১
কাল
সবাই মিলে গড়ের জঙ্গলে গেছিলাম।
পঞ্চু,
তিতি,
ঘুঁটে
আর দীপ। আগেই বলে দিই,
ঘুঁটের
নাম ঘুঁটে না। দীপও দীপ নয়।
এটা একটা আশ্চর্য ব্যাপার।
একজনকে ওর বাবা-মা
নাম দিয়েছিল দীপাঞ্জন,
আর
অন্যজনের দিদা বলেছিল ওর নাম
হবে স্যমন্তক। কিন্তু স্যমন্তক
আগে যেখানে থাকত,
সেখানে
স্কুলে ওর নাম হয়ে গিয়েছিল
ঘুঁটে। একদিন নাকি টিফিনে
লুকোচুরি খেলার সময় স্যমন্তক
গিয়ে লুকিয়েছিল পাঁচিলের
ধারে একটা ছোটো ঘরের পেছনে।
কেউ খুঁজেই পায়নি ওকে। ও লুকিয়ে
লুকিয়ে সারা টিফিন সবাইকে
খেলতে দেখেছে,
যারা
চোর হয়েছে,
তারা
কেমন করে খুঁজেছে সব দেখেছে,
আর
শেষে যখন বেরিয়ে গর্ব করে বলতে
লেগেছে,
তখন
প্রতাপ,
যে
কি না সবচেয়ে বেশিক্ষণ চোর
হয়েছিল,
রেগে
বলেছে,
“ওই
ঘরটা তো ঘুঁটের ঘর। তুই ঘুঁটের
ঘরে লুকিয়েছিলি,
এ-বাবা!”
স্যমন্তক
যত বলে ঘরের মধ্যে তো লুকোয়নি,
পেছনে
লুকিয়েছিল – কে শোনে কার কথা!
সব
ছেলে মেয়েরা ওকে ঘুঁটে-ঘুঁটে-ঘুঁটে-ঘুঁটে
বলে খ্যাপাতে শুরু করল,
মাঝ
থেকে ওর নামটাই হয়ে গেল ঘুঁটে!
কেউ
ভেবে দেখল না,
একটা
স্কুলের ভেতরে ঘুঁটে রাখার
ঘর কী করে থাকতে পারে!
স্যমন্তক
আমাদের পাড়ায় এসে,
নতুন
স্কুলে ভর্তি হয়ে,
খুব
নিশ্চিন্ত হয়েছিল। এখানে তো
আর কেউ ওর ঘুঁটে নাম জানবে না!
ক্লাসে
প্রথম বন্ধুত্ব হয়েছিল আমার
সঙ্গেই। আমিই বলেছিলাম,
“তুই
ওই গোলাপি বাড়িতে এসেছিস নতুন?
পাড়ায়
খেলতে আসবি তো?
আসিস।
আমরা সবাই সন্ধেবেলা খেলি।
স্কুলের পরে।”
দু-তিন
দিন বেশ চলেছিল। দীপাঞ্জন
ছিল না তখন। মা-বাবার
সঙ্গে কোথায় গেছিল – সিঙ্গাপুর
না হংকং। তিন দিন পরে দীপাঞ্জন
খেলতে এল – তখন আমরা সবাই সবে
ঠিক করছি,
আজ
আমরা গুজানপোতা খেলব।
দুজনে
মুখোমুখি হতেই স্যমন্তকের
মুখ শুকিয়ে গেল। দীপাঞ্জন
বলল, “আরে,
তুই
সেই ঘুঁটে না?
প্রতাপের
ইস্কুলে পড়িস?”
আমতা
আমতা করে কী বলতে গেল স্যমন্তক,
কিন্তু
দীপাঞ্জন আঙুল তুলে স্যমন্তককে
দেখিয়ে বলল,
“আরে,
তোরা
জানিস,
ওকে
ওর স্কুলের ছেলেরা কী বলে
ডাকে? ওর
নাম ঘুঁটে। ও লুকোচুরির সময়
ঘুঁটের ঘরে লুকোতে ভালোবাসে।”
ঘুঁটের
ব্যাপারটা আমরা কেউ ব্যাপারটা
জানতাম না,
তবে
এতটুকু জানতাম,
যে
দীপাঞ্জনের এক পিসতুতো না
খুড়তুতো ভাই আছে,
আমাদেরই
বয়সী,
তার
নাম প্রতাপ – আর সে এক বদমাইশের
আখড়া। দীপাঞ্জনের বাড়িতে
প্রতাপ বেড়াতে এলে আমি সে কদিন
খেলতেই বেরোই না। নানারকম
বদখেয়াল চাপে প্রতাপের মনে
রোজই, আর
সে সব করতে হয় আমাদেরই – পরে
যখন পাড়ার লোকে জানতে পারে,
দোষ
হয় আমাদের। কেউ বিশ্বাসই করে
না প্রতাপ এসব দুষ্টুমির পেছনে
থাকে। বার বার বাবা-মা’র
মুখে শুনেছি – প্রতাপ এমন
করতেই পারে না। ও ভালো ছেলে।
মা-বাবারা
কোন ছেলে,
কোন
মেয়েকে কী কারণে ভালো বলে সে
জানি না,
তবে
প্রতাপ ভালো নয় সে আমরা সবাই
জানতাম।
বোধহয়
সেইজন্যই আমরা সবাই আনন্দে
ঘুঁটে-ঘুঁটে
বলে নেচে উঠিনি।
দীপাঞ্জন
প্রতাপের মতো দুষ্টু না হলেও,
স্যমন্তকের
নামটা ঘুঁটেতে বদলানোর জন্য
চেষ্টা করেছিল অনেক। আমরা
পাত্তা দিইনি। শেষে যেদিন
বলল, “আরে,
শোন
– ঘুঁটে মোটেই খারাপ নাম না।
দেখ, ঘুঁটে
কী ভালো জিনিস। ঘুঁটে দিয়ে
কতো ভালো কাজ হয়… গরিবের উপকার
হয়… ঘুঁটে গোবর দিয়ে তৈরি ও
– গোবর কতো ভালো...”
তখন
আমি বলেছিলাম,
“তাহলে
তোর নামও ঘুঁটে হতে পারে তো?”
