর ওই, ও – ওর পূর্বপুরুষ মাছ ধরতে সমুদ্রে। ওরাই বলবে কেন ওরা কিছু করে না।”
লোক দুটি প্রণাম করে বলল, “আমরা কিছুই করতে পারি না। কারণ যুগ যুগ ধরে পশ্চিমের দ্বীপের জমিতে কোনও ফসল ফলে না, জলে মাছ ধরা যায় না। পশ্চিমের দ্বীপ অভিশপ্ত যে!”
বন্ধু বললেন, “অভিশাপের কথাটা আমি শুনেছি বটে। কিন্তু কিসের অভিশাপ?”
কুমার হাত নেড়ে ডাকলেন এক বৃদ্ধকে। বললেন, “ইনি ছিলেন পশ্চিমের দ্বীপের ইশকুলের প্রধান গুরু। আজ এখানে কোনও ইশকুল নেই। অভিশাপের কথা আমার এঁর কাছ থেকেই শোনা। গুরুমশাই, আপনি আমার বন্ধুকে কাহিনিটা বলুন।”
অভিশাপ

বৃদ্ধ শিক্ষক বলতে শুরু করলেন, “যুবরাজ, এ কাহিনি নয়, সত্য ঘটনা। আজ থেকে বহু যুগ আগে, আপনার বংশের প্রথম রাজা সবে রাজা হয়েছেন, তখন এই পশ্চিমের দ্বীপ ছিল বর্ধিষ্ণু জনপদ। আমাদের দ্বীপের মাটিতে সোনা ফলত। দ্বীপের চারপাশের সমুদ্র ছিল মৎস্যজীবির স্বর্গ। ওই বড়ো বড়ো পাহাড় থেকে আসত চূনাপাথর। পশ্চিমের দ্বীপের সবচেয়ে বড়ো শহর ছিল এটাই। শহরের কোনও বাড়িই প্রাসাদের চেয়ে কম ছিল না। পাহাড়ের চূনাপাথরে বানানো শহর।
কিন্তু দ্বীপের মানুষের মনে গর্ব বাসা বেঁধেছিল। তারা ভাবত, তাদের মতো ভাগ্যবান দুনিয়ায় কেউ নেই। তাই তারা স্বর্গে বাস করে। এই অহংকারই ওদের সর্বনাশ ডেকে আনল।
মহারাজের এক বিশ্বস্ত সেনাপতি ছিলেন এই দ্বীপেরই যোদ্ধা। রাজা ওঁকেই দ্বীপ-শাসনের ভার দিয়ে বলেছিলেন, ‘তুমি পশ্চিমের দ্বীপের অধিশ্বর। ওপারেই শত্রুদের দেশ। জলপথে তারা আক্রমণ করলে তুমিই আমাদের প্রথম প্রহরী।’
হাজার যুদ্ধজাহাজের নৌবহর নিয়ে সেনাপতি এই শহরে থাকতেন। পশ্চিমের দ্বীপ তখন জমজমাট। জাহাজঘাটে হাজার যুদ্ধজাহাজ ছাড়াও দূর দূর দেশের অজস্র বণিকের নৌকো, আর শহরে হাজার জাহাজের লক্ষ নাবিক, আর সৈনিকদ। শহরই ছিল বহু মাইল জোড়া। বাড়ি-ঘর, দোকানপাট তো ছিলই, আর ছিল হাতিশাল, ঘোড়াশাল, নৌকো বানানোর আর সারানোর কারখানা। বহু মানুষের ভীড়। এ সব নিয়ে পশ্চিমের দ্বীপ চালাতেন সেনাপতি। দ্বীপের মানুষ বলত, সেনাপতি-রাজা। ভগবানের মত ভয় করত, ভক্তিও করত। পুজো করত তাঁর স্ত্রীকেও।”
এই স্ত্রী-ই তো সব সমস্যার মূল, তাই না?” বললেন যুবরাজ।
মাথা নাড়লেন বৃদ্ধ। বললেন, “তা এক রকম সত্যি, কিন্তু ঘটনার জন্য সেনাপতি-রাজাও সমানভাবে দায়ী।”
কী ঘটনা?” জানতে চাইল বন্ধু।
বৃদ্ধ শিক্ষক বললেন, “সেনাপতি-রাজা নানা কাজের জন্য দেশের নানা জায়গা থেকে অনেক জ্ঞানী-গুণী লোক নিয়ে এসেছিলেন। তারা ব্যবসা করত, কারখানা বানিয়েছিল, বিদ্যালয় তৈরি করেছিল... এদের মধ্যে একজন, সেনাপতি-রাজার প্রধান হিসাবরক্ষক, এসেছিলেন উত্তরের রাজ্য থেকে।
হিসাবরক্ষকের একমাত্র সন্তান এক মেয়ে। অত্যন্ত রূপবতী। এই মেয়ের আসল নাম কী ছিল আজ আর কেউ জানে না। সবাই তাকে রূপসী বলে ডাকত বলে ওটাই ওর নাম হয়ে গিয়েছিল। সবাই জানত ওর নামই রূপসী।
সেনাপতি-রাজা তাকে দেখে বললেন, ‘আমি তোমার মেয়েকে বিয়ে করতে চাই।’
মেয়ের বাবা বললেন, ‘কিন্তু রাজা, আপনার তো স্ত্রী আছেন। আপনি কী করে আর একজনকে বিয়ে করবেন? রাজা ছাড়া কেউ তো একবারের বেশি বিয়ে করতে পারেন না।’
সেনাপতি-রাজা বললেন, ‘আমিও তো রাজা-ই। আমি কাল-ই রাজধানীতে দূত পাঠাব, মহারাজের অনুমতি চেয়ে।’”
শিক্ষক বলে চললেন, “কিন্তু সে দূত আর পাঠান’ হলো না। সেদিন রাতে কী হয়েছিল, কেউ জানে না, কিন্তু পরদিন সেনাপতি-রাজার দূত রূপসীর বাবার কাছে চিঠি নিয়ে গেল – সেনাপতি-রাজা রূপসীকে নিজের ভাইয়ের সঙ্গে বিয়ে দিতে চান। এই ভাই সেনাপতি-রাজার নৌ-বহরের দায়িত্বে ছিলেন, উনিও মস্তো বড়ো বীর। সবাই বুঝল, এর জন্য সেনাপতি-রাজার স্ত্রী-ই দায়ী।
রূপসী যেমন সুন্দরী, তেমনই বুদ্ধিমতী। সেনাপতি-রাজার বাড়িতে খুব শিগগিরই সবার প্রিয় হয়ে উঠল। তার মিষ্টি মুখ, আর মিষ্টি আচরণে সবাই মুগ্ধ। সবাই ধন্য ধন্য করতে লাগল। সেনাপতি-রাজার ভাইও খুব সুখী। বাড়িতে সবাই আনন্দে ডগ-মগ।
কিছুদিনের মধ্যেই লোকে বলতে শুরু করল যে দেশের আর সেনাপতি-রাজার ভাগ্যও রূপসীরই জন্য। লক্ষ্মীমন্ত বউ রাজার ভাইয়ের। সেনাপতি-রাজার ভাইকে সবাই ভাই-রাজা বলে ডাকত, এখন সক্কলে রূপসীকে বৌদি-রানি বলে ডাকতে শুরু করল।
শুধু সুখী নন সেনাপতি-রাজার স্ত্রী। তাঁর মন হিংসায় জ্বলে পুড়ে যাচ্ছে। এতদিন তিনি ছিলেন পশ্চিম-দ্বীপের একমাত্র রানি। আজ আর এক রানি এসে জুটেছে। সবাই এখনও তাঁকে যথেষ্ট সম্মান করে, কিন্তু তিনি বোঝেন সে কেবল মুখেই। বৌদি-রানি অনেক বেশি আন্তরিক সম্মান পান। ভয়ে থাকেন – এক দিন বুঝি বৌদি-রানিই আসল রানি হয়ে বসবেন। যত ভয় পান, তত বাড়ে হিংসা।”
বন্ধু বললেন, “বড়ো জ্বালায় পড়েছেন রানি। কিন্তু এর সঙ্গে অভিশাপের কী সম্পর্ক?”
