গভীর
সমুদ্রে,
যেখান
থেকে ডাঙা দেখা যায় না,
সেখানে
থাকত একদল তিমি। বিশাল বিশাল,
চকচকে,
সাদা-কালো
তিমি। ওরা যেমন গভীর জলে ডুব
দিতে পারত,
তেমনই
জলের ওপরেও সাঁতার কাটতে পারত
তিরবেগে। সমুদ্রের প্রাণী
ধরে খেত,
তাদের
শিকার করতে প্রায়ই চলে আসত
সাগরতীরের কাছে। সিল-মাছটা,
পেঙ্গুইনটা
ধরে খেত। কখনও মাছ বা কচ্ছপও।
ছোটো
বাচ্চা তিমিটা মার কাছে জানতে
চাইত,
“ওই
যে আট-পাওয়ালা
অদ্ভুত প্রাণীটা আমাদের দেখে
পালাচ্ছে,
ওটা
খাই?” ওর
মা বলত,
“খেতেই
পারিস। আমরা সব খাই। কিন্তু
আমার অক্টোপাস খেতে ভালো লাগে
না। দশ পা-ওয়ালা
স্কুইডও না।” বাচ্চাটা সব
শিকার ধরতে পারে না,
তার
ওপর সিলগুলো তো জো-ও-ও-ওরে
সাঁতার কাটে – বাচ্চা তিমি
ওদের কাছেই পৌঁছতে পারে না।
একদিন খপ করে একটা আট-পাওয়ালা
অক্টোপাস ধরে খেল। ভালো লাগল
না খুব। মনে মনে ভাবল,
সিল
ধরতে শিখতেই হবে।
ওর মা
ওকে বলেছে,
“সিল
শিকার সোজা নয়। ফট করে তেড়ে
যাস না। আমাদের দেখে শেখ আগে।”
ও চেয়ে
চেয়ে দেখে,
কেমন
ওর মা,
দিদিমা,
মাসিরা
এমনকি দাদা-দিদিরাও,
সাঁ
সাঁ করে তেড়ে যায়,
কেমন
ভয় পাওয়া সিলগুলোকে খপ করে
ধরে জলের ওপরে আকাশে ছুঁড়ে
দেয়, আর
ফিরে জলে পড়ার আগেই ধরে নেয়
আবার। ওর মা ওকে এনে দেয়,
বলে,
“খেয়ে
নে।”
দারুণ
খেতে। মাছের চেয়ে অনেক ভালো।
মাছ ধরতে পারে ও,
কিন্তু
খেতে ভালো লাগে না। মা ওকে
বলে, ওদের
মত অন্য তিমিরা কেউ কেউ মাছ
ছাড়া আর কিছু খায়ই না। শুনে
ওর অবাক লাগে। সিল থাকতে মাছ
খায় নাকি কেউ। বোকা নাকি!
ওর
মা বলে,
কার
কী খেতে ভালো লাগে তা দিয়ে কি
বুদ্ধি বোঝা যায়?
যায়
না।
বাচ্চা
তিমি রোজই অভ্যেস করে কী করে
সাঁই করে তেড়ে যাওয়া যায়। ও
কাছাকাছি যাওয়ার আগেই সিলগুলো
এমন জোরে সাঁতরে পালায়,
যে
ও কাছেই যেতে পারে না। হাঁপিয়ে
যায়। তবু রোজ অভ্যেস করে।
ভাবে,
কাল
– কাল ঠিক ধরে ফেলব।
একদিন,
ওদের
দলটা একটা সিলের দলকে তাড়িয়ে
নিয়ে এসেছে ডাঙার কাছাকাছি।
সন্ধে হয়ে এসেছে,
ওদের
দিদিমা বলেছে,
অন্ধকারে
আর তাড়া করতে হবে না। ডাঙার
কাছে এসে গেলে সিলগুলো ডাঙায়
উঠে যাবে।
“ডাঙায়
উঠে গেলে আমরা যেতে পারব না?”
জানতে
চাইল বাচ্চা তিমি।
মা বলল,
“না।
আমরা ডাঙায় উঠতে পারি না।
ডাঙায় চলতে গেলে মানুষের মত
পা লাগে। আমাদের তো পা নেই।”
বাচ্চা
তিমি মানুষ দেখেছে। দূর থেকে।
ওরা সাঁতার কাটে ডাঙার কাছে।
গভীর সমুদ্রে যায় নৌকো করে।
ভাবল, পা
তো সিলদেরও নেই। আমাদেরই মতন
পাখনা আছে। ওরা পারে কী করে?