তিতি
লাফিয়ে বলেছিল,
“এই
ভালো। ঘুঁটে বলে ডাকব তোকে।
আর,
স্যমন্তককে
ডাকব দীপ বলে। ঠিক ঠিক…”
দীপাঞ্জন
কী বলবে ভেবে পেল না। তিতিকে
ও বেশ পছন্দই করে। তাই তিতি
রেগে যাবে এমন কিছু বলে না ও।
একটু বোকা বোকা হেসে বলল,
“হ্যাঁ-অ্যাঁ-অ্যাঁ,
তাতে
আপত্তি কী?”
তিতি
স্যমন্তকের দিকে তাকিয়ে বলল,
“তোকে
দীপ বলে ডাকি?”
পরে
স্যমন্তক আমাকে বলেছিল,
যে
দীপ নামটা ওর মোটেই পছন্দ ছিল
না, কিন্তু
তখন ভেবেছিল,
ঘুঁটের
চেয়ে দীপ অনেক ভালো। তাই ঘাড়
হেলিয়ে বলেছিল,
“ডাকিস!”
এইজন্যই
দীপ হল ঘুঁটে আর ঘুঁটে হল দীপ।
বোঝা গেল?
দীপাঞ্জন…
ইয়ে,
ঘুঁটেই
আমাদের দলের নতুন কাজকর্মের
আইডিয়া দেয়। গুজানপোতা খেলাটাও
ওরই তৈরি। শুধু গুজানপোতা
নয়, মাসে
দু-মাসে
নতুন একটা খেলার কথা ও-ই
ভাবে। আমি চেষ্টা করি,
একটা
দুটো যে লেগেও যায় এমন নয়,
কিন্তু
বেশিদিনের জন্য না। আমি নিজেও
জানি আমার খেলার চেয়ে ঘুঁটের
খেলা অনেক বেশি ইন্টারেস্টিং।
তাই
ঘুঁটে যখন বলল,
“চ’,
আজ
গড়ের জঙ্গলে যাই...”
তখন
কেউ কিছু না ভেবেই বলল,
“চ’,
চ’...”
দীপ
নতুন, ও
কখনও গড়ের জঙ্গলে যায়নি। বলল,
“জঙ্গল
কোথায়?
এখানে
জঙ্গল আছে বলে তো জানতাম না?”
বললাম,
“জঙ্গল
না। পুরোনো গড়ের বাগান। ওটাকেই
আমরা জঙ্গল বলি।”
দীপ
উৎসাহিত হয়ে বলল,
“তোরা
পুরোনো গড়ে যাস?
আমি
যাইনি কোনও দিন। মা বলেছে,
ওখানে
না যেতে। ওটা বিপজ্জনক জায়গা।”
আমি
বললাম,
“আমরা
গড়ে যাই না। গড়ের চারপাশটা
তো জঙ্গল ছিল,
সেখানেই
যাই। একটা জায়গা ঘিরে দিয়েছে
এখন। পরে পার্ক হবে,
পিকনিক
স্পট হবে বলেছে বাবা। সেই
ঘেরার মধ্যেই থাকি আমরা।”
বড়োদের
ব্যাপার আমরা ঠিক বুঝি না।
শুনলাম,
গড়
সারানো হবে,
চারপাশের
বাগান সারিয়ে তোলা হবে,
তারপরে
শুনলাম,
না,
তাতে
অনেক খরচ,
শুধু
বাগান সারিয়ে সেখানে পিকনিকের
ব্যবস্থা হবে। যা রোজগার হবে,
তা
দিয়ে পরে গড় সারানো হবে।
হইহই
করে পাঁচিল উঠল,
আগাছা
সাফ হলো,
তারপরে
সব চুপচাপ। পরে বাবা বলল,
ওখানে
আর কিছু করতে গেলে যতো টাকা
লাগবে,
ততো
টাকা নাকি সরকারের নেই-ই।
বললাম,
“তাহলে
পাঁচিল তুলতে,
আগাছা
সাফ করতে,
এসবে
পয়সা খরচা করল কেন সরকার?”
বাবা
মুখ বেঁকিয়েছিল। কিছু বলেনি।
তবে পাঁচিলটা ওঠায় আমাদের
খেলার জায়গা একটা বেড়েছিল।
এখন অবশ্য রোদে জলে জায়গায়
জায়গায় পাঁচিলটা ভেঙে-টেঙে
গেছে,
তবে
আমরা জানি কোথায় থাকতে হবে,
কোথায়
গেলে বিপদ।
“আমাদের
সঙ্গে থাকবি,
দূরে
যাবি না। জঙ্গলে থাকলেই সমস্যা
নেই,”
বলে
ঘুঁটে এগোল। আমরা চললাম সঙ্গে।
আমরা মানে,
পঞ্চু,
তিতি,
ঘুঁটে
আর দীপ। ও,
হ্যাঁ,
আর
আমি।
গড়ের
জঙ্গলে আমরা অনেক কিছু খেলি
– বেশিরভাগই ঘুঁটের তৈরি খেলা,
তবে
কাল সন্ধেয় ঘুঁটে বলল,
আজ
আমরা উকু-মিও-পুষি
খেলব। সবাই বলল,
আচ্ছা।
আমিও। উকু-মিও-পুষি
তো আমার তৈরি খেলা,
তাই।
উকু-মিও-পুষি
একরকমের লুকোচুরি খেলা। একজন
চোর হয়,
বাকিরা
লুকিয়ে পড়ে। চোর একশো গুনে
বলে,
“এখা-আ-আ-আ-নে,”
তখন
যারা লুকিয়েছে,
তাদের
কেউ লুকোনো জায়গা থেকে বলে,
“মিও,”
ঠিক
বেড়ালের মতো। যে চোর সে আবার
একশো গুনতে গুনতে সেই দিকে
যায়, একশো
গোনা হলে আবার বলে,
“এখা-আ-আ-আ-নে,”
আবার,
অন্য
কোনও দিক থেকে কেউ বলে,
“মিও।”
এমনি করে খুঁজে বের করতে হয়
কোথায় কে লুকিয়ে আছে। বেড়ালের
মতো মিও ডাকা হয় বলে আমি খেলার
নাম দিয়েছিলাম মিও-পুষি।
বাকিরা বলল,
না,
উকু-মিও-পুষি।
উকু কেন?