বৃদ্ধ বললেন, “ধৈর্য ধরুন। এ গল্প নয়, ইতিহাস। ঘটনা পর পর বর্ণনা না করলে বুঝবেন না।
তখনকার দিনে দেশে দেশে যুদ্ধ লেগেই থাকত। সমুদ্রের ওপারে ছিল আমাদের শত্রুদের দেশ। ইতিহাসে লেখা আছে, এমন বহুবার হয়েছে যখন তাদের নৌ-বাহিনি আমাদের আক্রমণ করেছে – আমাদের রাজত্ব নিয়ে নেবার জন্য।”
বন্ধু হেসে বললেন, “এমনও লেখা আছে যে আমাদের রাজাও ওদের দেশ আক্রমণ করে রাজ্য জয় করেছেন।”
তা আছে,” মানলেন বৃদ্ধ। “এবং যেহেতু পশ্চিম দ্বীপ দুই রাজ্যের ঠিক মাঝামাঝি, এবং সমুদ্রের মধ্যে, তাই দুই দেশেরই রাজা চাইতেন এই দ্বীপ দখল করে রাখতে। এ কাহিনিও তেমন এক আক্রমণের। কিছুদিন শান্তিতে কাটতে না কাটতেই আমাদের রাজা স্থির করলেন যে উনি পশ্চিম সমুদ্র পার করে শত্রুর দেশ দখল করবেন। দূত এল সেনাপতি-রাজার কাছে – নৌবহর যেন সাগর পেরিয়ে আক্রমণ করে। শত্রুদের যুদ্ধ-জাহাজ সব ধ্বংস হলে রাজা সৈন্য নিয়ে যাবেন সাগর পেরিয়ে রাজ্য দখল করতে।
সেনাপতি-রাজার নির্দেশে ভাই-রাজা রওয়ানা দিলেন জাহাজ সাজিয়ে। আর সেই সুযোগে রানি এলেন সেনাপতি-রাজার কাছে। বললেন, ‘দেখুন, আমার কিন্তু মনে হচ্ছে আপনার ভাই দিনে দিনে প্রজাদের কাছে বেশি প্রিয় হয়ে উঠছে। এখনই সবাই ভাই-রাজা বলে। এবারে যুদ্ধ জিতে এলে সবাই ওকেই মাথায় করে নাচবে। তখন মহারাজ যদি ওকেই দ্বীপের রাজা বানিয়ে দেন, আপনার কী হবে?’
রাজা আশ্চর্য হয়ে বললেন, ‘এ সব কী বলছ, রানি?’
রানি বললেন, ‘আপনি মহারাজকে বলে ওকে উত্তরের রাজ্যের সেনাপতি করে পাঠিয়ে দিন।’
সেনাপতি-রাজা হা-হা করে হেসে বললেন, ‘তোমার মাথা খারাপ হয়েছে, রানি। শোনোনি, ভাই যুদ্ধে যাবার আগে কী বলে গেল? নিচু হয়ে সভার মাঝখান আমার জুতোয় চুমু খেয়ে বলে গেল, আমি শুধু নৌবহর ধ্বংস করে ফিরব না – শত্রু রাজার মাথার মুকুটটাও নিয়ে আসব দাদা। আপনি নিজে হাতে মহারাজের কাছে নিয়ে যাবেন। সেই ভাই আমার জায়গায় সেনাপতি হবে?
“‘আর হলেও, উত্তরের রাজ্যে গিয়ে ও কী করবে? ও নৌ-যুদ্ধ সেনাপতি। ওখানে সমুদ্র নেই। বরং ও যদি পশ্চিম দ্বীপের সেনাপতি হয়, তাহলে আমি উত্তরের রাজ্যের সেনাপতি হতে পারব। দেশের ভালো হবে।’
রানি আর কিছু বললেন না। দেওরকে সরানোটা তো ওঁর প্রধান উদ্দেশ্য ছিল না। তাই তিনি ভাই-রাজাকে ছেড়ে রূপসীর ওপর নজরদারি শুরু করলেন। ভাবলেন, কোনও রকমে রূপসীর মধ্যে কোনও ত্রুটি পেলে আর ছেড়ে কথা কইবেন না।
কিন্তু সে-ও হয় না। রূপসীর আচারে-আচরণে, কথায়-বার্তায়, পোশাকে-আশাকে – কোনও ত্রুটি খুঁজে পান না। পশ্চিমের দ্বীপের মেয়ে না হয়েও সে সব বিষয়ে ঠিক আমাদের মতোই চলে, বলে, কাজ করে।
রানির অনেক সখীর মধ্যে যাঁরা পশ্চিম দ্বীপের, তাঁদেরও উনি দলে টানলেন। তাঁরাও রূপসীর জনপ্রিয়তার জন্য তাঁকে পছন্দ করতেন না, কিন্তু ভয়ে কিছু বলতেও পারতেন না। রানিকে নিজেদের দিকে পেয়ে সকলে মিলে ভয়ানক এক চক্রান্ত করলেন তাঁরা।”
বন্ধু উত্তেজনায় সামনে ঝুঁকে পড়লেন। যুবরাজ আগে সবটাই শুনেছেন, সভার বাকি লোক তো সে গল্প জানেই, কিন্তু তাঁরাও নিশ্চুপ হয়ে শুনতে লাগলেন।
তখন বসন্ত কাল। সারা দেশের মতো পশ্চিমের দ্বীপেও বসন্তের উৎসব চলছে। রাজধানী থেকে প্রতি বছরের মতো কথকরা এসেছে গান গাইতে, কবিতা শোনাতে, গল্প বলতে। তারা শহরের দরজায় দরজায় ঘুরে ঘুরে গান গায়, শহরের রাস্তায় দাঁড়িয়ে গল্প বলে। আজকাল এসব আর হয় না, তবে তখন আমাদের সারা দেশে এভাবেই লোকে বসন্ত উৎসব পালন করত।
সেদিন হঠাৎ রূপসীর কাছে রানি খবর পাঠালেন, ‘তোমার দাইকে আমার কাছে পাঠিয়ে দাও। কাজ আছে।’
সেদিন রূপসীর কাছে আর কোনও সহচরী বা দাই ছিল না। সবাই গেছিল উৎসবে। তবু, রূপসী মনে করল, কতক্ষণের জন্য বা? পাঠিয়ে দিল দাইকে। আর, তার একটু পরেই একজন কথক সেই পথে ঘুরতে ঘুরতে দরজায় এসে বলল, ‘কে আছেন? গান শুনবেন? গল্প বলব?’
তখনকার দিনে বিবাহিত মেয়েরা একা অন্য পুরুষের সামনে বেরোত না। রূপসী ভিতর থেকে বলল, ‘এখন বাড়িতে কেউ নেই। এখন আমি গল্প শুনতে পারব না। আপনি যান।’
কথক বলল, ‘আমি অনেকটা পথ হেঁটে এসেছি। আমাকে একটু জল দেবেন?’”
অবাক হয়ে বন্ধু বললেন, “এ কী কথা! জলই বা কী করে দেবে রূপসী? বাড়িতে তো কেউ নেই।”
ঐতিহাসিকরা মনে করেন, রানিই সব কিছুর মূলে। উনিই রূপসীর দাইকে ইচ্ছে করে ডেকে পাঠিয়েছিলেন। উনিই কথককে পাঠিয়েছিলেন রূপসীর বাড়ি।
শিক্ষক বলে চললেন, “রূপসী বলল, ‘বললাম না, আমি এখন বেরোতে পারব না?’