দিনের
আলো নিভে এল,
সিলের
দল জল ছেড়ে ডাঙায় উঠল,
জলের
মধ্যে ভেসে ভেসে ঘুমোনর জোগাড়
করল তিমির দল। অন্ধকারে শিকার
আর শিকারী কেউই বেরোয় না।
পরদিন
ভোর না হতে বাচ্চা তিমি দল
ছেড়ে সাঁতরে গেল সমুদ্রতীরের
দিকে। ভাবল,
যদি
একটাও সিল জলে নেমে থাকে…
যেমনই নামবে,
তেমনই
ধরবে!
আস্তে
আস্তে সাঁতার কেটে ডাঙার কাছে
পৌঁছে দেখে ভোরের আধো-অন্ধকারে,
জল
যেখানে অল্প,
সেখানে
ছপছপ করছে -
একটা
সিল! একলা।
ওরই মতো।
তিরবেগে,
ঠিক
যেমন দেখেছে ওর দিদিমাকে তেমনই
তেড়ে গেল বাচ্চা তিমি। কিন্তু
সিলটা ওকে দেখে ফেলেছে। ও-ও
সাঁতার কাটছে ডাঙার দিকে।
বাচ্চা তিমি জানে,
ঠিক
ধরে ফেলবে। এই সিলটা বেঁচে
পালাতে পারবে না।
জল কমে
আসছে,
পেটে
বালির ছোঁয়া লাগছে,
আর
কি যাওয়া উচিত?
ভাবতে
ভাবতেই বাচ্চা তিমি বুঝতে
পারল আর সাঁতার কাটতে পারছে
না। ওর পাখনাগুলো জলের ওপরে
উঠে গেছে। ছোটো ছোটো পাখনা
মাটিতেও পৌঁছচ্ছে না। চোখের
সামনে ছোটো সিলটা ডাঙায় পৌঁছে
ওর সামনের পাখনা দিয়ে হিঁচড়ে
হিঁচড়ে শরীরটা টেনে চলে গেল
পাথরের আড়ালে।
সর্বনাশ!
এখন
কী করে বাচ্চা তিমি?
শরীরটা
ঘুরিয়ে আবার সমুদ্রের দিকে
ফিরতে গিয়ে বুঝল সেও সম্ভব
নয়। আটকে গেছে। ভয়ে শরীরটা
ঠাণ্ডা হয়ে গেল। চিৎকার করে
ডাকল মা-কে।
ওদিকে
সমুদ্রের জলে মা-ও
ঘুম ভেঙে দেখেছে বাচ্চা তো
পাশে নেই!
সবে
জিজ্ঞেস করতে গেছে,
কেউ
দেখেছিস,
কোথায়
গেছে,
এমন
সময় ডাক ভেসে এল। মা কোনও দিকে
না তাকিয়ে সাঁতার দিল সে দিকে।
সঙ্গে গেল ওর দাদা। দিদিমা
ডেকে বলল,
“সাবধান
– এই ভাবে দলকে দল তিমি ডাঙায়
গিয়ে আটকে যায়!”