উকু
আমার নাম,
তাই।
এটাও বন্ধুদের দেওয়া। আমার
মাথায় প্রায়ই উকুন হয় তো,
তাই।
ঘুঁটে
বলল,
“স্যমন্তক
আমার সঙ্গে থাক। ও নতুন,
তাই
দিক চেনে না।” সবাই দীপাঞ্জনকে
ঘুঁটে বলে আর স্যমন্তককে দীপ,
কিন্তু
ঘুঁটে স্যমন্তকই বলে। আমি
একবার ভাবলাম,
কেন?
ওর
সঙ্গে কেন?
তার
চেয়ে আমার সঙ্গেই থাক না।
কিন্তু বলতে সাহস পেলাম না।
আমি জানি তাহলেই তিতি বলবে,
আমার
সঙ্গে থাক। তাহলে দীপ যদি
তিতির সঙ্গে যায়,
আমি
খুব কষ্ট পাব। তার চেয়ে এ-ই
ভালো।
খেলা
জমল না। আমি,
তিতি
আর পঞ্চু খেললাম,
পঞ্চুর
ছোটো ভাইটা সঙ্গে এসেছিল,
ও
লুকোতে জানে না,
খালি
ছুটে বেরিয়ে পড়ে,
তাই
পঞ্চুকে পেছনে পেছনে দৌড়তে
হয় – মাঝে থেকে পঞ্চুই সবচেয়ে
বেশি ধরা পড়ল।
এর
মধ্যে দীপ আর ঘুঁটে কোথায় গেল?
সাড়াই
নেই। খানিকক্ষণ বাদে পঞ্চুর
ভাইটা,
“অ্যা
করব, অ্যা
করব,”
বলে
কান্না জুড়ল। পঞ্চু ওকে নিয়ে
দৌড়ল বাড়ি। আমি আর তিতি চারিদিকে
“দীপ,
দীপ;
ঘুঁটে,
ঘুঁটে;
দীপাঞ্জন,
স্যমন্তক...”
ডেকে
ডেকে ঘুরলাম,
শেষে
ও-ই
জঙ্গলের ওই পার থেকে বেরিয়ে
এল ঘুঁটে। বলল,
“স্যমন্তক
বাড়ি চলে গেছে।”
সেকি!
কখন?
বলে
গেল না?
এমন
তো কখনও হয়নি!
ঘুঁটে
বলল, “ভয়
পেল। বলল,
গড়ের
দিকে তাকালেই ভয় করছে।”
ভয় পেল?
আশ্চর্য!
দীপকে
দেখে ভীতু বলে মনেই হয়নি। তবে
চিনি তো সামান্য কিছুদিন।
ভয়ের কিছু ঘটেওনি এই ক-দিনে।
আমরাও
ফিরে গেলাম বাড়ি।
২
সন্ধে
গড়িয়ে রাত হচ্ছে। পড়াশোনা
শেষ হবার সময়। মা খাবার গরম
করছে,
এখনই
খেতে ডাকবে। রান্নাঘরে খুটখাট,
ঠুংঠাং
শুনছি,
আর
খিদে পাচ্ছে।
এমন
সময় বাইরের দরজায় কে ঘণ্টা
দিল। মা রান্নাঘর থেকে ডেকে
বলল,
“একটু
দেখবে,
আমার
হাত জোড়া...”
আমি
সবে উঠতে যাব,
বাবা
বলল,
“আমি
যাচ্ছি। এখন আবার কে...”
বাবা-ই
দরজা খুলল,
বাইরের
ঘরে কাদের কথাবার্তা শুনতে
পেলাম। আবার উঠতে যাচ্ছি,
বাবা
এসে বলল,
“একটু
আয় তো...”
একজন
অচেনা ভদ্রলোক আর ভদ্রমহিলা
দাঁড়িয়ে আছেন। আমাকে দেখে
বললেন,
“তোমার
নাম তিতি?”
আমি
বললাম,
“না,
আমি
তিতি নই...”
বাবা
বলল, “এঁরা
স্যমন্তকের মা-বাবা।
স্যমন্তক তোদের বন্ধু?”
আমি
বললাম,
“হ্যাঁ,
হ্যাঁ।
স্যমন্তক আমার ক্লাসে পড়ে।
পাড়ায়ও আমরা খেলি।”
ভদ্রলোক
বললেন,
“তোমরা
আজকেও খেলেছ একসঙ্গে?”
আমি
ঘাড় নেড়ে বললাম,
“হ্যাঁ।
আমরা খেলতে গেছিলাম একসঙ্গে,
তবে
স্যমন্তক আগে চলে গেছিল।”
ভদ্রমহিলা
ভুরু কুঁচকে বললেন,
“চলে
গেছিল?
কোথায়?
কেন?”
আমি
বললাম,
“ঘুঁ…
মানে ইয়ে,
দীপাঞ্জন
বলল,
ওর
নাকি ভয় করছিল।”
এর পর
পুরো গল্পটাই বলতে হল। বাবা
ভুরু কুঁচকে বলল,
“কিন্তু
স্যমন্তক তো বাড়িই ফেরেনি?
না
কি?”
ওর
মা-বাবা
উদ্বিগ্ন চোখে মাথা নাড়লেন।
বললেন স্যমন্তক সেই যে বিকেলে
খেলতে বেরিয়েছে,
আর
আসেইনি।
আমি
অবাক। ওঁরা বললেন,
“তিতির
বাড়ি কোথায়?
ওখানে
গিয়ে থাকতে পারে?”
মা
ততক্ষণে রান্নাঘর থেকে এসে
গিয়েছে। বলল,
“তিতি
তো আমাদের পেছনের বাড়িতেই
থাকে।”
আমি
বললাম,
“কিন্তু
তিতি,
দীপাঞ্জন
আর আমি তো একসঙ্গে বাড়ি ফিরেছি।
স্যমন্তক তো আমাদের সঙ্গে
ছিল না…”
ওর মা
বললেন,
“তাও
আমরা একবার সবার বাড়ি গিয়েই
দেখি – যদি পরে গিয়ে থাকে?”