কথক বলল, ‘আমি বুড়ো মানুষ। আপনার কোনও ভয় নেই। আপনি জানলা দিয়ে আমাকে একটু জল দিন – আমি সকাল থেকে হেঁটে হেঁটে খুব ক্লান্ত।’
শুনে রূপসীর মায়া হলো। একটা পাত্রে জল নিয়ে এসে দেখল, কথক মোটেই বুড়ো না, ক্লান্তও না। বরং জোয়ান এবং কমবয়সী।
রূপসীকে দেখে সে অবাক হয়ে বলল, ‘আমি কত দেশ ঘুরেছি। আপনার মতো সুন্দরী আমি কোথাও দেখিনি।’
রূপসী লজ্জা পেয়ে ছুটে ভিতরে গেছে, এমন সময় রূপসীর দাই ফিরে এল।”
রাজপুত্র রেগে বললেন, “ফিরে এল না কাঁচকলা! নিশ্চয়ই কাছেই গাছের আড়ালে লুকিয়ে ছিল।”
শিক্ষক এ কথার উত্তর না দিয়ে বলে চললেন, “সে তো আকাশ থেকে পড়ল! বলল, ‘এ কী, বৌদি-রানি! এ তোমার কী রকম রীতি-নীতি! আমাকে রানি-মায়ের কাছে পাঠিয়ে, বাড়িতে কেউ নেই, তুমি কথক ডেকে তোমার রূপের গপ্প-গাছা করছ?’
রূপসী যতই বোঝায়, কে কার কথা শোনে! শেষে দাই গিয়ে নালিশ করল রানির কাছে। রানি তো তৈরিই ছিলেন, পশ্চিম দ্বীপের সব সখীদের সঙ্গে নিয়ে ইনিয়ে বিনিয়ে নালিশ করলেন রাজার কাছে।
তখনকার দিনে রাজামশাইরা অত ভেবেচিন্তে দেখতেন না। রানির নালিশ শুনেই রেগে বললেন, ‘রূপসীর প্রাণদণ্ড। ওকে এখনই কারাগারে বন্দী করো। কাল সকালেই ওর মাথা কেটে ফেলা হবে।’
ব্যাস, ওমনি গিয়ে প্রহরীরা রূপসীকে বন্দী করল। কেউ তার কোনও কথা শুনল না, পরদিন সকালেই রাজবাড়ির বাগানে গাছের গায়ে বাঁধা হলো। রাজা নিজে এলেন। ওঁর সামনেই জল্লাদ রূপসীর মাথা কাটবে।
ভীড় করে দ্বীপবাসীরা দেখতে এসেছে। কিছু দূরে দাঁড়িয়ে রূপসীর মা-বাবা চোখের জল ফেলছেন, কিন্তু তাঁদের করার কিছুই নেই।
সেনাপতি-রাজা হাত তুললেন, জল্লাদ তার খড়্গ তুলল। রাজা হাত নামালেন, খড়্গ নেমে এল তিরবেগে।
রূপসীর চিৎকারে সমবেত লোকজন চোখ বুজল, কিন্তু তারপরে সবাই অবাক হয়ে দেখল, রূপসীর মাথা কেটে মাটিতে পড়ে নেই। জল্লাদ অবাক হয়ে খড়্গের দিকে তাকিয়ে আছে, রূপসী কিন্তু বেঁচে!
রাজা রেগে বললেন, ‘খড়্গতে ধার দিয়ে আনতে পারোনি, অপদার্থ!”
খড়্গে শান পরীক্ষা করতে জল্লাদ একটা ঘাস নিয়ে আলতো করে খড়্গে লাগাল। ঘাসটা দু-টুকরো হয়ে মাটিতে পড়ল। রাজা বললেন, ‘হয়েছে। এবারে ওর মাথাটা কাটো।’
জল্লাদ আর একবার শান দিয়ে, আবার সজোরে আঘাত করল।
ফল হল একই। রূপসীর চিৎকার শোনা গেল। আর কিছুই হলো না।
রাজা রেগে বললেন, ‘অপদার্থ, দূর হয়ে যাও,’ বলে সেনাধ্যক্ষকে বললেন, ‘আপনার সৈন্যকে বলুন তরোয়াল দিয়ে মাথা কেটে নিতে।’ সেনাধ্যক্ষ বেছে নিয়ে একজনকে বললেন, ‘যা।’ সে এল তরোয়াল খুলে।
তারও একই দশা হলো।
এবারে এক সাংঘাতিক অবস্থার সৃষ্টি হলো। রাজার সৈন্যরা একে একে এসে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে – কেউ আর রূপসীর মাথা কাটতে পারে না। সেনাধ্যক্ষ নিজে এসে বিফল হয়ে ফিরে গেলেন। এমনকি রাজা নিজের তরোয়াল দিয়েও রূপসীর মাথা কাটা গেল না।
সারা দিন ধরে, রাজার অস্ত্রাগারের নানা তরোয়াল, খড়্গ, ছুরি, মায় বল্লম দিয়ে মেরে, খুঁচিয়ে – কেউ রূপসীর চামড়ায় একটা দাগ পর্যন্ত ফেলতে পারল না। ব্যথায় কাঁদতে কাঁদতে রূপসী অজ্ঞান হয়ে গেল। তখন সবাই থেমে ভাবতে লাগল কী করা যায়।
সূর্য তখন প্রায় ডোবে ডোবে, এমন সময় রূপসীর জ্ঞান ফিরল। যন্ত্রণায় কাতরাতে কাতরাতে বলল, ‘তোমরা এখনও বুঝতে পারলে না যে আমি নির্দোষ? সেই জন্যই তোমরা আমাকে মারতে পারলে না। কিন্তু তা-ও যদি আমাকে মারতেই হবে, তবে শোনো, আমাকে আর এভাবে কষ্ট দিও না। আমার বাবার কোমরের ছুরিটা নিয়ে এসো। ওটা দিয়েই আমাকে মারতে পারবে।’
ব্যথায়, যন্ত্রণায়, রূপসীর গলা এতই মৃদু, যে প্রায় কেউই ওর কথা শুনতে পায়নি। কিন্তু রানি শুনেছেন। পাছে রাজার কানে যায়, আর উনি রূপসীকে রেহাই দিয়ে দেন, সেই ভয়ে তিনি এক ছুটে ভীড়ের মধ্যে গিয়ে রূপসীর বাবার কোমরবন্ধে গোঁজা চাকুটা ছিনিয়ে নিয়ে এসে রূপসীর বুকে গেঁথে দিলেন।
রূপসী ওখানেই লুটিয়ে পড়ল।
সবাই স্তম্ভিত হয়ে দেখল রূপসীর বুক থেকে ফিনকি দিয়ে দুধের মতো সাদা রক্ত বেরিয়ে মাটি ভিজিয়ে দিচ্ছে।
আর, তখন – সারা আকাশ কালো হয়ে এল। সমুদ্র উত্তাল হয়ে উঠল। আকাশচেরা বিদ্যুতের ঝলকের সঙ্গে সবাই শুনল রূপসীর গলা। রূপসী বলল, ‘বেঁচে ছিলাম যখন, তোমরা বোঝোনি। এখন আমার মৃত্যুর পরে আমার রক্ত দেখে কি বুঝলে, যে আমার কোনও দোষ নেই – রানি মিথ্যা বলে আমাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে? নির্দোষের মৃত্যুর দায় রইল তোমাদের সকলের ওপর। আজ থেকে পশ্চিমের দ্বীপের দুর্বিসহ দুর্দশার শুরু। সাত পুরুষ ধরে চলবে এই দুর্দশা। জমি হয়ে যাবে অনুর্বর। জল থেকে আর পাবে না মাছ। তোমরা বেঁচে থাকবে কেবল অন্যের দয়ার ওপর নির্ভর করে।’”