শুনলও
না।
আর একটু
আলো ফুটলে কাছের গ্রাম থেকে
একটা ছেলে সমুদ্রের দিকে আসতে
আসতে তীরের কাছে এসে থমকে
দাঁড়াল। তারপরে ঘুরে দৌড়োল
গ্রামের দিকে আবার,
“বাবা,
বাবা,
তিনটে
বিশাল তিমি বালির ওপর পড়ে আছে।
আটকে গেছে।”
দেখতে
দেখতে গ্রামশুদ্ধু লোক এসে
হাজির হল ওখানে।
রোদ
বাড়ছে,
বাচ্চা
তিমির নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট
হচ্ছে। ছটফট করে পেটের চামড়াও
ছড়ে গেছে। চারিদিকে লোকে
দাঁড়িয়ে আছে। এমন সময় একজন
তড়বড় করে এসে বলল,
“ওদের
গায়ে সমুদ্র থেকে জল এনে ঢালো।
নইলে চামড়া পুড়ে যাবে।” বলে
হাতে হাতে কয়েকটা বালতি ধরিয়ে
দিল।
মানুষগুলো
সমুদ্র থেকে লাইন করে জল এনে
এনে ওদের গায়ে ঢালতে লাগল।
গ্রামের ডেকরেটর তড়িঘড়ি বাঁশ
আর ত্রিপল নিয়ে এসে মস্ত মস্ত
ছাউনি বানিয়ে দিল যাতে ছায়া
পড়ে।বাচ্চা তিমির একটু স্বস্তি
হল। কিন্তু নিঃশ্বাস নিতে
তখনও কষ্ট হচ্ছে। পাশে দেখতে
পাচ্ছে ওর মা আর দাদাও কষ্ট
করে শ্বাস ফেলছে।
ওদিকে
গ্রাম থেকে আর একজন ছুটে এসে
বলল, ‘তিমি
বাঁচাও সংসদ’-কে
খবর দেওয়া হয়ছে। ওরা আসছে।
বলেছে,
ওদের
গায়ে জল ঢালতে থাক। আর কিচ্ছু
করবে না। ওদের নাড়ানোর চেষ্টা
করবে না। তাতে ওদের চামড়া কেটে
ছড়ে যাবে। তার পর পেকে পুঁজ
হয়ে গেলে ওদের আর বাঁচান যাবে
না।
“ওরা
হাঁপাচ্ছে কেন?”
একটা
মানুষ বাচ্চা জানতে চাইল ওর
মা’র কাছে। মানুষ মা বলল,
“ওদের
শরীর এত ভারি যে ওদের ফুসফুসে
চাপ পড়ছে। জলে থাকলে অত চাপ
পড়ে না। কিন্তু ডাঙায় ওদের
নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হয়।”
সবাই
উদগ্রীব হয়ে দেখতে থাকে,
আসছে
কি, তিমি
বাঁচাও সংসদ?
রোদ
বাড়ে। তিমিদের কষ্ট বাড়ে।
হঠাৎ,
দূর
থেকে কে যেন দেখতে পেল,
ছুটে
এসে বলল,
“আসছে,
আসছে,
তিনটে
গাড়ি!”
তিনটে
গাড়ি,
তার
একটাতে একটা ক্রেনের মতো দেখতে
কী একটা। কাছে আসার পরে দুটো
গাড়ি নড়বড়িয়ে নেমে এল সমুদ্রের
ধারে, আর
ক্রেনওয়ালা ট্রাকটা রয়ে গেল
দূরে। তিমি বাঁচাও সংসদের
লোকেরা ছুটে এসে মোটা কাপড়
দিয়ে তিমিদের ঢেকে দিল। বলল,
“এই
কাপড়ের ওপরে জল ঢালো।” তারপরে
হাত নেড়ে ডাকল ক্রেনটাকে।
ওরা দেখে নিয়েছে,
সমুদ্রের
তীরের বালির ওপর ভারি ক্রেন
আসতে পারবে।
ক্রেন
দিয়ে প্রথমে বড়ো মা-তিমির
লেজ থেকে সমুদ্রের জল অবধি
একটা নালা কাটা হল। জল ভেসে
এল মা-তিমির
শরীরের নিচে। জলের ছোঁয়ায়
স্বস্তি পেল মা। দেখতে দেখতে
আরও দুটো নালা কাটা হল দুই
ভাই-তিমির
লেজ থেকে জল অবধি। গ্রামের
লোকে হাত লাগাল – কোদাল-বেলচা
দিয়ে টেনে টেনে বালি সরিয়ে
তিন জন তিমির নিচেই তৈরি হল
ছোটো ছোটো পুকুর। উজ্জ্বল
হয়ে উঠল তাদের ছোটো ছোটো
চোখগুলো।
তিমি
বাঁচাও সংসদের লোকেরা এবারে
গাড়ি থেকে বের করল তিনটে
মোটা-কাপড়ের
হাতা। মস্তো মস্তো হাতাগুলো
লাগানো হল তিমিদের লেজের ঠিক
ওপরে। ততক্ষণে একটা অদ্ভুত
দেখতে নৌকো এসেছে,
চ্যাপ্টা,
মস্তো
বড়ো। জলে ভাসছে খানিক দূরেই।
লম্বা লম্বা শক্ত লোহার দড়ি
দিয়ে কাপড়ের হাতাগুলো আটকে
সেগুলো নেওয়া হল লঞ্চে।
“তিনজনকেই
একসঙ্গে টেনে নিয়ে যাবে?”