ওর বাবা
বললেন,
“আর
ওই দীপাঞ্জন?
ও
কোথায় থাকে?”
বাবা
বলল, “ও
বাড়িটা এখান থেকে একটু দূরে।
আপনারা সহজে পাবেন না। চলুন,
আমি
নিয়ে যাচ্ছি।” বলে মা-কে
বলল,
“তোমরা
খেয়ে নাও,
আমি
এসে খাব।”
স্যমন্তকের
মা-বাবার
আপত্তি অগ্রাহ্য করে বাবা চট
করে শার্ট চাপিয়ে এল। বলল,
“আসুন,
আগে
তিতির বাড়ি যাব।”
মা দরজা
বন্ধ করে বলল,
“চলো,
খেয়ে
নিই।”
আমি
বললাম,
“বাবা
আসুক...”
মা
মাথা নাড়ল। বলল,
“খেয়ে
দেয়ে শুয়ে পড়ো। বাবা কখন ফিরবে
ঠিক নেই।”
আমি
বুঝলাম না। দীপাঞ্জনের বাড়ি
কতো আর দূর?
হেঁটে
যেতে দশ মিনিটও লাগবে না। মা
কিছু না বলে খাবার বেড়ে দিল।
আমি মায়ের মুখ দেখে বুঝলাম
এখন কিছু না বলাই ভালো। চুপচাপ
খেয়ে নিজের ঘরে চলে গেলাম।
শুতে ইচ্ছে করছিল না। কিছু
করতেই ইচ্ছে করছিল না। দু-একবার
বারান্দায় গেলাম। বাইরের
রাস্তা শুনশান,
আধো
অন্ধকার। বাগানের গাছগুলো
গেটের সামনে রাস্তার আলোটাকে
আড়াল করে রাখে,
দূরের
আলোটা ত্যারচা করে এসে পড়েছে
বাগানে আমার ঘরের সামনে। আধো
অন্ধকারে আমাদের বাগানটাও
গড়ের জঙ্গলের মতোই দেখায়।
কোথায় গেল ছেলেটা?
উৎসাহ
করে যখন আমাদের সঙ্গে গেল,
তখন
তো মনেই হয়নি ভয় পেয়েছে!
আর
ভয় পেলেও,
বাড়ি
না গিয়ে গেল কোথায়?
কখন
গেল? আমরা
বেশিক্ষণ খেলিনি। পঞ্চুর ভাই
বলল বাড়ি যাবে… স্যমন্তকের
মা-বাবাকে
পঞ্চুর কথা বলা হয়নি। কিন্তু
তাতে লাভ হতো না,
স্যমন্তক
পঞ্চুর বাড়ি চেনেই না।
বাগানের
গেট খুলে বাবা ঢুকল। আমি বাড়ির
ভেতর দিয়ে বসার ঘরে যেতে যেতেই
বাবা চাবি দিয়ে দরজা খুলে
ভেতরে এল। বসার ঘরের এক দিকের
দরজায় বাবা,
অন্য
দিকের দরজায় মা,
আর
আমি।
বাবা
মাথা নাড়ল। “ওদের বাড়ি যায়নি।
আমরা দীপাঞ্জনের বাড়িও ঘুরে
এসেছি। দীপাঞ্জন বলল পঞ্চু
বলে কেউ তোদের বন্ধু আছে। কে
পঞ্চু?
আমি
তো চিনি না?”
মা-ও
চেনে না। বললাম,
“পঞ্চু
আমাদের দেওয়া ডাক নাম। ওই
উকিলবাবুর...”
মা বলল,
“ও
তো তোদের চেয়ে ছোটো না খানিকটা?
কোন
ক্লাসে পড়ে?”
ছোটো
হতে পারে,
কিন্তু
তাতে আমাদের কিছু এসে যায় না।
পঞ্চু আমাদের সঙ্গে সমান তালে
খেলতে পারে।
মা বলল,
“তাহলে
এখন ওনারা কী করছেন?”
বাবা
বলল, “কিছু
তো আর করার নেই,
দীপাঞ্জন
ওদের নিয়ে গেল পঞ্চুর বাড়ি –
আমি ফিরলাম,
ফোন
নম্বর নিয়ে এসেছি। পঞ্চুর
বাড়িতে ছেলেটা না থাকলে ওরা
পুলিশে যাবে।”
পুলিশ?
কেন
পুলিশ কেন?
স্যমন্তক
কি চোর-ডাকাত
নাকি?
বাবা
বুঝিয়ে বলল,
মানুষ
হারিয়ে গেলেও পুলিশে যাওয়া
উচিত। পুলিশ হারানো মানুষকেও
খুঁজে বের করতে পারে।
কী করে?
জিজ্ঞেস
করা হল না। বাবা-মা
কথা বলতে বলতে খাবার ঘরে চলে
গেল, আমাকে
বলল, “যাও
গিয়ে শুয়ে পড়ো। কাল স্কুল আছে
না?”
গেলাম,
কিন্তু
শুলাম না। খাবার ঘর থেকে
মা-বাবার
কথা ভেসে আসছে। অস্পষ্ট। কিছু
বোঝা যাচ্ছে না। অন্ধকারেই
একটু পড়ার টেবিলে বসলাম।
তারপরে আবার বারান্দায় যাবার
জন্য দরজাটা খুললাম,
কিন্তু
ইচ্ছে করল না। তারপরে বিছানায়
বসে ভাবলাম ঘুমোনো উচিত।
কিন্তু চোখে একফোঁটা ঘুম নেই।
চটি খুলে বিছানায় পা তুলে
গুটিয়ে দেওয়ালে পিঠ দিয়ে বসে
হাঁটুর ওপর থুৎনি রেখে আবার
ভাবলাম,
ঘুমিয়ে
পড়া উচিত…
ঘুমিয়ে
বোধহয় পড়েছিলাম। নইলে হঠাৎ
ঘুম ভাঙল কী করে?
বাগানের
গেটে খটাং খটাং করে কেউ শব্দ
করছে। বাবা নিশ্চয়ই গেটে তালা
দিয়ে দিয়েছে। বিছানা ছেড়ে
উঠতে উঠতে দেখলাম রাত এগারোটা
বেজে গেছে। ও বাবা!