মাস্টারমশাই থেমে, চশমা খুলে, চোখ মুছে জল খেলেন। বললেন, “সেই থেকেই পশ্চিমের দ্বীপের দুর্দশার শুরু। পরদিন সন্ধ্যায় ভাই-রাজার জাহাজ ফিরে এল – ভয়াবহ খবর নিয়ে। আগের দিন সন্ধেবেলা, যুদ্ধে জয় যখন প্রায় সুনিশ্চিত, ভাই-রাজা জাহাজের উঁচু জায়গায় উঠে দূরবীণ দিয়ে দেখছেন শত্রুরাজ্য আর কত দূরে, এমন সময়, কথা নেই, বার্তা নেই, একটা উড়ো গুলি এসে ওঁর বুকের ছাতি এফোঁড় ওফোঁড় করে দিয়ে বেরিয়ে গেছে। ভাই-রাজা আর নেই।
সেনাপতি-রাজা বুঝলেন, যে সময়ে ওঁরা এখানে রূপসীর প্রাণ নিচ্ছিলেন, সে সময়েই ভাই-রাজা মারা গিয়েছেন।
ভাই-রাজার হঠাৎ মৃত্যুতে হতভম্ব নৌ-বাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে, আর সেই সুযোগে শত্রু নৌসেনা ওদের সব জাহাজই প্রায় ডুবিয়ে দিয়েছে। ভাই-রাজার জাহাজ কোনও রকমে পালিয়ে খবর নিয়ে এসেছে যে শত্রু আর বেশি দূরে নেই।
তক্ষুনি দূত পাঠিয়ে দিয়েছিলেন সেনাপতি-রাজা। মহারাজের কাছে সব খবর জানিয়ে, পশ্চিমের দ্বীপ রক্ষা করার জন্য আরও সৈন্য পাঠান’র আর্জি নিয়ে। সেই সঙ্গে বলেছিলেন, ‘কাল সকালেই সব নাগরিক দ্বীপ ছেড়ে রাজধানীর দিকে পালাবে।’
দূত মধ্যরাতে পৌঁছেছিল রাজধানীতে। কিন্তু দ্বীপবাসীরা আর পরদিন ভোর দেখতে পায়নি। রাত থাকতেই শত্রুদের নৌবহর পৌঁছে গেছিল পশ্চিমের দ্বীপে। বেশিরভাগ দ্বীপবাসীকে তারা সকাল হবার আগেই কুপিয়ে কেটে সবার বাড়ি আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে দিল। সেনাপতি-রাজা, রানি, রাজবাড়ির অন্যান্য সবাইকে উঠোনে টেনে এনে মারল। কামান দেগে ধ্বংস করে দিল রাজপ্রাসাদ, আর অন্যান্য সব বড়ো বাড়ি। শত্রুরা অবশ্য আর এগোতে পারেনি। মহারাজার সৈন্যদল এসে পড়ল, ওরাও পালাল দ্বীপ ছেড়ে নিজেদের দেশে। কিন্তু তখন আর পশ্চিমের দ্বীপে সাকুল্যে কয়েক হাজার নারী-পুরুষ বেঁচে রয়েছে। রাস্তা-ঘাট, নদী-নালা, জমি-ক্ষেত – সব মানুষের রক্তে মাখামাখি। রাজার সৈন্যদলের সঙ্গে যারা বেঁচে ছিল, তাদের অনেকেই চলে গেল। ফেলে গেল মৃতদেহ, পচা গন্ধ আর মহামারি। বছর ঘুরতে না ঘুরতে কয়েকশোর বেশি মানুষ রইল না পশ্চিমের দ্বীপে।”
এবার বৃদ্ধ খুব তাড়াতাড়ি বলতে শুরু করলেন। “এই হলো ঘটনা। তার পর থেকে আমাদের ক্ষেতে আর ফসল ফলে না। জলে মাছ পাওয়া যায় না। ব্যবসায়ীরা ব্যবসা করতে গিয়ে সফল হয় না। ভীষণ ভালো ছাত্ররা কোনও কারণ ছাড়াই পরীক্ষায় ফেল করে। শেষ পর্যন্ত প্রায় সবাই চলে গেল। পড়ে রইলাম শুধু আমরা – একদল, যারা ভাবি পশ্চিমের দ্বীপের উন্নতি করব, আর একদল, যারা কোনও কাজ করতে চায় না। বসে খেতে চায় – তারা। আপনার ঠাকুর্দার বাবা দ্বীপের জন্য মাসোহারার বরাদ্দ করেছেন – র‍্যাশনের মতো সেই মাসোহারায় বসে বসে আমরা খাই।”

শাপমোচন

তিন সপ্তাহ পরে, এক সন্ধেবেলা বন্ধু এসে বললেন, “আসতে পারি?”
খবরের কাগজ নামিয়ে কুমার হেসে বললেন, “শেষ পর্যন্ত আমার কথা মনে পড়ল? এত দিন ধরে বইয়ের গাদায় কী খোঁজা হচ্ছিল, শুনি?”
বন্ধু বললেন, “রাজধানী থেকে হাজার বই আনিয়ে সেগুলো শুধুই ডাঁই করে ফেলে রেখেছ গ্রন্থাগারে। দশ দিন ধরে গোছালাম। তার পরে রূপসী, সেনাপতি-রাজা, ভাই-রাজা; আর দুই রানি – সেনাপতি-রাজার রানি, আর বৌদি-রানি – সম্বন্ধে পড়াশোনা করলাম। এরা সত্যিই কোনও দিন ছিল, না সবই গল্প? জানতে হবে না? ফাঁকে ফাঁকে গেলাম দ্বীপের লোকের সঙ্গে কথা বলে জানতে – কে কে এই অভিশাপের কথা বিশ্বাস করে।”
কী বুঝলে?”
সেনাপতি-রাজা, রানি, ভাই-রাজা আর রূপসী সত্যিই ছিল। হয়ত সত্যিই রূপসীকে রানি হিংসা করত। আর সত্যিই তাকে একটা অপবাদ দিয়ে মেরে ফেলেছিল।”
যুবরাজ খুব জোরে হাসলেন। বললেন, “আর সত্যিই তরোয়াল, ছুরি, বল্লম – এসব দিয়ে রূপসীর কোনও ক্ষতি করা সম্ভব হয়নি, আর সত্যিই শেষে তার বাবার ছুরিতেই তার মৃত্যু হলো, আর সত্যিই তার পরে আকাশ থেকে অভিশাপ শোনা গেল?”
মাথা নেড়ে বন্ধু বললেন, “এগুলো হয়নি। কিন্তু সত্যিই আমাদের দেশ শত্রু দেশকে আক্রমণ করেছিল সেই যুদ্ধেই ভাই-রাজা মারা যান, আর শত্রুরা পশ্চিমের দ্বীপ ধ্বংস করে। ইতিহাস বইয়ে লেখা আছে।”
রূপসীর মৃত্যুর কথা ইতিহাসে লেখা নেই?”
বন্ধু বললেন, “রূপসীর কোনও কথাই নেই। পশ্চিমের দ্বীপের ধ্বংসের প্রায় পঞ্চাশ বছর পরে দেশের রাজা হুকুম দিয়েছিলেন কোনোও পুঁথিতে রূপসী বা বৌদি-রানির কথা থাকবে না। ভয় পেয়েছিলেন, পাছে সে কথা ধরে সারা দেশে অভিশাপ ছড়িয়ে পড়ে। সেই সময়ে সব পুঁথি, সব বই থেকে রূপসীর নাম মুছে দিয়ে সব নতুন করে লেখা হয়।”
কুমার অবাক হয়ে বললেন, “এ কথা তুমি জানলে কী করে?”
বন্ধু বললেন, “রূপসীর কথা কোনও বইয়ে লেখা নেই, কিন্তু রাজার এই আদেশটা আছে যে!”