জানতে
চাইল গ্রামের একজন বাচ্চা।
“না,
একসঙ্গে
তিনজনকে টানা যাবে না,”
বলল
তিমি বাঁচাও সংসদের লোক।
“প্রথমে বাচ্চাদুটোকে নিয়ে
যাব। ওরা ছোটো,
তাই
এমনিই টেনে নিয়ে যাওয়া যাবে।”
“মা
তিমিকে টানতে আর কী লাগবে?”
“দাঁড়াও,
দেখই
না।”
প্রথমে
ছোটো বাচ্চাটাকে গায়ে আটকানো
হাতার লেজের দিকের তারের দড়ি
নৌকোয় বেঁধে টেনে নিয়ে গেল
ওরা অল্প জলে। তারপরে লেজের
দিক থেকে তারগুলো খুলে হাতার
মাথার দিকে লাগানো হল।
“কেন?”
জানতে
চাইল গ্রামের বাচ্চারা।
“কারণ
তিমি পেছন দিকে সাঁতার কাটতে
পারে না,”
ওদের
বুঝিয়ে বলল সবাই। “জলে নিয়ে
পেছন দিকে টানলে ওরা ভয় পায়,
ছটফট
করে। তাতে নৌকোশুদ্ধু ডুবে
যেতে পারে।”
বাচ্চা
তিমিটাকে আরও খানিকটা টেনে
নিয়ে গিয়ে ওরা সব তার,
দড়ি,
কাপড়ের
হাতা খুলে নিল তাড়াতাড়ি। দুটো
ঢেউ এসে পৌঁছতেই বাচ্চাটা
নিজের লেজ নেড়ে আরও গভীরে
পৌঁছে গেল। কিন্তু চলে গেল
না। ওখানেই রয়ে গেল।
ওরা
তারপরে ওর দাদাকে টেনে নিয়ে
গেল জলে। কিন্তু মা-কে
নেওয়া অত সহজ হল না। মা তিমির
লেজে কাপড়ের হাতা জড়িয়ে ওরা
তার বাঁধল বটে,
কিন্তু
তারপরে মায়ের লেজের পেছনে
মস্তো একটা মোটা রবারের পাত
রেখে প্রথমে নৌকো দিয়ে টেনে
মা-কে
ওই রবারের পাতের ওপর তুলল।
তারপরে রবারের পাতে দড়িদড়া
বেঁধে সেই রবারে শোয়ানো মা
তিমিকে টেনে নিয়ে গেল জলে।
সেখানে আবার দড়ি খুলে রবারের
পাতের মাথার দিকে লাগিয়ে আরও
গভীরে টেনে নিয়ে গেল মা তিমিকে।
সেখানে মা তিমিও নিজেই সাঁতার
কেটে চলে গেল দুই ছেলের সঙ্গে।
ডাঙায়
দাঁড়িয়ে সকলে উল্লাসে ফেটে
পড়ল। তিমি সংরক্ষণ সমিতির
লোকেরা আনন্দে একে অপরের হাতে
হাতে তালি দিয়ে হইহই করে উঠল।
গ্রামের লোকেরাও এ ওকে জড়িয়ে
ধরে আনন্দ করল। বাচ্চারা
ছুটোছুটি করে বাচ্চাদের মতো
চিৎকার করল।
তারপরেই
এক আশ্চর্য দৃশ্য!
একে
একে সব কজন তিমি জল থেকে লাফিয়ে
উঠে আবার জলে ঝপাং করে আছাড়ে
পড়ল। সাগরতীরে দাঁড়ান সবাই
আবার হাত তুলে চেঁচিয়ে উঠল।
“কী
করছে ওরা,
মা?”
জানতে
চাইল একজন বাচ্চা।
“ওদের
বাঁচিয়েছি আমরা,
তাই
থ্যাঙ্ক ইউ বলছে,”
বলল
মানুষ মা।
গভীর
সমুদ্রে যেতে যেতে মা তিমি
ছেলেদের বলল,
“না
জেনে কক্ষনও কম জলে যাবে না।
বড়োদের কথা না শুনলে কেমন বিপদ
হয়, দেখলে
তো?”
মানুষ
বাচ্চারা বলল,
“আমরাও
বড়ো হয়ে তিমি সংরক্ষণ সমিতিতে
কাজ করতে যাব।”
1 comment:
golpo tao sundar, moral tao. kintu sone keda. khud ADAM soneni tai aaj amader ei hal.
Post a Comment