এতক্ষণ
ঘুমিয়েছি!
বারান্দার
দরজার দিকে যাচ্ছিলাম,
দেখলাম
বাইরের আলোটা জ্বলে উঠল। বাবা
উঠেছে। কিংবা মা। আমি ঘুরে
বাইরের ঘরে গেলাম।
বাবা
দরজা খুলে দাঁড়িয়ে আছে,
ঘরের
আলো জ্বলছে,
দরজার
বাইরের আলোটাও। দরজায় দাঁড়িয়ে
দু-জন
পুলিশ।
বাবা
বলছে,
“আমার
মেয়ে জেগে আছে কি না...”
বলে
দরজা ছেড়ে সরে গিয়ে পুলিশদের
আসার রাস্তা করে দিলো। ভেতরের
দরজায় আমাকে দেখতে পেয়ে বলল,
“তুই
ঘুমোসনি?
এই
এনারা পুলিশের লোক। তোর সঙ্গে
কথা বলতে চাইছেন।”
পুলিশ
দু-জন
ঘরে ঢুকে এল। আমাকে দেখছিল
কেমন করে। আমার একটু ভয় করল,
আমি
বাবার পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে বাবার
হাতটা ধরলাম। তবে সেরকম কিছু
জিজ্ঞেস করল না। আমার নাম কী,
কোন
স্কুলে,
কোন
ক্লাসে পড়ি,
স্যমন্তককে
কত দিন চিনি,
কাল
কেন গড়ের জঙ্গলে গেছিলাম,
শেষ
কখন স্যমন্তককে দেখেছি,
খেলা
চলার সময় দেখিনি,
কেন
– এ সব জানতে চাইল। তারপর জানতে
চাইল,
স্যমন্তক
বাড়ি না গিয়ে অন্য কোথাও গিয়ে
থাকতে পারে?
এমন
কোনও জায়গার কথা আমি জানি কি?
মাথা
নাড়লাম। একজন পুলিশ বলল,
“ও
কি কখনও বলেছে,
যে
ওর এখানে ভালো লাগে না,
আগে
যেখানে থাকত সেখানে ফিরে যেতে
চায়?”
আবার
মাথা নাড়লাম। কিছু বললাম না।
স্যমন্তক ওখানে ফিরে যেতে
চায় না। ওখানে ওকে সবাই ঘুঁটে
বলে ডাকত। বললাম না কিছু।
পুলিশটা
বলল,
“দীপাঞ্জন
বলে যে ছেলেটার সঙ্গে কাল
স্যমন্তক ছিল,
ওকে
বলেছে।”
আমার
খুব আশ্চর্য লাগল। দীপাঞ্জনকে
স্যমন্তক এ কথা বলেছে?
কেন?
আমাদের
তো কখনও বলেনি। তবে দুটো ছেলে
একসঙ্গে হলে কী কথা বলে তা তো
আমি জানি না…
পুলিশটা
জিজ্ঞেস করল,
“ভুরু
কোঁচকালে কেন?”
কুঁচকেছিলাম?
জানি
না। কিন্তু এখন বলতেই হল। আগের
জায়গায় ওর ফিরে যাওয়ার ইচ্ছের
কথা আমাদের বলেনি কখনও,
বরং
আমার ধারণা ওই স্কুল ছেড়ে এসে
আমাদের স্কুলে ওর ভালোই লাগত।
পুলিশ
দু-জন
উঠে পড়ল। মা জানতে চাইল,
“আপনারা
এখন কী করবেন?”
ওরা
বলল, “গড়ের
বাগানেই খুঁজতে হবে। ওখানেই
ছেলেটাকে দেখা গেছে শেষ। বাইরে
কোথাও হারিয়ে গেলে একরকম,
আর
কোনওভাবে আহত টাহত হয়ে যদি
ওখানেই পড়ে থাকে...”
পুলিশরা
চলে গেলে পরে বাবা-মা
আলো নিভিয়ে দিয়ে শুতে গেল।
আমিও ঘরে গেলাম,
কিন্তু
এবারে আমার ঘুম একেবারে উড়েই
গেছে। যতোবার শুই খালি মনে
হয়,
ছেলেটা
কোথায়?
কোথাও
পড়ে আছে?
পা
ভেঙে?
মাথা
ফেটে?
তারপরে
উঠে পড়লাম। একটা কথা বার বার
মনে হতে শুরু করেছে। আমাদের
খেলার মধ্যে তো দীপ আর ঘুঁটে
ছিলই না। এমন নয় তো,
যে
ঘুঁটে ওকে নিয়ে গড়ের মধ্যে
গিয়েছিল – আমাদের লুকোনো
জায়গাগুলো দেখাতে?
পাঁচিলটা
ভেঙে পড়ার পর থেকে আমরা মাঝে
মাঝে লুকিয়ে ওদিকে চলে যেতাম।
ওখানেও আমাদের লুকোনোর কয়েকটা
জায়গা আছে,
যেগুলো
আমরা কখনও বড়োদের বলিনি। যদি…
এবারে
আর থাকতে না পেরে মা-বাবার
ঘরে চলে গেলাম। বললাম,
“বাবা,
আমাকে
ওখানে নিয়ে যাবে?”
মা-বাবা
জেগেই ছিল। এক লাফে দু-জনেই
উঠে পড়ল বিছানা ছেড়ে। বাবা
বলল,
“আমারও
মনে হচ্ছিল। চল...”
মা
একবার বলল,
“তোর
কালকে স্কুলে…” তার পরে বলল,
“ছেলেটা
কোথায় গেল,
কী
করছে,
মা
বাবার কী অবস্থা...”