দুজনে খানিকক্ষণ চুপ করে বসে রইলেন।
খানিক পরে রাজপুত্র বললেন, “আমার কী মনে হয় জান? শত্রুরা প্রায় গোটা দ্বীপটাকে উজাড় করে, হাজার হাজার লোককে মেরে, তাদের খাবারদাবার লুট করে, শহর ধ্বংস করে চলে যাবার পরে, নিশ্চয়ই আরও অসুখ - হয়ত মহামারীও হয়েছিল। সে সব অসুখে যখন আরও লোক মারা গেল, তখনই রূপসীকে নিয়ে এই কাহিনিগুলো তৈরি হয়েছিল।”
ঠিক বলেছ,” বললেন বন্ধু। “কিন্তু এই কাহিনিগুলো এখন সবাই বিশ্বাস করে। হয়ত পরে কোনও চাষি চাষ করেছে – কোনও কারণে তার ফসল নষ্ট হয়েছে, কোনও জেলে মাছ ধরতে গিয়ে নৌকাডুবি হয়ে মারা গিয়েছে – ব্যাস, লোকে ধরেই নিয়েছে এই দেশে আর কিচ্ছু হবে না, ক্রমে হাল ছেড়ে দিয়ে বসে আছে। আমি গত ক’দিনে যত লোকের সঙ্গে কথা বলেছি, সবাই মনে করে, এই অভিশাপ সত্যি, সাত পুরুষে এর থেকে মুক্তি নেই।”
এই বদনামটা ঘোচাতে হবে,” বললেন কুমার। “আমরা ঘোচাব।”

⧪⧪
দিন কয়েক পরে, সকালের খাবার খেতে খেতে বন্ধু জিজ্ঞেস করলেন, “কুমার, রূপসী যখন মারা গিয়েছিল, তখন আমাদের দেশের রাজা কে ছিল জান?”
রাধাবল্লভী ছিঁড়ে আলুর দমের টুকরোর চারপাশে মুড়িয়ে নিয়ে মুখে দেবার আগে রাজপুত্র থামলেন। বললেন, “ওই মাস্টারমশাই বলেছিলেন আমাদের বংশের প্রথম রাজা, তাই না?”
ঠিক তাই,” বললেন বন্ধু। “ইতিহাস বইতেও সেনাপতি-রাজার সময়কার রাজার কথা লেখা আছে। তোমাদের বংশের প্রথম রাজা। আর তোমার বাবা সেই বংশের কত নম্বর রাজা?”
রাজপুত্র অবাক হয়ে বললেন, “তা তো জানি না, কিন্তু বইয়ের ঘরে একটা বই আছে। আমাদের বংশপঞ্জী লেখা। সেটা আনাতে বলি?”
বলতে হবে না। তোমার পেছনের টেবিলে রাখা আছে। উঠে গিয়ে দেখে নাও।”
বন্ধুর বলার ভঙ্গীতে কিছু একটা ছিল, যার জন্য রাজকুমার খাওয়া থামিয়ে তখনই উঠে গিয়ে বইটার খোলা পাতা দেখতে শুরু করলেন। “এই যে, এই প্রথম রাজা। উনি এক, তার পর – দুই, তিন, চার... আমার বাবা তাহলে সাত নম্বর রাজা – তাই না? তুমি গুনেছ? সাত নম্বরই তো?” কুমার আবার ফিরে এসে খেতে বসলেন।
বন্ধু প্রথমে উত্তর দিলেন না। সামনের মাছভাজার থালা থেকে ভালো দেখে একটা মাছ তুলে নিয়ে বললেন, “এই মাছগুলো সমুদ্রের হলে কী হবে, ভাজলে ভালোই লাগে খেতে।” তারপরে রাজপুত্রের মুখ থেকে বললেন, “হ্যাঁ। আমিও তাই গুনেছি বটে।”
তো?” জানতে চাইলেন রাজপুত্র। গুনে কী পেলে?”
গুনে বুঝলাম যে তুমি তোমার বংশের আট নম্বর বংশধর।”
আমার বাবা যদি সাত নম্বর হন, তাহলে আমি তো আট নম্বর বটেই।”
আর তুমি এখন পশ্চিমের দ্বীপের রাজা।”
সেনাপতি রাজার মতো? বেশ বলেছ। তাতেই বা কী হলো?”
রূপসীর অভিশাপ তো সাত পুরুষের। তুমি তো অষ্টম পুরুষ।”
কুমার হতবাক হয়ে গেলেন। শেষে বললেন, “তার মানে...”
কুমারকে থামিয়ে দিয়ে বন্ধু বললেন, “স্‌-স্‌-স্‌, এখন না। খেয়ে নাও। তার পরে, মন্ত্রণাকক্ষে...”
আমার আর খিদে নেই,” বলে হাত ধুয়ে কুমার টানতে টানতে বন্ধুকে নিয়ে গেলেন মন্ত্রণাকক্ষে। বন্ধু কত বার বললেন, “আরে, আমার তো এখনও খিদে আছে। আমি আর একটা রাধাবল্লভী খাব মাছ ভাজা দিয়ে...” শুনলেনই না। সারা দিন দু’জনে কী জল্পনা করলেন, রাতে খেতে বসে কুমার বন্ধুকে বললেন, “তোমার বুদ্ধির জয় হোক। ভাগ্যিস তুমি মহারাজের হাত থেকে পালিয়ে পশ্চিমের দ্বীপে এসেছিলে!”

⧪⧪
কয়েক দিন পরে রাজপুত্র আর বন্ধু ঘোড়ায় করে বেরোলেন বন্ধুর বুদ্ধি অনুযায়ী কতটা কাজ এগিয়েছে তা দেখতে। দেখলেন, সারা দ্বীপে জায়গায় জায়গায়, যেখানেই পাহাড়ের গায়ে পাথর দেখা যাচ্ছে, সেখানেই বড়ো বড়ো অক্ষরে নানা রঙের লেখা। কোথাও লেখা, ‘এই দ্বীপ রূপসী রানির দ্বীপ’, কোথাও লেখা, ‘পশ্চিমের দ্বীপ রূপসী রানির’, বা ‘এখানেই থাকেন রূপসী রানি’ – এই সব।
পরদিন বিকেলে যুবরাজের আদেশে পশ্চিম দ্বীপের সব বাসিন্দা প্রাসাদের বাইরে জড়ো হলো। কুমার তাদের বললেন, “আমাদের প্রিয় দ্বীপ আজ আর অভিশপ্ত নয়। সাত পুরুষ আগে, যে রাজার রাজত্বে রূপসী রানিকে অন্যায়ভাবে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল, আজ আমাদের রাজা সেই বংশের সপ্তম রাজা। আমি সেই রাজার বংশের অষ্টম পুরুষ। পণ্ডিতরা বলেছেন, বসন্ত উৎসবের দিনে রূপসী রানির মৃত্যু হয়েছিল। আজ থেকে সাত মাস পরে, ফাল্গুন মাসের পূর্ণিমার রাতে রানির অভিশাপ শেষ হয়ে যাবে। সেই দিনই অভিশাপের শেষ দিন। এখন থেকে ওই দিনে আমাদের দ্বীপের সবার ছুটি। এই আগামী ফাল্গুনী পূর্ণীমার পরদিন থেকে আবার আমরা সাত পুরুষ পরে চাষের কাজ শুরু করব। সে দিন আমাদের নিজেদের নৌকো আবার যাবে সমুদ্রে, মাছ ধরে আনতে। সে দিন থেকে রূপসী রানির অভিশাপ নয়, আশীর্বাদ ঝরে পড়বে আমাদের ওপর।”
যুবরাজের কথা শেষ হওয়া মাত্র শ’য়ে শ’য়ে লাল, নীল, গোলাপী, হলদে, সবুজ বেলুন উড়িয়ে দেওয়া হলো আকাশে, মুঠো-মুঠো আবির ছড়ান’ হলো পথে ঘাটে, হাটে মাঠে, বনে জঙ্গলে, সাগরতীরে। আনন্দের স্রোত বয়ে গেল দ্বীপের সব মানুষের মধ্যে। যুবরাজের অনুরোধে, রাজার আদেশে, নৌকা এল দেশের অন্য প্রান্ত থেকে, সমুদ্রে মাছ ধরার জন্য। হাল বানান’ হলো রাজার ছুতোর ডেকে, চাষের কাজে লাগবে।

⧪⧪
দিন কাটে। রূপসী দ্বীপে এখন চাষ হয়। নৌকা-ভরে মাছ নিয়ে ফেরে জেলেরা। কিন্তু তবু কুমার মনে করেন, এ যথেষ্ট নয়। ভাবেন, কী করলে পশ্চীমের দ্বীপ আবার আগের মতো হয়ে উঠবে?
কিছুদিন পরে বন্ধুকে বললেন, “আরও কিছু করতে হবে। লোকে এখনও রূপসীকে ভয় পায়। যদি কোনও দিন ঝড় হয়ে একটা নৌকাডুবি হয়, কখনও যদি একজনেরও ফসল কোনও কারণে নষ্ট হয়, সবাই ভাববে রূপসীর অভিশাপ শেষ হয়নি। সেই ভয়টাকে দূর করতে হবে।”
বন্ধু বললেন, “রূপসীই দ্বীপের রানি। রূপসীই দ্বীপকে বাঁচাবে – এই কথাটা সবাইকে বিশ্বাস করাতে হবে।”
রাজপুত্র বললেন, “রূপসীকে আমরা যদি পশ্চিমের দ্বীপের রানি বলে মানুষের মনে প্রতিষ্ঠা করাতে চাই, তাহলে জঙ্গলের ভিতরের ধ্বংসস্তুপ থেকে ওর বাড়িটা উদ্ধার করে সেটাকে জাদুঘর বানাই চলো। যাতে লোকে সেখানে পশ্চিম দ্বীপের ইতিহাস জানতে পারে।”
দারুণ বুদ্ধি!” বললেন বন্ধু। “শুধু রূপসীর বাড়ি নয়, গোটা শহরটাকেই আমরা জঙ্গলের হাত থেকে উদ্ধার করব। সুন্দর করে সাজাব। লোকে সেখানে আমাদের অতীত ইতিহাস দেখতে পাবে। ঐতিহাসিকরা সেখানে ইতিহাসের কথা লিখে রাখবেন, আর যেহেতু রূপসী রানির গল্পটা কোনও বইয়ে লেখা নেই, তাই সেটাকে আমরা লোককথা বলব। ফাল্গুনী পূর্ণিমার দিন হবে রূপসী রানির দিন। সে দিনটা রূপসীর নামে উদযাপন করব। সবাই দেখতে আসবে।”
শুধু দ্বীপের লোক নয়। দেশের অন্য জায়গার লোকও এসে যাতে দেখতে পারে তার ব্যবস্থা করতে হবে। পান্থশালা তৈরি হবে। লোকের আনাগোনা বাড়বে...” যুবরাজ হঠাৎ কথা থামিয়ে বন্ধুর দিকে চেয়ে রইলেন। বন্ধু অবাক হয়ে বললেন, “কুমার, কী হল?”
যুবরাজ উত্তর দিলেন না। বন্ধু উদ্বিগ্ন হয়ে আবার কিছু বলতে যাবেন, হাত তুলে কুমার বললেন, “এক মিনিট। একটা দারুণ বুদ্ধি এসেছে। বলি কী করব...
শোনো, পশ্চিমের দ্বীপ এক অপরূপ সুন্দর দ্বীপ। এই সৌন্দর্য দেখতেই লোকে ভীড় করে আসবে। এবং শুধু দেশের লোক নয়, বিদেশীরাও আসবে।”
বন্ধু বললেন, “বেশ কথা, কিন্তু বিদেশীদের থাকা খাওয়ার মতো ব্যবস্থাও থাকতে হবে।”
হাত তুলে রাজপুত্র বললেন, “যদি বিদেশীদের পশ্চিমের দ্বীপের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কথা বলে টেনে আনতে হয়, তাহলে শুধু ভালো খাবার আর থাকার জায়গা হলে চলবে না। ভালো ভালো বাজার তৈরি করব আমরা। বিদেশীরা কেনাকাটা করতে পারবে। এখানকার লোকেদের রোজগারের আর একটা উপায় হবে। শুধু চাষ আর মাছ-ধরার ওপর নির্ভর না করলেও চলবে।”
বন্ধু বললেন, “এটা খুব ভালো বুদ্ধি।”
কুমার বললেন, “আরও আছে। ভালো করে ভাবতে হবে। এখানে আর কীই বা তৈরি হয়? কারিগরই বা কোথায়? কিন্তু, ভাবো... মনে করো, যদি রূপসী রানির দ্বীপে পৃথিবীর সব জায়গার সেরা সেরা জিনিসের দোকান দেওয়া যায়?”
অবাক হয়ে বন্ধু বললেন, “তাতে কী হবে?”
ভাবো। সারা পৃথিবীর সব দেশে খবর দেব। তাদের বলব, রূপসী রানির দ্বীপের মানুষকে তোমরা তোমাদের ভালো ভালো জিনিস পাঠাও। দ্বীপের মানুষ বিক্রি করবে।”
বন্ধু বুঝতে পারলেন না। বললেন, “তা কী করে হবে? তাতে লাভই বা কী হবে?”
কুমার বললেন, “বুঝিয়ে দিচ্ছি। পশ্চিমের দ্বীপকে সমৃদ্ধ করতে গেলে এত কম লোক দিয়ে হবে না কিন্তু। আরও মানুষ চাই। চাষ-বাস শুরু হয়েছে বলে হয়ত আস্তে আস্তে আরও কিছু মানুষ আসবে। কিন্তু তারাই বা কী করে রোজগার করবে? সবাই তো চাষবাস বা মাছ ধরতে জানে না। আগে যুদ্ধ হত অনেক বেশি। তাই সে সব কারখানা, তার জন্য মানুষজন লাগত। কিন্তু এখন? রোজগার করতে গেলে আজকের যুগের কারখানা তৈরি করতে হবে। জঙ্গল কেটে আসবাব বানাতে হবে। চূণাপাথরের পাহাড় ভেঙে সিমেন্ট তৈরি হবে। তাই কি চাও?”
চমকে উঠে বন্ধু বললেন, “দ্বীপের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নষ্ট হয়ে যাবে যে!”
সেই জন্যই দ্বীপে আমরা কোনও কারখানা তৈরি হতে দেব না। এখানকার বিশেষত্ব হলো প্রাকৃতিক সৌন্দর্য – সেটাই থাকবে।”
বন্ধু আস্তে আস্তে বললেন, “বুঝেছি, তুমি চাইছ এখানে কোনও কারখানা থাকবে না, কিন্তু বিদেশীদের জন্য গোটা দ্বীপটাই পৃথিবীময় জিনিসের একটা বাজার হবে। কিন্তু সারা পৃথিবীর লোক এখানে দোকান দেবে কেন? আর লোকে সেগুলো কিনতে এখানে আসবেই বা কেন?”
গোটা দ্বীপ না,” বললেন রাজকুমার। “শুধু এই শহরটাই। এখানেই সব দোকান বাজার পান্থশালা হবে। বাকিটা শুধু সুন্দর পাহাড়, জঙ্গল আর সমুদ্রতীর থাকবে। আর এ শহরের দোকান থেকে আমার বিশ্বাস লোকে কিনবে, কারণ এখানে যা-ই বিক্রি হবে, তার জন্য কোনও কর দিতে হবে না। রাজা কোনও টাকাই নেবে না তা থেকে। দ্বীপের দোকানদারদেরও কর দিতে হবে না। সুতরাং খদ্দের যেমন সস্তায় জিনিস কিনবে, দ্বীপবাসীরাও লাভ করবে অনেক বেশি।”
মহারাজ অনুমতি দেবেন?”