এর পরে
জামা-টামা
পরে বেরোতে দেরি হলো না।
৩
গিয়ে
দেখি জায়গাটা একেবারে জমজমাট।
ফটফট করে জেনারেটর চলছে,
চারিদিক
আলোয় আলো,
পুলিশের
লোক, পাড়ার
অল্প কিছু লোকজন। পুলিশ অবশ্য
চারিদিকে দড়ির বেড়া দিয়ে
সবাইকে বাইরে রেখেছে। বাবা
বলল, “ওরে
বাবা, এ
অবস্থায় আমাদের কাছেই যেতে
দেবে না।”
আমাদের
বন্ধুদের কেউ নেই। তাদের
মা-বাবাও
না। শুধু ঘেরার মধ্যে একধারে
মাটিতে বসে রয়েছে সম্যন্তকের
মা-বাবা।
তবে চেনা লোক অনেকেই আছে। আর
অচেনা লোকও। তাদের কেউ কেউ
একে তাকে ফিসফিস করে আমাকে
দেখিয়ে কী বলল।
আমরা
গিয়ে দড়িটার কাছে দাঁড়ালাম।
আলো রয়েছে অনেক,
ঘেরার
মধ্যে পুলিশও অনেক। কিন্তু
তারা কী করছে বোঝা যাচ্ছে না।
ভাবছি,
এখানে
তো কোনও পুলিশ নেই কাছেপিঠে
– এক ছুটে ঢুকে যাই?
এমন
সময় একজন পুলিশ সামনে এসে
দাঁড়াল।
“তুমি
এখানে কী করছ?”
উবু
হয়ে বসে আমাকে জিজ্ঞেস করল।
আমি
কিছু বলার আগে বাবা বলল,
“ওর
দুশ্চিন্তায় ঘুম হচ্ছিল না।
তাই...”
পুলিশটা
বলল,
“এক
মিনিট...”
বলে
হনহন করে চলে গেল। দূরে আর
একজন পুলিশের কাছে গিয়ে কী
বলল,
তারপরে
দুজনেই হেঁটে এল আমাদের কাছে।
মনে
হল যেন ইনি বড়ো অফিসার। বড়োকর্তা।
প্রথমজন বলল,
“স্যার,
এ-ই...”
বড়কর্তা
জিজ্ঞেস করল,
“তুমি
সন্ধেবেলা এখানে ছিলে?”
বললাম,
“হ্যাঁ।”
বলল,
“কোথায়
কোথায় ছিলে,
কোথায়
কোথায় লুকিয়েছিলে,
দেখাতে
পারবে?”
বললাম,
“আমরা
কে কোথায় ছিলাম বলতে পারব,
কিন্তু
ঘুঁ… দীপাঞ্জন আর স্যমন্তক
কোনদিকে গিয়েছিল তা তো প্রথমবারের
পরে আর...”
প্রথম
পুলিশ দড়িটা টেনে তুলে বলল,
“তুমি
এসো তো…” তারপরে মা-বাবাকে
বলল,
“আপনারাও
আসুন।”
মা-বাবা
মাথা নামিয়ে দড়ি পার করল। আমরা
ওদের সঙ্গে হেঁটে গেলাম ভেতরে।
স্যমন্তকের মা-বাবা
আমাদের দেখে উঠতে যাচ্ছিল,
একজন
পুলিশ হাত তুলে বলল,
“আপনারা
ওখানেই বসুন।” আমার একটু গর্ব
হল। বড়ো সাহেব আমাকে বলল,
“কোনদিকে
গেছিল স্যমন্তকরা?”
আমি
হাত তুলে দেখালাম। বললাম,
“আমরা
– মানে আমি,
তিতি,
পঞ্চু
আর পঞ্চুর ভাই ওদিকে,
ওদিকে
আর ওদিকে গেছিলাম। কিন্তু
স্যমন্তক আর দীপাঞ্জন ও-ই
দিকে লুকিয়েছিল। আমরা আলাদা
আলাদা ছিলাম,
কিন্তু
যেহেতু স্যমন্তক নতুন,
কোথায়
গড়ের পাঁচিল ভাঙা,
জানে
না,
তাই
ওর সঙ্গে দীপাঞ্জন গেছিল...”
পুলিশ
বলল,
“হুঁ।
ওদিকেই পাঁচিলটা ভাঙা। ওদিকে
ওরা ছাড়া আর কেউ যায়নি?”
গিয়েছিল।
প্রথমে পঞ্চুর ভাই কথা শোনে
না বলে আমরা যেতে চাইনি,
কিন্তু
দু-তিন
দান পরে আমি গিয়েছিলাম,
দীপাঞ্জনরা
কোথায় দেখতে। তার পরেই পঞ্চুর
ভাই…
“দেখতে
পাওনি ওদের?”
মাথা
নাড়লাম। “বেশিক্ষণ খোঁজার
সময়ও পাইনি। খেলছিলাম তো,
তার
ওপর পঞ্চুর ভাইটা দুষ্টুমি
করে বার বার বেরিয়ে পড়ছিল…
আর পঞ্চু ধরা পড়ে যাচ্ছিল।”
পুলিশরা
একটু হাসল। বলল,
“কোথায়
লুকিয়েছিলে তুমি?
চলো
দেখাও।”
আমি
নিয়ে গেলাম। এখানটাও আলো ঝলমল
করছে। মস্তো উঁচু একটা স্ট্যান্ডে
বিরাট একটা চৌকো আলো। বাবা
পরে বলেছিল এই আলোগুলো সিনেমায়
রাতকে দিন বানাতে কাজে লাগে।
স্যমন্তকের বাবা-মা
নাকি সিনেমায় কী কাজ করে।
অবশ্য তখনও জানতাম না।
ঝোপের
আড়ালে একটা পাথর। এখানেই আমি
লুকিয়েছিলাম। প্রথম পুলিশ
আমার দিক থেকে মুখ তুলে তাকাল
গড়ের দিকে। বলল,
“এখানেই
পাঁচিল ভাঙা। তোমরা কি ঠিক
বলছ,
ভাঙা
পাঁচিলটা ডিঙিয়ে ওদিকে যাওনি?”
আমি
ততক্ষণে ভেবে নিয়েছি কী করা
উচিত। বললাম,
“আমরা
চারজন কাল যাইনি। তবে...”
“যাওয়া
অভ্যেস আছে। তাই তো?”
মাথা
নাড়লাম আমি। “আমাকে ওখানে
নিয়ে যাবে?
তাহলে
আমি দেখিয়ে দেব,
আমরা
কোথায় কোথায় যাই...”