হা-হা করে হেসে যুবরাজ বললেন, “মহারাজ আমাকে নির্বাসন দেবার সময় বলেছিলেন, ‘যাও, ওখানে গিয়ে সবার কর মকুব করো।’ আমি তো তা-ই করছি। কিন্তু ভাবো, বাইরের লোকের আনাগোনা বাড়লে সরাইখানা, পান্থশালা – এসব থেকেও রাজার জন্য রাজস্ব যাবে। রাজস্ব যাবে চাষের রোজগার থেকে, মাছধরার রোজগার থেকে।
বন্ধু, তোমার ওপর দায়িত্ব রইল, সারা পৃথিবীর সব বড়ো বড়ো কারখানা, সব বড়ো দোকান, সব বড়ো ব্যবসায়ীকে চিঠি লেখো। পশ্চিমের দ্বীপকে আমরা স্বর্গরাজ্য করে তুলব।”

⧪⧪
পাঁচ বছর পরে, শীতের আরম্ভে একদিন সকালবেলা যুবরাজের কাছে হন্তদন্ত হয়ে এলেন বন্ধু। যুবরাজ বললেন, “এসো, বসো। কিছু খাও। ক’দিন ধরে তো খেটেই মরছ।”
বন্ধু বললেন, “প্রত্যেক ফাল্গুনি পূর্ণিমার রাত রূপসী রানির নামে উদযাপন করাটা এত লোকপ্রিয় হবে জানলে কে তোমাকে বুদ্ধিটা দিত? এখনই সব পান্থশালার সব ঘর ভাড়া হয়ে গেছে। সারা দুনিয়া থেকে লোকে নাম লিখিয়ে রেখেছে। সাতটা আরও নতুন পান্থশালা খোলার অনুমতি চেয়ে চিঠি এসেছে – তার মধ্যে তিনটে বিদেশী পান্থশালা। এদের উত্তর দিতে হবে। আমার আজও নাওয়া-খাওয়া হবে না।”
কে বলেছিল নৌকো চুরি করে নির্বাসিত বন্ধুর খোঁজে আসতে?” হেসে বললেন রাজকুমার।
যা বলেছ। তখনই যদি মহারাজকে গিয়ে বলতাম, ‘আমার কোনও দোষ নেই, মহারাজ,’ উনি হয়ত মাপ করে দিতেন।”
বেশ তো!” বলে বন্ধুর হাতে একটা চিঠি দিলেন কুমার। বললেন, “সুযোগ আসছে আবার। বলে দেখো, ‘মহারাজ, আমাকে মাপ করে দিন, রাজধানীতে একটা কম খাটনির চাকরি দিন।’”
এটা কী?” চিঠি হাতে নিয়ে বন্ধু চোখ কপালে তুললেন। “এ কী! মহারাজ নিজে আসছেন ফাল্গুনী পূর্ণিমার উৎসবে?”
মাথা নাড়লেন কুমার। “তুমি কী করবে?”
বন্ধু বললেন, “পালাব। আবার একটা ডিঙি নৌকো নিয়ে ভেসে পড়ব।”
কুমার বললেন, “তার দরকার নেই। আমি খোঁজ করে নিয়েছি। দ্বীপের উত্তরের পাহাড়ের ঘন জঙ্গলের মধ্যে মস্তো মস্তো গুহা আছে। মহারাজ যতদিন থাকবেন, তুমি ওখানেই ছুটি কাটিও। পাহারা থাকবে, কোনও অসুবিধে হবে না। আরামে বিছানা পেতে ঘুমোবে। কোনও গ্রাম-টামে তোমাকে রাখতে চাই না। কোথায় গিয়ে বাবা হাজির হবেন, কে জানে! লিখেছেন তো – সারা দ্বীপ ঘুরে দেখতে চান।”
হেসে বন্ধু বললেন, “তোমার মতো বন্ধু থাকলে দুশ্চিন্তা থাকে না। এখন বলো, এই পান্থশালা যারা বানাতে চায়, তাদের কী লিখব? এত পান্থশালা বানালে কারখানা লাগবে না। এতেই প্রাকৃতিক ক্ষতি শুরু হয়ে যাবে।”

⧪⧪
ফাল্গুনী পূর্ণিমার উৎসবের পরে আরও তিন দিন কেটে গেছে। মহারাজ আর মহারানি এক সপ্তাহ ধরে দ্বীপের উৎসবে মেতে ছিলেন। শেষ হবার পর যুবরাজের রাজত্ব ঘুরে দেখেছেন। সকালবেলা প্রাসাদের অলিন্দে বসে চা খেতে খেতে মহারাজ বললেন, “কত দিন লাগবে তোমার এই দ্বীপের কাজ গুছিয়ে বেরোতে?”
রাজপুত্র চমকে বললেন, “বেরোতে? কোথায় বেরোব?”
রাজা চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বললেন, “রাজধানী যাবে। আবার কোথায়? রাজ্যভার নিতে হবে না? আমি আর কত দিন রাজত্ব করবে?”
অবাক হয়ে কুমার বললেন, “আমি রাজত্ব করব?”
তবে না তো কী? তোমাকে বলেছিলাম, পশ্চিমের দ্বীপকে সুজলা, সুফলা করে তুলতে পারলে তোমাকে রাজ্য দিয়ে তীর্থে যাব। সেই কথা রাখার সময় এসেছে। তবে তীর্থে আমি যাব না। তুমি যাবে রাজধানীতে, তোমার অভিষেক করে রানি আর আমি এখানে এসে থাকব। জীবনের শেষ দিনগুলো স্বর্গে কাটিয়ে যাব। পৃথিবীতে থাকতেই স্বর্গের সন্ধান তুমি আমাকে দিয়েছ, ছাড়ি কী করে?”
কুমার তাকিয়ে দেখলেন, মা মিটিমিটি হাসছেন। অর্থাৎ দুজনে এইসব ফন্দি করেই পশ্চিমের দ্বীপে এসেছিলেন।
কুমারকে চুপ করে থাকতে দেখে রাজা বললেন, “তোমার সেই অপোগণ্ড বন্ধুটি কোথায়? তাকে কোন জঙ্গলে লুকিয়ে রেখেছ?”
চমকে উঠলেন কুমার।
রাজা হেসে বললেন, “ও যে এখানে আছে, তা আমার গুপ্তচররা আমাকে প্রথম থেকেই জানিয়ে রেখেছিল। এখন একটা জঙ্গলের গুহার মধ্যে আছে, তাও আমি জানি। ডেকে আনো। ভয় নেই, আমি ওকে কোনও শাস্তিই দেব না।”
দূত গিয়ে কুমারের বন্ধুকে নিয়ে এল। ভয়ে ভয়ে রাজাকে প্রণাম করে দূরে দাঁড়াল বন্ধু। রাজা বললেন, “হতভাগা, সামনে এস। বড্ডো জ্বালিয়েছ আমাকে অনেক দিন, কিন্তু কোনও দিন তোমাকে দেখিইনি। একটু কাছে এসো। মুখটা দেখি।”
কাছ থেকে দেখে বললেন, “তোমার বাবা আর ঠাকুর্দা আমার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে বন্দী হয়েছিলেন তুমি জান?”
মাথা নিচু করে বন্ধু বললেন, “জানি, মহারাজ। কিন্তু ওঁদের কোনও দোষ ছিল না।”
মহারাজ ঝুঁকে পড়ে জিজ্ঞেস করলেন, “দোষ ছিল না তুমি জানলে কী করে? তুমি তখনও জন্মাওনি। তোমার মায়ের পেটে তখনও। তোমার বাবা-ঠাকুর্দা আমার সিপাইদের আক্রমণ করে খাজনা লুট করতে চেয়েছিল। রাত্রির অন্ধকারে এসেছিল। আমার সৈন্যরা ধরে ফেলে। জান সে কথা?”
হাত জোড় করে বন্ধু বলল, “মহারাজ, আমার বাবা আর ঠাকুর্দা আপনার খাজনা লুট করার জন্য যায়নি। সৈন্যরা আমাদের বাড়ি থেকে একটা সোনার সুতোর কাজ করা আসন নিয়ে নিয়েছিল – ওরা সেটাই উদ্ধার করতে গেছিল।”
তোমরা তো গরিব। খেতে পাও না, খাজনা দিতে পার না।” রাজার চোখ কুঁচকে ছোটো হয়ে গেল। “তোমার বাবা সোনার আসন কোথা থেকে পেলেন?”
আমি শুনেছি, ঠাকুর্দার পরিবারের আসন ছিল ওটা। নিয়ম ছিল বংশের বড়ো ছেলেকে সেই আসনটা দেওয়া হত।”
রাজা বললেন, “তাহলে তোমরা কোনও সময় বড়োলোক ছিলে – নইলে সে আসন এল কোথা থেকে?”
বন্ধু জানেন না, বহু যুগ আগে তাঁরা কী ছিলেন, তাই চুপ করে রইলেন।
রাজা জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি কি জান, তুমি কোন বংশের ছেলে?”
রাজা কী জানতে চাইছেন বুঝতে না পেরে বন্ধু কুমারের দিকে তাকালেন।
কাছে এসো।” রাজার আদেশে কাছে এগিয়ে এল বন্ধু। রাজা বললেন, “হাত দেখাও।”
একটু ইতস্তত করে কাছে এল বন্ধু। রাজা তার হাতটা ধরে কেউ কিছু বোঝার আগে কটিবন্ধে গোঁজা চাকু বের করে তার ধারাল ডগাটা গেঁথে দিলেন বন্ধুর আঙুলে।
সভার সব লোক অবাক হয়ে দেখল, বন্ধুর আঙুল থেকে দুধের মতো সাদা রক্ত বেরিয়ে টুপটুপ করে মাটিতে ঝরে পড়ছে।
রাজা কুমারকে বললেন, “স্বীকার করছি – ভেবেছিলাম, গুপ্তঘাতক পাঠিয়ে তোমার বন্ধুকে মেরেই ফেলব। কিন্তু মহামন্ত্রী আমাকে আটকালেন। এখন বুঝছি, ভালোই করেছিলেন।”
বন্ধুর দিকে তাকিয়ে বললেন, “তুমি সুন্দরীর বংশধর।”
সবাই হতবাক। রাজা বলে চললেন, “সুন্দরী উত্তরের রাজ্য থেকে এসেছিল সবাই জানে। এবং সম্ভবতঃ একমাত্র ওরই বংশের মানুষের রক্ত সাদা ছিল। সুতরাং তুমি সুন্দরীরই বংশের মানুষ।”
নিজের রক্তের দিকে খানিকক্ষণ চেয়ে থেকে বন্ধু বললেন, “আপনি জানতেন?”
মহারাজ মাথা নাড়লেন। “জানতাম না। আন্দাজ করেছিলাম। তোমার বাবাকে যখন সৈন্যরা আমার সামনে নিয়ে আসে, তখন দেখি মারামারির ফলে ওঁর শরীর থেকে সাদা রক্ত বেরোচ্ছে। আমি নিজে হাতে তোমার ঠাকুর্দার আঙুল ফুটিয়ে সাদা রক্ত দেখতে পাই।”
কুমার জানতে চাইলেন, “কিন্তু এ কথা কেউ জানে না কেন?”
মহারাজ বললেন, “সাদা রক্তের কথা আমরা সবাই জানতাম। সবাই মানতাম সুন্দরী আমাদের শত্রু। ওর জন্যই পশ্চিমের দ্বীপ অভিশপ্ত। তাই ভয় পেয়ে তোমার বাবা আর ঠাকুর্দাকে মারিনি, পাছে গোটা দেশেই অভিশাপ ছড়িয়ে পড়ে। কাউকে কিছু না বলে আমরা তাঁদের পশ্চিমের দ্বীপে নির্বাসন দিয়েছিলাম।”
দম বন্ধ করে বন্ধু বললেন, “তার মানে, আমার বাবা, আর দাদু এখানেই ছিলেন...”
চোখ দিয়ে ওর ঝরঝর করে জল পড়তে লাগল।
মহারাজ বললেন, “ছিলেন না। আছেন। তোমার বাবা আর ঠাকুর্দা এখানেই আছেন। অনেক দিন হলো আমি কাউকে কিছু না বলেই ওঁদের কারাগার থেকে মুক্তি দিয়েছি, কিন্তু দেশে ফিরতে দিইনি। ওঁরা ভালো আছেন। আজ সকালে গ্রাম থেকে তোমার মা এসেছেন। সবাই তোমার সঙ্গে দেখা করার জন্য অপেক্ষা করছেন। আমি চাইলে ওঁদেরও এখানে আনতে পারতাম, কিন্তু ভাবলাম, তুমি যেমন চাইবে, তেমনই হবে। সবার সামনে, খোলা দরবারে, আমাদের উপস্থিতিতে তুমি জীবনে প্রথম তোমার বাবা আর ঠাকুর্দার সঙ্গে দেখা করতে না-ই চাইতে পারো। আমার শান্ত্রী রয়েছে, তুমি চাইলে দেখা করে এসো। না হলে ওরাই তোমার মা-বাবাকে এখানে নিয়ে আসবে।”
হতবাক বন্ধু কুমারের দিকে ফিরল।
কুমার হেসে বললেন, “আমার অনুমতির অপেক্ষা করতে হবে না। স্বয়ং মহারাজ তোমাকে যেতে বলেছেন। যাও। আগে ওঁদের সঙ্গে দেখা করো, তারপরে ওঁদের এখানে নিয়ে এসো। আমি তোমার মহলে ওঁদেরও থাকার ব্যবস্থা করি। আর, হ্যাঁ, মহারাজের অনুমতি হলে আমরা আজ দুপুরের খাওয়া সকলে একসঙ্গেই খাব, তাই দেরি কোরো না।”

⧪⧪
আরও এক মাস কাটল। মহারাজ এবার রাজধানীতে ফেরার তোড়জোড় করছেন। সকালে তিনি কুমার আর বন্ধুকে সভায় ডেকে পাঠালেন।
বললেন, “কুমার, এ তোমার বন্ধু। আমি বলেছিলাম, রাজার বন্ধু হয় না – তোমার বন্ধু আমাকে ভুল প্রমাণ করে দিল। তুমি রাজা হলেও ও তোমার বন্ধু থাকবে। ওকে হেলা কোরো না। ওকে মন্ত্রীত্ব দিও। প্রথমে আমাদের মন্ত্রীদের কাছ থেকে ও কাজটা শিখে নিক, তারপরে আমার প্রধানমন্ত্রীকে ছুটি দিও। ও-ই হবে তোমার প্রধানমন্ত্রী। কি, তুমি রাজি তো?”
বন্ধু কোনও রকমে মাথা নেড়ে মহারাজকে প্রণাম করল।
মহারাজ বললেন, “বেশ। তবে চলো দুজনে – চৈত্রের পূর্ণিমায় কুমারের অভিষেক হবে। তোমাদের ওখানে বসিয়ে আমি আর রানি ফিরে আসব পশ্চিমের দ্বীপে। কী, রানি? সব হিসেব মিলল তো?”
রানি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “কই মিলল? ছেলেদের বিয়ে না দিয়েই চলে আসব নাকি?”
তাই তো!” কপাল চাপড়ালেন রাজা। “ওটা তো আমি ভুলেই গিয়েছিলাম। বেশ। ও-কাজটাও করতে হবে। কুমার আর তার বন্ধুর বিয়ে। কিন্তু সেটা পরে। এখন, রাজা হিসেবে পশ্চিমের দ্বীপের জন্য প্রথম যে কাজটা আমি করব, তা হলো এই, যে দ্বীপের নামটা বদলে দেব। এখন থেকে পশ্চিমের দ্বীপের নাম হবে রূপসী দ্বীপ।
মুন্সী, লিখে নাও...”

মালয়েশিয়ার লঙ্কাউই দ্বীপপুঞ্জের লোকগাথা ভিত্তিক গল্প

1 comment:

m sayef said...

SIR,
EK KOTHAI DARUN.

NIL ROKTO PORECHILAM, SADA ROKTO PROTHOM PORLAM