আড়চোখে
দেখলাম,
মা-বাবা
চোখ তাকাতাকি করল। বুঝলাম
পরে বকুনি জুটবে। যাক,
তখন
আর ভাবার সময় নেই। বড়োকর্তা
পুলিশ আমার দিকে হাত বাড়িয়ে
দিয়েছে,
আমি
হাতটা ধরে রওয়ানা দিয়েছি গড়ের
দিকে।
পাঁচিল
থেকে গড়টা খুব কাছে না। যেতে
যেতে দেখালাম,
ওই
পাথরটার পেছনে আমাদের আস্তানা
– ওখানে আমরা পিঙ্গলটাং খেলি।
সেটা বললাম না,
পিঙ্গলটাং
খুব কঠিন খেলা। দীপাঞ্জনের
মাথা থেকে বেরিয়েছিল। সেটা
বোঝানো যায় না। খেলে দেখতে
হয়। দেখালাম আমরা কোন গাছটায়
চড়ি। পাড়ায় কারওর বাগানের
গাছে চড়া বারণ। তাই এখানে এসে
চড়ি। ওই গাছটা চড়া সহজ,
তাই…
দেখালাম গড়ের বাইরের দিকের
ভাঙা ঘরগুলো – একবার ওখানে
পিকনিক করেছিলাম – পটেটো চিপ্স
আর কোল্ড ড্রিঙ্ক নিয়ে এসেছিলাম
বাড়ি থেকে।
সব
জায়গায় ওই সিনেমার আলো নেই,
কিন্তু
টর্চ রয়েছে। যেখানেই দেখাই,
সেখানেই
ওরা আলো ফেলে,
লোকজন
ডেকে,
খুঁজে
দেখে। ডাকে,
“স্যমন্তক,
স্যমন্তক...”
কোথাও
নেই।
আমার
আর যাবারও নেই কোত্থাও। টর্চ
নিভিয়ে বড়ো পুলিশ আমাকে জিজ্ঞেস
করল,
“এ
ছাড়া আর কোথাও যাওনি কখনও?”
যাইনি।
মাথা নাড়লাম।
আবার
টর্চ জ্বেলে গড়ের দিকে ফেলল।
বলল,
“এই
এত্তোবড়ো গড়,
এখানে
এত খেলার জায়গা,
এত
লুকোনোর কুঠরি – তোমরা কোনওদিন
আর কোথাও যাওনি?
সত্যি?”
সত্যি
যাইনি। কেন যাইনি সেটা মনে
পড়া মাত্র বললাম,
“আর
একটা জায়গা আছে…” বলে হনহন
করে হাঁটা দিলাম। একাই,
আলো
ছাড়াই।
“ওরে
দাঁড়া,
দাঁড়া...”
বলে
বাবা ছুটে এসে হাত ধরল। ছুটে
এল ওরা সবাই। আমি হনহনিয়ে
চলছি। সবাই আমার সঙ্গে চলেছে।
গড়ের ভেতরে না। বাইরেই। এখানে
আমরা এসেছিলাম একেবারে শুরুর
দিকে। তিতি প্রায় পড়েই গেছিল
ভেতরে। দীপাঞ্জনই বলেছিল,
“এখানে
কেউ আসলে পড়ে যাবে। চল,
আমরা
ঢেকে দিই।”
অনেক
খুঁজে খুঁজে একটা চ্যাপ্টামতন
পাথর এনেছিলাম টেনে টেনে।
বড়ো না,
তবে
আমার আর তিতির দ্বারা ওটা
সরানো সম্ভব ছিল না। টেনে
এনেছিল দীপাঞ্জন আর পঞ্চু।
পঞ্চুও না – দীপাঞ্জনই। গর্তটা
ঢেকে দিয়েছিলাম। এখন ওখানে
কারওর পা ঢুকে গিয়ে মচকে যেতে
পারে,
কিন্তু
কেউ ভেতরে পড়ে যাবে না।
পাথরটা
এখনও ওখানেই রয়েছে। দূর থেকে
টর্চের আলোতেই দেখা গেল। তাও
গেলাম কাছে। পাথরটা দেখিয়ে
বললাম,
“এটা।”
পা দিয়ে
ঠেলার চেষ্টা করল একজন পুলিশ।
বলল, “ভারি
আছে। এটা সরিয়ে ওইটুকু ছেলে...”
আমি
তাড়াতাড়ি হাত দিয়ে ভুঁড়িতে
ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিয়ে বললাম,
“না,
না।
আলো দাও – আলো দাও।”
এখানেও
জেনারেটরের আলো নেই। একেবারেই
অন্ধকার। কিন্তু পুলিশদের
হাতে তিন-চারটে
টর্চ জ্বলে উঠল একসঙ্গে। আমি
আঙুল দিয়ে দেখালাম। “এই দেখো।
এখানে পাথরটা সরানো হয়েছে।
পাথরের নিচের ঘাসগুলো বেরিয়ে
এসেছে। দেখো ঘাসগুলো সাদা।
আমাদের সায়েন্স ক্লাসে পড়িয়েছে।
ঘাস বা পাতা যদি পাথর চাপা
দিয়ে রাখা হয়,
তাহলে
সেগুলো সবুজ থেকে সাদা হয়ে
যায়। আমি আমাদের বাগানে দেখেছি।”
হাঁটু
গেড়ে বসে একজন পুলিশ অন্যদিকে
আঙুল দেখিয়ে বলল,
“স্যার
এখানে মাটিও ডিস্টার্ব হয়েছে।”
আমি
বললাম,
“এটা
কিন্তু খুব ভারি পাথর না। আমি
টানতে পারিনি,
কিন্তু
খানিকটা দীপাঞ্জন একাই এনেছিল।
খাড়া করে সাইডে দাঁড় করালে
টানা যায়।”
বড়ো
পুলিশ বলল,
“সরাও।”
দুজন
পুলিশ অনায়াসে পাথরটা সরিয়ে
দিল। একটা ছোটো চৌকো গর্ত।
পাথরের সিঁড়ি নেমে গিয়েছে
নিচে।
“কী
আছে ভেতরে?”
জানি
না। আমরা এর পরে আর যাইনি। এই
গর্তটা দেখেই আমরা থেমেছি।
দীপাঞ্জন বলেছিল এ নিশ্চয়ই
পুরোনো গড়ের কারাগারে যাবার
রাস্তা।
পুলিশরা
আমাদের সরিয়ে দিল। টেনে আনা
হলো একটা আলো। তারপরে এক এক
করে চারজন পুলিশ নিচে নামল,
হাতে
বন্দুক,
আর
টর্চ।
মিনিট
দশেক পরে একজন উঠে এল হাঁপাতে
হাঁপাতে। “আছে স্যার। নিচে…
আবদুল নিয়ে আসছে...”
তারপরেই
দাড়িওয়ালা একজন পুলিশ কোলে
করে তুলে আনল স্যমন্তককে।
অজ্ঞান।
৪
দিন
তিনেক পরে বড়ো পুলিশ আরও দু-জনকে
সঙ্গে নিয়ে এল আমাদের বাড়িতে।
বলল,
“এই
যে ডিটেকটিভ,
তোমার
চোখ তো সাংঘাতিক!
সাদা
আর সবুজ ঘাস দেখে ফেললে ওই
টর্চের আলোতে?
বড়ো
হয়ে পুলিশ হবে?
না
কি শার্লক হোমস?
নিদেন
ফেলুদা?”
মনে
মনে বললাম,
“মিতিন
মাসিই বা নয় কেন?”
মুখে
বললাম,
“স্যমন্তক
কিছু বলেছে?”
স্যমন্তকের
সঙ্গে আমার এখনও দেখা হয়নি।
হাসপাতালে গিয়েছিলাম দু-দিন।
একদিন বাবা নিয়ে গিয়েছিল,
আর
আজ স্যমন্তকের মা। দূর থেকে
দেখে এসেছি। পা-টা
প্লাস্টার করা। আকাশে তুলে
ঝোলানো।
পুলিশ
অফিসার বলল,
“আজ
কথা হয়েছে। স্যমন্তকের
কিছু বিশেষ মনে নেই। ওকে নিয়ে
দীপাঞ্জন ওই গর্তের কাছে
গিয়েছিল,
তারপরে
দু-জনে
মিলে পাথরটা সরিয়েছিল।
স্যমন্তককে দীপাঞ্জন বলেছিল
যে ও নাকি
অনেকবার ওই গর্তে ঢুকেছে।”
বাবা
জানতে চাইল,
“কিসের
গর্ত ওটা?”
ঠোঁট
উলটে পুলিশ কর্তা বলল,
“জানি
না, হতে
পারে কোনও দিন কোনও গুদাম
টুদাম ছিল। ছোটো একটা ঘর।
খালি। কিচ্ছু নেই।”
তারপরে
কী হল?
জানলাম
যে কী করে
নিচে পড়ে গেছে স্যমন্তক
সে আর ওর মনে
নেই। কিন্তু পড়ে যে গিয়েছে,
মাথায়
যে লেগেছে,
অজ্ঞান
যে হয়ে গিয়েছিল,
সে
বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। পা-টা
ভেঙে গিয়েছিল। যখন জ্ঞান
ফিরেছে তখন অন্ধকার। তারই
মধ্যে উঠে দাঁড়াতে গিয়ে পায়ের
ব্যথায় আবার অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল।
সেরকম কোনও সময়েই আমরা গিয়ে
পড়েছিলাম।
পুলিশ
অফিসার বলল,
“দীপাঞ্জন
ওকে ঠেলে
ফেলে না দিলেও অন্তত পড়ে যাবার
পরে আবার গর্তটা বন্ধ করে ওখান
থেকে চলে গিয়েছিল,
সে
বিষয়ে সন্দেহ নেই। ও বলছে
ভেবেছিল স্যমন্তক মরে গেছে।
খুবই রিস্ক নিয়েছিল। স্যমন্তকের
যদি পা না ভাঙত,
ও
নিশ্চয়ই সিঁড়ি বেয়ে এসে ডাকাডাকি
চেঁচামেচি
করত। দীপাঞ্জন
কেন এমন করল
তোমার কোনও আইডিয়া আছে?”
আমি
মাথা নাড়লাম। স্যমন্তক আর
দীপাঞ্জনের কোনও ঝগড়া ছিল
বলে জানতাম না।
পুলিশ
কর্তা বলল,
“দীপাঞ্জনের
মা-বাবা
এখন উকিল দিয়েছেন। ফলে দীপাঞ্জনকে
আমরা কোনও কথাই জিজ্ঞেস করতে
পারছি না। তবে শেষ যেটা শুনেছি,
সেটা
হলো এই,
যে
স্যমন্তক নাকি দীপাঞ্জনের
নাম চুরি করেছে। এই নাম চুরির
ব্যাপারে কিছু জানো?”
জানি।
বলতে হল সবটাই।
৫
আজ
দীপাঞ্জন আর আমাদের সঙ্গে
খেলতে আসে না। আমাদের স্কুলেও
পড়ে না। ওরা আর এখানে থাকেই
না। শুনেছি ও নাকি চলে গেছে
ওর খুড়তুতো না পিসতুতো ভাই
প্রতাপের স্কুলে। থাকেও ওখানেই
কোথাও,
কাছাকাছি।
আমার
ভয় ছিল স্যমন্তকের নাম দীপ
আর দীপাঞ্জনের নাম ঘুঁটে করার
আইডিয়া যেহেতু আমার মাথা থেকে
বেরিয়েছিল,
তাই
পুরো দোষটা আমার নামেই না পড়ে।
তবে তা হয়নি। যেটা হয়েছে,
সেটা
হল স্যমন্তকের মা-বাবা
আমাকে খুব আদর করেছে,
আর
দামি দামি সব উপহার দিয়েছে।
আমি আর স্যমন্তক দারুণ বন্ধু
হয়ে গিয়েছি। সেটা তিতির খুব
পছন্দ না,
তবে
তিতি আমাকে বোধহয় এত হিংসে
করে না যে আমাকে মেরে ফেলার
চেষ্টা করবে।
বড়োরা
আর দীপাঞ্জনের নাম বিশেষ করে
না। আমরাও স্যমন্তককে আর দীপ
বলে ডাকি না – শুধু মাঝে মাঝে
ভুল করে ছাড়া।
ঘুঁটে
বলে এখন আর কেউ নেই।
No comments:
Post a Comment